📄 উমর ইবনুল খাত্তাব—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া
তিনি ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য করতেন না
[৩৫] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর দরজায় সুহাইল ইবনে আমর, হারিস বিন হিশাম, আবু সুফ্যান বিন হারবসহ কুরাইশের কতিপয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি উপস্থিত হলেন। সুহাইব, বিলালসহ যে-সকল দাস বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁরাও উপস্থিত হলেন। উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর অনুমতি পাওয়ার পর দেখা গেলো তিনি দাসদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছেন; কিন্তু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে সেই অনুমতি দেননি। আবু সুফয়ান বললেন, "আজকের দিনটার মতো কখনো আমি দেখিনি। তিনি এ-সকল দাসকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিলেন, অথচ আমাদের দরজায় বসিয়ে রাখলেন, আমাদের দিকে তাকালেনও না!" সুহাইব ইবনে আমর একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বললেন, "হে লোকসকল, আল্লাহর কসম! আমি আপনাদের চেহারায় ক্রোধের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি। যদি আপনারা ক্রুদ্ধ হয়ে থাকেন, তবে নিজেদের ওপরই ক্রুদ্ধ হওয়া উচিত। তাদেরও (দ্বীনের) দাওয়াত দেওয়া হয়েছে, আপনাদেরও দাওয়াত দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তারা দ্রুত সাড়া দিয়েছে আর আপনারা বিলম্ব করেছেন। এখন কেমন হবে যদি কিয়ামতের দিনও তাদের আহ্বান জানানো হয় আর আপনাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা না হয়? আল্লাহর কসম! তারা আপনাদের চেয়ে মর্যাদায় এগিয়ে গেলে সেটা আপনাদের কষ্টকর মনে হয়নি, অথচ এই দরজায়-যেখানে আপনারা প্রতিযোগিতা করছেন-আপনাদের মর্যাদাহানি হলে সেটাকে অধিকতর কষ্টকর মনে হচ্ছে।” বর্ণনাকারী বলেন, 'কথাগুলো বলে সুহাইব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁর কাপড় ঝাড়া দিয়ে চলে গেলেন।' হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, সুহাইব রাদিয়াল্লাহু আনহু-সত্য বলেছেন যে, 'কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি দ্রুত ধাবিত বান্দাকে যতোটা মর্যাদা দেবেন ততোটা মর্যাদা ওই বান্দাকে দেবেন না, যে তাঁর থেকে পিছিয়ে ছিলো।'
প্রত্যেকেই তাঁর চেয়ে বেশি জানে বলে বিনয় প্রকাশ
[৩৬] ইবনে জুদআন-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-শুনলেন, এক ব্যক্তি বলছেন, "হে আল্লাহ, আপনি আমাকে অল্পসংখ্যকদের অন্তর্ভুক্ত করুন।" উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “অল্পসংখ্যক কারা?” ওই ব্যক্তি বললেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,
وَمَا آمَنَ مَعَهُ إِلَّا قَلِيلٌ
"তাঁর (নূহের) সঙ্গে অল্পসংখ্যকই ঈমান এনেছিলো।” [সূরা হুদ, ১১: আয়াত ৪০]
وَقَلِيلٌ مِنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ
"আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পসংখ্যকই কৃতজ্ঞ।" [সূরা সাবা, ৩৪: আয়াত ১৩]
এ দুটি ছাড়া সংশ্লিষ্ট আরও কিছু আয়াত তিলাওয়াত করলেন। তখন উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "প্রত্যেকেই আমার চেয়ে বেশি জানে।”
সাদাসিধে খাদ্য
[৩৭] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আহনাফ বিন কায়স বর্ণনা করেছেন, "আমরা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-যে-খাবার খেতেন তা দেখতাম। তাঁর খাবার ছিলো কোনোদিন টাটকা গোশত, কোনোদিন শুকনো টুকরো টুকরো গোশত এবং কোনোদিন যাইতুন তেল।"
কল্যাণের জন্য দোয়া
[৩৮] আমর ইবনে মাইমুন-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এক ব্যক্তিকে এই দোয়া পড়তে শুনলেন,
اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ، فَحُلْ بَيْنِي وَبَيْنَ مَعَاصِيكَ أَنْ أَعْمَلْ بِشَيْءٍ مِنْهَا
"হে আল্লাহ, আপনি বান্দা ও তার অন্তরের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন, সুতরাং আপনি আমার ও আপনার নাফরমানির মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করুন, যাতে আমি কোনো ধরনের নাফরমানিমূলক কাজ না করি।" উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-তখন বললেন, "আল্লাহ তোমার প্রতি রহমত বর্ষণ করুন।" এবং তিনি তার জন্য কল্যাণের দোয়া করলেন।
সুস্থতা ও ক্ষমা প্রার্থনা
[৩৯] আবুল আলিয়া-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব- রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে যে-দোয়া সবচেয়ে বেশি পড়তে শুনতাম তা এই:
اللَّهُمَّ عَافِنَا وَاعْفُ عَنَّا “হে আল্লাহ, আপনি আমাদের সুস্থ রাখুন এবং আমাদের ক্ষমা করে দিন।"
সম্পদ শত্রুতা ও হিংসা বাড়িয়ে দেয়
[৪০] মিসওয়ার বিন মাখরামা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে কিছু সম্পদ নিয়ে আসা হলো এবং সেগুলো মসজিদে রাখা হলো। তিনি তা দেখতে এলেন, তৎক্ষণাৎ তাঁর চোখ দুটি অশ্রুতে ভরে উঠলো। আবদুর রহমান ইবনে আওফ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তখন বললেন, "হে আমিরুল মুমিনীন, আপনি কেন কাঁদছেন? এটা তো আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞতার বিষয়।” তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "আল্লাহর কসম! এটা এমন জিনিস, যখন তা কোনো সম্প্রদায়কে দেওয়া হয় তাদের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ বেড়ে যায়।"
তিনি নিজ পুত্রকেও কিছু দিলেন না
[৪১] যায়দ বিন আসলাম তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ বিন আরকাম-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখলাম উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে বললেন, "হে আমিরুল মুমিনীন, জালুলা থেকে আমাদের কাছে কিছু সম্পদ এসেছে, তাতে রুপার পাত্রও আছে। তো আপনি একদিন অবসর হয়ে সেগুলো দেখে যান এবং এই বিষয়ে আমাদের নির্দেশনা জানিয়ে দিন।" উমর- রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "আমাকে অবসরে দেখলে তুমি মনে করিয়ে দিয়ো।" পরে আবদুল্লাহ বিন আরকাম তাঁর কাছে একদিন এলেন এবং বললেন, "আজ আমি আপনাকে অবসরে দেখতে পাচ্ছি।" উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "ঠিক আছে, একটা মাদুর পাতো। তিনি যে-জায়গা উল্লেখ করলেন সেখানে মাদুর পাতা হলো এবং তাঁর নির্দেশ মোতাবেক সম্পদগুলো মাদুরের ওপর রাখা হলো। তারপর তিনি এলেন এবং সম্পদগুলো দেখে বললেন, হে আল্লাহ, আমি এই সম্পদের কথা ভেবেছি এবং বলেছি-
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحُرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الْمَآبِ
"নারী, সন্তান, রাশিকৃত সোনারুপা, চিহ্নযুক্ত অশ্বরাজি, গবাদি পশু এবং খেতখামারের প্রতি আসক্তি মানুষের নিকট সুশোভিত করা হয়েছে। এসব ইহজীবনের ভোগ্য বস্তু। আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে উত্তম আশ্রয়স্থল।" এবং এটাও বলেছি-
لِكَيْلَا تَأْسَوْا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا آتَاكُمْ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ
"তা এ জন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছো তাতে যেনো তোমরা বিমর্ষ না হও এবং যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন তার জন্য আনন্দোৎফুল্ল না হও। আল্লাহ উদ্ধত ও অহংকারীদের পছন্দ করেন না।"
তারপর তিনি বললেন, "আমাদের জন্য যা-কিছু সুশোভিত করে দেওয়া হয়েছে তার দ্বারা আমরা আনন্দিত না হয়ে পারি না। হে আল্লাহ, এই সম্পদ ভালো কাজে খরচ করার তাওফিক দিন এবং আপনার কাছে এ-সম্পদের অনিষ্ট থেকে পানাহ চাই।" বর্ণনাকারী বলেন, তখন ওইগুলো বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য আবদুর রহমান বিন বুহাইয়া নামে তাঁর এক পুত্রকে নিয়ে আসা হলো। সে বললো, 'বাবা, আমাকে একটি আংটি দিন।' জবাবে তিনি বললেন, "তুমি তোমার মায়ের কাছে যাও, তিনি তোমাকে ছাতু খাইয়ে দেবেন।" বর্ণনাকারী বলেন, 'আল্লাহর কসম! উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁকে কিছুই দিলেন না।'
আদব-কায়দা শিক্ষা দেওয়ার জন্য চাবুক হাতে নিলেন
[৪২] ইবনে জুদআন থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "উমর ইবনুল খাত্তাব- রাদিয়াল্লাহু আনহু-শাসনের চাবুক হাতে নিয়েছিলেন আর উসমান ইবনে আফ্ফান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তার চেয়েও কঠিন চাবুক হাতে নিয়েছিলেন।"
নির্জন জায়গায় নিজেকে তিরস্কার
[৪৩] আনাস ইবনে মালেক-রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে বের হলাম। তিনি একটি দেয়ালঘেরা স্থানে প্রবেশ করলেন। আমার ও তাঁর মাঝে একটি দেয়াল আড়াল হয়ে থাকলো। আমি আড়াল থেকে শুনতে পেলাম, তিনি বলছেন, "বাহ বাহ! উমর এখন আমিরুল মুমিনীন! হে খাত্তাবের বেটা, তুমি অবশ্যই আল্লাহকে ভয় করবে, অন্যথায় তোমাকে তাঁর শাস্তি ভোগ করতে হবে।"
আল্লাহর আনুগত্যে দৃঢ় থাকার পর বিচ্যুত না হওয়া
[৪৪] যুহরি-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-মিম্বরে দাঁড়িয়ে লোকদের উদ্দেশে খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন-
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ
"যারা বলে, 'আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ', তারপর দৃঢ় ও অবিচলিত থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, 'তোমরা ভীত হোয়ো না এবং চিন্তিত হোয়ো এবং তোমাদের যে-জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার জন্য আনন্দিত হও।”
তারপর বললেন, "আল্লাহর কসম! তারা আল্লাহর আনুগত্যে দৃঢ় থেকেছে পরবর্তী সময়ে শেয়ালের মতো চাতুরী করে পথ পরিবর্তন করেনি।"
উটের খাবার বাঁচিয়ে মুসলমানদের দান
[৪৫] যায়দ বিন আসলাম-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর একটিমাত্র ঘোড়া ছিলো। একদিন তিনি বললেন, “হে আসলাম, তুমি ঘোড়াটিকে কী পরিমাণ খাবার খাওয়াও?” আসলাম বললেন, “পর্যাপ্ত পরিমাণ যব খাওয়াই।” তিনি বললেন, “আমরা যদি ওই যব মুসলমানদের কোনো পরিবারে খরচ করি এবং ঘোড়াটিকে নকি উপত্যকায় পাঠিয়ে দিই, তাহলে কেমন হয়?” তারপর তিনি ঘোড়াটিকে নকি উপত্যকায় পাঠিয়ে দিলেন এবং তার খাদ্য একটি মুসলমান পরিবারের জন্য ব্যয় করলেন।
পুত্রকে বাণিজ্য করার নির্দেশ দিলেন
[৪৬] উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পুত্র আসেম থেকে বর্ণিত, আমার পিতা ইয়ারফার মাধ্যমে আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি তাঁর কাছে এলাম, তিনি তখন তাঁর জায়নামাযে ছিলেন, এটা ফজরের সময় অথবা যোহরের সময়ের কথা। তিনি বললেন, "আমি মনে করি না যে, এই সম্পদ যথাযথভাবে তত্ত্বাবধান করার পূর্বে তা আমার জন্য বৈধ হবে। যখন আমি খিলাফতের দায়িত্ব নিই তখন তা আমার জন্য হারাম ছিলো না। পরে তা আমার কাছে আমানতস্বরূপ রয়েছে। তোমার জন্য আল্লাহর সম্পদ থেকে এক মাস খরচ করেছি; আর খরচ করবো না। তবে আমি তোমাকে আলিয়া তে আমার যে-সম্পদ রয়েছে তার মূল্য দিয়ে সাহায্য করবো। তুমি তার পুরোটা নিয়ে নাও এবং তোমার সম্প্রদায়ের কোনো একজন ব্যবসায়ী লোকের কাছে গিয়ে তার অংশীদার হও। সে কিছু ক্রয় করলে তুমি তাতে শরিক হও এবং (মুনাফা পেলে) তোমার পরিবারের জন্য খরচ করো।"
কন্যাকে ধমক দিয়ে বিদায় করলেন
[৪৭] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, 'উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে কিছু সম্পদ নিয়ে আসা হলো। এই সংবাদ তাঁর কন্যা উম্মুল মুমিনীন হাফসা- রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর কাছে পৌঁছলে তিনি এসে বললেন, "হে আমিরুল মুমিনীন, এই সম্পদে আপনার নিকটাত্মীয়দের হক রয়েছে। আল্লাহ তাআলা এই সম্পদ থেকে নিকটাত্মীয়দের দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।" তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "হে কন্যা, আমার নিকটাত্মীয়দের হক রয়েছে আমার নিজের সম্পদে; আর এগুলো হলো মুসলমানদের খরচ মেটানোর জন্য। তুমি তোমার পিতাকে ধোঁকা দিচ্ছো আর তোমার নিকটাত্মীয়দের জন্য কল্যাণকামনা করছো? যাও এখান থেকে।" তখন হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা-তাঁর কাপড়ের আঁচল টানতে টানতে উঠে এলেন।'
উটের গোশত সবার আগে রাসূলের সহধর্মিণীদের কাছে পাঠালেন
[৪৮] আসলাম-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলা হলো, জাহর একটি অন্ধ উটনী রয়েছে। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "আমরা তা কোনো-একটি পরিবারকে দিয়ে দেবো, যাতে তারা উপকৃত হতে পারে।” আমি বললাম, 'সেটি তো অন্ধ।' তিনি বললেন, "তারা উটের দ্বারা পাল লাগাবে।” আমি বললাম, 'কিন্তু জমিনে ঘাস খাবে কীভাবে?' তিনি বললেন, "এটি কি জিযিয়ার পশু, না সাদাকার পশু?” আমি বললাম, 'না; বরং জিযিয়ার পশু।' উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-তখন বললেন, "তোমরা মনে হয় উটনীটাকে খেতে চাচ্ছো?" আমি বললাম, 'উটনীটির গায়ে জিযিয়ার চিহ্ন রয়েছে।' আসলাম-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, 'উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নির্দেশে উটনীটি এনে জবাই করা হলো। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে নয়টি পাত্র ছিলো। তাঁর কাছে ফলমূল বা অন্যান্য সামগ্রী এলে তিনি ভাগ করে এসব পাত্রে রাখতেন এবং করীম- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সহধর্মিণীদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। সর্বশেষ পাত্রটি পাঠাতেন তাঁর কন্যা হাফসার কাছে; শেষে যদি কিছুটা কম পড়তো সেটা হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর ভাগে ও অন্য লোকদের ভাগেই যেতো।' আসলাম-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, 'উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-উটনীটির গোশত ওই নয়টি পাত্রে রাখলেন এবং সেগুলো নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সহধর্মিণীদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। গোশত অবশিষ্ট যা থাকলো তা তাঁর নির্দেশে পাকানো হলো এবং তিনি মুহাজির ও আনসারদের সবাইকে তাতে নিমন্ত্রণ করলেন।'
তিনটি কাজের জন্য ব্যাকুলতা
[৪৯] ইয়াহইয়া বিন জা'দাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু- বলেছেন, "যদি তিনটি বিষয় সম্ভব হতো তবে আমি আল্লাহ তাআলার সঙ্গে মিলিত হওয়া পর্যন্ত সেগুলোর ওপর অটল থাকতাম! যদি আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে সিজদায় আমার কপাল রেখে দিতে পারতাম! যদি এমন মজলিসে বসে থাকতে পারতাম যেখানে উত্তম ফল লাভের মতো কেবল উত্তম কথা পাওয়া যায়। অথবা যদি আজীবন আল্লাহর পথে চলতে পারতাম!”
দুর্ভিক্ষের সময় নিজের উপর ঘি নিষিদ্ধ করেছিলেন
[৫০] আনাস ইবনে মালিক—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পেটে গুড়গুড় শব্দ হতে লাগলো। দুর্ভিক্ষের সময় তিনি (রুটির সঙ্গে) তেল খেতেন এবং সেই সময়টায় নিজের জন্য ঘি নিষিদ্ধ করে নিয়েছিলেন। ফলে তিনি তাঁর পেটে আঙুল দিয়ে টোকা দিলেন এবং বললেন, “গুড়গুড় করতে থাকো। মানুষের অবস্থা সজীব হওয়ার আগ পর্যন্ত আমার কাছে তোমার জন্য অন্য কিছু নেই।”
তাঁর জন্য জান্নাতে প্রাসাদ নির্মিত হয়েছে
[৫১] জাবের ইবনে আবদুল্লাহ—রাদিয়াল্লাহু আনহু—থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ—সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম—ইরশাদ করেছেন, “আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম। হঠাৎ একটি স্বর্ণ-নির্মিত প্রাসাদ দেখতে পেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটি কার জন্য? ফেরেশতারা বললো, কুরাইশের এক ব্যক্তির। হে ইবনুল খাত্তাব, তোমার আত্মমর্যাদাবোধ বিষয়ে জানা থাকাটাই আমাকে সেই প্রাসাদে প্রবেশ থেকে বিরত রেখেছিলো।” উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু—বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনার ওপরও কি আমার আত্মমর্যাদাবোধ প্রদর্শন করবো!”
তাওয়াফের সময় তাঁর দোয়া
[৫২] হাবীব বিন সাহবান আল-কাহেলি বলেন, আমি বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করছিলাম। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-ও তাওয়াফ করছিলেন। তিনি কেবল এই দোয়া পাঠ করছিলেন—
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ “হে আমাদের রব, আপনি দুনিয়াতেও আমাদের কল্যাণ দান করুন, আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন। এবং আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।”
বর্ণনাকারী বলেন, 'এটা ছাড়া তাঁর কোনো কথা ছিলো না।'
যে-ইলম উপকার করে না তা ক্ষতি করে
[৫৩] ইবনে উয়াইনাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, “ইলম যদি তোমার কোনো উপকার না করে, তবে অবশ্যই তা তোমার ক্ষতি করবে।”
ধৈর্য উত্তম জীবনযাপনের চাবিকাঠি
[৫৪] মুজাহিদ-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “আমরা ধৈর্যের দ্বারা উত্তম জীবনযাপনের সুখ পেয়েছি।”
অভাবহীনতার বোধই সচ্ছলতা
[৫৫] হিশাম তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-খুতবায় বললেন, “অবশ্যই তোমরা জেনে রেখো, লোভই দরিদ্রতা; আর অভাবহীনতার বোধই সচ্ছলতা। মানুষ যখন কোনো বস্তু থেকে অভাবহীন বোধ করে তখন তার ওই বস্তুর কোনো প্রয়োজন থাকে না।”
মুখের ওপর প্রশংসা করা মানে তাকে জবাই করা
[৫৬] যায়দ বিন আসলাম তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “প্রশংসা মানে জবাই করা।” (অর্থাৎ, কারও সামনে তার প্রশংসা করার অর্থ হলো তাকে জবাই করে ফেলা।)
ইবাদতগুযার বান্দাদের জন্য প্রশংসা অপ্রয়োজনীয় বিষয়
[৫৭] আবু উসমান আন-নাহদি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “প্রশংসা হলো আবেদদের জন্য গনিমত।” (এটা তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো বিষয় নয়।)
দুনিয়াকে ভাগাড়ের সঙ্গে তুলনা
[৫৮] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-একবার ময়লার ভাগাড়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দাঁড়ালেন। যেন তা তাঁর সঙ্গীদের জন্য কষ্টের কারণ হয়েছে এবং তাঁরা পীড়া বোধ করেছেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-তখন তাঁদের বললেন, “এটাই হলো তোমাদের দুনিয়া, যার প্রতি তোমরা লালায়িত।”
তিনি এই দোয়া পাঠ করতেন
[৫৯] হাসান বসরি -রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এই দোয়া পড়তেন-
اللَّهُمَّ اجْعَلْ عَمَلِي صَالِحًا، وَاجْعَلْهُ لَكَ خَالِصًا، وَلَا تَجْعَلْ لِأَحَدٍ فِيهِ شَيْئًا "হে আল্লাহ, আমার কাজকর্মকে নেক ও সৎ করুন এবং আপনার উদ্দেশে একনিষ্ঠ করুন; অন্য কারও জন্য তাতে কোনো অংশ নির্ধারণ করবেন না।"
তিনি এই দোয়া সবচেয়ে বেশি পাঠ করতেন
[৬০] আবুল আলিয়া-রাহيمাহুল্লাহ-বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে সবচেয়ে বেশি যে-দোয়া পড়তে শুনতাম তা এই:
اللَّهُمَّ عَافِنَا وَاعْفُ عَنَّا অর্থাৎ, “হে আল্লাহ, আমাদের সুস্থ রাখুন এবং আমাদের ক্ষমা করে দিন।"
নতুন জামা না নিয়ে রিফু-করা জামাটি নিলেন
[৬১] হিশাম তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমার কাছে আইলাহর বা আযরুআতের আমির বর্ণনা করেছেন যে, উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-শামে (সিরিয়ায়) এলেন। তিমি আমার কাছে তাঁর জামাটি রিফু করে দেওয়া ও ধুয়ে দেওয়ার জন্য পাঠালেন। তাঁর জামার পেছনের বসার জায়গাটি ফেড়ে গিয়েছিলো। আমি তাঁর জামাটি ধুয়ে দিলাম এবং রিফু করে দিলাম। তার জন্য নতুন একটি কুবতুরী জামা সেলাই করে জামা দুটি তাঁর কাছে পাঠালাম। উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে জামা দুটি নিয়ে আসার পর তিনি কুবতুরী জামাটি স্পর্শ করে বললেন, "এটা বেশ মসৃণ।" তারপর সেটা নিক্ষেপ করে নিজের জামাটি হাতে নিয়ে বললেন, "এটা ঘাম বেশি শোষণ করে থাকে।"
প্রতিবেশীকে না খাইয়ে নিজে তৃপ্ত হওয়া যায় না
[৬২] আবায়া বিন রিফাআ-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন,
لا يشبع الرجل دون جاره "কোনো ব্যক্তি প্রতিবেশীকে ছাড়া তৃপ্ত হতে পারে না।” (অর্থাৎ, কোনো খাবার প্রতিবেশীকে না খাইয়ে নিজে তৃপ্তি সহকারে খেতে পারে না।)
আল্লাহ তাআলা ক্ষমা না করলে ধ্বংস অনিবার্য
[৬৩] আবান ইবনে উসমান রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, উসমান ইবনে আফ্ফান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন আমি উপস্থিত ছিলাম। তিনি বলছিলেন, "ধ্বংস আমার! ধ্বংস আমার মায়ের! যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে ক্ষমা না করেন।" কথাগুলো তিনি তিন বার বললেন, তারপর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন এবং মাঝখানে অন্য কোনো কথা বললেন না।'
রাত জেগে যিকির ও নামায
[৬৪] হাসান বিন আবুল হাসান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব- রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মৃত্যুর পর তাঁর একজন স্ত্রীকে উসমান বিন আবুল আস বিয়ে করলেন। তিনি বলেন, আমি সন্তান বা সম্পদের লোভে তাঁকে বিয়ে করিনি; বরং তাঁকে বিয়ে করেছি এ-কারণে যে, তিনি আমাকে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু- এর রাতের আমল সম্পর্কে অবহিত করবেন। সুতরাং আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-রাতের বেলা কীরূপ নামায আদায় করতেন? তিনি বললেন, "তিনি এশার নামায আদায় করতেন। তারপর আমাদেরকে তাঁর শিয়রে পানির একটি পাত্র রাখার নির্দেশ দিতেন। রাতের বেলা আড়মোড়া ভাঙতেন এবং ওই পাত্র থেকে পানি নিয়ে চেহারা ও দুই হাত মুছতেন। তারপর আল্লাহর যিকিরে মশগুল হতেন। এভাবেই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়তেন। তারপর আবার আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠতেন এবং এভাবে তাঁর তাহাজ্জুদ পড়ার সময় এসে পড়তো।”
নিজের স্ত্রীকে সুগন্ধী মাখতে দিলেন না
[৬৫] সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে বাহরাইন থেকে মিসক ও আম্বর সুগন্ধী এলো। তিনি বললেন, "যদি আমি এমন কোনো মহিলা পেতাম যে ভালো ওজন করতে পারে তবে এ সুগন্ধী মুসলমানদের মাঝে বণ্টন করে দিতাম।" তখন তাঁর স্ত্রী আতিকা বিনতে যায়দ বিন আমর বিন নুফাইল বললেন, আমি ভালো ওজন করতে পারি। ওগুলো দিন আমি ওজন করে দিই।" উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "না, তুমি ওজন করবে না।" আতিকা বললেন, "কেন?" উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "আমার আশংকা হয় (সুগন্ধীর ওজন মাপতে গিয়ে তোমার হাতে কিছুটা লেগে যাবে এবং) তুমি তা নিয়ে নেবে এবং এভাবে ব্যবহার করবে।"-একথা বলে তিনি তাঁর দুই জুলফিতে আঙুল ঘষে দেখালেন.-"এবং তা তোমার গলায় ঘষবে; এভাবে আমার ভাগে অন্য মুসলমানদের চেয়ে বেশি পড়ে যাবে।"
কুরআন তেলাওয়াত আল্লাহর প্রতি মানুষকে অনুরক্ত করে
[৬৬] আবু নাদরাহ বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-আবু মুসা আল-আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, "আমাদেরকে আমাদের রবের প্রতি আগ্রহী করুন।" আবু মুসা আল-আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু-তখন কুরআন তেলাওয়াত করলেন। উপস্থিত লোকেরা বললেন, নামাযের সময় হয়েছে। তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "আমরা কি নামাযে নই?"
আমল ও ইবাদতে বিলম্ব করা ঠিক নয়
[৬৭] মালেক বিন হারিস-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "সব কাজেই ধীরতা-স্থিরতা ভালো, তবে আখেরাতের কাজ ব্যতীত।” (অর্থাৎ, আমল ও ইবাদতে বিলম্ব করা ঠিক নয়।)
মিথ্যাবাদীর জন্য দোয়া
[৬৮] হারিস বিন সুওয়াইদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, কুফার একজন ব্যক্তি আম্মার বিন ইয়াসার-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়ে উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে নালিশ জানালো। আম্মার-রাদিয়াল্লাহু আনহু-লোকটির উদ্দেশে বললেন, "যদি তুমি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকো তবে আল্লাহ তোমার সম্পদ বাড়িয়ে দিন, তোমার সন্তান বাড়িয়ে দিন এবং তোমাকে মানুষের নেতা বা আমির বানান।"
খারাপ মানুষের সঙ্গে মেলামেশার চেয়ে একাকী থাকা ভালো
[৬৯] ইসমাঈল বিন উমাইয়া বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "খারাপের সঙ্গে মেলামেশার চেয়ে নিঃসঙ্গতাতেই সুখ রয়েছে।"
মধুমিশ্রিত পানীয়ের মূল্য ভাতা থেকে কেটে নেওয়ার নির্দেশ
[৭০] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে মধুমিশ্রিত পানীয় আনা হলো। তিনি তা চাখলেন এবং বুঝতে পারলেন যে তাতে মধু ও পানি রয়েছে। তখন তিনি বললেন, "তোমরা আমার থেকে তার হিসাব নিয়ে নাও, তার খরচ শোধ করে নাও।"
কুরআন তেলাওয়াতের ফলে কান্নায় কণ্ঠরোধ হওয়া
[৭১] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-তিলাওয়াতের জন্য কুরআনের নির্দিষ্ট অংশ পাঠের সময় কোনো কোনো আয়াত পাঠের ফলে অশ্রু তাঁর কণ্ঠরোধ করে দিতো, ফলে তিনি বাড়িতেই অবস্থান করতেন। লোকেরা তাঁকে দেখতে যেতো এবং ভাবতো, তিনি অসুস্থ।"
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর প্রতি উপদেশ
[৭২] আলা বিন আবদুল করীম তাঁর একজন সঙ্গী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমরা ইলম শিক্ষা করো এবং ইলমের জন্য ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা শিক্ষা করো। যাদের তোমরা শিক্ষাদান করো তাদের প্রতি কোমলহৃদয় হও এবং যারা তোমাদের থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে তারা যেনো তোমাদের প্রতি বিনয়ী হয়। তোমরা দোর্দণ্ড প্রতাপশালী আলেম হোয়ো না। আর তোমাদের মূর্খতার সঙ্গে যেনো তোমাদের জ্ঞানের মিশ্রণ না ঘটে।"
তওবাকারীদের হৃদয় কোমল থাকে
[৭৩] আউন বিন আবদুল্লাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমরা তওবাকারীদের সাহচর্যে থাকো। কারণ, তাঁদের হৃদয় সবচেয়ে কোমল।"
ধন-সম্পদের স্বল্পতা কোনো ক্ষতি করতে পারে না
[৭৪] ইসমাঈল ইবনে আবি খুলদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমরা কিতাবের ধারক হও এবং জ্ঞানের ঝরনা হও। আল্লাহ তাআলার কাছে একদিন-একদিনের রিযিক প্রার্থনা করো। ধন-সম্পদের স্বল্পতা তোমাদের কোনো ক্ষতি করবে না।"
কিয়ামত আসার পূর্বেই নিজেদের হিসাব গ্রহণ করা উচিত
[৭৫] সাবিত বিন হাজ্জাজ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমাদের হিসাব নেওয়ার পূর্বে নিজেরাই নিজেদের হিসাব নাও। তোমাদের পরিমাপ করার পূর্বে নিজেরাই নিজেদের পরিমাপ করো। দুনিয়াতে নিজেদের হিসাব নেওয়া ও মহাসমাবেশের জন্য প্রস্তুত থাকার কারণে কিয়ামতের দিন তোমাদের জন্য হিসাব সহজ হবে,
يَوْمَئِذٍ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَى مِنْكُمْ خَافِيَةٌ
"সেইদিন উপস্থিত করা হবে তোমাদেরকে এবং তোমাদের কিছুই গোপন থাকবে না।- [সূরা আল-হাক্কা, ৬৯ : আয়াত ১৮]"
কবরে গণ্ডদেশকে মাটির সঙ্গে মিলিয়ে রাখার নির্দেশ
[৭৬] আবদুল্লাহ ইবনে উমর—রাদিয়াল্লাহু আনহুমা—বলেন, আমার পিতা উমর ইবনুল খাত্তাব—রাদিয়াল্লাহু আনহু—আমাকে নির্দেশ দিয়ে বললেন, "যখন আমাকে কবরে রাখবে, আমার গাল জমিনের সঙ্গে মিলিয়ে রাখবে; যাতে আমার গাল ও জমিনের মধ্যে কোনোকিছু না থাকে।"
কোনো মুসলমানকে অপমান করা পাপাচারের জন্য যথেষ্ট
[৭৭] হাসান বসরি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর এক কর্মচারীর কাছে একদল লোক এলো। তিনি আরবদের ভেতরে প্রবেশ করতে দিলেন এবং দাসশ্রণির লোকদের বাইরে রাখলেন। এই সংবাদ উমর—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে পৌঁছলো। তখন তিনি বললেন, "অপর মুসলমান ভাইকে অপমান করা কোনো মুসলমানের পাপাচারের জন্য যথেষ্ট।"
ঘি লঘুপাক করার নির্দেশ
[৭৮] যায়দ বিন আসলাম তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, একবছর দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো। ফলে ঘিয়ের দাম অত্যন্ত বেড়ে গেলো। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু—তরকারি হিসেবে তেল খেতেন, ফলে তাঁর পেটে গুড়গুড় শব্দ হতো। তিনি পেটের দিকে ইঙ্গিত করে বলতেন, "যতো ইচ্ছা গুড়গুড় করো, আল্লাহর কসম! যতোদিন লোকেরা ঘি খেতে পাবে না, ততোদিন তুমিও তা খেতে পাবে না।" তারপর বলেন, "তুমি আগুনে জ্বাল দিয়ে তা লঘুপাক করে দাও।” আসলাম— রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেন, 'আমি তাঁর জন্য খাবার পাকাতাম, তিনি তা খেতেন।'
অশিষ্ট ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন
[৭৯] বাশীর বিন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব— রাদিয়াল্লাহু আনহু-শামে (সিরিয়ায়) আসার পর তাঁকে অনারবি ঘোড়া দেওয়া হলো। তিনি তাতে চড়ে বসলেন। কিন্তু ঘোড়াটি তাঁকে ঝাঁকি দিলো। তিনি নেমে পড়লেন এবং বললেন, "কে তোমাকে এটা শিখিয়েছে, আল্লাহর তার অমঙ্গল করুন।"
কান্নার কারণে চেহারায় দাগ
[৮০] আবদুল্লাহ বিন ঈসা - রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "উমর ইবনুল খাত্তাব - রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চেহারায় কান্নার কারণে কালো দুটি দাগ পড়ে গিয়েছিলো।"
দামি বেশভূষা ও ভোগবিলাস পরিহারের নির্দেশ
[৮১] আবু উসমান আন-নাহদি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উতবা আযারবাইযানে আসার পর তাঁকে খাবিস পরিবেশন করা হলো। তিনি আরও বড় দুই পাত্র খাবিস তৈরির নির্দেশ দিলেন। ফলে তাঁর জন্য দুই পাত্র খাবিস তৈরি করা হলো। তারপর পাত্র দুটিকে উটে চড়িয়ে উমর ইবনুল খাত্তাব - রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এলে তিনি তা চাখলেন এবং তাঁর কাছে উত্তম মিষ্টান্ন মনে হলো। তিনি বললেন, "প্রত্যেক মুসলমানই কি ভ্রমণের সময় এমন মিষ্টান্ন খেয়ে তৃপ্ত হয়?" কর্মচারী বললো, না। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "তাহলে এতে আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই।” তিনি পাত্র দুটি ঢেকে দিলেন এবং ফিরিয়ে দিলেন। উতবাকে চিঠি লিখে জানালেন: "পর সমাচার, এটা তোমার বাবার অথবা তোমার মায়ের পরিশ্রমের ফল নয়। সুতরাং মুসলমানদেরকে সে-খাবারেই তৃপ্ত করো যে-খাবারে তুমি সফরে তৃপ্ত হও। অনারবদের বেশ-ভূষা ও ভোগবিলাস থেকে দূরে থাকো এবং মা'দ বিন আদনানের অনুসরণ করো।"
মোটা রুটি ও তেল মুসলমানদের খাবার
[৮২] যায়দ বিন ওয়াহাব হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু-থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এলাম। দেখলাম লোকদের সামনে বড় বড় পাত্র। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি তাঁর কাছে গেলে তিনি মোটা রুটি ও তেল আনতে বললেন। আমি বললাম, আপনি কি আমাকে রুটি ও গোশত খেতে নিষেধ করছেন এবং এই খাবার খেতে ডেকেছেন? উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু — তখন বললেন, “আমি তোমাকে খাবার খেতে ডেকেছি এবং এটাই মুসলমানদের খাবার।”
জাহান্নামের ভীতি
[৮৩] মুতাররিফ — রাহিমাহুল্লাহ — কা’ব আল-আহবার — রাদিয়াল্লাহু আনহু — থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব — রাদিয়াল্লাহু আনহু — আমাকে বললেন, “আপনি আমাদের এমন কিছু কথা শোনান যাতে আমাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার হয়।” আমি তখন বললাম, “হে আমিরুল মুমিনীন, আপনাদের কাছে কি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ বিদ্যমান নয়?” তিনি বললেন, “অবশ্যই আছে। তারপরও, হে কা’ব, আপনি আমাদের কিছু কথা শোনান যাতে আমাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার হয়।” আমি বললাম, “হে আমিরুল মুমিনীন, আপনি এমন ব্যক্তির মতো আমল করুন, যদি আপনি সত্তর জন নবীর আমলের সমপরিমাণ আমল নিয়েও কিয়ামতের দিন উপস্থিত হতে চান, তারপরও যেনো তা আপনার কাছে তুচ্ছ মনে হয়।”
এ-কথা শুনে উমর — রাদিয়াল্লাহু আনহু — মাথা নিচু করে ফেললেন, তারপর পুরোপুরি মাথা উঠালেন। ধীরস্থির হয়ে বললেন, “হে কা’ব, আরও বলুন।” আমি বললাম, “হে আমিরুল মুমিনীন, যদি পৃথিবীর পূর্বপ্রান্তে কোনো ষাঁড়ের নাকের ছিদ্র পরিমাণ জাহান্নাম খুলে দেওয়া হয়, তবে তার তাপে পশ্চিমপ্রান্তের কোনো ব্যক্তির মগজ গলে গিয়ে বইতে শুরু করবে।” এ-কথা শুনে উমর — রাদিয়াল্লাহু আনহু — মাথা নিচু করে ফেললেন, তারপর পুরোপুরি মাথা উঠিয়ে ধীরস্থির হয়ে বললেন, “হে কা’বা, আরও বলুন।” আমি বললাম, “হে আমিরুল মুমিনীন, কিয়ামতের দিন জাহান্নাম এমনভাবে গর্জন করবে যে, প্রত্যেক নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেবেশতা ও প্রত্যেক মনোনীত নবী নতজানু হয়ে লুটিয়ে পড়বেন এবং বলতে থাকবেন, হে আমার রব, নাফসি! নাফসি! আজ আপানার কাছে কেবল আমার নিজের পরিত্রাণের প্রার্থনা করছি।” এ-কথা শুনে উমর — রাদিয়াল্লাহু আনহু — মাথা নিচু করে ফেললেন। আমি বললাম, “হে আমিরুল মুমিনীন, এ-কথা কি আপনারা আল্লাহর কিতাবে পাননি?” তিনি বললেন, “কীভাবে?” আমি বললাম, “আল্লাহ তাআলার এই বাণী:
يَوْمَ تَأْتِي كُلُّ نَفْسٍ تُجَادِلُ عَنْ نَفْسِهَا وَتُوَفَّىٰ كُلُّ نَفْسٍ مَا عَمِلَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
“স্মরণ করো সেই দিনকে, যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি আত্মসমর্থনে যুক্তি উপস্থিত করতে আসবে এবং প্রত্যেককে তার কর্মের পূর্ণফল দেওয়া হবে এবং তাদের প্রতি কোনোরূপ জুলুম করা হবে না।"
তওবা করার পদ্ধতি
[৮৪] ইয়াযিদ কিন আসাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব- রাদিয়াল্লাহু আনহু-এক লোককে এ-কথা বলতে শুনলেন: أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ অর্থাৎ, “আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর কাছে তওবা করি।” তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "আফসোস তোমার জন্য, তুমি এর সঙ্গে তার পরের অংশ মিলিয়ে নাও এবং বলো: فَاغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَ অর্থাৎ "আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তওবা কবুল করুন।”"
তালিযুক্ত কাপড় পরিধান
[৮৫] আবু উসমান উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে ওই অবস্থায় দেখেছেন যে, "তিনি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-জামরায় পাথর নিক্ষেপ করছিলেন, তখন তাঁর গায়ে চামড়ার তালি লাগানো একটি কাপড় ছিলো।"
আল্লাহর যিকির অন্তরের চিকিৎসা
[৮৬] আ'মাশ বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমরা আল্লাহর যিকির করো; কারণ, তা তোমাদের অন্তরের জন্য চিকিৎসা। আর তোমরা মানুষের গুণগান গাওয়া থেকে বিরত থাকো; কারণ, তা অন্তরের ব্যাধি।”
অনর্থক কিচ্ছা-কাহিনি বলতে বারণ
[৮৭] আবু সালেহ আল-গিফারি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব- রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে একজন লোক এলো এবং বললো, "আমার সম্প্রদায় আমাকে এগিয়ে দিয়েছে, তাই আমি তাদের নামায পড়িয়েছি। তারপর তারা আমাকে গল্পকাহিনি বলার নির্দেশ দিয়েছে। আমি তা-ই করেছি।" উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "তুমি তাদের নামায পড়াও; কিন্তু কিচ্ছা-কাহিনি বোলো না।" লোকটি একই কথা তিন বার বা চার বার বললো। অবশেষে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাকে বললেন, “তুমি তাদের কাহিনি শোনাবে না। কারণ, আমি আশংকা করি যে, তুমি নিজেকে বড় মর্যাদাবান মনে করবে, ফলে আল্লাহ তাআলা তোমাকে পাকড়াও করবেন।"
রাতের ঘুম বিঘ্ন ঘটায় ইবাদতে এবং দিনের ঘুম কর্তব্যে
[৮৮] মুআবিয়া বিন খুদাইজ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, আমর ইবনুল আস- রাদিয়াল্লাহু আনহু-আমাকে আলেকজান্দ্রিয়া জয়ের সংবাদ দিয়ে উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে পাঠালেন। দুপুরের দিকে আমি মদিনায় পৌঁছলাম এবং আমার বাহন মসজিদের ফটকের সঙ্গে বেঁধে মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর গৃহ থেকে একটি মেয়ে বেরিয়ে এলো। সে আমাকে সফরের পোশাকে দেখতে পেয়ে ভেতরে চলে গেলো। (তারপর আবার এসে) বললো, “আমিরুল মুমিনীন আপনাকে ডাকছেন।” মুয়াবিয়া বিন খুদাইজ গৃহের ভেতরে প্রবেশ করে সংবাদ জানালেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু- বললেন, “এই মেয়ে, ঘরে কি কোনো খাবার আছে?” সে রুটি ও তেল নিয়ে এলো। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, “তুমি খাও।” মুআবিয়া বিন খুদাইজ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, “আমি লজ্জার সঙ্গে তা খেতে থাকলাম।” তিনি বললেন, “তুমি খাও, মুসাফির তো খাবার খেতে পছন্দ করে।” তারপর বললেন, “এই মেয়ে, খেজুর আছে কি?” মেয়েটি একটি পাত্রে খেজুর নিয়ে এলো। তিনি বললেন, “খাও।” আমি লজ্জার সঙ্গে তা খেলাম। তারপর তিনি বললেন, “হে মুআবিয়া, মসজিদে প্রবেশ করে তুমি কী ভাবছিলে?” আমি বললাম, “ভাবছিলাম, আমিরুল মুমিনীন এখন দিবানিদ্রায় আছেন।” আমার কথা শুনে তিনি বললেন, “তুমি যা ভেবেছো তা কতই না নিন্দনীয়! যদি আমি দিনের বেলা ঘুমাই তবে আমার দায়িত্ব-কর্তব্যকে অবহেলা করবো আর যদি রাতের বেলা ঘুমাই তবে আমি (আমল-ইবাদত না করার কারণে) নিজেকেই বিনষ্ট করবো। এ দুটি কারণ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় আমি কীভাবে ঘুমাতে পারি, হে মুআবিয়া?”
দুনিয়াবিমুখতা উত্তম আমল
[৮৯] সুফয়ান সাওরি-রাহিমাহুল্লাহ-বর্ণনা করেন, উমর ইবনুল খাত্তাব- রাদিয়াল্লাহু আনহু-আবু মুসা আল-আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর উদ্দেশে চিঠি লিখলেন: “নিশ্চয় তুমি দুনিয়াবিমুখতার চেয়ে উত্তম অন্য কিছু দ্বারা আখেরাতের জন্য আমল করতে পারবে না। তুমি অবশ্যই চারিত্রিক তারল্য ও নিকৃষ্টতা থেকে দূরে থাকবে।"
উত্তম সঙ্গীর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাকুলতা
[৯০] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-রাতের বেলা তাঁর এক সঙ্গীর কথা উল্লেখ করতেন এবং বলতেন রাতটি কতই-না লম্বা! ফজরের নামায পড়ার পরপরই তিনি ওই সঙ্গীর কাছে ছুটে যেতেন এবং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ামাত্রই তাঁকে জড়িয়ে ধরতেন অথবা তাঁর সঙ্গে কোলাকুলি করতেন।"
ভুসিযুক্ত আটা দিয়ে রুটি তৈরির নির্দেশ
[৯১] আবু ইসহাক-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমার জন্য যেনো আটা চালা না হয়। কারণ, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে চালাহীন (ভুসিযুক্ত) আটা খেতে দেখেছি।"
তাঁর নেতৃত্বের আলামত
[৯২] আবু উবায়দুল্লাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-একবার ঘোড়া ছোটালেন। হঠাৎ আলখাল্লার নিচ থেকে তাঁর উরু বেরিয়ে পড়লো। নাজরানের অধিবাসীদের এক ব্যক্তি তাঁর উরুতে একটি তিল দেখতে পেলো। বললো, "আমরা আমাদের কিতাবে পেয়েছি যে, এই লোকই আমাদের ভিটে-মাটি ছাড়া করবে।"
যখন যা মন চায় তখন সেটাই খাওয়া অপচয়
[৯৩] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, একবার উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁর পুত্র আবদুল্লাহর কাছে গেলেন এবং তার কাছে গোশত দেখতে পেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলো, "এই গোশত কিসের জন্য?” আবদুল্লাহ বললেন, "আমার গোশত খেতে মন চেয়েছে।" উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "তোমার যখন যা মন চায় তখনই কি সেটা খাও? কোনো ব্যক্তির পক্ষে অপচয়ের জন্য এ-বিষয়টাই যথেষ্ট যে, তার যখন যা মন চায় তখনই সে ওটা খায়।"
টক দুধ খেয়ে আল্লাহ তাআলার প্রংশসা
[৯৪] হানাশ বিন হারিস-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব- রাদিয়াল্লাহু আনহু-কখনোই কোনো খাবারের দোষ ধরতেন না। একবার তাঁর গোলাম ইয়ারফা বা আসলাম বললেন, "আমি তাঁর জন্য এমন খাবার তৈরি করবো যাতে তিনি দোষ ধরতে বাধ্য হন।" সুতরাং তিনি টক দুধ তৈরি করলেন এবং উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-সামনে পরিবেশন করলেন। তিনি তা হাতে নিলেন এবং কিছুটা ভ্রুকুঞ্চিত করলেন। তারপর বললেন, "আল্লাহ তাআলার এই রিযিক কতই-না উত্তম।"
যখন যা মন চায় তখন সেটাই খরিদ করা অপচয়
[৯৫] আল-আ'মাশ থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর এক সঙ্গী থেকে বর্ণনা করেছেন, একবার জাবের-রাদিয়াল্লাহু আনহু-গোশত ঝুলিয়ে উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কী হে জাবের?" জাবের-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "এটা গোশত, খেতে মন চেয়েছে তাই খরিদ করেছি।" উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "যখনই তোমার কোনোকিছু মন চায় তুমি কি তা খরিদ করো? তুমি কি এই আয়াতে বর্ণিত লোকদের অন্তর্ভুক্ত হতে ভয় করো না?:
أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا وَاسْتَمْتَعْتُمْ بِهَا
"তোমরা তোমাদের পার্থিব জীবনেই সুখ-সম্ভার পেয়েছো এবং সেগুলো উপভোগও করেছো।"
বারোটি তালিযুক্ত জামা
[৯৬] যাকারিয়া বিন মাযিন আয-যুহলি-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবু মাযিন বর্ণনা করেন যে, তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখেছেন। তিনি বলেন, "আমার ভাই জারুদের সঙ্গে নিহত হলো। আমরা মৃতদেহগুলো উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে পাঠালাম। আমি উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর গায়ে একটি তালিযুক্ত চাদর দেখলাম। গুনে দেখেছি তাতে বারোটি তালি রয়েছে।"
পরিধানের জন্য একটিমাত্র কাপড়
[৯৭] কাতাদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-জুমার দিন মসজিদে আসতে অন্য লোকদের চেয়ে বেশি দেরি করলেন। তিনি সবার কাছে কৈফিয়ত দিলেন যেনো বিষয়টিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি দেখা হয়। বললেন, "এই কাপড় ধৌত করার কারণে আমার বিলম্ব হয়েছে। কাপড়টি ধুয়ে দেওয়া হয়েছিলো; কিন্তু এটি ছাড়া আমার আর কোনো কাপড় ছিলো না।"
নামায তরককারীর জন্য ইসলামে কোনো অংশ নেই
[৯৮] মিসওয়ার বিন মাখরামা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, 'সুবহে সাদিক হওয়ার পর আমি ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে গেলাম, তাঁকে বললাম, “হে আমিরুল মুমিনীন, নামাযের সময় হয়েছে।" তিনি বললেন, "হ্যাঁ, যে-ব্যক্তি নামায তরক করে ইসলামে তার কোনো অংশ নেই।” তিনি নামায আদায় করলেন এই অবস্থায় যে, তার ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছিলো।'
জামার আস্তিন কাটার জন্য ছুরি আনতে বললেন
[৯৯] আবু উসমান আন-নাহদি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব- রাদিয়াল্লাহু আনহু-উতবার বিন ফারকাদের গায়ে একটি জামা দেখলেন, যার আস্তিন বেশ লম্বা। তখন তিনি ওই জামার আঙুলের সামনের অংশটুকু কেটে ফেলার জন্য ছুরি আনতে বললেন। উতবা তখন বললেন, "হে আমিরুল মুমিনীন, আমার লজ্জাবোধ হচ্ছে যে, আপনি এভাবে আমার জামার আস্তিন কেটে দেবেন; বরং আমি নিজেই তা কেটে ফেলবো।" এ-কথা শুনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু- তাকে ছেড়ে দিলেন।'
বারোটি তালিযুক্ত জামা গায়ে দিয়ে খুতবা প্রদান
[১০০] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-তখন মুসলিম জগতের খলিফা। তিনি মসজিদে-লোকদের উদ্দেশে খুতবা দিলেন। তখন তাঁর গায়ে যে-চাদর ছিলো তাতে বারোটি তালি ছিলো।"
দুনিয়াবি দায়িত্ব থেকে মুক্তি কামনা
[১০১] আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললাম, "আল্লাহ তাআলা আপনার দ্বারা অনেক শহর নির্মাণ করেছেন, আপনার দ্বারা অনেক বিজয় নিশ্চিত করেছেন এবং আপনার দ্বারা যা-ইচ্ছা তা-ই করিয়ে নিয়েছেন।" আমার কথা শুনে তিনি বললেন, "আমি এর থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম। তাহলে প্রতিদানও থাকতো না, গুনাহও থাকতো না।"
কষ্টের জীবনযাপনে প্রতিদান রয়েছে
[১০২] মুসআব বিন সা'দ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, হাফসা বিনতে উমর- রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-তাঁর পিতাকে বললেন, "হে আমিরুল মুমিনীন, যদি আপনি এখন যে-পোশাক পরছেন তার চেয়ে ভালো পোশাক পরতেন এবং এখন যে- খাবার খাচ্ছেন তার চেয়ে ভালো খাবার খেতেন! কারণ, আল্লাহ তাআলা রিযিকে সচ্ছলতা দিয়েছেন এবং অনেক উত্তম বস্তু দান করেছেন।" উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "আমি তোমার সঙ্গে কিছুটা বোঝাপড়া করতে চাই। তোমার কি মনে পড়ে না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কী কঠিন জীবনযাপন করেছেন?" তারপর তিনি রাসূলের জীবনের কষ্টগুলো স্মরণ করিয়ে দিতে লাগলেন এবং অবশেষে হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা-কে কাঁদিয়ে ছাড়লেন। বললেন, "আমি তোমাকে এসব কথা বলেছি এই জন্য যে, আল্লাহর কসম! যদি আমি তাঁদের দুজনের (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু) সঙ্গে কষ্টের জীবনযাপনে শরিক হতে পারি তাহলে আশা করা যায় তাঁদের স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনেও তাঁদের সঙ্গে থাকতে পারবো।"
আল্লাহ তাআলা ক্ষমা না করলে ধ্বংস অনিবার্য
[১০৩] উসমান বিন আফ্ফান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বর্শা দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর আমি তাঁর কাছে গেলাম। তাঁকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে উঠাতে গেলাম। তিনি বললেন, "আমাকে ছাড়ুন! ধ্বংস আমার ও ধ্বংস আমার মায়ের যদি আমাকে ক্ষমা করা না হয়! ধ্বংস আমার ও ধ্বংস আমার মায়ের যদি আমাকে ক্ষমা করা না হয়!"
সাধারণ খাদ্য পাঠানোর নির্দেশ
[১০৪] মুজাহিদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-যখন সিরিয়ায় এলেন, একজন সমাজপতি তাঁর জন্য ও তাঁর সঙ্গীদের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করলেন। তারপর তাঁদের নিমন্ত্রণ করতে এলেন। উমর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাঁর সঙ্গীদের বললেন, "তোমাদের যার যার ইচ্ছা তাঁর নিমন্ত্রণে যেতে পারো।” ওই সমাজপতিকে বললেন, "তুমি আমার জন্য দুটি রুটি ও যে-কোনো এক প্রকার খাদ্য পাঠিয়ে দাও।" তিনি খাবার পাঠিয়ে দিলেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-তখন তাঁর একটি উটকে লাদি ও আলকাতরা দ্বারা অনুশীলন করাচ্ছিলেন। খাবার এলে তিনি দুই হাত মাটিতে ঘষে নিলেন, তারপর হাত ঝাড়া দিলেন এবং ওই খাবার খেলেন।'
আল্লাহর কিতাবকে চোখের সামনে আয়নার মতো রাখা
[১০৫] ইবনে গানাম বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, কিয়ামতের দিন আসমানের বিচারকের সামনে দুনিয়ার বিচারকের ধ্বংস রয়েছে; তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন, সত্যের 'পক্ষে ফয়সালা দিয়েছেন; স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি, মনোবাসনা চরিতার্থ বা ভয়ের কারণে কোনো ফয়সালা দেননি এবং আল্লাহ তাআলার কিতাবকে দুই চোখের সামনে আয়নার মতো রেখেছেন।"
প্রকৃত আল্লাহভীতির নামই দীন
[১০৬] ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল-আনসারী-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর ঊর্ধ্বতন বর্ণনাকারী থেকে বর্ণনা করেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "রাতের শেষভাগে গুঞ্জরন সৃষ্টি করার নাম দীন নয়; বরং প্রকৃত আল্লাহভীতির নামই দীন।"
ক্ষণস্থায়ী বিষয়ের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করার উপদেশ
[১০৭] খালফ বিন হাওশাব-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমি দুনিয়ার ব্যাপারে চিন্তা করে দেখেছি: যদি আমি দুনিয়া পেতে চাই তবে আখেরাত বিনষ্ট হয় আর যদি আখেরাত চাই তবে দুনিয়া বিনষ্ট হয়। বিষয়টা যখন এমনই, তখন তোমরা ক্ষণস্থায়ী বিষয়গুলোর প্রতি ভ্রুক্ষেপ কোরো না।"
মানুষের সচ্ছলতার জন্য ব্যাকুলতা
[১০৮] আবদুল্লাহ বিন ইয়াযিদ বিন সায়িব বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব-রাদিয়াল্লাহু আনহু-একটি বাহনে চড়লেন। তিনি দেখলেন যে, তা মলের সঙ্গে যব ত্যাগ করছে। তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "জন্তু-জানোয়ার এভাবে খায় অথচ মুসলমানরা জীর্ণশীর্ণ হয়ে মারা যাচ্ছে। মানুষের সচ্ছলতা ফিরে আসার আগ পর্যন্ত আমি বাহনে চড়বো না।"
টিকাঃ
৫. ইরাকের দিয়ালা জেলার অন্তর্গত একটি শহর। ১৬ হিজরিতে (৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে) এখানে জালুলা ময়দানে যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর এলাকাটির নাম হয় জালুলা।
৬. সূরা আলে ইমরান (০৩): আয়াত ১৪
৭. সূরা হাদীদ (৫৭): আয়াত ২৩
৮. الدرة : والدرة، هي السوط الذي يُؤَدَّبُ به : দিররাহ যে-চাবুকের দ্বারা আদব-কায়দা শিক্ষা দেওয়া হয়। (অনুবাদক)
৯. সূরা হা মীম আস-সাজদা (৪১): আয়াত ৩০
১০. নকি উপত্যকা: হিজাযে একটি উপত্যকা, যা মদীনা থেকে দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- মুসলমানদের ঘোড়াগুলোর চারণভূমিরূপে নকী উপত্যকা সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। (দেখুন: তারিখুল মাদিনাতিল মুনাওয়ারাহ, উমর বিন শিবাহ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫৫।)-অনুবাদক।
১১. আলিয়া: আস-সাফরা উপত্যকা-এলাকার একটি প্রাচীন ঐতিহাসিক গ্রাম। মদীনা মুনাওয়ারা থেকে পশ্চিম দিকে অবস্থিত।
১২. জাহর: এই নামে ইয়ামানে তিনটি এলাকা রয়েছে।
১৩. সহীহ বুখারি: ৭০২৪; আহমাদ: ১২০৪৭
১৪. সূরা বাকারা (০২): আয়াত ২০১
১৫. দক্ষিণ জর্ডানে অবস্থিত একটি প্রাচীন ইসলামি শহর। জাযিরাতুল আরবের বাইরে এটিই প্রথম ইসলামি শহর। বর্তমান সময়ে আকাবা শহরটি এখানেই অবস্থিত।
১৬. এটি সিরিয়ার দক্ষিণ সীমান্তে অবস্থিত একটি ছোট শহর। এরপরেই রয়েছে জর্ডানের রামসা শহরটি।
১৭. কুবতুরী: সাদা কাতান কাপড়
১৮. খেজুর ও মধুর মিশ্রণে তৈরি একপ্রকার মিষ্টান্ন
১৯. عليكم بالمعدية : اقتدوا بمعد بن عدنان والبسوا الخشن من الثياب، وامشوا حفاة فهو حث على التواضع ونهي عن الإفراط في الترفه والتنعم এই হাদিসে المعدية দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, তোমরা মা'দ বিন আদনানের অনুসরণ করো: মোটা কাপড় পরিধান করো, খালি পায়ে হাঁটো। কারণ, তা বিনয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে এবং ভোগ-বিলাসে বাড়াবাড়ি থেকে বিরত রাখে।
২০. সূরা নাহল, ১৬: আয়াত ১১১
📄 উসমান ইবনে আফফান—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া
আমলকারী প্রতিটি আমলের প্রতিদান পাবে
[১০৯] হাম্মাদ বিন যায়দ—রাহিমাহুল্লাহ—থেকে বর্ণিত, উসমান বিন আফ্ফান— রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেন, “কোনো আমলকারী যে-কোনো আমলই করুক না কেন, আল্লাহ তাআলা তাকে ওই আমলের চাদর পরিয়ে দেবেন।"
লজ্জাশীলতার কারণে তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতেন না
[১১০] হাসান বসরি—রাহিমাহুল্লাহ—উসমান বিন আফ্ফান—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর লজ্জাশীলতার তীব্রতার কথা উল্লেখ করে বলেন, “তিনি যখন ঘরে থাকতেন এবং ঘরের দরজা বন্ধ থাকতো, তখনও তিনি গোসল করার জন্য শরীর থেকে কাপড় সরাতেন না। লজ্জাশীলতাই তাঁকে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে বাধা দিতো।"
গৌরব প্রকাশার্থে ভোজের আয়োজন নিন্দনীয়
[১১১] হুমাইদ বিন নুআঈম—রাহিমাহুল্লাহ—থেকে বর্ণিত, উমর ও উসমান— রাদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে খাবারের দাওয়াত দেওয়া হলো। তাঁরা বের হওয়ার পর উসমান—রাদিয়াল্লাহু আনহু—উমর—রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, “আমরা এমন এক ভোজে শরিক হতে যাচ্ছি, যাতে শরিক না হলেই আমাদের জন্য ভালো হতো।” উমর—রাদিয়াল্লাহু আনহু—জিজ্ঞেস করলেন, “কেন?” উসমান— রাদিয়াল্লাহু আনহু—বললেন, “আমি আশংকা করছি যে, গৌরব প্রকাশের জন্য ওই ভোজের আয়োজন করা হয়েছে।"
ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কাউকে ঘুম থেকে জাগাতেন না
[১১২] যুবাইর বিন আবদুল্লাহ—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আমার দাদা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, উসমান বিন আফ্ফান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-রাতের বেলা তাঁর পরিবারের কাউকে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে জাগাতেন না। তবে কাউকে জাগ্রত পেলে তাঁকে ডেকে ওজুর পানি আনতে বলতেন। তা ছাড়া তিনি সারা বছর রোযা রাখতেন।"
তাঁর সুপারিশে অসংখ্য ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে
[১১৩] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন: وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ بِشَفَاعَةِ رَجُلٍ مِنْ أُمَّتِي مَا هُوَ مِنْ بَيْتِي أَكْثَرُ مِنْ رَبِيعَةَ وَمُضَرَ "যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম! আমার উম্মতের একজন ব্যক্তির সুপারিশে জাহান্নাম থেকে রাবীআ ও মুদার গোত্রের লোকদের চেয়েও বেশি লোক মুক্তি পাবে। তবে ওই ব্যক্তি আমার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "সাহাবায়ে কেরাম মনে করতেন যে এখানে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটি হলে উসমান বিন আফফান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-অথবা উওয়াইস আল-কারনী।"
মুসলিম জাহানের খলিফা হয়েও খচ্চরের ওপর চড়েছেন
[১১৪] মাইমুন বিন মিহরান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, হামদানি আমাকে জানিয়েছেন যে, "তিনি উসমান বিন আফফান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে খচ্চরের পিঠে দেখতে পেলেন। তাঁর পেছনে খচ্চরের ওপর তাঁর গোলাম নায়িলও রয়েছেন। অথচ তখন তিনি মুসলিম জাহানের খলীফা।"
কুরআন তেলাওয়াতের দ্বারা গোটা রাতকে সজীব রাখতেন
[১১৫] ইবনে সিরিন-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-শহীদ হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী বলেছেন, "তোমরা তাকে হত্যা করলে, অথচ তিনি এক রাকাতে কুরআন তেলওয়াতের দ্বারা গোটা রাতকে সজীব রাখতেন।” (এক রাকাতেই গোটা রাত পার করে দিতেন।)
আমিরুল মুমিনীন হয়েও কোনো পাহারাদার রাখেননি
[১১৬] জাফর বিন বুরকান হামদানি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "আমি উসমান বিন আফফান—রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে একটি কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকতে দেখলাম। তাঁর আশেপাশে কেউ-ই ছিলো না। (কোনো পাহারাদার ছিলো না।) অথচ তখন তিনি আমিরুল মুমিনীন।"
ঘুমের পর পার্শ্বদেশে কঙ্করের দাগ লেগে থাকতো
[১১৭] ইউনুস বিন উবাইদ বলেন, হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-কে যাঁরা মসজিদে দ্বিপ্রহরে ঘুমাতেন তাঁদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি বলেন, আমি উসমান বিন আফ্ফান—রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে দ্বিপ্রহরে মসজিদে ঘুমাতে দেখেছি। অথচ তখন তিনি মুসলিম জাহানের খলীফা। তিনি যখন দাঁড়াতেন তাঁর পার্শ্বদেশে কঙ্করের দাগ দেখা যেতো। অন্যরা বলাবলি করতেন, "ইনি হলেন আমিরুল মুমিনীন, ইনি হলেন আমিরুল মুমিনীন।"
নিজেই ওজুর পানি এনে ওজু করতেন
[১১৮] আবদুল্লাহ বিন আর-রুমি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "উসমান বিন আফ্ফান—রাদিয়াল্লাহু আনহু-রাতের বেলা জাগতেন এবং নিজেই ওজুর পানি নিয়ে ওজু করতেন। তাঁর স্ত্রী তাঁকে বলতেন, আপনি কি খাদেমদের নির্দেশ দিতে পারেন না তারা এসে আপনাকে ওজুর পানি দিয়ে যাবে? তিনি বলতেন, না, বিশ্রাম করার জন্য তাদের ঘুমের অধিকার রয়েছে।”
তাঁর হত্যাকারীদের কারও স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেনি
[১১৯] আমরাতা বিন কায়স আল-আদাবিয়্যাহ বলেন, উসমান বিন আফ্ফান—রাদিয়াল্লাহু আনহু—যে-বছর শহীদ হলেন সেই বছর আমি আয়েশা—রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর সঙ্গে মক্কার উদ্দেশে বের হলাম। মদিনার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা কুরআনের সেই কপিটি দেখলাম যা তাঁর কোলে থাকা অবস্থায় তিনি শাহাদাতবরণ করেছিলেন। তাঁর রক্তের প্রথম ফোঁটাটি ঝরে পড়েছিলো এই আয়াতের ওপর:
فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ "এবং তাদের বিরুদ্ধে তোমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
আমরাতা বলেন, "যারা উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে হত্যা করেছিলো তাদের কেউই স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেননি।"
তাঁর কোনো অপরাধ ছিলো না
[১২০] আবু সালেহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আল্লাহ তাআলা উসমান বিন আফ্ফানকে রহম করুন। তিনি এমন কোনো অপরাধ করেননি যার জন্য তাঁকে হত্যা করা যেতে পারে।"
স্বপ্নে শহীদ হওয়ার সুসংবাদ
[১২১] আবু হুরায়রাহ-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, "উসমান বিন আফ্ফানকে তাঁর গৃহে চল্লিশ দিন অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। তিনি আমাকে বলেন, সাহরির সময় (সুবহে সাদিকের আগে) আপনি আমাকে ডেকে দেবেন। সাহরির সময় আমি তাঁর কাছে এলাম এবং বললাম, হে আমিরুল মুমিনীন, সাহরির সময় হয়েছে। তিনি তখন তাঁর চেহারা মুছলেন এবং বললেন, 'ইয়া সুবহানাল্লাহ! হে আবু হুরায়রাহ, আপনি তো আমার স্বপ্ন ভেঙে দিলেন। আমি স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখলাম। তিনি আমাকে বললেন, আগামীকাল তুমি আমাদের সঙ্গে ইফতার করবে।' সে-দিনই তিনি শহীদ হলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি রহম করুন।"
পবিত্র হৃদয় আল্লাহর কালাম পাঠে ক্লান্ত হয় না
[১২২] সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উসমান বিন আফফান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমাদের অন্তর যদি পবিত্র হয় তবে আল্লাহ তাআলার কালাম পাঠে তোমাদের কখনো পরিতৃপ্তি আসবে না।” (অর্থাৎ, তেলাওয়াতের তৃষ্ণা তোমাদের থেকেই যাবে।)
কুরআন তেলাওয়াতের দ্বারা আল্লাহ তাআলাকে দর্শন
[১২৩] সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উসমান বিন আফ্ফান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমি চাই না আমার ওপর এমন কোনো দিন বা রাত আসুক যাতে আমি আল্লাহর দর্শন লাভ করি না।” সুফিয়ান বলেন, "তিনি কুরআন তেলাওয়াত বুঝিয়েছেন।"
তিনি ছিলেন সবচেয়ে আল্লাহভীরু
[১২৪] মুতাররিফ—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আমি আলী—রাদিয়াল্লাহু আনহু—এর সঙ্গে (বাইআত হওয়ার জন্য) সাক্ষাৎ করলাম। তিনি তখন বললেন, আমার কাছে আসতে কোন জিনিস তোমাকে দেরি করালো? উসমানের ভালোবাসা? হ্যাঁ, এখন তো তুমি অবশ্যই বলতে পারো যে, তিনি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখতেন এবং আমাদের মধ্যে সবচেয়ে আল্লাহভীরু ছিলেন।"
নিরাপদ রাখার প্রার্থনা
[১২৫] খালিদ আর-রাবায়ি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আমি বিভিন্ন কিতাবে পেয়েছি যে, উসমান বিন আফফান—রাদিয়াল্লাহু আনহু—কিয়ামতের দিন বলবেন, "হে আমার প্রতিপালক, আমাকে নিরাপদ রাখুন, আপনার মুমিন বান্দারা আমাকে হত্যা করেছে।"
নিজে সিরকা ও তেল খেতেন
[১২৬] শুরাহবিল বিন মুসলিম—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, "উসমান বিন আফ্ফান—রাদিয়াল্লাহু আনহু—মানুষকে রাজকীয় খাবার খাওয়াতেন; কিন্ত তিনি নিজের বাড়িতে প্রবেশ করতেন এবং (তরকারি হিসেবে) সিরকা ও তেল খেতেন।"
কবর সবচেয়ে কঠিন মনযিল
[১২৭] উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর আযাদকৃত হানি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু—যখন কোনো কবরের পাশে দাঁড়াতেন, কেঁদে ফেলতেন, এমনকি তাঁর দাড়ি ভিজে যেতো। তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি যখন জান্নাতের (ও জাহান্নামের) কথা স্মরণ করেন তখন কাঁদেন না, অথচ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন? (এর কারণ কী?) তিনি জবাবে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই কথা বলতে শুনেছি:
الْقَبْرُ أَوَّلُ مَنَازِلِ الْآخِرَةِ فَإِنْ نَجَا مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَيْسَرُ مِنْهُ وَإِنْ لَمْ يَنْجُ مِنْهُ فَمَا بَعْدَهُ أَشَدُّ مِنْهُ.
قَالَ: وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا رَأَيْتُ مَنْزِلًا إِلَّا وَرَأَيْتُ الْقَبْرَ أَفْظَعَ مِنْهُ.
"আখেরাতের মনযিলসমূহের মধ্যে কবর হলো প্রথম মনযিল, যদি কেউ তা থেকে মুক্তি লাভ করতে পারে, পরের মনযিলগুলো তার জন্য সহজ হয়ে যায়; আর যদি তা থেকে মুক্তি লাভ করতে না পারে, তাহলে পরের মনযিলগুলো আরও কঠিন হয়ে পড়ে।"
তারপর তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এটাও বলেছেন, "আমি কবর ঘরের চেয়ে বেশি জঘন্য অন্য কোনো ঘর দেখিনি।" তিনি আরও বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কোনো মৃতদেহকে দাফন করা থেকে অবসর হওয়ার পর বলতেন:
اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ وَاسْأَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ فَإِنَّهُ الْآنَ يُسْأَلُ "তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করো। তার জন্য ইসতিকামাতের (দৃঢ়পদ থাকার) দোয়া করো। কারণ, এখন সে জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হবে।”
ছাই হয়ে যাওয়ার আকাঙ্শা
[১২৮] আবদুল্লাহ আর-রুমি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমার কাছে পৌঁছেছে যে, উসমান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, হায়! যদি আমি না জানতাম যে আমাকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে কোনো একটার দিকে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে, তবে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে কোনটা আমার জন্য শেষ আশ্রয়স্থল হবে তা নিশ্চিত জানার আগেই ছাই হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করতাম।"
আবদুল্লাহ বিন যুবাইরের আনুগত্যের নির্দেশ
[১২৯] হিশাম তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ বিন যুবাইর- রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, আমি উসমান বিন আফ্ফান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখার সময় বললাম, আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন। আল্লাহর কসম! আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য তাদের হত্যা করা বৈধ করে দিয়েছেন। তিনি বললেন, “না, আল্লাহর কসম! আমি তাদের কিছুতেই হত্যা করবো না।” ফলে অবরোধকারীরা ঘরে প্রবেশ করে এবং তাঁকে হত্যা করে। সেদিন তিনি রোযাদার ছিলেন। উসমান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-আবদুল্লাহ বিন যুবাইর-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে তাঁর বাড়িতে আমীর নিযুক্ত করেন। তিনি বলেছেন, "আমার আনুগত্য করা যাদের জন্য আবশ্যক ছিলো তারা যেনো আবদুল্লাহ বিন যুবাইরের আনুগত্য করে।"
দিবসে রোযা রাখতেন ও রাতে নামায পড়তেন
[১৩০] যুবাইর বিন আবদুল্লাহ তাঁর দাদি বা নানি থেকে বর্ণনা করেন, তাঁর নাম ছিলো যুহাইমাহ, তিনি বলেন, "উসমান বিন আফ্ফান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-দিবসে রোযা রাখতেন এবং রাতের শুরুর অংশ বাদে গোটা রাত নামায পড়তেন।"
দাওয়াতে যাওয়া ও বরকতের জন্য দোয়া করা পছন্দ করতেন
[১৩১] আবু উসমান থেকে বর্ণিত, মুগীরা বিন শুবা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর গোলাম বিয়ে করলেন। তিনি তাঁকে উসমান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে তাঁকে দাওয়াত দিতে পাঠালেন। তিনি তখন আমিরুল মুমিনীন। গোলাম তাঁর কাছে এলে বললেন, "আমি তো রোযা রেখেছি। তবে আমি দাওয়াতে যেতে পছন্দ করি এবং বরকতের জন্য দোয়া করি।"
খারাপ কাজ থেকে বেঁচে যাওয়ার ফলে গোলাম আযাদ করে দিলেন
[১৩২] সুলাইমান বিন মুসা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "উসমান বিন আফ্ফান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে একটি গোত্রের নিকট যেতে অনুরোধ জানানো হলো। ওই গোত্র একটি নিকৃষ্ট কাজে লিপ্ত ছিলো। তিনি তাদের কাছে এলেন এবং তাদের ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়তে দেখলেন। খারাপ কাজটিও দেখলেন। তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন; কারণ, তাঁকে তাদের মুখোমুখি হতে হয়নি। তারপর একটি গোলাম আযাদ করে দিলেন।"
টিকাঃ
২২. এটি মুরসাল বর্ণনা হলেও এর সমার্থক আরও অনেক সহীহ বর্ণনা হাদীসে এসেছে। কোনো কোনো বর্ণনাতে বনু তামীমের কথাও আছে। বিস্তারিত দেখুন: তিরমিজি: ২৪৩৮, ইবনে মাজাহ: ৪৩১৬, মুসনাদে আহমাদ-১৫৮৫৮। (সম্পাদক)
২৩. সূরা বাকারা (০২): আয়াত ১৩৭।
২৪. ইবনে মাজাহ: ৪২৬৭, মুসনাদে আহমাদ: ৪৫৪, সনদ সহীহ। (সম্পাদক)
২৫. আবু দাউদ: ৩২২১, মুসনাদুল বাযযার: ৪৪৫, মুসতাদরাকে হাকেম: ১৩৭২
📄 আলী বিন আবু তালিব—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া
পরিচয় গোপন রেখে জামা ক্রয়
[১৩৩] আবু মাতার-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আমি আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু- কে দেখলাম তিনি লুঙ্গি-পরিহিত, গায়ে চাদর জড়ানো এবং সঙ্গে একটি বর্শা। যেনো তিনি গ্রাম্য বেদুইন। এই বেশে তিনি সুতি কাপড়ের বাজারে (দারে ফুরাত) পৌঁছলেন। তিনি একটি জামার দাম তিন দিরহাম বললেন। কিন্তু লোকটি তাঁকে চিনে ফেলায় তিনি তাঁর থেকে কিছু কিনলেন না। তারপর আরেক জন দোকানির কাছে এলেন। সেও তাঁকে চিনে ফেলায় তিনি তার থেকেও কিছু কিনলেন না। তারপর তিনি একজন কিশোর দোকানির কাছে এলেন এবং তার থেকে তিন দিরহাম দিয়ে একটি জামা কিনলেন। কিশোরটির বাবা দোকানে এলে কোনো লোক তাকে জানালো (যে, তার ছেলে আমীরুল মুমিনীনের কাছে তিন দিরহামে একটি জামা বিক্রি করেছে। অথচ সে তা দুই দিরহামে বিক্রি করতো)। ফলে কিশোরটির বাবা একটি দিরহাম নিয়ে আলী- রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে বললো, হে আমিরুল মুমিনীন, এই দিরহামটি নিন। তিনি বললেন, "এটা কিসের দিরহাম?" লোকটি বললো, "আপনি যে- জামাটি ক্রয় করেছেন তার দাম দুই দিরহাম।" তখন তিনি বললেন, "সে আমার কাছে জামাটি আমার সম্মতিতে বিক্রি করেছে এবং তার সম্মতিতে জামাটির মূল্য গ্রহণ করেছে।” (তাই তিনি দিরহামটি নিলেন না।)
দশ জনের নয় জনই সত্য অস্বীকার করবে
[১৩৪] আওফা বিন দালহাম আল-আদাভী-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমার কাছে আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-থেকে এই বর্ণনা পৌঁছেছে যে, তিনি বলেছেন, "তোমরা ইলম অর্জন করো, তার দ্বারা তোমরা পরিচিত হবে। ইলম অনুযায়ী আমল করো, তাহলে 'আহলে ইলম'গণের অন্তর্ভুক্ত হবে। তোমাদের পরে এমন এক যুগ আসবে যখন দশ জনের মধ্যে নয় জনই সত্য অস্বীকার করবে। যারা দুনিয়া বিমুখ থাকবে কেবল তারাই বেঁচে যাবে। তারাই হলো হেদায়েতের ইমাম এবং ইলমের আলোকবর্তিকা।"
অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তির অনুসরণের আকাঙ্ক্ষা
[১৩৫] মুহাজির আল-আমিরি-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমি তো তোমাদের ব্যাপারে দুটি বিষয়ের আশংকা করি: অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ। অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষা আখেরাতকে ভুলিয়ে দেয় এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ সত্য থেকে বিরত রাখে। আরে সাবধান! দুনিয়া তো পশ্চাদ্গামী আর আখেরাত আগমনকারী। আর দুনিয়া ও আখেরাত উভয়েরই দাস রয়েছে। সুতরাং তোমরা আখেরাতের দাস হও; দুনিয়ার দাস হোয়ো না। আজ আমল আছে, কিন্তু হিসাব নেই। আগামীকাল (আখেরাতে) হিসাব থাকবে, কিন্তু আমল থাকবে না।"
পরনের চাদর বিক্রি
[১৩৬] আবু বাহর-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁদের শায়খ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পরনে একটি মোটা চাদর দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, "আমি এটি পাঁচ দিরহাম দিয়ে খরিদ করেছি। কেউ যদি আমাকে এক দিরহাম বাড়িয়ে দেয় তবে আমি তা তার কাছে বিক্রি করবো।" বর্ণনাকারী শায়খ বলেন, আমি তাঁর কাছে কিছু খুচরা দিরহাম দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, "আমরা ইয়ানবু থেকে যে-ভাতা পাই তা থেকে এগুলো উদ্বৃত্ত হয়েছে।"
বাইতুল মাল ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করার নির্দেশ
[১৩৭] মুজাম্মাআ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কখনো বাইতুল মাল ঝাড় দিয়ে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করার নির্দেশ দিতেন। তারপর তাতে এই আশায় নামায পড়তেন যে, কিয়ামতের দিন বাইতুল মাল তাঁর ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে যে, তিনি মুসলমানদের না দিয়ে তাতে মাল আটকে রাখেননি।"
আধা দিরহাম দিয়ে গোশত ক্রয়
[১৩৮] আলী বিন রাবীআ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর দুজন স্ত্রী ছিলো। প্রথম জনের পালার দিন এলে আধা দিরহাম দিয়ে গোশত খরিদ করতেন এবং দ্বিতীয় জনের পালার দিন এলে বাকি আধা দিরহাম দিয়ে গোশত খরিদ করতেন।"
জাহান্নামের দরজার বর্ণনা
[১৩৯] হিত্তান বিন আবদুল্লাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমরা কি জানো জাহান্নামের দরজা কেমন হবে?” বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বললাম, এসব দরজার মতো হবে। তিনি বললেন, "না; বরং তা এ রকম হবে।" এই কথা বলে তিনি তাঁর হাত উপরের দিকে উঠালেন এবং প্রসারিত করলেন। আর আবু উমর তাঁর হাত আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর হাতের ওপর উঁচু করলেন।
নিজ হাতে উটকে খাওয়াচ্ছিলেন
[১৪০] আবু মুলাইকাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "উসমান বিন আফ্ফান-রাদিয়াল্লাহু আনহু-যখন তাঁর হাতে বাইআত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে খবর পাঠালেন। তিনি তাঁকে একটি আলখাল্লা পরিহিত দেখলেন আর তাঁর মাথায় একটি মস্তকবন্ধনী বাঁধা। তিনি তখন তাঁর একটি উটকে খাওয়াচ্ছিলেন।"
তালিযুক্ত জামার পরিধানে অন্তর বিনম্র থাকে
[১৪১] উমর বিন কায়স-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কেন আপনি জামায় তালি লাগান? তিনি বললেন, "তাতে অন্তর বিনম্র হয় এবং মুমিনরা তা অনুসরণ করে।"
সাদাসিধে জীবনের নমুনা
[১৪২] আদি বিন সাবেত-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, "আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে ফালুজা (আটা, পানি ও মধু দ্বারা তৈরি মিষ্টান্নাবিশেষ) নিয়ে আসা হলো। কিন্তু তিনি তা খেলেন না।"
নিজ হাতে কাজ করে খাদ্য উপার্জন
[১৪৩] মুজাহিদ-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমি একটি বাগান বা উদ্যানের কাছে এলাম। তার মালিক বললো, বাগানে এক বালতি পানি দেওয়ার বিনিময়ে একটি খেজুর পাবে। (এতে কি তুমি রাজি আছো?) তখন আমি একটি খেজুরের বিনিময়ে এক বালতি করে পানি দিতে শুরু করলাম। খেজুরে আমার হাত ভরে গেলো। তারপর পানি পান করলাম। অতঃপর হাতভর্তি খেজুর নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এলাম। তাঁর কিছুটা তিনি খেলেন, কিছুটা আমি খেলাম।"
তাঁর কাছে একটি লুঙ্গির দাম ছিলো না
[১৪৪] ইয়াযিদ বিন মিহযান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আমরা রাহাবায় আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি একটি তরবারি নিয়ে আসতে বললেন। তারপর তা কোষমুক্ত করে বললেন, এ তরবারিটি কে ক্রয় করবে? আল্লাহর কসম! যদি আমার কাছে একটি লুঙ্গি কেনার দাম থাকতো, তবে আমি তা বিক্রি করতাম না।"
মিথ্যাবাদীর চোখ অন্ধ হয়ে গেলো
[১৪৫] যাযান আবু উমর রাহিমাহুল্লাহ-এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-রাহাবায় থাকাকালে এক ব্যক্তিকে একটি হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু লোকটি তাঁকে মিথ্যা বললো। আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "তুমি আমার সঙ্গে মিথ্যা বলেছো।" লোকটি বললো, "না, আমি মিথ্যা বলিনি।" আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "তুমি যদি আমার সঙ্গে মিথ্যা বলে থাকো, তবে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করবো তিনি যেনো তোমার চোখ অন্ধ করে দেন।" বর্ণনাকারী বলেন, "তিনি আল্লাহর কাছে লোকটির চোখ অন্ধ করে দেওয়ার জন্য দোয়া করলেন। ফলে সে অন্ধ হয়ে গেলো।"
পরিচয় গোপন রেখে জামা ক্রয়
[১৪৬] আবু আবদুর রহমান হামদানি-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর দাদি থেকে, তিনি তাঁর মা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-ফুরাতের আবাসস্থলে আসার পর একজন দরজিকে বললেন, "তুমি কি জামাটি বিক্রি করবে? তুমি কি আমাকে চেনো?” দরজি বললো, "হ্যাঁ, আপনাকে চিনি।” আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "তাহলে তোমার থেকে জামা ক্রয়ে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।” তিনি আরেক জন দরজির কাছে এলেন এবং তাকে বললেন, "তুমি কি আমাকে চেনো?” দরজি বললো, "না, চিনি না।” তিনি বললেন, "তাহলে সুতি কাপড়ের জামাটি আমার কাছে বিক্রি করো।" দরজি জামাটি বিক্রি করলো। আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাকে বললেন, "জামাটি লম্বা করে ধরো।" জামার হাতা তাঁর আঙুলের ডগা পর্যন্ত পৌঁছলে তিনি বললেন, “তুমি অতিরিক্ত অংশটুকু কেটে ফেলো।” দরজি (জামার অতিরিক্ত অংশ কেটে দিয়ে) মুড়ি সেলাই করে দিলো। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-জামাটি পরিধান করলেন এবং এই দোয়া পাঠ করলেন:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي كَسَانِي مَا أَتَوَارَى بِهِ وَأَتَجَمَّلُ فِي خَلْقِهِ
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে বস্ত্র পরিধান করিয়েছেন, যার দ্বারা আমি লজ্জা নিবারণ করি এবং আমার দেহকে সজ্জিত করি।"
হেঁটে যেতেন ঈদগাহে
[১৪৭] আবু সিনান আশ-শাইবানি-রাহিমাহুল্লাহ-হেরাতের এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, “আমি আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে ঈদগাহে হেঁটে যেতে দেখেছি।"
নিজের শাহাদাতবরণের ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী
[১৪৮] যায়দ বিন ওয়াহাব আল-জুহানি-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে বসরার অধিবাসীদের একটি প্রতিনিধিদল এলো। তাদের মধ্যে একটি লোক ছিলো খাওয়ারিজদের নেতা। তার নাম ছিলো জা'দ বিন বা'জাহ। সে লোকদের উদ্দেশে ভাষণ দিলো এবং আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও মহিমা প্রকাশ করলো। সে বললো, হে আলী, আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। তাহলে আপনি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন। আর আপনি 'মুহসিন'-এর অবস্থা তো জানেনই (তিনি কীভাবে মৃত্যুবরণ করেছিলেন)। (বক্তা এখানে মুহসিন বলে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বুঝিয়েছে।) তারপর আবার বললো, “আপনি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করবেন।” আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-তখন বললেন, “না, যাঁর হাতে আমার প্রাণ তার কসম! বরং আমি নির্মমভাবে নিহত হবো। এটা (গর্দান) কর্তন করা হবে এবং এটা (দাড়ি) রক্তে রঞ্জিত হবে। এটাই চূড়ান্ত পরিণতি এবং অবধারিত নিয়তি। যে-ব্যক্তি মিথ্যা রটনা করবে সে অবশ্যই ধ্বংস হবে।” তারপর জা'দ বিন বা'জাহ বললো, “আপনাকে ভালো পোশাক পরতে কে বাধা দিয়েছে?” আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, “আমার পোশাকের ব্যাপারে তোমার সমস্যা কী? নিশ্চয় আমার এই পোশাক অহংকারমুক্ত এবং মুসলমানদের অনুসরণ করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।"
যাতে অভ্যস্ত নন তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন
[১৪৯] হাব্বাতা বিন জাবিন আল-উরানি-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, আলী- রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে ফালুজা উপস্থিত করা হলো। তিনি ফালুজাটা তার সামনে রাখলেন এবং বললেন, "তোমার ঘ্রাণ চমৎকার, তোমার রং সুন্দর, তোমার স্বাদও চমৎকার। কিন্তু যাতে আমি অভ্যস্ত নই নিজেকে তাতে অভ্যস্ত করতে অপছন্দ করি।"
লম্বা হওয়ার কারণে জামার হাতা কেটে ফেললেন
[১৫০] মাতির বিন সা'লাবা আত-তাইমি সুতি কাপড় বিক্রেতা আবুন নাওয়ার থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "আলী বিন আবু তালিব-রাদিয়াল্লাহু আনহু- আমার কাছে এলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর এক গোলাম ছিলো। তিনি আমার কাছ থেকে দুটি সুতি কাপড়ের জামা কিনলেন। তারপর তার গোলামকে বললেন, "জামা দুইটির মধ্যে তোমার যেটা পছন্দ সেটা নিয়ে নাও। গোলাম একটি জামা নিলো, অপরটি আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-নিলেন। তারপর জামাটি পরিধান করলেন এবং হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “যে-অংশটুকু আমার হাতের চেয়ে লম্বা হয়েছে সেটা কেটে ফেলো।" দরজি অতিরিক্ত অংশ কেটে দিলো এবং মুড়ি সেলাই করে দিলো। তিনি সেই জামাটি পরে চলে গেলেন।
নিজেই খেজুর বহন করে নিয়ে গেলেন
[১৫১] আলী বিন হাশিম কাপড়-ব্যবসায়ী সালেহ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি তাঁর মা বা দাদি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, "আমি দেখেছি, আলী- রাদিয়াল্লাহু আনহু-এক দিরহাম দ্বারা কিছু খেজুর ক্রয় করলেন এবং খেজুরগুলো একটি কম্বলে মুড়িয়ে নিজেই বহন করলেন। লোকেরা বললো, "হে আমিরুল মুমিনীন, আপনার পরিবর্তে আমরা বহন করে দিই।” তিনি বললেন, “না, পরিবারের কর্তারই তা বহন করা অধিক যুক্তিযুক্ত।"
একজন মহান ব্যক্তির চলে যাওয়া
[১৫২] আমর বিন হাবাশি বলেন, হাসান বিন আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহুমা- আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-নিহত হওয়ার পর আমাদের উদ্দেশে বক্তৃতা দিলেন। তিনি বললেন, "একজন বিশ্বস্ত মানুষ তোমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর পূর্বে তাঁর মতো জ্ঞানী ব্যক্তি কেউ ছিলেন না এবং পরবর্তী লোকেরাও তাঁর সমকক্ষ হতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-যদি তাঁর হাতে ঝান্ডা দিয়ে যুদ্ধে প্রেরণ করতেন তাহলে তিনি বিজয়ী না হয়ে ফিরে আসতেন না। তিনি সোনা-রুপা বিত্ত-বৈভব রেখে যাননি। কেবল তিনি যে-ভাতা পেতেন ওই ভাতা থেকে সাতশটি দিরহাম থেকে গিয়েছিলো, যা তিনি পরিবারের খাদেমের জন্য বরাদ্দ রাখতেন।"
ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বেঁধেছিলেন
[১৫৩] মুহাম্মদ বিন কা'ব আল-কুরাযি আলী-রাদিয়াল্লাহু আনহু-থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলাম, তখন এমনও অবস্থা হয়েছে যে, ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বেঁধেছি। অথচ আজকে আমার সদকার পরিমাণ চল্লিশ হাজার।"
📄 আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখে দুনিয়া
সর্বত্র আল্লাহর নেয়ামত বিস্তৃত
[১৫৪] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “হে বৎস, তুমি মানুষের মধ্যে যা-কিছু দেখো তার সবকিছুর তত্ত্ব-তালাশে লেগে যেয়ো না। যে-ব্যক্তি মানুষের মধ্যে কোনো-কিছু দেখেই তার তত্ত্ব-তালাশে লেগে যায় তার দুঃখ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তার ক্রোধ কখনো প্রশমিত হয় না। আর যে-ব্যক্তি তার পানাহার ব্যতীত অন্য কোথাও আল্লাহর নেয়ামত দেখতে পায় না তার আমল কমে যায় এবং তার শাস্তি উপস্থিত হয়। আর যে-ব্যক্তি দুনিয়ার ব্যাপারে অমুখাপেক্ষী নয়, তার কোনো দুনিয়াই নেই।" (বিপুল সম্পত্তির মালিক হওয়ার পরও তার মনে সম্পদের হাহাকার থেকে যায়। যেনো সে কিছুই পায়নি।)
যাঁর কাছে কুরআনের সার্বিক মর্ম উন্মোচিত তিনিই জ্ঞানী
[১৫৫] আবু কিলাবাতা-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তুমি ততোক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ জ্ঞানী হতে পারবে না যতোক্ষণ তোমার কাছে কুরআনের বিভিন্ন দিক উন্মোচিত হবে। তুমি ততোক্ষণ পর্যন্ত জ্ঞানী হতে পারবে না যতোক্ষণ না আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কারণে মানুষের প্রতি তোমার ঘৃণা জন্মাবে, তারপর নিজের দিকে তাকিয়ে দেখবে যে, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার কারণে মানুষের চেয়ে নিজের প্রতিই তোমার তীব্র ঘৃণা জন্মেছে।"
কুরআনের বদৌলতে রয়েছে মহাপুরস্কার
[১৫৬] আওফ বিন মালিক আল-আশযায়ি-রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি স্বপ্নে চামড়া-নির্মিত একটি তাঁবু এবং একটি সবুজ উদ্যান দেখতে পেলেন। তাঁবুর চারপাশে বিশ্রামরত মেষপাল দেখতে পেলেন। মেষগুলো জাবর কাটছে এবং মলরূপে আজওয়া খেজুর ত্যাগ করছে। তিনি বলেন, "আমি বললাম, এই তাঁবুটি কার?" বলা হলো, "আবদুর রহমান বিন আওফের।" আওফ বিন মালিক-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, আমরা অপেক্ষা করলাম। তিনি (আবদুর রহমান বিন আওফ) বেরিয়ে এলেন এবং আমাকে বললেন, "হে আওফ, কুরআনুল কারীমের বদৌলতে আল্লাহ তাআলা আমাকে এগুলো দান করেছেন। আর আপনি যদি এই প্রাসাদ দেখতেন, তাহলে এমন-সব বস্তু দেখতে পেতেন যা আপনা চোখ কখনো দেখেনি, যার কথা আপনার কান কখনো শোনেনি এবং যার ধারণা আপনার মনে কখনো উদিত হয়নি। আল্লাহ তাআলা আবুদ দারদার জন্য প্রস্তুত রেখেছেন। তা এ-কারণে যে, তিনি দুই হাত ও অন্তর দ্বারা দুনিয়াকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন।"
কেউই মৃত্যু থেকে রেহাই পাবে না
[১৫৭] সাঈদ আল-জারিরি-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর জনৈক শায়খ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-একজন লোককে জানাযায় শরিক হতে দেখলেন। সে বলছিলো, এই লোক কে? এই লোক কে? তার কথা শুনে আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বললেন, "এটা তো তুমি, এটা তো তুমি। আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন:
إِنَّكَ مَيِّتُ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ "নিশ্চয় আপনি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল।"
তাঁর পাপসমূহই তাঁর অসুখ
[১৫৮] মুআবিয়া ইবনে কুরা আল-মুযানি-রাহিমাহুল্লাহ-বর্ণনা করেন, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-অসুস্থতা বোধ করলে তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে দেখতে এলেন। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কী অসুখ, হে আবুদ দারদা?" তিনি বললেন, "আমার পাপসমূহই আমার অসুখ।" তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে আপনি কী কামনা করেন?" তিনি বললেন, "আমি জান্নাত কামনা করি।" তাঁরা বললেন, "আমরা কি আপনার জন্য একজন ডাক্তার ডেকে আনবো না?" তিনি বললেন, "যিনি ডাক্তার তিনিই তো আমাকে শুইয়ে রেখেছেন।"
যতোটুকু যথেষ্ট ততোটুকুই কল্যাণকর
[১৫৯] আবদুল্লাহ বিন মুররা-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমরা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করো এমনভাবে যে তোমরা তাঁকে দেখছো। তোমরা নিজেদের মৃত বলে গণ্য করো। তোমরা জেনে রাখো যে, তোমাদের গাফেল করে দেওয়া অধিক সম্পদের তুলনায় সেই সম্পদই বেশি কল্যাণকর যা অল্প হলেও প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট হয়। মনে রেখো, সৎকাজ কখনো বিনষ্ট হয় না এবং পাপের কথা কখনো ভোলা যায় না।"
সচ্ছলতার দিনগুলোতে আল্লাহকে ভোলা যাবে না
[১৬০] আবু কিলাবাতা-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "সচ্ছলতার দিনগুলোতে আল্লাহ তাআলাকে ডাকো তাহলে নিশ্চয় তিনি দুরবস্থার দিনগুলোতেও তোমার ডাকে সাড়া দেবেন।"
আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন মানুষও তাকে ভালোবাসে
[১৬১] আবদুর রহমান বিন আবু লায়লা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-সালামা বিন মাখলাদের কাছে এই চিঠি লিখলেন: "পর সমাচার এই যে, বান্দা যখন আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সঙ্গে আমল করে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে ভালোবাসেন। আল্লাহ যখন তাকে ভালোবাসেন, তখন তাকে মানুষের মধ্যেও প্রিয়ভাজন বানিয়ে দেন। আর বান্দা যখন আল্লাহর নাফরমানি করে, আল্লাহ তাকে অপছন্দ করেন। আল্লাহ যখন তাকে অপছন্দ করেন, তখন মানুষের মধ্যেও তাকে অপছন্দনীয় বানিয়ে দেন।"
চিন্তা ও উপদেশগ্রহণ উত্তম আমল
[১৬২] আওন বিন আবদুল্লাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উম্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সবচেয়ে উত্তম আমল কী ছিলো? তিনি বললেন, "চিন্তা ও উপদেশগ্রহণ।"
বাজার মানুষকে উদাসীন বানিয়ে দেয়
[১৬৩] সুলাইমান বিন আমের-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, মানুষের ঘর তার জন্য কতই-না উত্তম ইবাদতখানা! তাতে তার চোখ ও জিহ্বা হেফাজতে থাকে। তোমরা বাজার থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, বাজার মানুষকে গাফেল বানিয়ে দেয় এবং অনর্থক কাজে লিপ্ত করে।"
তিনটি ব্যাপার না থাকলে মৃত্যুই হতো শ্রেয়
[১৬৪] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "যদি তিনটি ব্যাপার না থাকতো, তবে আমি মাটির উপরে নয়, মাটির গর্ভে থাকাটাই পছন্দ করতাম: আমার বন্ধুরা, যারা আমার কাছে ভালো কথা বলতে আসেন যেভাবে ভালো খেজুর নির্বাচন করা হয়; আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হয়ে চেহারাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে রাখা; আল্লাহর পথে একটি সকাল বা একটি সন্ধ্যা।"
তওবাকারী ও যিকিরকারীদের জন্য দোয়া
[১৬৫] আবু জাবের-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাহাজ্জুদগুজার লোকদের কুরআন তেলাওয়াত শুনলে বলতেন, "যারা কিয়ামতের পূর্বে নিজেদের জন্য কান্নাকাটি করে এবং আল্লাহর যিকির দ্বারা যাদের হৃদয় বিগলিত হয় তাদের জন্য আমার পিতা কুরবান হোক।"
সময় শেষ হওয়ার আগেই সৎকাজ করার উপদেশ
[১৬৬] রাবীআ বিন যায়দ রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, "যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তোমরা সৎকাজ করে নাও। কারণ, তোমরা তোমাদের আমল দ্বারাই লোকদের সঙ্গে লড়াই করবে।"
আল্লাহর কাছে দুনিয়া মাছির ডানা থেকেও মূল্যহীন
[১৬৭] বিলাল বিন সা'দ-রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আল্লাহর কসম! যদি আল্লাহ তাআলার কাছে দুনিয়ার মূল্য মাছির ডানা পরিমাণও হতো, তিনি ফেরআউনকে এক ঢোক পানিও পান করাতেন না।"
যিকিরকারীরা হাসতে হাসতে জান্নাতে প্রবেশ করবে
[১৬৮] জুবাইর বিন নুফাইর-রাহিমাহুল্লাহ-তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে যাদের জিহ্বা আল্লাহর যikির দ্বারা সিক্ত থাকে তারা হাসতে হাসতে জান্নাতে প্রবেশ করবে।"
আলেম ব্যতীত কারও থেকে দীনের কথা গ্রহণযোগ্য নয়
[১৬৯] জুবাইর বিন নুফাইর-রাহিমাহুল্লাহ-বর্ণনা করেছেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "যিনি আলেম এবং যিনি আলেমের বক্তব্য বর্ণনা করেন তাদের উভয়ই প্রতিদানের ক্ষেত্রে সমান। আর তারা উভয়ে ব্যতীত অন্যদের মাঝে কল্যাণ নেই।” (তাদের থেকে দ্বীনের কথা গ্রহণ করা যাবে না।)
জ্ঞানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের প্রতিদান সমান
[১৭০] সালিম বিন আবুল জা'দ-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “কল্যাণকর জ্ঞানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ই প্রতিদানের ক্ষেত্রে সমান। এই দুই প্রকার মানুষ ছাড়া অন্য মানুষের মাঝে কল্যাণ নেই।"
তিনটি কারণে মানুষ পরিশুদ্ধ হতে পারে না
[১৭১] জুবাইর বিন নুফাইর-রাহিমাহুল্লাহ-বর্ণনা করেছেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তিনটি বিষয় না থাকলে মানুষ পরিশুদ্ধ হয়ে যেতো: অনুসৃত কৃপণতা, অনুসৃত প্রবৃত্তি এবং প্রত্যেক মত প্রদানকারীর নিজের মতের প্রতি মুগ্ধ হওয়া।"
আল্লাহর যিকির দ্বারা জিহ্বাকে সজীব রাখা উত্তম আমল
[১৭২] সালিম বিন আবুল জা'দ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলা হলো, সা'দ বিন মুনাব্বিহ একশোটি দলিল ঝুলিয়েছেন। তিনি বললেন, "একশোটি দলিল তো একজন ব্যক্তির জন্য অনেক বেশি সম্পদ। তুমি যদি চাও তাহলে তার চেয়ে উত্তম বিষয়ের সংবাদ তোমাকে জানাবো: দিনে-রাতে সব সময় ঈমানের ওপর অটল থাকা এবং আল্লাহর যিকির দ্বারা জিহ্বাকে সজীব রাখা।” (আল্লাহর যিকিরে মগ্ন থাকা।)
অর্জিত ইলম অনুযায়ী আমল করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা
[১৭৩] হুমাইদ বিন হেলাল বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমি যে-ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা এই যে, যখন আমি আমার মহান প্রতিপালকের সঙ্গে মিলিত হবো, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করবেন, "তুমি ইলম অর্জন করেছো, সুতরাং তুমি অর্জিত ইলম অনুযায়ী কী আমল করেছো?"
যা-কিছু আল্লাহর যিকিরের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে তা কল্যাণময়
[১৭৪] খালিদ বিন মা'দান-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "দুনিয়া হলো অভিশপ্ত। দুনিয়াতে যা-কিছু আছে তাও অভিশপ্ত, তবে আল্লাহর যিকির এবং যা-কিছু আল্লাহর যিকিরের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে তা ব্যতীত। ইলম শিক্ষাদানকারী এবং ইলম অর্জনকারী উভয়ই প্রতিদানের ক্ষেত্রে সমান। বাকি সব মানুষ অর্থহীন; তাদের মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।" (তাদের থেকে ইসলামি জ্ঞান গ্রহণ করা যাবে না।)
'আল্লাহু আকবার' যিকির উত্তম
[১৭৫] আবু রাজা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমার কাছে একশো বার 'আল্লাহু আকবার' বলা একশো দিনার সাদকা করার চেয়েও উত্তম।"
ইলম ও আলমেরদের ভালোবাসা
[১৭৬] মুআবিয়া বিন কুররা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমরা ইলম অন্বেষণ করো, যদি ইলম অন্বেষণ করতে না পারো তবে আলেমগণকে ভালোবাসো। যদি তাদের ভালোবাসতেও না পারো, তবে তাদের অপছন্দ কোরো না।"
মসজিদ ব্যবসা করার জায়গা নয়
[১৭৭] আবু আবদি রাব্বিহী-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "এ ব্যাপারটা আমাকে আনন্দ দেয় না যে, আমি মসজিদের ফটকের সামনে চত্বরে দাঁড়াই, ক্রয়-বিক্রয় করি এবং প্রতিদিন তিনশো দিনার মুনাফা আয় করি। কারণ, আমি তো প্রতিওয়াক্ত নামায মসজিদেই আদায় করি। আমি বলি না যে, আল্লাহ তাআলা ব্যবসা হালাল করেননি এবং সুদ হারাম করেননি; বরং আমি ওই সকল লোকের অন্তর্ভুক্ত হতে ভালোবাসি যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
لَا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهُ "ব্যবসা এবং কেনাবেচা তাদের আল্লাহর যিকির (স্মরণ) থেকে গাফেল করে না।"
তিনটি বিষয় তিনি পছন্দ করেন, মানুষ অপছন্দ করে
[১৭৮] আবু ইয়াস-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “তিনটি বিষয় আছে যেগুলো মানুষ অপছন্দ করে; কিন্তু আমি সেগুলো পছন্দ করি: দরিদ্রতা, অসুস্থতা ও মৃত্যু।"
হারাম পন্থায় উপার্জন এক ভয়াবহ ব্যাধি
[১৭৯] আবদুল্লাহ বিন বাবাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "হালাল পন্থায় সম্পদ উপার্জন খুব কম হয়। কেউ যদি হারাম পন্থায় সম্পদ উপার্জন এবং তা নিজের জন্য খরচ করে অথবা কেউ যদি হারাম পন্থায় সম্পদ উপার্জন করে এবং তা অন্যের জন্য খরচ করে, তবে তা এক ভয়াবহ ব্যাধি। আর যে-ব্যক্তি হালাল পন্থায় উপার্জন করে এবং নিজের জন্য তা খরচ করে, তাহলে তা পাপসমূহকে ধৌত করে দেয়, যেভাবে (বৃষ্টির) পানি পাথর থেকে মাটি ধুয়ে দেয়।"
জ্ঞানী ব্যক্তিদের সামান্য আমলও উত্তম
[১৮০] আবু সাঈদ আল-কিন্দি রাহিমাহুল্লাহ-এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "জ্ঞানী ব্যক্তিদের (রাতের বেলা) ঘুম এবং (দিনের বেলা) পানাহার কতই-না উত্তম। নির্বোধদের রাত্রিজাগরণ ও দিনের বেলা রোযা রাখার দ্বারা তারা কীভাবে প্রতারিত হবেন? যাঁর পরিপূর্ণ তাকওয়া ও ইয়াকীন রয়েছে তাদের সামান্য পরিমাণ আমল, যারা ধোঁকায় পতিত তাদের পাহাড় পরিমাণ আমলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, উত্তম ও প্রণিধানযোগ্য।"
মানুষের সামনে রয়েছে দুরতিক্রম্য বাধার পাহাড়
[১৮১] আ'মাশ-রাহিমাহুল্লাহ-জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, উন্মুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহা-আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে আটা ফুরিয়ে যাওয়ার কথা বললেন। জবাবে তিনি বললেন, "আমাদের সামনে দুরতিক্রম্য বাধার পাহাড় রয়েছে। সেখানে হালকা শরীরের মানুষ ভারী শরীরের মানুষ থেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হবে।"
মৃত্যু-পরবর্তী অবস্থা জানতে পারলে মানুষ বিলাসিতা থেকে দূরে থাকতো
[১৮২] হিযাম বিন হাকিম-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তোমরা মৃত্যুর পর যা-কিছুর মুখোমুখি হবে তা যদি জানতে পারতে তাহলে তোমরা প্রবৃত্তিবশত (মন যা চায় তাই) কোনো খাবার খেতে না এবং প্রবৃত্তিবশতঃ কোনো পানীয় পান করতে না, বিশ্রাম গ্রহণের জন্য কোনো গৃহে প্রবেশ করতে না; বরং তোমরা পাহাড়ে অবস্থান করার জন্য লালায়িত হতে, বুক চাপড়াতে এবং নিজেদের জন্য কান্নাকাটি করতে। হায়, আমি যদি কোনো গাছ হতাম, আমাকে কেটে ফেলা হতো অথবা খেয়ে ফেলা হতো!” বুরদ বলেন, আমার কাছে এই রেওয়ায়েত পৌঁছেছে যে, একবার আবু বকর সিদ্দিক-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর পাশ দিয়ে একটি পাখি উড়ে গেলো। তিনি পাখিটিকে উদ্দেশ করে বললেন, “হে পাখি, তুমি কতই-না ভাগ্যবান! তুমি ফলমূল খাও, বৃক্ষরাজিতে বিশ্রাম নাও। অথচ এ জন্য তোমাকে কোনো হিসাব দিতে হবে না।"
ঝগড়ায় লিপ্ত থাকা তোমার জালেম হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ
[১৮৩] সুলাইমান বিন মুসা-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, অবিরাম যুদ্ধে লিপ্ত থাকা তোমার জালেম হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ; সব সময় ঝগড়ায় লিপ্ত থাকা তোমার জালেম হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ; এবং যা খুশি তা-ই বলে বেড়ানো তোমার মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ। তবে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে কথা-বার্তা হলে ভিন্ন কথা।
তিনি নিজের চুলায় আগুনে ফুঁক দিলেন
[১৮৪] মাইমুন বিন মিহরান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উম্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা-বলেছেন, “আমি আবুদ দারদাকে দেখেছি, তিনি আমাদের এই পাত্রটির নিচে আগুনে ফুঁক দিয়ে চলেছেন, এমনকি তাঁর চোখ থেকে পানি বইতে শুরু করেছে।"
ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে ইবাদতে একনিষ্ঠ হলেন
[১৮৫] খাইসামা থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “জাহেলি যুগে আমি ব্যবসায়ী ছিলাম। ইসলামের আগমনের পর আমি ব্যবসা ও ইবাদত দুটিই একসঙ্গে করতে শুরু করলাম; কিন্তু আমার জন্য এ দুটি একসঙ্গে হলো না। ফলে আমি ইবাদতকেই গ্রহণ করলাম এবং ব্যবসা ছেড়ে দিলাম।"
মানুষের মধ্যে কোনো সুন্নাহ দেখতে পান না
[১৮৬] সালেম বিন আবুল জা'দ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, উম্মুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহা-বলেছেন, “একবার আবুদ দারদা ক্রোধান্বিত হয়ে আমার কাছে এলেন। আমি বললাম, কী হয়েছে আপনার? তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম! আমি তাদের মধ্যে মুহাম্মদ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আর কেবল নামাজ পড়া ছাড়া কোনো সুন্নাহই দেখতে পাই না।"
অসুস্থতার কারণে গুনাহ মাফ হয়
[১৮৭] সালেম বিন আবদুল্লাহ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-একটি লোককে দেখলেন। লোকটির ত্বক তাকে আশ্চর্যান্বিত করলো। তাই তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি কখনো জ্বরে আক্রান্ত হওনি?” সে বললো, না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার কি কখনো কাশি-টাশি হয়নি?” সে বললো, না। আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-তখন বললেন, "দুর্ভাগ্য এর, সে তার গুনাহ নিয়েই মারা যাবে।"
চিন্তামগ্ন থাকা উত্তম ইবাদত
[১৮৮] সালেম বিন আবুল জা'দ-রাহিমাহুল্লাহ-উন্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণনা করেছেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেন, "কিছু সময় চিন্তমগ্ন থাকা সারা রাত জেগে ইবাদত করা থেকে উত্তম।"
ইবাদতের বিষয় প্রকাশ করা ঠিক নয়
[১৮৯] আবু ইদ্রীস-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু- একজন মহিলাকে দেখলেন যার দুই চোখের মাঝখানে ছাগলের পায়ের খুরের মতো সিজদার দাগ পড়ে গেছে। তিনি তাকে বললেন, "তোমার দুই চোখের মাঝে যদি এই দাগ না থাকতো, তবে তোমার জন্য কল্যাণকর হতো।"
তিনি মৃত্যু পছন্দ করতেন
[১৯০] ইয়া'লা বিন ওয়ালীদ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি যাকে ভালোবাসেন তার জন্য কী পছন্দ করেন? তিনি বললেন, "মৃত্যু।" লোকেরা বললো, যদি তার মৃত্যু না হয়, তাহলে? তিনি বললেন, "তার সম্পদ ও সন্তান স্বল্প হোক।"
তিনি ছিলেন আহলে ইলম-এর অন্তর্ভুক্ত
[১৯১] কাসেম বিন আবদুর রহমান-রাহিমাহুল্লাহ-বলেছেন, "আবুদ দারদা- রাদিয়াল্লাহু আনহু-ওই সকল ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে।"
মুমিনের জিহ্বা আল্লাহর কাছে প্রিয়
[১৯৯] আসাদ বিন ওয়াদাআ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "মুমিন ব্যক্তির শরীরে এমন কোনো অঙ্গ নেই যা আল্লাহ তাআলার কাছে তার জিহ্বার তুলনায় অধিক প্রিয়, জিহ্বার কারণে সে জান্নাতে প্রবেশ করে। আর কাফেরের শরীরে এমন কোনো অঙ্গ নেই যা আল্লাহ তাআলার কাছে তার জিহ্বা থেকে ঘৃণ্য, জিহ্বার কারণে সে জাহান্নামে প্রবেশ করে।"
সংকটে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা
[১৯৩] আবু হুসাইন-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "যদি তোমার ওপর এমন সংকট আপতিত হয়, যে-ব্যাপারে তোমার কোনো সামর্থ্য নেই, তাহলে ধৈর্য ধারণ করো এবং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুক্তির প্রতীক্ষায় থাকো।"
সাদাসিধে কাপড় পরিধানের নির্দেশ
[১৯৪] মাইমুন থেকে বর্ণিত, উম্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমার প্রিয়তম স্বামী আমাকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, "মানুষ যদি কাতান কাপড় পরে তাহলে তুমি সুতি কাপড় পরবে, মানুষ যদি সুতি কাপড় পরে তাহলে তুমি পশমের কাপড় পরবে।"
চরিত্রের সৌন্দর্যই মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যাবে
[১৯৫] শাহর থেকে বর্ণিত, উন্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা-বলেছেন, আবুদ দারদা একবার রাত্রিজাগরণ করে নামায পড়লেন, নামায পড়ার পর কাঁদতে শুরু করলেন। কেঁদে কেঁদে বললেন, "হে আল্লাহ, আপনি আমার আকৃতিকে সুন্দর বানিয়েছেন, সুতরাং আমার চরিত্রকেও সুন্দর বানান।" ভোর পর্যন্ত তিনি এই দোয়াই করলেন। আমি বললাম, হে আবুদ দারদা, রাত থেকে নিয়ে ভোর পর্যন্ত আপনি সচ্চরিত্রতার ব্যাপারেই দোয়া করে গেলেন। তিনি বললেন, "হে উন্মুদ দারদা, মুসলমান বান্দার চরিত্র যদি সুন্দর হয়, তবে চরিত্রের সৌন্দর্যই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করায়; যদি তার চরিত্র খারাপ হয়, তবে চরিত্রের দোষই তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করায়। আর মুমিন বান্দাকে তার ঘুমন্ত অবস্থায়ও ক্ষমা করে দেওয়া হয়।" আমি জিজ্ঞেস করলাম, তা কীভাবে? তিনি বললেন, "তার ভাই রাতে জাগ্রত হয় এবং তাহাজ্জুদ পড়ে, তারপর আল্লাহর কাছে দোয়া করে, আল্লাহ তাআলা তার দোয়া কবুল করে নেন। সে তার বাবার জন্য দোয়া করে, আল্লাহ তাআলা তার দোয়া কবুল করে নেন।"
পুত্রের প্রহৃত দাসীকে মুক্ত করে দিলেন
[১৯৬] আবুল মুতাওয়াক্কিল আন-নাজি-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর একটি দাসী ছিলো। তাঁর পুত্র একবার ওই দাসীকে একটি চড় মারলো। আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাকে ওই দাসীটির জন্য বসিয়ে রাখলেন এবং দাসীটিকে বললেন, "তুমি এর থেকে প্রতিশোধ নাও।" দাসীটি বললো, আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাকে বললেন, "তুমি যদি তাকে ক্ষমাই করে দিয়ে থাকো, তাহলে যাও এখানে হারাম শরীফে যতো লোক আছে তাদের ডেকে নিয়ে আসো এবং তাদের সাক্ষী রেখে বলো যে তুমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছো।" সে হারাম শরীফে গেলো এবং লোকদের ডেকে নিয়ে এসে তাদের সাক্ষী রেখে বললো যে, সে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে। তারপর আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-তাকে বললেন, "তুমি যাও, আল্লাহর ওয়াস্তে আমি তোমাকে মুক্ত করে দিয়েছি। হায়, আবুদ দারদার পরিবার যদি এর পরিপূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে পারতো!"
সালাম তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হাদিয়া
[১৯৭] রাশেদ বিন সা'দ থেকে বর্ণিত, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমার ভাইয়েরা আমাকে যা-কিছু হাদিয়া দেয় তার মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় হলো তাদের সালাম। আর তাদের সম্পর্কে যেসব সংবাদ আমার কাছে পৌঁছে তার মধ্যে বিস্ময়কর সংবাদ হলো তাদের কারও মৃত্যুসংবাদ।"
জ্ঞানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মুজাহিদের সমান প্রতিদান পাবে
[১৯৮] আবদুর রহমান বিন মানসুর আল-ফাযারি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "যে-কোনো ব্যক্তি ভোরে কোনো কল্যাণের (জ্ঞানের) উদ্দেশ্যে মসজিদে যায়, তার শেখার জন্য বা শেখানোর জন্য, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার জন্য মুজাহিদের প্রতিদান লিখে দেন। সে লাভবান না হয়ে ফেরে না।"
কতিপয় উপদেশ
[১৯৯] আবদুর রহমান বিন আবু আওফ-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "সন্দেহ পোষণ করা একধরনের কুফরী; বিলাপ করা জাহেলি যুগের কাজ; কবিতা হলো শয়তানের বাঁশি; আত্মসাৎকৃত সম্পদ জাহান্নামের অঙ্গার; মদ সকল পাপের সমষ্টি; যৌবন একধরনের উন্মাদনা; নারীরা শয়তানের ফাঁদ (নারীদের দ্বারা শয়তান প্রতারিত করে); অহংকার সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যাপার; সবচেয়ে নিকৃষ্ট খাবার হলো এতিমের মাল ভক্ষণ; নিকৃষ্ট উপার্জন হলো সুদ; সে-ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান যে অন্যের দ্বারা উপদেশ গ্রহণ করে; আর দুর্ভাগা সে-ই যে তার মায়ের পেটে দুর্ভাগ্যের শিকার হয়।"
খেজুরের বিচি দ্বারা তাসবিহ পাঠ করতেন
[২০০] কাসেম বিন আবদুর রহমান-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কিছু খেজুরের বিচি ছিলো। দশটা বা তার কিছু বেশি হবে। সেগুলো একটি থলেতে থাকতো। তিনি ফজরের নামাযের পর তার বিছানায় বসতেন। থলেটা হাতে নিতেন এবং খেজুরের বিচি একটা একটা বের করে সেগুলো দ্বারা তাসবীহ পাঠ করতেন। একবার শেষে হয়ে গেলে পুনরায় একটি একটি করে শুরু করতেন। এভাবে তিনি বিচিগুলো দ্বারা তাসবীহ পাঠ করতেন। বর্ণনাকারী বলেন, অবশেষে উম্মুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহা-তাঁর কাছে এসে বলতেন, "হে আবুদ দারদা, আপনার জন্য নাশতা উপস্থিত।" কখনো কখনো তিনি বলতেন, "নাশতা নিয়ে যাও; আজ আমি রোযা রেখেছি।"
বাচালতা নিন্দনীয়
[২০১] সাঈদ বিন আবদুল আযিয-রাহিমাহুল্লাহ-এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-একজন বাচাল মহিলাকে বললেন, "যদি তুমি বোবা হতে তাহলে তা তোমার জন্য কতই-না ভালো হতো।"
কারও কাছে কিছু চাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা
[২০২] আমর বিন মাইমুন তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, উম্মুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহা-বলেন, আবুদ দারদা আমাকে বলেন, "তুমি মানুষের কাছে কোনো জিনিস চাইবে না।" আমি বললাম, যদি আমার প্রয়োজন হয়? তিনি বললেন, "যদি তোমার প্রয়োজন হয় তবে তুমি যারা ফসল কাটে তাদের অনুসরণ করো; তাদের (বোঝা/পাত্র) যা পড়ে যায় তা কুড়িয়ে নাও। তা পেষাই করো এবং খাও। তারপরও মানুষের কাছে কিছু চেয়ো না।"
ইয়াযিদের বিয়ের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করলেন
[২০৩] সাবিত—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, ইয়াযিদ বিন মুআবিয়া আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে তাঁর কন্যাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব পাঠালেন। কিন্তু তিনি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। ইয়াযিদের পারিষদবর্গের একজন তাকে বললো, আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন, আপনি কি আমাকে তাকে বিয়ে করার অনুমতি দেবেন? ইয়াযিদ বললেন, তোমার ধ্বংস হোক, আমি কি চিরকুমার থেকে যাবো? লোকটি আবারো বললো, আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন, আমাকে কি অনুমতি দেবেন? ইয়াযিদ বললেন, হ্যাঁ। লোকটি আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কন্যাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠালেন। তিনি লোকটির কাছে তাঁর কন্যাকে বিয়ে দিয়ে দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, তখন লোকদের মধ্যে রটনা হয়ে গেলো যে, ইয়াযিদ আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে তার কন্যাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ একজন দরিদ্র মুসলমান তাঁর কাছে প্রস্তাব পাঠালে তিনি তার কাছে তাঁর কন্যাকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। এই রটনা শুনে আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বললেন, "আমি আমার কন্যা দারদার কল্যাণের কথা ভেবেছি। দারদা সম্পর্কে তোমাদের কী ধারণা, যখন তার মাথার কাছে খোজারা দাঁড়াবে এবং সে এমন-সব বাড়িঘর দেখতে পাবে যেখানে তার চোখ ঝলসে উঠবে, সেদিন তার দ্বীন কোথায় থাকবে?"
কপট নম্রতা ও বিনয় পরিহার্য
[২০৪] মুহাম্মদ বিন সা'দ আল-আনসারি—রাহিমাহুল্লাহ—থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, "কপট নম্রতা ও বিনয় থেকে তোমরা আল্লাহ তাআলার কাছে পানাহ চাও।” তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, কপট নম্রতা ও বিনয় কী? তিনি বললেন, "দেহটাকে বিনম্র ও বিনীত দেখা যায়; কিন্তু অন্তর বিনম্র নয়।"
যারা আল্লাহর নির্দেশ পরিত্যাগ করে তারা সহজে ধ্বংস হয়
[২০৫] জুবাইর বিন নুফাইর-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, যখন সাইপ্রাস বিজিত হলো এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করা হলো, তাঁদের একজন অপর জনের সঙ্গে কাঁদতে শুরু করলেন। আমি আবুদ দারদাকে দেখলাম একাকী বসে কাঁদছেন। আমি তাঁকে বললাম, হে আবুদ দারদা, এমন দিনে আপনি কী জন্য কাঁদছেন যেদিন আল্লাহ তাআলা ইসলাম ও মুসলমানদের সম্মানিত করেছেন? তিনি বললেন, "আফসোস তোমার জন্য হে জুবাইর, কোনো জাতি যখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পরিত্যাগ তখন তাদের ধ্বংস করে দেওয়া আল্লাহ তাআলার জন্য কতই-না সহজ! এই জাতি ছিলো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী; তাদের রাজ্য ও রাজত্ব ছিলো। কিন্তু তারা আল্লাহর নির্দেশ পরিত্যাগ করেছিলো। সুতরাং তাদের কী অবস্থা হয়েছে তা তো তোমার চোখের সামনে।"
অর্জিত ইলম অনুযায়ী আমল না করলে ধ্বংস
[২০৬] মাইমুন বিন মিহরান-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “যে-ব্যক্তি ইলম অর্জন করলো না সে একবার ধ্বংস হোক; আর যে-ব্যক্তি ইলম অর্জন করার পরও সেই ইলম অনুযায়ী আমল করলো না সে সাত বার ধ্বংস হোক।"
সৎকাজ বিনষ্ট হয় না
[২০৭] আবু কিলবাতা-রাহিমাহুল্লাহ- থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "সৎকাজ বিনষ্ট হয় না এবং পাপের কথা ভোলা যায় না। মহান বিচারক আল্লাহ তাআলা কখনো ঘুমান না। সুতরাং যেমন খুশি তেমনই হও (যা খুশি তা-ই করো)। যেমন কর্ম করবে তেমনই ফল পাবে।"
তিনটি উপদেশ
[২০৮] আবু আবদুল্লাহ আল-জাসরী-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, এক ব্যক্তি আবুদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে গিয়ে তাঁকে সালাম দিয়ে বললো, আমাকে উপদেশ দিন, আমি যুদ্ধ করতে যাচ্ছি। তিনি তাকে বললেন, "তুমি আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁকে এমনভাবে ভয় করো যেনো তুমি তাঁকে দেখছো। নিজেকে মৃতদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করো; জীবিতদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য কোরো না; মজলুমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো।"
মুসলমানদের ঘৃণা থেকে বেঁচে থাকা
[২০৯] সুফয়ান সাওরি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, “মানুষ যেনো মুমিনদের অন্তরের গোপনীয় ঘৃণা ও অপছন্দ থেকে বেঁচে থাকে।"
মৃত্যুর স্মরণ হিংসা ও পাপাচার কমিয়ে দেয়
[২১০] সুফয়ান সাওরি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, “যে-ব্যক্তি মৃত্যুকে বেশি স্মরণ করে তার হিংসা ও পাপাচার কমে যায়।"
সম্পদ কুক্ষিগতকারীরা ধ্বংস হোক
[২১১] ফুরাত বিন সুলাইমান—রাহিমাহুল্লাহ—থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, “যারা মুখ হা করে সম্পদ জমা করে তারা ধ্বংস হোক। যেনো সে উন্মাদ; মানুষের কাছে কী আছে তা সে দেখতে পায়; কিন্তু নিজের কাছে কী আছে তা সে দেখতে পায় না। যদি সে পারতো তাহলে রাতকে দিন বানিয়ে ছাড়তো। ধ্বংস তার; কারণ, সে কঠিন হিসাব ও মর্মন্তুদ শাস্তির মুখোমুখি হবে।” বর্ণনাকারী বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলতেন, “আমি মৃত্যুকে ভালোবাসি অথচ তারা তা অপছন্দ করে; আমি অসুস্থতা পছন্দ করি, অথচ তারা তা অপছন্দ করে; আমি দরিদ্রতা পছন্দ করি, অথচ তারা তা ঘৃণা করে। তারা উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছে, বিপুল সম্পদ কুক্ষিগত করেছে, মজবুত প্রাসাদ নির্মাণ করেছে। কিন্তু তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ধোঁকায় পরিণত হয়েছে, তাদের কুক্ষিগত সম্পদ বিনষ্ট হয়ে পড়েছে এবং তাদের গৃহসমূহ কবরস্থানে পরিণত হয়েছে।"
যেসব বান্দা আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয়
[২১২] হাসান বসরি—রাহিমাহুল্লাহ—বলেন, আবুদ দারদা—রাদিয়াল্লাহু আনহু—বলেছেন, “তোমরা যদি চাও তাহলে আমি তোমাদের জানাতে পারি যে আল্লাহর তাআলার কাছে আল্লাহর কোন বান্দাগণ সবচেয়ে প্রিয়। যাঁরা আল্লাহ তাআলাকে তাঁর বান্দাদের কাছে প্রিয় করে তোলে এবং দুনিয়াতে কল্যাণকর কাজ করে বেড়ায়। তোমরা যদি চাও তাহলে আমি তোমাদের কসম দিয়ে বলতে পারি যে, আল্লাহ তাআলার বান্দাদের মধ্যে তাঁরাই আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় যাঁরা চন্দ্র ও সূর্যের নিচে বিচরণ করে।"
নফসের অনুসরণকারীর জন্য রয়েছে দুর্ভোগ
[২১৩] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, “যে-ব্যক্তি মানুষের মধ্যে যা-কিছু দেখবে সব ক্ষেত্রেই নিজের নফসের (মনের) অনুসরণ করবে তার দুঃখ-কষ্ট দীর্ঘায়ত হবে এবং তার ক্রোধ কখনো প্রশমিত হবে না।"
যা আছে তা-ই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা
[২১৪] হাসান বসরি-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "আমি তোমাদের ব্যাপারে আলেমের পদস্খলন এবং কুরআন নিয়ে মুনাফিকদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার আশংকা করি। কুরআনই চূড়ান্ত সত্য; পথের আলোকস্তম্ভের মতো কুরআনেরও একটি আলোকস্তম্ভ রয়েছে। যে-ব্যক্তি দুনিয়া থেকে অমুখাপেক্ষী নয়, দুনিয়ার কোনো অংশই তার নেই। (যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট না হলে মনের মধ্যে হাহাকার থেকেই যায়।)
ইচ্ছাধীন তিনটি বিষয়
[২১৫] আওফ বিন আবু জামীলাহ-রাহিমাহুল্লাহ-জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "তিনটি বিষয় আদমসন্তানের ইচ্ছা-স্বাধীনতার মধ্যে রয়েছে: বিপদের ব্যাপারে কারও কাছে অভিযোগ না করা; দুঃখ-কষ্টের কথা কারও কাছে বর্ণনা না করা এবং নিজেই নিজের প্রশংসা না করা।"
ইলম উঠিয়ে নেওয়ার পূর্বেই তা শিক্ষা করো
[২১৬] সালিম বিন আবুল জা'দ-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা- রাদিয়াল্লাহু আনহু-বলেছেন, "কী ব্যাপার, আমি দেখতে পাচ্ছি যে তোমাদের আলেমগণ ইন্তেকাল করে চলে যাচ্ছেন আর তোমাদের মূর্খরা ইলম অর্জন করছে না? ইলম উঠিয়ে নেওয়ার পূর্বেই তোমরা তা শিক্ষা করো। ইলম উঠিয়ে নেওয়ার অর্থ হলো আলেমগণের চলে যাওয়া। কী ব্যাপার, আমি দেখতে পাচ্ছি যে, যে- ব্যাপারে তোমাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় তোমরা তাতেই আগ্রহী হচ্ছো এবং যে- ব্যাপারে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে তা বিনষ্ট করে চলেছো? আমি তোমাদের মধ্যে ঘোড়ার চিকিৎসকের চেয়েও দুষ্ট লোকদের চিনি। তারা হলো ওই সকল লোক যারা নামাযে বিলম্ব করে আসে এবং অবহেলার সঙ্গে কুরআন তেলাওয়াত শোনে।"
মসজিদে অসংলগ্ন কথাবার্তা নিষিদ্ধ
[২১৭] সাঈদ বিন আবদুল আযিয-রাহিমাহুল্লাহ-বলেন, আবুদ দারদা- রাদিয়াল্লাহু আনহু-শুনতে পেলেন যে, মসজিদে এক ব্যক্তি তাঁর সঙ্গীকে বলছে, “আমি এতো টাকা দিয়ে এক আঁটি লাকড়ি খরিদ করেছি।” তখন তিনি বললেন, “মসজিদগুলো এ-কারণেই আবাদ হয় না।"
অনর্থক কাজ পরিত্যাগ করা উত্তম আমল
[২১৮] সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব-রাহিমাহুল্লাহ-থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “ইশার সালাতের পর অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত হওয়ার চেয়ে, ইশার সালাতের আগে (একটু) ঘুমিয়ে নেওয়া আমার কাছে অধিক প্রিয়।"
টিকাঃ
২৬. অর্থাৎ, কুরআনুল কারীমের প্রতিটি আয়াতের বিভিন্ন অর্থ ও মর্মের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিটি আয়াতের সার্বিক অর্থ ও মর্ম যখন কারও কাছে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হবে তখনই তিনি জ্ঞানী বলে বিবেচিত হবেন।
২৭. সূরা যুমার (৩৯): আয়াত ৩০।
২৮. সূরা নূর (২৪): আয়াত ৩৭।
২৯. এখানে ভারী শরীরের মানুষ বলতে ভোগ-বিলাসী বোঝানো হয়েছে। আর দুরতিক্রম্য বাধার পাহাড় হলো কবর থেকে নিয়ে কিয়ামতের হিসাব পর্যন্ত ঘাঁটিসমূহ। (অনুবাদক)
৩০. কারণ এই দাগের কারণে তার অতিরিক্ত ইবাদাত করার বিষয়টি মানুষের সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে। অবশ্য এই দাগটি তাঁর ইচ্ছাধীন না হওয়ার কারণে কোন সমস্যা হবে না ইনশাআল্লাহ। (সম্পাদক)
৩২. মূল কিতাবে এই হাদীসটি ‘যুহদুয যুবাইর ইবনিল আওয়াম-রাদিয়াল্লাহু আনহু’-শিরোনামাধীন আনা হয়েছে।
৩৩. মূল কিতাবে এই হাদীসটি ‘যুহduz যুবাইর ইবনিল আওয়াম-রাদিয়াল্লাহু আনহু’-শিরোনামাধীন আনা হয়েছে।
৩৪. মূল কিতাবে এই হাদীসটি ‘যুহদু আবিদ দারদা-রাদিয়াল্লাহু আনহু’-শিরোনামাধীন সবচেয়ে শেষে রয়েছে।