📄 সালাফের দৃষ্টিতে কবর
১. আবু হুরায়রা বলেন, দুটি নতুন কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাসুল বলেন,
لَرَكْعَتَيْنِ خَفِيفَتَيْنِ خَيْرٌ مِمَّا يَحْفِرُونَ أَوْ يَنْقِلُونَ
কবরবাসীর নিকট নিজেদের সঞ্চিত বা অর্জিত সমুদয় বস্তু অপেক্ষা দুই রাকাত নফল নামাযের মূল্য অনেক বেশি।
বর্ণনাকারী আবু হিশাম সন্দেহ পোষণ করে বলেন, সম্ভবত তারা নিজেদের পার্থিব অনেক নিআমতের তুলনায় আমলনামায় এমন দুই রাকাত সালাতের সওয়াব দেখতে বেশি পছন্দ করবেন।
২. আবদুল্লাহ বিন উমর বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ বলেছেন,
القَبْرُ حُفْرَةٌ مِنْ حُفَرٍ جَهَنَّمَ أَوْ رَوْضَةً مِنْ رِيَاضِ الجَنَّةِ
কবর জাহান্নামের গর্তসমূহের একটি গর্ত অথবা জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান।
৩. আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বর্ণনা করেন, মাসউদ বলেন,
إِنَّمَا يَكْفِي أَحَدَكُمْ مَا قَنَعَتْ بِهِ نَفْسُهُ وَإِنَّمَا يَصِيرُ أَحَدُكُمْ إِلَى مَوْضِعِ أَرْبَعَةِ أَذْرُعٍ فِي ذِرَاعٍ وَشِبْرٍ وَإِنَّمَا يَصِيرُ الْأَمْرُ إِلَى آخِرِهِ
তোমাদের কারও জন্য তার অন্তরের সন্তুষ্টি পরিমাণ সম্পদই যথেষ্ট। আর তোমাদের গন্তব্য সাড়ে চার গজ জায়গা এবং প্রত্যেক বিষয়ের শেষ অবস্থাই ধর্তব্য।
৬. আবু গাতফান মুররি বর্ণনা করেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাসুল -কে বললেন,
لَوْ فُزِعْنَا أَحْيَانًا لَفَزَعْنَا، فَكَيْفَ بِظُلْمَةِ الْقَبْرِ وَضَيِّقِهِ؟ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّمَا يُوَفَّى الْعَبْدُ عَلَى مَا قُبِضَ عَلَيْهِ
বর্তমানে আমাদের কবরের ভয় দেখালেই আমরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি! তাহলে বাস্তবে সেই সংকীর্ণ কবরে কীভাবে থাকব? রাসুল ﷺ বললেন, বান্দার প্রাণ যে অবস্থায় কবয করা হবে সে অবস্থার ভিত্তিতেই তাকে বিনিময় দেওয়া হবে।
৭. আবদুল্লাহ বিন বকর বিন আবদুল্লাহ মুযনী বর্ণনা করেন, উবাইদুল্লাহ বিন ঈয়ার বলেন, মানুষের বসবাসের জন্য দুটি জায়গা রয়েছে। একটি জমিনের ওপরে। অন্যটি ভূ-গর্তে। প্রথমে সে জমিনের ওপরে পার্থিব জীবনের বাড়িতে থাকে। এ সময় এই বাড়িটিকে সাজিয়ে রাখে। তাতে উত্তর ও দক্ষিণমুখী দরজা- জানালা নির্মাণ করে। শীত ও গ্রীষ্মের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী জমা করে। এই অস্থায়ী ঘর নিয়ে ব্যস্ত থাকতে থাকতেই হঠাৎ একদিন সে তার মাটির নিচে থাকা বাড়িতে অর্থাৎ কবরে চলে যায়। কিন্তু দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ইতিমধ্যে সে তার কবরের বাড়ির পরিবেশ নষ্ট করে ফেলেছে। সেখানে এক ফিরিশতা এসে তাকে বলে, এই যে দুনিয়ার বাড়িঘর, যা তুমি যথাযথভাবে গড়ে তুলেছিলে, কতদিন ছিলে সেখানে? সে বলবে, আমার জানা নেই! আবার প্রশ্ন করবে, এই যে এই কবর, যা তুমি অবহেলায় বিরান করেছ, এখানে কতদিন থাকবে? সে বলবে, এখন তো এটাই আমার ঠিকানা!
ফিরিশতা বলবে, তুমি নিজেই তাহলে বিষয়টা স্বীকার করে নিলে! অথচ দুনিয়াতে তুমি কত বুদ্ধিমান ছিলে!"
৮. হাসান বসরী (রহঃ) উসমান বিন আবুল আস (রাঃ) সম্পর্কে বলেন, একবার তিনি এক জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। কবরস্থানে গিয়ে তিনি ধসে পড়া একটি কবরের পাশে বসেন। তার পরিবারের একজন পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল, যার ব্যাপারে বিভিন্ন সমালোচনা শোনা যেত। তাকে 'হে অমুক!' বলে ডাক দিলেন। সে কাছে আসতেই তিনি তাকে বললেন, নিজের ঘরটা তো ভালো করে দেখো!
লোকটি বলল, আমি তো দেখছি এটি শুকনো, সংকুচিত, অন্ধকার, খাদ্য, পানীয় ও জীবনসঙ্গীহীন এক বিরান ঘর!
উসমান বিন আবুল আস (রাঃ) বললেন, আল্লাহর শপথ! এটাই তোমার আসল ঘর। তুমি সত্য বলেছ। মৃত ব্যক্তিকে লক্ষ করে তিনি আরও বললেন, আল্লাহর শপথ! তুমি যদি ফিরে আসতে পারতে, তবে এখানকার যাবতীয় বস্তু সেখানে স্থানান্তর করতে।
৯. যমরাহ বিন রবীআহ (রহঃ) বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন জাওশাব (রহঃ) বলেন, জনৈকা মহিলা কবরের ভেতরে সিন্ধুকের মতো অবস্থা দেখে অপর এক মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এই সিন্ধুকের মতো বস্তুটি কী? উত্তরে অপরজন বললেন, এটি আমলের ভান্ডার। এ কথা শুনে প্রশ্নকারিণী মহিলা তার সাথে থাকা কিছু জিনিস সদকার উদ্দেশ্যে অপরজনের হাতে দিয়ে বললেন, যাও, এগুলো আমলের ভান্ডারে রেখে এসো।
১০. বাকিয়াহ যাহরানী (রহঃ) বলেন, ছাবিত বুনানী (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি, একবার আমি কবরস্থানের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। এমন সময় পেছন হতে কে যেন আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, হে ছাবিত, কবরস্থানের নীরবতা দেখে ধোঁকায় পড়ে যেয়ো না। এর ভেতরে কত পেরেশান মানুষ রয়েছে! এ কথা শুনতেই আমি পেছনে ফিরে তাকালাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না।
১১. হুশাইম বিন বশীর বলেন, একবার হাসান বসরী একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরগুলোকে লক্ষ্য করে বলেন, হায়! এই ঢিবিগুলোতে কী সুনসান নীরবতা ছেয়ে আছে! অথচ এসবের ভেতরে কত দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ রয়েছে!
১২. শামলাহ বিন হুযাল বলেন, আমি হাসান বসরী সম্পর্কে শুনেছি যে, তিনি কবি ফারাযদাকের সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলেন। লোকজন কবরের চারপাশে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর আলোচনা করছিল। এমন সময় হাসান বসরী বললেন, হে আবু ফিরাস!, এই দিনের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করে রেখেছ? কবি বললেন, আশি বছর যাবৎ 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর সাক্ষ্য প্রস্তুত রেখেছি। হাসান বললেন, এই আমলের ওপর অবিচল থেকো আর সুসংবাদ গ্রহণ কোরো।
১৫. হাম্মাদ বিন সালামাহ বলেন, এক জানাযায় আমি হাসান বসরী-কে কবি ফারাযদাকের প্রতি এই প্রশ্ন করতে দেখেছি যে, এই দিনের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করেছ? উত্তরে ফারাযদাক বললেন, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্য প্রস্তুত করেছি। উত্তর শুনে হাসান বললেন, আল্লাহর শপথ! তুমি তো খুব বিচক্ষণ!
১৬. তামাম বিন বুযাই সাদী বর্ণনা করেন, মুহাম্মাদ বিন কাআব কুরাইযী বলেন, উমর বিন আবদুল আযীয খলীফা হওয়ার পর আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। দরবারে ঢুকে তাকে দেখে আমি চমকে গেলাম। তিনি বললেন, কী ব্যাপার কাআবের বেটা, তুমি এমনভাবে কী দেখছ? খলীফা হওয়ার আগে মদীনায় থাকতে তো আমার দিকে এভাবে তাকাতে না? বললাম, আমীরুল মুমিনীন, আপনি ঠিক বলেছেন। খিলাফত লাভের পর আপনার শারীরিক পরিবর্তন, গায়ের রং পরিবর্তন আর রুক্ষ চুল আমাকে বিস্মিত করেছে।
তিনি বললেন, তাহলে মৃত্যুর তিন দিন পর আমাকে দেখতে তোমার কেমন লাগবে বলো? তখন চোখ-দুটো গড়িয়ে পড়বে। দুই গালের মাংস খসে পড়বে। মুখ আর নাকের ছিদ্র দিয়ে পোকা-মাকড় বেড়িয়ে আসবে। তখন তো আমাকে তোমার আরও বেশি অপরিচিত মনে হবে!
১৭. খালিদ বিন আবু বকর বলেন, সামরিক উর্দি পরিহিত সুদর্শন এক যুবক হাসান বসরী এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।। তিনি তাকে ডেকে বললেন,
আদমসন্তান যৌবন আর সৌন্দর্যের বড়াই করে বেড়ায়। অথচ কবর তার দেহকে নিঃশেষ করে দেবে। তুমি যদি সেই অবস্থা দেখতে তাহলে নিজের জন্য আফসোস করতে। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাগণের অন্তরের পরিশুদ্ধি দেখে থাকেন।
১৮. আবু মুআবিয়াহ বলেন, মালিক বিন মিগওয়াল -এর সাথে দেখা হলে সাধারণত এ কথা না বলে তিনি আমাকে ছাড়তেন যে, পার্থিব জীবন যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে। প্রস্তুতি গ্রহণ করো আর কবরের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। কবরের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা!"
১৯. লাইসী বলেন, হিশাম দাসতুআই-এর স্ত্রী বলেন, বলেন, একবার কোনো কারণে ঘরের বাতি নিভে গেলে অন্ধকারে তাঁর (হিশাম -এর) অবস্থা খুব খারাপ হয়ে পড়ল। আমি বললাম, আপনার পাশের বাতিটি নিভে যাওয়ায় এমন অন্ধকার ছেয়ে গেছে। তিনি বললেন, আমি কবরের অন্ধকারকে স্মরণ করছি। সালাফদের কেউ যদি আমার সামনে থাকত, তবে আমি তাকে আমার মৃত্যুতে আমার ঘরে এসে শোক প্রকাশ করতে বলে যেতাম। এ ঘটনার অল্প কিছুদিন পরই তিনি ইনতিকাল করেন। মৃত্যুর পর তাঁর এক ভাই কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবর লক্ষ্য করে বলেন, হে আবু বকর, আল্লাহর শপথ! কবরের ব্যাপারে আপনি খুব সতর্ক ছিলেন!
২০. জারির বিন হাযিম বলেন, আমি আবদুল্লাহ বিন উবাইদ বিন উমাইর -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, জিন জাতির পক্ষ হতে দৈত্যাকৃতির এক
জিনকে সুলাইমান বিন দাউদ -এর নিকট পাঠানো হলো। এই জিনটি সমুদ্রে বসবাস করত। সে সুলাইমান -এর প্রাসাদের মূল ফটকে এসেই একটি গাছের ডাল ধরে শেকড়সুদ্ধ তা উপড়ে সীমানার বাইরে ছুঁড়ে ফেলল। সুলাইমান আওয়াজ পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কী হল? তখন জিনটির ঘটনা তাঁকে খুলে বলা হলো। তিনি বললেন, সে যা চায়, তোমরাও কি তা চাও? সকলে বলল, না। তিনি বললেন, সে বলতে চায় যে, তুমি যা খুশি করে বেড়াও। যদি তা-ই করো তাহলে তুমি জমিনের বুকে এভাবেই চলতে থাকবে।”
২১. কিনানাহ বিন জাবালাহ সালামী বর্ণনা করেন, ইয়াযিদ রাকাশী বলেন, চির সমাপ্তির ঠিকানা সারিবদ্ধ এই কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখো। আজকে নামফলক দেখে তাদের পরিচয় জানতে হয়। লোকজন তাদের কবর জিয়ারত করতে আসে। তবে সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ শেষ হয়ে গিয়েছে। এভাবে পড়ে থাকতে থাকতে একসময় বিরান হয়ে যাবে। আবার সময়ের আবর্তনে জনবসতি গড়ে উঠে আবাদ হয়ে যাবে। এই বিরান ভূমির বাসিন্দা কিংবা জনবসতিতে বসবাসকারী কেউ কি কবরবাসীর কথা শুনতে পাবে?
২২. আযহার বিন মারওয়ান রিকাশি বর্ণনা করেন। জাফর বিন সুলাইমান বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম, সে একটি লাশ কবরে শুইয়ে দিয়ে বলল, যিনি মায়ের পেটে ভ্রূণের জন্য সবকিছু সহজ করে দিতে পারেন, সেই মহান সত্তা (আল্লাহ) তোমার প্রতি সহজ আচরণে সক্ষম।
২৩. হাসান বসরী বলেন, এমন দুটি দিন ও রাত রয়েছে যার মতো আর কোনো রাত বা দিনের ব্যাপারে কেউ কখনো কিছু শোনেনি। তন্মধ্যে একটি রাত হলো কবরের প্রথম রাত, যা তোমার জীবনে আগে কখনো আসেনি। আর অন্যটি হলো কবরের শেষ রাত। যা ফুরিয়ে আসলেই কিয়ামত শুরু হয়ে যাবে। আর দুটি দিনের প্রথমটি হলো সেদিন, যেদিন আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে একজন ফিরিশতা তোমার নিকট জান্নাতের সুসংবাদ কিংবা জাহান্নামের দুঃসংবাদ নিয়ে হাজির হবে। আর অন্যটি হলো যেদিন তোমার আমলনামা দেওয়া হবে। ডান হাতে কিংবা বাম হাতে।
২৪. বিশর বিন হারিছ বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করে তার জন্য কবর কতই-না উত্তম জায়গা!
২৫. মুফাযযাল বিন গাসসান তার শাইখদের একজন ফযল রাকাশী সম্পর্কে বলেন, তিনি পার্থিব জীবনে মুজাহাদা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলতেন, একবার আমি কবরস্তানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরবাসীকে লক্ষ্য করে বললাম, "হে আভিজাত্য, সম্পদ এবং প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতায় ডুবে থাকা লোকজন, হে ঝলমলে পোশাকের মালিক, দম্ভভরে চলাচলকারী, ব্যতিব্যস্ত ও সম্পদ আহরণকারী লোকজন! হে অসহায়, কপর্দকহীন ও ক্ষুধার্ত লোকজন! হে আবিদ, বিনয়ী, তাওবাকারী ও সাধক লোকজন!
আমার এই আহ্বানে তাদের কেউ সাড়া দেয়নি। আমার জীবনের শপথ! যদি আমার আহ্বানে সাড়া দিতে তাদের প্রতি কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা না থাকত, তবে তারা প্রত্যেকেই আলাদা আলাদাভাবে উত্তর দিত।
২৬. আবুল ইয়ামান বলেন, সাফওয়ান বিন আমর বিন হারম একদিন নিআমতসমূহের আলোচনা এবং নিআমত লাভের ভিত্তিতে মানুষের বিভিন্ন প্রকার উল্লেখ করেন। তখন তিনি খুব জোর দিয়ে বলেন,
মাটিতে মিশে যাওয়া মানবদেহের জন্য উত্তম একটি নিআমত এই যে, তুমি আখিরাতের হিসাবে বিশ্বাস রাখবে এবং উত্তম প্রতিদানের জন্য অপেক্ষা করবে।
২৭. ইবরাহীম বিন মুহাম্মাদ বিন মুনতাশির বর্ণনা করেন, মাসরূক বলেন, মুমিনের জন্য কবরের চেয়ে উত্তম কোনো ঘর হতে পারে না। সেখানে সে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট হতে নিষ্কৃতি পেয়ে বিশ্রাম করে আর আল্লাহ তাআলার আযাব-গযব হতেও নিরাপদ থাকে।
২৮. উমর বিন আবদুর রহমান বলেন, আমি ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ -কে বলতে শুনেছি, একবার ঈসা একটি কবরের সামনে দাঁড়ালেন। তার সাথে তার হাওয়ারীন (সাহাবীগণ) ছিলেন। তারা কবরের ভয়াবহতা, অন্ধকার এবং সংকীর্ণতা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তাদের আলোচনা শুনে ঈসা বললেন, তোমরা সেখানে মাতৃগর্ভের চেয়েও সংকীর্ণ এক কুঠরিতে থাকবে। তবে আল্লাহ তাআলা যদি কারও জন্য প্রশস্ত করতে চান তবে তিনি তার কবর প্রশস্ত করে দেবেন।
২৯. আবুল মিকদাম বলেন, আমরা বকর বিন আবদুল্লাহ -এর জানাযা ও দাফন সেরে হাসান বসরী -এর সাথে ফিরছিলাম। আমি তাকে বললাম, আল্লাহ তাআলার এই বাণী সম্পর্কে আপনি কী বলেন? (وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ) 'আর তাদের সামনে পুনরুত্থান দিবসের আগ পর্যন্ত পর্দা থাকবে।
আমার কথা শুনে তিনি ডানে-বামে তাকিয়ে বললেন, তাদের কবরের আড়ালে রেখে তোমরা তার ওপরিভাগে এই যে ছোটাছুটি করছ, পুনরুত্থানের আগ পর্যন্ত একে অপরের কোনো শব্দ শুনতে পাবে না।
৩০. নুআইম বিন সালামাহ বলেন, কবরে মাটি ছিটানোর সময় প্রথমবার بِسْمِ اللهِ' (বিসমিল্লাহ), দ্বিতীয়বার 'اَلْمُلْكُ لله' (আল মুলকু লিল্লাহ) 'সমস্ত রাজত্ব একমাত্র আল্লাহর' এবং তৃতীয়বার 'لَا شَرِيكَ لَهُ' (লা শারিকা লাহু) 'তার কোনো অংশীদার নেই' বলবে।
৩১. তাবেঈ আবদুর রহমান বিন মাইসারা বলেন, এক ব্যক্তির হিসাব তলব করা হলো; তার নেক আমলের তুলনায় গুনাহের পাল্লা ভারী হয়ে গেল। তখন অনুসন্ধান করে দেখা গেল, সে জনৈক ব্যক্তির কবরে তিনবার মাটি ছিটিয়েছে। এই আমলের সওয়াব নেক আমলের সাথে যুক্ত করা হলো। তার নেক আমল গুনাহের তুলনায় ভারী হয়ে গেল।”
৩২. ফাইয বিন ইসহাক বলেন, বিখ্যাত তাবে-তাবেঈ ফুযাইল বিন আয়ায আমাকে বলেন, তুমি কি জানো? পুরো দুনিয়া তোমার হলেও তোমাকে বলা হবে, এই দুনিয়া ত্যাগ করে চলে আসো। আর তোমাকে তোমার কবরে রেখে যাওয়া হবে। তুমি কি ঠিক তা-ই মনে করো না?
৩৩. ফাইয বিন ইসহাক বলেন, একদিন ফুযাইল বিন আয়ায আমাকে বললেন,
সর্বনাশ হোক! তুমি কি মৃত্যুবরণ করবে না? তোমাকে একদিন এই পরিবার- পরিজন ও সহায়-সম্পত্তি ছেড়ে চলে যেতে হবে। তোমাকে কবরে রেখে আসা হবে। তুমি একাই সেই সংকীর্ণ কুঠরিতে পড়ে থাকবে। অতঃপর তিনি পাঠ করলেন,
فَمَا لَهُ مِن قُوَّةٍ وَلَا نَاصِرٍ
সেদিন তার কোনো ক্ষমতা থাকবে না এবং সাহায্যকারীও না।
তারপর বললেন, তুমি যদি তা মনে না করো, তাহলে তো জমিনের বুকে তোমার চেয়ে বোকা কোনো প্রাণীই নেই।
৩৪. আবু মুহাম্মাদ নাখাঈ বলেন, ইছাম বিন আলী একদিন তার সঙ্গী- সাথিদের অবস্থানরত অবস্থায় হঠাৎ শিউরে ওঠেন। কয়েকজন জিজ্ঞাসা করলেন, কী হয়েছে আপনার? তিনি বললেন, কবরের কথা মনে পড়েছে।
৩৫. হিশাম দাসতআঈ বলেন, মাঝে মাঝে যখন মৃত্যুর কথা স্মরণ করে আমি এই কল্পনা করি যে আমাকে কাফন পরানো হয়েছে, তখন দম বন্ধ হয়ে আসে।"
৩৬. তাবেঈ মাইমুন বিন মিহরান বর্ণনা করেন, সাহাবী আবু দারদা বলেন, তোমাদের জন্য পার্থিব ঘরবাড়ি ও কবরের মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। তোমরা কবরবাসীর জিয়ারত করে থাকো, কিন্তু তারা তোমাদের জিয়ারত করতে পারে না। তোমরা একসময় স্থান পরিবর্তন করে তাদের কাছে চলে যাবে, কিন্তু তারা কখনো তোমাদের পাশে ফিরে আসবে না। হয়তো কবরই তোমাকে পার্থিব ঘরবাড়ি থেকে অখণ্ড অবসর দিতে পারে।"
৩৭. মুফাযযাল বিন গাসসান বলেন, এক ব্যক্তি কবরের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমরা যেসব বিষয়ে উৎসুক হয়ে বসে আছি তারা সেসব বিষয় ত্যাগ করেছেন।"
৩৮. উমারাহ বিন মিহরান মিওয়ালি বলেন, মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি আমাকে বললেন, তোমার বাসস্থানে আমি আহামরি কিছু দেখিনি। বললাম, আমার বাসস্থান তো কবরস্থানের পাশেই। এটা কি আপনাকে বিস্মিত করে না? তিনি বললেন, তাহলে তো কবরগুলো তোমার কষ্ট লাঘব করে দেবে, আখিরাত স্মরণ করিয়ে দেবে।
৩৯. মুহাম্মাদ বিন হারব মক্কী বলেন, একদিন আমাদের মাঝে আবু আবদুর রহমান উমারী হাযির হলেন। আমরা তার পাশে জড়ো হলাম। মক্কার গণ্যমান্য কিছু ব্যক্তিও উপস্থিত হলো। কিছুক্ষণ পর তিনি মাথা উঁচু করে তাকালেন। কাবার আশেপাশে নির্মিত আকর্ষণীয় কিছু বাড়িঘরের দিকে তার দৃষ্টি পড়ল। তিনি উঁচু স্বরে বলে উঠলেন, হে সুরক্ষিত দালানকোঠার বাসিন্দাগণ, ভয়ংকর বিপদে ঘেরা অন্ধকার কবরের কথা স্মরণ করো। হে আয়েশী লোকজন, কবরের পোকা-মাকড়, পুঁজ আর পচেগলে মাটিতে মিশে যাওয়ার কথা স্মরণ করো। এ পর্যন্ত বলেই তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠল। অতঃপর তিনি সেখান থেকে উঠে গেলেন।"
৪০. ইমাম দাউদ তাঈ এক জানাযায় উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, দুনিয়াবাসী, জেনে রাখো, কবরের লোকজন নিজেদের পাঠিয়ে দেয়া আমল নিয়ে উল্লসিত হয় আর রেখে যাওয়া বিত্তবৈভব নিয়ে আক্ষেপ করে। আজ তারা যেসব বিষয় নিয়ে আক্ষেপ করছে, তোমরা তা নিয়ে হানাহানি, কাড়াকাড়ি আর বিবাদে মশগুল রয়েছ。
৪২. ফুযাইল বিন আবদুল ওয়াহাব বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
(خُذُوهُ فَغُلُوهُ)
(কিয়ামতের দিন জাহান্নামীদের ব্যাপারে বলা হবে,) তাকে ধরো, অতঃপর বেড়ি পরিয়ে দাও。
আয়াতের এই অংশের ব্যাখ্যায় মুতামার বিন সুলাইমান তার পিতা সুলাইমান বিন তুরখান তাইমী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'তাকে ধরো' বলার সাথে সাথে ফিরিশতাগণ অপরাধীদের এমনভাবে ধরপাকড় করবে যে, সে তার হাত সামান্য নাড়াচাড়া করারও সুযোগ পাবে না। তখন সে বলবে, তুমি কি আমার প্রতি কোনো দয়া করবে না? ফিরিশতা বলবেন, যেখানে আল্লাহ তাআলা দয়া করেননি। সেখানে আমি কীভাবে দয়া করি?
৪৩. দাউদ বিন মিহরান বর্ণনা করেন, শুআইব বিন আবু হামযাহ বলেন, উমর বিন আবদুল আযীয সিরিয়ার বিভিন্ন শহরের কিছু লোকজনের নিকট এই চিঠি লেখেন যে, সালাম ও কুশল বাদ, স্মরণ রেখো, কত আদমসন্তানের দেহকে মাটি হজম করে ফেলেছে! কত কীট-পতঙ্গ তার পাকস্থলি ছেদ করে বেড়িয়ে এসেছে! হে লোকসকল, এসব মনে করিয়ে দিয়ে আমি নিজেকে এবং তোমাদের সতর্ক করছি。
৪৪. আযহার বিন মারওয়ান রিকাশি বলেন, বিশর বিন মানসুর-এর একটি বিশেষ কামরা ছিল। তিনি আসরের সালাত আদায় করে সেখানে প্রবেশ
করতেন। সেখানে ঢুকে তিনি কবরস্থানমুখী দরজা (কিংবা জানালা) খুলে দিয়ে কবরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। "
৪৫. মুফাযযাল বিন গাসসান বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি খননকৃত একটি কবরের পার্শ্ব অতিক্রমকালে বলেন, মুমিনের বিশ্রামের জন্য এই কবর কতই-না উত্তম স্থান!
টিকাঃ
৮৩. মুসান্নাফু ইবনি আবী শাইবাহ, ২/১৫৮। হাদিস নং ৭৬৩৩। সালাতের ফযীলত অধ্যায়। মুজামুল আওসাত লিত-তাবারানী, ১/২৮২। হাদিস নং ৯২০। আয-যুহদু লি-ইবনি মুবারক, ১/১০। হাদিস নং ৩১। আল্লাহ আযযা ওয়া যাল্লার আনুগত্যের প্রতি উৎসাহ দান অধ্যায়。
৮৪. সুনানু তিরমিযী, ২৪৬০। আবু সাঈদ খুদরি হতে। কিয়ামত বিষয়ক আলোচনা। ইবনুল হাজার আসকালানী হাসান গরিব বলেছেন। হিদায়াতুর রুওয়াত, ৫/৭৪。
৮৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ১/১৩৮。
৮৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৬। সনদ দুর্বল তবে বক্তব্য সহিহ。
৮৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৬。
৮৮. আয যুহদু লি আহমাদ বিন হাম্বল, ৩২৪। বর্ণনা নং ২৩৬৬。
৮৯. আহওয়ালুল কুবুর (ইবনু রজব), ১৩৯; সাকবুল ইবারত, ২২৮; শরহু নাহজিল বালাগাহ, ১৫১。
৯০. আল হাওয়াতিফ, ৫৩। বর্ণনা: ৪৫。
১১. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৯। রূহ, ১০১。
১১. আসলে সত্তর হবে। কারণ, কবি ফারাযদাক ৩৮-১১৪ হি: মোট ৭৬/৭৭ বছর বেঁচে ছিলেন。
১৩. ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ৪/৪৮৭。
১৪. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৫৩১。
৯৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৫/৩৩৩。
৯৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৬。
৯৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৮。
৯৮. আহওয়ালুল কুবুর, ২১১。
১১. তারীখু দিমাশক, ২২/২৬৩。
১০০. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৪。
১০১. শরহুস সুদূর, ১৫৬。
১০২, আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৬। বিদায়া ওয়া নিহায়া, ১০/১৩১। ১৫৮ হিজরির আলোচনায়。
তবে ইমাম আবু দাউদ সাজিস্তানী তার কিতাবুয যুহদ, ৩১৯। বর্ণনা নং ৩৬৬-তে এবং ইমাম বাইহাকী তার শুআবুল ঈমান, ১৩/২১৪। বর্ণনা নং ১০২১৫-তে বর্ণনাটি আনাস বিন মালিক-এর বাণী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যার সনদ হাসান。
১০৩. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৭。
১০৪. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৯。
১০৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৭。
১০৬. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবাহ, ৩৪৮৬৫। সনদ সহিহ。
১০৭. ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ পর্যন্ত সনদ হাসান। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল ও সুয়ূতী নিজ নিজ গ্রন্থে এই বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। কিতাবুয যুহদ, ৩০১। ঈসা হতে বর্ণিত উপদেশমালা。
১০৮. সুরা মুমিনুন, (২৩): ১০০
১০৯. তাফসিরু ইবনি রজব হাম্বলী, ২/৩১। সুরা মুমিনুন, (২৩): ১০০ এর ব্যাখ্যায়। এ ছাড়াও ইবনু রজব হাম্বলী তার আহওয়ালুল কুবুর, ৫ এ আবু হুরায়রা -এর উদ্ধৃতি দিয়ে সমার্থক বর্ণনা উল্লেখ করেছেন。
১১০. তারীখু দিমাশক, ৬২/১৭৪। এই বর্ণনাটি একাধিক বর্ণনাকারীর পরিচয় অস্পষ্ট থাকায় দুর্বল। তা ছাড়া কবরে তিন বার মাটি ছিটানো সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো নিয়ে মুহাদ্দিসগণের নানা মত রয়েছে। সুনানু ইবনু মাজাহ, ১৫৬৫-তে আবু হুরায়রা হতে এ-সংক্রান্ত সহিহ বর্ণনা থাকলেও ইবনু আবী হাতিম হাদিসটি বাতিল বলে মত দিয়েছেন। তবে ইবনুল হাজার আসকালানী-সহ অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ এই বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। বিস্তারিত, তালখীসুল হাবীর, ২/৩০৩, ৩০৪। বর্ণনা নং ৭৮৮। জানাযা অধ্যায়。
১১১. সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী, বর্ণনা নং ৬৭৩১। এই উদ্ধৃতি দিয়ে ইবনুল হাজার আসকালানী তালখিসুল হাবীর, ২/৩০৩ এ সমার্থক বর্ণনা উল্লেখ করেছেন。
১১২, আহওয়ালুল কুবুর, ১৩০。
১১৩. সুরা তারিক, (৮৬): ১০
১১৪. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩০。
১১৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৪。
১১৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৪, ১৫৫。
১১৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৮。
১১৮. আহওয়ালুল কুবুর, ৩৯。
১১৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ২/৩৪৮。
১২০. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৮/৩৭৬। হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৮/২৮৫। সনদ হাসান。
১২১. আহওয়ালুল কুবুর, ৩৯。
১২২. সুরা হাক্কাহ, (৬৯) : ৩০
১২৩. তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৮/২৩১。
১২৪. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫২, ১৫৩। ফসলুল খুত্তাব, ২/২৯৩。
১২৫. শরহুস সুদূর, ২২২。
১২৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৭。
১. আবু হুরায়রা বলেন, দুটি নতুন কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাসুল বলেন,
لَرَكْعَتَيْنِ خَفِيفَتَيْنِ خَيْرٌ مِمَّا يَحْفِرُونَ أَوْ يَنْقِلُونَ
কবরবাসীর নিকট নিজেদের সঞ্চিত বা অর্জিত সমুদয় বস্তু অপেক্ষা দুই রাকাত নফল নামাযের মূল্য অনেক বেশি।
বর্ণনাকারী আবু হিশাম সন্দেহ পোষণ করে বলেন, সম্ভবত তারা নিজেদের পার্থিব অনেক নিআমতের তুলনায় আমলনামায় এমন দুই রাকাত সালাতের সওয়াব দেখতে বেশি পছন্দ করবেন।
২. আবদুল্লাহ বিন উমর বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ বলেছেন,
القَبْرُ حُفْرَةٌ مِنْ حُفَرٍ جَهَنَّمَ أَوْ رَوْضَةً مِنْ رِيَاضِ الجَنَّةِ
কবর জাহান্নামের গর্তসমূহের একটি গর্ত অথবা জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান।
৩. আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বর্ণনা করেন, মাসউদ বলেন,
إِنَّمَا يَكْفِي أَحَدَكُمْ مَا قَنَعَتْ بِهِ نَفْسُهُ وَإِنَّمَا يَصِيرُ أَحَدُكُمْ إِلَى مَوْضِعِ أَرْبَعَةِ أَذْرُعٍ فِي ذِرَاعٍ وَشِبْرٍ وَإِنَّمَا يَصِيرُ الْأَمْرُ إِلَى آخِرِهِ
তোমাদের কারও জন্য তার অন্তরের সন্তুষ্টি পরিমাণ সম্পদই যথেষ্ট। আর তোমাদের গন্তব্য সাড়ে চার গজ জায়গা এবং প্রত্যেক বিষয়ের শেষ অবস্থাই ধর্তব্য।
৬. আবু গাতফান মুররি বর্ণনা করেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাসুল -কে বললেন,
لَوْ فُزِعْنَا أَحْيَانًا لَفَزَعْنَا، فَكَيْفَ بِظُلْمَةِ الْقَبْرِ وَضَيِّقِهِ؟ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّمَا يُوَفَّى الْعَبْدُ عَلَى مَا قُبِضَ عَلَيْهِ
বর্তমানে আমাদের কবরের ভয় দেখালেই আমরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি! তাহলে বাস্তবে সেই সংকীর্ণ কবরে কীভাবে থাকব? রাসুল ﷺ বললেন, বান্দার প্রাণ যে অবস্থায় কবয করা হবে সে অবস্থার ভিত্তিতেই তাকে বিনিময় দেওয়া হবে।
৭. আবদুল্লাহ বিন বকর বিন আবদুল্লাহ মুযনী বর্ণনা করেন, উবাইদুল্লাহ বিন ঈয়ার বলেন, মানুষের বসবাসের জন্য দুটি জায়গা রয়েছে। একটি জমিনের ওপরে। অন্যটি ভূ-গর্তে। প্রথমে সে জমিনের ওপরে পার্থিব জীবনের বাড়িতে থাকে। এ সময় এই বাড়িটিকে সাজিয়ে রাখে। তাতে উত্তর ও দক্ষিণমুখী দরজা- জানালা নির্মাণ করে। শীত ও গ্রীষ্মের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী জমা করে। এই অস্থায়ী ঘর নিয়ে ব্যস্ত থাকতে থাকতেই হঠাৎ একদিন সে তার মাটির নিচে থাকা বাড়িতে অর্থাৎ কবরে চলে যায়। কিন্তু দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ইতিমধ্যে সে তার কবরের বাড়ির পরিবেশ নষ্ট করে ফেলেছে। সেখানে এক ফিরিশতা এসে তাকে বলে, এই যে দুনিয়ার বাড়িঘর, যা তুমি যথাযথভাবে গড়ে তুলেছিলে, কতদিন ছিলে সেখানে? সে বলবে, আমার জানা নেই! আবার প্রশ্ন করবে, এই যে এই কবর, যা তুমি অবহেলায় বিরান করেছ, এখানে কতদিন থাকবে? সে বলবে, এখন তো এটাই আমার ঠিকানা!
ফিরিশতা বলবে, তুমি নিজেই তাহলে বিষয়টা স্বীকার করে নিলে! অথচ দুনিয়াতে তুমি কত বুদ্ধিমান ছিলে!"
৮. হাসান বসরী (রহঃ) উসমান বিন আবুল আস (রাঃ) সম্পর্কে বলেন, একবার তিনি এক জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। কবরস্থানে গিয়ে তিনি ধসে পড়া একটি কবরের পাশে বসেন। তার পরিবারের একজন পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল, যার ব্যাপারে বিভিন্ন সমালোচনা শোনা যেত। তাকে 'হে অমুক!' বলে ডাক দিলেন। সে কাছে আসতেই তিনি তাকে বললেন, নিজের ঘরটা তো ভালো করে দেখো!
লোকটি বলল, আমি তো দেখছি এটি শুকনো, সংকুচিত, অন্ধকার, খাদ্য, পানীয় ও জীবনসঙ্গীহীন এক বিরান ঘর!
উসমান বিন আবুল আস (রাঃ) বললেন, আল্লাহর শপথ! এটাই তোমার আসল ঘর। তুমি সত্য বলেছ। মৃত ব্যক্তিকে লক্ষ করে তিনি আরও বললেন, আল্লাহর শপথ! তুমি যদি ফিরে আসতে পারতে, তবে এখানকার যাবতীয় বস্তু সেখানে স্থানান্তর করতে।
৯. যমরাহ বিন রবীআহ (রহঃ) বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন জাওশাব (রহঃ) বলেন, জনৈকা মহিলা কবরের ভেতরে সিন্ধুকের মতো অবস্থা দেখে অপর এক মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এই সিন্ধুকের মতো বস্তুটি কী? উত্তরে অপরজন বললেন, এটি আমলের ভান্ডার। এ কথা শুনে প্রশ্নকারিণী মহিলা তার সাথে থাকা কিছু জিনিস সদকার উদ্দেশ্যে অপরজনের হাতে দিয়ে বললেন, যাও, এগুলো আমলের ভান্ডারে রেখে এসো।
১০. বাকিয়াহ যাহরানী (রহঃ) বলেন, ছাবিত বুনানী (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি, একবার আমি কবরস্থানের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। এমন সময় পেছন হতে কে যেন আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, হে ছাবিত, কবরস্থানের নীরবতা দেখে ধোঁকায় পড়ে যেয়ো না। এর ভেতরে কত পেরেশান মানুষ রয়েছে! এ কথা শুনতেই আমি পেছনে ফিরে তাকালাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না।
১১. হুশাইম বিন বশীর বলেন, একবার হাসান বসরী একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরগুলোকে লক্ষ্য করে বলেন, হায়! এই ঢিবিগুলোতে কী সুনসান নীরবতা ছেয়ে আছে! অথচ এসবের ভেতরে কত দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ রয়েছে!
১২. শামলাহ বিন হুযাল বলেন, আমি হাসান বসরী সম্পর্কে শুনেছি যে, তিনি কবি ফারাযদাকের সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলেন। লোকজন কবরের চারপাশে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর আলোচনা করছিল। এমন সময় হাসান বসরী বললেন, হে আবু ফিরাস!, এই দিনের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করে রেখেছ? কবি বললেন, আশি বছর যাবৎ 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর সাক্ষ্য প্রস্তুত রেখেছি। হাসান বললেন, এই আমলের ওপর অবিচল থেকো আর সুসংবাদ গ্রহণ কোরো।
১৫. হাম্মাদ বিন সালামাহ বলেন, এক জানাযায় আমি হাসান বসরী-কে কবি ফারাযদাকের প্রতি এই প্রশ্ন করতে দেখেছি যে, এই দিনের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করেছ? উত্তরে ফারাযদাক বললেন, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্য প্রস্তুত করেছি। উত্তর শুনে হাসান বললেন, আল্লাহর শপথ! তুমি তো খুব বিচক্ষণ!
১৬. তামাম বিন বুযাই সাদী বর্ণনা করেন, মুহাম্মাদ বিন কাআব কুরাইযী বলেন, উমর বিন আবদুল আযীয খলীফা হওয়ার পর আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। দরবারে ঢুকে তাকে দেখে আমি চমকে গেলাম। তিনি বললেন, কী ব্যাপার কাআবের বেটা, তুমি এমনভাবে কী দেখছ? খলীফা হওয়ার আগে মদীনায় থাকতে তো আমার দিকে এভাবে তাকাতে না? বললাম, আমীরুল মুমিনীন, আপনি ঠিক বলেছেন। খিলাফত লাভের পর আপনার শারীরিক পরিবর্তন, গায়ের রং পরিবর্তন আর রুক্ষ চুল আমাকে বিস্মিত করেছে।
তিনি বললেন, তাহলে মৃত্যুর তিন দিন পর আমাকে দেখতে তোমার কেমন লাগবে বলো? তখন চোখ-দুটো গড়িয়ে পড়বে। দুই গালের মাংস খসে পড়বে। মুখ আর নাকের ছিদ্র দিয়ে পোকা-মাকড় বেড়িয়ে আসবে। তখন তো আমাকে তোমার আরও বেশি অপরিচিত মনে হবে!
১৭. খালিদ বিন আবু বকর বলেন, সামরিক উর্দি পরিহিত সুদর্শন এক যুবক হাসান বসরী এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।। তিনি তাকে ডেকে বললেন,
আদমসন্তান যৌবন আর সৌন্দর্যের বড়াই করে বেড়ায়। অথচ কবর তার দেহকে নিঃশেষ করে দেবে। তুমি যদি সেই অবস্থা দেখতে তাহলে নিজের জন্য আফসোস করতে। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাগণের অন্তরের পরিশুদ্ধি দেখে থাকেন।
১৮. আবু মুআবিয়াহ বলেন, মালিক বিন মিগওয়াল -এর সাথে দেখা হলে সাধারণত এ কথা না বলে তিনি আমাকে ছাড়তেন যে, পার্থিব জীবন যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে। প্রস্তুতি গ্রহণ করো আর কবরের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। কবরের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা!"
১৯. লাইসী বলেন, হিশাম দাসতুআই-এর স্ত্রী বলেন, বলেন, একবার কোনো কারণে ঘরের বাতি নিভে গেলে অন্ধকারে তাঁর (হিশাম -এর) অবস্থা খুব খারাপ হয়ে পড়ল। আমি বললাম, আপনার পাশের বাতিটি নিভে যাওয়ায় এমন অন্ধকার ছেয়ে গেছে। তিনি বললেন, আমি কবরের অন্ধকারকে স্মরণ করছি। সালাফদের কেউ যদি আমার সামনে থাকত, তবে আমি তাকে আমার মৃত্যুতে আমার ঘরে এসে শোক প্রকাশ করতে বলে যেতাম। এ ঘটনার অল্প কিছুদিন পরই তিনি ইনতিকাল করেন। মৃত্যুর পর তাঁর এক ভাই কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবর লক্ষ্য করে বলেন, হে আবু বকর, আল্লাহর শপথ! কবরের ব্যাপারে আপনি খুব সতর্ক ছিলেন!
২০. জারির বিন হাযিম বলেন, আমি আবদুল্লাহ বিন উবাইদ বিন উমাইর -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, জিন জাতির পক্ষ হতে দৈত্যাকৃতির এক
জিনকে সুলাইমান বিন দাউদ -এর নিকট পাঠানো হলো। এই জিনটি সমুদ্রে বসবাস করত। সে সুলাইমান -এর প্রাসাদের মূল ফটকে এসেই একটি গাছের ডাল ধরে শেকড়সুদ্ধ তা উপড়ে সীমানার বাইরে ছুঁড়ে ফেলল। সুলাইমান আওয়াজ পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কী হল? তখন জিনটির ঘটনা তাঁকে খুলে বলা হলো। তিনি বললেন, সে যা চায়, তোমরাও কি তা চাও? সকলে বলল, না। তিনি বললেন, সে বলতে চায় যে, তুমি যা খুশি করে বেড়াও। যদি তা-ই করো তাহলে তুমি জমিনের বুকে এভাবেই চলতে থাকবে।”
২১. কিনানাহ বিন জাবালাহ সালামী বর্ণনা করেন, ইয়াযিদ রাকাশী বলেন, চির সমাপ্তির ঠিকানা সারিবদ্ধ এই কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখো। আজকে নামফলক দেখে তাদের পরিচয় জানতে হয়। লোকজন তাদের কবর জিয়ারত করতে আসে। তবে সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ শেষ হয়ে গিয়েছে। এভাবে পড়ে থাকতে থাকতে একসময় বিরান হয়ে যাবে। আবার সময়ের আবর্তনে জনবসতি গড়ে উঠে আবাদ হয়ে যাবে। এই বিরান ভূমির বাসিন্দা কিংবা জনবসতিতে বসবাসকারী কেউ কি কবরবাসীর কথা শুনতে পাবে?
২২. আযহার বিন মারওয়ান রিকাশি বর্ণনা করেন। জাফর বিন সুলাইমান বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম, সে একটি লাশ কবরে শুইয়ে দিয়ে বলল, যিনি মায়ের পেটে ভ্রূণের জন্য সবকিছু সহজ করে দিতে পারেন, সেই মহান সত্তা (আল্লাহ) তোমার প্রতি সহজ আচরণে সক্ষম।
২৩. হাসান বসরী বলেন, এমন দুটি দিন ও রাত রয়েছে যার মতো আর কোনো রাত বা দিনের ব্যাপারে কেউ কখনো কিছু শোনেনি। তন্মধ্যে একটি রাত হলো কবরের প্রথম রাত, যা তোমার জীবনে আগে কখনো আসেনি। আর অন্যটি হলো কবরের শেষ রাত। যা ফুরিয়ে আসলেই কিয়ামত শুরু হয়ে যাবে। আর দুটি দিনের প্রথমটি হলো সেদিন, যেদিন আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে একজন ফিরিশতা তোমার নিকট জান্নাতের সুসংবাদ কিংবা জাহান্নামের দুঃসংবাদ নিয়ে হাজির হবে। আর অন্যটি হলো যেদিন তোমার আমলনামা দেওয়া হবে। ডান হাতে কিংবা বাম হাতে।
২৪. বিশর বিন হারিছ বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করে তার জন্য কবর কতই-না উত্তম জায়গা!
২৫. মুফাযযাল বিন গাসসান তার শাইখদের একজন ফযল রাকাশী সম্পর্কে বলেন, তিনি পার্থিব জীবনে মুজাহাদা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলতেন, একবার আমি কবরস্তানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরবাসীকে লক্ষ্য করে বললাম, "হে আভিজাত্য, সম্পদ এবং প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতায় ডুবে থাকা লোকজন, হে ঝলমলে পোশাকের মালিক, দম্ভভরে চলাচলকারী, ব্যতিব্যস্ত ও সম্পদ আহরণকারী লোকজন! হে অসহায়, কপর্দকহীন ও ক্ষুধার্ত লোকজন! হে আবিদ, বিনয়ী, তাওবাকারী ও সাধক লোকজন!
আমার এই আহ্বানে তাদের কেউ সাড়া দেয়নি। আমার জীবনের শপথ! যদি আমার আহ্বানে সাড়া দিতে তাদের প্রতি কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা না থাকত, তবে তারা প্রত্যেকেই আলাদা আলাদাভাবে উত্তর দিত।
২৬. আবুল ইয়ামান বলেন, সাফওয়ান বিন আমর বিন হারম একদিন নিআমতসমূহের আলোচনা এবং নিআমত লাভের ভিত্তিতে মানুষের বিভিন্ন প্রকার উল্লেখ করেন। তখন তিনি খুব জোর দিয়ে বলেন,
মাটিতে মিশে যাওয়া মানবদেহের জন্য উত্তম একটি নিআমত এই যে, তুমি আখিরাতের হিসাবে বিশ্বাস রাখবে এবং উত্তম প্রতিদানের জন্য অপেক্ষা করবে।
২৭. ইবরাহীম বিন মুহাম্মাদ বিন মুনতাশির বর্ণনা করেন, মাসরূক বলেন, মুমিনের জন্য কবরের চেয়ে উত্তম কোনো ঘর হতে পারে না। সেখানে সে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট হতে নিষ্কৃতি পেয়ে বিশ্রাম করে আর আল্লাহ তাআলার আযাব-গযব হতেও নিরাপদ থাকে।
২৮. উমর বিন আবদুর রহমান বলেন, আমি ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ -কে বলতে শুনেছি, একবার ঈসা একটি কবরের সামনে দাঁড়ালেন। তার সাথে তার হাওয়ারীন (সাহাবীগণ) ছিলেন। তারা কবরের ভয়াবহতা, অন্ধকার এবং সংকীর্ণতা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তাদের আলোচনা শুনে ঈসা বললেন, তোমরা সেখানে মাতৃগর্ভের চেয়েও সংকীর্ণ এক কুঠরিতে থাকবে। তবে আল্লাহ তাআলা যদি কারও জন্য প্রশস্ত করতে চান তবে তিনি তার কবর প্রশস্ত করে দেবেন।
২৯. আবুল মিকদাম বলেন, আমরা বকর বিন আবদুল্লাহ -এর জানাযা ও দাফন সেরে হাসান বসরী -এর সাথে ফিরছিলাম। আমি তাকে বললাম, আল্লাহ তাআলার এই বাণী সম্পর্কে আপনি কী বলেন? (وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ) 'আর তাদের সামনে পুনরুত্থান দিবসের আগ পর্যন্ত পর্দা থাকবে।
আমার কথা শুনে তিনি ডানে-বামে তাকিয়ে বললেন, তাদের কবরের আড়ালে রেখে তোমরা তার ওপরিভাগে এই যে ছোটাছুটি করছ, পুনরুত্থানের আগ পর্যন্ত একে অপরের কোনো শব্দ শুনতে পাবে না।
৩০. নুআইম বিন সালামাহ বলেন, কবরে মাটি ছিটানোর সময় প্রথমবার بِسْمِ اللهِ' (বিসমিল্লাহ), দ্বিতীয়বার 'اَلْمُلْكُ لله' (আল মুলকু লিল্লাহ) 'সমস্ত রাজত্ব একমাত্র আল্লাহর' এবং তৃতীয়বার 'لَا شَرِيكَ لَهُ' (লা শারিকা লাহু) 'তার কোনো অংশীদার নেই' বলবে।
৩১. তাবেঈ আবদুর রহমান বিন মাইসারা বলেন, এক ব্যক্তির হিসাব তলব করা হলো; তার নেক আমলের তুলনায় গুনাহের পাল্লা ভারী হয়ে গেল। তখন অনুসন্ধান করে দেখা গেল, সে জনৈক ব্যক্তির কবরে তিনবার মাটি ছিটিয়েছে। এই আমলের সওয়াব নেক আমলের সাথে যুক্ত করা হলো। তার নেক আমল গুনাহের তুলনায় ভারী হয়ে গেল।”
৩২. ফাইয বিন ইসহাক বলেন, বিখ্যাত তাবে-তাবেঈ ফুযাইল বিন আয়ায আমাকে বলেন, তুমি কি জানো? পুরো দুনিয়া তোমার হলেও তোমাকে বলা হবে, এই দুনিয়া ত্যাগ করে চলে আসো। আর তোমাকে তোমার কবরে রেখে যাওয়া হবে। তুমি কি ঠিক তা-ই মনে করো না?
৩৩. ফাইয বিন ইসহাক বলেন, একদিন ফুযাইল বিন আয়ায আমাকে বললেন,
সর্বনাশ হোক! তুমি কি মৃত্যুবরণ করবে না? তোমাকে একদিন এই পরিবার- পরিজন ও সহায়-সম্পত্তি ছেড়ে চলে যেতে হবে। তোমাকে কবরে রেখে আসা হবে। তুমি একাই সেই সংকীর্ণ কুঠরিতে পড়ে থাকবে। অতঃপর তিনি পাঠ করলেন,
فَمَا لَهُ مِن قُوَّةٍ وَلَا نَاصِرٍ
সেদিন তার কোনো ক্ষমতা থাকবে না এবং সাহায্যকারীও না।
তারপর বললেন, তুমি যদি তা মনে না করো, তাহলে তো জমিনের বুকে তোমার চেয়ে বোকা কোনো প্রাণীই নেই।
৩৪. আবু মুহাম্মাদ নাখাঈ বলেন, ইছাম বিন আলী একদিন তার সঙ্গী- সাথিদের অবস্থানরত অবস্থায় হঠাৎ শিউরে ওঠেন। কয়েকজন জিজ্ঞাসা করলেন, কী হয়েছে আপনার? তিনি বললেন, কবরের কথা মনে পড়েছে।
৩৫. হিশাম দাসতআঈ বলেন, মাঝে মাঝে যখন মৃত্যুর কথা স্মরণ করে আমি এই কল্পনা করি যে আমাকে কাফন পরানো হয়েছে, তখন দম বন্ধ হয়ে আসে।"
৩৬. তাবেঈ মাইমুন বিন মিহরান বর্ণনা করেন, সাহাবী আবু দারদা বলেন, তোমাদের জন্য পার্থিব ঘরবাড়ি ও কবরের মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। তোমরা কবরবাসীর জিয়ারত করে থাকো, কিন্তু তারা তোমাদের জিয়ারত করতে পারে না। তোমরা একসময় স্থান পরিবর্তন করে তাদের কাছে চলে যাবে, কিন্তু তারা কখনো তোমাদের পাশে ফিরে আসবে না। হয়তো কবরই তোমাকে পার্থিব ঘরবাড়ি থেকে অখণ্ড অবসর দিতে পারে।"
৩৭. মুফাযযাল বিন গাসসান বলেন, এক ব্যক্তি কবরের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমরা যেসব বিষয়ে উৎসুক হয়ে বসে আছি তারা সেসব বিষয় ত্যাগ করেছেন।"
৩৮. উমারাহ বিন মিহরান মিওয়ালি বলেন, মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি আমাকে বললেন, তোমার বাসস্থানে আমি আহামরি কিছু দেখিনি। বললাম, আমার বাসস্থান তো কবরস্থানের পাশেই। এটা কি আপনাকে বিস্মিত করে না? তিনি বললেন, তাহলে তো কবরগুলো তোমার কষ্ট লাঘব করে দেবে, আখিরাত স্মরণ করিয়ে দেবে।
৩৯. মুহাম্মাদ বিন হারব মক্কী বলেন, একদিন আমাদের মাঝে আবু আবদুর রহমান উমারী হাযির হলেন। আমরা তার পাশে জড়ো হলাম। মক্কার গণ্যমান্য কিছু ব্যক্তিও উপস্থিত হলো। কিছুক্ষণ পর তিনি মাথা উঁচু করে তাকালেন। কাবার আশেপাশে নির্মিত আকর্ষণীয় কিছু বাড়িঘরের দিকে তার দৃষ্টি পড়ল। তিনি উঁচু স্বরে বলে উঠলেন, হে সুরক্ষিত দালানকোঠার বাসিন্দাগণ, ভয়ংকর বিপদে ঘেরা অন্ধকার কবরের কথা স্মরণ করো। হে আয়েশী লোকজন, কবরের পোকা-মাকড়, পুঁজ আর পচেগলে মাটিতে মিশে যাওয়ার কথা স্মরণ করো। এ পর্যন্ত বলেই তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠল। অতঃপর তিনি সেখান থেকে উঠে গেলেন।"
৪০. ইমাম দাউদ তাঈ এক জানাযায় উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, দুনিয়াবাসী, জেনে রাখো, কবরের লোকজন নিজেদের পাঠিয়ে দেয়া আমল নিয়ে উল্লসিত হয় আর রেখে যাওয়া বিত্তবৈভব নিয়ে আক্ষেপ করে। আজ তারা যেসব বিষয় নিয়ে আক্ষেপ করছে, তোমরা তা নিয়ে হানাহানি, কাড়াকাড়ি আর বিবাদে মশগুল রয়েছ。
৪২. ফুযাইল বিন আবদুল ওয়াহাব বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
(خُذُوهُ فَغُلُوهُ)
(কিয়ামতের দিন জাহান্নামীদের ব্যাপারে বলা হবে,) তাকে ধরো, অতঃপর বেড়ি পরিয়ে দাও。
আয়াতের এই অংশের ব্যাখ্যায় মুতামার বিন সুলাইমান তার পিতা সুলাইমান বিন তুরখান তাইমী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'তাকে ধরো' বলার সাথে সাথে ফিরিশতাগণ অপরাধীদের এমনভাবে ধরপাকড় করবে যে, সে তার হাত সামান্য নাড়াচাড়া করারও সুযোগ পাবে না। তখন সে বলবে, তুমি কি আমার প্রতি কোনো দয়া করবে না? ফিরিশতা বলবেন, যেখানে আল্লাহ তাআলা দয়া করেননি। সেখানে আমি কীভাবে দয়া করি?
৪৩. দাউদ বিন মিহরান বর্ণনা করেন, শুআইব বিন আবু হামযাহ বলেন, উমর বিন আবদুল আযীয সিরিয়ার বিভিন্ন শহরের কিছু লোকজনের নিকট এই চিঠি লেখেন যে, সালাম ও কুশল বাদ, স্মরণ রেখো, কত আদমসন্তানের দেহকে মাটি হজম করে ফেলেছে! কত কীট-পতঙ্গ তার পাকস্থলি ছেদ করে বেড়িয়ে এসেছে! হে লোকসকল, এসব মনে করিয়ে দিয়ে আমি নিজেকে এবং তোমাদের সতর্ক করছি。
৪৪. আযহার বিন মারওয়ান রিকাশি বলেন, বিশর বিন মানসুর-এর একটি বিশেষ কামরা ছিল। তিনি আসরের সালাত আদায় করে সেখানে প্রবেশ
করতেন। সেখানে ঢুকে তিনি কবরস্থানমুখী দরজা (কিংবা জানালা) খুলে দিয়ে কবরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। "
৪৫. মুফাযযাল বিন গাসসান বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি খননকৃত একটি কবরের পার্শ্ব অতিক্রমকালে বলেন, মুমিনের বিশ্রামের জন্য এই কবর কতই-না উত্তম স্থান!
টিকাঃ
৮৩. মুসান্নাফু ইবনি আবী শাইবাহ, ২/১৫৮। হাদিস নং ৭৬৩৩। সালাতের ফযীলত অধ্যায়। মুজামুল আওসাত লিত-তাবারানী, ১/২৮২। হাদিস নং ৯২০। আয-যুহদু লি-ইবনি মুবারক, ১/১০। হাদিস নং ৩১। আল্লাহ আযযা ওয়া যাল্লার আনুগত্যের প্রতি উৎসাহ দান অধ্যায়。
৮৪. সুনানু তিরমিযী, ২৪৬০। আবু সাঈদ খুদরি হতে। কিয়ামত বিষয়ক আলোচনা। ইবনুল হাজার আসকালানী হাসান গরিব বলেছেন। হিদায়াতুর রুওয়াত, ৫/৭৪。
৮৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ১/১৩৮。
৮৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৬। সনদ দুর্বল তবে বক্তব্য সহিহ。
৮৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৬。
৮৮. আয যুহদু লি আহমাদ বিন হাম্বল, ৩২৪। বর্ণনা নং ২৩৬৬。
৮৯. আহওয়ালুল কুবুর (ইবনু রজব), ১৩৯; সাকবুল ইবারত, ২২৮; শরহু নাহজিল বালাগাহ, ১৫১。
৯০. আল হাওয়াতিফ, ৫৩। বর্ণনা: ৪৫。
১১. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৯। রূহ, ১০১。
১১. আসলে সত্তর হবে। কারণ, কবি ফারাযদাক ৩৮-১১৪ হি: মোট ৭৬/৭৭ বছর বেঁচে ছিলেন。
১৩. ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ৪/৪৮৭。
১৪. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৫৩১。
৯৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৫/৩৩৩。
৯৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৬。
৯৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৮。
৯৮. আহওয়ালুল কুবুর, ২১১。
১১. তারীখু দিমাশক, ২২/২৬৩。
১০০. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৪。
১০১. শরহুস সুদূর, ১৫৬。
১০২, আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৬। বিদায়া ওয়া নিহায়া, ১০/১৩১। ১৫৮ হিজরির আলোচনায়。
তবে ইমাম আবু দাউদ সাজিস্তানী তার কিতাবুয যুহদ, ৩১৯। বর্ণনা নং ৩৬৬-তে এবং ইমাম বাইহাকী তার শুআবুল ঈমান, ১৩/২১৪। বর্ণনা নং ১০২১৫-তে বর্ণনাটি আনাস বিন মালিক-এর বাণী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যার সনদ হাসান。
১০৩. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৭。
১০৪. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৯。
১০৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৭。
১০৬. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবাহ, ৩৪৮৬৫। সনদ সহিহ。
১০৭. ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ পর্যন্ত সনদ হাসান। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল ও সুয়ূতী নিজ নিজ গ্রন্থে এই বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। কিতাবুয যুহদ, ৩০১। ঈসা হতে বর্ণিত উপদেশমালা。
১০৮. সুরা মুমিনুন, (২৩): ১০০
১০৯. তাফসিরু ইবনি রজব হাম্বলী, ২/৩১। সুরা মুমিনুন, (২৩): ১০০ এর ব্যাখ্যায়। এ ছাড়াও ইবনু রজব হাম্বলী তার আহওয়ালুল কুবুর, ৫ এ আবু হুরায়রা -এর উদ্ধৃতি দিয়ে সমার্থক বর্ণনা উল্লেখ করেছেন。
১১০. তারীখু দিমাশক, ৬২/১৭৪। এই বর্ণনাটি একাধিক বর্ণনাকারীর পরিচয় অস্পষ্ট থাকায় দুর্বল। তা ছাড়া কবরে তিন বার মাটি ছিটানো সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো নিয়ে মুহাদ্দিসগণের নানা মত রয়েছে। সুনানু ইবনু মাজাহ, ১৫৬৫-তে আবু হুরায়রা হতে এ-সংক্রান্ত সহিহ বর্ণনা থাকলেও ইবনু আবী হাতিম হাদিসটি বাতিল বলে মত দিয়েছেন। তবে ইবনুল হাজার আসকালানী-সহ অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ এই বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। বিস্তারিত, তালখীসুল হাবীর, ২/৩০৩, ৩০৪। বর্ণনা নং ৭৮৮। জানাযা অধ্যায়。
১১১. সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী, বর্ণনা নং ৬৭৩১। এই উদ্ধৃতি দিয়ে ইবনুল হাজার আসকালানী তালখিসুল হাবীর, ২/৩০৩ এ সমার্থক বর্ণনা উল্লেখ করেছেন。
১১২, আহওয়ালুল কুবুর, ১৩০。
১১৩. সুরা তারিক, (৮৬): ১০
১১৪. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩০。
১১৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৪。
১১৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৪, ১৫৫。
১১৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৮。
১১৮. আহওয়ালুল কুবুর, ৩৯。
১১৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ২/৩৪৮。
১২০. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৮/৩৭৬। হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৮/২৮৫। সনদ হাসান。
১২১. আহওয়ালুল কুবুর, ৩৯。
১২২. সুরা হাক্কাহ, (৬৯) : ৩০
১২৩. তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৮/২৩১。
১২৪. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫২, ১৫৩। ফসলুল খুত্তাব, ২/২৯৩。
১২৫. শরহুস সুদূর, ২২২。
১২৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৭。
📄 পার্থিব জীবনের অসারতা, মৃত্যু ও কবর বিষয়ে সালাফের কবিতা
১. উমর বিন যর বলেন, মাইমুন বিন মিহরান বলেন, একবার আমি খলীফা উমর বিন আবদুল আযীয-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বিখ্যাত কবি সাবিক বারবার-কে দেখতে পেলাম। তিনি খলীফাকে নিচের পঙ্ক্তিতিমালা শোনালেন,
فكم من صحيح بات للموت آمنا *** أتته المنايا بغتة بعد ما هجع
فلم يستطيع إذا جاءه الموت بغتة *** فرارا ولا منه بقوته امتنع
فأصبح يبكيه النساء مقنعا *** ولا يسمع الداعي وإن صوته رفع
وقرب من لحد فصار مقيله *** وفارق ما قد كان بالأمس قد جمع
فلا يترك الموت الغني لماله *** ولا معدما في المال ذا حاجة يدع
ঘুমের ঘোরেই ঝরে গেছে কত যে সুস্থ প্রাণ!
ডাক এসেছে ঘুমের মাঝেই, ছিড়েছে পিছুটান।
অমোঘ হুকুম যেতেই হবে, পালিয়ে বাঁচার সুযোগ নেই,
পেশির বলে যায় না রোখা, এমন মুরোদ কারোরই নেই।
বিলাপী নারীর আর্তনাদে জেনেছে পড়শি বাড়ি,
তার আওয়াজে জাগেনি কেউ, শব্দে যে তার আড়ি।
শোকের অশ্রু চোখে রেখেই দিয়েছে সবাই কবর,
পরের দিনই ভুলে গেছে, নেয়নি কেউ খবর।
ধনে মানে মরণবানে ছাড়বে না যে কভু,
নিঃস্ব গরিব সবাই যাবে, দিয়েছে বেঁধে প্রভু।
কবিতা শুনে খলীফা আফসোস করতে লাগলেন। কাঁদতে কাঁদতে একসময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলেন। অতঃপর আমরা সেখান হতে উঠে আসলাম。
২. কবি ইবনু আবি উমরাহ বলেন,
يا أيها الذي قد غره الأمل *** ودون ما يأمل التنغيص والأجل
ألا ترى إنما الدنيا وزينتها *** كمتولي الركب دارا ثم ارتحل
حتوفها رصد وعيشها نكد *** وصفوها ريق وملكها دول
يظل يفزع بالروعات ساكنها *** ما أن.... لين ولا له جزل
كأنه للمنايا والردى عرض **** تظل فيه بنات الدهر تنتقل
والمرء يشقى بما يسعى لوارثه **** والقبر وارثه ما يسعى له الرجل.
ধূলির ধরায় মিথ্যে মায়ায় দিনগুলো সব যাচ্ছে কেটে,
নিত্যই সব ডুবছে এথা পিছুটানের চোরাস্রোতে।
রঙিন সুখের জগৎজুড়ে বলব কী আর হায়!
আপন মনে নিবাস গড়ে সবাই চলে যায়।
নগদ সুখের সদাই করে, বাকির খাতায় হায় অপমান,
জগৎ জয়ের মাতাল নেশায় দিন ফুরোলে হয় বিরান।
আশার ঘরে শঙ্কা জাগায়, ঘোর বিপদের ডঙ্কা বাজায়,
হেঁচকা টানে সুখের ঝালর ছিন্ন করে বেদনা জাগায়।
শেষ হিসেবের ধ্বংস পানে, নিচ্ছে টেনে দমে দমে,
ঘড়ির কাটায় সন্ধি পেতে আসছে মরণ প্রতিক্ষণে।
ইহজীবনে যা জমেছে, ষোলো আনা হায় পরের তরে,
ওপারেতে নেই কিছু আজ, সঙ্গী কেবল শূন্য থলে。
৩. প্রখ্যাত কবি আবুল ইতাহিয়া -এর ছেলে তার একটি কবিতা আবৃত্তি করেন,
لربما غوفص ذو عزة ... أصح ما كان ولم يسقم
يا واضع الميت في قبره ... خاطبك القبر فلم تفهم
বেঘোর পাপের নেশায় ডুবে হারিয়ে গেছে কত প্রাণ!
সুস্থ দেহ, সুস্থ মনেই পড়েছে তার সুতোয় টান।
কবর খুঁড়ে আজকে যারা আসছ রেখে আপনজন,
তোমাকেও ডাকছে কবর, তা বুঝে আর কতজন?
৪. মুহাম্মাদ বিন আবুল ইতাহিয়াহ বলেন, আমার পিতা আরও বলেন,
إني سألت الثرى ما فعلت بعدي ... وجوه فيك منعفرة
فأجابني صيرت ريحهم ... يؤذيك بعد روائح عطرة
وأكلت أجسادا منعمة ... كان النعيم يهزها نضرة
فما بقي غير جماجم عز منه ... بيض تلوح وأعظم نخرة.
প্রশ্ন করেছি কবরের মাটিকে, প্রিয়জনের কী খবর?
কেমন ছিলে প্রিয়মুখের সাথে, হে আঁধার কবর!
কবর শুধায়, সুবাস ছড়ানো কোমল সে দেহের,
সবটুকুই নিয়েছি শুষে, রেহাই মিলেনি কোষের।
ঝলমলে সে চাঁদমুখখানি ধুলোয় করেছি মলিন,
কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়ে বিবর্ণ করেছি, অবস্থা আজ কঠিন।
অস্থি মজ্জাহীন সে করোটি আজ পড়ে আছে অসহায়,
পচে-গলে সব মিটে গেছে আজ, মিলিয়েছে সব হাওয়ায়।
কবরখানি ডাকছে তোমায়, আজকে তুমি নির্বিকার,
সেদিন তোমায় পুছলে এসব, বলো না ফের দুর্বিচার!
আঁধার মুখে ছুটছ তুমি, ভালো-মন্দ নেই খবর,
এসব কিছুর বৈধতা কী? পুছবে যখন কবর-ঘর?
আঁধার-ঘরে একলা রবে, সেদিন তোমার উপায় কী?
আজকে যারা নিত্য পাশে, তারাও সেদিন থাকবে কি?
মুহাম্মাদ বিন আবুল ইতাহিয়াহ বলেন, এক ব্যক্তি জনৈক বিচারকের নিকট এই পঙ্ক্তিমালা পাঠ করেন। কবিতা শুনে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। বললেন, তুমি তাকে যেমন দেখছ সে কি তা বলবে?
৭. সুফিয়ান বিন হুসাইন বলেন, বিখ্যাত আরব কবি ফারাযদাকের স্ত্রী নাওয়ার বিনতু আইয়ান বিন যুবাইআহ বিন ঈকাল মুজাশিঈ যখন ইনতিকাল করেন, হাসান বসরী তার জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। দাফন শেষ করে কবি ফারাযদাক মাটি ঝেড়ে উঠে দাঁড়ান এবং নিচের পঙ্ক্তিমালা আবৃতি করেন,
أخاف وراء القبر إن لم تعافني *** أشد من القبر التهابا وأضيقا
إذا جاءني يوم القيامة قائد عنيف *** وسواق يسوق الفرزدقا
لقد خاب من أولاد آدم من مشى *** إلى النار مغلول القيادة أزرقا
ইয়া রব, আপনার ক্ষমা না পেলে কবরের ওপারে আমার ভয়ের অন্ত নেই,
মাগফিরাতহীন কবর যে অগ্নিশিখা ঘেরা এক সংকীর্ণ ভয়ের ঘর।
হাশরের মাঠে কপর্দকহীন ফারাযদাক পথহারা পথিকের মতো ঘুরে বেড়াবে।
জাহান্নামের পথে ছিটকে পড়া আদমসন্তানের চোখে-মুখে,
সেদিন বিষাদের নীল ছাপ ফুটে উঠবে।
কবিতা শেষ করে ফারাযদাক বলে উঠলেন, আল্লাহর শপথ! সেদিন সকল মানুষই কাঁদবে!
হাসান বসরী বললেন, সেদিন তারা কী বলবে?
ফারাযদাক বললেন, তারা বলবে, তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো মানুষ ছিলে। আর আমি ছিলাম সবচেয়ে খারাপ!
হাসান বসরী বললেন, আমি যেমন সবচেয়ে ভালো মানুষ নই। তুমিও সবচেয়ে খারাপ মানুষ নও।
আচ্ছা, সেদিনের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করছ?
ফারাযদাক বললেন, সত্তর বছর যাবৎ 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর সাক্ষ্য প্রস্তুত রাখছি।
হাসান বসরী কোনোরকম চিন্তাভাবনা না করে এই আমল চালিয়ে যাও।
৮. আবু আলী নিম্নোক্ত পঙ্ক্তিমালা আবৃতি করেন,
هالوا عليه الترب ثم انثنوا *** عنه وخلوه وأعماله
لم ينقض النوح من داره **** عليه حتى اقتسموا ماله
কবরে মাটি দিয়ে, মৃতকে আমলের হাতে সঁপে অন্যত্রে ধ্যান দিয়েছে সকলেই।
শুরু হয়ে গেছে উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্ব!
মায়াকান্নার বিলাপ দুয়ার পেরোতেই।
৯. রিয়াশি আব্বাস ইবনুল ফারায নিচের পঙ্ক্তিমালা আবৃতি করেন,
تهيج منازل الأموات وجدا *** ويحدث عند رؤيتها اكتئاب
منازل لا تجيبك حين تدعو *** وعز عليك أنك لا تجاب
মৃত লোকদের বাসস্থান তোমায় আলোড়িত করে ছাড়বে,
তাদের জিয়ারত তোমার মাঝে উদাসী ভাব এনে দেবে।
এখানে শত আহ্বানে মিলবে না সাড়া, শুধু নীরবতা,
বিপদের কালো ছায়াতেও এখানে বিরাজ করে রাজ্যের নিস্তব্ধতা。
১০. ইবরাহীম বিন উরমাহ ইস্পাহানী রিয়াশি-এর উদ্ধৃতি দিয়ে নিচের পঙ্ক্তিটি আবৃত্তি করেন,
وكيف يجيب من ندعوه ميتا *** تضمنه الجنادل والتراب
আমরা যাকে মৃত বলে ডেকে থাকি, তার আবার সাড়া দেয়ার উপায় থাকে কীভাবে?
সে তো আজ মাটি ও পাথরে মিশে জড় পদার্থ হয়ে গিয়েছে!
১১. ইবরাহীম বিন উরমাহ ইস্পাহানী নিচের পঙ্ক্তিমালা আবৃতি করেন,
مقيم إلى أن يبعث الله خلقه *** لقاؤك لا يرجى وأنت قريب
تزيد بلى في كل يوم وليلة *** وتنسى كما تبلى وأنت حبيب
মৃত লোকজন পড়ে থাকবে আঁধার কবরের কোলে,
জাগবে সেদিন, ডাকবে যেদিন মহান রবের দরবারে।
আমাদের জিয়ারত শুধু মাটির সাক্ষাতে শেষ হয়,
সাধ্যি কার অদৃশ্য এ আড়াল করতে পারে ক্ষয়?
উদয়-অস্তে বেড়ে চলে কেবল জীর্ণতার ইতিহাস,
ঠিক যেভাবে ভুলে যাচ্ছে বন্ধু, স্বজন ও সমাজ।
১২. আমর বিন জারির বাজালী বলেন, তোমরা কি জানো, বাদশাহ নুমান বিন মুনজির কখন তাওবা করার ইচ্ছা করেছিলেন? সবাই বলল, না। তিনি বললেন, একদিন নুমান ইবনুল মুনজির খোশমেজাজে শিকারের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলেন। তিনি হীরা শহরের মধ্যভাগে অবস্থিত একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে তিনি কিছুক্ষণ অবস্থান করেন। তখন বিখ্যাত কবি ও দার্শনিক আদি বিন যায়িদ তাকে বললেন, সকল অকল্যাণ বিদূরিত হোক! আপনি কি জানেন, এই কবরগুলো কী বলে? তিনি বললেন, না। আদী বললেন, কবরবাসী বলে,
يا أيها الركب المحيون على الأرض محدون
كما أنتم كنا وكما نحن تكونون
জমিনের বুকে ঘুরে বেড়ানো সীমাবদ্ধ লোকসকল!
তোমরাও একদিন আমাদের মতো হয়ে যাবে,
যেমন আমরা একদিন তোমাদেরই মতো ছিলাম!
এ কথা শুনে নুমান বললেন, পঙ্ক্তিটি আমাকে আবার শোনান। সে আবার তা শোনাল। নুমান বিন মুনজির ভগ্ন হৃদয়ে ঘরে ফিরে গেল। আরেকদিন তিনি ঘর থেকে বের হয়ে সমাধিস্থলে আসলেন। আদী বিন জায়িদ বললেন, সকল অকল্যাণ বিদূরিত হোক! আপনি কি জানেন, এই কবরগুলো কী বলে? তিনি বললেন, না। আদী বললেন, কবর বলে-
رب ركب قد أناخوا حولنا *** يشربون الخمر بالماء الزلال
ثم بادوا عصف الدهر بهم *** وكذاك الدهر حال بعد حال
আমাদের চারপাশে কত সওয়ারি তার উট হাঁকিয়ে বেড়ায়!
সুপেয় পানিতে শরাব মিশিয়ে নেশার জগতে হারিয়ে যায়।
অতঃপর কালের ঘূর্ণিপাকে একদিন নিঃশেষ হয়ে থেমে যায়,
এভাবেই যুগের পর যুগ পাল্টাতে থাকে।
বাদশাহ বললেন, পঙ্ক্তি দুটি পুনরাবৃত্তি করুন। আদি তা-ই করলেন। অতঃপর বাদশাহ নুমান বিন মুনজির (পৌত্তলিক ধর্ম ছেড়ে তৎকালীন সঠিক দ্বীন) খ্রিষ্টধর্মের দীক্ষা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন। তিনি খ্রিষ্টান অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেন।
১৩. উসমান বিন উমর তাইমী উবাইদুল্লাহ বিন উমর বিন হাফস হতে কিছু পঙ্ক্তি শোনেন। তিনি তাকে বলেন, তোমার ভাতিজার জন্য পঙ্ক্তিগুলো লিখে দাও। উবাইদুল্লাহ সেগুলো লিখে দিলেন। যা নিম্নরূপ:
أمم قبلنا خلت وقرون *** قوم موسى منهم بنوا إسرائيل
نقبوا في البلاد من حذر الموت *** وجالوا على الأرض كل مجال
ثم صاروا إلى التي خلقوا منها *** فأضحوا من التراب الهال
هل تراه يبقى عليهم مسح *** فايح فاه للصبا والشمال.
আমাদের পূর্বে কত শতাব্দী আর উম্মাহ অতীত হয়েছে
মুসা -এর জাতি বনী ইসরাঈল ছিল তাদেরই একদল।
মৃত্যুর হাত থেকে পালিয়ে বেড়াতে তারা নগরে-বন্দরে ঘুরেছে!
কত প্রান্তর চষে বেড়িয়েছে এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বুক বেঁধে।
অবশেষে সৃষ্টির শুরুতেই ফিরে গিয়েছে তারা,
স্তূপীকৃত মাটিই হয়েছে তাদের শেষ পরিণতি।
আজ কি তোমরা তাদের কোনো চিহ্নটুকু দেখতে পাও?
হায় আফসোস! অফেরতযোগ্য শৈশব ও বাকি সময়ের জন্যে!**
১৪. হামিদ বিন আহমাদ বিন উসাইদ বলেন, একদিন আমি আলী বিন জাবালাহ-এর হাত ধরে কবি আবুল ইতাহিয়া-এর সাথে দেখা করতে গেলাম। তিনি তখন হাম্মামে গোসল করছিলেন। আমরা তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ইতিমধ্যে সেখানে ইবরাহীম বিন মুকাতিল বিন সাহাল এসে উপস্থিত হলেন। তিনি দেখতে বেশ সুদর্শন ছিলেন। কবি আবুল ইতাহিয়া বেশ মনোযোগ সহকারে তাকে দেখে এই পঙ্ক্তিটি আবৃত্তি করেন,
يا حسان الوجوه سوف تموتون *** وتبلى الوجوه تحت التراب
হে সুদর্শন, খুব শীঘ্রই মৃত্যু তোমায় গ্রাস করে নেবে,
তোমার এই নিটোল দেহ একদিন মাটির নিচে হারিয়ে যাবে।
আবুল ইতাহিয়া-এর পঙ্ক্তি শুনে আলী বিন জাবালাহ এগিয়ে এসে বললেন, আমার পক্ষ হতে দুই লাইন লিখে রাখো,
يا مربي شبابه للتراب سوف *** تلهوا البلى بغض الشباب
يا ذوي الأوجه الحسان المصونات *** وأجسامها الغضاض الرطاب
হে সতর্ক যৌবনের অধিকারী! সুস্থ-সুদর্শন গড়নের গর্বিত মালিক!
শীঘ্রই যৌবনের এই সবুজ সৌরভ ফুরিয়ে তুমি ধুলোয় মিশে যাবে।
এবার আবুল ইতাহিয়া বললেন, হে হামিদ, তুমি কিছু বলো। বললাম, আপনার সাথে আর আবুল হাসানের সাথে মিলিয়ে বলব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম,
أكثروا من نعيمها وأقلوا *** سوف تهدونها لعفر التراب
قد نعتك الأيام نعيا صحيحا *** بفراق الإخوان والأصحاب
نعموا الأوجه الحسان فما *** صونكوها إلا لعفر التراب
ولبسوا ناعم الثياب ففي *** الحفرة يعرون من جميع الثياب
قد ترون الشباب كيف يموتون *** إذا استنصروا بماء الشباب
যৌবনের এই কম-বেশি নিআমত অচিরেই ধুলোয় ধূসরিত হবে,
তুমিহীন সে দিনগুলো প্রিয়জন হয়তো শোকেই কাটিয়ে দেবে।
যৌবনের যে নেশায় আজ মত্ত তুমি, তার শেষ ঠিকানা তো মাটির ঘরে
ঝলমলে পোশাকের আভিজাত্য ছিনিয়ে সেদিন কবরের আঁধারে ছেড়ে আসবে,
যৌবনের তুঙ্গে থাকতেই কত দেহ অকালে বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছে!
১৫. হাসান বসরী থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার সাহাবী উসমান বিন আবুল আস এক জানাযায় অংশ নিলেন। কবরস্থানে গিয়ে তিনি একটি ভাঙা কবর দেখতে পেলেন। এ সময় তিনি তার পরিবারের একজনকে বললেন, দেখো দেখো, তোমার স্থায়ী ঠিকানার দিকে দেখো। লোকটি এগিয়ে এসে দেখে বলল, এ ঘরে তো কোনো দানাপানি আর বিলাস-ব্যবস্থা নেই! তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! এটাই তোমার আসল ঠিকানা। লোকটি বলল, আপনি সত্য বলেছেন। এরপর তিনি সেই কবরের পাশ থেকে ফিরে এসে বললেন, আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আমাকে সেই ঘরে থাকতে হবে।
হাসান বসরী বলেন, এ সময় তাকে নিচের পঙ্ক্তিমালা আবৃত্তি করতে শুনি,
هَلْ عَلَى نَفْسِ امْرِئٍ مَحْزُونُ *** مُوقِنٌ أَنَّهُ غَداً مَدْفُونُ
فَهُوَ لِلْمَوتِ مُسْتَعِدُّ ... لا يَصُونُ الحُطام فيما يصونُ
كُلُّنا يُكْثِرُ الْمَذَمَّةَ لِلدُّنْيا ... وكُلُّ بِحُبِّها مدفون
بأكثر الكنوز إن الذي يكفيك *** ما أكثرت منها الدون
وَتَرَى مَنْ بِهَا جَمِيعًا كَانَ *** قَدْ عَلِقَتْ مِنْهُمُ وَمِنْكَ الرُّهُونُ
أَيْنَ آبَاؤُنَا وَآبَاؤُهُمْ قَبْلُ *** وَأَيْنَ الْقُرُونُ أَيْنَ الْقُرُونُ
إِنَّا لِتِلْكَ الْمَنَايَا وَلَو أَنَّكَ ... فِي شَاهِقِ مِنْ تِلْكَ الْحُصُونِ
كَمْ أُناسٍ كَانُوا فَأَفْنَتْهُمُ الأَيَّامُ *** حَتَّى كَأَنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا
إِنَّ رَأْيَا دَعا إلى طاعة الله *** لرأيا باذل ميمون
আগামীকাল যে দাফন হতে যাচ্ছে, তার কি আর ইহকালীন চিন্তা থাকতে পারে?
সে তো মৃত্যুর প্রস্তুতি নেবে, যার ইতিহাস কেউ রক্ষা করে না।
দুনিয়ার জন্য শত অপমান আমরা গায়ে মাখি, অথচ দুনিয়ার সকল প্রেমিকই আজ কবরে!
বিত্তের পেছনে ছুটে বেড়ালে তোমার জন্য হয়তো কিছুই যথেষ্ট হবে না।
এ ভূমি থেকেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে তারা তোমা হতে তা বন্ধক নিয়েছিল।
কোথায় সে সকল পূর্বপুরুষ আজ, কোথায় প্রজন্মান্তরের সেসব লোকজন?
সুউচ্চ দুর্গের আশ্রয় থাকলেও এই পরিণাম আমাদের কাছে পৌঁছে যাবেই।
সহস্রাব্দের সকল মানুষের জীবনেই এমন একদিন এসেছে,
যেদিন গত হওয়ার পর মনে হয়েছে, তারা আসলে কখনোই এখানে ছিল না।
নিঃসন্দেহে এসব ভাবনা মহান রবের পথে আহ্বান জানায়,
আহ্বান জানায় সৌভাগ্যের পরশমণির প্রতি。
১৬. সুলাইমান বিন আবু শাইখ বলেন, মুহাম্মাদ বিন হাকাম আমাকে কবি আশা হামদান এই পঙ্ক্তিমালা আবৃত্তি করে শোনান,
فَمَا تَزَوَّدَ مِمَّا كَانَ يَجْمَعُهُ *** سِوَى حَنُوطٍ غَدَاةَ الْبَيْنِ مَعَ خِرَقِ
وَغَيْرَ نَفْحَةِ أَعْوَادٍ تُشَبُّ لَهُ *** وَقُلَّ ذَلِكَ مِنْ زَادٍ لِمُنْطَلِقٍ
لَا تَأْسَيِّنَّ عَلَى شَيْءٍ فَكُلُّ فَتًى *** إِلَى مَنِيَّتِهِ سَيَّارُ فِي عَنَقِ
وَكُلُّ مَنْ ظَنَّ أَنَّ الْمَوْتَ يُخْطِئُهُ ** مُعَلَّلُ بَأَعَالِيلَ مِنَ الْحَمَقِ
بِأَيِّمَا بَلْدَةٍ تُقْدَرْ مَنِيَّتُهُ *** إِنْ لَا يُسَيَّرُ إِلَيْهَا طَائِعًا يُسَقِ
শেষ বিদায়ে মানুষের সঞ্চয় বলতে কয়েক প্রস্থ কাপড় আর কিছু সুগন্ধীমাত্র
আর কিছু আগরমিশ্রিত কাষ্ঠ জ্বালিয়ে খুব সামান্য আয়োজনে শুরু হবে দীর্ঘ যাত্রা।
তবে এসব নিয়ে হতাশ হয়ে লাভ নেই, ধীরে ধীরে সকলেই ঠিক সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে,
নির্বোধ ব্যাধিগ্রস্ত হলো সেই ব্যক্তি, যে মনে করে যে, মৃত্যু তাকে ভুলে যাবে!
কোনো শহরে যখন মৃত্যুর ফরমান জারি হয়,
মৃত্যু তার নিজ গতিতে তা প্রদক্ষিণ করে থাকে。
১৭. একই সূত্রে তিনি নিচের পঙ্ক্তিমালা আবৃত্তি করেন,
دار الفجائع والهموم ... ودار البنود والأحزان والشكوى
منا الفتى فيها بمنزل ... إذ صار تحته جيرانها ملقى
يقفوا مساوئها محاسنها ... لا شيء بين المنعى والبشرى
ইহকালের এ জগৎখানি নিকষ আঁধারময়,
বিপদের ঝুঁকি হতে এখানে কেউই মুক্ত নয়।
এ যে দুর্যোগ-দুর্বিপাকের এক কঠিন ঠিকানা,
মন্দা, শঙ্কা আর আর শত অভিযোগের আস্তানা।
এখানে একজন উঁচু তলার বাসিন্দা হয়ে থাকে,
আর তার পদতলে অযুত প্রতিবেশী গুমরে মরে,
এখানে সুখ-দুঃখ কেউ কারও পিছু ছাড়ে না।
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মাঝে এখানে খুব বেশি ফারাকও ধরা পড়ে না।
১৮. বিশর ইবনুল হারিসের ঘনিষ্ঠ সহচর মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান নিচের পঙ্ক্তি দু'টি আবৃতি করেন,
كَأَنِّي بِإِخْوَانِي عَلَى حَافَتَيْ قَبْرِي *** يَهِيْلُوْنَهُ فَوْقِيْ وَأَعْيُنُهُمْ تَجْرِي
عَفَى اللهُ عَنِّيْ يَوْمَ أُنْزَلُ ثَاوِيًا *** أَأَزَارُ فَلَا أَدْرِيْ وَأَجْفَا فَلَا أَدْرِي
আমি যেন দেখতে পাচ্ছি, বন্ধুগণ কবরের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে,
তারা আমার ওপরে জড়ো হয়ে আছে আর তাদের দৃষ্টি এদিক-সেদিক ঘুরছে।
যেদিন আমি গোরের আঁধারে নামব, আল্লাহ যেন আমায় ক্ষমা করেন,
লোকজন আমার জিয়ারতে আসবে, একসময় এই ভিড়ও ফুরিয়ে যাবে,
অথচ আমি তার কিছুই জানব না।
১৯. মুহাম্মাদ বিন বুকাইর এই পঙ্ক্তি দুটি আবৃত্তি করেন,
يَا سَاعَةَ الْقَبْرِ أَيْنَ زُوَّارِي ... إِذَا تَخَلَّيْتُ بَيْنَ أَحْجَارِي
يَهْجُرُ ذِكْرِيْ وَيَحْتَمِي وَطَنِيْ *** وَتَنْقَضِيْ مُدَّتِيْ وَإِيْثَارِي
হায়! কবরের দিনকাল! দর্শনার্থীরা আজ কোথায়?
পাথরের আড়ালে নিঃস্ব হতেই তারা হারিয়ে গেল কোথায়?
আমার আলোচনা পরিত্যক্ত হয়েছে, ভিটেমাটি স্মৃতিহীন হতে চলেছে,
আমার স্বর্ণসময় আর স্বার্থহীন আলোচনা মলিন হতে চলেছে।
২০. মুহাম্মাদ বিন উবাইদ বিন সুফিয়ান কিছু পঙ্ক্তি আবৃত্তি করে শুনিয়ে বলেন, আবুস সামহি আত-তাঈ তাকে এই পঙ্ক্তিমালা শুনিয়েছেন,
إِذَا أَصْحَابُ وَدِّي وَدَّعُونِي *** وَرَاحُوا وَالْأَكُفُ بِهَا غُبَارٌ
مُقِيمٌ لَا يُجَاوِرُنِي صَدِيقٌ *** بِأَرْضٍ لَا أَزُورُ وَلَا أَزَارُ
فَذَاكَ النَّأْيُ لَا الْهِجْرَانُ *** شَهْرًا وَشَهْرًا ثُمَّ تَجْتَمِعُ الدِّيَارُ
আমাকে কবরে রেখে ধূলিমলিন হাতে ফিরে যাবে উপত্যকাবাসী,
আমার স্থায়ী সঙ্গী হবে না কেউ, এখানে একে অপরের সাক্ষাৎও আদৌ সম্ভব নয়।
সেখানে সাক্ষাতের কোনো ব্যবস্থা নেই, নয় তা দূর প্রবাসের জীবন,
যেখানে কিছুদিন পর হলেও স্বজনের দেখা পাওয়া যায়।
২১. হুসাইন বিন আবদুর রহমান হুদবাহ বিন খাশরাম উযরি-এর নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করেন,
أَلَا عَلِّلَانِي قَبْلَ نَوْحِ النَّوَائِحِ *** وَقَبْلَ اضْطِلَاعِ النَّفْسِ بَيْنَ الْجَوَانِحِ
وَقَبْلَ غَدٍ يَا وَيْحَ نَفْسِي مِنْ غَدِ *** إِذَا رَاحَ أَصْحَابِي وَلَسْتُ بِرَائِحِ
إِذَا رَاحَ أَصْحَابِي تَفِيضُ دُمُوعُهُمْ *** وَغُودِرْتُ فِي أَرْضِ لَحْدٍ عَلَى صَفَائِح
يَقُولُونَ هَلْ أَصْلَحْتُمْ لِأَخِيكُمْ *** وَمَا الْقَبْرُ فِي أَرْضِ الْفَضَاءِ بِصَالِحِ
হায়! বিলাপের সুর ওঠার আগেই কত লোক আমাকে ভুলে বসেছে!
অন্যের কাঁধে চড়ার আগেই তারা আমাকে ভুলে গিয়েছে!
আফসোস! আগামী প্রভাতের আগেই আমি বিস্মৃত হয়েছি!
বন্ধুরা ফিরে গেলেও আমি একলা পড়ে আছি!
অশ্রুসজল চোখে প্রিয়দের মাহফিল ফিরে গেছে হায়!
আমি তো মাটিতে চাপা পড়ে আছি, একাকী অসহায়!
তারা বলছে, তোমরা কি বন্ধুর জন্য ভালো কিছু করেছ?
কবরের এই নির্জন শূন্যতা মোটেও ভালো কিছু নয়।
২২. আবু ইসহাক বলেন, এক ব্যক্তির সাথে আমার পঞ্চাশ বছরের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তার মৃত্যুর পর আমি জানাযায় অংশগ্রহণ করি। তাকে দাফন করে মাটি সমান করে দেওয়ার পর লোকজন চলে গেল। আমি কয়েকটি কবরের পাশে গিয়ে বসলাম। আমি ভাবতে লাগলাম, এই কবরবাসী লোকজন একদিন এই দুনিয়াতে ছিল। একে একে তাদের সকলেই বিদায় নিয়ে আজ কবরের বাসিন্দা হয়েছে। ভাবতে ভাবতে আমি আবৃত্তি করতে লাগলাম,
سلام على أهل القبور الدوارس *** كأنهم لم يجلسوا في المجالس
ولم يشربوا من بارد الماء شربة *** ولم يأكلوا من بين رطب ويابس
কবরবাসীর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক, তারা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়েছে,
যেন কোনোদিন কোনো বৈঠকে তারা আসন পাতেনি।
কখনো ঠান্ডা পানীয়তে ঠোঁট ছোঁয়ায়নি,
তাজা বা শুষ্ক খাবারের স্বাদ নেয়নি。
তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! এর পরে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসল; আর আমি ভারাক্রান্ত মনে সেখান থেকে উঠে আসলাম।
২৩. আহমাদ বিন ইয়াহইয়া বালাজুরী আবৃত্তি করেন,
استعدي للموت يا نفس واسعي *** لنجاة فالحازم المستعد
قد نبئت أنه ليس للحي *** خلود ولا من الموت بد
আন্তু তাসহীন্ ওয়াল হাওয়াদ্ লা *** তাসহু ওয়া তাওল্লাহীন্ ওয়াল মানাইয়া তাজিদ্
ইন্নামা আংতু মুস্তায়ান মা সাওফা *** তার্দীন্ ওয়াল আওয়ারী তারুদ্দু
লা তুরজ্জিল বাক্বা ফি মা'দিনিল মাউত *** ওয়াদ্দারু হুক্কুহা লিকা ওয়ার্দ
আইয়ু মাল্কিন ফিল আরদি আও আইয়ু হাজ্জ *** লিমরিইন হাজ্জুহু মিনাল আরদ্বি লাহাদ্দু
কাইফা তুহিনী আমরাওঁ ওয়াল লিজাজাতান *** আইয়ামু আলাইহিল আনফাসু ফিহা তুয়াদ্দু।
প্রিয় মন, মরণের জন্য প্রস্তুত হও, মুক্তির পথ খুঁজে বের করো।
তুমি তো ভালো করেই জানো যে, এখানে কেউ স্থায়ী নয়।
তুমি হয়তো ভুলের ঘোরে আছ, মৃত্যুকে আসলে এড়ানো যায় না।
মৃত্যু, সে তো আসবেই, এই যন্ত্রণা মোটেও ভুল করবে না।
তুমি তো কেবল ঋণ করে আনা প্রাণ, অচিরেই যাকে ফিরিয়ে দিতে হবে।
মরণশীল এই উপত্যকায় টিকে থাকার আশা কোরো না,
এখানে তোমার স্থায়ী কোনো আবাস নেই।
এই বিশাল জগৎ-সংসারে তোমার বলে কিছু থাকলে তা হলো, কবর।
সামান্য কিছু নিঃশ্বাসের মালিকানা পেয়ে কীভাবে এত রং-তামাশা করে বেড়াও。
২৪. আবু জাফর কুরাইশী (রহঃ) আবৃত্তি করেন,
আ'তায়া আনী আদ-দুনিয়া ওয়া আংতা বাসীর *** ওয়া তাজহালু মা ফিহা ওয়া আংতা খাবীর
ওয়া তাসবাহু তাবনীহা কাআন্নাকা খালিদ *** ওয়া আংতা গাদাও আম্মা বানাইতা তাসীর
ফালাও কান ফিহা লিয়াল্লাজী আংতা আরিফ *** লাকাদ কান ফীমা কাদ বালুতু নাযীর
মাতা আবসারত আইনাকা শাইয়ান ফালাম *** ইয়াকুন লাহু মুখবিরুন আন্নাল বাক্বা ইয়াসীর
ফাদুনাকা ফাসনাউ কুল্লামা আংতা সানিউ *** ফা ইন্না বুয়ুতাল মায়্যিতীনা কুবুর।
এত বিচক্ষণ হয়েও তুমি অন্ধের মতো কাজ করে যাচ্ছ?
সব জেনেও এমন বোকার মতো আচরণ করছ!
জমিনের বুকে এমনভাবে চলছ যেন এখানেই থেকে যাবে চিরকাল!
অথচ আগামীকালই এসব ছেড়ে তোমায় চলে যেতে হবে।
গভীর ভাবনায় বসে যদি ভেবে দেখো,
এই জগতের সবকিছুতেই তুমি কবরের সতর্কবার্তা খুঁজে পাবে।
অতএব যা করার জলদি করে নাও,
মৃত্যুর পর কবরই সকলের মূল ঠিকানা.**
২৫. ইমাম দিনওয়ারী বলেন, আহমাদ বিন আবদান আযদী আমাকে আবৃত্তি করে শোনান,
تناجيك أجداث وهن سكوت *** وسكانها تحت التراب خفوت
أيا جامع الدنيا لغير بلاغة *** لمن تجمع الدنيا وأنت تموت
নিথর নিস্তব্ধ দেহগুলো চুপিসারে তোমাকে ডেকে বলে,
সমাধির অন্তরালে তাদের নীরব অবস্থান তোমাকে ডেকে বলে,
হে বল্লাহীন বিত্ত বৈভবের মালিক, কার জন্য তুমি এসব জড়ো করছ?
তুমি তো মরেই যাবে!**
২৬. আবু আলী আল ওয়াররাক আবৃত্তি করেন,
ذوي الود من أهل القبور عليكم *** السلام أما من دعوة تسمعونها
ولا من سؤال ترجون جوابه إلينا *** ولا من حاجة تطلبونها
سكنتم ظهور الأرض حينا بشرة **** فما لبثت حتى سكنتم بطونها
وخليتم اللذات فيها لأهلها *** وكنتم زمانا تعبدون فتونها
وكنت أناسا قبلنا مثل ما نرى *** تظنون بالدنيا وتستحسنونها
وكم صورة تحت التراب لسد *** وكان حريصا جاهدا أن يصونها
وما زالت الدنيا محل ترجل *** نخوش المنايا سهلها وحزونها
وقد كان للدنيا قرون كثيرة *** ولكن سريب الدهر أتى قرونها
وللناس أجال قصار ستنقضي *** وللناس أرزاق سيستكملونها.
কীট-পতঙ্গের পেটে যাওয়া কবরবাসীর প্রতি রহমত নাযিল হোক,
আমাদের শত হাঁকডাকে তাদের আজ কিছুই যায় আসে না।
হায়! আজ আর কোনো প্রশ্নের উত্তর আশা কোরো না তোমরা,
সুযোগ নেই চেয়ে-চিন্তে কিছু লুফে নেওয়ার।
একসময় এই তল্লাট তোমাদের আভিজাত্যে মুখরিত ছিল,
গহিন কবরের নিকষ আঁধারে আজ কী অবস্থা? বলো!
দুনিয়ার জীবনে প্রিয়জন নিয়ে আনন্দ-উল্লাস করেছ,
দিনের পর দিন প্রবৃত্তির আনুগত্যে বুঁদ হয়ে ছিলে,
ঠিক যে জীবন আজ আমরা কাটিয়ে যাচ্ছি।
তোমরা তখন সাময়িক সমৃদ্ধির নেশায় মাতাল ছিলে,
আর আজ? কবরজগতে বিপদাপদের কোনো ইয়ত্তা নেই!
অথচ তখন দুনিয়া রক্ষার বিধ্বংসী লোভ তোমাদের পেয়ে বসেছিল।
এই দুনিয়া এক বহুরূপী গিরগিটি, কারও থাকার জায়গা নয়,
এখানে যত সুখ-দুখ, মৃত্যুই তার শেষ পরিণাম।
জমিনের বুক হলো মানবগোষ্ঠীর একমুখী যাত্রাপথ মাত্র,
সময়ের বিবর্তনে এখানে যাত্রীদলের পরিবর্তন ঘটে থাকে।
মানুষের সেই যাত্রাও খুবই অল্প সময়ের, দেখতে-না-দেখতেই শেষ!
আর পাথেয় রিজিকও সীমিত, দ্রুত ফুরিয়ে আসার মতো.**
২৭. মুহাম্মাদ বিন মুগীরা তামীমী বলেন, মদীনায় এক ব্যক্তির মৃত্যু হলো। লোকটির পিতা পুত্রশোকে খুবই শোকাহত ছিলেন। ঘুমের মধ্যে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, কে যেন বলছে, আপনি আপনার সন্তানের কবরে এসে তাকে বিদায় জানিয়ে যান। ঘুম ভাঙতেই লোকটি ঘর থেকে বের হয়ে ছেলের কবরের দিকে চললেন। লোকটি কবি ছিলেন না। তবুও সন্তানের কবরের সামনে দাঁড়াতেই ভারাক্রান্ত মনে বলে উঠলেন,
يا صاحب القبر الذي قد استوى *** هيجت لي حزنا على طول البلى
حزنا طويلا يا بني ما انقضى *** ولم أغمض من دهاني ما دهى
حذار ما حدث مما قد سقى **** من غصص الموت وغم قد نوى
وضغطة القبر الذي فيها الأذى
হে সমতল কবরবাসী, বিরাট দুশ্চিন্তা জাগিয়ে তুমি বিদায় নিয়েছ,
বেটা, এই সমস্যাও একদিন শেষ হবে, কষ্ট শেষে যখন সুখের নিদ্রা আসবে।
হায়! মৃত্যুর ফরমান এসে একদিন, যাবতীয় বেদনার ইতি টানবে,
আসল দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা? সে তো কবরের কষ্টে নিহিত।
কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি ফিরে আসতে উদ্যত হলে পেছন থেকে আওয়াজ আসল,
اسمع أحدثك بائن قد أضى ... بخبر أوضح من ضوء الضحى
في غصص الموت وغم قد جلا *** وفرح لقيه بعد الرضى
القول بالتوحيد فينا قد خلا *** أتيت من ذاك جزيلا وغنى
جنات فردوس رضى للفتى **** يدعون فيها ناعما بما اشتهى
শুনুন, দিনের আলোর মতোই পষ্ট ভাষায় বলছি,
মৃত্যুর যাতনা আর দুর্ভাবনা কাটিয়ে আনন্দ ও তৃপ্তিময় প্রাপ্তির সুসংবাদ দিচ্ছি।
তাওহীদের পুঁজি নিয়ে আসতে পারলে এখানে ঐশ্বর্যের দেখা মিলবে,
প্রতিশ্রুত নিআমাত ফিরদাউসের উত্তরাধিকারহীন মালিকানা মিলবে।
এই পর্যন্ত বলে আওয়াজটি থেমে গেল। বৃদ্ধ লোকটিও ফিরে আসলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছেলেকে নিয়ে আর কোনো দুশ্চিন্তা করেননি।
২৮. মুহাম্মাদ বিন আবদুল কারীম রাযী বলেন, আমি আইদ বিন শুরাহীল -এর কাছে শুনেছি আবদুল্লাহ বিন মুবারক বলেন,
إن الذي قد زين الأباعدا *** والأقربين صاعدا فصاعدا
عساك يوما تذكر الملاحدا *** يامن يرجي أن يكون خالدا
شربت فاعلمه حديدا باردا *** لا بد تلقى طيبا وزائدا.
অকালেই যারা দূরের ও কাছের লোকজনকে সমাহিত করে এসেছে,
মনে রেখো, তোমার সময় ঘনিয়ে এসেছে, কবরকে স্মরণ করার।
আর হে সমাহিত, যাকে চিরতরে কবরের আঁধারে রেখে আসা হয়েছে,
মৃত্যু তোমার জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় এক শীতল ও পবিত্র পানীয়।
অতএব, সানন্দে একে গ্রহণ করে নাও。
টিকাঃ
১২৭. হিলইয়াতু আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৫/৩১৮。
১১৮. তারীবু দিমাশক, ৩২/৩২১, ৩২২。
১২৯. মুজামুশ শুআরা, ১/৪৩২。
১৩২. দিওয়ানু আবিল ইতাহিয়ায়হ, ৭৬。
১৩৩, দিওয়ানু ফারাযদাক, ২/৩১。
১৩৪. ইয়াহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ৪/৪৮৭। মুরাকাবা ও মুহাসাবা অধ্যায়। ইমাম গাযালীর সনদে ইমাম বালাজুরীও তা বর্ণনা করেছেন। আনসাবুল আশরাফ, ১২/৭৭। ফারাযদাক অধ্যায়。
১৩৫. মুহাযারাতুল উদাবা, ২/৫১৯。
১৩৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৪২。
১৩৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৪২。
১৩৮. আহওয়ালুল কুবুর, ১৪২। আত-তাওয়াবীন, ১২৬। বর্ণনা নং ৭৮。
১৩৯. নুমান ইবনুল মুনজির বিন মুনজির বিন ইমরাউল কায়িস। আনুমানিক ৫৮২-৬০২ বা তারও কিছু বেশি সময় তিনি হীরা অঞ্চলের শাসক ছিলেন। ইরাকের বিখ্যাত নুমানিয়া শহরের গোড়াপত্তন করেন। আল-আলাম (খাইরুদ্দিন যারকালী), ৮/৪৩, ৪৪。
১৪০. আদী বিন যায়িদ বিন হাম্মার আব্বাদী তামীমী। জাহিলী যুগের একজন কবি। ইরাকের হীরা অঞ্চলের অধিবাসী। ১০১-১১০ হিজরির মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তারীখুল ইসলাম (যাহাবী), ৩/৯৯। ব্যক্তি নং ১৭৫。
১৪১. জাহিলী যুগে শাসকশ্রেণির জন্য এই দুআ করা হতো。
১৪২, তারীখু দিমাশক, ৪০/১০৬। কোথাও কোথাও শব্দের ভিন্নতা রয়েছে。
১৪৩. তারীখু দিমাশক, ৪০/১২৪১。
১৪৪. আহওয়ালুল কুবুর ১৫৮。
১৪৫. মজমুআতুল কাসায়িদিয যুহদিয়্যাত, ২/৩৫৬。
১৪৬. তাফসীরু ইবনি কাসীর ৬/৩১১। সূরা লুকমান, (৩১): ৩৪ এর ব্যাখ্যাতে। তারীখু দিমাশক, ৩৪/৪৮১, ৪৮২। এ ছাড়া ভিন্ন সনদে রয়েছে: আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৯/২০৫। ১০১ হিজরির আলোচনায়। হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৫/৩১৮। উমর বিন আবদুল আযীয অধ্যায়。
১৪৭. আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ৬/১৫৩。
১৪৮. তারীখু দিমাশক, ৬৩/৩০, ৩১。
১৪৯. শরহু দিওয়ানিল হিমাসাহ লিত তাবরিযী, ২/৮৪。
১৫০. দিওয়ানু হুদবাহ বিন খাশরাম, ২/২。
১৫১. দিওয়ানু আবুল ইতাহিয়াহ, ১১২。
১৫২. তারিখু দামিশক, ৬/৭৫। বাগিয়্যাতুত্তালাব ফি তারিখি হালাব, ৩/২২২。
১৫৩. তারীখু দিমাশক, ৪১/৪৬৮; আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ৩/১১৪。
১৫৪. আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ৩/২৭৫; মিনহাজুল ইয়াকীন শরহু আদাবিদ দুনিয়া ওয়াদ দীন, ৫৭৯。
১৫৫. তারীখু দিমাশক, ২৭/৪০২; মাজমুআতুল কাসাইদি ওয়ায যাহদিয়্যাত, ২/২৯০। শব্দের ভিন্নতা রয়েছে。
১৫৬. আল হাওয়াতিফ, ৫৮। বর্ণনা নং ৫৭。
১৫৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৫。
১. উমর বিন যর বলেন, মাইমুন বিন মিহরান বলেন, একবার আমি খলীফা উমর বিন আবদুল আযীয-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বিখ্যাত কবি সাবিক বারবার-কে দেখতে পেলাম। তিনি খলীফাকে নিচের পঙ্ক্তিতিমালা শোনালেন,
فكم من صحيح بات للموت آمنا *** أتته المنايا بغتة بعد ما هجع
فلم يستطيع إذا جاءه الموت بغتة *** فرارا ولا منه بقوته امتنع
فأصبح يبكيه النساء مقنعا *** ولا يسمع الداعي وإن صوته رفع
وقرب من لحد فصار مقيله *** وفارق ما قد كان بالأمس قد جمع
فلا يترك الموت الغني لماله *** ولا معدما في المال ذا حاجة يدع
ঘুমের ঘোরেই ঝরে গেছে কত যে সুস্থ প্রাণ!
ডাক এসেছে ঘুমের মাঝেই, ছিড়েছে পিছুটান।
অমোঘ হুকুম যেতেই হবে, পালিয়ে বাঁচার সুযোগ নেই,
পেশির বলে যায় না রোখা, এমন মুরোদ কারোরই নেই।
বিলাপী নারীর আর্তনাদে জেনেছে পড়শি বাড়ি,
তার আওয়াজে জাগেনি কেউ, শব্দে যে তার আড়ি।
শোকের অশ্রু চোখে রেখেই দিয়েছে সবাই কবর,
পরের দিনই ভুলে গেছে, নেয়নি কেউ খবর।
ধনে মানে মরণবানে ছাড়বে না যে কভু,
নিঃস্ব গরিব সবাই যাবে, দিয়েছে বেঁধে প্রভু।
কবিতা শুনে খলীফা আফসোস করতে লাগলেন। কাঁদতে কাঁদতে একসময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলেন। অতঃপর আমরা সেখান হতে উঠে আসলাম。
২. কবি ইবনু আবি উমরাহ বলেন,
يا أيها الذي قد غره الأمل *** ودون ما يأمل التنغيص والأجل
ألا ترى إنما الدنيا وزينتها *** كمتولي الركب دارا ثم ارتحل
حتوفها رصد وعيشها نكد *** وصفوها ريق وملكها دول
يظل يفزع بالروعات ساكنها *** ما أن.... لين ولا له جزل
كأنه للمنايا والردى عرض **** تظل فيه بنات الدهر تنتقل
والمرء يشقى بما يسعى لوارثه **** والقبر وارثه ما يسعى له الرجل.
ধূলির ধরায় মিথ্যে মায়ায় দিনগুলো সব যাচ্ছে কেটে,
নিত্যই সব ডুবছে এথা পিছুটানের চোরাস্রোতে।
রঙিন সুখের জগৎজুড়ে বলব কী আর হায়!
আপন মনে নিবাস গড়ে সবাই চলে যায়।
নগদ সুখের সদাই করে, বাকির খাতায় হায় অপমান,
জগৎ জয়ের মাতাল নেশায় দিন ফুরোলে হয় বিরান।
আশার ঘরে শঙ্কা জাগায়, ঘোর বিপদের ডঙ্কা বাজায়,
হেঁচকা টানে সুখের ঝালর ছিন্ন করে বেদনা জাগায়।
শেষ হিসেবের ধ্বংস পানে, নিচ্ছে টেনে দমে দমে,
ঘড়ির কাটায় সন্ধি পেতে আসছে মরণ প্রতিক্ষণে।
ইহজীবনে যা জমেছে, ষোলো আনা হায় পরের তরে,
ওপারেতে নেই কিছু আজ, সঙ্গী কেবল শূন্য থলে。
৩. প্রখ্যাত কবি আবুল ইতাহিয়া -এর ছেলে তার একটি কবিতা আবৃত্তি করেন,
لربما غوفص ذو عزة ... أصح ما كان ولم يسقم
يا واضع الميت في قبره ... خاطبك القبر فلم تفهم
বেঘোর পাপের নেশায় ডুবে হারিয়ে গেছে কত প্রাণ!
সুস্থ দেহ, সুস্থ মনেই পড়েছে তার সুতোয় টান।
কবর খুঁড়ে আজকে যারা আসছ রেখে আপনজন,
তোমাকেও ডাকছে কবর, তা বুঝে আর কতজন?
৪. মুহাম্মাদ বিন আবুল ইতাহিয়াহ বলেন, আমার পিতা আরও বলেন,
إني سألت الثرى ما فعلت بعدي ... وجوه فيك منعفرة
فأجابني صيرت ريحهم ... يؤذيك بعد روائح عطرة
وأكلت أجسادا منعمة ... كان النعيم يهزها نضرة
فما بقي غير جماجم عز منه ... بيض تلوح وأعظم نخرة.
প্রশ্ন করেছি কবরের মাটিকে, প্রিয়জনের কী খবর?
কেমন ছিলে প্রিয়মুখের সাথে, হে আঁধার কবর!
কবর শুধায়, সুবাস ছড়ানো কোমল সে দেহের,
সবটুকুই নিয়েছি শুষে, রেহাই মিলেনি কোষের।
ঝলমলে সে চাঁদমুখখানি ধুলোয় করেছি মলিন,
কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়ে বিবর্ণ করেছি, অবস্থা আজ কঠিন।
অস্থি মজ্জাহীন সে করোটি আজ পড়ে আছে অসহায়,
পচে-গলে সব মিটে গেছে আজ, মিলিয়েছে সব হাওয়ায়।
কবরখানি ডাকছে তোমায়, আজকে তুমি নির্বিকার,
সেদিন তোমায় পুছলে এসব, বলো না ফের দুর্বিচার!
আঁধার মুখে ছুটছ তুমি, ভালো-মন্দ নেই খবর,
এসব কিছুর বৈধতা কী? পুছবে যখন কবর-ঘর?
আঁধার-ঘরে একলা রবে, সেদিন তোমার উপায় কী?
আজকে যারা নিত্য পাশে, তারাও সেদিন থাকবে কি?
মুহাম্মাদ বিন আবুল ইতাহিয়াহ বলেন, এক ব্যক্তি জনৈক বিচারকের নিকট এই পঙ্ক্তিমালা পাঠ করেন। কবিতা শুনে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। বললেন, তুমি তাকে যেমন দেখছ সে কি তা বলবে?
৭. সুফিয়ান বিন হুসাইন বলেন, বিখ্যাত আরব কবি ফারাযদাকের স্ত্রী নাওয়ার বিনতু আইয়ান বিন যুবাইআহ বিন ঈকাল মুজাশিঈ যখন ইনতিকাল করেন, হাসান বসরী তার জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। দাফন শেষ করে কবি ফারাযদাক মাটি ঝেড়ে উঠে দাঁড়ান এবং নিচের পঙ্ক্তিমালা আবৃতি করেন,
أخاف وراء القبر إن لم تعافني *** أشد من القبر التهابا وأضيقا
إذا جاءني يوم القيامة قائد عنيف *** وسواق يسوق الفرزدقا
لقد خاب من أولاد آدم من مشى *** إلى النار مغلول القيادة أزرقا
ইয়া রব, আপনার ক্ষমা না পেলে কবরের ওপারে আমার ভয়ের অন্ত নেই,
মাগফিরাতহীন কবর যে অগ্নিশিখা ঘেরা এক সংকীর্ণ ভয়ের ঘর।
হাশরের মাঠে কপর্দকহীন ফারাযদাক পথহারা পথিকের মতো ঘুরে বেড়াবে।
জাহান্নামের পথে ছিটকে পড়া আদমসন্তানের চোখে-মুখে,
সেদিন বিষাদের নীল ছাপ ফুটে উঠবে।
কবিতা শেষ করে ফারাযদাক বলে উঠলেন, আল্লাহর শপথ! সেদিন সকল মানুষই কাঁদবে!
হাসান বসরী বললেন, সেদিন তারা কী বলবে?
ফারাযদাক বললেন, তারা বলবে, তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো মানুষ ছিলে। আর আমি ছিলাম সবচেয়ে খারাপ!
হাসান বসরী বললেন, আমি যেমন সবচেয়ে ভালো মানুষ নই। তুমিও সবচেয়ে খারাপ মানুষ নও।
আচ্ছা, সেদিনের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করছ?
ফারাযদাক বললেন, সত্তর বছর যাবৎ 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর সাক্ষ্য প্রস্তুত রাখছি।
হাসান বসরী কোনোরকম চিন্তাভাবনা না করে এই আমল চালিয়ে যাও।
৮. আবু আলী নিম্নোক্ত পঙ্ক্তিমালা আবৃতি করেন,
هالوا عليه الترب ثم انثنوا *** عنه وخلوه وأعماله
لم ينقض النوح من داره **** عليه حتى اقتسموا ماله
কবরে মাটি দিয়ে, মৃতকে আমলের হাতে সঁপে অন্যত্রে ধ্যান দিয়েছে সকলেই।
শুরু হয়ে গেছে উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্ব!
মায়াকান্নার বিলাপ দুয়ার পেরোতেই।
৯. রিয়াশি আব্বাস ইবনুল ফারায নিচের পঙ্ক্তিমালা আবৃতি করেন,
تهيج منازل الأموات وجدا *** ويحدث عند رؤيتها اكتئاب
منازل لا تجيبك حين تدعو *** وعز عليك أنك لا تجاب
মৃত লোকদের বাসস্থান তোমায় আলোড়িত করে ছাড়বে,
তাদের জিয়ারত তোমার মাঝে উদাসী ভাব এনে দেবে।
এখানে শত আহ্বানে মিলবে না সাড়া, শুধু নীরবতা,
বিপদের কালো ছায়াতেও এখানে বিরাজ করে রাজ্যের নিস্তব্ধতা。
১০. ইবরাহীম বিন উরমাহ ইস্পাহানী রিয়াশি-এর উদ্ধৃতি দিয়ে নিচের পঙ্ক্তিটি আবৃত্তি করেন,
وكيف يجيب من ندعوه ميتا *** تضمنه الجنادل والتراب
আমরা যাকে মৃত বলে ডেকে থাকি, তার আবার সাড়া দেয়ার উপায় থাকে কীভাবে?
সে তো আজ মাটি ও পাথরে মিশে জড় পদার্থ হয়ে গিয়েছে!
১১. ইবরাহীম বিন উরমাহ ইস্পাহানী নিচের পঙ্ক্তিমালা আবৃতি করেন,
مقيم إلى أن يبعث الله خلقه *** لقاؤك لا يرجى وأنت قريب
تزيد بلى في كل يوم وليلة *** وتنسى كما تبلى وأنت حبيب
মৃত লোকজন পড়ে থাকবে আঁধার কবরের কোলে,
জাগবে সেদিন, ডাকবে যেদিন মহান রবের দরবারে।
আমাদের জিয়ারত শুধু মাটির সাক্ষাতে শেষ হয়,
সাধ্যি কার অদৃশ্য এ আড়াল করতে পারে ক্ষয়?
উদয়-অস্তে বেড়ে চলে কেবল জীর্ণতার ইতিহাস,
ঠিক যেভাবে ভুলে যাচ্ছে বন্ধু, স্বজন ও সমাজ।
১২. আমর বিন জারির বাজালী বলেন, তোমরা কি জানো, বাদশাহ নুমান বিন মুনজির কখন তাওবা করার ইচ্ছা করেছিলেন? সবাই বলল, না। তিনি বললেন, একদিন নুমান ইবনুল মুনজির খোশমেজাজে শিকারের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলেন। তিনি হীরা শহরের মধ্যভাগে অবস্থিত একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে তিনি কিছুক্ষণ অবস্থান করেন। তখন বিখ্যাত কবি ও দার্শনিক আদি বিন যায়িদ তাকে বললেন, সকল অকল্যাণ বিদূরিত হোক! আপনি কি জানেন, এই কবরগুলো কী বলে? তিনি বললেন, না। আদী বললেন, কবরবাসী বলে,
يا أيها الركب المحيون على الأرض محدون
كما أنتم كنا وكما نحن تكونون
জমিনের বুকে ঘুরে বেড়ানো সীমাবদ্ধ লোকসকল!
তোমরাও একদিন আমাদের মতো হয়ে যাবে,
যেমন আমরা একদিন তোমাদেরই মতো ছিলাম!
এ কথা শুনে নুমান বললেন, পঙ্ক্তিটি আমাকে আবার শোনান। সে আবার তা শোনাল। নুমান বিন মুনজির ভগ্ন হৃদয়ে ঘরে ফিরে গেল। আরেকদিন তিনি ঘর থেকে বের হয়ে সমাধিস্থলে আসলেন। আদী বিন জায়িদ বললেন, সকল অকল্যাণ বিদূরিত হোক! আপনি কি জানেন, এই কবরগুলো কী বলে? তিনি বললেন, না। আদী বললেন, কবর বলে-
رب ركب قد أناخوا حولنا *** يشربون الخمر بالماء الزلال
ثم بادوا عصف الدهر بهم *** وكذاك الدهر حال بعد حال
আমাদের চারপাশে কত সওয়ারি তার উট হাঁকিয়ে বেড়ায়!
সুপেয় পানিতে শরাব মিশিয়ে নেশার জগতে হারিয়ে যায়।
অতঃপর কালের ঘূর্ণিপাকে একদিন নিঃশেষ হয়ে থেমে যায়,
এভাবেই যুগের পর যুগ পাল্টাতে থাকে।
বাদশাহ বললেন, পঙ্ক্তি দুটি পুনরাবৃত্তি করুন। আদি তা-ই করলেন। অতঃপর বাদশাহ নুমান বিন মুনজির (পৌত্তলিক ধর্ম ছেড়ে তৎকালীন সঠিক দ্বীন) খ্রিষ্টধর্মের দীক্ষা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন। তিনি খ্রিষ্টান অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেন।
১৩. উসমান বিন উমর তাইমী উবাইদুল্লাহ বিন উমর বিন হাফস হতে কিছু পঙ্ক্তি শোনেন। তিনি তাকে বলেন, তোমার ভাতিজার জন্য পঙ্ক্তিগুলো লিখে দাও। উবাইদুল্লাহ সেগুলো লিখে দিলেন। যা নিম্নরূপ:
أمم قبلنا خلت وقرون *** قوم موسى منهم بنوا إسرائيل
نقبوا في البلاد من حذر الموت *** وجالوا على الأرض كل مجال
ثم صاروا إلى التي خلقوا منها *** فأضحوا من التراب الهال
هل تراه يبقى عليهم مسح *** فايح فاه للصبا والشمال.
আমাদের পূর্বে কত শতাব্দী আর উম্মাহ অতীত হয়েছে
মুসা -এর জাতি বনী ইসরাঈল ছিল তাদেরই একদল।
মৃত্যুর হাত থেকে পালিয়ে বেড়াতে তারা নগরে-বন্দরে ঘুরেছে!
কত প্রান্তর চষে বেড়িয়েছে এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বুক বেঁধে।
অবশেষে সৃষ্টির শুরুতেই ফিরে গিয়েছে তারা,
স্তূপীকৃত মাটিই হয়েছে তাদের শেষ পরিণতি।
আজ কি তোমরা তাদের কোনো চিহ্নটুকু দেখতে পাও?
হায় আফসোস! অফেরতযোগ্য শৈশব ও বাকি সময়ের জন্যে!**
১৪. হামিদ বিন আহমাদ বিন উসাইদ বলেন, একদিন আমি আলী বিন জাবালাহ-এর হাত ধরে কবি আবুল ইতাহিয়া-এর সাথে দেখা করতে গেলাম। তিনি তখন হাম্মামে গোসল করছিলেন। আমরা তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ইতিমধ্যে সেখানে ইবরাহীম বিন মুকাতিল বিন সাহাল এসে উপস্থিত হলেন। তিনি দেখতে বেশ সুদর্শন ছিলেন। কবি আবুল ইতাহিয়া বেশ মনোযোগ সহকারে তাকে দেখে এই পঙ্ক্তিটি আবৃত্তি করেন,
يا حسان الوجوه سوف تموتون *** وتبلى الوجوه تحت التراب
হে সুদর্শন, খুব শীঘ্রই মৃত্যু তোমায় গ্রাস করে নেবে,
তোমার এই নিটোল দেহ একদিন মাটির নিচে হারিয়ে যাবে।
আবুল ইতাহিয়া-এর পঙ্ক্তি শুনে আলী বিন জাবালাহ এগিয়ে এসে বললেন, আমার পক্ষ হতে দুই লাইন লিখে রাখো,
يا مربي شبابه للتراب سوف *** تلهوا البلى بغض الشباب
يا ذوي الأوجه الحسان المصونات *** وأجسامها الغضاض الرطاب
হে সতর্ক যৌবনের অধিকারী! সুস্থ-সুদর্শন গড়নের গর্বিত মালিক!
শীঘ্রই যৌবনের এই সবুজ সৌরভ ফুরিয়ে তুমি ধুলোয় মিশে যাবে।
এবার আবুল ইতাহিয়া বললেন, হে হামিদ, তুমি কিছু বলো। বললাম, আপনার সাথে আর আবুল হাসানের সাথে মিলিয়ে বলব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম,
أكثروا من نعيمها وأقلوا *** سوف تهدونها لعفر التراب
قد نعتك الأيام نعيا صحيحا *** بفراق الإخوان والأصحاب
نعموا الأوجه الحسان فما *** صونكوها إلا لعفر التراب
ولبسوا ناعم الثياب ففي *** الحفرة يعرون من جميع الثياب
قد ترون الشباب كيف يموتون *** إذا استنصروا بماء الشباب
যৌবনের এই কম-বেশি নিআমত অচিরেই ধুলোয় ধূসরিত হবে,
তুমিহীন সে দিনগুলো প্রিয়জন হয়তো শোকেই কাটিয়ে দেবে।
যৌবনের যে নেশায় আজ মত্ত তুমি, তার শেষ ঠিকানা তো মাটির ঘরে
ঝলমলে পোশাকের আভিজাত্য ছিনিয়ে সেদিন কবরের আঁধারে ছেড়ে আসবে,
যৌবনের তুঙ্গে থাকতেই কত দেহ অকালে বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছে!
১৫. হাসান বসরী থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার সাহাবী উসমান বিন আবুল আস এক জানাযায় অংশ নিলেন। কবরস্থানে গিয়ে তিনি একটি ভাঙা কবর দেখতে পেলেন। এ সময় তিনি তার পরিবারের একজনকে বললেন, দেখো দেখো, তোমার স্থায়ী ঠিকানার দিকে দেখো। লোকটি এগিয়ে এসে দেখে বলল, এ ঘরে তো কোনো দানাপানি আর বিলাস-ব্যবস্থা নেই! তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! এটাই তোমার আসল ঠিকানা। লোকটি বলল, আপনি সত্য বলেছেন। এরপর তিনি সেই কবরের পাশ থেকে ফিরে এসে বললেন, আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আমাকে সেই ঘরে থাকতে হবে।
হাসান বসরী বলেন, এ সময় তাকে নিচের পঙ্ক্তিমালা আবৃত্তি করতে শুনি,
هَلْ عَلَى نَفْسِ امْرِئٍ مَحْزُونُ *** مُوقِنٌ أَنَّهُ غَداً مَدْفُونُ
فَهُوَ لِلْمَوتِ مُسْتَعِدُّ ... لا يَصُونُ الحُطام فيما يصونُ
كُلُّنا يُكْثِرُ الْمَذَمَّةَ لِلدُّنْيا ... وكُلُّ بِحُبِّها مدفون
بأكثر الكنوز إن الذي يكفيك *** ما أكثرت منها الدون
وَتَرَى مَنْ بِهَا جَمِيعًا كَانَ *** قَدْ عَلِقَتْ مِنْهُمُ وَمِنْكَ الرُّهُونُ
أَيْنَ آبَاؤُنَا وَآبَاؤُهُمْ قَبْلُ *** وَأَيْنَ الْقُرُونُ أَيْنَ الْقُرُونُ
إِنَّا لِتِلْكَ الْمَنَايَا وَلَو أَنَّكَ ... فِي شَاهِقِ مِنْ تِلْكَ الْحُصُونِ
كَمْ أُناسٍ كَانُوا فَأَفْنَتْهُمُ الأَيَّامُ *** حَتَّى كَأَنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا
إِنَّ رَأْيَا دَعا إلى طاعة الله *** لرأيا باذل ميمون
আগামীকাল যে দাফন হতে যাচ্ছে, তার কি আর ইহকালীন চিন্তা থাকতে পারে?
সে তো মৃত্যুর প্রস্তুতি নেবে, যার ইতিহাস কেউ রক্ষা করে না।
দুনিয়ার জন্য শত অপমান আমরা গায়ে মাখি, অথচ দুনিয়ার সকল প্রেমিকই আজ কবরে!
বিত্তের পেছনে ছুটে বেড়ালে তোমার জন্য হয়তো কিছুই যথেষ্ট হবে না।
এ ভূমি থেকেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে তারা তোমা হতে তা বন্ধক নিয়েছিল।
কোথায় সে সকল পূর্বপুরুষ আজ, কোথায় প্রজন্মান্তরের সেসব লোকজন?
সুউচ্চ দুর্গের আশ্রয় থাকলেও এই পরিণাম আমাদের কাছে পৌঁছে যাবেই।
সহস্রাব্দের সকল মানুষের জীবনেই এমন একদিন এসেছে,
যেদিন গত হওয়ার পর মনে হয়েছে, তারা আসলে কখনোই এখানে ছিল না।
নিঃসন্দেহে এসব ভাবনা মহান রবের পথে আহ্বান জানায়,
আহ্বান জানায় সৌভাগ্যের পরশমণির প্রতি。
১৬. সুলাইমান বিন আবু শাইখ বলেন, মুহাম্মাদ বিন হাকাম আমাকে কবি আশা হামদান এই পঙ্ক্তিমালা আবৃত্তি করে শোনান,
فَمَا تَزَوَّدَ مِمَّا كَانَ يَجْمَعُهُ *** سِوَى حَنُوطٍ غَدَاةَ الْبَيْنِ مَعَ خِرَقِ
وَغَيْرَ نَفْحَةِ أَعْوَادٍ تُشَبُّ لَهُ *** وَقُلَّ ذَلِكَ مِنْ زَادٍ لِمُنْطَلِقٍ
لَا تَأْسَيِّنَّ عَلَى شَيْءٍ فَكُلُّ فَتًى *** إِلَى مَنِيَّتِهِ سَيَّارُ فِي عَنَقِ
وَكُلُّ مَنْ ظَنَّ أَنَّ الْمَوْتَ يُخْطِئُهُ ** مُعَلَّلُ بَأَعَالِيلَ مِنَ الْحَمَقِ
بِأَيِّمَا بَلْدَةٍ تُقْدَرْ مَنِيَّتُهُ *** إِنْ لَا يُسَيَّرُ إِلَيْهَا طَائِعًا يُسَقِ
শেষ বিদায়ে মানুষের সঞ্চয় বলতে কয়েক প্রস্থ কাপড় আর কিছু সুগন্ধীমাত্র
আর কিছু আগরমিশ্রিত কাষ্ঠ জ্বালিয়ে খুব সামান্য আয়োজনে শুরু হবে দীর্ঘ যাত্রা।
তবে এসব নিয়ে হতাশ হয়ে লাভ নেই, ধীরে ধীরে সকলেই ঠিক সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে,
নির্বোধ ব্যাধিগ্রস্ত হলো সেই ব্যক্তি, যে মনে করে যে, মৃত্যু তাকে ভুলে যাবে!
কোনো শহরে যখন মৃত্যুর ফরমান জারি হয়,
মৃত্যু তার নিজ গতিতে তা প্রদক্ষিণ করে থাকে。
১৭. একই সূত্রে তিনি নিচের পঙ্ক্তিমালা আবৃত্তি করেন,
دار الفجائع والهموم ... ودار البنود والأحزان والشكوى
منا الفتى فيها بمنزل ... إذ صار تحته جيرانها ملقى
يقفوا مساوئها محاسنها ... لا شيء بين المنعى والبشرى
ইহকালের এ জগৎখানি নিকষ আঁধারময়,
বিপদের ঝুঁকি হতে এখানে কেউই মুক্ত নয়।
এ যে দুর্যোগ-দুর্বিপাকের এক কঠিন ঠিকানা,
মন্দা, শঙ্কা আর আর শত অভিযোগের আস্তানা।
এখানে একজন উঁচু তলার বাসিন্দা হয়ে থাকে,
আর তার পদতলে অযুত প্রতিবেশী গুমরে মরে,
এখানে সুখ-দুঃখ কেউ কারও পিছু ছাড়ে না।
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মাঝে এখানে খুব বেশি ফারাকও ধরা পড়ে না।
১৮. বিশর ইবনুল হারিসের ঘনিষ্ঠ সহচর মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান নিচের পঙ্ক্তি দু'টি আবৃতি করেন,
كَأَنِّي بِإِخْوَانِي عَلَى حَافَتَيْ قَبْرِي *** يَهِيْلُوْنَهُ فَوْقِيْ وَأَعْيُنُهُمْ تَجْرِي
عَفَى اللهُ عَنِّيْ يَوْمَ أُنْزَلُ ثَاوِيًا *** أَأَزَارُ فَلَا أَدْرِيْ وَأَجْفَا فَلَا أَدْرِي
আমি যেন দেখতে পাচ্ছি, বন্ধুগণ কবরের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে,
তারা আমার ওপরে জড়ো হয়ে আছে আর তাদের দৃষ্টি এদিক-সেদিক ঘুরছে।
যেদিন আমি গোরের আঁধারে নামব, আল্লাহ যেন আমায় ক্ষমা করেন,
লোকজন আমার জিয়ারতে আসবে, একসময় এই ভিড়ও ফুরিয়ে যাবে,
অথচ আমি তার কিছুই জানব না।
১৯. মুহাম্মাদ বিন বুকাইর এই পঙ্ক্তি দুটি আবৃত্তি করেন,
يَا سَاعَةَ الْقَبْرِ أَيْنَ زُوَّارِي ... إِذَا تَخَلَّيْتُ بَيْنَ أَحْجَارِي
يَهْجُرُ ذِكْرِيْ وَيَحْتَمِي وَطَنِيْ *** وَتَنْقَضِيْ مُدَّتِيْ وَإِيْثَارِي
হায়! কবরের দিনকাল! দর্শনার্থীরা আজ কোথায়?
পাথরের আড়ালে নিঃস্ব হতেই তারা হারিয়ে গেল কোথায়?
আমার আলোচনা পরিত্যক্ত হয়েছে, ভিটেমাটি স্মৃতিহীন হতে চলেছে,
আমার স্বর্ণসময় আর স্বার্থহীন আলোচনা মলিন হতে চলেছে।
২০. মুহাম্মাদ বিন উবাইদ বিন সুফিয়ান কিছু পঙ্ক্তি আবৃত্তি করে শুনিয়ে বলেন, আবুস সামহি আত-তাঈ তাকে এই পঙ্ক্তিমালা শুনিয়েছেন,
إِذَا أَصْحَابُ وَدِّي وَدَّعُونِي *** وَرَاحُوا وَالْأَكُفُ بِهَا غُبَارٌ
مُقِيمٌ لَا يُجَاوِرُنِي صَدِيقٌ *** بِأَرْضٍ لَا أَزُورُ وَلَا أَزَارُ
فَذَاكَ النَّأْيُ لَا الْهِجْرَانُ *** شَهْرًا وَشَهْرًا ثُمَّ تَجْتَمِعُ الدِّيَارُ
আমাকে কবরে রেখে ধূলিমলিন হাতে ফিরে যাবে উপত্যকাবাসী,
আমার স্থায়ী সঙ্গী হবে না কেউ, এখানে একে অপরের সাক্ষাৎও আদৌ সম্ভব নয়।
সেখানে সাক্ষাতের কোনো ব্যবস্থা নেই, নয় তা দূর প্রবাসের জীবন,
যেখানে কিছুদিন পর হলেও স্বজনের দেখা পাওয়া যায়।
২১. হুসাইন বিন আবদুর রহমান হুদবাহ বিন খাশরাম উযরি-এর নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করেন,
أَلَا عَلِّلَانِي قَبْلَ نَوْحِ النَّوَائِحِ *** وَقَبْلَ اضْطِلَاعِ النَّفْسِ بَيْنَ الْجَوَانِحِ
وَقَبْلَ غَدٍ يَا وَيْحَ نَفْسِي مِنْ غَدِ *** إِذَا رَاحَ أَصْحَابِي وَلَسْتُ بِرَائِحِ
إِذَا رَاحَ أَصْحَابِي تَفِيضُ دُمُوعُهُمْ *** وَغُودِرْتُ فِي أَرْضِ لَحْدٍ عَلَى صَفَائِح
يَقُولُونَ هَلْ أَصْلَحْتُمْ لِأَخِيكُمْ *** وَمَا الْقَبْرُ فِي أَرْضِ الْفَضَاءِ بِصَالِحِ
হায়! বিলাপের সুর ওঠার আগেই কত লোক আমাকে ভুলে বসেছে!
অন্যের কাঁধে চড়ার আগেই তারা আমাকে ভুলে গিয়েছে!
আফসোস! আগামী প্রভাতের আগেই আমি বিস্মৃত হয়েছি!
বন্ধুরা ফিরে গেলেও আমি একলা পড়ে আছি!
অশ্রুসজল চোখে প্রিয়দের মাহফিল ফিরে গেছে হায়!
আমি তো মাটিতে চাপা পড়ে আছি, একাকী অসহায়!
তারা বলছে, তোমরা কি বন্ধুর জন্য ভালো কিছু করেছ?
কবরের এই নির্জন শূন্যতা মোটেও ভালো কিছু নয়।
২২. আবু ইসহাক বলেন, এক ব্যক্তির সাথে আমার পঞ্চাশ বছরের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তার মৃত্যুর পর আমি জানাযায় অংশগ্রহণ করি। তাকে দাফন করে মাটি সমান করে দেওয়ার পর লোকজন চলে গেল। আমি কয়েকটি কবরের পাশে গিয়ে বসলাম। আমি ভাবতে লাগলাম, এই কবরবাসী লোকজন একদিন এই দুনিয়াতে ছিল। একে একে তাদের সকলেই বিদায় নিয়ে আজ কবরের বাসিন্দা হয়েছে। ভাবতে ভাবতে আমি আবৃত্তি করতে লাগলাম,
سلام على أهل القبور الدوارس *** كأنهم لم يجلسوا في المجالس
ولم يشربوا من بارد الماء شربة *** ولم يأكلوا من بين رطب ويابس
কবরবাসীর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক, তারা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়েছে,
যেন কোনোদিন কোনো বৈঠকে তারা আসন পাতেনি।
কখনো ঠান্ডা পানীয়তে ঠোঁট ছোঁয়ায়নি,
তাজা বা শুষ্ক খাবারের স্বাদ নেয়নি。
তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! এর পরে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসল; আর আমি ভারাক্রান্ত মনে সেখান থেকে উঠে আসলাম।
২৩. আহমাদ বিন ইয়াহইয়া বালাজুরী আবৃত্তি করেন,
استعدي للموت يا نفس واسعي *** لنجاة فالحازم المستعد
قد نبئت أنه ليس للحي *** خلود ولا من الموت بد
আন্তু তাসহীন্ ওয়াল হাওয়াদ্ লা *** তাসহু ওয়া তাওল্লাহীন্ ওয়াল মানাইয়া তাজিদ্
ইন্নামা আংতু মুস্তায়ান মা সাওফা *** তার্দীন্ ওয়াল আওয়ারী তারুদ্দু
লা তুরজ্জিল বাক্বা ফি মা'দিনিল মাউত *** ওয়াদ্দারু হুক্কুহা লিকা ওয়ার্দ
আইয়ু মাল্কিন ফিল আরদি আও আইয়ু হাজ্জ *** লিমরিইন হাজ্জুহু মিনাল আরদ্বি লাহাদ্দু
কাইফা তুহিনী আমরাওঁ ওয়াল লিজাজাতান *** আইয়ামু আলাইহিল আনফাসু ফিহা তুয়াদ্দু।
প্রিয় মন, মরণের জন্য প্রস্তুত হও, মুক্তির পথ খুঁজে বের করো।
তুমি তো ভালো করেই জানো যে, এখানে কেউ স্থায়ী নয়।
তুমি হয়তো ভুলের ঘোরে আছ, মৃত্যুকে আসলে এড়ানো যায় না।
মৃত্যু, সে তো আসবেই, এই যন্ত্রণা মোটেও ভুল করবে না।
তুমি তো কেবল ঋণ করে আনা প্রাণ, অচিরেই যাকে ফিরিয়ে দিতে হবে।
মরণশীল এই উপত্যকায় টিকে থাকার আশা কোরো না,
এখানে তোমার স্থায়ী কোনো আবাস নেই।
এই বিশাল জগৎ-সংসারে তোমার বলে কিছু থাকলে তা হলো, কবর।
সামান্য কিছু নিঃশ্বাসের মালিকানা পেয়ে কীভাবে এত রং-তামাশা করে বেড়াও。
২৪. আবু জাফর কুরাইশী (রহঃ) আবৃত্তি করেন,
আ'তায়া আনী আদ-দুনিয়া ওয়া আংতা বাসীর *** ওয়া তাজহালু মা ফিহা ওয়া আংতা খাবীর
ওয়া তাসবাহু তাবনীহা কাআন্নাকা খালিদ *** ওয়া আংতা গাদাও আম্মা বানাইতা তাসীর
ফালাও কান ফিহা লিয়াল্লাজী আংতা আরিফ *** লাকাদ কান ফীমা কাদ বালুতু নাযীর
মাতা আবসারত আইনাকা শাইয়ান ফালাম *** ইয়াকুন লাহু মুখবিরুন আন্নাল বাক্বা ইয়াসীর
ফাদুনাকা ফাসনাউ কুল্লামা আংতা সানিউ *** ফা ইন্না বুয়ুতাল মায়্যিতীনা কুবুর।
এত বিচক্ষণ হয়েও তুমি অন্ধের মতো কাজ করে যাচ্ছ?
সব জেনেও এমন বোকার মতো আচরণ করছ!
জমিনের বুকে এমনভাবে চলছ যেন এখানেই থেকে যাবে চিরকাল!
অথচ আগামীকালই এসব ছেড়ে তোমায় চলে যেতে হবে।
গভীর ভাবনায় বসে যদি ভেবে দেখো,
এই জগতের সবকিছুতেই তুমি কবরের সতর্কবার্তা খুঁজে পাবে।
অতএব যা করার জলদি করে নাও,
মৃত্যুর পর কবরই সকলের মূল ঠিকানা.**
২৫. ইমাম দিনওয়ারী বলেন, আহমাদ বিন আবদান আযদী আমাকে আবৃত্তি করে শোনান,
تناجيك أجداث وهن سكوت *** وسكانها تحت التراب خفوت
أيا جامع الدنيا لغير بلاغة *** لمن تجمع الدنيا وأنت تموت
নিথর নিস্তব্ধ দেহগুলো চুপিসারে তোমাকে ডেকে বলে,
সমাধির অন্তরালে তাদের নীরব অবস্থান তোমাকে ডেকে বলে,
হে বল্লাহীন বিত্ত বৈভবের মালিক, কার জন্য তুমি এসব জড়ো করছ?
তুমি তো মরেই যাবে!**
২৬. আবু আলী আল ওয়াররাক আবৃত্তি করেন,
ذوي الود من أهل القبور عليكم *** السلام أما من دعوة تسمعونها
ولا من سؤال ترجون جوابه إلينا *** ولا من حاجة تطلبونها
سكنتم ظهور الأرض حينا بشرة **** فما لبثت حتى سكنتم بطونها
وخليتم اللذات فيها لأهلها *** وكنتم زمانا تعبدون فتونها
وكنت أناسا قبلنا مثل ما نرى *** تظنون بالدنيا وتستحسنونها
وكم صورة تحت التراب لسد *** وكان حريصا جاهدا أن يصونها
وما زالت الدنيا محل ترجل *** نخوش المنايا سهلها وحزونها
وقد كان للدنيا قرون كثيرة *** ولكن سريب الدهر أتى قرونها
وللناس أجال قصار ستنقضي *** وللناس أرزاق سيستكملونها.
কীট-পতঙ্গের পেটে যাওয়া কবরবাসীর প্রতি রহমত নাযিল হোক,
আমাদের শত হাঁকডাকে তাদের আজ কিছুই যায় আসে না।
হায়! আজ আর কোনো প্রশ্নের উত্তর আশা কোরো না তোমরা,
সুযোগ নেই চেয়ে-চিন্তে কিছু লুফে নেওয়ার।
একসময় এই তল্লাট তোমাদের আভিজাত্যে মুখরিত ছিল,
গহিন কবরের নিকষ আঁধারে আজ কী অবস্থা? বলো!
দুনিয়ার জীবনে প্রিয়জন নিয়ে আনন্দ-উল্লাস করেছ,
দিনের পর দিন প্রবৃত্তির আনুগত্যে বুঁদ হয়ে ছিলে,
ঠিক যে জীবন আজ আমরা কাটিয়ে যাচ্ছি।
তোমরা তখন সাময়িক সমৃদ্ধির নেশায় মাতাল ছিলে,
আর আজ? কবরজগতে বিপদাপদের কোনো ইয়ত্তা নেই!
অথচ তখন দুনিয়া রক্ষার বিধ্বংসী লোভ তোমাদের পেয়ে বসেছিল।
এই দুনিয়া এক বহুরূপী গিরগিটি, কারও থাকার জায়গা নয়,
এখানে যত সুখ-দুখ, মৃত্যুই তার শেষ পরিণাম।
জমিনের বুক হলো মানবগোষ্ঠীর একমুখী যাত্রাপথ মাত্র,
সময়ের বিবর্তনে এখানে যাত্রীদলের পরিবর্তন ঘটে থাকে।
মানুষের সেই যাত্রাও খুবই অল্প সময়ের, দেখতে-না-দেখতেই শেষ!
আর পাথেয় রিজিকও সীমিত, দ্রুত ফুরিয়ে আসার মতো.**
২৭. মুহাম্মাদ বিন মুগীরা তামীমী বলেন, মদীনায় এক ব্যক্তির মৃত্যু হলো। লোকটির পিতা পুত্রশোকে খুবই শোকাহত ছিলেন। ঘুমের মধ্যে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, কে যেন বলছে, আপনি আপনার সন্তানের কবরে এসে তাকে বিদায় জানিয়ে যান। ঘুম ভাঙতেই লোকটি ঘর থেকে বের হয়ে ছেলের কবরের দিকে চললেন। লোকটি কবি ছিলেন না। তবুও সন্তানের কবরের সামনে দাঁড়াতেই ভারাক্রান্ত মনে বলে উঠলেন,
يا صاحب القبر الذي قد استوى *** هيجت لي حزنا على طول البلى
حزنا طويلا يا بني ما انقضى *** ولم أغمض من دهاني ما دهى
حذار ما حدث مما قد سقى **** من غصص الموت وغم قد نوى
وضغطة القبر الذي فيها الأذى
হে সমতল কবরবাসী, বিরাট দুশ্চিন্তা জাগিয়ে তুমি বিদায় নিয়েছ,
বেটা, এই সমস্যাও একদিন শেষ হবে, কষ্ট শেষে যখন সুখের নিদ্রা আসবে।
হায়! মৃত্যুর ফরমান এসে একদিন, যাবতীয় বেদনার ইতি টানবে,
আসল দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা? সে তো কবরের কষ্টে নিহিত।
কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি ফিরে আসতে উদ্যত হলে পেছন থেকে আওয়াজ আসল,
اسمع أحدثك بائن قد أضى ... بخبر أوضح من ضوء الضحى
في غصص الموت وغم قد جلا *** وفرح لقيه بعد الرضى
القول بالتوحيد فينا قد خلا *** أتيت من ذاك جزيلا وغنى
جنات فردوس رضى للفتى **** يدعون فيها ناعما بما اشتهى
শুনুন, দিনের আলোর মতোই পষ্ট ভাষায় বলছি,
মৃত্যুর যাতনা আর দুর্ভাবনা কাটিয়ে আনন্দ ও তৃপ্তিময় প্রাপ্তির সুসংবাদ দিচ্ছি।
তাওহীদের পুঁজি নিয়ে আসতে পারলে এখানে ঐশ্বর্যের দেখা মিলবে,
প্রতিশ্রুত নিআমাত ফিরদাউসের উত্তরাধিকারহীন মালিকানা মিলবে।
এই পর্যন্ত বলে আওয়াজটি থেমে গেল। বৃদ্ধ লোকটিও ফিরে আসলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছেলেকে নিয়ে আর কোনো দুশ্চিন্তা করেননি।
২৮. মুহাম্মাদ বিন আবদুল কারীম রাযী বলেন, আমি আইদ বিন শুরাহীল -এর কাছে শুনেছি আবদুল্লাহ বিন মুবারক বলেন,
إن الذي قد زين الأباعدا *** والأقربين صاعدا فصاعدا
عساك يوما تذكر الملاحدا *** يامن يرجي أن يكون خالدا
شربت فاعلمه حديدا باردا *** لا بد تلقى طيبا وزائدا.
অকালেই যারা দূরের ও কাছের লোকজনকে সমাহিত করে এসেছে,
মনে রেখো, তোমার সময় ঘনিয়ে এসেছে, কবরকে স্মরণ করার।
আর হে সমাহিত, যাকে চিরতরে কবরের আঁধারে রেখে আসা হয়েছে,
মৃত্যু তোমার জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় এক শীতল ও পবিত্র পানীয়।
অতএব, সানন্দে একে গ্রহণ করে নাও。
টিকাঃ
১২৭. হিলইয়াতু আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৫/৩১৮。
১১৮. তারীবু দিমাশক, ৩২/৩২১, ৩২২。
১২৯. মুজামুশ শুআরা, ১/৪৩২。
১৩২. দিওয়ানু আবিল ইতাহিয়ায়হ, ৭৬。
১৩৩, দিওয়ানু ফারাযদাক, ২/৩১。
১৩৪. ইয়াহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ৪/৪৮৭। মুরাকাবা ও মুহাসাবা অধ্যায়। ইমাম গাযালীর সনদে ইমাম বালাজুরীও তা বর্ণনা করেছেন। আনসাবুল আশরাফ, ১২/৭৭। ফারাযদাক অধ্যায়。
১৩৫. মুহাযারাতুল উদাবা, ২/৫১৯。
১৩৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৪২。
১৩৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৪২。
১৩৮. আহওয়ালুল কুবুর, ১৪২। আত-তাওয়াবীন, ১২৬। বর্ণনা নং ৭৮。
১৩৯. নুমান ইবনুল মুনজির বিন মুনজির বিন ইমরাউল কায়িস। আনুমানিক ৫৮২-৬০২ বা তারও কিছু বেশি সময় তিনি হীরা অঞ্চলের শাসক ছিলেন। ইরাকের বিখ্যাত নুমানিয়া শহরের গোড়াপত্তন করেন। আল-আলাম (খাইরুদ্দিন যারকালী), ৮/৪৩, ৪৪。
১৪০. আদী বিন যায়িদ বিন হাম্মার আব্বাদী তামীমী। জাহিলী যুগের একজন কবি। ইরাকের হীরা অঞ্চলের অধিবাসী। ১০১-১১০ হিজরির মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তারীখুল ইসলাম (যাহাবী), ৩/৯৯। ব্যক্তি নং ১৭৫。
১৪১. জাহিলী যুগে শাসকশ্রেণির জন্য এই দুআ করা হতো。
১৪২, তারীখু দিমাশক, ৪০/১০৬। কোথাও কোথাও শব্দের ভিন্নতা রয়েছে。
১৪৩. তারীখু দিমাশক, ৪০/১২৪১。
১৪৪. আহওয়ালুল কুবুর ১৫৮。
১৪৫. মজমুআতুল কাসায়িদিয যুহদিয়্যাত, ২/৩৫৬。
১৪৬. তাফসীরু ইবনি কাসীর ৬/৩১১। সূরা লুকমান, (৩১): ৩৪ এর ব্যাখ্যাতে। তারীখু দিমাশক, ৩৪/৪৮১, ৪৮২। এ ছাড়া ভিন্ন সনদে রয়েছে: আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৯/২০৫। ১০১ হিজরির আলোচনায়। হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৫/৩১৮। উমর বিন আবদুল আযীয অধ্যায়。
১৪৭. আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ৬/১৫৩。
১৪৮. তারীখু দিমাশক, ৬৩/৩০, ৩১。
১৪৯. শরহু দিওয়ানিল হিমাসাহ লিত তাবরিযী, ২/৮৪。
১৫০. দিওয়ানু হুদবাহ বিন খাশরাম, ২/২。
১৫১. দিওয়ানু আবুল ইতাহিয়াহ, ১১২。
১৫২. তারিখু দামিশক, ৬/৭৫। বাগিয়্যাতুত্তালাব ফি তারিখি হালাব, ৩/২২২。
১৫৩. তারীখু দিমাশক, ৪১/৪৬৮; আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ৩/১১৪。
১৫৪. আল-মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ৩/২৭৫; মিনহাজুল ইয়াকীন শরহু আদাবিদ দুনিয়া ওয়াদ দীন, ৫৭৯。
১৫৫. তারীখু দিমাশক, ২৭/৪০২; মাজমুআতুল কাসাইদি ওয়ায যাহদিয়্যাত, ২/২৯০। শব্দের ভিন্নতা রয়েছে。
১৫৬. আল হাওয়াতিফ, ৫৮। বর্ণনা নং ৫৭。
১৫৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৫。
📄 সালাফের দেখা কবরের আযাব
১. ইমাম শাবী বলেন, আবদুল্লাহ বিন উমর রাসুল-কে বললেন,
إِنِّي مَرَرْتُ بِبَدْرٍ فَرَأَيْتُ رَجُلًا يَخْرُجُ مِنَ الْأَرْضِ فَيَضْرِبُهُ رَجُلٌ بِمِقْمَعَةٍ مَعَهُ حَتَّى يَغِيبَ فِي الْأَرْضِ ثُمَّ يَخْرُجُ فَيَفْعَلُ بِهِ مِثْلَ ذَلِكَ مِرَارًا. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ذَاكَ أَبُو جَهْلِ بْنُ هِشَامٍ يُعَذِّبُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ
আমি বদর প্রান্তরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম মাটি ফুঁড়ে এক লোক উঠে আসছে। এমন সময় আরেকজন এসে হাতুড়ি দিয়ে তাকে আঘাত করল। আঘাতের তীব্রতায় সে মাটিতে দেবে (অদৃশ্য) হয়ে গেল। এভাবে কয়েকবার তার সাথে এমন ঘটনা ঘটে। সব শুনে রাসুল বললেন, এই লোকটি হলো আবু জাহল বিন হিশাম। কিয়ামত পর্যন্ত তাকে এভাবেই শাস্তি দেওয়া হবে।”
২. আমর বিন দীনার বলেন, সালিম বিন আবদুল্লাহ তার পিতা আবদুল্লাহ বিন উমর ইবনুল খাত্তাব হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,
একবার আমি মক্কা-মদীনা সফর করছিলাম। পথিমধ্যে পানিভর্তি একটি ছোট পাত্র নিয়ে একটি কবরস্তানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। এমন সময় অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় এক ব্যক্তি কবর হতে বের হয়ে আসল। তার গলায় বেড়ি পরানো। সে আমাকে বলল, হে আবদুল্লাহ, আমাকে পানি পান করান। হে আবদুল্লাহ, আমাকে সিক্ত করুন। আল্লাহর শপথ! আমি বুঝতে পারলাম না, সে কি আমার নাম জানত নাকি আরবদের স্বাভাবিক রীতি হিসেবে আবদুল্লাহ (আল্লাহর বান্দা) বলে ডাকছিল? এমন সময় আরেক ব্যক্তি উঠে এসে বলল, হে আবদুল্লাহ, তাকে সিক্ত করবেন না। তাকে পানি পান করাবেন না। অতঃপর তার গলার বেড়ি ধরে টেনে তাকে কবরে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। "
৩. হিশাম বিন উরওয়াহ তার পিতা উরওয়াহ বিন যুবাইর-এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একবার তিনি মক্কা-মদীনা সফর করছিলেন। পথিমধ্যে
একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে হঠাৎ একটি কবর হতে লোহার বেড়ি জড়ানো অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় এক লোক বেরিয়ে এল। বেরিয়ে এসেই সে বলল, হে আবদুল্লাহ, আমাকে পানি পান করান। বারি সিক্ত করুন। ইতিমধ্যে তার পেছনে আরেকজন লোক বেরিয়ে এসে বলল, হে আবদুল্লাহ, আপনি তাকে সিক্ত করবেন না। পানি দেবেন না।
বর্ণনাকারী বলেন, এ দৃশ্য দেখে তিনি জ্ঞান হারিয়ে উটের পিঠ থেকে উল্টে পড়ে যান। তার জিনিসপত্র এদিক-সেদিক ছড়িয়ে রইল। সকালে যখন তার জ্ঞান ফিরল, তখন ধুলোবালিতে তার চুল সাদা হয়ে ছাগামাহ ঘাসের ন্যায় হয়ে যায়।
সফর শেষে খলীফা উসমান বিন আফফান -কে বিষয়টি জানালে তিনি একাকী সফর করতে নিষেধ করেন。
৪. আবু কুযআ বসরী নিজের কিংবা অন্য একজনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একবার আমরা আমাদের এলাকা ও বসরার মধ্যবর্তী জলাধারগুলোর একটির নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে এক জায়গায় আমরা বিকট স্বরে গাধার আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমরা স্থানীয় একজনকে বললাম, এই ভয়ংকর আওয়াজটি কিসের? সে বলল, আওয়াজটি আমাদের এলাকার একজন মৃত ব্যক্তির। জীবদ্দশায় তার মা তাকে কিছু বললে উত্তরে সে বলত, তুমি অমন কর্কশ স্বরেই চ্যাঁচাতে থাকো। তার মৃত্যুর পর থেকে প্রতিরাতে তার কবর হতে এমন কর্কশ আওয়াজ ভেসে আসে。
৫. আমর বিন দীনার বলেন, মদীনায় এক লোক ছিল, যার একজন বোন থাকত মদীনার শেষ প্রান্তে। বোনটি নানা কষ্টে ভুগত। সে মাঝে মাঝে তার বোনকে দেখতে যেত। দেখে আবার ফিরে আসত। একসময় বোনটি মারা গেল। খবর পেয়ে লোকটি এসে জানাযার ব্যবস্থা করল। কবর পর্যন্ত বোনের লাশ নিয়ে গেল। যথাযথভাবে দাফন করে বাড়ি ফিরল। ঘরে ফিরে তার মনে পড়ল যে, কবরে নামার সময় ভুল করে তার মুদ্রার থলেটি সেখানে ফেলে এসেছে। থলেটি উদ্ধার করতে এক ব্যক্তির সাহায্য কামনা করলে সে এগিয়ে আসল। উভয়ে কবরস্থানে গিয়ে কবরের মাটি কিছুটা সরাতেই থলেটি পেয়ে গেল। তখন ভাইটি বলল,
আরেকটু খুঁড়ে দেখো তো আমার বোনটার কী অবস্থা? একটু দেখি। কথামতো কবরের একটি ইট সরাতেই দেখা গেল, পুরো কবর আগুনের শিখায় দাউ দাউ করছে। ইটটি যথাস্থানে রেখে লোকটি তড়িঘড়ি তার মায়ের কাছে ফিরে আসল। মাকে জিজ্ঞাসা করল, আমার বোনের অবস্থা কেমন ছিল বলুন তো। মা বললেন, তোমার বোনের কথা আর বোলো না। সে তো ধ্বংস হয়ে গেছে! ছেলে বলল, তার কী সমস্যা ছিল খুলে বলুন। মা বললেন, সে নামায আদায়ে খুব টালবাহানা করত। তা ছাড়া অযুর ব্যাপারে যথাযথ খেয়াল রাখত না। আর প্রতিবেশীরা শুয়ে পড়লে তাদের দরজায় কান পাতত। আড়ি পেতে শোনা কথাগুলো আবার মানুষের মাঝে বলে বেড়াত。
৬. হুসাইন আসাদী বর্ণনা করেন, মারছাদ বিন হাওশাব বলেন, একবার আমি ইউসুফ বিন আমর-এর নিকট বসা ছিলাম। তার পাশেই এক ব্যক্তি বসে ছিলেন, যার চেহারার এক পাশ লোহার মতো শক্ত ও সমান হয়ে আছে।
ইউসুফ তাকে বললেন, তুমি যা দেখেছ, মারছাদকে তা খুলে বলো।
সে বলল, কুৎসিত এই ঘটনাটি যখন ঘটে তখন আমি যুবক। দেশে তখন প্লেগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি ভাবলাম, শহরের কোনো এক প্রান্তে চলে যাই যেখানে লোকজনের দাফন হয়। এবং এসব কাজে অংশ নেওয়া যায়। যেই ভাবা সেই কাজ। এমনই একদিন আমি কবর খোঁড়ার কাজে মগ্ন ছিলাম। কাজ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ের কথা। আমি একটি কবর খুঁড়ে তার মাটি অন্য কবরের ওপর ফেলছিলাম। এমন সময় একজন পুরুষ মানুষের মৃতদেহ আনা হলো। তাকে দাফন করে মাটি দিয়ে লোকজন চলে গেল। লোকজন চলে যাওয়ার পরপরই পশ্চিম দিক হতে উটের মত বিশালাকৃতির ও সাদা বর্ণের দুটি পাখি উড়ে এল। একটি তার মাথার দিকে আর অন্যটি পায়ের দিকে এসে নামল। পাখি দুটি তাকে জাগিয়ে তুলল। একটি পাখি তার কবরে নেমে গেল। অন্যটি এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে রইল। আমি তখন আমার কর্মরত কবরের এক কোনায় চলনশক্তি হারিয়ে বসে ছিলাম। আমার মুখ এমনভাবে হা হয়ে ছিল, যেন কোনোভাবেই তা পূর্ণ হওয়ার মতো নয়। ইতিমধ্যে কবরে নামা পাখিটি মৃত ব্যক্তির হাতের ডান দিকে একটি ঠোকর মারল। আমি শুনতে পেলাম, পাখিটি
তাকে বলছে, তুমি কি শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার সময় দুটি ফিনফিনে মিসরীয় পোশাক গায়ে চাপিয়ে অহংকার করতে করতে যাওনি? লোকটি বলল, এ বিষয়ে আমি দুর্বল ছিলাম।
এ কথা বলতে পাখিটি তাকে আরেকটি ঠোকর মারল। এতে পুরো কবর পানি বা চর্বি-জাতীয় কিছুর ফেনায় ভরে উঠল। এভাবে তিনবার ঠোকর মারল। আর তিনবারই কবরে পানি বা চর্বি-জাতীয় কিছুর ফেনা ছড়িয়ে পড়ল। অতঃপর মাথা উঠাতেই পাখিটির দৃষ্টি পড়ল আমার দিকে।
আমাকে দেখেই সে বলে উঠল, আল্লাহ তার অকল্যাণ করুন! সে কোথায় বসে আছে দেখেছ? এই বলেই আমার চেহারার একপাশে ঠোকর মেরে বসল। ঠোকর খেয়ে আমি সারা রাত অচেতন অবস্থায় সেখানেই পড়ে রইলাম। সকালে হুঁশ ফেরার পর আমি নিজের এই অবস্থা দেখতে পেলাম। আর নিজের বসে থাকার কথা মনে করতে লাগলাম।
বর্ণনাকারী বলেন, তিনি হুবহু এমন কিংবা কাছাকাছি কথা বলেছেন।
৭. আবু আবদুর রহমান বিন বুহাইর বর্ণনা করেন, ইরাকের মুজিবিয়া শহরের ছাগার নামক এলাকার হাসান বিন ফুরাত নামক জনৈক ব্যক্তি নিজের অবস্থান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একদিন তিনি আবু ইসহাক ফারাযি-এর নিকট উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি এসে কাফন-চোরদের তাওবা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে বললেন, যারা কবর খোঁড়ে, তাদের কি তাওবা করার কোনো সুযোগ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আছে। নিয়ত যদি ঠিক থাকে তবে তার তাওবা কবুল হবে। আর তার সত্যতা সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই অবগত আছেন।
লোকটি বলল, কবর খুঁড়তে গিয়ে আমি এমন অনেক লাশ দেখেছি, যাদের চেহারা কিবলা হতে ঘুড়ে গিয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে আবু ইসহাক ফারাযি-এর সঠিক ধারণা না থাকায় তিনি ইমাম আওযাঈ-এর নিকট 'কাফন-চোরদের' বিষয়টি জানিয়ে পত্র পাঠালেন। জবাবে ইমাম আওযাঈ লিখলেন, নিয়ত ঠিক থাকলে তার তাওবা কবুল
হবে। আর নিয়তের সততার বিষয়টি আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। আর সে যে, বিভিন্ন মানুষের চেহারা কিবলা হতে ঘুরে যেতে দেখেছে; তারা হলো সেসব মানুষ, যারা সুন্নাতবিমুখ অবস্থায় মারা গিয়েছে。
৮. আবদুল মুমিন বিন আবদুল্লাহ বলেন, এক কাফন-চোর তাওবা করে কবর খননের কাজ ছেড়ে দেয়। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কবর খননকালে তোমার দেখা সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা কী ছিল?
সে বলল, একবার আমি কবর খুঁড়ে একটি লাশ উঠালাম। লাশটির সারা দেহে পেরেক মারা ছিল। তার মাথায় একটি বড়সড় পেরেক ঠোকা ছিল। এমনি আরেকটি ছিল পায়ে।
এমনিভাবে আরেক কাফন-চোরকে তার তাওবার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে সে বলল, একবার আমি একটি লাশ কবর থেকে তুললাম। সে সময় আমি তার চেহারা কিবলা হতে অন্য দিকে ঘুড়ানো অবস্থায় পেয়েছি।
৯. মুহাম্মাদ বিন উবাইদ বর্ণনা করেন, আবুল হারীশ তার মায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আব্বাসি খলীফা আবু জাফর মানসুর ১৩৬ হিজরিতে খিলাফত লাভ করে কুফার চারপাশে যখন পরিখা খনন শুরু করেন, লোকজন তখন পরিখাস্থল হতে নিজেদের মৃত স্বজনদের স্থানান্তর করেন। সে সময় এক মৃত যুবককে নিজের হাতে কামড় দেওয়া অবস্থায় দেখা যায়।
১০. মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম বর্ণনা করেন, হুওয়াইরিছ বিন জুবাব বলেন, একবার আমি উটের পিঠে চড়ে অনেক পুরোনো ও বিশাল একটি গাছের নিচে অবস্থান করছিলাম। এমন সময় পাশের একটি কবর হতে এক ব্যক্তি উঠে এল। যার চেহারা ও মাথায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। গায়ে লোহার পোশাক জড়ানো। বেড়িয়ে এসেই সে বলতে লাগল, আমাকে একটু পানি পান করান। পানি পান করান। এমন সময় তার পেছনে আরেক ব্যক্তি বেরিয়ে আসল। সে বলতে লাগল, এই কাফিরকে পানি পান করাবে না। বলেই সে তাকে ধরে ফেলল। পেছনে আসা লোকটি তার গায়ে জড়ানো শেকলের দু-প্রান্ত ধরে টেনে-
হিঁচড়ে নিয়ে গেল এবং আমাদের সামনে দিয়ে দুজনই কবরে ঢুকে গেল। এ দৃশ্য দেখে আমার উট ঘাবড়ে গিয়ে ছুটে পালাতে লাগল। আমি কোনোভাবেই তাকে বাগে আনতে পারছিলাম না। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে অবশেষে উটটি 'আরকুষ যবইয়াহ' এলাকায় এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। আমি উটের পিঠ হতে নেমে মাগরিব ও এশার নামায আদায় করলাম। এরপর আবার উটের পিঠে উঠে সকালে মদীনায় আসলাম। মদীনায় আমি উমর ইবনুল খাত্তাব-এর সাথে সাক্ষাৎ করে ঘটনাটি বললাম। সব শুনে তিনি বললেন, হুওয়াইরিছ, তুমি খুব বিস্ময়কর ঘটনা শোনালে! অবশ্য তোমাকে মিথ্যা বলার অপবাদ দিচ্ছি না।
মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম বলেন, এরপর উমর শহরের উভয় প্রান্তের ইসলামপূর্ব জাহিলী যুগ দেখা বয়স্ক লোকজনকে ডেকে পাঠালেন। লোকজন জমা হলে তিনি হুওয়াইরিছ-কেও ডেকে পাঠালেন। তিনি আসলে উমর সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, হুওয়ারিছের প্রতি আমি সন্দেহ পোষণ করছি না। তবে সে খুব আশ্চর্যজনক ঘটনা শুনিয়েছে। হুওয়াইরিছ, তুমি আমাকে যা শুনিয়েছ, তাদেরও তা শোনাও। তিনি ঘটনাটি শোনালেন। ঘটনা শুনে উপস্থিত লোকজন বলে উঠল, আমীরুল মুমিনীন, আমরা লোকটিকে চিনতে পেরেছি। সে গিফার গোত্রের লোক। জাহিলী যুগেই তার মৃত্যু হয়েছে। উমর তার ব্যাপারে আরও কিছু জানতে চাইলে তারা বলল, সে জাহিলী যুগের প্রথা মেনে চলা লোকদের একজন ছিল। তবে সে আরব রীতি অনুসারে অতিথি আপ্যায়ন করত না।
১১. মুফাযযাল বিন ইউনুস জুফী বলেন, আমরা জানতে পেরেছি যে, একবার খলীফা উমর বিন আবদুল আযীয মাসলামাহ বিন আবদুল মালিককে জিজ্ঞাসা করলেন, মাসলামাহ, তোমার পিতা খলীফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের দাফন-কাফনের কাজ কে করেছে? মাসলামাহ বললেন, আমীরুল মুমিনীন, অমুক অমুক করেছে।
তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, খলীফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিককে কারা দাফন করেছে? মাসলামাহ বললেন, অমুক অমুক।
খলীফা বললেন, তাদের সাথে যা ঘটেছে বলে আমি জেনেছি, তোমাকে তা বলি শোনো। তাদের উভয়ের দাফনকারীগণ আমাকে বলেছে যে, তোমার পিতা
আবদুল মালিক ও ভাই ওয়ালিদকে কবরে নামানোর পরে যখন কাফনের গিট খুলে দিতে লাগল; তখন দেখা গেল যে, তাদের চেহারা পেছন দিকে ঘুরে গিয়েছে!
মাসলামাহ, ভালো করে খেয়াল রাখবে। আমি যখন মৃত্যুবরণ করব, তুমি আমাকে দাফন করবে। আর সে সময় আমার চেহারার দিকে লক্ষ রাখবে। দেখবে যে, আমার অবস্থাও কি আপন লোকদের মতো হয়েছে নাকি আমি তা হতে নাজাত লাভ করেছি!
মাসলামাহ বলেন, উমর বিন আবদুল আযীয-এর ইনতিকালের পর আমি তাকে কবরে শুইয়ে দিয়ে চেহারার প্রতি লক্ষ করে দেখলাম যে, তার চেহারা ঠিক আছে。
১২. আবু আবদুল্লাহ আবদুল মুমিন বিন আবদুল্লাহ মুসিলী বর্ণনা করেন, ফিলিস্তিনের রামলা শহরের জনৈক ব্যক্তি বলেছেন, একবার আমরা প্রবল ঝড়ো বাতাসের কবলে পড়লাম। বাতাসের ঝাপটায় কবরের মাটি পর্যন্ত সরে গেল। তখন আমি কিছু কবরবাসীকে কিবলা হতে মুখ ঘোরানো অবস্থায় দেখতে পেলাম। মাত্র এগারো দিন আগে মৃত্যুবরণ করা এক বৃদ্ধ আমলাদার লোকের কথা আমার মনে পড়ে গেল। আমি তার কবরের পাশে গিয়ে দেখলাম, তার চেহারা কিবলামুখী আছে। তবে তার নাকে সামান্য আঁচড়ের দাগ রয়েছে। তার সবকিছু ঠিকঠাক দেখে আমরা 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করলাম。
১৩. আবদুল মুমিন আরও বলেন, জনৈক ব্যক্তি বলেছেন, আমার এক মেয়ের মৃত্যুর পর আমি আমি তাকে কবরে নামালাম। কবর হতে উঠে সব ঠিকঠাক করার সময় একটি ইট ঠিক করতে গিয়ে দেখি, তার চেহারা কিবলা হতে ঘুরে গিয়েছে! ব্যাপারটা দেখে আমি একেবারেই ভেঙে পড়লাম। এই অবস্থাতেই একদিন তাকে স্বপ্নে দেখলাম। সে আমাকে বলল, বাবা, আমাকে এমন অবস্থায় দেখে তুমি ভেঙে পড়েছ? আমার আশেপাশের অধিকাংশ লোকের চেহারাই কিবলা হতে ঘুরে গিয়েছে। তার কথায় মনে হলো, এই মানুষগুলো জীবদ্দশায় কবীরা গুনাহে লিপ্ত ছিল。
১৪. আবু উআইনাহ ইবনুল মুহাল্লাব বলেন, আমি ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাবকে বলতে শুনেছি, সুলাইমান বিন আবদুল মালিক খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর আমাকে ইরাক ও খুরাসানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দান করেন। সে সময় উমর বিন আবদুল আযীয আমাকে এই বলে সতর্ক করেন যে, ইয়াযিদ, আল্লাহকে ভয় করো। খলিফা ওয়ালিদের লাশ যখন আমি কবরে নামাই তখন কাফনের মধ্যেই সে ছটফট করছিল。
১৫. সালাম তঈল বর্ণনা করেন, আমর বিন মাইমুন বলেন, আমি উমর বিন আবদুল আযীয -কে বলতে শুনেছি, খলীফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিককে যারা কবরে নামিয়েছে, আমি তাদের একজন। তাকে কবরে নামানোর সময় আমি লক্ষ করলাম যে, তার দুই হাঁটু ভাঁজ হয়ে ঘাড়ের দিকে বাঁকা হয়ে আসছে। এই দৃশ্য দেখে তার এক ছেলে বলে উঠল, আল্লাহ, আমার পিতাকে আপনি শান্তি দান করুন। হে কাবার রব, আমার পিতাকে শান্তি দান করুন! তার কথা শুনে আমি বললাম, কাবার রবের কসম! তোমার পিতার জন্য সে সময় ফুরিয়ে গেছে।
পরবর্তী সময়ে উমর বিন আবদুল আযীয এই ঘটনা বলে মানুষকে উপদেশ দিতেন。
১৬. আবদুল হামীদ বিন মাহমুদ মিওয়ালি বলেন, একবার আমি আবদুল্লাহ বিন আব্বাস -এর নিকট বসা ছিলাম। এমন সময় একদল লোক এসে তাকে বলল, আমরা হজ আদায়ের উদ্দেশ্যে সফর করে এসেছি। আমাদের একজন সফরসঙ্গী সিফাহ নামক স্থানে এসে মৃত্যুবরণ করেন। আমরা তার মৃতদেহ বহন করে কিছুদূর এগিয়ে যাই। এরপর সুবিধামতো জায়গা দেখে আমরা তার জন্য কবর খনন করি। কবর খননের কাজ শেষ হতেই কবরে কালো বিষাক্ত সাপ কিলবিল করতে থাকে। এই দৃশ্য দেখে আমরা সেখান হতে সরে অন্যত্রে আরেকটি কবর খনন করি। সেখানেও কবর খনন শেষ হতেই কালো বিষাক্ত সাপে কবর ভরে যায়। এখন তাকে ফেলে রেখে আমরা আপনার নিকট এসেছি। সব শুনে ইবনু আব্বাস বললেন, এটা হলো তার অপকর্মের ফলাফল। তোমরা গিয়ে তাকে
কোনো একটি কবরে দাফন করে দাও। সেই পবিত্র সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, তার জন্য পুরো দুনিয়া খুঁড়ে ফেললেও এ রকম চিত্রই দেখতে পাবে।
বর্ণনাকারী বলেন, আমরা গিয়ে তাকে দাফন করে আসলাম। অতঃপর আমাদের সাথে থাকা তার জিনিসপত্র নিয়ে তার পরিবারের লোকজনের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। আমরা তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার স্বামীর কী এমন বদ আমল ছিল? তিনি বললেন, সে তৈরি খাবার বিক্রি করত। সে রোজ রোজ তার পরিবারস্থ লোকদের কামাই-রোজগার কেড়ে নিত। তাদের দিয়ে যব ভাঙিয়ে অন্যায়ভাবে তা খাবারে মিশিয়ে দিত。
১৭. আবু ইসহাক সাহিবুশ বলেন, একবার আমাকে একটি লাশ গোসল করানোর জন্য ডাকা হলো। আমি মৃত ব্যক্তির চেহারা হতে কাপড় সরাতেই দেখলাম, একটি সাপ তার গলা পেঁচিয়ে আছে।
তিনি বলেন, আমি মৃতদেহের গোসল না সেরেই চলে আসি। লোকজন তখন বলাবলি করছিল যে, লোকটি সালাফদের গালিগালাজ করত。
১৮. হুসাইন বিন আলী বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ، جَمَعَ اللَّهُ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ، فَجَعَلَ أُمَّةً مُحَمَّدٍ فِي زُمْرَةٍ فَيَلْقَى أَوَّلُهُمْ آخِرَهُمْ، فَيُصَافِحُونَهُمْ، وَيُعَانِقُونَهُمْ، وَيُسَلِّمُونَ عَلَيْهِمْ، وَيَقُولُونَ: إِخْوَانُنَا هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَانُوا يَتَرَكَّمُونَ عَلَيْنَا، وَيَسْتَغْفِرُونَ لَنَا. قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: فَمَا مِنْ أَحَدٍ خَارِجٍ مِنَ الدُّنْيَا شَاتِمًا لِأَحَدٍ مِنْهُمْ إِلَّا سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْهِ دَابَّةٌ فِي قَبْرِهِ تَقْرِضُ لَحْمَهُ، فَيَجِدُ أَلَمَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ
কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা যখন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল উম্মতকে একত্র করবেন; তখন মুহাম্মাদ -এর উম্মতকে এমন এক স্থানে রাখবেন যেখানে পূর্ববর্তী উম্মতগণ এসে পরবর্তীদের সাথে সাক্ষাৎ করবে। তারা একে অপরের সাথে মুসাফাহা করবে, মুআনাকা করবে এবং একে অপরকে সালাম জানাবে।
পাশাপাশি তারা এ কথাও বলবে যে, এরা আমাদের সেসব ভাই, যারা পার্থিব জীবনে আমাদের প্রতি রহমতের জন্য দুআ করেছেন। আমাদের জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
রাসুল আরও বলেছেন যে, তবে যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কারও প্রতি বিষোদগার করতে করতে মৃত্যুবরণ করবে; তার জন্য আল্লাহ একটি হিংস্র প্রাণী লেলিয়ে দেবেন, যা তার গোশত খুবলে খাবে। তার এই শাস্তি কিয়ামত পর্যন্ত চলবে।
১৯. সাঈদ বিন খালিদ বিন ইয়াযিদ আনসারী বসরার জনৈক গোরখোদকের কাছ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, একদিন আমি একটি কবর খনন করলাম। কাজ সেরে পাশেই মাটিতে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দুজন মহিলা আমার সাথে সাক্ষাৎ করল। তাদের একজন আমাকে বলল, হে আল্লাহর বান্দা, আমরা আপনাকে আল্লাহর দোহাই দিচ্ছি, এই মহিলাকে আমাদের নিকট হতে দূরে দাফন করুন। আমাদের তার প্রতিবেশী বানিয়ে দেবেন না! তিনি বলেন, এই স্বপ্ন দেখে আমি জেগে উঠি। কিছুক্ষণ পর জনৈকা মহিলার লাশ নিয়ে আসলে আমি লোকজনকে বলি, তার কবর তোমাদের পেছনে তৈরি করা হয়েছে। এই বলে আমি তাদের অন্য কবর দেখিয়ে দিই। রাত্রিবেলা আমি স্বপ্নে আবার সেই দুই মহিলাকে দেখতে পাই। তাদের একজন আমাকে বলল, আপনাকে আল্লাহ তাআলা উত্তম প্রতিদান দান করুন। আপনি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অকল্যাণ থেকে রক্ষা করেছেন। আমি বললাম, ব্যাপার কী? আপনি কথা বলছেন কিন্তু আপনার সঙ্গিনী কোনো কথা বলছে না! মহিলাটি বললেন, সে কোনো রকম অসিয়ত না করেই মারা গেছে। আর অসিয়ত ছাড়া মৃত্যুবরণকারীর জন্য নিয়ম হলো, সে কিয়ামত পর্যন্ত কোনো কথা বলতে পারবে না।
২০. আবু উসমান উমাওয়ি বলেন, আমি আমার পিতা ইয়াহইয়া বিন সাঈদ -এর নিকট বনু আসাদ গোত্রের গোরখোদকদের সম্পর্কে আবু বকর বিন আইয়াশ -এর একটি ঘটনা শুনেছি। তিনি বলেন, একবার আমি একদল গোরখোদকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তাদের একজন আমাকে বিন আইয়াশের
বর্ণিত একটি ঘটনাটি শোনায়। সে বলে, আমি আর এক সঙ্গী, আমরা বনু আসাদের কবর খোঁড়ার কাজে নিয়োজিত ছিলাম। এক রাতে একটি ঘটনা ঘটল। আমি একটি কবর থেকে কথাবার্তার আওয়াজ শুনতে পেলাম। এক কবর হতে অন্য কবরবাসীকে উদ্দেশ্য করে কে যেন বলছে, হে আবদুল্লাহ!
উত্তর এল, বলো, জাবির!
প্রথমজন বলল, আমাদের মা মারা গিয়েছেন। তিনি আমাদের কাছে আসছেন।
দ্বিতীয়জন বলল, তাতে আমাদের কী লাভ? আমরা তো আর তার দ্বারা কোনো উপকারও পাচ্ছি না। বাবা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে শপথ করেছেন যে, তিনি তার জানাযা পড়বেন না।
তারা এভাবে কয়েকবার বলাবলি করল। তাদের কথা শুনে আমি আমার সঙ্গীর কাছে চলে এলাম। সেও তাদের কথোপকথন শুনতে পেয়েছে কিন্তু বোঝেনি। আমি তাকে বিস্তারিত বুঝিয়ে বললে সে বুঝতে পারে। পরের দিন এক লোক এসে আগের রাতে কথাবার্তা হওয়া কবর দুটি দেখিয়ে আমাকে বলল, এই দুই কবরের মাঝে আমার জন্য একটি কবর খুঁড়ে দিন। আমি কবর দুটি দেখিয়ে বললাম, এর নাম জাবির, আর ওর নাম কি আবদুল্লাহ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি তাকে গতরাতে শোনা ঘটনা খুলে বললাম। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি শপথ করেছিলাম যে, তার জানাযা পড়ব না। তবে সেটা অন্যায় ছিল। আমি আমার কসমের জন্য কাফফারা দেব, তার জানাযা পড়ব এবং তার জন্য রহমতের দুআ করব। এই বলে তিনি চলে গেলেন। এ সময় তার হাতে একটি ছড়ি আর পানির পাত্র ছিল। তিনি আরও বলেন, আমি এই শপথের জন্য কাফফারা আদায় করা ছাড়াও হজের নিয়ত করলাম।
টিকাঃ
১২৮. মুজামুল আওসাত লিত-তাবরানী, ৬/৩৩৫। রিওয়ায়াত নং ৬৫৬০। আরও রয়েছে: দালাইলুন নাবুওয়াতি লিল-বাইহাকী, ৩/৮৯, ৯০। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/২৮৯, ২৯০। সনদ গরীব。
১৫৯. মান আশা বাদাল মাওতি, পৃ: ৩২। রূহ, ৯৪。
১৬০. আল-আহওয়াল, ৬৪ এবং রূহ (ইবনুল কায়্যিম), ৯৪。
১৬১. মান আ'শা বা'দাল মাওতি, ২৭। বর্ণনা নং ২৬。
১৬২, রূহ (ইবনু কাইয়্যিম জাওযিয়্যাহ), ৬৭, ৬৮。
১৬১. রুহ, ১০০। আহওয়ালুল কুবুর, ১৮。
১৬৪. আহওয়ালুল কুবুর, ৬৮। তাওয়াবীন, ২৮৩-২৮৫。
১৬৫. আহওয়ালুল কুবুর, ৬৮。
১৬৬. আহওয়ালুল কুবুর, ৬৮。
১৬৭. মান আশা বাদাল মাওত, ৫০। বর্ণনা নং ৫৬。
১৬৮. আহওয়ালুল কুবুর, ৬৮。
১৬৯. আহওয়ালুল কুবুর, ৬৮。
১৭০. রূহ, ৯৭。
১৭১. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৪/৫০৩-৫০৬。
১৭২, তারীখু দিমাশক, ৬৩/১৮০。
১70. শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, ৬/১২১৬; শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৭/২৩২। বর্ণনা নং ৪৯২৮。
১78. আস সুন্নাতু লি ইবনি আসিম, ২/৪৮৩। বর্ণনা নং ১০০২। সনদ দুর্বল。
১75. আন-নাহিয়াতু আন ত'নি আমীরিল মুমিনিনা মুআবিয়া (দারুল কুতুবুল ইলমিয়্যাহ), ১/২০। সনদ মুরসাল। হাসান。
১৭৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৬। সনদ দুর্বল। তবে অসিয়ত না করে মৃত্যুবরণ করলে কথা বলতে না পারা সম্পর্কিত কিছু হাদিস পাওয়া যায়। সেসব হাদিসের সনদও দুর্বল。
১৭৭. আল হাওয়াতিফ, ৫৬। বর্ণনা নং ৫৫。
১. ইমাম শাবী বলেন, আবদুল্লাহ বিন উমর রাসুল-কে বললেন,
إِنِّي مَرَرْتُ بِبَدْرٍ فَرَأَيْتُ رَجُلًا يَخْرُجُ مِنَ الْأَرْضِ فَيَضْرِبُهُ رَجُلٌ بِمِقْمَعَةٍ مَعَهُ حَتَّى يَغِيبَ فِي الْأَرْضِ ثُمَّ يَخْرُجُ فَيَفْعَلُ بِهِ مِثْلَ ذَلِكَ مِرَارًا. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ذَاكَ أَبُو جَهْلِ بْنُ هِشَامٍ يُعَذِّبُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ
আমি বদর প্রান্তরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম মাটি ফুঁড়ে এক লোক উঠে আসছে। এমন সময় আরেকজন এসে হাতুড়ি দিয়ে তাকে আঘাত করল। আঘাতের তীব্রতায় সে মাটিতে দেবে (অদৃশ্য) হয়ে গেল। এভাবে কয়েকবার তার সাথে এমন ঘটনা ঘটে। সব শুনে রাসুল বললেন, এই লোকটি হলো আবু জাহল বিন হিশাম। কিয়ামত পর্যন্ত তাকে এভাবেই শাস্তি দেওয়া হবে।”
২. আমর বিন দীনার বলেন, সালিম বিন আবদুল্লাহ তার পিতা আবদুল্লাহ বিন উমর ইবনুল খাত্তাব হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,
একবার আমি মক্কা-মদীনা সফর করছিলাম। পথিমধ্যে পানিভর্তি একটি ছোট পাত্র নিয়ে একটি কবরস্তানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। এমন সময় অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় এক ব্যক্তি কবর হতে বের হয়ে আসল। তার গলায় বেড়ি পরানো। সে আমাকে বলল, হে আবদুল্লাহ, আমাকে পানি পান করান। হে আবদুল্লাহ, আমাকে সিক্ত করুন। আল্লাহর শপথ! আমি বুঝতে পারলাম না, সে কি আমার নাম জানত নাকি আরবদের স্বাভাবিক রীতি হিসেবে আবদুল্লাহ (আল্লাহর বান্দা) বলে ডাকছিল? এমন সময় আরেক ব্যক্তি উঠে এসে বলল, হে আবদুল্লাহ, তাকে সিক্ত করবেন না। তাকে পানি পান করাবেন না। অতঃপর তার গলার বেড়ি ধরে টেনে তাকে কবরে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। "
৩. হিশাম বিন উরওয়াহ তার পিতা উরওয়াহ বিন যুবাইর-এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একবার তিনি মক্কা-মদীনা সফর করছিলেন। পথিমধ্যে
একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে হঠাৎ একটি কবর হতে লোহার বেড়ি জড়ানো অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় এক লোক বেরিয়ে এল। বেরিয়ে এসেই সে বলল, হে আবদুল্লাহ, আমাকে পানি পান করান। বারি সিক্ত করুন। ইতিমধ্যে তার পেছনে আরেকজন লোক বেরিয়ে এসে বলল, হে আবদুল্লাহ, আপনি তাকে সিক্ত করবেন না। পানি দেবেন না।
বর্ণনাকারী বলেন, এ দৃশ্য দেখে তিনি জ্ঞান হারিয়ে উটের পিঠ থেকে উল্টে পড়ে যান। তার জিনিসপত্র এদিক-সেদিক ছড়িয়ে রইল। সকালে যখন তার জ্ঞান ফিরল, তখন ধুলোবালিতে তার চুল সাদা হয়ে ছাগামাহ ঘাসের ন্যায় হয়ে যায়।
সফর শেষে খলীফা উসমান বিন আফফান -কে বিষয়টি জানালে তিনি একাকী সফর করতে নিষেধ করেন。
৪. আবু কুযআ বসরী নিজের কিংবা অন্য একজনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একবার আমরা আমাদের এলাকা ও বসরার মধ্যবর্তী জলাধারগুলোর একটির নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে এক জায়গায় আমরা বিকট স্বরে গাধার আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমরা স্থানীয় একজনকে বললাম, এই ভয়ংকর আওয়াজটি কিসের? সে বলল, আওয়াজটি আমাদের এলাকার একজন মৃত ব্যক্তির। জীবদ্দশায় তার মা তাকে কিছু বললে উত্তরে সে বলত, তুমি অমন কর্কশ স্বরেই চ্যাঁচাতে থাকো। তার মৃত্যুর পর থেকে প্রতিরাতে তার কবর হতে এমন কর্কশ আওয়াজ ভেসে আসে。
৫. আমর বিন দীনার বলেন, মদীনায় এক লোক ছিল, যার একজন বোন থাকত মদীনার শেষ প্রান্তে। বোনটি নানা কষ্টে ভুগত। সে মাঝে মাঝে তার বোনকে দেখতে যেত। দেখে আবার ফিরে আসত। একসময় বোনটি মারা গেল। খবর পেয়ে লোকটি এসে জানাযার ব্যবস্থা করল। কবর পর্যন্ত বোনের লাশ নিয়ে গেল। যথাযথভাবে দাফন করে বাড়ি ফিরল। ঘরে ফিরে তার মনে পড়ল যে, কবরে নামার সময় ভুল করে তার মুদ্রার থলেটি সেখানে ফেলে এসেছে। থলেটি উদ্ধার করতে এক ব্যক্তির সাহায্য কামনা করলে সে এগিয়ে আসল। উভয়ে কবরস্থানে গিয়ে কবরের মাটি কিছুটা সরাতেই থলেটি পেয়ে গেল। তখন ভাইটি বলল,
আরেকটু খুঁড়ে দেখো তো আমার বোনটার কী অবস্থা? একটু দেখি। কথামতো কবরের একটি ইট সরাতেই দেখা গেল, পুরো কবর আগুনের শিখায় দাউ দাউ করছে। ইটটি যথাস্থানে রেখে লোকটি তড়িঘড়ি তার মায়ের কাছে ফিরে আসল। মাকে জিজ্ঞাসা করল, আমার বোনের অবস্থা কেমন ছিল বলুন তো। মা বললেন, তোমার বোনের কথা আর বোলো না। সে তো ধ্বংস হয়ে গেছে! ছেলে বলল, তার কী সমস্যা ছিল খুলে বলুন। মা বললেন, সে নামায আদায়ে খুব টালবাহানা করত। তা ছাড়া অযুর ব্যাপারে যথাযথ খেয়াল রাখত না। আর প্রতিবেশীরা শুয়ে পড়লে তাদের দরজায় কান পাতত। আড়ি পেতে শোনা কথাগুলো আবার মানুষের মাঝে বলে বেড়াত。
৬. হুসাইন আসাদী বর্ণনা করেন, মারছাদ বিন হাওশাব বলেন, একবার আমি ইউসুফ বিন আমর-এর নিকট বসা ছিলাম। তার পাশেই এক ব্যক্তি বসে ছিলেন, যার চেহারার এক পাশ লোহার মতো শক্ত ও সমান হয়ে আছে।
ইউসুফ তাকে বললেন, তুমি যা দেখেছ, মারছাদকে তা খুলে বলো।
সে বলল, কুৎসিত এই ঘটনাটি যখন ঘটে তখন আমি যুবক। দেশে তখন প্লেগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি ভাবলাম, শহরের কোনো এক প্রান্তে চলে যাই যেখানে লোকজনের দাফন হয়। এবং এসব কাজে অংশ নেওয়া যায়। যেই ভাবা সেই কাজ। এমনই একদিন আমি কবর খোঁড়ার কাজে মগ্ন ছিলাম। কাজ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ের কথা। আমি একটি কবর খুঁড়ে তার মাটি অন্য কবরের ওপর ফেলছিলাম। এমন সময় একজন পুরুষ মানুষের মৃতদেহ আনা হলো। তাকে দাফন করে মাটি দিয়ে লোকজন চলে গেল। লোকজন চলে যাওয়ার পরপরই পশ্চিম দিক হতে উটের মত বিশালাকৃতির ও সাদা বর্ণের দুটি পাখি উড়ে এল। একটি তার মাথার দিকে আর অন্যটি পায়ের দিকে এসে নামল। পাখি দুটি তাকে জাগিয়ে তুলল। একটি পাখি তার কবরে নেমে গেল। অন্যটি এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে রইল। আমি তখন আমার কর্মরত কবরের এক কোনায় চলনশক্তি হারিয়ে বসে ছিলাম। আমার মুখ এমনভাবে হা হয়ে ছিল, যেন কোনোভাবেই তা পূর্ণ হওয়ার মতো নয়। ইতিমধ্যে কবরে নামা পাখিটি মৃত ব্যক্তির হাতের ডান দিকে একটি ঠোকর মারল। আমি শুনতে পেলাম, পাখিটি
তাকে বলছে, তুমি কি শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার সময় দুটি ফিনফিনে মিসরীয় পোশাক গায়ে চাপিয়ে অহংকার করতে করতে যাওনি? লোকটি বলল, এ বিষয়ে আমি দুর্বল ছিলাম।
এ কথা বলতে পাখিটি তাকে আরেকটি ঠোকর মারল। এতে পুরো কবর পানি বা চর্বি-জাতীয় কিছুর ফেনায় ভরে উঠল। এভাবে তিনবার ঠোকর মারল। আর তিনবারই কবরে পানি বা চর্বি-জাতীয় কিছুর ফেনা ছড়িয়ে পড়ল। অতঃপর মাথা উঠাতেই পাখিটির দৃষ্টি পড়ল আমার দিকে।
আমাকে দেখেই সে বলে উঠল, আল্লাহ তার অকল্যাণ করুন! সে কোথায় বসে আছে দেখেছ? এই বলেই আমার চেহারার একপাশে ঠোকর মেরে বসল। ঠোকর খেয়ে আমি সারা রাত অচেতন অবস্থায় সেখানেই পড়ে রইলাম। সকালে হুঁশ ফেরার পর আমি নিজের এই অবস্থা দেখতে পেলাম। আর নিজের বসে থাকার কথা মনে করতে লাগলাম।
বর্ণনাকারী বলেন, তিনি হুবহু এমন কিংবা কাছাকাছি কথা বলেছেন।
৭. আবু আবদুর রহমান বিন বুহাইর বর্ণনা করেন, ইরাকের মুজিবিয়া শহরের ছাগার নামক এলাকার হাসান বিন ফুরাত নামক জনৈক ব্যক্তি নিজের অবস্থান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, একদিন তিনি আবু ইসহাক ফারাযি-এর নিকট উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি এসে কাফন-চোরদের তাওবা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে বললেন, যারা কবর খোঁড়ে, তাদের কি তাওবা করার কোনো সুযোগ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আছে। নিয়ত যদি ঠিক থাকে তবে তার তাওবা কবুল হবে। আর তার সত্যতা সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই অবগত আছেন।
লোকটি বলল, কবর খুঁড়তে গিয়ে আমি এমন অনেক লাশ দেখেছি, যাদের চেহারা কিবলা হতে ঘুড়ে গিয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে আবু ইসহাক ফারাযি-এর সঠিক ধারণা না থাকায় তিনি ইমাম আওযাঈ-এর নিকট 'কাফন-চোরদের' বিষয়টি জানিয়ে পত্র পাঠালেন। জবাবে ইমাম আওযাঈ লিখলেন, নিয়ত ঠিক থাকলে তার তাওবা কবুল
হবে। আর নিয়তের সততার বিষয়টি আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। আর সে যে, বিভিন্ন মানুষের চেহারা কিবলা হতে ঘুরে যেতে দেখেছে; তারা হলো সেসব মানুষ, যারা সুন্নাতবিমুখ অবস্থায় মারা গিয়েছে。
৮. আবদুল মুমিন বিন আবদুল্লাহ বলেন, এক কাফন-চোর তাওবা করে কবর খননের কাজ ছেড়ে দেয়। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কবর খননকালে তোমার দেখা সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা কী ছিল?
সে বলল, একবার আমি কবর খুঁড়ে একটি লাশ উঠালাম। লাশটির সারা দেহে পেরেক মারা ছিল। তার মাথায় একটি বড়সড় পেরেক ঠোকা ছিল। এমনি আরেকটি ছিল পায়ে।
এমনিভাবে আরেক কাফন-চোরকে তার তাওবার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে সে বলল, একবার আমি একটি লাশ কবর থেকে তুললাম। সে সময় আমি তার চেহারা কিবলা হতে অন্য দিকে ঘুড়ানো অবস্থায় পেয়েছি।
৯. মুহাম্মাদ বিন উবাইদ বর্ণনা করেন, আবুল হারীশ তার মায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আব্বাসি খলীফা আবু জাফর মানসুর ১৩৬ হিজরিতে খিলাফত লাভ করে কুফার চারপাশে যখন পরিখা খনন শুরু করেন, লোকজন তখন পরিখাস্থল হতে নিজেদের মৃত স্বজনদের স্থানান্তর করেন। সে সময় এক মৃত যুবককে নিজের হাতে কামড় দেওয়া অবস্থায় দেখা যায়।
১০. মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম বর্ণনা করেন, হুওয়াইরিছ বিন জুবাব বলেন, একবার আমি উটের পিঠে চড়ে অনেক পুরোনো ও বিশাল একটি গাছের নিচে অবস্থান করছিলাম। এমন সময় পাশের একটি কবর হতে এক ব্যক্তি উঠে এল। যার চেহারা ও মাথায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। গায়ে লোহার পোশাক জড়ানো। বেড়িয়ে এসেই সে বলতে লাগল, আমাকে একটু পানি পান করান। পানি পান করান। এমন সময় তার পেছনে আরেক ব্যক্তি বেরিয়ে আসল। সে বলতে লাগল, এই কাফিরকে পানি পান করাবে না। বলেই সে তাকে ধরে ফেলল। পেছনে আসা লোকটি তার গায়ে জড়ানো শেকলের দু-প্রান্ত ধরে টেনে-
হিঁচড়ে নিয়ে গেল এবং আমাদের সামনে দিয়ে দুজনই কবরে ঢুকে গেল। এ দৃশ্য দেখে আমার উট ঘাবড়ে গিয়ে ছুটে পালাতে লাগল। আমি কোনোভাবেই তাকে বাগে আনতে পারছিলাম না। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে অবশেষে উটটি 'আরকুষ যবইয়াহ' এলাকায় এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। আমি উটের পিঠ হতে নেমে মাগরিব ও এশার নামায আদায় করলাম। এরপর আবার উটের পিঠে উঠে সকালে মদীনায় আসলাম। মদীনায় আমি উমর ইবনুল খাত্তাব-এর সাথে সাক্ষাৎ করে ঘটনাটি বললাম। সব শুনে তিনি বললেন, হুওয়াইরিছ, তুমি খুব বিস্ময়কর ঘটনা শোনালে! অবশ্য তোমাকে মিথ্যা বলার অপবাদ দিচ্ছি না।
মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম বলেন, এরপর উমর শহরের উভয় প্রান্তের ইসলামপূর্ব জাহিলী যুগ দেখা বয়স্ক লোকজনকে ডেকে পাঠালেন। লোকজন জমা হলে তিনি হুওয়াইরিছ-কেও ডেকে পাঠালেন। তিনি আসলে উমর সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, হুওয়ারিছের প্রতি আমি সন্দেহ পোষণ করছি না। তবে সে খুব আশ্চর্যজনক ঘটনা শুনিয়েছে। হুওয়াইরিছ, তুমি আমাকে যা শুনিয়েছ, তাদেরও তা শোনাও। তিনি ঘটনাটি শোনালেন। ঘটনা শুনে উপস্থিত লোকজন বলে উঠল, আমীরুল মুমিনীন, আমরা লোকটিকে চিনতে পেরেছি। সে গিফার গোত্রের লোক। জাহিলী যুগেই তার মৃত্যু হয়েছে। উমর তার ব্যাপারে আরও কিছু জানতে চাইলে তারা বলল, সে জাহিলী যুগের প্রথা মেনে চলা লোকদের একজন ছিল। তবে সে আরব রীতি অনুসারে অতিথি আপ্যায়ন করত না।
১১. মুফাযযাল বিন ইউনুস জুফী বলেন, আমরা জানতে পেরেছি যে, একবার খলীফা উমর বিন আবদুল আযীয মাসলামাহ বিন আবদুল মালিককে জিজ্ঞাসা করলেন, মাসলামাহ, তোমার পিতা খলীফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের দাফন-কাফনের কাজ কে করেছে? মাসলামাহ বললেন, আমীরুল মুমিনীন, অমুক অমুক করেছে।
তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, খলীফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিককে কারা দাফন করেছে? মাসলামাহ বললেন, অমুক অমুক।
খলীফা বললেন, তাদের সাথে যা ঘটেছে বলে আমি জেনেছি, তোমাকে তা বলি শোনো। তাদের উভয়ের দাফনকারীগণ আমাকে বলেছে যে, তোমার পিতা
আবদুল মালিক ও ভাই ওয়ালিদকে কবরে নামানোর পরে যখন কাফনের গিট খুলে দিতে লাগল; তখন দেখা গেল যে, তাদের চেহারা পেছন দিকে ঘুরে গিয়েছে!
মাসলামাহ, ভালো করে খেয়াল রাখবে। আমি যখন মৃত্যুবরণ করব, তুমি আমাকে দাফন করবে। আর সে সময় আমার চেহারার দিকে লক্ষ রাখবে। দেখবে যে, আমার অবস্থাও কি আপন লোকদের মতো হয়েছে নাকি আমি তা হতে নাজাত লাভ করেছি!
মাসলামাহ বলেন, উমর বিন আবদুল আযীয-এর ইনতিকালের পর আমি তাকে কবরে শুইয়ে দিয়ে চেহারার প্রতি লক্ষ করে দেখলাম যে, তার চেহারা ঠিক আছে。
১২. আবু আবদুল্লাহ আবদুল মুমিন বিন আবদুল্লাহ মুসিলী বর্ণনা করেন, ফিলিস্তিনের রামলা শহরের জনৈক ব্যক্তি বলেছেন, একবার আমরা প্রবল ঝড়ো বাতাসের কবলে পড়লাম। বাতাসের ঝাপটায় কবরের মাটি পর্যন্ত সরে গেল। তখন আমি কিছু কবরবাসীকে কিবলা হতে মুখ ঘোরানো অবস্থায় দেখতে পেলাম। মাত্র এগারো দিন আগে মৃত্যুবরণ করা এক বৃদ্ধ আমলাদার লোকের কথা আমার মনে পড়ে গেল। আমি তার কবরের পাশে গিয়ে দেখলাম, তার চেহারা কিবলামুখী আছে। তবে তার নাকে সামান্য আঁচড়ের দাগ রয়েছে। তার সবকিছু ঠিকঠাক দেখে আমরা 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করলাম。
১৩. আবদুল মুমিন আরও বলেন, জনৈক ব্যক্তি বলেছেন, আমার এক মেয়ের মৃত্যুর পর আমি আমি তাকে কবরে নামালাম। কবর হতে উঠে সব ঠিকঠাক করার সময় একটি ইট ঠিক করতে গিয়ে দেখি, তার চেহারা কিবলা হতে ঘুরে গিয়েছে! ব্যাপারটা দেখে আমি একেবারেই ভেঙে পড়লাম। এই অবস্থাতেই একদিন তাকে স্বপ্নে দেখলাম। সে আমাকে বলল, বাবা, আমাকে এমন অবস্থায় দেখে তুমি ভেঙে পড়েছ? আমার আশেপাশের অধিকাংশ লোকের চেহারাই কিবলা হতে ঘুরে গিয়েছে। তার কথায় মনে হলো, এই মানুষগুলো জীবদ্দশায় কবীরা গুনাহে লিপ্ত ছিল。
১৪. আবু উআইনাহ ইবনুল মুহাল্লাব বলেন, আমি ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাবকে বলতে শুনেছি, সুলাইমান বিন আবদুল মালিক খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর আমাকে ইরাক ও খুরাসানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দান করেন। সে সময় উমর বিন আবদুল আযীয আমাকে এই বলে সতর্ক করেন যে, ইয়াযিদ, আল্লাহকে ভয় করো। খলিফা ওয়ালিদের লাশ যখন আমি কবরে নামাই তখন কাফনের মধ্যেই সে ছটফট করছিল。
১৫. সালাম তঈল বর্ণনা করেন, আমর বিন মাইমুন বলেন, আমি উমর বিন আবদুল আযীয -কে বলতে শুনেছি, খলীফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিককে যারা কবরে নামিয়েছে, আমি তাদের একজন। তাকে কবরে নামানোর সময় আমি লক্ষ করলাম যে, তার দুই হাঁটু ভাঁজ হয়ে ঘাড়ের দিকে বাঁকা হয়ে আসছে। এই দৃশ্য দেখে তার এক ছেলে বলে উঠল, আল্লাহ, আমার পিতাকে আপনি শান্তি দান করুন। হে কাবার রব, আমার পিতাকে শান্তি দান করুন! তার কথা শুনে আমি বললাম, কাবার রবের কসম! তোমার পিতার জন্য সে সময় ফুরিয়ে গেছে।
পরবর্তী সময়ে উমর বিন আবদুল আযীয এই ঘটনা বলে মানুষকে উপদেশ দিতেন。
১৬. আবদুল হামীদ বিন মাহমুদ মিওয়ালি বলেন, একবার আমি আবদুল্লাহ বিন আব্বাস -এর নিকট বসা ছিলাম। এমন সময় একদল লোক এসে তাকে বলল, আমরা হজ আদায়ের উদ্দেশ্যে সফর করে এসেছি। আমাদের একজন সফরসঙ্গী সিফাহ নামক স্থানে এসে মৃত্যুবরণ করেন। আমরা তার মৃতদেহ বহন করে কিছুদূর এগিয়ে যাই। এরপর সুবিধামতো জায়গা দেখে আমরা তার জন্য কবর খনন করি। কবর খননের কাজ শেষ হতেই কবরে কালো বিষাক্ত সাপ কিলবিল করতে থাকে। এই দৃশ্য দেখে আমরা সেখান হতে সরে অন্যত্রে আরেকটি কবর খনন করি। সেখানেও কবর খনন শেষ হতেই কালো বিষাক্ত সাপে কবর ভরে যায়। এখন তাকে ফেলে রেখে আমরা আপনার নিকট এসেছি। সব শুনে ইবনু আব্বাস বললেন, এটা হলো তার অপকর্মের ফলাফল। তোমরা গিয়ে তাকে
কোনো একটি কবরে দাফন করে দাও। সেই পবিত্র সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, তার জন্য পুরো দুনিয়া খুঁড়ে ফেললেও এ রকম চিত্রই দেখতে পাবে।
বর্ণনাকারী বলেন, আমরা গিয়ে তাকে দাফন করে আসলাম। অতঃপর আমাদের সাথে থাকা তার জিনিসপত্র নিয়ে তার পরিবারের লোকজনের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। আমরা তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার স্বামীর কী এমন বদ আমল ছিল? তিনি বললেন, সে তৈরি খাবার বিক্রি করত। সে রোজ রোজ তার পরিবারস্থ লোকদের কামাই-রোজগার কেড়ে নিত। তাদের দিয়ে যব ভাঙিয়ে অন্যায়ভাবে তা খাবারে মিশিয়ে দিত。
১৭. আবু ইসহাক সাহিবুশ বলেন, একবার আমাকে একটি লাশ গোসল করানোর জন্য ডাকা হলো। আমি মৃত ব্যক্তির চেহারা হতে কাপড় সরাতেই দেখলাম, একটি সাপ তার গলা পেঁচিয়ে আছে।
তিনি বলেন, আমি মৃতদেহের গোসল না সেরেই চলে আসি। লোকজন তখন বলাবলি করছিল যে, লোকটি সালাফদের গালিগালাজ করত。
১৮. হুসাইন বিন আলী বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ، جَمَعَ اللَّهُ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ، فَجَعَلَ أُمَّةً مُحَمَّدٍ فِي زُمْرَةٍ فَيَلْقَى أَوَّلُهُمْ آخِرَهُمْ، فَيُصَافِحُونَهُمْ، وَيُعَانِقُونَهُمْ، وَيُسَلِّمُونَ عَلَيْهِمْ، وَيَقُولُونَ: إِخْوَانُنَا هَؤُلَاءِ الَّذِينَ كَانُوا يَتَرَكَّمُونَ عَلَيْنَا، وَيَسْتَغْفِرُونَ لَنَا. قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: فَمَا مِنْ أَحَدٍ خَارِجٍ مِنَ الدُّنْيَا شَاتِمًا لِأَحَدٍ مِنْهُمْ إِلَّا سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْهِ دَابَّةٌ فِي قَبْرِهِ تَقْرِضُ لَحْمَهُ، فَيَجِدُ أَلَمَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ
কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা যখন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল উম্মতকে একত্র করবেন; তখন মুহাম্মাদ -এর উম্মতকে এমন এক স্থানে রাখবেন যেখানে পূর্ববর্তী উম্মতগণ এসে পরবর্তীদের সাথে সাক্ষাৎ করবে। তারা একে অপরের সাথে মুসাফাহা করবে, মুআনাকা করবে এবং একে অপরকে সালাম জানাবে।
পাশাপাশি তারা এ কথাও বলবে যে, এরা আমাদের সেসব ভাই, যারা পার্থিব জীবনে আমাদের প্রতি রহমতের জন্য দুআ করেছেন। আমাদের জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
রাসুল আরও বলেছেন যে, তবে যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কারও প্রতি বিষোদগার করতে করতে মৃত্যুবরণ করবে; তার জন্য আল্লাহ একটি হিংস্র প্রাণী লেলিয়ে দেবেন, যা তার গোশত খুবলে খাবে। তার এই শাস্তি কিয়ামত পর্যন্ত চলবে।
১৯. সাঈদ বিন খালিদ বিন ইয়াযিদ আনসারী বসরার জনৈক গোরখোদকের কাছ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, একদিন আমি একটি কবর খনন করলাম। কাজ সেরে পাশেই মাটিতে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দুজন মহিলা আমার সাথে সাক্ষাৎ করল। তাদের একজন আমাকে বলল, হে আল্লাহর বান্দা, আমরা আপনাকে আল্লাহর দোহাই দিচ্ছি, এই মহিলাকে আমাদের নিকট হতে দূরে দাফন করুন। আমাদের তার প্রতিবেশী বানিয়ে দেবেন না! তিনি বলেন, এই স্বপ্ন দেখে আমি জেগে উঠি। কিছুক্ষণ পর জনৈকা মহিলার লাশ নিয়ে আসলে আমি লোকজনকে বলি, তার কবর তোমাদের পেছনে তৈরি করা হয়েছে। এই বলে আমি তাদের অন্য কবর দেখিয়ে দিই। রাত্রিবেলা আমি স্বপ্নে আবার সেই দুই মহিলাকে দেখতে পাই। তাদের একজন আমাকে বলল, আপনাকে আল্লাহ তাআলা উত্তম প্রতিদান দান করুন। আপনি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অকল্যাণ থেকে রক্ষা করেছেন। আমি বললাম, ব্যাপার কী? আপনি কথা বলছেন কিন্তু আপনার সঙ্গিনী কোনো কথা বলছে না! মহিলাটি বললেন, সে কোনো রকম অসিয়ত না করেই মারা গেছে। আর অসিয়ত ছাড়া মৃত্যুবরণকারীর জন্য নিয়ম হলো, সে কিয়ামত পর্যন্ত কোনো কথা বলতে পারবে না।
২০. আবু উসমান উমাওয়ি বলেন, আমি আমার পিতা ইয়াহইয়া বিন সাঈদ -এর নিকট বনু আসাদ গোত্রের গোরখোদকদের সম্পর্কে আবু বকর বিন আইয়াশ -এর একটি ঘটনা শুনেছি। তিনি বলেন, একবার আমি একদল গোরখোদকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তাদের একজন আমাকে বিন আইয়াশের
বর্ণিত একটি ঘটনাটি শোনায়। সে বলে, আমি আর এক সঙ্গী, আমরা বনু আসাদের কবর খোঁড়ার কাজে নিয়োজিত ছিলাম। এক রাতে একটি ঘটনা ঘটল। আমি একটি কবর থেকে কথাবার্তার আওয়াজ শুনতে পেলাম। এক কবর হতে অন্য কবরবাসীকে উদ্দেশ্য করে কে যেন বলছে, হে আবদুল্লাহ!
উত্তর এল, বলো, জাবির!
প্রথমজন বলল, আমাদের মা মারা গিয়েছেন। তিনি আমাদের কাছে আসছেন।
দ্বিতীয়জন বলল, তাতে আমাদের কী লাভ? আমরা তো আর তার দ্বারা কোনো উপকারও পাচ্ছি না। বাবা তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে শপথ করেছেন যে, তিনি তার জানাযা পড়বেন না।
তারা এভাবে কয়েকবার বলাবলি করল। তাদের কথা শুনে আমি আমার সঙ্গীর কাছে চলে এলাম। সেও তাদের কথোপকথন শুনতে পেয়েছে কিন্তু বোঝেনি। আমি তাকে বিস্তারিত বুঝিয়ে বললে সে বুঝতে পারে। পরের দিন এক লোক এসে আগের রাতে কথাবার্তা হওয়া কবর দুটি দেখিয়ে আমাকে বলল, এই দুই কবরের মাঝে আমার জন্য একটি কবর খুঁড়ে দিন। আমি কবর দুটি দেখিয়ে বললাম, এর নাম জাবির, আর ওর নাম কি আবদুল্লাহ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি তাকে গতরাতে শোনা ঘটনা খুলে বললাম। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি শপথ করেছিলাম যে, তার জানাযা পড়ব না। তবে সেটা অন্যায় ছিল। আমি আমার কসমের জন্য কাফফারা দেব, তার জানাযা পড়ব এবং তার জন্য রহমতের দুআ করব। এই বলে তিনি চলে গেলেন। এ সময় তার হাতে একটি ছড়ি আর পানির পাত্র ছিল। তিনি আরও বলেন, আমি এই শপথের জন্য কাফফারা আদায় করা ছাড়াও হজের নিয়ত করলাম।
টিকাঃ
১২৮. মুজামুল আওসাত লিত-তাবরানী, ৬/৩৩৫। রিওয়ায়াত নং ৬৫৬০। আরও রয়েছে: দালাইলুন নাবুওয়াতি লিল-বাইহাকী, ৩/৮৯, ৯০। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/২৮৯, ২৯০। সনদ গরীব。
১৫৯. মান আশা বাদাল মাওতি, পৃ: ৩২। রূহ, ৯৪。
১৬০. আল-আহওয়াল, ৬৪ এবং রূহ (ইবনুল কায়্যিম), ৯৪。
১৬১. মান আ'শা বা'দাল মাওতি, ২৭। বর্ণনা নং ২৬。
১৬২, রূহ (ইবনু কাইয়্যিম জাওযিয়্যাহ), ৬৭, ৬৮。
১৬১. রুহ, ১০০। আহওয়ালুল কুবুর, ১৮。
১৬৪. আহওয়ালুল কুবুর, ৬৮। তাওয়াবীন, ২৮৩-২৮৫。
১৬৫. আহওয়ালুল কুবুর, ৬৮。
১৬৬. আহওয়ালুল কুবুর, ৬৮。
১৬৭. মান আশা বাদাল মাওত, ৫০। বর্ণনা নং ৫৬。
১৬৮. আহওয়ালুল কুবুর, ৬৮。
১৬৯. আহওয়ালুল কুবুর, ৬৮。
১৭০. রূহ, ৯৭。
১৭১. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৪/৫০৩-৫০৬。
১৭২, তারীখু দিমাশক, ৬৩/১৮০。
১70. শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, ৬/১২১৬; শুআবুল ঈমান লিল বাইহাকী, ৭/২৩২। বর্ণনা নং ৪৯২৮。
১78. আস সুন্নাতু লি ইবনি আসিম, ২/৪৮৩। বর্ণনা নং ১০০২। সনদ দুর্বল。
১75. আন-নাহিয়াতু আন ত'নি আমীরিল মুমিনিনা মুআবিয়া (দারুল কুতুবুল ইলমিয়্যাহ), ১/২০। সনদ মুরসাল। হাসান。
১৭৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৬। সনদ দুর্বল। তবে অসিয়ত না করে মৃত্যুবরণ করলে কথা বলতে না পারা সম্পর্কিত কিছু হাদিস পাওয়া যায়। সেসব হাদিসের সনদও দুর্বল。
১৭৭. আল হাওয়াতিফ, ৫৬। বর্ণনা নং ৫৫。
📄 সালাফের দেখা কবরের বিভিন্ন অবস্থা
১. হাম্মাদ বিন যায়িদ বর্ণনা করেন, তুফাওয়াহ বংশের জনৈক ব্যক্তি বলেন, আমরা এক ব্যক্তিকে দাফন করলাম। পরে একটি বিষয় ঠিকঠাক করার জন্য আবার (কবর খুঁড়তে) গেলাম। গিয়ে দেখি মৃতদেহটি কবরে নেই।
২. রবী বিন সুবাইহ বলেন, ছাবিত বুনানী যখন ইনতিকাল করলেন, আমি, হুমাইদ তঈল এবং আবু জাফর জাসর ইবনু ফারকাদ তার কবরে নামলাম। আমরা তাকে কবরে শুইয়ে দিয়ে কাঁচা ইট দিয়ে কবর ঠিকঠাক করে দিচ্ছিলাম। হুমাইদ তঈল ছিলেন মাথার দিকে। হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন যে, ছাবিত বুনানী কবরে নেই। এ দৃশ্য দেখে তিনি ইশারায় আমাদের তা জানালেন। আমরা তাকে ইশারা করে লোকজনকে জানাতে নিষেধ করলাম। আমরা কবর ঠিকঠাক করে ফিরে আসলাম। ফিরে এসে হুমাইদ তঈল আমীর সুলাইমান বিন আলী-এর কাছে গিয়ে সব খুলে বললেন। পরদিন রাত্রি ঘনিয়ে এলে তিনি ঘোড়া হাঁকিয়ে সেখানে গিয়ে ইট সরিয়ে ছাবিত বুনানী-কে কবরে পেলেন না। কবরের মাটি সমান করে দিয়ে তিনি ফিরে আসলেন। সকালে আমরা সবাই ছাবিত বুনানী-এর মেয়ের কাছে গিয়ে তার আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, আমার মনে হচ্ছে আপনারা তাকে কবরে খুঁজে পাননি! বললাম, হ্যাঁ, কিন্তু এর রহস্য কী? তিনি বললেন, পঞ্চাশ বছর যাবৎ তিনি শেষরাতে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করে এই দুআ করতেন,
يَا رَبِّ، إِنْ كُنْتَ أَعْطَيْتَ أَحَدًا الصَّلَاةَ فِي قَبْرِهِ فَأَعْطِيْنِيْهَا
হে আমার রব, আপনি যদি কবরে কাউকে নামায পড়ার সুযোগ দান করেন তবে আমাকেও সে সুযোগ দান করুন।
ইনশাআল্লাহ, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তার এই দুআ ফিরিয়ে দেবেন না।
বর্ণনাকারী রবী বিন সুবাইহ বলেন, আবু জাফর জাসর বললেন, সেই পবিত্র সত্তার শপথ, যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই! আমি রাত্রিবেলা স্বপ্নে তাকে সবুজ পোশাকে কবরে নামায আদায় করতে দেখেছি।
৩. ইয়াজিদ বিন তরীফ বাজালী বলেন, যামাযিম যুদ্ধের সময় আমার এক ভাই মৃত্যুবরণ করে। তাকে কবর দেওয়ার পরে আমি তার কবরে মাথা ঠেকিয়ে কিছু শোনার চেষ্টা করি। আমি আমার বাম কানে ভাইয়ের দুর্বল কণ্ঠের আওয়াজ শুনে চিনতে পারি। সে তখন বলছিল, আল্লাহ। এরপরই তাকে আরেকজন প্রশ্ন করল, তোমার দ্বীন কী? সে বলল, ইসলাম।
৪. আলা বিন আবদুর কারীম বলেন, এক লোক মারা গেল। তার এক ভাই ছিলেন, যিনি চোখে কম দেখতেন। তিনি বলেন, ভাইয়ের দাফনের পর লোকজন যখন চলে গেল, আমি কবরে মাথা রাখলাম। আমি কবরের ভেতর থেকে আওয়াজ শুনতে পেলাম, তোমার রব কে? তোমার নবী কে? এরপরই আমি আমার ভাইয়ের পরিচিত কণ্ঠ শুনতে পেলাম। সে বলছিল, আল্লাহ আমার রব। মুহাম্মাদ আমার নবী। তারপর কবরের ভেতর থেকে তির ছুড়ে যাওয়ার মত শাঁ শাঁ শব্দ বের হতে লাগল। এই আওয়াজ শুনে আমার শরীর হিম হয়ে গেল। আমি ফিরে আসলাম。
৬. মুহাম্মাদ বিন মুসা সাইগ বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন নাফি মাদানী বলেন, মদিনাবাসী জনৈক ব্যক্তির ইনতিকাল হলে তাকে যথারীতি দাফন করা হয়। এক ব্যক্তি স্বপ্নে তাকে জাহান্নামীদের মধ্যে দেখতে পায়। এই অবস্থা দেখে সে খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। এর সাত বা আট দিন পর লোকটি তাকে আবার স্বপ্নে দেখে। এবার তাকে জান্নাতে দেখতে পায়। লোকটি তাকে বলল, তুমি না বলেছিলে, তুমি জাহান্নামী?
কবরবাসী বলল, আমি সেখানেই ছিলাম। আমাদের পাশে এক সালিহ (পুণ্যবান) ব্যক্তিকে দাফন করা হয়। তিনি তার আশেপাশের চল্লিশজনের জন্য সুপারিশ করেন। আমিও তাদের একজন。
টিকাঃ
১৭৮. শরহুস সুদূর, ১৯৭。
১৭৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/৫২০; হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ২/৩১৯;
তবাকাতুল কুবরা লিইবনি সাআদ, ৭/১৭৪。
১৮০. তাহযীবুল আছার মুসনাদু উমর, ২/৫১৩। বর্ণনা নং ৫৩৬。
১৮১. ইরশাদুস সারী, ৩/৪৭৮। ১৩৭৪ নং হাদিসে কবরের আযাব সংক্রান্ত আলোচনায়。
১৮২, রূহ, ৯০。
১. হাম্মাদ বিন যায়িদ বর্ণনা করেন, তুফাওয়াহ বংশের জনৈক ব্যক্তি বলেন, আমরা এক ব্যক্তিকে দাফন করলাম। পরে একটি বিষয় ঠিকঠাক করার জন্য আবার (কবর খুঁড়তে) গেলাম। গিয়ে দেখি মৃতদেহটি কবরে নেই।
২. রবী বিন সুবাইহ বলেন, ছাবিত বুনানী যখন ইনতিকাল করলেন, আমি, হুমাইদ তঈল এবং আবু জাফর জাসর ইবনু ফারকাদ তার কবরে নামলাম। আমরা তাকে কবরে শুইয়ে দিয়ে কাঁচা ইট দিয়ে কবর ঠিকঠাক করে দিচ্ছিলাম। হুমাইদ তঈল ছিলেন মাথার দিকে। হঠাৎ তিনি খেয়াল করলেন যে, ছাবিত বুনানী কবরে নেই। এ দৃশ্য দেখে তিনি ইশারায় আমাদের তা জানালেন। আমরা তাকে ইশারা করে লোকজনকে জানাতে নিষেধ করলাম। আমরা কবর ঠিকঠাক করে ফিরে আসলাম। ফিরে এসে হুমাইদ তঈল আমীর সুলাইমান বিন আলী-এর কাছে গিয়ে সব খুলে বললেন। পরদিন রাত্রি ঘনিয়ে এলে তিনি ঘোড়া হাঁকিয়ে সেখানে গিয়ে ইট সরিয়ে ছাবিত বুনানী-কে কবরে পেলেন না। কবরের মাটি সমান করে দিয়ে তিনি ফিরে আসলেন। সকালে আমরা সবাই ছাবিত বুনানী-এর মেয়ের কাছে গিয়ে তার আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, আমার মনে হচ্ছে আপনারা তাকে কবরে খুঁজে পাননি! বললাম, হ্যাঁ, কিন্তু এর রহস্য কী? তিনি বললেন, পঞ্চাশ বছর যাবৎ তিনি শেষরাতে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করে এই দুআ করতেন,
يَا رَبِّ، إِنْ كُنْتَ أَعْطَيْتَ أَحَدًا الصَّلَاةَ فِي قَبْرِهِ فَأَعْطِيْنِيْهَا
হে আমার রব, আপনি যদি কবরে কাউকে নামায পড়ার সুযোগ দান করেন তবে আমাকেও সে সুযোগ দান করুন।
ইনশাআল্লাহ, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তার এই দুআ ফিরিয়ে দেবেন না।
বর্ণনাকারী রবী বিন সুবাইহ বলেন, আবু জাফর জাসর বললেন, সেই পবিত্র সত্তার শপথ, যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই! আমি রাত্রিবেলা স্বপ্নে তাকে সবুজ পোশাকে কবরে নামায আদায় করতে দেখেছি।
৩. ইয়াজিদ বিন তরীফ বাজালী বলেন, যামাযিম যুদ্ধের সময় আমার এক ভাই মৃত্যুবরণ করে। তাকে কবর দেওয়ার পরে আমি তার কবরে মাথা ঠেকিয়ে কিছু শোনার চেষ্টা করি। আমি আমার বাম কানে ভাইয়ের দুর্বল কণ্ঠের আওয়াজ শুনে চিনতে পারি। সে তখন বলছিল, আল্লাহ। এরপরই তাকে আরেকজন প্রশ্ন করল, তোমার দ্বীন কী? সে বলল, ইসলাম।
৪. আলা বিন আবদুর কারীম বলেন, এক লোক মারা গেল। তার এক ভাই ছিলেন, যিনি চোখে কম দেখতেন। তিনি বলেন, ভাইয়ের দাফনের পর লোকজন যখন চলে গেল, আমি কবরে মাথা রাখলাম। আমি কবরের ভেতর থেকে আওয়াজ শুনতে পেলাম, তোমার রব কে? তোমার নবী কে? এরপরই আমি আমার ভাইয়ের পরিচিত কণ্ঠ শুনতে পেলাম। সে বলছিল, আল্লাহ আমার রব। মুহাম্মাদ আমার নবী। তারপর কবরের ভেতর থেকে তির ছুড়ে যাওয়ার মত শাঁ শাঁ শব্দ বের হতে লাগল। এই আওয়াজ শুনে আমার শরীর হিম হয়ে গেল। আমি ফিরে আসলাম。
৬. মুহাম্মাদ বিন মুসা সাইগ বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন নাফি মাদানী বলেন, মদিনাবাসী জনৈক ব্যক্তির ইনতিকাল হলে তাকে যথারীতি দাফন করা হয়। এক ব্যক্তি স্বপ্নে তাকে জাহান্নামীদের মধ্যে দেখতে পায়। এই অবস্থা দেখে সে খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। এর সাত বা আট দিন পর লোকটি তাকে আবার স্বপ্নে দেখে। এবার তাকে জান্নাতে দেখতে পায়। লোকটি তাকে বলল, তুমি না বলেছিলে, তুমি জাহান্নামী?
কবরবাসী বলল, আমি সেখানেই ছিলাম। আমাদের পাশে এক সালিহ (পুণ্যবান) ব্যক্তিকে দাফন করা হয়। তিনি তার আশেপাশের চল্লিশজনের জন্য সুপারিশ করেন। আমিও তাদের একজন。
টিকাঃ
১৭৮. শরহুস সুদূর, ১৯৭。
১৭৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/৫২০; হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ২/৩১৯;
তবাকাতুল কুবরা লিইবনি সাআদ, ৭/১৭৪。
১৮০. তাহযীবুল আছার মুসনাদু উমর, ২/৫১৩। বর্ণনা নং ৫৩৬。
১৮১. ইরশাদুস সারী, ৩/৪৭৮। ১৩৭৪ নং হাদিসে কবরের আযাব সংক্রান্ত আলোচনায়。
১৮২, রূহ, ৯০。