📄 উকবা ইবনে আমের আল জুহানী (রাঃ)
আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার প্রবেশ-দ্বারে এসে পৌঁছলেন। উৎসুক মদীনাবাসী প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথী আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে এক নজর দেখার জন্য ব্যাকুল। তারা ঘরের ছাদে ও উঁচু জায়গায় ভীড় জমিয়ে 'আল্লাহু আকবার' তাকবীরধ্বনির মাধ্যমে মদীনার আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে। তাঁকে এক নজর দেখে চক্ষুদ্বয়কে শীতল করার জন্য রাস্তায় বের হয়ে পড়ে।
মদীনার ছোট ছোট শিশুরা দফ্ হাতে আনন্দের গান গেয়ে গেয়ে নবীজীকে এ ভাষায় অভ্যর্থনা জানাতে থাকে:
أَقْبَلَ الْبَدْرُ عَلَيْنَا مِنْ ثَنِيَّاتِ الْوِدَاع وَجَبَ الشَّكْرُ عَلَيْنَا مَا دَعَا لِلَّهِ دَاع .
'পূর্ণিমার চাঁদ সানিয়াতুল বিদা থেকে উদিত হয়ে আমাদের মাঝে আগমন করেছেন। আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী যতদিন আহ্বান জানাবেন, ততদিন তাঁর আগমনের জন্য আমাদের শোকরগুযারী করা একান্ত কর্তব্য।'
রাস্তার দু'ধারে উৎসুক নারী-পুরুষ ও শিশুরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর কাফেলা ধীরে ধীরে মদীনায় প্রবেশ করছেন। তাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক নজর দেখে অনেকের আনন্দের অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে। ব্যাকুল মন শান্ত ও পরিতৃপ্ত হচ্ছে।
কিন্তু উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাফেলাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য উৎসুক জনতার সঙ্গে যোগ দিতে পারেননি। কারণ, তিনি তাঁর বকরি পালের তত্ত্বাবধানে মদীনা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছিলেন। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় বকরিগুলো যাতে কষ্ট না পায় এ জন্য তিনি সেখানে এ দায়িত্ব পালন করছিলেন। হ্যাঁ, মদীনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনে আনন্দ ও খুশির জোয়ার আসে প্রতিটি ঘরে ঘরে। মদীনার শহর-সীমানা অতিক্রম করে দূর-দূরান্তের বেদুইন তাঁবুগুলোতেও সেই আনন্দ-উৎসবের ঢেউ লাগে। এ আনন্দের বার্তা উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে।
উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কিভাবে সাক্ষাৎ করেন, সেই সাক্ষাতের কাহিনী তাঁর কাছ থেকেই শুনুন।
তিনি বর্ণনা করেন:
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করেন, তখন আমি আমার বকরির পাল চরাতে মদীনা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছিলাম। সেখানেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনায় পৌঁছার সংবাদ পাই। এই শুভ সংবাদ পেয়েই আমি সেখানে বকরির পাল রেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দেখা করার জন্য রওয়ানা হই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমার বাইআত গ্রহণ করবেন?
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: 'তুমি কে?'
আমি উত্তর দিলাম: উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'বাইআত দুই ধরনের। যেমন, বেদুইনদের থেকে বাইআত নেওয়া। এটা স্বাভাবিক বাইআত এবং অপরটি হচ্ছে হিজরতের বাইআত। তোমার জন্য কোন্টি গ্রহণ করব?'
আমি বললাম, বরং হিজরতের বাইআত গ্রহণ করুন!
অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার থেকে মুহাজিরদের কৃত বাইআতের মতো বাইআত গ্রহণ করলেন। সেখানে এক রাত কাটিয়ে আমি আমার বকরি পালের জায়গায় ফিরে এলাম।
আমরা এক সঙ্গে বারো জন মদীনা শহর থেকে অনেক দূরে মরু এলাকায় বকরি চরাতাম। আমরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করি। আমরা পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করলাম:
'আমরা যদি ইসলামের বিধি-বিধান শিক্ষার উদ্দেশ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত না হই, তবে আমাদের কোনো কল্যাণ নেই।'
অতএব, আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি যে, প্রতিদিন আমাদের একজন করে মদীনায় যাবে। তার বকরির পাল আমাদের কাছে থাকবে। এভাবে পালাক্রমে আমরা প্রত্যেকেই মদীনায় যাব। আমি বকরি পালনে বেশি আন্তরিক ছিলাম। তাই এ ব্যাপারে অন্যের ওপর আমার আস্থা ছিল না বিধায় তাদেরকে বললাম:
ঠিক আছে, আমিই তোমাদের প্রত্যেকের বকরির পালের দায়িত্ব নিলাম। তোমরা পালাক্রমে একজন করে প্রতিদিনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খidমতে উপস্থিত হও।
এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিদিন খুব ভোরে একজন করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে রওয়ানা হতো। আমি থাকতাম তার বকরির পাল দেখাশোনার দায়িত্বে। সে ফিরে এসে তার বকরির পাল ফেরৎ নিত এবং যা যা শিখে আসত তা আমার কাছে বলতো। তার থেকে আমি ঐসব শিখে নিতাম।
কিন্তু এ পদ্ধতিতে জ্ঞানার্জনে পরিতৃপ্ত হতে পারলাম না। ইসলামী জ্ঞানার্জনের সরাসরি পথই আমি গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়ে পড়লাম। দুনিয়ার মোহমুক্তির পথ তালাশ করতে লাগলাম। ভাবলাম, বকরির পাল চরানো দ্বারা আমি বিত্তবানও হব না, দুনিয়ার মোহে থাকলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতে ও জানতেও পারব না। আমি কুরআনের শিক্ষা সরাসরি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে গ্রহণ না করে তো ভুল করছি। এ ভুল তো করা উচিত হচ্ছে না।
এসব চিন্তা-ভাবনা করে বকরি পালনের দায়-দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে মসজিদে নববীতে আসহাবে সুফফার সাথে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়ে মদীনায় চলে আসলাম।
উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এই কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েননি বা বিচলিত ভাবও দেখাননি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি কাজ শুরু করে দেন।
এ ছিল প্রত্যেকের কাছেই কল্পনাতীত ব্যাপার যে, তিনি মাত্র দশ বছরের মধ্যেই আলিম সাহাবীদের মধ্যে ইলমুল কিরাআতের শীর্ষস্থানীয় ইমাম হবেন। ইসলামের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধসমূহের সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবেন এবং হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন খ্যাতি অর্জনকারী গভর্নরের অন্যতম হিসেবে ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনিই কি এমন ধারণা করতে পেরেছিলেন যে, তিনি তাঁর বকরি পালের দায়িত্ব ছেড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে এমন যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন, যে যোগ্যতা তাঁকে ইসলামী বাহিনীর সেনাপতি পদে উন্নীত করবে? যে দামেস্ককে সেকালে দুনিয়ার সভ্যতা-সংস্কৃতির 'মা' বলা হতো সেই দামেস্কের বিজয়ী হবেন, এ কথা কি তিনি ভাবতে পেরেছিলেন? দামেস্কের প্রবেশপথে 'তুমা' নামক স্থানে মনোরম বাগানে তাঁর আলীশান বাসগৃহ তৈরি করা হবে এবং প্রাচীন সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র মিসর বিজয়ী সেনা-কর্মকর্তাদের অন্যতম সেনা-কর্মকর্তা হবেন এবং পরবর্তী সময়ে মিসরের গভর্নরের পদ অলংকৃত করবেন। প্রসিদ্ধ 'আল মুকাত্তাম' পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় চূড়ার পাদদেশে নিজের জন্য বাড়ি তৈরি করবেন। এ সবই ছিল পর্দার আড়ালে লুক্কায়িত তাঁর সৌভাগ্যের লিখন, যা একমাত্র আল্লাহই জ্ঞাত ছিলেন।
হ্যাঁ, উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত নিবিড় সাহচর্য লাভ করেন। তিনি সারাক্ষণই যেন ছায়ার মতো তাঁর সাথে লেগে থাকতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে যেতেন, তিনিও সেখানেই যেতেন এবং ঘোড়ার লাগাম ধরে থাকতেন। অধিকাংশ সময়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের ঘোড়াটির পিছনে বসিয়ে নিতেন। এত অধিকবার তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে একই ঘোড়ায় আরোহণ করেছেন যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে ঘোড়ায় আরোহণকারী হিসেবেই খ্যাতি লাভ করেন। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো তাঁর ঘোড়া থেকে নেমে হেঁটে চলেছেন আর তাকে ঘোড়ার পিঠেই অবস্থান নিতে বলেছেন। উকবা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করেন:
মদীনার কোনো এক বাগানে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়েছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন:
হে উকবা! তুমি কি ঘোড়ায় উঠবে না?
আমি না-সূচক উত্তর দিতে মনস্থ করে আবার ভাবলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর ঘোড়ায় চড়তে বলেছেন, আর আমি যদি তাঁর নির্দেশ অমান্য করি, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানে বেয়াদবী হবে এবং এতে গোনাহ হবে- এই আশঙ্কায় বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ আমি উঠছি।
অতঃপর তিনি ঘোড়ার লাগাম ধরে হেঁটে চললেন আর আমি তাঁর নির্দেশ পালনার্থে ঘোড়ায় চড়ে যেতে লাগলাম। কিছু দূর যেতে না যেতেই আমি ঘোড়া থেকে নেমে পড়লাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করতে অনুরোধ জানালাম। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
'উকবা! তোমাকে আজ এমন দুটি সূরা শিক্ষা দেব, যা নিঃসন্দেহে অন্য যে কোনো সূরার গুরুত্বের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।'
আমি আরয করলাম: নিশ্চয়ই ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি তা শিখব।
অতঃপর তিনি আমাকে সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে শোনালেন। নামাযের সময় হলে তিনি ইমামতি করার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন এবং এ দুটি সূরা দিয়েই নামায আদায় করলেন। নামাযশেষে বললেন: 'যখনই ঘুমাতে যাবে কিংবা ঘুম থেকে জাগ্রত হবে, তখনই এ সূরা দুটি পাঠ করবে।'
উকবা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন: 'আমি যতদিন জীবিত থাকব, ততদিনই এ দুটি সূরা পাঠ অব্যাহত রাখব।'
উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআল্লা আনহু সারা জীবন দুটি বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে তৎপর ছিলেন। তন্মধ্যে একটি হলো ইলম শিক্ষা করা ও অপরটি জিহাদে অংশগ্রহণ করা। নিজের জীবনের চেয়েও এ দুটি বিষয়ের প্রতি খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন, এমনকি এ জন্য তিনি আর্থিক কুরবানীও করেন।
বিদ্যাচর্চা বা জ্ঞানার্জনে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যবান মুবারক থেকেই নিয়মিত কুরআন মাজীদের হিয্য ও এর শিক্ষা গ্রহণ করতেন। ফলে তিনি জগদ্বিখ্যাত কারী, ওয়ায়েয, মুহাদ্দিস, ফকীহ, ফারায়েয বিশেষজ্ঞ, সাহিত্যিক ও কবি হিসেবে সর্বজনগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত মধুর। মধুর কন্ঠে তিনি যখন কুরআন তিলাওয়াত করতেন, তখন শ্রোতারা তন্ময় হয়ে তিলাওয়াত শুনতেন। তিনি রাতের গভীরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন বেশি। কুরআনের আয়াতে বায়্যিনাতসমূহ বেশি বেশি পাঠ করতেন। সাহাবীগণ প্রাণভরে তাঁর তিলাওয়াত শ্রবণ করে নিজেদের অন্তরকে পরিতৃপ্ত করতেন। এমনও হতো যে, তাঁর তিলাওয়াতের মাঝে সবাই আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে পড়তেন। তাদের দু'চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ত। একদিন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে ডেকে নিয়ে বললেন:
'উব্বা আমাকে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করে শোনাও।'
উব্বা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
অবশ্যই হে খালীফাতুল মুসলিমীন।
অতঃপর তিনি তিলাওয়াত শুরু করলেন। তিলাওয়াত শুনতে শুনতে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এমনভাবে ক্রন্দন করতে থাকলেন যে, তাঁর চোখের পানি দু'গাল বেয়ে তাঁর দাড়ি মুবারক পর্যন্ত ভিজিয়ে দিল।
উবা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু স্বহস্তে লিখিত একখানা কুরআন মাজীদ রেখে যান, যে কুরআন মাজীদখানা মাত্র কয়েক শ' বছর পূর্বেও মিসরের 'উব্বা ইবনে আমের জামে মসজিদের' লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত ছিল। যার শেষে লিখা ছিল: كَتَبَهُ عُقْبَةُ بْنُ عَامِرُ الْجُهَنِي
'এটি উব্বা ইবনে আমের আল জুহানীর স্বহস্তে লিখিত।'
উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কর্তৃক লিখিত কুরআন পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রাচীন হাতে লেখা কুরআন শরীফ। ইসলামী বিশ্বের নষ্ট হয়ে যাওয়া অনেক দুর্লভ ও মূল্যবান বই সম্পদের মতো এই কুরআন শরীফখানাও সেখান থেকে হারিয়ে যায়, আর মুসলিম সমাজের এই মূল্যবান সম্পদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
জিহাদের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান হলো- তিনি উহুদের যুদ্ধ থেকে শুরু করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সংঘটিত সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি দুর্ধর্ষ, দুঃসাহসী, তেজস্বী ও শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদের অন্যতম ছিলেন। দামেস্ক বিজয়ের দিন তাঁকে জীবনের কঠিনতম পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। এ কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন মুসলিম বিশ্বের সেনাপতি আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পক্ষ থেকে। সেটাও এইভাবে যে, দামেস্ক বিজয়ের সুসংবাদ নিয়ে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিদমতে উপস্থিত হওয়ার জন্য তাঁকে দামেস্ক থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। তিনি এ সংবাদ বহন করে এক শুক্রবার থেকে অন্য শুক্রবার পর্যন্ত রাত-দিন ক্রমাগত আট দিন ও সাত রাত কোনোরূপ বিশ্রাম বা বিরতি না রেখে এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে এই বিরাট বিজয়ের খবর পৌঁছান।
'মিসর বিজয়ের যুদ্ধে তিনি মুসলিম বাহিনীর একাংশের সেনাপতি ছিলেন। আমীরুল মু'মিনীন মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে সেখানে ক্রমাগত তিন বছর গভর্নর পদে বহাল রাখেন। অতঃপর ভূমধ্যসাগরের 'রুডুস' দ্বীপ বিজয়ের উদ্দেশ্যে উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে প্রেরণ করেন। জিহাদ সম্পর্কিত হাদীসসমূহের দ্বারা তাঁর অন্তর পরিপূর্ণ ছিল। যা তিনি বিশেষভাবে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বর্ণনা করেন। তিনি যুগশ্রেষ্ঠ তীরন্দায ছিলেন, এমনকি তিনি একটু অবসর সময় কাটাতে চাইলে তীরন্দাযী বা তীর চালনার মাধ্যমে কাটাতেন।
মিসরে অবস্থানকালে উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইন্তিকালের পূর্ব মুহূর্তে তাঁর সন্তানদের ডেকে ওসিয়ত করেন:
يَا بُنَيَّ أَنْهَاكُمْ عَنْ ثَلَاثٍ فَاحْتَفِظُوا بِهِنَّ : لَا تَقْبَلُوا الْحَدِيثَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ إِلَّا مِنْ ثِقَةٍ وَلَا تَسْتَدِينُوا وَلَوْ لَبِسْتُمُ الْعَبَاءَ وَلَا تَكْتُبُوا شِعرًا فَتَشْغَلُوا بِهِ قُلُوبَكُمْ عَنِ الْقُرْآنِ .
'হে বৎসগণ! তিনটি কাজ করা থেকে তোমাদের নিষেধ করছি। তোমরা এ তিনটি বিষয় ভালোভাবে স্মরণ রাখবে:
১. বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী বা 'ছেকাহ' রাবী ছাড়া অনির্ভরযোগ্য কোনো ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস বর্ণনা করলে তা কখনও গ্রহণ করবে না।
২. কোনো অবস্থাতেই ঋণ গ্রহণ করবে না; যদিও বা অভাবের তাড়নায় ছেঁড়া চাদর পরিধান করতে হয়।
৩. এবং কখনো কবিতা চর্চায় নিমগ্ন হয়ো না, কারণ কবিতা চর্চা তোমাদের অন্তরকে কুরআনের চর্চা থেকে ফিরিয়ে রাখবে।'
তাঁর ইনতিকাল হলে তাঁকে কায়রোর প্রবেশপথের উঁচু টিলার পাদদেশে দাফন করা হয়। দাফন শেষ হলে বাড়ি ফিরে এসে তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তির হিসাব করা হলে দেখা যায় যে, সম্পদ হিসেবে একাত্তর বা তিয়াত্তরটি ধনুক এবং প্রত্যেকটি ধনুকের সাথেই তীর চালানোর সাজ-সরঞ্জাম এবং এসব জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর কাজে ব্যবহার করার জন্য ওসিয়তনামা।
বিশ্বখ্যাত ক্বারী এবং গাযী মুজাহিদ উব্বা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর চেহারা মুবারককে আল্লাহ নূরের আলোয় আলোকিত করুন এবং ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষ থেকে তাঁকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করুন। আমীন!
টিকাঃ
১. আল ইসতিয়াব: ৩য় খণ্ড, ১০৬ পৃ.
২. উসদুল গাবাহ: ৩য় খণ্ড, ৪১৭ পৃ.
৩. আল ইসাবাহ: ২য় খণ্ড, ৪৮২ পৃ.
৪. সিয়ারু ইলামুন নুবালা: ২য় খণ্ড, ৩৩৪ পৃ.
৫. জামহারাতুল আনসাব: ৪১৬ পৃ.
৬. আল মাআরিফ: ১২১ পৃ.
৭. কালাইদুল জুমান: ৪১ পৃ.
৮. আন নুজুমুয যাহেরাহ: ১ম খণ্ড, ১৯/২১/৬২/৮১ পৃ.
৯. তাবাকাত উলামাউ আফ্রিকীয়াহ এবং তিউনিস: ৭০-৮৫ পৃ.
১০. ফাতহুল মিস্ত্রে ওয়া আখবারুহা: ২৮৭ পৃ.
১১. তাহযীবুত্ তাহযীব: ৭ম খণ্ড, ২৪২ পৃ.
১২. তাযকিরাতুল হুফ্ফায়: ১ম খণ্ড, ৪২ পৃ.
📄 হাবীব ইবনে যায়েদ (রাঃ)
হাবীব ইবনে যায়েদ আল আনসারী (রা) ও তাঁর আহলে বাইতের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর দু'আ।
'আমার আহলে বাইতের পক্ষ থেকে আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহমত ও বরকত দান করুন।'
-মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)
হাবীব ইবনে যায়েদ আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্ধারিত জীবনধারার অমোঘ নিয়মে এমন এক পরিবারে প্রতিপালিত হচ্ছিলেন, যে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যই যেমন ছিলেন ঈমানী চেতনায় বলীয়ান, তেমনি এ বিপ্লবী দাওয়াত ছড়িয়ে দিতেও তাঁদের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। এ পরিবারের প্রতিটি সদস্য দীনের দাবি পূরণে যে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সীমাহীন কুরবানীর অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তা জনপদের প্রত্যেককে ঈমানী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করত।
তাঁর পিতা যায়েদ ইবনে আসেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা ইয়াসরিবের একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব এবং বায়'আত আল আকাবায় অংশ গ্রহণকারী ৭০ সাহাবীর অন্যতম ছিলেন। সে অনুষ্ঠানে তিনি দুই ছেলেসহ সস্ত্রীক বায়'আত করার গৌরবে গৌরবান্বিত হন। তাঁর মা উম্মু আম্মারা নুসায়বাতুল মাযনিয়াহ ইসলামের ইতিহাসে সেই প্রথম মহিলা, যিনি আল্লাহর দীনের হেফাযত ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিরক্ষায় হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর ভাই আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা উহুদের যুদ্ধে নিজের বক্ষকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হেফাযতের জন্য ঢালস্বরূপ ব্যবহার করেন। তিনি শত্রুপক্ষের অসংখ্য তীর-বর্শার আঘাত থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করার গৌরবে গৌরবান্বিত সাহাবী। তাঁর স্বীকৃতিস্বরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জন্য এ দু'আ করেন-
بَارَكَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ مِنْ أَهْلِ بَيْتٍ رَحِمَكُمُ اللَّهُ مِنْ أَهْلِ بَيْتٍ .
'আমার আহলে বাইতের পক্ষ থেকে আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহমত ও বরকত দান করুন।'
শিশুকালেই নিষ্পাপ হাবীব ইবনে যায়েদের অন্তর ঈমানের আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। মা-বাবা, খালা ও ভাইয়ের সাথে মক্কাগামী ইতিহাসখ্যাত সেই সত্তর জন সাহাবীর কাফেলায় যোগদানের সৌভাগ্যও তাঁর হয়েছিল। গভীর রাতের অন্ধকারে অনুষ্ঠিত বায়'আতে আকাবায় শিশু হাবীবও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে কোমল দু' হাত রেখে বায়'আত গ্রহণ করেন এবং সেদিন থেকে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর পিতামাতার চেয়েও প্রিয় মনে করেন ও তাঁর জীবনের বিনিময়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠাকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন।
শিশু সাহাবী হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা একান্তই ছোট হওয়ার কারণে 'বদরের যুদ্ধে' অংশগ্রহণ করতে পারেননি। এমনকি যুদ্ধাস্ত্র বহনের বয়স না হওয়ায় তিনি উহুদের যুদ্ধেও অংশগ্রহণে অক্ষম হন। এর পরে সংঘটিত প্রতিটি যুদ্ধেই তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অংশগ্রহণ করেন। এসব যুদ্ধে তিনি বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, ত্যাগ, ধৈর্য ও নৈপুণ্যে শত্রুবাহিনীকে পরাস্ত করতে সক্ষম হন। বিশাল শত্রুবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে তাঁর তীক্ষ্ণ রণ-কৌশল, দৃঢ় ঈমানী চেতনা, উচ্চ মনোবল এবং সীমাহীন মানসিক প্রস্তুতি একান্তভাবে প্রশংসনীয় ছিল।
প্রিয় পাঠক! হাবীব ইবনে যায়েদ আল আনসারী (রা)-এর জীবনে ঘটে যাওয়া একটি রোমহর্ষক ঘটনার প্রতি আলোকপাত করতে চাচ্ছি, যা অতি ভয়ঙ্কর ও হৃদয়বিদারক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় থেকে পরবর্তী সময়ে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে ঘটনার স্মরণে মানুষের অন্তর কেঁপে উঠত, ঘটনাটি সত্যিই অবিস্মরণীয়।
হিজরী নবম সালে ইসলামী রাষ্ট্র সগৌরবে পূর্ণাঙ্গ রূপ নিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আরব দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে প্রতিনিধি দল উপস্থিত হতে থাকে। ইসলাম গ্রহণ ও ইসলামী রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকারের ঘোষণা দানের জন্য একের পর এক বিভিন্ন আরব গোত্রের প্রতিনিধি দলের মদীনায় আগমন। তাদের মধ্যে নজদের ঘনবসতি অধ্যুষিত উঁচু প্রান্তর থেকে আসা গোত্র বনূ হুনাইফার প্রতিনিধি দলের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ। বনূ হুনায়ফার এই প্রতিনিধিদল মদীনার প্রান্তেই তাদের উট বহরের অবস্থান নিয়ে মুসাইলামা ইবনে হাবীব আল হানাফী নামক এক ব্যক্তিকে উটবহর ও সরঞ্জামাদির পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে তাদের গোত্রের ইসলাম গ্রহণ ও ইসলামী রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকারের ঘোষণাদানই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দের সাথে এ প্রতিনিধি দলকে অভ্যর্থনা জানান। উত্তম আতিথেয়তা দান করেন এবং প্রতিনিধি দলের প্রত্যেক সদস্যকে, এমনকি উটবহরের পাহারায় নিযুক্ত ব্যক্তিকেও অন্যান্য প্রতিনিধিদের মতো উপঢৌকন প্রদানের নির্দেশ দেন। এই প্রতিনিধি দল নজদে ফিরে যেতে না যেতেই সেই মুসাইলামা ইবনে হাবীব ইসলাম পরিত্যাগ করে এবং তার গোত্রের জনগোষ্ঠীকে এই বলে আহ্বান জানায় যে, সেও একজন প্রেরিত নবী। যাকে আল্লাহ বনূ হুনায়ফা গোত্রের জন্য প্রেরণ করেছেন, যেমন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরাইশ গোত্রে প্রেরণ করেছেন। দেখতে না দেখতেই তার গোত্রের জনশক্তি নানা বাহানায় মুসাইলামাতুল কাযযাবের চারপাশে সমবেত হয়ে তার শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। এসব বাহানার অন্যতম ছিল গোত্রপ্রীতি। তার অনুসারীদের এক গোত্রীয় নেতা এই বলে ঘোষণা দেয় যে:
'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিঃসন্দেহে সত্য নবী এবং মুসায়লামা একজন ভণ্ড। কিন্তু স্ব রবিয়া গোত্রীয় ভণ্ড নবী কুরাইশ বংশের একজন সত্য নবীর চেয়ে আমার নিকট অধিক প্রিয়।'
অতঃপর যখন মুসাইলামাতুল কাযযাবের চারপাশে মুরতাদদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল এবং সে প্রভাববিস্তারে সমর্থ হলো, তখন সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে একটি পত্র প্রেরণ করে। যার ভাষা ছিল আল্লাহর রাসূল মুসাইলামার পক্ষ থেকে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি :
'আস্সালামু আলাইকা। অতঃপর আমাকে অবশ্যই আপনার নবুয়তের অংশীদার করা হয়েছে। আরব ভূখণ্ডের অর্ধেক আমাদের আর অর্ধেক কুরাইশ গোত্রের। কিন্তু কুরাইশ সীমালংঘনকারী গোত্র।'
এ চিঠি তার অন্ধ অনুসারী মুরতাদদের দু'জনকে দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে প্রেরণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে এ চিঠি পাঠ করে শোনানো হলে পত্রবাহক দু'জনকে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের দু'জনের বক্তব্য কী? তারা উত্তর দেয়, মুসায়লামার বক্তব্যই আমাদের বক্তব্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন:
'আল্লাহর শপথ! দূতদের হত্যা করা বিধিসম্মত হলে আমি অবশ্যই তোমাদের শিরশ্ছেদ করতাম।'
অতঃপর মুসাইলামাতুল কাযযাবের পত্রের জবাবে লিখেন:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد رسول الله إلى مسيلمة الكذابِ السَّلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الهدى، أَمَّا بعد. فَإِنَّ الْأَرْضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ والعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِين.
'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
'আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে মুসাইলামাতুল কাযযাবের প্রতি। হেদায়াতের অনুসারীদের প্রতি সালাম। অতঃপর প্রণিধানযোগ্য যে, এই ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব নিশ্চয়ই একমাত্র আল্লাহরই। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে পছন্দ করেন, তাকে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়ে থাকেন। আর শেষ পরিণাম শুধুমাত্র মুত্তাকীদের জন্যই।'
সেই মুরতাদদ্বয়ের হাতেই এ উত্তরখানা মুসাইলামাতুল কাযযাবকে প্রেরণ করা হয়। এর ফলে হেদায়াতের পথে ফেরৎ আসার পরিবর্তে মুসাইলামাতুল কাযযাব আল্লাহদ্রোহিতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টিতে আরো উন্মত্ত হয়ে পড়ে।
মুসাইলামাতুল কাযযাবকে তার ভণ্ডামি ও ভ্রষ্টপথ পরিহার করে হেদায়াতের পথে ফিরিয়ে আনার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি দাওয়াতী পত্র প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন। সেই চিঠি বহন করার জন্য এ কাহিনীর মূল চরিত্র হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে দূত হিসেবে মনোনীত করেন। হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা একদিকে যেমন ছিলেন রাজকীয় চেহারার সুপুরুষ যুবক, অন্যদিকে ছিলেন আপাদমস্তক ঈমানের প্রতিচ্ছবি।
হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা কোনোরূপ ভয়ভীতি, দুর্বলতা ও শঙ্কা প্রকাশ না করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সোপর্দ করা গুরুদায়িত্ব পালনে তৎক্ষণাৎ রওয়ানা হলেন। তিনি একের পর এক পাহাড়, পর্বত ও নিম্নভূমি অতিক্রম করে নজদের ঘনবসতিপূর্ণ উঁচু ভূ-খণ্ডে বনূ হুনাইফা গোত্রে এসে মুসাইলামাতুল কাযযাবকে সেই পত্র হস্তান্তর করলেন। হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার বহন করে আনা পত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার সৌভাগ্যের পরিবর্তে ভণ্ড মুসাইলামা হিংসা-বিদ্বেষ ও অহমিকায় ফেটে পড়ে। এমনকি তার ফর্সা মুখমণ্ডল বিশ্বাসঘাতকতা, নাশকতা ও পাপাচারের কালিমায় আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে।
সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দূত হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে বন্দী করে পায়ে শৃঙ্খলাবদ্ধাবস্থায় পরের দিন দ্বিপ্রহরে গণ-আদালতে তার সামনে উপস্থিত করার নির্দেশ দেয়। মুসাইলামাতুল কাযযাব গণ-আদালত-এর সভাপতির আসনে সমাসীন হয়ে তার ডান ও বামপার্শ্বে মুরতাদদের দুই জল্লাদকে নিয়োজিত করে করে। সেখানে যথাসময়ে হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে উপস্থিত করা হয়। বন্দী বেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দূত হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা দু' পায়ে শৃঙ্খলাবদ্ধাবস্থাতে শান্ত ও নির্ভীকচিত্তে ধীরগতিতে অগ্রসর হতে থাকেন। হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনhuমা বলিষ্ঠ ঈমানী চেতনা ও সাহসী মনোবলসহ গণ-আদালতে এসে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে গেলেন। ভয়ভীতিহীন যেন এক লৌহমানব। যে কোনো পরিস্থিতির উত্তরের জন্য নির্বিকার। তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মুসাইলামাতুল কাযযাব জিজ্ঞাসা করল :
'তুমি কি মুহাম্মদকে আল্লাহর রাসূল হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান কর?'
তিনি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন:
'হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।'
মুসাইলামাতুল কাযযাব তাঁর এ উত্তরে রাগে ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে আবার জিজ্ঞাসা করে:
'আমি যে আল্লাহর রাসূল তা কি তুমি স্বীকার কর?'
এবার হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা উপহাসের ভঙ্গিতে তাকে জবাব দিলেন:
'তুমি যা বলছো তা আমি শুনতে পাচ্ছি না। কী বলতে চাও স্পষ্ট করে বল।'
আর যায় কোথায়, রাগে ও ক্ষোভে মুসাইলামার চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেল। তার ঠোঁট কাঁপতে থাকল। সঙ্গে সঙ্গে জল্লাদকে নির্দেশ দিল:
'তার দেহের একাংশ কেটে ফেল। সাথে সাথে জল্লাদ তরবারির আঘাতে তাঁর দেহের একাংশ কেটে ফেলল।'
কর্তিত অংশটুকু মাটিতে ছিটকে পড়ে লাফাতে লাগল। পুনরায় মুসাইলামাতুল কাযযাব তাকে একই প্রশ্ন করল :
'তুমি কি মুহাম্মদকে আল্লাহর রাসূল হিসেবে সাক্ষ্য দাও?'
হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা জবাব দিলেন:
'হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।'
অতঃপর সে বলল:
'আমাকেও কি আল্লাহর রাসূল হিসেবে তুমি স্বীকার করো?'
হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা উত্তর দিলেন:
'আমি তো তোমাকে বলেছি, তুমি যা বলছো তা আমি শুনতে পাচ্ছি না। কেননা, আমার কানে বধিরতা দেখা দেয়।'
এবারও সে হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার দেহের আরেকটি অংশ কেটে ফেলতে জল্লাদকে নির্দেশ দেয়। নির্দেশ পাওয়ামাত্রই জল্লাদ তাঁর আরেকটি অংশ কেটে ফেলে এবং সেটি পূর্বোক্ত অংশের পাশেই ছিটকে পড়ে লাফাতে লাফাতে নিথর হয়ে গেল। লোকজন বিস্মিত দৃষ্টিতে তা দেখছিল। এভাবেই মুসাইলামাতুল কাযযাব হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছিল। আর তিনিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন আর মুসাইলামাতুল কাযযাবও তাঁর দেহ থেকে এক এক অংশ কেটে ফেলার নির্দেশ দিচ্ছিল। তাঁর দেহের অর্ধাংশ টুকরো টুকরো হয়ে মাটির ওপর পতিত হলো। আর তিনি অবশিষ্ট কর্তিত দেহে উচ্চারণ করে যাচ্ছিলেন 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ'।
যে শিশু বালক তাঁর আম্মা-আব্বার সাথে আকাবার গভীর রজনীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে হাত মিলিয়ে বায়'আত করেছিলেন, যৌবনে পদার্পণ করে সে সাক্ষ্যেরই দাবি পূরণে তাঁর দু'ঠোঁটে 'ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ' উচ্চারণ করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং তাঁর পবিত্র আত্মা ইল্লিয়্যীনের পথে দেহ থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করে। শাহাদাতের সংবাদ বহনকারী বার্তাবাহক তাঁর মা নুসাইবা আল মাযনিয়াহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার শাহাদাতের সংবাদ জানালে তিনি একান্তই শান্তচিত্তে উত্তর দেন:
'এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে শাহাদাত বরণ করার লক্ষ্যেই তাঁকে প্রস্তুত করে তুলেছিলাম। আল্লাহর নিকট অবশ্যই সে পুরস্কৃত হবে। শৈশবে আকাবার রজনীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে যে বায়'আত সে করেছিল... বড় হয়ে তা পূরণ করল। আল্লাহ যদি তাওফীক দেন, তাহলে মুসাইলামাতুল কাযযাবকে বর্শার আঘাতে হত্যা করে তার প্রতিশোধ নেব ও তার সন্তানদেরকে তার মৃত্যুতে মাতম করিয়ে ছাড়ব।'
নুসাইবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার এ আশা পূরণ হতে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হলো না। মদীনায় আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পক্ষ থেকে ভণ্ড নবী মুসাইলামা ও ইসলাম ত্যাগীদের বিরুদ্ধে জিহাদের আহ্বান জানানো হলো। মুসলমানরা চরম উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভণ্ড নবীর শিরশ্ছেদ করার জন্য জিহাদে অংশগ্রহণ করতে লাগল। সে বাহিনীতে নুসাইবা আল মাযনিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাসহ তাঁর বড় ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাও অংশগ্রহণ করেন। মুসাইলামাতুল কাযযাবের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের এক চরম সন্ধিক্ষণে বর্শা হাতে নুসাইবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা দুঃসাহসী সিংহীর মতো শত্রুবাহিনীর কাতার ভেদ করে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছিলেন, আর উচ্চৈঃস্বরে বলছিলেন:
'কোথায় সেই আল্লাহর দুশমন মুসাইলামাতুল কাযযাব? কোথায় সেই আল্লাহর দুশমন? আমাকে বলে দাও কোথায় সে?'
পরিশেষে, নুসাইবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বর্শা হাতে যখন মুসাইলামাতুল কাযযাবের নিকট পৌঁছলেন, ততক্ষণে মুসলমানদের বর্শা ও তরবারি ভণ্ডনবী মুসাইলামাকে রক্তে রঞ্জিত করে জাহান্নামের অতল গহবরে নিক্ষেপ করেছে। মুসাইলামাতুল কাযযাবের ভূলুণ্ঠিত রক্তাক্ত লাশ দেখে সন্তানের প্রতিশোধের জ্বালা নিবারণ ও চক্ষুদ্বয়কে শান্ত করলেন তিনি। কেন করবেন না? আল্লাহর দুশমন পাপিষ্ঠ ভণ্ডের হাতে তাঁর আল্লাহভীরু নেক সন্তান জীবন দিয়েছেন। তার প্রতিশোধ আল্লাহ নিবেন না? হ্যাঁ, অবশ্যই নিবেন। উভয়েই তাদের রবের দরবারে পৌছে গেছে। তবে পার্থক্য এই যে, একজনের স্থান হলো জান্নাতে এবং আরেকজনের জাহান্নামে।
টিকাঃ
১. উসদুল গাবাহ: ১ম খণ্ড, ৪৪৩ পৃ. অথবা তরজমা অংশ: ১০৪৯ নং.
২. আনসাবুল আশরাফ: ২৫০ ও ৩২৫ পৃ.
৩. আত তাবাকাতুল কুবরা: ৪র্থ খণ্ড, ৩১৬ পৃ.
৪. আস সীরাতুন নুবুবিয়াহ লি ইবনি হিশাম সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৫. আল ইসাবা: ১ম খণ্ড, ৩০৬ পৃ. অথবা আত তারজামা ১৫৮৪ নং.
৬. শুহাদা-উল-ইসলাম ফী আহদিন নুবুওয়াহ লিন্ নাশার.
📄 আবু তালহা আল আনসারী (রাঃ)
‘উম্মু সুলায়মকে দেওয়া আবু তালহার মহরের মতো এত উত্তম মহর আর আমরা দেখিনি। তার মহর ছিল ইসলাম।’
- মদীনার মুসলিম রমণীদের উক্তি
যায়েদ ইবনে সাহল আন নাজ্জারী তাঁর স্বগোত্রে আবূ তালহা নামে পরিচিত ছিলেন। রুমাইছা বিনতে মিলহান (যাকে উম্মু সুলায়ম নামে ডাকা হতো) তাঁর স্বামীর মৃত্যুতে বিধবা হলে এ সংবাদকে আবূ তালহা অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ বলে গ্রহণ করল। প্রকৃতপক্ষে তাতে অবাক হওয়ারও কিছু ছিল না। কারণ, উম্মু সুলাইম (রা) জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, নৈতিকতা ও চারিত্রিক গুণাবলির দিক দিয়ে ছিলেন নেত্রীস্থানীয় মহিলা। এমন গুণে গুণান্বিত মহিলার দিকে কার না দৃষ্টি পড়ে? সুতরাং সঙ্গত কারণেই আবূ তালহা অন্য কোনো প্রস্তাব আসার পূর্বেই তার প্রস্তাব পেশ করাকে সর্বোত্তম মনে করল। আবূ তালহার বিশ্বাস ছিল, উম্মু সুলাইম তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে অন্য কারো প্রস্তাবে রাজি হতে পারেন না। কারণ, ধন-সম্পদে, জ্ঞানে-গুণে, সামাজিক মান-মর্যাদায় ও সুস্বাস্থ্যের দিক দিয়ে সে সুপুরুষই শুধু নয়; বরং সে নাজ্জার গোত্রের শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী ও ইয়াসরিবের দক্ষ তীরন্দাযেরও অন্যতম।
সে ধরে নিল, তার মতো এমন এক ব্যক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কোনো কারণ নেই এবং তা হতেও পারে না। আবূ তালহা অনেক চিন্তা-ভাবনা করে উন্মু সুলাইমের বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো; কিন্তু পথে এক 'দুঃসংবাদ' তাঁর কানে এল। উম্মু সুলাইম মক্কা থেকে আগত দাঈর ডাকে সাড়া দিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান এনেছেন ও পিতৃধর্ম পৌত্তলিকতা পরিত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কিছুক্ষণ এ সংবাদের ওপর চিন্তা করল, তারপর বলল:
'তাতে এমন কী আসে-যায়? তাঁর মরহুম স্বামীও তো ইসলাম গ্রহণ না করে পিতৃধর্মের অনুসারী হিসেবেই উম্মু সুলাইমের সাথে ঘর-সংসার করেছে। আমিও তো তা করতে পারি।'
হিসেবে এই যোগ-বিয়োগ করতে করতে আবূ তালহা উম্মু সুলাইমের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলে এবং উম্মু সুলাইমের সাক্ষাৎপ্রার্থী হলে আবু তালহাকে সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়া হলো। উম্মু সুলাইম এবং তার ছেলে আনাসের উপস্থিতিতে আবূ তালহা উম্মু সুলাইমের কাছে প্রস্তাব পেশ করলে উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা উত্তরে বললেন:
'আবূ তালহা! আপনার মতো ব্যক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা যায় না। কিন্তু যেহেতু আপনি একজন কাফির এবং আমি একজন মুসলমান সে জন্য আমি আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি না।'
উত্তর শুনে আবূ তালহা ভাবতে লাগল:
উম্মু সুলাইম হয়তো আমার চেয়ে বেশি ধনাঢ্য ও ক্ষমতাবান কোনো ব্যক্তিকে কথা দিয়ে ফেলেছেন। তাই এই খোঁড়া অজুহাতের মাধ্যমে আমাকে বিদায় দিতে চাচ্ছেন।'
এসব চিন্তা-ভাবনা করে সে বলল:
'হে উম্মু সুলাইম! আল্লাহর শপথ! আমার প্রস্তাব গ্রহণের পথে এটি কোনো কারণ নয়।'
উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বললেন:
'তাহলে আমার সামনে বাধা কী বলে আপনি মনে করেন?'
আবূ তালহা বলল:
'সোনা, চাঁদি, হীরা-জাওহার ইত্যাদির প্রাচুর্যই হয়তো বা!'
উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বিস্ময়ের স্বরে বললেন:
'সোনা-চাঁদি?'
আবূ তালহা বলল : 'মনে হয়, তা-ই।'
উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বললেন : 'আবূ তালহা আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাক্ষী রেখে স্পষ্ট ভাষায় বলছি, 'আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তাহলে সোনা-চাঁদি ছাড়াই আপনাকে আমি স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি আছি। আপনার ইসলাম গ্রহণকেই আমার মহর হিসেবে গণ্য করা হবে।'
উম্মু সুলাইমের এ উত্তর শোনামাত্রই চন্দন কাঠের তৈরি রং- রওশন করা তার সেই মূর্তির পা মনে পড়ল, যে মূর্তিকে অন্যান্য আরব নেতাদের ন্যায় নিজের পূজা-অর্চনার জন্য পরম ভক্তির সাথে সংরক্ষণ করে আসছিল। ভাবল, আমি যদি মুসলমান হয়ে যাই, তাহলে এই দেবতার কী হবে? উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বুঝতে পারলেন, আবূ তালহা কী ভাবছে! এই সুযোগকে কাজে লাগালেন উম্মু সুলাইম।
তিনি বললেন : 'আবূ তালহা! একবার কি চিন্তা করে দেখেছেন যে, আল্লাহকে ছাড়া আপনি যে দেবতার পূজা-অর্চনা করছেন, তা মাটি থেকে উৎপাদিত একটি বৃক্ষের অংশ ছাড়া আর কিছুই নয়?'
আবূ তালহা বলল : 'হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন।'
উম্মু সুলাইম বললেন : 'আপনার কি এখনো লজ্জা হচ্ছে না?'
আপনি এমন একটি কাষ্ঠফলকের পূজা করে যাচ্ছেন, যার একাংশকে আপনি নিজের জন্য প্রভু হিসেবে তৈরি করে নিয়েছেন। আর অপরাংশকে অন্য কেউ রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে। আবু তালহা! আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তাহলে আপনাকে আমি স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। ইসলাম গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কিছুই আমি আপনার নিকট থেকে মহর হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নই।
আবু তালহা বলল: 'কে আমাকে ইসলামে দীক্ষিত করবে?'
উম্মু সুলায়ম বললেন: 'আমিই এ কাজের জন্য যথেষ্ট।'
আবু তালহা বলল: 'কিভাবে?'
উম্মু সুলাইম বললেন: 'সত্যের সাক্ষ্য দিন এবং বলুন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং এও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।' অতঃপর বাড়ি ফিরে মূর্তিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলুন!
আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করলে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামের বিধি মোতাবেক উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা তাকে বিয়ে করলেন। মুসলমান রমণীগণ বলতে শুরু করলেন, উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহার মহরের মতো এত সম্মানজনক ও গৌরবময় মহরের কথা আর আমরা কখনো শুনিনি, যিনি তাঁর পুরো মহরকেই ইসলামের জন্য কুরবানী করে দিয়েছেন। ইসলাম গ্রহণের দিন থেকে আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ইসলামের বিজয়ের জন্য তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে আল আকাবায় বায়'আত গ্রহণকারী ৭০ জন সাহাবীর মধ্যে তাঁর স্ত্রী উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা সহ তিনিও একজন ছিলেন। ইয়াসরিবে মুসলমানদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বারো জন নকীব বা দায়িত্বশীল নিযুক্ত করেছিলেন আবু তালহা তাঁদের একজন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধে শত্রুপক্ষ দ্বারা চরম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ত্যাগ ও কুরবানীর নজির স্থাপন করেন। উহুদ যুদ্ধে তিনি যে পরীক্ষার সম্মুখীন হন, তা সত্যিই তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা। সে ঘটনাটি হলো:
আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভালোবাসতেন। তাঁর প্রতিটি রক্তকণা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেমে তরঙ্গায়িত হতো। যত বারই তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে তাকাতেন, তত বারই তিনি তৃষ্ণার্ত থেকে যেতেন। যত বারই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা শুনতেন, তার শ্রবণ-ক্ষুধা আরও বৃদ্ধি পেত। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতেন:
'আমার জীবন আপনার জন্য নিবেদিত। আমার সম্মান আপনার সম্মান ও সুখ্যাতির জন্য কুরবান হোক।'
উহুদ যুদ্ধের এক পর্যায়ে যখন মুসলিম যোদ্ধারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অরক্ষিত রেখে তাদের বিজয় সুনিশ্চিত ভেবে গনীমতের মাল আহরণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন মুশরিকরা চতুর্দিক থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রচণ্ড আক্রমণের এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি পবিত্র দাঁত ভেঙে যায় এবং তাঁর পবিত্র চেহারা আহত ও রক্তাক্ত হয়ে পড়ে। ঠোঁট আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং মুখমণ্ডলে রক্তের ধারা বইতে থাকে। শত্রুপক্ষ থেকে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে, মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন। মুসলমানদের ক্ষণিকের বিজয় মুহূর্তের মধ্যেই পরাজয়ের রূপ নেয় এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হত্যার সংবাদে মুসলমানরা শুধু মুষড়েই পড়েননি; বরং আল্লাহর দুশমন শত্রুবাহিনীর দিকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে থাকেন। এই চরম সন্ধিক্ষণে যে কয়েকজন জানবায সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে ছিলেন, আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আন্হু তাঁদের অন্যতম। আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে যান। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শত্রুবাহিনীর নিক্ষিপ্ত তীর ও বর্শার আঘাত থেকে হেফাযত করতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করতে আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শত্রুক্রবাহিনীর দিকে লক্ষ্য করে এমন দ্রুতগতিতে তীর নিক্ষেপ আরম্ভ করেন যে, প্রতিটি তীর শত্রুবাহিনীর এক একজনকে ধরাশায়ী করতে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পেছনে অবস্থান নিয়ে উঁচু হয়ে নিক্ষিপ্ত তীরের লক্ষ্যবস্তুর প্রতি প্রত্যক্ষ করছিলেন। কিন্তু আবূ তালহা তাঁর পিছনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশ্রয় গ্রহণের অনুরোধ করছিলেন এই বলে যে:
'আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক, ওদের দিকে উঁচু হয়ে তাকাবেন না। শত্রুবাহিনীর বর্ষিত তীর আপনাকে আঘাত হানতে পারে। আমার বক্ষ আপনার বক্ষের জন্য এবং আমার শির আপনার সম্মানের জন্য নিবেদিত। আমি নিজেকে আপনার জন্য কুরবান করে দিয়েছি, যেন আপনার ওপর কোনো আঘাত না আসে।'
ইতোমধ্যেই মুসলমান বাহিনীর এক যোদ্ধা তীরের এক বোঝা নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উচ্চৈঃস্বরে ডেকে বলতে লাগলেন:
انْتُرْ سِهَامَكَ بَيْنَ يَدَى أبي طَلْحَةَ وَلا تَمْضِ بها هاربًا.
'তীরের বোঝাটা আবূ তালহার সামনে রাখো, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিও না।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হেফাযতে আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন। এ যুদ্ধে তাঁর তিন তিনটি ধনুক ভেঙে যায়। তিনি শত্রুবাহিনীর উল্লেখযোগ্য যোদ্ধাদের নিধন করেন। আস্তে আস্তে যুদ্ধ থেমে যায়। আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করেন। আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কুরবানীকে সত্যিকার কুরবানী হিসাবে গ্রহণ করা হয়। যুদ্ধের সংকট সন্ধিক্ষণে যেমন আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন একজন বীর যোদ্ধা, তেমনি দাতা হিসেবেও ছিলেন তিনি একজন শ্রেষ্ঠ দানবীর। মদীনায় সুপেয় শীতল পানি ও উন্নত ফলজ বৃক্ষ সমৃদ্ধ সুবিশাল দুটি বিরাট আঙ্গুর ও খেজুরের বাগান ছিল তাঁর।
অপূর্ব সৌন্দর্যঘেরা খেজুর বাগানে মৃদু বাতাসে খেজুর শাখাগুলো ঝিরঝির শব্দে হালকাভাবে দুলছে। তারই শীতল ছায়ায় একদিন আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নামায আদায় করছিলেন। সে সময় লাল ঠোঁট, রঙিন পা ও সবুজ রঙের একটি সুন্দর পাখি তার নামাযের একাগ্রতায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করল। পাখিটি গাছের ডালে নেচে নেচে মধুর সুরে গান গাইছিল। সুন্দর এই পাখিটির স্বাধীন ও মুক্ত বিচরণ আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নামাযের একাগ্রতাকে নষ্ট করল। মনটা ফিরে এলে তিনি ক'রাকাআত নামায পড়েছেন, তা আর মনে করতে পারলেন না। এই ঘটনা তাঁকে মর্মাহত করল। তিনি অন্য চিন্তা-ভাবনা করতে বাধ্য হলেন। নামায শেষে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে এই সাজানো বাগানের বিবরণ এবং সুন্দর পাখিটি কিভাবে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে নামাযে তাঁকে অন্যমনস্ক করে তোলে এ সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা দেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনাকে সাক্ষী রেখে এই বাগানকে আল্লাহর পথে দান করছি। আল্লাহ ও আপনার পছন্দনীয় পথে এই বাগানের ব্যবহার করুন।'
তাঁর সম্পর্কে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর তিনি ৩০ বছর জীবিত ছিলেন। বছরে যে ক'দিন রোযা রাখা নিষিদ্ধ সে ক'দিন ছাড়া তিনি সারা বছর রোযা রাখতেন। তিনি বৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে ছিলেন যে কোনো যুবকের মতো উদ্যমী ও সক্রিয়। দীনের দাওয়াতে দূর-দূরান্তে গমন এবং জিহাদে অংশগ্রহণ থেকে তাঁকে কেউ বিরত রাখতে পারেনি। উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সময় মুসলিম বাহিনী যখন সমুদ্রপথে জিহাদের উদ্যোগ গ্রহণ করে, আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু একজন যোদ্ধা হিসেবে তাতে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তাঁর এ প্রস্তুতি দেখে তাঁর ছেলেরা তাঁকে বললেন:
'হে আমাদের পিতা! আপনার ওপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক। আশির উপর আপনার বয়স। জীবনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবূ বকর সিদ্দীক ও উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জিহাদ করেছেন। এখন কি একটুও আরাম করবেন না? আমাদের অনুমতি দিন, আপনার পক্ষ থেকে আমরাই জিহাদে অংশ নিই।'
আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন:
انْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا.
'তোমরা যে কোনো অবস্থাতেই থাকো না কেন, জিহাদের জন্য বের হয়ে পড়ো।'
এ বাক্যের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জিহাদে অংশ গ্রহণের কথা বলেছেন। বৃদ্ধ ও যুবক সবাই এ আদেশের অন্তর্ভুক্ত। জিহাদে অংশগ্রহণ করার জন্য আল্লাহ বয়সের কোনো সীমারেখা নির্ধারণ করেননি। ছেলেদের অনুরোধ উপেক্ষা করেই তিনি জিহাদে বের হয়ে পড়লেন।
অশীতিপর বৃদ্ধ আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সৈনিক বেশে যখন মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে জাহাজে উঠলেন, তখন তাঁকে খুবই উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। জাহাজটি যখন মধ্য সমুদ্রে, তখন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অসুখেই তিনি ইনতিকাল করেন। মুসলিম বাহিনী আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দাফন করার জন্য দ্বীপের সন্ধান করতে থাকে। এক সপ্তাহ পর একটি দ্বীপের সন্ধান পাওয়া গেল। এই এক সপ্তাহে আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মরদেহের বিন্দুমাত্রও পরিবর্তন ঘটেনি। তা এমনভাবে শায়িত ছিল, মনে হচ্ছিল যে, তিনি ঘুমের মধ্যে রয়েছেন। গভীর সমুদ্রের মাঝে এক দ্বীপে সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও জন্মভূমি থেকে দূরে, বহু দূরে...। আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দাফন করা হলো। তাতে তাঁর কোনো আফসোস নেই। কেননা, তখন তিনি আল্লাহর নিকটে পৌঁছেছেন। যেহেতু আল্লাহর নৈকট্য লাভই তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, তাই এতে তাঁর পরিবার-পরিজনেরও কোনো আফসোস বা দুঃখ-ব্যথা নেই।
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ১ম খণ্ড, ৫০৬ পৃ.
২. উসদুল গাবাহ (আত তারজামা): নং ১৮৪৩.
৩. আল ইসতিয়াব: ১ম খণ্ড, ৫৪৯ পৃ. টীকা দ্রষ্টব্য.
৪. আত তাবাকাতুল কুবরা: ৩য় খণ্ড, ৫০৪ পৃ.
৫. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১ম খণ্ড, ১৯০ পৃ.
৬. তাহযীবুত তাহযীব: ৩য় খণ্ড, ৪১৪ পৃ.
৭. তারীখুত তাবারী: ২য় খণ্ড, ৬১৯ পৃ., ৩য় খণ্ড, ১২৪, ১৮১ পৃঃ, ৪র্থ খণ্ড, ১৯২ পৃ.। দারুল মাআরিফ সংস্করণ, ১০ম খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৮. তাহযীব ইবনে আসাকির: ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৪ পৃ.
৯. আস সীরাতু লি-ইবনি হিশাম সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১০. হায়াতুস সাহাবা: ৪র্থ খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
📄 রামলাহ বিনতে আবু সুফিয়ান (রাঃ)
‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তিনি জীবনের সবকিছুর ওপর প্রাধান্য দান করেন। অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হতে মানুষ যেমন অপছন্দ করে, তেমনি তিনি পৌত্তলিকতায় ফিরে যাওয়াকে অপছন্দ করতেন।’
- ঐতিহাসিকদের উক্তি
মক্কায় আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের প্রচণ্ড দাপট ও একচ্ছত্র প্রতাপ-প্রতিপত্তি। কুরাইশ বংশে তার কঠোর আচরণ ও সীমাহীন নিয়ন্ত্রণের মুখে প্রতিটি ব্যক্তি। এমন কার সাহস যে, তার নির্দেশের সামান্যতম অবাধ্য হয়? তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়? কল্পনাই করা যায় না যে, তার প্রতি মক্কাবাসীর সে কি সীমাহীন আনুগত্য। কিন্তু তারই কন্যা উম্মু হাবীবা, যিনি রামলাহ নামে খ্যাত, সেই লৌহমানব পিতার প্রতিষ্ঠিত প্রভাবকে একেবারেই তুচ্ছ প্রমাণিত করে দিলেন। তিনি ও তাঁর স্বামী উবায়দুল্লাহ ইবনে জাহ্শ তাঁর পিতা আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের দেবতাকে অস্বীকার ও তার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বসলেন। তাঁরা এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনলেন এবং মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের স্বীকৃতি ঘোষণা করলেন।
আবু সুফিয়ান তার প্রচণ্ড প্রভাব-প্রতিপত্তির সবটুকু প্রয়োগ করা সত্ত্বেও কন্যা রামলাহ ও তাঁর স্বামীকে তাদের পৈতৃক ধর্ম পৌত্তলিকতায় ফিরিয়ে আনতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হলো। কন্যা রামলাহর অন্তরে ঈমান যেভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে শেকড় গেড়েছে, পিতা আবু সুফিয়ানের যুলুম-নির্যাতনের ঝড়ো হওয়া তা উপড়ে ফেলতে ব্যর্থ হলো। শুধু তাই নয়, ইসলামকে আরো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকতে তাঁর জিদ বাড়িয়ে দিল এবং সংকল্পকে করল অধিকতর ঈমানী বলে বলীয়ান। কন্যার ঈমানের কাছে পিতার সর্বাত্মক বিরোধিতা পরাভূত হলো। এ ব্যর্থতার গ্লানিময় মুখখানা সে কুরাইশদের কিভাবে দেখাবে, এ প্রশ্নই তার কাছে বড় হয়ে দেখা দিল।
রামলাহ ও তাঁর স্বামীর ওপর আবু সুফিয়ানের ক্ষুব্ধ ও সহিংস প্রতিক্রিয়া অসহনীয় আকার ধারণকালে তাদের মক্কায় বসবাস করা দুর্বিষহ হয়ে উঠল। মক্কার অন্যান্য মুসলমানের ওপরও অব্যাহত নির্যাতন অকল্পনীয় রূপ ধারণ করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অবস্থায় তাঁদেরকে ঈমান রক্ষার স্বার্থে হাবশায় হিজরত করার অনুমতি দিলেন। রামলাহ শিশু কন্যা হাবীবা ও তাঁর স্বামী উবায়দুল্লাহ ইবনে জাহ্শকে সঙ্গে নিয়ে তাদের ঈমানের হেফাযতের তাগিদে নাজ্জাশীর আশ্রয়ে হিজরত করেন। তাঁরাই হিজরতকারীদের প্রথম দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু আবূ সুফিয়ান ইবনে হারব ও কুরাইশদের হাতছাড়া হয়ে রামলাহ ও তাঁর স্বামী এবং মুসলমানরা নিরাপদে হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়ায়) পৌঁছে শান্তির নিঃশ্বাস নেবে, এ ছিল কুরাইশদের জন্য অসহনীয় ব্যাপার।
এ কারণে তারা হাবশায় বাদশাহ নাজ্জাশীর কাছে প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। উদ্দেশ্য ছিল নাজ্জাশীকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তাদের ফেরত আনা। এই কুরাইশ প্রতিনিধি দল খ্রিস্টান বাদশাহ নাজ্জাশীকে এই বলে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে যে, মুসলমানরা ঈসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর মা মারইয়াম আলাইহীস সালাম সম্পর্কে আপত্তিকর কথাবার্তা বলে থাকে। কুরাইশ প্রতিনিধি দলের এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাদশাহ নাজ্জাশী মুহাজির নেতৃবৃন্দকে তাঁর কাছে ডেকে পাঠান। উদ্দেশ্য, ইসলামের নিগূঢ় তত্ত্ব ও আকীদা-বিশ্বাস এবং ঈসা আলাইহিস সালাম ও মারইয়াম আলাইহীস সালাম সম্পর্কে তাদের ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে অবহিত হওয়া। মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ পবিত্র কুরআনের কিছু অংশ তিলাওয়াত করে শোনাতে বলেন বাদশাহ নাজ্জাশী। মুহাজির নেতৃবৃন্দ তাঁর কাছে ইসলামের আকীদা ও হাকীকত সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা পেশ করেন এবং পবিত্র কুরআন মাজীদ থেকে তাঁকে কিছু অংশ তিলাওয়াত করে শোনান। কালামে পাক থেকে তিলাওয়াত শুনে বাদশাহ নাজ্জাশী কেঁদে উঠলেন। সে কান্নায় তাঁর দাড়ি অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠে। তিনি স্বাভাবিক হয়ে মুহাজির নেতাদের বললেন, 'যা কিছু এখন আপনাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর নাযিল করা হচ্ছে এবং যা কিছু ইতঃপূর্বে ঈসা আলাইহিস সালামের ওপর নাযিল করা হয়েছিল, নিঃসন্দেহে উভয়ই একই নূরের উৎস থেকে নাযিলকৃত।' এই বলে বাদশাহ নাজ্জাশী 'লা-শারীক আল্লাহ'র ওপর ঈমান আনার কথা ঘোষণা দেন এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের সাক্ষ্য প্রদানের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলমানদের যারা হাবশায় হিজরত করে এসেছেন, তাদেরকে তিনি আশ্রয় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।
বাদশাহ নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করা সত্ত্বেও তাঁর মন্ত্রিপরিষদ, উচ্চ পদস্থ আমলারা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। তারা খ্রিস্টান ধর্মে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। উম্মু হাবীবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা ভাবলেন, দীর্ঘদিন নানা নির্যাতন ভোগের পর এখন হয়তো একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যাবে। হাবশায় বসবাসের দিনগুলো শান্তিতে কাটবে। কিন্তু তার তাকদীরে এমন ঈমানী পরীক্ষা আরও যে কত আছে, তা কি তিনি জানতেন? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উম্মু হাবীবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে কঠিনতর পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁর জন্য সংরক্ষিত কল্যাণের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সাথে সাথে শুরু হলো কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষা। তিনি আল্লাহর রহমতে উত্তীর্ণ হলেন এ পরীক্ষায়। আল্লাহর এই গোপন ইচ্ছা কোনো মানব সন্তানের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না, যতক্ষণ তিনি তা প্রকাশ না করেন। উম্মু হাবীবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা প্রতিদিনের ন্যায় বিছানায় ঘুমিয়ে পড়লে তিনি স্বপ্নে দেখলেন:
'তাঁর স্বামী উবায়দুল্লাহ ইবনে জাহ্শ গভীর সমুদ্রের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছেন। উত্তাল তরঙ্গমালা তাকে আঘাতের পর আঘাত হানছে এবং সে অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে। কী যে করুণ দৃশ্য...।'
উম্মু হাবীba রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার ঘুম ভেঙে গেল। তিনি ভীত বিহবল হয়ে বসে পড়লেন। দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনাগ্রস্ত অশান্ত মনে ভাবলেন, এ স্বপ্নের কথা তিনি কাউকে বলবেন না, এমনকি তাঁর স্বামী উবায়দুল্লাহকেও না। কিন্তু তিনি এ স্বপ্নের কথা কাউকে না বললেও স্বপ্নের ফলাফল তো বাস্তবায়ন হতেই চলল।
পরের দিন শেষ হতে না হতেই এর ফলাফল প্রকাশ পেল। উবায়দুল্লাহ ইবনে জাহ্শ সে দিনই ইসলাম পরিত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে ও অস্বাভাবিক মদপানে ঝুঁকে পড়ে। মুরতাদ উবায়দুল্লাহ ইবনে জাহ্শ উম্মে হাবীবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার জন্য বিকল্প দুটি প্রস্তাব রাখল। তার যে কোনো একটি গ্রহণ করার স্বাধীনতা দিল তাকে। যার একটি হলো, তালাকের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হওয়া অথবা ইসলাম পরিত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করা। এ প্রস্তাব শোনার পর উম্মু হাবীবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা সুস্পষ্টভাবে দেখলেন, তার সামনে তিনটি পথ খোলা। এ তিনটি পথের যে কোনো একটি তাকে গ্রহণ করতে হবে। যার একটি অপরটির চেয়েও দুর্বিষহ। প্রথম পথটি হচ্ছে:
'তাঁর স্বামীর প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে তাঁর খ্রিস্টান হয়ে যাওয়া। কিন্তু ইসলাম পরিত্যাগ করে মুরতাদ হওয়া তো আদৌ সম্ভব নয়। মুরতাদ হওয়া মানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ত্যাগ করা। এর মানে স্বেচ্ছায় জাহান্নামের আযাবকে কবুল করে নেওয়া।'
উম্মু হাবীবা ধিক্কারের সাথে এ পথ পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে এ সংকল্প ও সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন:
'যদি লোহার চিরুনি দিয়ে আমার হাড় থেকে গোশত আলাদা করা হয়, তাহলেও আমি মুরতাদ হওয়ার পথ বেছে নেব না।'
দ্বিতীয় পথটি তাঁর সামনে ছিল:
'মক্কায় তাঁর পিতার বাড়িতে চলে যাওয়া। যদিও সে বাড়ি এখনও শিরকের মহাদুর্গ। ঈমানী চেতনার বলিষ্ঠ ঘোষণা এল, না! সেখানে ঈমান পরিত্যাগ-এর জন্য অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা অত্যধিক বাড়িয়ে দেওয়া হবে। দীন ইসলাম অনুযায়ী সেখানে জীবন যাপন হবে কঠিনতর।'
এ চিন্তা করে সে পথও তিনি পরিত্যাগ করলেন।
তৃতীয় পথটি ছিল :
'এ পথে নিরাপত্তা আছে; কিন্তু আপনজন ছাড়া এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন আর জীবিকা নির্বাহের প্রশ্নটিও জড়িত।'
তিনি একজন মহিলা, অপারগতা ও সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। নানা আশঙ্কায় শঙ্কিত। অনেক চিন্তা-ভাবনার পর তৃতীয় পথকেই আল্লাহর ওপর ভরসা করে বেছে নিলেন। হ্যাঁ, তিনি বিচ্ছিন্নাবস্থায় হাবশায়ই থাকবেন, যতদিন না আল্লাহ কোনো সুরাহা করে দেন।
আল্লাহর পক্ষ থেকে অবিলম্বে সাহায্য এল। উম্মু হাবীবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হলো না। 'ইদ্দত' পালনের দিনগুলো শেষ হতে না হতেই তাঁর বিপদ কেটে গেল। দুঃখ-কষ্টের এ অমানিশা দূর হয়ে যেন হেরার রোশনীতে তাঁর জীবন-দিগন্ত উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
কোনো এক সকালে হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন 'আবরাহা' নামক বাদশাহ নাজ্জাশীর এক বিশেষ রাজকীয় মহিলা দূত তাঁর দ্বারে অপেক্ষমাণ। মহিলা দূত উম্মু হাবীবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে স্বাগতম জানালেন। ঘরের ভিতরে প্রবেশের অনুমতি পেয়ে তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন এবং সালাম ও কুশল বিনিময়ের পর তাঁর জন্য বহন করে আনা বাদশাহর পয়গাম অবগত করলেন:
'বাদশাহ নাজ্জাশী আপনাকে সালাম জানিয়ে এ সুসংবাদ দিয়েছেন যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে তাঁর জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং বাদশাহকে পত্র মারফত তা অবগত করেছেন।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাদশাহর নিকট যে পত্র পাঠিয়েছেন, তাতে তিনি এ শুভ কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য তাঁকেই তাঁর উকিল নিযুক্ত করেছেন। আপনার পক্ষ থেকে যাকে পছন্দ উকিল নিযুক্ত করুন। রাজকীয় মহিলা দূতের মাধ্যমে এ প্রস্তাব উম্মু হাবীবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং দূতকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকেন:
'হে দূত! এ শুভ সংবাদের জন্য আল্লাহ আপনাকে খুশি করুন...। হে দূত! আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন...।'
প্রত্যুত্তরে দূত বললেন:
'এ শুভ সংবাদের জন্য আল্লাহ আপনাকেও খুশি করুন।'
আনন্দময় এই বাক্য বিনিময়ের পর উম্মু হাবীবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা নিজের দু'হাতের বালা খুলে দূতকে পরিয়ে দিলেন। পায়ের নূপুর দুটিও খুলে দূতকে পরিয়ে দিলেন। তাতেও যেন পরিতৃপ্তি পেলেন না। গলার হার ও কানের দুটি বালি এবং আংটিগুলো খুলে তাকে পরিয়ে বললেন, এ সংবাদে তিনি এতই আনন্দিত হয়েছেন যে, যদি দুনিয়ার সব হীরা, মুক্তা ও স্বর্ণ-রৌপ্যের মালিক তিনি হতেন, তাহলেও আনন্দের আতিশয্যে এ মুহূর্তে তাকে তা দান করে দিতেন। অতঃপর তিনি দূতকে জানিয়ে দিলেন:
'খালিদ ইবনে সাঈদ আল আসকে আমার পক্ষ থেকে উকিল নিযুক্ত করলাম। কারণ, তিনিই এখন আমার একমাত্র নিকটাত্মীয়।'
হাবশার এক পাহাড়ি টিলায় বাদশাহ নাজ্জাশীর রাজকীয় প্রাসাদ। চারদিকের নৈসর্গিক পরিবেশ, অপূর্ব সুন্দর বাগান ও গাছপালা বাদশাহ নাজ্জাশীর রাজকীয় প্রাসাদের শোভা বৃদ্ধি করছে। প্রাসাদটি নানা বর্ণের কারুকার্যখচিত ঝাড়বাতির বর্ণিল আলোয় আলোকিত। মূল্যবান পাথরের তৈরি ঝকমকে মেঝে এবং রাজকীয় সোফা ও গালিচায় সুসজ্জিত বিরাট হলরুমে জা'ফর ইবনে আবী তালিব, খালিদ ইবনে সাঈদ ইবনে আল আস, আবদুল্লাহ ইবনে হুযাইফা আসসাহী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম-এর মতো শ্রদ্ধাভাজন ও সম্মানী সাহাবী নেতৃবৃন্দ এবং হাবশায় উপস্থিত মুহাজির সাহাবীগণ এ অনুষ্ঠানে সানন্দে অংশগ্রহণ করেন। বাদশাহ নাজ্জাশী নিজ ওকালতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে উম্মু হাবীবা বিনতে আবু সুফিয়ানের বিবাহ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন। সম্মানিত উপস্থিতিদের উদ্দেশ্যে বাদশাহ নাজ্জাশী নিম্নোক্ত ভাষণে বলেন:
'মহাপরাক্রমশালী একমাত্র শক্তিধর, পূর্ণ নিরাপত্তা দানকারী, সব দুর্বলতা ও অক্ষমতার ঊর্ধ্বে যার স্থান, তিনি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তাঁরই সমস্ত প্রশংসা জ্ঞাপন করছি এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা প্রভু ও ইলাহ নেই। আমি এও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁরই প্রেরিত রাসূল। ঈসা আলাইহিস সালাম যাঁর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন।'
অতঃপর এই মহান অনুষ্ঠানে তিনি ঘোষণা দেন:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন:
'আবু সুফিয়ানের কন্যা উম্মু হাবীবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার সাথে তাঁকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করিয়ে দেই। তাঁর এ নির্দেশে সাড়া দিয়ে আমি এ বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত হিসেবে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে উম্মু হাবীবার জন্য মহরানাস্বরূপ চারশত স্বর্ণমুদ্রা ধার্য করে এই মহতী অনুষ্ঠানে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর সাথে তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করালাম।'
এই বলে তিনি উম্মু হাবীবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার নিযুক্ত উকিল খালিদ ইবনে সাঈদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সামনে তা পেশ করেন। এরপর খালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর আসন থেকে দাঁড়িয়ে এ মহান অনুষ্ঠানে বাদশাহের ঘোষণার সমর্থনে বলেন:
'সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর, তাঁর কাছে সাহায্য কামনা করছি। তাঁর দরবারেই গুনাহ মাফ চাচ্ছি এবং তাওবা করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই আল্লাহর রাসূল। যাঁকে হেদায়াত ও সত্য ধর্ম বা দীনে হক দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। যিনি কাফির-মুশরিকদের সর্বপ্রকার বিরোধিতা সত্ত্বেও মানবজাতির জীবনবিধান ইসলামকে মানব রচিত সমস্ত জীবন বিধান ও ধর্মের উপর বিজয়ী করেছেন।'
অতঃপর আমার বক্তব্য হলো:
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই মহতী অনুষ্ঠানে উম্মু হাবীবা বিনতে আবূ সুফিয়ানের উকিল হিসেবে আমি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ-এর সাথে তাঁকে বিবাহ দিলাম।'
‘আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর স্ত্রীর ওপর বরকত নাযিল করুন। আল্লাহ উম্মু হাবীবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার জন্য যে কল্যাণ নির্ধারিত করে রেখেছেন তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ।’
এই বলে উম্মু হাবীবার মহরানা বহন করে তাঁকে সোপর্দ করার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁর সঙ্গী-সাথীরাও চলে যাওয়ার জন্য ওঠে দাঁড়ালেন। তৎক্ষণাৎ বাদশাহ নাজ্জাশী তাঁদের উদ্দেশ্যে বললেন:
‘অনুগ্রহপূর্বক বসুন। কারণ, সর্বকালেই নবীদের সুন্নাত হলো বিয়েতে ওয়ালীমার ব্যবস্থা করা।’
আগে থেকেই দাওয়াতের আয়োজন ছিল। মেহমানদের জন্য খাবার পেশ করা হলো। সবাই তৃপ্তি সহকারে পানাহার করে আনন্দের সাথে বিদায় নিলেন।
উম্মু হাবীবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা তাঁর বিবাহোত্তর খুশির বর্ণনা দিয়ে বলেন যে,
‘মহরানার স্বর্ণমুদ্রাগুলো আমার কাছে পৌঁছলে তা থেকে ৫০ মিছকাল বা ৭৫ তোলা স্বর্ণ আমি বিবাহের শুভ সংবাদদানকারিণী ‘আবরাহা’র জন্য পাঠিয়ে দেই এবং তাঁকে বলি যে, বাদশাহর দূত হিসেবে বিয়ের শুভ সংবাদ দানের সাথে সাথে আপনাকে পুরস্কার দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে সময় আমার কাছে কোনো অর্থ ছিল না। ৫০ মিছকাল স্বর্ণ প্রেরণের কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘আবরাহা’ আমার কাছে উপস্থিত হয়ে স্বর্ণমুদ্রাগুলো এবং সাথে করে নিয়ে আসা সুন্দর এক মোড়কে রাখা আমার অলংকারগুলোও আমাকে ফেরত দিলেন, যা আমি তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব শুনে উপহার হিসেবে দিয়েছিলাম।’
তিনি এসব ফেরত দিয়ে বললেন:
বাদশাহ অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন:
‘আমি এসবের কিছুই যেন গ্রহণ না করি।’
বাদশাহ তাঁর স্ত্রীদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন:
তাদের নিকট যত সুগন্ধি রয়েছে তা সবই যেন আপনার খিদমতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
পরের দিন 'আবরাহা' যা'ফরান, নানা রকমের মূল্যবান সুগন্ধি, মিশক-আম্বর ইত্যাদি নিয়ে আবার উপস্থিত হয়ে বলেন: 'আপনার নিকট আমার একটু অনুরোধ।'
জিজ্ঞাসা করলাম: 'সেটা কী?'
তিনি বললেন: 'আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জানিয়ে তাঁকে আমার সালাম জানাবেন। এটা কিন্তু ভুলবেন না। এ কথা বলে আমাকে সাজাতে লেগে গেলেন।'
অতঃপর আমাকে হাবশা থেকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আনা হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাতে বিবাহ প্রস্তাব, আবরাহার সাথে আমার সংলাপ ও ঘটনাবলির বর্ণনা দেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আবরাহার সালাম পেশ করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব শুনে খুবই আনন্দিত হন এবং বলেন: 'আবরাহার ওপরও আমার সালাম এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর।'
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ৪র্থ খণ্ড, ৪৪১ পৃ.
২. আল ইসতিয়াব: ৪র্থ খণ্ড, ৩০৩ পৃ.
৩. উসদুল গাবাহ: ৫ম খণ্ড, ৪৫৭ পৃ.
৪. সিফাতুস সাফওয়াহ: ২য় খণ্ড, ২২ পৃ.
৫. আল মাআরিফ লি-ইবনি কুতাইবা: ১৩৬ ও ৪৪০ পৃ.
৬. সিয়ারু আলামুন নুবালা.
৭. মিরআতুল জিনান লিল ইয়াফেয়ী.
৮. আস্ সীরাতুন নুবুবিয়াহ লি-ইবনি হিশাম (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য).
৯. তারীখুত তাবারী: (১০ম খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য).
১০. তাবাকাত ইবনে সা'দ: (৮ম খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য).
১১. তাহযীবুত তাহযীব লি-ইবনি হাজার.
১২. হায়াতুস সাহাবা: (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য).
১৩. আলামুন্ নিসা লিকাহালাহ: ১ম খণ্ড, ৪৬৪ পৃ.