📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 নু'আইম ইবনে মাসউদ (রাঃ)

📄 নু'আইম ইবনে মাসউদ (রাঃ)


‘নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জানতেন, শত্রুপক্ষকে ধোঁকা দেওয়াও যুদ্ধেরই একটি কৌশল।’

তীক্ষ্ণ মেধার জাগ্রতপ্রাণ, দৃঢ় মনোবল, কর্মচঞ্চল ও ঝটপট কঠিন পরিস্থিতি বুদ্ধিমত্তার সাথে মোকাবেলা করতে পারঙ্গম মরুস্তান যুবক নু'আঈম ইবনে মাসউদ। মুহূর্তেই বাড়িতে, পর মুহূর্তেই সফরে, তার রুটিন কী তা একমাত্র সে-ই জানে। বহুমুখী গুণাবলির অধিকারী, নাচ, গান ও নর্তকীপ্রিয় নজদের সৌখিন এ যুবকের আমোদ-প্রমোদ ও বিলাসিতার যেমন জুড়ি ছিল না, তেমনি নাচ গানের প্রতিও তার ছিল প্রবল ঝোঁক। এসব নানা কারণেই সে ইয়াসরিবের ইহুদীঘেঁষা হয়ে ওঠে।

আমোদ-প্রমোদ, গান ও বাজনার ইচ্ছা করলেই সে ইয়াসরিবের পথে রওনা হতো। তার ভোগ-বিলাসের খায়েশ পূরণের জন্য ইয়াসরিবের ইহুদীদের অঢেল অর্থ দান করত। এসব কারণে সর্বদাই তার ইয়াসরিবে যাতায়াত অব্যাহত থাকত। ইহুদীদের বিশেষ করে বনু কুরাইযা গোত্রের সাথে তার সম্পর্কও ছিল নিবিড় ও মধুর। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানবজাতির কল্যাণ এবং মঙ্গলের জন্য মক্কায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দীনে হক ও হেদায়াতসহ প্রেরণ করলেন। প্রথমে মক্কায় ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়লে নু'আঈম ইবনে মাসউদ ইসলাম থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ মাত্র একটিই, ইসলাম গ্রহণ তার ভোগ-বিলাস ও আমোদ-প্রমোদে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। তাহলে তো এ দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সবই পরিহার করতে হবে তাকে। এসব ভেবে সে ইসলামকে শুধু এড়িয়েই চলল না; বরং যারা ইসলামের চরম শত্রু তাদের সহযোগী হয়ে উঠল।

নু'আঈম ইবনে মাসউদ ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে খন্দক বা আহযাবের যুদ্ধে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। তার এই পরিবর্তিত ঘটনা সে নিজ হাতেই পরবর্তীতে লিপিবদ্ধ করে। ইতিহাসের পাতা তার সেই ভূমিকার কথা অদ্যাবধি স্বর্ণাক্ষরে ধারণ করে আছে। নু'আঈম ইবনে মাসউদের জীবনী আলোচনার পূর্বে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোচনা করা দরকার।

খন্দক বা আহযাব যুদ্ধের মাত্র কিছুদিন পূর্বে ইয়াসরিবের বনূ নযীর গোত্রের ইহুদীরা এবং তাদের নেতৃবৃন্দ ইসলামকে চিরতরে নির্মূল করার চক্রান্ত করে। এ জন্য তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। তারা মক্কার কুরাইশ নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করে। তাদের সাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, কুরাইশ বাহিনী মদীনায় পৌঁছলে তারা তাদের সাথে যোগ দেবে। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য দিন-তারিখও ধার্য করা হয়। সাথে সাথে নির্ধারিত তারিখের ব্যতিক্রম যাতে না হয়, সে দিকটির প্রতিও গুরুত্বারোপ করে। কুরাইশদের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার পর তারা নজদের 'গাতফান' গোত্রের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য রওয়ানা হয়। ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে তাদেরকেও প্ররোচিত করে এবং এই নতুন দীন ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য তাদের আহ্বান জানায়। কুরাইশদের সাথে তাদের গোপন সম্পর্কের ব্যাপারেও তাদের অবহিত করে। তারা গাতফান গোত্রের সাথেও একই ধরনের প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয়, যেমনটি হয়েছিল কুরাইশদের সাথে। কুরাইশদের মতো তাদের সাথেও সময় ও দিন-তারিখ নির্ধারণ করে। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক মক্কার কুরাইশদের সর্বস্তরের মানুষ তাদের নেতা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মদীনার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ে। গাতফান গোত্রের লোকজনও উওয়াইনা ইবনে হিস্স্স আল গাতফানীর নেতৃত্বে বের হয়ে আসে। গাতফান বাহিনীর অগ্রভাগে ছিল আমাদের এ কাহিনীর নায়ক নু'আঈম ইবনে মাসউদ।

কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের সম্মিলিত বাহিনী যে মদীনা আক্রমণ করতে আসছে, এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যথাসময়েই পৌঁছে। তিনি পরামর্শের জন্য সাহাবীদের সাধারণ সভার আহবান করেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেন যে, মদীনার চারপাশে খন্দক খনন করা হবে। আক্রমণকারী বাহিনী অকস্মাৎ এই খন্দকে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সম্মুখে অগ্রসর হতে ব্যর্থ হবে। তখন এ খন্দককে সামনে রেখে মুসলিম বাহিনী তার সুদৃঢ় অবস্থান নিয়ে তাদের মোকাবেলা করবে। পরিকল্পনা মোতাবেক মক্কা ও নজদ থেকে বিরাট দুই বাহিনী মদীনার প্রবেশদ্বারের সন্নিকটে এসে খন্দক দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়।

এদিকে বনী নাযীর গোত্রের ইহুদী নেতৃবর্গ মদীনায় বসবাসরত বনু কুরাইযা ইহুদী গোত্রের নেতৃবৃন্দের সাথে মিলিত হয়। তাদেরকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কৃত সন্ধি ভঙ্গ করে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেয়। নজদ থেকে আগত এই বিশাল বাহিনীর প্রতি সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণের জন্যও প্ররোচিত করতে থাকে। বনী কুরাইযা গোত্রের নেতৃবর্গ তাদেরকে বলে:

'সত্যিকারার্থে আমরা যা চাই ও পছন্দ করি, আপনারা আমাদেরকে সেদিকেই আহবান করছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, আপনারা ভাল করেই জানেন যে, আমাদের ও মুহাম্মদ-এর মধ্যে শান্তি চুক্তি হয়েছে এ শর্তে যে, শত্রুর আক্রমণে আমরা তাঁকে সাহায্য করব। অন্যদিকে সেও আমাদেরকে মদীনায় শান্তিতে বসবাসের নিশ্চয়তা প্রদান করবে। আপনারা এও ভালো করে জানেন যে, অদ্যাবধি তার সাথে আমাদের কৃত চুক্তির ব্যাপারে কোন অভিযোগ করার মতো কারণ ঘটেনি। আমরা আশঙ্কা করছি, মুহাম্মদ যদি এ যুদ্ধে বিজয়ী হয়, তাহলে সে কঠোর ও নির্দয় হস্তে আমাদের এ বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ নেবে এবং চিরতরে আমাদেরকে মদীনা থেকে উচ্ছেদ করে ছাড়বে।'

কিন্তু বনূ নযীর নেতৃবর্গ চুক্তিভঙ্গের জন্য তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেই থাকে। তারা শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যানের সুফল ও ভবিষ্যৎ কল্যাণের আশ্বাসও প্রদান করে। তারা নিশ্চয়তা দান করে যে:

'নিঃসন্দেহে এ যুদ্ধে মুহাম্মদ পরাজিত হবেই। তাদের বিশাল দুটি বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে মুসলমানগণ পরাজিত হবে বলে তারা তাদেরকে আশান্বিত করে তোলে।'

পরিশেষে বনু কুরাইযার ইহুদীরা তাদের প্ররোচনায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কৃত চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণকারী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে যোগদানের ঘোষণা দেয়। মদীনার অভ্যন্তরে বসবাসরত ইহুদীদের চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণকারীদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণের এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদের উপর বজ্রপাতের মতো আপতিত হয়।

আক্রমণকারী বাহিনী মদীনা অবরোধ করে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব ভালো করেই বুঝতে পারলেন যে, তিনি দুই দিক দিয়েই শত্রুবেষ্টিত হয়ে পড়েছেন। কুরাইশ ও গাতফান বাহিনী মদীনার বাইরে মুসলমানদের মুখোমুখি ছাউনি গেড়ে এবং বনু কুরাইযার ইহুদীরা মদীনার অভ্যন্তরে বসে মুসলমানদেরকে পেছনের দিক থেকে আক্রমণের জন্য ওৎ পেতে থেকে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথীদের মধ্যে 'মুনাফিকরা' বলতে থাকে:

'মুহাম্মদ আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, আমরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ধনভাণ্ডারের মালিক হয়ে যাবো। অথচ এখন আমাদের এক একজনের অবস্থা হলো নিরাপদে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে পর্যন্ত যেতে পারছি না।'

এরপর মুনাফিকরা দলে দলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে এ বলে চলে যেতে লাগল :
'বনূ কুরাইযা গোত্র চুক্তিভঙ্গ করায় মদীনায় আমাদের স্ত্রী-পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি ও বাড়ি-ঘর হুমকির সম্মুখীন।'

তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এ কথাও ব্যক্ত করল যে:
'যুদ্ধ মারাত্মক আকার ধারণ করলে বনূ কুরায়যা গোত্রের আক্রমণ থেকে তারাও নিরাপদ নয়।'

এভাবে দেখা গেল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে শেষ পর্যন্ত কয়েক শ' সত্যিকার ঈমানদার সাহাবী যুদ্ধ-ময়দানে অবশিষ্ট থাকলেন।

ক্রমাগত বিশ দিনের অবরোধের মধ্যে কোনো এক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাকুলভাবে বারবার এই বলে আল্লাহর দরবারে দু'আ করতে থাকেন:
اللهُمَّ إِنِّى أَنْشِدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَنْضَدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ .
'হে আল্লাহ! তোমার কাছে সাহায্য চাচ্ছি, যে সাহায্যের তুমি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ।'

এদিকে রুটিন মোতাবেক সে রাতেও নু'আঈম ইবনে মাসউদ তার শয্যা গ্রহণে যায়। কিন্তু আজ তার চোখে ঘুম নেই, তার দু'চোখের পলকে যেন কাঁটা ফুটছে। সর্বশক্তি নিয়োগ করেও সে ঘুমের ধারে-কাছেও পৌঁছতে সমর্থ হলো না। তার থেকে ঘুম যেন হাজার মাইল দূরে। বিনিদ্র রজনীতে আকাশের অসংখ্য তারকারাজির দিকে তাকিয়ে রইল সে। আজ সে খুব বেশি দুশ্চিন্তার শিকার। চিন্তার সাগরে সে যেন হাবুডুবু খাচ্ছে। চিন্তার শেষ নেই। হঠাৎ যেন এক সময় সে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল। তার বিবেক তাকে ভিতর থেকে বলে উঠল:

'ধিক্কার তোমাকে হে নু'আঈম। সুদূর নজদ থেকে এই দূর-দূরান্তে কেন এসেছ? কিসে তোমাকে এই মহান ব্যক্তি ও তাঁর সাথীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নিয়ে এসেছে। কিসের স্বার্থে? এ যুদ্ধ কি তোমার ছিনিয়ে নেওয়া অধিকার প্রতিষ্ঠার? নাকি তোমার লুণ্ঠিত সম্ভ্রমের প্রতিশোধের?'

'অকারণে তুমি এখানে এসেছ নু'আঈম! ধিক্কার তোমাকে...।'

তার অনুতপ্ত মন তাকে ধিক্কার দিয়ে বলতে থাকল:
'তোমার মতো একজন বিজ্ঞ লোকের পক্ষে কি অকারণে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হওয়া শোভা পায়? সৎ ও নির্দোষ এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে কে তোমাকে উৎসাহিত করেছে? যিনি তাঁর অনুসারীদের ন্যায়বিচার ও পরোপকারের আদেশ এবং নিকটাত্মীয়দের অধিকার প্রদানে সর্বদা নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তাঁর বিরুদ্ধে তুমি যুদ্ধ করতে এসেছ? কে তোমাকে তাঁর সাথীদের রক্তপাত ঘটানোর উদ্দেশ্যে চমকানো বর্ষা বহনে অনুপ্রাণিত করেছে? যারা একমাত্র সত্য ও হেদায়াতের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত, তুমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছ?'

নু'আঈম ও তার বিবেকের এই বিতর্ক বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। বিতর্কের পরিসমাপ্তি ঘটল। সে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হলো। রাতের অন্ধকারে নু'আঈম গাতফান গোত্রের সৈন্য ছাউনি থেকে সবার নজর এড়িয়ে দ্রুতগতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সামনে উপস্থিত দেখে বললেন:

'তুমি কি নু'আঈম ইবনে মাসউদ?'

সে উত্তরে বলল:
'হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!'

'গভীর রাতে এ মুহূর্তে কী উদ্দেশ্যে এসেছ?'

নু'আঈম উত্তর দিলো:
'একমাত্র কালেমা শাহাদাতের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আপনার খিদমতে উপস্থিত হয়েছি।'

এই বলেই সে কালেমা শাহাদাত পাঠ করল। অতঃপর আরয করল:
'হে আল্লাহর রাসূল। আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। এ কথা গাতফান গোত্রের কেউ জানে না। এ মুহূর্তে আমাকে যে কোনো খিদমতের জন্য নির্দেশ দিন।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন:
إِنَّمَا أَنْتَ فِينَا رَجُلٌ وَاحِدٌ ... فَاذْهَبْ إِلَى قَوْمِكَ وَخَدِّلْ عَنَّا إِنْ اسْتَطَعْتَ فَإِنَّ الْحَرْبَ خُدْعَةٌ .

'তুমিই আমাদের একমাত্র ব্যক্তি, যে এ মুহূর্তে কূটনৈতিক চাল চালতে পার। তুমি যদি পারো গাতফান গোত্রকে যুদ্ধ-ময়দান থেকে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কর। কেননা, শত্রুপক্ষকে ধোঁকায় ফেলা সমর-কৌশলেরই অংশ।'

নু'আঈম বললেন:
'হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার দ্বারা আপনি এমন কিছু দেখতে পাবেন, যা আপনাকে সন্তুষ্ট করবে, ইনশাআল্লাহ।'

এই বলে নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমত থেকে সে মুহূর্তেই বনু কুরাইযা গোত্রের আস্তানায় তার আগের সঙ্গী-সাথীদের কাছে গেলেন। তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও কথাবার্তার এক পর্যায়ে তাদের বললেন:

'হে বনু কুরাইযার ভাইয়েরা! আমি যে তোমাদের একজন বিশ্বস্ত ও অন্তরঙ্গ বন্ধু তা তো তোমরা ভালো করেই জান। সর্বদা তোমাদের প্রতি আমার সৎপরামর্শ ও আন্তরিকতার ব্যাপারেও অবগত।'

তারা বলল:
'হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ নু'আঈম! তুমি আমাদের নিকট নিঃসন্দেহে আস্থাভাজন ব্যক্তি।'

তাদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত হয়ে অতঃপর বললেন:
'এ যুদ্ধে কুরাইশ ও গatফান গোত্রের অবস্থান তোমাদের অবস্থান থেকে নিঃসন্দেহে ভিন্নতর।'

তারা বলল, কিভাবে?

নু'আঈম বললেন:
'মদীনা তোমাদের নিজেদের শহর। এ শহরেই তোমাদের ধন-সম্পত্তি, সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী-পুত্র সবই অবস্থান করছে। কোনোক্রমেই তোমরা এসব অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে পার না। অপরদিকে কুরাইশ ও গাতফানদের ধন-সম্পত্তি, অর্থ-কড়ি, সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রী-পুত্র সবই মদীনার বাইরে তাদের নিজেদের শহরে। তারা সেখান থেকে মুহাম্মদের সাথে যুদ্ধ করতে এসেছে। তারা তোমাদের শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে তার বিরুদ্ধে সহযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। যদি তারা বিজয়ী হয়, তাহলে মুহাম্মদের ধন-সম্পত্তিকে মালে গনীমত হিসেবে তারাই নেবে। আর যদি কুরাইশ ও গাতফানদের বাহিনী পরাজিত হয়, তাহলে মুহাম্মদের তাড়া খেয়ে তারা তোমাদেরকে মুহাম্মদের হাতে ফেলে রেখে নিরাপদেই স্ব-স্ব গোত্রে ফিরে যাবে। সে ক্ষেত্রে মুহাম্মদ তোমাদের থেকে চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যা কল্পনাও করতে পারছ না। তোমরা ভালো করেই জান যে, এককভাবে মুহাম্মদের মোকাবেলা করার শক্তি তোমাদের নেই।'

তারা বলল: 'ঠিকই বলছ। এখন তোমার পরামর্শ কী?'

তিনি বললেন: 'আমার কাছে এর একমাত্র সমাধান হলো, যতক্ষণ না তোমরা তাদের নেতৃস্থানীয় কিছু লোককে জামানত হিসেবে তোমাদের কাছে না রেখেছ, ততক্ষণ তোমরা তাদের সাথে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করো না। তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের জামানত হিসেবে রাখতে পারলেই তারা সর্বশক্তি দিয়ে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে প্রাণপণে যুদ্ধে নেমে পড়বে। হয় বিজয়, নয় তোমাদের ও তাদের শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত নিঃশেষ।'

তারা বলে উঠল: 'হ্যাঁ, তুমি উত্তম পরামর্শ দিয়েছ।'

অতঃপর তাদের থেকে বিদায় নিয়ে নু'আঈম ইবনে মাসউদ কুরাইশ সেনাপতি আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের কাছে এসে তাকে ও তার সঙ্গী নেতৃস্থানীয়দের বললেন:

'কুরাইশ ভাইয়েরা! মুহাম্মদের সাথে আমার শত্রুতা ও তোমাদের সাথে আমার আন্তরিকতা ও সহৃদয়তার কথা তোমরা ভালো করেই জান। আমার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পৌছেছে, যা তোমাদের জানান আমি আমার গুরুদায়িত্ব বলে মনে করি। তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ হলো, বিষয়টি তোমাদের মধ্যেই সীমিত রাখবে এবং আমার বরাত বা হাওয়ালা দিয়ে তা কখনো প্রচার করবে না। তারা কথা দেয় যে, এ ব্যাপারে আমরা অবশ্যই তোমার অনুরোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করব।'

অতঃপর নু'আঈম বলেন:
'বনু কুরাইযা গোত্র মুহাম্মদের বিরুদ্ধাচরণে অনুতপ্ত। তারা মুহাম্মদের কাছে দূত পাঠিয়ে আবেদন করেছে যে, আমরা আমাদের কৃতকর্মের জন্য ভীষণভাবে অনুতপ্ত। আমরা শান্তিচুক্তি পুনর্জীবিত করে সন্ধিভুক্ত হতে চাই। আপনার সদয় সম্মতি পেলে আমরা কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের বেশ কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এনে আপনার কাছে সোপর্দ করতে চাই, যেন আপনি তাদের শিরশ্ছেদ করতে পারেন। আপনাকে এই শিকার সংগ্রহ করে দেওয়ার মাধ্যমে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আপনার সাথে মিলিত হতে চাই।' মুহাম্মদ তাদের এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। ইহুদীরা যদি তোমাদের কাছে জামানত চায়, আমার অনুরোধ, তাহলে কাউকেও জামানত হিসেবে দেবে না।'

আবু সুফিয়ান বলল:
'এ গোপন সংবাদ প্রদানের মাধ্যমে নিঃসন্দেহে তুমি আমাদের প্রকৃত বন্ধুদের দাবিই পূরণ করলে।'

অতঃপর নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু সুফিয়ানের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে গাতফান গোত্রের অন্যান্য নেতাদের সাথে মিলিত হন। আবূ সুফিয়ানের সাথে তিনি যেভাবে কথা বলেছেন, তাদের কাছেও অনুরূপভাবে কথা বলেন। আবু সুফিয়ানকে যেভাবে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তাদেরও অনুরূপ পরামর্শ দেন।

প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে আবু সুফিয়ান বনু কুরাইযার মনোভাবকে যাচাই করার জন্য তাদের কাছে পরের দিন ভোর হতে না হতেই তার নিজ ছেলেকে দূত হিসেবে পাঠাল। তার ছেলে বনু কুরাইযার নেতৃবর্গের কাছে গিয়ে বলল:

'আমার পিতা আবু সুফিয়ান আপনাদের খিদমতে সালাম আরয করেছেন এবং বলে পাঠিয়েছেন যে, যেহেতু আমরা মুহাম্মদ এবং তার সঙ্গী-সাথীদেরকে দীর্ঘদিন যাবৎ অবরোধ করে রেখেছি, যার ফলে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমরা চাচ্ছি, কালবিলম্ব না করে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরম্ভ করি এবং এই অবরোধের সমাপ্তি ঘটাই। আপনাদের খিদমতে আমার পিতা আমাকে এ জন্যই পাঠিয়েছেন, যেন আগামীকালই আমাদের ও আপনাদের এ যৌথ আক্রমণের সূচনা হয়।'

ইহুদীরা তাকে বলে:
'আগামীকাল শনিবার। আমাদের ধর্মমতে পবিত্র দিন। আমরা কাল কোনো মতেই যুদ্ধে জড়িত হতে পারব না। এ ছাড়াও আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত আপনাদের সাহায্যার্থে যুদ্ধে জড়িত হতে পারব না, যতক্ষণ না আপনাদের কুরাইশ গোত্র ও গাতফান গোত্রের সত্তরজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে আমাদের কাছে জামানত হিসেবে না রাখবেন। কারণ, আমরা আশঙ্কা করছি, প্রচণ্ড যুদ্ধের ভয়াবহতা সহ্য করতে না পেরে আপনারা আমাদেরকে একা মুহাম্মদের হাতে বলির পাঁঠা হিসেবে ছেড়ে দিয়ে স্ব-স্ব আবাসভূমিতে পালিয়ে যেতে পারেন। আপনারা ভালো করেই জানেন যে, সে পরিস্থিতিতে মুহাম্মদের মোকাবেলা করার সাধ্য আমাদের নেই।'

কিন্তু বনূ নযীর নেতৃবর্গ চুক্তিভঙ্গের জন্য তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেই থাকে। তারা শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যানের সুফল ও ভবিষ্যৎ কল্যাণের আশ্বাসও প্রদান করে। তারা নিশ্চয়তা দান করে যে:

'নিঃসন্দেহে এ যুদ্ধে মুহাম্মদ পরাজিত হবেই। তাদের বিশাল দুটি বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে মুসলমানগণ পরাজিত হবে বলে তারা তাদেরকে আশান্বিত করে তোলে।'

পরিশেষে বনু কুরাইযার ইহুদীরা তাদের প্ররোচনায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কৃত চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণকারী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে যোগদানের ঘোষণা দেয়। মদীনার অভ্যন্তরে বসবাসরত ইহুদীদের চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণকারীদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণের এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদের উপর বজ্রপাতের মতো আপতিত হয়।

আক্রমণকারী বাহিনী মদীনা অবরোধ করে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব ভালো করেই বুঝতে পারলেন যে, তিনি দুই দিক দিয়েই শত্রুবেষ্টিত হয়ে পড়েছেন। কুরাইশ ও গাতফান বাহিনী মদীনার বাইরে মুসলমানদের মুখোমুখি ছাউনি গেড়ে এবং বনু কুরাইযার ইহুদীরা মদীনার অভ্যন্তরে বসে মুসলমানদেরকে পেছনের দিক থেকে আক্রমণের জন্য ওৎ পেতে থেকে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথীদের মধ্যে 'মুনাফিকরা' বলতে থাকে:

'মুহাম্মদ আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, আমরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ধনভাণ্ডারের মালিক হয়ে যাবো। অথচ এখন আমাদের এক একজনের অবস্থা হলো নিরাপদে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে পর্যন্ত যেতে পারছি না।'

এরপর মুনাফিকরা দলে দলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে এ বলে চলে যেতে লাগল :
'বনূ কুরাইযা গোত্র চুক্তিভঙ্গ করায় মদীনায় আমাদের স্ত্রী-পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি ও বাড়ি-ঘর হুমকির সম্মুখীন।'

তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এ কথাও ব্যক্ত করল যে:
'যুদ্ধ মারাত্মক আকার ধারণ করলে বনূ কুরায়যা গোত্রের আক্রমণ থেকে তারাও নিরাপদ নয়।'

এভাবে দেখা গেল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে শেষ পর্যন্ত কয়েক শ' সত্যিকার ঈমানদার সাহাবী যুদ্ধ-ময়দানে অবশিষ্ট থাকলেন।

ক্রমাগত বিশ দিনের অবরোধের মধ্যে কোনো এক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাকুলভাবে বারবার এই বলে আল্লাহর দরবারে দু'আ করতে থাকেন:
اللهُمَّ إِنِّى أَنْشِدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَنْضَدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ .
'হে আল্লাহ! তোমার কাছে সাহায্য চাচ্ছি, যে সাহায্যের তুমি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ।'

এদিকে রুটিন মোতাবেক সে রাতেও নু'আঈম ইবনে মাসউদ তার শয্যা গ্রহণে যায়। কিন্তু আজ তার চোখে ঘুম নেই, তার দু'চোখের পলকে যেন কাঁটা ফুটছে। সর্বশক্তি নিয়োগ করেও সে ঘুমের ধারে-কাছেও পৌঁছতে সমর্থ হলো না। তার থেকে ঘুম যেন হাজার মাইল দূরে। বিনিদ্র রজনীতে আকাশের অসংখ্য তারকারাজির দিকে তাকিয়ে রইল সে। আজ সে খুব বেশি দুশ্চিন্তার শিকার। চিন্তার সাগরে সে যেন হাবুডুবু খাচ্ছে। চিন্তার শেষ নেই। হঠাৎ যেন এক সময় সে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল। তার বিবেক তাকে ভিতর থেকে বলে উঠল:

'ধিক্কার তোমাকে হে নু'আঈম। সুদূর নজদ থেকে এই দূর-দূরান্তে কেন এসেছ? কিসে তোমাকে এই মহান ব্যক্তি ও তাঁর সাথীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নিয়ে এসেছে। কিসের স্বার্থে? এ যুদ্ধ কি তোমার ছিনিয়ে নেওয়া অধিকার প্রতিষ্ঠার? নাকি তোমার লুণ্ঠিত সম্ভ্রমের প্রতিশোধের?'

'অকারণে তুমি এখানে এসেছ নু'আঈম! ধিক্কার তোমাকে...।'

তার অনুতপ্ত মন তাকে ধিক্কার দিয়ে বলতে থাকল:
'তোমার মতো একজন বিজ্ঞ লোকের পক্ষে কি অকারণে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হওয়া শোভা পায়? সৎ ও নির্দোষ এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে কে তোমাকে উৎসাহিত করেছে? যিনি তাঁর অনুসারীদের ন্যায়বিচার ও পরোপকারের আদেশ এবং নিকটাত্মীয়দের অধিকার প্রদানে সর্বদা নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তাঁর বিরুদ্ধে তুমি যুদ্ধ করতে এসেছ? কে তোমাকে তাঁর সাথীদের রক্তপাত ঘটানোর উদ্দেশ্যে চমকানো বর্ষা বহনে অনুপ্রাণিত করেছে? যারা একমাত্র সত্য ও হেদায়াতের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত, তুমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছ?'

নু'আঈম ও তার বিবেকের এই বিতর্ক বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। বিতর্কের পরিসমাপ্তি ঘটল। সে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হলো। রাতের অন্ধকারে নু'আঈম গাতফান গোত্রের সৈন্য ছাউনি থেকে সবার নজর এড়িয়ে দ্রুতগতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সামনে উপস্থিত দেখে বললেন:

'তুমি কি নু'আঈম ইবনে মাসউদ?'

সে উত্তরে বলল:
'হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!'

'গভীর রাতে এ মুহূর্তে কী উদ্দেশ্যে এসেছ?'

নু'আঈম উত্তর দিলো:
'একমাত্র কালেমা শাহাদাতের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আপনার খিদমতে উপস্থিত হয়েছি।'

এই বলেই সে কালেমা শাহাদাত পাঠ করল। অতঃপর আরয করল:
'হে আল্লাহর রাসূল। আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। এ কথা গাতফান গোত্রের কেউ জানে না। এ মুহূর্তে আমাকে যে কোনো খিদমতের জন্য নির্দেশ দিন।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন:
إِنَّمَا أَنْتَ فِينَا رَجُلٌ وَاحِدٌ ... فَاذْهَبْ إِلَى قَوْمِكَ وَخَدِّلْ عَنَّا إِنْ اسْتَطَعْتَ فَإِنَّ الْحَرْبَ خُدْعَةٌ .

'তুমিই আমাদের একমাত্র ব্যক্তি, যে এ মুহূর্তে কূটনৈতিক চাল চালতে পার। তুমি যদি পারো গাতফান গোত্রকে যুদ্ধ-ময়দান থেকে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কর। কেননা, শত্রুপক্ষকে ধোঁকায় ফেলা সমর-কৌশলেরই অংশ।'

নু'আঈম বললেন:
'হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার দ্বারা আপনি এমন কিছু দেখতে পাবেন, যা আপনাকে সন্তুষ্ট করবে, ইনশাআল্লাহ।'

এই বলে নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমত থেকে সে মুহূর্তেই বনু কুরাইযা গোত্রের আস্তানায় তার আগের সঙ্গী-সাথীদের কাছে গেলেন। তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও কথাবার্তার এক পর্যায়ে তাদের বললেন:

'হে বনু কুরাইযার ভাইয়েরা! আমি যে তোমাদের একজন বিশ্বস্ত ও অন্তরঙ্গ বন্ধু তা তো তোমরা ভালো করেই জান। সর্বদা তোমাদের প্রতি আমার সৎপরামর্শ ও আন্তরিকতার ব্যাপারেও অবগত।'

তারা বলল:
'হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ নু'আঈম! তুমি আমাদের নিকট নিঃসন্দেহে আস্থাভাজন ব্যক্তি।'

তাদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত হয়ে অতঃপর বললেন:
'এ যুদ্ধে কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের অবস্থান তোমাদের অবস্থান থেকে নিঃসন্দেহে ভিন্নতর।'

তারা বলল, কিভাবে?

নু'আঈম বললেন:
'মদীনা তোমাদের নিজেদের শহর। এ শহরেই তোমাদের ধন-সম্পত্তি, সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী-পুত্র সবই অবস্থান করছে। কোনোক্রমেই তোমরা এসব অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে পার না। অপরদিকে কুরাইশ ও গatফানদের ধন-সম্পত্তি, অর্থ-কড়ি, সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রী-পুত্র সবই মদীনার বাইরে তাদের নিজেদের শহরে। তারা সেখান থেকে মুহাম্মদের সাথে যুদ্ধ করতে এসেছে। তারা তোমাদের শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে তার বিরুদ্ধে সহযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। যদি তারা বিজয়ী হয়, তাহলে মুহাম্মদের ধন-সম্পত্তিকে মালে গনীমত হিসেবে তারাই নেবে। আর যদি কুরাইশ ও গাতফানদের বাহিনী পরাজিত হয়, তাহলে মুহাম্মদের তাড়া খেয়ে তারা তোমাদেরকে মুহাম্মদের হাতে ফেলে রেখে নিরাপদেই স্ব-স্ব গোত্রে ফিরে যাবে। সে ক্ষেত্রে মুহাম্মদ তোমাদের থেকে চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যা কল্পনাও করতে পারছ না। তোমরা ভালো করেই জান যে, এককভাবে মুহাম্মদের মোকাবেলা করার শক্তি তোমাদের নেই।'

তারা বলল: 'ঠিকই বলছ। এখন তোমার পরামর্শ কী?'

তিনি বললেন: 'আমার কাছে এর একমাত্র সমাধান হলো, যতক্ষণ না তোমরা তাদের নেতৃস্থানীয় কিছু লোককে জামানত হিসেবে তোমাদের কাছে না রেখেছ, ততক্ষণ তোমরা তাদের সাথে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করো না। তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের জামানত হিসেবে রাখতে পারলেই তারা সর্বশক্তি দিয়ে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে প্রাণপণে যুদ্ধে নেমে পড়বে। হয় বিজয়, নয় তোমাদের ও তাদের শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত নিঃশেষ।'

তারা বলে উঠল: 'হ্যাঁ, তুমি উত্তম পরামর্শ দিয়েছ।'

অতঃপর তাদের থেকে বিদায় নিয়ে নু'আঈম ইবনে মাসউদ কুরাইশ সেনাপতি আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের কাছে এসে তাকে ও তার সঙ্গী নেতৃস্থানীয়দের বললেন:

'কুরাইশ ভাইয়েরা! মুহাম্মদের সাথে আমার শত্রুতা ও তোমাদের সাথে আমার আন্তরিকতা ও সহৃদয়তার কথা তোমরা ভালো করেই জান। আমার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পৌছেছে, যা তোমাদের জানান আমি আমার গুরুদায়িত্ব বলে মনে করি। তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ হলো, বিষয়টি তোমাদের মধ্যেই সীমিত রাখবে এবং আমার বরাত বা হাওয়ালা দিয়ে তা কখনো প্রচার করবে না। তারা কথা দেয় যে, এ ব্যাপারে আমরা অবশ্যই তোমার অনুরোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করব।'

অতঃপর নু'আঈম বলেন:
'বনু কুরাইযা গোত্র মুহাম্মদের বিরুদ্ধাচরণে অনুতপ্ত। তারা মুহাম্মদের কাছে দূত পাঠিয়ে আবেদন করেছে যে, আমরা আমাদের কৃতকর্মের জন্য ভীষণভাবে অনুতপ্ত। আমরা শান্তিচুক্তি পুনর্জীবিত করে সন্ধিভুক্ত হতে চাই। আপনার সদয় সম্মতি পেলে আমরা কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের বেশ কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এনে আপনার কাছে সোপর্দ করতে চাই, যেন আপনি তাদের শিরশ্ছেদ করতে পারেন। আপনাকে এই শিকার সংগ্রহ করে দেওয়ার মাধ্যমে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আপনার সাথে মিলিত হতে চাই।' মুহাম্মদ তাদের এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। ইহুদীরা যদি তোমাদের কাছে জামানত চায়, আমার অনুরোধ, তাহলে কাউকেও জামানত হিসেবে দেবে না।'

আবু সুফিয়ান বলল:
'এ গোপন সংবাদ প্রদানের মাধ্যমে নিঃসন্দেহে তুমি আমাদের প্রকৃত বন্ধুদের দাবিই পূরণ করলে।'

অতঃপর নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু সুফিয়ানের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে গাতফান গোত্রের অন্যান্য নেতাদের সাথে মিলিত হন। আবূ সুফিয়ানের সাথে তিনি যেভাবে কথা বলেছেন, তাদের কাছেও অনুরূপভাবে কথা বলেন। আবু সুফিয়ানকে যেভাবে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তাদেরও অনুরূপ পরামর্শ দেন।

প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে আবু সুফিয়ান বনু কুরাইযার মনোভাবকে যাচাই করার জন্য তাদের কাছে পরের দিন ভোর হতে না হতেই তার নিজ ছেলেকে দূত হিসেবে পাঠাল। তার ছেলে বনু কুরাইযার নেতৃবর্গের কাছে গিয়ে বলল:

'আমার পিতা আবু সুফিয়ান আপনাদের খিদমতে সালাম আরয করেছেন এবং বলে পাঠিয়েছেন যে, যেহেতু আমরা মুহাম্মদ এবং তার সঙ্গী-সাথীদেরকে দীর্ঘদিন যাবৎ অবরোধ করে রেখেছি, যার ফলে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমরা চাচ্ছি, কালবিলম্ব না করে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরম্ভ করি এবং এই অবরোধের সমাপ্তি ঘটাই। আপনাদের খidমতে আমার পিতা আমাকে এ জন্যই পাঠিয়েছেন, যেন আগামীকালই আমাদের ও আপনাদের এ যৌথ আক্রমণের সূচনা হয়।'

ইহুদীরা তাকে বলে:
'আগামীকাল শনিবার। আমাদের ধর্মমতে পবিত্র দিন। আমরা কাল কোনো মতেই যুদ্ধে জড়িত হতে পারব না। এ ছাড়াও আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত আপনাদের সাহায্যার্থে যুদ্ধে জড়িত হতে পারব না, যতক্ষণ না আপনাদের কুরাইশ গোত্র ও গাতফান গোত্রের সত্তরজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে আমাদের কাছে জামানত হিসেবে না রাখবেন। কারণ, আমরা আশঙ্কা করছি, প্রচণ্ড যুদ্ধের ভয়াবহতা সহ্য করতে না পেরে আপনারা আমাদেরকে একা মুহাম্মদের হাতে বলির পাঁঠা হিসেবে ছেড়ে দিয়ে স্ব-স্ব আবাসভূমিতে পালিয়ে যেতে পারেন। আপনারা ভালো করেই জানেন যে, সে পরিস্থিতিতে মুহাম্মদের মোকাবেলা করার সাধ্য আমাদের নেই।'

আবু সুফিয়ানের পুত্র কুরাইশ সৈন্য ছাউনিতে ফিরে এসে তাদেরকে বনু কুরাইযা গোত্রের নেতৃবৃন্দের ভূমিকা সম্পর্কে অবগত করলে তারা ক্ষোভ ও ধিক্কারের সাথে সমস্বরে বলে উঠল:
'শূকর ও বানরের সন্তানেরা বড়ই জঘন্য শর্তারোপ করেছে...। আমরা আল্লাহর শপথ করে বলছি, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ তো দূরের কথা, তারা যদি আমাদের কাছে একটা ছাগলছানাও জামানত হিসেবে দাবি করে সেটাও তাদের দেওয়া হবে না।'

অবরোধকারী ও মিত্র এ জোটে ফাটল ধরাতে এবং তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর চালে পুরোপুরিই সাফল্য লাভ করলেন। অপরদিকে আল্লাহ কুরাইশ ও তাঁর মিত্র বাহিনীর ওপর পাঠালেন প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টিসহ প্রলয়ঙ্করী ঝড়ো হাওয়া ও তুফান। যে তুফান তাদের তাঁবুর রশি ছিঁড়ে লণ্ডভণ্ড করে ফেলল। ডেক-ডেকচিগুলো এদিক-সেদিক উড়িয়ে নিয়ে গেল ও আগুন নিভিয়ে ফেলল। তাদের চোখে-মুখে ধুলাবালি নিক্ষিপ্ত করে প্রায় অন্ধ করে দিল। শুধু লোকজনই নয় উট, গাধা, ঘোড়া ও যানবাহন বলতে যা কিছু ছিল সেসবও ছিঁড়ে-ছুটে এদিক-সেদিক ছুটে গেল। রাতের অন্ধকারে প্রাণভয়ে কুরাইশ বাহিনীও মদীনা থেকে পালিয়ে গেল। সকালে যখন মুসলিম বাহিনী দেখতে পেল যে, আল্লাহর দুশমনেরা পলায়ন করেছে, তখন তারা আনন্দে বলতে থাকল :

'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন। তাঁর বাহিনীকে বিজয়ী করেছেন এবং তিনি নিজেই আক্রমণকারী মিত্র বাহিনীকে পরাজিত করেছেন।'

নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেদিন থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একান্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হলেন। তাঁকে অতি সম্মানে ভূষিত করে তাঁর হাতে গাতফান গোত্রের পতাকা প্রদান করা হলো। তাঁকে সামরিক বাহিনীর ডিভিশনাল কমান্ডার থেকে শুরু করে প্রাদেশিক গভর্নরের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ করা হয়। মক্কা বিজয়ের দিনে আবু সুফিয়ান দাঁড়িয়ে যখন অগ্রসরমান মুসলিম বাহিনী প্রত্যক্ষ করছিল, তখন এক পর্যায়ে দেখল যে :

'এক ব্যক্তি গাতফান গোত্রের পতাকা বহন করে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছে। সে তার পাশে উপস্থিত লোকদের জিজ্ঞাসা করে, এ ব্যক্তি কে?'

তারা বলল:
'গাতফান নেতা নু'আঈম ইবনে মাসউদ।'

তার নাম শোনামাত্রই আবু সুফিয়ান বলে উঠে :
'সে খন্দকের যুদ্ধে আমাদের কতই না বিপর্যয় এনে দিয়েছে! আল্লাহর শপথ! মুহাম্মদের বিরুদ্ধাচরণে তার চেয়ে অধিক তৎপর আর কেউ ছিল না। আর আজ সে তারই অনুসারী হয়ে নিজ গোত্রের পতাকা বহন করছে। সে আজ মুহাম্মদের পতাকাতলে সমবেত হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে।'

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: জীবনী নং ৮৭৭৯.
২. আল ইসতিয়াব: ইসাবাহ-এর টীকা অংশ, ৫ খণ্ড, ৫৮৪ পৃ.
৩. উসদুল গাবাহ: ৫ম খণ্ড, ৩৪৮ পৃ. অথবা ৫২৭৪ নং জীবনী.
৪. সীরাতুন নুবুবিয়াহ লিইবনে হিশam: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৫. হায়াতুস সাহাবাহ: ৪র্থ খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 খাব্বাব ইবনে আরত (রাঃ)

📄 খাব্বাব ইবনে আরত (রাঃ)


আল্লাহ খাব্বাব ইবনে আরতের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, নিষ্ঠা সহকারে হিজরত করেছিলেন এবং মুজাহিদের জীবন যাপন করেছেন।
-আলী ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু

একদা উম্মু আনমার আল খুযাইয়া তার খিদমতের জন্য এবং আয়-রোজগারেও সহায়ক হতে পারে, এমন এক বালককে ক্রয়ের উদ্দেশ্যে মক্কার দাস মার্কেটে গেল। বিক্রির জন্য আনা শিশু দাসদের চেহারা ও মুখমণ্ডলের দিকে সে খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নজর ফেরাতে থাকল। পরিশেষে এমন এক বালকের প্রতি তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো, যে ছিল যেমন সুন্দর চেহারাসম্পন্ন, তেমনি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। যার চেহারায় ছিল বুদ্ধিমত্তার ছাপ। তখনো সে ছিল একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক মাত্র। মনে মনে ঐ বালকটিকে ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। দর-কষাকষি করে, মূল্য পরিশোধ করে তাকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো। কিছুদূর যাওয়ার পর উম্মু আনমার ছেলেটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল :

'ছেলে! তোমার নাম কী?' উত্তর দিল : 'খাব্বাব।' আবার জিজ্ঞাসা করল : 'তোমার বাবার নাম কী?' সে বলল : 'আরত' পুনরায় জিজ্ঞাসা করল : 'তুমি কোথাকার বাসিন্দা?' সে বলল : 'নজদের' উম্মু আনমার বলল : 'তাহলে তুমি আরব?'

সে উত্তর দিল: 'জী! আমি বনূ তামীম গোত্রের সন্তান।'

উম্মে আনমার বলল: 'কিভাবে তুমি ক্রীতদাস হলে এবং মক্কার দাস ব্যবসায়ীদের হাতে পড়লে?'

সে বলল: 'আরবের একটি গোত্রের সশস্ত্র লোকজন আমাদের গোত্রের উপর হামলা চালিয়ে উট, ঘোড়া, গাধা ইত্যাদি লুট করে এবং মহিলাদের বন্দী করে এবং শিশুদের ধরে নিয়ে যায়। আমি সেই বন্দী শিশুদের একজন। ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে হাত ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে আপনার হাতে এসে পড়েছি।'

বাড়ি ফিরে উম্মু আনমার তলোয়ার তৈরির প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে খাব্বাবকে মক্কার কর্মকারদের একজনের হাতে তুলে দিল। কিছুদিনের মধ্যেই খাব্বাব তলোয়ার তৈরিতে বেশ দক্ষতা অর্জন করল।

খাব্বাব আরো একটু বয়ঃপ্রাপ্ত ও তার মধ্যে ধীরস্থিরতা পরিলক্ষিত হলে উন্মু আনমার তার জন্য একটি দোকান ভাড়া করে তাকে যন্ত্রপাতি ক্রয় করে দেয় এবং তলোয়ার তৈরির জন্য তার মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেয়। কিছুদিনের মধ্যেই খাব্বাবের তৈরি তলোয়ারের মান ও গুণগত প্রশংসা মক্কার সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তার তলোয়ার জনপ্রিয় হয়ে উঠল এবং সবাই তার তৈরি তলোয়ার কিনতে আসতে লাগল। খাব্বাব একজন যুবক ও স্বল্পবয়সী হওয়া সত্ত্বেও চিন্তা, বিবেক-বুদ্ধিতে ছিলেন পরিপক্ক এবং জ্ঞান-গরিমায় ও অভিজ্ঞতায় ছিলেন বৃদ্ধদের মতো সমৃদ্ধ, সত্যবাদী, সৎ ও আমানতদার।

দিনের কাজ শেষে অবসর সময়ে জাহেলী সমাজে বিদ্যমান অশান্তি ও বিপর্যয় থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায়, সে সম্প গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতেন। নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত যে জীবনধারা চলছে, যার শিকার তিনি নিজেও তা থেকে পরিত্রাণের চিন্তা করতেন। এই অন্ধকার কবে দূর হবে, কবে সমাজ পরিশুদ্ধ হবে? প্রত্যাশিত সুপ্রভাত কবে উদ্ভাসিত হবে? এবং তিনি সেই সুপ্রভাত দেখে যেতে পারবেন কি না? এসব চিন্তা ছিল তাঁর অবসরের একমাত্র খোরাক। সে উদ্দেশ্যে তিনি দীর্ঘ জীবনের আকাঙ্ক্ষা করতেন।

খাব্বাবকে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হলো না। তাঁর নিকট পৌঁছল প্রত্যাশিত সেই সুপ্রভাতের আহ্বান। যে আহ্বান জানাচ্ছেন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ নামক হাশেমী গোত্রেরই এক ব্যক্তি।

কালবিলম্ব না করে খাব্বাব মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর খিদমতে উপস্থিত হলেন। মনোযোগ সহকারে তাঁর কথা শুনলেন। আলোচনা যতই গভীরে যাচ্ছিল খাব্বাবের অন্তর ততই আলোকিত হয়ে উঠছিল। এমনকি দেখতে দেখতে নূরে রব্বানী তাঁর অন্তরকে পূর্ণ আলোকিত করে তুলল। ক্রীতদাস খাব্বাব এখন ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত। বিলম্ব আর সহ্য হলো না। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং কালেমা শাহাদাত পাঠ করে নবজীবন লাভ করলেন।

তিনি ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে ষষ্ঠ ব্যক্তি। তিনিই ইসলামের ছয় ভাগের এক ভাগ নামে পরিচিত ছিলেন।

খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ইসলাম গ্রহণ করার সুসংবাদ মক্কার জনগণ থেকে লুকিয়ে রাখলেন না। তাঁর ইসলাম গ্রহণের সংবাদ তার মালিকা উম্মু আনমারের নিকট পৌঁছে গেল। খাব্বাবের ইসলাম গ্রহণের সংবাদে সে ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হলো। ক্রোধে সে এতই উন্মত্ত হয়ে উঠল যে, সে খাব্বাবকে কঠোর শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সে তার ভাই সিবাআ ইবনে আবদুল উযযাকে সঙ্গে নিয়ে খাব্বাবের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। খুযাআ গোত্রের একদল যুবকও তাদের সঙ্গী হলো। সবাই খাব্বাবের কাছে গিয়ে পৌঁছে দেখল তিনি তার কাজের মধ্যে ডুবে আছেন। সিবাআ তার দিকে অগ্রসর হয়ে রাগতঃস্বরে বলল:

'তোমার সম্পর্কে আমাদের কাছে একটি সংবাদ পৌঁছেছে, যা আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না।'

খাব্বাব জিজ্ঞাসা করলেন: 'কী খবর?'

সিবাআ বলল: 'তুমি নাকি ধর্মচ্যুত হয়ে হাশেমী গোত্রের এক ব্যক্তির অনুসরণ করছ?'

খাব্বাব ধীরস্থিরভাবে উত্তর দিলেন: 'না আমি ধর্মচ্যুত হইনি, বরং লা-শরীক আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি মাত্র। আর আপনাদের দেব-দেবীদের প্রত্যাখ্যান করে এ সাক্ষ্য দিয়েছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর রাসূল।'

খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর উত্তর সিবাআ ও তার সঙ্গী-সাথীরা শোনামাত্রই তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সম্মিলিতভাবে তাঁকে প্রহার করতে শুরু করল। নির্যাতনের জন্য তাদের হাত-পা সমানে চলল। তাতেও তাদের প্রতিশোধস্পৃহা থামল না। হাতের কাছে হাতুড়ি ও লৌহখণ্ড প্রভৃতি যা পেল তাই দিয়ে নির্দয়ভাবে প্রহার করতে লাগল।

এক পর্যায়ে খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তাঁর শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকল। খাব্বাবের ওপর তাঁর মনিবের এই নির্যাতনের সংবাদ মক্কার অলিতে-গলিতে খড়কুটোর আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। মক্কাবাসী খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাহসিকতায় হতভম্ব হয়ে গেল। কারণ, তারা এই প্রথম শুনতে পেল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারীদের একজন প্রকাশ্যভাবে ইসলামের ঘোষণা করে প্রহৃত হয়েছে। কুরাইশ নেতৃবর্গ খাব্বাবের এই সাহসিকতায় বিচলিত হয়ে পড়ল। কারণ, পেশায় কর্মকার, বিধবা উম্মু আনমারের এক নগণ্য ক্রীতদাস হয়ে তারই দেব-দেবীদের প্রকাশ্যে গালি দেবে? তার বাপ-দাদার ধর্মকে যুক্তিহীন বলবে? মক্কায় যার না আছে কোনো সাহায্যকারী, না আছে কোনো আশ্রয়দাতা। সেই ব্যক্তি দেব-দেবীকে প্রকাশ্যে ভর্ৎসনা করবে এবং পৌত্তলিকতাকে উপহাস করবে- এ কথা তারা কল্পনাও করতে পারেনি।

তারা ভাবতে লাগল: 'যদি এখনই তার ধৃষ্টতা এই হয়, আর তা বাড়তে দেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তো সীমা ছাড়িয়ে যাবে।'

তাদের দিক থেকে এ দুশ্চিন্তায় কোনো অতিরঞ্জন ছিল না। তারা দেখল ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে এবং ইসলাম গ্রহণকারী অন্যরাও খাব্বাবের সাহসিকতা দেখে ইসলামের ঘোষণা দেওয়া শুরু করেছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা, আবু জাহল ইবনে হিশামদের নেতৃত্বে কুরাইশ দলপতিরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রতিরোধকল্পে পরামর্শ বৈঠকে বসল। তারা এ বৈঠকে একমত হলো যে, ইসলামের প্রসার দিনের পর দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, তাকে আর অগ্রসর হতে দেওয়া যায় না। শিকড় শক্ত হওয়ার আগেই এর মূলোৎপাটন করতে হবে। স্ব-গোত্রীয় মুহাম্মদের অনুসারীদের অগ্রযাত্রা প্রতিরোধ করতে হবে বা নিজেদের ধর্মমতে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রত্যেক গোত্রপতিকে তারা নিজ নিজ গোত্রের বিশৃঙ্খলা দমনের দায়িত্ব দেয়। তাদেরকে এ নির্দেশও দেওয়া হয় যে:

'তাদের ওপর কঠিন নির্যাতন চালাতে হবে, যেন তারা নিজ নিজ ধর্মে ফিরে আসতে বাধ্য হয় অথবা নির্যাতনে তাদের মৃত্যু হয়।'

এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে নির্যাতন করার দায়িত্ব পড়ে সিবাআ ইবনে আবদুল উযযার ওপর। দুপুর বেলায় মক্কার ভূমি যখন খরতাপে উত্তপ্ত হয়ে উঠে, বালুময় মাঠ যখন অগ্নিতপ্ত হয়ে টগবগ করে, ঠিক এ সময়ে সে খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মক্কার অগ্নিঝরা তপ্ত মাঠে নিয়ে বিবস্ত্র করে লোহার পোশাক পরিয়ে (যা যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়) বেঁধে রাখে। পিপাসায় ছটফট করতে থাকলে তাকে পানি দিতে নিষেধ করা হয়। খাব্বাব যখন ভীষণ কাতর ও ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, তখন তাঁর কাছে গিয়ে প্রশ্ন করা হতো মুহাম্মদ সম্পর্কে তোর ধ্যান-ধারণা কী? তখন খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিতেন:

'তিনি আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর রাসূল, যিনি আমাদের জন্য দীনে হক ও হেদায়াতসহ প্রেরিত হয়েছেন। তিনিই একমাত্র আমাদেরকে জাহেলী যুগের অন্ধকার থেকে ইসলামের আলোর পথে আনতে সক্ষম।'

তাঁর এ উত্তর শুনে সে তাঁকে নির্দয়ভাবে প্রহার করত। লাথি ও কিল-ঘুষি মারত। তারপর আবার জিজ্ঞাসা করত:
'লাত ও উযযা সম্পর্কে তোর ধ্যান-ধারণা কী?' তখন খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিতেন: 'বোবা ও বধির দুটি মাটির মূর্তি মাত্র, যা কারো উপকার বা ক্ষতি কিছুই করতে পারে না।'

এ উত্তরে সে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উত্তপ্ত পাথর এনে তার পিঠে চাপা দিয়ে রাখত। এতে তাঁর দু'কাঁধ বেয়ে পিঠের চর্বি গলে গলে পড়ত।

খাব্বাব ইবনে আরত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর প্রতি সিবাআর চেয়ে তাঁর মালিকা উম্মু আনমারের নির্যাতন কোনো অংশেই কম ছিল না। একদা উম্মু আনমার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খাব্বাবের দোকানের সামনে দিয়ে যাবার সময় তাঁর সাথে কথা বলতে দেখে তার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। এরপর সে প্রতিদিন খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দোকানে আসত এবং তাঁর হাপর থেকে উত্তপ্ত লাল টকটকে লৌহখণ্ড তাঁর মাথার ওপর চেপে ধরত। এতে খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মাথা পুড়ে বাষ্প উত্থিত হতো এবং তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলতেন। এমতাবস্থায় খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর মালিকা উম্মু আনমার ও তার ভাই সিবাআর জন্য আল্লাহর দরবারে বদদু'আ করতে থাকতেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের মদীনায় হিজরত করে চলে যাওয়ার অনুমতি দিলে খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও সেজন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং সুযোগমতো হিজরত করে মদীনায় চলে যান। মক্কা ত্যাগের পূর্বে আল্লাহ উম্মু আনমারের জন্য তাঁর কৃত বদদু'আ বাস্তবে পরিণত করে দেখান। তা এইভাবে যে, উম্মু আনমার কঠিন মাথা ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এ ধরনের তীব্র ও কঠিন মাথা ব্যথার কথা ইতঃপূর্বে কেউ শোনেনি। প্রচণ্ড মাথা ব্যথার তাড়নায় সে কুকুরের মতো চিৎকার করত। চিকিৎসার জন্য তার ছেলেরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। পরিশেষে চিকিৎসকেরা পরামর্শ দেয়:

'এ ধরনের মাথা ব্যথার একমাত্র চিকিৎসা হলো লৌহখণ্ড উত্তপ্ত করে লাল টগবগে হলে তা দ্বারা নিয়মিত মাথায় দাগ দেওয়া। এই মাথা ব্যথা থেকে বাঁচার জন্য উম্মু আনমার লৌহখণ্ড গরম করে মাথায় ইস্ত্রির মতো ঘষতো। তাতে তার যন্ত্রণার অনুভূতি কিছুটা লাঘব হওয়ার পরিবর্তে আরো বহুগুণ বেড়ে যেত, এমনকি তার যন্ত্রণায় পূর্বের মাথা ব্যথাই ভুলে যেত।'

মদীনায় হিজরত করে আনসারদের আতিথেয়তায় খাব্বাব ইবনে আরত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে তাঁর চক্ষুদ্বয়কে শীতল করেন। খাব্বাব ইবনে আরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে তাঁরই ঝাণ্ডার নিচে সমবেত হয়ে বদর ও উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উহুদের যুদ্ধে উম্মু আনমারের ভাই সিবাআ ইবনে আবদুল উযযাকে বীর কেশরী হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে নিহতাবস্থায় দেখার সৌভাগ্য তাঁর হয়। আল্লাহ তাঁকে দীর্ঘ জীবন দান করেন। তিনি চার খলীফার শাসনকাল প্রত্যক্ষ করেন। তাদের বিশেষ তত্ত্বাবধানে ও তাদের দ্বারা সর্বদাই সম্মানিত ও প্রশংসিত হয়ে জীবন অতিবাহিত করেন।

খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু একদিন কোনো কাজে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দরবারে আসেন। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে উঁচু আসনে সমাসীন করেন। তাঁকে বলেন:

'বেলাল ছাড়া এই মজলিসে আর কেউ নেই যে, তাকে আপনার চেয়ে অধিক সম্মানে ভূষিত করা যেতে পারে।'

অতঃপর আলোচনার এক পর্যায়ে খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মক্কার মুশরিকরা যে চরম নির্যাতন চালিয়েছিল, সে সম্পর্কে কিছু জানতে চান।

খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ওপর নির্যাতনের বর্ণনা গর্বের সাথে করা 'রিয়া' হতে পারে মনে করে লজ্জাবোধ করছিলেন। কিন্তু উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বারবার অনুরোধ করায় খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পিঠের কাপড় সরিয়ে দিলেন। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর পিঠের ক্ষত-বিক্ষত অবস্থা দেখে ভয়ে পিছনে সরে গেলেন এবং বললেন: 'এসব কিভাবে হলো?'

খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'মুশরিকরা আমাকে নির্যাতন করার জন্য কয়লার স্তূপ প্রজ্বলিত করত। যখন তা লাল হয়ে উঠত, তখন আমাকে বিবস্ত্র করে হাত-পা বেঁধে এর ওপর হেঁচড়াতে থাকত। এমনকি আমার পিঠের গোস্ত হাড্ডি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত। ক্ষতস্থানের নির্গত রক্তমিশ্রিত পানি টপটপ করে পড়ে সেই কয়লার আগুন নিভে যেত।'

খাব্বাব ইবনে আরত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে অতিকষ্টে জীবন অতিবাহিত করার পর শেষ জীবনে অঢেল সম্পদের মালিক হন। এত স্বর্ণ-রৌপ্যের মালিক হন, যা তাঁর জন্য স্বপ্নেরও অতীত ছিল। সেই অঢেল সম্পদ থেকে তিনি আল্লাহর রাস্তায় এমনভাবে খরচ করতেন, যা অনেকের কাছে ছিল কল্পনাতীত। তিনি স্বর্ণ ও রৌপ্যের মুদ্রাগুলো তাঁর বাড়ির একটি নির্দিষ্ট স্থানে বাক্সের তালা না লাগিয়ে উন্মুক্ত অবস্থায় রেখে দিতেন। ফকীর, মিসকীন, গরীব ও অভাবী তাঁর বাড়িতে এসে অনুমতি বা চাওয়া ছাড়াই ইচ্ছামতো সেখান থেকে নিয়ে যেত। এসব সত্ত্বেও তিনি ভয় পেতেন যে, এ ধন-সম্পদের হিসাব কঠিন হবে এবং তাঁকে শাস্তি পেতে হবে। তার একদল বন্ধু-বান্ধব বর্ণনা করেছেন:

'খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মৃত্যুশয্যায় আমরা তাঁর কাছে গেলে তিনি আমাদেরকে একটি স্থান দেখিয়ে বললেন, এখানে ৮০,০০০ (আশি হাজার) দিরহাম রয়েছে। আল্লাহর শপথ আমি থলির মুখ কখনো বন্ধ করিনি কিংবা কোনো অভাবীকে সেখান থেকে তার ইচ্ছামতো গ্রহণ করতেও বাধা দেইনি। এই বলে তিনি কাঁদতে থাকলেন।'

তারা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন : 'কেন কাদছেন?' তিনি বললেন :
'আমি কাঁদছি, কারণ আমার সঙ্গী-সাথীরা এ দুনিয়ায় তাদের কর্মের বিনিময়ে একটি কপর্দকও পাননি, আর আমি এখনো জীবিত এবং অঢেল সম্পদের মালিক। আমার ভয় হয় যে, এসব সম্পদ হয়তো আমার ঐসব কাজের প্রতিদান, যা এ পৃথিবীতে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।'

খাব্বাব ইবনে আরত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আল্লাহর সান্নিধ্যে গমনের পর আমীরুল মুমিনীন আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন :

'আল্লাহ তাআলা খাব্বাবের ওপর রহম করুন। তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, নিষ্ঠা সহকারে হিজরত করেছিলেন এবং মুজাহিদী জীবন যাপন করেছেন। আল্লাহ উত্তম আমলকারীদের কর্মফল বৃথা যেতে দেন না।'

رَحِمَ اللهُ خَبَّاباً فَلَقَدْ أَسْلَمَ رَاغِباً وَهَاجَرَ طَائِعاً وعاش مُجَاهِداً .... ولن يضيع اللَّهُ أَجْرَ مَنْ أَحْسَنَ عَمَلاً

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ২২১০ নং জীবনী.
২. উসদুল গাবাহ: ২য় খণ্ড, ৯৮-১০০ পৃ.
৩. আল ইসতিয়াব : ১ম খণ্ড, ৪২৩ পৃ.
৪. তাহযীবুত তাহযীব: ৩য় খণ্ড, ১৩৩ পৃ.
৫. হুলিয়াতুল আওলিয়া: ১ম খণ্ড, ১৪৩পৃ.
৬. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১ম খণ্ড, ১৬৮ পৃ.
৭. আল জামউ বাইনা রিজালিস সহীহায়ন: ১২৪ পৃ.
৮. আল মাআরিফ লি ইবনে কুতায়বা: ৩১৬ পৃ.
৯. হায়াতুস সাহাবা: ৪র্থ খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 রাবীঈ ইবনে যিয়াদ আল হারেসী (রাঃ)

📄 রাবীঈ ইবনে যিয়াদ আল হারেসী (রাঃ)


‘আমি খলীফা নিযুক্ত হওয়ার পর রাবিঈ ইবনে যিয়াদ যেভাবে হক কথা ও সৎ পরামর্শ দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করেছে এমনটি আর কেউ করেনি।’
-উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)

আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইনতিকালের শোকে মাদীনাতুর রাসূলের জনসাধারণ তখনো দুঃখে-শোকে মুহ্যমান। এখনো তাঁরা অশ্রুসিক্ত চক্ষু মুছেই চলেছেন। অপরদিকে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে বায়'আত গ্রহণের জন্য আরবের প্রতিটি জনপদ থেকে প্রতিনিধি দলের আগমন অব্যাহত রয়েছে। তারা হেদায়াত ও দিক-নির্দেশনা শুনতে ও নতুন খলীফার হাতে শান্তি ও কঠিন মুহূর্তে আনুগত্যের বায়'আত করতে আসছে। এ রকম এক সকালে অন্যান্য প্রতিনিধি দলের সাথে বাহরাইনের এক প্রতিনিধি দলের আগমন ঘটে। যে প্রতিনিধি দলে ছিলেন বাহরাইনের বিভিন্ন জনপদের প্রতিনিধিগণ।

উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ প্রতিনিধিদের কথাবার্তা ও বিভিন্ন পরামর্শাদি একান্ত আগ্রহ সহকারে শুনলেন। শুধু বাহরাইনের আগত প্রতিনিধি দলের কথাই মনোযোগ সহকারে শুনলেন না; বরং আগত প্রত্যেক সদস্যের কথাই শুনলেন একইভাবে। এ কারণে যে, তাদের থেকে হয়তো আল কুরআনের কোনো মূল্যবান উপদেশ, হেদায়াত ও পরামর্শ পাওয়া যাবে। পাওয়া যাবে আমল-আখলাকের কথা, রাষ্ট্র পরিচালনার কথা, মুসলমানদের কল্যাণের কথা। কিন্তু তিনি তাদের থেকে যা আশা করেছিলেন তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনতে পেলেন না। অতঃপর উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু প্রতিনিধিদের এক ব্যক্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন:

'আমার নিকট এসে বসুন।'

তার বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা দেখে তিনি আঁচ করতে পেরেছিলেন যে, এ ব্যক্তি নিশ্চয়ই কোনো মূল্যবান পরামর্শ দেবে। নিকটে এলে বললেন।
'এবার আপনি কিছু বলুন।'

এ সুযোগে ঐ ব্যক্তি আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন:
'হে আমীরুল মুসলিমীন! আপনার উপর উম্মতে মুসলিমার গুরুদায়িত্ব নিঃসন্দেহে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিরাট পরীক্ষা। তিনি আপনার কৃতকর্মের হিসাব নেবেন, সাফল্য ও ব্যর্থতা পরীক্ষা করে দেখবেন। খিলাফতের যে কঠিন দায়িত্ব আপনার ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে, তা পালনে সর্বদাই আল্লাহকে ভয় করে চলুন। জেনে রাখুন, সুদূর ফোরাত নদীর তীরেও যদি একটি ছাগলছানা হারিয়ে যায়, সে সম্পর্কেও কিয়ামতের দিন আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হবে।'

এ কথা শুনে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আতঙ্কিত হয়ে উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে শুরু করলেন।

তিনি বললেন:
'খিলাফতের দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এমন সত্য কথাটি আর কেউ আমাকে বলেননি। আপনি মূল্যবান নসীহত দ্বারা আমাকে ধন্য করেছেন।'

এবার বলুন: 'আপনি কে?'

তিনি উত্তর দিলেন:
'আমার নাম রাবিঈ ইবনে যিয়াদ আল হারেসী।'

উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন:
'মুহাজির ইবনে যিয়াদের ভাই?'

উত্তর দিলেন: 'জী হ্যাঁ।'

অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটলে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ডেকে বললেন:

'রাবিঈ ইবনে যিয়াদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ কর। সে যদি তার পরামর্শে সত্যিই নিঃস্বার্থ হয়ে থাকে, তাহলে তাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগানো যাবে এবং তার যোগ্যতা ও পরামর্শ রাষ্ট্র-পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের বিরাট সহায়ক হবে। অতএব, তাকে কাজে লাগাও এবং তার কার্যক্রম সম্পর্কে আমাকে অবগত করতে থাক।'

কিছুদিন যেতে না যেতেই খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নির্দেশে আবু মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পারস্যের আহওয়াজ প্রদেশের 'মানাযির' নামক শহর বিজয়ের উদ্দেশ্যে সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন এবং রাবিঈ ইবনে যিয়াদ ও তাঁর ভাই মুহাজিরকেও এ বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আবূ মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনী দ্বারা মানাযির শহর আবরোধ করলে পারস্য বাহিনীর সাথে এক প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বেধে যায়। ইতিহাসে যার নজির দুর্লভ। এ প্রচণ্ড যুদ্ধে পারস্য বাহিনী যেমন অতুলনীয় বীরত্বের পরিচয় দেয়, তেমনি তাদের আক্রমণও ছিল প্রচণ্ড। তারা অত্যাধুনিক সামরিক কৌশল প্রয়োগ করে কল্পনাতীতভাবে আক্রমণ চালালে মুসলিম বাহিনীর সীমাহীন প্রাণহানি ঘটে। রমযান মাসে যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার কারণে মুসলিম বাহিনী ছিল স্বাভাবিকভাবেই শারীরিক দিক থেকে দুর্বল। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভাই মুহাজির রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসলিম বাহিনীর এত প্রাণহানি দেখে শাহাদাতের উদ্দেশ্যে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি শরীরে কপূর জাতীয় সুগন্ধি মেখে কাফনের কাপড় পরিধান করে তারই ভাই রাবিঈকে শেষ ওসিয়ত করে প্রস্তুত হয়ে যান। তার এ অবস্থা দেখে রাবিঈ ইবনে যিয়াদ সেনাপতি আবূ মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট এসে বললেন:

'আমার ভাই মুহাজির শাহাদাতের উদ্দেশ্যে জান্নাতের বিনিময়ে নিজেকে বিক্রি করে ফেলেছে, অথচ সে রোযাদার। মুসলিম বাহিনী এ রোযার কারণে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় তারা রোযা ছাড়তে রাজি নয়, এখন আপনি কী সিদ্ধান্ত নেবেন ভেবে দেখুন।'

রাবিঈ ইবনে যিয়াদের এ প্রস্তাবে আবূ মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সৈন্যদের একত্র করে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন:

'হে মুসলিম ভাইয়েরা! আমি সকল রোযাদার সৈন্যদের আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, হয় আপনারা রোযা ভেঙে পানাহার করুন, নয়তো যুদ্ধ থেকে নিজেদের বিরত থাকুন। এ কথা বলে তিনি তাঁর হাতে ধারণ করা পানির পাত্র থেকে পানি পান করতে থাকলেন, যেন সৈন্যরা তাঁকে অনুসরণ করে রোযা ভেঙে পানাহার করে।'

রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভাই মুহাজির সেনাপতি আবূ মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এই ঘোষণার কথা শুনলে তিনিও এক চুমুক পানি পান করে বললেন:

'আল্লাহর শপথ! তৃষ্ণার জন্য পানি পান করছি না, শুধু সেনাপতির নির্দেশ পালনের জন্যই পানাহারে অংশ নিলাম। তারপর হাতের তলোয়ার কোষমুক্ত করেই শত্রুবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। শত্রুবাহিনীর ব্যূহ ভেদ করে তাদের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েন। শত্রু বাহিনীতে হৈচৈ পড়ে গেল এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। তাকে প্রতিহত করার জন্য চারদিক থেকে তার ওপর আক্রমণ চালানো হলো। তলোয়ারের একই সাথে চতুর্মুখী আক্রমণের ফলে তিনি শাহাদাত বরণ করলেন।'

শাহাদাতের পর তাঁর শিরশ্ছেদ করে তা যুদ্ধ ক্ষেত্রে এক উচ্চ টিলার ওপর বর্শার মাথায় ঝুলিয়ে রাখা হলো। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ভাইয়ের কর্তিত শির দেখে বললেন:

'হে প্রিয় ভাই! তোমার শাহাদাতের সৌভাগ্যের জন্য ধন্যবাদ। তুমি জান্নাতের সীমাহীন নিয়ামতের অধিকারী। তোমার এ গৌরব লাভে আল্লাহর পক্ষ থেকে অনন্ত জীবনের জন্য আমার ঈর্ষা হচ্ছে। গৌরবময় স্থানে তুমি ঝুলন্ত। আল্লাহর শপথ করে বলছি, ইনশাআল্লাহ আমি তোমার এবং অন্য শহীদদের পক্ষ হতে অবশ্যই এর প্রতিশোধ গ্রহণ করব।'

সেনাপতি আবূ মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ভাইয়ের প্রতি রাবিঈ ইবনে যিয়াদের আন্তরিক দরদ ও ঈমানী দৃঢ়তা প্রত্যক্ষ করে অভিভূত হলেন। প্রতিশোধের আগুন তার মধ্যে প্রজ্বলিত দেখে তিনি নিজে মানাযির শহর বিজয়ের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন। মুসলিম বাহিনীর সেনাপতির দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সে দায়িত্ব অর্পণ করলেন রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উপর। আর তিনি পারস্যেরই 'সূস' নগরী বিজয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন।

রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনীকে নিয়ে শত্রুদের ওপর ঝড়ের মতো আঘাত হানতে শুরু করলেন। শত্রুরা মনে করল এ যেন এক আসমানী কোনো গযব। প্রতিরোধ-ব্যূহ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। শত্রুরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে যেদিকে পারলো পালাতে শুরু করল। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ আক্রমণের মধ্য দিয়ে আল্লাহ তাঁর হাতে 'মানাযির' নগরীর বিজয় দান করলেন। শত্রু বাহিনীকে সমূলে নিঃশেষ করে তাদের নারী ও শিশুদেরকে দাস রূপে আশ্রয় ক্যাম্পে নিয়ে এলেন। কল্পনাতীত মালে গনীমত লাভ করলেন। মানাযির বিজয়ের হিরো হিসেবে রাবিঈ ইবনে যিয়াদ যেন নতুন এক ইতিহাস গড়লেন। আরেক সফল সেনাপতির যেন আবির্ভাব ঘটল। তাঁর বীরত্বের প্রশংসা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। নতুন যে কোনো অভিযানের আগে তার কথাই সকলের স্মরণে আসত।

মুসলিম সেনাবাহিনী 'সিজিস্তান' বিজয়ের সিদ্ধান্ত নিলে এ অভিযানের জন্য তাঁকেই সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করে তাঁর হাতেই তা বিজয়ের দৃঢ় প্রত্যাশা করা হয়। সেনাপতি রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসলিম সেনাবাহিনীকে নিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের লক্ষ্যে রওয়ানা হলেন। তিনি এ অভিযানে এমন দুর্গম ও বিপদসংকুল ২৫০ মাইল দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেন যে, মরুভূমির দুর্ধর্ষ ও হিংস্র প্রাণীরাও তা অতিক্রম করতে ভয় পায়। এ দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে কারুকার্য খচিত সুউচ্চ অট্টালিকা, ধন-দৌলতের প্রাচুর্যবিশিষ্ট প্রকৃতির সৌন্দর্যের লীলাভূমি শস্য-শ্যামল ও সুউচ্চ দুর্ভেদ্য প্রাচীরবেষ্টিত সিজিস্তানের সীমান্তবর্তী 'রুস্তাকু যালেকের' নিকট পৌঁছেন। বিচক্ষণ সেনাপতি রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পূর্ব থেকেই 'রুস্তাকু যালেক' শহরে তাঁর গুপ্তচরদের জাল বিছিয়ে রেখেছিলেন। তাদের সূত্রে জানতে পারলেন যে:

'সহসাই শত্রুপক্ষ 'আল মাহারজান' নামক তাদের জাতীয় উৎসব উপলক্ষে 'রুস্তাকু যালেক' নগরীতে একত্রিত হতে যাচ্ছে। তিনি সে সময়ের অপেক্ষায় থাকলেন। নির্ধারিত রাত্রে শত্রুপক্ষ আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠলে তাদের উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে বড় বড় জমিদার, দলপতি ও তাদের প্রাদেশিক গভর্নরসহ ২০ হাজার যোদ্ধাকে বন্দী করেছিলেন ও তাদেরকে দাস-দাসীতে পরিণত করেছিলেন। এই বন্দীদের মধ্যে উক্ত গভর্নরের এক ক্রীতদাসও ছিল। যে তার মনিবকে নির্ধারিত কর প্রদানের জন্য ৩ লাখ মুদ্রার বিরাট একটি অংক সাথে করে এনেছিল। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উক্ত ক্রীতদাসকে জিজ্ঞাসা করলেন:

'এ অর্থ কোথায় পেয়েছো?'

সে উত্তরে বলল: 'এক গ্রাম থেকে।'

'প্রতি বছরই কি একটি গ্রাম থেকে এই পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়ে থাকে?'

উক্ত ক্রীতদাস উত্তর দিল: 'জী হ্যাঁ।'

রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জিজ্ঞাসা করলেন:
'সেটা কিভাবে?'

সে উত্তর দিল:
'আমাদের কোদাল, কুড়াল ও কঠোর পরিশ্রমে বেরিয়ে আসা শরীরের ঘামের বিনিময়ে।'

যুদ্ধশেষে সেনাপতি রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট বন্দী প্রাদেশিক গভর্নর মুক্তিপণের বিনিময়ে তার ও তার পরিবারের প্রাণভিক্ষার আবেদন জানান।

রাবিঈ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাকে বললেন:
'যদি পর্যাপ্ত মুক্তিপণ দিতে পারো, তাহলে আবেদন গ্রহণ করা যেতে পারে।'

গভর্নর আবেদন করল:
'বিনিময়ে কী পরিমাণ অর্থ চান?'

রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন:
'এই বর্শাটি মাটিতে গেড়ে দিলাম। এর মাথা বরাবর সোনা ও রূপা দ্বারা এমনভাবে ভরে দাও যেন বর্শাটি ঢেকে যায়।'

গভর্নর বলল:
'ঠিক আছে আমি তাতেই সম্মত।'

এই বলে তার ধন-ভাণ্ডার থেকে সোনা ও রূপা বের করে সেখানে স্তূপ করতে আরম্ভ করল। শেষ পর্যন্ত বর্শার মাথা তাতে ঢেকে গেল। তারপর রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বিজয়ী বাহিনী নিয়ে সিজিস্তানের ভিতরে ঢুকে পড়লেন। হেমন্ত ঋতুর প্রচণ্ড দমকা হাওয়ায় গাছ-পালার শুষ্ক পাতা ঝরে পড়ার ন্যায় সিজিস্তানের দুর্গ ও সামরিক ঘাঁটিসমূহ মুসলিম বাহিনীর পদানত হতে থাকল। শহর, নগর ও গ্রাম-গঞ্জের মানুষ মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরিবর্তে তাদের সাদর সম্ভাষণ জানাতে থাকল এবং তাদের আনুগত্যের মধ্যেই নিজেদের মঙ্গল দেখতে থাকল।

এভাবে রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনীকে নিয়ে যুদ্ধ ছাড়াই সিজিস্তানের রাজধানী 'জারাঞ্জা' শহরে পৌছে গেলেন। সেখানে পৌছে দেখতে পেলেন যে, শত্রুবাহিনী মুসলিম বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। মুসলিম বাহিনীকে প্রতিরোধের জন্যে পারস্য সম্রাট বিপুল সৈন্য সমাবেশ করেছে। চারিদিক থেকে সামরিক রেজিমেন্টগুলো তাদের সহযোগিতার জন্য সমবেত করেছে। যে কোনো মূল্যে তারা 'জারাঞ্জা' থেকে মুসলিম বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে সিজিস্তান পুনরুদ্ধারে বদ্ধপরিকর। দু'বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ বেধে গেল। এ যুদ্ধে কোনো পক্ষই তাদের সৈন্যদের জীবন অকাতরে বিলিয়ে দিতে কার্পণ্য করল না। উভয়পক্ষের বিপুল ক্ষয়-ক্ষতি ও প্রাণহানির এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনীতে বিজয়ধ্বনি উঠল। পারস্য বাহিনী ও জনগণের প্রাণ রক্ষার জন্য পারস্য সেনাপতি 'পারভেয' পরাজয় নিশ্চিত ভেবে অবিলম্বে রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও শান্তি আলোচনার জন্য দূত পাঠাল। দূত মুসলিম সেনাপতি রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আলোচনার সময় ও স্থান নির্ধারণের আবেদন জানাল। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পারস্য সেনাপতির এই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পারভেযের অভ্যর্থনার সময় ও স্থান নির্ধারণ করে মুসলিম বাহিনীকে বিশেষ প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন। তাদের এও নির্দেশ দিলেন অভ্যর্থনার স্থানকে পারস্য সেনাদের লাশের স্তূপে পরিণত করা হোক এবং যে পথে পারস্য সেনাপতি পারভেয রাবিঈ ইবনে যিয়াদের সাথে দেখা করতে আসবে তার দু'পাশেও পারস্য সৈন্যদের লাশ বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হোক।

রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের লম্বা সুঠাম দেহের সুপুরুষ। তাঁর মাথাটিও ছিল আকারে বেশ বড়। তাঁকে দেখলেই অন্তর ভীতত্রস্ত হয়ে উঠত। পারস্য সেনাপতি পারভেয সন্ধির উদ্দেশ্যে আলোচনার স্থানে পৌঁছে রাবিঈ ইবনে যিয়াদের দিকে দেখামাত্রই ভয়ে কাঁপতে থাকল। তাকে পারস্য সৈন্যদের মৃতদেহের স্তূপের দৃশ্য ও রাবিঈ-এর চেহারা- উভয়ে মিলে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলল। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে করমর্দন করার জন্য সামনে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে দূরে দাঁড়িয়ে রুদ্ধশ্বাসে স্যালুট দিল। সেনাপতি রাবিঈ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট প্রস্তাবে বলল যে, ইরানী বড় বড় স্বর্ণের জামপ্লেট মাথায় বহনকারী এক হাজার ক্রীতদাস উপঢৌকনের বিনিময়ে সন্ধি প্রস্তাব নিবেদন করছি। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ শর্তে সন্ধি করতে সম্মত হলেন।

সন্ধির দ্বিতীয় দিন রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শহর প্রদক্ষিণে বের হলেন। তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য স্বর্ণের ইরানী জামপ্লেট মাথায় বহন করে দাসদের বিরাট দল নৃত্য করতে করতে তাঁকে ঘিরে ধরে। শহরের প্রবেশপথ ও অলিগলিতে জনতার ঢল নামে। রাস্তার দু'পাশে সারিবদ্ধ মানুষ মুসলমানদের বিজয়কে আল্লাহু আকবার তাকবীর ধ্বনি দিয়ে সমর্থন জানায়। ইতিহাসে এ এক স্মরণীয় ঘটনা।

রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসলমানদের জন্য এমন একটি উন্মুক্ত তরবারি ছিলেন, যে তরবারির প্রচণ্ড আঘাতে শহরের পর শহর, নগরের পর নগরের বিজয় সুনিশ্চিত হয়ে উঠত। মুসলিম শাসিত এলাকার পরিধি বিস্তারকল্পে তিনি প্রদেশের পর প্রদেশ তার সাথে সংযোজন করে এসব প্রদেশে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর এ অব্যাহত বিজয়ের এক পর্যায়ে মুসলিম বিশ্বের খিলাফতের দায়িত্ব উমাইয়া বংশের হাতে চলে যায়। মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে তাঁর অনিচ্ছাসত্ত্বেও খুরাসানের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি মানসিক দিক দিয়ে এ দায়িত্বভারে মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। এ দায়িত্বের ব্যাপারে তাঁর অনীহা এ কারণে আরো চরম আকার ধারণ করে, যখন যিয়াদ ইবনে আবিহ (পিতৃ-পরিচয়হীন যিয়াদ) একজন উচ্চপদস্থ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে এই বলে নির্দেশ দেন যে:

'আমীরুল মুমিনীন মুআবিয়া গুরুত্বের সাথে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যুদ্ধে অর্জিত মালামালের স্বর্ণ ও রৌপ্য কেন্দ্রীয় কোষাগারের জন্য নির্দিষ্ট রেখে অবশিষ্ট সম্পদ যোদ্ধাদের মাঝে বিতরণ করা হোক।'

রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এই নির্দেশ পাওয়ার পর যিয়াদ ইবনে আবিহ (পিতৃ-পরিচয়হীন যিয়াদ)-কে প্রত্যুত্তরে লিখে জানান:

'আমীরুল মুমিনীন মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর উদ্ধৃতি দিয়ে যে নির্দেশ পাঠিয়েছেন, আমি তাকে আল কুরআনের নির্দেশের পরিপন্থী মনে করি। কারণ, আল কুরআনে গনীমতের সম্পদ বণ্টনের যে পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে, তাতে সমস্ত সম্পদের এক-পঞ্চমাংশই শুধু বায়তুল মালে জমাদানের নির্দেশ আছে। বাকি অংশ সম্পূর্ণই যোদ্ধাদের মাঝে বিতরণযোগ্য বলে উল্লেখিত। কুরআনের এ নির্দেশ মোতাবেক মালে গনীমত থেকে স্বর্ণ-রৌপ্য আলাদা করে সরকারি কোষাগারে জমা করার কোনো সুযোগ নেই।'

অতঃপর তিনি সকল মুজাহিদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দেন:
'যে যেখানে যে অবস্থাতেই আছ, সে অবস্থাতেই গনীমতের অংশ বুঝে নাও। কুরআনের নির্দেশ মোতাবেক মুজাহিদদের মাঝে গনীমতের সম্পদ বিতরণ করে অবশিষ্ট মাত্র এক-পঞ্চমাংশই তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী দামেশকে প্রেরণ করেন।'

যিয়াদ ইবনে আবিহ (পিতৃ-পরিচয়হীন যিয়াদ)-এর কুরআনবিরোধী ফরমানকে প্রত্যাখ্যানের পরেই শুক্রবার যিয়াদের নিকট এ পত্র পৌছার পূর্বের দিন মুসলিম বিশ্বের এই নন্দিত সিপাহসালার খুরাসানের গভর্নর রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সাদা ধবধবে কাফনের কাপড় পরিধান করে জুমআর নামাযে ইমামতী করতে আসেন।

জনগণের উদ্দেশ্যে জুমআর খুতবা প্রদান করেন। খুতবাশেষে সমবেত মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে বলেন:
'হে ভাইয়েরা! আমি জীবনের প্রতি একান্তই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছি। আমি আল্লাহর কাছে একটি দু'আ করছি আপনারা সবাই আমার দু'আর সাথে সাথে আমীন বলুন।'

অতঃপর তিনি দু'আ করতে থাকেন:
'হে আল্লাহ, তুমি যদি আমার মঙ্গল ও কল্যাণ চাও, তাহলে অনতিবিলম্বে আমাকে তোমার কাছে ডেকে নাও...। তাঁর নির্দেশ মোতাবেক সমবেত মুসল্লীগণ আমীন আমীন বলেন...।'

মহান আল্লাহ রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দু'আ সাথে সাথে কবুল করেন এবং সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পূর্বেই তাঁর পবিত্র আত্মাকে তাঁর রহমতের সুমহান স্থান ইল্লিয়‍্যীনে উঠিয়ে নেন।

টিকাঃ
১. উসদুল গাবাহ: ২য় খণ্ড, ২০৬ পৃ.
২. তারীখুত তাবারী: ৪র্থ খণ্ড, ১৮৩-১৮৫ পৃ. ৫ম খণ্ড, ২২৬, ২৮৫, ২৮৬ ও ২৯১ পৃ.
৩. আল ইসাবাহ: ১ম খণ্ড, ৪০৫ পৃ.
৪. আল কামেল ফিত তারীখ: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৫. জুমহারাতুল আনসাব: ৩৯১ পৃ.
৬. তাহযীবুত তাহযীব : ৩য় খণ্ড, ২৪৪ পৃ.
৭. হায়াতুস সাহাবা: ২য় খণ্ড, ১৬৮ ও ২৬৮ পৃ.

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)

📄 আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ)


‘জান্নাতী ব্যক্তিকে দেখে যদি কেউ নিজের চক্ষু শীতল করতে চায়, সে যেন আবদুল্লাহ ইবনে সালামকে দেখে।’

হুসাইন ইবনে সালাম ইসলামপূর্ব শহর ইয়াসরিবের অধিবাসী ইহুদী পাদ্রিদের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা ও সর্বজনস্বীকৃত মহাজ্ঞানী নন্দিত ও পূজনীয় ব্যক্তি।

জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মদীনার সর্বস্তরের জনসাধারণের সম্মানের পাত্র। তিনি পরহেযগারী, দীনদারী, সত্যবাদিতা, নিষ্ঠা ও আমানতদারীতার এক বিরল ব্যক্তিত্ব।

তিনি এতবড় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও শ্রদ্ধাভাজন হওয়া সত্ত্বেও যেমন একান্তই ছিলেন সহজ-সরল জীবনের অধিকারী, তেমনি ছিলেন সদালাপী, মিষ্টভাষী, কঠোর পরিশ্রমী। সময়ের সদ্ব্যবহারকারী হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন তিনি। সর্বদাই তাঁর সময়কে তিনি তিন ভাগে ভাগ করে কাজে লাগাতেন।

প্রথম অংশ: গির্জায় ওয়ায-নসীহত, বক্তৃতা-বিবৃতি ও ইবাদত-বন্দেগীতে।
দ্বিতীয়াংশ: খেজুর বাগানের পরিচর্যা- বৃক্ষ পরিষ্কার ও নর-নারী গাছের ফুলের তালকিহ বা মিলনকর্মসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজে।
তৃতীয়াংশ: তাওরাত কিতাবের ওপর ব্যক্তিগত লেখাপড়া ও গবেষণায়।

যখনই তিনি তাওরাত পাঠ করতেন এবং নবীকুলের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর মক্কার বুকে আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণীর আলোচনা পেতেন, তখন তিনি তা নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনায় নিমগ্ন হয়ে পড়তেন।

ভবিষ্যদ্বাণীর আলোকে তিনি শেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর আবির্ভাব সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন। তাঁর প্রকৃতি, গুণাবলি ও পরিচয়ের নিদর্শনসমূহ এবং স্থান-কাল-সময় ইত্যাদির যোগ-বিয়োগ ও চিন্তা-ভাবনা করতে করতে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে পড়তেন। নবীর জন্মভূমি থেকে ইয়াসরিবে হিজরত করে এখানেই তাঁর বসবাস করার সময় ঘনিয়ে এসেছে বুঝতে পেরেও তাঁর চেহারা হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠত।

তাওরাতে যখনই শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের এই অধ্যায় পাঠ করতেন অথবা চিন্তা-ভাবনা করতেন, তখনই আল্লাহর কাছে এটাই প্রত্যাশা করতেন, যেন তাঁকে সেই নবীর আগমনকাল পর্যন্ত দীর্ঘজীবী করা হয়। যেন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ এবং তাঁর প্রতি সর্বপ্রথম ঈমান গ্রহণ করার সৌভাগ্য দান করা হয়।

হেদায়াত ও রহমতের ভাণ্ডার নিয়ে সেই প্রত্যাশিত শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কায় আগমন ঘটল। তাঁর প্রেরণের মাধ্যমে আল্লাহ হুসাইন ইবনে সালামের দু'আর প্রতিফলন ঘটালেন। নবীজীর সাথে সাক্ষাৎ, তাঁর সাহচর্য গ্রহণ ও তাঁর ওপর অবতীর্ণ আল কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের সৌভাগ্য দান করলেন। এ জন্য আল্লাহ তাকে দীর্ঘজীবীও করেন।

প্রিয় পাঠক!
তাঁর ইসলাম গ্রহণের চিত্তাকর্ষক ঘটনার বিবরণ দেওয়ার জন্য আমরা তাঁর নিজ বর্ণনাকেই যথেষ্ট মনে করি। কারণ, তাঁর বিবরণই এ ব্যাপারে সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বোত্তম।

তিনি বর্ণনায় বলেন:
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের সংবাদ পেয়ে আমি তাঁর নাম, বংশ-পরিচয়, চারিত্রিক গুণাবলি, স্বভাব-চরিত্র, সময়কাল ইত্যাদি সঠিক তথ্যসমূহ সংগ্রহ করলাম। তাঁর এসব তথ্য তাওরাত কিতাবে বর্ণিত আলামতের সাথে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মিলাতে থাকলাম। সূক্ষ্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই করে তাঁর দাওয়াতের ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে আস্থা পোষণ করলাম। কিন্তু তাঁর এ আবির্ভাবের সংবাদ কঠোরভাবে গোপন রাখলাম। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেদিন মক্কা থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেছেন, সেদিন পর্যন্ত এ সংবাদ কাউকে বললাম না।'

‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে ইয়াসরিবে পৌছে ‘কুবা’ নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন। এক ব্যক্তি আমাদের মহল্লায় এসে লোকজনদের একত্র করে তাঁর আগমনের সুসংবাদ দেয়। আমি সেই মুহূর্তে খেজুর গাছের মাথায় চড়ে গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত ছিলাম। আমার ফুফু খালেদা বিনতে আল হারেস গাছের নিচে বসেছিলেন। সেই ব্যক্তির মুখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের সংবাদ শুনেই অকস্মাৎ আমার মুখ থেকে সরবে বের হয়ে পড়ল আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!!'

আমার মুখ থেকে সরবে আল্লাহু আকবার ধ্বনি শুনে আমার ফুফু বলে উঠলেন :
‘আল্লাহ তোমাকে নিপাত করুন। আল্লাহর শপথ, তুমি যদি আমাদের নবী মূসা ইবনে ইমরান আলাইহিস সালামের আগমনের সুসংবাদ শুনতে, তবু এর চেয়ে বেশি উৎফুল্ল হতে না।’

আমি তাকে উত্তর দিলাম :
‘ফুফু! আল্লাহর শপথ করে বলছি, ইনি আমাদের নবী মূসা ইবনে ইমরান আলাইহিস সালামের ভাই এবং তাঁরই দীন ইসলামের অনুসারী। মূসা আলাইহিস সালামকে যে উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়েছিল তাঁকেও সে উদ্দেশ্যেই প্রেরণ করা হয়েছে।’

আমার উত্তর শুনে তিনি নীরবতা অবলম্বন করেন। অতঃপর বলেন :
‘ইনিই কি সেই নবী? যাঁর আগমনের কথা তুমি আমাদের শোনাতে এবং যাঁর সম্পর্কে বলতে যে, তিনি তাঁর পূর্বের সব নবুওয়াতের সাক্ষ্য দান করবেন ও রিসালাতের সমাপ্তি এবং পূর্ণতা দানকারী হবেন? তাহলে ইনিই কি সেই প্রত্যাশিত নবী?’

আমি উত্তর দিলাম : ‘জী হ্যাঁ?’

ফুফু বললেন :
‘তাহলে এখন আমাদের কী করণীয়?’

কিন্তু আমি এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে কালবিলম্ব না করে তৎক্ষণাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। সেখানে গিয়ে দেখি যে, তাঁর অবস্থানকক্ষের দরজায় লোকজনের ভীষন ভীড়। এই ভীড় ঠেলে তাঁর নিকট পৌছলাম। তাঁর পবিত্র যবান থেকে আমি সর্বপ্রথম যা শুনি তা হলো:

أَيُّهَا النَّاسُ أَفْشُوا السلام ....
وَأَطْعِمُوا الطَّعَام .... وَصَلُّوا بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ .
تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلَامٍ .
'হে আল্লাহর বান্দাগণ, তোমরা বেশি বেশি করে সালামের প্রচলন কর, ক্ষুধার্তদেরকে খেতে দাও। রাত্রিতে জনগণ যখন ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে, তখন উঠে তাহাজ্জুদের নামায আদায় কর, তাহলে নির্বিঘ্নে ও নিশ্চিন্তে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।'

আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁর চেহারা মুবারক দেখলাম। আলাপ-আলোচনাও খুব মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করতে থাকলাম। সব দেখে-শুনে নিশ্চিত হলাম যে, নবুওয়াতের কোনো মিথ্যা দাবিদারের চেহারা এমন নূরানী হতে পারে না। অতঃপর তাঁর আরো নিকটে এলাম ও কালেমা শাহাদাতের ঘোষণায় বললাম:

'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো দ্বিতীয় ইলাহ নেই এবং এও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর প্রেরিত রাসূল।'

এই সাক্ষ্য শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন:
'তোমার নাম কী?'

উত্তর দিলাম: 'আল হুসাইন ইবনে সালাম।'

তিনি বললেন: 'না, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম।'

উত্তর দিলাম:
'জী, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম। সেই আল্লাহর শপথ করে বলছি, যিনি আপনাকে সত্য দীন সহকারে প্রেরণ করেছেন। আজ থেকে আমার অন্য কোনো নাম হোক তা আমি চাই না।'

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। বাড়িতে এসে আমার স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও অন্যান্য সকলকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানালাম। আমার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা সবাই ইসলামে দীক্ষিত হলো। তাদের সাথে সাথে আমার ফুফুও ইসলাম গ্রহণ করলেন। তখন তিনি একান্ত অশীতিপর বৃদ্ধা। তাদের ইসলাম গ্রহণের পর তাদের বললাম:

'আমার আগামী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত আমার ও তাদের ইসলাম গ্রহণের কথা ইহুদীদের থেকে যেন গোপন রাখা হয়।'

তারা সবাই হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিল। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে বললাম:

'হে রাসূলুল্লাহ! নিঃসন্দেহে ইহুদী জাতি একটি বিভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট ও মিথ্যাবাদী জাতি। তা সত্ত্বেও আমার ইচ্ছা যে, আপনি তাদের নেতৃস্থানীয়দের আপনার খিদমতে আহ্বান করুন এবং আমাকে আপনার ঘরের যে কোনো একটি স্থানে লুকিয়ে রাখুন। আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জানার পূর্বে তাদের কাছে আমার গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করুন। কারণ, তারা যদি এটা জানতে পারে যে, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, তাহলে আমাকে দোষারোপ করতে থাকবে এবং অশ্লীল ও ঘৃণিত ভাষায় গালি-গালাজ করবে।'

আমার পরামর্শ মোতাবেক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদীদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আসার পূর্বে তিনি আমাকে একটা কক্ষে লুকিয়ে রাখলেন। অতঃপর ইহুদী নেতৃবৃন্দকে দাওয়াতী আলোচনার মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণের জন্য আহ্বান জানালেন। ঈমান গ্রহণের জন্য হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য উপস্থাপন করতে থাকেন। তাদের নিকট বিদ্যমান আসমানী কিতাবসমূহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের নিদর্শন সম্পর্কে যা কিছু তারা জানে তারও উল্লেখ করেন।

তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে নিষ্প্রয়োজন ও বেহুদা তর্কে লিপ্ত হয়। সত্য ও যুক্তির পরিবর্তে তারা ঝগড়া ও বাক-বিতণ্ডার পথ অনুসরণ করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে পুরোপুরি নিরাশ হলেন, তখন তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন:

'হুসাইন ইবনে সালামকে তোমরা কিভাবে মূল্যায়ন কর?'

তারা উত্তর দিল :
'তিনি আমাদের একজন পরম শ্রদ্ধাভাজন ধর্মীয় নেতা। তাঁর পিতাও আমাদের শ্রদ্ধাভাজন নেতা ছিলেন। তিনি আমাদের এত বিরাট ধর্মীয় পাদ্রি যে, তাঁর চেয়ে বড় পাদ্রি আমাদের মধ্যে দ্বিতীয় কেউ নেই। তাঁর পিতাও অনুরূপ ছিলেন। তিনি আমাদের ধর্ম বিশেষজ্ঞ।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এ কথা শুনে বললেন:
'তোমাদের কী ধারণা? সে যদি ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে কি তোমরা ইসলাম গ্রহণ করবে?'

ইহুদী নেতারা উত্তর দিল:
'হতেই পারে না যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করবেন। আমরা তার ইসলাম গ্রহণ থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাচ্ছি।'

আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বলেন:
তাদের এসব কথাবার্তার মাঝেই আমি তাদের সামনে উপস্থিত হই এবং বলি:

'হে ইহুদী সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দীনে হক এনেছেন তা কবুল কর।'

আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমরা ভালো করেই জান যে, তিনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। তোমাদের নিকট সংরক্ষিত তাওরাত কিতাবে তাঁর নাম, পরিচয়, গুণাবলি ও বর্ণনা ইত্যাদি বিস্তারিতভাবেই লিপিবদ্ধ দেখতে পাও। তোমরা জেনে রেখো, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল এবং আমিও তাঁর ওপর ঈমান এনেছি এবং তাঁর রিসালাতের সাক্ষ্য দিচ্ছি। এও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি তাঁকে নবী হিসেবেই জানতে পেরেছি।'

এ কথা শুনে তারা সমস্বরে চিৎকার করে বলে উঠল: 'মিথ্যা বলছ, তুমি মিথ্যা বলছ।'

'আল্লাহর শপথ! তুমি আমাদের মধ্যে একজন সর্বনিকৃষ্ট পিতার ইতরতম সন্তান, মূর্খের ছেলে গণ্ড মূর্খ।'

এমন কোনো গালি নেই যে, তারা তা উচ্চারণ করল না। এসব ঘটনার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম: 'হুযূর, আমি কি আপনাকে বলিনি যে, নিঃসন্দেহে ইহুদী জাতি একটি মিথ্যা ও জঘন্য ধরনের নিকৃষ্টতম জাতি। বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা তাদের অস্থিমজ্জাগত।'

তখন থেকেই মরুভূমির তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির ঠাণ্ডা পানির প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মতোই আবদুল্লাহ ইবনে সালাম ইসলামের শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়েন। গভীর আন্তরিকতার সাথে আল কুরআন অধ্যয়ন করতে থাকেন। এমন একটি মুহূর্তও তাঁর কাটেনি যে মুহূর্তে তিনি আল কুরআনের তিলাওয়াত করতেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এমন নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেন যে, সার্বক্ষণিকভাবে ছায়ার মতো অনুসরণ করতেন। নিজেকে সর্বদাই জান্নাতের কাজের জন্য ওয়াকফ করে দেন। যে কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সেই সুসংবাদে ধন্য করেন, যা সাহাবীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সেই সুসংবাদেরও একটি ঘটনা আছে, যা কায়েস ইবনে উবাদা ও অন্যান্য রাবী বর্ণনা করেছেন। কায়েস ইবনে উবাদা বর্ণনা করেন:

'একদা মদীনা মুনাওয়ারায় মসজিদে নববী শরীফের এক ইলমী মজলিস বা আলোচনাসভায় উপস্থিত ছিলাম। সে মজলিসে এক শেখও উপস্থিত ছিলেন। তাঁর কথাবার্তায় ভীষণভাবে আকৃষ্ট হচ্ছিলাম। তিনি উপস্থিত সুধীদের কাছে মিষ্টি ভাষায় মজার মজার আলোচনা করছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর লোকেরা বলাবলি করছিল যে, যদি কেউ জান্নাতী ব্যক্তিকে দেখতে চায়, তবে সে যেন এই ব্যক্তিকে দেখে।'

প্রশ্ন করলাম: 'এই ব্যক্তি কে?'

তারা উত্তর দিল: 'আবদুল্লাহ ইবনে সালাম।'

আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম:
'আল্লাহর শপথ, আমি অবশ্যই তাঁকে অনুসরণ করব। তিনি যেদিকে রওয়ানা হলেন আমিও সেদিকেই তাঁকে অনুসরণ করতে থাকলাম। তিনি যেতে যেতে মদীনার এক শহরতলিতে পৌঁছে তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করলেন।'

আমি তাঁর সাথে দেখা করতে চাইলে তিনি আমাকে তাঁর সাথে দেখা করার অনুমতি দিয়ে বললেন: 'হে ভাইপো, কী উদ্দেশ্যে এসেছ?'

তাঁকে বললাম: 'আপনি যখন মসজিদ থেকে বের হয়ে আসছিলেন, তখন লোকজন বলাবলি করছিল যে, জান্নাতী ব্যক্তিকে দেখে কেউ নিজের চক্ষু শীতল করতে চাইলে সে যেন এই ব্যক্তিকে দেখে। এই সংবাদ শুনে আমি বিস্তারিত জানার জন্য আপনার পেছনে পেছনে ছুটলাম। লোকেরা কিভাবে জানল যে, আপনি জান্নাতবাসী পুরুষ?'

তিনি উত্তর দিলেন: 'হে বৎস, জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে আল্লাহই ভালো জানেন যে, কে জান্নাতী আর কে নয়।'

আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম: 'হ্যাঁ ঠিক আছে, কিন্তু তারপরও তো কোনো একটি কারণ নিশ্চয়ই আছে।'

তিনি উত্তরে বললেন, হ্যাঁ, তারও একটা কারণ আছে।

বললাম: 'তাহলে সে কারণটি দয়া করে বলুন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম পুরস্কারে পুরস্কৃত করুন।'

তখন তিনি বললেন:
'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় এক রাতে স্বপ্নে দেখি যে, আমার নিকট এক ব্যক্তি এসে আমাকে বলছে, দাঁড়ান। আমি দাঁড়িয়ে গেলে তিনি আমার হাত ধরে চলতে থাকেন। আমি তার সাথে কিছুদূর চলার পর বাম দিকে একটি রাস্তা দেখতে পেলাম। ঐ রাস্তায় চলতে মনস্থ করলে তিনি বললেন, এ রাস্তায় যেতে নেই। এ রাস্তা আপনার জন্য নয়। কিছুক্ষণ পর দেখি যে, আমার ডান পাশে সুপ্রশস্ত এক রাস্তা।'

তিনি তখন আমাকে বললেন:
'এই পথে চলুন। আমি তাঁর কথামতো সে রাস্তায় চলতে আরম্ভ করলাম। এমনকি ফুল-ফলে সুসজ্জিত মনোরম এক বিশাল বাগানে পৌছে গেলাম। যেমনই সবুজ সেখানকার গাছপালা, তেমনই সুন্দর তার ফুল-ফল। তার মধ্যবর্তী স্থানে বিরাট এক লৌহ স্তম্ভ। যার ভিত যমীনে ও মাথা আকাশে, যার মাথায় সোনার একটি হাতলিবিশেষ। আমার সঙ্গী বললেন, স্তম্ভে উঠুন। তাঁকে বললাম ওতে উঠা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।'

'অতঃপর একজন খাদেম এসে ওখানে উঠার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করল। তার সহযোগিতায় আমি উঠতে উপরে থাকলাম। এমনকি সেই স্তম্ভের শীর্ষে পৌছে গেলাম। শীর্ষে পৌছে সেই হাতলিটি শক্ত করে ধরে সকাল পর্যন্ত ঝুলতে থাকলাম। এমনকি এভাবেই আমার ঘুম ভেঙে গেল।'

সকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে স্বপ্নের বিস্তারিত বর্ণনা দিলাম। তা শুনে তিনি বললেন,
'তুমি বামপাশে যে রাস্তা দেখেছ তা বামপন্থী (দোযখবাসীদের) পথ এবং ডানপাশের যে রাস্তা ধরেছ তা ডানপন্থীদের (জান্নাতীদের) পথ। আর সবুজ সুন্দর মনোরম বাগান যা তোমাকে আকর্ষণ করেছে, সেটি হলো ইসলাম। আর মাঝখানের স্তম্ভ হলো দীনের স্তম্ভ এবং হাতলটি হলো 'উরওয়াতুল উস্কা' বা দৃঢ় রশি- তুমি মৃত্যু পর্যন্ত এটি ধরে থাকবে।'

টিকাঃ
১. সাল ইসাবাহ: আস সাআদাহ সংস্করণ: ৪র্থ খণ্ড, ৮০-৮১ পৃ.
২. উসদুল গাবাহ: ৩য় খণ্ড, ১৭৬-১৭৭ পৃ.
৩. আল ইসতিয়াব: হায়দরাবাদ সংস্করণ: ১ম খণ্ড, ৩৮৩-৩৮৪ পৃ.
৪. আল জারহু ওয়াত তা'দীলু: ২য় খণ্ড, ৬২-৬৩ পৃ.
৫. তাজরীদু আসমাউস সাহাবা: ১ম খণ্ড, ৩৩৮-৩৩৯ পৃ.
৬. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১ম খণ্ড, ৩০১-৩০৩ পৃ.
৭. তারিখু খলীফাতু ইবনে খাইয়াত: ৮ পৃ.
৮. আল ইবরু: ১ম খণ্ড, ১৫-৩২ পৃ.
৯. শাজারাতুযযাহাব: ১ম খণ্ড, ৫৩ পৃ.
১০. তারীখুল ইসলাম লিযযাহাবী: ২য় খণ্ড, ২৩০-২৩১ পৃ.
১১. তারীখু দামেস্ক লিইবনে আসাকির: ৭ম খণ্ড, ৪৪৩-৪৪৮ পৃ.
১২. তাযকিরাতুল হুফ্ফায়: ১ম খণ্ড, ২২-২৩ পৃ.
১৩. আসসীরাতুন নুবুবিয়াহ লিইবনে হিশাম: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১৪. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৩য় খণ্ড, ২১১-২১২ পৃ.
১৫. হায়াতুস সাহাবা: ৪র্থ খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00