📄 হাসান বসরীর তাকওয়া
হাসান বসরী র. এভাবে দু'আ করতেন- 'হে আল্লাহ, সকল প্রশংসা আপনার জন্য। আপনি আমাদের রিযিককে প্রশস্ত করে দিয়েছেন। আমাদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। আমাদেরকে সুস্থ-সবল রেখেছেন। আমরা যা চেয়েছি, আমাদেরকে সব কিছু থেকে দান করেছেন।'
হাসান বসরী র. বলেছেন, 'যে-ব্যক্তি কামাই নিয়ে পেরেশান থাকে, কোথায় কোথায় সে ব্যয় করবে, সেটা নিয়েও সে পেরেশান হয়।'
এক ব্যক্তি এসে হাসান বসরী র.-কে জিজ্ঞাসা করলো, 'কেমন আছেন?' তিনি বললেন, 'দুটো নিয়ামতের মাঝে ডুবে আছি। একটি নিয়ামত আমার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রেখেছে। আরেকটি নিয়ামতের কারণে লোকেরা আমার প্রশংসা করে, অথচ আমার ভেতরের খবর তারা জানে না।'
এক ব্যক্তি হাসান বসরী র.-এর কাছে এসে বললো, 'আবূ সা'ঈদ, কেমন আছেন?' তিনি বললেন, 'ভালো।' লোকটি বললো, 'আপনার অবস্থা কেমন যাচ্ছে?' হাসান বসরী হাসলেন। বললেন, 'আমাকে আমার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছো? ধরো, একদল লোক একটি নৌকায় উঠেছে। মাঝ-সমুদ্রে যাওয়ার পরে তুফানের আঘাতে নৌকাটি ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। যাত্রীদের প্রত্যেকে একেকটি কাঠখণ্ড জড়িয়ে ধরে সমুদ্রের পানিতে ভাসতে লাগলো। তাদের অবস্থা কেমন হবে?' লোকটি বললো, 'মারাত্মক ভয়াবহ অবস্থা!' তিনি বললেন, 'আমার অবস্থা তাদের চেয়েও খারাপ।'
হাসান বসরী 'উমার ইবনু আব্দুিল আযীয র.-এর কাছে চিঠি লিখলেন: "জেনে রাখুন, আপনার সামনে বড় বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। এখনো সে পর্যন্ত পৌঁছোননি; কিন্তু একদিন সেগুলোর মুখামুখি হতে হবে। হয়তো মুক্তি মিলবে, নয়তো দুর্ভাগ্য ও ধ্বংস। আর মুমিনের সর্বশেষ ফিতনা হলো কবরের ফিতনা।”
📄 ফুযাইল ইবনু ইয়ায ও রাজ-দরবার
ফুযাইল ইবনু 'ইয়ায ১৯র. বলতেন, 'আমাদের জন্য তাদের দরবারে যাওয়া নিষেধ। আর যদি যেতেই হয়, তবে হক কথা বলা আবশ্যক।'
ফুযাইল ইবনু 'ইয়ায বলেন, 'প্রকৃত মুজাহিদ আলিম সে নয়, যে শাসকের দরবারে গিয়ে ভালো-মন্দ কিছু কথা বলে। পরে যখন শাহি ভোজের দাওয়াত পায় সোজা, দস্তরখানে গিয়ে শরীক হয়। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধকারী প্রকৃত আলিম তো সেই ব্যক্তি, যে শাসক থেকে দূরে থাকে।'
ফুযাইল আরও বলেন, 'কত আলিম রাজদরবারে দ্বীন ও ঈমান নিয়ে প্রবেশ করে আর শূন্য-হাতে বেরিয়ে আসে। আল্লাহ যেন আমাদেরকে দ্বীনী পরীক্ষা ও ঈমানের মুসীবত থেকে রক্ষা করেন।'
আরও বলেন, 'অনেক সময় রাজদরবারে গমনকারী আলিমের মাঝে কিছুটা দ্বীনদারি থাকে। কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে আসে রিক্ত হস্তে, নিঃস্ব হয়ে।' লোকেরা জিজ্ঞাসা করলেন-'কীভাবে?' তিনি বললেন, 'রাজার মিথ্যাচারকে সত্য বলে মাথা নাড়ায়। তার চাটুকারিতা ও মোসাহেবিতে মত্ত হয়।'
ফুযাইল ইবনু 'ইয়ায বলেন, 'যে-ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে সম্মান (তথা পালন) করবে, আল্লাহও তাকে সম্মানিত করবেন। এর জন্য আত্মীয়-স্বজন, বংশ-গৌরবের দরকার হবে না।'
টিকাঃ
১৯. বিখ্যাত বুযুর্গ ও তাসাওউফের ইমাম (১০৭-১৮৭ হি.)। অত্যধিক ইবাদতের কারণে তার উপাধি ছিলো 'আবিদুল হারামাইন'। তার শাইখদের মাঝে প্রসিদ্ধ হলেন—সুলাইমান ইবনু আ'মাশ ও সুফিয়ান সাওরী র.। 'আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক র.-সহ অনেক ইমাম তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
📄 সুফিয়ান সাওরীর দরবারবিমুখতা
মুহাম্মাদ ইবনু শাযান বলেন, 'আমি ইয়াহইয়া আল-কাত্তানকে বলতে শুনেছি, একবার ইমাম সুফিয়ান সাওরী র.-এর কাছে খলীফা মাহদীর পক্ষ থেকে একটি চিঠি আসে। ফিরতি চিঠিতে ইমাম নিজের নাম আগে লেখেন, খলীফার নাম পরে লেখেন। তখন আমরা তাকে বললাম- 'খলীফার এটা সহ্য হবে না।' ইমাম বললেন, 'আমি নিজের হাতে লিখলে এটাই লিখবো। অন্য কিছু লিখতে পারবো না।' তখন আমরা চিঠিটি নিয়ে নিলাম এবং তার মুখে বলা কথাগুলো লিখলাম।'২০
সুআইর ইবনু খিমস বর্ণনা করেন, মাক্কায় ইমাম সুফিয়ান সাওরীর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। তাঁর সঙ্গে একজন বৃদ্ধ ছিলো। আমাকে দেখে ইমাম বললেন, 'আমাকে তার (অর্থাৎ মাক্কার আমীরের) কাছে নিয়ে চলো। সে এই মুরব্বীকে উত্যক্ত করছে।' আমি বললাম, 'আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আমি আমীরের কাছে যাচ্ছি তাকে সালাম দিতে। আর তার ছেলের মৃত্যুতে সমবেদনা জানাতে। আপনি তাকে সালামও দেবেন না?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর ক্ষমা চাই।'
এরপর আমরা সবাই আমীরের কাছে গেলাম। আমি তাকে সালাম দিলাম। সমবেদনা জানালাম। কিন্তু সুফিয়ান সাওরী সালাম দিলেন না, সমবেদনাও জানালেন না; বরং আমীরকে লক্ষ করে বললেন, 'হে মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম, যদি পারো ছেলের চলে যাওয়া থেকে শিক্ষাগ্রহণ করো। এই বয়স্ক মানুষটিকে কষ্ট দেওয়ার কী দরকার?' আমীর বললেন, 'আমি তো তাকে কাযীর পদ দিতে চেয়েছিলাম আর কিছু না।' তিনি বললেন, 'তার সেটা প্রয়োজন নেই।' আমীর বললেন, 'ঠিক আছে, তাকে অব্যাহতি দিলাম।'
ইমাম সুফিয়ান সাওরী র.-কে বলা হলো-'আপনি কেন সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করেন না?' তিনি বললেন, 'সমুদ্রই যখন উত্তাল হয়, তাকে থামানোর সাধ্য কার!'২১
হাসান ইবনু 'ঈসা বলেন, 'আমি 'আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক র.-কে বললাম, যখন সুফিয়ান সাওরী র. খলীফা আবু জা'ফরের পক্ষ থেকে আসা কাযী হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে গোপনে বসরায় চলে যান, তখন হাম্মাদ ইবনু যায়দ তাকে বলেন, 'যদি আপনি তাদের কাছ থেকে না-পালিয়ে তাদের দরবারে যেতেন, তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ করতেন, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতেন—তাতে কি আপনার বেশি সাওয়াব হতো না?' তিনি বললেন, 'তারা আমাকে বশীভূত করতে চেয়েছে। তাই আমি রাজি হইনি।'
হাসান বলেন, 'আমার এ-কথা শুনে ইবন মুবারক বললেন, 'তুমি এটা কোত্থেকে জানলে?’ আমি বললাম, ‘নিশাপুরের কয়েকজন আমাকে এটা জানিয়েছে।’ তিনি বললেন, ‘সুফিয়ান এমন কিছু বলেননি।’ আমি বললাম, ‘তা হলে তিনি কেন তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন?’ ইবনু মুবারক বললেন, ‘সুফিয়ান সব সময় বলতেন— ‘এ-সব (রাজা-বাদশা) লোকদেরকে দুনিয়া ঢেলে দেওয়া হয়েছে; যখন তুমি তাদের দরবারে যাওয়া শুরু করবে, এখানে-ওখানে সম্মান ও সমাদর পেতে থাকবে; যেখানে যাবে, আদর-খাতির পাবে—বসার গদি পাবে; সব জায়গায় সারাক্ষণ লোকদের ভক্তি-শ্রদ্ধা পাবে; বলো, এত কিছুর পরেও এমন কোন হৃদয় আছে, যেটা তাদের প্রতি দুর্বল না হয়ে পারে!’ ২২
খলীফা মাহদী বিখ্যাত ইমাম ও বুযুর্গ ইবনু আবী যি’ব ২৩ র.-কে এক হাজার দীনার হাদিয়া প্রদান করেন। ইমামও সেটা গ্রহণ করেন। এটা যখন ইমাম সুফিয়ান সাওরী র. জানতে পারেন, তখন বলে ওঠেন—‘আহারে, এক হাজার দীনারের কারণে পাকড়াও হয়ে গেলো! তার বিবেক শেষ হয়ে গেলো!’
বস্তুত খলীফার এই এক হাজার দীনারের প্রস্তাব সুফিয়ান সাওরীর কাছেও আসে; কিন্তু তিনি সেটা প্রত্যাখ্যান করেন। তাকে বলা হলো—‘আপনি ওটা গ্রহণ করুন। তা হলে আর খলীফা আপনাকে ডাকাডাকি করবেন না। তা ছাড়া আপনার ও আপনার পরিবারের আর্থিক অবস্থাও এখন ভালো না।’ তখন সুফিয়ান বললেন, ‘তাদের এই দীনারকেই তো ভয় পাই। এটা ছাড়া তাদেরকে আর ভয় পাওয়ার কী আছে?’ ২৪
সুফিয়ান সাওরী র.-কে যখনই শাসকের সঙ্গে তার সম্পর্কটা সুন্দর করার কথা বলা হতো, তিনি বনী ইসরাঈলের একটি ঘটনা বলতেন। ঘটনাটি হলো—একদা ইয়াহুদীদের মাঝে একজন বাদশা, আরেকজন 'আবিদ (তথা বুযুর্গ) ছিলো। একদিন বাদশা 'আবিদ লোকটিকে ডেকে পাঠালেন। হাজির হওয়ার পরে তাকে কোনো এক বদ্ধ কক্ষে তিন দিন পর্যন্ত আটকে রাখলেন। তৃতীয় দিন বাদশা যখন আহার সম্পন্ন করলেন, দস্তরখানে রয়ে-যাওয়া অবশিষ্ট খাবার 'আবিদের কাছে পাঠাতে বললেন। কিন্তু 'আবিদ সেই খাবার প্রত্যাখ্যান করলেন। তখন বাদশার নির্দেশে আবারও তার ঘরের দরজা তিন দিন বন্ধ রাখা হলো। তৃতীয় দিন বাদশার খাবারের অবশিষ্ট অংশ 'আবিদের ঘরে পাঠানো হলো। 'আবিদ এবার সেই খাবার গ্রহণ করলেন এবং পেট পুরে খেলেন। এরপরে তার ঘরে বাদশা একজন সুন্দরী ক্রীতদাসী পাঠালেন। 'আবিদ তাকে দেখে নিজের প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন এবং দাসীটির সঙ্গে জৈবিক চাহিদা পূরণ করলেন।
এই ঘটনার পরে বাদশা 'আবিদকে তার দরবারে ডেকে পাঠালেন। উপস্থিত হলে তাকে লক্ষ করে বললেন, 'তুমিই তো সেই লোক, যে আমার ধন-সম্পদকে হারাম বলতে! এগুলো থেকে দূরে থাকতে বলতে! এখন তোমাকে জনগণের সামনে আমার পক্ষে কথা বলতে হবে।' সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজ্যের সাধারণ মানুষকে সমবেত করা হলো। 'আবিদ লোক সবার সামনে দাঁড়িয়ে বাদশার পক্ষে সাফাই গাইলো। তার দোষ-ত্রুটির পক্ষে যুক্তি দেখালো। তখন বাদশা তাকে বললেন, 'আমি বনী ইসরাঈলের বাদশা। তারা সবাই আমার অধীনস্থ প্রজা। আমি তো তোমার চেয়ে বেশি ইনসাফগার দেখছি। আমি তোমার কাছে আমার দস্তরখানের উচ্ছিষ্ট পাঠালাম, সেটা দিয়ে তুমি উদরপূর্তি করলে। এরপর তোমার কাছে আমার সবচেয়ে সুন্দরী দাসী পাঠালাম, তাকে দিয়ে তুমি তোমার কামবৃত্তি চরিতার্থ করলে। যা পেলে, সেটাই ভোগ করলে; নিজেকে এতটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে না। আমি তো (সব কিছুর ওপর ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও) তোমার তুলনায় নিজের ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণশীল।' এরপর বাদশার নির্দেশে 'আবিদের মুণ্ডপাত করা হলো।
এক ব্যক্তি সুফিয়ান সাওরী র.-এর কাছে এসে বললো, 'আপনি যদি বাদশার দরবারে যান এবং কিছু অর্থ-সম্পদ গ্রহণ করেন-ক্ষতি কী?' তিনি বললেন, 'যদি তোমাকে আমি একটি হাদীস বর্ণনা করি, এরপর সারা বছর তোমার সঙ্গে কথা না বলি-ক্ষতি কী?'
ইবরাহীম থেকে বর্ণিত-সুফিয়ান সাওরী র. ঐ ব্যক্তির জবাবে বললেন, 'জান্নাতের হুরদের জানো? তাদের কেউ কোনো জায়গা থেকে হেঁটে গেলেও চতুর্পার্শ্ব উজ্জ্বল দীপ্তিতে ভরে যায়। তুমি আমাকে এমন মূল্যবান সম্পদ দুনিয়ার তুচ্ছ সম্পত্তির বিনিময়ে ছেড়ে দিতে বলছো? তোমার সঙ্গে এক বছর আমার কথা বন্ধ থাকবে।'
সুফিয়ান সাওরী ও 'আবদুল আযীয ইবনু আবী রাওয়াদ তাদের কিছু ব্যবসার পণ্য রেখেছিলেন সেকালের প্রখ্যাত ব্যবসায়ী আবূ জা'ফরের কাছে। আবূ জা'ফর চল্লিশবারের অধিক হাজ্জ ও উমরাহ পালন করেছিলেন। একদিন আবূ জা'ফরের বাড়ির সামনে কিছু বৃদ্ধ লোক এসে উপস্থিত হলো। তাদের ভাতার দায়িত্বে-থাকা লোকটি ছিলো অসাধু। ফলে তারা আবূ জা'ফরকে অনুরোধ জানালো—তিনি যেন খলীফার সঙ্গে সেই লোকটিকে অপসারণের ব্যাপারে কথা বলেন; কিন্তু আবূ জা'ফর অস্বীকৃতি জানালেন।
পরের দিন সে-সব বৃদ্ধের সঙ্গে অনেক নারী ও শিশুও এলো। সকলে মিলে কান্নাকাটি করে আবূ জা'ফরকে অনুরোধ করলো। একপর্যায়ে আবূ জা'ফরের মন গলে গেলো এবং তিনি খলীফা মাহদীর সঙ্গে কথা বললেন। খলীফা তাকে বললেন, 'আমি তো এই ব্যাপারে কিছুই জানি না। যা-ই হোক, তারা তাদের পছন্দের লোককে এ-পদে নিয়োগ দিক।' অতঃপর খলীফা দায়িত্বে-থাকা লোকটিকে অব্যাহতি দিলেন। পাশাপাশি আবূ জা'ফরকেও তিনি অনেক সম্মান করলেন এবং নিজের ঘনিষ্ঠ বানালেন; তাকে ত্রিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দান করলেন। কিন্তু আবূ জা'ফর তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন। তখন সেগুলো উপস্থিত লোকদেরকে দেওয়া হলো। তারা আবূ জা'ফরকে বললো, 'আমরা এগুলো দিয়ে কী করবো?' তিনি বললেন, 'তোমাদের যার যার দরকার, তাকে তাকে দিয়ে দাও।' তখন পুরো অর্থ বণ্টন করে দেওয়া হলো।
এরপর আবূ জা'ফর কুফায় এলেন। সুফিয়ান সাওরী রহ. তার আসার কথা শুনতে পেলেন। আগে যখনই আবূ জা'ফর আসতেন, সুফিয়ান এগিয়ে গিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাতেন; বিদায়ের সময়ও অনেক দূর এগিয়ে দিয়ে আসতেন। কিন্তু এবার আবূ জা'ফর তাকে দেখতে পেলেন না। ফলে মনক্ষুন্ন হলেন।
একপর্যায়ে আবূ জা'ফর নিজেই সুফিয়ান সাওরীর কাছে গেলে, তাকে সালাম দিলেন; কিন্তু তিনি সালামের জবাব দিলেন না। মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। মুখে টু শব্দটি পর্যন্ত করলেন না। একপর্যায়ে তিনি রেগে উঠে গেলেন এবং দ্রুত নিজের ঘরে প্রবেশ করলেন। আবূ জা'ফর তখন চলে গেলেন। পরে সুফিয়ান সাওরীর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে একটি চিঠি লিখলেন।
চিঠিটি সুফিয়ান সাওরীর খাদেম মিহরানের কাছে দিলেন। মিহরান বলেন, 'আমি চিঠিটি সুফিয়ানের হাতে দিলে তিনি আমাকে ভর্ৎসনা করলেন। বললেন, 'তোমাকে এটা কে আনতে বলেছে?' আমি বললাম, 'আবূ 'আবদুল্লাহ! সে আমার প্রতিবেশী। আর আমার এলাকার লোক।' তখন সুফিয়ান চিঠিটি খুলে পড়লেন। এরপর কালি-কলম নিয়ে চিঠির নিচের অংশেই জবাব লিখলেন। তার জবাব ছিলো এ-কথাগুলো:
لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَاءِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ ﴾
বনী-ইসলাঈলের মধ্যে যারা কাফের, তাদেরকে দাউদ ও মরিয়ম-তনয় 'ঈসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে। এটা এ-কারণে যে, তারা অবাধ্যতা করতো এব সীমালঙ্ঘন করতো। [সুরা মায়িদা ৭৮]
এরপর তিনি আরও লিখলেন—'আমাদের পণ্য আমাদেরকে ফেরত দিন; তাতে যা লাভ হয়েছে, সেটা আপনার। মূলধন আমাদেরকে দিয়ে দিন।'
মিহরান বলেন, 'আমার ধারণা, লাভের অঙ্কটা অনেক বড় ছিলো।' মিহরান আরও বলেন, 'আবূ জা'ফরের সঙ্গে সুফিয়ানের আচরণ দেখে ইবনু আবী রাওয়াদ তার সঙ্গে কী করেন, সেটাও আমার দেখতে ইচ্ছা হলো। ফলে আমি হাজ্জের নিয়ত করলাম।' সুফিয়ানের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি আমাকে হাজ্জের অনুমতি দিয়ে দিলেন। আমি দ্রুত তার আগেই 'আবদুল আযীযের কাছে পৌঁছে গেলাম। দেখলাম—আবু জা'ফরও এসেছেন। তাকে সালাম দিলেন। কিন্তু আমি সালামের উত্তর শুনলাম না। হয়তো নিচু স্বরে উত্তর দিয়েছেন অথবা দেনইনি। তবে সুফিয়ানের মতো তিনি রাগ দেখালেন না। উভয়ে শান্ত হয়ে বসার পরে আবূ জা'ফর বললেন, 'তার (সুফিয়ান) চিঠির জবাব দেখবেন না?' 'আবদুল আযীয চিঠিটা পড়লেন। এরপর তাকে লক্ষ করে বললেন, 'এটা একজন মজবুত ঈমানদার মানুষের চিঠি। 'ঈসা (আবূ জা'ফর), তোমার উদাহরণ কীসের মতো জানো? তোমার উদাহরণ হলো একটা শূকরের মতো। যে ছোটবেলা দুধ খেতো আর বড় হয়ে গু খায়!' ২৫
আবূ সা'ঈদ সাফফার বলেন, 'আমি এই চিঠির টুকরোটি বিশর ইবনুল হারিসকেও দেখালাম।' তিনি বললেন, 'সুফিয়ান যা করেছেন, তার জায়গায় থাকলে আমিও তা-ই করতাম।'
ইয়াহইয়া ইবনু আব্দিল মালিক ইবনু আবী গানিয়্যাহ বলেন, 'আমরা সুফিয়ান সাওরীর মজলিসে ছিলাম। হঠাৎ সেখানে এক ব্যক্তি আগমন করেন এবং সুফিয়ানকে সালাম দেন। কিন্তু সুফিয়ান মুখ ফিরিয়ে নেন। তখন লোকটি বলেন, 'আবূ 'আবদুল্লাহ, আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি আপনার অমুক সঙ্গী।' সুফিয়ান এবারও কথা বললেন না। অন্যমনস্ক হয়েই থাকলেন। বারবার চেষ্টার পরেও যখন তিনি নীরব থাকলেন, লোকটি চলে গেলো। এরপর সুফিয়ান বললেন, 'এর কাহিনি জানো? সে আমাদের সঙ্গেই বসতো। আমরা তাকে কাছে টেনে নিয়েছিলাম। ভালোবাসা দিয়েছিলাম। কিন্তু একসময় সে রাজদরবারে আসা-যাওয়া শুরু করে। তার ধারণা, আমরা এখনো তার সঙ্গে সেই আগের মতোই আচরণ করবো। এটা কি কখনো সম্ভব!'
বিশর ইবনু হারিস বলতেন- 'সুফিয়ান (সাওরী) এমন একটি কাজ করেছেন, যে-ক্ষেত্রে তিনি চিরকাল আদর্শ হয়ে থাকবেন। সেটা হলো, শাসকগোষ্ঠীকে এড়িয়ে চলা।'
সুফিয়ান সাওরী বলেন, 'মুতাররিফের ২৬ সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। তিনি তখন গাধার পিঠে ছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, 'আপনি আমাদের কাছে আর আসেন না কেন?' আমি বললাম, 'কিছু সাদাকার দায়িত্ব পেয়েছো তাই!' এ-কথা শুনে তিনি কাঁদলেন। বললেন, 'মাফ করে দিন!'
সুফিয়ান সাওরী একবার মাক্কাতে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মাক্কার গভর্নর তাকে দেখতে এসে সালাম দিলেন; কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন না। তাকে বলা হলো-'মানুষ আপনার কাছে তাদের নিকট সুপারিশের জন্য আসে... (সুতরাং তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখা দরকার)।' তিনি বললেন, 'এটা ছুটানোর জন্যই তো আমি এমন করেছি।'
সুফিয়ান সাওরী র. যখন ইয়ামানে গেলেন, তখন মা'ন ইবনু যায়িদার একজন আত্মীয় এসে তাকে সালাম দিলেন; কিন্তু তিনি সালামের উত্তর দিলেন না। উল্টো মুখের ওপর চাদর টেনে নিলেন। তখন তাঁর একজন সঙ্গী বললেন, 'সালামের উত্তরটা নিতেন। আপনার ব্যাপারে ভয় হয়।' তিনি বললেন, 'হায়াত যত দিন আছে, তত দিন থাকবো। কীসের ভয়?'
সেই আত্মীয় মা'নের কাছে গিয়ে বললেন, 'সুফিয়ানকে আপনি কিছু করবেন না?' তখন মা'ন তার কাছে নিজের ছেলেকে পাঠালেন। সে এসে মা'নের পক্ষ থেকে তাকে সালাম জানালো, অভয় দিলো। নিজেদের প্রয়োজনের কথা বললো।
সুফিয়ান সাওরী র. (খলীফা) মাহদীর দরবারে গেলেন; কিন্তু তাকে সালাম দিলেন না। খলীফা তাঁকে বললেন, 'আবূ 'আবদুল্লাহ, আমাদের সঙ্গে থাকুন। আল্লাহর শপথ, আমি 'উমার ইবনুল খাত্তাব ও 'উমার ইবনু 'আবদিল আযীযের পথেই চলবো।' সাওরী র. বললেন, 'এ-সব মন্ত্রী-সান্ত্রী নিয়ে সেটা পারবে না।' তখন (খলীফার মন্ত্রী) আবু 'উবাইদুল্লাহ বললেন, আবূ 'আবদুল্লাহ, কেন সম্ভব নয়? আপনি বিভিন্ন সময়ে আমাদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন, আমরা আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করেছি।' সাওরী বললেন, 'আমি আজ পর্যন্ত আপনার কাছে কোনো চিঠি লিখিনি।'
হাজ্জের সময় সুফিয়ান সাওরী র. মাক্কা ও মীনার মাঝামাঝি অবস্থিত মাহদীর রাজদরবারে যান, কিন্তু তাকে 'আমীরুল মুমিনীন' বলে সালাম দেননি। এতে খলীফা কিছু একটা বলেন। তখন সুফিয়ান বলেন, “উমার হাজ্জ করেছেন। পুরো হাজ্জে ব্যয় করেছেন মাত্র ষোলোটি স্বর্ণমুদ্রা। আল্লাহকে ভয় করুন।' মাহদী বললেন, 'এরা আমাকে কোথাও ছাড়বে না।' এরপর তাকে বললেন, 'আপনি চলে যান।' মাহদী আবু 'উবাইদুল্লাহকে বললেন, 'আপনি না তার সঙ্গে পত্রযোগাযোগ করেন?' সুফিয়ান বললেন, 'আমি এর কাছে কখনো চিঠি লিখিনি। সেও আমার কাছে কখনো লেখেনি।'
সুফিয়ান সাওরী এবং সুলাইমান খাওয়াস মীনাতে ছিলেন। সুফিয়ান সুলাইমানকে খলীফা মাহদীর তাঁবুতে পাঠালেন, নিজে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলেন। কিছুক্ষণ পরে সুলাইমান বের হয়ে বললেন, 'আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি। তাকে উপদেশ দিয়েছি। সে মানুক আর না মানুক, আমাদের কাঁধে যে-দায়িত্ব ছিলো, আমরা সেটা পালন করেছি। এরপর সে আমাকে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করেছিলো। আমি সেটার জবাব দিয়েছি।' সুফিয়ান বললেন, 'কিছুই করতে পারেননি।'
এবার তিনি খলীফার তাঁবুতে প্রবেশ করলেন। তাকে আদেশ-উপদেশ দিলেন। খলীফা তাকে কাছে বসতে বললেন। তিনি বললেন, 'যেটা আপনার নয়, সেটা আমি মাড়াতে পারবো না।' তখন খলীফা ভৃত্যকে বললেন, 'এটা উঠিয়ে নাও।' গালিচা উঠিয়ে নেওয়ার পরে সুফিয়ান খলীফার একেবারে কাছে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বললেন, নসীহত করলেন।
একপর্যায়ে খলীফা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'অমুক মাসআলাতে আপনার মতামত কী?' সুফিয়ান বললেন, 'এই হাজ্জের সফরে বিনা অনুমতিতে আপনি নবীজীর উম্মতের যত সম্পদ ব্যয় করেছেন, সে-ব্যাপারে আপনার মতামত কী?' 'উমার ইবনুল খাত্তাব নিজে ও তার সকল সঙ্গীরা হাজ্জ করেছেন মাত্র ষোলোটি স্বর্ণমুদ্রা খরচ করে। এরপরেও তিনি বলেছেন, 'আমরা বাইতুল মাল থেকে কতগুলো টাকা খরচ করে ফেললাম!'
সুফিয়ান সাওরী র.-এর এ-কথা শুনে মন্ত্রী আবূ 'উবাইদুল্লাহ বলে উঠলো, 'আপনি আমীরুল মুমিনীনের সঙ্গে এভাবে কথা বলছেন?' তিনি বললেন, 'ফেরাউনকে তো হামানই ধ্বংস করেছে (কিংবা বললেন, হামানকে তো ফেরাউনই ধ্বংস করেছে)।' সুফিয়ান সাওরী র. বেরিয়ে আসার পরে আবূ 'উবাইদুল্লাহ হারুনুর রশীদকে বললো, 'আমীরুল মুমিনীন, আপনার সঙ্গে সে এভাবে কথা বললো?' হারুন বললেন, 'চুপ থাকো! আল্লাহর শপথ, যাকে দেখলে লজ্জা লাগে, এমন এই একজন মানুষই পৃথিবীতে আছে...'
সুফিয়ান সাওরী র.-কে একবার মাক্কাতে খলীফা আবূ জা'ফরের ছেলে মাহদীর তাঁবুতে ডাকা হলো। যুবরাজের সঙ্গে আরও একজন লোক ছিলো। সুফিয়ান সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন, 'আল্লাহকে ভয় করুন। আমীরুল মুমিনীন 'উমার ইবনুল খাত্তাব সম্পূর্ণ হাজ্জ আদায় করেছেন মাত্র ষোলোটি স্বর্ণমুদ্রা খরচ করে। আর আপনি তো এখনো সে-পর্যন্ত যেতেই পারেননি (অর্থাৎ এখনো খলীফা হননি)। তার ভেতরেই এত পাইক-পেয়াদা নিয়ে এসে তাদের জন্য মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় কোষ থেকে পয়সা খরচ করছেন! এভাবে আপনার দ্বীনকেই বরবাদ করছেন।' এ-সময় যুবরাজ সুফিয়ান সাওরীকে লক্ষ করে বললেন, "আবূ 'আবদুল্লাহ, আমি তাদের কাউকে আসতে বলিনি। তারা সবাই আমীরুল মুমিনীনের অনুসরণ করেছে। আমার এখানে কিছুই করার নেই।' সুফিয়ান বললেন, 'যদি আপনার কিছুই করার না থাকে, তবে ঘরে থাকলেই তো পারেন; সেটাই আপনার জন্য ভালো।' এ-কথা শুনে যুবরাজ চটে গেলেন। বললেন, 'সুফিয়ান, আপনি তো এটাই চান, যেন আমরাও আপনার মতো জুব্বার ভেতরে থাকি।' সুফিয়ান সাওরীর গায়ে তখন মোটা একটি জুব্বা ছিলো। তিনি বললেন, 'আমার জুব্বার মতো হওয়ার দরকার নেই। আপনারটার চেয়ে ছোট আর আমারটার চেয়ে বড় হলেই হবে।'
তখন যুবজরাজের সঙ্গে-থাকা মন্ত্রী কথা বলতে শুরু করলো। বললো, 'আবূ 'আবদুল্লাহ, হাজ্জের অমুক মাসআলাতে আপনার কী মতামত?' কিন্তু তিনি জবাব দিলেন না। জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কে?' যুবরাজ বললেন, 'তিনি আবূ 'উবাইদুল্লাহ।' আবূ 'উবাইদুল্লাহ তখন সুফিয়ানকে লক্ষ করে বললেন, 'আবূ 'আবদুল্লাহ, আপনি আমার কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন; আমি আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করেছিলাম।' সুফিয়ান বললেন, 'আমি আপনার কাছে কখনো কোনো চিঠি পাঠাইনি।' অতঃপর তিনি প্রস্রাবের কারণ দেখিয়ে বের হয়ে এলেন। ২৭
হাজ্জের মৌসুমে সুফিয়ান সাওরী মাহদীকে বললেন, 'হাজ্জে কত টাকা ব্যয় করেছেন আপনি?' মাহদী বললেন, 'জানা নেই।' সুফিয়ান বললেন, 'কিন্তু 'উমার ইবনুল খাত্তাব মাত্র ষোলোটি দীনার ব্যয় করেছেন। তিনি গাছের ছায়াতে বিশ্রাম নিতেন। আর আপনি মানুষকে কষ্ট দিচ্ছেন। এ-সব তাঁবু, শামিয়ানা-এগুলো কী?' তখন মাহদী তাকে বললেন, 'সুফিয়ান, আপনি কি চান জগতের সকল মানুষ আপনার মতো পোশাক পরবে?' সুফিয়ান বললেন, 'আমারটার চেয়ে বড় পরুন, আপনারটার চেয়ে ছোট পরুন।'
'আব্বাস ইবনু কাসীর সুফিয়ান সাওরী র.-এর সঙ্গে কথা বলছিলেন। আলোচনা-প্রসঙ্গে বলেন, 'আমি (খলীফা) আবূ জা'ফরের দরবারে গিয়ে বলেছি-'আপনি আবূ 'উবাইদুল্লার মতো লোকদেরকে মুসলমানদের নেতৃত্বে বসান? আমাদেরকে বললে আমরা সুফিয়ান সাওরীকে আপনার কাছে নিয়ে আসতাম। আওযা'ঈর কাছে চিঠি লিখতাম, তিনি চলে আসতেন। এ-সবের কোনো বিনিময় লাগতো না। আপনার কাছে আমরা রিযিক চাই না।' তখন খলীফা বললেন, 'আমি যখন বসরাতে আসবো, আমাকে মনে করিয়ে দেবেন।' এ-সব কথা শুনে সুফিয়ান 'আব্বাদকে লক্ষ করে বললেন, 'আবূ জা'ফরের মতো মানুষের সামনে আমার কথা তুলেছেন!' 'আব্বাদ বললেন, 'আমি তো ভালোর জন্য করেছি।' তখন তার অশ্রুতে মুখ ভিজে যাচ্ছিল!
সুফিয়ান সাওরী র. খলীফা ইবনু আবী জা'ফরের দরবারে গেলেন। প্রথাগত শ্রদ্ধপ্রদর্শন না-করে কেবল বললেন, 'আস-সালামু আলাইকুম।' এতে খলীফা মুচকি হেসে বললেন, 'আপনার প্রয়োজন বলুন।' সুফিয়ান বললেন, 'পুরো দুনিয়া তো যুলুম দিয়ে ভরিয়ে ফেলেছেন! আল্লাহকে ভয় করুন। সময় থাকতে এগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন।' খলীফা বললেন, 'কীভাবে করবো?' সুফিয়ান বললেন, 'আপনি ঘরে বসে থাকবেন আর অন্য মানুষকে দিয়ে বাইরের সব কাজ করাবেন, তাতে হবে কীভাবে?' খলীফা বললেন, 'আমি সেটা পারবো না। আপনার প্রয়োজন বলুন।' সুফিয়ান বললেন, 'মুহাজির, আনসার ও তাবে'ঈদের পরিবার আপনার প্রাসাদের দরজায় অপেক্ষমাণ। তারা যুলুমের শিকার। আল্লাহকে ভয় করুন। তাদের অভিযোগ-আপত্তি শুনুন। তাদের সমস্যার সমাধান করুন।' সুফিয়ান বলেন- এরপর আমি বসলাম। আমার মনে হলো, তখন আমি চলে গেলেও খলীফা নিষেধ করবেন না। ফলে আমি উঠে বেরিয়ে আসতে লাগলাম। আবূ 'উবাইদুল্লাহ (মন্ত্রী) আমার পেছনে পেছনে আসতে লাগলেন। বললেন, 'আমীরুল মুমিনীনের কাছে আপনার প্রয়োজন পেশ করুন।' আমি বললাম, 'আমার কোনো প্রয়োজন নেই। যা ছিলো, বলে দিয়েছি।'
ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ামান বলেন, 'সুফিয়ান সাওরী র. যখন ইবরাহীম ইবনু আদহামের সঙ্গে বসতেন, কথা বলতে সংকোচ করতেন। বিশর বলেন-'কারণ, তিনি তার মর্তবা জানতেন।'
সুফিয়ান সাওরী র. বলেন, 'কত দিন তোমাদেরকে এভাবে উটের মতো টানতে হবে? ওয়ায়িযীনদের ক্লান্ত বানিয়ে ফেলেছো। তোমাদের অবস্থা কানা উটের মতো, যার কোনো কিছুতে ভ্রুক্ষেপ নেই।'
সুফিয়ান বলেন, 'মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি' এবং মালিক ইবনু দীনার এক জায়গায় একত্র হলেন। মালিক বললেন-'আমার এমন ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা হয়, যার কাছে মাত্র একদিনের খাবার আছে।' ইবনু ওয়াসি' বললেন- 'তারচেয়েও আমার ঈর্ষা হয় এমন ব্যক্তির প্রতি, যে সকালে ক্ষুধার্ত, সন্ধ্যায়ও ক্ষুধার্ত-অথচ আল্লাহ তাআলা তার ওপর সন্তুষ্ট।'
সুফিয়ান সাওরী র. 'আব্বাদের কাছে চিঠি লিখলেন:
'সুফিয়ান ইবনু সা'ঈদ থেকে 'আব্বাদ ইবনু 'আব্বাদ বরাবর।
পরকথা-আমরা এমন একটি যুগে অবস্থান করছি, যে-যুগ থেকে মুহাম্মাদ -এর সাহাবীরা আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতেন। অথচ তাদের যে-জ্ঞান ছিলো, আমাদের সেটা নেই। দ্বীনের প্রতি তাদের যে-নিবেদন ছিলো, আমাদের সেটা নেই। এই জ্ঞান, বিচক্ষণতা ও সবরের স্বল্পতা নিয়েই, ভালো কাজে সহায়তাকারীর অভাব নিয়েই, মানুষের চারিত্রিক বিচ্যুতি ও বিশৃঙ্খলা, দুনিয়ার আবিলতা ও পঙ্কিলতা নিয়েই আমরা সে-যুগে চলে এসেছি! তা হলে আমাদের কী অবস্থা হতে পারে! তাই ঈমানের ওপর অটল থাকুন। প্রসিদ্ধি থেকে দূরে থাকুন। কারণ, এটা প্রসিদ্ধির আলো থেকে দূরে থাকার যুগ।
আর নির্জনতা অবলম্বন করুন। একা থাকুন। তাদের (অর্থাৎ শাসক) থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করুন। 'উমার ইবনুল খাত্তাব বলতেন, 'তোমরা লোভ-লালসা থেকে দূরে থাকো। কেননা, লোভ হলো দারিদ্র্য। আর লোভহীনতা হলো সমৃদ্ধি। আর একাকীত্বের মাঝে রয়েছে অসৎসঙ্গ থেকে মুক্তি।' সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব র. বলতেন-'নির্জনতা হলো ইবাদত।'
আগের দিনে মানুষ পারস্পরিক ওঠাবসা ও সংস্পর্শের মাধ্যমে উপকৃত হতো। আর এখন সেই দিন চলে গেছে। আমার মতে, এখন মানুষের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকার মাঝেই মুক্তি।
আমীর-উমরাদের ধারে-কাছেও যাবেন না। কোনো কিছুতে তাদের সঙ্গে মিশবেন না। এই ধোঁকায় পড়বেন না যে, তাদের কাছে গেলে সুপারিশ করে কোনো মযলূমকে সহায়তা করবেন। কেননা, ওটা শয়তাদের ধোঁকা। এটাকে অসৎ আলিমরা (শাসকের কাছে যাবার) সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে। বলা হতো- 'মুর্খ 'আবিদ আর অসৎ আলিমের ফিতনা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, তাদের ফিতনা হলো বড় ফিতনা।' আর মাসআলা-মাসায়েল যা শিখেছেন ও দিয়েছেন, তা-ই যথেষ্ট। এ-ব্যাপারে তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবেন না।
আর এমন ব্যক্তি হবার খায়েশ করবেন না, যে চায়—মানুষ তার কথার ওপর 'আমাল করুক, তার কথা প্রচারিত হোক, তার বক্তব্য মানুষ শুনুক। কারণ, ওগুলো না-করা হলেই তার প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে।
নেতৃত্বের লোভ পরিত্যাগ করুন। কেননা, নেতৃত্বের লোভ স্বর্ণ-রৌপ্যের লোভের চেয়েও মারাত্মক। এটা এমন এক গোপন ফাঁদ, যা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন আলিম ব্যতীত কেউ ধরতে সক্ষম হয় না। একবার এ-ফাঁদে পা দিলে নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন। আর সব সময় নিয়তের প্রতি যত্নবান থেকে কাজ করুন। হাসান বসরী র. বলতেন—'আল্লাহ তাআলা ঐ বান্দাকে রহম করুন, যে তার নিয়তের প্রতি যত্নবান। কারণ, নিয়ত ছাড়া বান্দা কোনো কাজ করে না। যদি তার জন্য কল্যাণকর হয়, তবে সেটা করে। আর যদি ক্ষতিকর হয়, তবে সেটা থেকে বিরত থাকে।'
আর মানুষের প্রশংসায় প্রতারিত হবেন না। কারণ, নিয়ত সব সময় সমান থাকে না। একবার তাউসকে বলা হলো—'আমাদের জন্য দু'আ করুন।' তিনি বললেন, 'এখন আমি সেটার জন্য ইখলাস অনুভব করছি না।'
রিয়া ও লৌকিকতা থেকে বেঁচে থাকুন। কারণ, রিয়া পিঁপড়ার চেয়েও সঙ্গোপনে হৃদয়ে প্রবেশ করে।
হুযাইফা বলতেন, 'এমন একটি যুগ আসবে, যে-যুগে কেবল সে-ব্যক্তিই রেহাই পাবে, যে ডুবন্ত ব্যক্তির মতো (পূর্ণ নিষ্ঠা, নিবেদন ও কায়মনোবাক্যে) দু'আ করবে।' হুযাইফা -কে জিজ্ঞাসা করা হলো—'কোন ফিতনা অধিক ভয়ংকর?' তিনি বললেন, 'তোমাকে ভালো ও মন্দ দু'টি প্রস্তাব দেওয়া হবে, অথচ তুমি কোনটা গ্রহণ করবে, সেটাই বুঝতে পারবে না।'
রাসূল থেকে বর্ণিত হয়েছে—তিনি বলেন, "এই উম্মতের ওপর তত দিন পর্যন্ত আল্লাহর হাত ও নিরাপত্তা থাকবে, যত দিন তাদের ভালো লোকেরা খারাপ লোক থেকে দূরে থাকবে; যত দিন তাদের সৎ মানুষগুলো অসৎ মানুষগুলিকে সম্মান করা থেকে বিরত থাকবে; যত দিন তাদের আলিমরা শাসকগোষ্ঠী থেকে বিমুখ থাকবে। কিন্তু যখন তারা এগুলোতে লিপ্ত হবে, আল্লাহ তাদের থেকে নিজের হাত ও নিরাপত্তা উঠিয়ে নেবেন। তাদের ওপর যালিম লোকদেরকে চাপিয়ে দেবেন, যারা তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেবে। আর তিনি তাদেরকে দারিদ্র্য ও অভাবের মাঝে ফেলবেন। তাদের হৃদয়ে ভয় ঢেলে দেবেন।" ২৮
হুযাইফা বলেন, 'তোমাদের ওপর ফিতনা ধারাবাহিকভাবে আসতে থাকবে। একটা শেষ না-হতেই আরেকটা এসে ব্যস্ত করে ফেলবে। তাই মৃত্যুই যেন হয়। তোমার মন ও ধ্যানের কেন্দ্রবিন্দু। আশা কমিয়ে ফেলো। মৃত্যুকে অধিক স্মরণ করো। কেননা, যখন মৃত্যুকে স্মরণ করবে, দুনিয়ার সব কিছু গুরুত্বহীন হয়ে যাবে। 'উমার বলেন, 'মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো। কারণ, সেটা বেশিকে কমিয়ে দেয় আর কমকে বাড়িয়ে দেয়। ২৯ মৃত্যু মানুষের কাছাকাছি চলে এসেছে। এমন অনেক বিষয় সামনে আসবে, যখন মানুষ মৃত্যুকেই কামনা করবে।
আসসালামু আলাইকুম।
শু'আইব ইবনু হারব বলেন, আমি সুফিয়ান সাওরীকে আমার পিতার মীরাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি আমাকে বললেন, 'ওটা গ্রহণ কোরো না।'
শুবাইব ইবনু হারব বলেন, 'আমি সুফিয়ান সাওরীকে বললাম, 'তাদের (শাসকদের) সঙ্গে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। আমি কি (মুদারাবা) ব্যবসার জন্য তাদের কাছ থেকে সম্পদ গ্রহণ করতে পারবো?' তিনি আমাকে বললেন, 'তাদের সম্পদের পাহারাদার হোয়ো না।'
আহমাদ ইবনু হাম্বল র. সুফিয়ান সাওরী র.-এর নাম উল্লেখ করে বললেন, 'আমার হৃদয়ে তার উপরে কেউ নেই!'
মাহমূদ ইবনু গাইলান বলেন, 'আমি মুআম্মাল ইবনু ইসমাঈলকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের উত্তর দিলেন না। আমি দ্বিতীয়বার সালাম দিলাম, কিন্তু তিনি এবারও উত্তর দিলেন না। আমি বললাম, 'কী হয়েছে?' তখন তার পাশে-থাকা এক ব্যক্তি বললেন, 'জানো, সুফিয়ান কী বলেছেন? তার কাছে যখনই কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে সংবাদ আসতো যে, সে শাসকের দরবারে গিয়েছে, তিনি তাকে উপদেশ দিতেন, সতর্ক করতেন। যদি না শুনতো, তার সঙ্গ ত্যাগ করতেন।'
একবার আয়েজ ইবনু 'আমর যালিম শাসক আবূ মুসলিম খুরাসানীর ৩০ রাজকীয় ভোজসভায় শরীক হলেন। খাবারের পরে তিনি আবূ মুসলিমকে বিভিন্ন উপদেশ দিলেন। 'আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক র. এ-ঘটনা জানতে পেরে বললেন, 'সুফিয়ান সাওরীর (শাসককে) এড়িয়ে চলা আমাদের কাছে (শাসকদের সংস্পর্শে যাওয়া এবং তাদেরকে উপদেশ-দানকারী) ইবরাহীম আস-সায়েগের উপদেশ থেকে অধিক প্রিয়।'
আহমাদ ইবনু ইউনুস বর্ণনা করেন-আমাকে আবূ শিহাব বলেছেন যে, তিনি সুফিয়ান সাওরীকে বলতে শুনেছেন- 'যদি সে তোমাকে সূরা ইখলাস পড়তে ডাকে, তাও যাবে না।' আমি আবূ শিহাবকে জিজ্ঞাসা করলাম, "সে' বলতে কে?' তিনি বললেন, 'বাদশা!'
আবূ হাম্মাম বলেন, 'আমি সা'ঈদ ইবনু 'আবদুল আযীয আত-তানূখীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। কথাপ্রসঙ্গে তিনি সুফিয়ান সাওরী র.-এর আলোচনা করলেন। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, 'তুমি জানো, সুফিয়ান আমাকে কী বলেছেন? তিনি বলেছেন-'যদি তারা তোমাকে কুরআন পড়তে ডাকে, তাও তাদের কাছে যাবে না।' আবূ হাম্মাম বলেন, 'পরবর্তীতে মাক্কা গেলে সুফিয়ান সাওরী র.-এর সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ করি। সুফিয়ান আমাকে বলেন, 'যে-ব্যক্তি রাজা-বাদশার সংস্পর্শে যায়, তার সংস্পর্শে যেয়ো না।'
'আবদুর রাযযাক বর্ণনা করেন-'আমি সুফিয়ান সাওরীকে বলতে শুনেছি যে, তিনি (খলীফা) আবূ জা'ফরের দরবারে যান; কিন্তু তাকে সালাম দেননি।'
'আবদুর রাযযাক থেকে আরও বর্ণিত-সুফিয়ান সাওরী র. বলেন, 'আমি (খলীফা) আবূ জা'ফরের দরবারে যাই; কিন্তু তাকে সালাম দিইনি।' তিনি আমাকে বললেন, 'আপনার প্রয়োজন পেশ করুন।' আমি বললাম, 'যুলুম-নির্যাতন দিয়ে দুনিয়া ভরিয়ে ফেলেছেন। আল্লাহকে ভয় করুন।'
হুসাইন ইবনু মু'আযের ভ্রাতুষ্পুত্র (ইবনু খুলাইফ বসরী) বর্ণনা করেন— একবার আমি মাক্কাতে চাচার সঙ্গে ছিলাম। আমরা সুফিয়ান সাওরী র.-এর সঙ্গে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার চাচা সাধারণ পোশাক খুলে দামি পোশাক পরলেন। সুফিয়ান র.-এর কাছে গিয়ে চাচা তাকে সালাম দিলেন। তিনি চাচার দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেললেন, কিন্তু সালামের জবাব দিলেন না। শুধু এটুকু বললেন, 'সালামের বিনিময়ে সালাম।' এরপর বেশ কিছু সময় আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন না, আমাদের দিকে তাকালেন না—এমনকি বসতেও বললেন না! তখন চাচা বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! আবূ 'আবদুল্লাহ, আল্লাহ তাআলা তো কুরআনে বলেছেন— “যখন তোমাদেরকে সালাম দেওয়া হয়, তখন আরও উত্তমভাবে কিংবা সমানভাবে তোমরা সালামের জবাব দাও।” সুফিয়ান র. কেবল এতটুকু বললেন, 'সালামের বিনিময়ে সালাম।' তখন আমি চাচার গায়ে-থাকা চাদর, লুঙ্গি ও জুতা হিসাব করে দেখলাম—সাত কিংবা পাঁচটি রৌপ্যমুদ্রার সমান হবে। ফিরে আসার পরে আমি চাচাকে বললাম, 'উনার কাছে কেন গেলেন?' তিনি বললেন, 'চুপ থাকো। এ মানুষটি দুনিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ফলে দুনিয়াদাররা তার কাছে মূল্যহীন হয়ে গেছে।'
ফযল ইবনু দুকাইন বর্ণনা করেন—আমাদের এখানে বনু 'আমর ইবনু মুররার একজন লোক ছিলো। ডাক-বিভাগের একজন লোক তার ওপর যুলুম করে। তখন সে সুফিয়ান সাওরী র.-এর কাছে গিয়ে নালিশ করে। ফযল বলেন— সুফিয়ান লোকটিকে বললেন, 'যখন সে এখানে আসবে, আমাকে খবর দেবে। আমি তার সঙ্গে কথা বলবো।' পরে কোনো একদিন। সুফিয়ান জামে মসজিদে ছিলেন, তখন লোকটি ওখানে আসে। অভিযোগকারী তাকে বলে, 'আবু 'আবদুল্লাহ মসজিদে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।' লোকটি মসজিদে গেলে সুফিয়ান সাওরী র. তাকে বলেন, 'তার অধিকার তাকে ফিরিয়ে দাও। যুলুম কোরো না।' লোকটি বললো, 'সুফিয়ান চাওয়ার পরেও দিইনি'-মানুষের এ-কথা বলার ভয় যদি না থাকতো, তবে আমি আপনাকেও ফিরিয়ে দিতাম। কারণ, আপনি এভাবে চাইতে পারেন না।' এ-কথা শুনে সুফিয়ান লোকটিকে বিদায় দিলেন। সে অভিযোগকারীর পাওনা আদায় করে বিদায় নিলো।
ওয়াকী র. বলেন, 'একবার এক বাইয়াতের প্রেক্ষিতে সুফিয়ান সাওরীকে আটক করে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু তিনি শপথ দিতে অস্বীকৃতি জানান।'
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল র. বলেন, 'সুফিয়ান সাওরী র. মাহদীর দরবারে গিয়েছিলেন। পরে প্রস্রাবের কথা বলে বেরিয়ে এলেন।'
'আবদুর রহমান ইবনু মাহদী বলেন, 'সুফিয়ান সাওরীকে বলতে শুনেছি—'আমি একবার আবূ জা'ফরের ছেলে যুবরাজ মাহদীর কাছে যাই; কিন্তু তাকে সালাম দিইনি। এ দেখে আবূ 'উবাইদুল্লাহ আমাকে বললো, 'আমরা যখনই আপনার চিঠি পাই, আপনার প্রয়োজন পুরো করি।' আমি বললাম, 'আমি কখনোই তোমাকে কোনো চিঠি পাঠাইনি। তা হলে তুমি ওগুলো কই পেলে?”
সুফিয়ান সাওরী বলতেন—'যদি আমার জানাশোনা কম থাকতো, আমার দুঃখও কম হতো।' ৩১
সুফিয়ান ইবনু ওয়াকী বলেন, 'আমি আমার পিতাকে (ইমাম ওয়াকী' ইবনুল জাররাহ র.) বলতে শুনেছি—'সুফিয়ান সাওরী র. বলতেন, 'আমরা এখনো মাঝপথে অটল রয়েছি। যখন দেখবে মাঝপথ ছেড়ে ডানে-বামে সরে যাচ্ছি, তখন থেকে আমাদের অনুসরণ ছেড়ে দেবে।' ইমাম আহমাদকে জিজ্ঞাসা করা হলো—'ডান-বামে যাওয়ার অর্থ কী?' তিনি বললেন, 'শাসক।"
বিখ্যাত 'আবিদ ও যাহিদ শু'আইব ইবনু হারব ৩২ বলেন, 'আমার বিশ্বাস, কিয়ামতের দিন সুফিয়ান সাওরী আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হবেন। মানুষকে বলা হবে—তোমরা নবীকে পাওনি, কিন্তু সুফিয়ান সাওরীকে তো পেয়েছো!'
আহমদ ইবনু সাদাকা ওয়াসিতের এক ব্যক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন—'আমি এক রাতে ইউসুফ -কে স্বপ্নে দেখলাম। বললাম, 'হে আল্লাহর নবী, সুফিয়ান সাওরীর কী অবস্থা?' ইউসুফ বললেন, 'তিনি আমাদের নবীদের সঙ্গে রয়েছেন।৩৩
আবূ মুআবিয়া র. বলেন, 'আমি সুফিয়ান সাওরীকে স্বপ্নে দেখেছি—তিনি একটি বাগানে ছিলেন। তার মুখে ছিলো কুরআনের এই আয়াত:
وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي صَدَقَنَا وَعْدَهُ وَأَوْرَثَنَا الْأَرْضَ نَتَبَوَّأُ مِنَ الْجَنَّةِ حَيْثُ نَشَاءُ فَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ ﴾
তারা বলবে, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের প্রতি তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন এবং আমাদেরকে এই ভূমির উত্তরাধিকারী করেছেন। আমরা জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা বসবাস করব। মেহনতকারীদের পুরস্কার কতই চমৎকার!' [সুরা যুমার ৭৪]
ইবনু আবী যি'ব সুফিয়ান সাওরী র.-কে বলেন, 'আমি (খলীফা) আবূ জা'ফরকে বলেছি, 'আমি আপনার ছেলে মাহদীর চেয়ে উত্তম।' এ-কথা শুনে সুফিয়ান বললেন, 'সুবহানাল্লাহ! আপনি কীভাবে তাকে 'মাহদী' (হিদায়াতপ্রাপ্ত) বললেন?' ইবনু আবী যি'ব বলেন, 'সুবহানাল্লাহ। আল্লাহ চান তো, আমরা সবাই 'মাহদী'।'
সুফিয়ান সাওরী (খলীফা) আবূ জা'ফরের দরবারে এলেন। তখন খলীফা তাকে হাদীস বর্ণনা করতে বললেন। সুফিয়ান দু'টি হাদীস বর্ণনা করলেন। একটি বনী ইসরাঈলের হাদীস, দ্বিতীয়টি সুমদ্র-সংক্রান্ত হাদীস।
তিনি চলে যাওয়ার পরে খলীফা উপস্থিত লোকদেরকে বলরেন, 'তোমরা জানো, তিনি কেন এই দুটি হাদীস বর্ণনা করলেন?' সবাই বললো, 'না।' খলীফা বললেন, 'প্রথম হাদীসটিতে এসেছে-“তোমরা বনী ইসরাঈলের ঘটনা বর্ণনা করো; তাতে অসুবিধা নেই।” আর দ্বিতীয় হাদীসটিতে এসেছে- "তোমরা সমুদ্র সম্পর্কে কথা বলো; তাতে কোনো অসুবিধা নেই।” তাই তিনি আমাদেরকে এমন দুটি হাদীস বর্ণনা করলেন, যাতে তার অসুবিধা না হয়। ৩৪
মাররূযী বলেন, 'আমি ইমাম আহমাদ র.-কে বললাম, "আব্বাদ ইবনু কাসীর একবার ইমাম সুফিয়ান সাওরী র.-কে বললেন, 'আমি (খলীফা) আবূ জা'ফরের কাছে আপনার ব্যাপারে আলোচনা করেছি।" সুফিয়ান বললেন, 'কেন তুমি আমার ব্যাপারে তার সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে?' ইমাম আহমাদ এ-কথা শুনে বললেন, 'সুফিয়ান ঠিকই বলেছেন। সে কেন তার কথা আলোচনা করতে গেলো?'
সুফিয়ান সাওরী র. বলেন, 'যখন কোনো আলিমকে শাসকের দরবারে যেতে দেখবে, ধরে নেবে, সে একটা চোর। আর যখন কোনো আলিমকে ধনীদের কাছে যেতে দেখবে, ধরে নেবে, সে রিয়াকার (ধর্মব্যবসায়ী)।' সুফিয়ান আরও বলেন, "(সেখানে গিয়ে) যুলুমের প্রতিকার করবে কিংবা মাজলুমের সহায়তা করবে'-এই ধোঁকায় পোড়ো না। এটা ইবলীসের কৌশল। শাসকের পদলেহী আলিমরা এগুলোকেই তাদের সান্নিধ্যে যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে।'
সুফিয়ান সাওরী র. বলেন, 'ইয়াহইয়া ইবনু আবী গানিয়্যাহ বলেন— 'আমি সুফিয়ান সাওরীর সঙ্গে বসা ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে সালাম দিয়ে সুফিয়ানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। সুফিয়ান তার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে আবার নামিয়ে ফেললেন, কিন্তু হাত বাড়ালেন না। এ-অবস্থা দেখে লোকটি না-বসেই চলে গেলো। সুফিয়ান বললেন, 'সে আমাদের সঙ্গেই বসতো। পরে শুনলাম, সে তাদের (অর্থাৎ শাসকের) সঙ্গেও বসে। সে ভাবছিলো, দুই দিকই ঠিক রাখবে। যে-কেউ এমন করবে, তোমরা তার সঙ্গেও ঠিক এটাই করবে।'
সুফিয়ান সাওরী র. বলেন, 'অনেক সময় আমার এমন কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, যাদেরকে পছন্দ হয় না। কিন্তু যখন তাদের কেউ বলে, 'কেমন আছেন?', তখন মনটা গলে যায়। এই যদি হয় সামান্য খোঁজখবর নেওয়ার ফল, তা হলে এই শরীর যাদের দস্তরখানে খাবে, যাদের গালিচা মাড়াবে (অর্থাৎ শাসক ও ধনী), তাদের প্রতি হৃদয়ের কী অবস্থা হবে!'
আসসাম বলেন, 'আমি সুফিয়ান সাওরীকে বললাম, '(ইরাকের) সাওয়াদ্দে আমার কিছু আত্মীয়-স্বজন আছেন। আমি তাদেরকে আমার জমিতে কৃষিকাজ করার কথা বলতে চাচ্ছিলাম।' সুফিয়ান বললেন, 'আবূ 'আলী, এটা কোরো না। আজকে এটা করলে কালকে তোমাকে কর দিতে হবে। কর-উসুলকারীর দরজায় গেলে ভেতরে ঢুকতে পারবে না। পরে সে যখন তোমার কাছে আসবে, তুমি কথা বলার সাহস পাবে না। তখন বলবে, যদি একটা গাধা কিনতাম, তবে সেটা দিয়ে তার কাছে যেতে পারতাম। গাধা কিনবে, কিন্তু তার নাগাল পাবে না। তখন বলবে, যদি একটা তুর্কি ঘোড়া কিনতাম! ঘোড়া কিনবে, তত দিনে তুমি কর-উসুলকারীর অনুগত ভৃত্যে পরিণত হবে।'
'উবাইদুল্লাহ ইবনু 'উবাইদুর রহমান আল-আশজাঈ ছিলেন সুফিয়ান সাওরীর ঘনিষ্ঠ শাগরেদ। একবার তিনি কয়েকজন হাদীস বর্ণনাকারীকে শাসক-সম্পর্কিত কিছু হাদীস বলেন। যখন সুফিয়ান হাদীসগুলো দেখলেন, বুঝতে পারলেন, কোত্থেকে এগুলো এসেছে! তখন আশজাঈ থেকে তিনি দূরত্ব অবলম্বন করলেন।
টিকাঃ
২০. আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীস লকবধারী মুসলিম জাহানের জগদ্বিখ্যাত ইমাম আবু 'আবদুল্লাহ সুফিয়ান ইবনু সা'ঈদ আস-সাওরী (৯৭-১৬১ হি.)। কুফার ফকীহ ও মুফাসসির। বিখ্যাত যাহিদ। প্রথম সারির তাবি'অ-তাবি'ঈনদের একজন। তার শাইখগণের মাঝে প্রসিদ্ধ হলেন-ইমাম মালিক ইবনু আনাস, আইউব সাখতিয়ানী, শু'বা ইবনুল হাজ্জাজ, জা'ফর সাদিক। আর তার ছাত্রদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন-'আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, সুফিয়ান ইবনু 'উয়াইনা র.। এই বিখ্যাত ইমামও শাসকদের থেকে সর্বোচ্চ দূরত্ব রেখে চলতেন। শিকার যেমন হিংস্র ব্যাঘ্র থেকে পলায়ন করে তিনি শাসকদের থেকে সেভাবে পলায়ন করতেন। ফলে উমাইয়া খলীফা আবু জা'ফর মানসূরের জেলে ইমাম আবু হানীফা র.-এর মৃত্যু হলে আবু জা'ফর তাকে কাযীর পদ দেওয়ার প্রস্তাব করেন। তিনি এ-সংবাদ পেয়ে গোপনে কুফা থেকে মাক্কায় চলে যান। বিভিন্ন জায়গায় তাকে খুঁজে না-পেলে রাজকীয় ঘোষণা দেওয়া হয়-'যে তাকে ধরে আনতে পারবে, তাকে দশ হাজার মুদ্রা দেওয়া হবে।' তখন সুফিয়ান মাক্কা থেকে বসরাতে পালিয়ে যান। সেখান থেকে ইয়ামানে যান। এভাবে জীবনভর এক শহর থেকে আরেক শহরে পালিয়ে বেড়ান। কোনো অন্যায়ের কারণে নয়, শাসকের দেওয়া সর্বোচ্চ রাজকীয় পদ থেকে বাঁচার জন্য! এই ছিলেন আমাদের সালাফে সালিহীন। বিপরীতে আজ আমরা শাসকের একটু কৃপাদৃষ্টির জন্য নিজের আদর্শ, ঐতিহ্য বিকিয়ে দিতেও দ্বিধাবোধ করি না।
২১. অর্থাৎ শাসকের মাঝে বদদ্বীনী তৈরি হলে সেটা পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে; তখন সেটা থামানো সম্ভব হয় না। এটা ইতিহাসের চিরসত্য বিষয়। শাসক হলো একটি দেশ ও জাতির মাথার মতো; সেটা পচে গেলে পুরো জাতি পচে যায়।
২২. আল্লাহ তাআলা সালাফে সালিহীনকে রহম করুন। তারা কতটা দূরদর্শী ছিলেন। রাজদরবারে যাওয়ার শুরুটা শুভ ও বাহ্যত কল্যাণকর দেখালেও পরিণতি যে কতটা অশুভ ও ভয়ংকর, সেটা তারা অনুধাবন করে এগুলো থেকে পালিয়ে বেড়াতেন। আমরা তো আজ সেই জালেই ফেঁসে গেছি। না দ্বীন, না দুনিয়া—দুটোই বরবাদ হচ্ছে।
২৩. শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবনু আবী যি’ব (৮০-১৫৯)। ইকরিমা, শু’বা ইবনু দীনার, শুরাহবীল ইবনু সা’দ, যুহরী প্রমুখ থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। তার শাগরিদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন—‘আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক, ইয়াহইয়া আল কাত্তান প্রমুখ। বড় বড় ইমামগণ ইবনু আবী যি’বের প্রশংসা করেছেন। তন্মধ্যে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের মন্তব্য সবিশেষ প্রসিদ্ধ। ইবনু আবী যি’ব ইমাম মালিক র.-এর সমকালীন ছিলেন। আহমাদ র. বলেন, ‘তিনি হক প্রকাশে, শাসকের সামনে সত্য বলার ক্ষেত্রে মালিকের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন! আবু জা’ফর মানসূরসহ বিভিন্ন শাসকের সঙ্গে তার প্রেরণাদায়ক বিভিন্ন ঘটনা রয়েছে। সত্য প্রকাশে, অন্যায়ের প্রতিবাদে তিনি ছিলেন অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী।
২৪. সুতরাং দেখা যাচ্ছে অতীব প্রয়োজনের সময়, এমনকি আপাত কল্যাণকর কিছু দেখলেও শাসকের দয়া-দাক্ষিণ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকাই সালাফের নীতি।
২৫. শাসকের সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে, শাসকপ্রদত্ত হাদিয়া-তোহফার সঙ্গে তার নিজের সম্পত্তি মিশ্রিত হয়ে সেটার অংশ তাদের কাছে এসে যাওয়ার আশঙ্কা ছিলো। তাই তারা এতটা কঠোরতার সঙ্গে ব্যাবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন।
২৬. মুতাররিফ ইবনু তরীফ র.। ইমাম ও মুহাদ্দিস। সুফিয়ান ইবনু 'উয়াইনা র. তাকে অত্যধিক পছন্দ করতেন। তার বর্ণিত বিভিন্ন হাদীস কুতুবে সিত্তাহতে রয়েছে। এত বড় 'আলিম ও মুহাদ্দিস হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার কারণে সুফিয়ান তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন।
২৭. এটা মিথ্যা কিংবা প্রতারণা নয়; প্রকৃত অর্থেই প্রস্রাবের প্রয়োজন থাকা এবং সেই ছুতোতে শাসক থেকে দূরে থাকার কৌশল। প্রশংসনীয় কাজ।
২৮. 'আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক র.-এর যুহদ (৮২১); হাদীসটি মুরসাল
২৯. গোনাহ বেশি হলে সেটা কমিয়ে দেয়। পুণ্য কম থাকলে সেটা বাড়িয়ে দেয়। অন্য ব্যাখ্যায়, মৃত্যু সব কিছু উল্টে দেয়। প্রাচুর্য্যপূর্ণ জীবনে মৃত্যুকে স্মরণ করলে কষ্ট বাড়ে। আর দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনে মৃত্যুকে স্মরণ করলে প্রশান্তি বাড়ে।
৩০. রক্তপাত ও নৃশংসতার ক্ষেত্রে সে হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
৩১. কয়েকভাবে এ-মন্তব্যের ব্যাখ্যা করা হয়। এক. নিজ যুগের বড় ইমাম হওয়ার কারণে স্বভাবতই শাসকের নজরে পড়ে যান। খলীফাদের পক্ষ থেকে তাকে বারবার বড় বড় পদ প্রস্তাব করা হয়, কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। দেশে-বিদেশে পালিয়ে বেড়ান। তার মাথা রাজদরবারে এনে দিতে পারলে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। জীবনের অধিকাংশ সময় দুঃখ-ক্লেশে কাটে। দুই, শাসকের সঙ্গে আলেমের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, এটা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। ফলে সেই অনুযায়ী 'আমাল করতে হয়েছে। জটিলতাও তৈরি হয়েছে। যদি না জানতেন, তবে এ-পথে চলাও লাগতো না, পেরেশানিও তৈরি হতো না। তিন, আখিরাত প্রসঙ্গে বলেছেন। কারণ, সেদিন প্রত্যেককে তার 'ইলম অনুযায়ী হিসাব দিতে হবে।
৩২. শাইখুল ইসলাম ইমাম শু'আইব ইবনু হারব। ইকরিমা, মিসআর, শু'বা, সুফিয়ান-সহ বড় বড় ইমাম থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। আর তার শিষ্যদের মাঝে আহমাদ ইবনু হাম্বল, হাসান ইবনু জুনাইদ (বাদগাদী) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
৩৩. স্বপ্ন শারী'আতের দলীল নয়। স্বপ্নের দ্বারা দ্বীনী ও দুনিয়াবী কোনো বিধান সাব্যস্ত হবে না। কিন্তু ইসলাম স্বপ্নের গুরুত্ব দিয়েছে: এটিকে ওহীর অংশ বলে সাব্যস্ত করেছে। ফলে স্বপ্নের মাধ্যমে ইসতিনাস তথা মানসিক প্রশান্তি লাভ সম্ভব এবং শারী'আতে গহীত। স্বপ্নে মৃত ব্যক্তিকে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে ভালো-মন্দ জানার বিষয়টি সালাফের যুগ থেকেই প্রমাণিত। ইমাম যাহাবী র. তার মানাকিবে আবী হানীফা গ্রন্থে এমন অনেক স্বপ্নের কথাই উল্লেখ করেছেন। এগুলো দ্বারা মূলত অকাট্যরূপে গায়িব জানা উদ্দেশ্য নয়, বরং ইসতিহসান কিংবা ইতমিনান (আত্মিক যস্তি) উদ্দেশ্য।
৩৪. 'তোমরা বনু ইসরাঈলের ঘটনা বর্ণনা করো, তাতে কোনো অসুবিধা নেই'-এটি সহীহ হাদীস (আবু দাউদ ৩৬৬২; আহমাদ ২/৪৭৪)। কিন্তু সমুদ্র-সম্পর্কিত বর্ণনাটি আজলূনী কাশফুল খাফাতে বর্ণনা করেছেন (১/৪২১); এটা হাদীস নয়। সুফিয়ান সাওরী মনে করতেন- শাসকদেরকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করার ফলাফল কম। ফলে তাদের কাছ থেকে দূরে থাকতেন। অনিচ্ছায় কখনো সামনে পড়ে গেলেও কীভাবে দ্রুত বেরিয়ে আসবেন, সেই কৌশল অবলম্বন করতেন। শাসকরাও যে সেটা বুঝতেন, উপরের ঘটনাটি এরই প্রমাণ। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও সুফিয়ান সাওরীর 'ইলমী ও দ্বীনী অবস্থান এতই সমুন্নত ছিলো যে, শাসকরা তার পিছু ছাড়তেন না।
📄 আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের দরবারবিমুখতা
'আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক ৩৫ র. বলেন, 'তোমরা 'ইলম অর্জন করো। অতঃপর ওটা ছড়িয়ে দাও। কেননা, 'ইলমের মাধ্যমেই তোমরা নিয়ামতের মূল্য বুঝবে। আর যখন নিয়ামতের মূল্য বুঝবে, তখন শুকরিয়া আদায় করবে। আর যখন শুকরিয়া আদায় করবে, তখন নিয়ামত আরও বাড়বে। আর মনে মনে শক্ত করে এই পণ করো—যুহদের তালা দিয়ে তোমরা প্রবৃত্তির দরজা বন্ধ করে দেবে। বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা বিতরণ করবে। কারণ, প্রকৃত বন্ধুত্বের বড়ই অভাব। শত্রুতা—সে তো সবখানে বিদ্যমান।'
ইবনু মুবারক র. বলেন, 'একদিন একজন খোদাভীরু বুযুর্গ ব্যক্তি জনৈক কাযীর দরবারে গেলেন। দরবারে তখন কাযীর সামনে বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত আসামীদের পেশ করা হচ্ছিলো। যখনই কাযী কারও ব্যাপারে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিচ্ছিলেন, বুযুর্গ তার ব্যাপারে সুপারিশ করছিলেন। এভাবে পাঁচ থেকে ছয়জন ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পেলো। তখন বুযুর্গ সুপারিশ করতে লজ্জা পেলেন। সপ্তম ব্যক্তির ব্যাপারেও কাযী মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেন এবং সে-আদেশ কার্যকর হলো। অতঃপর কাযী বুযুর্গকে লক্ষ করে বললেন, 'আপনি জানেন, আমি কেন তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছি?' বুযুর্গ বললেন, 'না।' আমীর বললেন, 'তার ব্যাপারে রায় ঘোষণার সময় আপনি নীরব ছিলেন। কিছুই বলেননি। তাই আমি ভাবলাম, হয়তো সে আপনার সঙ্গে বড় কোনো অন্যায় করে থাকবে। সে-কারণে মৃত্যুদণ্ড দিলাম।'
ইবনু মুবারক র. বলেন, 'এ-কথা শোনার পরে বুযুর্গ মাথায় হাত দিলেন। বলতে লাগলেন—'আফসোস, তাদের সামনে চুপ থাকাও ক্ষতিকর। তা হলে কথা বলা কতটা ভয়ংকর! আল্লাহকে সাক্ষ্য রেখে বলছি, আজ থেকে আর কোনো দিন তাদের দরবারে আসবো না।'
সাকান ইবনু হাকীম মাররূযী একবার হাজ্জের সংকল্প করলেন। বের হওয়ার আগে 'আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক র.-এর কাছে গিয়ে বললেন, 'অমুক (শাসক) বরাবর আমার জন্য একখানা সুপারিশপত্র লিখে দিন।' ইবনু মুবারক বললেন, 'তার বরাবর নয়, সুফিয়ান সাওরী বরাবর একখানা পত্র লিখে দিচ্ছি।' পত্র নিয়ে সুফিয়ান সাওরী র.-এর কাছে গেলে সাকান তার কাছ থেকে অনেক উপকৃত হন।
ফেরার সময় সুফিয়ান সাওরীর কাছে বিদায় নিতে গেলে তিনি বলেন, 'আবূ 'আবদুর রহমানকে (অর্থাৎ ইবনু মুবারককে) আমার সালাম বলবে। আর তাকে এই ওসীয়তনামাটা দেবে।' সাকান ইবনু মুবারকের কাছে যথারীতি ওসীয়তনামাটা পৌঁছে দিলেন। সুফিয়ান র.-এর মৃত্যুর পরে ইবনু মুবারক র. সাকানকে ডেকে বললেন, 'ওসীয়তনামায় কী লেখা ছিলো, জানো?' সাকান বললেন, 'না।' ইবনু মুবারক আঙুলের ইশারা দিয়ে বললেন, 'তাদের ধারে-কাছেও যেয়ো না।' ৩৫
দাউদ ইবনু রুশাইদ বলেন, "আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক র. রাজদরবারে গমন নিয়ে কিছু পঙ্ক্তি রচনা করেন-
خُذْ منَ الجَارُوشِ والأرْزِ وَالخُبْز والشعير
واجْعَلنْ ذاكَ حَلالاً تنجُ مِنْ حرِ السَّعِيرِ
وانا ما اسْتَطَعْت هَذا ك الله عن دار الأمير
لا تَزُرْها واجتنبها إنها شرّ مَزُور
تُوهِّنُ الدِّين وَتَد نيك من الحوب الكبير
চাল-ডাল যা পাও, সেটা খেয়েই বেঁচে থাকো। হালালভাবে এগুলো খেয়ে বেঁচে থাকতে পারলেও পরকালের আগুন থেকে বাঁচতে পারবে। কিন্তু কখনোই রাজদরবারে যেয়ো না। সেখান থেকে সাধ্যমতো দূরে থাকো। কারণ, এর চেয়ে নিকৃষ্ট দর্শনস্থল আর নেই। এটা তোমার দ্বীনকে শেষ করে দেবে। তোমাকে নিয়ে যাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
সালামা ইবনু সুলাইমান মারওয়াযী "আবদুল্লাহ'র কিতাব পড়ছিলেন। লোকেরা বললো-'শুধু 'আবদুল্লাহ না-বলে 'আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (পুরো নাম) বলুন।' তিনি বললেন, 'মাক্কতে যখন 'আবদুল্লাহ বলা হয়, তখন তিনি ইবনু 'আব্বাস।' মাদীনাতে যখন 'আবদুল্লাহ বলা হয়, তখন তিনি ইবনু 'উমার। কুফাতে যখন 'আবদুল্লাহ বলা হয়, তখন তিনি ইবনু মাসউদ। আর খোরাসানে যখন 'আবদুল্লাহ বলা হয়, তখন তিনি ইবনুল মুবারক।'
সুফিয়ান সাওরী র. বলতেন-'আমি পূর্ণ একটি বছর 'আবদুল্লাহ ইবনু মুবারকের মতো জীবন যাপনের চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি!' ৩৬
নু'আইম ইবনু হাম্মাদ বলেন, 'আমি 'আবদুর রহমান ইবনু মাহদীকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'সুফিয়ান সাওরী আর 'আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের মাঝে আপনার কাছে কে উত্তম?' তিনি বললেন, 'ইবনুল মুবারক।' আমি বললাম, 'মানুষ তো আপনার বিপরীত কথা বলে।' তিনি বললেন, 'মানুষ নিশ্চিত হয়ে দেখেনি।' এই কথা পরে আমি বিশর ইবনুল হারেসকে বললাম। তিনি বললেন, 'আপনার কিতাব থেকে এটা মুছে ফেলুন।'
মাররূযী বলেন, 'আমি ইমাম আহমাদকে বলতে শুনেছি-খোরাসানে 'আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের মতো আর কারও জন্ম হয়নি।'
তিনি আরও বলেন, 'তাকওয়ার কারণেই আল্লাহ তাঁর মর্যাদা বুলন্দ করেছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'আবূ তুমাইলা ইবনুল মুবারকের শানে এই পঙ্ক্তি পাঠ করতেন:
كنت فخرا لمرو إذ كنت فيها
ثم صارت كسائر البلدان
আপনি যত দিন মারও-তে ছিলেন, তত দিন আপনি ছিলেন তার গর্ব। এরপর সেটা অন্যান্য শহরের মতোই হয়ে গেছে।
হাসান ইবনু 'ঈসা বলেন, 'আমি কুফাতে ইবনুল মুবারক র.-এর সঙ্গে বসা ছিলাম। এমন সময় সেখানে একজন বৃদ্ধ লোক এলেন। তার গায়ে ছিলো দামি পোশাক। চোখে-মুখে আভিজাত্যের ছাপ। সঙ্গে ছিলো একটি তুর্কি ঘোড়া। লোকটি ইবনুল মুবারকের কাছে এসে তার সঙ্গে অনেক সময় ধরে উসমান ইবনুল আসওয়াদের হাদীস নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করলেন। আমি ভাবলাম-তিনি ওটা উসমান থেকে শুনে থাকবেন। কারণ, তিনি বয়সে ইবনুল মুবারকের সমবয়সী কিংবা তার চেয়ে বড় ছিলেন।
অতঃপর তিনি ইবনুল মুবারককে লক্ষ করে বললেন, 'আবূ 'আবদুর রহমান, আল্লাহ জানেন, আপনার এই অবস্থার কারণেই আমি আপনাকে মুহাব্বত করি।' এরপর তিনি আরও বললেন, 'আপনাকে মুহাব্বতের যদি কোনো কারণই না থাকতো, তবুও শাসকগোষ্ঠী থেকে দূরে থাকার কারণে আপনাকে আমি মুহাব্বত করতাম।'
ইবনুল মুবারক প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বললেন, 'ঘোড়াটি আমার ভালো লাগেনি।' লোকটি বললেন, 'আমি মাত্রই আমীরুল মুমিনীনের আস্তাবল-তত্ত্বাবধায়কের কাছ থেকে এলাম। এটা দেখে তিনি আমাকে দুই হাজার দিরহাম দিয়েছেন।' তখন ইবনুল মুবারক মাথা নিচু করে চুপ রইলেন। কোনো কথা বললেন না। একপর্যায়ে লোকটি চলে গেলো। তখন তিনি আমাকে বললেন, 'তোমার আশ্চর্য লাগে না, তাকে দেখে! আমি শাসক থেকে দূরে থাকি বিধায় সে নাকি আমাকে মুহাব্বত করে। অথচ সে এখন তাদের দরবার থেকেই এসেছে!'
ইসমা'ঈল ইবনু আবুল 'আব্বাস বর্ণনা করেন, 'আমি কুফাতে ইবনুল মুবারক ر.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আরবরা যখন খোরাসানে আসতে শুরু করে, প্রথমে তারা সেখানকার ধনী ও সম্ভ্রান্ত লোকদের কাছে (তাদের বাড়ি ও জায়গাতে) থাকে। পরে ধীরে ধীরে তারা তাদের ধন-সম্পদ, জায়গা-জমি দখল করে নেয়। যুক্তি দিয়ে বলে, এগুলো আমাদের অর্জন। পরে তাদের মধ্যে কেউ কেউ খোরাসানীদেরকে এক তৃতীয়াংশ সম্পদ ফিরিয়ে দেয়। বাকি সম্পদ আরবদের হাতেই থেকে যায়। একপর্যায়ে আবূ মুসলিম খোরাসানী আসে এবং আরবদেরকে হত্যা করে তাদের সেই সম্পদ নিয়ে নেয়। সে-সব সম্পদের ভাগ এমন কিছু মানুষের হাতে আসে, যারা সেটা ফিরিয়ে দিতে চায়। কিন্তু কাদেরকে দেবে—আরবদেরকে দেবে, যাদের হাত থেকে আবূ মুসলিম নিয়েছিলো? নাকি খোরাসানীদেরকে দেবে, যাদের হাত থেকে আরবরা নিয়েছিলো?' ইবুনল মুবারক আমার প্রশ্ন শুনে বললেন, 'এ-প্রশ্ন কুফার কাউকে করেছো?' আমি বললাম, 'হ্যাঁ, শারীক ইবনু 'আবদুল্লাহকে করেছি।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'শারীক কী বলেছে?' আমি বললাম, 'তিনি বলেছেন, সেগুলো খোরাসানীদেরকে ফিরিয়ে দেবে, যাদের থেকে আরবরা ছিনিয়ে নিয়েছিলো।' তখন ইবনুল মুবারক চুপ থাকলেন। কিছু দিন পরে দেখা হলে আমাকে বললেন, 'আবুল 'আব্বাস, শারীক তোমাকে যে-ফাতওয়া দিয়েছেন, আমারও সেটাই সঠিক মনে হয়।'
টিকাঃ
৩৫. প্রথম সারির তাবি'অ-তাবি'ঈন ইমাম 'আবদুল্লাহ ইবন মুবারক র. (১১৮-১৮১ হি.)। বড় বড় তাবি'ঈদের কাছে 'ইলম অর্জন করেন। ইমাম আ'যম আবু হানিফা র.-এর কাছে 'ইলম ও 'আমাল শেখেন। ইমাম আ'যমের ব্যাপারে তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা রয়েছে। তার অন্য কয়েজন উল্লেখযোগ্য শাইখ হচ্ছেন—হিশাম ইবনু 'উরওয়া, আ'মাশ, সুলাইমান আত-তাইমী, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আনসারী। তার কয়েকজন শাগরিদ হচ্ছেন মা'মার ইবনু রাশিদ, ইয়াহইয়া আল- কান্ডান, ইয়াহইয়া ইবনু মা'ঈন, 'ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ। ইবনু মুবারকের উল্লেখযোগ্য একটি কিতাব—আয-যুহদ।
৩৬. যাহাবীর সিয়ার ৮/৩৮৯