📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 সুহাইব আর রুমী (রাঃ)

📄 সুহাইব আর রুমী (রাঃ)


'হে আবূ ইয়াহ্ইয়া! কী সর্বোত্তম লাভেই না বিক্রি করেছ.....! কী সর্বোত্তম লাভেই না তোমার বিক্রি!' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)

সুহাইব আর রূমী...

ইসলামী দুনিয়ায় মুসলমানদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে, যে সুহাইব আর রূমীর পরিচয় জানে না এবং তাঁর জীবনের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে কিছুই শোনেনি! আমাদের অনেকেই যে বিষয়টি জানে না তা হলো, সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু প্রকৃতপক্ষে রোমান নন; বরং তিনি ছিলেন আরব বংশোদ্ভূত। তাঁর পিতা ছিলেন নুমাইর গোত্রের এবং মাতা ছিলেন তামীম গোত্রের সদস্যা। সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে রোমান হিসেবে সম্বোধন করার পিছনে একটি ঘটনা বিদ্যমান, যা যুগ যুগ ধরে ইতিহাসের পাতা ধারণ করে আসছে। বহু পুস্তকেও এ ঘটনা বিধৃত। ঘটনাটি হলো:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতপ্রাপ্তির প্রায় দুই দশক পূর্বের কথা। পারস্য সম্রাট কিসরার পক্ষ থেকে সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পিতা সিনান ইবনে মালেক আন নুমাইরিকে আল উবুল্লার গভর্নর নিযুক্ত করেন। তার সন্তানদের মধ্যে পাঁচ বছরের শিশু সুহাইব ছিল তাঁর অত্যধিক প্রিয়। সুহাইবের চেহারা ছিল হাস্যোজ্জ্বল, মাথার চুল লাল, স্বভাব ছিল বুদ্ধিদীপ্ত ও চটপটে। তাঁর দুটি চোখ যেন বুদ্ধিমত্তা ও আভিজাত্যের জ্যোতি ছড়াত। সন্তানের এই সুন্দর ও নিষ্পাপ চেহারার দিকে তাঁর পিতা যখন তাকাতেন, তখন তিনি যে কোনো দুশ্চিন্তামুক্ত হতেন। একদা কোলের এই সন্তান সুহাইবকে নিয়ে তাঁর মা নিকটাত্মীয় রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের পরিবার ও খাদেমদের সঙ্গে ইরাকের 'আসসানিয়া' গ্রামে বিনোদনের উদ্দেশ্যে যান। রাতে সে গ্রামেই রোমান সৈন্যদের একটি দল আক্রমণ করে। তারা গ্রামের নিরাপত্তারক্ষীদের হত্যা করে সম্পদ লুণ্ঠন করে এবং গ্রামবাসীদের বন্দী করে দাসে পরিণত করে। তারা সুহাইবকেও বন্দী করে নিয়ে যায় এবং রোম সাম্রাজ্যে দাস ক্রয়-বিক্রয়ের বাজারে নিয়ে তাকে বিক্রি করে। এভাবেই এই শিশুর বেচাকেনা চলতে থাকে এবং একের পর এক মালিক পরিবর্তন হতে থাকে। অন্যান্য ক্রীতদাসের মতো এক মনিবের খিদমত থেকে অন্য মনিবের খিদমতে সে নিয়োজিত হতে থাকল। মনিবের হাত পরিবর্তনের কারণে সুহাইব আর রূমীর সে সমাজব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে কী ঘটছে তা দেখার এবং এর ভেতরে কী ঘটছে তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়।

রোমান সম্রাট ও তাঁর অমাত্যবর্গের বালাখানা ও চিত্তবিনোদন কেন্দ্রসমূহে কী ধরনের নৈতিকতাবিরোধী কার্যকলাপের মহড়া হতো, তিনি তা খুব ভালো করেই প্রত্যক্ষ করেন এবং স্বীয় কানে শুনতেন অমানবিক ও অনৈতিক নানা কাহিনী। সুহাইব আর রূমী সে সমাজব্যবস্থার প্রতি চরম ঘৃণা পোষণ করতেন ও ধিক্কার দিতেন। সে সমাজব্যবস্থা থেকে লব্ধ তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁর মনকে দারুণভাবে বিষিয়ে তোলে। তিনি মনে মনে বলতেন:

'মানবতাবিরোধী, রোগাক্রান্ত, বিধ্বস্ত আমাদের এ সমাজ কোনো তুফান ছাড়া সংশোধন হওয়ার নয়।'

সুহাইব আর রূমী রোম সাম্রাজ্যের বালাখানাসমূহে প্রতিপালিত হন। সে সমাজের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির মাঝে বেড়ে ওঠেন। এমনকি তিনি তাঁর মাতৃভাষাও প্রায় ভুলে যান। কিন্তু তিনি ভুলে যাননি যে, তিনি আরব সন্তান ও মরুভূমির অধিবাসী। তিনি একথাও ভুলে যাননি যে, তিনি ধন-সম্পদের মতো লুণ্ঠিত এক মানুষ, যাকে ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বালাখানা পর্যন্ত পৌঁছানো হয়েছে। তিনি প্রতি মুহূর্তেই দাসত্বমুক্তির চিন্তা করতেন এবং সুযোগের অপেক্ষায় থাকতেন। সর্বদা তিনি আত্মীয়-স্বজনদের সাথে মিলিত হওয়ার আশায় ব্যাকুল ছিলেন। আরবের মরুভূমির দিকে প্রত্যাবর্তন করার আগ্রহ তাঁর প্রবল থেকে প্রবলতর হতে থাকে। একদিন তিনি রোমান এক পাদ্রিকে অপর এক খ্রিস্টান গোত্রপতিকে উদ্দেশ্য করে বলতে শোনেন:

'সে সময় নিকটবর্তী হচ্ছে, যখন আরব ভূখণ্ডের মক্কা নগরীতে এমন একজন নবীর আবির্ভাব হবে, যিনি ঈসা আলাইহিস সালামের রিসালাতের সত্যতার সাক্ষ্য দেবেন এবং বিশ্ববাসীকে অন্ধকার থেকে আলো ও হেদায়াতের দিকে নিয়ে আসবেন।'

সুযোগ বুঝে একদিন সুহাইব তাঁর মনিবের শৃঙ্খল ছিন্ন করে গোটা পৃথিবীর আশ্রয় কেন্দ্র, নবীর আবির্ভাবস্থল মক্কা বা 'উম্মুল কুরা'র উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।

মক্কায় পৌঁছে সেখানেই বসবাস করতে থাকলেন। রোমানদের মতো ভাঙা ভাঙা আরবী উচ্চারণে কথা বলতে এবং মাথায় ফুরফুরে লাল চুল দেখে তাঁকে অনেকে সুহাইব আর রূমী নামে ডাকত। সুহাইব আর রূমী মক্কায় পৌঁছে মক্কার এক সরদার আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি ব্যবসায়-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করে প্রচুর ধন-দৌলতের মালিক হন। ব্যবসায়-বাণিজ্যের ব্যস্ততা ও দৈনন্দিন নানা পেরেশানী থাকা সত্ত্বেও সেই খ্রিস্টান পাদ্রির ভবিষ্যদ্বাণীর কথা তিনি মোটেও ভুলে যাননি। যখনই সে কথা তাঁর স্মরণ হতো, তখনই তাঁর মন নবীর সন্ধানে সক্রিয় হয়ে উঠত। সেই নবীর আবির্ভাব কবে হবে? এ প্রশ্নের উত্তর নিজের মাঝেই খুঁজতেন। তাঁকে আর বেশি দিন অপেক্ষা করতে হলো না। তাঁর মন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেল।

বিদেশে লম্বা বাণিজ্য সফরশেষে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করে তিনি শুনতে পেলেন: 'মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহকে নবী হিসেবে আল্লাহ প্রেরণ করেছেন। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করছেন এবং অশ্লীল ব্যভিচার ও অন্যায় কাজ করতে নিষেধ করছেন।'

সুহাইব আর রূমী তাদের জিজ্ঞাসা করলেন:
'তিনি কি 'আল আমীন' নামে খ্যাত সেই ব্যক্তি নন?'

তারা বলল: 'হ্যাঁ, তিনিই সেই ব্যক্তি।'

সুহাইব তাদের জিজ্ঞাসা করলেন: 'তাঁর বাড়ি কোন্ স্থানে?'

তারা তাঁকে জানাল: 'সাফা পর্বতের পাদদেশে আরকাম ইবনে আবিল আরকামে।'

সাথে সাথে তারা সুহাইবকে এ বলেও সতর্ক করে দিল: 'সাবধান! কুরাইশদের কেউ যেন তোমাকে দেখে না ফেলে। যদি তাদের কেউ তাঁর সাথে কথা বলতেও দেখে ফেলে, তাহলে কিন্তু তোমাকে ভীষণ নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হবে। যেহেতু তুমি একজন অসহায় বিদেশি লোক, তাদের অত্যাচার থেকে এখানে তোমাকে সাহায্য করার বা আশ্রয় দেওয়ার কেউ নেই। তাই পরিণাম সম্পর্কে সজাগ থেকো।'

তারপর কোনো এক প্রত্যুষে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এদিক-সেদিক দেখতে দেখতে সুহাইব 'দারুল আরকামে' গিয়ে উপস্থিত হন। সেখানে পৌছে দরজায় আম্মার ইবনে ইয়াসারকে দেখতে পান। পূর্ব থেকেই তার সাথে পরিচয় ছিল, তা সত্ত্বেও আতঙ্কিত হলেন, একটু ইতস্তত করে তার কাছে পৌছে প্রশ্ন করলেন: 'আম্মার! তুমি এখানে কী উদ্দেশ্যে? আম্মার ইবনে ইয়াসার তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন। আমি এখানে কী চাই সেটা পরের কথা, আগে তুমিই বল যে, তুমি এখানে কী উদ্দেশ্যে এসেছ?'

সুহাইব উত্তর দিলেন: 'এ ব্যক্তি কী বলেন তা শোনার জন্য তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছি।'

আম্মার বললেন: 'আমিও একই উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি।'

সুহাইব তাঁকে প্রস্তাব দিলেন: 'তাহলে আল্লাহর রহমতে আমরা এক সাথে তাঁর সাথে দেখা করতে ভেতরে প্রবেশ করি।'

আম্মার ইবনে ইয়াসার ও সুহাইব ইবনে সিনান আর রূমী একত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য 'দারুল আরকামে' প্রবেশ করলেন।

উভয়েই তাঁর কথাবার্তা মনোযোগ সহকারে শুনলেন। তাঁর আলোচনায় উভয়েই সকল জিজ্ঞাসার উত্তর পেলেন। হৃদয় ঈমানী নূরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। উভয়ই একত্রে তাদের দু'হাত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে সম্প্রসারণ করলেন এবং এক সঙ্গে বলে উঠলেন:

'আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।'

অতঃপর উভয়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে সারাদিন কাটালেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হেদায়াতে, ঈমানী বলে বলীয়ান হলেন। রাত ঘনিয়ে এল, ধীরে ধীরে চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রাতের আঁধারে উভয়েই নবীজীর তাওহীদী তা'লীমে ঈমানের আলোকবর্তিকায় পরিতৃপ্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমত থেকে নিজ নিজ গৃহে ফিরে এলেন।

বেলাল, আম্মার, সুমাইয়া, খাব্বাবসহ অন্যান্য সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহুমের মতো সুহাইব আর রূমীকেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান আনার অপরাধে কুরাইশদের নির্মম ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সবকিছু অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে সহ্য করেন। এ কথা তিনি ভালো করেই জানতেন যে, আখেরী মানযিল যাদের জান্নাত, তাদের জন্য নির্যাতন অবধারিত। এ মানযিলে পৌঁছতে হলে আঘাতের পর আঘাত, নির্যাতনের পর নির্যাতন আসবেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দিলে সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে মদীনায় হিজরত করে আসার মনস্থ করেন। কিন্তু কুরাইশরা তাঁর হিজরতের এই মনোবাসনা আঁচ করতে পেরে তাঁর পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ওপর সার্বক্ষণিক পাহারা নিযুক্ত করে, যেন তিনি তার উপার্জিত সোনা-দানা ও ধনসম্পদ নিয়ে হিজরত করার সুযোগ না পান।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাথী আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হিজরতের পর সর্বদাই তিনি হিজরতের অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু কোনো ক্রমেই তাঁর জন্য হিজরত করা সম্ভব হয়ে উঠছিল না। কারণ, তাঁর জন্য নিয়োগকৃত গুপ্তচরদের বিনিদ্র সতর্ক দৃষ্টি এবং পাহারাদারদের নিশ্ছিদ্র বেষ্টনী এড়িয়ে হিজরত করা সম্ভব ছিল না। প্রচণ্ড শীতের এক গভীর রাতে সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আমাশয়ে আক্রান্ত রোগীর ন্যায় বারবার বাইরে যেতে থাকলেন এবং খামাখা সেখানে কালক্ষেপণ করতে লাগলেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাঁকে খুঁজতে না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেখানেই বসে থাকতে লাগলেন। তাঁকে আমাশয় আক্রান্ত অবস্থায় দেখে পাহারাদারগণ পরস্পর বলাবলি করতে লাগল যে:

'তোমরা নিশ্চিত থাক, সে নিশ্চিয়ই লাত ও উযযা দেবতার অভিশাপের শিকার হয়েছে।'

অতঃপর তাঁকে ডেকে আনার পরিবর্তে এ অবস্থায় রেখে নিজ নিজ বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। এ সুযোগে সুহাইব তাদের হাত থেকে সটকে পড়েন এবং মদীনার উদ্দেশ্যে দৌড়াতে থাকেন; কিন্তু কিছুদূর যেতে না যেতেই হঠাৎ তাদের ঘুম ভেঙে যায় এবং তাঁকে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে তারা সবচেয়ে দ্রুতগামী ঘোড়া নিয়ে তাঁর অনুসরণ করতে থাকে। এমনকি শেষ পর্যন্ত পাহারাদারগণ তাঁকে ঘিরে ফেলে। তিনি এমতাবস্থায় পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে তীরের থলি থেকে তীরগুলো বের করে অবস্থানুয়ায়ী তা মাটিতে ছড়িয়ে দিয়েই একটি ধনুকে স্থাপন করে তাদের দিকে তাক করে ধরে তাদের উদ্দেশ্যে উচ্চৈঃস্বরে বলতে থাকেন:

'হে কুরাইশ সম্প্রদায়ের লোকেরা! তোমরা আমার তীর চালনা সম্পর্কে খুব ভালো করেই জান এবং আমিও আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারদর্শী একজন শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ। আল্লাহর কসম! তোমরা কখনো আমার কাছে আসতে চেষ্টা করবে না, আমার থলির প্রতিটি তীর দ্বারা তোমাদের এক একজনকে হত্যা করব। তার পর যারা অবশিষ্ট থাকবে তাদেরকে তরবারি দ্বারা খতম করব।'

তার মরণপণ চ্যালেঞ্জ শুনে একজন বলে ফেলল : 'হে সুহাইব! তুমি নিঃসহায় কপর্দকহীন অবস্থায় মক্কায় এসে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছ, আমরাও কসম করে বলছি, আজ তোমাকে বীরের মতো জান ও মাল নিয়ে আমাদের হাত থেকে যেতে দেব না।'

সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের মনোভাব টের পেয়ে তৎক্ষণাৎ বললেন : 'আমি যদি আমার অর্থ-সম্পদ তোমাদের দিয়ে দেই, তাহলে কি আমাকে যেতে দেবে?'

তারা উত্তর দিল : 'হ্যাঁ, তাহলে তুমি যেতে পারবে।'

সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মক্কায় তাঁর বাড়িতে সোনা-দানা গচ্ছিত রাখার স্থানের কথা তাদের বলে দিলেন। তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন মক্কায় চলে গেল। নির্দিষ্ট স্থানে তারা সম্পদ পেয়ে গেল এবং তাকে নির্বিঘ্নে চলে যেতে দিল। সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর জীবনের কষ্টার্জিত অগাধ সম্পদ পেছনে ফেলে নিশ্চিন্তে ও নির্বিঘ্নে এবং সন্তুষ্টচিত্তে তাঁর দীন নিয়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে মদীনার দিকে রওয়ানা হলেন। দীর্ঘপথ চলতে চলতে যখনই ক্লান্ত ও নিস্তেজ হয়ে পড়তেন, তখনই তাঁর মনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা ও তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার কথা চিন্তা করে তাঁর নিস্তেজ দেহে সতেজতা ফিরে পেতেন এবং নব-উদ্যমে আবার পথ চলা আরম্ভ করতেন।

মদীনার প্রবেশপথ 'কুবায়' পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আগমন করতে দেখে অত্যন্ত খুশি হন এবং বলেন : رَبِحَ الْبَيْعُ يَا أَبَا يَحْيِي رَبِحَ الْبَيْعُ -
'হে আবূ ইয়াহ্ইয়া! কী সর্বোত্তম লাভেই না বিক্রি করেছ? কী সর্বোত্তম লাভে তোমার বিক্রি।'

পরপর তিন বার তিনি তা পুনরাবৃত্তি করেন। এ কথা শুনে ক্লান্ত সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। অতঃপর সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন:

'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার আগে মক্কা থেকে না কেউ আপনার খিদমতে এসেছে, আর না এ সংবাদ জিবরাঈল আলাইহিস সালাম ছাড়া অন্য কেউ আপনাকে দিয়েছে।'

নিঃসন্দেহে আল্লাহর পথে তাঁর জান ও মালের বিক্রি সত্য ও ন্যায়ের পথে এক নজিরবিহীন উদাহরণ। যার সত্যতা আল্লাহ ওহী অবতীর্ণ করে নিশ্চিত করেন এবং জিবরাঈল আলাইহিস সালাম সাক্ষ্য প্রদান করে তার গুরুত্বকে আরো বাড়িয়ে দেন।

সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শানে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কালামে মাজীদে বলেন: وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْرِى نَفْسَهُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ وَاللَّهُ رَءُوفٌ بِالْعِبَادِ .
'এমন লোকও আছে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিজেকে বিক্রি করে থাকে। আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি বড়ই সদয়।' (সূরা বাকারা : ২০৭)

সুহাইব বিন সিনান আর রূমী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিজেকে সর্বোত্তম দামে আল্লাহর কাছে বিক্রি করার জন্য তাঁকে হাজার সালাম।'

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ৪১০৪ নং জীবনী দ্রষ্টব্য। ২. তাবাকাতে ইবনে সা'দ: ৩য় খণ্ড, ২২৬ পৃঃ। ৩. উসদুল গাবাহ : ৩য় খণ্ড, ৩০ পৃঃ। ৪. আল ইসতিআব (হামেশে ইসাবা) ২য় খণ্ড, ১৭৪ পৃঃ। ৫. সিফাতুস সাফওয়া: ১ম খণ্ড, ১৬৯ পৃঃ। ৬. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৭ম খণ্ড, ৩১৮-৩১৯ পৃঃ। ৭. হায়াতুস সাহাবা: ৪র্থ খণ্ডের সূচি দ্রষ্টব্য। ৮. আল-আ'লাম ও তার সংস্করণসমূহ।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 আবু দারদা’ (রাঃ)

📄 আবু দারদা’ (রাঃ)


আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মনে-প্রাণেই দুনিয়ার ভোগবিলাস ও লোভ-লালসা পরিত্যাগ করেছিলেন। -আবদুর রহমান বিন আওফ (রা)

অতি প্রত্যুষে নিদ্রা থেকে জেগে বাড়ির প্রবেশপথে বিশেষভাবে সংরক্ষিত মূর্তিকে পূজা করা ছিল আবূ দারদা' নামে খ্যাত উয়াইমার ইবনে মালেক আল খাযরাজীর নিত্যদিনের অবশ্য পালনীয় অভ্যাস। অভ্যাসের এই ধারাবাহিকতা থেকে সেদিনও বাদ পড়েনি, যে দিনের কথা এখানে বলা হচ্ছে। সেদিনও সে অভিজাত আতর বাজার থেকে আনা মূল্যবান সুগন্ধি দিয়ে চন্দনকাঠে তৈরি মূর্তিকে সুগন্ধময় করে তোলে। ইয়ামেনের বাজারের সর্বোৎকৃষ্ট রেশমি চাদর দিয়ে মূর্তিকে আবৃত করে। যে মূল্যবান চাদরটি ইয়ামেন থেকে আগমনকারী এক বণিক গতকালই তাকে উপহার দিয়েছিল।

সূর্য বেশ উপরে ওঠার পর আবূ দারদা' বাড়ি থেকে বের হয়ে ব্যবসায় কেন্দ্রে রওয়ানা হওয়ার সময় দেখতে পায় মদীনার ছোট-বড় সবাই রাস্তায়, সকল বয়সের লোকজনের সমাগম খুব বেশি। কারণ কী? জানতে পারল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী মুসলমানরা বদর যুদ্ধ থেকে বিজয়ীর বেশে মদীনায় ফিরে আসছে। তাদের বিজয়কে অভিনন্দিত করার জন্য এতো লোকের সমাগম। কিছুক্ষণ পরই দেখতে পেল বিজয়ীরা শহরে প্রবেশ করছে এবং কুরাইশ বন্দীদের দলবদ্ধভাবে শৃঙ্খলিত করে আনা হচ্ছে। মুসলমানদের এই বিজয় আর কুরাইশদের এই করুণ দৃশ্য দেখে আবু দারদা' কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে পাশ কাটিয়ে অগ্রসর হতেই খাযরাজ গোত্রের এক যুবক তার নজরে পড়ে। আবু দারদা' সেই যুবকের দিকে অগ্রসর হয়ে তার অন্তরঙ্গ বন্ধু আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। খাযরাজ গোত্রের সেই যুবক আবূ দারদা'কে সংবাদ দেয় যে,

'বদর প্রান্তরে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা শত্রুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে চরম বিপদের সম্মুখীন হন। পরিশেষে খুব বাহাদুরী ও নৈপুণ্যের সাথেই যুদ্ধ করে শুধু বীরত্বের পরিচয়ই দেননি; বরং প্রচুর গনীমতের মালসহ নিরাপদেই ফিরে এসেছেন। তার সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।'

খাযরাজ গোত্রের সেই যুবক আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা সম্পর্কে আবূ দারদা'র জিজ্ঞাসায় মোটেই অবাক হয়নি। কারণ, আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ও আবূ দারদা'র মধ্যে গভীর বন্ধুত্বের কারণে পরস্পরের ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কথা সবাই জানত। ইসলামের দাওয়াত পৌঁছলে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ইসলাম গ্রহণ করেন, আর আবূ দারদা' তা প্রত্যাখ্যান করে; কিন্তু এ দুই বন্ধুর পারস্পরিক সম্পর্কের কোনো অবনতি হয়নি। কারণ, আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ইসলাম গ্রহণ সত্ত্বেও আবু দারদা'র সাথে সাক্ষাৎ ও তার বাড়িতে যাতায়াত অব্যাহত রাখেন। তাকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার প্রচেষ্টা চলতে থাকে অব্যাহতভাবে। আবূ দারদা'র কুফরী জীবন যাপনের জন্য তার এই বন্ধু খুবই ব্যথিত হতেন।

আবু দারদা' নিজের ব্যবসায় কেন্দ্রে পৌঁছে তার উঁচু আসনে বসে যথারীতি ব্যবসায়ের কাজ শুরু করে। কর্মচারীদের আদেশ-নিষেধ পূর্বের ন্যায়ই দিতে থাকে। ব্যবসায়ের রুটিনের কোনো পরিবর্তন নেই। কিন্তু সে মোটেই জানত না যে, আজ তার বাড়িতে কী তুলকালাম কাণ্ডই না ঘটে গেছে।

আজ বিশেষ উদ্দেশ্যে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা তার বন্ধু আবু দারদা'র বাড়ি গেলেন। তিনি জানতেন, এ সময় আবু দারদা' বাড়িতে নেই। ভাবখানা দেখালেন এই, বিশেষ জরুরি কাজ। তার বাড়িতে পৌঁছে দেখেন, ঘরের দরজা খোলা এবং তার মা বাড়ির আঙিনায় সাংসারিক কাজে ব্যস্ত। আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা সেখানে পৌঁছে বলেন:

'হে আল্লাহর প্রিয় বান্দী! আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।'

উত্তরে আবু দারদা'র মা বললেন:
'হে আবূ দারদা'র ভাই, তোমার প্রতিও শান্তি বর্ষিত হোক।'

আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা জিজ্ঞাসা করেন: 'আমার বন্ধু আবু দারদা' কোথায়?'

আবূ দারদা'র মা উত্তরে বলেন: 'সে তার ব্যবসায় কেন্দ্রে। খুব শীঘ্রই বাড়ি ফিরে আসবে।'

আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা আবূ দারদা'র স্ত্রীকে বললেন: 'আবূ দারদা'র সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আমাকে এখানে অপেক্ষা করার অনুমতি দেবেন কি?'

তার স্ত্রী উত্তরে বলল: 'অবশ্যই!'

অতঃপর তাকে প্রবেশের সুযোগ দিল। ঘরের দরজা খুলে দিয়ে তার স্ত্রী ভিতরে সাংসারিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কখনো বা ঘর-বাড়ির কাজে মাথা ঘামাচ্ছে, আবার কখনো বা সন্তানদের দেখাশোনা ও যত্নে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। এই ফাঁকে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা আবু দারদা'র মূর্তির ঘরে প্রবেশ করেন এবং সাথে বহন করে আনা কুড়াল বের করে আবূ দারদা'র মূর্তির কাছে গিয়ে ইচ্ছেমতো সেটিকে টুকরো টুকরো করতে থাকেন। আর বলতে থাকেন: ... آلَا كُلُّ مَا يُدْعَى مَعَ اللَّهِ بَاطِلٌ إِلَّا كُلُّ مَا يُدْعَى مَعَ اللَّهِ بَاطِلٌ
'সাবধান! আল্লাহর সাথে অন্য যাকেই ডাকা হোক না কেন, সবই মিথ্যা। সাবধান! আল্লাহর সাথে অন্য যাকেই ডাকা হোক না কেন, সবই মিথ্যা।'

মূর্তিকে ইচ্ছেমতো টুকরো টুকরো করা শেষ হলে তিনি বিদায় নিয়ে চলে আসেন। আবু দারদা'র স্ত্রী বিশেষ কারণে মূর্তির ঘরে প্রবেশ করতেই মূর্তিকে টুকরো টুকরো ও তার হাত-পা, কান-গলা, মাথা-মোট কথা প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন দেখে যেন তড়িতাহত হয় এবং দুই হাত চাপড়িয়ে বলতে থাকে:

'হে ইবনে রাওয়াহা! তুমি আমাকে ধ্বংস করে ফেলেছ! তুমি আমাকে ধ্বংস করে ফেলেছ।'

কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই আবূ দারদা' বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে মূর্তিঘরের দরজায় বসে চিৎকার করে কাঁদতে দেখে। সে আরো দেখতে পায় যে, তার চেহারায় ভীতিভাব সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

আবূ দারদা' তার কাছে পৌঁছে জিজ্ঞাসা করে: 'কী হয়েছে তোমার?'

উত্তরে সে বলল: 'তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার বন্ধু আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা আসে এবং তোমার মূর্তির কী দুরবস্থা করেছে তা তো দেখতেই পাচ্ছ।'

আবূ দারদা' মূর্তিঘরের ভিতরে নজর দিয়েই দেখে যে, মূর্তিকে এমনভাবে টুকরো টুকরো করা হয়েছে যে, তা জ্বালানির কাজে ব্যবহার করা ছাড়া আর কোনো কাজে আসবে না। সে রাগে ফেটে পড়ে এবং এই কাজের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়; কিন্তু পরক্ষণেই সে একটু শান্ত হয়ে পড়লে তার প্রতিশোধস্পৃহা স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং ক্রোধ প্রশমিত হয়। এবার সে চিন্তা করতে লাগল, কেন এমন হলো। অতঃপর নিজে নিজেই বলে উঠল:

'যদি ওই মূর্তিতে কোনো কল্যাণ থাকত, তাহলে সে নিজেই নিজেকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারত।'

সে নিজের বিবেকের কাছেই উত্তর পেয়ে তৎক্ষণাৎ আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার কাছে চলে গেল এবং তাকে সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করল। তিনিই ছিলেন এ মহল্লার ইসলাম গ্রহণকারী সর্বশেষ ব্যক্তি। ঈমান আনার সেই শুভক্ষণ থেকে আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যে মহব্বত জন্মেছিল, তার মধ্যে সামান্যতম খাদও ছিল না। ঈমান আনার পর থেকেই তিনি তাঁর অতীত জীবনের জন্য বড়ই অনুতপ্ত হতে থাকেন। তাঁর অনুতাপের কারণ ছিল এই যে, তাঁর আগে যেসব সাহাবী ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তাঁরা ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছেন। তাঁরা কুরআন হিয্য করেছেন, তার মর্মার্থ উপলব্ধি করেছেন। তাঁরা ইবাদত করেছেন বেশি। তাকওয়া ও খোদাভীতির কারণে তাঁরা আল্লাহর সন্তুষ্টিও হাসিল করেছেন। আমি তো তাদের থেকে বহু পেছনে আছি। জিহাদের ক্ষেত্রেও আমি পিছিয়ে আছি। এ অনুতাপ তাঁকে প্রতি মুহূর্তে আহত করত। তিনি এ নিয়ে অনেক ভাবনা-চিন্তার পর সিদ্ধান্ত নিলেন:

'যেভাবেই হোক এই ব্যবধান অবশ্যই দূর করতে হবে। এজন্য আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। সময়কে বেশি করে কাজে লাগাতে হবে।'

এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুরু হলো তাঁর সাধনা তথা কঠোর অধ্যবসায়। ইসলামী জ্ঞানার্জনে এবং ইসলামের কাজে তিনি নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করলেন। আল কুরআনের হিয্য ও প্রতিটি শব্দের অর্থ এবং এর মর্ম উপলব্ধিতে নিষ্ঠার সাথে আত্মনিয়োগ করেন। যখন তিনি মনে করলেন ইবাদত-বন্দেগীতে একাগ্রতা সৃষ্টিতে তাঁর ব্যবসায়-বাণিজ্যই বাধা সৃষ্টি করছে, তখন থেকেই তিনি কোনো ইতস্তত না করে ব্যবসায়-বাণিজ্য ছেড়ে দিলেন। কেউ তাঁকে ব্যবসায়-বাণিজ্য ছেড়ে দেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন:

'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনার পূর্বে আমি নিছক একজন ব্যবসায়ী ছিলাম। ইসলাম গ্রহণের পর চেষ্টা করছিলাম ইবাদত ও ব্যবসায়ের মধ্যে সমন্বয় করি; কিন্তু আমি যা চেয়েছিলাম তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এ কারণে ব্যবসায় ছেড়ে দিয়ে ইবাদত-বন্দেগীতে নিমগ্ন হয়েছি। তিনি আল্লাহর শপথ করে বলেন: মসজিদে নববীর দরজায় আমার দোকান হোক এবং আমি মসজিদে প্রতি ওয়াক্ত নামায জামাআতের সাথে আদায় করার পরও ক্রয়-বিক্রয়ে এমনভাবে লাভবান হই যে, দৈনিক তার পরিমাণ ৩০০ স্বর্ণমুদ্রা পর্যন্ত পৌঁছাক, বিদ্যাচর্চা ও ইবাদত-বন্দেগীর পরিবর্তে আজ আমি এটাও পছন্দ করি না।'

অতঃপর তিনি প্রশ্নকারীর দিকে তাকিয়ে বলেন:
আমি একথা বলি না যে, আল্লাহ তাআলা ব্যবসা হারাম করেছেন, কিন্তু আমি অবশ্যই তাদের মতো হতে চাই: أحِبُّ أَنْ أَكُونَ مِنَ الَّذِينَ لَا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ .
'যাদেরকে ব্যবসায়-বাণিজ্য আল্লাহর স্মরণকে ভুলিয়ে রাখে না বা গাফেল করে না।'

এর অর্থ এটা নয় যে, আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ব্যবসায়-বাণিজ্যকে ইবাদতের অন্তরায় মনে করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি দুনিয়ার মোহ, লোভ-লালসা ও বিলাসিতাকে পরিত্যাগ করেছিলেন। জীবন ধারণের জন্য যতটুকু দরকার, এর উপরই তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন।

প্রচণ্ড শীতের কোনো এক রাতে তাঁর বাড়িতে বেশ কয়েকজন মেহমান আসেন। তাদের জন্য গরম গরম খাদ্য পরিবেশন করা হয়; কিন্তু শীত নিবারণের জন্য বিছানাপত্রের কোনো ব্যবস্থা না করায় মেহমানরা নিজেদের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা করতে থাকেন। তাদেরই একজন আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে গিয়ে এ প্রয়োজনের কথা বলার জন্য উদ্যোগী হলে অপর একজন তাকে নিবৃত্ত করে বললেন:

আরে রাখো, এভাবেই রাতটা কাটিয়ে দাও; কিন্তু তা উপেক্ষা করে তিনি তাঁর কক্ষের দরজায় পৌঁছে দেখেন, আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শুয়ে এবং তাঁর স্ত্রী তাঁর কাছেই বসে আছেন। তাঁদের উভয়ের গায়েই পাতলা একখানা চাদর, যা কোনো অবস্থাতেই শীত নিবারণ করতে পারে না। সেই মেহমান আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে গিয়ে বললেন:

'কী ব্যাপার, আমরা যেভাবে শীতবস্ত্রহীন অবস্থায় রাত কাটাচ্ছি, আপনিও দেখছি একইভাবে রাত কাটাচ্ছেন। আপনাদের শীতবস্ত্র কোথায়?'

আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন:
'আমাদের আরো একটি বাড়ি আছে, সেই বাড়িতে সব পাঠিয়ে দিয়েছি। সামান্য আসবাবপত্রও যদি বাড়িতে থাকত, তাহলে তা অবশ্যই আপনাদের জন্য পাঠিয়ে দিতাম। দ্বিতীয়ত, সে বাড়িতে পৌঁছতে যে রাস্তা অতিক্রম করতে হয়, সে পথ খুবই দুর্গম। সে পথের পথিকদের মধ্যে যারা বেশি বেশি সাজ-সরঞ্জামের অধিকারী, তাদের চেয়ে যারা সামান্য ও হালকা সাজ-সামানের অধিকারী, তারাই শ্রেয়। আমরা অত্যধিক সাজ-সরঞ্জামের ওপর হালকা সাজ-সামানকে প্রাধান্য দিয়েছি, যেন সহজেই সে পথ অতিক্রম করতে পারি।'

অতঃপর মেহমানকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'আমার কথার মর্মার্থ কি বুঝেছেন?'

মেহমান উত্তরে বললেন:
'জী, খুব ভালো করেই বুঝেছি, আমাকে উত্তম নসীহতের জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।'

খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সিরিয়ার গভর্নর নিয়োগের প্রস্তাব দিলে তিনি এ প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁকে রাজি করানো কঠিন হয়ে পড়ে। উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ প্রস্তাবের ওপর অনুরোধের চাপ সৃষ্টি করলে তিনি শর্ত সাপেক্ষে রাজি হন এবং বলেন:

'আমাকে যদি কুরআনের এবং শরীআর শিক্ষা প্রদানসহ নামাযে ইমামতি করার অনুমতি দেন, তবেই আমি এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারি।'

উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ শর্ত তিনটি মেনে নিলেন। অতঃপর আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার রাজধানী দামেশকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। সেখানে পৌঁছে তিনি দেখতে পান, দামেশকের সর্বস্তরের মানুষ ভোগবিলাসে লিপ্ত এবং ধন-দৌলতের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তাদের এ অবস্থা দেখে আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ভীষণভাবে বিচলিত ও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি জনসাধারণকে দামেশকের মসজিদে সমবেত হতে বললেন। তার আহ্বানে সবাই মসজিদে সমবেত হলে তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন:

'হে দামেশকবাসী! আমরা ইসলামের বন্ধনে আবদ্ধ পরস্পরে দীনী ভাই। ইসলামের শত্রুদের মোকাবেলায় আপনারাই আমার সাহায্যকারী। আমার সাথে আপনাদের হৃদ্যতা ও ভালোবাসা গড়ে তুলতে এবং আমার নসীহত গ্রহণ করতে আপনাদেরকে কে বাধা দিতে পারে? আপনাদের প্রতি আমার ওয়ায-নসীহত অব্যাহত থাকবে সেজন্য আপনাদেরকে কোনো পারিশ্রমিক দিতে হবে না। কেননা, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকেই আমাকে ভাতা দেওয়া হয়ে থাকে। আপনাদের মধ্যে যারা নির্ভরযোগ্য আলেম ছিলেন, তাদের অনেকেই ইনতিকাল করেছেন। যারা আছেন তারাও একে একে চিরতরে চলে যাবেন। আমি দেখছি, তাদের শূন্যস্থান পূরণ হবে না। কারণ, আপনারা বিদ্যাচর্চা ও ইসলামের জ্ঞান আহরণে আগ্রহী হচ্ছেন না। আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি যে, আপনাদেরকে দেওয়ার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজে যে দায়িত্ব নিয়েছেন, আপনারা তা-ই পাওয়ার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করছেন। যে বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে আল্লাহ আপনাদের নির্দেশ দিয়েছেন, আপনারা সে গুরুদায়িত্বই ভুলে গিয়েছেন।'

আপনাদের হলো কী? অল্পে তৃপ্তির পরিবর্তে আপনারা খাবার টেবিলে এত অধিক আয়োজন করে থাকেন, যার সামান্য খেয়ে থাকতে পারেন। আপনারা এমনসব অট্টালিকা তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, যেসব অট্টালিকায় আপনারা চিরদিন বসবাস করবেন না। এবং এমনসব উচ্চাশার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন, যার বাস্তবায়ন কখনো সম্ভব নয়। আপনাদের পূর্বে যেসব লোকেরা অঢেল সম্পদ অর্জন করেছিল এবং প্রাচুর্যের অন্বেষণে ও প্রতিযোগিতায় নেমেছিল, তাদের সম্পদের ধ্বংসাবশেষ এবং তাদের অট্টালিকাসমূহ আজ বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে।

হে দামেশকবাসী ভাইয়েরা!
আপনাদের অতি নিকটেই হুদ আলাইহিস সালামের উম্মত ‘আদ’ জাতির ধ্বংসাবশেষ, যে জাতি জনবল, ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্যে পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্য ও উন্নত জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। আজ কে এমন আছে যে, আমার নিকট থেকে মাত্র দু’দিরহামের বিনিময়ে তাদের ধ্বংসাবশেষ ক্রয় করতে প্রস্তুত?’

উপস্থিত জনগণ তার এ হৃদয়গ্রাহী আলোচনা শুনে শুধু বিমুগ্ধই হয়নি, বরং ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকে। এ কান্নার আওয়াজ মসজিদের বাইরের লোকজন পর্যন্ত শুনতে পায়।

এরপর থেকে আবূ দারদা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দামেশকের সাধারণ সভা-সমাবেশে যোগ দিতে থাকেন। হাট-বাজারে চলাফেরা ও যাতায়াত অব্যাহত রাখেন। কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর দিতেন, অজ্ঞ ও নিরক্ষরদের জ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে এবং গাফিলদের দায়িত্বসচেতন করে তুলতে বিভিন্ন মজলিস-মাহফিলে যোগ দিতেন।

একবার চলার পথে তিনি দেখতে পান, একদল লোক জড়ো হয়ে এক ব্যক্তিকে গালমন্দ ও বেদম বেত্রাঘাত করছে। তিনি তাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন:
‘ব্যাপার কী?’

তারা বলল: ‘সে ব্যক্তি মহা অপরাধে অপরাধী।'

আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'যদি কেউ কোনো কূপে পড়ে যায়, তাহলে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করবে না?'

তারা বলল:
'অবশ্যই।'

তিনি বললেন:
'তাহলে তাকে আর গালমন্দ ও মারধর করো না, বরং সৎ পরামর্শ দাও এবং সুন্দর জীবন যাপনের পথ দেখাও। আর আল্লাহ যে তোমাদেরকে গুনাহ থেকে রক্ষা করেছেন, তার জন্য শুকরিয়া আদায় কর।'

উত্তেজিত ব্যক্তিরা আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বলল:
'তাহলে কি আপনি তাকে ঘৃণা করেন না?'

তিনি উত্তর দিলেন:
'প্রকৃতপক্ষে সে কাজকে আমি অবশ্যই ঘৃণা করি; কিন্তু যখন সে ঐ কাজ থেকে বিরত হবে, তখন থেকেই সে আমার ভাই।'

সেই অপরাধী ব্যক্তিটি আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কথাবার্তা শুনে এতই বিমুগ্ধ হল যে, তৎক্ষণাৎ তাওবা করে নতুন এক মানুষে পরিণত হলো।

এক যুবক আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল : 'হে রাসূলুল্লাহর সাথী, আমাকে কিছু উপদেশ দিন।'

তিনি সে যুবককে বললেন:
'হে প্রিয় বৎস! গোপনে গোপনে আল্লাহকে স্মরণ কর, আল্লাহ তোমাকে তোমার বিপদ ও কঠিন মুহূর্তে স্মরণ করবেন। হে প্রিয় বৎস, তুমি পারলে আলেম হও, নচেৎ শিক্ষার্থী। তা না পারলে কমপক্ষে শ্রবণকারী হও; কিন্তু মূর্খ অজ্ঞ হয়ে থেকো না। তাহলে ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রিয় বৎস, মসজিদই যেন তোমার বাড়ি হয়। কারণ, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:

'মসজিদ হলো প্রত্যেক খোদাভীরু লোকের বাড়ি, যারা মসজিদকে তাদের বাড়ি বানাবে, মহান আল্লাহ তাদের প্রশান্তি ও রহমতের নিশ্চয়তা দান করবেন এবং তাদের ওপর তাঁর রহমত, অনুগ্রহ ও করুণা বর্ষণ করবেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলার নিশ্চয়তাও প্রদান করবেন।'

তিনি একদিন দেখলেন, একদল যুবক রাস্তার পাশে বসে খোশগল্প করছে এবং পথচারীদের দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি তাদের কাছে গিয়ে বললেন :

'হে বৎসগণ! মুসলিম যুবকদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও পূত পবিত্র স্থান হলো তাদের নিজেদের বাসগৃহ। তাদের দৃষ্টিকে সংরক্ষণ ও নাফসকে নিয়ন্ত্রণ রাখার স্থান হলো নিজ নিজ গৃহ। তোমাদের নৈতিকতার জন্য সাংঘাতিক ধরনের অপরাধ হলো হাট-বাজার ও গমনাগমনের রাস্তায় বসে আড্ডা দেওয়া। কারণ, এ ধরনের বদ-অভ্যাস যুবকদের অকর্মণ্য করে তোলে ও তাদের নৈতিকতাকে ধ্বংস করে দেয়।'

তিনি দামেশকের গভর্নর থাকাকালীন মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর কাছে এক বিশেষ দূত প্রেরণ করেন। সে দূতের মাধ্যমে মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ প্রস্তাব পেশ করেন যে, তাদের মেয়ে দারদা'কে তার ছেলে ইয়াযীদের সঙ্গে বিবাহ দিতে যেন রাজি হন। তারা মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ছেলে ইয়াযীদের সঙ্গে তাদের মেয়ে দারদা'কে বিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং তার পরিবর্তে সাধারণ মুসলিম পরিবারের একজন উন্নত চরিত্রের অধিকারী দ্বীনদার আল্লাহভীরু যুবকের সঙ্গে বিয়ে দেন। আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ পদক্ষেপের কথা দামেশকবাসীর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। সমাজের সর্বস্তরের লোকজন আলোচনা করতে থাকে যে, আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মেয়েকে মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ছেলে ইয়াযীদের সাথে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সাধারণ মুসলিম পরিবারের এক ছেলের সাথে তাকে বিবাহ দিয়েছেন। কোনো এক ব্যক্তি তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর দেন :

'আমি আমার মেয়েকে যে ধরনের ইসলামী ধ্যান-ধারণার আলোকে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছি, এ বিবাহ প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে আমি ঠিক তার বিপরীত অবস্থা থেকে তাকে রক্ষা করেছি মাত্র।'

সে ব্যক্তি বলল: 'সেটা আবার কিভাবে?'

আবূ দারদা' তাকে পাল্টা প্রশ্ন করে বললেন:
'রাজপ্রাসাদে যখন তার সামনে সেবার জন্য ক্রীতদাসেরা সদা প্রস্তুত থাকবে এবং সে নিজেকে এমন প্রাসাদের মধ্যে দেখতে পাবে, যার ঝাড়বাতির চাকচিক্য দৃষ্টি কেড়ে নেবে, তখন তার দীন কোথায় থাকবে?'

তিনি সিরিয়ার গভর্নর থাকাকালীন আমীরুল মুমিনীন উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু গোপনে তাঁর অবস্থা জানার জন্য কোনো রাতের আঁধারে গভর্নর আবূ দারদা'র বাড়িতে পৌঁছে তাঁর ঘরের কড়া নাড়লেন। ঘরের দারজা খোলা পেয়ে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অন্ধকার ঘরে ঢুকে পড়লেন। আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কারো প্রবেশের পদধ্বনি আঁচ করে উঠে দাঁড়ালে দেখেন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু। তাঁকে খোশ আমদেদ জানালেন এবং বসতে বললেন। মুসলিম বিশ্বের দুই মহান নেতা রাতের অন্ধকারেই একান্ত পরিবেশে পারস্পরিক আলোচনায় নিমগ্ন হয়ে পড়লেন। আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঘরে কুপি জ্বালানোর মতো তেল না থাকায় রাতের আঁধারে তারা একে অপরকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। এ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ফাঁকে উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু আনহুর 'বালিশ' কেমন, আরামদায়ক, না সাধারণ তা হাত বাড়িয়ে দেখেন। তিনি দেখতে পান যে, আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তার ঘোড়ার পিঠে ব্যবহৃত কাপড়টিকেই রাত্রিবেলা বালিশ হিসেবে ব্যবহার করছেন। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবার আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বিছানার অবস্থা কেমন, তা হাত বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করেন। দেখেন, গুঁড়ো পাথর মিশ্রিত বালি সমতল করে নিয়ে একেই তিনি বিছানা বানিয়েছেন। এবার উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর লেপ-তোশকের অনুরূপভাবে খবর নিতে লাগলেন। দেখতে পেলেন যে, লেপ-তোশক বা কম্বল ইত্যাদি বলতে পাথর কণার বিছানায় তার একটি মাত্র পাতলা কম্বল যা দামেশকের প্রচণ্ড শীত প্রতিরোধের মোটেই উপযোগী নয়। এসব দেখে তিনি আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললেন:

'আমি কি আপনার প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর জন্য বাইতুলমাল থেকে উপযুক্ত ভাতার ব্যবস্থা করিনি? আমি কি আপনার মাসিক ভাতা যথাসময়ে আপনার কাছে প্রেরণ করিনি? আপনার এ দুরবস্থায় আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক।'

আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু খালীফাতুল মুসলিমীনকে উত্তর দিলেন: 'হে খালীফাতুল মুসলিমীন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সে হাদীসটি কি আপনার মনে পড়ে? যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শুনিয়েছিলেন?'

উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'কোন্টি?'

আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আমাদের একথা বলেননি? لَيَكُن بَلاغُ أَحَدِكُمْ مِّنَ الدُّنْيَا كَزَادِ رَاكِبٍ .
'দুনিয়ায় তোমাদের ধন-সম্পদ ও অর্থকড়ি যেন একজন মুসাফিরের সরঞ্জামাদির চেয়ে বেশি না হয়।'

উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন: 'হ্যাঁ।'

আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'হে খালীফাতুল মুসলিমীন, এ সত্ত্বেও আমরা কী করছি?'

উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কথা শুনে কাঁদতে লাগলেন। তাঁর সাথে সাথে আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নিজেও কাঁদতে থাকলেন। অতঃপর তাদের উভয়ের কাঁদতে কাঁদতেই রাত ভোর হয়ে গেল।

আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত দামেশকবাসীদের হেদায়াতের জন্য ওয়ায-নসীহত জারি রাখেন। সর্বদাই তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সতর্ক করেন। আল কুরআনের ইল্ম, ইসলামের চিন্তা ও দর্শন এবং হিকমত-এর দীক্ষা দিতে থাকেন। জীবনের অন্তিম সময়ে তাঁর বন্ধু-বান্ধব তাঁর শয্যাপাশে উপস্থিত হয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন: 'আপনার অভিযোগ কী?'

তিনি বললেন: 'আমার গুনাহের ব্যাপারে আমি চিন্তিত।'

অতঃপর তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো: 'আপনার অন্তিম ইচ্ছা কী?'

তিনি বললেন: 'আল্লাহর ক্ষমাই আমার অন্তিম ইচ্ছা।'

অতঃপর তাঁর আশপাশের উপস্থিত সবাইকে বললেন: 'আমাকে কালেমা তাইয়েবার তালকীন করতে থাক।'

উপস্থিত লোকজন সমস্বরে কালেমা তাইয়েবার আবৃত্তি বা তালকীন করতে থাকেন। দেখতে পেলেন যে, তাঁর পবিত্র আত্মা এ দুনিয়া ত্যাগ করে ইল্লিয়‍্যীনের পথে রওয়ানা হয়ে গেছে।'

আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইনতিকালের পর প্রখ্যাত তাবেঈ আওফ ইবনে মালিক আল আশজাঈ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু স্বপ্নে দেখেন যে : 'সুবিস্তীর্ণ সুন্দর সবুজ মাঠ, যেদিকে নজর যায় সেদিকেই শুধু সবুজ, আর সবুজ, যার মধ্যখানে চামড়া দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি বিশালাকার একটি গম্বুজ। তার চারপাশে সাদা ও সম্মুখমুখী সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো হাজার হাজার বকরির পাল, যা কোনো চোখ কখনো দেখেনি।'

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: 'এসব কার?'

তাঁকে জানানো হলো: 'এসব আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর।'

অতঃপর আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেই গম্বুজ থেকে বেরিয়ে এসে তাঁকে বললেন:

'হে ইবনে মালেক, মহান আল্লাহ আমাদের আল কুরআনের বদৌলতে এসব দান করেছেন। তুমি যদি এ পথ ধরে আরো একটু এগিয়ে যাও, তাহলে এমন কিছু দেখতে পাবে, যা তোমার চোখ কোনো দিনই দেখেনি। এমন কিছু শুনতে পাবে, যা তোমার কান কোনো দিনই শোনেনি এবং এমন কিছু পাবে, যা কোনো দিন কল্পনাও করতে পারনি।'

ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জিজ্ঞাসা করলেন: 'হে আবূ মুহাম্মদ, এসব কার জন্য?'

তিনি বললেন: 'আল্লাহ এসব আবু দারদা'র জন্য সজ্জিত করে রেখেছেন। কেননা, আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সত্যিকার অর্থেই এবং মনে-প্রাণেই দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও লোভ-লালসাকে পরিত্যাগ করেছিলেন এবং দুনিয়াকে তাঁর দু'হাত ও সীনা দ্বারা ধাক্কা দিয়ে দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন।'

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ৬১১৭ নং জীবনী। ২. আল ইসতিআব (হামেশে ইসাবাহ): ৩য় খণ্ড, ১৫ পৃ:, ৪র্থ খণ্ড, ১২৫৯ পৃঃ। ৩. উসদুল গাবাহ: ৪র্থ খণ্ড, ১৫৯ পৃঃ। ৪. হুলিয়াতুল আওলিয়া: ১ম খণ্ড, ৩০৮ পৃঃ। ৫. হুসনুস সাহাবা: ২১৮ পৃঃ। ৬. সাফওয়াতুস সাফওয়া: ১ম খণ্ড, ২৫৭ পৃঃ। ৭. তারীখুল ইসলাম লিযযাহাবী: ২য় খণ্ড, ১০৭ পৃঃ। ৮. হায়াতুস সাহাবা: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য। ৯. আল কাওয়াকিবুদ দুররিয়াহ: ১ম খণ্ড, ৪৫ পৃ:। ১০. আল আ'লাম লিযিরিকলী: ৫ম খণ্ড, ২৮১পৃ:।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ)

📄 যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ)


'আল্লাহর শপথ! যায়েদ ইবনে হারেসা নেতৃত্বের জন্য অত্যন্ত যোগ্য ব্যক্তি। নিঃসন্দেহে সে আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিদের অন্যতম।' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)

সু'দা বিনতে ছা'লাবা তাঁর শ্বশুরালয় থেকে পিত্রালয় বনূ মা'ন গোত্রে যাচ্ছিল। তাঁর সাথে ছিল শিশুপুত্র যায়েদ ইবনে হারেসা আল কা'বী। নিজ গোত্রের আবাসভূমিতে পৌছার পূর্ব মুহূর্তে আলবাইন গোত্রের লুটতরাজকারী অশ্বারোহী বাহিনী তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। তারা তাদের অর্থ-সম্পদ ছিনিয়ে নেয়, উটসমূহ হাঁকিয়ে নিয়ে যায় এবং লোকজনকে বন্দী করে। যাদেরকে তারা বন্দী করে নিয়ে যায়, শিশু যায়েদ ছিল তাদের অন্যতম। তারা তাকে বিক্রির জন্য উকাযের মেলায় নিয়ে আসে। সেখানে কুরাইশ বংশের একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি হাকিম ইবনে হাযাম ইবনে খুওয়াইলিদ চার শ' দিরহামের বিনিময়ে যায়েদ ইবনে হারেসাকে ক্রয় করে। তার সাথে সে আরো কতিপয় বালককেও ক্রয় করে তাদেরকে মক্কায় নিয়ে আসে।

হাকিম ইবনে হাযাম উকায মেলা থেকে ফিরে এলে তার ফুফু খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য তার বাড়িতে আসেন। হাকিম ইবনে হাযাম তার ফুফু খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদকে বলেন : 'উকায মেলা থেকে বেশ কিছু বালক ক্রয় করে এনেছি। তাদের মধ্যে যাকে পছন্দ হয় আমার পক্ষ থেকে তাকে উপহার হিসেবে নিয়ে যান।'

খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ যায়েদ ইবনে হারেসার চেহারায় তার বুদ্ধিমত্তা ও চতুরতার নিদর্শন দেখে তাকেই নিজের জন্য পছন্দ করেন। তাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। এর কিছুদিন পরেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদের বিয়ে হয়। খাদীজা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্মানজনক ও উত্তম একটি উপহার দেওয়ার চিন্তা করলেন। কিন্তু বালক যায়েদ ইবনে হারেসা ছাড়া তার কাছে আর কোনো উপহার পছন্দ হলো না। পরিশেষে, যায়েদকেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতের জন্য উপহার হিসেবে পেশ করলেন।

ভাগ্যবান বালক যায়েদ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তত্ত্বাবধানে ও তাঁর মহান সাহচর্যে সুন্দর ও উত্তম গুণাবলিতে সমৃদ্ধ হয়ে বেড়ে উঠতে থাকে।

এদিকে একমাত্র কলিজার টুকরা যায়েদকে হারিয়ে তার হতভাগ্য মা দারুণভাবে ব্যথিত ও অস্থির হয়ে পড়ে। সে সর্বদা অঝোরে কাঁদতে থাকে। হৃদয়ে দুঃখ-বেদনার পাহাড় ভেঙে পড়তে থাকে। এক মুহূর্তও সে শান্ত হতে পারল না। তার হতাশা ক্রমেই বাড়তে থাকে। কারণ, সে জানে না যায়েদ জীবিত না মৃত। জীবিত হলে আশায় বুক বাঁধত। আর মৃত হলে তাকে পাবার আশা ছেড়ে দিত।

অন্যদিকে যায়েদের পিতাও রাত-দিন ছেলেকে খুঁজতে থাকে, তারও অস্থির অবস্থা। যাকে ও যে কাফেলাকে পাচ্ছে তাকেই জিজ্ঞাসা করছে যায়েদের কথা। হয়তো লোকটির কাছে পুত্রের খবর থাকতেও পারে। ছেলের শোকে মুহ্যমান সে। পুত্রশোকে মুহ্যমান পিতা তার হারানো পুত্রকে নিয়ে যে শোকগাথা রচনা করে তার গদ্যরূপ হচ্ছে:

بَكَيْتُ عَلَى زَيْدٍ وَلَمْ أَدْرِ مَا فَعَلْ أَحَيَّ فَيُرْجِي أَمْ أَتِي دُونَهُ الْأَجَلَّ.
'যায়েদের সন্ধানে কেঁদে কেঁদে বেড়াচ্ছি, জানি না দিশেহারা অবস্থায় এখন কী করব! জানি না সে এখনও জীবিত নাকি দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিয়েছে? কেমন করে সিদ্ধান্ত নেব?'

فَوَاللَّهِ مَا أَدْرِي وَإِنِّي لَسَائِلٌ أَغَالَكَ بَعْدِي السَّهْلُ أَمْ غَالَكَ الْجَبَلُ
'জানি না, সে কোথায় ও কী অবস্থায় আছে; কিন্তু আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি অব্যাহতভাবে তাকে খুঁজতেই থাকব। হে যায়েদ আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোমাকে না জানি মরুভূমির কোন্ প্রান্তরে লুকিয়ে রেখেছে, অথবা কোন্ এক পাহাড়ের শৃঙ্গে তোমাকে বন্দী করে রেখেছে।'

تذَكَّرُنِيهِ الشَّمْسُ عِنْدَ طُلُوعِهَا وتَعْرِضُ ذِكْرَاهَ إِذَا غَرْبُهَا أَفَلْ
'প্রত্যেক দিনের সূর্যোদয় থেকে সারাদিন তোমাকে স্মরণ করতে থাকি, দিনে তোমাকে পাওয়ার আশা করি, সূর্যাস্তের পর যে রাত আসে, সে রাতেও তোমাকে পাওয়ার আশায় বিনিদ্র রজনী যাপন করি।'

سَأَعْمَلَ نُصِ الْعَيْسِ فِي الْأَرْضِ جَاهِدًا وَلَا أَسَامُ التَّطْوَافَ أَوْ تَسْأَمُ الْإِبْلِ
'দ্রুতগামী সর্বোৎকৃষ্ট উট নিয়ে আমি তোমাকে পৃথিবীব্যাপী খুঁজতে থাকব, আমার উট যতক্ষণ না ক্লান্ত হয়ে বসে পড়বে, ততদিন আমি তোমাকে খুঁজবই, খুঁজব।'

حَيَاتِي، أَوْ تَاتِي عَلَى مَنِيَّتِي فَكُلِّ امْرِئٍ فَانٍ وَإِنْ غَرَّهُ الْأَمَلُ
'তোমার সন্ধান থেকে আমাকে বিরত রাখতে পারে একমাত্র মৃত্যু, অন্যথায় সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত সারা জীবনই আমি তোমাকে খুঁজে বেড়াব। নিঃসন্দেহে প্রত্যেকই মরণশীল, কিন্তু আশা নামক কুহেলিকা ভ্রান্তিতে ডুবিয়ে রাখে।'

কোনো এক হজ্জ মওসুমে যায়েদের গোত্রের কিছু লোক হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় আসে (উল্লেখ্য, ইসলাম-পূর্ব যুগেও বাইতুল্লাহর হজ্জ অব্যাহত ছিল।)। বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করার সময় তারা যায়েদের মুখোমুখি সাক্ষাৎ পেয়ে যায় এবং তারা যায়েদকে চিনে ফেলে। সেও তার গোত্রের লোকজনকে চিনতে পারে। যায়েদকে তারা নানা কথা জিজ্ঞাসা করে জেনে নেয় তার অতীত ও বর্তমানকে। যায়েদও তার মা-বাবার কুশল জিজ্ঞাসা করে। তারা হজ্জ পালন শেষে দেশে ফিরে এসেই যায়েদের পিতা হারেসাকে তার হারানো ছেলের সন্ধান দেয় বিস্তারিতভাবে। যে সুসংবাদের জন্য এত দীর্ঘ প্রতীক্ষা, সে প্রতীক্ষার কি অবসান হলো? হয়তো হলো, যায়েদের পিতার খুশি দেখে কে? যায়েদের পিতা মুক্তিপণের অর্থ, বাহন উট ও পথের পাথেয় যোগাড় করল। তারপর তড়িৎগতিতে তার ভাই কা'বকে সাথে নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলো।

মক্কায় পৌঁছেই তারা মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছল এবং তাকে তাদের আগমনের কারণ জানাল। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সামনে এলে যায়েদের পিতা আবেগময় কন্ঠে বলল:

'হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তান! আপনারা আল্লাহর ঘরের খাদেম, আপনারা সায়েলের সওয়াল, অভাবীর অভাব পূরণ করেন, ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করেন, বিপদগ্রস্তকে বিপদ মুক্তিতে সহায়তা করেন। আপনারা অনেক গুণে গুণান্বিত। যায়েদ নামের ছেলেটি আপনার কাছে আছে। সে আমার ছেলে। মুক্তিপণ যা লাগে তা-ই আমি দেব। আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিন। বলুন, কী পরিমাণ মুক্তিপণ লাগবে? আপনার কাছে আমি তা-ই পেশ করব। আমাদের প্রতি আপনি করুণা করুন।'

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত শান্তকণ্ঠে বললেন:
'কে আপনাদের সন্তান, যাকে আমরা ক্রীতদাস বানিয়েছি?'

তারা উত্তর দিল:
'আপনার গোলাম যায়েদ ইবনে হারেসা।'

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'মুক্তিপণের চেয়েও উত্তম এক শর্ত আপনাদের কাছে রাখছি, সে শর্ত মানবেন কি?'

তারা জিজ্ঞাসা করল:
'সে শর্ত কী?'

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'আমি তাকে আপনাদের সামনে হাজির করছি। সে আপনাদের সাথে চলে যাবে, না আমার এখানেই থাকবে- এই দু'য়ের মধ্যে যেটি সে পছন্দ করবে, আপনারা কি তাতেই রাজি হবেন? তার স্বাধীন ইচ্ছাকে কি মূল্য দেবেন? যদি আপনাদের সাথে চলে যেতে চায়, তাহলে মুক্তিপণ বা কোনো অর্থ ছাড়াই আপনাদের সাথে চলে যাবে। আর যদি সে আমার এখানেই থাকতে চায়, তাহলে আমি তার স্বাধীন সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করতে পারব না।'

তারা উভয়েই সমস্বরে বলে উঠল:
'নিঃসন্দেহে আপনি ইনসাফপূর্ণ শর্তারোপ করেছেন। এর চেয়ে ভালো শর্ত আর কিছু হতে পারে না।'

অতঃপর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদকে ডেকে এনে তাদের সামনে হাজির করে বললেন: 'এঁরা দু'জন কে?

যায়েদ উত্তর দিল, 'ইনি আমার পিতা হারেসা ইবনে শুরাহিল এবং ইনি আমার চাচা কা'ব।'

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদকে বললেন:
'আমরা তোমাকে এই শর্তে স্বাধীনতা দিয়েছি যে, তুমি যদি চাও তাহলে এ দু'জনের সাথে চলে যেতে পার, আর যদি না চাও তাহলে আমার এখানেই থাকতে পার।'

যায়েদ তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল:
'আমি তাদের সাথে না গিয়ে বরং আপনার এখানেই থাকবো- এটাই আমার স্বাধীন সিদ্ধান্ত।'

তার পিতা হারেসা বলল:
'হে আমার হতভাগ্য সন্তান! তোমার জন্য আফসোস! পিতামাতার কোলে ফিরে যাওয়ার চেয়ে তুমি কি দাসত্বকেই প্রাধান্য দিচ্ছ?'

যায়েদ বললো:
'আমি এ ব্যক্তির চরিত্রে এমন গুণাবলি দেখেছি যে, কোনো কিছুই তাঁর থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না।'

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদের এই আচরণ ও মানসিকতা দেখে তার হাত ধরে সেই মুহূর্তেই বাইতুল্লায় নিয়ে গেলেন এবং কুরাইশ গোত্রের একদল লোকের উপস্থিতিতে হাজারে আসওয়াদের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন:

'হে কুরাইশগণ! তোমরা সাক্ষী থেকো, এ বালক এখন থেকে আমার পুত্র। সে আমার উত্তরাধিকারী এবং আমি তার উত্তরাধিকারী।'

يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ، اشْهَدُوا أَنَّ هَذَا ابْنِي يَرِثُنِي وَارِثُهُ .
এ দৃশ্য দেখে তার পিতা ও চাচা তাকে ফেরৎ পাওয়ার চেয়েও অধিক আনন্দিত হলো। তারা যায়েদকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে রেখে আনন্দিতচিত্তে স্বগৃহে রওয়ানা হলো।

সেদিন থেকেই যায়েদ ইবনে হারেসাকে যায়েদ বিন মুহাম্মদ বলে ডাকা শুরু হলো। ইসলামে পিতাপুত্রের মৌখিক সম্পর্ককে রহিত করার পূর্ব পর্যন্ত তাকে যায়েদ বিন মুহাম্মদ হিসেবেই ডাকা হতো। মৌখিক পিতাপুত্র সম্পর্ক রহিতের আয়াতে এভাবে আল্লাহ ঘোষণা দেন: ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ .
'তোমরা তাদেরকে তাদের পিতার নামে ডাকো।' (সূরা আহযাব: ৫)

এই আয়াত নাযিলের মুহূর্ত থেকেই আবার তাকে যায়েদ ইবনে হারেসা নামে ডাকা শুরু হলো। পিতামাতার চেয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রাধান্য দেওয়ার মুহূর্তে যায়েদ ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি যে, সে কী পুরস্কারে পুরস্কৃত হবে। সে এও বুঝতে পারেনি যে, সে যে মনিবকে পিতামাতা ও জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর ওপর অগ্রাধিকার দিল, তিনি পূর্বাপর সকল মানুষের নেতা এবং সকল সৃষ্টির প্রতি প্রেরিত রাসূল। যায়েদ ভবিষ্যতে কী সুমহান উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হচ্ছে তা সে যেমন জানত না, তেমনি সে জানতো না যে, শীঘ্রই আসমানী শাসন দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মানবতাবিনাশী ব্যাধিতে আক্রান্ত বিশ্বসমাজ শীঘ্রই ব্যাধিমুক্ত হবে ও সুস্থ সমাজব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য তথা সারা পৃথিবীই আদল-ইনসাফের পরশ পাবে। সত্য ও ন্যায় এবং পুণ্যের সুবাতাস প্রবাহিত হবে এবং যায়েদ নিজেই হবে সেই সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এ ভবিষ্যৎ ছিল তার অজানা। আল্লাহ যাকে চান, তাকেই এ সৌভাগ্যের অধিকারী করেন। মহান আল্লাহ বড়ই সৌভাগ্য দানকারী।

অব্যাহত দাস জীবন যাপনের পরিবর্তে আপন মা-বাবার কোলে চলে যাওয়ার অপূর্ব সুযোগ পাওয়ার ঐতিহাসিক ঘটনার মাত্র কয়েক বছর পরেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাসূল হিসেবে ঘোষণা করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের ওপর ঈমান গ্রহণকারী সর্বপ্রথম পুরুষ হলেন এই যায়েদ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে কত বড় সৌভাগ্য দান করেছিলেন, তা কি ভাবা যায়?

যায়েদ ইবনে হারেসা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপন সংবাদ সংরক্ষণকারী ছিলেন। বৃহত্তর ও ক্ষুদ্রাকার অভিযান ও বিভিন্ন যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে নিযুক্ত সেনাপতি ছিলেন তিনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদীনায় অনুপস্থিতিকালে তিনি রাসূলুল্লাহর স্থলাভিষিক্তদের অন্যতম খলীফা ছিলেন।

যায়েদ ইবনে হারেসা যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর পিতামাতার চেয়েও অধিক ভালোবাসতেন ও শ্রদ্ধা করতেন, অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাঁকে অপরিসীম ভালোবাসতেন এবং ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ নবী পরিবারের সদস্যের মতোই 'আহলে বাইতের' সাথে খোলামেলাভাবে মেলামেশার অধিকার প্রদান করেন। যদি কখনো তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দূরে যেতেন তাহলে ফিরে না আসা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই উদ্বিগ্ন থাকতেন। ফিরে এলে আনন্দ প্রকাশ করতেন ও তাকে এমন আন্তরিকভাবে সাক্ষাৎ দিতেন যে, যায়েদ ছাড়া আর কেউ এমন একান্ত সাক্ষাৎ পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জনে সমর্থ হয়নি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদের উপস্থিতিতে কেমন আনন্দিত হতেন, উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা সে ব্যাপারে একটি ঘটনার বর্ণনা দেন:

'একদা যায়েদ ইবনে হারেসা কোনো এক জরুরি কাজে শহরের বাইরে যান। ফিরতে দেরি হয়। মদীনায় এমন এক সময় ফিরে আসেন, যখন রাত গভীর। তিনি এসে দরজায় কড়া নাড়লেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আমার কক্ষে অবস্থান করছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদের আগমন টের পেয়ে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য কক্ষ থেকে বের হয়ে পড়লেন। তখন তাঁর পরিধানে এমন এক খণ্ড চাদর ছিল, যা দ্বারা কোনোক্রমে নাভি থেকে পায়ের হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা সম্ভত হতো, তা নিয়েই তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়লেন এবং যায়েদের সাথে গলা মিলালেন ও তার কপালে চুমু দিলেন।'

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন:
'আল্লাহর শপথ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইতঃপূর্বে বা পরে আর কোনো দিন এমন খালি গায়ে আমি দেখিনি।'

যায়েদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসার ঘটনার সংবাদ মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে সবাই তাঁকে 'যায়েদুল হুব্ব' বা আদরের যায়েদ বলে ডাকত। তাকে زَيْدُ الْحَبّ বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়পাত্র উপাধিতে ভূষিত করা হয়। যায়েদের পর তার ছেলে উসামাকেও حِبُّ رَسُولِ اللَّهِ وَإِبْنُ حُبِّهِ বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের 'প্রিয়পাত্র' এবং 'প্রিয় পাত্রের প্রিয় পুত্র' উপাধিতে ভূষিত করেন।

আল্লাহর কী হিকমত! অষ্টম হিজরীতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বন্ধুকে বন্ধুর বিচ্ছেদ-বেদনা দিয়ে পরীক্ষা করতে চাইলেন। ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূত হিসেবে 'হারেস বিন উমাইর আল আযদী'কে বসরার বাদশাহর কাছে প্রেরণ করেন। হারেস বিন উমাইর আল আযদী পূর্ব জর্দানের 'মৃতা' নামক স্থানে পৌঁছলে গাসসানদের এক নেতা শুরাহাবিল ইবনে আমর তাঁকে বসরার বাদশাহর কাছে পৌঁছতে বাধা দেয়, তাঁকে গ্রেফতার করে তার হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বাদশাহর সামনে পেশ করে। বাদশাহ পরে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এ ঘটনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। এ ঘটনা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন হাজার যোদ্ধার এক বাহিনী মৃতার প্রান্তরে দূত হত্যার প্রতিশোধের জন্য প্রেরণ করেন এবং এই বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে তাঁর প্রিয়পাত্র যায়েদ ইবনে হারেসাকে নিযুক্ত করে বলেন:

'যদি যায়েদ শহীদ হয়, তবে সেনাপতির দায়িত্ব অর্পিত হবে জা'ফর ইবনে আবী তালিবের ওপর এবং যদি জা'ফর শাহাদাত বরণ করে, তাহলে সে দায়িত্ব অর্পিত হবে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার ওপর। সেও যদি শাহাদাত বরণ করে, তখন সেনাবাহিনী পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে সেনাপতি হিসেবে বেছে নিবে।'

যথারীতি মুসলিম বাহিনী পূর্ব জর্দানের 'মাআন' নামক স্থানে পৌঁছলে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস এক লাখ সৈন্য নিয়ে দ্রুতগতিতে তার গাসসানী গভর্নরের সাহায্যে এগিয়ে আসে। তাদের সাহায্যের জন্য আরো এক লাখ আরব গোত্রীয় মুশরিক সৈন্য প্রস্তুত থাকে। সর্বমোট দুই লাখ সুদক্ষ শত্রু সৈন্য মুসলিম বাহিনীর অদূরেই অবস্থান নেয়। মুসলিম বাহিনী ক্রমাগত দুই রাত 'মাআন' নামক স্থানেই অবস্থান নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাদের পদক্ষেপের বিষয়ে পরামর্শ করেন। পরামর্শসভার এক সদস্য প্রস্তাব করলেন:

'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পত্র দ্বারা শত্রুবাহিনীর সংখ্যা সম্পর্কে জানানো হোক।'

উত্তর না আসা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা দরকার। অন্য একজন বললেন:
'হে দীনী ভাইয়েরা! আল্লাহর শপথ। আমরা সংখ্যার আধিক্যে নির্ভর করে জিহাদ বা লড়াই করি না। শত্রুবাহিনীর শক্তি ও সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে আমাদের বিজয় সূচিত হয় না। আমরা আল্লাহর দীনের জন্যই জিহাদ করি। অতএব যে উদ্দেশ্যে আপনারা এসেছেন, সে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শত্রুর মোকাবেলায় অগ্রসর হোন। আল্লাহ নিশ্চয়ই দুটির যে কোনো একটি আপনাদের প্রদান করবেন, হয় বিজয়, না হয় শাহাদাত।'

অতঃপর সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বের এখানে সমাপ্তি ঘটল। 'মৃতা' নামক স্থানে রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনী যুদ্ধ ঘোষণা করল। মুসলিম বাহিনী এমন দৃঢ়তার সাথে যুদ্ধ করতে থাকল যে, শত্রু-সৈন্যদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

মাত্র তিন হাজার সৈন্যের এই মুসলিম বাহিনী উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও আরব যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত দু'লক্ষাধিক সৈন্যের বিরাট বাহিনীর অন্তরে প্রচণ্ড ভীতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হলো। ইসলামের পতাকাবাহী সেনাপতি যায়েদ ইবনে হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু এমন দক্ষতার সঙ্গে সৈন্য পরিচালনা করেন যে, তৎকালীন বীর যোদ্ধাদের ইতিহাসে এমন বীরত্বের ঘটনা ছিল সত্যিই বিরল। কিন্তু শত্রুবাহিনীর আক্রমণের প্রচণ্ডতা এমনই ছিল যে, বর্শার শতাধিক আঘাত তার দেহকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে এবং তার দেহ রক্তের স্রোতে ভাসতে থাকে। তিনি নিস্তেজ হয়ে আল্লাহর পথে শাহাদাত বরণ করেন। অতঃপর জা'ফর ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেনাপতির ঝাণ্ডা হাতে নেন এবং বীরবিক্রমে লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন।

এরপর জিহাদের ঝাণ্ডা হাতে তুলে নেন আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু। তিনিও বীরবিক্রমে ময়দান কাঁপিয়ে তোলেন এবং লড়াই করে পূর্বসূরীদের মতো শাহাদাত বরণ করেন। সবশেষে মুসলিম বাহিনী খালিদ ইবনে ওয়ালীদকে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তিনি সবেমাত্র ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি মুসলিম বাহিনীকে আসন্ন ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে পিছনে সরে আসেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃতা যুদ্ধের বিবরণ ও পরপর তিন সেনাপতির শাহাদাতের সংবাদ শুনে খুবই ব্যথিত হন। এর আগে কোনো দিন তাঁকে এত অধিক ব্যথিত হতে আর দেখা যায়নি। ব্যথিত মন নিয়ে তিনি শহীদদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমবেদনা প্রকাশ করেন। যায়েদ ইবনে হারেসা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাড়িতে পৌঁছলে তাঁর ছোট মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে উপস্থিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তার সাথে কাঁদতে থাকেন। এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে শুরু করলে সা'দ ইবনে উবাদা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:

'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এভাবে কাঁদছেন?'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন:
'এটা হচ্ছে বন্ধুর জন্য বন্ধুর কান্না।'

টিকাঃ
১. সহীহ মুসলিম: ৭ম খণ্ড, ১৩১ পৃ. সাহাবীদের ফযীলত অধ্যায়। ২. জামেউল উসূল মিন আহাদীসে রাসূল (স): ১০ম খণ্ড, ২৫-২৬ পৃ। ৩. আল ইসাবাহ: ২৯০ নং জীবনী দ্রষ্টব্য। ৪. আল ইসতিআব (আল হামেশ সংস্করণ)ঃ ১ম খণ্ড, ৫৪৪ পৃ.। ৫. আস সিরাতুন নুবুবিয়া লি ইবনে হিশামঃ ৪র্থ খণ্ডের সূচি দ্রষ্টব্য। ৬. সিফাতুস সাফওয়া: ১ম খণ্ড, ১৪৭ পৃ.। ৭. খাযানাতুল আদাব লিল বাগদাদী: ১ম খণ্ড, ৩৬৩ পৃ.। ৮. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৮ম হিজরীর ঘটনাবলি দ্রষ্টব্য। ৯. হায়াতুস সাহাবা: ৪র্থ খণ্ডের সূচি দ্রষ্টব্য।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ)

📄 উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ)


'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তোমার পিতার চেয়ে 'উসামার পিতা অধিক প্রিয় ছিলেন। আর উসামাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তোমার চেয়ে অধিক প্রিয়।' -আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা)-এর প্রতি উমর ফারুক (রা)-এর উক্তি

হিজরতের সাত বছর পূর্বের কথা। মক্কায় মুসলমানদের জন্য ছিল চরম দুর্দিন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ প্রতিদিনই কুরাইশদের নির্মম অত্যাচারের শিকার হতেন। ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ এবং ইসলাম প্রচারের কারণে মুসলমানদের ওপর অব্যাহতভাবে অত্যাচার চলত। এহেন যুলুম-অত্যাচার আর দুর্ভাবনা ও দুশ্চিন্তার মাঝেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে দেখা গেল আনন্দের আভাস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে আনন্দের পবিত্র আভাস দেখে সকলেই আনন্দিত হলেন। সংবাদ এল, উম্মুল আইমানের ঘরে আল্লাহ একটি ছেলে দান করেছেন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এ সংবাদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বড়ই খুশি হলেন। তাঁর মুখমণ্ডলে হাসি ফুটল। কে এই শিশু, যার জন্মগ্রহণের সংবাদ শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত আনন্দিত হয়েছিলেন? হ্যাঁ, এ শিশুই উসামা ইবনে যায়েদ।

এ শিশুর জন্মগ্রহণের সংবাদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিশয় আনন্দিত হলেন। এ শিশুর পিতামাতার সন্তান লাভে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুশি হওয়ারই কথা। কারণ, তাঁরা অতি আপনজন। তাদের একজন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের 'প্রিয়পাত্র' যায়েদ ইবনে হারেসা এবং অপরজন উম্মুল আইমান। এই শিশুর মায়ের নাম ছিল 'বারাকাতুল হাবাশীয়াশী' যাকে উম্মুল আইমান নামে ডাকা হতো। তিনি ছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আম্মা আমেনা বিনতে ওয়াহাব-এর ক্রীতদাসী।

আমেনার জীবদ্দশায় তিনিই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লালন-পালন করেন, এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মায়ের ইনতিকালের পরও একটি সময় পর্যন্ত তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সেবাযত্ন করেন। মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দুনিয়াতে বিচার-বিশ্লেষণের ও পার্থক্য শক্তির দু'চোখ খুলেই নিজের মা ছাড়া আর যাকে আপন বলে দেখেন, তিনি এই মহিলা। সুতরাং স্বাভাবিক কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ভালোবাসতেন, শ্রদ্ধা করতেন। প্রায়ই তাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন:

'আমার মায়ের পর তিনিই আমার মা এবং আমার পরিবারের অবশিষ্ট মুরব্বী, যাকে নিজ বাড়িতেই রেখেছি।'

তিনিই সেই সৌভাগ্যবান শিশুর মা উম্মুল আইমান আর তার পিতা ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়পাত্র যায়েদ ইবনে হারেসা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু। ইসলামপূর্ব যুগে যিনি ছিলেন তাঁর পালক-পুত্র, সম্মানিত সাহাবা, গোপনীয় বিষয়ের বিশ্বস্ত আমানতদার, নবী-পরিবারের সদস্য এবং সবার চেয়ে অধিক ভালোবাসার পাত্র।

উসামা ইবনে যায়েদ-এর জন্মগ্রহণে মুসলমানগণ খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন। এ কারণে যে, যেসব ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর খুশি প্রকাশ করেছেন, সেসব ক্ষেত্রে সাহাবীগণও খুশির বহিঃপ্রকাশ করেছেন। এ ছেলেকেই সাহাবীদের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের 'প্রিয়পাত্রের প্রিয় সন্তান' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ছোট শিশু উসামাকে সাহাবীগণ এ উপাধিতে ভূষিত করে মোটেই বাড়াবাড়ি করেননি। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসামাকে খুবই ভালোবাসতেন। এ দুই বন্ধুর মধ্যে বয়সের পার্থক্য তো আসমান-জমিন ফারাক। উসামা ইবনে যায়েদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যা ফাতিমাতুয যাহরার ছেলে হাসান ইবনে আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সমবয়সী। হাসান দেখতে খুবই সুন্দর, গোলাপী ফর্সা এবং হুবহু তাঁর নানা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো। আর উসামা ছিলেন খুবই কালো, খর্বাকার নাসিকা, তার হাবশী মা উম্মুল আইমানের মতো। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়ের মধ্যে স্নেহ-ভালোবাসার কোনো পার্থক্য করতেন না।

উসামাকে তাঁর এক উরুর ওপর বসাতেন এবং অন্য উরুর ওপর হাসানকে। অতঃপর উভয়কেই বুকে জড়িয়ে ধরে বলতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أُحِبُّهُمَا فَأَحِبُّهُمَا .
'হে আল্লাহ, আমি এ দু'জনকেই সমান ভালোবাসি, তুমিও তাদেরকে ভালোবাস।'

উসামার প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা কতটুকু গভীর ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় একটি ঘটনায়। একদিন উসামা হোঁচট খেয়ে দরজার চৌকাঠের ওপর পড়ে যাওয়ায় তার কপাল কেটে যায় এবং ক্ষতস্থান থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে উসামার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত মুছে ফেলার ইঙ্গিত করেন; কিন্তু তাতে তাঁর বিলম্ব হতে দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই উঠে গিয়ে উসামার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত চুষে থুথু করে ফেলতে থাকেন এবং তাকে আদর-সোহাগভরা কথাবার্তা শোনান ও সান্ত্বনা দেন, যাতে সে সন্তুষ্ট হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসামাকে শৈশবে যেমন ভালোবাসতেন, যৌবনেও ঠিক তেমনি ভালোবাসতেন। কুরাইশদের এক অভিজাত নেতা হাকিম ইবনে হাযাম ইয়ামেনের এক বাদশাহ যুইয়াযদানের নিলামকৃত মহামূল্যবান গাউন পঞ্চাশ দিনার বা স্বর্ণ মুদ্রায় খরিদ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উপহার দেন। কিন্তু ইবনে হাযাম তখনো মুশরিক থাকায় তিনি তার উপহার গ্রহণ না করে তা কিনে নেন এবং একবার মাত্র জুমআর দিনে পরিধান করে তা উসামাকে উপহার দেন। উক্ত গাউন পরে উসামা তার সমবয়সী আনসার ও মুহাজির যুবকদের মধ্যে সকাল-বিকাল ঘোরাফিরা করতেন।

উসামা যৌবনে পদার্পণ করলে তার মধ্যে চারিত্রিক ও মানবিক গুণাবলির অপূর্ব প্রকাশ পরিলক্ষিত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জন্য তার প্রতি আরো বেশি আকৃষ্ট হন। উসামা শুধু সাধারণ অর্থেই বুদ্ধিমান ছিলেন না; বরং অসাধারণ প্রজ্ঞারও অধিকারী ছিলেন। তিনি শুধু সাহসী যোদ্ধাই ছিলেন না; বরং যুদ্ধের কলাকৌশলে তিনি ছিলেন একজন কুশলী যোদ্ধা। যে কোনো জটিল সমস্যার সমাধানে তিনি ছিলেন বিশেষ প্রজ্ঞাবান।

তিনি যেমন মানবিক গুণে ছিলেন গুণান্বিত, তেমনি ছিলেন একজন মুত্তাকী ও খোদাভীরু আবেদ। উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উসামা ইবনে যায়েদ একদিন সাহাবী সন্তানদের একদল কিশোর সাহাবীসহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খidমতে উপস্থিত হন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোগ্যতার ভিত্তিতে যাদের গ্রহণ করার কথা তাদের গ্রহণ করেন এবং অল্প বয়সের জন্য যাদের ফেরৎ দেওয়ার, তাদের ফেরৎ পাঠান। যাদেরকে ফেরৎ পাঠানো হয় তাদের মধ্যে উসামা ইবনে যায়েদ অন্যতম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জিহাদের পতাকাতলে জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহে অংশ না নিতে পারায় উসামা দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। খন্দকের যুদ্ধের প্রাক্কালেও উসামা যুবক সাহাবীদের একদল নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে হাযির হন। এবার তিনি পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে ভর করে নিজের উচ্চতা বৃদ্ধির চেষ্টা করেন, যাতে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লম্বা মনে করে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার তাকে ছোট্ট সাহাবীদের থেকে আলাদা করে নেন ও যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমিত দেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর।

হুনাইনের যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী চরমভাবে পরাজয়ের মুখোমুখি হন। উসামা ইবনে যায়েদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও চাচাত ভাই আবূ সুফিয়ান ইবনে হারেস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং অন্য ছয়জন সম্মানিত সাহাবীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শত্রুর মোকাবেলায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে ইস্পাতের প্রাচীরের মতো অবস্থান নেন। জানবায সাহাবী যোদ্ধাদের এই ক্ষুদ্রতম ইউনিটের সাহায্যেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পরাজয়কে বিজয়ে রূপান্তরিত করেন এবং যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া সাহাবীদেরকে আক্রমণকারী মুশরিকদের হাত থেকে রক্ষা করেন।

যুবক সাহাবী উসামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মাত্র আঠারো বছর বয়সে তার পিতা সেনাপতি যায়েদ বিন হারেসা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পতাকাতলে 'মৃতার' যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি এ যুদ্ধে স্বচক্ষে তাঁর পিতার শাহাদাতের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। পিতার শাহাদাতে বিন্দুমাত্র দুর্বলতাও প্রকাশ না করে কেঁদে অস্থিরও না হয়ে বরং জা'ফর ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে বীরবিক্রমে শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকেন। তার চোখের সামনে জা'ফর ইবনে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু শহীদ হলে সেনাপতির নেতৃত্ব আসে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাতে। তাঁর শাহাদাতের পর খালিদ ইবনে ওয়ালীদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে যতক্ষণ পর্যন্ত এই ক্ষুদ বাহিনীকে বিশাল রোমান বাহিনী থেকে পশ্চাদপসরণ না করানো হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। যুদ্ধ শেষে আল্লাহর কাছে পিতা যায়েদ ইবনে হারেসার সর্বোচ্চ পুরস্কারের আশা নিয়ে সিরিয়ার পূর্ব প্রান্তরে মৃতার যুদ্ধক্ষেত্রে পিতার লাশকে দাফন করে, তার শাহাদাতপ্রাপ্ত পিতা সেনাপতি যায়েদ ইবনে হারেসার ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। এগারো হিজরীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জিহাদের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সর্বস্তরের মুজাহিদদের নির্দেশ দেন।

আবূ বকর সিদ্দীক, উমর ফারূক, সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস, আবী উবাইদা ইবনে জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমসহ অন্যান্য নেতৃস্থানীয় সাহাবীগণ এ বাহিনীতে যোগ দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিশাল বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে 'উসামা ইবনে যায়েদকে' নিয়োজিত করেন। তখনো তার বয়স ছিল বিশ বছরের চেয়েও কম।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে রোম সাম্রাজ্যের 'সাজা' অঞ্চলের 'আল বাল্কা' ও 'আদ্দারুম' দুর্গ পর্যন্ত অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন।

সৈন্যদের বিদায় মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং অসুস্থতা দিন দিন বেড়েই চলল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর স্বাস্থ্যের আশঙ্কাজনক অবস্থা অবলোকন করে এ বাহিনীর যাত্রা বিলম্বিত করা হলো। উসামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা দেন:

'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌছলে আমি ও আমার সাথীরা যারা যেতে চাইলেন, তাঁদের নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হলাম।'

দেখতে পেলাম যে, তিনি শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছেন। রোগের তাড়নায় তিনি কথা পর্যন্ত বলতে পারছেন না। তিনি শুধু আকাশের দিকে তাঁর দু'হাত মুবারক উঠালেন এবং হাত দু'খানা আমার ওপর রাখলেন। আমি তাতে বুঝলাম যে, তিনি আমার জন্য দু'আ করছেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ মুবারক থেকে তাঁর পবিত্র রূহ চিরবিদায় নিয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেল। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে খিলাফতের বাইআত সম্পন্ন হলে আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উসামা রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাহিনীকে রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দিলেন।

কিন্তু আনসারদের একটি ক্ষুদ্র অংশ এ অভিযান আরো বিলম্বিত করার পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁরা উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে আবেদন করেন যে: 'তিনি যেন খালীফাতুল মুসলিমীন আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে দেখা করে তাঁদের এ দাবি উপস্থাপন করেন।'

আনসারদের সেই ক্ষুদ্র দলটি উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মাধ্যমে আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে এই শর্তে দাবি জানালেন, যদি আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে আমাদের পক্ষ থেকে উসামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নেতৃত্বে জিহাদে অংশ নিয়ে রওয়ানা হতে কোনোই আপত্তি থাকবে না। খালীফাতুল মুসলিমীনের কাছে এ প্রস্তাব উত্থাপন করুন, তিনি যেন অল্প বয়সী উসামার পরিবর্তে বয়ঃপ্রাপ্ত ও অধিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যে কোনো ব্যক্তিকে এ গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে সেনাপতি নিয়োগ করেন। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আনসার মুজাহিদদের ক্ষুদ্র দলটির এ প্রস্তাব নিয়ে আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট উত্থাপন করার উদ্দেশ্যে দেখা করেন। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর মুখে আনসারদের এই প্রস্তাব উচ্চারণ মাত্রই তিনি এক লাফে উঠে দাঁড়ান এবং সাথে সাথে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দাড়ি ধরে ক্রুদ্ধ স্বরে বলতে লাগলেন :

'হে ইবনে খাত্তাব, তোমার মা তোমার জন্য বিলাপ করুন .....এবং তোমাকে চিরবিদায় করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসামাকে সেনাপতি নিযুক্ত করেছেন, আর তুমি তাকে অপসারণের প্রস্তাব নিয়ে এসেছ? আল্লাহর শপথ! তা কখনো হতে পারে না এবং হবে না।'

উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের নিকট ফিরে এলে তারা আলোচনার ফলাফল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি উত্তরে বললেন : 'আপনারা উসামার নেতৃত্বেই অভিযানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ুন। আপনাদের মা আপনাদের হারিয়ে ফেলুক। আপনাদের প্রস্তাব উপস্থাপন করতে গিয়ে খালীফাতুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কী যে অপমানিত হয়েছি...।'

যুবক সেনাপতি উসামা ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার নেতৃত্বে এই বিশাল বাহিনী মদীনা থেকে রওয়ানা হলে উসামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ঘোড়ায় চড়ে এই বাহিনীর আগে আগে চলছিলেন আর খালীফাতুর রাসূলুল্লাহ আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর সাথে হেঁটে হেঁটে মদীনার সীমানা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিলেন। উসামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বলেন :

'হে আল্লাহর রাসূলের খলীফা, আল্লাহর শপথ! হয় আপনি ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে আমাদের এগিয়ে দিন, অন্যথায় আমি নিজেই নিচে নেমে আপনার সাথে হেঁটে হেঁটে অগ্রসর হব।'

আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন :
'আল্লাহর শপথ! তুমি ঘোড়ার পিঠ থেকে নামতে পারবে না। আল্লাহর শপথ! আমিও ঘোড়ায় উঠব না। আমি কি জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর পথে একটি ঘণ্টা নিজের পা দুটি ধূলিমলিন করব না?'

অতঃপর তিনি উসামাকে বললেন :
'তোমার দীন, আমানতদারী এবং উত্তম পরিণতির জন্য আল্লাহর কাছে সোপর্দ করছি। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যতদূর পর্যন্ত অভিযান পরিচালনার জন্য তোমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, সে পর্যন্ত অভিযান চালানোর জন্য উপদেশ দিচ্ছি।'

অতঃপর আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উসামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললেন:
'যদি তুমি উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আমার সহযোগিতার জন্য মদীনাতে থাকার অনুমতি দেওয়া পছন্দ কর, তাহলে তাকে মদীনায় অবস্থানের অনুমতি দাও।'

আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এই অনুরোধের প্রেক্ষিতে উসামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মদীনায় অবস্থানের জন্য ফেরৎ পাঠান।

অতঃপর উসামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ মোতাবেক এই অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে 'তুখুমুল বাল্কা' ও ফিলিস্তীনের 'আদ্দারুম দুর্গ' এবং কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত জয় করেন। এই বিজয়ের ফলে রোম সম্রাটের মধ্যে ভয়াবহ ভীতি ও চরম আতঙ্কের সৃষ্টি হয় ও মুতার যুদ্ধে পরাজয়ের পর মুসলমানদের অন্তরে প্রতিষ্ঠিত রোমানদের প্রতি ভয়ভীতি চিরতরে দূরীভূত হয়ে যায়। শুধু তা-ই নয়, সমস্ত মুসলমানের জন্য সিরিয়া এলাকা, মিসর ও উত্তর আফ্রিকাসহ আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত বিজয়ের পথ সুগম হয়ে উঠে, যার মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের পরিধির বিস্তৃতি সম্ভব হয়।

এই অব্যাহত বিজয়ের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উসামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেই ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করেছিলেন, যে ঘোড়ার পিঠে তাঁর পিতা শহীদ হয়েছিলেন। তাঁর সাথে আজ বিজয়ের গৌরব ও যোদ্ধাদের বহনকৃত মালে গনীমতের অঢেল সম্পদ। যে সম্পদ সম্পর্কে বলা হয়:

'উসামা ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাহিনীর মতো রক্তপাতবিহীন এবং মালে গনীমতের অঢেল সম্পদ অর্জন আর কোনো সেনাপতির সময়ে সম্ভব হয়নি।'

উসামা ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর সমস্ত জীবন মুসলমানদের সম্মান ও শ্রদ্ধা এবং ভক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন। যেমন ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের অনুগত ও নিবেদিত তেমনই ছিলেন অত্যন্ত স্নেহধন্য।

উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার চেয়ে উসামা ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার জন্য অধিক সরকারি ভাতা নির্ধারণ করলে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর পিতা উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে আপত্তি জানিয়ে বলেন:

'হে পিতা! আপনি উসামা ইবনে যায়েদের জন্য নির্ধারণ করেছেন চার হাজার দিরহাম আর আমার জন্য তিন হাজার দিরহাম! তার পিতা তো আপনার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না। তেমনি সেও আমার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ নয়।'

উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাকে বলেন:
'তোমার এ অহমিকার জন্য তোমাকে ধিক্কার। তুমি বাস্তবতার চেয়ে অনেক দূরে অবস্থান করছ। নিঃসন্দেহে উসামার পিতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তোমার পিতার চেয়ে অধিক প্রিয় ছিলেন। তেমনি সে নিজেও তোমার চেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অনেক বেশি প্রিয়।'

পিতার এ কথা শুনে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা অত্যন্ত বিনয় ও সন্তুষ্টচিত্তে তার জন্য ধার্যকৃত ভাতায় রাজি হয়ে গেলেন। উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে উসামা ইবনে যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার সাক্ষাৎ হলে তিনি বলতেন:

'মারহাবা! খোশ আমদেদ! হে আমার আমীর!'

জনৈক ব্যক্তি উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ উক্তিতে আশ্চর্যান্বিত হলে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আমার আমীর নিযুক্ত করেছিলেন।'

আল্লাহ এই বিরাট গুণাবলিসম্পন্ন মহান ব্যক্তির ওপর তাঁর করুণা ও মহব্বতের হাত সম্প্রসারণ করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের মধ্যে এমন গুরুত্বপূর্ণ, মহান ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, বহুমুখী গুণের অধিকারী প্রাণপুরুষ ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া নিঃসন্দেহে দুরূহ।

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ (তাবআ-মুস্তাফা মুহাম্মদ): ১ম খণ্ড, ৪৬ পৃ.। ২. আল ইসতিআব (হাশিয়াতুল ইসাবাহ): ১ম খণ্ড, ৩৪-৩৬ পৃ.। ৩. তাকরীবুত তাহযীব: ১ম খণ্ড, ৫৩ পৃ.। ৪. তারীখুল ইসলাম লিয্যাহাবী: ২য় খণ্ড, ২৭০-২৭২ পৃ.। ৫. আত তাবাকাতুল কুবরা : ৪র্থ খণ্ড, ৬১-৭২ পৃ.। ৬. আল-ইবার: ১ম খণ্ড, ৯৫ পৃ.। ৭. মিন আবতালেনা আল্লাযীনা সানউ আত্ তারীখ: লিআবিল ফাতুহ আত্ তিউনিস। ৮. কাদাতুফতুহুশাম ওয়াল মেসের। ৯. আল আ'লাম ও তার সংস্করণ দ্রষ্টব্য- ২৮১-২৮২ পৃ.।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00