📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 ওয়াহ্শী ইবনে হারব (রাঃ)

📄 ওয়াহ্শী ইবনে হারব (রাঃ)


‘সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তিটিকে যেমন হত্যা করেছে, তেমনি তার কাফফারায় ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ব্যক্তিটির হত্যাকারীও সে।’
- ঐতিহাসিকদের উক্তি

কে সেই ব্যক্তি- যে উহুদের যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আরবের খ্যাতনামা পাহলওয়ান হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে হত্যা করেছিল- কে সেই ব্যক্তি? যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তরকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছিল? অতঃপর সেই ব্যক্তিই তার কাফফারাস্বরূপ ইয়ামামার যুদ্ধে ভণ্ডনবী ‘মুসাইলামাতুল কায্যাব’কে হত্যা করেও মুসলমানদের ব্যথা সে প্রশমিত করেছিল!

হ্যাঁ, সে ব্যক্তি হলো আবূ দাসামা নামে খ্যাত ওয়াহ্শী ইবনে হারব আল হাবশী। তার সেই নির্মম ও হৃদয়বিদারক ঘটনা যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় হয়ে আছে। তার নিজ বর্ণনা থেকেই এই দুঃখজনক ঘটনাটি মনোযোগ সহকারে পাঠ করুন।

ওয়াহ্শী ইবনে হারব বর্ণনায় বলেন:
‘আমি জনৈক কুরাইশ সরদার জুবায়ের ইবনে মুঈমের ক্রীতদাস ছিলাম। তার চাচা তুয়ামাই বদরের যুদ্ধে হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে নিহত হয়। এতে সে চরমভাবে শোকাহত ও ক্ষুব্ধ হয় এবং লাত ও উয্যার নামে শপথ করে বলে যে, সে অবশ্যই হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব থেকে তার চাচার রক্তের প্রতিশোধ নেবে। এই শপথের দাবি পূরণে সে হামযা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে হত্যার সুযোগ খুঁজতে থাকে।'

'কিছুদিন পর কুরাইশ নেতৃবৃন্দ উহুদের প্রান্তরে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চিরতরে এ দুনিয়া থেকে বিদায় এবং বদরের যুদ্ধে তাদের নিহত আত্মীয়-স্বজনদের রক্তের প্রতিশোধের লক্ষ্যে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে উদ্দেশ্যে সেনাবিন্যাসের কাজ আরম্ভ করে। নির্দিষ্ট কোঠায় পৌঁছানোর জন্য মিত্রদেরসহ সর্বস্তরে যোদ্ধা সংগ্রহের কাজ চলতে থাকে। সর্বাত্মক প্রস্তুতির পর আবু সুফিয়ান ইবনে হারবকে সেনাপতি নিযুক্ত করা হলো। কুরাইশ সেনাপতি আবু সুফিয়ান সৈন্যদের যুদ্ধে উত্তেজিত করা এবং তারা যাতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে না যায়, সে জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়। সে লক্ষ্য অর্জনের কৌশল হিসাবে বদর যুদ্ধে যাদের পিতা, ভাই, ভাতিজা, চাচা, ফুফা এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন নিহত হয়েছে, তাদের পরিবারের মহিলাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দলকে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। তার পরিকল্পনা মোতাবেক যেসব মহিলা এ যুদ্ধে তার সাথে অংশগ্রহণ করে তাদের মধ্যে তার স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা ছিল সর্বাগ্রে। কারণ, তার পিতা, চাচা ও ভাই সবাই বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছিল।'

ওয়াহ্শী ইবনে হারব তার বর্ণনা অব্যাহত রেখে বলে:
জিঘাংসায় উদ্বুদ্ধ সৈন্যবাহিনী রওয়ানা হওয়ার পূর্বক্ষণে জুবায়ের ইবনে মুইমের দৃষ্টি আমার প্রতি আকৃষ্ট হয়। সে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে : 'আবু দাসামা! তুমি কি দাসত্বের জিঞ্জির থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাও?' তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম:

'এমন কে আছে, যে আমাকে এ কাজে সহায়তা করতে পারে?' সে উত্তর দিল: 'আমিই তোমাকে এ কাজে সহায়তা করতে প্রস্তুত।' জিজ্ঞাসা করলাম: 'কিভাবে?' সে বলল:

'মুহাম্মদ-এর চাচা হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে আমার নিহত চাচা তুয়াইমা ইবনে আদীর পরিবর্তে হত্যা করতে পারলেই তুমি দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে।'

আমি বললাম : 'এ শর্ত পূরণে কে আমাকে জামানত বা নিশ্চয়তা দান করবে?' সে উত্তর দিল : 'তুমি যাকে চাও তাকেই সাক্ষী নিযুক্ত করতে পার। আর আমি জনসমক্ষে এর ঘোষণা দিতেও প্রস্তুত।'

উত্তরে বললাম : 'হ্যাঁ, এ কাজের জন্য আমি প্রতিশ্রুতি দিলাম।'

ওয়াহ্শী ইবনে হারব বর্ণনা করে যে :
'আমি একজন হাবশী। অন্য হাবশীদের মতো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বর্শা নিক্ষেপে আমি ছিলাম শীর্ষে। আমার নিক্ষিপ্ত কোনো বর্শাই লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো না। আমার মুক্ত হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর আমি বর্শা হাতে কুরাইশ সৈন্যদের সাথে মিলিত হয়ে সৈন্যদের পেছন সারিতে মহিলাদের প্রায় কাছাকাছি স্থানে অবস্থান নিলাম। কেননা, যুদ্ধ করার আমার কোনোই ইচ্ছা ছিল না। জয়-পরাজয়ও আমার উদ্দেশ্য ছিল না।'

যখনই আমি আবূ সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দার পাশ দিয়ে অতিক্রম করতাম কিংবা সে আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করত, সূর্যের আলোকচ্ছটায় আমার হাতের বর্শার ঝিলিক দেখেই সে বলে উঠত : 'আবু দাসামা! হামযা ও তার ভাতিজা মুহাম্মদ-এর ওপর আমাদের অন্তরে যে ক্রোধের আগুন জ্বলছে তা একমাত্র তুমিই নির্বাপিত করতে পার।'

'কুরাইশ বাহিনী উহুদ প্রান্তরে পৌঁছলে উভয়পক্ষে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বেধে গেল। আমি হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সন্ধানে বের হলাম। আমি তাঁকে আগে থেকেই চিনতাম। এমনিতেই হামযা কারো দৃষ্টির আড়ালে থাকার মতো ব্যক্তি ছিলেন না। আরবীয় বীর যোদ্ধাদের ন্যায় তিনিও পালক দ্বারা বিশেষভাবে তৈরি 'পাহলওয়ান মুকুট' ব্যবহার করতেন। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পরই হামযাকে পেয়ে গেলাম। বিশালকায় শক্তিশালী উট গর্জে উঠলে যেমন তার চারপাশের লোকজন ভয়ে ছোটাছুটি করে, তেমনি তাঁর তলোয়ারের আঘাতে তাঁর দু'পাশের শত্রুরা একের পর এক কচুকাটা হচ্ছিল। এমনকি সামনে কেউ দাঁড়াতেও সাহস পাচ্ছিল না, তাঁকে কেউ আঘাত হানতেও সমর্থ হচ্ছিল না। আমি দূর থেকে তাঁকে আঘাত হানার উদ্দেশ্যে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখলাম। কোনো গাছ বা উঁচু টিলার আড়ালে লুকিয়ে থেকে আমি তাঁর কাছাকাছি পৌঁছানোর অপেক্ষায় থাকলাম। এ মুহূর্তে সিবায়া ইবনে আবদুল উয্যা নামক অশ্বারোহী কুরাইশ যোদ্ধা অগ্রসর হয়ে হামযা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চৈঃস্বরে আহ্বান করতে লাগল। হামযা! সাহস থাকলে আমার সামনে এস। এস সাহস থাকলে আমার সামনে এস।'

হামযা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন: 'হে মুশরিক সন্তান, এস আমার সামনে এস...।'

'দেখতে দেখতে হামযা রাদিয়াল্লাহু আনহুর তরবারির আঘাতে সে মাটিতে ছিটকে পড়ল এবং তাঁর সামনেই রক্তাক্ত দেহ ছটফট করতে লাগল। এ সময়ই হামযা রাদিয়াল্লাহহু আনহুকে আঘাত করার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নিলাম। তাঁর দিকে অগ্রসর হতে থাকলাম। আমার বর্শাটি ভালোভাবে দেখে নিলাম। বর্শার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া মাত্রই তা তাঁর দিকে সজোরে ছুঁড়ে মারলাম। সাথে সাথে তা তাঁর তল পেটের সম্মুখ দিয়ে ঢুকে পিছন দিয়ে বের হয়ে গেল। এ অবস্থাতেও তিনি দু'কদম আমার দিকে অগ্রসর হলেন এবং শেষ পর্যন্ত পড়ে গেলেন। আমি ততক্ষণ পর্যন্ত মাটিতে তাঁর দেহকে বর্শাবিদ্ধ রাখলাম, যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত না হলাম।'

'অতঃপর তাঁর দেহ থেকে বর্শা খুলে নিয়ে নিজ তাঁবুতে গিয়ে নিশ্চিন্তে বসে পড়লাম। কারণ, যুদ্ধের জয়-পরাজয়ে আমার কোনো আগ্রহ ছিল না। হামযাকে হত্যা করার মাধ্যমে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়াই আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল। যুদ্ধ তুমুল আকার ধারণ করল। উভয় পক্ষে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে লাগল। এক পর্যায়ে রণক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের বিপক্ষে চলে গেল। তাঁদের অনেক প্রাণহানি ঘটল। তখন হিন্দা বিনতে উতবার নেতৃত্বে নর্তকীদের একদল ছুটে গিয়ে কুরাইশ সৈন্যদের পিছনে মুসলমানদের মৃতদেহকে বিকৃত (মৃতদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, নাক, কান, ইত্যাদি কেটে ও চোখ উপড়ে ফেলার মতো চরম নৃশংস আচরণ) করতে লাগল। তারা শহীদ সাহাবীদের পেট কেটে দেহ থেকে কলিজা বিচ্ছিন্ন করতে থাকল। চক্ষু উপড়ে ফেলতে থাকল। নাক ও কান কেটে তাদের পরিচয়ের বিকৃতি ঘটাতে থাকল। তাদের ঐসব কাটা নাক, কান, চক্ষু দ্বারা গলার মালা ও কানের বালি তৈরি করে পরিধান করে মনের ক্ষোভ মেটাতে লাগল।'

আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা তার গলার সোনার হারখানি এবং শহীদদের কর্তিত নাক-কানের তৈরি মালা ও বালা আমাকে পরিয়ে দিয়ে বলল:
'এগুলো তোমার হে আবু দাসামা এগুলো তোমার। এগুলো তুমি ভালো করে সংরক্ষণ কর। কারণ, এগুলো অতীব মূল্যবান।'

'উহুদের প্রান্তর শান্ত হলে এবং যুদ্ধ থেমে গেলে কুরাইশ বাহিনীর সাথে আমি মক্কায় ফিরে আসি। জুবাইর ইবনে মুতইম আমার প্রতি খুশি হয়ে তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করে আমাকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে দেয়। তখন থেকেই আমি স্বাধীন মানুষের মর্যাদা লাভ করি।'

অপরদিকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াত প্রতিদিনই সম্প্রসারিত হতে লাগল। প্রতি মুহূর্তেই মুসলিম জনশক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকল। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াত যত দ্রুত বিস্তার লাভ করতে থাকল আমিও তত বেশি চিন্তাযুক্ত হতে লাগলাম। ভয় ও আশঙ্কা আমার মন-মানসিকতাকে ভীষণভাবে আক্রান্ত করে ফেলল। এই দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনার মাঝেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দুর্ধর্ষ মুসলিম বাহিনী নিয়ে বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করলেন। কালবিলম্ব না করে আমি তায়েফকে নিরাপদ আশ্রয়-স্থান ভেবে সে উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে পলায়ন করলাম। কিন্তু দেখতে না দেখতেই নামেমাত্র প্রতিরোধ করে তায়েফবাসীরাও ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পরিকল্পনা করল। তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দেখা করে তায়েফবাসীদের ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সংবাদ অবগত করার জন্য এক প্রতিনিধিদল মনোনীত করল এবং তাদের মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের নিকট প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। এ দেখে আমি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লাম ও চতুর্দিকে অন্ধকার দেখতে লাগলাম। সুবিশাল পৃথিবী আমার জন্য সংকুচিত হয়ে এল। পলায়নের সমস্ত পথও বন্ধ হয়ে গেল। চিন্তা করতে লাগলাম, সিরিয়ায় পলায়ন করব, নাকি ইয়ামেনে, না অন্য কোনো দেশে? ভেবে কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছিলাম না। আল্লাহর শপথ! প্রতিনিয়ত আমি যেন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছিলাম।'

এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি তার পরামর্শের হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। সে আমাকে বলল:
'তোমার জন্য আফসোস ওয়াহ্শী! কেন তুমি দুশ্চিন্তায় ভুগছ? আল্লাহর শপথ! কোনো লোক ইসলাম গ্রহণ করলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কক্ষনো হত্যা করেন না।'

'তার এই অভয়বাণী শুনে অন্য কোনো দেশে পলায়নের পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে মদীনায় গিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে আত্মসমর্পণ করাই শ্রেয় মনে করলাম। মদীনায় পৌঁছে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তথ্যাদি সংগ্রহ করতে আরম্ভ করলাম। জানতে পারলাম যে, তিনি মসজিদে অবস্থান করছেন। মসজিদে প্রবেশ করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ভীত ও সন্ত্রস্ত মনে তাঁর দিকে অগ্রসর হতে থাকলাম। এমনকি তাঁর একেবারে মাথার কাছে গিয়ে উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলাম, 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ও আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।'

কালেমা শাহাদাতের আওয়াজ শোনামাত্রই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে দৃষ্টি তুলে তাকালেন। আমাকে দেখেই তিনি তাঁর দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে বললেন: 'তুমিই কি ওয়ার্শী?'

আমি ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে আতঙ্কিতাবস্থায় উত্তর দিলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমিই ওয়াহ্শী ইবনে হারব।'

আমার উত্তর শুনে তিনি বললেন: 'বস, আমাকে বর্ণনা দাও কিভাবে হামযাকে হত্যা করেছ?'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ মোতাবেক তাঁর কাছে বসে হামযা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে হত্যার পুরো ঘটনা বর্ণনা করলাম। বর্ণনাশেষে তিনি খুবই বিরক্তভাবে আমার থেকে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং বলেন:

'ওয়াহ্শী! তোমার মুখকে সর্বদা আমার নজর থেকে দূরে রাখবে। এরপর থেকে কখনো যেন তোমাকে আমি না দেখি।'

ওয়াহ্শী বলেন: 'এরপর থেকে আমি সর্বদাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টি এড়িয়ে চলতাম, যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নজর আমার ওপর না পড়ে।'

'সাহাবাদের গণ-মজলিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মুখভাগে অবস্থান নিলে আমি তাঁর পিছনে গিয়ে বসতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত পর্যন্ত এভাবেই তাঁর নজর এড়িয়ে চলতে থাকলাম।'

ওয়াহ্শী ইবনে হারব তাঁর পরবর্তী সময়ের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন,
'ইসলাম গ্রহণ করলে পূর্ববর্তী পাপ মুছে যায়, ইসলামের এ মর্মবাণী খুব ভালো করে জানা সত্ত্বেও কৃতকর্মের জন্য আমি সর্বদাই নিজেকে অভিশপ্ত মনে করতাম। আমি ইসলাম ও মুসলমানদের যে কী অপরিমেয় ক্ষতিসাধন করেছি, তা ভেবে আমি সর্বদাই উৎকণ্ঠিত থাকতাম। সেই মহাপাপের কাফ্ফারা কিভাবে আদায় করা যায়, সেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ওপর খিলাফতের গুরুদায়িত্ব অর্পিত হলো। মুসাইলামাতুল কাযযাব নামক এক ভণ্ড নবুওয়াতের দাবি করলে বনূ হুনায়ফা গোত্রের লোকজন ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে মুরতাদ হতে থাকল। খালীফাতুল মুসলিমীন আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বনূ হুনায়ফা গোত্রের জনগণকে পুনরায় ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার আহ্বান জানান। তারা তাঁর আহবানে সাড়া না দিলে বাধ্য হয়ে তিনি ভণ্ডনবী মুসাইলামাতুল কাযযাবের মোকাবেলার উদ্দেশ্যে জিহাদের ডাক দিলেন। সামরিক প্রস্তুতি আরম্ভ হলো। এবার আমি মনে মনে আল্লাহর শপথ করে বললাম:

'ওয়াহ্শী! এবার তোমার একটা সুবর্ণ সুযোগ। একে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ কর। এ সুযোগ যেন কোনোক্রমেই তোমার হাতছাড়া না হয়।'

যে বর্শা দিয়ে 'সাইয়েদুশ' শুহাদা হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে শহীদ করেছিলাম, সেই বর্শাখানা হাতে নিলাম এবং শপথ গ্রহণ করলাম:
'এর দ্বারা মুসাইলামাতুল কাযযাবকে হত্যা করব, নয়তো এ যুদ্ধে অবশ্যই শাহাদাত বরণ করব।'

সেই বিশাল বাগান, যে বাগান মুরতাদদের মৃতদেহের স্তূপে ভরে গিয়েছিল, যা ইসলামের ইতিহাসে 'হাদীকাতুল মাওত' নামে খ্যাত। যুদ্ধের এক পর্যায়ে সেই বাগানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল মুসাইলামাতুল কাযযাব ও তার বাহিনী। মুরতাদদের ওপর যখন মুসলিম বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাদের প্রতিরোধকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলল, সে মুহূর্তে আমি মুসাইলামাতুল কাযযাবকে খুঁজতে আরম্ভ করলাম এবং তাকে দেখতে পেলাম যে, সে তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আমি যেভাবে তাকে লক্ষ্যবস্তু করেছিলাম, ঠিক সেভাবেই অপর এক আনসারী যুবকও তাকে সেভাবেই লক্ষ্যবস্তু করেছিল। আমাদের উভয়ের লক্ষ্য ছিল তাকে হত্যা করা। সুযোগ বুঝে আমার বর্শা তাক করে নিলাম এবং সজোরে তার দিকে নিক্ষেপ করলাম। বর্শা তার দেহ ভেদ করে বিপরীত দিক দিয়ে বের হয়ে গেল। ঠিক একই মুহূর্তে, যে মুহূর্তে আমার বর্শা তাকে ভেদ করে বিপরীত দিক দিয়ে বের হয়ে পড়ে, সেই আনসারী যুবক সাহাবীও তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ও সজোরে তলোয়ারের আঘাত হানে।'

আল্লাহই ভালো জানেন যে, আমাদের দু'জনের কার আঘাতে ভণ্ডনবী মুসাইলামাতুল কাযযাব নিহত হয়েছে। ওয়াহ্শী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'আমিই যদি তার হত্যাকারী হই, তাহলে মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে আপন ব্যক্তির যেমন আমি হত্যাকারী, তেমনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সবচাইতে ঘৃণিত পাপিষ্ঠের হত্যাকারীও আমি।'

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩১৫ পৃ.
২. উসদুল গাবাহ ৫ম খণ্ড, ৭৩-৮৩ পৃঃ.
৩. আল ইসতিয়াব: হায়দারাবাদ সংস্করণ, ২য় খণ্ড, ৬০৮-৬০৯ পৃ.
৪. আত তারীখুল কাবীর: ৪র্থ খণ্ড, ২য় খণ্ড: ১৮০ পৃ.
৫. আল জামউ বাইনা রিজালিস সহীহাইন: ২য় খণ্ড, ৫৪৬ পৃ.
৬. তাজরীদু আসমাউস সাহাবা: ২য় খণ্ড, ১৩৬ পৃ.
৭. তাহযীবুত তাহযীব: ১১তম খণ্ড, ১১৩ পৃঃ.
৮. আস সীরাতু লিইবনি হিশাম: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৯. মুসনাদে আবু দাউদ: ১৮৬ পৃঃ.
১০. আল কামিলু লি-ইবনি আসীর: ২য় খণ্ড, ১০৮ পৃঃ.
১১. তারীখুত তাবারী: ১০ম খন্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১২. ইমতাউ আসমাঈ: ১ম খণ্ড, ১৫২-১৫৩ পৃ.
১৩. সিয়ারু আলামুন নুবালা: ১ম খণ্ড, ১২৯-১৩০ পৃ.
১৪. আল মাআরিফ লি-ইবনি কুতায়বা: ১৪৪ পৃ.
১৫. তারীখুল ইসলাম লিযযাহাবী: ১ম খণ্ড, ২৫২ পৃ.

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 হাকীম ইবনে হিযাম (রাঃ)

📄 হাকীম ইবনে হিযাম (রাঃ)


‘মক্কায় এমন চার ব্যক্তি আছে, যারা শিরকে নিমজ্জিত থাকুক- এটা আমি মোটেও চাইনি। আমি প্রতি মুহূর্তেই তাদের ইসলাম গ্রহণের জন্য উদগ্রীব থাকতাম। তাদেরই একজন হাকীম ইবনে হিযাম।’
- মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন এক সাহাবী সম্পর্কে আপনারা অবগত আছেন কি, যিনি পবিত্র কা'বাগৃহের অভ্যন্তরে ভূমিষ্ঠ হন?

হ্যাঁ! পবিত্র কা'বার ইতিহাসে তিনিই একমাত্র সেই স্বনামধন্য ব্যক্তি।

কা'বাগৃহের ভিতরে জন্মগ্রহণের সংক্ষিপ্ত ঘটনাটি হলো, বিশেষ এক অনুষ্ঠান বা উৎসব উপলক্ষে একদা জনসাধারণের জন্য কা'বাগৃহের দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এই সুযোগে হাকীম ইবনে হিযাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মা এই আনন্দ-উৎসবে তার নিকটাত্মীয়া ও বান্ধবীদের সাথে কা'বাগৃহে বেড়াতে আসেন। সে সময় তিনি ছিলেন পূর্ণ গর্ভবতী। কা'বাগৃহের ভিতরে অবস্থানকালে হঠাৎ তীব্রভাবে তার প্রসব বেদনা শুরু হয় এবং তা দ্রুত বাড়তে থাকে। এমনকি সেখান থেকে বের হওয়ার সময়টুকুও তিনি পাননি। তড়িঘড়ি করে একখণ্ড চামড়ার বিছানা আনা হলে তার ওপরই তিনি সন্তান প্রসব করেন। ইতিহাসে পবিত্র ঘরের ভিতরে একমাত্র জন্মগ্রহণকারী সন্তান। উম্মুল মু'মিনীন খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার ভাতিজা হাকীম ইবনে হিযাম ইবনে খুওয়াইলিদ। তিনি মক্কার অভিজাত পরিবারে বেড়ে ওঠেন। সম্পদের প্রাচুর্যে ভরা এই পরিবারে লালিত-পালিত হতে থাকেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে দেখা গেল তাঁর চরিত্রে অনেক ভালো গুণের প্রকাশ ঘটে। তার মধ্যে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হতে থাকলো নিরহঙ্কার ও বিনয়গুণ। বালক বয়সে তাঁর মধ্যে দেখা গেল মেধার বহুমুখী স্ফুরণ, যে কারণে পরিণত বয়সে তাঁর গোত্রীয় জনগণ তাকে গোত্রীয় নেতার পদে সমাসীন করে। দীন-হীন অনাথ নিঃস্বদের পুনর্বাসন এবং দস্যুকবলিত হাজীদের সাহায্য কমিটির প্রধানের দায়িত্বও তাঁকে দেওয়া হয়। ইসলামপূর্ব যুগে বা আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগে বাইতুল্লাহ শরীফের উদ্দেশ্যে হজ্জ করতে আসা অনেক হাজীই দস্যুকবলিত হয়ে সর্বস্ব হারাতেন। এ হাজীদের অভাব মোচন ও আর্থিক যোগান দিতে গিয়ে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ধনভাণ্ডার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দারাজ হাতে বিলিয়ে দিতেন।

তিনি বয়সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে পাঁচ বছরের বড় হওয়া সত্ত্বেও ইসলামপূর্বকালেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যতম অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। বিভিন্ন বৈঠক ও সমাবেশে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে স্থান করে নিতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতেন। তাঁর ফুফু খাদীজাতুল কুবরার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিয়ে হওয়ায় আত্মীয়তার এই নতুন সম্পর্ক তাদের পরস্পরের আন্তরিকতাকে আরো সুদৃঢ় করে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এ গভীরতম এবং আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্কের পরও হাকীম ইবনে হিযাম মক্কা বিজয়ের দিন পর্যন্ত নবুওয়াতের বিশ বছরের দীর্ঘ সময়েও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহ্বানে সাড়া দেননি; বরং পাশ কাটিয়ে চলতেন।

যে কোনো সচেতন ব্যক্তিমাত্রই চিন্তা করতে বাধ্য হবেন যে, হাকীম ইবনে হিযামের মতো ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তাআলা এত মেধা দিয়েছিলেন, ধনভাণ্ডার দ্বারা সমৃদ্ধ করেছিলেন, যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরঙ্গ বন্ধুদের একজন ছিলেন, নিকটাত্মীয় ছিলেন, তারই তো সর্বপ্রথম ঈমান আনার এবং ইসলামের মর্মবাণী ও নবুওয়াতের প্রতি বিশ্বাস আনার কথা ছিল। কিন্তু তিনি কেন পাশ কাটাতে থাকলেন? এ প্রশ্নের উত্তর আল্লাহই ভালো জানেন।

সবই আল্লাহর ইচ্ছা। আমরা যেমন হাকীম ইবনে হিযামের বিলম্বে ইসলাম গ্রহণে বিস্মিত হই, তেমনি তিনি নিজেও এ বিলম্বের জন্য বিস্মিত হয়েছেন। তিনি যখন ইসলামে প্রবেশ করে ঈমানী চেতনায় বলীয়ান হলেন, তখন থেকে প্রায়ই তিনি নিজের অতীত জীবনের কথা চিন্তা করে অনুতপ্ত হতেন। যে দীর্ঘ জীবন তিনি শিরকে নিমজ্জিত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অস্বীকার করে জীবন যাপন করেছেন, তার জন্য পরিতাপ ও আফসোস করতেন। ইসলাম গ্রহণের পর একদিন তাঁকে ক্রন্দনরত অবস্থায় দেখে তাঁর ছেলে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন:

'আব্বাজান! আপনি কাঁদছেন কেন?'

হাকীম ইবনে হিযাম বললেন:
'আমার কান্নার কারণ বহুবিধ।

প্রথমত
'বিলম্বে ইসলাম গ্রহণের কারণে আমি এমন সব গুরুত্বপূর্ণ ভালো কাজ থেকে বঞ্চিত হয়েছি যে, গোটা পৃথিবীর সমপরিমাণ সোনার বিনিময়েও সে মর্যাদা লাভে সমর্থ হব না।'

দ্বিতীয়ত
'আল্লাহর রহমতে আমি বদর ও উহুদের যুদ্ধে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আসি। তখন কৃতজ্ঞতাস্বরূপ শপথ করেছিলাম যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে আর কখনোই কুরাইশদের সহায়তার জন্য মক্কার সীমানা অতিক্রম করব না। কিন্তু আমি যত চেষ্টাই করে থাকি না কেন, তারা আমাকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে টেনে-হেঁচড়ে ঘর থেকে বের করেই ছেড়েছে।'

তৃতীয়ত
'আমি যখনই ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তখনই আমার সামনে কুরাইশ বংশে আমার মুরব্বীদের জাহেলী যুগের চিন্তা-চেতনা ও ভাবধারা এবং তাদের অনুসৃত নীতি ও পথ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি তাদের কুসংস্কারের কাছে অন্ধ হয়ে গিয়েছি। আহ! কি অন্যায়ই না করেছি! কতই না ভালো হতো, যদি ওসব না করতাম। খোদাদ্রোহী নেতৃবর্গ ও পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরণই আমাকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করেছে। তারপরও হে বৎস! কেন ক্রন্দন করব না?'

হাকীম ইবনে হিযাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বিলম্বে ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি যেমন আমাদের নিকট এক বিস্ময় তেমনি তাঁর নিজের কাছেও ছিল বিস্ময়, সে কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও হাকীম ইবনে হিযামের কথা চিন্তা করে অবাক হতেন। কেনই বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাকীম-এর জন্য অবাক হবেন না? কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো এটাই চাইতেন যে, তাঁর মতো প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি দ্রুত ইসলামে দীক্ষিত হোন।

মক্কা বিজয়ের রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের বলেন:
'মক্কায় এমন চার ব্যক্তি আছে, যারা বিন্দুমাত্র শিরকে নিমজ্জিত থাকুক তা আমি মোটেও চাই না। আমি প্রতি মুহূর্তেই তাদের ইসলাম গ্রহণের জন্য আকাঙ্ক্ষিত থাকতাম।'

সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু প্রশ্ন করলেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সেই চার ব্যক্তি কারা?'

তিনি উত্তর দিলেন:
'আত্তাব ইবনে উসাইদ, জুবায়ের ইবনে মুতইম, হাকীম ইবনে হিযাম ও সুহাইল ইবনে আমর। আল্লাহর রহমতে পরবর্তীতে তারা সবাই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশা পূরণ হয়।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন হakীম ইবনে হিযামের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন না করে পারেননি। তাই তিনি তাঁর ঘোষককে এই কথা ঘোষণা করার নির্দেশ দেন:

১. 'যে সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দাহ ও রাসূল, সে নিরাপদ।
২. যে অস্ত্র সমর্পণ করে কা'বাগৃহের পাশে বসে থাকবে, সেও নিরাপদ।
৩. যে নিজ গৃহের দরজা বন্ধ করে ভেতরে অবস্থান করবে, সেও নিরাপদ।
৪. যে ব্যক্তি আবূ সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় নেবে, সেও নিরাপদ। এবং
৫. যে ব্যক্তি হাকীম ইবনে হিযামের বাড়িতে প্রবেশ করবে, সেও নিরাপদ।'

হাকীম ইবনে হিযামের বাড়ি ছিল মক্কার সমতলভূমি এলাকায় এবং আবু সুফিয়ানের বাড়ি ছিল মক্কার পাহাড়ি টিলায়। হাকীম ইবনে হিযাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোষণার মর্মবাণী পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করেই ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, প্রতি মুহূর্তের নেক আমল দ্বারা জাহেলী যুগের কৃত সমস্ত অপরাধের কাফ্ফারা আদায় করবেন। ইসলামের বিরোধিতায় তিনি যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন, সেই পরিমাণ অর্থ ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারণের জন্য ব্যয় করতে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। তিনি সে প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়িতও করেছিলেন। তিনি মক্কার ঐতিহাসিক 'দারুন নাদওয়া' ভবনের মালিক ছিলেন। এই 'দারুন নাদওয়া'তেই কুরাইশ নেতৃবর্গ জাহেলী যুগে তাদের পরামর্শসভা ও সম্মেলনের আয়োজন করত। এখানেই কুরাইশ সরদার ও নেতৃবর্গ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে যাবতীয় ষড়যন্ত্র করার সিদ্ধান্ত নিতে একত্রিত হতো। হাকীম ইবনে হিযাম এ ঘরের অতীত স্মৃতিকে নিঃশেষ করে দিয়ে চিরমুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। অভিশপ্ত এ অতীতকে তিনি ভুলে যেতে চাইলেন। বিষাদময় স্মৃতি বিস্তৃত হতে চাইলেন। বিস্মৃতির পর্দা দিয়ে ঢেকে দিতে চাইলেন। তাই তিনি সেই নাদওয়া ভবনকে এক লক্ষ দিরহামে বিক্রি করে দিলেন। এই স্মৃতিময় ভবন বিক্রির সময় জনৈক কুরাইশ যুবক তাঁকে বলে,

'হে চাচা! কুরাইশদের অতীত স্মৃতির সর্বশেষ নিদর্শনটি বিক্রি করে দিলেন?'

হাকীম ইবনে হিযাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাকে বললেন:
'আফসোস হে বৎস! তাকওয়ার মর্যাদা ছাড়া আর সবরকম মর্যাদার অবসান হয়েছে। আমি শুধু এ কারণে এ ঘর বিক্রি করেছি যে, এর মূল্য দিয়ে জান্নাতে একটি ঘর খরিদ করব। আমি তোমাদেরকে এ ব্যাপারে সাক্ষী রাখছি যে, এর বিক্রয়লব্ধ অর্থ আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য দান করলাম।'

হাকীম ইবনে হিযাম ইসলাম গ্রহণের পর প্রথম যে হজ্জ করেন সে হজ্জের উদ্দেশ্যে গমনকালে তাঁর অগ্রভাগে উজ্জ্বল মূল্যবান কাপড়ে আবৃত একশত উটের একটি বহরকে মিনার দিকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং এসব আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানী করা হয়।

দ্বিতীয় হজ্জে তিনি যখন আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন, তখন তাঁর সাথে একশত ক্রীতদাস ছিল। যাদের প্রত্যেকের গলায় রৌপ্যের মেডেল পরানো ছিল। তাতে লেখা ছিল, হাকীম ইবনে হিযামের পক্ষ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আরাফাতের ময়দানে সবাইকে আযাদ করে দেওয়া হলো।

তৃতীয় হজ্জে এক হাজার বকরি, হ্যাঁ, উত্তম জাতের এক হাজার বকরি মিনাতে কুরবানী করা হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে মুসলমান ফকীর-মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। হুনাইনের যুদ্ধ শেষে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গনীমতের সম্পদের আবেদন করলে তাঁকে তা দেওয়া হয়। এর পরেও তিনি আবারও আবেদন করেন, এবার আরো বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আবারও আবেদন করেন। এবার আরো বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এভাবে এর সংখ্যা একশতটি উটে গিয়ে দাঁড়ায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেন:

'হে হাকীম! এসব মাল-সম্পদ খুবই প্রিয় ও আকর্ষণীয়, যারা তা কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করে আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন। আর অকৃতজ্ঞ বা লোভীদের জন্য আল্লাহ তাতে কোনো বরকত রাখেননি; বরং তাদের জন্য রয়েছে শুধু অতৃপ্তি আর অতৃপ্তি। সে ঐ ক্ষুধার্ত পেটের ন্যায়, যা বারবার আহারের পরও অতৃপ্ত থাকে। হে হাকীম! জেনে রেখো, গ্রহণকারীর হাতের চেয়ে দাতার হাত সর্বদাই উত্তম।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে এই নসীহত শোনার পর হাকীম ইবনে হিযাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:

'হে আল্লাহর রাসূল! যিনি আপনাকে সত্য দীন সহকারে প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আপনার পরে আর কারো কাছে কোনো প্রকার আবেদন করব না। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আর কারো কাছ থেকে কোনো সাহায্য নেব না।'

হাকীম ইবনে হিযাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অবশিষ্ট জীবনে তাঁর কৃত শপথকে বাস্তবে পরিণত করে দেখিয়েছিলেন।

আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতকালে একাধিকবার রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাঁর নির্ধারিত অর্থ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানোর পরও তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। এমনিভাবে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতকালেও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাঁর নির্ধারিত অর্থ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানানোর পর প্রথম খলীফাকে যেমন উত্তর দিয়েছিলেন, তেমনি এবারও তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। এমনকি পরিশেষে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জনসম্মুখে এর ব্যাখ্যায় বাধ্য হয়ে ঘোষণা দেন যে:

'হে মুসলিম ভাই-বোনেরা! আমি বারবার হাকীম ইবনে হিযামকে তাঁর নির্দিষ্ট অংশ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করে আসছি। কিন্তু তিনি বারবারই তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন।'

এভাবেই হাকীম ইবনে হিযাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত অন্যের কাছ থেকে বা রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো প্রকার অর্থ গ্রহণ করেননি।

টিকাঃ
১. আল ইসতিয়াব: ১ম খণ্ড, ৩৬৮ পৃ.
২. আল ইসাবাহ: ১ম খণ্ড, ৩২৭ পৃ.
৩. আল মিলালু ওয়ান নেহাল: ১ম খণ্ড, ২৭ পৃ.
৪. তাবাকাতুল কুবরা : ১ম খণ্ড, ২৬ পৃ.
৫. সিয়ারু আলামুন নুবালা: ৩য় খণ্ড, ১৬৪ পৃ.
৬. যুআমাউল ইসলাম: ১৯০-১৯৬ পৃ.
৭. হামাতুল ইসলাম: ১ম খণ্ড, ১২১ পৃ.
৮. তারীখুল খুলাফা: ১২৬ পৃ.
৯. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১ম খণ্ড, ৩১৯ পৃ.
১০. আল মাআরিফ: ৯২-৯৩ পৃ.
১১. উসদুল গাবা: ২য় খণ্ড, ৯-১৫ পৃ.
১২. মুহাদ্বরাতুল উদাবা: ৪র্থ খণ্ড, ৪৭৮ পৃ.
১৩. মুরাওয়ে জুযযাহাব: ২য় খণ্ড, ৩০২ পৃ.

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 আব্বাদ ইবনে বিশর (রাঃ)

📄 আব্বাদ ইবনে বিশর (রাঃ)


‘তিনজন আনসারীর ফযীলত এত বেশি যে, মর্যাদায় কেউই তাদের সমকক্ষ হতে পারেনি। তারা হলেন, সা'দ বিন মুআয, উসাইদ বিন হুদাইর এবং আব্বাদ বিন বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম।’
-উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা

ইসলামী দাওয়াতের ইতিহাসে আব্বাদ ইবনে বিশরের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। যদি আল্লাহভীরু ব্যক্তিদের সারিতে তাঁর অবস্থান অনুসন্ধান করতে চান, তাহলে নিঃসন্দেহে তাঁকে একজন পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারী, আল্লাহপ্রেমিক, তাহাজ্জুদ নামাযে আল কুরআনের বিভিন্ন অংশ তিলাওয়াতকারী আবেদ হিসেবে দেখতে পাবেন।

যদি তাঁকে বীর যোদ্ধাদের সারিতে সন্ধান করেন, তাহলেও তাঁকে অকুতোভয় বীর যোদ্ধা ও আল্লাহর কালেমা বুলন্দকারী এমন এক সাহসী যোদ্ধা হিসেবে দেখতে পাবেন, যার সমকক্ষ খুঁজে পাওয়াই দুরূহ।

এমনিভাবে, যদি তদানীন্তন ইসলামী বিশ্বের প্রাদেশিক গভর্নরদের সারিতে তাঁর অবস্থান নির্ণয় করতে চান, তাহলেও তাঁকে অত্যন্ত সফল ও সচেতন শাসক হিসেবে দেখতে পাবেন। রাষ্ট্রীয় অর্থের আমানতদার এক বিশাল ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁকে দেখা যাবে।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এবং তাঁর গোত্রের অপর দু'জন সাহাবী তাঁর প্রশংসায় বলেছেন,
'আবদুল আশহাল' গোত্রে এমন তিনজন আনসারী আছেন, যাদের ফযীলত ও মর্যাদায় সমকক্ষ হওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তারা সবাই আবদুল আশহালের সন্তান।'

'তারা হলেন, সা'দ ইবনে মুআয, উসাইদ বিন হুদাইর এবং আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম।'

ইয়াসরিবে দাওয়াতে ইসলামীর সূচনাকালে আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আল আনসারী ছিলেন যৌবনদীপ্ত তরতাজা এক যুবক। তাঁর চেহারায় ছিল নিষ্পাপ লাবণ্য ও উজ্জ্বলতার ছাপ, যাঁর আচার-আচরণে প্রতিফলিত হতো যুগশ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের মতো বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতা। অথচ তাঁর বয়স তখনো পঁচিশ অতিক্রম করেনি।

ইয়াসরিবে আগন্তুক মক্কার প্রথম দাঈ ইলাল্লাহ যুবক মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে মিলিত হতে না হতেই পরস্পরের মধ্যে দৃঢ় ঈমানী বন্ধনের সৃষ্টি হয়। মৌলিক মানবীয় ও চারিত্রিক গুণাবলির একান্ত সাদৃশ্যের কারণে তাঁদের মধ্যে হৃদ্যতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে।

মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সুললিত মধুর স্বরে ও আবেগময়ী সুরে কুরআন তিলাওয়াত করতে শুনে তিনিও তাঁর মতো কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং তাঁর অন্ধকার অন্তরও আল কুরআনের নূরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। তাঁরা উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে, ভ্রমণে ও নিজ গৃহে অবস্থানকালে আল কুরআনের মধুর তিলাওয়াতে মগ্ন থাকতেন। যার ফলে সাহাবীদের মধ্যে তাঁরা ঈমান ও কুরআনের বন্ধু হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো এক রাতে মাসজিদুন নববী সংলগ্ন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার ঘরে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করছিলেন। মসজিদে আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সুললিত কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করতে শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে জিজ্ঞাসা করলেন:

'আয়েশা! এ কি আব্বাদ ইবনে বিশরের কন্ঠ? জিবরাঈল আলাইহিস সালাম যেভাবে ও যে মিষ্টি স্বরে আমার ওপর কুরআন নাযিল করেন, সেই মিষ্টিস্বরে তিলাওয়াত শুনছি!'

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা উত্তর দিলেন: 'হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।'

এটি আব্বাদের আওয়াজ নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর জন্য তিনি আল্লাহর দরবারে এই বলে দু'আ করলেন: 'হে আল্লাহ! তাঁর সমস্ত গুনাহ মাফ করে দাও।'

আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে সংঘটিত সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রতিটি যুদ্ধেই তিনি আল কুরআনের ধারক-বাহকের যথাযোগ্য দায়িত্ব পালন করেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'যাতুর রিকা' অভিযান থেকে ফেরার পথে পাহাড়ি একটি ঘাঁটিতে রাত্রি যাপনের জন্য যাত্রাবিরতি করেন। এ যুদ্ধে কোনো এক মুসলিম যোদ্ধা যুদ্ধ চলাকালে স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন প্রতিপক্ষের এক মহিলা যোদ্ধাকে বন্দী করে আনে। স্বামী এই মহিলাকে না পেয়ে লাত এবং উয্যা দেবতার কসম করে বলে:

'আমি মুহাম্মদ ও তার সাথীদের অবশ্যই অনুসরণ করতে থাকব এবং এর প্রতিশোধে রক্তপাত না ঘটানো পর্যন্ত ক্ষান্ত হব না।'

এ ঘাঁটিতে মুসলিম বাহিনী তাদের উটবহরকে নিরাপদ স্থানে বসানোর আগেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন:

'আজকের রাতে পাহারার দায়িত্ব কে পালন করবে?'

আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং আম্মার ইবনে ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আরয করলেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার অনুমতি পেলে আমরা দু'জনই পাহারার দায়িত্ব পালন করব।'

মদীনায় মুহাজিরগণ আগমন করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দু'জনের পরস্পরকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছিলেন। তাঁরা দু'জনেই সেই পাহাড়ি ঘাঁটির প্রবেশপথে এলে আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ভাই আম্মার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললেন:

'রাতের দু'ভাগের কোন্ ভাগে আপনি ঘুমানো পছন্দ করবেন? প্রথম ভাগে, নাকি শেষ ভাগে?'

আম্মার ইবনে ইয়াসার উত্তর দিলেন:
'রাতের প্রথম ভাগেই আমি নিদ্রা যেতে চাই। তাই আব্বাদ ইবনে বিশরের থেকে একটু দূরেই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।'

নীরব নিস্তব্ধ রজনী। ধীরে ধীরে মৃদু-মন্দ বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে। গোটা পরিবেশ শান্ত ও স্তব্ধ। আসমানে তারকারাজি জ্বলছে। পাহাড়-পর্বত, গাছ- গাছালি আর বালুকণা সবই আল্লাহর তাসবীহ ও পবিত্রতা বর্ণনায় নিমগ্ন হয়ে পড়েছে। আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মন ইবাদতের জন্য ব্যস্ত এবং কুরআন তিলাওয়াতের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল।

তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াতের চেয়ে নামাযে তিলাওয়াতে বেশি স্বাদ পেতেন। আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে নামাযে নিমগ্ন হয়ে কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমেই বেশি পুণ্য। তাই তিনি কিবলামুখী হয়ে নিয়ত করে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। মধুর স্বরে তিনি সূরা কাহফ তিলাওয়াত আরম্ভ করলেন। তিলাওয়াতের স্বাদে তাঁর আত্মা এমনভাবে উদ্বেলিত হলো, যেন তা আসমানে উড়ে চলেছে। নামাযে তাঁর গভীর একাগ্রতার এক পর্যায়ে ইসলামী বাহিনীর সন্ধানে সেই ব্যক্তি দ্রুত এগিয়ে আসে। পাহাড়ি ঘাঁটির সম্মুখ দিয়ে অতিক্রমকালে দূর থেকে আব্বাদকে দণ্ডায়মান দেখে বুঝতে পারে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীরা গুহার অভ্যন্তরে রাত্রি যাপনের জন্য যাত্রাবিরতি করছেন। আর দণ্ডায়মান ব্যক্তি তাদেরকে পাহারা দিচ্ছে। সে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে তার থলে থেকে তীরগুচ্ছ বের করে ধনুক তাক করেই সজোরে আব্বাদ ইবনে বিশরের দিকে নিক্ষেপ করল। সাথে সাথে তা আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দেহে বিদ্ধ হলো। আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আস্তে করে তীরখানা তাঁর দেহ থেকে খুলে ফেলে আবার একাগ্রতার সাথে নামাযের মাধ্যমে কুরআন তিলাওয়াতে মনোনিবেশ করলেন। সেই ব্যক্তি আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দিকে আবার তীর নিক্ষেপ করল এবং তাও তাঁর দেহে বিদ্ধ হলো। বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পূর্বের ন্যায় এ তীরটিও তাঁর দেহ থেকে খুলে তিলাওয়াত অব্যাহত রাখলেন। সে তৃতীয় বারের মতো আবার তীর নিক্ষেপ করলে পূর্বের মতো সেটিও তাঁর দেহে বিদ্ধ হলো এবং তিনি সেটিও খুলে ফেললেন। এবার আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর অদূরেই ঘুমানো আম্মার ইবনে ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে এই বলে ডেকে উঠালেন যে:

'বিষাক্ত তীরের যখমে আমি নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছি।'

আম্মার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তৎক্ষণাৎ জেগে উঠলে তীর নিক্ষেপকারী তাদের দু'জনকে দেখে পালিয়ে গেল। আম্মার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দৃষ্টি আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দিকে পড়ামাত্রই দেখতে পেলেন যে, আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তিন তিনটি যখম থেকে রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হচ্ছে। আম্মার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললেন:

يَا سُبْحَانَ اللهِ هَلَّا الْقَظْتَني عند أول سهم رمـاك بـه؟

'সুবহানাল্লাহ! আপনার প্রতি প্রথম তীর নিক্ষেপ করার সাথে সাথেই কেন আমাকে জাগাননি?' আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:

'আমি এমন একটি সূরা তিলাওয়াত করছিলাম, তাতে মোটেও চাচ্ছিলাম না যে, তার তিলাওয়াত অপূর্ণাঙ্গ থেকে যাক। আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পাহাড়ি গুহার পাহারায় আমাদের নিযুক্ত করেছেন যদি তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা না করতাম, তাহলে সূরাটির তিলাওয়াত অপূর্ণাঙ্গ থাকার চেয়ে মৃত্যুকেই প্রাধান্য দিতাম।'

আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতের সময় 'রিদ্দার' যুদ্ধের সূচনা হলে আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসাইলামাতুল কাযযাবের সৃষ্ট ফিতনার মূলোৎপাটন এবং মুরতাদদের আবার ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেন।

আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন সেই বাহিনীর অগ্রগামী নেতাদের অন্যতম। এ যুদ্ধে মুসলমানদের পারস্পরিক অনাস্থার সূত্রপাত ঘটে। আনসার ও মুহাজিরদের, গ্রাম ও শহরবাসীদের পরস্পরের প্রতি অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ- অভিমানের কারণে আশানুরূপ বিজয় সূচিত না হওয়ায় তিনি ভীষণভাবে মর্মাহত হন। যুদ্ধ করার পরিবর্তে তারা পারস্পরিক দোষারোপে লিপ্ত হওয়ায় তাঁর মনে এ আশঙ্কা বদ্ধমূল হয়ে পড়ে যে, এই ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় সম্ভব হবে না। যদি না আনসার ও মুহাজির এবং গ্রামবাসী ও শহরবাসীদের ভিন্ন ভিন্ন রেজিমেন্টে বিভক্ত না করা হয় এবং প্রত্যেক রেজিমেন্টকে নিজ নিজ জয়-পরাজয়ের জন্য দায়ী না করা যায়।

পরদিন চরম ও রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধ সংঘটনের আগের রাতে আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু স্বপ্নে দেখেন:
'আকাশের বুককে তাঁর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। তিনি সেখানে প্রবেশ করলে আকাশ তাঁকে তার ভিতরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।'

সকালে আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে তাঁর এ স্বপ্নের কথা বললে তিনি তার তা'বীরে বলেন:
আব্বাদ ইবনে বিশর (রা) ১৫৭ www.pathagar.com
page_159.jpg
'হে আব্বাদ ইবনে বিশর নিঃসন্দেহে এর তা'বীর শাহাদাত ছাড়া অন্য কিছুই নয়।'

পরের দিন যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করলে আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পাহাড়ি টিলার ওপর থেকে সকল আনসারকে তাঁর দিকে আহ্বান জানিয়ে বললেন:

'হে আনসার ভাইয়েরা! অন্য যোদ্ধাদের থেকে আলাদা হয়ে আসুন এবং তলোয়ারের কোষ ভেঙে ফেলুন, যেন এই তলোয়ার দ্বিতীয় বার তাতে ঢুকানোর প্রয়োজন না হয়। ইসলামের বিজয়কে অন্যের করুণার ওপর ছেড়ে দেবেন না।'

এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাবেত ইবনে কায়েস, বারাআ ইবনে মালেক এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তলোয়ার রক্ষক আবূ দুজানা আনহুমের নেতৃত্বে চারশত আনসার তাঁর পাশে সমবেত হন। আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এসব সাহাবীকে নিয়ে শত্রুবাহিনীর ওপর এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন যে, তাতে মুসাইলামাতুল কাযযাবের সুরক্ষিত ব্যূহ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মুসাইলামা ও তার যোদ্ধারা যুদ্ধ-ময়দান পরিত্যাগ করে সুরক্ষিত উঁচু দেয়ালঘেরা বিশাল বাগানে আশ্রয় নেয়। মুসাইলামা ও তার যোদ্ধাদের লাশে এই বাগান ভরে গেলে এই বাগান 'হাদীকাতুল মাওত' বা 'মৃত্যুর বাগান' নামে পরিচিত হয়। সেই সুরক্ষিত প্রাচীরের ভেতরে প্রবেশের পর শত্রুবাহিনীর আক্রমণে রক্তে রঞ্জিত আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শাহাদাত বরণ করেন। যুদ্ধশেষে দেখা গেল, তাঁর সারা দেহে তলোয়ারের আঘাত, বর্শার যখম ও এমনভাবে বিদ্ধ তীরে জর্জরিত যে, তাঁকে চেনার কোনো উপায় ছিল না। পরিশেষে তাঁর শরীরের একটি চিহ্ন দেখে তাঁকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

টিকাঃ
১. তারীখুল ইসলাম লিয যাহাবী: ১ম খণ্ড, ৩৭০ পৃ.
২. তাহযীবুত তাহযীব: ৫ম খণ্ড, ৯০ পৃ.
৩. আত তাবাকাতুল কুবরা লি-ইবনি সা'দ: ৩য় খণ্ড, ৪৪০ পৃ.
৪. আল মুহাব্বারু ফিতারীখ: ২৮২ পৃ.
৫. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১ম খণ্ড, ২৪৩ পৃ.
৬. হায়াতুস সাহাবা: ১ম খণ্ড, ৭১৬ পৃ. এবং সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 যায়েদ ইবনে সাবেত (রাঃ)

📄 যায়েদ ইবনে সাবেত (রাঃ)


‘কবি হাসসান ও তাঁর ছেলে সাবেতের পরে যেমন ইলমে কাফিয়ার কোনো উল্লেখযোগ্য ইমাম নেই, তেমনি যায়েদ ইবনে ছাবেতকে বাদ দিলে ইলমে মা'আনীর বা আল কুরআনের অর্থ ও নিগূঢ় তত্ত্ব উদ্‌ঘাটনেরও কোনো ইমাম নেই।’
-হাসসান ইবনে ছাবেত (রা)

দ্বিতীয় হিজরীর কথা। মদীনা মুনাওয়ারায় বদর যুদ্ধের প্রস্তুতির এক পর্যায়ে লোকদের ভীড় জমে উঠেছে। আল্লাহর জমিনে তাঁরই কালেমা বুলন্দ করার লক্ষ্যে নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর ডাক দিয়েছেন। সে ডাকে সাড়া দিয়ে সশস্ত্র যোদ্ধারা উপস্থিত। সারিবদ্ধ যোদ্ধাদের শেষবারের মতো পর্যবেক্ষণ করার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এক এক করে প্রত্যেককে দেখে নিচ্ছেন। এক পর্যায়ে যার বয়স তেরোতে পৌছেনি, এমন একটি ছেলেকে দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর চেহারায় ফুটে উঠছিল তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার আভাস এবং দৃঢ় মনোবলের ছাপ। তাঁর হাতে ছিল একটি তলোয়ার, যা দৈর্ঘ্যে তাঁর সমান বা তাঁর চেয়েও একটু লম্বা। তিনি তা হাতে ধারণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে এগিয়ে এসে বললেন:

'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যেহেতু নিজেকে আপনার জন্য কুরবান করে দিয়েছি, তাই আমি আপনার সাথেই এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার এবং আপনার জিহাদী পতাকার নিচে আল্লাহর দুশমনদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার অধিকার রাখি। আমাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দিন।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এই দৃঢ় মনোবল ও চেতনা দেখে যেমন খুশি হলেন, তেমনি হলেন অবাক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাঁধে স্নেহভরে একটি মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন:
'সাবাস!'

তাঁর এই জিহাদী মনোভাব ও সাহসের জন্য আনন্দ প্রকাশ করলেও বয়সের স্বল্পতার জন্য জিহাদে অংশগ্রহণ থেকে তাঁকে বিরত রাখলেন। আদর-স্নেহের ভাষায় তাঁকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। বেদনাহত হয়ে যায়েদ ইবনে ছাবেত তাঁর তলোয়ার মাটিতে টেনে টেনে নিয়ে মন ভার করে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। তাঁর মনে আফসোস, ইসলামের প্রথম জিহাদে যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে সংঘটিত হচ্ছে, সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে সে বঞ্চিত হলো। তাঁর মা নাওয়ার বিনতে মালেক, সেও ছেলের এই ব্যর্থতায় গভীরভাবে মর্মাহত হয়ে ছেলের পেছনে পেছনে বাড়ি ফিরলেন। তার মনেও বিরাট আশা ছিল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পতাকাতলে বদরী মুজাহিদদের সাথে তার ছেলে এ জিহাদে অংশ নিয়ে যুদ্ধ করবে ও তার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে। এই স্মৃতি বহন করে জীবনের বাকি দিনগুলো সে কাটিয়ে দেবে। যদি তাঁর পিতা ছাবেত আজ জীবিত থাকতেন, তাহলে নিশ্চয়ই তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেন। কিন্তু এই আনসার বালক যায়েদ থেমে যাওয়ার পাত্র নয়। তাঁর প্রতিভা তাঁকে আরও এগিয়ে নিয়ে এল। বয়স কম হওয়ার জন্য যেহেতু যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য লাভ করতে সমর্থ হননি সেহেতু তাঁর প্রতিভাকে গুরুত্বপূর্ণ এমন এক দিকে বিকাশ করার সিদ্ধান্ত নিলেন, বয়সসীমার সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য ও সাহচর্য লাভের আরও অধিক সুযোগ করে দেবে। আর সেটি হলো জ্ঞানচর্চা ও আল কুরআনের হিফয-এর মাধ্যম।

বালক সাহাবী যায়েদ তাঁর এই সুপরিকল্পিত কর্মসূচি তাঁর মায়ের কাছে উপস্থাপন করলেন। তাঁর মা ছেলের এই পরিকল্পনা শুনে অতীব আনন্দিত ও খুশি হলেন। এ পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন।

এক পর্যায়ে যায়েদের মা নাওয়ার ছেলের এই মনোবাসনা ও প্রচেষ্টা তাঁর গোত্রের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের নজরে আনলেন এবং হিফয ও বিদ্যার্জনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে অবগত করালেন।

তারা বালক সাহাবী যায়েদকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলেন:
'হে আল্লাহর নবী! আমাদের সন্তান যায়েদ ইবনে ছাবেত। সে অদ্যাবধি আল কুরআনের ১৭টি সূরা হিফয করেছে। যেভাবে কুরআন আপনার অন্তরে অবতীর্ণ হয়েছে, ঠিক তাঁর তিলাওয়াতও এমনি প্রাঞ্জল ও নির্ভুল। তদুপরি লেখাপড়াতেও তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন। আপনার সাহচর্যের আকাঙ্ক্ষী। সে সার্বক্ষণিকভাবে আপনার খিদমতে থাকার অনুমতি চায়। আপনি এ ব্যাপারে আমাদের কথাগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।'

বালক সাহাবী যায়েদ যা কিছু হিফয করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা থেকে কিছু আয়াত তিলাওয়াত করতে বললে, যায়েদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিলাওয়াত করে শোনালেন। সে তিলাওয়াত কতই না চমৎকার, নির্ভুল, স্পষ্ট ও হৃদয়গ্রাহী! আল কুরআনের প্রতিটি শব্দ এমন স্পষ্টভাবে তাঁর ঠোঁট দুটো থেকে নির্গত হতে থাকে, সে যেন আসমানের নক্ষত্ররাজির মতো স্পষ্ট ও স্বচ্ছ। শুধু বিশুদ্ধ তিলাওয়াতই নয়, কণ্ঠস্বরও এমন শ্রুতিমধুর, যা শ্রোতার অন্তরকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। অর্থের সাথে সামঞ্জস্য রেখে যেখানে থামা দরকার, সেখানে থামলেন। যেখানে থামার দরকার নেই, সেখানে তিলাওয়াত অব্যাহত রাখলেন। তাতে প্রমাণিত হচ্ছিল যে, তিনি শুধু বিশুদ্ধ তিলাওয়াতেই পারদর্শী নন, বরং আল কুরআনের অর্থ সম্পর্কেও সম্পূর্ণ জ্ঞাত। তিনি প্রমাণ করলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর সম্পর্কে যতটুকু বলা হয়েছিল, প্রকৃত অর্থে তার চাইতে তিনি অনেক অনেক বেশি গুণে গুণান্বিত। বিশেষ করে আল কুরআনের অর্থ বুঝে পড়ার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতীব আনন্দিত ও খুশি হলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে বললেন:

‘যায়েদ! আমাকে সাহায্য করার জন্য ইহুদীদের ইবরানী ভাষা শেখ। কেননা, সে ভাষায় পত্রাদি বিনিময়কালে আমি যা কিছু বলি হুবহু তারা সে ভাষায় অনুবাদ করে কি না, সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ হয়।’

বালক সাহাবী যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন : ‘আপনার নির্দেশ শিরোধার্য। আমি অবশ্যই ইবরানী ভাষা শিখে নেব, ইনশাআল্লাহ।’

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ পেয়ে তিনি দ্রুত ইবরানী ভাষা শেখা আরম্ভ করলেন এবং অল্পদিনের মধ্যেই ইবরানী ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠেন। ইহুদীদের উদ্দেশ্যে কিছু লিখতে চাইলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে যায়েদ ইবনে ছাবেত তা লিখতেন এবং তাদের দেওয়া পত্রাদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পড়ে শোনাতেন। ইবরানী ভাষার পর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে খুব দ্রুত সুরিয়ানী ভাষাসহ আরবের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক গোত্রের ব্যবহৃত আঞ্চলিক ভাষাও শিখে ফেললেন।

কিছুদিন যেতে না যেতে এই বালক সাহাবী যায়েদ ইবনে ছাবেত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখপাত্র হিসেবে পরিগণিত হলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর মধ্যে গাম্ভীর্য, আমানতদারী, প্রজ্ঞা ও তীক্ষ্ণ মেধার পরিচয় পেলেন, তখন তাঁকে আসমান থেকে যমীনের জন্য প্রেরিত রিসালাহ বা ওহী লেখার দায়িত্বে নিয়োজিত করলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর যখনই কোনো আয়াত বা সূরা অবতীর্ণ হতো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ডেকে এনে বলতেন :
‘যায়েদ! এটা লেখ। তখন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তা লিপিবদ্ধ করতেন।’

অতএব, যায়েদ ইবনে ছাবেত সর্বদাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ ওহী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থেকেই মুখস্থ করতেন, লিপিবদ্ধ করতেন এবং কুরআনের আয়াতের পরিধি বিস্তারের সাথে সাথেই তিনিও বেড়ে উঠতে থাকেন। সর্বোপরি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র যবান মুবারক থেকেই আল কুরআনের শিক্ষা লাভ করেন ও অবতীর্ণ সূরা বা আয়াতের শানে নুযূল জেনে নেন এবং প্রতিটি আয়াতের নির্দেশিত হেদায়াতের আলোকে শরীআতের নিগূঢ় তত্ত্ব ও জটিল বিষয় সম্পর্কে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। এভাবেই তিনি আল কুরআনের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর তিনি উম্মতে মুহাম্মাদীর সর্বশ্রেষ্ঠ কুরআন বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।

আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতের সময় বিভিন্ন সাহাবীর নিকট সংরক্ষিত কুরআনের বিক্ষিপ্ত অংশ ও সূরাসমূহ গ্রন্থাকারে একত্রিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সে উদ্দেশ্যে তাঁকেই প্রধান করে 'জামিউল কুরআন' বা কুরআন একত্রীকরণ কমিটি গঠন করা হয়।

এমনিভাবে তৃতীয় খলীফা উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সময় ইসলামের বিজয় সম্প্রসারণের এক পর্যায়ে অনারব বিজিত দেশগুলোতে আঞ্চলিক ভাষায় কুরআনের তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে উচ্চারণ ও লেখার পার্থক্য জটিল আকার ধারণ করে। উম্মতে মুহাম্মাদীকে মাসহাফুল ইমাম বা মদীনায় সংরক্ষিত কুরআনের মূল কপির সাথে সমস্ত কুরআনকে মিলিয়ে নেওয়ার এবং উক্ত কুরআনের হুবহু কপি করে সারা মুসলিম বিশ্বে সরবরাহ করার লক্ষ্যে তাঁকেই জামিউল কুরআনের এই দ্বিতীয় কমিটিরও প্রধান করা হয়। এত বড় উচ্চ সম্মানের পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর জন্য এর চেয়ে সম্মানের দায়িত্ব আর কী হতে পারে?

অকল্পনীয় জটিল পরিস্থিতিতে অনেক বিজ্ঞ পণ্ডিত ও গুণীজন যখন সমস্যার কোনো সুরাহা করতে পারতেন না, তখন আল কুরআনের তীক্ষ্ণ জ্ঞান, ফযীলত ও বরকত যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সঠিক ও সত্য পথের দিক-নির্দেশনা দিত। যেমন হয়েছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পরে বনূ সাকীফ গোত্রের সম্মেলন কক্ষে। খলীফা নিযুক্ত করার ব্যাপারে সবাই একত্রিত হলে নিযুক্তি নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে চরম মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। সাকীফার সেই সম্মেলনে মুহাজিরগণ বললেন, 'খিলাফতের জন্য মুহাজিরগণই উত্তম। অতএব, খলীফা আমাদের মধ্য থেকেই হওয়া উচিত।'

আনসারগণ বললেন: 'খিলাফত আনসারদের মধ্যেই হতে হবে। কারণ, প্রকৃতপক্ষে আমরাই সর্বাধিক যোগ্য।'

তৃতীয় পক্ষ বললেন, 'খলীফা আনসারদের মধ্য থেকে একজন এবং মুহাজিরদের মধ্য থেকে অন্য একজন হবেন।'

তৃতীয় পক্ষ যুক্তি প্রদর্শন করলেন এই বলে: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত অবস্থায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজে যদি মুহাজির কোনো ভাইকে নিয়োগ করতেন, তখন কোনো আনসার ভাইকে তাঁর সহযোগী করতেন।'

খলীফা নিয়োগ নিয়ে ত্রিমুখী মত-পার্থক্যের এক পর্যায়ে ফিতনা সৃষ্টির উপক্রম হলো। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কফিন তাদের সামনে বিদ্যমান, তখন পর্যন্ত দাফনের অপেক্ষায়।

সাহাবীদের মধ্যে খিলাফত নিয়ে সৃষ্ট ঘোরতর মতবিরোধের গোঁজামিলকালে পক্ষপাতিত্বহীন এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনার একান্ত প্রয়োজন চরমভাবে দেখা দিল। মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্ট এই ফিতনা অংকুরেই বিনাশ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ল। সেই চরম সংকটপূর্ণ মুহূর্তে যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আল আনসারীর কণ্ঠ থেকে ঠিক সেই ধরনের আওয়ায বেরিয়ে এল। তিনি সমবেত জনগণের উদ্দেশ্যে বললেন:

'হে আনসার ভাইয়েরা! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু মুহাজির ছিলেন, তাঁর খলীফাও তাঁর মতো একজন মুহাজিরকে হতে হবে। আর আমরা যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনসার বা সাহায্যকারী ছিলাম তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর এখন আমরা তাঁর খলীফার আনসার বা সাহায্যকারী হব। সত্য ও হকের জন্য তাঁকে সার্বিক সহযোগিতা করব।'

এ ঘোষণা দিয়েই তিনি আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দিকে তাঁর হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন :
'ইনিই আপনাদের খলীফা, অতএব আপনারা তাঁর হাতে বায়'আত করুন।'

যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে ছায়ার মতো অনুসরণ করার ফলে কুরআন চর্চা, তার অর্থ অনুধাবন এবং নিগূঢ় তত্ত্ব উদ্‌ঘাটনের গভীর ব্যুৎপত্তি অর্জনের সৌভাগ্য লাভ করেন। যে কারণে মুসলমানদের নিকট তিনি অত্যন্ত সম্মানিত ও শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। খুলাফায়ে রাশেদীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংকটকালীন মুহূর্তে তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন এবং সাধারণ মুসলমানগণও ফাতওয়া-ফারায়েয সম্পর্কে জানতে তাঁরই শরণাপন্ন হতেন। মীরাস বণ্টন পদ্ধতি এবং ফারায়েয সংক্রান্ত যাবতীয় মাসআলা বর্ণনায় তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না।

একদা পশ্চিম দামেশকের 'জাবিয়াহ' নামক গ্রামে মুসলিম বাহিনীর বিজয় উপলক্ষে এক জন-সমাবেশে বিপুলসংখ্যক সাহাবীর উদ্দেশ্যে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বক্তৃতায় বলেন :
'আপনাদের কেউ যদি আল কুরআনের অর্থ, নিগূঢ় তত্ত্ব ও এর মর্ম সম্পর্কে জানতে চান, তাহলে যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট থেকে তা জেনে নিন।

ফিক্হ ও ফিক্হশাস্ত্রের জটিল বিষয় সম্পর্কে যদি জানতে চান, তাহলে তা মু'আয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট থেকে জেনে নিন।

আর যদি কেউ আর্থিক সাহায্য চান, তাহলে তা আমার কাছ থেকে চেয়ে নিন। কেননা, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুসলমানদের বাইতুল মালের সুষ্ঠু বণ্টনের ভার আমার উপর ন্যস্ত করেছেন।'

যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইলমের সীমাহীন যোগ্যতা, গভীর পাণ্ডিত্য এবং খোদাভীরুতার কারণে সাহাবী ও তাবেঈদের জ্ঞানপিপাসুরা তাঁকে অসীম শ্রদ্ধা ও ভক্তির দৃষ্টিতে দেখতেন। তদানীন্তন মুসলিম বিশ্বের 'বাহরুল উলূম' নামে খ্যাত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাও যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে কেমন শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন, তার একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

একদা যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কোথাও রওয়ানা হওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করতে গেলে তৎক্ষণাৎ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা ঘোড়ার সম্মুখে উপস্থিত হয়ে একহাতে ঘোড়ার লাগাম ও অন্য হাতে রিকাব বা পা রাখার কড়া বা পা দানী ধরে যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ঘোড়ার পৃষ্ঠে আরোহণ করার সুযোগ করে দেন।

যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর এ ধরনের খিদমতের জন্য লজ্জাভরে আপত্তি করলে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা উত্তর দেন:
'রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের আলিমদেরকে এ ধরনের সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন।'

তৎক্ষণাৎ যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললেন:
'আপনার হাতখানা একটু আমাকে দেখান তো!'

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়ামাত্রই তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার হাতে চুমু দিয়ে বললেন:
'আহলে বাইতের সদস্যদের প্রতি এভাবেই সম্মান করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।'

যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইনতিকালে তাঁর বুকে ধারণকৃত ইলমেরও পরিসমাপ্তি ঘটায় মুসলমানগণ আক্ষেপ ও কান্নায় ভেঙে পড়েন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:

'আজ মুসলিম জাতির 'হিবরুল উম্মাহ' বা অবিসংবাদিত মহান জ্ঞান তাপসের ইনতিকাল হলো। আমরা আশা করছি যে, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর যোগ্যতা যেন তাঁর উত্তরসূরীর স্থান লাভ করে।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবি হাসসান ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মৃত্যুতে শোকগাথা রচনা করেন। তিনি তাঁর ও নিজের জ্ঞানের উপযুক্ত কোনো স্থলাভিষিক্ত না দেখে সেই শোকবাণীর সাথে নিজেকেও বলেন:
فَمَنْ لِلقَوافِي بَعْدَ حَسَّانَ وَابْنِهِ ومن للمعاني بعد زيد بن ثابت?

'কবি হাসসান ও তাঁর ছেলের পরে যেমন ইলমে কাফিয়ার উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় কেউ নেই, তেমনি যায়েদ ইবনে ছাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পরেও ইলমে মাআনীর বা কুরআনের অর্থ ও তার নিগূঢ় তত্ত্ব উদ্‌ঘাটনের দ্বিতীয় কোনো ইমাম নেই।'

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: আত তারজামা, ২৮৮০ পৃ.
২. আল ইসতিয়াব: বিহামিসে ইসাবাহ: ১ম খণ্ড, ৫৫১ পৃ.
৩. গায়াতুন নিহায়াহ: ১ম খণ্ড, ২৯৬ পৃ.
৪. সিফাতুস সাফওয়া: ১ম খণ্ড, ২৪৯ পৃঃ হিন্দুস্তান সংস্করণ.
৫. উসদুল গাবাহ: আত তারজামা, ১৮২৪ পৃ.
৬. তাহযীবুত তাহযীব: ৩য় খণ্ড, ৩৯৯ পৃ.
৭. তাকরীবুত তাহযীব : ১ম খণ্ড, ২৭২ পৃ.
৮. আত তাবাকাত লিইবনি সা'দ : সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৯. আল মা'আরিফ: ২৬০ পৃ.
১০. হায়াতুস সাহাবা: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১১. আসসীরাতু লি-ইবনি হিশাম: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১২. তারীখুত তাবারী: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১৩. আখবারুল কুদাতু লিওয়াকিঈ: ১ম খণ্ড, ১০৮-১১০ পৃ.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00