📄 আব্বাদ ইবনে বিশর (রাঃ)
‘তিনজন আনসারীর ফযীলত এত বেশি যে, মর্যাদায় কেউই তাদের সমকক্ষ হতে পারেনি। তারা হলেন, সা'দ বিন মুআয, উসাইদ বিন হুদাইর এবং আব্বাদ বিন বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম।’
-উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা
ইসলামী দাওয়াতের ইতিহাসে আব্বাদ ইবনে বিশরের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। যদি আল্লাহভীরু ব্যক্তিদের সারিতে তাঁর অবস্থান অনুসন্ধান করতে চান, তাহলে নিঃসন্দেহে তাঁকে একজন পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারী, আল্লাহপ্রেমিক, তাহাজ্জুদ নামাযে আল কুরআনের বিভিন্ন অংশ তিলাওয়াতকারী আবেদ হিসেবে দেখতে পাবেন।
যদি তাঁকে বীর যোদ্ধাদের সারিতে সন্ধান করেন, তাহলেও তাঁকে অকুতোভয় বীর যোদ্ধা ও আল্লাহর কালেমা বুলন্দকারী এমন এক সাহসী যোদ্ধা হিসেবে দেখতে পাবেন, যার সমকক্ষ খুঁজে পাওয়াই দুরূহ।
এমনিভাবে, যদি তদানীন্তন ইসলামী বিশ্বের প্রাদেশিক গভর্নরদের সারিতে তাঁর অবস্থান নির্ণয় করতে চান, তাহলেও তাঁকে অত্যন্ত সফল ও সচেতন শাসক হিসেবে দেখতে পাবেন। রাষ্ট্রীয় অর্থের আমানতদার এক বিশাল ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁকে দেখা যাবে।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এবং তাঁর গোত্রের অপর দু'জন সাহাবী তাঁর প্রশংসায় বলেছেন,
'আবদুল আশহাল' গোত্রে এমন তিনজন আনসারী আছেন, যাদের ফযীলত ও মর্যাদায় সমকক্ষ হওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তারা সবাই আবদুল আশহালের সন্তান।'
'তারা হলেন, সা'দ ইবনে মুআয, উসাইদ বিন হুদাইর এবং আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম।'
ইয়াসরিবে দাওয়াতে ইসলামীর সূচনাকালে আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আল আনসারী ছিলেন যৌবনদীপ্ত তরতাজা এক যুবক। তাঁর চেহারায় ছিল নিষ্পাপ লাবণ্য ও উজ্জ্বলতার ছাপ, যাঁর আচার-আচরণে প্রতিফলিত হতো যুগশ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের মতো বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতা। অথচ তাঁর বয়স তখনো পঁচিশ অতিক্রম করেনি।
ইয়াসরিবে আগন্তুক মক্কার প্রথম দাঈ ইলাল্লাহ যুবক মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে মিলিত হতে না হতেই পরস্পরের মধ্যে দৃঢ় ঈমানী বন্ধনের সৃষ্টি হয়। মৌলিক মানবীয় ও চারিত্রিক গুণাবলির একান্ত সাদৃশ্যের কারণে তাঁদের মধ্যে হৃদ্যতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে।
মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সুললিত মধুর স্বরে ও আবেগময়ী সুরে কুরআন তিলাওয়াত করতে শুনে তিনিও তাঁর মতো কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং তাঁর অন্ধকার অন্তরও আল কুরআনের নূরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। তাঁরা উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে, ভ্রমণে ও নিজ গৃহে অবস্থানকালে আল কুরআনের মধুর তিলাওয়াতে মগ্ন থাকতেন। যার ফলে সাহাবীদের মধ্যে তাঁরা ঈমান ও কুরআনের বন্ধু হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো এক রাতে মাসজিদুন নববী সংলগ্ন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার ঘরে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করছিলেন। মসজিদে আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সুললিত কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করতে শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'আয়েশা! এ কি আব্বাদ ইবনে বিশরের কন্ঠ? জিবরাঈল আলাইহিস সালাম যেভাবে ও যে মিষ্টি স্বরে আমার ওপর কুরআন নাযিল করেন, সেই মিষ্টিস্বরে তিলাওয়াত শুনছি!'
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা উত্তর দিলেন: 'হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।'
এটি আব্বাদের আওয়াজ নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর জন্য তিনি আল্লাহর দরবারে এই বলে দু'আ করলেন: 'হে আল্লাহ! তাঁর সমস্ত গুনাহ মাফ করে দাও।'
আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে সংঘটিত সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রতিটি যুদ্ধেই তিনি আল কুরআনের ধারক-বাহকের যথাযোগ্য দায়িত্ব পালন করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'যাতুর রিকা' অভিযান থেকে ফেরার পথে পাহাড়ি একটি ঘাঁটিতে রাত্রি যাপনের জন্য যাত্রাবিরতি করেন। এ যুদ্ধে কোনো এক মুসলিম যোদ্ধা যুদ্ধ চলাকালে স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন প্রতিপক্ষের এক মহিলা যোদ্ধাকে বন্দী করে আনে। স্বামী এই মহিলাকে না পেয়ে লাত এবং উয্যা দেবতার কসম করে বলে:
'আমি মুহাম্মদ ও তার সাথীদের অবশ্যই অনুসরণ করতে থাকব এবং এর প্রতিশোধে রক্তপাত না ঘটানো পর্যন্ত ক্ষান্ত হব না।'
এ ঘাঁটিতে মুসলিম বাহিনী তাদের উটবহরকে নিরাপদ স্থানে বসানোর আগেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন:
'আজকের রাতে পাহারার দায়িত্ব কে পালন করবে?'
আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং আম্মার ইবনে ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আরয করলেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার অনুমতি পেলে আমরা দু'জনই পাহারার দায়িত্ব পালন করব।'
মদীনায় মুহাজিরগণ আগমন করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দু'জনের পরস্পরকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছিলেন। তাঁরা দু'জনেই সেই পাহাড়ি ঘাঁটির প্রবেশপথে এলে আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ভাই আম্মার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললেন:
'রাতের দু'ভাগের কোন্ ভাগে আপনি ঘুমানো পছন্দ করবেন? প্রথম ভাগে, নাকি শেষ ভাগে?'
আম্মার ইবনে ইয়াসার উত্তর দিলেন:
'রাতের প্রথম ভাগেই আমি নিদ্রা যেতে চাই। তাই আব্বাদ ইবনে বিশরের থেকে একটু দূরেই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।'
নীরব নিস্তব্ধ রজনী। ধীরে ধীরে মৃদু-মন্দ বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে। গোটা পরিবেশ শান্ত ও স্তব্ধ। আসমানে তারকারাজি জ্বলছে। পাহাড়-পর্বত, গাছ- গাছালি আর বালুকণা সবই আল্লাহর তাসবীহ ও পবিত্রতা বর্ণনায় নিমগ্ন হয়ে পড়েছে। আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মন ইবাদতের জন্য ব্যস্ত এবং কুরআন তিলাওয়াতের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল।
তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াতের চেয়ে নামাযে তিলাওয়াতে বেশি স্বাদ পেতেন। আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে নামাযে নিমগ্ন হয়ে কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমেই বেশি পুণ্য। তাই তিনি কিবলামুখী হয়ে নিয়ত করে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। মধুর স্বরে তিনি সূরা কাহফ তিলাওয়াত আরম্ভ করলেন। তিলাওয়াতের স্বাদে তাঁর আত্মা এমনভাবে উদ্বেলিত হলো, যেন তা আসমানে উড়ে চলেছে। নামাযে তাঁর গভীর একাগ্রতার এক পর্যায়ে ইসলামী বাহিনীর সন্ধানে সেই ব্যক্তি দ্রুত এগিয়ে আসে। পাহাড়ি ঘাঁটির সম্মুখ দিয়ে অতিক্রমকালে দূর থেকে আব্বাদকে দণ্ডায়মান দেখে বুঝতে পারে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীরা গুহার অভ্যন্তরে রাত্রি যাপনের জন্য যাত্রাবিরতি করছেন। আর দণ্ডায়মান ব্যক্তি তাদেরকে পাহারা দিচ্ছে। সে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে তার থলে থেকে তীরগুচ্ছ বের করে ধনুক তাক করেই সজোরে আব্বাদ ইবনে বিশরের দিকে নিক্ষেপ করল। সাথে সাথে তা আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দেহে বিদ্ধ হলো। আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আস্তে করে তীরখানা তাঁর দেহ থেকে খুলে ফেলে আবার একাগ্রতার সাথে নামাযের মাধ্যমে কুরআন তিলাওয়াতে মনোনিবেশ করলেন। সেই ব্যক্তি আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দিকে আবার তীর নিক্ষেপ করল এবং তাও তাঁর দেহে বিদ্ধ হলো। বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পূর্বের ন্যায় এ তীরটিও তাঁর দেহ থেকে খুলে তিলাওয়াত অব্যাহত রাখলেন। সে তৃতীয় বারের মতো আবার তীর নিক্ষেপ করলে পূর্বের মতো সেটিও তাঁর দেহে বিদ্ধ হলো এবং তিনি সেটিও খুলে ফেললেন। এবার আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর অদূরেই ঘুমানো আম্মার ইবনে ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে এই বলে ডেকে উঠালেন যে:
'বিষাক্ত তীরের যখমে আমি নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছি।'
আম্মার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তৎক্ষণাৎ জেগে উঠলে তীর নিক্ষেপকারী তাদের দু'জনকে দেখে পালিয়ে গেল। আম্মার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দৃষ্টি আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দিকে পড়ামাত্রই দেখতে পেলেন যে, আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তিন তিনটি যখম থেকে রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হচ্ছে। আম্মার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললেন:
يَا سُبْحَانَ اللهِ هَلَّا الْقَظْتَني عند أول سهم رمـاك بـه؟
'সুবহানাল্লাহ! আপনার প্রতি প্রথম তীর নিক্ষেপ করার সাথে সাথেই কেন আমাকে জাগাননি?' আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আমি এমন একটি সূরা তিলাওয়াত করছিলাম, তাতে মোটেও চাচ্ছিলাম না যে, তার তিলাওয়াত অপূর্ণাঙ্গ থেকে যাক। আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পাহাড়ি গুহার পাহারায় আমাদের নিযুক্ত করেছেন যদি তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা না করতাম, তাহলে সূরাটির তিলাওয়াত অপূর্ণাঙ্গ থাকার চেয়ে মৃত্যুকেই প্রাধান্য দিতাম।'
আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতের সময় 'রিদ্দার' যুদ্ধের সূচনা হলে আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসাইলামাতুল কাযযাবের সৃষ্ট ফিতনার মূলোৎপাটন এবং মুরতাদদের আবার ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেন।
আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন সেই বাহিনীর অগ্রগামী নেতাদের অন্যতম। এ যুদ্ধে মুসলমানদের পারস্পরিক অনাস্থার সূত্রপাত ঘটে। আনসার ও মুহাজিরদের, গ্রাম ও শহরবাসীদের পরস্পরের প্রতি অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ- অভিমানের কারণে আশানুরূপ বিজয় সূচিত না হওয়ায় তিনি ভীষণভাবে মর্মাহত হন। যুদ্ধ করার পরিবর্তে তারা পারস্পরিক দোষারোপে লিপ্ত হওয়ায় তাঁর মনে এ আশঙ্কা বদ্ধমূল হয়ে পড়ে যে, এই ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় সম্ভব হবে না। যদি না আনসার ও মুহাজির এবং গ্রামবাসী ও শহরবাসীদের ভিন্ন ভিন্ন রেজিমেন্টে বিভক্ত না করা হয় এবং প্রত্যেক রেজিমেন্টকে নিজ নিজ জয়-পরাজয়ের জন্য দায়ী না করা যায়।
পরদিন চরম ও রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধ সংঘটনের আগের রাতে আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু স্বপ্নে দেখেন:
'আকাশের বুককে তাঁর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। তিনি সেখানে প্রবেশ করলে আকাশ তাঁকে তার ভিতরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।'
সকালে আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে তাঁর এ স্বপ্নের কথা বললে তিনি তার তা'বীরে বলেন:
আব্বাদ ইবনে বিশর (রা) ১৫৭ www.pathagar.com
page_159.jpg
'হে আব্বাদ ইবনে বিশর নিঃসন্দেহে এর তা'বীর শাহাদাত ছাড়া অন্য কিছুই নয়।'
পরের দিন যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করলে আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পাহাড়ি টিলার ওপর থেকে সকল আনসারকে তাঁর দিকে আহ্বান জানিয়ে বললেন:
'হে আনসার ভাইয়েরা! অন্য যোদ্ধাদের থেকে আলাদা হয়ে আসুন এবং তলোয়ারের কোষ ভেঙে ফেলুন, যেন এই তলোয়ার দ্বিতীয় বার তাতে ঢুকানোর প্রয়োজন না হয়। ইসলামের বিজয়কে অন্যের করুণার ওপর ছেড়ে দেবেন না।'
এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাবেত ইবনে কায়েস, বারাআ ইবনে মালেক এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তলোয়ার রক্ষক আবূ দুজানা আনহুমের নেতৃত্বে চারশত আনসার তাঁর পাশে সমবেত হন। আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এসব সাহাবীকে নিয়ে শত্রুবাহিনীর ওপর এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন যে, তাতে মুসাইলামাতুল কাযযাবের সুরক্ষিত ব্যূহ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মুসাইলামা ও তার যোদ্ধারা যুদ্ধ-ময়দান পরিত্যাগ করে সুরক্ষিত উঁচু দেয়ালঘেরা বিশাল বাগানে আশ্রয় নেয়। মুসাইলামা ও তার যোদ্ধাদের লাশে এই বাগান ভরে গেলে এই বাগান 'হাদীকাতুল মাওত' বা 'মৃত্যুর বাগান' নামে পরিচিত হয়। সেই সুরক্ষিত প্রাচীরের ভেতরে প্রবেশের পর শত্রুবাহিনীর আক্রমণে রক্তে রঞ্জিত আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শাহাদাত বরণ করেন। যুদ্ধশেষে দেখা গেল, তাঁর সারা দেহে তলোয়ারের আঘাত, বর্শার যখম ও এমনভাবে বিদ্ধ তীরে জর্জরিত যে, তাঁকে চেনার কোনো উপায় ছিল না। পরিশেষে তাঁর শরীরের একটি চিহ্ন দেখে তাঁকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
টিকাঃ
১. তারীখুল ইসলাম লিয যাহাবী: ১ম খণ্ড, ৩৭০ পৃ.
২. তাহযীবুত তাহযীব: ৫ম খণ্ড, ৯০ পৃ.
৩. আত তাবাকাতুল কুবরা লি-ইবনি সা'দ: ৩য় খণ্ড, ৪৪০ পৃ.
৪. আল মুহাব্বারু ফিতারীখ: ২৮২ পৃ.
৫. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১ম খণ্ড, ২৪৩ পৃ.
৬. হায়াতুস সাহাবা: ১ম খণ্ড, ৭১৬ পৃ. এবং সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
📄 যায়েদ ইবনে সাবেত (রাঃ)
‘কবি হাসসান ও তাঁর ছেলে সাবেতের পরে যেমন ইলমে কাফিয়ার কোনো উল্লেখযোগ্য ইমাম নেই, তেমনি যায়েদ ইবনে ছাবেতকে বাদ দিলে ইলমে মা'আনীর বা আল কুরআনের অর্থ ও নিগূঢ় তত্ত্ব উদ্ঘাটনেরও কোনো ইমাম নেই।’
-হাসসান ইবনে ছাবেত (রা)
দ্বিতীয় হিজরীর কথা। মদীনা মুনাওয়ারায় বদর যুদ্ধের প্রস্তুতির এক পর্যায়ে লোকদের ভীড় জমে উঠেছে। আল্লাহর জমিনে তাঁরই কালেমা বুলন্দ করার লক্ষ্যে নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর ডাক দিয়েছেন। সে ডাকে সাড়া দিয়ে সশস্ত্র যোদ্ধারা উপস্থিত। সারিবদ্ধ যোদ্ধাদের শেষবারের মতো পর্যবেক্ষণ করার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এক এক করে প্রত্যেককে দেখে নিচ্ছেন। এক পর্যায়ে যার বয়স তেরোতে পৌছেনি, এমন একটি ছেলেকে দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর চেহারায় ফুটে উঠছিল তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার আভাস এবং দৃঢ় মনোবলের ছাপ। তাঁর হাতে ছিল একটি তলোয়ার, যা দৈর্ঘ্যে তাঁর সমান বা তাঁর চেয়েও একটু লম্বা। তিনি তা হাতে ধারণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে এগিয়ে এসে বললেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যেহেতু নিজেকে আপনার জন্য কুরবান করে দিয়েছি, তাই আমি আপনার সাথেই এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার এবং আপনার জিহাদী পতাকার নিচে আল্লাহর দুশমনদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার অধিকার রাখি। আমাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দিন।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এই দৃঢ় মনোবল ও চেতনা দেখে যেমন খুশি হলেন, তেমনি হলেন অবাক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাঁধে স্নেহভরে একটি মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন:
'সাবাস!'
তাঁর এই জিহাদী মনোভাব ও সাহসের জন্য আনন্দ প্রকাশ করলেও বয়সের স্বল্পতার জন্য জিহাদে অংশগ্রহণ থেকে তাঁকে বিরত রাখলেন। আদর-স্নেহের ভাষায় তাঁকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। বেদনাহত হয়ে যায়েদ ইবনে ছাবেত তাঁর তলোয়ার মাটিতে টেনে টেনে নিয়ে মন ভার করে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। তাঁর মনে আফসোস, ইসলামের প্রথম জিহাদে যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে সংঘটিত হচ্ছে, সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে সে বঞ্চিত হলো। তাঁর মা নাওয়ার বিনতে মালেক, সেও ছেলের এই ব্যর্থতায় গভীরভাবে মর্মাহত হয়ে ছেলের পেছনে পেছনে বাড়ি ফিরলেন। তার মনেও বিরাট আশা ছিল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পতাকাতলে বদরী মুজাহিদদের সাথে তার ছেলে এ জিহাদে অংশ নিয়ে যুদ্ধ করবে ও তার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে। এই স্মৃতি বহন করে জীবনের বাকি দিনগুলো সে কাটিয়ে দেবে। যদি তাঁর পিতা ছাবেত আজ জীবিত থাকতেন, তাহলে নিশ্চয়ই তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেন। কিন্তু এই আনসার বালক যায়েদ থেমে যাওয়ার পাত্র নয়। তাঁর প্রতিভা তাঁকে আরও এগিয়ে নিয়ে এল। বয়স কম হওয়ার জন্য যেহেতু যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য লাভ করতে সমর্থ হননি সেহেতু তাঁর প্রতিভাকে গুরুত্বপূর্ণ এমন এক দিকে বিকাশ করার সিদ্ধান্ত নিলেন, বয়সসীমার সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য ও সাহচর্য লাভের আরও অধিক সুযোগ করে দেবে। আর সেটি হলো জ্ঞানচর্চা ও আল কুরআনের হিফয-এর মাধ্যম।
বালক সাহাবী যায়েদ তাঁর এই সুপরিকল্পিত কর্মসূচি তাঁর মায়ের কাছে উপস্থাপন করলেন। তাঁর মা ছেলের এই পরিকল্পনা শুনে অতীব আনন্দিত ও খুশি হলেন। এ পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন।
এক পর্যায়ে যায়েদের মা নাওয়ার ছেলের এই মনোবাসনা ও প্রচেষ্টা তাঁর গোত্রের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের নজরে আনলেন এবং হিফয ও বিদ্যার্জনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে অবগত করালেন।
তারা বালক সাহাবী যায়েদকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলেন:
'হে আল্লাহর নবী! আমাদের সন্তান যায়েদ ইবনে ছাবেত। সে অদ্যাবধি আল কুরআনের ১৭টি সূরা হিফয করেছে। যেভাবে কুরআন আপনার অন্তরে অবতীর্ণ হয়েছে, ঠিক তাঁর তিলাওয়াতও এমনি প্রাঞ্জল ও নির্ভুল। তদুপরি লেখাপড়াতেও তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন। আপনার সাহচর্যের আকাঙ্ক্ষী। সে সার্বক্ষণিকভাবে আপনার খিদমতে থাকার অনুমতি চায়। আপনি এ ব্যাপারে আমাদের কথাগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।'
বালক সাহাবী যায়েদ যা কিছু হিফয করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা থেকে কিছু আয়াত তিলাওয়াত করতে বললে, যায়েদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিলাওয়াত করে শোনালেন। সে তিলাওয়াত কতই না চমৎকার, নির্ভুল, স্পষ্ট ও হৃদয়গ্রাহী! আল কুরআনের প্রতিটি শব্দ এমন স্পষ্টভাবে তাঁর ঠোঁট দুটো থেকে নির্গত হতে থাকে, সে যেন আসমানের নক্ষত্ররাজির মতো স্পষ্ট ও স্বচ্ছ। শুধু বিশুদ্ধ তিলাওয়াতই নয়, কণ্ঠস্বরও এমন শ্রুতিমধুর, যা শ্রোতার অন্তরকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। অর্থের সাথে সামঞ্জস্য রেখে যেখানে থামা দরকার, সেখানে থামলেন। যেখানে থামার দরকার নেই, সেখানে তিলাওয়াত অব্যাহত রাখলেন। তাতে প্রমাণিত হচ্ছিল যে, তিনি শুধু বিশুদ্ধ তিলাওয়াতেই পারদর্শী নন, বরং আল কুরআনের অর্থ সম্পর্কেও সম্পূর্ণ জ্ঞাত। তিনি প্রমাণ করলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর সম্পর্কে যতটুকু বলা হয়েছিল, প্রকৃত অর্থে তার চাইতে তিনি অনেক অনেক বেশি গুণে গুণান্বিত। বিশেষ করে আল কুরআনের অর্থ বুঝে পড়ার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতীব আনন্দিত ও খুশি হলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে বললেন:
‘যায়েদ! আমাকে সাহায্য করার জন্য ইহুদীদের ইবরানী ভাষা শেখ। কেননা, সে ভাষায় পত্রাদি বিনিময়কালে আমি যা কিছু বলি হুবহু তারা সে ভাষায় অনুবাদ করে কি না, সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ হয়।’
বালক সাহাবী যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন : ‘আপনার নির্দেশ শিরোধার্য। আমি অবশ্যই ইবরানী ভাষা শিখে নেব, ইনশাআল্লাহ।’
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ পেয়ে তিনি দ্রুত ইবরানী ভাষা শেখা আরম্ভ করলেন এবং অল্পদিনের মধ্যেই ইবরানী ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠেন। ইহুদীদের উদ্দেশ্যে কিছু লিখতে চাইলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে যায়েদ ইবনে ছাবেত তা লিখতেন এবং তাদের দেওয়া পত্রাদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পড়ে শোনাতেন। ইবরানী ভাষার পর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে খুব দ্রুত সুরিয়ানী ভাষাসহ আরবের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক গোত্রের ব্যবহৃত আঞ্চলিক ভাষাও শিখে ফেললেন।
কিছুদিন যেতে না যেতে এই বালক সাহাবী যায়েদ ইবনে ছাবেত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখপাত্র হিসেবে পরিগণিত হলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর মধ্যে গাম্ভীর্য, আমানতদারী, প্রজ্ঞা ও তীক্ষ্ণ মেধার পরিচয় পেলেন, তখন তাঁকে আসমান থেকে যমীনের জন্য প্রেরিত রিসালাহ বা ওহী লেখার দায়িত্বে নিয়োজিত করলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর যখনই কোনো আয়াত বা সূরা অবতীর্ণ হতো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ডেকে এনে বলতেন :
‘যায়েদ! এটা লেখ। তখন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তা লিপিবদ্ধ করতেন।’
অতএব, যায়েদ ইবনে ছাবেত সর্বদাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ ওহী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থেকেই মুখস্থ করতেন, লিপিবদ্ধ করতেন এবং কুরআনের আয়াতের পরিধি বিস্তারের সাথে সাথেই তিনিও বেড়ে উঠতে থাকেন। সর্বোপরি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র যবান মুবারক থেকেই আল কুরআনের শিক্ষা লাভ করেন ও অবতীর্ণ সূরা বা আয়াতের শানে নুযূল জেনে নেন এবং প্রতিটি আয়াতের নির্দেশিত হেদায়াতের আলোকে শরীআতের নিগূঢ় তত্ত্ব ও জটিল বিষয় সম্পর্কে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। এভাবেই তিনি আল কুরআনের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর তিনি উম্মতে মুহাম্মাদীর সর্বশ্রেষ্ঠ কুরআন বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।
আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতের সময় বিভিন্ন সাহাবীর নিকট সংরক্ষিত কুরআনের বিক্ষিপ্ত অংশ ও সূরাসমূহ গ্রন্থাকারে একত্রিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সে উদ্দেশ্যে তাঁকেই প্রধান করে 'জামিউল কুরআন' বা কুরআন একত্রীকরণ কমিটি গঠন করা হয়।
এমনিভাবে তৃতীয় খলীফা উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সময় ইসলামের বিজয় সম্প্রসারণের এক পর্যায়ে অনারব বিজিত দেশগুলোতে আঞ্চলিক ভাষায় কুরআনের তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে উচ্চারণ ও লেখার পার্থক্য জটিল আকার ধারণ করে। উম্মতে মুহাম্মাদীকে মাসহাফুল ইমাম বা মদীনায় সংরক্ষিত কুরআনের মূল কপির সাথে সমস্ত কুরআনকে মিলিয়ে নেওয়ার এবং উক্ত কুরআনের হুবহু কপি করে সারা মুসলিম বিশ্বে সরবরাহ করার লক্ষ্যে তাঁকেই জামিউল কুরআনের এই দ্বিতীয় কমিটিরও প্রধান করা হয়। এত বড় উচ্চ সম্মানের পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর জন্য এর চেয়ে সম্মানের দায়িত্ব আর কী হতে পারে?
অকল্পনীয় জটিল পরিস্থিতিতে অনেক বিজ্ঞ পণ্ডিত ও গুণীজন যখন সমস্যার কোনো সুরাহা করতে পারতেন না, তখন আল কুরআনের তীক্ষ্ণ জ্ঞান, ফযীলত ও বরকত যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সঠিক ও সত্য পথের দিক-নির্দেশনা দিত। যেমন হয়েছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পরে বনূ সাকীফ গোত্রের সম্মেলন কক্ষে। খলীফা নিযুক্ত করার ব্যাপারে সবাই একত্রিত হলে নিযুক্তি নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে চরম মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। সাকীফার সেই সম্মেলনে মুহাজিরগণ বললেন, 'খিলাফতের জন্য মুহাজিরগণই উত্তম। অতএব, খলীফা আমাদের মধ্য থেকেই হওয়া উচিত।'
আনসারগণ বললেন: 'খিলাফত আনসারদের মধ্যেই হতে হবে। কারণ, প্রকৃতপক্ষে আমরাই সর্বাধিক যোগ্য।'
তৃতীয় পক্ষ বললেন, 'খলীফা আনসারদের মধ্য থেকে একজন এবং মুহাজিরদের মধ্য থেকে অন্য একজন হবেন।'
তৃতীয় পক্ষ যুক্তি প্রদর্শন করলেন এই বলে: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত অবস্থায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজে যদি মুহাজির কোনো ভাইকে নিয়োগ করতেন, তখন কোনো আনসার ভাইকে তাঁর সহযোগী করতেন।'
খলীফা নিয়োগ নিয়ে ত্রিমুখী মত-পার্থক্যের এক পর্যায়ে ফিতনা সৃষ্টির উপক্রম হলো। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কফিন তাদের সামনে বিদ্যমান, তখন পর্যন্ত দাফনের অপেক্ষায়।
সাহাবীদের মধ্যে খিলাফত নিয়ে সৃষ্ট ঘোরতর মতবিরোধের গোঁজামিলকালে পক্ষপাতিত্বহীন এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনার একান্ত প্রয়োজন চরমভাবে দেখা দিল। মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্ট এই ফিতনা অংকুরেই বিনাশ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ল। সেই চরম সংকটপূর্ণ মুহূর্তে যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আল আনসারীর কণ্ঠ থেকে ঠিক সেই ধরনের আওয়ায বেরিয়ে এল। তিনি সমবেত জনগণের উদ্দেশ্যে বললেন:
'হে আনসার ভাইয়েরা! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু মুহাজির ছিলেন, তাঁর খলীফাও তাঁর মতো একজন মুহাজিরকে হতে হবে। আর আমরা যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনসার বা সাহায্যকারী ছিলাম তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর এখন আমরা তাঁর খলীফার আনসার বা সাহায্যকারী হব। সত্য ও হকের জন্য তাঁকে সার্বিক সহযোগিতা করব।'
এ ঘোষণা দিয়েই তিনি আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দিকে তাঁর হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন :
'ইনিই আপনাদের খলীফা, অতএব আপনারা তাঁর হাতে বায়'আত করুন।'
যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে ছায়ার মতো অনুসরণ করার ফলে কুরআন চর্চা, তার অর্থ অনুধাবন এবং নিগূঢ় তত্ত্ব উদ্ঘাটনের গভীর ব্যুৎপত্তি অর্জনের সৌভাগ্য লাভ করেন। যে কারণে মুসলমানদের নিকট তিনি অত্যন্ত সম্মানিত ও শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। খুলাফায়ে রাশেদীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংকটকালীন মুহূর্তে তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন এবং সাধারণ মুসলমানগণও ফাতওয়া-ফারায়েয সম্পর্কে জানতে তাঁরই শরণাপন্ন হতেন। মীরাস বণ্টন পদ্ধতি এবং ফারায়েয সংক্রান্ত যাবতীয় মাসআলা বর্ণনায় তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না।
একদা পশ্চিম দামেশকের 'জাবিয়াহ' নামক গ্রামে মুসলিম বাহিনীর বিজয় উপলক্ষে এক জন-সমাবেশে বিপুলসংখ্যক সাহাবীর উদ্দেশ্যে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বক্তৃতায় বলেন :
'আপনাদের কেউ যদি আল কুরআনের অর্থ, নিগূঢ় তত্ত্ব ও এর মর্ম সম্পর্কে জানতে চান, তাহলে যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট থেকে তা জেনে নিন।
ফিক্হ ও ফিক্হশাস্ত্রের জটিল বিষয় সম্পর্কে যদি জানতে চান, তাহলে তা মু'আয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট থেকে জেনে নিন।
আর যদি কেউ আর্থিক সাহায্য চান, তাহলে তা আমার কাছ থেকে চেয়ে নিন। কেননা, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুসলমানদের বাইতুল মালের সুষ্ঠু বণ্টনের ভার আমার উপর ন্যস্ত করেছেন।'
যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইলমের সীমাহীন যোগ্যতা, গভীর পাণ্ডিত্য এবং খোদাভীরুতার কারণে সাহাবী ও তাবেঈদের জ্ঞানপিপাসুরা তাঁকে অসীম শ্রদ্ধা ও ভক্তির দৃষ্টিতে দেখতেন। তদানীন্তন মুসলিম বিশ্বের 'বাহরুল উলূম' নামে খ্যাত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাও যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে কেমন শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন, তার একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
একদা যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কোথাও রওয়ানা হওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করতে গেলে তৎক্ষণাৎ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা ঘোড়ার সম্মুখে উপস্থিত হয়ে একহাতে ঘোড়ার লাগাম ও অন্য হাতে রিকাব বা পা রাখার কড়া বা পা দানী ধরে যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ঘোড়ার পৃষ্ঠে আরোহণ করার সুযোগ করে দেন।
যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর এ ধরনের খিদমতের জন্য লজ্জাভরে আপত্তি করলে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা উত্তর দেন:
'রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের আলিমদেরকে এ ধরনের সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন।'
তৎক্ষণাৎ যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললেন:
'আপনার হাতখানা একটু আমাকে দেখান তো!'
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়ামাত্রই তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার হাতে চুমু দিয়ে বললেন:
'আহলে বাইতের সদস্যদের প্রতি এভাবেই সম্মান করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।'
যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইনতিকালে তাঁর বুকে ধারণকৃত ইলমেরও পরিসমাপ্তি ঘটায় মুসলমানগণ আক্ষেপ ও কান্নায় ভেঙে পড়েন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'আজ মুসলিম জাতির 'হিবরুল উম্মাহ' বা অবিসংবাদিত মহান জ্ঞান তাপসের ইনতিকাল হলো। আমরা আশা করছি যে, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর যোগ্যতা যেন তাঁর উত্তরসূরীর স্থান লাভ করে।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবি হাসসান ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মৃত্যুতে শোকগাথা রচনা করেন। তিনি তাঁর ও নিজের জ্ঞানের উপযুক্ত কোনো স্থলাভিষিক্ত না দেখে সেই শোকবাণীর সাথে নিজেকেও বলেন:
فَمَنْ لِلقَوافِي بَعْدَ حَسَّانَ وَابْنِهِ ومن للمعاني بعد زيد بن ثابت?
'কবি হাসসান ও তাঁর ছেলের পরে যেমন ইলমে কাফিয়ার উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় কেউ নেই, তেমনি যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পরেও ইলমে মাআনীর বা কুরআনের অর্থ ও তার নিগূঢ় তত্ত্ব উদ্ঘাটনের দ্বিতীয় কোনো ইমাম নেই।'
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: আত তারজামা, ২৮৮০ পৃ.
২. আল ইসতিয়াব: বিহামিসে ইসাবাহ: ১ম খণ্ড, ৫৫১ পৃ.
৩. গায়াতুন নিহায়াহ: ১ম খণ্ড, ২৯৬ পৃ.
৪. সিফাতুস সাফওয়া: ১ম খণ্ড, ২৪৯ পৃঃ হিন্দুস্তান সংস্করণ.
৫. উসদুল গাবাহ: আত তারজামা, ১৮২৪ পৃ.
৬. তাহযীবুত তাহযীব: ৩য় খণ্ড, ৩৯৯ পৃ.
৭. তাকরীবুত তাহযীব : ১ম খণ্ড, ২৭২ পৃ.
৮. আত তাবাকাত লিইবনি সা'দ : সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৯. আল মা'আরিফ: ২৬০ পৃ.
১০. হায়াতুস সাহাবা: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১১. আসসীরাতু লি-ইবনি হিশাম: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১২. তারীখুত তাবারী: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১৩. আখবারুল কুদাতু লিওয়াকিঈ: ১ম খণ্ড, ১০৮-১১০ পৃ.
📄 রাবীআ ইবনে কা'ব (রাঃ)
আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট আছেন।
রাবীআ ইবনে কা'ব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর নিজের সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন:
'আমি যৌবনে পদার্পণ করেছি মাত্র, ঠিক এমন সময় ঈমানী চেতনায় আমার অন্তর উদ্ভাসিত ও ইসলামের মহত্ত্বে আমার মন ভরে গেল।'
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রথম দর্শনেই আমি প্রাণখুলে ভালোবাসতে শুরু করি। সে ভালোবাসা শুধু আমার মন-মস্তিষ্কেরই নয়, দেখতে দেখতে তা সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিদ্যুৎ প্রবাহের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ল। আমি সবকিছু ত্যাগ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসায় লীন হয়ে গেলাম।'
একদিন নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলাম:
'আল্লাহ তোমার ওপর করুণা বর্ষণ করুন। কারণ, তুমি ধ্বংসের পথে চলেছ। শুধু মনে মনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসার পরিবর্তে তাঁর খিদমতে কেন নিজেকে নিয়োজিত করছ না? তুমি নিজেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম হিসেবে নিয়োগের অনুরোধ কেন জানাও না? যদি তিনি তোমার এ অনুরোধে রাজি হয়ে যান, তাহলে এর অধিক তুমি কী চাও? তাহলে তাঁর সাহচর্যে তুমি যেমন নিজেকে ধন্য করবে, তেমনি তাঁর ভালোবাসার দাবিতে উত্তীর্ণ হবে এবং দীন-দুনিয়ার সর্বোৎকৃষ্ট কল্যাণে নিজেকে ধন্য করতে পারবে।'
অনতিবিলম্বে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে নিজেকে তাঁর খিদমতে পেশ করে আমার আবেদন মঞ্জুরির জন্য অনুরোধ জানালাম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নিরাশ করলেন না। তাঁর খাদেম হিসেবে আমাকে গ্রহণ করলেন। সেদিন থেকেই আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছায়ার মতো অনুসরণ করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে যেতেন আমিও তাঁর সাথে সেখানে যেতাম। যখন যে নির্দেশ দিতেন, সে নির্দেশ পালনে সর্বক্ষণ সচেষ্ট থাকতাম। আমার দিকে তাঁর দৃষ্টি নিক্ষেপ মাত্রই তৎক্ষণাৎ বিনীত মস্তকে তাঁর নিকট গিয়ে উপস্থিত হতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কোনো প্রয়োজনে আমাকে সবসময় উপস্থিত পেতেন। সারা দিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত থাকতাম। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে ইশার নামাযান্তে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর হুজরা মুবারকে ফিরতেন, তখন আমিও বাড়ি ফেরার চিন্তা করতাম। কিন্তু হঠাৎ করে আমার মন ভেতর থেকে আবার আমাকে প্রশ্ন করে বসল:
'হে রাবীআ, কোথায় চলেছ? রাতে যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে?'
অতএব, আমি তাঁর হুজরার দরজায় বসে থাকতাম। কোনোক্রমেই দরজার নিকট থেকে কোথাও যেতাম না। দেখতাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের বিরাট এক অংশ ইবাদাত-বন্দেগীতে নিমগ্ন থাকতেন। কখনো কখনো আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করতে শুনতাম। তিনি অনেক সময় পর্যন্ত বারবার তা তিলাওয়াত করতেন। কোনো কোনো সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পড়তে শুনতাম 'সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ' (আল্লাহ তাঁর প্রশংসাকারীর দু'আ কবুল করেন) কখনো দীর্ঘ সময় পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার পুনরাবৃত্তি করতে শুনতাম। এমনকি এভাবে কখনো তন্দ্রায়, ঢলে পড়তাম আবার কখনো বা ঘুমিয়ে পড়তাম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস ছিল, যদি কোনো উপকারী তাঁর জন্য কিছু করত, তাহলে তিনি প্রতিদান হিসেবে তার চেয়ে উত্তম কিছু দিতেন। তার জন্য আমার এ খিদমতের বদলাস্বরূপ আমাকেও উত্তম কিছু দেবার ইচ্ছা পোষণ করলেন। একদিন আমার কাছে এসে সম্বোধন করলেন:
'হে রাবীআ ইবনে কা'ব!'
আমি জবাব দিলাম:
'আমি উপস্থিত, আল্লাহ আপনাকে ধন্য করুন, আপনার কল্যাণ করুন।'
তিনি বললেন:
'আমার কাছে কিছু চাও, আমি তোমাকে তা-ই দিতে প্রস্তত, যা তুমি চাও।'
আমি একটু চিন্তা করেই বললাম:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে একটু সময় দিন, আপনার নিকট কী চাইব তা একটু চিন্তা করে বলব।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'ঠিক আছে। আমি সে সময় দিলাম।'
আমি চিন্তা করতে লাগলাম:
'আমি একজন যুবক, আমার অর্থ-সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন এবং বাড়িঘর কিছুই নেই। অন্যান্য দরিদ্র ও অভাবী সাহাবীদের সাথে আমিও মসজিদে সুফফায় থাকছি। লোকজন আমাদেরকে 'ইসলামের মেহমান' বলে সম্বোধন করছে। যদি কোনো মুসলমান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সদকার অর্থ নিয়ে আসে, তিনি পুরোটাই আমাদের জন্য পাঠিয়ে দেন। আর যদি কোনো হাদিয়া নিয়ে আসেন, সেখান থেকে সামান্য কিছু রেখে বাকিটাও আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। আমি এই অভাব-অনটন থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে দুনিয়ার কিছু কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কিছু পাওয়ার ইচ্ছা করলাম, যেন স্বাবলম্বী হয়ে আমিও সম্পদশালীদের মতো হতে পারি।'
কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তা করে মনে মনে বললাম :
'হে রাবীআ ইবনে কা'ব! তুমি ধ্বংসের পথে পা বাড়িয়েছ। তোমার ধ্বংস অবধারিত। তোমার ধনসম্পত্তি ক্ষণস্থায়ী ও ধ্বংসশীল। এখানে তোমার জন্য আল্লাহ যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা তুমি অবশ্যই পাবে।'
নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান রয়েছে, যে কারণে মহান আল্লাহর দরবারে তাঁর কোনো দোআ প্রত্যাখ্যাত হয় না। অতএব, তাঁর কাছ থেকে পরকালের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য যা পারো চেয়ে নাও। পরকালীন মঙ্গল ও কল্যাণের দু'আ নেওয়ার ব্যাপারে মনের অন্তস্তল থেকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'রাবীআ কী বলতে চাও?'
আমি আরয করলাম:
'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছে আমার একমাত্র আরয, আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করুন, তিনি যেন জান্নাতে আপনার বন্ধু হিসেবে আমাকে ধন্য করেন।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে স্নেহভরে জিজ্ঞাসা করলেন:
'তোমাকে কে এই পরামর্শ দিয়েছে?'
উত্তরে আরয করলাম:
'আল্লাহর শপথ করে বলছি, এ ব্যাপারে কেউ আমাকে কোনো পরামর্শ দেয়নি। প্রকৃতপক্ষে আপনি যখন আমাকে বলেছিলেন যে, কিছু চাও, যা চাইবে তা-ই তোমাকে দেব। তখন মনে মনে দুনিয়ার ধন-সম্পদের ব্যাপারে চাওয়ার চিন্তা করলাম। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই আল্লাহ তাআলা আমাকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ধনসম্পদের মোহ ত্যাগ করে পরকালের চিরস্থায়ী মঙ্গল ও কল্যাণ চাওয়ার জন্য অন্তরকে প্রশস্ত করে দিলেন। তাই আপনার কাছে আরয করলাম যে, আল্লাহর কাছে দু'আ করুন, যেন জান্নাতে আমি আপনার বন্ধু হতে পারি।'
আমার উত্তর শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘক্ষণ নীরব রইলেন।
অতঃপর তিনি বললেন : 'রাবীআ! এ ছাড়া অন্য কিছু?'
উত্তরে আরয করলাম : 'এ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি যা চেয়েছি, দুনিয়ার অন্য কিছুকে তার সমকক্ষ মনে করব না।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : 'তাহলে অধিক সিজদায় আমাকে সাহায্য কর।'
এরপর থেকেই দুনিয়াতে তাঁর খিদমতে ও সাহচর্যে যেমন নিজেকে ধন্য করেছি, জান্নাতেও তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সাহচর্যের আশায় কঠোর ইবাদাত-বন্দেগীতে নিমগ্ন হয়ে পড়লাম। কিছুদিন যেতে না যেতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন : 'হে রাবীআ বিয়ে করবে না?'
আমি বললাম : 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার খিদমতের পথে বাধা হয় এমন কোনো কাজ আমি করব না। তা ছাড়া স্ত্রীর মোহরানা দেওয়ার মতো ও পারিবারিক জীবনের দায়ভার বহনের আর্থিক সঙ্গতিও আমার নেই।'
আমার এ উত্তর শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরবতা অবলম্বন করলেন। এমনিভাবে অন্য একদিন আবার আমাকে প্রশ্ন করলেন : 'হে রাবীআ! বিয়ে করবে না?'
আমি পূর্বের কথার পুনরাবৃত্তি করলাম। কিন্তু সেখান থেকে চলে আসার পর কেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পূর্বের ন্যায় উত্তর দিলাম, ভেবে লজ্জিত হতে থাকলাম এবং মনে মনে ভাবলাম : 'রাবীআ! তোমার দুর্ভাগ্য, নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার চেয়ে ভালো জানেন। তোমার দীন ও দুনিয়ার কল্যাণ কিসে নিহিত রয়েছে তা এবং তোমার সামর্থ্য সম্পর্কেও তিনি সম্পূর্ণ জ্ঞাত।'
মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম। এরপর যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় বিয়ের প্রস্তাব দেন, তাহলে সম্মতি প্রদান করব। কিছুদিন যেতে না যেতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আবার বললেন : 'রাবীআ তুমি বিয়ে করবে না?'
এবার উত্তরে আরয করলাম : 'হে আল্লাহর রাসূল! জী হ্যাঁ, ইনশাআল্লাহ করব; কিন্তু আমার কাছে কে মেয়ে বিয়ে দেবে? আমার অবস্থা তো আপনি ভালোভাবেই অবগত।'
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার এক গোত্রের নাম উল্লেখ করে বললেন : 'সেই গোত্রের সেই ব্যক্তির নিকট চলে যাও। সেখানে গিয়ে তাকে বলো, আপনার অমুক মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন।'
আমি লজ্জাজড়িত অবস্থায় উক্ত গোত্রে গিয়ে পৌঁছে বললাম : 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আপনার কাছে এই জন্য প্রেরণ করেছেন, যেন আপনার অমুক মেয়েকে আমার কাছে বিয়ে দেন।'
তিনি প্রশ্ন করলেন, অমুক মেয়ে? আমি বললাম : 'জী হ্যাঁ, অমুক মেয়ে।'
তিনি বললেন : 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মারহাবা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত ব্যক্তিকেও মারহাবা! আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত ব্যক্তির উদ্দেশ্য সফল না হয়ে সে ফেরত যাবে না।'
তারা সেই প্রস্তাবিত মেয়ের সাথে আমাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে দিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে ফিরে এসে আরয করলাম :
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! নিঃসন্দেহে উত্তম পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক করে এলাম। তারা আমার কথাতেই পূর্ণ আস্থা স্থাপন করে আমাকে স্বাগত জানিয়ে তাদের মেয়ের সাথে আমাকে বিয়ে দিয়েছেন; কিন্তু তাদের মেয়ের মহরানা কোথা থেকে পরিশোধ করব?'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বনূ আসলাম গোত্রপতি 'বুরাইদা ইবনে আল খাসিব'কে ডেকে পাঠান এবং তাঁকে নির্দেশ দেন:
'তুমি রাবীআর জন্য খেজুরের আঁটি পরিমাণ সোনা সংগ্রহ কর।'
তিনি আমার পক্ষ থেকে মহরানা পরিশোধের জন্য তা সংগ্রহ করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন:
'এই সোনার টুকরোটি নিয়ে তাদের কাছে গিয়ে বলো যে, এ আপনাদের মেয়ের মহরানা।'
আমি তা নিয়ে সেখানে গেলাম এবং তা তাদের খিদমতে পেশ করলাম। তারা অত্যন্ত আনন্দের সাথে তা গ্রহণ করলেন এবং খুশিতে বলতে লাগলেন:
'অনেক উত্তম। অনেক উত্তম!'
সেখান থেকে ফিরে এসে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, তাদের চেয়ে সম্মানিত কোনো লোকদের আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি। এই সামান্য কয়েক রতি সোনা যা তাদেরকে দিয়েছি, তাতেই তারা খুশিতে বলতে লাগল :
'অনেক উত্তম! অনেক উত্তম!'
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলাম:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! ওয়ালীমা করার মতো আমার কিছুই নেই।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে নির্দেশ দিলেন:
'রাবীআর ওয়ালীমার উদ্দেশ্যে একটি বকরি ক্রয়ের জন্য কিছু অর্থ সংগ্রহ কর।'
তিনি আমার জন্য বিরাট মোটাতাজা একটি খাসি ক্রয় করে আনলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন:
'তুমি গিয়ে উম্মুল মুমিনীন আয়েশাকে বলো, বাসায় যে যৎসামান্য যব আছে তা যেন তোমার ওয়ালীমার জন্য দিয়ে দেন।'
আমি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার খিদমতে উপস্থিত হই এবং তাঁর ঘরে যে যব আছে তা আমার ওয়ালীমার জন্য দেওয়ার কথা জানাই। তিনি বলেন, যবের এই পাত্রখানা নাও। এখানে সাত সা' পরিমাণ যব রয়েছে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, এই যব ছাড়া আমাদের ঘরে অন্য কোনো খাবার নেই।
আমি খাসি ও যব নিয়ে আমার শ্বশুরালয়ে উপস্থিত হলাম। তারা বললেন :
'আমরা এই যব দ্বারা রুটি তৈরির দায়িত্ব নিচ্ছি। আর তুমি খাসিটি তোমার বন্ধু-বান্ধবদের কাছে নিয়ে যাও, তারা তা তৈরি করে দিক।'
খাসিটা নিয়ে আমার গোত্রের ভাইদের কাছে এলাম। আমি এবং তারা মিলে তা যবেহ করে রান্না করলাম। ওয়ালীমার জন্য আমাদের গোশত ও রুটি প্রস্তুত হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াত দিলাম। তিনি আমার দাওয়াত গ্রহণ করলেন। সুন্দর ও আনন্দঘন পরিবেশে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো।
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর জমির পাশেই আমার জন্য একখণ্ড জমি বরাদ্দ করলেন। দেখতে দেখতেই দুনিয়া আমাকে গ্রাস করে ফেলল। এমনকি একটি খেজুর গাছকে কেন্দ্র করে আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়লাম। আমি খেজুর গাছের দাবি করে বললাম, সেটা আমার সীমানায় :
'আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দাবি করলেন যে, সেটি তাঁর সীমানায়। এমনকি একে কেন্দ্র করে তাঁর সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হলাম।'
পরিণতিতে তিনি হঠাৎ আমার সম্পর্কে একটা আপত্তিকর কথা বলে ফেললেন এবং পরক্ষণেই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে তিনি আমাকে বলতে থাকলেন : 'হে রাবীআ! তুমিও আমার ব্যাপারে একই রকম কথা বল, যেন তা কিসাস হয়ে যায়।'
আমি বললাম : 'আল্লাহর শপথ! আমি তা বলতে পারি না।' তিনি তাঁর অনুরোধের এক পর্যায়ে বললেন : 'তুমি যদি আমার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ না কর, তবে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে তোমার বিরুদ্ধে এ দুনিয়াতে প্রতিশোধ গ্রহণ না করার অভিযোগ করব।'
এ বলে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে রওয়ানা হলেন। আমিও তাঁর পিছনে পিছনে চলতে থাকলাম এবং আমার পিছনে পিছনে আমার বনু আসলাম গোত্রের লোকজন রওয়ানা হলো। তারা বলাবলি করতে লাগল : 'সে-ই আগে বিবাদে লিপ্ত হয়েছে। তোমার প্রতি কটুবাক্য প্রয়োগ করেছে- তা সত্ত্বেও সে-ই আবার তোমার বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অভিযোগ করতে চলল!'
আমি তাদের উদ্দেশ্যে বললাম : 'তোমাদের প্রতি ধিক্কার! তোমরা কি জান, তিনি কে? তিনি হলেন সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু। মুসলমানদের বয়োবৃদ্ধ শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। তিনি তোমাদের দেখার আগেই তোমরা ফিরে যাও। তিনি হয়তো এটা মনে করতে পারেন যে, তোমরা তাঁর বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করতে এসেছ। এভাবে তিনি ক্রুদ্ধ হতে পারেন এবং তাঁর ক্রুদ্ধ হওয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তোমাদের প্রতি বিরক্ত হতে পারেন। আমরা সবাই তাদের দু'জনের রাগের কারণে আল্লাহর বিরাগভাজন হতে পারি। ফলে হয়তো রাবীআ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কাজেই তোমরা আগেভাগেই চলে যাও।'
আমার অনুরোধে তারা সবাই চলে যায়।
এরপর আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে হুবহু উক্ত ঘটনার বিবরণ দেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা তুলে আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন:
'রাবীআ তোমার ও সিদ্দীকের মধ্যে কী হয়েছে?' আমি উত্তর দিলাম:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি যে কটুবাক্য প্রয়োগ করেছেন তাঁর প্রতি অনুরূপ কটুবাক্য প্রয়োগ করার জন্য আমাকে চাপ দিচ্ছেন। অথচ আমি তা করতে চাচ্ছি না।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'উত্তম, সে যা বলেছে, তুমি কখনও তার প্রতি অনুরূপ বাক্য প্রয়োগ করো না; বরং তুমি তাঁর উদ্দেশ্যে বলো, আল্লাহ আবূ বকরকে ক্ষমা করে দিন।' আমি বললাম :
'হে ভাই আবূ বকর, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিন।' আমার এই দু'আ শুনে তিনি কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে বিদায় নিলেন এবং বলতে থাকলেন:
'হে রাবীআ ইবনে কা'ব! আমার পক্ষ থেকে আল্লাহ তোমাকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করুন। আমার পক্ষ থেকে আল্লাহ তোমাকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করুন।'
টিকাঃ
১. উসদুল গাবা: ২য় খণ্ড, ১৭১ পৃ.
২. আল ইসাবাহ: ১ম খণ্ড, ৫১১ পৃ.
৩. আল ইসতিয়াব: ১ম খণ্ড, ৫০৬ পৃ.
৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৩৩৫-৩৩৬ পৃ.
৫. কানযুল উম্মাল: ৭ম খণ্ড, ৩৬ পৃ.
৬. আত তাবাকাতুল কুবরা: ৪র্থ খণ্ড, ৩১৩ পৃ.
৭. মুসনাদে আবু দাউদ: ১৬১-১৬২ পৃ.
৮. তারীখুল খুলাফা: ৫৬ পৃ.
📄 আবুল আস ইবনে আর রাবীঈ (রাঃ)
‘আবুল আস আমাকে যে কথা দিয়েছিল তা সত্যে পরিণত করেছে এবং আমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাও যথাযথভাবে পালন করেছে।’
- মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)
আবুল আস ইবনে রাবীঈ আল আবশামী আল কুরাইশী সবেমাত্র যৌবনে পদার্পণ করতে যাচ্ছেন। তাঁর সুস্বাস্থ্য, লাবণ্যময় ও দৃষ্টিনন্দিত চেহারা সবারই দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। ভোগ-বিলাসের জীবনে প্রাচুর্যও যেন উপচে পড়ছে। আরব সভ্যতা ও কৃষ্টি-ঐতিহ্যের প্রতিফলন যেন ঘটছে এ চেহারায়। ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্টাচার, মধুর ব্যবহার ও নীতি-নৈতিকতার সে এক মূর্তপ্রতীক, এক বিরল দৃষ্টান্ত। সম্মান ও মর্যাদার গৌরব সবটাই তার পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত। তার বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা যেন আরবের ভবিষ্যৎ নেতারই পূর্বাভাস।
উত্তরাধিকার সূত্রেই আবুল আস কুরাইশদের গ্রীষ্ম ও শীতকালীন বহির্বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। নিয়মিতভাবে তাঁর বাণিজ্যিক উটবহরের বিরাট কাফেলা মক্কা ও সিরিয়ায় যাতায়াত করত। যে কাফেলায় ১০০টি উট ও ২০০ জন উট পরিচালক থাকত। তাঁর আমানতদারী, সত্যবাদিতা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা ছিল পরীক্ষিত। এ জন্য তাঁর তত্ত্বাবধানে লোকজন ব্যবসার উদ্দেশ্যে নির্দ্বিধায় তাদের সম্পদ বিনিয়োগ করত।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনসঙ্গিনী উম্মুল মুমিনীন খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ ছিলেন তাঁর খালা। তিনি নিজ সন্তানের মতোই তাঁকে ভালোবাসতেন। খাদীজা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার আদর-স্নেহ যেমন ছিল আবুল আসের জন্য অন্তর-নিংড়ানো, তেমনি ঘরের দ্বারও ছিল সর্বদা তাঁর জন্য উন্মুক্ত। সেও খাদীজা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে অতীব ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্নেহ-ভালোবাসাও তাঁর প্রতি কোনো অংশে কম ছিল না। এভাবে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর অতিবাহিত হচ্ছিল। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে এলো প্রথম কন্যা যয়নাব, সেও যেন ফুলের সৌরভের মতোই ঘরকে সুবাসিত করতে লাগল।
দৃষ্টিনন্দিতা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকল। বিয়ের বয়স হলো। মক্কার সব পরিবারের যুবকের নজর পড়ল যয়নবের দিকে। সে ছিল দেখতে যেমন অতুলনীয় সুন্দরী, চাল-চলন, চরিত্র ও পারিবারিক মর্যাদায়ও ছিল যুগশ্রেষ্ঠ। যয়নবের দিকে কুরাইশ যুবকদের লোভনীয় দৃষ্টি পড়লে কী হবে? যয়নবের খালাত ভাই আবুল আস ইবনে রাবীঈর সাথেই যে তাঁর বিবাহ নিশ্চিত। তাই এ ব্যাপারে কেউই মুখ খুলতে পারছিল না।
যয়নব বিনতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আবুল আস ইবনে রাবীঈর বিবাহের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই মক্কার সর্বত্র ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দীনে হকসহ তাঁর প্রেরিত রাসূল হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়, তিনি যেন তাঁর নিকটাত্মীয় ও আপনজনকে ভ্রান্ত পথ থেকে ফিরিয়ে আনেন। দীনে হকের দাওয়াতে মহিলাদের মধ্যে সর্বপ্রথম যিনি ঈমান গ্রহণ করেন, তিনি হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনসঙ্গিনী খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এবং তাঁর কন্যা যয়নব, রুকাইয়া, উম্মু কুলসুম এবং ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুন্না। যদিও তাদের মধ্যে ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা একবারেই ছোট্ট ছিলেন।
আবুল আস মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামাতা। এতসত্ত্বেও তাঁর বাপ-দাদাদের পৌত্তলিক জীবনধারা থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করাকে মোটেও পছন্দ করল না। যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার সাথে মধুর দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে থাকলেও আবুল আস কিন্তু তখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি। অপরদিকে যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহা তাওহীদের আলোকে পরিপূর্ণভাবে ইসলামী জীবনযাপন করছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কুরাইশদের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটলে তারা আবুল আসের পরিবারকে এই বলে চাপ প্রয়োগ করতে মনস্থ করল যে:
'ধিক্কার তোমাদের প্রতি! তোমরা নিজ ছেলেকে মুহাম্মদের মেয়ের সাথে বিয়ে করিয়ে নিজ ঘরে এনে বহাল তবিয়তে ঘর-সংসার করাচ্ছ। যদি যয়নবকে তাঁর বাপের ঘরে ফেরত পাঠানো হয়, তাহলেই সামাজিক চাপে মুহাম্মদ কুরাইশদের প্রতি অবশ্যই নতি স্বীকার করবে।'
কোনো কোনো উৎসাহী বলল : 'বাহ! কতই না চমৎকার প্রস্তাব!'
তারা আবুল আসের কাছে গিয়ে এ প্রস্তাব পেশ করল যে:
'হে আবুল আস! তোমার জীবনসঙ্গিনীকে তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দাও এবং তাকে তার পিতার কাছে ফেরত পাঠাও। আমরা কুরাইশ বংশের সর্বোত্তম, সবচেয়ে রূপবতী ও গুণবতী মেয়ের সঙ্গে তোমার বিবাহের ব্যবস্থা করে দেব।'
আবুল আস তাদেরকে উত্তরে বলে:
'আল্লাহর শপথ, আমি কখনো আমার স্ত্রীকে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারি না। তাঁর বিনিময়ে কুরাইশদের কেন? যদি সারাবিশ্বের সবচেয়ে রূপবতী ও গুণবতী বিশ্ব সুন্দরী মেয়েকেও দেওয়া হয়, তবুও না।'
পরিকল্পনা মোতাবেক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপর দুই কন্যা রুকাইয়া ও উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে তালাক দিয়ে তাদের পিত্রালয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে তাদের শিরকের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ায় খুবই আনন্দিত হলেন। অপর দু'জনের মতো আবুল আসও যদি তাঁর মেয়ে যয়নবকে ফেরত দিত, তবে কতই না ভালো হতো! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ইচ্ছা পোষণ করতে থাকলেও যয়নবকে ফেরত আনতে বাস্তবে কোনো তৎপরতা দেখাননি বলে যয়নব স্বামীর গৃহেই থেকে গেলেন। তখন পর্যন্ত মুশরিকদের সাথে ঈমানদার মহিলাদের বিবাহ বিচ্ছেদের কোনো আসমানী নির্দেশ নাযিল হয়নি বলে এ ব্যাপারে তিনি নির্দেশের অপেক্ষা করতে লাগলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করে চলে আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে থাকে। কুরাইশরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে বদরের যুদ্ধে বের হলে তাদের সাথে আবুল আসকে অংশগ্রহণের জন্য বাধ্য করা হয়। সে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের সাথে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বা মুশরিকদের বিজয়ী হিসেবে দেখা, এর কোনো একটির প্রতিও তার আগ্রহ ছিল না। তবুও তাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হয়। এর মানে পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করে। বদরের ময়দানে সংঘটিত যুদ্ধে কুরাইশরা চরমভাবে পরাজিত হয়। তাদের গর্ব-অংহঙ্কার ভূলুষ্ঠিত হয়। বিজয়ের সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা পরাজয় ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এ যুদ্ধে মূলত কুরাইশদের মেরুদণ্ডই ভেঙে যায়। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তাদের একাংশ নিহত হয়। অপর একটি অংশ যুদ্ধবন্দী হয়। অবশিষ্টরা পালিয়ে যায়।
যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে যয়নব বিনতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বামী আবুল আস ছিল অন্যতম। যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির জন্য বন্দীদের আর্থিক যোগ্যতা, সামাজিক মর্যাদা ও স্ব-স্ব গোত্রে তাদের নেতৃত্ব-কর্তৃতের দিকে লক্ষ্য রেখে এক হাজার দিরহাম থেকে চার হাজার দিরহাম পর্যন্ত মুক্তিপণ নির্ধারণ করা হয়। কুরাইশ যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেওয়ার এ সুযোগে যুদ্ধবন্দীদের আত্মীয়-স্বজনদের পক্ষ থেকে খবরা-খবর আদান-প্রদান, দেখা-সাক্ষাৎ ও নির্ধারিত মুক্তিপণ প্রদানের উদ্দেশ্যে যাতায়াত শুরু হয়ে যায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম কন্যা যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহার স্বামী আবুল আস-এর জন্যেও দূতের মাধ্যমে নির্ধারিত মুক্তিপণ পাঠানো হলো। আর তা ছিল যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলার আনহার বিবাহ অনুষ্ঠানে তাঁর মা খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ যে হারটি তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন, মুক্তিপণ হিসেবে যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহা সেটিকেই দূতের হাতে তুলে দিলেন।
যথারীতি আবুল আস-এর জন্য মুক্তিপণ হিসেবে যয়নবের দূত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে সেই হারখানি পেশ করামাত্রই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়তমা জীবনসঙ্গিনী খাদীজা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার কথা মনে পড়ে গেলে তিনি আপ্লুত হয়ে পড়লেন। তাঁর নূরানী চেহারায় শোকের ছায়া পড়ে গেল। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দায়িত্ব পালনরত সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন:
'আমার বড় মেয়ে যয়নব তার স্বামী আবুল আসকে মুক্তির লক্ষ্যে মুক্তিপণ পাঠিয়েছে। যদি তোমরা ভালো মনে কর, তাহলে বন্দীকে মুক্তি দাও এবং মুক্তিপণ হিসাবে প্রেরিত 'হারখানিও' ফেরত পাঠাও। এতে আমি বড়ই আনন্দিত হব।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্ঠে এ কথা শোনামাত্রই সাহাবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম বলে উঠলেন:
ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার অন্তরকে আমরা ব্যথায় ভারাক্রান্ত না রেখে মুহূর্তে আনন্দিত করতে চাই। এখনি আমরা আবুল আসকে মুক্ত করে দিচ্ছি ও যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার কাছে হারটি ফেরত পাঠাচ্ছি।'
আবুল আসকে মুক্ত করার পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি শর্তারোপ করলেন:
'অনতিবিলম্বে যয়নবকে যেন তাঁর নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হয়।'
আবুল আস মুক্ত হয়ে মক্কায় পৌঁছামাত্রই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কৃত তার প্রতিশ্রুতি কোনোরূপ কালবিলম্ব না করে বাস্তবায়ন করে। সে বাড়িতে পৌছেই স্ত্রী যয়নবকে সফরের প্রস্তুতির নির্দেশ দেয়। তাঁকে এ কথা বলেও আশ্বস্ত করে যে:
'তাঁকে মদীনায় নিয়ে যাওয়ার জন্য মক্কার সন্নিকটে তাঁর পিতার প্রেরিত লোকজন অপেক্ষা করছে।'
আবুল আস স্ত্রীর জন্য সফরের সাজ-সরঞ্জামাদি ও তাঁর আরোহণের জন্য উট প্রস্তুত করল। যয়নবের সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর ছোট ভাই আমর ইবনে রাবীঈকে সাথে দিল। তাঁর পক্ষ থেকে যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত লোকদের হাতে সোপর্দ করার জন্য দায়িত্ব দিল।
আমর ইবনে রাবীঈ বড় ভাই আবুল আসের নির্দেশ পাওয়ামাত্রই তীর-ধনুকে সজ্জিত হলো। অতিরিক্ত তীরের একটা বস্তাও কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে উটের পিঠে আরোহীদের বসার হাওদায় বসানোর পর সে দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যভাবে কুরাইশদের সামনেই মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। যয়নবকে নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার এ চিত্র দেখে মক্কাবাসী হতভম্ব হয়ে গেল। হিংসা-বিদ্বেষের আগুন যেন তাদের জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছিল। তারা দু'জনকে ধাওয়া করার উদ্দেশ্যে ছুটে গেল। তারা মক্কার অদূরেই তাদের গতিরোধ করে। তারা যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে আতঙ্কিত করে তুলল। তাঁর জীবননাশের একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করল।
এ পরিস্থিতিতে যয়নবের সফরসঙ্গী আমর কোনো রকম দুর্বলতার শিকার না হয়ে তাদের দিকে তীর-ধনুক তাক করে দাঁড়িয়ে গেল এবং বস্তার তীরগুলো মাপ মতো সামনে ছড়িয়ে হুংকার দিয়ে বলল:
'আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, খবরদার! তোমাদের কেউই যয়নবের দিকে অগ্রসর হতে চেষ্টা কর না। যদি কেউ চেষ্টা কর, তাহলে সে অবশ্যই আমার তীর দ্বারা বিদ্ধ হবে।'
আমাকে একজন দক্ষ তীরন্দায হিসেবে তোমরা মক্কার ছোট-বড় সবাই জান। পরিস্থিতি চরম মারমুখী রূপ নিলে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান আমরের কাছে এসে তাকে অনুরোধ করে:
'ভাতিজা! তোমার তীর-ধনুক কিছুক্ষণের জন্য নিষ্ক্রিয় রাখ। আমরা তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই।'
এ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছুক্ষণের জন্য সে তার তীর-ধনুক নিষ্ক্রিয় রাখল।
আবু সুফিয়ান তাঁকে বলল:
'আমর! তুমি যা করছ, তা ঠিক হচ্ছে না। তুমি যয়নবকে নিয়ে গৌরবের সাথে দিন-দুপুরে আমাদের সম্মুখ দিয়ে এমনভাবে রওয়ানা হয়েছ, যেন তার চলে যাওয়াকে আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারি। অথচ গোটা আরব এটা খুব ভালো করেই দেখেছে যে, বদরের যুদ্ধে আমাদের কী বিপর্যয়েরই না সম্মুখীন হতে হয়েছে। তুমি তো জান যে, তার পিতা মুহাম্মদের হাতে আমরা কী সাজাই না পেয়েছি। অতএব, তুমি তার মেয়েকে নিয়ে দিন-দুপুরে আমাদের সামনে দিয়ে যেভাবে বীরদর্পে বের হয়েছ, সেটা মোটেও ঠিক হয়নি। এভাবে তাকে যেতে দেওয়ার অর্থই হলো আরবের গোত্ররা আমাদের ভীতু হিসেবে চিহ্নিত করবে। আরব আমাদেরকে কাপুরুষ ছাড়া আর কী মনে করবে? কাজেই তুমি তাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে যাও এবং তাকে তার স্বামীর বাড়িতে কয়েক দিন কাটাতে দাও। তাকে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে কমপক্ষে লোকজনকে বলাবলি করতে দাও যে, কুরাইশরা তাকে মক্কা থেকে চলে যেতে বাধা দিয়েছে এবং তাকে ফিরিয়ে এনেছে। তারপর কোনো এক রাতে আমাদের অগোচরে সম্মানের সাথে তাকে তার পিতার কাছে পৌঁছে দাও। তাকে আমাদের কাছে বন্দী করে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।'
আবূ সুফিয়ানের এ পরামর্শে আমর সম্মত হলো এবং যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে নিয়ে মক্কায় ফিরে এল। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ফের সে আবূ সুফিয়ানের কথামতো যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে মক্কা থেকে রওয়ানা হলো ও তার ভাইয়ের নির্দেশ মতো তাঁকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত ব্যক্তিদের নিকট নিজ হাতে সোপর্দ করল।
যয়নব বিনতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হলে দীর্ঘ দিন যাবৎ আবুল আস মক্কায় নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে থাকে। মক্কা বিজয়ের মাত্র কিছু দিন পূর্বে সে তার তেজারতী কাফেলা নিয়ে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। তার বিরাট এ তেজারতী কাফেলার মালবাহী উটের সংখ্যাই ছিল একশত। এই উট বহরের পরিচালনায় নিযুক্ত কর্মচারীর সংখ্যাও ছিল একশত সত্তর জন।
আবুল আসের এই কাফেলা মক্কায় ফেরার পথে মদীনার কাছে পৌঁছা মাত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নিযুক্ত মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের টহলদার বাহিনীর সামনে পড়ে যায়। এরা কুরাইশদের এ তেজারতী কাফেলায় আক্রমণ চালায় এবং এ উটবহর কব্জা করে সমস্ত জনশক্তিকে বন্দী করে ফেলে। এ কাফেলায় আবুল আসই একমাত্র ব্যক্তি, যে টহলদার বাহিনীর হাত থেকে পালাতে সক্ষম হয়। যাকে অনেক খোঁজাখুজি করেও টহলরত বাহিনী গ্রেফতার করতে পারেনি।
রাত পুরোপুরি অন্ধকারে আচ্ছাদিত হয়ে পড়লে আবুল আস অন্ধকারের এ সুযোগে মক্কায় ফেরত না গিয়ে ভীত ও সন্ত্রস্ত মনে মদীনায় প্রবেশ করে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সে যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁর কাছে প্রাণ ভিক্ষা ও আশ্রয় কামনা করে। ফলে তিনি আবুল আসকে আশ্রয় ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেন।
ভোর হতে না হতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদে গেলেন। মেহরাবে দাঁড়িয়ে জামা'আত সোজা করানোর পর আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে তাকবীর তাহরীমা বাঁধলেন। সাথে সাথে উপস্থিত মুসল্লীদের আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর তাহরীমার হাত বেঁধে ফেলামাত্রই যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা মহিলাদের চত্বর থেকে উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন:
'হে নামাযরত মুসলিম ভাইয়েরা! আমি যয়নব বিনতে মুহাম্মদ বলছি। আমি আবুল আসকে আশ্রয় দিয়েছি। অতএব, আপনারাও তাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ও আশ্রয় দিন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযান্তে সালাম ফিরিয়ে মুসল্লীদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসলেন এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'নামাযের শুরুতে আমি যা শুনেছি তোমরাও কি তা শুনেছ?' সবাই বলে উঠলেন: 'জী হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: যে মহান সত্তার হাতে আমার জীবন-মরণের ফায়সালা, সেই আল্লাহর শপথ, আমি এ ব্যাপারে পূর্বাহ্ণে কিছুই জানি না, তোমাদের সাথে আমিও তার সম্পর্কে শুনতে পেলাম মাত্র।
মুসলমানদের দুর্বলতম ব্যক্তিও চাইলে কাউকে নিরাপত্তা দান করতে পারে, সে ক্ষেত্রে সবার পক্ষ থেকেই আশ্রিত হয়।
অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোজা তাঁর বাড়িতে গিয়ে যয়নব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে বললেন:
'আবুল আসকে মেহমানদারীতে কোনো ত্রুটি করো না। কিন্তু এ কথা জেনে রেখো যে, তুমি এখন তার জন্য হালাল নও। কারণ, কোনো কাফিরের সাথে ঈমানদার মহিলার বিবাহ জায়েয নয়।'
তারপর তিনি টহলরত সেই বাহিনীকে ডেকে পাঠান, যে বাহিনী আবুল আসের উটবহরকে কজা ও তার লোকজনকে বন্দী করে নিয়ে আসে। তারা এলে তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন:
'এই ব্যক্তি আমাদের যে একান্তই আপনজন তা তোমরা ভালো করেই জান। টহলরত অবস্থায় তোমরা তার উটবহর ও লোকজনকে কব্জা করেছ। আমি চাই যে, তোমরা যদি তার প্রতি ইহসান করতে চাও, তাহলে তাঁর সব কিছুই তাকে ফেরত দাও। আর যদি তোমরা তা না করতে চাও, তাহলে এসব তোমাদের জন্য 'ফাই' বা আল্লাহর পক্ষ থেকে যুদ্ধ ছাড়াই প্রাপ্ত সম্পদ এবং তা তোমাদের জন্য নিঃসন্দেহে হালাল ও তোমাদের মধ্যেই বণ্টনযোগ্য।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য শুনে টহলরত বাহিনীর সব সাহাবী সমস্বরে বলে উঠলেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা অবশ্যই তাকে তার সব কিছুই ফেরত দিয়ে দেব।'
আবুল আস তার উটবহর ফেরত নিতে এলে উক্ত টহলরত বাহিনীর সাহাবীরা তাঁকে বললেন:
'হে আবুল আস! তুমি কুরাইশদের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, শুধু তাই নয়, তুমি সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাত ভাই এবং বড় জামাতা। তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করা পছন্দ করবে? সে ক্ষেত্রে আমাদের কব্জা করা সমস্ত সম্পদ থেকে আমাদের অধিকার ছেড়ে দেব। তুমিই মক্কাবাসীর এই বিশাল সম্পদের একচ্ছত্র মালিক হয়ে আমাদের সাথে মদীনাতেই বসবাস করতে থাকবে। তাতে কি তুমি সম্মত আছো?'
উত্তরে আবুল আস বলল:
'ছি! আপনারা আমার প্রতি একটি সর্বনিকৃষ্ট ও ঘৃণ্যতম শর্ত আরোপ করছেন। আপনারা কি চান যে, আমি বিশ্বাসঘাতকতার মধ্য দিয়ে ইসলামী যিন্দেগীর সূচনা করি?'
প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আবুল আসকে তার সমস্ত সম্পদ ফেরত দেওয়া হলো। সে নিরাপদে মক্কায় ফিরে গিয়েই প্রত্যেককে তাদের সমস্ত প্রাপ্য বুঝিয়ে দিয়ে মক্কাবাসীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দেয় যে:
'তোমাদের এমন কি কেউ আছ যে, আমার কাছে তার প্রাপ্য রয়েছে অথচ এখনো তা বুঝে নাওনি?"'
তারা উত্তর দেয়:
'না। আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে, তোমার কাছে একটি কপর্দকও পায়।'
আমাদের পক্ষ থেকে আল্লাহ তোমাকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করুন। নিঃসন্দেহে আমরা তোমাকে একজন একান্ত নিষ্ঠাবান ও ন্যায়পরায়ণ দয়ালু ব্যক্তি হিসেবেই পেয়েছি।
তাদের এ উত্তর শুনে আবুল আস বলে:
'হ্যাঁ, আমিও ঘোষণা দিচ্ছি যে, আমি তোমাদের সকলেরই যা যা প্রাপ্য তা বুঝিয়ে দিয়েছি এবং এই সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আমার আর কোনো প্রভু নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি যে, তোমাদের সম্পদ মদীনায় আমার ইসলাম গ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমার ভয় হচ্ছিল, তোমরা আমাকে এই বলে তিরস্কার করবে যে, টহলদার বাহিনীর হাতে ধৃত হওয়ার বাহানা করে মূলত সে আমাদের সম্পদ আত্মসাৎ করতে চেয়েছে।'
'আল্লাহ তোমাদের সম্পদকে তোমাদের কাছে ফেরত দেওয়ার তাওফীক দিয়েছেন এবং আমিও তা থেকে দায়মুক্ত হতে পেরে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলাম।'
অতঃপর আবুল আস মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আগমনকে গভীর আন্তরিকতা সহকারে স্বাগত জানান এবং তাঁর স্ত্রী যয়নবকে তাঁকে ফেরত দিয়ে তাঁর সম্পর্কে বললেন:
'সে আমাকে যে কথা দিয়েছিল তা সত্যে পরিণত করেছে আর আমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাও যথাযথভাবে পালন করেছে।'
টিকাঃ
১. সিয়ারুল আলাম আন নুবালা লিয যাহাবী: ১ম খণ্ড, ২৩৯ পৃ.
২. উসদুল গাবাহ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৮৫ পৃ: অথবা আত-তারজামা অংশ, ৬০৩৫ পৃ.
৩. আনসাবুল আশরাফ: ৩৯৭ পৃঃ এবং এর পরে.
৪. আল ইসাবাহ: ৪র্থ খণ্ড, ১২১ পৃ.
৫. আস সীবাতুন নুবুবিয়াহ লিইবনে হিশাম : ২য় খণ্ড, ৩০৬-৩১৪ পৃ.
৬. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ : ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩৫৪ পৃ.
৭. হায়াতুস সাহাবা: ৪র্থ খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৮. আল ইসতিয়াব বিহামিশিল ইসাবাহ: ৪র্থ খণ্ড, ১২৫ পৃ.