📄 আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস (রাঃ)
‘আমি আবু সুফিয়ান ইবনে হারেসের প্রতি সন্তুষ্ট হলাম। তার কৃত সমস্ত জীবনের শত্রুতা ও বিরোধিতাকে আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। সে হবে জান্নাতে যুবকদের নেতা।’
- মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)
পারস্পরিক সম্পর্ক ও গভীর ভালোবাসার মতো যত যোগসূত্রই এ যাবৎ একে অপরের মধ্যে সেতুবন্ধ সৃষ্টি করেছে, তার মধ্যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে আবদুল্লাহ ও আবু সুফিয়ান ইবনে হারেসের মধ্যে বিদ্যমান এমন যোগসূত্র খুবই কম পরিলক্ষিত হয়। কারণ, আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে আবদুল্লাহ একই সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। এদিক থেকে উভয়ই সমবয়সী। যেমন তারা একই সময়ে জন্মগ্রহণ করেন, ঠিক তেমনি একই পরিবারে প্রতিপালিতও হন।
আবূ সুফিয়ান ইবনে হারেস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আপন চাচাত ভাই। তার পিতা হারেস। হারেসের ভাই আবদুল্লাহ হলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতা। হারেস ও আবদুল্লাহ উভয়েই ছিলেন মুত্তালিবের ঔরসজাত সন্তান।
এ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছাড়াও আবু সুফিয়ান মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুধভাই। উভয়কেই হালিমা আস সা'দিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা একই সঙ্গে স্তন্য পান করিয়েছেন। এতসব যোগসূত্র পরস্পবকে নবুওয়াতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত গভীর ভালোবাসা ও বন্ধুত্বে আবদ্ধ করে রাখে। শুধু তাই নয়, সর্বোপরি আকৃতি দু'জনের প্রায় একই ছিল। আবু সুফিয়ানের ব্যাপারে সবারই ধারণা এটাই স্বাভাবিক ছিল যে, সে সর্বপ্রথম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতের প্রতি সাড়া দিয়ে মুসলমান হবে। তাঁর অনুসারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বপ্রধানও হবে। কিন্তু আল্লাহর ফায়সালা ছিল ভিন্ন। ঘটনাও ছিল প্রত্যাশার বিপরীত।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইসলামের দাওয়াত দিতে আরম্ভ করেন, তখন তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের অনেকেই তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাদেরকে এ দাওয়াত প্রত্যাখ্যানের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করতে থাকেন। ঠিক এ পর্যায়ে আবু সুফিয়ানের অন্তরে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে শত্রুতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গভীর বন্ধুত্ব দেখতে দেখতেই চরম শত্রুতায় পরিণত হয়।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার সময়ে আবু সুফিয়ান কুরাইশ বংশের একজন প্রসিদ্ধ অশ্বারোহী ও কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল। সে তার তলোয়ার ও কবিতা উভয় দ্বারাই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। তার সর্বশক্তি ইসলামের প্রতিরোধে ও মুসলমানদের নির্যাতন ও নিপীড়নের কাজে নিয়োজিত করে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে এমন কোনো যুদ্ধই সংঘটিত হয়নি, যার উদ্যোক্তা আবু সুফিয়ান ছিল না।
মুসলমানদের ওপর এমন কোনো অত্যাচার ও নির্যাতন হয়নি, যার বিরাট ভূমিকায় সে ছিল না। আবু সুফিয়ান তার কবিতার আকর্ষণীয় ভাষা, জাদুকরী ছন্দ তথা সর্বশক্তি দ্বারাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধিতায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিল। তার কবিতায় থাকত শুধু গালিগালাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে আবু সুফিয়ানের এই হীন তৎপরতা ক্রমাগত প্রায় কুড়ি বছর যাবৎ চলতে থাকে। এই দীর্ঘ সময়ে এ হীন তৎপরতা ও ষড়যন্ত্রের এমন কোনো কৌশল বা সুযোগ নেই, যা সে ব্যবহার করেনি। এমন কোনো অত্যাচার ও নির্যাতন নেই, যা সে মুসলমানদের ওপর চালায়নি ও তাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রাখেনি।
আল্লাহর কী মহিমা! মক্কা বিজয়ের পূর্ব মুহূর্তে আবূ সুফিয়ানের ভাগ্য ইসলাম গ্রহণের জন্য সুপ্রসন্ন হলো। তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাও একটি স্মরণীয় ঘটনা। কবি-সাহিত্যিকরা সে ঘটনাকে যেমন বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, ঐতিহাসিকগণও ইতিহাসের পাতায় তেমনি গুরুত্ব সহকারেই স্থান দিয়েছেন। আবু সুফিয়ান নিজেই তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন:
'ইসলাম বিজয় লাভ করলে এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে দলে দলে লোকজন ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে শীঘ্রই মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু করতে যাচ্ছেন, এ সংবাদ মক্কার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। আমার মনে হলো, দুনিয়াটা আমার কাছে খুবই সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে। পায়ের তলা থেকে মাটি যেন সরে যাচ্ছে। মনে মনে ভাবছিলাম এ মুহূর্তে কোথায় পালাই? কার আশ্রয় নেই? কেই বা আমার সঙ্গী-সাথী হবে? এসব দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনার মধ্যে আমার সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী ও পরিবার-পরিজনের কাছে এসে তাদের মক্কা থেকে পালানোর উদ্দেশ্যে প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেই। তাদের ইঙ্গিত দেই যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে-কোন মুহূর্তে মক্কায় প্রবেশ করতে পারে। আর মুসলমানদের হাতে ধরা পড়লে আমাকে হত্যাই করা হবে।'
তারা এক বাক্যে আমাকে উত্তর দিল:
'আপনি পরিস্থিতি এখনো সঠিকভাবে আঁচ করতে পারছেন না। আরব তো আরব। আরব বিশ্বের বাইরের দেশগুলোও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য স্বীকার করে নিচ্ছে ও দলে দলে তাঁর দীন গ্রহণ করছে। তাঁর ইসলামী রাষ্ট্র সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে অথচ আপনি এখনো তার বিরুদ্ধাচরণে সর্বশক্তি নিয়োগ করেই চলেছেন। আপনার উচিত ছিল, তাঁর সাহায্য-সহযোগিতায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করা।'
পরিবারের লোকজন এক হয়ে আমাকে ইসলাম সম্পর্কে এমনভাবে বোঝাতে ও উদ্বুদ্ধ করতে লাগল যে, আল্লাহ তাআলা আমার মনকে ইসলামের জন্য সম্প্রসারিত করে দিলেন। আর সাথে সাথে আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্যে রওয়ানার জন্য উঠে দাঁড়ালাম এবং 'মাযকুর' নামক আমার এক খাদিমকে আমাদের সফরের জন্য একটি ঘোড়া ও একটি উট প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিলাম। আমি আমার সফরসঙ্গী হিসেবে আমার এক ছেলে জা'ফরকে সংগে নিলাম। পথিমধ্যে জানতে পারলাম, মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী 'আল আবওয়া' নামক স্থানে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা-বিরতি করেছেন। আমি সে স্থানের উদ্দেশ্যেই দিক পরিবর্তন করলাম। 'আল-আবওয়া' নামক স্থানের যতই নিকটবর্তী হচ্ছিলাম, ততই ভাবছিলাম, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেওয়ার পূর্বেই কেউ যদি আমাকে চিনে ফেলে, তাহলে সে নির্ঘাত আমার শিরশ্ছেদ করবে। তাই আমি আমার বেশ বদলে ফেললাম এবং নিজেকে দৃষ্টির আড়ালে রেখে সম্মুখে অগ্রসর হতে লাগলাম। এমনকি 'আল আবওয়া' থেকে এক মাইল দূরেই যানবাহন রেখে পায়ে হেঁটে এক মাইল পথ অতিক্রম করতে থাকলাম। আর প্রত্যক্ষ করলাম যে, বিপরীত দিক থেকে দলে দলে মুসলমানদের অগ্রগামী কাফেলার লোকজন মক্কার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। যখনই একটি দলের সম্মুখীন হতাম, তখনই প্রাকৃতিক প্রয়োজন বা অন্য কিছুর বাহানা করে আমি রাস্তা থেকে পাশ কাটিয়ে যেতাম এই ভয়ে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের কেউ আমাকে চিনে না ফেলে। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে পথ অতিক্রম করার এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যানবাহনকে অগ্রসর হতে দেখলাম। আমি অনুতপ্ত ও ধিকৃত অবস্থায় এ সুযোগে তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হলাম। তিনি তাঁর মুবারক চক্ষুদ্বয় দিয়ে আমার দিকে খুব ভালো করে তাকালেন। সম্পূর্ণ অন্য বেশে দেখে আমাকে চিনতে পেরেই আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আমি আবার সে দিকেই গিয়ে দাঁড়ালাম যেন আমার প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়ে। এরপরও তিনি আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্যদিকে মুখ করলেন। আমি আবার সেই দিকেই গিয়ে উপস্থিত হলাম। এমনকি অনুরূপ অবস্থায় বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলতে থাকল। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ইসলাম গ্রহণে আনন্দিত হবেন এবং তাঁর সাহাবীগণও তাঁর আনন্দে আনন্দিত হবেন। কিন্তু সাহাবীগণ যখন দেখতে পেলেন যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার আমার দিক থেকে বারবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ও আমার দিকে তাকাতেই পছন্দ করছেন না, তখন তারাও আমার উপস্থিতিকে ঘৃণাভরে দেখতে আরম্ভ করলেন। এমনকি সবাই আমাকে বয়কট করলেন। আমি আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনিও আমাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন। সাহায্য-সহযোগিতার জন্য উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শরণাপন্ন হলাম এই ভেবে যে, তার অন্তরে একটু স্থান করে নিতে পারি কি না। দেখতে পেলাম, তিনি আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর চেয়েও আমাকে অধিক ঘৃণা করছেন। এমনকি তিনি আমার উপস্থিতির জন্য শুধু ক্ষিপ্তই হয়ে উঠলেন না, এমনকি তিনি আনসারদের এক যুবককে আমার বিরুদ্ধে লেলিয়েও দিলেন।'
ঐ ব্যক্তি আমাকে কঠোর ভাষায় বললেন:
'হে খোদার দুশমন! তুমিই না আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদেরকে নিপীড়ন ও নির্যাতন করেছিলে? তাঁদের বিরুদ্ধাচরণ ও শত্রুতায় পৃথিবীকে বিষময় করে তুলেছিলে আর কবিতার মাধ্যমে নানা গালমন্দ করেছিলে?'
এমনকি তার উচ্চৈঃস্বরে গালমন্দের সমর্থনে অন্যান্য সাহাবীরাও আমার দিকে রাগান্বিত চোখে তাকাচ্ছিলেন। আমি যতই নিজেকে আত্মগোপন করার চেষ্টা করছিলাম, ততই তারা আমাকে ঘৃণা করছিলেন। এমতাবস্থায় আমার চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দেখতে পেলাম। সাথে সাথে তাঁর কাছে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে গেলাম এবং তাঁর কাছে আবেদন পেশ করে বললাম:
'চাচা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রক্তের সম্পর্ক ও কুরাইশ বংশে আমার মান-সম্মান ও নেতৃত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে যা জানেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেসব বিচার করে আমার ইসলাম গ্রহণে আনন্দিত হবেন বলে আমি বিরাট আশা পোষণ করে এসেছি। আপনি আমার ব্যাপারে তাঁকে একটু সুপারিশ করুন।'
তিনি উত্তর দিলেন:
'আল্লাহর শপথ! আমি তোমার প্রতি তাঁর বিরক্তি ও ঘৃণাভাব দেখছি। তাই কোনো উপযুক্ত সুযোগ ছাড়া কোনোভাবেই সুপারিশ করতে পারব না। কারণ, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্মান ও ভক্তি করি এবং তাঁর মতামতকে শ্রদ্ধা করি।'
এ পরিপ্রেক্ষিতে নিরুপায় হয়ে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললাম: 'চাচাজান, এ অবস্থায় আমাকে কার হাওলা করছেন?'
তিনি বললেন, 'আমার যা বলার বলেছি, তোমার ব্যাপারে এর বেশি আমার কিছুই করার নেই।'
তাঁর এই উক্তি শুনে আমি ভীষণভাবে চিন্তিত হয়ে পড়লাম। এমতাবস্থায় আমার চাচাত ভাই আলী ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দেখতে পেলাম। তার নিকট গিয়ে সামান্য করুণা চেয়ে আবেদন-নিবেদন করলে তিনিও সেই একই উত্তর দিলেন, যা আমার চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দিয়েছিলেন। পরিশেষে নিরুপায় হয়ে আমার চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে আবার ধরনা দিলাম এবং অনুরোধ করে বললাম যে:
'চাচাজান! আপনি যদি আমার প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হৃদয়কে দয়ার্দ্র করতে না-ই পারেন, কমপক্ষে ঐ ব্যক্তিকে তো আমাকে উচ্চৈঃস্বরে গালি ও ভর্ৎসনা দেওয়া এবং অন্যান্যদেরকে আমার বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেন।'
তিনি বললেন:
'কে তোমাকে গালি দিচ্ছে? আমাকে তার বিবরণ দাও। চাচার নিকট সেই আনসারীর বিবরণ দিলাম। চাচা তার পরিচয় পেয়ে বললেন, সে তো নুআইমান ইবনে হারেস আন নাজাশী। তাঁকে ডেকে বললেন:
নুআইমান! আবু সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাত ভাই এবং আমার ভাতিজা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজ হয়তো তার উপর বিরক্ত হয়ে আছেন। একদিন হয়তো তার ওপর সন্তুষ্টও হতে পারেন। তুমি তাকে গালমন্দ করা থেকে বিরত থাক। সে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত তাকে চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু অনুরোধ করেই যাচ্ছিলেন।'
পরিশেষে চাচা আব্বাসের অনুরোধে আনসারী প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, এ মুহূর্ত থেকে আর তাকে বিরক্ত করব না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'জুহফা' নামক স্থানে (যা মদীনার পথে মক্কা থেকে চার মনযিল দূরে) যাত্রাবিরতিকালে যে তাঁবুতে তিনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, আমি সে তাঁবুর দরজায় বসে পড়ি, আর আমার ছেলে জা'ফর আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁবু থেকে বের হওয়ার সময় আমাকে দরজার সামনে বসা অবস্থায় দেখতে পান। এবারও তিনি আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আমি বারবার ব্যর্থ হচ্ছি বটে; কিন্তু একেবারে নিরাশ হইনি। যখনই তিনি কোনো স্থানে যাত্রাবিরতি করতেন, সেখানেই তাঁর তাঁবুর দরজায় বসে পড়তাম এবং সেখানেই অবস্থান নিতাম। আমার ছেলে জা'ফরকে আমার সামনে দাঁড় করিয়ে রাখতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার প্রতি নজর দিয়েই আমার দিক থেকে অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেন। এমতাবস্থায় কয়েক দিন চলল। এক পর্যায়ে আমার উৎকণ্ঠা সীমা অতিক্রম করে গেল। আমি ভেঙে পড়লাম। এ সময় আমার স্ত্রীকে শেষ সংবাদ দিলাম:
'আল্লাহর শপথ করে বলছি, হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন, নয় তো আমি আমার ছেলেকে নিয়ে হতাশাগ্রস্ত মরু প্রান্তরে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করব- এটাই আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমার এই সিদ্ধান্তের সংবাদ জানলেন, তখন আমার প্রতি সদয় হলেন। তিনি বিশ্রামাগার থেকে বের হওয়ার সময় এই প্রথম বারের মতো স্নেহের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। আমি আশা করছিলাম যে, তিনি আমার দুরবস্থার প্রতি লক্ষ্য করে একটু মুচকি হাসি হাসবেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কায় প্রবেশকালে আমিও তাঁর সফরসঙ্গীগণের অন্তর্ভুক্ত হই। তিনি যখন মাসজিদুল হারামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন, আমি তখন তাঁর আগে আগে দৌড়াতে থাকি। এমনকি এক মুহূর্তের জন্যও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গ ত্যাগ করিনি।
মক্কা বিজয়ের পর পরই বনূ আহওয়াজ গোত্রের নেতৃত্বে সমস্ত আরব গোত্র সম্মিলিতভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে 'হুনাইন' নামক স্থানে এক অভিযান পরিচালনা করে। এটি এমন এক জঙ্গি অভিযান, যা ইতঃপূর্বে কারো বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে বলে কেউ জানে না। তারা এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের চিরতরে নির্মূল করে দেওয়ার সিদ্ধান্তই নিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সেনাপতির দায়িত্ব নিলেন। সাহাবীদের বিরাট বাহিনী নিয়ে তাদের মোকাবেলার জন্য রওয়ানা হলেন। হুনাইনের যুদ্ধ-ময়দানে পৌছে যখন আমি দেখতে পেলাম যে, মুশরিকদের বিরাট সমাবেশ। আমি মনে মনে শপথ নিলাম:
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শত্রুতায় আমার অতীত জীবনের কৃত সমস্ত অপরাধের কাফফারা আজই আদায় করে ছাড়ব এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার এই বীরত্ব ও কুরবানী দেখে এবার নিশ্চয়ই খুশি হবেন।'
উভয় বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ বেধে গেল। মুসলমান বাহিনীর ওপর মুশরিকদের প্রচণ্ড আক্রমণের এক পর্যায়ে মুসলমান বাহিনীর মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ল। এমনকি তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যুদ্ধের ময়দানে ফেলে রেখেই প্রাণ ভয়ে ছোটাছুটি করতে লাগল। আমরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় পরাজয়ের সম্মুখীন হতে যাচ্ছিলাম। যুদ্ধের জয়-পরাজয়ের এই চরম সন্ধিক্ষণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক- তিনি 'শাহ্হ্বা' নামক অশ্বপৃষ্ঠে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে পাহাড়ের মতো দৃঢ় অবস্থান নিলেন। তিনি নিজের ও তাঁর চতুর্দিকের সাথীদের প্রতিরক্ষায় উন্মুক্ত তালোয়ার চালাতে লাগলেন। মনে হচ্ছিল যেন ক্ষিপ্ত সিংহ। সেই চরম মুহূর্তে আমি আমার ঘোড়ার পৃষ্ঠ থেকে এক লাফে নিচে নেমে আমার তলোয়ারের খাপ ভেঙে ফেললাম এবং মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার তলোয়ার যেন আর তাতে ঢোকানোর প্রয়োজন না হয়। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আল্লাহই সেই সময় আমার মনের অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞাত। সেই মুহূর্তে আমার জীবনের বিনিময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের নিরাপত্তাই আমার জন্য মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াল। আমি শাহাদাতের জন্য প্রস্তুত হলাম। আমার চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অশ্ব 'শাহ্হ্বার' লাগাম ধরে তার পাশে মযবুত অবস্থান নিয়েছিলেন আর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপর পাশে অবস্থান নিয়ে আমার বাম হাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পা রাখার জন্য তামা বা পিতলের তৈরি রিংবিশেষ বা পাদানী শক্ত করে ধরলাম এবং ডান হাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিরক্ষায় মরণপণ তলোয়ার পরিচালনা করতে থাকলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করতে গিয়ে আমি জীবন বাজি রেখে ক্ষিপ্রতার সাথে শত্রুবাহিনীর চরম আঘাতের মোকাবেলা করছি দেখে তিনি আমার চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে জিজ্ঞাসা করলেন:
চাচা, মরণপণ এই যোদ্ধা ব্যক্তিটি কে?
উৎসাহব্যঞ্জক স্বরে তিনি উত্তর দিলেন:
এই ব্যক্তি আপনার চাচাত ভাই। আপনার চাচা হারেসের ছেলে আবু সুফিয়ান। এটাই উপযুক্ত সময়। তিনি এর ফাঁকেই আমার জন্য সুপারিশপূর্বক আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, তার প্রতি সদয় হোন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহূর্তেই বললেন:
'আমি তার প্রতি সন্তুষ্ট হলাম। তাঁর কৃত সারা জীবনের শত্রুতা ও বিরোধিতাকে আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। সে হবে জান্নাতে যুবকদের নেতা।'
আমার প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তোষ প্রকাশ হওয়ায় আমার অন্তর আনন্দে ভরে উঠল। সাথে সাথে আমি ঘোড়ার পাদানীতে রাখা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পায়ে আনন্দ ভরে চুমু দিলাম। আর তিনিও তৎক্ষণাৎ আমাকে সম্বোধন করে বললেন:
'আমার জীবনের শপথ, হে আমার প্রিয় ভাই! শত্রুর ব্যূহ ভেদ করে সামনের দিকে আক্রমণ চালাও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই নির্দেশবাক্য আমার জিহাদী চেতনা ও সাহসকে আগ্নেয়গিরির উদ্গীরণের মতো নতুনভাবে জাগিয়ে তুলল। গায়েবী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে নব উদ্যোগে শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে তাদের ব্যূহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। সাথে সাথেই সাহাবীদের এক জানবাজ দল আমার সাথে যোগ দিলে আমরা প্রচণ্ড ধাওয়া করে শত্রুদেরকে তিন মাইলের মতো দূরত্বে তাড়িয়ে নিয়ে গেলাম। তাদের শক্তিশালী অবস্থান ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।'
আবূ সুফিয়ান ইবনে হারেস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু 'হুনাইন' যুদ্ধের এ ঈমানী পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হওয়ার পর থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তর নিংড়ানো ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হন। তিনি নিকটতম সাথীদের মর্যাদা লাভে ধন্য হলেন। এতদসত্ত্বেও আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর অতীত জীবনের কৃত অপরাধের কারণে কোনো দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতেন না। সেই লজ্জায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নজরে নজর দিতেন না। আবু সুফিয়ান তার অন্ধকার যুগের অপকীর্তির কারণে হেদায়াতের নূর ও আল কুরআনের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকার কাফফারা হিসেবে রাত-দিন কুরআন তিলাওয়াত ও হেদায়াতের নির্দেশ আহরণে সচেষ্ট থাকতেন। দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চ ও তার আনন্দ-উৎসব থেকে দূরে থেকে আল্লাহর ধ্যানে সর্বদা দেহমন নিমগ্ন রাখতেন। একদা মসজিদে নববীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মসজিদে প্রবেশ করতে দেখতে পেয়ে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে জিজ্ঞাসা করলেন: 'আয়েশা! তুমি কি এই লোকটিকে চেন?'
তিনি উত্তর দিলেন: 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তো তাকে চিনি না।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'সে আমার চাচাত ভাই আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস। সে হলো মসজিদে নামাযের জন্য সর্বপ্রথম প্রবেশকারী ও সর্বশেষ প্রত্যাবর্তনকারী ব্যক্তি। খোদার ভয়ে যার চক্ষুদ্বয় হতে ক্রন্দনরত পানি এক মুহূর্তের জন্য পড়া বন্ধ হয় না।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ভীষণ চিন্তিত ও ব্যথিত হন। তিনি এমনভাবে ভেঙে পড়েন, যেমন একমাত্র সন্তানের মৃত্যুতে তার মা অথবা একান্তই অন্তরঙ্গ কোনো বন্ধুর বিয়োগে তার বন্ধু ভেঙে পড়েন। তিনি এমন ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকেন, যেমন একমাত্র অন্তরঙ্গ বন্ধুই তার বন্ধুর জন্য ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকে। তাঁর মৃত্যুতে এমন হৃদয়গ্রাহী ভাষায়, আবেগময়ী ছন্দে মর্সিয়া রচনা করেন, যা শোনামাত্রই প্রতিটি ব্যক্তির মনে এর প্রতিটি বাক্য ব্যথা, ব্যাকুলতা ও দুঃখের প্রতিধ্বনি হিসেবে ধ্বনিত হয়।
উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতের সময়ে আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর মৃত্যু সন্নিকটবর্তী বলে অনুধাবন করলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নিজ হাতেই নিজের কবর খনন করে চিরনিদ্রার বিছানায় শায়িত হওয়ার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিলেন। এ অবস্থায় তিন দিন অতিবাহিত হতে না হতেই মৃত্যুর পূর্বাভাস পেলেন। সে যেন মৃত্যুর পূর্ব-নির্ধারিত উপস্থিতি। তিনি তাঁর স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও পরিবারের লোকজনদের ডাকলেন এবং ওসিয়ত করলেন যে,
'আমার মৃত্যুতে তোমরা কান্নাকাটি করো না। আল্লাহর শপথ, আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর কোনো গুনাহে লিপ্ত হইনি। আমার জানামতে, এমন কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও করিনি, যার জন্য আমি আল্লাহর দরবারে লাঞ্ছিত হব।'
দেখতে না দেখতেই তাঁর পবিত্র আত্মা দেহ ত্যাগ করে চলে গেল। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর নামাযে জানাযার ইমামতি করেন। তাঁর মৃত্যুতে উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও সাহাবীরা ভীষণভাবে মর্মাহত ও ব্যথিত হন।
তাঁর মৃত্যুকে ইসলাম ও তাঁর পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বলে মনে করা হয়।
টিকাঃ
১. আল ইসতিয়াব: ৪র্থ খণ্ড, ৮৩ পৃ.
২. আল ইসাবাহ: ৪র্থ খণ্ড, ৯০ পৃ.
৩. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১ম খণ্ড, ৫১৯ পৃ. (হালব সংস্করণ).
৪. আল কামিল লিইবনে আছীর: ২য় খণ্ড, ১৬৪ পৃ.
৫. আস সীরাতুন নুবুবিয়াহ লিইবনে হিশাম: ২য় খণ্ড, ২৬৮ পৃ. ও সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৬. তারীখ আত তাবারী: ২য় খণ্ড, ৩২৯ পৃ.
৭. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ: ৪র্থ খণ্ড, ২৮৭ পৃ.
৮. আত তাবাকাতুল কুবরা: ৪র্থ খণ্ড, ৫১ পৃ.
৯. তাবাকাত ফুহুলুশ শুয়ারা: ২-৬ পৃ.
১০. নিহায়াহ আল আরব: ১৭শ খণ্ড, ২৯৮ পৃ.
১১. সাইরু আলামুন নুবালা: ১ম খণ্ড, ১৩৭ পৃ.
১২. দুয়ালুল ইসলাম: ২য় খণ্ড, ৩৬ পৃ.
১৩. মাআর রাঈউল আওয়াল: ১০৪ পৃ.
📄 সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাঃ)
‘শত্রুদের উপর তীর নিক্ষেপ করো সা'দ ....... বীরত্বের সাথে তীর নিক্ষেপ করো, তোমার প্রতি আমার পিতামাতা কুরবান হোক।’
- উহুদ যুদ্ধে রাসূল (স)-এর উৎসাহব্যঞ্জক বাণী।
উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সা'দ (রা)-কে শত্রু বাহিনীর ওপর তীর নিক্ষেপ করার জন্য নির্দেশ দিচ্ছিলেন :
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ - وَإِنْ جَاهَدُكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ .
'আমি তো মানুষকে তাদের পিতামাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। মা সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে এবং তাদের দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তন তো আমারই নিকট। তোমার পিতামাতা যদি আমার সাথে শিরক করার জন্য তোমার প্রতি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে, এমন শিরক যে তার সমর্থনে তোমার নিকট কোনো দলীল-প্রমাণ নেই, সে ক্ষেত্রে তুমি তোমার পিতামাতার আনুগত্য করো না। তবে দুনিয়ায় তাদের সাথে সদয় ও শ্রদ্ধাসুলভ আচরণের মাধ্যমে দিনাতিপাত করো। সদ্ভাবে এবং যে বিশুদ্ধচিত্তে আমার অভিমুখী হয়েছে, তার পথ অবলম্বন করো। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট এবং তোমরা যা করবে সে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবহিত করব।' (সূরা লোকমান: ১৪-১৫)
আল কুরআনের এই আয়াতে সত্যের পথে একান্তই শান্তশিষ্ট ও নম্র-ভদ্র এক কিশোরের ঈমানী চেতনাকে পরীক্ষা করা হয়েছে। তার তাওহীদ ও কুফরী ভাবধারা এবং মিথ্যার ওপর সত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার এক বিরল ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। যে ঘটনা যুগ যুগ ধরে সত্য সন্ধানীদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে আসছে। সত্যের পথে যে কিশোরের ঈমানী দৃঢ়তাকে কেন্দ্র করে এই ঘটনার সূত্রপাত, তিনি হলেন মক্কার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের শ্রদ্ধাভাজন পিতামাতার একমাত্র প্রাণপ্রিয় সন্তান সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস। যার প্রতি আল্লাহ নিজে সন্তুষ্ট এবং তিনিও আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট।
মক্কা নগরীতে যখন ইসলামের আলোর বিস্তার ঘটে, তখন তিনি উঠতি বয়সের এক কিশোর। স্বভাবে অত্যন্ত নম্র-ভদ্র ও শান্ত-শিষ্ট, পিতামাতার প্রতি একান্ত অনুগত। বিশেষ করে তিনি তার মাতার প্রতি ছিলেন বিশেষভাবে শ্রদ্ধাশীল।
সতেরো বছর বয়সের সা'দ ব্যক্তিত্বে ও বুদ্ধিমত্তায় ছিলেন সমবয়সীদের তুলনায় অনেক অগ্রসর। অপরদিকে তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয়দের মতো বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান ও দূরদর্শী। তিনি তাঁর সমবয়সী বন্ধুদের মতো হাসি-তামাশা ও আমোদ-প্রমোদপ্রিয় ছিলেন না। তীর-ধনুক তৈরির প্রতি ছিল তাঁর অসাধারণ ঝোঁক এবং তীরন্দাযীর প্রতি সীমাহীন আগ্রহ। এ ক্ষেত্রে তিনি সমকালীন আরবের অতি দক্ষ তীরন্দাযদের তুলনায় কোনো অংশেই কম ছিলেন না। তাঁকে দেখে মনে হতো যে, গুরুত্বপূর্ণ কোনো অভিযানের জন্য প্রস্তুতিতে সদাব্যস্ত। অপরদিকে শিরক ও পৌত্তলিকতায় নিমজ্জিত তাঁর জাতির কর্মকাণ্ডে তিনি মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না।
তিনি সর্বদা এ অপেক্ষায় ছিলেন যে, এমন কোনো নেতার আবির্ভাব কখন ঘটবে, যখন তিনি তাঁর বিস্ময়কর গুণাবলির পূর্ণ শক্তিশালী বাহু মক্কার বিধ্বস্ত সমাজের দিকে সম্প্রসারণ করবেন এবং অন্ধকারে নিমজ্জিত মানবজাতিকে উদ্ধার করবেন।
এসব আশাবাদের এক পর্যায়ে আল্লাহ বিশ্বমানবতার মুক্তির জন্য সেই গুণাবলি সম্পন্ন মহান নেতা বিশ্বনবী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাব ঘটালেন মক্কা নগরীতে। তিনি সাথে নিয়ে এলেন চির ভাস্বর, চির মহীয়ান আল কুরআন।
সেই আলোর রোশনীতে অন্ধকারে নিমজ্জিত জাতিকে তিনি মুক্তির পথে আহ্বান জানালেন। তারা জাহিলিয়াতের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সন্ধান পেল। এ হক ও হেদায়াতের দাওয়াত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস-এর কাছে পৌঁছানোর সাথে সাথে তিনিও তা কবুল করে নিলেন। তিনি হলেন, প্রথম পর্যায়ের ইসলাম গ্রহণকারী তৃতীয় বা চতুর্থ সাহাবী। এ জন্যই তিনি গর্বের সাথে প্রায়ই বলতেন, 'সাত দিন এমনভাবে অতিবাহিত করলাম যে, আমি ইসলামের এক-তৃতীয়াংশ হিসেবেই রইলাম।'
সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা এত স্বাভাবিক ও সহজ ঘটনা ছিল না। তিনি বিজ্ঞ ছিলেন বটে কিন্তু ঈমান আনার পথে তাঁকে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। তাঁর এ পরীক্ষার সমর্থনে শেষ পর্যন্ত আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনের আয়াত নাযিল করেছেন। তাঁর সেই দুর্লভ পরীক্ষার ঘটনা সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এভাবে বর্ণনা করেন:
'আমার ইসলাম গ্রহণের তিন রাত পূর্বে আমি স্বপ্নে দেখি, আমি যেন সমুদ্রের অতল গহবরে নিমজ্জিত হয়েছি এবং পানির তিমিরাচ্ছন্নতায় আমি আচ্ছাদিত হয়ে পড়েছি। গভীর সমুদ্রের তলদেশে ঢেউয়ের তালে তালে শুধু ওলট-পালট হচ্ছি। হঠাৎ দেখি আমার সামনে চাঁদের আলো উপস্থিত। আমি সেই চাঁদের আলোকে অনুসরণ করতে লাগলাম। এক পর্যায়ে চাঁদের নিকট পৌঁছে দেখি, সেখানে আমার পৌঁছানোর আগেই যারা সেখানে পৌঁছে গেছেন, তারা হলেন- যায়েদ ইবনে হারেসা, আলী ইবনে আবী তালিব এবং আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম।'
আমি তাঁদের প্রশ্ন করলাম:
'আপনারা কতক্ষণ আগে এখানে এসে পৌঁছেছেন?'
তাঁরা উত্তর দিলেন:
'ঘণ্টাখানেক আগে।'
এ স্বপ্ন দেখার তিন দিন যেতে না যেতেই সূর্য যখন দ্বিপ্রহরের কাছাকাছি, আমার কাছে খবর পৌঁছল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন। আমি বুঝতে পারলাম যে, হয়তো আল্লাহ আমার কল্যাণই চাচ্ছেন। আমার ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি আমাকে অন্ধকার পথ থেকে আলোর পথে আনতে চাচ্ছেন।
কালক্ষেপণ না করে তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্ধানে বের হলাম। খুঁজতে খুঁজতে তাঁকে 'শিআবে যিয়াদ' নামক স্থানে পেলাম। তিনি সবেমাত্র আসরের নামায শেষ করেছেন। আমি তাঁর হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করলাম। স্বপ্নে যে ক'জন ভাইকে দেখেছি সেই ক'জন ছাড়া আর কেউ আমার পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেননি।'
অতঃপর ইসলাম গ্রহণের সেই সংক্ষিপ্ত ঘটনার পর পরবর্তী পরীক্ষার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন:
'আমার আম্মা আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ শুনে ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। তাঁর ক্ষোভ বর্ণনা করার ভাষা আমার জানা নেই। আমি তার স্নেহধন্য ও অনুগত ছেলে।'
তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'কেমন ধর্ম তুমি গ্রহণ করেছ, তাতে এমন কী আছে যে, যার জন্য তোমার পিতামাতার ধর্ম পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছ? আল্লাহর শপথ, এই মুহূর্ত থেকে আমি পানাহার পরিত্যাগ করলাম, যতক্ষণ না তুমি তোমার নতুন ধর্ম পরিত্যাগ করে আমাদের ধর্মে ফিরে আসবে। অন্যথায় আমি এই দুনিয়া থেকে এ অবস্থায় চিরবিদায় নেব। এ জন্য তুমি সারাজীবন অনুতাপ করতে থাকবে। এ অগ্নিজ্বালা তোমাকে সারা জীবন দগ্ধ করবে। কিয়ামত পর্যন্ত লোকে তোমাকে এর জন্য ধিক্কার ও তিরস্কার করতে থাকবে।'
আমি আমার আম্মাকে অনুরোধ করে বললাম:
'আম্মা কখনো আপনি পানাহার পরিত্যাগ করবেন না। দুনিয়ার যে কোনো কিছুর বিনিময়েই হোক না কেন, আমি আমার দীন পরিত্যাগ করব না। আমি আমার অবস্থান নিলাম। তিনিও তার মতো জিদ ধরলেন ও পানাহার পরিত্যাগ করা অবস্থায় কয়েক দিন অতিবাহিত করলেন।'
এমনকি পানাহার না করার কারণে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ল। অস্বাভাবিক দুর্বল ও প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়লেন। এদিকে আমি প্রতিটি মুহূর্তেই তাঁর কাছে এসে তাঁর স্বাস্থ্যের খবরাখবর নিতে থাকি। তাঁর জীবন রক্ষার জন্য যৎকিঞ্চিৎ পানাহার করতে অনুরোধ জানাতে থাকি। তিনি প্রতিবারই কঠোরভাবে আমার কাতর আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে থাকেন। এমনকি তিনি এতই কঠোর শপথ করে বসলেন যে :
'হয় আমাকে আমার দীন ত্যাগ করে পৌত্তলিকতায় ফিরে আসতে হবে নতুবা তিনি পানাহার ত্যাগ করে মৃত্যুকে গ্রহণ করবেন।'
সংকট চরম আকার ধারণ করলে আম্মাকে বললাম :
'আম্মা আপনার প্রতি আমার অগাধ ভালোবাসা রয়েছে। আমি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে আপনার চেয়েও অধিক ভালোবাসি। আল্লাহর শপথ, যদি আপনাকে হাজারটি রূহ দান করা হয় এবং হাজার রূহই একের পর এক মৃত্যুবরণ করে, তবু আমি সা'দ দুনিয়ার কোনো কিছুরই বিনিময়ে ইসলাম ত্যাগ করব না।'
আমার এই অবিচলিত ও সীমাহীন দৃঢ় মনোবল দেখে তিনিই অবশেষে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হন এবং অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গে যৎ সামান্য পানাহার করতে সম্মত হন।'
আর এই মুহূর্তেই আল্লাহ এ ঘটনার প্রেক্ষিতে পবিত্র আয়াত নাযিল করেন :
وَإِنْ جَاهَدُكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبُهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا .
'তোমার পিতামাতা যদি আমার সাথে শিরক করার জন্য তোমার প্রতি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে, এমন শিরক যে, যার সমর্থনে তোমার নিকট কোনো দলীল-প্রমাণ নেই। সে ক্ষেত্রে তুমি তোমার পিতামাতার আনুগত্য করো না। তবে দুনিয়ায় তাদের সাথে সদয় ও শ্রদ্ধাসুলভ আচরণের মাধ্যমে দিনাতিপাত করো।'
সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে যেমন মুসলমানদের মর্যাদা সমুন্নত হয়, তেমনি ইসলামের গৌরব এবং শক্তিও বৃদ্ধি পায়। বদরের যুদ্ধে তাঁর ছোট ভাই উমাইর ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভূমিকাও চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর ছোট ভাই উমাইর ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে উঠতি বয়সের কিশোর বলা যায়। বদরের যুদ্ধের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন যোদ্ধাদের যোগ্যতা পরিমাপের জন্য তাদের শারীরিক অবস্থা যাচাই করছিলেন, তখন বয়সের স্বল্পতার কারণে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বাদ পড়েন কি না তা ভেবে উমাইর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টি এড়িয়ে গোপনে অবস্থান নিচ্ছিলেন। এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে দেখে ফেলেন এবং বয়সে ছোট হওয়ার কারণে তাঁকে ফেরৎ পাঠান। তাঁকে বাদ দেওয়ায় তিনি এমনভাবে কাঁদতে থাকেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হৃদয় গলে গেল। পরিশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দিলেন। এতে সা'দ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মনে আনন্দের জোয়ার বইতে লাগল। তিনি হাসিমুখে ছোট ভাই উমাইরের কাঁধে তলোয়ার ঝুলিয়ে দিলেন। মনে হচ্ছিল যেন তলোয়ারই তার চাইতে লম্বা। আনন্দের সাথে দুই সহোদর জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর জন্য যুদ্ধে রওয়ানা হলেন। যুদ্ধশেষে সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ছোট ভাই উমাইরকে শহীদ অবস্থায় বদরের রণক্ষেত্রে রেখে আল্লাহর কাছে এর বিনিময়ে উত্তম প্রতিদানের আশা করে একাই মদীনায় ফিরে এলেন।
উহুদের যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনীতে শত্রুদের ভয় ছড়িয়ে পড়লে তাদের পদস্খলন ঘটে। সাহাবীদের কয়েকজন ছাড়া সবাই প্রাণ বাঁচানোর জন্য নিরাপদ স্থানের উদ্দেশ্যে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ১০ জন সাহাবীও ছিলেন না। সেই চরম বিপদের সময় সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর তীরের প্রচণ্ড আঘাতের পর আঘাতে শত্রু বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেন। এক পর্যায়ে এমন নৈপুণ্যের সাথে তীর চালনা করছিলেন যে, তাঁর প্রতিটি তীর তিনি এক একজন মুশরিককে ধরাশায়ী করছিল। তাঁর এই তীর চালনার নৈপুণ্য দেখে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে উৎসাহ প্রদান করছিলেন আর বলছিলেন যে :
'তীর নিক্ষেপ কর সা'দ, বীরত্বের সাথে তীর নিক্ষেপ কর, তোমার প্রতি আমার আব্বা-আম্মা কুরবান হোক।'
তাঁর প্রতি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই উদ্দীপনাময় বাক্য উচ্চারণের জন্য সারা জীবন তিনি গর্ববোধ করতেন এই বলে যে:
'আমি ছাড়া আর কারো ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন উদ্দীপনাময় স্বরে তাঁর মা-বাবাকে কুরবান হওয়ার কথা কখনও উচ্চারণ করেননি।'
সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর সম্মানের সর্বোচ্চ শিখরে তখন আরোহণ করেন, যখন উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পারস্য সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেন। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ উদ্দেশ্যে মুসলিম সাম্রাজ্যের সকল গভর্নরদের প্রতি এক ফরমান জারি করেন:
'যুদ্ধে অংশগ্রহণের উপযোগী সব জনশক্তি চাই অস্ত্রধারী যোদ্ধা হোক অথবা অশ্বারোহী তীরন্দাজ, চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো চিকিৎসক হোক কিংবা পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখার মতো বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। পরামর্শ দেওয়ার মতো যোগ্য ব্যক্তিই হোক কিংবা যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করার মতো কোনো কবি-সাহিত্যিক বা বক্তা- সব ধরনের ব্যক্তিকেই আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।'
দলে দলে প্রতিনিধি দল আসতে লাগল। মদীনার অলিগলি তাদের পদচারণায় সরব হয়ে উঠল। সৈন্য সংগ্রহ চূড়ান্ত হলে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর কর্মপরিষদ এবং পরামর্শসভার যৌথ অধিবেশনে এ বিরাট বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে কাকে নিযুক্ত করা যায় এ নিয়ে পরামর্শ করেন।
তারা সর্বসম্মতিক্রমে ও সমস্বরে বললেন:
'সিংহ তো সর্বদা একজনই, আর তিনি হলেন, সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।'
উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নাম ঘোষণা করলেন। এবং এই বিরাট বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে তার হাতে যুদ্ধ-পতাকা সোপর্দ করলেন।
পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জিহাদের উদ্দেশ্যে মদীনা মুনাওয়ারা থেকে রওয়ানা হওয়ার প্রাক্কালে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের বিদায় দেওয়ার জন্য সেনাপতি সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ওসিয়ত করে বললেন:
'হে সা'দ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মামা সম্পর্কের অহংকার যেন আপনাকে পেয়ে না বসে এবং মনের মধ্যে এ অহংকার মাথাচাড়া দিয়ে না উঠে যে, আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন নিকটতম সাহাবী। জেনে রাখুন, আল্লাহ কখনো পাপ ও অন্যায়কে পাপ ও অন্যায় দিয়ে নির্বাপিত করেন না; বরং পাপ ও অন্যায়কে তিনি পুণ্য ও করুণা দিয়েই নির্বাপিত করে থাকেন। হে সা'দ! আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমেই সত্যিকারার্থে তিনি তাঁর বান্দাকে নিরূপণ করে থাকেন; বংশ-গৌরবের কারণে নয়। উচ্চ বংশীয় সম্ভ্রান্ত পরিবার নামে খ্যাত ও নিম্ন বংশীয় সাধারণ পরিবার আল্লাহর দৃষ্টিতে সবাই সমান। কারণ, আল্লাহই তাদের প্রভু। আর তারা সবাই তাঁর বান্দাহ। তাকওয়া ও আনুগত্যের ভিত্তিতেই তারা সর্বাধিক সম্মানিত। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত ও নির্দেশের প্রতি বিশেষ করে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ ও হেদায়াত আমাদের জন্য চূড়ান্ত হেদায়াত, নসীহত ও নির্দেশ।'
অতঃপর এই বিরাট বাহিনী জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। তাদের মধ্যে ছিল নিরানব্বই জন বদরী সাহাবীসহ বায়আতে রেযওয়ানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে উপস্থিত থাকা তিনশত দশজন স্বনামধন্য বুযুর্গ সাহাবী। ফতেহ মক্কা বা মক্কা বিজয়কালের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামের নিকটতম তিন শত যোদ্ধা সাহাবী ছাড়াও সাহাবী সন্তানদের সাত শত তরুণ যোদ্ধা এ বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে তার শোভা বৃদ্ধি করছিল।
সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর এই বিরাট বাহিনী নিয়ে ১৬ হিজরীতে ঐতিহাসিক কাদেসিয়া ময়দানের অভিমুখে রওয়ানা হলেন। কাদেসিয়ার যুদ্ধে আল্লাহ মুসলমানদের ঐতিহাসিক বিজয় দান করেছিলেন। এই যুদ্ধের শেষ দিনকে 'ইয়াওমুল হারীর' বা হত্যাকাণ্ডের বিভীষিকাময় দিন বলা হয়। সেই দিন মুসলমান যোদ্ধারা পারস্য বাহিনীকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে নিঃশেষ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং তাদেরকে এমনভাবে হত্যা করতে থাকেন যে, তাদের পালানোর আর কোনো সুযোগ ছিল না। আল্লাহু আকবার তাকবীর ধ্বনির তালে তালে মুসলিম যোদ্ধারা এমনভাবে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন যে, পারস্য সেনাপতি রুস্তমের কর্তিত শির মুসলমানদের বর্শার মাথায় ঝুলানো হলে শত্রুবাহিনীর মধ্যে ভীষণভাবে ভীতির সঞ্চার হয়। তাদের এক এক করে ইঙ্গিত করামাত্রই অবনত মস্তকে মুসলিম বোদ্ধাদের সামনে উপস্থিত হলে তাদের তরবারি দ্বারাই তাদেরকে হত্যা করা হতো। গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ ধন-সম্পদের পরিমাণ যতই বর্ণনা করা হোক না কেন, তা ছিল সবই কম। এ যুদ্ধে পারস্য সৈনিকদের মধ্যে যাদের ছিন্নভিন্ন লাশ গণনা করা সম্ভব হয়েছিল তাদের সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজার।
সা'দ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আল্লাহ দীর্ঘ হায়াত ও বিশাল প্রাচুর্য দান করেছিলেন। মৃত্যুর ওসিয়তকালে তিনি তাঁর ছেঁড়া-ফাটা পশমি একখানা জামা দেখিয়ে বলেন যে:
كفنونى بِهَا فَإِنِّي لَقِيتُ بِهَا الْمُشْرِكُونَ يَوْمَ بَدْرٍ وَإِنِّي أَرِيدُ أَنْ أَلْقَى بِهَا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ أَيْضًا .
'এই জামা দিয়ে আমাকে কাফন পরাবে। কারণ এই জামা পরিধান করে আমি বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম এবং আমি চাই যে, এই জামা পরা অবস্থায় কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হই। তাঁর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করি।' আমীন!
টিকাঃ
১. আল ইসতিয়াব: ২য় খণ্ড, ১৮ পৃ.
২. আল ইসাবাহ: ২য় খণ্ড, ৩০ পৃ.
৩. আল মিলালু ওয়ান নিহালু: ১ম খণ্ড, ২০ পৃ.
৪. আশহুরু মাশাহিরিল ইসলাম: ৩য় খণ্ড, ৫২৫ পৃ.
৫. আত তাবাকাতুল কুবরা ১ম খণ্ড, ২১ পৃ.
৬. তুহফাতুল আহওয়াযী: ১০ খণ্ড, ২৫৩ পৃ.
৭. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১ম খণ্ড, ৬২ পৃ.
৮. যুআমাউল ইসলাম: ১১৪ পৃ.
৯. রিজালু হাওলার রাসূল: ১৪১ পৃ.
১০. সা'দ ইবনে আবী ওক্কাস ওয়া আবয়াতায়ালুল কাদেসিয়াহ লিস্-সাহ্হার.
১১. আর রিয়াদুল নাদিরাহ: ২য় খণ্ড, ২৯২ পৃ.
১২. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১ম খণ্ড, ১৩৮ পৃ.
১৩. তাহযীব ইবনে আসাকির: ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৯৩ পৃ.
১৪. আল মাআরিফ: ১০৬ পৃ.
১৫. আন নুজুমুয যাহিরাত: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১৬. উসদুল গাবাহ: ২য় খণ্ড, ২৯০ পৃ.
১৭. জামহারাতু আনসাবিল আরব: ৭১ পৃ.
১৮. তারীখুল ইসলাম: ১ম খণ্ড, ৭৯ পৃ.
১৯. ফাতাহ মিসর ওয়া আখবারুহা: ৩১৮ পৃ.
২০. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৮ম খণ্ড, ৭২ পৃ.
📄 হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান (রাঃ)
তোমাদের জন্য হুযাইফা (রা) যা বর্ণনা করে, তা বিশ্বাস করো এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) যেভাবে কুরআন তিলাওয়াত করে, তোমরা সেভাবে কুরআন তিলাওয়াত করো।
-রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণী
'তুমি যা পসন্দ কর, মুহাজির হিসেবেও পরিচয় দিতে পার, আর যদি আনসার হিসেবে পরিচয় দিতে চাও, তাও দিতে পার। এই দুটির মধ্যে যে পরিচয় তোমার কাছে বেশি পছন্দনীয়, সেই পরিচয়েই নিজের পরিচয় দাও।'
ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে। তাঁর পরিচয়ের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপরিউক্ত কথাগুলো বলেন।
মুসলমানদের সবচাইতে সম্মানিত দুই গোষ্ঠীর মধ্যে যে কোনো এক গোষ্ঠীর পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার মূলে রয়েছে একটি ঘটনা। ঘটনাটি হচ্ছে, হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পিতা আল ইয়ামান মক্কা নগরীর বনূ আব্স গোত্রের সদস্য। কোনো কারণে একজনকে হত্যা করার অপরাধে মক্কা থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সে ইয়াসরিবে গিয়ে আবদে আশহাল গোত্রে আশ্রয় নেয়। সেই গোত্রেই বিয়ে করে। তাদের সাথেই আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ হয়। সেখানেই তাঁর পুত্র হুযাইফা জন্মগ্রহণ করে। এই প্রবাস জীবনের এক পর্যায়ে আল ইয়ামানের ওপর থেকে মক্কা প্রবেশের বাধা-নিষেধ তুলে নেওয়া হয়। তখন থেকেই সে মক্কায় আসা-যাওয়া শুরু করে। তার মদীনায় অবস্থানকালই ছিল দীর্ঘ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় হিজরত করার পূর্বেই ইসলামের আলোকে আরব ভূমি আলোকিত হয়ে ওঠে। তখন হুযাইফার পিতা আল ইয়ামানের নেতৃত্বে আবদ আশহাল গোত্রের আরো এগারো জন সদস্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য মক্কায় আসেন এবং তাঁর সঙ্গে দেখা করে ইসলাম গ্রহণ করেন। এ কারণে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মদীনায় প্রতিপালিত মাক্কী সন্তান হিসেবে পরিচিত হন।
হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসলিম পিতামাতার যত্নে ইসলামী পরিবেশে প্রতিপালিত হতে থাকেন। এ পরিবারের সদস্যরা ইসলামের প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণের গৌরবে গৌরবান্বিত ছিলেন। শিশু হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে না দেখেই পিতামাতার সংস্পর্শে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক নজর দেখে মনে শান্তি পাওয়ার জন্য শিশু সাহাবী হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মনে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি হয়। পিতামাতার কোলে ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো আলোচনা হলেই অদম্য আগ্রহে তাঁকে খুঁজতে থাকতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তিনি পিতা-মাতাকে নানা প্রশ্ন করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর এই আগ্রহ ক্রমেই বাড়তে থাকে। বাধ্য হয়েই আল ইয়ামান শিশু হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাৎ লাভ করানোর জন্য মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। মক্কায় পৌছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ হলে শিশু সাহাবী হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি মুহাজির না আনসার?'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন:
'তুমি যা চাও, মুহাজির হিসেবেও পরিচয় দিতে পার, আর যদি আনসার হিসেবে পরিচয় দিতে চাও তাও দিতে পার। এ দুটির মধ্যে যে পরিচয় তোমার কাছে বেশি পছন্দনীয়, সে পরিচয়েই নিজের পরিচয় দাও।'
উত্তরে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি বরং আনসার হিসেবে পরিচিত হতে চাই।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় হিজরত করেন, তখন হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্যে সর্বক্ষণ লেগে থাকেন। তিনি এক মুহূর্তও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দূরে যেতেন না। শুধু বদরের যুদ্ধ ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার পেছনে একটা ঘটনা রয়েছে। তিনি নিজেই সে ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেন:
'বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার পিছনে কারণ হলো, আমি ও আমার পিতা মদীনার বাইরে ছিলাম। সে সময় আমরা কুরাইশদের হাতে বন্দী হই।
জিজ্ঞাসাবাদকালে তারা বলে যে:
'তোমরা কোথায় কী উদ্দেশ্যে যাচ্ছো?'
আমরা উত্তর দিলাম :
'মদীনার উদ্দেশ্যে।'
তারা প্রশ্ন করল :
'হ্যাঁ, তোমরা মুহাম্মদের পক্ষ নিয়ে তার শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যাচ্ছ?'
আমরা উত্তর দিলাম:
আমরা শুধু মদীনার উদ্দেশ্যেই রওয়ানা হয়েছি। তারা কোনোক্রমেই এই কথা বিশ্বাস করতে চাচ্ছিল না, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি না দেই যে, আমরা বদরের যুদ্ধে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করব না। কোনোভাবেই যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মিলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করি, এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে আমাদের ছেড়ে দেয়। মদীনায় পৌঁছে কুরাইশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ঘটনা এবং যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছাড়া পেয়েছি তা বর্ণনা করি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমাদের করণীয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন:
'আমরা তাদেরকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করব এবং তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইব। তাদের শক্তির চেয়ে আল্লাহর শক্তিই বড় শক্তি।'
হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর পিতা আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে উহুদের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শত্রুদের চরম আক্রমণের মুখে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে আল্লাহর রহমতে রক্ষা পান এবং তাঁর পিতা আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু শাহাদাত বরণ করেন। কিন্তু এই শাহাদাত মুশরিকদের তলোয়ারের আঘাতে নয়; বরং মুসলমানদের তলোয়ারের আঘাতের কারণে।
তারও একটা ঘটনা রয়েছে, তা হলো:
উহুদের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল ইয়ামান এবং সাবেত ইবনে ওয়াক্স রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে তাদের অতি বার্ধক্যের কারণে মহিলা ও শিশুদের সাথে নিরাপদ আশ্রয়ে নির্ধারিত দুর্গে অবস্থান নিতে বলেন। কিন্তু যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করলে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু তার সাথী সাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বলেন:
'সাবেত তুমি কী চিন্তা করছো? আল্লাহর শপথ! আমরা আর কত দিন বাঁচব? বড় জোর গাধার পিপাসা লাগতে যতটুকু সময় লাগে। নিঃসন্দেহে আজ অথবা কাল মৃত্যু আমাদের প্রাণ কেড়ে নেবে সে জন্য নিঃসন্দেহে আমাদের তলোয়ার নিয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ করা উচিত। হতে পারে এ ওসীলায় আল্লাহ তাঁর নবীর সাথে আমাদেরও শাহাদাত দান করতে পারেন।'
অতঃপর উভয়েই তলোয়ার হাতে নিয়ে জিহাদের ময়দানে এসে জিহাদ শুরু করেন। আল্লাহ সাবেত ইবনে ওয়াক্স রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে শাহাদাত নসীব করেন। হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পিতা আল ইয়ামান ভুলবশত মুসলমানদের আঘাতের শিকার হন। কারণ, তারা তাঁকে চিনতেন না। এদিকে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দূর থেকে আমার পিতা, আমার পিতা বলে চিৎকার করতে থাকেন। কিন্তু জীবন-মরণ এই জিহাদে কার কথা কে শোনে। পরিণতিতে বৃদ্ধ সাহাবী তাঁর সাথীদের তলোয়ারের আঘাতের পর আঘাতে ভূমিতে লুটিয়ে পড়েন। হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এই হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্য দায়ী সাহাবীদের উদ্দেশ্যে শুধু এতটুকুই বললেন: 'আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিন। তিনি অসীম করুণাময়।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে তার পিতা আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর 'দিয়াত' বা রক্তের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ফায়সালা করেন। হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেই রক্তের মূল্য নিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে বলেন:
'আমার পিতার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শাহাদাত লাভ। তাঁর সে আশা পূরণ হয়েছে। হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থেকো, আমি আমার পিতার রক্তের মূল্য মুসলমানদের উপঢৌকন দিলাম।'
তাঁর এই বিপ্লবী ভূমিকা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মর্যাদা অত্যধিক বৃদ্ধি করে দেয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তিনটি গুণ পরিষ্কারভাবে পরিস্ফুটিত হয়:
১. কঠিন সমস্যায় সূক্ষ্ম উপস্থিত বুদ্ধি।
২. যে কোনো পরিস্থিতিকে দ্রুত অনুধাবন।
৩. সীমাহীন গোপনীয়তা রক্ষা করার দুর্লভ গুণ।
সাহাবীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, যে সাহাবী যে ধরনের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন, তাকে সেই ধরনের দায়িত্ব অর্পণ করতেন।
মদীনায় মুসলমানগণ ইহুদী ও তাদের অনুচরদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে পড়েন। মুসলমানদের ছদ্মাবরণে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মুনাফিকদের নাম ধরে ধরে পরিচয় করিয়ে দেন। এটা ছিল এমন একটি গোপন বিষয়, যা অন্য সাহাবীরা জানতেন না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের গতিবিধি সম্পর্কে তাঁকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার দায়িত্ব দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে তাদের গোপন ষড়যন্ত্র এবং ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেন। যথাসময়ে যেন তার প্রতিকার করা সম্ভব হয়। সাহাবীগণ এ জন্য হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপন তথ্যের সংরক্ষণাগার বলে ডাকতেন। ইসলামের স্বার্থে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ এবং বিপজ্জনক খিদমতের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর উপস্থিত বুদ্ধি, তীক্ষ্ণ মেধা ও আনুগত্যকে কাজে লাগিয়েছেন।
বিশেষ করে খন্দক যুদ্ধের চরম মুহূর্তে যখন মুসলিম বাহিনী সামনে ও পেছনে উভয় দিক থেকে শত্রুবাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ ছিলেন। দীর্ঘ দিনের এ অবরোধের কারণে পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত অবনতির দিকে যাচ্ছিল। তখন এই কঠিন পরীক্ষায় মুসলমানদের ধৈর্য ও ত্যাগের সীমা অতিক্রম হতে যাচ্ছিল। প্রতিটি মুহূর্তেই বিপদ আপতিত হওয়ার ও হতাশায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এমনকি দুর্বল ঈমানের মুসলমানগণ আল্লাহর সাহায্যের ব্যাপারে নানা মন্তব্য পর্যন্ত করতে শুরু করে। তখন হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন দৃঢ় ঈমানী প্রত্যয়ে প্রত্যয়ী। অন্যদিকে কুরাইশ ও তার সহযোগী বাহিনীদের অবস্থাও মুসলিম বাহিনীর চেয়ে কোনোক্রমেই ভালো ছিল না। তাদের এ দুরবস্থার সময় আল্লাহ তাদের উপর এমন এক গযব নাযিল করেন, যা তাদের মনোবলকে আরও দুর্বল করে দেয়। বিজয়ের আশা দুরাশায় পরিণত হয়। আল্লাহ তাআলা তাদের ঝড়ো হাওয়া দ্বারা বিপর্যস্ত করেন। কুরাইশদের তাঁবুসমূহ লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। বাসনপত্রের এক একটি নানাদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। অনেকগুলো প্রবল বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যায়। তাদের মুখমণ্ডল ধূলিতে আচ্ছাদিত হয়। চোখে ও নাকে-মুখে বালির কণা ঢুকে পড়ে। এই চরম প্রতিকূল ও বিপদসংকুল পরিবেশে তাদের ভাগ্যে পরাজয়কেই ত্বরান্বিত করে। তারা সর্বপ্রথম নিজেদের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। তারা বিশ্বাসী ছিল যে, বিজয় তাদের অনিবার্য। কারণ, আনুগত্যে, নিয়মানুবর্তিতায়, শৃঙ্খলায় ও ত্যাগ স্বীকারে সদা প্রস্তুত ছিল তারা।
কিন্তু এসব দ্বারা আল্লাহর গযব থেকে রক্ষা পাওয়া গেল না। ঠিক সেই মুহূর্তে যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল। বিজয় ছিনিয়ে আনার জন্য গুপ্তচরের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের গোপনীয়তা ও দুর্বল অবস্থা উদ্ঘাটন করে সেখানে আঘাত করাই ছিল এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার মতো গুপ্তচরের তীব্র প্রয়োজন দেখা দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কুরাইশ সেনাপতির গতিবিধি ও শত্রুবাহিনীর প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য রাতের গভীর অন্ধকারে শত্রুবাহিনীর অভ্যন্তরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন, যাতে শত্রু বাহিনীর ওপর আঘাত হানার আগে তাদের সঠিক অবস্থা জানতে পারেন।
এ মুহূর্তে আমরা হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নির্ঘাত মৃত্যুর মুখে যাওয়ার ঘটনাটি তাঁর নিজ বর্ণনা থেকেই তুলে ধরছি।
হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
'আমরা সেই ঝড়ের রাতে সারিবদ্ধ হয়ে চৌকসভাবে বসেছিলাম। আবূ সুফিয়ান এবং তার সহযোগী মিত্র বাহিনীর যোদ্ধারা আমাদের সামনে এবং বনু কুরাইযার ইহুদী সম্প্রদায়ের যোদ্ধারা আমাদের পেছনে অবস্থান নিয়েছিল। আমরা তাদের পক্ষ থেকে আমাদের সন্তান ও মহিলাদের ওপর আক্রমণের আশঙ্কা করছিলাম। এ রাতের মতো এমন ভয়াবহ অন্ধকার ও ভীষণ ঝড়-তুফানের রাত আমরা জীবনে আর কখনো দেখিনি। দমকা হাওয়ার শব্দ ছিল কড়কড় বজ্রধ্বনির মতো। আর এর ভয়াবহ অন্ধকার ছিল এমন যে, আমরা কেউ আমাদের হাতের আঙুল পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমাদের মধ্যে অবস্থানরত মুনাফিকরা বিভিন্ন বাহানায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে এই বলে অনুমতি নিচ্ছিল যে, আমাদের বাড়িঘর অরক্ষিত, তাই আমাদের নিজ নিজ ঘরে ফিরে যাওয়া জরুরি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে যুদ্ধ-ময়দান ছেড়ে যেতে অনুমতি দেন। মুনাফিকদের মধ্যে যারাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সবাইকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। এভাবে বিভিন্ন অজুহাতে যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত আমরা মাত্র ৩০০ (তিন শত) জন বা এর কিছু বেশি সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ময়দানে অবশিষ্ট ছিলাম।' মুনাফিকদের যুদ্ধের ময়দান থেকে চলে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক এক করে আমাদের সবারই অবস্থান পর্যবেক্ষণ করার জন্য বের হন এবং আমার কাছে এসে পৌঁছেন। শীতবস্ত্র হিসেবে আমার পরিধানে ছিল আমার স্ত্রীর ওড়না বা চাদর, যা দ্বারা কোনোক্রমে আমার হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঢাকা হয়েছিল। তাছাড়া আর কিছু ছিল না। এ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার একেবারে কাছে এগিয়ে এলেন। আমি তখন হাঁটু গেড়ে বসেছিলাম।
তিনি বললেন: 'তুমি কে?'
আমি বললাম : 'হুযাইফা।'
তিনি বললেন: 'হুযাইফ?'
তখন আমি ভীষণ ঠাণ্ডা ও ক্ষুধায় কাতর হয়ে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিলাম।
আমি বললাম: 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান।'
তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কানে কানে বললেন: 'শত্রুবাহিনীর অবস্থান জানা একান্ত দরকার, শত্রুবাহিনীর ভিতর ঢুকে পড় এবং তাদের অবস্থান সম্পর্কে আমাকে অবহিত কর। এ রাতে আমি সবচেয়ে শীত, ক্ষুধায় ও ভীতিতে আক্রান্ত হয়েছিলাম।'
আমার এই অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার জন্য এই দোআ করলেন:
اللَّهُمَّ احْفِظُهُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ عَنْ يَمِينِهِ وَعَنْ شِمَالِهِ وَمِنْ فَوْقِهِ وَمِنْ تَحْتِه .
'হে আল্লাহ! হুযাইফাকে তাঁর সামনে, পেছনে, ডানে, বামে এবং উপর-নিচের যাবতীয় বিপদ-মুসীবত থেকে রক্ষা করো।'
‘আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু'আ শেষ হতে না হতেই আল্লাহ আমার মন থেকে সর্বপ্রকার ভয়-ভীতি ও শরীর থেকে শীতের আড়ষ্টতা দূর করে দিলেন।’
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে বললেন: 'হুযাইফা! খবরদার শত্রুবাহিনীর মধ্যে কিছু করো না, শুধু তাদের তথ্য এনে আমাকে দেবে।'
উত্তরে বললাম: 'জী হ্যাঁ! এই বলে রাতের অন্ধকারে নির্ঘাত মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে শত্রু বাহিনীর মধ্যে সংগোপনে ঢুকে পড়লাম। কিছু দূর অগ্রসর হয়েই দেখি, কুরাইশ সেনাপতি আবু সুফিয়ান তার সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে। সে বলছে:
'কুরাইশদের আমি এ মর্মে সতর্ক করে দিচ্ছি যে, আমরা আশঙ্কা করছি, মুহাম্মদের অনুচররা আমাদের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে। তাই প্রত্যেকেই যেন তার পার্শ্ববর্তী সাথীর প্রতি লক্ষ্য রাখে।'
আমি তৎক্ষণাৎ আমার পাশের ব্যক্তির হাত ধরে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'তোমার নাম কী? সে উত্তর দিল আমি অমুকের পুত্র অমুক।'
অতঃপর আবু সুফিয়ান তার বক্তৃতা অব্যাহত রেখে বলল: 'কুরাইশ ভাইয়েরা! আল্লাহর শপথ! আপনারা নিশ্চয়ই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। আমাদের উট-ঘোড়াগুলো ঝড়ের কারণে মারা গেছে। আমাদের সহযোগী ইহুদী সম্প্রদায় বনু কুরাইযা তাদের কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আমরা প্রচণ্ড শীতে ও তুফানে আক্রান্ত হয়ে পড়েছি। আপনারা এর প্রত্যক্ষ সাক্ষী।'
অতঃপর বলল: 'অতএব যার যা অবশিষ্ট আছে, তাই নিয়ে চলুন আমরা মক্কায় ফিরে যাই। এই বলে সে তার উটের কাছে গিয়ে উটের রশি খুলে তার পিঠে উঠে বসল এবং চাবুক হাঁকিয়ে মক্কার পথে রওয়ানা হলো।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি আমাকে কোনো কিছু করা থেকে বিরত না রাখতেন বা শুধু তথ্য সংগ্রহের জন্য না পাঠাতেন, তাহলে এ সুযোগে আমি আবূ সুফিয়ানকে অবশ্যই হত্যা করতাম। এরপর আমি সেখান থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে এলাম। এ সময় তিনি তাঁর কোনো এক স্ত্রীর চাদর গায়ে জড়িয়ে নামায আদায় করছিলেন। আমাকে দেখে তিনি কাছে ডেকে নিলেন এবং চাদরের একটা অংশ দিয়ে আমাকে আবৃত করলেন। আমি তাঁকে আমার রিপোর্ট পেশ করলে তিনি খুবই আনন্দিত হলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও শুকরিয়া আদায় করলেন।
হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা সারা জীবনই মুনাফিকদের চরিত্র ও পরিচয় নিজের জন্য আমানত রেখে অতিবাহিত করতেন। খলীফাগণ মুনাফিকদের সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাঁর কাছ থেকে জেনে নিতেন। এমনকি উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর অবস্থা ছিল এই যে, কোনো মুসলমান মারা গেলে হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা তার জানাযায় উপস্থিত হয়েছেন কি না তা জিজ্ঞাসা করতেন। যদি উত্তর পেতেন যে, হ্যাঁ তিনি জানাযায় উপস্থিত হয়েছেন, তবেই তিনি জানাযায় ইমামতি করতেন। আর যদি না-সূচক উত্তর পেতেন, তাহলে তাকে মুনাফিক হিসেবে সন্দেহ করতেন এবং তার জানাযার নামায থেকে সরে দাঁড়াতেন। একবার উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে জিজ্ঞাসা করেন: 'তার গভর্নরদের মধ্যে কোনো মুনাফিক আছে কি না?'
তিনি বললেন: 'হ্যাঁ, একজন আছে।'
উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'সে কে তা দেখিয়ে দাও।'
হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন: 'না, আমি তা করতে পারি না।'
হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, অল্প দিনের মধ্যেই উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাকে অপসারণ করেন, যেন সেই মুনাফিকের ব্যাপারে তিনি ইঙ্গিত লাভ করেছেন। সম্ভবত খুব স্বল্পসংখ্যক মুসলমানই একথা জানেন যে, সেনাপতি হিসেবে হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামানই মুসলমানদের জন্য নাহাওয়ান্দ, দাইনাওয়ার, হামাদান এবং রাই শহর বিজয় করেছিলেন। বিজিত শহরগুলোতে আল্লাহর কিতাব আল কুরআন তিলাওয়াতের উচ্চারণের ব্যাপারে মুসলমানরা ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে শতধা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার পর তিনিই আবার তাদেরকে একই তিলাওয়াতের ব্যাপারে ঐকমত্যে আনেন। বহু গুণে গুণান্বিত হওয়া সত্ত্বেও নিজের ব্যাপারে চরম খোদাভীতিই ছিল হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার প্রকৃত গুণ। মৃত্যুশয্যায় রোগ প্রচণ্ড আকার ধারণ করলে রাতের বেলায়ই সাহাবীরা তাঁর কাছে এলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন:
'এটা কোন্ সময়?'
সবাই বললেন:
'একটু পরেই রাত পোহাবে।'
তিনি বললেন:
'এমন সকাল থেকে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই, যা আমাকে দোযখের দিকে নিয়ে যেতে পারে।'
অতঃপর জিজ্ঞাসা করলেন:
'আপনারা কি আমার জন্য কাফন এনেছেন?
তারা বললেন:
'হ্যাঁ।'
তিনি বললেন:
'অধিক মূল্যবান কাফন দেবেন না। কারণ, আল্লাহর কাছে যদি আমি পুরস্কৃত হই, তাহলে এই কাফন পরিবর্তন করে উত্তম পোশাক পরিয়ে দেওয়া হবে। আর যদি বিপরীত অবস্থা হয়, তাহলে এটা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হবে।'
অতঃপর বলতে থাকলেন:
اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَعْلَمُ إِنِّي كُنْتُ أَحِبُّ الفَقْرَ عَلَى الْغِنَى وَأُحِبُّ الدِّلَّةَ عَلَى الْعِزَّ وَأُحِبُّ الْمَوْتَ عَلَى الْحَيَاةِ .
'হে আল্লাহ! তুমি জানো, আমি দারিদ্র্যকে প্রাচুর্যের উপর প্রাধান্য দিয়েছি। নম্রতাকে কঠোরতার চেয়ে এবং মৃত্যুকে জীবনের চেয়ে ভালোবেসেছি।'
তারপর তিনি জীবনের শেষ মনভরা আশা নিয়ে দু'আ করেন:
حَبِيبٌ جَاءَ عَلَى شَوْقٍ، لَا أَفْلَحَ مِنْ نَدِم .
'হে আল্লাহ! তোমার বন্ধু সাক্ষাতের উচ্চ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তোমার দ্বারে হাজির, কিন্তু ত্রুটি-বিচ্যুতিতে জাহান্নামের ভয়ে একান্তই লজ্জিত।'
হুযাইফা ইবনে আল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা একজন ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত বর্ষণ করুন। আমীন।
টিকাঃ
১. আল ইসতিয়াব: ১ম খণ্ড, ২৭৬ পৃ.
২. আল ইসাবাহ: ১ম খণ্ড, ৩১৭ পৃ.
৩. আত তাবাকাতুল কুবরা: ১ম খণ্ড, ২৫ পৃ.
৪. সিযা আলামুন নুবালা: ২য় খণ্ড, ২৬০ পৃ.
৫. তাহযীবুত তাহযীব: ২য় খণ্ড, ২১৯ পৃ.
৬. সিফাতুস সাফাওয়াহ: ১ম খণ্ড, ২৪৯ পৃ.
৭, উসদুল গাবাহ: ১ম খণ্ড, ২৯০ পৃ.
৮. তারীখুল ইসলাম: ২য় খণ্ড, ১৫২ পৃ.
৯. আল মাআরিফ: ১১৪ পৃ.
১০. আন নুজুমুয যাহিরাহ: ১ম খণ্ড, ৭৬, ৮৫, ও ১০২ পৃ.
📄 উকবা ইবনে আমের আল জুহানী (রাঃ)
আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার প্রবেশ-দ্বারে এসে পৌঁছলেন। উৎসুক মদীনাবাসী প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথী আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে এক নজর দেখার জন্য ব্যাকুল। তারা ঘরের ছাদে ও উঁচু জায়গায় ভীড় জমিয়ে 'আল্লাহু আকবার' তাকবীরধ্বনির মাধ্যমে মদীনার আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে। তাঁকে এক নজর দেখে চক্ষুদ্বয়কে শীতল করার জন্য রাস্তায় বের হয়ে পড়ে।
মদীনার ছোট ছোট শিশুরা দফ্ হাতে আনন্দের গান গেয়ে গেয়ে নবীজীকে এ ভাষায় অভ্যর্থনা জানাতে থাকে:
أَقْبَلَ الْبَدْرُ عَلَيْنَا مِنْ ثَنِيَّاتِ الْوِدَاع وَجَبَ الشَّكْرُ عَلَيْنَا مَا دَعَا لِلَّهِ دَاع .
'পূর্ণিমার চাঁদ সানিয়াতুল বিদা থেকে উদিত হয়ে আমাদের মাঝে আগমন করেছেন। আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী যতদিন আহ্বান জানাবেন, ততদিন তাঁর আগমনের জন্য আমাদের শোকরগুযারী করা একান্ত কর্তব্য।'
রাস্তার দু'ধারে উৎসুক নারী-পুরুষ ও শিশুরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর কাফেলা ধীরে ধীরে মদীনায় প্রবেশ করছেন। তাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক নজর দেখে অনেকের আনন্দের অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে। ব্যাকুল মন শান্ত ও পরিতৃপ্ত হচ্ছে।
কিন্তু উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাফেলাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য উৎসুক জনতার সঙ্গে যোগ দিতে পারেননি। কারণ, তিনি তাঁর বকরি পালের তত্ত্বাবধানে মদীনা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছিলেন। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় বকরিগুলো যাতে কষ্ট না পায় এ জন্য তিনি সেখানে এ দায়িত্ব পালন করছিলেন। হ্যাঁ, মদীনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনে আনন্দ ও খুশির জোয়ার আসে প্রতিটি ঘরে ঘরে। মদীনার শহর-সীমানা অতিক্রম করে দূর-দূরান্তের বেদুইন তাঁবুগুলোতেও সেই আনন্দ-উৎসবের ঢেউ লাগে। এ আনন্দের বার্তা উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে।
উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কিভাবে সাক্ষাৎ করেন, সেই সাক্ষাতের কাহিনী তাঁর কাছ থেকেই শুনুন।
তিনি বর্ণনা করেন:
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করেন, তখন আমি আমার বকরির পাল চরাতে মদীনা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছিলাম। সেখানেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনায় পৌঁছার সংবাদ পাই। এই শুভ সংবাদ পেয়েই আমি সেখানে বকরির পাল রেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দেখা করার জন্য রওয়ানা হই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমার বাইআত গ্রহণ করবেন?
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: 'তুমি কে?'
আমি উত্তর দিলাম: উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'বাইআত দুই ধরনের। যেমন, বেদুইনদের থেকে বাইআত নেওয়া। এটা স্বাভাবিক বাইআত এবং অপরটি হচ্ছে হিজরতের বাইআত। তোমার জন্য কোন্টি গ্রহণ করব?'
আমি বললাম, বরং হিজরতের বাইআত গ্রহণ করুন!
অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার থেকে মুহাজিরদের কৃত বাইআতের মতো বাইআত গ্রহণ করলেন। সেখানে এক রাত কাটিয়ে আমি আমার বকরি পালের জায়গায় ফিরে এলাম।
আমরা এক সঙ্গে বারো জন মদীনা শহর থেকে অনেক দূরে মরু এলাকায় বকরি চরাতাম। আমরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করি। আমরা পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করলাম:
'আমরা যদি ইসলামের বিধি-বিধান শিক্ষার উদ্দেশ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত না হই, তবে আমাদের কোনো কল্যাণ নেই।'
অতএব, আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি যে, প্রতিদিন আমাদের একজন করে মদীনায় যাবে। তার বকরির পাল আমাদের কাছে থাকবে। এভাবে পালাক্রমে আমরা প্রত্যেকেই মদীনায় যাব। আমি বকরি পালনে বেশি আন্তরিক ছিলাম। তাই এ ব্যাপারে অন্যের ওপর আমার আস্থা ছিল না বিধায় তাদেরকে বললাম:
ঠিক আছে, আমিই তোমাদের প্রত্যেকের বকরির পালের দায়িত্ব নিলাম। তোমরা পালাক্রমে একজন করে প্রতিদিনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খidমতে উপস্থিত হও।
এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিদিন খুব ভোরে একজন করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে রওয়ানা হতো। আমি থাকতাম তার বকরির পাল দেখাশোনার দায়িত্বে। সে ফিরে এসে তার বকরির পাল ফেরৎ নিত এবং যা যা শিখে আসত তা আমার কাছে বলতো। তার থেকে আমি ঐসব শিখে নিতাম।
কিন্তু এ পদ্ধতিতে জ্ঞানার্জনে পরিতৃপ্ত হতে পারলাম না। ইসলামী জ্ঞানার্জনের সরাসরি পথই আমি গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়ে পড়লাম। দুনিয়ার মোহমুক্তির পথ তালাশ করতে লাগলাম। ভাবলাম, বকরির পাল চরানো দ্বারা আমি বিত্তবানও হব না, দুনিয়ার মোহে থাকলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতে ও জানতেও পারব না। আমি কুরআনের শিক্ষা সরাসরি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে গ্রহণ না করে তো ভুল করছি। এ ভুল তো করা উচিত হচ্ছে না।
এসব চিন্তা-ভাবনা করে বকরি পালনের দায়-দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে মসজিদে নববীতে আসহাবে সুফফার সাথে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়ে মদীনায় চলে আসলাম।
উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এই কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েননি বা বিচলিত ভাবও দেখাননি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি কাজ শুরু করে দেন।
এ ছিল প্রত্যেকের কাছেই কল্পনাতীত ব্যাপার যে, তিনি মাত্র দশ বছরের মধ্যেই আলিম সাহাবীদের মধ্যে ইলমুল কিরাআতের শীর্ষস্থানীয় ইমাম হবেন। ইসলামের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধসমূহের সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবেন এবং হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন খ্যাতি অর্জনকারী গভর্নরের অন্যতম হিসেবে ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনিই কি এমন ধারণা করতে পেরেছিলেন যে, তিনি তাঁর বকরি পালের দায়িত্ব ছেড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে এমন যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন, যে যোগ্যতা তাঁকে ইসলামী বাহিনীর সেনাপতি পদে উন্নীত করবে? যে দামেস্ককে সেকালে দুনিয়ার সভ্যতা-সংস্কৃতির 'মা' বলা হতো সেই দামেস্কের বিজয়ী হবেন, এ কথা কি তিনি ভাবতে পেরেছিলেন? দামেস্কের প্রবেশপথে 'তুমা' নামক স্থানে মনোরম বাগানে তাঁর আলীশান বাসগৃহ তৈরি করা হবে এবং প্রাচীন সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র মিসর বিজয়ী সেনা-কর্মকর্তাদের অন্যতম সেনা-কর্মকর্তা হবেন এবং পরবর্তী সময়ে মিসরের গভর্নরের পদ অলংকৃত করবেন। প্রসিদ্ধ 'আল মুকাত্তাম' পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় চূড়ার পাদদেশে নিজের জন্য বাড়ি তৈরি করবেন। এ সবই ছিল পর্দার আড়ালে লুক্কায়িত তাঁর সৌভাগ্যের লিখন, যা একমাত্র আল্লাহই জ্ঞাত ছিলেন।
হ্যাঁ, উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত নিবিড় সাহচর্য লাভ করেন। তিনি সারাক্ষণই যেন ছায়ার মতো তাঁর সাথে লেগে থাকতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে যেতেন, তিনিও সেখানেই যেতেন এবং ঘোড়ার লাগাম ধরে থাকতেন। অধিকাংশ সময়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের ঘোড়াটির পিছনে বসিয়ে নিতেন। এত অধিকবার তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে একই ঘোড়ায় আরোহণ করেছেন যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে ঘোড়ায় আরোহণকারী হিসেবেই খ্যাতি লাভ করেন। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো তাঁর ঘোড়া থেকে নেমে হেঁটে চলেছেন আর তাকে ঘোড়ার পিঠেই অবস্থান নিতে বলেছেন। উকবা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করেন:
মদীনার কোনো এক বাগানে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়েছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন:
হে উকবা! তুমি কি ঘোড়ায় উঠবে না?
আমি না-সূচক উত্তর দিতে মনস্থ করে আবার ভাবলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর ঘোড়ায় চড়তে বলেছেন, আর আমি যদি তাঁর নির্দেশ অমান্য করি, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানে বেয়াদবী হবে এবং এতে গোনাহ হবে- এই আশঙ্কায় বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ আমি উঠছি।
অতঃপর তিনি ঘোড়ার লাগাম ধরে হেঁটে চললেন আর আমি তাঁর নির্দেশ পালনার্থে ঘোড়ায় চড়ে যেতে লাগলাম। কিছু দূর যেতে না যেতেই আমি ঘোড়া থেকে নেমে পড়লাম এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করতে অনুরোধ জানালাম। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
'উকবা! তোমাকে আজ এমন দুটি সূরা শিক্ষা দেব, যা নিঃসন্দেহে অন্য যে কোনো সূরার গুরুত্বের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।'
আমি আরয করলাম: নিশ্চয়ই ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি তা শিখব।
অতঃপর তিনি আমাকে সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে শোনালেন। নামাযের সময় হলে তিনি ইমামতি করার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন এবং এ দুটি সূরা দিয়েই নামায আদায় করলেন। নামাযশেষে বললেন: 'যখনই ঘুমাতে যাবে কিংবা ঘুম থেকে জাগ্রত হবে, তখনই এ সূরা দুটি পাঠ করবে।'
উকবা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন: 'আমি যতদিন জীবিত থাকব, ততদিনই এ দুটি সূরা পাঠ অব্যাহত রাখব।'
উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআল্লা আনহু সারা জীবন দুটি বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে তৎপর ছিলেন। তন্মধ্যে একটি হলো ইলম শিক্ষা করা ও অপরটি জিহাদে অংশগ্রহণ করা। নিজের জীবনের চেয়েও এ দুটি বিষয়ের প্রতি খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন, এমনকি এ জন্য তিনি আর্থিক কুরবানীও করেন।
বিদ্যাচর্চা বা জ্ঞানার্জনে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যবান মুবারক থেকেই নিয়মিত কুরআন মাজীদের হিয্য ও এর শিক্ষা গ্রহণ করতেন। ফলে তিনি জগদ্বিখ্যাত কারী, ওয়ায়েয, মুহাদ্দিস, ফকীহ, ফারায়েয বিশেষজ্ঞ, সাহিত্যিক ও কবি হিসেবে সর্বজনগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত মধুর। মধুর কন্ঠে তিনি যখন কুরআন তিলাওয়াত করতেন, তখন শ্রোতারা তন্ময় হয়ে তিলাওয়াত শুনতেন। তিনি রাতের গভীরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন বেশি। কুরআনের আয়াতে বায়্যিনাতসমূহ বেশি বেশি পাঠ করতেন। সাহাবীগণ প্রাণভরে তাঁর তিলাওয়াত শ্রবণ করে নিজেদের অন্তরকে পরিতৃপ্ত করতেন। এমনও হতো যে, তাঁর তিলাওয়াতের মাঝে সবাই আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে পড়তেন। তাদের দু'চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ত। একদিন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে ডেকে নিয়ে বললেন:
'উব্বা আমাকে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করে শোনাও।'
উব্বা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
অবশ্যই হে খালীফাতুল মুসলিমীন।
অতঃপর তিনি তিলাওয়াত শুরু করলেন। তিলাওয়াত শুনতে শুনতে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এমনভাবে ক্রন্দন করতে থাকলেন যে, তাঁর চোখের পানি দু'গাল বেয়ে তাঁর দাড়ি মুবারক পর্যন্ত ভিজিয়ে দিল।
উবা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু স্বহস্তে লিখিত একখানা কুরআন মাজীদ রেখে যান, যে কুরআন মাজীদখানা মাত্র কয়েক শ' বছর পূর্বেও মিসরের 'উব্বা ইবনে আমের জামে মসজিদের' লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত ছিল। যার শেষে লিখা ছিল: كَتَبَهُ عُقْبَةُ بْنُ عَامِرُ الْجُهَنِي
'এটি উব্বা ইবনে আমের আল জুহানীর স্বহস্তে লিখিত।'
উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কর্তৃক লিখিত কুরআন পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রাচীন হাতে লেখা কুরআন শরীফ। ইসলামী বিশ্বের নষ্ট হয়ে যাওয়া অনেক দুর্লভ ও মূল্যবান বই সম্পদের মতো এই কুরআন শরীফখানাও সেখান থেকে হারিয়ে যায়, আর মুসলিম সমাজের এই মূল্যবান সম্পদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
জিহাদের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান হলো- তিনি উহুদের যুদ্ধ থেকে শুরু করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সংঘটিত সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি দুর্ধর্ষ, দুঃসাহসী, তেজস্বী ও শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদের অন্যতম ছিলেন। দামেস্ক বিজয়ের দিন তাঁকে জীবনের কঠিনতম পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। এ কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন মুসলিম বিশ্বের সেনাপতি আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পক্ষ থেকে। সেটাও এইভাবে যে, দামেস্ক বিজয়ের সুসংবাদ নিয়ে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিদমতে উপস্থিত হওয়ার জন্য তাঁকে দামেস্ক থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। তিনি এ সংবাদ বহন করে এক শুক্রবার থেকে অন্য শুক্রবার পর্যন্ত রাত-দিন ক্রমাগত আট দিন ও সাত রাত কোনোরূপ বিশ্রাম বা বিরতি না রেখে এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে এই বিরাট বিজয়ের খবর পৌঁছান।
'মিসর বিজয়ের যুদ্ধে তিনি মুসলিম বাহিনীর একাংশের সেনাপতি ছিলেন। আমীরুল মু'মিনীন মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে সেখানে ক্রমাগত তিন বছর গভর্নর পদে বহাল রাখেন। অতঃপর ভূমধ্যসাগরের 'রুডুস' দ্বীপ বিজয়ের উদ্দেশ্যে উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে প্রেরণ করেন। জিহাদ সম্পর্কিত হাদীসসমূহের দ্বারা তাঁর অন্তর পরিপূর্ণ ছিল। যা তিনি বিশেষভাবে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বর্ণনা করেন। তিনি যুগশ্রেষ্ঠ তীরন্দায ছিলেন, এমনকি তিনি একটু অবসর সময় কাটাতে চাইলে তীরন্দাযী বা তীর চালনার মাধ্যমে কাটাতেন।
মিসরে অবস্থানকালে উব্বা ইবনে আমের আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইন্তিকালের পূর্ব মুহূর্তে তাঁর সন্তানদের ডেকে ওসিয়ত করেন:
يَا بُنَيَّ أَنْهَاكُمْ عَنْ ثَلَاثٍ فَاحْتَفِظُوا بِهِنَّ : لَا تَقْبَلُوا الْحَدِيثَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ إِلَّا مِنْ ثِقَةٍ وَلَا تَسْتَدِينُوا وَلَوْ لَبِسْتُمُ الْعَبَاءَ وَلَا تَكْتُبُوا شِعرًا فَتَشْغَلُوا بِهِ قُلُوبَكُمْ عَنِ الْقُرْآنِ .
'হে বৎসগণ! তিনটি কাজ করা থেকে তোমাদের নিষেধ করছি। তোমরা এ তিনটি বিষয় ভালোভাবে স্মরণ রাখবে:
১. বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী বা 'ছেকাহ' রাবী ছাড়া অনির্ভরযোগ্য কোনো ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস বর্ণনা করলে তা কখনও গ্রহণ করবে না।
২. কোনো অবস্থাতেই ঋণ গ্রহণ করবে না; যদিও বা অভাবের তাড়নায় ছেঁড়া চাদর পরিধান করতে হয়।
৩. এবং কখনো কবিতা চর্চায় নিমগ্ন হয়ো না, কারণ কবিতা চর্চা তোমাদের অন্তরকে কুরআনের চর্চা থেকে ফিরিয়ে রাখবে।'
তাঁর ইনতিকাল হলে তাঁকে কায়রোর প্রবেশপথের উঁচু টিলার পাদদেশে দাফন করা হয়। দাফন শেষ হলে বাড়ি ফিরে এসে তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তির হিসাব করা হলে দেখা যায় যে, সম্পদ হিসেবে একাত্তর বা তিয়াত্তরটি ধনুক এবং প্রত্যেকটি ধনুকের সাথেই তীর চালানোর সাজ-সরঞ্জাম এবং এসব জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর কাজে ব্যবহার করার জন্য ওসিয়তনামা।
বিশ্বখ্যাত ক্বারী এবং গাযী মুজাহিদ উব্বা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর চেহারা মুবারককে আল্লাহ নূরের আলোয় আলোকিত করুন এবং ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষ থেকে তাঁকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করুন। আমীন!
টিকাঃ
১. আল ইসতিয়াব: ৩য় খণ্ড, ১০৬ পৃ.
২. উসদুল গাবাহ: ৩য় খণ্ড, ৪১৭ পৃ.
৩. আল ইসাবাহ: ২য় খণ্ড, ৪৮২ পৃ.
৪. সিয়ারু ইলামুন নুবালা: ২য় খণ্ড, ৩৩৪ পৃ.
৫. জামহারাতুল আনসাব: ৪১৬ পৃ.
৬. আল মাআরিফ: ১২১ পৃ.
৭. কালাইদুল জুমান: ৪১ পৃ.
৮. আন নুজুমুয যাহেরাহ: ১ম খণ্ড, ১৯/২১/৬২/৮১ পৃ.
৯. তাবাকাত উলামাউ আফ্রিকীয়াহ এবং তিউনিস: ৭০-৮৫ পৃ.
১০. ফাতহুল মিস্ত্রে ওয়া আখবারুহা: ২৮৭ পৃ.
১১. তাহযীবুত্ তাহযীব: ৭ম খণ্ড, ২৪২ পৃ.
১২. তাযকিরাতুল হুফ্ফায়: ১ম খণ্ড, ৪২ পৃ.