📘 সাহাবীদের ইসলামগ্রহণের গল্প 📄 সুহাইব ইবনে সিনান রা.

📄 সুহাইব ইবনে সিনান রা.


জাহেলী যুগের পৃথিবী। মানুষ এখনো সভ্যতার আলো দেখেনি। রোম-পারস্য দাপুটে সাম্রাজ্য। নিজেদের সভ্য দাবি করলেও আসলে তাদের জানা নেই— কতটা অসভ্য তারা। এরকম অসভ্যদের আক্রমণ-অত্যাচারে প্রায়ই স্বাধীন মানুষ দাস হয়ে যেত। একবার দাস হয়ে গেলে তাকে আর মানুষ হিসেবে গণ্য করা হতো না। সে অন্যান্য পোষা প্রাণীর মতো সমাজে বেঁচে থাকত এবং তাকে হাটে-বাজারে কেনা-বেচা করা হতো। এরকম এক বাজারে পাওয়া গেল সুহাইবকে।

সিনান ইবনে মালিক শাসক মানুষ। প্রাচীন শহর উবুল্লার শাসক। পারস্য সম্রাটের প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। এমনিতে জন্মেছিলেন আরবে। তার গোত্রের নাম ছিল বনী নুমাইর। সুহাইব তার-ই সন্তান। বয়স পাঁচের বেশি হবে না। গভীর মায়া ও যত্নে তিনি বেড়ে উঠছেন। কিন্তু মায়ার এ বন্ধন তার ভাগ্যে ছিল না। তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। শিশু বয়সেই দাস হয়ে ওঠেন। মায়ের সঙ্গে গিয়েছিলেন ইরাকের সানিয়া পল্লীতে বেড়াতে। বেড়ানো আর হয়নি। রাতে রোমান বাহিনী পল্লীতে আক্রমণ করে। লুটতরাজ করে। নারী ও শিশুদের বন্দী করে। তখন বন্দী মানেই দাসত্ব বরণ করে নেওয়া। সুহাইবও বন্দী হলেন। পাঁচ বছর বয়সেই রোমের বাজারে দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে গেলেন।

সুহাইবের নতুন জীবন শুরু হলো। রোমের ভূমিতে তিনি বেড়ে উঠতে লাগলেন। দাস হিসেবে বেড়ে ওঠা-যে জীবনের কেউ খোঁজ রাখেনি। সময় থেমে থাকে না। বছরের পর বছর পার হয়ে গেল। সুহাইব যৌবনে পদার্পণ করেছেন। জন্মেছিলেন আরব পরিবারে। মরুর সন্তান। ভাষা ছিল আরবি। সেটি তিনি এখন আর মনে করতে পারেন না। তবে এক মুহূর্তের জন্য আরবকে ভুলে যাননি। মনে খুব আশা-একদিন দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাবেন। তবে সেই দিন কবে আসবে, জানা নেই। তিনি সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন।

অনিশ্চিত জীবন। কঠিন সময় যাচ্ছে। মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তার বেড়েই চলছে। এর মধ্যে এক খ্রিস্টান ভবিষ্যদ্বক্তার সঙ্গে তার দেখা হলো। তখনকার ভবিষ্যদ্বক্তারা বেশিরভাগই ছিল ভণ্ড। তাদের উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের নিকট থেকে অর্থকড়ি হাতিয়ে নেওয়া। এ লোকটি সেরকম ছিলেন না। তার কথাবার্তায় জ্ঞানের প্রভাব ছিল। তিনি বললেন, 'সে সময় সমাগত যখন জাযীরাতুল আরবের মক্কায় একজন নবী আবির্ভূত হবেন। তিনি ঈসা ইবনে মরিয়মের নবুওয়াতকে সত্যায়িত করবেন এবং মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যাবেন।' এটি অবশ্যই নতুন একটি খবর। এ খবরে সুহাইবের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আরও প্রবল হয়ে ওঠে।

যুবক বয়সে যে কোনো সাধনাই কাজে লেগে যায়। সুহাইবের একটাই সাধনা-একটা মোক্ষম সুযোগ। এ সুযোগে তিনি পালাবেন। দাসত্বের এ শৃঙ্খল তার আর ভালো লাগছে না। সাধনা কাজে দিল। তিনি সুযোগ পেয়ে গেলেন। একদিন ঠিকই মনিবের চোখে ধুলো দিয়ে পালালেন। পালিয়ে সরাসরি মক্কায় চলে এলেন। খ্রিস্টান ভবিষ্যদ্বক্তার কথা ফলবেই। এ আশাই তাকে মক্কায় টেনে আনে।

মক্কায় তিনি নতুন। মাথায় সোনালী চুল। আরবিও ঠিকমতো বলতে পারেন না। মক্কার লোকেরা এই নতুন মানুষটিকে দেখে অবাক হয়। তারা তার নামের শেষে একটা উপাধি জুড়ে দেয়। তার নাম হয়ে ওঠে সুহাইব আর-রুমী। ভাগ্য ছিল সুপ্রসন্ন। মক্কার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। তার সঙ্গে চুক্তি করে তিনিও ব্যবসা শুরু করেন। তিনি দ্রুত ব্যবসায় সফল হয়ে ওঠেন। প্রচুর অর্থ-কড়ির মালিক হন।

ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মধ্যেও সুহাইব সেই খ্রিস্টানের ভবিষ্যবাণী ভুলে যাননি। একদিন তিনি দাসত্ব থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করতেন। এখনো সেই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়নি। এবার মুক্তি দাসত্ব থেকে নয়—অন্ধকার থেকে আলোর সন্ধান করছেন তিনি। কবে আসবেন সেই নবী? অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না। তবে আর বাকিও বেশি ছিল না।

একদিন সফর থেকে ফিরেই মক্কায় একটি শোরগোল শুনতে পেলেন। লোকেরা আলোচনার নতুন বিষয় পেয়েছে। এই নিয়েই শোরগোল হচ্ছে। তিনি শুনলেন, তারা বলছে, 'মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ নবুওয়াত লাভ করেছেন। মানুষকে তিনি এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের আদল ও ইহসানের প্রতি উৎসাহিত করছেন এবং অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখার নির্দেশ দিচ্ছেন। সুহাইবের আনন্দের সীমা থাকে না।'

এই মানুষটির জন্যই তিনি বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। তবুও তিনি বিষয়টি নিশ্চিত হতে চাইলেন। সুহাইব লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, 'যাকে আল-আমীন বলা হয়, তিনিই কি সেই ব্যক্তি?'
লোকেরা বলল, 'হ্যাঁ।'
'তার বাসস্থান কোথায়?'
'সাফা পাহাড়ের কাছে আল-আরকাম ইবনে আবিল আরকামের বাড়িতে তিনি থাকেন। তবে সতর্ক থেকো, কুরাইশদের কেউ যেন তোমাকে তার কাছে দেখে না ফেলে। যদি তারা তা দেখে, তাহলে তারা তোমার সাথে তেমন আচরণই করবে যেমনটি তারা আমাদের সঙ্গে করে থাকে। তুমি তো ভিনদেশি মানুষ। তোমাকে রক্ষা করার এ শহরে কেউ নেই। তোমার গোত্র-গোষ্ঠীও এখানে নেই।'

সুহাইব এতে বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালেন না। তাকে সেখানে যেতেই হবে। তিনি দারুল আরকামের দিকে রওনা হলেন। গোপনীয়তা রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। পথের শেষ প্রান্তে এসে নিজেকে আর গোপন রাখতে পারলেন না। সামনেই আরেকজনকে দেখা যাচ্ছে। সেও একই পথে হাঁটছে। মানুষটিকে তিনি চেনেন। আম্মার ইবনে ইয়াসির। কিন্তু সে কোথায় যাচ্ছে? কাছে গেলেন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু জিজ্ঞেস করতেও দ্বিধা লাগছে। প্রথমে আম্মারই তাকে প্রশ্ন করলেন, 'কোথায় যাচ্ছ হে?'

সুহাইব প্রশ্নের জবাব প্রশ্ন দিয়েই দিলেন। তিনি বললেন, 'তুমি একা একা কোথায় যাচ্ছ?'
আম্মার বললেন, 'আমি মুহাম্মাদের কাছে যেতে চাই এবং তার কথা শুনতে চাই।'
এ কথা শুনে সুহাইব বললেন, ' আমিও একই উদ্দেশ্যে যাচ্ছি।'

তারপর তারা দুজন একসঙ্গেই দারুল আরকামে প্রবেশ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা শুনলেন। একসঙ্গেই ঈমানের ঘোষণা দিলেন।

সুহাইব ইবনে সিনান আর-রুমী রাযিয়াল্লাহু আনহু তার ইসলামগ্রহণের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। ফলে তাকে কুরাইশদের নিষ্ঠুর অত্যাচারের শিকার হতে হয়। অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে সকল নির্যাতন সহ্য করেন। রাসূলের সঙ্গে হিজরত করার ইচ্ছা থাকলেও তা পারেননি। কুরাইশরা তার পিছু লেগে ছিল, যাতে তিনি তার বিপুল ধন-সম্পদ নিয়ে মক্কা থেকে সরে যেতে না পারেন। অবশেষে দ্বীনের খাতিরে সবকিছু ত্যাগ করে তিনি মদীনায় হিজরত করেন। তিনি ছিলেন অতিথি পরায়ণ ও দানশীল। গরিব দুঃখীর প্রতি ছিলেন দরাযহস্ত। অন্যদিকে সুহাইব ছিলেন দক্ষ তিরন্দাজ। বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহযাত্রী ছিলেন। তার সম্পর্কে উমর রা.-এর অত্যন্ত সুধারণা ছিল। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ওসিয়ত করে যান-সুহাইব তার জানাযার ইমামতি করবেন। শুরার সদস্যবৃন্দ যতক্ষণ নতুন খলীফার নাম ঘোষণা না করবেন, তিনিই খেলাফতের দায়িত্ব পালন করতে থাকবেন। উমর রা.-এর মৃত্যুর পর তিন দিন পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এ দায়িত্ব পালন করেন। হিজরী ৩৮ সনে ৭২ বছর বয়সে তিনি মদীনায় ইন্তেকাল করেন।

জাহেলী যুগের পৃথিবী। মানুষ এখনো সভ্যতার আলো দেখেনি। রোম-পারস্য দাপুটে সাম্রাজ্য। নিজেদের সভ্য দাবি করলেও আসলে তাদের জানা নেই— কতটা অসভ্য তারা। এরকম অসভ্যদের আক্রমণ-অত্যাচারে প্রায়ই স্বাধীন মানুষ দাস হয়ে যেত। একবার দাস হয়ে গেলে তাকে আর মানুষ হিসেবে গণ্য করা হতো না। সে অন্যান্য পোষা প্রাণীর মতো সমাজে বেঁচে থাকত এবং তাকে হাটে-বাজারে কেনা-বেচা করা হতো। এরকম এক বাজারে পাওয়া গেল সুহাইবকে।

সিনান ইবনে মালিক শাসক মানুষ। প্রাচীন শহর উবুল্লার শাসক। পারস্য সম্রাটের প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। এমনিতে জন্মেছিলেন আরবে। তার গোত্রের নাম ছিল বনী নুমাইর। সুহাইব তার-ই সন্তান। বয়স পাঁচের বেশি হবে না। গভীর মায়া ও যত্নে তিনি বেড়ে উঠছেন। কিন্তু মায়ার এ বন্ধন তার ভাগ্যে ছিল না। তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। শিশু বয়সেই দাস হয়ে ওঠেন। মায়ের সঙ্গে গিয়েছিলেন ইরাকের সানিয়া পল্লীতে বেড়াতে। বেড়ানো আর হয়নি। রাতে রোমান বাহিনী পল্লীতে আক্রমণ করে। লুটতরাজ করে। নারী ও শিশুদের বন্দী করে। তখন বন্দী মানেই দাসত্ব বরণ করে নেওয়া। সুহাইবও বন্দী হলেন। পাঁচ বছর বয়সেই রোমের বাজারে দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে গেলেন।

সুহাইবের নতুন জীবন শুরু হলো। রোমের ভূমিতে তিনি বেড়ে উঠতে লাগলেন। দাস হিসেবে বেড়ে ওঠা-যে জীবনের কেউ খোঁজ রাখেনি। সময় থেমে থাকে না। বছরের পর বছর পার হয়ে গেল। সুহাইব যৌবনে পদার্পণ করেছেন। জন্মেছিলেন আরব পরিবারে। মরুর সন্তান। ভাষা ছিল আরবি। সেটি তিনি এখন আর মনে করতে পারেন না। তবে এক মুহূর্তের জন্য আরবকে ভুলে যাননি। মনে খুব আশা-একদিন দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাবেন। তবে সেই দিন কবে আসবে, জানা নেই। তিনি সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন।

অনিশ্চিত জীবন। কঠিন সময় যাচ্ছে। মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তার বেড়েই চলছে। এর মধ্যে এক খ্রিস্টান ভবিষ্যদ্বক্তার সঙ্গে তার দেখা হলো। তখনকার ভবিষ্যদ্বক্তারা বেশিরভাগই ছিল ভণ্ড। তাদের উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের নিকট থেকে অর্থকড়ি হাতিয়ে নেওয়া। এ লোকটি সেরকম ছিলেন না। তার কথাবার্তায় জ্ঞানের প্রভাব ছিল। তিনি বললেন, 'সে সময় সমাগত যখন জাযীরাতুল আরবের মক্কায় একজন নবী আবির্ভূত হবেন। তিনি ঈসা ইবনে মরিয়মের নবুওয়াতকে সত্যায়িত করবেন এবং মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যাবেন।' এটি অবশ্যই নতুন একটি খবর। এ খবরে সুহাইবের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আরও প্রবল হয়ে ওঠে।

যুবক বয়সে যে কোনো সাধনাই কাজে লেগে যায়। সুহাইবের একটাই সাধনা-একটা মোক্ষম সুযোগ। এ সুযোগে তিনি পালাবেন। দাসত্বের এ শৃঙ্খল তার আর ভালো লাগছে না। সাধনা কাজে দিল। তিনি সুযোগ পেয়ে গেলেন। একদিন ঠিকই মনিবের চোখে ধুলো দিয়ে পালালেন। পালিয়ে সরাসরি মক্কায় চলে এলেন। খ্রিস্টান ভবিষ্যদ্বক্তার কথা ফলবেই। এ আশাই তাকে মক্কায় টেনে আনে।

মক্কায় তিনি নতুন। মাথায় সোনালী চুল। আরবিও ঠিকমতো বলতে পারেন না। মক্কার লোকেরা এই নতুন মানুষটিকে দেখে অবাক হয়। তারা তার নামের শেষে একটা উপাধি জুড়ে দেয়। তার নাম হয়ে ওঠে সুহাইব আর-রুমী। ভাগ্য ছিল সুপ্রসন্ন। মক্কার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। তার সঙ্গে চুক্তি করে তিনিও ব্যবসা শুরু করেন। তিনি দ্রুত ব্যবসায় সফল হয়ে ওঠেন। প্রচুর অর্থ-কড়ির মালিক হন।

ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মধ্যেও সুহাইব সেই খ্রিস্টানের ভবিষ্যবাণী ভুলে যাননি। একদিন তিনি দাসত্ব থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করতেন। এখনো সেই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়নি। এবার মুক্তি দাসত্ব থেকে নয়—অন্ধকার থেকে আলোর সন্ধান করছেন তিনি। কবে আসবেন সেই নবী? অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না। তবে আর বাকিও বেশি ছিল না।

একদিন সফর থেকে ফিরেই মক্কায় একটি শোরগোল শুনতে পেলেন। লোকেরা আলোচনার নতুন বিষয় পেয়েছে। এই নিয়েই শোরগোল হচ্ছে। তিনি শুনলেন, তারা বলছে, 'মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ নবুওয়াত লাভ করেছেন। মানুষকে তিনি এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের আদল ও ইহসানের প্রতি উৎসাহিত করছেন এবং অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখার নির্দেশ দিচ্ছেন। সুহাইবের আনন্দের সীমা থাকে না।'

এই মানুষটির জন্যই তিনি বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। তবুও তিনি বিষয়টি নিশ্চিত হতে চাইলেন। সুহাইব লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, 'যাকে আল-আমীন বলা হয়, তিনিই কি সেই ব্যক্তি?'
লোকেরা বলল, 'হ্যাঁ।'
'তার বাসস্থান কোথায়?'
'সাফা পাহাড়ের কাছে আল-আরকাম ইবনে আবিল আরকামের বাড়িতে তিনি থাকেন। তবে সতর্ক থেকো, কুরাইশদের কেউ যেন তোমাকে তার কাছে দেখে না ফেলে। যদি তারা তা দেখে, তাহলে তারা তোমার সাথে তেমন আচরণই করবে যেমনটি তারা আমাদের সঙ্গে করে থাকে। তুমি তো ভিনদেশি মানুষ। তোমাকে রক্ষা করার এ শহরে কেউ নেই। তোমার গোত্র-গোষ্ঠীও এখানে নেই।'

সুহাইব এতে বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালেন না। তাকে সেখানে যেতেই হবে। তিনি দারুল আরকামের দিকে রওনা হলেন। গোপনীয়তা রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। পথের শেষ প্রান্তে এসে নিজেকে আর গোপন রাখতে পারলেন না। সামনেই আরেকজনকে দেখা যাচ্ছে। সেও একই পথে হাঁটছে। মানুষটিকে তিনি চেনেন। আম্মার ইবনে ইয়াসির। কিন্তু সে কোথায় যাচ্ছে? কাছে গেলেন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু জিজ্ঞেস করতেও দ্বিধা লাগছে। প্রথমে আম্মারই তাকে প্রশ্ন করলেন, 'কোথায় যাচ্ছ হে?'

সুহাইব প্রশ্নের জবাব প্রশ্ন দিয়েই দিলেন। তিনি বললেন, 'তুমি একা একা কোথায় যাচ্ছ?'
আম্মার বললেন, 'আমি মুহাম্মাদের কাছে যেতে চাই এবং তার কথা শুনতে চাই।'
এ কথা শুনে সুহাইব বললেন, ' আমিও একই উদ্দেশ্যে যাচ্ছি।'

তারপর তারা দুজন একসঙ্গেই দারুল আরকামে প্রবেশ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা শুনলেন। একসঙ্গেই ঈমানের ঘোষণা দিলেন।

সুহাইব ইবনে সিনান আর-রুমী রাযিয়াল্লাহু আনহু তার ইসলামগ্রহণের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। ফলে তাকে কুরাইশদের নিষ্ঠুর অত্যাচারের শিকার হতে হয়। অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে সকল নির্যাতন সহ্য করেন। রাসূলের সঙ্গে হিজরত করার ইচ্ছা থাকলেও তা পারেননি। কুরাইশরা তার পিছু লেগে ছিল, যাতে তিনি তার বিপুল ধন-সম্পদ নিয়ে মক্কা থেকে সরে যেতে না পারেন। অবশেষে দ্বীনের খাতিরে সবকিছু ত্যাগ করে তিনি মদীনায় হিজরত করেন। তিনি ছিলেন অতিথি পরায়ণ ও দানশীল। গরিব দুঃখীর প্রতি ছিলেন দরাযহস্ত। অন্যদিকে সুহাইব ছিলেন দক্ষ তিরন্দাজ। বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহযাত্রী ছিলেন। তার সম্পর্কে উমর রা.-এর অত্যন্ত সুধারণা ছিল। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ওসিয়ত করে যান-সুহাইব তার জানাযার ইমামতি করবেন। শুরার সদস্যবৃন্দ যতক্ষণ নতুন খলীফার নাম ঘোষণা না করবেন, তিনিই খেলাফতের দায়িত্ব পালন করতে থাকবেন। উমর রা.-এর মৃত্যুর পর তিন দিন পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এ দায়িত্ব পালন করেন। হিজরী ৩৮ সনে ৭২ বছর বয়সে তিনি মদীনায় ইন্তেকাল করেন।

📘 সাহাবীদের ইসলামগ্রহণের গল্প 📄 গ্রন্থপঞ্জি

📄 গ্রন্থপঞ্জি


আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।
রাশীদ হাইলামায, মুহাম্মাদ সা. : হৃদয়ের বাদশাহ (১-৩), অনুবাদ : মুহাম্মাদ আদম আলী, মাকতাবাতুল ফুরকান, ঢাকা।
ড. মুহাম্মদ আব্দুল মাবুদ, আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা।
আল্লামা শিবলী নোমানী, সীরাতুন নবী সা., অনুবাদ ও সম্পাদনা : মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, মদীনা পাবলিকেশন, ঢাকা।
মাওলানা সফিউর রহমান মোবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুুম, অনুবাদ মীযান বিন হারুন, দারুল হুদা কুতুবখানা, ঢাকা।

আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।
রাশীদ হাইলামায, মুহাম্মাদ সা. : হৃদয়ের বাদশাহ (১-৩), অনুবাদ : মুহাম্মাদ আদম আলী, মাকতাবাতুল ফুরকান, ঢাকা।
ড. মুহাম্মদ আব্দুল মাবুদ, আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা।
আল্লামা শিবলী নোমানী, সীরাতুন নবী সা., অনুবাদ ও সম্পাদনা : মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, মদীনা পাবলিকেশন, ঢাকা।
মাওলানা সফিউর রহমান মোবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুুম, অনুবাদ মীযান বিন হারুন, দারুল হুদা কুতুবখানা, ঢাকা।

ফন্ট সাইজ
15px
17px