📘 সালাফদের চোখে কবর > 📄 সালাফের দেখা কবরের বিভিন্ন অবস্থা

📄 সালাফের দেখা কবরের বিভিন্ন অবস্থা


১. হাম্মাদ বিন যায়িদ বর্ণনা করেন, তুফাওয়াহ বংশের জনৈক ব্যক্তি বলেন, আমরা এক ব্যক্তিকে দাফন করলাম। পরে একটি বিষয় ঠিকঠাক করার জন্য আবার (কবর খুঁড়তে) গেলাম। গিয়ে দেখি মৃতদেহটি কবরে নেই।
২. রবী বিন সুবাইহ বলেন, ছাবিত বুনানী যখন ইনতিকাল করলেন, আমি, হুমাইদ তঈল এবং আবু জাফর জাসর ইবনু ফারকাদ তার কবরে নামলাম। আমরা তাকে কবরে শুইয়ে দিয়ে কাঁচা ইট দিয়ে কবর ঠিকঠাক করে দিচ্ছিলাম। হুমাইদ তঈল ছিলেন মাথার দিকে। হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন যে, ছাবিত বুনানী কবরে নেই। এ দৃশ্য দেখে তিনি ইশারায় আমাদের তা জানালেন। আমরা তাকে ইশারা করে লোকজনকে জানাতে নিষেধ করলাম। আমরা কবর ঠিকঠাক করে ফিরে আসলাম। ফিরে এসে হুমাইদ তঈল আমীর সুলাইমান বিন আলী-এর কাছে গিয়ে সব খুলে বললেন। পরদিন রাত্রি ঘনিয়ে এলে তিনি ঘোড়া হাঁকিয়ে সেখানে গিয়ে ইট সরিয়ে ছাবিত বুনানী-কে কবরে পেলেন না। কবরের মাটি সমান করে দিয়ে তিনি ফিরে আসলেন। সকালে আমরা সবাই ছাবিত বুনানী-এর মেয়ের কাছে গিয়ে তার আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, আমার মনে হচ্ছে আপনারা তাকে কবরে খুঁজে পাননি! বললাম, হ্যাঁ, কিন্তু এর রহস্য কী? তিনি বললেন, পঞ্চাশ বছর যাবৎ তিনি শেষরাতে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করে এই দুআ করতেন,
يَا رَبِّ، إِنْ كُنْتَ أَعْطَيْتَ أَحَدًا الصَّلَاةَ فِي قَبْرِهِ فَأَعْطِيْنِيْهَا
হে আমার রব, আপনি যদি কবরে কাউকে নামায পড়ার সুযোগ দান করেন তবে আমাকেও সে সুযোগ দান করুন।
ইনশাআল্লাহ, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তার এই দুআ ফিরিয়ে দেবেন না।
বর্ণনাকারী রবী বিন সুবাইহ বলেন, আবু জাফর জাসর বললেন, সেই পবিত্র সত্তার শপথ, যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই! আমি রাত্রিবেলা স্বপ্নে তাকে সবুজ পোশাকে কবরে নামায আদায় করতে দেখেছি।
৩. ইয়াজিদ বিন তরীফ বাজালী বলেন, যামাযিম যুদ্ধের সময় আমার এক ভাই মৃত্যুবরণ করে। তাকে কবর দেওয়ার পরে আমি তার কবরে মাথা ঠেকিয়ে কিছু শোনার চেষ্টা করি। আমি আমার বাম কানে ভাইয়ের দুর্বল কণ্ঠের আওয়াজ শুনে চিনতে পারি। সে তখন বলছিল, আল্লাহ। এরপরই তাকে আরেকজন প্রশ্ন করল, তোমার দ্বীন কী? সে বলল, ইসলাম।
৪. আলা বিন আবদুর কারীম বলেন, এক লোক মারা গেল। তার এক ভাই ছিলেন, যিনি চোখে কম দেখতেন। তিনি বলেন, ভাইয়ের দাফনের পর লোকজন যখন চলে গেল, আমি কবরে মাথা রাখলাম। আমি কবরের ভেতর থেকে আওয়াজ শুনতে পেলাম, তোমার রব কে? তোমার নবী কে? এরপরই আমি আমার ভাইয়ের পরিচিত কণ্ঠ শুনতে পেলাম। সে বলছিল, আল্লাহ আমার রব। মুহাম্মাদ আমার নবী। তারপর কবরের ভেতর থেকে তির ছুড়ে যাওয়ার মত শাঁ শাঁ শব্দ বের হতে লাগল। এই আওয়াজ শুনে আমার শরীর হিম হয়ে গেল। আমি ফিরে আসলাম。
৬. মুহাম্মাদ বিন মুসা সাইগ বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন নাফি মাদানী বলেন, মদিনাবাসী জনৈক ব্যক্তির ইনতিকাল হলে তাকে যথারীতি দাফন করা হয়। এক ব্যক্তি স্বপ্নে তাকে জাহান্নামীদের মধ্যে দেখতে পায়। এই অবস্থা দেখে সে খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। এর সাত বা আট দিন পর লোকটি তাকে আবার স্বপ্নে দেখে। এবার তাকে জান্নাতে দেখতে পায়। লোকটি তাকে বলল, তুমি না বলেছিলে, তুমি জাহান্নামী?
কবরবাসী বলল, আমি সেখানেই ছিলাম। আমাদের পাশে এক সালিহ (পুণ্যবান) ব্যক্তিকে দাফন করা হয়। তিনি তার আশেপাশের চল্লিশজনের জন্য সুপারিশ করেন। আমিও তাদের একজন。

টিকাঃ
১৭৮. শরহুস সুদূর, ১৯৭。
১৭৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/৫২০; হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ২/৩১৯;
তবাকাতুল কুবরা লিইবনি সাআদ, ৭/১৭৪。
১৮০. তাহযীবুল আছার মুসনাদু উমর, ২/৫১৩। বর্ণনা নং ৫৩৬。
১৮১. ইরশাদুস সারী, ৩/৪৭৮। ১৩৭৪ নং হাদিসে কবরের আযাব সংক্রান্ত আলোচনায়。
১৮২, রূহ, ৯০。

১. হাম্মাদ বিন যায়িদ বর্ণনা করেন, তুফাওয়াহ বংশের জনৈক ব্যক্তি বলেন, আমরা এক ব্যক্তিকে দাফন করলাম। পরে একটি বিষয় ঠিকঠাক করার জন্য আবার (কবর খুঁড়তে) গেলাম। গিয়ে দেখি মৃতদেহটি কবরে নেই।
২. রবী বিন সুবাইহ বলেন, ছাবিত বুনানী যখন ইনতিকাল করলেন, আমি, হুমাইদ তঈল এবং আবু জাফর জাসর ইবনু ফারকাদ তার কবরে নামলাম। আমরা তাকে কবরে শুইয়ে দিয়ে কাঁচা ইট দিয়ে কবর ঠিকঠাক করে দিচ্ছিলাম। হুমাইদ তঈল ছিলেন মাথার দিকে। হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন যে, ছাবিত বুনানী কবরে নেই। এ দৃশ্য দেখে তিনি ইশারায় আমাদের তা জানালেন। আমরা তাকে ইশারা করে লোকজনকে জানাতে নিষেধ করলাম। আমরা কবর ঠিকঠাক করে ফিরে আসলাম। ফিরে এসে হুমাইদ তঈল আমীর সুলাইমান বিন আলী-এর কাছে গিয়ে সব খুলে বললেন। পরদিন রাত্রি ঘনিয়ে এলে তিনি ঘোড়া হাঁকিয়ে সেখানে গিয়ে ইট সরিয়ে ছাবিত বুনানী-কে কবরে পেলেন না। কবরের মাটি সমান করে দিয়ে তিনি ফিরে আসলেন। সকালে আমরা সবাই ছাবিত বুনানী-এর মেয়ের কাছে গিয়ে তার আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, আমার মনে হচ্ছে আপনারা তাকে কবরে খুঁজে পাননি! বললাম, হ্যাঁ, কিন্তু এর রহস্য কী? তিনি বললেন, পঞ্চাশ বছর যাবৎ তিনি শেষরাতে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করে এই দুআ করতেন,
يَا رَبِّ، إِنْ كُنْتَ أَعْطَيْتَ أَحَدًا الصَّلَاةَ فِي قَبْرِهِ فَأَعْطِيْنِيْهَا
হে আমার রব, আপনি যদি কবরে কাউকে নামায পড়ার সুযোগ দান করেন তবে আমাকেও সে সুযোগ দান করুন।
ইনশাআল্লাহ, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তার এই দুআ ফিরিয়ে দেবেন না।
বর্ণনাকারী রবী বিন সুবাইহ বলেন, আবু জাফর জাসর বললেন, সেই পবিত্র সত্তার শপথ, যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই! আমি রাত্রিবেলা স্বপ্নে তাকে সবুজ পোশাকে কবরে নামায আদায় করতে দেখেছি।
৩. ইয়াজিদ বিন তরীফ বাজালী বলেন, যামাযিম যুদ্ধের সময় আমার এক ভাই মৃত্যুবরণ করে। তাকে কবর দেওয়ার পরে আমি তার কবরে মাথা ঠেকিয়ে কিছু শোনার চেষ্টা করি। আমি আমার বাম কানে ভাইয়ের দুর্বল কণ্ঠের আওয়াজ শুনে চিনতে পারি। সে তখন বলছিল, আল্লাহ। এরপরই তাকে আরেকজন প্রশ্ন করল, তোমার দ্বীন কী? সে বলল, ইসলাম।
৪. আলা বিন আবদুর কারীম বলেন, এক লোক মারা গেল। তার এক ভাই ছিলেন, যিনি চোখে কম দেখতেন। তিনি বলেন, ভাইয়ের দাফনের পর লোকজন যখন চলে গেল, আমি কবরে মাথা রাখলাম। আমি কবরের ভেতর থেকে আওয়াজ শুনতে পেলাম, তোমার রব কে? তোমার নবী কে? এরপরই আমি আমার ভাইয়ের পরিচিত কণ্ঠ শুনতে পেলাম। সে বলছিল, আল্লাহ আমার রব। মুহাম্মাদ আমার নবী। তারপর কবরের ভেতর থেকে তির ছুড়ে যাওয়ার মত শাঁ শাঁ শব্দ বের হতে লাগল। এই আওয়াজ শুনে আমার শরীর হিম হয়ে গেল। আমি ফিরে আসলাম。
৬. মুহাম্মাদ বিন মুসা সাইগ বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন নাফি মাদানী বলেন, মদিনাবাসী জনৈক ব্যক্তির ইনতিকাল হলে তাকে যথারীতি দাফন করা হয়। এক ব্যক্তি স্বপ্নে তাকে জাহান্নামীদের মধ্যে দেখতে পায়। এই অবস্থা দেখে সে খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। এর সাত বা আট দিন পর লোকটি তাকে আবার স্বপ্নে দেখে। এবার তাকে জান্নাতে দেখতে পায়। লোকটি তাকে বলল, তুমি না বলেছিলে, তুমি জাহান্নামী?
কবরবাসী বলল, আমি সেখানেই ছিলাম। আমাদের পাশে এক সালিহ (পুণ্যবান) ব্যক্তিকে দাফন করা হয়। তিনি তার আশেপাশের চল্লিশজনের জন্য সুপারিশ করেন। আমিও তাদের একজন。

টিকাঃ
১৭৮. শরহুস সুদূর, ১৯৭。
১৭৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/৫২০; হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ২/৩১৯;
তবাকাতুল কুবরা লিইবনি সাআদ, ৭/১৭৪。
১৮০. তাহযীবুল আছার মুসনাদু উমর, ২/৫১৩। বর্ণনা নং ৫৩৬。
১৮১. ইরশাদুস সারী, ৩/৪৭৮। ১৩৭৪ নং হাদিসে কবরের আযাব সংক্রান্ত আলোচনায়。
১৮২, রূহ, ৯০。

📘 সালাফদের চোখে কবর > 📄 বাদশাহ যুলকারনাইন ও বিভিন্ন জাতির লোকজন

📄 বাদশাহ যুলকারনাইন ও বিভিন্ন জাতির লোকজন


১. আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ খুযাঈ বলেন, বাদশাহ যুলকারনাইন একবার এমন এক জাতির মাঝে উপস্থিত হলেন যাদের হাতে জমিনের বুকে জীবনযাপন করার মতো তেমন কোনো ব্যবস্থাপনা ছিল না। তারা নিজেদের জন্য কবর খুঁড়ে রাখত আর সকালবেলা যত্নসহকারে কবরগুলো পরিষ্কার করে সেখানে নামায আদায় করে দুআ করত। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো লতাপাতা ও সবজি আহার করত। জমিতে উৎপন্ন শস্যই ছিল তাদের প্রধান। এ দৃশ্য দেখে যুলকারনাইন তাদের সর্দারের কাছে দূত পাঠালেন।
বর্ণনাকারী বলেন, সংবাদ পেয়ে সর্দার এই সংবাদ পাঠালেন যে, তার নিকট আমার কোনো প্রয়োজন নেই। এই সংবাদ পেয়ে যুলকারনাইন নিজেই তার সাথে দেখা করলেন। তখন সর্দার বললেন, আপনার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন থাকলে তো আমি নিজেই আসতাম। যুলকারনাইন বললেন, আমি তোমাদের এমন অবস্থা আর কোনো উম্মতের মাঝে দেখিনি! তারা বলল, সেটা আবার কী? তিনি বললেন, তোমাদের নিকট দুনিয়া এবং দুনিয়ার কোনো ভোগ-সামগ্রী নেই। তোমরা জীবনকে উপভোগ করার জন্য স্বর্ণ ও রৌপ্য সংগ্রহ করো না কেন? তারা বলল, আমরা তা পছন্দ করি না। কারণ, কেউ যখন এসব অর্জন করতে শুরু করে তখন তার মধ্যে এসবের প্রতি অতিরিক্ত লোভ-লালসা সৃষ্টি হয় এবং সে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। তিনি বললেন, তোমরা কবর খনন করে থাকো। আর সকাল হলেই যত্নসহকারে সেগুলো পরিষ্কার করে সেখানে নামায আদায় করো। এর কারণ কী? তারা বলল, এসবের উদ্দেশ্য হলো, যখন আমাদের মাঝে ইহকালীন আশা-আকাঙ্ক্ষা উঁকি দেয়, আমরা খননকৃত কবরগুলোর দিকে দৃষ্টি দিই, তখন এগুলো আমাদের দুনিয়ার আশা-আকাঙ্ক্ষায় মত্ত হতে বাধা দেয়।
বাদশাহ বললেন, আমি লক্ষ করে দেখলাম, তোমরা শুধু জমি হতে উৎপন্ন শস্যই আহার করো। তোমরা চতুষ্পদ প্রাণী লালনপালন করো না কেন? তা করলে তো তোমরা দুধ পান করতে পারতে। সওয়ারি পেতে। তোমাদের জীবন সহজ হতো! তারা বলল, আমরা নিজেদের পাকস্থলিকে এসব অবলা প্রাণীর কবর বানাতে চাই না। তা ছাড়া আমরা খেয়াল করে দেখেছি যে জমিতে প্রচুর পরিমাণে শস্য উৎপাদিত হয়। আর মানুষের জন্য প্রয়োজন পরিমাণ খাদ্য সংগ্রহ করাই যথেষ্ট। মাত্রাতিরিক্ত হলে আমরা সে খাদ্য গ্রহণ করি না। এরপর সর্দার পেছন হতে হাত বাড়িয়ে একটি
মানুষের মাথার খুলি এনে সামনে রাখলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি জানেন ইনি কে? তিনি বললেন, না। উনি কে? সর্দার বললেন, এই লোকটি পৃথিবীতে রাজত্বকারীদেরই একজন। আল্লাহ তাআলা তাকে জমিনের ওপর কর্তৃত্ব দান করেছিলেন। রাজত্ব পেয়ে সে একাধারে নিষ্ঠুর, জালিম ও খিয়ানাতকারী হয়ে ওঠে। যার পরিণামে আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর বিভীষিকা দ্বারা তাকে পাকড়াও করেছেন। আজকে সে ছুড়ে ফেলা পাথরের মতো গড়াগড়ি খাচ্ছে। আল্লাহ তাআলা তার আমলের হিসাব গ্রহণের আগ পর্যন্ত এভাবেই চলবে। অতঃপর হিসাব গ্রহণ করে আখিরাতে তিনি তাকে তার আমলের উপযুক্ত বিনিময় দেবেন। অতঃপর সর্দার আরও একটি খুলি তুলে ধরে জিজ্ঞাসা করলেন, উনাকে চেনেন? যুলকারনাইন বললেন, না। কে উনি? সর্দার বললেন, ইনিও একজন বাদশাহ। আল্লাহ তাআলা আগেরজনের পরে তাকে ক্ষমতা দান করেছিলেন। আর সে নিজ চোখেই পূর্ববর্তীদের অন্যায়, অনাচার ও নাফরমানির ভয়াবহ পরিণাম দেখেছিল। তাই তিনি আল্লাহ তাআলার অনুগত হয়ে ওঠেন। তাঁর ভয়ে ভীত হন। আর প্রজা-সাধারণের প্রতি ন্যায়পরায়ণ হয়ে ওঠেন। আজকে তার পরিণতিও আপনি দেখতে পাচ্ছেন। আল্লাহ তাআলা তার আমলের হিসাব গ্রহণ করবেন এবং আখিরাতে তাকে তার উপযুক্ত বিনিময় দান করবেন। অতঃপর সর্দার যুলকারনাইনের মাথার খুলির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এই খুলিও সেই খুলি দুটির মতোই। অতএব হে যুলকারনাইন, ভেবে দেখুন, আপনি কী করছেন?
বাদশাহ যুলকারনাইন বললেন, তুমি কি আমার সঙ্গী হবে? আমি তোমাকে ভাইয়ের মর্যাদা দেব, মন্ত্রী বানাব, কিংবা আমার সম্পত্তির অংশীদার বানাতে চাই। সর্দার বললেন, আমি আর আপনি একই স্থানে থাকা ঠিক হবে না। আর আমাদের সবার একইরকম হয়ে যাওয়াটাও ঠিক নয়। যুলকারনাইন প্রশ্ন করলেন, কেন? তিনি বললেন, কারণ মানুষ আপনার শত্রু। কিন্তু আমার বন্ধু। বাদশাহ বললেন, সেটা কীভাবে? সর্দার বললেন, আপনার রাজত্ব ও সম্পদের কারণেই তারা আপনার সাথে শত্রুতা পোষণ করে থাকে। পক্ষান্তরে আমার কাছে এমন কিছু নেই যার জন্য কারও সাথে শত্রুতা তৈরি হতে পারে। আমার কাছে তো কেবল প্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী রয়েছে। এরপর বাদশাহ যুলকারনাইন সেখান থেকে ফিরে আসেন.**
২. খালফ বিন খালীফা বর্ণনা করেন, আবু হাশিম রুম্মানী বলেন, আমার নিকট এই বর্ণনা পৌঁছেছে যে, বাদশাহ যুলকারনাইন পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছেছিলেন। একবার তিনি এমন এক ব্যক্তির সন্ধান পান, যার হাতে একটি ছড়ি ছিল, আর সে তা দিয়ে মৃত মানুষের হাড়গোড় উলটে-পালটে দেখত। সাধারণত যুলকারনাইন কোথাও গেলে সেখানকার লোকজন তার সাথে সাক্ষাৎ করে কুশল বিনিময় করত। কিন্তু এই লোকটি তার সাথে দেখা করতে আসল না। এতে যুলকারনাইন খানিকটা বিস্মিত হয়ে নিজেই তার কাছে গেলেন। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি আমার কাছে আসলে না, কথাবার্তা বললে না, কারণ কী? সে বলল, আপনার নিকট আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আর এটা জানা বিষয় যে, আমার নিকট আপনার কোনো প্রয়োজন থাকলে আপনিই আমার কাছে আসবেন। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এসব কী নাড়াচাড়া করছ? লোকটি বলল, মৃত মানুষের হাড়গোড়। চল্লিশ বছর যাবৎ এটাই আমার কাজ। আমি এই জীর্ণ হাড়গুলোর মধ্যে সম্ভ্রান্ত লোকদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমার কাছে সব একইরকম মনে হচ্ছে। যুলকারনাইন বললেন, তুমি কি আমার সঙ্গী হবে? আমার পাশে থাকবে? লোকটি বলল, আপনি যদি আমার বিষয়ে একটি দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাহলে আমি আপনার সঙ্গী হব। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করলেন, কী দায়িত্ব? লোকটি বলল, আমার মৃত্যু আসলে আপনি তা ঠেকিয়ে দেবেন। যুলকারনাইন বললেন, তা তো সম্ভব নয়। লোকটি বলল, তাহলে আপনার সাথে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই。
৩. সাঈদ বিন আবু হিলাল লাইসী বলেন, বর্ণিত আছে যে, বাদশাহ যুলকারনাইন তার বিশ্ব-সফরে এক শহরে যাত্রাবিরতি করলেন। শহরের আবাল- বৃদ্ধ-বনিতা সকলে তার চারপাশে জড়ো হয়ে তার বহর দেখতে লাগল। নগর ফটক ঘেঁষে এক বৃদ্ধ নিজের আমলে মশগুল ছিলেন। যুলকারনাইনের বাহিনী তার পাশ কেটে চলে গেলেও তিনি তাদের দিকে ফিরে তাকালেন না। এতে যুলকারনাইন বিস্মিত হয়ে বৃদ্ধকে ডেকে পাঠালেন। তিনি আসতেই বাদশাহ বললেন, আপনার ব্যাপারটা কী? শহরের লোকজন সব আমার চারপাশে জড়ো হলো কিন্তু আপনি আসলেন না। ব্যাপার কী? বৃদ্ধ বললেন, আপনি কিসে চড়ে এসেছেন তার প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই। একজন বাদশাহ এবং একজন নিঃস্ব লোকের একই
দিন মৃত্যু ঘটে। আমরা উভয়কে দাফন করি। কিছুদিন পর উভয়ের লাশ উত্তোলন করা হয়। গোশত পচে-গলে মিশে গেছে। হাড়-গোড় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ কারণেই আপনার রাজত্ব আমাকে আকর্ষণ করে না। বাদশাহ যুলকারনাইন শহর ছেড়ে যাওয়ার সময় বৃদ্ধকে গভর্নর নিযুক্ত করে যান。
৪. হারিস বিন মুহাম্মাদ তামিমী কুরাইশ বংশের জনৈক বৃদ্ধের কাছ থেকে বর্ণনা করেন যে, বাদশাহ ইসকানদার (যুলকারনাইন) এক শহরে উপস্থিত হলেন যেখানে পর পর সাত জন শাসক শাসনক্ষমতা পরিচালনা করে ইতিহাসের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছেন। ইসকানদার জিজ্ঞাসা করলেন, এই জমিনে শাসনকারীদের কোনো বংশধর বেঁচে আছে কি? লোকজন বলল, হ্যাঁ, একজন বেঁচে আছেন, তিনি কবরস্থানে থাকেন। বাদশাহ তাকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন জিনিস তোমাকে কবরস্থানে পড়ে থাকতে কৌতূহল জুগিয়েছে? লোকটি বলল, আমি শাসক ও প্রজাদের হাড়গোড়ের মধ্যে কী পার্থক্য রয়েছে তা জানতে চাই। আমি উভয় শ্রেণির হাড়গোড় জমা করেছি। কিন্তু সেখানে শাসক ও প্রজা সাধারণকে একইরকম পেয়েছি। ইসকানদার বললেন, তুমি কি আমার সাথে যাবে? এতে তোমার মাধ্যমে তোমার পূর্বপুরুষের হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধার হবে। আর তোমার কোনো ইচ্ছা থাকলে তাও পূরণ করা হবে। লোকটি বলল, আমার মনের বাসনা তো অনেক বড়। আপনি যদি তা পূরণ করতে পারেন তো বলুন। বাদশাহ জানতে চাইলেন, কী তোমার মনস্কামনা? সে বলল, মৃত্যুহীন জীবন, বার্ধক্যহীন যৌবন, দারিদ্র্যহীন প্রাচুর্য আর বিরক্তিহীন বিলাসিতা। বাদশাহ বললেন, এ তো অসম্ভব! লোকটি বলল, তাহলে আপনি নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করুন আর আমাকে রাজা-বাদশাহদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাতে দিন। বাদশাহ ইসকানদার বললেন, লোকটি আমার দেখা সবচেয়ে জ্ঞানী লোকদের অন্যতম একজন।

টিকাঃ
১৮৩. তারীখে দামিশক, ১৭/৩৫৩-৩৫৫। তা ছাড়া আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক এর কিতাবুয যুহদ, ২/৫৮ ও জালালুদ্দীন সুযুতী এ এর দুররুল মানসুর, ৫/৪৪৯ (সুরা কাহফ, (১৮): ৮৩ এর ব্যাখ্যায়) সমার্থক বর্ণনা রয়েছে。
১৮৪. তারীখু দিমাশক, ১৭/৩৫৩। সনদ হাসান。
১৮৫. কিতাবুয যুহদ, ২/৫৮
১৮৬. তারীখু দিমাশক, ১৭/৩৫৫। সনদ দুর্বল。

১. আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ খুযাঈ বলেন, বাদশাহ যুলকারনাইন একবার এমন এক জাতির মাঝে উপস্থিত হলেন যাদের হাতে জমিনের বুকে জীবনযাপন করার মতো তেমন কোনো ব্যবস্থাপনা ছিল না। তারা নিজেদের জন্য কবর খুঁড়ে রাখত আর সকালবেলা যত্নসহকারে কবরগুলো পরিষ্কার করে সেখানে নামায আদায় করে দুআ করত। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো লতাপাতা ও সবজি আহার করত। জমিতে উৎপন্ন শস্যই ছিল তাদের প্রধান। এ দৃশ্য দেখে যুলকারনাইন তাদের সর্দারের কাছে দূত পাঠালেন।
বর্ণনাকারী বলেন, সংবাদ পেয়ে সর্দার এই সংবাদ পাঠালেন যে, তার নিকট আমার কোনো প্রয়োজন নেই। এই সংবাদ পেয়ে যুলকারনাইন নিজেই তার সাথে দেখা করলেন। তখন সর্দার বললেন, আপনার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন থাকলে তো আমি নিজেই আসতাম। যুলকারনাইন বললেন, আমি তোমাদের এমন অবস্থা আর কোনো উম্মতের মাঝে দেখিনি! তারা বলল, সেটা আবার কী? তিনি বললেন, তোমাদের নিকট দুনিয়া এবং দুনিয়ার কোনো ভোগ-সামগ্রী নেই। তোমরা জীবনকে উপভোগ করার জন্য স্বর্ণ ও রৌপ্য সংগ্রহ করো না কেন? তারা বলল, আমরা তা পছন্দ করি না। কারণ, কেউ যখন এসব অর্জন করতে শুরু করে তখন তার মধ্যে এসবের প্রতি অতিরিক্ত লোভ-লালসা সৃষ্টি হয় এবং সে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। তিনি বললেন, তোমরা কবর খনন করে থাকো। আর সকাল হলেই যত্নসহকারে সেগুলো পরিষ্কার করে সেখানে নামায আদায় করো। এর কারণ কী? তারা বলল, এসবের উদ্দেশ্য হলো, যখন আমাদের মাঝে ইহকালীন আশা-আকাঙ্ক্ষা উঁকি দেয়, আমরা খননকৃত কবরগুলোর দিকে দৃষ্টি দিই, তখন এগুলো আমাদের দুনিয়ার আশা-আকাঙ্ক্ষায় মত্ত হতে বাধা দেয়।
বাদশাহ বললেন, আমি লক্ষ করে দেখলাম, তোমরা শুধু জমি হতে উৎপন্ন শস্যই আহার করো। তোমরা চতুষ্পদ প্রাণী লালনপালন করো না কেন? তা করলে তো তোমরা দুধ পান করতে পারতে। সওয়ারি পেতে। তোমাদের জীবন সহজ হতো! তারা বলল, আমরা নিজেদের পাকস্থলিকে এসব অবলা প্রাণীর কবর বানাতে চাই না। তা ছাড়া আমরা খেয়াল করে দেখেছি যে জমিতে প্রচুর পরিমাণে শস্য উৎপাদিত হয়। আর মানুষের জন্য প্রয়োজন পরিমাণ খাদ্য সংগ্রহ করাই যথেষ্ট। মাত্রাতিরিক্ত হলে আমরা সে খাদ্য গ্রহণ করি না। এরপর সর্দার পেছন হতে হাত বাড়িয়ে একটি
মানুষের মাথার খুলি এনে সামনে রাখলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি জানেন ইনি কে? তিনি বললেন, না। উনি কে? সর্দার বললেন, এই লোকটি পৃথিবীতে রাজত্বকারীদেরই একজন। আল্লাহ তাআলা তাকে জমিনের ওপর কর্তৃত্ব দান করেছিলেন। রাজত্ব পেয়ে সে একাধারে নিষ্ঠুর, জালিম ও খিয়ানাতকারী হয়ে ওঠে। যার পরিণামে আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর বিভীষিকা দ্বারা তাকে পাকড়াও করেছেন। আজকে সে ছুড়ে ফেলা পাথরের মতো গড়াগড়ি খাচ্ছে। আল্লাহ তাআলা তার আমলের হিসাব গ্রহণের আগ পর্যন্ত এভাবেই চলবে। অতঃপর হিসাব গ্রহণ করে আখিরাতে তিনি তাকে তার আমলের উপযুক্ত বিনিময় দেবেন। অতঃপর সর্দার আরও একটি খুলি তুলে ধরে জিজ্ঞাসা করলেন, উনাকে চেনেন? যুলকারনাইন বললেন, না। কে উনি? সর্দার বললেন, ইনিও একজন বাদশাহ। আল্লাহ তাআলা আগেরজনের পরে তাকে ক্ষমতা দান করেছিলেন। আর সে নিজ চোখেই পূর্ববর্তীদের অন্যায়, অনাচার ও নাফরমানির ভয়াবহ পরিণাম দেখেছিল। তাই তিনি আল্লাহ তাআলার অনুগত হয়ে ওঠেন। তাঁর ভয়ে ভীত হন। আর প্রজা-সাধারণের প্রতি ন্যায়পরায়ণ হয়ে ওঠেন। আজকে তার পরিণতিও আপনি দেখতে পাচ্ছেন। আল্লাহ তাআলা তার আমলের হিসাব গ্রহণ করবেন এবং আখিরাতে তাকে তার উপযুক্ত বিনিময় দান করবেন। অতঃপর সর্দার যুলকারনাইনের মাথার খুলির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এই খুলিও সেই খুলি দুটির মতোই। অতএব হে যুলকারনাইন, ভেবে দেখুন, আপনি কী করছেন?
বাদশাহ যুলকারনাইন বললেন, তুমি কি আমার সঙ্গী হবে? আমি তোমাকে ভাইয়ের মর্যাদা দেব, মন্ত্রী বানাব, কিংবা আমার সম্পত্তির অংশীদার বানাতে চাই। সর্দার বললেন, আমি আর আপনি একই স্থানে থাকা ঠিক হবে না। আর আমাদের সবার একইরকম হয়ে যাওয়াটাও ঠিক নয়। যুলকারনাইন প্রশ্ন করলেন, কেন? তিনি বললেন, কারণ মানুষ আপনার শত্রু। কিন্তু আমার বন্ধু। বাদশাহ বললেন, সেটা কীভাবে? সর্দার বললেন, আপনার রাজত্ব ও সম্পদের কারণেই তারা আপনার সাথে শত্রুতা পোষণ করে থাকে। পক্ষান্তরে আমার কাছে এমন কিছু নেই যার জন্য কারও সাথে শত্রুতা তৈরি হতে পারে। আমার কাছে তো কেবল প্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী রয়েছে। এরপর বাদশাহ যুলকারনাইন সেখান থেকে ফিরে আসেন.**
২. খালফ বিন খালীফা বর্ণনা করেন, আবু হাশিম রুম্মানী বলেন, আমার নিকট এই বর্ণনা পৌঁছেছে যে, বাদশাহ যুলকারনাইন পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছেছিলেন। একবার তিনি এমন এক ব্যক্তির সন্ধান পান, যার হাতে একটি ছড়ি ছিল, আর সে তা দিয়ে মৃত মানুষের হাড়গোড় উলটে-পালটে দেখত। সাধারণত যুলকারনাইন কোথাও গেলে সেখানকার লোকজন তার সাথে সাক্ষাৎ করে কুশল বিনিময় করত। কিন্তু এই লোকটি তার সাথে দেখা করতে আসল না। এতে যুলকারনাইন খানিকটা বিস্মিত হয়ে নিজেই তার কাছে গেলেন। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি আমার কাছে আসলে না, কথাবার্তা বললে না, কারণ কী? সে বলল, আপনার নিকট আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আর এটা জানা বিষয় যে, আমার নিকট আপনার কোনো প্রয়োজন থাকলে আপনিই আমার কাছে আসবেন। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এসব কী নাড়াচাড়া করছ? লোকটি বলল, মৃত মানুষের হাড়গোড়। চল্লিশ বছর যাবৎ এটাই আমার কাজ। আমি এই জীর্ণ হাড়গুলোর মধ্যে সম্ভ্রান্ত লোকদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমার কাছে সব একইরকম মনে হচ্ছে। যুলকারনাইন বললেন, তুমি কি আমার সঙ্গী হবে? আমার পাশে থাকবে? লোকটি বলল, আপনি যদি আমার বিষয়ে একটি দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাহলে আমি আপনার সঙ্গী হব। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করলেন, কী দায়িত্ব? লোকটি বলল, আমার মৃত্যু আসলে আপনি তা ঠেকিয়ে দেবেন। যুলকারনাইন বললেন, তা তো সম্ভব নয়। লোকটি বলল, তাহলে আপনার সাথে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই。
৩. সাঈদ বিন আবু হিলাল লাইসী বলেন, বর্ণিত আছে যে, বাদশাহ যুলকারনাইন তার বিশ্ব-সফরে এক শহরে যাত্রাবিরতি করলেন। শহরের আবাল- বৃদ্ধ-বনিতা সকলে তার চারপাশে জড়ো হয়ে তার বহর দেখতে লাগল। নগর ফটক ঘেঁষে এক বৃদ্ধ নিজের আমলে মশগুল ছিলেন। যুলকারনাইনের বাহিনী তার পাশ কেটে চলে গেলেও তিনি তাদের দিকে ফিরে তাকালেন না। এতে যুলকারনাইন বিস্মিত হয়ে বৃদ্ধকে ডেকে পাঠালেন। তিনি আসতেই বাদশাহ বললেন, আপনার ব্যাপারটা কী? শহরের লোকজন সব আমার চারপাশে জড়ো হলো কিন্তু আপনি আসলেন না। ব্যাপার কী? বৃদ্ধ বললেন, আপনি কিসে চড়ে এসেছেন তার প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই। একজন বাদশাহ এবং একজন নিঃস্ব লোকের একই
দিন মৃত্যু ঘটে। আমরা উভয়কে দাফন করি। কিছুদিন পর উভয়ের লাশ উত্তোলন করা হয়। গোশত পচে-গলে মিশে গেছে। হাড়-গোড় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ কারণেই আপনার রাজত্ব আমাকে আকর্ষণ করে না। বাদশাহ যুলকারনাইন শহর ছেড়ে যাওয়ার সময় বৃদ্ধকে গভর্নর নিযুক্ত করে যান。
৪. হারিস বিন মুহাম্মাদ তামিমী কুরাইশ বংশের জনৈক বৃদ্ধের কাছ থেকে বর্ণনা করেন যে, বাদশাহ ইসকানদার (যুলকারনাইন) এক শহরে উপস্থিত হলেন যেখানে পর পর সাত জন শাসক শাসনক্ষমতা পরিচালনা করে ইতিহাসের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছেন। ইসকানদার জিজ্ঞাসা করলেন, এই জমিনে শাসনকারীদের কোনো বংশধর বেঁচে আছে কি? লোকজন বলল, হ্যাঁ, একজন বেঁচে আছেন, তিনি কবরস্থানে থাকেন। বাদশাহ তাকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন জিনিস তোমাকে কবরস্থানে পড়ে থাকতে কৌতূহল জুগিয়েছে? লোকটি বলল, আমি শাসক ও প্রজাদের হাড়গোড়ের মধ্যে কী পার্থক্য রয়েছে তা জানতে চাই। আমি উভয় শ্রেণির হাড়গোড় জমা করেছি। কিন্তু সেখানে শাসক ও প্রজা সাধারণকে একইরকম পেয়েছি। ইসকানদার বললেন, তুমি কি আমার সাথে যাবে? এতে তোমার মাধ্যমে তোমার পূর্বপুরুষের হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধার হবে। আর তোমার কোনো ইচ্ছা থাকলে তাও পূরণ করা হবে। লোকটি বলল, আমার মনের বাসনা তো অনেক বড়। আপনি যদি তা পূরণ করতে পারেন তো বলুন। বাদশাহ জানতে চাইলেন, কী তোমার মনস্কামনা? সে বলল, মৃত্যুহীন জীবন, বার্ধক্যহীন যৌবন, দারিদ্র্যহীন প্রাচুর্য আর বিরক্তিহীন বিলাসিতা। বাদশাহ বললেন, এ তো অসম্ভব! লোকটি বলল, তাহলে আপনি নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করুন আর আমাকে রাজা-বাদশাহদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাতে দিন। বাদশাহ ইসকানদার বললেন, লোকটি আমার দেখা সবচেয়ে জ্ঞানী লোকদের অন্যতম একজন।

টিকাঃ
১৮৩. তারীখে দামিশক, ১৭/৩৫৩-৩৫৫। তা ছাড়া আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক এর কিতাবুয যুহদ, ২/৫৮ ও জালালুদ্দীন সুযুতী এ এর দুররুল মানসুর, ৫/৪৪৯ (সুরা কাহফ, (১৮): ৮৩ এর ব্যাখ্যায়) সমার্থক বর্ণনা রয়েছে。
১৮৪. তারীখু দিমাশক, ১৭/৩৫৩। সনদ হাসান。
১৮৫. কিতাবুয যুহদ, ২/৫৮
১৮৬. তারীখু দিমাশক, ১৭/৩৫৫। সনদ দুর্বল。

📘 সালাফদের চোখে কবর > 📄 জন্ম হয়েছে কবরে!

📄 জন্ম হয়েছে কবরে!


উমর ইবনুল খাত্তাব-এর ভৃত্য এবং বিখ্যাত তাবেঈ আবু যায়িদ আসলাম বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাবএকদিন লোকজনের মাঝে উপস্থিত হলেন; এমন সময় জনৈক ব্যক্তি তার শিশু ছেলেকে কাঁধে চড়িয়ে উমর-এর পাশ
দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের দেখে তিনি বললেন, বাবা ও ছেলের মধ্যে এত অমিল তো আমি আর কখনো দেখিনি। লোকটি বলল, আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, তার মা মৃত্যুর পর তাকে প্রসব করেছে! আমীরুল মুমিনীন বললেন, বলো কী! তা কীভাবে সম্ভব? লোকটি বলল, একবার কিছু কাজে দূরের সফরে বের হলাম। ছেলেটি তখন আমার স্ত্রীর গর্ভে। আমি বের হওয়ার আগে তাকে বললাম, তোমার গর্ভে যে সন্তান রয়েছে, আমি তাকে আল্লাহর তাআলার কাছে আমানত রেখে যাচ্ছি। আল্লাহ তাকে নিরাপদ রাখুন। সফর থেকে ফিরে জানতে পারলাম, আমার স্ত্রী ইনতিকাল করেছে। এক রাতের ঘটনা। আমি আর আমার চাচাতো ভাই খোলা ময়দানে বসে আছি। হঠাৎ দেখলাম অদূরের কবরস্থানে বাতির আলোর মতো আলো জ্বলছে। আমি ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কিসের আলো? সে বলল, প্রতিরাতেই তোমার স্ত্রীর কবরে আলোটি দেখতে পাই। কিন্তু কিসের আলো তা জানি না। লোকটি বলল, এরপর আমি একটি কুঠার নিয়ে কবরের কাছে গিয়ে দেখি কবরটি খোলা আর ছেলেটি তার মায়ের কোলে। এমন সময় কেউ একজন আমাকে লক্ষ্য করে বলল,
হে আল্লাহর নিকট আমানত প্রদানকারী, তোমার গচ্ছিত আমানত গ্রহণ করো। তুমি যদি তার মাকে আমানত রেখে যেতে, তবে তাকেও ফিরে পেতে। এ কথা শুনে আমি ছেলেটিকে তুলে নিলাম। আর কবরটিও বন্ধ হয়ে গেল.**

টিকাঃ
১৮৭. মানাকিব আমারিল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব (ইবনুল জাওযী, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ), ৬৬। সনদ মাকবুল।

📘 সালাফদের চোখে কবর > 📄 প্রাচীন কবর হতে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন উপদেশ

📄 প্রাচীন কবর হতে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন উপদেশ


১. প্রখ্যাত তাবেঈ আমর বিন মাইমুন বর্ণনা করেন, সাহাবী জারীর বিন আবদুল্লাহ বাজালী বলেন, আমরা পারস্যের একটি শহর জয় করলাম। আমাদের কাছে খবর এল যে, কাছেই একটি গুহায় অনেক ধন-সম্পদ রয়েছে। আমরা কিছু স্থানীয় মানুষকে নিয়ে সেই গুহায় প্রবেশ করলাম। সেখানে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও ধন-সম্পদ ছিল। আমরা তা বাজেয়াপ্ত করে একটি খিলানযুক্ত বাংকারের মতো গুপ্তঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। ঘরটির প্রবেশ পথ একটি বড় শিলাখণ্ড দিয়ে আড়াল করা ছিল। পাথরের আড়াল সরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই একটি স্বর্ণখচিত পালঙ্ক দেখতে পেলাম। পালঙ্কে দানবাকৃতির অনেক পুরোনো এক মৃত ব্যক্তি শায়িত রয়েছে। এমন
মানুষ আমি কখনো দেখিনি। সেখানে কিছু তৈজসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। লোকটির মাথার কাছে এক টুকরো কাঠের মধ্যে কিছু লেখা খোদাই করা রয়েছে। স্থানীয় লোকজন আমাকে তা পড়ে শোনাল। সেখানে লেখা ছিল,
হে আল্লাহ তাআলার মালিকানাধীন বান্দা! তুমি আপন স্রষ্টার সামনে ঔদ্ধত্য প্রকাশ কোরো না। তাঁর দেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার কোরো না। জেনে রেখো, তোমার জীবৎকাল যত দীর্ঘই হোক, মৃত্যুই তোমার পার্থিব জীবনের শেষ পরিণাম। তোমার সামনে হিসাবের দরবার রয়েছে। এখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সময় ফুরিয়ে আসলে হঠাৎ একদিন তোমাকে পাকড়াও করা হবে। তুমি যা কিছু পছন্দ করো, এখন থেকেই আখিরাতের কল্যাণের জন্য তা পাঠাতে থাকো। সেখানে তুমি তা পেয়ে যাবে। পার্থিব জীবনের ধোঁকায় না পড়ে মৃত্যুর পাথেয় সংগ্রহ করো।
হে আল্লাহ তাআলার মালিকানাধীন বান্দা, আমার অবস্থা দেখে শিক্ষা গ্রহণ করো। নিশ্চয়ই আমার পরিণতিতে তোমাদের জন্য শিক্ষার বিষয় রয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমার মধ্যে তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ রেখেছেন।
আমি পারস্য সম্রাট বাহরাম বিন বাহরাম। আমি ছিলাম তাদের মধ্যে সবচেয়ে উৎপীড়ক, কঠোর, দীর্ঘ অভিলাষী, রাজনৈতিক আভিজাত্যের অধিকারী, আরামপ্রিয় ও সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলায় পারদর্শী একজন সম্রাট।
আমি নিজের রাজত্বকে বহুদূর বিস্তার করেছি, প্রচণ্ড প্রতাপশালী শাসকদের কচুকাটা করেছি, বড় বড় বাহিনীকে পরাস্ত করেছি আর বিদ্বানদের খুঁজে খুঁজে অপদস্থ করে ছেড়েছি। দীর্ঘ পাঁচ শ বছরের জীবৎকালে আমি এ পরিমাণ সম্পদ জমা করেছি, যা ইতিপূর্বে আর কেউ করতে পারেনি। এতকিছুর পরও আমি নিজের মৃত্যুকে ঠেকাতে পারিনি।"
২. হাসান বিন জাহওয়ার বর্ণনা করেন, হাইছাম বিন আদী বলেন, কয়েকজন আলিম আমাকে বলেছেন যে, তারা ইস্পাহানে একটি জলাশয় খনন করছিলেন। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে বিশাল এক পাথরখণ্ড বেরিয়ে আসল। পাথরটি তাদের কাছে বিশেষ কিছু মনে হলো। এমন কিছু আগে কেউ দেখেনি। কিছু লোক সেখানে জড়ো হয়ে গেল। তারা পাথরটি উল্টাতেই নিচে একটি ঘর দেখতে পেল। ঘরটিতে স্বর্ণখচিত চারটি পালঙ্ক ছিল। প্রথম পালঙ্কটিতে একজন বৃদ্ধের লাশ রাখা ছিল; যাকে দেখেই বোঝা যায় যে, তিনি নেতৃস্থানীয় কেউ হবেন। তার মাথায় চুল ছিল না। লম্বা দাড়ি ছিল। তার পালঙ্কের ওপর পান্নাখচিত ও আংটাবিশিষ্ট কিছু পাত্র রাখা ছিল।
দ্বিতীয় পালঙ্কে একজন সুদর্শন যুবকের মৃতদেহ ছিল। তার বিছানায় তিনটি পাত্র ছিল। আর মাথার পাশে একটি মুকুট ঝুলানো ছিল।
তৃতীয় পালঙ্কে এক বালকের দেহ ছিল। তার দুই কানে ছিল দুটি দুল। প্রতিটি দুলেই মুক্তো লাগানো।
চতুর্থ পালঙ্কে চাঁদমুখী এক যুবতীর মৃতদেহ ছিল। তার পালঙ্কেও অনেক পাত্র ছিল। তার হাতে বালা ও পান্নাখচিত চুড়ি ছিল।
প্রতিটি দেহের শিয়র ঘেঁষে ফারসী ভাষায় কিছু লেখা ছিল। স্থানীয় লোকজন ফারসী জানা একজন মানুষকে ডেকে এনে তা পড়তে দিল।
প্রথম ব্যক্তির শিয়র পাশে লেখা ছিল, আমি রুস্তম! এই নগরীর শাসক। আমি খুবই কঠিন মানুষ ছিলাম। কত নিআমতের স্বাদ আমি গ্রহণ করেছি! এত সম্পদ আমি জমা করেছি, ইতিপূর্বে কেউ যা করতে পারেনি। বহু সৈন্যদলকে আমি পরাজয়ের গ্লানি উপহার দিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে উত্থিত তরবারি ভোঁতা করে দিয়েছি। এত কিছুর পরেও মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার কোনো উপায় আমি খুঁজে পাইনি।
দ্বিতীয় ব্যক্তির পাশে লেখা ছিল, 'আমি সাবুর বিন মালিক। দুরন্ত যৌবনেই মৃত্যু আমাকে আঘাত করেছে। আমার যাবতীয় প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে। মৃত্যু যদি আমার কাছে বিনিময় দাবি করত, তাহলে আমি সবচেয়ে বেশি মূল্য দিয়ে তাকে ফিরিয়ে দিতাম।
তৃতীয় লাশের পাশে লেখা ছিল, আমি বাহরাম বিন মালিক। মৃত্যু এক অনিবার্য বিপর্যয়। মানুষ যদি চিরকাল জমিনের বুকে থাকত, তাহলে আমরাও থাকতাম।
চতুর্থ পালঙ্কে নারীদেহের পাশে লেখা ছিল, আমি মিনাহাত বিনতে মালিক। মৃত্যু আমার আভিজাত্য কেড়ে নিয়েছে। কোমলতা ছিনিয়ে নিয়ে ব্যথিত করেছে। তোমরা দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ো না।
বর্ণনাকারী বলেন, স্থানীয় লোকজন সেখান থেকে প্রচুর মূল্যবান সম্পদ লাভ করেন।
৩. আবদুল্লাহ বিন আইয়াশ হামাদানী ❑ নাজরানের কিছু লোক আমাকে বলেছেন যে, আমরা একবার মহান এক ব্যক্তিত্বের কবর খুঁড়তে বের হলাম। প্রাচীনকালের সম্রাটদের কবরস্থান হিসেবে পরিচিত এক জায়গায় আমরা কবর খুঁড়তে গিয়ে মাটির নিচে কারুকার্যখচিত একটি লোহার কফিন পেলাম। কফিনটি খুলতেই ভেতরে চুল- দাড়ি আঁচড়ানো, হালকা গড়নের এবং অভিজাত পোশাকে পরিহিত এক বৃদ্ধের মৃতদেহ পেলাম। লোকটির মাথার পাশে এক টুকরো কাগজে পেলাম। তাতে লেখা, আমি লৌহমানব জুনাইদাহ বিন জুনাইদ। আমি ছয় শ বছর বেঁচে ছিলাম। আমার আজকের অবস্থা নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছ। দুনিয়া এবং তার প্রেমিকদের জন্য আফসোস! দুনিয়ার লোভ ও ধোঁকায় নিপতিত ব্যক্তির জন্য ধ্বংস অনিবার্য।
৪. ঈসা বিন আবদুল্লাহ বিন ইয়াহইয়ার বিন দাইসান বলেন, মুআবিয়া -এর আমলে একবার শরৎকালে প্রচুর বৃষ্টি হলো। পানির ঢল নেমে এক জায়গায় ফাটল দেখা দিল। জায়গাটিতে পাথরে নির্মিত একটি ঘর ছিল। ঘরের মূল ফটকটিও পাথরের ছিল। স্রোতের ধাক্কায় দরজাটি খুলে গেলে দেখা গেল একটি কবর। কবরের ওপর এক টুকরো লোহার পাত রাখা। তাতে লেখা,
আমি বারান বুহাইর। সম্রাটের সন্তান সম্রাট। আমি সাত শ বছর বেঁচে ছিলাম। শত-সহস্র কুমারীর সতীত্ব হরণ করেছি। হাজার হাজার বাহিনীকে পরাস্ত করেছি। সবশেষে মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। যে ব্যক্তি আমার কবর দেখবে; সে যেন আল্লাহকে ভয় করে। আর এ কথা জেনে রাখে যে, মৃত্যুই তার শেষ পরিণাম।
৫. হুসাইন বিন আবদুল্লাহ কুরাইশী জনৈক আনসারীর কাছ থেকে বর্ণনা করেন, দাউদ যখন ভুল করে বসলেন; তখন তিনি কিছু সময়ের জন্য শুধু ইবাদত-বন্দেগীতে মগ্ন থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই ইচ্ছায় তিনি একজন পাদরির সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে পাহাড়ের পাদদেশে গিয়ে তার নাম ধরে ডাকলেন। কিন্তু পাদরি কোনো সাড়া দিল না। অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর পাদরি বলল, এভাবে আমার নাম ধরে কে ডাকাডাকি করছে? তার মা-বাবা বোধ হয় তাকে এ ব্যাপারে ভয়-ভীতি দেখায়নি। আর তার ইবাদত-বন্দেগীও তেমন কাজে আসেনি! পাদরির কথা শুনে দাউদ বললেন, আমি দাউদ। সুরম্য প্রাসাদ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অশ্ব, সুন্দরী নারী আর বিভিন্ন সম্পদের অধিকারী। পাদরি বলল, এগুলোর বিনিময়ে আপনি যদি জান্নাত লাভ করতে পারতেন, তবে কামিয়াব হতেন। দাউদ বললেন, কে তুমি? পাদরি বলল, আমি এক তৃষ্ণার্ত ও অনুসন্ধিৎসু বৈরাগী। দাউদ বললেন, তোমার প্রিয় বন্ধু কে? কার সাথে উঠাবসা করো তুমি? পাদরি বলল, আপনি যদি তা দেখতে চান তাহলে পাহাড়ের শীর্ষে চড়ুন। দাউদ পাহাড়ের চূড়ায় তার আস্তানায় প্রবেশ করে একটি মৃতদেহ দেখতে পেলেন। তিনি বললেন, এই কি তোমার প্রিয় বন্ধু, উঠাবসার সঙ্গী? সে বলল, হ্যাঁ। দাউদ বললেন, এই লোকটি কে? পাদরি বলল, তিনি একজন বাদশাহ। তার মাথার পাশে তামার পাত্রে তার ঘটনা লিপিবদ্ধ রয়েছে। দাউদ কাছে গিয়ে তা পড়লেন। তাতে লেখা ছিল, আমি অমুকের সন্তান অমুক। আমি একজন সম্রাট। আমি হাজার বছর জীবন পেয়েছি। হাজার নগরী আবাদ করেছি। হাজার বাহিনীকে পরাজিত করেছি। হাজার নারীর ঘ্রাণ নিয়েছি। হাজার কুমারীর সতীচ্ছেদ করেছি। আমার রাজত্ব চলাকালেই একদিন মালাকুল মাওত চলে এসেছেন। তিনি আমার সাম্রাজ্য হতে আমাকে বের করে নিয়ে গিয়েছেন। আজ আমার অবস্থা হলো, মাটি আমার বিছানা। পোকা- মাকড় আমার প্রতিবেশী।
লেখাটি পড়ে দাউদ অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়লেন।
৬. তাবেঈ লাইস বিন আবু সুলাইম বর্ণনা করেন, বিখ্যাত তাবেঈ মুজাহিদ বিন জাবার বলেন, ইবরাহীম বাইতুল্লাহর ভিত্তি গড়ার সময় একটি পাথর দেখতে পান, যাতে খোদাই করে লেখা ছিল,
হে আদমসন্তান, কল্যাণের বীজ বপন করো। আনন্দের শস্য লাভ করবে। মন্দের বীজ বপন কোরো না। তাহলে পরিতাপের ফল ভোগ করতে হবে। হে আদমসন্তান, তোমরা মন্দ আমল করো। কিন্তু পরিণামে শাস্তিকে অপছন্দ করো! মনে রেখো, কাটাগুল্ম থেকে আঙুর ফল আশা করা যায় না।
৭. আবু জাকারিয়া তাইমী বলেন, একবার খলীফা সুলাইমান বিন আবদুল মালিক মসজিদুল হারামে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় তার নিকট একটি শিলালিপি আনা হলো। তিনি লেখার পাঠোদ্ধার করার মতো কাউকে খুঁজছিলেন। অবশেষে ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ -এর কাছে নিয়ে গেলে তিনি তা পড়ে শোনালেন। পাথরটিতে লেখা ছিল,
আদমসন্তান, তুমি যদি তোমার অবশিষ্ট জীবনের দিকে লক্ষ করে দেখতে, তাহলে দীর্ঘ জীবনের আশা ত্যাগ করতে। আমল বৃদ্ধিতে আগ্রহী হতে। জীবনের প্রতি আশা-আকাঙ্ক্ষা কমিয়ে আনতে। আগামীকাল তুমি অপমানজনক অবস্থার সম্মুখীন হবে। অচিরেই তোমার অনুগত, শুভাকাঙ্ক্ষী, পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধব হারিয়ে যাবে। প্রিয় সন্তান দূরে সরে যাবে। জন্মদাতা পিতা ও আত্মীয়স্বজন তোমাকে প্রত্যাখ্যান করবে। তুমি না দুনিয়াতে আর ফিরে আসতে পারবে, না তোমার আমলের পরিমাণ কেউ বাড়িয়ে দিতে পারবে। অতএব দুঃখ ও অপমানের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসার আগেই বিচার-দিবসের জন্য আমল শুরু করো। লেখাটি পড়ার পর খলীফা সুলাইমান বিন আবদুল মালিক কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
৮. মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন বুরজুলানী বর্ণনা করেন, আবু মুহাম্মাদ সাইয়াত বলেন, আমি আবুল আব্বাস ওয়ালিদ -এর কাছ থেকে শুনেছি যে, ইয়াযিদ বিন মুআবিয়াহর মৃত্যুর পর ৬৪ হিজরিতে কাবা ধসিয়ে দেওয়া হয়। তখন কাবার ধ্বংসস্তূপে একটি ইট পাওয়া যায়। তার গায়ে হিব্রু ভাষায় লেখা ছিল,
মরণ-যন্ত্রণার ব্যাপারে সতর্ক থেকো। মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য আমল শুরু করো। কারণ, মৃত্যুর থাবা থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। আর মৃত্যুর পর ফিরে আসারও কোনো সুযোগ নেই। মৃত্যুর ফিরিশতা আল্লাহর এমনই অনুগত যে, কখনো অবাধ্য হয় না।
৯. মুগীরা সাওয়াফ বলেন, আমি বাইতুল মুকাদ্দাসে একটি ইটের ওপর এই লেখা পড়েছি যে,
ভালোভাবে ভেবে দেখো, তোমার পূর্বে কত উম্মতকে মৃত্যুর ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে? সমস্ত প্রশংসা পবিত্র সেই সত্তার, যিনি মৃতকে জীবন দান করেন। সকল বস্তুর ওপর তিনি একক ক্ষমতার অধিকারী।
১০. আবু আবদুর রহমান যাহিদ বলেন, আমি বাইতুল মুকাদ্দাসে একটি লাঠিজাতীয় বস্তুতে নিচের লেখাটি পড়েছি,
এমন এক ঘরে তোমার জীবন কাটবে, তুমি চলে যাওয়ার পর তোমার প্রতি আস্থা রাখা লোকজনও যে ঘরের ব্যাপারে ভীত হয়ে উঠবে। আর তোমার অনুগত লোকজন অন্যের হয়ে যাবে।
১১. আবদুল্লাহ বিন লাহীআহ বলেন, আলেকজান্দ্রিয়া শহরের একজন অধিবাসী আমাকে বলেছেন যে, একবার নীলনদ থেকে একটি দামি শিলাপাথর উদ্ধার করা হয়। পাথরটিতে রোমান ভাষায় কিছু লেখা ছিল। এক ব্যক্তি এসে লেখাটি পড়ে কাঁদতে লাগল। লোকজন বলল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! এই লেখাটি আমাকে কাঁদিয়েছে। বলল, এখানে কী লেখা আছে? তিনি বললেন,
নেক আমল করে তা ভুলে যাও। তবে গুনাহ করলে তা মনে রেখো। যে ব্যক্তি তা করবে, সে হয়তো দীর্ঘ প্রশান্তির কোনো পথ খুঁজে পাবে।

টিকাঃ
১৮৮. বাহরাম বিন বাহরাম বিন হরমুজ বিন সাবুর বিন ইবদশীর। তিনি দ্বিতীয় বাহরাম নামে প্রসিদ্ধ। মুসলিম ঐতিহাসিকগণ হরমুজ বিন সাবুরকে দ্বিতীয় বাহরামের পিতামহ হিসেবে উল্লেখ করলেও পশ্চিমা ও ইরানি ঐতিহাসিকদের অধিকাংশই চাচা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পারস্যের বিখ্যাত সাসানীয় সাম্রাজ্যের পঞ্চম শাসক। তিনি ২৭৪-২৯৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। আল কামিলু ফিত তারীখ (ইবনুল আসীর), ১/৩৬৬, ৩৫৭। আল মুনতাজাম (ইবনুল জাওযী), ২/৮৩। এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ইরানিকা, ৩/৫১৪-৫২২。
১৮৯. ভুল তথ্য। খ্রিষ্টপূর্ব ও পরবর্তী ইরানের ইতিহাসে এত বছর রাজত্বকারী কোনো সম্রাটের ইতিহাস পাওয়া যায় না。
১৯০. আত তাবসিরাতু লি ইবনিল জাওযী, ১/৩৪৪。
১৯১. মাওসুআতু ইবনি আবিদ দুনিয়া, ৪/৬৮১, ৫৮২। বর্ণনা: ৮৮৬৮। (দারু আতলাসিল খাযরা, সৌদি আরব)
১৯২. মাওসুআতু ইবনি আবিদ দুনিয়া, ৪/৬৮২। বর্ণনা: ৮৮৬৯。
১৯৩. মাওসুআতু ইবনি আবিদ দুনিয়া, ৪/৬৮২। বর্ণনা ৮৮৭০。
১৯৪. দাউদ -এর ভুল বলতে অনেকেই পরনারীর প্রতি তার দৃষ্টিপাত ও সাময়িক কামনার কথা বুঝে থাকেন। জালালুদ্দীন সুয়ূতী ও আবু হাতিম রাজী নিজ নিজ তাফসীরগ্রন্থে ঘটনাটি বর্ণনা করলেও তা অগ্রহণযোগ্য, যথাযথ সূত্রবিহীন এবং ইসরাঈলী রিওয়ায়াত। হাফিয ইবনুল কাসীর এই ঘটনাটি প্রত্যাখ্যান করেছেন; বরং দুজন বিচারপ্রার্থীর দেয়াল টপকে দাউদ -এর ইবাদতখানায় প্রবেশের ঘটনাটি গ্রহণযোগ্য। তাফসীরু জালালাইন, ১/৬০০, ৬০১। তাফসীরু ইবনি আবী হাতিম, ১০/২৩৮, ২৩৯। তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৭/৫১-৫৩। সুরা সোয়াদ, (৩৮): ২২-২৪ এর ব্যাখ্যায়。
১৯৫. বাগিয়্যাতুত তলাব ফি তারীখি হালাব, ৭/৪১৬।। সনদ দুর্বল。
১৯৮. মাওসুআতু ইবনি আবিদ দুনিয়া, ৪/৫৮৮। বর্ণনা: ৮৮৯১。
১৯৯. মাওসুআতু ইবনি আবিদ দুনিয়া, ৪/৫৮৮। বর্ণনা: ৮৮১২。
২০০. মাওসুআতু ইবনি আবিদ দুনিয়া, ৪/৫৮৮। বর্ণনা: ৮৮৯৩。
২০১. মাওসুআতু ইবনি আবিদ দুনিয়া, ৪/৫৮৮। বর্ণনা: ৮৮৯৪。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00