📘 সাহাবীদের ইসলামগ্রহণের গল্প > 📄 তুফাইল ইবনে আমর রা.

📄 তুফাইল ইবনে আমর রা.


ইয়েমেন-মক্কা থেকে সাতশ মাইল দূরে একটি দেশ। এ দেশের একটি শক্তিশালী গোত্রের নাম দাওস। এ গোত্রের সর্দার হচ্ছেন তুফাইল। জাহেলী যুগে বিবেক, ব্যক্তিত্ব কিংবা বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা হতো না বললেই চলে। এর মধ্যেও কিছু মানুষ ব্যতিক্রম ছিলেন। তাদের তীক্ষ্ণমেধা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও আত্মমর্যাদাবোধের সবাই প্রশংসা করত। তাদের মধ্যে তুফাইল অন্যতম। তিনি ভাষা-পণ্ডিতও ছিলেন। কাব্য প্রতিভা ছিল তার সহজাত বৈশিষ্ট্য। সর্দার হিসেবে মানুষের দুঃখ-কষ্ট বুঝতেন এবং সাহায্য করতেন। মেহমানদের জন্য তার বাড়ি ছিল সরাইখানা-রাত-দিন কখনো চুলো থেকে হাঁড়ি নামত না।

তুফাইল ব্যবসায়ী ছিলেন। এজন্য প্রায়ই তার মক্কায় আসা-যাওয়া করতে হতো। একবার তিনি মক্কায় এলেন। এসেই নতুন এক বিপদে পড়লেন। এ বিপদ সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। ইতোমধ্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত লাভ করেছেন। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছেন। আর মুশরিক কুরাইশরা চরমভাবে এর বিরোধিতা করছে। তুফাইল এমন এক সময় মক্কায় এসে পৌঁছেছেন-যখন এ বিরোধ সবচেয়ে মারত্মক আকার ধারণ করেছে। কুরাইশরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে গড়ে তুলেছে। তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা-চৌকি স্থাপন করেছে। এসব চৌকির লোকজনের কাজ হচ্ছে, শহরের বাইরে থেকে আসা বণিকদের মুহাম্মাদ সম্পর্কে সতর্ক করা। তারা তুফাইলেরও গতিরোধ করে। তারা প্রথমে তার সঙ্গে উত্তম আচরণ করে। সর্বোত্তম সম্ভাষণে স্বাগত জানায় এবং আতিথেয়তার প্রস্তাব দেয়।

তুফাইলের কাছে কুরাইশদের এ আচরণ অদ্ভুত লাগে। মক্কার পরিস্থিতি সম্পর্কে তার জানা ছিল না। পরে নেতৃবৃন্দের কথায় পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন। তারা তাকে বলে, 'হে তুফাইল, আপনি আমাদের শহরে এসেছেন-স্বাগত! আমাদের মধ্যে আপনি এই লোকটি-যে নিজেকে নবী বলে দাবি করে, সে আমাদের জীবন-সংসার কী এক মায়াজালে পেঁচিয়ে বড় কঠিন করে ফেলেছে। আমাদের ঐক্যের সকল রজ্জুকে সে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। সে আমাদের সাজানো-গোছানো সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। তার সকল কথাবার্তা জাদুর মতো। তা ছেলে ও পিতা মধ্যে, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে, ভাই ও বোনের মধ্যে বিরোধের প্রাচীর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমরা ভয় পাচ্ছি, আপনার নিজের ও কওমেরও না-জানি আমাদের দশা হয়! তাই সাবধান! আপনি তার সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না। তার কোনো কথাও আপনি শুনতে যাবেন না।'

মক্কার কুরাইশদের এ প্রচেষ্টায় তুফাইল খুব অবাক হলেন। একটা মানুষকে নিয়ে এত হইচইয়ের কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না। তবে লোকটি নিশ্চিতভাবেই খুব প্রভাবশালী। তা না হলে তাকে ঠেকাতে কুরাইশদের বড় বড় নেতারা এত মরিয়া হয়ে উঠত না। ব্যাপারটিকে এখন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। ভয়ও লাগছে। অহেতুক কোনো ঝামেলায় তিনি পড়তে চান না।

তুফাইল মক্কায় এসে কাবা তাওয়াফ করতেন। সেখানে রক্ষিত মূর্তিসমূহের পূজাও করতেন। এবারও এজন্য কাবা-চত্বরের দিকে রওনা হলেন। তবে রওনা হওয়ার আগে তিনি সতর্কতা অবলম্বন করলেন। কানে ভালো করে তুলো ভরে নিলেন—যাতে কোনোভাবেই মুহাম্মাদের কথা কানে না আসে।

তিনি যা আশঙ্কা করেছিলেন, তা-ই হলো। কাবা-চত্বরে ঢুকতেই দূর থেকে মুহাম্মাদকে দেখতে পেলেন। তিনি কাবা-চত্বরের পাশে নামায পড়ছেন। তার নামায দেখেই তুফাইল আকৃষ্ট হয়ে গেলেন। এ তো তাদের নামাযের মতো নয়। তুফাইলের মনে ঝড় বয়ে গেল। তার আরও কাছে যেতে ইচ্ছে হলো। ইচ্ছেটাকে আটকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। তিনি এক পা, দু'পা করে এগিয়ে গেলেন। কানে তুলো দিয়ে বাইরের শব্দ একটু কমানো যায়; পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। তুফাইলের কানে সেই তিলাওয়াত ভেসে আসে। তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা শুনতে থাকেন। এতে তিনি ভীষণভাবে আলোড়িত হন। তিনি মনে মনে চিন্তা করতে লাগলেন: 'আমি কেন আমার কান বন্ধ করে আছি? আমি আরবের এত বড় একজন বিচক্ষণ কবি! আর আমি কিনা বুঝব না কোনটি ভালো আর কোনটা মন্দ? তবে এই লোকটির কথা শুনতে সমস্যা কোথায়? যদি তার কথা ভালো হয় তাহলে তা গ্রহণ করব। আর যদি মন্দ হয় তবে দূরে ছুড়ে ফেলে দেব।'

বিষয়টি মোটেও মন্দ নয়। তিনি তা ছুঁড়ে দিতেও পারলেন না। বরং গভীর আকর্ষণে উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন। রাসূল নামায শেষে বাড়ির পথ ধরেছেন। তুফাইল তাঁকে অনুসরণ করছেন। অদ্ভুত ঘটনা। তুফাইল নিজেও আশ্চর্য না হয়ে পারলেন না। ঐশী নির্দেশ না হলে এরকম ঘটনা পৃথিবীতে ঘটে না। রাসূল ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর সঙ্গে তুফাইলও। এই প্রথম তিনি রাসূলের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেলেন। তিনি বললেন, হে মুহাম্মাদ, আপনার কাওমের লোকেরা আপনার সম্পর্কে আমাকে এসব কথা বলেছে। তারা আপনার সম্পর্কে এত ভয় দেখিয়েছে যে, আপনার কোনো কথা যাতে আমার কানে না ঢুকতে পারে, সেজন্য আমি কানে তুলো ভরে নিয়েছি। তা সত্ত্বেও আল্লাহ আপনার কিছু কথা না শুনিয়ে ছাড়লেন না। যা শুনেছি, ভালোই মনে হয়েছে। আপনি আমার নিকট ইসলামকে তুলে ধরুন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব আনন্দিত হলেন। তিনি তাঁর নিকট ইসলামের সৌন্দর্য বর্ণনা করলেন এবং তারপর কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালেন। এটি ছিল সবচেয়ে চমৎকার ও শৈল্পিক অভিব্যক্তি—যা ইতিপূর্বে তুফাইল কখনো শোনেনি! ওই দিন পর্যন্ত এর সৌন্দর্যের কাছাকাছিও কিছু তিনি পাননি। তিনি সেখানেই আল্লাহর একত্ববাদের কথা ঘোষণা করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইসলামগ্রহণের পর তুফাইল রা. নিজের গোত্রে ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে তিনি রাসূলের খেদমতে দাওস কবীলার আশিটি পরিবার নিয়ে হাজির হন। এতে রাসূল সা. খুব খুশি হন। তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহ আনহুর শাসনামলে রিদ্দার যুদ্ধে শাহাদাতবরণ করেন।

📘 সাহাবীদের ইসলামগ্রহণের গল্প > 📄 যিমাদ আযদী রা.

📄 যিমাদ আযদী রা.


যিমাদ আযদী-ইয়েমেনের বাসিন্দা। আযাদ শানুআ গোত্রের সন্তান। ঝাড়-ফুঁক করেই জীবিকা অর্জন করতেন। একবার এক কাজে তিনি মক্কায় আগমন করেন। মক্কায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই কিছু মূর্খ লোক তাকে ঘিরে ধরে। তিনি কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা তাকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করার পরামর্শ দেয় এবং বলে, ‘নিশ্চয় মুহাম্মাদ জ্বিনগ্রস্ত লোক!’

এ কথা শুনে যিমাদ খুশিই হন। তার চেহারায় হাসির দ্যুতি ফুটে ওঠে। উপস্থিত মূর্খরা এর কোনো কারণ খুঁজে পেল না। তিনি মনে মনে বললেন, ‘আমার অবশ্যই এই লোকের নিকট যাওয়া উচিত। সম্ভবত আল্লাহ আমার হাতে লোকটিকে ভালো করে দেবেন।’

একদিন তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। কোনো ভূমিকা ছাড়াই যিমাদ বললেন, ‘হে মুহাম্মাদ, আমি তো জ্বিনগ্রস্তদের ঝাড়-ফুঁক করি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, আমার হাতে সুস্থ করেন। আপনার কি ঝাড়-ফুঁক লাগবে?’

রাসূলের সঙ্গে তার কোনো পূর্ব পরিচয় নেই। কোনো পরিচয় পর্ব ছাড়া এভাবে কেউ কথা বলে না। জ্বিনগ্রস্ত লোকের সঙ্গে এ পর্বের কোনো প্রয়োজনও মনে করেননি যিমাদ। তিনি ধরেই নিয়েছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিনগ্রস্ত। তিনি তাকে এমন এক প্রস্তাব দিয়েছেন, যা সত্যিই অদ্ভুত। তার জন্যই আসলে ঝাড়-ফুঁক বেশি দরকার। সেটি কীভাবে করতে হয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে ভালো করেই জানেন। তিনি যিমাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য; আমি কেবল তাঁরই প্রশংসা করি, আর তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তিনি যাকে হেদায়েতের পথ দেখান তাকে পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা কারও নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই; তার কোনো শরীক নেই; আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।'

যিমাদ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এ কী কথা শুনছেন তিনি! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো আরও কিছু বলতেন। কিন্তু যিমাদ তাকে বাধা দিয়ে বললেন, 'আপনি কথাগুলো আবার বলুন। ওগুলোর প্রভাব তো গভীর সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার নয়; বরং তিনবার বললেন। বিস্ময়ে অধীর হয়ে যিমাদ বলে উঠলেন, 'জীবনে আমি বহু জ্যোতিষী, জাদুকর ও কবির কথা শুনেছি। কিন্তু আপনার কথার মতো কথা কোনোদিন শুনিনি। এ অনুভূতির প্রকাশ ও সৌন্দর্য অনিঃশেষ সমুদ্রের গভীরতার মতো! আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। আমি আপনার হাতে বাইআত হব।' তার দিকে রাসূলের পবিত্র হাত সম্প্রসারিতই ছিল। যিমাদ তখনই মুসলমান হয়ে গেলেন।

যিমাদ আযদী-ইয়েমেনের বাসিন্দা। আযাদ শানুআ গোত্রের সন্তান। ঝাড়-ফুঁক করেই জীবিকা অর্জন করতেন। একবার এক কাজে তিনি মক্কায় আগমন করেন। মক্কায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই কিছু মূর্খ লোক তাকে ঘিরে ধরে। তিনি কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা তাকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করার পরামর্শ দেয় এবং বলে, ‘নিশ্চয় মুহাম্মাদ জ্বিনগ্রস্ত লোক!’

এ কথা শুনে যিমাদ খুশিই হন। তার চেহারায় হাসির দ্যুতি ফুটে ওঠে। উপস্থিত মূর্খরা এর কোনো কারণ খুঁজে পেল না। তিনি মনে মনে বললেন, ‘আমার অবশ্যই এই লোকের নিকট যাওয়া উচিত। সম্ভবত আল্লাহ আমার হাতে লোকটিকে ভালো করে দেবেন।’

একদিন তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। কোনো ভূমিকা ছাড়াই যিমাদ বললেন, ‘হে মুহাম্মাদ, আমি তো জ্বিনগ্রস্তদের ঝাড়-ফুঁক করি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, আমার হাতে সুস্থ করেন। আপনার কি ঝাড়-ফুঁক লাগবে?’

রাসূলের সঙ্গে তার কোনো পূর্ব পরিচয় নেই। কোনো পরিচয় পর্ব ছাড়া এভাবে কেউ কথা বলে না। জ্বিনগ্রস্ত লোকের সঙ্গে এ পর্বের কোনো প্রয়োজনও মনে করেননি যিমাদ। তিনি ধরেই নিয়েছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিনগ্রস্ত। তিনি তাকে এমন এক প্রস্তাব দিয়েছেন, যা সত্যিই অদ্ভুত। তার জন্যই আসলে ঝাড়-ফুঁক বেশি দরকার। সেটি কীভাবে করতে হয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে ভালো করেই জানেন। তিনি যিমাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য; আমি কেবল তাঁরই প্রশংসা করি, আর তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তিনি যাকে হেদায়েতের পথ দেখান তাকে পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা কারও নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই; তার কোনো শরীক নেই; আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।'

যিমাদ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এ কী কথা শুনছেন তিনি! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো আরও কিছু বলতেন। কিন্তু যিমাদ তাকে বাধা দিয়ে বললেন, 'আপনি কথাগুলো আবার বলুন। ওগুলোর প্রভাব তো গভীর সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার নয়; বরং তিনবার বললেন। বিস্ময়ে অধীর হয়ে যিমাদ বলে উঠলেন, 'জীবনে আমি বহু জ্যোতিষী, জাদুকর ও কবির কথা শুনেছি। কিন্তু আপনার কথার মতো কথা কোনোদিন শুনিনি। এ অনুভূতির প্রকাশ ও সৌন্দর্য অনিঃশেষ সমুদ্রের গভীরতার মতো! আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। আমি আপনার হাতে বাইআত হব।' তার দিকে রাসূলের পবিত্র হাত সম্প্রসারিতই ছিল। যিমাদ তখনই মুসলমান হয়ে গেলেন।

📘 সাহাবীদের ইসলামগ্রহণের গল্প > 📄 আবুল আস ইবনে রাবী রা.

📄 আবুল আস ইবনে রাবী রা.


মক্কায় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক পাওয়া দুষ্কর। অপকর্মে ডুবে থাকলে মানুষের ব্যক্তিত্ব থাকে না। মানুষের বিবেক-বুদ্ধিও কাজ করে না। এর মধ্যে ব্যতিক্রমী যুবক আবুল আস। বংশগৌরব, বীরত্ব এবং ব্যক্তিত্বে অনন্য। ব্যবসায়ী মানুষ। মক্কা ও শামে সব সময় তার বাণিজ্যিক কাফেলা চলতই। এসব কাফেলায় কম করে হলেও একশ উট থাকত। আর লোকবল থাকত দুশো। তার সততা ও আমানতদারীর প্রশংসা করত সবাই। এজন্য ব্যবসায়ে উন্নতি করতে তার সময় বেশি লাগেনি। আর সেটি ক্রমাগত বেড়েই চলছে।

তিনি ছিলেন খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার ভাতিজা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াতের আগেই যায়নাবকে তার সঙ্গে বিয়ে দেন। তারপর যখন নবুওয়াত লাভ করেন, তখন আবুল আস স্বধর্মেই বহাল থাকেন। ইসলামে তখনো বিধর্মীর সাথে বিবাহ হারাম না হওয়ায় তাদের সংসার টিকে গেল। তবে বেশিদিন এ অবস্থা থাকল না। বদর-যুদ্ধের পর অবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেল।

আবুল আস বদর-যুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষে ছিলেন। যুদ্ধে বেঁচে গেলেও বন্দী হলেন। মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তিও পেয়ে গেলেন। তবে তার মুক্তিপণের ঘটনা খুব করুণ। তার প্রতি মহীয়সী নারী যায়নাবের ভালোবাসা ছিল অনেক। তিনি তার স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে অর্থকড়ি না পাঠিয়ে নিজের গলার একটি হার পাঠালেন। এ হার দেখেই রাসূলের হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। এটি তার প্রয়াত স্ত্রী খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার। যায়নাবের বিয়ের সময় তিনিই তার মেয়েকে এ হারটি দিয়েছিলেন। খাদিজার চেহারা মানসপটে ভেসে উঠলে রাসূল অন্যরকম হয়ে যেতেন। তার চোখ ছলছল করে উঠত। এই বুঝি অশ্রুর প্লাবন শুরু হবে। হারটি দেখেই তিনি চেহারা ঢেকে ফেলেন। রাসূলের আবেগ খুব কমই চোখে পড়ত। এটি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ছিল তার। এই এক জায়গায় তার ভালোবাসা বাধ মানত না। তিনি তার প্রিয় সাহাবীদের বললেন, 'তোমরা যদি চাও তাহলে যায়নাবের স্বামীকে মুক্ত করে দিতে পার এবং এ হারও তাকে ফিরিয়ে দিতে পার।' আহ! এরকম অনুরোধ অন্য কারও ব্যাপারে করেছেন কি না জানা নেই। এতে আবুল আস যত না উপলক্ষ, তার চেয়ে বেশি ছিল সেই হার।

আবুল আস মুক্তি পেয়ে গেলেন। মক্কায় যাওয়ার আগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কানে কানে কিছু একটা বললেন। কি বলেছেন, কেউ শোনেনি। কিন্তু এতে আবুল আস সক্রিয় হয়ে ওঠেন। মক্কায় গিয়েই স্ত্রীকে মদীনায় পাঠিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত তাদের বিবাহ টিকল না। ইসলামে নতুন বিধান চালু হয়েছে। মুশরিকদের সাথে আর কোনোদিন কোনো মুসলিম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। যায়নাব মদীনায় এলেন। তবে তার আসার পথটা ছিল কঠিন। মক্কার মুশরিকরা বাধা দিল। এতে তিনি আহত হলেন। অন্তঃসত্ত্বা থাকাতে তার গর্ভপাত হয়ে গেল। আমৃত্যু তিনি এই যাতনা সহ্য করেন।

সময় যায়। আবুল আসের এখন নিঃসঙ্গ জীবন। যায়নাব অনেক অনুনয়-বিনয় করেও স্বামীকে মদীনায় আনতে পারেননি। দুজন দুপ্রান্তে একাকী জীবন কাটাচ্ছেন। এ দূরত্ব যেন কাছে টানারই আবহ সৃষ্টি করল। কয়েকবছর পর তারা আবার পরস্পরের দেখা পেলেন। তবে এবার ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

মক্কা বিজয়ের আগের ঘটনা। একবার কুরাইশদের একটা বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে আবুল আস সিরিয়া যান। সেখান থেকে জিনিস-পত্র কিনে মক্কায় ফিরছিলেন। কাফেলাটি যখন মদীনার কাছাকাছি পৌঁছে, তখন মুসলমানরা খবর পেয়ে এ কাফেলার সবাইকে বন্দি করে মদীনায় নিয়ে আসে। আবুল আসকে মুসলমান হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তাতে অস্বীকৃতি জানান। যায়নাব রাযিয়াল্লাহু আনহা আবুল আসের খবর পেয়ে দৌড়ে মসজিদে এসে ঘোষণা করলেন, 'হে লোকসকল, আমি আবুল আসকে নিরাপত্তা দিয়েছি।'

এ নিরাপত্তায় তখন বাধা দেওয়ার সুযোগ ছিল না। কোনো মুসলিম কাউকে নিরাপত্তা দিলে সেটি কার্যকর করা হতো। যায়নাব যে আবুল আসের নিরাপত্তা দিয়েছেন, বিষয়টি রাসূলও জানতেন না। সকালে ফজরের নামাযের পর ঘটনাটি জানাজানি হয়। সাহাবীরাও মেনে নেন। এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবুল আসের জন্য সাহাবীদের বিশেষ অনুরোধ করলেন। তিনি বললেন, 'কোনো সন্দেহ নেই যে, তোমরা পুরো ঘটনা জানো। তোমরা তার বাণিজ্য-সম্ভার তাকে ফেরত দিতে পার এবং তাকে ছেড়ে দিতে পার। এটা আমি পছন্দ করি। আর যদি তোমরা চাও তাহলে তার সম্পদ নিয়ে নিতে পার এবং ব্যবহারও করতে পার। এটা যেহেতু গনীমতের মাল, এজন্য তোমাদের সে অধিকার আছে।'

সাহাবীরা তো রাসূলের সন্তুষ্টিতেই জীবনের সফলতা খুঁজতেন। তারা রাজি হয়ে গেলেন। তখন অবশ্য কেউ কেউ আবুল আসকে ইসলামগ্রহণ করে মক্কাবাসীদের এই মালামালসহ মদীনায় থেকে যাওয়ার পরামর্শও দেন। আবুল আস তখন জবাব দিলেন, 'আমি আমার নতুন জীবন শঠতার মাধ্যমে শুরু করতে পারি না।' তিনি মালামালসহ মক্কায় ফিরে গেলেন।

আবুল আস মক্কায় পৌঁছে এক এক করে সবাইকে তাদের মাল বুঝিয়ে দিলেন। তারপর তিনি বললেন, 'হে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা, আমার কাছে তোমাদের আর কোনো পাওনা আছে কি?' তারা বলল, 'না। আমরা তোমাকে খুব ভালো প্রতিশ্রুতি পালনকারী হিসেবে পেয়েছি।' আবুল আস বললেন, 'আমি তোমাদের হক পূর্ণরূপে আদায় করেছি। এখন আমি ঘোষণা দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার বান্দা ও রাসূল। আমাকে যে জিনিস এতদিন পর্যন্ত এ ঘোষণা দেওয়া থেকে বিরত রেখেছে সেটা হলো, তোমরা ধারণা করতে আমি তোমাদের মাল আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই এমন করেছি। আল্লাহ আমাকে তোমাদের মাল ফিরিয়ে দেয়ার তাওফীক দিয়েছেন। তোমাদের আর কোনো কিছুই আমার কাছে নেই। এখন আমি মুসলমান হয়ে গেছি।'

আবুল আস মক্কা এবং মক্কাবাসীদেরকে বিদায় জানিয়ে সরাসরি মদীনায় চলে আসেন। তিনি মসজিদে নববীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেখানেই নিজের ঈমান এবং রাসূলের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের ঘোষণা দেন।

মক্কায় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক পাওয়া দুষ্কর। অপকর্মে ডুবে থাকলে মানুষের ব্যক্তিত্ব থাকে না। মানুষের বিবেক-বুদ্ধিও কাজ করে না। এর মধ্যে ব্যতিক্রমী যুবক আবুল আস। বংশগৌরব, বীরত্ব এবং ব্যক্তিত্বে অনন্য। ব্যবসায়ী মানুষ। মক্কা ও শামে সব সময় তার বাণিজ্যিক কাফেলা চলতই। এসব কাফেলায় কম করে হলেও একশ উট থাকত। আর লোকবল থাকত দুশো। তার সততা ও আমানতদারীর প্রশংসা করত সবাই। এজন্য ব্যবসায়ে উন্নতি করতে তার সময় বেশি লাগেনি। আর সেটি ক্রমাগত বেড়েই চলছে।

তিনি ছিলেন খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার ভাতিজা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াতের আগেই যায়নাবকে তার সঙ্গে বিয়ে দেন। তারপর যখন নবুওয়াত লাভ করেন, তখন আবুল আস স্বধর্মেই বহাল থাকেন। ইসলামে তখনো বিধর্মীর সাথে বিবাহ হারাম না হওয়ায় তাদের সংসার টিকে গেল। তবে বেশিদিন এ অবস্থা থাকল না। বদর-যুদ্ধের পর অবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেল।

আবুল আস বদর-যুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষে ছিলেন। যুদ্ধে বেঁচে গেলেও বন্দী হলেন। মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তিও পেয়ে গেলেন। তবে তার মুক্তিপণের ঘটনা খুব করুণ। তার প্রতি মহীয়সী নারী যায়নাবের ভালোবাসা ছিল অনেক। তিনি তার স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে অর্থকড়ি না পাঠিয়ে নিজের গলার একটি হার পাঠালেন। এ হার দেখেই রাসূলের হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। এটি তার প্রয়াত স্ত্রী খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার। যায়নাবের বিয়ের সময় তিনিই তার মেয়েকে এ হারটি দিয়েছিলেন। খাদিজার চেহারা মানসপটে ভেসে উঠলে রাসূল অন্যরকম হয়ে যেতেন। তার চোখ ছলছল করে উঠত। এই বুঝি অশ্রুর প্লাবন শুরু হবে। হারটি দেখেই তিনি চেহারা ঢেকে ফেলেন। রাসূলের আবেগ খুব কমই চোখে পড়ত। এটি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ছিল তার। এই এক জায়গায় তার ভালোবাসা বাধ মানত না। তিনি তার প্রিয় সাহাবীদের বললেন, 'তোমরা যদি চাও তাহলে যায়নাবের স্বামীকে মুক্ত করে দিতে পার এবং এ হারও তাকে ফিরিয়ে দিতে পার।' আহ! এরকম অনুরোধ অন্য কারও ব্যাপারে করেছেন কি না জানা নেই। এতে আবুল আস যত না উপলক্ষ, তার চেয়ে বেশি ছিল সেই হার।

আবুল আস মুক্তি পেয়ে গেলেন। মক্কায় যাওয়ার আগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কানে কানে কিছু একটা বললেন। কি বলেছেন, কেউ শোনেনি। কিন্তু এতে আবুল আস সক্রিয় হয়ে ওঠেন। মক্কায় গিয়েই স্ত্রীকে মদীনায় পাঠিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত তাদের বিবাহ টিকল না। ইসলামে নতুন বিধান চালু হয়েছে। মুশরিকদের সাথে আর কোনোদিন কোনো মুসলিম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। যায়নাব মদীনায় এলেন। তবে তার আসার পথটা ছিল কঠিন। মক্কার মুশরিকরা বাধা দিল। এতে তিনি আহত হলেন। অন্তঃসত্ত্বা থাকাতে তার গর্ভপাত হয়ে গেল। আমৃত্যু তিনি এই যাতনা সহ্য করেন।

সময় যায়। আবুল আসের এখন নিঃসঙ্গ জীবন। যায়নাব অনেক অনুনয়-বিনয় করেও স্বামীকে মদীনায় আনতে পারেননি। দুজন দুপ্রান্তে একাকী জীবন কাটাচ্ছেন। এ দূরত্ব যেন কাছে টানারই আবহ সৃষ্টি করল। কয়েকবছর পর তারা আবার পরস্পরের দেখা পেলেন। তবে এবার ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

মক্কা বিজয়ের আগের ঘটনা। একবার কুরাইশদের একটা বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে আবুল আস সিরিয়া যান। সেখান থেকে জিনিস-পত্র কিনে মক্কায় ফিরছিলেন। কাফেলাটি যখন মদীনার কাছাকাছি পৌঁছে, তখন মুসলমানরা খবর পেয়ে এ কাফেলার সবাইকে বন্দি করে মদীনায় নিয়ে আসে। আবুল আসকে মুসলমান হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তাতে অস্বীকৃতি জানান। যায়নাব রাযিয়াল্লাহু আনহা আবুল আসের খবর পেয়ে দৌড়ে মসজিদে এসে ঘোষণা করলেন, 'হে লোকসকল, আমি আবুল আসকে নিরাপত্তা দিয়েছি।'

এ নিরাপত্তায় তখন বাধা দেওয়ার সুযোগ ছিল না। কোনো মুসলিম কাউকে নিরাপত্তা দিলে সেটি কার্যকর করা হতো। যায়নাব যে আবুল আসের নিরাপত্তা দিয়েছেন, বিষয়টি রাসূলও জানতেন না। সকালে ফজরের নামাযের পর ঘটনাটি জানাজানি হয়। সাহাবীরাও মেনে নেন। এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবুল আসের জন্য সাহাবীদের বিশেষ অনুরোধ করলেন। তিনি বললেন, 'কোনো সন্দেহ নেই যে, তোমরা পুরো ঘটনা জানো। তোমরা তার বাণিজ্য-সম্ভার তাকে ফেরত দিতে পার এবং তাকে ছেড়ে দিতে পার। এটা আমি পছন্দ করি। আর যদি তোমরা চাও তাহলে তার সম্পদ নিয়ে নিতে পার এবং ব্যবহারও করতে পার। এটা যেহেতু গনীমতের মাল, এজন্য তোমাদের সে অধিকার আছে।'

সাহাবীরা তো রাসূলের সন্তুষ্টিতেই জীবনের সফলতা খুঁজতেন। তারা রাজি হয়ে গেলেন। তখন অবশ্য কেউ কেউ আবুল আসকে ইসলামগ্রহণ করে মক্কাবাসীদের এই মালামালসহ মদীনায় থেকে যাওয়ার পরামর্শও দেন। আবুল আস তখন জবাব দিলেন, 'আমি আমার নতুন জীবন শঠতার মাধ্যমে শুরু করতে পারি না।' তিনি মালামালসহ মক্কায় ফিরে গেলেন।

আবুল আস মক্কায় পৌঁছে এক এক করে সবাইকে তাদের মাল বুঝিয়ে দিলেন। তারপর তিনি বললেন, 'হে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা, আমার কাছে তোমাদের আর কোনো পাওনা আছে কি?' তারা বলল, 'না। আমরা তোমাকে খুব ভালো প্রতিশ্রুতি পালনকারী হিসেবে পেয়েছি।' আবুল আস বললেন, 'আমি তোমাদের হক পূর্ণরূপে আদায় করেছি। এখন আমি ঘোষণা দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার বান্দা ও রাসূল। আমাকে যে জিনিস এতদিন পর্যন্ত এ ঘোষণা দেওয়া থেকে বিরত রেখেছে সেটা হলো, তোমরা ধারণা করতে আমি তোমাদের মাল আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই এমন করেছি। আল্লাহ আমাকে তোমাদের মাল ফিরিয়ে দেয়ার তাওফীক দিয়েছেন। তোমাদের আর কোনো কিছুই আমার কাছে নেই। এখন আমি মুসলমান হয়ে গেছি।'

আবুল আস মক্কা এবং মক্কাবাসীদেরকে বিদায় জানিয়ে সরাসরি মদীনায় চলে আসেন। তিনি মসজিদে নববীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেখানেই নিজের ঈমান এবং রাসূলের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের ঘোষণা দেন।

📘 সাহাবীদের ইসলামগ্রহণের গল্প > 📄 সুহাইব ইবনে সিনান রা.

📄 সুহাইব ইবনে সিনান রা.


জাহেলী যুগের পৃথিবী। মানুষ এখনো সভ্যতার আলো দেখেনি। রোম-পারস্য দাপুটে সাম্রাজ্য। নিজেদের সভ্য দাবি করলেও আসলে তাদের জানা নেই— কতটা অসভ্য তারা। এরকম অসভ্যদের আক্রমণ-অত্যাচারে প্রায়ই স্বাধীন মানুষ দাস হয়ে যেত। একবার দাস হয়ে গেলে তাকে আর মানুষ হিসেবে গণ্য করা হতো না। সে অন্যান্য পোষা প্রাণীর মতো সমাজে বেঁচে থাকত এবং তাকে হাটে-বাজারে কেনা-বেচা করা হতো। এরকম এক বাজারে পাওয়া গেল সুহাইবকে।

সিনান ইবনে মালিক শাসক মানুষ। প্রাচীন শহর উবুল্লার শাসক। পারস্য সম্রাটের প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। এমনিতে জন্মেছিলেন আরবে। তার গোত্রের নাম ছিল বনী নুমাইর। সুহাইব তার-ই সন্তান। বয়স পাঁচের বেশি হবে না। গভীর মায়া ও যত্নে তিনি বেড়ে উঠছেন। কিন্তু মায়ার এ বন্ধন তার ভাগ্যে ছিল না। তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। শিশু বয়সেই দাস হয়ে ওঠেন। মায়ের সঙ্গে গিয়েছিলেন ইরাকের সানিয়া পল্লীতে বেড়াতে। বেড়ানো আর হয়নি। রাতে রোমান বাহিনী পল্লীতে আক্রমণ করে। লুটতরাজ করে। নারী ও শিশুদের বন্দী করে। তখন বন্দী মানেই দাসত্ব বরণ করে নেওয়া। সুহাইবও বন্দী হলেন। পাঁচ বছর বয়সেই রোমের বাজারে দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে গেলেন।

সুহাইবের নতুন জীবন শুরু হলো। রোমের ভূমিতে তিনি বেড়ে উঠতে লাগলেন। দাস হিসেবে বেড়ে ওঠা-যে জীবনের কেউ খোঁজ রাখেনি। সময় থেমে থাকে না। বছরের পর বছর পার হয়ে গেল। সুহাইব যৌবনে পদার্পণ করেছেন। জন্মেছিলেন আরব পরিবারে। মরুর সন্তান। ভাষা ছিল আরবি। সেটি তিনি এখন আর মনে করতে পারেন না। তবে এক মুহূর্তের জন্য আরবকে ভুলে যাননি। মনে খুব আশা-একদিন দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাবেন। তবে সেই দিন কবে আসবে, জানা নেই। তিনি সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন।

অনিশ্চিত জীবন। কঠিন সময় যাচ্ছে। মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তার বেড়েই চলছে। এর মধ্যে এক খ্রিস্টান ভবিষ্যদ্বক্তার সঙ্গে তার দেখা হলো। তখনকার ভবিষ্যদ্বক্তারা বেশিরভাগই ছিল ভণ্ড। তাদের উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের নিকট থেকে অর্থকড়ি হাতিয়ে নেওয়া। এ লোকটি সেরকম ছিলেন না। তার কথাবার্তায় জ্ঞানের প্রভাব ছিল। তিনি বললেন, 'সে সময় সমাগত যখন জাযীরাতুল আরবের মক্কায় একজন নবী আবির্ভূত হবেন। তিনি ঈসা ইবনে মরিয়মের নবুওয়াতকে সত্যায়িত করবেন এবং মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যাবেন।' এটি অবশ্যই নতুন একটি খবর। এ খবরে সুহাইবের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আরও প্রবল হয়ে ওঠে।

যুবক বয়সে যে কোনো সাধনাই কাজে লেগে যায়। সুহাইবের একটাই সাধনা-একটা মোক্ষম সুযোগ। এ সুযোগে তিনি পালাবেন। দাসত্বের এ শৃঙ্খল তার আর ভালো লাগছে না। সাধনা কাজে দিল। তিনি সুযোগ পেয়ে গেলেন। একদিন ঠিকই মনিবের চোখে ধুলো দিয়ে পালালেন। পালিয়ে সরাসরি মক্কায় চলে এলেন। খ্রিস্টান ভবিষ্যদ্বক্তার কথা ফলবেই। এ আশাই তাকে মক্কায় টেনে আনে।

মক্কায় তিনি নতুন। মাথায় সোনালী চুল। আরবিও ঠিকমতো বলতে পারেন না। মক্কার লোকেরা এই নতুন মানুষটিকে দেখে অবাক হয়। তারা তার নামের শেষে একটা উপাধি জুড়ে দেয়। তার নাম হয়ে ওঠে সুহাইব আর-রুমী। ভাগ্য ছিল সুপ্রসন্ন। মক্কার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। তার সঙ্গে চুক্তি করে তিনিও ব্যবসা শুরু করেন। তিনি দ্রুত ব্যবসায় সফল হয়ে ওঠেন। প্রচুর অর্থ-কড়ির মালিক হন।

ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মধ্যেও সুহাইব সেই খ্রিস্টানের ভবিষ্যবাণী ভুলে যাননি। একদিন তিনি দাসত্ব থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করতেন। এখনো সেই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়নি। এবার মুক্তি দাসত্ব থেকে নয়—অন্ধকার থেকে আলোর সন্ধান করছেন তিনি। কবে আসবেন সেই নবী? অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না। তবে আর বাকিও বেশি ছিল না।

একদিন সফর থেকে ফিরেই মক্কায় একটি শোরগোল শুনতে পেলেন। লোকেরা আলোচনার নতুন বিষয় পেয়েছে। এই নিয়েই শোরগোল হচ্ছে। তিনি শুনলেন, তারা বলছে, 'মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ নবুওয়াত লাভ করেছেন। মানুষকে তিনি এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের আদল ও ইহসানের প্রতি উৎসাহিত করছেন এবং অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখার নির্দেশ দিচ্ছেন। সুহাইবের আনন্দের সীমা থাকে না।'

এই মানুষটির জন্যই তিনি বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। তবুও তিনি বিষয়টি নিশ্চিত হতে চাইলেন। সুহাইব লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, 'যাকে আল-আমীন বলা হয়, তিনিই কি সেই ব্যক্তি?'
লোকেরা বলল, 'হ্যাঁ।'
'তার বাসস্থান কোথায়?'
'সাফা পাহাড়ের কাছে আল-আরকাম ইবনে আবিল আরকামের বাড়িতে তিনি থাকেন। তবে সতর্ক থেকো, কুরাইশদের কেউ যেন তোমাকে তার কাছে দেখে না ফেলে। যদি তারা তা দেখে, তাহলে তারা তোমার সাথে তেমন আচরণই করবে যেমনটি তারা আমাদের সঙ্গে করে থাকে। তুমি তো ভিনদেশি মানুষ। তোমাকে রক্ষা করার এ শহরে কেউ নেই। তোমার গোত্র-গোষ্ঠীও এখানে নেই।'

সুহাইব এতে বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালেন না। তাকে সেখানে যেতেই হবে। তিনি দারুল আরকামের দিকে রওনা হলেন। গোপনীয়তা রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। পথের শেষ প্রান্তে এসে নিজেকে আর গোপন রাখতে পারলেন না। সামনেই আরেকজনকে দেখা যাচ্ছে। সেও একই পথে হাঁটছে। মানুষটিকে তিনি চেনেন। আম্মার ইবনে ইয়াসির। কিন্তু সে কোথায় যাচ্ছে? কাছে গেলেন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু জিজ্ঞেস করতেও দ্বিধা লাগছে। প্রথমে আম্মারই তাকে প্রশ্ন করলেন, 'কোথায় যাচ্ছ হে?'

সুহাইব প্রশ্নের জবাব প্রশ্ন দিয়েই দিলেন। তিনি বললেন, 'তুমি একা একা কোথায় যাচ্ছ?'
আম্মার বললেন, 'আমি মুহাম্মাদের কাছে যেতে চাই এবং তার কথা শুনতে চাই।'
এ কথা শুনে সুহাইব বললেন, ' আমিও একই উদ্দেশ্যে যাচ্ছি।'

তারপর তারা দুজন একসঙ্গেই দারুল আরকামে প্রবেশ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা শুনলেন। একসঙ্গেই ঈমানের ঘোষণা দিলেন।

সুহাইব ইবনে সিনান আর-রুমী রাযিয়াল্লাহু আনহু তার ইসলামগ্রহণের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। ফলে তাকে কুরাইশদের নিষ্ঠুর অত্যাচারের শিকার হতে হয়। অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে সকল নির্যাতন সহ্য করেন। রাসূলের সঙ্গে হিজরত করার ইচ্ছা থাকলেও তা পারেননি। কুরাইশরা তার পিছু লেগে ছিল, যাতে তিনি তার বিপুল ধন-সম্পদ নিয়ে মক্কা থেকে সরে যেতে না পারেন। অবশেষে দ্বীনের খাতিরে সবকিছু ত্যাগ করে তিনি মদীনায় হিজরত করেন। তিনি ছিলেন অতিথি পরায়ণ ও দানশীল। গরিব দুঃখীর প্রতি ছিলেন দরাযহস্ত। অন্যদিকে সুহাইব ছিলেন দক্ষ তিরন্দাজ। বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহযাত্রী ছিলেন। তার সম্পর্কে উমর রা.-এর অত্যন্ত সুধারণা ছিল। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ওসিয়ত করে যান-সুহাইব তার জানাযার ইমামতি করবেন। শুরার সদস্যবৃন্দ যতক্ষণ নতুন খলীফার নাম ঘোষণা না করবেন, তিনিই খেলাফতের দায়িত্ব পালন করতে থাকবেন। উমর রা.-এর মৃত্যুর পর তিন দিন পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এ দায়িত্ব পালন করেন। হিজরী ৩৮ সনে ৭২ বছর বয়সে তিনি মদীনায় ইন্তেকাল করেন।

জাহেলী যুগের পৃথিবী। মানুষ এখনো সভ্যতার আলো দেখেনি। রোম-পারস্য দাপুটে সাম্রাজ্য। নিজেদের সভ্য দাবি করলেও আসলে তাদের জানা নেই— কতটা অসভ্য তারা। এরকম অসভ্যদের আক্রমণ-অত্যাচারে প্রায়ই স্বাধীন মানুষ দাস হয়ে যেত। একবার দাস হয়ে গেলে তাকে আর মানুষ হিসেবে গণ্য করা হতো না। সে অন্যান্য পোষা প্রাণীর মতো সমাজে বেঁচে থাকত এবং তাকে হাটে-বাজারে কেনা-বেচা করা হতো। এরকম এক বাজারে পাওয়া গেল সুহাইবকে।

সিনান ইবনে মালিক শাসক মানুষ। প্রাচীন শহর উবুল্লার শাসক। পারস্য সম্রাটের প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। এমনিতে জন্মেছিলেন আরবে। তার গোত্রের নাম ছিল বনী নুমাইর। সুহাইব তার-ই সন্তান। বয়স পাঁচের বেশি হবে না। গভীর মায়া ও যত্নে তিনি বেড়ে উঠছেন। কিন্তু মায়ার এ বন্ধন তার ভাগ্যে ছিল না। তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। শিশু বয়সেই দাস হয়ে ওঠেন। মায়ের সঙ্গে গিয়েছিলেন ইরাকের সানিয়া পল্লীতে বেড়াতে। বেড়ানো আর হয়নি। রাতে রোমান বাহিনী পল্লীতে আক্রমণ করে। লুটতরাজ করে। নারী ও শিশুদের বন্দী করে। তখন বন্দী মানেই দাসত্ব বরণ করে নেওয়া। সুহাইবও বন্দী হলেন। পাঁচ বছর বয়সেই রোমের বাজারে দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে গেলেন।

সুহাইবের নতুন জীবন শুরু হলো। রোমের ভূমিতে তিনি বেড়ে উঠতে লাগলেন। দাস হিসেবে বেড়ে ওঠা-যে জীবনের কেউ খোঁজ রাখেনি। সময় থেমে থাকে না। বছরের পর বছর পার হয়ে গেল। সুহাইব যৌবনে পদার্পণ করেছেন। জন্মেছিলেন আরব পরিবারে। মরুর সন্তান। ভাষা ছিল আরবি। সেটি তিনি এখন আর মনে করতে পারেন না। তবে এক মুহূর্তের জন্য আরবকে ভুলে যাননি। মনে খুব আশা-একদিন দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাবেন। তবে সেই দিন কবে আসবে, জানা নেই। তিনি সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন।

অনিশ্চিত জীবন। কঠিন সময় যাচ্ছে। মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তার বেড়েই চলছে। এর মধ্যে এক খ্রিস্টান ভবিষ্যদ্বক্তার সঙ্গে তার দেখা হলো। তখনকার ভবিষ্যদ্বক্তারা বেশিরভাগই ছিল ভণ্ড। তাদের উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের নিকট থেকে অর্থকড়ি হাতিয়ে নেওয়া। এ লোকটি সেরকম ছিলেন না। তার কথাবার্তায় জ্ঞানের প্রভাব ছিল। তিনি বললেন, 'সে সময় সমাগত যখন জাযীরাতুল আরবের মক্কায় একজন নবী আবির্ভূত হবেন। তিনি ঈসা ইবনে মরিয়মের নবুওয়াতকে সত্যায়িত করবেন এবং মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যাবেন।' এটি অবশ্যই নতুন একটি খবর। এ খবরে সুহাইবের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আরও প্রবল হয়ে ওঠে।

যুবক বয়সে যে কোনো সাধনাই কাজে লেগে যায়। সুহাইবের একটাই সাধনা-একটা মোক্ষম সুযোগ। এ সুযোগে তিনি পালাবেন। দাসত্বের এ শৃঙ্খল তার আর ভালো লাগছে না। সাধনা কাজে দিল। তিনি সুযোগ পেয়ে গেলেন। একদিন ঠিকই মনিবের চোখে ধুলো দিয়ে পালালেন। পালিয়ে সরাসরি মক্কায় চলে এলেন। খ্রিস্টান ভবিষ্যদ্বক্তার কথা ফলবেই। এ আশাই তাকে মক্কায় টেনে আনে।

মক্কায় তিনি নতুন। মাথায় সোনালী চুল। আরবিও ঠিকমতো বলতে পারেন না। মক্কার লোকেরা এই নতুন মানুষটিকে দেখে অবাক হয়। তারা তার নামের শেষে একটা উপাধি জুড়ে দেয়। তার নাম হয়ে ওঠে সুহাইব আর-রুমী। ভাগ্য ছিল সুপ্রসন্ন। মক্কার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। তার সঙ্গে চুক্তি করে তিনিও ব্যবসা শুরু করেন। তিনি দ্রুত ব্যবসায় সফল হয়ে ওঠেন। প্রচুর অর্থ-কড়ির মালিক হন।

ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মধ্যেও সুহাইব সেই খ্রিস্টানের ভবিষ্যবাণী ভুলে যাননি। একদিন তিনি দাসত্ব থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করতেন। এখনো সেই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়নি। এবার মুক্তি দাসত্ব থেকে নয়—অন্ধকার থেকে আলোর সন্ধান করছেন তিনি। কবে আসবেন সেই নবী? অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না। তবে আর বাকিও বেশি ছিল না।

একদিন সফর থেকে ফিরেই মক্কায় একটি শোরগোল শুনতে পেলেন। লোকেরা আলোচনার নতুন বিষয় পেয়েছে। এই নিয়েই শোরগোল হচ্ছে। তিনি শুনলেন, তারা বলছে, 'মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ নবুওয়াত লাভ করেছেন। মানুষকে তিনি এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের আদল ও ইহসানের প্রতি উৎসাহিত করছেন এবং অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখার নির্দেশ দিচ্ছেন। সুহাইবের আনন্দের সীমা থাকে না।'

এই মানুষটির জন্যই তিনি বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করছেন। তবুও তিনি বিষয়টি নিশ্চিত হতে চাইলেন। সুহাইব লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, 'যাকে আল-আমীন বলা হয়, তিনিই কি সেই ব্যক্তি?'
লোকেরা বলল, 'হ্যাঁ।'
'তার বাসস্থান কোথায়?'
'সাফা পাহাড়ের কাছে আল-আরকাম ইবনে আবিল আরকামের বাড়িতে তিনি থাকেন। তবে সতর্ক থেকো, কুরাইশদের কেউ যেন তোমাকে তার কাছে দেখে না ফেলে। যদি তারা তা দেখে, তাহলে তারা তোমার সাথে তেমন আচরণই করবে যেমনটি তারা আমাদের সঙ্গে করে থাকে। তুমি তো ভিনদেশি মানুষ। তোমাকে রক্ষা করার এ শহরে কেউ নেই। তোমার গোত্র-গোষ্ঠীও এখানে নেই।'

সুহাইব এতে বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালেন না। তাকে সেখানে যেতেই হবে। তিনি দারুল আরকামের দিকে রওনা হলেন। গোপনীয়তা রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। পথের শেষ প্রান্তে এসে নিজেকে আর গোপন রাখতে পারলেন না। সামনেই আরেকজনকে দেখা যাচ্ছে। সেও একই পথে হাঁটছে। মানুষটিকে তিনি চেনেন। আম্মার ইবনে ইয়াসির। কিন্তু সে কোথায় যাচ্ছে? কাছে গেলেন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু জিজ্ঞেস করতেও দ্বিধা লাগছে। প্রথমে আম্মারই তাকে প্রশ্ন করলেন, 'কোথায় যাচ্ছ হে?'

সুহাইব প্রশ্নের জবাব প্রশ্ন দিয়েই দিলেন। তিনি বললেন, 'তুমি একা একা কোথায় যাচ্ছ?'
আম্মার বললেন, 'আমি মুহাম্মাদের কাছে যেতে চাই এবং তার কথা শুনতে চাই।'
এ কথা শুনে সুহাইব বললেন, ' আমিও একই উদ্দেশ্যে যাচ্ছি।'

তারপর তারা দুজন একসঙ্গেই দারুল আরকামে প্রবেশ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা শুনলেন। একসঙ্গেই ঈমানের ঘোষণা দিলেন।

সুহাইব ইবনে সিনান আর-রুমী রাযিয়াল্লাহু আনহু তার ইসলামগ্রহণের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। ফলে তাকে কুরাইশদের নিষ্ঠুর অত্যাচারের শিকার হতে হয়। অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে সকল নির্যাতন সহ্য করেন। রাসূলের সঙ্গে হিজরত করার ইচ্ছা থাকলেও তা পারেননি। কুরাইশরা তার পিছু লেগে ছিল, যাতে তিনি তার বিপুল ধন-সম্পদ নিয়ে মক্কা থেকে সরে যেতে না পারেন। অবশেষে দ্বীনের খাতিরে সবকিছু ত্যাগ করে তিনি মদীনায় হিজরত করেন। তিনি ছিলেন অতিথি পরায়ণ ও দানশীল। গরিব দুঃখীর প্রতি ছিলেন দরাযহস্ত। অন্যদিকে সুহাইব ছিলেন দক্ষ তিরন্দাজ। বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহযাত্রী ছিলেন। তার সম্পর্কে উমর রা.-এর অত্যন্ত সুধারণা ছিল। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ওসিয়ত করে যান-সুহাইব তার জানাযার ইমামতি করবেন। শুরার সদস্যবৃন্দ যতক্ষণ নতুন খলীফার নাম ঘোষণা না করবেন, তিনিই খেলাফতের দায়িত্ব পালন করতে থাকবেন। উমর রা.-এর মৃত্যুর পর তিন দিন পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এ দায়িত্ব পালন করেন। হিজরী ৩৮ সনে ৭২ বছর বয়সে তিনি মদীনায় ইন্তেকাল করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00