📘 সালাফদের চোখে দুনিয়া > 📄 কবিতার সুরে-সুরে এই দুনিয়া

📄 কবিতার সুরে-সুরে এই দুনিয়া


আহমাদ ইবনু মুসা আস সাকাফি রহিমাহুল্লাহু একটি গুচ্ছকবিতায় দুনিয়ার এক উদাসীন বাদশাহর কথা তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বলেন, আমি বাদশাহকে একসময় নারী ও অর্থকড়ি নিয়ে মত্ত থাকতে দেখেছি। এই পৃথিবীতে তার কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। অনেকদিন পরে জানতে পারি, বাদশাহ দুনিয়ার পাঠ চুকিয়ে পরলোক গমন করেছেন। তখন তিনি কবিতা রচনা করে মানুষকে এই পরিণতির ব্যাপারে সতর্ক করেন এবং বলেন, দেখো, একদিন তোমাকেও এই দুনিয়া ছেড়ে যেতে হবে। সুতরাং এখনই আত্মসংশোধনের চিন্তা করো। কবির ভাষায়-
جَهُولٌ لَيْسَ تَنْهَاهُ النَّوَاهِي * وَلَا تَلْقَاهُ إِلَّا وَهُوَ سَاهِي
يُسَرُّ بِيَوْمِهِ لَعِبًا وَلَهْوًا * وَلَا يَدْرِي وَفِي غَدِهِ الدَّوَاهِي
مَرَرْتُ بِقَصْرِهِ فَرَأَيْتُ أَمْرًا * عَجِيبًا فِيهِ مُزْدَجَرُ وَنَاهِي
بَدَا فَوْقَ السَّرِيرِ فَقُلْتُ مَنْ ذَا * فَقَالُوا: ذَلِكَ الْمَلِكُ الْمُبَاهِي
رَأَيْتُ الْبَابَ سُوِّدَ وَالْجَوَارِي * يَنُحْنَ وَهُنَّ يَكْسِرْنَ الْمَلَاهِي
تَبَيَّنْ أَيَّ دَارٍ أَنْتَ فِيهَا * وَلَا تَسْكُنْ إِلَيْهَا وَادْرِ مَا هِيَ
মূর্খরা তো মন্দ বিষয়ে থাকে না আর দূরে,
দেখা হলেই পাবে তাকে অকাজে জড়িয়ে।
হেলা-খেলার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে তার দিবস-কাল,
সে জানে না, তার পেছনে লুকিয়ে আছে দুঃখ-সকাল।
চলার বাঁকে একদিন আমি একটি মহল পেলাম,
আশ্চর্য এক দৃশ্য দেখে আমি অবাক হলাম।
ছিল তারা পাপে মত্ত নিষিদ্ধ সব কাজে,
রবের এক সতর্কবার্তা বাজত সকাল-সাঁঝে।
হঠাৎ একদিন দেখতে পাই খাটিয়ার ওপর লাশ,
কার লাশ জানতে চেয়ে অতিক্রম করলাম পাশ।
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম এই লাশটি কার?
লোকেরা সবাই জবাব দিলো দাম্ভিক ওই বাদশাহর।
মহলের ফটকে আমি অবাক হয়ে দেখি,
কালো কাপড় টানানো জানি না এর কারণ কী।
বাদশাহরই বিয়োগ-ব্যথায় কাঁদছে বাঁদি-সখি,
বিনোদনের সব বস্তু ভাঙছে মনকে বললাম একি!
কোন ঘরকে করবে আপন চিন্তা করে দেখো,
এই দুনিয়া ছাড়তে হবে নীতি মনে রেখো。
إِنَّ الدَّابَّةَ إِذَا لَمْ تُرْكَبْ وَتُمْتَهَنْ تَصَعَّبَتْ وَتَغَيَّرَ خُلُقُهَا، كَذَلِكَ الْقُلُوبُ إِذَا لَمْ تُرَقَّقْ بِذِكْرِ الْمَوْتِ وَيَنْصَبُهَا دَأَبُ الْعِبَادَةِ تَقْسُو وَتَغْلُظ .
'পশুকে বাহন হিসেবে ব্যবহার না করলে পশু অকর্মণ্য ও ঔদ্ধত হয়ে পড়ে; ঠিক তেমনি মৃত্যুর স্মরণের মাধ্যমে হৃদয়কে বিগলিত না করলে, হৃদয় পাষাণ হয়ে যায়; মহান আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্যের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে যায়।'
তিনি আরও বলেন-
إِنَّ الرِّقَّ إِذَا لَمْ يَتَخَرَّقُ أَوْ يَفْحَلْ، فَسَوْفَ يَكُونُ وِعَاءً لِلْعَسَلِ، وَكَذَلِكَ الْقُلُوبُ مَا لَمْ تَخْرِقُهَا الشَّهَوَاتُ، أَوْ يُدَنِّسُهَا الطَّمَعُ، أَوْ يُقَسِّيهَا النَّعِيمُ، فَسَوْفَ تَكُونُ أَوْعِيَةً لِلْحِكْمَةِ .
'ব্যবহৃত মশক যদি চিড়ে কিংবা পুড়িয়ে একেবারে ব্যবহারের অযোগ্য না করে ফেলা হয়, তাহলে সেটা যেমন মধুর পাত্র হতে পারে; ঠিক তেমনি হৃদয়কে লোভ, বিলাসিতা ও প্রবৃত্তির তাড়নায় বিনষ্ট না করে ফেললে হৃদয়ও জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বরপাত্র হয়। [১৩৫]
সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহু বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন-
আখিরাতের ব্যাপারে যদি তোমার আগ্রহ থাকে, তাহলে দুনিয়ার কাঙ্ক্ষিত বিষয় প্রাপ্তি বা সম্পাদনের ক্ষেত্রে তোমার মধ্যে ত্বরাপ্রবণতা থাকবে না।[১৩৪]

টিকাঃ
[১৩৪] সনদ মাকতু। কারণ সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাক্ষাৎলাভ করেননি।
[১৩৫] ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ৩/২৩০।

📘 সালাফদের চোখে দুনিয়া > 📄 কবিতার নিবেদন বুঝে নিয়ো

📄 কবিতার নিবেদন বুঝে নিয়ো


আবু বকর আল আবিদ রহিমাহুল্লাহু দুনিয়ার ব্যাপারে বলেন-
يَا خَاطِبَ الدُّنْيَا عَلَى نَفْسِهَا * إِنَّ لَهَا فِي كُلِّ يَوْمٍ خَلِيلٌ
مَا أَقْتَلَ الدُّنْيَا لِخُطَّابِهَا * تَقْتُلْهُمْ قِدْمًا قَبِيلًا قَبِيل
تَسْتَنْكِحُ الْبَعْلَ وَقَدْ وَطَنَتْ فِي مَوْضِعٍ آخَرَ مِنْهُ بَدِيلٌ
إِنِّي لَمُغْتَرُّ وَإِنَّ الْبِلَى يَعْمَلُ فِي جِسْمِي قَلِيلًا قَلِيلٌ
تَزَوَّدُوا لِلْمَوْتِ دَارًا فَقَدْ * نَادَى مُنَادِيهِ الرَّحِيلَ الرَّحِيلُ
দুনিয়া প্রেমী, বলছি তোমায় ভালোবাসো তুমি যাকে,
প্রতিদিন সে নতুন প্রেমে ব্যস্ত থাকে।
দুনিয়াকে যারা দিছে প্রস্তাব মারছে তাদের গলায় ছুড়ি,
আগে-পরে অনেককে সে হত্যা করেছে, ছিঁড়েছে জীবন-ঘুরি।
এক স্বামীকে করে বিয়ে সকাল কিংবা রাতে,
তার স্থানে অন্য স্বামীকে বিয়ের জন্য ডাকে।
দুনিয়ার শিকার আমিও। পাচ্ছি না কো সুখের সুর,
দুরাবস্থা খাচ্ছে আমায় করছে শুধু দূর দূর!
বন্ধু আমি আপন হয়ে বলছি কাব্যাকারে,
পরকালের পাথেয় জোগাও জগৎ ও সংসারে।
আর কতকাল থাকবে তুমি ধোঁকার মধু-চাকে,
গোপন থেকে একজন তবে বিদায়ের জন্য ডাকে।
আবদুল্লাহ রহিমাহুল্লাহু বলেন, অপর এক কবি আমাকে বলেছেন—
দুনিয়ার চরিত্র এবং তার প্রতি আমাদের ভালোবাসার নিবেদন দেখে আমি অবাক হই।
দুনিয়ার তো হিংসা-বিদ্বেষ শত্রুতা ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার নেই।
হেলায়-খেলায় দুনিয়ার দিনগুলো কেটে যাচ্ছে বেশ। মৃত্যুও ধেয়ে আসছে উন্মত্ত গতিতে— কে জানে কোন দুঃখ-কূপে পড়ি হবে জীবন নিঃশেষ!
আবদুল্লাহ রহিমাহুল্লাহু বলেন, জনৈক দার্শনিক কবির দৃষ্টিতে—
দুনিয়া কেবল মিছে আশা এবং আকাঙ্ক্ষার নাম। তুমি দুনিয়া থেকে বেঁচে থাকো।
দুনিয়ার আশা হলো পশুর চারণভূমি এবং তাঁবুর মতো। তুমি দুনিয়া তাদের জন্য ছেড়ে দাও— যারা পশুর চারণভূমিতে বিচরণ করতে চায়। যারা পশুর মতো বিচরণে খুশি হয়।
যুগের দুর্বিপাক একদিন এই দুনিয়াকে ধ্বংস করে দেবে। পঙ্গু ও অসাড় করে দেবে তার ভক্তদেরকে।

📘 সালাফদের চোখে দুনিয়া > 📄 একজন মহিলার কবিতা

📄 একজন মহিলার কবিতা


আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর রহিমাহুল্লাহু বলেন, আমের ইবনু আবদুল্লাহ রহিমাহুল্লাহু একবার একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন সেখানে একজন বৃদ্ধা মহিলা দেখতে পান। বৃদ্ধার চুলগুলো ছিল এলোমেলো। চেহারায় ছিল চিন্তার ছাপ। সে কবরস্থানের পাশে বসে বারবার একটি কবিতা আবৃত্তি করছিল। জানি অনূদিত ভাষায় তার কবিতার আকুতি প্রকাশ করা যাবে না। তবুও বলছি—
آذَنَتْ زِينَةُ الْحَيَياةِ بِبَيْنِ * وَانْقِضَاءِ مِنْ أَهْلِهَا وَفَنَاءِ
এই দুনিয়ার সাজ-সজ্জা হয়ে যাবে শেষ।
চলে যাবে সকল মানুষ বাঁচবে না কেউ শেষ। [১৩৬]

টিকাঃ
[১৩৬] বাহজাতুল মাজালিস: ৩/১৪৫।

📘 সালাফদের চোখে দুনিয়া > 📄 দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ো না

📄 দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ো না


আবদুল্লাহ রহিমাহুল্লাহু বলেন, আমার পিতা আমাকে দুনিয়ার ব্যাপারে নসিহত করে বলেন-
دَعِ الدُّنْيَا لِنَاكِحِهَا * يَسْتَصْبِحُ مِنْ ذَبَائِحِهَا
وَلَا تَغْرُرْكَ رَائِحَةُ * تُصِيبُكَ مِنْ رَوَائِحِهَا
أَرَى الدُّنْيَا وَإِنْ عُشِقَتْ * تَدُلُّ عَلَى فَضَائِحِهَا
দুনিয়াকে দাও যে ছেড়ে
দুনিয়াবরের লাগি,
এক সকালে করবে জবাই
জীবন হবে পানি।
দুনিয়ারই ঘ্রাণে ধোঁকায় পড়ো না তুমি,
সেই ঘ্রাণই একদিন হবে তোমার বিপদ-ভূমি।
দুনিয়াকে অনেক আগে মেপেছি তবে আমি,
এই দুনিয়া দেয় যে ধোঁকা কেবল ছলনাময়ী।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00