📄 আলী বিন আবু তালিব—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া
পরিচয় গোপন রেখে জামা ক্রয়
[১৩৩] আবু মাতার-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আমি আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু- কে দেখলাম তিনি লুঙ্গি-পরিহিত, গায়ে চাদর জড়ানো এবং সঙ্গে একটি বর্শা। যেনো তিনি গ্রাম্য বেদুইন। এই বেশে তিনি সুতি কাপড়ের বাজারে (দারে ফুরাত) পৌঁছলেন। তিনি একটি জামার দাম তিন দিরহাম বললেন। কিন্তু লোকটি তাঁকে চিনে ফেলায় তিনি তাঁর থেকে কিছু কিনলেন না। তারপর আরেক জন দোকানির কাছে এলেন। সেও তাঁকে চিনে ফেলায় তিনি তার থেকেও কিছু কিনলেন না। তারপর তিনি একজন কিশোর দোকানির কাছে এলেন এবং তার থেকে তিন দিরহাম দিয়ে একটি জামা কিনলেন। কিশোরটির বাবা দোকানে এলে কোনো লোক তাকে জানালো (যে, তার ছেলে আমীরুল মুমিনীনের কাছে তিন দিরহামে একটি জামা বিক্রি করেছে। অথচ সে তা দুই দিরহামে বিক্রি করতো)। ফলে কিশোরটির বাবা একটি দিরহাম নিয়ে আলী- রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে বললো, হে আমিরুল মুমিনীন, এই দিরহামটি নিন। তিনি বললেন, "এটা কিসের দিরহাম?" লোকটি বললো, "আপনি যে- জামাটি ক্রয় করেছেন তার দাম দুই দিরহাম।" তখন তিনি বললেন, "সে আমার কাছে জামাটি আমার সম্মতিতে বিক্রি করেছে এবং তার সম্মতিতে জামাটির মূল্য গ্রহণ করেছে।” (তাই তিনি দিরহামটি নিলেন না।)
দশ জনের নয় জনই সত্য অস্বীকার করবে
[১৩৪] আওফা বিন দালহাম আল-আদাভী-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমার কাছে আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-থেকে এই বর্ণনা পৌঁছেছে যে, তিনি বলেছেন, "তোমরা ইলম অর্জন করো, তার দ্বারা তোমরা পরিচিত হবে। ইলম অনুযায়ী আমল করো, তাহলে 'আহলে ইলম'গণের অন্তর্ভুক্ত হবে। তোমাদের পরে এমন এক যুগ আসবে যখন দশ জনের মধ্যে নয় জনই সত্য অস্বীকার করবে। যারা দুনিয়া বিমুখ থাকবে কেবল তারাই বেঁচে যাবে। তারাই হলো হেদায়েতের ইমাম এবং ইলমের আলোকবর্তিকা।"
অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তির অনুসরণের আকাঙ্ক্ষা
[১৩৫] মুহাজির আল-আমিরি-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমি তো তোমাদের ব্যাপারে দুটি বিষয়ের আশংকা করি: অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ। অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষা আখেরাতকে ভুলিয়ে দেয় এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ সত্য থেকে বিরত রাখে। আরে সাবধান! দুনিয়া তো পশ্চাদ্গামী আর আখেরাত আগমনকারী। আর দুনিয়া ও আখেরাত উভয়েরই দাস রয়েছে। সুতরাং তোমরা আখেরাতের দাস হও; দুনিয়ার দাস হোয়ো না। আজ আমল আছে, কিন্তু হিসাব নেই। আগামীকাল (আখেরাতে) হিসাব থাকবে, কিন্তু আমল থাকবে না।"
পরনের চাদর বিক্রি
[১৩৬] আবু বাহর-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁদের শায়খ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পরনে একটি মোটা চাদর দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, "আমি এটি পাঁচ দিরহাম দিয়ে খরিদ করেছি। কেউ যদি আমাকে এক দিরহাম বাড়িয়ে দেয় তবে আমি তা তার কাছে বিক্রি করবো।" বর্ণনাকারী শায়খ বলেন, আমি তাঁর কাছে কিছু খুচরা দিরহাম দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, "আমরা ইয়ানবু থেকে যে-ভাতা পাই তা থেকে এগুলো উদ্বৃত্ত হয়েছে।"
বাইতুল মাল ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করার নির্দেশ
[১৩৭] মুজাম্মাআ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কখনো বাইতুল মাল ঝাড় দিয়ে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করার নির্দেশ দিতেন। তারপর তাতে এই আশায় নামায পড়তেন যে, কিয়ামতের দিন বাইতুল মাল তাঁর ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে যে, তিনি মুসলমানদের না দিয়ে তাতে মাল আটকে রাখেননি।"
আধা দিরহাম দিয়ে গোশত ক্রয়
[১৩৮] আলী বিন রাবীআ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর দুজন স্ত্রী ছিলো। প্রথম জনের পালার দিন এলে আধা দিরহাম দিয়ে গোশত খরিদ করতেন এবং দ্বিতীয় জনের পালার দিন এলে বাকি আধা দিরহাম দিয়ে গোশত খরিদ করতেন।"
জাহান্নামের দরজার বর্ণনা
[১৩৯] হিত্তান বিন আবদুল্লাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমরা কি জানো জাহান্নামের দরজা কেমন হবে?” বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বললাম, এসব দরজার মতো হবে। তিনি বললেন, "না; বরং তা এ রকম হবে।" এই কথা বলে তিনি তাঁর হাত উপরের দিকে উঠালেন এবং প্রসারিত করলেন। আর আবু উমর তাঁর হাত আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর হাতের ওপর উঁচু করলেন।
নিজ হাতে উটকে খাওয়াচ্ছিলেন
[১৪০] আবু মুলাইকাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "উসমান বিন আফ্ফান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-যখন তাঁর হাতে বাইআত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে খবর পাঠালেন। তিনি তাঁকে একটি আলখাল্লা পরিহিত দেখলেন আর তাঁর মাথায় একটি মস্তকবন্ধনী বাঁধা। তিনি তখন তাঁর একটি উটকে খাওয়াচ্ছিলেন।"
তালিযুক্ত জামার পরিধানে অন্তর বিনম্র থাকে
[১৪১] উমর বিন কায়স-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কেন আপনি জামায় তালি লাগান? তিনি বললেন, "তাতে অন্তর বিনম্র হয় এবং মুমিনরা তা অনুসরণ করে।"
সাদাসিধে জীবনের নমুনা
[১৪২] আদি বিন সাবেত-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে ফালুজা (আটা, পানি ও মধু দ্বারা তৈরি মিষ্টান্নাবিশেষ) নিয়ে আসা হলো। কিন্তু তিনি তা খেলেন না।"
নিজ হাতে কাজ করে খাদ্য উপার্জন
[১৪৩] মুজাহিদ-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমি একটি বাগান বা উদ্যানের কাছে এলাম। তার মালিক বললো, বাগানে এক বালতি পানি দেওয়ার বিনিময়ে একটি খেজুর পাবে। (এতে কি তুমি রাজি আছো?) তখন আমি একটি খেজুরের বিনিময়ে এক বালতি করে পানি দিতে শুরু করলাম। খেজুরে আমার হাত ভরে গেলো। তারপর পানি পান করলাম। অতঃপর হাতভর্তি খেজুর নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এলাম। তাঁর কিছুটা তিনি খেলেন, কিছুটা আমি খেলাম।"
তাঁর কাছে একটি লুঙ্গির দাম ছিলো না
[১৪৪] ইয়াযিদ বিন মিহযান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমরা রাহাবায় আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি একটি তরবারি নিয়ে আসতে বললেন। তারপর তা কোষমুক্ত করে বললেন, এ তরবারিটি কে ক্রয় করবে? আল্লাহর কসম! যদি আমার কাছে একটি লুঙ্গি কেনার দাম থাকতো, তবে আমি তা বিক্রি করতাম না।"
মিথ্যাবাদীর চোখ অন্ধ হয়ে গেলো
[১৪৫] যাযান আবু উমর রাহিমাহুল্লাহ-এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-রাহাবায় থাকাকালে এক ব্যক্তিকে একটি হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু লোকটি তাঁকে মিথ্যা বললো। আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "তুমি আমার সঙ্গে মিথ্যা বলেছো।" লোকটি বললো, "না, আমি মিথ্যা বলিনি।" আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "তুমি যদি আমার সঙ্গে মিথ্যা বলে থাকো, তবে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করবো তিনি যেনো তোমার চোখ অন্ধ করে দেন।" বর্ণনাকারী বলেন, "তিনি আল্লাহর কাছে লোকটির চোখ অন্ধ করে দেওয়ার জন্য দোয়া করলেন। ফলে সে অন্ধ হয়ে গেলো।"
পরিচয় গোপন রেখে জামা ক্রয়
[১৪৬] আবু আবদুর রহমান হামদানি-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর দাদি থেকে, তিনি তাঁর মা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-ফুরাতের আবাসস্থলে আসার পর একজন দরজিকে বললেন, "তুমি কি জামাটি বিক্রি করবে? তুমি কি আমাকে চেনো?” দরজি বললো, "হ্যাঁ, আপনাকে চিনি।” আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "তাহলে তোমার থেকে জামা ক্রয়ে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।” তিনি আরেক জন দরজির কাছে এলেন এবং তাকে বললেন, "তুমি কি আমাকে চেনো?” দরজি বললো, "না, চিনি না।” তিনি বললেন, "তাহলে সুতি কাপড়ের জামাটি আমার কাছে বিক্রি করো।" দরজি জামাটি বিক্রি করলো। আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাকে বললেন, "জামাটি লম্বা করে ধরো।" জামার হাতা তাঁর আঙুলের ডগা পর্যন্ত পৌঁছলে তিনি বললেন, “তুমি অতিরিক্ত অংশটুকু কেটে ফেলো।” দরজি (জামার অতিরিক্ত অংশ কেটে দিয়ে) মুড়ি সেলাই করে দিলো। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-জামাটি পরিধান করলেন এবং এই দোয়া পাঠ করলেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي كَسَانِي مَا أَتَوَارَى بِهِ وَأَتَجَمَّلُ فِي خَلْقِهِ
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে বস্ত্র পরিধান করিয়েছেন, যার দ্বারা আমি লজ্জা নিবারণ করি এবং আমার দেহকে সজ্জিত করি।"
হেঁটে যেতেন ঈদগাহে
[১৪৭] আবু সিনান আশ-শাইবানি-রাহিমাহুল্লাহ-হেরাতের এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, “আমি আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে ঈদগাহে হেঁটে যেতে দেখেছি।"
নিজের শাহাদাতবরণের ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী
[১৪৮] যায়দ বিন ওয়াহাব আল-জুহানি-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে বসরার অধিবাসীদের একটি প্রতিনিধিদল এলো। তাদের মধ্যে একটি লোক ছিলো খাওয়ারিজদের নেতা। তার নাম ছিলো জা'দ বিন বা'জাহ। সে লোকদের উদ্দেশে ভাষণ দিলো এবং আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও মহিমা প্রকাশ করলো। সে বললো, হে আলী, আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। তাহলে আপনি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন। আর আপনি 'মুহসিন'-এর অবস্থা তো জানেনই (তিনি কীভাবে মৃত্যুবরণ করেছিলেন)। (বক্তা এখানে মুহসিন বলে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বুঝিয়েছে।) তারপর আবার বললো, “আপনি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন।” আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তখন বললেন, “না, যাঁর হাতে আমার প্রাণ তার কসম! বরং আমি নির্মমভাবে নিহত হবো। এটা (গর্দান) কর্তন করা হবে এবং এটা (দাড়ি) রক্তে রঞ্জিত হবে। এটাই চূড়ান্ত পরিণতি এবং অবধারিত নিয়তি। যে-ব্যক্তি মিথ্যা রটনা করবে সে অবশ্যই ধ্বংস হবে।” তারপর জা'দ বিন বা'জাহ বললো, “আপনাকে ভালো পোশাক পরতে কে বাধা দিয়েছে?” আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, “আমার পোশাকের ব্যাপারে তোমার সমস্যা কী? নিশ্চয় আমার এই পোশাক অহংকারমুক্ত এবং মুসলমানদের অনুসরণ করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।"
যাতে অভ্যস্ত নন তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন
[১৪৯] হাব্বাতা বিন জাবিন আল-উরানি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, আলী- রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে ফালুজা উপস্থিত করা হলো। তিনি ফালুজাটা তার সামনে রাখলেন এবং বললেন, "তোমার ঘ্রাণ চমৎকার, তোমার রং সুন্দর, তোমার স্বাদও চমৎকার। কিন্তু যাতে আমি অভ্যস্ত নই নিজেকে তাতে অভ্যস্ত করতে অপছন্দ করি।"
লম্বা হওয়ার কারণে জামার হাতা কেটে ফেললেন
[১৫০] মাতির বিন সা'লাবা আত-তাইমি সুতি কাপড় বিক্রেতা আবুন নাওয়ার থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "আলী বিন আবু তালিব-রাদিয়াল্লাহু আনহু- আমার কাছে এলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর এক গোলাম ছিলো। তিনি আমার কাছ থেকে দুটি সুতি কাপড়ের জামা কিনলেন। তারপর তার গোলামকে বললেন, "জামা দুইটির মধ্যে তোমার যেটা পছন্দ সেটা নিয়ে নাও। গোলাম একটি জামা নিলো, অপরটি আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-নিলেন। তারপর জামাটি পরিধান করলেন এবং হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “যে-অংশটুকু আমার হাতের চেয়ে লম্বা হয়েছে সেটা কেটে ফেলো।" দরজি অতিরিক্ত অংশ কেটে দিলো এবং মুড়ি সেলাই করে দিলো। তিনি সেই জামাটি পরে চলে গেলেন।
নিজেই খেজুর বহন করে নিয়ে গেলেন
[১৫১] আলী বিন হাশিম কাপড়-ব্যবসায়ী সালেহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি তাঁর মা বা দাদি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, "আমি দেখেছি, আলী- রাদিয়াল্লাহু আনহু-এক দিরহাম দ্বারা কিছু খেজুর ক্রয় করলেন এবং খেজুরগুলো একটি কম্বলে মুড়িয়ে নিজেই বহন করলেন। লোকেরা বললো, "হে আমিরুল মুমিনীন, আপনার পরিবর্তে আমরা বহন করে দিই।” তিনি বললেন, “না, পরিবারের কর্তারই তা বহন করা অধিক যুক্তিযুক্ত।"
একজন মহান ব্যক্তির চলে যাওয়া
[১৫২] আমর বিন হাবাশি বলেন, হাসান বিন আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা- আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-নিহত হওয়ার পর আমাদের উদ্দেশে বক্তৃতা দিলেন। তিনি বললেন, "একজন বিশ্বস্ত মানুষ তোমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর পূর্বে তাঁর মতো জ্ঞানী ব্যক্তি কেউ ছিলেন না এবং পরবর্তী লোকেরাও তাঁর সমকক্ষ হতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-যদি তাঁর হাতে ঝান্ডা দিয়ে যুদ্ধে প্রেরণ করতেন তাহলে তিনি বিজয়ী না হয়ে ফিরে আসতেন না। তিনি সোনা-রুপা বিত্ত-বৈভব রেখে যাননি। কেবল তিনি যে-ভাতা পেতেন ওই ভাতা থেকে সাতশটি দিরহাম থেকে গিয়েছিলো, যা তিনি পরিবারের খাদেমের জন্য বরাদ্দ রাখতেন।"
ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বেঁধেছিলেন
[১৫৩] মুহাম্মদ বিন কা'ব আল-কুরাযি আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলাম, তখন এমনও অবস্থা হয়েছে যে, ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বেঁধেছি। অথচ আজকে আমার সদকার পরিমাণ চল্লিশ হাজার।"
📄 আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া
সর্বত্র আল্লাহর নেয়ামত বিস্তৃত
[১৫৪] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “হে বৎস, তুমি মানুষের মধ্যে যা-কিছু দেখো তার সবকিছুর তত্ত্ব-তালাশে লেগে যেয়ো না। যে-ব্যক্তি মানুষের মধ্যে কোনো-কিছু দেখেই তার তত্ত্ব-তালাশে লেগে যায় তার দুঃখ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তার ক্রোধ কখনো প্রশমিত হয় না। আর যে-ব্যক্তি তার পানাহার ব্যতীত অন্য কোথাও আল্লাহর নেয়ামত দেখতে পায় না তার আমল কমে যায় এবং তার শাস্তি উপস্থিত হয়। আর যে-ব্যক্তি দুনিয়ার ব্যাপারে অমুখাপেক্ষী নয়, তার কোনো দুনিয়াই নেই।" (বিপুল সম্পত্তির মালিক হওয়ার পরও তার মনে সম্পদের হাহাকার থেকে যায়। যেনো সে কিছুই পায়নি।)
যাঁর কাছে কুরআনের সার্বিক মর্ম উন্মোচিত তিনিই জ্ঞানী
[১৫৫] আবু কিলাবাতা-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তুমি ততোক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ জ্ঞানী হতে পারবে না যতোক্ষণ তোমার কাছে কুরআনের বিভিন্ন দিক উন্মোচিত হবে। তুমি ততোক্ষণ পর্যন্ত জ্ঞানী হতে পারবে না যতোক্ষণ না আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কারণে মানুষের প্রতি তোমার ঘৃণা জন্মাবে, তারপর নিজের দিকে তাকিয়ে দেখবে যে, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কারণে মানুষের চেয়ে নিজের প্রতিই তোমার তীব্র ঘৃণা জন্মেছে।"
কুরআনের বদৌলতে রয়েছে মহাপুরস্কার
[১৫৬] আওফ বিন মালিক আল-আশযায়ি-রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি স্বপ্নে চামড়া-নির্মিত একটি তাঁবু এবং একটি সবুজ উদ্যান দেখতে পেলেন। তাঁবুর চারপাশে বিশ্রামরত মেষপাল দেখতে পেলেন। মেষগুলো জাবর কাটছে এবং মলরূপে আজওয়া খেজুর ত্যাগ করছে। তিনি বলেন, "আমি বললাম, এই তাঁবুটি কার?" বলা হলো, "আবদুর রহমান বিন আওফের।" আওফ বিন মালিক-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, আমরা অপেক্ষা করলাম। তিনি (আবদুর রহমান বিন আওফ) বেরিয়ে এলেন এবং আমাকে বললেন, "হে আওফ, কুরআনুল কারীমের বদৌলতে আল্লাহ তাআলা আমাকে এগুলো দান করেছেন। আর আপনি যদি এই প্রাসাদ দেখতেন, তাহলে এমন-সব বস্তু দেখতে পেতেন যা আপনা চোখ কখনো দেখেনি, যার কথা আপনার কান কখনো শোনেনি এবং যার ধারণা আপনার মনে কখনো উদিত হয়নি। আল্লাহ তাআলা আবুদ দারদার জন্য প্রস্তুত রেখেছেন। তা এ-কারণে যে, তিনি দুই হাত ও অন্তর দ্বারা দুনিয়াকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন।"
কেউই মৃত্যু থেকে রেহাই পাবে না
[১৫৭] সাঈদ আল-জারিরি-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর জনৈক শায়খ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-একজন লোককে জানাযায় শরিক হতে দেখলেন। সে বলছিলো, এই লোক কে? এই লোক কে? তার কথা শুনে আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "এটা তো তুমি, এটা তো তুমি। আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন:
إِنَّكَ مَيِّتُ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ "নিশ্চয় আপনি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল।"
তাঁর পাপসমূহই তাঁর অসুখ
[১৫৮] মুআবিয়া ইবনে কুরা আল-মুযানি-রাহিমাহুল্লাহ-বর্ণনা করেন, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-অসুস্থতা বোধ করলে তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে দেখতে এলেন। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কী অসুখ, হে আবুদ দারদা?" তিনি বললেন, "আমার পাপসমূহই আমার অসুখ।" তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে আপনি কী কামনা করেন?" তিনি বললেন, "আমি জান্নাত কামনা করি।" তাঁরা বললেন, "আমরা কি আপনার জন্য একজন ডাক্তার ডেকে আনবো না?" তিনি বললেন, "যিনি ডাক্তার তিনিই তো আমাকে শুইয়ে রেখেছেন।"
যতোটুকু যথেষ্ট ততোটুকুই কল্যাণকর
[১৫৯] আবদুল্লাহ বিন মুররা-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমরা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করো এমনভাবে যে তোমরা তাঁকে দেখছো। তোমরা নিজেদের মৃত বলে গণ্য করো। তোমরা জেনে রাখো যে, তোমাদের গাফেল করে দেওয়া অধিক সম্পদের তুলনায় সেই সম্পদই বেশি কল্যাণকর যা অল্প হলেও প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট হয়। মনে রেখো, সৎকাজ কখনো বিনষ্ট হয় না এবং পাপের কথা কখনো ভোলা যায় না।"
সচ্ছলতার দিনগুলোতে আল্লাহকে ভোলা যাবে না
[১৬০] আবু কিলাবাতা-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "সচ্ছলতার দিনগুলোতে আল্লাহ তাআলাকে ডাকো তাহলে নিশ্চয় তিনি দুরবস্থার দিনগুলোতেও তোমার ডাকে সাড়া দেবেন।"
আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন মানুষও তাকে ভালোবাসে
[১৬১] আবদুর রহমান বিন আবু লায়লা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-সালামা বিন মাখলাদের কাছে এই চিঠি লিখলেন: "পর সমাচার এই যে, বান্দা যখন আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সঙ্গে আমল করে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে ভালোবাসেন। আল্লাহ যখন তাকে ভালোবাসেন, তখন তাকে মানুষের মধ্যেও প্রিয়ভাজন বানিয়ে দেন। আর বান্দা যখন আল্লাহর নাফরমানি করে, আল্লাহ তাকে অপছন্দ করেন। আল্লাহ যখন তাকে অপছন্দ করেন, তখন মানুষের মধ্যেও তাকে অপছন্দনীয় বানিয়ে দেন।"
চিন্তা ও উপদেশগ্রহণ উত্তম আমল
[১৬২] আওন বিন আবদুল্লাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উম্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সবচেয়ে উত্তম আমল কী ছিলো? তিনি বললেন, "চিন্তা ও উপদেশগ্রহণ।"
বাজার মানুষকে উদাসীন বানিয়ে দেয়
[১৬৩] সুলাইমান বিন আমের-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, মানুষের ঘর তার জন্য কতই-না উত্তম ইবাদতখানা! তাতে তার চোখ ও জিহ্বা হেফাজতে থাকে। তোমরা বাজার থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, বাজার মানুষকে গাফেল বানিয়ে দেয় এবং অনর্থক কাজে লিপ্ত করে।"
তিনটি ব্যাপার না থাকলে মৃত্যুই হতো শ্রেয়
[১৬৪] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "যদি তিনটি ব্যাপার না থাকতো, তবে আমি মাটির উপরে নয়, মাটির গর্ভে থাকাটাই পছন্দ করতাম: আমার বন্ধুরা, যারা আমার কাছে ভালো কথা বলতে আসেন যেভাবে ভালো খেজুর নির্বাচন করা হয়; আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হয়ে চেহারাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে রাখা; আল্লাহর পথে একটি সকাল বা একটি সন্ধ্যা।"
তওবাকারী ও যিকিরকারীদের জন্য দোয়া
[১৬৫] আবু জাবের-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাহাজ্জুদগুজার লোকদের কুরআন তেলাওয়াত শুনলে বলতেন, "যারা কিয়ামতের পূর্বে নিজেদের জন্য কান্নাকাটি করে এবং আল্লাহর যিকির দ্বারা যাদের হৃদয় বিগলিত হয় তাদের জন্য আমার পিতা কুরবান হোক।"
সময় শেষ হওয়ার আগেই সৎকাজ করার উপদেশ
[১৬৬] রাবীআ বিন যায়দ রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, "যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তোমরা সৎকাজ করে নাও। কারণ, তোমরা তোমাদের আমল দ্বারাই লোকদের সঙ্গে লড়াই করবে।"
আল্লাহর কাছে দুনিয়া মাছির ডানা থেকেও মূল্যহীন
[১৬৭] বিলাল বিন সা'দ-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আল্লাহর কসম! যদি আল্লাহ তাআলার কাছে দুনিয়ার মূল্য মাছির ডানা পরিমাণও হতো, তিনি ফেরআউনকে এক ঢোক পানিও পান করাতেন না।"
যিকিরকারীরা হাসতে হাসতে জান্নাতে প্রবেশ করবে
[১৬৮] জুবাইর বিন নুফাইর-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে যাদের জিহ্বা আল্লাহর যikির দ্বারা সিক্ত থাকে তারা হাসতে হাসতে জান্নাতে প্রবেশ করবে।"
আলেম ব্যতীত কারও থেকে দীনের কথা গ্রহণযোগ্য নয়
[১৬৯] জুবাইর বিন নুফাইর-রাহিমাহুল্লাহ-বর্ণনা করেছেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "যিনি আলেম এবং যিনি আলেমের বক্তব্য বর্ণনা করেন তাদের উভয়ই প্রতিদানের ক্ষেত্রে সমান। আর তারা উভয়ে ব্যতীত অন্যদের মাঝে কল্যাণ নেই।” (তাদের থেকে দ্বীনের কথা গ্রহণ করা যাবে না।)
জ্ঞানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের প্রতিদান সমান
[১৭০] সালিম বিন আবুল জা'দ-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “কল্যাণকর জ্ঞানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ই প্রতিদানের ক্ষেত্রে সমান। এই দুই প্রকার মানুষ ছাড়া অন্য মানুষের মাঝে কল্যাণ নেই।"
তিনটি কারণে মানুষ পরিশুদ্ধ হতে পারে না
[১৭১] জুবাইর বিন নুফাইর-রাহিমাহুল্লাহ-বর্ণনা করেছেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তিনটি বিষয় না থাকলে মানুষ পরিশুদ্ধ হয়ে যেতো: অনুসৃত কৃপণতা, অনুসৃত প্রবৃত্তি এবং প্রত্যেক মত প্রদানকারীর নিজের মতের প্রতি মুগ্ধ হওয়া।"
আল্লাহর যিকির দ্বারা জিহ্বাকে সজীব রাখা উত্তম আমল
[১৭২] সালিম বিন আবুল জা'দ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলা হলো, সা'দ বিন মুনাব্বিহ একশোটি দলিল ঝুলিয়েছেন। তিনি বললেন, "একশোটি দলিল তো একজন ব্যক্তির জন্য অনেক বেশি সম্পদ। তুমি যদি চাও তাহলে তার চেয়ে উত্তম বিষয়ের সংবাদ তোমাকে জানাবো: দিনে-রাতে সব সময় ঈমানের ওপর অটল থাকা এবং আল্লাহর যিকির দ্বারা জিহ্বাকে সজীব রাখা।” (আল্লাহর যিকিরে মগ্ন থাকা।)
অর্জিত ইলম অনুযায়ী আমল করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা
[১৭৩] হুমাইদ বিন হেলাল বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমি যে-ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা এই যে, যখন আমি আমার মহান প্রতিপালকের সঙ্গে মিলিত হবো, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করবেন, "তুমি ইলম অর্জন করেছো, সুতরাং তুমি অর্জিত ইলম অনুযায়ী কী আমল করেছো?"
যা-কিছু আল্লাহর যিকিরের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে তা কল্যাণময়
[১৭৪] খালিদ বিন মা'দান-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "দুনিয়া হলো অভিশপ্ত। দুনিয়াতে যা-কিছু আছে তাও অভিশপ্ত, তবে আল্লাহর যিকির এবং যা-কিছু আল্লাহর যিকিরের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে তা ব্যতীত। ইলম শিক্ষাদানকারী এবং ইলম অর্জনকারী উভয়ই প্রতিদানের ক্ষেত্রে সমান। বাকি সব মানুষ অর্থহীন; তাদের মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।" (তাদের থেকে ইসলামি জ্ঞান গ্রহণ করা যাবে না।)
'আল্লাহু আকবার' যিকির উত্তম
[১৭৫] আবু রাজা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমার কাছে একশো বার 'আল্লাহু আকবার' বলা একশো দিনার সাদকা করার চেয়েও উত্তম।"
ইলম ও আলমেরদের ভালোবাসা
[১৭৬] মুআবিয়া বিন কুররা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমরা ইলম অন্বেষণ করো, যদি ইলম অন্বেষণ করতে না পারো তবে আলেমগণকে ভালোবাসো। যদি তাদের ভালোবাসতেও না পারো, তবে তাদের অপছন্দ কোরো না।"
মসজিদ ব্যবসা করার জায়গা নয়
[১৭৭] আবু আবদি রাব্বিহী-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "এ ব্যাপারটা আমাকে আনন্দ দেয় না যে, আমি মসজিদের ফটকের সামনে চত্বরে দাঁড়াই, ক্রয়-বিক্রয় করি এবং প্রতিদিন তিনশো দিনার মুনাফা আয় করি। কারণ, আমি তো প্রতিওয়াক্ত নামায মসজিদেই আদায় করি। আমি বলি না যে, আল্লাহ তাআলা ব্যবসা হালাল করেননি এবং সুদ হারাম করেননি; বরং আমি ওই সকল লোকের অন্তর্ভুক্ত হতে ভালোবাসি যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
لَا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهُ "ব্যবসা এবং কেনাবেচা তাদের আল্লাহর যিকির (স্মরণ) থেকে গাফেল করে না।"
তিনটি বিষয় তিনি পছন্দ করেন, মানুষ অপছন্দ করে
[১৭৮] আবু ইয়াস-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “তিনটি বিষয় আছে যেগুলো মানুষ অপছন্দ করে; কিন্তু আমি সেগুলো পছন্দ করি: দরিদ্রতা, অসুস্থতা ও মৃত্যু।"
হারাম পন্থায় উপার্জন এক ভয়াবহ ব্যাধি
[১৭৯] আবদুল্লাহ বিন বাবাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "হালাল পন্থায় সম্পদ উপার্জন খুব কম হয়। কেউ যদি হারাম পন্থায় সম্পদ উপার্জন এবং তা নিজের জন্য খরচ করে অথবা কেউ যদি হারাম পন্থায় সম্পদ উপার্জন করে এবং তা অন্যের জন্য খরচ করে, তবে তা এক ভয়াবহ ব্যাধি। আর যে-ব্যক্তি হালাল পন্থায় উপার্জন করে এবং নিজের জন্য তা খরচ করে, তাহলে তা পাপসমূহকে ধৌত করে দেয়, যেভাবে (বৃষ্টির) পানি পাথর থেকে মাটি ধুয়ে দেয়।"
জ্ঞানী ব্যক্তিদের সামান্য আমলও উত্তম
[১৮০] আবু সাঈদ আল-কিন্দি রাহিমাহুল্লাহ-এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "জ্ঞানী ব্যক্তিদের (রাতের বেলা) ঘুম এবং (দিনের বেলা) পানাহার কতই-না উত্তম। নির্বোধদের রাত্রিজাগরণ ও দিনের বেলা রোযা রাখার দ্বারা তারা কীভাবে প্রতারিত হবেন? যাঁর পরিপূর্ণ তাকওয়া ও ইয়াকীন রয়েছে তাদের সামান্য পরিমাণ আমল, যারা ধোঁকায় পতিত তাদের পাহাড় পরিমাণ আমলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, উত্তম ও প্রণিধানযোগ্য।"
মানুষের সামনে রয়েছে দুরতিক্রম্য বাধার পাহাড়
[১৮১] আ'মাশ-রাহিমাহুল্লাহ-জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, উন্মুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহা-আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে আটা ফুরিয়ে যাওয়ার কথা বললেন। জবাবে তিনি বললেন, "আমাদের সামনে দুরতিক্রম্য বাধার পাহাড় রয়েছে। সেখানে হালকা শরীরের মানুষ ভারী শরীরের মানুষ থেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হবে।"
মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থা জানতে পারলে মানুষ বিলাসিতা থেকে দূরে থাকতো
[১৮২] হিযাম বিন হাকিম-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমরা মৃত্যুর পর যা-কিছুর মুখোমুখি হবে তা যদি জানতে পারতে তাহলে তোমরা প্রবৃত্তিবশত (মন যা চায় তাই) কোনো খাবার খেতে না এবং প্রবৃত্তিবশতঃ কোনো পানীয় পান করতে না, বিশ্রাম গ্রহণের জন্য কোনো গৃহে প্রবেশ করতে না; বরং তোমরা পাহাড়ে অবস্থান করার জন্য লালায়িত হতে, বুক চাপড়াতে এবং নিজেদের জন্য কান্নাকাটি করতে। হায়, আমি যদি কোনো গাছ হতাম, আমাকে কেটে ফেলা হতো অথবা খেয়ে ফেলা হতো!” বুরদ বলেন, আমার কাছে এই রেওয়ায়েত পৌঁছেছে যে, একবার আবু বকর সিদ্দিক-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পাশ দিয়ে একটি পাখি উড়ে গেলো। তিনি পাখিটিকে উদ্দেশ করে বললেন, “হে পাখি, তুমি কতই-না ভাগ্যবান! তুমি ফলমূল খাও, বৃক্ষরাজিতে বিশ্রাম নাও। অথচ এ জন্য তোমাকে কোনো হিসাব দিতে হবে না।"
ঝগড়ায় লিপ্ত থাকা তোমার জালেম হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ
[১৮৩] সুলাইমান বিন মুসা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, অবিরাম যুদ্ধে লিপ্ত থাকা তোমার জালেম হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ; সব সময় ঝগড়ায় লিপ্ত থাকা তোমার জালেম হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ; এবং যা খুশি তা-ই বলে বেড়ানো তোমার মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ। তবে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে কথা-বার্তা হলে ভিন্ন কথা।
তিনি নিজের চুলায় আগুনে ফুঁক দিলেন
[১৮৪] মাইমুন বিন মিহরান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উম্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা-বলেছেন, “আমি আবুদ দারদাকে দেখেছি, তিনি আমাদের এই পাত্রটির নিচে আগুনে ফুঁক দিয়ে চলেছেন, এমনকি তাঁর চোখ থেকে পানি বইতে শুরু করেছে।"
ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে ইবাদতে একনিষ্ঠ হলেন
[১৮৫] খাইসামা থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “জাহেলি যুগে আমি ব্যবসায়ী ছিলাম। ইসলামের আগমনের পর আমি ব্যবসা ও ইবাদত দুটিই একসঙ্গে করতে শুরু করলাম; কিন্তু আমার জন্য এ দুটি একসঙ্গে হলো না। ফলে আমি ইবাদতকেই গ্রহণ করলাম এবং ব্যবসা ছেড়ে দিলাম।"
মানুষের মধ্যে কোনো সুন্নাহ দেখতে পান না
[১৮৬] সালেম বিন আবুল জা'দ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উম্মুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহা-বলেছেন, “একবার আবুদ দারদা ক্রোধান্বিত হয়ে আমার কাছে এলেন। আমি বললাম, কী হয়েছে আপনার? তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম! আমি তাদের মধ্যে মুহাম্মদ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আর কেবল নামাজ পড়া ছাড়া কোনো সুন্নাহই দেখতে পাই না।"
অসুস্থতার কারণে গুনাহ মাফ হয়
[১৮৭] সালেম বিন আবদুল্লাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-একটি লোককে দেখলেন। লোকটির ত্বক তাকে আশ্চর্যান্বিত করলো। তাই তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি কখনো জ্বরে আক্রান্ত হওনি?” সে বললো, না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার কি কখনো কাশি-টাশি হয়নি?” সে বললো, না। আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-তখন বললেন, "দুর্ভাগ্য এর, সে তার গুনাহ নিয়েই মারা যাবে।"
চিন্তামগ্ন থাকা উত্তম ইবাদত
[১৮৮] সালেম বিন আবুল জা'দ-রাহিমাহুল্লাহ-উন্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণনা করেছেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, "কিছু সময় চিন্তমগ্ন থাকা সারা রাত জেগে ইবাদত করা থেকে উত্তম।"
ইবাদতের বিষয় প্রকাশ করা ঠিক নয়
[১৮৯] আবু ইদ্রীস-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু- একজন মহিলাকে দেখলেন যার দুই চোখের মাঝখানে ছাগলের পায়ের খুরের মতো সিজদার দাগ পড়ে গেছে। তিনি তাকে বললেন, "তোমার দুই চোখের মাঝে যদি এই দাগ না থাকতো, তবে তোমার জন্য কল্যাণকর হতো।"
তিনি মৃত্যু পছন্দ করতেন
[১৯০] ইয়া'লা বিন ওয়ালীদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি যাকে ভালোবাসেন তার জন্য কী পছন্দ করেন? তিনি বললেন, "মৃত্যু।" লোকেরা বললো, যদি তার মৃত্যু না হয়, তাহলে? তিনি বললেন, "তার সম্পদ ও সন্তান স্বল্প হোক।"
তিনি ছিলেন আহলে ইলম-এর অন্তর্ভুক্ত
[১৯১] কাসেম বিন আবদুর রহমান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "আবুদ দারদা- রাদিয়াল্লাহু আনহু-ওই সকল ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে।"
মুমিনের জিহ্বা আল্লাহর কাছে প্রিয়
[১৯৯] আসাদ বিন ওয়াদাআ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "মুমিন ব্যক্তির শরীরে এমন কোনো অঙ্গ নেই যা আল্লাহ তাআলার কাছে তার জিহ্বার তুলনায় অধিক প্রিয়, জিহ্বার কারণে সে জান্নাতে প্রবেশ করে। আর কাফেরের শরীরে এমন কোনো অঙ্গ নেই যা আল্লাহ তাআলার কাছে তার জিহ্বা থেকে ঘৃণ্য, জিহ্বার কারণে সে জাহান্নামে প্রবেশ করে।"
সংকটে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা
[১৯৩] আবু হুসাইন-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "যদি তোমার ওপর এমন সংকট আপতিত হয়, যে-ব্যাপারে তোমার কোনো সামর্থ্য নেই, তাহলে ধৈর্য ধারণ করো এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুক্তির প্রতীক্ষায় থাকো।"
সাদাসিধে কাপড় পরিধানের নির্দেশ
[১৯৪] মাইমুন থেকে বর্ণিত, উম্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমার প্রিয়তম স্বামী আমাকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, "মানুষ যদি কাতান কাপড় পরে তাহলে তুমি সুতি কাপড় পরবে, মানুষ যদি সুতি কাপড় পরে তাহলে তুমি পশমের কাপড় পরবে।"
চরিত্রের সৌন্দর্যই মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যাবে
[১৯৫] শাহর থেকে বর্ণিত, উন্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা-বলেছেন, আবুদ দারদা একবার রাত্রিজাগরণ করে নামায পড়লেন, নামায পড়ার পর কাঁদতে শুরু করলেন। কেঁদে কেঁদে বললেন, "হে আল্লাহ, আপনি আমার আকৃতিকে সুন্দর বানিয়েছেন, সুতরাং আমার চরিত্রকেও সুন্দর বানান।" ভোর পর্যন্ত তিনি এই দোয়াই করলেন। আমি বললাম, হে আবুদ দারদা, রাত থেকে নিয়ে ভোর পর্যন্ত আপনি সচ্চরিত্রতার ব্যাপারেই দোয়া করে গেলেন। তিনি বললেন, "হে উন্মুদ দারদা, মুসলমান বান্দার চরিত্র যদি সুন্দর হয়, তবে চরিত্রের সৌন্দর্যই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করায়; যদি তার চরিত্র খারাপ হয়, তবে চরিত্রের দোষই তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করায়। আর মুমিন বান্দাকে তার ঘুমন্ত অবস্থায়ও ক্ষমা করে দেওয়া হয়।" আমি জিজ্ঞেস করলাম, তা কীভাবে? তিনি বললেন, "তার ভাই রাতে জাগ্রত হয় এবং তাহাজ্জুদ পড়ে, তারপর আল্লাহর কাছে দোয়া করে, আল্লাহ তাআলা তার দোয়া কবুল করে নেন। সে তার বাবার জন্য দোয়া করে, আল্লাহ তাআলা তার দোয়া কবুল করে নেন।"
পুত্রের প্রহৃত দাসীকে মুক্ত করে দিলেন
[১৯৬] আবুল মুতাওয়াক্কিল আন-নাজি-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর একটি দাসী ছিলো। তাঁর পুত্র একবার ওই দাসীকে একটি চড় মারলো। আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাকে ওই দাসীটির জন্য বসিয়ে রাখলেন এবং দাসীটিকে বললেন, "তুমি এর থেকে প্রতিশোধ নাও।" দাসীটি বললো, আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাকে বললেন, "তুমি যদি তাকে ক্ষমাই করে দিয়ে থাকো, তাহলে যাও এখানে হারাম শরীফে যতো লোক আছে তাদের ডেকে নিয়ে আসো এবং তাদের সাক্ষী রেখে বলো যে তুমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছো।" সে হারাম শরীফে গেলো এবং লোকদের ডেকে নিয়ে এসে তাদের সাক্ষী রেখে বললো যে, সে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে। তারপর আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাকে বললেন, "তুমি যাও, আল্লাহর ওয়াস্তে আমি তোমাকে মুক্ত করে দিয়েছি। হায়, আবুদ দারদার পরিবার যদি এর পরিপূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে পারতো!"
সালাম তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হাদিয়া
[১৯৭] রাশেদ বিন সা'দ থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমার ভাইয়েরা আমাকে যা-কিছু হাদিয়া দেয় তার মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় হলো তাদের সালাম। আর তাদের সম্পর্কে যেসব সংবাদ আমার কাছে পৌঁছে তার মধ্যে বিস্ময়কর সংবাদ হলো তাদের কারও মৃত্যুসংবাদ।"
জ্ঞানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মুজাহিদের সমান প্রতিদান পাবে
[১৯৮] আবদুর রহমান বিন মানসুর আল-ফাযারি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "যে-কোনো ব্যক্তি ভোরে কোনো কল্যাণের (জ্ঞানের) উদ্দেশ্যে মসজিদে যায়, তার শেখার জন্য বা শেখানোর জন্য, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার জন্য মুজাহিদের প্রতিদান লিখে দেন। সে লাভবান না হয়ে ফেরে না।"
কতিপয় উপদেশ
[১৯৯] আবদুর রহমান বিন আবু আওফ-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "সন্দেহ পোষণ করা একধরনের কুফরী; বিলাপ করা জাহেলি যুগের কাজ; কবিতা হলো শয়তানের বাঁশি; আত্মসাৎকৃত সম্পদ জাহান্নামের অঙ্গার; মদ সকল পাপের সমষ্টি; যৌবন একধরনের উন্মাদনা; নারীরা শয়তানের ফাঁদ (নারীদের দ্বারা শয়তান প্রতারিত করে); অহংকার সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যাপার; সবচেয়ে নিকৃষ্ট খাবার হলো এতিমের মাল ভক্ষণ; নিকৃষ্ট উপার্জন হলো সুদ; সে-ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান যে অন্যের দ্বারা উপদেশ গ্রহণ করে; আর দুর্ভাগা সে-ই যে তার মায়ের পেটে দুর্ভাগ্যের শিকার হয়।"
খেজুরের বিচি দ্বারা তাসবিহ পাঠ করতেন
[২০০] কাসেম বিন আবদুর রহমান-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কিছু খেজুরের বিচি ছিলো। দশটা বা তার কিছু বেশি হবে। সেগুলো একটি থলেতে থাকতো। তিনি ফজরের নামাযের পর তার বিছানায় বসতেন। থলেটা হাতে নিতেন এবং খেজুরের বিচি একটা একটা বের করে সেগুলো দ্বারা তাসবীহ পাঠ করতেন। একবার শেষে হয়ে গেলে পুনরায় একটি একটি করে শুরু করতেন। এভাবে তিনি বিচিগুলো দ্বারা তাসবীহ পাঠ করতেন। বর্ণনাকারী বলেন, অবশেষে উম্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা-তাঁর কাছে এসে বলতেন, "হে আবুদ দারদা, আপনার জন্য নাশতা উপস্থিত।" কখনো কখনো তিনি বলতেন, "নাশতা নিয়ে যাও; আজ আমি রোযা রেখেছি।"
বাচালতা নিন্দনীয়
[২০১] সাঈদ বিন আবদুল আযিয-রাহিমাহুল্লাহ-এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-একজন বাচাল মহিলাকে বললেন, "যদি তুমি বোবা হতে তাহলে তা তোমার জন্য কতই-না ভালো হতো।"
কারও কাছে কিছু চাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা
[২০২] আমর বিন মাইমুন তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, উম্মুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহা-বলেন, আবুদ দারদা আমাকে বলেন, "তুমি মানুষের কাছে কোনো জিনিস চাইবে না।" আমি বললাম, যদি আমার প্রয়োজন হয়? তিনি বললেন, "যদি তোমার প্রয়োজন হয় তবে তুমি যারা ফসল কাটে তাদের অনুসরণ করো; তাদের (বোঝা/পাত্র) যা পড়ে যায় তা কুড়িয়ে নাও। তা পেষাই করো এবং খাও। তারপরও মানুষের কাছে কিছু চেয়ো না।"
ইয়াযিদের বিয়ের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করলেন
[২০৩] সাবিত—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, ইয়াযিদ বিন মুআবিয়া আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে তাঁর কন্যাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব পাঠালেন। কিন্তু তিনি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। ইয়াযিদের পারিষদবর্গের একজন তাকে বললো, আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন, আপনি কি আমাকে তাকে বিয়ে করার অনুমতি দেবেন? ইয়াযিদ বললেন, তোমার ধ্বংস হোক, আমি কি চিরকুমার থেকে যাবো? লোকটি আবারো বললো, আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন, আমাকে কি অনুমতি দেবেন? ইয়াযিদ বললেন, হ্যাঁ। লোকটি আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কন্যাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠালেন। তিনি লোকটির কাছে তাঁর কন্যাকে বিয়ে দিয়ে দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, তখন লোকদের মধ্যে রটনা হয়ে গেলো যে, ইয়াযিদ আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে তার কন্যাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ একজন দরিদ্র মুসলমান তাঁর কাছে প্রস্তাব পাঠালে তিনি তার কাছে তাঁর কন্যাকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। এই রটনা শুনে আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বললেন, "আমি আমার কন্যা দারদার কল্যাণের কথা ভেবেছি। দারদা সম্পর্কে তোমাদের কী ধারণা, যখন তার মাথার কাছে খোজারা দাঁড়াবে এবং সে এমন-সব বাড়িঘর দেখতে পাবে যেখানে তার চোখ ঝলসে উঠবে, সেদিন তার দ্বীন কোথায় থাকবে?"
কপট নম্রতা ও বিনয় পরিহার্য
[২০৪] মুহাম্মদ বিন সা'দ আল-আনসারি—রাহিমাহুল্লাহ—থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, "কপট নম্রতা ও বিনয় থেকে তোমরা আল্লাহ তাআলার কাছে পানাহ চাও।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, কপট নম্রতা ও বিনয় কী? তিনি বললেন, "দেহটাকে বিনম্র ও বিনীত দেখা যায়; কিন্তু অন্তর বিনম্র নয়।"
যারা আল্লাহর নির্দেশ পরিত্যাগ করে তারা সহজে ধ্বংস হয়
[২০৫] জুবাইর বিন নুফাইর-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, যখন সাইপ্রাস বিজিত হলো এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করা হলো, তাঁদের একজন অপর জনের সঙ্গে কাঁদতে শুরু করলেন। আমি আবুদ দারদাকে দেখলাম একাকী বসে কাঁদছেন। আমি তাঁকে বললাম, হে আবুদ দারদা, এমন দিনে আপনি কী জন্য কাঁদছেন যেদিন আল্লাহ তাআলা ইসলাম ও মুসলমানদের সম্মানিত করেছেন? তিনি বললেন, "আফসোস তোমার জন্য হে জুবাইর, কোনো জাতি যখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পরিত্যাগ তখন তাদের ধ্বংস করে দেওয়া আল্লাহ তাআলার জন্য কতই-না সহজ! এই জাতি ছিলো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী; তাদের রাজ্য ও রাজত্ব ছিলো। কিন্তু তারা আল্লাহর নির্দেশ পরিত্যাগ করেছিলো। সুতরাং তাদের কী অবস্থা হয়েছে তা তো তোমার চোখের সামনে।"
অর্জিত ইলম অনুযায়ী আমল না করলে ধ্বংস
[২০৬] মাইমুন বিন মিহরান-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “যে-ব্যক্তি ইলম অর্জন করলো না সে একবার ধ্বংস হোক; আর যে-ব্যক্তি ইলম অর্জন করার পরও সেই ইলম অনুযায়ী আমল করলো না সে সাত বার ধ্বংস হোক।"
সৎকাজ বিনষ্ট হয় না
[২০৭] আবু কিলবাতা-রাহিমাহুল্লাহ- থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "সৎকাজ বিনষ্ট হয় না এবং পাপের কথা ভোলা যায় না। মহান বিচারক আল্লাহ তাআলা কখনো ঘুমান না। সুতরাং যেমন খুশি তেমনই হও (যা খুশি তা-ই করো)। যেমন কর্ম করবে তেমনই ফল পাবে।"
তিনটি উপদেশ
[২০৮] আবু আবদুল্লাহ আল-জাসরী-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, এক ব্যক্তি আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে গিয়ে তাঁকে সালাম দিয়ে বললো, আমাকে উপদেশ দিন, আমি যুদ্ধ করতে যাচ্ছি। তিনি তাকে বললেন, "তুমি আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁকে এমনভাবে ভয় করো যেনো তুমি তাঁকে দেখছো। নিজেকে মৃতদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করো; জীবিতদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য কোরো না; মজলুমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো।"
মুসলমানদের ঘৃণা থেকে বেঁচে থাকা
[২০৯] সুফয়ান সাওরি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, “মানুষ যেনো মুমিনদের অন্তরের গোপনীয় ঘৃণা ও অপছন্দ থেকে বেঁচে থাকে।"
মৃত্যুর স্মরণ হিংসা ও পাপাচার কমিয়ে দেয়
[২১০] সুফয়ান সাওরি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, “যে-ব্যক্তি মৃত্যুকে বেশি স্মরণ করে তার হিংসা ও পাপাচার কমে যায়।"
সম্পদ কুক্ষিগতকারীরা ধ্বংস হোক
[২১১] ফুরাত বিন সুলাইমান—রাহিমাহুল্লাহ—থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, “যারা মুখ হা করে সম্পদ জমা করে তারা ধ্বংস হোক। যেনো সে উন্মাদ; মানুষের কাছে কী আছে তা সে দেখতে পায়; কিন্তু নিজের কাছে কী আছে তা সে দেখতে পায় না। যদি সে পারতো তাহলে রাতকে দিন বানিয়ে ছাড়তো। ধ্বংস তার; কারণ, সে কঠিন হিসাব ও মর্মন্তুদ শাস্তির মুখোমুখি হবে।” বর্ণনাকারী বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলতেন, “আমি মৃত্যুকে ভালোবাসি অথচ তারা তা অপছন্দ করে; আমি অসুস্থতা পছন্দ করি, অথচ তারা তা অপছন্দ করে; আমি দরিদ্রতা পছন্দ করি, অথচ তারা তা ঘৃণা করে। তারা উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছে, বিপুল সম্পদ কুক্ষিগত করেছে, মজবুত প্রাসাদ নির্মাণ করেছে। কিন্তু তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ধোঁকায় পরিণত হয়েছে, তাদের কুক্ষিগত সম্পদ বিনষ্ট হয়ে পড়েছে এবং তাদের গৃহসমূহ কবরস্থানে পরিণত হয়েছে।"
যেসব বান্দা আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয়
[২১২] হাসান বসরি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, “তোমরা যদি চাও তাহলে আমি তোমাদের জানাতে পারি যে আল্লাহর তাআলার কাছে আল্লাহর কোন বান্দাগণ সবচেয়ে প্রিয়। যাঁরা আল্লাহ তাআলাকে তাঁর বান্দাদের কাছে প্রিয় করে তোলে এবং দুনিয়াতে কল্যাণকর কাজ করে বেড়ায়। তোমরা যদি চাও তাহলে আমি তোমাদের কসম দিয়ে বলতে পারি যে, আল্লাহ তাআলার বান্দাদের মধ্যে তাঁরাই আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় যাঁরা চন্দ্র ও সূর্যের নিচে বিচরণ করে।"
নফসের অনুসরণকারীর জন্য রয়েছে দুর্ভোগ
[২১৩] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “যে-ব্যক্তি মানুষের মধ্যে যা-কিছু দেখবে সব ক্ষেত্রেই নিজের নফসের (মনের) অনুসরণ করবে তার দুঃখ-কষ্ট দীর্ঘায়ত হবে এবং তার ক্রোধ কখনো প্রশমিত হবে না।"
যা আছে তা-ই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা
[২১৪] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমি তোমাদের ব্যাপারে আলেমের পদস্খলন এবং কুরআন নিয়ে মুনাফিকদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার আশংকা করি। কুরআনই চূড়ান্ত সত্য; পথের আলোকস্তম্ভের মতো কুরআনেরও একটি আলোকস্তম্ভ রয়েছে। যে-ব্যক্তি দুনিয়া থেকে অমুখাপেক্ষী নয়, দুনিয়ার কোনো অংশই তার নেই। (যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট না হলে মনের মধ্যে হাহাকার থেকেই যায়।)
ইচ্ছাধীন তিনটি বিষয়
[২১৫] আওফ বিন আবু জামীলাহ-রাহিমাহুল্লাহ-জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তিনটি বিষয় আদমসন্তানের ইচ্ছা-স্বাধীনতার মধ্যে রয়েছে: বিপদের ব্যাপারে কারও কাছে অভিযোগ না করা; দুঃখ-কষ্টের কথা কারও কাছে বর্ণনা না করা এবং নিজেই নিজের প্রশংসা না করা।"
ইলম উঠিয়ে নেওয়ার পূর্বেই তা শিক্ষা করো
[২১৬] সালিম বিন আবুল জা'দ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা- রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "কী ব্যাপার, আমি দেখতে পাচ্ছি যে তোমাদের আলেমগণ ইন্তেকাল করে চলে যাচ্ছেন আর তোমাদের মূর্খরা ইলম অর্জন করছে না? ইলম উঠিয়ে নেওয়ার পূর্বেই তোমরা তা শিক্ষা করো। ইলম উঠিয়ে নেওয়ার অর্থ হলো আলেমগণের চলে যাওয়া। কী ব্যাপার, আমি দেখতে পাচ্ছি যে, যে- ব্যাপারে তোমাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় তোমরা তাতেই আগ্রহী হচ্ছো এবং যে- ব্যাপারে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে তা বিনষ্ট করে চলেছো? আমি তোমাদের মধ্যে ঘোড়ার চিকিৎসকের চেয়েও দুষ্ট লোকদের চিনি। তারা হলো ওই সকল লোক যারা নামাযে বিলম্ব করে আসে এবং অবহেলার সঙ্গে কুরআন তেলাওয়াত শোনে।"
মসজিদে অসংলগ্ন কথাবার্তা নিষিদ্ধ
[২১৭] সাঈদ বিন আবদুল আযিয-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা- রাদিয়াল্লাহু আনহু-শুনতে পেলেন যে, মসজিদে এক ব্যক্তি তাঁর সঙ্গীকে বলছে, “আমি এতো টাকা দিয়ে এক আঁটি লাকড়ি খরিদ করেছি।” তখন তিনি বললেন, “মসজিদগুলো এ-কারণেই আবাদ হয় না।"
অনর্থক কাজ পরিত্যাগ করা উত্তম আমল
[২১৮] সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “ইশার সালাতের পর অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত হওয়ার চেয়ে, ইশার সালাতের আগে (একটু) ঘুমিয়ে নেওয়া আমার কাছে অধিক প্রিয়।"
টিকাঃ
২৬. অর্থাৎ, কুরআনুল কারীমের প্রতিটি আয়াতের বিভিন্ন অর্থ ও মর্মের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিটি আয়াতের সার্বিক অর্থ ও মর্ম যখন কারও কাছে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হবে তখনই তিনি জ্ঞানী বলে বিবেচিত হবেন।
২৭. সূরা যুমার (৩৯): আয়াত ৩০।
২৮. সূরা নূর (২৪): আয়াত ৩৭।
২৯. এখানে ভারী শরীরের মানুষ বলতে ভোগ-বিলাসী বোঝানো হয়েছে। আর দুরতিক্রম্য বাধার পাহাড় হলো কবর থেকে নিয়ে কিয়ামতের হিসাব পর্যন্ত ঘাঁটিসমূহ। (অনুবাদক)
৩০. কারণ এই দাগের কারণে তার অতিরিক্ত ইবাদাত করার বিষয়টি মানুষের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে। অবশ্য এই দাগটি তাঁর ইচ্ছাধীন না হওয়ার কারণে কোন সমস্যা হবে না ইনশাআল্লাহ। (সম্পাদক)
৩২. মূল কিতাবে এই হাদীসটি ‘যুহদুয যুবাইর ইবনিল আওয়াম-রাদিয়াল্লাহু আনহু’-শিরোনামাধীন আনা হয়েছে।
৩৩. মূল কিতাবে এই হাদীসটি ‘যুহduz যুবাইর ইবনিল আওয়াম-রাদিয়াল্লাহু আনহু’-শিরোনামাধীন আনা হয়েছে।
৩৪. মূল কিতাবে এই হাদীসটি ‘যুহদু আবিদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু’-শিরোনামাধীন সবচেয়ে শেষে রয়েছে।
📄 যুবাইর ইবনুল আওয়াম—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া
তিনি ভূমিকরের কোনো সম্পদ গ্রহণ করতেন না
[২১৯] সাঈদ বিন আবদুল আযিয-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "যুবাইর ইবনুল আওয়াম-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর এক হাজার মামলুক (তাঁর ক্ষমতাধীন অমুসলিম) ছিলো; তারা তাকে খারাজ (ভূমিকর) দিতো। কিন্তু তিনি প্রতিরাত্রে খারাজের সমস্ত সম্পদ লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। তারপর বাড়িতে ফিরতেন, তার সঙ্গে ওই সম্পদের কিছুই থাকতো না।"
আঘাত ও মহামারি সহ্য করা
[২২০] হিশাম বিন উরওয়া তাঁর পিতা উরওয়া থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যুবাইর ইবনুল আওয়াম-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে মিসরে পাঠানো হলো। মিসরে যাওয়ার পর তাঁকে বলা হলো, মিসরে তো মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে। জবাবে তিনি বললেন, "আমি তো এখানে আঘাত ও মহামারি সহ্য করার জন্যই এসেছি।"
তাঁর বুকের অসংখ্য তিরচিহ্ন
[২২১] আলী বিন যায়দ বলেন, আমাকে এমন ব্যক্তি, যিনি যুবাইর ইবনুল আওয়াম-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখেছেন, বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর বুকে মানুষের চোখের মতো আঘাত ও তিরের চিহ্ন রয়েছে।"
সৎকাজ গোপনীয়তার সঙ্গে করা
[২২২] কায়স বর্ণনা করেন, আমি যুবাইর ইবনুল আওয়াম-রাদিয়াল্লাহু আনহু- কে বলতে শুনেছি যে, "কারও পক্ষে যদি গোপনীয়তার সঙ্গে সৎকাজ করা সম্ভব হয় সে যেনো তা করে নেয়।"
মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতি
[২২৩] উরওয়া—রাহিমাহুল্লাহ—থেকে বর্ণিত, আয়েশা—রাদিয়াল্লাহু আনহা—বলেছেন, “তোমার পিতা ছিলেন ওই সকল লোকের অন্তর্ভুক্ত যারা দুঃখ-দুর্দশায় আক্রান্ত হওয়ার পরও আল্লাহ তাআলার ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্য থেকে যারা সৎকাজ করেছেন এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছেন তাঁদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।”
📄 তালহা বিন উবায়দুল্লাহ—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া
গোত্রের লোকদের মধ্যে সম্পদ বণ্টন করে দিলেন
[২২৪] তালহা বিন ইয়াহইয়া রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর দাদী সু'দা বিনতে আওফ আল-মুররিয়্যাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "তালহা একদিন ভোরে চিৎকার করে উঠলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে আপনার? আপনি এমন কোনো কারণে দিশেহারা যার জন্য আমি আপনাকে তিরস্কার করবো?” তিনি বললেন, "আরে না, আল্লাহর কসম! তুমি অতি উত্তম স্ত্রী; বরং ব্যাপার হলো, আমার কাছে কিছু সম্পদ জমা হয়েছে। সেটাই আমাকে পেরেশান করছে।” আমি বললাম, "আপনার গোত্রের লোকদের ডেকে আপনি তা দিয়ে দিন।" তিনি গোলামকে ডেকে বললেন, "হে গোলাম, তুমি আমার গোত্রের লোকদের ডেকে নিয়ে আসো।" তারা এলে তিনি তাদের মধ্যে তার সম্পদ বণ্টন করে দিলেন। সু'দা বলেন, আমি খাজাঞ্চিকে জিজ্ঞেস করলাম, "কী পরিমাণ সম্পদ ছিলো?" সে বললো, "চার লাখ।"
সম্পদ থাকার ভয়ে ঘেমে উঠলেন
[২২৫] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, তালহা বিন উবায়দুল্লাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-সাত লাখ দিরহামের বিনিময়ে একটি জমি বিক্রি করলেন। এই সম্পদ তাঁর কাছে মাত্র এক রাত থাকলো। কিন্তু তিনি এই সম্পদের ভয়ে ঘর্মাক্ত হয়ে রাত্রিযাপন করলেন। সকালে উঠে এই সম্পদ লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন।"
তাঁর চোখে অশ্রু লেগে থাকতো
[২২৬] আবু রাজা আল-উতারিদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে দেখেছি এবং তার চোখের নিচে দেখেছি জীর্ণ রশির মতো অশ্রু।"
একনিষ্ঠভাবে নামায আদায়
[২২৭] হিশাম বিন উরওয়া—রাহিমাহুল্লাহ—বলেছেন, আমাকে মুহাম্মদ বিন আল-মুনকাদির বলেছেন, তুমি যদি আবদুল্লাহ বিন যুবাইরকে নামাযে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পেতে তাহলে বলতে, ঝড়ো বাতাসের ভেতর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি বৃক্ষ এবং মানজানিকের ইতস্তত পাথর নিক্ষেপের প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন একজন মানুষ।”