📄 আবু যর গিফারী রা.
অদ্দান উপত্যকা। গিফার গোত্রের বাসভূমি। রাতে সাধারণত এ গোত্রের লোকজন ঘুমায় না। তারা শিকারের সন্ধানে থাকে। মানুষ শিকার। পথে কাউকে একা পেলেই তার সর্বস্ব কেড়ে নেয়। মেরে ফেলতেও দ্বিধা করে না। ডাকাতের দল এরা। লুণ্ঠনই জীবিকার অবলম্বন। কত বণিক দল যে তাদের হাতে নিঃস্ব হয়েছে, হিসেব রাখে না কেউ। অবশ্য সব বণিকদলের ওপর এরা আক্রমণ করে না। মক্কার কুরাইশরাও এ পথে সিরিয়া যায়। তাদের কাছ থেকে ভালো চাঁদা পায় বলে কিছু বলে না। চাঁদা দিতে না চাইলেই লুটতরাজ চলে। তাদের ভয় করে সবাই। এসব ভয়ানক মানুষের ভিড়ে একজন কেবল ব্যতিক্রম। ডাকাতির বাইরে নতুন এক চিন্তায় তার মন অস্থির হয়ে আছে।
মানুষটির নাম জুন্দুব (আবু যর)। দুর্ধর্ষ ডাকাত। দুর্দান্ত সাহসী। সাহস না থাকলে ডাকাতি করা যায় না। তবে তার সাহসের সবাই প্রশংসা করে। গোত্রে নাম-ডাক ছড়িয়েছে। এমনিতে গোত্রের লোকেরা মূর্তিপূজা করে। অনেক খোদা মানে। এগুলো তার মনে ধরেনি কখনো। ডাকাতরা ধর্মের চিন্তা করে না। জুন্দুব চিন্তা করেন। তার মন বলে—খোদা কেবল একজনই। এত খোদা থাকতে পারে না। গভীর অন্ধকারেও তার মন আলোর সন্ধান করেছে। এভাবে কতকাল গিয়েছে, কে জানে। এখন তিনি শুনতে পেলেন, মক্কায় এক নতুন নবীর আগমন ঘটেছে। তিনি নতুন ধর্মের কথা শোনাচ্ছেন। এক স্রষ্টার দিকে আহ্বান করছেন। এই নতুন নবী সম্পর্কে জানা দরকার। ধর্মটাই বা কী? তার আর দেরি সহ্য হচ্ছে না।
জুন্দুব সর্দার মানুষ। অনেক দায়িত্ব। এগুলো ফেলে কোথাও যাওয়া মুশকিল। নতুন নবী সম্পর্কে জানতে হলে মক্কায় যেতে হবে। পথ অনেক। হুট করে যাওয়াও যাচ্ছে না। ফিরে আসতে সময় লাগবে। অনেক ভেবে নিজের ভাইকেই পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তার ভাইয়ের নাম আনিস। আনিসকে বুঝিয়ে বললেন সব। নতুন নবীর সঙ্গে কথা বলতে হবে। ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে আসতে হবে। আনিস গেল।
এবার জুন্দুবের অপেক্ষা করার পালা। মাত্র ক'টা দিন। সময় যেন কাটছেই না। এক অপার্থিব অস্থিরতা তাকে ঘিরে রেখেছে। হঠাৎ আনিস ফিরে আসার খবর এলো। জুন্দুব দৌড়ে গেলেন। এক শ্বাসে অনেক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন। আনিস বলতে লাগল : 'আমি মক্কায় এমন এক ব্যক্তিকে দেখেছি, যিনি তোমার ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এক নতুন ধর্ম নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। আল্লাহ তাকে নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তবে লোকজন তাকে সাবি (ধর্ম পরিবর্তনকারী) বলে। লোকজন তাকে কী নামে সম্বোধন করছে, আমি কেবল তা-ই বলছি। কেউ বলে তিনি একজন যাদুকর, কেউ বলে গণক, আবার কেউ বলে কবি; কিন্তু আমি তার কথা নিজ কানে শুনেছি, আমি নিশ্চিত—তিনি এসবের কিছুই নন। আল্লাহর কসম, তিনি সত্যই বলছেন।'
আনিসের কথায় জুন্দুবের অস্থিরতা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে সামলানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এখনই সেই মানুষটির কাছে যাওয়া প্রয়োজন। তাকে স্বচক্ষে না দেখলে তৃপ্তি মিটবে না। সব ছেড়ে গেলেও অসুবিধা নেই। কিন্তু পরিবারের দায়িত্ব কে নেবে? এ দায়িত্ব কাউকে দেওয়া দরকার। আনিসকে বলতেই সে রাজি হয়ে গেল। শুধু বলল, মক্কার লোকদের ব্যাপারে সতর্ক থেকো।
জুন্দুবের মনে এখন আনন্দের ঢেউ। মনে হয়, বহুকাল পরে কোনো প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হবে। তিনি দ্রুত প্রস্তুতি নিলেন। সঙ্গে কিছু খাবার ও এক মশক পানি নিলেন। তারপর রওনা হয়ে গেলেন। মরুর পথে একাকী—মক্কার দিকে, প্রিয়জনের সাক্ষাতে। মরুভূমির কঠিন পথ। মাথার ওপর সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপ নিয়েই তিনি হাঁটছেন। রাতের নিকষ কালো অন্ধকারেও তার পথ চলা থামেনি। তিনি মক্কায় এসে পৌঁছলেন। এ শহরের অলি-গলি তার অপরিচিত। নতুন নবী কোথায় থাকেন, তিনি দেখতেই বা কেমন—এসব তার জানা নেই। কাউকে জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন। এ শহরে তার পরিচিত কেউ নেই। নিষ্ঠুরতা আর বর্বরতায় এরা অভ্যস্ত। সম্ভবত এরা গিফারীদেরও ছাড়িয়ে যাবে। শহরে ঢুকতেই একজনের দেখা মিলল। আবু যরের দেরি করতে ইচ্ছে করছে না। তাকে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন, 'তোমরা যাকে সাবি বলো, সেই লোকটি কোথায়?'
লোকটি এ প্রশ্নে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সে এমন করে আবু যরের দিকে তাকায়, যেন এখনই মাথায় তুলে আছাড় দেবে। আবু যর ভয়ই পেয়ে যান। এ ভয় কাপুরুষতার নয়, এটি এত কাছে এসেও না পাবার ভয়। তাকে তার গন্তব্যে পৌঁছতে হবে। এজন্য কথা না বাড়িয়ে আবার হাঁটা শুরু করেন। কাবা- চত্বরে গেলে নিশ্চয়ই কিছু জানা যাবে। সব গোত্রের লোকই সেখানে যায়। নতুন নবীও হয়তো আসবেন।
কাবা-চত্বরে এসেও কিছু জানা যাচ্ছে না। কারও সঙ্গে কথা-ই বলা যাচ্ছে না। সবাই কেমন জানি নির্লিপ্ত। দ্বিধায় জর্জরিত। সাবিদের মধ্যে কারও খবর মিলছে না। পথের ক্লান্তিতে বিষণ্ণ হয়ে উঠছে তার মন। সন্ধ্যাও ঘনিয়ে আসছে। দেহকে আর সোজা রাখা যাচ্ছে না। তিনি সটান হয়ে চত্বরের এক পাশে শুয়ে পড়লেন। জ্বলে ওঠা লণ্ঠনের আলো এসে পড়ছে তার চেহারায়। এ চেহারা এ শহরের মানুষ কখনো দেখেনি!
আগন্তুকের চেহারা দেখে আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু থমকে দাঁড়ালেন। এ পথ দিয়েই তাকে বাড়ি যেতে হয়। পথে মুসাফির কাউকে পেলে সঙ্গে নেন। আজকের লোকটাকে অন্যরকম মনে হচ্ছে। সম্ভবত মক্কায় নতুন এসেছে। কাউকে চেনে না মনে হয়। চোখে-মুখে রাজ্যের অনিশ্চয়তা। পেটানো শরীর হলেও কেমন নুইয়ে পড়েছে। তিনি তাকে ডাকলেন। নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন।
মক্কায় এক কঠিন অবস্থা বিরাজ করছে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত লাভ করেছেন। তিনি সে কথা প্রকাশ্যে ঘোষণাও করেছেন। তারপর থেকেই মক্কার মুশরিকরা বেঁকে বসেছে। তাদের এতদিনের 'আল-আমীন' এখন শত্রু হয়ে গেছে। কেউ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর কাছে ভিড়লে তার আর রক্ষা নেই। এ পর্যন্ত মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন তার ওপর ঈমান এনেছে। প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া শুরু হয়নি এখনো। শহরের বিভিন্ন স্থানে মক্কার মুশরিকরা ঘোরাফেরা করছে। বাইরের লোকদের মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যাপারে আগেই সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে তারা তাদের সেখানে যেতে বারণ করে। তারপর না শুনলে শাস্তি দেয়। এজন্য নতুন নবীর কথা জানলেও কেউ মুখ ফুটে বলে না। কাউকে দাওয়াত দিতেও ভয় ভয় লাগে। নেতাদের বলে দিলে সর্বনাশ!
জুন্দুব নীরবে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অনুসরণ করলেন। নতুন নবীর প্রসঙ্গে তাকে জিজ্ঞেস করবেন কি না, বুঝতে পারছেন না। কে জানে লোকটা কেমন! লোকটার বয়স কম। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ। আচরণও ভালো মনে হচ্ছে। তবুও ভয় লাগে। নেতাদের কেউ হলে নিশ্চয়ই তাকে মক্কা থেকে বের করে দেবে। মেরেও ফেলতে পারে। মৃত্যুকে তিনি ভয় পাচ্ছেন না। তবে প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা না করে মরতেও চাচ্ছেন না। এদিকে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুও ভয় পাচ্ছেন—দ্বীনের কথা বললে যদি সে গ্রহণ না করে!
শেষ পর্যন্ত কেউই এ বিষয়ে কোনো কথা বললেন না। তাদের মনের কথা অব্যক্তই রয়ে গেল। মনের কথা আটকে রাখা সহজ নয়; কষ্টের। পরিবেশ কতটা মারাত্মক হলে অন্তরে এতটা ভয় কাজ করে! রাতের অন্ধকারের নির্জনতায়ও সে ভয় কাটছে না। পরদিন সকালে আবার যে যার পথে বেরিয়ে পড়লেন।
জুন্দুবের পথ কাবা-চত্বরেই থেমে আছে। আজ দুই দিন হয়ে গেল। তিনি যার সন্ধানে এসেছেন, তার সম্পর্কে এখনো কিছুই জানতে পারেননি। জানার কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। আজ রাতেও নিশ্চয় ওই লোকটা এসে তাকে নিয়ে যাবে এবং সে তার বাড়িতে ঘুমাবে। পরদিন আবার এখানে এসে বসে থাকবে। হলোও তাই। এভাবে তৃতীয় রাত ঘনিয়ে এলো।
সম্ভবত আর দেরি করা যায় না। মুসাফিরের উদ্দেশ্য জানা দরকার। কতদিন এভাবে কাটবে? তিনদিন তো হয়ে গেল। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুই ঝুঁকি নিলেন। তাঁরই হক বেশি জানার। সাহস সঞ্চয় করে মুসাফিরের দিকে এগিয়ে গেলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি মক্কায় কেন এসেছেন?'
সময় এসেছে মনের কথা বলার। এখন আর সংকোচ করে লাভ নেই। যা-ই ঘটুক, বলারই সিদ্ধান্ত নিলেন জুন্দুব। আগে একটু ভূমিকা করে বললেন, 'আপনি যদি আমার কাছে অঙ্গীকার করেন, আমি যা চাই সেদিকে আমাকে পথ দেখাবেন-তাহলে আমি বলতে পারি।'
জুন্দুবের কথা শেষ হতেই আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু সায় দিলেন। তখন জুন্দুব বললেন, 'আমি অনেক দূর থেকে মক্কায় এসেছি-নতুন নবীর সাথে সাক্ষাৎ করতে এবং তিনি যেসব কথা বলেন তার কিছু শুনতে।'
আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক খেলে গেল। এমন মানুষই তো তিনি খুঁজছেন। এবার দুজনের কথার খই ফুটতে লাগল। নবীর পরিচয় দিতে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। 'তিনি প্রকৃতই একজন সত্য নবী,' এই বলে আলী আলোচনা শুরু করলেন। জুন্দুব গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। তাঁর প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। যে চায়, সে পায়। এই প্রাপ্তিতে জুন্দুব উচ্ছ্বসিত। এখনো প্রিয়জনের দেখা বাকি!
সকালেই দুজন নবীর সাক্ষাতে রওনা হলো। মক্কা থেকে রাসূলের নিবাস বেশি দূরে নয়। তবুও এই পথটুকুতে দুজনের জন্য একসঙ্গে চলা কঠিন। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সবাই চেনে। জুন্দুবকে কেউ চেনে না। তাকে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে দেখলে মুশরিকদের মনে সন্দেহ দানা বেধে উঠবে। এজন্য সতর্কতা প্রয়োজন। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি আগে আগে হাঁটব। আপনি আমাকে অনুসরণ করবেন। যদি আমি কোনো বিপদের আশঙ্কা করি, তাহলে প্রস্রাবের ভান করে রাস্তার এক পাশে সরে যাব। আপনি আপনার পথে চলতে থাকবেন। চিন্তা করবেন না, আমি আপনাকে ঠিকই খুঁজে নেব। আর আমি যদি কোনো বিপদের আশঙ্কা না করি, তাহলে আপনি আমার সঙ্গেই পথ চলবেন এবং আমরা যেখানে যেতে চাই, সেখানে গিয়ে মিলিত হব।'
শীঘ্রই তারা একটি ঘরের নিকট এসে দাঁড়ালেন। কেউ একজন তাদের জন্য দরজা খুলে দিল। জুন্দুব ঘরে প্রবেশ করেই এমন এক উদ্ভাসিত চেহারা দেখলেন, যেন পূর্ণিমার চাঁদ, যার আগমন-প্রতীক্ষায় তিনি বছরের বছর অতিবাহিত করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে দৃষ্টি দিতেই তার অন্তর প্রশান্তিতে ভরে গেল। জুন্দুব বলে উঠলেন, 'আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ।' তার কথায় মনে হয়, জুন্দুব ইতোমধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট নিজেকে সমর্পণ করেছেন। তারপর তিনি নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। নিজের পেশা ও মক্কায় আসার কারণ বর্ণনা করে বলেন: 'হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে এখন কী করতে হবে? আপনি মানুষকে কোন ধর্মের দিকে আহ্বান করেন?'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : 'আমি তোমাকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য আহ্বান করছি। তার সঙ্গে অন্য কারও ইবাদত করা যাবে না। আর মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করতে হবে।' আবু যর তখনই উচ্চারণ করলেন : 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং আমি এটিও সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি তার রাসূল।'
আর এভাবেই জুন্দুব ইবনে জুনাদাহ (আবু যর) রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলামে পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই তার জীবন অতিবাহিত করেছেন দুনিয়াবিমুখ হয়ে—কেবলমাত্র আল্লাহ এবং তার রাসূলের আনুগত্যের মাধ্যমে। একদিন যে লোকটি অদ্দান উপত্যকায় আতঙ্ক আর ত্রাসের নাম ছিল, সে ব্যক্তিই ইসলামগ্রহণের পর থেকে নির্লোভ আর দুনিয়াবিমুখতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিলেন। তার প্রত্যাশা ছিল, সকলেই তার মতো ধন-দৌলতের প্রতি সম্পূর্ণ নিরাসক্ত হোক। তার মতে আগামীকালের জন্য কোনো সম্পদই আজ সঞ্চয় করা যাবে না। এক্ষেত্রে তিনি পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর নির্ভর করাকেই প্রাধান্য দিতেন। এজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আকাশের নীচে এবং পৃথিবীর উপর আবু যরের চেয়ে বিশ্বাসী ও সত্যবাদী আর কেউ নেই।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তিনি এতই ভালোবাসতেন যে, তার মৃত্যুর পর যখনই তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা মনে করতেন, তখনই অঝোর ধারায় কাঁদতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেন, 'আল্লাহ আবু যরের ওপর রহম করুন। সে একাকী চলে, একাকীই মরবে, কিয়ামতের দিন একাই উঠবে। (আস-সিরাহ আন-নবুওয়াহ, ইবনে হাশিম, ৪/১৭৮; আল-হাকিম, ৩/৫০)। এ ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছিল। তিনি উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে মদীনা থেকে বহুদূরে নির্জন মরুভূমিতে ‘রাবজা’ নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন।
📄 হামযা রা.
মক্কার দিনকালের এখন ঠিক নেই। প্রতিদিন কোনো-না- কোনো অঘটন ঘটছেই। কুরাইশদের একের পর এক চেষ্টা বিফলে যাচ্ছে। তারা ইসলামকে ঠেকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। পারছে না। পারার কথাও নয়—এটি তারা শুনেছে; তবে বিশ্বাস করে না। একদিন পুরো শহরই ইসলামের পতাকাতলে শামিল হবে। সেদিন কবে হবে—আপাতত তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ইতোমধ্যে নবুওয়াতের দুই বছর চলে গেছে। মক্কায় আবার হজের মৌসুম শুরু হয়েছে। হজের মৌসুমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সচকিত হয়ে ওঠেন। ভিন দেশের মানুষের কাছে ইসলামকে তুলে ধরেন। বেশিরভাগ মানুষই সম্পদ ও নেতৃত্ব হারানোর ভয় করে। এজন্য এ পথে আর এগুতে চায় না। একদিন তিনি সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান করছেন। এ সময় আবু জাহেল এলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে তাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিশ্চুপ। চারদিকের কত শব্দই তো কানে আসে। সব শব্দে মানুষ বিচলিত হয় না। কিন্তু গালিগালাজের শব্দ মানুষ সহ্য করতে পারে না। ক্ষেপে যায়। রাসূল ক্ষেপছেন না। তিনি নির্বিকার। জবাব দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করছেন না।
আবু জাহেল স্পষ্টতই ব্যর্থ হলো। একাই রাগে গড়গড় করতে করতে কাবা-চত্বরের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে তার কুরাইশ বন্ধুরা আড্ডা দিচ্ছে। আবু জাহেল সেই আড্ডায় গিয়ে বসে দম নিল। ঘটনাটা এখানেই শেষ হলো না। গড়াল আরও অনেকদূর! মক্কার মুশরিকরা এ ঘটনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
এ সময় আব্দুল্লাহ ইবনে জুদানের ক্রীতদাস কাবা-চত্বরেই ছিল। একটু দূর থেকে পুরো ঘটনাই সে প্রত্যক্ষ করে। ঘটনাটা কাউকে জানানো দরকার। খামাখা একজন মানুষকে এভাবে গালি দেওয়ার কোনো মানে হয় না। এর একটা বিহিত হওয়া উচিত। যুলুমের মুখে নিশ্চুপ থাকাও একটি যুলুম। দাস মানুষ। নিজের পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। নেতৃস্থানীয় কাউকে বিষয়টা বলা দরকার। তেমন কাউকে এখন দেখা যাচ্ছে না। অপেক্ষা করা ছাড়া এই মুহূর্তে তার আর কিছু করার নেই।
হামযা-কুরাইশদের অহংকারের প্রতীক। আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান। তার শরীর পেশিবহুল এবং শক্তিশালী। কুরাইশদের প্রত্যেকে তাকে ভয় পায়। তার সাহসিকতার জন্য সবাই তাকে সমীহ করে চলে এবং সব সময় তার পক্ষেই থাকার চেষ্টা করে। তিনি তার ভাতিজা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুই বছরের বড় এবং দুধভাইও। তার মা রাসূলের আত্মীয়-চাচাতো বোন।
হামযা শিকার করতেন। শিকার করা তার কাছে ইবাদতের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এজন্য অনেক প্রস্তুতি নিতেন, সাজ-সজ্জা তো ছিলই। ঘটনার দিন তিনি শিকার থেকে ফিরছিলেন। তার দু-হাতে তির-ধনুক ধরা ছিল। ফেরার পথে সবাইকে শিকারী যন্ত্রপাতি দিয়ে অভিবাদন জানানো ছিল তার সাধারণ নিয়ম। তারপর কাবা-চত্বরে গিয়ে শিকার সমাপ্ত করতেন। অভ্যাস অনুযায়ী ওই দিন শিকার থেকে ফেরার পথে যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে, তিনি তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন, তাদের খোঁজখবর নিলেন। তারপরই আব্দুল্লাহ ইবনে জুদানের ক্রীতদাসের সঙ্গে তার দেখা হলো।
আব্দুল্লাহ ইবনে জুদানের ক্রীতদাস তাকে দেখে খুশি হলো। সকালের ঘটনাটা বলার মতো লোক পাওয়া গেছে। সে বলল : আবু আম্মারা, আপনি কি জানেন আপনার ভাতিজা মুহাম্মাদ এবং আবুল হাকাম ইবনে হিশাম (আবু জাহেল)-এর মধ্যে কী ঘটেছে? ওই তো ওইখানে-সে মুহাম্মাদকে দেখে তার নিকট এগিয়ে যায়। তারপর খুব বাজে ভাষায় তাকে গালমন্দ করেছে এবং অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেছে এমনকি তাকে উসকে দিতে চেয়েছে যেন একটি মারামারি বাধিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু মুহাম্মাদ তার দিকে ফিরেও তাকাননি। কোনো জবাবও দেননি।'
এ ঘটনা শুনে হামযা ভীষণ ক্ষেপে যান; তার শিরা-উপশিরায় আগুন ধরে যায়। ইসলাম গ্রহণ না করলেও ভাতিজার প্রতি ছিল প্রাণের টান; তিনি তাকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের আচরণ কখনো তার ভালো লাগেনি। যদিও এতদিন এর কোনো প্রতিবাদ করেননি, কিন্তু আজ আর চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না। আবু জাহেলের জঘন্য কর্মকাণ্ড তাকে অস্থির করে তুলল। এখনই এর জবাব দিতে হবে। তিনি দ্রুত রওনা হয়ে গেলেন!
শরীরে শিকারের পোশাক। কাঁধে ঝুলছে তির-ধনুক। এগুলো নিয়েই তিনি হাঁটছেন। এখনো শিকারেই যাচ্ছেন। তবে এবার লক্ষ্য কোনো বন্যপ্রাণী নয়; কাবা-চত্বরে আড্ডায় বসে থাকা আবু জাহেল। পথে কারও প্রতি তার ভ্রুক্ষেপ নেই। কেউ সাহসও করছে না কিছু বলার। সবাই যেন তাকে অনুসরণ করছে। কী ঘটে, তা-ই দেখার আগ্রহ তাদের। কাবা-চত্বরে আবু জাহেলকে খুঁজে পেতে দেরি হলো না। আসলেই সে বসে আড্ডা দিচ্ছে। সে জানে না, তার ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে। আবু জাহেলকে দেখেই হামযা তার দিকে তেড়ে গেলেন।
হামযার দিকে ভয়ার্ত চোখ দেখে আবু জাহেল ভড়কে গেল। ভড়কে গেল তার সঙ্গীরাও। এই মানুষটিকে সমীহ করে না, মক্কায় এমন কেউ বেঁচে নেই। আবু জাহেল ঘটনা বুঝতে পেরে আগেই কৃতকর্মের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করল। কাজ হলো না। শাস্তির ভয়ে অপরাধ থেকে বিরত থাকা যায়। অপরাধ করে মাফ পাওয়া যায় না। হামযা তার ধনুক দিয়ে আবু জাহেলের মাথায় সজোরে আঘাত করলেন। এতে তার মাথা কেটে গেল। এবার তার বুক বরাবর তির নিশানা করে গর্জে উঠলেন: 'কোন সাহসে তুমি তাকে আক্রমণ করলে? কোন সাহসে তুমি তাকে গালমন্দ করেছ? তাহলে জেনে রাখো, আমিও তার দ্বীন কবুল করলাম; সে যা বলে আজ থেকে আমিও তা-ই বলব। ক্ষমতা থাকলে আমার সামনে দাঁড়াও!'
ঘটনার আকস্মিকতায় আবু জাহেল দিশেহারা হয়ে গেল। অবস্থা বেগতিক দেখে বনু মাখযুমের কিছু লোক আবু জাহেলের সাহায্যে ছুটে এল। আবু জাহেল তাদের বাধা দিয়ে বললেন, 'তোমরা আবু আম্মারকে ছেড়ে দাও। আল্লাহর কসম! কিছুক্ষণ আগেই আমি তার ভাতিজাকে মারাত্মক গালি দিয়েছি।'
লোকেরা হামযাকে উসকে দিতে বলল, 'হামযা, সম্ভবত তুমি ধর্মত্যাগী হয়েছ!' হামযা দ্রুত এর জবাব দিলেন : 'যখন তার সত্যতা আমার নিকট প্রকাশ হয়ে পড়েছে, তখন তা থেকে আমাকে বিরত রাখবে কে? হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। যা কিছু তিনি বলেন, সবই সত্য। আল্লাহর কসম! আমি তা থেকে আর ফিরে আসতে পারি না। যদি তোমরা সত্যবাদী হও, আমাকে একটু বাধা দিয়েই দেখো!'
হামযার সিদ্ধান্ত ছিল চূড়ান্ত এবং তিনি সেখান থেকে সরাসরি তার ভাতিজা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সেখানেই গিয়েই তিনি তার ঈমানের ঘোষণা দিলেন। যে দিনের সূচনা হয়েছিল একটি অনভিপ্রেত ঘটনার মধ্য দিয়ে, সেই একইদিনের সমাপ্তি হলো হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো সাহসী বীরের ঈমান গ্রহণের মাধ্যমে। সেই দিন চিরদিনের জন্য ভাস্কর হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়।
হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু বদর-যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেন। এ যুদ্ধের শুরুতে মক্কার মুশরিকরা দ্বন্দ্ব-যুদ্ধের আহ্বান জানায়। এতে যে তিনজন মুহাজির সাহাবীকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগিয়ে যেতে বলেন, তিনি তাদের একজন। এরপর উহুদ-যুদ্ধে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। কাফেররা তার লাশ বিকৃত করে ফেলে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সম্মানিত চাচার লাশ দেখে কেঁদে ওঠেন। তাকে সাইয়্যিদুশ শুহাদা (সকল শহীদদের নেতা), আসাদুল্লাহ (আল্লাহর সিংহ) এবং আসাদ আল-জান্নাহ (জান্নাতের সিংহ) বলে সম্বোর্ডন করা হয়।
📄 সাদ ইবনে মুআয রা. এবং উসাইদ ইবনে হুদাইর রা.
মদীনায় নতুন একজন মানুষ এসে বসতি গেড়েছেন। তিনি এসেই যেন মদীনায় ঝড় তুলেছেন। এ ঝড়ে আকাশ প্রকম্পিত হয় না। মানুষের অন্তরে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সব ভেঙেচুরে নতুনভাবে গড়ে তোলে। তিনি হলেন মুসআব ইবনে উমাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রথম প্রতিনিধি। ঠিক যেন রাসূলেরই প্রতিচ্ছবি! তার আভিজাত্য ও গঠন, চরিত্র ও কথোপকথন এবং অপার্থিব আচার-আচরণে মুগ্ধ হয় না, এমন মানুষ বিরল। মানুষ তাকে আশ্চর্য প্রদীপ মনে করে। কাছে এলে আর দূরে সরে যেতে পারে না। তিনি যা-ই বলেন, তা-ই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনে। এতে তারা শত বছরের পুরোনো অন্ধ বিশ্বাস ও লৌকিকতা বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করছে না। তারা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করছে। মুসআব ইবনে উমাইর রাযিয়াল্লাহু আনহুই একমাত্র সাহাবী-যিনি ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত গড়তে একাই লড়েছেন, জীবন বাজি রেখেছেন এবং আল্লাহর সাহায্যে তার মিশন সম্পন্ন করেছেন।
তখন মদীনার পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল বেশ জটিল। খ্রিস্টান, ইহুদী আর পৌত্তলিকতায় বিশ্বাসী গোত্ররা পাশাপাশি অবস্থান করত। এ অবস্থান সহজ ছিল না। প্রায়ই গোত্রে গোত্রে মারামারি লেগে যেত। তুচ্ছ বিষয় নিয়েই খুনাখুনি হতো। আর তা থামতও না। একবার কেউ শত্রু হয়ে গেলে বংশপরম্পরায় শত্রুতা চলত। তবে সবচেয়ে খারাপ ছিল ইহুদীরা। সর্বশেষ নবীর আগমনের নিশ্চিত তথ্য জানার পরও অবিশ্বাস আর শত্রুতা ছিল তাদের স্বভাবজাত। এই কঠিন পরিস্থিতিতেই মুসআব রাযিয়াল্লাহু আনহু দাওয়াতের কাজ শুরু করেন।
আউস ও খাজরায—মদীনার দুটি প্রসিদ্ধ গোত্র। জাহেলী যুগে প্রসিদ্ধ হওয়া মানেই যুদ্ধ-বিগ্রহের কঠিন জীবন। এ দুটি গোত্রও তা থেকে ব্যতিক্রম ছিল না। পরস্পর শত্রুতা ও লড়াইয়ের জন্যই এরা মদীনায় ব্যাপক পরিচিত লাভ করে। এদের নেতারাও আজন্ম যোদ্ধা। এরকম দুজন নেতা ছিলেন সাদ ইবনে মুআয এবং উসাইদ ইবনে হুদাইর। তারা ছিলেন আউস গোত্রের। বনু আব্দুল আশহাল শাখাগোত্রে তাদের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা।
মদীনায় ইসলামের দাওয়াতী কার্যক্রমের পরিধি বাড়ছে। মুসআব বনী জাফার গোত্রে বসে মানুষকে কুরআনের তালীম দিতেন। একদিন আসআদ ইবনে জুরারা মুসআবকে নিয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকার উদ্দেশ্যে বের হলেন। ওই এলাকা ছিল বনী আব্দুল আশহাল গোত্রের বসতি। তারা একটি কূপের নিকট এসে যাত্রাবিরতি করেন। সাদ ইবনে মুআয এবং উসাইদ ইবনে খুদাইর এই সংবাদ পেলেন। তারা ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। এর আগেও তারা মুসআবের সংবাদ পেয়েছেন। সে এসে এদেশে নতুন ধর্ম প্রচার করছে। এটা তাদের সহ্য হচ্ছে না। এখন একদম তাদের নাকের ডগায় চলে এসেছে। এর একটা বিহিত করা দরকার। এ দুজনকেই দেশ ছাড়া করতে হবে। সাদ ইবনে মুআযের রাগই বেশি। তিনি নিজেই যেতে চাইলেন। মুশকিল হচ্ছে, আসআদ ইবনে জুরারা হলো তার খালাতো ভাই। এজন্য তিনি উসাইদকে বললেন, 'তোমার পিতার সর্বনাশ হোক! তুমি এখনই এ দুজন লোকের কাছে যাও। তারা আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে আমাদের বাড়ির ওপর চড়াও হয়েছে। তাদের তাড়িয়ে দাও; এ পথ মাড়াতে নিষেধ করো। যদি ওই লোকটির সঙ্গে আসআদ ইবনে যুরারা না থাকত, তাহলে আমি নিজেই যেতাম। তার সামনে আমার যাওয়া ঠিক হবে না।'
উসাইদ ইবনে হুদাইর সাদের কথায় রাজি হলেন। হাতে বর্শা তুলে নিলেন। তারপর একাই ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য ছুটলেন। চেহারায় মারাত্মক গোস্বা। মেজাজও তেঁতে আছে। দ্রুত হাঁটছেন। তার হাঁটার ভঙ্গিতে গোস্বা যেন বেড়েই চলছে। আসআদ তাকে দূর থেকে আসতে দেখলেন। তিনি ঘাবড়ালেন না। এরকম ভয় জয় করে তারা ইতোমধ্যে অনেক পথ পাড়ি দিয়েছেন। তিনি মুসআবকে বললেন, 'দেখুন, একজন লোক আপনার দিকে এগিয়ে আসছে। সে তার গোত্রের সর্দার। আপনি তাকে মুসলিম বানিয়ে দেন।'
উসাইদ শুরু থেকেই উত্তেজিত। তিনি অত্যন্ত গরম মেজাজে বললেন, 'তুমি কেন এখানে এসেছ এবং দুর্বলদের নিকট এসব কী প্রচার করছ? যদি জানে বাঁচতে চাও, এখনই এ দেশ ছেড়ে চলে যাও।'
এরকম উস্কানীমূলক কথায় শান্ত থাকা যায় না। কেউ গরম হয়ে কথা বললে তার জবাবও গরম হয়ে দিতে হয়। দুনিয়ার মানুষ এভাবেই অভ্যস্ত। মুসআব রাযিয়াল্লাহু আনহু তো আসমানী মানুষ। তিনি পুরোপুরিই ব্যতিক্রম। তার অন্তর থেকে জাগতিক ভয়-ভীতি বহু আগেই বিদায় নিয়েছে। তিনি তার স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, 'আপনি কি একটু বসবেন এবং আমার কথা শুনবেন! যদি আপনার ভালো লাগে, তাহলে তা গ্রহণ করবেন নতুবা আপনি যা বলেন, আমরা তা-ই করব।'
মুসআবের কথা শুনে উসাইদ হঠাৎ করেই রাগ করার কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না। যুদ্ধবাজ গোত্রের নেতা হলেও তার বিবেকবোধ প্রখর ছিল। তিনি নমনীয় হতে বাধ্য হলেন। তিনি বলে উঠলেন, 'এ তো বড় বুদ্ধিমত্তা ও ইনসাফের কথা।' এ কথা বলেই তিনি বর্শা পাশে রেখে বসে পড়েন।
এবার মুসআব তার কথা শুরু করলেন। তার কণ্ঠ থেকে ইসলামের মর্মকথা উচ্চারিত হচ্ছে। এ যেন মিষ্টিমধুর ঝর্ণাধারা! উসাইদ দারুণভাবে মুগ্ধ হন। নিজের ভেতর আবেগ যেন উথলে উঠছে। সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করাই তার জন্য মুশকিল হয়ে উঠেছে। মুসআবের কথা শেষ না হতেই তিনি বললেন, 'এ বিষয়টি কতই না চমৎকার...কি অপূর্ব কথা...'। তারপর তিনি বললেন, 'কেউ যদি এই দ্বীন গ্রহণ করতে চায়, তাহলে তার কী করা উচিত?'
মুসআব রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'প্রথমে গোসল ও পাক-সাফ কাপড় পরে কালিমা উচ্চারণ করতে হবে। তারপর সালাত আদায় করতে হবে।' এবারও মুসআবের কথা শেষ না হতেই উসাইদ উঠে দাঁড়ালেন। তারপর তিনি যেন গায়েব হয়ে গেলেন। একটু পরেই তিনি ফিরে এলেন। তার চুল থেকে টপ টপ করে পানি ঝরছে। কারও আর বুঝতে বাকি থাকল না, উসাইদ ইসলামে প্রবেশ করতে চলেছেন। শীঘ্রই তিনি মুসআবের হাতে হাত রেখে তাওহীদের বাণী উচ্চারণ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার অন্তর ঈমানে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল এবং তিনি নতুন মানুষ হয়ে উঠলেন। এ এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত! মুসলিম হয়েই তিনি মুসআবের প্রতি দরদী হয়ে উঠলেন। মুসআবের বিপদ এখনো কাটেনি। তিনি নিজে যে বিপদ ঘটাতে এসেছিলেন, সেই বিপদের আশঙ্কা এখনো শেষ হয়নি। তিনি মূলত সাদ ইবনে মাআযের কথাই ভাবছিলেন। এজন্য বললেন, 'আমি আরেকজনকে চিনি। যদি সে ঈমান আনে, তাহলে এই শহরে ঈমান আনার ক্ষেত্রে আর কেউ বাকি থাকবে না। একটু অপেক্ষা করুন। আমি তাকে আপনার নিকট পাঠাচ্ছি।'
ওই মজলিস থেকে উসাইদ সরাসরি সাদ ইবনে মুআযের নিকট গেলেন। সাদ মূলত তার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। সঙ্গে আরও বন্ধুরা ছিল। তারা উসাইদের আগমন দেখে ভিন্ন কিছু আঁচ করল। তাদের ধারণা ঠিকই ছিল। তারা বলল, 'ওই তো সে আসছে। কিন্তু যে চেহারা নিয়ে সে গিয়েছিল, তাতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এটি সেই একই উসাইদ নয়।'
সাদও কম বিচক্ষণ ছিলেন না। তিনি ঘটনা টের পেলেন। নিশ্চিতভাবেই উসাইদ কোনো সুরাহা না করেই ফিরে এসেছে। উসাইদ কাছে আসতেই জিজ্ঞেস করলেন, 'কী করে এসেছ তুমি?' উসাইদ নিজের বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগাতে চাইলেন। তিনি যে ইসলাম গ্রহণ করে এসেছেন, এ কথা বললে সাদ আরও ক্ষেপে যাবে। মানুষ অকারণে রেগে গেলে সেখানে কারণ বর্ণনা করতে নেই। রাগ কমাতে হলে ভিন্ন কিছু করতে হয়। বড় কারও সান্নিধ্যে গেলে রাগ এমনিতেই দূর হয়ে যায়। তাকে এখন যেভাবেই হোক মুসআবের কাছে পাঠাতে হবে। এজন্য তিনি জবাবে বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি ওই দুজনের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রথমে আমি তাদের ওই কাজে বারণ করেছি। তারপর তারা বলল, ঠিক আছে, আপনি যা ভালো মনে করেন, আমরা তা-ই করব।' আরও বললেন, 'আমি শুনেছি, বনী হারেসার লোকেরা আসআদ ইবনে যুরারাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। তারা তো ভালো করেই জানে সে তোমার খালাতো ভাই।'
এবার সাদ আরও রেগে গেলেন। তিনি গোত্রের সর্দার। তিনি এরকম বিশৃঙ্খল পরিবেশ কোনোভাবেই সায় দিতে পারেন না। একই সঙ্গে তিনি উসাইদের প্রতি খুব অসন্তুষ্ট হলেন। তাকে যে কাজে পাঠিয়েছিলেন, তা সে করতে পারেনি। এখন তাকেই এর সুরাহা করতে যেতে হবে। তিনি বর্শা উঠিয়ে নিলেন এবং মুসআবের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। তার চোখে-মুখ গোস্বায় ফেটে পড়ছে। শীঘ্রই তিনি মুসআবের নিকট হাজির হলেন। তিনি এত বেশি ক্রোধান্বিত হয়ে উঠলেন যে, মুখে যা আসে তা-ই বলতে লাগলেন। প্রথমে তিনি তার চাচাতো ভাই আসআদের প্রতি তীব্র ভাষায় কথা বলা শুরু করলেন যে কিনা মুসআবকে এ শহরে নিয়ে এসেছে : 'আল্লাহর কসম, আমার আর তোমার মাঝে যে আত্মীয়তা তা যদি না থাকত, তবে তুমিও আজ রেহাই পেতে না।'
তারপর তিনি মুসআবকে লক্ষ করে তীব্র হুমকি দিতে থাকেন। জোরে জোরে তাকে গালমন্দ করেন। তার রাগ বাড়ছেই। মুসআব মুসআবেরই মতো। তার চেহারায় এর কোনো প্রভাবই দেখা গেল না। মৃত্যু-সে তো আসবেই। ভয়ে আগেই মৃত্যুবরণ করার মানুষ তিনি নন। বরং যারাই তাকে হত্যা করতে এসেছে, তারাই নতুন জীবন নিয়ে ফিরে গেছে। তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন, 'দয়া করে একটু বসুন। আমার বক্তব্য শুনুন! আপনার ভালো লাগলে গ্রহণ করবেন নতুবা আপনার যা ইচ্ছা করবেন।'
হঠাৎ করেই পরিবেশ ভিন্ন মোড় নিতে শুরু করেছে। বিষয়টি এখন সাদের ইচ্ছাধীন। তাকে কোনো কাজে বাধ্য করার লোক এ পৃথিবীতে নেই। সুতরাং কিছু কথা শুনলে সমস্যা কী? তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, তুমি ন্যায্য কথা বলেছ।' উসাইদের মতো তিনিও তার বর্শা পাশে রেখে বসে পড়লেন এবং মুসআবের কথা শুনতে লাগলেন। 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' বলে মুসআব কথা শুরু করতেই সাদ হকচকিয়ে গেলেন। তার চেহারায় আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ল। মুসআব যা বলতে চেয়েছিলেন, তা শেষ করার আগেই তিনিও উসাইদের মতো বলে উঠলেন, 'কেউ যদি এই দ্বীন গ্রহণ করতে চায়, তাহলে তার কী করা উচিত?'
মুসআব রাযিয়াল্লাহু আনহু উসাইদকে যা বলেছিলেন, তাকেও একই কথা বললেন। এ দ্বীনের সবকিছুই পরিষ্কার এবং বাস্তব সত্য। যে কেউ তা গ্রহণ করবে, সে-ই সত্যিকার অর্থে বুদ্ধিমান। এর বিরুদ্ধাচরণ করার কোনো যুক্তি নেই। এখন আর পিছপা হওয়ার সুযোগ নেই অথবা এই দ্বীন থেকে নিজেকে বিরত রাখারও কোনো মানে হয় না। মুসআবের সান্নিধ্যে এসে সাদও একই দায়িত্বপালনে সেই অলৌকিক চাবির সন্ধান পেয়েছেন—যা দিয়ে তিনি তার গোত্রের অন্তরসমূহের বাঁধন খুলতে ব্যাকুল হয়ে গেলেন। তিনিও তার গোত্রের নিকট এমনভাবে ফিরে গেলেন—যাতে মুসআবের নিকট আসার সময়কার ক্ষিপ্রতার কোনো চিহ্ন ছিল না।
টিকাঃ
৫ মুহাম্মাদ সা.: হৃদয়ের বাদশাহ, দ্বিতীয় খণ্ড, মাকতাবাতুল ফুরকান, ঢাকা, পৃ. ১৮।
📄 উমাইর ইবনে ওহাব রা.-এর
বদরযুদ্ধ শেষ হয়েছে বেশিদিন হয়নি। মক্কার মুশরিক বাহিনী শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছে। এমন পরাজয়ের কথা তারা কল্পনাও করেনি। এতে তাদের বড় বড় নেতা নিহত হয়েছে এবং অনেকেই মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়েছে। তারা ফিরেছে একেবারে নিঃস্ব হয়ে। কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে। এখন মক্কার ঘরে ঘরে শোকের মাতম চলছে। কেউ কেউ প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। শলা-পরামর্শ চলছেই।
উমাইর ইবনে ওহাব-কুরাইশদের মধ্যে জঘন্য প্রকৃতির দুষ্কৃতকারী নেতা। ইসলামের চরম দুশমন। সব নেতারই কিছু যোগ্যতা থাকে। উমাইরেরও ছিল। তার অনুমানশক্তি ছিল মারাত্মক প্রখর। তার দৃষ্টি যেন শ্যেণ দৃষ্টি। বিরাট কাফেলা দেখেই লোকসংখ্যা বলে দিতে পারত। এ অনুমান প্রায়ই সঠিক হতো। বদরেও মুশরিকরা তাকে কাজে লাগিয়েছে। মুসলিমদের সৈন্যসংখ্যা ঠিক বললেও সেটি তাদের কোনো উপকার করেনি। সে বলেছিল, মুসলিমদের সংখ্যা তিনশর মতো হবে। এর কিছু কম বা বেশিও হতে পারে। কি আশ্চর্য অনুধাবন ক্ষমতা! এ ক্ষমতা দিয়ে সে এখনো নবীকে চিনতে পারেনি। এজন্য ঐশী অনুকম্পা লাগে। এর কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
উমাইরের ঘরে মন টিকছে না। অস্থির লাগছে। সকাল হতেই কাবা-চত্বরের দিকে গেল। তাওয়াফ করবে। তারপর দেবদেবিকে সাজদা করবে। মনে যদি একটু স্বস্তি আসে! কিছুতেই মন ভালো করা যাচ্ছে না। দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে আছে। সে ছেলের কথা ভাবছে। তার ছেলে ওহাব ইবনে উমাইর। এখন মুসলিমদের হাতে বন্দী। এ কষ্ট তার অন্তরকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলছে। এখন কেবল মুহাম্মাদকে হত্যা করতে পারলেই এ বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব।
কাবা-চত্বরে মানুষজন তেমন নেই। দূর থেকে সাফওয়ান ইবনে উমাইরকে দেখা গেল। সে হাতিমের নিচে বসে আছে। সে তার পাশে গিয়ে বসল। দুজনের চোখে-মুখেই চরম হতাশা। উমাইরই প্রথম কথা বলল। সে বদর-যুদ্ধে কুয়োয় নিক্ষিপ্তদের মর্মান্তিক পরিণতির কথা বর্ণনা করল। তখন সাফওয়ান বলল, 'আল্লাহর কসম, এদের নিহত হওয়ার পর আমাদের বেঁচে থাকার কোনো সার্থকতা নেই।'
উমাইর তাকে বলল, 'তুমি ঠিকই বলেছ। আল্লাহর কসম, যদি আমার ওপর এমন ঋণের বোঝা না থাকত—যা পরিশোধ করার কোনো ব্যবস্থা আমার নেই। আর যদি আমার সন্তানাদি না থাকত আমার অবর্তমানে যাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, তবে আমি গিয়ে অবশ্যই মুহাম্মাদকে হত্যা করতাম। আরও কারণ হলো, আমার ছেলে তাদের হাতে বন্দী।'
সাফওয়ান যেন যাদুর কাঠি পেয়ে গেল। এরকম সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক না। টাকা খরচ করা সহজ, প্রাণ বিসর্জন দেওয়া কঠিন। মুহাম্মাদকে সে নিজেও হত্যা করতে চায়। এখন তাকে হত্যা করতে যাওয়া মানেই নিজের প্রাণ বিসর্জন দেওয়া। সাফওয়ান দ্রুত বলে উঠল, 'তোমার ঋণের দায়িত্ব আমার, তোমার পক্ষ থেকে আমি তা পরিশোধ করব। তোমার সন্তানেরা আমার সন্তানদের সঙ্গে থাকবে। ততদিন তারা বেঁচে থাকবে, আমি তাদের দেখাশোনা করব। আমার থাকবে আর তারা পাবে না, এমনটি কখনো হবে না।'
সাফওয়ানের কথায় উমাইরের মনে আশা জেগে উঠল। মুহাম্মাদকে হত্যা করা সহজ নয়। এতে যদি তার প্রাণও যায়, তবু তার আফসোস থাকবে না। তার দুশ্চিন্তার কারণ ছিল, পরিবারের ভরণ-পোষণ আর ঋণের বোঝা। সাফওয়ান যখন এ দায়িত্ব নিচ্ছে, তখন আর চিন্তা নেই। এজন্য উমাইর বলল, 'তাহলে বিষয়টি আমার আর তোমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাক! তুমি কী করতে যাচ্ছ, আর আমিই বা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছি-কাউকে এ ব্যাপারে কিছু বলো না।'
সাফওয়ান বলল, 'তা-ই করব।'
দুজনের কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়ে গেছে। উমাইর আর দেরি করতে চাচ্ছে না। তখনই তারা সেখান থেকে উঠে পৃথক হয়ে গেল এবং এর পরিণতি দেখার আশায় থাকল। সাফওয়ান অনেকটা নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরলেও উমাইরের সেই সুযোগ নেই। তার কাজ অনেক কঠিন। মনে উত্তেজনা কাজ করছে। প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবে কি না-সে জানে না। আপাতত সে ভয়-ভীতিকে পাত্তা দিতে চায় না। বাড়িতে গিয়েই সে সফরের প্রস্তুতি শুরু করল। নিজের তরবারিতে বিষ মিশিয়ে ধার দিতে লাগল। যখন মনঃপুত হলো, তখন ক্ষান্ত হলো। এই তরবারিই তার সম্বল। বাহ্যিকভাবে সে ছেলেকে উদ্ধার করতে যাচ্ছে। আর সুযোগ বুঝে মুহাম্মাদকে গুপ্তহত্যায় মেতে উঠবে। সে মদীনার পথে বেরিয়ে পড়ল।
সময়মতোই উমাইর মদীনায় গিয়ে পৌঁছল। পথে তাকে কোনো বিপদে পড়তে হয়নি। সে সরাসরি মসজিদে নববীর কাছে এসে থামল। বাইরে উট রেখে সে মসজিদে প্রবেশ করে। মুহাম্মাদকে এখানেই পাওয়া যাওয়ার কথা। দূর থেকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে দেখলেন; তার দূরদর্শিতার তুলনা ছিল না। তিনি উমাইরের হাঁটার ভঙ্গি দেখেই বিপদ আঁচ করে ফেলেন। তিনি বলে ওঠেন : 'এই যে কুকুরটি—আল্লাহর দুশমন-উমাইর, সে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছাড়া এখানে আসেনি। সে-ই তো আমাদের মাঝে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করেছিল এবং বদরযুদ্ধে আমাদের সৈন্যসংখ্যা অনুমান করে শত্রুদের জানিয়ে দিয়েছিল।'
এই কথা বলেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলেন। তিনি দ্রুত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, এই যে আল্লাহর দুশমন কাঁধে তরবারি ঝুলিয়ে এখানে এসেছে।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই সম্মতিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব অবাক হলেন। তিনি এটি আশা করেননি। এই লোকটির উদ্দেশ্য নিশ্চিতভাবেই খারাপ; তাকে দেখেই এটি বোঝা যাচ্ছে। তবে আল্লাহর রাসূল যা দেখেন, সেটি নিশ্চয়ই তার ধারণার বাইরে। তিনি যেহেতু তাকে কাছে আসতে বলেছেন, এখন আর বিকল্প কিছু করার সুযোগ নেই।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবার উমাইরের দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি উমাইরের ঝুলন্ত তরবারি তার ঘাড়ের সাথে চেপে রেখে বুকের কাপড় জড়িয়ে ধরলেন এবং সাথী আনসারদের বললেন, 'তোমরা রাসূলের কাছে গিয়ে বসো এবং এ দুরাচারের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। কেননা, একে বিশ্বাস করা যায় না।' তারপর তারা তাকে রাসূলুল্লাহর কাছে নিয়ে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমাইরের অবস্থা দেখে বললেন, 'উমর, তাকে ছেড়ে দাও।' আর উমাইরকে বললেন, 'উমাইর, আমার কাছে এসো।'
উমাইর রাসূলের কাছে গিয়ে বলল, 'সুপ্রভাত।' এটাই ছিল জাহেলী যুগের সম্ভাষণ। উমাইর নিজের উদ্দেশ্য গোপন রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জবাবে বললেন, 'উমাইর, তোমার সম্ভাষণ অপেক্ষা উত্তম সম্ভাষণের ব্যবস্থা দিয়ে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন। আর তা হলো সালাম, শান্তি-যা হবে জান্নাতীদের সম্ভাষণ।'
উমাইর বলল, 'হে মুহাম্মাদ, আল্লাহর কসম, আমি এ বিষয়ে এখনই অবগত হলাম।' তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'উমাইর, তুমি কী জন্য এসেছ?'
সে বলল, 'আপনাদের হাতে আটক এই বন্দীর মুক্তির জন্য আমি এখানে এসেছি। তার ব্যাপারে দয়া করুন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবার কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, 'তবে তোমার কাঁধে তরবারি কেন?' এ প্রশ্নে উমাইর পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সে যতটা সহজ ভেবেছিল, কোনোকিছুই সেভাবে এগোচ্ছে না। মনে হচ্ছে, মুহাম্মাদকে গুপ্তহত্যার পরিবর্তে সে নিজেই এখন প্রকাশ্য হত্যার শিকার হবে। এজন্য সে একটি উদ্ভট জবাব দিল : 'আল্লাহ তরবারির অমঙ্গল করুন। তা কি আমাদের কোনো কাজে এসেছে?'
এটি কোনো সন্তোষজনক জবাব নয়। বিষয়টি সে নিজেও জানে। মূলত এ প্রশ্নে তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছে। যা পেরেছে, বলেছে। কিন্তু এভাবে পার পাওয়া গেল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'সত্যি করে বলো, কী উদ্দেশ্যে এসেছ?' সত্যি করে নিজের উদ্দেশ্য বললেই বিপদ। নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনা যায় না। মদীনায় আসার আগে মৃত্যুভয়কে এড়িয়ে যেতে পারলেও এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। অকারণে সে মরতেও চাচ্ছে না। উমাইর কোনোমতে বলল, 'ওই বিষয় ছাড়া আমি আর কোনো উদ্দেশ্যে আসিনি।'
এবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দৃঢ় কণ্ঠে বলা শুরু করলেন : 'কিছুতেই তা নয়, বরং তুমি ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া হাতীমে বসে বদরের কুয়োর নিক্ষিপ্ত কুরাইশদের সম্পর্কে আলোচনা করছিলে। তুমি না বলেছিলে, আমার যদি ঋণের বোঝা এবং সন্তানদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব না থাকত, তবে আমি অবশ্যই বেরিয়ে গিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করতাম। তখন সাফওয়ান তোমার ঋণ ও সন্তানের দায়িত্ব এই শর্তে গ্রহণ করে যে, তুমি আমাকে হত্যা করবে। অথচ আল্লাহ তোমার ও তোমার উদ্দেশ্যের মাঝে অন্তরায় হয়ে আছেন।'
উমাইরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। এটি কেমন করে সম্ভব-মক্কার আলোচনা তার কানে এলো কীভাবে? হুবহু একইরকম! এটি দুনিয়ার কারও কাজ নয়। তার মনে তোলপাড় শুরু হলো। আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত এ তোলপাড় থামল না। সে বলে উঠল, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল। ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি আকাশের ওইসব সংবাদ আমাদের শোনাতেন এবং আপনার ওপর যেসকল ওহী অবতীর্ণ হতো, আমরা তা সবই অবিশ্বাস করতাম। আর এ বিষয়টি আমি ও সাফওয়ান ব্যতীত অন্য কেউ জানে না। সুতরাং আল্লাহর কসম, আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি, এ সংবাদ আপনাকে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানায়নি। সকল প্রশংসা ওই আল্লাহর, যিনি আমাকে ইসলামের পথ দেখালেন ও এই স্থানে নিয়ে এলেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর রাসূল।'
সাহাবীরা এ ঘটনা দেখে বিস্মিত হলেন। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুজিযা স্বচক্ষে দেখলেন। সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু। মানুষকে হত্যা করা হয়তো সহজ, কিন্তু উমাইরের মতো লোকদের অন্তকরণে সত্যকে প্রোথিত করে দেওয়া অনেক কঠিন কাজ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তারা এই শিক্ষাকেই আঁকড়ে ধরলেন—‘একজন মুসলিমের জীবন এমন হওয়া উচিত যেন তাকে হত্যা করতে আসা শত্রুও তার সান্নিধ্য থেকে কিছু হলেও উপকৃত হতে পারে এবং ফিরে যাওয়ার আগে সে যেন ভিন্ন মানুষে পরিণত হয়।
উমাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলামগ্রহণের পর মক্কায় ফিরে যান। রাত-দিন মক্কার অলিতে-গলিতে দাওয়াত দিতে থাকেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার হাতে বিপুল সংখ্যক লোক ঈমান আনেন। উহুদ-যুদ্ধের পূর্বে মুমিনদের এই দলটি সঙ্গে করে তিনি আবার মদীনায় চলে যান। মক্কা বিজয়ের পর তার বন্ধু ও সাথী সাফওয়ান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-ও ইসলামগ্রহণ করেন। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে উমাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজে খলীফাকে সহযোগিতা করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে মিসর অভিযানে তিনি সেনাকমান্ডার হিসেবে মদীনা থেকে সাহায্য-সৈন্য নিয়ে ছুটে যান। ইসকান্দারিয়া বিজয়ের পর আমর রাযিয়াল্লাহুর নির্দেশে তিনি মিসরের বহু এলাকা পদানত করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের শেষ দিকে তিনি ইন্তেকাল করেন।