📘 সালাফদের চোখে কবর > 📄 জানাজায় উপস্থিত হয়ে হাসি-তামাশা নিন্দনীয়

📄 জানাজায় উপস্থিত হয়ে হাসি-তামাশা নিন্দনীয়


১. কাতাদাহ বলেন, আমাদের নিকট খবর পৌঁছেছে যে, আবু দারদা এক ব্যক্তিকে জানাযায় উপস্থিত হয়ে হাসতে দেখেন। তিনি তাকে বললেন, মৃত ব্যক্তির করুণ অবস্থা কি তোমার চোখে পড়ছে না? তারপরেও হাসছ কেন?**
২. আবদুল্লাহ বিন মাসউদ সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, একবার জনৈক ব্যক্তির জানাযায় উপস্থিত হয়ে একজনকে তিনি হাসতে দেখলেন। তাকে বললেন, 'জানাযায় উপস্থিত হয়েও তুমি হাসছ? আল্লাহর শপথ! আমি আর কখনোই তোমার সাথে কথা বলব না।'
৩. সাবিত বুনানী বলেন, আমরা যখন কোনো জানাযায় অংশগ্রহণ করতাম তখন সকলের চেহারায় কাঁদোকাঁদো ভাব বা গভীর বিষাদের ছাপ দেখতে পেতাম। অথচ বর্তমানে তুমি যদি কোনো জানাযার দিকে তাকাও। দেখবে কারও-না- কারও ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে আছে!
৪. হাসান বসরী-এর সন্তানদের একজন বলেন, আমরা হাসান বসরী -এর সাথে এক জানাযায় শরীক হলাম। তিনি এক লোককে পাশের বন্ধুর সাথে হাসিমুখে কথা বলতে দেখলেন। এ অবস্থা দেখে তিনি বলে উঠলেন, সুবহানাল্লাহ! এটা কি হেসে কাটানোর সময়?
তিনি আরও বলেন, মৃত ব্যক্তির পাশে উঁচু স্বরে কথা না বলে স্বর নামিয়ে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা উচিত।"
৫. আইয়ুব সখতিয়ানী বর্ণনা করেন, কোনো এক জানাযায় কথার আওয়াজ শুনতে পেয়ে আবু কিলাবা বলেন, তারা পিনপতন নীরবতা বজায় রেখে মৃতদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেন।

টিকাঃ
৩৪. ফসলুল খুত্তাব, ২/২০০। সনদ মুরসাল। কাতাদা আবু দারদা এ হতে সরাসরি এই কথা শোনেননি。
৩৫. ফসলুল বুত্তাব, ২/২০০। সনদ দুর্বল。
৩৬. শু'আবুল ইমান লিল বাইহাকী, ১১/৪৬০। বর্ণনা নং ৮৮৩৪। সনদ মাকবুল。
৩৭. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৮。

📘 সালাফদের চোখে কবর > 📄 জানাজায় উপস্থিত সালাফদের হালত

📄 জানাজায় উপস্থিত সালাফদের হালত


১. আওন বিন আবদুল্লাহ বলেন,
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا كَانَ فِي جَنَازَةٍ عَلَتْهُ الْكَابَةُ وَأَكْثَرَ حَدِيثَ النَّفْسِ وَأَقَلَّ الْكَلَامَ
রাসুল যখন কোনো জানাযায় শরীক হতেন। তখন তিনি বিমর্ষচিত্ত হয়ে পড়তেন। বেশিরভাগ সময় আনমনে কথা বলতেন। অন্যের সাথে খুব কম কথা বলতেন।
২. ইবরাহীম নাখাঈ বলেন, তাদের মধ্যে যখন কারও জানাযা পড়া হতো। উপস্থিত সকলের চেহারায় তিন দিন পর্যন্ত জানাযা ও মৃত্যুর স্পষ্ট ছাপ লক্ষ করা যেত।
৩. হাসান বিন সালিহ বলেন। আমি ইমাম আমাশ-কে বলতে শুনেছি, আমরা যখন কোনো জানাযায় অংশগ্রহণ করতাম তখন পুরো গোত্রে এমন কাউকে দেখতাম না, যার চেহারায় গভীর বিষাদের ছাপ নেই।
৫. আমির বিন ইয়াসাফ বলেন। ইয়াহইয়া বিন আবু কাসীর যেদিন কোনো জানাযায় শরীক হতেন সেদিন রাতে তিনি ঘুমাতেন না। কবরের চিন্তায় সেদিন তিনি পরিবারের কারও সাথে কথাও বলতেন না।
৬. আতা আযরাক বলেন। মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি একবার এক জানাযায়
শরীক হলেন। দাফন সম্পন্ন করে তিনি যখন ঘরে ফিরলেন তার সামনে মধ্যাহ্ন ভোজ পরিবেশন করা হলো। তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। বললেন, আজকের দিনটি আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি দিন। এই বলে তিনি খানা খেতে অসম্মতি জানালেন।
৭. সালাম বিন আবু মুতী বলেন। আমি কাতাদা -এর সাথে এক জানাযায় শরীক হলাম। দাফন শেষ করে ফিরে আসা পর্যন্ত তিনি কোন কথা বলেননি। হারিরী-এর সাথে এক জানাযায় শরীক হলাম। তিনি লোকজন থেকে আলাদা হওয়ার আগ পর্যন্ত অনবরত চোখের পানি ফেলেছেন। আরেকবার মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি-এর সাথে এক জানাযায় গেলাম। তিনি তার দরজায় হাত রেখে মাথা ঢেকে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। একটুও নড়াচড়া করলেন না। একসময় লোকজন চলে গেলেও তিনি তা টের পেলেন না। আমি তার কাছে গেলাম। এবার তিনি এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলেন, কেউ নেই। অতঃপর কবরের সামনে গেলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে কিছু বললেন এবং চলে গেলেন।
৮. সালিহ মুররি বলেন, হাসসান বিন আবু সিনান-এর কোনো প্রতিবেশী মারা গেলে মৃত ব্যক্তির ঘরের মতো তার ঘর হতেও শোক ও কান্নার আওয়াজ পাওয়া যেত। তিনি যখন জানাযায় শরীক হতেন, সেখান হতে ফিরে সে রাতে আর খাওয়া-দাওয়া করতেন না। আমি তার ছেলে ও ঘরের অন্যদের দেখেছি, প্রতিবেশীর মৃত্যুতেও কিছুদিনের জন্য তাদের মাঝে বাকহীন নীরবতা ও বিধ্বস্ত ভাব দেখা যেত।
৯. আবদুল্লাহ বিন ইয়াহইয়া বিন আবু কাছীর যেদিন কোনো জানাযায় অংশগ্রহণ করতেন সেদিন রাতের খাবার খেতেন না। অত্যধিক দুশ্চিন্তার দরুন পরিবারের কারও সাথে কথাও বলতেন না।
১০. ইমাম আমাশ বলেন, আমি একদল লোকের সাক্ষাৎ লাভ করেছি, তাদের মাঝে কারও জানাযা উপস্থিত হলে তারা সেখানে জড়ো হয়। নির্বাক বসে
রয়। কোনো রকম ফিসফাস করে না। মৃত ব্যক্তিকে যখন কবরে রাখা হয়, আমি তাদের প্রত্যেকের অন্তরে মৃত ব্যক্তির প্রতি এমন ভালোবাসা দেখতে পেয়েছি, যেন সে তাদের জন্মদাতা পিতা, সহোদর ভাই কিংবা ঔরসজাত সন্তান।**
১১. সুওয়াইদ বিন আমর কালবী বর্ণনা করেন, রবী বিন আবু রাশিদ -এর প্রতিবেশীদের কেউ মারা গেলে তার অবস্থা এমন হতো যে কিছুদিনের জন্য পরিবারের লোকজনও তাকে চিনতে পারত না।
১২. আবাহ বিন কুলাইব লাইসী বর্ণনা করেন। মারছাদ বিন আমির হানাঈ বলেন, জাবির বিন যায়িদ তার মহল্লার জনৈক ব্যক্তির জানাযায় অংশগ্রহণ করলেন। জানাযার নামাযের পর লোকেরা তাকে বলল, হে আবু শাসা, আপনি যদি তার কবরে নামতেন খুব ভালো হতো। তিনি লাশ নামানোর জন্য কবরে নামলেন। মৃত ব্যক্তিকে কবরে নামিয়ে কবর হতে ওঠার আগেই তিনি মূর্ছা যান। লোকজন তাকে অচেতন অবস্থায় কবর হতে উঠিয়ে আনে।
১৩. সালিহ আল মুররি বলেন, আমি বসরায় যুবক ও বৃদ্ধদের একটি দলকে দেখেছি। যারা একটি জানাযা ও দাফন শেষ করে ফিরছিল। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল যেন এইমাত্র কবর হতে তাদের পুনরুত্থান ঘটেছে! আল্লাহর শপথ! পরবর্তী কিছুদিনও তাদের চেহারার সেই বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে চেনা যেত।

টিকাঃ
৩৮. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ২/২৮৫。
৩৯. আল মারাসিল লি আবি দাউদ, ৪৩০। মুরসাল হাদিস। বর্ণনাকারীগণ সকলেই নির্ভরযোগ্য。
৪০. মুসান্নাফু আবদির রাযযাক, ৩/৪৫১। বর্ণনা নং ৬২৮৩। সনদ সহিহ。
৪১. মুসান্নাফু ইবনি আবী শাইবা, ৭/২৪১। বর্ণনা নং ৩৫৬৯০। সনদ সহিহ。
৪২. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৭。
৪৩. তারীবু দিমাশক, ৫৬/১৭০。
৪৪. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৭। সনদ সহিহ。
৪৫. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৮。
৪৬. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৭。
৪৭. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৭。
৪৮. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৮。
৪৯. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৯。
৫০. ফসলুল খুত্তাব, ২/২০০。

📘 সালাফদের চোখে কবর > 📄 যিয়ারত ও জানাজায় উপস্থিত হয়ে সালাফদের উপলব্ধি

📄 যিয়ারত ও জানাজায় উপস্থিত হয়ে সালাফদের উপলব্ধি


১. আবদুল্লাহ বিন তালহা বিন মুহাম্মাদ আত-তাইমী বলেন, একবার এক জানাযায় অংশ নেওয়ার সুবাদে সাঈদ ইবনুস সাইব আত-তইফী-কে বলতে শুনি, আল্লাহর শপথ! মৃত্যু মানুষের জন্য পরিবার-পরিজনের মধ্যে আনন্দের কিছু বয়ে আনে না। আল্লাহর শপথ! মৃত্যু সুপ্রশস্ত নিআমতের অধিকারী মুমিনের জন্য সংকুচিত হয়ে আসা দুনিয়াকে আরও সংকীর্ণ করে দেয়। আর তারা প্রফুল্লচিত্তে এই দুনিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে যায়।
এ কথা বলে তিনি অশ্রুভরা নয়নে উঠে দাঁড়ালেন।”
২. সালমান বিন সালিহ বলেন, একদিন হাসান বসরী-কে কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। সন্ধ্যায় যখন তার দেখা মিলল, সবাই জানতে চাইলেন, 'আপনি সারাদিন কোথায় ছিলেন?'
তিনি বললেন, এমন কিছু ভাইয়ের সান্নিধ্যে ছিলাম, যাদের আমি ভুলে গেলেও তারা আমায় স্মরণ রাখে। আমি তাদের দোষচর্চা করলেও তারা আমার নিন্দা করে বেড়ায় না।
এ কথা শুনে সবাই বলে উঠল, এরাই তো আমাদের আসল ভাই। হে আবু সাঈদ, আল্লাহর দোহাই! ব্যাপারটা একটু খোলাসা করুন। তারা কারা?
তিনি বললেন, তারা হলো কবরবাসী। '
৩. মালিক বিন দীনার বলেন, একবার আমি এবং হাসসান বিন আবি সিনান এর সাথে কবর জিয়ারত করতে গেলাম। সেখানে গিয়ে তিনি কী যেনো ভাবলেন! অতঃপর আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে মালিক, মানুষের প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিশতাগণ সমস্ত জীবিত ব্যক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। মানুষ যখন তার শিয়রে মালাকুল মাওতকে দেখতে পাবে, তখন সে ভয়ে-আতঙ্কে মুষড়ে পড়বে।' তাঁর মুখে এ কথা শুনে মালিক বিন দীনার নিজের মাথায় হাত দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, আফসোস সেদিনের জন্য! হায় আফসোস সেদিনের জন্য!**
৪. আবু আসিম আল-হানাতী বলেন, একবার আমি মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি এর সাথে পথ চলছিলাম। পথিমধ্যে আমরা একটি কবরস্থানে এসে পৌঁছলাম। কবরস্থান দেখতেই তার দু-চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি বললেন, হে আবু আসিম, কবরের ওপরিভাগের দৃশ্য যেন আপনাকে ধোঁকায় না রাখে, এর ভেতরের প্রতিটি দেহই আনন্দ কিংবা বেদনার দোলায় দুলছে।"
৫. আবু জাফর ফাররা বলেন, হাসান বিন সালিহ একবার ব্যক্তিগত ইবাদতখানায় পৌঁছে কবরবাসীকে (কברস্থান) দেখতে পেলেন। সেদিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, কবর, তোমার ওপরিভাগের দৃশ্য কত সুন্দর! অথচ তোমার আঁধার গর্ভে লুকিয়ে আছে বিপদের ঘনঘটা!"
৬. হাজ্জাজ বিন আবু যিয়াদ বলেন, একবার আমরা বসরার জুবান এলাকায় এক জানাযায় অংশগ্রহণ করলাম। দাফনের প্রস্তুতি চলাকালে আমি একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দেখলাম, আমি কবরবাসীদের একজন। অন্যান্য কবরবাসীর সাথে কবরে শুয়ে আছি। কবরগুলোর মাটিতে ফাটল দেখতে পেলাম। দেখলাম, কেউ মাটিতে শুয়ে আছে। কেউ সুদৃশ্য ঝালর টানা বিশেষ কামরায়। কেউ রেশমি পোশাকের আভিজাত্য জড়িয়ে ঘুমুচ্ছে। কেউ রেশম কোমল বিছানায় শুয়ে আছে। কেউ রাইহান ফুলের জান্নাতি সুবাসে নিদ্রা-বিভোর। কারও মুখে মুচকি হাসির আভা। কারও শরীরে বাহারি রঙের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে। কারও- বা আবার ক্ষণে ক্ষণে রং পাল্টে যাচ্ছে! মনকাড়া এসব দৃশ্য দেখে স্বপ্নেই আমি অশ্রুসিক্ত নয়নে বলে উঠলাম, 'ইয়া আল্লাহ, আপনি চাইলে তো সকলের মর্যাদা বরাবর করে দিতে পারেন!'
এমন সময় কবরস্থানের একপ্রান্ত হতে আওয়াজ ভেসে এল, হাজ্জাজ, কবর হলো আমলের বিনিময় লাভের ঘাঁটি। এ কথা শুনতেই আমার তন্দ্রা কেটে গেল।”
৭. আবু সাঈদ সালাম বিন আবু মুতী বলেন, একবার আমরা মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি-এর সাথে এক জানাযায় শরীক হলাম। লোকজন দ্রুতপদে এগিয়ে গেল। আমরা 'জুবান' পর্যন্ত তাদের পিছে পিছে চলে মূল জানাযার নাগাল পেলাম। তখনো অবশ্য সবাই এসে পৌঁছায়নি। কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই চলে আসলে আমরা জানাযার সালাত আদায় করে নিলাম। জানাযার পর আমি দাফনের কাজে অংশ নিলাম। দাফন সেরে মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি-এর নিকট ফিরে আসলাম। এসে দেখি তিনি তার পাশের জনকে কিছু বলছেন। কান পেতে শুনলাম তিনি বলছেন,
প্রতিদিনই আমাদের কেউ-না-কেউ নম্বর এই জগতের মায়া ছেড়ে নির্জন কবরজগতে পাড়ি জমাচ্ছে। আর এভাবেই পরবর্তী লোকজন শীঘ্রই পূর্ববর্তীগণের সাথে মিলিত হবে।
৮. নাহীম আল ইজলী-এর নিকট বসরার এক লোক বর্ণনা করে বলেন, একবার এক জানাযার জামাতে হাসান বসরী-কে দেখতে পেলাম। লোকজন তার নিকট জড়ো হলো। তিনি উপস্থিত জনসাধারণকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি দয়া ও মেহেরবানি করুন। তোমরা আজকের দিনের জন্য আমল করতে থাকো। আজকে তোমাদের এই ভাই আখিরাতের যাত্রায় তোমাদের পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছেন। আর তোমরা তার উত্তরসূরি হিসেবে রয়ে গেছ।
যে ব্যক্তি তার ভাইকে দাফন করে নিজে তার উত্তরসূরি হয়েছে, তাকে বলছি শোনো, আগামীকাল অন্যদের পেছনে ফেলে তুমিও মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করবে। সেদিন এভাবেই অন্যরা তোমার পেছনে রয়ে যাবে। এভাবেই আগে-পরে করে একে একে যেতে থাকবে। একে একে সবাই একদিন একত্র হবে। মৃত্যু তোমাদের সকলকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেবে। সকলকেই মৃত্যুর কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। নিঃসন্দেহে সকলকে একদিন কবরবাসী হতে হবে। কিয়ামতের সূচনালগ্নে ঠিক সেখান থেকেই পুনরুত্থান হবে। আল্লাহ তাআলার দরবারে উপস্থিত করা হবে। প্রত্যেককে তাঁর সম্মুখে একাকী হাজির হতে হবে। সেখানে সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে লুটিয়ে পড়বে।
১০. সাঈদ বিন আল জারিরী তার কয়েকজন উস্তাদ হতে বর্ণনা করেন, আবু দারদা এক জানাযায় শরীক হলেন। জনৈক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করল, মৃত ব্যক্তিটি কে? তিনি বললেন, এটি তুমি। আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّكَ مَيِّتُ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ 'নিশ্চয় তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল।' (সুরা যুমার ৩৯:৩০)
১০. ইয়াহইয়া বিন জাবির বর্ণনা করেন। আবু দারদা এক জানাযায় শরীক হতে বের হলেন। মৃত ব্যক্তির পরিবারের লোকজন তার শোকে কাঁদতে কাঁদতে আসল। এ দৃশ্য দেখে তিনি বললেন, হতভাগার দল! আগামীকাল মৃত্যুবরণকারী আজ যে মারা গেছে তার জন্য কান্নাকাটি করছে!

টিকাঃ
৫১. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৪。
৫২. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৮。
৫৩. তারীখু দিমাশক, ৫৬/৪২৩。
৫৪. আল মুখতারু মিন মানাকিবিল আখইয়ার, ১৭২。
৫৫. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৩。
৫৬. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৩。
৫৭. তারীখু দিমাশক, ৫৬/১৭০। সনদ হাসান。
৫৮. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৪。
৫৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৬/২০১। সনদ গ্রহণযোগ্য。
৬০. কিতাবুয যুহদ (আবু দাউদ), ২১৫। বর্ণনা নং ২৪৯। সনদ বিচ্ছিন্ন। তবে বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য。

📘 সালাফদের চোখে কবর > 📄 জানাজায় আবৃত্তি করা সালাফের কবিতা

📄 জানাজায় আবৃত্তি করা সালাফের কবিতা


১. আবদুল ওয়াহিদ খাত্তাব বলেন, আমি হাসান বসরী -এর সাথে আবু রজা উতারিদি -এর জানাযায় অংশগ্রহণ করলাম। কবর দেওয়া শেষ হলে তিনি হাত ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়ে বললেন, আবু রজা, আপনি দুনিয়ার দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-কষ্ট হতে নিষ্কৃতি পেয়ে গেলেন। আল্লাহ তাআলা আপনার মৃত্যুকে দীর্ঘ প্রশান্তির উপকরণ বানিয়ে দিন। অতঃপর ইমাম ফারাযদাক-এর দিকে ফিরে বললেন, আবু ফিরাস, এই লোকটির মতোই সচেতন থেকো। আমরা সকলেই মৃতদের উত্তরসূরি। এ কথা শুনে ফারাযদাক কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন,
فلسنا بأنجا منهم غير أننا *** بقينا قليلا بعدهم وترحلوا
তাদের দাফন করে এসে আমরা যে দিব্যি বেঁচে থাকব, বিষয়টা এমন নয়, কিছুদিন হয়তো থাকব, তারপর মোটেও নয়।
২. জাফর বিন কিলাব বর্ণনা করেন, মুসগাব বলেছেন, ইসলামে দুটি স্থান (দুনিয়া ও কবর) ব্যতীত অন্যকিছুকে বাসস্থান বলা হয় না। এই বলে তিনি নিচের পঙ্ক্তিটি পাঠ করেন,
نجدد أحزانا لدى كل هالك **** ونسرع نسيانا ولم يأتنا أمن
فأنا ولا كفران الله ربنا *** كالبدن لا تدري متى يؤمها البدن
কবরজগতে প্রতিটি ধ্বংসশীল মানুষের দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি পায় আর দুনিয়ায় তড়িঘড়ি সব ভুলে বসে, শান্তি পাওয়াই দায়
আমি তো প্রতিপালক আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত নই
দেহ যেমন নিজের বেড়ে চলার খবর রাখে না, আমি ঠিক তেমন নই।
৩. তাবেয়ী উরওয়াহ বিন উজাইনাহ আবৃত্তি করেন,
نراع إذا الجنائز قابلتنا *** ونسكن حين تخفى ذاهبات
كروعة ثلة المغار سبع ... فلما غاب عادت راتعات
জানাযার দৃশ্য আমাদের ভীত করে তোলে
প্রিয়হারা বিলাপ কেবল শঙ্কা জাগায়।
বিত্তের তৃপ্তি যখন ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়
সাতমুখী আঘাতের ভয় চারিদিকে প্রলয় জাগায়।
৪. মুহাম্মাদ বিন খালফ তাইমী বলেন, আমার পিতা খালফ বিন সালিহ বলেন, আমি আবু বকর নাহশালী -এর কাছে শুনেছি, তিনি এক জানাযায় উপস্থিত ছিলেন। মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার পরিবারের লোকজন কাঁদতে শুরু করল। আবু বকর নাহশালী তখন মাটিতে দাগ কাটতে কাটতে বলতে লাগলেন,
ترى الميت يبكيه الذي مات قبله *** وموت الذي يبكي عليه قريب
আজ তুমি যার জন্য কাঁদছ, সেও তো একদিন অন্য কারও জন্য কেঁদেছিল, আজ যারা কেঁদে কেটে একাকার হচ্ছে, তাদের মৃত্যুও খুব বেশি দূরে নয়!
৫. মুহাম্মাদ বিন খালফ তাইমী বলেন, আমার পিতার কাছে শুনেছি, তিনি বলেন, আমরা এক ব্যক্তিকে দাফন করে ইবনু সাম্মাক-এর সাথে ফিরে আসছিলাম। এ সময় তিনি খানিকটা এগিয়ে এসে বললেন,
تمر أقاربي جنبات قبري ... كأن أقاربي لا يعرفوني
প্রিয়দের মাহফিল কবর ছেড়ে ক্রমশ দূরে সরতে শুরু করেছে, পরিচিত এ মুখগুলো যেন একেবারেই চেনে না আমাকে।
৬. হিশাম বিন আবদুল মালিক বাহিলী-এর আযাদকৃত গোলাম আবু হাফস বলেন, আমি হিশাম -এর লেখা তার মুখে শুনেছি। তিনি বলেন,
وما سالم عما قليل بسالم **** ولو كثرت حراسه وكتابه
ومن يك ذا باب شديد وحاجب **** فعما قليل يهجر الباب حاجبه
ويصبح بعد الحجب للناس عبرة *** رهينة بيت لم يسير جوانبه
فما كان إلا الدفن حتى تحولت *** إلى غيره أجناده ومواكبه
وأصبح مسرورا به كل كاشح *** وأسلمه جيرانه وأقاربه
فنفسك أكسبها السعادة جاهدا *** فكل امرئ رهن بما هو كاسبه.
মৃত্যুর থাবা হতে নিরাপত্তা দেওয়ার মতো কিছু নেই,
ব্যাপক পাহারাদারি আর কূটকৌশল এখানে কোনো কাজের নয়।
কেউ যদি সুদৃঢ় বাধার দুয়ার তুলে আড়ালে আশ্রয় গ্রহণ করে,
মৃত্যুর সামনে সেই আড়াল সামান্য প্রতিরোধও দাঁড় করাতে পারবে না।
এত প্রতিরোধের পরও মানুষের জন্য শিক্ষার বিষয় হলো,
কবরের দখলে থাকা মানুষের কিছুই এখানে গোপন থাকে না।
দাফন শেষ হতেই দুনিয়ার সৈন্য-সামন্ত ও জনস্রোত
অন্যের সু-নজর লাভের আশায় ছুটে যায়।
শত্রুর মুখে ফুটে ওঠে নিশ্চিন্ত ক্রুর হাসি,
আর স্বজন ও প্রতিবেশীরা তার হাত থেকে নিরাপদ হয়ে যায়।
মনে রেখো, সৌভাগ্য তোমাকেই সাধনা করে অর্জন করতে হবে,
মানুষ ভালো-মন্দ যা কামাই করে, তা-ই তার আমলনামায় জমা থাকে।""
৭. হিব্বান বিন ওয়াসিল ইসহাক ইবনুল জাসসাস-কে বললেন, আবু আররার ইজলী হলেন বনু ইজল গোত্রের একজন খ্যাতিমান বেদুইন কবি। আমি একটি পঙ্ক্তি বলব, আপনি একটি পঙ্ক্তি বলবেন। অতঃপর তা লিখে তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে আবু আররার ইজলী-এর নিকট পাঠানো হবে। দেখি তিনি কী বলেন।
হিব্বান বিন ওয়াসিল বললেন,
فإن كنت لا تدرين ما الموت فانظري *** إلى دير هند کیف خطت مقابره
মৃত্যুর বাস্তবতা সম্পর্কে তোমার যদি ধারণা না থাকে, দিয়ারু হিন্দের দিকে তাকাও; কত শত কবর সেখানে ছড়িয়ে আছে।
ইবনুল জাসসাস বললেন,
تري عجباً مما قضى الله فيهم *** رهائن حتف أوجبته مقادره
“যুগ যুগ ধরে কবরের আঁধারে যাদের নিবাস,
বহুকাল ধরে যারা পড়ে আছে সেখানে, তাদের সাথে আল্লাহ যা করেছেন তা দেখলে তুমি শিউড়ে উঠবে যাবে।"
তাদের পঙ্ক্তি দুটি লিখে বেদুইন কবির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। তিনি তা পড়ে বললেন,
بيوت ترى أثقالها فوق أهلها *** ومجمع زور لا يكلم زائره
কবর এমন এক ঘর, যেখানে একবার মাটির আড়াল সৃষ্টি করলে,
হাজার অনুমতি প্রার্থনা করেও ভেতরের কারও সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না।

টিকাঃ
৬১. তারীখু দিমাশক, ৭৪/৬৫。
৬২. তারীখু দিমাশক, ৭১/২৬৮。
৬৩. আত-তাবসিরাহ, ১/৩৪২; আল মুজালাসাতু ওয়া জাওয়াহিরুল ইলমি, ৩/২৭৮。
৬৪. তারীখু দিমাশক, ৩১/২৫。
৬৫. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৮。
৬৬. তারীখু দিমাশক, ২০/৮১ ও ৬৬/২৫৭; বাগিয়াতুত তলব ফি তারীখি হালব, ১০/৪৫৭১。
৬৭. দিয়ারু হিন্দ সিরিয়ার হীরা শহরের দুটি স্থাপনার নাম। একটি দিয়ারু হিন্দ সুগরা, অপরটি দিয়ারু হিন্দ কুবরা নামে পরিচিত। আদ দিয়ারাতু লিল ইসবাহানী, ২৭, ২৮。
৬৮. বাদাইউল বাদাই, ১১৬。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00