📄 কাফন-দাফনের সময় সালাফের বিভিন্ন নসীহাহ
১. উমর ইবনুল খাত্তাব বর্ণনা করেন। রাসুল বলেছেন,
مَا مِن ميّتٍ يُوضَعُ على سريره فيُخطى به ثلاث خُطى إِلَّا تَكَلَّمَ بكلام يسمعه من شاء اللهُ إِلَّا الثَّقَلَيْنِ الجِنَّ والإنس، يقول: يا إخوتاه، ويا حملة نَعْشَاهُ، لا تَغُرَّنَّكُمُ الدُّنيا كما غَرَّتْني، ولا يَلعَبَنَّ بِكُمُ الزَّمانُ كما لعِبَ بي، خَلَفْتُ مَا تَرَكْتُ لِوَرَثَتِي وَالدَّيَانُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مُحَاسَبِي وَأَنْتُمْ تَشِيعُونِي وَتَوَدَعُونِي
মৃত ব্যক্তিকে খাটিয়াতে রেখে তিন কদম যাওয়ার আগেই মৃত ব্যক্তি এমন ভাষায় কিছু কথা বলে, যা মানুষ ও জীন ব্যতীত আল্লাহ তাআলা যাকে শোনাতে চান সে শোনে। মৃত ব্যক্তি বলে, হে আমার ভাইয়েরা, আমাকে বহনকারী বন্ধুগণ, সাবধান! দুনিয়া আমাকে যেমন ধোঁকায় ফেলেছিল। তোমাদের যেন তেমন ধোঁকা দিতে না পারে। সময় আমাকে নিয়ে যে খেলা খেলেছে। তা যেন তোমাদের সাথে না খেলে। আমি যা অর্জন করেছি, আজ তা উত্তরাধিকারীদের হাতে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কিয়ামতের দিন হিসাবের দায়ভার আমাকেই নিতে হবে। তোমরা তো সামান্য সময়ের জন্য পেছনে চলে বিদায় দিতে আসছ!
২. আবু হুরায়রা সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে তার সম্মুখ দিয়ে দিনের আলোয় কোনো জানাযা অতিবাহিত হলে তিনি বলতেন, তুমি দিনের আলোয় যাও, আমরা রাতে আসছি। আর রাতে গেলে বলতেন, তুমি রাতে যাও, আমরা দিনে আসছি।”
৩. তাবিঈ আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ আল-হানী বলেন, একবার আমি সাহাবী আবু উমামা বাহিলী এর সাথে জানাযার সালাত আদায় করি। দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি বললেন, পুনরুত্থানের আগ পর্যন্ত এটাই আলমে বরযখ (কবরজগৎ)।
৪. আলী বিন যুফার আস সাআদী বর্ণনা করেন। সাহাবী আহনাফ বিন কাইস এর সামনে দিয়ে একটি জানাযা গেল। তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা ওই ব্যক্তির প্রতি রহম করুন, যিনি এমন দিনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন।
৫. মালিক বিন দীনার বলেন। আমরা হাসান বসরী -এর সাথে এক জানাযায় শরীক ছিলাম। হঠাৎ তিনি শুনতে পেলেন একজন আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করছে, কার জানাযা হচ্ছে? হাসান বললেন, "আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন। এই লাশটি হলাম আমি আর তুমি। তোমরা পূর্ববর্তীদের আলোচনা নিয়ে পড়ে আছ। আর এভাবেই আমাদের পরবর্তী লোকজন পূর্ববর্তীদের সাথে মিলিত হবে (অন্যের আলোচনা করতে করতে মৃত্যু চলে আসবে)।"
৬. কিতরি আল খাশশাব বলেন, আমরা এক জানাযায় অংশগ্রহণ করলাম। সেখানে ইমাম শাবী -সহ কুফার গণ্যমান্য লোকজনও উপস্থিত ছিলেন। লাশ দাফনের পর ইমাম শাবী বললেন, 'মৃত্যু হলো বান্দার পার্থিব জীবনের পরিসমাপ্তি।' তার কথায় উপস্থিত সকলে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
৭. সাওয়াদাহ বিন আবুল আসাদ বলেন, আমার পিতা আবুল আসাদ -এর সম্মুখ দিয়ে কোনো জানাযা অতিক্রম করলে তিনি বলতেন, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। হায়! এ দৃশ্য দেখে আমি যেন একেবারে নিঃস্ব সর্বহারা হয়ে গেলাম।
৮. দাউদ ইবনুল মুহাব্বার বলেন, আমার পিতা মুহাব্বার বিন কাহযাম বিন সুলাইমান বলেছেন, একবার আমরা একটি জানাযার খাটিয়া বহন করে রবী বিন বাররা -এর সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। আমাদের দেখে তিনি বললেন, এই অপরিচিত লোকটি কে?
আমরা বললাম, সে তো আমাদের অপরিচিত নয়; বরং খুব কাছের এবং আপন একজন মানুষ।
জবাব শুনে তিনি বললেন, জীবিত ব্যক্তিদের জন্য মৃত ব্যক্তির চেয়ে অচেনা অপরিচিত আর কে হতে পারে?
এ কথা বলেই তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। আল্লাহর শপথ! তার এই কথায় উপস্থিত সকলেই ডুকরে কেঁদে উঠল।
৯. হাতিম বিন সুলাইমান তাঈ বলেন, আমি আবদুল ওয়াহিদ বিন যায়িদ -এর সাথে হাওশাব -এর জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি বললেন, হে আবু বিশর, আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি রহম করুন। এই দিনটির ব্যাপারে আপনি সদা সতর্ক ছিলেন। আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি রহম করুন। মৃত্যুর ব্যাপারে আপনি ছিলেন সদা শঙ্কিত। আল্লাহর শপথ! যদি সম্ভব হতো তাহলে আপনার মৃত্যুর পর আমার পা-দুটো আমাকে আর বয়ে বেড়াত না (সব ছেড়ে আমলে মশগুল হয়ে পড়তাম)।
বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা বলেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
১০. মুনকাদির বিন মুহাম্মাদ বিন মুনকাদির বলেন। আমরা সাফওয়ান বিন সুলাইম -এর সাথে এক জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। সেখানে আমার পিতা এবং ইমাম আবু হাযিম -ও উপস্থিত ছিলেন। লোকজন মৃত ব্যক্তিকে বিশিষ্ট একজন আবিদ বলে মন্তব্য করল। জানাযার পর সাফওয়ান বললেন, এবার তার আমল করার সুযোগ শেষ। এখন থেকে সে জমিনবাসীর দুআর মুখাপেক্ষী। আল্লাহর শপথ! এ কথা শুনে উপস্থিত সবাই কাঁদতে শুরু করল।
১১. সাহল বিন আসলাম আদাওয়ি বলেন। প্রত্যক্ষদর্শী এক ব্যক্তি আমাকে জানিয়েছেন যে, মুতাররিফ বিন আবদুল্লাহ বিন শিখখির এক জানাযায় শরীক ছিলেন। দাফন শেষে যখন সুন্নাত অনুযায়ী কবরের মাটি সমান করে দেওয়া হলো, তিনি বললেন, আলহামদুলিল্লাহ! এবার তার ইহকালীন যাত্রার ইতি ঘটল।
১২. মুহাম্মাদ বিন খালফ বর্ণনা করেন, মুহাম্মাদ বিন আলা তাইমী উকবাহ বাযযার-এর কাছ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "আমি একজন বেদুইনকে দেখলাম, সে একটি জানাযা দেখতেই এগিয়ে এসে বলল, "আহলান সাহলান! স্বাগতম!" আমি বললাম, "কী কারণে স্বাগত জানাচ্ছ?” লোকটি বলল, "এমন ব্যক্তিকে কেন স্বাগত জানাব না, যাকে এমন প্রতিবেশীর কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যার অনুগ্রহ প্রতিনিয়ত বর্ষিত হচ্ছে। যিনি সুমহান ক্ষমাশীল!" তার কথায় আমার মনে হলো আমি যেন ব্যাপারটা তখনই জানতে পারলাম।
১৩. মুহাম্মাদ বিন উআইনাহ বলেন, আমি এক ব্যক্তির জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। সেখানে একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। কবরের মাটি সমান করে দেওয়ার পর তিনি বললেন, "হে অমুক, আজ তুমি সব দায় থেকে মুক্ত হলে, আর তোমাকেও মুক্ত করা হলো। আমরা তোমাকে রেখে ফিরে যাচ্ছি। অবশ্য আমরা তোমার পাশে থাকলেও তোমার কোনো লাভ হবে না। অতঃপর কবরের দিকে ফিরে আরও বললেন, হে কবরবাসী, তোমরা আজ বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে আছ। অথচ বিষয়টি আমাদের কারওই নজর কাড়েনি।
১৪. আবু বকর ইবনু আবিদ দুনিয়া বলেন, এক জানাযায় আমি এক টুকরো কাগজ পেলাম, যাতে লেখা ছিল, তোমরা তোমাদের ধ্যান-জ্ঞান সব দুনিয়ার জন্য ব্যয় করেছ। আর অত্যাসন্ন মৃত্যুকে বেমালুম ভুলে গেছ! আল্লাহর শপথ! অচিরেই এক আঁধার ছেয়ে আসা দিনে মৃত্যু তোমাদের জাপটে ধরবে। সেদিন তোমরা সমস্ত নিআমতের স্বাদ ভুলে যাবে আর চরম অপদস্থ হবে। কিন্তু সেদিনের অপমান তোমাদের কোনো উপকারে
আসবে না। সাবধান! সাবধান!! সাবধান!!! আচমকা মৃত্যু চলে আসার আগে, পচে-গলে মিটে যাওয়া লোকজনের প্রতিবেশী হওয়ার আগে সতর্ক হও।
টিকাঃ
১৯. সহিহ বুখারী, ১৩৭২। জানাযা অধ্যায়।
২০. মুসনাদু ফারুক, ১/২৩৫। সনদ মুনকাতি। তবে সমার্থক বর্ণনা পাওয়া যায়।
২১. মুসান্নাকু আবদুর রাজ্জাক, ৩/৫৪১। বর্ণনা নং ৬৬৬১। তা ছাড়া আবু দারদা -এর ব্যাপারেও এ রকম বর্ণনা রয়েছে। উয়নুল আখবার, ২/৩৩১। সনদ মুরসাল।
২২. আহওয়ালুল কুবুর, ৬।
২৩. তারীখু দিমাশক, ২৪/৩২৬।
২৪. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৬৯৯।
২৫. ফসলুল খুত্তাব, ২/২০০।
২৬. আয যুহদু লি আহমাদ বিন হাম্বল, ২১১৮। বর্ণনা: ১৫২৯।
২৭. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৬/২৯৭।
২৮. তারীখু দিমাশক, ৩৭/২২৫।
২৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/৬৬। সাফওয়ান বিন সুলাইম -এর জীবনীতে।
৩০. তারীখু দিমাশক, ৫৮/৩৩৩।
৩১. আহওয়ালুল কুবুর, ১৫৭।
৩২. আল ইতিবারু ওয়া সিলওয়াতুল আরিফীন, ১/২৭২।
৩৩. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০১।
📄 জানাজায় উপস্থিত হয়ে হাসি-তামাশা নিন্দনীয়
১. কাতাদাহ বলেন, আমাদের নিকট খবর পৌঁছেছে যে, আবু দারদা এক ব্যক্তিকে জানাযায় উপস্থিত হয়ে হাসতে দেখেন। তিনি তাকে বললেন, মৃত ব্যক্তির করুণ অবস্থা কি তোমার চোখে পড়ছে না? তারপরেও হাসছ কেন?**
২. আবদুল্লাহ বিন মাসউদ সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, একবার জনৈক ব্যক্তির জানাযায় উপস্থিত হয়ে একজনকে তিনি হাসতে দেখলেন। তাকে বললেন, 'জানাযায় উপস্থিত হয়েও তুমি হাসছ? আল্লাহর শপথ! আমি আর কখনোই তোমার সাথে কথা বলব না।'
৩. সাবিত বুনানী বলেন, আমরা যখন কোনো জানাযায় অংশগ্রহণ করতাম তখন সকলের চেহারায় কাঁদোকাঁদো ভাব বা গভীর বিষাদের ছাপ দেখতে পেতাম। অথচ বর্তমানে তুমি যদি কোনো জানাযার দিকে তাকাও। দেখবে কারও-না- কারও ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে আছে!
৪. হাসান বসরী-এর সন্তানদের একজন বলেন, আমরা হাসান বসরী -এর সাথে এক জানাযায় শরীক হলাম। তিনি এক লোককে পাশের বন্ধুর সাথে হাসিমুখে কথা বলতে দেখলেন। এ অবস্থা দেখে তিনি বলে উঠলেন, সুবহানাল্লাহ! এটা কি হেসে কাটানোর সময়?
তিনি আরও বলেন, মৃত ব্যক্তির পাশে উঁচু স্বরে কথা না বলে স্বর নামিয়ে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা উচিত।"
৫. আইয়ুব সখতিয়ানী বর্ণনা করেন, কোনো এক জানাযায় কথার আওয়াজ শুনতে পেয়ে আবু কিলাবা বলেন, তারা পিনপতন নীরবতা বজায় রেখে মৃতদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেন।
টিকাঃ
৩৪. ফসলুল খুত্তাব, ২/২০০। সনদ মুরসাল। কাতাদা আবু দারদা এ হতে সরাসরি এই কথা শোনেননি。
৩৫. ফসলুল বুত্তাব, ২/২০০। সনদ দুর্বল。
৩৬. শু'আবুল ইমান লিল বাইহাকী, ১১/৪৬০। বর্ণনা নং ৮৮৩৪। সনদ মাকবুল。
৩৭. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৮。
📄 জানাজায় উপস্থিত সালাফদের হালত
১. আওন বিন আবদুল্লাহ বলেন,
كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا كَانَ فِي جَنَازَةٍ عَلَتْهُ الْكَابَةُ وَأَكْثَرَ حَدِيثَ النَّفْسِ وَأَقَلَّ الْكَلَامَ
রাসুল যখন কোনো জানাযায় শরীক হতেন। তখন তিনি বিমর্ষচিত্ত হয়ে পড়তেন। বেশিরভাগ সময় আনমনে কথা বলতেন। অন্যের সাথে খুব কম কথা বলতেন।
২. ইবরাহীম নাখাঈ বলেন, তাদের মধ্যে যখন কারও জানাযা পড়া হতো। উপস্থিত সকলের চেহারায় তিন দিন পর্যন্ত জানাযা ও মৃত্যুর স্পষ্ট ছাপ লক্ষ করা যেত।
৩. হাসান বিন সালিহ বলেন। আমি ইমাম আমাশ-কে বলতে শুনেছি, আমরা যখন কোনো জানাযায় অংশগ্রহণ করতাম তখন পুরো গোত্রে এমন কাউকে দেখতাম না, যার চেহারায় গভীর বিষাদের ছাপ নেই।
৫. আমির বিন ইয়াসাফ বলেন। ইয়াহইয়া বিন আবু কাসীর যেদিন কোনো জানাযায় শরীক হতেন সেদিন রাতে তিনি ঘুমাতেন না। কবরের চিন্তায় সেদিন তিনি পরিবারের কারও সাথে কথাও বলতেন না।
৬. আতা আযরাক বলেন। মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি একবার এক জানাযায়
শরীক হলেন। দাফন সম্পন্ন করে তিনি যখন ঘরে ফিরলেন তার সামনে মধ্যাহ্ন ভোজ পরিবেশন করা হলো। তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। বললেন, আজকের দিনটি আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি দিন। এই বলে তিনি খানা খেতে অসম্মতি জানালেন।
৭. সালাম বিন আবু মুতী বলেন। আমি কাতাদা -এর সাথে এক জানাযায় শরীক হলাম। দাফন শেষ করে ফিরে আসা পর্যন্ত তিনি কোন কথা বলেননি। হারিরী-এর সাথে এক জানাযায় শরীক হলাম। তিনি লোকজন থেকে আলাদা হওয়ার আগ পর্যন্ত অনবরত চোখের পানি ফেলেছেন। আরেকবার মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি-এর সাথে এক জানাযায় গেলাম। তিনি তার দরজায় হাত রেখে মাথা ঢেকে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। একটুও নড়াচড়া করলেন না। একসময় লোকজন চলে গেলেও তিনি তা টের পেলেন না। আমি তার কাছে গেলাম। এবার তিনি এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলেন, কেউ নেই। অতঃপর কবরের সামনে গেলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে কিছু বললেন এবং চলে গেলেন।
৮. সালিহ মুররি বলেন, হাসসান বিন আবু সিনান-এর কোনো প্রতিবেশী মারা গেলে মৃত ব্যক্তির ঘরের মতো তার ঘর হতেও শোক ও কান্নার আওয়াজ পাওয়া যেত। তিনি যখন জানাযায় শরীক হতেন, সেখান হতে ফিরে সে রাতে আর খাওয়া-দাওয়া করতেন না। আমি তার ছেলে ও ঘরের অন্যদের দেখেছি, প্রতিবেশীর মৃত্যুতেও কিছুদিনের জন্য তাদের মাঝে বাকহীন নীরবতা ও বিধ্বস্ত ভাব দেখা যেত।
৯. আবদুল্লাহ বিন ইয়াহইয়া বিন আবু কাছীর যেদিন কোনো জানাযায় অংশগ্রহণ করতেন সেদিন রাতের খাবার খেতেন না। অত্যধিক দুশ্চিন্তার দরুন পরিবারের কারও সাথে কথাও বলতেন না।
১০. ইমাম আমাশ বলেন, আমি একদল লোকের সাক্ষাৎ লাভ করেছি, তাদের মাঝে কারও জানাযা উপস্থিত হলে তারা সেখানে জড়ো হয়। নির্বাক বসে
রয়। কোনো রকম ফিসফাস করে না। মৃত ব্যক্তিকে যখন কবরে রাখা হয়, আমি তাদের প্রত্যেকের অন্তরে মৃত ব্যক্তির প্রতি এমন ভালোবাসা দেখতে পেয়েছি, যেন সে তাদের জন্মদাতা পিতা, সহোদর ভাই কিংবা ঔরসজাত সন্তান।**
১১. সুওয়াইদ বিন আমর কালবী বর্ণনা করেন, রবী বিন আবু রাশিদ -এর প্রতিবেশীদের কেউ মারা গেলে তার অবস্থা এমন হতো যে কিছুদিনের জন্য পরিবারের লোকজনও তাকে চিনতে পারত না।
১২. আবাহ বিন কুলাইব লাইসী বর্ণনা করেন। মারছাদ বিন আমির হানাঈ বলেন, জাবির বিন যায়িদ তার মহল্লার জনৈক ব্যক্তির জানাযায় অংশগ্রহণ করলেন। জানাযার নামাযের পর লোকেরা তাকে বলল, হে আবু শাসা, আপনি যদি তার কবরে নামতেন খুব ভালো হতো। তিনি লাশ নামানোর জন্য কবরে নামলেন। মৃত ব্যক্তিকে কবরে নামিয়ে কবর হতে ওঠার আগেই তিনি মূর্ছা যান। লোকজন তাকে অচেতন অবস্থায় কবর হতে উঠিয়ে আনে।
১৩. সালিহ আল মুররি বলেন, আমি বসরায় যুবক ও বৃদ্ধদের একটি দলকে দেখেছি। যারা একটি জানাযা ও দাফন শেষ করে ফিরছিল। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল যেন এইমাত্র কবর হতে তাদের পুনরুত্থান ঘটেছে! আল্লাহর শপথ! পরবর্তী কিছুদিনও তাদের চেহারার সেই বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে চেনা যেত।
টিকাঃ
৩৮. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ২/২৮৫。
৩৯. আল মারাসিল লি আবি দাউদ, ৪৩০। মুরসাল হাদিস। বর্ণনাকারীগণ সকলেই নির্ভরযোগ্য。
৪০. মুসান্নাফু আবদির রাযযাক, ৩/৪৫১। বর্ণনা নং ৬২৮৩। সনদ সহিহ。
৪১. মুসান্নাফু ইবনি আবী শাইবা, ৭/২৪১। বর্ণনা নং ৩৫৬৯০। সনদ সহিহ。
৪২. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৭。
৪৩. তারীবু দিমাশক, ৫৬/১৭০。
৪৪. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৭। সনদ সহিহ。
৪৫. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৮。
৪৬. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৭。
৪৭. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৭。
৪৮. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৮。
৪৯. হায়াতুস সালাফি বাইনাল কওলি ওয়াল আমাল, ১/৭০৯。
৫০. ফসলুল খুত্তাব, ২/২০০。
📄 যিয়ারত ও জানাজায় উপস্থিত হয়ে সালাফদের উপলব্ধি
১. আবদুল্লাহ বিন তালহা বিন মুহাম্মাদ আত-তাইমী বলেন, একবার এক জানাযায় অংশ নেওয়ার সুবাদে সাঈদ ইবনুস সাইব আত-তইফী-কে বলতে শুনি, আল্লাহর শপথ! মৃত্যু মানুষের জন্য পরিবার-পরিজনের মধ্যে আনন্দের কিছু বয়ে আনে না। আল্লাহর শপথ! মৃত্যু সুপ্রশস্ত নিআমতের অধিকারী মুমিনের জন্য সংকুচিত হয়ে আসা দুনিয়াকে আরও সংকীর্ণ করে দেয়। আর তারা প্রফুল্লচিত্তে এই দুনিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে যায়।
এ কথা বলে তিনি অশ্রুভরা নয়নে উঠে দাঁড়ালেন।”
২. সালমান বিন সালিহ বলেন, একদিন হাসান বসরী-কে কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। সন্ধ্যায় যখন তার দেখা মিলল, সবাই জানতে চাইলেন, 'আপনি সারাদিন কোথায় ছিলেন?'
তিনি বললেন, এমন কিছু ভাইয়ের সান্নিধ্যে ছিলাম, যাদের আমি ভুলে গেলেও তারা আমায় স্মরণ রাখে। আমি তাদের দোষচর্চা করলেও তারা আমার নিন্দা করে বেড়ায় না।
এ কথা শুনে সবাই বলে উঠল, এরাই তো আমাদের আসল ভাই। হে আবু সাঈদ, আল্লাহর দোহাই! ব্যাপারটা একটু খোলাসা করুন। তারা কারা?
তিনি বললেন, তারা হলো কবরবাসী। '
৩. মালিক বিন দীনার বলেন, একবার আমি এবং হাসসান বিন আবি সিনান এর সাথে কবর জিয়ারত করতে গেলাম। সেখানে গিয়ে তিনি কী যেনো ভাবলেন! অতঃপর আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে মালিক, মানুষের প্রাণ হরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ফিরিশতাগণ সমস্ত জীবিত ব্যক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। মানুষ যখন তার শিয়রে মালাকুল মাওতকে দেখতে পাবে, তখন সে ভয়ে-আতঙ্কে মুষড়ে পড়বে।' তাঁর মুখে এ কথা শুনে মালিক বিন দীনার নিজের মাথায় হাত দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, আফসোস সেদিনের জন্য! হায় আফসোস সেদিনের জন্য!**
৪. আবু আসিম আল-হানাতী বলেন, একবার আমি মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি এর সাথে পথ চলছিলাম। পথিমধ্যে আমরা একটি কবরস্থানে এসে পৌঁছলাম। কবরস্থান দেখতেই তার দু-চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি বললেন, হে আবু আসিম, কবরের ওপরিভাগের দৃশ্য যেন আপনাকে ধোঁকায় না রাখে, এর ভেতরের প্রতিটি দেহই আনন্দ কিংবা বেদনার দোলায় দুলছে।"
৫. আবু জাফর ফাররা বলেন, হাসান বিন সালিহ একবার ব্যক্তিগত ইবাদতখানায় পৌঁছে কবরবাসীকে (কברস্থান) দেখতে পেলেন। সেদিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, কবর, তোমার ওপরিভাগের দৃশ্য কত সুন্দর! অথচ তোমার আঁধার গর্ভে লুকিয়ে আছে বিপদের ঘনঘটা!"
৬. হাজ্জাজ বিন আবু যিয়াদ বলেন, একবার আমরা বসরার জুবান এলাকায় এক জানাযায় অংশগ্রহণ করলাম। দাফনের প্রস্তুতি চলাকালে আমি একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দেখলাম, আমি কবরবাসীদের একজন। অন্যান্য কবরবাসীর সাথে কবরে শুয়ে আছি। কবরগুলোর মাটিতে ফাটল দেখতে পেলাম। দেখলাম, কেউ মাটিতে শুয়ে আছে। কেউ সুদৃশ্য ঝালর টানা বিশেষ কামরায়। কেউ রেশমি পোশাকের আভিজাত্য জড়িয়ে ঘুমুচ্ছে। কেউ রেশম কোমল বিছানায় শুয়ে আছে। কেউ রাইহান ফুলের জান্নাতি সুবাসে নিদ্রা-বিভোর। কারও মুখে মুচকি হাসির আভা। কারও শরীরে বাহারি রঙের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে। কারও- বা আবার ক্ষণে ক্ষণে রং পাল্টে যাচ্ছে! মনকাড়া এসব দৃশ্য দেখে স্বপ্নেই আমি অশ্রুসিক্ত নয়নে বলে উঠলাম, 'ইয়া আল্লাহ, আপনি চাইলে তো সকলের মর্যাদা বরাবর করে দিতে পারেন!'
এমন সময় কবরস্থানের একপ্রান্ত হতে আওয়াজ ভেসে এল, হাজ্জাজ, কবর হলো আমলের বিনিময় লাভের ঘাঁটি। এ কথা শুনতেই আমার তন্দ্রা কেটে গেল।”
৭. আবু সাঈদ সালাম বিন আবু মুতী বলেন, একবার আমরা মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি-এর সাথে এক জানাযায় শরীক হলাম। লোকজন দ্রুতপদে এগিয়ে গেল। আমরা 'জুবান' পর্যন্ত তাদের পিছে পিছে চলে মূল জানাযার নাগাল পেলাম। তখনো অবশ্য সবাই এসে পৌঁছায়নি। কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই চলে আসলে আমরা জানাযার সালাত আদায় করে নিলাম। জানাযার পর আমি দাফনের কাজে অংশ নিলাম। দাফন সেরে মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি-এর নিকট ফিরে আসলাম। এসে দেখি তিনি তার পাশের জনকে কিছু বলছেন। কান পেতে শুনলাম তিনি বলছেন,
প্রতিদিনই আমাদের কেউ-না-কেউ নম্বর এই জগতের মায়া ছেড়ে নির্জন কবরজগতে পাড়ি জমাচ্ছে। আর এভাবেই পরবর্তী লোকজন শীঘ্রই পূর্ববর্তীগণের সাথে মিলিত হবে।
৮. নাহীম আল ইজলী-এর নিকট বসরার এক লোক বর্ণনা করে বলেন, একবার এক জানাযার জামাতে হাসান বসরী-কে দেখতে পেলাম। লোকজন তার নিকট জড়ো হলো। তিনি উপস্থিত জনসাধারণকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি দয়া ও মেহেরবানি করুন। তোমরা আজকের দিনের জন্য আমল করতে থাকো। আজকে তোমাদের এই ভাই আখিরাতের যাত্রায় তোমাদের পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছেন। আর তোমরা তার উত্তরসূরি হিসেবে রয়ে গেছ।
যে ব্যক্তি তার ভাইকে দাফন করে নিজে তার উত্তরসূরি হয়েছে, তাকে বলছি শোনো, আগামীকাল অন্যদের পেছনে ফেলে তুমিও মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করবে। সেদিন এভাবেই অন্যরা তোমার পেছনে রয়ে যাবে। এভাবেই আগে-পরে করে একে একে যেতে থাকবে। একে একে সবাই একদিন একত্র হবে। মৃত্যু তোমাদের সকলকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেবে। সকলকেই মৃত্যুর কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। নিঃসন্দেহে সকলকে একদিন কবরবাসী হতে হবে। কিয়ামতের সূচনালগ্নে ঠিক সেখান থেকেই পুনরুত্থান হবে। আল্লাহ তাআলার দরবারে উপস্থিত করা হবে। প্রত্যেককে তাঁর সম্মুখে একাকী হাজির হতে হবে। সেখানে সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে লুটিয়ে পড়বে।
১০. সাঈদ বিন আল জারিরী তার কয়েকজন উস্তাদ হতে বর্ণনা করেন, আবু দারদা এক জানাযায় শরীক হলেন। জনৈক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করল, মৃত ব্যক্তিটি কে? তিনি বললেন, এটি তুমি। আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّكَ مَيِّتُ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ 'নিশ্চয় তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল।' (সুরা যুমার ৩৯:৩০)
১০. ইয়াহইয়া বিন জাবির বর্ণনা করেন। আবু দারদা এক জানাযায় শরীক হতে বের হলেন। মৃত ব্যক্তির পরিবারের লোকজন তার শোকে কাঁদতে কাঁদতে আসল। এ দৃশ্য দেখে তিনি বললেন, হতভাগার দল! আগামীকাল মৃত্যুবরণকারী আজ যে মারা গেছে তার জন্য কান্নাকাটি করছে!
টিকাঃ
৫১. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৪。
৫২. আহওয়ালুল কুবুর, ১৩৮。
৫৩. তারীখু দিমাশক, ৫৬/৪২৩。
৫৪. আল মুখতারু মিন মানাকিবিল আখইয়ার, ১৭২。
৫৫. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৩。
৫৬. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৩。
৫৭. তারীখু দিমাশক, ৫৬/১৭০। সনদ হাসান。
৫৮. ফসলুল খুত্তাব, ৫/৩৯৪。
৫৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তবাকাতুল আসফিয়া, ৬/২০১। সনদ গ্রহণযোগ্য。
৬০. কিতাবুয যুহদ (আবু দাউদ), ২১৫। বর্ণনা নং ২৪৯। সনদ বিচ্ছিন্ন। তবে বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য。