📘 সাহাবিদের চোখে দুনিয়া > 📄 তালহা বিন উবায়দুল্লাহ—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া

📄 তালহা বিন উবায়দুল্লাহ—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া


গোত্রের লোকদের মধ্যে সম্পদ বণ্টন করে দিলেন
[২২৪] তালহা বিন ইয়াহইয়া রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর দাদী সু'দা বিনতে আওফ আল-মুররিয়‍্যাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "তালহা একদিন ভোরে চিৎকার করে উঠলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে আপনার? আপনি এমন কোনো কারণে দিশেহারা যার জন্য আমি আপনাকে তিরস্কার করবো?” তিনি বললেন, "আরে না, আল্লাহর কসম! তুমি অতি উত্তম স্ত্রী; বরং ব্যাপার হলো, আমার কাছে কিছু সম্পদ জমা হয়েছে। সেটাই আমাকে পেরেশান করছে।” আমি বললাম, "আপনার গোত্রের লোকদের ডেকে আপনি তা দিয়ে দিন।" তিনি গোলামকে ডেকে বললেন, "হে গোলাম, তুমি আমার গোত্রের লোকদের ডেকে নিয়ে আসো।" তারা এলে তিনি তাদের মধ্যে তার সম্পদ বণ্টন করে দিলেন। সু'দা বলেন, আমি খাজাঞ্চিকে জিজ্ঞেস করলাম, "কী পরিমাণ সম্পদ ছিলো?" সে বললো, "চার লাখ।"
সম্পদ থাকার ভয়ে ঘেমে উঠলেন
[২২৫] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, তালহা বিন উবায়দুল্লাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-সাত লাখ দিরহামের বিনিময়ে একটি জমি বিক্রি করলেন। এই সম্পদ তাঁর কাছে মাত্র এক রাত থাকলো। কিন্তু তিনি এই সম্পদের ভয়ে ঘর্মাক্ত হয়ে রাত্রিযাপন করলেন। সকালে উঠে এই সম্পদ লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন।"
তাঁর চোখে অশ্রু লেগে থাকতো
[২২৬] আবু রাজা আল-উতারিদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে দেখেছি এবং তার চোখের নিচে দেখেছি জীর্ণ রশির মতো অশ্রু।"
একনিষ্ঠভাবে নামায আদায়
[২২৭] হিশাম বিন উরওয়া—রাহিমাহুল্লাহ—বলেছেন, আমাকে মুহাম্মদ বিন আল-মুনকাদির বলেছেন, তুমি যদি আবদুল্লাহ বিন যুবাইরকে নামাযে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পেতে তাহলে বলতে, ঝড়ো বাতাসের ভেতর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি বৃক্ষ এবং মানজানিকের ইতস্তত পাথর নিক্ষেপের প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন একজন মানুষ।”

📘 সাহাবিদের চোখে দুনিয়া > 📄 আবু যর গিফারি—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া

📄 আবু যর গিফারি—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া


তিনি যা জানেন অন্যরা জানে না
[২২৮] আয়িযুল্লাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ! আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তাহলে কম হাসতে এবং বেশি কাঁদতে; বিছানায় কম বিশ্রাম নিতে এবং স্ত্রীদের সম্ভোগ করতে না; পরিতৃপ্তিসহ খাবার খেতে না; বরং তোমরা আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য পাহাড়ে চলে যেতে।" বর্ণনাকারী বলেন, আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-যখন এই হাদিস বর্ণনা করতেন, বলতেন, "হায়, আমি যদি বৃক্ষ হতাম যা কেটে ফেলা হতো!"
সম্পদের কারণে ভয়
[২২২৯] আবু শু'বা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন রাবাযা নামক স্থানে একদল লোক আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পাশে দিয়ে যাবার সময় তার কাছে কিছু খরচাপাতি পেশ করলো। তিনি বললেন, "আমাদের কাছে কিছু ছাগী আছে, আমরা সেগুলোর দুধ দোহন করি; কিছু গাধা আছে, সেগুলোর ওপর বোঝা বহন করি; কিছু দাস আছে, তারা আমাদের সেবা করে; এবং অতিরিক্ত জামা-কাপড়ও আছে। আমি এসব সম্পদের হিসাবের ব্যাপারে ভয় করছি।"
বৃক্ষ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা
[২৩০] মুজাহিদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু- বলতেন, "হায়, আমি যদি বৃক্ষ হতাম যা কেটে ফেলা হতো! হায়, আমাকে যদি সৃষ্টি করা না হতো!"
সততার সঙ্গে অল্প দোয়াই যথেষ্ট
[২৩১] বুকাইর বিন আবদুল্লাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “সততার সঙ্গে দোয়া ততোটুকুই যথেষ্ট, খাবারের জন্য যতোটুকু লবণ যথেষ্ট।”
মানুষের একটি আয়াতই যথেষ্ট
[২৩২] আবুস সাবিল-রাহিমাহুল্লাহ-আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “আমি এমন একটি আয়াত জানি, যদি লোকেরা তা গ্রহণ করে তবে সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট। তা হলো:
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“যে-ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উপায় বের করে দেন এবং এমনভাবে রিযিক দান করেন যা সে ভাবতেও পারে না।” আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এই আয়াত বলতেন এবং এর পুনরাবৃত্তি করতেন।
তাঁর গৃহ নির্মাণের ব্যাপারটি পছন্দ করলেন না
[২৩৩] সাবিত-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পাশ দিয়ে গেলেন, তিনি তখন নিজের জন্য একটি ঘর নির্মাণ করছিলেন। আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁকে বললেন, “আপনি কি লোকদের কাঁধের ওপর পাথর চাপালেন?” আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, “আমি তো কেবল একটি ঘর নির্মাণ করছি।” আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-আবারও বললেন, “আপনি কি লোকদের কাঁধের ওপর পাথর চাপালেন?” আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, “ভাই আমার, আপনি সম্ভবত এ-কারণে আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন।” আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, “আমি যদি আপনার পাশ দিয়ে যেতাম এই অবস্থায় যে, আপনি আপনার স্ত্রীর কোলে বসে রয়েছেন, তবে সেটাও আমার জন্য আপনাকে এই অবস্থায় দেখার চেয়ে প্রিয় হতো।"
মুত্তাকী ও তওবাকারীদের মধ্যে কল্যাণ রয়েছে
[২৩৪] আবু আবদুল্লাহ, অর্থাৎ, আওন-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি লোকদের লক্ষ করো? তাদের অধিকাংশের মধ্যেই কোনো কল্যাণ নেই। তবে মুত্তাকী ও তাওবাকারী ব্যতীত।"
কুক্ষিগত স্বর্ণ-রুপা কিয়ামতের দিন আগুনের অঙ্গার হবে
[২৩৫] আবদুল্লাহ বিন সামিত-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমি আবু যর গিফারি- রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে ছিলাম। তাঁর ভাতা দেওয়া হলো। তখন তার সঙ্গে তার দাসীও ছিল। তিনি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জন্য তা খরচ করলেন। কিন্তু কিছু দেরহাম অতিরিক্ত হলো। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হচ্ছে সাতটা দেরহাম অতিরিক্ত হবার কথা বলা হয়েছে। তখন তিনি দাসীকে দিরহামগুলো দিয়ে কিছু ভাংতি পয়সা খরিদ করে আনতে বললেন। তখন আমি তাঁকে বললাম, দিরহামগুলো রেখে দিন, কোনো প্রয়োজনে কাজে লাগতে পারে বা আপনার কোনো মেহমান এলে তার জন্য খরচ করতে পারবেন। তিনি বললেন, আমার প্রিয় বন্ধু-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-আমাকে বলেছেন, "স্বর্ণ বা রুপা যদি কুক্ষিগত করে রাখা হয় তবে তা কিয়ামতের দিন তার মালিকের জন্য আগুনের অঙ্গার হবে। যতোক্ষণ না সে তা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ তাআলার রাস্তায় খরচ করবে।"
দিনারগুলো ফিরিয়ে দিলেন
[২৩৬] আবু বকর বিন মুনকাদির-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "হাবীব বিন আবু সালামা তখন সিরিয়ার আমীর ছিলেন। তিনি আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্য তিনশো দিনার পাঠালেন এবং বললেন, "এগুলো দিয়ে আপনার প্রয়োজনপূরণে সাহায্য নিন।" আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "এগুলো তাঁর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। তিনি কি আমাদের চেয়ে আল্লাহর ব্যাপারে সম্মানিত কাউকে পাননি? আশ্রয় নেওয়ার মতো ছায়াটুকু আমাদের আছে, কিছু মেষ আছে সেগুলো সন্ধ্যায় আমাদের কাছে ফিরে আসে। একটি দাসী আছে যে আমাদের জন্য খেদমত করে থাকে। এর চেয়ে অতিরিক্ত জিনিসের ব্যাপারে আমি ভয় করি।"
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নৈকট্য লাভ
[২৩৭] ইরাক বিন মালেক—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আবু যর গিফারি—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, কিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সবেচেয়ে নিকটে বসবো। তা এই কারণে যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি,
إِنَّ أَقْرَبَكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ خَرَجَ مِنَ الدُّنْيَا كَهَيْئَةِ مَا تَرَكْتُهُ فِيهَا، وَأَنَّهُ وَاللَّهِ مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَقَدْ تَشَبَّتَ مِنْهَا بِشَيْءٍ غَيْرِي
"তোমাদের মধ্যে যারা ওই অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে যে-অবস্থায় আমি তাদের রেখে গিয়েছিলাম, তারা কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটে বসবে। আল্লাহর কসম! আমি ব্যতীত তোমাদের প্রত্যেকেই দুনিয়াবি কোনো-না-কোনো বিষয়ের সঙ্গে জড়িত থাকবে।"
প্রসিদ্ধ পোশাক ও বাহনের ব্যাপারে সতর্কবাণী
[২৩৮] শাহর বিন হাওশাব—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আবু যর গিফারি—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, "কেউ প্রসিদ্ধ পোশাক পরিধান করলে বা প্রসিদ্ধ বাহনে আরোহণ করলে, যতোক্ষণ সে ওই অবস্থায় থাকে, আল্লাহ তাআলা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, যদিও সে সম্মানিত হয়।"
যার যতো সম্পদ সে ততো কঠিন হিসাবের মুখোমুখি হবে
[২৩৯] ইবরাহিম আত-তাইমি—রাহিমাহুল্লাহ—তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবু যর গিফারি—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, "দুই দিরহামের মালিক এক দিরহামের মালিকের চেয়ে কঠিন হিসাবের মুখোমুখি হবে।"
অবশেষে তিনি রাবাযায় চলে গেলেন
[২৪০] শাহর বিন হাওশাব—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, মুআবিয়া—রাদিয়াল্লাহু আনহু—উসমান বিন আফ্ফান—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে চিঠি লিখে জানালেন: "সিরিয়ায় যদি আপনার কোনো প্রয়োজন থাকে তবে আবু যরকে আপনার কাছে ফিরিয়ে নিন।" এই সংবাদ শুনে আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "আবু যর যদি আমার পিঠে আঘাত করে এবং আমার দুই হাত কেটে দেন, তাহলেও আমি তার প্রতি ক্ষুব্ধ হবো না। কারণ, আমি রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি:
مَا أَظَلَّتِ الخَضْرَاءُ وَلَا أَقَلَّتِ الْغَبْرَاءُ لِذِي لَهْجَةٍ أَصْدَقَ مِنْ أَبِي ذَرٍّ
"আবু যরের চেয়ে সত্যবাদী কোনো ভাষাধারীকে পৃথিবীর বৃক্ষরাশি ছায়া দেয়নি এবং পৃথিবীর ভূমি বহন করেনি।” কেউ যদি দুনিয়ার বুকে দুনিয়াবিমুখ কোনো সাধারণ মানুষকে দেখে আনন্দ পেতে চায় সে যেনো আবু যরের দিকে তাকায়। আবু যর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-উসমান বিন আফফান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এলেন। উসমান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁকে বললেন, "হে আবু যর, আপনি আমাদের কাছে থাকুন। সকাল ও সন্ধ্যায় আপনার জন্য উষ্ট্রীর দুধ পাঠিয়ে দেবো।" আবু যর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "তাতে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। রাবাযায় আমার একটি ঘর আছে। আমাকে ওখানে চলে যেতে দিন।” ফলে উসমান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁকে অনুমতি দিলেন।
শিরক ছাড়া যে-কোনো পাপ ক্ষমাযোগ্য
[২৪১] মা'রুর-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা বলেন, হে আদমের সন্তান, তুমি যদি দুনিয়া পরিমাণ পাপ নিয়েও আমার সঙ্গে মিলিত হও এবং আমার সঙ্গে কোনোকিছুকে শরীক করে না থাকো, তবে আমি সমপরিমাণ হেদায়েত নিয়ে তোমার সঙ্গে মিলিত হবো।" (এখানে আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হওয়ার অর্থ তওবা করে আল্লাহ কাছে ফিরে যাওয়া।)
জমি গ্রহণের তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই
[২৪২] ইবরাহিম আত-তাইমি-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলা হলো, "আপনি কি কোনো জমি গ্রহণ করবেন না, যেমন অমুক অমুক গ্রহণ করেছে?” তিনি জবাব দিলেন, “আমি আমীর হয়ে কী করবো?” প্রতিদিন আমার জন্য যা যথেষ্ট তা হলো সামান্য পানি বা দুধ আর জুমআর দিনে এক কফীয গম।”
তিনি সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন
[২৪৩] সুফয়ান সাওরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, ঈসা ইবনে মারয়াম-আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-।
মানুষের সামনে দুরতিক্রম্য বাধার পাহাড় রয়েছে
[২৪৪] আওফ বিন মালিক আল-আশযায়ি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, আমার কাছে এই সংবাদ পৌঁছেছে যে, উম্মে যর আবু যর গিফারিকে তাদের জীবনযাপনের ব্যাপারে তিরস্কার করলেন। তখন আবু যর গিফারি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁকে বললেন, “হে উম্মে যর, আমাদের সামনে বাধার দুরতিক্রম্য পাহাড় রয়েছে। ভারী শরীরের অধিকারীর চেয়ে পাতলা শরীরের অধিকারী তা সহজে পেরিয়ে যাবে।” (ভারী শরীরের অধিকারী বলতে ভোগ-বিলাসী বোঝানো হয়েছে।)
তিনি মানুষের কল্যাণকামী, তাদের প্রতি দয়ার্দ্রচিত্ত
[২৪৫] উবায়দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর এক শায়খ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “হে লোকসকল, আমি তোমাদের কল্যাণ কামনাকারী, তোমাদের জন্য দয়ার্দ্রচিত্ত; তোমরা কবরের নিঃসঙ্গতা থেকে বাঁচার জন্য রাতের অন্ধকারে নামায আদায় করো; পুনরুত্থান-দিবসের উত্তাপ থেকে বাঁচার জন্য দুনিয়াতে রোযা রাখো; কঠিন দিবসের ভয় থেকে বাঁচার জন্য দান-সাদকা করো। হে লোকসকল, আমি তোমাদের কল্যাণকামী, তোমাদের জন্য দয়ার্দ্রচিত্ত।"

টিকাঃ
৩৫. সূরা তালাক (৬৫) : আয়াত ৩।
৩৬. ইবনে মাজাহ: ৪২২০, মুসনাদে আহমাদ: ২১১৫১, সনদ যঈফ, কারণ, আবুস সালী হাদীসটি সরাসরি আবু যর গিফারি থেকে বর্ণনা করেন, অথচ তিনি তার দেখা পাননি, ফলে সনদে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। (সম্পাদক)
৩৭. মুসনাদে আহমাদ: ২১৩৮৪ এর সনদ সহীহ। (সম্পাদক)
৩৮. শুআবুল ঈমান, বায়হাকী ৯৯২০; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ৩২২৬৮
৩৯. তিরমিজি: ৩৮০১; মুসনাদে আহমাদ: ৭০৭৮; সনদ হাসান
৪০. কফীয: প্রাচীনকালের একটি পরিমাপ। বিভিন্ন দেশে এর পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন। মিসরে বর্তমানে এক কফীয বলতে ১৬ কেজি বোঝায়।

📘 সাহাবিদের চোখে দুনিয়া > 📄 ইমরান বিন হুসাইন—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া

📄 ইমরান বিন হুসাইন—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া


আল্লাহর প্রিয় বিষয়ই তাঁর কাছে প্রিয়
[২৪৬] মুতাররিফ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমি ইমরান বিন হুসাইন-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললাম, আপনাকে যে-অবস্থায় দেখি তা আমাকে আপনার সাক্ষাতে আসতে বাধা দেয়। তিনি বললেন, "তুমি তা কোরো না। কারণ, আল্লাহ তাআলার কাছে যা প্রিয় তা-ই আমার কাছে প্রিয়।"
মৃত্যুর আগে ফেরেশতাগণের সালাম
[২৪৭] মুতাররিফ-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইমরান বিন হুসাইন-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমি অনুভব করলাম যে কেউ একজন আমাকে সালাম দিচ্ছেন। কিন্তু যখন আমি সেক নিলাম, সালামের ব্যাপারটা বন্ধ হয়ে গেলো।" আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনার ওপর সালাম আসে কি আপনার মাথার দিক থেকে, না পায়ের দিক থেকে?” তিনি বললেন, "না, পায়ের দিক থেকে নয়, মাথার দিক থেকে।" আমি বললাম, "আমি জানি না, আপনার মৃত্যুর আগে সালামের ব্যাপারটির পুনরাবৃত্তি ঘটে কি না।" পরে একদিন তিনি আমাকে বললেন, "আমি অনুভব করছি যে, আবারও আমাকে সালাম দেওয়া হচ্ছে।" এরপর তিনি কিছুদিন বেঁচে ছিলেন, তারপর মৃত্যুবরণ করেন।
ছাই হওয়ার আকাঙ্শা
[২৪৮] কাতাদা-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইমরান বিন হুসাইন-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "হায়, আমি যদি ছাই হতাম, বাতাস আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতো।"
তিনি ছিলেন বসরার শ্রেষ্ঠ মানুষ
[২৪৯] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, “ইমরান বিন হুসাইন-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মতো লোক বসরায় বসবাস করেননি।"
ডান হাত দ্বারা কখনো লজ্জাস্থান স্পর্শ করেননি
[২৫০] হাকাম বিন আ'রাজ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, ইমরান বিন হুসাইন-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করার পর থেকে এখনো পর্যন্ত ডান হাত দ্বারা আমার লজ্জাস্থান স্পর্শ করিনি।"
নিঃসঙ্গ ব্যক্তিরা আল্লাহর প্রিয়
[২৫১] ইবনে আবু মুলাইকাহ-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ বিন আমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: أَحَبُّ شَيْءٍ إِلَى اللَّهِ الْغُرَبَاءُ قِيلَ: وَمَنِ الْغُرَبَاءُ؟ قَالَ: الْفَرَّارُونَ بِدِينِهِمْ؛ يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَعَ عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ “আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো অপরিচিত নিঃসঙ্গরা।” জিজ্ঞেস করা হলো, “অপরিচিত নিঃসঙ্গ কারা?” তিনি বললেন, “যারা তাদের দীন নিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। আল্লাহ তাআলা তাদের কিয়ামতের দিন ঈসা ইবনে মারইয়াম-আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে উত্থিত করবেন।”
সুফিয়ান বিন ওয়াকি বলেন, "আমি আশা করি যে, আহমদ বিন হাম্বল-রাহিমাহুল্লাহ-এই সকল লোকের অন্তর্ভুক্ত হবেন।"
যারা আল্লাহকে স্মরণ করে আল্লাহ তাদের স্মরণ করেন
[২৫২] মুজাহিদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবদুল্লাহ বিন আমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “কোনো মজলিসে যদি আল্লাহ তাআলার যিকির করা হয় তবে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তাদের চেয়েও সম্মানিত ও মর্যাদাবান এক মজলিসে স্মরণ করেন। কোনো মজলিসের লোকেরা যদি আল্লাহ তাআলার নাম যিকির না করেহি ওই মজলিস ত্যাগ করে, তা কিয়ামতের দিন তাদের জন্য দুঃখের কারণ হবে।"
বিনয়ের জন্য দরিদ্র
[২৫৩] আমর বিন মুররাহ-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর এক শায়খ থেকে বর্ণনা করেন, আবুদ দারদা -রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "মহান রবের প্রতি বিনীত হওয়ার উদ্দেশ্যে আমি দারিদ্রতা পছন্দ করি। আমার মহান রবের সঙ্গে মিলিত হওয়ার বাসনায় আমি মৃত্যু পছন্দ করি। আমার পাপসমূহের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য আমি অসুস্থতা ভালোবাসি।"
মিথ্যা পাপাচারের দিকে টেনে নেয়
[২৫৪] মালেক বিন আনাস -রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ -রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলতেন, "তোমরা সত্য কথা বলবে। কারণ, তা সততার পথ দেখায়। আর সততা জান্নাতে নিয়ে যায়। তোমরা মিথ্যা থেকে দূরে থাকবে। কারণ, মিথ্যা পাপাচারের দিকে টেনে নেয়। আর পাপাচার জাহান্নামে টেনে নেয়।” তিনি আরও বলতেন, “যে-ব্যক্তি সত্য কথা বললো সে সৎকাজ করলো আর যে-ব্যক্তি মিথ্যা কথা বললো সে পাপাচার করলো।"

টিকাঃ
৪১. আবু নুআঈমের হিলয়াতুল আউলিয়াতে এটি উল্লেখিত হয়েছে ইমাম আহমদের সনদে (১/২৫) হাদীসটির সনদ যঈফ। কারণ, এতে সুফিয়ান ইবনে ওকী নামে একজন দুর্বল বর্ণনাকারী রয়েছেন। (সম্পাদক)

📘 সাহাবিদের চোখে দুনিয়া > 📄 সালমান ফারেসি—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া

📄 সালমান ফারেসি—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া


আল্লাহর জন্য বিনয় প্রকাশ করলে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন
[২৫৫] জারীর-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সালমান ফারেসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু- আমাকে বলেছেন, “হে জারীর, আল্লাহ তাআলার জন্য বিনীত হও; যে-ব্যক্তি দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলার জন্য বিনীত হয়, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।"
নাফরমানিমূলক কথা পাপাচারের দিকে টেনে নেয়
[২৫৬] শিমর বিন আতিয়্যা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সালমান ফারেসি- রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “যারা আল্লাহ তাআলার নাফরমানিমূলক কথা বেশি বলে তারাই বেশি পাপ করে।"
ভাতা পাওয়ামাত্রই লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন
[২৫৭] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সালমান ফারেসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর ভাতা ছিলো পাঁচ হাজার দিরহাম। তা ছাড়া তিনি প্রায় তিরিশ হাজার মুসলমানের আমীর ছিলেন। তিনি যে-আলখাল্লাটি গায়ে দিয়ে লোকদের উদ্দেশে ভাষণ দিতেন তার একটি অংশ বিছিয়ে বসতেন, আরেকটি অংশ পরিধান করতেন। তিনি তাঁর ভাতা পাওয়ামাত্রই তা লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। তিনি নিজ হাতে রোজগার করে খেতেন।"
মুশরিক নারীর ঘরে নামায পড়লেন
[২৫৮] নাফে বিন জুবাইর-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সালমান ফারেসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-নামাযের জায়গা তালাশের জন্য একজন অনারব কাফের নারী অথবা একজন মুশরিক নারীর ঘরে এলেন। ওই নারী তাঁকে বললেন, "একটি পবিত্র চিত্তের অন্বেষণ করুন এবং যেখানে খুশি নামায পড়ুন।" সালমান ফারেসি- রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাকে বললেন, "তুমি বুদ্ধিমতী।"
বাজার শয়তানের কেন্দ্র
[২৫৯] আবু উসমান আন-নাহদি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সালমান ফারেসি- রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তুমি বাজারে প্রথম প্রবেশকারী এবং শেষ প্রস্থানকারী হোয়ো না। কেননা, বাজারে শয়তানের অবতরণস্থল ও তার ঝান্ডার কেন্দ্র রয়েছে।” ইয়াহইয়া বলেন, "অর্থাৎ, বাজার হলো শয়তানের যুদ্ধক্ষেত্র।"
অমুসলিমের অন্তর থেকেও প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা উৎসারিত হয়
[২৬০] মাইমুন বিন মিহরান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, হুযায়ফাহ ও সালমান ফারেসি-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-একজন নাবাতি নারীর বাড়িতে অবতরণ করলেন। নামাযের সময় হলে তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "এখানে কি পবিত্র স্থান আছে, যেখানে আমরা নামায আদায় করতে পারি?” জবাবে ওই নারী বললেন, "আপনাদের অন্তর পবিত্র করুন।" তখন তাঁদের একজন অপর জনকে বললেন, "কাফেরের অন্তর থেকে প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা গ্রহণ করুন।"
সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের ছায়ায় আশ্রয় পাবে
[২৬১] ইবরাহিম আত-তাইমি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সালমান ফারেসি- রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহর (আরশের) ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না সেই দিন সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় পাবে: ১. এমন ব্যক্তি, যে তার মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে বলে, আমি তোমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসি এবং দ্বিতীয় জনও অনুরূপ কথা বলে। ২. এমন ব্যক্তি, যিনি আল্লাহকে স্মরণ করেন এবং আল্লাহর ভয়ে তাঁর দুই চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়। ৩. ওই ব্যক্তি, যিনি ডান হাত দ্বারা দান করেন; কিন্তু বাম হাত থেকে তা গোপনে রাখেন। ৪. এমন ব্যক্তি, যাকে কোনো সুন্দরী-রূপসী নারী প্ররোচিত করে, তখন তিনি তাকে বলেন, আমি তো আল্লাহ তাআলাকে ভয় করি। ৫. এমন ব্যক্তি, যাঁর হৃদয় মসজিদের ভালোবাসার কারণে মসজিদের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ৬. ওই ব্যক্তি, যিনি নামাযের ওয়াক্ত জানার জন্য সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করেন। ৭. এমন ব্যক্তি যিনি কথা বললে জ্ঞানের সঙ্গে কথা বলেন এবং যদি চুপ থাকেন তবে সেটাও হয় প্রজ্ঞার কারণে।"
পূর্বসূরিদের থেকে জ্ঞান শেখা অপরিহার্য
[২৬২] আবুল বাখতারি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সালমান ফারেসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "মানুষের মধ্যে কল্যাণ ততোদিনই অব্যাহত থাকবে যতোদিন পূর্বসূরিদের থেকে উত্তরসূরিরা জ্ঞান শিখবে। আর যদি উত্তরসূরিদের জ্ঞান অর্জনের পূর্বেই পূর্বসূরিরা চলে যায়, তবে তো তাদের ধ্বংসের সময় চলে আসবে।"
আল্লাহ তাআলা কাউকে নিরাশ করেন না
[২৬৩] আবু উসমান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সালমান ফারেসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "মানুষ যদি জানতো আল্লাহ তাআলা দুর্বলদের কীভাবে সাহায্য করেন তবে কখনোই তারা প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে বাড়াবাড়ি করতো না।” তিনি বলেন, “যে-বান্দা আল্লাহ তাআলা উদ্দেশে দুই হাত প্রসারিত করে এবং কল্যাণ প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাআলা তাকে নিরাশ করে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।" তিনি আরও বলেন, "এক ব্যক্তি রাত জেগে চুলোয় আগুন ঠেলে এবং আরেক জন আল্লাহ তাআলার যিকির করে রাত কাটায়, তবে আমি মনে করি, আল্লাহর যিকিরকারী ও কুরআন তেলাওয়াতকারীই শ্রেষ্ঠ।” তিনি আরও বলেন, "কোনো ব্যক্তি যদি ভালোভাবে ওজু করে এবং একমাত্র নামাযের উদ্দেশ্যেই মসজিদে আসে, তবে সে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সাক্ষাৎকারী হয় এবং আল্লাহ তাআলার জন্য আবশ্যক হলো তাঁর সাক্ষাৎকারীকে সম্মানিত করা।"
যতোবার বলবে ততোবার লেখা হবে
[২৬৪] আবু উসমান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সালমান ফারেসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "একজন ব্যক্তি যখন বেশি বেশি 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে, তখন ফেরেশতা সেটা লিখতে কঠিনবোধ করে। অবশেষে যখন সে তার প্রভুর দ্বারস্থ হয় তখন তিনি বলেন, "আমার বান্দা যেভাবে তা বেশি বেশি বলেছে, তুমিও তা সেভাবে লেখো।"
হাউযে কাউসারে তিনি নবীজীর সঙ্গে মিলিত হবেন
[২৬৬৫] আবু সুফয়ান তাঁর কয়েক জন শায়খ থেকে বর্ণনা করেন, সা'দ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-সালমান ফারেসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখার জন্য তাঁর কাছে গেলেন। তাঁকে দেখে সালমান ফারেসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কেঁদে ফেললেন। সা'দ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁকে বললেন, "হে আবু আবদুল্লাহ, আপনি কেন কাঁদছেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ইন্তেকাল করেছেন এই অবস্থায় যে তিনি আপনার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন; হাউযে কাউসারে আপনি তাঁর সঙ্গে মিলিত হবেন এবং আপনার সঙ্গীদের সঙ্গেও মিলিত হবেন।" সালমান ফারেসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তখন বললেন, "হ্যাঁ, আমি তো মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছি না এবং দুনিয়ার প্রতি লালায়িত হয়েও কাঁদছি না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-আমাদেরকে দৃঢ়ভাবে বলেছেন:
لِتَكُنْ بُلْغَةُ أَحَدِكُمْ مِنَ الدُّنْيَا مِثْلُ زَادِ الرَّاكِبِ "দুনিয়াতে তোমাদের প্রয়োজনপূরণের সম্পদ যেনো একজন মুসাফিরের পাথেয়র মতো হয়।"
তিনি বলেন, "অথচ আমার চারপাশে কত সম্পদ।" বর্ণনাকারী বলেন, "তাঁর কাছে তখন একটি পানপাত্র, একটি খাবারের পাত্র, একটি ওজু বা গোসলের পাত্র ছিলো।” সা'দ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "হে আবু আবদুল্লাহ, আপনি আমাদের এমন একটি উপদেশ দিন যা আমরা আপনার মৃত্যুর পর পালন করবো।" সালমান ফারেসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "হে সা'দ, আপনি আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করুন যখন আপনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হন, আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করুন যখন আপনি সম্পদ বণ্টন করেন এবং আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করুন যখন কোনো বিচারের ফয়সালা দেন।"
তাঁর লজ্জাশীলতা
[২৬৬] কায়স বিন হারিস-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সালমান ফারেসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমার কোনো মুসলমানের সতর দেখা অথবা কোনো মুসলমানের আমার সতর দেখা থেকে আমার কাছে প্রিয় হলো আমার মৃত্যুবরণ করে পুনরুত্থিত হওয়া, আবারও মৃত্যুবরণ করে পুনরুত্থিত হওয়া, আবারও মৃত্যুবরণ করে পুনরুত্থিত হওয়া।”
তখন আল্লাহ তাআলার অভিসম্পাত নেমে আসবে
[২৬৭] আলা বিন আল-মুসাইয়িব-রাহিমাহুল্লাহ-বলে সালমান ফারেসি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-থেকে মারফু হাদিসরূপে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, যখন ইলম ব্যাপক হবে, কিন্তু আমল (কিছু লোকের মধ্যে) সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে; মানুষের জিহ্বাসমূহ একই কথা বলবে, কিন্তু তাদের অন্তর হবে ভিন্ন ভিন্ন; (তাদের মুখের কথা ও মনের ভাবনার কোনো মিল থাকবে না); প্রত্যেকেই তার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে। সেই সময় আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর অভিসম্পাত বর্ষণ করবেন; তাদের বধির করে দেবেন এবং চক্ষুসমূহকে অন্ধ করে দেবেন।”
তিনটি বিষয় হাসির এবং তিনটি বিষয় কান্নার
[২৬৮] জাফর—রাহিমাহুল্লাহ—থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সালমান ফارهসি— রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলতেন, “তিনটি বিষয় আমাকে হাসায় এবং তিনটি বিষয় আমাকে কাঁদায়। আমার হাসি পায় দুনিয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষীকে দেখে, যাকে মৃত্যু পিছু ধাওয়া করছে; হাসি পায় ওই গাফেলকে দেখে, যাকে সব সময় নজরে রাখা হচ্ছে এবং হাসি পায় এমন লোককে দেখে যে অট্টহাসি হাসছে, অথচ সে জানে না সে কি তার প্রতিপালককে অসন্তুষ্ট করছে না-কি সন্তুষ্ট করছে। আর তিনটি বিষয় আমাকে কাঁদায় : মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রেমিকগণ ও তাঁর সঙ্গীসাথিদের বিদায়; মৃত্যুযন্ত্রণার সময় উপস্থিত হওয়ার ভীতি, রাব্বুল আলামীনের সামনে দণ্ডায়মান হওয়া, যখন আমি জানতে পারবো না আমি কি জান্নাতে যাবো না-কি জাহান্নামে যাবো।”
ইবাদতের জন্য বাড়ির ছাদে ঘর
[২৬৯] উইয়াইনাহ বিন আবদুর রহমান—রাহিমাহুল্লাহ—তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, উসমান বিন আবুল আস—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, “যদি জুমআর নামায এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জামাত না থাকতো তাহলে আমি আমার এই বাড়ির ছাদে ছোট একটি ঘর বানাতাম এবং কবরে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত তা থেকে বের হতাম না।"
বিলাল—রাদিয়াল্লাহু আনহু—এর দোয়া
[২৭০] উমাইর বিন হানি আল-আনাসি—রাহিমাহুল্লাহ—বিলাল—রাদিয়াল্লাহু আনহু—এর স্ত্রী হিন্দা আল-খাওলানিয়্যাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “আমি বিলালকে বলতে শুনেছি যে, “হে আল্লাহ, আমার ভালো আমলগুলো কবুল করুন এবং পাপসমূহ মার্জনা করুন এবং আমার অসুস্থতার সময়ে আমাকে ক্ষমা করুন।"
পথে কখনো কোনো ময়লা ফেলতেন না
[২৭১] ইসমাঈল বিন উবাইদ বলেন, আয়েয বিন আমর—রাহিমাহুল্লাহ— বলেছেন, “মুসলমানদের চলার পথে আমার চিলুমচির ময়লাপানি ফেলার চেয়ে সেটাকে আমার বাসরঘরে ফেলাকে অধিক শ্রেয় মনে করি।” বর্ণনাকারী বলেন, “তাঁর বাড়ি থেকে কোনো পানি বের হতো না; এমনকি বৃষ্টির পানিও না।” বর্ণনাকারী বলেন, “তিনি স্বপ্নে দেখেন যে তিনি জান্নাতবাসী হয়েছেন।"
শোকে তিন দিন তিন রাত না খেয়ে থাকলেন
[২৭২] শাইবানি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আমরা কনস্ট্যান্টিনোপলের যুদ্ধে মাসলামা বিন আবদুল মালিকের সঙ্গে ছিলাম। (ভয়ংকর যুদ্ধ হয়েছিলো সেদিন।) মানজানিকগুলোর পাশ থেকে হতাহতদের সরিয়ে নেওয়া যাচ্ছিলো। কিন্তু মাসআলা বিন আবদুল মালিকের সামনে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য পরিবেশন করা হচ্ছিলো। তখন আমি একজন লোককে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলতে শুনলাম। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ তাআলা আপনাকে রহম করুন, আপনি ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বললেন? তিনি বললেন, আমরা মালিক বিন আবদুল্লাহ আল-কাসআমীর সঙ্গে একটি যুদ্ধে ছিলাম। সেখানে মুসলমানদের একজন লোক আক্রান্ত হলো (নিহত হলো)। তারপর মালিক বিন আবদুল্লাহর সামনে রাতের খাবার পরিবেশন করা হলো। কিন্তু তিনি খেলেন না। পরের দিন তিনি রোযা রাখলেন। এভাবে তিনি তিন তিন ও তিন রাত না খেয়ে থাকলেন, তা কেবল ওই নিহত মুসলমানের শোকে। এমনকি মুসলমানদের সবাই ওই নিহত ব্যক্তির জন্য শোক প্রকাশ করছে, যেভাবে আপন বন্ধু মৃত্যুবরণ করলে শোক প্রকাশ করে।”
তা আল্লাহর পক্ষ থেকে লেখা হয়েছে
[২৭৩] মালিক বিন আবদুল্লাহ—রাহিমাহুল্লাহ—এর আযাদকৃত গোলাম হাসান— রাহিমাহুল্লাহ—থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তাঁর পায়ের নলায়—অর্থাৎ, মালিকের পায়ের নলায় একটি রগে ‘আল্লাহু’ শব্দটি লেখা ছিলো। তিনি ওজু করার সময় আমি ওই রগটির দিকে তাকিয়েছিলাম। তিনি বললেন, “তাকিয়ে কী দেখছো? জেনে রাখো, এই শব্দটি (দুনিয়ার) কোনো লেখক লেখেননি।”
মজলিস থেকে ওঠে এলে তাদের সালাম দেওয়া
[২৭৪] মুআবিয়া বিন কুররা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমার পিতা আমাকে বলেছেন, "হে বৎস, তুমি যদি এমন একদল লোকের সঙ্গে থাকো যারা আল্লাহ তা'আলার যিকির করছে, তখন তোমার ওখান থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজন হলো, তবে উঠে আসার সময় তুমি তাদের সালাম দাও। তা এ-কারণে যে, তারা যতোক্ষণ বসে থাকবে ততোক্ষণ তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।"
সৎ মানুষের অন্তর আল্লাহ তা'আলার পাত্র
[২৭৫] আবু উমামা আল-বাহেলি-রাদিয়াল্লাহু আনহু- বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন :
إِنَّ لِلَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى آنِيَةً فِي الْأَرْضِ وَأَحَبُّ الْآنِيَةِ إِلَيْهِ مَا رَقَ مِنْهَا وَصَفَا، وَآنِيَةُ اللَّهِ فِي الْأَرْضِ قُلُوبُ الْعِبَادِ الصَّالِحِينَ
"নিশ্চয় জমিনের বুকে আল্লাহ তা'আলার কিছু পাত্র রয়েছে। আল্লাহ তা'আলার সেটিই সবচেয়ে প্রিয় পাত্র যা নরম ও কোমল। জমিনের বুকে আল্লাহর পাত্রসমূহ হলো সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অন্তর।"

টিকাঃ
৪২. علج: বিশাল-বপু অনারব কাফের বা যে-কোনো কাফের।
৪৩. মূল কিতাবে এই হাদীসটি 'ফাদলু আবি হুরায়রাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু' শিরোনামাধীন আনা হয়েছে।
৪৪. মূল কিতাবে এই হাদীসটি ‘ফাদলু আবি হুরায়রাহ—রাদিয়াল্লাহু আনহু’—শিরোনামাধীন আনা হয়েছে।
৪৫. মূল কিতাবে এই হাদীসটি ‘ফাদলু আবি হুরায়রাহ—রাদিয়াল্লাহু আনহু’ শিরোনামাধীন আনা হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00