📄 অচিরে সফর করতে হবে
সালিহ ইবনু মালেক রহিমাহুল্লাহু বলেন, উম্মে ইবরাহিম একবার ইবরাহিমের কাছে একটি পত্র লিখে তাকে বাড়ি আসতে বলেন। উত্তরে ইবরাহিম লিখেন—
আপনি আমার সাথে যে-স্থানে সাক্ষাৎ করতে চাইছেন, তা আসল ঠিকানা নয়। দুনিয়া একেবারেই ক্ষণস্থায়ী। আখিরাতের মুসাফিরের জন্য সামান্য সময়ের সরাইখানা মাত্র। এখানে পিতা-মাতার স্নেহ-ভালোবাসা মাত্র কয়েকদিনের। তাদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই এই স্নেহ-ভালোবাসার মৃত্যু ঘটবে। এ বিষয়ে যদি আপনার সামান্য সংশয়ও থাকে, তাহলে ভেবে দেখুন, তারা আজ কোথায়—যারা একসময় দুনিয়ার বুকে প্রচণ্ড প্রতাপের সাথে রাজত্ব করেছে? তাদের কেউ আজ বেঁচে নেই। সবাই পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। আমাদের অবস্থাও ঠিক তাই হবে। আমরাও সম্মান-সম্পদ এবং মায়া- মহব্বত ছেয়ে ওপারে চলে যাব। দুনিয়ায় যেটুকু পুঁজি অর্জন করতে পারব, আখিরাতে সেটুকুই কেবল আমাদের বলে দাবি করতে পারব। আর আখিরাতের এই সফরে খুব শীঘ্রই বেরিয়ে পড়তে হবে। ওয়াসসালাম。
একবার হাসান ইবনু আবিল হাসান রহিমাহুল্লাহু উমর ইবনু আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহুর কাছে একটি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রে লিখা ছিল—
'একবার হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহু খলিফাতুল মুসলিমিন উমর ইবনুল আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহুর কাছে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। চিঠিতে যাতে লিখা ছিল—
'হামদ ও সালাতের পর, সম্মানিত খলিফা! মনে রাখবেন, দুনিয়া স্থায়ী বসবাসের জায়গা নয়। সাময়িক বাসস্থান মাত্র। এখানে কেউ চিরদিন থাকতে পারে না। এখানে সবাই আখিরাতের সওদা করতে আসে। আদম আলাইহিস সালামকে এখানে শাস্তিস্বরূপ পাঠানো হয়েছিল। কাজেই আপনি সব সময় দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। আর মনে রাখবেন, আপনি দুনিয়াকে যতটুকু ত্যাগ করতে পারবেন, ততটুকুই আপনার পুঁজি। আর যতটুকু গ্রহণ করবেন, ততটুকুই আপনার ক্ষতি। দুনিয়ায় যারা ধনী, তারাই মূলত অভাবী। আর যারা অভাবী, তারাই মূলত ধনী。
দুনিয়া প্রতি মুহূর্তে তার প্রার্থীদেরকে হত্যা করে। এই নীরব হত্যা কেউ বুঝে; আবার কেউ বুঝে না। যে দুনিয়াকে সম্মান করে, দুনিয়া তাকে অপদস্থ করে। আর যে দুনিয়া সঞ্চয় করে, দুনিয়া তাকে দারিদ্র্যের চরম সীমায় নিক্ষেপ করে।
দুনিয়া হলো, নীরব ঘাতক—বিষের পেয়ালায় দুধ। যারাই এতে ঠোঁট ছোঁয়ায়, তারাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে。
সুতরাং মহামান্য খলিফা, আপনি দুনিয়ায় ওই অসুস্থ ব্যক্তির ন্যায় বসবাস করুন, যে তার ক্ষতস্থানে ওষুধের প্রলেপ দিয়েছে। দীর্ঘ রোগ-ভোগের ভয়ে আহার-বিহারে বেছে চলছে এবং সীমাহীন কষ্ট থেকে মুক্তির আশায় ওষুধের সাময়িক তিক্ততা বরদাশত করছে।
মনে রাখবেন, দুনিয়া নিষ্ঠুর। প্রতারক। প্রবঞ্চক। সে সৌন্দর্যের জাল বিছিয়ে মানুষকে ঘায়েল করে। বড় বড় আশা দেখিয়ে বশে আনে। প্রণয়-প্রার্থীদের সামনে গোপন সৌন্দর্য তুলে ধরে তাদেরকে বিভ্রান্ত করে। দুশ্চরিত্রা নববধূর ন্যায় ঘুরে বেড়ায়। বভুক্ষ চোখগুলো তাকে অবলোকন করে। দূষিত মনগুলো তার জন্য লালায়িত থাকে। ইন্দ্রিয় থেকে প্রতিনিয়ত লালসা ঝরতে থাকে। এরপর যখন তাদের মিলন হয়, তখন একান্ত মুহূর্তে সে তাদের সবাইকে গলা টিপে হত্যা করে।
দুনিয়া সব সময়ই তার নাগরদের সঙ্গে এমন আচরণ করে আসছে। কিন্তু পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের পরিণতি দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে না। আগের জনকে দুনিয়ার গর্ভে বিলীন হতে দেখে পরের জন সতর্ক হয় না। একারণে অনেক খোদাপ্রেমিকও দুনিয়ার মায়ার জালে আটকে পড়ে। দুনিয়ার ঈষৎ ছোঁয়া পেয়ে প্রতারিত হয়। স্বেচ্ছাচারিতায় মেতে ওঠে। পরকাল ও পরিণতির কথা বেমালুম ভুলে যায়। তার মন-মস্তিষ্কজুড়ে কেবলই দুনিয়া বিরাজ করে। সে কর্তব্য কর্ম ভুলে যায়। তখন দুনিয়াও তাকে ত্যাগ করে। সে পদস্খলনের শিকার হয়। হতাশা, অনুতাপ ও অনুশোচনা তাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরে। এই অনুশোচনা একসময় তার মনস্তাপে পরিণত হয়। সে তখন সবকিছুতেই দিশেহারা বোধ করে। লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। ক্লান্তি ও অবসাদ তার নিত্য সঙ্গী হয়। ফলে সে একসময় নিঃস্ব ও নিঃসম্বল হয়ে পড়ে। দিক-ভ্রান্তের ন্যায় এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়。
সুতরাং আমিরুল মুমিনিন, দুনিয়ার ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক থাকুন। দুনিয়ায় যে-অবস্থা ও অবস্থানে আছেন, তাতেই তুষ্ট থাকুন। দুনিয়া গ্রহণ করলে কোন পরিণতির দিকে ধাবিত হবেন, সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখুন। কারণ দুনিয়ার মোহগ্রস্ত ব্যক্তি যখনই নিজেকে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ মনে করে, তখনই দুনিয়া তার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। একারণে দেখা যায়, দুনিয়ায় যে সুখে থাকে, সে প্রতারিত হয়। যে অব্যাহত কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বস্তুত দুনিয়ার সচ্ছলতাকে বিপদের সুতোয় গেঁথে দেওয়া হয়েছে। সৃষ্টিকে ধ্বংসের উপলক্ষ্য হিসেবে স্থির করা হয়েছে। কাজেই দুনিয়ায় সুখের অব্যবহিত পরেই দুঃখ আসে। সুখ-দুঃখের গভীরে হারিয়ে যায়। আর ফিরে আসে না। ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তাও জানা যায় না। ফলে সুনির্দিষ্ট কোনো বস্তুর জন্য অপেক্ষাও করা যায় না। একারণেই জ্ঞানীরা বলেন, দুনিয়ার স্বপ্ন মিথ্যা। আশা-আকাঙ্ক্ষা অমূলক。
প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এই দুনিয়া পেশ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি গ্রহণ করেননি। অথচ তিনি দুনিয়া গ্রহণ করলেও তাঁর সম্মান হ্রাস পেত না। আখিরাত নষ্ট হতো না। তবু তিনি দুনিয়াকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন। কারণ, তিনি জানতেন, আল্লাহ দুনিয়াকে ঘৃণা করেন। আর আল্লাহ যা ঘৃণা করেন, তাকে সেটা দেওয়া হলেই তিনি গ্রহণ করতে পারেন না।
বস্তুত আল্লাহ তাআলা দুনিয়াকে খুবই হীন করে সৃষ্টি করেছেন। ফলে নবি কিংবা তাঁর কোনো অনুসারীর পক্ষে দুনিয়াকে সম্মান করা সঙ্গত নয়। ভালোবেসে সম্মানের উচ্চাসনে আসীন বিজ্ঞচিত নয়。
মহান প্রভু পরীক্ষাস্বরূপ তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে দুনিয়ার ধনসম্পদ থেকে দূরে রাখেন। অভাবঅনটন ও দুঃখদারিদ্র্য দিয়ে তাদের ইমান পরখ করেন। এরপর তাদের পুরস্কারের ব্যবস্থা করেন। অপর দিকে তিনি অভাজনদেরকে দুনিয়ার প্রাচুর্য ও ভোগ-সম্ভার দান করেন। তাদেরকে আমৃত্যু দুনিয়ার মোহে ফেলে রাখেন। তারা তখন ভাবে যে, দুনিয়ার মাধ্যমে তাদেরকে সম্মানিত করা হয়েছে। সে বিলকুল ভুলে যায় যে, দুনিয়ার অর্থসম্পদ প্রকৃত সম্মানের মানদণ্ড নয়। অন্যথায় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া ত্যাগ করে সারাটা জীবন অভাবঅনটনে থাকতেন। ক্ষুধার যন্ত্রণায় পেটে পাথর বাঁধতেন না。
হাদিসে কুদসিতে এসেছে মহান রব একবার হজরত মুসা আলাইহিস সালামকে বলেছিলেন- إِذَا رَأَيْتَ الْغِنَى مُقْبِلًا فَقُلْ: ذَنْبٌ عُجِّلَتْ عُقُوبَتُهُ، وَإِذَا رَأَيْتَ الْفَقْرَ مُقْبِلًا فَقُلْ: مَرْحَبًا بِشِعَارِ الصَّالِحِينَ .
'আপনি সচ্ছলতার মুখ দেখলে মনে করবেন, আপনার কোনো পাপের নগদ শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। আর দারিদ্র্যে নিপতিত হলে ভাববেন, আপনি সৎ বান্দাদের কিছুটা গুণ ধারণ করতে পেরেছেন। সুতরাং হে দারিদ্র্য, তোমায় স্বাগতম!'
আমিরুল মুমিনিন! আপনি চাইলে ঈসা আলাইহিস সালাম-এর অনুসরণ করতে পারেন। তিনি বলতেন, পেটের ক্ষুধাই আমার খাদ্য। ভয় আমার পরিচয়-প্রতীক। শরীরের লোম আমার পোশাক। শীতকালের সোনালি রোদ আমার গরম কাপড়। চাঁদ আমার রাতের প্রদীপ। পা দুটো আমার যানবাহন। জমিনের তৃণলতা আমার ফলমূল। আমার কাছে কখনোই কোনো সম্পদ সঞ্চিত থাকে না। তবু এই পৃথিবীতে আমার চেয়ে ধনী কেউ নেই। কারণ, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও প্রতি আমার বিন্দুমাত্র মুখাপেক্ষিতা নেই。
টিকাঃ
[১৭৮] ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ৩/২১৭।
সালিহ ইবনু মালেক রহিমাহুল্লাহু বলেন, উম্মে ইবরাহিম একবার ইবরাহিমের কাছে একটি পত্র লিখে তাকে বাড়ি আসতে বলেন। উত্তরে ইবরাহিম লিখেন—
আপনি আমার সাথে যে-স্থানে সাক্ষাৎ করতে চাইছেন, তা আসল ঠিকানা নয়। দুনিয়া একেবারেই ক্ষণস্থায়ী। আখিরাতের মুসাফিরের জন্য সামান্য সময়ের সরাইখানা মাত্র। এখানে পিতা-মাতার স্নেহ-ভালোবাসা মাত্র কয়েকদিনের। তাদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই এই স্নেহ-ভালোবাসার মৃত্যু ঘটবে। এ বিষয়ে যদি আপনার সামান্য সংশয়ও থাকে, তাহলে ভেবে দেখুন, তারা আজ কোথায়—যারা একসময় দুনিয়ার বুকে প্রচণ্ড প্রতাপের সাথে রাজত্ব করেছে? তাদের কেউ আজ বেঁচে নেই। সবাই পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। আমাদের অবস্থাও ঠিক তাই হবে। আমরাও সম্মান-সম্পদ এবং মায়া- মহব্বত ছেয়ে ওপারে চলে যাব। দুনিয়ায় যেটুকু পুঁজি অর্জন করতে পারব, আখিরাতে সেটুকুই কেবল আমাদের বলে দাবি করতে পারব। আর আখিরাতের এই সফরে খুব শীঘ্রই বেরিয়ে পড়তে হবে। ওয়াসসালাম。
একবার হাসান ইবনু আবিল হাসান রহিমাহুল্লাহু উমর ইবনু আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহুর কাছে একটি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রে লিখা ছিল—
'একবার হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহু খলিফাতুল মুসলিমিন উমর ইবনুল আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহুর কাছে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। চিঠিতে যাতে লিখা ছিল—
'হামদ ও সালাতের পর, সম্মানিত খলিফা! মনে রাখবেন, দুনিয়া স্থায়ী বসবাসের জায়গা নয়। সাময়িক বাসস্থান মাত্র। এখানে কেউ চিরদিন থাকতে পারে না। এখানে সবাই আখিরাতের সওদা করতে আসে। আদম আলাইহিস সালামকে এখানে শাস্তিস্বরূপ পাঠানো হয়েছিল। কাজেই আপনি সব সময় দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। আর মনে রাখবেন, আপনি দুনিয়াকে যতটুকু ত্যাগ করতে পারবেন, ততটুকুই আপনার পুঁজি। আর যতটুকু গ্রহণ করবেন, ততটুকুই আপনার ক্ষতি। দুনিয়ায় যারা ধনী, তারাই মূলত অভাবী। আর যারা অভাবী, তারাই মূলত ধনী。
দুনিয়া প্রতি মুহূর্তে তার প্রার্থীদেরকে হত্যা করে। এই নীরব হত্যা কেউ বুঝে; আবার কেউ বুঝে না। যে দুনিয়াকে সম্মান করে, দুনিয়া তাকে অপদস্থ করে। আর যে দুনিয়া সঞ্চয় করে, দুনিয়া তাকে দারিদ্র্যের চরম সীমায় নিক্ষেপ করে।
দুনিয়া হলো, নীরব ঘাতক—বিষের পেয়ালায় দুধ। যারাই এতে ঠোঁট ছোঁয়ায়, তারাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে。
সুতরাং মহামান্য খলিফা, আপনি দুনিয়ায় ওই অসুস্থ ব্যক্তির ন্যায় বসবাস করুন, যে তার ক্ষতস্থানে ওষুধের প্রলেপ দিয়েছে। দীর্ঘ রোগ-ভোগের ভয়ে আহার-বিহারে বেছে চলছে এবং সীমাহীন কষ্ট থেকে মুক্তির আশায় ওষুধের সাময়িক তিক্ততা বরদাশত করছে।
মনে রাখবেন, দুনিয়া নিষ্ঠুর। প্রতারক। প্রবঞ্চক। সে সৌন্দর্যের জাল বিছিয়ে মানুষকে ঘায়েল করে। বড় বড় আশা দেখিয়ে বশে আনে। প্রণয়-প্রার্থীদের সামনে গোপন সৌন্দর্য তুলে ধরে তাদেরকে বিভ্রান্ত করে। দুশ্চরিত্রা নববধূর ন্যায় ঘুরে বেড়ায়। বভুক্ষ চোখগুলো তাকে অবলোকন করে। দূষিত মনগুলো তার জন্য লালায়িত থাকে। ইন্দ্রিয় থেকে প্রতিনিয়ত লালসা ঝরতে থাকে। এরপর যখন তাদের মিলন হয়, তখন একান্ত মুহূর্তে সে তাদের সবাইকে গলা টিপে হত্যা করে।
দুনিয়া সব সময়ই তার নাগরদের সঙ্গে এমন আচরণ করে আসছে। কিন্তু পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের পরিণতি দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে না। আগের জনকে দুনিয়ার গর্ভে বিলীন হতে দেখে পরের জন সতর্ক হয় না। একারণে অনেক খোদাপ্রেমিকও দুনিয়ার মায়ার জালে আটকে পড়ে। দুনিয়ার ঈষৎ ছোঁয়া পেয়ে প্রতারিত হয়। স্বেচ্ছাচারিতায় মেতে ওঠে। পরকাল ও পরিণতির কথা বেমালুম ভুলে যায়। তার মন-মস্তিষ্কজুড়ে কেবলই দুনিয়া বিরাজ করে। সে কর্তব্য কর্ম ভুলে যায়। তখন দুনিয়াও তাকে ত্যাগ করে। সে পদস্খলনের শিকার হয়। হতাশা, অনুতাপ ও অনুশোচনা তাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরে। এই অনুশোচনা একসময় তার মনস্তাপে পরিণত হয়। সে তখন সবকিছুতেই দিশেহারা বোধ করে। লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। ক্লান্তি ও অবসাদ তার নিত্য সঙ্গী হয়। ফলে সে একসময় নিঃস্ব ও নিঃসম্বল হয়ে পড়ে। দিক-ভ্রান্তের ন্যায় এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়。
সুতরাং আমিরুল মুমিনিন, দুনিয়ার ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক থাকুন। দুনিয়ায় যে-অবস্থা ও অবস্থানে আছেন, তাতেই তুষ্ট থাকুন। দুনিয়া গ্রহণ করলে কোন পরিণতির দিকে ধাবিত হবেন, সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখুন। কারণ দুনিয়ার মোহগ্রস্ত ব্যক্তি যখনই নিজেকে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ মনে করে, তখনই দুনিয়া তার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। একারণে দেখা যায়, দুনিয়ায় যে সুখে থাকে, সে প্রতারিত হয়। যে অব্যাহত কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বস্তুত দুনিয়ার সচ্ছলতাকে বিপদের সুতোয় গেঁথে দেওয়া হয়েছে। সৃষ্টিকে ধ্বংসের উপলক্ষ্য হিসেবে স্থির করা হয়েছে। কাজেই দুনিয়ায় সুখের অব্যবহিত পরেই দুঃখ আসে। সুখ-দুঃখের গভীরে হারিয়ে যায়। আর ফিরে আসে না। ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তাও জানা যায় না। ফলে সুনির্দিষ্ট কোনো বস্তুর জন্য অপেক্ষাও করা যায় না। একারণেই জ্ঞানীরা বলেন, দুনিয়ার স্বপ্ন মিথ্যা। আশা-আকাঙ্ক্ষা অমূলক。
প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এই দুনিয়া পেশ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি গ্রহণ করেননি। অথচ তিনি দুনিয়া গ্রহণ করলেও তাঁর সম্মান হ্রাস পেত না। আখিরাত নষ্ট হতো না। তবু তিনি দুনিয়াকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন। কারণ, তিনি জানতেন, আল্লাহ দুনিয়াকে ঘৃণা করেন। আর আল্লাহ যা ঘৃণা করেন, তাকে সেটা দেওয়া হলেই তিনি গ্রহণ করতে পারেন না।
বস্তুত আল্লাহ তাআলা দুনিয়াকে খুবই হীন করে সৃষ্টি করেছেন। ফলে নবি কিংবা তাঁর কোনো অনুসারীর পক্ষে দুনিয়াকে সম্মান করা সঙ্গত নয়। ভালোবেসে সম্মানের উচ্চাসনে আসীন বিজ্ঞচিত নয়。
মহান প্রভু পরীক্ষাস্বরূপ তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে দুনিয়ার ধনসম্পদ থেকে দূরে রাখেন। অভাবঅনটন ও দুঃখদারিদ্র্য দিয়ে তাদের ইমান পরখ করেন। এরপর তাদের পুরস্কারের ব্যবস্থা করেন। অপর দিকে তিনি অভাজনদেরকে দুনিয়ার প্রাচুর্য ও ভোগ-সম্ভার দান করেন। তাদেরকে আমৃত্যু দুনিয়ার মোহে ফেলে রাখেন। তারা তখন ভাবে যে, দুনিয়ার মাধ্যমে তাদেরকে সম্মানিত করা হয়েছে। সে বিলকুল ভুলে যায় যে, দুনিয়ার অর্থসম্পদ প্রকৃত সম্মানের মানদণ্ড নয়। অন্যথায় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া ত্যাগ করে সারাটা জীবন অভাবঅনটনে থাকতেন। ক্ষুধার যন্ত্রণায় পেটে পাথর বাঁধতেন না。
হাদিসে কুদসিতে এসেছে মহান রব একবার হজরত মুসা আলাইহিস সালামকে বলেছিলেন- إِذَا رَأَيْتَ الْغِنَى مُقْبِلًا فَقُلْ: ذَنْبٌ عُجِّلَتْ عُقُوبَتُهُ، وَإِذَا رَأَيْتَ الْفَقْرَ مُقْبِلًا فَقُلْ: مَرْحَبًا بِشِعَارِ الصَّالِحِينَ .
'আপনি সচ্ছলতার মুখ দেখলে মনে করবেন, আপনার কোনো পাপের নগদ শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। আর দারিদ্র্যে নিপতিত হলে ভাববেন, আপনি সৎ বান্দাদের কিছুটা গুণ ধারণ করতে পেরেছেন। সুতরাং হে দারিদ্র্য, তোমায় স্বাগতম!'
আমিরুল মুমিনিন! আপনি চাইলে ঈসা আলাইহিস সালাম-এর অনুসরণ করতে পারেন। তিনি বলতেন, পেটের ক্ষুধাই আমার খাদ্য। ভয় আমার পরিচয়-প্রতীক। শরীরের লোম আমার পোশাক। শীতকালের সোনালি রোদ আমার গরম কাপড়। চাঁদ আমার রাতের প্রদীপ। পা দুটো আমার যানবাহন। জমিনের তৃণলতা আমার ফলমূল। আমার কাছে কখনোই কোনো সম্পদ সঞ্চিত থাকে না। তবু এই পৃথিবীতে আমার চেয়ে ধনী কেউ নেই। কারণ, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও প্রতি আমার বিন্দুমাত্র মুখাপেক্ষিতা নেই。
টিকাঃ
[১৭৮] ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ৩/২১৭।
📄 যেভাবে যুহদ অবলম্বন করবেন
একবার উমর ইবনু আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহু হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহুর কাছে দুনিয়ার ব্যাপারে উপদেশ চেয়ে পত্র লিখলে উত্তরে তিনি লিখে পাঠান—
'হামদ ও সালাতের পর নিবেদন এই যে, আত্মোন্নয়ন ও আত্মশুদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর ও ফলপ্রসূ উপায় হলো, দুনিয়াবিমুখতা। তবে এই দুনিয়াবিমুখতার গুণ অর্জিত হয়, ইয়াকিন দ্বারা। ইয়াকিন অর্জিত হয় অব্যাহত চিন্তা ও শিক্ষাগ্রহণের দ্বারা। আর এই তিনটি গুণ অর্জন করার পর আপনি যখন দুনিয়া নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবেন, তখন খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে, দুনিয়া আপনার ব্যস্ততার ক্ষেত্র নয়। দুনিয়ার জন্য আপনি নিজেকে বিসর্জন দিতে পারেন না। কারণ, দুনিয়া একেবারেই তুচ্ছ, স্থিতিহীন এবং ধোঁকা ও দুর্যোগপূর্ণ。
টিকাঃ
[১৭৯] আয যুহদুল কাবির: ৬৮, ১৫০
একবার উমর ইবনু আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহু হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহুর কাছে দুনিয়ার ব্যাপারে উপদেশ চেয়ে পত্র লিখলে উত্তরে তিনি লিখে পাঠান—
'হামদ ও সালাতের পর নিবেদন এই যে, আত্মোন্নয়ন ও আত্মশুদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর ও ফলপ্রসূ উপায় হলো, দুনিয়াবিমুখতা। তবে এই দুনিয়াবিমুখতার গুণ অর্জিত হয়, ইয়াকিন দ্বারা। ইয়াকিন অর্জিত হয় অব্যাহত চিন্তা ও শিক্ষাগ্রহণের দ্বারা। আর এই তিনটি গুণ অর্জন করার পর আপনি যখন দুনিয়া নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবেন, তখন খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে, দুনিয়া আপনার ব্যস্ততার ক্ষেত্র নয়। দুনিয়ার জন্য আপনি নিজেকে বিসর্জন দিতে পারেন না। কারণ, দুনিয়া একেবারেই তুচ্ছ, স্থিতিহীন এবং ধোঁকা ও দুর্যোগপূর্ণ。
টিকাঃ
[১৭৯] আয যুহদুল কাবির: ৬৮, ১৫০
📄 চিরকুটের কথাগুলো
মিসআর ইবনু কিদাম রহিমাহুল্লাহু বলেন, এক দেশে একজন বিজ্ঞ আলিম ও ন্যায়বিচারক কাজি ছিলেন। সাধারণ মানুষ তাকে বাদশাহর চেয়েও বেশি ভালোবাসত ও সম্মান করত। কিন্তু দাম্ভিক বাদশাহ এতে ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে তাকে হত্যা করে ফেলে。
এরপর সভাসদদের ডেকে বলে, সে নিশ্চয় এতদিন কোনো বই-পত্র দেখে বিচার করেছে। তাই তার বিচার সব সময় সুষ্ঠু হয়েছে। তোমরা এই বিচারকের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নাও, সে বিচার-সংক্রান্ত কোনো বই-পত্র রেখে গেছে কি-না!
বাদশাহর নির্দেশ মতে তৎক্ষণাৎ একটি তদন্ত কমিটি বিচারকের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয় এবং তার পরিবারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তার পরিবার জানায়, 'আমাদের কাছে তিনি কোনো কাগজ-পত্র রেখে যাননি। তা ছাড়া আমরা তাকে বিচার-সংক্রান্ত কোনো বই-পত্রও পড়তে দেখিনি। তবে তার বুকপকেটে সব সময় একটুকরো কাগজ থাকত।’
পরিবারের দেওয়া তথ্য নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তাগণ তৎক্ষণাৎ বাদশাহর কাছে ফিরে আসেন এবং মৃতের দেহ তল্লাশি করে একটুকরো কাগজ বের করেন। কাগজে চারটি উপদেশ লিখা ছিল-
এক. আমার খুব অবাক লাগে—যখন দেখি মানুষ মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও দুনিয়া নিয়ে মেতে থাকে。
দুই. যে জানে জাহান্নাম সত্য, তার মুখে কি হাসি মানায়?
তিন. যে দিব্যি চোখে মানুষের জন্ম-মৃত্যু, সুখ-দুঃখ ও লয়-ক্ষয় দেখে, দুনিয়ার মায়ায় জড়ানো কি তার সাজে?
চার. যে জানে, আল্লাহর তাকদির সত্য, দুনিয়ার জন্য অতিরিক্ত কষ্ট-ক্লেশ কি তার জন্য শোভা পায়?
মিসআর ইবনু কিদাম রহিমাহুল্লাহু বলেন, এক দেশে একজন বিজ্ঞ আলিম ও ন্যায়বিচারক কাজি ছিলেন। সাধারণ মানুষ তাকে বাদশাহর চেয়েও বেশি ভালোবাসত ও সম্মান করত। কিন্তু দাম্ভিক বাদশাহ এতে ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে তাকে হত্যা করে ফেলে。
এরপর সভাসদদের ডেকে বলে, সে নিশ্চয় এতদিন কোনো বই-পত্র দেখে বিচার করেছে। তাই তার বিচার সব সময় সুষ্ঠু হয়েছে। তোমরা এই বিচারকের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নাও, সে বিচার-সংক্রান্ত কোনো বই-পত্র রেখে গেছে কি-না!
বাদশাহর নির্দেশ মতে তৎক্ষণাৎ একটি তদন্ত কমিটি বিচারকের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয় এবং তার পরিবারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তার পরিবার জানায়, 'আমাদের কাছে তিনি কোনো কাগজ-পত্র রেখে যাননি। তা ছাড়া আমরা তাকে বিচার-সংক্রান্ত কোনো বই-পত্রও পড়তে দেখিনি। তবে তার বুকপকেটে সব সময় একটুকরো কাগজ থাকত।’
পরিবারের দেওয়া তথ্য নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তাগণ তৎক্ষণাৎ বাদশাহর কাছে ফিরে আসেন এবং মৃতের দেহ তল্লাশি করে একটুকরো কাগজ বের করেন। কাগজে চারটি উপদেশ লিখা ছিল-
এক. আমার খুব অবাক লাগে—যখন দেখি মানুষ মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও দুনিয়া নিয়ে মেতে থাকে。
দুই. যে জানে জাহান্নাম সত্য, তার মুখে কি হাসি মানায়?
তিন. যে দিব্যি চোখে মানুষের জন্ম-মৃত্যু, সুখ-দুঃখ ও লয়-ক্ষয় দেখে, দুনিয়ার মায়ায় জড়ানো কি তার সাজে?
চার. যে জানে, আল্লাহর তাকদির সত্য, দুনিয়ার জন্য অতিরিক্ত কষ্ট-ক্লেশ কি তার জন্য শোভা পায়?
📄 সালাফদের চিঠি
ইসা রহিমাহুল্লাহু বলেন, উমর ইবনু আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহু এক ব্যক্তির উদ্দেশ্যে লিখে পাঠান—
'হামদ ও সালাতের পর সমাচার এই যে, তুমি সব সময় আল্লাহকে ভয় করবে। তোমার ধনসম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করবে। আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণের কাজে নিজেকে ব্যতিব্যস্ত রাখবে। ওপারের সম্বল জোগাড়ের সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। এক কথায়, তুমি নিজেকে মৃতদের অন্তর্ভুক্ত মনে করবে। আর এটাও মনে করবে যে, তোমার জীবন এখানেই শেষ।'
আবুল বাখতারি রহিমাহুল্লাহু বলেন, একবার উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দুনিয়াবিমুখ হওয়ার উপদেশ দিয়ে একটি পত্র লিখেন। সেখানে তিনি বলেন—
শোনো, আজকের আমল আগামীকালের জন্য রেখে দেবে না। আজকের আমল আজ- ই করে নেবে। আর দুনিয়ার প্রতি সব সময় বিমুখ থাকবে। দুনিয়া যেন কখনোই তোমাকে গ্রাস করতে না-পারে—সেদিকে লক্ষ রাখবে। আমি আমার ও তোমার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দুনিয়ার মোহ ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে পানাহ চাইছি。
ইসা রহিমাহুল্লাহু বলেন, উমর ইবনু আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহু এক ব্যক্তির উদ্দেশ্যে লিখে পাঠান—
'হামদ ও সালাতের পর সমাচার এই যে, তুমি সব সময় আল্লাহকে ভয় করবে। তোমার ধনসম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করবে। আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণের কাজে নিজেকে ব্যতিব্যস্ত রাখবে। ওপারের সম্বল জোগাড়ের সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। এক কথায়, তুমি নিজেকে মৃতদের অন্তর্ভুক্ত মনে করবে। আর এটাও মনে করবে যে, তোমার জীবন এখানেই শেষ।'
আবুল বাখতারি রহিমাহুল্লাহু বলেন, একবার উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দুনিয়াবিমুখ হওয়ার উপদেশ দিয়ে একটি পত্র লিখেন। সেখানে তিনি বলেন—
শোনো, আজকের আমল আগামীকালের জন্য রেখে দেবে না। আজকের আমল আজ- ই করে নেবে। আর দুনিয়ার প্রতি সব সময় বিমুখ থাকবে। দুনিয়া যেন কখনোই তোমাকে গ্রাস করতে না-পারে—সেদিকে লক্ষ রাখবে। আমি আমার ও তোমার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দুনিয়ার মোহ ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে পানাহ চাইছি。