📄 উতবা ইবনে গাযওয়ান (রাঃ)
‘ইসলামে উত্তা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর একটি বিশেষ স্থান রয়েছে।’
-উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু
আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইশার নামাযান্তে তাঁর বিছানায় একটু বিশ্রাম করতে এসেছেন। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর রাতের আঁধারে জনগণের অবস্থা সরেজমিনে দেখার জন্য প্রতি রাতের ন্যায় আজও তিনি টহলে বের হয়ে পড়বেন।
কিন্তু আমীরুল মুমিনীনের চোখে নিদ্রা নেই। তা যেন আজ তাঁর থেকে হাজার মাইল দূরে। আজই তাঁর কাছে পারস্য বাহিনীর সাথে যুদ্ধরত মুসলিম সেনাপতির দূত এমন এক বার্তা নিয়ে এসেছে, যা তাঁকে উৎকণ্ঠিত করে তুলেছে।
'মুসলিম বাহিনীর হাতে পরাজিত পারস্য বাহিনী পশ্চাৎপসরণ করে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে ওৎ পেতে বসেছে। যখনই তাদের ওপর মুসলিম বাহিনী চূড়ান্ত আক্রমণের চেষ্টা চালায়, তখনই বিভিন্ন দিক থেকে তাদের জন্য সাহায্য এসে পৌঁছায়। ফলে মুসলিম বাহিনীর সামনে তারা দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। তাদের এই প্রতিরোধের মোকাবেলায় মুসলিম বাহিনী না নতুন সৈন্য সংগ্রহ করতে পারছে, না চূড়ান্তভাবে আক্রমণ করতে পারছে।'
তাঁকে আরো জানানো হয়েছে যে, 'পরাজিত এই সৈন্যদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি হলো 'উবুল্লাহ শহর', সেখান থেকে পারস্য সৈন্যদের বিপুল পরিমাণ রসদ ও জনশক্তি যোগান দেওয়া হচ্ছে।'
উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু চিন্তা করলেন: 'পারস্য সৈন্যদের রসদ সরবরাহ কেন্দ্র 'উবুল্লাহ' শহরকে দখল করে নেওয়া প্রয়োজন। যেন তাদের রসদ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।'
কিন্তু মুসলিম সৈন্যের স্বল্পতাই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মদীনা থেকে সৈন্য প্রেরণ করে মুসলিম বাহিনীকে শক্তিশালী করাও নানা কারণে অসুবিধাজনক। কেননা, মদীনার যুদ্ধক্ষম যুবক, বৃদ্ধ এবং নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সিপাহসালাররা জিহাদের উদ্দেশ্যে আগেই চলে গেছেন। মদীনায় যারা রয়ে গেছেন, তাদের সংখ্যা এ কাজের জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়।
উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সিদ্ধান্ত নিলেন: 'এই মুষ্টিমেয় সামরিক শক্তি ব্যবহারের জন্য অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন, বিচক্ষণ সেনাপতির রণকৌশলকে কাজে লাগিয়ে বিজয় সুনিশ্চিত করতে হবে।'
তীরের বোঝা সামনে ছড়িয়ে দিয়ে এক এক করে পছন্দসই তীর বেছে নেওয়ার মতো তিনি সকলের চেহারাই মনশ্চক্ষু দিয়ে দেখে নিলেন। কিন্তু কাউকে তাঁর কাছে আশানুরূপ মনে হলো না। তিনি বারবার এ বিষয়ে চিন্তা করতে থাকলেন। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলেন না। এক পর্যায়ে হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন:
'হ্যাঁ, এমন একজনকে পেয়েছি, যিনি এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।'
এবার খালীফাতুল মুসলিমীন নিদ্রার মনস্থ করলেন এবং মনে মনে বলতে থাকলেন:
'তিনি এমন এক মুজাহিদ, যিনি বদর, উহুদ, খন্দক এবং অন্যান্য যুদ্ধের ময়দানে তাঁর বীরত্বের প্রমাণ রেখেছেন। এমনকি ইয়ামামার যুদ্ধ-ময়দানও যার কৃতিত্বের সাক্ষ্য দেয়। সে যুদ্ধে তাঁর দৃঢ় ভূমিকার কথাও স্মরণীয়। যার তলোয়ার চালনায় কোনো আঘাত ফসকে যায় না, যার নিক্ষিপ্ত তীরও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। দু'বার যিনি হিজরত করার সৌভাগ্যও অর্জন করেছেন এবং দুনিয়ার বুকে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে সপ্তম ব্যক্তিও তিনি।'
সকাল হয়ে গেলে তিনি উত্ত্বা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তাঁর কাছে ডেকে পাঠালেন। তারপর মাত্র তিন শত সাত বা নয় জন যোদ্ধার সমন্বয়ে গঠিত এ বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে তাঁকে মনোনীত করলেন। তাঁর হাতে জিহাদের পতাকা তুলে দিয়ে তাঁকে অতি শীঘ্রই সামরিক সাহায্য পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিলেন।
এই স্বল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে উত্ত্বা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রওয়ানা হওয়ার প্রাক্কালে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর সেনাপতিকে নসীহত করেন:
'হে উত্ত্বা! আমি তোমাকে 'উবুল্লাহ' অভিযানে পাঠাচ্ছি। 'উবুল্লাহ' শত্রুদের সুরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। আল্লাহর কাছে দু'আ করছি, যেন তিনি এ ঘাঁটি বিজয়ে তোমাকে সাহায্য করেন। সেখানে পৌঁছে দুর্গে অবস্থানকারী শত্রুদের আল্লাহর পথে আহ্বান জানাও। তারা যদি তোমার আহ্বানে সাড়া দেয়, তাহলে তাদেরকে খোশ আমদেদ জানাবে। যারা ইসলাম গ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করবে, তারা যেন অপমানিত ও লাঞ্ছিত মনোভাব নিয়ে জিযিয়া কর প্রদান করে। যদি তারা এ দুটি শর্ত প্রত্যাখ্যান করে, তাহলেই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। বিজয় না হওয়া পর্যন্ত দুর্বলতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। তোমাকে যে পদে সমাসীন করা হয়েছে, দায়িত্বশীল হিসেবে তোমার অধীনস্থ সৈন্যদের সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করবে।'
'সাবধান! তোমার নাফসকে এতটুকু প্রশ্রয় দেবে না, যেন সে তোমাকে অহঙ্কারের দিকে ধাবিত করে। যদি তুমি সীমা লঙ্ঘন কর, তাহলে তুমি তোমার আখিরাতকে ধ্বংস করবে। তুমি ভালো করে জান যে, তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছ এবং মানবেতর জীবন থেকে মহৎ জীবন পেয়েছ। তুমি আজ এমন এক বাহিনীর সেনাপতি, যারা তোমার নির্দেশ পালনে সর্বদা প্রস্তুত। তুমি যা নির্দেশ দেবে সাথে সাথেই তারা তা পালন করবে। তোমার অঙ্গুলি সংকেত মাত্রই এর বাস্তবায়ন হবে। এর থেকে উত্তম কোনো নিয়ামত কী হতে পারে? যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়, তাহলে সবই বরবাদ হবে। যদি প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ কর, তাহলে নিজেকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। আমরা উভয়েই এ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি।'
উত্তা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর এই ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে ইরানের 'উবুল্লাহ' শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। সাথে ছিলেন তাঁর স্ত্রীসহ অন্য পাঁচজন সৈন্যের স্ত্রী ও বোন। এদের নিয়ে পথ অতিক্রম করতে করতে যখন উবুল্লাহর সন্নিকটে নারিকেলের বাগানবিশিষ্ট জনবসতির নিকট যাত্রা বিরতি করলেন, তখন তাদের সাথে বহন করে আনা খাদ্যভাণ্ডার একেবারেই শেষ। পুরো বাহিনীই ক্ষুধার সম্মুখীন। ক্ষুধা অসহ্য হয়ে উঠলে সেনাপতি উত্তা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কয়েকজন যোদ্ধাকে আশপাশ এলাকা থেকে খাদ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দিলেন। তারা খাবার সংগ্রহের জন্য বের হলেন। খাদ্য সংগ্রহের এক চমৎকার কাহিনী তাদেরই এক সাথী এভাবে বর্ণনা করেছেন যে:
'খাদ্যের সন্ধান করতে করতে আমরা এক জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম। সেখানে আমরা দুটি বস্তায় দু ধরনের খাবারযোগ্য জিনিস দেখতে পেলাম। যার একটা হলো খেজুর আর অন্যটা হলো হলুদ শক্ত খোসা আবৃত ছোট ছোট শস্য দানা। আমরা এ দুই প্রকারের খাদ্যই সৈন্যদের জন্য নিয়ে এলাম।'
আমাদের একজন এই ছোট ছোট দানা দেখে বললেন:
'এটা বিষ। শত্রুরা আমাদের জন্য তৈরি করে রেখেছে। তাই এর ধারে-কাছে যাওয়াও ঠিক হবে না। তাই আমরা খেজুরের দিকে মনোনিবেশ করলাম এবং খেজুরই খেতে থাকলাম। আমরা ছোট দানাবিশিষ্ট খাদ্যকে পরিহার করলাম। এ সময় আমাদের একটি ঘোড়া রশি ছিঁড়ে সেখানে এসে তা খেতে থাকে। আল্লাহর শপথ! আমরা আশঙ্কা করছিলাম যে, ঘোড়াটি মারা যাবে। তাই মৃত্যুর আগেই সেটিকে যবাহ করে এর গোশত কাজে লাগাব এমন চিন্তা করতে লাগলাম।'
কিন্তু ঘোড়ার মালিক এসে বলল:
'ঘোড়াটিকে এ অবস্থায়ই থাকতে দাও, আমি আজ রাতে এটিকে পাহারা দিয়ে রাখব। যদি এর মৃত্যুর আশঙ্কা দেখি, তাহলে যবেহ করে ফেলব।'
সকালে আমরা দেখলাম :
'ঘোড়াটি সুস্থই আছে। কোনোরূপ বিষাক্ত প্রতিক্রিয়া এর দেহে নেই।'
আমার বোন আমাকে বলল :
'আমি আব্বার কাছে শুনেছি, বিষাক্ত খাদ্য রান্না করলে বা আগুনে তাপ দিলে এর বিষক্রিয়া নষ্ট হয়ে যায়।'
অতঃপর কিছু দানা নিয়ে হাড়িতে জাল দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পরেই সে বলতে থাকে :
'তোমরা এসে দেখ, এই দানাগুলো লাল হয়ে যাচ্ছে। অতঃপর সে এর খোসা ফেলে দিলে সাদা সাদা দানা বের হয়ে এল এবং তা খাবার জন্য প্রস্তুত করল।'
তারপর আমরা সেগুলো খাওয়ার জন্য বড় বড় প্লেটে রাখলাম। সেনাপতি উত্তা আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন :
'খাদ্য গ্রহণের পূর্বে বিসমিল্লাহ পড়ে নাও, তারপর খেতে থাক।' আমরা দেখতে পেলাম তা এক সুস্বাদু খাদ্য। তারপর আমরা এই ছোট ছোট দানাবিশিষ্ট খাদ্য সম্পর্কে জানতে পারি যে, এর নাম হলো ধান।'
উত্তা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ ছোট বাহিনীকে যে উবুল্লাহ শহরের দিকে পাঠানো হয়েছিল, তা ছিল দাজলা নদীর তীরবর্তী সুরক্ষিত একটি শহর। এ শহর ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের অস্ত্রগুদাম। প্রাচীরবেষ্টিত এই শহরের প্রবেশদ্বারগুলোর শৃঙ্গে ছিল শত্রুবাহিনীর গতিবিধির প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখার চৌকিসমূহ। এতসব সত্ত্বেও উত্তা ইবনে গাযওয়ানের আক্রমণ থেকে তারা উবুল্লাহ শহরকে রক্ষা করতে পারল না। যদিও তাঁর সমরশক্তি ছিল একেবারেই নগণ্য ও অস্ত্রের ছিল খুবই অপ্রতুলতা। অপরদিকে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে বহু কষ্টে মাত্র ছয় শত যোদ্ধা দিয়ে সহযোগিতা করতে পেরেছিলেন। যাদের সাথে ছিল স্বল্পসংখ্যক মহিলা। যুদ্ধাস্ত্র বলতে তাদের হাতে ছিল মাত্র তরবারি ও বর্শা। পারস্যের অত্যাধুনিক অস্ত্রের মোকাবেলায় বুদ্ধিমত্তার সাথে সেনাপতির দ্বারা সেগুলোর ব্যবহারই ছিল মুসলিম বাহিনীর একমাত্র সম্বল।
উত্তা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মহিলাদের বর্শার মাথায় উড়ানোর জন্য ঝাণ্ডা তৈরি করালেন। যেন তারা মুসলিম বাহিনীর বেশ পিছনে অবস্থান নিয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে থাকে। তাদেরকে এ নির্দেশও দেওয়া হলো যে, মুসলিম বাহিনীর অগ্রগামী অংশ উবুল্লাহ শহরের কাছে পৌঁছলে তার পেছনের অংশ এমনভাবে ধুলা উড়াতে থাকবে, যেন আকাশ ধুলায় ধূসরিত হয়ে যায়। এতে যেন তারা কোনো দুর্বলতা না দেখায় এবং মহিলারা যেন সাহসিকতার সাথে ধুলা উড়াতে উড়াতে মুসলিম বাহিনীর অনুসরণ করতে থাকে। মুসলিম বাহিনী উবুল্লাহ শহরের সন্নিকটে পৌঁছতেই তাদের প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে পারস্য সৈন্যরা বেরিয়ে আসে। মুসলিম বাহিনীকে হঠাৎ তাদের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত দেখে সবাই হতভম্ব হয়ে যায়। তারা আরও দেখে যে, এ বাহিনীর পিছনে আকাশ ধুলায় ধূসরিত হয়ে পড়েছে এবং তার ফাঁকে ফাঁকে ঝাণ্ডা উড়ছে। এসব আলামত থেকে পারস্য বাহিনী মনে করল যে, পিছনে আরো অগণিত সৈন্য অগ্রগামী বাহিনীর সাহায্যার্থে অগ্রসর হচ্ছে। এ দেখে তারা তৎক্ষণাৎ নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করতে থাকে যে:
'দ্বারপ্রান্তে মুসলিম অগ্রগামী দল, নিশ্চয়ই পিছনে রয়েছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুসংগঠিত নিয়মিত বাহিনী। তাদের সংখ্যা অনেক হওয়ার কারণে তাদেরই ঘোড়ার খুরের আঘাতে আকাশ ধূলি ধূসরিত হচ্ছে। আমরা সংখ্যায় মুসলিম বাহিনীর তুলনায় একান্তই নগণ্য।'
এসব চিন্তা-ভাবনায় তাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। মুসলিম বাহিনীকে প্রতিরোধের পরিবর্তে তারা দিশেহারা হয়ে দ্রুত পালাতে থাকে। তাদের হাতের কাছে হালকা ও মূল্যবান সামগ্রী যে যা পারল তা নিয়ে দ্রুতগতিতে দাজলা নদীতে নোঙ্গর করে রাখা নৌকাগুলোতে গিয়ে উঠে উبুল্লাহ শহর থেকে পালাতে থাকল।
বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে রণ-চতুরতা প্রয়োগ করে উত্ত্বা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রক্তপাতহীন বিজয় লাভের মাধ্যমে উবুল্লাহ শহরে প্রবেশ করলেন। অতঃপর এ অভিযানকে অব্যাহত রেখে উবুল্লাহর পার্শ্ববর্তী শহর-গ্রামগুলো অধিকার করতে থাকলেন। এসব অভিযানে মুসলিম বাহিনী অগণিত মালে গনীমত অর্জন করলেন। প্রতিজনের অংশে সেগুলো এত পরিমাণ দেওয়া হলো যে, তা কল্পনা করাও কঠিন। এমনকি তাদের একজন মদীনায় ফেরত এলে উবুল্লাহ বিজয়ীদের অবস্থা জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তরে বললেন:
'তাদের অবস্থা আর কী জিজ্ঞাসা করছেন, রৌপ্য ও স্বর্ণমুদ্রাকে খাঁচি হিসেবে মেপে মেপে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে।'
এ সংবাদ শুনে মদীনার জনগণ এতই খুশি হলো যে, বসবাসের উদ্দেশ্যে উবুল্লাহর দিকে যেতে লাগল।
সীমাহীন প্রাচুর্যের এই শহরে সৈন্যদের বেশি দিন রাখলে তারা স্থানীয় অধিবাসীদের ন্যায় ভোগ-বিলাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়তে পারে ভেবে উত্ত্বা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ধন-দৌলতের এত প্রাচুর্যের মাঝে থাকলে শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় ভাঁটা পড়বে ও যুদ্ধ-জিহাদে অনীহা দেখা দেবে। এসব আশঙ্কা করে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে উবুল্লাহ শহর থেকে দূরে সেনানিবাস হিসেবে বসরা শহর তৈরির অনুমতি চেয়ে পাঠালেন। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর দূরদর্শিতায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বসরায় সেনানিবাস গড়ার অনুমতি প্রদান করেন। খালীফাতুল মুসলিমীনের অনুমতি পেয়ে উত্ত্বা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নতুন শহরের ডিজাইন ও ম্যাপ তৈরি করলেন। সর্বপ্রথম তিনি বসরায় বিশাল জামে মসজিদ তৈরি করলেন। তাকে আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামরিক প্রশিক্ষণ, সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করলেন। যার বদৌলতে তিনি ও তার বাহিনী শত্রুদের ওপর বিজয় অর্জন করতে এবং ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হলেন। অতঃপর মুসলিম বাহিনী একের পর এক শহর, নগর, গ্রাম-গঞ্জ জয় করে চলল। এমনকি এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে বিজিত শহরে তাদের নামে জায়গা বরাদ্দ ও নিজেদের জন্য বাড়ি-ঘর নির্মাণের প্রতিযোগিতা আরম্ভ হয়ে গেল; কিন্তু উত্তা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নিজের নামে কোনো জায়গাও বরাদ্দ নিলেন না এবং কোনো ঘর-বাড়িও নির্মাণ করলেন না। সৈনিকদের জন্য নির্ধারিত একটি সাধারণ তাঁবুতে বসবাস করাকেই তিনি অগ্রাধিকার দিলেন। কেননা, তিনি তাঁর পবিত্র অন্তরে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ঘর-বাড়ির চেয়ে পরকালের চিরস্থায়ী জান্নাতের বিরাট আশাকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছিলেন।
উত্ত্বা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন যে, বসরায় অবস্থানরত সৈন্যরা দুনিয়ার প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। ভোগ-বিলাসে এতই নিমগ্ন হয়ে পড়েছে যে, তারা নিজের সত্তাকেই ভুলে যাচ্ছে। কিছুদিন পূর্বেও যে বাহিনীর সদস্যরা ধান থেকে চাল বের করে তা দ্বারা সুস্বাদু খাদ্য হতে পারে বলে জানত না। মাত্র কিছুদিনের ব্যবধানে পারসিকদের বিখ্যাত মিষ্টি সামগ্রী 'ফালুযাজ' এবং ঘি, মধু, মাখন এবং পেস্তাদানা ইত্যাদির সমন্বয়ে তৈরি 'লাওযিনাজ' নামক খাদ্য সামগ্রী আজ তাদের নিত্যদিনের খাদ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত।'
তাদের এ অবস্থা দেখে তিনি দুনিয়ার পার্থিব মোহ ও প্রয়োজনের চেয়ে অধিক পাওয়ার চেষ্টা না করে পরকালের প্রতি আরও অধিক আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন।
অতঃপর তিনি কুফার জামে মসজিদে সবাইকে সমবেত করে তাদের উদ্দেশ্যে বললেন:
'সমবেত ভাইয়েরা! এ দুনিয়া ধ্বংসশীল ও ক্ষণস্থায়ী, যে তার অন্তিম লগ্ন অতিবাহিত করছে এবং আপনারা এ দুনিয়া থেকে সত্বর চিরস্থায়ী বাসস্থানে ফিরে যেতে বাধ্য। অতএব, আপনারা উত্তম পাথেয়সহ সেখানে গমন করার চিন্তা করুন। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সপ্তম সাহাবী। গাছের পাতা ছাড়া উত্তম খাদ্য বলতে আমাদের ভাগ্যে আর কিছুই জোটেনি, যা খেয়ে আমাদের মুখে ঘা হয়ে যেত। পরিত্যক্ত এক টুকরা চাদর পেয়ে একদিন আমি ও সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম। যার একাংশ দিয়ে আমি জামা তৈরি করেছিলাম এবং অন্য অংশ দিয়ে সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস পরিধানের লুঙ্গি হিসেবে ব্যবহার করেছিল। আজ আমরা উভয়ই এক এক প্রদেশের গভর্নর। নিজের নাফসের কাছে বিরাট ব্যক্তিত্ব ও সম্মানিত এবং আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট ও লজ্জিত হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।'
অতঃপর একজনকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে তাদেরকে পেছনে রেখে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে পড়েন। মদীনায় খালীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিদমতে পৌঁছে তাঁকে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি, কুফা ও বসরার গভর্নরের পদ থেকে অব্যাহতি দানের আবেদন জানান। হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও তাঁকে দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে কুফায় প্রত্যাগমনের জন্য চাপ দিতে থাকেন। পরস্পরের অনুরোধ ও পাল্টা অনুরোধের এক পর্যায়ে তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নির্দেশ মেনে নিতে বাধ্য হন। মনঃক্ষুণ্ণ অবস্থায় কুফার উদ্দেশ্যে উটে চড়ে এই দু'আ করতে থাকেন:
'হে আল্লাহ! আমাকে কুফায় আর ফিরিয়ে নিও না, হে আল্লাহ! আমাকে কুফায় আর ফিরিয়ে নিও না।'
আল্লাহ সাথে সাথে তাঁর দু'আ কবুল করলেন। মদীনা থেকে কিছু দূরে যেতে না যেতেই তাঁকে বহনকারী উটটি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে তিনিও ছিটকে মাটিতে পড়ে গিয়ে সাথে সাথে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
টিকাঃ
১. আমাদের দেশে ঘোড়ার গোশ্ত খাওয়ার প্রচলন নেই। অথচ শরীআতের দৃষ্টিতে এর গোশ্ত হালাল.
২. আল ইসাবা: জীবনী নং ৫৪১১.
৩. আল ইসতিয়াব: বিহামিশিল ইসতিয়াব: ৩য় খণ্ড, ১১৩ পৃ.
৪. তারীখুল ইসলাম লিযযাহাবী: ২য় খণ্ড, ৭ পৃ.
৫. উসদুল গাবাহ: ৩য় খণ্ড, ৩৬৩ পৃ.
৬. তারীখু খলীফাতু ইবনে খিয়াত: ১ম খণ্ড, ৯৫-৯৮ পৃ.
৭. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৭ম খণ্ড, ৪৮ পৃ.
৮. মু'জামুল বুলদান: বসরা বিষয়ক আলোচনা: ১০ খণ্ড, ৪৩০ পৃ.
৯. আত তাবাকাতুল কুবরা লি ইবনে সা'দ: ৭ম খণ্ড, ১ পৃ.
১০. তারীখুত তাবারী: ১০ খন্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১১. সিয়ারু ই'লামুন নুবালা: ১ম খণ্ড, ২২১-২২২ পৃ.
১২. হায়াতুস সাহাবা: ৪র্থ খণ্ড, সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
📄 নু'আইম ইবনে মাসউদ (রাঃ)
‘নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জানতেন, শত্রুপক্ষকে ধোঁকা দেওয়াও যুদ্ধেরই একটি কৌশল।’
তীক্ষ্ণ মেধার জাগ্রতপ্রাণ, দৃঢ় মনোবল, কর্মচঞ্চল ও ঝটপট কঠিন পরিস্থিতি বুদ্ধিমত্তার সাথে মোকাবেলা করতে পারঙ্গম মরুস্তান যুবক নু'আঈম ইবনে মাসউদ। মুহূর্তেই বাড়িতে, পর মুহূর্তেই সফরে, তার রুটিন কী তা একমাত্র সে-ই জানে। বহুমুখী গুণাবলির অধিকারী, নাচ, গান ও নর্তকীপ্রিয় নজদের সৌখিন এ যুবকের আমোদ-প্রমোদ ও বিলাসিতার যেমন জুড়ি ছিল না, তেমনি নাচ গানের প্রতিও তার ছিল প্রবল ঝোঁক। এসব নানা কারণেই সে ইয়াসরিবের ইহুদীঘেঁষা হয়ে ওঠে।
আমোদ-প্রমোদ, গান ও বাজনার ইচ্ছা করলেই সে ইয়াসরিবের পথে রওনা হতো। তার ভোগ-বিলাসের খায়েশ পূরণের জন্য ইয়াসরিবের ইহুদীদের অঢেল অর্থ দান করত। এসব কারণে সর্বদাই তার ইয়াসরিবে যাতায়াত অব্যাহত থাকত। ইহুদীদের বিশেষ করে বনু কুরাইযা গোত্রের সাথে তার সম্পর্কও ছিল নিবিড় ও মধুর। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানবজাতির কল্যাণ এবং মঙ্গলের জন্য মক্কায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দীনে হক ও হেদায়াতসহ প্রেরণ করলেন। প্রথমে মক্কায় ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়লে নু'আঈম ইবনে মাসউদ ইসলাম থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ মাত্র একটিই, ইসলাম গ্রহণ তার ভোগ-বিলাস ও আমোদ-প্রমোদে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। তাহলে তো এ দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সবই পরিহার করতে হবে তাকে। এসব ভেবে সে ইসলামকে শুধু এড়িয়েই চলল না; বরং যারা ইসলামের চরম শত্রু তাদের সহযোগী হয়ে উঠল।
নু'আঈম ইবনে মাসউদ ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে খন্দক বা আহযাবের যুদ্ধে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। তার এই পরিবর্তিত ঘটনা সে নিজ হাতেই পরবর্তীতে লিপিবদ্ধ করে। ইতিহাসের পাতা তার সেই ভূমিকার কথা অদ্যাবধি স্বর্ণাক্ষরে ধারণ করে আছে। নু'আঈম ইবনে মাসউদের জীবনী আলোচনার পূর্বে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোচনা করা দরকার।
খন্দক বা আহযাব যুদ্ধের মাত্র কিছুদিন পূর্বে ইয়াসরিবের বনূ নযীর গোত্রের ইহুদীরা এবং তাদের নেতৃবৃন্দ ইসলামকে চিরতরে নির্মূল করার চক্রান্ত করে। এ জন্য তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। তারা মক্কার কুরাইশ নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করে। তাদের সাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, কুরাইশ বাহিনী মদীনায় পৌঁছলে তারা তাদের সাথে যোগ দেবে। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য দিন-তারিখও ধার্য করা হয়। সাথে সাথে নির্ধারিত তারিখের ব্যতিক্রম যাতে না হয়, সে দিকটির প্রতিও গুরুত্বারোপ করে। কুরাইশদের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার পর তারা নজদের 'গাতফান' গোত্রের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য রওয়ানা হয়। ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে তাদেরকেও প্ররোচিত করে এবং এই নতুন দীন ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য তাদের আহ্বান জানায়। কুরাইশদের সাথে তাদের গোপন সম্পর্কের ব্যাপারেও তাদের অবহিত করে। তারা গাতফান গোত্রের সাথেও একই ধরনের প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয়, যেমনটি হয়েছিল কুরাইশদের সাথে। কুরাইশদের মতো তাদের সাথেও সময় ও দিন-তারিখ নির্ধারণ করে। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক মক্কার কুরাইশদের সর্বস্তরের মানুষ তাদের নেতা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মদীনার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ে। গাতফান গোত্রের লোকজনও উওয়াইনা ইবনে হিস্স্স আল গাতফানীর নেতৃত্বে বের হয়ে আসে। গাতফান বাহিনীর অগ্রভাগে ছিল আমাদের এ কাহিনীর নায়ক নু'আঈম ইবনে মাসউদ।
কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের সম্মিলিত বাহিনী যে মদীনা আক্রমণ করতে আসছে, এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যথাসময়েই পৌঁছে। তিনি পরামর্শের জন্য সাহাবীদের সাধারণ সভার আহবান করেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেন যে, মদীনার চারপাশে খন্দক খনন করা হবে। আক্রমণকারী বাহিনী অকস্মাৎ এই খন্দকে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সম্মুখে অগ্রসর হতে ব্যর্থ হবে। তখন এ খন্দককে সামনে রেখে মুসলিম বাহিনী তার সুদৃঢ় অবস্থান নিয়ে তাদের মোকাবেলা করবে। পরিকল্পনা মোতাবেক মক্কা ও নজদ থেকে বিরাট দুই বাহিনী মদীনার প্রবেশদ্বারের সন্নিকটে এসে খন্দক দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়।
এদিকে বনী নাযীর গোত্রের ইহুদী নেতৃবর্গ মদীনায় বসবাসরত বনু কুরাইযা ইহুদী গোত্রের নেতৃবৃন্দের সাথে মিলিত হয়। তাদেরকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কৃত সন্ধি ভঙ্গ করে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেয়। নজদ থেকে আগত এই বিশাল বাহিনীর প্রতি সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণের জন্যও প্ররোচিত করতে থাকে। বনী কুরাইযা গোত্রের নেতৃবর্গ তাদেরকে বলে:
'সত্যিকারার্থে আমরা যা চাই ও পছন্দ করি, আপনারা আমাদেরকে সেদিকেই আহবান করছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, আপনারা ভাল করেই জানেন যে, আমাদের ও মুহাম্মদ-এর মধ্যে শান্তি চুক্তি হয়েছে এ শর্তে যে, শত্রুর আক্রমণে আমরা তাঁকে সাহায্য করব। অন্যদিকে সেও আমাদেরকে মদীনায় শান্তিতে বসবাসের নিশ্চয়তা প্রদান করবে। আপনারা এও ভালো করে জানেন যে, অদ্যাবধি তার সাথে আমাদের কৃত চুক্তির ব্যাপারে কোন অভিযোগ করার মতো কারণ ঘটেনি। আমরা আশঙ্কা করছি, মুহাম্মদ যদি এ যুদ্ধে বিজয়ী হয়, তাহলে সে কঠোর ও নির্দয় হস্তে আমাদের এ বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ নেবে এবং চিরতরে আমাদেরকে মদীনা থেকে উচ্ছেদ করে ছাড়বে।'
কিন্তু বনূ নযীর নেতৃবর্গ চুক্তিভঙ্গের জন্য তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেই থাকে। তারা শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যানের সুফল ও ভবিষ্যৎ কল্যাণের আশ্বাসও প্রদান করে। তারা নিশ্চয়তা দান করে যে:
'নিঃসন্দেহে এ যুদ্ধে মুহাম্মদ পরাজিত হবেই। তাদের বিশাল দুটি বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে মুসলমানগণ পরাজিত হবে বলে তারা তাদেরকে আশান্বিত করে তোলে।'
পরিশেষে বনু কুরাইযার ইহুদীরা তাদের প্ররোচনায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কৃত চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণকারী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে যোগদানের ঘোষণা দেয়। মদীনার অভ্যন্তরে বসবাসরত ইহুদীদের চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণকারীদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণের এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদের উপর বজ্রপাতের মতো আপতিত হয়।
আক্রমণকারী বাহিনী মদীনা অবরোধ করে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব ভালো করেই বুঝতে পারলেন যে, তিনি দুই দিক দিয়েই শত্রুবেষ্টিত হয়ে পড়েছেন। কুরাইশ ও গাতফান বাহিনী মদীনার বাইরে মুসলমানদের মুখোমুখি ছাউনি গেড়ে এবং বনু কুরাইযার ইহুদীরা মদীনার অভ্যন্তরে বসে মুসলমানদেরকে পেছনের দিক থেকে আক্রমণের জন্য ওৎ পেতে থেকে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথীদের মধ্যে 'মুনাফিকরা' বলতে থাকে:
'মুহাম্মদ আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, আমরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ধনভাণ্ডারের মালিক হয়ে যাবো। অথচ এখন আমাদের এক একজনের অবস্থা হলো নিরাপদে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে পর্যন্ত যেতে পারছি না।'
এরপর মুনাফিকরা দলে দলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে এ বলে চলে যেতে লাগল :
'বনূ কুরাইযা গোত্র চুক্তিভঙ্গ করায় মদীনায় আমাদের স্ত্রী-পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি ও বাড়ি-ঘর হুমকির সম্মুখীন।'
তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এ কথাও ব্যক্ত করল যে:
'যুদ্ধ মারাত্মক আকার ধারণ করলে বনূ কুরায়যা গোত্রের আক্রমণ থেকে তারাও নিরাপদ নয়।'
এভাবে দেখা গেল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে শেষ পর্যন্ত কয়েক শ' সত্যিকার ঈমানদার সাহাবী যুদ্ধ-ময়দানে অবশিষ্ট থাকলেন।
ক্রমাগত বিশ দিনের অবরোধের মধ্যে কোনো এক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাকুলভাবে বারবার এই বলে আল্লাহর দরবারে দু'আ করতে থাকেন:
اللهُمَّ إِنِّى أَنْشِدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَنْضَدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ .
'হে আল্লাহ! তোমার কাছে সাহায্য চাচ্ছি, যে সাহায্যের তুমি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ।'
এদিকে রুটিন মোতাবেক সে রাতেও নু'আঈম ইবনে মাসউদ তার শয্যা গ্রহণে যায়। কিন্তু আজ তার চোখে ঘুম নেই, তার দু'চোখের পলকে যেন কাঁটা ফুটছে। সর্বশক্তি নিয়োগ করেও সে ঘুমের ধারে-কাছেও পৌঁছতে সমর্থ হলো না। তার থেকে ঘুম যেন হাজার মাইল দূরে। বিনিদ্র রজনীতে আকাশের অসংখ্য তারকারাজির দিকে তাকিয়ে রইল সে। আজ সে খুব বেশি দুশ্চিন্তার শিকার। চিন্তার সাগরে সে যেন হাবুডুবু খাচ্ছে। চিন্তার শেষ নেই। হঠাৎ যেন এক সময় সে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল। তার বিবেক তাকে ভিতর থেকে বলে উঠল:
'ধিক্কার তোমাকে হে নু'আঈম। সুদূর নজদ থেকে এই দূর-দূরান্তে কেন এসেছ? কিসে তোমাকে এই মহান ব্যক্তি ও তাঁর সাথীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নিয়ে এসেছে। কিসের স্বার্থে? এ যুদ্ধ কি তোমার ছিনিয়ে নেওয়া অধিকার প্রতিষ্ঠার? নাকি তোমার লুণ্ঠিত সম্ভ্রমের প্রতিশোধের?'
'অকারণে তুমি এখানে এসেছ নু'আঈম! ধিক্কার তোমাকে...।'
তার অনুতপ্ত মন তাকে ধিক্কার দিয়ে বলতে থাকল:
'তোমার মতো একজন বিজ্ঞ লোকের পক্ষে কি অকারণে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হওয়া শোভা পায়? সৎ ও নির্দোষ এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে কে তোমাকে উৎসাহিত করেছে? যিনি তাঁর অনুসারীদের ন্যায়বিচার ও পরোপকারের আদেশ এবং নিকটাত্মীয়দের অধিকার প্রদানে সর্বদা নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তাঁর বিরুদ্ধে তুমি যুদ্ধ করতে এসেছ? কে তোমাকে তাঁর সাথীদের রক্তপাত ঘটানোর উদ্দেশ্যে চমকানো বর্ষা বহনে অনুপ্রাণিত করেছে? যারা একমাত্র সত্য ও হেদায়াতের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত, তুমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছ?'
নু'আঈম ও তার বিবেকের এই বিতর্ক বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। বিতর্কের পরিসমাপ্তি ঘটল। সে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হলো। রাতের অন্ধকারে নু'আঈম গাতফান গোত্রের সৈন্য ছাউনি থেকে সবার নজর এড়িয়ে দ্রুতগতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সামনে উপস্থিত দেখে বললেন:
'তুমি কি নু'আঈম ইবনে মাসউদ?'
সে উত্তরে বলল:
'হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!'
'গভীর রাতে এ মুহূর্তে কী উদ্দেশ্যে এসেছ?'
নু'আঈম উত্তর দিলো:
'একমাত্র কালেমা শাহাদাতের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আপনার খিদমতে উপস্থিত হয়েছি।'
এই বলেই সে কালেমা শাহাদাত পাঠ করল। অতঃপর আরয করল:
'হে আল্লাহর রাসূল। আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। এ কথা গাতফান গোত্রের কেউ জানে না। এ মুহূর্তে আমাকে যে কোনো খিদমতের জন্য নির্দেশ দিন।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন:
إِنَّمَا أَنْتَ فِينَا رَجُلٌ وَاحِدٌ ... فَاذْهَبْ إِلَى قَوْمِكَ وَخَدِّلْ عَنَّا إِنْ اسْتَطَعْتَ فَإِنَّ الْحَرْبَ خُدْعَةٌ .
'তুমিই আমাদের একমাত্র ব্যক্তি, যে এ মুহূর্তে কূটনৈতিক চাল চালতে পার। তুমি যদি পারো গাতফান গোত্রকে যুদ্ধ-ময়দান থেকে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কর। কেননা, শত্রুপক্ষকে ধোঁকায় ফেলা সমর-কৌশলেরই অংশ।'
নু'আঈম বললেন:
'হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার দ্বারা আপনি এমন কিছু দেখতে পাবেন, যা আপনাকে সন্তুষ্ট করবে, ইনশাআল্লাহ।'
এই বলে নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমত থেকে সে মুহূর্তেই বনু কুরাইযা গোত্রের আস্তানায় তার আগের সঙ্গী-সাথীদের কাছে গেলেন। তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও কথাবার্তার এক পর্যায়ে তাদের বললেন:
'হে বনু কুরাইযার ভাইয়েরা! আমি যে তোমাদের একজন বিশ্বস্ত ও অন্তরঙ্গ বন্ধু তা তো তোমরা ভালো করেই জান। সর্বদা তোমাদের প্রতি আমার সৎপরামর্শ ও আন্তরিকতার ব্যাপারেও অবগত।'
তারা বলল:
'হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ নু'আঈম! তুমি আমাদের নিকট নিঃসন্দেহে আস্থাভাজন ব্যক্তি।'
তাদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত হয়ে অতঃপর বললেন:
'এ যুদ্ধে কুরাইশ ও গatফান গোত্রের অবস্থান তোমাদের অবস্থান থেকে নিঃসন্দেহে ভিন্নতর।'
তারা বলল, কিভাবে?
নু'আঈম বললেন:
'মদীনা তোমাদের নিজেদের শহর। এ শহরেই তোমাদের ধন-সম্পত্তি, সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী-পুত্র সবই অবস্থান করছে। কোনোক্রমেই তোমরা এসব অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে পার না। অপরদিকে কুরাইশ ও গাতফানদের ধন-সম্পত্তি, অর্থ-কড়ি, সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রী-পুত্র সবই মদীনার বাইরে তাদের নিজেদের শহরে। তারা সেখান থেকে মুহাম্মদের সাথে যুদ্ধ করতে এসেছে। তারা তোমাদের শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে তার বিরুদ্ধে সহযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। যদি তারা বিজয়ী হয়, তাহলে মুহাম্মদের ধন-সম্পত্তিকে মালে গনীমত হিসেবে তারাই নেবে। আর যদি কুরাইশ ও গাতফানদের বাহিনী পরাজিত হয়, তাহলে মুহাম্মদের তাড়া খেয়ে তারা তোমাদেরকে মুহাম্মদের হাতে ফেলে রেখে নিরাপদেই স্ব-স্ব গোত্রে ফিরে যাবে। সে ক্ষেত্রে মুহাম্মদ তোমাদের থেকে চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যা কল্পনাও করতে পারছ না। তোমরা ভালো করেই জান যে, এককভাবে মুহাম্মদের মোকাবেলা করার শক্তি তোমাদের নেই।'
তারা বলল: 'ঠিকই বলছ। এখন তোমার পরামর্শ কী?'
তিনি বললেন: 'আমার কাছে এর একমাত্র সমাধান হলো, যতক্ষণ না তোমরা তাদের নেতৃস্থানীয় কিছু লোককে জামানত হিসেবে তোমাদের কাছে না রেখেছ, ততক্ষণ তোমরা তাদের সাথে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করো না। তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের জামানত হিসেবে রাখতে পারলেই তারা সর্বশক্তি দিয়ে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে প্রাণপণে যুদ্ধে নেমে পড়বে। হয় বিজয়, নয় তোমাদের ও তাদের শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত নিঃশেষ।'
তারা বলে উঠল: 'হ্যাঁ, তুমি উত্তম পরামর্শ দিয়েছ।'
অতঃপর তাদের থেকে বিদায় নিয়ে নু'আঈম ইবনে মাসউদ কুরাইশ সেনাপতি আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের কাছে এসে তাকে ও তার সঙ্গী নেতৃস্থানীয়দের বললেন:
'কুরাইশ ভাইয়েরা! মুহাম্মদের সাথে আমার শত্রুতা ও তোমাদের সাথে আমার আন্তরিকতা ও সহৃদয়তার কথা তোমরা ভালো করেই জান। আমার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পৌছেছে, যা তোমাদের জানান আমি আমার গুরুদায়িত্ব বলে মনে করি। তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ হলো, বিষয়টি তোমাদের মধ্যেই সীমিত রাখবে এবং আমার বরাত বা হাওয়ালা দিয়ে তা কখনো প্রচার করবে না। তারা কথা দেয় যে, এ ব্যাপারে আমরা অবশ্যই তোমার অনুরোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করব।'
অতঃপর নু'আঈম বলেন:
'বনু কুরাইযা গোত্র মুহাম্মদের বিরুদ্ধাচরণে অনুতপ্ত। তারা মুহাম্মদের কাছে দূত পাঠিয়ে আবেদন করেছে যে, আমরা আমাদের কৃতকর্মের জন্য ভীষণভাবে অনুতপ্ত। আমরা শান্তিচুক্তি পুনর্জীবিত করে সন্ধিভুক্ত হতে চাই। আপনার সদয় সম্মতি পেলে আমরা কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের বেশ কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এনে আপনার কাছে সোপর্দ করতে চাই, যেন আপনি তাদের শিরশ্ছেদ করতে পারেন। আপনাকে এই শিকার সংগ্রহ করে দেওয়ার মাধ্যমে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আপনার সাথে মিলিত হতে চাই।' মুহাম্মদ তাদের এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। ইহুদীরা যদি তোমাদের কাছে জামানত চায়, আমার অনুরোধ, তাহলে কাউকেও জামানত হিসেবে দেবে না।'
আবু সুফিয়ান বলল:
'এ গোপন সংবাদ প্রদানের মাধ্যমে নিঃসন্দেহে তুমি আমাদের প্রকৃত বন্ধুদের দাবিই পূরণ করলে।'
অতঃপর নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু সুফিয়ানের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে গাতফান গোত্রের অন্যান্য নেতাদের সাথে মিলিত হন। আবূ সুফিয়ানের সাথে তিনি যেভাবে কথা বলেছেন, তাদের কাছেও অনুরূপভাবে কথা বলেন। আবু সুফিয়ানকে যেভাবে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তাদেরও অনুরূপ পরামর্শ দেন।
প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে আবু সুফিয়ান বনু কুরাইযার মনোভাবকে যাচাই করার জন্য তাদের কাছে পরের দিন ভোর হতে না হতেই তার নিজ ছেলেকে দূত হিসেবে পাঠাল। তার ছেলে বনু কুরাইযার নেতৃবর্গের কাছে গিয়ে বলল:
'আমার পিতা আবু সুফিয়ান আপনাদের খিদমতে সালাম আরয করেছেন এবং বলে পাঠিয়েছেন যে, যেহেতু আমরা মুহাম্মদ এবং তার সঙ্গী-সাথীদেরকে দীর্ঘদিন যাবৎ অবরোধ করে রেখেছি, যার ফলে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমরা চাচ্ছি, কালবিলম্ব না করে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরম্ভ করি এবং এই অবরোধের সমাপ্তি ঘটাই। আপনাদের খিদমতে আমার পিতা আমাকে এ জন্যই পাঠিয়েছেন, যেন আগামীকালই আমাদের ও আপনাদের এ যৌথ আক্রমণের সূচনা হয়।'
ইহুদীরা তাকে বলে:
'আগামীকাল শনিবার। আমাদের ধর্মমতে পবিত্র দিন। আমরা কাল কোনো মতেই যুদ্ধে জড়িত হতে পারব না। এ ছাড়াও আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত আপনাদের সাহায্যার্থে যুদ্ধে জড়িত হতে পারব না, যতক্ষণ না আপনাদের কুরাইশ গোত্র ও গাতফান গোত্রের সত্তরজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে আমাদের কাছে জামানত হিসেবে না রাখবেন। কারণ, আমরা আশঙ্কা করছি, প্রচণ্ড যুদ্ধের ভয়াবহতা সহ্য করতে না পেরে আপনারা আমাদেরকে একা মুহাম্মদের হাতে বলির পাঁঠা হিসেবে ছেড়ে দিয়ে স্ব-স্ব আবাসভূমিতে পালিয়ে যেতে পারেন। আপনারা ভালো করেই জানেন যে, সে পরিস্থিতিতে মুহাম্মদের মোকাবেলা করার সাধ্য আমাদের নেই।'
কিন্তু বনূ নযীর নেতৃবর্গ চুক্তিভঙ্গের জন্য তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেই থাকে। তারা শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যানের সুফল ও ভবিষ্যৎ কল্যাণের আশ্বাসও প্রদান করে। তারা নিশ্চয়তা দান করে যে:
'নিঃসন্দেহে এ যুদ্ধে মুহাম্মদ পরাজিত হবেই। তাদের বিশাল দুটি বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে মুসলমানগণ পরাজিত হবে বলে তারা তাদেরকে আশান্বিত করে তোলে।'
পরিশেষে বনু কুরাইযার ইহুদীরা তাদের প্ররোচনায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কৃত চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণকারী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে যোগদানের ঘোষণা দেয়। মদীনার অভ্যন্তরে বসবাসরত ইহুদীদের চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণকারীদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণের এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদের উপর বজ্রপাতের মতো আপতিত হয়।
আক্রমণকারী বাহিনী মদীনা অবরোধ করে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব ভালো করেই বুঝতে পারলেন যে, তিনি দুই দিক দিয়েই শত্রুবেষ্টিত হয়ে পড়েছেন। কুরাইশ ও গাতফান বাহিনী মদীনার বাইরে মুসলমানদের মুখোমুখি ছাউনি গেড়ে এবং বনু কুরাইযার ইহুদীরা মদীনার অভ্যন্তরে বসে মুসলমানদেরকে পেছনের দিক থেকে আক্রমণের জন্য ওৎ পেতে থেকে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথীদের মধ্যে 'মুনাফিকরা' বলতে থাকে:
'মুহাম্মদ আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, আমরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ধনভাণ্ডারের মালিক হয়ে যাবো। অথচ এখন আমাদের এক একজনের অবস্থা হলো নিরাপদে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে পর্যন্ত যেতে পারছি না।'
এরপর মুনাফিকরা দলে দলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে এ বলে চলে যেতে লাগল :
'বনূ কুরাইযা গোত্র চুক্তিভঙ্গ করায় মদীনায় আমাদের স্ত্রী-পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি ও বাড়ি-ঘর হুমকির সম্মুখীন।'
তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এ কথাও ব্যক্ত করল যে:
'যুদ্ধ মারাত্মক আকার ধারণ করলে বনূ কুরায়যা গোত্রের আক্রমণ থেকে তারাও নিরাপদ নয়।'
এভাবে দেখা গেল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে শেষ পর্যন্ত কয়েক শ' সত্যিকার ঈমানদার সাহাবী যুদ্ধ-ময়দানে অবশিষ্ট থাকলেন।
ক্রমাগত বিশ দিনের অবরোধের মধ্যে কোনো এক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাকুলভাবে বারবার এই বলে আল্লাহর দরবারে দু'আ করতে থাকেন:
اللهُمَّ إِنِّى أَنْشِدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَنْضَدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ .
'হে আল্লাহ! তোমার কাছে সাহায্য চাচ্ছি, যে সাহায্যের তুমি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ।'
এদিকে রুটিন মোতাবেক সে রাতেও নু'আঈম ইবনে মাসউদ তার শয্যা গ্রহণে যায়। কিন্তু আজ তার চোখে ঘুম নেই, তার দু'চোখের পলকে যেন কাঁটা ফুটছে। সর্বশক্তি নিয়োগ করেও সে ঘুমের ধারে-কাছেও পৌঁছতে সমর্থ হলো না। তার থেকে ঘুম যেন হাজার মাইল দূরে। বিনিদ্র রজনীতে আকাশের অসংখ্য তারকারাজির দিকে তাকিয়ে রইল সে। আজ সে খুব বেশি দুশ্চিন্তার শিকার। চিন্তার সাগরে সে যেন হাবুডুবু খাচ্ছে। চিন্তার শেষ নেই। হঠাৎ যেন এক সময় সে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল। তার বিবেক তাকে ভিতর থেকে বলে উঠল:
'ধিক্কার তোমাকে হে নু'আঈম। সুদূর নজদ থেকে এই দূর-দূরান্তে কেন এসেছ? কিসে তোমাকে এই মহান ব্যক্তি ও তাঁর সাথীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নিয়ে এসেছে। কিসের স্বার্থে? এ যুদ্ধ কি তোমার ছিনিয়ে নেওয়া অধিকার প্রতিষ্ঠার? নাকি তোমার লুণ্ঠিত সম্ভ্রমের প্রতিশোধের?'
'অকারণে তুমি এখানে এসেছ নু'আঈম! ধিক্কার তোমাকে...।'
তার অনুতপ্ত মন তাকে ধিক্কার দিয়ে বলতে থাকল:
'তোমার মতো একজন বিজ্ঞ লোকের পক্ষে কি অকারণে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হওয়া শোভা পায়? সৎ ও নির্দোষ এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে কে তোমাকে উৎসাহিত করেছে? যিনি তাঁর অনুসারীদের ন্যায়বিচার ও পরোপকারের আদেশ এবং নিকটাত্মীয়দের অধিকার প্রদানে সর্বদা নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তাঁর বিরুদ্ধে তুমি যুদ্ধ করতে এসেছ? কে তোমাকে তাঁর সাথীদের রক্তপাত ঘটানোর উদ্দেশ্যে চমকানো বর্ষা বহনে অনুপ্রাণিত করেছে? যারা একমাত্র সত্য ও হেদায়াতের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত, তুমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছ?'
নু'আঈম ও তার বিবেকের এই বিতর্ক বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। বিতর্কের পরিসমাপ্তি ঘটল। সে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হলো। রাতের অন্ধকারে নু'আঈম গাতফান গোত্রের সৈন্য ছাউনি থেকে সবার নজর এড়িয়ে দ্রুতগতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সামনে উপস্থিত দেখে বললেন:
'তুমি কি নু'আঈম ইবনে মাসউদ?'
সে উত্তরে বলল:
'হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!'
'গভীর রাতে এ মুহূর্তে কী উদ্দেশ্যে এসেছ?'
নু'আঈম উত্তর দিলো:
'একমাত্র কালেমা শাহাদাতের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আপনার খিদমতে উপস্থিত হয়েছি।'
এই বলেই সে কালেমা শাহাদাত পাঠ করল। অতঃপর আরয করল:
'হে আল্লাহর রাসূল। আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। এ কথা গাতফান গোত্রের কেউ জানে না। এ মুহূর্তে আমাকে যে কোনো খিদমতের জন্য নির্দেশ দিন।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন:
إِنَّمَا أَنْتَ فِينَا رَجُلٌ وَاحِدٌ ... فَاذْهَبْ إِلَى قَوْمِكَ وَخَدِّلْ عَنَّا إِنْ اسْتَطَعْتَ فَإِنَّ الْحَرْبَ خُدْعَةٌ .
'তুমিই আমাদের একমাত্র ব্যক্তি, যে এ মুহূর্তে কূটনৈতিক চাল চালতে পার। তুমি যদি পারো গাতফান গোত্রকে যুদ্ধ-ময়দান থেকে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কর। কেননা, শত্রুপক্ষকে ধোঁকায় ফেলা সমর-কৌশলেরই অংশ।'
নু'আঈম বললেন:
'হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার দ্বারা আপনি এমন কিছু দেখতে পাবেন, যা আপনাকে সন্তুষ্ট করবে, ইনশাআল্লাহ।'
এই বলে নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমত থেকে সে মুহূর্তেই বনু কুরাইযা গোত্রের আস্তানায় তার আগের সঙ্গী-সাথীদের কাছে গেলেন। তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও কথাবার্তার এক পর্যায়ে তাদের বললেন:
'হে বনু কুরাইযার ভাইয়েরা! আমি যে তোমাদের একজন বিশ্বস্ত ও অন্তরঙ্গ বন্ধু তা তো তোমরা ভালো করেই জান। সর্বদা তোমাদের প্রতি আমার সৎপরামর্শ ও আন্তরিকতার ব্যাপারেও অবগত।'
তারা বলল:
'হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ নু'আঈম! তুমি আমাদের নিকট নিঃসন্দেহে আস্থাভাজন ব্যক্তি।'
তাদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত হয়ে অতঃপর বললেন:
'এ যুদ্ধে কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের অবস্থান তোমাদের অবস্থান থেকে নিঃসন্দেহে ভিন্নতর।'
তারা বলল, কিভাবে?
নু'আঈম বললেন:
'মদীনা তোমাদের নিজেদের শহর। এ শহরেই তোমাদের ধন-সম্পত্তি, সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী-পুত্র সবই অবস্থান করছে। কোনোক্রমেই তোমরা এসব অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে পার না। অপরদিকে কুরাইশ ও গatফানদের ধন-সম্পত্তি, অর্থ-কড়ি, সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রী-পুত্র সবই মদীনার বাইরে তাদের নিজেদের শহরে। তারা সেখান থেকে মুহাম্মদের সাথে যুদ্ধ করতে এসেছে। তারা তোমাদের শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে তার বিরুদ্ধে সহযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। যদি তারা বিজয়ী হয়, তাহলে মুহাম্মদের ধন-সম্পত্তিকে মালে গনীমত হিসেবে তারাই নেবে। আর যদি কুরাইশ ও গাতফানদের বাহিনী পরাজিত হয়, তাহলে মুহাম্মদের তাড়া খেয়ে তারা তোমাদেরকে মুহাম্মদের হাতে ফেলে রেখে নিরাপদেই স্ব-স্ব গোত্রে ফিরে যাবে। সে ক্ষেত্রে মুহাম্মদ তোমাদের থেকে চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যা কল্পনাও করতে পারছ না। তোমরা ভালো করেই জান যে, এককভাবে মুহাম্মদের মোকাবেলা করার শক্তি তোমাদের নেই।'
তারা বলল: 'ঠিকই বলছ। এখন তোমার পরামর্শ কী?'
তিনি বললেন: 'আমার কাছে এর একমাত্র সমাধান হলো, যতক্ষণ না তোমরা তাদের নেতৃস্থানীয় কিছু লোককে জামানত হিসেবে তোমাদের কাছে না রেখেছ, ততক্ষণ তোমরা তাদের সাথে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করো না। তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের জামানত হিসেবে রাখতে পারলেই তারা সর্বশক্তি দিয়ে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে প্রাণপণে যুদ্ধে নেমে পড়বে। হয় বিজয়, নয় তোমাদের ও তাদের শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত নিঃশেষ।'
তারা বলে উঠল: 'হ্যাঁ, তুমি উত্তম পরামর্শ দিয়েছ।'
অতঃপর তাদের থেকে বিদায় নিয়ে নু'আঈম ইবনে মাসউদ কুরাইশ সেনাপতি আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের কাছে এসে তাকে ও তার সঙ্গী নেতৃস্থানীয়দের বললেন:
'কুরাইশ ভাইয়েরা! মুহাম্মদের সাথে আমার শত্রুতা ও তোমাদের সাথে আমার আন্তরিকতা ও সহৃদয়তার কথা তোমরা ভালো করেই জান। আমার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পৌছেছে, যা তোমাদের জানান আমি আমার গুরুদায়িত্ব বলে মনে করি। তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ হলো, বিষয়টি তোমাদের মধ্যেই সীমিত রাখবে এবং আমার বরাত বা হাওয়ালা দিয়ে তা কখনো প্রচার করবে না। তারা কথা দেয় যে, এ ব্যাপারে আমরা অবশ্যই তোমার অনুরোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করব।'
অতঃপর নু'আঈম বলেন:
'বনু কুরাইযা গোত্র মুহাম্মদের বিরুদ্ধাচরণে অনুতপ্ত। তারা মুহাম্মদের কাছে দূত পাঠিয়ে আবেদন করেছে যে, আমরা আমাদের কৃতকর্মের জন্য ভীষণভাবে অনুতপ্ত। আমরা শান্তিচুক্তি পুনর্জীবিত করে সন্ধিভুক্ত হতে চাই। আপনার সদয় সম্মতি পেলে আমরা কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের বেশ কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এনে আপনার কাছে সোপর্দ করতে চাই, যেন আপনি তাদের শিরশ্ছেদ করতে পারেন। আপনাকে এই শিকার সংগ্রহ করে দেওয়ার মাধ্যমে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আপনার সাথে মিলিত হতে চাই।' মুহাম্মদ তাদের এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। ইহুদীরা যদি তোমাদের কাছে জামানত চায়, আমার অনুরোধ, তাহলে কাউকেও জামানত হিসেবে দেবে না।'
আবু সুফিয়ান বলল:
'এ গোপন সংবাদ প্রদানের মাধ্যমে নিঃসন্দেহে তুমি আমাদের প্রকৃত বন্ধুদের দাবিই পূরণ করলে।'
অতঃপর নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু সুফিয়ানের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে গাতফান গোত্রের অন্যান্য নেতাদের সাথে মিলিত হন। আবূ সুফিয়ানের সাথে তিনি যেভাবে কথা বলেছেন, তাদের কাছেও অনুরূপভাবে কথা বলেন। আবু সুফিয়ানকে যেভাবে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তাদেরও অনুরূপ পরামর্শ দেন।
প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে আবু সুফিয়ান বনু কুরাইযার মনোভাবকে যাচাই করার জন্য তাদের কাছে পরের দিন ভোর হতে না হতেই তার নিজ ছেলেকে দূত হিসেবে পাঠাল। তার ছেলে বনু কুরাইযার নেতৃবর্গের কাছে গিয়ে বলল:
'আমার পিতা আবু সুফিয়ান আপনাদের খিদমতে সালাম আরয করেছেন এবং বলে পাঠিয়েছেন যে, যেহেতু আমরা মুহাম্মদ এবং তার সঙ্গী-সাথীদেরকে দীর্ঘদিন যাবৎ অবরোধ করে রেখেছি, যার ফলে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমরা চাচ্ছি, কালবিলম্ব না করে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরম্ভ করি এবং এই অবরোধের সমাপ্তি ঘটাই। আপনাদের খidমতে আমার পিতা আমাকে এ জন্যই পাঠিয়েছেন, যেন আগামীকালই আমাদের ও আপনাদের এ যৌথ আক্রমণের সূচনা হয়।'
ইহুদীরা তাকে বলে:
'আগামীকাল শনিবার। আমাদের ধর্মমতে পবিত্র দিন। আমরা কাল কোনো মতেই যুদ্ধে জড়িত হতে পারব না। এ ছাড়াও আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত আপনাদের সাহায্যার্থে যুদ্ধে জড়িত হতে পারব না, যতক্ষণ না আপনাদের কুরাইশ গোত্র ও গাতফান গোত্রের সত্তরজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে আমাদের কাছে জামানত হিসেবে না রাখবেন। কারণ, আমরা আশঙ্কা করছি, প্রচণ্ড যুদ্ধের ভয়াবহতা সহ্য করতে না পেরে আপনারা আমাদেরকে একা মুহাম্মদের হাতে বলির পাঁঠা হিসেবে ছেড়ে দিয়ে স্ব-স্ব আবাসভূমিতে পালিয়ে যেতে পারেন। আপনারা ভালো করেই জানেন যে, সে পরিস্থিতিতে মুহাম্মদের মোকাবেলা করার সাধ্য আমাদের নেই।'
আবু সুফিয়ানের পুত্র কুরাইশ সৈন্য ছাউনিতে ফিরে এসে তাদেরকে বনু কুরাইযা গোত্রের নেতৃবৃন্দের ভূমিকা সম্পর্কে অবগত করলে তারা ক্ষোভ ও ধিক্কারের সাথে সমস্বরে বলে উঠল:
'শূকর ও বানরের সন্তানেরা বড়ই জঘন্য শর্তারোপ করেছে...। আমরা আল্লাহর শপথ করে বলছি, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ তো দূরের কথা, তারা যদি আমাদের কাছে একটা ছাগলছানাও জামানত হিসেবে দাবি করে সেটাও তাদের দেওয়া হবে না।'
অবরোধকারী ও মিত্র এ জোটে ফাটল ধরাতে এবং তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর চালে পুরোপুরিই সাফল্য লাভ করলেন। অপরদিকে আল্লাহ কুরাইশ ও তাঁর মিত্র বাহিনীর ওপর পাঠালেন প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টিসহ প্রলয়ঙ্করী ঝড়ো হাওয়া ও তুফান। যে তুফান তাদের তাঁবুর রশি ছিঁড়ে লণ্ডভণ্ড করে ফেলল। ডেক-ডেকচিগুলো এদিক-সেদিক উড়িয়ে নিয়ে গেল ও আগুন নিভিয়ে ফেলল। তাদের চোখে-মুখে ধুলাবালি নিক্ষিপ্ত করে প্রায় অন্ধ করে দিল। শুধু লোকজনই নয় উট, গাধা, ঘোড়া ও যানবাহন বলতে যা কিছু ছিল সেসবও ছিঁড়ে-ছুটে এদিক-সেদিক ছুটে গেল। রাতের অন্ধকারে প্রাণভয়ে কুরাইশ বাহিনীও মদীনা থেকে পালিয়ে গেল। সকালে যখন মুসলিম বাহিনী দেখতে পেল যে, আল্লাহর দুশমনেরা পলায়ন করেছে, তখন তারা আনন্দে বলতে থাকল :
'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন। তাঁর বাহিনীকে বিজয়ী করেছেন এবং তিনি নিজেই আক্রমণকারী মিত্র বাহিনীকে পরাজিত করেছেন।'
নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেদিন থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একান্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হলেন। তাঁকে অতি সম্মানে ভূষিত করে তাঁর হাতে গাতফান গোত্রের পতাকা প্রদান করা হলো। তাঁকে সামরিক বাহিনীর ডিভিশনাল কমান্ডার থেকে শুরু করে প্রাদেশিক গভর্নরের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ করা হয়। মক্কা বিজয়ের দিনে আবু সুফিয়ান দাঁড়িয়ে যখন অগ্রসরমান মুসলিম বাহিনী প্রত্যক্ষ করছিল, তখন এক পর্যায়ে দেখল যে :
'এক ব্যক্তি গাতফান গোত্রের পতাকা বহন করে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছে। সে তার পাশে উপস্থিত লোকদের জিজ্ঞাসা করে, এ ব্যক্তি কে?'
তারা বলল:
'গাতফান নেতা নু'আঈম ইবনে মাসউদ।'
তার নাম শোনামাত্রই আবু সুফিয়ান বলে উঠে :
'সে খন্দকের যুদ্ধে আমাদের কতই না বিপর্যয় এনে দিয়েছে! আল্লাহর শপথ! মুহাম্মদের বিরুদ্ধাচরণে তার চেয়ে অধিক তৎপর আর কেউ ছিল না। আর আজ সে তারই অনুসারী হয়ে নিজ গোত্রের পতাকা বহন করছে। সে আজ মুহাম্মদের পতাকাতলে সমবেত হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে।'
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: জীবনী নং ৮৭৭৯.
২. আল ইসতিয়াব: ইসাবাহ-এর টীকা অংশ, ৫ খণ্ড, ৫৮৪ পৃ.
৩. উসদুল গাবাহ: ৫ম খণ্ড, ৩৪৮ পৃ. অথবা ৫২৭৪ নং জীবনী.
৪. সীরাতুন নুবুবিয়াহ লিইবনে হিশam: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৫. হায়াতুস সাহাবাহ: ৪র্থ খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
📄 খাব্বাব ইবনে আরত (রাঃ)
আল্লাহ খাব্বাব ইবনে আরতের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, নিষ্ঠা সহকারে হিজরত করেছিলেন এবং মুজাহিদের জীবন যাপন করেছেন।
-আলী ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু
একদা উম্মু আনমার আল খুযাইয়া তার খিদমতের জন্য এবং আয়-রোজগারেও সহায়ক হতে পারে, এমন এক বালককে ক্রয়ের উদ্দেশ্যে মক্কার দাস মার্কেটে গেল। বিক্রির জন্য আনা শিশু দাসদের চেহারা ও মুখমণ্ডলের দিকে সে খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নজর ফেরাতে থাকল। পরিশেষে এমন এক বালকের প্রতি তার দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো, যে ছিল যেমন সুন্দর চেহারাসম্পন্ন, তেমনি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। যার চেহারায় ছিল বুদ্ধিমত্তার ছাপ। তখনো সে ছিল একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক মাত্র। মনে মনে ঐ বালকটিকে ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। দর-কষাকষি করে, মূল্য পরিশোধ করে তাকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো। কিছুদূর যাওয়ার পর উম্মু আনমার ছেলেটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল :
'ছেলে! তোমার নাম কী?' উত্তর দিল : 'খাব্বাব।' আবার জিজ্ঞাসা করল : 'তোমার বাবার নাম কী?' সে বলল : 'আরত' পুনরায় জিজ্ঞাসা করল : 'তুমি কোথাকার বাসিন্দা?' সে বলল : 'নজদের' উম্মু আনমার বলল : 'তাহলে তুমি আরব?'
সে উত্তর দিল: 'জী! আমি বনূ তামীম গোত্রের সন্তান।'
উম্মে আনমার বলল: 'কিভাবে তুমি ক্রীতদাস হলে এবং মক্কার দাস ব্যবসায়ীদের হাতে পড়লে?'
সে বলল: 'আরবের একটি গোত্রের সশস্ত্র লোকজন আমাদের গোত্রের উপর হামলা চালিয়ে উট, ঘোড়া, গাধা ইত্যাদি লুট করে এবং মহিলাদের বন্দী করে এবং শিশুদের ধরে নিয়ে যায়। আমি সেই বন্দী শিশুদের একজন। ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে হাত ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে আপনার হাতে এসে পড়েছি।'
বাড়ি ফিরে উম্মু আনমার তলোয়ার তৈরির প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে খাব্বাবকে মক্কার কর্মকারদের একজনের হাতে তুলে দিল। কিছুদিনের মধ্যেই খাব্বাব তলোয়ার তৈরিতে বেশ দক্ষতা অর্জন করল।
খাব্বাব আরো একটু বয়ঃপ্রাপ্ত ও তার মধ্যে ধীরস্থিরতা পরিলক্ষিত হলে উন্মু আনমার তার জন্য একটি দোকান ভাড়া করে তাকে যন্ত্রপাতি ক্রয় করে দেয় এবং তলোয়ার তৈরির জন্য তার মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেয়। কিছুদিনের মধ্যেই খাব্বাবের তৈরি তলোয়ারের মান ও গুণগত প্রশংসা মক্কার সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তার তলোয়ার জনপ্রিয় হয়ে উঠল এবং সবাই তার তৈরি তলোয়ার কিনতে আসতে লাগল। খাব্বাব একজন যুবক ও স্বল্পবয়সী হওয়া সত্ত্বেও চিন্তা, বিবেক-বুদ্ধিতে ছিলেন পরিপক্ক এবং জ্ঞান-গরিমায় ও অভিজ্ঞতায় ছিলেন বৃদ্ধদের মতো সমৃদ্ধ, সত্যবাদী, সৎ ও আমানতদার।
দিনের কাজ শেষে অবসর সময়ে জাহেলী সমাজে বিদ্যমান অশান্তি ও বিপর্যয় থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায়, সে সম্প গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতেন। নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত যে জীবনধারা চলছে, যার শিকার তিনি নিজেও তা থেকে পরিত্রাণের চিন্তা করতেন। এই অন্ধকার কবে দূর হবে, কবে সমাজ পরিশুদ্ধ হবে? প্রত্যাশিত সুপ্রভাত কবে উদ্ভাসিত হবে? এবং তিনি সেই সুপ্রভাত দেখে যেতে পারবেন কি না? এসব চিন্তা ছিল তাঁর অবসরের একমাত্র খোরাক। সে উদ্দেশ্যে তিনি দীর্ঘ জীবনের আকাঙ্ক্ষা করতেন।
খাব্বাবকে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হলো না। তাঁর নিকট পৌঁছল প্রত্যাশিত সেই সুপ্রভাতের আহ্বান। যে আহ্বান জানাচ্ছেন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ নামক হাশেমী গোত্রেরই এক ব্যক্তি।
কালবিলম্ব না করে খাব্বাব মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর খিদমতে উপস্থিত হলেন। মনোযোগ সহকারে তাঁর কথা শুনলেন। আলোচনা যতই গভীরে যাচ্ছিল খাব্বাবের অন্তর ততই আলোকিত হয়ে উঠছিল। এমনকি দেখতে দেখতে নূরে রব্বানী তাঁর অন্তরকে পূর্ণ আলোকিত করে তুলল। ক্রীতদাস খাব্বাব এখন ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত। বিলম্ব আর সহ্য হলো না। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং কালেমা শাহাদাত পাঠ করে নবজীবন লাভ করলেন।
তিনি ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে ষষ্ঠ ব্যক্তি। তিনিই ইসলামের ছয় ভাগের এক ভাগ নামে পরিচিত ছিলেন।
খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ইসলাম গ্রহণ করার সুসংবাদ মক্কার জনগণ থেকে লুকিয়ে রাখলেন না। তাঁর ইসলাম গ্রহণের সংবাদ তার মালিকা উম্মু আনমারের নিকট পৌঁছে গেল। খাব্বাবের ইসলাম গ্রহণের সংবাদে সে ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হলো। ক্রোধে সে এতই উন্মত্ত হয়ে উঠল যে, সে খাব্বাবকে কঠোর শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সে তার ভাই সিবাআ ইবনে আবদুল উযযাকে সঙ্গে নিয়ে খাব্বাবের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। খুযাআ গোত্রের একদল যুবকও তাদের সঙ্গী হলো। সবাই খাব্বাবের কাছে গিয়ে পৌঁছে দেখল তিনি তার কাজের মধ্যে ডুবে আছেন। সিবাআ তার দিকে অগ্রসর হয়ে রাগতঃস্বরে বলল:
'তোমার সম্পর্কে আমাদের কাছে একটি সংবাদ পৌঁছেছে, যা আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না।'
খাব্বাব জিজ্ঞাসা করলেন: 'কী খবর?'
সিবাআ বলল: 'তুমি নাকি ধর্মচ্যুত হয়ে হাশেমী গোত্রের এক ব্যক্তির অনুসরণ করছ?'
খাব্বাব ধীরস্থিরভাবে উত্তর দিলেন: 'না আমি ধর্মচ্যুত হইনি, বরং লা-শরীক আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি মাত্র। আর আপনাদের দেব-দেবীদের প্রত্যাখ্যান করে এ সাক্ষ্য দিয়েছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর রাসূল।'
খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর উত্তর সিবাআ ও তার সঙ্গী-সাথীরা শোনামাত্রই তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সম্মিলিতভাবে তাঁকে প্রহার করতে শুরু করল। নির্যাতনের জন্য তাদের হাত-পা সমানে চলল। তাতেও তাদের প্রতিশোধস্পৃহা থামল না। হাতের কাছে হাতুড়ি ও লৌহখণ্ড প্রভৃতি যা পেল তাই দিয়ে নির্দয়ভাবে প্রহার করতে লাগল।
এক পর্যায়ে খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তাঁর শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকল। খাব্বাবের ওপর তাঁর মনিবের এই নির্যাতনের সংবাদ মক্কার অলিতে-গলিতে খড়কুটোর আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। মক্কাবাসী খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাহসিকতায় হতভম্ব হয়ে গেল। কারণ, তারা এই প্রথম শুনতে পেল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারীদের একজন প্রকাশ্যভাবে ইসলামের ঘোষণা করে প্রহৃত হয়েছে। কুরাইশ নেতৃবর্গ খাব্বাবের এই সাহসিকতায় বিচলিত হয়ে পড়ল। কারণ, পেশায় কর্মকার, বিধবা উম্মু আনমারের এক নগণ্য ক্রীতদাস হয়ে তারই দেব-দেবীদের প্রকাশ্যে গালি দেবে? তার বাপ-দাদার ধর্মকে যুক্তিহীন বলবে? মক্কায় যার না আছে কোনো সাহায্যকারী, না আছে কোনো আশ্রয়দাতা। সেই ব্যক্তি দেব-দেবীকে প্রকাশ্যে ভর্ৎসনা করবে এবং পৌত্তলিকতাকে উপহাস করবে- এ কথা তারা কল্পনাও করতে পারেনি।
তারা ভাবতে লাগল: 'যদি এখনই তার ধৃষ্টতা এই হয়, আর তা বাড়তে দেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তো সীমা ছাড়িয়ে যাবে।'
তাদের দিক থেকে এ দুশ্চিন্তায় কোনো অতিরঞ্জন ছিল না। তারা দেখল ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে এবং ইসলাম গ্রহণকারী অন্যরাও খাব্বাবের সাহসিকতা দেখে ইসলামের ঘোষণা দেওয়া শুরু করেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা, আবু জাহল ইবনে হিশামদের নেতৃত্বে কুরাইশ দলপতিরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রতিরোধকল্পে পরামর্শ বৈঠকে বসল। তারা এ বৈঠকে একমত হলো যে, ইসলামের প্রসার দিনের পর দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, তাকে আর অগ্রসর হতে দেওয়া যায় না। শিকড় শক্ত হওয়ার আগেই এর মূলোৎপাটন করতে হবে। স্ব-গোত্রীয় মুহাম্মদের অনুসারীদের অগ্রযাত্রা প্রতিরোধ করতে হবে বা নিজেদের ধর্মমতে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রত্যেক গোত্রপতিকে তারা নিজ নিজ গোত্রের বিশৃঙ্খলা দমনের দায়িত্ব দেয়। তাদেরকে এ নির্দেশও দেওয়া হয় যে:
'তাদের ওপর কঠিন নির্যাতন চালাতে হবে, যেন তারা নিজ নিজ ধর্মে ফিরে আসতে বাধ্য হয় অথবা নির্যাতনে তাদের মৃত্যু হয়।'
এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে নির্যাতন করার দায়িত্ব পড়ে সিবাআ ইবনে আবদুল উযযার ওপর। দুপুর বেলায় মক্কার ভূমি যখন খরতাপে উত্তপ্ত হয়ে উঠে, বালুময় মাঠ যখন অগ্নিতপ্ত হয়ে টগবগ করে, ঠিক এ সময়ে সে খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মক্কার অগ্নিঝরা তপ্ত মাঠে নিয়ে বিবস্ত্র করে লোহার পোশাক পরিয়ে (যা যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়) বেঁধে রাখে। পিপাসায় ছটফট করতে থাকলে তাকে পানি দিতে নিষেধ করা হয়। খাব্বাব যখন ভীষণ কাতর ও ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, তখন তাঁর কাছে গিয়ে প্রশ্ন করা হতো মুহাম্মদ সম্পর্কে তোর ধ্যান-ধারণা কী? তখন খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিতেন:
'তিনি আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর রাসূল, যিনি আমাদের জন্য দীনে হক ও হেদায়াতসহ প্রেরিত হয়েছেন। তিনিই একমাত্র আমাদেরকে জাহেলী যুগের অন্ধকার থেকে ইসলামের আলোর পথে আনতে সক্ষম।'
তাঁর এ উত্তর শুনে সে তাঁকে নির্দয়ভাবে প্রহার করত। লাথি ও কিল-ঘুষি মারত। তারপর আবার জিজ্ঞাসা করত:
'লাত ও উযযা সম্পর্কে তোর ধ্যান-ধারণা কী?' তখন খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিতেন: 'বোবা ও বধির দুটি মাটির মূর্তি মাত্র, যা কারো উপকার বা ক্ষতি কিছুই করতে পারে না।'
এ উত্তরে সে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উত্তপ্ত পাথর এনে তার পিঠে চাপা দিয়ে রাখত। এতে তাঁর দু'কাঁধ বেয়ে পিঠের চর্বি গলে গলে পড়ত।
খাব্বাব ইবনে আরত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর প্রতি সিবাআর চেয়ে তাঁর মালিকা উম্মু আনমারের নির্যাতন কোনো অংশেই কম ছিল না। একদা উম্মু আনমার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খাব্বাবের দোকানের সামনে দিয়ে যাবার সময় তাঁর সাথে কথা বলতে দেখে তার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। এরপর সে প্রতিদিন খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দোকানে আসত এবং তাঁর হাপর থেকে উত্তপ্ত লাল টকটকে লৌহখণ্ড তাঁর মাথার ওপর চেপে ধরত। এতে খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মাথা পুড়ে বাষ্প উত্থিত হতো এবং তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলতেন। এমতাবস্থায় খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর মালিকা উম্মু আনমার ও তার ভাই সিবাআর জন্য আল্লাহর দরবারে বদদু'আ করতে থাকতেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের মদীনায় হিজরত করে চলে যাওয়ার অনুমতি দিলে খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও সেজন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং সুযোগমতো হিজরত করে মদীনায় চলে যান। মক্কা ত্যাগের পূর্বে আল্লাহ উম্মু আনমারের জন্য তাঁর কৃত বদদু'আ বাস্তবে পরিণত করে দেখান। তা এইভাবে যে, উম্মু আনমার কঠিন মাথা ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এ ধরনের তীব্র ও কঠিন মাথা ব্যথার কথা ইতঃপূর্বে কেউ শোনেনি। প্রচণ্ড মাথা ব্যথার তাড়নায় সে কুকুরের মতো চিৎকার করত। চিকিৎসার জন্য তার ছেলেরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। পরিশেষে চিকিৎসকেরা পরামর্শ দেয়:
'এ ধরনের মাথা ব্যথার একমাত্র চিকিৎসা হলো লৌহখণ্ড উত্তপ্ত করে লাল টগবগে হলে তা দ্বারা নিয়মিত মাথায় দাগ দেওয়া। এই মাথা ব্যথা থেকে বাঁচার জন্য উম্মু আনমার লৌহখণ্ড গরম করে মাথায় ইস্ত্রির মতো ঘষতো। তাতে তার যন্ত্রণার অনুভূতি কিছুটা লাঘব হওয়ার পরিবর্তে আরো বহুগুণ বেড়ে যেত, এমনকি তার যন্ত্রণায় পূর্বের মাথা ব্যথাই ভুলে যেত।'
মদীনায় হিজরত করে আনসারদের আতিথেয়তায় খাব্বাব ইবনে আরত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে তাঁর চক্ষুদ্বয়কে শীতল করেন। খাব্বাব ইবনে আরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে তাঁরই ঝাণ্ডার নিচে সমবেত হয়ে বদর ও উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উহুদের যুদ্ধে উম্মু আনমারের ভাই সিবাআ ইবনে আবদুল উযযাকে বীর কেশরী হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে নিহতাবস্থায় দেখার সৌভাগ্য তাঁর হয়। আল্লাহ তাঁকে দীর্ঘ জীবন দান করেন। তিনি চার খলীফার শাসনকাল প্রত্যক্ষ করেন। তাদের বিশেষ তত্ত্বাবধানে ও তাদের দ্বারা সর্বদাই সম্মানিত ও প্রশংসিত হয়ে জীবন অতিবাহিত করেন।
খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু একদিন কোনো কাজে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দরবারে আসেন। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে উঁচু আসনে সমাসীন করেন। তাঁকে বলেন:
'বেলাল ছাড়া এই মজলিসে আর কেউ নেই যে, তাকে আপনার চেয়ে অধিক সম্মানে ভূষিত করা যেতে পারে।'
অতঃপর আলোচনার এক পর্যায়ে খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মক্কার মুশরিকরা যে চরম নির্যাতন চালিয়েছিল, সে সম্পর্কে কিছু জানতে চান।
খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ওপর নির্যাতনের বর্ণনা গর্বের সাথে করা 'রিয়া' হতে পারে মনে করে লজ্জাবোধ করছিলেন। কিন্তু উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বারবার অনুরোধ করায় খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পিঠের কাপড় সরিয়ে দিলেন। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর পিঠের ক্ষত-বিক্ষত অবস্থা দেখে ভয়ে পিছনে সরে গেলেন এবং বললেন: 'এসব কিভাবে হলো?'
খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'মুশরিকরা আমাকে নির্যাতন করার জন্য কয়লার স্তূপ প্রজ্বলিত করত। যখন তা লাল হয়ে উঠত, তখন আমাকে বিবস্ত্র করে হাত-পা বেঁধে এর ওপর হেঁচড়াতে থাকত। এমনকি আমার পিঠের গোস্ত হাড্ডি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত। ক্ষতস্থানের নির্গত রক্তমিশ্রিত পানি টপটপ করে পড়ে সেই কয়লার আগুন নিভে যেত।'
খাব্বাব ইবনে আরত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে অতিকষ্টে জীবন অতিবাহিত করার পর শেষ জীবনে অঢেল সম্পদের মালিক হন। এত স্বর্ণ-রৌপ্যের মালিক হন, যা তাঁর জন্য স্বপ্নেরও অতীত ছিল। সেই অঢেল সম্পদ থেকে তিনি আল্লাহর রাস্তায় এমনভাবে খরচ করতেন, যা অনেকের কাছে ছিল কল্পনাতীত। তিনি স্বর্ণ ও রৌপ্যের মুদ্রাগুলো তাঁর বাড়ির একটি নির্দিষ্ট স্থানে বাক্সের তালা না লাগিয়ে উন্মুক্ত অবস্থায় রেখে দিতেন। ফকীর, মিসকীন, গরীব ও অভাবী তাঁর বাড়িতে এসে অনুমতি বা চাওয়া ছাড়াই ইচ্ছামতো সেখান থেকে নিয়ে যেত। এসব সত্ত্বেও তিনি ভয় পেতেন যে, এ ধন-সম্পদের হিসাব কঠিন হবে এবং তাঁকে শাস্তি পেতে হবে। তার একদল বন্ধু-বান্ধব বর্ণনা করেছেন:
'খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মৃত্যুশয্যায় আমরা তাঁর কাছে গেলে তিনি আমাদেরকে একটি স্থান দেখিয়ে বললেন, এখানে ৮০,০০০ (আশি হাজার) দিরহাম রয়েছে। আল্লাহর শপথ আমি থলির মুখ কখনো বন্ধ করিনি কিংবা কোনো অভাবীকে সেখান থেকে তার ইচ্ছামতো গ্রহণ করতেও বাধা দেইনি। এই বলে তিনি কাঁদতে থাকলেন।'
তারা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন : 'কেন কাদছেন?' তিনি বললেন :
'আমি কাঁদছি, কারণ আমার সঙ্গী-সাথীরা এ দুনিয়ায় তাদের কর্মের বিনিময়ে একটি কপর্দকও পাননি, আর আমি এখনো জীবিত এবং অঢেল সম্পদের মালিক। আমার ভয় হয় যে, এসব সম্পদ হয়তো আমার ঐসব কাজের প্রতিদান, যা এ পৃথিবীতে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।'
খাব্বাব ইবনে আরত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আল্লাহর সান্নিধ্যে গমনের পর আমীরুল মুমিনীন আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন :
'আল্লাহ তাআলা খাব্বাবের ওপর রহম করুন। তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, নিষ্ঠা সহকারে হিজরত করেছিলেন এবং মুজাহিদী জীবন যাপন করেছেন। আল্লাহ উত্তম আমলকারীদের কর্মফল বৃথা যেতে দেন না।'
رَحِمَ اللهُ خَبَّاباً فَلَقَدْ أَسْلَمَ رَاغِباً وَهَاجَرَ طَائِعاً وعاش مُجَاهِداً .... ولن يضيع اللَّهُ أَجْرَ مَنْ أَحْسَنَ عَمَلاً
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ২২১০ নং জীবনী.
২. উসদুল গাবাহ: ২য় খণ্ড, ৯৮-১০০ পৃ.
৩. আল ইসতিয়াব : ১ম খণ্ড, ৪২৩ পৃ.
৪. তাহযীবুত তাহযীব: ৩য় খণ্ড, ১৩৩ পৃ.
৫. হুলিয়াতুল আওলিয়া: ১ম খণ্ড, ১৪৩পৃ.
৬. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১ম খণ্ড, ১৬৮ পৃ.
৭. আল জামউ বাইনা রিজালিস সহীহায়ন: ১২৪ পৃ.
৮. আল মাআরিফ লি ইবনে কুতায়বা: ৩১৬ পৃ.
৯. হায়াতুস সাহাবা: ৪র্থ খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
📄 রাবীঈ ইবনে যিয়াদ আল হারেসী (রাঃ)
‘আমি খলীফা নিযুক্ত হওয়ার পর রাবিঈ ইবনে যিয়াদ যেভাবে হক কথা ও সৎ পরামর্শ দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করেছে এমনটি আর কেউ করেনি।’
-উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)
আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইনতিকালের শোকে মাদীনাতুর রাসূলের জনসাধারণ তখনো দুঃখে-শোকে মুহ্যমান। এখনো তাঁরা অশ্রুসিক্ত চক্ষু মুছেই চলেছেন। অপরদিকে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে বায়'আত গ্রহণের জন্য আরবের প্রতিটি জনপদ থেকে প্রতিনিধি দলের আগমন অব্যাহত রয়েছে। তারা হেদায়াত ও দিক-নির্দেশনা শুনতে ও নতুন খলীফার হাতে শান্তি ও কঠিন মুহূর্তে আনুগত্যের বায়'আত করতে আসছে। এ রকম এক সকালে অন্যান্য প্রতিনিধি দলের সাথে বাহরাইনের এক প্রতিনিধি দলের আগমন ঘটে। যে প্রতিনিধি দলে ছিলেন বাহরাইনের বিভিন্ন জনপদের প্রতিনিধিগণ।
উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ প্রতিনিধিদের কথাবার্তা ও বিভিন্ন পরামর্শাদি একান্ত আগ্রহ সহকারে শুনলেন। শুধু বাহরাইনের আগত প্রতিনিধি দলের কথাই মনোযোগ সহকারে শুনলেন না; বরং আগত প্রত্যেক সদস্যের কথাই শুনলেন একইভাবে। এ কারণে যে, তাদের থেকে হয়তো আল কুরআনের কোনো মূল্যবান উপদেশ, হেদায়াত ও পরামর্শ পাওয়া যাবে। পাওয়া যাবে আমল-আখলাকের কথা, রাষ্ট্র পরিচালনার কথা, মুসলমানদের কল্যাণের কথা। কিন্তু তিনি তাদের থেকে যা আশা করেছিলেন তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনতে পেলেন না। অতঃপর উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু প্রতিনিধিদের এক ব্যক্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন:
'আমার নিকট এসে বসুন।'
তার বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা দেখে তিনি আঁচ করতে পেরেছিলেন যে, এ ব্যক্তি নিশ্চয়ই কোনো মূল্যবান পরামর্শ দেবে। নিকটে এলে বললেন।
'এবার আপনি কিছু বলুন।'
এ সুযোগে ঐ ব্যক্তি আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন:
'হে আমীরুল মুসলিমীন! আপনার উপর উম্মতে মুসলিমার গুরুদায়িত্ব নিঃসন্দেহে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিরাট পরীক্ষা। তিনি আপনার কৃতকর্মের হিসাব নেবেন, সাফল্য ও ব্যর্থতা পরীক্ষা করে দেখবেন। খিলাফতের যে কঠিন দায়িত্ব আপনার ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে, তা পালনে সর্বদাই আল্লাহকে ভয় করে চলুন। জেনে রাখুন, সুদূর ফোরাত নদীর তীরেও যদি একটি ছাগলছানা হারিয়ে যায়, সে সম্পর্কেও কিয়ামতের দিন আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হবে।'
এ কথা শুনে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আতঙ্কিত হয়ে উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে শুরু করলেন।
তিনি বললেন:
'খিলাফতের দায়িত্ব আমার উপর অর্পিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এমন সত্য কথাটি আর কেউ আমাকে বলেননি। আপনি মূল্যবান নসীহত দ্বারা আমাকে ধন্য করেছেন।'
এবার বলুন: 'আপনি কে?'
তিনি উত্তর দিলেন:
'আমার নাম রাবিঈ ইবনে যিয়াদ আল হারেসী।'
উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন:
'মুহাজির ইবনে যিয়াদের ভাই?'
উত্তর দিলেন: 'জী হ্যাঁ।'
অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটলে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ডেকে বললেন:
'রাবিঈ ইবনে যিয়াদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ কর। সে যদি তার পরামর্শে সত্যিই নিঃস্বার্থ হয়ে থাকে, তাহলে তাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগানো যাবে এবং তার যোগ্যতা ও পরামর্শ রাষ্ট্র-পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের বিরাট সহায়ক হবে। অতএব, তাকে কাজে লাগাও এবং তার কার্যক্রম সম্পর্কে আমাকে অবগত করতে থাক।'
কিছুদিন যেতে না যেতেই খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নির্দেশে আবু মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পারস্যের আহওয়াজ প্রদেশের 'মানাযির' নামক শহর বিজয়ের উদ্দেশ্যে সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন এবং রাবিঈ ইবনে যিয়াদ ও তাঁর ভাই মুহাজিরকেও এ বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আবূ মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনী দ্বারা মানাযির শহর আবরোধ করলে পারস্য বাহিনীর সাথে এক প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বেধে যায়। ইতিহাসে যার নজির দুর্লভ। এ প্রচণ্ড যুদ্ধে পারস্য বাহিনী যেমন অতুলনীয় বীরত্বের পরিচয় দেয়, তেমনি তাদের আক্রমণও ছিল প্রচণ্ড। তারা অত্যাধুনিক সামরিক কৌশল প্রয়োগ করে কল্পনাতীতভাবে আক্রমণ চালালে মুসলিম বাহিনীর সীমাহীন প্রাণহানি ঘটে। রমযান মাসে যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার কারণে মুসলিম বাহিনী ছিল স্বাভাবিকভাবেই শারীরিক দিক থেকে দুর্বল। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভাই মুহাজির রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসলিম বাহিনীর এত প্রাণহানি দেখে শাহাদাতের উদ্দেশ্যে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি শরীরে কপূর জাতীয় সুগন্ধি মেখে কাফনের কাপড় পরিধান করে তারই ভাই রাবিঈকে শেষ ওসিয়ত করে প্রস্তুত হয়ে যান। তার এ অবস্থা দেখে রাবিঈ ইবনে যিয়াদ সেনাপতি আবূ মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট এসে বললেন:
'আমার ভাই মুহাজির শাহাদাতের উদ্দেশ্যে জান্নাতের বিনিময়ে নিজেকে বিক্রি করে ফেলেছে, অথচ সে রোযাদার। মুসলিম বাহিনী এ রোযার কারণে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় তারা রোযা ছাড়তে রাজি নয়, এখন আপনি কী সিদ্ধান্ত নেবেন ভেবে দেখুন।'
রাবিঈ ইবনে যিয়াদের এ প্রস্তাবে আবূ মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সৈন্যদের একত্র করে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন:
'হে মুসলিম ভাইয়েরা! আমি সকল রোযাদার সৈন্যদের আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, হয় আপনারা রোযা ভেঙে পানাহার করুন, নয়তো যুদ্ধ থেকে নিজেদের বিরত থাকুন। এ কথা বলে তিনি তাঁর হাতে ধারণ করা পানির পাত্র থেকে পানি পান করতে থাকলেন, যেন সৈন্যরা তাঁকে অনুসরণ করে রোযা ভেঙে পানাহার করে।'
রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভাই মুহাজির সেনাপতি আবূ মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এই ঘোষণার কথা শুনলে তিনিও এক চুমুক পানি পান করে বললেন:
'আল্লাহর শপথ! তৃষ্ণার জন্য পানি পান করছি না, শুধু সেনাপতির নির্দেশ পালনের জন্যই পানাহারে অংশ নিলাম। তারপর হাতের তলোয়ার কোষমুক্ত করেই শত্রুবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। শত্রুবাহিনীর ব্যূহ ভেদ করে তাদের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েন। শত্রু বাহিনীতে হৈচৈ পড়ে গেল এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। তাকে প্রতিহত করার জন্য চারদিক থেকে তার ওপর আক্রমণ চালানো হলো। তলোয়ারের একই সাথে চতুর্মুখী আক্রমণের ফলে তিনি শাহাদাত বরণ করলেন।'
শাহাদাতের পর তাঁর শিরশ্ছেদ করে তা যুদ্ধ ক্ষেত্রে এক উচ্চ টিলার ওপর বর্শার মাথায় ঝুলিয়ে রাখা হলো। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ভাইয়ের কর্তিত শির দেখে বললেন:
'হে প্রিয় ভাই! তোমার শাহাদাতের সৌভাগ্যের জন্য ধন্যবাদ। তুমি জান্নাতের সীমাহীন নিয়ামতের অধিকারী। তোমার এ গৌরব লাভে আল্লাহর পক্ষ থেকে অনন্ত জীবনের জন্য আমার ঈর্ষা হচ্ছে। গৌরবময় স্থানে তুমি ঝুলন্ত। আল্লাহর শপথ করে বলছি, ইনশাআল্লাহ আমি তোমার এবং অন্য শহীদদের পক্ষ হতে অবশ্যই এর প্রতিশোধ গ্রহণ করব।'
সেনাপতি আবূ মূসা আল আশআরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ভাইয়ের প্রতি রাবিঈ ইবনে যিয়াদের আন্তরিক দরদ ও ঈমানী দৃঢ়তা প্রত্যক্ষ করে অভিভূত হলেন। প্রতিশোধের আগুন তার মধ্যে প্রজ্বলিত দেখে তিনি নিজে মানাযির শহর বিজয়ের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন। মুসলিম বাহিনীর সেনাপতির দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সে দায়িত্ব অর্পণ করলেন রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উপর। আর তিনি পারস্যেরই 'সূস' নগরী বিজয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন।
রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনীকে নিয়ে শত্রুদের ওপর ঝড়ের মতো আঘাত হানতে শুরু করলেন। শত্রুরা মনে করল এ যেন এক আসমানী কোনো গযব। প্রতিরোধ-ব্যূহ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। শত্রুরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে যেদিকে পারলো পালাতে শুরু করল। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ আক্রমণের মধ্য দিয়ে আল্লাহ তাঁর হাতে 'মানাযির' নগরীর বিজয় দান করলেন। শত্রু বাহিনীকে সমূলে নিঃশেষ করে তাদের নারী ও শিশুদেরকে দাস রূপে আশ্রয় ক্যাম্পে নিয়ে এলেন। কল্পনাতীত মালে গনীমত লাভ করলেন। মানাযির বিজয়ের হিরো হিসেবে রাবিঈ ইবনে যিয়াদ যেন নতুন এক ইতিহাস গড়লেন। আরেক সফল সেনাপতির যেন আবির্ভাব ঘটল। তাঁর বীরত্বের প্রশংসা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। নতুন যে কোনো অভিযানের আগে তার কথাই সকলের স্মরণে আসত।
মুসলিম সেনাবাহিনী 'সিজিস্তান' বিজয়ের সিদ্ধান্ত নিলে এ অভিযানের জন্য তাঁকেই সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করে তাঁর হাতেই তা বিজয়ের দৃঢ় প্রত্যাশা করা হয়। সেনাপতি রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসলিম সেনাবাহিনীকে নিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের লক্ষ্যে রওয়ানা হলেন। তিনি এ অভিযানে এমন দুর্গম ও বিপদসংকুল ২৫০ মাইল দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেন যে, মরুভূমির দুর্ধর্ষ ও হিংস্র প্রাণীরাও তা অতিক্রম করতে ভয় পায়। এ দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে কারুকার্য খচিত সুউচ্চ অট্টালিকা, ধন-দৌলতের প্রাচুর্যবিশিষ্ট প্রকৃতির সৌন্দর্যের লীলাভূমি শস্য-শ্যামল ও সুউচ্চ দুর্ভেদ্য প্রাচীরবেষ্টিত সিজিস্তানের সীমান্তবর্তী 'রুস্তাকু যালেকের' নিকট পৌঁছেন। বিচক্ষণ সেনাপতি রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পূর্ব থেকেই 'রুস্তাকু যালেক' শহরে তাঁর গুপ্তচরদের জাল বিছিয়ে রেখেছিলেন। তাদের সূত্রে জানতে পারলেন যে:
'সহসাই শত্রুপক্ষ 'আল মাহারজান' নামক তাদের জাতীয় উৎসব উপলক্ষে 'রুস্তাকু যালেক' নগরীতে একত্রিত হতে যাচ্ছে। তিনি সে সময়ের অপেক্ষায় থাকলেন। নির্ধারিত রাত্রে শত্রুপক্ষ আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠলে তাদের উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে বড় বড় জমিদার, দলপতি ও তাদের প্রাদেশিক গভর্নরসহ ২০ হাজার যোদ্ধাকে বন্দী করেছিলেন ও তাদেরকে দাস-দাসীতে পরিণত করেছিলেন। এই বন্দীদের মধ্যে উক্ত গভর্নরের এক ক্রীতদাসও ছিল। যে তার মনিবকে নির্ধারিত কর প্রদানের জন্য ৩ লাখ মুদ্রার বিরাট একটি অংক সাথে করে এনেছিল। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উক্ত ক্রীতদাসকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'এ অর্থ কোথায় পেয়েছো?'
সে উত্তরে বলল: 'এক গ্রাম থেকে।'
'প্রতি বছরই কি একটি গ্রাম থেকে এই পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়ে থাকে?'
উক্ত ক্রীতদাস উত্তর দিল: 'জী হ্যাঁ।'
রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জিজ্ঞাসা করলেন:
'সেটা কিভাবে?'
সে উত্তর দিল:
'আমাদের কোদাল, কুড়াল ও কঠোর পরিশ্রমে বেরিয়ে আসা শরীরের ঘামের বিনিময়ে।'
যুদ্ধশেষে সেনাপতি রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট বন্দী প্রাদেশিক গভর্নর মুক্তিপণের বিনিময়ে তার ও তার পরিবারের প্রাণভিক্ষার আবেদন জানান।
রাবিঈ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাকে বললেন:
'যদি পর্যাপ্ত মুক্তিপণ দিতে পারো, তাহলে আবেদন গ্রহণ করা যেতে পারে।'
গভর্নর আবেদন করল:
'বিনিময়ে কী পরিমাণ অর্থ চান?'
রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন:
'এই বর্শাটি মাটিতে গেড়ে দিলাম। এর মাথা বরাবর সোনা ও রূপা দ্বারা এমনভাবে ভরে দাও যেন বর্শাটি ঢেকে যায়।'
গভর্নর বলল:
'ঠিক আছে আমি তাতেই সম্মত।'
এই বলে তার ধন-ভাণ্ডার থেকে সোনা ও রূপা বের করে সেখানে স্তূপ করতে আরম্ভ করল। শেষ পর্যন্ত বর্শার মাথা তাতে ঢেকে গেল। তারপর রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বিজয়ী বাহিনী নিয়ে সিজিস্তানের ভিতরে ঢুকে পড়লেন। হেমন্ত ঋতুর প্রচণ্ড দমকা হাওয়ায় গাছ-পালার শুষ্ক পাতা ঝরে পড়ার ন্যায় সিজিস্তানের দুর্গ ও সামরিক ঘাঁটিসমূহ মুসলিম বাহিনীর পদানত হতে থাকল। শহর, নগর ও গ্রাম-গঞ্জের মানুষ মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরিবর্তে তাদের সাদর সম্ভাষণ জানাতে থাকল এবং তাদের আনুগত্যের মধ্যেই নিজেদের মঙ্গল দেখতে থাকল।
এভাবে রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনীকে নিয়ে যুদ্ধ ছাড়াই সিজিস্তানের রাজধানী 'জারাঞ্জা' শহরে পৌছে গেলেন। সেখানে পৌছে দেখতে পেলেন যে, শত্রুবাহিনী মুসলিম বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। মুসলিম বাহিনীকে প্রতিরোধের জন্যে পারস্য সম্রাট বিপুল সৈন্য সমাবেশ করেছে। চারিদিক থেকে সামরিক রেজিমেন্টগুলো তাদের সহযোগিতার জন্য সমবেত করেছে। যে কোনো মূল্যে তারা 'জারাঞ্জা' থেকে মুসলিম বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে সিজিস্তান পুনরুদ্ধারে বদ্ধপরিকর। দু'বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ বেধে গেল। এ যুদ্ধে কোনো পক্ষই তাদের সৈন্যদের জীবন অকাতরে বিলিয়ে দিতে কার্পণ্য করল না। উভয়পক্ষের বিপুল ক্ষয়-ক্ষতি ও প্রাণহানির এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনীতে বিজয়ধ্বনি উঠল। পারস্য বাহিনী ও জনগণের প্রাণ রক্ষার জন্য পারস্য সেনাপতি 'পারভেয' পরাজয় নিশ্চিত ভেবে অবিলম্বে রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও শান্তি আলোচনার জন্য দূত পাঠাল। দূত মুসলিম সেনাপতি রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আলোচনার সময় ও স্থান নির্ধারণের আবেদন জানাল। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পারস্য সেনাপতির এই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পারভেযের অভ্যর্থনার সময় ও স্থান নির্ধারণ করে মুসলিম বাহিনীকে বিশেষ প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন। তাদের এও নির্দেশ দিলেন অভ্যর্থনার স্থানকে পারস্য সেনাদের লাশের স্তূপে পরিণত করা হোক এবং যে পথে পারস্য সেনাপতি পারভেয রাবিঈ ইবনে যিয়াদের সাথে দেখা করতে আসবে তার দু'পাশেও পারস্য সৈন্যদের লাশ বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হোক।
রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের লম্বা সুঠাম দেহের সুপুরুষ। তাঁর মাথাটিও ছিল আকারে বেশ বড়। তাঁকে দেখলেই অন্তর ভীতত্রস্ত হয়ে উঠত। পারস্য সেনাপতি পারভেয সন্ধির উদ্দেশ্যে আলোচনার স্থানে পৌঁছে রাবিঈ ইবনে যিয়াদের দিকে দেখামাত্রই ভয়ে কাঁপতে থাকল। তাকে পারস্য সৈন্যদের মৃতদেহের স্তূপের দৃশ্য ও রাবিঈ-এর চেহারা- উভয়ে মিলে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলল। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে করমর্দন করার জন্য সামনে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে দূরে দাঁড়িয়ে রুদ্ধশ্বাসে স্যালুট দিল। সেনাপতি রাবিঈ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট প্রস্তাবে বলল যে, ইরানী বড় বড় স্বর্ণের জামপ্লেট মাথায় বহনকারী এক হাজার ক্রীতদাস উপঢৌকনের বিনিময়ে সন্ধি প্রস্তাব নিবেদন করছি। রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ শর্তে সন্ধি করতে সম্মত হলেন।
সন্ধির দ্বিতীয় দিন রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শহর প্রদক্ষিণে বের হলেন। তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য স্বর্ণের ইরানী জামপ্লেট মাথায় বহন করে দাসদের বিরাট দল নৃত্য করতে করতে তাঁকে ঘিরে ধরে। শহরের প্রবেশপথ ও অলিগলিতে জনতার ঢল নামে। রাস্তার দু'পাশে সারিবদ্ধ মানুষ মুসলমানদের বিজয়কে আল্লাহু আকবার তাকবীর ধ্বনি দিয়ে সমর্থন জানায়। ইতিহাসে এ এক স্মরণীয় ঘটনা।
রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসলমানদের জন্য এমন একটি উন্মুক্ত তরবারি ছিলেন, যে তরবারির প্রচণ্ড আঘাতে শহরের পর শহর, নগরের পর নগরের বিজয় সুনিশ্চিত হয়ে উঠত। মুসলিম শাসিত এলাকার পরিধি বিস্তারকল্পে তিনি প্রদেশের পর প্রদেশ তার সাথে সংযোজন করে এসব প্রদেশে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর এ অব্যাহত বিজয়ের এক পর্যায়ে মুসলিম বিশ্বের খিলাফতের দায়িত্ব উমাইয়া বংশের হাতে চলে যায়। মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে তাঁর অনিচ্ছাসত্ত্বেও খুরাসানের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি মানসিক দিক দিয়ে এ দায়িত্বভারে মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। এ দায়িত্বের ব্যাপারে তাঁর অনীহা এ কারণে আরো চরম আকার ধারণ করে, যখন যিয়াদ ইবনে আবিহ (পিতৃ-পরিচয়হীন যিয়াদ) একজন উচ্চপদস্থ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে এই বলে নির্দেশ দেন যে:
'আমীরুল মুমিনীন মুআবিয়া গুরুত্বের সাথে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যুদ্ধে অর্জিত মালামালের স্বর্ণ ও রৌপ্য কেন্দ্রীয় কোষাগারের জন্য নির্দিষ্ট রেখে অবশিষ্ট সম্পদ যোদ্ধাদের মাঝে বিতরণ করা হোক।'
রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এই নির্দেশ পাওয়ার পর যিয়াদ ইবনে আবিহ (পিতৃ-পরিচয়হীন যিয়াদ)-কে প্রত্যুত্তরে লিখে জানান:
'আমীরুল মুমিনীন মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর উদ্ধৃতি দিয়ে যে নির্দেশ পাঠিয়েছেন, আমি তাকে আল কুরআনের নির্দেশের পরিপন্থী মনে করি। কারণ, আল কুরআনে গনীমতের সম্পদ বণ্টনের যে পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে, তাতে সমস্ত সম্পদের এক-পঞ্চমাংশই শুধু বায়তুল মালে জমাদানের নির্দেশ আছে। বাকি অংশ সম্পূর্ণই যোদ্ধাদের মাঝে বিতরণযোগ্য বলে উল্লেখিত। কুরআনের এ নির্দেশ মোতাবেক মালে গনীমত থেকে স্বর্ণ-রৌপ্য আলাদা করে সরকারি কোষাগারে জমা করার কোনো সুযোগ নেই।'
অতঃপর তিনি সকল মুজাহিদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দেন:
'যে যেখানে যে অবস্থাতেই আছ, সে অবস্থাতেই গনীমতের অংশ বুঝে নাও। কুরআনের নির্দেশ মোতাবেক মুজাহিদদের মাঝে গনীমতের সম্পদ বিতরণ করে অবশিষ্ট মাত্র এক-পঞ্চমাংশই তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী দামেশকে প্রেরণ করেন।'
যিয়াদ ইবনে আবিহ (পিতৃ-পরিচয়হীন যিয়াদ)-এর কুরআনবিরোধী ফরমানকে প্রত্যাখ্যানের পরেই শুক্রবার যিয়াদের নিকট এ পত্র পৌছার পূর্বের দিন মুসলিম বিশ্বের এই নন্দিত সিপাহসালার খুরাসানের গভর্নর রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সাদা ধবধবে কাফনের কাপড় পরিধান করে জুমআর নামাযে ইমামতী করতে আসেন।
জনগণের উদ্দেশ্যে জুমআর খুতবা প্রদান করেন। খুতবাশেষে সমবেত মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে বলেন:
'হে ভাইয়েরা! আমি জীবনের প্রতি একান্তই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছি। আমি আল্লাহর কাছে একটি দু'আ করছি আপনারা সবাই আমার দু'আর সাথে সাথে আমীন বলুন।'
অতঃপর তিনি দু'আ করতে থাকেন:
'হে আল্লাহ, তুমি যদি আমার মঙ্গল ও কল্যাণ চাও, তাহলে অনতিবিলম্বে আমাকে তোমার কাছে ডেকে নাও...। তাঁর নির্দেশ মোতাবেক সমবেত মুসল্লীগণ আমীন আমীন বলেন...।'
মহান আল্লাহ রাবিঈ ইবনে যিয়াদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দু'আ সাথে সাথে কবুল করেন এবং সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পূর্বেই তাঁর পবিত্র আত্মাকে তাঁর রহমতের সুমহান স্থান ইল্লিয়্যীনে উঠিয়ে নেন।
টিকাঃ
১. উসদুল গাবাহ: ২য় খণ্ড, ২০৬ পৃ.
২. তারীখুত তাবারী: ৪র্থ খণ্ড, ১৮৩-১৮৫ পৃ. ৫ম খণ্ড, ২২৬, ২৮৫, ২৮৬ ও ২৯১ পৃ.
৩. আল ইসাবাহ: ১ম খণ্ড, ৪০৫ পৃ.
৪. আল কামেল ফিত তারীখ: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৫. জুমহারাতুল আনসাব: ৩৯১ পৃ.
৬. তাহযীবুত তাহযীব : ৩য় খণ্ড, ২৪৪ পৃ.
৭. হায়াতুস সাহাবা: ২য় খণ্ড, ১৬৮ ও ২৬৮ পৃ.