📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 সাঈদ ইবনে যায়েদ (রাঃ)

📄 সাঈদ ইবনে যায়েদ (রাঃ)


হে আল্লাহ, তুমি যদিও আমাকে এই উত্তম দীন থেকে বঞ্চিত করেছ, কিন্তু আমার ছেলে সাঈদকে এই দীন থেকে বঞ্চিত করো না। - সাঈদ (রা)-এর পিতা যায়েদের দু'আ

যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল জন-কোলাহল থেকে বেশ দূরে অবস্থান নিয়ে কুরাইশদের কোনো এক অনুষ্ঠানের কর্মসূচি দেখছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন, পুরুষেরা দামি দামি রেশমি পাগড়ি মাথায় বেঁধে ইয়ামেনের তৈরি গাউন পরিধান করে অনুষ্ঠানে ঘোরাফিরা করছে। মহিলারা ও ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা রং-বেরঙের জামা, কাপড়-চোপড় ও বিচিত্র অলংকারাদি পরিধান করে দলবদ্ধভাবে সমবেত হচ্ছে ও মেলার শোভা বর্ধন করছে। সম্পদশালী ও ধনী ব্যক্তিরা নানা বয়সের ও নানা ধরনের পশুকে রঙিন সাজে সজ্জিত করে দেবতার সন্তুষ্টির জন্য বলি দেওয়ার উদ্দেশ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল খানায়ে কা'বার দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে এসব দৃশ্য দেখছিলেন। এক পর্যায়ে কুরাইশদের সম্বোধন করে বলতে থাকলেন :

'হে কুরাইশ সম্প্রদায়! ভেড়া-বকরির স্রষ্টা হলেন আল্লাহ। আকাশ থেকে তাদের জন্য আল্লাহ বৃষ্টি বর্ষণ করেন। তাদের বেঁচে থাকার জন্য পানি ও ঘাস দিয়েছেন, যা খেয়ে ওরা জীবন ধারণ করে। তোমরা কেন ওগুলোকে আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে বলি দিচ্ছ? তোমরা বড়ই অজ্ঞ ও মূর্খ।'

এ কথা শোনামাত্র তাঁর চাচা, উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পিতা খাত্তাব ভীষণ রেগে যায় এবং তাকে সজোরে চপেটাঘাত করে বলে:

'তুই নিপাত যা! এ ধরনের ধৃষ্টতাপূর্ণ কথা এর আগেও তোর মুখ থেকে বহুবার শুনেছি। প্রতিবারই আমরা ধৈর্য ধারণ করেছি। এখন আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়েছে।'

খাত্তাবের এ বকাবকি ও চপেটাঘাতের সুযোগে তারই স্বগোত্রীয় নির্বোধেরা নুফাইলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রহার করতে করতে তাকে মক্কা থেকে বের করে দেয়। তিনি হেরা পর্বতে আশ্রয় নেন। খাত্তাব কুরাইশ গোত্রের দুষ্ট ছেলেদের বলে দেয়, তোমরা প্রহরায় থাকবে, যাতে সে মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে। তাই গোপনে সবার দৃষ্টি এড়ানো ছাড়া যায়েদ ইবনে আমর মক্কায় প্রবেশ করতে পারতেন না।

যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল ক্ষান্ত হওয়া বা থেমে যাওয়ার মতো পুরুষ ছিলেন না। তিনি কুরাইশদের নজর এড়িয়ে ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল, আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ, উসমান ইবনে হারেস, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফু উমাইয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিবের সাথে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ করতে থাকেন ও শিরকে নিমজ্জিত কুরাইশদের ব্যাপারে সমালোচনা করতে থাকেন।

যায়েদ তাদেরকে বলেন:
'আল্লাহর শপথ! তোমরা এটা ভালো করেই জান যে, তোমাদের জাতি মূর্খতা ও অজ্ঞতায় নিমজ্জিত। তাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সাথে দীনে ইবরাহীমের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকৃতপক্ষে তোমরা দীনে ইবরাহীমের বিপরীতে চলছ। যদি তোমরা নাজাত পেতে চাও, তাহলে তোমরা নতুন কোনো ধর্মের সন্ধান কর।'

কুরাইশদের এই চার গুণীজন ইহুদী ও খ্রিস্টানসহ সমসাময়িক অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের কাছে গিয়ে ধর্ম সম্পর্কে জানার আপ্রাণ চেষ্টা চালান এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দীনে হানীফের সন্ধান করতে থাকেন।

তাদের মধ্য থেকে ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ ও উসমান ইবনে হারেসের মন আকৃষ্ট হয়নি প্রচলিত কোনো ধর্মের প্রতি। যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল-এর নতুন ধর্ম সন্ধানের ব্যাপারে এক চমৎকার ঘটনা রয়েছে। তার নিজ বর্ণনা থেকেই সে ঘটনা অবগত হোন। যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল বলেন:

'আমি ইহুদী ও খ্রিস্টান পাদ্রিদের সান্নিধ্যে গিয়ে তাদের কাছে আমার মনের আবেগ প্রকাশ করি; কিন্তু মনকে প্রশান্তি দেওয়ার মতো কোনো আকীদা-বিশ্বাসের সন্ধান তাদের কাছে পাইনি। অতঃপর আমি সবখানে মিল্লাতে ইবরাহীমের সন্ধান করতে থাকি। এ অনুসন্ধানেরই এক পর্যায়ে আমি সিরিয়ায় পৌছি। সেখানে গিয়ে জানতে পারি এক পাদ্রির কাছে আসমানী কিতাবের শিক্ষা রয়েছে। ঐ পাদ্রির সান্নিধ্যে গেলাম। তাকে আমার মনের কথা খুলে বললাম।'

তিনি বললেন : 'হে মক্কার ভাই, আমার ধারণা যে, তুমি দীনে ইবরাহীমের সন্ধান করছ।'

উত্তর দিলাম:
'হ্যাঁ, সেটাই আমার জীবনের একমাত্র কাম্য।'

তিনি বললেন:
'তুমি এমন একটি ধর্মের সন্ধান করছ, যা বর্তমানে হারিয়ে গেছে। তুমি আর ঘোরাফেরা না করে মক্কায় চলে যাও। আল্লাহ শীঘ্রই তোমাদের গোত্রে এমন এক নবী প্রেরণ করবেন, যিনি দীনে ইবরাহীমকে তোমাদের কাছে পেশ করবেন। যদি তোমার জীবদ্দশায় তাকে পেয়ে যাও নিঃসন্দেহে তার অনুসরণ করো।'

একথা শুনে যায়েদ দ্রুত মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। মক্কায় তার আগমনের পূর্বেই আল্লাহ দীনে হক ও হেদায়াতসহ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে যায়েদের সাক্ষাৎ হলো না। কারণ, বেদুইন দস্যুদের একটি দল তাকে পথে আক্রমণ করলে তিনি পথেই জীবন হারান। এভাবেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দর্শন থেকে তার চক্ষুদ্বয় বঞ্চিত থাকে। যায়েদ অন্তিম অবস্থায় আকাশের দিকে তাকিয়ে সর্বশেষ যে কথাগুলো উচ্চারণ করতে থাকেন তা হলো-

'হে আল্লাহ! আমাকে যদিও এই কল্যাণ থেকে তুমি বঞ্চিত করলে, কিন্তু আমার ছেলে সাঈদকে তা থেকে বঞ্চিত করো না।'

আল্লাহ যায়েদের এই দু'আ কবুল করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনগণকে ইসলামের দাওয়াত দিতে আরম্ভ করলে প্রথম সারির যেসব সাহাবী আল্লাহর প্রতি ঈমান আনেন ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সাক্ষ্য দান করেন, সাঈদ ছিলেন তাঁদেরই অন্যতম। সাঈদ-এর মতো ব্যক্তির সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আশ্চর্যের কিছুই নেই। কারণ, সত্যিকার অর্থেই সাঈদ এমন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যে পরিবারের প্রতিটি সদস্যই ছিল কুরাইশদের ধর্মীয় রীতি-নীতির চরম বিরোধী। তিনি এমন এক পিতার সন্তান ছিলেন, যার গোটা জীবনই শেষ হয়েছে সত্যের সন্ধানে।

সাঈদ ইবনে যায়েদ শুধু একাই ইসলাম গ্রহণ করেননি, বরং তাঁর সাথে তাঁর স্ত্রী উমর ইবনে খাত্তাবের বোন ফাতেমা বিনতে খাত্তাবও ইসলাম গ্রহণ করেন।

এই কুরাইশ যুবক ইসলাম গ্রহণের অপরাধে তার গোত্রের যে কোনো ব্যক্তির তুলনায় বেশি নির্যাতন ভোগ করেছেন।

তার ওপর অবর্ণনীয় যুলুম-অত্যাচার হওয়া সত্ত্বেও কুরাইশরা তাকে ও তার স্ত্রীকে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি; বরং তার স্ত্রী ফাতেমা কুরাইশদের থেকে এমন এক লৌহ মানবকে বিচ্ছিন্ন করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন, যার গুরুত্ব ইসলামের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখ্য। অতীব গুরুত্বপূর্ণ সেই ব্যক্তি হলেন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।

সাঈদ ইবনে যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মাত্র কুড়ি বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি যৌবনের সর্বশক্তি ইসলামের সম্প্রসারণে নিয়োগ করেন। তিনি একমাত্র বদর যুদ্ধ ছাড়া আর সব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বদর যুদ্ধের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিশেষ এক গুরুত্বপূর্ণ কাজে মদীনার বাইরে প্রেরণ করলে তিনি বদর যুদ্ধে অংশ নেওয়া থেকে বঞ্চিত হন।

পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের পতনের জন্য মুসলিম বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অভিযানেও তিনি শরীক ছিলেন। শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে অংশগ্রহণই করেননি; বরং তিনি উভয় যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন।

ইয়ারমুকের যুদ্ধে সাঈদ ইবনে যায়েদের বীরত্ব ও সাফল্য তো রীতিমত ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।

তাঁর নিজের থেকেই আমরা ঐ দিনের তাঁর বীরত্বের ঘটনা শুনি:

'ইয়ারমুক যুদ্ধে আমরা ছিলাম প্রায় (২৪,০০০) চব্বিশ হাজার যোদ্ধা। অন্যদিকে রোমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল ১,২০,০০০ (এক লাখ বিশ হাজার)। এই বিশাল সৈন্যবাহিনী ধীরগতিতে এমনভাবে আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, যেন অদৃশ্য শক্তিতে চালিত চলন্ত এক পাহাড়। এ বাহিনীর অগ্রভাগে ছিল ক্রুশ। এই ক্রুশ বহন করছিল বিশপ পাদ্রি ও সন্ন্যাসীরা। তারা জোরে জোরে স্লোগান দিচ্ছিল। সৈন্যরাও সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করে স্লোগানের উত্তর দিচ্ছিল এবং তা বজ্রের ন্যায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

'রোমানদের বিরাট বাহিনীর এ দৃশ্য ও বিপুল সংখ্যাধিক্য মুসলিম বাহিনীর মনেও কিছুটা ভীতির সঞ্চার করে। এ অবস্থায় আবু উবাইদা ইবনে আল জাররাহ দাঁড়িয়ে তাদেরকে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন।'

তিনি বলেন:
'হে আল্লাহর বান্দাগণ, আপনারা জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর পথে আল্লাহর জন্য লড়াই করুন। আল্লাহ আপনাদের সাহায্য করবেন এবং শত্রু বাহিনীর মোকাবেলায় আপনাদের অবস্থানকে দৃঢ়তা দান করবেন। হে আল্লাহর বান্দারা, ধৈর্য ধারণ করুন। ধৈর্যই কুফরী থেকে পরিত্রাণ, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং অপমান ও গ্লানি থেকে অব্যাহতি লাভের একমাত্র উপায়। আপনারা বর্মের সাহায্যে নিজেদের সুরক্ষিত করুন এবং বর্শাসমূহকে তাক করে ধরুন। পূর্ণ নীরবতা পালন করুন। মনে মনে শুধু আল্লাহর স্মরণ করতে থাকুন। ইনশাআল্লাহ আমি এখনই যুদ্ধ আরম্ভ করার নির্দেশ দিচ্ছি ...।'

সাঈদ ইবনে যায়েদ বর্ণনা করেন:
'এ মুহূর্তে মুসলিম বাহিনীর এক যোদ্ধা তার ব্যূহ থেকে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে আবু উবাইদাহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বলেন:

আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, এ মুহূর্তেই শাহাদাতবরণ করব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কি আপনার তরফ থেকে কোনো সংবাদ দেওয়ার আছে? তাহলে তা আমার মাধ্যমে প্রেরণ করতে পারেন।'

আবূ উবাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বললেন:
'হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার ও মুসলিম বাহিনীর পক্ষ থেকে সালাম জানাবেন এবং তাঁকে বলবেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহ আমাদের সাথে যে ওয়াদা করেছিলেন তার সবটাই আমরা হাতে হাতে পেয়েছি।'

সাঈদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'তার এ কথা শোনার পরক্ষণেই আমি দেখলাম, সে কোষ থেকে তরবারি উন্মুক্ত করে শত্রুবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাথে সাথে আমিও নিচু হয়ে দু-হাঁটুতে ভর দিয়ে বর্শা তাক করে আমার দিকে অগ্রসরমান প্রথম অশ্বারোহী শত্রুকে চ্যালেঞ্জ করেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। দেখলাম, সেই মুহূর্তে আমার মনের সব ভীতি দূর হয়ে গেছে।

মুহূর্তের মধ্যে আমার বর্শার অগ্রভাগ তার দেহ ভেদ করে পিছন দিক দিয়ে বের হয়ে গেল। সবাই এ মুহূর্তে রোমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং প্রাণপণে লড়াই করতে থাকল। পরিশেষে, আল্লাহ মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করলেন।'

সাঈদ ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এরপর সিরিয়ার রাজধানী দামেশক বিজয়ে অংশ নেন। দামেশকবাসী মুসলিম বাহিনীর আনুগত্য স্বীকার করলে আবূ উবাইদা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে দামেশকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনিই দামেশকের প্রথম মুসলিম গভর্নর।

বনূ উমাইয়ার শাসনামলে সাঈদ ইবনে যায়েদের জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটে, যে বিষয়ে মদীনাবাসী দীর্ঘদিন পর্যন্ত আলোচনা করতে থাকে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় এভাবে,
আরওয়া বিনতে ওয়াইস নামের এক মহিলা এ সন্দেহ করে যে, সাঈদ ইবনে যায়েদ তার জমির কিছু অংশ নিজ জমির সাথে একীভূত করে নিয়েছেন। এ বিষয়ে সমাজের সর্বস্তরে সে তার অভিযোগ ছড়াতে থাকে। এখানেই শেষ নয়, সে মদীনার গভর্নর মারওয়ান ইবনে হাকামের কাছেও বিচার দাবি করে। মারওয়ান ইবনে হাকাম এর নিষ্পত্তির লক্ষ্যে তার কাছে কতিপয় লোক প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সাহাবীর বিষয়টি বড়ই পীড়াদায়ক বলে মনে হয়।

সাঈদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন: 'সে মনে করে যে, আমি তার প্রতি যুলুম করছি। কিভাবে আমার পক্ষে তা সম্ভব?'

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে: مَنْ ظَلَمَ شِبْرًا مِنَ الْأَرْضِ طُوقَتْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ سَبْعِ أَرْضِينَ .
'যে ব্যক্তি অন্যের এক বিঘত ভূমিও যুলুম করে নেবে কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত স্তবক পর্যন্ত ভূমি ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।'

'ইয়া আল্লাহ! যে দাবি করছে, আমি তার জমি দখল করে নিজ সীমানার অন্তর্ভুক্ত করেছি, সে যদি মিথ্যাবাদিনী হয়, তাহলে তাকে অন্ধ করে দাও এবং যে কূপ আমি দখল করেছি বলে অভিযোগ করেছে, তার মধ্যে তাকে নিক্ষেপ করো। আমার পক্ষে এমন জ্বলন্ত প্রমাণ দেখাও যাতে সবাই জানতে পারে যে, আমি তার ওপর যুলুম করিনি।'

কিছুদিন যেতে না যেতেই মদীনায় প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে ভীষণ বন্যা হয়, যার ফলে আকীক উপত্যকা বন্যায় ভেসে যায়। এমন বন্যা অতীতে আর কখনো দেখা যায়নি। এ বন্যায় জমির সীমানার ওপর জন্মে ওঠা মাটির স্তূপ ধুয়ে যায় এবং প্রকৃত সীমানা বের হয়ে পড়ে। ফলে মদীনাবাসী জানতে পারে যে, সাঈদ ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তার দাবিতে সত্য ও সঠিক। এর প্রায় এক মাসের মধ্যেই সেই মহিলা অন্ধ হয়ে যায় এবং অন্ধাবস্থায় সে তার জমিতেই চলাফেরার এক পর্যায়ে সেই কূপে নিপতিত হয়।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা বলেন: 'আমরা ছোট বেলায় লোকদের অভিশাপ দিতে শুনতাম।'

তারা বলত যে:
'আল্লাহ তোমাকে আরওয়ার মতো অন্ধ করে দিক।'

এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: اتَّقُوا دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ .
'মযলুমের বদদু'আ থেকে সতর্ক থাকো। কেননা, মযলুমের দু'আ ও আল্লাহর মাঝে কোনোই অন্তরাল থাকে না।'

এখানে মযলুম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী সাঈদ ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, যিনি আশারায়ে মুবাশশারার অন্যতম।

টিকাঃ
১. তাবাকাত ইবনে সা'দ: ৩য় খণ্ড, ২৭৫ পৃ.। ২. তাহযীব ইবনে আসাকির: ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১২৭ পৃ.। ৩. সিফাতুস সাফওয়া: ১ম খণ্ড, ১৪১ পৃ.। ৪. হুলিয়াতুল আওলিয়া: ১ম খণ্ড, ৯৫ পৃ.। ৫. আররিয়াদ আনন্দরা: ২য় খণ্ড, ৩০২ পৃ.। ৬. হায়াতুস সাহাবাহ: ৪র্থ খণ্ডের সূচি দ্রষ্টব্য।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 জা'ফর ইবনে আবী তালিব (রাঃ)

📄 জা'ফর ইবনে আবী তালিব (রাঃ)


‘রক্তে রঞ্জিত দুটি পাখায় ভর করে জান্নাতে জা'ফর ইবনে আবী তালিবকে উড়ে বেড়াতে দেখেছি।’
- মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)

আবদে মান্নাফ গোত্রে পাঁচজন ব্যক্তি এমন ছিলেন, যাদের চেহারা ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা মুবারকের সাথে অত্যধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। অপরিচিত অনেকেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাদের মধ্যে সহজে পার্থক্য করতে পারত না। ঐ পাঁচ ব্যক্তির পরিচয় জানতে নিশ্চয়ই আপনারা আগ্রহী হবেন, যাদের চেহারা আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মুবারকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল।

তারা হলেন: ১. আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ইবনে আবদুল মুত্তালিব। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আপন চাচাত এবং দুধ ভাই। ২. কুসাম ইবনে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব। তিনিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাত ভাই। ৩. সায়েব ইবনে উবায়দ ইবনে আবদে ইয়াযীদ ইবনে হাশিম। তিনি ইমাম শাফেঈ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির দাদা ছিলেন। ৪. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাতি ফাতেমাতুয জাহরা ও আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার পুত্র হাসান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু। ৫. আমীরুল মুমিনীন আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভাই জা'ফর ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।

এখানে আমরা জা'ফর ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর জীবনী সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করছি।

কুরাইশ বংশে আবী তালিব ছিলেন নেতৃত্বের শীর্ষে। এ কারণেই তিনি ছিলেন সকলের একান্ত শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। অধিকন্তু তিনি ছিলেন অনেক সন্তানের জনক। আর্থিক দিক দিয়ে তিনি ছিলেন দরিদ্র; কিন্তু তার দারিদ্র্য চরম আকার ধারণ করে যখন অনাবৃষ্টির কারণে প্রচণ্ড অভাব কুরাইশ বংশের প্রায় সব পরিবারকেই ভীষণভাবে কাবু করে ফেলে। এ বছরকে 'অনাবৃষ্টির বছর' নামে অভিহিত করা হয়। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যে, শস্যাদি রোদে পুড়ে যাওয়ার কারণে মানুষ শুকনো হাড্ডি পর্যন্ত রান্না করে তার সুরুয়া পান করতে বাধ্য হয়। সে সময় কুরাইশ বংশের হাশিম গোত্রের শুধুমাত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছাড়া আর কারো আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। এ অবস্থায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে প্রস্তাব রাখলেন:

'আপনার ভাই আবী তালিব অধিক সন্তানের জনক। অভাব-অনটন যেসব পরিবারকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, এ পরিবারটি তাদের অন্যতম। অনাহারক্লিষ্টতায় এ পরিবারের প্রতিটি সদস্য নিষ্পেষিত। আসুন, আমরা তার সন্তানদের কয়েকজনের দায়িত্বভার গ্রহণ করে তাকে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেই। আমরা উভয়ে কমপক্ষে এক একজনের দায়িত্ব নিই।'

উত্তরে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'এটা নিঃসন্দেহে উত্তম প্রস্তাব।'

অতঃপর উভয়ে আবী তালিবের বাড়ি গিয়ে তাঁকে বললেন: 'অভাব-অনটনের কারণে মানুষের যে দুরবস্থা তা তো দেখছেন। আপনিও অভাব-অনটনের নির্মম শিকার। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত আমরা আপনার সন্তানদের দু'জনকে আমাদের পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করে আপনার বোঝা একটু হালকা করতে চাই।'

আবী তালিব বললেন:
'আমার বড় ছেলে আকীলকে আমার কাছে রেখে অবশিষ্টদের যাকে খুশি নিয়ে যেতে পার।'

অতঃপর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলীকে এবং আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জা'ফরকে তাঁদের পরিবারভুক্ত করে নিলেন। তখন থেকেই আলী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারভুক্ত ছিলেন এবং তিনিই ছোটদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম কিশোর সাহাবী। এভাবে চাচার বাড়িতে অবস্থানকালেই জা'ফর যৌবনে পদার্পণ করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হন।

'দারুল আরকামে' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতী বৈঠক শুরুর পূর্বেই আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর প্রচেষ্টায় সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী হাতেগোনা কয়েকজনের অন্যতম ছিলেন জা'ফর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা। প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারী প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর মতো এ দম্পতির ওপরও নেমে আসে কুরাইশদের অমানুষিক নির্যাতন। উভয়েই অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে সব নির্যাতন স্বীকার করে নেন। কারণ, তাঁরা খুব ভালো করে জানতেন যে, জান্নাতের পথ অত্যন্ত দুর্গম। নির্যাতনের সীমাহীন পাহাড়, অত্যাচারের জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড এবং নিপীড়নের রক্তসাগর পাড়ি দিয়েই জান্নাতে প্রবেশ করতে হবে।

এতো বাধা দিয়েও কুরাইশরা ক্ষান্ত হয়নি। মুসলমানগণ যাতে ইবাদত-বন্দেগী করতে না পারেন, তার জন্য নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ও সামাজিক বয়কট ইত্যাদি মাথা পেতে নিলেও ইবাদতের পথে বাধা সৃষ্টিকে মুসলমানরা কোনোক্রমেই মেনে নিতে না পেরে স্বাধীনভাবে ইবাদত-বন্দেগীর স্বার্থে তারা হাবশার (আবিসিনিয়ার) পথে হিজরতের চিন্তা-ভাবনা করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে হিজরতের অনুমতি দেন। কিন্তু মক্কায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অন্যান্য সঙ্গী-সাথীদের কুরাইশদের নির্মম অত্যাচারের মুখে ফেলে হাবশার পথে পা বাড়ালেও জা'ফর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন অত্যন্ত ব্যথিত, দুঃখিত ও চিন্তাগ্রস্ত। শান্তির হাতছানি কোনোক্রমেই তাঁদের মনকে আনন্দিত করতে পারছিল না। বারবার জা'ফরের মনে প্রশ্ন হয়ে দেখা দিচ্ছিল:

'কোন্ অপরাধে এ নিষ্পাপ কাফেলার প্রতিটি নর-নারী জন্মস্থান ত্যাগ করে হাবশার পথে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছে? মাতৃভূমির স্নিগ্ধ আলো-বাতাসে তো তারা শৈশব, কৈশোর ও যৌবনে পদার্পণ করেছে। মাতৃভূমির প্রতিটি বালুকণার সাথে যাদের দেশপ্রেম, ভালোবাসা ও আনন্দ-উৎফুল্লতা মিশে আছে, তারা আজ কেন দেশান্তরিত? তাদের অপরাধ কি এই যে, তারা ঘোষণা দিয়েছে- আল্লাহ ছাড়া তাদের আর কোনো প্রভু নেই?'

কুরাইশদের এই নির্মম অত্যাচার প্রতিহত করার মতো শক্তি-সামর্থ্য না থাকায় এবং তাদের হীনতা ও দুর্বলতায় জা'ফর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বড়ই পীড়া অনুভব করছিলেন। এ অবস্থার মধ্যে জা'ফর ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নেতৃত্বে মুহাজিরদের প্রথম কাফেলা হাবশায় পৌঁছল। হাবশার ন্যায়পরায়ণ বাদশাহর আশ্রয়ে তাঁরা নিরাপদে জীবন যাপন করতে থাকেন। ইসলাম গ্রহণ করার পর এই প্রথম তাঁরা শান্তির মুখ দেখেন। একাগ্রতার সাথে নিরাপদে ও শান্তিতে ইবাদত-বন্দেগী করার সুযোগ পান। সেখানে ছিল না তাদের ইবাদত-বন্দেগীতে কোনো বাধা। ছিল না কোনো বিদ্রূপ ও উপহাস। সেখানে ছিল না নেতৃবর্গের চরিত্র হননের কোনো প্রয়াস বা তাদের চরিত্রের বিরুদ্ধে অশ্লীল কোনো কটাক্ষ। মুসলমানদের এ কাফেলা নিরাপদে হাবশায় বা বর্তমান আবিসিনিয়ায় পাড়ি জমাতে সক্ষম হয়। কুরাইশরা এতে যে কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি, এটা ছিল তাদের কাছে রীতিমতো অসহ্য ব্যাপার। সেখানে বাদশাহর আশ্রয়ে তারা নিরাপদে নিশ্চিন্তে ধর্ম-কর্ম করছে, তাওহীদী আকীদা-বিশ্বাস অনুযায়ী নিরাপদে জীবন যাপন করছে- এ সংবাদ ছিল কুরাইশদের সহ্যের বাইরে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিল হাবশায় গিয়ে তাদের মেরে ফেলবে অথবা সেখান থেকে তাদের ফিরিয়ে এনে মক্কায় সুবিশাল কয়েদখানায় বন্দী করে রাখবে।

এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত জানার জন্য আমরা উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা প্রদত্ত ঐতিহাসিক বর্ণনার সাহায্য গ্রহণ করছি। উম্মু সালামা হিন্দ বিনতে সুহাইল আল মাখযুমিয়াহ বলেন:

'আমরা হাবশায়- বর্তমান ইথিওপিয়া পৌছে উত্তম প্রতিবেশীসুলভ আচরণ পেয়ে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করি। পরিপূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা আমাদের দেওয়া হয়। কোনো প্রকার নির্যাতন, বিদ্রূপ, উপহাস ছাড়াই আমরা আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করে যাচ্ছিলাম। কুরাইশদের কাছে আমাদের এই নিরাপদ আশ্রয় লাভের সংবাদ পৌঁছলে তারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ফলে বাদশাহ নাজ্জাশীর কাছে কুরাইশরা দু'জন প্রতিনিধি প্রেরণ করে, যারা ছিল খুবই বাকপটু এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তারা হলো আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ ইবনে রাবীআ। তারা বাদশাহ ও তাঁর দরবারের পাদ্রিদের জন্য প্রচুর মূল্যবান উপঢৌকন নিয়ে হাজির হয়। তাদেরকে পরামর্শ দেওয়া হয় যে, বাদশাহর সাথে কথা বলার আগে যেন রাজ-দরবারের পাদ্রিদের কাছে এসব উপঢৌকন পৌঁছানো হয়।

কুরাইশ দূতদ্বয় হাবশায় পৌঁছেই বাদশাহ নাজ্জাশীর দরবারের পাদ্রিদের সাথে দেখা করে এবং মক্কা থেকে আনীত উপঢৌকনসমূহ পৌঁছায়। তারা পাদ্রিদের প্রত্যেকের সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাতের মাধ্যমে এ অনুরোধই জানায় যে, বাদশাহ নাজ্জাশীর রাজ্যে আমাদের কিছু নির্বোধ পথভ্রষ্ট লোক পালিয়ে এসেছে, যারা বাপ-দাদার সনাতন ধর্ম পরিত্যাগ করে আমাদের সমাজব্যবস্থা ও জাতিসত্তায় শুধু আঘাতই হানেনি; ভাইয়ে ভাইয়ে ও পিতা-পুত্রের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টিও করেছে। আমরা যখন বাদশাহর দরবারে তাদের প্রত্যাবর্তনের দাবি জানাব, তখন আপনারা তাদের কাছে দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই আমাদের হাতে সোপর্দ করার সুপারিশ করবেন। কেননা, তাদের নতুন ধর্মের ভালো-মন্দ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য কুরাইশ নেতৃবৃন্দই যথেষ্ট। তাই নতুন ধর্ম ইসলাম সম্পর্কে এসব দেশত্যাগীদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন পড়ে না।'

স্বাভাবিকভাবেই পাদ্রিগণ সবাই দূতদ্বয়ের এই প্রস্তাবের সাথে ঐকমত্য পোষণ করে। উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন:
'বাদশাহ নাজ্জাশী যদি আগে-ভাগেই মুহাজিরদের কাউকে ডেকে ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে বসেন, এ ভয়ে দূতদ্বয় অত্যন্ত তটস্থ ছিল।'

কুরাইশ দূতেরা দরবারে উপস্থিত হয়ে বাদশাহর খিদমতেও উপঢৌকন পেশ করে। বাদশাহ এসব মূল্যবান উপঢৌকন দেখে অবাক হন এবং তা সাদরে গ্রহণ করেন। এ সুযোগে তারা বাদশাহর কাছে তাদের বক্তব্য পেশ করে এবং তারা বিনীত আবেদন করে বলে:
'বাদশাহ নামদার! আমাদের বংশের কিছু দুষ্ট প্রকৃতির লোক আমাদের অজান্তে আপনার রাজ্যে পালিয়ে এসেছে। তারা এমন এক অদ্ভুত ও নতুন ধর্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী, যে সম্পর্কে আমরা যেমন কিছু জানি না, তেমনি আপনিও জানেন না। একদিকে যেমন তারা আমাদের ধর্ম প্রত্যাখ্যান করেছে, অন্যদিকে তেমনি তারা আপনাদের ধর্মেও দীক্ষিত হয়নি। আমাদের নেতৃবৃন্দ সর্বসম্মতভাবে তাদেরকে নিজ নিজ ঘরে ফেরৎ নেওয়ার জন্য আপনার খিদমতে আমাদের পাঠিয়েছেন। তারা তাদের ধর্মদ্রোহিতা সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত।'

তাদের বক্তব্য শ্রবণান্তে বাদশাহ তার দরবারে উপস্থিত ধর্ম উপদেষ্টার দায়িত্বে নিয়োজিত পাদ্রিদের দিকে মতামত যাচাই-এর লক্ষ্যে দৃষ্টি প্রদান করলেন। পাদ্রিগণ সমস্বরে বলে উঠল:
'বাদশাহ নামদার! তাদের গোত্রের নেতৃবৃন্দই তাদের কৃত অপরাধ সম্পর্কে ভালো জানেন। তাদের সম্পর্কে কী করণীয় এ জন্য তারাই যথেষ্ট। তাদেরকে তাদের গোত্রের নেতৃবৃন্দের কাছে ফেরৎ দানের অনুরোধ করছি, যাতে তাদের নেতৃবৃন্দই তাদের সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।'

পাদ্রিদের এই অযাচিত সমর্থনের কথা শোনামাত্রই বাদশাহ তাদের প্রতি ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন:
'আল্লাহর শপথ করে বলছি, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের একজনকেও আমি এদের দু'জনের হাতে সোপর্দ করব না, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের ডেকে এনে অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য না শুনব। যদি এ দূতদ্বয়ের কথা যথার্থই সত্য হয়, তাহলে তাদেরকে দূতদ্বয়ের হাতে সোপর্দ করা হবে। অন্যথায় কোনোক্রমেই তাদের হাতে সোপর্দ করা হবে না। বরং যতদিন তারা এ ভূখণ্ডে থাকতে চায়, থাকার অনুমতি থাকবে এবং উত্তম আশ্রয়দাতার আচরণ অব্যাহত রাখা হবে।'

উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বর্ণনা করেন:
'অতঃপর বাদশাহ নাজ্জাশী তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য আমাদেরকে তাঁর দরবারে ডেকে পাঠান। দরবারে উপস্থিত হওয়ার পূর্বে আমরা নিজেদের মধ্যে সলাপরামর্শের উদ্দেশ্যে বৈঠকে মিলিত হই এবং পরস্পরে আলোচনা করি। আমরা ধরে নিই, বাদশাহ নাজ্জাশী নিশ্চয়ই আমাদেরকে দীন ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। আমরা আমাদের ঈমান-আকীদা স্পষ্টভাবে তুলে ধরব। আমাদের পক্ষ থেকে জা'ফর ইবনে আবী তালিব ছাড়া আর কেউ কোনো বক্তব্য রাখবেন না।'

উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন:
এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হই। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর ধর্মীয় উপদেষ্টা পাদ্রিদের ডেকে এনেছেন। তারা সবুজ রঙের বিশেষ ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ মূল্যবান গাউন পরিধান করে তাদের ধর্মীয় প্রতীক টুপি মাথায় দিয়ে ধর্মীয় কিতাব হাতে নিয়ে একে একে বাদশাহর দু'পাশের আসনগুলোতে বসে পড়ল। তাদের মধ্যেই বসে ছিল কুরাইশ দূতদ্বয় আমর ইবনুল আস এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাবীআ। যথাসময়ে বৈঠকের কাজ আরম্ভ হলো।

বাদশাহ আমাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন:
'কোন্ নতুন ধর্ম তোমরা গড়ে নিয়েছ? যে কারণে পৈতৃক ধর্ম পরিত্যাগ করতে হয়েছে। আমাদের ধর্মেও দীক্ষিত হওনি, এমনকি প্রচলিত কোনো ধর্মও গ্রহণ করনি। তোমাদের নিকট এর কোনো সদুত্তর আছে কি?
জা'ফর ইবনে আবী তালিব বাদশাহর প্রশ্নের উত্তরে বললেন:
'বাদশাহ নামদার! আমরা ব্যভিচারী, আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারী, মূর্তিপূজারী, মৃত প্রাণীর গোশত ভক্ষণকারী এবং পথভ্রষ্ট জাতি ছিলাম। প্রতিবেশীর অধিকার গ্রাসে আমরা ছিলাম সিদ্ধহস্ত। সমাজের শক্তিশালীরা দুর্বলদের নির্যাতন করত। তাদের শোষণ করে তারা আনন্দ পেত। এই বিভীষিকাময় সামাজিক পরিবেশের এক পর্যায়ে আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকে তাঁর রাসূল প্রেরণ করেন। যিনি বংশ-মর্যাদা, সত্যবাদিতা, আমানতদারী, নৈতিকতা ও উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে অতুলনীয়। তিনি আমাদের এক আল্লাহর দিকে আহ্বান জানালেন। যেন আমরা শিরকে লিপ্ত না হয়ে তাঁরই ইবাদত করি এবং মূর্তি ও দেব-দেবীর পূজা থেকে বিরত থাকি। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যে শিরক ও মূর্তিপূজায় যুগ যুগ ধরে লিপ্ত ছিল, তিনি আমাদের তা পরিত্যাগ করতে বললেন। তিনি আমাদেরকে সত্যবাদিতা ও আমানতদারীর পথে চলার নির্দেশ দিয়ে থাকেন। স্বজনদের প্রতি সদয় হওয়ার জন্য এবং প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেন। আল্লাহর নিষেধ মানতে এবং তাঁর অপছন্দনীয় কর্মকাণ্ড থেকে বিরত ও রক্তপাত থেকে নিবৃত্ত থাকতে উপদেশ দিয়ে থাকেন। ব্যভিচার ও মিথ্যা পরিহার করতেও তিনি উপদেশ দেন। ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করতে ও চরিত্রবান নারীর চরিত্রে অপবাদ দিতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন। তিনি আমাদের শিরকমুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার নির্দেশ দেন। আমরা যেন সালাত আদায় করি, যাকাত প্রদান করি এবং রমযান মাসে রোযা রাখি। তাঁর এই সত্যের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর প্রতি আমরা ঈমান এনেছি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে যেসব হেদায়াত তিনি নিয়ে এসেছেন তার অনুসরণ করছি। তিনি যা কিছু আমাদের জন্য হালাল করেছেন, তা আমরা হালাল করে নিয়েছি। আর যা কিছু আমাদের জন্য হারাম করেছেন তা আমরা পরিহার করেছি।

সম্মানিত বাদশাহ নামদার! শুধু এ কারণেই আমাদের গোত্রীয় নেতৃবর্গ ও জনগণ আমাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে। আমাদের ওপর এসব অত্যাচারের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, যেন অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে আমরা সত্যধর্ম ত্যাগ করে আবার মূর্তিপূজায় ফিরে যাই এবং শিরকে লিপ্ত হই। যখন অত্যাচার ও নির্যাতন সীমা অতিক্রম করল এবং আমাদের জন্য পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে উঠল, আমাদের ধর্ম পালনে প্রচণ্ড বাধা সৃষ্টি করা হলো, তখন আমরা আপনার দেশে হিজরত করতে বাধ্য হই। অন্য যে কোনো রাজা-বাদশাহের ওপর আপনাকে আমরা প্রাধান্য দিয়েছি। আমরা আশা করছি, আপনার পক্ষ থেকে আমাদের ওপর যুলুম করা হবে না।'

উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বর্ণনা করেন:
'অতঃপর বাদশাহ নাজ্জাশী জা'ফর ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে উদ্দেশ্য করে বললেন:

'আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের নবীর ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তার কোনো অংশ কি তোমার মনে আছে?'

তিনি উত্তর দিলেন: 'জী, হ্যাঁ!'

বাদশাহ বললেন: 'তা আমাকে পাঠ করে শোনাও।'

অতঃপর তিনি বাদশাহকে সূরা মারইয়ামের প্রথমাংশ পাঠ করে শোনালেন:
كهيعص - ذِكْرُ رَحْمَتِ رَبِّكَ عَبْدَهُ زَكَرِيَّا - إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا . قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنُ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا .

'কাফ-হা-ইয়া-'আইন-সাদ। এটি তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা যাকারিয়ার প্রতি। যখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করেছিল নিভৃতে। সে বলেছিল, আমার অস্থি দুর্বল হয়েছে, বার্ধক্যে আমার মস্তক শুভ্রোজ্জ্বল হয়েছে, হে আমার প্রতিপালক! তোমাকে আহ্বান করে আমি কখনও ব্যর্থকাম হইনি।' (সূরা মারইয়াম: ১-৪)

উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বর্ণনা দেন:
'এ আয়াত শুনে বাদশাহ নাজ্জাশীর মনে এতই আবেগের সৃষ্টি হলো যে, তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে কাঁদতে লাগলেন। তাঁর দু' গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকল। তাঁকে কাঁদতে দেখে দরবারের পাদ্রিরাও কাঁদতে লাগলেন। এমনকি তাদের চক্ষের পানিতে সামনে রাখা ধর্মীয় বইগুলোও ভিজে যায়। আল্লাহর কালামের যতটুকু তারা শুনলেন তাতেই এ প্রতিক্রিয়া দেখা গেল।

এরপর বাদশাহ বললেন:
'তোমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন এবং ঈসা আলাইহিস সালাম যা কিছু নিয়ে এসেছিলেন, তা হুবহু একই উৎসের জ্যোতি।'

অতঃপর কুরাইশ দূতদ্বয়কে উদ্দেশ্য করে বললেন:
'তোমরা চলে যাও। আল্লাহর শপথ! আমি কক্ষনো তাদেরকে তোমাদের হাতে সোপর্দ করব না।'

উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:
'আমরা যখন সভাশেষে বাদশাহর দরবার থেকে বের হয়ে আসছিলাম, আমর ইবনুল আস আমাদের শাসাচ্ছিল এবং তার সাথী আবদুল্লাহ ইবনে রাবীআকে বলছিল, খোদার কসম! আমি আগামীকাল আবার বাদশাহর কাছে আসব এবং তাদের ব্যাপারে এমনসব তথ্য তাকে দেব, যাতে তার মন-মেজাজ ঘৃণা ও ক্ষোভে জ্বলে উঠে এবং সে তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়। তাদের ব্যাপারে এমনসব তথ্য দেব, যা দ্বারা তাদের সার্বিক জীবনযাত্রা বিপন্ন হতে বাধ্য। এদের আশ্রয়ছাড়া করব। তার সাথী আবদুল্লাহ ইবনে রাবীআ আমর ইবনুল আসকে বলে:
এদের ব্যাপারে আর বাড়াবাড়ি করো না। যাই হোক না কেন, এরা তো আমাদেরই জ্ঞাতি-গোষ্ঠী।

আমর ইবনুল আস উত্তরে বলে:
এসব মায়াকান্না। এদের সম্পর্কে এমন সংবাদ দেব যে, এদের পায়ের তলার মাটি সরে যাবে। আল্লাহর কসম! বাদশাহকে অবশ্যই বলব যে, এরা ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালামকে আল্লাহর বান্দা মনে করে।

পরের দিন আমর ইবনুল আস বাদশাহ নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হয়ে পুনরায় আরয করল :
বাদশাহ নামদার! যাদেরকে আপনি আশ্রয় দিয়েছেন, নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তারা ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বড়ই আপত্তিকর কথা বলে থাকে। আমার কথা বিশ্বাস না হলে তাদের ডেকে আনুন ও জিজ্ঞাসা করে দেখুন যে, সে ব্যাপারে তাদের আকীদা-বিশ্বাস কী?'

উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বর্ণনা করেন:
'আমরা এ দুরভিসন্ধিমূলক সংবাদে বিচলিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। আমরা পরস্পর সলাপরামর্শ করতে থাকি যে, বাদশাহ ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে আমরা কী উত্তর দেব? পরিশেষে আমরা সবাই এ সিদ্ধান্তে একমত হই যে, আল্লাহর শপথ! ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে আল্লাহ যা বলেছেন হুবহু তা-ই বলা ছাড়া আমরা নিজেদের পক্ষ থেকে অতিরঞ্জিত কিছুই বলতে যাব না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা কিছু তাঁর ব্যাপারে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, সে শিক্ষা থেকে কিঞ্চিৎও আমরা পিছু হটব না। এর পরিণাম যা হবার হবে।

আমরা এ সিদ্ধান্তও নিই যে, আমাদের পক্ষ থেকে আজও জা'ফর ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বক্তব্য রাখবেন। বাদশাহ নাজ্জাশীর আহ্বানে রাজ-দরবারে উপস্থিত হয়ে দেখি পাদ্রিরা গতকালের ন্যায় আজও সাজ-সজ্জা ও জাঁকজমকের সাথে বাদশাহর দুই পার্শ্বে উপবিষ্ট। তাঁদের মধ্যে রয়েছে আমর ইবনুল আস ও তার সাথী আবদুল্লাহ ইবনে রাবীআ।

আমরা দরবারে পৌঁছানো মাত্রই বাদশাহ আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন: 'ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে তোমাদের আকীদা-বিশ্বাস কী?'

জা'ফর ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন:
ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে আমরা সেই আকীদাই পোষণ করি, যা আমাদের নবীর ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে।

বাদশাহ নাজ্জাশী জিজ্ঞাসা করলেন:
'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ আয়াতসমূহে ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে কী বলা হয়েছে?'

জা'ফর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন:
'তাঁর ব্যাপারে বলা হয়েছে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তিনি আল্লাহপ্রেরিত রূহ ও কালেমা বা পবিত্র বাক্য, যা নিষ্পাপ কুমারী মাতা মারইয়াম আলাইহিস সালামের গর্ভে নিক্ষেপ করেন।'

জা'ফর ইবনে আবী তালিবের মুখে ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে এ আকীদা ও বিশ্বাসের কথা শোনামাত্রই বাদশাহ নাজ্জাশী মাটিতে সজোরে চাপড় দিয়ে বলে উঠলেন:
'তোমাদের নবী ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে যে আকীদা ও বিশ্বাস নিয়ে এসেছেন, ঈসা আলাইহিস সালাম সে আকীদা-বিশ্বাস থেকে একচুল পরিমাণও এদিক-সেদিক ছিলেন না।'

বাদশাহর এ উক্তি শুনে তার দু'পাশের পাদ্রিরা এ থেকে অসম্মতিসূচক শব্দ উচ্চারণ করতে থাকলে বাদশাহ দৃঢ়ভাবে বললেন:
আপনারা স্বীকার করুন আর নাই করুন, ঈসা আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।

অতঃপর তিনি মুহাজিরদের উদ্দেশ্যে বললেন:
আপনারা স্ব-স্ব স্থানে ফিরে যান। আপনারা সম্পূর্ণ নিরাপদ। আপনাদের উদ্দেশ্যে কোনো কটুবাক্য, ভর্ৎসনা ও ঠাট্টা-বিদ্রূপ ইত্যাদিকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। মনে রাখবেন, আপনাদের ধর্মীয় কার্যকলাপ ও স্বাধীনতায় বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপকে কঠোর শাস্তিমূলক অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করছি। আল্লাহর শপথ! পাহাড় তুল্য স্বর্ণস্তূপও যদি শুধুমাত্র আপনাদের কাউকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার বিনিময়ে আমাকে উপঢৌকন হিসাবে পেশ করতে চায়, তবুও আমি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করব।

অতঃপর বাদশাহ আমর ইবনুল আস ও তার সঙ্গীর প্রতি তাকিয়ে বললেন:
'এই দুই ব্যক্তির সমস্ত উপঢৌকন ফিরিয়ে দাও। এ ধরনের উৎকোচের আমার কোনো প্রয়োজন নেই।'

এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন:
'অতঃপর আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ ইবনে রবীআ লাঞ্ছিত ও বিধ্বস্ত ধিকৃত অবস্থায় ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে মাথা নীচু করে বাদশাহর দরবার হতে বেরিয়ে যায় এবং আমরা অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সাথে হাবশায় অবস্থান করতে থাকি।'

বাদশাহ নাজ্জাশীর মহানুভবতার ছত্রছায়ায় জা'ফর ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সস্ত্রীক অত্যন্ত নিরাপদে ও শান্তিতে দশ বছর অতিবাহিত করেন। সপ্তম হিজরীতে তিনি মদীনা মুনাওয়ারার উদ্দেশ্যে অন্যান্য মুসলমানের সাথে আবিসিনিয়া ত্যাগ করেন। এমন এক মুহূর্তে তিনি মদীনায় পৌঁছেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার বিজয়ের পর সরাসরি মদীনায় এসে পৌঁছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জা'ফর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দেখে খুবই আনন্দিত হন।

তিনি বলেন:
مَا أَدْرِى بِأَيِّهِمَا أَنَا أَشَدُّ فَرَحًا!! ابفتح خيبر أم بقدوم جعفر؟

'আমি বুঝতে পারছি না, খায়বারের বিজয় না জা'ফর ইবনে আবী তালিবের আগমন- কোন্টি আমাকে বেশি আনন্দিত করেছে।'

সর্বস্তরের মুসলমানদের মধ্যে বিশেষ করে গরীব অনাথ মুসলমানদের মধ্যে যে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়, তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনন্দের চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিল না। কারণ, জা'ফর ইবনে আবী তালিব ছিলেন অসহায় গরীব-মিসকীনদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। আন্তরিক সাহায্যের হাত সম্প্রসারণকারী এক নিষ্ঠাবান বন্ধু।

আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর সম্পর্কে বলেন:
'অসহায়দের জন্য জা'ফর ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন উত্তম বন্ধু। তিনি আমাদেরকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যেতেন এবং ঘরে যা কিছু থাকত তা দিয়েই আমাদের আপ্যায়ন করতেন। এমনকি পাত্রের খাবার শেষ হয়ে গেলে তিনি ঘি রাখার ছোট ছোট পাত্র এনে দিতেন, তা খুলে যতটা সম্ভব হতো আমরা চেটে খেতাম।'

মদীনায় জা'ফর ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বেশি দিন অবস্থান সম্ভব হলো না।

অষ্টম হিজরীর প্রথম দিকে ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সিরিয়ার পাদদেশে সমবেত রোমান বাহিনীর মোকাবেলার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন। এ বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে যায়েদ ইবনে হারেসা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মনোনীত করেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিলেন:
'যদি যায়েদ ইবনে হারেসা শহীদ বা আহত হয়, সে ক্ষেত্রে সেনাপতি হবে জা'ফর ইবনে আবী তালিব। জা'ফর ইবনে আবী তালিব যদি শাহাদাত বরণ করে বা আহত হয়, তাহলে সেনাপতি হবে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা। আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাও যদি শাহাদাত বরণ করে বা আহত হয়, সে ক্ষেত্রে মুসলিম যোদ্ধারা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে সেনাপতি নিযুক্ত করবে।'

এই ইসলামী বাহিনী যখন জর্দানের নিকটবর্তী 'মৃতা' নামক স্থানে পৌঁছে, তখন দেখতে পায় যে, রোমান সম্রাট এই ইসলামী বাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য এক লাখ সৈন্য মোতায়েন করেছে। তাদের সাহায্য করার জন্য আরবের লাখ, জুয়াম এবং কুদায়া প্রভৃতি গোত্রের খ্রিস্টান এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের আরো এক লাখ যোদ্ধা যোগ দিয়েছে। অপরদিকে ইসলামী বাহিনীর সর্বমোট যোদ্ধার সংখ্যা হলো মাত্র তিন হাজার। শত্রু বাহিনীর সাথে ইসলামী বাহিনীর আসমান-জমিন পার্থক্য। এ অবস্থায় মুসলিম বাহিনী ও রোমান বাহিনীর মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধের এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে শত্রুবাহিনীর অভ্যন্তরে হামলা পরিচালনার এক পর্যায়ে যায়েদ ইবনে হারেসা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শত্রুবাহিনীর আঘাতে ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়লেন। অশ্বপৃষ্ঠে আরোহী যুদ্ধরত জা'ফর ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর সোনালি বর্ণের ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন। তার ঘোড়াকে যেন শত্রুবাহিনী ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য তিনি নিজ হাতে ঘোড়ার পা কেটে ফেললেন এবং সাথে সাথে সেনাপতি হিসেবে ঝাণ্ডার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলেন। তিনিও যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মতোই শত্রুবাহিনীর বাহু ভেদ করে এক সময় ভিতরে প্রবেশ করলেন এবং তাদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালালেন আর সাথে সাথে এ কবিতা আবৃত্তি করতে থাকলেন:

يَا حَبَّذا الجَنَّةُ وَاقْتِرَابُهَا * طَيِّبَةً وَبَارِدٌ شَرَابُهَا والروم روم قد دَنَا عَذَابُهَا * كَافِرَةً بَعِيدَةً أَنْسَابُهَا عَلَى إِذ لَا قَيْتُهَا صِرَابُهَا

'আহ! জান্নাত আমার কতই না সন্নিকটে, এ মুহূর্তে আমি যেন তা প্রত্যক্ষ করছি। তার ঠাণ্ডা সুপেয় পানীয় কতই না পবিত্র তৃপ্তিদায়ক ও সুস্বাদু। কাফিররা তো ঈমানের ফুল বাগানে আগাছাস্বরূপ। আজ খোদাদ্রোহী রোমান বাহিনীর গর্দান আমার তলোয়ারের আওতায়। কাজেই তাদের কচুকাটা করা ছাড়া আর কিই বা করার আছে? এ মুহূর্তে আমার তলোয়ারের আঘাত তাদের জন্য গযবে ইলাহীস্বরূপ।'

এ কবিতা পড়তে লাগলেন আর শত্রুবাহিনীর ব্যূহকে তলোয়ারের আঘাতে তছনছ করে সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকলেন। এক পর্যায়ে শত্রুদের প্রচণ্ড এক আঘাতে তাঁর ডান হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সাথে সাথে তিনি বাম হাতে ঝাণ্ডা ধারণ করলেন। দেখতে না দেখতেই প্রচণ্ড আরেক আঘাতে তার বাম হাতও দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এরপরও যেন ইসলামের ঝাণ্ডা ভূলুণ্ঠিত না হয়, তাই সাথে সাথে কর্তিত হাতের অবশিষ্টটুকু দিয়ে দু'হাত বুকে লাগিয়ে ঝাণ্ডাকে উঁচু করে রাখলেন। ততক্ষণে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছুটে এসে ঝাণ্ডা তুলে ধরলেন। তিনিও বীরবিক্রমে যুদ্ধ পরিচালনা করে পূর্ববর্তী দুই সেনাপতির ন্যায় শাহাদাত বরণ করলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে মুতার যুদ্ধে তাঁর তিন সেনাপতির শাহাদাতের সংবাদ পৌঁছলে তিনি অত্যন্ত দুঃখিত ও ব্যথিত হলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি তাঁর চাচাত ভাই জা'ফর ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তার বাড়িতে পৌঁছে দেখলেন, তার স্ত্রী আসমা তার দীর্ঘ সময় ধরে অনুপস্থিত স্বামী জা'ফরকে অভ্যর্থনা জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রুটি তৈরির জন্য সবেমাত্র আটার খামির তৈরি করেছেন। বাচ্চাদেরকে গোসল করিয়ে গায়ে তেল ও সুগন্ধি লাগিয়ে কাপড়-চোপড় পরিয়ে সাজিয়েছেন। ফারূক রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী আসমা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন:
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বাড়িতে তাশরীফ আনলে দেখতে পাই যে, তাঁর চেহারা মুবারক বেদনা ও দুশ্চিন্তার কালো ছায়ায় আচ্ছাদিত। এ অবস্থায় আমি তাঁকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে চাইনি, এই ভেবে হয়তো আমাকে এমন কোনো দুঃসংবাদ শুনতে হতে পারে, যা আমার কাম্য নয়।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সালাম দিয়ে বললেন:
'জা'ফরের বাচ্চাদেরকে আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাদের ডাক দিলে সাথে সাথে তারা আনন্দিত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ছুটে এল। কে কার আগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোলে চড়বে এ নিয়ে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। প্রত্যেকেই চেষ্টা করল যেন সে-ই প্রাধান্য পায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রতি মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকালেন। তাদের গায়ের সুগন্ধির ঘ্রাণ নিতে লাগলেন। আর দু'চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।' আমি বললাম:
'হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক, আপনি কী কারণে কাঁদছেন? জা'ফর ও তাঁর সাথীদের ব্যাপারে কোনো দুঃসংবাদ পেয়েছেন কি?'

তিনি বললেন:
“হ্যাঁ, তারা সবাই আজ শাহাদত বরণ করেছে। জা'ফর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর উৎফুল্ল ও উচ্ছ্বসিত বাচ্চারা যখন দেখল যে, তাদের মা হঠাৎ করে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন, তখন তারা নিজ নিজ জায়গায় নিথর হয়ে গেল। যেন তাদের ওপর বজ্রপাত হয়েছে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেদনা-ভারাক্রান্ত মনে দু'চোখের অশ্রু মুছতে মুছতে বিদায় নিলেন।"

তিনি তখন বলছিলেন:
اللَّهُمَّ أُخْلُفْ جَعْفَرًا فِي وَلَدِهِ اللَّهُمَّ اخْلُفْ جَعْفَرًا فِي أَهْلِهِ.
'হে আল্লাহ! জা'ফরের সন্তানদের জন্য তুমিই তাদের অভিভাবক হও। জা'ফরের পরিবারের হেফাযতের দায়িত্ব তুমিই গ্রহণ করো।'

অতঃপর বললেন:
لقد رَأَيْتُ جَعْفَرًا فِي الْجَنَّة، له جناحان مُضَرِّجَانِ بِالدِّمَاءِ، وَهُوَ مَصْبُوعُ القوادم.
'আমি জাফরকে রক্তে রঞ্জিত দুটি পাখায় ভর করে জান্নাতে উড়তে দেখেছি।'

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ১ম খণ্ড, ২৩৭ পৃ.
২. সিফাতুস সাফওয়া: ১ম খণ্ড, ২০৫ পৃ.
৩. হুলিয়াতুল আওলিয়া: ১ম খণ্ড, ১১৪ পৃ.
৪. তাবাকাত ইবনে সা'দ: ৪র্থ খণ্ড, ২২ পৃ.
৫. মু'জামুল বুলদান: মৃতা যুদ্ধ বিষয়ক.
৬. তাহযীবুত তাহযীব: ২য় খণ্ড, ৯৮ পৃ.
৭. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৪র্থ খণ্ড, ২৪১ পৃ.
৮. আস সীরাতুন নুবুবিয়াহ লি ইবনি হিশাম, ১ম খন্ড, ৩৫৭ পৃঃ এবং ৪র্থ খণ্ড, ৩ ও ২০ পৃ.
৯. আদ দুরারু ফী ইখতিসারিল মাগাযী এবং আস সিয়ারু লি ইবনে আবদুল বাবর: ২২২ ও ৫০ পৃ.
১০. হায়াতুস সাহাবা: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১১. আল কামিল লি ইবনিল আছীর: ২য় খণ্ড, ৩০ ও ৯৬ পৃ.

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস (রাঃ)

📄 আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস (রাঃ)


‘আমি আবু সুফিয়ান ইবনে হারেসের প্রতি সন্তুষ্ট হলাম। তার কৃত সমস্ত জীবনের শত্রুতা ও বিরোধিতাকে আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। সে হবে জান্নাতে যুবকদের নেতা।’
- মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)

পারস্পরিক সম্পর্ক ও গভীর ভালোবাসার মতো যত যোগসূত্রই এ যাবৎ একে অপরের মধ্যে সেতুবন্ধ সৃষ্টি করেছে, তার মধ্যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে আবদুল্লাহ ও আবু সুফিয়ান ইবনে হারেসের মধ্যে বিদ্যমান এমন যোগসূত্র খুবই কম পরিলক্ষিত হয়। কারণ, আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে আবদুল্লাহ একই সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। এদিক থেকে উভয়ই সমবয়সী। যেমন তারা একই সময়ে জন্মগ্রহণ করেন, ঠিক তেমনি একই পরিবারে প্রতিপালিতও হন।

আবূ সুফিয়ান ইবনে হারেস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আপন চাচাত ভাই। তার পিতা হারেস। হারেসের ভাই আবদুল্লাহ হলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতা। হারেস ও আবদুল্লাহ উভয়েই ছিলেন মুত্তালিবের ঔরসজাত সন্তান।

এ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছাড়াও আবু সুফিয়ান মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুধভাই। উভয়কেই হালিমা আস সা'দিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা একই সঙ্গে স্তন্য পান করিয়েছেন। এতসব যোগসূত্র পরস্পবকে নবুওয়াতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত গভীর ভালোবাসা ও বন্ধুত্বে আবদ্ধ করে রাখে। শুধু তাই নয়, সর্বোপরি আকৃতি দু'জনের প্রায় একই ছিল। আবু সুফিয়ানের ব্যাপারে সবারই ধারণা এটাই স্বাভাবিক ছিল যে, সে সর্বপ্রথম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতের প্রতি সাড়া দিয়ে মুসলমান হবে। তাঁর অনুসারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বপ্রধানও হবে। কিন্তু আল্লাহর ফায়সালা ছিল ভিন্ন। ঘটনাও ছিল প্রত্যাশার বিপরীত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইসলামের দাওয়াত দিতে আরম্ভ করেন, তখন তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের অনেকেই তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাদেরকে এ দাওয়াত প্রত্যাখ্যানের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করতে থাকেন। ঠিক এ পর্যায়ে আবু সুফিয়ানের অন্তরে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে শত্রুতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গভীর বন্ধুত্ব দেখতে দেখতেই চরম শত্রুতায় পরিণত হয়।

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার সময়ে আবু সুফিয়ান কুরাইশ বংশের একজন প্রসিদ্ধ অশ্বারোহী ও কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল। সে তার তলোয়ার ও কবিতা উভয় দ্বারাই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। তার সর্বশক্তি ইসলামের প্রতিরোধে ও মুসলমানদের নির্যাতন ও নিপীড়নের কাজে নিয়োজিত করে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে এমন কোনো যুদ্ধই সংঘটিত হয়নি, যার উদ্যোক্তা আবু সুফিয়ান ছিল না।

মুসলমানদের ওপর এমন কোনো অত্যাচার ও নির্যাতন হয়নি, যার বিরাট ভূমিকায় সে ছিল না। আবু সুফিয়ান তার কবিতার আকর্ষণীয় ভাষা, জাদুকরী ছন্দ তথা সর্বশক্তি দ্বারাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধিতায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিল। তার কবিতায় থাকত শুধু গালিগালাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে আবু সুফিয়ানের এই হীন তৎপরতা ক্রমাগত প্রায় কুড়ি বছর যাবৎ চলতে থাকে। এই দীর্ঘ সময়ে এ হীন তৎপরতা ও ষড়যন্ত্রের এমন কোনো কৌশল বা সুযোগ নেই, যা সে ব্যবহার করেনি। এমন কোনো অত্যাচার ও নির্যাতন নেই, যা সে মুসলমানদের ওপর চালায়নি ও তাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রাখেনি।

আল্লাহর কী মহিমা! মক্কা বিজয়ের পূর্ব মুহূর্তে আবূ সুফিয়ানের ভাগ্য ইসলাম গ্রহণের জন্য সুপ্রসন্ন হলো। তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাও একটি স্মরণীয় ঘটনা। কবি-সাহিত্যিকরা সে ঘটনাকে যেমন বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, ঐতিহাসিকগণও ইতিহাসের পাতায় তেমনি গুরুত্ব সহকারেই স্থান দিয়েছেন। আবু সুফিয়ান নিজেই তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন:

'ইসলাম বিজয় লাভ করলে এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে দলে দলে লোকজন ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে শীঘ্রই মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু করতে যাচ্ছেন, এ সংবাদ মক্কার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। আমার মনে হলো, দুনিয়াটা আমার কাছে খুবই সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে। পায়ের তলা থেকে মাটি যেন সরে যাচ্ছে। মনে মনে ভাবছিলাম এ মুহূর্তে কোথায় পালাই? কার আশ্রয় নেই? কেই বা আমার সঙ্গী-সাথী হবে? এসব দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনার মধ্যে আমার সন্তান-সন্ততি, স্ত্রী ও পরিবার-পরিজনের কাছে এসে তাদের মক্কা থেকে পালানোর উদ্দেশ্যে প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেই। তাদের ইঙ্গিত দেই যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে-কোন মুহূর্তে মক্কায় প্রবেশ করতে পারে। আর মুসলমানদের হাতে ধরা পড়লে আমাকে হত্যাই করা হবে।'

তারা এক বাক্যে আমাকে উত্তর দিল:
'আপনি পরিস্থিতি এখনো সঠিকভাবে আঁচ করতে পারছেন না। আরব তো আরব। আরব বিশ্বের বাইরের দেশগুলোও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য স্বীকার করে নিচ্ছে ও দলে দলে তাঁর দীন গ্রহণ করছে। তাঁর ইসলামী রাষ্ট্র সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে অথচ আপনি এখনো তার বিরুদ্ধাচরণে সর্বশক্তি নিয়োগ করেই চলেছেন। আপনার উচিত ছিল, তাঁর সাহায্য-সহযোগিতায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করা।'

পরিবারের লোকজন এক হয়ে আমাকে ইসলাম সম্পর্কে এমনভাবে বোঝাতে ও উদ্বুদ্ধ করতে লাগল যে, আল্লাহ তাআলা আমার মনকে ইসলামের জন্য সম্প্রসারিত করে দিলেন। আর সাথে সাথে আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্যে রওয়ানার জন্য উঠে দাঁড়ালাম এবং 'মাযকুর' নামক আমার এক খাদিমকে আমাদের সফরের জন্য একটি ঘোড়া ও একটি উট প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিলাম। আমি আমার সফরসঙ্গী হিসেবে আমার এক ছেলে জা'ফরকে সংগে নিলাম। পথিমধ্যে জানতে পারলাম, মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী 'আল আবওয়া' নামক স্থানে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা-বিরতি করেছেন। আমি সে স্থানের উদ্দেশ্যেই দিক পরিবর্তন করলাম। 'আল-আবওয়া' নামক স্থানের যতই নিকটবর্তী হচ্ছিলাম, ততই ভাবছিলাম, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেওয়ার পূর্বেই কেউ যদি আমাকে চিনে ফেলে, তাহলে সে নির্ঘাত আমার শিরশ্ছেদ করবে। তাই আমি আমার বেশ বদলে ফেললাম এবং নিজেকে দৃষ্টির আড়ালে রেখে সম্মুখে অগ্রসর হতে লাগলাম। এমনকি 'আল আবওয়া' থেকে এক মাইল দূরেই যানবাহন রেখে পায়ে হেঁটে এক মাইল পথ অতিক্রম করতে থাকলাম। আর প্রত্যক্ষ করলাম যে, বিপরীত দিক থেকে দলে দলে মুসলমানদের অগ্রগামী কাফেলার লোকজন মক্কার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। যখনই একটি দলের সম্মুখীন হতাম, তখনই প্রাকৃতিক প্রয়োজন বা অন্য কিছুর বাহানা করে আমি রাস্তা থেকে পাশ কাটিয়ে যেতাম এই ভয়ে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের কেউ আমাকে চিনে না ফেলে। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে পথ অতিক্রম করার এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যানবাহনকে অগ্রসর হতে দেখলাম। আমি অনুতপ্ত ও ধিকৃত অবস্থায় এ সুযোগে তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হলাম। তিনি তাঁর মুবারক চক্ষুদ্বয় দিয়ে আমার দিকে খুব ভালো করে তাকালেন। সম্পূর্ণ অন্য বেশে দেখে আমাকে চিনতে পেরেই আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আমি আবার সে দিকেই গিয়ে দাঁড়ালাম যেন আমার প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়ে। এরপরও তিনি আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্যদিকে মুখ করলেন। আমি আবার সেই দিকেই গিয়ে উপস্থিত হলাম। এমনকি অনুরূপ অবস্থায় বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলতে থাকল। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ইসলাম গ্রহণে আনন্দিত হবেন এবং তাঁর সাহাবীগণও তাঁর আনন্দে আনন্দিত হবেন। কিন্তু সাহাবীগণ যখন দেখতে পেলেন যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার আমার দিক থেকে বারবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ও আমার দিকে তাকাতেই পছন্দ করছেন না, তখন তারাও আমার উপস্থিতিকে ঘৃণাভরে দেখতে আরম্ভ করলেন। এমনকি সবাই আমাকে বয়কট করলেন। আমি আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাক্ষাৎ পেলাম। তিনিও আমাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন। সাহায্য-সহযোগিতার জন্য উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শরণাপন্ন হলাম এই ভেবে যে, তার অন্তরে একটু স্থান করে নিতে পারি কি না। দেখতে পেলাম, তিনি আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর চেয়েও আমাকে অধিক ঘৃণা করছেন। এমনকি তিনি আমার উপস্থিতির জন্য শুধু ক্ষিপ্তই হয়ে উঠলেন না, এমনকি তিনি আনসারদের এক যুবককে আমার বিরুদ্ধে লেলিয়েও দিলেন।'

ঐ ব্যক্তি আমাকে কঠোর ভাষায় বললেন:
'হে খোদার দুশমন! তুমিই না আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদেরকে নিপীড়ন ও নির্যাতন করেছিলে? তাঁদের বিরুদ্ধাচরণ ও শত্রুতায় পৃথিবীকে বিষময় করে তুলেছিলে আর কবিতার মাধ্যমে নানা গালমন্দ করেছিলে?'

এমনকি তার উচ্চৈঃস্বরে গালমন্দের সমর্থনে অন্যান্য সাহাবীরাও আমার দিকে রাগান্বিত চোখে তাকাচ্ছিলেন। আমি যতই নিজেকে আত্মগোপন করার চেষ্টা করছিলাম, ততই তারা আমাকে ঘৃণা করছিলেন। এমতাবস্থায় আমার চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দেখতে পেলাম। সাথে সাথে তাঁর কাছে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে গেলাম এবং তাঁর কাছে আবেদন পেশ করে বললাম:
'চাচা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রক্তের সম্পর্ক ও কুরাইশ বংশে আমার মান-সম্মান ও নেতৃত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে যা জানেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেসব বিচার করে আমার ইসলাম গ্রহণে আনন্দিত হবেন বলে আমি বিরাট আশা পোষণ করে এসেছি। আপনি আমার ব্যাপারে তাঁকে একটু সুপারিশ করুন।'

তিনি উত্তর দিলেন:
'আল্লাহর শপথ! আমি তোমার প্রতি তাঁর বিরক্তি ও ঘৃণাভাব দেখছি। তাই কোনো উপযুক্ত সুযোগ ছাড়া কোনোভাবেই সুপারিশ করতে পারব না। কারণ, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্মান ও ভক্তি করি এবং তাঁর মতামতকে শ্রদ্ধা করি।'

এ পরিপ্রেক্ষিতে নিরুপায় হয়ে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললাম: 'চাচাজান, এ অবস্থায় আমাকে কার হাওলা করছেন?'

তিনি বললেন, 'আমার যা বলার বলেছি, তোমার ব্যাপারে এর বেশি আমার কিছুই করার নেই।'

তাঁর এই উক্তি শুনে আমি ভীষণভাবে চিন্তিত হয়ে পড়লাম। এমতাবস্থায় আমার চাচাত ভাই আলী ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দেখতে পেলাম। তার নিকট গিয়ে সামান্য করুণা চেয়ে আবেদন-নিবেদন করলে তিনিও সেই একই উত্তর দিলেন, যা আমার চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দিয়েছিলেন। পরিশেষে নিরুপায় হয়ে আমার চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে আবার ধরনা দিলাম এবং অনুরোধ করে বললাম যে:
'চাচাজান! আপনি যদি আমার প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হৃদয়কে দয়ার্দ্র করতে না-ই পারেন, কমপক্ষে ঐ ব্যক্তিকে তো আমাকে উচ্চৈঃস্বরে গালি ও ভর্ৎসনা দেওয়া এবং অন্যান্যদেরকে আমার বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেন।'

তিনি বললেন:
'কে তোমাকে গালি দিচ্ছে? আমাকে তার বিবরণ দাও। চাচার নিকট সেই আনসারীর বিবরণ দিলাম। চাচা তার পরিচয় পেয়ে বললেন, সে তো নুআইমান ইবনে হারেস আন নাজাশী। তাঁকে ডেকে বললেন:
নুআইমান! আবু সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাত ভাই এবং আমার ভাতিজা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজ হয়তো তার উপর বিরক্ত হয়ে আছেন। একদিন হয়তো তার ওপর সন্তুষ্টও হতে পারেন। তুমি তাকে গালমন্দ করা থেকে বিরত থাক। সে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত তাকে চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু অনুরোধ করেই যাচ্ছিলেন।'

পরিশেষে চাচা আব্বাসের অনুরোধে আনসারী প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, এ মুহূর্ত থেকে আর তাকে বিরক্ত করব না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 'জুহফা' নামক স্থানে (যা মদীনার পথে মক্কা থেকে চার মনযিল দূরে) যাত্রাবিরতিকালে যে তাঁবুতে তিনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, আমি সে তাঁবুর দরজায় বসে পড়ি, আর আমার ছেলে জা'ফর আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁবু থেকে বের হওয়ার সময় আমাকে দরজার সামনে বসা অবস্থায় দেখতে পান। এবারও তিনি আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আমি বারবার ব্যর্থ হচ্ছি বটে; কিন্তু একেবারে নিরাশ হইনি। যখনই তিনি কোনো স্থানে যাত্রাবিরতি করতেন, সেখানেই তাঁর তাঁবুর দরজায় বসে পড়তাম এবং সেখানেই অবস্থান নিতাম। আমার ছেলে জা'ফরকে আমার সামনে দাঁড় করিয়ে রাখতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার প্রতি নজর দিয়েই আমার দিক থেকে অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেন। এমতাবস্থায় কয়েক দিন চলল। এক পর্যায়ে আমার উৎকণ্ঠা সীমা অতিক্রম করে গেল। আমি ভেঙে পড়লাম। এ সময় আমার স্ত্রীকে শেষ সংবাদ দিলাম:

'আল্লাহর শপথ করে বলছি, হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন, নয় তো আমি আমার ছেলেকে নিয়ে হতাশাগ্রস্ত মরু প্রান্তরে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করব- এটাই আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমার এই সিদ্ধান্তের সংবাদ জানলেন, তখন আমার প্রতি সদয় হলেন। তিনি বিশ্রামাগার থেকে বের হওয়ার সময় এই প্রথম বারের মতো স্নেহের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। আমি আশা করছিলাম যে, তিনি আমার দুরবস্থার প্রতি লক্ষ্য করে একটু মুচকি হাসি হাসবেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কায় প্রবেশকালে আমিও তাঁর সফরসঙ্গীগণের অন্তর্ভুক্ত হই। তিনি যখন মাসজিদুল হারামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন, আমি তখন তাঁর আগে আগে দৌড়াতে থাকি। এমনকি এক মুহূর্তের জন্যও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গ ত্যাগ করিনি।

মক্কা বিজয়ের পর পরই বনূ আহওয়াজ গোত্রের নেতৃত্বে সমস্ত আরব গোত্র সম্মিলিতভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে 'হুনাইন' নামক স্থানে এক অভিযান পরিচালনা করে। এটি এমন এক জঙ্গি অভিযান, যা ইতঃপূর্বে কারো বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে বলে কেউ জানে না। তারা এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের চিরতরে নির্মূল করে দেওয়ার সিদ্ধান্তই নিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সেনাপতির দায়িত্ব নিলেন। সাহাবীদের বিরাট বাহিনী নিয়ে তাদের মোকাবেলার জন্য রওয়ানা হলেন। হুনাইনের যুদ্ধ-ময়দানে পৌছে যখন আমি দেখতে পেলাম যে, মুশরিকদের বিরাট সমাবেশ। আমি মনে মনে শপথ নিলাম:

'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শত্রুতায় আমার অতীত জীবনের কৃত সমস্ত অপরাধের কাফফারা আজই আদায় করে ছাড়ব এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার এই বীরত্ব ও কুরবানী দেখে এবার নিশ্চয়ই খুশি হবেন।'

উভয় বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ বেধে গেল। মুসলমান বাহিনীর ওপর মুশরিকদের প্রচণ্ড আক্রমণের এক পর্যায়ে মুসলমান বাহিনীর মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ল। এমনকি তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যুদ্ধের ময়দানে ফেলে রেখেই প্রাণ ভয়ে ছোটাছুটি করতে লাগল। আমরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় পরাজয়ের সম্মুখীন হতে যাচ্ছিলাম। যুদ্ধের জয়-পরাজয়ের এই চরম সন্ধিক্ষণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য আমার পিতামাতা কুরবান হোক- তিনি 'শাহ্হ্বা' নামক অশ্বপৃষ্ঠে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে পাহাড়ের মতো দৃঢ় অবস্থান নিলেন। তিনি নিজের ও তাঁর চতুর্দিকের সাথীদের প্রতিরক্ষায় উন্মুক্ত তালোয়ার চালাতে লাগলেন। মনে হচ্ছিল যেন ক্ষিপ্ত সিংহ। সেই চরম মুহূর্তে আমি আমার ঘোড়ার পৃষ্ঠ থেকে এক লাফে নিচে নেমে আমার তলোয়ারের খাপ ভেঙে ফেললাম এবং মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার তলোয়ার যেন আর তাতে ঢোকানোর প্রয়োজন না হয়। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আল্লাহই সেই সময় আমার মনের অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞাত। সেই মুহূর্তে আমার জীবনের বিনিময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের নিরাপত্তাই আমার জন্য মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াল। আমি শাহাদাতের জন্য প্রস্তুত হলাম। আমার চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অশ্ব 'শাহ্হ্বার' লাগাম ধরে তার পাশে মযবুত অবস্থান নিয়েছিলেন আর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপর পাশে অবস্থান নিয়ে আমার বাম হাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পা রাখার জন্য তামা বা পিতলের তৈরি রিংবিশেষ বা পাদানী শক্ত করে ধরলাম এবং ডান হাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিরক্ষায় মরণপণ তলোয়ার পরিচালনা করতে থাকলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রক্ষা করতে গিয়ে আমি জীবন বাজি রেখে ক্ষিপ্রতার সাথে শত্রুবাহিনীর চরম আঘাতের মোকাবেলা করছি দেখে তিনি আমার চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে জিজ্ঞাসা করলেন:

চাচা, মরণপণ এই যোদ্ধা ব্যক্তিটি কে?

উৎসাহব্যঞ্জক স্বরে তিনি উত্তর দিলেন:
এই ব্যক্তি আপনার চাচাত ভাই। আপনার চাচা হারেসের ছেলে আবু সুফিয়ান। এটাই উপযুক্ত সময়। তিনি এর ফাঁকেই আমার জন্য সুপারিশপূর্বক আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, তার প্রতি সদয় হোন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহূর্তেই বললেন:

'আমি তার প্রতি সন্তুষ্ট হলাম। তাঁর কৃত সারা জীবনের শত্রুতা ও বিরোধিতাকে আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। সে হবে জান্নাতে যুবকদের নেতা।'

আমার প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তোষ প্রকাশ হওয়ায় আমার অন্তর আনন্দে ভরে উঠল। সাথে সাথে আমি ঘোড়ার পাদানীতে রাখা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পায়ে আনন্দ ভরে চুমু দিলাম। আর তিনিও তৎক্ষণাৎ আমাকে সম্বোধন করে বললেন:

'আমার জীবনের শপথ, হে আমার প্রিয় ভাই! শত্রুর ব্যূহ ভেদ করে সামনের দিকে আক্রমণ চালাও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই নির্দেশবাক্য আমার জিহাদী চেতনা ও সাহসকে আগ্নেয়গিরির উদ্গীরণের মতো নতুনভাবে জাগিয়ে তুলল। গায়েবী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে নব উদ্যোগে শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে তাদের ব্যূহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। সাথে সাথেই সাহাবীদের এক জানবাজ দল আমার সাথে যোগ দিলে আমরা প্রচণ্ড ধাওয়া করে শত্রুদেরকে তিন মাইলের মতো দূরত্বে তাড়িয়ে নিয়ে গেলাম। তাদের শক্তিশালী অবস্থান ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।'

আবূ সুফিয়ান ইবনে হারেস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু 'হুনাইন' যুদ্ধের এ ঈমানী পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হওয়ার পর থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তর নিংড়ানো ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হন। তিনি নিকটতম সাথীদের মর্যাদা লাভে ধন্য হলেন। এতদসত্ত্বেও আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর অতীত জীবনের কৃত অপরাধের কারণে কোনো দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতেন না। সেই লজ্জায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নজরে নজর দিতেন না। আবু সুফিয়ান তার অন্ধকার যুগের অপকীর্তির কারণে হেদায়াতের নূর ও আল কুরআনের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকার কাফফারা হিসেবে রাত-দিন কুরআন তিলাওয়াত ও হেদায়াতের নির্দেশ আহরণে সচেষ্ট থাকতেন। দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চ ও তার আনন্দ-উৎসব থেকে দূরে থেকে আল্লাহর ধ্যানে সর্বদা দেহমন নিমগ্ন রাখতেন। একদা মসজিদে নববীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মসজিদে প্রবেশ করতে দেখতে পেয়ে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে জিজ্ঞাসা করলেন: 'আয়েশা! তুমি কি এই লোকটিকে চেন?'

তিনি উত্তর দিলেন: 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তো তাকে চিনি না।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'সে আমার চাচাত ভাই আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস। সে হলো মসজিদে নামাযের জন্য সর্বপ্রথম প্রবেশকারী ও সর্বশেষ প্রত্যাবর্তনকারী ব্যক্তি। খোদার ভয়ে যার চক্ষুদ্বয় হতে ক্রন্দনরত পানি এক মুহূর্তের জন্য পড়া বন্ধ হয় না।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ভীষণ চিন্তিত ও ব্যথিত হন। তিনি এমনভাবে ভেঙে পড়েন, যেমন একমাত্র সন্তানের মৃত্যুতে তার মা অথবা একান্তই অন্তরঙ্গ কোনো বন্ধুর বিয়োগে তার বন্ধু ভেঙে পড়েন। তিনি এমন ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকেন, যেমন একমাত্র অন্তরঙ্গ বন্ধুই তার বন্ধুর জন্য ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকে। তাঁর মৃত্যুতে এমন হৃদয়গ্রাহী ভাষায়, আবেগময়ী ছন্দে মর্সিয়া রচনা করেন, যা শোনামাত্রই প্রতিটি ব্যক্তির মনে এর প্রতিটি বাক্য ব্যথা, ব্যাকুলতা ও দুঃখের প্রতিধ্বনি হিসেবে ধ্বনিত হয়।

উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতের সময়ে আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর মৃত্যু সন্নিকটবর্তী বলে অনুধাবন করলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নিজ হাতেই নিজের কবর খনন করে চিরনিদ্রার বিছানায় শায়িত হওয়ার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিলেন। এ অবস্থায় তিন দিন অতিবাহিত হতে না হতেই মৃত্যুর পূর্বাভাস পেলেন। সে যেন মৃত্যুর পূর্ব-নির্ধারিত উপস্থিতি। তিনি তাঁর স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও পরিবারের লোকজনদের ডাকলেন এবং ওসিয়ত করলেন যে,

'আমার মৃত্যুতে তোমরা কান্নাকাটি করো না। আল্লাহর শপথ, আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর কোনো গুনাহে লিপ্ত হইনি। আমার জানামতে, এমন কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও করিনি, যার জন্য আমি আল্লাহর দরবারে লাঞ্ছিত হব।'

দেখতে না দেখতেই তাঁর পবিত্র আত্মা দেহ ত্যাগ করে চলে গেল। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর নামাযে জানাযার ইমামতি করেন। তাঁর মৃত্যুতে উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও সাহাবীরা ভীষণভাবে মর্মাহত ও ব্যথিত হন।

তাঁর মৃত্যুকে ইসলাম ও তাঁর পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বলে মনে করা হয়।

টিকাঃ
১. আল ইসতিয়াব: ৪র্থ খণ্ড, ৮৩ পৃ.
২. আল ইসাবাহ: ৪র্থ খণ্ড, ৯০ পৃ.
৩. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১ম খণ্ড, ৫১৯ পৃ. (হালব সংস্করণ).
৪. আল কামিল লিইবনে আছীর: ২য় খণ্ড, ১৬৪ পৃ.
৫. আস সীরাতুন নুবুবিয়াহ লিইবনে হিশাম: ২য় খণ্ড, ২৬৮ পৃ. ও সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
৬. তারীখ আত তাবারী: ২য় খণ্ড, ৩২৯ পৃ.
৭. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ: ৪র্থ খণ্ড, ২৮৭ পৃ.
৮. আত তাবাকাতুল কুবরা: ৪র্থ খণ্ড, ৫১ পৃ.
৯. তাবাকাত ফুহুলুশ শুয়ারা: ২-৬ পৃ.
১০. নিহায়াহ আল আরব: ১৭শ খণ্ড, ২৯৮ পৃ.
১১. সাইরু আলামুন নুবালা: ১ম খণ্ড, ১৩৭ পৃ.
১২. দুয়ালুল ইসলাম: ২য় খণ্ড, ৩৬ পৃ.
১৩. মাআর রাঈউল আওয়াল: ১০৪ পৃ.

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাঃ)

📄 সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাঃ)


‘শত্রুদের উপর তীর নিক্ষেপ করো সা'দ ....... বীরত্বের সাথে তীর নিক্ষেপ করো, তোমার প্রতি আমার পিতামাতা কুরবান হোক।’
- উহুদ যুদ্ধে রাসূল (স)-এর উৎসাহব্যঞ্জক বাণী।

উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সা'দ (রা)-কে শত্রু বাহিনীর ওপর তীর নিক্ষেপ করার জন্য নির্দেশ দিচ্ছিলেন :
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ - وَإِنْ جَاهَدُكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ .

'আমি তো মানুষকে তাদের পিতামাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। মা সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে এবং তাদের দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তন তো আমারই নিকট। তোমার পিতামাতা যদি আমার সাথে শিরক করার জন্য তোমার প্রতি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে, এমন শিরক যে তার সমর্থনে তোমার নিকট কোনো দলীল-প্রমাণ নেই, সে ক্ষেত্রে তুমি তোমার পিতামাতার আনুগত্য করো না। তবে দুনিয়ায় তাদের সাথে সদয় ও শ্রদ্ধাসুলভ আচরণের মাধ্যমে দিনাতিপাত করো। সদ্ভাবে এবং যে বিশুদ্ধচিত্তে আমার অভিমুখী হয়েছে, তার পথ অবলম্বন করো। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট এবং তোমরা যা করবে সে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবহিত করব।' (সূরা লোকমান: ১৪-১৫)

আল কুরআনের এই আয়াতে সত্যের পথে একান্তই শান্তশিষ্ট ও নম্র-ভদ্র এক কিশোরের ঈমানী চেতনাকে পরীক্ষা করা হয়েছে। তার তাওহীদ ও কুফরী ভাবধারা এবং মিথ্যার ওপর সত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার এক বিরল ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। যে ঘটনা যুগ যুগ ধরে সত্য সন্ধানীদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে আসছে। সত্যের পথে যে কিশোরের ঈমানী দৃঢ়তাকে কেন্দ্র করে এই ঘটনার সূত্রপাত, তিনি হলেন মক্কার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের শ্রদ্ধাভাজন পিতামাতার একমাত্র প্রাণপ্রিয় সন্তান সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস। যার প্রতি আল্লাহ নিজে সন্তুষ্ট এবং তিনিও আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট।

মক্কা নগরীতে যখন ইসলামের আলোর বিস্তার ঘটে, তখন তিনি উঠতি বয়সের এক কিশোর। স্বভাবে অত্যন্ত নম্র-ভদ্র ও শান্ত-শিষ্ট, পিতামাতার প্রতি একান্ত অনুগত। বিশেষ করে তিনি তার মাতার প্রতি ছিলেন বিশেষভাবে শ্রদ্ধাশীল।

সতেরো বছর বয়সের সা'দ ব্যক্তিত্বে ও বুদ্ধিমত্তায় ছিলেন সমবয়সীদের তুলনায় অনেক অগ্রসর। অপরদিকে তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয়দের মতো বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান ও দূরদর্শী। তিনি তাঁর সমবয়সী বন্ধুদের মতো হাসি-তামাশা ও আমোদ-প্রমোদপ্রিয় ছিলেন না। তীর-ধনুক তৈরির প্রতি ছিল তাঁর অসাধারণ ঝোঁক এবং তীরন্দাযীর প্রতি সীমাহীন আগ্রহ। এ ক্ষেত্রে তিনি সমকালীন আরবের অতি দক্ষ তীরন্দাযদের তুলনায় কোনো অংশেই কম ছিলেন না। তাঁকে দেখে মনে হতো যে, গুরুত্বপূর্ণ কোনো অভিযানের জন্য প্রস্তুতিতে সদাব্যস্ত। অপরদিকে শিরক ও পৌত্তলিকতায় নিমজ্জিত তাঁর জাতির কর্মকাণ্ডে তিনি মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না।

তিনি সর্বদা এ অপেক্ষায় ছিলেন যে, এমন কোনো নেতার আবির্ভাব কখন ঘটবে, যখন তিনি তাঁর বিস্ময়কর গুণাবলির পূর্ণ শক্তিশালী বাহু মক্কার বিধ্বস্ত সমাজের দিকে সম্প্রসারণ করবেন এবং অন্ধকারে নিমজ্জিত মানবজাতিকে উদ্ধার করবেন।

এসব আশাবাদের এক পর্যায়ে আল্লাহ বিশ্বমানবতার মুক্তির জন্য সেই গুণাবলি সম্পন্ন মহান নেতা বিশ্বনবী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাব ঘটালেন মক্কা নগরীতে। তিনি সাথে নিয়ে এলেন চির ভাস্বর, চির মহীয়ান আল কুরআন।

সেই আলোর রোশনীতে অন্ধকারে নিমজ্জিত জাতিকে তিনি মুক্তির পথে আহ্বান জানালেন। তারা জাহিলিয়াতের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সন্ধান পেল। এ হক ও হেদায়াতের দাওয়াত সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস-এর কাছে পৌঁছানোর সাথে সাথে তিনিও তা কবুল করে নিলেন। তিনি হলেন, প্রথম পর্যায়ের ইসলাম গ্রহণকারী তৃতীয় বা চতুর্থ সাহাবী। এ জন্যই তিনি গর্বের সাথে প্রায়ই বলতেন, 'সাত দিন এমনভাবে অতিবাহিত করলাম যে, আমি ইসলামের এক-তৃতীয়াংশ হিসেবেই রইলাম।'

সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা এত স্বাভাবিক ও সহজ ঘটনা ছিল না। তিনি বিজ্ঞ ছিলেন বটে কিন্তু ঈমান আনার পথে তাঁকে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। তাঁর এ পরীক্ষার সমর্থনে শেষ পর্যন্ত আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনের আয়াত নাযিল করেছেন। তাঁর সেই দুর্লভ পরীক্ষার ঘটনা সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এভাবে বর্ণনা করেন:

'আমার ইসলাম গ্রহণের তিন রাত পূর্বে আমি স্বপ্নে দেখি, আমি যেন সমুদ্রের অতল গহবরে নিমজ্জিত হয়েছি এবং পানির তিমিরাচ্ছন্নতায় আমি আচ্ছাদিত হয়ে পড়েছি। গভীর সমুদ্রের তলদেশে ঢেউয়ের তালে তালে শুধু ওলট-পালট হচ্ছি। হঠাৎ দেখি আমার সামনে চাঁদের আলো উপস্থিত। আমি সেই চাঁদের আলোকে অনুসরণ করতে লাগলাম। এক পর্যায়ে চাঁদের নিকট পৌঁছে দেখি, সেখানে আমার পৌঁছানোর আগেই যারা সেখানে পৌঁছে গেছেন, তারা হলেন- যায়েদ ইবনে হারেসা, আলী ইবনে আবী তালিব এবং আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম।'

আমি তাঁদের প্রশ্ন করলাম:
'আপনারা কতক্ষণ আগে এখানে এসে পৌঁছেছেন?'

তাঁরা উত্তর দিলেন:
'ঘণ্টাখানেক আগে।'

এ স্বপ্ন দেখার তিন দিন যেতে না যেতেই সূর্য যখন দ্বিপ্রহরের কাছাকাছি, আমার কাছে খবর পৌঁছল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন। আমি বুঝতে পারলাম যে, হয়তো আল্লাহ আমার কল্যাণই চাচ্ছেন। আমার ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি আমাকে অন্ধকার পথ থেকে আলোর পথে আনতে চাচ্ছেন।

কালক্ষেপণ না করে তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্ধানে বের হলাম। খুঁজতে খুঁজতে তাঁকে 'শিআবে যিয়াদ' নামক স্থানে পেলাম। তিনি সবেমাত্র আসরের নামায শেষ করেছেন। আমি তাঁর হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করলাম। স্বপ্নে যে ক'জন ভাইকে দেখেছি সেই ক'জন ছাড়া আর কেউ আমার পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেননি।'

অতঃপর ইসলাম গ্রহণের সেই সংক্ষিপ্ত ঘটনার পর পরবর্তী পরীক্ষার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন:
'আমার আম্মা আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ শুনে ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। তাঁর ক্ষোভ বর্ণনা করার ভাষা আমার জানা নেই। আমি তার স্নেহধন্য ও অনুগত ছেলে।'

তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'কেমন ধর্ম তুমি গ্রহণ করেছ, তাতে এমন কী আছে যে, যার জন্য তোমার পিতামাতার ধর্ম পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছ? আল্লাহর শপথ, এই মুহূর্ত থেকে আমি পানাহার পরিত্যাগ করলাম, যতক্ষণ না তুমি তোমার নতুন ধর্ম পরিত্যাগ করে আমাদের ধর্মে ফিরে আসবে। অন্যথায় আমি এই দুনিয়া থেকে এ অবস্থায় চিরবিদায় নেব। এ জন্য তুমি সারাজীবন অনুতাপ করতে থাকবে। এ অগ্নিজ্বালা তোমাকে সারা জীবন দগ্ধ করবে। কিয়ামত পর্যন্ত লোকে তোমাকে এর জন্য ধিক্কার ও তিরস্কার করতে থাকবে।'

আমি আমার আম্মাকে অনুরোধ করে বললাম:
'আম্মা কখনো আপনি পানাহার পরিত্যাগ করবেন না। দুনিয়ার যে কোনো কিছুর বিনিময়েই হোক না কেন, আমি আমার দীন পরিত্যাগ করব না। আমি আমার অবস্থান নিলাম। তিনিও তার মতো জিদ ধরলেন ও পানাহার পরিত্যাগ করা অবস্থায় কয়েক দিন অতিবাহিত করলেন।'

এমনকি পানাহার না করার কারণে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ল। অস্বাভাবিক দুর্বল ও প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়লেন। এদিকে আমি প্রতিটি মুহূর্তেই তাঁর কাছে এসে তাঁর স্বাস্থ্যের খবরাখবর নিতে থাকি। তাঁর জীবন রক্ষার জন্য যৎকিঞ্চিৎ পানাহার করতে অনুরোধ জানাতে থাকি। তিনি প্রতিবারই কঠোরভাবে আমার কাতর আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে থাকেন। এমনকি তিনি এতই কঠোর শপথ করে বসলেন যে :
'হয় আমাকে আমার দীন ত্যাগ করে পৌত্তলিকতায় ফিরে আসতে হবে নতুবা তিনি পানাহার ত্যাগ করে মৃত্যুকে গ্রহণ করবেন।'

সংকট চরম আকার ধারণ করলে আম্মাকে বললাম :
'আম্মা আপনার প্রতি আমার অগাধ ভালোবাসা রয়েছে। আমি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে আপনার চেয়েও অধিক ভালোবাসি। আল্লাহর শপথ, যদি আপনাকে হাজারটি রূহ দান করা হয় এবং হাজার রূহই একের পর এক মৃত্যুবরণ করে, তবু আমি সা'দ দুনিয়ার কোনো কিছুরই বিনিময়ে ইসলাম ত্যাগ করব না।'

আমার এই অবিচলিত ও সীমাহীন দৃঢ় মনোবল দেখে তিনিই অবশেষে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হন এবং অত্যন্ত ঘৃণার সঙ্গে যৎ সামান্য পানাহার করতে সম্মত হন।'

আর এই মুহূর্তেই আল্লাহ এ ঘটনার প্রেক্ষিতে পবিত্র আয়াত নাযিল করেন :
وَإِنْ جَاهَدُكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبُهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا .

'তোমার পিতামাতা যদি আমার সাথে শিরক করার জন্য তোমার প্রতি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে, এমন শিরক যে, যার সমর্থনে তোমার নিকট কোনো দলীল-প্রমাণ নেই। সে ক্ষেত্রে তুমি তোমার পিতামাতার আনুগত্য করো না। তবে দুনিয়ায় তাদের সাথে সদয় ও শ্রদ্ধাসুলভ আচরণের মাধ্যমে দিনাতিপাত করো।'

সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে যেমন মুসলমানদের মর্যাদা সমুন্নত হয়, তেমনি ইসলামের গৌরব এবং শক্তিও বৃদ্ধি পায়। বদরের যুদ্ধে তাঁর ছোট ভাই উমাইর ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভূমিকাও চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর ছোট ভাই উমাইর ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে উঠতি বয়সের কিশোর বলা যায়। বদরের যুদ্ধের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন যোদ্ধাদের যোগ্যতা পরিমাপের জন্য তাদের শারীরিক অবস্থা যাচাই করছিলেন, তখন বয়সের স্বল্পতার কারণে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বাদ পড়েন কি না তা ভেবে উমাইর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টি এড়িয়ে গোপনে অবস্থান নিচ্ছিলেন। এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে দেখে ফেলেন এবং বয়সে ছোট হওয়ার কারণে তাঁকে ফেরৎ পাঠান। তাঁকে বাদ দেওয়ায় তিনি এমনভাবে কাঁদতে থাকেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হৃদয় গলে গেল। পরিশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দিলেন। এতে সা'দ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মনে আনন্দের জোয়ার বইতে লাগল। তিনি হাসিমুখে ছোট ভাই উমাইরের কাঁধে তলোয়ার ঝুলিয়ে দিলেন। মনে হচ্ছিল যেন তলোয়ারই তার চাইতে লম্বা। আনন্দের সাথে দুই সহোদর জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর জন্য যুদ্ধে রওয়ানা হলেন। যুদ্ধশেষে সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ছোট ভাই উমাইরকে শহীদ অবস্থায় বদরের রণক্ষেত্রে রেখে আল্লাহর কাছে এর বিনিময়ে উত্তম প্রতিদানের আশা করে একাই মদীনায় ফিরে এলেন।

উহুদের যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনীতে শত্রুদের ভয় ছড়িয়ে পড়লে তাদের পদস্খলন ঘটে। সাহাবীদের কয়েকজন ছাড়া সবাই প্রাণ বাঁচানোর জন্য নিরাপদ স্থানের উদ্দেশ্যে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ১০ জন সাহাবীও ছিলেন না। সেই চরম বিপদের সময় সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর তীরের প্রচণ্ড আঘাতের পর আঘাতে শত্রু বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেন। এক পর্যায়ে এমন নৈপুণ্যের সাথে তীর চালনা করছিলেন যে, তাঁর প্রতিটি তীর তিনি এক একজন মুশরিককে ধরাশায়ী করছিল। তাঁর এই তীর চালনার নৈপুণ্য দেখে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে উৎসাহ প্রদান করছিলেন আর বলছিলেন যে :
'তীর নিক্ষেপ কর সা'দ, বীরত্বের সাথে তীর নিক্ষেপ কর, তোমার প্রতি আমার আব্বা-আম্মা কুরবান হোক।'

তাঁর প্রতি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই উদ্দীপনাময় বাক্য উচ্চারণের জন্য সারা জীবন তিনি গর্ববোধ করতেন এই বলে যে:
'আমি ছাড়া আর কারো ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন উদ্দীপনাময় স্বরে তাঁর মা-বাবাকে কুরবান হওয়ার কথা কখনও উচ্চারণ করেননি।'

সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর সম্মানের সর্বোচ্চ শিখরে তখন আরোহণ করেন, যখন উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পারস্য সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেন। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ উদ্দেশ্যে মুসলিম সাম্রাজ্যের সকল গভর্নরদের প্রতি এক ফরমান জারি করেন:

'যুদ্ধে অংশগ্রহণের উপযোগী সব জনশক্তি চাই অস্ত্রধারী যোদ্ধা হোক অথবা অশ্বারোহী তীরন্দাজ, চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো চিকিৎসক হোক কিংবা পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখার মতো বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। পরামর্শ দেওয়ার মতো যোগ্য ব্যক্তিই হোক কিংবা যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করার মতো কোনো কবি-সাহিত্যিক বা বক্তা- সব ধরনের ব্যক্তিকেই আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।'

দলে দলে প্রতিনিধি দল আসতে লাগল। মদীনার অলিগলি তাদের পদচারণায় সরব হয়ে উঠল। সৈন্য সংগ্রহ চূড়ান্ত হলে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর কর্মপরিষদ এবং পরামর্শসভার যৌথ অধিবেশনে এ বিরাট বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে কাকে নিযুক্ত করা যায় এ নিয়ে পরামর্শ করেন।

তারা সর্বসম্মতিক্রমে ও সমস্বরে বললেন:
'সিংহ তো সর্বদা একজনই, আর তিনি হলেন, সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।'

উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নাম ঘোষণা করলেন। এবং এই বিরাট বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে তার হাতে যুদ্ধ-পতাকা সোপর্দ করলেন।

পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জিহাদের উদ্দেশ্যে মদীনা মুনাওয়ারা থেকে রওয়ানা হওয়ার প্রাক্কালে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের বিদায় দেওয়ার জন্য সেনাপতি সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ওসিয়ত করে বললেন:

'হে সা'দ! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মামা সম্পর্কের অহংকার যেন আপনাকে পেয়ে না বসে এবং মনের মধ্যে এ অহংকার মাথাচাড়া দিয়ে না উঠে যে, আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন নিকটতম সাহাবী। জেনে রাখুন, আল্লাহ কখনো পাপ ও অন্যায়কে পাপ ও অন্যায় দিয়ে নির্বাপিত করেন না; বরং পাপ ও অন্যায়কে তিনি পুণ্য ও করুণা দিয়েই নির্বাপিত করে থাকেন। হে সা'দ! আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমেই সত্যিকারার্থে তিনি তাঁর বান্দাকে নিরূপণ করে থাকেন; বংশ-গৌরবের কারণে নয়। উচ্চ বংশীয় সম্ভ্রান্ত পরিবার নামে খ্যাত ও নিম্ন বংশীয় সাধারণ পরিবার আল্লাহর দৃষ্টিতে সবাই সমান। কারণ, আল্লাহই তাদের প্রভু। আর তারা সবাই তাঁর বান্দাহ। তাকওয়া ও আনুগত্যের ভিত্তিতেই তারা সর্বাধিক সম্মানিত। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত ও নির্দেশের প্রতি বিশেষ করে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ ও হেদায়াত আমাদের জন্য চূড়ান্ত হেদায়াত, নসীহত ও নির্দেশ।'

অতঃপর এই বিরাট বাহিনী জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। তাদের মধ্যে ছিল নিরানব্বই জন বদরী সাহাবীসহ বায়আতে রেযওয়ানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে উপস্থিত থাকা তিনশত দশজন স্বনামধন্য বুযুর্গ সাহাবী। ফতেহ মক্কা বা মক্কা বিজয়কালের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামের নিকটতম তিন শত যোদ্ধা সাহাবী ছাড়াও সাহাবী সন্তানদের সাত শত তরুণ যোদ্ধা এ বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে তার শোভা বৃদ্ধি করছিল।

সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর এই বিরাট বাহিনী নিয়ে ১৬ হিজরীতে ঐতিহাসিক কাদেসিয়া ময়দানের অভিমুখে রওয়ানা হলেন। কাদেসিয়ার যুদ্ধে আল্লাহ মুসলমানদের ঐতিহাসিক বিজয় দান করেছিলেন। এই যুদ্ধের শেষ দিনকে 'ইয়াওমুল হারীর' বা হত্যাকাণ্ডের বিভীষিকাময় দিন বলা হয়। সেই দিন মুসলমান যোদ্ধারা পারস্য বাহিনীকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে নিঃশেষ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং তাদেরকে এমনভাবে হত্যা করতে থাকেন যে, তাদের পালানোর আর কোনো সুযোগ ছিল না। আল্লাহু আকবার তাকবীর ধ্বনির তালে তালে মুসলিম যোদ্ধারা এমনভাবে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন যে, পারস্য সেনাপতি রুস্তমের কর্তিত শির মুসলমানদের বর্শার মাথায় ঝুলানো হলে শত্রুবাহিনীর মধ্যে ভীষণভাবে ভীতির সঞ্চার হয়। তাদের এক এক করে ইঙ্গিত করামাত্রই অবনত মস্তকে মুসলিম বোদ্ধাদের সামনে উপস্থিত হলে তাদের তরবারি দ্বারাই তাদেরকে হত্যা করা হতো। গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ ধন-সম্পদের পরিমাণ যতই বর্ণনা করা হোক না কেন, তা ছিল সবই কম। এ যুদ্ধে পারস্য সৈনিকদের মধ্যে যাদের ছিন্নভিন্ন লাশ গণনা করা সম্ভব হয়েছিল তাদের সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজার।

সা'দ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আল্লাহ দীর্ঘ হায়াত ও বিশাল প্রাচুর্য দান করেছিলেন। মৃত্যুর ওসিয়তকালে তিনি তাঁর ছেঁড়া-ফাটা পশমি একখানা জামা দেখিয়ে বলেন যে:
كفنونى بِهَا فَإِنِّي لَقِيتُ بِهَا الْمُشْرِكُونَ يَوْمَ بَدْرٍ وَإِنِّي أَرِيدُ أَنْ أَلْقَى بِهَا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ أَيْضًا .

'এই জামা দিয়ে আমাকে কাফন পরাবে। কারণ এই জামা পরিধান করে আমি বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম এবং আমি চাই যে, এই জামা পরা অবস্থায় কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হই। তাঁর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করি।' আমীন!

টিকাঃ
১. আল ইসতিয়াব: ২য় খণ্ড, ১৮ পৃ.
২. আল ইসাবাহ: ২য় খণ্ড, ৩০ পৃ.
৩. আল মিলালু ওয়ান নিহালু: ১ম খণ্ড, ২০ পৃ.
৪. আশহুরু মাশাহিরিল ইসলাম: ৩য় খণ্ড, ৫২৫ পৃ.
৫. আত তাবাকাতুল কুবরা ১ম খণ্ড, ২১ পৃ.
৬. তুহফাতুল আহওয়াযী: ১০ খণ্ড, ২৫৩ পৃ.
৭. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১ম খণ্ড, ৬২ পৃ.
৮. যুআমাউল ইসলাম: ১১৪ পৃ.
৯. রিজালু হাওলার রাসূল: ১৪১ পৃ.
১০. সা'দ ইবনে আবী ওক্কাস ওয়া আবয়াতায়ালুল কাদেসিয়াহ লিস্-সাহ্হার.
১১. আর রিয়াদুল নাদিরাহ: ২য় খণ্ড, ২৯২ পৃ.
১২. সিফাতুস সাফওয়াহ: ১ম খণ্ড, ১৩৮ পৃ.
১৩. তাহযীব ইবনে আসাকির: ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৯৩ পৃ.
১৪. আল মাআরিফ: ১০৬ পৃ.
১৫. আন নুজুমুয যাহিরাত: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য.
১৬. উসদুল গাবাহ: ২য় খণ্ড, ২৯০ পৃ.
১৭. জামহারাতু আনসাবিল আরব: ৭১ পৃ.
১৮. তারীখুল ইসলাম: ১ম খণ্ড, ৭৯ পৃ.
১৯. ফাতাহ মিসর ওয়া আখবারুহা: ৩১৮ পৃ.
২০. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৮ম খণ্ড, ৭২ পৃ.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00