📄 দুনিয়াদার দ্বীন বিসর্জন দেয়
যাকারিয়া ইবনু আদ রহিমাহুল্লাহু বলেন, ইসা আলাইহিস সালাম বিশিষ্টজনদের উদ্দেশ্যে বলেন—
'তোমরা সর্বাবস্থায় দ্বীনকে নিরাপদ রাখবে। প্রয়োজনে দুঃখ-দারিদ্র্যে ধৈর্য ধারণ করবে। দুনিয়ার অপ্রাপ্তি বা ক্ষতির কারণে কখনো দুঃখিত হবে না—যেমন দুনিয়াদাররা দ্বীন নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে দুঃখিত হয় না।'
📄 দুনিয়ার মহব্বত পোষণ করা অনুচিত
দাউদ ইবনু হিলাল রহিমাহুল্লাহু বলেন, আল্লাহ তাআলা একবার দাউদ আলাইহিস সালামের নিকট এ মর্মে অহি প্রেরণ করেন যে—
'যারা আমার বন্ধু, তাদের হৃদয়ে দুনিয়ার মহব্বত থাকা উচিত নয়। কেননা দুনিয়ার মহব্বত আমার সঙ্গে কথোপকথনের স্বাদ নষ্ট করে দেয়।
হে দাউদ, আপনি আমার ও আপনার মাঝে দুনিয়াদার আলিমকে টেনে আনবেন না। কারণ, তাদের আনলে আমার ও আপনার মধ্যকার মহব্বত হ্রাস পেতে থাকে। দুনিয়াদার আলিম আমার মুমিন বান্দাদের জন্য ডাকাতের মতো। তাই তাদেরকে কখনো কাছে ডাকবেন না।'
ইয়াযিদ ইবনু হাযেম রহিমাহুল্লাহু বলেন, সুলাইমান ইবনু আবদুল মালেক রহিমাহুল্লাহু প্রতি জুমায় আগত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে বলতেন-
'দুনিয়াদাররা সব সময় অসম্ভব রকম অস্থিরতা ও আতঙ্কের মধ্যে থাকে। তারা দুনিয়া হারানোর ভয়ে কারও ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে না। কোথাও গিয়ে দু-দণ্ড স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে না। এরই মধ্যে একদিন মৃত্যুর পরোয়ানা চলে আসে। অমনি সব কিছু ছেড়ে কবরদেশে চলে যেতে হয়। জীবনের সমস্ত অর্জন ও উপার্জন পরবর্তীরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। সারা জীবনের মূল্যবান সম্পদ অন্যদের হাতে চলে যায়।' এই সংক্ষিপ্ত নাসিহার পরে তিনি নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন-
أَفَرَأَيْتَ إِنْ مَتَّعْنَاهُمْ سِنِينَ ثُمَّ جَاءَهُمْ مَا كَانُوا يُوعَدُونَ مَا أَغْنَى عَنْهُمْ مَا كَانُوا يُمَتَّعُونَ .
'তুমি ভেবে দেখো, যদি আমি তাদেরকে দীর্ঘকাল ভোগ-বিলাস দিই এবং পরে তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল তা তাদের নিকট এসে পড়ে, তখন তাদের ভোগ-বিলাসের উপকরণ তাদের কোনো কাজে আসবে কি?' [সূরা শু'আরা : ২০৫-২০৭]
📄 উমর ইবনু আবদুল আজিজ রাহিমাহুল্লাহর চিঠি
সালেহ ইবনু আবদুল্লাহ রহিমাহুল্লাহু বলেন, উমর ইবনু আবদুল আজিজ রহিমাহুল্লাহু আদি ইবনু আরতাত নামের জনৈক গভর্নরের নিকট নিম্নোক্ত পত্রটি প্রেরণ করেন-
'গভর্নর, মহান আল্লাহ প্রিয়-অপ্রিয় সবাইকে দুনিয়া দান করেন। তবে যারা প্রিয়, দুনিয়া তাদের দুঃখ ও দুশ্চিন্তার কারণ হয়। আর যারা অপ্রিয়, দুনিয়া পেয়ে তারা ধোঁকা ও প্রবঞ্চনার শিকার হয়।'
📄 দুনিয়াদারদের এক বিস্ময়কর ঘটনা
আম্মার ইবনু সাইদ রহিমাহুল্লাহু বলেন, একবার হজরত ইসা আলাইহিস সালাম তাঁর সহচরদের নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তারা একটি এলাকার পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন। তখন গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেন, এলাকাবাসীদের কেউ বেঁচে নেই। সবাই মারা গেছে এবং তাদের মৃতদেহগুলো এখানে-সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এ মর্মান্তিক অবস্থা দেখে তিনি সহচরদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন-
'প্রিয় সহচরবৃন্দ, এরা আল্লাহর ক্রোধ ও অসন্তোষের কারণে ধ্বংসের শিকার হয়েছে। এজন্য তাদের কাফনদাফনের কোনো ব্যবস্থা হয়নি। তারা যদি স্বাভাবিক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করত, তবে তাদের কাফনদাফনের ব্যবস্থা হতো'
সহচররা তখন বলেন, 'আল্লাহর নবি, আপনি আমাদেরকে তাদের পুরো ঘটনা খুলে বলুন।' তখন ইসা আলাইহিস সালাম দু-হাত তুলে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন। তৎক্ষণাৎ আল্লাহ অহির মাধ্যমে তাঁকে জানিয়ে দেন যে, আপনি গভীর রাতে এখানে এসে তাদেরকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকবেন। তখন তারাই আপনাকে নিজেদের ঘটনা বর্ণনা করে শোনাবে।'
মহান আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ইসা আলাইহিস সালাম গভীর রাতে অতি সন্তর্পণে সেখানে এসে উপস্থিত হন। এরপর একটি টিলার ওপর দাঁড়িয়ে তাদেরকে উঁচু আওয়াজে ডেকে বলেন, 'আমি আল্লাহর নবি ইসা বলছি। তোমরা কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? প্রতিউত্তরে মৃতদের থেকে একজন বলে উঠে-
'হে রুহুল্লাহ, আপিন বলুন। আমরা শুনতে পাচ্ছি।'
'তোমরা কেমন আছ?'
'আমরা রাতে শান্তি থেকে নিরাপদ থাকি। কিন্তু সকাল হলেই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হই।'
'কিন্তু কেন?'
'কারণ, আমরা আখিরাতের তুলনায় দুনিয়াকে বেশি ভালোবাসতাম। পাপকাজের ক্ষেত্রেও মানুষের কথামতো চলতাম।'
'দুনিয়ার প্রতি তোমাদের ভালোবাসা কেমন ছিল?'
'মায়ের প্রতি দুগ্ধপোষ্য সন্তানের ভালোবাসার মতো। সন্তান যেমন মাকে পেলে আনন্দিত হয়; আমরাও তেমন দুনিয়ার অর্থ-সম্পদ পেলে আনন্দিত হতাম। আবার কোনো কিছু হাতছাড়া হয়ে গেলে হতাশ ও পেরেশান হয়ে পড়তাম।'
'তুমি একাই কেন সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছ? তোমার সাথি-সঙ্গীরা কোথায়?'
'তাদের মুখে আগুনের লাগাম পরানো হয়েছে। কঠোর হৃদয় ফেরেশতারা সেই লাগام টেনে ধরে রেখেছে।'
'সবার এই করুণ অবস্থা হয়ে থাকলে, তুমি কথা বলছ কী করে?'
'আমি দুনিয়াকে তাদের মতো ভালোবাসতাম না। তবে তাদের সাথে চলাফেরা করতাম। আমি এখন 'আ'রাফ' তথা জাহান্নামের পাড়ে অবস্থান করছি। জানি না, আল্লাহ আমাকে এখান থেকে মুক্তি দেবেন নাকি জাহান্নামে ঠেলে দেবেন।'[৪৬]
টিকাঃ
[৪৬] ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন: ৩/২২০।