📄 আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর নাসিহা
হজরত আলি ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু এক ভাষণে বলেন—
আমি তোমাদেরকে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি এবং বলছি, এক দিন সবাইকে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। দুনিয়া তোমাদের দেহ মাটি করে দেবে। আজ যে মাটির ওপর দিয়ে হাঁটছ, কাল সে মাটিই তোমাদেরকে গ্রাস করে ফেলবে।
দুনিয়া সুখ-দুঃখের মিশ্রভূমি। সুখ-দুঃখ মিলেই মানুষের জীবন। দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট দেখে হা-হুতাশ করো না। পুণ্য করতে পারলে, এই দুঃখ-কষ্ট একদিন অবশ্যই শেষ হয়ে যাবে। তখন জীবনের তৃষ্ণার্ত ভূমিতে সুখের বারিধারা নেমে আসবে। অনুরূপ দুনিয়ার সুখ-শান্তিতে আত্মহারা হয়ে যেয়ো না। কারণ এই সুখও একদিন শেষ হয়ে যাবে। এই জীবনে পুণ্য করতে না পারলে, পরকাল বিষাদে ছেয়ে যাবে। আমার এই ভেবে খুব অবাক লাগে যে, বোকা মানুষগুলো দিনরাত দুনিয়ার পেছনে ছুটে বেড়ায়; আর দুনিয়া তাদেরকে ক্রমশ মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়。
টিকাঃ
[১৮২] ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ৩/২২৮। সনদ: যয়িফ।
📄 হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহুর জুমার খুতবা
আবদুর রহমান সালামি রহিমাহুল্লাহু বলেন, আমরা একবার সফরে বের হই। সেই সফরে মাদায়েনের কাছাকাছি এসে যাত্রাবিরতি করি। তখন আমার পিতা আমার হাত ধরে বলেন, চলো, আমরা জুমার সালাত আদায় করে আসি। আমি আমার পিতার সাথে সালাত আদায় করতে পার্শ্ববর্তী একটি মসজিদে যাই। মসজিদে গিয়ে দেখি, হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু জুমার খুতবা দিচ্ছেন। খুতবায় তিনি বলছেন—
'সাবধান! কিয়ামত অতি সন্নিকটে। অচিরেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন আপনাদের আমলের হিসাব গ্রহণ করা হবে। অতএব, দুনিয়ার সম্পদ জমিয়ে কোনো লাভ নেই।
পরবর্তী জুমায় লক্ষ করি, মুসল্লিরা সকাল সকাল মসজিদে গমন করছেন। তাদের ব্যস্তসমস্ত অবস্থা দেখে আমি আব্বাজানকে জিজ্ঞেস করি, 'লোকেরা কি এখনই মসজিদে যাচ্ছে? তিনি বলেন, হ্যাঁ। এরপর তাদের পিছু পিছু আমরাও মসজিদে যাই। তিনি সেদিনও পূর্বের বিষয় নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেন。
টিকাঃ
[১৮৩] হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/২৮১।
📄 শেষ বেলার কথাগুলি
আবদুল্লাহ আল ফাদল রহিমাহুল্লাহু বলেন, হজরত উমর ইবনু আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহু তাঁর জীবনের শেষ ভাষণে বলেন-
'হামদ ও সালাতের পর। প্রিয় ভাইয়েরা আমার, আপনাদের হাতে এখন যে-সম্পদ আছে, তা মূলত আপনাদের পূর্ববর্তীদের রেখে যাওয়া সম্পদ। আপনারও একদিন তাদের মতো আপনাদের হাতে থাকা এই সম্পদ রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় নেবেন। আপনারাই তো আপনাদের স্বজনদের শেষ গোসল দিয়ে জীবনের জন্য বিদায় দিয়েছেন। কবরের সাড়ে তিন হাত মাটি খনন করে সেখানে দাফন করে রেখে এসেছেন। সেখানে না আছে বিছানা, না আছে সাথি, না আছে বাতি। দুনিয়ায় তাদের অনেক সম্পদ ছিল। কিছুই তো তাদের জন্য কবরে রেখে আসেননি। নিজেরা গিয়ে তাদেরকে সঙ্গ দেননি। তারা সেখানে একা পড়ে আছে। পরিবারপরিজন, বন্ধুবান্ধব সবাই তাদেরকে ফেলে চলে এসেছে। এখন কবরই তাদের শেষ ঠিকানা। মাটিই তাদের পরম বন্ধু।
আপনারা তো বরং তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এসেছেন। আপনার চলে আসার পরেই ফেরেশতারা তাদেরকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করেছে। তাদের হিসাব-নিকাশ নেওয়া শুরু করেছে। হিসাব দিতে গিয়ে তারা দেখেছে, দুনিয়ায় যে যেটুকু নেক আমল করেছে, সেটুকুই তাদের কাজে এসেছে। আর দুনিয়ায় যা কিছু সঞ্চয় করে গেছে, তার কিছুই তাদের কাজে আসেনি।
মহান রবের শপথ, এ কথাগুলোর প্রথম সম্বোধন পাত্র আমি নিজে। এরপর আপনারা। কারণ একথাগুলোর সবচেয়ে বড় হকদার আমি।’
বর্ণনাকারী বলেন, তিনি একথাগুলো বলার সময় অঝোরে কাঁদছিলেন। বাঁধভাঙা অশ্রু গাল ও দাড়ি বেড়ে গড়িয়ে পড়ছিল। তিনি রুমাল দিয়ে কিছুক্ষণ অশ্রু মোছার চেষ্টা করেন। এরপর মিম্বর থেকে নেমে বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করেন。
টিকাঃ
[১৮৪] হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৫/২৬৬।
📄 হাসানের খুতবা
মুসলিম আল আজালি রহিমাহুল্লাহু বলেন-
হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার হৃদয়ছোঁয়া একটি খুতবা দেন। খুতবায় তিনি বলেন-হামদ, সালাত ও শোকরের পর সমাচার এই যে, তোমরা মনে রেখো, প্রতিটি প্রাণীই একদিন মৃত্যুবরণ করবে। তোমাদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটবে না। মৃত্যুর পর তোমাদেরকে আবার জীবিত করা হবে। সেদিন তোমাদের সামনে তোমাদের আমলনামা পেশ করা হবে এবং সে অনুযায়ী তোমাদের শাস্তি ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হবে।
সাবধান, দুনিয়া যেন তোমাদেরকে ধোঁকায় না ফেলে। দুনিয়ার রূপ-লাবণ্য ও চাকচিক্য যেন তোমাদেরকে গ্রাস করতে না পারে। কারণ, দুনিয়া দেখতে যেমনই হোক, বাস্তবে সে একটি পরীক্ষাগার। এখানে মানুষের ইমান ও কুফর পরীক্ষা করা হয়। তাদের ভালোমন্দ যাচাই করা হয়। তা ছাড়া, দুনিয়ার ধ্বংস অনিবার্য, প্রতারণা সুবিদিত, স্থায়িত্ব ঠুনকো এবং চরিত্র ঢোলের মতো—আজ এর তালে বাজে তো; কাল ওর তালে। এভাবে সেসব শ্রেণি ও পেশার মানুষকে ধোঁকা দেয়। ফলে খুব কম মানুষই তার অনিষ্ট থেকে বাঁচতে পারে। কিছু লোক তো সব সময় দুনিয়ার আমোদ-ফুর্তিতে মেতে থাকে। এরাই সবচেয়ে বেশি বিপদের শিকার হয়। দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে নিমজ্জিত থাকা খুবই খারাপ কাজ। সুখ-দুঃখ দুনিয়ার এপিঠ-ওপিঠ। দুনিয়া দুনিয়াদারদের জন্য সব সময় তির উঁচু করে রাখে। তার আকস্মিক নিক্ষেপিত তির ভক্তদের মৃত্যু ডেকে আনে। প্রতিটি মানুষই নির্ধারিত সময়ে মৃত্যুবরণ করবে। কেউই এখানে জনম জনম ধরে থাকতে পারবে না।
প্রিয় বন্ধুগণ, এখন তোমরা যে-পৃথিবীতে বসবাস করছ, তোমাদের পূর্বে এখানে এমন জাতি বসবাস করত, যারা শক্তি, অর্থ ও জনবলে তোমাদের চেয়ে অনেক প্রবল ও সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু দুনিয়া তাদেরকে গ্রাস করে নিয়েছে। তাদের এখন দৃশ্যমান কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনকি তাদের অনেকের নামও আজ ইতিহাসের স্মরণ নেই। তারা জীবনের পথ অতিক্রম করে এখন কবরে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে। তাদের কবর তাদের স্বজনদের থেকে বেশি দূরে না। খুব কাছেই। দেয়ালের এপাশ-ওপাশ মাত্র। এরপরও তাদের মাঝে কথাবার্তা নেই। যোগাযোগ বা সাক্ষাতের কোনো উপায় নেই। মৃত্যুর ফেরেশতা সেই সুযোগ কেড়ে নিয়েছে। কবের স্যাঁতস্যাঁতে মাটি ও পোকামাকড় তাদের দেহ খেয়ে ফেলেছে। হাড্ডিগুলো গলে শেষ হয়ে গেছে। দুনিয়ার সাথে সুগভীর সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তারা আর কোনোদিন দুনিয়ার বুকে ফিরতে পারবে না। তাদের জীবনের অন্তিম সমাপ্তি ঘটেছে।
মনে রেখো, তোমাদের পূর্ববর্তীদের যে অবস্থা হয়েছিল, তোমোদেরও ঠিক সে অবস্থাই হবে। তোমাদের জীবনেরও ঊষা গড়িয়ে সাঁঝ নেমে আসবে। রুহ নামক সূর্য ডুব দেবে পড়ন্ত বিকেলে। তোমাকে একাই পাড়ি দিতে হবে রহস্য ঘেরা মৃত্যুর সমুদ্র। একাকী থাকতে হবে নির্জন কবরে। কেউ থাকবে না তোমার সাথে। দেহ পচে-গলে মাটির সাথে মিশে যাবে। এটাই হবে তোমার শেষ ঠিকানা। এক সময় কবরে থাকার দিনও ফুরিয়ে যাবে। ফের কবর থেকে উঠতে হবে। মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা কথাগুলো প্রকাশ পেয়ে যাবে। আল্লাহর সামনে নতশিরে উপস্থিত হতে হবে। ভালো কাজের পুরস্কার ও মন্দকাজের শাস্তি নির্ধারণ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا.
'আমলনামা সামনে রাখা হবে। আমলনামায় যা আছে; তার কারণে আপনি তাদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখবেন। তারা বলবে, হায় আফসোস! এ কেমন আমলনামা। ছোট-বড় কোনো কিছুই তো বাদ দেয়নি সবই এতে রয়েছে। তারা তাদের কৃতকর্ম সামনে উপস্থিত পাবে। আপনার পালনকর্তা কারও প্রতি (বিন্দু মাত্রও) জুলুম করবেন না। [সুরা কাহাফ: ৪৯]
আল্লাহর ভয়ে বুক দুরুদুরু করে কাঁপবে। অবশেষে হয়তো জান্নাতে; নয়তো জাহান্নামে যেতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জান্নাতি বানিয়ে দিক। আমিন。
টিকাঃ
[১৮৫] উলুমুদ্দিন: ৩/২২৭।