📘 সাহাবীদের ইসলামগ্রহণের গল্প > 📄 উমাইর ইবনে ওহাব রা.-এর

📄 উমাইর ইবনে ওহাব রা.-এর


বদরযুদ্ধ শেষ হয়েছে বেশিদিন হয়নি। মক্কার মুশরিক বাহিনী শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছে। এমন পরাজয়ের কথা তারা কল্পনাও করেনি। এতে তাদের বড় বড় নেতা নিহত হয়েছে এবং অনেকেই মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়েছে। তারা ফিরেছে একেবারে নিঃস্ব হয়ে। কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে। এখন মক্কার ঘরে ঘরে শোকের মাতম চলছে। কেউ কেউ প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। শলা-পরামর্শ চলছেই।

উমাইর ইবনে ওহাব-কুরাইশদের মধ্যে জঘন্য প্রকৃতির দুষ্কৃতকারী নেতা। ইসলামের চরম দুশমন। সব নেতারই কিছু যোগ্যতা থাকে। উমাইরেরও ছিল। তার অনুমানশক্তি ছিল মারাত্মক প্রখর। তার দৃষ্টি যেন শ্যেণ দৃষ্টি। বিরাট কাফেলা দেখেই লোকসংখ্যা বলে দিতে পারত। এ অনুমান প্রায়ই সঠিক হতো। বদরেও মুশরিকরা তাকে কাজে লাগিয়েছে। মুসলিমদের সৈন্যসংখ্যা ঠিক বললেও সেটি তাদের কোনো উপকার করেনি। সে বলেছিল, মুসলিমদের সংখ্যা তিনশর মতো হবে। এর কিছু কম বা বেশিও হতে পারে। কি আশ্চর্য অনুধাবন ক্ষমতা! এ ক্ষমতা দিয়ে সে এখনো নবীকে চিনতে পারেনি। এজন্য ঐশী অনুকম্পা লাগে। এর কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।

উমাইরের ঘরে মন টিকছে না। অস্থির লাগছে। সকাল হতেই কাবা-চত্বরের দিকে গেল। তাওয়াফ করবে। তারপর দেবদেবিকে সাজদা করবে। মনে যদি একটু স্বস্তি আসে! কিছুতেই মন ভালো করা যাচ্ছে না। দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে আছে। সে ছেলের কথা ভাবছে। তার ছেলে ওহাব ইবনে উমাইর। এখন মুসলিমদের হাতে বন্দী। এ কষ্ট তার অন্তরকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলছে। এখন কেবল মুহাম্মাদকে হত্যা করতে পারলেই এ বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব।

কাবা-চত্বরে মানুষজন তেমন নেই। দূর থেকে সাফওয়ান ইবনে উমাইরকে দেখা গেল। সে হাতিমের নিচে বসে আছে। সে তার পাশে গিয়ে বসল। দুজনের চোখে-মুখেই চরম হতাশা। উমাইরই প্রথম কথা বলল। সে বদর-যুদ্ধে কুয়োয় নিক্ষিপ্তদের মর্মান্তিক পরিণতির কথা বর্ণনা করল। তখন সাফওয়ান বলল, 'আল্লাহর কসম, এদের নিহত হওয়ার পর আমাদের বেঁচে থাকার কোনো সার্থকতা নেই।'

উমাইর তাকে বলল, 'তুমি ঠিকই বলেছ। আল্লাহর কসম, যদি আমার ওপর এমন ঋণের বোঝা না থাকত—যা পরিশোধ করার কোনো ব্যবস্থা আমার নেই। আর যদি আমার সন্তানাদি না থাকত আমার অবর্তমানে যাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, তবে আমি গিয়ে অবশ্যই মুহাম্মাদকে হত্যা করতাম। আরও কারণ হলো, আমার ছেলে তাদের হাতে বন্দী।'

সাফওয়ান যেন যাদুর কাঠি পেয়ে গেল। এরকম সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক না। টাকা খরচ করা সহজ, প্রাণ বিসর্জন দেওয়া কঠিন। মুহাম্মাদকে সে নিজেও হত্যা করতে চায়। এখন তাকে হত্যা করতে যাওয়া মানেই নিজের প্রাণ বিসর্জন দেওয়া। সাফওয়ান দ্রুত বলে উঠল, 'তোমার ঋণের দায়িত্ব আমার, তোমার পক্ষ থেকে আমি তা পরিশোধ করব। তোমার সন্তানেরা আমার সন্তানদের সঙ্গে থাকবে। ততদিন তারা বেঁচে থাকবে, আমি তাদের দেখাশোনা করব। আমার থাকবে আর তারা পাবে না, এমনটি কখনো হবে না।'

সাফওয়ানের কথায় উমাইরের মনে আশা জেগে উঠল। মুহাম্মাদকে হত্যা করা সহজ নয়। এতে যদি তার প্রাণও যায়, তবু তার আফসোস থাকবে না। তার দুশ্চিন্তার কারণ ছিল, পরিবারের ভরণ-পোষণ আর ঋণের বোঝা। সাফওয়ান যখন এ দায়িত্ব নিচ্ছে, তখন আর চিন্তা নেই। এজন্য উমাইর বলল, 'তাহলে বিষয়টি আমার আর তোমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাক! তুমি কী করতে যাচ্ছ, আর আমিই বা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছি-কাউকে এ ব্যাপারে কিছু বলো না।'
সাফওয়ান বলল, 'তা-ই করব।'

দুজনের কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়ে গেছে। উমাইর আর দেরি করতে চাচ্ছে না। তখনই তারা সেখান থেকে উঠে পৃথক হয়ে গেল এবং এর পরিণতি দেখার আশায় থাকল। সাফওয়ান অনেকটা নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরলেও উমাইরের সেই সুযোগ নেই। তার কাজ অনেক কঠিন। মনে উত্তেজনা কাজ করছে। প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবে কি না-সে জানে না। আপাতত সে ভয়-ভীতিকে পাত্তা দিতে চায় না। বাড়িতে গিয়েই সে সফরের প্রস্তুতি শুরু করল। নিজের তরবারিতে বিষ মিশিয়ে ধার দিতে লাগল। যখন মনঃপুত হলো, তখন ক্ষান্ত হলো। এই তরবারিই তার সম্বল। বাহ্যিকভাবে সে ছেলেকে উদ্ধার করতে যাচ্ছে। আর সুযোগ বুঝে মুহাম্মাদকে গুপ্তহত্যায় মেতে উঠবে। সে মদীনার পথে বেরিয়ে পড়ল।

সময়মতোই উমাইর মদীনায় গিয়ে পৌঁছল। পথে তাকে কোনো বিপদে পড়তে হয়নি। সে সরাসরি মসজিদে নববীর কাছে এসে থামল। বাইরে উট রেখে সে মসজিদে প্রবেশ করে। মুহাম্মাদকে এখানেই পাওয়া যাওয়ার কথা। দূর থেকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে দেখলেন; তার দূরদর্শিতার তুলনা ছিল না। তিনি উমাইরের হাঁটার ভঙ্গি দেখেই বিপদ আঁচ করে ফেলেন। তিনি বলে ওঠেন : 'এই যে কুকুরটি—আল্লাহর দুশমন-উমাইর, সে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছাড়া এখানে আসেনি। সে-ই তো আমাদের মাঝে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করেছিল এবং বদরযুদ্ধে আমাদের সৈন্যসংখ্যা অনুমান করে শত্রুদের জানিয়ে দিয়েছিল।'

এই কথা বলেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলেন। তিনি দ্রুত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, এই যে আল্লাহর দুশমন কাঁধে তরবারি ঝুলিয়ে এখানে এসেছে।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই সম্মতিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব অবাক হলেন। তিনি এটি আশা করেননি। এই লোকটির উদ্দেশ্য নিশ্চিতভাবেই খারাপ; তাকে দেখেই এটি বোঝা যাচ্ছে। তবে আল্লাহর রাসূল যা দেখেন, সেটি নিশ্চয়ই তার ধারণার বাইরে। তিনি যেহেতু তাকে কাছে আসতে বলেছেন, এখন আর বিকল্প কিছু করার সুযোগ নেই।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবার উমাইরের দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি উমাইরের ঝুলন্ত তরবারি তার ঘাড়ের সাথে চেপে রেখে বুকের কাপড় জড়িয়ে ধরলেন এবং সাথী আনসারদের বললেন, 'তোমরা রাসূলের কাছে গিয়ে বসো এবং এ দুরাচারের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। কেননা, একে বিশ্বাস করা যায় না।' তারপর তারা তাকে রাসূলুল্লাহর কাছে নিয়ে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমাইরের অবস্থা দেখে বললেন, 'উমর, তাকে ছেড়ে দাও।' আর উমাইরকে বললেন, 'উমাইর, আমার কাছে এসো।'

উমাইর রাসূলের কাছে গিয়ে বলল, 'সুপ্রভাত।' এটাই ছিল জাহেলী যুগের সম্ভাষণ। উমাইর নিজের উদ্দেশ্য গোপন রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জবাবে বললেন, 'উমাইর, তোমার সম্ভাষণ অপেক্ষা উত্তম সম্ভাষণের ব্যবস্থা দিয়ে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন। আর তা হলো সালাম, শান্তি-যা হবে জান্নাতীদের সম্ভাষণ।'

উমাইর বলল, 'হে মুহাম্মাদ, আল্লাহর কসম, আমি এ বিষয়ে এখনই অবগত হলাম।' তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'উমাইর, তুমি কী জন্য এসেছ?'
সে বলল, 'আপনাদের হাতে আটক এই বন্দীর মুক্তির জন্য আমি এখানে এসেছি। তার ব্যাপারে দয়া করুন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, 'তবে তোমার কাঁধে তরবারি কেন?' এ প্রশ্নে উমাইর পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সে যতটা সহজ ভেবেছিল, কোনোকিছুই সেভাবে এগোচ্ছে না। মনে হচ্ছে, মুহাম্মাদকে গুপ্তহত্যার পরিবর্তে সে নিজেই এখন প্রকাশ্য হত্যার শিকার হবে। এজন্য সে একটি উদ্ভট জবাব দিল : 'আল্লাহ তরবারির অমঙ্গল করুন। তা কি আমাদের কোনো কাজে এসেছে?'

এটি কোনো সন্তোষজনক জবাব নয়। বিষয়টি সে নিজেও জানে। মূলত এ প্রশ্নে তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছে। যা পেরেছে, বলেছে। কিন্তু এভাবে পার পাওয়া গেল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'সত্যি করে বলো, কী উদ্দেশ্যে এসেছ?' সত্যি করে নিজের উদ্দেশ্য বললেই বিপদ। নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনা যায় না। মদীনায় আসার আগে মৃত্যুভয়কে এড়িয়ে যেতে পারলেও এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। অকারণে সে মরতেও চাচ্ছে না। উমাইর কোনোমতে বলল, 'ওই বিষয় ছাড়া আমি আর কোনো উদ্দেশ্যে আসিনি।'

এবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দৃঢ় কণ্ঠে বলা শুরু করলেন : 'কিছুতেই তা নয়, বরং তুমি ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া হাতীমে বসে বদরের কুয়োর নিক্ষিপ্ত কুরাইশদের সম্পর্কে আলোচনা করছিলে। তুমি না বলেছিলে, আমার যদি ঋণের বোঝা এবং সন্তানদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব না থাকত, তবে আমি অবশ্যই বেরিয়ে গিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করতাম। তখন সাফওয়ান তোমার ঋণ ও সন্তানের দায়িত্ব এই শর্তে গ্রহণ করে যে, তুমি আমাকে হত্যা করবে। অথচ আল্লাহ তোমার ও তোমার উদ্দেশ্যের মাঝে অন্তরায় হয়ে আছেন।'

উমাইরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। এটি কেমন করে সম্ভব-মক্কার আলোচনা তার কানে এলো কীভাবে? হুবহু একইরকম! এটি দুনিয়ার কারও কাজ নয়। তার মনে তোলপাড় শুরু হলো। আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত এ তোলপাড় থামল না। সে বলে উঠল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল। ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি আকাশের ওইসব সংবাদ আমাদের শোনাতেন এবং আপনার ওপর যেসকল ওহী অবতীর্ণ হতো, আমরা তা সবই অবিশ্বাস করতাম। আর এ বিষয়টি আমি ও সাফওয়ান ব্যতীত অন্য কেউ জানে না। সুতরাং আল্লাহর কসম, আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি, এ সংবাদ আপনাকে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানায়নি। সকল প্রশংসা ওই আল্লাহর, যিনি আমাকে ইসলামের পথ দেখালেন ও এই স্থানে নিয়ে এলেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর রাসূল।'

সাহাবীরা এ ঘটনা দেখে বিস্মিত হলেন। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুজিযা স্বচক্ষে দেখলেন। সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু। মানুষকে হত্যা করা হয়তো সহজ, কিন্তু উমাইরের মতো লোকদের অন্তকরণে সত্যকে প্রোথিত করে দেওয়া অনেক কঠিন কাজ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তারা এই শিক্ষাকেই আঁকড়ে ধরলেন—‘একজন মুসলিমের জীবন এমন হওয়া উচিত যেন তাকে হত্যা করতে আসা শত্রুও তার সান্নিধ্য থেকে কিছু হলেও উপকৃত হতে পারে এবং ফিরে যাওয়ার আগে সে যেন ভিন্ন মানুষে পরিণত হয়।

উমাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলামগ্রহণের পর মক্কায় ফিরে যান। রাত-দিন মক্কার অলিতে-গলিতে দাওয়াত দিতে থাকেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার হাতে বিপুল সংখ্যক লোক ঈমান আনেন। উহুদ-যুদ্ধের পূর্বে মুমিনদের এই দলটি সঙ্গে করে তিনি আবার মদীনায় চলে যান। মক্কা বিজয়ের পর তার বন্ধু ও সাথী সাফওয়ান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-ও ইসলামগ্রহণ করেন। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে উমাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজে খলীফাকে সহযোগিতা করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে মিসর অভিযানে তিনি সেনাকমান্ডার হিসেবে মদীনা থেকে সাহায্য-সৈন্য নিয়ে ছুটে যান। ইসকান্দারিয়া বিজয়ের পর আমর রাযিয়াল্লাহুর নির্দেশে তিনি মিসরের বহু এলাকা পদানত করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের শেষ দিকে তিনি ইন্তেকাল করেন।

📘 সাহাবীদের ইসলামগ্রহণের গল্প > 📄 আবু সুফিয়ান রা.-এর

📄 আবু সুফিয়ান রা.-এর


মক্কায় ইসলামের ঘোরতর শত্রুদের একজন ছিলেন আবু সুফিয়ান। কুরাইশদের প্রসিদ্ধ এই নেতা ইসলামকে ধ্বংস করতে তার চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেননি। মুসলিমদের বিরুদ্ধে সকল যুদ্ধ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামায় তিনি ছিলেন অগ্রনী। গত বিশ বছর ধরে তিনি ইসলামের শত্রুতা করে আসছেন। আল্লাহ তার ভাগ্যকেও সুপ্রসন্ন করেছেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তবে তার ইসলামগ্রহণের ঘটনা সহজ ছিল না।

হিজরতের অষ্টম বছর। এ বছর রমাযান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দশ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা-বিজয় অভিযানে বের হন। এক সময় তারা মক্কার কাছাকাছি মাররুয যাহরানে এসে পৌঁছেন। তখন সূর্য ডুবে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানেই যাত্রাবিরতি করেন। মুসলিম বাহিনীকে বিশ্রাম নিতে নির্দেশ দেন। এর সঙ্গে তার আরেকটি নির্দেশ ছিল: প্রত্যেক সাহাবীকে কাঠ সংগ্রহ করে নিজ অবস্থানে আগুন জ্বালাতে বলেন।

কুরাইশরা এ অভিযানের কিছুই টের পায়নি। কিছুদিন আগে বনু খুযাআর ঘটনায় মক্কায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে আবু সুফিয়ান মদীনায় গিয়ে মুসলিমদের হুদাইবিয়ার চুক্তির ব্যাপারে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে। এ আশ্বস্ততায় কেউ কান দেয়নি। চুক্তি একবার ভঙ্গ করলে সেটি আর বহাল থাকে না। আবু সুফিয়ান কার্যত ব্যর্থ হয়েছেন। এখন দীর্ঘদিন যাবত মদীনা থেকে কোনো খবরও পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য মক্কার কুরাইশরা আরও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছে। পরিশেষে তারা আবু সুফিয়ান এবং হাকিম ইবনে হিযামকে মদীনার দিকে পাঠাতে সিদ্ধান্ত নিল। তারা বলল, 'যদি তোমরা মুহাম্মাদের সাক্ষাৎ লাভ করো, তাহলে আমাদের জন্য নিরাপত্তা চাইবে।' দুই বন্ধু মদীনার পথে রওনা হলেন। মরুভূমির বিশাল পথ। পথের ক্লান্তি থেকে তাদের মনে ভিন্ন কৌতূহল কাজ করছে। তারা মুসলিমদের করুণা ভিক্ষা করতে যাচ্ছে। ব্যাপারটি সত্যিই অদ্ভুত। কিছুতেই তাদের দমন করা গেল না। উল্টো তারাই এখন ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের মালিক বনে গেছে। তাদের করুণা ছাড়া মক্কায় বেঁচে থাকাও মুশকিল হয়ে পড়েছে। তারা মক্কা আক্রমণ করলে সব ছারখার করে দেবে।

বেলা প্রায় ডুবে যাচ্ছে। এর মধ্যে পথে তারা বুদাইল ইবনে ওয়ারকার দেখা পেল। তাকেও তারা সঙ্গে নিল। এখন তারা তিনজন। পথ চলতে চলতে মাররুয যাহরান এলাকায় এসে পৌঁছল। ইতোমধ্যে চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে তাদের দৃষ্টি আটকে গেল। হাজার হাজার তাঁবু আর অগ্নিশিখা দেখা যাচ্ছে। দূর থেকে সমুদ্রের মতো বিশাল মনে হচ্ছে কাফেলাটাকে। কারা এরা?

আবু সুফিয়ানের আগমনের কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জেনে গেছেন। তিনি সাহাবীদের ডেকে দ্রুত তাকে ধরার নির্দেশ দিলেন। আবু সুফিয়ান যে এখন 'আরাক' অঞ্চলে অবস্থান করছেন, সেটিও তাদের বললেন। আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীরা মুসলিম বাহিনীর বিশাল কাফেলার সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করছে। কিছু টের পাওয়ার আগেই তারা হঠাৎ করে বন্দী হয়ে পড়েন। ঘটনার আকস্মিকতায় তাদের কিছু করারও ছিল না। এখন তাদের উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আবু সুফিয়ানের গ্রেপ্তারের সংবাদ পেয়েই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুশি হয়ে উঠলেন। তিনি দ্রুত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ছুটলেন। এদিকে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বিপদ আঁচ করতে পারলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু সুফিয়ানকে সময় দিতে চাচ্ছেন না। দ্রুত কিছু একটা করে ফেলতে চান। রাসূলের অনুমতি ছাড়া করতেও পারছেন না। কিন্তু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই তাই আবু সুফিয়ানকে একটু সময় দিতে চান। হয়তো মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা এবং নিজের অসহায়ত্ব বুঝে আবু সুফিয়ান ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নেবে। তিনিও দ্রুত রাসূলের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।

আবু সুফিয়ানের সামনে সকল পথই রুদ্ধ হয়ে গেছে এবং এখন এর বিকল্প কিছু নেই; আবু সুফিয়ান, মক্কার বিশাল প্রতাপশালী নেতা এখন নতুন জীবনে প্রবেশ করছেন। দীর্ঘ আলাপচারিতার পর অবশেষে তার ঠোঁট থেকে এ বাক্যগুলো শোনা গেল: 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।'

আবু সুফিয়ান ছিলেন সর্দার মানুষ। জাহেলী যুগের সর্দার মানেই সকল অপকর্মের নেতা। শয়তান তাকে এত সহজে ছাড়ল না। সে তাকে প্ররোচনা দিতে লাগল। এ প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তার মাথা বিগড়ে গেল। তিনি আশেপাশের গোত্রের সহযোগিতায় রাসূলকে আক্রমণ করার চিন্তা শুরু করেন। আর তখনই তিনি তার কাঁধে একটি হাতের উপস্থিতি টের পান। তিনি শুনতে পান: 'তাহলে আল্লাহ তোমাকে চরম অপমানিত করবেন এবং আমরা আবার বিজয় লাভ করব।'

আবু সুফিয়ান পাশ ফিরে তাকাতেই দেখেন স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে আছেন। আর তার কাঁধে রাসূলেরই হাত। তার অন্তরের কথা অন্য কারও তো জানার কথা নয়! এটি নিশ্চয়ই আল্লাহ তার রাসূলকে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি মুহূর্তেই শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্তি পেয়ে গেলেন এবং বলে উঠলেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল। আমি আল্লাহর নিকট তাওবা করছি, আমি তার নিকট আমার অপরাধের ক্ষমা চাচ্ছি! আমি আপনার নবুওয়াতের ব্যাপারে সন্দিহান ছিলাম, আমি বিষয়টি নিয়ে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করছিলাম—এখন সব সন্দেহ দূর হয়ে গেছে! আল্লাহর কসম, আমার অন্তরে যা উদয় হয়েছিল, তা ছিল শয়তানের ওয়াসাওয়াসা এবং আমার জাগতিক অন্তরের দুর্বলতা!' তখন থেকেই তিনি পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করলেন।

ইসলামগ্রহণের পর আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস রাযিয়াল্লাহু আনহু অতীত জীবনের জন্য অনুশোচনায় জর্জরিত হয়েছেন। পরবর্তী জীবনে রাত-দিন শুধু কুরআন তিলাওয়াত, কুরআনের বিধি-বিধান ও উপদেশাবলী অনুধাবনে অতিবাহিত করতেন। ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগে তিনি ইন্তেকাল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আবু সুফিয়ান জান্নাতের অধিবাসী যুবকদের নেতা।' (আল-ইসাবা, ৪/৯০)

📘 সাহাবীদের ইসলামগ্রহণের গল্প > 📄 তুফাইল ইবনে আমর রা.

📄 তুফাইল ইবনে আমর রা.


ইয়েমেন-মক্কা থেকে সাতশ মাইল দূরে একটি দেশ। এ দেশের একটি শক্তিশালী গোত্রের নাম দাওস। এ গোত্রের সর্দার হচ্ছেন তুফাইল। জাহেলী যুগে বিবেক, ব্যক্তিত্ব কিংবা বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা হতো না বললেই চলে। এর মধ্যেও কিছু মানুষ ব্যতিক্রম ছিলেন। তাদের তীক্ষ্ণমেধা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও আত্মমর্যাদাবোধের সবাই প্রশংসা করত। তাদের মধ্যে তুফাইল অন্যতম। তিনি ভাষা-পণ্ডিতও ছিলেন। কাব্য প্রতিভা ছিল তার সহজাত বৈশিষ্ট্য। সর্দার হিসেবে মানুষের দুঃখ-কষ্ট বুঝতেন এবং সাহায্য করতেন। মেহমানদের জন্য তার বাড়ি ছিল সরাইখানা-রাত-দিন কখনো চুলো থেকে হাঁড়ি নামত না।

তুফাইল ব্যবসায়ী ছিলেন। এজন্য প্রায়ই তার মক্কায় আসা-যাওয়া করতে হতো। একবার তিনি মক্কায় এলেন। এসেই নতুন এক বিপদে পড়লেন। এ বিপদ সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। ইতোমধ্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত লাভ করেছেন। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করছেন। আর মুশরিক কুরাইশরা চরমভাবে এর বিরোধিতা করছে। তুফাইল এমন এক সময় মক্কায় এসে পৌঁছেছেন-যখন এ বিরোধ সবচেয়ে মারত্মক আকার ধারণ করেছে। কুরাইশরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে গড়ে তুলেছে। তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা-চৌকি স্থাপন করেছে। এসব চৌকির লোকজনের কাজ হচ্ছে, শহরের বাইরে থেকে আসা বণিকদের মুহাম্মাদ সম্পর্কে সতর্ক করা। তারা তুফাইলেরও গতিরোধ করে। তারা প্রথমে তার সঙ্গে উত্তম আচরণ করে। সর্বোত্তম সম্ভাষণে স্বাগত জানায় এবং আতিথেয়তার প্রস্তাব দেয়।

তুফাইলের কাছে কুরাইশদের এ আচরণ অদ্ভুত লাগে। মক্কার পরিস্থিতি সম্পর্কে তার জানা ছিল না। পরে নেতৃবৃন্দের কথায় পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন। তারা তাকে বলে, 'হে তুফাইল, আপনি আমাদের শহরে এসেছেন-স্বাগত! আমাদের মধ্যে আপনি এই লোকটি-যে নিজেকে নবী বলে দাবি করে, সে আমাদের জীবন-সংসার কী এক মায়াজালে পেঁচিয়ে বড় কঠিন করে ফেলেছে। আমাদের ঐক্যের সকল রজ্জুকে সে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। সে আমাদের সাজানো-গোছানো সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। তার সকল কথাবার্তা জাদুর মতো। তা ছেলে ও পিতা মধ্যে, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে, ভাই ও বোনের মধ্যে বিরোধের প্রাচীর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমরা ভয় পাচ্ছি, আপনার নিজের ও কওমেরও না-জানি আমাদের দশা হয়! তাই সাবধান! আপনি তার সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না। তার কোনো কথাও আপনি শুনতে যাবেন না।'

মক্কার কুরাইশদের এ প্রচেষ্টায় তুফাইল খুব অবাক হলেন। একটা মানুষকে নিয়ে এত হইচইয়ের কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না। তবে লোকটি নিশ্চিতভাবেই খুব প্রভাবশালী। তা না হলে তাকে ঠেকাতে কুরাইশদের বড় বড় নেতারা এত মরিয়া হয়ে উঠত না। ব্যাপারটিকে এখন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। ভয়ও লাগছে। অহেতুক কোনো ঝামেলায় তিনি পড়তে চান না।

তুফাইল মক্কায় এসে কাবা তাওয়াফ করতেন। সেখানে রক্ষিত মূর্তিসমূহের পূজাও করতেন। এবারও এজন্য কাবা-চত্বরের দিকে রওনা হলেন। তবে রওনা হওয়ার আগে তিনি সতর্কতা অবলম্বন করলেন। কানে ভালো করে তুলো ভরে নিলেন—যাতে কোনোভাবেই মুহাম্মাদের কথা কানে না আসে।

তিনি যা আশঙ্কা করেছিলেন, তা-ই হলো। কাবা-চত্বরে ঢুকতেই দূর থেকে মুহাম্মাদকে দেখতে পেলেন। তিনি কাবা-চত্বরের পাশে নামায পড়ছেন। তার নামায দেখেই তুফাইল আকৃষ্ট হয়ে গেলেন। এ তো তাদের নামাযের মতো নয়। তুফাইলের মনে ঝড় বয়ে গেল। তার আরও কাছে যেতে ইচ্ছে হলো। ইচ্ছেটাকে আটকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। তিনি এক পা, দু'পা করে এগিয়ে গেলেন। কানে তুলো দিয়ে বাইরের শব্দ একটু কমানো যায়; পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। তুফাইলের কানে সেই তিলাওয়াত ভেসে আসে। তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা শুনতে থাকেন। এতে তিনি ভীষণভাবে আলোড়িত হন। তিনি মনে মনে চিন্তা করতে লাগলেন: 'আমি কেন আমার কান বন্ধ করে আছি? আমি আরবের এত বড় একজন বিচক্ষণ কবি! আর আমি কিনা বুঝব না কোনটি ভালো আর কোনটা মন্দ? তবে এই লোকটির কথা শুনতে সমস্যা কোথায়? যদি তার কথা ভালো হয় তাহলে তা গ্রহণ করব। আর যদি মন্দ হয় তবে দূরে ছুড়ে ফেলে দেব।'

বিষয়টি মোটেও মন্দ নয়। তিনি তা ছুঁড়ে দিতেও পারলেন না। বরং গভীর আকর্ষণে উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন। রাসূল নামায শেষে বাড়ির পথ ধরেছেন। তুফাইল তাঁকে অনুসরণ করছেন। অদ্ভুত ঘটনা। তুফাইল নিজেও আশ্চর্য না হয়ে পারলেন না। ঐশী নির্দেশ না হলে এরকম ঘটনা পৃথিবীতে ঘটে না। রাসূল ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর সঙ্গে তুফাইলও। এই প্রথম তিনি রাসূলের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেলেন। তিনি বললেন, হে মুহাম্মাদ, আপনার কাওমের লোকেরা আপনার সম্পর্কে আমাকে এসব কথা বলেছে। তারা আপনার সম্পর্কে এত ভয় দেখিয়েছে যে, আপনার কোনো কথা যাতে আমার কানে না ঢুকতে পারে, সেজন্য আমি কানে তুলো ভরে নিয়েছি। তা সত্ত্বেও আল্লাহ আপনার কিছু কথা না শুনিয়ে ছাড়লেন না। যা শুনেছি, ভালোই মনে হয়েছে। আপনি আমার নিকট ইসলামকে তুলে ধরুন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব আনন্দিত হলেন। তিনি তাঁর নিকট ইসলামের সৌন্দর্য বর্ণনা করলেন এবং তারপর কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালেন। এটি ছিল সবচেয়ে চমৎকার ও শৈল্পিক অভিব্যক্তি—যা ইতিপূর্বে তুফাইল কখনো শোনেনি! ওই দিন পর্যন্ত এর সৌন্দর্যের কাছাকাছিও কিছু তিনি পাননি। তিনি সেখানেই আল্লাহর একত্ববাদের কথা ঘোষণা করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইসলামগ্রহণের পর তুফাইল রা. নিজের গোত্রে ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে তিনি রাসূলের খেদমতে দাওস কবীলার আশিটি পরিবার নিয়ে হাজির হন। এতে রাসূল সা. খুব খুশি হন। তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহ আনহুর শাসনামলে রিদ্দার যুদ্ধে শাহাদাতবরণ করেন।

📘 সাহাবীদের ইসলামগ্রহণের গল্প > 📄 যিমাদ আযদী রা.

📄 যিমাদ আযদী রা.


যিমাদ আযদী-ইয়েমেনের বাসিন্দা। আযাদ শানুআ গোত্রের সন্তান। ঝাড়-ফুঁক করেই জীবিকা অর্জন করতেন। একবার এক কাজে তিনি মক্কায় আগমন করেন। মক্কায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই কিছু মূর্খ লোক তাকে ঘিরে ধরে। তিনি কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা তাকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করার পরামর্শ দেয় এবং বলে, ‘নিশ্চয় মুহাম্মাদ জ্বিনগ্রস্ত লোক!’

এ কথা শুনে যিমাদ খুশিই হন। তার চেহারায় হাসির দ্যুতি ফুটে ওঠে। উপস্থিত মূর্খরা এর কোনো কারণ খুঁজে পেল না। তিনি মনে মনে বললেন, ‘আমার অবশ্যই এই লোকের নিকট যাওয়া উচিত। সম্ভবত আল্লাহ আমার হাতে লোকটিকে ভালো করে দেবেন।’

একদিন তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। কোনো ভূমিকা ছাড়াই যিমাদ বললেন, ‘হে মুহাম্মাদ, আমি তো জ্বিনগ্রস্তদের ঝাড়-ফুঁক করি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, আমার হাতে সুস্থ করেন। আপনার কি ঝাড়-ফুঁক লাগবে?’

রাসূলের সঙ্গে তার কোনো পূর্ব পরিচয় নেই। কোনো পরিচয় পর্ব ছাড়া এভাবে কেউ কথা বলে না। জ্বিনগ্রস্ত লোকের সঙ্গে এ পর্বের কোনো প্রয়োজনও মনে করেননি যিমাদ। তিনি ধরেই নিয়েছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিনগ্রস্ত। তিনি তাকে এমন এক প্রস্তাব দিয়েছেন, যা সত্যিই অদ্ভুত। তার জন্যই আসলে ঝাড়-ফুঁক বেশি দরকার। সেটি কীভাবে করতে হয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে ভালো করেই জানেন। তিনি যিমাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য; আমি কেবল তাঁরই প্রশংসা করি, আর তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তিনি যাকে হেদায়েতের পথ দেখান তাকে পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা কারও নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই; তার কোনো শরীক নেই; আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।'

যিমাদ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এ কী কথা শুনছেন তিনি! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো আরও কিছু বলতেন। কিন্তু যিমাদ তাকে বাধা দিয়ে বললেন, 'আপনি কথাগুলো আবার বলুন। ওগুলোর প্রভাব তো গভীর সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার নয়; বরং তিনবার বললেন। বিস্ময়ে অধীর হয়ে যিমাদ বলে উঠলেন, 'জীবনে আমি বহু জ্যোতিষী, জাদুকর ও কবির কথা শুনেছি। কিন্তু আপনার কথার মতো কথা কোনোদিন শুনিনি। এ অনুভূতির প্রকাশ ও সৌন্দর্য অনিঃশেষ সমুদ্রের গভীরতার মতো! আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। আমি আপনার হাতে বাইআত হব।' তার দিকে রাসূলের পবিত্র হাত সম্প্রসারিতই ছিল। যিমাদ তখনই মুসলমান হয়ে গেলেন।

যিমাদ আযদী-ইয়েমেনের বাসিন্দা। আযাদ শানুআ গোত্রের সন্তান। ঝাড়-ফুঁক করেই জীবিকা অর্জন করতেন। একবার এক কাজে তিনি মক্কায় আগমন করেন। মক্কায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই কিছু মূর্খ লোক তাকে ঘিরে ধরে। তিনি কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা তাকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করার পরামর্শ দেয় এবং বলে, ‘নিশ্চয় মুহাম্মাদ জ্বিনগ্রস্ত লোক!’

এ কথা শুনে যিমাদ খুশিই হন। তার চেহারায় হাসির দ্যুতি ফুটে ওঠে। উপস্থিত মূর্খরা এর কোনো কারণ খুঁজে পেল না। তিনি মনে মনে বললেন, ‘আমার অবশ্যই এই লোকের নিকট যাওয়া উচিত। সম্ভবত আল্লাহ আমার হাতে লোকটিকে ভালো করে দেবেন।’

একদিন তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। কোনো ভূমিকা ছাড়াই যিমাদ বললেন, ‘হে মুহাম্মাদ, আমি তো জ্বিনগ্রস্তদের ঝাড়-ফুঁক করি। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, আমার হাতে সুস্থ করেন। আপনার কি ঝাড়-ফুঁক লাগবে?’

রাসূলের সঙ্গে তার কোনো পূর্ব পরিচয় নেই। কোনো পরিচয় পর্ব ছাড়া এভাবে কেউ কথা বলে না। জ্বিনগ্রস্ত লোকের সঙ্গে এ পর্বের কোনো প্রয়োজনও মনে করেননি যিমাদ। তিনি ধরেই নিয়েছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিনগ্রস্ত। তিনি তাকে এমন এক প্রস্তাব দিয়েছেন, যা সত্যিই অদ্ভুত। তার জন্যই আসলে ঝাড়-ফুঁক বেশি দরকার। সেটি কীভাবে করতে হয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে ভালো করেই জানেন। তিনি যিমাদকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য; আমি কেবল তাঁরই প্রশংসা করি, আর তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তিনি যাকে হেদায়েতের পথ দেখান তাকে পথভ্রষ্ট করার ক্ষমতা কারও নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই; তার কোনো শরীক নেই; আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।'

যিমাদ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। এ কী কথা শুনছেন তিনি! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো আরও কিছু বলতেন। কিন্তু যিমাদ তাকে বাধা দিয়ে বললেন, 'আপনি কথাগুলো আবার বলুন। ওগুলোর প্রভাব তো গভীর সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার নয়; বরং তিনবার বললেন। বিস্ময়ে অধীর হয়ে যিমাদ বলে উঠলেন, 'জীবনে আমি বহু জ্যোতিষী, জাদুকর ও কবির কথা শুনেছি। কিন্তু আপনার কথার মতো কথা কোনোদিন শুনিনি। এ অনুভূতির প্রকাশ ও সৌন্দর্য অনিঃশেষ সমুদ্রের গভীরতার মতো! আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। আমি আপনার হাতে বাইআত হব।' তার দিকে রাসূলের পবিত্র হাত সম্প্রসারিতই ছিল। যিমাদ তখনই মুসলমান হয়ে গেলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00