📄 উমাইর বিন হাবিব বিন হামাসা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া
নির্বোধের সাহচর্য থেকে দূরে থাকার নির্দেশ
[৪৭৪] জাফর আল-খাতামি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে তাঁর দাদা উমাইর বিন হাবিবের সাহচর্য ছিলো। তিনি তাঁর সন্তানদের উদ্দেশে নসিহত করে বলেন, “হে আমার প্রিয় সন্তানেরা, তোমরা কিছুতেই নির্বোধদের সংশ্রবে যাবে না। নির্বোধদের সংশ্রব হলো একটা ব্যাধি। নির্বোধের থেকে যদি কেউ কিছু শেখে তবে তার সেই শিক্ষার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হয় না। নির্বোধ ব্যক্তি যা বলে ও করে তার অল্পকিছু নিয়ে যদি কেউ পালিয়ে না আসে তবে তাকে অনেক বেশি কিছু নিয়ে পালিয়ে আসতে হয়। যে-ব্যক্তি অপছন্দনীয় বিষয়ের ওপর ধৈর্যধারণ করতে পারে সে যা ভালোবাসে তা লাভ করে। আর তোমাদের কেউ যদি মানুষকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করতে চায় তবে সে যেনো নিজেকে কষ্ট-যন্ত্রণায় ধৈর্য ধারণ করার জন্য প্রস্তুত রাখে এবং একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে প্রতিদানের আশা রাখে। যে-ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার থেকে প্রতিদান পাওয়ার বিশ্বাস রাখে, সে কষ্ট-যন্ত্রণার স্পর্শ পায় না।"
চুপ থাকায় রয়েছে কল্যাণ
[৪৭৫] সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমরা সা’দ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর বললেন, আমি আমার এই চুপ থাকার মাঝে এমন কিছু কথা বলেছি যা ফুরাত ও নীল নদ যে-জল সিঞ্চন করে তার থেকেও উত্তম।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কী বলেছেন? তিনি বললেন,
سُبْحَانَ اللَّهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ " “সমস্ত মহিমা আল্লাহর, সকল প্রশংসা আল্লাহর, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আল্লাহ তো অতি মহান।”
পরিধেয় জুব্বায় কাফন পরানোর ওসিয়ত
[৪৭৬] ইবনে শিহাব-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলো। তখন তিনি তাঁর একটি পশমের তৈরি পুরনো জুব্বা নিয়ে আসতে বললেন। তারপর বললেন, “তোমরা আমাকে এই জুব্বায় কাফন পরাবে। বদরের যুদ্ধের দিন আমি মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলাম, সেইদিন এই জুব্বা আমার পরনে ছিলো। এ-কারণে আমি জুব্বাটি লুকিয়ে রেখেছিলাম।"
কিয়ামত দিবসের অবস্থা
[৪৭৭] আবু আবদুল্লাহ আল-জাদালি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উবাদা বিন সামিত ও কা’ব আল-আহবার-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, “কিয়ামতের দিন যখন সকল মানুষ সমবেত হবে তখন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবেন, “আজ চূড়ান্ত ফয়সালার দিন। সুতরাং তারা কোথায় যাদের শরীরের পার্শ্বদেশ (ইবাদতের কারণে) শয্যা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতো? তারা কোথায় যারা আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করতো দাঁড়ানো অবস্থায়, বসা অবস্থায় এবং শোয়া অবস্থায়?” এমনকি তিনি এই সকল শব্দ উল্লেখ করবেন। তারপর জাহান্নাম থেকে একটি গলা বেরিয়ে আসবে। গলাটি বলবে, “তিন প্রকারের লোককে শাস্তি দেওয়ার জন্য আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে: যে-ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন উপাসনা নির্ধারণ করেছে, প্রত্যেক অহংকারী ও উদ্ধত ব্যক্তি এবং প্রত্যেক সীমালঙ্ঘনকারী। আমি এরূপ মানুষকে পিতা যেমন সন্তানকে চেনে এবং সন্তান যেমন পিতাকে চেনে তার চেয়ে বেশি চিনি।” বর্ণনাকারী বলেন, “দরিদ্র মুসলমানদের জান্নাতে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। যাওয়ার পথে ফেরেশতারা তাদের আটকে দেবে। তখন তারা বলবে, তোমরা আমাদের আটকে দিচ্ছো, অথচ আমাদের সম্পদ ছিলো না এবং আমরা আমিরও ছিলাম না।”
লাল উটের ওপর চড়ে ভাষণ
[৪৭৮] সালামা বিন নুবাইত-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমার পিতা, আমার দাদা ও আমার চাচা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলেন। আমার পিতা আমাকে বলেছেন, "আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখেছি, আরাফাতের দিন সন্ধ্যায় একটি লাল উটের ওপর চড়ে ভাষণ দিয়েছেন।"
ফজরের দুই রাকাত সুন্নত পড়ার তাকিদ
[৪৭৯] সালামা বিন নুবাইত-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমার পিতা আমাকে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে (তাহাজ্জুদ) নামায পড়ার উপদেশ দিলেন। আমি বললাম, বাবা, আমি তো তাহাজ্জুদ নামায পড়ার সামর্থ্য রাখি না। (তাহাজ্জুদের সময় ঘুম থেকে উঠতে পারি না।) তখন তিনি বললেন, তাহলে অবশ্যই ফজরের ফরয নামাযের আগে দুই রাকাত সুন্নত নামায পড়বে, কখনো তা ছাড়বে না। আর কখনো ফেতনায় জড়াবে না।"
তিনি গরিব-মিসকিনদের ভালোবাসতেন
[৪৮০] সাঈদ বিন আবু সাঈদ আল-মাকবুরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবু হুরায়রাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, জাফর বিন আবু তালিব গরিব- মিসকিনদের ভালোবাসতেন। তিনি তাদের সঙ্গে বসতেন, তাদের সঙ্গে গল্প করতেন। গরিব লোকেরাও তাঁর সঙ্গে গল্প করতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-তাঁর নাম দিয়েছিলেন আবুল মাসাকিন (মিসকিনদের পিতা)।
নামাযে খুশু-খুযুর দৃষ্টান্ত
[৪৮১] ইবনুল মুনকাদির বলেন, তুমি যদি যুবাইর ইবনুল আওয়াম-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে নামায পড়তে দেখতে তাহলে বলতে, "গাছের একটি ডাল, যাকে বাতাস নাড়া দিচ্ছে; মানজানিক থেকে এখানে-ওখানে পাথর নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, অথচ এর প্রতি তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপই নাই।"
তিনি উত্তমরূপে নামায আদায় করতেন
[৪৮২] মক্কার আলেমগণ বলতেন, ইবনে জুরাইজ নামায শিখেছেন আতা বিন আবু রাবাহ থেকে, আতা বিন আবু রাবাহ নামায শিখেছেন উরওয়া ইবনুয যুবাইর থেকে, উরওয়া ইবনুয যুবাইর নামায শিখেছেন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-থেকে, উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-নামায শিখেছেন রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-থেকে। আবদুর রাজ্জাক বলেন, “আমি ইবনে জুরাইজ থেকে উত্তমরূপে আর কাউকে নামায পড়তে দেখিনি।"
যিকিরকারীই উত্তম
[৪৮৩] জাবির বিন আমর আবুল ওয়াযযা বলেন, আবু বুরদা আসলামি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, “কোনো ব্যক্তির কোলে যদি দিনার থাকে এবং সে তা দান করে দেয় আর অপর ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার যিকির করে, তবে যিকিরকারীই উত্তম।” আবু আবদুর রহমান আবদুল্লাহ বিন আহমদ বিন হাম্বল-রাহিমাহুমুল্লাহ-তাঁর পিতার মৃত্যুর কথা স্মরণ করলেন এবং বললেন, তিনি মৃত্যুর সময় কয়েকটি খুচরো দিরহাম রেখে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “তোমরা আমার পক্ষ থেকে একটি কসমের কাফফারারূপে এগুলো দান করে দিয়ো। আমার মনে হয় কসমটি আমি ভেঙে ফেলেছিলাম।”
এশার নামাযের পর ঘুমিয়ে পড়ার উপদেশ
[৪৮৪] মুআবিয়া বিন কুররা-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তাঁর পিতার নিজের সন্তানদের এশার নামায পড়ার পর বলতেন, হে আমার সন্তানেরা, তোমরা ঘুমিয়ে পড়ো, আশা করা যায় আল্লাহ তাআলা তোমাদের রাতের বেলায় কল্যাণ দান করবেন।”
📄 আবু মাসঊদ আল-আনসারি—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া
দীনও ধ্বংস হচ্ছে, দুনিয়াও ধ্বংস হচ্ছে
[৪৮৫] আবদুর রহমান বিন আবু লায়লা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবু মাসউদ আল-আনসারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-দুনিয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন এবং বললেন, তোমরা দুনিয়াকে কলজের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখো, আল্লাহর কসম! তোমরা আখেরাতে দুনিয়া থেকে একটি দিনার বা একটি দিরহাম নিয়ে যেতে পারবে না। তোমরা সেগুলোকে ভূপৃষ্ঠে ও ভূগর্ভেই রেখে যাবে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা রেখে গেছে। অথচ তোমার এই দুনিয়া নিয়েই ঝগড়া-বিবাদ যা করার করছো, পরস্পরকে যা ধোঁকা দেওয়ার ধোঁকা দিচ্ছো। এভাবে তো তোমাদের দীনও ধ্বংস হয়ে, দুনিয়াও ধ্বংস হয়ে যাবে।"
উপঢৌকন প্রত্যাখ্যান করলেন
[৪৮৬] মুহাম্মদ বিন সিরিন আল-আনসারি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবু মাসউদ আল-আনসারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-একজন লোকের জন্য তার কোনো প্রয়োজনে সুপারিশ করলেন। তারপর বাড়িতে পরিবারের কাছে এলেন এবং উপঢৌকন দেখতে পেলেন। ইবনে আওন বলেন, আমার ধারণা, মুহাম্মদ বিন সিরিন বলেছেন, উপঢৌকন ছিলো হাঁস ও মুরগি। আবু মাসউদ আল-আনসারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কী? তাঁরা বললেন, "আপনি যে-লোকটির জন্য সুপারিশ করেছিলেন সেই লোক এগুলো পাঠিয়েছে।” তিনি বললেন, "এগুলো বের করো, এগুলো বের করো। আমি কি আমার সুপারিশের প্রতিদান এই দুনিয়াতেই গ্রহণ করবো?"
📄 আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস—রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর চোখে দুনিয়া
জিহ্বাকে টেনে ধরে উপদেশ
[৪৮৭] সাঈদ জুবায়ের-রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে দেখলাম, তিনি তাঁর জিহ্বাকে টেনে ধরলেন এবং জিহ্বার উদ্দেশে বললেন, “তুমি ভালো কথা বলবে, তাহলে লাভবান হবে অথবা চুপ থাকবে, তাহলে অনুতপ্ত হওয়ার পূর্বেই নিরাপদ থাকবে।”
যিকিরকারী বিদ্যমান থাকা অবস্থায় কিয়ামত হবে না
[৪৮৮] হাসিন বিন জুন্দুব-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, “যতোদিন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি আল্লাহ আল্লাহ যিকির করবে ততোদিন পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না।”
ভ্রমণের সময় বেশি বেশি যিকির করতেন
[৪৮৯] আবদুল্লাহ বিন আবু মুলাইকা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর সঙ্গে মদিনা থেকে মক্কায় এবং মক্কা থেকে মদিনায় ভ্রমণ করেছি। (ভ্রমণের শুরুতে) তিনি দুই রাকাত নামায পড়তেন। তিনি অর্ধেক রাত জেগে কাটাতেন। আল্লাহর কসম! তখন বেশি বেশি যিকির-আযকার করতেন।"
অন্যের দোষ না ধরে নিজের দোষ ধরা
[৪৯০] মুজাহিদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, “যখন তুমি তোমার বন্ধু ও সঙ্গীর দোষ-ত্রুটি উল্লেখ করতে চাও, তখন নিজের দোষ-ত্রুটির কথা মনে করো।”
জিহ্বার কারণেই মানুষ সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছনার শিকার হবে
[৪৯১] সাঈদ আল-জুরাইরি-রাহিমাহুল্লাহ-এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে দেখেছি, তিনি জিহ্বার আগা ধরে রেখেছেন এবং বলছেন, "তোমার জন্য আফসোস, তুমি ভালো কথা বলো, তাহলে লাভবান হবে এবং খারাপ কথা থেকে চুপ থাকো, তাহলে নিরাপদ থাকবে।" তখন তাঁকে এক ব্যক্তি বললেন, হে ইবনে আব্বাস, কী ব্যাপার, আমি আপনাকে জিহ্বার ডগা ধরে এমন কথা বলতে শুনছি? জবাবে তিনি বললেন, "আমি শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন বান্দা তার জিহ্বার কারণেই সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছনার শিকার হবে।"
তাঁর জামা পুরোনো হতে হতে গুটিয়ে গিয়েছিল
[৪৯২] আবু হামযা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আমি দেখেছি যে, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর জামা গুটিয়ে গিয়ে তাঁর টাখনুর ওপরে উঠে গেছে এবং হাতা আঙুলের গোড়া পর্যন্ত পৌঁছে হাতের পিঠ ঢেকে দিয়েছে।"
📄 আবদুল্লাহ ইবনে উমর—রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর চোখে দুনিয়া
এতিমদের সঙ্গে নিয়ে খেতেন
[৪৯৩] আবু বকর বিন হাফস বিন ইমরান-রাহিমাহুমুল্লাহ-বলেন, "আবদুল্লাহ ইবনে উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এমন কোনো খাবার খেতেন না যাতে তাঁর দস্তরখানে কোনো এতিম শরিক হতো না।"
চার মাস যাবৎ তৃপ্তিসহ খাননি
[৪৯৪] মুহাম্মদ বিন সিরিন-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে বললেন, আমি কি আপনার জন্য জাওয়ারিশ (হজমকারী আরক) বানিয়ে দেবো? তিনি বললেন, জাওয়ারিশ কী জিনিস? লোকটি বললো, এটি বস্তু, খাবার খেয়ে যদি আপনার অস্বস্তি হয়, তখন এই বস্তু সামান্য পান করবেন, আপনার সব অস্বস্তি দূর হয়ে যাবে। তখন ইবনে উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-বললেন, "গত চার মাস যাবৎ আমি তৃপ্তিসহ খাইনি। তবে আমি যে তা পেতে চাই না তা নয়। কিন্তু আমি এমন একদল মানুষের সঙ্গে ছিলাম যাঁরা এক বার তৃপ্তির সঙ্গে খেতেন, আরেক বার ক্ষুধার্ত থাকতেন।"
পানীয় এতিমকে দিয়ে দিলেন
[৪৯৫] সুফয়ানি বিন হুসাইন তাঁর পিতা হুসাইন থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-যখন দুপুরের খাবার খেতেন বা রাতের খাবার খেতেন, আশপাশের এতিমদের ডেকে নিয়ে আসতেন। একদিন দুপুরের খাবার খেতে বসলেন, তখন একজন এতিমকে ডেকে আনার জন্য তার কাছে লোক পাঠালেন। কিন্তু লোকটি এতিমকে পেলো না। তিনি দুপুরের খাবারের পর সুস্বাদু সাবিক পান করতেন। তাঁরা দুপুরের খাবার শেষ করে ফেলার পর ওই এতিমটি এলো। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর হাতে তখন তার পান করার জন্য পানীয় রয়েছে। তিনি ওই পানীয়ই এতিমটির দিকে এগিয়ে দিলেন এবং বললেন, "তুমি এটা নাও। আমি মনে করি না যে তোমার লোকসান হয়েছে।"
আঙুরগুলো তিন বার দান করলেন
[৪৯৬] নাফে রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং আঙুর খেতে চাইলেন। আমি তাঁর জন্য এক দিরহাম দিয়ে কয়েকটি আঙুরের থোকা কিনে আনলাম। সেগুলো নিয়ে তাঁর কাছে এলাম এবং তাঁর হাতে দিলাম। এই সময় একজন ভিক্ষুক এলো এবং দরজায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষা চাইলো। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, "আঙুরগুলো তাকে দিয়ে দাও।" আমি তাঁকে বললাম, কিছু চাখুন, কিছু খান। তিনি বললেন, "তুমি তাকে দিয়ে দাও।" আমি ভিক্ষুককে আঙুর দিয়ে দিলাম। তারপর তার থেকে সেগুলো এক দিরহাম দিয়ে কিনলাম। আমি আঙুরগুলো নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলাম এবং তাঁর হাতে দিলাম। তখন ভিক্ষুকটি আবার ফিরে এলো। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, "আঙুরগুলো তাকে দিয়ে দাও।" আমি তাঁকে বললাম, কিছু চাখুন, কিছু খান। তিনি বললেন, "তুমি তাকে দিয়ে দাও।” আমি ভিক্ষুককে আঙুরগুলো দিয়ে দিলাম। তারপর তার থেকে আবার সেগুলো এক দিরহাম দিয়ে কিনলাম। আঙুরগুলো নিয়ে ঘরে এলাম এবং তাঁর হাতে দিলাম। কিন্তু ভিক্ষুকটি আবারও ফিরে এলো। তখন ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা আমাকে বললেন, "আঙুরগুলো ভিক্ষুককে দিয়ে দাও।” আমি তাঁকে বললাম, কিছু চাখুন, কিছু খান। তিনি বললেন, "তুমি তাকে দিয়ে দাও।” আমি ভিক্ষুককে আঙুর দিয়ে দিলাম এবং বললাম, “ছি ছি ছি, তৃতীয় বার (বা চতুর্থ বার) চাইতে তোমার লজ্জা লাগলো না?” (বর্ণনাকারী বলেন, আমি জানি যে, তিনি "চতুর্থ বার” কথাটাই বলেছিলেন। বর্ণনাকারী ইয়াযিদ বিন হারুন এখানে সন্দেহে পতিত হয়েছেন) নাফে-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "তারপর আমি ভিক্ষুক থেকে এক দিরহাম দিয়ে আঙুরগুলো কিনে নিলাম। ভিক্ষুক চলে গেলো। আমি আঙুরগুলো নিয়ে তাঁর কাছে এলাম। তখন তিনি খেলেন।"
সামান্য বস্তুও তাঁর ঘরে ছিলো না
[৪৯৭] মাইমুন বিন মিহরান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আমি আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর ঘরে প্রবেশ করলাম। কিন্তু তার ঘরে আমি আমার এই জামা পরিমাণ বস্তুও দেখতে পেলাম না।"
সূরা ইখলাস কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য
[৪৯৮] খালিদ বিন আবদুল্লাহ আল-কুরাশি—রাহিমাহুল্লাহ-এর আযাদকৃত গোলাম আবু গালিব বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর—রাদিয়াল্লাহু আনহুমা—মক্কায় আমাদের কাছে এলেন। তিনি রাতের বেলা তাহাজ্জুদ নামায পড়তেন। একদিন রাতে সুবহে সাদিক হওয়ার আগে তিনি বললেন, "হে আবু গালিব, তুমি নামায পড়ার জন্য ঘুম থেকে জাগ্রত হও না এবং কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ পাঠ করো না?” জবাবে আমি বললাম, "হে আবু আবদুর রহমান, সুবহে সাদিক তো হয়ে এলো প্রায়। আমি কীভাবে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ তেলাওয়াত করবো?” তিনি বললেন, "সূরা ইখলাস, অর্থাৎ, قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ "বলো, তিনিই আল্লাহ, এক- অদ্বিতীয়" কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য।"
শীতল পানি পান করে কান্না শুরু করলেন
[৪৯৯] আবদুল্লাহ বিন উকাইল বিন শুমাইর আর-রিয়াহি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর—রাদিয়াল্লাহু আনহুমা—শীতল পানি পান করলেন এবং কেঁদে ফেললেন। তাঁর কান্না তীব্র হয়ে উঠলো। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, "আল্লাহ তাআলার কিতাবের একটি আয়াত স্মরণ করেছি : وَحِيلَ بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ مَا يَشْتَهُونَ "তাদের এবং তারা যা- কিছু কামনা করে তার মধ্যে অন্তরাল সৃষ্টি করা হয়েছে।" বুঝেছি যে, জাহান্নামের অধিবাসীরা শীতল পানি ছাড়া আর কিছুই কামনা করবে না। আর আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন :أفِيضُوا عَلَيْنَا مِنَ الْمَاءِ أَوْ مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ "আমাদের ওপর কিছু পানি ঢেলে দাও অথবা আল্লাহ জীবিকারূপে তোমাদের যা দিয়েছেন তা থেকে কিছু দাও।"
উপার্জন হালাল হলে তার ব্যয়ও হালাল হয়
[৫০০] আমর বিন মাইমুন তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ বিন আমের বিন কুরাইয—রাদিয়াল্লাহু আনহু—অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এই অসুস্থতাতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর রাসূলুল্লাহ— সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিগণের কাছে লোক পাঠালেন তাঁদের ডেকে আনার জন্য। তাঁদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-ও ছিলেন। আবদুল্লাহ বিন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁদের বললেন, "আমার কী অবস্থা তা তো আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন। আমিও মনে করি যে, আমি মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছি। আমার সম্পর্কে আপনাদের ধারণা কী?" সবাই বললেন, "গরিব-দুঃখীদের দান করতেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ় রাখতেন; গ্রামে গ্রামে পথচারীদের জন্য কূপ খনন করেছেন। আরাফার ময়দানে হাউয খনন করেছেন। তাতে আল্লাহর ঘরের হাজিগণ ওজু-গোসল করেন। আপনি যে পরকালে মুক্তি পাবেন এতে আমাদের সন্দেহ নেই।” কিন্তু তাঁর চোখ ছিলো আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর দিকে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-চুপ ছিলেন। যখন তিনি কথা বলতে দেরি করছিলেন তখন আবদুল্লাহ বিন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "হে আবু আবদুর রহমান, কী ব্যাপার, আপনি কথা বলছেন না কেন?" তখন তিনি বললেন, "উপার্জন যদি হালাল হয়, তবে সব খরচই পবিত্র হয়। আপনাকে বিচার-দিবসে উপস্থিত করা হবে, তখনই (সব) জানতে পারবেন।"
কালোরা সবচেয়ে গরিব মানুষ
[৫০১] মুহাম্মদ বিন আব্বাদ বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা যখন দান করতে চাইতেন তখন বললেন, "তোমরা কালো মানুষদের দান করো; কারণ, তারা সবচেয়ে গরিব মানুষ।"
তাঁর সবকিছু ছিলো অনুসরণযোগ্য
[৫০২] আসিম আল-আহওয়াল তার কাছে বর্ণনাকারীর সূত্রে বলেছেন, "যখন কোনো মানুষ আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে দেখতো, মনে করতো তাঁর মধ্যে অনুসরণ করার মতো কিছু-না-কিছু আছে: তা হলো রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কর্ম ও আমল।"
মানুষ চলে গেলেও তাদের কর্মগুলো রয়ে যায়
[৫০৩] মুজাহিদ-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর সঙ্গে হাঁটছিলাম। তিনি একটি বাড়ির ধ্বংসাবশেষের কাছে এলেন। তারপর আমাকে বললেন, তুমি বলো, হে ধ্বংসাবশেষ, তোমার বাসিন্দাদের কী অবস্থা? তখন আমি বললাম, হে ধ্বংসাবশেষ, তোমার বাসিন্দাদের কী অবস্থা? ইবনে উমর বললেন, “তারা চলে গেছে, তাদের কর্মগুলো রয়ে গেছে।"
মাসে এক বার বা দুই বারের বেশি তৃপ্তিসহ খেতেন না
[৫০৪] নাফে -রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর কাছে ‘কাবল’ নামের একটি বস্তু নিয়ে আসা হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটা দিয়ে আমি কী করবো? লোকটি বললো, এটি আপনার রুচি ও হজমশক্তি বাড়িয়ে দেবে। তিনি বললেন, মাস চলে যায়, কিন্তু আমি এক বার বা দুই বারের বেশি তৃপ্তিসহকারে খাই না।"
পার্থিব জীবনে সবকিছুর স্বাদ আস্বাদন ভালো নয়
[৫০৫] ইয়াহইয়া বিন ওয়াসসাব বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-বলেছেন, “হে ছেলে, তুমি ছারিদা ভালোভাবে পাকাবে, তাহলে তেলের গুরুপাকত্ব চলে যাবে। কিছু মানুষ আছে যারা পার্থিব জীবনেই ভালো জিনিসগুলোর স্বাদ আস্বাদন করে ফেলতে চায়।"
এক বৈঠকে বাইশ হাজার দিনার দান করলেন
[৫০৬] মাইমুন বিন মিহরান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর- রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর কাছে তাঁর এক মজলিসে বাইশ হাজার দিনার এলো। তিনি সেগুলোকে দান-সাদকা করার আগে মজলিস থেকে উঠলেন না।"
নিকৃষ্ট বস্তু নিকৃষ্ট বস্তুর পরিপূরক নয়
[৫০৭] তামিম বিন সালামা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর- রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর কাছে ইবনে আমেরের বিষয়টি উত্থাপন করা হলো। তখন তিনি বললেন, “নিকৃষ্ট বস্তু নিকৃষ্ট বস্তুর পরিপূরক হতে পারে না।"
হালাল উপার্জন হলে খরচও ভালো জায়গায় হয়
[৫০৮] মাইমুন বিন মিহরান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর- রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছেন, “উপার্জন হালাল হলে খরচও পবিত্র হয়।"
সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখা উচিত নয়
[৫০৯] নাফে-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-বলেছেন, "সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার চেয়ে খরচ করে ফেলাই উত্তম।"
তাঁর চেয়ে জ্ঞানী মানুষ ছিলেন না
[৫১০] তাউস বিন কায়সান আল-ইয়ামানি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর চেয়ে আল্লাহভীরু মানুষ আর দেখিনি। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর চেয়ে জ্ঞানী মানুষ দেখিনি।" বর্ণনাকারী বলেন, "তাউস বিন কায়সান আল-ইয়ামানি-রাহিমাহুল্লাহ-হাদিস অক্ষরে অক্ষরে মুখস্থ করতেন।"
সন্দেহযুক্ত বিষয় পরিত্যাগ করা
[৫১১] শুবা বিন আল-হাজ্জাজ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমি আবু সুফয়ান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলতেন, "সন্দেহযুক্ত বিষয় পরিত্যাগ করো এবং সন্দেহমুক্ত নিশ্চিত বিষয়ের ওপর আমল করো।"
এক মজলিসেই তিরিশ হাজার দিরহাম দান করেছেন
[৫১২] নাফে-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে তার কোনো সম্পদ আনন্দিত করতে পারতো না, যতোক্ষণ না তিনি তা আল্লাহর জন্য ব্যয় করে দিতেন। এমন একটা সময় ছিলো যখন তিনি এক মজলিসেই তিরিশ হাজার দিরহাম দান করেছেন। ইবনে আমের তাঁকে দুই বার তিরিশ হাজার দিরহাম করে উপঢৌকন দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "আমি আশংকা করছি যে, ইবনে আমেরের দিরহামগুলো আমাকে ফেতনায় ফেলে দেবে। (হে নাফে), তুমি যাও, তুমি স্বাধীন।” নাফে বলেন, "তিনি মুসাফির না হলে বা রমযান মাস ছাড়া কোনো মাসে গোশতের তরকারি খেতেন না। মাস চলে যেতো, কিন্তু তিনি এক টুকরো গোশতেরও স্বাদ নিতেন না।"
আয়াতটি পড়ে কেঁদে উঠলেন
[৫১৩] কাসিম বিন আবু বাযযা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, যে-ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে পড়তে শুনেছেন তিনি বর্ণনা করেছেন, "তিনি সূরা মুতাফফিফিন পাঠ করছিলেন। وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ "দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়" আয়াত পাঠ করে "যেদিন সকল মানুষ জগৎসমূহের প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবে" আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন। তখন কেঁদে উঠলেন এবং সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। এরপর বাকি অংশ আর পড়তে পারলেন না।"
কঠিন হিসাবের ভয়ে কান্না
[৫১৪] বারা বিন সুলাইমান বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে উমর—রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর আযাদকৃত গোলাম নাফেকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ইবনে উমর—রাদিয়াল্লাহু আনহুমা—যখনই সূরা বাকারার শেষের এই দুটি আয়াত পাঠ করতেন কেঁদে ফেলতেন:
لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَإِنْ تُبْدُوا مَا فِي أَنْفُسِكُمْ أَوْ تُخْفُوهُ يُحَاسِبْكُمْ بِهِ اللَّهُ
"আসমান ও জমিনে যা-কিছু আছে সবকিছু আল্লাহরই। তোমাদের মনে যা আছে তা প্রকাশ করো অথবা গোপন করো, তার হিসাব আল্লাহ তোমাদের থেকে গ্রহণ করবেন।"
আয়াত থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত। (এখানে মোট তিনটি আয়াত রয়েছে।) তারপর বলতেন, "কঠিন হিসাবের ভয়ের কারণে এই কান্না।"
তিনি অহংকারী হতে চান না
[৫১৫] কাযাআতা বিন ইয়াহইয়া আল-বাসরি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে উমর—রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর পরনে মোটা অমসৃণ কাপড় দেখতে পেলাম। তাঁকে বললাম, "হে আবু আবদুর রহমান, আমি আপনার জন্য মসৃণ কাপড় নিয়ে এসেছি, যা খুরাসানে তৈরি করা হয়েছে। আমি যদি এই কাপড় আপনার পরনে দেখি তবে আমার চক্ষু শীতল হবে। কারণ, আপনার পরনে এখন অমসৃণ মোটা কাপড় রয়েছে।” তিনি বললেন, "তুমি আমাকে কাপড়টা দেখাও, আমি তা দেখি।” তিনি কাপড়টা হাত দ্বারা স্পর্শ করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি রেশমের কাপড়?” আমি বললাম, "না; বরং তা তুলো দিয়ে তৈরি কাপড়।" তিনি বললেন, "আমি আশংকা করি যে, যদি আমি তা পরিধান করি তবে আমি দাম্ভিক ও অহংকারীতে পরিণত হবো। আল্লাহ তাআলা বলেছেন : وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلِّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ "আর আল্লাহ তো কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।"
বিকেলেও ইবাদত করতেন
[৫১৬] নাফে রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-যোহর থেকে আসর পর্যন্ত ইবাদতে মগ্ন থাকতেন।"
তিনিই আগে-ভাগে খেদমত করতেন
[৫১৭] মুজাহিদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আমি আবদুল্লাহ ইবনে উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর সাহচর্যে থেকেছি। তখন আমি তাঁর খেদমত করতে চাইতাম; কিন্তু তিনিই আমার বেশি খেদমত করতেন।"
প্রার্থনা করতেন এবং পানাহ চাইতেন
[৫১৮] নাফে রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা যখন নামায পড়তেন এবং নামাযে জান্নাতের বর্ণনা-সম্বলিত আয়াত পড়তেন, তখন থামতেন এবং আল্লাহ তাআলার কাছে জান্নাত প্রার্থনা করতেন, দোয়া করতেন ও কাঁদতেন। যখন জাহান্নামের বর্ণনা-সম্বলিত আয়াত পড়তেন, তখন থামতেন, দোয়া করতেন এবং আল্লাহ তাআলার কাছে পানাহ চাইতেন।"
একশোটি উট আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিলেন
[৫১৯] নাফে-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-তাঁর একটি ভূমি বিক্রি করলেন দুইশো উটের বিনিময়ে; তার মধ্যে একশো উট তিনি আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিলেন। যাদের দান করলেন তাদের এই শর্ত দিলেন যে, তারা যেনো ওয়াদিল কুরা অতিক্রম না করে তাদের উটগুলো বিক্রি না করে।"
পুত্রের উদ্দেশে উপদেশ
[৫২০] জাফর বিন বুরকান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, যিনি আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে এই ঘটনায় দেখেছেন তিনি বর্ণনা করেছেন, ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর পুত্র তাঁর কাছে এলো এবং বললো, “বাবা, আমাকে একটি চাদর কিনে দিন।" তিনি বললেন, "হে প্রিয়পুত্র, তুমি তোমার চাদর উল্টিয়ে পরিধান করো। এবং তুমি ওইসব লোকের মতো হোয়ো না যারা আল্লাহ তাআলার প্রদত্ত রিযিক পেটেও ব্যবহার করে, পিঠেও ব্যবহার করে।"
আল্লাহর ভয়ে মাটিতে পতিত হওয়া
[৫২১] আবু হাযেম-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-ইরাকের একজন লোকের পাশ দিয়ে গেলেন। লোকটি মাটিতে পড়ে ছিলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, লোকটা কী হয়েছে? উপস্থিত লোকেরা বললো, যখন তাকে কুরআন তেলাওয়াত করে শোনানো হয় তখন তার এই অবস্থা হয়। তিনি তখন বললেন, "আমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করি; কিন্তু এভাবে মাটিতে পতিত হই না।"
দাসী মুক্ত করে দিলেন
[৫২২] মুজাহিদ-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-দাঁড়িয়ে নামায পড়ছিলেন। যখন এই আয়াতে পৌঁছলেন : لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ “তোমরা যা ভালোবাসো তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা পুণ্য অর্জন করতে পারবে না।" তাঁর একটি দাসী মুক্ত করে দিলেন। তখনও তিনি নামাযই পড়ছিলেন। তিনি এই দাসীটিকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন।"
দিনারগুলো আল্লাহর ওয়াস্তে দান করে দিলেন
[৫২৩] আসিম তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "আবদুল্লাহ বিন জাফর-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর জন্য নাফের মাধ্যমে দশ হাজার (বা এক হাজার) দিনার পাঠালেন। ইবনে উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা তাঁর স্ত্রী সাফিয়্যার কাছে গেলেন। তাঁকে বললেন, ইবনে জাফর আমাকে নাফের মাধ্যমে দশ হাজার (বা এক হাজার) দিনার দিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী বললেন, হে আবু আবদুর রহমান, আপনি দিনারগুলো দিয়ে কোনো জিনিস ক্রয় করার অপেক্ষা করছেন? ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, "তার চেয়ে যা উত্তম তা কি আমি করবো না? দিনারগুলো আল্লাহর ওয়াস্তে দান করে দেবো।"
তিনি ছিলেন অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ
[৫২৪] ইউসুফ বিন মাজিশুন তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-বলেছেন, "যাঁদের নিজ নিজ পোশাকে দাফন করা হয়েছে তাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে উমরের চেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিদের সঙ্গে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ আর কাউকে দেখিনি।"
এগারো বছর যাবৎ তৃপ্তিসহ খাবার খাননি
[৫২৫] উমর বিন হামযাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমি আমার বাবার সঙ্গে বসে ছিলাম। তারপর আমরা একটি লোকের পাশ দিয়ে গেলাম। আমার বাবা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "আমাকে বলুন, আপনাকে যেদিন জুরফে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর সঙ্গে কথা বলতে দেখলাম, সেদিন আপনি তাঁর সঙ্গে কী কথা বলেছিলেন।" লোকটি বললেন, আমি তাকে বলেছিলাম, "হে আবু আবদুর রহমান, আপনার হজমশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে, আপনার বয়স বেড়ে গেছে, অথচ আপনার সঙ্গীসাথিরা আপনার অধিকার বুঝলো না, আপনার মর্যাদা বুঝলো না। সুতরাং যখন আপনি আপনার পরিবারের কাছে যাবেন, যদি আপনি তাদের নির্দেশ দেন আপনার জন্য এমন-সব খাবার তৈরি করার যা আপনাকে আরও কমনীয় করে তুলবে (তাহলে বেশ ভালো হয়)।" জবাবে তিনি বললেন, “ছি ছি, আফসোস তোমার জন্য, আমি এগারো বছর যাবৎ (বা বারো বছর যাবৎ, বা তেরো বছর যাবৎ, বা চৌদ্দো বছর যাবৎ) তৃপ্তিসহ খাবার খাইনি। সুতরাং তুমি আমার সম্পর্কে এ কেমন ধারণা করলে, অথচ গাধার তৃষ্ণার মতো আমার জীবনের অল্প সময়ই বাকি আছে।"
একটি স্মরণীয় ঘটনা
[৫২৬] মালিক বিন আনাস রাহিমাহুমুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর- রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-জুহফায় অবস্থান গ্রহণ করলেন। তখন ইবনে আমের তাঁর বাবুর্চিকে বললেন, "তুমি তোমার খাবার ইবনে উমরের কাছে পৌঁছে দাও।” বাবুর্চি খাবারের থালা নিয়ে এলো। ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "তুমি তা রাখো।" বাবুর্চি আরেকটি থালা নিয়ে এলো এবং প্রথম থালাটি উঠিয়ে নিয়ে যেতে চাইলো। ইবনে উমর তাঁকে বললেন, "কী ব্যাপার তোমার?" বাবুর্চি বললো, "আমি প্রথম থালাটি উঠিয়ে নিয়ে যেতে চাই।" ইবনে উমর বললেন, "তুমি তা রাখো, এটা ওটার ওপর ঢেলে দাও।" বর্ণনাকারী বলেন, "বাবুর্চি যখনই কোনো থালা নিয়ে আসছিলো, ইবনে উমর একটিকে অপরটির ওপর ঢেলে দিতে বলছিলেন।” তখন একটি চাকর ইবনে আমেরের কাছে গেলো এবং বললো, "এ তো দেখছি কুফার গ্রাম্য লোক!" ইবনে আমের বললেন, "ইনি হলেন তোমার মনিব আবদুল্লাহ ইবনে উমর -রাদিয়াল্লাহু আনহুমা।"
একটি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ
[৫২৭] আবু নাদরাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবু সাঈদ খুদরি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমরা এমন-সব (মন্দ) কাজ করো যা তোমাদের চোখে চুলের চেয়েও তুচ্ছ বিবেচিত হয়। অথচ আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে এগুলোকে ধ্বংসাত্মক কাজ বিবেচনা করতাম।"
বিপুল পরিমাণ সম্পদ হলেও যাকাত আদায় করবেন
[৫২৮] বিশর বিন হারিস-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, "আমি এই ব্যাপারে কোনো পরোয়া করি না: যদি আমার ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকে তবে আমি তা গণনা করবো এবং তার যাকাত আদায় করবো।"
জাহান্নামের ভয় তাঁর ঘুম কেড়ে নিয়েছে
[৫২৯] শাদ্দাদ বিন আওস-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা যখন শয্যায় যেতেন, শয্যায় এমনভাবে থাকতেন যেনো কড়াইয়ে গমের দানা ফুটছে। তিনি বলতেন, “হে আল্লাহ, জাহান্নামের ভয় আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।” বর্ণনাকারী বলেন, "তারপর তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন।"
জিহ্বাই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করে
[৫৩০] সাঈদ বিন জুবায়ের-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবু সাঈদ খুদরী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "মানুষ যখন ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, তার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার জিহ্বাকে অস্বীকার করে, তাকে বলে: তুমি আমাদের (কল্যাণের) জন্য আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। যদি তুমি সঠিক ও সরল পথে থাকো, তবে আমরাও সরল ও সঠিক পথে থাকবো; যদি তুমি বক্র ও ভ্রষ্ট পথে যাও, তবে আমরাও বক্র ও ভ্রষ্ট পথে যাবো।"
অপরিচিত ব্যক্তিরূপে থাকা
[৫৩১] আবু হাযিম সালামা বিন দিনার-রাহিমাহুমুল্লাহ-বলেন, সাহল বিন সা'দ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলতেন, "আমি তোমাদের মধ্যে অপরিচিত ব্যক্তিরূপে বেঁচে আছি।" তিনি বলতেন, কেন? সাহল বিন সা'দ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলতেন, "আমার পরিচিত সঙ্গীসাথিরা সবাই চলে গেছেন। আমিই কেবল তোমাদের মধ্যে অপরিচিত ব্যক্তিরূপে রয়ে গেছি।"
দুপুরে দিবানিদ্রায় যেতেন না
[৫৩২] আবু হাযিম সালামা বিন দিনার তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, সাহল বিন সা'দ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমরা জুমআর দিনের প্রতীক্ষায় থাকতাম।" আমি বললাম, কেন? তিনি বলেছেন, "একজন বৃদ্ধা আমাদের জন্য 'সিলক' নিয়ে আসতেন। সেটাকে তিনি যবের সঙ্গে মিশিয়ে একধরনের খাদ্য প্রস্তুত করতেন। আমরা তা থেকে খেতাম। এটা ছাড়া দুপুরে আর কোনো খাবার খেতাম না এবং জুমআর নামাযের পর দিবানিদ্রায় যেতাম না।"
দুটি দোয়া
[৫৩৩] আবদুল্লাহ বিন আহমদ আশ-শাইবানি-রাহিমাহুমুল্লাহ-বলেছেন, এটি একটি চিঠি, অহেতুক ভয় থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য (বা শত্রুদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে) আমার বাবা দোয়া-সম্বলিত চিঠিটি নিজ হাতে আমার উদ্দেশে লিখেছিলেন। আমি চিঠিটির অনুলিপি তৈরি করে রেখে দিয়েছি। তা এরূপ :
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ: أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهُ التَّامَّاتِ الَّتِي لَا يُجَاوِزُهُنَّ بَرُّ وَلَا فَاجِرٌ مِنْ شَرِّ مَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ، وَمِنْ شَرِّ مَا يَعْرُجُ فِيهَا، وَمِنْ شَرِّ مَا ذَرَأَ فِي الْأَرْضِ، وَمِنْ شَرِّ مَا يَخْرُجُ مِنْهَا، وَمِنْ شَرِّ فِتَنِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، وَمِنْ شَرِّ كُلِّ طَارِقٍ إِلَّا طَارِقًا يَطْرُقُ بِخَيْرٍ يَا رَحْمَنُ.
"বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম : আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ কালিমাসমূহের ওসিলায়-যা কোনো পুণ্যবান ও পাপাচারী অতিক্রম করতে পারে না-পানাহ চাই আকাশ থেকে যা অবতীর্ণ হয় তার অনিষ্ট থেকে এবং যা আকাশে উড্ডীন হয় তার অনিষ্ট থেকে; জমিনে যা সৃষ্টি হয় তার অনিষ্ট থেকে এবং জমিন থেকে যা উদ্গত হয় তার অনিষ্ট থেকে; দিবস ও রজনীর ফেতনার অনিষ্ট থেকে; রাত্রিকালীন অভিযাত্রীর অনিষ্ট থেকে, তবে যে-অভিযাত্রী কল্যাণ নিয়ে সে নয়, হে রাহমান।"
তারপর আবার লিখেছেন:
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ : أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ غَضَبِهِ وَعِقَابِهِ وَشَرِّ عِبَادِهِ وَمِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَنْ يَحْضُرُونَ اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ وَمَا أَظْلَلْنَ وَرَبَّ الْأَرَضِينَ السَّبْعِ وَمَا أَقْلَلْنَ وَرَبَّ الشَّيَاطِينِ وَمَا أَضَلَّتْ.
"বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম: আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ কালিমাসমূহের ওসিলায় পানাহ চাই তাঁর ক্রোধ ও শাস্তি থেকে; তাঁর বান্দাদের অনিষ্ট থেকে; শয়তানের কুমন্ত্রণা ও তাদের উপস্থিতি থেকে, হে আল্লাহ, সাত আসমান ও তারা যা ছায়াচ্ছন্ন করেছে তার প্রতিপালক, সাত জমিন ও তাদের ওপরে যা রয়েছে তার প্রতিপালক, শয়তানসমূহ ও তারা যা-কিছুকে পথভ্রষ্ট করেছে তার রব।" তিনি চিরকুট লিখেও একটি বিষয় জানিয়েছিলেন। আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, "ভয়ের কারণে শত্রুরা ছত্রভঙ্গ ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে।" আমার ধারণা তিনি বলেছেন, "আল্লাহর শত্রুরা লাঞ্ছিত হবে।" আবু আবদুর রহমান আবদুল্লাহ বলেন, আমার পিতা বলেছেন, উল্লিখিত কথাগুলোর কিয়দংশ আবু নদর থেকে বর্ণিত।
সিজদায় আল্লাহর নৈকট্য
[৫৩৪] আবু সালেহ যাকওয়ান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবু হুরায়রাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ أَقْرَبَ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ.
"সিজদারত অবস্থায় বান্দা তাঁর রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়। সুতরাং তোমরা সিজদারত অবস্থায় বেশি বেশি দোয়া পাঠ করো।"
মানুষ কখনো কল্পনাও করেনি
[৫৩৫] আবু সালেহ যাকওয়ান-রাহিমাহুল্লাহ-আবু হুরায়রাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন:
اتَّخَذْتُ لِعِبَادِيَ الصَّالِحِينَ مَا لَا عَيْنٌ رَأَتْ وَلَا أُذُنٌ سَمِعَتْ وَلَا خَطَرَ عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ "আমি আমার সৎ বান্দাদের জন্য এসব-সব নেয়ামতরাজি প্রস্তুত করে রেখেছি যা কোনো চোখ কখনো দেখেনি, যার কথা কোনো কান কখনো শোনেনি এবং মানুষের মন যার কল্পনা করেনি।"
মানুষের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ রয়েছে নেয়ামতরাজি
[৫৩৬] এই হাদিস বর্ণনা করার পর আবু হুরায়রাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "তোমরা ইচ্ছা করলে কুরআনের এই আয়াত পাঠ করতে পারো
فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَا أُخْفِيَ لَهُمْ مِنْ قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ "কেউই জানে না তাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর কী লুক্কায়িত রাখা হয়েছে তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ।"
যে-ব্যক্তি মানুষকে দান করবে আল্লাহ তাকে দান করবেন
[৫৩৭] আবদুল্লাহ বিন আবু নাজিহ আস-সাকাফি বলেন, আবদুল্লাহ বিন উবাইদ বিন উমাইর আল-লাইসি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "কিয়ামতের দিন মানুষকে পূর্বের তুলনায় প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত, প্রচণ্ড পিপাসার্ত ও নগ্ন করে উত্থিত করা হবে। সুতরাং যে-ব্যক্তি আল্লাহর জন্য মানুষকে আহার দান করেছে, আল্লাহ তাকে আহার দান করবেন, যে-ব্যক্তি আল্লাহর জন্য মানুষকে পোশাক দান করেছে, আল্লাহ তাকে পোশাক দান করবেন, যে-ব্যক্তি আল্লাহর জন্য মানুষকে পানি পান করিয়েছে, আল্লাহ তাকে পানি পান করাবেন। যে-ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্ট করার জন্য সচেষ্ট ছিলো, আল্লাহ তাআলা তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য সর্বাধিক সক্ষম।"
পাপসমূহ শুকনো পাতার মতো ঝরে যাবে
[৫৩৮] আবু কাতাদা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উবাই বিন কা'ব আল-আনসারি- রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “তোমরা সত্যপথ ও সুন্নাহর অনুসরণ করো। যদি কোনো বান্দা সত্যপথ ও সুন্নাহর ওপরে থাকে, রহমানকে (আল্লাহ তাআলাকে) স্মরণ করে এবং আল্লাহ তাআলার ভয়ে তার চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়, কিছুতেই তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। কোনো বান্দা যদি সত্যপথ ও সুন্নাহর ওপর থাকে, রহমানকে (আল্লাহ তাআলাকে) স্মরণ করে, আল্লাহ তাআলার ভয়ে তার দেহ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে, তাহলে তার উদাহরণ হলো ওই বৃক্ষ, যার পাতাসমূহ শুকিয়ে গেছে; যখন বাতাস প্রবাহিত হয় তার পাতাগুলো ঝরে পড়ে, ওই বান্দার পাপসমূহও এভাবে ঝরে পড়ে যেভাবে বৃক্ষের শুকনো পাতাসমূহ ঝরে পড়ে। সত্যপথ ও সুন্নাহর ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন সত্যপথ ও সুন্নাহর বিপরীতে গিয়ে ইজতিহাদ ও মুজাহাদা থেকে উত্তম। সুতরাং তোমরা তোমাদের আমলগুলো নিরীক্ষণ করো, যদি সেগুলো ইজতিহাদ ও মধ্যপন্থা হয় তবে যেনো তা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর পন্থা ও পদ্ধতি এবং তাদের সুন্নাহ অনুযায়ী হয়।"
দুনিয়া তোমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে
[৫৩৯] মুহাম্মদ বিন কা'ব আল-করাযি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ বিন ইয়াযিদ আল-খাতমি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে খাবার খেতে দাওয়াত দেওয়া হলো। তিনি এসে দেখলেন বাড়ি-ঘর সুসজ্জিত করা হয়েছে। তখন তিনি ঘরের বাইরে বসলেন এবং কাঁদতে শুরু করলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, আপনি কাঁদছেন কেনো? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-যখন কোনো সেনাদলকে অভিযানে পাঠাতেন, তিনি তাঁদের সঙ্গে আকাবাতুল ওয়াদা পর্যন্ত আসতেন এবং তাঁদের বিদায় জানাতেন এই দোয়া করে:
أَسْتَوْدِعُ اللَّهَ دِينَكُمْ وَأَمَانَتَكُمْ وَخَوَاتِيمَ أَعْمَالِكُمْ
"আমি তোমাদের দীনকে, তোমাদের আমানতসমূহকে এবং তোমাদের আমলসমূহের শেষ পরিণতিকে আল্লাহর তাআলার কাছে আমানত রাখছি।"
একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এক ব্যক্তিকে দেখলেন যে সে তার চাদরে এক টুকরো চামড়া দিয়ে তালি লাগিয়েছে। তখন তিনি সূর্যের উদয়স্থলের দিকে ফিরলেন এবং দুই হাত দ্বারা ইশারা করে বললেন:
تَطَالَعَتْ عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا تَطَالَعَتْ عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا
"দুনিয়া তোমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে, দুনিয়া তোমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।" তিনি কথাটা এমনভাবে বললেন যে, আমরা ধারণা করলাম সত্যিই দুনিয়া আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তারপর তিনি বললেন:
أَنْتُمُ الْيَوْمَ خَيْرٌ أَمَّا إِذَا غَدَتْ عَلَيْكُمْ قَصْعَةٌ وَرَاحَتْ أُخْرَى وَيَغْدُو أَحَدُكُمْ فِي حُلَّةٍ وَيَرُوحُ فِي أُخْرَى وَتُسْتَرُ بُيُوتُكُمْ كَمَا تُسْتَرُ الْكَعْبَةُ
"আজ তোমরা কল্যাণময় আছো; আর যখন তোমাদের সামনে খাবারের একটি থালা পরিবেশন করা হবে এবং আরেকটি উঠিয়ে নেওয়া হবে; যখন তোমাদের কেউ সকালে এক জোড়া জামা-কাপড় পরবে এবং সন্ধ্যায় আরেক জোড়া জামা-কাপড় পরবে; যখন তোমরা তোমাদের ঘরকে আচ্ছাদিত করবে যেভাবে কা'বাকে আচ্ছাদিত করো (তখন তোমাদের কল্যাণ কমে যাবে)।"
আবদুল্লাহ বিন ইয়াযিদ আল-খাতমি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, আমি কি কাঁদবো না, অথচ আমি জীবদ্দশাতেই দেখছি যে, তোমরা তোমাদের ঘর-বাড়িকে আচ্ছাদিত (সজ্জিত) করেছো যেভাবে কা'বাকে আচ্ছাদিত করা হয়?"
জাহান্নাম তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে যাবে
[৫৪০] আবু তামিমা আল-হুজাইমি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমি আবু মুসা আল-আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলতে শুনেছি, তিনি বসরার মিম্বরে বসে বলেছেন, "যারা ধারাবাহিক রোযা রাখবে, আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য এইভাবে জাহান্নাম সংকীর্ণ করে দেবেন।" উকবা বিন আবদুল্লাহ আমাদের জন্য নব্বই পর্যন্ত গুনে দেখালেন।
ঘুমের সময়ও পায়জামা পরতেন
[৫৪১] আনাস বিন মালিক-রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, "আবু মুসা আল-আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর একটি পায়জামা ছিলো। ঘুমের ঘোরে সতর খুলে যাওয়ার আশংকায় তিনি ওই পায়জামা পরে ঘুমাতেন।"
তাঁর দানশীলতা
[৫৪২] আবদুল্লাহ বিন জাফর উম্মে বকর বিনতে মিসওয়ার আয-যাহরিয়্যাহ- রাহিমাহুমুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, “আবদুর রহমান বিন আওফ—রাদিয়াল্লাহু আনহু—উসমান বিন আফফান—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে চল্লিশ হাজার দিনারের বিনিময়ে একটি জমি বিক্রয় করলেন। তিনি চল্লিশ হাজার দিনার বনু যাহরার দরিদ্র লোকদের মধ্যে, গরিব-মিসকিনদের মধ্যে এবং উম্মাহাতুল মুমিনীন—রাদিয়াল্লাহু আনহুন্না-এর মাঝে বণ্টন করে দিলেন। মিসওয়ার বলেন, আমি আয়েশা—রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর কাছে তাঁর অংশ নিয়ে গেলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এই দিনারগুলো দিয়ে তোমাকে কে পাঠিয়েছে? আমি বললাম, আবদুর রহমান বিন আওফ। তখন তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ—সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—বলেছেন, ‘আমার মৃত্যুর পর কেবল ধৈর্যশীলরাই তোমাদের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ করবে।’ আল্লাহ তাআলা যেনো ইবনে আওফকে জান্নাতের কোমল পানীয় পান করান।”
কান্না করো, দয়া পাবে
[৫৪3] আবু আইয়ুব-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, একজন লোক মসজিদে বসে গল্প-কাহিনি বলতো। তার নাম ছিলো আসওয়াদ বিন সারি। একদিন আবু মুসা আল-আশআরি—রাদিয়াল্লাহু আনহু—তাদের আওয়াজ শুনলেন এবং তাদের কাছে গেলেন। যাওয়ার সময় তার জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলো। ফলে তিনি ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়ে উঠলেন। তিনি বললেন, “নিশ্চয় কোনো পাপের কারণে আমার জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেছে।” একজন লোকটির জন্য তাঁকে তার জুতোজোড়া দিলো। তখন তিনি লোকটির জন্য এই দোয়া করলেন : “আল্লাহ তাআলা তোমাকে বহন করুন এবং (জান্নাতে) পৌঁছে দিন, যেভাবে তুমি তোমার ভাইকে বহন করে পৌঁছে দিয়েছো।” তারপর তিনি মসজিদে সমবেত লোকদের উদ্দেশে বললেন, তোমরা কাঁদো। জাহান্নামবাসীরা কাঁদবে; কিন্তু তাঁদের কান্নার প্রতি দয়া দেখানো হবে না। সুতরাং তোমরা এখন কান্না করো; কারণ, তোমাদের আজকের কান্নার প্রতি দয়া দেখানো হবে।”
দুনিয়াকে তাদের সামনে শোভনীয় করে তোলা হয়েছে
[৫৪4] হাম্মাদ বিন সালামা—রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আনাস বিন মালিক—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, একটি সফরে আমরা আবু মুসা আল-আশআরি—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে ছিলাম। তখন তিনি কিছু লোককে কথা বলতে শুনলেন। তারা খুব লালিত্যপূর্ণ ভাষায় কথা বলছিলো। তখন তিনি আমাকে বললেন, “হে আনাস, এসো, আমরা আল্লাহ তাআলার যিকির করি। এই লোকদের একেক জন তো জিহ্বা থেকে চামড়া খসিয়ে ফেলার উপক্রম করছে।" তারপর তিনি বললেন, “হে আনাস, কোন জিনিস মানুষকে আখেরাতের ব্যাপারে পিছিয়ে রেখেছে এবং তাদের ধ্বংস করে দিয়েছে?” আমি বললাম, "কুপ্রবৃত্তি ও শয়তান।" তিনি বললেন, "না; বরং দুনিয়াকে তাদের সামনে পরিবেশন করা হয়েছে এবং আখেরাতকে তাদের থেকে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদি তারা ভালোভাবে সবকিছু দেখতো তবে তারা বক্র পথে যেতো না এবং দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকতো না।"
লজ্জাশীলতার কারণে মেরুদণ্ড সোজা করেন না
[৫৪৫] আবু মিখলায-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবু মুসা আল-আশআরি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমি অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরের ভেতর গোসল করি। কারণ, আমি আমার রবের প্রতি লজ্জার কারণে আমার কাপড় উঠিয়ে মেরুদণ্ড সোজা করতে পারি না।"
মিথ্যা বলা অপছন্দ করেন
[৫৪৬] হাম্মাদ বিন সালামা রাহিমাহুল্লাহ-আনাস বিন মালিক-রাদিয়াল্লাহু আনহু-থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, আমাকে আবু মুসা আল-আশআরি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "হে আনাস, তুমি আমার সফরের পাথেয় গুছিয়ে দাও।” তিনি লোকদের বললেন, "আমি তিনটি কাজের জন্য বেরুচ্ছি।” সময় হয়ে এলে বললেন, "হে আনাস, শেষ হয়েছে কি?” আমি বললাম, "অমুক অমুক জিনিস গোছানো বাকি রয়েছে। আপনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলে আমি সবকিছু গুছিয়ে নিতাম।" তিনি বললেন, "আমি এ ব্যাপারটা অপছন্দ করি যে, আমি আমার পরিবারের সঙ্গে মিথ্যা বলি, ফলে তারা আমার সঙ্গে মিথ্যা বলুক; আমি তাদের সঙ্গে খিয়ানত করি, ফলে তারা আমার সঙ্গে খেয়ানত করুক।"
টাকা-পয়সা মানুষকে ধ্বংস করে
[৫৪৫৭] সাঈদ বিন আবু বুরদা-রাহিমাহুমুল্লাহ-তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবু মুসা আল-আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "এই দিরহাম ও দিনার তোমাদের পূর্বে যাদের ছিলো তাদের ধ্বংস করেছে। এখন আমি দেখছি যে, এই দুটি তোমাদেরও ধ্বংস করে ছাড়বে।"
কাঁদতে কাঁদতে চোখ থেকে রক্ত প্রবাহিত হবে
[৫৪৫] কাসাম বিন যুহাইর-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবু মুসা আল-আশআরি- রাদিয়াল্লাহু আনহু-বসরায় আমাদের উদ্দেশে খুতবা দিলেন। খুতবায় তিনি বললেন, "হে লোকসকল, তোমরা কাঁদো; যদি তোমাদের কান্না না আসে তবে কান্নার ভান করো। জাহান্নামবাসীরা কাঁদবে, কাঁদতে কাঁদতে তাদের চোখের জল শুকিয়ে যাবে; তারপর তাদের চোখ থেকে রক্ত প্রবাহিত হবে। যদি সেই রক্তধারাতে জাহাজ ভাসিয়ে দেওয়া হয় তবে তা চলতে শুরু করবে।” (তবু তাদের সেই কান্না কোনো কাজে আসবে না।)
[৫৪] গুনাইম বিন কায়স-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবু মুসা আল-আশআরি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "মানুষের এই অন্তর মরুভূমিতে পড়ে থাকা পাখির একটি পালকের মতো। বাতাস তাকে উল্টেপাল্টে নিয়ে যায়।” (মানুষের হৃদয়েরও এইভাবে পরিবর্তন ঘটে।)
[৫৫] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সামুরা ইবনে জুন্দুব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলা হলো, "আপনার ছেলে তো রাতে ঘুমাতে পারেনি।" তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "কেন, বদহজমের কারণে?" বলা হলো, "হ্যাঁ, বদহজমের কারণে।" তিনি বললেন, "সে যদি এখন মারা যায় তবে আমি তার জানাযার নামায পড়াবো না।"
[৫৬] ইয়াযিদ বিন আবদুল্লাহ বিন শিখখির-রাহিমাহুমুল্লাহ-বলেন, একজন ব্যক্তি তামিম দারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এলো। তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, "আপনি রাতের বেলা কেমন নামায পড়তেন?" এই কথা শুনে তামিম দারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-খুব ক্ষুব্ধ হলেন। বললেন, আল্লাহর কসম! রাতের বেলা গোপনে এক রাকাত নামায আদায় করা আমার কাছে গোটা রাত ধরে নামায আদায় করা ও পরে তা মানুষের কাছে বলে বেড়ানো থেকে অধিক প্রিয়।” তখন প্রশ্নকারী ক্ষিপ্ত হয়ে গেলো। বললো, "হে আল্লাহর রাসূলের সঙ্গীগণ, আল্লাহ তাআলাই আপনাদের ব্যাপারে ভালো জানেন, যদি আমরা আপনাদের প্রশ্ন করি তাহলে আপনারা ক্ষুব্ধ হন, আর যদি প্রশ্ন না করি তাহলে আমাদের প্রতি কঠোর আচরণ করেন।" এই কথা শুনে তামিম দারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-লোকটির দিকে এগিয়ে গেলেন এবং বললেন, "ভেবে দেখো, যদি তুমি শক্তিশালী মুমিন হও আর আমি দুর্বল মুমিন হই, তবে কি তুমি আমাকে তোমার শক্তি দ্বারা চাবুকপেটা করবে এবং আমাকে কেটে ফেলবে? "ভেবে দেখো, যদি আমি শক্তিশালী মুমিন হই এবং তুমি দুর্বল মুমিন হও, তবে কি আমি তোমাকে আমার শক্তি দ্বারা চাবুকপেটা করবো এবং তোমাকে কেটে ফেলবো? বরং তুমি নিজেকে দীনের জন্য উপযুক্ত করে তোলো এবং দীনকে তোমার জন্য সহনীয় করে তোলো নিজের জন্য এমন ইবাদতপদ্ধতি তৈরি করে নাও যাতে তুমি সন্তুষ্ট হতে পারো।"
নামাযের সর্বাবস্থায় কুরআন খতম করেছেন
[৫৫২] আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, “রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিদের মধ্যে তামিম দারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-থেকে ইবাদত-সম্পর্কিত যতো হাদিস আমি পেয়েছি অন্য কারও ততো হাদিস পাইনি। তিনি নামাযে দাঁড়ানো অবস্থায় কুরআন খতম করেছেন, রুকু অবস্থায় কুরআন খতম করেছেন এবং সিজদা অবস্থায়ও কুরআন খতম করেছেন। তিনি পদব্রজে হজ পালন করেছেন।"
নামাযের জন্য বিশেষ পোশাক ক্রয় করেছিলেন
[৫৫৩] আবদুল্লাহ বিন সিরিন-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "তামিম দারি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এক হাজার দিরহাম দিয়ে এক জোড়া পোশাক ক্রয় করেছিরেন। এই পোশাকে তিনি নামায আদায় করতেন।"
ইবাদতে তাঁরা তাঁর সমান ছিলেন না
[৫৫৪] জাফর ইবেন আমর-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আমরা এক শ্রেণি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিদের সন্তান ছিলাম। আমরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করলাম, আমাদের পিতাগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহচর্য ও হিজরতের মাধ্যমে আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে গিয়েছেন। সুতরাং সবাই এসো, ইবাদতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যয় করি। আশা করা যায়, আমরা তাঁদের মতো ফজিলত হাসিল করতে পারবো।” তিনি বলেন, "এই দলে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর, মুহাম্মদ বিন আবু হুযাইফাহ, মুহাম্মদ বিন আবু বকর, মুহাম্মদ বিন তালহা, মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন আল-আসওয়াদ বিন আব্দ ইয়াগুস। আমার দিন-রাত ইবাদতে সর্বোচ্চ শ্রম ব্যয় করতে শুরু করলাম। তখন আমরা তামিম দারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বৃদ্ধ পেয়েছিলাম। কিন্তু নামাযে আমরা তাঁর সমান দাঁড়িয়েও থাকতে পারতাম না, বসেও থাকতে পারতাম না।"
দুনিয়াবিমুখতা সবচেয়ে কার্যকরী আমল
[৫৫৫] আবদুর রহমান বিন হাতিব বলেন, আবু ওয়াকিদ আল-লাইসি— রাহিমাহুল্লাহ—বলেছেন, “আমরা আমাদের আমলগুলো নিরীক্ষণ করে দেখলাম। আখেরাত অর্জনে দুনিয়া-বিমুখতা থেকে কার্যকরী আমল আর কোনোটি পাইনি।"
দুনিয়াতে কেউ ফিরে আসবে না
[৫৫৬] কায়স বিন হাযিম বলেন, আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা আল-আনসারি—রাদিয়াল্লাহু আনহু—কাঁদলেন। তখন তাঁর স্ত্রীও কেঁদে ফেললেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞাস করলেন, তুমি কেন কাঁদলে? স্ত্রী বললেন, আমি আপনাকে কাঁদতে দেখলাম। আপনার কান্নায় আমিও কেঁদে ফেললাম। তখন তিনি বললেন, “আমাকে জানানো হয়েছে যে, আমি দুনিয়া থেকে প্রস্থান করবো; দুনিয়াতে পুনরায় ফিরে আসবো বলে জানানো হয়নি।"
আ'রাফের অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা
[৫৫৭] কাতাদা—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আবু হুযাইফার আযাদকৃত গোলাম সালিম—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, “হায় আমি যদি আ'রাফের অধিবাসীদের সঙ্গে থাকতে পারতাম!”
পাথর কাপড়ের একাংশ নিয়ে চলে গেলো
[৫৫৬] আমর বিন দিনার—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, “আমি আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর—রাদিয়াল্লাহু—আনহুকে পাথরের মাঝে চোখ বন্ধ করে নামায পড়তে দেখলাম। এই সময় তার সামনের দিক থেকে একটি পাথর এলো এবং তাঁর কাপড়ের একাংশ নিয়ে চলে গেলো; কিন্তু কাপড়ে কোনো প্যাঁচ লাগেনি।"
তাঁকে দেয়ালের ভগ্নাংশ ছাড়া কিছু মনে হতো না
[৫৫৯] ইয়াহইয়া বিন ওয়াসসাব—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর—রাদিয়াল্লাহু—সিজদায় যেতেন এবং এতো দীর্ঘ সময় থাকতেন যে, তাঁর পিঠে চড়ুই পাখিরা এসে বসতো এবং তাঁকে দেয়ালের একটি ভগ্নাংশ ছাড়া কিছু মনে করতো না।"
ভয়াবহ সতর্কবাণী
[৫৬০] আমের বিন আবদুল্লাহ ইবনুষ যুবাইর—রাহিমাহুমুল্লাহ—বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর -রাদিয়াল্লাহু আনহু- যখন মদিনায় শুতেন, তাঁর আলোচনা থামিয়ে দিতেন। তারপর বলতেন :
سُبْحَانَ الَّذِي يُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلَائِكَةُ مِنْ خِيْفَتِهِ
“কত মহান সেই সত্তা, বজ্র নিনাদ যার সপ্রশংস মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং ফেরেশতাগণও তা করে তাঁর ভয়ে।” তারপর তিনি বলতেন, “এটা দুনিয়াবাসীর জন্য ভয়াবহ সতর্কবাণী।"
সবার জন্য আল্লাহর আনুগত্য আবশ্যক
[১৫১] তালহা বিন নাফে -রাহিমাহুল্লাহ্-বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর -রাদিয়াল্লাহু আনহু- আমাদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। বললেন, “আমরা তোমাদের বিষয়ে যেরূপ ফেতনার শিকার হওয়ার ছিলাম সেরূপ ফেতনার শিকার হয়েছি। সুতরাং যদি আমরা তোমাদের এমন-সব বিষয়ে নির্দেশ দিই যাতে আল্লাহ্ তাআলার প্রতি আনুগত্য রয়েছে, তবে এই ক্ষেত্রে তোমাদের ওপর আমাদের নির্দেশ শোনা ও আনুগত্য করা আবশ্যক হবে। আর যদি তোমাদের এমন-সব বিষয়ে নির্দেশ দিই যাতে আল্লাহ্ তাআলার প্রতি আনুগত্য নেই, তবে এই ক্ষেত্রে তোমাদের ওপর আমাদের নির্দেশ শোনা ও আনুগত্য করার প্রয়োজন নেই এবং এতে কোনো ধরনের কল্যাণও নেই।”
দ্বিতীয় বার খেলেন না
[১৫২] হিসাম বিন উরওয়া আল-আসাদি -রাহিমাহুল্লাহ্-বলেন, হাকীম বিন হিযাম -রাহিমাহুল্লাহ্-বললেন, “তোমরা আমাকে পানি পান করাও।” সঙ্গীরা পান করালেন, এইমাত্র তো পান করেছেন। তিনি বললেন, “থাক, তাহলে আর পান করবে না।” তারপর বললেন, আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর -রাদিয়াল্লাহু আনহু- বললেন, “তোমরা আমাকে খেজুর খাওয়াও।” সঙ্গীরা বললেন, খেজুর তো রেখেছেন! তিনি বললেন, “থাক, তাহলে আর খাবো না।”
চল্লিশ বছর রোযা রেখেছেন
[৫৬৩] আনাস বিন মালিক -রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, “আবু তালহা আল- আনসারী -রাদিয়াল্লাহু আনহু- রাসূলুল্লাহ্ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইন্তিকালের পর ধারাবাহিকভাবে চল্লিশ বছর রোযা রেখেছেন।”
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে রোযা রেখেছেন
[৫৬৪] আনাস বিন মালিক-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, "আবু তালহা আল-আনসারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে অনেক বেশি রোযা রাখতেন; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর তিনি মৃত্যু পর্যন্ত অসুস্থতা বা সফর ছাড়া ধারাবাহিকভাবে রোযা রেখেছেন।"
কর্তৃত্ব ফলান না
[৫৬৫] আনাস বিন মালিক-রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আবু তালহা আল-আনসারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমি দুই জন লোকের ইমামতিও করি না এবং দুই জন লোকের ওপর কর্তৃত্বও ফলাই না।"
তিনি সব সময় নামাযের জন্য প্রস্তুত থাকতেন
[৫৬৬] সুফয়ান সাওরি-রাহিমাহুল্লাহ-একজন জুফি ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আদি বিন হাতিম আত-তায়ি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "কখনো এমন হয়নি যে, নামাযের ওয়াক্ত হয়েছে অথচ আমি নামাযের প্রতি আগ্রহান্বিত ছিলাম না এবং কখনো এমন হয়নি যে, নামাযের ওয়াক্ত হয়েছে অথচ আমি নামাযের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।"
গুনাহর কাজ চিরতরে ছেড়ে দেওয়াই তওবা
[৫৬৭] আবদুর রহমান বিন জুবাইর বিন নুফাইর-রাহিমাহুমুল্লাহ-তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আওফ বিন মালিক আল-আশযায়ি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “যে-কোনো গুনাহ থেকে কীভাবে তওবা করতে হয় তা আমার জানা আছে।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, "হে আবু আবদুর রহমান, কীভাবে তওবা করতে হয়?” তিনি বললেন, "তুমি গুনাহের কাজটি ছেড়ে দেবে এবং কখনো তা করবে না।"
কুরআন নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম
[৫৬৮] ফারওয়া বিন নাওফার আল-আশযায়ি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমি খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতিবেশী ছিলাম। একদিন আমি তাঁর সঙ্গে মসজিদ থেকে বের হলাম, তিনি আমার হাত ধরে রেখেছিলেন। তখন তিনি আমাকে বললেন, "হে হানতা, যা-কিছু দ্বারা তোমার সম্ভব তুমি আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করো; আল্লাহ তাআলার কাছে তাঁর কালাম (কিতাব) সবচেয়ে প্রিয় যার দ্বারা তুমি তাঁর নৈকট্য অর্জন করতে পারো।"
নিজে আমল না করে অন্যকে উপদেশ দেওয়া
[৫৬৯] আবুস সিওয়ার-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তাঁরা বসরার কারিগণের মধ্যে জুন্দুব বিন আবদুল্লাহ আল-বাজালি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এলেন। তিনি তাঁদের বললেন, "আমি তো সুন্দর পথ ও সুন্দর পদ্ধতি দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং তোমাদের এসব অহেতুক ধারণা থেকে বেঁচে থাকতে হবে।" তারপর বললেন, "যে-ব্যক্তি অন্যকে ইলম শিক্ষা দেয়, কিন্তু নিজে ওই ইলম অনুযায়ী আমল করে না, সে হলো ওই বাতির মতো, যে-বাতি অন্যদের আলো দেয়, কিন্তু নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে।"
দীনকে বিসর্জন দিয়ো না
[৫৭০] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, জুন্দুব বিন আবদুল্লাহ আল-বাজালি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁর সঙ্গীদের বলেছেন, "তোমরা যদি দরিদ্রতা ও কষ্টের মধ্যে থাকো তবে কুরআন তেলাওয়াত করো। যদি তোমার ওপর কোনো বিপদ আপতিত হয় তবে তোমার মাল খরচ (দান) করো, তোমার দীনকে নয়; যদি তুমি শত্রুর ভয়ে ভীত হও তবে তোমার রক্ত বিসর্জন দাও, তোমার দীনকে নয়। সেই ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে পরাজিত যার দীন পরাজিত; সেই ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে লুণ্ঠিত, যার দীন লুণ্ঠিত। ব্যাপার তো এই যে, জান্নাত পেয়ে যাওয়ার পর আর কোনো দরিদ্রতা থাকবে না; এবং জাহান্নামে চলে যাওয়ার পর আর কোনো প্রাচুর্য নেই। জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত ব্যক্তি কখনো অমুখাপেক্ষী হতে পারবে না এবং জাহান্নামে বন্দি ব্যক্তি কখনো তা থেকে পালিয়ে যেতে পারবে না।"
কুরআন হলো আলো ও পথপ্রদর্শক
[৫৭১] ইউনুস বিন জুবাইর-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমরা জুন্দুব বিন আবদুল্লাহ আল-বাজালি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পেছন পেছন গেলাম। যখন আমরা মুকাতিব দুর্গের কাছে পৌঁছলাম, তখন তাঁকে বললাম, আপনি আমাদের উপদেশ দিন। তিনি বললেন, "আমি তোমাদের আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার ও কুরআনকে আঁকড়ে ধরার উপদেশ দিই। কুরআন হলো অন্ধকারাচ্ছন্ন রাতের আলো এবং দিনের বেলার পথপ্রদর্শক। সুতরাং তোমরা যদি দরিদ্রতা ও কষ্টের মধ্যে থাকো তাহলে কুরআন তেলাওয়াত করো। যদি তোমাদের ওপর কোনো বিপদ আপতিত হয় তাহলে মাল সদকা করো, জানকে নয়। আর যদি বিপদ অতিক্রম করে আরও বড়ো কিছু (শত্রুর আক্রমণ) তাহলে জান ও মাল উভয়টি কুরবান করো, কিন্তু তোমার দীনকে কুরআন কোরো না। সেই ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে পরাজিত যার দীন পরাজিত; সেই ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে লুণ্ঠিত, যার দীন লুণ্ঠিত। ব্যাপার তো এই যে, জাহান্নামে চলে যাওয়ার পর আর কোনো প্রাচুর্য নেই এবং জান্নাত পেয়ে যাওয়ার পর আর কোনো দরিদ্রতা নেই। জাহান্নামে বন্দি ব্যক্তি কখনো তা থেকে পালিয়ে যেতে পারবে না এবং জাহান্নামে পতিত ব্যক্তি কখনো প্রাচুর্য পাবে না।"
আল্লাহ তাআলা সবাইকে ক্ষমা করেন
[৫৭২] আবু ইমরান আল-জুনি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, জুন্দুব বিন আবদুল্লাহ আল-বাজালি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, তোমাদের পূর্ববর্তী যুগের এক ব্যক্তি বলেছিলেন, আল্লাহর কসম! অমুক ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা কিছুতেই ক্ষমা করবেন না। তখন আল্লাহ তাআলা ওই যুগের নবীর কাছে ওহি প্রেরণ করলেন এই মর্মে যে, তুমি ওই লোকটিকে জানিয়ে দাও, সে যে-ব্যক্তির জন্য কসম খেয়েছে আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি এবং তার কসম খাওয়ার কারণে তার সমস্ত আমল বরবাদ করে দিয়েছি।"
একটি বিস্ময়কর ঘটনা
[৫৭৩] সাঈদ বিন ইয়াস আল-জারিরি-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর একজন শায়খ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিগণ সিজিস্তানে যুদ্ধরত ছিলেন। শত্রুপক্ষের সঙ্গে তাঁদের প্রচণ্ড লড়াই চলছিলো এবং সিজিস্তান দুর্গ দখল করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলো। তাঁদের সঙ্গে একজন বিশেষ ব্যক্তি ছিলেন। রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিগণ দলে দলে ভাগ হয়ে অবস্থান করছিলেন। একটি দল যাচ্ছিলো, যুদ্ধ করছিলো, তারপর ফিরে আসছিলো; আরেকটি দল যাচ্ছিলো, যুদ্ধ করছিলো, তারপর ফিরে আসছিলো। তাঁরা পরস্পর বলাবলি করতে শুরু করলেন: তোমরা কি এই লোকটা মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-যে-বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছিলেন সেই বৈশিষ্ট্য দেখতে পাচ্ছো? তখন তাঁদের একজন অপর জনকে বললেন, হ্যাঁ, ইনিই সেই লোক, ইনিই সেই লোক। শেষে তাঁরা সবাই একমত হলেন যে ইনিই সেই লোক। তাঁরা তাঁকে ডেকে বললেন, "আমাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড লড়াই শুরু হয়েছে এবং এই দুর্গটি দখল করা অতীব জরুরি হয়ে উঠেছে। আমরা আপনার মধ্যে সেই বৈশিষ্ট্য দেখতে পাচ্ছি যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উল্লেখ করেছিলেন। সুতরাং আপনি আপনার মহান রবের নামে কসম করুন যাতে তিনি আমাদের জন্য বিজয় নিশ্চিত করেন।" লোকটি তাঁদের কথা এড়িয়ে গেলেন। বললেন, "দেখুন, আমি একজন মিসকিন দুর্বল মানুষ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোনো সাহচর্য আমি পাইনি। আমি আপনাদের সাহচর্য পেয়েছি; আমি আপনাদের বরকত কামনা করি এবং আপনাদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি।" সাহাবিগণ তাদের কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। ফলে লোকটি ভয় পেয়ে গেলেন। তাঁরা তাঁকে বললেন, "আমরা আপনার কাছে আমাদের সাহচর্যের অধিকার নিয়ে দাবি জানাচ্ছি যে, আপনি আপনার মহান রবের নামে কসম করুন যাতে তিনি আমাদের বিজয় নিশ্চিত করে দেন।” তখন লোকটি বললেন, “হে আমার রব, আমি আপনার নামে কসম করছি, আপনি আমাদের বিজয় দান করুন এবং আমাকে প্রথম শহীদরূপে কবুল করুন।" বর্ণনাকারী বলেন, "আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিগণকে বিজয় দান করলেন এবং লোকটি প্রথমে শাহাদাতবরণ করলেন।"
তাকওয়া ও আল্লাহভীতি শ্রেষ্ঠ সম্পদ
[৫৭৪] আবুস সাফির-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা- বলেছেন, "মানুষ তাদের দীনের শ্রেষ্ঠ বিষয়টিকে বরবাদ করে ফেলেছে। তা হলো তাকওয়া ও আল্লাহভীতি।”
জুতার ফিতাও আল্লাহর কাছে চাও
[৫৭৫] হিশাম বিন উরওয়া তাঁর পিতা-রাহিমাহুমুল্লাহ-থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-বলেছেন, "তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করো, এমনকি জুতার ফিতা হলেও। আল্লাহ যদি কারও জন্য কিছু সহজ করে না দেন তবে, আল্লাহর কসম! কেউ তার জন্য কিছু সহজ করে দিতে পারে না।"
প্রাচুর্যের পর প্রাচুর্য
[৫৭৬] মুতাররিফ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমি উসমান বিন আবুল আস আস-সাকাফি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে ভেতরে প্রবেশ করার জন্য অনুমতি চাইলাম এবং কিছুক্ষণ বসে রইলাম। তারপর তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন এবং আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি বললেন, কিছু সময় দুনিয়ার জন্য এবং কিছু সময় আখেরাতের জন্য। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন তার কোনটি আমাদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে।" আমি বললাম, "আপনারা দুনিয়াও পেয়েছেন, আখেরাতও পেয়েছেন।" তখন তিনি বললেন, "তোমাদের কেউ যদি নিজ প্রচেষ্টা ও শ্রম ব্যয় করে একটি দিরহাম উপার্জন করে এবং তা কোনো যথাযথ কাজে ব্যয় করে, তবে তা আমাদের কারোর এক হাজার দিরহাম ব্যয় করার চেয়েও উত্তম; প্রাচুর্যের পর প্রাচুর্য।"
নিজ হাতের উপার্জন থেকে ব্যয় করা
[৫৭৭] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলতেন, "আমরা তাঁর চেয়ে উত্তম কাউকে দেখিনি।” অর্থাৎ, উসমান বিন আবুল আস আস-সাকাফি-রাদিয়াল্লাহু আনহু- হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি উসমান বিন আবুল আস আস-সাকাফি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, “হে ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ, আপনারা দান করেন, সদকা করেন, হজ করেন এবং এসব কারণে আপনারা আমাদের ঈর্ষান্বিত করে তোলেন।" তখন তিনি বললেন, "তোমাদের কেউ যদি নিজ প্রচেষ্টা ও শ্রম ব্যয় করে একটি দিরহাম উপার্জন করে এবং তা কোনো যথাযথ কাজে ব্যয় করে, তবে তা আমাদের কারোর এক হাজার দিরহাম ব্যয় করার চেয়েও উত্তম; প্রাচুর্যের পর প্রাচুর্য।"
কবরের উপমা
[৫৭৮] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উসমান বিন আবুল আস আস-সাকাফি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-একটি জানাযায় শরিক ছিলেন। তখন তিনি একটি পতনোন্মুখ কবরের কাছে এলেন। ওখানে তাঁর পরিবারের একজন লোক ছিলো। তিনি তার উদ্দেশে বললেন, "এই, এদিকে এসো।" লোকটি এলে তিনি কবরের দিকে ইশারা করে বললেন, "তোমার বাড়িটি উঁকি দিয়ে দেখো।" লোকটি বললো, আমি তো দেখছি এটি সংকীর্ণ, শুষ্ক ও অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি ঘর; তাতে কোনো খাদ্য নেই, কোনো পানীয় নেই, কোনো জীবনসঙ্গিনী নেই।" তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম! এটিই তোমার ঘর।" লোকটি বললো, "আল্লাহর কসম! আপনি সত্য বলেছেন। আল্লাহর কসম! আমি যদি ফিরেও যাই, তারপরও আমাকে ওখান থেকে এখানে নিয়ে আসা হবে।"
কুরআন তেলাওয়াত না করে ঘরে রেখে দিলে লাভ নেই
[৫৭৯] সুলাইমান বিন শুরাহবিল-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবু উমাম আল-বাহিলি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, তোমরা কুরআন তেলাওয়াত করো। ঝুলিয়ে রাখা মাসহাফ (মুদ্রিত কুরআন) যেনো তোমাদের ধোঁকায় না ফেলে। (কুরআন না পড়ে শুধু ঘরে ঝুলিয়ে রাখলে কোনো লাভ নেই।) আল্লাহ তাআলা এমন হৃদয়কে শাস্তি দেবেন না যা কুরআনের আধার।"
ভেড়া হওয়ার আকাঙ্ক্ষা
[৫৮০] শাহর বিন হাওশাব-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, কা'ব আল-আহবার- রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "হায়, আমি যদি আমার পরিবারের ভেড়া হতাম, তারা আমাবে ধরে জবাই করে ফেলতো, নিজেরা খেতো এবং অতিথিদের খাওয়াতো!"
কিয়ামত আসার পূর্বেই নিজেদের জন্য বিলাপ করা
[৫৮১] ইয়াহইয়া বিন আবু কাসির-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, কা'ব আল- আহবার-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এক ব্যক্তি কুরআন তেলাওয়াত, দোয়া বা এই রকম কিছু শুনতে পেলেন। তিনি কান পেতে তা শুনলেন, তারপর তার কাছে গেলেন। তাকে বললেন, "যারা কিয়ামত আসার পূর্বেই নিজেদের জন্য রোদন- বিলাপ করছে তারা কতই-না উত্তম কাজ করছে।"
শাসকের সামনে সত্য উচ্চারণ
[৫৮২] আবদুল্লাহ ইবনে জাফর উম্মে বকর বিনতে মিসওয়ার আল-যাহরিয়্যাহ- রাহিমাহুমুল্লাহ-থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, মারওয়ান বিন হাকাম তাঁর বাড়িটি তাঁর ছেলে আবদুল মালিককে দান করে দেওয়ার সময় মিসওয়ার বিন মাখরামা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে সাক্ষী থাকতে আহ্বান জানালেন। মিসওয়ার- রাদিয়াল্লাহু আনহু-জিজ্ঞেস করলেন, "তাতে কি আবসিয়্যার মালিকানা থাকবে?" মারওয়ান বললেন, না। তখন তিনি বললেন, "তাহলে আমি সাক্ষী থাকতে পারবো না।" মারওয়ান জিজ্ঞেস করলেন, কেন? তিনি বললেন, "কারণ, বাড়িটি তো কেবল আপনার এক হাত থেকে অন্য হাতে যাবে।” মারওয়ান বললেন, "তাতে আপনার সমস্যা কী? আপনি কি বিচারক? আপনি তো কেবল সাক্ষী।" মিসওয়ার-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "যখনই আপনারা কোনো অপরাধ করবেন, অন্যায় করবেন তাতে কি আমাকে সাক্ষী থাকতে হবে?” আবদুল্লাহ বলেন, "আবসিয়্যাহ ছিলেন মারওয়ানের স্ত্রী।"
লোকটিকে পুনরায় নামায পড়ালেন
[৫৮৩] আলী বিন ইয়াযিদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "মিসওয়ার-রাদিয়াল্লাহু আনহু—একটি লোককে নামায পড়তে দেখলেন। লোকটি পূর্ণাঙ্গরূপে রুকুও করছিলো না, সিজদাও দিচ্ছিলো না। ফলে তিনি লোকটিকে বললেন, তুমি নামায পুনরায় পড়ো। কিন্তু লোকটি পুনরায় নামায পড়তে অস্বীকৃতি জানালো। তিনি লোকটিকে নামায পুনরায় পড়ার আগ পর্যন্ত ছাড়লেন না।"
কোনো মুনাফা অর্জন করবেন না
[৫৮৪] আবদুল্লাহ ইবনে জাফর উম্মে বকর বিনতে মিসওয়ার আল-যাহরিয়্যাহ— রাহিমাহুমুল্লাহ—থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, মিসওয়ার বিন মাখরামা— রাদিয়াল্লাহু আনহু—বেশি পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণ করলেন। তারপর তিনি একদিন শরতের আকাশে মেঘ দেখতে পেলেন। মেঘের ব্যাপারটাকে তিনি অপছন্দ করলেন। পরক্ষণেই বললেন, "আরে, আমার কী হলো, আমি এমন বিষয়কে (মেঘকে) অপছন্দ করছি যা মুসলমানদের জন্য উপকারী! যাদের থেকে আমি খাদ্য সংরক্ষণ করেছি তারা যদি আসে তবে আমি খাদ্যদ্রব্য ফিরিয়ে দেবো।" এসব সংবাদ আমিরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে পৌঁছলো। তিনি বললেন, "কেউ কি মিসওয়ারকে ধরে উমরের কাছে নিয়ে আসতে পারবে?" তিনি এসে বললেন, "হে আমিরুল মুমিনীন, আমি অনেক খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণ করেছিলাম। তারপর আকাশে মেঘ জমা হতে দেখলাম এবং ব্যাপারটি অপছন্দ করলাম। পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত নিলাম যে, এই খাদ্যদ্রব্যে কোনো ধরনের মুনাফা আয় করবো না।" তখন উমর—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "আল্লাহ তাআলা তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।"
যিকিরকারীদের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়
[৫৮৫] রুফাই বিন মিহরান—রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সাহল বিন হানযালা আল- আবশামি—রাদিয়াল্লাহু আনহু—থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "যখন একদল মানুষ সমবেত হয়ে আল্লাহ তাআলার যিকির করে, তখন একজন ঘোষণাকারী তাদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন: তোমরা উঠে দাঁড়াও, তোমাদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে; তোমাদের পাপসমূহকে পুণ্যে বদল করে দেওয়া হয়েছে।"
তিনি প্রশংসা চাইতেন না
[৫৮৬] বকর বিন আবদুল্লাহ বিন আল-মুযানি-রাহিমাহুল্লাহ-আদি বিন আরতাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একজন সাহাবি, এই উম্মাহর প্রথম সারির একজন ব্যক্তি, অন্যদের তুলনায় তাঁর মর্যাদাও ছিলো বেশি, যখন তাঁর প্রশংসা করা হতো বা গুণগান গাওয়া হতো তখন বলতেন, "হে আল্লাহ, তারা যা বলছে তার জন্য তুমি আমাকে পাকড়াও কোরো না। তারা যা জানে না সেই ব্যাপারে তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।"
তাঁদের জীবনযাপন
[৫৮৭] ইয়াযিদ বিন আবু হাবিব-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত,
وَالَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا
"এবং যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না, কার্পণ্যও করে না; বরং তারা আছে এতদুভয়ের মাঝে মধ্যপন্থায়।" এই আয়াতটির ব্যাখ্যা তিনি বলেছেন, তাঁরা হলেন মুহাম্মদ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিগণ। তাঁরা খাবার খেতেন; কিন্তু ভোজনোৎসব করতেন না। তাঁরা কাপড় পরিধান করতেন; কিন্তু কাপড় পরে নিজেদের সৌন্দর্য বর্ধন করতেন না। তাঁদের সকল হৃদয় ছিলো একই হৃদয়।"
একজন দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তির উদাহরণ
[৫৮৮] মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন হাবিব-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আমি ফাৎহ আল-মুসিলি রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে গেলাম। তিনি তখন ইটের চুলায় আগুন ধরাচ্ছিলেন। ফাৎহল আল-মুসিলি ছিলেন একজন আরব ব্যক্তি। তিনি ছিলেন সম্মানিত, দুনিয়াবিমুখ।"
তিন প্রকার মানুষের বর্ণনা
[৫৮৯] আদম বিন আলী-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুআযযিন বিলাল বিন রাবাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর ভাইকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, "মানুষ হলো তিন প্রকার: ১. নিরাপদ, ২. লাভমান, ৩. ক্ষতিগ্রস্ত। নিরাপদ যে-ব্যক্তি চুপ থাকে। লাভমান: সৎকাজের আদেশ করে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে; সে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অনেক বেশি প্রতিদান লাভ করবে। ক্ষতিগ্রস্ত: যে-লোক অশ্লীল ও গর্হিত কথাবার্তা বলে এবং জুলুমের ক্ষেত্রে জালিমকে সাহায্য করে।"
লোক-দেখানো হলে বিফল হবে
[৫৯০] সালিম বিন আবু হাফসা—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, “আবদুর রহমান ইবনে আবু নুম বছরের পর বছর ইহরাম বেঁধে থাকতেন। তিনি তাঁর তালবিয়া পাঠে বলতেন, লাব্বাইক (হে আল্লাহ, আমি উপস্থিত)। তারপর বলতেন, যদি তা লোক-দেখানো হয় তবে তা বিফল লাব্বাইক।”
আল্লাহ তাআলা দোয়া কবুল করলেন
[৫৯১] আবদুল্লাহ বিন শুবরুমা আদ-দাব্বি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আবদুর রহমান ইবনে আবু নুম—রাহিমাহুল্লাহ—এর মাথায় প্রচুর উকুন হলো। তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করলেন। ফলে সব উকুন গোলাকার (বলের মতো) হয়ে দুই চোখের মাঝখান দিয়ে নিচে পড়লো।”
যাঁরা পুণ্যবান তাঁরা মুত্তাকি ও সম্মানিত
[৫৯২] জারির বিন মুগিরা বলেন, “আবদুর রহমান ইবনে আবু নুম— রাহিমাহুল্লাহ—রমযানে মাত্র দুই বার ইফতার করতেন। যখন আমরা আবদুর রহমান ইবনে আবু নুমকে জিজ্ঞেস করতাম, কেমন আছেন আপনি, হে আবুল হাকাম? তিনি বলতেন, “যদি আমরা পুণ্যবান হই তবে সবচেয়ে সম্মানিত ও মুত্তাকি। আর আমরা যদি পাপাচারী হই তবে সবচেয়ে ইতর ও দুর্ভাগ্যগ্রস্ত।”
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কখনো হাসেননি
[৫৯৩] মুআল্লা বিন যিয়াদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, গাযওয়ান বিন গাযওয়ান আল-রাকাশি—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, “আমার ওপর আল্লাহ তাআলার এই অধিকার রয়েছে যে, তিনি যেনো আমাকে হাসতে না দেখেন যতোক্ষণ আমি জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে কোনটি আমার বাড়ি তা জানতে না পারি।” হাসান বসরি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেছেন, “তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এবং প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেছিলেন। আল্লাহ তাআলার সঙ্গে মিলিত হওয়ার (মৃত্যুর) আগে তাঁকে কখনো হাসতে দেখা যায়নি।”
গোটা দুনিয়াও তাঁকে আনন্দিত করবে না
[৫৯৪] খুওয়াইলিদ আল-আসারি বলেন, গাযওয়ান বিন গাযওয়ান আল- রাকাশি—রাদিয়াল্লাহু আনহু—আল্লাহ তাআলার বাণী وَلَدَيْنَا مَزِيدُ “আমার কাছে রয়েছে আরও বেশি” প্রসঙ্গে বলেছেন, "আমাকে যদি অতিরিক্ত অংশ হিসেবে গোটা দুনিয়াও দেওয়া হয় তবে তা আমাকে আনন্দিত করবে না।"
হাসিতে তাঁর লাভ নেই
[৫৯৫] আনাস বিন মালিক-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, আবু মুসা আল- আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলা হলো, গাযওয়ান বিন গাযওয়ান আল- রাকাশি তো হাসেন না। তখন তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে গাযওয়ান, আপনি কেন হাসেন না? তিনি বললেন, "হা হা, হাসি দিয়ে আমার কী লাভ?"
নেতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মা জানতেন না
[৫৯৬] আবু কাসির আল-আনবারি থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর এক শায়খ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, যখন মুসলামানদের সেনাবাহিনী যুদ্ধাভিযান শেষে ফিরে আসতো তখন উম্মে গাযওয়ান তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং জিজ্ঞেস করতেন, গাযওয়ান সম্পর্কে আপনাদের কাছে কোনো সংবাদ আছে কি? তাঁরা তখন বলতেন, "তিনি তো এই বাহিনীর নেতা।"
সুন্দর প্রতিশ্রুতি ও ভয়ংকর সতর্কবাণী
[৫৯৭] ইবনে আমের বলেন, গাযওয়ান বিন গাযওয়ান আল-রাকাশি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর একজন মা ছিলেন। তিনি কুরআন নিয়ে তাঁর ব্যস্ততা দেখতেন। ফলে তাকে জিজ্ঞেস করতেন, "এই মিয়া, তোমাকে যা ব্যস্ত রেখেছে তাতে তুমি কী দেখো?” তিনি বলতেন, "আমি তাতে দেখি সুন্দর প্রতিশ্রুতি এবং ভয়ংকর সতর্কবাণী।" আমরা তখন তাঁকে বলতাম, "আপনি কি তাতে সুন্দর সুন্দর জিনিস দেখতে পান যা আমরা অমুক অমুক বছর হারিয়ে ফেলেছিলাম?" তিনি বলতেন, "আমি তাতে দেখতে পাই সুন্দর প্রতিশ্রুতি এবং ভয়ংকর সতর্কবাণী।"
দোয়া কবুল হওয়ার একটি স্মরণীয় ঘটনা
[৫৯৮] সুলাইমান বিন মুগিরা হুমাইদ বিন হিলাল থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে একজন ব্যক্তি ছিলেন, সবাই তাঁকে আসওয়াদ বিন কুলসুম বলে ডাকতো। যিনি যখন হাঁটতেন তাঁর দৃষ্টি তাঁর পায়ের অগ্রভাগের সামনে যেতো না। তিনি একদিন হাঁটছিলেন, সেদিন (যে-রাস্তায় হাঁটছিলেন সেখানে) প্রাচীরের ওপর নারীদের একটি প্রাসাদ ছিলো। সম্ভবত নারীদের একজন তাঁর কাপড় বা ওড়না ফেলে রেখেছিলেন (এবং কিছু উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল)। ফলে তাঁরা আসওয়াদ বিন কুলসুমকে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। তারপর বললেন, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই, ইনি তো আসওয়াদ বিন কুলসুম।” এই আসওয়াদ বিন কুলসুম একবার জিহাদে বেরুলেন। তখন এই দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ, আমার এই অন্তর দাবি করছে যে সে স্বাচ্ছন্দ্যময় অবস্থায় আপনার সঙ্গে মিলিত হওয়াকে পছন্দ করে। সুতরাং আমার অন্তর যদি সত্যবাদী হয় তবে তাকে তা দান করুন, আর যদি সে তার জন্য অনিচ্ছুক হয় তবে এর জন্য তাকে শাস্তি দিন।” একবার বললেন, “সে যদি অনিচ্ছুকও হয়, তবুও তাকে তা (শাহাদাত) দান করুন। এবং আমার দেহকে চতুষ্পদ জন্তু, পাখিদের খাদ্যে পরিণত করুন।” তারপর তিনি একটি পাহাড়ের দিকে গেলেন। মুসলিম সেনাবাহিনীও তখন ওখানে একটি প্রাচীরের আড়ালে আশ্রয় নিলো; কিন্তু শত্রুদল তাদের দেখে ফেললো। ফলে তারা এগিয়ে গেলেন এবং প্রাচীরের গায়ে একটি খোঁড়ল খুঁজে পেলো। এখানে আসওয়াদ বিন কুলসুম তাঁর ঘোড়া থেকে নামলেন এবং তরবারি দ্বারা ওই খোড়লে আঘাত করলেন। খোঁড়লটা দেবে গেলো এবং বেরিয়ে এলো। তারপর খোঁড়ল থেকে পানি বের হলো। আসওয়াদ বিন কুলসুম এই পানি দিয়ে ওজু করলেন এবং নামায পড়লেন। বর্ণনাকারী বলেছেন, অনারবগণ বলেন, আরবরা যখন সমর্পিত হয় তখন এভাবেই সমর্পিত হয়। তারপর আসওয়াদ বিন কুলসুম অগ্রসর হলেন এবং শত্রুদের সঙ্গে লড়াই শুরু করলেন। লড়াই করতে করতে শাহাদাতবরণ করলেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মুসলিম সেনাবহিনী ওই প্রাচীরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। তখন আসওয়াদ বিন কুলসুমের ভাইকে বলা হলো, “আপনি যদি যেতেন, গিয়ে দেখতেন আপনার ভাইয়ের হাড়গোড় ও গোশতা বাকি আছে কি-না।” তিনি বললেন, “না, আমার ভাই একটি দোয়া করেছেন এবং সেই দোয়া কবুল হয়েছে। সুতরাং এই ব্যাপারে আমি আর কিছুর মুখোমুখি হতে চাই না।"
কবরের বিপদ সবচেয়ে ভয়াবহ
[৫৯৯] হাসান বসরি -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন, আমার এক ভাই ইন্তেকাল করলেন। আমরা তাঁর জানাযার সঙ্গে বের হলাম। যখন কবরের ওপর কাপড় বিছানো হলো তখন সিলাহ বিন আশইয়াম -রাহিমাহুল্লাহ- এলেন এবং কাপড়টা উঠালেন। তারপর বললেন, হে অমুক, (কবিতা)
فَإِنْ تَنْجُ مِنْهَا تَنْجُ مِنْ ذِي عَظِيمَةٍ ، وَإِلَّا فَإِنِّي لَا أَخَالُكَ نَاجِيَا
"তুমি যদি কবর থেকে মুক্তি পাও তবে ভয়াবহ বিপদ থেকে মুক্তি পেলে। আর যদি কবর থেকে মুক্তি না পাও তবে তুমি মুক্তি পাবে বলে আমি ভাবতে পারছি না।"
পুত্র শহীদ হলেন, নিজেও শহীদ হলেন
[৬০০] সাবিত আল-বুনানি বলেন, সিলাহ বিন আশইয়াম-রাহিমাহুল্লাহ-একটি যুদ্ধে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর এক পুত্রও ছিলো। তিনি বললেন, "হে প্রিয়পুত্র, তুমি এগিয়ে যাও এবং লড়াই করে শহীদ হও। যাতে আমি তোমাকে আল্লাহর সামনে পেশ করতে পারি।" তাঁর পুত্র অস্ত্র ধারণ করলেন এবং লড়াই করে শহীদ হলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর রহমত বর্ষণ করুন। তারপর সিলাহ বিন আশইয়াম- রাহিমাহুল্লাহ-নিজেই এগিয়ে গেলেন এবং লড়াই করে শহীদ হলেন। যুদ্ধশেষে অন্য নারীরা সিলাহ বিন আশইয়াম-রাহিমাহুল্লাহ-এর স্ত্রী মুআযাতা আল- আদাবিয়্যাহ-এর কাছে সমবেত হলেন। তিনি তাঁদের উদ্দেশে বললেন, "আপনারা যদি আমাকে অভিনন্দন জানাতে এসে থাকে তবে আপনাদের স্বাগত জানাই। আর যদি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এসে থাকেন তাহলে চলে যেতে পারেন।"
রাতে তিনি ঘুমাতেন না
[৬০২] মুহাম্মদ বিন ফুযাইল তাঁর পিতা-রাহিমাহুমুল্লাহ-থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, "মুআযাতা আল-আদাবিয়্যাহ-রাহিমাহাল্লাহ-দিবস শুরু হওয়া মাত্রই বলতেন এটা আমার সেই দিন, যে-দিনে আমি মৃত্যুবরণ করবো। সুতরাং তিনি সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমাতেন না। তারপর রাত শুরু হওয়া মাত্রই তিনি বলতেন, এটা আমার সেই রাত, যে-রাতে আমি মৃত্যুবরণ করবো। সুতরাং তিনি সকাল পর্যন্ত ঘুমাতেন না। শীতকাল এলে তিনি স্বাভাবিক পাতলা কাপড় পরতেন; ফলে শীতের কারণে তিনি ঘুমাতে পারতেন না।"
হালাল রোজগার অল্প হয়
[৬০২] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুস সাহবা সিলাহ বিন আশইয়াম-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, আমি হালাল উৎস থেকে দুনিয়া অর্জনের (রুজি-রোজগার) করার চেষ্টা করেছি। ফলে দৈনন্দিন খাদ্যদ্রব্য ব্যতীত আর কিছু লাভ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে আমি জীবিকার ব্যবস্থার জন্য তাতেই নির্ভর করি না এবং তা আমাকে ছাড়িয়েও যায়নি। আমি যখন তা দেখি, নিজেকে বলি, হে আত্মা, তোমার জন্য যতোটুকু রিযিক প্রয়োজন ততোটুকু দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তুমি তার এক-চতুর্থাংশ গ্রহণ করো। সুতরাং সে এক-চতুর্থাংশ গ্রহণ করেছে এবং ক্লেশ বোধ করেনি।"
যুবকদের উদ্দেশে উপদেশ
[৬০৩] সাবিত আল-বুনানি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "সিলাহ বিন আশইয়াম-রাহিমাহুল্লাহ-একটি নির্জন ভূমিতে চলে যেতেন এবং ওখানে ইবাদত-বন্দেগি করতেন। কতিপয় যুবক তাঁর পাশে যেতো এবং খেলাধুলা ও হাসি-তামাশা করতো। তিনি যুবকদের বলতেন, তোমরা এমন একটি মানবগোষ্ঠীর সংবাদ আমাকে জানাও, যারা সফরের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে, কিন্তু দিনের বেলা যাত্রাবিরতি করেছে এবং রাতের বেলা ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। তাহলে তাদের সফর শেষ করতে পারবে?" বর্ণনাকারী বলেন, এভাবে যুবকেরা তার পাশে আসতো এবং তিনি তাদের উপদেশ দিতেন। একদিন তারা এলো এবং তিনি এই গল্পটাই তাদের বললেন। তখন যুবকদের একজন বললো, হে যুবকেরা, আল্লাহর কসম! তিনি তাঁর গল্প দ্বারা আমাদেরই ইঙ্গিত করেছেন। কারণ, আমরা দিনের বেলা খেলাধুলা ও হাসি-তামাশা করি এবং রাতের বেলা ঘুমাই।” এরপর থেকে তারা সিলাহ বিন আশইয়াম-রাহিমাহুল্লাহ-এর অনুসরণ করতে শুরু করলো; তাঁরা তার সঙ্গে নির্জন ভূমিতে বের হলো এবং ইবাদত-বন্দেগি করতো। তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত এভাবেই কেটেছে।"
একটি কারামত
[৬০৪] আবুস সাবিল বলেন, সিলাহ বিন আশইয়াম-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "আমি একটি বাহনে চড়ে এই এলাকাগুলো ভ্রমণ করছিলাম। তখন প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লাম। ওখানে কাউকে পেলাম না যে আমার কাছে খাদ্য বিক্রি করবে। পথে কারও কাছ থেকে কিছু পাওয়া আমার জন্য বেশ জটিল হয়ে পড়লো। এভাবেই আমি চলতে থাকলাম।” বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা, তিনি বলেছিলেন, "আমি আমার মহান রবের কাছে দোয়া করছিলাম এবং তাঁর কাছে খাবার চাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমি আমার পেছনে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি পেছন ফিরে তাকালাম এবং দেখতে পেলাম একটি সাদা রঙের রুমাল। আমি আমার সওয়ারি থেকে নামলাম এবং কাপড়টি হাতে নিলাম। সেটা ছিল একটি খেজুর-ভর্তি থলে। আমি থলেটি নিয়ে নিলাম এবং আমার সওয়ারিতে আরোহণ করলাম। থলে থেকে খেজুর খেলাম এবং তৃপ্ত হলাম। সন্ধ্যা হয়ে এলো। আমি একজন পুরোহিতের কাছে তাঁর আশ্রমে অবতরণ করলাম। তাঁকে আমি পুরো ঘটনা বললাম। তিনি আমার থেকে ওই থলের খেজুর খেতে চাইলেন। সুতরাং আমি তাকে খেজুর খেতে দিলাম। পরবর্তী সময়ে একদিন ওই পুরোহিতের কাছে গেলাম। ওখানে সুন্দর সুন্দর খেজুর গাছ দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, "আপনি আমাকে যে-খেজুরগুলো খেতে দিয়েছিলেন সেগুলোর বিচি থেকে এই গাছগুলো হয়েছে।" সিলাহ বিন আশইয়াম-রাহিমাহুল্লাহ-ওই রুমালসদৃশ কাপড়টা পরিবারের কাছে নিয়ে এসেছিলেন; তাঁর স্ত্রী সেটা মানুষকে দেখাতেন।
হারুরিয়্যাহ সম্প্রদায়
[৬০৫] আবুস সাবিল (দারিব বিন নাকির আল-জারিরি) বলেন, আমি সিলাহ বিন আশইয়াম-রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে সঙ্গে থাকতাম এবং তাঁর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতাম। একদিন আমি তাঁকে বললাম, আমাকে কিছু বিষয় শিক্ষা দিন, কিছু উপদেশ দিন, কিছু নসিহত করুন। তিনি বললেন, তুমি এগুলো করো: আল্লাহ তাআলার কিতাব থেকে উপদেশ গ্রহণ করো, মুসলমানদের জন্য কল্যাণ কামনা করো, আল্লাহ তাআলাকে বেশি বেশি ডাকো। সাধারণ মানুষের আহ্বান কিছুতেই যেনো তোমাকে ধ্বংস না করে ফেলে। তুমি নাফরমানির হাতে নিহত হোয়ো না। (নাফরমানিমূলক কর্মকাণ্ড যেনো তোমাকে হত্যা করে না ফেলে। মুমিনগণ ব্যতীত যদি কোনো জনগোষ্ঠী দাবি করে যে, তারা ঈমানের ওপর রয়েছে তবে অবশ্যই তাদের থেকে দূরে থাকো।" আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওই জনগোষ্ঠী কারা? তিনি বললেন, "এই ইতর হারুরিয়্যাহ সম্প্রদায়।"
হামাগুড়ি দিয়ে বিছানায় আসতেন
[৬০৬] আবদুল্লাহ বিন শাওযাব আল-খুরাসানি বলেন, মুআযাতা আল-আদাবিয়্যাহ বলেছেন, সিলাহ বিন আশইয়াম-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর ঘরের মসজিদ (ঘরের যে-অংশে নামায পড়তেন সেই অংশ) থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বিছানায় আসতেন। রাত জেগে ইবাদত করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। তখনো হামাগুড়ি দিয়ে বিছানায় আসতেন।”
একটি স্মরণীয় ঘটনা
[৬০৭] আবু ইমরান আল-জুনি বলেন, জুন্দুব বিন আবদুল্লাহ আল-বাজালি— রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, আমি ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে মদিনায় এলাম। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মসজিদে প্রবেশ করলাম, দেখতে পেলাম একদল মানুষ সমবেত হয়ে আলোচনা করছেন। আমি সমাবেশটির দিকে এগিয়ে গেলাম এবং তাঁদের কাছে পৌঁছলাম। সমাবেশে একজন যুবককে দেখলাম, তাঁর পরনে দুটিমাত্র কাপড়, যেনো তিনি সফর থেকে এসেছেন। তাঁকে আমি বলতে শুনলাম, "কা'বার রবের কসম! আমির-উমারা ধ্বংস হোক; আমি তাদের প্রতি কোনো ধরনের সহানুভূতি পোষণ করবো না।" তখন আমি তাঁর পাশে বসলাম। তাঁর সঙ্গে কী ঘটনা ঘটেছে তা তিনি বর্ণনা করলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে প্রস্থান করতে উদ্যত হলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তাঁরা বললেন, ইনি হলেন মুসলমানদের নেতা উবাই বিন কা'ব আল- আনসারি। তখন আমি তাঁর অনুসরণ করলাম এবং তাঁর বাড়িতে এসে পৌঁছলাম। বাড়িটি জীর্ণ, চারদিকে দুরবস্থা। তাঁকে মনে হলো দুনিয়াবিমুখ মানুষ, জনসাধারণ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। তাঁর বিষয়গুলো একই রকম। আমি তাঁকে সালাম দিলাম, তিনি আমার সালামের জবাব দিলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথাকার অধিবাসী? আমি বললাম, আমি ইরাকের অধিবাসী। তিনি বললেন, ও, ওখানকার লোকেরা খুব বেশি প্রশ্ন করে। তাঁর এই কথা শুনে আমি রেগে গেলাম। তাই কেবলামুখী হয়ে দুই হাঁটুর ওপর বসলাম এবং এইভাবে দুই হাত তুললাম। তারপর দোয়া করলাম, "হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে অভিযোগ জানাই। আমি ইলম অর্জন করার উদ্দেশ্যে টাকা-পয়সা খরচ করেছি, দেহকে ক্লান্ত- পরিশ্রান্ত করেছি, কষ্টকর সফর করেছি। যখন তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি তখন তাঁরা আমাকে চিনতেই পারছেন না এবং যা-খুশি বলছেন।" আমার এই দোয়া শুনে উবাই ইবনে কা'ব—রাদিয়াল্লাহু আনহু—খুব কাঁদলেন এবং আমাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতে লাগলেন। বললেন, তোমার জন্য আফসোস, আমি তো এখান থেকে চলে যাইনি। তারপর বললেন, “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, যদি আমি আগামী জুমআ পর্যন্ত বেঁচে থাকি তাহলে অবশ্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—থেকে যা-কিছু শুনেছি তার সব বলে দেবো। এতে আমি কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে পরোয়া করবো না।” তাঁর থেকে এই কথা শোনার পর আমি বেরিয়ে এলাম এবং পরবর্তী জুমআর অপেক্ষা করতে লাগলাম। বৃহস্পতিবারে আমি বাইরে বের হলাম। শহরের গলিগুলোকে জনাকীর্ণ দেখতে পেলাম। এমন কোনো গলি পেলাম না যেখানে মানুষ দেখতে পেলাম না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার? এতো লোক সমাগম কেন? তারা বললেন, আপনাকে মনে হচ্ছে এই শহরে নতুন লোক। আমি বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই। তাঁরা বললেন, মুসলমানদের নেতা উবাই বিন কা'ব আল-আনসারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-ইন্তেকাল করেছেন। তাঁদের মুখে এই সংবাদ শুনে আমি খুবই ব্যথিত হলাম এবং ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়লাম।" জুন্দুব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, "তারপর আমি আবু মুসা আল-আশআরি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং পুরো ঘটনা বিবৃত করলাম। তিনি বললেন, হায়, তিনি যদি জীবিত থাকতেন তাহলে তাঁর সব কথা আমাদের বলে যেতে পারতেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি রহমত বর্ষণ করুন। তিনি ছিলেন এমন বান্দা, আল্লাহ তাআলা যাঁর গোপনীয় বিষয়গুলো প্রকাশ করতে চাননি।"
তাঁরা উদ্দেশ্যসাধনে কঠোর ছিলেন
[৬০৮] আবদুর রহমান বিন আমর আল-আওযায়ি রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, বিলাল বিন সা'দ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমি তাঁদের (রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিগণকে) দেখেছি যে, তাঁরা নিজেদের উদ্দেশ্যসাধনে (ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে) কঠোর ছিলেন। তবে তাঁরা পরস্পর কিছুটা হাসাহাসি করতেন। রাত শুরু হলেই তাঁরা আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হয়ে যেতেন।"
বিনয়ের আলামত
[৬০৯] আবু ঈসা মুসা বিন তালহা আল-কুরাশি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ বিন আমর আল-আদাবি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "বিনয়ের চূড়ান্ত প্রকাশ হলো তোমার যে-কোনো মজলিসের নিম্ন আসনে বসতে রাজি থাকা এবং যার সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ তাকেই সালাম দেওয়া।"
জিহ্বাকে সংযত না করলে কেউ মুত্তাকি হতে পারবে না
[৬১০] আতা আল-ওয়াসাতি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আনাস বিন মালিক-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "কোনো ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে যথার্থভাবে ভয় করতে পারবে না (মুত্তাকি হতে পারবে না) যতোক্ষণ না তার জিহ্বাকে সংযত করে।"
মহিলাকে সতর্ক করলেন
[৬১১] মুহারিব বিন দিসার-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, “শুতাইর বিন শাকাল আল-আবসি-রাহিমাহুল্লাহ-কে একজন মহিলা বললেন, হে আমার বৎস, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি আমাকে জন্ম দিয়েছেন? মহিলা বললেন, না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি আমাকে দুধ পান করিয়েছেন? মহিলা বললেন, না। তখন তিনি বললেন, তাহলে আপনি মিথ্যা বলছেন কেন?”
মহিলা সামনে পড়লেই চোখ নিচু করে ফেলবে
[৬১২] খালিদ বিন মাজদু-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আনাস বিন মালিক-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “তোমার সামনে কোনো মহিলা পড়লে, তুমি চোখ নিচু করে ফেলবে। সে তোমাকে পেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত চোখ নিচু করে রাখবে।"
আল্লাহ তাআলার প্রতি লজ্জাবোধ করো
[৬১৩] উরওয়া ইবনুষ যুবাইর-রাহিমাহুমুল্লাহ-বলেন, আবু বকর সিদ্দিক-রাদিয়াল্লাহু আনহু-লোকদের উদ্দেশে খুতবা দিলেন। খুতবায় বললেন, “হে মুসলমানগণ, তোমরা আল্লাহ তাআলার প্রতি লজ্জাবোধ করো। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম! আমি যখন নির্জন ভূমিতে ইস্তিনজা করতে যাই, আমার মাথা ঢেকে রাখি। কারণ, আমি আমার মহান রবের প্রতি লজ্জাবোধ করি।"
জান্নাতের নেয়ামত
[৬১৪] আবু ইসহাক-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, دَانِيَةٌ قُطُوفُهَا “যার ফলরাশি অবনমিত থাকবে নাগালের মধ্যে” এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বারা বিন আযিব আল-আনসারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, জান্নাতের অধিবাসীরা জান্নাতের ফলসমূহ খাবে যেভাবে খুশি সেভাবেই; দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে এবং হেলান দিয়ে-যে-কোনো অবস্থায়।"
কুরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা
[৬১৫] আবু ইসহাক-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ “কিছুতেই তোমরা পুণ্য অর্জন করতে পারবে না” এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আমর বিন মাইমুন আল-আওদি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, “এখানে ‘পুণ্য’-এর অর্থ হলো জান্নাত।"
বিড়ালকে কষ্ট দেওয়ার শাস্তি
[৬১৬] সায়িব বিন মালিক-রাহিমাহুল্লাহ্-আবদুল্লাহ বিন উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ্-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- ইরশাদ করেছেন:
دَخَلْتُ الْجَنَّةَ فَرَأَيْتُ أَكْثَرَ أَهْلِهَا الْفُقَرَاءَ وَاطَّلَعْتُ فِي النَّارِ فَرَأَيْتُ أَكْثَرَ أَهْلِهَا الْأَغْنِيَاءَ وَرَأَيْتُ فِيهَا ثَلَاثَةً يُعَذِّبُونَ : امْرَأَةً مِنْ حِمْيَرَ طُوَالُ رَبَطَتْ هِرَّةً فَلَمْ تُطْعِمْهَا وَلَمْ تَسْقِهَا وَلَمْ تَدَعْهَا تَأْكُلُ مِنْ خَشَاشِ الْأَرْضِ فَهِيَ تَنْهَشُ قَلْبَهَا وَدُبُرَهَا ، وَرَأَيْتُ أَخَا دُعْدُعِ الَّذِي كَانَ يَسْرِقُ الْحَاجَ بِمِحْجَنِهِ فَإِذَا فُطِنَ لَهُ قَالَ : إِنَّمَا تَعَلَّقَ بِمِحْجَنِي، وَالَّذِي سَرَقَ بَدَنَتَيْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
“আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম এবং জান্নাতের অধিকাংশ অধিবাসীকে গরিব (যারা দুনিয়াতে গরিব ছিলো) দেখতে পেলাম। তারপর জাহান্নামে উঁকি দিলাম, সেখানে বেশির ভাগ লোককে ধনী (যারা দুনিয়াতে ধনী ছিলো) দেখতে পেলাম। তিনটি লোককে জাহান্নামে শাস্তি পেতে দেখলাম: হিময়ার এলাকার একজন লম্বা নারী, যে একটি বেড়ালকে বেঁধে রেখেছিলো, বিড়ালটিকে খেতে দেয়নি, পানি পান করতে দেয়নি; ছেড়েও দেয়নি, যাতে সে বাইরে গিয়ে জমিনের ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। বিড়ালটি ওই নারীর হৃৎপিণ্ড খুবলে খাচ্ছে, তার পশ্চাদদেশে কামড়াচ্ছে। অপর জন হলো দুদু-এর ভাই, সে তার বাঁকা মাথার লাঠি দিয়ে হাজিদের মালামাল চুরি করতো। যখনই সে ধরা খেয়ে যেতো বলতো, ওটা তো আমার লাঠির আগায় আটকে গিয়েছে। (আমি তা চুরি করিনি।) তৃতীয় জন হলো ওই ব্যক্তি, যে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুটি উটনী চুরি করেছিলো।”
ধারাবাহিক অল্প আমল যথেষ্ট
[৬১৭] আবু ইসহাক-রাহিমাহুল্লাহ্-বলেন, আবু সালামা আবদুল্লাহ বিন আবদুল আসাদ আল-মাখযুমি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে ওই আমল সবচেয়ে প্রিয়, যা ধারাবাহিকভাবে পালন করা হয়, যদিও তার পরিমাণ কম হয়।"
নিজে যা পালন করেন না তা অন্য বলা অপছন্দ করেন
[৬১৮] আবু ওয়ায়িল বলেন, আলকামা-রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, "আপনি কি আমাদের উপদেশমূলক গল্পকাহিনি বলবেন না? তিনি বললেন আমি তোমাদের এমন বিষয়ে আদেশ দিতে অপছন্দ করি যা আমি নিজে পালন করি না।"
মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য
[৬১৯] দিহইয়া আল-কালবি-রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তাঁর স্ত্রী দুররা বিনতে আবু লাহাব-রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, মানুষের মধ্যে আল্লাহ তাআলাকে সবচেয়ে বেশি কে ভয় করে? কে সবচেয়ে মুত্তাকি? তিনি বললেন, آمَرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَأَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأَوْصَلُهُمْ لِلرَّحِمِ "তাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি সৎকাজের আদেশ করে, অসৎকাজের নিষেধ করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখে।"
হুলওয়ানের আমিরের অন্যায় ও জুলুম
[৬২০] ওয়াসিল বিন আহদাব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবরাহিম আন-নাখয়ি-রাহিমাহুল্লাহ-হুলওয়ানের আমিরকে দেখলেন, রাস্তায় চলতে চলতে মানুষকে চলাচলে বাধা দিচ্ছে। তখন তিনি বললেন, "দীনের ক্ষেত্রে অন্যায় ও জুলুম করার চেয়ে রাস্তায় অন্যায় ও জুলুম করা ভালো।"
সুলতানদের ফেতনা থেকে পানাহ
[৬২১] আবু গায়লান বলেন, মুতাররিফ বিন শিখখির-রাহিমাহুল্লাহ-এই দোয়া করতেন, “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে সুলতানদের ফেতনা থেকে পানাহ চাই এবং তাদের কলম যে-নির্দেশ জারি করে তার অনিষ্ট থেকেও পানাহ চাই।"
অর্থের বিনিময়ে দীন ছিনিয়ে নেবে
[৬২২] আবু ওয়ায়িল শাকিক বিন সালামা আল-আসাদি-রাহিমাহুল্লাহ- বলেন, আমি বসরায় উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে গেলাম। তখন তাঁর কাছে আসবাহানের জিযিয়া (জিম্মিদের) কর নিয়ে আসা হয়েছে। তার ছিলো তিরিশ লাখ দিরহাম। দিরহামগুলো তাঁর সামনে রাখা হয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "হে আবু ওয়ায়িল, কেউ যদি এই পরিমাণ সম্পদ রেখে মৃত্যুবরণ করে তার ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?” আমি বললাম, আমাকে বলুন, "তা যদি হয় গনিমতের মাল থেকে চুরি করা তাহলে কেমন হবে?" তিনি বললেন, "তাহলে তো সেটা অনিষ্টের ওপর অনিষ্ট।” তারপর তিনি বললেন, "হে আবু ওয়ায়িল, আমি যখন কুফায় যাবো তখন আপনি আমার কাছে আসবেন, আমি আপনাকে হাদিয়া-উপটৌকন দেবো।" পরে তিনি কুফায় এলেন। আমি আলকামার কাছে এলাম এবং ব্যাপারটি তাকে জানালাম। তিনি বললেন, "আপনি যদি আমার কাছে পরামর্শ না চেয়ে তার কাছে চলে যেতেন তবে সেটা ভালো হতো। তখন আপনাকে আমি কিছুই বলতাম না। কিন্তু যখন আপনি আমার কাছে পরামর্শ চেয়েছেন তখন আমার কর্তব্য হলো আপনাকে উপদেশ দেওয়া আমি পছন্দ করি না যে আমার দুই হাজার দিনারের সঙ্গে আরও দুই হাজার দিনার হোক। আমি তার থেকে অনেক বেশি সম্মানিত। তা এই কারণে যে, আমি তাদের দুনিয়া থেকে সামান্য কিছু আয় করতে পারবো; কিন্তু তারা আমার দীন থেকে তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু ছিনিয়ে নেবে।"
শেষ যুগ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী
[৬২৩] আলি আল-মুরাদি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, মুআয বিন জাবাল- রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "শেষ যুগে প্রাদুর্ভাব ঘটবে ফাসেক কুরআন শিক্ষাকারীদের, পাপাচারী মন্ত্রীদের, খেয়ানতকারী আমানতদারদের, জালেম দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এবং মিথ্যাবাদী নেতাদের।"
ভিক্ষুককে আঙুরের বিচি দিলেন
[৬২৪] আবুল আলিয়া-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর কাছে ছিলাম। তাঁর কাছে অন্য মহিলারাও ছিলেন। এ-সময় একজন ভিক্ষুক এলো। তিনি ভিক্ষুককে আঙুরের একটি বিচি দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। এটা দেখে মহিলারা সবাই বিস্মিত হলেন। তখন তিনি বললেন, "এই বিচি থেকে অনেক চারা গজাবে।"
দ্বিমুখী আচরণকারী বিশ্বস্ত নয়
[৬২৫] ইকরিমা—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, লুকমান হাকিম—আলাইহিস সালাম— বলেছেন, “দ্বৈত চেহারার ব্যক্তি (দ্বিমুখী আচরণ যার), কখনোই আল্লাহ তাআলার কাছে বিশ্বস্ত বলে গণ্য হয় না।”
অনুসরণের ক্ষেত্রে অটল থাকা
[৬২৬] ইয়াযিদ বিন আবদুল্লাহ বিন শিখখির থেকে বর্ণিত, হানযালা আল- আসাদি—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—ইরশাদ করেছেন :
لَوْ كُنْتُمْ تَكُونُونَ كَمَا أَنْتُمْ عِنْدِي لَأَظَلَّتْكُمُ الْمَلَائِكَةُ بِأَجْنِحَتِهَا
“তোমরা আমার কাছে যেমন আছো আমার কাছ থেকে চলে যাওয়ার পরও যদি তেমনই থাকো তবে ফেরেশতাগণ তাদের পাখাপুঞ্জ দ্বারা তোমাদের ছায়া দান করবেন।”
যারা গোপনে পাপ করে এবং গোপনেই তওবা করে
[৬২৭] লাইস বিন আবু সালিম আল-কুরাশি থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তায়ালার ফারাত: وَإِنَّهُ كَانَ لِلْأَوَّابِينَ غَفُورًا ক্ষমাপরায়ণ”। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুজাহিদ—রাহিমাহুল্লাহ—বলেছেন, “তারা ওই সমস্ত ব্যক্তি যারা গোপনেই পাপ করে এবং গোপনেই তওবা করে।”
বিপদের সময় আল্লাহর নেয়ামতপ্রাপ্তি
[৬২৮] মিনহাল বিন আমর—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, ইবরাহিম—আলাইহিস সালাম—বলেছেন, “যখন আমাকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিলো সেই দিনগুলো ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে নেয়ামতপূর্ণ দিন।"
অবসর সময়ে খেলাধুলার নির্দেশ নেই
[৬২৯] সুলাইমান বিন মিহরান আল-আ'মাশ বলেন, কাজি শুরাইহ বিন হারিস— রাহিমাহুল্লাহ-ঈদের দিন একদল লোকের পাশ দিয়ে গেলেন। তারা খেলাধুলা করছিলো। তখন তিনি বললেন, "অবসর সময়ে খেলাধুলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি।" আল-আ'মাশ বলেন, একদিন কাজি শুরাইহ-এর কাছে একজন ভিক্ষুক এলো। তিনি ভিক্ষুককে বললেন, "তুমি বসো, তুমি তো একজন ব্যবসায়ী।"
কুরআন মাজিদের ওপর ধুলো জমবে
[৬৩০] আবু খালিদ আল-আহমার বলেন, চল্লিশ বছর আগে একজন শায়খ আমাকে বর্ণনা করেছেন, দাহহাক-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "এমন এক যুগ আসবে যখন মানুষের মধ্যে অহেতুক আলোচনা ও কথাবার্তা বেড়ে যাবে। এমনকি কুরআন মাজিদের ওপর ধুলো জমবে, কেউ তার দিকে ফিরেও তাকাবে না।"
আল্লাহভীতু ব্যক্তির কুরআন তেলাওয়াত সবচেয়ে সুন্দর
[৬৩১] লাইস বিন আবু সালিম আল-কুরাশি বলেন, তাউস বিন কায়সান আল- ইয়ামানি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "ওই ব্যক্তির কুরআন তেলাওয়াত সবচেয়ে বেশি সুন্দর, যে-ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে।"
যা আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন করে দেওয়া তা জুয়া
[৬৩২] উবায়দুল্লাহ বলেন, কাসিম বিন মুহাম্মদ আত-তাইমি-রাহيمাহুল্লাহ- বলেছেন, "যেসব জিনিস আল্লাহ তাআলার যিকির থেকে উদাসীন করে দেয় অথবা নামায থেকে বিরত রাখে তা জুয়া বলে গণ্য হবে।"
জান্নাতের পরিবেশ নাতিশীতোষ্ণ
[৬৩৩] আলকামা রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "জান্নাতের পরিবেশ হবে নাতিশীতোষ্ণ। সেখানে উত্তাপও থাকবে না, শৈত্যও থাকবে না।"
অগ্রবর্তীদের বর্ণনা
[৬৩৪] আল-আওযায়ি বলেন, উসমান বিন আবু সাওদাহ আল-মাকদিসি- রাদিয়াল্লাহু আনহু-এই আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন: وَالسَّابِقُونَ السَّابِقُونَ أُولَئِكَ الْمُقَرَّبُونَ "আর অগ্রবর্তীরাই তো অগ্রবর্তী; তারাই নৈকট্যপ্রাপ্ত।” তারপর বললেন, "তাঁরা হলেন ওই সকল যাঁরা সবার আগে মসজিদে গমন করেন এবং সবার আগে আল্লাহ তাআলার পথে জিহাদে বের হন।"
সীমানা পাহারা দেওয়া উত্তম ইবাদত
[৬৩৫] মুতয়িম বিন মিকদাম-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবু হুরায়রাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "যখন আমি তিন দিন সীমানা পাহারা দিই, তখন ইবাদতকারীরা যতো খুশি ইবাদত করুক।" (সীমানা পাহারা দেওয়াই শ্রেষ্ঠ ইবাদত বলে বিবেচিত হবে।)
পাহারারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে শহীদ
[৬৩৬] ইয়াযিদ বিন আবদুল্লাহ বিন কুসাইত ও সাফওয়ান বিন সুলাইম-রাহিমাহুমুল্লাহ-বলেন, “যে-ব্যক্তি সীমানা পাহারারত অবস্থায় মারা যাবে সে শহীদের কাতারে শামিল হবে।"
দশ লাখ নেকির দোয়া
[৬৩৭] মুহাজির-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, “যে-ব্যক্তি বাজারে প্রবেশ করবে সে যেনো এই দোয়া পাঠ করে:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
"আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই; তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। সকল রাজত্ব তাঁর এবং সকল প্রশংসা তাঁর; তিনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।" তাহলে আল্লাহ তাআলা তার জন্য দশ লাখ নেকি লিখে দেবেন এবং দশ লাখ গুনাহ মার্জনা করে দেবেন এবং দশ লাখ ত্রুটি ক্ষমা করে দেবেন।"
স্ত্রীসঙ্গ ত্যাগ করতেন
[৬৩৮] হুবাইরাহ বলেন, আলি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "মাসের প্রথম দশ দিন শুরু হলে রাসূলুল্লাহু-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-তাঁর পরিবারকে উৎসাহিত করতেন এবং চাদর উঠিয়ে নিতেন (ইবাদতের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন)।” আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করা হলো, চাদর উঠিয়ে নেওয়ার অর্থ কী? তিনি বললেন, "স্ত্রীসঙ্গ ত্যাগ করা।"
কেবল মুমিন বান্দারাই ওজু অবস্থায় থাকতে পারে
[৬৩৯] সাওবান বিন বাজদাদ আল-কুরাশি-রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
اسْتَقِيمُوا وَلَنْ تُحْصُوا وَاعْلَمُوا أَنَّ مِنْ خَيْرِ أَعْمَالِكُمُ الصَّلَاةَ وَلَنْ يُحَافِظُ عَلَى الْوُضُوءِ إِلَّا مُؤْمِنٌ.
"তোমরা দীনের ওপর অটল থাকো এবং কী কী ভালো কাজ করলে তার হিসাব রেখো না। তোমরা জেনে রাখো, তোমাদের সর্বোত্তম কাজ হলো নামায; আর মুমিন বান্দা ছাড়া অন্য কেউ ওজু অবস্থায় থাকতে পারে না।"
সময়মতো নামায আদায় সর্বোত্তম আমল
[৬৪০] আমর আশ-শাইবানি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমি নবী করীম- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে প্রশ্ন করে বললাম, "কোন আমল সর্বোত্তম?” তিনি বললেন, "সময়মতো নামায আদায় করা।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, "তারপর কোনটি?" তিনি বললেন, "মা-বাবার প্রতি সদাচরণ।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, "তারপর কোনটি?” তিনি বললেন, "আল্লাহ তাআলার পথে জিহাদে বের হওয়া।" আমি এতোটুকুতেই সমাপ্ত করেছি; আর কোনো প্রশ্ন করিনি।"
তাহকিক ছাড়া হাদিস বর্ণনা করা নিষিদ্ধ
[৬৪১] ইয়াহইয়া বিন হানি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমার বাবা আমাকে বললেন, "হে আমার পুত্র, তুমি আমার জন্য হাদিসের ক্ষেত্রে অবশ্যই দুটি শব্দ যোগ করবে: 'তারা দাবি করেছেন' এবং 'অবশ্যই'। (অর্থাৎ, তাহকিক ছাড়া হাদিস বর্ণনা করবে না।)
জিহ্বা ও লজ্জাস্থান হেফাজতকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে
[৬৪২] উকাইল বলেন, আবু মুসা আল-আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু- বলেছেন, আমি ও আবুদ দারদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে ছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-বললেন, “যে-ব্যক্তি দুই উরুর মাঝখানে যা রয়েছে তা (লজ্জাস্থান) এবং দুই চোয়ালের মাঝখানে যা রয়েছে তা (জিহ্বা) হেফাজত করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।"
জ্ঞান প্রজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত হয়ে শক্তিশালী হয়
[৬৪৩] সাঈদ বিন বুরদ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, সুলাইমান বিন মুসা আল-কুরাশি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, “কোনো বিষয়ের সঙ্গে কোনো বিষয় যুক্ত হয়ে সবচেয়ে ওজনদার হয় তখন, যখন জ্ঞান প্রজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত হয়।"
কেবলামুখী মজলিস সবচেয়ে মর্যাদাবান
[৬৪৪] বুরদ বিন সিনান আশ-শামি বলেন, সুলাইমান বিন মুসা আল-কুরাশি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, “প্রত্যেক মজলিসের একটি মর্যাদা রয়েছে। আর সবচেয়ে মর্যাদাবান মজলিস হলো যা কেবলামুখী রয়েছে।"
তাঁরা কিছুতেই দীনের বিপরীত কোনো কাজ করতে পারতেন না
[৬৪৫] ওয়ালিদ বিন জুমাই বলেন, আবু সালামা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিগণ বক্র পথে হাঁটতেন না; তাঁরা তাঁদের মজলিসে কবিতা আবৃত্তি করতেন না এবং জাহেলি যুগের ঘটনাও আলোচনা করতেন না। যদি তাঁদের কাউকে দীনের কোনো বিষয়ের বিপরীত কিছু করতে বলা হতো তখন তাঁর চোখের পাতার ভেতরের অংশ এমনভাবে কাঁপতে থাকতো যেন তিনি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েছেন।"
জ্ঞানপ্রার্থী ও দুনিয়াপ্রার্থীর লালসা কখনো শেষ হয় না
[৬৪৬] তাউস বিন কায়সান আল-ইয়ামানি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস—রাদিয়াল্লাহু আনহুমা—বলেছেন, “দুই প্রকারের লালায়িত ব্যক্তির লালসা কখনো শেষ হয় না: জ্ঞানপ্রার্থী ও দুনিয়াপ্রার্থী।"
হাদিস শিখেও জাহান্নামে প্রবেশ করবে
[৬৪৭] মাকহুল বিন আবু মুসলিম আশ-শামি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, “যে-ব্যক্তি হাদিস শিখবে নির্বোধদের সঙ্গে অহেতুক তর্ক-বিতর্ক করার জন্য অথবা আলেমদের সঙ্গে গৌরব প্রকাশ করে বেড়ানোর জন্য অথবা নিজের দিকে মানুষের চেহারা ফেরানোর জন্য তাহলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।"
শিক্ষামূলক গল্প শুনে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন
[৬৪৮] মুগিরা বিন মিকসাম বলেন, "হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-শিক্ষামূলক গল্প বলতেন এবং সাঈদ বিন জুবাইর ফুঁপিয়ে কাঁদতেন।"
শিক্ষামূলক গল্প-কাহিনি বলতেন
[৬৪৯] আতা থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা- বলেছেন, "আমি তামিম দারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে উমর ইবনুল খাত্তাব- রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর যুগে শিক্ষামূলক গল্প-কাহিনি বলতে শুনেছি। অর্থাৎ, তিনি মানুষকে উপদেশ দিতেন।"
অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকার প্রার্থনা
[৬৫০] উকাইল বলেন, ইবরাহিম আন-নাখয়ি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "যার কথাই আলোচনা করা হয় তার ব্যাপারে আমার মনে মনে এই আশা থাকে যে, সে যেনো অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে। (অর্থাৎ, ইবরাহিম আত-তাইমির অনিষ্ট থেকে।) আমিও চাই যে, সে এমনভাবে নিরাপদ হয়ে যাক যাতে তার ওপর কারও অভিযোগ না থাকে এবং কারও ওপর তার অভিযোগ না থাকে।"
পুত্রের উদ্দেশে নির্দেশ
[৬৫১] ইয়াহইয়া বিন আবু কাসির থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সুলাইমান বিন মুসা আল-কুরাশি-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর পুত্রকে বলেছেন, "হে পুত্র, তুমি কোনো পথপ্রদর্শকের (মুর্শিদের) নির্দেশনা ব্যতীত কোনো ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ো না। যদি তার নির্দেশনা গ্রহণ করো তবে কোনো ব্যাপারে দুঃখ পাবে না।”
কারও পেছনে পেছনে হাঁটা ফেতনা
[৬৫২] হাইসাম বলেন, আসিম বিন দামরাহ-রাহিমাহুল্লাহ-একজন লোককে অনুসরণ করে তার পেছনে পেছনে হাঁটতে দেখলেন। তিনি তখন বললেন, “এটা অনুসৃতের জন্য ফেতনা এবং অনুসারীদের জন্য অপমান।"
তাঁর পেছনে কাউকে হাঁটতে দিতেন না
[৬৫৩] আসিম বিন দামরাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "মুহাম্মদ বিন সিরিন আল- আনসারি তাঁর সঙ্গে কাউকে হাঁটতে দিতেন না।"
সামনে চার জনের বেশি বসলে উঠে চলে যেতেন
[৬৫৪] আসিম বিন দামরাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, “আবুল আলিয়া- রাহিমাহুল্লাহ-এমন ছিলেন যে, যদি তাঁর সামনে চার জনের বেশি বসতো তবে তিনি উঠে চলে যেতেন।"
দ্বিমুখী আচরণকারীর দুটি জিহ্বা হবে
[৬৫৫] আম্মার বিন ইয়াসির-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَا كَانَ لَهُ وَجْهَانِ فِي الدُّنْيَا كَانَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لِسَانَانِ مِنْ نَارٍ "দুনিয়াতে যার দুটি মুখ রয়েছে (যে লোক দ্বিমুখী আচরণ করে) কিয়ামতের দিন দুটি আগুনের জিহ্বা হবে।"
মায়ের প্রতি সদাচারের নির্দেশ
[৬৫৬] ইবনে শুবরুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু হুরায়রাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে একজন লোক এলো। বললো, "হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে জানান, আমার সদাচার ও সর্বোত্তম সাহচর্য পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন মানুষের অধিকার সবচেয়ে বেশি।” তিনি বললেন, "তোমাকে অবশ্যই জানানো হবে, তিনি হলেন তোমার মা।" লোকটি বললো, "তারপর কে?” তিনি বললেন, "তোমার মা।" লোকটি বললো, "তারপর কে?” তিনি বললেন, "তোমার মা।” লোকটি বললো, "তারপর কে?” তিনি বললেন, "তোমার বাবা।” লোকটি বললো, "হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে জানান, আমার যে-সম্পদ রয়েছে তা থেকে আমি কীভাবে দান-সাদকা করবো। তিনি বললেন, "তা তোমাকে অবশ্যই জানানো হবে: তুমি দান-সাদকা করবে এই অবস্থায় যে, তুমি সুস্থ আছো, ধন-মাল অর্জনের প্রতি তোমার লোভও আছে; বেঁচে থাকার আশা করছো এবং দরিদ্রতারও ভয় করছো। আর দান-সাদকা করতে এতো বিলম্ব কোরো না যে তোমার প্রাণ তোমার কন্ঠনালি পর্যন্ত পৌঁছে যায় (মৃত্যুবরণের সময় চলে আসে)। তুমি বলেছো, আমার সম্পদ অমুকের, আমার সম্পদ তমুকের। হ্যাঁ, তোমার সম্পদ অন্যদের হাতেই চলে যাবে, যদিও তুমি তা অপছন্দ করো।” (কারণ, মানুষ তার সম্পদ কবরে নিয়ে যেতে পারবে না।)
যা-কিছু কষ্ট দেওয়া তা-ই মুসিবত
[৬৫৭] আবু ইসহাক বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে খলিফাতুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-এর জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলো। তিনি তখন ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পড়লেন। তারপর বললেন, "যা-কিছু তোমাকে কষ্ট দেয় সেটাই হলো মুসিবত।"
সুস্থ অন্তরের বর্ণনা
[৬৫৮] ইয়াহইয়া বিন আমর তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ১! مَنْ أَنَّى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ “তবে যে-ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার কাছে সুস্থ অন্তর নিয়ে আসবে" এই আয়াতটির ব্যাখ্যায় আবুল জাউযা (আওস বিন আবদুল্লাহ আর-রাবয়ি-রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, “যে-অন্তরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ রয়েছে।"
নিয়তকে ইখলাসপূর্ণ ও পরিশুদ্ধ করার নির্দেশ
[৬৫৯] মানসুর বলেন, وَتَبَتَّلْ إِلَيْهِ تَبْتِيلًا “এবং একনিষ্ঠভাবে তোমার প্রতিপালকের প্রতি মগ্ন হও।" এই আয়াতটির ব্যাখ্যায় মুজাহিদ- রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "তোমার নিয়তকে সম্পূর্ণরূপে ইখলাসপূর্ণ ও পরিশুদ্ধ করো।"
দুনিয়া অর্জনকারীর সঙ্গে আখেরাত অর্জনের প্রতিযোগিতা
[৬৬০] আইয়ুব বলেন, আমি হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, "যখন তুমি কোনো ব্যক্তিকে দেখবে দুনিয়া অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করছে তখন তুমি তার সঙ্গে আখেরাত অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করো।"
সব সময়ের যিকির
[৬৬১] আসিম আল-আহওয়াল বলেন, মুহাম্মদ বিন সিরিন-রাহিমাহুল্লাহ-এর সাধারণ কথা ছিল এটি : سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ “সপ্রশংস মহিমা মহান আল্লাহর, আল্লাহ সবকিছু থেকে পবিত্র, সকল প্রশংসা তাঁরই”।
কিছু সময় দুনিয়ার জন্য, কিছু সময় আখেরাতের জন্য
[৬৬২] আজলান বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা- তাঁর মজলিসের সদস্যদের বলতেন, "কিছু সময় দুনিয়ার জন্য আর কিছু সময় আখেরাতের জন্য। তোমরা আলোচনার মাঝে মাঝে বলবে اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَنَ (আল্লাহুম্মাগ ফির লানা/ হে আল্লাহ, আমাদের ক্ষমা করে দাও)।”
সবার সামনে ভালো খাবার খাওয়া অনুচিত
[৬৬৩] আমর বিন কায়স আল-মুলায়ি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "রাসূলুল্লাহ- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিগণ এ-বিষয়টা অপছন্দ করতেন যে, কোনো লোক তার বাচ্চার হাতে খাদ্যদ্রব্য/মিষ্টান্ন দেবে, সে সেটা নিয়ে বাইরে যাবে, তখন গরিব ছেলে-মেয়েরা সেটা দেখে পরিবারের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি জুড়ে দেবে এবং কোনো এতিম তা দেখে পরিবারের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করবে।"
একটি শিক্ষণীয় ঘটনা
[৬৬৪] আবু ইমরান আল-জুনি বলেন, নাওফ আল-বিক্কালি-রাহিমাহুল্লাহ- বলেন, "একজন মুমিন ব্যক্তি আর একজন কাফের ব্যক্তি মাছ শিকার করতে বের হলো। কাফের ব্যক্তি জাল ফেলতে লাগলো এবং তার দেবতাদের স্মরণ করতে লাগলো। তার জাল ভরে মাছ উঠতে লাগলো। আর মুমিন ব্যক্তি জাল ফেলতে লাগলো আর আল্লাহকে স্মরণ করতে লাগলো; কিন্তু তার জালে কোনো মাছ উঠে আসছিলো না। তারা উভয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাছ শিকার করলো। মুমিন ব্যক্তিটি একটিমাত্র মাছ শিকার করতে পারলো। সে মাছটি হাত দিয়ে ধরলো, কিন্তু পরক্ষণেই মাছটি নড়ে উঠলো এবং পানিতে পড়ে গেলো। মুমিন ব্যক্তিটি ফিরে এলো, তার হাতে কোনো মাছ ছিলো না। আর কাফের ব্যক্তিটি ফিরে এলো, তার নৌকাভর্তি মাছ। তখন মুমিন ব্যক্তির ফেরেশতা আশাহত হলো এবং বললো, হে আমার রব, আপনার এই মুমিন বান্দা আপনাকে ডেকেছে, অথচ সে খালি হাতে ফিরে এসেছে। আর আপনার কাফের বান্দা তার নৌকাভর্তি মাছ নিয়ে ফিরেছে। আল্লাহ তাআলা মুমিন ব্যক্তির ফেরেশতাকে বললেন, "এদিকে এসো।" আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে মুমিন বান্দার বাসস্থান দেখালেন। তারপর বললেন, "আমার মুমিন বান্দা এখানে আসার পর সবকিছুর কষ্ট ভুলে যাবে।” তারপর ফেরেশতাকে জাহান্নামে কাফেরের বাসস্থান দেখালেন এবং বললেন, "সে দুনিয়াতে যা-কিছু অর্জন করেছে তা কি এখানে তার কোনো কাজে আসবে?” ফেরেশতা বললো, "না, আল্লাহর কসম! হে আমার রব।"
তারা অজ্ঞতাবশত মানুষকে বিভ্রান্ত করে
[৬৬৫] আবদুল্লাহ বিন শুমাইত আত-তামিমি বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, "তোমাদের কেউ কেউ আগ্রহী হয়ে কুরআন শিক্ষা করে এবং ইলম অর্জন করে, কুরআন শিক্ষা ও ইলম অর্জন হয়ে যাওয়ার পর দুনিয়া অর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দুনিয়াকে তার বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নেয় এবং মাথার ওপর তুলে নেয়। তখন তিন শ্রেণির দুর্বল মানুষ তার দিকে তাকায়: দুর্বল নারী, গ্রাম্য মূর্খ ও অনারব। তারা তার উদ্দেশে বলেন, "এই লোক আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে আমাদের চেয়ে বেশি জানে; সে যদি দুনিয়াতে কোনো ধনভাণ্ডার না দেখতে পেতো তবে দুনিয়াকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিতো না, মাথায় তুলতো না। ফলে তারাও দুনিয়ার প্রতি লালায়িত হবে এবং দুনিয়া অর্জন করবে।" আবদুল্লাহ বলেন, আমার পিতা বলতেন, তার উদাহরণ হলো ওইসব ব্যক্তি যাদের কথা আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
لِيَحْمِلُوا أَوْزَارَهُمْ كَامِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمِنْ أَوْزَارِ الَّذِينَ يُضِلُّونَهُمْ بِغَيْرِ عِلْمٍ
"ফলে কিয়ামত দিবসে তারা বহন করবে তাদের পাপভার পূর্ণমাত্রায় এবং পাপভার তাদেরও যাদের তারা অজ্ঞতাবশত বিভ্রান্ত করেছে।"
আল্লাহ কর্তৃক বান্দাকে স্মরণ
[৬৬৬] শাকিক বলেন, وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ "আল্লাহ তাআলার স্মরণই শ্রেষ্ঠ” এই আয়াতটির ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “বান্দার আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করার চেয়ে আল্লাহ তাআলার বান্দার স্মরণ (উল্লেখ) করা শ্রেষ্ঠ।”
আল্লাহর দিকে হাত উত্তোলন করে দোয়া করা
[৬৬৭] খালিদ বিন মা'দান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "অবশ্যই তোমারা তোমাদের হাতগুলো আল্লাহ তাআলার দিকে উত্তোলন করবে, তা না হলে তিনি হাতগুলোতে বেড়ি পরিয়ে দেবেন।"
ইবাদতের আলামত মানুষকে না দেখানো
[৬৬৮] আবু ইদরিস-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু- একজন মহিলার দুই চোখের মাঝখানে (কপালে) ছাগলের হাঁটুর গিরার (দাগের) মতো একটি দাগ দেখলেন। দেখে বললেন, “এই দাগ যদি তোমার কপালে না থাকতো তাহলে তা তোমার জন্য উত্তম হতো।” (মানে কপালে সিজদার দাগ।)
মা-বাবার ঘরে প্রবেশ করতে হলেও অনুমতি লাগবে
[৬৬৯] আবুস সাবিল বলেন, আমি সিলাহ বিন আশইয়াম-রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করলাম, “মা-বাবার ঘরে প্রবেশ করতে হলেও কি তাদের থেকে অনুমতি চাইতে হবে?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ।”
অলৌকিক রুমালটি তাঁদের কাছেই ছিলো
[৬৭০] হাফসা বিনতে সিরিন বলেন, মুআযাতা আল-আদাবিয়্যাহ-রাহিমাহাল্লাহ-বলেছেন, “সিলাহ বিন আশইয়াম-রাহিমাহুল্লাহ- শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর অলৌকিকভাবে পাওয়া রুমালটি আমাদের কাছেই ছিলো। তিনি শহীদ হওয়ার পর আমরা তা হারিয়ে ফেলেছি।"
জাহান্নামের ভয়ে তিনি ঘুমাতে পারেন না
[৬৭১] মালিক বিন দিনার বলেন, আমের বিন কায়স-রাহিমাহুল্লাহ-কে তাঁর কন্যা জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, কী ব্যাপার, অন্য মানুষদের ঘুমাতে দেখি, কিন্তু আপনাকে ঘুমাতে দেখি না?” তিনি বললেন, “হে আমার প্রিয় কন্যা, জাহান্নামের ভয় তোমার পিতাকে ঘুমাতে দেয় না।"
টিকাঃ
৭৯. মধু ও ঘির মিশ্রণে তৈরি পানীয়
৮০. সূরা ইখলাস (১১২): আয়াত ১।
৮১. সূরা সাবা (৩৪): আয়াত ৫৪।
৮২. সূরা আরাফ (০৭): আয়াত ৫০।
৮৩. একজাতীয় উদ্ভিদের শেকড় দিয়ে তৈরি নির্যাস।
৮৪. রুটি আর গোশতের মিশেলে তৈরি একপ্রকার খাদ্য। (সম্পাদক)
৮৫. সূরা মুতাফফিফিন (৮৩): আয়াত ১।
৮৬. সূরা মুতাফফিফিন (৮৩): আয়াত ৬।
৮৭. সূরা বাকারা (০২): আয়াত ২৮৪।
৮৮. সূরা হাদীদ (৫৭): আয়াত ২৩
৮৯. সূরা আলে ইমরান (০৩): আয়াত ৯২
৯০. নিমার )التار( : সাধারণ অর্থ: নেকড়ের চামড়া। বিশেষ অর্থ: জামা ও সালোয়ার একসঙ্গে সেলাই করে তৈরিকৃত পোশাক।
৯১. উপমহাসাগরীয় অঞ্চলে রান্নায় ব্যবহৃত একধরনের সবজি। ইংরজেতে বলে Chard
৯২. সহীহ ইবনে হিব্বান: ১৯২৮, মুসনাদে আবী ইয়ালা: ৬৬৫৮, সনদ সহীহ
৯৩. মুসনাদে আহমাদ: ১০০১৭, সনদ সহীহ
৯৪. সূরা সাজদা (৪১): আয়াত ১৭।
৯৫. আবু দাউদ: ২৬০১, সনদ সহীহ
৯৬. আসসুনানুল কুবরা, বাইহাকী: ১৪৫৮৭
৯৭. সাওমুদ দাহর: যেসব দিনে রোযা রাখা নিষিদ্ধ সেসব দিন ছাড়া বাকি দিনগুলোতে ধারাবাহিক রোযা রাখাকে সাওমুদ দাহর বলে। একে সাওমুল আবাদও বলা হয়। সাওmuদ দাহরের হুকুম নিয়ে মতভেদ আছে।
৯৮. আ'রাফ: জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থান।
৯৯. যঈফা আবদুল্লাহ বিন যার আল-গুয়ানির সানাদকালে ফেতনা প্রসঙ্গে।
১০০. আল-আওয়ায : ১. এমন এলাকা যেখানে গরিব-মিসকিনরা সমবেত হয়। ২. ইরাকের বসরা ও ইরানের মধ্যবর্তী এলাকাসমূহ
১০১. পুরো নাম: ফাৎহ বিন মুহাম্মদ বিন ওয়াশশাহ আল-আযদি আল-মুসিলি। তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ বুযুর্গ ও ওলি। তিনি আতা বিন আবু রাবাহ-রাহিমাহুল্লাহ- থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। আর তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন আল-মাআফি বিন ইমরান, মুহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আত-তাফাবি।
১০২. সূরা কাফ (৫০): আয়াত ৩৫
১০৩. আবু নুআঈমের হিলয়াতুল আউলিয়াতে এটি উল্লেখিত হয়েছে ইমাম আহমাদের সনদে (১/২৫) হাদীসটির সনদ যঈফ। কারণ, এতে সুফিয়ান ইবনে ওকী নামে একজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন। (সম্পাদক)
১০৪. আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফতকালে হারুরিয়্যাহ সম্প্রদায়ের ফেতনা তীব্র হয়ে উঠেছিলো। কুফার হারুরা অঞ্চলে তাদের ঘাঁটি ছিলো বলে তাদের হারুরিয়্যা বলা হতো। তারা আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলো। এরা খারিজিদের অন্তর্গত।
১০৫. সূরা হাককাহ (৬৯): আয়াত ২৩।
১০৬. সূরা আলে ইমরান (০৩): আয়াত ৯২।
১০৭. তিন ব্যক্তির অবস্থাসহ পুরো হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে মাওয়ারিদুয যামআন গ্রন্থে। হাদীস নং: ২৫৬৮, সনদ সহীহ। হাদীসের প্রথম অংশটি বিখ্যাত অনেক হাদীসগ্রন্থেই বর্ণিত হয়েছে, তবে যেখানে জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী ধনী লোকের পরিবর্তে নারীরা হওয়ার কথা বলা হয়েছে। দেখুন: বুখারী: ৩২৪১; মুসলিম: ২৭৩৭; তিরমিজি: ২৬০২; মুসনাদে আহমাদ: ২০৮৬ (সম্পাদক)
১০৮. আয়েশা ও উম্মে সালমা-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকেও অনুরূপ হাদীস বর্ণিত হয়েছে, দেখুন, তিরমিজি: ২৮৫৬; সহীহ ইবনে খুযাইমা: ১৬২৬; আলমুজামুল কবীর: ৫১৪
১০৯. মুসনাদে আহমাদ: ২৭৪৩৪; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ: ২৫৩৯৭; সনদ যঈফ (সম্পাদক)
১১০. তিরমিজি: ২৪৫২; আলমুজামুল কাবীর: ৩৪৯৩
১১১. সূরা বনি ইসরাঈল (১৭): আয়াত ২৫।
১১২. এটি ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-রাসূলুল্লাহু-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-থেকে বর্ণনা করেন তিরমিজি: ৩৪২৮, সনদ হাসান (সম্পাদক)
১১৩. মুসনাদে আহমাদ: ১১০৩; সনদ হাসান
১১৪. ইবনে মাজাহ: ২২৭; মুসনাদে আহমাদ: ২২৩৭৮; সনদ সহীহ
১১৫. বুখারী: ৭৫৩৪; মুসলিম, ১৩৭; মুসনাদে আহমাদ: ৪২৪৩
১১৬. মুসনাদে আহমাদ: ১৯৫৫৯; মুস্তাদারাকে হাকেম: ৮০৬৩; সনদ হাসান
১১৭. আবু দাউদ: ৪৮৭৩; সহীহ ইবনে হিব্বান: ৫৭৫৬; সনদ সহীহ (সম্পাদক)
১১৮. ইবনে মাজাহ: ২৭০৬; সনদ সহীহ
১১৯. সূরা শুআরা (২৬): আয়াত ৮৯।
১২০. সূরা মুযযাম্মিল (৭৩): আয়াত ৮।
১২১. সূরা নাহল (১৬): আয়াত ২৫।