📘 সালাফের দরবারবিমুখতা > 📄 আসহাবে রাসূলুল্লাহর ﷺ জীবন ও বাণী থেকে

📄 আসহাবে রাসূলুল্লাহর ﷺ জীবন ও বাণী থেকে


বসরার শাসক ইবনু 'আমির একবার শহরে এলে রাসূল ﷺ-এর কয়েকজন সাহাবী তার সঙ্গে দেখা করতে যান। কিন্তু আবূ দারদা গেলেন না। ইবনু 'আমির ভাবলেন—তিনি যখন এলেন না, আমিই তার কাছে গিয়ে তার (শাসকের সঙ্গে দেখা করার) দায়িত্বটা পালন করে আসি। এই ভেবে কয়েকজন লোক নিয়ে আবূ দারদা -এর কাছে এলেন। বললেন, 'আমার কাছে রাসূল -এর এক দল সাহাবী এসেছেন, কিন্তু আপনি আসেননি; তাই ভাবলাম, আমিই আপনার কাছে এসে আপনার দায়িত্বটা পালন করে ফেলি।

আবু দারদা মাথা উঁচু করে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আজকের মতো কখনোই তুমি আমার দৃষ্টিতে এত ক্ষুদ্র ছিলে না। আল্লাহর রাসূল আমাদেরকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন— 'যখন তোমরা বদলে যাবে, আমরাও যেন বদলে যাই।''১

'আবদুল্লাহ ইবনু 'আমিরের মুমূর্ষ অবস্থায় 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার-সহ কয়েকজন সাহাবী ও অন্যান্য লোক তাকে দেখতে গেলেন। 'আবদুল্লাহ তাদেরকে শারীরীক কষ্ট ও মানসিক দুশ্চিন্তার কথা জানালে তারা বললেন, 'আপনি সব সময় আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। মুসলমানদের কল্যাণে অনেক কাজ করেছেন। তাদের জন্য কূপ খনন করেছেন। মুসাফিরকে সাহায্য করেছেন। আরও কত কিছু করেছেন। কিন্তু ইবনু 'আমির যেন সেগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন না। তার চোখ ছিলো ইবনু 'উমার -এর দিকে। উদগ্রীব ছিলেন—তিনি কী বলেন, সেটার শোনার জন্য। ইবনু 'উমার বললেন, 'যদি আয় সুন্দর হয়, তবে ব্যয়ও সুন্দর হবে। (হিসাবের জায়গাতে) শীঘ্রই যাচ্ছেন। সেখানে গেলেই দেখবেন।'

ইবনু 'আমর নবীজী-এর কাছ থেকে বর্ণনা করেন, “ইনসাফগাররা আল্লাহর কাছে নূরের মিম্বরের ওপর পরম করুণাময় রহমানের ডানপাশে থাকবেন। আর তাঁর উভয় হাতই ডান। তারা সে-সব লোক, যারা ফয়সালার ক্ষেত্রে, পরিবারের ক্ষেত্রে, নিজেদের দায়িত্বে অর্পিত সকল কাজে ন্যায়ের ওপর থাকে।” ২

'উবাইদুল্লাহ ইবনু যিয়াদ আবূ হাতেম বলেন, 'আমি আবূ হুরাইরা-কে বলতে শুনেছি-“যে-শিক্ষক শিক্ষা দেওয়ার বিনিময় নেয়, দুনিয়াতেই তার প্রতিদান দিয়ে দেওয়া হবে। আর যদি শিক্ষা না-দিয়েই বিনিময় নেয়, তবে কিয়ামতের দিন তার নেক 'আমাল থেকে ক্ষতিপূরণ নেওয়া হবে। আর যদি (ছাত্রদেরকে) প্রহারের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করে, তবে কিসাস নেওয়া হবে। আর যদি তাদের মাঝে ইনসাফ না-করে, তবে যালিম হিসেবে সাব্যস্ত হবে। যদি শিক্ষক অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত ছাত্রকে দিয়ে কোনো কাজ করায়, তবে তাকে দায়ভার বহন করতে হবে। আর যদি শিক্ষার বিনিময়ে তার অধিকার বুঝে না পায়, তবে কিয়ামতের দিন তার (যে-ছাত্র শিক্ষকের হক আদায় করেনি) থেকে নেক 'আমাল দেওয়া হবে। আর যদি সবার মাঝে সে ইনসাফ করে, সে-শিক্ষক আদিল ও ন্যায়পরায়ণ শিক্ষক হিসেবে বিবেচিত হবে।”

যিয়াদ ইবনু হুদাইর বলেন, 'আমাকে 'উমার ইবনুল খাত্তাব জিজ্ঞাসা করলেন-'জানো, কোন জিনিস ইসলামকে ধ্বংস করে?' আমি বললাম, 'না।' তিনি বললেন-'আলিমের পদস্খলন, কুরআন নিয়ে মুনাফিকের তর্ক, আর পথভ্রষ্ট শাসকদের শাসন ইসলামকে ধ্বংস করে।'

'আবীদা বলেন, "আলী আমার ও শুরাইহের কাছে সংবাদ পাঠালেন-'আমি মতানৈক্য অপছন্দ করি। সুতরাং আগে যেভাবে বিচার করতে, সেভাবেই করতে থাকো।'³

ইমাম আহমাদ র. সূত্রে বর্ণিত—হুযাইফা বলেন, 'রাজদরবারগুলো ফিতনায় পরিপূর্ণ। একদিক থেকে জান্নাতে ঢোকায়, আরেকদিক থেকে বের করে দেয়।'৪

এক লোক ইবনু 'আব্বাস -এর কাছে এসে বললো, 'আমি বাদশার দরবারে গিয়ে তাকে উপদেশ দিতে চাই। আপনার এ-ব্যাপারে মতামত কী?' তিনি বললেন, 'দরকার নেই। ফিতনায় পড়ে যাবে।' লোকটি বললো, 'বাদশা যদি আমাকে অন্যায় করতে বলে, তখন?' ইবনু 'আব্বাস বলেন, 'তুমি তো এটাই চাচ্ছিলে। পারলে তখন তাকে দেখিয়ে দাও—কেমন পুরুষ তুমি!'

জাবের থেকে বর্ণিত—তিনি বলেন, 'আমি হাজ্জাজের দরবারে গিয়েছি। কিন্তু তাকে সালাম দিইনি।''৫

'উমার ইবনুল খাত্তাব একবার বিশর ইবনু আসিমকে সাদাকা উসুল করতে পাঠালেন। একপর্যায়ে বিশর বললেন, "উমার, আমি রাসূল -কে বলতে শুনেছি— “যে-ব্যক্তিকে মুসলমানদের কোনো দায়িত্বে নিযুক্ত করা হলো, কিয়ামতের দিন তাকে জাহান্নামের পুলের ওপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে। পুলটি তখন কাঁপতে থাকবে। যদি সে পুণ্যবান হয় তবে মুক্তি পাবে। আর যদি পুণ্যবান না হয়, তবে পুলটি ছিঁড়ে সে জাহান্নামের গভীরে পড়ে যাবে।" হাদীসটি শুনে 'উমার অস্থির হয়ে উঠলেন। বিমর্ষ অবস্থায় ফিরে আসতে লাগলেন। পথে আবু যর -এর সঙ্গে দেখা হলো। তিনি বললেন, "উমার, আপনাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেন?' তিনি বললেন, 'কেন দেখাবে না? বিশর ইবনু আসিম রাসূলুল্লাহ থেকে এমন একটি হাদীস শুনিয়েছে আমাকে।' আবূ যর বললেন, 'আপনি এটা নবীজীর কাছ থেকে শোনেননি?' তিনি বললেন, 'না।' আবূ যর বলেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি নবীজী -কে বলতে শুনেছি— “যে-ব্যক্তিকে মুসলমানদের কোনো দায়িত্ব দেওয়া হবে, কিয়ামতের দিন তাকে জাহান্নামের ওপর একটি পুলে দাঁড় করানো হবে। পুলটি এমনভাবে কাঁপতে থাকবে যে, তার শরীরের জোড়াগুলো আলাদা হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। যদি সে পুণ্যবান হয়, তবে মুক্তি পাবে। আর যদি পাপী হয়, তবে পুলটি ছিঁড়ে সত্তর বছর পর্যন্ত জাহান্নামের কৃষ্ণকায় গহ্বরে নিপতিত হবে—সেখানে কোনো আলো থাকবে না।” 'উমার, এবার বলুন, কোন হাদীসটি আপনার কাছে বেশি ভয়ংকর?' তিনি বললেন, 'দুটোই আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। এ-ই যদি হয় (দায়িত্ব গ্রহণের) পরিণতি, তবে কে সেটা গ্রহণ করে!' ৬

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে-'উমার এক ব্যক্তিকে সাদাকার দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। কিন্তু তিন দিন পরে দেখতে পান, লোকটি তখনো যায়নি। 'উমার তাকে বললেন, 'তুমি এখনো গেলে না? তুমি কি জানো না, এ-কাজে তোমার আল্লাহর পথের মুজাহিদদের সমপরিমাণ সাওয়াব হবে?' লোকটি বললেন, 'না, তেমন নয়।' 'উমার বললেন, 'কেন?' তিনি বললেন, 'আমি রাসূল -এর একটি হাদীস শুনেছি; তিনি বলেছেন—“যে-ব্যক্তিকে মুসলমানদের কোনো দায়িত্ব দেওয়া হলো, কিয়ামতের দিন তাকে জাহান্নামের একটি পুলের ওপর দাঁড় করানো হবে। পুলটি এমনভাবে কাঁপতে থাকবে যে, তার শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিঁড়ে যাবে। তখন সেগুলো ঠিক করে দেওয়া হবে এবং তাকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যদি পুণ্যবান হয়, তবে মুক্তি পাবে। আর যদি পাপাচারী হয়, তবে পুল ছিঁড়ে চল্লিশ বছর পর্যন্ত জাহান্নামের গভীর তলদেশে নিক্ষিপ্ত হবে।”” এ-কথা শুনে 'উমার বললেন, 'আল্লাহর রাসূল থেকে এই হাদীস আর কে শুনেছে?' তিনি বললেন, 'আবূ যর ও সালমান।' 'উমার তাদের দুজনের কাছে লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞাসা করলে তারা বললেন, 'হ্যাঁ, আমরাও রাসূলের কাছ থেকে এটা শুনেছি।' তখন 'উমার বললেন, 'এ-ই যদি হয় (দায়িত্বের) পরিণতি, তবে এটা কে গ্রহণ করতে যাবে?'৭

মা'কিল ইবনু ইয়াসার অসুস্থ হলে যিয়াদ তাকে দেখতে এলেন। তার সঙ্গে কথা বললেন, ভালো-মন্দ খোঁজখবর নিলেন। হাসি-তামাশার মাধ্যমে তাকে প্রফুল্ল করার চেষ্টা করলেন। তখন মা'কিল ইবনু ইয়াসার তাকে বললেন, 'আমি নবীজী -কে বলতে শুনেছি—“যে-ব্যক্তিকে মুসলমানদের কোনো কাজে নিযুক্ত করা হলো, অথচ সে তাদের অগোচরে তাদের কল্যাণকামী হলো না, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন (যে-দিন সকল সৃষ্টিকে একত্র করা হবে) অধোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।"

'উমার যখন শামে এলেন, বিলাল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন। 'উমার-এর আশপাশে তখন বড় বড় সিপাহসালারগণ ছিলেন। বিলাল বললেন, "উমার!' 'উমার বললেন, 'এই তো, আমি 'উমার এখানে।' বিলাল বললেন, 'আমি এ-সকল লোক ও আল্লাহর মাঝে দণ্ডায়মান। কিন্তু আল্লাহ ও আপনার মাঝে কেউ নেই। আপনি আপনার ডানে, বামে, সামনে, পেছনে তাকিয়ে দেখুন। আপনার চারপাশে যারা রয়েছে, তারা পাখির মাংস ছাড়া আর কিছু খায় না।' তখন 'উমার বললেন, 'আপনি সত্য বলেছেন। (এরপর উপস্থিত সেনাদেরকে লক্ষ করে বললেন) আমি এখান থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত উঠবো না, যতক্ষণ না তোমরা প্রত্যেক মুসলমানদের জন্য দুই মুদ্দ খাবার, সিরকা ও তেলের ব্যবস্থা করে দেবে।' তখন তারা বললো, 'যথা হুকুম, আমীরুল মুমিনীন। আল্লাহ তাআলা আপনার রিযিক প্রশস্ত করে দিয়েছেন। কল্যাণ বাড়িয়ে দিয়েছেন।'

সা'ঈদ ইবনু 'আমির আল জুমাহী 'উমার ইবনুল খাত্তাব-এর কাছে এসে বললেন, 'আমীরুল মুমিনীন, আমি আপনাকে চারটি ওসীয়ত করবো। আপনি সেগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। গ্রহণ করবেন এবং সে-অনুযায়ী 'আমাল করবেন। 'উমার বললেন, 'সেগুলো কী, সা'ঈদ?' সা'ঈদ বললেন, 'মানুষের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন; কিন্তু আল্লাহর ব্যাপারে মানুষকে ভয় করবেন না। মুসলমানদের জন্য সেটাই পছন্দ করুন, যা আপনি নিজের জন্য ও নিজের পরিবারের জন্য পছন্দ করেন। কাছের ও দূরের-আপনার অধীনস্থ সকল মুসলমানের ব্যাপারে সমান বিচার করুন। প্রত্যেকটি কাজে সঠিক ও ন্যায়ের পথ অবলম্বন করুন, আল্লাহ আপনাকে আপনার দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবেন, আপনার পেরেশানি দূর করবেন। কোনো একটি ব্যাপারে দুই ধরনের ফয়সালা দেবেন না; তা হলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। হক থেকে আপনি দূরে সরে যাবেন না। আর আপনার কথা ও কাজে যেন মিল থাকে। কেননা সর্বোত্তম কথা সেটাই, যা কাজে পরিণত করা হয়। সবশেষে, হক যেখানেই থাকে, সেটা গ্রহণের মতো সাহস রাখুন। আল্লাহর ব্যাপারে কারও তিরস্কারের পরোয়া করবেন না।' 'উমার বললেন, 'সা'ঈদ, এগুলো সব বাস্তবায়ন করা কার পক্ষে সম্ভব?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাআলা আপনার মতো যার কাঁধে এই গুরুদায়িত্ব (শাসনভার) অর্পণ করেছেন, সে-ই পারবে। আপনার কাজ তো কেবল আদেশ দেওয়া। অন্যরা সেটা পালন করবে।' ৯

আবূ মুসলিম খাওলানী ১০ র.-এর মুমূর্ষ অবস্থায় মুআবিয়া তাকে দেখতে গেলেন। কিন্তু আবূ মুসলিম তাকে চিনতে পারলেন না। মুআবিয়া বললেন, 'আবূ মুসলিম, আমাকে চিনতে পারছেন না? ভুলে গেছেন? আবূ মুসলিম, আপনার সামনে আমীরুল মুমিনীন। যা মনে চায়, বলুন।' তখন আবূ মুসলিম র. মুআবিয়া-কে লক্ষ করে বললেন, 'মনে রাখবেন, যখন আপনাকে গোটা উম্মাহর দায়িত্ব দেওয়া হয়, আর আপনি সকলের প্রতি ইনসাফ করেন, কিন্তু নিম্ন পর্যায়ের সামান্য কিছু লোকদের প্রতি অবিচার করেন, তবে আপনি আপনার সব ইনসাফ মাটি করে যুলুমে লিপ্ত হলেন। তাই যেভাবে (আল্লাহ ও রাসূলের পক্ষ থেকে) নির্দেশিত হয়েছেন, সেটার ওপর অবিচল থাকুন।' ১১

আবূ সা'ঈদ খুদরী রাসূল ﷺ থেকে বর্ণনা করেন, "তোমাদের কেউ যেন মানুষের ভয়ে সত্য ও ন্যায় বলা থেকে বিরত না থাকে।” তিনি বলেন, 'আর এ-কারণেই আমি অমুকের কাছে গিয়ে আদেশ-উপদেশ দিয়ে তার কান ভরিয়ে ফেলেছি।' ১২

সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব র. থেকে বর্ণিত-“উমার একদিন মানুষের মাঝে কিছু সম্পদ বণ্টন করলেন। সবাই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলো। তখন তিনি বললেন, 'তোমরা কতটা নির্বোধ! এগুলো যদি আমার সম্পদ হতো, তবে তোমাদেরকে একটা রৌপ্যমুদ্রাও দিতাম না।' ১৩

তারেক ইবনু শিহাব 'আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণনা করেন—তিনি বলেছেন, 'অনেক সময় কোনো লোক নিজের ঘর থেকে দ্বীন নিয়ে বের হয়। এরপর এমন কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়, যাকে সে (সত্য-মিথ্যা) প্রশংসায় ডুবিয়ে দেয়। হয়তো প্রয়োজনটাও তার মেটানো হয় না। শেষে দ্বীন ও ঈমান হারিয়ে, আল্লাহর অসন্তোষ নিয়ে ঘরে ফিরে আসে।'

ইবনু 'আব্বাস থেকে বর্ণিত—রাসূলে কারীম বলেছেন, "অতি শীঘ্রই এমন একটি সম্প্রদায় বের হবে, যারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান রাখবে, যারা কুরআন তিলাওয়াত করবে, কিন্তু শয়তান তাদের নিকট এসে বলবে— 'যদি তোমরা শাসকের কাছে গিয়ে দুনিয়ার সামান্য অংশও অর্জন করতে পারো, তাতে ক্ষতি কী? দ্বীন তো তোমাদের কাছে সুরক্ষিত আছেই।' মনে রেখো, এটা কখনোই সম্ভব নয়। কাঁটাগাছ থেকে যেমন কাঁটা ছাড়া কিছু পাওয়া যায় না, তেমনি তাদের কাছে গেলে পাপ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না।" ১৪

আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিত—আল্লাহর রাসূল বলেছেন, "তোমরা নেতৃত্ব কামনা করো, অথচ অতি শীঘ্রই সেটা লজ্জা ও পরিতাপে পরিণত হবে। কারণ, নেতৃত্ব থাকাকালে সেটা উপভোগের। চলে যাওয়ার পরে (পরকালে) সেটা দুর্ভোগের।" ১৫

'আবদুর রহমান ইবনু সামুরা থেকে বর্ণিত—নবীজী বলেছেন, "নেতৃত্ব চেয়ে নিয়ো না।” ১৬

টিকাঃ
১. অর্থাৎ যখন তোমরা দ্বীনের চেয়ে দুনিয়াকে প্রাধান্য দেবে, আমরাও তোমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করাটাকেই প্রাধান্য দেবো।
২. মুসান্নাফে ইবন আবী শাইবা (১৪/১২৭); মুসলিম (১৮২৭); সহীহ ইবনু হিব্বান (১০/৩৩৬)
৩. 'আবীদা ইবন 'আমর সালমানী। তাবি'ঈ ও বিখ্যাত ফকীহ। মাক্কা বিজয়ের বছর ইয়ামানে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু নবীজী -কে দেখার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হন। পরে 'আলী ইবনু আবী তালিব, ইবনু মাস'উদ রা.-সহ প্রমুখ বিজ্ঞ সাহাবীদের কাছ থেকে 'ইলম অর্জন করেন। ইবরাহীম নাখ'ঈ, শা'বী, মুহাম্মাদ ইবনু সীরীনের মতো মানুষগণ তার কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। ৭২ হিজরীতে তিনি ওফাত পান।
৪. জামি'উ মা'মার ১১/৩১৬; ইবনু আবী শাইবা ১৫/২৩৮; হিলইয়াতুল আউলিয়া ১/২৭৭; শু'আবুল ঈমান বাইহাকী ৭/৪৯
৫. এখানে সালাম বলতে মুসলমানদের পারস্পরিক সাক্ষাতে বিনিময়-করা স্বাভাবিক সালাম নয়, রাজা-বাদশাহকে প্রদত্ত রাজকীয় সম্ভাষণ; যেটা সালাফে সালিহীন করতেন না।
৬. মু'জামুল কাবীর তাবারানী (২/৩৯); মুসান্নাফে ইবনু আবী শাইবা (১২/২১৭); শু'আবুল ঈমান বাইহাকী (১৩/৮২)
৭. সুবহানাল্লাহ! রাষ্ট্রীয় পদ পাওয়ার পরেও ঘরে বসে থাকতেন তারা। আর আজ তো একটা নিম্ন পর্যায়ের সরকারি চাকুরির জন্যও পঙ্গপালের মতো মুসলমানরা ছুটে যায়। হালাল-হারাম কোনো কিছুর বাছ-বিচার করে না। বড় বড় দ্বীনদার ও নামাযী-রোযাদাররাও হালাল-হারামের ব্যাপারে পরোয়া করে না—সম্পত্তি বাড়ানোটাই যেন সকলের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৯. 'উমার ইবনুল খাত্তাবের ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন। তিনি এই কথা বিনয়ের কারণে বলেছেন। নতুবা তিনি হুবহু এমনই ছিলেন!
১০. তিনি প্রথম সারির ভাগ্যবান তাবি'ঈ। রাসূলুল্লাহ -এর জীবদ্দশাতেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু আফসোস মাদীনায় আসতে আসতে নবীজী দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। ফলে সাহাবীর মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন। কিন্তু আবু বকর -সহ বড় বড় সাহাবীদের সান্নিধ্য ও সুদৃষ্টি লাভ করেন। হাদীস ও আসারের কিতাবে তার অসংখ্য কারামতের কথা বর্ণিত হয়েছে। 'উমার রা. তাকে অনেক স্নেহ ও সম্মান করতেন।
১১. এই ঘটনার অর্থ এমন নয় যে, হযরত মুআবিয়া যুলুম করতেন; বরং সালাফে সালিহীন এভাবেই সবাইকে নসীহত করতেন। অন্যায়ে লিপ্ত হওয়ার আগেই একে অন্যকে সতর্ক করতেন। মুআবিয়া-এর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন রাসূলের সাহাবী। কাতিবে ওহী (ওহী লেখক)। মুসলমানদের সম্মানিত মামা। যাহাবী বলেন, 'শাসক হিসেবে তিনি ছিলেন 'আদিল ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। জনগণের কাছে পছন্দের মানুষ। তার ছোটখাটো কিছু ভুল ছিলো। আল্লাহ সেগুলো ক্ষমা করে দেবেন-আশা করছি।'
১২. মুসনাদু আহমাদ ৩/৪৪; সুনানে বাইহাকী ১০/৯০
১৩. এটা 'উমার -এর বিনয়ের বহিঃপ্রকাশ। এমন বোঝার সুযোগ নেই যে, 'উমার রা. দান করতেন না; বরং তিনি বিশাল চিত্তের অধিকারী বদান্য ছিলেন। এটা মূলত লোকদের অতি প্রশংসা বন্ধ করার জন্য বলেছেন।
১৪. ইবনু মাজাহ (২৫৫); তাবারানীর মু'জামুল আওসাত (৮/১৫০); মিযযীর তাহযীব ১০/১৬১; তারীখ ইবনু আসাকির ৬৪/৩১৪
১৫. বুখারী (৬৭২৯); নাসা'ঈ (৪২১১); মুসনাদু আহমাদ (২/৪৪৮)
১৬. মুসনাদু আহমাদ ৫/৬২; মুসনাদু বাযযার (৬/২৫২); ইবনু হিব্বان (১০/৩৩২); হিলইয়াহ ৭/২৩০২

📘 সালাফের দরবারবিমুখতা > 📄 সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবের দরবারবিমুখতা

📄 সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবের দরবারবিমুখতা


মাইমূন ইবনু মিহরান বলেন, 'একদিন দুপুরে উমাইয়া-খলীফা 'আবদুল মালিক (ইবনু মারওয়ান) ঘুমাতে পারলেন না। উঠে প্রহরীকে বললেন, 'মসজিদে আমাদের কোনো বক্তা আছে কি না, দ্যাখো তো (খলীফার উদ্দেশ্য ছিলো-ঘুমের সময়টুকু গল্প কিংবা আলোচনার মাঝে কাটাতে)!' প্রহরী মসজিদে এসে সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবকে ১৭ দেখতে পেলো। দূর থেকে ইশারায় ডেকে দরজার দিকে পা বাড়ালো। সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব নিজের জায়গাতে বসে থাকলেন। প্রহরী ভাবলো, তিনি তার ইশারা দেখেননি। তখন আরও কাছে এসে ইশারা করলো। যখন বুঝলো, তিনি ইশারা দেখেছেন, তখন ফিরে গেলো। দরজাতে আসার পরে লক্ষ করলো, ইবনুল মুসাইয়্যিব স্বস্থানেই বসা। এবার প্রহরী (কিছুটা ক্রদ্ধ হয়ে) সা'ঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের একেবারে মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। বললো, 'আমীরুল মুমিনীনের ডাকে সাড়া দিন।' ইবনুল মুসাইয়্যিব বললেন, 'তিনি আমার কাছে তোমাকে পাঠিয়েছেন?' সে বললো, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'আমি কে?' প্রহরী বললো, 'সেটা তো আমি জানি না। কিন্তু তিনি বলেছেন, মসজিদে আমাদের কোনো বক্তা থাকলে ডেকে নিয়ে এসো। আপনাকেই আমার সবচেয়ে উপযুক্ত মনে হলো।' সা'ঈদ বললেন, 'ফিরে গিয়ে তাকে বলো, আমি তাদের বক্তা নই।' প্রহরী ফিরে গিয়ে পুরো ঘটনা তুলে ধরলে 'আবদুল মালিক বললেন, 'সত্য বলেছেন। তিনি সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব।'

জা'ফর ইবনু সুলাইমান বলেন, 'বসরার এক লোকের কাছে আমি শুনেছি, খলীফা 'আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান হাজ্জ শেষ করে মাদীনাতে এলেন। সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবকে একজন দূত মারফত ডেকে পাঠালেন। দূত তাকে মসজিদে পেলো। কাছে এসে বললো, 'চলুন।' তিনি বললেন, 'কোথায়?' দূত বললো, 'আমীরুল মুমিনের কাছে।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। তার কোনো কথাও আমার মানার সুযোগ নেই।' দূত ফিরে গিয়ে খলীফাকে হুবহু এ-কথাগুলোই শুনিয়ে দিলো। 'আবদুল মালিক বললেন, 'দূর হও! তাকে ডেকে নিয়ে আসো। তার সঙ্গে নরম ব্যবহার কোরো।' দূত মসজিদে এসে বললো, 'চলুন।' সা'ঈদ বললেন, 'কোথায়?' দূত বললো, 'আমীরুল মুমিনীনের কাছে।' সা'ঈদ বললেন, 'আল্লাহর কসম, তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। তার কোনো কথা আমার মানারও সুযোগ নেই।' দূত তখন ফিরে গিয়ে খলীফাকে সব কথা শোনালো। খলীফা বললেন, 'আবার যাও। তাকে ডেকে নিয়ে আসো। কঠোর ব্যবহার কোরো না।' দূত তৃতীয়বারের মতো মসজিদে এসে বললো, 'চলুন।' সা'ঈদ বললেন, 'কোথায়?' দূত বললো, 'আমীরুল মুমিনীনের কাছে।' সা'ঈদ বললেন, 'আল্লাহর কসম, তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। তার কোনো কথা আমার মানারও সুযোগ নেই।' তখন দূত বললো, 'খলীফা আপনার সঙ্গে নরম ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। নতুবা তিনি বললে আপনার মাথা নিয়ে তার দরবারে হাজির করতাম!' সা'ঈদ শান্তভাবে বললেন, 'মাথার ভয় নেই। যাওয়া তো দূরের কথা, আমি বসা থেকেও উঠতে পারবো না!' দূত তখন ফিরে গিয়ে খলীফাকে সব কথা শোনালো। খলীফা বললেন, 'আবূ মুহাম্মাদ তার সিদ্ধান্ত পাল্টাবে না। থাক, দরকার নেই। থাক দরকার নেই!'

সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব র.-এর এক ক্রীতদাস পালিয়ে গেলো। পরে সে রোমানদের বিরুদ্ধে মুসলিম-বাহিনীর সঙ্গে জিহাদে অংশ নিলো। ক্রীতদাসটি ছিলো অত্যন্ত সাহসী ও লড়াকু। মুসলিম-বাহিনীর সামনে থেকে লড়াই করতো। কিন্তু হঠাৎ করেই সে পিছু হটতে শুরু করে। যুদ্ধের গতি কমিয়ে দেয়। কুরাইশী এক সিপাহসালার তাকে ডেকে বলেন, 'কী খবর তোমার? আগে তো যুদ্ধ করতে? এখন ছেড়ে দিলে কেন?' সে বললো, 'আমি ইবনুল মুসাইয়্যিবের ক্রীতদাস। যেহেতু তার অনুমতি ছাড়া যুদ্ধে এসেছি, তাই ভয় হয়, যদি মারা যাই!' সিপাহসালার তাকে বললেন, 'তুমি যুদ্ধ করো। ভয়ের কিছু নেই। যদি মারা যাও, তবে ইবনুল মুসাইয়্যিব তোমার যত দাম চাইবে, সেটা আমি তাকে পরিশোধ করবো।' সিপাহসালারের কথা শুনে সে আবারও পূর্ণ উদ্যমে যুদ্ধে শরীক হলো এবং শাহাদাত বরণ করলো।

কুরাইশী সিপাহসালার মাদীনায় ফিরে সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবকে ডেকে পাঠালেন, কিন্তু তিনি এলেন না। তখন সিপাহসালার নিজেই সাঈদের কাছে এসে বললেন, 'আমি মাদীনায় এসেছি। একজন কুরাইশী হিসেবে আপনি আমাকে দেখতে আসবেন, সেই প্রত্যাশা ছিলো; কিন্তু আপনি আসেননি। আপনাকে লোক দিয়ে ডাকালাম, তাও যাননি।' ইবনুল মুসাইয়্যিব র. বললেন, 'আপনার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন ছিলো না, তাই যাইনি। যদি আমার কাছে আপনার কোনো প্রয়োজন থাকে, তা হলে তো আপনিই আসবেন!' কুরাইশী বললেন, 'আমার প্রয়োজন আছে। আপনার গোলাম যুদ্ধে শহীদ হয়েছে। আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, আপনি তার যত দাম চাইবেন, আপনাকে সেটা পরিশোধ করবো। সুতরাং আপনি দাম বলুন।' সা'ঈদ বললেন, 'আল্লাহর শপথ, আমি কখনোই তার দাম গ্রহণ করবো না। সে (পালানোর কারণে) জাহান্নামে গেলেও আমি (মালিক হিসেবে তার জিহাদের) সাওয়াব পাবো।'

খলীফা 'উমার ইবনু 'আবদুল আযীয র. বলতেন, 'আমার কাছে মাদীনার আলিমগণ আসেন। আর সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবের 'ইলম আসে (তিনি আসেন না)।' ১৮

হাম্মাদ আল খাইয়াত বলেন, 'শাসকের বিপক্ষে অবিচলতার ক্ষেত্রে ইবনু আবী যি'বকে সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবের সঙ্গে তুলনা করা হতো।' মাররূযী বলেন, 'আমি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলকে বললাম, সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবকে তো তারা (শাসকরা) মেরেছে।' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, মেরেছে। তবে তারা তাকে একবার হাদিয়াও দিয়েছিলো। কিন্তু তিনি বললেন, 'যতক্ষণ না এটা হালাল, না হারাম, সেটা জানবো— ততক্ষণ পর্যন্ত এটা গ্রহণ করবো না।' শেষমেশ সালিম ও কাসিমের সহায়তায় ওটা গ্রহণ করা থেকে রেহাই পান।'

ইবনু হাম্বল বলেন, 'ফিতনার সময় মসজিদে নববীতে সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব ছাড়া আর কারও (তালীমী ও তরবিয়তী) মজলিস অব্যাহত ছিলো না।'

টিকাঃ
১৭. সাইয়েদুত তাবি'ঈন, 'আলিমু আহলিল মাদীনাহ সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব র.। বিখ্যাত মুহাদ্দিস। মাদীনার সাতজন ফকীহের একজন। 'উমার ইবনুল খাত্তাব -এর যুগে মাদীনাতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মুসাইয়্যিব বাইয়াতে রিযওয়ানের সদস্য। সাহাবীদের কাছ থেকে 'ইলম অর্জন করেন। তার শিক্ষকদের কতিপয় হলেন-যায়িদ ইবনু সাবিত, সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস, 'আবদুল্লাহ ইবনু 'আব্বাস, ইবনু 'উমার রা। আবু হুরাইরা রা.-এর একান্ত সান্নিধ্যে থাকেন। তার মেয়ে বিবাহ করে জামাতা হন। তিনি অধিকাংশ সময় মাসজিদে থাকতেন। চল্লিশ বছর জামা'আতে নামায ছোটেনি কখনো। ত্রিশ বছর ধরে মাসজিদের বাইরে মু'আযযিনের আজান শোনেননি। হকের ব্যাপারে সা'ঈদ ছিলেন আপসহীন। শাসকের সঙ্গে মোসাহেবি করতেন না। তাদের অন্যায় দেখে নীরব থাকতেন না। অথচ উমাইয়া শাসকদের অনেকেই ছিলো উৎপীড়ক, অন্যায়কারী। ফলে তার সঙ্গে শাসকদের বিরূপ সম্পর্ক তৈরি হয়। তিনি তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন। রাষ্ট্রীয় ভাতা প্রত্যাখ্যান করেন। তারা ডাকলেও সাড়া দেননি। কোনো বর্ণনাতে পাওয়া যায়, তিনি সে-সব যালিম শাসকের জন্য বদদু'আ করতেন! শাসকগোষ্ঠী একসময় তাকে নজরবন্দি করে ফেলে। মাসজিদে তার 'ইলমী মাজালিসগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তাকে নরম করার কৌশল হিসেবে উমাইয়া খলীফা 'আব্দুল মালিক ইবনু মারওয়ান তার ছেলে যুবরাজ ওয়ালীদের জন্য সা'ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবের মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু সা'ঈদ যুবরাজকে প্রত্যাখ্যান করে কুরাইশের এক সাধারণ যুবকের হাতে মেয়েকে তুলে দেন। বিয়ের মোহরানা ছিলো দুই দিরহাম। উমাইয়া শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করে তার বিরুদ্ধে। তাকে বেত্রাঘাত করা হয়। বন্দি করে মাদীনার অলিতেগলিতে ঘোরানো হয়।
১৮. সত্য ও সততা, ন্যায় ও নীতির পরম আদর্শ খলীফায়ে রাশিদ 'উমার ইবনু 'আবদিল 'আযীয র.। এমন বুযুর্গ খলীফার দরবারে যেতেও যদি আমাদের সালাফের আপত্তি থাকে, তবে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর কাছে যাওয়ার ব্যাপারে কিছু বলার থাকে না।

📘 সালাফের দরবারবিমুখতা > 📄 উমার ইবনু ‘আবদিল আযীযের তাকওয়া

📄 উমার ইবনু ‘আবদিল আযীযের তাকওয়া


এক ব্যক্তি 'উমার ইবনু 'আবদিল আযীয র.-এর সামনে এসে তার গুণকীর্তন করতে লাগলেন। 'উমার তাকে বললেন, 'আমি আমার ব্যাপারে যা জানি, তুমিও যদি তা জানতে, তবে আমার দিকে তাকাতেও না।'

'উমার ইবনু 'আবদিল আযীয র. বলতেন: রাজ-বাদশারা হলেন বাজারের মতো। এখানে সে-ই আসে যে নিজেকে পণ্য মনে করে। অথবা এখানে যে-ই আসে, বিকে যায়।

একবার 'উমার ইবনু 'আবদিল 'আযীয র. লোকদের মাঝে কিছু জিনিস বিতরণ করলেন। ইবনু সিরীন র.-এর কাছেও পাঠালেন; কিন্তু তিনি সেটা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন। বললেন, "উমারের ব্যাপারে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমার দরকার নেই (তাই নিইনি)।'

📘 সালাফের দরবারবিমুখতা > 📄 হাসান বসরীর তাকওয়া

📄 হাসান বসরীর তাকওয়া


হাসান বসরী র. এভাবে দু'আ করতেন- 'হে আল্লাহ, সকল প্রশংসা আপনার জন্য। আপনি আমাদের রিযিককে প্রশস্ত করে দিয়েছেন। আমাদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। আমাদেরকে সুস্থ-সবল রেখেছেন। আমরা যা চেয়েছি, আমাদেরকে সব কিছু থেকে দান করেছেন।'

হাসান বসরী র. বলেছেন, 'যে-ব্যক্তি কামাই নিয়ে পেরেশান থাকে, কোথায় কোথায় সে ব্যয় করবে, সেটা নিয়েও সে পেরেশান হয়।'

এক ব্যক্তি এসে হাসান বসরী র.-কে জিজ্ঞাসা করলো, 'কেমন আছেন?' তিনি বললেন, 'দুটো নিয়ামতের মাঝে ডুবে আছি। একটি নিয়ামত আমার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রেখেছে। আরেকটি নিয়ামতের কারণে লোকেরা আমার প্রশংসা করে, অথচ আমার ভেতরের খবর তারা জানে না।'

এক ব্যক্তি হাসান বসরী র.-এর কাছে এসে বললো, 'আবূ সা'ঈদ, কেমন আছেন?' তিনি বললেন, 'ভালো।' লোকটি বললো, 'আপনার অবস্থা কেমন যাচ্ছে?' হাসান বসরী হাসলেন। বললেন, 'আমাকে আমার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছো? ধরো, একদল লোক একটি নৌকায় উঠেছে। মাঝ-সমুদ্রে যাওয়ার পরে তুফানের আঘাতে নৌকাটি ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো। যাত্রীদের প্রত্যেকে একেকটি কাঠখণ্ড জড়িয়ে ধরে সমুদ্রের পানিতে ভাসতে লাগলো। তাদের অবস্থা কেমন হবে?' লোকটি বললো, 'মারাত্মক ভয়াবহ অবস্থা!' তিনি বললেন, 'আমার অবস্থা তাদের চেয়েও খারাপ।'

হাসান বসরী 'উমার ইবনু আব্দুিল আযীয র.-এর কাছে চিঠি লিখলেন: "জেনে রাখুন, আপনার সামনে বড় বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। এখনো সে পর্যন্ত পৌঁছোননি; কিন্তু একদিন সেগুলোর মুখামুখি হতে হবে। হয়তো মুক্তি মিলবে, নয়তো দুর্ভাগ্য ও ধ্বংস। আর মুমিনের সর্বশেষ ফিতনা হলো কবরের ফিতনা।”

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00