📄 রাবীআ ইবনে কা'ব (রাঃ)
আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট আছেন।
রাবীআ ইবনে কা'ব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর নিজের সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন:
'আমি যৌবনে পদার্পণ করেছি মাত্র, ঠিক এমন সময় ঈমানী চেতনায় আমার অন্তর উদ্ভাসিত ও ইসলামের মহত্ত্বে আমার মন ভরে গেল।'
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রথম দর্শনেই আমি প্রাণখুলে ভালোবাসতে শুরু করি। সে ভালোবাসা শুধু আমার মন-মস্তিষ্কেরই নয়, দেখতে দেখতে তা সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিদ্যুৎ প্রবাহের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ল। আমি সবকিছু ত্যাগ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসায় লীন হয়ে গেলাম।'
একদিন নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলাম:
'আল্লাহ তোমার ওপর করুণা বর্ষণ করুন। কারণ, তুমি ধ্বংসের পথে চলেছ। শুধু মনে মনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসার পরিবর্তে তাঁর খিদমতে কেন নিজেকে নিয়োজিত করছ না? তুমি নিজেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম হিসেবে নিয়োগের অনুরোধ কেন জানাও না? যদি তিনি তোমার এ অনুরোধে রাজি হয়ে যান, তাহলে এর অধিক তুমি কী চাও? তাহলে তাঁর সাহচর্যে তুমি যেমন নিজেকে ধন্য করবে, তেমনি তাঁর ভালোবাসার দাবিতে উত্তীর্ণ হবে এবং দীন-দুনিয়ার সর্বোৎকৃষ্ট কল্যাণে নিজেকে ধন্য করতে পারবে।'
অনতিবিলম্বে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে নিজেকে তাঁর খিদমতে পেশ করে আমার আবেদন মঞ্জুরির জন্য অনুরোধ জানালাম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নিরাশ করলেন না। তাঁর খাদেম হিসেবে আমাকে গ্রহণ করলেন। সেদিন থেকেই আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছায়ার মতো অনুসরণ করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে যেতেন আমিও তাঁর সাথে সেখানে যেতাম। যখন যে নির্দেশ দিতেন, সে নির্দেশ পালনে সর্বক্ষণ সচেষ্ট থাকতাম। আমার দিকে তাঁর দৃষ্টি নিক্ষেপ মাত্রই তৎক্ষণাৎ বিনীত মস্তকে তাঁর নিকট গিয়ে উপস্থিত হতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কোনো প্রয়োজনে আমাকে সবসময় উপস্থিত পেতেন। সারা দিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত থাকতাম। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে ইশার নামাযান্তে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর হুজরা মুবারকে ফিরতেন, তখন আমিও বাড়ি ফেরার চিন্তা করতাম। কিন্তু হঠাৎ করে আমার মন ভেতর থেকে আবার আমাকে প্রশ্ন করে বসল:
'হে রাবীআ, কোথায় চলেছ? রাতে যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে?'
অতএব, আমি তাঁর হুজরার দরজায় বসে থাকতাম। কোনোক্রমেই দরজার নিকট থেকে কোথাও যেতাম না। দেখতাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের বিরাট এক অংশ ইবাদাত-বন্দেগীতে নিমগ্ন থাকতেন। কখনো কখনো আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করতে শুনতাম। তিনি অনেক সময় পর্যন্ত বারবার তা তিলাওয়াত করতেন। কোনো কোনো সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পড়তে শুনতাম 'সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ' (আল্লাহ তাঁর প্রশংসাকারীর দু'আ কবুল করেন) কখনো দীর্ঘ সময় পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার পুনরাবৃত্তি করতে শুনতাম। এমনকি এভাবে কখনো তন্দ্রায়, ঢলে পড়তাম আবার কখনো বা ঘুমিয়ে পড়তাম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস ছিল, যদি কোনো উপকারী তাঁর জন্য কিছু করত, তাহলে তিনি প্রতিদান হিসেবে তার চেয়ে উত্তম কিছু দিতেন। তার জন্য আমার এ খিদমতের বদলাস্বরূপ আমাকেও উত্তম কিছু দেবার ইচ্ছা পোষণ করলেন। একদিন আমার কাছে এসে সম্বোধন করলেন:
'হে রাবীআ ইবনে কা'ব!'
আমি জবাব দিলাম:
'আমি উপস্থিত, আল্লাহ আপনাকে ধন্য করুন, আপনার কল্যাণ করুন।'
তিনি বললেন:
'আমার কাছে কিছু চাও, আমি তোমাকে তা-ই দিতে প্রস্তত, যা তুমি চাও।'
আমি একটু চিন্তা করেই বললাম:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে একটু সময় দিন, আপনার নিকট কী চাইব তা একটু চিন্তা করে বলব।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'ঠিক আছে। আমি সে সময় দিলাম।'
আমি চিন্তা করতে লাগলাম:
'আমি একজন যুবক, আমার অর্থ-সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন এবং বাড়িঘর কিছুই নেই। অন্যান্য দরিদ্র ও অভাবী সাহাবীদের সাথে আমিও মসজিদে সুফফায় থাকছি। লোকজন আমাদেরকে 'ইসলামের মেহমান' বলে সম্বোধন করছে। যদি কোনো মুসলমান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সদকার অর্থ নিয়ে আসে, তিনি পুরোটাই আমাদের জন্য পাঠিয়ে দেন। আর যদি কোনো হাদিয়া নিয়ে আসেন, সেখান থেকে সামান্য কিছু রেখে বাকিটাও আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। আমি এই অভাব-অনটন থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে দুনিয়ার কিছু কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কিছু পাওয়ার ইচ্ছা করলাম, যেন স্বাবলম্বী হয়ে আমিও সম্পদশালীদের মতো হতে পারি।'
কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তা করে মনে মনে বললাম :
'হে রাবীআ ইবনে কা'ব! তুমি ধ্বংসের পথে পা বাড়িয়েছ। তোমার ধ্বংস অবধারিত। তোমার ধনসম্পত্তি ক্ষণস্থায়ী ও ধ্বংসশীল। এখানে তোমার জন্য আল্লাহ যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা তুমি অবশ্যই পাবে।'
নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান রয়েছে, যে কারণে মহান আল্লাহর দরবারে তাঁর কোনো দোআ প্রত্যাখ্যাত হয় না। অতএব, তাঁর কাছ থেকে পরকালের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য যা পারো চেয়ে নাও। পরকালীন মঙ্গল ও কল্যাণের দু'আ নেওয়ার ব্যাপারে মনের অন্তস্তল থেকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'রাবীআ কী বলতে চাও?'
আমি আরয করলাম:
'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছে আমার একমাত্র আরয, আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করুন, তিনি যেন জান্নাতে আপনার বন্ধু হিসেবে আমাকে ধন্য করেন।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে স্নেহভরে জিজ্ঞাসা করলেন:
'তোমাকে কে এই পরামর্শ দিয়েছে?'
উত্তরে আরয করলাম:
'আল্লাহর শপথ করে বলছি, এ ব্যাপারে কেউ আমাকে কোনো পরামর্শ দেয়নি। প্রকৃতপক্ষে আপনি যখন আমাকে বলেছিলেন যে, কিছু চাও, যা চাইবে তা-ই তোমাকে দেব। তখন মনে মনে দুনিয়ার ধন-সম্পদের ব্যাপারে চাওয়ার চিন্তা করলাম। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই আল্লাহ তাআলা আমাকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ধনসম্পদের মোহ ত্যাগ করে পরকালের চিরস্থায়ী মঙ্গল ও কল্যাণ চাওয়ার জন্য অন্তরকে প্রশস্ত করে দিলেন। তাই আপনার কাছে আরয করলাম যে, আল্লাহর কাছে দু'আ করুন, যেন জান্নাতে আমি আপনার বন্ধু হতে পারি।'
আমার উত্তর শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘক্ষণ নীরব রইলেন।
অতঃপর তিনি বললেন : 'রাবীআ! এ ছাড়া অন্য কিছু?'
উত্তরে আরয করলাম : 'এ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি যা চেয়েছি, দুনিয়ার অন্য কিছুকে তার সমকক্ষ মনে করব না।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : 'তাহলে অধিক সিজদায় আমাকে সাহায্য কর।'
এরপর থেকেই দুনিয়াতে তাঁর খিদমতে ও সাহচর্যে যেমন নিজেকে ধন্য করেছি, জান্নাতেও তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সাহচর্যের আশায় কঠোর ইবাদাত-বন্দেগীতে নিমগ্ন হয়ে পড়লাম। কিছুদিন যেতে না যেতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন : 'হে রাবীআ বিয়ে করবে না?'
আমি বললাম : 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার খিদমতের পথে বাধা হয় এমন কোনো কাজ আমি করব না। তা ছাড়া স্ত্রীর মোহরানা দেওয়ার মতো ও পারিবারিক জীবনের দায়ভার বহনের আর্থিক সঙ্গতিও আমার নেই।'
আমার এ উত্তর শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরবতা অবলম্বন করলেন। এমনিভাবে অন্য একদিন আবার আমাকে প্রশ্ন করলেন : 'হে রাবীআ! বিয়ে করবে না?'
আমি পূর্বের কথার পুনরাবৃত্তি করলাম। কিন্তু সেখান থেকে চলে আসার পর কেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পূর্বের ন্যায় উত্তর দিলাম, ভেবে লজ্জিত হতে থাকলাম এবং মনে মনে ভাবলাম : 'রাবীআ! তোমার দুর্ভাগ্য, নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার চেয়ে ভালো জানেন। তোমার দীন ও দুনিয়ার কল্যাণ কিসে নিহিত রয়েছে তা এবং তোমার সামর্থ্য সম্পর্কেও তিনি সম্পূর্ণ জ্ঞাত।'
মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম। এরপর যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় বিয়ের প্রস্তাব দেন, তাহলে সম্মতি প্রদান করব। কিছুদিন যেতে না যেতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আবার বললেন : 'রাবীআ তুমি বিয়ে করবে না?'
এবার উত্তরে আরয করলাম : 'হে আল্লাহর রাসূল! জী হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ করব; কিন্তু আমার কাছে কে মেয়ে বিয়ে দেবে? আমার অবস্থা তো আপনি ভালোভাবেই অবগত।'
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার এক গোত্রের নাম উল্লেখ করে বললেন : 'সেই গোত্রের সেই ব্যক্তির নিকট চলে যাও। সেখানে গিয়ে তাকে বলো, আপনার অমুক মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন।'
আমি লজ্জাজড়িত অবস্থায় উক্ত গোত্রে গিয়ে পৌঁছে বললাম : 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আপনার কাছে এই জন্য প্রেরণ করেছেন, যেন আপনার অমুক মেয়েকে আমার কাছে বিয়ে দেন।'
তিনি প্রশ্ন করলেন, অমুক মেয়ে? আমি বললাম : 'জী হ্যাঁ, অমুক মেয়ে।'
তিনি বললেন : 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মারহাবা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত ব্যক্তিকেও মারহাবা! আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত ব্যক্তির উদ্দেশ্য সফল না হয়ে সে ফেরত যাবে না।'
তারা সেই প্রস্তাবিত মেয়ের সাথে আমাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে দিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে ফিরে এসে আরয করলাম :
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! নিঃসন্দেহে উত্তম পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক করে এলাম। তারা আমার কথাতেই পূর্ণ আস্থা স্থাপন করে আমাকে স্বাগত জানিয়ে তাদের মেয়ের সাথে আমাকে বিয়ে দিয়েছেন; কিন্তু তাদের মেয়ের মহরানা কোথা থেকে পরিশোধ করব?'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বনূ আসলাম গোত্রপতি 'বুরাইদা ইবনে আল খাসিব'কে ডেকে পাঠান এবং তাঁকে নির্দেশ দেন:
'তুমি রাবীআর জন্য খেজুরের আঁটি পরিমাণ সোনা সংগ্রহ কর।'
তিনি আমার পক্ষ থেকে মহরানা পরিশোধের জন্য তা সংগ্রহ করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন:
'এই সোনার টুকরোটি নিয়ে তাদের কাছে গিয়ে বলো যে, এ আপনাদের মেয়ের মহরানা।'
আমি তা নিয়ে সেখানে গেলাম এবং তা তাদের খিদমতে পেশ করলাম। তারা অত্যন্ত আনন্দের সাথে তা গ্রহণ করলেন এবং খুশিতে বলতে লাগলেন:
'অনেক উত্তম। অনেক উত্তম!'
সেখান থেকে ফিরে এসে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, তাদের চেয়ে সম্মানিত কোনো লোকদের আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি। এই সামান্য কয়েক রতি সোনা যা তাদেরকে দিয়েছি, তাতেই তারা খুশিতে বলতে লাগল :
'অনেক উত্তম! অনেক উত্তম!'
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলাম:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! ওয়ালীমা করার মতো আমার কিছুই নেই।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে নির্দেশ দিলেন:
'রাবীআর ওয়ালীমার উদ্দেশ্যে একটি বকরি ক্রয়ের জন্য কিছু অর্থ সংগ্রহ কর।'
তিনি আমার জন্য বিরাট মোটাতাজা একটি খাসি ক্রয় করে আনলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন:
'তুমি গিয়ে উম্মুল মুমিনীন আয়েশাকে বলো, বাসায় যে যৎসামান্য যব আছে তা যেন তোমার ওয়ালীমার জন্য দিয়ে দেন।'
আমি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার খিদমতে উপস্থিত হই এবং তাঁর ঘরে যে যব আছে তা আমার ওয়ালীমার জন্য দেওয়ার কথা জানাই। তিনি বলেন, যবের এই পাত্রখানা নাও। এখানে সাত সা' পরিমাণ যব রয়েছে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, এই যব ছাড়া আমাদের ঘরে অন্য কোনো খাবার নেই।
আমি খাসি ও যব নিয়ে আমার শ্বশুরালয়ে উপস্থিত হলাম। তারা বললেন :
'আমরা এই যব দ্বারা রুটি তৈরির দায়িত্ব নিচ্ছি। আর তুমি খাসিটি তোমার বন্ধু-বান্ধবদের কাছে নিয়ে যাও, তারা তা তৈরি করে দিক।'
খাসিটা নিয়ে আমার গোত্রের ভাইদের কাছে এলাম। আমি এবং তারা মিলে তা যবেহ করে রান্না করলাম। ওয়ালীমার জন্য আমাদের গোশত ও রুটি প্রস্তুত হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াত দিলাম। তিনি আমার দাওয়াত গ্রহণ করলেন। সুন্দর ও আনন্দঘন পরিবেশে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো।
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর জমির পাশেই আমার জন্য একখণ্ড জমি বরাদ্দ করলেন। দেখতে দেখতেই দুনিয়া আমাকে গ্রাস করে ফেলল। এমনকি একটি খেজুর গাছকে কেন্দ্র করে আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়লাম। আমি খেজুর গাছের দাবি করে বললাম, সেটা আমার সীমানায় :
'আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দাবি করলেন যে, সেটি তাঁর সীমানায়। এমনকি একে কেন্দ্র করে তাঁর সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হলাম।'
পরিণতিতে তিনি হঠাৎ আমার সম্পর্কে একটা আপত্তিকর কথা বলে ফেললেন এবং পরক্ষণেই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে তিনি আমাকে বলতে থাকলেন : 'হে রাবীআ! তুমিও আমার ব্যাপারে একই রকম কথা বল, যেন তা কিসাস হয়ে যায়।'
আমি বললাম : 'আল্লাহর শপথ! আমি তা বলতে পারি না।' তিনি তাঁর অনুরোধের এক পর্যায়ে বললেন : 'তুমি যদি আমার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ না কর, তবে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে তোমার বিরুদ্ধে এ দুনিয়াতে প্রতিশোধ গ্রহণ না করার অভিযোগ করব।'
এ বলে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে রওয়ানা হলেন। আমিও তাঁর পিছনে পিছনে চলতে থাকলাম এবং আমার পিছনে পিছনে আমার বনু আসলাম গোত্রের লোকজন রওয়ানা হলো। তারা বলাবলি করতে লাগল : 'সে-ই আগে বিবাদে লিপ্ত হয়েছে। তোমার প্রতি কটুবাক্য প্রয়োগ করেছে- তা সত্ত্বেও সে-ই আবার তোমার বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অভিযোগ করতে চলল!'
আমি তাদের উদ্দেশ্যে বললাম : 'তোমাদের প্রতি ধিক্কার! তোমরা কি জান, তিনি কে? তিনি হলেন সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু। মুসলমানদের বয়োবৃদ্ধ শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। তিনি তোমাদের দেখার আগেই তোমরা ফিরে যাও। তিনি হয়তো এটা মনে করতে পারেন যে, তোমরা তাঁর বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করতে এসেছ। এভাবে তিনি ক্রুদ্ধ হতে পারেন এবং তাঁর ক্রুদ্ধ হওয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তোমাদের প্রতি বিরক্ত হতে পারেন। আমরা সবাই তাদের দু'জনের রাগের কারণে আল্লাহর বিরাগভাজন হতে পারি। ফলে হয়তো রাবীআ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কাজেই তোমরা আগেভাগেই চলে যাও।'
আমার অনুরোধে তারা সবাই চলে যায়।
এরপর আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে হুবহু উক্ত ঘটনার বিবরণ দেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা তুলে আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন:
'রাবীআ তোমার ও সিদ্দীকের মধ্যে কী হয়েছে?' আমি উত্তর দিলাম:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি যে কটুবাক্য প্রয়োগ করেছেন তাঁর প্রতি অনুরূপ কটুবাক্য প্রয়োগ করার জন্য আমাকে চাপ দিচ্ছেন। অথচ আমি তা করতে চাচ্ছি না।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'উত্তম, সে যা বলেছে, তুমি কখনও তার প্রতি অনুরূপ বাক্য প্রয়োগ করো না; বরং তুমি তাঁর উদ্দেশ্যে বলো, আল্লাহ আবূ বকরকে ক্ষমা করে দিন।' আমি বললাম :
'হে ভাই আবূ বকর, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিন।' আমার এই দু'আ শুনে তিনি কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে বিদায় নিলেন এবং বলতে থাকলেন:
'হে রাবীআ ইবনে কা'ব! আমার পক্ষ থেকে আল্লাহ তোমাকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করুন। আমার পক্ষ থেকে আল্লাহ তোমাকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করুন।'
টিকাঃ
১. উসদুল গাবা: ২য় খণ্ড, ১৭১ পৃ.
২. আল ইসাবাহ: ১ম খণ্ড, ৫১১ পৃ.
৩. আল ইসতিয়াব: ১ম খণ্ড, ৫০৬ পৃ.
৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৩৩৫-৩৩৬ পৃ.
৫. কানযুল উম্মাল: ৭ম খণ্ড, ৩৬ পৃ.
৬. আত তাবাকাতুল কুবরা: ৪র্থ খণ্ড, ৩১৩ পৃ.
৭. মুসনাদে আবু দাউদ: ১৬১-১৬২ পৃ.
৮. তারীখুল খুলাফা: ৫৬ পৃ.
📄 আবুল আস ইবনে আর রাবীঈ (রাঃ)
‘আবুল আস আমাকে যে কথা দিয়েছিল তা সত্যে পরিণত করেছে এবং আমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাও যথাযথভাবে পালন করেছে।’
- মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)
আবুল আস ইবনে রাবীঈ আল আবশামী আল কুরাইশী সবেমাত্র যৌবনে পদার্পণ করতে যাচ্ছেন। তাঁর সুস্বাস্থ্য, লাবণ্যময় ও দৃষ্টিনন্দিত চেহারা সবারই দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। ভোগ-বিলাসের জীবনে প্রাচুর্যও যেন উপচে পড়ছে। আরব সভ্যতা ও কৃষ্টি-ঐতিহ্যের প্রতিফলন যেন ঘটছে এ চেহারায়। ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্টাচার, মধুর ব্যবহার ও নীতি-নৈতিকতার সে এক মূর্তপ্রতীক, এক বিরল দৃষ্টান্ত। সম্মান ও মর্যাদার গৌরব সবটাই তার পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত। তার বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা যেন আরবের ভবিষ্যৎ নেতারই পূর্বাভাস।
উত্তরাধিকার সূত্রেই আবুল আস কুরাইশদের গ্রীষ্ম ও শীতকালীন বহির্বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। নিয়মিতভাবে তাঁর বাণিজ্যিক উটবহরের বিরাট কাফেলা মক্কা ও সিরিয়ায় যাতায়াত করত। যে কাফেলায় ১০০টি উট ও ২০০ জন উট পরিচালক থাকত। তাঁর আমানতদারী, সত্যবাদিতা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা ছিল পরীক্ষিত। এ জন্য তাঁর তত্ত্বাবধানে লোকজন ব্যবসার উদ্দেশ্যে নির্দ্বিধায় তাদের সম্পদ বিনিয়োগ করত।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনসঙ্গিনী উম্মুল মুমিনীন খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ ছিলেন তাঁর খালা। তিনি নিজ সন্তানের মতোই তাঁকে ভালোবাসতেন। খাদীজা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার আদর-স্নেহ যেমন ছিল আবুল আসের জন্য অন্তর-নিংড়ানো, তেমনি ঘরের দ্বারও ছিল সর্বদা তাঁর জন্য উন্মুক্ত। সেও খাদীজা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে অতীব ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্নেহ-ভালোবাসাও তাঁর প্রতি কোনো অংশে কম ছিল না। এভাবে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর অতিবাহিত হচ্ছিল। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে এলো প্রথম কন্যা যয়নাব, সেও যেন ফুলের সৌরভের মতোই ঘরকে সুবাসিত করতে লাগল।
দৃষ্টিনন্দিতা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকল। বিয়ের বয়স হলো। মক্কার সব পরিবারের যুবকের নজর পড়ল যয়নবের দিকে। সে ছিল দেখতে যেমন অতুলনীয় সুন্দরী, চাল-চলন, চরিত্র ও পারিবারিক মর্যাদায়ও ছিল যুগশ্রেষ্ঠ। যয়নবের দিকে কুরাইশ যুবকদের লোভনীয় দৃষ্টি পড়লে কী হবে? যয়নবের খালাত ভাই আবুল আস ইবনে রাবীঈর সাথেই যে তাঁর বিবাহ নিশ্চিত। তাই এ ব্যাপারে কেউই মুখ খুলতে পারছিল না।
যয়নব বিনতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আবুল আস ইবনে রাবীঈর বিবাহের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই মক্কার সর্বত্র ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দীনে হকসহ তাঁর প্রেরিত রাসূল হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়, তিনি যেন তাঁর নিকটাত্মীয় ও আপনজনকে ভ্রান্ত পথ থেকে ফিরিয়ে আনেন। দীনে হকের দাওয়াতে মহিলাদের মধ্যে সর্বপ্রথম যিনি ঈমান গ্রহণ করেন, তিনি হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনসঙ্গিনী খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এবং তাঁর কন্যা যয়নব, রুকাইয়া, উম্মু কুলসুম এবং ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুন্না। যদিও তাদের মধ্যে ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা একবারেই ছোট্ট ছিলেন।
আবুল আস মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামাতা। এতসত্ত্বেও তাঁর বাপ-দাদাদের পৌত্তলিক জীবনধারা থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করাকে মোটেও পছন্দ করল না। যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার সাথে মধুর দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে থাকলেও আবুল আস কিন্তু তখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি। অপরদিকে যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহা তাওহীদের আলোকে পরিপূর্ণভাবে ইসলামী জীবনযাপন করছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কুরাইশদের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটলে তারা আবুল আসের পরিবারকে এই বলে চাপ প্রয়োগ করতে মনস্থ করল যে:
'ধিক্কার তোমাদের প্রতি! তোমরা নিজ ছেলেকে মুহাম্মদের মেয়ের সাথে বিয়ে করিয়ে নিজ ঘরে এনে বহাল তবিয়তে ঘর-সংসার করাচ্ছ। যদি যয়নবকে তাঁর বাপের ঘরে ফেরত পাঠানো হয়, তাহলেই সামাজিক চাপে মুহাম্মদ কুরাইশদের প্রতি অবশ্যই নতি স্বীকার করবে।'
কোনো কোনো উৎসাহী বলল : 'বাহ! কতই না চমৎকার প্রস্তাব!'
তারা আবুল আসের কাছে গিয়ে এ প্রস্তাব পেশ করল যে:
'হে আবুল আস! তোমার জীবনসঙ্গিনীকে তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দাও এবং তাকে তার পিতার কাছে ফেরত পাঠাও। আমরা কুরাইশ বংশের সর্বোত্তম, সবচেয়ে রূপবতী ও গুণবতী মেয়ের সঙ্গে তোমার বিবাহের ব্যবস্থা করে দেব।'
আবুল আস তাদেরকে উত্তরে বলে:
'আল্লাহর শপথ, আমি কখনো আমার স্ত্রীকে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারি না। তাঁর বিনিময়ে কুরাইশদের কেন? যদি সারাবিশ্বের সবচেয়ে রূপবতী ও গুণবতী বিশ্ব সুন্দরী মেয়েকেও দেওয়া হয়, তবুও না।'
পরিকল্পনা মোতাবেক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপর দুই কন্যা রুকাইয়া ও উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে তালাক দিয়ে তাদের পিত্রালয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে তাদের শিরকের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ায় খুবই আনন্দিত হলেন। অপর দু'জনের মতো আবুল আসও যদি তাঁর মেয়ে যয়নবকে ফেরত দিত, তবে কতই না ভালো হতো! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ইচ্ছা পোষণ করতে থাকলেও যয়নবকে ফেরত আনতে বাস্তবে কোনো তৎপরতা দেখাননি বলে যয়নব স্বামীর গৃহেই থেকে গেলেন। তখন পর্যন্ত মুশরিকদের সাথে ঈমানদার মহিলাদের বিবাহ বিচ্ছেদের কোনো আসমানী নির্দেশ নাযিল হয়নি বলে এ ব্যাপারে তিনি নির্দেশের অপেক্ষা করতে লাগলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করে চলে আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে থাকে। কুরাইশরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে বদরের যুদ্ধে বের হলে তাদের সাথে আবুল আসকে অংশগ্রহণের জন্য বাধ্য করা হয়। সে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের সাথে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বা মুশরিকদের বিজয়ী হিসেবে দেখা, এর কোনো একটির প্রতিও তার আগ্রহ ছিল না। তবুও তাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হয়। এর মানে পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করে। বদরের ময়দানে সংঘটিত যুদ্ধে কুরাইশরা চরমভাবে পরাজিত হয়। তাদের গর্ব-অংহঙ্কার ভূলুষ্ঠিত হয়। বিজয়ের সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা পরাজয় ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এ যুদ্ধে মূলত কুরাইশদের মেরুদণ্ডই ভেঙে যায়। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তাদের একাংশ নিহত হয়। অপর একটি অংশ যুদ্ধবন্দী হয়। অবশিষ্টরা পালিয়ে যায়।
যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে যয়নব বিনতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বামী আবুল আস ছিল অন্যতম। যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির জন্য বন্দীদের আর্থিক যোগ্যতা, সামাজিক মর্যাদা ও স্ব-স্ব গোত্রে তাদের নেতৃত্ব-কর্তৃতের দিকে লক্ষ্য রেখে এক হাজার দিরহাম থেকে চার হাজার দিরহাম পর্যন্ত মুক্তিপণ নির্ধারণ করা হয়। কুরাইশ যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেওয়ার এ সুযোগে যুদ্ধবন্দীদের আত্মীয়-স্বজনদের পক্ষ থেকে খবরা-খবর আদান-প্রদান, দেখা-সাক্ষাৎ ও নির্ধারিত মুক্তিপণ প্রদানের উদ্দেশ্যে যাতায়াত শুরু হয়ে যায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম কন্যা যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহার স্বামী আবুল আস-এর জন্যেও দূতের মাধ্যমে নির্ধারিত মুক্তিপণ পাঠানো হলো। আর তা ছিল যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলার আনহার বিবাহ অনুষ্ঠানে তাঁর মা খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ যে হারটি তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন, মুক্তিপণ হিসেবে যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহা সেটিকেই দূতের হাতে তুলে দিলেন।
যথারীতি আবুল আস-এর জন্য মুক্তিপণ হিসেবে যয়নবের দূত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে সেই হারখানি পেশ করামাত্রই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়তমা জীবনসঙ্গিনী খাদীজা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার কথা মনে পড়ে গেলে তিনি আপ্লুত হয়ে পড়লেন। তাঁর নূরানী চেহারায় শোকের ছায়া পড়ে গেল। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দায়িত্ব পালনরত সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন:
'আমার বড় মেয়ে যয়নব তার স্বামী আবুল আসকে মুক্তির লক্ষ্যে মুক্তিপণ পাঠিয়েছে। যদি তোমরা ভালো মনে কর, তাহলে বন্দীকে মুক্তি দাও এবং মুক্তিপণ হিসাবে প্রেরিত 'হারখানিও' ফেরত পাঠাও। এতে আমি বড়ই আনন্দিত হব।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্ঠে এ কথা শোনামাত্রই সাহাবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম বলে উঠলেন:
ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার অন্তরকে আমরা ব্যথায় ভারাক্রান্ত না রেখে মুহূর্তে আনন্দিত করতে চাই। এখনি আমরা আবুল আসকে মুক্ত করে দিচ্ছি ও যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার কাছে হারটি ফেরত পাঠাচ্ছি।'
আবুল আসকে মুক্ত করার পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি শর্তারোপ করলেন:
'অনতিবিলম্বে যয়নবকে যেন তাঁর নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হয়।'
আবুল আস মুক্ত হয়ে মক্কায় পৌঁছামাত্রই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কৃত তার প্রতিশ্রুতি কোনোরূপ কালবিলম্ব না করে বাস্তবায়ন করে। সে বাড়িতে পৌছেই স্ত্রী যয়নবকে সফরের প্রস্তুতির নির্দেশ দেয়। তাঁকে এ কথা বলেও আশ্বস্ত করে যে:
'তাঁকে মদীনায় নিয়ে যাওয়ার জন্য মক্কার সন্নিকটে তাঁর পিতার প্রেরিত লোকজন অপেক্ষা করছে।'
আবুল আস স্ত্রীর জন্য সফরের সাজ-সরঞ্জামাদি ও তাঁর আরোহণের জন্য উট প্রস্তুত করল। যয়নবের সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর ছোট ভাই আমর ইবনে রাবীঈকে সাথে দিল। তাঁর পক্ষ থেকে যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত লোকদের হাতে সোপর্দ করার জন্য দায়িত্ব দিল।
আমর ইবনে রাবীঈ বড় ভাই আবুল আসের নির্দেশ পাওয়ামাত্রই তীর-ধনুকে সজ্জিত হলো। অতিরিক্ত তীরের একটা বস্তাও কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে উটের পিঠে আরোহীদের বসার হাওদায় বসানোর পর সে দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যভাবে কুরাইশদের সামনেই মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। যয়নবকে নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার এ চিত্র দেখে মক্কাবাসী হতভম্ব হয়ে গেল। হিংসা-বিদ্বেষের আগুন যেন তাদের জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছিল। তারা দু'জনকে ধাওয়া করার উদ্দেশ্যে ছুটে গেল। তারা মক্কার অদূরেই তাদের গতিরোধ করে। তারা যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে আতঙ্কিত করে তুলল। তাঁর জীবননাশের একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করল।
এ পরিস্থিতিতে যয়নবের সফরসঙ্গী আমর কোনো রকম দুর্বলতার শিকার না হয়ে তাদের দিকে তীর-ধনুক তাক করে দাঁড়িয়ে গেল এবং বস্তার তীরগুলো মাপ মতো সামনে ছড়িয়ে হুংকার দিয়ে বলল:
'আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, খবরদার! তোমাদের কেউই যয়নবের দিকে অগ্রসর হতে চেষ্টা কর না। যদি কেউ চেষ্টা কর, তাহলে সে অবশ্যই আমার তীর দ্বারা বিদ্ধ হবে।'
আমাকে একজন দক্ষ তীরন্দায হিসেবে তোমরা মক্কার ছোট-বড় সবাই জান। পরিস্থিতি চরম মারমুখী রূপ নিলে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান আমরের কাছে এসে তাকে অনুরোধ করে:
'ভাতিজা! তোমার তীর-ধনুক কিছুক্ষণের জন্য নিষ্ক্রিয় রাখ। আমরা তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই।'
এ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছুক্ষণের জন্য সে তার তীর-ধনুক নিষ্ক্রিয় রাখল।
আবু সুফিয়ান তাঁকে বলল:
'আমর! তুমি যা করছ, তা ঠিক হচ্ছে না। তুমি যয়নবকে নিয়ে গৌরবের সাথে দিন-দুপুরে আমাদের সম্মুখ দিয়ে এমনভাবে রওয়ানা হয়েছ, যেন তার চলে যাওয়াকে আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারি। অথচ গোটা আরব এটা খুব ভালো করেই দেখেছে যে, বদরের যুদ্ধে আমাদের কী বিপর্যয়েরই না সম্মুখীন হতে হয়েছে। তুমি তো জান যে, তার পিতা মুহাম্মদের হাতে আমরা কী সাজাই না পেয়েছি। অতএব, তুমি তার মেয়েকে নিয়ে দিন-দুপুরে আমাদের সামনে দিয়ে যেভাবে বীরদর্পে বের হয়েছ, সেটা মোটেও ঠিক হয়নি। এভাবে তাকে যেতে দেওয়ার অর্থই হলো আরবের গোত্ররা আমাদের ভীতু হিসেবে চিহ্নিত করবে। আরব আমাদেরকে কাপুরুষ ছাড়া আর কী মনে করবে? কাজেই তুমি তাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে যাও এবং তাকে তার স্বামীর বাড়িতে কয়েক দিন কাটাতে দাও। তাকে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে কমপক্ষে লোকজনকে বলাবলি করতে দাও যে, কুরাইশরা তাকে মক্কা থেকে চলে যেতে বাধা দিয়েছে এবং তাকে ফিরিয়ে এনেছে। তারপর কোনো এক রাতে আমাদের অগোচরে সম্মানের সাথে তাকে তার পিতার কাছে পৌঁছে দাও। তাকে আমাদের কাছে বন্দী করে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।'
আবূ সুফিয়ানের এ পরামর্শে আমর সম্মত হলো এবং যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে নিয়ে মক্কায় ফিরে এল। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ফের সে আবূ সুফিয়ানের কথামতো যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে মক্কা থেকে রওয়ানা হলো ও তার ভাইয়ের নির্দেশ মতো তাঁকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত ব্যক্তিদের নিকট নিজ হাতে সোপর্দ করল।
যয়নব বিনতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হলে দীর্ঘ দিন যাবৎ আবুল আস মক্কায় নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে থাকে। মক্কা বিজয়ের মাত্র কিছু দিন পূর্বে সে তার তেজারতী কাফেলা নিয়ে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। তার বিরাট এ তেজারতী কাফেলার মালবাহী উটের সংখ্যাই ছিল একশত। এই উট বহরের পরিচালনায় নিযুক্ত কর্মচারীর সংখ্যাও ছিল একশত সত্তর জন।
আবুল আসের এই কাফেলা মক্কায় ফেরার পথে মদীনার কাছে পৌঁছা মাত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নিযুক্ত মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের টহলদার বাহিনীর সামনে পড়ে যায়। এরা কুরাইশদের এ তেজারতী কাফেলায় আক্রমণ চালায় এবং এ উটবহর কব্জা করে সমস্ত জনশক্তিকে বন্দী করে ফেলে। এ কাফেলায় আবুল আসই একমাত্র ব্যক্তি, যে টহলদার বাহিনীর হাত থেকে পালাতে সক্ষম হয়। যাকে অনেক খোঁজাখুজি করেও টহলরত বাহিনী গ্রেফতার করতে পারেনি।
রাত পুরোপুরি অন্ধকারে আচ্ছাদিত হয়ে পড়লে আবুল আস অন্ধকারের এ সুযোগে মক্কায় ফেরত না গিয়ে ভীত ও সন্ত্রস্ত মনে মদীনায় প্রবেশ করে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সে যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁর কাছে প্রাণ ভিক্ষা ও আশ্রয় কামনা করে। ফলে তিনি আবুল আসকে আশ্রয় ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেন।
ভোর হতে না হতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদে গেলেন। মেহরাবে দাঁড়িয়ে জামা'আত সোজা করানোর পর আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে তাকবীর তাহরীমা বাঁধলেন। সাথে সাথে উপস্থিত মুসল্লীদের আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর তাহরীমার হাত বেঁধে ফেলামাত্রই যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা মহিলাদের চত্বর থেকে উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন:
'হে নামাযরত মুসলিম ভাইয়েরা! আমি যয়নব বিনতে মুহাম্মদ বলছি। আমি আবুল আসকে আশ্রয় দিয়েছি। অতএব, আপনারাও তাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ও আশ্রয় দিন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযান্তে সালাম ফিরিয়ে মুসল্লীদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসলেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'নামাযের শুরুতে আমি যা শুনেছি তোমরাও কি তা শুনেছ?' সবাই বলে উঠলেন: 'জী হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: যে মহান সত্তার হাতে আমার জীবন-মরণের ফায়সালা, সেই আল্লাহর শপথ, আমি এ ব্যাপারে পূর্বাহ্ণে কিছুই জানি না, তোমাদের সাথে আমিও তার সম্পর্কে শুনতে পেলাম মাত্র।
মুসলমানদের দুর্বলতম ব্যক্তিও চাইলে কাউকে নিরাপত্তা দান করতে পারে, সে ক্ষেত্রে সবার পক্ষ থেকেই আশ্রিত হয়।
অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোজা তাঁর বাড়িতে গিয়ে যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে বললেন:
'আবুল আসকে মেহমানদারীতে কোনো ত্রুটি করো না। কিন্তু এ কথা জেনে রেখো যে, তুমি এখন তার জন্য হালাল নও। কারণ, কোনো কাফিরের সাথে ঈমানদার মহিলার বিবাহ জায়েয নয়।'
তারপর তিনি টহলরত সেই বাহিনীকে ডেকে পাঠান, যে বাহিনী আবুল আসের উটবহরকে কজা ও তার লোকজনকে বন্দী করে নিয়ে আসে। তারা এলে তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন:
'এই ব্যক্তি আমাদের যে একান্তই আপনজন তা তোমরা ভালো করেই জান। টহলরত অবস্থায় তোমরা তার উটবহর ও লোকজনকে কব্জা করেছ। আমি চাই যে, তোমরা যদি তার প্রতি ইহসান করতে চাও, তাহলে তাঁর সব কিছুই তাকে ফেরত দাও। আর যদি তোমরা তা না করতে চাও, তাহলে এসব তোমাদের জন্য 'ফাই' বা আল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধ ছাড়াই প্রাপ্ত সম্পদ এবং তা তোমাদের জন্য নিঃসন্দেহে হালাল ও তোমাদের মধ্যেই বণ্টনযোগ্য।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য শুনে টহলরত বাহিনীর সব সাহাবী সমস্বরে বলে উঠলেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা অবশ্যই তাকে তার সব কিছুই ফেরত দিয়ে দেব।'
আবুল আস তার উটবহর ফেরত নিতে এলে উক্ত টহলরত বাহিনীর সাহাবীরা তাঁকে বললেন:
'হে আবুল আস! তুমি কুরাইশদের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, শুধু তাই নয়, তুমি সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাত ভাই এবং বড় জামাতা। তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করা পছন্দ করবে? সে ক্ষেত্রে আমাদের কব্জা করা সমস্ত সম্পদ থেকে আমাদের অধিকার ছেড়ে দেব। তুমিই মক্কাবাসীর এই বিশাল সম্পদের একচ্ছত্র মালিক হয়ে আমাদের সাথে মদীনাতেই বসবাস করতে থাকবে। তাতে কি তুমি সম্মত আছো?'
উত্তরে আবুল আস বলল:
'ছি! আপনারা আমার প্রতি একটি সর্বনিকৃষ্ট ও ঘৃণ্যতম শর্ত আরোপ করছেন। আপনারা কি চান যে, আমি বিশ্বাসঘাতকতার মধ্য দিয়ে ইসলামী যিন্দেগীর সূচনা করি?'
প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আবুল আসকে তার সমস্ত সম্পদ ফেরত দেওয়া হলো। সে নিরাপদে মক্কায় ফিরে গিয়েই প্রত্যেককে তাদের সমস্ত প্রাপ্য বুঝিয়ে দিয়ে মক্কাবাসীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দেয় যে:
'তোমাদের এমন কি কেউ আছ যে, আমার কাছে তার প্রাপ্য রয়েছে অথচ এখনো তা বুঝে নাওনি?"'
তারা উত্তর দেয়:
'না। আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে, তোমার কাছে একটি কপর্দকও পায়।'
আমাদের পক্ষ থেকে আল্লাহ তোমাকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করুন। নিঃসন্দেহে আমরা তোমাকে একজন একান্ত নিষ্ঠাবান ও ন্যায়পরায়ণ দয়ালু ব্যক্তি হিসেবেই পেয়েছি।
তাদের এ উত্তর শুনে আবুল আস বলে:
'হ্যাঁ, আমিও ঘোষণা দিচ্ছি যে, আমি তোমাদের সকলেরই যা যা প্রাপ্য তা বুঝিয়ে দিয়েছি এবং এই সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আমার আর কোনো প্রভু নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি যে, তোমাদের সম্পদ মদীনায় আমার ইসলাম গ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমার ভয় হচ্ছিল, তোমরা আমাকে এই বলে তিরস্কার করবে যে, টহলদার বাহিনীর হাতে ধৃত হওয়ার বাহানা করে মূলত সে আমাদের সম্পদ আত্মসাৎ করতে চেয়েছে।'
'আল্লাহ তোমাদের সম্পদকে তোমাদের কাছে ফেরত দেওয়ার তাওফীক দিয়েছেন এবং আমিও তা থেকে দায়মুক্ত হতে পেরে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলাম।'
অতঃপর আবুল আস মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আগমনকে গভীর আন্তরিকতা সহকারে স্বাগত জানান এবং তাঁর স্ত্রী যয়নবকে তাঁকে ফেরত দিয়ে তাঁর সম্পর্কে বললেন:
'সে আমাকে যে কথা দিয়েছিল তা সত্যে পরিণত করেছে আর আমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাও যথাযথভাবে পালন করেছে।'
টিকাঃ
১. সিয়ারুল আলাম আন নুবালা লিয যাহাবী: ১ম খণ্ড, ২৩৯ পৃ.
২. উসদুল গাবাহ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৮৫ পৃ: অথবা আত-তারজামা অংশ, ৬০৩৫ পৃ.
৩. আনসাবুল আশরাফ: ৩৯৭ পৃঃ এবং এর পরে.
৪. আল ইসাবাহ: ৪র্থ খণ্ড, ১২১ পৃ.
৫. আস সীবাতুন নুবুবিয়াহ লিইবনে হিশাম : ২য় খণ্ড, ৩০৬-৩১৪ পৃ.
৬. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ : ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩৫৪ পৃ.
৭. হায়াতুস সাহাবা: ৪র্থ খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৮. আল ইসতিয়াব বিহামিশিল ইসাবাহ: ৪র্থ খণ্ড, ১২৫ পৃ.
📄 আসেম ইবনে সাবেত (রাঃ)
‘যে কেউ উত্তমভাবে যুদ্ধ করতে চায়, সে যেন আসেম ইবনে ছাবেত-এর মত যুদ্ধ করে।’
-মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)
মক্কার কুরাইশ নেতৃবৃন্দ থেকে ক্রীতদাস পর্যন্ত সর্বস্তরের যুদ্ধবাজরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বের হয়ে আসে। তাদের অন্তরে ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি চরম ঘৃণা আর বিদ্বেষ। বদর যুদ্ধের প্রতিশোধ-স্পৃহা এবং সে যুদ্ধে নিকটাত্মীয়দের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জিঘাংসায় তারা অন্ধু হয়ে উঠেছিল। প্রতিশোধের নেশা তাদের রক্তের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত ছিল।
এখানেই শেষ নয়, এ যুদ্ধে তাদের যোদ্ধাদের অধিকতর উত্তেজিত করা ও বীরত্বব্যঞ্জক গান গেয়ে সৈন্যদের মধ্যে রণোন্মাদনা সৃষ্টির জাহেলী যুগের এক বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা হলো। এ লক্ষ্যে তারা কুরাইশ মহিলাদের একটি গায়িকা দল গঠন করে। এ দলের শীর্ষে ছিল আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবা, উমর ইবনে আস-এর স্ত্রী রাইতা বিনতে মুনাব্বেহ, সুলাফা বিনতে সা'দ এবং আরো অনেক নামকরা গায়িকা। সুলাফার সাথে ছিল তার স্বামী তালহা এবং তার তিন ছেলে মূসাফে, জুলাস ও কিলাব। কুরাইশ ও মুসলিম বাহিনী উহুদ প্রান্তরে পরস্পর মুখোমুখি হলে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দার নেতৃত্বে মহিলারা তাদের হাতে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে কুরাইশ সৈন্যদের পেছনে অবস্থান নেয়। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে তারা জ্বালাময়ী ও উত্তেজনাকর কবিতা আবৃত্তি করতে থাকে। তারা নেচে নেচে যে উত্তেজনাকর গান গাইতে থাকে, তার একটি আরবী অংশ হলো:
إِنْ تُقْبِلُوا نُعَانِقُ ونَقْرُشِ النَّمَارِقُ أَوْ تُدْبِرُوا نُفَارِقُ فِرَاقَ غَيْرِ وَامِقَ
'যদি তোমরা সামনে অগ্রসর হয়ে মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণ করো, তবে আমরা তোমাদের আলিঙ্গন করব, বিলাসবহুল ফুলশয্যায় সম্মতি দেব, আরাম কেদারায় বসতে দেব, উষ্ণ স্বাগত জানাব। আর যদি তাদের আক্রমণের মুখে পিছু হটে যাও, তবে ধিক্কারের সাথে তোমাদের প্রত্যাখ্যান করব এবং ঘৃণাভরে সারা জীবনের জন্য ছুড়ে মারব।'
তাদের এসব কথা অশ্বারোহী যোদ্ধাদের দারুণভাবে উত্তেজিত করে। গায়িকাদের স্বামীদের হৃদয়েও তা জাদুকরী প্রভাব ফেলে।
মুসলিম বাহিনীর ওপর কুরাইশদের বিজয়ের মাধ্যমে এ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটলে কুরাইশ মহিলারা উন্মাদ হয়ে এমন সব জঘন্য অপকর্ম ঘটায়, যা ইতিহাসে বিরল। তারা শহীদ মুসলমানদের খুঁজে খুঁজে শনাক্ত করে তাদের লাশকে অপবিত্র করতে থাকে। তাদের বুক ও পেট চিরে কলিজা বের করে, চক্ষু উৎপাটন করে, কান ও নাক কেটে ফেলে, এতে তারা ক্ষান্ত না হয়ে শহীদদের কর্তিত নাক, কান কেটে গলার মালা, কানের বালি ও পায়ের নুপুর বানিয়ে তা পরিধান করে ক্ষোভের সমাপ্তি ঘটায়। কিন্তু সুলাফা বিনতে সা'দ-এর অবস্থা অন্যান্য কুরাইশ মহিলাদের চেয়ে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ ছিল না। দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার তেমনি কোনো সীমাও ছিল না। তার শুধু একটাই আশা যে, এ বিজয় মুহূর্তে তার স্বামী ও ছেলেরা তাকে এক নজর দেখে আনন্দ করুক এবং সেও তাদের এক নজর দেখেই বিজয়ানন্দে যোগ দিক। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তার মনের এ আশা পূরণ হতে না দেখে সে নিজেই তাদের খুঁজতে যুদ্ধের ময়দানের অনেক ভিতরে ঢুকে পড়ে। সুলাফা একের পর এক নিহতদের চেহারা উলট-পালট করে দেখতে থাকে। কোথাও তাদের না পেয়ে সে অস্থির হয়ে পড়ে। হঠাৎ স্বামীর রক্তাক্ত দেহ মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে উন্মাদের মতো তার লাশ জাপটে ধরে। চারদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তার তিন ছেলে মূসাফ, জুলাস ও কিলাব-এর সন্ধান করতে থাকে। উহুদের পাদদেশে তার ছেলে মূসাফ ও কিলাবকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করতে করতে তাদের দিকে ছুটে যায়। সুলাফা তাদের কাছেই ছেলে জুলাসকে জীবিত অবস্থায় দেখে দৌড়ে গিয়ে তার রক্তাক্ত দেহকে বুকে জড়িয়ে ধরে। উন্মাদনায় চিৎকার করতে করতে সোহাগভরা হৃদয়ে ছেলের মুখমণ্ডলের রক্ত মুছতে থাকে। দীর্ঘক্ষণ রক্তাক্ত অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে থাকার কারণে শুকিয়ে যাওয়া রক্তে তার চোখ দুটি বন্ধ হয়ে যায়। এসব রক্ত পরিষ্কারের ব্যর্থ চেষ্টা করে জুলাসকে বারবার জিজ্ঞাসা করতে থাকে:
'কে তোমার পিতাকে ও ভাইদের হত্যা করেছে? বলো সে কে? কে তোমাকে আঘাতের পর আঘাত করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে?'
জুলাস অন্তিম অবস্থায় মায়ের কাছে তাদের ওপর আক্রমণকারীর নাম বলতে গিয়ে মৃত্যু-যন্ত্রণায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পরিশেষে, অত্যন্ত নিস্তেজ কণ্ঠে এতটুকু বলতে সক্ষম হয়:
'আসেম ইবনে ছাবেত আমাকে আঘাত করেছে এবং আমার ভাই জুলাস ও কিলাবকেও...। এই বলে এক হেঁচকিতেই সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।'
স্বামীর ও সন্তানদের এ দুরবস্থা দেখে সুলাফা বিনতে সা'দ উন্মাদে বিলাপ করতে থাকে এবং লাত-মানাত দেবতার শপথ করে বলতে থাকে:
'যতক্ষণ কুরাইশরা আসেম ইবনে ছাবেত থেকে তার স্বামী ও সন্তানদের হত্যার প্রতিশোধ না নেবে এবং আসেমের মাথার খুলিতে তাকে শরাব পানের সুযোগ করে না দিবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে মাতম করা থেকে ক্ষান্ত হবে না এবং ক্রন্দনও বন্ধ করবে না।'
অতঃপর সে ঘোষণা করে:
'জীবিত বা মৃত অবস্থায় যে আসেম ইবনে ছাবেতকে হাজির করতে পারবে, অথবা তার মাথা এনে দিতে পারবে, তাকে তার চাহিদামতো অঢেল অর্থ পুরস্কার দেওয়া হবে।'
তার পুরস্কারের ঘোষণা দ্রুত কুরাইশদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মক্কার প্রতিটি ভাগ্য পরীক্ষার্থী যুবকই আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় সুলাফা বিনতে সা'দ-এর সামনে পেশ করে ঘোষিত পুরস্কার লাভের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
উহুদ যুদ্ধ শেষে মুসলিম যোদ্ধারা মদীনায় ফিরে আসেন। মদীনায় পৌঁছে শহীদদের মাগফিরাত কামনা, তাদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ও বীর গাযীদের নৈপুণ্যপূর্ণ ভূমিকা এবং উহুদ যুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করেন। একই পরিবারের তিন ভাইকে হত্যা করার গৌরব অর্জনকারী আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কথা এলে তারা সবাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে তাকে ধন্যবাদ জানাতে থাকেন।
তাদেরই একজন বলে উঠে: 'এতে অবাক হওয়ার কী আছে? তোমরা সে কথা কেন স্মরণ করছো না, বদরের যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের প্রশ্ন করেছিলেন যে, তোমরা কোন্ পদ্ধতিতে জিহাদ করবে?'
তখন আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ধনুক হাতে দাঁড়িয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলেন: 'শত্রু যদি আমার একশত গজের আওতায় থাকে, তাহলে তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে তাঁকে নিপাত করব। আর যদি তার চেয়ে নিকটে বর্শার আওতায় পৌঁছে যায়, তাহলে বর্শা নিক্ষেপের মাধ্যমে শত্রুকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করব, যাতে বর্শা শত্রুদেহ ভেদ করে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। আমি ততক্ষণ পর্যন্ত শত্রুর বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে বর্শা ব্যবহার করতে থাকব যতক্ষণ পর্যন্ত তা ভেঙে না যায়। যদি বর্শা ভেঙে যায়, তাহলে তা দূরে নিক্ষেপ করে তরবারি উন্মুক্ত করে নেব এবং তলোয়ার দিয়েই যুদ্ধ করতে থাকব?'
তার এ উত্তরের প্রেক্ষিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন: 'এ পদ্ধতিতেই যুদ্ধ করতে হবে। যে উত্তমভাবে যুদ্ধ করতে চায়, সে যেন আসেম ইবনে সাবেতের পদ্ধতিতে যুদ্ধ করে।'
উহুদ যুদ্ধের পরপরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শীর্ষস্থানীয় ছয় জন সাহাবীর এক বিশেষ দলকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে মদীনার বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। আসেম ইবনে ছাবেতকে এই দলের আমীর মনোনীত করা হলো। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যথাসময়ে রওয়ানা হয়ে গেলেন। মক্কার সীমানা ধরে পথ চলার এক পর্যায়ে হুযাইল গোত্রের দস্যুরা মুষ্টিমেয় কয়েকজন পথিককে দেখতে পেয়ে তাদের উপর আকস্মিক হামলা চালায়। তারা হুযাইল গোত্রের অন্যান্য লোকদের সহায়তায় চতুর্দিক থেকে সাহাবীদের ঘিরে ফেলে।
আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তার সঙ্গীরা তাদের প্রতিহত করার জন্য তলোয়ার উন্মুক্ত করলেন। তাদের এই প্রস্তুতি দেখে আক্রমণকারীরা বলল:
'মোকাবেলা করার মতো শক্তি নিঃসন্দেহে তোমাদের এই ছয় জনের নেই। আমরা আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমরা যদি আত্মসমর্পণ কর, তাহলে তোমাদের কোনো ক্ষতি করব না। সে ক্ষেত্রে তোমাদেরকে নিরাপত্তা দান করা হবে।'
তাদের এ প্রস্তাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে উদ্দেশ্যে তারা নিজেদের মধ্যে পরস্পর পরামর্শ-দৃষ্টি বিনিময় করলেন।
আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বললেন :
'আমি কখনো মুশরিকদের প্রতিশ্রুতিতে নিজেকে তাদের হাতে সোপর্দ করব না।'
তিনি উহুদ যুদ্ধে সুলাফা বিনতে সা'দ-এর পুরস্কারের ঘোষণার কথাও মনে মনে স্মরণ করলেন এবং নিজের তলোয়ার উঁচু করে বলতে থাকলেন:
اللهم إني أحمى لدينك وأدفع عنه ... فاحم لحمى وعظمى ولا تظفر بهما أحدا من أعداء الله .
'হে আল্লাহ! আমি তোমার দীনের রক্ষায় এবং তার হেফাযতে অস্ত্র তুলে ধরলাম। তুমি আমাকে সাহায্য কর। আর আমার দেহ ও হাড় হাড্ডিকে এমনভাবে হেফাযত কর যেন এই মুশরিক দুশমনরা কোনোভাবেই তার উপর বিজয়ী হতে না পারে।'
এই বলেই আক্রমণকারী হুযাইলীদের ওপর তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন। সাথে সাথে তাঁর অপর দুই সাথীও তাঁকে অনুসরণ করে দুশমনদের বিরুদ্ধে লড়াই-এ অংশ নেন। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে একের পর এক এ তিনজনই শাহাদাত বরণ করেন। অপর তিনজন তাদের আমীরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আত্মসমর্পণ করলে তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
প্রথম পর্যায়ে হুযাইল গোত্রের লোকেরা ভাবতেই পারেনি যে, এই তিনজনের মধ্যে আসেম ইবনে ছাবেতও রয়েছেন। পরে তারা তার পরিচয় পায়। পরিচয় পাওয়ার পর তারা যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে। তাদের এই আনন্দের কারণ হলো, সুলাফা বিনতে সা'দ-এর পুরস্কার ঘোষণা। জীবিত বা মৃত আসেমকে এনে দিলে দাতা তার ইচ্ছানুরূপ পুরস্কার লাভ করবে। কেননা, সুলাফা তার মাথার খুলি দিয়ে শরাব পান করে স্বামী ও পুত্রশোক প্রশমিত করবে।
আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শাহাদাতের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই হুযাইলদের অদূরেই কুরাইশদের কাছে তার এই সংবাদ পৌঁছে গেল।
তৎক্ষণাৎ কুরাইশ নেতারা হুযাইল গোত্রের নিকটে তাদের এক প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মাথা চাইল। তারা এই মাথা সুলাফার হাতে তুলে দিয়ে তার স্বামী ও তিন ছেলে হারানোর শোক কিছুটা হলেও লাঘব করতে চাইল। কুরাইশ প্রতিনিধিরা এ উদ্দেশ্যে প্রচুর অর্থ ও সোনা-দানা সঙ্গে নিয়ে রওয়ানাকালে এই বলে নির্দেশ দেওয়া হলো:
'তারা যেন আসেমের মাথার বিনিময়ে হুযাইলীদের সাথে কোনো প্রকার দর-কষাকষি করে সংকীর্ণ মনের পরিচয় না দেয়।'
কুরাইশ প্রতিনিধির হাতে আসেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শির তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তা বিচ্ছিন্ন করার জন্য মৃতদেহের নিকটে গিয়ে দেখে যে, মৌমাছি ও ভীমরুলের ঝাঁক তাঁর মৃতদেহকে ঘিরে আছে। তাঁর লাশের নিকট যেতে চেষ্টা করতেই মৌমাছি ও ভীমরুল তাদের চোখ, কান, মাথা, মুখমণ্ডলসহ শরীরের সব জায়গায় হুল ফোটাতে থাকে। এমতাবস্থায় তারা বারবার চেষ্টা করার পরও আসেম রাদিয়াল্লাহু আনহুর লাশের নিকট যেতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। আর এভাবে লাশের প্রতিরক্ষা হতে থাকে। তারা মৃতদেহের কাছে পৌঁছতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়ে পরস্পরে পরামর্শ করে যে, রাত পর্যন্ত আসেমের লাশকে এভাবেই থাকতে দাও। রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এলে ভীমরুল ও মৌমাছিরা লাশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সুযোগে তার শিরশ্ছেদ করা কোনো ব্যাপারই নয়। এ পরামর্শ মোতাবেক দিনের অবশিষ্ট সময়ে আসেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শিরশ্ছেদ করার চেষ্টা না করে লাশের অদূরে বসে তারা পাহারা দিতে থাকে।
কিন্তু দিনের শেষে রাত ঘনিয়ে আসার পূর্বেই আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল। মেঘের গর্জন একদিকে জনপদকে আতঙ্কিত ও অপরদিকে গাঢ় ধোঁয়ার মত মেঘরাশি চারদিক ছেয়ে ফেলল। সন্ধ্যা না হতেই মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হলো। রাতভর মুষলধারে এমন ঝড়-বৃষ্টি হলো, যা প্রবীণতম ব্যক্তিরা পর্যন্ত এ অঞ্চলে কখনো হতে দেখেনি। মুহূর্তের মধ্যেই পানিতে মাঠ-ঘাট ডুবে গেল এবং গোটা অঞ্চল বাঁধভাঙা প্লাবনে ভেসে গেল। সারা রাত বৃষ্টি শেষে সকাল বেলা হুযাইল গোত্রের লোকেরা আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শিরশ্ছেদের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ল; কিন্তু বহু খোঁজাখুঁজির পরেও শির তো শির তার লাশেরই কোনো সন্ধান পেল না। আসেম রাদিয়াল্লাহু আনহুর মৃতদেহকে প্রবল খর-স্রোতের তোড় দূরে বহুদূরে কোনো এক অজানা স্থানে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, যা এক আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। আল্লাহ আসেম ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর যুদ্ধকালীন কৃত দু'আ কবুল করেন এবং তাঁর পবিত্র দেহকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর পবিত্র মাথার খুলি দিয়ে সুলাফা বিনতে সা'দ-এর শরাব পান করার ঘৃণ্য অভিলাষ চিরতরে ব্যর্থ করে দেন।
আল্লাহ এভাবে তাঁর প্রিয় বান্দার ওপর মুশরিকদের সমস্ত ইচ্ছা পূরণের সর্ব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করেন।
টিকাঃ
১. আল ইসাবা: আত-তারজামা, ৪৩৪০ পৃ.
২. আল ইসতিয়াব: বি হাশেমে ইসাবা: ৩য় খণ্ড, ১৩২ পৃ.
৩. উসদুল গাবাহ: আত-তারজামা, ২৬৬৩ পৃ.
৪. আত তাবাকাতুল কুবরা: ২য় খন্ড, ৪১, ৪৩, ৫৫, ৭৯ পৃ: এবং ৩য় খণ্ড, ৯০ পৃ.
৫. হুলিয়াতুল আওলিয়া: ১ম খণ্ড, ১১০ পৃ.
৬. সিফাতুস সাফওয়া: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৭. তারীখুত তাবারীহ: ১০ম খন্ডের সূচি দ্রষ্টব্য.
৮. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৩য় খণ্ড, ৬২-৬৯ পৃ.
৯. তারীখু খালীফাতু ইবনে খিয়াত: ২৭ ও ৩৬ পৃ.
১০. আস সীরাতুন নুবুবিয়াহ লিইবনে হিশাম: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১১. আল মুহাব্বারু ফিততারীখ: ১১৮ পৃ.
১২. দেওয়ানে হাসান বিন ছাবেত ওয়া শুরুহিহী: আসেম ইবনে সাবেতের জীবনী.
১৩. হায়াতুস সাহাবা: ৪র্থ খণ্ডের সূচি দ্রষ্টব্য.
📄 সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ)
সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা প্রথম মুসলিম নারী, যিনি আল্লাহর দীনের প্রতিরক্ষায় এক মুশরিক গুপ্তচরকে হত্যা করেছিলেন।
প্রিয় পাঠক।
আপনারা কি জানেন? অসাধারণ প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতাসম্পন্ন এই মহিলা সাহাবী কে? যার সম্পর্কে হাজার পুরুষ হাজারো রকমের হিসাব করে সুরাহা পেত না। হ্যাঁ, সেই দুরন্ত সাহসী মহিলা তিনি, যিনি ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম একজন মুশরিক হত্যার গৌরব লাভ করেন। যিনি সর্বপ্রথম মুসলমানদের জন্য অশ্বারোহী যোদ্ধাকে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। যিনি সর্বপ্রথম তাঁর তরবারিকে জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর জন্য হাতে তুলে নিয়েছিলেন। তিনিই হলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফু সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব আল হাশেমিয়্যা আল কুরাইশিয়া্য। যিনি শুধু বংশ-পরিচয়েই যুগশ্রেষ্ঠ ছিলেন না; বরং সামাজিক মর্যাদায়ও সকলের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাদা কুরাইশ গোত্র প্রধান আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম তাঁর পিতা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মা আমেনা বিনতে ওয়াহাব-এর সহোদরা হা'লা বিনতে ওয়াহাব হলেন তাঁর মাতা। তাঁর প্রথম স্বামী ছিল আবূ সুফিয়ান ইবনে হারবের ভাই উমাইয়া গোত্রের নেতা আল হারেস ইবনে হারব। যিনি তাঁকে বিধবা হিসেবে রেখে ইহজগৎ ত্যাগ করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্বামী হলেন তদানীন্তন আরব রমণীদের নয়নমণি এবং প্রথম উম্মুল মুমিনীন খাদীজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার ভাই আওয়াম ইবনে খুওয়াইলিদ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাওয়ারী বা সাহায্যকারী যুবায়ের ইবনে আল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন তাঁর ছেলে। তিনি এতই নিরহংকার ও বিনয়ী ছিলেন যে, একমাত্র ঈমানের গৌরব ছাড়া আর কোনো গৌরব তাঁর ছিল না, যার প্রতি অন্যের দৃষ্টি আকৃষ্ট হতে পারে। তাঁর দ্বিতীয় স্বামী আল আওয়াম তাঁর কোলে একমাত্র শিশু যুবায়েরকে রেখে ইনতিকাল করেন। তিনি তাঁর শিশু সন্তানকে দুঃখ-কষ্টে লালন-পালন করেন। তাঁকে যুদ্ধবিদ্যা ও অশ্ব-পরিচালনার মতো সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বড় করে তোলেন। তীর-ধনুক তৈরির জ্ঞানও তাঁকে দেন। ঝুঁকিপূর্ণ ও ভীতিকর পরিস্থিতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার এবং যে কোনো ভয়-ভীতির মোকাবেলা করার মতো কঠিনতম কাজের জন্যও তাঁকে দুঃসাহসী করে গড়ে তোলেন। এসব অনুশীলনে যদি যুবায়েরকে তিনি বিন্দুমাত্র ইতস্তত বা ভয় করতে দেখতেন, তাহলে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাতের মতো কঠিন সাজাও দিতেন। এ জন্য তার এক চাচা তাঁকে তিরস্কার করলেন: 'ছেলেকে কি এমনভাবে প্রহার করতে হয়? তুমি ওকে শত্রুর মতো প্রহার করছ। মায়ের সোহাগভরা শাসন এটা নয়।'
তিনি এর উত্তরে তাকে বলেন:
مَنْ قَالَ قَدْ أَبْغَضْتُهُ فَقَدْ كَذَبْ وَإِنَّمَا أَضْرِبُهُ لِكَيْ يَلِبْ وَيَهْزِمَ الْجَيْشِ وَيَأْتِي بِالسَّلَبْ
'কে বলে যে, আমি যুবায়েরের সাথে শত্রুতাসুলভ আচরণ করছি, নিঃসন্দেহে সে মিথ্যা বলছে। প্রকৃতপক্ষে আমি তাকে এজন্য প্রহার করছি যে, সে যেন রণ-কৌশলে নৈপুণ্য অর্জন করতে, শত্রুবাহিনীর ওপর সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে, শত্রুবাহিনীর ব্যূহকে ভেদ ও তছনছ করতে এবং মালে গনীমতের সম্পদ নিয়ে ফিরতে সমর্থ হয়।'
আল্লাহ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামকে সমস্ত মানবকুলের জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী করে প্রেরণ করে তাঁর নিকটাত্মীয়দের থেকেই দাওয়াত শুরু করার নির্দেশ দেন। আল্লাহর এই আদেশ পেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল মুত্তালিব গোত্রের ছোট-বড়, শিশু-যুবক, নারী-পুরুষ সবাইকে একত্র করে তাদের উদ্দেশ্যে বলেন:
'হে আমার কন্যা ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ, হে সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব, হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর! আমি তোমাদেরকে আল্লাহর শান্তি থেকে রক্ষা করতে পারব না।'
অতঃপর তিনি তাদেরকে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার জন্য আহ্বান জানান। তাদেরকে তিনি তাঁর রিসালাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। তাদের মধ্যে যাদের তাওফীক হলো, তারা ঈমান এনে আল্লাহর নূরে নূরান্বিত হলেন এবং যারা তা প্রত্যাখ্যান করল তারা অন্ধকারেই নিমজ্জিত রইল। এ আহ্বানে সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীদের অন্যতম ছিলেন। সেদিন থেকেই সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব ঈমান গ্রহণের মাধ্যমে ইসলামী জীবন যাপন করতে আরম্ভ করেন।
সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব তাঁর ছেলে যুবায়ের ইবনে আওয়ামসহ প্রথম সারির মুসলমানদের মতো কুরাইশদের অবর্ণনীয় যুলুম-নির্যাতন ও অন্যায়-অত্যাচারের শিকারে পরিণত হলেন। আল্লাহর রাসূল তাঁর সাথী-সঙ্গীদের মদীনায় হিজরতের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিলে এই হাশেমী রমণীও তাঁর সমস্ত ধন-দৌলত, মূল্যবান আসবাবপত্র, সহায়-সম্পদ মক্কায় ফেলে রেখে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি ও দীনের হেফাযতকল্পে মদীনায় হিজরত করেন। ষাট বছর বয়সের এই মহিলাকে তার বার্ধক্য যেমন হিজরত থেকে বিরত রাখতে পারেনি, তেমনি জিহাদের ময়দানেও তাঁর বীরোচিত ভূমিকা রাখা থেকে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। অদ্যাবধি শ্রদ্ধা ও গর্বের সাথে মুসলমানগণ তা স্মরণ করে আসছেন। আমরা এখানে তাঁর জীবনের দুটি ঘটনার আলোচনা করছি। প্রথম ঘটনাটি হলো উহুদ যুদ্ধের ও দ্বিতীয়টি খন্দক যুদ্ধের। উহুদ যুদ্ধের ঘটনাটি হলো:
তিনি জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর উদ্দেশ্যে মহিলা ইউনিটের অন্তর্ভুক্ত হয়ে মুসলিম সৈন্যদের সাথে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি এ যুদ্ধে যোদ্ধাদের জন্য পানি বহন করে আনা, তৃষ্ণার্তদের পানি পান করানো, তীর শাণিত করা ও ধনুক ঠিক করার দায়িত্ব পালন করেন। এসব দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে তাঁর মনে যে উদ্দেশ্য লুক্কায়িত ছিল তা হলো, যুদ্ধের পুরো অবস্থার উপরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা। কারণ, তাতে অবাক হবার মতো কিছু ছিল না। যুদ্ধের ময়দানে তাঁরই ভাইপো মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর নেতৃত্বে আল্লাহর সিংহ উপাধিতে ভূষিত তাঁর ভাই হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং রাসূলুল্লাহর সাহায্যকারী তাঁর ছেলে যুবায়ের ইবনে আওয়াম উপস্থিত। সব কিছুর ঊর্ধ্বে ছিল ইসলাম। যা তিনি মনে-প্রাণে গ্রহণ করেছেন এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের জন্যই হিজরত করেছেন। তিনি যে জান্নাতের পথ ধরেছেন। এসব কারণই তাঁকে সশরীরে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হতে বাধ্য করেছে।
যুদ্ধের এক চরম সন্ধিক্ষণে কিছুসংখ্যক সাহাবী ছাড়া মুসলিম বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শত্রুদের অস্ত্রের সামনে রেখে প্রাণভয়ে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। অবস্থার এতই অবনতি ঘটে যে, মুশরিক কুরাইশরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘিরে ফেলে এবং তাঁকে হত্যার প্রচেষ্টা চালায়। দুঃখজনক এ অবস্থা দেখে সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহ তাআলা আনহা তাঁর পানি বহনকারী সুরাহী মাটিতে নিক্ষেপ করে পলায়নকারী এক মুসলিম সৈন্যের হাত থেকে তার বর্শা কেড়ে নেন এবং শত্রুক্রবাহিনীর যাকেই পান তাকেই বর্শার আঘাতে আহত করতে করতে সামনে অগ্রসর হতে থাকেন। তিনি পলায়নকারী মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে উচ্চৈঃস্বরে বলতে থাকেন:
'তোমাদের প্রতি ধিক্কার! তোমরা আল্লাহর রাসূলকে ময়দানে ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছ?'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সম্মুখে অগ্রসর হতে দেখে আশঙ্কা করলেন যে, তিনি তাঁর ভাই হামযার বিকৃত লাশ দেখে না ফেলেন। এ জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার ছেলে যুবায়েরকে ইশারা করে বলেন:
'তোমার মাকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়া থেকে বিরত রাখ।'
যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে তাঁর মায়ের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে বলতে থাকেন:
'আম্মা! আম্মা! আর অগ্রসর হবেন না, যে পর্যন্ত হয়েছেন তাই যথেষ্ট।'
সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা ছেলে যুবায়েরকে ধমক দিয়ে বললেন:
'সরে যাও, এখন মা মা বলে ডাকার সময় নয়।'
যুবায়ের তখন বললেন:
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে বিশেষভাবে মহিলাদের নির্দিষ্ট স্থানে চলে যেতে বলেছেন।'
তিনি প্রশ্ন করলেন:
'কেন? আমার শাহাদাতপ্রাপ্ত ভাই হামযার নাক-কান কেটে তার লাশকে বিকৃত করে ফেলেছে বলে? তাতো আমি জেনেই ফেলেছি। এতে কী হয়েছে এবং সে তো আল্লাহর পথেই শহীদ হয়েছে।'
সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার এই দৃঢ় মনোবল দেখে যুবায়েরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'হে যুবায়ের, তাঁকে তাঁর কাজ করতে দাও। যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটলে সাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা তাঁর ভাই হামযা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর লাশের কাছে উপস্থিত হয়ে দেখতে পান যে, তাঁর পেট ফেড়ে ফেলা হয়েছে, কলিজা টেনে বের করা হয়েছে, নাক-কান কেটে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং চেহারাকে বিকৃত করা হয়েছে।'
তিনি তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করে বলতে থাকলেন:
'এ সব কিছুই আল্লাহর উদ্দেশ্যে, আল্লাহর সিদ্ধান্তেই আমি সন্তুষ্ট। আল্লাহর শপথ, আমি ধৈর্য অবলম্বন করব এবং আল্লাহর দরবারে এসবের প্রতিদান ইনশাআল্লাহ অবশ্যই পাব।'
এটাই ছিল উহুদ যুদ্ধে সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার গৌরবময় ভূমিকা।
খন্দক যুদ্ধে তিনি যে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। আসুন! ইতিহাসের পাতা থেকে আমরা তা জেনে নেই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নীতি ছিল, তিনি কোনো যুদ্ধাভিযানে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে শত্রুদের বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কায় নারী ও শিশুদের দুর্গের মধ্যে হেফাযতে রাখতেন। যেন অরক্ষিত অবস্থায় শত্রুরা তাদের ক্ষতি সাধন করতে না পারে। তাই খন্দকের যুদ্ধেও তিনি উম্মাহাতুল মুমিনীনসহ ফুফু সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব এবং অন্যান্য মুসলিম রমণীকে হাসসান ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত নিরাপদ দুর্গে রাখলেন। এটি ছিল মদীনার দুর্গসমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুরক্ষিত ও নিরাপদ এবং শত্রুর নাগালের বাইরে।
মুসলমানরা যখন খন্দকের পাড়ে অবস্থান গ্রহণ করে কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের মোকাবিলায় ব্যস্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মতো উদ্বেগজনক এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা ফজরের পূর্ব মুহূর্তে অন্ধকারে ছায়ার মতো কী যেন একটা নড়াচড়া করতে দেখলেন। পান সেদিকে মনোযোগের দিয়ে দেখলেন যে:
'এক অপরিচিত ব্যক্তি দুর্গের চতুষ্পার্শ্বে ঘুরাফেরা করে ভিতরের অবস্থা জানার চেষ্টা করছে। তিনি নিশ্চিত হলেন যে, সে নিশ্চয়ই ইহুদীদের গুপ্তচর হবে। সে হয়তো জানতে চাচ্ছে, দুর্গে কোনো পুরুষ পাহারাদার আছে, নাকি পাহারাবিহীন শুধু শিশু ও মহিলাদের অরক্ষিত রাখা হয়েছে!'
তিনি মনে মনে ভাবলেন:
'নিঃসন্দেহে এ বনু কুরাইযা গোত্রের ইহুদী গুপ্তচর। যে বনু কুরাইযা তাদের ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যকার চুক্তি ভঙ্গ করে কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের পক্ষ অবলম্বন করে তাদেরকে সাহায্য করছে। এ মুহূর্তে এই ইহুদীর হাত থেকে রক্ষা করার মতো কোনো মুসলমানই এখানে নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সমস্ত মুসলিম জনশক্তি সংঘবদ্ধভাবে দুশমনের মোকাবেলায় খন্দকে ব্যস্ত। আল্লাহর এই দুশমন আমাদের দুর্গের অবস্থা ও প্রকৃত সংবাদ ইহুদীদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হলে ইহুদীরা দুর্গে আক্রমণ করে শিশুদের ও মহিলাদের ক্রীতদাস-দাসীতে পরিণত করবে। এটা হবে মুসলমানদের জন্য চরম বিপর্যয়। এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের ইজ্জত রক্ষার অবশিষ্ট আর কিছু থাকবে না।'
এসব চিন্তা করে তিনি ওড়না মাথায় মুড়িয়ে এবং কোমর বেঁধে তাঁবুর একটি শক্ত খুঁটি লাঠি হিসেবে কাঁধে নিয়ে অতি গোপনে নিচে এসে আস্তে আস্তে দুর্গের দরজা খোলেন এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আল্লাহর এই দুশমনকে অনুসরণ করতে থাকেন। কাঁধে আঘাত করার মতো সুবিধাজনক স্থানে পৌছামাত্রই তাকে সজোরে আঘাত হানেন। এক আঘাতেই সে মাটিতে পড়ে যায়। পরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় আঘাত হানেন। সে নিস্তেজ হয়ে পড়লে এবং শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে তিনি সাথে আনা ছুরি দ্বারা এই ইহুদীর শিরশ্ছেদ করে ফেলেন এবং তার খণ্ডিত শির নিয়ে দুর্গের ছাদে চলে আসেন। দুর্গের উপর থেকে নিচে অপেক্ষমাণ তার অন্যান্য সাথীদের প্রতি লক্ষ্য করে তা ছুঁড়ে মারলে গড়িয়ে এসে তাদের সামনে পড়ে। এ দেখে সেখানে অবস্থানরত তার অন্য সাথীদের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার হয়। তারা এ ইহুদীর কর্তিত শির দেখে পরস্পরে বলাবলি করতে থাকে:
'আমরা এখন বুঝতে পারলাম যে, মুহাম্মদ মহিলা ও শিশুদেরকে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে যেতে পারে না, নিশ্চয়ই দুর্গে যোদ্ধাদের উল্লেখ্যযোগ্যসংখ্যক প্রহরী রয়েছে।'
আল্লাহ সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিবের ওপর সন্তুষ্ট হোন। তিনি মুসলিম রমণীদের জন্য এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি নিজে তাঁর ছেলেকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং তা ছিল সার্থক প্রশিক্ষণ। নিজের ভাই শহীদ হয়েছেন, তাতে তিনি উত্তম সবর করেছেন। বিপদ-আপদ ও কষ্টে আল্লাহ তাঁকে বারবার পরীক্ষা করেছেন। তিনি নিজেকে একজন দৃঢ় মনোবলের অধিকারিণী সাহসী মহিলা হিসেবে প্রমাণ করেছেন। ইতিহাসের পাতায় তাঁর বীরোচিত ভূমিকা স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাই সর্বপ্রথম মুসলিম রমণী, যিনি ইসলামের খাতিরে এক মুশরিককে হত্যা করেন।
টিকাঃ
১. উসদুল গাবাহ: ৭ম খণ্ড, ১৭৪ পৃ.
২. আত তাবাকাতুল কুবরা: ৮ম খণ্ড, ৪১ পৃ.
৩. সিয়ারু আলাম আন নুবালা: ২য় খণ্ড, ১৯৩ পৃঃ.
৪. আল ইসাবা: ৮ম খণ্ড, ৩৪৮ পৃ.
৫. আল ইসতিয়াব: ৪র্থ খণ্ড, ৩৪৫ পৃ.
৬. সামতুল আ-লাই: ১ম খণ্ড, ১৮ পৃ.
৭. হায়াতুস সাহাবা: ১ম খণ্ড, ১৫৪ পৃ. ও সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৮. আসসীরাতুন নুবুবিয়াহ লি-ইবনি হিশাম: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৯. জাইলু তারীখুত তাবারী: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১০. আল কামিল ফিতা তারীখ: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১১. আলামুন নিসা লিকিহালাহ: ২য় খণ্ড, ৩৪১-৩৪৬ পৃ.
১২. ফুতুহুল বুলদান লিল বালাযুরী.
১৩. আল আগানী লিআবিল ফারাজ: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১৪. আল মুসতাতরিফ লিল আবশিহী: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১৫. আল মাআরিফ লি ইবনে কুতায়বা: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.