📄 জানাজায় আবৃত্তি করা সালাফের কবিতা
১. আবদুল ওয়াহিদ খাত্তাব বলেন, আমি হাসান বসরী -এর সাথে আবু রজা উতারিদি -এর জানাযায় অংশগ্রহণ করলাম। কবর দেওয়া শেষ হলে তিনি হাত ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়ে বললেন, আবু রজা, আপনি দুনিয়ার দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-কষ্ট হতে নিষ্কৃতি পেয়ে গেলেন। আল্লাহ তাআলা আপনার মৃত্যুকে দীর্ঘ প্রশান্তির উপকরণ বানিয়ে দিন। অতঃপর ইমাম ফারাযদাক-এর দিকে ফিরে বললেন, আবু ফিরাস, এই লোকটির মতোই সচেতন থেকো। আমরা সকলেই মৃতদের উত্তরসূরি। এ কথা শুনে ফারাযদাক কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন,
فلسنا بأنجا منهم غير أننا *** بقينا قليلا بعدهم وترحلوا
তাদের দাফন করে এসে আমরা যে দিব্যি বেঁচে থাকব, বিষয়টা এমন নয়, কিছুদিন হয়তো থাকব, তারপর মোটেও নয়।
২. জাফর বিন কিলাব বর্ণনা করেন, মুসগাব বলেছেন, ইসলামে দুটি স্থান (দুনিয়া ও কবর) ব্যতীত অন্যকিছুকে বাসস্থান বলা হয় না। এই বলে তিনি নিচের পঙ্ক্তিটি পাঠ করেন,
نجدد أحزانا لدى كل هالك **** ونسرع نسيانا ولم يأتنا أمن
فأنا ولا كفران الله ربنا *** كالبدن لا تدري متى يؤمها البدن
কবরজগতে প্রতিটি ধ্বংসশীল মানুষের দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি পায় আর দুনিয়ায় তড়িঘড়ি সব ভুলে বসে, শান্তি পাওয়াই দায়
আমি তো প্রতিপালক আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত নই
দেহ যেমন নিজের বেড়ে চলার খবর রাখে না, আমি ঠিক তেমন নই।
৩. তাবেয়ী উরওয়াহ বিন উজাইনাহ আবৃত্তি করেন,
نراع إذا الجنائز قابلتنا *** ونسكن حين تخفى ذاهبات
كروعة ثلة المغار سبع ... فلما غاب عادت راتعات
জানাযার দৃশ্য আমাদের ভীত করে তোলে
প্রিয়হারা বিলাপ কেবল শঙ্কা জাগায়।
বিত্তের তৃপ্তি যখন ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়
সাতমুখী আঘাতের ভয় চারিদিকে প্রলয় জাগায়।
৪. মুহাম্মাদ বিন খালফ তাইমী বলেন, আমার পিতা খালফ বিন সালিহ বলেন, আমি আবু বকর নাহশালী -এর কাছে শুনেছি, তিনি এক জানাযায় উপস্থিত ছিলেন। মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার পরিবারের লোকজন কাঁদতে শুরু করল। আবু বকর নাহশালী তখন মাটিতে দাগ কাটতে কাটতে বলতে লাগলেন,
ترى الميت يبكيه الذي مات قبله *** وموت الذي يبكي عليه قريب
আজ তুমি যার জন্য কাঁদছ, সেও তো একদিন অন্য কারও জন্য কেঁদেছিল, আজ যারা কেঁদে কেটে একাকার হচ্ছে, তাদের মৃত্যুও খুব বেশি দূরে নয়!
৫. মুহাম্মাদ বিন খালফ তাইমী বলেন, আমার পিতার কাছে শুনেছি, তিনি বলেন, আমরা এক ব্যক্তিকে দাফন করে ইবনু সাম্মাক-এর সাথে ফিরে আসছিলাম। এ সময় তিনি খানিকটা এগিয়ে এসে বললেন,
تمر أقاربي جنبات قبري ... كأن أقاربي لا يعرفوني
প্রিয়দের মাহফিল কবর ছেড়ে ক্রমশ দূরে সরতে শুরু করেছে, পরিচিত এ মুখগুলো যেন একেবারেই চেনে না আমাকে।
৬. হিশাম বিন আবদুল মালিক বাহিলী-এর আযাদকৃত গোলাম আবু হাফস বলেন, আমি হিশাম -এর লেখা তার মুখে শুনেছি। তিনি বলেন,
وما سالم عما قليل بسالم **** ولو كثرت حراسه وكتابه
ومن يك ذا باب شديد وحاجب **** فعما قليل يهجر الباب حاجبه
ويصبح بعد الحجب للناس عبرة *** رهينة بيت لم يسير جوانبه
فما كان إلا الدفن حتى تحولت *** إلى غيره أجناده ومواكبه
وأصبح مسرورا به كل كاشح *** وأسلمه جيرانه وأقاربه
فنفسك أكسبها السعادة جاهدا *** فكل امرئ رهن بما هو كاسبه.
মৃত্যুর থাবা হতে নিরাপত্তা দেওয়ার মতো কিছু নেই,
ব্যাপক পাহারাদারি আর কূটকৌশল এখানে কোনো কাজের নয়।
কেউ যদি সুদৃঢ় বাধার দুয়ার তুলে আড়ালে আশ্রয় গ্রহণ করে,
মৃত্যুর সামনে সেই আড়াল সামান্য প্রতিরোধও দাঁড় করাতে পারবে না।
এত প্রতিরোধের পরও মানুষের জন্য শিক্ষার বিষয় হলো,
কবরের দখলে থাকা মানুষের কিছুই এখানে গোপন থাকে না।
দাফন শেষ হতেই দুনিয়ার সৈন্য-সামন্ত ও জনস্রোত
অন্যের সু-নজর লাভের আশায় ছুটে যায়।
শত্রুর মুখে ফুটে ওঠে নিশ্চিন্ত ক্রুর হাসি,
আর স্বজন ও প্রতিবেশীরা তার হাত থেকে নিরাপদ হয়ে যায়।
মনে রেখো, সৌভাগ্য তোমাকেই সাধনা করে অর্জন করতে হবে,
মানুষ ভালো-মন্দ যা কামাই করে, তা-ই তার আমলনামায় জমা থাকে।""
৭. হিব্বান বিন ওয়াসিল ইসহাক ইবনুল জাসসাস-কে বললেন, আবু আররার ইজলী হলেন বনু ইজল গোত্রের একজন খ্যাতিমান বেদুইন কবি। আমি একটি পঙ্ক্তি বলব, আপনি একটি পঙ্ক্তি বলবেন। অতঃপর তা লিখে তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে আবু আররার ইজলী-এর নিকট পাঠানো হবে। দেখি তিনি কী বলেন।
হিব্বান বিন ওয়াসিল বললেন,
فإن كنت لا تدرين ما الموت فانظري *** إلى دير هند کیف خطت مقابره
মৃত্যুর বাস্তবতা সম্পর্কে তোমার যদি ধারণা না থাকে, দিয়ারু হিন্দের দিকে তাকাও; কত শত কবর সেখানে ছড়িয়ে আছে।
ইবনুল জাসসাস বললেন,
تري عجباً مما قضى الله فيهم *** رهائن حتف أوجبته مقادره
“যুগ যুগ ধরে কবরের আঁধারে যাদের নিবাস,
বহুকাল ধরে যারা পড়ে আছে সেখানে, তাদের সাথে আল্লাহ যা করেছেন তা দেখলে তুমি শিউড়ে উঠবে যাবে।"
তাদের পঙ্ক্তি দুটি লিখে বেদুইন কবির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। তিনি তা পড়ে বললেন,
بيوت ترى أثقالها فوق أهلها *** ومجمع زور لا يكلم زائره
কবর এমন এক ঘর, যেখানে একবার মাটির আড়াল সৃষ্টি করলে,
হাজার অনুমতি প্রার্থনা করেও ভেতরের কারও সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না।
টিকাঃ
৬১. তারীখু দিমাশক, ৭৪/৬৫。
৬২. তারীখু দিমাশক, ৭১/২৬৮。
৬৩. আত-তাবসিরাহ, ১/৩৪২; আল মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলমি, ৩/২৭৮。
৬৪. তারীখু দিমাশক, ৩১/২৫。
৬৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৮。
৬৬. তারীখু দিমাশক, ২০/৮১ ও ৬৬/২৫৭; বাগিয়াতুত তলব ফি তারীখি হালব, ১০/৪৫৭১。
৬৭. দিয়ারু হিন্দ সিরিয়ার হীরা শহরের দুটি স্থাপনার নাম। একটি দিয়ারু হিন্দ সুগরা, অপরটি দিয়ারু হিন্দ কুবরা নামে পরিচিত। আদ দিয়ারাতু লিল ইসবাহানী, ২৭, ২৮。
৬৮. বাদাইউল বাদাই, ১১৬。
📄 কবর থেকে ভেসে আসা উপদেশমালা
১. বিখ্যাত আবিদ ও যাহিদ সালিহ মুররি বলেন, গ্রীষ্মের খরতাপ মাখা সময়ে একদিন আমি এক কবরস্থানে গেলাম। কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখি সেখানে নিঃশব্দ নীরবতা বিরাজ করছে। কবরবাসী যেন নীরবতার অনন্য উদাহরণ! তাদের এই অবস্থা দেখে আমি বলে উঠলাম,
আল্লাহ তাআলা এক মহান পবিত্র সত্তা, যিনি তোমাদের দেহ থেকে প্রাণ হরণ করার পর আবার একদিন উভয়ের সম্মিলন ঘটাবেন। রোজ হাশরে তোমাদের পুনরুজ্জীবিত করবেন আর সুদীর্ঘ সময় পরে সকলকে আবার জড়ো করবেন।
আমার কথা শেষ না হতেই এক কবর হতে গম্ভীর কণ্ঠে ভেসে আসল, হে সালিহ,
وَمِنْ آيَاتِهِ أَن تَقُومَ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ بِأَمْرِهِ ثُمَّ إِذَا دَعَاكُمْ دَعْوَةً مِّنَ الْأَرْضِ إِذَا أَنتُمْ تَخْرُجُونَ
আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তাঁরই নির্দেশে আসমান ও জমিন স্থিতিশীল থাকে। তারপর তিনি যখন তোমাদের জমিন থেকে বের হয়ে আসার জন্য একবার আহ্বান করবেন তখনই তোমরা বের হয়ে আসবে।"
সালিহ মুররি বলেন, 'আল্লাহর শপথ! এ কথা শুনে আমি একদম চুপ হয়ে গেলাম। আর আমার চেহারায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।'
২. বিশর বিন মানসুর সালিমী বলেন, আতা আযরাক আমাকে বলেন, তুমি যখন কবরস্থানে যাবে, তখন তোমার মনের অবস্থা যেন এমন হয় যে, তুমি কবরের মধ্যে রয়েছ। এক রাতে আমি এক কবরস্থানে গিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় নিজেকে কবরবাসীদের একজন ভাবছিলাম। এমন সময় একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম,
হে উদাসীন নিদ্রাকাতর, এখানে তুমি পরিপূর্ণ নিআমত কিংবা অপমানজনক ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির যেকোনো একটির সম্মুখীন হতে চলেছ।"
৩. আবু আইয়ুব হাশিমী বলেন, একবার ছাবিত বুনানী এক কবরস্থানে ছিলেন। তিনি আপন মনে কিছু বলছিলেন। ইত্যবসরে কবর থেকে একটি আওয়াজ ভেসে আসল, তুমি যদি তাদের নীরবতার রহস্য উদ্ধার করতে পারতে তবে দেখতে, তাদের মধ্যে কত লোক ভীষণ দুশ্চিন্তায় সময় কাটাচ্ছে।
৪. আবদুর রহমান বিন জুবাইর বিন নুফাইর বর্ণনা করেন। ইয়াজিদ বিন শুরাইহ একবার এক কবর হতে একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন। আওয়াজে বলা হয়, তোমরা যদি আজ আমাদের মতো দেখতে পেতে, তবে তো আমরাও তোমাদের মতোই হতাম। পার্থিব জীবনে আমরাও তোমাদের মতোই একে অন্যের ঘনিষ্ঠ ছিলাম। কিন্তু এই নির্জন প্রান্তর সেই আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। আজ আমরা বদ্ধ ঘরে পড়ে আছি। তোমাদের নাগাল পাওয়ার কোনো সুযোগ আজ আর নেই। আমাদের কাতারে এসে দাঁড়ালে কেউ আর ফিরে যেতে পারে না। এখন এই সংকীর্ণ কুঠরিই আমাদের বাড়িঘর। আমাদের আসল ঠিকানা!**
টিকাঃ
৬৯. সূরা রুম, (৩০): ২৫。
৭০. হিলয়াতুল আওলিয়া, ৬/১৭০。
৭১. শরহুস সুদূর, ২১৪。
৭২. আল হাওয়াতিফ, বর্ণনা নং ৪৫。
৭৩. শরহুস সুদূর, ২১৫。
📄 কবর হতে ভেসে আসা পঙক্তিমালা
১. সাঈদ বিন হাশিম সালামী তার পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমাদের প্রতিবেশী এক যুবক জনৈকা কুমারী যুবতীকে বিয়ে করে ঘরে তুলল। নতুন বউ ঘরে তুলে সে আমোদ-ফুর্তিতে মজে রইল। কবরস্থানের একদম পাশেই ছিল তার বাড়িটি। এক রাতে সদ্য পরিণীতা স্ত্রীকে নিয়ে স্বভাবমাফিক আনন্দ-ফুর্তির মাঝেই ভয়ানক এক ঘটনা ঘটে গেল। নিকটস্থ কবরস্থান হতে কর্কশ কণ্ঠে ভীতিজাগানিয়া কিছু কথাবার্তা ভেসে এল। বজ্র-নিনাদের মতো বাজখাই কণ্ঠের আওয়াজ সে শুনতে পেল, কবর হতে কেউ একজন বলছে,
يا أهل لذة لهو لا تدوم لهم *** إن المنايا تبيد اللهو واللعبا
كم قد رأيناه مسرورا بلذته *** أمسى فريدا من الأهلين مغتربا
প্রাণসখার এ সুখ তোমার রইবে নাকো চিরকাল,
মৃত্যুবাণে ছিন্ন হবে স্বপ্ন-সুখের রঙিন জাল।
প্রিয়ার ঘ্রাণে মত্ত প্রেমে দেখেছি হায় কত জনে!
আজকে তারা হারিয়ে গেছে আঁধার গোরের নির্জনে।
বর্ণনাফারী বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, এ ঘটনার তিন দিনের মধ্যেই নববিবাহিত তরুণের মৃত্যু ঘটে।
২. ইয়াহইয়া বিন সাঈদ কুরাইশী তার পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে শারকী বিন কুতামী হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, দুজন ব্যক্তির মাঝে ভ্রাতৃসম হৃদ্যতা ও সখ্য ছিল। একসময় একজন অপরজন হতে দূরে চলে গেলেন। একসময় তাদের একজনের মৃত্যু ঘটল। খবর পেয়ে অপরজন ছুটে এলেন। মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা হলো। দাফনের পর অন্যরা ফিরে গেলেও বন্ধুটি রয়ে গেলেন। বন্ধুটি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে স্বাভাবিক হয়ে ফিরে আসতে উদ্যত হতেই কবরের ভেতর থেকে কিছু পঙ্ক্তি শুনতে পেলেন। যা ছিল-
أَجِدَّكَ تَطْوِي الدَّوْمَ لَيْلًا وَلَا تَرَى *** عَلَيْكَ لِأَهْلِ الدَّوْمِ أَنْ تَتَكَلَّمَا
وَبِالدَّوْمِ نَاوِ لَوْ ثَوَيْتَ مَكَانَهُ *** فَمَرَّ بِأَهْلِ الدَّوْمِ عَاجَ فَسَلَّمَا
تُجَدِّدُ صَرْمًا أَنْتَ كُنْتَ بَدَأْتَهُ *** وَلَا أَنَا فِيهِ كُنْتُ أَسْوَا وَأَظْلَمَا
তুমি দেখছি রাতের আবর্তন গুটিয়ে ফিরে যাচ্ছ!
অথচ কবরের বাসিন্দাদের ব্যাপারে কিছুই ভাবছ না!
যেদিন তুমি স্থায়ীভাবে এখানে বসবাস শুরু করবে,
সেদিন বুঝবে, এখানকার শান্তি ও স্থিতি কীভাবে মিটে গেছে।
শুরুতেই তুমি এখানে বিচ্ছিন্নতার তিক্ত স্বাদ অনুভব করবে,
দুনিয়ার বুকে আমি নিজেও খুব মন্দ বা অনাচারী ছিলাম না।"
৩. মুসআব হামদানী বলেন, দুই ভাই কিংবা প্রতিবেশী ছিল, যাদের পারস্পরিক হৃদ্যতা ছিল তুলনাহীন। তাদের একজনের প্রতি অন্যজনের হৃদয়ে গভীর আন্তরিকতা ছিল। ঘটনাক্রমে বড় জন ছোট জনকে রেখে ইস্পাহান গেলেন। দীর্ঘ সফর শেষে ফিরে এসে শোনেন প্রাণপ্রিয় বন্ধুসম ভাইটির অকাল-মৃত্যু ঘটেছে। ভাইয়ের শোকে কাতর লোকটি নিয়মিত কবরস্থানে গিয়ে ভাইয়ের কবর জিয়ারত করে আসতেন। এভাবে প্রায় সাত মাস চলে গেল। একদিন জিয়ারত করতে গিয়ে কবরস্থানে অজানা স্থান হতে দুটি পঙ্ক্তি শুনতে পেলেন :
يا أيها الباكي على غيره *** نفسك أصلحها ولا تبكه
إن الذي تبكي على إثره *** يوشك يوشك يوشك أن تسلك في سلكه
শোনো, আজকে বুঝি অশ্রু তোমার ঝরছে পরের তরে?
পরের ভাবনা ছাড়ো এবার, ভাবো নিজের তরে।
আমলনামায় চোখ বুলিয়ে হয়তো সে আজ কেঁদে সারা।
ক'দিন বাদে তুমিও যাবে, শুরু হবে তোমার পালা।
৪. সাফওয়ান বিন আমর বিন হারম বর্ণনা করেন। সুলাইমান বিন ইয়াসার হাযরামী বলেন, একদল লোক একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি কবর হতে নিম্নোক্ত পঙ্ক্তিমালা শুনতে পান,
يا أيها الركب سيروا *** من قبل أن لا تسيروا
فهذه الدار حقا *** فيها إلينا المصير
كم منعم في نعيم *** وتسلبنه الدهور
وآخر في عذاب *** لبئس ذلك المصير
فكما كنتم كنا *** فغيرنا ريب المنون
وسوف كما كنا تكونون
হে অভিযাত্রীগণ, দ্রুত এগিয়ে চলো,
জীবনের পথ ফুরিয়ে আসার আগেই পথ চলো।
মনে রেখো, এ এক অবধারিত ঠিকানা,
যেখানে তোমার নিশ্চিত ঠিকানা হবেই হবে।
এখানে সুখের সন্ধানে পড়ে আছে কত শত প্রাণ,
আশায় আশায় কেটে গেছে কত প্রতীক্ষার প্রহর!
হায়! এখানে কেউ পড়ে আছে শান্তির অনলে,
যাতনার এ ঘরে বেড়ে চলে মর্মব্যথা।
অথচ আমাদের দিনগুলো কেটেছিল তোমাদেরই মতো,
নিয়তির পরিহাসে আজ বদলে গেছে জীবনের হিসেব।
মনে রেখো, সেদিন তোমারও আসবে।
অচিরেই আসছে, যেদিন এমনি বিরান ঘরে ঠাঁই হবে অসহায় তোমার।"
৫. ইমাম শাবী বর্ণনা করেন। সাফওয়ান বিন উমাইয়া একবার এক কবরস্থানে ছিলেন। হঠাৎ দেখলেন, দূর হতে একটি মশালের আলো এগিয়ে আসছে। কাছে আসতে দেখা গেল একদল লোক একটি লাশ দাফন করতে এসেছেন। তারা যখন কবরস্থানের কাছে চলে আসল, বলতে লাগল, অমুক অমুক কবরের দিকে লক্ষ করো। তিনি বলেন, এমন সময় তাদের মধ্যে একজন একটি কবর হতে বিষণ্ণ ও ভয়ার্ত কণ্ঠে এই কথা বলতে শোনেন:
أنعم الله بالظعينة عينا *** وبمسراك يا أمين إلينا
جزعا ما جزعت من ظلمة القبر ... ومن مسك التراب أمينا
"হে আমীনা, মহান রবের নিআমত তোমায় যেন ঋদ্ধ করে
আমাদের প্রিয়জনকে যেন নানা প্রাপ্তিতে সমৃদ্ধ করে।
আমীনা, তুমি তো জানো, কবরের আঁধার আমায় রেখেছে ঘিরে,
পড়ে আছি একাকী এ ধূলিমলিন নীড়ে।
লোকটি গোত্রের লোকদের কাছে ঘটনাটি খুলে বলল। শুনে সবাই কাঁদতে কাঁদতে দাড়ি ভিজিয়ে ফেলল। তারা আমাকে বলল, আপনি কি জানেন এই আমীনা কে? বললাম, না। তারা বলল, আমীনা হলো মৃত ব্যক্তির বোন। সে এক বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছে। তাদের কথা শুনে সাফওয়ান বিন উমাইয়া বললেন, আমরা তো জানি যে মৃত ব্যক্তি কথা বলতে পারে না। তাহলে এই আওয়াজটি কোথা হতে আসল?
৬. সুহাইম বিন মাইমুন ছিলেন লাইস বিন সাআদ এর শিষ্য। তিনি লাইস বিন সাআদ-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, একবার এক লোক কবরস্থানে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে সে শুনতে পেল কোনো এক কবর হতে কেউ বলছে,
أنعم الله بالخليلين عينا *** وبمسراك يا أميم إلينا
হে উমাইমা, জোড়া স্বজনের নিআমতে করুন তোমায় ধন্য
রাঙিয়ে যাক আগমন তব আমাদেরই জন্য।
এই পঙ্ক্তির উত্তরে কেউ একজন বলে উঠল, 'এসব শুভ কামনায় কোনো লাভ হবে না। আমার পিতা তার প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন।' সকাল হতেই লোকটি কবর হতে শোনা নারীর পরিবারের সন্ধান করতে লাগল। পরিবারের সন্ধানে বের হয়ে তিনি একজন পুরুষের সন্ধান পেলেন। লোকটির নিকট নিজের স্বপ্নের ঘটনা উল্লেখ করে কবরের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে সে জানাল, 'এই দুটি হলো আমার দুই মেয়ের কবর। আর এটি তাদের মা উমাইমার কবর। আমি তার প্রতি কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ ছিলাম। তবে আজকে এখনই আমি তার প্রতি সন্তুষ্টি ঘোষণা করে তার দু-চোখে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিলাম।' বর্ণনাকারী বলেন, 'লোকটি তার মৃত স্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তার আখিরাতের পথে অকৃত্রিম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিল এবং তাকে উদ্ধার করল।'
৭. সালামাহ বসরী বলেন, এক ব্যক্তি সুন্দর করে বানানো একটি কবর দেখে মুগ্ধ বিমোহিত হয়ে পড়ে। রাতে স্বপ্নে তার কাছে এক ব্যক্তি আসল। আগন্তুক লোকটির চেহারায় বেদনার ক্লিষ্ট ছাপ বোঝা যাচ্ছিল। লোকটি স্বপ্নদ্রষ্টার সামনে এসে বলল,
أعجبك القبر وحسن البناء *** والجسم فيه قد حواه البلى
فاسأل الأموات عن حالهم *** ينبأك عن ذاك ذهاب الحلى
“কবরপৃষ্ঠের কারুকাজ বুঝি মুগ্ধ করেছে তোমায়?
অন্দরে তার হচ্ছেটা কী, খবর কি তার রাখো?
পারো যদি কোনোভাবে প্রশ্ন করো তাদের,
ব্যথায় কাতর মৃতজনের জবাব শুনে দেখো।
তিনি বলেন, এই কথা বলেই লোকটি চলে গেল। পিছে পিছে গিয়ে দেখি, তিনি কবরস্থানে প্রবেশ করলেন এবং সেই কবরের ভেতরে ঢুকে গেলেন।
৮. জর্ডানের বলকা অঞ্চলে রুসতুম আবরাকী নামক একজন আবিদ ছিলেন। তিনি বলেন, জনৈকা আবিদা মহিলা তার কাছে বর্ণনা করেন যে, তিনি তার সন্তানের অকাল-মৃত্যুতে বেশ কাতর ছিলেন। তার জন্য বছরখানেক তিনি চোখের পানি ফেলেছেন। তিনি বলেন, ছেলে মারা যাওয়ার এক বছর পর আমি তাকে স্বপ্নে দেখি। সে কাফনের কাপড় পরিহিত অবস্থায় কবরে বসে আছে। তার চোখের ভ্রু ঝরে একেবারে সাফ।
বর্ণনাকারী বললেন, আল্লাহর শপথ! ছেলেটির তো খুব সামান্যই পরিবর্তন হয়েছে।
মহিলা বললেন, তার কাফনে মাটির কোনো চিহ্ন ছিল না। আমি ভয়ে ভয়ে তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, বেটা, তোমার আখিরাতের বাসস্থান কেমন হয়েছে? আমার কথায় সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
أنا في الترب مقيل بالي الأركان جمعا
لو ترى أمي رسومي لذرفت الدمع دمعا
"মাটির শোষণে আমার হাড়-মাংস সব ক্ষয়ে গেছে,
তুমি যদি আমার কষ্ট দেখতে মা, চোখের জলে বুক ভাসাতে।
মহিলা বলেন, এরপর ছেলে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। আমি শুধু কিছু কালো দাগের মতো দেখতে পেলাম। যেখানে শরীরের সামান্য অবকাঠামো বা চিহ্নটুকু পর্যন্ত ছিল না। কবরটিও আগের মতো হয়ে গেল। আর আমিও ধরফরিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম।
এরপর মহিলাটি একেবারেই মুষড়ে পড়লেন। চরম দুশ্চিন্তা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগল। একসময় তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।
৯. মুহাম্মাদ বিন মুগীরা তামীমী বলেন, আমার দাদা আলী বিন আবু তালিব বিন ইয়াযিদ হানাফী -এর কাগজপত্রে পেয়েছি, তিনি লিখেছেন, ছুমালী বর্ণনা করেন যে, এক লোক মদীনায় ঘুরতে বের হলো। হঠাৎ সে একটি কবর হতে নিচের পঙ্ক্তিমালা শুনতে পেল,
هَذَا أَبُونَا قَدْ أَتَانَا زَائِرًا *** أَحْبِبْ بِهِ زَوْرًا إِلَيْنَا بَاكِرَا
وَخَيْرُ مَيِّتٍ ضُمِّنَ الْمَقَابِرَا *** جَدَّ إِلَيْنَا عُتْبَةُ مُثَابِرًا
قَدْ وَحَدَ اللهَ زَمَانًا صَابِرًا *** عُوِّضَ مِنْ تَوْحِيدِهِ أَسَاوِرَا
فِي جَنَّةِ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا فَاخِرَا
কিছুক্ষণের মধ্যেই পিতার সাথে সাক্ষাৎ হতে চলেছে,
তার এই অকাল আগমন মোটেও কাম্য নয়।
উত্তম মৃত্যুবরণকারী হলো সে, যার সাথে কবরের পুরোনো সম্পর্ক রয়েছে।
ওতবাহ!! শেষ অবধি তিনি এসেই গেলেন!
জমিনের বুকে তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল তাওহীদের ঘোষণাকারী
আজ এই তাওহীদের ইয়াকীন তার জন্য ফিরদাউসের দ্বার খুলে দেবে।
লোকটি বলল, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে এই পঙ্ক্তিমালার রহস্য উদ্ধার না করে আমি কোথাও যাচ্ছি না। ইতিমধ্যে সেখানে একজন পুরুষের জানাযা উপস্থিত হলো। আমি লোকজনের কাছে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। তারা বলল, মৃত লোকটি বনু সালামাহ গোত্রের আনসারী পরিবারের একজন। আর এখানে যে দুটি কবর রয়েছে, একটি তার ছেলের, অন্যটি তার মেয়ের। ছেলেটির নাম ওতবাহ আর মেয়েটির নাম উবাইদাহ। লোকজন পুরোনো কবর দুটির মধ্যবর্তী স্থানে তাকে দাফন করে চলে গেল。
টিকাঃ
৭৪. শরহুস সুদূর, ২১৪。
৭৫. আল হাওয়াতিফ, ৫২। বর্ণনা নং ৪৩。
৭৬. আল হাওয়াতিফ, ৫১। বর্ণনা নং ৪২。
৭৭. শরহুস সুদুর, ২১৫。
৭৮. তারীখু দিমাশক, ২৪/১১৯, ১২০。
৭৯. আল হাওয়াতিফ, ৫৬। বর্ণনা: ৫৪。
৮০. আহওয়ালুল কুবুর, ১৪৪১
৮১. আহওয়ালুল কুবুর, ১৪৫。
৮২. আল হাওয়াতিফ, পৃ. ৫৭। বর্ণনা নং ৫৬。
📄 সালাফের দৃষ্টিতে কবর
১. আবু হুরায়রা বলেন, দুটি নতুন কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাসুল বলেন,
لَرَكْعَتَيْنِ خَفِيفَتَيْنِ خَيْرٌ مِمَّا يَحْفِرُونَ أَوْ يَنْقِلُونَ
কবরবাসীর নিকট নিজেদের সঞ্চিত বা অর্জিত সমুদয় বস্তু অপেক্ষা দুই রাকাত নফল নামাযের মূল্য অনেক বেশি।
বর্ণনাকারী আবু হিশাম সন্দেহ পোষণ করে বলেন, সম্ভবত তারা নিজেদের পার্থিব অনেক নিআমতের তুলনায় আমলনামায় এমন দুই রাকাত সালাতের সওয়াব দেখতে বেশি পছন্দ করবেন।
২. আবদুল্লাহ বিন উমর বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ বলেছেন,
القَبْرُ حُفْرَةٌ مِنْ حُفَرٍ جَهَنَّمَ أَوْ رَوْضَةً مِنْ رِيَاضِ الجَنَّةِ
কবর জাহান্নামের গর্তসমূহের একটি গর্ত অথবা জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান।
৩. আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বর্ণনা করেন, মাসউদ বলেন,
إِنَّمَا يَكْفِي أَحَدَكُمْ مَا قَنَعَتْ بِهِ نَفْسُهُ وَإِنَّمَا يَصِيرُ أَحَدُكُمْ إِلَى مَوْضِعِ أَرْبَعَةِ أَذْرُعٍ فِي ذِرَاعٍ وَشِبْرٍ وَإِنَّمَا يَصِيرُ الْأَمْرُ إِلَى آخِرِهِ
তোমাদের কারও জন্য তার অন্তরের সন্তুষ্টি পরিমাণ সম্পদই যথেষ্ট। আর তোমাদের গন্তব্য সাড়ে চার গজ জায়গা এবং প্রত্যেক বিষয়ের শেষ অবস্থাই ধর্তব্য।
৬. আবু গাতফান মুররি বর্ণনা করেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাসুল -কে বললেন,
لَوْ فُزِعْنَا أَحْيَانًا لَفَزَعْنَا، فَكَيْفَ بِظُلْمَةِ الْقَبْرِ وَضَيِّقِهِ؟ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّمَا يُوَفَّى الْعَبْدُ عَلَى مَا قُبِضَ عَلَيْهِ
বর্তমানে আমাদের কবরের ভয় দেখালেই আমরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি! তাহলে বাস্তবে সেই সংকীর্ণ কবরে কীভাবে থাকব? রাসুল ﷺ বললেন, বান্দার প্রাণ যে অবস্থায় কবয করা হবে সে অবস্থার ভিত্তিতেই তাকে বিনিময় দেওয়া হবে।
৭. আবদুল্লাহ বিন বকর বিন আবদুল্লাহ মুযনী বর্ণনা করেন, উবাইদুল্লাহ বিন ঈয়ার বলেন, মানুষের বসবাসের জন্য দুটি জায়গা রয়েছে। একটি জমিনের ওপরে। অন্যটি ভূ-গর্তে। প্রথমে সে জমিনের ওপরে পার্থিব জীবনের বাড়িতে থাকে। এ সময় এই বাড়িটিকে সাজিয়ে রাখে। তাতে উত্তর ও দক্ষিণমুখী দরজা- জানালা নির্মাণ করে। শীত ও গ্রীষ্মের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী জমা করে। এই অস্থায়ী ঘর নিয়ে ব্যস্ত থাকতে থাকতেই হঠাৎ একদিন সে তার মাটির নিচে থাকা বাড়িতে অর্থাৎ কবরে চলে যায়। কিন্তু দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ইতিমধ্যে সে তার কবরের বাড়ির পরিবেশ নষ্ট করে ফেলেছে। সেখানে এক ফিরিশতা এসে তাকে বলে, এই যে দুনিয়ার বাড়িঘর, যা তুমি যথাযথভাবে গড়ে তুলেছিলে, কতদিন ছিলে সেখানে? সে বলবে, আমার জানা নেই! আবার প্রশ্ন করবে, এই যে এই কবর, যা তুমি অবহেলায় বিরান করেছ, এখানে কতদিন থাকবে? সে বলবে, এখন তো এটাই আমার ঠিকানা!
ফিরিশতা বলবে, তুমি নিজেই তাহলে বিষয়টা স্বীকার করে নিলে! অথচ দুনিয়াতে তুমি কত বুদ্ধিমান ছিলে!"
৮. হাসান বসরী (রহঃ) উসমান বিন আবুল আস (রাঃ) সম্পর্কে বলেন, একবার তিনি এক জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। কবরস্থানে গিয়ে তিনি ধসে পড়া একটি কবরের পাশে বসেন। তার পরিবারের একজন পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল, যার ব্যাপারে বিভিন্ন সমালোচনা শোনা যেত। তাকে 'হে অমুক!' বলে ডাক দিলেন। সে কাছে আসতেই তিনি তাকে বললেন, নিজের ঘরটা তো ভালো করে দেখো!
লোকটি বলল, আমি তো দেখছি এটি শুকনো, সংকুচিত, অন্ধকার, খাদ্য, পানীয় ও জীবনসঙ্গীহীন এক বিরান ঘর!
উসমান বিন আবুল আস (রাঃ) বললেন, আল্লাহর শপথ! এটাই তোমার আসল ঘর। তুমি সত্য বলেছ। মৃত ব্যক্তিকে লক্ষ করে তিনি আরও বললেন, আল্লাহর শপথ! তুমি যদি ফিরে আসতে পারতে, তবে এখানকার যাবতীয় বস্তু সেখানে স্থানান্তর করতে।
৯. যমরাহ বিন রবীআহ (রহঃ) বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন জাওশাব (রহঃ) বলেন, জনৈকা মহিলা কবরের ভেতরে সিন্ধুকের মতো অবস্থা দেখে অপর এক মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এই সিন্ধুকের মতো বস্তুটি কী? উত্তরে অপরজন বললেন, এটি আমলের ভান্ডার। এ কথা শুনে প্রশ্নকারিণী মহিলা তার সাথে থাকা কিছু জিনিস সদকার উদ্দেশ্যে অপরজনের হাতে দিয়ে বললেন, যাও, এগুলো আমলের ভান্ডারে রেখে এসো।
১০. বাকিয়াহ যাহরানী (রহঃ) বলেন, ছাবিত বুনানী (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি, একবার আমি কবরস্থানের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। এমন সময় পেছন হতে কে যেন আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, হে ছাবিত, কবরস্থানের নীরবতা দেখে ধোঁকায় পড়ে যেয়ো না। এর ভেতরে কত পেরেশান মানুষ রয়েছে! এ কথা শুনতেই আমি পেছনে ফিরে তাকালাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না।
১১. হুশাইম বিন বশীর বলেন, একবার হাসান বসরী একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরগুলোকে লক্ষ্য করে বলেন, হায়! এই ঢিবিগুলোতে কী সুনসান নীরবতা ছেয়ে আছে! অথচ এসবের ভেতরে কত দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ রয়েছে!
১২. শামলাহ বিন হুযাল বলেন, আমি হাসান বসরী সম্পর্কে শুনেছি যে, তিনি কবি ফারাযদাকের সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলেন। লোকজন কবরের চারপাশে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর আলোচনা করছিল। এমন সময় হাসান বসরী বললেন, হে আবু ফিরাস!, এই দিনের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করে রেখেছ? কবি বললেন, আশি বছর যাবৎ 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর সাক্ষ্য প্রস্তুত রেখেছি। হাসান বললেন, এই আমলের ওপর অবিচল থেকো আর সুসংবাদ গ্রহণ কোরো।
১৫. হাম্মাদ বিন সালামাহ বলেন, এক জানাযায় আমি হাসান বসরী-কে কবি ফারাযদাকের প্রতি এই প্রশ্ন করতে দেখেছি যে, এই দিনের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করেছ? উত্তরে ফারাযদাক বললেন, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্য প্রস্তুত করেছি। উত্তর শুনে হাসান বললেন, আল্লাহর শপথ! তুমি তো খুব বিচক্ষণ!
১৬. তামাম বিন বুযাই সাদী বর্ণনা করেন, মুহাম্মাদ বিন কাআব কুরাইযী বলেন, উমর বিন আবদুল আযীয খলীফা হওয়ার পর আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। দরবারে ঢুকে তাকে দেখে আমি চমকে গেলাম। তিনি বললেন, কী ব্যাপার কাআবের বেটা, তুমি এমনভাবে কী দেখছ? খলীফা হওয়ার আগে মদীনায় থাকতে তো আমার দিকে এভাবে তাকাতে না? বললাম, আমীরুল মুমিনীন, আপনি ঠিক বলেছেন। খিলাফত লাভের পর আপনার শারীরিক পরিবর্তন, গায়ের রং পরিবর্তন আর রুক্ষ চুল আমাকে বিস্মিত করেছে।
তিনি বললেন, তাহলে মৃত্যুর তিন দিন পর আমাকে দেখতে তোমার কেমন লাগবে বলো? তখন চোখ-দুটো গড়িয়ে পড়বে। দুই গালের মাংস খসে পড়বে। মুখ আর নাকের ছিদ্র দিয়ে পোকা-মাকড় বেড়িয়ে আসবে। তখন তো আমাকে তোমার আরও বেশি অপরিচিত মনে হবে!
১৭. খালিদ বিন আবু বকর বলেন, সামরিক উর্দি পরিহিত সুদর্শন এক যুবক হাসান বসরী এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।। তিনি তাকে ডেকে বললেন,
আদমসন্তান যৌবন আর সৌন্দর্যের বড়াই করে বেড়ায়। অথচ কবর তার দেহকে নিঃশেষ করে দেবে। তুমি যদি সেই অবস্থা দেখতে তাহলে নিজের জন্য আফসোস করতে। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাগণের অন্তরের পরিশুদ্ধি দেখে থাকেন।
১৮. আবু মুআবিয়াহ বলেন, মালিক বিন মিগওয়াল -এর সাথে দেখা হলে সাধারণত এ কথা না বলে তিনি আমাকে ছাড়তেন যে, পার্থিব জীবন যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে। প্রস্তুতি গ্রহণ করো আর কবরের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। কবরের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা!"
১৯. লাইসী বলেন, হিশাম দাসতুআই-এর স্ত্রী বলেন, বলেন, একবার কোনো কারণে ঘরের বাতি নিভে গেলে অন্ধকারে তাঁর (হিশাম -এর) অবস্থা খুব খারাপ হয়ে পড়ল। আমি বললাম, আপনার পাশের বাতিটি নিভে যাওয়ায় এমন অন্ধকার ছেয়ে গেছে। তিনি বললেন, আমি কবরের অন্ধকারকে স্মরণ করছি। সালাফদের কেউ যদি আমার সামনে থাকত, তবে আমি তাকে আমার মৃত্যুতে আমার ঘরে এসে শোক প্রকাশ করতে বলে যেতাম। এ ঘটনার অল্প কিছুদিন পরই তিনি ইনতিকাল করেন। মৃত্যুর পর তাঁর এক ভাই কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবর লক্ষ্য করে বলেন, হে আবু বকর, আল্লাহর শপথ! কবরের ব্যাপারে আপনি খুব সতর্ক ছিলেন!
২০. জারির বিন হাযিম বলেন, আমি আবদুল্লাহ বিন উবাইদ বিন উমাইর -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, জিন জাতির পক্ষ হতে দৈত্যাকৃতির এক
জিনকে সুলাইমান বিন দাউদ -এর নিকট পাঠানো হলো। এই জিনটি সমুদ্রে বসবাস করত। সে সুলাইমান -এর প্রাসাদের মূল ফটকে এসেই একটি গাছের ডাল ধরে শেকড়সুদ্ধ তা উপড়ে সীমানার বাইরে ছুঁড়ে ফেলল। সুলাইমান আওয়াজ পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কী হল? তখন জিনটির ঘটনা তাঁকে খুলে বলা হলো। তিনি বললেন, সে যা চায়, তোমরাও কি তা চাও? সকলে বলল, না। তিনি বললেন, সে বলতে চায় যে, তুমি যা খুশি করে বেড়াও। যদি তা-ই করো তাহলে তুমি জমিনের বুকে এভাবেই চলতে থাকবে।”
২১. কিনানাহ বিন জাবালাহ সালামী বর্ণনা করেন, ইয়াযিদ রাকাশী বলেন, চির সমাপ্তির ঠিকানা সারিবদ্ধ এই কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখো। আজকে নামফলক দেখে তাদের পরিচয় জানতে হয়। লোকজন তাদের কবর জিয়ারত করতে আসে। তবে সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ শেষ হয়ে গিয়েছে। এভাবে পড়ে থাকতে থাকতে একসময় বিরান হয়ে যাবে। আবার সময়ের আবর্তনে জনবসতি গড়ে উঠে আবাদ হয়ে যাবে। এই বিরান ভূমির বাসিন্দা কিংবা জনবসতিতে বসবাসকারী কেউ কি কবরবাসীর কথা শুনতে পাবে?
২২. আযহার বিন মারওয়ান রিকাশি বর্ণনা করেন। জাফর বিন সুলাইমান বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম, সে একটি লাশ কবরে শুইয়ে দিয়ে বলল, যিনি মায়ের পেটে ভ্রূণের জন্য সবকিছু সহজ করে দিতে পারেন, সেই মহান সত্তা (আল্লাহ) তোমার প্রতি সহজ আচরণে সক্ষম।
২৩. হাসান বসরী বলেন, এমন দুটি দিন ও রাত রয়েছে যার মতো আর কোনো রাত বা দিনের ব্যাপারে কেউ কখনো কিছু শোনেনি। তন্মধ্যে একটি রাত হলো কবরের প্রথম রাত, যা তোমার জীবনে আগে কখনো আসেনি। আর অন্যটি হলো কবরের শেষ রাত। যা ফুরিয়ে আসলেই কিয়ামত শুরু হয়ে যাবে। আর দুটি দিনের প্রথমটি হলো সেদিন, যেদিন আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে একজন ফিরিশতা তোমার নিকট জান্নাতের সুসংবাদ কিংবা জাহান্নামের দুঃসংবাদ নিয়ে হাজির হবে। আর অন্যটি হলো যেদিন তোমার আমলনামা দেওয়া হবে। ডান হাতে কিংবা বাম হাতে।
২৪. বিশর বিন হারিছ বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করে তার জন্য কবর কতই-না উত্তম জায়গা!
২৫. মুফাযযাল বিন গাসসান তার শাইখদের একজন ফযল রাকাশী সম্পর্কে বলেন, তিনি পার্থিব জীবনে মুজাহাদা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলতেন, একবার আমি কবরস্তানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরবাসীকে লক্ষ্য করে বললাম, "হে আভিজাত্য, সম্পদ এবং প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতায় ডুবে থাকা লোকজন, হে ঝলমলে পোশাকের মালিক, দম্ভভরে চলাচলকারী, ব্যতিব্যস্ত ও সম্পদ আহরণকারী লোকজন! হে অসহায়, কপর্দকহীন ও ক্ষুধার্ত লোকজন! হে আবিদ, বিনয়ী, তাওবাকারী ও সাধক লোকজন!
আমার এই আহ্বানে তাদের কেউ সাড়া দেয়নি। আমার জীবনের শপথ! যদি আমার আহ্বানে সাড়া দিতে তাদের প্রতি কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা না থাকত, তবে তারা প্রত্যেকেই আলাদা আলাদাভাবে উত্তর দিত।
২৬. আবুল ইয়ামান বলেন, সাফওয়ান বিন আমর বিন হারম একদিন নিআমতসমূহের আলোচনা এবং নিআমত লাভের ভিত্তিতে মানুষের বিভিন্ন প্রকার উল্লেখ করেন। তখন তিনি খুব জোর দিয়ে বলেন,
মাটিতে মিশে যাওয়া মানবদেহের জন্য উত্তম একটি নিআমত এই যে, তুমি আখিরাতের হিসাবে বিশ্বাস রাখবে এবং উত্তম প্রতিদানের জন্য অপেক্ষা করবে।
২৭. ইবরাহীম বিন মুহাম্মাদ বিন মুনতাশির বর্ণনা করেন, মাসরূক বলেন, মুমিনের জন্য কবরের চেয়ে উত্তম কোনো ঘর হতে পারে না। সেখানে সে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট হতে নিষ্কৃতি পেয়ে বিশ্রাম করে আর আল্লাহ তাআলার আযাব-গযব হতেও নিরাপদ থাকে।
২৮. উমর বিন আবদুর রহমান বলেন, আমি ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ -কে বলতে শুনেছি, একবার ঈসা একটি কবরের সামনে দাঁড়ালেন। তার সাথে তার হাওয়ারীন (সাহাবীগণ) ছিলেন। তারা কবরের ভয়াবহতা, অন্ধকার এবং সংকীর্ণতা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তাদের আলোচনা শুনে ঈসা বললেন, তোমরা সেখানে মাতৃগর্ভের চেয়েও সংকীর্ণ এক কুঠরিতে থাকবে। তবে আল্লাহ তাআলা যদি কারও জন্য প্রশস্ত করতে চান তবে তিনি তার কবর প্রশস্ত করে দেবেন।
২৯. আবুল মিকদাম বলেন, আমরা বকর বিন আবদুল্লাহ -এর জানাযা ও দাফন সেরে হাসান বসরী -এর সাথে ফিরছিলাম। আমি তাকে বললাম, আল্লাহ তাআলার এই বাণী সম্পর্কে আপনি কী বলেন? (وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ) 'আর তাদের সামনে পুনরুত্থান দিবসের আগ পর্যন্ত পর্দা থাকবে।
আমার কথা শুনে তিনি ডানে-বামে তাকিয়ে বললেন, তাদের কবরের আড়ালে রেখে তোমরা তার ওপরিভাগে এই যে ছোটাছুটি করছ, পুনরুত্থানের আগ পর্যন্ত একে অপরের কোনো শব্দ শুনতে পাবে না।
৩০. নুআইম বিন সালামাহ বলেন, কবরে মাটি ছিটানোর সময় প্রথমবার بِسْمِ اللهِ' (বিসমিল্লাহ), দ্বিতীয়বার 'اَلْمُلْكُ لله' (আল মুলকু লিল্লাহ) 'সমস্ত রাজত্ব একমাত্র আল্লাহর' এবং তৃতীয়বার 'لَا شَرِيكَ لَهُ' (লা শারিকা লাহু) 'তার কোনো অংশীদার নেই' বলবে।
৩১. তাবেঈ আবদুর রহমান বিন মাইসারা বলেন, এক ব্যক্তির হিসাব তলব করা হলো; তার নেক আমলের তুলনায় গুনাহের পাল্লা ভারী হয়ে গেল। তখন অনুসন্ধান করে দেখা গেল, সে জনৈক ব্যক্তির কবরে তিনবার মাটি ছিটিয়েছে। এই আমলের সওয়াব নেক আমলের সাথে যুক্ত করা হলো। তার নেক আমল গুনাহের তুলনায় ভারী হয়ে গেল।”
৩২. ফাইয বিন ইসহাক বলেন, বিখ্যাত তাবে-তাবেঈ ফুযাইল বিন আয়ায আমাকে বলেন, তুমি কি জানো? পুরো দুনিয়া তোমার হলেও তোমাকে বলা হবে, এই দুনিয়া ত্যাগ করে চলে আসো। আর তোমাকে তোমার কবরে রেখে যাওয়া হবে। তুমি কি ঠিক তা-ই মনে করো না?
৩৩. ফাইয বিন ইসহাক বলেন, একদিন ফুযাইল বিন আয়ায আমাকে বললেন,
সর্বনাশ হোক! তুমি কি মৃত্যুবরণ করবে না? তোমাকে একদিন এই পরিবার- পরিজন ও সহায়-সম্পত্তি ছেড়ে চলে যেতে হবে। তোমাকে কবরে রেখে আসা হবে। তুমি একাই সেই সংকীর্ণ কুঠরিতে পড়ে থাকবে। অতঃপর তিনি পাঠ করলেন,
فَمَا لَهُ مِن قُوَّةٍ وَلَا نَاصِرٍ
সেদিন তার কোনো ক্ষমতা থাকবে না এবং সাহায্যকারীও না।
তারপর বললেন, তুমি যদি তা মনে না করো, তাহলে তো জমিনের বুকে তোমার চেয়ে বোকা কোনো প্রাণীই নেই।
৩৪. আবু মুহাম্মাদ নাখাঈ বলেন, ইছাম বিন আলী একদিন তার সঙ্গী- সাথিদের অবস্থানরত অবস্থায় হঠাৎ শিউরে ওঠেন। কয়েকজন জিজ্ঞাসা করলেন, কী হয়েছে আপনার? তিনি বললেন, কবরের কথা মনে পড়েছে।
৩৫. হিশাম দাসতআঈ বলেন, মাঝে মাঝে যখন মৃত্যুর কথা স্মরণ করে আমি এই কল্পনা করি যে আমাকে কাফন পরানো হয়েছে, তখন দম বন্ধ হয়ে আসে।"
৩৬. তাবেঈ মাইমুন বিন মিহরান বর্ণনা করেন, সাহাবী আবু দারদা বলেন, তোমাদের জন্য পার্থিব ঘরবাড়ি ও কবরের মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। তোমরা কবরবাসীর জিয়ারত করে থাকো, কিন্তু তারা তোমাদের জিয়ারত করতে পারে না। তোমরা একসময় স্থান পরিবর্তন করে তাদের কাছে চলে যাবে, কিন্তু তারা কখনো তোমাদের পাশে ফিরে আসবে না। হয়তো কবরই তোমাকে পার্থিব ঘরবাড়ি থেকে অখণ্ড অবসর দিতে পারে।"
৩৭. মুফাযযাল বিন গাসসান বলেন, এক ব্যক্তি কবরের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমরা যেসব বিষয়ে উৎসুক হয়ে বসে আছি তারা সেসব বিষয় ত্যাগ করেছেন।"
৩৮. উমারাহ বিন মিহরান মিওয়ালি বলেন, মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি আমাকে বললেন, তোমার বাসস্থানে আমি আহামরি কিছু দেখিনি। বললাম, আমার বাসস্থান তো কবরস্থানের পাশেই। এটা কি আপনাকে বিস্মিত করে না? তিনি বললেন, তাহলে তো কবরগুলো তোমার কষ্ট লাঘব করে দেবে, আখিরাত স্মরণ করিয়ে দেবে।
৩৯. মুহাম্মাদ বিন হারব মক্কী বলেন, একদিন আমাদের মাঝে আবু আবদুর রহমান উমারী হাযির হলেন। আমরা তার পাশে জড়ো হলাম। মক্কার গণ্যমান্য কিছু ব্যক্তিও উপস্থিত হলো। কিছুক্ষণ পর তিনি মাথা উঁচু করে তাকালেন। কাবার আশেপাশে নির্মিত আকর্ষণীয় কিছু বাড়িঘরের দিকে তার দৃষ্টি পড়ল। তিনি উঁচু স্বরে বলে উঠলেন, হে সুরক্ষিত দালানকোঠার বাসিন্দাগণ, ভয়ংকর বিপদে ঘেরা অন্ধকার কবরের কথা স্মরণ করো। হে আয়েশী লোকজন, কবরের পোকা-মাকড়, পুঁজ আর পচেগলে মাটিতে মিশে যাওয়ার কথা স্মরণ করো। এ পর্যন্ত বলেই তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠল। অতঃপর তিনি সেখান থেকে উঠে গেলেন।"
৪০. ইমাম দাউদ তাঈ এক জানাযায় উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, দুনিয়াবাসী, জেনে রাখো, কবরের লোকজন নিজেদের পাঠিয়ে দেয়া আমল নিয়ে উল্লসিত হয় আর রেখে যাওয়া বিত্তবৈভব নিয়ে আক্ষেপ করে। আজ তারা যেসব বিষয় নিয়ে আক্ষেপ করছে, তোমরা তা নিয়ে হানাহানি, কাড়াকাড়ি আর বিবাদে মশগুল রয়েছ。
৪২. ফুযাইল বিন আবদুল ওয়াহাব বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
(خُذُوهُ فَغُلُوهُ)
(কিয়ামতের দিন জাহান্নামীদের ব্যাপারে বলা হবে,) তাকে ধরো, অতঃপর বেড়ি পরিয়ে দাও。
আয়াতের এই অংশের ব্যাখ্যায় মুতামার বিন সুলাইমান তার পিতা সুলাইমান বিন তুরখান তাইমী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'তাকে ধরো' বলার সাথে সাথে ফিরিশতাগণ অপরাধীদের এমনভাবে ধরপাকড় করবে যে, সে তার হাত সামান্য নাড়াচাড়া করারও সুযোগ পাবে না। তখন সে বলবে, তুমি কি আমার প্রতি কোনো দয়া করবে না? ফিরিশতা বলবেন, যেখানে আল্লাহ তাআলা দয়া করেননি। সেখানে আমি কীভাবে দয়া করি?
৪৩. দাউদ বিন মিহরান বর্ণনা করেন, শুআইব বিন আবু হামযাহ বলেন, উমর বিন আবদুল আযীয সিরিয়ার বিভিন্ন শহরের কিছু লোকজনের নিকট এই চিঠি লেখেন যে, সালাম ও কুশল বাদ, স্মরণ রেখো, কত আদমসন্তানের দেহকে মাটি হজম করে ফেলেছে! কত কীট-পতঙ্গ তার পাকস্থলি ছেদ করে বেড়িয়ে এসেছে! হে লোকসকল, এসব মনে করিয়ে দিয়ে আমি নিজেকে এবং তোমাদের সতর্ক করছি。
৪৪. আযহার বিন মারওয়ান রিকাশি বলেন, বিশর বিন মানসুর-এর একটি বিশেষ কামরা ছিল। তিনি আসরের সালাত আদায় করে সেখানে প্রবেশ
করতেন। সেখানে ঢুকে তিনি কবরস্থানমুখী দরজা (কিংবা জানালা) খুলে দিয়ে কবরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। "
৪৫. মুফাযযাল বিন গাসসান বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি খননকৃত একটি কবরের পার্শ্ব অতিক্রমকালে বলেন, মুমিনের বিশ্রামের জন্য এই কবর কতই-না উত্তম স্থান!
টিকাঃ
৮৩. মুসান্নাফু ইবনি আবী শাইবাহ, ২/১৫৮। হাদিস নং ৭৬৩৩। সালাতের ফযীলত অধ্যায়। মুজামুল আওসাত লিত-তাবারানী, ১/২৮২। হাদিস নং ৯২০। আয-যুহদু লি-ইবনি মুবারক, ১/১০। হাদিস নং ৩১। আল্লাহ আযযা ওয়া যাল্লার আনুগত্যের প্রতি উৎসাহ দান অধ্যায়。
৮৪. সুনানু তিরমিযী, ২৪৬০। আবু সাঈদ খুদরি হতে। কিয়ামত বিষয়ক আলোচনা। ইবনুল হাজার আসকালানী হাসান গরিব বলেছেন। হিদায়াতুর রুওয়াত, ৫/৭৪。
৮৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ১/১৩৮。
৮৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৬। সনদ দুর্বল তবে বক্তব্য সহিহ。
৮৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৬。
৮৮. আয যুহদু লি আহমাদ বিন হাম্বল, ৩২৪। বর্ণনা নং ২৩৬৬。
৮৯. আহওয়ালুল কুবুর (ইবনু রজব), ১৩৯; সাকবুল ইবারত, ২২৮; শরহু নাহজিল বালাগাহ, ১৫১。
৯০. আল হাওয়াতিফ, ৫৩। বর্ণনা: ৪৫。
১১. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৯। রূহ, ১০১。
১১. আসলে সত্তর হবে। কারণ, কবি ফারাযদাক ৩৮-১১৪ হি: মোট ৭৬/৭৭ বছর বেঁচে ছিলেন。
১৩. ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ৪/৪৮৭。
১৪. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৫৩১。
৯৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৫/৩৩৩。
৯৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৬。
৯৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৮。
৯৮. আহওয়ালুল কুবুর, ২১১。
১১. তারীখু দিমাশক, ২২/২৬৩。
১০০. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৪。
১০১. শরহুস সুদূর, ১৫৬。
১০২, আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৬। বিদায়া ওয়া নিহায়া, ১০/১৩১। ১৫৮ হিজরির আলোচনায়。
তবে ইমাম আবু দাউদ সাজিস্তানী তার কিতাবুয যুহদ, ৩১৯। বর্ণনা নং ৩৬৬-তে এবং ইমাম বাইহাকী তার শুআবুল ঈমান, ১৩/২১৪। বর্ণনা নং ১০২১৫-তে বর্ণনাটি আনাস বিন মালিক-এর বাণী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যার সনদ হাসান。
১০৩. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৭。
১০৪. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৯。
১০৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৭。
১০৬. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবাহ, ৩৪৮৬৫। সনদ সহিহ。
১০৭. ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ পর্যন্ত সনদ হাসান। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল ও সুয়ূতী নিজ নিজ গ্রন্থে এই বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। কিতাবুয যুহদ, ৩০১। ঈসা হতে বর্ণিত উপদেশমালা。
১০৮. সুরা মুমিনুন, (২৩): ১০০
১০৯. তাফসিরু ইবনি রজব হাম্বলী, ২/৩১। সুরা মুমিনুন, (২৩): ১০০ এর ব্যাখ্যায়। এ ছাড়াও ইবনু রজব হাম্বলী তার আহওয়ালুল কুবুর, ৫ এ আবু হুরায়রা -এর উদ্ধৃতি দিয়ে সমার্থক বর্ণনা উল্লেখ করেছেন。
১১০. তারীখু দিমাশক, ৬২/১৭৪। এই বর্ণনাটি একাধিক বর্ণনাকারীর পরিচয় অস্পষ্ট থাকায় দুর্বল। তা ছাড়া কবরে তিন বার মাটি ছিটানো সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো নিয়ে মুহাদ্দিসগণের নানা মত রয়েছে। সুনানু ইবনু মাজাহ, ১৫৬৫-তে আবু হুরায়রা হতে এ-সংক্রান্ত সহিহ বর্ণনা থাকলেও ইবনু আবী হাতিম হাদিসটি বাতিল বলে মত দিয়েছেন। তবে ইবনুল হাজার আসকালানী-সহ অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ এই বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। বিস্তারিত, তালখীসুল হাবীর, ২/৩০৩, ৩০৪। বর্ণনা নং ৭৮৮। জানাযা অধ্যায়。
১১১. সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী, বর্ণনা নং ৬৭৩১। এই উদ্ধৃতি দিয়ে ইবনুল হাজার আসকালানী তালখিসুল হাবীর, ২/৩০৩ এ সমার্থক বর্ণনা উল্লেখ করেছেন。
১১২, আহওয়ালুল কুবুর, ১৩০。
১১৩. সুরা তারিক, (৮৬): ১০
১১৪. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩০。
১১৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৪。
১১৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৪, ১৫৫。
১১৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৮。
১১৮. আহওয়ালুল কুবুর, ৩৯。
১১৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ২/৩৪৮。
১২০. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৮/৩৭৬। হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৮/২৮৫। সনদ হাসান。
১২১. আহওয়ালুল কুবুর, ৩৯。
১২২. সুরা হাক্কাহ, (৬৯) : ৩০
১২৩. তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৮/২৩১。
১২৪. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫২, ১৫৩। ফসলুল খুত্তাব, ২/২৯৩。
১২৫. শরহুস সুদূর, ২২২。
১২৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৭。
১. আবু হুরায়রা বলেন, দুটি নতুন কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাসুল বলেন,
لَرَكْعَتَيْنِ خَفِيفَتَيْنِ خَيْرٌ مِمَّا يَحْفِرُونَ أَوْ يَنْقِلُونَ
কবরবাসীর নিকট নিজেদের সঞ্চিত বা অর্জিত সমুদয় বস্তু অপেক্ষা দুই রাকাত নফল নামাযের মূল্য অনেক বেশি।
বর্ণনাকারী আবু হিশাম সন্দেহ পোষণ করে বলেন, সম্ভবত তারা নিজেদের পার্থিব অনেক নিআমতের তুলনায় আমলনামায় এমন দুই রাকাত সালাতের সওয়াব দেখতে বেশি পছন্দ করবেন।
২. আবদুল্লাহ বিন উমর বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ বলেছেন,
القَبْرُ حُفْرَةٌ مِنْ حُفَرٍ جَهَنَّمَ أَوْ رَوْضَةً مِنْ رِيَاضِ الجَنَّةِ
কবর জাহান্নামের গর্তসমূহের একটি গর্ত অথবা জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান।
৩. আবদুল্লাহ বিন আব্বাস বর্ণনা করেন, মাসউদ বলেন,
إِنَّمَا يَكْفِي أَحَدَكُمْ مَا قَنَعَتْ بِهِ نَفْسُهُ وَإِنَّمَا يَصِيرُ أَحَدُكُمْ إِلَى مَوْضِعِ أَرْبَعَةِ أَذْرُعٍ فِي ذِرَاعٍ وَشِبْرٍ وَإِنَّمَا يَصِيرُ الْأَمْرُ إِلَى آخِرِهِ
তোমাদের কারও জন্য তার অন্তরের সন্তুষ্টি পরিমাণ সম্পদই যথেষ্ট। আর তোমাদের গন্তব্য সাড়ে চার গজ জায়গা এবং প্রত্যেক বিষয়ের শেষ অবস্থাই ধর্তব্য।
৬. আবু গাতফান মুররি বর্ণনা করেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাসুল -কে বললেন,
لَوْ فُزِعْنَا أَحْيَانًا لَفَزَعْنَا، فَكَيْفَ بِظُلْمَةِ الْقَبْرِ وَضَيِّقِهِ؟ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّمَا يُوَفَّى الْعَبْدُ عَلَى مَا قُبِضَ عَلَيْهِ
বর্তমানে আমাদের কবরের ভয় দেখালেই আমরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি! তাহলে বাস্তবে সেই সংকীর্ণ কবরে কীভাবে থাকব? রাসুল ﷺ বললেন, বান্দার প্রাণ যে অবস্থায় কবয করা হবে সে অবস্থার ভিত্তিতেই তাকে বিনিময় দেওয়া হবে।
৭. আবদুল্লাহ বিন বকর বিন আবদুল্লাহ মুযনী বর্ণনা করেন, উবাইদুল্লাহ বিন ঈয়ার বলেন, মানুষের বসবাসের জন্য দুটি জায়গা রয়েছে। একটি জমিনের ওপরে। অন্যটি ভূ-গর্তে। প্রথমে সে জমিনের ওপরে পার্থিব জীবনের বাড়িতে থাকে। এ সময় এই বাড়িটিকে সাজিয়ে রাখে। তাতে উত্তর ও দক্ষিণমুখী দরজা- জানালা নির্মাণ করে। শীত ও গ্রীষ্মের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী জমা করে। এই অস্থায়ী ঘর নিয়ে ব্যস্ত থাকতে থাকতেই হঠাৎ একদিন সে তার মাটির নিচে থাকা বাড়িতে অর্থাৎ কবরে চলে যায়। কিন্তু দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ইতিমধ্যে সে তার কবরের বাড়ির পরিবেশ নষ্ট করে ফেলেছে। সেখানে এক ফিরিশতা এসে তাকে বলে, এই যে দুনিয়ার বাড়িঘর, যা তুমি যথাযথভাবে গড়ে তুলেছিলে, কতদিন ছিলে সেখানে? সে বলবে, আমার জানা নেই! আবার প্রশ্ন করবে, এই যে এই কবর, যা তুমি অবহেলায় বিরান করেছ, এখানে কতদিন থাকবে? সে বলবে, এখন তো এটাই আমার ঠিকানা!
ফিরিশতা বলবে, তুমি নিজেই তাহলে বিষয়টা স্বীকার করে নিলে! অথচ দুনিয়াতে তুমি কত বুদ্ধিমান ছিলে!"
৮. হাসান বসরী (রহঃ) উসমান বিন আবুল আস (রাঃ) সম্পর্কে বলেন, একবার তিনি এক জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। কবরস্থানে গিয়ে তিনি ধসে পড়া একটি কবরের পাশে বসেন। তার পরিবারের একজন পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল, যার ব্যাপারে বিভিন্ন সমালোচনা শোনা যেত। তাকে 'হে অমুক!' বলে ডাক দিলেন। সে কাছে আসতেই তিনি তাকে বললেন, নিজের ঘরটা তো ভালো করে দেখো!
লোকটি বলল, আমি তো দেখছি এটি শুকনো, সংকুচিত, অন্ধকার, খাদ্য, পানীয় ও জীবনসঙ্গীহীন এক বিরান ঘর!
উসমান বিন আবুল আস (রাঃ) বললেন, আল্লাহর শপথ! এটাই তোমার আসল ঘর। তুমি সত্য বলেছ। মৃত ব্যক্তিকে লক্ষ করে তিনি আরও বললেন, আল্লাহর শপথ! তুমি যদি ফিরে আসতে পারতে, তবে এখানকার যাবতীয় বস্তু সেখানে স্থানান্তর করতে।
৯. যমরাহ বিন রবীআহ (রহঃ) বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন জাওশাব (রহঃ) বলেন, জনৈকা মহিলা কবরের ভেতরে সিন্ধুকের মতো অবস্থা দেখে অপর এক মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এই সিন্ধুকের মতো বস্তুটি কী? উত্তরে অপরজন বললেন, এটি আমলের ভান্ডার। এ কথা শুনে প্রশ্নকারিণী মহিলা তার সাথে থাকা কিছু জিনিস সদকার উদ্দেশ্যে অপরজনের হাতে দিয়ে বললেন, যাও, এগুলো আমলের ভান্ডারে রেখে এসো।
১০. বাকিয়াহ যাহরানী (রহঃ) বলেন, ছাবিত বুনানী (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি, একবার আমি কবরস্থানের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। এমন সময় পেছন হতে কে যেন আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, হে ছাবিত, কবরস্থানের নীরবতা দেখে ধোঁকায় পড়ে যেয়ো না। এর ভেতরে কত পেরেশান মানুষ রয়েছে! এ কথা শুনতেই আমি পেছনে ফিরে তাকালাম। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না।
১১. হুশাইম বিন বশীর বলেন, একবার হাসান বসরী একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরগুলোকে লক্ষ্য করে বলেন, হায়! এই ঢিবিগুলোতে কী সুনসান নীরবতা ছেয়ে আছে! অথচ এসবের ভেতরে কত দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ রয়েছে!
১২. শামলাহ বিন হুযাল বলেন, আমি হাসান বসরী সম্পর্কে শুনেছি যে, তিনি কবি ফারাযদাকের সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলেন। লোকজন কবরের চারপাশে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর আলোচনা করছিল। এমন সময় হাসান বসরী বললেন, হে আবু ফিরাস!, এই দিনের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করে রেখেছ? কবি বললেন, আশি বছর যাবৎ 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর সাক্ষ্য প্রস্তুত রেখেছি। হাসান বললেন, এই আমলের ওপর অবিচল থেকো আর সুসংবাদ গ্রহণ কোরো।
১৫. হাম্মাদ বিন সালামাহ বলেন, এক জানাযায় আমি হাসান বসরী-কে কবি ফারাযদাকের প্রতি এই প্রশ্ন করতে দেখেছি যে, এই দিনের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করেছ? উত্তরে ফারাযদাক বললেন, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্য প্রস্তুত করেছি। উত্তর শুনে হাসান বললেন, আল্লাহর শপথ! তুমি তো খুব বিচক্ষণ!
১৬. তামাম বিন বুযাই সাদী বর্ণনা করেন, মুহাম্মাদ বিন কাআব কুরাইযী বলেন, উমর বিন আবদুল আযীয খলীফা হওয়ার পর আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। দরবারে ঢুকে তাকে দেখে আমি চমকে গেলাম। তিনি বললেন, কী ব্যাপার কাআবের বেটা, তুমি এমনভাবে কী দেখছ? খলীফা হওয়ার আগে মদীনায় থাকতে তো আমার দিকে এভাবে তাকাতে না? বললাম, আমীরুল মুমিনীন, আপনি ঠিক বলেছেন। খিলাফত লাভের পর আপনার শারীরিক পরিবর্তন, গায়ের রং পরিবর্তন আর রুক্ষ চুল আমাকে বিস্মিত করেছে।
তিনি বললেন, তাহলে মৃত্যুর তিন দিন পর আমাকে দেখতে তোমার কেমন লাগবে বলো? তখন চোখ-দুটো গড়িয়ে পড়বে। দুই গালের মাংস খসে পড়বে। মুখ আর নাকের ছিদ্র দিয়ে পোকা-মাকড় বেড়িয়ে আসবে। তখন তো আমাকে তোমার আরও বেশি অপরিচিত মনে হবে!
১৭. খালিদ বিন আবু বকর বলেন, সামরিক উর্দি পরিহিত সুদর্শন এক যুবক হাসান বসরী এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।। তিনি তাকে ডেকে বললেন,
আদমসন্তান যৌবন আর সৌন্দর্যের বড়াই করে বেড়ায়। অথচ কবর তার দেহকে নিঃশেষ করে দেবে। তুমি যদি সেই অবস্থা দেখতে তাহলে নিজের জন্য আফসোস করতে। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাগণের অন্তরের পরিশুদ্ধি দেখে থাকেন।
১৮. আবু মুআবিয়াহ বলেন, মালিক বিন মিগওয়াল -এর সাথে দেখা হলে সাধারণত এ কথা না বলে তিনি আমাকে ছাড়তেন যে, পার্থিব জীবন যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে। প্রস্তুতি গ্রহণ করো আর কবরের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। কবরের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা!"
১৯. লাইসী বলেন, হিশাম দাসতুআই-এর স্ত্রী বলেন, বলেন, একবার কোনো কারণে ঘরের বাতি নিভে গেলে অন্ধকারে তাঁর (হিশাম -এর) অবস্থা খুব খারাপ হয়ে পড়ল। আমি বললাম, আপনার পাশের বাতিটি নিভে যাওয়ায় এমন অন্ধকার ছেয়ে গেছে। তিনি বললেন, আমি কবরের অন্ধকারকে স্মরণ করছি। সালাফদের কেউ যদি আমার সামনে থাকত, তবে আমি তাকে আমার মৃত্যুতে আমার ঘরে এসে শোক প্রকাশ করতে বলে যেতাম। এ ঘটনার অল্প কিছুদিন পরই তিনি ইনতিকাল করেন। মৃত্যুর পর তাঁর এক ভাই কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবর লক্ষ্য করে বলেন, হে আবু বকর, আল্লাহর শপথ! কবরের ব্যাপারে আপনি খুব সতর্ক ছিলেন!
২০. জারির বিন হাযিম বলেন, আমি আবদুল্লাহ বিন উবাইদ বিন উমাইর -কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, জিন জাতির পক্ষ হতে দৈত্যাকৃতির এক
জিনকে সুলাইমান বিন দাউদ -এর নিকট পাঠানো হলো। এই জিনটি সমুদ্রে বসবাস করত। সে সুলাইমান -এর প্রাসাদের মূল ফটকে এসেই একটি গাছের ডাল ধরে শেকড়সুদ্ধ তা উপড়ে সীমানার বাইরে ছুঁড়ে ফেলল। সুলাইমান আওয়াজ পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কী হল? তখন জিনটির ঘটনা তাঁকে খুলে বলা হলো। তিনি বললেন, সে যা চায়, তোমরাও কি তা চাও? সকলে বলল, না। তিনি বললেন, সে বলতে চায় যে, তুমি যা খুশি করে বেড়াও। যদি তা-ই করো তাহলে তুমি জমিনের বুকে এভাবেই চলতে থাকবে।”
২১. কিনানাহ বিন জাবালাহ সালামী বর্ণনা করেন, ইয়াযিদ রাকাশী বলেন, চির সমাপ্তির ঠিকানা সারিবদ্ধ এই কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখো। আজকে নামফলক দেখে তাদের পরিচয় জানতে হয়। লোকজন তাদের কবর জিয়ারত করতে আসে। তবে সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ শেষ হয়ে গিয়েছে। এভাবে পড়ে থাকতে থাকতে একসময় বিরান হয়ে যাবে। আবার সময়ের আবর্তনে জনবসতি গড়ে উঠে আবাদ হয়ে যাবে। এই বিরান ভূমির বাসিন্দা কিংবা জনবসতিতে বসবাসকারী কেউ কি কবরবাসীর কথা শুনতে পাবে?
২২. আযহার বিন মারওয়ান রিকাশি বর্ণনা করেন। জাফর বিন সুলাইমান বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম, সে একটি লাশ কবরে শুইয়ে দিয়ে বলল, যিনি মায়ের পেটে ভ্রূণের জন্য সবকিছু সহজ করে দিতে পারেন, সেই মহান সত্তা (আল্লাহ) তোমার প্রতি সহজ আচরণে সক্ষম।
২৩. হাসান বসরী বলেন, এমন দুটি দিন ও রাত রয়েছে যার মতো আর কোনো রাত বা দিনের ব্যাপারে কেউ কখনো কিছু শোনেনি। তন্মধ্যে একটি রাত হলো কবরের প্রথম রাত, যা তোমার জীবনে আগে কখনো আসেনি। আর অন্যটি হলো কবরের শেষ রাত। যা ফুরিয়ে আসলেই কিয়ামত শুরু হয়ে যাবে। আর দুটি দিনের প্রথমটি হলো সেদিন, যেদিন আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে একজন ফিরিশতা তোমার নিকট জান্নাতের সুসংবাদ কিংবা জাহান্নামের দুঃসংবাদ নিয়ে হাজির হবে। আর অন্যটি হলো যেদিন তোমার আমলনামা দেওয়া হবে। ডান হাতে কিংবা বাম হাতে।
২৪. বিশর বিন হারিছ বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করে তার জন্য কবর কতই-না উত্তম জায়গা!
২৫. মুফাযযাল বিন গাসসান তার শাইখদের একজন ফযল রাকাশী সম্পর্কে বলেন, তিনি পার্থিব জীবনে মুজাহাদা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলতেন, একবার আমি কবরস্তানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরবাসীকে লক্ষ্য করে বললাম, "হে আভিজাত্য, সম্পদ এবং প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতায় ডুবে থাকা লোকজন, হে ঝলমলে পোশাকের মালিক, দম্ভভরে চলাচলকারী, ব্যতিব্যস্ত ও সম্পদ আহরণকারী লোকজন! হে অসহায়, কপর্দকহীন ও ক্ষুধার্ত লোকজন! হে আবিদ, বিনয়ী, তাওবাকারী ও সাধক লোকজন!
আমার এই আহ্বানে তাদের কেউ সাড়া দেয়নি। আমার জীবনের শপথ! যদি আমার আহ্বানে সাড়া দিতে তাদের প্রতি কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা না থাকত, তবে তারা প্রত্যেকেই আলাদা আলাদাভাবে উত্তর দিত।
২৬. আবুল ইয়ামান বলেন, সাফওয়ান বিন আমর বিন হারম একদিন নিআমতসমূহের আলোচনা এবং নিআমত লাভের ভিত্তিতে মানুষের বিভিন্ন প্রকার উল্লেখ করেন। তখন তিনি খুব জোর দিয়ে বলেন,
মাটিতে মিশে যাওয়া মানবদেহের জন্য উত্তম একটি নিআমত এই যে, তুমি আখিরাতের হিসাবে বিশ্বাস রাখবে এবং উত্তম প্রতিদানের জন্য অপেক্ষা করবে।
২৭. ইবরাহীম বিন মুহাম্মাদ বিন মুনতাশির বর্ণনা করেন, মাসরূক বলেন, মুমিনের জন্য কবরের চেয়ে উত্তম কোনো ঘর হতে পারে না। সেখানে সে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট হতে নিষ্কৃতি পেয়ে বিশ্রাম করে আর আল্লাহ তাআলার আযাব-গযব হতেও নিরাপদ থাকে।
২৮. উমর বিন আবদুর রহমান বলেন, আমি ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ -কে বলতে শুনেছি, একবার ঈসা একটি কবরের সামনে দাঁড়ালেন। তার সাথে তার হাওয়ারীন (সাহাবীগণ) ছিলেন। তারা কবরের ভয়াবহতা, অন্ধকার এবং সংকীর্ণতা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তাদের আলোচনা শুনে ঈসা বললেন, তোমরা সেখানে মাতৃগর্ভের চেয়েও সংকীর্ণ এক কুঠরিতে থাকবে। তবে আল্লাহ তাআলা যদি কারও জন্য প্রশস্ত করতে চান তবে তিনি তার কবর প্রশস্ত করে দেবেন।
২৯. আবুল মিকদাম বলেন, আমরা বকর বিন আবদুল্লাহ -এর জানাযা ও দাফন সেরে হাসান বসরী -এর সাথে ফিরছিলাম। আমি তাকে বললাম, আল্লাহ তাআলার এই বাণী সম্পর্কে আপনি কী বলেন? (وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ) 'আর তাদের সামনে পুনরুত্থান দিবসের আগ পর্যন্ত পর্দা থাকবে।
আমার কথা শুনে তিনি ডানে-বামে তাকিয়ে বললেন, তাদের কবরের আড়ালে রেখে তোমরা তার ওপরিভাগে এই যে ছোটাছুটি করছ, পুনরুত্থানের আগ পর্যন্ত একে অপরের কোনো শব্দ শুনতে পাবে না।
৩০. নুআইম বিন সালামাহ বলেন, কবরে মাটি ছিটানোর সময় প্রথমবার بِسْمِ اللهِ' (বিসমিল্লাহ), দ্বিতীয়বার 'اَلْمُلْكُ لله' (আল মুলকু লিল্লাহ) 'সমস্ত রাজত্ব একমাত্র আল্লাহর' এবং তৃতীয়বার 'لَا شَرِيكَ لَهُ' (লা শারিকা লাহু) 'তার কোনো অংশীদার নেই' বলবে।
৩১. তাবেঈ আবদুর রহমান বিন মাইসারা বলেন, এক ব্যক্তির হিসাব তলব করা হলো; তার নেক আমলের তুলনায় গুনাহের পাল্লা ভারী হয়ে গেল। তখন অনুসন্ধান করে দেখা গেল, সে জনৈক ব্যক্তির কবরে তিনবার মাটি ছিটিয়েছে। এই আমলের সওয়াব নেক আমলের সাথে যুক্ত করা হলো। তার নেক আমল গুনাহের তুলনায় ভারী হয়ে গেল।”
৩২. ফাইয বিন ইসহাক বলেন, বিখ্যাত তাবে-তাবেঈ ফুযাইল বিন আয়ায আমাকে বলেন, তুমি কি জানো? পুরো দুনিয়া তোমার হলেও তোমাকে বলা হবে, এই দুনিয়া ত্যাগ করে চলে আসো। আর তোমাকে তোমার কবরে রেখে যাওয়া হবে। তুমি কি ঠিক তা-ই মনে করো না?
৩৩. ফাইয বিন ইসহাক বলেন, একদিন ফুযাইল বিন আয়ায আমাকে বললেন,
সর্বনাশ হোক! তুমি কি মৃত্যুবরণ করবে না? তোমাকে একদিন এই পরিবার- পরিজন ও সহায়-সম্পত্তি ছেড়ে চলে যেতে হবে। তোমাকে কবরে রেখে আসা হবে। তুমি একাই সেই সংকীর্ণ কুঠরিতে পড়ে থাকবে। অতঃপর তিনি পাঠ করলেন,
فَمَا لَهُ مِن قُوَّةٍ وَلَا نَاصِرٍ
সেদিন তার কোনো ক্ষমতা থাকবে না এবং সাহায্যকারীও না।
তারপর বললেন, তুমি যদি তা মনে না করো, তাহলে তো জমিনের বুকে তোমার চেয়ে বোকা কোনো প্রাণীই নেই।
৩৪. আবু মুহাম্মাদ নাখাঈ বলেন, ইছাম বিন আলী একদিন তার সঙ্গী- সাথিদের অবস্থানরত অবস্থায় হঠাৎ শিউরে ওঠেন। কয়েকজন জিজ্ঞাসা করলেন, কী হয়েছে আপনার? তিনি বললেন, কবরের কথা মনে পড়েছে।
৩৫. হিশাম দাসতআঈ বলেন, মাঝে মাঝে যখন মৃত্যুর কথা স্মরণ করে আমি এই কল্পনা করি যে আমাকে কাফন পরানো হয়েছে, তখন দম বন্ধ হয়ে আসে।"
৩৬. তাবেঈ মাইমুন বিন মিহরান বর্ণনা করেন, সাহাবী আবু দারদা বলেন, তোমাদের জন্য পার্থিব ঘরবাড়ি ও কবরের মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। তোমরা কবরবাসীর জিয়ারত করে থাকো, কিন্তু তারা তোমাদের জিয়ারত করতে পারে না। তোমরা একসময় স্থান পরিবর্তন করে তাদের কাছে চলে যাবে, কিন্তু তারা কখনো তোমাদের পাশে ফিরে আসবে না। হয়তো কবরই তোমাকে পার্থিব ঘরবাড়ি থেকে অখণ্ড অবসর দিতে পারে।"
৩৭. মুফাযযাল বিন গাসসান বলেন, এক ব্যক্তি কবরের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমরা যেসব বিষয়ে উৎসুক হয়ে বসে আছি তারা সেসব বিষয় ত্যাগ করেছেন।"
৩৮. উমারাহ বিন মিহরান মিওয়ালি বলেন, মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি আমাকে বললেন, তোমার বাসস্থানে আমি আহামরি কিছু দেখিনি। বললাম, আমার বাসস্থান তো কবরস্থানের পাশেই। এটা কি আপনাকে বিস্মিত করে না? তিনি বললেন, তাহলে তো কবরগুলো তোমার কষ্ট লাঘব করে দেবে, আখিরাত স্মরণ করিয়ে দেবে।
৩৯. মুহাম্মাদ বিন হারব মক্কী বলেন, একদিন আমাদের মাঝে আবু আবদুর রহমান উমারী হাযির হলেন। আমরা তার পাশে জড়ো হলাম। মক্কার গণ্যমান্য কিছু ব্যক্তিও উপস্থিত হলো। কিছুক্ষণ পর তিনি মাথা উঁচু করে তাকালেন। কাবার আশেপাশে নির্মিত আকর্ষণীয় কিছু বাড়িঘরের দিকে তার দৃষ্টি পড়ল। তিনি উঁচু স্বরে বলে উঠলেন, হে সুরক্ষিত দালানকোঠার বাসিন্দাগণ, ভয়ংকর বিপদে ঘেরা অন্ধকার কবরের কথা স্মরণ করো। হে আয়েশী লোকজন, কবরের পোকা-মাকড়, পুঁজ আর পচেগলে মাটিতে মিশে যাওয়ার কথা স্মরণ করো। এ পর্যন্ত বলেই তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠল। অতঃপর তিনি সেখান থেকে উঠে গেলেন।"
৪০. ইমাম দাউদ তাঈ এক জানাযায় উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, দুনিয়াবাসী, জেনে রাখো, কবরের লোকজন নিজেদের পাঠিয়ে দেয়া আমল নিয়ে উল্লসিত হয় আর রেখে যাওয়া বিত্তবৈভব নিয়ে আক্ষেপ করে। আজ তারা যেসব বিষয় নিয়ে আক্ষেপ করছে, তোমরা তা নিয়ে হানাহানি, কাড়াকাড়ি আর বিবাদে মশগুল রয়েছ。
৪২. ফুযাইল বিন আবদুল ওয়াহাব বর্ণনা করেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
(خُذُوهُ فَغُلُوهُ)
(কিয়ামতের দিন জাহান্নামীদের ব্যাপারে বলা হবে,) তাকে ধরো, অতঃপর বেড়ি পরিয়ে দাও。
আয়াতের এই অংশের ব্যাখ্যায় মুতামার বিন সুলাইমান তার পিতা সুলাইমান বিন তুরখান তাইমী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'তাকে ধরো' বলার সাথে সাথে ফিরিশতাগণ অপরাধীদের এমনভাবে ধরপাকড় করবে যে, সে তার হাত সামান্য নাড়াচাড়া করারও সুযোগ পাবে না। তখন সে বলবে, তুমি কি আমার প্রতি কোনো দয়া করবে না? ফিরিশতা বলবেন, যেখানে আল্লাহ তাআলা দয়া করেননি। সেখানে আমি কীভাবে দয়া করি?
৪৩. দাউদ বিন মিহরান বর্ণনা করেন, শুআইব বিন আবু হামযাহ বলেন, উমর বিন আবদুল আযীয সিরিয়ার বিভিন্ন শহরের কিছু লোকজনের নিকট এই চিঠি লেখেন যে, সালাম ও কুশল বাদ, স্মরণ রেখো, কত আদমসন্তানের দেহকে মাটি হজম করে ফেলেছে! কত কীট-পতঙ্গ তার পাকস্থলি ছেদ করে বেড়িয়ে এসেছে! হে লোকসকল, এসব মনে করিয়ে দিয়ে আমি নিজেকে এবং তোমাদের সতর্ক করছি。
৪৪. আযহার বিন মারওয়ান রিকাশি বলেন, বিশর বিন মানসুর-এর একটি বিশেষ কামরা ছিল। তিনি আসরের সালাত আদায় করে সেখানে প্রবেশ
করতেন। সেখানে ঢুকে তিনি কবরস্থানমুখী দরজা (কিংবা জানালা) খুলে দিয়ে কবরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। "
৪৫. মুফাযযাল বিন গাসসান বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি খননকৃত একটি কবরের পার্শ্ব অতিক্রমকালে বলেন, মুমিনের বিশ্রামের জন্য এই কবর কতই-না উত্তম স্থান!
টিকাঃ
৮৩. মুসান্নাফু ইবনি আবী শাইবাহ, ২/১৫৮। হাদিস নং ৭৬৩৩। সালাতের ফযীলত অধ্যায়। মুজামুল আওসাত লিত-তাবারানী, ১/২৮২। হাদিস নং ৯২০। আয-যুহদু লি-ইবনি মুবারক, ১/১০। হাদিস নং ৩১। আল্লাহ আযযা ওয়া যাল্লার আনুগত্যের প্রতি উৎসাহ দান অধ্যায়。
৮৪. সুনানু তিরমিযী, ২৪৬০। আবু সাঈদ খুদরি হতে। কিয়ামত বিষয়ক আলোচনা। ইবনুল হাজার আসকালানী হাসান গরিব বলেছেন। হিদায়াতুর রুওয়াত, ৫/৭৪。
৮৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ১/১৩৮。
৮৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৬। সনদ দুর্বল তবে বক্তব্য সহিহ。
৮৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৬。
৮৮. আয যুহদু লি আহমাদ বিন হাম্বল, ৩২৪। বর্ণনা নং ২৩৬৬。
৮৯. আহওয়ালুল কুবুর (ইবনু রজব), ১৩৯; সাকবুল ইবারত, ২২৮; শরহু নাহজিল বালাগাহ, ১৫১。
৯০. আল হাওয়াতিফ, ৫৩। বর্ণনা: ৪৫。
১১. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৯। রূহ, ১০১。
১১. আসলে সত্তর হবে। কারণ, কবি ফারাযদাক ৩৮-১১৪ হি: মোট ৭৬/৭৭ বছর বেঁচে ছিলেন。
১৩. ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ৪/৪৮৭。
১৪. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৫৩১。
৯৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৫/৩৩৩。
৯৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৬。
৯৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৮。
৯৮. আহওয়ালুল কুবুর, ২১১。
১১. তারীখু দিমাশক, ২২/২৬৩。
১০০. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৪。
১০১. শরহুস সুদূর, ১৫৬。
১০২, আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৬। বিদায়া ওয়া নিহায়া, ১০/১৩১। ১৫৮ হিজরির আলোচনায়。
তবে ইমাম আবু দাউদ সাজিস্তানী তার কিতাবুয যুহদ, ৩১৯। বর্ণনা নং ৩৬৬-তে এবং ইমাম বাইহাকী তার শুআবুল ঈমান, ১৩/২১৪। বর্ণনা নং ১০২১৫-তে বর্ণনাটি আনাস বিন মালিক-এর বাণী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যার সনদ হাসান。
১০৩. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৭。
১০৪. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৯。
১০৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৭。
১০৬. মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবাহ, ৩৪৮৬৫। সনদ সহিহ。
১০৭. ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ পর্যন্ত সনদ হাসান। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল ও সুয়ূতী নিজ নিজ গ্রন্থে এই বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। কিতাবুয যুহদ, ৩০১। ঈসা হতে বর্ণিত উপদেশমালা。
১০৮. সুরা মুমিনুন, (২৩): ১০০
১০৯. তাফসিরু ইবনি রজব হাম্বলী, ২/৩১। সুরা মুমিনুন, (২৩): ১০০ এর ব্যাখ্যায়। এ ছাড়াও ইবনু রজব হাম্বলী তার আহওয়ালুল কুবুর, ৫ এ আবু হুরায়রা -এর উদ্ধৃতি দিয়ে সমার্থক বর্ণনা উল্লেখ করেছেন。
১১০. তারীখু দিমাশক, ৬২/১৭৪। এই বর্ণনাটি একাধিক বর্ণনাকারীর পরিচয় অস্পষ্ট থাকায় দুর্বল। তা ছাড়া কবরে তিন বার মাটি ছিটানো সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো নিয়ে মুহাদ্দিসগণের নানা মত রয়েছে। সুনানু ইবনু মাজাহ, ১৫৬৫-তে আবু হুরায়রা হতে এ-সংক্রান্ত সহিহ বর্ণনা থাকলেও ইবনু আবী হাতিম হাদিসটি বাতিল বলে মত দিয়েছেন। তবে ইবনুল হাজার আসকালানী-সহ অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ এই বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। বিস্তারিত, তালখীসুল হাবীর, ২/৩০৩, ৩০৪। বর্ণনা নং ৭৮৮। জানাযা অধ্যায়。
১১১. সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী, বর্ণনা নং ৬৭৩১। এই উদ্ধৃতি দিয়ে ইবনুল হাজার আসকালানী তালখিসুল হাবীর, ২/৩০৩ এ সমার্থক বর্ণনা উল্লেখ করেছেন。
১১২, আহওয়ালুল কুবুর, ১৩০。
১১৩. সুরা তারিক, (৮৬): ১০
১১৪. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩০。
১১৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৪。
১১৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৪, ১৫৫。
১১৭. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৮。
১১৮. আহওয়ালুল কুবুর, ৩৯。
১১৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ২/৩৪৮。
১২০. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৮/৩৭৬। হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৮/২৮৫। সনদ হাসান。
১২১. আহওয়ালুল কুবুর, ৩৯。
১২২. সুরা হাক্কাহ, (৬৯) : ৩০
১২৩. তাফসীরু ইবনি কাসীর, ৮/২৩১。
১২৪. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫২, ১৫৩। ফসলুল খুত্তাব, ২/২৯৩。
১২৫. শরহুস সুদূর, ২২২。
১২৬. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৭。