📄 উন্মুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর চোখে দুনিয়া
দুনিয়া যেনো তোমাদের নিয়ে না খেলে
[৩৮০] বনি তামীম গোত্রের আবু হাযযার নামের এক শায়খ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উন্মুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহা—আমাকে বললেন, হে আবু হাযযার, খাটিয়ার ওপর রাখা মৃত ব্যক্তি কী বলে সেটা কি আমি তোমাকে বলবো না? আমি বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি বললেন, “সে বলে, হে আমার পরিবার, হে আমার প্রতিবেশীরা, হে আমার খাটিয়ার বহনকারীরা, দুনিয়া যেনো তোমাদের ধোঁকায় না ফেলে যেভাবে আমাকে ধোঁকায় ফেলেছে। দুনিয়া তোমাদের নিয়ে যেনো না খেলে যেভাবে আমাকে নিয়ে খেলেছে। আমার পরিবার আমার পাপসমূহের সামান্য অংশও বহন করবে না (দায়ভার নেবে না)। আজ তারা আমাকে বেষ্টন করে আছে, অথচ কিয়ামতের আল্লাহ তাআলার সামনে যুক্তিতর্কে তারা আমাকে হারিয়ে দেবে।” উম্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা—আরও বললেন, “দুনিয়া কোনো বান্দার অন্তরকে মোহগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে হারুত ও মারুতের চেয়েও অধিক শক্তিশালী। কোনো বান্দা যদি দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয় তবে দুনিয়া তার গাল ভেঙে দেয়।"
প্রতিটি কর্মে ইবাদতকে অনুসন্ধান করা
[৩৮১] আওন বিন আবদুল্লাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমরা উম্মুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর কাছে বসতাম। তাঁর কাছে বসে আমরা আল্লাহ তাআলার যিকির করতাম। সবাই একদিন তাঁকে বললেন, আমরা মনে হয় আপনাকে বিরক্ত করে ফেলেছি। তিনি বললেন, “তোমরা দাবি করছো যে তোমরা আমাকে বিরক্ত করে ফেলেছো। অথচ আমি প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর ইবাদতের অনুসন্ধান করি। আমি যিকিরের মজলিসের চেয়ে আমার চিত্তকে প্রশান্তকারী এবং আমার দীনপালনের ক্ষেত্রে অধিক উপযুক্ত আর কিছু পাইনি।"
টিকাঃ
৫৭. হারুত ও মারুত দুইজন ফেরেশতার নাম। বনী ইসরাঈলের মানুষদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যাদেরকে যাদুবিদ্যা দিয়ে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন। (সম্পাদক)
📄 আলী ইবনুল হুসাইন—রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
একশো পরিবারের ভরণপোষণ করতেন
[৩৮২] শাইবা বিন নাআমাতা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আলী ইবনুল হুসাইন-রাহিমাহুল্লাহ-কৃপণতা করতেন। কিন্তু তাঁর ইন্তেকালের পর সবাই দেখতে পেলো যে, তিনি মদিনায় একশো পরিবারের ভরণপোষণ করতেন।” বর্ণনাকারী বলেন, জারীর বিন আবদুল হামীম ইদানীং বা পূর্বে বলেছেন, "আলী ইবনুল হুসাইন-রাহিমাহুল্লাহ-মৃত্যুবরণ করার পর সবাই তাঁর পিঠে কিছু দাগ দেখতে পেলো; দাগগুলো ছিলো তিনি গরিব-মিসকিনদের জন্য যেসব ঝুলি বহন করে নিয়ে যেতেন সেগুলোর।"
হাশেমি বংশে তিনি ছিলেন মহত্তর
[৩৮৩] সুফয়ান ইবনে উয়াইনাহ থেকে বর্ণিত, ইমাম যুহরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আমি হাশেমি বংশের মধ্যে আলী ইবনুল হুসাইন-রাহিমাহুল্লাহ-এর চেয়ে মহত্তর কাউকে দেখিনি। তাঁদের সকলের ওপর আল্লাহ তাআলার শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক।"
দান করার আগে ভিক্ষুকের হাতে চুমু খেতেন
[৩৮৪] আবুল মিনহাল আত-তায়ি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আলী ইবনুল হুসাইন-রাহيمাহুল্লাহ-যখন কোনো ভিক্ষুক বা প্রার্থনাকারীকে দান-সাদকা করতেন, তখন আগে তাকে চুমু খেতেন, তারপর দান-সাদকা করতেন।"
অট্টহাসির ফলে জ্ঞান হ্রাস পায়
[৩৮৫] ফুযাইল বিন গাযওয়ান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আলী ইবনুল হুসাইন-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "যে-ব্যক্তি এক বার অট্টহাসি হাসলো সে এক কুলি পরিমাণ জ্ঞান ফেলে দিলো।"
নিজ হাতে গরিব-মিসকিনকে দান করতেন
[৩৮৬] আবুল মিনহাল আত-তায়ি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আমি আলী ইবনুল হুসাইন-রাহিমাহুল্লাহ-কে দেখেছি, তিনি নিজ হাতে গরিব-মিসকিনকে দান করছেন।"
দান-সাদকা আল্লাহর ক্রোধ নির্বাপিত করে
[৩৮৭] আবু হামযা আস-সুমালি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আলী ইবনুল হুসাইন-রাহিমাহুল্লাহ-নিজে রুটির ঝুলি বহন করে নিয়ে যেতেন এবং বলতেন, "রাতের বেলা যে-সাদকা করা হয় তা মহান রাব্বুল আলামীনের ক্রোধ নির্বাপিত করে।"
তাঁর মৃত্যুর পর তাদের খোরপোশ বন্ধ হয়ে গেলো
[৩৮৮] মুহাম্মদ বিন ইসহাক-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, মদিনার বাসিন্দাদের মধ্যে অনেক মানুষ খোরপোশ পেতো ঠিক, কিন্তু তারা জানতো না যে কোথা থেকে তাদের খורপোশ আসছে। যখন আলী ইবনুল হুসাইন-রাহিমাহুল্লাহ-মৃত্যুবরণ করলেন তখন তাদের কাছে রাতের বেলা যে-খোরপোশ আসতো সেটা আসা বন্ধ হয়ে গেলো।"
উপকারী ইলম পাওয়ার উপযুক্ত নয়
[৩৮৯] মিসআর বলেন, আবদুল আ'লা আত-তাইমি-রাহিমাহুল্লাহ-আমাকে বলেছেন, "যাকে ইলম দান করা হয়েছে, অথচ ওই ইলম তাকে কাঁদায় না, তাহলে সে উপকারী ইলম পাওয়ার উপযুক্তই নয়।"
বিনয় ও নম্রতা বাড়ানোর নির্দেশ
[৩৯০] মিসআর বলেন, আবদুল আ'লা আত-তাইমি-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর সিজদায় বলতেন, হে আমার প্রতিপালক, তুমি তোমার প্রতি আমাদের বিনয় ও নম্রতা বাড়িয়ে দাও, যেভাবে তোমার শত্রুরা ঘৃণা বাড়িয়ে দিয়েছে। হে আমার প্রতিপালক, তোমার উদ্দেশে সিজদাবনত হওয়ার পর তুমি আমাদের উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ কোরো না।"
তরবারি উঁচু করে ধরে রাখা অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবে
[৩৯১] সুফয়ান সাওরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, ইয়াহইয়া বিন হানি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "শাহাদাতবরণকারী ব্যক্তি তার তরবারি উঁচু করে ধরে রাখা অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবে।"
অহংকার অসৎকাজ বাড়িয়ে দেয়
[৩৯২] খালাফ বিন খলীফা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, মানসুর বিন যাযান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "দুশ্চিন্তা ও দুঃখ সৎকাজ বাড়িয়ে দেয় এবং পাপাচার ও আত্মম্ভরিতা অসৎকাজ বাড়িয়ে দেয়।"
দিনে-রাতে তিন বার কুরআন খতম করতেন
[৩৯৩] মুহাম্মদ বিন ফুযাইল বিন গাযওয়ান তাঁর পিতা ফুযাইল থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "কুরয-রাহিমাহুল্লাহ-এর মেয়ে তাঁর কাছে গেলেন। তিনি তাঁর কাছে একটি জায়নামায দেখতে পেলেন, যাতে তিনি শুকনো ঘাস ভরে নিয়েছেন। দীর্ঘক্ষণ নামায পড়ার কারণে তিনি জায়নামাযটির ওপর একটি চাদর বিছিয়ে নিয়েছেন। তিনি দিন ও রাত মিলিয়ে তিন বার কুরআনুল কারীম খতম করতেন। মিহরাবে তিনি একটি লাঠি রাখতেন। যখন তন্দ্রাচ্ছন্ন হতেন তখন এই লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন।" মুহাম্মদ বিন ফুযাইল তাঁর থেকে অথবা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, কুরয-রাহিমাহুল্লাহ-যখন বাইরে বেরুতেন, লোকদের সৎকাজের আদেশ করতেন। ফলে তারা তাঁকে, এমনভাবে পেটাতো যে একসময় তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়তেন।"
পরিচ্ছন্ন ভূমি পেলেই নামায পড়তেন
[৩৯৪] সুফয়ান সাওরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে শুবরুমাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "আমি একটি সফরে কুরয-রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি যখনই পরিচ্ছন্ন ভূমি পেতেন, সেখানে নামতেন এবং নামায পড়তেন।"
দিনে দুই লাখ বার তাসবিহ পাঠ
[৩৯৫] সাঈদ বিন আবদুল আযিয বলেন, আমি মারুফ বিন হানি-রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, আমি দেখছি যে আপনার জিহ্বা কখনো আল্লাহ তাআলার যিকির থেকে বিরত হয় না। তাহলে আপনি দিনে কত বার তাসবিহ পাঠ করেন? তিনি বললেন, "দুই লাখ বার। তবে আমার আঙুল যদি গোনায় ভুল করে সেটা ভিন্ন কথা।"
যিনি ইলম অনুযায়ী আমল করেন তিনিই ভালো আলেম
[৩৯৬] আবু মা'মার বলেন, সুফ্যান বিন উইয়াইনাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "যিনি মন্দ বিষয়গুলো থেকে কল্যাণকর ও ভালো বিষয়গুলোকে আলাদা করতে পারেন তিনিই আলেম নন; বরং আলেম হলেন ওই ব্যক্তি যিনি কল্যাণকর ও ভালো বিষয়গুলো জানেন এবং সেগুলোর অনুসরণ করেন এবং মন্দ বিষয়গুলো জানেন ও সেগুলো থেকে দূরত্বে সরে থাকেন।"
শয়তানের আফসোস
[৩৯৭] মালিক বিন মিগওয়াল বলেন, আবদুল্লাহ আযিয বিন রাফি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "যখন মুমিনের আত্মা ঊর্ধ্বাকাশে পৌঁছে যায় তখন ফেরেশতাগণ-আলাইহিমুস সালাম বলেন, সপ্রশংস মহিমা ওই সত্তার যিনি এই বান্দাকে শয়তান থেকে উদ্ধার করেছেন।" কিন্তু শয়তান তখন বলে, "হায় আফসোস, কীভাবে সে মুক্তি পেলো!"
দুনিয়াতে আখেরাতের পুণ্য সঞ্চয়ের কথা ভুলে যেয়ো না
[৩৯৮] মুবারক বিন সাঈদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, শায়খ মানসুর বিন মু'তামার বিন আবদুল্লাহ-রাহিমাহুল্লাহ-পবিত্র কুরআনের
وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا
"এবং দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না” আয়াতের ব্যাখ্যা বলেন, "এটা দুনিয়ার (সম্পদসমূহের) কোনো অংশ নয়; বরং সেই অংশ হলো তোমার জীবন, তুমি তাতে আখেরাতের পুণ্য সঞ্চয় করবে।"
জ্ঞানের শিক্ষক বরকতময়
[৩৯৯] লাইস বিন আইমান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন,
وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ
"আমি যেখানেই থাকি না কেন, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন।” এই আয়াতটির ব্যাখ্যায় মুজাহিদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "বরকতময় কথাটির অর্থ হলো কল্যাণের (কল্যাণকর জ্ঞানের) শিক্ষক।"
মুমিন বান্দা ধৈর্যশক্তিতে অটল থাকে
[৪০০] আবদুর রহমান বিন আমর আল-আওযায়ি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমি উবায়দুল্লাহ বিন আবু লুবাবা-রাহিমাহুল্লাহ-কে কা'বা শরীফে তাওয়াফ করতে দেখলাম। তিনি তখন দুর্বল ছিলেন। আমি তাঁকে বললাম, আপনি যদি নিজের প্রতি একটু মমতা দেখাতেন! জবাবে তিনি বললেন, “কে মুমিন বান্দা সেটা তার ধৈর্যশক্তি দ্বারা নির্ণীত হয়।"
আল্লাহর সামনে ফলকে যা লেখা আছে
[৪০১] সাঈদ বিন আবদুল আযিয-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, ইউনুস বিন মাইসারাহ বিন হালবাস-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, আল্লাহ তাআলার সামনে ফলকে লেখা আছে:
إِنِّي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ، أَرْحَمُ وَأَتَرَحَمُ، سَبَقَتْ رَحْمَتِي غَضَبِي وَعَفْوِي عُقُوبَتِي، وَأَذِنْتُ لِمَنْ جَاءَ بِوَاحِدَةٍ مِنْ ثَلَاثِينَ وَثَلَاثِمِائَةَ أَنْ أُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ
“আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমি পরম করুণাময়, দয়ালু। আমি দয়া করি, অনুগ্রহ করি। আমার রহমত আমার ক্রোধকে অতিক্রম করে গেছে এবং আমার ক্ষমা আমার শাস্তিকে ছাড়িয়ে গেছে। আমি এই অনুগ্রহ করেছি যে, যে-ব্যক্তি তিনশো তিরিশটির কোনো একটি নিয়ে উপস্থিত হবে আমি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করবো।"
কুরআন ও মৃত্যু পাপাচার নিবৃত্ত রাখে
[৪০২] আবু আফফান বলেন, আমি ইয়াযিদ বিন তামীম-রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “যে-ব্যক্তিকে পবিত্র কুরআন এবং (অন্য মানুষের) মৃত্যু (পাপাচার থেকে) নিবৃত্ত করতে পারলো না, তার সামনে যদি সারিবদ্ধভাবে পাহাড়ও দণ্ডায়মান থাকে, তবু সে পাপাচার থেকে নিবৃত্ত হবে না।"
বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন
[৪০৩] আবু যুরআ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উমাইয়া খলীফা সুলাইমান তাঁর পুত্র যুবরাজ আইয়ুবের সঙ্গে হানি বিন কুলসুমের কন্যাকে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন তাঁর কাছে। কিন্তু হানি বিন কুলসুম এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি পরিবারের কাছে ফিরে এলেন এবং তাঁর চাচাতো ভাইকে ডেকে পাঠালেন। তার কাছে তাঁর কন্যাকে বিয়ে দিয়ে দিলেন। এই সংবাদ শুনে সুলাইমান বললেন, "তিনি যদি আমার কাছে দুনিয়াও চাইতেন, তবু আমি আমার পুত্রকে তাঁর কন্যার সঙ্গে বিয়ে দিতাম।"
তিনি আয়তলোচনা হুর দেখেছিলেন
[৪০৪] আমর বিন আবু সালামা বলেন, আমি সাঈদ বিন আবদুল আযিয-রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, "আমরা এমন কাউকে জানতাম না যিনি স্বপ্ন ছাড়া নিজ চোখে সরাসরি আয়তলোচনা হুর দেখেছেন। তবে আমরা আবু মাখরামাহ থেকে যা শুনেছি তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তা এই যে, তিনি একদিন কোনো এক প্রয়োজনে প্রবেশ করলেন। তিনি হুরদের তাদের পালকির ওপর ও খাটের ওপর দেখতে পেলেন। তিনি তাদের দেখামাত্রই তাদের থেকে তাঁর চোখ ঘুরিয়ে নিলেন। একজন হুর তখন বললো, 'হে আবু মাখরামাহ, আমার কাছে আসুন; আমি আপনার স্ত্রী। আর এ হলো অমুকের স্ত্রী।' তৎক্ষণাৎ তিনি তাঁর সঙ্গীদের কাছে বেরিয়ে আসেন এবং তাঁদের এই সংবাদ জানান। তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের ওসিয়ত লেখেন। বর্ণনাকারী বলেন, ওখানে যতো জন ওসিয়ত লিখেছিলেন তাঁদের প্রত্যেকেই শাহাদাতবরণ করেন।"
বিশ বছর যাবৎ জিহ্বার চিকিৎসা
[৪০৫] আবদুর রহমান বিন আমর আল-আওযায়ি -রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সিরিয়ায় ইবনে আবু যাকারিয়া-রাহিমাহুল্লাহ-এর চেয়ে মর্যাদাবান কোনো ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি বলেছেন, "আমি বিশ বছর যাবৎ আমার জিহ্বার চিকিৎসা (সংশোধন) করার পর সে আমার অনুগত হয়েছে।"
তখন রাজতন্ত্রের উদ্ভব ঘটবে
[৪০৬] হুমাইদ বিন হিলাল বলেন, খালিদ বিন উমায়ের-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, উতবা বিন গাযওয়ান-রাদিয়াল্লাহু আনহু খুতবা দিলেন: আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করলেন, তারপর বললেন, তারপর কথা এই যে, দুনিয়া তো বিচ্ছেদের অনুমতি নিয়েছে এবং দ্রুতগতিতে বিনাশের পথে ধাবমান রয়েছে। তোমাদের কেউ যখন পাত্রের পানি ফেলে দেয়, তারপর পাত্রে যতোটুকু পানি অবশিষ্ট থাকে, দুনিয়ারও ঠিক ততোটুকুই অবশিষ্ট রয়েছে। তোমরা এমন এক আবাসস্থলের দিকে ধাবিত হচ্ছো যার কোনো ধ্বংস নেই। সুতরাং তোমাদের কাছে উত্তম যা-কিছু রয়েছে তা নিয়েই দুনিয়া থেকে বিদায়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করো। আমার কাছে এই সংবাদ পৌঁছেছে যে, জাহান্নামের মুখ থেকে একটি পাথর নিচে পড়তে শুরু করলে তা সত্তর বছরের গভীরতায় গিয়ে পৌঁছেছে। এবং অবশ্যই এই জাহান্নাম (মানবমণ্ডলী দ্বারা) পূর্ণ হবে। তোমরা কি আশ্চর্যান্বিত হচ্ছো! তবে জেনে রাখো, আমার কাছে এই বর্ণনাও পৌঁছেছে যে, জান্নাতের দরজার দুটি পাল্লার মধ্যে চল্লিশ বছরের দূরত্ব রয়েছে। এমন একদিন আসবে যখন এই দরজায় প্রচণ্ড ভিড় লেগে যাবে। আমি নিজেকে এই অবস্থায় মনে করতে পারি যে, (মক্কাবাসীদের অবরোধ আরোপের সময় আবু তালিব গিরিখাদে) রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে যে-সাত জন ছিলেন আমি তাদের সপ্তম জন। তখন গাছের পাতা ছাড়া আমাদের আর কোনো খাবার ছিলো না। গাছের পাতা খেতে খেতে আমাদের চোয়াল ক্ষতযুক্ত হয়ে পড়েছিলো। আমি একটি চাদর কুড়িয়ে পেয়েছিলাম; আমি সেটাকে আমার মধ্যে ও সা'দের মধ্যে ভাগ করে নিলাম। তার অর্ধেকটা দিয়ে আমি লুঙ্গি বানিয়ে পরলাম; বাকি অর্ধেক দিয়ে সা'দ লুঙ্গি বানিয়ে পরলেন। এখন আমাদের (ওই সাত জনের) মধ্যে যাঁরা জীবিত আছেন তাঁদের প্রত্যেকেই কোনো-না-কোনো শহরের আমীর। আমি আল্লাহ তাআলার কাছে পানাহ চাই নিজেকে বড় মনে করা থেকে এবং আল্লাহ তাআলার কাছে ছোট হওয়া থেকে। বিষয় তো এই যে, নবুওতের শিক্ষা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং তার পরিণতিরূপে (খিলাফতের পরিবর্তে) রাজতন্ত্রের উদ্ভব ঘটবে। আমাদের পরে তোমরা অবশ্যই ফেতনায় আক্রান্ত হবে এবং আমীর-উমারাদের শাসনের অভিজ্ঞতা লাভ করবে।"
সেই যুগে অবৈধ কাজকেও বৈধ মনে করা হবে
[৪০৭] আমর বিন মুররাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আদি বিন হাতিম-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমরা বর্তমান সময়ে এমন একটি যুগে আছো যখন বৈধ কাজকেও অবৈধ মনে করা হয়। এই যুগ সত্বর অতিবাহিত হয়ে যাবে। তারপর এমন যুগ আসবে যখন অবৈধ ও খারাপ কাজকেও বৈধ ও ভালো মনে করা হবে।"
তিনি সব সময় নামাযের প্রতি আগ্রহী থাকতেন
[৪০৮] আমর বিন মুররাহ-রাহيمাহুল্লাহ-বলেন, আদি বিন হাতিম-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "কখনো এমন হয়নি যে, নামাযের সময় হয়েছে অথচ আমি নামাযে প্রতি আগ্রহী ছিলাম না।"
বিত্তশালী হওয়ার পরও তিনি বাসি রুটি খেতেন
[৪০৯] সাঈদ বিন শাইবান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমাকে যিনি বর্ণনা করেছেন তিনি দেখেছেন, "আদি বিন হাতিম -রাদিয়াল্লাহু আনহু - বাসি শুকনো রুটি (খাওয়ার জন্য) টুকরো টুকরো করছেন।"
তাড়াহুড়ো করে নামায পড়ার কারণে তিরস্কার
[৪১০] মাইমুন বিন মিহরান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, একজন মুহাজির সাহাবি - রাদিয়াল্লাহু আনহু - এক ব্যক্তিকে নামায পড়তে দেখলেন। লোকটি খুব সংক্ষিপ্তভাবে নামায শেষ করলো। ফলে মুহাজির সাহাবি তাকে তিরস্কার করলেন। লোকটি বললো, আমার একটি হারানো জিনিসের কথা মনে পড়ে গেছে, তাই নামায সংক্ষিপ্ত করেছি। তখন মুহাজির সাহাবি বললেন, "তুমি সবচেয়ে বড় হারানো জিনিস খুইয়ে ফেলেছো।"
একটি কারামত ও আল্লাহর নিদর্শন
[৪১১] কুদামা বিন হামাতা ইবনে উখুতি সাহম বিন মিনজাব বলেন, আমি সাহম বিন মিনজাবকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, "আমরা আলা বিন আল-হাদরামী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে দারিন-এ যুদ্ধ করি। তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে তিনটি দোয়া করলেন। এবং তাঁর তিনটি দোয়াই কবুল করা হলো। আমরা একটি মনযিলে শিবির স্থাপন করলাম। তিনি ওজু করার জন্য পানি চাইলেন। কিন্তু পানি পাওয়া গেলো না। ফলে তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং দুই রাকাত নামায পড়লেন। তারপর এই দোয়া করলেন, "হে আল্লাহ, আমরা তো আপনার বান্দা। আমরা আপনার পথে আপনার শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করি। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের বৃষ্টির পানি পান করান (আমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করুন)। আমরা ওই পানি পান করবো এবং ওজু করবো। আমাদের ওজু করার পর তাতে আর কারও জন্য কোনো অংশ থাকবে না।" আমরা একটু সামনে এগিয়ে গেলাম এবং পানি পেলাম। এইমাত্র আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করেছে। আমরা ওই পানি ওজু করলাম এবং সঙ্গে করেও নিয়ে নিলাম। আমি আমার একটি ছোট চামড়ার পাত্র পানি দ্বারা ভরলাম এবং ওই স্থানে রেখে দিলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিলো এটা দেখা যে, তাঁর দয়া কবুল হয়েছে না-কি হয় নি। আমরা কিছুদূর এগিয়ে গেলাম। তারপর আমার সঙ্গীদের বললাম, আমি আমার একটি পাত্র ভুলে রেখে এসেছি। সুতরাং আমি ওই স্থানে ফিরে এলাম। তো দেখতে পেলাম যে, ওখানে যেনো কোনো কুঠো পানিও ছিলো না। তারপর আমরা আবার চলতে শুরু করলাম এবং দারিম-এর এসে পৌঁছালাম। আমাদের ও শব্দের মধ্যে সমুদ্র বাধা হয়ে দাঁড়ালো! আ'লা বিন আল-হাদরামী -রাদিয়াল্লাহু আনহু- দ্বিতীয় বার দোয়া করলেন: "হে আল্লাহ, আপনি প্রতাপম্ন, আপনি সর্বোচ্চ সত্তা, আপনি মহান; আমরা তো আপনার বান্দা, আপনার পথে আপনার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। হে আল্লাহ, আমাদের জন্য তাদের কাছে পৌঁছার পথ করে দাও।" সমুদ্রের ঢেউ তখন আমাদেরে বহন করে ফেললো। আমরা ঘোড়ার জিন (ঘোড়ার পিঠের ওপর যে নরম গদি থাকে) পর্যন্ত সমুদ্রে পানিতে ডুবে গেলাম। এভাবে ওপর তীরে শত্রুদের কাছে গিয়ে পৌঁছালাম। আমাদের ফিরে আসার সময় আ'লা বিন আল-হাদরামী-রাদিয়াল্লাহু আনহু- পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হলেন। ওই রোগীই তিনি মুয়াবরণ করলেন। তাঁকে গোসল করানোর জন্য পানি খুঁজলাম, কিন্তু পেলাম না। আমরা তাঁর কাপড়ের তাঁর কাপড়ের তাঁকে কাফন করালাম এবং দাফন করে দিলাম। তারপর আমরা কিছুদূর এগিয়ে গেলাম। ওখানে অনেক পানি পেলাম। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বললো, আমরা যদি পেছনে ফিরে গিয়ে তাঁকে কবর থেকে তুলে যদি গোসল দিতে তাহলে ভালো হয়। আমরা পেছনে ফিরে গেলাম এবং তাঁর লাশ খুঁজলাম। কিন্তু পেলামই না। তখন আমাদের দলের একজন ব্যক্তি বললো, আমি তাঁকে এই দোয়া করতে শুনেছি, (দ্বিতীয় দোয়া), তিনি বলেছেন, “হে আল্লাহ, হে সর্বোচ্চ সত্তা, হে প্রতাপম্ন, হে মহান, আমার মুখাপেক্ষীবাদের তাঁদের (শত্রুদের) থেকে গোপন করে রেখো (বা অনুগ্রহ কোনো কথা বলেছেন)। এবং কাউকে আমার হুকুম দেখার সুযোগ দিও না।" আমরা তাঁর জন্য ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পাঠ করলাম এবং তাঁকে রেখেই ফিরে এলাম।"
ইবাদত করতে না পারার জন্য অশেষ আফসোস
[৪১২] মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান -রাহিমাহ্-বলেন, বিলাল বিন আবুল দারদা-রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, তাঁর মা আসসামাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহা অন্ধ হয়ে পড়েছিলেন। একদিন তাঁর পুত্র তাঁর কাছে গেলেন। ইতোমধ্যে তিনি নামায পড়ে নিয়েছিলেন। আসসামাহ জিজ্ঞেস করলেন, হে প্রিয়পুত্র, তুমি কি নামায পড়েছো? তিনি বললেন, হ্যাঁ, পড়েছি। তখন আসসামাহ নিম্নলিখিত কবিতাটি আবৃত্তি করলেন:
عَنَّامُ مَالَكِ لَاهِيَهُ ، حَلَّتْ بِدَارِكِ دَاهِيَهْ ابْكِي الصَّلَاةَ لِوَقْتِهَا . إِنْ كُنْتِ يَوْمًا بَاكِيَهْ وَابْكِ الْقُرَانَ إِذَا تُلِي . قَدْ كُنْتِ يَوْمًا تَالِيَهْ تَتْلِينَهُ بِتَفَكَّرٍ. وَدُمُوعُ عَيْنِكِ جَارِيَهُ فَالْيَوْمَ لَا تَتْلِينَهُ ، إِلَّا وَعِنْدَكَ تَالِيَهْ لَهْفِي عَلَيْكِ صَبَابَةً . مَا عِشْتُ طُولَ حَيَاتِيَهُ
"হে আসসাম, কী হলো তোমার, তুমি তো গাফেল হয়ে পড়েছো! তোমার গৃহে তো দুর্যোগ নেমে এসেছে।"
"সময়মতো নামাযের (নামায না পড়ার) জন্য কাঁদো যদি তুমি কোনোদিন কেঁদে থাকো।”
"কুরআনের জন্য কাঁদো, যখন তা তেলাওয়াত করা হয় তুমিও তো একদিন কুরআন তেলাওয়াতকারী ছিলে।"
"তুমি চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে কুরাআন তিলাওয়াত করতে এবং তোমার চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হতো।"
"আজ তুমি কুরআন তেলাওয়াত করতে পারো না তবে তোমার কাছে তেলাওয়াতকারী রয়েছে।"
"তোমর প্রতি আমার অশেষ আফসোস যতোদিন তুমি বেঁচে থাকো।"
শপথ ভঙ্গ করে মক্কা পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছেন
[৪১৩] আমর বিন আবু সালামা-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, সাঈদ বিন আবদুল আযিয-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "আমরা বিলাল বিন আবুদ দারদার মা আসসামাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহা-ছাড়া এমন কাউকে জানি না যিনি মক্কায় হেঁটে যাওয়ার ব্যাপারে শপথ ভঙ্গ করেছেন এবং তা (কাফফারা আদায়) পূর্ণ করেছেন। তিনি শপথ ভঙ্গ করেছেন এবং মক্কা পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছেন। পাঁচশো দিনার দানও করেছেন। (উদাহরণ: আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, যদি আমি অমুক কাজটি করতে না পারি তবে মক্কা পর্যন্ত হেঁটে যাবো।)
তাঁরা রাতের শুরুর ভাগে ও শেষভাগে নামায পড়তেন
[৪১৪] সালামা বিন ইয়াহইয়া-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, তাঁর ফুফু উম্মে ইসহাক বিনতে তালহা-রাহিমাহাল্লাহ-বলেছেন, "হাসান বিন আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-রাতের শুরুভাগেই রাতের নামায (তাহাজ্জুদ) আদায় করতেন এবং "হুসাইন বিন আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-রাতের শেষভাগে রাতের নামায (তাহাজ্জুদ) আদায় করতেন।"
[৪১৫] জা'ফর বিন আওন-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, মিসআর বলেন, যিনি আমাকে জানিয়েছেন তিনি বলেছেন, "হুসাইন বিন আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা- একবার দরিদ্রদের পাশ দিয়ে গেলেন। তখন তিনি তাদের সঙ্গে বসলেন। তারপর কুরআনের এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন:
إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْتَكْبِرِينَ
"নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা অহংকারী দাম্ভিকদের পছন্দ করেন না।"
এশার আগে রাতের নামায পড়ে নিতেন
[৪১৬] মাখলাদ বিন হুসাইন-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, ইবনে জুরাইজ বলেছেন, "হাসান বিন আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-মাগরিব থেকে নিয়ে এশা পর্যন্ত পুরো সময়টা নামায পড়তেন। এই নামাযের ব্যাপারে তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করা হলো। জবাবে তিনি বললেন, "নিশ্চয় তা রাত্রিজাগরণ।"
দুনিয়াবিমুখতা উত্তম আমল
[৪১৭] ইয়াজইয়া বিন আবদুর রহমান—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আবু ওয়াকিদ আল-লাইসি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেছেন, “আমরা সব আমল পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণ করে দেখেছি। আখেরাত (আখেরাতে সাফল্য) প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দুনিয়াবিমুখতার চেয়ে উত্তম কোনো আমল আমরা পাইনি।"
তাঁদের পরনের মতো চাদর ছিলো না
[৪১৮] আবু হাযেম—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আবু হুরায়রাহ—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, “আমি আহলে সুফ্ফার সত্তর জন সদস্য দেখেছি। তাদের কারোরই পরনের মতো চাদর ছিলো না।"
তিনি এতো সামগ্রী চাননি
[৪১৯] মুহাম্মদ বিন আবু উমর থেকে বর্ণিত, ফুযাইল বিন ইয়ায—রাহিমাহুল্লাহ— বলেছেন, আমি আলীকে (অর্থাৎ, তাঁর পুত্রকে) বললাম, “তুমি যদি আমার এই দুর্দিনে আমাকে কিছুটা সাহায্য করতে! (এই কথা শুনে) সে একটি ঝুড়ি নিলো এবং (খাদ্যসামগ্রী) আনার জন্য বাজারে চলে গেলো। একজন লোক এসে আমাকে ব্যাপারটি জানালো। ফলে আমি তাঁর কাছে গেলাম এবং তাকে বাজারে ফেরত পাঠালাম। তাকে বললাম, আমি এটা চাইনি।” (অথবা তিনি বলেছেন,) “আমি তো এই সবকিছু চাইনি।"
তাঁর সততা ও সত্যবাদিতা
[৪২০] মুহাম্মদ বিন আবু উসমান—রাহিমাহুল্লাহ—ফুযাইল বিন ইয়ায—রাহিমাহুল্লাহ—থেকে বর্ণনা করেন, ফুযাইল বিন ইয়াযের কয়েকটি উট ছিলো। তাঁর পুত্র আলী উটগুলোকে খাদ্যদ্রব্য বহন করার কাজে ব্যবহার করতেন। (উটগুলোকে ভাড়ায় খাটাতেন; অন্য ব্যবসায়ীদের পণ্য আনা-নেওয়া করতেন।) একবার তিনি যে-খাদ্যদ্রব্য বহন করে আনলেন তা কম হলো। (এ-কারণে উটগুলো যারা ভাড়া নিয়েছিলো তারা ভাড়া আটকে দিলো।) ফলে আলী ভাড়াকারীদের সঙ্গে বসে রইলেন। (এই সংবাদ শুনে) ফুযাইল বিন ইয়ায তাদের কাছে এলেন। তাদের বললেন, “তোমরা আলীর সঙ্গে এটা কী আচরণ করলে? (তোমরা কি ভাবছো যে আলী ওখান থেকে খাদ্যদ্রব্য সরিয়েছে? তবে জেনে রাখো,) আমরা যখন কুফায় ছিলাম আমাদের একটি ছাগী ছিলো। ছাগীটি একটি আমীর বা নেতাশ্রেণির এক ব্যক্তির সামান্য ঘাস খেয়ে ফেলেছিলো। এরপর থেকে কোনোদিন আমি ওই ছাগীর দুধ পান করিনি।" ভাড়াকারীরা তখন বললো, "হে আবু আলী, উটগুলো যে আপনার তা আমাদের জানা ছিলো না।"
অর্ধেক রাখলেন, বাকি অর্ধেক দান করে দিলেন
[৪২১] মুহাম্মদ বিন উমর থেকে বর্ণিত, তিনি ফুযাইল বিন ইয়ায-রাহিমাহুল্লাহ- থেকে বর্ণনা করেন, তাঁরা উচ্চ দ্রব্যমূল্যের দিনে এক দিনার দিয়ে যব কেনেন। তখন উম্মে আলী ফুযাইলকে বলেন, "পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য দুই থালা পরিমাণ যব বণ্টন করে দিন। প্রত্যেকে এক থালা নিজে নিজের জন্য গ্রহণ করবে, অপর থালা সাদকা করে দেবে। (আলী দুই থালা নেবে; এক থালা নিজের জন্য রাখবে, অপর থালা সদকা করে দেবে।) যতোক্ষণ না তা শেষ হওয়ার উপক্রম করে বা অনুরূপ খাদ্যের ব্যবস্থা হয় (ততোক্ষণ এভাবে চলতে থাকবে)।"
সহজ-সরল জীবনের নমুনা
[৪২২] হাসান বিন আবদুল আযিয বলেন, আমি ইয়াহইয়া বিন হাসসানকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, "মাঝে মাঝে আমি ফুযাইল বিন ইয়াযকে দেখতাম, তখন তার প্রতি আমার মায়া লাগতো। একদিন আমি তাঁকে দেখে তাঁর কাছে গেলোম। দেখলাম তার হাতে সামান্য পরিমাণ বিচি। তিনি একজন সবজি-বিক্রেতাকে। খুঁজছেন। সবজি-বিক্রেতা থেকে বিচিগুলোর বিনিময়ে সবজি কিনবেন। আমি তাঁকে আর কোনোকিছু জিজ্ঞেস করলাম না। তাঁর থেকে দূরে সরে এলাম। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি রহম করুন।"
হাদিস শুনে বেহুঁশ হয়ে পড়লেন
[৪২৩] মুহাম্মদ বিন উসমান বলেন, আলী ইবনে ফুযাইল-রাহিমাহুল্লাহ- সুফিয়ান ইবনে উইয়ানাহ-রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে ছিলেন। সুফিয়ান সাওরি একটি হাদিস বর্ণনা করলেন, তাতে জাহান্নামের আলোচনা ছিলো। আলীর হাতে একটি কাগজ ছিলো, কাগজের মধ্যে কিছু-একটা বাঁধা ছিলো। হাদিস শুনে তিনি জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলেন এবং পড়ে গেলেন। তিনি তাঁর হাতের কাগজটি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন অথবা তা তাঁর হাত থেকে পড়ে গেলো। সুফিয়ান সাওরি তাঁর দিকে তাকালেন এবং বললেন, "আমি যদি জানতাম আপনি এখানে আছেন তবে আমি এই হাদিস বর্ণনা করতাম না।" অনেকক্ষণ পর আলীর হুঁশ ফিরে এলো। তখন তিনটি বিষয় কম হবে
[৪২৪] মুআফি বিন ইমরান থেকে বর্ণিত, ইমাম আওযায়ি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেছেন, বলা হতো যে, "মানুষের মাঝে এমন একটি যুগ আসবে যখন তিনটি জিনিস সবচেয়ে কম হবে: ১. উপকারী সহৃদয় ভাই; ২. হালাল উপার্জনের টাকা এবং ৩. সুন্নত অনুযায়ী আমল।"
তাঁর পরনে ছিলো তালিযুক্ত জামা
[৪২৫] আলী বিন হামলাহ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি মুআবিয়া—রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে দামেস্কের মিম্বরে খুতবা দিতে দেখেছি। তখন তাঁর পরনে ছিলো তালিযুক্ত জামা।"
বান্দার সঙ্গে আল্লাহর কথোপকথন
[৪২৬] আবু ইমরান আল-জুনি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আবু হুরায়রাহ—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, "কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা বান্দাকে কাছে টেনে নেবেন। তিনি তাঁর হাত দ্বারা তাকে মানুষ ও অন্যান্য সৃষ্টির অন্তরালে নিয়ে নেবেন। ওই অন্তরালেই তিনি বান্দার কাছে তার আমলনামা দেবেন। তারপর বলবেন, হে আদম-সন্তান, তুমি তোমার আমলনামা পাঠ করো। তখন সে তার নেক আমলগুলোর বিবরণ পাঠ করবে এবং চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, তার অন্তর পুলকিত হয়ে উঠবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, হে আমার বান্দা, তুমি কি তোমার এই নেক আমলগুলোর কথা জানো? বান্দা বলবে, হে আমার রব, হ্যাঁ, আমি জানি। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তোমার থেকে তোমার নেক আমলগুলো কবুল করে নিয়েছি। এই কথা শুনে বান্দা আল্লাহর সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়বে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, হে আদম-সন্তান, তুমি তোমার মাথা তোলো এবং পুনরায় তোমার আমলনামা হাতে নাও। এবার বান্দা তার আমলনামা হাতে নিয়ে তার বদ আমল ও পাপের বিবরণ পাঠ করবে এবং তার চেহারা কালো হয়ে যাবে এবং তার অন্তর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, হে আমার বান্দা, তুমি কি তোমার পাপের কথা স্বীকার করো? জবাবে বান্দা বলবে, হে আমার রব, হ্যাঁ, আমি আমার পাপের কথা স্বীকার করি। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি তোমার পাপসমূহ মার্জনা করে দিলাম।” আবু হুরায়রাহ—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেন, "বান্দার নেক আমল যতোক্ষণ কবুল করা হবে ততোক্ষণ সে সেজদা দেবে এবং যতোক্ষণ তার পাপসমূহ মার্জনা করা হবে ততোক্ষণও সে সেজদা দেবে। অন্যান্য মানুষ ও সৃষ্টি বান্দার সেজদা ছাড়া আর কিছুই দেখবে না। তখন তারা পরস্পরকে বলতে থাকবে, এই বান্দার কল্যাণ হোক, সে কখনো আল্লাহ তাআলার নাফরমানি করেনি। আবু হুরায়রাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, "ওই বান্দার মধ্যে ও আল্লাহ তাআলার মধ্যে কী ঘটেছে তা অন্যরা জানতে পারবে না। তা কেবল ওই বান্দাই জানতে পারবে।"
বিশ লাখ গুণ সওয়াব
[৪২৭] আবু উসমান আন-নাহদি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবু হুরায়রাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দার একটি পুণ্যের কাজকে হাজার হাজার পুণ্যের কাজ বানিয়ে দেবেন।" আবু উসমান আন-নাহদি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সেই বছর আমি হজ করলাম, যদিও আমার সেই বছর হজ করার ইচ্ছা ছিলো না। (আমার উদ্দেশ্য ছিলো আবু হুরায়রাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা।) আমি আবু হুরায়রাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার কাছে এই বক্তব্য পৌঁছেছে যে, আপনি বলেছেন, "নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দার একটি পুণ্যের কাজকে হাজার হাজার পুণ্যের কাজ বানিয়ে দেবেন।” তখন আবু হুরায়রাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "আমি তো এভাবে বলিনি। যে-ব্যক্তি তোমার কাছে বর্ণনা করেছে সে আমার কথা মুখস্থ রাখতে পারেনি।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কথাটা কীভাবে বলেছিলেন? তিনি বললেন, "বরং বিশ লাখ গুণ বাড়িয়ে দেবেন।" তারপর বললেন, "তোমরা কি আল্লাহ তাআলার কিতাবে তা পড়োনি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কোন জায়গায়?” তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
مَنْ ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضَاعِفَهُ لَهُ أَضْعَافًا كَثِيرَةً
"কে সে যে আল্লাহকে করযে হাসানা প্রদান করবে? আল্লাহ তা তার জন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন।"
আর আল্লাহ তাআলা পক্ষ থেকে যদি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তার অর্থ হলো, বিশ লাখ বা তার চেয়েও বেশি।
আল্লাহর সন্তুষ্টি শ্রেষ্ঠ নেয়ামত
[৪২৮] ইউনুস বিন মুহাম্মদ বলেন, বসরায় একজন বিচারক ছিলেন, তাঁর ডাকনাম ছিলো আবু সালেম। তাঁর মর্যাদা বর্ণনা করে তিনি বলেন, তিনি একজন শায়খের মসজিদে ছিলেন। আমি তাঁর পাশে বসলাম। তখন তিনি আমাকে জানালেন যে, "তিনি নামায পড়ছিলেন। কুরআন তেলাওয়াত করতে করতে এই আয়াতে পৌঁছলেন,
مُتَّكِئِينَ عَلَى فُرُشٍ بَطَائِنُهَا مِنْ إِسْتَبْرَقٍ
"তারা হেলান দিয়ে বসবে এমন ফরাশে যার অভ্যন্তরে রয়েছে রেশমের পুরু স্তর।"
তখন দোয়া করলেন, হে আমার প্রতিপালক, এটা তো ভেতরগত অবস্থা, তাহলে বাহ্যিক অবস্থা কী? তখন অদৃশ্য থেকে ডাকা হলো, এবং তিনি জানলেন না যে কে তাঁকে ডাকলো, ডেকে বললো, বাহ্যিক অবস্থা হবে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি।" ইউনুস বলেন, তিনি ফার্সি ভাষায় গল্প করতেন।
হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে সাক্ষাৎ
[৪২৯] ইবনে শাওযাব বলেন, সালেহ বিন খালেদ -রাহিমাহুল্লাহ-বলছেন, "কেনো একজন মানুষ তার বন্ধুর সঙ্গে বিরক্ত চেহারা নিয়ে সাক্ষাৎ করে? তুমি তোমার মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় সাক্ষাৎ করো। তোমার কাছে যদি কোনো কল্যাণকর কথা (জ্ঞান) থাকে, তবে তা তুমি তাকে জানাও।"
দুনিয়াবিমুখ ইবাদতকারী ব্যক্তিই সফলকাম
[৪৩০০] আবুস সাবিল বলেন, আমাদের মজলিসে একজন শায়খ থামলেন। তিনি বললেন, আমার কাছে আমার বাবা (অথবা বলেছেন, আমার দাদা) বর্ণনা করেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জান্নাতুল বাকিতে দেখেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-বললেন, "কোন সে ব্যক্তি আজ এমন এক সাদকা করবে, যার ব্যাপারে আমি কিয়ামতের দিন সাক্ষ্য প্রদান করবো।" তখন একটি লোক এগিয়ে এলো। আল্লাহর কসম! জান্নাতুল বাকিতে তার মতো কদর্য চেহারার, তার মতো খাটো এবং তার মতো কুৎসিত চোখের এক জন লোকও ছিলো না। সে একটি উট নিয়ে এলো। আল্লাহর কসম! এই উটটির মতো সুন্দর উট জান্নাতুল বাকিতে একটিও ছিলো না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "এটাই কি তোমার সাদকা?" লোকটি বললো, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই সময় অন্য একজন লোক এই লোকটিকে কটাক্ষ হানলো এবং বললো, "সে যেনো তা সাদকা করে। আল্লাহর কসম! উটটি তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর।" কিন্তু রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-তাঁর কথা শুনে ফেললেন এবং (ক্রুদ্ধ স্বরে) বললেন, "তুমি মিথ্যা বলেছো, সে তোমার থেকেও উত্তম, উটটি থেকেও উত্তম। তুমি মিথ্যা বলেছো, সে তোমার থেকেও উত্তম, উটটি থেকেও উত্তম।" এই কথা তিনি তিন বার বললেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-বললেন, “যে-ব্যক্তি দুনিয়াবিমুখ হয়েছে ও ইবাদতে সর্বশক্তি ব্যয় করেছে সে সফল হয়েছে। যে-ব্যক্তি দুনিয়াবিমুখ হয়েছে ও ইবাদতে সর্বশক্তি ব্যয় করেছে সে সফল হয়েছে।"
আল্লাহভীতু ব্যক্তির কুরআন তেলাওয়াত সবচেয়ে সুন্দর
[৪৩১] আবদুল করিম আবু উমাইয়া বলেন, তাল্ক বিন হাবিব-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "ওই ব্যক্তির কুরআন তেলাওয়াতের স্বর সবচেয়ে সুন্দর, তুমি যাকে দেখবে যে কুরআন তেলাওয়াতের সময় সে আল্লাহর ভয়ে ভীত।” আবদুল করীম বলেন, তাল্ক বিন হাবীব-রাহিমাহুল্লাহ-এমনই এক ব্যক্তি ছিলেন। আবদুল করীম বলেছেন, তাল্ক বিন হাবীব আরও বলেন, "যতোক্ষণ না আমার মেরুদণ্ডে ব্যথা হয় ততোক্ষণ আমি নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালোবাসি।" তাল্ক বিন হাবীব-রাহিমাহুল্লাহ-সূরা বাকারা দ্বারা নামায শুরু করতেন এবং সূরা আনকাবুতে পৌঁছার আগে রুকুতে যেতেন না।"
আল্লাহ তাআলা তার দোয়া কবুল করলেন
[৪৩২] আবদুস সামাদ বিন মা'কিল বিন মুনাব্বিহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমি আমার চাচা ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ-রাহিমাহুল্লাহ-কে দেখলাম যে তাঁকে একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন এবং বললেন, "হে আবু আবদুল্লাহ, আমি একজন জারজসন্তানকে ক্রয় করে তাকে মুক্ত করে দেবো কি?" তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” তারপর ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ-রাহিমাহুল্লাহ-বর্ণনা করতে শুরু করলেন, বললেন, "আল্লাহ তাআলার ইবাদতগুজার বান্দাদের একটি দল ছিলো। তাদের মধ্যে একটি তরুণ ছিলো। তারা তরুণটিকে সম্মান দেখাতো, তাকে খাবার দিতো এবং তার প্রতি খুব শ্রদ্ধার ভাব বজায় রাখতো। একদিন তাদের কুরবানি পেশ করার সময় এলো। দলটির সবাই কুরবানি পেশ করলো, তরুণটিও কুরবানি পেশ করলো। তখন দলটির সবারই কুরবানি কবুল হলো; কিন্তু তরুণটির কুরবানি প্রত্যাখ্যাত হলো।" ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ্-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "তখন তরুণটি ইবাদতে অত্যন্ত মনোযোগী হলো এবং প্রচেষ্টা ব্যয় করলো। সে চিন্তা করতে লাগলো, ব্যাপারটা কী, কেন তার আমলের ক্ষেত্রে এমন হচ্ছে। কিন্তু সে কোনো ত্রুটি খুঁজে পেলো না। ফলে সে তার মায়ের কাছে এলো। মাকে জিজ্ঞেস করলো, হে মা, আমার ওপর এক বিরাট আপদ আপতিত হয়েছে। আমি আমার কিছু ভাইয়ের সঙ্গে ছিলাম, তারা আমাকে সম্মান দেখাতো, আমাকে খাবার খাওয়াতো এবং আমার প্রতি খুব শ্রদ্ধার ভাব পোষণ করতো। এভাবে একদিন তাদেরও কুরবানি দেওয়ার সময় হলো, আমারও কুরবানি দেওয়ার সময় হলো। তারা কুরবানি পেশ করলো, আমিও কুরবানি পেশ করলাম। তখন তাদের কুরবানি কবুল করা হলো; কিন্তু আমার কুরবানি প্রত্যাখ্যাত হলো। আমি আমার ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভেবেছি; কিন্তু কোনো ত্রুটি পাইনি। হে মা, আমাকে যে-বাবার ঔরসের সন্তান বলে দাবি করা হয় আমি কি তার সন্তান, না-কি তার নই? মা বললেন, তুমি এই কথা বলে কী বোঝাতে চাচ্ছো? তরুণটি বললো, হে মা, আপনি সর্বাবস্থায় আমার মা। সুতরাং আপনি আমাকে বলুন। মা বললেন, আমি একদিন রাতের বেলা কাঠ সংগ্রহের জন্য বের হই। তখন একটি পুরুষ আমাকে কাবু করে ফেলে (এবং আমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করে)। তুমি সেই পুরুষের সন্তান। যুবকটি তখন বলো, হে মা, আল্লাহ তাআলা আপনাকে ক্ষমা করুন। তারপর যুবকটি সিজদায় পড়ে গেলো এবং কাঁদতে শুরু করলো। কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলো, হে আমার প্রতিপালক, আমার বাবা-মা টকফল খাবে আর টক হবে কি আমার দাঁত? হে আল্লাহ, তা থেকে আপনি চিরমহান, চিরপবিত্র। অন্যদের যদি কামরিপু ঘায়েল করে ফেলে তবে তার পাপের বোঝা কি আমার ওপর বর্তাবে? হে আল্লাহ, তা থেকে আপনি চিরমহান, চিরপবিত্র। সে কাঁদতে থাকলো এবং দোয়া করতে থাকলো। অবশেষে তার কুরবানি কবুল করা হলো।"
অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকতেন
[৪৩৩] আবু আসিম আল-আবাদানি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, একজন লোক দাউদ আত-তায়ি-রাহিমাহুল্লাহ-কে বললেন, আপনার ঘরের ছাদে যেসব মাকড়সার জাল রয়েছে আপনি যদি নির্দেশ দিতেন তবে সেগুলো পরিষ্কার করে দেওয়া হতো। দাউদ আত-তায়ি-রাহিমাহুল্লাহ-বললেন, "তুমি কি জানো না যে, তাঁরা (পূর্বসূরি আলেমগণ) অনর্থক দৃষ্টিপাত অপছন্দ করতেন?" তারপর তিনি বললেন, "আমি জানি যে, মুজাহিদ-রাহিমাহুল্লাহ-এর বাড়িতে তাঁর মাথার ওপর তিরিশ বছর পর্যন্ত মাকড়সার জাল ছিলো। কিন্তু তিনি তা টের পাননি।"
সব সময় ভরপেট খেলে আকল-বুদ্ধি কমে যায়
[৪৩৪] আবদুল্লাহ বিন শুমাইত বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, তিনি দুনিয়াদারদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেছেন, “যে-লোক সব সময় ভরপেট খায় তার আকল-বুদ্ধি কম থাকে; তার একমাত্র চিন্তাই হলো পেট, যৌনাঙ্গ ও চামড়া (পেটের ক্ষুধা ও যৌনক্ষুধা মেটানো এবং সৌন্দর্যচর্চা করা)। সে সব সময় (মনে মনে) বলে, "সকাল হলেই খাবো, পান করবো, হাসি-তামাশা করবো, আমোদ-ফুর্তি করবো। যখন সন্ধ্যা হবে, ঘুমিয়ে পড়বো।” এই ধরনের লোক হলো রাতের বেলায় মৃতদেহ এবং দিনের বেলায় অকর্মণ্য।
নিজের চেয়ে অন্যকে শ্রেষ্ঠ মনে করা
[৪৩৫] ইবরাহিম বিন ঈসা আল-ইয়াশকুরি বলেন, আমি বকর বিন আবদুল্লাহ আল-মুযানি-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, "যখনই আমি বাড়ি থেকে বের হই এবং যে-কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে, তাকে আমি নিজের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করি। কারণ, নিজের ব্যাপার আমার পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে (যে আমি কতটুকু কী)। কিন্তু মানুষের বেলায় আমি সন্দিহান। (কারণ, তাদের যে-কেউ আমার থেকে উত্তম হতে পারে।)
ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বাঁধা
[৪৩৬] আনাস বিন মালিক-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, আবু তালহা আনসারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আমরা ক্ষুধার্ত আছি বলে অভিযোগ পেশ করলাম। তখন আমরা আমাদের পেটের কাপড় উঁচু করে দেখালাম প্রত্যেকের পেটে একটি করে পাথর বাঁধা আছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-তাঁর পেটের কাপড় উঁচু করে দেখালেন যে, তাঁর পেটে দুটি পাথর বাঁধা রয়েছে।"
বিনাশগ্রস্তকে বিনাশ থেকে বাঁচানো যায় না
[৪৩৭] আবদুল্লাহ বিন শুমাইত বলেন, তাঁর পিতা শুমাইত-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, আল্লাহ তাআলা দাউদ-আলাইহিস সালাম-এর কাছে ওহি প্রেরণ করলেন: “তুমি যদি কোনো বিনাশগ্রস্তকে তার বিনাশ হওয়া থেকে বাঁচাতে পারো তবে আমি তোমার নাম দেবো দুর্দান্ত বিচক্ষণ ব্যক্তি।"
পূর্বসূরিরা ভয়ের ফলে কাঁদতেন
[৪৩৮] ইকরিমা—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আসমা বিনতে আবু বকর—রাদিয়াল্লাহু আনহা-কে জিজ্ঞেস করা হলো, “পূর্বসূরিদের কেউ কি ভয়ের কারণে অজ্ঞান হয়ে যেতেন?” তিনি বললেন, “না; বরং তাঁরা কাঁদতেন।"
সালাম মুসলমানদের জন্য অভিনন্দন
[৪৩৯] মুহাম্মদ বিন যিয়াদ আল-আলহানি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আমি আবু উমামা আল-বাহিলি—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর হাত ধরে যাচ্ছিলাম। তিনি যখনই কারও পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তাকে সালাম দিচ্ছিলেন। তারপর তিনি বললেন, “সালাম আমাদের আহলে যিম্মিদের জন্য নিরাপত্তা আর আমাদের ধর্মীয় ভাইদের জন্য অভিনন্দন।"
প্রকাশ্যে ইবাদত করার কারণে নিন্দা করলেন
[৪৪০] মুহাম্মদ বিন যিয়াদ আল-আলহানি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, “আবু উমামা আল-বাহিলি—রাদিয়াল্লাহু আনহু—একজন সেজদারত লোকের পাশ দিয়ে গেলেন। সে দীর্ঘক্ষণ সিজদায় পড়ে ছিলো এবং কাঁদছিলো। আবু উমামা—রাদিয়াল্লাহু আনহু—তাকে পা দিয়ে আঘাত করলেন। তারপর বললেন, হায় সিজদা! তুমি যদি তা তোমার বাড়িতে করতে (তাহলে কত-না ভালো হতো)!"
অন্যকে উপদেশ দেওয়ার পূর্বে নিজে আমল করতে হবে
[৪৪১] সুলাইম বিন আমের—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, উম্মুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহা—আমাকে নাওফ আল-বিক্কালি এবং আরেকটি লোকের কাছে পাঠালেন। তাঁরা দুজন মসজিদে বসে গল্প করছিলেন। উম্মুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহা—আমাকে বললেন, তুমি তাদের গিয়ে বলো, “আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন। আর আপনারা মানুষদের যেসব উপদেশ দিয়ে বেড়ান তা যেনো আপনাদের নিজেদের জন্যও প্রযোজ্য হয়।”
শুধু শুধু প্রশ্ন করা বিপক্ষে দলিল হবে
[৪৪২] ওয়াহাব আল-মাক্কি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, একটি যুবক লোক উম্মুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর কাছে আমল-ইবাদতের ব্যাপারে প্রশ্ন করতো। অনেক বেশি প্রশ্ন করতো। উন্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা-তাকে বললেন, "তুমি আমাকে যা-কিছু জিজ্ঞেস করো, তার প্রতিটিই আমল করো?” যুবকটি বললো, না। তখন উন্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা-বললেন, "তাহলে কেন তোমার বিপক্ষে আল্লাহ তাআলার দলিল বৃদ্ধি করছো?"
মিথ্যাবাদীর জন্য দোয়া
[৪৪৩] হারিস বিন সুওয়াইদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, কুফার বাসিন্দাদের একজন ব্যক্তি আমিরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে আম্মার বিন ইয়াসির আল-আনাসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বিরুদ্ধে তাঁর অনুপস্থিতিতে অভিযোগ করলো। পরে আম্মার-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাকে বললেন, তুমি যদি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকো তবে আল্লাহ তাআলা তোমার সম্পদ বাড়িয়ে দিক, তোমার সন্তান বাড়িয়ে দিক এবং তোমাকে আমির বানান।"
তিনটি ব্যাপারই যথেষ্ট
[৪৪৪] ইয়াসির বিন উবায়দ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আম্মার বিন ইয়াসির আল- আনাসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "উপদেশ দানকারী হিসেবে মৃত্যুই যথেষ্ট; আর অমুখাপেক্ষিতা হিসেবে বিশ্বাসই যথেষ্ট এবং ইবাদতই ব্যস্ততা হিসেবে যথেষ্ট।"
নিজেকে ধ্বংস করার আকাঙ্ক্ষা
[৪৪৫] আবদুর রহমান বিন আবযা-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আম্মার বিন ইয়াসির আল-আনাসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু- ফুরাত নদীর তীরে ভ্রমণ করছিলেন। তখন তিনি বললেন, “হে আল্লাহ, যদি আমি জানতে পারতাম যে, ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেওয়া আপনাকে আমার প্রতি সন্তুষ্ট করবে তবে আমি সেটাই করতাম। হে আল্লাহ, যদি আমি জানতে পারতাম যে, আগুন প্রজ্বলিত করে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়া আপনাকে আমার প্রতি সন্তুষ্ট করবে তবে আমি সেটাই করতাম। হে আল্লাহ, যদি আমি জানতে পারতাম যে, আমার নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং নিমজ্জিত হয়ে মৃত্যুবরণ করা আপনাকে আমার প্রতি সন্তুষ্ট করবে তবে আমি সেটাই করতাম।"
টিকাঃ
৫৮. পুরো নাম: আবু আবদুল্লাহ কুরয বিন ওয়াবারাহ আল-হারিসী আল-কুফী। তাঁকে আল্লাহ তাআলার বিস্ময়কর ওলী এবং দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিদের মধ্যে অগ্রগণ্য বলে আখ্যায়িত করা হয়।
৫৯. সূরা কাসাস (২৮) : আয়াত ৭৭।
৬০. সূরা মারইয়াম (১৯) : আয়াত ৩১।
৬১. পুরো নাম: সুলাইমান বিন আবদুল মালিক বিন মারওয়ান বিন আল-হাকাম বিন আবুল আস বিন উমাইয়া। জন্ম ৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে এবং মৃত্যু ৭১৭ খ্রিস্টাব্দে। সপ্তম উমাইয়া খলীফা। তাঁকে শক্তিশালী উমাইয়া খলীফা গণ্য করা হয়। তাঁর পুত্র আইয়ুব তাঁর জীবদ্দশাতেই মৃত্যুবরণ করেন।
৬২. উতবা বিন গাযওয়ান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন সাহাবী। সপ্তদশ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
৬৪. দারিন: ইয়ামানের একটি এলাকা। মধ্যযুগে ভারত থেকে দারিন-এ 'মিস্ক' রপ্তানি করা হতো।
৬৬. এই আসসামাহ কে তা নিয়ে মতবিরোধ আছে। এই হাদীস অনুযায়ী যদি তিনি বিলাল বিন আবুদ দারদার মা হন তবে তাঁর মূল নাম খায়রাহ বিনতে আবু হাদরাদ। আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর দুই জন স্ত্রীর মধ্যে তিনি প্রথম জন। দ্বিতীয় মত, তিনি বিলাল বিন আবুদ দারদার মা নন; বরং তার কন্যা। (তারিখে দিমাশক, ইবনে আসাকির, ৬৯তম খণ্ড) তৃতীয় মত, তিনি বিলাল বিন আবুদ দারদার পুত্রবধূ, অর্থাৎ, সুলাইমান বিন বিলালের স্ত্রী এবং মুহাম্মদ বিন সুলাইমানের মা। (সাফওয়াতুস সাফওয়া, ইবনুল জাওযী, তৃতীয় খণ্ড)
৬৭. সূরা নাহল (১৬): আয়াত ২৩।
৬৮. ফুযাইল বিন ইয়ায—রাহিমাহুল্লাহ—হিজরি দ্বিতীয় শতকের শ্রেষ্ঠ হাদীসবেত্তাদের একজন। তাঁর উপাধি ছিলো 'আবিদুল হারামাইন'। জীবনকাল : ১০৭-১৮৭ হিজরি।
৬৯. বর্ণনাটি এই কিতাবে সংক্ষিপ্ত আকারে এসেছে। সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ও অন্য কিতাবে বিস্তারিত এসেছে।
৭০. সূরা বাকারা (০২): আয়াত ২৪৫।
৭১. সূরা আর-রাহমান (৫৫) : আয়াত ৫৪।
৭২. মুসনাদে আহমাদ: ২০৩৬০, সনদ যঈফ। এর সনদে আবুস সালীল নামক রাবী রয়েছে তিনি অপরিচিত। (সম্পাদক)
৭৩. এটি একটি ঈসরাঈলী বর্ণনা। এমন বর্ণনার ক্ষেত্রে নীতি হলো, যদি তা কুরান-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক না হয় তবে তার ব্যাপারে সত্য-মিথ্যা কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে নীরবতা অবলম্বন করা। (সম্পাদক)
৭৪. مُوَطَّأَ الْعَقِبَيْنِ : শব্দটির অর্থ যার অধিক অনুসারী রয়েছে বা অধিক মানুষ দ্বারা অনুসৃত। কিন্তু এখানে সুলতান বা আমির বা ধনাঢ্য ব্যক্তি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যার পেছনে লোকেরা লেগে থাকে।
📄 হুযায়ফাহ ইবনুল ইয়ামান—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া
মানুষ বিনয় ও নম্রতা হারিয়ে ফেলবে
[৪৪৬] আবু আবদুল্লাহ আল-ফিলিস্তিনি থেকে বর্ণিত, হুযায়ফাহ ইবনুল ইয়ামান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর ভাই আবদুল আযিয বর্ণনা করেন, হুযায়ফাহ ইবনুল ইয়ামান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “তোমরা তোমাদের ধর্মের থেকে প্রথম যে-জিনিসটা হারিয়ে ফেলবে তা বিনয় ও নম্রতা। আর তোমাদের ধর্মের সর্বশেষ যে-জিনিসটা হারিয়ে ফেলবে তা হলো নামায।"
হারাম খাদ্য দ্বারা তৈরি হওয়া রক্ত-মাংস জান্নাতে প্রবেশ করবে না
[৪৪৭] মালিক আল-আহমার-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমি হুযায়ফাহ ইবনুল ইয়ামান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, মদবিক্রেতা মদ পানকারীর মতোই; শূকরের পালনকারী শূকরের গোশতখাদকের মতোই। তোমরা তোমাদের দাসদের ব্যাপারে সর্তক দৃষ্টি রাখো এবং খতিয়ে দেখো তারা কোথা থেকে তাদের 'কর' নিয়ে আসে। জান্নাতে এমন কোনো গোশতের টুকরো প্রবেশ করবে না যা হারাম খাদ্য দ্বারা তৈরি হয়েছে।"
সিজদার অবস্থা সবচেয়ে উত্তম
[৪৪৮] আবু ওয়ায়িল-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুযায়ফাহ ইবনুল ইয়ামান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “বান্দার সবচেয়ে প্রিয় যে অবস্থার কারণে আল্লাহ তায়ালা তার প্রশংসা করে থাকেন তা হলো, আল্লাহর সামনে মস্তকাবনত করে রাখা।"
📄 মুআয ইবনে জাবাল—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া
তিনি বিলাসবহুল মসজিদ নির্মাণ করতে নিষেধ করলেন
[৪৪৯] তাউস বিন কায়সান আল-ইয়ামানি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-আমাদের এলাকায় এলেন। তখন তাঁকে বলা হলো, আপনি যদি নির্দেশ দেন তবে পাথর ও কাঠ সংগ্রহ করা হবে এবং আমরা আপনার জন্য একটি মসজিদ বানিয়ে দেবো। তিনি বললেন, আমি ভয় করি যে, কিয়ামতের দিন তার বোঝা আমার পিঠের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।"
পুত্রের উদ্দেশে উপদেশ
[৪৫০] মুআবিয়া বিন কুররা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁর পুত্রকে বলেছেন, হে পুত্র, যখন তুমি কোনো নামায পড়বে তখন জীবনের শেষ নামায হিসেবে পড়বে; তুমি কখনোই এই ধারণা করবে না যে তুমি পুনরায় নামায পড়তে পারবে। হে আমার পুত্র, তুমি জেনে রাখো, মুমিন বান্দা দুটি পুণ্যময় কাজের মধ্যবর্তী সময়ে মৃত্যুবরণ করে : যে-পুণ্যময় কাজ সে মৃত্যুর আগে করেছে, আর যে-পুণ্যময় কাজ সে মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের জন্য রেখে দিয়েছে।” (অর্থাৎ, সাদকায়ে জারিয়া)।
যিকির শ্রেষ্ঠ আমল
[৪৫১] আবুয যুবায়ের বলেন, যে-ব্যক্তি মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-থেকে শুনেছেন তিনি আমাকে জানিয়েছেন, মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আল্লাহ তাআলার শাস্তি থেকে আদম-সন্তানকে মুক্তি দানকারী শ্রেষ্ঠ বিষয় হলো আল্লাহ তাআলার যিকির।” সঙ্গীরা বললেন, "আল্লাহ তাআলার পথে তরবারি নয় কি?” তাঁরা কথাটা তিন বার বললেন। জবাবে মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "আল্লাহর পথে তরবারি দ্বারা জিহাদ করতে করতে যদি শহীদ হয়ে যায় তবে ভিন্ন কথা।"
ঈমানদার ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে
[৪৫২] আবুল হাজ্জাজ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন "যে-ব্যক্তি এই বিশ্বাস ধারণ করে যে, আল্লাহ তাআলা সত্য এবং কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং আল্লাহ তাআলা মানুষকে কবর থেকে পুনরুত্থিত করবেন, সে-ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে।"
সবকিছু পরিমিতরূপে করা
[৪৫৩] আবদুল্লাহ বিন সালামা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে এক ব্যক্তি বললেন, "আপনি আমাকে জ্ঞান শেখান।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি আমার কথা মানবে?" লোকটি বললেন, "আমি আপনার কথা মানার জন্য অতিশয় উদ্গ্রীব।” মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "রোযা রাখো এবং রোযা ছেড়ে দাও। নামায পড়ো এবং ঘুমাও। উপার্জন করো, কিন্তু পাপকাজ কোরো না। প্রকৃত মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না। আর মজলুমের বদদোয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখো।"
আরাম-আয়েশের জন্য তিনি বেঁচে থাকেননি
[৪৫৪] আমর বিন কায়স-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন, মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, দেখো, ভোর হয়েছে কি? তাঁকে জানানো হলো, না, ভোর হয়নি। তারপর তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, দেখো, ভোর হয়েছে কি? তাঁকে জানানো হলো, না, এখনো ভোর হয়নি। তারপর আরও কিছু সময় কেটে গেলে তাঁকে বলা হলো যে, হ্যাঁ, এখন ভোর হয়েছে। তখন মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "আল্লাহ তাআলার কাছে এমন রাত থেকে পানাহ চাই যার ভোর জাহান্নামে নিয়ে যাবে। মৃত্যুকে অভিবাদন! অভিবাদন দীর্ঘদিনের অনুপস্থিত প্রিয় দর্শনার্থীকে, যিনি আমার দরিদ্রাবস্থায় এসেছেন! হে আল্লাহ, আমি আপনাকে ভয় করেছি, আজ আমি আপনার থেকে প্রত্যাশা করি। হে আল্লাহ আপনি জানেন যে, আমি এই দুনিয়াকে চেয়েছি এবং তাতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছি দিবানিদ্রার জন্য নয় এবং গাছ রোপণের জন্য নয়; বরং রৌদ্রপ্রখর দুপুরে পিপাসার্ত থাকার জন্য, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইবাদতে সর্বোচ্চ শ্রম ব্যয় করার জন্য এবং বাহনে চড়ে যিকিরের মজলিসে আলেম-উলামার সঙ্গে ভিড় জমানোর জন্য।"
আমল করা ছাড়া কোনো প্রতিদান নেই
[৪৫৫] সুলাইমান বিন মুসা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুআয ইবনে জাবাল- রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, তোমাদের আমল করার যতো ইচ্ছা ততো আমল করতে থাকো; কারণ, আমল করা ছাড়া কিছুতেই তোমাদের প্রতিদান দেওয়া হবে না।"
সাদাসিধে জীবনের নমুনা
[৪৫৬] মুহাম্মদ বিন সিরিন-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমিরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-যখন কোনো গভর্নর নিযুক্ত করতেন তার নিয়োগপত্রে লোকদের উদ্দেশে লিখে দিতেন: "তোমরা তার কথা শোনো এবং তার আনুগত্য করো, যতোক্ষণ সে তোমাদের মধ্যে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার করে।” তিনি হুযায়ফাহ ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে মাদায়িনে গভর্নর নিযুক্ত করলেন। তাঁর নিয়োগপত্রে লিখে দিলেন: "তোমরা তার কথা শোনো এবং তার আনুগত্য করো এবং সে তোমাদের কাছে যা চায় তা তাকে প্রদান করো।" মাদায়িনের লোকেরা তাঁকে অভিনন্দন জানালো এই অবস্থায় যে, তিনি একটি শীর্ণ গাধার পিঠে বসে আছেন, তার হাতে সামান্য বস্তু তিনি তা থেকে খাচ্ছেন। তিনি তাদেরকে তাঁর নিয়োগপত্র, অর্থাৎ, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চিঠি পাঠ করে শোনালেন। তারা বললো, আপনার প্রয়োজন কী? আমিরুল মুমিনীন আপনার ব্যাপারে যা আমাদের লিখেছেন তা ইতোপূর্বে কখনো লেখেননি। হুযায়ফাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "আমার প্রয়োজন এই যে, আমি যতোদিন তোমাদের মধ্যে থাকি তোমরা আমাকে রুটি খাওয়াবে, আমার গাধাটাকে ঘাস খাওয়াবে এবং তোমাদের ভূমিকর সংগ্রহ করবে।" মাদায়িনে তাঁর কাজ শেষ করার পর তিনি মদিনায় ফিরে এলেন। আমিরুল মুমিনীন তাঁর আগমনের সংবাদ শুনে রাস্তায় গিয়ে বসে থাকলেন এটা দেখার জন্য যে, হুযায়ফাহ- রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে যে-অবস্থায় পাঠিয়েছিলেন সেই অবস্থাতেই আছেন, না-কি পরিবর্তন ঘটেছে। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-যখন তাঁকে আগের অবস্থাতেই দেখলেন, তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর বললেন, "তুমি আমার ভাই এবং আমি তোমার ভাই। তুমি আমার ভাই এবং আমি তোমার ভাই।"
তাঁর একটি ভাষণ
[৪৫৭] আবু ইয়াযিদ আল-সাদানি বলেছেন, আবু হুরায়রাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-মদিনার মসজিদে মিম্বরে দাঁড়ালেন; তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-চৌকাঠের যে-জায়গায় দাঁড়াতেন সেই জায়গায় নয়। দাঁড়িয়ে বললেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আবু হুরায়রাহকে ইসলামের পথপ্রদর্শন করেছেন। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আবু হুরায়রাহকে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আবু হুরায়রাহর প্রতি মুহাম্মাদ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-দ্বারা অনুগ্রহ করেছেন। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে খামির (আটার রুটি) খাইয়েছেন এবং পোশাক পরিধান করিয়েছেন। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে বিনতে গাযওয়ানের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন, অথচ আমি তার (তাদের বাড়িতে) পেটে-ভাতে শ্রমিক ছিলাম। বিনতে গাযওয়ান আমাকে পিতা বানালেন, এবং আমি তাকে মাতা বানালাম যেভাবে তিনি আমাকে পিতা বানিয়েছেন (আমার ঔরসের সন্তান তিনি তাঁর গর্ভে ধারণ করলেন)।" তারপর বললেন, আরবদের ধ্বংস এমন এক অনিষ্টের কারণে যা নিকটবর্তী। তাদের ধ্বংস শিশুদের শাসনের কারণে, যারা তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে রাষ্ট্র চালাবে, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে মানুষকে হত্যা করবে। হে বনু ফাররুখ, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো, হে বনু ফাররুখ, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম! দীনে ইসলাম যদি সুরাইয়া তারকাতেই ঝুলন্ত থাকে তবুও তোমাদের একদল মানুষ তা পালন করতে সমর্থ হবে।”
আয়াতটি পড়ে কাঁদতে শুরু করলেন
[৪৫৮] আবুদ দুহা-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তামিম দারি- রাদিয়াল্লাহু আনহু-সূরা আল-জাসিয়া পাঠ করছিলেন। যখন তিনি এই আয়াতে পৌঁছলেন: أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ "দুষ্কৃতকারীরা কি মনে করে যে আমি জীবন ও মৃত্যুর দিক দিয়ে তাদের ওইসব লোকের সমান গণ্য করবো যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে।"
তিনি আয়াতটি পুনরাবৃত্তি করতে থাকলেন এবং কাঁদতে শুরু করলেন। এইভাবে ভোর হয়ে গেলো।
বহুরূপী হওয়া থেকে বিরত থাকো
[৪৫৯] শাকিক বিন সালামা-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু মাসঊদ উকবা বিন আমর আল-আনসারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-আমাদের কাছে এলেন। আমরা তাঁকে আরজ করলাম, আপনি আমাদের নসিহত করুন। তিনি বললেন, "তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আমি এমন ভোর থেকে পানাহ চাই যা জাহান্নামে নিয়ে যাবে। দীনের (ইসলামের) ক্ষেত্রে বহুরূপী হওয়ার থেকে বেঁচে থাকো; আজ যা স্বীকার করে নিয়েছো আগামীকাল তা অস্বীকার কোরো না এবং যা অস্বীকার করেছো আগামীকাল তা স্বীকার করে নিয়ো না।"
অল্পে তুষ্টিই প্রকৃত সচ্ছলতা
[৪৬০] ইকরিমা বিন খালিদ-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সা'দ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁর পুত্রের উদ্দেশে বলেছেন, "হে আমার পুত্র, আমার মৃত্যুর পর তুমি তোমার জন্য আমার চেয়ে অধিক কল্যাণকামী কারও সাক্ষাৎ পাবে এমন ধারণা থেকে দূরে থাকো। (সুতরাং জেনে রাখো,) যখন নামায পড়তে চাইবে, ভালোভাবে ওজু করবে। তারপর নামায পড়ো এই কথা ভেবে যে, এই নামাযের পরে তুমি আর নামায পড়তে পারবে না (এটিই তোমার জীবনের শেষ নামায)। লোভ-লালসা থেকে বেঁচে থাকো; কারণ, লোভ-লালসা দরিদ্রতাকে উপস্থিত করে। অল্পে তুষ্ট থাকো; কারণ, অল্পে তুষ্টিই প্রকৃত সচ্ছলতা। এমন কোনো কথা বলা ও কাজ করা থেকে বিরত থাকো যার জন্য জবাবদিহি করতে হয়, অনুশোচনা করতে হয়। (এগুলো ব্যতীত) তোমার যা ভালো মনে হয় করো।"
নিজে আমল না করে অন্যকে উপদেশ দেওয়া ক্ষতিকর
[৪৬১] সাফওয়ান বিন মুহরিয-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, জুন্দুব বিন আবদুল্লাহ আল-জাবালি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-আমার কাছে অবতরণ করলেন। তখন আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, তিনি বলছেন, “যে-ব্যক্তি অন্য মানুষকে উপদেশ দেয় এবং নিজের কথা ভুলে যায় সে হলো ওই বাতির মতো যে-বাতি অন্যকে আলো দেয় কিন্তু নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে।"
অহংকার দূর করার জন্য কাঠের বোঝা বহন করতেন
[৪৬২] আবদুল্লাহ বিন হানযালা-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন যে, আবদুল্লাহ বিন সালাম আল-খাযরাজি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বাজারে হাঁটছিলেন এবং তাঁর কাঁধে কাঠের একটি বোঝা ছিলো। তখন তাঁকে বলা হলো, আল্লাহ তাআলা কি আপনাকে এমন কষ্ট করা থেকে মুক্তি দেননি? তিনি জবাবে বললেন, অবশ্যই মুক্তি দিয়েছেন। কিন্তু আমি এই কাজ দ্বারা আমার অহংকার দূর করতে চাই। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ كِبْرٍ
“যে-ব্যক্তির অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।”
মন-গলানোর উপদেশ
[৪৬৩] আবু সাঈদ বিন নুমান-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার পাশ দিয়ে একটি কাফেলা গেলো এবং কাফেলার সবাই আমাকে নসিহত করলেন। কাফেলার শেষে রয়েছেন একজন কমবয়সী যুবক। তিনি তাঁর পায়ের অগ্রভাগ ও বাহনের দিকে তাকিয়ে আছেন। যেনো তিনি এমন একটি জিনিসের দিকে তাকিয়ে আছেন যার দায়িত্ব তাঁর ওপর বর্তেছে। আমি তাঁকে বললাম, আমাকে উপদেশ দিন, আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি রহমত বর্ষণ করুন। তিনি আমাকে বললেন, কাফেলার সবাই আপনাকে উপদেশ দিয়েছে। আমি বললাম, তাহলে আপনিও, আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি রহমত বর্ষণ করুন, আমাকে উপদেশ দিন। সুতরাং তিনি বললেন, কেউই তার দুনিয়ার যে-অংশ রয়েছে তা থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারে না, অথচ সবাই আখেরাতের অংশের প্রতি অধিক মুখাপেক্ষী। সুতরাং যখন দুটি বিষয়ের মধ্যে বিরোধ বাধবে, একটি আখেরাতের বিষয়, অপরটি দুনিয়ার বিষয়, তখন আখেরাতের বিষয়টি দিয়ে শুরু করুন এবং সেটিকে প্রাধান্য দিন। তার ওপর আমল করুন, তা ভালোভাবে উপলব্ধি করুন, তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন, তা যেখানে ক্ষান্ত হয় আপনি তার সঙ্গে সেখানে ক্ষান্ত হোন।"
আবু সাঈদ বিন নুমান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, কাফেলার অন্যদের উপদেশ যেনো আমার মন থেকে মুছে গেলো। আর এই যুবক যা বললেন তা আল্লাহ তাআলা আমার অন্তরে বদ্ধমূল করে দিলেন। কাফেলা যখন আমাকে ছাড়িয়ে চলে গেলো, আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই যুবকটি কে? তখন কেউ একজন বললো, "মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু।"
শিশুসুলভ শাসনের আশংকা
[৪৬৪] তারিক বিন আবদুর রহমান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, শামে (সিরিয়ায়) মহামারি শুরু হলো। দাবানল ছড়িয়ে পড়লো। লোকেরা বলাবলি করতে শুরু করলো, এটা তুফান ছাড়া কিছু নয়, তবে এই তুফানে পানি নেই। মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এই সংবাদ পৌছালো। ফলে তিনি সবার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিলেন। তিনি বলেন, "তোমরা যা বলাবলি করছো তা আমার কাছে পৌঁছেছে। এটা তো তোমাদের মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকে রহমত এবং তোমাদের নবী মুহাম্মদ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দোয়া। তোমাদের পূর্বে যাঁরা সৎকর্মপরায়ণ ছিলেন তাঁদের জন্য এতোটুকুই যথেষ্ট ছিলো। কিন্তু এটার চেয়ে যা আরও বেশি ভয়ংকর তা ভয় করো। তা হলো, তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি ঘরে ফিরে আসবে, অথচ তার জানাই থাকবে না সে মুমিন আছে না-কি মুনাফিক হয়ে গেছে। এবং তোমরা শিশুদের শাসনকে ভয় করো।"
তিনটি কাজ তিরস্কারের উপযুক্ত
[৪৬৫] মুহাম্মদ বিন নাদ্র আল-হারিসি-রাহিমাহুল্লাহ-মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-থেকে মারফুরূপে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, যে-ব্যক্তি তিনটি কাজ করবে সে অবশ্যই ঘৃণা ও তিরস্কারের উপযুক্ত: বিস্মিত হওয়া ছাড়াই হাসি, রাত্রিজাগরণ ছাড়াই ঘুম এবং ক্ষুধা ছাড়াই খাদ্যগ্রহণ।"
ইনসাফের দৃষ্টান্ত
[৪৬৬] ইয়াহইয়া বিন সাঈদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর দু-জন স্ত্রী ছিলেন। তিনি যদি তাদের একজনের ঘরে থাকতেন, তবে অপর জনের ঘর থেকে এক ফোঁটা পানিও পান করতেন না।
অন্যরা যখন গাফেল তখন আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ
[৪৬৭] আবু ইদরিস আল-খাওলানি-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “তোমাকে অবশ্যই এমন লোকদের সঙ্গে মিশতে হবে যারা গল্প-গুজবে লিপ্ত থাকে। যখন তুমি দেখবে যে তারা (আল্লাহর যিকির থেকে) গাফেল হয়ে পড়েছে, তখন তুমি একমাত্র আল্লাহ তাআলার প্রতি সম্পূর্ণরূপে মনোনিবেশ করবে।” আবু তালহা হাকিম বিন দিনার বলেন, সালাফে সালেহিন বলতেন, মাকবুল দোয়ার আলামত এই যে, যখন তুমি লোকদেরকে (আল্লাহর যিকির থেকে) গাফেল হয়ে যেতে দেখবে, তখন তুমি আল্লাহ তাআলার প্রতি সম্পূর্ণরূপে মনোনিবেশ করবে।”
যিকির শ্রেষ্ঠ আমল
[৪৬৮] আবু বাহরিয়্যাহ (আবদুল্লাহ বিন কায়স আল-কিন্দি রাহيمাহুল্লাহ) বলেন, মুআয ইবনে জাবাল-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “আদম-সন্তান যতো আমল করে তার মধ্যে আল্লাহ তাআলার আযাব থেকে উদ্ধারকারী শ্রেষ্ঠ আমল হলো আল্লাহর যিকির।” সঙ্গীরা জিজ্ঞেস করলেন, “হে আবু আবদুর রহমান, আল্লাহ তাআলার পথে জিহাদ নয় কি?” জবাবে তিনি বললেন, “তাও না, তবে কেউ যদি জিহাদ করতে করতে শহীদ হয়ে যায় তবে ভিন্ন কথা। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে বলেছেন:
وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ “আর আল্লাহর যিকিরই তো সর্বশ্রেষ্ঠ”।
টিকাঃ
৭৫. সূরা জাসিয়া (৪৫): আয়াত ২১।
৭৬. হাদীসটি ইমাম আহমাদ-রাহিমাহুল্লাহ-তার মুসনাদে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। দেখুন: ৩৭৮৯, ৪৩১০ (সম্পাদক)
৭৭. আবু নুআঈম হাদীসটি ইমাম আহমাদের সূত্রেই বর্ণনা করেছেন, দেখুন-হিলয়াতুল আউলিয়া ১/২৩৭ (সম্পাদক)
৭৮. সূরা আনকাবুত (২৯): আয়াত ৪৫।