📄 বিভিন্ন প্রাসাদ ও ভবনের গায়ে লিপিবদ্ধ উপদেশমালা
১. উমর বিন আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বলেন, উরওয়া বিন যুবাইর-এর প্রাসাদের পাশেই আকীক পাথরখচিত এক প্রাসাদের মূল ফটকে আমি এই লেখাটি পড়েছি,
কম্ ক্বদ্ তওয়ারছু হাজাল ক্বসরু মিম্ মালিক্ *** ফামাত ওয়াল ওয়ারিছুল বাক্বয়ী 'আলাল আছার।
এই প্রাসাদ কত রাজা-বাদশাহের পৈত্রিক অধিকারে গিয়েছে,
একজনের মৃত্যুতে অন্যজন এসে উত্তরাধিকার প্রয়োগ করেছে।
২. মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন উকবা বিন আবু সহবা বলেন, আমি তরসুস শহরের বাবুল জিহাদ তোরণের পাশে একটি কবরে এই লেখাটি দেখতে পাই,
ফারাক্বতু দুনইয়ায়ী ওয়া স্বরত ইলা রাব্বি *** ফিয়া রব্বি ফাগফির মা তাক্বাদ্দামা মিন জাম্বি
আমর্নি বিআশইয়াউ ওয়া 'আন গাইরিহা নাহা *** ফাখালাফতুহা ফিহা ফাআসবাহতু ফি কুরবি
মোহময় জীবনের মায়া ছেড়ে রবের আশ্রয়ে চললাম,
হে আমার রব, যাবতীয় গুনাহের ফিরিস্তি ক্ষমা করে দিন।
আপনার কতশত ফরমান লঙ্ঘন করে আজ এই যাতনার মুখে এসে পড়েছি।
৪. ইবনু আবিদ দুনিয়া বলেন, রবীআহ গোত্রের এক ব্যক্তির কাছে শুনেছি, তিনি বলেন, আমাদের শত্রু দ্বীপের এক ব্যক্তি বলেছে, আসকার নগরীর এক প্রান্তে আমরা একটি পাথর পেলাম, তাতে রোমান ভাষায় কিছু লেখা ছিল। আমরা লেখাটি পড়তে পারে এমন এক ব্যক্তিকে খুঁজে বের করলাম। তিনি আমাদের তা পড়ে শোনালেন। সেখানে লেখা ছিল,
দুমতু 'আলা মা কানা মিন্নি নাদামাহ্ *** ওয়া মাঁই ইয়াত্তাবি'উ মা তাশতাহিহিন নাফসু ইয়ানদাম্
আলম তা'লামু ইন্নাল হিসাবা আমামাকুম *** ওয়া ইন্ ওয়ারয়াকুম ত্বালিবাল লাইসা ইয়াসআম্
ফাখাফু লিকাই তা'মানু বা'দা মাউতিকুম *** ওয়াতালক্বওনা রব্বান 'আদিলাল লাইসা ইয়াজলিম
ফালাইসাল মাগরুরু বিদুন্ইয়াহু রাহা *** সাইয়ান্দামু ইন্ যাллаত বিহিন না'লু ফা'লাম।
সকল ভুল-ভ্রান্তির জন্য আমি লজ্জিত, অনুতপ্ত।
প্রবৃত্তির অনুসারী ব্যক্তিকে তো অপদস্থ হতেই হবে।
খেয়াল করেছ কি? হিসাব-নিকাশের দিন ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে,
আর জীবনের নানা আবেদনও পিছু নিয়েছে।
আল্লাহকে ভয় করো, পরকালে শান্তির দেখা পাবে।
এমন দয়ালু মালিকের সাক্ষাৎ পাবে, যিনি অবিচার করেন না।
দুনিয়ার ধোঁকায় পা বাড়ালে কোথাও আর শান্তি পাওয়া যাবে না।
দুনিয়াদার ব্যক্তি অচিরেই পাথুরে নির্জনতায় পর্যুদস্ত হতে যাচ্ছে।
৫. ইবনু আবিদ দুনিয়া বলেন, আমার কয়েকজন সাথির কাছে শুনেছি, তারা জনৈক আলিমের কাছ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি নজদ এলাকার একটি গুহায় ইসলামের দুই হাজার বছর আগের একটি শিলালিপি পাই। তাতে কিছু পঙ্ক্তিমালা লেখা ছিল। আমি সেগুলোর পাঠোদ্ধার করেছি। সেখানে লেখা ছিল,
منع البقاء فلا بقاء عليكما *** ليل بكر سواده ونهاره
حزنا لم يريا معا في موطن *** وكلاهما تجري به المقدار
لو نال شيء يلبسان حلوقه *** وعاورته الريح والأمطار
ولقد رمقنا الليل أين أتى به *** والشمس فانحسرت بنا الأبصار
والله يقضي بين ذلك أمره *** فيكون فيه اليسر والإعسار
وبه فناء قبيلة ونماؤها *** وتوارد الأيام والأصدار.
জমিনের বুকে স্থায়ী বলে কিছু নেই,
রাতের আঁধার, দিনের কিরণ সব চক্রাকারে আসছে যাচ্ছে।
নিজ নিজ চক্রপথে রাত ও দিন কোনো কুক্ষণেও সংঘর্ষে গড়ায়নি।
দিন ও রাতের মাঝে যা কিছু দ্বিধা তৈরি হয়েছে,
সবই তার প্রবল বাতাস ঝড়ো বৃষ্টির আড়াল।
এখানে রাতের আঁধার নামতেই ছড়িয়ে পড়ে শীতল প্রশ্বাস,
দিনের আলো এসে কেড়ে নেয় পথিকের দৃষ্টি কিরণ।
এভাবেই নিপুণ চক্র তৈরি করে দিয়েছেন মহান রব,
এতে সরল সমীকরণ ও জটিল হিসেবের ধাঁধা লুকিয়ে রয়েছে।
লুকিয়ে আছে জাতি, গোষ্ঠী ও ব্যক্তির উত্থানপতন রহস্য।
এভাবেই চক্রাকারে দিন, কাল ঘটনার আবর্তন চলছে。
টিকাঃ
২৩৬. আল ইতিবারু ওয়াল আকাবুস সুরুরি ওয়াল আহযান। বর্ণনা নং ৬০。
২৩৭. মাওসুআতু ইবনি আবিদ দুনিয়া, ৪৫৭১। বর্ণনা: ৮৮৪৫。
২৩৮. তারীখু দিমাশক, ৬/৩৪১。
২৩৯. মাওসুআতু ইবনি আবিদ দুনিয়া, ৪/৫৮৭। বর্ণনা: ৮৮৮৮。
১. উমর বিন আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বলেন, উরওয়া বিন যুবাইর-এর প্রাসাদের পাশেই আকীক পাথরখচিত এক প্রাসাদের মূল ফটকে আমি এই লেখাটি পড়েছি,
কম্ ক্বদ্ তওয়ারছু হাজাল ক্বসরু মিম্ মালিক্ *** ফামাত ওয়াল ওয়ারিছুল বাক্বয়ী 'আলাল আছার।
এই প্রাসাদ কত রাজা-বাদশাহের পৈত্রিক অধিকারে গিয়েছে,
একজনের মৃত্যুতে অন্যজন এসে উত্তরাধিকার প্রয়োগ করেছে।
২. মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন উকবা বিন আবু সহবা বলেন, আমি তরসুস শহরের বাবুল জিহাদ তোরণের পাশে একটি কবরে এই লেখাটি দেখতে পাই,
ফারাক্বতু দুনইয়ায়ী ওয়া স্বরত ইলা রাব্বি *** ফিয়া রব্বি ফাগফির মা তাক্বাদ্দামা মিন জাম্বি
আমর্নি বিআশইয়াউ ওয়া 'আন গাইরিহা নাহা *** ফাখালাফতুহা ফিহা ফাআসবাহতু ফি কুরবি
মোহময় জীবনের মায়া ছেড়ে রবের আশ্রয়ে চললাম,
হে আমার রব, যাবতীয় গুনাহের ফিরিস্তি ক্ষমা করে দিন।
আপনার কতশত ফরমান লঙ্ঘন করে আজ এই যাতনার মুখে এসে পড়েছি।
৪. ইবনু আবিদ দুনিয়া বলেন, রবীআহ গোত্রের এক ব্যক্তির কাছে শুনেছি, তিনি বলেন, আমাদের শত্রু দ্বীপের এক ব্যক্তি বলেছে, আসকার নগরীর এক প্রান্তে আমরা একটি পাথর পেলাম, তাতে রোমান ভাষায় কিছু লেখা ছিল। আমরা লেখাটি পড়তে পারে এমন এক ব্যক্তিকে খুঁজে বের করলাম। তিনি আমাদের তা পড়ে শোনালেন। সেখানে লেখা ছিল,
দুমতু 'আলা মা কানা মিন্নি নাদামাহ্ *** ওয়া মাঁই ইয়াত্তাবি'উ মা তাশতাহিহিন নাফসু ইয়ানদাম্
আলম তা'লামু ইন্নাল হিসাবা আমামাকুম *** ওয়া ইন্ ওয়ারয়াকুম ত্বালিবাল লাইসা ইয়াসআম্
ফাখাফু লিকাই তা'মানু বা'দা মাউতিকুম *** ওয়াতালক্বওনা রব্বান 'আদিলাল লাইসা ইয়াজলিম
ফালাইসাল মাগরুরু বিদুন্ইয়াহু রাহা *** সাইয়ান্দামু ইন্ যাллаত বিহিন না'লু ফা'লাম।
সকল ভুল-ভ্রান্তির জন্য আমি লজ্জিত, অনুতপ্ত।
প্রবৃত্তির অনুসারী ব্যক্তিকে তো অপদস্থ হতেই হবে।
খেয়াল করেছ কি? হিসাব-নিকাশের দিন ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে,
আর জীবনের নানা আবেদনও পিছু নিয়েছে।
আল্লাহকে ভয় করো, পরকালে শান্তির দেখা পাবে।
এমন দয়ালু মালিকের সাক্ষাৎ পাবে, যিনি অবিচার করেন না।
দুনিয়ার ধোঁকায় পা বাড়ালে কোথাও আর শান্তি পাওয়া যাবে না।
দুনিয়াদার ব্যক্তি অচিরেই পাথুরে নির্জনতায় পর্যুদস্ত হতে যাচ্ছে।
৫. ইবনু আবিদ দুনিয়া বলেন, আমার কয়েকজন সাথির কাছে শুনেছি, তারা জনৈক আলিমের কাছ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি নজদ এলাকার একটি গুহায় ইসলামের দুই হাজার বছর আগের একটি শিলালিপি পাই। তাতে কিছু পঙ্ক্তিমালা লেখা ছিল। আমি সেগুলোর পাঠোদ্ধার করেছি। সেখানে লেখা ছিল,
منع البقاء فلا بقاء عليكما *** ليل بكر سواده ونهاره
حزنا لم يريا معا في موطن *** وكلاهما تجري به المقدار
لو نال شيء يلبسان حلوقه *** وعاورته الريح والأمطار
ولقد رمقنا الليل أين أتى به *** والشمس فانحسرت بنا الأبصار
والله يقضي بين ذلك أمره *** فيكون فيه اليسر والإعسار
وبه فناء قبيلة ونماؤها *** وتوارد الأيام والأصدار.
জমিনের বুকে স্থায়ী বলে কিছু নেই,
রাতের আঁধার, দিনের কিরণ সব চক্রাকারে আসছে যাচ্ছে।
নিজ নিজ চক্রপথে রাত ও দিন কোনো কুক্ষণেও সংঘর্ষে গড়ায়নি।
দিন ও রাতের মাঝে যা কিছু দ্বিধা তৈরি হয়েছে,
সবই তার প্রবল বাতাস ঝড়ো বৃষ্টির আড়াল।
এখানে রাতের আঁধার নামতেই ছড়িয়ে পড়ে শীতল প্রশ্বাস,
দিনের আলো এসে কেড়ে নেয় পথিকের দৃষ্টি কিরণ।
এভাবেই নিপুণ চক্র তৈরি করে দিয়েছেন মহান রব,
এতে সরল সমীকরণ ও জটিল হিসেবের ধাঁধা লুকিয়ে রয়েছে।
লুকিয়ে আছে জাতি, গোষ্ঠী ও ব্যক্তির উত্থানপতন রহস্য।
এভাবেই চক্রাকারে দিন, কাল ঘটনার আবর্তন চলছে。
টিকাঃ
২৩৬. আল ইতিবারু ওয়াল আকাবুস সুরুরি ওয়াল আহযান। বর্ণনা নং ৬০。
২৩৭. মাওসুআতু ইবনি আবিদ দুনিয়া, ৪৫৭১। বর্ণনা: ৮৮৪৫。
২৩৮. তারীখু দিমাশক, ৬/৩৪১。
২৩৯. মাওসুআতু ইবনি আবিদ দুনিয়া, ৪/৫৮৭। বর্ণনা: ৮৮৮৮。
📄 একটি পরিবারের তাওবা ও মৃত্যুর ঘটনা
সদাকাহ বিন মিরদাস বলেন, ত্রিপোলি শহরের উপকণ্ঠে একটি উঁচু ভূমিতে আমি তিনটি কবর দেখতে পাই। যার প্রথমটির নামফলকে লেখা ছিল,
وَكَيْفَ يَلَذُّ الْعَيْشَ مِنْ هُوَ عَالِمُ *** بِأَنَّ إِلَهَ الْخَلْقِ لَا بُدَّ سَائِلُهُ؟
فَيَأْخُذُ مِنْهُ ظُلْمَهُ لِعِبَادِهِ *** وَيَجْزِيهِ بِالْخَيْرِ الَّذِي هُوَ فَاعِلُهُ
আল্লাহ তাআলার কাছে সকলকে জবাবদিহি করতে হবে,
তা জেনেও মানুষ কীভাবে আনন্দ-উল্লাস করে বেড়ায়?
অচিরেই তিনি তার বান্দাদের অপকর্মের হিসাব নেবেন,
তখন নেক আমলের জন্য প্রত্যেককে উপযুক্ত বিনিময় দান করবেন।
দ্বিতীয় কবরের নামফলকে লেখা ছিল,
وَكَيْفَ يَلَذُّ الْعَيْشَ مَنْ كَانَ مُوقِنًا *** بِأَنَّ الْمَنَايَا بَغْتَةً سَتُعَاجِلُهُ
فَتَسْلُبُهُ مُلْكًا عَظِيمًا وَنَخْوَةٌ ... وَتُسْكِنُهُ الْبَيْتَ الَّذِي هُوَ آهِلُهُ
মৃত্যুর নীল থাবা সুনিশ্চিত জেনেও
কীভাবে মানুষ তার জীবনকে উপভোগ করতে পারে!
খুব শীঘ্রই মৃত্যুর সর্বগ্রাসী আগ্রাসন ভোগ-বিলাস আর প্রিয়জনের বাহু হতে তাকে ছিনিয়ে নেবে।
তৃতীয় কবরের নামফলকে খোদিত ছিল,
وَكَيْفَ يَلَذُّ الْعَيْشَ مَنْ هُوَ صَائِرُ *** إِلَى جَدَثٍ يُبْلِي الشَّبَابَ مَنَاهِلُهُ
وَيُذْهِبُ رَسْمَ الْوَجْهِ مِنْ بَعْدِ ضَوْئِهِ *** وَيَبْلَى سَرِيعًا جِسْمُهُ وَمَفَاصِلُهُ
অনতিবিলম্বে যে ব্যক্তি সংকীর্ণ কবরের উদরে যেতে চলেছে,
সে কীভাবে এখনো আনন্দ-উল্লাসে মত্ত আছে?
কবরবাসীর প্রথম প্রহরেই তার ইতিহাস মিটে যাবে,
শরীর পচে-গলে ছিন্নভিন্ন হয়ে হারিয়ে যাবে!
কবর তিনটি অন্যান্য কবরের চেয়ে সামান্য উঁচু এবং আলাদা ধরনের ছিল। আমি পাশের গ্রামে গিয়ে এক বৃদ্ধকে বসে থাকতে দেখে বললাম, আপনাদের গ্রামে এসে খুব বিস্ময়কর একটি জিনিস লক্ষ করলাম। তিনি বললেন, এখানে বিস্ময়ের আবার কী দেখলেন? তখন বৃদ্ধকে কবরের ঘটনা খুলে বলে নিজের বিস্মিত হওয়ার কারণ উল্লেখ করলাম। সব শুনে তিনি বললেন, তারা তিন জন ছিল সহোদর ভাই। তাদের একজন ছিল আমীর। সম্রাটের সহযোগী। সে বিভিন্ন শহরে গভর্নর হিসেবে ও সেনাবাহিনীতে সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছে। অন্যজন ছিলেন বড় মাপের একজন ব্যবসায়ী। আর তৃতীয় জন ছিলেন একজন আবিদ। তিনি আপন ইবাদত-বন্দেগীতে মগ্ন থাকতেন। একসময় তাদের আবিদ ভাইটির মৃত্যু ঘনিয়ে এল। খবর পেয়ে বাকি দুই ভাই ছুটে আসল। তাদের মধ্যে আমীর ভাইটি খলীফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের পক্ষ হতে আমাদের শাসক হিসেবে নিযুক্ত ছিল। সে ছিল খুবই অত্যাচারী, শোষক এবং বিপথগামী। দুই ভাই অন্তিম শয়ানে থাকা ভাইকে বলল, তুমি কি কোনো অসিয়ত করবে? ভাই বললেন, না। আল্লাহর শপথ! আমার কোনো সম্পদ নেই যে, অসিয়ত করে যাব। আমার কোনো ঋণ নেই যে, তা আদায় করতে বলে যাব। দুনিয়াতে আমি এমন কিছু রেখে যাচ্ছি না, যা আমার আমলকে ছিনিয়ে নিতে পারে। এ কথা শুনে
খলীফার সহযোগী ভাইটি বলল, ভাই, বলো তুমি কী চাও? আমার সমস্ত সম্পদ তোমার জন্য হাজির। তুমি এই সম্পদের ব্যাপারে যা খুশি অসিয়ত করে যাও। যত খুশি ব্যয় করো। এ ব্যাপারে তুমি আমার কাছ থেকে যেকোনো প্রতিশ্রুতিও গ্রহণ করতে পার। শাসক ভাই নিজের কথা শেষ করতেই ব্যবসায়ী ভাইটি বলে উঠল, ভাই, তুমি তো আমার ব্যবসা আর সম্পদ সম্পর্কে জানো। তোমার হয়তো কখনো কোনো ভালো কাজে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করতে মন চেয়েছে, যা তুমি পারনি। আজ আমার সমস্ত সম্পদ তোমার জন্য হাজির। তুমি এখান থেকে যা ইচ্ছা গ্রহণ করো। তোমার জন্য সব উন্মুক্ত। এই কথা বলে তারা ভাইয়ের প্রতি ঝুঁকল। তখন মৃত্যুপথযাত্রী ভাই বললেন, তোমাদের সম্পদ আমার দরকার নেই। তবে আমি তোমাদের কাছে একটি প্রতিশ্রুতি চাই। তোমরা কিছুতেই তা ভঙ্গ করবে না। আমি যখন মৃত্যুবরণ করব। তোমরা আমাকে গোসল দেবে। কাফন পরাবে। এবং নির্দিষ্ট স্থানে দাফন করবে। অতঃপর আমার নামফলকে এই কথা লিখে দেবে,
وَكَيْفَ يَلَذُّ الْعَيْشَ مِنْ هُوَ عَالِمٌ *** بِأَنَّ إِلَهَ الْخَلْقِ لَا بُدَّ سَائِلُهُ؟
فَيَأْخُذُ مِنْهُ ظُلْمَهُ لِعِبَادِهِ *** وَيَجْزِيهِ بِالْخَيْرِ الَّذِي هُوَ فَاعِلُهُ
আল্লাহ তাআলার কাছে সকলকে জবাবদিহি করতে হবে,
তা জেনেও মানুষ কীভাবে আনন্দ-উল্লাস করে বেড়ায়?
অচিরেই তিনি তার বান্দাদের অপকর্মের হিসাব নেবেন,
তখন নেক আমলের জন্য প্রত্যেককে উপযুক্ত বিনিময় দান করবেন।
আমার কাফন-দাফন সম্পন্ন করার পর প্রতিদিন তোমরা আমার কবর জিয়ারত করতে আসবে। এতে তোমরা নিজেদের জন্য উপদেশ খুঁজে পাবে। ভাইয়ের মৃত্যুর পর বাকি দুই ভাই তা-ই করতে লাগল। প্রশাসনে কর্মরত ভাইটি তার সাথে একদল সৈনিক নিয়ে ভাইয়ের কবরের পাশে আসত। সেখানে দাঁড়িয়ে তার জন্য কিছু পাঠ করে চোখের জলে বুক ভাসাত। তৃতীয় দিন যখন সে কবর জিয়ারত করতে গেল, ফিরে আসার মুহূর্তে কবরের ভেতর হতে বিকট আওয়াজ শুনতে পেল। বিকট আওয়াজে তার প্রাণপাখি উড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়িমরি করে ছুটে বাঁচল। রাতে কবরবাসী ভাইকে স্বপ্নে দেখল। জিজ্ঞাসা করল, ভাই, তোমার কবরে আজ বিকট আওয়াজ শুনেছি। তা কিসের
আওয়াজ ছিল? ভাই বলল, বিরাটকায় এক হাতুড়ি দ্বারা আঘাতের আওয়াজ। আমাকে এই বলে প্রহার করা হয়েছে যে, কত মানুষকে তুমি জুলুমের শিকার হতে দেখেছ; অথচ তাদের কোনো সাহায্য করোনি!
সকাল হতেই দ্বিতীয় ভাইটি বিমর্ষচিত্তে ব্যবসায়ী ভাই ও নিজের ঘনিষ্ঠ লোকজনকে ডেকে আনল। সবাই আসলে সে বলল, আমাদের ভাই মৃত্যুর পূর্বে তার নামফলকে যা লিখতে অসিয়ত করেছিল তার উদ্দেশ্য ছিল আমাকে শিক্ষা দেওয়া। আমি ভালো করেই বুঝতে পেরেছি যে, চিরকাল আমি তোমাদের মাঝে থাকব না। এরপর সে প্রশাসনিক দায়-দায়িত্ব ছেড়ে ইবাদত-বন্দেগীতে মনোনিবেশ করল। খলীফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানকে দায়িত্ব হতে অব্যাহতি গ্রহণ ও পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে জানিয়ে পত্র পাঠাল। এর পরে সে কিছু আবিদের সাথে নির্জন পাহাড়ে আশ্রয় নিল। একসময় তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসল। সে সময় তার সাথে কয়েকজন রাখাল উপস্থিত ছিল।
ব্যবসায়ী ভাইয়ের কাছে সংবাদ পৌঁছলে সে মৃত্যুপথযাত্রী ভাইয়ের শয্যাপাশে ছুটে আসল। জিজ্ঞাসা করল, ভাই, তুমি কি কোনো অসিয়ত করবে? ভাই বলল, আমার কাছে কোনো সম্পদ নেই যে, অসিয়ত করে যাব। তবে তোমার কাছে আমার দাবি যে, মৃত্যুর পর আমার কবর উঁচু না করে সমান করে দেবে। আর আমাকে আমার ভাইয়ের পাশে দাফন করবে। দাফনের পর নামফলকে এই কথাগুলো লিখে দেবে,
وَكَيْفَ يَلَذُّ الْعَيْشُ مَنْ كَانَ مُوقِنًا ... بِأَنَّ الْمَنَايَا بَغْتَةً سَتُعَاجِلُهُ
فَتَسْلُبُهُ مُلْكًا عَظِيمًا وَنَخْوَةٌ ... وَتُسْكِنُهُ الْبَيْتَ الَّذِي هُوَ آهِلُهُ
মৃত্যুর নীল থাবা সুনিশ্চিত জেনেও
কীভাবে মানুষ তার জীবনকে উপভোগ করতে পারে!
খুব শীঘ্রই মৃত্যুর সর্বগ্রাসী আগ্রাসন ভোগ-বিলাস আর প্রিয়জনের বাহু হতে তাকে ছিনিয়ে নেবে।
মৃত্যুপথযাত্রী ভাই আরও বলল, আমার কাফন-দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর তিন দিন তুমি আমার কবরের পাশে আমার জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট রহমত ও
মাগফিরাতের দুআ করবে। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ব্যবসায়ী ভাই তার সকল ইচ্ছা পূরণ করল। প্রথম দু-দিনের পর তৃতীয় দিনও সে ভাইয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তার জন্য চোখের জলে বুক ভাসিয়ে দুআ করল। জিয়ারত শেষে ফিরে আসবে এমন সময় কবরের ভেতর হতে বিকট এক আওয়াজ শুনতে পেল। আওয়াজ শুনে সে হকচকিয়ে উঠল। বিধ্বস্ত অবস্থায় সেখান থেকে ফিরে আসল। রাতে সে তার ভাইকে স্বপ্নে দেখল।
সে বলল, আমি ভাইকে দেখতেই নিজের ভয় পাওয়ার ঘটনা তুলে ধরে বললাম, ভাই, আমি তোমার কবর জিয়ারত করতে এসেছিলাম। ভাই বলল, হায়! ঘরোয়া দেখা-সাক্ষাতের পর আর যদি দেখা-সাক্ষাৎ করার কোনো সুযোগ থাকত! জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই, তোমার কী অবস্থা? বলল, তাওবার ফলে বেশ ভালো আছি। বললাম, আবিদ ভাইটি কেমন আছে? বলল, সে তো অগ্রগামী নেককার লোকজনের সাথে আছে। বললাম, এখন আমাদের কী হবে? বলল, দুনিয়ার জীবন থেকে পরকালের জন্য যে যা পাঠাবে, এখানে এসে ঠিক তা-ই পাবে। তোমার কাছে যা আছে, তা অন্যের হাতে যাওয়ার আগেই একে মূল্যায়ন করো।
সকাল হতে ব্যবসায়ী ভাইটি পার্থিব ভোগবিলাস ছেড়ে নির্জনতা বেছে নিল। সে নিজের ধন-সম্পদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তা চার ভাগে বণ্টন করে দিল। আর নিজেকে ইবাদত-বন্দেগীতে সঁপে দিল। তার একজন ছেলে ছিল। সুঠাম দেহের অধিকারী ও সুদর্শন যুবক। ছেলেটি সমস্ত আয়-ব্যয় ও ব্যবসার হিসাব বুঝে নিল। একদিন এই ভাইয়েরও মৃত্যু ঘনিয়ে আসল। মৃত্যুশয্যায় তার যুবক সন্তান বলল, বাবা, আপনি কি কোনো অসিয়ত করে যেতে চান? লোকটি বলল, বেটা, আল্লাহর শপথ! তোমার পিতার কাছে অসিয়ত করে যাওয়ার মতো কিছু নেই। তবে আমি তোমার কাছে এই দাবি জানাচ্ছি যে, আমার মৃত্যুর পর আমাকে তোমার দুই চাচার পাশে দাফন করবে; আর আমার নামফলকে এই পঙ্ক্তিমালা লিখে দেবে,
وَكَيْفَ يَلَذُّ الْعَيْشَ مَنْ هُوَ صَائِرُ *** إِلَى جَدَثٍ يُبْلِي الشَّبَابَ مَنَاهِلُهُ
وَيُذْهِبُ رَسْمَ الْوَجْهِ مِنْ بَعْدِ ضَوْنِهِ *** وَيَبْلَى سَرِيعًا جِسْمُهُ وَمَفَاصِلُهُ
অনতিবিলম্বে যে ব্যক্তি সংকীর্ণ কবরের উদরে যেতে চলেছে,
সে কীভাবে এখনো আনন্দ-উল্লাসে মত্ত আছে?
কবরবাসের প্রথম প্রহরেই তার ইতিহাস মিটে যাবে,
শরীর পচে-গলে ছিন্নভিন্ন হয়ে হারিয়ে যাবে!
মৃত্যুপথযাত্রী পিতা আরও বলল, আমার কাফন-দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর তিনদিন তুমি আমার কবরের পাশে আমার জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করবে। পিতার মৃত্যুর পর ছেলে তার সকল ইচ্ছা পূরণ করল। প্রথম ও দ্বিতীয় দিনের পর যথারীতি তৃতীয় দিনও সে পিতার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তার জন্য দুআ করল। জিয়ারত শেষে ফিরে আসতে উদ্যত হতেই কবরের ভেতর হতে একটি আওয়াজ শুনতে পেল। আওয়াজ শুনে সে ভয় পেয়ে গেল। বিষন্ন মনে সে তার পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে আসল। রাতে সে তার পিতাকে স্বপ্নে দেখল।
স্বপ্নযোগে পিতা তার সন্তানকে বলল, বেটা, তুমি আমাদের কাছে খুব অল্প সময়ের জন্য এসেছ। আর এই জীবনেরও সমাপ্তি রয়েছে। মৃত্যু অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি নিকটবর্তী। অতএব আখেরি সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করো। দীর্ঘ সফরের জন্য তৈরি হও। এই অস্থায়ী নিবাস ছেড়ে চিরস্থায়ী নিবাসের রসদ মওজুদ করো। অকর্মণ্য লোকদের মতো ধোঁকায় পড়ে যেয়ো না। তাদের দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা তাদের প্রতারিত করে চলেছে। আজকে তাদের আখিরাতের পাথেয় খুবই সামান্য । এই অসতর্কতা ও আলসেমি মৃত্যুর সময় চরম লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা তাদের জীবন দুনিয়ার পেছনে বরবাদ করায় কপাল চাপড়ে পরিতাপ করছে। অথচ মৃত্যু ঘনিয়ে এলে এই অপমান কোনো কাজে দেবে না। তাদের প্রাচুর্য তাদের যে মরীচিকায় ফেলে রেখেছে। কিয়ামতের কঠিন দিনে এই অপ্রাপ্তি ও পরিতাপ ভুলের প্রায়শ্চিত্ত আদায়ে মোটেও যথেষ্ট হবে না।
বেটা, তুমি এখনি প্রস্তুতি শুরু করো। নতুন করে শুরু করো। পূর্ণ শক্তিতে শুরু করো।
যে বৃদ্ধ আমাকে ঘটনা শুনিয়েছেন, তিনি বলেন, আমি সেই যুবকের রাতে দেখা স্বপ্নের বাস্তবতা জানতে তার সাথে দেখা করতে গেলাম। সে আমাকে পুরো ঘটনা শোনাল।
যুবক বলল, স্বপ্নে আমার পিতা আমাকে যা বলেছেন; বাস্তবতা বিন্দুমাত্র ভিন্ন কিছু নয়। আমি তো দেখছি মৃত্যু আমার সাথে ছায়ার মতো লেগে আছে। অতঃপর সেও ধন-সম্পদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল। সব সদকা করে দিল। ঋণ পরিশোধ করল। অংশীদারদের হক আদায় করে দিল। যাবতীয় লেনদেন মিটিয়ে সকলকে সালাম জানিয়ে বিদায় দিল। তারাও তাকে বিদায় জানাল। সে একজন সদা সতর্ক ব্যক্তির মতোই নিজের দায়িত্ব সেরে নিল।
সে বলত, আমার পিতা বলেছেন, 'তুমি এখনি প্রস্তুতি শুরু করো। নতুন করে শুরু করো। পূর্ণ শক্তিতে শুরু করো।' হয়তো তিন বেলা পর আমি আর এখানে থাকব না। কিংবা তিন দিন, তিন মাস বা তিন বছর পর। তিন বছর তো অনেক বেশি হয়ে যাবে। আর আমি এতদিন এভাবে থাকতে চাই না।
বৃদ্ধ বলেন, এই ঘটনার তিন দিনের মাথায় যুবক তার পরিবার ও সন্তানাদিকে ডেকে জড়ো করল। সে তাদের সালাম জানিয়ে বিদায় নিল এবং কিবলামুখী হলো। এর পরে লম্বা হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করল আর কালিমাতুশ শাহাদাত পাঠ করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল! আল্লাহ তাআলা তার প্রতি রহম করুন! তার মৃত্যুর পর বিভিন্ন শহর হতে লোকজন এসে তার কবর জিয়ারত করতে লাগল。
টিকাঃ
২৪০. তারীখু দিমাশক, ৭২/৫৫-৫৭, ২৪/৩৩ ও ২৪/৪৩; শরহুস সুদূর, ২৮৬-২৮৮。
সদাকাহ বিন মিরদাস বলেন, ত্রিপোলি শহরের উপকণ্ঠে একটি উঁচু ভূমিতে আমি তিনটি কবর দেখতে পাই। যার প্রথমটির নামফলকে লেখা ছিল,
وَكَيْفَ يَلَذُّ الْعَيْشَ مِنْ هُوَ عَالِمُ *** بِأَنَّ إِلَهَ الْخَلْقِ لَا بُدَّ سَائِلُهُ؟
فَيَأْخُذُ مِنْهُ ظُلْمَهُ لِعِبَادِهِ *** وَيَجْزِيهِ بِالْخَيْرِ الَّذِي هُوَ فَاعِلُهُ
আল্লাহ তাআলার কাছে সকলকে জবাবদিহি করতে হবে,
তা জেনেও মানুষ কীভাবে আনন্দ-উল্লাস করে বেড়ায়?
অচিরেই তিনি তার বান্দাদের অপকর্মের হিসাব নেবেন,
তখন নেক আমলের জন্য প্রত্যেককে উপযুক্ত বিনিময় দান করবেন।
দ্বিতীয় কবরের নামফলকে লেখা ছিল,
وَكَيْفَ يَلَذُّ الْعَيْشَ مَنْ كَانَ مُوقِنًا *** بِأَنَّ الْمَنَايَا بَغْتَةً سَتُعَاجِلُهُ
فَتَسْلُبُهُ مُلْكًا عَظِيمًا وَنَخْوَةٌ ... وَتُسْكِنُهُ الْبَيْتَ الَّذِي هُوَ آهِلُهُ
মৃত্যুর নীল থাবা সুনিশ্চিত জেনেও
কীভাবে মানুষ তার জীবনকে উপভোগ করতে পারে!
খুব শীঘ্রই মৃত্যুর সর্বগ্রাসী আগ্রাসন ভোগ-বিলাস আর প্রিয়জনের বাহু হতে তাকে ছিনিয়ে নেবে।
তৃতীয় কবরের নামফলকে খোদিত ছিল,
وَكَيْفَ يَلَذُّ الْعَيْشَ مَنْ هُوَ صَائِرُ *** إِلَى جَدَثٍ يُبْلِي الشَّبَابَ مَنَاهِلُهُ
وَيُذْهِبُ رَسْمَ الْوَجْهِ مِنْ بَعْدِ ضَوْئِهِ *** وَيَبْلَى سَرِيعًا جِسْمُهُ وَمَفَاصِلُهُ
অনতিবিলম্বে যে ব্যক্তি সংকীর্ণ কবরের উদরে যেতে চলেছে,
সে কীভাবে এখনো আনন্দ-উল্লাসে মত্ত আছে?
কবরবাসীর প্রথম প্রহরেই তার ইতিহাস মিটে যাবে,
শরীর পচে-গলে ছিন্নভিন্ন হয়ে হারিয়ে যাবে!
কবর তিনটি অন্যান্য কবরের চেয়ে সামান্য উঁচু এবং আলাদা ধরনের ছিল। আমি পাশের গ্রামে গিয়ে এক বৃদ্ধকে বসে থাকতে দেখে বললাম, আপনাদের গ্রামে এসে খুব বিস্ময়কর একটি জিনিস লক্ষ করলাম। তিনি বললেন, এখানে বিস্ময়ের আবার কী দেখলেন? তখন বৃদ্ধকে কবরের ঘটনা খুলে বলে নিজের বিস্মিত হওয়ার কারণ উল্লেখ করলাম। সব শুনে তিনি বললেন, তারা তিন জন ছিল সহোদর ভাই। তাদের একজন ছিল আমীর। সম্রাটের সহযোগী। সে বিভিন্ন শহরে গভর্নর হিসেবে ও সেনাবাহিনীতে সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছে। অন্যজন ছিলেন বড় মাপের একজন ব্যবসায়ী। আর তৃতীয় জন ছিলেন একজন আবিদ। তিনি আপন ইবাদত-বন্দেগীতে মগ্ন থাকতেন। একসময় তাদের আবিদ ভাইটির মৃত্যু ঘনিয়ে এল। খবর পেয়ে বাকি দুই ভাই ছুটে আসল। তাদের মধ্যে আমীর ভাইটি খলীফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের পক্ষ হতে আমাদের শাসক হিসেবে নিযুক্ত ছিল। সে ছিল খুবই অত্যাচারী, শোষক এবং বিপথগামী। দুই ভাই অন্তিম শয়ানে থাকা ভাইকে বলল, তুমি কি কোনো অসিয়ত করবে? ভাই বললেন, না। আল্লাহর শপথ! আমার কোনো সম্পদ নেই যে, অসিয়ত করে যাব। আমার কোনো ঋণ নেই যে, তা আদায় করতে বলে যাব। দুনিয়াতে আমি এমন কিছু রেখে যাচ্ছি না, যা আমার আমলকে ছিনিয়ে নিতে পারে। এ কথা শুনে
খলীফার সহযোগী ভাইটি বলল, ভাই, বলো তুমি কী চাও? আমার সমস্ত সম্পদ তোমার জন্য হাজির। তুমি এই সম্পদের ব্যাপারে যা খুশি অসিয়ত করে যাও। যত খুশি ব্যয় করো। এ ব্যাপারে তুমি আমার কাছ থেকে যেকোনো প্রতিশ্রুতিও গ্রহণ করতে পার। শাসক ভাই নিজের কথা শেষ করতেই ব্যবসায়ী ভাইটি বলে উঠল, ভাই, তুমি তো আমার ব্যবসা আর সম্পদ সম্পর্কে জানো। তোমার হয়তো কখনো কোনো ভালো কাজে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করতে মন চেয়েছে, যা তুমি পারনি। আজ আমার সমস্ত সম্পদ তোমার জন্য হাজির। তুমি এখান থেকে যা ইচ্ছা গ্রহণ করো। তোমার জন্য সব উন্মুক্ত। এই কথা বলে তারা ভাইয়ের প্রতি ঝুঁকল। তখন মৃত্যুপথযাত্রী ভাই বললেন, তোমাদের সম্পদ আমার দরকার নেই। তবে আমি তোমাদের কাছে একটি প্রতিশ্রুতি চাই। তোমরা কিছুতেই তা ভঙ্গ করবে না। আমি যখন মৃত্যুবরণ করব। তোমরা আমাকে গোসল দেবে। কাফন পরাবে। এবং নির্দিষ্ট স্থানে দাফন করবে। অতঃপর আমার নামফলকে এই কথা লিখে দেবে,
وَكَيْفَ يَلَذُّ الْعَيْشَ مِنْ هُوَ عَالِمٌ *** بِأَنَّ إِلَهَ الْخَلْقِ لَا بُدَّ سَائِلُهُ؟
فَيَأْخُذُ مِنْهُ ظُلْمَهُ لِعِبَادِهِ *** وَيَجْزِيهِ بِالْخَيْرِ الَّذِي هُوَ فَاعِلُهُ
আল্লাহ তাআলার কাছে সকলকে জবাবদিহি করতে হবে,
তা জেনেও মানুষ কীভাবে আনন্দ-উল্লাস করে বেড়ায়?
অচিরেই তিনি তার বান্দাদের অপকর্মের হিসাব নেবেন,
তখন নেক আমলের জন্য প্রত্যেককে উপযুক্ত বিনিময় দান করবেন।
আমার কাফন-দাফন সম্পন্ন করার পর প্রতিদিন তোমরা আমার কবর জিয়ারত করতে আসবে। এতে তোমরা নিজেদের জন্য উপদেশ খুঁজে পাবে। ভাইয়ের মৃত্যুর পর বাকি দুই ভাই তা-ই করতে লাগল। প্রশাসনে কর্মরত ভাইটি তার সাথে একদল সৈনিক নিয়ে ভাইয়ের কবরের পাশে আসত। সেখানে দাঁড়িয়ে তার জন্য কিছু পাঠ করে চোখের জলে বুক ভাসাত। তৃতীয় দিন যখন সে কবর জিয়ারত করতে গেল, ফিরে আসার মুহূর্তে কবরের ভেতর হতে বিকট আওয়াজ শুনতে পেল। বিকট আওয়াজে তার প্রাণপাখি উড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়িমরি করে ছুটে বাঁচল। রাতে কবরবাসী ভাইকে স্বপ্নে দেখল। জিজ্ঞাসা করল, ভাই, তোমার কবরে আজ বিকট আওয়াজ শুনেছি। তা কিসের
আওয়াজ ছিল? ভাই বলল, বিরাটকায় এক হাতুড়ি দ্বারা আঘাতের আওয়াজ। আমাকে এই বলে প্রহার করা হয়েছে যে, কত মানুষকে তুমি জুলুমের শিকার হতে দেখেছ; অথচ তাদের কোনো সাহায্য করোনি!
সকাল হতেই দ্বিতীয় ভাইটি বিমর্ষচিত্তে ব্যবসায়ী ভাই ও নিজের ঘনিষ্ঠ লোকজনকে ডেকে আনল। সবাই আসলে সে বলল, আমাদের ভাই মৃত্যুর পূর্বে তার নামফলকে যা লিখতে অসিয়ত করেছিল তার উদ্দেশ্য ছিল আমাকে শিক্ষা দেওয়া। আমি ভালো করেই বুঝতে পেরেছি যে, চিরকাল আমি তোমাদের মাঝে থাকব না। এরপর সে প্রশাসনিক দায়-দায়িত্ব ছেড়ে ইবাদত-বন্দেগীতে মনোনিবেশ করল। খলীফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানকে দায়িত্ব হতে অব্যাহতি গ্রহণ ও পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে জানিয়ে পত্র পাঠাল। এর পরে সে কিছু আবিদের সাথে নির্জন পাহাড়ে আশ্রয় নিল। একসময় তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসল। সে সময় তার সাথে কয়েকজন রাখাল উপস্থিত ছিল।
ব্যবসায়ী ভাইয়ের কাছে সংবাদ পৌঁছলে সে মৃত্যুপথযাত্রী ভাইয়ের শয্যাপাশে ছুটে আসল। জিজ্ঞাসা করল, ভাই, তুমি কি কোনো অসিয়ত করবে? ভাই বলল, আমার কাছে কোনো সম্পদ নেই যে, অসিয়ত করে যাব। তবে তোমার কাছে আমার দাবি যে, মৃত্যুর পর আমার কবর উঁচু না করে সমান করে দেবে। আর আমাকে আমার ভাইয়ের পাশে দাফন করবে। দাফনের পর নামফলকে এই কথাগুলো লিখে দেবে,
وَكَيْفَ يَلَذُّ الْعَيْشُ مَنْ كَانَ مُوقِنًا ... بِأَنَّ الْمَنَايَا بَغْتَةً سَتُعَاجِلُهُ
فَتَسْلُبُهُ مُلْكًا عَظِيمًا وَنَخْوَةٌ ... وَتُسْكِنُهُ الْبَيْتَ الَّذِي هُوَ آهِلُهُ
মৃত্যুর নীল থাবা সুনিশ্চিত জেনেও
কীভাবে মানুষ তার জীবনকে উপভোগ করতে পারে!
খুব শীঘ্রই মৃত্যুর সর্বগ্রাসী আগ্রাসন ভোগ-বিলাস আর প্রিয়জনের বাহু হতে তাকে ছিনিয়ে নেবে।
মৃত্যুপথযাত্রী ভাই আরও বলল, আমার কাফন-দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর তিন দিন তুমি আমার কবরের পাশে আমার জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট রহমত ও
মাগফিরাতের দুআ করবে। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ব্যবসায়ী ভাই তার সকল ইচ্ছা পূরণ করল। প্রথম দু-দিনের পর তৃতীয় দিনও সে ভাইয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তার জন্য চোখের জলে বুক ভাসিয়ে দুআ করল। জিয়ারত শেষে ফিরে আসবে এমন সময় কবরের ভেতর হতে বিকট এক আওয়াজ শুনতে পেল। আওয়াজ শুনে সে হকচকিয়ে উঠল। বিধ্বস্ত অবস্থায় সেখান থেকে ফিরে আসল। রাতে সে তার ভাইকে স্বপ্নে দেখল।
সে বলল, আমি ভাইকে দেখতেই নিজের ভয় পাওয়ার ঘটনা তুলে ধরে বললাম, ভাই, আমি তোমার কবর জিয়ারত করতে এসেছিলাম। ভাই বলল, হায়! ঘরোয়া দেখা-সাক্ষাতের পর আর যদি দেখা-সাক্ষাৎ করার কোনো সুযোগ থাকত! জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই, তোমার কী অবস্থা? বলল, তাওবার ফলে বেশ ভালো আছি। বললাম, আবিদ ভাইটি কেমন আছে? বলল, সে তো অগ্রগামী নেককার লোকজনের সাথে আছে। বললাম, এখন আমাদের কী হবে? বলল, দুনিয়ার জীবন থেকে পরকালের জন্য যে যা পাঠাবে, এখানে এসে ঠিক তা-ই পাবে। তোমার কাছে যা আছে, তা অন্যের হাতে যাওয়ার আগেই একে মূল্যায়ন করো।
সকাল হতে ব্যবসায়ী ভাইটি পার্থিব ভোগবিলাস ছেড়ে নির্জনতা বেছে নিল। সে নিজের ধন-সম্পদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তা চার ভাগে বণ্টন করে দিল। আর নিজেকে ইবাদত-বন্দেগীতে সঁপে দিল। তার একজন ছেলে ছিল। সুঠাম দেহের অধিকারী ও সুদর্শন যুবক। ছেলেটি সমস্ত আয়-ব্যয় ও ব্যবসার হিসাব বুঝে নিল। একদিন এই ভাইয়েরও মৃত্যু ঘনিয়ে আসল। মৃত্যুশয্যায় তার যুবক সন্তান বলল, বাবা, আপনি কি কোনো অসিয়ত করে যেতে চান? লোকটি বলল, বেটা, আল্লাহর শপথ! তোমার পিতার কাছে অসিয়ত করে যাওয়ার মতো কিছু নেই। তবে আমি তোমার কাছে এই দাবি জানাচ্ছি যে, আমার মৃত্যুর পর আমাকে তোমার দুই চাচার পাশে দাফন করবে; আর আমার নামফলকে এই পঙ্ক্তিমালা লিখে দেবে,
وَكَيْفَ يَلَذُّ الْعَيْشَ مَنْ هُوَ صَائِرُ *** إِلَى جَدَثٍ يُبْلِي الشَّبَابَ مَنَاهِلُهُ
وَيُذْهِبُ رَسْمَ الْوَجْهِ مِنْ بَعْدِ ضَوْنِهِ *** وَيَبْلَى سَرِيعًا جِسْمُهُ وَمَفَاصِلُهُ
অনতিবিলম্বে যে ব্যক্তি সংকীর্ণ কবরের উদরে যেতে চলেছে,
সে কীভাবে এখনো আনন্দ-উল্লাসে মত্ত আছে?
কবরবাসের প্রথম প্রহরেই তার ইতিহাস মিটে যাবে,
শরীর পচে-গলে ছিন্নভিন্ন হয়ে হারিয়ে যাবে!
মৃত্যুপথযাত্রী পিতা আরও বলল, আমার কাফন-দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর তিনদিন তুমি আমার কবরের পাশে আমার জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করবে। পিতার মৃত্যুর পর ছেলে তার সকল ইচ্ছা পূরণ করল। প্রথম ও দ্বিতীয় দিনের পর যথারীতি তৃতীয় দিনও সে পিতার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তার জন্য দুআ করল। জিয়ারত শেষে ফিরে আসতে উদ্যত হতেই কবরের ভেতর হতে একটি আওয়াজ শুনতে পেল। আওয়াজ শুনে সে ভয় পেয়ে গেল। বিষন্ন মনে সে তার পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে আসল। রাতে সে তার পিতাকে স্বপ্নে দেখল।
স্বপ্নযোগে পিতা তার সন্তানকে বলল, বেটা, তুমি আমাদের কাছে খুব অল্প সময়ের জন্য এসেছ। আর এই জীবনেরও সমাপ্তি রয়েছে। মৃত্যু অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি নিকটবর্তী। অতএব আখেরি সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করো। দীর্ঘ সফরের জন্য তৈরি হও। এই অস্থায়ী নিবাস ছেড়ে চিরস্থায়ী নিবাসের রসদ মওজুদ করো। অকর্মণ্য লোকদের মতো ধোঁকায় পড়ে যেয়ো না। তাদের দীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা তাদের প্রতারিত করে চলেছে। আজকে তাদের আখিরাতের পাথেয় খুবই সামান্য । এই অসতর্কতা ও আলসেমি মৃত্যুর সময় চরম লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা তাদের জীবন দুনিয়ার পেছনে বরবাদ করায় কপাল চাপড়ে পরিতাপ করছে। অথচ মৃত্যু ঘনিয়ে এলে এই অপমান কোনো কাজে দেবে না। তাদের প্রাচুর্য তাদের যে মরীচিকায় ফেলে রেখেছে। কিয়ামতের কঠিন দিনে এই অপ্রাপ্তি ও পরিতাপ ভুলের প্রায়শ্চিত্ত আদায়ে মোটেও যথেষ্ট হবে না।
বেটা, তুমি এখনি প্রস্তুতি শুরু করো। নতুন করে শুরু করো। পূর্ণ শক্তিতে শুরু করো।
যে বৃদ্ধ আমাকে ঘটনা শুনিয়েছেন, তিনি বলেন, আমি সেই যুবকের রাতে দেখা স্বপ্নের বাস্তবতা জানতে তার সাথে দেখা করতে গেলাম। সে আমাকে পুরো ঘটনা শোনাল।
যুবক বলল, স্বপ্নে আমার পিতা আমাকে যা বলেছেন; বাস্তবতা বিন্দুমাত্র ভিন্ন কিছু নয়। আমি তো দেখছি মৃত্যু আমার সাথে ছায়ার মতো লেগে আছে। অতঃপর সেও ধন-সম্পদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল। সব সদকা করে দিল। ঋণ পরিশোধ করল। অংশীদারদের হক আদায় করে দিল। যাবতীয় লেনদেন মিটিয়ে সকলকে সালাম জানিয়ে বিদায় দিল। তারাও তাকে বিদায় জানাল। সে একজন সদা সতর্ক ব্যক্তির মতোই নিজের দায়িত্ব সেরে নিল।
সে বলত, আমার পিতা বলেছেন, 'তুমি এখনি প্রস্তুতি শুরু করো। নতুন করে শুরু করো। পূর্ণ শক্তিতে শুরু করো।' হয়তো তিন বেলা পর আমি আর এখানে থাকব না। কিংবা তিন দিন, তিন মাস বা তিন বছর পর। তিন বছর তো অনেক বেশি হয়ে যাবে। আর আমি এতদিন এভাবে থাকতে চাই না।
বৃদ্ধ বলেন, এই ঘটনার তিন দিনের মাথায় যুবক তার পরিবার ও সন্তানাদিকে ডেকে জড়ো করল। সে তাদের সালাম জানিয়ে বিদায় নিল এবং কিবলামুখী হলো। এর পরে লম্বা হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করল আর কালিমাতুশ শাহাদাত পাঠ করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল! আল্লাহ তাআলা তার প্রতি রহম করুন! তার মৃত্যুর পর বিভিন্ন শহর হতে লোকজন এসে তার কবর জিয়ারত করতে লাগল。
টিকাঃ
২৪০. তারীখু দিমাশক, ৭২/৫৫-৫৭, ২৪/৩৩ ও ২৪/৪৩; শরহুস সুদূর, ২৮৬-২৮৮。
📄 সালাফের দৃষ্টিতে পুনরুত্থান
১. ওয়ালিদ বিন মুসলিম বর্ণনা করেন। আবদুর রহমান বিন ইয়াযিদ বিন জাবির বলেন, জাহিলী যুগের ধ্যান-ধারণায় কট্টর বিশ্বাসী এক বৃদ্ধ এসে বলল, হে মুহাম্মাদ , তোমার এমন তিনটি কথা আমি শুনেছি, যা কোনো বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারে না।
আমি জানতে পারলাম, তুমি নাকি বলেছ:
১। আরবরা তাদের এবং পূর্বপুরুষের উপাস্যদের পরিত্যাগ করবে!
২। পারস্য-রাজ কিসরা ও রোম সম্রাট কাইসারের ধনভান্ডার তোমাদের হস্তগত হবে!
৩। আমাদের সকলের মৃত্যুর পর পুনরুত্থান হবে!
রাসুল বললেন, সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। আরবজাতি অতিসত্বর তাদের এবং তাদের পূর্বপুরুষদের উপাস্যগুলো পরিত্যাগ করবে। তারা কিসরা এবং কাইসারের ধনভান্ডার জয় করবে। এবং তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে। আর নিঃসন্দেহে তোমাদের পুনরুত্থান ঘটানো হবে। আর শোনো, কিয়ামতের দিন আমি তোমার হাত ধরে এ কথা স্মরণ করিয়ে দেব।
বৃদ্ধ বলল, মৃত্যুর ব্যাপারে তুমি আমাকে বিভ্রান্ত কোরো না। আর আমাকে ভুলেও যেয়ো না। রাসুল বললেন, আমি তোমাকে বিভ্রান্ত করছি না আর ভুলেও যাব না।
বৃদ্ধ লোকটির জীবদ্দশাতেই রাসুল -এর ওফাত হয়। একসময় রোম ও পারস্য মুসলমানদের পদানত হয়। রাসুল -এর ভবিষ্যদ্বাণীর এমন নিখুঁত বাস্তবতা দেখে একসময় বৃদ্ধ ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম-পরবর্তী জীবন খুবই উত্তম ছিল। উমর বহুবার তার এই ঘটনা শুনেছেন। মসজিদে তার কাছ থেকেই শুনতেন। মাঝে মাঝে উমর তাঁর নিকট দাঁড়িয়ে বলতেন, আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। রাসুল আপনার হাত ধরার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছেন। তিনি কেবল তাদের হাতই ধরবেন, যারা ইসলামের স্পর্শে সাফল্য ও সৌভাগ্যের ছোঁয়া পেয়ে ধন্য হয়েছেন。
২. আবদুল্লাহ বিন উমর হতে বর্ণিত, রাসুল বলেছেন,
لَيْسَ عَلَى أَهْلِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْشَةً فِي قُبُورِهِمْ، وَلَا مَنْشَرِهِمْ، وَكَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى أَهْلِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَهُمْ يَنْفُضُونَ التَّرَابَ عَنْ رُءُوسِهِمْ، وَيَقُولُونَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنَّا الْحَزَنَ
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' পাঠকারীদের কবরে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। পুনরুত্থানের দিনও কোনো সমস্যা নেই। আমি তো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠকারীদের দেখতে পাচ্ছি যে তারা মাথা হতে মাটি ঝাড়ছে আর বলছে, সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার, যিনি আমাদের এই দুর্ভোগ হতে রেহাই দিয়েছেন。
৩. আম্মাজান উম্মু সালামাহ বলেন,
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: يُحْشَرُ النَّاسُ حُفَاةً عُرَاةً كَمَا بَدَأُوْا
قَالَتْ أُمُّ سَلَمَةَ: فَقُلْتُ : وَاسَوْأَتَاهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلْ يَنْظُرُ بَعْضُنَا إِلَى بَعْضٍ؟
فَقَالَ: يَشْغُلُ النَّاسُ. قُلْتُ : وَمَا يُشْغِلُهُمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟
قَالَ : نَشْرُ الصُّحُفِ، فِيهَا مَثَاقِيلُ الذَّرِّ، وَمَثَاقِيلُ الْخَرْدَلِ
আমি রাসুল -কে বলতে শুনেছি, মানুষের পুনরুত্থান হবে নগ্নপদে বিবস্ত্র অবস্থায়। যেভাবে সে জন্মগ্রহণ করেছে। (এ কথা শুনে) উম্মু সালামা বিস্ময়ভরে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি সেদিন একে অপরকে দেখতে পাব? তিনি বললেন, মানুষ সেদিন ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বে। বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, তারা কী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে? উত্তরে তিনি বললেন, আমলনামা নিয়ে। সেখানে বিন্দু ও ধূলিকণা পরিমাণ বিষয়ও উল্লেখ থাকবে।
৪. আবু বকর আইয়াশ বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বলেন, হাশরের দিন মানুষ কবর হতে বেরিয়ে তাদের রেখে যাওয়া ভূমির পরিবর্তে অন্য ভূমি দেখবে। নিজেদের চেনাজানা মানুষের বদলে অচেনা লোকজন দেখবে। বিষয়টির উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন,
فما الناس بالناس الذين عهدتهم *** ولا الدار بالدار التي كنت تعرف
এরা তো আর তারা নয়, যাদের তুমি জানতে
এ দুয়ারও সে দুয়ার নয়, যেথায় তুমি থাকতে。
৫. মাইমুন বিন মুসা মারাঈ বলেন, আমি হাসান বসরী-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُم مِّنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنسِلُونَ ﴾
আর যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে তখনই তারা কবর হতে ছুটে আসবে তাদের রবের দিকে。
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, শিঙায় ফুঁ দেওয়ার আওয়াজ শুনতেই মানুষ মাথার মাটি ঝাড়তে ঝাড়তে কবর হতে ছুটে বেড়িয়ে আসবে। এ সময় মুমিনগণ বলতে থাকবে, হে আল্লাহ, সমস্ত পবিত্রতা ও প্রশংসা একমাত্র আপনারই জন্য। আমরা তো যথাযথভাবে আপনার ইবাদত করতে পারিনি。
৬. সাঈদ বিন আবদুল্লাহ জুহানী বর্ণনা করেন, তাবেঈ ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেন, মানুষ কবরের মাটিতে মিশে যাবে। প্রথমবার যখন শিঙ্গায় ফুৎকারের আওয়াজ শোনা যাবে তখন সমস্ত রূহ নিজ নিজ দেহে ফিরে আসবে এবং বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো জোড়া লাগবে। দ্বিতীয়বার ফুৎকার শোনার পর লোকজন নিজ নিজ পায়ে উঠে দাঁড়াবে এবং মাথা হতে মাটি ঝাড়বে。
৭. সুলাইমান বিন তরখান বলেন, আমি সাইয়ার শামী -কে বলতে শুনেছি যে, মানুষ যখন ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় কবর হতে বেরিয়ে আসবে তখন একজন ঘোষণাকারী (ফিরিশতা) ঘোষণা করবে,
(يَا عِبَادِ لَا خَوْفٌ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ وَلَا أَنتُمْ تَحْزَنُونَ )
হে আমার বান্দাগণ, আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং তোমরা চিন্তিতও হবে না。
এ ঘোষণা শুনে সবাই আশাবাদী হয়ে সেদিকে ছুটতে শুরু করবে। তখন বলা হবে,
(الَّذِينَ آمَنُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا مُسْلِمِينَ)
(তোমরা) যারা আমার আয়াতসমূহে বিশ্বাস করেছিলে এবং অনুগত ছিলে।
এ ঘোষণা শুনে মুসলমান ব্যতীত বাকি সকলে হতাশায় মুষড়ে পড়বে。
৮. নযর বিন আরবি বলেন, আমি জানতে পেরেছি যে, মানুষ যখন কবর হতে পুনরুত্থিত হয়ে উঠে আসবে তখনো তাদের স্লোগান হবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আর কবর থেকে উঠার পর ভালো ও মন্দ সকলের প্রথম বাক্য হবে, 'ইয়া রব, আমাদের প্রতি দয়া করুন।'
৯. ওয়ালিদ বিন আবু মারওয়ান বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বলেছেন, মৃত ব্যক্তি তার কাফন-সহ পুনরুত্থিত হবে।
১১. ইবাদ বিন ওয়ালিদ কুরাইশী বর্ণনা করেন। মুকাতিল বিন হাইয়ান বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا )
আর (সেদিন) জমিন তার বোঝা বের করে দেবে।
এই আয়াতে জমিনের বোঝা বের করে দেওয়ার অর্থ হলো, ভূ-গর্ভ হতে মৃত লোকজন বেড়িয়ে আসবে আর ভূ-পৃষ্ঠে চলতে শুরু করবে।
১২. রুস্তম বিন উসামা বর্ণনা করেন। বিখ্যাত আবিদ ফযল বিন মুহমাল সাদী বলেন, আমাদের সাথে মুজিব নামে মুত্তাকী ও আবিদ শ্রেণির এক লোকের উঠা-বসা ছিল। অন্যদের তুলনায় তিনি ছিলেন অনন্য সৌন্দর্যের অধিকারী। তার রাত কেটে যেত নামাযে দাঁড়িয়ে। আর দিনের বেলা রোজা রাখতে রাখতে তিনি হাড় জিরজিরে হয়ে পড়েন। এভাবেই ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত অবস্থায় একসময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন। মুহাম্মাদ বিন নযর হারিসী ছিলেন তার অন্যতম বন্ধু। তিনি অবশ্য মুজিবের আগেই ইনতিকাল করেন। মুজিবের ইনতিকালের পর আমি একদিন স্বপ্নযোগে মুহাম্মাদ বিন নযরের সাক্ষাৎ লাভ করি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার ভাই মুজিবের কী অবস্থা?
বলল, সে তার আমল অনুযায়ী ফল পেয়েছে। জিজ্ঞাসা করলাম, তার সেই সুন্দর চেহারার এখন কী অবস্থা? বলল, আল্লাহ তাআলা তার চেহারা মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছেন।
বললাম, তুমি না বললে সে তার আমল অনুযায়ী ফল লাভ করেছে, তাহলে আবার এমন হয় কী করে?
সে বলল, ভাই, তুমি কি জানো না? কবর মানবদেহকে গ্রাস করে নেয়! আর কিয়ামতের দিন আমলসমূহ পুনরুজ্জীবিত হয়! বললাম, হ্যাঁ, কবর তো দেহকে এমনভাবে গ্রাস করে যে তার কিছুই আর বাকি থাকে না। অতঃপর কিয়ামতের দিন সবাই পুনরুত্থিত হবে।
সে বলল, ঠিক বলেছ ভাই। আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা দেহকে এমনভাবে মিটিয়ে দেয় যে, তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। অতঃপর যেদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে সেদিন চোখের পলক ফেলার চেয়ে দ্রুত সময়ে তিনি তাদের পুনরুত্থান ঘটাবেন。
১৩. জাফর বিন সুলাইমান বর্ণনা করেন। ইবরাহীম বিন ঈসা ইয়াশকারী বলেন, আমাদের নিকট খবর পৌঁছেছে যে, মুমিন ব্যক্তি যখন কবর উঠে আসবে তখন দুজন ফিরিশতা তার সাথে সাক্ষাৎ করবেন। একজনের হাতে রেশমি কাপড়ে জড়ানো বরফ ও সুগন্ধী থাকবে। অন্যজনের হাতে শরাব-ভর্তি জান্নাতি সোরাহি। প্রথমজন তাতে সুগন্ধী মিশিয়ে শরাবসহ তাকে পরিবেশন করতে বলবেন। দ্বিতীয়জন সেই পানীয় মুমিনের সম্মুখে পরিবেশন করবেন। মুমিন তা পান করবেন। এরপর জান্নাতে প্রবেশের আগে তার কোনো প্রকার তৃষ্ণা জাগবে না.***
১৪. আবুল আলিয়া বলেন, মৃত ব্যক্তিকে তার কাফনসহ পুনরুত্থান করানো হবে।
সালিহ মুররি বলেন, হাশরের দিন কবরবাসী ছিন্ন কাফন, জীর্ণ দেহ, বিবর্ণ চেহারা, উশকোখুশকো চুল, শ্রান্ত দেহে নিজ নিজ কবর হতে বেরিয়ে আসবে। ভয়ে-আতঙ্কে তাদের প্রাণ চলে যাওয়ার উপক্রম হয়ে যাবে। হাশরের ময়দানে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ বলতে পারবে না তার ঠিকানা কী হতে চলেছে? অতঃপর কারও ঠিকানা জান্নাত আর কারও ঠিকানা হবে জাহান্নাম। নেককার বান্দা আমলনামা পেয়ে উল্লাসে উঁচু স্বরে বলে উঠবে, হায়! জাহান্নাম কতই-না
নিকৃষ্ট ঠিকানা। হে আল্লাহ, আপনি যদি আপনার সুপ্রশস্ত রহমত দ্বারা আমাদের রক্ষা না করতেন, তাহলে তো আমাদের মারাত্মক গুনাহসমূহ আমাদের চুপসে দিত। আর আমাদের এমন-সব অপরাধ রয়েছে, যা আপনি ছাড়া আর কেউ ক্ষমা করতে পারে না।
تَمَّتْ بِتَوْفِيقِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ الْحَكِيمِ الرَّحِيمِ
টিকাঃ
২৪১. আল আহওয়াল, ৭১, বর্ণনা: ৮৯। সনদ মারফু。
২৪২. মুজামুল আওসাত লিত-তাবারানী, ৯/১৮১, হাদিস নং ১৪৭৮; শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ১/২০২, হাদিস নং ৯৯। সনদ দুর্বল。
২৪৩. মুজামুল আওসাত লিত তাবারানী, ৮৩৩। হাসান লিগাইরিহি। কাছাকাছি সহিহ বর্ণনা রয়েছে: সুনানু তিরমিযী, ৩৩৩২। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস হতে। সনদ হাসান সহিহ。
২৪৪. আল আহওয়াল, ১৭৬। বর্ণনা: ২১৭ আবু বকর বিন আইয়াশ আবদুল্লাহ বিন আব্বাস এর সাক্ষাৎ লাভ করেননি。
২৪৫. সুরা ইয়াসিন, (৩৬): ৫১。
২৪৬. আল আহওয়াল, ৬৬, বর্ণনা: ৮৪。
২৪৭. বিদায়া ওয়া নিহায়া, ১৯/৩৪৫। (দারু হাজ্জার)
২৪৮. সুরা যুখরুফ, (৪৩): ৬৮
২৪৯. সুরা যুখরুফ (৪৩): ৬৯
২৫০. তাফসীরুত তাবারী, ২০/৬৮১; সুরা যুখরুফ, (৪৩): ৬৮ ও ৬৯ এর ব্যাখ্যায়。
২৫১. বিদায়া ওয়া নিহায়া, ১৯/৩৯১। (দারু হাজার)
২৫২, আন নিহায়াতু ফিল ফিতানি ওয়াল মালাহিম, ১/৩২২。
২৫৩. সুরা যিলযাল, (৯৯): ২
২৫৪. আল আহওয়াল, ৬৫। বর্ণনা: ৮২。
২৫৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৪৫。
২৫৬. আন নিহায়াতু ফিল ফিতানি ওয়াল মালাহিম, ১/৩৪৬。
২৫৭. বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৯/৩৮০। (দারু হিজর প্রকাশিত。)
১. ওয়ালিদ বিন মুসলিম বর্ণনা করেন। আবদুর রহমান বিন ইয়াযিদ বিন জাবির বলেন, জাহিলী যুগের ধ্যান-ধারণায় কট্টর বিশ্বাসী এক বৃদ্ধ এসে বলল, হে মুহাম্মাদ , তোমার এমন তিনটি কথা আমি শুনেছি, যা কোনো বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারে না।
আমি জানতে পারলাম, তুমি নাকি বলেছ:
১। আরবরা তাদের এবং পূর্বপুরুষের উপাস্যদের পরিত্যাগ করবে!
২। পারস্য-রাজ কিসরা ও রোম সম্রাট কাইসারের ধনভান্ডার তোমাদের হস্তগত হবে!
৩। আমাদের সকলের মৃত্যুর পর পুনরুত্থান হবে!
রাসুল বললেন, সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। আরবজাতি অতিসত্বর তাদের এবং তাদের পূর্বপুরুষদের উপাস্যগুলো পরিত্যাগ করবে। তারা কিসরা এবং কাইসারের ধনভান্ডার জয় করবে। এবং তোমরা অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে। আর নিঃসন্দেহে তোমাদের পুনরুত্থান ঘটানো হবে। আর শোনো, কিয়ামতের দিন আমি তোমার হাত ধরে এ কথা স্মরণ করিয়ে দেব।
বৃদ্ধ বলল, মৃত্যুর ব্যাপারে তুমি আমাকে বিভ্রান্ত কোরো না। আর আমাকে ভুলেও যেয়ো না। রাসুল বললেন, আমি তোমাকে বিভ্রান্ত করছি না আর ভুলেও যাব না।
বৃদ্ধ লোকটির জীবদ্দশাতেই রাসুল -এর ওফাত হয়। একসময় রোম ও পারস্য মুসলমানদের পদানত হয়। রাসুল -এর ভবিষ্যদ্বাণীর এমন নিখুঁত বাস্তবতা দেখে একসময় বৃদ্ধ ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম-পরবর্তী জীবন খুবই উত্তম ছিল। উমর বহুবার তার এই ঘটনা শুনেছেন। মসজিদে তার কাছ থেকেই শুনতেন। মাঝে মাঝে উমর তাঁর নিকট দাঁড়িয়ে বলতেন, আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। রাসুল আপনার হাত ধরার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছেন। তিনি কেবল তাদের হাতই ধরবেন, যারা ইসলামের স্পর্শে সাফল্য ও সৌভাগ্যের ছোঁয়া পেয়ে ধন্য হয়েছেন。
২. আবদুল্লাহ বিন উমর হতে বর্ণিত, রাসুল বলেছেন,
لَيْسَ عَلَى أَهْلِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْشَةً فِي قُبُورِهِمْ، وَلَا مَنْشَرِهِمْ، وَكَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى أَهْلِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَهُمْ يَنْفُضُونَ التَّرَابَ عَنْ رُءُوسِهِمْ، وَيَقُولُونَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنَّا الْحَزَنَ
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' পাঠকারীদের কবরে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। পুনরুত্থানের দিনও কোনো সমস্যা নেই। আমি তো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠকারীদের দেখতে পাচ্ছি যে তারা মাথা হতে মাটি ঝাড়ছে আর বলছে, সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার, যিনি আমাদের এই দুর্ভোগ হতে রেহাই দিয়েছেন。
৩. আম্মাজান উম্মু সালামাহ বলেন,
سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: يُحْشَرُ النَّاسُ حُفَاةً عُرَاةً كَمَا بَدَأُوْا
قَالَتْ أُمُّ سَلَمَةَ: فَقُلْتُ : وَاسَوْأَتَاهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلْ يَنْظُرُ بَعْضُنَا إِلَى بَعْضٍ؟
فَقَالَ: يَشْغُلُ النَّاسُ. قُلْتُ : وَمَا يُشْغِلُهُمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟
قَالَ : نَشْرُ الصُّحُفِ، فِيهَا مَثَاقِيلُ الذَّرِّ، وَمَثَاقِيلُ الْخَرْدَلِ
আমি রাসুল -কে বলতে শুনেছি, মানুষের পুনরুত্থান হবে নগ্নপদে বিবস্ত্র অবস্থায়। যেভাবে সে জন্মগ্রহণ করেছে। (এ কথা শুনে) উম্মু সালামা বিস্ময়ভরে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি সেদিন একে অপরকে দেখতে পাব? তিনি বললেন, মানুষ সেদিন ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বে। বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, তারা কী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে? উত্তরে তিনি বললেন, আমলনামা নিয়ে। সেখানে বিন্দু ও ধূলিকণা পরিমাণ বিষয়ও উল্লেখ থাকবে।
৪. আবু বকর আইয়াশ বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বলেন, হাশরের দিন মানুষ কবর হতে বেরিয়ে তাদের রেখে যাওয়া ভূমির পরিবর্তে অন্য ভূমি দেখবে। নিজেদের চেনাজানা মানুষের বদলে অচেনা লোকজন দেখবে। বিষয়টির উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন,
فما الناس بالناس الذين عهدتهم *** ولا الدار بالدار التي كنت تعرف
এরা তো আর তারা নয়, যাদের তুমি জানতে
এ দুয়ারও সে দুয়ার নয়, যেথায় তুমি থাকতে。
৫. মাইমুন বিন মুসা মারাঈ বলেন, আমি হাসান বসরী-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُم مِّنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنسِلُونَ ﴾
আর যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে তখনই তারা কবর হতে ছুটে আসবে তাদের রবের দিকে。
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, শিঙায় ফুঁ দেওয়ার আওয়াজ শুনতেই মানুষ মাথার মাটি ঝাড়তে ঝাড়তে কবর হতে ছুটে বেড়িয়ে আসবে। এ সময় মুমিনগণ বলতে থাকবে, হে আল্লাহ, সমস্ত পবিত্রতা ও প্রশংসা একমাত্র আপনারই জন্য। আমরা তো যথাযথভাবে আপনার ইবাদত করতে পারিনি。
৬. সাঈদ বিন আবদুল্লাহ জুহানী বর্ণনা করেন, তাবেঈ ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেন, মানুষ কবরের মাটিতে মিশে যাবে। প্রথমবার যখন শিঙ্গায় ফুৎকারের আওয়াজ শোনা যাবে তখন সমস্ত রূহ নিজ নিজ দেহে ফিরে আসবে এবং বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো জোড়া লাগবে। দ্বিতীয়বার ফুৎকার শোনার পর লোকজন নিজ নিজ পায়ে উঠে দাঁড়াবে এবং মাথা হতে মাটি ঝাড়বে。
৭. সুলাইমান বিন তরখান বলেন, আমি সাইয়ার শামী -কে বলতে শুনেছি যে, মানুষ যখন ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় কবর হতে বেরিয়ে আসবে তখন একজন ঘোষণাকারী (ফিরিশতা) ঘোষণা করবে,
(يَا عِبَادِ لَا خَوْفٌ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ وَلَا أَنتُمْ تَحْزَنُونَ )
হে আমার বান্দাগণ, আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং তোমরা চিন্তিতও হবে না。
এ ঘোষণা শুনে সবাই আশাবাদী হয়ে সেদিকে ছুটতে শুরু করবে। তখন বলা হবে,
(الَّذِينَ آمَنُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا مُسْلِمِينَ)
(তোমরা) যারা আমার আয়াতসমূহে বিশ্বাস করেছিলে এবং অনুগত ছিলে।
এ ঘোষণা শুনে মুসলমান ব্যতীত বাকি সকলে হতাশায় মুষড়ে পড়বে。
৮. নযর বিন আরবি বলেন, আমি জানতে পেরেছি যে, মানুষ যখন কবর হতে পুনরুত্থিত হয়ে উঠে আসবে তখনো তাদের স্লোগান হবে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আর কবর থেকে উঠার পর ভালো ও মন্দ সকলের প্রথম বাক্য হবে, 'ইয়া রব, আমাদের প্রতি দয়া করুন।'
৯. ওয়ালিদ বিন আবু মারওয়ান বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বলেছেন, মৃত ব্যক্তি তার কাফন-সহ পুনরুত্থিত হবে।
১১. ইবাদ বিন ওয়ালিদ কুরাইশী বর্ণনা করেন। মুকাতিল বিন হাইয়ান বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا )
আর (সেদিন) জমিন তার বোঝা বের করে দেবে।
এই আয়াতে জমিনের বোঝা বের করে দেওয়ার অর্থ হলো, ভূ-গর্ভ হতে মৃত লোকজন বেড়িয়ে আসবে আর ভূ-পৃষ্ঠে চলতে শুরু করবে।
১২. রুস্তম বিন উসামা বর্ণনা করেন। বিখ্যাত আবিদ ফযল বিন মুহমাল সাদী বলেন, আমাদের সাথে মুজিব নামে মুত্তাকী ও আবিদ শ্রেণির এক লোকের উঠা-বসা ছিল। অন্যদের তুলনায় তিনি ছিলেন অনন্য সৌন্দর্যের অধিকারী। তার রাত কেটে যেত নামাযে দাঁড়িয়ে। আর দিনের বেলা রোজা রাখতে রাখতে তিনি হাড় জিরজিরে হয়ে পড়েন। এভাবেই ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত অবস্থায় একসময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন। মুহাম্মাদ বিন নযর হারিসী ছিলেন তার অন্যতম বন্ধু। তিনি অবশ্য মুজিবের আগেই ইনতিকাল করেন। মুজিবের ইনতিকালের পর আমি একদিন স্বপ্নযোগে মুহাম্মাদ বিন নযরের সাক্ষাৎ লাভ করি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার ভাই মুজিবের কী অবস্থা?
বলল, সে তার আমল অনুযায়ী ফল পেয়েছে। জিজ্ঞাসা করলাম, তার সেই সুন্দর চেহারার এখন কী অবস্থা? বলল, আল্লাহ তাআলা তার চেহারা মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছেন।
বললাম, তুমি না বললে সে তার আমল অনুযায়ী ফল লাভ করেছে, তাহলে আবার এমন হয় কী করে?
সে বলল, ভাই, তুমি কি জানো না? কবর মানবদেহকে গ্রাস করে নেয়! আর কিয়ামতের দিন আমলসমূহ পুনরুজ্জীবিত হয়! বললাম, হ্যাঁ, কবর তো দেহকে এমনভাবে গ্রাস করে যে তার কিছুই আর বাকি থাকে না। অতঃপর কিয়ামতের দিন সবাই পুনরুত্থিত হবে।
সে বলল, ঠিক বলেছ ভাই। আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা দেহকে এমনভাবে মিটিয়ে দেয় যে, তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। অতঃপর যেদিন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে সেদিন চোখের পলক ফেলার চেয়ে দ্রুত সময়ে তিনি তাদের পুনরুত্থান ঘটাবেন。
১৩. জাফর বিন সুলাইমান বর্ণনা করেন। ইবরাহীম বিন ঈসা ইয়াশকারী বলেন, আমাদের নিকট খবর পৌঁছেছে যে, মুমিন ব্যক্তি যখন কবর উঠে আসবে তখন দুজন ফিরিশতা তার সাথে সাক্ষাৎ করবেন। একজনের হাতে রেশমি কাপড়ে জড়ানো বরফ ও সুগন্ধী থাকবে। অন্যজনের হাতে শরাব-ভর্তি জান্নাতি সোরাহি। প্রথমজন তাতে সুগন্ধী মিশিয়ে শরাবসহ তাকে পরিবেশন করতে বলবেন। দ্বিতীয়জন সেই পানীয় মুমিনের সম্মুখে পরিবেশন করবেন। মুমিন তা পান করবেন। এরপর জান্নাতে প্রবেশের আগে তার কোনো প্রকার তৃষ্ণা জাগবে না.***
১৪. আবুল আলিয়া বলেন, মৃত ব্যক্তিকে তার কাফনসহ পুনরুত্থান করানো হবে।
সালিহ মুররি বলেন, হাশরের দিন কবরবাসী ছিন্ন কাফন, জীর্ণ দেহ, বিবর্ণ চেহারা, উশকোখুশকো চুল, শ্রান্ত দেহে নিজ নিজ কবর হতে বেরিয়ে আসবে। ভয়ে-আতঙ্কে তাদের প্রাণ চলে যাওয়ার উপক্রম হয়ে যাবে। হাশরের ময়দানে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ বলতে পারবে না তার ঠিকানা কী হতে চলেছে? অতঃপর কারও ঠিকানা জান্নাত আর কারও ঠিকানা হবে জাহান্নাম। নেককার বান্দা আমলনামা পেয়ে উল্লাসে উঁচু স্বরে বলে উঠবে, হায়! জাহান্নাম কতই-না
নিকৃষ্ট ঠিকানা। হে আল্লাহ, আপনি যদি আপনার সুপ্রশস্ত রহমত দ্বারা আমাদের রক্ষা না করতেন, তাহলে তো আমাদের মারাত্মক গুনাহসমূহ আমাদের চুপসে দিত। আর আমাদের এমন-সব অপরাধ রয়েছে, যা আপনি ছাড়া আর কেউ ক্ষমা করতে পারে না।
تَمَّتْ بِتَوْفِيقِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ الْحَكِيمِ الرَّحِيمِ
টিকাঃ
২৪১. আল আহওয়াল, ৭১, বর্ণনা: ৮৯। সনদ মারফু。
২৪২. মুজামুল আওসাত লিত-তাবারানী, ৯/১৮১, হাদিস নং ১৪৭৮; শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ১/২০২, হাদিস নং ৯৯। সনদ দুর্বল。
২৪৩. মুজামুল আওসাত লিত তাবারানী, ৮৩৩। হাসান লিগাইরিহি। কাছাকাছি সহিহ বর্ণনা রয়েছে: সুনানু তিরমিযী, ৩৩৩২। আবদুল্লাহ বিন আব্বাস হতে। সনদ হাসান সহিহ。
২৪৪. আল আহওয়াল, ১৭৬। বর্ণনা: ২১৭ আবু বকর বিন আইয়াশ আবদুল্লাহ বিন আব্বাস এর সাক্ষাৎ লাভ করেননি。
২৪৫. সুরা ইয়াসিন, (৩৬): ৫১。
২৪৬. আল আহওয়াল, ৬৬, বর্ণনা: ৮৪。
২৪৭. বিদায়া ওয়া নিহায়া, ১৯/৩৪৫। (দারু হাজ্জার)
২৪৮. সুরা যুখরুফ, (৪৩): ৬৮
২৪৯. সুরা যুখরুফ (৪৩): ৬৯
২৫০. তাফসীরুত তাবারী, ২০/৬৮১; সুরা যুখরুফ, (৪৩): ৬৮ ও ৬৯ এর ব্যাখ্যায়。
২৫১. বিদায়া ওয়া নিহায়া, ১৯/৩৯১। (দারু হাজার)
২৫২, আন নিহায়াতু ফিল ফিতানি ওয়াল মালাহিম, ১/৩২২。
২৫৩. সুরা যিলযাল, (৯৯): ২
২৫৪. আল আহওয়াল, ৬৫। বর্ণনা: ৮২。
২৫৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৪৫。
২৫৬. আন নিহায়াতু ফিল ফিতানি ওয়াল মালাহিম, ১/৩৪৬。
২৫৭. বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৯/৩৮০। (দারু হিজর প্রকাশিত。)