📄 হাসানের খুতবা
মুসলিম আল আজালি রহিমাহুল্লাহু বলেন-
হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার হৃদয়ছোঁয়া একটি খুতবা দেন। খুতবায় তিনি বলেন-হামদ, সালাত ও শোকরের পর সমাচার এই যে, তোমরা মনে রেখো, প্রতিটি প্রাণীই একদিন মৃত্যুবরণ করবে। তোমাদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটবে না। মৃত্যুর পর তোমাদেরকে আবার জীবিত করা হবে। সেদিন তোমাদের সামনে তোমাদের আমলনামা পেশ করা হবে এবং সে অনুযায়ী তোমাদের শাস্তি ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হবে।
সাবধান, দুনিয়া যেন তোমাদেরকে ধোঁকায় না ফেলে। দুনিয়ার রূপ-লাবণ্য ও চাকচিক্য যেন তোমাদেরকে গ্রাস করতে না পারে। কারণ, দুনিয়া দেখতে যেমনই হোক, বাস্তবে সে একটি পরীক্ষাগার। এখানে মানুষের ইমান ও কুফর পরীক্ষা করা হয়। তাদের ভালোমন্দ যাচাই করা হয়। তা ছাড়া, দুনিয়ার ধ্বংস অনিবার্য, প্রতারণা সুবিদিত, স্থায়িত্ব ঠুনকো এবং চরিত্র ঢোলের মতো—আজ এর তালে বাজে তো; কাল ওর তালে। এভাবে সেসব শ্রেণি ও পেশার মানুষকে ধোঁকা দেয়। ফলে খুব কম মানুষই তার অনিষ্ট থেকে বাঁচতে পারে। কিছু লোক তো সব সময় দুনিয়ার আমোদ-ফুর্তিতে মেতে থাকে। এরাই সবচেয়ে বেশি বিপদের শিকার হয়। দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে নিমজ্জিত থাকা খুবই খারাপ কাজ। সুখ-দুঃখ দুনিয়ার এপিঠ-ওপিঠ। দুনিয়া দুনিয়াদারদের জন্য সব সময় তির উঁচু করে রাখে। তার আকস্মিক নিক্ষেপিত তির ভক্তদের মৃত্যু ডেকে আনে। প্রতিটি মানুষই নির্ধারিত সময়ে মৃত্যুবরণ করবে। কেউই এখানে জনম জনম ধরে থাকতে পারবে না।
প্রিয় বন্ধুগণ, এখন তোমরা যে-পৃথিবীতে বসবাস করছ, তোমাদের পূর্বে এখানে এমন জাতি বসবাস করত, যারা শক্তি, অর্থ ও জনবলে তোমাদের চেয়ে অনেক প্রবল ও সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু দুনিয়া তাদেরকে গ্রাস করে নিয়েছে। তাদের এখন দৃশ্যমান কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনকি তাদের অনেকের নামও আজ ইতিহাসের স্মরণ নেই। তারা জীবনের পথ অতিক্রম করে এখন কবরে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে। তাদের কবর তাদের স্বজনদের থেকে বেশি দূরে না। খুব কাছেই। দেয়ালের এপাশ-ওপাশ মাত্র। এরপরও তাদের মাঝে কথাবার্তা নেই। যোগাযোগ বা সাক্ষাতের কোনো উপায় নেই। মৃত্যুর ফেরেশতা সেই সুযোগ কেড়ে নিয়েছে। কবের স্যাঁতস্যাঁতে মাটি ও পোকামাকড় তাদের দেহ খেয়ে ফেলেছে। হাড্ডিগুলো গলে শেষ হয়ে গেছে। দুনিয়ার সাথে সুগভীর সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তারা আর কোনোদিন দুনিয়ার বুকে ফিরতে পারবে না। তাদের জীবনের অন্তিম সমাপ্তি ঘটেছে।
মনে রেখো, তোমাদের পূর্ববর্তীদের যে অবস্থা হয়েছিল, তোমোদেরও ঠিক সে অবস্থাই হবে। তোমাদের জীবনেরও ঊষা গড়িয়ে সাঁঝ নেমে আসবে। রুহ নামক সূর্য ডুব দেবে পড়ন্ত বিকেলে। তোমাকে একাই পাড়ি দিতে হবে রহস্য ঘেরা মৃত্যুর সমুদ্র। একাকী থাকতে হবে নির্জন কবরে। কেউ থাকবে না তোমার সাথে। দেহ পচে-গলে মাটির সাথে মিশে যাবে। এটাই হবে তোমার শেষ ঠিকানা। এক সময় কবরে থাকার দিনও ফুরিয়ে যাবে। ফের কবর থেকে উঠতে হবে। মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা কথাগুলো প্রকাশ পেয়ে যাবে। আল্লাহর সামনে নতশিরে উপস্থিত হতে হবে। ভালো কাজের পুরস্কার ও মন্দকাজের শাস্তি নির্ধারণ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا.
'আমলনামা সামনে রাখা হবে। আমলনামায় যা আছে; তার কারণে আপনি তাদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখবেন। তারা বলবে, হায় আফসোস! এ কেমন আমলনামা। ছোট-বড় কোনো কিছুই তো বাদ দেয়নি সবই এতে রয়েছে। তারা তাদের কৃতকর্ম সামনে উপস্থিত পাবে। আপনার পালনকর্তা কারও প্রতি (বিন্দু মাত্রও) জুলুম করবেন না। [সুরা কাহাফ: ৪৯]
আল্লাহর ভয়ে বুক দুরুদুরু করে কাঁপবে। অবশেষে হয়তো জান্নাতে; নয়তো জাহান্নামে যেতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জান্নাতি বানিয়ে দিক। আমিন。
টিকাঃ
[১৮৫] উলুমুদ্দিন: ৩/২২৭।
📄 বিদায়ের প্রস্তুতি নাও
ইয়াহইয়া ইবনু কাছির রহিমাহুল্লাহু বলেন, হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু একদিন খুতবায় বলেন-
'সুন্দর ও সুদর্শন ব্যক্তিরা আজ কোথায়-যারা নিজেদের সৌন্দর্য ও যৌবন নিয়ে গর্ব ও অহংকার করে বেড়াত! কোথায় আজ সেই প্রতাপশালী বাদশারা-যারা বিশাল বিশাল শহর ও সাম্রাজ্য গড়ে তুলত; চার পাশে পাঁচিল তুলে শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করত!
কোথায় আজ ওই বীর সেনানীরা-যাদের গর্জনে যুদ্ধের ময়দান কেঁপে উঠত। যাদের পদভারে রণাঙ্গন প্রকম্পিত হতো! কালের গর্ভে তারা সবাই বিলীন হয়ে গেছে। সময়ের অগ্নিঝড়ে তারা সবাই ঝরে পড়েছে। কেউ-ই আজ বেঁচে নেই। পাড়ি জমিয়েছে না- ফেরার দেশে। দুনিয়ার সম্পদ, ক্ষমতা, রাজত্ব ও আভিজাত্য ছেড়ে তাদের আশ্রয় হয়েছে গহীন অন্ধকার কবরে। তাই তুমিও দ্রুত গুছিয়ে নাও তোমার সফরের সামানা। প্রস্তুতি নাও বিদায়ের। আর দেরি করো না।’
টিকাঃ
[১৮৬] হিলিয়াতুল আওলিয়া: ১/৩৪১