📄 দুর্ভাগ্যের লক্ষণ
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহু বলেন- চারটি জিনিস দুর্ভাগ্যের লক্ষণ। ১. হৃদয়ের কাঠিন্য। [৬৬] ২. অশ্রু সংকট। [৬৭] ৩. পার্থিব জীবনের ব্যাপারে উচ্চাভিলাষ। [৬৮] ৪. দুনিয়ার মোহ ও মহব্বত।[৬৯]
ইবনু আমর রহিমাহুল্লাহু বলেন, হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম বলেছেন-
দুনিয়াটা ধোঁকায় পূর্ণ। সে মানুষকে সব সময় ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। হৃদয়ের প্রশান্তি কেড়ে নেয়।
টিকাঃ
[৬৬] অর্থাৎ, হৃদয় অত্যধিক পাষাণ হওয়ার কারণে সেখানে আল্লাহর ভয় জাগ্রত না-হওয়া।
[৬৭] অর্থাৎ, আল্লাহর প্রেমে ও আকর্ষণে চোখ অশ্রুসিক্ত না-হওয়া।
[৬৮] অর্থাৎ, দুনিয়ার ব্যাপারে এতবেশি আশা পোষণ করা, যা আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণের ক্ষতির কারণ হয়।
[৬৯] কানযুল উম্মাল: ৩/২১৩। এই বর্ণনাটি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর থেকে মারফু হাদিস হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
📄 দুনিয়ামুখী হলে জীবন হয় বিক্ষিপ্ত
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
مَنْ كَانَتْ نِيَّتُهُ طَلَبَ الْآخِرَةِ جَعَلَ اللهُ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ، وَجَمَعَ لَهُ شَمْلَهُ، وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ، وَمَنْ كَانَتْ نِيَّتُهُ طَلَبَ الدُّنْيَا جَعَلَ اللَّهُ الْفَقْرَ بَيْنَ عَيْنَيْهِ، وَشَتَّتَ عَلَيْهِ أَمْرَهُ، وَلَا يَأْتِيهِ مِنْهَا إِلَّا مَا كُتِبَ لَهُ .
'যে ব্যক্তি আখিরাতকে লক্ষ্য বানায়, মহান আল্লাহ তাকে সবকিছুতে স্থিতি দান করেন। হৃদয়ে প্রাণ-প্রাচুর্য ঢেলে দেন। ফলে দুনিয়া তার পদতলে আছড়ে পড়ে। আর যে ব্যক্তি পার্থিব দুনিয়াকে লক্ষ্য বানায়, আল্লাহ তাকে সবকিছুতেই অস্থির চিত্ত করে দেন। তার কপালে দারিদ্রতার তিলক এঁকে দেন। তার তার পরিকল্পনা বিক্ষিপ্ত করে দেন এবং তার জন্য দুনিয়ার যে-টুকু প্রাপ্তি লিখে রেখেছেন, সেটুকুই কেবল তাকে দান করেন।'[৭০]
টিকাঃ
[৭০] যাওয়ায়েদ: ১০/২৪৭। সনদ যয়িফ।
📄 দুটি পত্র ও তার বার্তা
একবার হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহু খলিফাতুল মুসলিমিন উমর ইবনুল আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহুর কাছে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। চিঠিতে যাতে লিখা ছিল-
'হামদ ও সালাতের পর, সম্মানিত খলিফা! মনে রাখবেন, দুনিয়া স্থায়ী বসবাসের জায়গা নয়। সাময়িক বাসস্থান মাত্র। এখানে কেউ চিরদিন থাকতে পারে না। এখানে সবাই আখিরাতের সওদা করতে আসে। আদম আলাইহিস সালামকে এখানে শাস্তিস্বরূপ পাঠানো হয়েছিল। কাজেই আপনি সব সময় দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। আর মনে রাখবেন, আপনি দুনিয়াকে যতটুকু ত্যাগ করতে পারবেন, ততটুকুই আপনার পুঁজি। আর যতটুকু গ্রহণ করবেন, ততটুকুই আপনার ক্ষতি। দুনিয়ায় যারা ধনী, তারাই মূলত অভাবী। আর যারা অভাবী, তারাই মূলত ধনী।
দুনিয়া প্রতি মুহূর্তে তার প্রার্থীদেরকে হত্যা করে। এই নীরব হত্যা কেউ বুঝে; আবার কেউ বুঝে না। যে দুনিয়াকে সম্মান করে, দুনিয়া তাকে অপদস্থ করে। আর যে দুনিয়া সঞ্চয় করে, দুনিয়া তাকে দারিদ্র্যের চরম সীমায় নিক্ষেপ করে।
দুনিয়া হলো, নীরব ঘাতক—বিষের পেয়ালায় দুধ। যারাই এতে ঠোঁট ছোঁয়ায়, তারাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
সুতরাং মহামান্য খলিফা, আপনি দুনিয়ায় ওই অসুস্থ ব্যক্তির ন্যায় বসবাস করুন, যে তার ক্ষতস্থানে ওষুধের প্রলেপ দিয়েছে। দীর্ঘ রোগ-ভোগের ভয়ে আহার-বিহারে বেছে চলছে এবং সীমাহীন কষ্ট থেকে মুক্তির আশায় ওষুধের সাময়িক তিক্ততা বরদাশত করছে।
মনে রাখবেন, দুনিয়া নিষ্ঠুর। প্রতারক। প্রবঞ্চক। সে সৌন্দর্যের জাল বিছিয়ে মানুষকে ঘায়েল করে। বড় বড় আশা দেখিয়ে বশে আনে। প্রণয়-প্রার্থীদের সামনে গোপন সৌন্দর্য তুলে ধরে তাদেরকে বিভ্রান্ত করে। দুশ্চরিত্রা নববধূর ন্যায় ঘুরে বেড়ায়। অপলোক চোখগুলো তাকে অবলোকন করে। দূষিত মনগুলো তার জন্য লালায়িত থাকে। ইন্দ্রিয় থেকে প্রতিনিয়ত লালসা ঝরতে থাকে। এরপর যখন তাদের মিলন হয়, তখন একান্ত মুহূর্তে সে তাদের সবাইকে গলা টিপে হত্যা করে।
দুনিয়া সব সময়ই তার নাগরদের সঙ্গে এমন আচরণ করে আসছে। কিন্তু পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের পরিণতি দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে না। আগের জনকে দুনিয়ার গর্ভে বিলীন হতে দেখে পরের জন সতর্ক হয় না। একারণে অনেক খোদাপ্রেমিকও দুনিয়ার মায়ার জালে আটকে পড়ে। দুনিয়ার ঈষৎ ছোঁয়া পেয়ে প্রতারিত হয়। স্বেচ্ছাচারিতায় মেতে ওঠে। পরকাল ও পরিণতির কথা বেমালুম ভুলে যায়। তার মন-মস্তিস্কজুড়ে কেবলই দুনিয়া বিরাজ করে। সে কর্তব্য কর্ম ভুলে যায়। তখন দুনিয়াও তাকে ত্যাগ করে। সে পদস্খলনের শিকার হয়। হতাশা, অনুতাপ ও অনুশোচনা তাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরে। এই অনুশোচনা একসময় তার মনস্তাপে পরিণত হয়। সে তখন সবকিছুতেই দিশেহারা বোধ করে। লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। ক্লান্তি ও অবসাদ তার নিত্য সঙ্গী হয়। ফলে সে একসময় নিঃস্ব ও নিঃসম্বল হয়ে পড়ে। দিকভ্রান্তের ন্যায় এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়।
সুতরাং আমিরুল মুমিনিন, দুনিয়ার ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক থাকুন। দুনিয়ায় যে-অবস্থা ও অবস্থানে আছেন, তাতেই তুষ্ট থাকুন। দুনিয়া গ্রহণ করলে কোনো পরিণতির দিকে ধাবিত হবেন, সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখুন। কারণ দুনিয়ার মোহগ্রস্ত ব্যক্তি যখনই নিজেকে নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ মনে করে, তখনই দুনিয়া তার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। একারণে দেখা যায়, দুনিয়ায় যে সুখে থাকে, সে প্রতারিত হয়। যে অব্যাহত কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বস্তুত দুনিয়ার সচ্ছলতাকে বিপদের সুতোয় গেঁথে দেওয়া হয়েছে। সৃষ্টিকে ধ্বংসের উপলক্ষ্য হিসেবে স্থির করা হয়েছে। কাজেই দুনিয়ায় সুখের অব্যবহিত পরেই দুঃখ আসে। সুখের দুঃখের গভীরে হারিয়ে যায়। আর ফিরে আসে না। ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তাও জানা যায় না। ফলে সুনির্দিষ্ট কোনো বস্তুর জন্য অপেক্ষাও করা যায় না। একারণেই জ্ঞানীরা বলেন, দুনিয়ার স্বপ্ন মিথ্যা। আশা-আকাঙ্ক্ষা অমূলক।
প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর কাছে এই দুনিয়া পেশ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি গ্রহণ করেননি। অথচ তিনি দুনিয়া গ্রহণ করলেও তার সম্মান হ্রাস পেত না। আখিরাত নষ্ট হতো না। তবু তিনি দুনিয়াকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন। কারণ, তিনি জানতেন, আল্লাহ দুনিয়াকে ঘৃণা করেন। আর আল্লাহ যা ঘৃণা করেন, তাকে সেটা দেওয়া হলেই তিনি গ্রহণ করতে পারেন না।
বস্তুত আল্লাহ তাআলা দুনিয়াকে খুবই হীন করে সৃষ্টি করেছেন। ফলে নবি কিংবা তার কোনো অনুসারীর পক্ষে দুনিয়াকে সম্মান করা সঙ্গত নয়। ভালোবেসে সম্মানের উচ্চাসনে আসীন বিজ্ঞচিত নয়।
মহান প্রভু পরীক্ষাস্বরূপ তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে দুনিয়ার ধনসম্পদ থেকে দূরে রাখেন। অভাবঅনটন ও দুঃখদারিদ্র্য দিয়ে তাদের ঈমান পরখ করেন। এরপর তাদের পুরস্কারের ব্যবস্থা করেন। অপর দিকে তিনি অভাজনদেরকে দুনিয়ার প্রাচুর্য ও ভোগ-সম্ভার দান করেন। তাদেরকে আমৃত্যু দুনিয়ার মোহে ফেলে রাখেন। তারা তখন ভাবে যে, দুনিয়ার মাধ্যমে তাদেরকে সম্মানিত করা হয়েছে। সে বিলকুল ভুলে যায় যে, দুনিয়ার অর্থসম্পদ প্রকৃত সম্মানের মানদণ্ড নয়। অন্যথায় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া ত্যাগ করে সারাটা জীবন অভাবঅনটনে থাকতেন। ক্ষুধার যন্ত্রণায় পেটে পাথর বাঁধতেন না।
হাদিসে কুদসিতে এসেছে মহান রব একবার হজরত মুসা আলাইহিস সালামকে বলেছিলেন-
إِذَا رَأَيْتَ الْغِنَى مُقْبِلًا فَقُلْ: ذَنْبٌ عُجِّلَتْ عُقُوبَتُهُ، وَإِذَا رَأَيْتَ الْفَقْرَ مُقْبِلًا فَقُلْ: مَرْحَبًا بِشِعَارِ الصَّالِحِينَ .
'আপনি সচ্ছলতার মুখ দেখলে মনে করবেন, আপনার কোনো পাপের নগদ শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। আর দারিদ্র্যে নিপতিত হলে ভাববেন, আপনি সৎ বান্দাদের কিছুটা গুণ ধারণ করতে পেরেছেন। সুতরাং হে দারিদ্র্য, তোমায় স্বাগতম!'
আমিরুল মুমিনিন! আপনি চাইলে ইসা আলাইহিস সালাম-এর অনুসরণ করতে পারেন। তিনি বলতেন, পেটের ক্ষুধাই আমার খাদ্য। ভয় আমার পরিচয়-প্রতীক। শরীরের লোম আমার পোশাক। শীত কালের সোনালি রোদ আমার গরম কাপড়। চাঁদ আমার রাতের প্রদীপ। পা দুটো আমার যানবাহন। জমিনের তৃণলতা আমার ফলমূল। আমার কাছে কখনোই কোনো সম্পদ সঞ্চিত থাকে না। তবু এই পৃথিবীতে আমার চেয়ে ধনী কেউ নেই। কারণ, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও প্রতি আমার বিন্দুমাত্র মুখাপেক্ষিতা নেই। [৭১]
যুহাইর ইবনু নু'আইম রহিমাহুল্লাহু আবদুল্লাহ ইবনু আবদুল গাফফার রহিমাহুল্লাহুর কাছে চিঠি লিখেন-
'হামদ ও সালাতের পর নিবেদন এই যে, স্নেহের ভাতিজা! আমি এখন আল্লাহর রহমতে সুস্থ আছি। কিন্তু মৃত্যু যেকোনো সময় আমার সাথে আলিঙ্গন করতে পারে। আমি ওপারে চলে যেতে পারি। কারণ আমার তো জানা নেই, কখন মৃত্যুর খেয়া জীবনের তটে এসে ভিড়বে।
ভাতিজা আমার! তোমার আব্বু-আম্মুর প্রতি খেয়াল রেখো। তাঁদের খেদমত করতে ভুলে যেয়ো না। পরম যত্নে তাদের সেবা করবে। দুনিয়ার লোভলালসা থেকে নিজেকে সংযত রাখবে। যতটুকু অর্থসম্পদ প্রয়োজন, কেবল ততটুকুই গ্রহণ করবে। কারণ, দুনিয়ার প্রতি যারা ঝুঁকে পড়ে, দুনিয়া তাদেরকে ধ্বংস করে ছাড়ে।
সব সময় নেক আমল করবে। যে আমলে মহান আল্লাহ খুশি হন, বেছে বেছে সে আমলগুলো করবে। আর যে আমলে তিনি বিরক্ত হন, সেগুলো থেকে বিরত থাকবে।
ভাতিজা আমার! আরেকটা কথা শোনো, রবেব কারিমের এই আয়াতটা সব সময় স্মরণ রেখো-
أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَاهُمْ بَلَى وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ .
'তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের নীরব কথা ও গোপন পরামর্শের কথা শুনি না? অবশ্যই আমি সব শুনি। আমার ফেরেশতা তাদের কাছে আছে। তারা সবকিছু লিখে রাখে।' [সুরা যুখরুফ: ৮০]'
টিকাঃ
[৭১] ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ৩/২ ১৯৭।
📄 দুনিয়ালোভীরা কইই-না বোকা!
ইসা আলাইহিস সালাম বলেন-
দুনিয়ালোভীরা নিপাত যাক! তারা বড্ড বোকা। দুনিয়া তাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করে; এরপরও তারা দুনিয়াকে বিশ্বাস করে! দুনিয়া তাদেরকে যেখানে সেখানে অপদস্থ করে; এরপরও তারা দুনিয়ার প্রতি আস্থা রাখে। সুতরাং এই ধোঁকাগ্রস্ত ও প্রবঞ্চিত দুনিয়ালোভীরা নিপাত যাক。
দুনিয়া তাদেরকে নানামুখি বিপদে নিপতিত করে। প্রিয় ও আপনজনদের বিচ্ছেদ ঘটায়। এরপর একসময় তার একান্ত অনুগতদেরকে ছুড়ে ফেলে। পরকালীন শাস্তির মুখোমুখি করে। এই বাস্তবতা জেনেও যারা দুনিয়ার প্রতি লালায়িত থাকে, দুনিয়ার চিন্তা ও চেষ্টায় মন ও মস্তিষ্ক ব্যতিব্যস্ত রাখে এবং এর জন্য পাপ কাজে লিপ্ত হয়, তারা নিপাত যাক। [৭২]
টিকাঃ
[৭২] নিহায়াতুল আরব: ৫/২৪৫।