📄 সালমান আল-ফারসি রা.
এক সময় পৃথিবীতে মানুষ দীর্ঘ হায়াত পেত। হাজার বছর কিংবা তারও বেশি। সেটা কমে কমে এখন একশ'র নিচে চলে এসেছে। কেউ কেউ একশ'র বেশিও বাঁচে। তখন সেটি খবর হয়ে ওঠে। সালমান আল-ফারসী এরকম একজন। তিনি দীর্ঘ হায়াত পেয়েছিলেন। কয়েকশ বছর। তার যুগে অন্য কেউ এত হায়াত পাননি। দীর্ঘ জীবনের ঘটনাও দীর্ঘ হয়। এজন্য তার ইসলামগ্রহণের ঘটনা এক-দুইদিনের নয়; বরং শত বছরের। আল্লাহ তাকে বিশেষভাবে ইসলামের জন্য মনোনীত করেছিলেন।
পারস্যের ইসফাহান অঞ্চলে একটি গ্রামের নাম জায়ান। এ গ্রামেই তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। যুবক বয়স পর্যন্ত তিনি এখানেই ছিলেন। তার বাবা ছিলেন গ্রামের সর্দার। সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। ধনীদের বিভিন্ন বাতিক থাকে। তার বাবারও ছিল। কী এক অমঙ্গলের আশঙ্কায় প্রিয় ছেলেকে গৃহবন্দী করে রাখলেন। পায়ে বেড়ি পর্যন্ত পরালেন। যুবক বয়সে বন্দিত্ব ভালো লাগার কথা নয়। সালমানেরও ভালো লাগল না। একদিন সুযোগ বুঝে ঘর ছেড়ে পালালেন।
স্রষ্টার ইবাদতে খুব আগ্রহ ছিল সালমানের। এজন্য জীবন উৎসর্গ করতে চাইতেন। পিতার ধর্ম ছিল মাজুসী। তিনি আগুনের পূজা করতেন। আর সারাক্ষণ আগুন জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সালমানকেই। এসব কাজে তার আগ্রহের কমতি ছিল না। একদিন গ্রামের এক গীর্জায় ঢুকে পড়েন তিনি। তাদের প্রার্থনা-পদ্ধতি তার মন কেড়ে নেয়। সেই থেকে খ্রিস্টধর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। তখন এ ধর্মের উৎস ছিল শামে। তিনি স্থানীয় খ্রিস্টানদের সহায়তায় দামেস্কে পাড়ি জমান।
দামেস্কে তিনি নতুন। এই প্রথম গ্রামের বাইরে কোথাও এলেন। কাউকেই চেনেন না। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে এক গীর্জায় গিয়ে উঠলেন। গীর্জার পুরোহিতকে নিজের বাসনা বললেন: 'আমি খ্রিস্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি। আমার ইচ্ছা, আপনার সাহচর্যে থেকে আপনার খিদমত করা, আপনার নিকট থেকে শিক্ষা লাভ করা এবং আপনার সঙ্গে প্রার্থনা করা।' এতে পুরোহিত রাজি হলো। তিনি তার সঙ্গে থাকা শুরু করলেন।
ধনীর আদরের দুলাল ছিলেন সালমান। সবছেড়ে এই বৈরাগ্য জীবনেই তিনি শান্তি খুঁজে পেলেন। কিন্তু এ শান্তি বেশিদিন টিকল না। পুরোহিতের কর্মকাণ্ড তার ভালো লাগল না। ধর্মীয় নেতা হতে হলে সৎ হতে হয়। পুরোহিতটা মারাত্মক অসৎ। অসৎ লোকের সঙ্গে থাকা মুশকিল। সেবা করা আরও কঠিন। অন্য কোথাও যাবেন, সে উপায়ও নেই। বাধ্য হয়ে এখানেই থাকতে লাগলেন।
সালমানের ভাগ্য বরাবরই সুপ্রসন্ন। কিছু দিনের মধ্যেই অসৎ লোকটি মরে গেল। তার জায়গায় এলো নতুন পুরোহিত। নতুন মানুষটিকে তার ভালো লাগল। তিনি দুনিয়া-বিরাগী এবং ইবাদতগুজার; সঠিক খ্রিস্টধর্মের প্রচারক এবং ধারক। সালমান সর্বস্ব দিয়ে তার সেবা করতেন। দুজন আত্মার আত্মীয় হয়ে ওঠেন। এভাবে লম্বা একটা সময় অতিবাহিত হলো। তারপর সেই পুরোহিত ইন্তেকাল করলেন। মৃত্যুর আগে সালমানকে আরেকজন পুরোহিতের সন্ধান দিয়ে গেলেন। সেই পুরোহিত থাকেন মাসুলে। এখন তাকে মাসুলে যেতে হবে। তিনি গেলেন।
সালমানের আবার নতুন জীবন শুরু হলো। মাসুলের লোকটিও ভালো। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তিনিও পরপারে পাড়ি জমান। এবার সন্ধান পেলেন নাসসিবিনে আরেক পুরোহিতের। গেলেন। নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী এ পুরোহিতও বেশিদিন বাঁচলেন না। তিনি মৃত্যুর আগে সালমানকে বললেন, 'অমুক নামে আমুরিয়্যাতে এক লোক আছেন। তুমি তার সাহচর্য অবলম্বন করো। এ ছাড়া আমাদের এ সত্যের উপর অবশিষ্ট আর কাউকে আমি জানি না।'
জীবন উৎসর্গিত না হলে কেউ এমনভাবে ইবাদত-বন্দেগীতে লেগে থাকে না। এ পর্যন্ত চারজন পুরোহিতের সঙ্গ লাভ করেছেন। খ্রিস্টধর্মের যাবতীয় বিষয়াদি, গির্জার নানা কর্মকাণ্ড, প্রার্থনা পদ্ধতি, উৎসব—কোনো কিছুই শেখা বাকি নেই। চাইলেই তিনি এখন পুরোহিত সেজে বিলাসী জীবন কাটাতে পারেন। কিন্তু তিনি শিষ্যত্বকেই বেছে নিলেন। আমুরিয়্যাতে গিয়ে হাজির হলেন। ওই লোককে খুঁজে বের করলেন। তার সঙ্গে থাকার অনুমতি চাইলেন। অনুমতি মিলল।
নতুন পুরোহিত লোকটি আগের তিনজনের মতো একই পথ ও মতের অনুসারী। সালমানের ভালো লাগল। তবে এ ভালো লাগাও বেশিদিন টিকল না। অদৃশ্যের ইশারায় তিনিও খুব দ্রুত জীবনের অন্তিম মুহূর্তে পৌঁছে গেলেন। এ সময় সালমান তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমার অবস্থা তো আপনি ভালোই জানেন। এখন আমাকে কী করতে বলেন, কার কাছে যেতে পরামর্শ দেন?'
পুরোহিত বললেন, 'বৎস, আমরা যে সত্যকে ধরে রেখেছিলাম, সে সত্যের ওপর ভূ-পৃষ্ঠে অন্য কোনো ব্যক্তি অবশিষ্ট আছে বলে আমার জানা নেই। তবে অদূর ভবিষ্যতে আরব দেশে একজন নবী আবির্ভূত হবেন। তিনি ইবরাহীমের দ্বীন নতুনভাবে নিয়ে আসবেন। তিনি তার জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে বড় বড় কালো পাথরের যমীনের মাঝখানে খেজুর উদ্যানবিশিষ্ট ভূমির দিকে হিজরত করবেন। দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট কিছু নিদর্শনও তার থাকবে। তিনি হাদিয়ার জিনিস তো খাবেন, কিন্তু সদাকার জিনিস খাবেন না। তার দুকাঁধের মাঝখানে নবুওয়াতের মোহর থাকবে। তুমি পারলে সে দেশে যাও।'
এরপর পুরোহিত মারা গেলেন। এখন সালমান পুরোপুরি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন। এখন গন্তব্য অনেকদূর। পথ চেনা নেই। একা একা যাওয়াও সম্ভব নয়। কোনো কাফেলা পেলে সহজ হতো। আরবরা এখানে ব্যবসা করতে আসে। সবসময় আসে না। বছরের নির্দিষ্ট কিছু মাসে আসে। এরকম কোনো আরব কাফেলার অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
সব অপেক্ষাই একদিন শেষ হয়। সময় এমনই। সালমানের অপেক্ষাও শেষ হলো। একটা আরব কাফেলা পাওয়া গেল। আম্মুরিয়াতে থাকাকালে তিনি কিছু গরু ও ছাগলের মালিক হয়েছিলেন। সেগুলোর বিনিময়ে কাফেলার লোকজন তাকে নিতে রাজি হলো। কাফেলার লোকজন কেমন, সালমানের তা জানার অবকাশ ছিল না। তখন আরবদের চরিত্র বলতে কিছু ছিল না। এ কাফেলার লোকজনও তেমন। তারা সালমানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল। ওয়াদী-আল-কুরা নামক স্থানে তাকে এক ইহুদীর নিকট বিক্রি করে দিল। এভাবে বিক্রি হয়ে গেলে মানুষ আর স্বাধীন থাকে না। দাস হয়ে যায়। সালমানও দাস হয়ে গেলেন।
ওয়াদী-আল-কুরা হচ্ছে মদীনা ও শামের মধ্যবর্তী একটি জায়গা। মাঝপথে এসে তাকে এখন একজন ইহুদীর দাসত্ব করতে হচ্ছে। তবে এ অবস্থা বেশিদিন চলেনি। অল্পদিনের মধ্যেই ওই ইহুদীর এক চাচাতো ভাই বেড়াতে এলো। সে ইয়াসরিবে বনু কুরাইযা গোত্রে বসবাস করে। সালমানকে তার পছন্দ হলো এবং খরিদ করে নিল। পণ্য আর মানুষ বিক্রিতে তখন কোনো তফাৎ ছিল না।
সালমানের মনিব পাল্টে গেল। এ ব্যাপারে দাসদের কিছু করার থাকে না। তবে সালমান এতে খুশি হলেন। শীঘ্রই তিনি তার গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন। হলোও তা-ই। নতুন মনিবের সঙ্গে তিনি ইয়াসরিবে এসে পৌঁছলেন। তার চেহারায় আনন্দের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ল। এ আনন্দ তখন দেখার কেউ ছিল না। শেষ পর্যন্ত তিনি তার কাঙ্ক্ষিত শহরে এসে পৌঁছেছেন। খেজুর উদ্যানবিশিষ্ট ভূমি-ইয়াসরিব (মদীনা)।
রাসূল সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরত করে এখন কুবায় অবস্থান করছেন। চারদিকে এ খবর ছড়িয়ে পড়েছে। ইহুদীদের পল্লীতেও এ খবর ঢেউ তুলেছে। সালমান তখন খেজুর গাছের চূড়ায়। খেজুর সংগ্রহ করছেন। দাস হিসেবে এটি ছিল তার স্বাভাবিক কাজ। দাসত্বের শৃঙ্খল তাকে তার অভিষ্ট লক্ষ্য থেকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারেনি। সর্বশেষ নবীর আগমনের অপেক্ষা করছেন। তার সঙ্গে সাক্ষাতের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ক্রমাগত বেড়েই চলছে। এটা যে ঘটবে, এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। তবে সেই প্রতিক্ষিত নবী যে তার শহরেই এসে পড়েছেন, এখনো তিনি তা জানার সুযোগ পাননি।
একটু পরেই একজনকে তার দিকে দৌড়ে আসতে দেখলেন। কাছে আসতেই তাকে চেনা গেল। লোকটি তার মনিবের ভাতিজা। তার আসার ভঙ্গি একটু অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। উত্তেজনা আর আবেগে সে হাঁপাতে হাঁপাতে আসছে। নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটেছে। হয়তো নতুন কোনো সংবাদ জানাতে সে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কাজের ফাঁকে সালমান লোকটিকে লক্ষ্য করছে। সে চিৎকার করতে করতে বলছে : ‘হে অমুক...!’
তার মনিবকেও খুব উত্তেজিত মনে হলো। সে এসব হইচইয়ের কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছে না। লোকটি অবশেষে তাদের নিকটে এসে দম নিল। তারপর বলল, ‘আল্লাহ বনী কায়লাকে (আউস ও খাযরায গোত্র) ধ্বংস করুন। আমি কেবলই সেখান থেকে এসেছি। আল্লাহর কসম, তারা এখন কুবাতে মক্কা থেকে আজই আগত এক ব্যক্তির কাছে সমবেত হয়েছে, যে কিনা নিজেকে নবী বলে মনে করে।’
অবিশ্বাস্য কিছু শুনলে মানুষের মাথা ঠিক থাকে না। আর যদি তা সত্য হয়, তাহলে সে হুঁশ হারিয়ে ফেলে। সালমানের এখন সেই অবস্থা। আনন্দের আতিশয্যে তার শরীর কাঁপছে। হাত-পা অবশ হয়ে যাচ্ছে। মনে হলো, তিনি গাছের নিচে বসা মনিবের ঘাড়ের ওপর ধপাস করে পড়ে যাবেন! যে মানুষটির জন্য তিনি বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন, সেই মানুষটি এখন তার কাছাকাছি এসে উপস্থিত হয়েছেন। আর এখন তার স্বাধীনতা নেই। চাইলেই ছুটে যেতে পারছেন না। রাসূলকে দেখার দেরি সহ্য হচ্ছে না তার।
তিনি আর গাছের উপর বসে থাকতে পারলেন না। দ্রুত নিচে নেমে এলেন। মনিবের ভাতিজাকে জিজ্ঞেস করলেন : 'তুমি কী বললে—কী সংবাদ?' এ কথা বলতেই মনিব তার গালে সজোরে এক চড় বসিয়ে দিল। দাসত্বের শৃঙ্খল বড় কঠিন। তখন মনিবরা দাস-দাসীদের মানুষই মনে করত না। তাদের আবেগ প্রকাশের কোনো সুযোগ ছিল না। আবেগ থাকলেও তা লুকিয়ে রাখতে হতো। সালমান তা পারেননি। এটিই তার মনিবকে ক্ষেপিয়ে তোলে। চড় মেরেই সে শান্ত হয়নি। মারধোরও শুরু করে এবং বলে : 'এর সাথে তোমার সম্পর্ক কী?' তারপর বলল, 'যাও, যা করছিলে তা-ই করো।'
সালমানের সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই। চোখের পাপড়ি ভিজে উঠল। অসহায়ত্বেরও সীমা থাকে। দাসদের জন্য এর কোনো সীমা নেই। তাদের কষ্ট দেখে কেউ কষ্ট পায় না। সাহায্যও করে না। তিনি আবার খেজুরবৃক্ষে চড়লেন। কাজ করার চেষ্টা করছেন। এত কষ্ট নিয়ে কাজ করা যায় না। কিছু করারও নেই। কতকাল ধরে তিনি সত্য দ্বীন পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করছেন। আমুরিয়্যার পুরোহিতের কথা তার মনে পড়ছে। দিবালোকের মতো তিনটি সত্য নিদর্শনের কথা তিনি বলেছিলেন। সেগুলো মিলিয়ে দেখার তীব্র বাসনা তাকে আরও অস্থির করে তুলছে।
সন্ধ্যার আগে তার ছুটি মিলবে না। সন্ধ্যা হতে এখনো অনেক বাকি। আজ যেন সময় যাচ্ছে না। সূর্যের গতি মনে হয়, থেমেই গেছে! পাথরের মতো নিশ্চল শরীরে তিনি কাজ করছেন। সময় যায় সময়ের মতোই। একসময় সূর্য ডুবল। তখনই তিনি কিছু জিনিস সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
সন্ধ্যার অন্ধকার চারিদিকে। অন্ধকার ক্রমাগত ঘনভূত হচ্ছে। এর মধ্যে তিনি পথ চলছেন। তার দীর্ঘ পথ চলা শেষ হতে যাচ্ছে। দামেস্ক, মাসুল, নুসাইবিন এবং আমুরিয়্যা শেষে এখন এই ইয়াসরিবে। পুরো পৃথিবী তার কাছে অন্যরকম লাগছে। এই রাতে আকাশও বড় বেশি উজ্জ্বল। পূর্ণিমার চাঁদের আলো ভেসে উঠছে-যে আলো তাকে আরেক অপার্থিব আলোর পথ দেখাচ্ছে।
বহু প্রতীক্ষিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবশেষে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। এতকাল তিনি যেসব পুরোহিতদের সঙ্গ লাভ করেছিলেন, ভেবেছিলেন—তিনি তাদের মতোই একজন হবেন। কিন্তু তাকে সেরকম লাগছে না। তার চেহারা থেকে জ্যোতির্ময় আলো বের হচ্ছে। এ আলো পুরো কুবাকে আলোকিত করে ফেলেছে। তিনি তার সঙ্গীদের সঙ্গে কথা বলছেন।
সালমানের কাছে যা ছিল, তিনি তা রাসূলের হাতে দিয়ে বললেন, 'আমি এগুলো আপনার জন্য সদকা হিসেবে সংগ্রহ করেছি। শুনেছি আপনি একজন পুণ্যবান ব্যক্তি। আপনার কিছু সহায়-সম্বলহীন সঙ্গী-সাথী আছেন। আমি দেখলাম, অন্যদের তুলনায় আপনিই এগুলো পাওয়ার অধিক উপযুক্ত।'
সালমান খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জিনিস স্পর্শই করলেন না। তিনি তাঁর সঙ্গীদের বললেন, 'বিসমিল্লাহ বলে খাও।'
সালমান ভিন্ন কিছুই জানতে চেষ্টা করছিলেন। তাঁর মাথায় আমুরিয়া্যার পাদ্রীর কথা ঘুরপাক খাচ্ছে এবং তিনি দেখতে চাচ্ছেন, তাঁর বর্ণনা ঠিক কি না। যেহেতু পাদ্রী বলেছিল যে, তিনি সদকার জিনিস খাবেন না; সুতরাং রাসূল হওয়ার প্রথম শর্তটি মিলে গেছে। তাঁর ঠোঁট থেকে বের হলো: 'এটি প্রথম নিদর্শন! আল্লাহর কসম, তিনি সদকার খাবার খান না।'
তারপর তিনি ফিরে এলেন। পরের দিন আবার কিছু জিনিস সংগ্রহ করে রাসূলের নিকট এসে হাজির হলেন। এবার তিনি বললেন, 'আমি দেখেছি, আপনি সদকার খাবার খাননি। আপনি বিশ্বস্ততা ও দয়া দেখিয়েছেন এবং আমি এটি খুব পছন্দ করি। এবার আপনার জন্য সদকা নয়, কিছু হাদিয়া এনেছি।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাদিয়া গ্রহণ করলেন এবং সাহাবীদের সঙ্গে তিনি নিজেও সেখান থেকে খেলেন। দ্বিতীয় নিদর্শনও মিলে গেল। তিনি তাঁর আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না এবং আনমনে বলে উঠলেন, 'এটি দ্বিতীয় নিদর্শন! তিনি হাদিয়ার খাবার গ্রহণ করেন এবং তা থেকে নিজেও খান।'
তারপর আরেকদিন সালমান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন ‘বাকী আল-গারকাদ' কবরস্থানে তার এক সঙ্গীকে দাফন করছিলেন। সালমান দেখলেন, রাসূল গায়ে ‘শামলা’ (এক ধরনের ঢিলা পোশাক) জড়িয়ে বসে আছেন। তিনি তাকে সালাম দিলেন। তারপর রাসূলের পেছনের দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে আমুরিয়া্যার পাদ্রীর বর্ণিত তৃতীয় নিদর্শন-নবুওয়াতের মোহর-খুঁজতে লাগলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে পিঠের চাদরটি সরিয়ে নিলেন। তখন সালমান মোহরটি স্পষ্ট দেখতে পেলেন। অতঃপর তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঈমানের ঘোষণা দেন।
তখন থেকে সালমান রাযিয়াল্লাহু আনহু মনিবের কাজের বাইরে বেশিরভাগ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গেই কাটাতেন। সালমান রাযিয়াল্লাহু আনহু গোলামীর কারণে বদর ও উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। পরে রাসূল সা.-এর সহায়তায় দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। তারপর তিনি খাইবার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে তিনিই পরীখা খননের পরামর্শ দেন। রাসূল সা.-এর সোহবতে তিনি ইলম ও মারেফাতে বিশেষ পাদর্শিতা লাভ করেন। যুহুদ ও তাকওয়ার তিনি ছিলেন বাস্তব নমুনা। জীবনে কোনো বাড়ি তৈরি করেননি। কোথাও কোনো প্রাচীর বা গাছের ছায়া পেলে সেখানেই শুয়ে যেতেন। উসমান ইবনে আফফান রা.-এর খেলাফতকালে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর সময় তার সম্পদের মধ্যে ছিল একটি বড় পিয়ালা, তামার একটি থালা এবং একটি পানির পাত্র।
📄 উমর ইবনুল খাত্তাব রা.
মানুষটির যেন কোনো ভয়-ডর নেই। কাউকেই পরোয়া করেন না। লম্বা গড়ন। গম্ভীর চেহারা। ঘন দাড়ি। মোঁচের দুপাশ লম্বা ও পুরু। দেখলেই ভয় লাগে। সামান্য ঘটনায় রুদ্র-মূর্তি ধারণ করতে সময় লাগে না। তারপর যা ঘটার ঘটে। এজন্য কেউ তার সামনে দাঁড়াতেও সাহস করে না। এই মানুষটির নাম উমর-মক্কার সবচেয়ে দুঃসাহসী এবং বেপরোয়া হলেও বুদ্ধিমান। বুদ্ধিমান না হলে সাহস ধরে রাখা যায় না।
ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে মক্কার মুশরিকরা এর বিরুদ্ধাচরণে মেতে ওঠে। তারা মুসলমানদের ওপর অমানবিক নির্যাতনও শুরু করে। এ কাজে উমরও এগিয়ে ছিলেন। তার হাত থেকে কোনোমতে জানে বেঁচেছে তারই এক মুসলিম দাসী। তিনি তাকে নির্মমভাবে প্রহার করতেন। প্রহার করতে করতে নিজেই ক্লান্ত হয়ে যেতেন। এ অবস্থায় বলতেন, 'আমি যদি ক্লান্ত না হতাম, তাহলে তোমাকে রেহাই দিতাম না।' সেই ঈমানদার দাসী তখন জবাব দিতেন, 'আল্লাহই তোমাকে ক্লান্ত করে দিয়েছেন,' কিন্তু উমরের অন্তরে এই কথাগুলোর কোনো প্রভাব দেখা যেত না। তার অন্তর ছিল কঠিন। পাথরের মতো কঠিন। জাগতিক দয়া-মায়ার ধারও ঘেঁষতেন না তিনি।
এর মধ্যে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ইসলামের উন্নতি তার দৃষ্টি এড়াত না। সমাজের নেতৃস্থানীয় লোকদের কিছু জটিল সমস্যা থাকে। তারা সত্য জেনেও অসত্যকে আগলে রাখেন। দুনিয়ার প্রতি যার যত টান, তার মধ্যে অসত্যের পরিমাণও বেশি। তবে একটা সত্যকে তিনি অস্বীকার করতে পারেননি। তিনি দেখতেন, যারাই মুহাম্মাদের নতুন ধর্ম গ্রহণ করছে, তারা সত্যিই ভালো মানুষ। একদিন সন্ধ্যায়, তিনি কাবা-চত্বরে রাত্রিযাপনের উদ্দেশ্যে এলেন। সেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও সেখানে এসে উপস্থিত হলেন এবং কুরআন তিলাওয়াত শুরু করেন। তিনি সূরা আল-হাক্কাহ পড়ছিলেন।
এই প্রথম উমর কুরআন শোনার সুযোগ পেলেন। কুরআনের সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করল। কিন্তু তিনি এতে মুগ্ধ হতে চান না। এর ত্রুটি বের করে এই মুগ্ধতাকে পাশ কাটাতে চান। কুরাইশরা নবীকে কত কিছু বলে যে বয়কট করার চেষ্টা করছে, উমর এসব জানেন। তিনি তাদের মতোই মনে মনে বললেন, 'তিনি একজন কবি।' আর তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন : 'এবং এটি কোনো কবির রচনা নয়; তোমরা কমই বিশ্বাস করো।' (দেখুন, সূরা আল-হাক্কাহ, ৬৯:৪১)
অদ্ভুত ব্যাপার! তিনি যা চিন্তা করছিলেন, সঙ্গে সঙ্গেই এর জবাব পেয়ে গেলেন। এবার তিনি ভাবলেন, 'নিশ্চয়ই লোকটি গণক।' আর তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিলাওয়াত করলেন: 'এবং এ কোনো গণক বা জ্যোতিষীর কথা নয়; তোমরা কমই অনুধাবন করো।' (দেখুন, সূরা হাক্কাহ, ৬৯:৪২)
এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরার শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন। উমর সেখান থেকে দূরে সরে যেতে পারলেন না। তিনি তা শুনলেন। এক রাশ বিস্ময় ও প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে শুনলেন। কোনো কিছুতে আগ্রহ সৃষ্টি হলে মস্তিস্কও ঠিকমতো কাজ করে। উমরের মস্তিস্কও কাজ করতে শুরু করেছে। সর্বনাশা চিন্তার স্রোতে নতুন ঢেউ আছড়ে পড়ছে। পরিবর্তনের চিহ্ন ফুটে উঠছে। তবে উমরের পরিবর্তনের জন্য এটি যথেষ্ট ছিল না। পরদিন সকালেই তিনি তার পুরোনো বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠেন এবং পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যান।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিমদের করুণ অবস্থা নিয়ে চিন্তিত। কুরাইশ নেতাদের কেউ ইসলামগ্রহণ করলে ইসলাম আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। সাধারণ মুসলিমদের মনোবল বাড়বে। এজন্য তিনি আল্লাহর কাছে ইসলামের চরম শত্রুদের মধ্যে দুজনের জন্য দুআ করলেন-উমর ইবনুল খাত্তাব অথবা আমর ইবনে হিশাম (আবু জাহেল)। তিনি তাদের যে কোনো একজনকে চাইলেন। আল্লাহ তার প্রিয় হাবীবের দুআ সঙ্গে সঙ্গে কবুল করে নিলেন। পরদিনই এর ফল পাওয়া গেল।
মক্কার কুরাইশরা জায়গায় জায়গায় মিটিং করছে। মুহাম্মাদকে আর আগে বাড়তে দেওয়া যায় না। তাকে হত্যা করতে হবে। কিন্তু কে করবে এই কাজ? দুঃসাহসী উমর উঠে দাঁড়ালেন। সাহাসের প্রমাণ রাখতে এর চেয়ে বড় সুযোগ আর মিলবে না। তাদের জানা নেই, এখানে সাহস দেখানো মানেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনা। উমরের ক্ষেত্রে এর উল্টোটা ঘটল। সময়ের পালাবদল-মানুষের কাছে বড় বিস্ময়কর লাগে। এতে তার কোনো হাত থাকে না, কিছু করতেও পারে না। উমর রওনা হয়েছেন। তার কোমরে উন্মুক্ত তরবারি। গন্তব্য সাফা পাহাড়—ইবনে আরকামের বাড়ি। রাসূলকে হত্যা করাই তার একমাত্র উদ্দেশ্য।
পথে নুয়াইম ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) উমরকে দেখলেন। তিনি ইতোমধ্যে ইসলামগ্রহণ করেছেন। তবে বিষয়টি এখনো গোপনই রেখেছেন। উমরের রণসজ্জা দেখে তিনি ভড়কে গেলেন। অজানা আশঙ্কায় তার মন অস্থির হয়ে উঠল। উমরকে থামানো দরকার। নিশ্চয়ই সে মুসলিমদের কোনো ক্ষতি করতে যাচ্ছে। মক্কায় এখন মুসলিমরা ছাড়া তার কোনো শত্রু নেই। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথায় যাচ্ছ, উমর?'
উমর জবাব দিলেন, 'আমি মুহাম্মাদকে হত্যা করতে যাচ্ছি, যে কিনা কুরাইশদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে, তাদের বেকুফ সাব্যস্ত করেছে, তাদের ধর্মের নিন্দা করেছে এবং তাদের দেবদেবীকে গালি দিয়েছে।'
নুয়াইম রাযিয়াল্লাহু আনহুর আশঙ্কাই সত্য হলো। উমর তো দারুল আরকামের দিকে যাচ্ছে! তাকে ফেরানোর জন্য এখনই কিছু একটা করা দরকার। তিনি বললেন : 'উমর, তুমি ধোঁকার মধ্যে আছ। তুমি কি মনে করো, মুহাম্মাদকে হত্যা করার পর বনু আবদে মানাফ তোমাকে ছেড়ে দেবে? তুমি অবাধে বিচরণ করতে পারবে? তুমি বরং নিজের ঘর সামলাও।'
এ কথায় উমর ভীষণ ধাক্কা খেলেন। তিনি দ্রুত জিজ্ঞেস করলেন, 'কেন, আমার ঘরে কী হয়েছে? তুমি কী বলতে চাও?'
-তোমার ভগ্নিপতি ও চাচাতো ভাই সাঈদ ইবনে যায়িদ ইবনে আমর এবং তোমার বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব, আল্লাহর কসম, তারা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তারা মুহাম্মাদের ধর্মের অনুসরণ করে চলেছে। কাজেই পারলে আগে তাদের সামলাও।'
উমারের রাগ আরও বেড়ে গেল। খাত্তাব-পরিবারের কেউ তার অনুমতি ছাড়া ইসলামগ্রহণ করবে, এটা হতে পারে না। যে মুহাম্মাদকে তিনি হত্যা করতে যাচ্ছেন, তাকেই তার পরিবারের সদস্যরা অনুসরণ করে! আগে পরিবারের লোকদের শায়েস্তা করা দরকার এবং সেটা এখনই। তিনি দ্রুত তার গতি পরিবর্তন করলেন। এবার লক্ষ্য রাসূল নন; তার আপন বোন ও বোন-জামাই।
বোনের বাড়িতে পৌঁছতে বেশি সময় লাগেনি। উমর ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালেন। কড়া নাড়তে যাবেন, এসময় তার কানে একটা আওয়াজ ভেসে এলো। আওয়াজটা পরিচিত। কদিন আগে কাবা-চত্বরে রাতের বেলায় মুহাম্মাদের কণ্ঠে যে আওয়াজ শুনেছিলেন, ঠিক সেরকম। উমরের বুঝতে বাকি থাকল না-একই বিষয় পাঠ করা হচ্ছে। কি অদ্ভুত ব্যাপার! এ আওয়াজ শুনলেই অন্তর বিগলিত হতে শুরু করে। উমরেরও ব্যতিক্রম হলো না। তবে তার কঠিন হৃদয় এত সহজে গলতে রাজি হলো না। তিনি সজোরে দরজার কড়া নাড়তে লাগলেন। প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে ঘরের লোকদের দরজা খুলতে বললেন।
ঘরে মানুষ তিনজন। ফাতিমা ও তার স্বামী সাঈদ এবং খাব্বাব-যিনি তাদের কুরআন শেখাচ্ছিলেন। উমরের কণ্ঠ শুনেই তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। ভয়ে তাদের শরীরের পশম দাঁড়িয়ে আছে। খাব্বাব এখানে বহিরাগত। তাকে দেখলে উমরের রাগ নিশ্চয়ই দ্বিগুণ হয়ে উঠবে। তিনি দ্রুত ঘরের এক কোণে লুকিয়ে গেলেন। ফাতিমা কুরআনের আয়াত লিখিত মাসহাফটিও লুকিয়ে রাখলেন। এসব কাজ করতে সময় লাগল। দরজা খুলতেও দেরি হলো। উমরের সন্দেহ বাড়ল। তিনি ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা যেন কী পড়ছিলে শুনলাম?'
'না, কই! আমরা তো কিছু পড়ছিলাম না। আপনি ভুল শুনেছেন,' ফাতিমার কণ্ঠে ভয় এবং জড়তা। উমর খুবই বিচক্ষণ। তার বুঝতে বাকি থাকল না। তিনি আরও ক্ষেপে গিয়ে বললেন : 'না, আমি ঠিকই শুনেছি। আল্লাহর কসম, আমি শুনেছি, তোমরা মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণ করেছ এবং সেটাই অনুসরণ করে চলেছ?'
এ কথা বলতে বলতে উমর ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন। রাগ সামলাতে না পেরে সাঈদের উপর চড়াও হন এবং তাকে মারাত্মক আঘাত করেন। স্বামীকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে নিজের বোন ফাতিমাকেও আঘাত করেন। এরকম শক্তপোক্ত মানুষের আঘাত সহ্য করা কঠিন। ফাতিমার চেহারা রক্তাক্ত হয়ে গেল। আঘাতে সংঘাত বাড়ে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো। এবার ফাতিমাও যেন জেগে উঠলেন। খাত্তাব পরিবারের রক্তও তার শরীরে বইছে। সে রক্তের দাবি পূরণ করতে তিনিও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে গেলেন। মূলত তার হারানোর কিছু নেই। সব যখন প্রকাশ পেয়ে গেছে, এখন আর লুকানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। তিনি তার ভাইয়ের মুখের ওপর বলে উঠলেন, 'হ্যাঁ, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি। এখন আপনি যা খুশি করতে পারেন।'
উমরের মাথায় যেন বজ্রপাত হলো। বজ্রপাতে মানুষ বাঁচে না। আগের সেই উমরও বেঁচে নেই। এখন নতুন উমরের জন্ম হচ্ছে। বোনের দৃঢ়তায় তার মস্তিস্কের জট খুলতে শুরু করেছে। তিনি দম নিচ্ছেন। এর মধ্যে তার বোন বলে উঠল, 'কী করবে, মেরে ফেলবে? আমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধর্মে শান্তি খুঁজে পেয়েছি।'
উমর এবার কোনো জবাব দিলেন না। ঘরের পরিবেশ হঠাৎ করেই নীরব হয়ে গেছে। বোনের রক্তাক্ত চেহারা দেখে তার মায়া হলো। তাকে এখন আহত সিংহীর মতো লাগছে। তবুও এক অপার্থিব পবিত্রতা তার চেহারা থেকে ঠিকরে পড়ছে। এতদিন ইসলাম গ্রহণ করায় অনেকের ওপর তিনি অত্যাচার করেছেন। এখন কি তাহলে তার নিজের বোন ও ভগ্নিপতিকেও নির্যাতনের শিকার হতে হবে? এ চিন্তা তাকে ভাবিয়ে তুলল। ভাগ্য ছিল সুপ্রসন্ন। উমরের অন্তর গলতে শুরু করেছে। তিনি তার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হলেন। উমর শান্ত কণ্ঠে বললেন, 'আচ্ছা, তোমরা যে বইটা পড়ছিলে, সেটা আমাকে দাও তো। আমি একটু পড়ে দেখি মুহাম্মাদ কী বাণী প্রচার করে?'
এ কথায় তারা খুব অবাক হন। তাকে কুরআনের মুসহাফটি দেওয়া ঠিক হবে কি হবে না, এ নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলেন। উমর হয়তো সেটি নিয়ে ছিঁড়ে ফেলবে, কুরআনের অবমাননা করবে এবং রাসূল সম্পর্কে মন্দ কথা বলবে। এ জন্য ফাতিমা বললেন, 'আমাদের আশঙ্কা হয়, বইটি দিলে তুমি নষ্ট করে ফেলবে।'
উমর তাদের আশ্বস্ত করে বললেন, 'ভয় পেয়ো না, আমি সেটি অক্ষত অবস্থায় আবার ফেরত দেব।'
সম্ভবত উমর হেদায়েতের পথে চলতে শুরু করেছেন—এ কথা ভেবেই ফাতিমা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন। তিনি সম্মানের সঙ্গে বললেন, 'হে আমার ভাই, আপনি মুশরিক হওয়ার কারণে অপবিত্র। অথচ এই বই স্পর্শ করতে হলে পবিত্রতা অর্জন করা প্রয়োজন।' তারপর ফাতিমা তাকে গোসল করে আসতে বললেন। অবিশ্বাস্য! উমর এ নির্দেশ মেনে নিলেন। এই ঘরে কিছুক্ষণ আগে যে গুমোট অন্ধকার ছিল, তা কেটে গিয়ে জান্নাতী আভায় দীপ্তমান হয়ে উঠল। তাদের চোখেমুখে আনন্দের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়ল। নতুন উমরের জন্ম হতে আর বেশি বাকি নেই!
এরপর ফাতিমা উমরকে ওই পৃষ্ঠাগুলো দিলেন যেখানে সূরা ত্বহা লিপিবদ্ধ ছিল এবং তিনি পড়তে শুরু করলেন। একপর্যায়ে তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না এবং বললেন, 'কি সুন্দর কথা! কি মহান বাণী!' উমরের পড়া শুনে আত্মগোপনে থেকে খাব্বাব আনন্দিত হয়ে উঠলেন। এখন আর লুকিয়ে থাকার মানে হয় না। তিনি বের হয়ে এলেন। সরাসরি উমরের কাছে গিয়ে বললেন, 'হে উমর, আমার মনে হয়, আল্লাহ তার নবীর দুআ কবুল করে তোমাকে ইসলামের জন্য মনোনীত করেছেন। গতকাল তিনি দুআ করছিলেন-'হে আল্লাহ, আবুল হাকাম ইবনে হিশাম অথবা উমর ইবনুল খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করো।' সুতরাং হে উমর, তুমি আল্লাহর ডাকে সাড়া দাও, তুমি আল্লাহর ডাকে সাড়া দাও।'
হঠাৎ খাব্বাবকে দেখে উমর অবাক হলেন। ঘরে যে তৃতীয় আরেকজন আছে, এটি তিনি চিন্তাও করেননি। খাব্বাব এখানে কী করছে? এতক্ষণই বা কোথায় ছিল? এ চিন্তা করার সময় নেই। তিনি তার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। খাব্বাবের মুখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা শুনে তার কঠিন হৃদয় আরও বিগলিত হয়েছে। তিনি যাকে হত্যা করতে চেয়েছেন, তিনিই কিনা গোপনে তার জন্য দুআ করেছেন! উমর আর সময় নষ্ট করতে চান না। তিনি খাব্বাবকে বললেন, 'হে খাব্বাব, আমাকে মুহাম্মাদের সন্ধান দাও। আমি এখনই তার নিকট যেতে চাই।'
খাব্বাব বললেন, 'তিনি সাফা পর্বতের নিকট একটা বাড়িতে কিছুসংখ্যক সাহাবীর সঙ্গে অবস্থান করছেন।'
তারপর ঘটনা খুব দ্রুত ঘটতে থাকল। উমরের গন্তব্য আগেও যা ছিল, এখনো তা-ই। তবে বিস্ময়কর সত্য হচ্ছে, এখন উদ্দেশ্য ভিন্ন। শীঘ্রই উমর দারে আরকামে পৌঁছে গেলেন এবং দরজায় করাঘাত করলেন। দরজার ওপাশে উমরকে তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাহাবায়ে কেরাম ভয় পেয়ে গেলেন। তারা রাসূলের কাছে ছুটে গেলেন। হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু এগিয়ে এসে বললেন: 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, তাকে আসার অনুমতি দেন। যদি সে ভালো উদ্দেশ্যে এসে থাকে তাহলে আমরা তাকে সহযোগিতা করব, আর যদি মন্দ উদ্দেশ্যে এসে থাকে তাহলে তার তরবারি দিয়েই তাকে হত্যা করব!'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘটনা বুঝতে বাকি থাকে না। দুআ কবুল হওয়াতে তার অন্তর গভীর কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ ভরে উঠল। তিনি বললেন, 'তাকে আসতে দাও।'
ঘরের দরজা খুলে দেওয়া হলো। বিশালদেহী উমর ভেতরে প্রবেশ করলেন। রক্তিম ফর্সা চেহারায় এখন অনেক বিনয়ের ছাপ। ঔদ্ধত্যের ছিটেফোঁটাও নেই। সমর্পিত অন্তরে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু থাকে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগেই উঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার অন্তরেও গভীর ভালোবাসা উথলে উঠেছে। তিনি উমরকে স্বাগত জানালেন। তারপর পরম মমতায় তাকে বুকে টেনে নিলেন। আহ! কী অপূর্ব দৃশ্য! গুটিকয়েক সাহাবী দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছেন। জান্নাতী আভায় ছেয়ে গেছে পুরো পরিবেশ। তারা সবাই-ই তো জান্নাতী! উমরও এখন সেই কাফেলায় যুক্ত হতে যাচ্ছেন।
সবকিছুরই ভূমিকা থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সেই পর্ব শুরু করলেন, 'হে খাত্তাবের পুত্র, কী উদ্দেশ্যে এসেছ? আল্লাহর কসম! আল্লাহর তরফ থেকে তোমার ওপর কোনো কঠিন মুসিবত না আসা পর্যন্ত তুমি সংযত হবে বলে আমার মনে হয় না।'
উমর বিনীতভাবে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি আল্লাহ, তার রাসূল ও আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের প্রতি ঈমান আনার জন্যই এসেছি।'
আর তখনই দারুল আরকামে এক অবিশ্বাস্য পরিবেশের সৃষ্টি হলো। গতরাতে যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআর প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, ওই সকল সাহাবায়ে কেরামসহ স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও নিজেদের সংবরণ করতে সক্ষম হলেন না এবং তারা সবাই একত্রে তাকবীর দিয়ে উঠলেন। এ তাকবীরে পুরো মক্কা যেন প্রকম্পিত হয়ে উঠল। সারারাত এ কম্পন আর থামেনি।
টিকাঃ
২. উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু (৫৮৪-৬৪৪ খ্রি.) ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা এবং প্রধান সাহাবীদের অন্যতম। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পর তিনি দ্বিতীয় খলীফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ইসলামী আইনের একজন অভিজ্ঞ আইনজ্ঞ ছিলেন। ন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করার কারণে তাকে আল-ফারুক (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী) উপাধি দেওয়া হয়। 'আমীরুল মুমিনীন' উপাধিটি সর্বপ্রথম তার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। তার শাসনামলে খেলাফতের সীমানা অকল্পনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। এসময় সাসানীয় সাম্রাজ্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দুই তৃতীয়াংশ মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে। তার শাসনামলেই জেরুজালেম মুসলিমদের হস্তগত হয়। এছাড়াও তার মেয়ে হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! শয়তান যখন তোমাকে কোনো পথে চলতে দেখে, তখন সে তোমার পথ ছেড়ে অন্য পথ ধরে চলে।' (সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৫৯৮৫)
📄 আবু যর গিফারী রা.
অদ্দান উপত্যকা। গিফার গোত্রের বাসভূমি। রাতে সাধারণত এ গোত্রের লোকজন ঘুমায় না। তারা শিকারের সন্ধানে থাকে। মানুষ শিকার। পথে কাউকে একা পেলেই তার সর্বস্ব কেড়ে নেয়। মেরে ফেলতেও দ্বিধা করে না। ডাকাতের দল এরা। লুণ্ঠনই জীবিকার অবলম্বন। কত বণিক দল যে তাদের হাতে নিঃস্ব হয়েছে, হিসেব রাখে না কেউ। অবশ্য সব বণিকদলের ওপর এরা আক্রমণ করে না। মক্কার কুরাইশরাও এ পথে সিরিয়া যায়। তাদের কাছ থেকে ভালো চাঁদা পায় বলে কিছু বলে না। চাঁদা দিতে না চাইলেই লুটতরাজ চলে। তাদের ভয় করে সবাই। এসব ভয়ানক মানুষের ভিড়ে একজন কেবল ব্যতিক্রম। ডাকাতির বাইরে নতুন এক চিন্তায় তার মন অস্থির হয়ে আছে।
মানুষটির নাম জুন্দুব (আবু যর)। দুর্ধর্ষ ডাকাত। দুর্দান্ত সাহসী। সাহস না থাকলে ডাকাতি করা যায় না। তবে তার সাহসের সবাই প্রশংসা করে। গোত্রে নাম-ডাক ছড়িয়েছে। এমনিতে গোত্রের লোকেরা মূর্তিপূজা করে। অনেক খোদা মানে। এগুলো তার মনে ধরেনি কখনো। ডাকাতরা ধর্মের চিন্তা করে না। জুন্দুব চিন্তা করেন। তার মন বলে—খোদা কেবল একজনই। এত খোদা থাকতে পারে না। গভীর অন্ধকারেও তার মন আলোর সন্ধান করেছে। এভাবে কতকাল গিয়েছে, কে জানে। এখন তিনি শুনতে পেলেন, মক্কায় এক নতুন নবীর আগমন ঘটেছে। তিনি নতুন ধর্মের কথা শোনাচ্ছেন। এক স্রষ্টার দিকে আহ্বান করছেন। এই নতুন নবী সম্পর্কে জানা দরকার। ধর্মটাই বা কী? তার আর দেরি সহ্য হচ্ছে না।
জুন্দুব সর্দার মানুষ। অনেক দায়িত্ব। এগুলো ফেলে কোথাও যাওয়া মুশকিল। নতুন নবী সম্পর্কে জানতে হলে মক্কায় যেতে হবে। পথ অনেক। হুট করে যাওয়াও যাচ্ছে না। ফিরে আসতে সময় লাগবে। অনেক ভেবে নিজের ভাইকেই পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তার ভাইয়ের নাম আনিস। আনিসকে বুঝিয়ে বললেন সব। নতুন নবীর সঙ্গে কথা বলতে হবে। ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে আসতে হবে। আনিস গেল।
এবার জুন্দুবের অপেক্ষা করার পালা। মাত্র ক'টা দিন। সময় যেন কাটছেই না। এক অপার্থিব অস্থিরতা তাকে ঘিরে রেখেছে। হঠাৎ আনিস ফিরে আসার খবর এলো। জুন্দুব দৌড়ে গেলেন। এক শ্বাসে অনেক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন। আনিস বলতে লাগল : 'আমি মক্কায় এমন এক ব্যক্তিকে দেখেছি, যিনি তোমার ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এক নতুন ধর্ম নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। আল্লাহ তাকে নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তবে লোকজন তাকে সাবি (ধর্ম পরিবর্তনকারী) বলে। লোকজন তাকে কী নামে সম্বোধন করছে, আমি কেবল তা-ই বলছি। কেউ বলে তিনি একজন যাদুকর, কেউ বলে গণক, আবার কেউ বলে কবি; কিন্তু আমি তার কথা নিজ কানে শুনেছি, আমি নিশ্চিত—তিনি এসবের কিছুই নন। আল্লাহর কসম, তিনি সত্যই বলছেন।'
আনিসের কথায় জুন্দুবের অস্থিরতা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে সামলানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এখনই সেই মানুষটির কাছে যাওয়া প্রয়োজন। তাকে স্বচক্ষে না দেখলে তৃপ্তি মিটবে না। সব ছেড়ে গেলেও অসুবিধা নেই। কিন্তু পরিবারের দায়িত্ব কে নেবে? এ দায়িত্ব কাউকে দেওয়া দরকার। আনিসকে বলতেই সে রাজি হয়ে গেল। শুধু বলল, মক্কার লোকদের ব্যাপারে সতর্ক থেকো।
জুন্দুবের মনে এখন আনন্দের ঢেউ। মনে হয়, বহুকাল পরে কোনো প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হবে। তিনি দ্রুত প্রস্তুতি নিলেন। সঙ্গে কিছু খাবার ও এক মশক পানি নিলেন। তারপর রওনা হয়ে গেলেন। মরুর পথে একাকী—মক্কার দিকে, প্রিয়জনের সাক্ষাতে। মরুভূমির কঠিন পথ। মাথার ওপর সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপ নিয়েই তিনি হাঁটছেন। রাতের নিকষ কালো অন্ধকারেও তার পথ চলা থামেনি। তিনি মক্কায় এসে পৌঁছলেন। এ শহরের অলি-গলি তার অপরিচিত। নতুন নবী কোথায় থাকেন, তিনি দেখতেই বা কেমন—এসব তার জানা নেই। কাউকে জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন। এ শহরে তার পরিচিত কেউ নেই। নিষ্ঠুরতা আর বর্বরতায় এরা অভ্যস্ত। সম্ভবত এরা গিফারীদেরও ছাড়িয়ে যাবে। শহরে ঢুকতেই একজনের দেখা মিলল। আবু যরের দেরি করতে ইচ্ছে করছে না। তাকে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন, 'তোমরা যাকে সাবি বলো, সেই লোকটি কোথায়?'
লোকটি এ প্রশ্নে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সে এমন করে আবু যরের দিকে তাকায়, যেন এখনই মাথায় তুলে আছাড় দেবে। আবু যর ভয়ই পেয়ে যান। এ ভয় কাপুরুষতার নয়, এটি এত কাছে এসেও না পাবার ভয়। তাকে তার গন্তব্যে পৌঁছতে হবে। এজন্য কথা না বাড়িয়ে আবার হাঁটা শুরু করেন। কাবা- চত্বরে গেলে নিশ্চয়ই কিছু জানা যাবে। সব গোত্রের লোকই সেখানে যায়। নতুন নবীও হয়তো আসবেন।
কাবা-চত্বরে এসেও কিছু জানা যাচ্ছে না। কারও সঙ্গে কথা-ই বলা যাচ্ছে না। সবাই কেমন জানি নির্লিপ্ত। দ্বিধায় জর্জরিত। সাবিদের মধ্যে কারও খবর মিলছে না। পথের ক্লান্তিতে বিষণ্ণ হয়ে উঠছে তার মন। সন্ধ্যাও ঘনিয়ে আসছে। দেহকে আর সোজা রাখা যাচ্ছে না। তিনি সটান হয়ে চত্বরের এক পাশে শুয়ে পড়লেন। জ্বলে ওঠা লণ্ঠনের আলো এসে পড়ছে তার চেহারায়। এ চেহারা এ শহরের মানুষ কখনো দেখেনি!
আগন্তুকের চেহারা দেখে আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু থমকে দাঁড়ালেন। এ পথ দিয়েই তাকে বাড়ি যেতে হয়। পথে মুসাফির কাউকে পেলে সঙ্গে নেন। আজকের লোকটাকে অন্যরকম মনে হচ্ছে। সম্ভবত মক্কায় নতুন এসেছে। কাউকে চেনে না মনে হয়। চোখে-মুখে রাজ্যের অনিশ্চয়তা। পেটানো শরীর হলেও কেমন নুইয়ে পড়েছে। তিনি তাকে ডাকলেন। নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন।
মক্কায় এক কঠিন অবস্থা বিরাজ করছে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত লাভ করেছেন। তিনি সে কথা প্রকাশ্যে ঘোষণাও করেছেন। তারপর থেকেই মক্কার মুশরিকরা বেঁকে বসেছে। তাদের এতদিনের 'আল-আমীন' এখন শত্রু হয়ে গেছে। কেউ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর কাছে ভিড়লে তার আর রক্ষা নেই। এ পর্যন্ত মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন তার ওপর ঈমান এনেছে। প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া শুরু হয়নি এখনো। শহরের বিভিন্ন স্থানে মক্কার মুশরিকরা ঘোরাফেরা করছে। বাইরের লোকদের মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ব্যাপারে আগেই সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে তারা তাদের সেখানে যেতে বারণ করে। তারপর না শুনলে শাস্তি দেয়। এজন্য নতুন নবীর কথা জানলেও কেউ মুখ ফুটে বলে না। কাউকে দাওয়াত দিতেও ভয় ভয় লাগে। নেতাদের বলে দিলে সর্বনাশ!
জুন্দুব নীরবে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অনুসরণ করলেন। নতুন নবীর প্রসঙ্গে তাকে জিজ্ঞেস করবেন কি না, বুঝতে পারছেন না। কে জানে লোকটা কেমন! লোকটার বয়স কম। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ। আচরণও ভালো মনে হচ্ছে। তবুও ভয় লাগে। নেতাদের কেউ হলে নিশ্চয়ই তাকে মক্কা থেকে বের করে দেবে। মেরেও ফেলতে পারে। মৃত্যুকে তিনি ভয় পাচ্ছেন না। তবে প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা না করে মরতেও চাচ্ছেন না। এদিকে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুও ভয় পাচ্ছেন—দ্বীনের কথা বললে যদি সে গ্রহণ না করে!
শেষ পর্যন্ত কেউই এ বিষয়ে কোনো কথা বললেন না। তাদের মনের কথা অব্যক্তই রয়ে গেল। মনের কথা আটকে রাখা সহজ নয়; কষ্টের। পরিবেশ কতটা মারাত্মক হলে অন্তরে এতটা ভয় কাজ করে! রাতের অন্ধকারের নির্জনতায়ও সে ভয় কাটছে না। পরদিন সকালে আবার যে যার পথে বেরিয়ে পড়লেন।
জুন্দুবের পথ কাবা-চত্বরেই থেমে আছে। আজ দুই দিন হয়ে গেল। তিনি যার সন্ধানে এসেছেন, তার সম্পর্কে এখনো কিছুই জানতে পারেননি। জানার কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। আজ রাতেও নিশ্চয় ওই লোকটা এসে তাকে নিয়ে যাবে এবং সে তার বাড়িতে ঘুমাবে। পরদিন আবার এখানে এসে বসে থাকবে। হলোও তাই। এভাবে তৃতীয় রাত ঘনিয়ে এলো।
সম্ভবত আর দেরি করা যায় না। মুসাফিরের উদ্দেশ্য জানা দরকার। কতদিন এভাবে কাটবে? তিনদিন তো হয়ে গেল। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুই ঝুঁকি নিলেন। তাঁরই হক বেশি জানার। সাহস সঞ্চয় করে মুসাফিরের দিকে এগিয়ে গেলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি মক্কায় কেন এসেছেন?'
সময় এসেছে মনের কথা বলার। এখন আর সংকোচ করে লাভ নেই। যা-ই ঘটুক, বলারই সিদ্ধান্ত নিলেন জুন্দুব। আগে একটু ভূমিকা করে বললেন, 'আপনি যদি আমার কাছে অঙ্গীকার করেন, আমি যা চাই সেদিকে আমাকে পথ দেখাবেন-তাহলে আমি বলতে পারি।'
জুন্দুবের কথা শেষ হতেই আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু সায় দিলেন। তখন জুন্দুব বললেন, 'আমি অনেক দূর থেকে মক্কায় এসেছি-নতুন নবীর সাথে সাক্ষাৎ করতে এবং তিনি যেসব কথা বলেন তার কিছু শুনতে।'
আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক খেলে গেল। এমন মানুষই তো তিনি খুঁজছেন। এবার দুজনের কথার খই ফুটতে লাগল। নবীর পরিচয় দিতে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। 'তিনি প্রকৃতই একজন সত্য নবী,' এই বলে আলী আলোচনা শুরু করলেন। জুন্দুব গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। তাঁর প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। যে চায়, সে পায়। এই প্রাপ্তিতে জুন্দুব উচ্ছ্বসিত। এখনো প্রিয়জনের দেখা বাকি!
সকালেই দুজন নবীর সাক্ষাতে রওনা হলো। মক্কা থেকে রাসূলের নিবাস বেশি দূরে নয়। তবুও এই পথটুকুতে দুজনের জন্য একসঙ্গে চলা কঠিন। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সবাই চেনে। জুন্দুবকে কেউ চেনে না। তাকে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে দেখলে মুশরিকদের মনে সন্দেহ দানা বেধে উঠবে। এজন্য সতর্কতা প্রয়োজন। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি আগে আগে হাঁটব। আপনি আমাকে অনুসরণ করবেন। যদি আমি কোনো বিপদের আশঙ্কা করি, তাহলে প্রস্রাবের ভান করে রাস্তার এক পাশে সরে যাব। আপনি আপনার পথে চলতে থাকবেন। চিন্তা করবেন না, আমি আপনাকে ঠিকই খুঁজে নেব। আর আমি যদি কোনো বিপদের আশঙ্কা না করি, তাহলে আপনি আমার সঙ্গেই পথ চলবেন এবং আমরা যেখানে যেতে চাই, সেখানে গিয়ে মিলিত হব।'
শীঘ্রই তারা একটি ঘরের নিকট এসে দাঁড়ালেন। কেউ একজন তাদের জন্য দরজা খুলে দিল। জুন্দুব ঘরে প্রবেশ করেই এমন এক উদ্ভাসিত চেহারা দেখলেন, যেন পূর্ণিমার চাঁদ, যার আগমন-প্রতীক্ষায় তিনি বছরের বছর অতিবাহিত করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে দৃষ্টি দিতেই তার অন্তর প্রশান্তিতে ভরে গেল। জুন্দুব বলে উঠলেন, 'আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ।' তার কথায় মনে হয়, জুন্দুব ইতোমধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট নিজেকে সমর্পণ করেছেন। তারপর তিনি নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। নিজের পেশা ও মক্কায় আসার কারণ বর্ণনা করে বলেন: 'হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে এখন কী করতে হবে? আপনি মানুষকে কোন ধর্মের দিকে আহ্বান করেন?'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : 'আমি তোমাকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য আহ্বান করছি। তার সঙ্গে অন্য কারও ইবাদত করা যাবে না। আর মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করতে হবে।' আবু যর তখনই উচ্চারণ করলেন : 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং আমি এটিও সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি তার রাসূল।'
আর এভাবেই জুন্দুব ইবনে জুনাদাহ (আবু যর) রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলামে পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই তার জীবন অতিবাহিত করেছেন দুনিয়াবিমুখ হয়ে—কেবলমাত্র আল্লাহ এবং তার রাসূলের আনুগত্যের মাধ্যমে। একদিন যে লোকটি অদ্দান উপত্যকায় আতঙ্ক আর ত্রাসের নাম ছিল, সে ব্যক্তিই ইসলামগ্রহণের পর থেকে নির্লোভ আর দুনিয়াবিমুখতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিলেন। তার প্রত্যাশা ছিল, সকলেই তার মতো ধন-দৌলতের প্রতি সম্পূর্ণ নিরাসক্ত হোক। তার মতে আগামীকালের জন্য কোনো সম্পদই আজ সঞ্চয় করা যাবে না। এক্ষেত্রে তিনি পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর নির্ভর করাকেই প্রাধান্য দিতেন। এজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আকাশের নীচে এবং পৃথিবীর উপর আবু যরের চেয়ে বিশ্বাসী ও সত্যবাদী আর কেউ নেই।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তিনি এতই ভালোবাসতেন যে, তার মৃত্যুর পর যখনই তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা মনে করতেন, তখনই অঝোর ধারায় কাঁদতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেন, 'আল্লাহ আবু যরের ওপর রহম করুন। সে একাকী চলে, একাকীই মরবে, কিয়ামতের দিন একাই উঠবে। (আস-সিরাহ আন-নবুওয়াহ, ইবনে হাশিম, ৪/১৭৮; আল-হাকিম, ৩/৫০)। এ ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছিল। তিনি উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে মদীনা থেকে বহুদূরে নির্জন মরুভূমিতে ‘রাবজা’ নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন।
📄 হামযা রা.
মক্কার দিনকালের এখন ঠিক নেই। প্রতিদিন কোনো-না- কোনো অঘটন ঘটছেই। কুরাইশদের একের পর এক চেষ্টা বিফলে যাচ্ছে। তারা ইসলামকে ঠেকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। পারছে না। পারার কথাও নয়—এটি তারা শুনেছে; তবে বিশ্বাস করে না। একদিন পুরো শহরই ইসলামের পতাকাতলে শামিল হবে। সেদিন কবে হবে—আপাতত তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ইতোমধ্যে নবুওয়াতের দুই বছর চলে গেছে। মক্কায় আবার হজের মৌসুম শুরু হয়েছে। হজের মৌসুমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সচকিত হয়ে ওঠেন। ভিন দেশের মানুষের কাছে ইসলামকে তুলে ধরেন। বেশিরভাগ মানুষই সম্পদ ও নেতৃত্ব হারানোর ভয় করে। এজন্য এ পথে আর এগুতে চায় না। একদিন তিনি সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান করছেন। এ সময় আবু জাহেল এলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে তাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিশ্চুপ। চারদিকের কত শব্দই তো কানে আসে। সব শব্দে মানুষ বিচলিত হয় না। কিন্তু গালিগালাজের শব্দ মানুষ সহ্য করতে পারে না। ক্ষেপে যায়। রাসূল ক্ষেপছেন না। তিনি নির্বিকার। জবাব দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করছেন না।
আবু জাহেল স্পষ্টতই ব্যর্থ হলো। একাই রাগে গড়গড় করতে করতে কাবা-চত্বরের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে তার কুরাইশ বন্ধুরা আড্ডা দিচ্ছে। আবু জাহেল সেই আড্ডায় গিয়ে বসে দম নিল। ঘটনাটা এখানেই শেষ হলো না। গড়াল আরও অনেকদূর! মক্কার মুশরিকরা এ ঘটনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
এ সময় আব্দুল্লাহ ইবনে জুদানের ক্রীতদাস কাবা-চত্বরেই ছিল। একটু দূর থেকে পুরো ঘটনাই সে প্রত্যক্ষ করে। ঘটনাটা কাউকে জানানো দরকার। খামাখা একজন মানুষকে এভাবে গালি দেওয়ার কোনো মানে হয় না। এর একটা বিহিত হওয়া উচিত। যুলুমের মুখে নিশ্চুপ থাকাও একটি যুলুম। দাস মানুষ। নিজের পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। নেতৃস্থানীয় কাউকে বিষয়টা বলা দরকার। তেমন কাউকে এখন দেখা যাচ্ছে না। অপেক্ষা করা ছাড়া এই মুহূর্তে তার আর কিছু করার নেই।
হামযা-কুরাইশদের অহংকারের প্রতীক। আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান। তার শরীর পেশিবহুল এবং শক্তিশালী। কুরাইশদের প্রত্যেকে তাকে ভয় পায়। তার সাহসিকতার জন্য সবাই তাকে সমীহ করে চলে এবং সব সময় তার পক্ষেই থাকার চেষ্টা করে। তিনি তার ভাতিজা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুই বছরের বড় এবং দুধভাইও। তার মা রাসূলের আত্মীয়-চাচাতো বোন।
হামযা শিকার করতেন। শিকার করা তার কাছে ইবাদতের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এজন্য অনেক প্রস্তুতি নিতেন, সাজ-সজ্জা তো ছিলই। ঘটনার দিন তিনি শিকার থেকে ফিরছিলেন। তার দু-হাতে তির-ধনুক ধরা ছিল। ফেরার পথে সবাইকে শিকারী যন্ত্রপাতি দিয়ে অভিবাদন জানানো ছিল তার সাধারণ নিয়ম। তারপর কাবা-চত্বরে গিয়ে শিকার সমাপ্ত করতেন। অভ্যাস অনুযায়ী ওই দিন শিকার থেকে ফেরার পথে যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে, তিনি তাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন, তাদের খোঁজখবর নিলেন। তারপরই আব্দুল্লাহ ইবনে জুদানের ক্রীতদাসের সঙ্গে তার দেখা হলো।
আব্দুল্লাহ ইবনে জুদানের ক্রীতদাস তাকে দেখে খুশি হলো। সকালের ঘটনাটা বলার মতো লোক পাওয়া গেছে। সে বলল : আবু আম্মারা, আপনি কি জানেন আপনার ভাতিজা মুহাম্মাদ এবং আবুল হাকাম ইবনে হিশাম (আবু জাহেল)-এর মধ্যে কী ঘটেছে? ওই তো ওইখানে-সে মুহাম্মাদকে দেখে তার নিকট এগিয়ে যায়। তারপর খুব বাজে ভাষায় তাকে গালমন্দ করেছে এবং অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেছে এমনকি তাকে উসকে দিতে চেয়েছে যেন একটি মারামারি বাধিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু মুহাম্মাদ তার দিকে ফিরেও তাকাননি। কোনো জবাবও দেননি।'
এ ঘটনা শুনে হামযা ভীষণ ক্ষেপে যান; তার শিরা-উপশিরায় আগুন ধরে যায়। ইসলাম গ্রহণ না করলেও ভাতিজার প্রতি ছিল প্রাণের টান; তিনি তাকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের আচরণ কখনো তার ভালো লাগেনি। যদিও এতদিন এর কোনো প্রতিবাদ করেননি, কিন্তু আজ আর চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না। আবু জাহেলের জঘন্য কর্মকাণ্ড তাকে অস্থির করে তুলল। এখনই এর জবাব দিতে হবে। তিনি দ্রুত রওনা হয়ে গেলেন!
শরীরে শিকারের পোশাক। কাঁধে ঝুলছে তির-ধনুক। এগুলো নিয়েই তিনি হাঁটছেন। এখনো শিকারেই যাচ্ছেন। তবে এবার লক্ষ্য কোনো বন্যপ্রাণী নয়; কাবা-চত্বরে আড্ডায় বসে থাকা আবু জাহেল। পথে কারও প্রতি তার ভ্রুক্ষেপ নেই। কেউ সাহসও করছে না কিছু বলার। সবাই যেন তাকে অনুসরণ করছে। কী ঘটে, তা-ই দেখার আগ্রহ তাদের। কাবা-চত্বরে আবু জাহেলকে খুঁজে পেতে দেরি হলো না। আসলেই সে বসে আড্ডা দিচ্ছে। সে জানে না, তার ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে। আবু জাহেলকে দেখেই হামযা তার দিকে তেড়ে গেলেন।
হামযার দিকে ভয়ার্ত চোখ দেখে আবু জাহেল ভড়কে গেল। ভড়কে গেল তার সঙ্গীরাও। এই মানুষটিকে সমীহ করে না, মক্কায় এমন কেউ বেঁচে নেই। আবু জাহেল ঘটনা বুঝতে পেরে আগেই কৃতকর্মের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করল। কাজ হলো না। শাস্তির ভয়ে অপরাধ থেকে বিরত থাকা যায়। অপরাধ করে মাফ পাওয়া যায় না। হামযা তার ধনুক দিয়ে আবু জাহেলের মাথায় সজোরে আঘাত করলেন। এতে তার মাথা কেটে গেল। এবার তার বুক বরাবর তির নিশানা করে গর্জে উঠলেন: 'কোন সাহসে তুমি তাকে আক্রমণ করলে? কোন সাহসে তুমি তাকে গালমন্দ করেছ? তাহলে জেনে রাখো, আমিও তার দ্বীন কবুল করলাম; সে যা বলে আজ থেকে আমিও তা-ই বলব। ক্ষমতা থাকলে আমার সামনে দাঁড়াও!'
ঘটনার আকস্মিকতায় আবু জাহেল দিশেহারা হয়ে গেল। অবস্থা বেগতিক দেখে বনু মাখযুমের কিছু লোক আবু জাহেলের সাহায্যে ছুটে এল। আবু জাহেল তাদের বাধা দিয়ে বললেন, 'তোমরা আবু আম্মারকে ছেড়ে দাও। আল্লাহর কসম! কিছুক্ষণ আগেই আমি তার ভাতিজাকে মারাত্মক গালি দিয়েছি।'
লোকেরা হামযাকে উসকে দিতে বলল, 'হামযা, সম্ভবত তুমি ধর্মত্যাগী হয়েছ!' হামযা দ্রুত এর জবাব দিলেন : 'যখন তার সত্যতা আমার নিকট প্রকাশ হয়ে পড়েছে, তখন তা থেকে আমাকে বিরত রাখবে কে? হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। যা কিছু তিনি বলেন, সবই সত্য। আল্লাহর কসম! আমি তা থেকে আর ফিরে আসতে পারি না। যদি তোমরা সত্যবাদী হও, আমাকে একটু বাধা দিয়েই দেখো!'
হামযার সিদ্ধান্ত ছিল চূড়ান্ত এবং তিনি সেখান থেকে সরাসরি তার ভাতিজা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সেখানেই গিয়েই তিনি তার ঈমানের ঘোষণা দিলেন। যে দিনের সূচনা হয়েছিল একটি অনভিপ্রেত ঘটনার মধ্য দিয়ে, সেই একইদিনের সমাপ্তি হলো হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো সাহসী বীরের ঈমান গ্রহণের মাধ্যমে। সেই দিন চিরদিনের জন্য ভাস্কর হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়।
হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু বদর-যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেন। এ যুদ্ধের শুরুতে মক্কার মুশরিকরা দ্বন্দ্ব-যুদ্ধের আহ্বান জানায়। এতে যে তিনজন মুহাজির সাহাবীকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগিয়ে যেতে বলেন, তিনি তাদের একজন। এরপর উহুদ-যুদ্ধে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। কাফেররা তার লাশ বিকৃত করে ফেলে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সম্মানিত চাচার লাশ দেখে কেঁদে ওঠেন। তাকে সাইয়্যিদুশ শুহাদা (সকল শহীদদের নেতা), আসাদুল্লাহ (আল্লাহর সিংহ) এবং আসাদ আল-জান্নাহ (জান্নাতের সিংহ) বলে সম্বোর্ডন করা হয়।