📘 সাহাবীদের ইসলামগ্রহণের গল্প > 📄 আবু সুফিয়ান রা.-এর

📄 আবু সুফিয়ান রা.-এর


মক্কায় ইসলামের ঘোরতর শত্রুদের একজন ছিলেন আবু সুফিয়ান। কুরাইশদের প্রসিদ্ধ এই নেতা ইসলামকে ধ্বংস করতে তার চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেননি। মুসলিমদের বিরুদ্ধে সকল যুদ্ধ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামায় তিনি ছিলেন অগ্রনী। গত বিশ বছর ধরে তিনি ইসলামের শত্রুতা করে আসছেন। আল্লাহ তার ভাগ্যকেও সুপ্রসন্ন করেছেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তবে তার ইসলামগ্রহণের ঘটনা সহজ ছিল না।

হিজরতের অষ্টম বছর। এ বছর রমাযান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দশ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা-বিজয় অভিযানে বের হন। এক সময় তারা মক্কার কাছাকাছি মাররুয যাহরানে এসে পৌঁছেন। তখন সূর্য ডুবে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানেই যাত্রাবিরতি করেন। মুসলিম বাহিনীকে বিশ্রাম নিতে নির্দেশ দেন। এর সঙ্গে তার আরেকটি নির্দেশ ছিল: প্রত্যেক সাহাবীকে কাঠ সংগ্রহ করে নিজ অবস্থানে আগুন জ্বালাতে বলেন।

কুরাইশরা এ অভিযানের কিছুই টের পায়নি। কিছুদিন আগে বনু খুযাআর ঘটনায় মক্কায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে আবু সুফিয়ান মদীনায় গিয়ে মুসলিমদের হুদাইবিয়ার চুক্তির ব্যাপারে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে। এ আশ্বস্ততায় কেউ কান দেয়নি। চুক্তি একবার ভঙ্গ করলে সেটি আর বহাল থাকে না। আবু সুফিয়ান কার্যত ব্যর্থ হয়েছেন। এখন দীর্ঘদিন যাবত মদীনা থেকে কোনো খবরও পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য মক্কার কুরাইশরা আরও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছে। পরিশেষে তারা আবু সুফিয়ান এবং হাকিম ইবনে হিযামকে মদীনার দিকে পাঠাতে সিদ্ধান্ত নিল। তারা বলল, 'যদি তোমরা মুহাম্মাদের সাক্ষাৎ লাভ করো, তাহলে আমাদের জন্য নিরাপত্তা চাইবে।' দুই বন্ধু মদীনার পথে রওনা হলেন। মরুভূমির বিশাল পথ। পথের ক্লান্তি থেকে তাদের মনে ভিন্ন কৌতূহল কাজ করছে। তারা মুসলিমদের করুণা ভিক্ষা করতে যাচ্ছে। ব্যাপারটি সত্যিই অদ্ভুত। কিছুতেই তাদের দমন করা গেল না। উল্টো তারাই এখন ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের মালিক বনে গেছে। তাদের করুণা ছাড়া মক্কায় বেঁচে থাকাও মুশকিল হয়ে পড়েছে। তারা মক্কা আক্রমণ করলে সব ছারখার করে দেবে।

বেলা প্রায় ডুবে যাচ্ছে। এর মধ্যে পথে তারা বুদাইল ইবনে ওয়ারকার দেখা পেল। তাকেও তারা সঙ্গে নিল। এখন তারা তিনজন। পথ চলতে চলতে মাররুয যাহরান এলাকায় এসে পৌঁছল। ইতোমধ্যে চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে তাদের দৃষ্টি আটকে গেল। হাজার হাজার তাঁবু আর অগ্নিশিখা দেখা যাচ্ছে। দূর থেকে সমুদ্রের মতো বিশাল মনে হচ্ছে কাফেলাটাকে। কারা এরা?

আবু সুফিয়ানের আগমনের কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জেনে গেছেন। তিনি সাহাবীদের ডেকে দ্রুত তাকে ধরার নির্দেশ দিলেন। আবু সুফিয়ান যে এখন 'আরাক' অঞ্চলে অবস্থান করছেন, সেটিও তাদের বললেন। আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীরা মুসলিম বাহিনীর বিশাল কাফেলার সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করছে। কিছু টের পাওয়ার আগেই তারা হঠাৎ করে বন্দী হয়ে পড়েন। ঘটনার আকস্মিকতায় তাদের কিছু করারও ছিল না। এখন তাদের উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আবু সুফিয়ানের গ্রেপ্তারের সংবাদ পেয়েই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুশি হয়ে উঠলেন। তিনি দ্রুত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ছুটলেন। এদিকে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বিপদ আঁচ করতে পারলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু সুফিয়ানকে সময় দিতে চাচ্ছেন না। দ্রুত কিছু একটা করে ফেলতে চান। রাসূলের অনুমতি ছাড়া করতেও পারছেন না। কিন্তু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই তাই আবু সুফিয়ানকে একটু সময় দিতে চান। হয়তো মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা এবং নিজের অসহায়ত্ব বুঝে আবু সুফিয়ান ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নেবে। তিনিও দ্রুত রাসূলের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।

আবু সুফিয়ানের সামনে সকল পথই রুদ্ধ হয়ে গেছে এবং এখন এর বিকল্প কিছু নেই; আবু সুফিয়ান, মক্কার বিশাল প্রতাপশালী নেতা এখন নতুন জীবনে প্রবেশ করছেন। দীর্ঘ আলাপচারিতার পর অবশেষে তার ঠোঁট থেকে এ বাক্যগুলো শোনা গেল: 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।'

আবু সুফিয়ান ছিলেন সর্দার মানুষ। জাহেলী যুগের সর্দার মানেই সকল অপকর্মের নেতা। শয়তান তাকে এত সহজে ছাড়ল না। সে তাকে প্ররোচনা দিতে লাগল। এ প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তার মাথা বিগড়ে গেল। তিনি আশেপাশের গোত্রের সহযোগিতায় রাসূলকে আক্রমণ করার চিন্তা শুরু করেন। আর তখনই তিনি তার কাঁধে একটি হাতের উপস্থিতি টের পান। তিনি শুনতে পান: 'তাহলে আল্লাহ তোমাকে চরম অপমানিত করবেন এবং আমরা আবার বিজয় লাভ করব।'

আবু সুফিয়ান পাশ ফিরে তাকাতেই দেখেন স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে আছেন। আর তার কাঁধে রাসূলেরই হাত। তার অন্তরের কথা অন্য কারও তো জানার কথা নয়! এটি নিশ্চয়ই আল্লাহ তার রাসূলকে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি মুহূর্তেই শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্তি পেয়ে গেলেন এবং বলে উঠলেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল। আমি আল্লাহর নিকট তাওবা করছি, আমি তার নিকট আমার অপরাধের ক্ষমা চাচ্ছি! আমি আপনার নবুওয়াতের ব্যাপারে সন্দিহান ছিলাম, আমি বিষয়টি নিয়ে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করছিলাম—এখন সব সন্দেহ দূর হয়ে গেছে! আল্লাহর কসম, আমার অন্তরে যা উদয় হয়েছিল, তা ছিল শয়তানের ওয়াসাওয়াসা এবং আমার জাগতিক অন্তরের দুর্বলতা!' তখন থেকেই তিনি পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করলেন।

ইসলামগ্রহণের পর আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস রাযিয়াল্লাহু আনহু অতীত জীবনের জন্য অনুশোচনায় জর্জরিত হয়েছেন। পরবর্তী জীবনে রাত-দিন শুধু কুরআন তিলাওয়াত, কুরআনের বিধি-বিধান ও উপদেশাবলী অনুধাবনে অতিবাহিত করতেন। ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগে তিনি ইন্তেকাল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আবু সুফিয়ান জান্নাতের অধিবাসী যুবকদের নেতা।' (আল-ইসাবা, ৪/৯০)

📘 সাহাবীদের ইসলামগ্রহণের গল্প > 📄 তুফাইল ইবনে আমর রা.

📄 তুফাইল ইবনে আমর রা.


ইয়েমেন-মক্কা থেকে সাতশ মাইল দূরে একটি দেশ। এ দেশের একটি শক্তিশালী গোত্রের নাম দাওস। এ গোত্রের সর্দার হচ্ছেন তুফাইল। জাহেলী যুগে বিবেক, ব্যক্তিত্ব কিংবা বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা হতো না বললেই চলে। এর মধ্যেও কিছু মানুষ ব্যতিক্রম ছিলেন। তাদের তীক্ষ্ণমেধা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও আত্মমর্যাদাবোধের সবাই প্রশংসা করত। তাদের মধ্যে তুফাইল অন্যতম। তিনি ভাষা-পণ্ডিতও ছিলেন। কাব্য প্রতিভা ছিল তার সহজাত বৈশিষ্ট্য। সর্দার হিসেবে মানুষের দুঃখ-কষ্ট বুঝতেন এবং সাহায্য করতেন। মেহমানদের জন্য তার বাড়ি ছিল সরাইখানা-রাত-দিন কখনো চুলো থেকে হাঁড়ি নামত না।

তুফাইল ব্যবসায়ী ছিলেন। এজন্য প্রায়ই তার মক্কায় আসা-যাওয়া করতে হতো। একবার তিনি মক্কায় এলেন। এসেই নতুন এক বিপদে পড়লেন। এ বিপদ সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। ইতোমধ্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত লাভ করেছেন। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছেন। আর মুশরিক কুরাইশরা চরমভাবে এর বিরোধিতা করছে। তুফাইল এমন এক সময় মক্কায় এসে পৌঁছেছেন-যখন এ বিরোধ সবচেয়ে মারত্মক আকার ধারণ করেছে। কুরাইশরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে গড়ে তুলেছে। তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা-চৌকি স্থাপন করেছে। এসব চৌকির লোকজনের কাজ হচ্ছে, শহরের বাইরে থেকে আসা বণিকদের মুহাম্মাদ সম্পর্কে সতর্ক করা। তারা তুফাইলেরও গতিরোধ করে। তারা প্রথমে তার সঙ্গে উত্তম আচরণ করে। সর্বোত্তম সম্ভাষণে স্বাগত জানায় এবং আতিথেয়তার প্রস্তাব দেয়।

তুফাইলের কাছে কুরাইশদের এ আচরণ অদ্ভুত লাগে। মক্কার পরিস্থিতি সম্পর্কে তার জানা ছিল না। পরে নেতৃবৃন্দের কথায় পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন। তারা তাকে বলে, 'হে তুফাইল, আপনি আমাদের শহরে এসেছেন-স্বাগত! আমাদের মধ্যে আপনি এই লোকটি-যে নিজেকে নবী বলে দাবি করে, সে আমাদের জীবন-সংসার কী এক মায়াজালে পেঁচিয়ে বড় কঠিন করে ফেলেছে। আমাদের ঐক্যের সকল রজ্জুকে সে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। সে আমাদের সাজানো-গোছানো সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। তার সকল কথাবার্তা জাদুর মতো। তা ছেলে ও পিতা মধ্যে, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে, ভাই ও বোনের মধ্যে বিরোধের প্রাচীর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমরা ভয় পাচ্ছি, আপনার নিজের ও কওমেরও না-জানি আমাদের দশা হয়! তাই সাবধান! আপনি তার সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না। তার কোনো কথাও আপনি শুনতে যাবেন না।'

মক্কার কুরাইশদের এ প্রচেষ্টায় তুফাইল খুব অবাক হলেন। একটা মানুষকে নিয়ে এত হইচইয়ের কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না। তবে লোকটি নিশ্চিতভাবেই খুব প্রভাবশালী। তা না হলে তাকে ঠেকাতে কুরাইশদের বড় বড় নেতারা এত মরিয়া হয়ে উঠত না। ব্যাপারটিকে এখন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। ভয়ও লাগছে। অহেতুক কোনো ঝামেলায় তিনি পড়তে চান না।

তুফাইল মক্কায় এসে কাবা তাওয়াফ করতেন। সেখানে রক্ষিত মূর্তিসমূহের পূজাও করতেন। এবারও এজন্য কাবা-চত্বরের দিকে রওনা হলেন। তবে রওনা হওয়ার আগে তিনি সতর্কতা অবলম্বন করলেন। কানে ভালো করে তুলো ভরে নিলেন—যাতে কোনোভাবেই মুহাম্মাদের কথা কানে না আসে।

তিনি যা আশঙ্কা করেছিলেন, তা-ই হলো। কাবা-চত্বরে ঢুকতেই দূর থেকে মুহাম্মাদকে দেখতে পেলেন। তিনি কাবা-চত্বরের পাশে নামায পড়ছেন। তার নামায দেখেই তুফাইল আকৃষ্ট হয়ে গেলেন। এ তো তাদের নামাযের মতো নয়। তুফাইলের মনে ঝড় বয়ে গেল। তার আরও কাছে যেতে ইচ্ছে হলো। ইচ্ছেটাকে আটকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। তিনি এক পা, দু'পা করে এগিয়ে গেলেন। কানে তুলো দিয়ে বাইরের শব্দ একটু কমানো যায়; পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। তুফাইলের কানে সেই তিলাওয়াত ভেসে আসে। তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা শুনতে থাকেন। এতে তিনি ভীষণভাবে আলোড়িত হন। তিনি মনে মনে চিন্তা করতে লাগলেন: 'আমি কেন আমার কান বন্ধ করে আছি? আমি আরবের এত বড় একজন বিচক্ষণ কবি! আর আমি কিনা বুঝব না কোনটি ভালো আর কোনটা মন্দ? তবে এই লোকটির কথা শুনতে সমস্যা কোথায়? যদি তার কথা ভালো হয় তাহলে তা গ্রহণ করব। আর যদি মন্দ হয় তবে দূরে ছুড়ে ফেলে দেব।'

বিষয়টি মোটেও মন্দ নয়। তিনি তা ছুঁড়ে দিতেও পারলেন না। বরং গভীর আকর্ষণে উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন। রাসূল নামায শেষে বাড়ির পথ ধরেছেন। তুফাইল তাঁকে অনুসরণ করছেন। অদ্ভুত ঘটনা। তুফাইল নিজেও আশ্চর্য না হয়ে পারলেন না। ঐশী নির্দেশ না হলে এরকম ঘটনা পৃথিবীতে ঘটে না। রাসূল ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর সঙ্গে তুফাইলও। এই প্রথম তিনি রাসূলের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেলেন। তিনি বললেন, হে মুহাম্মাদ, আপনার কাওমের লোকেরা আপনার সম্পর্কে আমাকে এসব কথা বলেছে। তারা আপনার সম্পর্কে এত ভয় দেখিয়েছে যে, আপনার কোনো কথা যাতে আমার কানে না ঢুকতে পারে, সেজন্য আমি কানে তুলো ভরে নিয়েছি। তা সত্ত্বেও আল্লাহ আপনার কিছু কথা না শুনিয়ে ছাড়লেন না। যা শুনেছি, ভালোই মনে হয়েছে। আপনি আমার নিকট ইসলামকে তুলে ধরুন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব আনন্দিত হলেন। তিনি তাঁর নিকট ইসলামের সৌন্দর্য বর্ণনা করলেন এবং তারপর কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালেন। এটি ছিল সবচেয়ে চমৎকার ও শৈল্পিক অভিব্যক্তি—যা ইতিপূর্বে তুফাইল কখনো শোনেনি! ওই দিন পর্যন্ত এর সৌন্দর্যের কাছাকাছিও কিছু তিনি পাননি। তিনি সেখানেই আল্লাহর একত্ববাদের কথা ঘোষণা করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইসলামগ্রহণের পর তুফাইল রা. নিজের গোত্রে ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে তিনি রাসূলের খেদমতে দাওস কবীলার আশিটি পরিবার নিয়ে হাজির হন। এতে রাসূল সা. খুব খুশি হন। তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহ আনহুর শাসনামলে রিদ্দার যুদ্ধে শাহাদাতবরণ করেন।

📘 সাহাবীদের ইসলামগ্রহণের গল্প > 📄 যিমাদ আযদী রা.

📄 যিমাদ আযদী রা.


যিমাদ আযদী-ইয়েমেনের বাসিন্দা। আযাদ শানুআ গোত্রের সন্তান। ঝাড়-ফুঁক করেই জীবিকা অর্জন করতেন। একবার এক কাজে তিনি মক্কায় আগমন করেন। মক্কায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই কিছু মূর্খ লোক তাকে ঘিরে ধরে। তিনি কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা তাকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করার পরামর্শ দেয় এবং বলে, ‘নিশ্চয় মুহাম্মাদ জ্বিনগ্রস্ত লোক!’

এ কথা শুনে যিমাদ খুশিই হন। তার চেহারায় হাসির দ্যুতি ফুটে ওঠে। উপস্থিত মূর্খরা এর কোনো কারণ খুঁজে পেল না। তিনি মনে মনে বললেন, ‘আমার অবশ্যই এই লোকের নিকট যাওয়া উচিত। সম্ভবত আল্লাহ আমার হাতে লোকটিকে ভালো করে দেবেন।’

একদিন তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। কোনো ভূমিকা ছাড়াই যিমাদ বললেন, ‘হে মুহাম্মাদ, আমি তো জ্বিনগ্রস্তদের ঝাড়-ফুঁক করি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, আমার হাতে সুস্থ করেন। আপনার কি ঝাড়-ফুঁক লাগবে?’

রাসূলের সঙ্গে তার কোনো পূর্ব পরিচয় নেই। কোনো পরিচয় পর্ব ছাড়া এভাবে কেউ কথা বলে না। জ্বিনগ্রস্ত লোকের সঙ্গে এ পর্বের কোনো প্রয়োজনও মনে করেননি যিমাদ। তিনি ধরেই নিয়েছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিনগ্রস্ত। তিনি তাকে এমন এক প্রস্তাব দিয়েছেন, যা সত্যিই অদ্ভুত। তার জন্যই আসলে ঝাড়-ফুঁক বেশি দরকার। সেটি কীভাবে করতে হয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে ভালো করেই জানেন। তিনি যিমাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য; আমি কেবল তাঁরই প্রশংসা করি, আর তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তিনি যাকে হেদায়েতের পথ দেখান তাকে পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা কারও নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই; তার কোনো শরীক নেই; আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।'

যিমাদ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এ কী কথা শুনছেন তিনি! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো আরও কিছু বলতেন। কিন্তু যিমাদ তাকে বাধা দিয়ে বললেন, 'আপনি কথাগুলো আবার বলুন। ওগুলোর প্রভাব তো গভীর সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার নয়; বরং তিনবার বললেন। বিস্ময়ে অধীর হয়ে যিমাদ বলে উঠলেন, 'জীবনে আমি বহু জ্যোতিষী, জাদুকর ও কবির কথা শুনেছি। কিন্তু আপনার কথার মতো কথা কোনোদিন শুনিনি। এ অনুভূতির প্রকাশ ও সৌন্দর্য অনিঃশেষ সমুদ্রের গভীরতার মতো! আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। আমি আপনার হাতে বাইআত হব।' তার দিকে রাসূলের পবিত্র হাত সম্প্রসারিতই ছিল। যিমাদ তখনই মুসলমান হয়ে গেলেন।

যিমাদ আযদী-ইয়েমেনের বাসিন্দা। আযাদ শানুআ গোত্রের সন্তান। ঝাড়-ফুঁক করেই জীবিকা অর্জন করতেন। একবার এক কাজে তিনি মক্কায় আগমন করেন। মক্কায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই কিছু মূর্খ লোক তাকে ঘিরে ধরে। তিনি কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা তাকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করার পরামর্শ দেয় এবং বলে, ‘নিশ্চয় মুহাম্মাদ জ্বিনগ্রস্ত লোক!’

এ কথা শুনে যিমাদ খুশিই হন। তার চেহারায় হাসির দ্যুতি ফুটে ওঠে। উপস্থিত মূর্খরা এর কোনো কারণ খুঁজে পেল না। তিনি মনে মনে বললেন, ‘আমার অবশ্যই এই লোকের নিকট যাওয়া উচিত। সম্ভবত আল্লাহ আমার হাতে লোকটিকে ভালো করে দেবেন।’

একদিন তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। কোনো ভূমিকা ছাড়াই যিমাদ বললেন, ‘হে মুহাম্মাদ, আমি তো জ্বিনগ্রস্তদের ঝাড়-ফুঁক করি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, আমার হাতে সুস্থ করেন। আপনার কি ঝাড়-ফুঁক লাগবে?’

রাসূলের সঙ্গে তার কোনো পূর্ব পরিচয় নেই। কোনো পরিচয় পর্ব ছাড়া এভাবে কেউ কথা বলে না। জ্বিনগ্রস্ত লোকের সঙ্গে এ পর্বের কোনো প্রয়োজনও মনে করেননি যিমাদ। তিনি ধরেই নিয়েছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিনগ্রস্ত। তিনি তাকে এমন এক প্রস্তাব দিয়েছেন, যা সত্যিই অদ্ভুত। তার জন্যই আসলে ঝাড়-ফুঁক বেশি দরকার। সেটি কীভাবে করতে হয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে ভালো করেই জানেন। তিনি যিমাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য; আমি কেবল তাঁরই প্রশংসা করি, আর তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তিনি যাকে হেদায়েতের পথ দেখান তাকে পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা কারও নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই; তার কোনো শরীক নেই; আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।'

যিমাদ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এ কী কথা শুনছেন তিনি! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো আরও কিছু বলতেন। কিন্তু যিমাদ তাকে বাধা দিয়ে বললেন, 'আপনি কথাগুলো আবার বলুন। ওগুলোর প্রভাব তো গভীর সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার নয়; বরং তিনবার বললেন। বিস্ময়ে অধীর হয়ে যিমাদ বলে উঠলেন, 'জীবনে আমি বহু জ্যোতিষী, জাদুকর ও কবির কথা শুনেছি। কিন্তু আপনার কথার মতো কথা কোনোদিন শুনিনি। এ অনুভূতির প্রকাশ ও সৌন্দর্য অনিঃশেষ সমুদ্রের গভীরতার মতো! আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। আমি আপনার হাতে বাইআত হব।' তার দিকে রাসূলের পবিত্র হাত সম্প্রসারিতই ছিল। যিমাদ তখনই মুসলমান হয়ে গেলেন।

📘 সাহাবীদের ইসলামগ্রহণের গল্প > 📄 আবুল আস ইবনে রাবী রা.

📄 আবুল আস ইবনে রাবী রা.


মক্কায় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক পাওয়া দুষ্কর। অপকর্মে ডুবে থাকলে মানুষের ব্যক্তিত্ব থাকে না। মানুষের বিবেক-বুদ্ধিও কাজ করে না। এর মধ্যে ব্যতিক্রমী যুবক আবুল আস। বংশগৌরব, বীরত্ব এবং ব্যক্তিত্বে অনন্য। ব্যবসায়ী মানুষ। মক্কা ও শামে সব সময় তার বাণিজ্যিক কাফেলা চলতই। এসব কাফেলায় কম করে হলেও একশ উট থাকত। আর লোকবল থাকত দুশো। তার সততা ও আমানতদারীর প্রশংসা করত সবাই। এজন্য ব্যবসায়ে উন্নতি করতে তার সময় বেশি লাগেনি। আর সেটি ক্রমাগত বেড়েই চলছে।

তিনি ছিলেন খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার ভাতিজা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াতের আগেই যায়নাবকে তার সঙ্গে বিয়ে দেন। তারপর যখন নবুওয়াত লাভ করেন, তখন আবুল আস স্বধর্মেই বহাল থাকেন। ইসলামে তখনো বিধর্মীর সাথে বিবাহ হারাম না হওয়ায় তাদের সংসার টিকে গেল। তবে বেশিদিন এ অবস্থা থাকল না। বদর-যুদ্ধের পর অবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেল।

আবুল আস বদর-যুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষে ছিলেন। যুদ্ধে বেঁচে গেলেও বন্দী হলেন। মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তিও পেয়ে গেলেন। তবে তার মুক্তিপণের ঘটনা খুব করুণ। তার প্রতি মহীয়সী নারী যায়নাবের ভালোবাসা ছিল অনেক। তিনি তার স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে অর্থকড়ি না পাঠিয়ে নিজের গলার একটি হার পাঠালেন। এ হার দেখেই রাসূলের হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। এটি তার প্রয়াত স্ত্রী খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার। যায়নাবের বিয়ের সময় তিনিই তার মেয়েকে এ হারটি দিয়েছিলেন। খাদিজার চেহারা মানসপটে ভেসে উঠলে রাসূল অন্যরকম হয়ে যেতেন। তার চোখ ছলছল করে উঠত। এই বুঝি অশ্রুর প্লাবন শুরু হবে। হারটি দেখেই তিনি চেহারা ঢেকে ফেলেন। রাসূলের আবেগ খুব কমই চোখে পড়ত। এটি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ছিল তার। এই এক জায়গায় তার ভালোবাসা বাধ মানত না। তিনি তার প্রিয় সাহাবীদের বললেন, 'তোমরা যদি চাও তাহলে যায়নাবের স্বামীকে মুক্ত করে দিতে পার এবং এ হারও তাকে ফিরিয়ে দিতে পার।' আহ! এরকম অনুরোধ অন্য কারও ব্যাপারে করেছেন কি না জানা নেই। এতে আবুল আস যত না উপলক্ষ, তার চেয়ে বেশি ছিল সেই হার।

আবুল আস মুক্তি পেয়ে গেলেন। মক্কায় যাওয়ার আগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কানে কানে কিছু একটা বললেন। কি বলেছেন, কেউ শোনেনি। কিন্তু এতে আবুল আস সক্রিয় হয়ে ওঠেন। মক্কায় গিয়েই স্ত্রীকে মদীনায় পাঠিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত তাদের বিবাহ টিকল না। ইসলামে নতুন বিধান চালু হয়েছে। মুশরিকদের সাথে আর কোনোদিন কোনো মুসলিম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। যায়নাব মদীনায় এলেন। তবে তার আসার পথটা ছিল কঠিন। মক্কার মুশরিকরা বাধা দিল। এতে তিনি আহত হলেন। অন্তঃসত্ত্বা থাকাতে তার গর্ভপাত হয়ে গেল। আমৃত্যু তিনি এই যাতনা সহ্য করেন।

সময় যায়। আবুল আসের এখন নিঃসঙ্গ জীবন। যায়নাব অনেক অনুনয়-বিনয় করেও স্বামীকে মদীনায় আনতে পারেননি। দুজন দুপ্রান্তে একাকী জীবন কাটাচ্ছেন। এ দূরত্ব যেন কাছে টানারই আবহ সৃষ্টি করল। কয়েকবছর পর তারা আবার পরস্পরের দেখা পেলেন। তবে এবার ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

মক্কা বিজয়ের আগের ঘটনা। একবার কুরাইশদের একটা বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে আবুল আস সিরিয়া যান। সেখান থেকে জিনিস-পত্র কিনে মক্কায় ফিরছিলেন। কাফেলাটি যখন মদীনার কাছাকাছি পৌঁছে, তখন মুসলমানরা খবর পেয়ে এ কাফেলার সবাইকে বন্দি করে মদীনায় নিয়ে আসে। আবুল আসকে মুসলমান হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তাতে অস্বীকৃতি জানান। যায়নাব রাযিয়াল্লাহু আনহা আবুল আসের খবর পেয়ে দৌড়ে মসজিদে এসে ঘোষণা করলেন, 'হে লোকসকল, আমি আবুল আসকে নিরাপত্তা দিয়েছি।'

এ নিরাপত্তায় তখন বাধা দেওয়ার সুযোগ ছিল না। কোনো মুসলিম কাউকে নিরাপত্তা দিলে সেটি কার্যকর করা হতো। যায়নাব যে আবুল আসের নিরাপত্তা দিয়েছেন, বিষয়টি রাসূলও জানতেন না। সকালে ফজরের নামাযের পর ঘটনাটি জানাজানি হয়। সাহাবীরাও মেনে নেন। এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবুল আসের জন্য সাহাবীদের বিশেষ অনুরোধ করলেন। তিনি বললেন, 'কোনো সন্দেহ নেই যে, তোমরা পুরো ঘটনা জানো। তোমরা তার বাণিজ্য-সম্ভার তাকে ফেরত দিতে পার এবং তাকে ছেড়ে দিতে পার। এটা আমি পছন্দ করি। আর যদি তোমরা চাও তাহলে তার সম্পদ নিয়ে নিতে পার এবং ব্যবহারও করতে পার। এটা যেহেতু গনীমতের মাল, এজন্য তোমাদের সে অধিকার আছে।'

সাহাবীরা তো রাসূলের সন্তুষ্টিতেই জীবনের সফলতা খুঁজতেন। তারা রাজি হয়ে গেলেন। তখন অবশ্য কেউ কেউ আবুল আসকে ইসলামগ্রহণ করে মক্কাবাসীদের এই মালামালসহ মদীনায় থেকে যাওয়ার পরামর্শও দেন। আবুল আস তখন জবাব দিলেন, 'আমি আমার নতুন জীবন শঠতার মাধ্যমে শুরু করতে পারি না।' তিনি মালামালসহ মক্কায় ফিরে গেলেন।

আবুল আস মক্কায় পৌঁছে এক এক করে সবাইকে তাদের মাল বুঝিয়ে দিলেন। তারপর তিনি বললেন, 'হে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা, আমার কাছে তোমাদের আর কোনো পাওনা আছে কি?' তারা বলল, 'না। আমরা তোমাকে খুব ভালো প্রতিশ্রুতি পালনকারী হিসেবে পেয়েছি।' আবুল আস বললেন, 'আমি তোমাদের হক পূর্ণরূপে আদায় করেছি। এখন আমি ঘোষণা দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার বান্দা ও রাসূল। আমাকে যে জিনিস এতদিন পর্যন্ত এ ঘোষণা দেওয়া থেকে বিরত রেখেছে সেটা হলো, তোমরা ধারণা করতে আমি তোমাদের মাল আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই এমন করেছি। আল্লাহ আমাকে তোমাদের মাল ফিরিয়ে দেয়ার তাওফীক দিয়েছেন। তোমাদের আর কোনো কিছুই আমার কাছে নেই। এখন আমি মুসলমান হয়ে গেছি।'

আবুল আস মক্কা এবং মক্কাবাসীদেরকে বিদায় জানিয়ে সরাসরি মদীনায় চলে আসেন। তিনি মসজিদে নববীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেখানেই নিজের ঈমান এবং রাসূলের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের ঘোষণা দেন।

মক্কায় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক পাওয়া দুষ্কর। অপকর্মে ডুবে থাকলে মানুষের ব্যক্তিত্ব থাকে না। মানুষের বিবেক-বুদ্ধিও কাজ করে না। এর মধ্যে ব্যতিক্রমী যুবক আবুল আস। বংশগৌরব, বীরত্ব এবং ব্যক্তিত্বে অনন্য। ব্যবসায়ী মানুষ। মক্কা ও শামে সব সময় তার বাণিজ্যিক কাফেলা চলতই। এসব কাফেলায় কম করে হলেও একশ উট থাকত। আর লোকবল থাকত দুশো। তার সততা ও আমানতদারীর প্রশংসা করত সবাই। এজন্য ব্যবসায়ে উন্নতি করতে তার সময় বেশি লাগেনি। আর সেটি ক্রমাগত বেড়েই চলছে।

তিনি ছিলেন খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার ভাতিজা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াতের আগেই যায়নাবকে তার সঙ্গে বিয়ে দেন। তারপর যখন নবুওয়াত লাভ করেন, তখন আবুল আস স্বধর্মেই বহাল থাকেন। ইসলামে তখনো বিধর্মীর সাথে বিবাহ হারাম না হওয়ায় তাদের সংসার টিকে গেল। তবে বেশিদিন এ অবস্থা থাকল না। বদর-যুদ্ধের পর অবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেল।

আবুল আস বদর-যুদ্ধে মুশরিকদের পক্ষে ছিলেন। যুদ্ধে বেঁচে গেলেও বন্দী হলেন। মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তিও পেয়ে গেলেন। তবে তার মুক্তিপণের ঘটনা খুব করুণ। তার প্রতি মহীয়সী নারী যায়নাবের ভালোবাসা ছিল অনেক। তিনি তার স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে অর্থকড়ি না পাঠিয়ে নিজের গলার একটি হার পাঠালেন। এ হার দেখেই রাসূলের হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। এটি তার প্রয়াত স্ত্রী খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার। যায়নাবের বিয়ের সময় তিনিই তার মেয়েকে এ হারটি দিয়েছিলেন। খাদিজার চেহারা মানসপটে ভেসে উঠলে রাসূল অন্যরকম হয়ে যেতেন। তার চোখ ছলছল করে উঠত। এই বুঝি অশ্রুর প্লাবন শুরু হবে। হারটি দেখেই তিনি চেহারা ঢেকে ফেলেন। রাসূলের আবেগ খুব কমই চোখে পড়ত। এটি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ছিল তার। এই এক জায়গায় তার ভালোবাসা বাধ মানত না। তিনি তার প্রিয় সাহাবীদের বললেন, 'তোমরা যদি চাও তাহলে যায়নাবের স্বামীকে মুক্ত করে দিতে পার এবং এ হারও তাকে ফিরিয়ে দিতে পার।' আহ! এরকম অনুরোধ অন্য কারও ব্যাপারে করেছেন কি না জানা নেই। এতে আবুল আস যত না উপলক্ষ, তার চেয়ে বেশি ছিল সেই হার।

আবুল আস মুক্তি পেয়ে গেলেন। মক্কায় যাওয়ার আগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কানে কানে কিছু একটা বললেন। কি বলেছেন, কেউ শোনেনি। কিন্তু এতে আবুল আস সক্রিয় হয়ে ওঠেন। মক্কায় গিয়েই স্ত্রীকে মদীনায় পাঠিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত তাদের বিবাহ টিকল না। ইসলামে নতুন বিধান চালু হয়েছে। মুশরিকদের সাথে আর কোনোদিন কোনো মুসলিম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। যায়নাব মদীনায় এলেন। তবে তার আসার পথটা ছিল কঠিন। মক্কার মুশরিকরা বাধা দিল। এতে তিনি আহত হলেন। অন্তঃসত্ত্বা থাকাতে তার গর্ভপাত হয়ে গেল। আমৃত্যু তিনি এই যাতনা সহ্য করেন।

সময় যায়। আবুল আসের এখন নিঃসঙ্গ জীবন। যায়নাব অনেক অনুনয়-বিনয় করেও স্বামীকে মদীনায় আনতে পারেননি। দুজন দুপ্রান্তে একাকী জীবন কাটাচ্ছেন। এ দূরত্ব যেন কাছে টানারই আবহ সৃষ্টি করল। কয়েকবছর পর তারা আবার পরস্পরের দেখা পেলেন। তবে এবার ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

মক্কা বিজয়ের আগের ঘটনা। একবার কুরাইশদের একটা বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে আবুল আস সিরিয়া যান। সেখান থেকে জিনিস-পত্র কিনে মক্কায় ফিরছিলেন। কাফেলাটি যখন মদীনার কাছাকাছি পৌঁছে, তখন মুসলমানরা খবর পেয়ে এ কাফেলার সবাইকে বন্দি করে মদীনায় নিয়ে আসে। আবুল আসকে মুসলমান হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তাতে অস্বীকৃতি জানান। যায়নাব রাযিয়াল্লাহু আনহা আবুল আসের খবর পেয়ে দৌড়ে মসজিদে এসে ঘোষণা করলেন, 'হে লোকসকল, আমি আবুল আসকে নিরাপত্তা দিয়েছি।'

এ নিরাপত্তায় তখন বাধা দেওয়ার সুযোগ ছিল না। কোনো মুসলিম কাউকে নিরাপত্তা দিলে সেটি কার্যকর করা হতো। যায়নাব যে আবুল আসের নিরাপত্তা দিয়েছেন, বিষয়টি রাসূলও জানতেন না। সকালে ফজরের নামাযের পর ঘটনাটি জানাজানি হয়। সাহাবীরাও মেনে নেন। এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবুল আসের জন্য সাহাবীদের বিশেষ অনুরোধ করলেন। তিনি বললেন, 'কোনো সন্দেহ নেই যে, তোমরা পুরো ঘটনা জানো। তোমরা তার বাণিজ্য-সম্ভার তাকে ফেরত দিতে পার এবং তাকে ছেড়ে দিতে পার। এটা আমি পছন্দ করি। আর যদি তোমরা চাও তাহলে তার সম্পদ নিয়ে নিতে পার এবং ব্যবহারও করতে পার। এটা যেহেতু গনীমতের মাল, এজন্য তোমাদের সে অধিকার আছে।'

সাহাবীরা তো রাসূলের সন্তুষ্টিতেই জীবনের সফলতা খুঁজতেন। তারা রাজি হয়ে গেলেন। তখন অবশ্য কেউ কেউ আবুল আসকে ইসলামগ্রহণ করে মক্কাবাসীদের এই মালামালসহ মদীনায় থেকে যাওয়ার পরামর্শও দেন। আবুল আস তখন জবাব দিলেন, 'আমি আমার নতুন জীবন শঠতার মাধ্যমে শুরু করতে পারি না।' তিনি মালামালসহ মক্কায় ফিরে গেলেন।

আবুল আস মক্কায় পৌঁছে এক এক করে সবাইকে তাদের মাল বুঝিয়ে দিলেন। তারপর তিনি বললেন, 'হে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা, আমার কাছে তোমাদের আর কোনো পাওনা আছে কি?' তারা বলল, 'না। আমরা তোমাকে খুব ভালো প্রতিশ্রুতি পালনকারী হিসেবে পেয়েছি।' আবুল আস বললেন, 'আমি তোমাদের হক পূর্ণরূপে আদায় করেছি। এখন আমি ঘোষণা দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার বান্দা ও রাসূল। আমাকে যে জিনিস এতদিন পর্যন্ত এ ঘোষণা দেওয়া থেকে বিরত রেখেছে সেটা হলো, তোমরা ধারণা করতে আমি তোমাদের মাল আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই এমন করেছি। আল্লাহ আমাকে তোমাদের মাল ফিরিয়ে দেয়ার তাওফীক দিয়েছেন। তোমাদের আর কোনো কিছুই আমার কাছে নেই। এখন আমি মুসলমান হয়ে গেছি।'

আবুল আস মক্কা এবং মক্কাবাসীদেরকে বিদায় জানিয়ে সরাসরি মদীনায় চলে আসেন। তিনি মসজিদে নববীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেখানেই নিজের ঈমান এবং রাসূলের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের ঘোষণা দেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00