📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 পরিশিষ্ট: হামাগুড়ি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ প্রসঙ্গে

📄 পরিশিষ্ট: হামাগুড়ি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ প্রসঙ্গে


[আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সম্পর্কিত এ হাদীসের উপর আল ইমাম আল হাফিয জামাল উদ্দীন আবিল ফারাজ আবদুর রহমান ইবনুল জাওযী আল বাগদাদী (মৃত ৫৯৭ হিঃ) অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ পর্যালোচনা করেছেন। আরবী রেফারেন্স বইয়ের দুষ্প্রাপ্যতার কথা বিবেচনা করে জ্ঞান-পিপাসু পাঠকবৃন্দের জ্ঞাতার্থে এখানে হাদীসটির পক্ষে-বিপক্ষের দলীল-প্রমাণাদিসহ তাঁর দীর্ঘ পর্যালোচনাটি সংযোজন করা হলো:]

অনেকটা তাবেঈ আত্ তাবেঈনের যুগে মোহমুক্তির উদ্দেশ্যে তাসাউফপন্থীদের মধ্যে আত্মশুদ্ধির নামে রিয়াযত ও মোরাকাবা-মোশাহাদার চর্চা তুঙ্গে উঠে। তাসাউফপন্থী পীর-মোর্শেদগণ প্রথম দিকে সদুদ্দেশ্যেই তাঁদের ইজতিহাদী চিন্তা-ভাবনার আলোকে দুনিয়াত্যাগী জীবনযাপন বেছে নেন। ধন-সম্পত্তির ক্ষতিকর ও নৈতিকতাবিধ্বংসী দিকের প্রতি হয়ে উঠেন শঙ্কিত ও ভীত। ভোগ-বিলাসত্যাগী এ সূফী-সাধকগণ 'রিয়াযতে নাক্স'-এর নামে ক্ষুধার্ত জীবনের অনুশীলন করতে ও নিজেদের ধন-সম্পত্তি অকাতরে বিলিয়ে দিতে থাকেন। পরবর্তীতে এ সূফী সাধকগণ আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানসিক দিক দিয়ে সে সময়কার হাদীসশাস্ত্র বিশারদ, ফিক্‌হবিদ, মুফাসসিরীন এবং মুহাক্কিক আলেম-উলামার প্রশ্নের সম্মুখীন হন। কেননা, রিয়াযতে নাফ্স-এর অনুশীলনের চেয়ে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে তাদের মতাদর্শকে প্রমাণ করা অধিক কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। যে কারণে বাধ্য হয়ে তাঁরা এমন নানাবিধ উদ্ধৃতির আশ্রয় নেন, যা নেহায়েতই ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর। তারা সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের ইসলামী নীতিমালার দিকে ফিরে না এসে কোনো কোনো সূফী-সাধকের ইচ্ছাপ্রণোদিত কর্মকাণ্ডকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে। এতেও তাদের সৃষ্ট মতাদর্শকে সত্য বলে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়ে ভিত্তিহীন ও জাল হাদীসের উদ্ধৃতি পর্যন্ত পেশ করতে থাকে। তাদের অন্যতম ও শীর্ষ বর্ণনাকারী হলো 'হারেস আল মোহাসেবী' নামক জনৈক অর্ধমূর্খ সূফী।

তিনি তার বর্ণনায় উল্লেখ করেন:
'সম্পদের মোহ ত্যাগ করতে এখনো যারা বিভ্রান্তিতে ভুগছেন, তাদেরকে বলছি: 'আপনারা কী করে এ ধারণায় লিপ্ত আছেন যে, হালাল উপায়ে অর্থোপার্জন তার পরিত্যাগের চেয়ে উত্তম? নিঃসন্দেহে আপনারা এ ধারণার মাধ্যমে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অন্যসব নবী ও রাসূলদেরকে মিথ্যা সাব্যস্ত করছেন। কি করে এ ধারণা পোষণ করছেন যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পদের ক্ষতিকর বিভীষিকা সম্পর্কে তাঁর উম্মতকে সতর্ক করেননি। তিনি কি এ কথা জানতেন না যে, সম্পদ তাদের জন্য কল্যাণকর? আপনারা কি এ ধারণা করছেন যে, যখন তিনি সম্পদ আহরণে নিষেধ করেছেন তখন আল্লাহ তা অবলোকন করেননি? এবং এটি জানতেন না যে, এর সংগ্রহ তাদের জন্য কল্যাণকর? সাহাবীদের সম্পদ ছিল বলে তা সংগ্রহের বৈধতা খুঁজে বেড়াচ্ছেন? তাতে কোনোই লাভ হবে না। কেননা, আবদুর রহমান ইবনে আওফ কিয়ামতের দিন এটিই চাইবেন যে, কতই না ভালো হতো, যদি তাকে অঢেল সম্পদের পরিবর্তে শুধুমাত্র দুনিয়াতে এক মুষ্টি খাবার দেওয়া হতো!' হারেস আল মোহাসেবী তার বর্ণনা অব্যাহত রেখে আরও বলেন:

'আমি সন্দেহাতীতভাবে জানতে পেরেছি যে, আবদুর রহমান ইবনে আওফের ইনতিকালের পর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ বলাবলি করেন যে, আমরা আবদুর রহমান ইবনে আওফ-এর পরিত্যক্ত ধন-সম্পত্তির আধিক্যের ব্যাপারে আতঙ্কিত। এটা, শুনে 'কা'ব' নামক এক ব্যক্তি বলেন:
'সুবহানাল্লাহ! তোমরা কেন আবদুর রহমান ইবনে আওফ-এর সম্পদের উপর আশঙ্কা বোধ করছ? কেননা, তিনি হালাল পন্থায় তা আহরণ করেছেন ও উত্তম পন্থায় তা খরচও করেছেন।'

কা'বের এ কথা শোনামাত্রই আবূ যর গিফারী ক্রোধান্বিত অবস্থায় কা'বকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য বের হয়ে পড়েন। আবূ যর-এর এ অবস্থা দেখে কা'ব দ্রুততর উট নিয়ে প্রস্থানের চেষ্টা করলে তাকে ধরে ফেলা হয় এবং তাকে বলা হয় যে, আবু যর তোমাকে খুঁজছে। এটি শোনামাত্রই কা'ব এক দৌড়ে উসমান (রা)-এর নিকট গিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করেন এবং ঘটনার বর্ণনা দেন। আবু যর গিফারী কা'বকে বলেন: হে ইহুদী সন্তান এদিকে এসো। আবদুর রহমান ইবনে আওফ-এর ধন-সম্পদ ছেড়ে যাওয়াটা নাকি তোমার নিকট কোনোই ব্যাপার নয়; অথচ একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বের হয়ে ঘোষণা দেন যে, ধনাঢ্যশালীরাই কিয়ামতের দিন হবে নিঃস্ব। শুধুমাত্র তারাই অব্যাহতি পাবে, যারা এই দু'আ পাঠ করবে। অতঃপর তিনি আবু যরকে বলেন:

'হে আবু যর! তুমি সম্পদের আধিক্য চাচ্ছ? আর আমি চাচ্ছি স্বল্পতা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচ্ছেন স্বল্পতা, আর হে ইবনে ইহুদ তুমি বলছো যে, আবদুর রহমান ইবনে আওফ যা ছেড়ে গেছেন এতে কোনো অন্যায় হয়নি। তুমি মিথ্যা বলছ। তোমার কন্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে যারা একমত প্রকাশ করছে তারাও মিথ্যাবাদী।'

কা'ব আবূ যর গিফারীর কথার কোনো প্রতিবাদ না করে নীরবে বের হয়ে যান।

হারেস আল মোহাসেবী আরো বলেন যে:
'আবদুর রহমান ইবনে আওফ-এর সুউচ্চ মর্যাদার পর অত্যন্ত সহজ-সরল জীবন যাপন করার পরও শুধুমাত্র তার অর্জিত হালাল সম্পদের প্রাচুর্যের জন্য কিয়ামতের দিন তাঁকে জবাবদিহি করতে হবে এবং মুহাজির ফকীর ও নিঃস্ব ব্যক্তিদের সাথে হেঁটে হেঁটে জান্নাতে প্রবেশ করা থেকে তাকে বিরত করা হবে, যার ফলে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি হামাগুড়ি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। সাহাবীদের অবস্থা ছিল- যখন তাদের নিকট কিছুই থাকত না তখন তারা আনন্দিত হতেন। আর তোমরা অভাব-অনটনের ভয়ে সম্পদ পুঞ্জীভূত করছ। এটাই হলো আল্লাহর উপর অনাস্থা ও তাওয়াক্কুল পরিপন্থী গর্হিত দুর্বল ইয়াকীন বা বিশ্বাসের পরিচায়ক। এর জন্য নিঃসন্দেহে তুমি গুনাহগার হবে। কতই না ভালো হতো যদি, তোমরা দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও ভোগ-বিলাসে মত্ত না হতে। সে আরো বলে যে, আমরা অবগত হয়েছি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

দুনিয়ার বঞ্চিত সম্পদ ও না পাওয়া ভোগ-বিলাসের প্রতি যে শুধু আফসোস করবে তাকেও এক বছর পর্যন্ত জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ করা হবে। আর তুমি প্রচেষ্টা ও কষ্টে যে সম্পদ পেয়েছ তার ওপর আল্লাহর গযবের ভয় করছ না? তোমার প্রতি হাজার আফসোস, সাহাবীদের যুগে যেমন হালাল ও পূত-পবিত্র সম্পদ ছিল, তেমন পূত-পবিত্র সম্পদ কি এখন সম্ভব যে, তুমি তা সংরক্ষণ করবে?

আফসোস ও ধিক্কার তোমাদের দুনিয়ার সম্পদ ও মোহের প্রতি। আমি তোমাদেরকে বিশেষভাবে নসীহত করছি যে, তোমরা শুধু তোমাদের একটি মাত্র গাধা বা ঘোড়াকে তোমাদের জন্য যথেষ্ট মনে করো। দান-খয়রাত বা পুণ্য কাজের উদ্দেশ্যেও সম্পদ আহরণে নিমগ্ন হয়ো না।'

সৎকাজে অর্থ ব্যয় করার স্বার্থে সম্পদ আহরণকারী জনৈক ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো বিজ্ঞকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বলেন:
'সৎকাজে দান-খয়রাত করার স্বার্থে ধন-সম্পদ আহরণ না করাই শ্রেয়। সে আরও বলে, আমরা জানতে পেরেছি যে, কোনো বুযুর্গ তাবেঈর নিকট এমন দুই ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যাদের একজন হালাল পন্থায় ধন উপার্জন করেছিল ও দীনের পথে খরচ করেছিল এবং অপরজন না হালাল পন্থায় উপার্জন করেছে আর না দীনের পথে খরচ করেছে। তাদের দু'জনের কে উত্তম? তিনি উত্তরে বললেন, যিনি বিরত ছিলেন তিনিই উত্তম। তাদের পরস্পরের ব্যবধান মাশরিক ও মাগরিবের পার্থক্যের সমতুল্য।'

এসব হলো- হারেস আল মোহাসেবীর উদ্ধৃতি। যা আবূ হামেদ আল গাযযালী সানন্দে গ্রহণ করে এবং নির্বিচারে ও খুবই গুরুত্বের সাথে প্রচার করেন এবং সা'লাবা নামক জনৈক ব্যক্তি অর্থ-সম্পদ পাওয়ার পর যে যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল তার উদাহরণ দিয়ে তাকে আরও শক্তিশালী করতে গিয়ে বলেন:
'যারাই নবী ও ওলীদের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন ও তাদের নসীহত সম্পর্কে সজাগ, তারা অবশ্যই এ কথা বলতে বাধ্য হবে যে, অর্থ-সম্পদ আহরণের চেয়ে তা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। যদিও তা কল্যাণকর ও সৎকর্মে ব্যয় করা হোক। কেননা, স্বল্প পরিমাণ সম্পদও তার মালিককে আল্লাহর 'যিকির' থেকে বঞ্চিত রাখে। এ জন্যই প্রত্যেক মুরীদের উচিত, সম্পদ থেকে দূরে অবস্থান করা। এমনকি প্রয়োজনের অধিক একটি দিরহামও অবশিষ্ট না রাখা। তবেই সে আল্লাহর নিকট প্রিয় হতে পারবে।'

প্রকৃতপক্ষে হারেস আল মোহাসেবী ও আবূ হামেদ আল গাযযালীর এসব যুক্তি বিবেক ও শরীআতপরিপন্থী এবং সম্পদ আহরণ ও তার সুষ্ঠু ব্যবহার সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ভ্রান্ত ধারণার ফসল।

সম্পদের গুরুত্ব
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সম্পদের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। সম্পদ সংরক্ষণ করারও বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন। যেহেতু সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত ব্যক্তিকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে বলেছেন, তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, সম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম।

আর এ গুরুত্ব ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:
وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا .

'নির্বোধ ও অবুঝ ইয়াতীম সন্তানদের বোঝ না হওয়া পর্যন্ত তোমাদেরকে যে সম্পদ দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা তাদের হাতে সোপর্দ করো না।' (সূরা নিসা : ৫)

আল্লাহ এ আয়াতের মাধ্যমে নির্বোধ ও অবুঝ ইয়াতীমদের হাতে মীরাসের সম্পদ তুলে দিতে নিষেধ করে বলেছেন:
فَإِنْ أَنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا فَادْفَعُوا إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُم .

'এবং যখন তাদের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধির পরিপক্বতা অনুভব করো ও তারা সম্পদের গুরুত্ব অনুধাবন করতে সক্ষম হয়, তখন তাদের সম্পদ তাদের হাতে সোপর্দ করো।' (সূরা নিসা: ৬)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ হাদীসে বর্ণিত যে, তিনি ধন-সম্পদের অপচয় করতে নিষেধ করেছেন।

তিনি সা'দ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে নির্দেশ দিয়েছেন:
لان تترك ورثتك أغنياء خير لك من أن تتركهم عالة يتكففون الناس .

'হে সা'দ! আমি চাই যে, তুমি তোমার সমস্ত সম্পদ না বিলিয়ে দিয়ে তোমার সন্তান-সন্ততিদেরকে সম্পদশালী হিসেবে রেখে যাও। তোমার জন্য এটাই উত্তম। যেন তোমার অনুপস্থিতিতে তাদেরকে অন্যের নিকট হাত পাততে না হয়।'

অন্যত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
ما نفعنى مال كمال أبي بكر .

'আবূ বকর সিদ্দীক-এর সম্পদ আমাকে যে সাহায্য করেছে, অন্য কারো সম্পদ আমাকে এতটা সাহায্য করতে পারেনি।'

'শুধুমাত্র হিজরতের পথখরচ ও সম্ভাব্য আপদ-বিপদের হাত থেকে রক্ষার জন্যই আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সাড়ে ছয় হাজার দিরহাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে তুলে দেন।'

আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে একটি হাদীসের উদ্ধৃতি হয়েছে:
عن عمرو ابن العاص قال : بعث الى رسول الله ﷺ فقال : خذ عليك ثيابك وسلاحك ثم انتنى، فأتيته فقال : إني أريد أن أبعثك على جيش فيسلمك الله ويغنمك وأرغب لك من مال رغبة صالحة فقلت يارسول الله ما أسلمت من أجل المال ولكنني أسلمت رغبة في الاسلام - فقال يا عمرو نعم المال الصالح للرجل الصالح .

আমর ইবনুল আস (রা) বর্ণনা করেছেন যে,
'একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি তাঁর খিদমতে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে কাপড়-চোপড়সহ সশস্ত্র হয়ে আসতে বলেন। তাঁর নির্দেশমতো যথাসময়ে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বললেন, আমি তোমাকে এই সেনাবাহিনীর প্রধান করে জিহাদে প্রেরণ করতে চাই। আমি আল্লাহর নিকট দু'আ করছি, আল্লাহ যেন তোমাকে সহীহ সালামতে রেখে এই অভিযানে গনীমতের সম্পদে ভূষিত করেন। আমি কল্যাণকর পন্থায় তা ব্যয় কামনা করি। প্রত্যুত্তরে আমি আরয করলাম:

হে রাসূলুল্লাহ! সম্পদের মোহে আমি ইসলাম গ্রহণ করিনি; বরং সত্যিকারার্থে ইসলামের মহব্বতেই তা গ্রহণ করেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার উত্তরের প্রত্যুত্তরে বলেন:
'সৎ কর্মশীল ব্যক্তির জন্যই তো হালাল সম্পদ শোভনীয়।'

আনাস ইবনে মালেক (রা) সম্পর্কে অপর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে,
أن رسول الله ﷺ دعاله بكل خير وكان في آخر دعائه أن قال اللهم اکثر ماله وولده وبارك له .

'একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনাস ইবনে মালেক-এর জন্য সমস্ত কল্যাণের দু'আ করেন। তাঁর দু'আর শেষাংশে তিনি বলেন: হে আল্লাহ্! তুমি তার ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দাও এবং তাতে বরকত দান করো।'

আবদুর রহমান ইবনে কা'ব বিন মালেক (রা) থেকে অন্য আর একটি হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে যে,
'কা'ব (রা)-এর ছেলে আবদুল্লাহ তাঁর পিতা কা'ব ইবনে মালেক-এর তাওবার ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন যে, আমি কা'ব ইবনে মালিককে তাঁর তাওবা করার ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি। তিনি বলেছেন যে, আমি ইসলাম গ্রহণকালে তাওবা ঘোষণায় বলেছিলাম:

ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার তাওবার অংশ হিসেবে আমার সমস্ত ধন-সম্পদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথে বিলিয়ে দিতে চাই। একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

امسك بعض مالك فهو خير لك .

'তোমার সম্পদের একটা অংশ তোমার জন্য রেখে দাও। এটি তোমার জন্যই কল্যাণকর হবে।'

উপরোক্ত হাদীসসমূহ সহীহ হাদীসের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। তাসাউফপন্থীরা সম্পদ আহরণ ও তার সুষ্ঠু ব্যবহার সম্পর্কে তাদের মোহ ত্যাগের চর্চাকালে যার উদ্ধৃতি দিত তা বর্ণিত হাদীসসমূহের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তারা নিজেদের মনগড়া এই ধারণা পোষণ করতে থাকে যে, সম্পদের আধিক্য বেহেশতে প্রবেশের মহা অন্তরায় এবং শাস্তিমূলক অপরাধ। শুধু তাই নয়; বরং তা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী কাজ।

ধন-সম্পদের আহরণ ও তার প্রাচুর্যের একটা ক্ষতিকর দিক অবশ্যই আছে, যা কেউই অস্বীকার করছে না। অনেকেই এর ক্ষতিকর দিক থেকে বেঁচেও থাকতে চান।

নিঃসন্দেহে সম্পদ উপার্জন করাটা কষ্টকর। তা অর্জনের আধিক্যের ধ্যানে নিমগ্ন থাকা যে পরকালের স্মরণ থেকে ব্যক্তিকে ভুলিয়ে রাখে, তাও সত্য। তাই এর ক্ষতিকর ও ভীতিকর দিকও অস্বীকার করার নয় বলেই অল্পে তুষ্টির প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কেউ যদি অল্পে তুষ্টির পথ অনুসরণ করে, নিঃসন্দেহে সেটা প্রশংসনীয়। কিন্তু কেউ যদি হালাল পন্থায় আধিক্যের পথ বেছে নেয়, তখন আমরা তার উদ্দেশ্যকে দেখব, যদি উদ্দেশ্য প্রতিযোগিতামূলক, গর্ব ও অহংকারমূলক হয়, সে ক্ষেত্রে তার অর্জন নিঃসন্দেহে ঘৃণিত। আর যদি পরিবার-পরিজনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবন যাপন, আপৎকালীন সময়ের সহায়ক, গরীব আত্মীয়-স্বজনের ও নিঃস্ব, ইয়াতীম, মিসকীনদের সহযোগিতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অভাব-অনটন মোকাবেলা ইত্যাদি জনকল্যাণমূলক ও ইসলামী কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া উদ্দেশ্য হয়, তবে নিঃসন্দেহে সেটা বৈধ ও উপার্জন না করার চেয়ে উত্তম। সাহাবীদের (রা) মধ্যে অনেকেই এ উদ্দেশ্যে হালাল পন্থায় অর্থ সঞ্চয় করেছেন। আহরণের চেষ্টা চালিয়েছেন এবং আল্লাহর নিকট তার আধিক্যের জন্য দু'আও করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে:

عن ابن عمر أن رسول الله ﷺ قال : أقطع الزبير حضر فرسه بأرض يقال لها ثرثر فاجرى فرسه حتى قام، ثم رمى سوطه فقال : أعطوه حيث بلغ السوط .

'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ঘোষণায় বলেন যে, আমি যুবায়েরকে 'সারসার' নামক স্থানে ঘোড়দৌড় পরিমাণ জমি বরাদ্দ দিতে চাই। যুবায়ের তাঁর ঘোড়া দৌড়িয়ে সীমানা নির্ধারণের এক পর্যায়ে ঘোড়া দাঁড়িয়ে গেলে তাঁর 'চাবুক'টি সম্মুখ দিকে নিক্ষেপ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতঃপর বললেন: যে পরিমাণ আওয়ায পৌঁছেছে সে পরিমাণ জমি তার জন্য বরাদ্দ দিয়ে দাও।'

সা'দ ইবনে উবাদা (রা) (اللهم وسع على ) 'হে আল্লাহ আমাকে ধন-দৌলতের প্রাচুর্য দান করো' বলে দু'আ করতেন।

উপরোল্লিখিত প্রমাণাদির চেয়েও বলিষ্ঠ প্রমাণ ইয়াকুব আলাইহিস্ সালাম-এর ঘটনা থেকে আমরা পাচ্ছি। যখন তাঁর সন্তানেরা তাঁর সামনে প্রস্তাব দেয় যে, "نزداد كيل بعير" 'আমরা আরও এক উট বোঝাই রেশন পাব।' তিনি তাদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে বিনইয়ামীনকে তাদের সাথে রেশনের জন্য পাঠান। তার পরেও সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহু কী করে একথা বলতে পারেন যে, আমরা আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরিত্যক্ত সম্পদ সম্পর্কে শঙ্কিত?

হালাল পন্থায় সম্পদ অর্জিত করার ওপর সাহাবীর যুগে কি ইজমায়ে উম্মাহ হয়নি? কোনো বিষয়ে 'ইজমা' বা সর্বসম্মত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরও কি তা শরীআতের চারটি ভিত্তির একটির মর্যাদা লাভ করেনি? তার পরও কেন সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সম্পদে শঙ্কিত হবেন?

শরীআত কি কোনো বিষয়ে অনুমতি প্রদান করার পরও সে বিষয়ের ওপর আমলকারীকে শাস্তি প্রদানের ধমক দেয়?

নিঃসন্দেহে এসব ধারণা শরীআত সম্পর্কে অজ্ঞতা ও মূর্খতার পরিচায়ক। প্রকৃতপক্ষে তারা সাহাবীদের কর্মপন্থা অনুসরণে ব্যর্থ।

প্রিয় পাঠক!
একথা গুরুত্বের সাথে প্রণিধানযোগ্য যে, দারিদ্র্য একটা ব্যাধি বা রোগ। এ রোগে যদি কাউকে আল্লাহ পরীক্ষা করতে চান, তাহলে তাকে সবর করতে হবে ও ধৈর্য ধারণ করতে হবে। 'দারিদ্র্য রোগে' আক্রান্ত ব্যক্তিকে আল্লাহ তার সবর অনুযায়ী পুরস্কৃত করবেন।

يدخل الفقراء الجنة قبل الأغنياء بخمس مائة لمكان صبرهم على البلاء .

'এ জন্যেই ফকীর বা দরিদ্র ব্যক্তিরা বিপদ-মুসীবতে শুধুমাত্র তাদের ধৈর্য ও সবরের কারণে ধনী ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের তুলনায় ৫০০ (পাঁচ শত) বছর পূর্বে বেহেশতে প্রবেশ করবেন।'

অন্যদিকে অর্থ ও বিত্ত আল্লাহর নিয়ামত। এর দাবি হলো আল্লাহর কৃতজ্ঞতা ও শোকর করা। একজন মুফতী যেমন তার জ্ঞান বিতরণের দ্বারা অজ্ঞদের সমস্যা সমাধানে বাধ্য, একজন মুজাহিদ যেমন মরলে শহীদ ও বাঁচলে গাযীর চেতনায় জীবন বাজি রেখে জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহয় নিবেদিত, তেমনি একজন বিত্তশালীও তার কষ্টার্জিত সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে দায়মুক্ত হতে বাধ্য।

অপরদিকে দরিদ্র ও নিঃস্বরা হলো আল্লাহর পথে দান-খয়রাত ও সমাজ সেবামূলক জনহিতকর কার্যকলাপ থেকে দায়মুক্ত নির্ঝঞ্ঝাট ব্যক্তি।

حديث الذي مات من اهل الصفة وخلف دينارين فقال رسول الله ﷺ : كَيْتَانِ .

এ হাদীসকে যারা সম্পদ না রেখে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে পেশ করতে চান, তারা মূলত কোন্ প্রেক্ষাপটে এই হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে সে সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। অথচ সাধারণত সাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহুম- এর অভ্যাস এমন ছিল যে, ক্ষুধার তাড়নায় হাত থেকে তরবারি পড়ে যেত, তবু খাবার জন্য অন্যের দ্বারস্থ হতেন না।

অপরদিকে আলোচ্য ব্যক্তি আসহাবে সুফফার মিসকীনদের অন্তর্ভুক্ত থেকে দান-খয়রাত এলে পাওয়ার জন্য অন্যান্য মিসকীনকে ঠেলে জোরপূর্বক তা সংগ্রহ করতে অভ্যস্ত ছিল। মিসকীনত্বকেই পেশা হিসেবে নিয়ে এ স্বর্ণমুদ্রা সঞ্চয় করে। সে নিজে খাবার না খেয়ে তা সঞ্চয় করত এবং যাকাত সংগ্রহের লক্ষ্যে সদা তৎপর থাকত। তার মৃত্যুর পর দেখা গেল যে, সে সাদকার অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে এই স্বর্ণমুদ্রা দুটি জমা করেছে। তার এ ঘৃণিত মনোভাব দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

'কিয়ামতের দিনে এই স্বর্ণমুদ্রা দুটি গরম করে তাকে তাপ দেওয়া হবে।'

বৈধ উপায়ে যদি সঞ্চয় করা নিষিদ্ধ হতো, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা'দ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলতেন না যে,
انك أن تذر ورثتك أغنياء خير من أى تذرهم عالة يتكفون الناس .
'তোমার উচিত তোমার সন্তান-সন্ততিদেরকে সম্পদশালী হিসেবে রেখে যাওয়া। কেননা, নিঃস্ব হিসেবে মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে জীবন যাপনের চেয়ে তা উত্তম।'

তারা কী করে এমন কথা বলতে পারে যে, কোনো সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পদ রেখে যেতেন না। অথচ আমরা নবী-জীবনের প্রতি দৃষ্টি দিলে দেখতে পাই যে, ইবরাহীম ও শুআইব আলাইহিমাস সালাম কৃষি খামার ও বিশাল সম্পদের অধিকারী ছিলেন। শুআইব আলাইহিস সালাম আধিক্যের প্রত্যাশা করেছিলেন। তাঁর ও তাঁর জামাতা মূসা আলাইহিস সালামের মধ্যে সংঘটিত পাওনানুসারে যা পাওয়ার তা ছাড়াও খুশি মনে অতিরিক্ত দিলে আপত্তি না থাকার কথা উল্লেখ করেছেন।

فَإِنْ أَتْمَمْتَ عَشْرًا فَمِنْ عِنْدَكَ .
'তুমি যদি তোমার নির্দিষ্ট মেয়াদ উত্তীর্ণের পর দশ বছর পর্যন্ত থাক, তবে সেটা তোমার অনুগ্রহ।' (সূরা কাসাস: ২৭)

এমনিভাবে আইয়ুব আলাইহিস সালামের রোগমুক্তির পর তাঁকে স্বর্ণখণ্ড গ্রহণের প্রস্তাব দিলে তিনি তাঁর চাদরের আঁচল ভরে তা বেশি বেশি করে উঠাতে থাকেন। অতঃপর তিনি পরিতৃপ্ত হয়েছেন কি না জানতে চাওয়া হলে, উত্তরে বললেন:

أرب من يشبع من فضلك .

'হে রব! কে তোমার সম্পদের ব্যাপারে পরিতৃপ্ত হতে পারে?' আধিক্যের আশা-আকাঙ্ক্ষা মানুষের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও বাসনা। এটি যদি জনহিতকর ও কল্যাণকর উদ্দেশ্যে হয়, তবে নিঃসন্দেহে তা মঙ্গলকর ও যুক্তিসঙ্গত।

এতক্ষণে যেসব প্রমাণাদি পেশ করা হলো, তার আলোকে যাচাই-বাছাই করলে হারেস আল মোহাসেবীর ঐসব যুক্তি ও দাবি কুরআন, নবী-রাসূল প্রদত্ত অর্থনীতির পরিপন্থী। মুসলমানদেরকে সম্পদহীন করার অপকৌশল মাত্র।

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পদ আহরণ করতে নিষেধ করেননি; বরং যা নিষেধ করেছেন, তা হলো অবৈধ পন্থায়, অসৎ উদ্দেশ্যে সম্পদ আহরণ করাকে।

এ বিষয়টি শুধুমাত্র আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে সংঘটিত হওয়াতে এটাই প্রমাণ করে যে, তারা অন্য সাহাবীদের জীবনী সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ।

তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু মীরাস হিসেবে ৩০০ (তিন শত) পিপা স্বর্ণ-রৌপ্য রেখে গিয়েছিলেন। তিনি কখনো বৈঠকখানায় রাখা পিপার মুখ ঢেকে রাখতেন না। পূর্ব অনুমতির ভিত্তিতেই প্রয়োজন মতো অভাবীগণ পিপা থেকে মুদ্রা নিয়ে যেতেন।

যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরিত্যক্ত সম্পদের পরিমাণ ছিল ৫,০২,০০,০০০ (পাঁচ কোটি দুই লাখ)। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরিত্যক্ত মুদ্রার পরিমাণ ছিল ৯০,০০০ (নব্বই হাজার)। অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম অত্যধিক সম্পদ অর্জন করেছেন এবং সন্তানাদির জন্য রেখে গেছেন। এ ব্যাপারে কেউই কোনো আপত্তি করেননি।

আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহুর হামাগুড়ি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করা সম্পর্কে বর্ণনা প্রমাণ করে যে, বর্ণনাকারী হারেস আল মোহাসেবী 'হাদীস' সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। অথবা সে এমন এক ঘুমন্ত ব্যক্তি, যাকে সজাগ করা যায় না। এ ধরনের বর্ণনার ওপর বিশ্বাস করা থেকে আমরা আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি। নিঃসন্দেহে এটি একটি মিথ্যা ধারণা। আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহু জীবদ্দশায় জান্নাতে প্রবেশ করার সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জন সাহাবীর একজন। তিনি একজন বদরী সাহাবী, যাদেরকে 'মাগফিরাত' প্রাপ্ত বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শূরা বা পরামর্শসভার সম্মানিত সদস্য। খায়বারের অভিযানে এক ওয়াক্ত নামাযে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইমাম। তিনি যদি জান্নাতে হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করেন, তাহলে জান্নাতে হেঁটে হেঁটে প্রবেশ করবেন কে? একদিকে তাঁর এ সুমহান মর্যাদা ও জান্নাতের সুসংবাদ, অপরদিকে তাঁর সম্পর্কে 'আম্মারা ইবনে যাযান' নামক অভিশপ্ত মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারী ব্যক্তির বর্ণনা।

ইমাম বুখারী (র) বলেছেন, এটি একটি বিভ্রান্ত বর্ণনা। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র) বলেছেন, সে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর বরাত দিয়ে অনেক বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করেছে। আবূ হাতেম আর রাযী বলেছেন, এই বর্ণনা বা হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম দারা কুতনী বলেছেন, দুর্বল বর্ণনা।

সাঈদ ইবনে মুসায়্যিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন: 'যে সম্পদ আহরণে অনীহা প্রকাশ করে ও দীনের কাজে খরচ করতে অনাগ্রহী, সে নিজের ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতিও নির্দয়। সে পরোপকারে ভ্রূক্ষেপহীন, তার মৃত্যুর পর সন্তান-সন্ততির জন্য মীরাস রেখে যেতে অমনোযোগী হেতু তার মধ্যে কোনোই কল্যাণ বা মঙ্গল নেই। তিনি স্বয়ং নিজে মৃত্যুকালে ৪০০ (চারশত) স্বর্ণমুদ্রা রেখে যান।'

সুফিয়ান আস সাওরী (র) ২০০ স্বর্ণমুদ্রা রেখে যান। তিনি বলতেন, 'অর্থ এ যুগের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার'।

কা'ব ও আবূ যর গিফারীর হাদীসের যে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে, তার সত্যতাও একেবারেই অসম্ভব। যা অজ্ঞ ও মূর্খ লোকদের মনগড়া বর্ণনা করা বিষয়বস্তু, যা দ্বারা সাধারণ লোকরা বিভ্রান্ত হয়েছে। কেউ কেউ না জেনে না বুঝেই উক্ত উদ্ধৃতিটি বর্ণনা করে থাকেন। যা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মূল বর্ণনাটিই ভিত্তিহীন। তাদের অপর একটি উদ্ধৃতি হলো, মালেক ইবনে আবদুল্লাহ আল যিয়াদীর বর্ণনা। সে বর্ণনায় বলে, আবু যর গিফারী (রা) লাঠি হাতে উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সাক্ষাতের অনুমতি চাইলে তিনি তাকে প্রবেশের অনুমতি দেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু কা'বকে বলেন, হে কা'ব! আবদুর রহমান ইবনে আওফ তো ইনতিকালই করেছেন, তুমি তার পরিত্যক্ত সম্পদ সম্পর্কে কী মত পোষণ কর?

কা'ব উত্তরে বললেন, 'যদি আল্লাহর হক আদায় করে থাকেন, তবে তাতে ক্ষতির কী আছে?"

এ কথা শোনামাত্রই আবু যর তার লাঠি দ্বারা কা'বকে আঘাত করেন এবং বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট শুনেছি এই পাহাড়কেও যদি আমার জন্য স্বর্ণে পরিণত করে দেওয়া হতো, তবু তা আমি আল্লাহর পথে এমনভাবে বিলিয়ে দিতাম, যেন আমার নিকট ছয় রতি পরিমাণ স্বর্ণও অবশিষ্ট না থাকে।'

হে উসমান! আপনি কি এটি শোনেননি বলে তিন তিন বার তার পুনরাবৃত্তি করেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু উত্তরে বললেন, হ্যাঁ শুনেছি।'

প্রিয় পাঠক!
উপরোল্লিখিত হাদীসটিও জাল ও মনগড়া। তার সনদে ইবনে লুহাইয়া নামক রাবী জাল ও মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে চিহ্নিত।

হাদীসবিশারদ ইমাম আল্লামা ইয়াহইয়া বলেন, তার বর্ণনাকৃত হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়।

ইতিহাসের অকাট্য বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত যে, আবু যর গিফারী (রা) ইনতিকাল করেন ২৫ হিজরীতে আর আবদুর রহমান ইবনে আওফ ইনতিকাল করেন ৩২ হিজরীতে। আবূ যর গিফারী (রা)-এর ইনতিকালের পরও আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা) সাত বছর পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।

হাদীসটির ভাষা বিভ্রান্তিকর ও ভুল-ত্রুটিতে পরিপূর্ণ। যাতে প্রমাণ হয় যে, এই হাদীসটি জাল।

তাদের দাবি হলো যে,
'এমনকি মৃত্যুকালে এক-চতুর্থাংশ সম্পদের ওসিয়ত করে যাওয়ারও অনুমতি নেই।'

অথচ উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
حَتَّى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَلَى الصَّدَقَةَ فَجِئْتُ بِنِصْفِ مَالِى فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ : وَمَا أَبْقَيْتَ لأَهْلِكَ؟ فَقُلْتُ مِثْلَهُ. فَلَمْ يُنْكِرْ عَلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ .

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে আল্লাহর পথে দান করতে উদ্বুদ্ধ করলে আমি আমার অর্ধেক সম্পদ এনে উপস্থিত হই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, 'তোমার সন্তানদের জন্য কী পরিমাণ রেখে এসেছ?' উত্তরে আরয করলাম এই পরিমাণ, যে পরিমাণ এনেছি। আমার রেখে আসা সম্পদের পরিমাণ জেনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেননি।

ইবনে জারীর আত তাবারী (র) বলেন, এই হাদীস প্রমাণ করে যে, তাসাউফপন্থীরা বিত্তহীন থাকা সওয়াবের কাজ বলে যে দাবি করে আসলে তা সঠিক নয়। ইবনে জারীর (রা) আরো বলেন যে,
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
كذلك قوله عليه وسلم : اتخذوا الغنم فانها بركة .

'তোমরা বকরি প্রতিপালন করো। কেননা, তা সম্পদ বৃদ্ধির পথ।'

আল্লামা ইবনে জারীর আরো বলেন, আগামীকালের জন্য যদি সঞ্চয় করাটা আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল পরিপন্থী হতো, তাহলে তোমরা এটা দেখছ না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী-পরিজনের জন্য পুরো এক বছরের খোরাক সঞ্চয় করে রেখে দিতেন।

বি: দ্র: বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন ইমাম আল জাওযীর গ্রন্থ তালবিস ইবলিস ১৭০ পৃ: থেকে ১৭৬ পৃ: পর্যন্ত। -অনুবাদক

وها هن صبايا المدينة الصغيرات يخرجن في أيديهن الدفوف ....... أقبل بدر علينا من ثنيات الوداع وجب الشكر علينا ما دعا لله داع

অন্য বর্ণনায় রয়েছে:
لما قدم المدينة جعل النساء والصبيان والولدان يقلن : من ثنيات الوداع طلع البدر علينا وجب الشكر علينا مادعا لله داع

যুগশ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক আল্লামা মুহাম্মদ নাসির উদ্দীন আলবানী (র) তাঁর سلسلة الأحاديث الضعيفة والموضوعة واثارها السيى في الأمة নামক গ্রন্থে এই বর্ণনাকে সহীহ নয় বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এটি একটি দুর্বল বর্ণনা মাত্র।

তিনি এই হাদীসটির পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বলেন, আবুল হাসান আল খালযী 'আল ফাওয়ায়েদ' الفوائد নামক গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ৫৯ পৃষ্ঠায় এবং ইমাম আল বায়হাকী দালায়েল আন নুবুয়‍্যাহ' دلائل النبوة গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ২৩৩ পৃষ্ঠায় আল ফযল ইবনে আল হাব্বাব-এর বরাত দিয়ে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এই বলে যে, আমি এ হাদীসটি আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আবূ আয়েশা থেকে শুনেছি। তিনি বলেছেন, এ হাদীসটির বর্ণনাকারীরা সবাই নির্ভরযোগ্য ; কিন্তু সনদ দুর্বল। হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষায় এটি معضل )মু'দাল) বা মাঝপথে তিন বা ততধিক বর্ণনাকারী পরম্পরায় বাদ পড়া হাদীস।

আবূ আয়েশা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের উস্তাদদের একজন। মধ্যপথে তিন বা ততধিক বর্ণনাকারী উল্লেখ না করে পরবর্তীরা এই হাদীস উল্লেখ করায় সত্যিই তিনি এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন কি না সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ইমাম আল ইরাকী তাঁর تخريج الاحياء নামক গ্রন্থের বর্ণনায় এনেছেন। (২য় খণ্ড, ২৪৪ পৃ.)

তারীখে ইবনে কাসীরে ইমাম বাইহাকীর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে:
هذا يذكره علماءنا عند مقدمة المدينة من مكمة لانه لما قدم المدينة من ثنيات الوداع من مقدمة من تبوك .

আমাদের আলেমগণ হিজরতের ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কা থেকে মদীনায় আগমনের বর্ণনায় সানিয়াতুল বিদা হয়ে মদীনায় আগমনের কথা বলে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি তাবুক যুদ্ধের পর সিরিয়ার পথে সানিয়াতুল বিদা হয়ে মদীনায় ফিরে আসেন। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের কালে নয়।

ইমাম আল জাওযীর প্রসিদ্ধ 'তালবিসু ইবলীস' গ্রন্থে এই বর্ণনাটি উদ্ধৃত হওয়ায় এই ভুল ধারণাটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। আল্লামা ইবনুল কাইয়েম তাঁর (আয্যাদ (الزاد) নামক গ্রন্থের ৩য় খণ্ডের ১৩ পৃষ্ঠায় ইমাম আল জাওযী ও অন্যদের ভুল ধারণাকে খণ্ডন করে বলেন:

هو وهم ظاهر لأن ثنيات الوداع إنماهى ناهية الشام لايرادها القادم من مكة إلى المدينة ولا يمر إلا اذا توجه الشام.

'এই ঘটনায় যারা এই মত পোষণ করেন তাদের উদ্দেশ্য সবার নিকটই স্পষ্ট। কেননা, 'সানিয়াতুল বিদা' হলো সিরিয়া থেকে মদীনায় আসার পথের একটি স্থান। সাধারণ ব্যবসায়-বাণিজ্যের সাথে জড়িত কোনো লোকই মক্কা থেকে মদীনায় আগমনের জন্যে 'সানিয়াতুল বিদা' হয়ে ঘুরে মদীনায় আসে না। আর হিজরতের প্রাক্কালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম কর্তৃক মক্কা থেকে সিরিয়া হয়ে সানিয়াতুল বিদার পথে মদীনায় প্রবেশের প্রশ্নই উঠে না।'

এই তাহকীক বা বস্তুনিষ্ঠ আলোচনার পরও লোকেরা মনে করে থাকে যে, রাসূল (সা) সানিয়াতুল বিদা হয়ে মদীনায় প্রবেশ করেছেন। আল্লামা আলবানী (র) বলেন:

মজার ব্যাপার হলো, ইমাম গাযযালী (র) তাঁর নিজের পক্ষ থেকে بالدفوف والالحان ছোট ছোট মেয়েরা দফ বা বাদ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে নেচে-গেয়ে এই আবৃত্তি করার কথা উল্লেখ করেন। মূলত কোথাও এর কোনো ভিত্তি নেই।

হাফিয আল ইরাকী স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন:
ليس فيه ذكر للدف والا لحان.

ছোট ছোট মেয়েরা দফ বা বাদ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে নেচে-গেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামকে স্বাগত জানানোর কথা কোথাও উল্লেখ নেই।

মূলত ইমাম গাযযালী (র)-এর এই বর্ণনা থেকে জানা যায়, যারা তবলা-বেহালার মতো বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গযল বা না'তে রাসূল পরিবেশন করার পক্ষপাতী, তাদের মতকে বৈধতা বা প্রাধান্য দেওয়ারই এটি একটি অপচেষ্টা মাত্র। - অনুবাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00