📄 আসেম ইবনে সাবেত (রাঃ)
‘যে কেউ উত্তমভাবে যুদ্ধ করতে চায়, সে যেন আসেম ইবনে ছাবেত-এর মত যুদ্ধ করে।’
-মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)
মক্কার কুরাইশ নেতৃবৃন্দ থেকে ক্রীতদাস পর্যন্ত সর্বস্তরের যুদ্ধবাজরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বের হয়ে আসে। তাদের অন্তরে ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি চরম ঘৃণা আর বিদ্বেষ। বদর যুদ্ধের প্রতিশোধ-স্পৃহা এবং সে যুদ্ধে নিকটাত্মীয়দের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জিঘাংসায় তারা অন্ধু হয়ে উঠেছিল। প্রতিশোধের নেশা তাদের রক্তের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত ছিল।
এখানেই শেষ নয়, এ যুদ্ধে তাদের যোদ্ধাদের অধিকতর উত্তেজিত করা ও বীরত্বব্যঞ্জক গান গেয়ে সৈন্যদের মধ্যে রণোন্মাদনা সৃষ্টির জাহেলী যুগের এক বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা হলো। এ লক্ষ্যে তারা কুরাইশ মহিলাদের একটি গায়িকা দল গঠন করে। এ দলের শীর্ষে ছিল আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবা, উমর ইবনে আস-এর স্ত্রী রাইতা বিনতে মুনাব্বেহ, সুলাফা বিনতে সা'দ এবং আরো অনেক নামকরা গায়িকা। সুলাফার সাথে ছিল তার স্বামী তালহা এবং তার তিন ছেলে মূসাফে, জুলাস ও কিলাব। কুরাইশ ও মুসলিম বাহিনী উহুদ প্রান্তরে পরস্পর মুখোমুখি হলে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দার নেতৃত্বে মহিলারা তাদের হাতে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে কুরাইশ সৈন্যদের পেছনে অবস্থান নেয়। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে তারা জ্বালাময়ী ও উত্তেজনাকর কবিতা আবৃত্তি করতে থাকে। তারা নেচে নেচে যে উত্তেজনাকর গান গাইতে থাকে, তার একটি আরবী অংশ হলো:
إِنْ تُقْبِلُوا نُعَانِقُ ونَقْرُشِ النَّمَارِقُ أَوْ تُدْبِرُوا نُفَارِقُ فِرَاقَ غَيْرِ وَامِقَ
'যদি তোমরা সামনে অগ্রসর হয়ে মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণ করো, তবে আমরা তোমাদের আলিঙ্গন করব, বিলাসবহুল ফুলশয্যায় সম্মতি দেব, আরাম কেদারায় বসতে দেব, উষ্ণ স্বাগত জানাব। আর যদি তাদের আক্রমণের মুখে পিছু হটে যাও, তবে ধিক্কারের সাথে তোমাদের প্রত্যাখ্যান করব এবং ঘৃণাভরে সারা জীবনের জন্য ছুড়ে মারব।'
তাদের এসব কথা অশ্বারোহী যোদ্ধাদের দারুণভাবে উত্তেজিত করে। গায়িকাদের স্বামীদের হৃদয়েও তা জাদুকরী প্রভাব ফেলে।
মুসলিম বাহিনীর ওপর কুরাইশদের বিজয়ের মাধ্যমে এ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটলে কুরাইশ মহিলারা উন্মাদ হয়ে এমন সব জঘন্য অপকর্ম ঘটায়, যা ইতিহাসে বিরল। তারা শহীদ মুসলমানদের খুঁজে খুঁজে শনাক্ত করে তাদের লাশকে অপবিত্র করতে থাকে। তাদের বুক ও পেট চিরে কলিজা বের করে, চক্ষু উৎপাটন করে, কান ও নাক কেটে ফেলে, এতে তারা ক্ষান্ত না হয়ে শহীদদের কর্তিত নাক, কান কেটে গলার মালা, কানের বালি ও পায়ের নুপুর বানিয়ে তা পরিধান করে ক্ষোভের সমাপ্তি ঘটায়। কিন্তু সুলাফা বিনতে সা'দ-এর অবস্থা অন্যান্য কুরাইশ মহিলাদের চেয়ে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ ছিল না। দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার তেমনি কোনো সীমাও ছিল না। তার শুধু একটাই আশা যে, এ বিজয় মুহূর্তে তার স্বামী ও ছেলেরা তাকে এক নজর দেখে আনন্দ করুক এবং সেও তাদের এক নজর দেখেই বিজয়ানন্দে যোগ দিক। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তার মনের এ আশা পূরণ হতে না দেখে সে নিজেই তাদের খুঁজতে যুদ্ধের ময়দানের অনেক ভিতরে ঢুকে পড়ে। সুলাফা একের পর এক নিহতদের চেহারা উলট-পালট করে দেখতে থাকে। কোথাও তাদের না পেয়ে সে অস্থির হয়ে পড়ে। হঠাৎ স্বামীর রক্তাক্ত দেহ মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে উন্মাদের মতো তার লাশ জাপটে ধরে। চারদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তার তিন ছেলে মূসাফ, জুলাস ও কিলাব-এর সন্ধান করতে থাকে। উহুদের পাদদেশে তার ছেলে মূসাফ ও কিলাবকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করতে করতে তাদের দিকে ছুটে যায়। সুলাফা তাদের কাছেই ছেলে জুলাসকে জীবিত অবস্থায় দেখে দৌড়ে গিয়ে তার রক্তাক্ত দেহকে বুকে জড়িয়ে ধরে। উন্মাদনায় চিৎকার করতে করতে সোহাগভরা হৃদয়ে ছেলের মুখমণ্ডলের রক্ত মুছতে থাকে। দীর্ঘক্ষণ রক্তাক্ত অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে থাকার কারণে শুকিয়ে যাওয়া রক্তে তার চোখ দুটি বন্ধ হয়ে যায়। এসব রক্ত পরিষ্কারের ব্যর্থ চেষ্টা করে জুলাসকে বারবার জিজ্ঞাসা করতে থাকে:
'কে তোমার পিতাকে ও ভাইদের হত্যা করেছে? বলো সে কে? কে তোমাকে আঘাতের পর আঘাত করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে?'
জুলাস অন্তিম অবস্থায় মায়ের কাছে তাদের ওপর আক্রমণকারীর নাম বলতে গিয়ে মৃত্যু-যন্ত্রণায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পরিশেষে, অত্যন্ত নিস্তেজ কণ্ঠে এতটুকু বলতে সক্ষম হয়:
'আসেম ইবনে ছাবেত আমাকে আঘাত করেছে এবং আমার ভাই জুলাস ও কিলাবকেও...। এই বলে এক হেঁচকিতেই সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।'
স্বামীর ও সন্তানদের এ দুরবস্থা দেখে সুলাফা বিনতে সা'দ উন্মাদে বিলাপ করতে থাকে এবং লাত-মানাত দেবতার শপথ করে বলতে থাকে:
'যতক্ষণ কুরাইশরা আসেম ইবনে ছাবেত থেকে তার স্বামী ও সন্তানদের হত্যার প্রতিশোধ না নেবে এবং আসেমের মাথার খুলিতে তাকে শরাব পানের সুযোগ করে না দিবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মাতম করা থেকে ক্ষান্ত হবে না এবং ক্রন্দনও বন্ধ করবে না।'
অতঃপর সে ঘোষণা করে:
'জীবিত বা মৃত অবস্থায় যে আসেম ইবনে ছাবেতকে হাজির করতে পারবে, অথবা তার মাথা এনে দিতে পারবে, তাকে তার চাহিদামতো অঢেল অর্থ পুরস্কার দেওয়া হবে।'
তার পুরস্কারের ঘোষণা দ্রুত কুরাইশদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মক্কার প্রতিটি ভাগ্য পরীক্ষার্থী যুবকই আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় সুলাফা বিনতে সা'দ-এর সামনে পেশ করে ঘোষিত পুরস্কার লাভের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
উহুদ যুদ্ধ শেষে মুসলিম যোদ্ধারা মদীনায় ফিরে আসেন। মদীনায় পৌঁছে শহীদদের মাগফিরাত কামনা, তাদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ও বীর গাযীদের নৈপুণ্যপূর্ণ ভূমিকা এবং উহুদ যুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করেন। একই পরিবারের তিন ভাইকে হত্যা করার গৌরব অর্জনকারী আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কথা এলে তারা সবাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে তাকে ধন্যবাদ জানাতে থাকেন।
তাদেরই একজন বলে উঠে: 'এতে অবাক হওয়ার কী আছে? তোমরা সে কথা কেন স্মরণ করছো না, বদরের যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের প্রশ্ন করেছিলেন যে, তোমরা কোন্ পদ্ধতিতে জিহাদ করবে?'
তখন আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ধনুক হাতে দাঁড়িয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলেন: 'শত্রু যদি আমার একশত গজের আওতায় থাকে, তাহলে তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে তাঁকে নিপাত করব। আর যদি তার চেয়ে নিকটে বর্শার আওতায় পৌঁছে যায়, তাহলে বর্শা নিক্ষেপের মাধ্যমে শত্রুকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করব, যাতে বর্শা শত্রুদেহ ভেদ করে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। আমি ততক্ষণ পর্যন্ত শত্রুর বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে বর্শা ব্যবহার করতে থাকব যতক্ষণ পর্যন্ত তা ভেঙে না যায়। যদি বর্শা ভেঙে যায়, তাহলে তা দূরে নিক্ষেপ করে তরবারি উন্মুক্ত করে নেব এবং তলোয়ার দিয়েই যুদ্ধ করতে থাকব?'
তার এ উত্তরের প্রেক্ষিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন: 'এ পদ্ধতিতেই যুদ্ধ করতে হবে। যে উত্তমভাবে যুদ্ধ করতে চায়, সে যেন আসেম ইবনে সাবেতের পদ্ধতিতে যুদ্ধ করে।'
উহুদ যুদ্ধের পরপরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শীর্ষস্থানীয় ছয় জন সাহাবীর এক বিশেষ দলকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে মদীনার বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। আসেম ইবনে ছাবেতকে এই দলের আমীর মনোনীত করা হলো। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যথাসময়ে রওয়ানা হয়ে গেলেন। মক্কার সীমানা ধরে পথ চলার এক পর্যায়ে হুযাইল গোত্রের দস্যুরা মুষ্টিমেয় কয়েকজন পথিককে দেখতে পেয়ে তাদের উপর আকস্মিক হামলা চালায়। তারা হুযাইল গোত্রের অন্যান্য লোকদের সহায়তায় চতুর্দিক থেকে সাহাবীদের ঘিরে ফেলে।
আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তার সঙ্গীরা তাদের প্রতিহত করার জন্য তলোয়ার উন্মুক্ত করলেন। তাদের এই প্রস্তুতি দেখে আক্রমণকারীরা বলল:
'মোকাবেলা করার মতো শক্তি নিঃসন্দেহে তোমাদের এই ছয় জনের নেই। আমরা আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমরা যদি আত্মসমর্পণ কর, তাহলে তোমাদের কোনো ক্ষতি করব না। সে ক্ষেত্রে তোমাদেরকে নিরাপত্তা দান করা হবে।'
তাদের এ প্রস্তাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে উদ্দেশ্যে তারা নিজেদের মধ্যে পরস্পর পরামর্শ-দৃষ্টি বিনিময় করলেন।
আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বললেন :
'আমি কখনো মুশরিকদের প্রতিশ্রুতিতে নিজেকে তাদের হাতে সোপর্দ করব না।'
তিনি উহুদ যুদ্ধে সুলাফা বিনতে সা'দ-এর পুরস্কারের ঘোষণার কথাও মনে মনে স্মরণ করলেন এবং নিজের তলোয়ার উঁচু করে বলতে থাকলেন:
اللهم إني أحمى لدينك وأدفع عنه ... فاحم لحمى وعظمى ولا تظفر بهما أحدا من أعداء الله .
'হে আল্লাহ! আমি তোমার দীনের রক্ষায় এবং তার হেফাযতে অস্ত্র তুলে ধরলাম। তুমি আমাকে সাহায্য কর। আর আমার দেহ ও হাড় হাড্ডিকে এমনভাবে হেফাযত কর যেন এই মুশরিক দুশমনরা কোনোভাবেই তার উপর বিজয়ী হতে না পারে।'
এই বলেই আক্রমণকারী হুযাইলীদের ওপর তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন। সাথে সাথে তাঁর অপর দুই সাথীও তাঁকে অনুসরণ করে দুশমনদের বিরুদ্ধে লড়াই-এ অংশ নেন। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে একের পর এক এ তিনজনই শাহাদাত বরণ করেন। অপর তিনজন তাদের আমীরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আত্মসমর্পণ করলে তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
প্রথম পর্যায়ে হুযাইল গোত্রের লোকেরা ভাবতেই পারেনি যে, এই তিনজনের মধ্যে আসেম ইবনে ছাবেতও রয়েছেন। পরে তারা তার পরিচয় পায়। পরিচয় পাওয়ার পর তারা যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে। তাদের এই আনন্দের কারণ হলো, সুলাফা বিনতে সা'দ-এর পুরস্কার ঘোষণা। জীবিত বা মৃত আসেমকে এনে দিলে দাতা তার ইচ্ছানুরূপ পুরস্কার লাভ করবে। কেননা, সুলাফা তার মাথার খুলি দিয়ে শরাব পান করে স্বামী ও পুত্রশোক প্রশমিত করবে।
আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শাহাদাতের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই হুযাইলদের অদূরেই কুরাইশদের কাছে তার এই সংবাদ পৌঁছে গেল।
তৎক্ষণাৎ কুরাইশ নেতারা হুযাইল গোত্রের নিকটে তাদের এক প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মাথা চাইল। তারা এই মাথা সুলাফার হাতে তুলে দিয়ে তার স্বামী ও তিন ছেলে হারানোর শোক কিছুটা হলেও লাঘব করতে চাইল। কুরাইশ প্রতিনিধিরা এ উদ্দেশ্যে প্রচুর অর্থ ও সোনা-দানা সঙ্গে নিয়ে রওয়ানাকালে এই বলে নির্দেশ দেওয়া হলো:
'তারা যেন আসেমের মাথার বিনিময়ে হুযাইলীদের সাথে কোনো প্রকার দর-কষাকষি করে সংকীর্ণ মনের পরিচয় না দেয়।'
কুরাইশ প্রতিনিধির হাতে আসেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শির তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তা বিচ্ছিন্ন করার জন্য মৃতদেহের নিকটে গিয়ে দেখে যে, মৌমাছি ও ভীমরুলের ঝাঁক তাঁর মৃতদেহকে ঘিরে আছে। তাঁর লাশের নিকট যেতে চেষ্টা করতেই মৌমাছি ও ভীমরুল তাদের চোখ, কান, মাথা, মুখমণ্ডলসহ শরীরের সব জায়গায় হুল ফোটাতে থাকে। এমতাবস্থায় তারা বারবার চেষ্টা করার পরও আসেম রাদিয়াল্লাহু আনহুর লাশের নিকট যেতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। আর এভাবে লাশের প্রতিরক্ষা হতে থাকে। তারা মৃতদেহের কাছে পৌঁছতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়ে পরস্পরে পরামর্শ করে যে, রাত পর্যন্ত আসেমের লাশকে এভাবেই থাকতে দাও। রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এলে ভীমরুল ও মৌমাছিরা লাশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সুযোগে তার শিরশ্ছেদ করা কোনো ব্যাপারই নয়। এ পরামর্শ মোতাবেক দিনের অবশিষ্ট সময়ে আসেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শিরশ্ছেদ করার চেষ্টা না করে লাশের অদূরে বসে তারা পাহারা দিতে থাকে।
কিন্তু দিনের শেষে রাত ঘনিয়ে আসার পূর্বেই আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল। মেঘের গর্জন একদিকে জনপদকে আতঙ্কিত ও অপরদিকে গাঢ় ধোঁয়ার মত মেঘরাশি চারদিক ছেয়ে ফেলল। সন্ধ্যা না হতেই মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হলো। রাতভর মুষলধারে এমন ঝড়-বৃষ্টি হলো, যা প্রবীণতম ব্যক্তিরা পর্যন্ত এ অঞ্চলে কখনো হতে দেখেনি। মুহূর্তের মধ্যেই পানিতে মাঠ-ঘাট ডুবে গেল এবং গোটা অঞ্চল বাঁধভাঙা প্লাবনে ভেসে গেল। সারা রাত বৃষ্টি শেষে সকাল বেলা হুযাইল গোত্রের লোকেরা আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শিরশ্ছেদের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ল; কিন্তু বহু খোঁজাখুঁজির পরেও শির তো শির তার লাশেরই কোনো সন্ধান পেল না। আসেম রাদিয়াল্লাহু আনহুর মৃতদেহকে প্রবল খর-স্রোতের তোড় দূরে বহুদূরে কোনো এক অজানা স্থানে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, যা এক আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। আল্লাহ আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর যুদ্ধকালীন কৃত দু'আ কবুল করেন এবং তাঁর পবিত্র দেহকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর পবিত্র মাথার খুলি দিয়ে সুলাফা বিনতে সা'দ-এর শরাব পান করার ঘৃণ্য অভিলাষ চিরতরে ব্যর্থ করে দেন।
আল্লাহ এভাবে তাঁর প্রিয় বান্দার ওপর মুশরিকদের সমস্ত ইচ্ছা পূরণের সর্ব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করেন।
টিকাঃ
১. আল ইসাবা: আত-তারজামা, ৪৩৪০ পৃ.
২. আল ইসতিয়াব: বি হাশেমে ইসাবা: ৩য় খণ্ড, ১৩২ পৃ.
৩. উসদুল গাবাহ: আত-তারজামা, ২৬৬৩ পৃ.
৪. আত তাবাকাতুল কুবরা: ২য় খন্ড, ৪১, ৪৩, ৫৫, ৭৯ পৃ: এবং ৩য় খণ্ড, ৯০ পৃ.
৫. হুলিয়াতুল আওলিয়া: ১ম খণ্ড, ১১০ পৃ.
৬. সিফাতুস সাফওয়া: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৭. তারীখুত তাবারীহ: ১০ম খন্ডের সূচি দ্রষ্টব্য.
৮. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৩য় খণ্ড, ৬২-৬৯ পৃ.
৯. তারীখু খালীফাতু ইবনে খিয়াত: ২৭ ও ৩৬ পৃ.
১০. আস সীরাতুন নুবুবিয়াহ লিইবনে হিশাম: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১১. আল মুহাব্বারু ফিততারীখ: ১১৮ পৃ.
১২. দেওয়ানে হাসান বিন ছাবেত ওয়া শুরুহিহী: আসেম ইবনে সাবেতের জীবনী.
১৩. হায়াতুস সাহাবা: ৪র্থ খণ্ডের সূচি দ্রষ্টব্য.
📄 সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ)
সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা প্রথম মুসলিম নারী, যিনি আল্লাহর দীনের প্রতিরক্ষায় এক মুশরিক গুপ্তচরকে হত্যা করেছিলেন।
প্রিয় পাঠক।
আপনারা কি জানেন? অসাধারণ প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতাসম্পন্ন এই মহিলা সাহাবী কে? যার সম্পর্কে হাজার পুরুষ হাজারো রকমের হিসাব করে সুরাহা পেত না। হ্যাঁ, সেই দুরন্ত সাহসী মহিলা তিনি, যিনি ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম একজন মুশরিক হত্যার গৌরব লাভ করেন। যিনি সর্বপ্রথম মুসলমানদের জন্য অশ্বারোহী যোদ্ধাকে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। যিনি সর্বপ্রথম তাঁর তরবারিকে জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর জন্য হাতে তুলে নিয়েছিলেন। তিনিই হলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফু সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব আল হাশেমিয়্যা আল কুরাইশিয়া্য। যিনি শুধু বংশ-পরিচয়েই যুগশ্রেষ্ঠ ছিলেন না; বরং সামাজিক মর্যাদায়ও সকলের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাদা কুরাইশ গোত্র প্রধান আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম তাঁর পিতা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মা আমেনা বিনতে ওয়াহাব-এর সহোদরা হা'লা বিনতে ওয়াহাব হলেন তাঁর মাতা। তাঁর প্রথম স্বামী ছিল আবূ সুফিয়ান ইবনে হারবের ভাই উমাইয়া গোত্রের নেতা আল হারেস ইবনে হারব। যিনি তাঁকে বিধবা হিসেবে রেখে ইহজগৎ ত্যাগ করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্বামী হলেন তদানীন্তন আরব রমণীদের নয়নমণি এবং প্রথম উম্মুল মুমিনীন খাদীজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার ভাই আওয়াম ইবনে খুওয়াইলিদ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাওয়ারী বা সাহায্যকারী যুবায়ের ইবনে আল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন তাঁর ছেলে। তিনি এতই নিরহংকার ও বিনয়ী ছিলেন যে, একমাত্র ঈমানের গৌরব ছাড়া আর কোনো গৌরব তাঁর ছিল না, যার প্রতি অন্যের দৃষ্টি আকৃষ্ট হতে পারে। তাঁর দ্বিতীয় স্বামী আল আওয়াম তাঁর কোলে একমাত্র শিশু যুবায়েরকে রেখে ইনতিকাল করেন। তিনি তাঁর শিশু সন্তানকে দুঃখ-কষ্টে লালন-পালন করেন। তাঁকে যুদ্ধবিদ্যা ও অশ্ব-পরিচালনার মতো সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বড় করে তোলেন। তীর-ধনুক তৈরির জ্ঞানও তাঁকে দেন। ঝুঁকিপূর্ণ ও ভীতিকর পরিস্থিতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার এবং যে কোনো ভয়-ভীতির মোকাবেলা করার মতো কঠিনতম কাজের জন্যও তাঁকে দুঃসাহসী করে গড়ে তোলেন। এসব অনুশীলনে যদি যুবায়েরকে তিনি বিন্দুমাত্র ইতস্তত বা ভয় করতে দেখতেন, তাহলে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাতের মতো কঠিন সাজাও দিতেন। এ জন্য তার এক চাচা তাঁকে তিরস্কার করলেন: 'ছেলেকে কি এমনভাবে প্রহার করতে হয়? তুমি ওকে শত্রুর মতো প্রহার করছ। মায়ের সোহাগভরা শাসন এটা নয়।'
তিনি এর উত্তরে তাকে বলেন:
مَنْ قَالَ قَدْ أَبْغَضْتُهُ فَقَدْ كَذَبْ وَإِنَّمَا أَضْرِبُهُ لِكَيْ يَلِبْ وَيَهْزِمَ الْجَيْشِ وَيَأْتِي بِالسَّلَبْ
'কে বলে যে, আমি যুবায়েরের সাথে শত্রুতাসুলভ আচরণ করছি, নিঃসন্দেহে সে মিথ্যা বলছে। প্রকৃতপক্ষে আমি তাকে এজন্য প্রহার করছি যে, সে যেন রণ-কৌশলে নৈপুণ্য অর্জন করতে, শত্রুবাহিনীর ওপর সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে, শত্রুবাহিনীর ব্যূহকে ভেদ ও তছনছ করতে এবং মালে গনীমতের সম্পদ নিয়ে ফিরতে সমর্থ হয়।'
আল্লাহ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামকে সমস্ত মানবকুলের জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী করে প্রেরণ করে তাঁর নিকটাত্মীয়দের থেকেই দাওয়াত শুরু করার নির্দেশ দেন। আল্লাহর এই আদেশ পেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল মুত্তালিব গোত্রের ছোট-বড়, শিশু-যুবক, নারী-পুরুষ সবাইকে একত্র করে তাদের উদ্দেশ্যে বলেন:
'হে আমার কন্যা ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ, হে সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব, হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর! আমি তোমাদেরকে আল্লাহর শান্তি থেকে রক্ষা করতে পারব না।'
অতঃপর তিনি তাদেরকে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার জন্য আহ্বান জানান। তাদেরকে তিনি তাঁর রিসালাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। তাদের মধ্যে যাদের তাওফীক হলো, তারা ঈমান এনে আল্লাহর নূরে নূরান্বিত হলেন এবং যারা তা প্রত্যাখ্যান করল তারা অন্ধকারেই নিমজ্জিত রইল। এ আহ্বানে সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীদের অন্যতম ছিলেন। সেদিন থেকেই সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব ঈমান গ্রহণের মাধ্যমে ইসলামী জীবন যাপন করতে আরম্ভ করেন।
সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব তাঁর ছেলে যুবায়ের ইবনে আওয়ামসহ প্রথম সারির মুসলমানদের মতো কুরাইশদের অবর্ণনীয় যুলুম-নির্যাতন ও অন্যায়-অত্যাচারের শিকারে পরিণত হলেন। আল্লাহর রাসূল তাঁর সাথী-সঙ্গীদের মদীনায় হিজরতের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিলে এই হাশেমী রমণীও তাঁর সমস্ত ধন-দৌলত, মূল্যবান আসবাবপত্র, সহায়-সম্পদ মক্কায় ফেলে রেখে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি ও দীনের হেফাযতকল্পে মদীনায় হিজরত করেন। ষাট বছর বয়সের এই মহিলাকে তার বার্ধক্য যেমন হিজরত থেকে বিরত রাখতে পারেনি, তেমনি জিহাদের ময়দানেও তাঁর বীরোচিত ভূমিকা রাখা থেকে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। অদ্যাবধি শ্রদ্ধা ও গর্বের সাথে মুসলমানগণ তা স্মরণ করে আসছেন। আমরা এখানে তাঁর জীবনের দুটি ঘটনার আলোচনা করছি। প্রথম ঘটনাটি হলো উহুদ যুদ্ধের ও দ্বিতীয়টি খন্দক যুদ্ধের। উহুদ যুদ্ধের ঘটনাটি হলো:
তিনি জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর উদ্দেশ্যে মহিলা ইউনিটের অন্তর্ভুক্ত হয়ে মুসলিম সৈন্যদের সাথে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি এ যুদ্ধে যোদ্ধাদের জন্য পানি বহন করে আনা, তৃষ্ণার্তদের পানি পান করানো, তীর শাণিত করা ও ধনুক ঠিক করার দায়িত্ব পালন করেন। এসব দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে তাঁর মনে যে উদ্দেশ্য লুক্কায়িত ছিল তা হলো, যুদ্ধের পুরো অবস্থার উপরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা। কারণ, তাতে অবাক হবার মতো কিছু ছিল না। যুদ্ধের ময়দানে তাঁরই ভাইপো মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর নেতৃত্বে আল্লাহর সিংহ উপাধিতে ভূষিত তাঁর ভাই হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং রাসূলুল্লাহর সাহায্যকারী তাঁর ছেলে যুবায়ের ইবনে আওয়াম উপস্থিত। সব কিছুর ঊর্ধ্বে ছিল ইসলাম। যা তিনি মনে-প্রাণে গ্রহণ করেছেন এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের জন্যই হিজরত করেছেন। তিনি যে জান্নাতের পথ ধরেছেন। এসব কারণই তাঁকে সশরীরে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হতে বাধ্য করেছে।
যুদ্ধের এক চরম সন্ধিক্ষণে কিছুসংখ্যক সাহাবী ছাড়া মুসলিম বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শত্রুদের অস্ত্রের সামনে রেখে প্রাণভয়ে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। অবস্থার এতই অবনতি ঘটে যে, মুশরিক কুরাইশরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘিরে ফেলে এবং তাঁকে হত্যার প্রচেষ্টা চালায়। দুঃখজনক এ অবস্থা দেখে সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহ তাআলা আনহা তাঁর পানি বহনকারী সুরাহী মাটিতে নিক্ষেপ করে পলায়নকারী এক মুসলিম সৈন্যের হাত থেকে তার বর্শা কেড়ে নেন এবং শত্রুক্রবাহিনীর যাকেই পান তাকেই বর্শার আঘাতে আহত করতে করতে সামনে অগ্রসর হতে থাকেন। তিনি পলায়নকারী মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে উচ্চৈঃস্বরে বলতে থাকেন:
'তোমাদের প্রতি ধিক্কার! তোমরা আল্লাহর রাসূলকে ময়দানে ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছ?'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সম্মুখে অগ্রসর হতে দেখে আশঙ্কা করলেন যে, তিনি তাঁর ভাই হামযার বিকৃত লাশ দেখে না ফেলেন। এ জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার ছেলে যুবায়েরকে ইশারা করে বলেন:
'তোমার মাকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়া থেকে বিরত রাখ।'
যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে তাঁর মায়ের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে বলতে থাকেন:
'আম্মা! আম্মা! আর অগ্রসর হবেন না, যে পর্যন্ত হয়েছেন তাই যথেষ্ট।'
সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা ছেলে যুবায়েরকে ধমক দিয়ে বললেন:
'সরে যাও, এখন মা মা বলে ডাকার সময় নয়।'
যুবায়ের তখন বললেন:
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে বিশেষভাবে মহিলাদের নির্দিষ্ট স্থানে চলে যেতে বলেছেন।'
তিনি প্রশ্ন করলেন:
'কেন? আমার শাহাদাতপ্রাপ্ত ভাই হামযার নাক-কান কেটে তার লাশকে বিকৃত করে ফেলেছে বলে? তাতো আমি জেনেই ফেলেছি। এতে কী হয়েছে এবং সে তো আল্লাহর পথেই শহীদ হয়েছে।'
সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার এই দৃঢ় মনোবল দেখে যুবায়েরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'হে যুবায়ের, তাঁকে তাঁর কাজ করতে দাও। যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটলে সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা তাঁর ভাই হামযা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর লাশের কাছে উপস্থিত হয়ে দেখতে পান যে, তাঁর পেট ফেড়ে ফেলা হয়েছে, কলিজা টেনে বের করা হয়েছে, নাক-কান কেটে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং চেহারাকে বিকৃত করা হয়েছে।'
তিনি তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করে বলতে থাকলেন:
'এ সব কিছুই আল্লাহর উদ্দেশ্যে, আল্লাহর সিদ্ধান্তেই আমি সন্তুষ্ট। আল্লাহর শপথ, আমি ধৈর্য অবলম্বন করব এবং আল্লাহর দরবারে এসবের প্রতিদান ইনশাআল্লাহ অবশ্যই পাব।'
এটাই ছিল উহুদ যুদ্ধে সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার গৌরবময় ভূমিকা।
খন্দক যুদ্ধে তিনি যে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। আসুন! ইতিহাসের পাতা থেকে আমরা তা জেনে নেই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নীতি ছিল, তিনি কোনো যুদ্ধাভিযানে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে শত্রুদের বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কায় নারী ও শিশুদের দুর্গের মধ্যে হেফাযতে রাখতেন। যেন অরক্ষিত অবস্থায় শত্রুরা তাদের ক্ষতি সাধন করতে না পারে। তাই খন্দকের যুদ্ধেও তিনি উম্মাহাতুল মুমিনীনসহ ফুফু সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব এবং অন্যান্য মুসলিম রমণীকে হাসসান ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত নিরাপদ দুর্গে রাখলেন। এটি ছিল মদীনার দুর্গসমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুরক্ষিত ও নিরাপদ এবং শত্রুর নাগালের বাইরে।
মুসলমানরা যখন খন্দকের পাড়ে অবস্থান গ্রহণ করে কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের মোকাবিলায় ব্যস্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মতো উদ্বেগজনক এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা ফজরের পূর্ব মুহূর্তে অন্ধকারে ছায়ার মতো কী যেন একটা নড়াচড়া করতে দেখলেন। পান সেদিকে মনোযোগের দিয়ে দেখলেন যে:
'এক অপরিচিত ব্যক্তি দুর্গের চতুষ্পার্শ্বে ঘুরাফেরা করে ভিতরের অবস্থা জানার চেষ্টা করছে। তিনি নিশ্চিত হলেন যে, সে নিশ্চয়ই ইহুদীদের গুপ্তচর হবে। সে হয়তো জানতে চাচ্ছে, দুর্গে কোনো পুরুষ পাহারাদার আছে, নাকি পাহারাবিহীন শুধু শিশু ও মহিলাদের অরক্ষিত রাখা হয়েছে!'
তিনি মনে মনে ভাবলেন:
'নিঃসন্দেহে এ বনু কুরাইযা গোত্রের ইহুদী গুপ্তচর। যে বনু কুরাইযা তাদের ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যকার চুক্তি ভঙ্গ করে কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের পক্ষ অবলম্বন করে তাদেরকে সাহায্য করছে। এ মুহূর্তে এই ইহুদীর হাত থেকে রক্ষা করার মতো কোনো মুসলমানই এখানে নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সমস্ত মুসলিম জনশক্তি সংঘবদ্ধভাবে দুশমনের মোকাবেলায় খন্দকে ব্যস্ত। আল্লাহর এই দুশমন আমাদের দুর্গের অবস্থা ও প্রকৃত সংবাদ ইহুদীদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হলে ইহুদীরা দুর্গে আক্রমণ করে শিশুদের ও মহিলাদের ক্রীতদাস-দাসীতে পরিণত করবে। এটা হবে মুসলমানদের জন্য চরম বিপর্যয়। এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের ইজ্জত রক্ষার অবশিষ্ট আর কিছু থাকবে না।'
এসব চিন্তা করে তিনি ওড়না মাথায় মুড়িয়ে এবং কোমর বেঁধে তাঁবুর একটি শক্ত খুঁটি লাঠি হিসেবে কাঁধে নিয়ে অতি গোপনে নিচে এসে আস্তে আস্তে দুর্গের দরজা খোলেন এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আল্লাহর এই দুশমনকে অনুসরণ করতে থাকেন। কাঁধে আঘাত করার মতো সুবিধাজনক স্থানে পৌছামাত্রই তাকে সজোরে আঘাত হানেন। এক আঘাতেই সে মাটিতে পড়ে যায়। পরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় আঘাত হানেন। সে নিস্তেজ হয়ে পড়লে এবং শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে তিনি সাথে আনা ছুরি দ্বারা এই ইহুদীর শিরশ্ছেদ করে ফেলেন এবং তার খণ্ডিত শির নিয়ে দুর্গের ছাদে চলে আসেন। দুর্গের উপর থেকে নিচে অপেক্ষমাণ তার অন্যান্য সাথীদের প্রতি লক্ষ্য করে তা ছুঁড়ে মারলে গড়িয়ে এসে তাদের সামনে পড়ে। এ দেখে সেখানে অবস্থানরত তার অন্য সাথীদের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার হয়। তারা এ ইহুদীর কর্তিত শির দেখে পরস্পরে বলাবলি করতে থাকে:
'আমরা এখন বুঝতে পারলাম যে, মুহাম্মদ মহিলা ও শিশুদেরকে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে যেতে পারে না, নিশ্চয়ই দুর্গে যোদ্ধাদের উল্লেখ্যযোগ্যসংখ্যক প্রহরী রয়েছে।'
আল্লাহ সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিবের ওপর সন্তুষ্ট হোন। তিনি মুসলিম রমণীদের জন্য এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি নিজে তাঁর ছেলেকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং তা ছিল সার্থক প্রশিক্ষণ। নিজের ভাই শহীদ হয়েছেন, তাতে তিনি উত্তম সবর করেছেন। বিপদ-আপদ ও কষ্টে আল্লাহ তাঁকে বারবার পরীক্ষা করেছেন। তিনি নিজেকে একজন দৃঢ় মনোবলের অধিকারিণী সাহসী মহিলা হিসেবে প্রমাণ করেছেন। ইতিহাসের পাতায় তাঁর বীরোচিত ভূমিকা স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাই সর্বপ্রথম মুসলিম রমণী, যিনি ইসলামের খাতিরে এক মুশরিককে হত্যা করেন।
টিকাঃ
১. উসদুল গাবাহ: ৭ম খণ্ড, ১৭৪ পৃ.
২. আত তাবাকাতুল কুবরা: ৮ম খণ্ড, ৪১ পৃ.
৩. সিয়ারু আলাম আন নুবালা: ২য় খণ্ড, ১৯৩ পৃঃ.
৪. আল ইসাবা: ৮ম খণ্ড, ৩৪৮ পৃ.
৫. আল ইসতিয়াব: ৪র্থ খণ্ড, ৩৪৫ পৃ.
৬. সামতুল আ-লাই: ১ম খণ্ড, ১৮ পৃ.
৭. হায়াতুস সাহাবা: ১ম খণ্ড, ১৫৪ পৃ. ও সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৮. আসসীরাতুন নুবুবিয়াহ লি-ইবনি হিশাম: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৯. জাইলু তারীখুত তাবারী: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১০. আল কামিল ফিতা তারীখ: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১১. আলামুন নিসা লিকিহালাহ: ২য় খণ্ড, ৩৪১-৩৪৬ পৃ.
১২. ফুতুহুল বুলদান লিল বালাযুরী.
১৩. আল আগানী লিআবিল ফারাজ: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১৪. আল মুসতাতরিফ লিল আবশিহী: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১৫. আল মাআরিফ লি ইবনে কুতায়বা: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
📄 উতবা ইবনে গাযওয়ান (রাঃ)
‘ইসলামে উত্তা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর একটি বিশেষ স্থান রয়েছে।’
-উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু
আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইশার নামাযান্তে তাঁর বিছানায় একটু বিশ্রাম করতে এসেছেন। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর রাতের আঁধারে জনগণের অবস্থা সরেজমিনে দেখার জন্য প্রতি রাতের ন্যায় আজও তিনি টহলে বের হয়ে পড়বেন।
কিন্তু আমীরুল মুমিনীনের চোখে নিদ্রা নেই। তা যেন আজ তাঁর থেকে হাজার মাইল দূরে। আজই তাঁর কাছে পারস্য বাহিনীর সাথে যুদ্ধরত মুসলিম সেনাপতির দূত এমন এক বার্তা নিয়ে এসেছে, যা তাঁকে উৎকণ্ঠিত করে তুলেছে।
'মুসলিম বাহিনীর হাতে পরাজিত পারস্য বাহিনী পশ্চাৎপসরণ করে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে ওৎ পেতে বসেছে। যখনই তাদের ওপর মুসলিম বাহিনী চূড়ান্ত আক্রমণের চেষ্টা চালায়, তখনই বিভিন্ন দিক থেকে তাদের জন্য সাহায্য এসে পৌঁছায়। ফলে মুসলিম বাহিনীর সামনে তারা দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। তাদের এই প্রতিরোধের মোকাবেলায় মুসলিম বাহিনী না নতুন সৈন্য সংগ্রহ করতে পারছে, না চূড়ান্তভাবে আক্রমণ করতে পারছে।'
তাঁকে আরো জানানো হয়েছে যে, 'পরাজিত এই সৈন্যদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি হলো 'উবুল্লাহ শহর', সেখান থেকে পারস্য সৈন্যদের বিপুল পরিমাণ রসদ ও জনশক্তি যোগান দেওয়া হচ্ছে।'
উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু চিন্তা করলেন: 'পারস্য সৈন্যদের রসদ সরবরাহ কেন্দ্র 'উবুল্লাহ' শহরকে দখল করে নেওয়া প্রয়োজন। যেন তাদের রসদ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।'
কিন্তু মুসলিম সৈন্যের স্বল্পতাই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মদীনা থেকে সৈন্য প্রেরণ করে মুসলিম বাহিনীকে শক্তিশালী করাও নানা কারণে অসুবিধাজনক। কেননা, মদীনার যুদ্ধক্ষম যুবক, বৃদ্ধ এবং নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সিপাহসালাররা জিহাদের উদ্দেশ্যে আগেই চলে গেছেন। মদীনায় যারা রয়ে গেছেন, তাদের সংখ্যা এ কাজের জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়।
উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সিদ্ধান্ত নিলেন: 'এই মুষ্টিমেয় সামরিক শক্তি ব্যবহারের জন্য অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন, বিচক্ষণ সেনাপতির রণকৌশলকে কাজে লাগিয়ে বিজয় সুনিশ্চিত করতে হবে।'
তীরের বোঝা সামনে ছড়িয়ে দিয়ে এক এক করে পছন্দসই তীর বেছে নেওয়ার মতো তিনি সকলের চেহারাই মনশ্চক্ষু দিয়ে দেখে নিলেন। কিন্তু কাউকে তাঁর কাছে আশানুরূপ মনে হলো না। তিনি বারবার এ বিষয়ে চিন্তা করতে থাকলেন। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলেন না। এক পর্যায়ে হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন:
'হ্যাঁ, এমন একজনকে পেয়েছি, যিনি এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।'
এবার খালীফাতুল মুসলিমীন নিদ্রার মনস্থ করলেন এবং মনে মনে বলতে থাকলেন:
'তিনি এমন এক মুজাহিদ, যিনি বদর, উহুদ, খন্দক এবং অন্যান্য যুদ্ধের ময়দানে তাঁর বীরত্বের প্রমাণ রেখেছেন। এমনকি ইয়ামামার যুদ্ধ-ময়দানও যার কৃতিত্বের সাক্ষ্য দেয়। সে যুদ্ধে তাঁর দৃঢ় ভূমিকার কথাও স্মরণীয়। যার তলোয়ার চালনায় কোনো আঘাত ফসকে যায় না, যার নিক্ষিপ্ত তীরও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। দু'বার যিনি হিজরত করার সৌভাগ্যও অর্জন করেছেন এবং দুনিয়ার বুকে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে সপ্তম ব্যক্তিও তিনি।'
সকাল হয়ে গেলে তিনি উত্ত্বা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তাঁর কাছে ডেকে পাঠালেন। তারপর মাত্র তিন শত সাত বা নয় জন যোদ্ধার সমন্বয়ে গঠিত এ বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে তাঁকে মনোনীত করলেন। তাঁর হাতে জিহাদের পতাকা তুলে দিয়ে তাঁকে অতি শীঘ্রই সামরিক সাহায্য পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিলেন।
এই স্বল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে উত্ত্বা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রওয়ানা হওয়ার প্রাক্কালে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর সেনাপতিকে নসীহত করেন:
'হে উত্ত্বা! আমি তোমাকে 'উবুল্লাহ' অভিযানে পাঠাচ্ছি। 'উবুল্লাহ' শত্রুদের সুরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। আল্লাহর কাছে দু'আ করছি, যেন তিনি এ ঘাঁটি বিজয়ে তোমাকে সাহায্য করেন। সেখানে পৌঁছে দুর্গে অবস্থানকারী শত্রুদের আল্লাহর পথে আহ্বান জানাও। তারা যদি তোমার আহ্বানে সাড়া দেয়, তাহলে তাদেরকে খোশ আমদেদ জানাবে। যারা ইসলাম গ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করবে, তারা যেন অপমানিত ও লাঞ্ছিত মনোভাব নিয়ে জিযিয়া কর প্রদান করে। যদি তারা এ দুটি শর্ত প্রত্যাখ্যান করে, তাহলেই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। বিজয় না হওয়া পর্যন্ত দুর্বলতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। তোমাকে যে পদে সমাসীন করা হয়েছে, দায়িত্বশীল হিসেবে তোমার অধীনস্থ সৈন্যদের সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করবে।'
'সাবধান! তোমার নাফসকে এতটুকু প্রশ্রয় দেবে না, যেন সে তোমাকে অহঙ্কারের দিকে ধাবিত করে। যদি তুমি সীমা লঙ্ঘন কর, তাহলে তুমি তোমার আখিরাতকে ধ্বংস করবে। তুমি ভালো করে জান যে, তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছ এবং মানবেতর জীবন থেকে মহৎ জীবন পেয়েছ। তুমি আজ এমন এক বাহিনীর সেনাপতি, যারা তোমার নির্দেশ পালনে সর্বদা প্রস্তুত। তুমি যা নির্দেশ দেবে সাথে সাথেই তারা তা পালন করবে। তোমার অঙ্গুলি সংকেত মাত্রই এর বাস্তবায়ন হবে। এর থেকে উত্তম কোনো নিয়ামত কী হতে পারে? যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়, তাহলে সবই বরবাদ হবে। যদি প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ কর, তাহলে নিজেকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। আমরা উভয়েই এ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি।'
উত্তা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর এই ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে ইরানের 'উবুল্লাহ' শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। সাথে ছিলেন তাঁর স্ত্রীসহ অন্য পাঁচজন সৈন্যের স্ত্রী ও বোন। এদের নিয়ে পথ অতিক্রম করতে করতে যখন উবুল্লাহর সন্নিকটে নারিকেলের বাগানবিশিষ্ট জনবসতির নিকট যাত্রা বিরতি করলেন, তখন তাদের সাথে বহন করে আনা খাদ্যভাণ্ডার একেবারেই শেষ। পুরো বাহিনীই ক্ষুধার সম্মুখীন। ক্ষুধা অসহ্য হয়ে উঠলে সেনাপতি উত্তা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কয়েকজন যোদ্ধাকে আশপাশ এলাকা থেকে খাদ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দিলেন। তারা খাবার সংগ্রহের জন্য বের হলেন। খাদ্য সংগ্রহের এক চমৎকার কাহিনী তাদেরই এক সাথী এভাবে বর্ণনা করেছেন যে:
'খাদ্যের সন্ধান করতে করতে আমরা এক জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম। সেখানে আমরা দুটি বস্তায় দু ধরনের খাবারযোগ্য জিনিস দেখতে পেলাম। যার একটা হলো খেজুর আর অন্যটা হলো হলুদ শক্ত খোসা আবৃত ছোট ছোট শস্য দানা। আমরা এ দুই প্রকারের খাদ্যই সৈন্যদের জন্য নিয়ে এলাম।'
আমাদের একজন এই ছোট ছোট দানা দেখে বললেন:
'এটা বিষ। শত্রুরা আমাদের জন্য তৈরি করে রেখেছে। তাই এর ধারে-কাছে যাওয়াও ঠিক হবে না। তাই আমরা খেজুরের দিকে মনোনিবেশ করলাম এবং খেজুরই খেতে থাকলাম। আমরা ছোট দানাবিশিষ্ট খাদ্যকে পরিহার করলাম। এ সময় আমাদের একটি ঘোড়া রশি ছিঁড়ে সেখানে এসে তা খেতে থাকে। আল্লাহর শপথ! আমরা আশঙ্কা করছিলাম যে, ঘোড়াটি মারা যাবে। তাই মৃত্যুর আগেই সেটিকে যবাহ করে এর গোশত কাজে লাগাব এমন চিন্তা করতে লাগলাম।'
কিন্তু ঘোড়ার মালিক এসে বলল:
'ঘোড়াটিকে এ অবস্থায়ই থাকতে দাও, আমি আজ রাতে এটিকে পাহারা দিয়ে রাখব। যদি এর মৃত্যুর আশঙ্কা দেখি, তাহলে যবেহ করে ফেলব।'
সকালে আমরা দেখলাম :
'ঘোড়াটি সুস্থই আছে। কোনোরূপ বিষাক্ত প্রতিক্রিয়া এর দেহে নেই।'
আমার বোন আমাকে বলল :
'আমি আব্বার কাছে শুনেছি, বিষাক্ত খাদ্য রান্না করলে বা আগুনে তাপ দিলে এর বিষক্রিয়া নষ্ট হয়ে যায়।'
অতঃপর কিছু দানা নিয়ে হাড়িতে জাল দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পরেই সে বলতে থাকে :
'তোমরা এসে দেখ, এই দানাগুলো লাল হয়ে যাচ্ছে। অতঃপর সে এর খোসা ফেলে দিলে সাদা সাদা দানা বের হয়ে এল এবং তা খাবার জন্য প্রস্তুত করল।'
তারপর আমরা সেগুলো খাওয়ার জন্য বড় বড় প্লেটে রাখলাম। সেনাপতি উত্তা আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন :
'খাদ্য গ্রহণের পূর্বে বিসমিল্লাহ পড়ে নাও, তারপর খেতে থাক।' আমরা দেখতে পেলাম তা এক সুস্বাদু খাদ্য। তারপর আমরা এই ছোট ছোট দানাবিশিষ্ট খাদ্য সম্পর্কে জানতে পারি যে, এর নাম হলো ধান।'
উত্তা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ ছোট বাহিনীকে যে উবুল্লাহ শহরের দিকে পাঠানো হয়েছিল, তা ছিল দাজলা নদীর তীরবর্তী সুরক্ষিত একটি শহর। এ শহর ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের অস্ত্রগুদাম। প্রাচীরবেষ্টিত এই শহরের প্রবেশদ্বারগুলোর শৃঙ্গে ছিল শত্রুবাহিনীর গতিবিধির প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখার চৌকিসমূহ। এতসব সত্ত্বেও উত্তা ইবনে গাযওয়ানের আক্রমণ থেকে তারা উবুল্লাহ শহরকে রক্ষা করতে পারল না। যদিও তাঁর সমরশক্তি ছিল একেবারেই নগণ্য ও অস্ত্রের ছিল খুবই অপ্রতুলতা। অপরদিকে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে বহু কষ্টে মাত্র ছয় শত যোদ্ধা দিয়ে সহযোগিতা করতে পেরেছিলেন। যাদের সাথে ছিল স্বল্পসংখ্যক মহিলা। যুদ্ধাস্ত্র বলতে তাদের হাতে ছিল মাত্র তরবারি ও বর্শা। পারস্যের অত্যাধুনিক অস্ত্রের মোকাবেলায় বুদ্ধিমত্তার সাথে সেনাপতির দ্বারা সেগুলোর ব্যবহারই ছিল মুসলিম বাহিনীর একমাত্র সম্বল।
উত্তা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মহিলাদের বর্শার মাথায় উড়ানোর জন্য ঝাণ্ডা তৈরি করালেন। যেন তারা মুসলিম বাহিনীর বেশ পিছনে অবস্থান নিয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে থাকে। তাদেরকে এ নির্দেশও দেওয়া হলো যে, মুসলিম বাহিনীর অগ্রগামী অংশ উবুল্লাহ শহরের কাছে পৌঁছলে তার পেছনের অংশ এমনভাবে ধুলা উড়াতে থাকবে, যেন আকাশ ধুলায় ধূসরিত হয়ে যায়। এতে যেন তারা কোনো দুর্বলতা না দেখায় এবং মহিলারা যেন সাহসিকতার সাথে ধুলা উড়াতে উড়াতে মুসলিম বাহিনীর অনুসরণ করতে থাকে। মুসলিম বাহিনী উবুল্লাহ শহরের সন্নিকটে পৌঁছতেই তাদের প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে পারস্য সৈন্যরা বেরিয়ে আসে। মুসলিম বাহিনীকে হঠাৎ তাদের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত দেখে সবাই হতভম্ব হয়ে যায়। তারা আরও দেখে যে, এ বাহিনীর পিছনে আকাশ ধুলায় ধূসরিত হয়ে পড়েছে এবং তার ফাঁকে ফাঁকে ঝাণ্ডা উড়ছে। এসব আলামত থেকে পারস্য বাহিনী মনে করল যে, পিছনে আরো অগণিত সৈন্য অগ্রগামী বাহিনীর সাহায্যার্থে অগ্রসর হচ্ছে। এ দেখে তারা তৎক্ষণাৎ নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করতে থাকে যে:
'দ্বারপ্রান্তে মুসলিম অগ্রগামী দল, নিশ্চয়ই পিছনে রয়েছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুসংগঠিত নিয়মিত বাহিনী। তাদের সংখ্যা অনেক হওয়ার কারণে তাদেরই ঘোড়ার খুরের আঘাতে আকাশ ধূলি ধূসরিত হচ্ছে। আমরা সংখ্যায় মুসলিম বাহিনীর তুলনায় একান্তই নগণ্য।'
এসব চিন্তা-ভাবনায় তাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। মুসলিম বাহিনীকে প্রতিরোধের পরিবর্তে তারা দিশেহারা হয়ে দ্রুত পালাতে থাকে। তাদের হাতের কাছে হালকা ও মূল্যবান সামগ্রী যে যা পারল তা নিয়ে দ্রুতগতিতে দাজলা নদীতে নোঙ্গর করে রাখা নৌকাগুলোতে গিয়ে উঠে উبুল্লাহ শহর থেকে পালাতে থাকল।
বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে রণ-চতুরতা প্রয়োগ করে উত্ত্বা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রক্তপাতহীন বিজয় লাভের মাধ্যমে উবুল্লাহ শহরে প্রবেশ করলেন। অতঃপর এ অভিযানকে অব্যাহত রেখে উবুল্লাহর পার্শ্ববর্তী শহর-গ্রামগুলো অধিকার করতে থাকলেন। এসব অভিযানে মুসলিম বাহিনী অগণিত মালে গনীমত অর্জন করলেন। প্রতিজনের অংশে সেগুলো এত পরিমাণ দেওয়া হলো যে, তা কল্পনা করাও কঠিন। এমনকি তাদের একজন মদীনায় ফেরত এলে উবুল্লাহ বিজয়ীদের অবস্থা জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তরে বললেন:
'তাদের অবস্থা আর কী জিজ্ঞাসা করছেন, রৌপ্য ও স্বর্ণমুদ্রাকে খাঁচি হিসেবে মেপে মেপে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে।'
এ সংবাদ শুনে মদীনার জনগণ এতই খুশি হলো যে, বসবাসের উদ্দেশ্যে উবুল্লাহর দিকে যেতে লাগল।
সীমাহীন প্রাচুর্যের এই শহরে সৈন্যদের বেশি দিন রাখলে তারা স্থানীয় অধিবাসীদের ন্যায় ভোগ-বিলাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়তে পারে ভেবে উত্ত্বা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ধন-দৌলতের এত প্রাচুর্যের মাঝে থাকলে শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় ভাঁটা পড়বে ও যুদ্ধ-জিহাদে অনীহা দেখা দেবে। এসব আশঙ্কা করে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে উবুল্লাহ শহর থেকে দূরে সেনানিবাস হিসেবে বসরা শহর তৈরির অনুমতি চেয়ে পাঠালেন। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর দূরদর্শিতায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বসরায় সেনানিবাস গড়ার অনুমতি প্রদান করেন। খালীফাতুল মুসলিমীনের অনুমতি পেয়ে উত্ত্বা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নতুন শহরের ডিজাইন ও ম্যাপ তৈরি করলেন। সর্বপ্রথম তিনি বসরায় বিশাল জামে মসজিদ তৈরি করলেন। তাকে আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামরিক প্রশিক্ষণ, সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করলেন। যার বদৌলতে তিনি ও তার বাহিনী শত্রুদের ওপর বিজয় অর্জন করতে এবং ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হলেন। অতঃপর মুসলিম বাহিনী একের পর এক শহর, নগর, গ্রাম-গঞ্জ জয় করে চলল। এমনকি এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে বিজিত শহরে তাদের নামে জায়গা বরাদ্দ ও নিজেদের জন্য বাড়ি-ঘর নির্মাণের প্রতিযোগিতা আরম্ভ হয়ে গেল; কিন্তু উত্তা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নিজের নামে কোনো জায়গাও বরাদ্দ নিলেন না এবং কোনো ঘর-বাড়িও নির্মাণ করলেন না। সৈনিকদের জন্য নির্ধারিত একটি সাধারণ তাঁবুতে বসবাস করাকেই তিনি অগ্রাধিকার দিলেন। কেননা, তিনি তাঁর পবিত্র অন্তরে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ঘর-বাড়ির চেয়ে পরকালের চিরস্থায়ী জান্নাতের বিরাট আশাকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছিলেন।
উত্ত্বা ইবনে গাযওয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন যে, বসরায় অবস্থানরত সৈন্যরা দুনিয়ার প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। ভোগ-বিলাসে এতই নিমগ্ন হয়ে পড়েছে যে, তারা নিজের সত্তাকেই ভুলে যাচ্ছে। কিছুদিন পূর্বেও যে বাহিনীর সদস্যরা ধান থেকে চাল বের করে তা দ্বারা সুস্বাদু খাদ্য হতে পারে বলে জানত না। মাত্র কিছুদিনের ব্যবধানে পারসিকদের বিখ্যাত মিষ্টি সামগ্রী 'ফালুযাজ' এবং ঘি, মধু, মাখন এবং পেস্তাদানা ইত্যাদির সমন্বয়ে তৈরি 'লাওযিনাজ' নামক খাদ্য সামগ্রী আজ তাদের নিত্যদিনের খাদ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত।'
তাদের এ অবস্থা দেখে তিনি দুনিয়ার পার্থিব মোহ ও প্রয়োজনের চেয়ে অধিক পাওয়ার চেষ্টা না করে পরকালের প্রতি আরও অধিক আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন।
অতঃপর তিনি কুফার জামে মসজিদে সবাইকে সমবেত করে তাদের উদ্দেশ্যে বললেন:
'সমবেত ভাইয়েরা! এ দুনিয়া ধ্বংসশীল ও ক্ষণস্থায়ী, যে তার অন্তিম লগ্ন অতিবাহিত করছে এবং আপনারা এ দুনিয়া থেকে সত্বর চিরস্থায়ী বাসস্থানে ফিরে যেতে বাধ্য। অতএব, আপনারা উত্তম পাথেয়সহ সেখানে গমন করার চিন্তা করুন। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সপ্তম সাহাবী। গাছের পাতা ছাড়া উত্তম খাদ্য বলতে আমাদের ভাগ্যে আর কিছুই জোটেনি, যা খেয়ে আমাদের মুখে ঘা হয়ে যেত। পরিত্যক্ত এক টুকরা চাদর পেয়ে একদিন আমি ও সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম। যার একাংশ দিয়ে আমি জামা তৈরি করেছিলাম এবং অন্য অংশ দিয়ে সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস পরিধানের লুঙ্গি হিসেবে ব্যবহার করেছিল। আজ আমরা উভয়ই এক এক প্রদেশের গভর্নর। নিজের নাফসের কাছে বিরাট ব্যক্তিত্ব ও সম্মানিত এবং আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট ও লজ্জিত হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।'
অতঃপর একজনকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে তাদেরকে পেছনে রেখে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে পড়েন। মদীনায় খালীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিদমতে পৌঁছে তাঁকে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি, কুফা ও বসরার গভর্নরের পদ থেকে অব্যাহতি দানের আবেদন জানান। হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও তাঁকে দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে কুফায় প্রত্যাগমনের জন্য চাপ দিতে থাকেন। পরস্পরের অনুরোধ ও পাল্টা অনুরোধের এক পর্যায়ে তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নির্দেশ মেনে নিতে বাধ্য হন। মনঃক্ষুণ্ণ অবস্থায় কুফার উদ্দেশ্যে উটে চড়ে এই দু'আ করতে থাকেন:
'হে আল্লাহ! আমাকে কুফায় আর ফিরিয়ে নিও না, হে আল্লাহ! আমাকে কুফায় আর ফিরিয়ে নিও না।'
আল্লাহ সাথে সাথে তাঁর দু'আ কবুল করলেন। মদীনা থেকে কিছু দূরে যেতে না যেতেই তাঁকে বহনকারী উটটি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে তিনিও ছিটকে মাটিতে পড়ে গিয়ে সাথে সাথে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
টিকাঃ
১. আমাদের দেশে ঘোড়ার গোশ্ত খাওয়ার প্রচলন নেই। অথচ শরীআতের দৃষ্টিতে এর গোশ্ত হালাল.
২. আল ইসাবা: জীবনী নং ৫৪১১.
৩. আল ইসতিয়াব: বিহামিশিল ইসতিয়াব: ৩য় খণ্ড, ১১৩ পৃ.
৪. তারীখুল ইসলাম লিযযাহাবী: ২য় খণ্ড, ৭ পৃ.
৫. উসদুল গাবাহ: ৩য় খণ্ড, ৩৬৩ পৃ.
৬. তারীখু খলীফাতু ইবনে খিয়াত: ১ম খণ্ড, ৯৫-৯৮ পৃ.
৭. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৭ম খণ্ড, ৪৮ পৃ.
৮. মু'জামুল বুলদান: বসরা বিষয়ক আলোচনা: ১০ খণ্ড, ৪৩০ পৃ.
৯. আত তাবাকাতুল কুবরা লি ইবনে সা'দ: ৭ম খণ্ড, ১ পৃ.
১০. তারীখুত তাবারী: ১০ খন্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১১. সিয়ারু ই'লামুন নুবালা: ১ম খণ্ড, ২২১-২২২ পৃ.
১২. হায়াতুস সাহাবা: ৪র্থ খণ্ড, সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
📄 নু'আইম ইবনে মাসউদ (রাঃ)
‘নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জানতেন, শত্রুপক্ষকে ধোঁকা দেওয়াও যুদ্ধেরই একটি কৌশল।’
তীক্ষ্ণ মেধার জাগ্রতপ্রাণ, দৃঢ় মনোবল, কর্মচঞ্চল ও ঝটপট কঠিন পরিস্থিতি বুদ্ধিমত্তার সাথে মোকাবেলা করতে পারঙ্গম মরুস্তান যুবক নু'আঈম ইবনে মাসউদ। মুহূর্তেই বাড়িতে, পর মুহূর্তেই সফরে, তার রুটিন কী তা একমাত্র সে-ই জানে। বহুমুখী গুণাবলির অধিকারী, নাচ, গান ও নর্তকীপ্রিয় নজদের সৌখিন এ যুবকের আমোদ-প্রমোদ ও বিলাসিতার যেমন জুড়ি ছিল না, তেমনি নাচ গানের প্রতিও তার ছিল প্রবল ঝোঁক। এসব নানা কারণেই সে ইয়াসরিবের ইহুদীঘেঁষা হয়ে ওঠে।
আমোদ-প্রমোদ, গান ও বাজনার ইচ্ছা করলেই সে ইয়াসরিবের পথে রওনা হতো। তার ভোগ-বিলাসের খায়েশ পূরণের জন্য ইয়াসরিবের ইহুদীদের অঢেল অর্থ দান করত। এসব কারণে সর্বদাই তার ইয়াসরিবে যাতায়াত অব্যাহত থাকত। ইহুদীদের বিশেষ করে বনু কুরাইযা গোত্রের সাথে তার সম্পর্কও ছিল নিবিড় ও মধুর। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানবজাতির কল্যাণ এবং মঙ্গলের জন্য মক্কায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দীনে হক ও হেদায়াতসহ প্রেরণ করলেন। প্রথমে মক্কায় ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়লে নু'আঈম ইবনে মাসউদ ইসলাম থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ মাত্র একটিই, ইসলাম গ্রহণ তার ভোগ-বিলাস ও আমোদ-প্রমোদে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। তাহলে তো এ দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সবই পরিহার করতে হবে তাকে। এসব ভেবে সে ইসলামকে শুধু এড়িয়েই চলল না; বরং যারা ইসলামের চরম শত্রু তাদের সহযোগী হয়ে উঠল।
নু'আঈম ইবনে মাসউদ ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে খন্দক বা আহযাবের যুদ্ধে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। তার এই পরিবর্তিত ঘটনা সে নিজ হাতেই পরবর্তীতে লিপিবদ্ধ করে। ইতিহাসের পাতা তার সেই ভূমিকার কথা অদ্যাবধি স্বর্ণাক্ষরে ধারণ করে আছে। নু'আঈম ইবনে মাসউদের জীবনী আলোচনার পূর্বে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোচনা করা দরকার।
খন্দক বা আহযাব যুদ্ধের মাত্র কিছুদিন পূর্বে ইয়াসরিবের বনূ নযীর গোত্রের ইহুদীরা এবং তাদের নেতৃবৃন্দ ইসলামকে চিরতরে নির্মূল করার চক্রান্ত করে। এ জন্য তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। তারা মক্কার কুরাইশ নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করে। তাদের সাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, কুরাইশ বাহিনী মদীনায় পৌঁছলে তারা তাদের সাথে যোগ দেবে। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য দিন-তারিখও ধার্য করা হয়। সাথে সাথে নির্ধারিত তারিখের ব্যতিক্রম যাতে না হয়, সে দিকটির প্রতিও গুরুত্বারোপ করে। কুরাইশদের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার পর তারা নজদের 'গাতফান' গোত্রের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য রওয়ানা হয়। ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে তাদেরকেও প্ররোচিত করে এবং এই নতুন দীন ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য তাদের আহ্বান জানায়। কুরাইশদের সাথে তাদের গোপন সম্পর্কের ব্যাপারেও তাদের অবহিত করে। তারা গাতফান গোত্রের সাথেও একই ধরনের প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয়, যেমনটি হয়েছিল কুরাইশদের সাথে। কুরাইশদের মতো তাদের সাথেও সময় ও দিন-তারিখ নির্ধারণ করে। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক মক্কার কুরাইশদের সর্বস্তরের মানুষ তাদের নেতা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মদীনার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ে। গাতফান গোত্রের লোকজনও উওয়াইনা ইবনে হিস্স্স আল গাতফানীর নেতৃত্বে বের হয়ে আসে। গাতফান বাহিনীর অগ্রভাগে ছিল আমাদের এ কাহিনীর নায়ক নু'আঈম ইবনে মাসউদ।
কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের সম্মিলিত বাহিনী যে মদীনা আক্রমণ করতে আসছে, এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যথাসময়েই পৌঁছে। তিনি পরামর্শের জন্য সাহাবীদের সাধারণ সভার আহবান করেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেন যে, মদীনার চারপাশে খন্দক খনন করা হবে। আক্রমণকারী বাহিনী অকস্মাৎ এই খন্দকে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সম্মুখে অগ্রসর হতে ব্যর্থ হবে। তখন এ খন্দককে সামনে রেখে মুসলিম বাহিনী তার সুদৃঢ় অবস্থান নিয়ে তাদের মোকাবেলা করবে। পরিকল্পনা মোতাবেক মক্কা ও নজদ থেকে বিরাট দুই বাহিনী মদীনার প্রবেশদ্বারের সন্নিকটে এসে খন্দক দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়।
এদিকে বনী নাযীর গোত্রের ইহুদী নেতৃবর্গ মদীনায় বসবাসরত বনু কুরাইযা ইহুদী গোত্রের নেতৃবৃন্দের সাথে মিলিত হয়। তাদেরকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কৃত সন্ধি ভঙ্গ করে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেয়। নজদ থেকে আগত এই বিশাল বাহিনীর প্রতি সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণের জন্যও প্ররোচিত করতে থাকে। বনী কুরাইযা গোত্রের নেতৃবর্গ তাদেরকে বলে:
'সত্যিকারার্থে আমরা যা চাই ও পছন্দ করি, আপনারা আমাদেরকে সেদিকেই আহবান করছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, আপনারা ভাল করেই জানেন যে, আমাদের ও মুহাম্মদ-এর মধ্যে শান্তি চুক্তি হয়েছে এ শর্তে যে, শত্রুর আক্রমণে আমরা তাঁকে সাহায্য করব। অন্যদিকে সেও আমাদেরকে মদীনায় শান্তিতে বসবাসের নিশ্চয়তা প্রদান করবে। আপনারা এও ভালো করে জানেন যে, অদ্যাবধি তার সাথে আমাদের কৃত চুক্তির ব্যাপারে কোন অভিযোগ করার মতো কারণ ঘটেনি। আমরা আশঙ্কা করছি, মুহাম্মদ যদি এ যুদ্ধে বিজয়ী হয়, তাহলে সে কঠোর ও নির্দয় হস্তে আমাদের এ বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ নেবে এবং চিরতরে আমাদেরকে মদীনা থেকে উচ্ছেদ করে ছাড়বে।'
কিন্তু বনূ নযীর নেতৃবর্গ চুক্তিভঙ্গের জন্য তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেই থাকে। তারা শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যানের সুফল ও ভবিষ্যৎ কল্যাণের আশ্বাসও প্রদান করে। তারা নিশ্চয়তা দান করে যে:
'নিঃসন্দেহে এ যুদ্ধে মুহাম্মদ পরাজিত হবেই। তাদের বিশাল দুটি বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে মুসলমানগণ পরাজিত হবে বলে তারা তাদেরকে আশান্বিত করে তোলে।'
পরিশেষে বনু কুরাইযার ইহুদীরা তাদের প্ররোচনায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কৃত চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণকারী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে যোগদানের ঘোষণা দেয়। মদীনার অভ্যন্তরে বসবাসরত ইহুদীদের চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণকারীদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণের এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদের উপর বজ্রপাতের মতো আপতিত হয়।
আক্রমণকারী বাহিনী মদীনা অবরোধ করে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব ভালো করেই বুঝতে পারলেন যে, তিনি দুই দিক দিয়েই শত্রুবেষ্টিত হয়ে পড়েছেন। কুরাইশ ও গাতফান বাহিনী মদীনার বাইরে মুসলমানদের মুখোমুখি ছাউনি গেড়ে এবং বনু কুরাইযার ইহুদীরা মদীনার অভ্যন্তরে বসে মুসলমানদেরকে পেছনের দিক থেকে আক্রমণের জন্য ওৎ পেতে থেকে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথীদের মধ্যে 'মুনাফিকরা' বলতে থাকে:
'মুহাম্মদ আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, আমরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ধনভাণ্ডারের মালিক হয়ে যাবো। অথচ এখন আমাদের এক একজনের অবস্থা হলো নিরাপদে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে পর্যন্ত যেতে পারছি না।'
এরপর মুনাফিকরা দলে দলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে এ বলে চলে যেতে লাগল :
'বনূ কুরাইযা গোত্র চুক্তিভঙ্গ করায় মদীনায় আমাদের স্ত্রী-পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি ও বাড়ি-ঘর হুমকির সম্মুখীন।'
তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এ কথাও ব্যক্ত করল যে:
'যুদ্ধ মারাত্মক আকার ধারণ করলে বনূ কুরায়যা গোত্রের আক্রমণ থেকে তারাও নিরাপদ নয়।'
এভাবে দেখা গেল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে শেষ পর্যন্ত কয়েক শ' সত্যিকার ঈমানদার সাহাবী যুদ্ধ-ময়দানে অবশিষ্ট থাকলেন।
ক্রমাগত বিশ দিনের অবরোধের মধ্যে কোনো এক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাকুলভাবে বারবার এই বলে আল্লাহর দরবারে দু'আ করতে থাকেন:
اللهُمَّ إِنِّى أَنْشِدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَنْضَدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ .
'হে আল্লাহ! তোমার কাছে সাহায্য চাচ্ছি, যে সাহায্যের তুমি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ।'
এদিকে রুটিন মোতাবেক সে রাতেও নু'আঈম ইবনে মাসউদ তার শয্যা গ্রহণে যায়। কিন্তু আজ তার চোখে ঘুম নেই, তার দু'চোখের পলকে যেন কাঁটা ফুটছে। সর্বশক্তি নিয়োগ করেও সে ঘুমের ধারে-কাছেও পৌঁছতে সমর্থ হলো না। তার থেকে ঘুম যেন হাজার মাইল দূরে। বিনিদ্র রজনীতে আকাশের অসংখ্য তারকারাজির দিকে তাকিয়ে রইল সে। আজ সে খুব বেশি দুশ্চিন্তার শিকার। চিন্তার সাগরে সে যেন হাবুডুবু খাচ্ছে। চিন্তার শেষ নেই। হঠাৎ যেন এক সময় সে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল। তার বিবেক তাকে ভিতর থেকে বলে উঠল:
'ধিক্কার তোমাকে হে নু'আঈম। সুদূর নজদ থেকে এই দূর-দূরান্তে কেন এসেছ? কিসে তোমাকে এই মহান ব্যক্তি ও তাঁর সাথীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নিয়ে এসেছে। কিসের স্বার্থে? এ যুদ্ধ কি তোমার ছিনিয়ে নেওয়া অধিকার প্রতিষ্ঠার? নাকি তোমার লুণ্ঠিত সম্ভ্রমের প্রতিশোধের?'
'অকারণে তুমি এখানে এসেছ নু'আঈম! ধিক্কার তোমাকে...।'
তার অনুতপ্ত মন তাকে ধিক্কার দিয়ে বলতে থাকল:
'তোমার মতো একজন বিজ্ঞ লোকের পক্ষে কি অকারণে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হওয়া শোভা পায়? সৎ ও নির্দোষ এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে কে তোমাকে উৎসাহিত করেছে? যিনি তাঁর অনুসারীদের ন্যায়বিচার ও পরোপকারের আদেশ এবং নিকটাত্মীয়দের অধিকার প্রদানে সর্বদা নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তাঁর বিরুদ্ধে তুমি যুদ্ধ করতে এসেছ? কে তোমাকে তাঁর সাথীদের রক্তপাত ঘটানোর উদ্দেশ্যে চমকানো বর্ষা বহনে অনুপ্রাণিত করেছে? যারা একমাত্র সত্য ও হেদায়াতের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত, তুমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছ?'
নু'আঈম ও তার বিবেকের এই বিতর্ক বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। বিতর্কের পরিসমাপ্তি ঘটল। সে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হলো। রাতের অন্ধকারে নু'আঈম গাতফান গোত্রের সৈন্য ছাউনি থেকে সবার নজর এড়িয়ে দ্রুতগতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সামনে উপস্থিত দেখে বললেন:
'তুমি কি নু'আঈম ইবনে মাসউদ?'
সে উত্তরে বলল:
'হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!'
'গভীর রাতে এ মুহূর্তে কী উদ্দেশ্যে এসেছ?'
নু'আঈম উত্তর দিলো:
'একমাত্র কালেমা শাহাদাতের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আপনার খিদমতে উপস্থিত হয়েছি।'
এই বলেই সে কালেমা শাহাদাত পাঠ করল। অতঃপর আরয করল:
'হে আল্লাহর রাসূল। আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। এ কথা গাতফান গোত্রের কেউ জানে না। এ মুহূর্তে আমাকে যে কোনো খিদমতের জন্য নির্দেশ দিন।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন:
إِنَّمَا أَنْتَ فِينَا رَجُلٌ وَاحِدٌ ... فَاذْهَبْ إِلَى قَوْمِكَ وَخَدِّلْ عَنَّا إِنْ اسْتَطَعْتَ فَإِنَّ الْحَرْبَ خُدْعَةٌ .
'তুমিই আমাদের একমাত্র ব্যক্তি, যে এ মুহূর্তে কূটনৈতিক চাল চালতে পার। তুমি যদি পারো গাতফান গোত্রকে যুদ্ধ-ময়দান থেকে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কর। কেননা, শত্রুপক্ষকে ধোঁকায় ফেলা সমর-কৌশলেরই অংশ।'
নু'আঈম বললেন:
'হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার দ্বারা আপনি এমন কিছু দেখতে পাবেন, যা আপনাকে সন্তুষ্ট করবে, ইনশাআল্লাহ।'
এই বলে নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমত থেকে সে মুহূর্তেই বনু কুরাইযা গোত্রের আস্তানায় তার আগের সঙ্গী-সাথীদের কাছে গেলেন। তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও কথাবার্তার এক পর্যায়ে তাদের বললেন:
'হে বনু কুরাইযার ভাইয়েরা! আমি যে তোমাদের একজন বিশ্বস্ত ও অন্তরঙ্গ বন্ধু তা তো তোমরা ভালো করেই জান। সর্বদা তোমাদের প্রতি আমার সৎপরামর্শ ও আন্তরিকতার ব্যাপারেও অবগত।'
তারা বলল:
'হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ নু'আঈম! তুমি আমাদের নিকট নিঃসন্দেহে আস্থাভাজন ব্যক্তি।'
তাদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত হয়ে অতঃপর বললেন:
'এ যুদ্ধে কুরাইশ ও গatফান গোত্রের অবস্থান তোমাদের অবস্থান থেকে নিঃসন্দেহে ভিন্নতর।'
তারা বলল, কিভাবে?
নু'আঈম বললেন:
'মদীনা তোমাদের নিজেদের শহর। এ শহরেই তোমাদের ধন-সম্পত্তি, সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী-পুত্র সবই অবস্থান করছে। কোনোক্রমেই তোমরা এসব অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে পার না। অপরদিকে কুরাইশ ও গাতফানদের ধন-সম্পত্তি, অর্থ-কড়ি, সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রী-পুত্র সবই মদীনার বাইরে তাদের নিজেদের শহরে। তারা সেখান থেকে মুহাম্মদের সাথে যুদ্ধ করতে এসেছে। তারা তোমাদের শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে তার বিরুদ্ধে সহযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। যদি তারা বিজয়ী হয়, তাহলে মুহাম্মদের ধন-সম্পত্তিকে মালে গনীমত হিসেবে তারাই নেবে। আর যদি কুরাইশ ও গাতফানদের বাহিনী পরাজিত হয়, তাহলে মুহাম্মদের তাড়া খেয়ে তারা তোমাদেরকে মুহাম্মদের হাতে ফেলে রেখে নিরাপদেই স্ব-স্ব গোত্রে ফিরে যাবে। সে ক্ষেত্রে মুহাম্মদ তোমাদের থেকে চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যা কল্পনাও করতে পারছ না। তোমরা ভালো করেই জান যে, এককভাবে মুহাম্মদের মোকাবেলা করার শক্তি তোমাদের নেই।'
তারা বলল: 'ঠিকই বলছ। এখন তোমার পরামর্শ কী?'
তিনি বললেন: 'আমার কাছে এর একমাত্র সমাধান হলো, যতক্ষণ না তোমরা তাদের নেতৃস্থানীয় কিছু লোককে জামানত হিসেবে তোমাদের কাছে না রেখেছ, ততক্ষণ তোমরা তাদের সাথে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করো না। তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের জামানত হিসেবে রাখতে পারলেই তারা সর্বশক্তি দিয়ে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে প্রাণপণে যুদ্ধে নেমে পড়বে। হয় বিজয়, নয় তোমাদের ও তাদের শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত নিঃশেষ।'
তারা বলে উঠল: 'হ্যাঁ, তুমি উত্তম পরামর্শ দিয়েছ।'
অতঃপর তাদের থেকে বিদায় নিয়ে নু'আঈম ইবনে মাসউদ কুরাইশ সেনাপতি আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের কাছে এসে তাকে ও তার সঙ্গী নেতৃস্থানীয়দের বললেন:
'কুরাইশ ভাইয়েরা! মুহাম্মদের সাথে আমার শত্রুতা ও তোমাদের সাথে আমার আন্তরিকতা ও সহৃদয়তার কথা তোমরা ভালো করেই জান। আমার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পৌছেছে, যা তোমাদের জানান আমি আমার গুরুদায়িত্ব বলে মনে করি। তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ হলো, বিষয়টি তোমাদের মধ্যেই সীমিত রাখবে এবং আমার বরাত বা হাওয়ালা দিয়ে তা কখনো প্রচার করবে না। তারা কথা দেয় যে, এ ব্যাপারে আমরা অবশ্যই তোমার অনুরোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করব।'
অতঃপর নু'আঈম বলেন:
'বনু কুরাইযা গোত্র মুহাম্মদের বিরুদ্ধাচরণে অনুতপ্ত। তারা মুহাম্মদের কাছে দূত পাঠিয়ে আবেদন করেছে যে, আমরা আমাদের কৃতকর্মের জন্য ভীষণভাবে অনুতপ্ত। আমরা শান্তিচুক্তি পুনর্জীবিত করে সন্ধিভুক্ত হতে চাই। আপনার সদয় সম্মতি পেলে আমরা কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের বেশ কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এনে আপনার কাছে সোপর্দ করতে চাই, যেন আপনি তাদের শিরশ্ছেদ করতে পারেন। আপনাকে এই শিকার সংগ্রহ করে দেওয়ার মাধ্যমে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আপনার সাথে মিলিত হতে চাই।' মুহাম্মদ তাদের এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। ইহুদীরা যদি তোমাদের কাছে জামানত চায়, আমার অনুরোধ, তাহলে কাউকেও জামানত হিসেবে দেবে না।'
আবু সুফিয়ান বলল:
'এ গোপন সংবাদ প্রদানের মাধ্যমে নিঃসন্দেহে তুমি আমাদের প্রকৃত বন্ধুদের দাবিই পূরণ করলে।'
অতঃপর নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু সুফিয়ানের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে গাতফান গোত্রের অন্যান্য নেতাদের সাথে মিলিত হন। আবূ সুফিয়ানের সাথে তিনি যেভাবে কথা বলেছেন, তাদের কাছেও অনুরূপভাবে কথা বলেন। আবু সুফিয়ানকে যেভাবে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তাদেরও অনুরূপ পরামর্শ দেন।
প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে আবু সুফিয়ান বনু কুরাইযার মনোভাবকে যাচাই করার জন্য তাদের কাছে পরের দিন ভোর হতে না হতেই তার নিজ ছেলেকে দূত হিসেবে পাঠাল। তার ছেলে বনু কুরাইযার নেতৃবর্গের কাছে গিয়ে বলল:
'আমার পিতা আবু সুফিয়ান আপনাদের খিদমতে সালাম আরয করেছেন এবং বলে পাঠিয়েছেন যে, যেহেতু আমরা মুহাম্মদ এবং তার সঙ্গী-সাথীদেরকে দীর্ঘদিন যাবৎ অবরোধ করে রেখেছি, যার ফলে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমরা চাচ্ছি, কালবিলম্ব না করে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরম্ভ করি এবং এই অবরোধের সমাপ্তি ঘটাই। আপনাদের খিদমতে আমার পিতা আমাকে এ জন্যই পাঠিয়েছেন, যেন আগামীকালই আমাদের ও আপনাদের এ যৌথ আক্রমণের সূচনা হয়।'
ইহুদীরা তাকে বলে:
'আগামীকাল শনিবার। আমাদের ধর্মমতে পবিত্র দিন। আমরা কাল কোনো মতেই যুদ্ধে জড়িত হতে পারব না। এ ছাড়াও আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত আপনাদের সাহায্যার্থে যুদ্ধে জড়িত হতে পারব না, যতক্ষণ না আপনাদের কুরাইশ গোত্র ও গাতফান গোত্রের সত্তরজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে আমাদের কাছে জামানত হিসেবে না রাখবেন। কারণ, আমরা আশঙ্কা করছি, প্রচণ্ড যুদ্ধের ভয়াবহতা সহ্য করতে না পেরে আপনারা আমাদেরকে একা মুহাম্মদের হাতে বলির পাঁঠা হিসেবে ছেড়ে দিয়ে স্ব-স্ব আবাসভূমিতে পালিয়ে যেতে পারেন। আপনারা ভালো করেই জানেন যে, সে পরিস্থিতিতে মুহাম্মদের মোকাবেলা করার সাধ্য আমাদের নেই।'
কিন্তু বনূ নযীর নেতৃবর্গ চুক্তিভঙ্গের জন্য তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেই থাকে। তারা শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যানের সুফল ও ভবিষ্যৎ কল্যাণের আশ্বাসও প্রদান করে। তারা নিশ্চয়তা দান করে যে:
'নিঃসন্দেহে এ যুদ্ধে মুহাম্মদ পরাজিত হবেই। তাদের বিশাল দুটি বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে মুসলমানগণ পরাজিত হবে বলে তারা তাদেরকে আশান্বিত করে তোলে।'
পরিশেষে বনু কুরাইযার ইহুদীরা তাদের প্ররোচনায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কৃত চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণকারী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে যোগদানের ঘোষণা দেয়। মদীনার অভ্যন্তরে বসবাসরত ইহুদীদের চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণকারীদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণের এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদের উপর বজ্রপাতের মতো আপতিত হয়।
আক্রমণকারী বাহিনী মদীনা অবরোধ করে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব ভালো করেই বুঝতে পারলেন যে, তিনি দুই দিক দিয়েই শত্রুবেষ্টিত হয়ে পড়েছেন। কুরাইশ ও গাতফান বাহিনী মদীনার বাইরে মুসলমানদের মুখোমুখি ছাউনি গেড়ে এবং বনু কুরাইযার ইহুদীরা মদীনার অভ্যন্তরে বসে মুসলমানদেরকে পেছনের দিক থেকে আক্রমণের জন্য ওৎ পেতে থেকে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথীদের মধ্যে 'মুনাফিকরা' বলতে থাকে:
'মুহাম্মদ আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, আমরা রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ধনভাণ্ডারের মালিক হয়ে যাবো। অথচ এখন আমাদের এক একজনের অবস্থা হলো নিরাপদে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে পর্যন্ত যেতে পারছি না।'
এরপর মুনাফিকরা দলে দলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে এ বলে চলে যেতে লাগল :
'বনূ কুরাইযা গোত্র চুক্তিভঙ্গ করায় মদীনায় আমাদের স্ত্রী-পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি ও বাড়ি-ঘর হুমকির সম্মুখীন।'
তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এ কথাও ব্যক্ত করল যে:
'যুদ্ধ মারাত্মক আকার ধারণ করলে বনূ কুরায়যা গোত্রের আক্রমণ থেকে তারাও নিরাপদ নয়।'
এভাবে দেখা গেল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে শেষ পর্যন্ত কয়েক শ' সত্যিকার ঈমানদার সাহাবী যুদ্ধ-ময়দানে অবশিষ্ট থাকলেন।
ক্রমাগত বিশ দিনের অবরোধের মধ্যে কোনো এক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাকুলভাবে বারবার এই বলে আল্লাহর দরবারে দু'আ করতে থাকেন:
اللهُمَّ إِنِّى أَنْشِدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَنْضَدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ .
'হে আল্লাহ! তোমার কাছে সাহায্য চাচ্ছি, যে সাহায্যের তুমি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ।'
এদিকে রুটিন মোতাবেক সে রাতেও নু'আঈম ইবনে মাসউদ তার শয্যা গ্রহণে যায়। কিন্তু আজ তার চোখে ঘুম নেই, তার দু'চোখের পলকে যেন কাঁটা ফুটছে। সর্বশক্তি নিয়োগ করেও সে ঘুমের ধারে-কাছেও পৌঁছতে সমর্থ হলো না। তার থেকে ঘুম যেন হাজার মাইল দূরে। বিনিদ্র রজনীতে আকাশের অসংখ্য তারকারাজির দিকে তাকিয়ে রইল সে। আজ সে খুব বেশি দুশ্চিন্তার শিকার। চিন্তার সাগরে সে যেন হাবুডুবু খাচ্ছে। চিন্তার শেষ নেই। হঠাৎ যেন এক সময় সে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল। তার বিবেক তাকে ভিতর থেকে বলে উঠল:
'ধিক্কার তোমাকে হে নু'আঈম। সুদূর নজদ থেকে এই দূর-দূরান্তে কেন এসেছ? কিসে তোমাকে এই মহান ব্যক্তি ও তাঁর সাথীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নিয়ে এসেছে। কিসের স্বার্থে? এ যুদ্ধ কি তোমার ছিনিয়ে নেওয়া অধিকার প্রতিষ্ঠার? নাকি তোমার লুণ্ঠিত সম্ভ্রমের প্রতিশোধের?'
'অকারণে তুমি এখানে এসেছ নু'আঈম! ধিক্কার তোমাকে...।'
তার অনুতপ্ত মন তাকে ধিক্কার দিয়ে বলতে থাকল:
'তোমার মতো একজন বিজ্ঞ লোকের পক্ষে কি অকারণে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হওয়া শোভা পায়? সৎ ও নির্দোষ এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে কে তোমাকে উৎসাহিত করেছে? যিনি তাঁর অনুসারীদের ন্যায়বিচার ও পরোপকারের আদেশ এবং নিকটাত্মীয়দের অধিকার প্রদানে সর্বদা নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তাঁর বিরুদ্ধে তুমি যুদ্ধ করতে এসেছ? কে তোমাকে তাঁর সাথীদের রক্তপাত ঘটানোর উদ্দেশ্যে চমকানো বর্ষা বহনে অনুপ্রাণিত করেছে? যারা একমাত্র সত্য ও হেদায়াতের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত, তুমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছ?'
নু'আঈম ও তার বিবেকের এই বিতর্ক বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। বিতর্কের পরিসমাপ্তি ঘটল। সে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হলো। রাতের অন্ধকারে নু'আঈম গাতফান গোত্রের সৈন্য ছাউনি থেকে সবার নজর এড়িয়ে দ্রুতগতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সামনে উপস্থিত দেখে বললেন:
'তুমি কি নু'আঈম ইবনে মাসউদ?'
সে উত্তরে বলল:
'হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল!'
'গভীর রাতে এ মুহূর্তে কী উদ্দেশ্যে এসেছ?'
নু'আঈম উত্তর দিলো:
'একমাত্র কালেমা শাহাদাতের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আপনার খিদমতে উপস্থিত হয়েছি।'
এই বলেই সে কালেমা শাহাদাত পাঠ করল। অতঃপর আরয করল:
'হে আল্লাহর রাসূল। আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। এ কথা গাতফান গোত্রের কেউ জানে না। এ মুহূর্তে আমাকে যে কোনো খিদমতের জন্য নির্দেশ দিন।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন:
إِنَّمَا أَنْتَ فِينَا رَجُلٌ وَاحِدٌ ... فَاذْهَبْ إِلَى قَوْمِكَ وَخَدِّلْ عَنَّا إِنْ اسْتَطَعْتَ فَإِنَّ الْحَرْبَ خُدْعَةٌ .
'তুমিই আমাদের একমাত্র ব্যক্তি, যে এ মুহূর্তে কূটনৈতিক চাল চালতে পার। তুমি যদি পারো গাতফান গোত্রকে যুদ্ধ-ময়দান থেকে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কর। কেননা, শত্রুপক্ষকে ধোঁকায় ফেলা সমর-কৌশলেরই অংশ।'
নু'আঈম বললেন:
'হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার দ্বারা আপনি এমন কিছু দেখতে পাবেন, যা আপনাকে সন্তুষ্ট করবে, ইনশাআল্লাহ।'
এই বলে নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমত থেকে সে মুহূর্তেই বনু কুরাইযা গোত্রের আস্তানায় তার আগের সঙ্গী-সাথীদের কাছে গেলেন। তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও কথাবার্তার এক পর্যায়ে তাদের বললেন:
'হে বনু কুরাইযার ভাইয়েরা! আমি যে তোমাদের একজন বিশ্বস্ত ও অন্তরঙ্গ বন্ধু তা তো তোমরা ভালো করেই জান। সর্বদা তোমাদের প্রতি আমার সৎপরামর্শ ও আন্তরিকতার ব্যাপারেও অবগত।'
তারা বলল:
'হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ নু'আঈম! তুমি আমাদের নিকট নিঃসন্দেহে আস্থাভাজন ব্যক্তি।'
তাদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত হয়ে অতঃপর বললেন:
'এ যুদ্ধে কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের অবস্থান তোমাদের অবস্থান থেকে নিঃসন্দেহে ভিন্নতর।'
তারা বলল, কিভাবে?
নু'আঈম বললেন:
'মদীনা তোমাদের নিজেদের শহর। এ শহরেই তোমাদের ধন-সম্পত্তি, সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী-পুত্র সবই অবস্থান করছে। কোনোক্রমেই তোমরা এসব অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে পার না। অপরদিকে কুরাইশ ও গatফানদের ধন-সম্পত্তি, অর্থ-কড়ি, সন্তান-সন্ততি ও স্ত্রী-পুত্র সবই মদীনার বাইরে তাদের নিজেদের শহরে। তারা সেখান থেকে মুহাম্মদের সাথে যুদ্ধ করতে এসেছে। তারা তোমাদের শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে তার বিরুদ্ধে সহযোগিতা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। যদি তারা বিজয়ী হয়, তাহলে মুহাম্মদের ধন-সম্পত্তিকে মালে গনীমত হিসেবে তারাই নেবে। আর যদি কুরাইশ ও গাতফানদের বাহিনী পরাজিত হয়, তাহলে মুহাম্মদের তাড়া খেয়ে তারা তোমাদেরকে মুহাম্মদের হাতে ফেলে রেখে নিরাপদেই স্ব-স্ব গোত্রে ফিরে যাবে। সে ক্ষেত্রে মুহাম্মদ তোমাদের থেকে চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যা কল্পনাও করতে পারছ না। তোমরা ভালো করেই জান যে, এককভাবে মুহাম্মদের মোকাবেলা করার শক্তি তোমাদের নেই।'
তারা বলল: 'ঠিকই বলছ। এখন তোমার পরামর্শ কী?'
তিনি বললেন: 'আমার কাছে এর একমাত্র সমাধান হলো, যতক্ষণ না তোমরা তাদের নেতৃস্থানীয় কিছু লোককে জামানত হিসেবে তোমাদের কাছে না রেখেছ, ততক্ষণ তোমরা তাদের সাথে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করো না। তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের জামানত হিসেবে রাখতে পারলেই তারা সর্বশক্তি দিয়ে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে প্রাণপণে যুদ্ধে নেমে পড়বে। হয় বিজয়, নয় তোমাদের ও তাদের শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত নিঃশেষ।'
তারা বলে উঠল: 'হ্যাঁ, তুমি উত্তম পরামর্শ দিয়েছ।'
অতঃপর তাদের থেকে বিদায় নিয়ে নু'আঈম ইবনে মাসউদ কুরাইশ সেনাপতি আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের কাছে এসে তাকে ও তার সঙ্গী নেতৃস্থানীয়দের বললেন:
'কুরাইশ ভাইয়েরা! মুহাম্মদের সাথে আমার শত্রুতা ও তোমাদের সাথে আমার আন্তরিকতা ও সহৃদয়তার কথা তোমরা ভালো করেই জান। আমার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পৌছেছে, যা তোমাদের জানান আমি আমার গুরুদায়িত্ব বলে মনে করি। তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ হলো, বিষয়টি তোমাদের মধ্যেই সীমিত রাখবে এবং আমার বরাত বা হাওয়ালা দিয়ে তা কখনো প্রচার করবে না। তারা কথা দেয় যে, এ ব্যাপারে আমরা অবশ্যই তোমার অনুরোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করব।'
অতঃপর নু'আঈম বলেন:
'বনু কুরাইযা গোত্র মুহাম্মদের বিরুদ্ধাচরণে অনুতপ্ত। তারা মুহাম্মদের কাছে দূত পাঠিয়ে আবেদন করেছে যে, আমরা আমাদের কৃতকর্মের জন্য ভীষণভাবে অনুতপ্ত। আমরা শান্তিচুক্তি পুনর্জীবিত করে সন্ধিভুক্ত হতে চাই। আপনার সদয় সম্মতি পেলে আমরা কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের বেশ কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এনে আপনার কাছে সোপর্দ করতে চাই, যেন আপনি তাদের শিরশ্ছেদ করতে পারেন। আপনাকে এই শিকার সংগ্রহ করে দেওয়ার মাধ্যমে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আপনার সাথে মিলিত হতে চাই।' মুহাম্মদ তাদের এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। ইহুদীরা যদি তোমাদের কাছে জামানত চায়, আমার অনুরোধ, তাহলে কাউকেও জামানত হিসেবে দেবে না।'
আবু সুফিয়ান বলল:
'এ গোপন সংবাদ প্রদানের মাধ্যমে নিঃসন্দেহে তুমি আমাদের প্রকৃত বন্ধুদের দাবিই পূরণ করলে।'
অতঃপর নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু সুফিয়ানের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে গাতফান গোত্রের অন্যান্য নেতাদের সাথে মিলিত হন। আবূ সুফিয়ানের সাথে তিনি যেভাবে কথা বলেছেন, তাদের কাছেও অনুরূপভাবে কথা বলেন। আবু সুফিয়ানকে যেভাবে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তাদেরও অনুরূপ পরামর্শ দেন।
প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে আবু সুফিয়ান বনু কুরাইযার মনোভাবকে যাচাই করার জন্য তাদের কাছে পরের দিন ভোর হতে না হতেই তার নিজ ছেলেকে দূত হিসেবে পাঠাল। তার ছেলে বনু কুরাইযার নেতৃবর্গের কাছে গিয়ে বলল:
'আমার পিতা আবু সুফিয়ান আপনাদের খিদমতে সালাম আরয করেছেন এবং বলে পাঠিয়েছেন যে, যেহেতু আমরা মুহাম্মদ এবং তার সঙ্গী-সাথীদেরকে দীর্ঘদিন যাবৎ অবরোধ করে রেখেছি, যার ফলে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমরা চাচ্ছি, কালবিলম্ব না করে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরম্ভ করি এবং এই অবরোধের সমাপ্তি ঘটাই। আপনাদের খidমতে আমার পিতা আমাকে এ জন্যই পাঠিয়েছেন, যেন আগামীকালই আমাদের ও আপনাদের এ যৌথ আক্রমণের সূচনা হয়।'
ইহুদীরা তাকে বলে:
'আগামীকাল শনিবার। আমাদের ধর্মমতে পবিত্র দিন। আমরা কাল কোনো মতেই যুদ্ধে জড়িত হতে পারব না। এ ছাড়াও আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত আপনাদের সাহায্যার্থে যুদ্ধে জড়িত হতে পারব না, যতক্ষণ না আপনাদের কুরাইশ গোত্র ও গাতফান গোত্রের সত্তরজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে আমাদের কাছে জামানত হিসেবে না রাখবেন। কারণ, আমরা আশঙ্কা করছি, প্রচণ্ড যুদ্ধের ভয়াবহতা সহ্য করতে না পেরে আপনারা আমাদেরকে একা মুহাম্মদের হাতে বলির পাঁঠা হিসেবে ছেড়ে দিয়ে স্ব-স্ব আবাসভূমিতে পালিয়ে যেতে পারেন। আপনারা ভালো করেই জানেন যে, সে পরিস্থিতিতে মুহাম্মদের মোকাবেলা করার সাধ্য আমাদের নেই।'
আবু সুফিয়ানের পুত্র কুরাইশ সৈন্য ছাউনিতে ফিরে এসে তাদেরকে বনু কুরাইযা গোত্রের নেতৃবৃন্দের ভূমিকা সম্পর্কে অবগত করলে তারা ক্ষোভ ও ধিক্কারের সাথে সমস্বরে বলে উঠল:
'শূকর ও বানরের সন্তানেরা বড়ই জঘন্য শর্তারোপ করেছে...। আমরা আল্লাহর শপথ করে বলছি, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ তো দূরের কথা, তারা যদি আমাদের কাছে একটা ছাগলছানাও জামানত হিসেবে দাবি করে সেটাও তাদের দেওয়া হবে না।'
অবরোধকারী ও মিত্র এ জোটে ফাটল ধরাতে এবং তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর চালে পুরোপুরিই সাফল্য লাভ করলেন। অপরদিকে আল্লাহ কুরাইশ ও তাঁর মিত্র বাহিনীর ওপর পাঠালেন প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টিসহ প্রলয়ঙ্করী ঝড়ো হাওয়া ও তুফান। যে তুফান তাদের তাঁবুর রশি ছিঁড়ে লণ্ডভণ্ড করে ফেলল। ডেক-ডেকচিগুলো এদিক-সেদিক উড়িয়ে নিয়ে গেল ও আগুন নিভিয়ে ফেলল। তাদের চোখে-মুখে ধুলাবালি নিক্ষিপ্ত করে প্রায় অন্ধ করে দিল। শুধু লোকজনই নয় উট, গাধা, ঘোড়া ও যানবাহন বলতে যা কিছু ছিল সেসবও ছিঁড়ে-ছুটে এদিক-সেদিক ছুটে গেল। রাতের অন্ধকারে প্রাণভয়ে কুরাইশ বাহিনীও মদীনা থেকে পালিয়ে গেল। সকালে যখন মুসলিম বাহিনী দেখতে পেল যে, আল্লাহর দুশমনেরা পলায়ন করেছে, তখন তারা আনন্দে বলতে থাকল :
'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন। তাঁর বাহিনীকে বিজয়ী করেছেন এবং তিনি নিজেই আক্রমণকারী মিত্র বাহিনীকে পরাজিত করেছেন।'
নু'আঈম ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেদিন থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একান্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হলেন। তাঁকে অতি সম্মানে ভূষিত করে তাঁর হাতে গাতফান গোত্রের পতাকা প্রদান করা হলো। তাঁকে সামরিক বাহিনীর ডিভিশনাল কমান্ডার থেকে শুরু করে প্রাদেশিক গভর্নরের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ করা হয়। মক্কা বিজয়ের দিনে আবু সুফিয়ান দাঁড়িয়ে যখন অগ্রসরমান মুসলিম বাহিনী প্রত্যক্ষ করছিল, তখন এক পর্যায়ে দেখল যে :
'এক ব্যক্তি গাতফান গোত্রের পতাকা বহন করে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছে। সে তার পাশে উপস্থিত লোকদের জিজ্ঞাসা করে, এ ব্যক্তি কে?'
তারা বলল:
'গাতফান নেতা নু'আঈম ইবনে মাসউদ।'
তার নাম শোনামাত্রই আবু সুফিয়ান বলে উঠে :
'সে খন্দকের যুদ্ধে আমাদের কতই না বিপর্যয় এনে দিয়েছে! আল্লাহর শপথ! মুহাম্মদের বিরুদ্ধাচরণে তার চেয়ে অধিক তৎপর আর কেউ ছিল না। আর আজ সে তারই অনুসারী হয়ে নিজ গোত্রের পতাকা বহন করছে। সে আজ মুহাম্মদের পতাকাতলে সমবেত হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে।'
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: জীবনী নং ৮৭৭৯.
২. আল ইসতিয়াব: ইসাবাহ-এর টীকা অংশ, ৫ খণ্ড, ৫৮৪ পৃ.
৩. উসদুল গাবাহ: ৫ম খণ্ড, ৩৪৮ পৃ. অথবা ৫২৭৪ নং জীবনী.
৪. সীরাতুন নুবুবিয়াহ লিইবনে হিশam: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৫. হায়াতুস সাহাবাহ: ৪র্থ খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.