📄 সালাফের দৃষ্টিতে পুনরুত্থান
১. ওয়ালিদ বিন মুসলিম বর্ণনা করেন। আবদুর রহমান বিন ইয়াযিদ বিন জাবির বলেন, জাহিলী যুগের ধ্যান-ধারণায় কট্টর বিশ্বাসী এক বৃদ্ধ এসে বলল, হে মুহাম্মাদ , তোমার এমন তিনটি কথা আমি শুনেছি, যা কোনো বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারে না।
আমি জানতে পারলাম, তুমি নাকি বলেছ:
১। আরবরা তাদের এবং পূর্বপুরুষের উপাস্যদের পরিত্যাগ করবে!
২। পারস্য-রাজ কিসরা ও রোম সম্রাট কাইসারের ধনভান্ডার তোমাদের হস্তগত হবে!
৩। আমাদের সকলের মৃত্যুর পর পুনরুত্থান হবে!
রাসুল বললেন, সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। আরবজাতি অতিসত্বর তাদের এবং তাদের পূর্বপুরুষদের উপাস্যগুলো পরিত্যাগ করবে। তারা কিসরা এবং কাইসারের ধনভান্ডার জয় করবে। এবং তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে। আর নিঃসন্দেহে তোমাদের পুনরুত্থান ঘটানো হবে। আর শোনো, কিয়ামতের দিন আমি তোমার হাত ধরে এ কথা স্মরণ করিয়ে দেব।
বৃদ্ধ বলল, মৃত্যুর ব্যাপারে তুমি আমাকে বিভ্রান্ত কোরো না। আর আমাকে ভুলেও যেয়ো না। রাসুল বললেন, আমি তোমাকে বিভ্রান্ত করছি না আর ভুলেও যাব না।
বৃদ্ধ লোকটির জীবদ্দশাতেই রাসুল -এর ওফাত হয়। একসময় রোম ও পারস্য মুসলমানদের পদানত হয়। রাসুল -এর ভবিষ্যদ্বাণীর এমন নিখুঁত বাস্তবতা দেখে একসময় বৃদ্ধ ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম-পরবর্তী জীবন খুবই উত্তম ছিল। উমর বহুবার তার এই ঘটনা শুনেছেন। মসজিদে তার কাছ থেকেই শুনতেন। মাঝে মাঝে উমর তাঁর নিকট দাঁড়িয়ে বলতেন, আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। রাসুল আপনার হাত ধরার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছেন। তিনি কেবল তাদের হাতই ধরবেন, যারা ইসলামের স্পর্শে সাফল্য ও সৌভাগ্যের ছোঁয়া পেয়ে ধন্য হয়েছেন。
২. আবদুল্লাহ বিন উমর হতে বর্ণিত, রাসুল বলেছেন,
لَيْسَ عَلَى أَهْلِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْشَةً فِي قُبُورِهِمْ، وَلَا مَنْشَرِهِمْ، وَكَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى أَهْلِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَهُمْ يَنْفُضُونَ التَّرَابَ عَنْ رُءُوسِهِمْ، وَيَقُولُونَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنَّا الْحَزَنَ
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' পাঠকারীদের কবরে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। পুনরুত্থানের দিনও কোনো সমস্যা নেই। আমি তো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠকারীদের দেখতে পাচ্ছি যে তারা মাথা হতে মাটি ঝাড়ছে আর বলছে, সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার, যিনি আমাদের এই দুর্ভোগ হতে রেহাই দিয়েছেন。
৩. আম্মাজান উম্মু সালামাহ বলেন,
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: يُحْشَرُ النَّاسُ حُفَاةً عُرَاةً كَمَا بَدَأُوْا
قَالَتْ أُمُّ سَلَمَةَ: فَقُلْتُ : وَاسَوْأَتَاهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلْ يَنْظُرُ بَعْضُنَا إِلَى بَعْضٍ؟
فَقَالَ: يَشْغُلُ النَّاسُ. قُلْتُ : وَمَا يُشْغِلُهُمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟
قَالَ : نَشْرُ الصُّحُفِ، فِيهَا مَثَاقِيلُ الذَّرِّ، وَمَثَاقِيلُ الْخَرْدَلِ
আমি রাসুল -কে বলতে শুনেছি, মানুষের পুনরুত্থান হবে নগ্নপদে বিবস্ত্র অবস্থায়। যেভাবে সে জন্মগ্রহণ করেছে। (এ কথা শুনে) উম্মু সালামা বিস্ময়ভরে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি সেদিন একে অপরকে দেখতে পাব? তিনি বললেন, মানুষ সেদিন ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বে। বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, তারা কী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে? উত্তরে তিনি বললেন, আমলনামা নিয়ে। সেখানে বিন্দু ও ধূলিকণা পরিমাণ বিষয়ও উল্লেখ থাকবে।
৪. আবু বকর আইয়াশ বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বলেন, হাশরের দিন মানুষ কবর হতে বেরিয়ে তাদের রেখে যাওয়া ভূমির পরিবর্তে অন্য ভূমি দেখবে। নিজেদের চেনাজানা মানুষের বদলে অচেনা লোকজন দেখবে। বিষয়টির উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন,
فما الناس بالناس الذين عهدتهم *** ولا الدار بالدار التي كنت تعرف
এরা তো আর তারা নয়, যাদের তুমি জানতে
এ দুয়ারও সে দুয়ার নয়, যেথায় তুমি থাকতে。
৫. মাইমুন বিন মুসা মারাঈ বলেন, আমি হাসান বসরী-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُم مِّنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنسِلُونَ ﴾
আর যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে তখনই তারা কবর হতে ছুটে আসবে তাদের রবের দিকে。
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, শিঙায় ফুঁ দেওয়ার আওয়াজ শুনতেই মানুষ মাথার মাটি ঝাড়তে ঝাড়তে কবর হতে ছুটে বেড়িয়ে আসবে। এ সময় মুমিনগণ বলতে থাকবে, হে আল্লাহ, সমস্ত পবিত্রতা ও প্রশংসা একমাত্র আপনারই জন্য। আমরা তো যথাযথভাবে আপনার ইবাদত করতে পারিনি。
৬. সাঈদ বিন আবদুল্লাহ জুহানী বর্ণনা করেন, তাবেঈ ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেন, মানুষ কবরের মাটিতে মিশে যাবে। প্রথমবার যখন শিঙ্গায় ফুৎকারের আওয়াজ শোনা যাবে তখন সমস্ত রূহ নিজ নিজ দেহে ফিরে আসবে এবং বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো জোড়া লাগবে। দ্বিতীয়বার ফুৎকার শোনার পর লোকজন নিজ নিজ পায়ে উঠে দাঁড়াবে এবং মাথা হতে মাটি ঝাড়বে。
৭. সুলাইমান বিন তরখান বলেন, আমি সাইয়ার শামী -কে বলতে শুনেছি যে, মানুষ যখন ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় কবর হতে বেরিয়ে আসবে তখন একজন ঘোষণাকারী (ফিরিশতা) ঘোষণা করবে,
(يَا عِبَادِ لَا خَوْفٌ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ وَلَا أَنتُمْ تَحْزَنُونَ )
হে আমার বান্দাগণ, আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং তোমরা চিন্তিতও হবে না。
এ ঘোষণা শুনে সবাই আশাবাদী হয়ে সেদিকে ছুটতে শুরু করবে। তখন বলা হবে,
(الَّذِينَ آمَنُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا مُسْلِمِينَ)
(তোমরা) যারা আমার আয়াতসমূহে বিশ্বাস করেছিলে এবং অনুগত ছিলে।
এ ঘোষণা শুনে মুসলমান ব্যতীত বাকি সকলে হতাশায় মুষড়ে পড়বে。
৮. নযর বিন আরবি বলেন, আমি জানতে পেরেছি যে, মানুষ যখন কবর হতে পুনরুত্থিত হয়ে উঠে আসবে তখনো তাদের স্লোগান হবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আর কবর থেকে উঠার পর ভালো ও মন্দ সকলের প্রথম বাক্য হবে, 'ইয়া রব, আমাদের প্রতি দয়া করুন।'
৯. ওয়ালিদ বিন আবু মারওয়ান বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বলেছেন, মৃত ব্যক্তি তার কাফন-সহ পুনরুত্থিত হবে।
১১. ইবাদ বিন ওয়ালিদ কুরাইশী বর্ণনা করেন। মুকাতিল বিন হাইয়ান বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا )
আর (সেদিন) জমিন তার বোঝা বের করে দেবে।
এই আয়াতে জমিনের বোঝা বের করে দেওয়ার অর্থ হলো, ভূ-গর্ভ হতে মৃত লোকজন বেড়িয়ে আসবে আর ভূ-পৃষ্ঠে চলতে শুরু করবে।
১২. রুস্তম বিন উসামা বর্ণনা করেন। বিখ্যাত আবিদ ফযল বিন মুহমাল সাদী বলেন, আমাদের সাথে মুজিব নামে মুত্তাকী ও আবিদ শ্রেণির এক লোকের উঠা-বসা ছিল। অন্যদের তুলনায় তিনি ছিলেন অনন্য সৌন্দর্যের অধিকারী। তার রাত কেটে যেত নামাযে দাঁড়িয়ে। আর দিনের বেলা রোজা রাখতে রাখতে তিনি হাড় জিরজিরে হয়ে পড়েন। এভাবেই ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত অবস্থায় একসময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন। মুহাম্মাদ বিন নযর হারিসী ছিলেন তার অন্যতম বন্ধু। তিনি অবশ্য মুজিবের আগেই ইনতিকাল করেন। মুজিবের ইনতিকালের পর আমি একদিন স্বপ্নযোগে মুহাম্মাদ বিন নযরের সাক্ষাৎ লাভ করি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার ভাই মুজিবের কী অবস্থা?
বলল, সে তার আমল অনুযায়ী ফল পেয়েছে। জিজ্ঞাসা করলাম, তার সেই সুন্দর চেহারার এখন কী অবস্থা? বলল, আল্লাহ তাআলা তার চেহারা মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছেন।
বললাম, তুমি না বললে সে তার আমল অনুযায়ী ফল লাভ করেছে, তাহলে আবার এমন হয় কী করে?
সে বলল, ভাই, তুমি কি জানো না? কবর মানবদেহকে গ্রাস করে নেয়! আর কিয়ামতের দিন আমলসমূহ পুনরুজ্জীবিত হয়! বললাম, হ্যাঁ, কবর তো দেহকে এমনভাবে গ্রাস করে যে তার কিছুই আর বাকি থাকে না। অতঃপর কিয়ামতের দিন সবাই পুনরুত্থিত হবে।
সে বলল, ঠিক বলেছ ভাই। আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা দেহকে এমনভাবে মিটিয়ে দেয় যে, তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। অতঃপর যেদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে সেদিন চোখের পলক ফেলার চেয়ে দ্রুত সময়ে তিনি তাদের পুনরুত্থান ঘটাবেন。
১৩. জাফর বিন সুলাইমান বর্ণনা করেন। ইবরাহীম বিন ঈসা ইয়াশকারী বলেন, আমাদের নিকট খবর পৌঁছেছে যে, মুমিন ব্যক্তি যখন কবর উঠে আসবে তখন দুজন ফিরিশতা তার সাথে সাক্ষাৎ করবেন। একজনের হাতে রেশমি কাপড়ে জড়ানো বরফ ও সুগন্ধী থাকবে। অন্যজনের হাতে শরাব-ভর্তি জান্নাতি সোরাহি। প্রথমজন তাতে সুগন্ধী মিশিয়ে শরাবসহ তাকে পরিবেশন করতে বলবেন। দ্বিতীয়জন সেই পানীয় মুমিনের সম্মুখে পরিবেশন করবেন। মুমিন তা পান করবেন। এরপর জান্নাতে প্রবেশের আগে তার কোনো প্রকার তৃষ্ণা জাগবে না.***
১৪. আবুল আলিয়া বলেন, মৃত ব্যক্তিকে তার কাফনসহ পুনরুত্থান করানো হবে।
সালিহ মুররি বলেন, হাশরের দিন কবরবাসী ছিন্ন কাফন, জীর্ণ দেহ, বিবর্ণ চেহারা, উশকোখুশকো চুল, শ্রান্ত দেহে নিজ নিজ কবর হতে বেরিয়ে আসবে। ভয়ে-আতঙ্কে তাদের প্রাণ চলে যাওয়ার উপক্রম হয়ে যাবে। হাশরের ময়দানে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ বলতে পারবে না তার ঠিকানা কী হতে চলেছে? অতঃপর কারও ঠিকানা জান্নাত আর কারও ঠিকানা হবে জাহান্নাম। নেককার বান্দা আমলনামা পেয়ে উল্লাসে উঁচু স্বরে বলে উঠবে, হায়! জাহান্নাম কতই-না
নিকৃষ্ট ঠিকানা। হে আল্লাহ, আপনি যদি আপনার সুপ্রশস্ত রহমত দ্বারা আমাদের রক্ষা না করতেন, তাহলে তো আমাদের মারাত্মক গুনাহসমূহ আমাদের চুপসে দিত। আর আমাদের এমন-সব অপরাধ রয়েছে, যা আপনি ছাড়া আর কেউ ক্ষমা করতে পারে না।
تَمَّتْ بِتَوْفِيقِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ الْحَكِيمِ الرَّحِيمِ
টিকাঃ
২৪১. আল আহওয়াল, ৭১, বর্ণনা: ৮৯। সনদ মারফু。
২৪২. মুজামুল আওসাত লিত-তাবারানী, ৯/১৮১, হাদিস নং ১৪৭৮; শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ১/২০২, হাদিস নং ৯৯। সনদ দুর্বল。
২৪৩. মুজামুল আওসাত লিত তাবারানী, ৮৩৩। হাসান লিগাইরিহি। কাছাকাছি সহিহ বর্ণনা রয়েছে: সুনানু তিরমিযী, ৩৩৩২। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস হতে। সনদ হাসান সহিহ。
২৪৪. আল আহওয়াল, ১৭৬। বর্ণনা: ২১৭ আবু বকর বিন আইয়াশ আবদুল্লাহ বিন আব্বাস এর সাক্ষাৎ লাভ করেননি。
২৪৫. সুরা ইয়াসিন, (৩৬): ৫১。
২৪৬. আল আহওয়াল, ৬৬, বর্ণনা: ৮৪。
২৪৭. বিদায়া ওয়া নিহায়া, ১৯/৩৪৫। (দারু হাজ্জার)
২৪৮. সুরা যুখরুফ, (৪৩): ৬৮
২৪৯. সুরা যুখরুফ (৪৩): ৬৯
২৫০. তাফসীরুত তাবারী, ২০/৬৮১; সুরা যুখরুফ, (৪৩): ৬৮ ও ৬৯ এর ব্যাখ্যায়。
২৫১. বিদায়া ওয়া নিহায়া, ১৯/৩৯১। (দারু হাজার)
২৫২, আন নিহায়াতু ফিল ফিতানি ওয়াল মালাহিম, ১/৩২২。
২৫৩. সুরা যিলযাল, (৯৯): ২
২৫৪. আল আহওয়াল, ৬৫। বর্ণনা: ৮২。
২৫৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৪৫。
২৫৬. আন নিহায়াতু ফিল ফিতানি ওয়াল মালাহিম, ১/৩৪৬。
২৫৭. বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৯/৩৮০। (দারু হিজর প্রকাশিত。)
১. ওয়ালিদ বিন মুসলিম বর্ণনা করেন। আবদুর রহমান বিন ইয়াযিদ বিন জাবির বলেন, জাহিলী যুগের ধ্যান-ধারণায় কট্টর বিশ্বাসী এক বৃদ্ধ এসে বলল, হে মুহাম্মাদ , তোমার এমন তিনটি কথা আমি শুনেছি, যা কোনো বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারে না।
আমি জানতে পারলাম, তুমি নাকি বলেছ:
১। আরবরা তাদের এবং পূর্বপুরুষের উপাস্যদের পরিত্যাগ করবে!
২। পারস্য-রাজ কিসরা ও রোম সম্রাট কাইসারের ধনভান্ডার তোমাদের হস্তগত হবে!
৩। আমাদের সকলের মৃত্যুর পর পুনরুত্থান হবে!
রাসুল বললেন, সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। আরবজাতি অতিসত্বর তাদের এবং তাদের পূর্বপুরুষদের উপাস্যগুলো পরিত্যাগ করবে। তারা কিসরা এবং কাইসারের ধনভান্ডার জয় করবে। এবং তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে। আর নিঃসন্দেহে তোমাদের পুনরুত্থান ঘটানো হবে। আর শোনো, কিয়ামতের দিন আমি তোমার হাত ধরে এ কথা স্মরণ করিয়ে দেব।
বৃদ্ধ বলল, মৃত্যুর ব্যাপারে তুমি আমাকে বিভ্রান্ত কোরো না। আর আমাকে ভুলেও যেয়ো না। রাসুল বললেন, আমি তোমাকে বিভ্রান্ত করছি না আর ভুলেও যাব না।
বৃদ্ধ লোকটির জীবদ্দশাতেই রাসুল -এর ওফাত হয়। একসময় রোম ও পারস্য মুসলমানদের পদানত হয়। রাসুল -এর ভবিষ্যদ্বাণীর এমন নিখুঁত বাস্তবতা দেখে একসময় বৃদ্ধ ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম-পরবর্তী জীবন খুবই উত্তম ছিল। উমর বহুবার তার এই ঘটনা শুনেছেন। মসজিদে তার কাছ থেকেই শুনতেন। মাঝে মাঝে উমর তাঁর নিকট দাঁড়িয়ে বলতেন, আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। রাসুল আপনার হাত ধরার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছেন। তিনি কেবল তাদের হাতই ধরবেন, যারা ইসলামের স্পর্শে সাফল্য ও সৌভাগ্যের ছোঁয়া পেয়ে ধন্য হয়েছেন。
২. আবদুল্লাহ বিন উমর হতে বর্ণিত, রাসুল বলেছেন,
لَيْسَ عَلَى أَهْلِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْشَةً فِي قُبُورِهِمْ، وَلَا مَنْشَرِهِمْ، وَكَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى أَهْلِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَهُمْ يَنْفُضُونَ التَّرَابَ عَنْ رُءُوسِهِمْ، وَيَقُولُونَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنَّا الْحَزَنَ
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' পাঠকারীদের কবরে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। পুনরুত্থানের দিনও কোনো সমস্যা নেই। আমি তো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠকারীদের দেখতে পাচ্ছি যে তারা মাথা হতে মাটি ঝাড়ছে আর বলছে, সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার, যিনি আমাদের এই দুর্ভোগ হতে রেহাই দিয়েছেন。
৩. আম্মাজান উম্মু সালামাহ বলেন,
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: يُحْشَرُ النَّاسُ حُفَاةً عُرَاةً كَمَا بَدَأُوْا
قَالَتْ أُمُّ سَلَمَةَ: فَقُلْتُ : وَاسَوْأَتَاهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلْ يَنْظُرُ بَعْضُنَا إِلَى بَعْضٍ؟
فَقَالَ: يَشْغُلُ النَّاسُ. قُلْتُ : وَمَا يُشْغِلُهُمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟
قَالَ : نَشْرُ الصُّحُفِ، فِيهَا مَثَاقِيلُ الذَّرِّ، وَمَثَاقِيلُ الْخَرْدَلِ
আমি রাসুল -কে বলতে শুনেছি, মানুষের পুনরুত্থান হবে নগ্নপদে বিবস্ত্র অবস্থায়। যেভাবে সে জন্মগ্রহণ করেছে। (এ কথা শুনে) উম্মু সালামা বিস্ময়ভরে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি সেদিন একে অপরকে দেখতে পাব? তিনি বললেন, মানুষ সেদিন ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বে। বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, তারা কী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে? উত্তরে তিনি বললেন, আমলনামা নিয়ে। সেখানে বিন্দু ও ধূলিকণা পরিমাণ বিষয়ও উল্লেখ থাকবে।
৪. আবু বকর আইয়াশ বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বলেন, হাশরের দিন মানুষ কবর হতে বেরিয়ে তাদের রেখে যাওয়া ভূমির পরিবর্তে অন্য ভূমি দেখবে। নিজেদের চেনাজানা মানুষের বদলে অচেনা লোকজন দেখবে। বিষয়টির উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন,
فما الناس بالناس الذين عهدتهم *** ولا الدار بالدار التي كنت تعرف
এরা তো আর তারা নয়, যাদের তুমি জানতে
এ দুয়ারও সে দুয়ার নয়, যেথায় তুমি থাকতে。
৫. মাইমুন বিন মুসা মারাঈ বলেন, আমি হাসান বসরী-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُم مِّنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنسِلُونَ ﴾
আর যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে তখনই তারা কবর হতে ছুটে আসবে তাদের রবের দিকে。
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, শিঙায় ফুঁ দেওয়ার আওয়াজ শুনতেই মানুষ মাথার মাটি ঝাড়তে ঝাড়তে কবর হতে ছুটে বেড়িয়ে আসবে। এ সময় মুমিনগণ বলতে থাকবে, হে আল্লাহ, সমস্ত পবিত্রতা ও প্রশংসা একমাত্র আপনারই জন্য। আমরা তো যথাযথভাবে আপনার ইবাদত করতে পারিনি。
৬. সাঈদ বিন আবদুল্লাহ জুহানী বর্ণনা করেন, তাবেঈ ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেন, মানুষ কবরের মাটিতে মিশে যাবে। প্রথমবার যখন শিঙ্গায় ফুৎকারের আওয়াজ শোনা যাবে তখন সমস্ত রূহ নিজ নিজ দেহে ফিরে আসবে এবং বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো জোড়া লাগবে। দ্বিতীয়বার ফুৎকার শোনার পর লোকজন নিজ নিজ পায়ে উঠে দাঁড়াবে এবং মাথা হতে মাটি ঝাড়বে。
৭. সুলাইমান বিন তরখান বলেন, আমি সাইয়ার শামী -কে বলতে শুনেছি যে, মানুষ যখন ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় কবর হতে বেরিয়ে আসবে তখন একজন ঘোষণাকারী (ফিরিশতা) ঘোষণা করবে,
(يَا عِبَادِ لَا خَوْفٌ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ وَلَا أَنتُمْ تَحْزَنُونَ )
হে আমার বান্দাগণ, আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং তোমরা চিন্তিতও হবে না。
এ ঘোষণা শুনে সবাই আশাবাদী হয়ে সেদিকে ছুটতে শুরু করবে। তখন বলা হবে,
(الَّذِينَ آمَنُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا مُسْلِمِينَ)
(তোমরা) যারা আমার আয়াতসমূহে বিশ্বাস করেছিলে এবং অনুগত ছিলে।
এ ঘোষণা শুনে মুসলমান ব্যতীত বাকি সকলে হতাশায় মুষড়ে পড়বে。
৮. নযর বিন আরবি বলেন, আমি জানতে পেরেছি যে, মানুষ যখন কবর হতে পুনরুত্থিত হয়ে উঠে আসবে তখনো তাদের স্লোগান হবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আর কবর থেকে উঠার পর ভালো ও মন্দ সকলের প্রথম বাক্য হবে, 'ইয়া রব, আমাদের প্রতি দয়া করুন।'
৯. ওয়ালিদ বিন আবু মারওয়ান বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বলেছেন, মৃত ব্যক্তি তার কাফন-সহ পুনরুত্থিত হবে।
১১. ইবাদ বিন ওয়ালিদ কুরাইশী বর্ণনা করেন। মুকাতিল বিন হাইয়ান বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا )
আর (সেদিন) জমিন তার বোঝা বের করে দেবে।
এই আয়াতে জমিনের বোঝা বের করে দেওয়ার অর্থ হলো, ভূ-গর্ভ হতে মৃত লোকজন বেড়িয়ে আসবে আর ভূ-পৃষ্ঠে চলতে শুরু করবে।
১২. রুস্তম বিন উসামা বর্ণনা করেন। বিখ্যাত আবিদ ফযল বিন মুহমাল সাদী বলেন, আমাদের সাথে মুজিব নামে মুত্তাকী ও আবিদ শ্রেণির এক লোকের উঠা-বসা ছিল। অন্যদের তুলনায় তিনি ছিলেন অনন্য সৌন্দর্যের অধিকারী। তার রাত কেটে যেত নামাযে দাঁড়িয়ে। আর দিনের বেলা রোজা রাখতে রাখতে তিনি হাড় জিরজিরে হয়ে পড়েন। এভাবেই ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত অবস্থায় একসময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন। মুহাম্মাদ বিন নযর হারিসী ছিলেন তার অন্যতম বন্ধু। তিনি অবশ্য মুজিবের আগেই ইনতিকাল করেন। মুজিবের ইনতিকালের পর আমি একদিন স্বপ্নযোগে মুহাম্মাদ বিন নযরের সাক্ষাৎ লাভ করি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার ভাই মুজিবের কী অবস্থা?
বলল, সে তার আমল অনুযায়ী ফল পেয়েছে। জিজ্ঞাসা করলাম, তার সেই সুন্দর চেহারার এখন কী অবস্থা? বলল, আল্লাহ তাআলা তার চেহারা মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছেন।
বললাম, তুমি না বললে সে তার আমল অনুযায়ী ফল লাভ করেছে, তাহলে আবার এমন হয় কী করে?
সে বলল, ভাই, তুমি কি জানো না? কবর মানবদেহকে গ্রাস করে নেয়! আর কিয়ামতের দিন আমলসমূহ পুনরুজ্জীবিত হয়! বললাম, হ্যাঁ, কবর তো দেহকে এমনভাবে গ্রাস করে যে তার কিছুই আর বাকি থাকে না। অতঃপর কিয়ামতের দিন সবাই পুনরুত্থিত হবে।
সে বলল, ঠিক বলেছ ভাই। আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা দেহকে এমনভাবে মিটিয়ে দেয় যে, তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। অতঃপর যেদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে সেদিন চোখের পলক ফেলার চেয়ে দ্রুত সময়ে তিনি তাদের পুনরুত্থান ঘটাবেন。
১৩. জাফর বিন সুলাইমান বর্ণনা করেন। ইবরাহীম বিন ঈসা ইয়াশকারী বলেন, আমাদের নিকট খবর পৌঁছেছে যে, মুমিন ব্যক্তি যখন কবর উঠে আসবে তখন দুজন ফিরিশতা তার সাথে সাক্ষাৎ করবেন। একজনের হাতে রেশমি কাপড়ে জড়ানো বরফ ও সুগন্ধী থাকবে। অন্যজনের হাতে শরাব-ভর্তি জান্নাতি সোরাহি। প্রথমজন তাতে সুগন্ধী মিশিয়ে শরাবসহ তাকে পরিবেশন করতে বলবেন। দ্বিতীয়জন সেই পানীয় মুমিনের সম্মুখে পরিবেশন করবেন। মুমিন তা পান করবেন। এরপর জান্নাতে প্রবেশের আগে তার কোনো প্রকার তৃষ্ণা জাগবে না.***
১৪. আবুল আলিয়া বলেন, মৃত ব্যক্তিকে তার কাফনসহ পুনরুত্থান করানো হবে।
সালিহ মুররি বলেন, হাশরের দিন কবরবাসী ছিন্ন কাফন, জীর্ণ দেহ, বিবর্ণ চেহারা, উশকোখুশকো চুল, শ্রান্ত দেহে নিজ নিজ কবর হতে বেরিয়ে আসবে। ভয়ে-আতঙ্কে তাদের প্রাণ চলে যাওয়ার উপক্রম হয়ে যাবে। হাশরের ময়দানে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ বলতে পারবে না তার ঠিকানা কী হতে চলেছে? অতঃপর কারও ঠিকানা জান্নাত আর কারও ঠিকানা হবে জাহান্নাম। নেককার বান্দা আমলনামা পেয়ে উল্লাসে উঁচু স্বরে বলে উঠবে, হায়! জাহান্নাম কতই-না
নিকৃষ্ট ঠিকানা। হে আল্লাহ, আপনি যদি আপনার সুপ্রশস্ত রহমত দ্বারা আমাদের রক্ষা না করতেন, তাহলে তো আমাদের মারাত্মক গুনাহসমূহ আমাদের চুপসে দিত। আর আমাদের এমন-সব অপরাধ রয়েছে, যা আপনি ছাড়া আর কেউ ক্ষমা করতে পারে না।
تَمَّتْ بِتَوْفِيقِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ الْحَكِيمِ الرَّحِيمِ
টিকাঃ
২৪১. আল আহওয়াল, ৭১, বর্ণনা: ৮৯। সনদ মারফু。
২৪২. মুজামুল আওসাত লিত-তাবারানী, ৯/১৮১, হাদিস নং ১৪৭৮; শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ১/২০২, হাদিস নং ৯৯। সনদ দুর্বল。
২৪৩. মুজামুল আওসাত লিত তাবারানী, ৮৩৩। হাসান লিগাইরিহি। কাছাকাছি সহিহ বর্ণনা রয়েছে: সুনানু তিরমিযী, ৩৩৩২। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস হতে। সনদ হাসান সহিহ。
২৪৪. আল আহওয়াল, ১৭৬। বর্ণনা: ২১৭ আবু বকর বিন আইয়াশ আবদুল্লাহ বিন আব্বাস এর সাক্ষাৎ লাভ করেননি。
২৪৫. সুরা ইয়াসিন, (৩৬): ৫১。
২৪৬. আল আহওয়াল, ৬৬, বর্ণনা: ৮৪。
২৪৭. বিদায়া ওয়া নিহায়া, ১৯/৩৪৫। (দারু হাজ্জার)
২৪৮. সুরা যুখরুফ, (৪৩): ৬৮
২৪৯. সুরা যুখরুফ (৪৩): ৬৯
২৫০. তাফসীরুত তাবারী, ২০/৬৮১; সুরা যুখরুফ, (৪৩): ৬৮ ও ৬৯ এর ব্যাখ্যায়。
২৫১. বিদায়া ওয়া নিহায়া, ১৯/৩৯১। (দারু হাজার)
২৫২, আন নিহায়াতু ফিল ফিতানি ওয়াল মালাহিম, ১/৩২২。
২৫৩. সুরা যিলযাল, (৯৯): ২
২৫৪. আল আহওয়াল, ৬৫। বর্ণনা: ৮২。
২৫৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৪৫。
২৫৬. আন নিহায়াতু ফিল ফিতানি ওয়াল মালাহিম, ১/৩৪৬。
২৫৭. বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৯/৩৮০। (দারু হিজর প্রকাশিত。)