📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান (রাঃ)

📄 হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান (রাঃ)


তোমাদের জন্য হুযাইফা (রা) যা বর্ণনা করে, তা বিশ্বাস করো এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) যেভাবে কুরআন তিলাওয়াত করে, তোমরা সেভাবে কুরআন তিলাওয়াত করো।
-রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণী

'তুমি যা পসন্দ কর, মুহাজির হিসেবেও পরিচয় দিতে পার, আর যদি আনসার হিসেবে পরিচয় দিতে চাও, তাও দিতে পার। এই দুটির মধ্যে যে পরিচয় তোমার কাছে বেশি পছন্দনীয়, সেই পরিচয়েই নিজের পরিচয় দাও।'

ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁর পরিচয়ের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপরিউক্ত কথাগুলো বলেন।

মুসলমানদের সবচাইতে সম্মানিত দুই গোষ্ঠীর মধ্যে যে কোনো এক গোষ্ঠীর পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার মূলে রয়েছে একটি ঘটনা। ঘটনাটি হচ্ছে, হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পিতা আল ইয়ামান মক্কা নগরীর বনূ আব্স গোত্রের সদস্য। কোনো কারণে একজনকে হত্যা করার অপরাধে মক্কা থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সে ইয়াসরিবে গিয়ে আবদে আশহাল গোত্রে আশ্রয় নেয়। সেই গোত্রেই বিয়ে করে। তাদের সাথেই আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ হয়। সেখানেই তাঁর পুত্র হুযাইফা জন্মগ্রহণ করে। এই প্রবাস জীবনের এক পর্যায়ে আল ইয়ামানের ওপর থেকে মক্কা প্রবেশের বাধা-নিষেধ তুলে নেওয়া হয়। তখন থেকেই সে মক্কায় আসা-যাওয়া শুরু করে। তার মদীনায় অবস্থানকালই ছিল দীর্ঘ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় হিজরত করার পূর্বেই ইসলামের আলোকে আরব ভূমি আলোকিত হয়ে ওঠে। তখন হুযাইফার পিতা আল ইয়ামানের নেতৃত্বে আবদ আশহাল গোত্রের আরো এগারো জন সদস্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য মক্কায় আসেন এবং তাঁর সঙ্গে দেখা করে ইসলাম গ্রহণ করেন। এ কারণে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মদীনায় প্রতিপালিত মাক্কী সন্তান হিসেবে পরিচিত হন।

হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসলিম পিতামাতার যত্নে ইসলামী পরিবেশে প্রতিপালিত হতে থাকেন। এ পরিবারের সদস্যরা ইসলামের প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণের গৌরবে গৌরবান্বিত ছিলেন। শিশু হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে না দেখেই পিতামাতার সংস্পর্শে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক নজর দেখে মনে শান্তি পাওয়ার জন্য শিশু সাহাবী হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মনে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি হয়। পিতামাতার কোলে ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো আলোচনা হলেই অদম্য আগ্রহে তাঁকে খুঁজতে থাকতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তিনি পিতা-মাতাকে নানা প্রশ্ন করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর এই আগ্রহ ক্রমেই বাড়তে থাকে। বাধ্য হয়েই আল ইয়ামান শিশু হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাৎ লাভ করানোর জন্য মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। মক্কায় পৌছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ হলে শিশু সাহাবী হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করেন:

'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি মুহাজির না আনসার?'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন:
'তুমি যা চাও, মুহাজির হিসেবেও পরিচয় দিতে পার, আর যদি আনসার হিসেবে পরিচয় দিতে চাও তাও দিতে পার। এ দুটির মধ্যে যে পরিচয় তোমার কাছে বেশি পছন্দনীয়, সে পরিচয়েই নিজের পরিচয় দাও।'

উত্তরে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি বরং আনসার হিসেবে পরিচিত হতে চাই।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় হিজরত করেন, তখন হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্যে সর্বক্ষণ লেগে থাকেন। তিনি এক মুহূর্তও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দূরে যেতেন না। শুধু বদরের যুদ্ধ ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার পেছনে একটা ঘটনা রয়েছে। তিনি নিজেই সে ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেন:

'বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার পিছনে কারণ হলো, আমি ও আমার পিতা মদীনার বাইরে ছিলাম। সে সময় আমরা কুরাইশদের হাতে বন্দী হই।

জিজ্ঞাসাবাদকালে তারা বলে যে:
'তোমরা কোথায় কী উদ্দেশ্যে যাচ্ছো?'

আমরা উত্তর দিলাম :
'মদীনার উদ্দেশ্যে।'

তারা প্রশ্ন করল :
'হ্যাঁ, তোমরা মুহাম্মদের পক্ষ নিয়ে তার শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যাচ্ছ?'

আমরা উত্তর দিলাম:
আমরা শুধু মদীনার উদ্দেশ্যেই রওয়ানা হয়েছি। তারা কোনোক্রমেই এই কথা বিশ্বাস করতে চাচ্ছিল না, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি না দেই যে, আমরা বদরের যুদ্ধে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করব না। কোনোভাবেই যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মিলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করি, এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে আমাদের ছেড়ে দেয়। মদীনায় পৌঁছে কুরাইশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ঘটনা এবং যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছাড়া পেয়েছি তা বর্ণনা করি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমাদের করণীয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন:

'আমরা তাদেরকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করব এবং তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইব। তাদের শক্তির চেয়ে আল্লাহর শক্তিই বড় শক্তি।'

হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর পিতা আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে উহুদের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শত্রুদের চরম আক্রমণের মুখে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে আল্লাহর রহমতে রক্ষা পান এবং তাঁর পিতা আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু শাহাদাত বরণ করেন। কিন্তু এই শাহাদাত মুশরিকদের তলোয়ারের আঘাতে নয়; বরং মুসলমানদের তলোয়ারের আঘাতের কারণে।

তারও একটা ঘটনা রয়েছে, তা হলো:
উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল ইয়ামান এবং সাবেত ইবনে ওয়াক্স রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে তাদের অতি বার্ধক্যের কারণে মহিলা ও শিশুদের সাথে নিরাপদ আশ্রয়ে নির্ধারিত দুর্গে অবস্থান নিতে বলেন। কিন্তু যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করলে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু তার সাথী সাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বলেন:

'সাবেত তুমি কী চিন্তা করছো? আল্লাহর শপথ! আমরা আর কত দিন বাঁচব? বড় জোর গাধার পিপাসা লাগতে যতটুকু সময় লাগে। নিঃসন্দেহে আজ অথবা কাল মৃত্যু আমাদের প্রাণ কেড়ে নেবে সে জন্য নিঃসন্দেহে আমাদের তলোয়ার নিয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ করা উচিত। হতে পারে এ ওসীলায় আল্লাহ তাঁর নবীর সাথে আমাদেরও শাহাদাত দান করতে পারেন।'

অতঃপর উভয়েই তলোয়ার হাতে নিয়ে জিহাদের ময়দানে এসে জিহাদ শুরু করেন। আল্লাহ সাবেত ইবনে ওয়াক্স রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে শাহাদাত নসীব করেন। হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পিতা আল ইয়ামান ভুলবশত মুসলমানদের আঘাতের শিকার হন। কারণ, তারা তাঁকে চিনতেন না। এদিকে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দূর থেকে আমার পিতা, আমার পিতা বলে চিৎকার করতে থাকেন। কিন্তু জীবন-মরণ এই জিহাদে কার কথা কে শোনে। পরিণতিতে বৃদ্ধ সাহাবী তাঁর সাথীদের তলোয়ারের আঘাতের পর আঘাতে ভূমিতে লুটিয়ে পড়েন। হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এই হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্য দায়ী সাহাবীদের উদ্দেশ্যে শুধু এতটুকুই বললেন: 'আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিন। তিনি অসীম করুণাময়।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে তার পিতা আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর 'দিয়াত' বা রক্তের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ফায়সালা করেন। হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেই রক্তের মূল্য নিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে বলেন:
'আমার পিতার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শাহাদাত লাভ। তাঁর সে আশা পূরণ হয়েছে। হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থেকো, আমি আমার পিতার রক্তের মূল্য মুসলমানদের উপঢৌকন দিলাম।'

তাঁর এই বিপ্লবী ভূমিকা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মর্যাদা অত্যধিক বৃদ্ধি করে দেয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তিনটি গুণ পরিষ্কারভাবে পরিস্ফুটিত হয়:

১. কঠিন সমস্যায় সূক্ষ্ম উপস্থিত বুদ্ধি।
২. যে কোনো পরিস্থিতিকে দ্রুত অনুধাবন।
৩. সীমাহীন গোপনীয়তা রক্ষা করার দুর্লভ গুণ।

সাহাবীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, যে সাহাবী যে ধরনের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন, তাকে সেই ধরনের দায়িত্ব অর্পণ করতেন।

মদীনায় মুসলমানগণ ইহুদী ও তাদের অনুচরদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে পড়েন। মুসলমানদের ছদ্মাবরণে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মুনাফিকদের নাম ধরে ধরে পরিচয় করিয়ে দেন। এটা ছিল এমন একটি গোপন বিষয়, যা অন্য সাহাবীরা জানতেন না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের গতিবিধি সম্পর্কে তাঁকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার দায়িত্ব দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে তাদের গোপন ষড়যন্ত্র এবং ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেন। যথাসময়ে যেন তার প্রতিকার করা সম্ভব হয়। সাহাবীগণ এ জন্য হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপন তথ্যের সংরক্ষণাগার বলে ডাকতেন। ইসলামের স্বার্থে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ এবং বিপজ্জনক খিদমতের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর উপস্থিত বুদ্ধি, তীক্ষ্ণ মেধা ও আনুগত্যকে কাজে লাগিয়েছেন।

বিশেষ করে খন্দক যুদ্ধের চরম মুহূর্তে যখন মুসলিম বাহিনী সামনে ও পেছনে উভয় দিক থেকে শত্রুবাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ ছিলেন। দীর্ঘ দিনের এ অবরোধের কারণে পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত অবনতির দিকে যাচ্ছিল। তখন এই কঠিন পরীক্ষায় মুসলমানদের ধৈর্য ও ত্যাগের সীমা অতিক্রম হতে যাচ্ছিল। প্রতিটি মুহূর্তেই বিপদ আপতিত হওয়ার ও হতাশায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এমনকি দুর্বল ঈমানের মুসলমানগণ আল্লাহর সাহায্যের ব্যাপারে নানা মন্তব্য পর্যন্ত করতে শুরু করে। তখন হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন দৃঢ় ঈমানী প্রত্যয়ে প্রত্যয়ী। অন্যদিকে কুরাইশ ও তার সহযোগী বাহিনীদের অবস্থাও মুসলিম বাহিনীর চেয়ে কোনোক্রমেই ভালো ছিল না। তাদের এ দুরবস্থার সময় আল্লাহ তাদের উপর এমন এক গযব নাযিল করেন, যা তাদের মনোবলকে আরও দুর্বল করে দেয়। বিজয়ের আশা দুরাশায় পরিণত হয়। আল্লাহ তাআলা তাদের ঝড়ো হাওয়া দ্বারা বিপর্যস্ত করেন। কুরাইশদের তাঁবুসমূহ লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। বাসনপত্রের এক একটি নানাদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। অনেকগুলো প্রবল বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যায়। তাদের মুখমণ্ডল ধূলিতে আচ্ছাদিত হয়। চোখে ও নাকে-মুখে বালির কণা ঢুকে পড়ে। এই চরম প্রতিকূল ও বিপদসংকুল পরিবেশে তাদের ভাগ্যে পরাজয়কেই ত্বরান্বিত করে। তারা সর্বপ্রথম নিজেদের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। তারা বিশ্বাসী ছিল যে, বিজয় তাদের অনিবার্য। কারণ, আনুগত্যে, নিয়মানুবর্তিতায়, শৃঙ্খলায় ও ত্যাগ স্বীকারে সদা প্রস্তুত ছিল তারা।

কিন্তু এসব দ্বারা আল্লাহর গযব থেকে রক্ষা পাওয়া গেল না। ঠিক সেই মুহূর্তে যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল। বিজয় ছিনিয়ে আনার জন্য গুপ্তচরের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের গোপনীয়তা ও দুর্বল অবস্থা উদ্‌ঘাটন করে সেখানে আঘাত করাই ছিল এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার মতো গুপ্তচরের তীব্র প্রয়োজন দেখা দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কুরাইশ সেনাপতির গতিবিধি ও শত্রুবাহিনীর প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য রাতের গভীর অন্ধকারে শত্রুবাহিনীর অভ্যন্তরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন, যাতে শত্রু বাহিনীর ওপর আঘাত হানার আগে তাদের সঠিক অবস্থা জানতে পারেন।

এ মুহূর্তে আমরা হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নির্ঘাত মৃত্যুর মুখে যাওয়ার ঘটনাটি তাঁর নিজ বর্ণনা থেকেই তুলে ধরছি।

হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
'আমরা সেই ঝড়ের রাতে সারিবদ্ধ হয়ে চৌকসভাবে বসেছিলাম। আবূ সুফিয়ান এবং তার সহযোগী মিত্র বাহিনীর যোদ্ধারা আমাদের সামনে এবং বনু কুরাইযার ইহুদী সম্প্রদায়ের যোদ্ধারা আমাদের পেছনে অবস্থান নিয়েছিল। আমরা তাদের পক্ষ থেকে আমাদের সন্তান ও মহিলাদের ওপর আক্রমণের আশঙ্কা করছিলাম। এ রাতের মতো এমন ভয়াবহ অন্ধকার ও ভীষণ ঝড়-তুফানের রাত আমরা জীবনে আর কখনো দেখিনি। দমকা হাওয়ার শব্দ ছিল কড়কড় বজ্রধ্বনির মতো। আর এর ভয়াবহ অন্ধকার ছিল এমন যে, আমরা কেউ আমাদের হাতের আঙুল পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমাদের মধ্যে অবস্থানরত মুনাফিকরা বিভিন্ন বাহানায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে এই বলে অনুমতি নিচ্ছিল যে, আমাদের বাড়িঘর অরক্ষিত, তাই আমাদের নিজ নিজ ঘরে ফিরে যাওয়া জরুরি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে যুদ্ধ-ময়দান ছেড়ে যেতে অনুমতি দেন। মুনাফিকদের মধ্যে যারাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সবাইকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। এভাবে বিভিন্ন অজুহাতে যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত আমরা মাত্র ৩০০ (তিন শত) জন বা এর কিছু বেশি সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ময়দানে অবশিষ্ট ছিলাম।' মুনাফিকদের যুদ্ধের ময়দান থেকে চলে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক এক করে আমাদের সবারই অবস্থান পর্যবেক্ষণ করার জন্য বের হন এবং আমার কাছে এসে পৌঁছেন। শীতবস্ত্র হিসেবে আমার পরিধানে ছিল আমার স্ত্রীর ওড়না বা চাদর, যা দ্বারা কোনোক্রমে আমার হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঢাকা হয়েছিল। তাছাড়া আর কিছু ছিল না। এ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার একেবারে কাছে এগিয়ে এলেন। আমি তখন হাঁটু গেড়ে বসেছিলাম।

তিনি বললেন: 'তুমি কে?'

আমি বললাম : 'হুযাইফা।'

তিনি বললেন: 'হুযাইফ?'

তখন আমি ভীষণ ঠাণ্ডা ও ক্ষুধায় কাতর হয়ে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিলাম।

আমি বললাম: 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান।'

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কানে কানে বললেন: 'শত্রুবাহিনীর অবস্থান জানা একান্ত দরকার, শত্রুবাহিনীর ভিতর ঢুকে পড় এবং তাদের অবস্থান সম্পর্কে আমাকে অবহিত কর। এ রাতে আমি সবচেয়ে শীত, ক্ষুধায় ও ভীতিতে আক্রান্ত হয়েছিলাম।'

আমার এই অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার জন্য এই দোআ করলেন:
اللَّهُمَّ احْفِظُهُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ عَنْ يَمِينِهِ وَعَنْ شِمَالِهِ وَمِنْ فَوْقِهِ وَمِنْ تَحْتِه .

'হে আল্লাহ! হুযাইফাকে তাঁর সামনে, পেছনে, ডানে, বামে এবং উপর-নিচের যাবতীয় বিপদ-মুসীবত থেকে রক্ষা করো।'

‘আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু'আ শেষ হতে না হতেই আল্লাহ আমার মন থেকে সর্বপ্রকার ভয়-ভীতি ও শরীর থেকে শীতের আড়ষ্টতা দূর করে দিলেন।’

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে বললেন: 'হুযাইফা! খবরদার শত্রুবাহিনীর মধ্যে কিছু করো না, শুধু তাদের তথ্য এনে আমাকে দেবে।'

উত্তরে বললাম: 'জী হ্যাঁ! এই বলে রাতের অন্ধকারে নির্ঘাত মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে শত্রু বাহিনীর মধ্যে সংগোপনে ঢুকে পড়লাম। কিছু দূর অগ্রসর হয়েই দেখি, কুরাইশ সেনাপতি আবু সুফিয়ান তার সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে। সে বলছে:

'কুরাইশদের আমি এ মর্মে সতর্ক করে দিচ্ছি যে, আমরা আশঙ্কা করছি, মুহাম্মদের অনুচররা আমাদের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে। তাই প্রত্যেকেই যেন তার পার্শ্ববর্তী সাথীর প্রতি লক্ষ্য রাখে।'

আমি তৎক্ষণাৎ আমার পাশের ব্যক্তির হাত ধরে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'তোমার নাম কী? সে উত্তর দিল আমি অমুকের পুত্র অমুক।'

অতঃপর আবু সুফিয়ান তার বক্তৃতা অব্যাহত রেখে বলল: 'কুরাইশ ভাইয়েরা! আল্লাহর শপথ! আপনারা নিশ্চয়ই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। আমাদের উট-ঘোড়াগুলো ঝড়ের কারণে মারা গেছে। আমাদের সহযোগী ইহুদী সম্প্রদায় বনু কুরাইযা তাদের কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আমরা প্রচণ্ড শীতে ও তুফানে আক্রান্ত হয়ে পড়েছি। আপনারা এর প্রত্যক্ষ সাক্ষী।'

অতঃপর বলল: 'অতএব যার যা অবশিষ্ট আছে, তাই নিয়ে চলুন আমরা মক্কায় ফিরে যাই। এই বলে সে তার উটের কাছে গিয়ে উটের রশি খুলে তার পিঠে উঠে বসল এবং চাবুক হাঁকিয়ে মক্কার পথে রওয়ানা হলো।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি আমাকে কোনো কিছু করা থেকে বিরত না রাখতেন বা শুধু তথ্য সংগ্রহের জন্য না পাঠাতেন, তাহলে এ সুযোগে আমি আবূ সুফিয়ানকে অবশ্যই হত্যা করতাম। এরপর আমি সেখান থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে এলাম। এ সময় তিনি তাঁর কোনো এক স্ত্রীর চাদর গায়ে জড়িয়ে নামায আদায় করছিলেন। আমাকে দেখে তিনি কাছে ডেকে নিলেন এবং চাদরের একটা অংশ দিয়ে আমাকে আবৃত করলেন। আমি তাঁকে আমার রিপোর্ট পেশ করলে তিনি খুবই আনন্দিত হলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও শুকরিয়া আদায় করলেন।

হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা সারা জীবনই মুনাফিকদের চরিত্র ও পরিচয় নিজের জন্য আমানত রেখে অতিবাহিত করতেন। খলীফাগণ মুনাফিকদের সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাঁর কাছ থেকে জেনে নিতেন। এমনকি উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর অবস্থা ছিল এই যে, কোনো মুসলমান মারা গেলে হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা তার জানাযায় উপস্থিত হয়েছেন কি না তা জিজ্ঞাসা করতেন। যদি উত্তর পেতেন যে, হ্যাঁ তিনি জানাযায় উপস্থিত হয়েছেন, তবেই তিনি জানাযায় ইমামতি করতেন। আর যদি না-সূচক উত্তর পেতেন, তাহলে তাকে মুনাফিক হিসেবে সন্দেহ করতেন এবং তার জানাযার নামায থেকে সরে দাঁড়াতেন। একবার উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে জিজ্ঞাসা করেন: 'তার গভর্নরদের মধ্যে কোনো মুনাফিক আছে কি না?'

তিনি বললেন: 'হ্যাঁ, একজন আছে।'

উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'সে কে তা দেখিয়ে দাও।'

হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন: 'না, আমি তা করতে পারি না।'

হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, অল্প দিনের মধ্যেই উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাকে অপসারণ করেন, যেন সেই মুনাফিকের ব্যাপারে তিনি ইঙ্গিত লাভ করেছেন। সম্ভবত খুব স্বল্পসংখ্যক মুসলমানই একথা জানেন যে, সেনাপতি হিসেবে হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামানই মুসলমানদের জন্য নাহাওয়ান্দ, দাইনাওয়ার, হামাদান এবং রাই শহর বিজয় করেছিলেন। বিজিত শহরগুলোতে আল্লাহর কিতাব আল কুরআন তিলাওয়াতের উচ্চারণের ব্যাপারে মুসলমানরা ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে শতধা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার পর তিনিই আবার তাদেরকে একই তিলাওয়াতের ব্যাপারে ঐকমত্যে আনেন। বহু গুণে গুণান্বিত হওয়া সত্ত্বেও নিজের ব্যাপারে চরম খোদাভীতিই ছিল হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার প্রকৃত গুণ। মৃত্যুশয্যায় রোগ প্রচণ্ড আকার ধারণ করলে রাতের বেলায়ই সাহাবীরা তাঁর কাছে এলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন:

'এটা কোন্ সময়?'

সবাই বললেন:
'একটু পরেই রাত পোহাবে।'

তিনি বললেন:
'এমন সকাল থেকে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই, যা আমাকে দোযখের দিকে নিয়ে যেতে পারে।'

অতঃপর জিজ্ঞাসা করলেন:
'আপনারা কি আমার জন্য কাফন এনেছেন?

তারা বললেন:
'হ্যাঁ।'

তিনি বললেন:
'অধিক মূল্যবান কাফন দেবেন না। কারণ, আল্লাহর কাছে যদি আমি পুরস্কৃত হই, তাহলে এই কাফন পরিবর্তন করে উত্তম পোশাক পরিয়ে দেওয়া হবে। আর যদি বিপরীত অবস্থা হয়, তাহলে এটা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হবে।'

অতঃপর বলতে থাকলেন:
اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَعْلَمُ إِنِّي كُنْتُ أَحِبُّ الفَقْرَ عَلَى الْغِنَى وَأُحِبُّ الدِّلَّةَ عَلَى الْعِزَّ وَأُحِبُّ الْمَوْتَ عَلَى الْحَيَاةِ .

'হে আল্লাহ! তুমি জানো, আমি দারিদ্র্যকে প্রাচুর্যের উপর প্রাধান্য দিয়েছি। নম্রতাকে কঠোরতার চেয়ে এবং মৃত্যুকে জীবনের চেয়ে ভালোবেসেছি।'

তারপর তিনি জীবনের শেষ মনভরা আশা নিয়ে দু'আ করেন:
حَبِيبٌ جَاءَ عَلَى شَوْقٍ، لَا أَفْلَحَ مِنْ نَدِم .

'হে আল্লাহ! তোমার বন্ধু সাক্ষাতের উচ্চ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তোমার দ্বারে হাজির, কিন্তু ত্রুটি-বিচ্যুতিতে জাহান্নামের ভয়ে একান্তই লজ্জিত।'

হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা একজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত বর্ষণ করুন। আমীন।

টিকাঃ
১. আল ইসতিয়াব: ১ম খণ্ড, ২৭৬ পৃ.
২. আল ইসাবাহ: ১ম খণ্ড, ৩১৭ পৃ.
৩. আত তাবাকাতুল কুবরা: ১ম খণ্ড, ২৫ পৃ.
৪. সিযা আলামুন নুবালা: ২য় খণ্ড, ২৬০ পৃ.
৫. তাহযীবুত তাহযীব: ২য় খণ্ড, ২১৯ পৃ.
৬. সিফাতুস সাফাওয়াহ: ১ম খণ্ড, ২৪৯ পৃ.
৭, উসদুল গাবাহ: ১ম খণ্ড, ২৯০ পৃ.
৮. তারীখুল ইসলাম: ২য় খণ্ড, ১৫২ পৃ.
৯. আল মাআরিফ: ১১৪ পৃ.
১০. আন নুজুমুয যাহিরাহ: ১ম খণ্ড, ৭৬, ৮৫, ও ১০২ পৃ.

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 উকবা ইবনে আমের আল জুহানী (রাঃ)

📄 উকবা ইবনে আমের আল জুহানী (রাঃ)


আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার প্রবেশ-দ্বারে এসে পৌঁছলেন। উৎসুক মদীনাবাসী প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথী আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে এক নজর দেখার জন্য ব্যাকুল। তারা ঘরের ছাদে ও উঁচু জায়গায় ভীড় জমিয়ে 'আল্লাহু আকবার' তাকবীরধ্বনির মাধ্যমে মদীনার আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে। তাঁকে এক নজর দেখে চক্ষুদ্বয়কে শীতল করার জন্য রাস্তায় বের হয়ে পড়ে।

মদীনার ছোট ছোট শিশুরা দফ্ হাতে আনন্দের গান গেয়ে গেয়ে নবীজীকে এ ভাষায় অভ্যর্থনা জানাতে থাকে:
أَقْبَلَ الْبَدْرُ عَلَيْنَا مِنْ ثَنِيَّاتِ الْوِدَاع وَجَبَ الشَّكْرُ عَلَيْنَا مَا دَعَا لِلَّهِ دَاع .

'পূর্ণিমার চাঁদ সানিয়াতুল বিদা থেকে উদিত হয়ে আমাদের মাঝে আগমন করেছেন। আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী যতদিন আহ্বান জানাবেন, ততদিন তাঁর আগমনের জন্য আমাদের শোকরগুযারী করা একান্ত কর্তব্য।'

রাস্তার দু'ধারে উৎসুক নারী-পুরুষ ও শিশুরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর কাফেলা ধীরে ধীরে মদীনায় প্রবেশ করছেন। তাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক নজর দেখে অনেকের আনন্দের অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে। ব্যাকুল মন শান্ত ও পরিতৃপ্ত হচ্ছে।

কিন্তু উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাফেলাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য উৎসুক জনতার সঙ্গে যোগ দিতে পারেননি। কারণ, তিনি তাঁর বকরি পালের তত্ত্বাবধানে মদীনা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছিলেন। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় বকরিগুলো যাতে কষ্ট না পায় এ জন্য তিনি সেখানে এ দায়িত্ব পালন করছিলেন। হ্যাঁ, মদীনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনে আনন্দ ও খুশির জোয়ার আসে প্রতিটি ঘরে ঘরে। মদীনার শহর-সীমানা অতিক্রম করে দূর-দূরান্তের বেদুইন তাঁবুগুলোতেও সেই আনন্দ-উৎসবের ঢেউ লাগে। এ আনন্দের বার্তা উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে।

উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কিভাবে সাক্ষাৎ করেন, সেই সাক্ষাতের কাহিনী তাঁর কাছ থেকেই শুনুন।

তিনি বর্ণনা করেন:
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করেন, তখন আমি আমার বকরির পাল চরাতে মদীনা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছিলাম। সেখানেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনায় পৌঁছার সংবাদ পাই। এই শুভ সংবাদ পেয়েই আমি সেখানে বকরির পাল রেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দেখা করার জন্য রওয়ানা হই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমার বাইআত গ্রহণ করবেন?

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: 'তুমি কে?'

আমি উত্তর দিলাম: উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'বাইআত দুই ধরনের। যেমন, বেদুইনদের থেকে বাইআত নেওয়া। এটা স্বাভাবিক বাইআত এবং অপরটি হচ্ছে হিজরতের বাইআত। তোমার জন্য কোন্টি গ্রহণ করব?'

আমি বললাম, বরং হিজরতের বাইআত গ্রহণ করুন!

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার থেকে মুহাজিরদের কৃত বাইআতের মতো বাইআত গ্রহণ করলেন। সেখানে এক রাত কাটিয়ে আমি আমার বকরি পালের জায়গায় ফিরে এলাম।

আমরা এক সঙ্গে বারো জন মদীনা শহর থেকে অনেক দূরে মরু এলাকায় বকরি চরাতাম। আমরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করি। আমরা পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করলাম:
'আমরা যদি ইসলামের বিধি-বিধান শিক্ষার উদ্দেশ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত না হই, তবে আমাদের কোনো কল্যাণ নেই।'

অতএব, আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি যে, প্রতিদিন আমাদের একজন করে মদীনায় যাবে। তার বকরির পাল আমাদের কাছে থাকবে। এভাবে পালাক্রমে আমরা প্রত্যেকেই মদীনায় যাব। আমি বকরি পালনে বেশি আন্তরিক ছিলাম। তাই এ ব্যাপারে অন্যের ওপর আমার আস্থা ছিল না বিধায় তাদেরকে বললাম:
ঠিক আছে, আমিই তোমাদের প্রত্যেকের বকরির পালের দায়িত্ব নিলাম। তোমরা পালাক্রমে একজন করে প্রতিদিনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খidমতে উপস্থিত হও।

এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিদিন খুব ভোরে একজন করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে রওয়ানা হতো। আমি থাকতাম তার বকরির পাল দেখাশোনার দায়িত্বে। সে ফিরে এসে তার বকরির পাল ফেরৎ নিত এবং যা যা শিখে আসত তা আমার কাছে বলতো। তার থেকে আমি ঐসব শিখে নিতাম।

কিন্তু এ পদ্ধতিতে জ্ঞানার্জনে পরিতৃপ্ত হতে পারলাম না। ইসলামী জ্ঞানার্জনের সরাসরি পথই আমি গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়ে পড়লাম। দুনিয়ার মোহমুক্তির পথ তালাশ করতে লাগলাম। ভাবলাম, বকরির পাল চরানো দ্বারা আমি বিত্তবানও হব না, দুনিয়ার মোহে থাকলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতে ও জানতেও পারব না। আমি কুরআনের শিক্ষা সরাসরি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে গ্রহণ না করে তো ভুল করছি। এ ভুল তো করা উচিত হচ্ছে না।

এসব চিন্তা-ভাবনা করে বকরি পালনের দায়-দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে মসজিদে নববীতে আসহাবে সুফফার সাথে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়ে মদীনায় চলে আসলাম।

উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এই কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েননি বা বিচলিত ভাবও দেখাননি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি কাজ শুরু করে দেন।

এ ছিল প্রত্যেকের কাছেই কল্পনাতীত ব্যাপার যে, তিনি মাত্র দশ বছরের মধ্যেই আলিম সাহাবীদের মধ্যে ইলমুল কিরাআতের শীর্ষস্থানীয় ইমাম হবেন। ইসলামের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধসমূহের সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবেন এবং হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন খ্যাতি অর্জনকারী গভর্নরের অন্যতম হিসেবে ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনিই কি এমন ধারণা করতে পেরেছিলেন যে, তিনি তাঁর বকরি পালের দায়িত্ব ছেড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে এমন যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন, যে যোগ্যতা তাঁকে ইসলামী বাহিনীর সেনাপতি পদে উন্নীত করবে? যে দামেস্ককে সেকালে দুনিয়ার সভ্যতা-সংস্কৃতির 'মা' বলা হতো সেই দামেস্কের বিজয়ী হবেন, এ কথা কি তিনি ভাবতে পেরেছিলেন? দামেস্কের প্রবেশপথে 'তুমা' নামক স্থানে মনোরম বাগানে তাঁর আলীশান বাসগৃহ তৈরি করা হবে এবং প্রাচীন সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র মিসর বিজয়ী সেনা-কর্মকর্তাদের অন্যতম সেনা-কর্মকর্তা হবেন এবং পরবর্তী সময়ে মিসরের গভর্নরের পদ অলংকৃত করবেন। প্রসিদ্ধ 'আল মুকাত্তাম' পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় চূড়ার পাদদেশে নিজের জন্য বাড়ি তৈরি করবেন। এ সবই ছিল পর্দার আড়ালে লুক্কায়িত তাঁর সৌভাগ্যের লিখন, যা একমাত্র আল্লাহই জ্ঞাত ছিলেন।

হ্যাঁ, উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত নিবিড় সাহচর্য লাভ করেন। তিনি সারাক্ষণই যেন ছায়ার মতো তাঁর সাথে লেগে থাকতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে যেতেন, তিনিও সেখানেই যেতেন এবং ঘোড়ার লাগাম ধরে থাকতেন। অধিকাংশ সময়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের ঘোড়াটির পিছনে বসিয়ে নিতেন। এত অধিকবার তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে একই ঘোড়ায় আরোহণ করেছেন যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে ঘোড়ায় আরোহণকারী হিসেবেই খ্যাতি লাভ করেন। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো তাঁর ঘোড়া থেকে নেমে হেঁটে চলেছেন আর তাকে ঘোড়ার পিঠেই অবস্থান নিতে বলেছেন। উকবা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করেন:

মদীনার কোনো এক বাগানে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়েছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন:
হে উকবা! তুমি কি ঘোড়ায় উঠবে না?

আমি না-সূচক উত্তর দিতে মনস্থ করে আবার ভাবলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর ঘোড়ায় চড়তে বলেছেন, আর আমি যদি তাঁর নির্দেশ অমান্য করি, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানে বেয়াদবী হবে এবং এতে গোনাহ হবে- এই আশঙ্কায় বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ আমি উঠছি।

অতঃপর তিনি ঘোড়ার লাগাম ধরে হেঁটে চললেন আর আমি তাঁর নির্দেশ পালনার্থে ঘোড়ায় চড়ে যেতে লাগলাম। কিছু দূর যেতে না যেতেই আমি ঘোড়া থেকে নেমে পড়লাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করতে অনুরোধ জানালাম। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন:

'উকবা! তোমাকে আজ এমন দুটি সূরা শিক্ষা দেব, যা নিঃসন্দেহে অন্য যে কোনো সূরার গুরুত্বের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।'

আমি আরয করলাম: নিশ্চয়ই ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি তা শিখব।

অতঃপর তিনি আমাকে সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে শোনালেন। নামাযের সময় হলে তিনি ইমামতি করার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন এবং এ দুটি সূরা দিয়েই নামায আদায় করলেন। নামাযশেষে বললেন: 'যখনই ঘুমাতে যাবে কিংবা ঘুম থেকে জাগ্রত হবে, তখনই এ সূরা দুটি পাঠ করবে।'

উকবা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন: 'আমি যতদিন জীবিত থাকব, ততদিনই এ দুটি সূরা পাঠ অব্যাহত রাখব।'

উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআল্লা আনহু সারা জীবন দুটি বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে তৎপর ছিলেন। তন্মধ্যে একটি হলো ইলম শিক্ষা করা ও অপরটি জিহাদে অংশগ্রহণ করা। নিজের জীবনের চেয়েও এ দুটি বিষয়ের প্রতি খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন, এমনকি এ জন্য তিনি আর্থিক কুরবানীও করেন।

বিদ্যাচর্চা বা জ্ঞানার্জনে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যবান মুবারক থেকেই নিয়মিত কুরআন মাজীদের হিয্য ও এর শিক্ষা গ্রহণ করতেন। ফলে তিনি জগদ্বিখ্যাত কারী, ওয়ায়েয, মুহাদ্দিস, ফকীহ, ফারায়েয বিশেষজ্ঞ, সাহিত্যিক ও কবি হিসেবে সর্বজনগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত মধুর। মধুর কন্ঠে তিনি যখন কুরআন তিলাওয়াত করতেন, তখন শ্রোতারা তন্ময় হয়ে তিলাওয়াত শুনতেন। তিনি রাতের গভীরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন বেশি। কুরআনের আয়াতে বায়্যিনাতসমূহ বেশি বেশি পাঠ করতেন। সাহাবীগণ প্রাণভরে তাঁর তিলাওয়াত শ্রবণ করে নিজেদের অন্তরকে পরিতৃপ্ত করতেন। এমনও হতো যে, তাঁর তিলাওয়াতের মাঝে সবাই আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে পড়তেন। তাদের দু'চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ত। একদিন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে ডেকে নিয়ে বললেন:

'উব্বা আমাকে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করে শোনাও।'

উব্বা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
অবশ্যই হে খালীফাতুল মুসলিমীন।

অতঃপর তিনি তিলাওয়াত শুরু করলেন। তিলাওয়াত শুনতে শুনতে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এমনভাবে ক্রন্দন করতে থাকলেন যে, তাঁর চোখের পানি দু'গাল বেয়ে তাঁর দাড়ি মুবারক পর্যন্ত ভিজিয়ে দিল।

উবা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু স্বহস্তে লিখিত একখানা কুরআন মাজীদ রেখে যান, যে কুরআন মাজীদখানা মাত্র কয়েক শ' বছর পূর্বেও মিসরের 'উব্বা ইবনে আমের জামে মসজিদের' লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত ছিল। যার শেষে লিখা ছিল: كَتَبَهُ عُقْبَةُ بْنُ عَامِرُ الْجُهَنِي

'এটি উব্বা ইবনে আমের আল জুহানীর স্বহস্তে লিখিত।'

উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কর্তৃক লিখিত কুরআন পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রাচীন হাতে লেখা কুরআন শরীফ। ইসলামী বিশ্বের নষ্ট হয়ে যাওয়া অনেক দুর্লভ ও মূল্যবান বই সম্পদের মতো এই কুরআন শরীফখানাও সেখান থেকে হারিয়ে যায়, আর মুসলিম সমাজের এই মূল্যবান সম্পদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

জিহাদের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান হলো- তিনি উহুদের যুদ্ধ থেকে শুরু করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সংঘটিত সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি দুর্ধর্ষ, দুঃসাহসী, তেজস্বী ও শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদের অন্যতম ছিলেন। দামেস্ক বিজয়ের দিন তাঁকে জীবনের কঠিনতম পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। এ কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন মুসলিম বিশ্বের সেনাপতি আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পক্ষ থেকে। সেটাও এইভাবে যে, দামেস্ক বিজয়ের সুসংবাদ নিয়ে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিদমতে উপস্থিত হওয়ার জন্য তাঁকে দামেস্ক থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। তিনি এ সংবাদ বহন করে এক শুক্রবার থেকে অন্য শুক্রবার পর্যন্ত রাত-দিন ক্রমাগত আট দিন ও সাত রাত কোনোরূপ বিশ্রাম বা বিরতি না রেখে এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে এই বিরাট বিজয়ের খবর পৌঁছান।

'মিসর বিজয়ের যুদ্ধে তিনি মুসলিম বাহিনীর একাংশের সেনাপতি ছিলেন। আমীরুল মু'মিনীন মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে সেখানে ক্রমাগত তিন বছর গভর্নর পদে বহাল রাখেন। অতঃপর ভূমধ্যসাগরের 'রুডুস' দ্বীপ বিজয়ের উদ্দেশ্যে উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে প্রেরণ করেন। জিহাদ সম্পর্কিত হাদীসসমূহের দ্বারা তাঁর অন্তর পরিপূর্ণ ছিল। যা তিনি বিশেষভাবে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বর্ণনা করেন। তিনি যুগশ্রেষ্ঠ তীরন্দায ছিলেন, এমনকি তিনি একটু অবসর সময় কাটাতে চাইলে তীরন্দাযী বা তীর চালনার মাধ্যমে কাটাতেন।

মিসরে অবস্থানকালে উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইন্তিকালের পূর্ব মুহূর্তে তাঁর সন্তানদের ডেকে ওসিয়ত করেন:
يَا بُنَيَّ أَنْهَاكُمْ عَنْ ثَلَاثٍ فَاحْتَفِظُوا بِهِنَّ : لَا تَقْبَلُوا الْحَدِيثَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ إِلَّا مِنْ ثِقَةٍ وَلَا تَسْتَدِينُوا وَلَوْ لَبِسْتُمُ الْعَبَاءَ وَلَا تَكْتُبُوا شِعرًا فَتَشْغَلُوا بِهِ قُلُوبَكُمْ عَنِ الْقُرْآنِ .

'হে বৎসগণ! তিনটি কাজ করা থেকে তোমাদের নিষেধ করছি। তোমরা এ তিনটি বিষয় ভালোভাবে স্মরণ রাখবে:
১. বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী বা 'ছেকাহ' রাবী ছাড়া অনির্ভরযোগ্য কোনো ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস বর্ণনা করলে তা কখনও গ্রহণ করবে না।
২. কোনো অবস্থাতেই ঋণ গ্রহণ করবে না; যদিও বা অভাবের তাড়নায় ছেঁড়া চাদর পরিধান করতে হয়।
৩. এবং কখনো কবিতা চর্চায় নিমগ্ন হয়ো না, কারণ কবিতা চর্চা তোমাদের অন্তরকে কুরআনের চর্চা থেকে ফিরিয়ে রাখবে।'

তাঁর ইনতিকাল হলে তাঁকে কায়রোর প্রবেশপথের উঁচু টিলার পাদদেশে দাফন করা হয়। দাফন শেষ হলে বাড়ি ফিরে এসে তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তির হিসাব করা হলে দেখা যায় যে, সম্পদ হিসেবে একাত্তর বা তিয়াত্তরটি ধনুক এবং প্রত্যেকটি ধনুকের সাথেই তীর চালানোর সাজ-সরঞ্জাম এবং এসব জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর কাজে ব্যবহার করার জন্য ওসিয়তনামা।

বিশ্বখ্যাত ক্বারী এবং গাযী মুজাহিদ উব্বা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর চেহারা মুবারককে আল্লাহ নূরের আলোয় আলোকিত করুন এবং ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষ থেকে তাঁকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করুন। আমীন!

টিকাঃ
১. আল ইসতিয়াব: ৩য় খণ্ড, ১০৬ পৃ.
২. উসদুল গাবাহ: ৩য় খণ্ড, ৪১৭ পৃ.
৩. আল ইসাবাহ: ২য় খণ্ড, ৪৮২ পৃ.
৪. সিয়ারু ইলামুন নুবালা: ২য় খণ্ড, ৩৩৪ পৃ.
৫. জামহারাতুল আনসাব: ৪১৬ পৃ.
৬. আল মাআরিফ: ১২১ পৃ.
৭. কালাইদুল জুমান: ৪১ পৃ.
৮. আন নুজুমুয যাহেরাহ: ১ম খণ্ড, ১৯/২১/৬২/৮১ পৃ.
৯. তাবাকাত উলামাউ আফ্রিকীয়াহ এবং তিউনিস: ৭০-৮৫ পৃ.
১০. ফাতহুল মিস্ত্রে ওয়া আখবারুহা: ২৮৭ পৃ.
১১. তাহযীবুত্ তাহযীব: ৭ম খণ্ড, ২৪২ পৃ.
১২. তাযকিরাতুল হুফ্ফায়: ১ম খণ্ড, ৪২ পৃ.

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 হাবীব ইবনে যায়েদ (রাঃ)

📄 হাবীব ইবনে যায়েদ (রাঃ)


হাবীব ইবনে যায়েদ আল আনসারী (রা) ও তাঁর আহলে বাইতের প্রতি রাসূলুল্লাহ (স)-এর দু'আ।
'আমার আহলে বাইতের পক্ষ থেকে আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহমত ও বরকত দান করুন।'
-মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)

হাবীব ইবনে যায়েদ আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্ধারিত জীবনধারার অমোঘ নিয়মে এমন এক পরিবারে প্রতিপালিত হচ্ছিলেন, যে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যই যেমন ছিলেন ঈমানী চেতনায় বলীয়ান, তেমনি এ বিপ্লবী দাওয়াত ছড়িয়ে দিতেও তাঁদের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। এ পরিবারের প্রতিটি সদস্য দীনের দাবি পূরণে যে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সীমাহীন কুরবানীর অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তা জনপদের প্রত্যেককে ঈমানী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করত।

তাঁর পিতা যায়েদ ইবনে আসেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা ইয়াসরিবের একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব এবং বায়'আত আল আকাবায় অংশ গ্রহণকারী ৭০ সাহাবীর অন্যতম ছিলেন। সে অনুষ্ঠানে তিনি দুই ছেলেসহ সস্ত্রীক বায়'আত করার গৌরবে গৌরবান্বিত হন। তাঁর মা উম্মু আম্মারা নুসায়বাতুল মাযনিয়াহ ইসলামের ইতিহাসে সেই প্রথম মহিলা, যিনি আল্লাহর দীনের হেফাযত ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিরক্ষায় হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর ভাই আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা উহুদের যুদ্ধে নিজের বক্ষকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হেফাযতের জন্য ঢালস্বরূপ ব্যবহার করেন। তিনি শত্রুপক্ষের অসংখ্য তীর-বর্শার আঘাত থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করার গৌরবে গৌরবান্বিত সাহাবী। তাঁর স্বীকৃতিস্বরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জন্য এ দু'আ করেন-

بَارَكَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ مِنْ أَهْلِ بَيْتٍ رَحِمَكُمُ اللَّهُ مِنْ أَهْلِ بَيْتٍ .

'আমার আহলে বাইতের পক্ষ থেকে আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহমত ও বরকত দান করুন।'

শিশুকালেই নিষ্পাপ হাবীব ইবনে যায়েদের অন্তর ঈমানের আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। মা-বাবা, খালা ও ভাইয়ের সাথে মক্কাগামী ইতিহাসখ্যাত সেই সত্তর জন সাহাবীর কাফেলায় যোগদানের সৌভাগ্যও তাঁর হয়েছিল। গভীর রাতের অন্ধকারে অনুষ্ঠিত বায়'আতে আকাবায় শিশু হাবীবও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে কোমল দু' হাত রেখে বায়'আত গ্রহণ করেন এবং সেদিন থেকে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর পিতামাতার চেয়েও প্রিয় মনে করেন ও তাঁর জীবনের বিনিময়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠাকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

শিশু সাহাবী হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা একান্তই ছোট হওয়ার কারণে 'বদরের যুদ্ধে' অংশগ্রহণ করতে পারেননি। এমনকি যুদ্ধাস্ত্র বহনের বয়স না হওয়ায় তিনি উহুদের যুদ্ধেও অংশগ্রহণে অক্ষম হন। এর পরে সংঘটিত প্রতিটি যুদ্ধেই তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অংশগ্রহণ করেন। এসব যুদ্ধে তিনি বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, ত্যাগ, ধৈর্য ও নৈপুণ্যে শত্রুবাহিনীকে পরাস্ত করতে সক্ষম হন। বিশাল শত্রুবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে তাঁর তীক্ষ্ণ রণ-কৌশল, দৃঢ় ঈমানী চেতনা, উচ্চ মনোবল এবং সীমাহীন মানসিক প্রস্তুতি একান্তভাবে প্রশংসনীয় ছিল।

প্রিয় পাঠক! হাবীব ইবনে যায়েদ আল আনসারী (রা)-এর জীবনে ঘটে যাওয়া একটি রোমহর্ষক ঘটনার প্রতি আলোকপাত করতে চাচ্ছি, যা অতি ভয়ঙ্কর ও হৃদয়বিদারক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় থেকে পরবর্তী সময়ে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে ঘটনার স্মরণে মানুষের অন্তর কেঁপে উঠত, ঘটনাটি সত্যিই অবিস্মরণীয়।

হিজরী নবম সালে ইসলামী রাষ্ট্র সগৌরবে পূর্ণাঙ্গ রূপ নিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আরব দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে প্রতিনিধি দল উপস্থিত হতে থাকে। ইসলাম গ্রহণ ও ইসলামী রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকারের ঘোষণা দানের জন্য একের পর এক বিভিন্ন আরব গোত্রের প্রতিনিধি দলের মদীনায় আগমন। তাদের মধ্যে নজদের ঘনবসতি অধ্যুষিত উঁচু প্রান্তর থেকে আসা গোত্র বনূ হুনাইফার প্রতিনিধি দলের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ। বনূ হুনায়ফার এই প্রতিনিধিদল মদীনার প্রান্তেই তাদের উট বহরের অবস্থান নিয়ে মুসাইলামা ইবনে হাবীব আল হানাফী নামক এক ব্যক্তিকে উটবহর ও সরঞ্জামাদির পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে তাদের গোত্রের ইসলাম গ্রহণ ও ইসলামী রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকারের ঘোষণাদানই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দের সাথে এ প্রতিনিধি দলকে অভ্যর্থনা জানান। উত্তম আতিথেয়তা দান করেন এবং প্রতিনিধি দলের প্রত্যেক সদস্যকে, এমনকি উটবহরের পাহারায় নিযুক্ত ব্যক্তিকেও অন্যান্য প্রতিনিধিদের মতো উপঢৌকন প্রদানের নির্দেশ দেন। এই প্রতিনিধি দল নজদে ফিরে যেতে না যেতেই সেই মুসাইলামা ইবনে হাবীব ইসলাম পরিত্যাগ করে এবং তার গোত্রের জনগোষ্ঠীকে এই বলে আহ্বান জানায় যে, সেও একজন প্রেরিত নবী। যাকে আল্লাহ বনূ হুনায়ফা গোত্রের জন্য প্রেরণ করেছেন, যেমন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরাইশ গোত্রে প্রেরণ করেছেন। দেখতে না দেখতেই তার গোত্রের জনশক্তি নানা বাহানায় মুসাইলামাতুল কাযযাবের চারপাশে সমবেত হয়ে তার শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। এসব বাহানার অন্যতম ছিল গোত্রপ্রীতি। তার অনুসারীদের এক গোত্রীয় নেতা এই বলে ঘোষণা দেয় যে:

'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিঃসন্দেহে সত্য নবী এবং মুসায়লামা একজন ভণ্ড। কিন্তু স্ব রবিয়া গোত্রীয় ভণ্ড নবী কুরাইশ বংশের একজন সত্য নবীর চেয়ে আমার নিকট অধিক প্রিয়।'

অতঃপর যখন মুসাইলামাতুল কাযযাবের চারপাশে মুরতাদদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেল এবং সে প্রভাববিস্তারে সমর্থ হলো, তখন সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে একটি পত্র প্রেরণ করে। যার ভাষা ছিল আল্লাহর রাসূল মুসাইলামার পক্ষ থেকে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি :
'আস্সালামু আলাইকা। অতঃপর আমাকে অবশ্যই আপনার নবুয়তের অংশীদার করা হয়েছে। আরব ভূখণ্ডের অর্ধেক আমাদের আর অর্ধেক কুরাইশ গোত্রের। কিন্তু কুরাইশ সীমালংঘনকারী গোত্র।'

এ চিঠি তার অন্ধ অনুসারী মুরতাদদের দু'জনকে দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে প্রেরণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে এ চিঠি পাঠ করে শোনানো হলে পত্রবাহক দু'জনকে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের দু'জনের বক্তব্য কী? তারা উত্তর দেয়, মুসায়লামার বক্তব্যই আমাদের বক্তব্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন:

'আল্লাহর শপথ! দূতদের হত্যা করা বিধিসম্মত হলে আমি অবশ্যই তোমাদের শিরশ্ছেদ করতাম।'

অতঃপর মুসাইলামাতুল কাযযাবের পত্রের জবাবে লিখেন:
بسم الله الرحمن الرحيم من محمد رسول الله إلى مسيلمة الكذابِ السَّلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الهدى، أَمَّا بعد. فَإِنَّ الْأَرْضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ والعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِين.

'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
'আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে মুসাইলামাতুল কাযযাবের প্রতি। হেদায়াতের অনুসারীদের প্রতি সালাম। অতঃপর প্রণিধানযোগ্য যে, এই ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব নিশ্চয়ই একমাত্র আল্লাহরই। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে পছন্দ করেন, তাকে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়ে থাকেন। আর শেষ পরিণাম শুধুমাত্র মুত্তাকীদের জন্যই।'

সেই মুরতাদদ্বয়ের হাতেই এ উত্তরখানা মুসাইলামাতুল কাযযাবকে প্রেরণ করা হয়। এর ফলে হেদায়াতের পথে ফেরৎ আসার পরিবর্তে মুসাইলামাতুল কাযযাব আল্লাহদ্রোহিতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টিতে আরো উন্মত্ত হয়ে পড়ে।

মুসাইলামাতুল কাযযাবকে তার ভণ্ডামি ও ভ্রষ্টপথ পরিহার করে হেদায়াতের পথে ফিরিয়ে আনার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি দাওয়াতী পত্র প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন। সেই চিঠি বহন করার জন্য এ কাহিনীর মূল চরিত্র হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে দূত হিসেবে মনোনীত করেন। হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা একদিকে যেমন ছিলেন রাজকীয় চেহারার সুপুরুষ যুবক, অন্যদিকে ছিলেন আপাদমস্তক ঈমানের প্রতিচ্ছবি।

হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা কোনোরূপ ভয়ভীতি, দুর্বলতা ও শঙ্কা প্রকাশ না করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সোপর্দ করা গুরুদায়িত্ব পালনে তৎক্ষণাৎ রওয়ানা হলেন। তিনি একের পর এক পাহাড়, পর্বত ও নিম্নভূমি অতিক্রম করে নজদের ঘনবসতিপূর্ণ উঁচু ভূ-খণ্ডে বনূ হুনাইফা গোত্রে এসে মুসাইলামাতুল কাযযাবকে সেই পত্র হস্তান্তর করলেন। হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার বহন করে আনা পত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার সৌভাগ্যের পরিবর্তে ভণ্ড মুসাইলামা হিংসা-বিদ্বেষ ও অহমিকায় ফেটে পড়ে। এমনকি তার ফর্সা মুখমণ্ডল বিশ্বাসঘাতকতা, নাশকতা ও পাপাচারের কালিমায় আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে।

সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দূত হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে বন্দী করে পায়ে শৃঙ্খলাবদ্ধাবস্থায় পরের দিন দ্বিপ্রহরে গণ-আদালতে তার সামনে উপস্থিত করার নির্দেশ দেয়। মুসাইলামাতুল কাযযাব গণ-আদালত-এর সভাপতির আসনে সমাসীন হয়ে তার ডান ও বামপার্শ্বে মুরতাদদের দুই জল্লাদকে নিয়োজিত করে করে। সেখানে যথাসময়ে হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে উপস্থিত করা হয়। বন্দী বেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দূত হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা দু' পায়ে শৃঙ্খলাবদ্ধাবস্থাতে শান্ত ও নির্ভীকচিত্তে ধীরগতিতে অগ্রসর হতে থাকেন। হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনhuমা বলিষ্ঠ ঈমানী চেতনা ও সাহসী মনোবলসহ গণ-আদালতে এসে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে গেলেন। ভয়ভীতিহীন যেন এক লৌহমানব। যে কোনো পরিস্থিতির উত্তরের জন্য নির্বিকার। তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মুসাইলামাতুল কাযযাব জিজ্ঞাসা করল :

'তুমি কি মুহাম্মদকে আল্লাহর রাসূল হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান কর?'

তিনি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন:
'হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।'

মুসাইলামাতুল কাযযাব তাঁর এ উত্তরে রাগে ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে আবার জিজ্ঞাসা করে:
'আমি যে আল্লাহর রাসূল তা কি তুমি স্বীকার কর?'

এবার হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা উপহাসের ভঙ্গিতে তাকে জবাব দিলেন:
'তুমি যা বলছো তা আমি শুনতে পাচ্ছি না। কী বলতে চাও স্পষ্ট করে বল।'

আর যায় কোথায়, রাগে ও ক্ষোভে মুসাইলামার চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেল। তার ঠোঁট কাঁপতে থাকল। সঙ্গে সঙ্গে জল্লাদকে নির্দেশ দিল:
'তার দেহের একাংশ কেটে ফেল। সাথে সাথে জল্লাদ তরবারির আঘাতে তাঁর দেহের একাংশ কেটে ফেলল।'

কর্তিত অংশটুকু মাটিতে ছিটকে পড়ে লাফাতে লাগল। পুনরায় মুসাইলামাতুল কাযযাব তাকে একই প্রশ্ন করল :
'তুমি কি মুহাম্মদকে আল্লাহর রাসূল হিসেবে সাক্ষ্য দাও?'

হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা জবাব দিলেন:
'হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।'

অতঃপর সে বলল:
'আমাকেও কি আল্লাহর রাসূল হিসেবে তুমি স্বীকার করো?'

হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা উত্তর দিলেন:
'আমি তো তোমাকে বলেছি, তুমি যা বলছো তা আমি শুনতে পাচ্ছি না। কেননা, আমার কানে বধিরতা দেখা দেয়।'

এবারও সে হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার দেহের আরেকটি অংশ কেটে ফেলতে জল্লাদকে নির্দেশ দেয়। নির্দেশ পাওয়ামাত্রই জল্লাদ তাঁর আরেকটি অংশ কেটে ফেলে এবং সেটি পূর্বোক্ত অংশের পাশেই ছিটকে পড়ে লাফাতে লাফাতে নিথর হয়ে গেল। লোকজন বিস্মিত দৃষ্টিতে তা দেখছিল। এভাবেই মুসাইলামাতুল কাযযাব হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছিল। আর তিনিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন আর মুসাইলামাতুল কাযযাবও তাঁর দেহ থেকে এক এক অংশ কেটে ফেলার নির্দেশ দিচ্ছিল। তাঁর দেহের অর্ধাংশ টুকরো টুকরো হয়ে মাটির ওপর পতিত হলো। আর তিনি অবশিষ্ট কর্তিত দেহে উচ্চারণ করে যাচ্ছিলেন 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ'।

যে শিশু বালক তাঁর আম্মা-আব্বার সাথে আকাবার গভীর রজনীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে হাত মিলিয়ে বায়'আত করেছিলেন, যৌবনে পদার্পণ করে সে সাক্ষ্যেরই দাবি পূরণে তাঁর দু'ঠোঁটে 'ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ' উচ্চারণ করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং তাঁর পবিত্র আত্মা ইল্লিয়্যীনের পথে দেহ থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করে। শাহাদাতের সংবাদ বহনকারী বার্তাবাহক তাঁর মা নুসাইবা আল মাযনিয়াহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে হাবীব ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার শাহাদাতের সংবাদ জানালে তিনি একান্তই শান্তচিত্তে উত্তর দেন:

'এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে শাহাদাত বরণ করার লক্ষ্যেই তাঁকে প্রস্তুত করে তুলেছিলাম। আল্লাহর নিকট অবশ্যই সে পুরস্কৃত হবে। শৈশবে আকাবার রজনীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে যে বায়'আত সে করেছিল... বড় হয়ে তা পূরণ করল। আল্লাহ যদি তাওফীক দেন, তাহলে মুসাইলামাতুল কাযযাবকে বর্শার আঘাতে হত্যা করে তার প্রতিশোধ নেব ও তার সন্তানদেরকে তার মৃত্যুতে মাতম করিয়ে ছাড়ব।'

নুসাইবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার এ আশা পূরণ হতে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হলো না। মদীনায় আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পক্ষ থেকে ভণ্ড নবী মুসাইলামা ও ইসলাম ত্যাগীদের বিরুদ্ধে জিহাদের আহ্বান জানানো হলো। মুসলমানরা চরম উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভণ্ড নবীর শিরশ্ছেদ করার জন্য জিহাদে অংশগ্রহণ করতে লাগল। সে বাহিনীতে নুসাইবা আল মাযনিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাসহ তাঁর বড় ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাও অংশগ্রহণ করেন। মুসাইলামাতুল কাযযাবের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের এক চরম সন্ধিক্ষণে বর্শা হাতে নুসাইবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা দুঃসাহসী সিংহীর মতো শত্রুবাহিনীর কাতার ভেদ করে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছিলেন, আর উচ্চৈঃস্বরে বলছিলেন:

'কোথায় সেই আল্লাহর দুশমন মুসাইলামাতুল কাযযাব? কোথায় সেই আল্লাহর দুশমন? আমাকে বলে দাও কোথায় সে?'

পরিশেষে, নুসাইবা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বর্শা হাতে যখন মুসাইলামাতুল কাযযাবের নিকট পৌঁছলেন, ততক্ষণে মুসলমানদের বর্শা ও তরবারি ভণ্ডনবী মুসাইলামাকে রক্তে রঞ্জিত করে জাহান্নামের অতল গহবরে নিক্ষেপ করেছে। মুসাইলামাতুল কাযযাবের ভূলুণ্ঠিত রক্তাক্ত লাশ দেখে সন্তানের প্রতিশোধের জ্বালা নিবারণ ও চক্ষুদ্বয়কে শান্ত করলেন তিনি। কেন করবেন না? আল্লাহর দুশমন পাপিষ্ঠ ভণ্ডের হাতে তাঁর আল্লাহভীরু নেক সন্তান জীবন দিয়েছেন। তার প্রতিশোধ আল্লাহ নিবেন না? হ্যাঁ, অবশ্যই নিবেন। উভয়েই তাদের রবের দরবারে পৌছে গেছে। তবে পার্থক্য এই যে, একজনের স্থান হলো জান্নাতে এবং আরেকজনের জাহান্নামে।

টিকাঃ
১. উসদুল গাবাহ: ১ম খণ্ড, ৪৪৩ পৃ. অথবা তরজমা অংশ: ১০৪৯ নং.
২. আনসাবুল আশরাফ: ২৫০ ও ৩২৫ পৃ.
৩. আত তাবাকাতুল কুবরা: ৪র্থ খণ্ড, ৩১৬ পৃ.
৪. আস সীরাতুন নুবুবিয়াহ লি ইবনি হিশাম সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৫. আল ইসাবা: ১ম খণ্ড, ৩০৬ পৃ. অথবা আত তারজামা ১৫৮৪ নং.
৬. শুহাদা-উল-ইসলাম ফী আহদিন নুবুওয়াহ লিন্ নাশার.

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 আবু তালহা আল আনসারী (রাঃ)

📄 আবু তালহা আল আনসারী (রাঃ)


‘উম্মু সুলায়মকে দেওয়া আবু তালহার মহরের মতো এত উত্তম মহর আর আমরা দেখিনি। তার মহর ছিল ইসলাম।’
- মদীনার মুসলিম রমণীদের উক্তি

যায়েদ ইবনে সাহল আন নাজ্জারী তাঁর স্বগোত্রে আবূ তালহা নামে পরিচিত ছিলেন। রুমাইছা বিনতে মিলহান (যাকে উম্মু সুলায়ম নামে ডাকা হতো) তাঁর স্বামীর মৃত্যুতে বিধবা হলে এ সংবাদকে আবূ তালহা অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ বলে গ্রহণ করল। প্রকৃতপক্ষে তাতে অবাক হওয়ারও কিছু ছিল না। কারণ, উম্মু সুলাইম (রা) জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, নৈতিকতা ও চারিত্রিক গুণাবলির দিক দিয়ে ছিলেন নেত্রীস্থানীয় মহিলা। এমন গুণে গুণান্বিত মহিলার দিকে কার না দৃষ্টি পড়ে? সুতরাং সঙ্গত কারণেই আবূ তালহা অন্য কোনো প্রস্তাব আসার পূর্বেই তার প্রস্তাব পেশ করাকে সর্বোত্তম মনে করল। আবূ তালহার বিশ্বাস ছিল, উম্মু সুলাইম তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে অন্য কারো প্রস্তাবে রাজি হতে পারেন না। কারণ, ধন-সম্পদে, জ্ঞানে-গুণে, সামাজিক মান-মর্যাদায় ও সুস্বাস্থ্যের দিক দিয়ে সে সুপুরুষই শুধু নয়; বরং সে নাজ্জার গোত্রের শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী ও ইয়াসরিবের দক্ষ তীরন্দাযেরও অন্যতম।

সে ধরে নিল, তার মতো এমন এক ব্যক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কোনো কারণ নেই এবং তা হতেও পারে না। আবূ তালহা অনেক চিন্তা-ভাবনা করে উন্মু সুলাইমের বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো; কিন্তু পথে এক 'দুঃসংবাদ' তাঁর কানে এল। উম্মু সুলাইম মক্কা থেকে আগত দাঈর ডাকে সাড়া দিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান এনেছেন ও পিতৃধর্ম পৌত্তলিকতা পরিত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কিছুক্ষণ এ সংবাদের ওপর চিন্তা করল, তারপর বলল:

'তাতে এমন কী আসে-যায়? তাঁর মরহুম স্বামীও তো ইসলাম গ্রহণ না করে পিতৃধর্মের অনুসারী হিসেবেই উম্মু সুলাইমের সাথে ঘর-সংসার করেছে। আমিও তো তা করতে পারি।'

হিসেবে এই যোগ-বিয়োগ করতে করতে আবূ তালহা উম্মু সুলাইমের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলে এবং উম্মু সুলাইমের সাক্ষাৎপ্রার্থী হলে আবু তালহাকে সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়া হলো। উম্মু সুলাইম এবং তার ছেলে আনাসের উপস্থিতিতে আবূ তালহা উম্মু সুলাইমের কাছে প্রস্তাব পেশ করলে উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা উত্তরে বললেন:

'আবূ তালহা! আপনার মতো ব্যক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা যায় না। কিন্তু যেহেতু আপনি একজন কাফির এবং আমি একজন মুসলমান সে জন্য আমি আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি না।'

উত্তর শুনে আবূ তালহা ভাবতে লাগল:
উম্মু সুলাইম হয়তো আমার চেয়ে বেশি ধনাঢ্য ও ক্ষমতাবান কোনো ব্যক্তিকে কথা দিয়ে ফেলেছেন। তাই এই খোঁড়া অজুহাতের মাধ্যমে আমাকে বিদায় দিতে চাচ্ছেন।'

এসব চিন্তা-ভাবনা করে সে বলল:
'হে উম্মু সুলাইম! আল্লাহর শপথ! আমার প্রস্তাব গ্রহণের পথে এটি কোনো কারণ নয়।'

উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বললেন:
'তাহলে আমার সামনে বাধা কী বলে আপনি মনে করেন?'

আবূ তালহা বলল:
'সোনা, চাঁদি, হীরা-জাওহার ইত্যাদির প্রাচুর্যই হয়তো বা!'

উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বিস্ময়ের স্বরে বললেন:
'সোনা-চাঁদি?'

আবূ তালহা বলল : 'মনে হয়, তা-ই।'

উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বললেন : 'আবূ তালহা আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাক্ষী রেখে স্পষ্ট ভাষায় বলছি, 'আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তাহলে সোনা-চাঁদি ছাড়াই আপনাকে আমি স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি আছি। আপনার ইসলাম গ্রহণকেই আমার মহর হিসেবে গণ্য করা হবে।'

উম্মু সুলাইমের এ উত্তর শোনামাত্রই চন্দন কাঠের তৈরি রং- রওশন করা তার সেই মূর্তির পা মনে পড়ল, যে মূর্তিকে অন্যান্য আরব নেতাদের ন্যায় নিজের পূজা-অর্চনার জন্য পরম ভক্তির সাথে সংরক্ষণ করে আসছিল। ভাবল, আমি যদি মুসলমান হয়ে যাই, তাহলে এই দেবতার কী হবে? উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বুঝতে পারলেন, আবূ তালহা কী ভাবছে! এই সুযোগকে কাজে লাগালেন উম্মু সুলাইম।

তিনি বললেন : 'আবূ তালহা! একবার কি চিন্তা করে দেখেছেন যে, আল্লাহকে ছাড়া আপনি যে দেবতার পূজা-অর্চনা করছেন, তা মাটি থেকে উৎপাদিত একটি বৃক্ষের অংশ ছাড়া আর কিছুই নয়?'

আবূ তালহা বলল : 'হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন।'

উম্মু সুলাইম বললেন : 'আপনার কি এখনো লজ্জা হচ্ছে না?'

আপনি এমন একটি কাষ্ঠফলকের পূজা করে যাচ্ছেন, যার একাংশকে আপনি নিজের জন্য প্রভু হিসেবে তৈরি করে নিয়েছেন। আর অপরাংশকে অন্য কেউ রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে। আবু তালহা! আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তাহলে আপনাকে আমি স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। ইসলাম গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কিছুই আমি আপনার নিকট থেকে মহর হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নই।

আবু তালহা বলল: 'কে আমাকে ইসলামে দীক্ষিত করবে?'

উম্মু সুলায়ম বললেন: 'আমিই এ কাজের জন্য যথেষ্ট।'

আবু তালহা বলল: 'কিভাবে?'

উম্মু সুলাইম বললেন: 'সত্যের সাক্ষ্য দিন এবং বলুন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং এও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।' অতঃপর বাড়ি ফিরে মূর্তিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলুন!

আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করলে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামের বিধি মোতাবেক উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা তাকে বিয়ে করলেন। মুসলমান রমণীগণ বলতে শুরু করলেন, উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহার মহরের মতো এত সম্মানজনক ও গৌরবময় মহরের কথা আর আমরা কখনো শুনিনি, যিনি তাঁর পুরো মহরকেই ইসলামের জন্য কুরবানী করে দিয়েছেন। ইসলাম গ্রহণের দিন থেকে আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ইসলামের বিজয়ের জন্য তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে আল আকাবায় বায়'আত গ্রহণকারী ৭০ জন সাহাবীর মধ্যে তাঁর স্ত্রী উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা সহ তিনিও একজন ছিলেন। ইয়াসরিবে মুসলমানদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বারো জন নকীব বা দায়িত্বশীল নিযুক্ত করেছিলেন আবু তালহা তাঁদের একজন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধে শত্রুপক্ষ দ্বারা চরম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ত্যাগ ও কুরবানীর নজির স্থাপন করেন। উহুদ যুদ্ধে তিনি যে পরীক্ষার সম্মুখীন হন, তা সত্যিই তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা। সে ঘটনাটি হলো:

আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভালোবাসতেন। তাঁর প্রতিটি রক্তকণা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেমে তরঙ্গায়িত হতো। যত বারই তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে তাকাতেন, তত বারই তিনি তৃষ্ণার্ত থেকে যেতেন। যত বারই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা শুনতেন, তার শ্রবণ-ক্ষুধা আরও বৃদ্ধি পেত। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতেন:

'আমার জীবন আপনার জন্য নিবেদিত। আমার সম্মান আপনার সম্মান ও সুখ্যাতির জন্য কুরবান হোক।'

উহুদ যুদ্ধের এক পর্যায়ে যখন মুসলিম যোদ্ধারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অরক্ষিত রেখে তাদের বিজয় সুনিশ্চিত ভেবে গনীমতের মাল আহরণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন মুশরিকরা চতুর্দিক থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রচণ্ড আক্রমণের এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি পবিত্র দাঁত ভেঙে যায় এবং তাঁর পবিত্র চেহারা আহত ও রক্তাক্ত হয়ে পড়ে। ঠোঁট আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং মুখমণ্ডলে রক্তের ধারা বইতে থাকে। শত্রুপক্ষ থেকে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে, মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন। মুসলমানদের ক্ষণিকের বিজয় মুহূর্তের মধ্যেই পরাজয়ের রূপ নেয় এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হত্যার সংবাদে মুসলমানরা শুধু মুষড়েই পড়েননি; বরং আল্লাহর দুশমন শত্রুবাহিনীর দিকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে থাকেন। এই চরম সন্ধিক্ষণে যে কয়েকজন জানবায সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে ছিলেন, আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আন্‌হু তাঁদের অন্যতম। আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে যান। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শত্রুবাহিনীর নিক্ষিপ্ত তীর ও বর্শার আঘাত থেকে হেফাযত করতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করতে আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শত্রুক্রবাহিনীর দিকে লক্ষ্য করে এমন দ্রুতগতিতে তীর নিক্ষেপ আরম্ভ করেন যে, প্রতিটি তীর শত্রুবাহিনীর এক একজনকে ধরাশায়ী করতে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পেছনে অবস্থান নিয়ে উঁচু হয়ে নিক্ষিপ্ত তীরের লক্ষ্যবস্তুর প্রতি প্রত্যক্ষ করছিলেন। কিন্তু আবূ তালহা তাঁর পিছনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশ্রয় গ্রহণের অনুরোধ করছিলেন এই বলে যে:

'আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক, ওদের দিকে উঁচু হয়ে তাকাবেন না। শত্রুবাহিনীর বর্ষিত তীর আপনাকে আঘাত হানতে পারে। আমার বক্ষ আপনার বক্ষের জন্য এবং আমার শির আপনার সম্মানের জন্য নিবেদিত। আমি নিজেকে আপনার জন্য কুরবান করে দিয়েছি, যেন আপনার ওপর কোনো আঘাত না আসে।'

ইতোমধ্যেই মুসলমান বাহিনীর এক যোদ্ধা তীরের এক বোঝা নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিল।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উচ্চৈঃস্বরে ডেকে বলতে লাগলেন:
انْتُرْ سِهَامَكَ بَيْنَ يَدَى أبي طَلْحَةَ وَلا تَمْضِ بها هاربًا.
'তীরের বোঝাটা আবূ তালহার সামনে রাখো, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিও না।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হেফাযতে আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন। এ যুদ্ধে তাঁর তিন তিনটি ধনুক ভেঙে যায়। তিনি শত্রুবাহিনীর উল্লেখযোগ্য যোদ্ধাদের নিধন করেন। আস্তে আস্তে যুদ্ধ থেমে যায়। আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করেন। আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কুরবানীকে সত্যিকার কুরবানী হিসাবে গ্রহণ করা হয়। যুদ্ধের সংকট সন্ধিক্ষণে যেমন আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন একজন বীর যোদ্ধা, তেমনি দাতা হিসেবেও ছিলেন তিনি একজন শ্রেষ্ঠ দানবীর। মদীনায় সুপেয় শীতল পানি ও উন্নত ফলজ বৃক্ষ সমৃদ্ধ সুবিশাল দুটি বিরাট আঙ্গুর ও খেজুরের বাগান ছিল তাঁর।

অপূর্ব সৌন্দর্যঘেরা খেজুর বাগানে মৃদু বাতাসে খেজুর শাখাগুলো ঝিরঝির শব্দে হালকাভাবে দুলছে। তারই শীতল ছায়ায় একদিন আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নামায আদায় করছিলেন। সে সময় লাল ঠোঁট, রঙিন পা ও সবুজ রঙের একটি সুন্দর পাখি তার নামাযের একাগ্রতায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করল। পাখিটি গাছের ডালে নেচে নেচে মধুর সুরে গান গাইছিল। সুন্দর এই পাখিটির স্বাধীন ও মুক্ত বিচরণ আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নামাযের একাগ্রতাকে নষ্ট করল। মনটা ফিরে এলে তিনি ক'রাকাআত নামায পড়েছেন, তা আর মনে করতে পারলেন না। এই ঘটনা তাঁকে মর্মাহত করল। তিনি অন্য চিন্তা-ভাবনা করতে বাধ্য হলেন। নামায শেষে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে এই সাজানো বাগানের বিবরণ এবং সুন্দর পাখিটি কিভাবে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে নামাযে তাঁকে অন্যমনস্ক করে তোলে এ সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা দেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেন:

'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনাকে সাক্ষী রেখে এই বাগানকে আল্লাহর পথে দান করছি। আল্লাহ ও আপনার পছন্দনীয় পথে এই বাগানের ব্যবহার করুন।'

তাঁর সম্পর্কে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর তিনি ৩০ বছর জীবিত ছিলেন। বছরে যে ক'দিন রোযা রাখা নিষিদ্ধ সে ক'দিন ছাড়া তিনি সারা বছর রোযা রাখতেন। তিনি বৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে ছিলেন যে কোনো যুবকের মতো উদ্যমী ও সক্রিয়। দীনের দাওয়াতে দূর-দূরান্তে গমন এবং জিহাদে অংশগ্রহণ থেকে তাঁকে কেউ বিরত রাখতে পারেনি। উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সময় মুসলিম বাহিনী যখন সমুদ্রপথে জিহাদের উদ্যোগ গ্রহণ করে, আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু একজন যোদ্ধা হিসেবে তাতে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তাঁর এ প্রস্তুতি দেখে তাঁর ছেলেরা তাঁকে বললেন:

'হে আমাদের পিতা! আপনার ওপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হোক। আশির উপর আপনার বয়স। জীবনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবূ বকর সিদ্দীক ও উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জিহাদ করেছেন। এখন কি একটুও আরাম করবেন না? আমাদের অনুমতি দিন, আপনার পক্ষ থেকে আমরাই জিহাদে অংশ নিই।'

আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন:
انْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا.

'তোমরা যে কোনো অবস্থাতেই থাকো না কেন, জিহাদের জন্য বের হয়ে পড়ো।'

এ বাক্যের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জিহাদে অংশ গ্রহণের কথা বলেছেন। বৃদ্ধ ও যুবক সবাই এ আদেশের অন্তর্ভুক্ত। জিহাদে অংশগ্রহণ করার জন্য আল্লাহ বয়সের কোনো সীমারেখা নির্ধারণ করেননি। ছেলেদের অনুরোধ উপেক্ষা করেই তিনি জিহাদে বের হয়ে পড়লেন।

অশীতিপর বৃদ্ধ আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সৈনিক বেশে যখন মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে জাহাজে উঠলেন, তখন তাঁকে খুবই উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। জাহাজটি যখন মধ্য সমুদ্রে, তখন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অসুখেই তিনি ইনতিকাল করেন। মুসলিম বাহিনী আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দাফন করার জন্য দ্বীপের সন্ধান করতে থাকে। এক সপ্তাহ পর একটি দ্বীপের সন্ধান পাওয়া গেল। এই এক সপ্তাহে আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মরদেহের বিন্দুমাত্রও পরিবর্তন ঘটেনি। তা এমনভাবে শায়িত ছিল, মনে হচ্ছিল যে, তিনি ঘুমের মধ্যে রয়েছেন। গভীর সমুদ্রের মাঝে এক দ্বীপে সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও জন্মভূমি থেকে দূরে, বহু দূরে...। আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দাফন করা হলো। তাতে তাঁর কোনো আফসোস নেই। কেননা, তখন তিনি আল্লাহর নিকটে পৌঁছেছেন। যেহেতু আল্লাহর নৈকট্য লাভই তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, তাই এতে তাঁর পরিবার-পরিজনেরও কোনো আফসোস বা দুঃখ-ব্যথা নেই।

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ১ম খণ্ড, ৫০৬ পৃ.
২. উসদুল গাবাহ (আত তারজামা): নং ১৮৪৩.
৩. আল ইসতিয়াব: ১ম খণ্ড, ৫৪৯ পৃ. টীকা দ্রষ্টব্য.
৪. আত তাবাকাতুল কুবরা: ৩য় খণ্ড, ৫০৪ পৃ.
৫. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১ম খণ্ড, ১৯০ পৃ.
৬. তাহযীবুত তাহযীব: ৩য় খণ্ড, ৪১৪ পৃ.
৭. তারীখুত তাবারী: ২য় খণ্ড, ৬১৯ পৃ., ৩য় খণ্ড, ১২৪, ১৮১ পৃঃ, ৪র্থ খণ্ড, ১৯২ পৃ.। দারুল মাআরিফ সংস্করণ, ১০ম খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৮. তাহযীব ইবনে আসাকির: ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৪ পৃ.
৯. আস সীরাতু লি-ইবনি হিশাম সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১০. হায়াতুস সাহাবা: ৪র্থ খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00