📄 যিয়ারত ও জানাজায় উপস্থিত হয়ে সালাফদের উপলব্ধি
১. আবদুল্লাহ বিন তালহা বিন মুহাম্মাদ আত-তাইমী বলেন, একবার এক জানাযায় অংশ নেওয়ার সুবাদে সাঈদ ইবনুস সাইব আত-তইফী-কে বলতে শুনি, আল্লাহর শপথ! মৃত্যু মানুষের জন্য পরিবার-পরিজনের মধ্যে আনন্দের কিছু বয়ে আনে না। আল্লাহর শপথ! মৃত্যু সুপ্রশস্ত নিআমতের অধিকারী মুমিনের জন্য সংকুচিত হয়ে আসা দুনিয়াকে আরও সংকীর্ণ করে দেয়। আর তারা প্রফুল্লচিত্তে এই দুনিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে যায়।
এ কথা বলে তিনি অশ্রুভরা নয়নে উঠে দাঁড়ালেন।”
২. সালমান বিন সালিহ বলেন, একদিন হাসান বসরী-কে কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। সন্ধ্যায় যখন তার দেখা মিলল, সবাই জানতে চাইলেন, 'আপনি সারাদিন কোথায় ছিলেন?'
তিনি বললেন, এমন কিছু ভাইয়ের সান্নিধ্যে ছিলাম, যাদের আমি ভুলে গেলেও তারা আমায় স্মরণ রাখে। আমি তাদের দোষচর্চা করলেও তারা আমার নিন্দা করে বেড়ায় না।
এ কথা শুনে সবাই বলে উঠল, এরাই তো আমাদের আসল ভাই। হে আবু সাঈদ, আল্লাহর দোহাই! ব্যাপারটা একটু খোলাসা করুন। তারা কারা?
তিনি বললেন, তারা হলো কবরবাসী। '
৩. মালিক বিন দীনার বলেন, একবার আমি এবং হাসসান বিন আবি সিনান এর সাথে কবর জিয়ারত করতে গেলাম। সেখানে গিয়ে তিনি কী যেনো ভাবলেন! অতঃপর আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে মালিক, মানুষের প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিশতাগণ সমস্ত জীবিত ব্যক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। মানুষ যখন তার শিয়রে মালাকুল মাওতকে দেখতে পাবে, তখন সে ভয়ে-আতঙ্কে মুষড়ে পড়বে।' তাঁর মুখে এ কথা শুনে মালিক বিন দীনার নিজের মাথায় হাত দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, আফসোস সেদিনের জন্য! হায় আফসোস সেদিনের জন্য!**
৪. আবু আসিম আল-হানাতী বলেন, একবার আমি মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি এর সাথে পথ চলছিলাম। পথিমধ্যে আমরা একটি কবরস্থানে এসে পৌঁছলাম। কবরস্থান দেখতেই তার দু-চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি বললেন, হে আবু আসিম, কবরের ওপরিভাগের দৃশ্য যেন আপনাকে ধোঁকায় না রাখে, এর ভেতরের প্রতিটি দেহই আনন্দ কিংবা বেদনার দোলায় দুলছে।"
৫. আবু জাফর ফাররা বলেন, হাসান বিন সালিহ একবার ব্যক্তিগত ইবাদতখানায় পৌঁছে কবরবাসীকে (কברস্থান) দেখতে পেলেন। সেদিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, কবর, তোমার ওপরিভাগের দৃশ্য কত সুন্দর! অথচ তোমার আঁধার গর্ভে লুকিয়ে আছে বিপদের ঘনঘটা!"
৬. হাজ্জাজ বিন আবু যিয়াদ বলেন, একবার আমরা বসরার জুবান এলাকায় এক জানাযায় অংশগ্রহণ করলাম। দাফনের প্রস্তুতি চলাকালে আমি একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দেখলাম, আমি কবরবাসীদের একজন। অন্যান্য কবরবাসীর সাথে কবরে শুয়ে আছি। কবরগুলোর মাটিতে ফাটল দেখতে পেলাম। দেখলাম, কেউ মাটিতে শুয়ে আছে। কেউ সুদৃশ্য ঝালর টানা বিশেষ কামরায়। কেউ রেশমি পোশাকের আভিজাত্য জড়িয়ে ঘুমুচ্ছে। কেউ রেশম কোমল বিছানায় শুয়ে আছে। কেউ রাইহান ফুলের জান্নাতি সুবাসে নিদ্রা-বিভোর। কারও মুখে মুচকি হাসির আভা। কারও শরীরে বাহারি রঙের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে। কারও- বা আবার ক্ষণে ক্ষণে রং পাল্টে যাচ্ছে! মনকাড়া এসব দৃশ্য দেখে স্বপ্নেই আমি অশ্রুসিক্ত নয়নে বলে উঠলাম, 'ইয়া আল্লাহ, আপনি চাইলে তো সকলের মর্যাদা বরাবর করে দিতে পারেন!'
এমন সময় কবরস্থানের একপ্রান্ত হতে আওয়াজ ভেসে এল, হাজ্জাজ, কবর হলো আমলের বিনিময় লাভের ঘাঁটি। এ কথা শুনতেই আমার তন্দ্রা কেটে গেল।”
৭. আবু সাঈদ সালাম বিন আবু মুতী বলেন, একবার আমরা মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি-এর সাথে এক জানাযায় শরীক হলাম। লোকজন দ্রুতপদে এগিয়ে গেল। আমরা 'জুবান' পর্যন্ত তাদের পিছে পিছে চলে মূল জানাযার নাগাল পেলাম। তখনো অবশ্য সবাই এসে পৌঁছায়নি। কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই চলে আসলে আমরা জানাযার সালাত আদায় করে নিলাম। জানাযার পর আমি দাফনের কাজে অংশ নিলাম। দাফন সেরে মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি-এর নিকট ফিরে আসলাম। এসে দেখি তিনি তার পাশের জনকে কিছু বলছেন। কান পেতে শুনলাম তিনি বলছেন,
প্রতিদিনই আমাদের কেউ-না-কেউ নম্বর এই জগতের মায়া ছেড়ে নির্জন কবরজগতে পাড়ি জমাচ্ছে। আর এভাবেই পরবর্তী লোকজন শীঘ্রই পূর্ববর্তীগণের সাথে মিলিত হবে।
৮. নাহীম আল ইজলী-এর নিকট বসরার এক লোক বর্ণনা করে বলেন, একবার এক জানাযার জামাতে হাসান বসরী-কে দেখতে পেলাম। লোকজন তার নিকট জড়ো হলো। তিনি উপস্থিত জনসাধারণকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি দয়া ও মেহেরবানি করুন। তোমরা আজকের দিনের জন্য আমল করতে থাকো। আজকে তোমাদের এই ভাই আখিরাতের যাত্রায় তোমাদের পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছেন। আর তোমরা তার উত্তরসূরি হিসেবে রয়ে গেছ।
যে ব্যক্তি তার ভাইকে দাফন করে নিজে তার উত্তরসূরি হয়েছে, তাকে বলছি শোনো, আগামীকাল অন্যদের পেছনে ফেলে তুমিও মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করবে। সেদিন এভাবেই অন্যরা তোমার পেছনে রয়ে যাবে। এভাবেই আগে-পরে করে একে একে যেতে থাকবে। একে একে সবাই একদিন একত্র হবে। মৃত্যু তোমাদের সকলকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেবে। সকলকেই মৃত্যুর কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। নিঃসন্দেহে সকলকে একদিন কবরবাসী হতে হবে। কিয়ামতের সূচনালগ্নে ঠিক সেখান থেকেই পুনরুত্থান হবে। আল্লাহ তাআলার দরবারে উপস্থিত করা হবে। প্রত্যেককে তাঁর সম্মুখে একাকী হাজির হতে হবে। সেখানে সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে লুটিয়ে পড়বে।
১০. সাঈদ বিন আল জারিরী তার কয়েকজন উস্তাদ হতে বর্ণনা করেন, আবু দারদা এক জানাযায় শরীক হলেন। জনৈক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করল, মৃত ব্যক্তিটি কে? তিনি বললেন, এটি তুমি। আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّكَ مَيِّتُ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ 'নিশ্চয় তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল।' (সুরা যুমার ৩৯:৩০)
১০. ইয়াহইয়া বিন জাবির বর্ণনা করেন। আবু দারদা এক জানাযায় শরীক হতে বের হলেন। মৃত ব্যক্তির পরিবারের লোকজন তার শোকে কাঁদতে কাঁদতে আসল। এ দৃশ্য দেখে তিনি বললেন, হতভাগার দল! আগামীকাল মৃত্যুবরণকারী আজ যে মারা গেছে তার জন্য কান্নাকাটি করছে!
টিকাঃ
৫১. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৪。
৫২. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৮。
৫৩. তারীখু দিমাশক, ৫৬/৪২৩。
৫৪. আল মুখতারু মিন মানাকিবিল আখইয়ার, ১৭২。
৫৫. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৩。
৫৬. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৩。
৫৭. তারীখু দিমাশক, ৫৬/১৭০। সনদ হাসান。
৫৮. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৪。
৫৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৬/২০১। সনদ গ্রহণযোগ্য。
৬০. কিতাবুয যুহদ (আবু দাউদ), ২১৫। বর্ণনা নং ২৪৯। সনদ বিচ্ছিন্ন। তবে বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য。
📄 জানাজায় আবৃত্তি করা সালাফের কবিতা
১. আবদুল ওয়াহিদ খাত্তাব বলেন, আমি হাসান বসরী -এর সাথে আবু রজা উতারিদি -এর জানাযায় অংশগ্রহণ করলাম। কবর দেওয়া শেষ হলে তিনি হাত ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়ে বললেন, আবু রজা, আপনি দুনিয়ার দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-কষ্ট হতে নিষ্কৃতি পেয়ে গেলেন। আল্লাহ তাআলা আপনার মৃত্যুকে দীর্ঘ প্রশান্তির উপকরণ বানিয়ে দিন। অতঃপর ইমাম ফারাযদাক-এর দিকে ফিরে বললেন, আবু ফিরাস, এই লোকটির মতোই সচেতন থেকো। আমরা সকলেই মৃতদের উত্তরসূরি। এ কথা শুনে ফারাযদাক কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন,
فلسنا بأنجا منهم غير أننا *** بقينا قليلا بعدهم وترحلوا
তাদের দাফন করে এসে আমরা যে দিব্যি বেঁচে থাকব, বিষয়টা এমন নয়, কিছুদিন হয়তো থাকব, তারপর মোটেও নয়।
২. জাফর বিন কিলাব বর্ণনা করেন, মুসগাব বলেছেন, ইসলামে দুটি স্থান (দুনিয়া ও কবর) ব্যতীত অন্যকিছুকে বাসস্থান বলা হয় না। এই বলে তিনি নিচের পঙ্ক্তিটি পাঠ করেন,
نجدد أحزانا لدى كل هالك **** ونسرع نسيانا ولم يأتنا أمن
فأنا ولا كفران الله ربنا *** كالبدن لا تدري متى يؤمها البدن
কবরজগতে প্রতিটি ধ্বংসশীল মানুষের দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি পায় আর দুনিয়ায় তড়িঘড়ি সব ভুলে বসে, শান্তি পাওয়াই দায়
আমি তো প্রতিপালক আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত নই
দেহ যেমন নিজের বেড়ে চলার খবর রাখে না, আমি ঠিক তেমন নই।
৩. তাবেয়ী উরওয়াহ বিন উজাইনাহ আবৃত্তি করেন,
نراع إذا الجنائز قابلتنا *** ونسكن حين تخفى ذاهبات
كروعة ثلة المغار سبع ... فلما غاب عادت راتعات
জানাযার দৃশ্য আমাদের ভীত করে তোলে
প্রিয়হারা বিলাপ কেবল শঙ্কা জাগায়।
বিত্তের তৃপ্তি যখন ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়
সাতমুখী আঘাতের ভয় চারিদিকে প্রলয় জাগায়।
৪. মুহাম্মাদ বিন খালফ তাইমী বলেন, আমার পিতা খালফ বিন সালিহ বলেন, আমি আবু বকর নাহশালী -এর কাছে শুনেছি, তিনি এক জানাযায় উপস্থিত ছিলেন। মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার পরিবারের লোকজন কাঁদতে শুরু করল। আবু বকর নাহশালী তখন মাটিতে দাগ কাটতে কাটতে বলতে লাগলেন,
ترى الميت يبكيه الذي مات قبله *** وموت الذي يبكي عليه قريب
আজ তুমি যার জন্য কাঁদছ, সেও তো একদিন অন্য কারও জন্য কেঁদেছিল, আজ যারা কেঁদে কেটে একাকার হচ্ছে, তাদের মৃত্যুও খুব বেশি দূরে নয়!
৫. মুহাম্মাদ বিন খালফ তাইমী বলেন, আমার পিতার কাছে শুনেছি, তিনি বলেন, আমরা এক ব্যক্তিকে দাফন করে ইবনু সাম্মাক-এর সাথে ফিরে আসছিলাম। এ সময় তিনি খানিকটা এগিয়ে এসে বললেন,
تمر أقاربي جنبات قبري ... كأن أقاربي لا يعرفوني
প্রিয়দের মাহফিল কবর ছেড়ে ক্রমশ দূরে সরতে শুরু করেছে, পরিচিত এ মুখগুলো যেন একেবারেই চেনে না আমাকে।
৬. হিশাম বিন আবদুল মালিক বাহিলী-এর আযাদকৃত গোলাম আবু হাফস বলেন, আমি হিশাম -এর লেখা তার মুখে শুনেছি। তিনি বলেন,
وما سالم عما قليل بسالم **** ولو كثرت حراسه وكتابه
ومن يك ذا باب شديد وحاجب **** فعما قليل يهجر الباب حاجبه
ويصبح بعد الحجب للناس عبرة *** رهينة بيت لم يسير جوانبه
فما كان إلا الدفن حتى تحولت *** إلى غيره أجناده ومواكبه
وأصبح مسرورا به كل كاشح *** وأسلمه جيرانه وأقاربه
فنفسك أكسبها السعادة جاهدا *** فكل امرئ رهن بما هو كاسبه.
মৃত্যুর থাবা হতে নিরাপত্তা দেওয়ার মতো কিছু নেই,
ব্যাপক পাহারাদারি আর কূটকৌশল এখানে কোনো কাজের নয়।
কেউ যদি সুদৃঢ় বাধার দুয়ার তুলে আড়ালে আশ্রয় গ্রহণ করে,
মৃত্যুর সামনে সেই আড়াল সামান্য প্রতিরোধও দাঁড় করাতে পারবে না।
এত প্রতিরোধের পরও মানুষের জন্য শিক্ষার বিষয় হলো,
কবরের দখলে থাকা মানুষের কিছুই এখানে গোপন থাকে না।
দাফন শেষ হতেই দুনিয়ার সৈন্য-সামন্ত ও জনস্রোত
অন্যের সু-নজর লাভের আশায় ছুটে যায়।
শত্রুর মুখে ফুটে ওঠে নিশ্চিন্ত ক্রুর হাসি,
আর স্বজন ও প্রতিবেশীরা তার হাত থেকে নিরাপদ হয়ে যায়।
মনে রেখো, সৌভাগ্য তোমাকেই সাধনা করে অর্জন করতে হবে,
মানুষ ভালো-মন্দ যা কামাই করে, তা-ই তার আমলনামায় জমা থাকে।""
৭. হিব্বান বিন ওয়াসিল ইসহাক ইবনুল জাসসাস-কে বললেন, আবু আররার ইজলী হলেন বনু ইজল গোত্রের একজন খ্যাতিমান বেদুইন কবি। আমি একটি পঙ্ক্তি বলব, আপনি একটি পঙ্ক্তি বলবেন। অতঃপর তা লিখে তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে আবু আররার ইজলী-এর নিকট পাঠানো হবে। দেখি তিনি কী বলেন।
হিব্বান বিন ওয়াসিল বললেন,
فإن كنت لا تدرين ما الموت فانظري *** إلى دير هند کیف خطت مقابره
মৃত্যুর বাস্তবতা সম্পর্কে তোমার যদি ধারণা না থাকে, দিয়ারু হিন্দের দিকে তাকাও; কত শত কবর সেখানে ছড়িয়ে আছে।
ইবনুল জাসসাস বললেন,
تري عجباً مما قضى الله فيهم *** رهائن حتف أوجبته مقادره
“যুগ যুগ ধরে কবরের আঁধারে যাদের নিবাস,
বহুকাল ধরে যারা পড়ে আছে সেখানে, তাদের সাথে আল্লাহ যা করেছেন তা দেখলে তুমি শিউড়ে উঠবে যাবে।"
তাদের পঙ্ক্তি দুটি লিখে বেদুইন কবির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। তিনি তা পড়ে বললেন,
بيوت ترى أثقالها فوق أهلها *** ومجمع زور لا يكلم زائره
কবর এমন এক ঘর, যেখানে একবার মাটির আড়াল সৃষ্টি করলে,
হাজার অনুমতি প্রার্থনা করেও ভেতরের কারও সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না।
টিকাঃ
৬১. তারীখু দিমাশক, ৭৪/৬৫。
৬২. তারীখু দিমাশক, ৭১/২৬৮。
৬৩. আত-তাবসিরাহ, ১/৩৪২; আল মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলমি, ৩/২৭৮。
৬৪. তারীখু দিমাশক, ৩১/২৫。
৬৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৮。
৬৬. তারীখু দিমাশক, ২০/৮১ ও ৬৬/২৫৭; বাগিয়াতুত তলব ফি তারীখি হালব, ১০/৪৫৭১。
৬৭. দিয়ারু হিন্দ সিরিয়ার হীরা শহরের দুটি স্থাপনার নাম। একটি দিয়ারু হিন্দ সুগরা, অপরটি দিয়ারু হিন্দ কুবরা নামে পরিচিত। আদ দিয়ারাতু লিল ইসবাহানী, ২৭, ২৮。
৬৮. বাদাইউল বাদাই, ১১৬。
📄 কবর থেকে ভেসে আসা উপদেশমালা
১. বিখ্যাত আবিদ ও যাহিদ সালিহ মুররি বলেন, গ্রীষ্মের খরতাপ মাখা সময়ে একদিন আমি এক কবরস্থানে গেলাম। কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখি সেখানে নিঃশব্দ নীরবতা বিরাজ করছে। কবরবাসী যেন নীরবতার অনন্য উদাহরণ! তাদের এই অবস্থা দেখে আমি বলে উঠলাম,
আল্লাহ তাআলা এক মহান পবিত্র সত্তা, যিনি তোমাদের দেহ থেকে প্রাণ হরণ করার পর আবার একদিন উভয়ের সম্মিলন ঘটাবেন। রোজ হাশরে তোমাদের পুনরুজ্জীবিত করবেন আর সুদীর্ঘ সময় পরে সকলকে আবার জড়ো করবেন।
আমার কথা শেষ না হতেই এক কবর হতে গম্ভীর কণ্ঠে ভেসে আসল, হে সালিহ,
وَمِنْ آيَاتِهِ أَن تَقُومَ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ بِأَمْرِهِ ثُمَّ إِذَا دَعَاكُمْ دَعْوَةً مِّنَ الْأَرْضِ إِذَا أَنتُمْ تَخْرُجُونَ
আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তাঁরই নির্দেশে আসমান ও জমিন স্থিতিশীল থাকে। তারপর তিনি যখন তোমাদের জমিন থেকে বের হয়ে আসার জন্য একবার আহ্বান করবেন তখনই তোমরা বের হয়ে আসবে।"
সালিহ মুররি বলেন, 'আল্লাহর শপথ! এ কথা শুনে আমি একদম চুপ হয়ে গেলাম। আর আমার চেহারায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।'
২. বিশর বিন মানসুর সালিমী বলেন, আতা আযরাক আমাকে বলেন, তুমি যখন কবরস্থানে যাবে, তখন তোমার মনের অবস্থা যেন এমন হয় যে, তুমি কবরের মধ্যে রয়েছ। এক রাতে আমি এক কবরস্থানে গিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় নিজেকে কবরবাসীদের একজন ভাবছিলাম। এমন সময় একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম,
হে উদাসীন নিদ্রাকাতর, এখানে তুমি পরিপূর্ণ নিআমত কিংবা অপমানজনক ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির যেকোনো একটির সম্মুখীন হতে চলেছ।"
৩. আবু আইয়ুব হাশিমী বলেন, একবার ছাবিত বুনানী এক কবরস্থানে ছিলেন। তিনি আপন মনে কিছু বলছিলেন। ইত্যবসরে কবর থেকে একটি আওয়াজ ভেসে আসল, তুমি যদি তাদের নীরবতার রহস্য উদ্ধার করতে পারতে তবে দেখতে, তাদের মধ্যে কত লোক ভীষণ দুশ্চিন্তায় সময় কাটাচ্ছে।
৪. আবদুর রহমান বিন জুবাইর বিন নুফাইর বর্ণনা করেন। ইয়াজিদ বিন শুরাইহ একবার এক কবর হতে একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন। আওয়াজে বলা হয়, তোমরা যদি আজ আমাদের মতো দেখতে পেতে, তবে তো আমরাও তোমাদের মতোই হতাম। পার্থিব জীবনে আমরাও তোমাদের মতোই একে অন্যের ঘনিষ্ঠ ছিলাম। কিন্তু এই নির্জন প্রান্তর সেই আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। আজ আমরা বদ্ধ ঘরে পড়ে আছি। তোমাদের নাগাল পাওয়ার কোনো সুযোগ আজ আর নেই। আমাদের কাতারে এসে দাঁড়ালে কেউ আর ফিরে যেতে পারে না। এখন এই সংকীর্ণ কুঠরিই আমাদের বাড়িঘর। আমাদের আসল ঠিকানা!**
টিকাঃ
৬৯. সূরা রুম, (৩০): ২৫。
৭০. হিলয়াতুল আওলিয়া, ৬/১৭০。
৭১. শরহুস সুদূর, ২১৪。
৭২. আল হাওয়াতিফ, বর্ণনা নং ৪৫。
৭৩. শরহুস সুদূর, ২১৫。
📄 কবর হতে ভেসে আসা পঙক্তিমালা
১. সাঈদ বিন হাশিম সালামী তার পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমাদের প্রতিবেশী এক যুবক জনৈকা কুমারী যুবতীকে বিয়ে করে ঘরে তুলল। নতুন বউ ঘরে তুলে সে আমোদ-ফুর্তিতে মজে রইল। কবরস্থানের একদম পাশেই ছিল তার বাড়িটি। এক রাতে সদ্য পরিণীতা স্ত্রীকে নিয়ে স্বভাবমাফিক আনন্দ-ফুর্তির মাঝেই ভয়ানক এক ঘটনা ঘটে গেল। নিকটস্থ কবরস্থান হতে কর্কশ কণ্ঠে ভীতিজাগানিয়া কিছু কথাবার্তা ভেসে এল। বজ্র-নিনাদের মতো বাজখাই কণ্ঠের আওয়াজ সে শুনতে পেল, কবর হতে কেউ একজন বলছে,
يا أهل لذة لهو لا تدوم لهم *** إن المنايا تبيد اللهو واللعبا
كم قد رأيناه مسرورا بلذته *** أمسى فريدا من الأهلين مغتربا
প্রাণসখার এ সুখ তোমার রইবে নাকো চিরকাল,
মৃত্যুবাণে ছিন্ন হবে স্বপ্ন-সুখের রঙিন জাল।
প্রিয়ার ঘ্রাণে মত্ত প্রেমে দেখেছি হায় কত জনে!
আজকে তারা হারিয়ে গেছে আঁধার গোরের নির্জনে।
বর্ণনাফারী বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, এ ঘটনার তিন দিনের মধ্যেই নববিবাহিত তরুণের মৃত্যু ঘটে।
২. ইয়াহইয়া বিন সাঈদ কুরাইশী তার পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে শারকী বিন কুতামী হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, দুজন ব্যক্তির মাঝে ভ্রাতৃসম হৃদ্যতা ও সখ্য ছিল। একসময় একজন অপরজন হতে দূরে চলে গেলেন। একসময় তাদের একজনের মৃত্যু ঘটল। খবর পেয়ে অপরজন ছুটে এলেন। মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা হলো। দাফনের পর অন্যরা ফিরে গেলেও বন্ধুটি রয়ে গেলেন। বন্ধুটি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে স্বাভাবিক হয়ে ফিরে আসতে উদ্যত হতেই কবরের ভেতর থেকে কিছু পঙ্ক্তি শুনতে পেলেন। যা ছিল-
أَجِدَّكَ تَطْوِي الدَّوْمَ لَيْلًا وَلَا تَرَى *** عَلَيْكَ لِأَهْلِ الدَّوْمِ أَنْ تَتَكَلَّمَا
وَبِالدَّوْمِ نَاوِ لَوْ ثَوَيْتَ مَكَانَهُ *** فَمَرَّ بِأَهْلِ الدَّوْمِ عَاجَ فَسَلَّمَا
تُجَدِّدُ صَرْمًا أَنْتَ كُنْتَ بَدَأْتَهُ *** وَلَا أَنَا فِيهِ كُنْتُ أَسْوَا وَأَظْلَمَا
তুমি দেখছি রাতের আবর্তন গুটিয়ে ফিরে যাচ্ছ!
অথচ কবরের বাসিন্দাদের ব্যাপারে কিছুই ভাবছ না!
যেদিন তুমি স্থায়ীভাবে এখানে বসবাস শুরু করবে,
সেদিন বুঝবে, এখানকার শান্তি ও স্থিতি কীভাবে মিটে গেছে।
শুরুতেই তুমি এখানে বিচ্ছিন্নতার তিক্ত স্বাদ অনুভব করবে,
দুনিয়ার বুকে আমি নিজেও খুব মন্দ বা অনাচারী ছিলাম না।"
৩. মুসআব হামদানী বলেন, দুই ভাই কিংবা প্রতিবেশী ছিল, যাদের পারস্পরিক হৃদ্যতা ছিল তুলনাহীন। তাদের একজনের প্রতি অন্যজনের হৃদয়ে গভীর আন্তরিকতা ছিল। ঘটনাক্রমে বড় জন ছোট জনকে রেখে ইস্পাহান গেলেন। দীর্ঘ সফর শেষে ফিরে এসে শোনেন প্রাণপ্রিয় বন্ধুসম ভাইটির অকাল-মৃত্যু ঘটেছে। ভাইয়ের শোকে কাতর লোকটি নিয়মিত কবরস্থানে গিয়ে ভাইয়ের কবর জিয়ারত করে আসতেন। এভাবে প্রায় সাত মাস চলে গেল। একদিন জিয়ারত করতে গিয়ে কবরস্থানে অজানা স্থান হতে দুটি পঙ্ক্তি শুনতে পেলেন :
يا أيها الباكي على غيره *** نفسك أصلحها ولا تبكه
إن الذي تبكي على إثره *** يوشك يوشك يوشك أن تسلك في سلكه
শোনো, আজকে বুঝি অশ্রু তোমার ঝরছে পরের তরে?
পরের ভাবনা ছাড়ো এবার, ভাবো নিজের তরে।
আমলনামায় চোখ বুলিয়ে হয়তো সে আজ কেঁদে সারা।
ক'দিন বাদে তুমিও যাবে, শুরু হবে তোমার পালা।
৪. সাফওয়ান বিন আমর বিন হারম বর্ণনা করেন। সুলাইমান বিন ইয়াসার হাযরামী বলেন, একদল লোক একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি কবর হতে নিম্নোক্ত পঙ্ক্তিমালা শুনতে পান,
يا أيها الركب سيروا *** من قبل أن لا تسيروا
فهذه الدار حقا *** فيها إلينا المصير
كم منعم في نعيم *** وتسلبنه الدهور
وآخر في عذاب *** لبئس ذلك المصير
فكما كنتم كنا *** فغيرنا ريب المنون
وسوف كما كنا تكونون
হে অভিযাত্রীগণ, দ্রুত এগিয়ে চলো,
জীবনের পথ ফুরিয়ে আসার আগেই পথ চলো।
মনে রেখো, এ এক অবধারিত ঠিকানা,
যেখানে তোমার নিশ্চিত ঠিকানা হবেই হবে।
এখানে সুখের সন্ধানে পড়ে আছে কত শত প্রাণ,
আশায় আশায় কেটে গেছে কত প্রতীক্ষার প্রহর!
হায়! এখানে কেউ পড়ে আছে শান্তির অনলে,
যাতনার এ ঘরে বেড়ে চলে মর্মব্যথা।
অথচ আমাদের দিনগুলো কেটেছিল তোমাদেরই মতো,
নিয়তির পরিহাসে আজ বদলে গেছে জীবনের হিসেব।
মনে রেখো, সেদিন তোমারও আসবে।
অচিরেই আসছে, যেদিন এমনি বিরান ঘরে ঠাঁই হবে অসহায় তোমার।"
৫. ইমাম শাবী বর্ণনা করেন। সাফওয়ান বিন উমাইয়া একবার এক কবরস্থানে ছিলেন। হঠাৎ দেখলেন, দূর হতে একটি মশালের আলো এগিয়ে আসছে। কাছে আসতে দেখা গেল একদল লোক একটি লাশ দাফন করতে এসেছেন। তারা যখন কবরস্থানের কাছে চলে আসল, বলতে লাগল, অমুক অমুক কবরের দিকে লক্ষ করো। তিনি বলেন, এমন সময় তাদের মধ্যে একজন একটি কবর হতে বিষণ্ণ ও ভয়ার্ত কণ্ঠে এই কথা বলতে শোনেন:
أنعم الله بالظعينة عينا *** وبمسراك يا أمين إلينا
جزعا ما جزعت من ظلمة القبر ... ومن مسك التراب أمينا
"হে আমীনা, মহান রবের নিআমত তোমায় যেন ঋদ্ধ করে
আমাদের প্রিয়জনকে যেন নানা প্রাপ্তিতে সমৃদ্ধ করে।
আমীনা, তুমি তো জানো, কবরের আঁধার আমায় রেখেছে ঘিরে,
পড়ে আছি একাকী এ ধূলিমলিন নীড়ে।
লোকটি গোত্রের লোকদের কাছে ঘটনাটি খুলে বলল। শুনে সবাই কাঁদতে কাঁদতে দাড়ি ভিজিয়ে ফেলল। তারা আমাকে বলল, আপনি কি জানেন এই আমীনা কে? বললাম, না। তারা বলল, আমীনা হলো মৃত ব্যক্তির বোন। সে এক বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছে। তাদের কথা শুনে সাফওয়ান বিন উমাইয়া বললেন, আমরা তো জানি যে মৃত ব্যক্তি কথা বলতে পারে না। তাহলে এই আওয়াজটি কোথা হতে আসল?
৬. সুহাইম বিন মাইমুন ছিলেন লাইস বিন সাআদ এর শিষ্য। তিনি লাইস বিন সাআদ-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, একবার এক লোক কবরস্থানে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে সে শুনতে পেল কোনো এক কবর হতে কেউ বলছে,
أنعم الله بالخليلين عينا *** وبمسراك يا أميم إلينا
হে উমাইমা, জোড়া স্বজনের নিআমতে করুন তোমায় ধন্য
রাঙিয়ে যাক আগমন তব আমাদেরই জন্য।
এই পঙ্ক্তির উত্তরে কেউ একজন বলে উঠল, 'এসব শুভ কামনায় কোনো লাভ হবে না। আমার পিতা তার প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন।' সকাল হতেই লোকটি কবর হতে শোনা নারীর পরিবারের সন্ধান করতে লাগল। পরিবারের সন্ধানে বের হয়ে তিনি একজন পুরুষের সন্ধান পেলেন। লোকটির নিকট নিজের স্বপ্নের ঘটনা উল্লেখ করে কবরের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে সে জানাল, 'এই দুটি হলো আমার দুই মেয়ের কবর। আর এটি তাদের মা উমাইমার কবর। আমি তার প্রতি কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ ছিলাম। তবে আজকে এখনই আমি তার প্রতি সন্তুষ্টি ঘোষণা করে তার দু-চোখে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিলাম।' বর্ণনাকারী বলেন, 'লোকটি তার মৃত স্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তার আখিরাতের পথে অকৃত্রিম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিল এবং তাকে উদ্ধার করল।'
৭. সালামাহ বসরী বলেন, এক ব্যক্তি সুন্দর করে বানানো একটি কবর দেখে মুগ্ধ বিমোহিত হয়ে পড়ে। রাতে স্বপ্নে তার কাছে এক ব্যক্তি আসল। আগন্তুক লোকটির চেহারায় বেদনার ক্লিষ্ট ছাপ বোঝা যাচ্ছিল। লোকটি স্বপ্নদ্রষ্টার সামনে এসে বলল,
أعجبك القبر وحسن البناء *** والجسم فيه قد حواه البلى
فاسأل الأموات عن حالهم *** ينبأك عن ذاك ذهاب الحلى
“কবরপৃষ্ঠের কারুকাজ বুঝি মুগ্ধ করেছে তোমায়?
অন্দরে তার হচ্ছেটা কী, খবর কি তার রাখো?
পারো যদি কোনোভাবে প্রশ্ন করো তাদের,
ব্যথায় কাতর মৃতজনের জবাব শুনে দেখো।
তিনি বলেন, এই কথা বলেই লোকটি চলে গেল। পিছে পিছে গিয়ে দেখি, তিনি কবরস্থানে প্রবেশ করলেন এবং সেই কবরের ভেতরে ঢুকে গেলেন।
৮. জর্ডানের বলকা অঞ্চলে রুসতুম আবরাকী নামক একজন আবিদ ছিলেন। তিনি বলেন, জনৈকা আবিদা মহিলা তার কাছে বর্ণনা করেন যে, তিনি তার সন্তানের অকাল-মৃত্যুতে বেশ কাতর ছিলেন। তার জন্য বছরখানেক তিনি চোখের পানি ফেলেছেন। তিনি বলেন, ছেলে মারা যাওয়ার এক বছর পর আমি তাকে স্বপ্নে দেখি। সে কাফনের কাপড় পরিহিত অবস্থায় কবরে বসে আছে। তার চোখের ভ্রু ঝরে একেবারে সাফ।
বর্ণনাকারী বললেন, আল্লাহর শপথ! ছেলেটির তো খুব সামান্যই পরিবর্তন হয়েছে।
মহিলা বললেন, তার কাফনে মাটির কোনো চিহ্ন ছিল না। আমি ভয়ে ভয়ে তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, বেটা, তোমার আখিরাতের বাসস্থান কেমন হয়েছে? আমার কথায় সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
أنا في الترب مقيل بالي الأركان جمعا
لو ترى أمي رسومي لذرفت الدمع دمعا
"মাটির শোষণে আমার হাড়-মাংস সব ক্ষয়ে গেছে,
তুমি যদি আমার কষ্ট দেখতে মা, চোখের জলে বুক ভাসাতে।
মহিলা বলেন, এরপর ছেলে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। আমি শুধু কিছু কালো দাগের মতো দেখতে পেলাম। যেখানে শরীরের সামান্য অবকাঠামো বা চিহ্নটুকু পর্যন্ত ছিল না। কবরটিও আগের মতো হয়ে গেল। আর আমিও ধরফরিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম।
এরপর মহিলাটি একেবারেই মুষড়ে পড়লেন। চরম দুশ্চিন্তা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগল। একসময় তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।
৯. মুহাম্মাদ বিন মুগীরা তামীমী বলেন, আমার দাদা আলী বিন আবু তালিব বিন ইয়াযিদ হানাফী -এর কাগজপত্রে পেয়েছি, তিনি লিখেছেন, ছুমালী বর্ণনা করেন যে, এক লোক মদীনায় ঘুরতে বের হলো। হঠাৎ সে একটি কবর হতে নিচের পঙ্ক্তিমালা শুনতে পেল,
هَذَا أَبُونَا قَدْ أَتَانَا زَائِرًا *** أَحْبِبْ بِهِ زَوْرًا إِلَيْنَا بَاكِرَا
وَخَيْرُ مَيِّتٍ ضُمِّنَ الْمَقَابِرَا *** جَدَّ إِلَيْنَا عُتْبَةُ مُثَابِرًا
قَدْ وَحَدَ اللهَ زَمَانًا صَابِرًا *** عُوِّضَ مِنْ تَوْحِيدِهِ أَسَاوِرَا
فِي جَنَّةِ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا فَاخِرَا
কিছুক্ষণের মধ্যেই পিতার সাথে সাক্ষাৎ হতে চলেছে,
তার এই অকাল আগমন মোটেও কাম্য নয়।
উত্তম মৃত্যুবরণকারী হলো সে, যার সাথে কবরের পুরোনো সম্পর্ক রয়েছে।
ওতবাহ!! শেষ অবধি তিনি এসেই গেলেন!
জমিনের বুকে তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল তাওহীদের ঘোষণাকারী
আজ এই তাওহীদের ইয়াকীন তার জন্য ফিরদাউসের দ্বার খুলে দেবে।
লোকটি বলল, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে এই পঙ্ক্তিমালার রহস্য উদ্ধার না করে আমি কোথাও যাচ্ছি না। ইতিমধ্যে সেখানে একজন পুরুষের জানাযা উপস্থিত হলো। আমি লোকজনের কাছে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। তারা বলল, মৃত লোকটি বনু সালামাহ গোত্রের আনসারী পরিবারের একজন। আর এখানে যে দুটি কবর রয়েছে, একটি তার ছেলের, অন্যটি তার মেয়ের। ছেলেটির নাম ওতবাহ আর মেয়েটির নাম উবাইদাহ। লোকজন পুরোনো কবর দুটির মধ্যবর্তী স্থানে তাকে দাফন করে চলে গেল。
টিকাঃ
৭৪. শরহুস সুদূর, ২১৪。
৭৫. আল হাওয়াতিফ, ৫২। বর্ণনা নং ৪৩。
৭৬. আল হাওয়াতিফ, ৫১। বর্ণনা নং ৪২。
৭৭. শরহুস সুদুর, ২১৫。
৭৮. তারীখু দিমাশক, ২৪/১১৯, ১২০。
৭৯. আল হাওয়াতিফ, ৫৬। বর্ণনা: ৫৪。
৮০. আহওয়ালুল কুবুর, ১৪৪১
৮১. আহওয়ালুল কুবুর, ১৪৫。
৮২. আল হাওয়াতিফ, পৃ. ৫৭। বর্ণনা নং ৫৬。