📄 আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)
নিঃসন্দেহে তিনি তরুণ। কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞা, জ্ঞান, দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা অভিজ্ঞ জ্ঞানবান বৃদ্ধের ন্যায়। যেমন জ্ঞানপিপাসু, তেমনি মহান। -উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)
শীর্ষস্থানীয় শ্রদ্ধাভাজন ও মর্যাদাবান যেসব সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহুম সকলের কাছে ছিলেন অতি সম্মানিত, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁদের অন্যতম। এতদসত্ত্বেও তাঁর ছিল পৃথক কিছু বৈশিষ্ট্য। বয়সে তরুণ হওয়া সত্ত্বেও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সার্বক্ষণিক সাহচর্য লাভে ধন্য হয়েছিলেন। সম্পর্কের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আপন চাচাত ভাই। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। এজন্য তাঁকে বলা হতো উম্মতের শ্রেষ্ঠ আলেম বা 'হাবরুল উম্মাহ'। তিনি নিয়মিত নফল রোযা রাখতেন, তাওবা-ইসতিগফার করতেন এবং রাতভর নফল ও তাহাজ্জুদ নামায আদায় করতেন। আল্লাহর ভয়ে তিনি এমনভাবে ক্রন্দন করতেন যে দু'চোখের পানিতে বুক ভেসে যেত।
নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন উম্মতে মুহাম্মাদীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ খোদাপ্রেমিক। আল কুরআনের অর্থ অনুধাবনের ক্ষেত্রে তিনি যেমন ছিলেন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, তেমনি এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণেও ছিলেন উলামায়ে সাহাবীদের শীর্ষস্থানীয় ও অদ্বিতীয়। জটিল বিষয়ের নিগূঢ় তত্ত্ব উপলব্ধির ক্ষেত্রে তাঁর প্রজ্ঞা ছিল খুবই প্রখর। নৈতিক প্রভাব বিস্তারেও তার জুড়ি ছিল না।
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের তিন বছর পূর্বে মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতিকালের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র তেরো বছর। এতদসত্ত্বেও উম্মতে মুসলিমার জন্য তিনি এক হাজার ছয়শত ষাটটি হাদীস হিফয করে রাখেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে যা সংযোজিত হয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাঁর মা তাঁকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হন। উদ্দেশ্য 'তাহনীকা' করণ বা তাঁর মুখের পবিত্র লালামিশ্রিত চর্বিত খেজুরের অংশবিশেষ নবজাতকের মুখে দিয়ে বরকত লাভ করা। মুখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র মুখের চর্বিত খেজুরের মাধ্যমে সর্বপ্রথম তাকওয়া ও হিকমত তাঁর দেহে প্রবেশ করে। وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا.
'যাকে হিকমত দান করা হয়েছে নিঃসন্দেহে তাকে অশেষ কল্যাণ দান করা হয়েছে।'
হাশেমী গোত্রের এই শিশু ধীরে ধীরে বড় হতে থাকেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেবায় নিমগ্ন থাকাকেই অধিক পছন্দ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিনি ওযূর পানি এনে দিতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে দাঁড়িয়ে গেলে তাঁর পেছনেই নামাযে দাঁড়াতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে বের হলে একই উটে তাঁর পিছনে বসে পড়তেন। এক কথায় উঠাবসা, চলাফেরা, যাতায়াত সব সময়ই আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ঠিক ছায়ার মতো লেগে থাকতেন।
তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যে হাদীস শুনতেন, সাথে সাথেই তা মুখস্থ করে নিতেন।
একবার একটি ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন:
'একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযূর ইচ্ছা করলে আমি বিষয়টি আঁচ করে তৎক্ষণাৎ ওযূর পানি এনে দেই। আমার তৎপরতা ও অনুধাবনশক্তির এ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই আনন্দিত হন। তিনি নামাযের প্রস্তুতি নিলে আমাকে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্য ইঙ্গিত করেন। আমি তাঁর পাশে না দাঁড়িয়ে পিছনে গিয়ে দাঁড়াই।
নামাযশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে লক্ষ্য করে বললেন:
'আবদুল্লাহ! তুমি কেন আমার পাশে না দাঁড়িয়ে পিছনের সারিতে দাঁড়ালে?'
আমি উত্তরে আরয করলাম:
ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার দৃষ্টিতে আপনি সম্মানিত ও শ্রদ্ধাভাজন হওয়ায় আমি আপনার পাশে দাঁড়ানো বেয়াদবী মনে করেছি।
আমার উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দভরে তাঁর দু'হাত আকাশের দিকে তুলে দু'আ করলেন:
اللَّهُمَّ أَنِهِ الْحِكْمَةَ .
'হে আল্লাহ, তুমি তাকে হিকমত, বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞা দান করো।'
সাথে সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ দু'আ কবুল করলেন। সে যুগের বহু খ্যাতিমান, বিচক্ষণ ও প্রজ্ঞাবানের চেয়ে হাশেমী গোত্রের এ শিশুটিকে আল্লাহ তাআলা শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত করেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার বিচক্ষণতার অনেক উদাহরণ আছে। নিম্নোক্ত উদাহরণটি সবিশেষ উল্লেখ্য:
মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বিরোধকে কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যোদ্ধা যখন তাঁর থেকে আলাদা হয়ে গেল, তখন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে প্রস্তাব দিলেন:
'আমীরুল মুমিনীন! আপনি অনুমতি দিলে আপনার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া যোদ্ধাদের সাথে আলোচনা করে আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করতে চাই।'
আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আমি আশঙ্কা করছি যে, তারা তোমার ওপর কোনো অন্যায় না করে বসে।'
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন:
'তা হতেই পারে না।'
আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে অনুমতি নিয়ে যখন তিনি খারেজী সম্প্রদায় অর্থাৎ আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া যোদ্ধাদের কাছে পৌঁছেন, তখন দেখতে পেলেন, তারা নামায ও ইবাদত-বন্দেগীতে খুবই একাগ্র ও একান্ত মনোযোগী।
তারা আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মোবারকবাদ জানিয়ে বললেন:
'কি উদ্দেশ্যে আপনার আগমন?'
তিনি বললেন : 'আপনাদের সাথে আলোচনা করার জন্য এসেছি।'
ইবনে আব্বাসের আলোচনার কথা জানতে পেরে তারা দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল।
কেউ কেউ বলল:
'ইবনে আব্বাসের সাথে কোনো আলোচনা করা যাবে না।'
অপর পক্ষ থেকে বলা হলো:
'আহ্! কেন বাধা দেওয়া হচ্ছে? তিনি কী বলতে এসেছেন বলতে দিন।'
পরিশেষে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আলোচনার অনুমতি দেওয়া হলো।
তখন তিনি তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন:
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাত ভাই ও তাঁর জামাতা আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, যিনি সর্বপ্রথম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান এনেছেন। আমি জানতে চাই, তাঁর বিরুদ্ধে আপনাদের কী কী অভিযোগ ও কেনই বা আপনারা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে চলে এসেছেন?'
তারা সমস্বরে উত্তর দিল: 'যেসব অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছি, তা প্রধানত তিনটি।'
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা জিজ্ঞেস করলেন: 'অভিযোগগুলো কী কী?'
তারা উত্তর দিল: 'তাঁর ও মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মধ্যকার বিরোধের নিষ্পত্তির জন্য প্রথমত দুই ব্যক্তিকে বিচারক মেনে নিয়ে তিনি শরীআতের সীমারেখা লঙ্ঘন করেছেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা ও মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন অথচ এ যুদ্ধে 'গনীমতের মাল' গ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি ও পরাজিত মহিলাদের বন্দিনী করতেও দেননি।
তৃতীয়ত, তিনি নিজের নামের শেষাংশ থেকে 'আমীরুল মুমিনীন' উপাধি বাদ দিয়েছেন অথচ মুসলমানেরা তাঁর হাতে বাইআত গ্রহণ ও তাঁকে তাদের আমীর নিযুক্ত করেছেন।'
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'আমি যদি কুরআন ও হাদীসের দলীল-প্রমাণের মাধ্যমে আপনাদের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে সমর্থ হই, তাহলে কি আপনারা আপনাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন? আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে আবার যোগ দেবেন?
তারা উত্তর দিল : 'অবশ্যই।'
তখন ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বললেন: 'আপনাদের অভিযোগ যে, আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দুই ব্যক্তিকে বিচারক মেনে নিয়ে শরীআতের সীমা লঙ্ঘন করেছেন। অথচ আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে: يٰأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنْتُمْ حُرُمٌ وَمَنْ قَتَلَهُ مِنْكُمْ مُتَعَمِّدًا فَجَزَاءٌ مِّثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِّنْكُمْ.
'হে ঈমানদারগণ! ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শিকার করো না। তোমাদের কেউ যদি জেনে-বুঝে এরূপ অপরাধ করে, তবে শিকারের সমপরিমাণ একটি জন্তু তাকে কুরবানী করতে হবে। সে সম্পর্কে ফায়সালা করবে তোমাদের মধ্য হতে দু'জন সুবিচারক ব্যক্তি।' (সূরা মায়িদা: ৯৫)
হে ভায়েরা! আল্লাহর কসম দিয়ে আপনাদের বলছি, সিকি দিরহামের খরগোশের তুলনায় মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও সংশোধন, কলহ-বিবাদের পরিসমাপ্তি, তাদের পারস্পরিক রক্তপাত বন্ধের এবং বিবদমান দু'পক্ষের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য দু'ব্যক্তির ওপর ফায়সালার ভার দেওয়াটাই কি অধিক যুক্তিসঙ্গত নয়? এ জন্য দু'জন বিচারক নির্ধারণ করা কি শরীআত লঙ্ঘিত অপরাধ?
তারা উত্তর দিল : 'হ্যাঁ! তাহলে মুসলমানদের রক্তপাত বন্ধের ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের খাতিরে বিচারক নিযুক্ত করাটাই নিঃসন্দেহে অধিক যুক্তিসঙ্গত।'
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জিজ্ঞাসা করলেন: 'যথার্থ উত্তর দানের মাধ্যমে কি আপনাদের প্রথম প্রশ্নের পরিসমাপ্তি ঘটাতে পেরেছি?'
তারা উত্তর দিলো: 'আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আমরা প্রথম প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পেয়েছি।'
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'আপনাদের দ্বিতীয় প্রশ্ন, আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যুদ্ধ করেছেন অথচ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারিণীদেরকে বন্দী করেননি, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করেছেন। আপনারা কি চেয়েছেন যে, আপনাদের মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে বন্দী করা উচিত ছিল? যেমনটি করা হতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে? যে যুগে এ ধরনের বন্দিনীদের বাঁদী ও স্ত্রী হিসেবে যোদ্ধাদের জন্য বৈধ করে দেওয়া হতো?'
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'যদি আপনারা হ্যাঁ-সূচক উত্তর দেন, সে ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে কাফির হয়ে যাবেন। আর যদি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে 'মা' বলে পরিচয় দিতে অস্বীকার করেন, তবু কাফির হয়ে যাবেন। কেননা, পবিত্র কুরআন মাজীদের আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন: النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهُتُهُمْ .
'নিশ্চয়ই নবী ঈমানদার লোকদের পক্ষে তাদের নিজেদের অপেক্ষাও অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য এবং নবীর স্ত্রীগণ তাদের 'মা'। (সূরা আহযাব : ৬)
এখন আপনারা এ দুটি উত্তরের যে কোনো একটি বেছে নিন।
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ প্রশ্নে সবাই নীরব ও নিশ্চুপ হয়ে গেল। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জিজ্ঞাসা করলেন: 'আপনারা কি আপনাদের দ্বিতীয় প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পেয়েছেন?'
তারা সমস্বরে উত্তর দিল: 'খোদার শপথ! আমরা দ্বিতীয় প্রশ্নের অত্যন্ত সন্তোষজনক উত্তর পেয়েছি।'
তখন ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরে বললেন: 'আপনাদের অভিযোগ যে, আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর নাম থেকে 'আমীরুল মুমিনীন' উপাধি মুছে ফেলেছেন। এ ক্ষেত্রে হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রাক্কালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টান্ত আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। মুশরিকীনে মক্কার সাথে হুদাইবিয়া সন্ধির শর্তাবলিতে এ কথা উল্লেখ করা হয় যে, এই চুক্তি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে সম্পাদিত হচ্ছে। তখন মক্কার মুশরিকরা আপত্তি করে বলেছিল, আমরা যদি আপনাকে রাসূলই মেনে নেই, তাহলে মক্কায় প্রবেশে বাধা কেন? এবং আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধেই বা লিপ্ত কেন? তাই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর স্থলে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ লিখুন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এ শর্ত এই বলে মেনে নেন যে: وَاللَّهِ إِنِّي لَرَسُولُ اللَّهِ وَإِنْ كَذَّبْتُمُونِي .
'আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল, তোমরা যতই অস্বীকৃতি জানাও না কেন?'
এ উদাহরণ পেশ করার পর ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন: 'তৃতীয় অভিযোগের যথার্থ উত্তর পেয়েছেন কি?'
তারা সমস্বরে বলে উঠল: 'আল্লাহর শপথ! আমরা সন্তোষজনক জবাব পেয়েছি।'
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বিচক্ষণতা, প্রজ্ঞা এবং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এ আলোচনা চলার ফলে দলছুট ২০,০০০ (বিশ হাজার) যোদ্ধা সঙ্গীসাথী পুনরায় আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে যোগদান করে বৈধ ও ইসলামী সরকারের আনুগত্য স্বীকার করলেন। অবশিষ্ট ৪,০০০ (চার হাজার) যোদ্ধা প্রতিহিংসা, হঠকারিতা ও জিদের বশবর্তী হয়ে খারেজী সম্প্রদায় পরিচয়ে বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত হয়ে পড়ে।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শিশুকাল থেকেই অসাধারণ বিদ্যানুরাগী ছিলেন। বিদ্যার্জনের পথে ধারণাতীতভাবে প্রচেষ্টা ও নানাবিধ সাধনা অব্যাহত রেখেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবিতাবস্থায় যতদিন সম্ভব হয়েছে, সরাসরি নবুওয়াতের ঝর্নাধারা থেকে জ্ঞানের পিপাসা নিবৃত্ত করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর তিনি সে পিপাসা নিবৃত্ত করার জন্য 'উলামাউস্ সাহাবা' বা সাহাবীদের মধ্যে যারা আলেম ছিলেন, তাঁদের সাহচর্যে এসে তাঁদের জ্ঞানভাণ্ডার থেকে পরিতৃপ্তি লাভ করেছেন।
তিনি নিজের শিক্ষা জীবনের ঘটনা উল্লেখপূর্বক বলেন:
'একবার আমার কাছে সংবাদ পৌঁছল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক সাহাবীর কাছে এমন একটি হাদীস আছে, যা আমার জানা নেই। আমি তৎক্ষণাৎ তার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আমি এমন এক সময় তাঁর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম, যখন তিনি দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তখন তাকে না ডেকে তাঁর বাড়ির দরজায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। মরুভূমির দমকা বাতাসে আমার চাদরের উপর বালির স্তর পড়ে গেল। অথচ আমি যদি দ্বিপ্রহরের এই প্রচণ্ড গরমে তার বাসায় প্রবেশের অনুমতি চাইতাম, তাহলে নিঃসন্দেহে তিনি আমাকে খোশ আমদেদ জানাতেন। আমি তার বিশ্রামকে আমার কষ্টের ওপর এ জন্যই প্রাধান্য দিয়েছিলাম, যেন তিনি দ্বিপ্রহরে খাওয়ার পর একটু অবসাদ দূর করে প্রশান্তি লাভ করতে পারেন।
তিনি ভিতর থেকে বেরিয়ে তাঁর বাড়ির দরজায় আমাকে এ অবস্থায় দেখতে পেয়ে বলেন:
'হে রাসূলুল্লাহর চাচাত ভাই! কী ব্যাপার? এ অবস্থায় আওয়াজ দেননি কেন? কী মনে করে এসেছেন? আমাকে ডেকে পাঠালে আমি নিজেই আপনার খিদমতে উপস্থিত হয়ে যেতাম।'
আমি তাঁকে উত্তরে বললাম:
'আপনার খিদমতে আমার উপস্থিতিটাই বেশি যুক্তিসঙ্গত। কারণ, ইলম শিক্ষা দেওয়া হয়, তা এমনিই আসে না। অতঃপর আশ্বস্ত হওয়ার পর তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি।'
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বিদ্যা অর্জনের পথে যেমন নিজেকে অত্যন্ত নগণ্য মনে করতেন, কোনোরূপ গর্ব-অহংকার হৃদয়ে স্থান দিতেন না, তেমনি আলেমদেরকে অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতেন। খিলাফাতে রাশিদার যুগে মদীনা মুনাওয়ারার শ্রেষ্ঠতম ফিক্হবিদ, বিচারশাস্ত্রের অন্যতম পারদর্শী ব্যক্তিত্ব, ইলমুল কিরাআত ও ফারায়েযশাস্ত্রের ইমাম এবং 'কাতিবে ওহী' বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ কুরআন মাজীদের বাণীসমূহের সর্বপ্রথম লিপিবদ্ধকারী যায়েদ ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে সংঘটিত একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
একদিন যায়েদ ইবনে সাবেত তাঁর অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করার জন্য প্রস্তুত। হাশেম গোত্রের এই বালক আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস যায়েদ ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সামনে এক হাতে তাঁর ঘোড়ার লাগাম এবং অন্য হাতে পা দানী ধরে এমনভাবে দাঁড়িয়ে যান, যেমন একজন ক্রীতদাস তার প্রভুর সম্মানে শ্রদ্ধাভরে দাঁড়িয়ে থাকে।
যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাকে বললেন:
'হে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাত ভাই। অনুগ্রহপূর্বক ঘোড়ার লাগাম ও রেকাব ছেড়ে দিন।'
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জবাব দিলেন:
'উলামায়ে ইসলামকে এভাবেই সম্মান প্রদর্শন করার জন্য আমরা নির্দেশিত হয়েছি।'
যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তা শোনামাত্র ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললেন:
'আপনার হাতখানা একটু দেখি।'
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর উদ্দেশ্যে হাত বাড়ানো মাত্রই যায়েদ ইবনে সাবিত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর হাতের দিকে ঝুঁকে পড়েন ও তাঁকে চুম্বন দিয়ে বলেন:
'আমরাও আমাদের নবীর আহলে বাইতের সদস্যদের সাথে এমনিভাবে সম্মান প্রদর্শন করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি।'
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বিদ্যা অর্জনের জন্য এমনভাবে মনোনিবেশ করেন যে, তিনি সর্বশাস্ত্রে আশ্চর্যজনকভাবে গভীর ব্যুৎপত্তি ও পাণ্ডিত্য লাভ করেন। অন্যতম প্রসিদ্ধ 'তাবেঈ' মাসরূক ইবনে আল আজদা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু' ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সম্পর্কে বলেন:
'যখন তাঁর দৈহিক কাঠামো ও অবয়বের প্রতি দৃষ্টিপাত করতাম তখন বলতাম যে, একজন সুপুরুষ। যখন কথাবার্তা বলতেন, তখন বলতাম যে, একজন বিশুদ্ধভাষী। আর যখন কোনো আলোচনায় অংশ নিতেন তখন বলতাম, সবচেয়ে জ্ঞানী ও বিজ্ঞ।'
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বিদ্যানুরাগীদের এ অসাধারণ ভিড় লাঘবের উদ্দেশ্যে এক এক দিন এক এক বিষয়ে প্রশ্নোত্তর ও আলোচনা করার সময়সূচি নির্ধারণ করে দেন। যেমন সপ্তাহে একদিন শুধু তাফসীর বিষয়েই আলোচনা করতেন। অপর দিন শুধু ফিক্হ, তার পরের দিন মাগাযী বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে সংঘটিত যুদ্ধসমূহের ওপর আলোচনা করতেন। অন্যদিন শুধু কবিতা, অপর দিন আরবদের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতেন। তাঁর ক্লাসে এমন কোনো আলেম বসতেন না, যিনি তাঁর আলোচনায় মুগ্ধ না হতেন এবং এমন কোনো প্রশ্নকারী ছিলেন না যে, তাঁর সন্তোষজনক উত্তরে সন্তুষ্ট না হতেন।
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যুবক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ইলম ও পাণ্ডিত্য এবং ব্যুৎপত্তির গুণে খিলাফতে রাশিদার একজন অন্যতম উপদেষ্টা পদে অধিষ্ঠিত হন। খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যদি কোনো জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতেন, তখন তিনি পরামর্শের জন্য নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও গুণীজনসহ ইসলামের প্রথম যুগে ঈমান গ্রহণকারী শ্রদ্ধাভাজন সাহাবীদেরকে আহ্বান করতেন। তিনি তাদের সাথে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকেও আমন্ত্রণ জানাতেন। এসব মহতী পরামর্শ পরিষদের বৈঠকে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উপস্থিত হলে উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে খুবই সম্মান করতেন, নিজের পাশে বসাতেন এবং বলতেন:
'আমরা কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। এ ব্যাপারে আপনার সুনির্দিষ্ট মতামত ও সুচিন্তিত পরামর্শ একান্তই কাম্য।'
যুবক সাহাবী ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে মুরব্বী ও বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবীদের সমপর্যায়ের পদমর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে একদা প্রতিবাদ জানানো হলে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জবাব দেন:
إِنَّهُ فَتَى الْكُهُولُ، لَهُ لِسَانٌ سَؤُولٌ وَقَلْبٌ عَقُولٌ .
'নিঃসন্দেহে তিনি একজন তরুণ; কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞা, জ্ঞান, দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা, অভিজ্ঞ জ্ঞানবান বৃদ্ধের ন্যায়। তিনি যেমনি জ্ঞানপিপাসু তেমনি মহান।'
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জ্ঞানপিপাসু আলেম-ওলামা ও ছাত্রদের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে গিয়ে সাধারণ মুসলমানদেরকে মোটেই ভুলে যাননি। তাদের জন্যও রীতিমতো ওয়ায-মাহফিল ও আলোচনাসভা ইত্যাদির আয়োজন করতেন। পথহারা, বিপথগামী গুনাহগারদের উদ্দেশ্যে দেওয়া তাঁর ভাষণের কিয়দংশ উদ্ধৃত করা হলো:
'হে পথহারা বিপথগামী ভাইয়েরা! কখনোই আপনারা আপনাদের কৃত গুনাহের পরিণতি থেকে নিজেদেরকে ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে মনে করবেন না। জেনে রাখুন, নাফস বা কুপ্রবৃত্তির দাসত্বই মানুষকে কবীরা গুনাহ বা মহাপাপে লিপ্ত করে। আপনার ডানে ও বামে সার্বক্ষণিক দু'জন ফেরেশতার উপস্থিতিতে অপকর্মে লিপ্ত হওয়াতে লজ্জাবোধ না করা কিন্তু সাধারণ ও ছোট গুনাহ নয়।
গুনাহকে হাস্য ও তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উড়িয়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে কবীরা গুনাহ বা মহাপাপ। যার পরিণতিতে আল্লাহ ভীষণ সাজা দিতে পারেন। কোনো অপকর্ম বা পাপ করে খুশি হওয়া বা আনন্দ করা যেমন মহাপাপ, তেমনি পাপাচারে বা গুনাহের কাজে কৃতকার্য না হয়ে দুঃখ প্রকাশ করাও মহাপাপ।
আল্লাহ দেখছেন- এ অনুভূতিকে উপেক্ষা করে, গুনাহের কাজে লিপ্তাবস্থায় অন্তরে প্রকম্পন ও ভীতি অনুধাবন না করে, গোপনে কৃত পাপকার্যের সংবাদ বের হয়ে পড়ার আশঙ্কা করাও নিঃসন্দেহে কবীরা গুনাহ বা মহাপাপ।
আপনারা কি জানেন? আইয়ুব আলাইহিস সালামের গোনাহ কী ছিল? যার কারণে আল্লাহ তাঁকে ধনসম্পত্তি ও দৈহিক শাস্তির পরীক্ষায় ফেলেছিলেন? তাঁর ত্রুটি এতটুকুই ছিল যে, 'এক মিসকীন তাঁর ওপর কৃত অত্যাচার লাঘবের জন্য তাঁর নিকট সাহায্যের আবেদন করেছিল; কিন্তু তিনি তাঁকে সাহায্য করেননি বলেই তাঁর সে পরীক্ষা।'
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার কথাবার্তা কখনোই সাম স্যহীন লোকদের মতো ছিল না। যারা নিজেরা খারাপ কাজে লিপ্ত হয়ে অন্যদের তা থেকে বিরত থাকার উপদেশ প্রদান করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তিনি দিনের বেলায় রোযা রাখতেন এবং রাত্রিতে তাহাজ্জুদ নামাযে নিমগ্ন থাকতেন।
আবদুল্লাহ ইবনে মুলাইকা বর্ণনা করেন যে: 'আমি একবার ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার সাথে মক্কা থেকে মদীনায় যেতে সঙ্গী হয়েছিলাম। কাফেলা সারাদিন পথ অতিক্রম করার পর রাত্রি যাপনের জন্য যখন কোনো মনযিলে যাত্রাবিরতি করত, তখন দেখতাম অত্যন্ত ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত সঙ্গী-সাথীরা অবসাদ দূরীকরণের জন্য গভীর নিদ্রায় নিমজ্জিত হতো। অন্যদিকে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মধ্যরাত থেকেই তাহাজ্জুদ ও নফল নামাযে নিমগ্ন হতেন।'
এ সফরের এক রাতের অবস্থা ছিল এই: وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ، ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ .
'অতঃপর এই মৃত্যু-যন্ত্রণা পরম সত্য হয়ে উপস্থিত হলো। এ সেই মৃত্যু যা থেকে তুমি পালিয়ে বেড়াতে।' (সূরা কাফ: ১৯)
এ আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে তিনি ব্যাকুল হয়ে উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করছিলেন। এমনকি এ অবস্থায়ই ফজর হয়ে যায়।
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা ছিলেন সুশ্রী, সুপুরুষ ও আকর্ষণীয় চেহারার অধিকারী। রাতভর কান্নারত অবস্থায় অতিবাহিত করার কারণে তাঁর দু'চোখ দিয়ে ঝরে পড়া পানির দাগ এমন মনে হতো, যেন তাঁর দু'গালে চিকন দুটি কালো ফিতার মতো দাগ পড়েছে।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা সাহাবীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ আলেম হিসেবেই শুধু সুখ্যাতি অর্জন করেননি বরং অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন।
মুসলিম বিশ্বের খলীফা মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু একবার হজ্জ পালনে আসেন। অপরদিকে রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়া ও সরকারি পদবিহীন সাধারণ জীবন যাপনকারী ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাও সে বছর হজ্জে আসেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় সরকারি লোকজনের দ্বারা মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তাঁবুর শোভা বর্ধন করা হয়েছিল। অপরদিকে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার তাঁবুতে সারা মুসলিম বিশ্ব থেকে আসা তাঁর অনুসারী এবং জ্ঞানপিপাসুদের বিরাটসংখ্যক উপস্থিতি মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থানকে ম্লান করে দেয়।
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা ৭১ বছর বেঁচে ছিলেন। সাধনা, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান, হিকমত ও তাকওয়ার শিক্ষায় তিনি তাঁর যুগকে উজ্জ্বল করে গিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিজ্ঞ ও বুযুর্গ সাহাবীদের মধ্যে যারা জীবিত ছিলেন, তাঁদের এবং প্রসিদ্ধ তাবেঈদের উপস্থিতিতে আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ছেলে মুহাম্মাদ আল হানাফিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু' তার জানাযা নামাযের ইমামতি করেন। যখন তাঁকে কবরস্থ করা হচ্ছিল, তখন উপস্থিত বিশাল জনতা অদৃশ্য তিলাওয়াতকারীর উঁচু আওয়াজে আল কুরআনের এ আয়াতগুলোর তিলাওয়াত শুনতে পান।
يَأَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَّرْضِيَّةٌ . فَادْخُلِي فِي عِبْدِي وَادْخُلِي جَنَّتِي .
'হে প্রশান্ত আত্মা! তোমার রবের দিকে উত্তম পরিণতির জন্য সন্তুষ্টচিত্তে প্রত্যাবর্তন করো। আমার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং জান্নাতে প্রবেশ করো।' (সূরা ফাজর: ২৭-৩০)
টিকাঃ
১. মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে আবী তালিবকে তাঁর মা হানাফিয়ার পরিচয়ে এ জন্য পরিচিত করানো হয়েছে, যেন ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তান হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা থেকে পার্থক্য বোঝা যায়। আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ছেলে মুহাম্মদ হলেন বনু হানাফিয়া গোত্রের তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভের সন্তান। ২. মারবিয়াতে আল ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ফী আত্ তাফীর গ্রন্থের ৪র্থ খণ্ডে ৩৪৮-৩৪৯ পৃষ্ঠায় এ ব্যাপারে এ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন, যা নিম্নরূপ: عن سعيد بن جبير قال : مات ابن عباس بالطائف فشهدت جنازته، فجاء طائر لم ير على خلقته حتى دخل في نعشه ثم لم يرخارجا منه فلما دفن تليت هذه الآية على شفير القبر لا يرى من تلاها ..... 'সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রা) বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) তায়েফে ইনতিকাল করেন। আমি তাঁর জানাযার নামাযে অংশগ্রহণ করি। হঠাৎ এমন একটি পাখি, যা কখনো প্রত্যক্ষ করা হয়নি, এসে তার কফিনে ঢুকে পড়ে। অতঃপর এ পাখীকে কেউ কফিন থেকে বের হতে দেখেনি। এমনিভাবে তাঁকে দাফন করা হলে কবর থেকে অদৃশ্য তিলাওয়াতকারীর উঁচু আওয়াজে এই আয়াত তিনটির তিলাওয়াত করতে শোনা যায়। অনুবাদক। ১. জামেউল উসূল: ১০ম খণ্ড (ফাযায়েলুস সাহাবা অধ্যায়)। ২. আল ইসাবাহ: ৪৭৮১নং জীবনী। ৩. আল ইসতিয়াব: আল-হামেশে সাহাবা, ২য় খণ্ড, ৩৫০পৃ.। ৪. উসদুল গাবা: ৩য় খণ্ড, ১৯২ পৃঃ। ৫. সিফাতুস সাফওয়া: ১ম খণ্ড, ৭৪৬ পৃ: (হালাব সংস্করণ)। ৬. হায়াতুস সাহাবাহ: ৪র্থ খণ্ডের সূচি দ্রষ্টব্য। ৭. আল আ'লাম ও তার রেফারেন্সসমূহ।
📄 নু’মান ইবনে মুকাররিন আল মুযানী (রাঃ)
নিফাকের আশ্রয়ের জন্য যেমন ঘর বা পরিবারের প্রয়োজন, ঈমানের প্রতিপালনের জন্যও তেমনি ঘর বা পরিবারের প্রয়োজন। বনূ মুকাররিনের পরিবার ছিল নিঃসন্দেহে ঈমানের ঘর বা পরিবার। -আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু
মক্কা থেকে ইয়াসরিবগামী পথের পাশেই ছিল মুযাইনা গোত্রের আবাস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করে এসেছেন, সে সংবাদ এবং এ পথে আসা-যাওয়া পথিকদের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নানাবিধ প্রশংসার সংবাদাদি সর্বক্ষণই মুযাইনা গোত্রের লোকদের কাছে পৌঁছত। তাঁর সম্পর্কে কখনোই কোনো খারাপ সংবাদ তাদের নিকট পৌঁছেনি।
কোনো এক সন্ধ্যায় মুযাইনা গোত্রের সরদার নু'মান ইবনে মুকাররিন আল মুযান্নী নিজ গোত্রীয় অন্যান্য ছোট-বড় সরদারদের সাথে তার ক্লাবঘরে খোশগল্প করছিলেন। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে তিনি বললেন:
আমার গোত্রীয় ভাইয়েরা! আল্লাহর শপথ করে বলছি:
'মুহাম্মদ সম্পর্কে যা জেনেছি এবং তাঁর দাওয়াত সম্পর্কে যা শুনেছি, তাতে ন্যায়পরায়ণতা এবং অপরের মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা ছাড়া তাঁর দাওয়াতে অন্য কিছু দেখছি না। আর তা-ই যদি হয়, তাহলে এ কল্যাণ ও শান্তির ডাকে সাড়া দিতে আমরা কেন বিলম্ব করব? অথচ লোকজন এ আহ্বানে দ্রুত সাড়া দিচ্ছে। অতঃপর তিনি তার আলোচনা অব্যাহত রেখে বললেন :
'আমি নিজের ব্যাপারে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, কাল প্রভাতেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে হাজির হব। তোমাদের কেউ যদি আমার সাথে যাওয়ার ইচ্ছা কর, তাহলে রাতেই প্রস্তুত হও।'
নু'মান ইবনে মুকাররিনের ভাষণ ও ঘোষণা উপস্থিত লোকদের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করল। ফজর হতে না হতেই দেখা গেল, নু'মান ইবনে মুকাররিনের ১০ ভাই এবং মুযাইনা গোত্রের ৪০০ অশ্বারোহী যোদ্ধা তাঁর নেতৃত্বে ইয়াসরিবের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার জন্য তৈরি।
বলা বাহুল্য, তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নু'মান ইবনে মুকাররিন এই বিরাট কাফেলা নিয়ে কোনো হাদিয়া-উপঢৌকন ছাড়া হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হতে লজ্জাবোধ করছিলেন। এদিকে ক্রমাগত অনাবৃষ্টি ও ফসলহানি মুযাইনা গোত্রকে অত্যন্ত অভাবী করে তুলেছিল। অভাবের কারণে গোত্রের ঘরে ঘরে কোনো শস্যদানা ছিল না এবং গাভীর বাঁটেও ছিল না দুধ। তারপরও নু'মান ইবনে মুকাররিন নিজের ও অন্যান্য ভাইদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্য সামগ্রী ও বকরি পশুসমূহের যা কিছু অবশিষ্ট ছিল সেসব সংগ্রহ করে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খidমতে পেশ করার জন্য এই বিরাট কাফেলার আগে আগে চলতে থাকলেন। নু'মান ইবনে মুকাররিন আল মুযান্নী ও তাঁর বিপুলসংখ্যক সাথী-সঙ্গীদের আগমনের সংবাদ ইয়াসরিব শহরের আনাচে-কানাচে খুশির ঢেউ ছড়িয়ে দেয়। কারণ, এ পর্যন্ত আরবের কোনো গোত্র এ গৌরবের অধিকারী হতে পারেনি যে, একই পরিবারের ১১ জন সহোদর তাদের গোত্রের ৪০০ জন অশ্বারোহী যোদ্ধার সাথে একত্রে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন।
নু'মান ইবনে মুকাররিন আল মুযান্নীর ইসলাম গ্রহণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনন্দের সীমা ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে নু'মানের হাদিয়া ও তাদের উপঢৌকন প্রেরণ আল্লাহর পক্ষ থেকে গৃহীত হওয়ার ও ইসলাম গ্রহণের শুভ সংবাদে নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয়:
وَمِنَ الْأَعْرَابِ مَنْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَيَتَّخِذُ مَا يُنْفِقُ قُرُبَاتٍ عِنْدَ اللَّهِ وَصَلَوَاتِ الرَّسُولِ إِلَّا إِنَّهَا قُرْبَةٌ لَّهُمْ سَيُدْخِلُهُمُ اللهُ فِي رَحْمَتِهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ .
'মরুবাসীদের কেউ কেউ আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান রাখে এবং যা ব্যয় করে তা আল্লাহর সান্নিধ্য ও রাসূলের দু'আ লাভের উপায় মনে করে। বাস্তবিকই তা তাদের জন্য আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায়, আল্লাহ তাদেরকে নিজ রহমতে দাখিল করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' (সূরা তাওবা : ৯৯)
নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাওহীদী ঝাণ্ডার নিচে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন জিহাদে অংশ নিতে থাকেন। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতের শুরুতে ফিতনায়ে মুনকিরীনে নবুওয়াত তথা ভণ্ড নবী দাবিদারদের ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর মুযাইনা গোত্রের বীর মুজাহিদদের সাথে নিয়ে আমীরুল মুমিনীন আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মূলশক্তি হিসেবে সুসংগঠিত হন। তাদের বিরুদ্ধে জিহাদে অংশ নিয়ে ফিতনা সৃষ্টিকারীদের পরাভূত করেন।
উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতকালে তিনি এমন খিদমত পেশ করেন, যার কারণে তিনি ইসলামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। কাদেসিয়ার যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে মুসলিম সেনাপতি সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কাদেসিয়া থেকে নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নেতৃত্বে কিসরা বা পারস্য সম্রাট ইয়াযদজুদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য এক প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেন। পারস্যের রাজধানী মাদায়েনে উপস্থিত হয়ে এই প্রতিনিধিদল কিসরা বা সম্রাট ইয়াযদজুদের সাক্ষাৎ কামনা করলে তার সাথে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হলো।
অতঃপর দোভাষীকে ডেকে সম্রাট বলল:
'এই প্রতিনিধিদলকে জিজ্ঞাসা কর, তারা কী উদ্দেশ্যে আমাদের দেশে এসেছে এবং কী উদ্দেশ্যেই বা তারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে? তাদেরকে জানিয়ে দাও, হয়তো তোমরা আমাদের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করছ এবং আমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে চাইনি।'
সম্রাটের এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সম্বোধন করে বললেন:
'তোমরা কেউ ইচ্ছা করলে জবাব দিতে পার। আর যদি তোমরা ভালো মনে কর, তাহলে তোমাদের পক্ষ থেকে আমি এর উত্তর দিতে প্রস্তুত।'
তারা বললেন:
'বরং আপনিই এর উত্তর দিন।'
তারা সম্রাটকে সম্বোধন করে বললেন:
'আমাদের মুখপাত্র হিসেবে তিনি বক্তব্য রাখবেন। অতএব তাঁর বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনুন।'
অতঃপর নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠ করে তাঁর বক্তব্যে বলেন:
'আল্লাহ আমাদের ওপর করুণা করেছেন এবং আমাদের জন্য তাঁর রাসূল প্রেরণ করেছেন। যিনি আমাদের কল্যাণের পথের সন্ধান দেন এবং সে পথে চলার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। অকল্যাণ ও পাপাচারের স্বরূপ উদ্ঘাটন করেন এবং তা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। তিনি আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি যে পথে আহ্বান জানান, যদি আমরা সে পথের অনুসারী হই, তাহলে আল্লাহ আমাদের দীন ও দুনিয়ার সার্বিক কল্যাণ ও মঙ্গল দান করবেন। তাঁর এ আহ্বানে সাড়া দেওয়ায় অতি দ্রুত আল্লাহ আমাদের দারিদ্র্যকে প্রাচুর্যে পরিণত করেছেন। নীচতা, হীনতা, অসম্মানের বদলে ইজ্জত ও সম্মান দিয়েছেন। পরস্পরের শত্রুতা ও হানাহানিকে ভ্রাতৃত্ব ও আন্তরিকতায় রূপান্তরিত করেছেন। তিনি আমাদের আরও নির্দেশ দেন:
*আমরা যেন মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান জানাই এবং আমাদের প্রতিবেশীদের থেকে তা আরম্ভ করি।'
অতএব আমরা আপনাদেরকেও আমাদের আদর্শ গ্রহণ করতে আহ্বান জানাচ্ছি। ইসলাম এমন এক জীবন বিধান, যা মানবকল্যাণের সমস্ত কর্মকাণ্ডকে কল্যাণ ও সম্মানের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার প্রেরণা দেয়। ইসলাম মানবতার অকল্যাণ ও ক্ষতিকর সমস্ত মত ও পথকে ঘৃণা করে এবং তা থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোর নির্দেশ দান করে। ইসলাম তার অনুসারীদের মিথ্যা ও কুফরীর শৃঙ্খল হতে মুক্তি দিয়ে ন্যায়, মানবতা ও ঈমানের আলোর পথে পরিচালিত করে। আপনারা যদি আমাদের এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে তা গ্রহণ করেন, তাহলে জীবনবিধান হিসেবে আপনাদের জন্য আল কুরআনকে রেখে যাব এবং আল কুরআন বোঝার ও তা অনুসরণ করার জন্য এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেব যেন এর নির্দেশমতো রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন।
অতঃপর পরকালের জবাবদিহিতা ও খোদাভীতির ওপর আপনাদের ন্যস্ত করে আমরা প্রত্যাবর্তন করব। আর যদি আপনারা ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন, তাহলে আমরা আপনাদের থেকে 'জিযিয়া' গ্রহণ করব এবং আপনাদের নিরাপত্তা বিধান করব। আর যদি 'জিযিয়া' প্রদানে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই যুদ্ধ করব।'
এ কথা শুনে সম্রাট ইয়াজ্জুদ ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে বলল:
'তোমাদের চেয়ে নিকৃষ্টতম, দুর্দশাগ্রস্ত, আত্মকলহে লিপ্ত ও ঘৃণিত ক্ষুদ্র কোনো জাতি এ পৃথিবীতে আছে বলে আমার জানা নেই। আঞ্চলিক করদ রাজ্যপ্রধানদের দ্বারাই তোমাদের ওপর আমাদের প্রভাববলয় বিদ্যমান ছিল। তোমাদের করায়ত্ত ও অধীনস্থ রাখার জন্য তারাই যথেষ্ট।'
অতঃপর একটু শান্ত হয়ে আবার বলল:
'অভাবের তাড়নাই যদি তোমাদেরকে আমার দরবারে উপস্থিত হতে বাধ্য করে থাকে, তাহলে আমি আমার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিচ্ছি, তারা তোমাদের প্রতিটি পরিবারের অভাব মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী এবং তোমাদের নেতৃবর্গ, সরদার ও গোত্রীয় প্রধানদের জন্য কাপড়-চোপড় ইত্যাদি পৌঁছে দেবে। এ ছাড়াও আমার পক্ষ থেকে তোমাদের তত্ত্বাবধানের জন্য একজন শাসক নিযুক্ত করে দিচ্ছি, যিনি তোমাদের প্রতি অতিশয় নম্র ও যত্নবান হবেন।'
প্রতিনিধিদলের জনৈক সদস্য ঘৃণাভরে সম্রাট ইয়াজ্জুদের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে তার ক্রোধ আবার বেড়ে যায় এবং বলতে থাকে:
'যদি দূত হত্যা করার মতো কোনো প্রথা থাকত, তাহলে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই হত্যা করতাম। তোমাদের সেনাপতিকে জানিয়ে দাও:
'আমি তাকে সমুচিত শিক্ষাদানের জন্য আমার সেনাপতি রুস্তমকে পাঠাচ্ছি। সে সেনাপতিসহ তোমাদেরকে কাদেসিয়ার গর্তসমূহে পুঁতে ফেলবে।'
অতঃপর তাদেরকে মাটি বহন করে নেওয়ার মতো অপমানকর সাজা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করে বলল:
'এই প্রতিনিধিদলের মধ্যে যে সবচেয়ে সম্মানী, তার মাথায় মাটির একটি ডালা উঠিয়ে দাও এবং এ অবস্থায় বিভিন্ন অলিগলিতে উপস্থিত জনগণের সম্মুখ দিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে রাজধানীর প্রধান ফটক দিয়ে এদের এমনভাবে বিদায় কর, যেন উচিত শিক্ষা নিয়ে যায়।'
তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করা হলো:
আপনাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানী ব্যক্তি কে?
আসেম বিন উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কালবিলম্ব না করে সামনে অগ্রসর হয়ে বললেন:
'আমি!'
অতঃপর তারা তাঁর মাথায় মাটির ডালা উঠিয়ে দিল। তিনি এ মাটির ডালা বহন করে এনে তাদের উটের কাছে পৌঁছলেন এবং বহন করে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকটে এলেন ও তাঁকে এ সুসংবাদ দিলেন যে:
'আল্লাহ অবশ্যই মুসলমানদেরকে পারস্য সাম্রাজ্য বিজয় করাবেন এবং তাদেরকে এ দেশের ভূমির মালিক বানিয়ে দেবেন।'
তারপর কাদেসিয়ায় পারস্য সম্রাটের বিশাল বাহিনীর সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হয়। কাদেসিয়া প্রান্তরের গভীর গর্ত ও খালবিলগুলো পারস্য সম্রাটের সৈন্য বাহিনীর হাজার হাজার লাশের স্তূপে ভরাট হয়ে যায়। এ যুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানিতে মুহ্যমান পারস্য সম্রাট প্রতিশোধের জন্য সৈন্য সংগ্রহ ও রণ-প্রস্তুতিতে উন্মাদ হয়ে উঠল। তার এ যুদ্ধবিধ্বস্ত বাহিনীকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করার সিদ্ধান্ত নিল। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সে দেড় লাখ সশস্ত্র সৈন্যের বিরাট বাহিনী যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ তৈরি করে ফেলল। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে পারস্য সম্রাটের এ বিরাট বাহিনীর রণ-প্রস্তুতির সংবাদ পৌছল। তিনি নিজেই সেনাপতির দায়িত্ব নিয়ে তার মোকাবেলা করার জন্য সিদ্ধান্ত নিলেন; কিন্তু 'মজলিসে শূরা' তাঁর এ মুহূর্তে মদীনায় উপস্থিত থাকার গুরুত্ব অনুভব করে তাঁকে সে ইচ্ছা পরিত্যাগ করতে অনুরোধ জানালেন যে:
'এ গুরু দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়ার জন্য এমন একজন যোগ্য সেনাপতি খুঁজে বের করুন, যার ওপর দায়িত্ব অর্পণ করে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন।'
উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মজলিসে শূরার অনুরোধ মেনে নিয়ে বললেন:
'তাহলে আপনারাই পরামর্শ দিন যে, এমন কে হতে পারে, যাকে এ বিরাট দায়িত্বে নিয়োজিত করা যেতে পারে?'
তাঁরা বললেন:
'আমীরুল মু'মিনীন! আপনিই তো আপনার সেনাবাহিনীর ব্যাপারে ভালো জানেন যে, তাদের মধ্যে কাকে এ গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের জন্য নিযুক্ত করা যেতে পারে!'
উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু চিন্তা-ভাবনার পর বললেন:
'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি এমন একজনকে এ অভিযানের জন্য সেনাপতি নিযুক্ত করতে চাই, যিনি শত্রুবাহিনীকে পরাস্ত করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হবেন। অতীতের যে কোনো সেনাপতির চেয়ে তার সাফল্যই হবে সর্বোত্তম। তিনি হলেন:
'আন নু'মান ইবনে মুকাররিন আল মুযানী।'
সবাই বলে উঠলেন:
'হ্যাঁ, এ কাজের জন্য তিনিই উপযুক্ত।'
জিহাদরত নু'মান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর প্রতি আমীরুল মুমিনীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নির্দেশ পাঠালেন এই ভাষায় :
'সালামান্তে
আমি অবগত হয়েছি যে, সুসজ্জিত বিপুলসংখ্যক পারস্য সৈন্য আপনাদের তথা ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে 'নাহাওয়ান্দে' সমবেত হয়েছে। আমার এ নির্দেশনামা পাওয়া মাত্রই আপনি আপনার বাহিনীসহ আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে ও তাঁরই ওপর ভরসা করে তাঁরই সাহায্যের আশায় শত্রুবাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য রওয়ানা হোন। মনে রাখবেন, আপনার বাহিনীকে নিয়ে অসাধ্য ঝুঁকিপূর্ণ এমন কোনো পথে রওয়ানা হবেন না, যা অতিক্রম করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ, এক লক্ষাধিক স্বর্ণমুদ্রার চেয়েও একজন মুসলমানের জীবন আমার নিকট শ্রেয়। ওয়াস্স্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।'
নির্দেশ পাওয়া মাত্র নু'মান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনীকে নিয়ে বিশাল শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য রওয়ানা হলেন। যুদ্ধ-কৌশল হিসেবে অশ্বারোহীর একটি ক্ষুদ্র দলকে 'নাহাওয়ান্দ' শহরে প্রবেশের পথঘাটসমূহ এবং তৎসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করলেন। 'নাহাওয়ান্দ' শহরের অদূরে তাদের ঘোড়া হঠাৎ থমকে গেল। তারা জোরে চাবুক মারার পরও ঘোড়াগুলো সামনে অগ্রসর হতে পারছিল না। রণক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই খ্যাতনামা তেজী ঘোড়াগুলো কেন সম্মুখে অগ্রসর হতে পারছে না, তা জানার জন্য ঘোড়ার পিঠ থেকে অশ্বারোহীরা নেমে পড়লেন। তারা দেখতে পেলেন বিশেষ ধরনের তৈরী লোহার পাত-পেরেক যা বিটুমিন-এর সাথে কার্পেটিংয়ের মতো রাস্তায় বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেসব ঘোড়াগুলোর পায়ে বিঁধে যাচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও ঘোড়াগুলো তা অতিক্রম করতে সক্ষম হচ্ছে না। পারস্য বাহিনী তাদের নিরাপত্তার জন্য 'নাহাওয়ান্দ' শহরে পৌঁছার সমস্ত পথে লোহার এসব পাতজাতীয় পেরেক বিছিয়ে রেখেছে, যেন পদাতিক বা অশ্বারোহী বাহিনীর যে কোনো অভিযান ব্যর্থ হয়ে যায়। অশ্বারোহী বাহিনী 'নাহাওয়ান্দ' শহরকে এ ধরনের দুর্ভেদ্য ও বহির্জগতের সাথে বিচ্ছিন্ন করে রাখার সংবাদ জানিয়ে নু'মান ইবনে মুকাররিনের নিকট পরামর্শ চেয়ে পাঠালেন।
নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁদের সেখানেই অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং প্রতি রাতে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অগ্নি প্রজ্বলিত করে আলোকিত করার উপদেশ দিলেন। 'নাহাওয়ান্দ' শহরে অবস্থানরত শত্রুবাহিনী তা যেন ভালো করে দেখতে পায়। মুসলিম বাহিনীকে এমন এক কৌশল গ্রহণ করতেও নির্দেশ দিলেন যাতে শত্রু বাহিনী মনে করে:
'বেশ কিছুদিন অবস্থানের পর আমাদের বিছানো পেরেকের দুর্ভেদ্য সীমা অতিক্রম করতে না পেরে এবং 'নাহাওয়ান্দ' শহরে প্রবেশে ব্যর্থ হয়ে মুসলিম সৈন্যরা পালিয়ে যাচ্ছে।' মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনীর পরাজয় ও পলায়ন সংবাদে নিশ্চিত হয়ে যেন তারা মুসলিম বাহিনীকে পিছন থেকে আক্রমণের লক্ষ্যে নিজেরাই নিজেদের রাস্তা পরিষ্কার করতে বাধ্য হয়।'
নু'মান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ কৌশল সফল হলো। যখন পারস্য বাহিনী দেখল যে, বেশ কিছুদিন অবস্থান নেওয়ার পর অশ্বারোহী মুসলিম বাহিনী পরাজিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পলায়নের পথ বেছে নিয়েছে, তখন তারা নিজেরাই নাহাওয়ান্দে পৌঁছার রাস্তায় বিছানো পেরক পরিষ্কার করে ফেলে। তাদের পথগুলো তারা নিজেরাই পেরেকমুক্ত করামাত্রই নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শত্রুবাহিনীর ওপর হঠাৎ আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন ও সংকেতস্বরূপ তিনবার আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারণ নির্ধারণ করে বলেন:
'আমি যখন প্রথম তাকবীরধ্বনি উচ্চারণ করব, তখন তোমাদের যারা এখনো পর্যন্ত অপ্রস্তুত তারা দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। দ্বিতীয় তাকবীরধ্বনির সাথে সাথে প্রত্যেকেই তার হাতিয়ার আক্রমণের জন্য পূর্ণ প্রস্তুত করে নেবে এবং তৃতীয় তাকবীরধ্বনির সাথে সাথেই আমি আল্লাহর দুশমনদের ওপর আক্রমণের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ব, আমার সাথে তোমরা সবাই আক্রমণ চালাবে।'
সিদ্ধান্ত মোতাবেক পর্যায়ক্রমে তিন বার তাকবীরধ্বনি উচ্চারণের মাধ্যমে শত্রুবাহিনীর ওপর বজ্রপাতের ন্যায় বীরবিক্রমে আক্রমণ চালালেন। দেখতে না দেখতেই তাঁর পেছনে মুসলিম বাহিনী ঝড়ের বেগে শত্রুবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। উভয় বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ বেধে গেল। যুদ্ধের ইতিহাসে এমন ভয়াবহ যুদ্ধ খুব কমই হয়েছে। মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণ পারস্য বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলল। অগণিত পারস্য সৈন্য মুসলিম বাহিনীর হাতে প্রাণ হারাল। পারস্য বাহিনীর লাশে শহরের পাহাড়ি টিলা থেকে সমতল ভূমি, পুকুর, ডোবা ও নালা-নর্দমা সব একাকার হয়ে গেল। পথঘাট, অলিগলি ও রাজপথ শত্রুদের রক্তের স্রোতে পিচ্ছিল হয়ে গেল।
আক্রমণের চরম এক পর্যায়ে মুসলিম সেনাপতি নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঘোড়ার পা প্রবাহিত রক্তের পিচ্ছিল পথে সটকে গেলে শত্রুবাহিনীর আক্রমণের মুখে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হয়ে শাহাদাত বরণ করলেন। তৎক্ষণাৎ মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভাই তাঁর হাত থেকে সেনাপতির ঝাণ্ডা নিজ হাতে নিয়ে তাঁরই চাদর দিয়ে তাঁর মৃতদেহকে ঢেকে দিলেন। যুদ্ধরত মুসলিম সৈন্য বাহিনীকে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর শাহাদাতের সংবাদ প্রচার থেকে বিরত থাকলেন। মুসলিম সৈন্য বাহিনীর এই বিরাট সাফল্য ও বিরাট বিজয় ইসলামের ইতিহাসে 'মহাবিজয়' নামে খ্যাতি লাভ করে।
বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী তাদের প্রাণপ্রিয় সেনাপতি নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ধন্যবাদ জানাতে এলে তাঁকে না দেখে এদিক-সেদিক খোঁজাখুঁজি করতে থাকে। তাঁর ভাই তখন নু'মান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর লাশের ওপর থেকে তাঁর চাদরখানা তুলে নিয়ে বললেন: 'ইনিই তোমাদের আমীর ও সেনাপতি।'
আল্লাহ বিজয় দানের মাধ্যমে তাঁর চক্ষুদ্বয়কে শীতল করে দিয়েছেন এবং শাহাদাতের মাধ্যমে তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তাঁকে ধন্য করেছেন।'
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ৮৭৪৫ নং জীবনী দ্রষ্টব্য। ২. ইবনুল আছীর: ২য় খণ্ড, ২১১ পৃ: ৩য় খণ্ড, ৭ পৃ:। ৩. তাহযীবুত তাহযীব : ১০ম খণ্ড, ৪৫৬ পৃ:। ৪. ফুতুহুল বুলদান: ৩১১ পৃ:। ৫. শারহে আলফিয়াতুল ইরাকী: ৩য় খণ্ড, ৭৬ পৃ:। ৬. আল ইলাম: ৯ম খণ্ড, ৯ পৃ:। ৭. আল কাদেসিয়া: ৬৬-৭৩ পৃ: দারুন নাফায়েস, বৈরূত।
📄 সুহাইব আর রুমী (রাঃ)
'হে আবূ ইয়াহ্ইয়া! কী সর্বোত্তম লাভেই না বিক্রি করেছ.....! কী সর্বোত্তম লাভেই না তোমার বিক্রি!' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)
সুহাইব আর রূমী...
ইসলামী দুনিয়ায় মুসলমানদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে, যে সুহাইব আর রূমীর পরিচয় জানে না এবং তাঁর জীবনের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে কিছুই শোনেনি! আমাদের অনেকেই যে বিষয়টি জানে না তা হলো, সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু প্রকৃতপক্ষে রোমান নন; বরং তিনি ছিলেন আরব বংশোদ্ভূত। তাঁর পিতা ছিলেন নুমাইর গোত্রের এবং মাতা ছিলেন তামীম গোত্রের সদস্যা। সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে রোমান হিসেবে সম্বোধন করার পিছনে একটি ঘটনা বিদ্যমান, যা যুগ যুগ ধরে ইতিহাসের পাতা ধারণ করে আসছে। বহু পুস্তকেও এ ঘটনা বিধৃত। ঘটনাটি হলো:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতপ্রাপ্তির প্রায় দুই দশক পূর্বের কথা। পারস্য সম্রাট কিসরার পক্ষ থেকে সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পিতা সিনান ইবনে মালেক আন নুমাইরিকে আল উবুল্লার গভর্নর নিযুক্ত করেন। তার সন্তানদের মধ্যে পাঁচ বছরের শিশু সুহাইব ছিল তাঁর অত্যধিক প্রিয়। সুহাইবের চেহারা ছিল হাস্যোজ্জ্বল, মাথার চুল লাল, স্বভাব ছিল বুদ্ধিদীপ্ত ও চটপটে। তাঁর দুটি চোখ যেন বুদ্ধিমত্তা ও আভিজাত্যের জ্যোতি ছড়াত। সন্তানের এই সুন্দর ও নিষ্পাপ চেহারার দিকে তাঁর পিতা যখন তাকাতেন, তখন তিনি যে কোনো দুশ্চিন্তামুক্ত হতেন। একদা কোলের এই সন্তান সুহাইবকে নিয়ে তাঁর মা নিকটাত্মীয় রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের পরিবার ও খাদেমদের সঙ্গে ইরাকের 'আসসানিয়া' গ্রামে বিনোদনের উদ্দেশ্যে যান। রাতে সে গ্রামেই রোমান সৈন্যদের একটি দল আক্রমণ করে। তারা গ্রামের নিরাপত্তারক্ষীদের হত্যা করে সম্পদ লুণ্ঠন করে এবং গ্রামবাসীদের বন্দী করে দাসে পরিণত করে। তারা সুহাইবকেও বন্দী করে নিয়ে যায় এবং রোম সাম্রাজ্যে দাস ক্রয়-বিক্রয়ের বাজারে নিয়ে তাকে বিক্রি করে। এভাবেই এই শিশুর বেচাকেনা চলতে থাকে এবং একের পর এক মালিক পরিবর্তন হতে থাকে। অন্যান্য ক্রীতদাসের মতো এক মনিবের খিদমত থেকে অন্য মনিবের খিদমতে সে নিয়োজিত হতে থাকল। মনিবের হাত পরিবর্তনের কারণে সুহাইব আর রূমীর সে সমাজব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে কী ঘটছে তা দেখার এবং এর ভেতরে কী ঘটছে তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়।
রোমান সম্রাট ও তাঁর অমাত্যবর্গের বালাখানা ও চিত্তবিনোদন কেন্দ্রসমূহে কী ধরনের নৈতিকতাবিরোধী কার্যকলাপের মহড়া হতো, তিনি তা খুব ভালো করেই প্রত্যক্ষ করেন এবং স্বীয় কানে শুনতেন অমানবিক ও অনৈতিক নানা কাহিনী। সুহাইব আর রূমী সে সমাজব্যবস্থার প্রতি চরম ঘৃণা পোষণ করতেন ও ধিক্কার দিতেন। সে সমাজব্যবস্থা থেকে লব্ধ তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁর মনকে দারুণভাবে বিষিয়ে তোলে। তিনি মনে মনে বলতেন:
'মানবতাবিরোধী, রোগাক্রান্ত, বিধ্বস্ত আমাদের এ সমাজ কোনো তুফান ছাড়া সংশোধন হওয়ার নয়।'
সুহাইব আর রূমী রোম সাম্রাজ্যের বালাখানাসমূহে প্রতিপালিত হন। সে সমাজের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির মাঝে বেড়ে ওঠেন। এমনকি তিনি তাঁর মাতৃভাষাও প্রায় ভুলে যান। কিন্তু তিনি ভুলে যাননি যে, তিনি আরব সন্তান ও মরুভূমির অধিবাসী। তিনি একথাও ভুলে যাননি যে, তিনি ধন-সম্পদের মতো লুণ্ঠিত এক মানুষ, যাকে ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বালাখানা পর্যন্ত পৌঁছানো হয়েছে। তিনি প্রতি মুহূর্তেই দাসত্বমুক্তির চিন্তা করতেন এবং সুযোগের অপেক্ষায় থাকতেন। সর্বদা তিনি আত্মীয়-স্বজনদের সাথে মিলিত হওয়ার আশায় ব্যাকুল ছিলেন। আরবের মরুভূমির দিকে প্রত্যাবর্তন করার আগ্রহ তাঁর প্রবল থেকে প্রবলতর হতে থাকে। একদিন তিনি রোমান এক পাদ্রিকে অপর এক খ্রিস্টান গোত্রপতিকে উদ্দেশ্য করে বলতে শোনেন:
'সে সময় নিকটবর্তী হচ্ছে, যখন আরব ভূখণ্ডের মক্কা নগরীতে এমন একজন নবীর আবির্ভাব হবে, যিনি ঈসা আলাইহিস সালামের রিসালাতের সত্যতার সাক্ষ্য দেবেন এবং বিশ্ববাসীকে অন্ধকার থেকে আলো ও হেদায়াতের দিকে নিয়ে আসবেন।'
সুযোগ বুঝে একদিন সুহাইব তাঁর মনিবের শৃঙ্খল ছিন্ন করে গোটা পৃথিবীর আশ্রয় কেন্দ্র, নবীর আবির্ভাবস্থল মক্কা বা 'উম্মুল কুরা'র উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।
মক্কায় পৌঁছে সেখানেই বসবাস করতে থাকলেন। রোমানদের মতো ভাঙা ভাঙা আরবী উচ্চারণে কথা বলতে এবং মাথায় ফুরফুরে লাল চুল দেখে তাঁকে অনেকে সুহাইব আর রূমী নামে ডাকত। সুহাইব আর রূমী মক্কায় পৌঁছে মক্কার এক সরদার আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি ব্যবসায়-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করে প্রচুর ধন-দৌলতের মালিক হন। ব্যবসায়-বাণিজ্যের ব্যস্ততা ও দৈনন্দিন নানা পেরেশানী থাকা সত্ত্বেও সেই খ্রিস্টান পাদ্রির ভবিষ্যদ্বাণীর কথা তিনি মোটেও ভুলে যাননি। যখনই সে কথা তাঁর স্মরণ হতো, তখনই তাঁর মন নবীর সন্ধানে সক্রিয় হয়ে উঠত। সেই নবীর আবির্ভাব কবে হবে? এ প্রশ্নের উত্তর নিজের মাঝেই খুঁজতেন। তাঁকে আর বেশি দিন অপেক্ষা করতে হলো না। তাঁর মন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেল।
বিদেশে লম্বা বাণিজ্য সফরশেষে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করে তিনি শুনতে পেলেন: 'মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহকে নবী হিসেবে আল্লাহ প্রেরণ করেছেন। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করছেন এবং অশ্লীল ব্যভিচার ও অন্যায় কাজ করতে নিষেধ করছেন।'
সুহাইব আর রূমী তাদের জিজ্ঞাসা করলেন:
'তিনি কি 'আল আমীন' নামে খ্যাত সেই ব্যক্তি নন?'
তারা বলল: 'হ্যাঁ, তিনিই সেই ব্যক্তি।'
সুহাইব তাদের জিজ্ঞাসা করলেন: 'তাঁর বাড়ি কোন্ স্থানে?'
তারা তাঁকে জানাল: 'সাফা পর্বতের পাদদেশে আরকাম ইবনে আবিল আরকামে।'
সাথে সাথে তারা সুহাইবকে এ বলেও সতর্ক করে দিল: 'সাবধান! কুরাইশদের কেউ যেন তোমাকে দেখে না ফেলে। যদি তাদের কেউ তাঁর সাথে কথা বলতেও দেখে ফেলে, তাহলে কিন্তু তোমাকে ভীষণ নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হবে। যেহেতু তুমি একজন অসহায় বিদেশি লোক, তাদের অত্যাচার থেকে এখানে তোমাকে সাহায্য করার বা আশ্রয় দেওয়ার কেউ নেই। তাই পরিণাম সম্পর্কে সজাগ থেকো।'
তারপর কোনো এক প্রত্যুষে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এদিক-সেদিক দেখতে দেখতে সুহাইব 'দারুল আরকামে' গিয়ে উপস্থিত হন। সেখানে পৌছে দরজায় আম্মার ইবনে ইয়াসারকে দেখতে পান। পূর্ব থেকেই তার সাথে পরিচয় ছিল, তা সত্ত্বেও আতঙ্কিত হলেন, একটু ইতস্তত করে তার কাছে পৌছে প্রশ্ন করলেন: 'আম্মার! তুমি এখানে কী উদ্দেশ্যে? আম্মার ইবনে ইয়াসার তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন। আমি এখানে কী চাই সেটা পরের কথা, আগে তুমিই বল যে, তুমি এখানে কী উদ্দেশ্যে এসেছ?'
সুহাইব উত্তর দিলেন: 'এ ব্যক্তি কী বলেন তা শোনার জন্য তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছি।'
আম্মার বললেন: 'আমিও একই উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি।'
সুহাইব তাঁকে প্রস্তাব দিলেন: 'তাহলে আল্লাহর রহমতে আমরা এক সাথে তাঁর সাথে দেখা করতে ভেতরে প্রবেশ করি।'
আম্মার ইবনে ইয়াসার ও সুহাইব ইবনে সিনান আর রূমী একত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য 'দারুল আরকামে' প্রবেশ করলেন।
উভয়েই তাঁর কথাবার্তা মনোযোগ সহকারে শুনলেন। তাঁর আলোচনায় উভয়েই সকল জিজ্ঞাসার উত্তর পেলেন। হৃদয় ঈমানী নূরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। উভয়ই একত্রে তাদের দু'হাত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে সম্প্রসারণ করলেন এবং এক সঙ্গে বলে উঠলেন:
'আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।'
অতঃপর উভয়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে সারাদিন কাটালেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হেদায়াতে, ঈমানী বলে বলীয়ান হলেন। রাত ঘনিয়ে এল, ধীরে ধীরে চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রাতের আঁধারে উভয়েই নবীজীর তাওহীদী তা'লীমে ঈমানের আলোকবর্তিকায় পরিতৃপ্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমত থেকে নিজ নিজ গৃহে ফিরে এলেন।
বেলাল, আম্মার, সুমাইয়া, খাব্বাবসহ অন্যান্য সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহুমের মতো সুহাইব আর রূমীকেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান আনার অপরাধে কুরাইশদের নির্মম ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সবকিছু অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে সহ্য করেন। এ কথা তিনি ভালো করেই জানতেন যে, আখেরী মানযিল যাদের জান্নাত, তাদের জন্য নির্যাতন অবধারিত। এ মানযিলে পৌঁছতে হলে আঘাতের পর আঘাত, নির্যাতনের পর নির্যাতন আসবেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দিলে সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে মদীনায় হিজরত করে আসার মনস্থ করেন। কিন্তু কুরাইশরা তাঁর হিজরতের এই মনোবাসনা আঁচ করতে পেরে তাঁর পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ওপর সার্বক্ষণিক পাহারা নিযুক্ত করে, যেন তিনি তার উপার্জিত সোনা-দানা ও ধনসম্পদ নিয়ে হিজরত করার সুযোগ না পান।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাথী আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হিজরতের পর সর্বদাই তিনি হিজরতের অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু কোনো ক্রমেই তাঁর জন্য হিজরত করা সম্ভব হয়ে উঠছিল না। কারণ, তাঁর জন্য নিয়োগকৃত গুপ্তচরদের বিনিদ্র সতর্ক দৃষ্টি এবং পাহারাদারদের নিশ্ছিদ্র বেষ্টনী এড়িয়ে হিজরত করা সম্ভব ছিল না। প্রচণ্ড শীতের এক গভীর রাতে সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আমাশয়ে আক্রান্ত রোগীর ন্যায় বারবার বাইরে যেতে থাকলেন এবং খামাখা সেখানে কালক্ষেপণ করতে লাগলেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাঁকে খুঁজতে না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেখানেই বসে থাকতে লাগলেন। তাঁকে আমাশয় আক্রান্ত অবস্থায় দেখে পাহারাদারগণ পরস্পর বলাবলি করতে লাগল যে:
'তোমরা নিশ্চিত থাক, সে নিশ্চিয়ই লাত ও উযযা দেবতার অভিশাপের শিকার হয়েছে।'
অতঃপর তাঁকে ডেকে আনার পরিবর্তে এ অবস্থায় রেখে নিজ নিজ বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। এ সুযোগে সুহাইব তাদের হাত থেকে সটকে পড়েন এবং মদীনার উদ্দেশ্যে দৌড়াতে থাকেন; কিন্তু কিছুদূর যেতে না যেতেই হঠাৎ তাদের ঘুম ভেঙে যায় এবং তাঁকে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে তারা সবচেয়ে দ্রুতগামী ঘোড়া নিয়ে তাঁর অনুসরণ করতে থাকে। এমনকি শেষ পর্যন্ত পাহারাদারগণ তাঁকে ঘিরে ফেলে। তিনি এমতাবস্থায় পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে তীরের থলি থেকে তীরগুলো বের করে অবস্থানুয়ায়ী তা মাটিতে ছড়িয়ে দিয়েই একটি ধনুকে স্থাপন করে তাদের দিকে তাক করে ধরে তাদের উদ্দেশ্যে উচ্চৈঃস্বরে বলতে থাকেন:
'হে কুরাইশ সম্প্রদায়ের লোকেরা! তোমরা আমার তীর চালনা সম্পর্কে খুব ভালো করেই জান এবং আমিও আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারদর্শী একজন শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ। আল্লাহর কসম! তোমরা কখনো আমার কাছে আসতে চেষ্টা করবে না, আমার থলির প্রতিটি তীর দ্বারা তোমাদের এক একজনকে হত্যা করব। তার পর যারা অবশিষ্ট থাকবে তাদেরকে তরবারি দ্বারা খতম করব।'
তার মরণপণ চ্যালেঞ্জ শুনে একজন বলে ফেলল : 'হে সুহাইব! তুমি নিঃসহায় কপর্দকহীন অবস্থায় মক্কায় এসে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছ, আমরাও কসম করে বলছি, আজ তোমাকে বীরের মতো জান ও মাল নিয়ে আমাদের হাত থেকে যেতে দেব না।'
সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের মনোভাব টের পেয়ে তৎক্ষণাৎ বললেন : 'আমি যদি আমার অর্থ-সম্পদ তোমাদের দিয়ে দেই, তাহলে কি আমাকে যেতে দেবে?'
তারা উত্তর দিল : 'হ্যাঁ, তাহলে তুমি যেতে পারবে।'
সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মক্কায় তাঁর বাড়িতে সোনা-দানা গচ্ছিত রাখার স্থানের কথা তাদের বলে দিলেন। তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন মক্কায় চলে গেল। নির্দিষ্ট স্থানে তারা সম্পদ পেয়ে গেল এবং তাকে নির্বিঘ্নে চলে যেতে দিল। সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর জীবনের কষ্টার্জিত অগাধ সম্পদ পেছনে ফেলে নিশ্চিন্তে ও নির্বিঘ্নে এবং সন্তুষ্টচিত্তে তাঁর দীন নিয়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে মদীনার দিকে রওয়ানা হলেন। দীর্ঘপথ চলতে চলতে যখনই ক্লান্ত ও নিস্তেজ হয়ে পড়তেন, তখনই তাঁর মনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা ও তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার কথা চিন্তা করে তাঁর নিস্তেজ দেহে সতেজতা ফিরে পেতেন এবং নব-উদ্যমে আবার পথ চলা আরম্ভ করতেন।
মদীনার প্রবেশপথ 'কুবায়' পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আগমন করতে দেখে অত্যন্ত খুশি হন এবং বলেন : رَبِحَ الْبَيْعُ يَا أَبَا يَحْيِي رَبِحَ الْبَيْعُ -
'হে আবূ ইয়াহ্ইয়া! কী সর্বোত্তম লাভেই না বিক্রি করেছ? কী সর্বোত্তম লাভে তোমার বিক্রি।'
পরপর তিন বার তিনি তা পুনরাবৃত্তি করেন। এ কথা শুনে ক্লান্ত সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। অতঃপর সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার আগে মক্কা থেকে না কেউ আপনার খিদমতে এসেছে, আর না এ সংবাদ জিবরাঈল আলাইহিস সালাম ছাড়া অন্য কেউ আপনাকে দিয়েছে।'
নিঃসন্দেহে আল্লাহর পথে তাঁর জান ও মালের বিক্রি সত্য ও ন্যায়ের পথে এক নজিরবিহীন উদাহরণ। যার সত্যতা আল্লাহ ওহী অবতীর্ণ করে নিশ্চিত করেন এবং জিবরাঈল আলাইহিস সালাম সাক্ষ্য প্রদান করে তার গুরুত্বকে আরো বাড়িয়ে দেন।
সুহাইব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শানে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কালামে মাজীদে বলেন: وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْرِى نَفْسَهُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ وَاللَّهُ رَءُوفٌ بِالْعِبَادِ .
'এমন লোকও আছে, যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিজেকে বিক্রি করে থাকে। আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি বড়ই সদয়।' (সূরা বাকারা : ২০৭)
সুহাইব বিন সিনান আর রূমী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিজেকে সর্বোত্তম দামে আল্লাহর কাছে বিক্রি করার জন্য তাঁকে হাজার সালাম।'
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ৪১০৪ নং জীবনী দ্রষ্টব্য। ২. তাবাকাতে ইবনে সা'দ: ৩য় খণ্ড, ২২৬ পৃঃ। ৩. উসদুল গাবাহ : ৩য় খণ্ড, ৩০ পৃঃ। ৪. আল ইসতিআব (হামেশে ইসাবা) ২য় খণ্ড, ১৭৪ পৃঃ। ৫. সিফাতুস সাফওয়া: ১ম খণ্ড, ১৬৯ পৃঃ। ৬. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ: ৭ম খণ্ড, ৩১৮-৩১৯ পৃঃ। ৭. হায়াতুস সাহাবা: ৪র্থ খণ্ডের সূচি দ্রষ্টব্য। ৮. আল-আ'লাম ও তার সংস্করণসমূহ।
📄 আবু দারদা’ (রাঃ)
আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মনে-প্রাণেই দুনিয়ার ভোগবিলাস ও লোভ-লালসা পরিত্যাগ করেছিলেন। -আবদুর রহমান বিন আওফ (রা)
অতি প্রত্যুষে নিদ্রা থেকে জেগে বাড়ির প্রবেশপথে বিশেষভাবে সংরক্ষিত মূর্তিকে পূজা করা ছিল আবূ দারদা' নামে খ্যাত উয়াইমার ইবনে মালেক আল খাযরাজীর নিত্যদিনের অবশ্য পালনীয় অভ্যাস। অভ্যাসের এই ধারাবাহিকতা থেকে সেদিনও বাদ পড়েনি, যে দিনের কথা এখানে বলা হচ্ছে। সেদিনও সে অভিজাত আতর বাজার থেকে আনা মূল্যবান সুগন্ধি দিয়ে চন্দনকাঠে তৈরি মূর্তিকে সুগন্ধময় করে তোলে। ইয়ামেনের বাজারের সর্বোৎকৃষ্ট রেশমি চাদর দিয়ে মূর্তিকে আবৃত করে। যে মূল্যবান চাদরটি ইয়ামেন থেকে আগমনকারী এক বণিক গতকালই তাকে উপহার দিয়েছিল।
সূর্য বেশ উপরে ওঠার পর আবূ দারদা' বাড়ি থেকে বের হয়ে ব্যবসায় কেন্দ্রে রওয়ানা হওয়ার সময় দেখতে পায় মদীনার ছোট-বড় সবাই রাস্তায়, সকল বয়সের লোকজনের সমাগম খুব বেশি। কারণ কী? জানতে পারল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী মুসলমানরা বদর যুদ্ধ থেকে বিজয়ীর বেশে মদীনায় ফিরে আসছে। তাদের বিজয়কে অভিনন্দিত করার জন্য এতো লোকের সমাগম। কিছুক্ষণ পরই দেখতে পেল বিজয়ীরা শহরে প্রবেশ করছে এবং কুরাইশ বন্দীদের দলবদ্ধভাবে শৃঙ্খলিত করে আনা হচ্ছে। মুসলমানদের এই বিজয় আর কুরাইশদের এই করুণ দৃশ্য দেখে আবু দারদা' কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে পাশ কাটিয়ে অগ্রসর হতেই খাযরাজ গোত্রের এক যুবক তার নজরে পড়ে। আবু দারদা' সেই যুবকের দিকে অগ্রসর হয়ে তার অন্তরঙ্গ বন্ধু আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। খাযরাজ গোত্রের সেই যুবক আবূ দারদা'কে সংবাদ দেয় যে,
'বদর প্রান্তরে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা শত্রুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে চরম বিপদের সম্মুখীন হন। পরিশেষে খুব বাহাদুরী ও নৈপুণ্যের সাথেই যুদ্ধ করে শুধু বীরত্বের পরিচয়ই দেননি; বরং প্রচুর গনীমতের মালসহ নিরাপদেই ফিরে এসেছেন। তার সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।'
খাযরাজ গোত্রের সেই যুবক আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা সম্পর্কে আবূ দারদা'র জিজ্ঞাসায় মোটেই অবাক হয়নি। কারণ, আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ও আবূ দারদা'র মধ্যে গভীর বন্ধুত্বের কারণে পরস্পরের ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কথা সবাই জানত। ইসলামের দাওয়াত পৌঁছলে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ইসলাম গ্রহণ করেন, আর আবূ দারদা' তা প্রত্যাখ্যান করে; কিন্তু এ দুই বন্ধুর পারস্পরিক সম্পর্কের কোনো অবনতি হয়নি। কারণ, আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ইসলাম গ্রহণ সত্ত্বেও আবু দারদা'র সাথে সাক্ষাৎ ও তার বাড়িতে যাতায়াত অব্যাহত রাখেন। তাকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার প্রচেষ্টা চলতে থাকে অব্যাহতভাবে। আবূ দারদা'র কুফরী জীবন যাপনের জন্য তার এই বন্ধু খুবই ব্যথিত হতেন।
আবু দারদা' নিজের ব্যবসায় কেন্দ্রে পৌঁছে তার উঁচু আসনে বসে যথারীতি ব্যবসায়ের কাজ শুরু করে। কর্মচারীদের আদেশ-নিষেধ পূর্বের ন্যায়ই দিতে থাকে। ব্যবসায়ের রুটিনের কোনো পরিবর্তন নেই। কিন্তু সে মোটেই জানত না যে, আজ তার বাড়িতে কী তুলকালাম কাণ্ডই না ঘটে গেছে।
আজ বিশেষ উদ্দেশ্যে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা তার বন্ধু আবু দারদা'র বাড়ি গেলেন। তিনি জানতেন, এ সময় আবু দারদা' বাড়িতে নেই। ভাবখানা দেখালেন এই, বিশেষ জরুরি কাজ। তার বাড়িতে পৌঁছে দেখেন, ঘরের দরজা খোলা এবং তার মা বাড়ির আঙিনায় সাংসারিক কাজে ব্যস্ত। আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা সেখানে পৌঁছে বলেন:
'হে আল্লাহর প্রিয় বান্দী! আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।'
উত্তরে আবু দারদা'র মা বললেন:
'হে আবূ দারদা'র ভাই, তোমার প্রতিও শান্তি বর্ষিত হোক।'
আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা জিজ্ঞাসা করেন: 'আমার বন্ধু আবু দারদা' কোথায়?'
আবূ দারদা'র মা উত্তরে বলেন: 'সে তার ব্যবসায় কেন্দ্রে। খুব শীঘ্রই বাড়ি ফিরে আসবে।'
আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা আবূ দারদা'র স্ত্রীকে বললেন: 'আবূ দারদা'র সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আমাকে এখানে অপেক্ষা করার অনুমতি দেবেন কি?'
তার স্ত্রী উত্তরে বলল: 'অবশ্যই!'
অতঃপর তাকে প্রবেশের সুযোগ দিল। ঘরের দরজা খুলে দিয়ে তার স্ত্রী ভিতরে সাংসারিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কখনো বা ঘর-বাড়ির কাজে মাথা ঘামাচ্ছে, আবার কখনো বা সন্তানদের দেখাশোনা ও যত্নে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। এই ফাঁকে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা আবু দারদা'র মূর্তির ঘরে প্রবেশ করেন এবং সাথে বহন করে আনা কুড়াল বের করে আবূ দারদা'র মূর্তির কাছে গিয়ে ইচ্ছেমতো সেটিকে টুকরো টুকরো করতে থাকেন। আর বলতে থাকেন: ... آلَا كُلُّ مَا يُدْعَى مَعَ اللَّهِ بَاطِلٌ إِلَّا كُلُّ مَا يُدْعَى مَعَ اللَّهِ بَاطِلٌ
'সাবধান! আল্লাহর সাথে অন্য যাকেই ডাকা হোক না কেন, সবই মিথ্যা। সাবধান! আল্লাহর সাথে অন্য যাকেই ডাকা হোক না কেন, সবই মিথ্যা।'
মূর্তিকে ইচ্ছেমতো টুকরো টুকরো করা শেষ হলে তিনি বিদায় নিয়ে চলে আসেন। আবু দারদা'র স্ত্রী বিশেষ কারণে মূর্তির ঘরে প্রবেশ করতেই মূর্তিকে টুকরো টুকরো ও তার হাত-পা, কান-গলা, মাথা-মোট কথা প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন দেখে যেন তড়িতাহত হয় এবং দুই হাত চাপড়িয়ে বলতে থাকে:
'হে ইবনে রাওয়াহা! তুমি আমাকে ধ্বংস করে ফেলেছ! তুমি আমাকে ধ্বংস করে ফেলেছ।'
কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই আবূ দারদা' বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে মূর্তিঘরের দরজায় বসে চিৎকার করে কাঁদতে দেখে। সে আরো দেখতে পায় যে, তার চেহারায় ভীতিভাব সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
আবূ দারদা' তার কাছে পৌঁছে জিজ্ঞাসা করে: 'কী হয়েছে তোমার?'
উত্তরে সে বলল: 'তোমার অনুপস্থিতিতে তোমার বন্ধু আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা আসে এবং তোমার মূর্তির কী দুরবস্থা করেছে তা তো দেখতেই পাচ্ছ।'
আবূ দারদা' মূর্তিঘরের ভিতরে নজর দিয়েই দেখে যে, মূর্তিকে এমনভাবে টুকরো টুকরো করা হয়েছে যে, তা জ্বালানির কাজে ব্যবহার করা ছাড়া আর কোনো কাজে আসবে না। সে রাগে ফেটে পড়ে এবং এই কাজের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়; কিন্তু পরক্ষণেই সে একটু শান্ত হয়ে পড়লে তার প্রতিশোধস্পৃহা স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং ক্রোধ প্রশমিত হয়। এবার সে চিন্তা করতে লাগল, কেন এমন হলো। অতঃপর নিজে নিজেই বলে উঠল:
'যদি ওই মূর্তিতে কোনো কল্যাণ থাকত, তাহলে সে নিজেই নিজেকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারত।'
সে নিজের বিবেকের কাছেই উত্তর পেয়ে তৎক্ষণাৎ আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার কাছে চলে গেল এবং তাকে সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করল। তিনিই ছিলেন এ মহল্লার ইসলাম গ্রহণকারী সর্বশেষ ব্যক্তি। ঈমান আনার সেই শুভক্ষণ থেকে আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যে মহব্বত জন্মেছিল, তার মধ্যে সামান্যতম খাদও ছিল না। ঈমান আনার পর থেকেই তিনি তাঁর অতীত জীবনের জন্য বড়ই অনুতপ্ত হতে থাকেন। তাঁর অনুতাপের কারণ ছিল এই যে, তাঁর আগে যেসব সাহাবী ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তাঁরা ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছেন। তাঁরা কুরআন হিয্য করেছেন, তার মর্মার্থ উপলব্ধি করেছেন। তাঁরা ইবাদত করেছেন বেশি। তাকওয়া ও খোদাভীতির কারণে তাঁরা আল্লাহর সন্তুষ্টিও হাসিল করেছেন। আমি তো তাদের থেকে বহু পেছনে আছি। জিহাদের ক্ষেত্রেও আমি পিছিয়ে আছি। এ অনুতাপ তাঁকে প্রতি মুহূর্তে আহত করত। তিনি এ নিয়ে অনেক ভাবনা-চিন্তার পর সিদ্ধান্ত নিলেন:
'যেভাবেই হোক এই ব্যবধান অবশ্যই দূর করতে হবে। এজন্য আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। সময়কে বেশি করে কাজে লাগাতে হবে।'
এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুরু হলো তাঁর সাধনা তথা কঠোর অধ্যবসায়। ইসলামী জ্ঞানার্জনে এবং ইসলামের কাজে তিনি নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করলেন। আল কুরআনের হিয্য ও প্রতিটি শব্দের অর্থ এবং এর মর্ম উপলব্ধিতে নিষ্ঠার সাথে আত্মনিয়োগ করেন। যখন তিনি মনে করলেন ইবাদত-বন্দেগীতে একাগ্রতা সৃষ্টিতে তাঁর ব্যবসায়-বাণিজ্যই বাধা সৃষ্টি করছে, তখন থেকেই তিনি কোনো ইতস্তত না করে ব্যবসায়-বাণিজ্য ছেড়ে দিলেন। কেউ তাঁকে ব্যবসায়-বাণিজ্য ছেড়ে দেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন:
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান আনার পূর্বে আমি নিছক একজন ব্যবসায়ী ছিলাম। ইসলাম গ্রহণের পর চেষ্টা করছিলাম ইবাদত ও ব্যবসায়ের মধ্যে সমন্বয় করি; কিন্তু আমি যা চেয়েছিলাম তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এ কারণে ব্যবসায় ছেড়ে দিয়ে ইবাদত-বন্দেগীতে নিমগ্ন হয়েছি। তিনি আল্লাহর শপথ করে বলেন: মসজিদে নববীর দরজায় আমার দোকান হোক এবং আমি মসজিদে প্রতি ওয়াক্ত নামায জামাআতের সাথে আদায় করার পরও ক্রয়-বিক্রয়ে এমনভাবে লাভবান হই যে, দৈনিক তার পরিমাণ ৩০০ স্বর্ণমুদ্রা পর্যন্ত পৌঁছাক, বিদ্যাচর্চা ও ইবাদত-বন্দেগীর পরিবর্তে আজ আমি এটাও পছন্দ করি না।'
অতঃপর তিনি প্রশ্নকারীর দিকে তাকিয়ে বলেন:
আমি একথা বলি না যে, আল্লাহ তাআলা ব্যবসা হারাম করেছেন, কিন্তু আমি অবশ্যই তাদের মতো হতে চাই: أحِبُّ أَنْ أَكُونَ مِنَ الَّذِينَ لَا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ .
'যাদেরকে ব্যবসায়-বাণিজ্য আল্লাহর স্মরণকে ভুলিয়ে রাখে না বা গাফেল করে না।'
এর অর্থ এটা নয় যে, আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ব্যবসায়-বাণিজ্যকে ইবাদতের অন্তরায় মনে করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি দুনিয়ার মোহ, লোভ-লালসা ও বিলাসিতাকে পরিত্যাগ করেছিলেন। জীবন ধারণের জন্য যতটুকু দরকার, এর উপরই তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন।
প্রচণ্ড শীতের কোনো এক রাতে তাঁর বাড়িতে বেশ কয়েকজন মেহমান আসেন। তাদের জন্য গরম গরম খাদ্য পরিবেশন করা হয়; কিন্তু শীত নিবারণের জন্য বিছানাপত্রের কোনো ব্যবস্থা না করায় মেহমানরা নিজেদের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা করতে থাকেন। তাদেরই একজন আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে গিয়ে এ প্রয়োজনের কথা বলার জন্য উদ্যোগী হলে অপর একজন তাকে নিবৃত্ত করে বললেন:
আরে রাখো, এভাবেই রাতটা কাটিয়ে দাও; কিন্তু তা উপেক্ষা করে তিনি তাঁর কক্ষের দরজায় পৌঁছে দেখেন, আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শুয়ে এবং তাঁর স্ত্রী তাঁর কাছেই বসে আছেন। তাঁদের উভয়ের গায়েই পাতলা একখানা চাদর, যা কোনো অবস্থাতেই শীত নিবারণ করতে পারে না। সেই মেহমান আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে গিয়ে বললেন:
'কী ব্যাপার, আমরা যেভাবে শীতবস্ত্রহীন অবস্থায় রাত কাটাচ্ছি, আপনিও দেখছি একইভাবে রাত কাটাচ্ছেন। আপনাদের শীতবস্ত্র কোথায়?'
আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন:
'আমাদের আরো একটি বাড়ি আছে, সেই বাড়িতে সব পাঠিয়ে দিয়েছি। সামান্য আসবাবপত্রও যদি বাড়িতে থাকত, তাহলে তা অবশ্যই আপনাদের জন্য পাঠিয়ে দিতাম। দ্বিতীয়ত, সে বাড়িতে পৌঁছতে যে রাস্তা অতিক্রম করতে হয়, সে পথ খুবই দুর্গম। সে পথের পথিকদের মধ্যে যারা বেশি বেশি সাজ-সরঞ্জামের অধিকারী, তাদের চেয়ে যারা সামান্য ও হালকা সাজ-সামানের অধিকারী, তারাই শ্রেয়। আমরা অত্যধিক সাজ-সরঞ্জামের ওপর হালকা সাজ-সামানকে প্রাধান্য দিয়েছি, যেন সহজেই সে পথ অতিক্রম করতে পারি।'
অতঃপর মেহমানকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'আমার কথার মর্মার্থ কি বুঝেছেন?'
মেহমান উত্তরে বললেন:
'জী, খুব ভালো করেই বুঝেছি, আমাকে উত্তম নসীহতের জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।'
খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সিরিয়ার গভর্নর নিয়োগের প্রস্তাব দিলে তিনি এ প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁকে রাজি করানো কঠিন হয়ে পড়ে। উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ প্রস্তাবের ওপর অনুরোধের চাপ সৃষ্টি করলে তিনি শর্ত সাপেক্ষে রাজি হন এবং বলেন:
'আমাকে যদি কুরআনের এবং শরীআর শিক্ষা প্রদানসহ নামাযে ইমামতি করার অনুমতি দেন, তবেই আমি এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারি।'
উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ শর্ত তিনটি মেনে নিলেন। অতঃপর আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার রাজধানী দামেশকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। সেখানে পৌঁছে তিনি দেখতে পান, দামেশকের সর্বস্তরের মানুষ ভোগবিলাসে লিপ্ত এবং ধন-দৌলতের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তাদের এ অবস্থা দেখে আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ভীষণভাবে বিচলিত ও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি জনসাধারণকে দামেশকের মসজিদে সমবেত হতে বললেন। তার আহ্বানে সবাই মসজিদে সমবেত হলে তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন:
'হে দামেশকবাসী! আমরা ইসলামের বন্ধনে আবদ্ধ পরস্পরে দীনী ভাই। ইসলামের শত্রুদের মোকাবেলায় আপনারাই আমার সাহায্যকারী। আমার সাথে আপনাদের হৃদ্যতা ও ভালোবাসা গড়ে তুলতে এবং আমার নসীহত গ্রহণ করতে আপনাদেরকে কে বাধা দিতে পারে? আপনাদের প্রতি আমার ওয়ায-নসীহত অব্যাহত থাকবে সেজন্য আপনাদেরকে কোনো পারিশ্রমিক দিতে হবে না। কেননা, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকেই আমাকে ভাতা দেওয়া হয়ে থাকে। আপনাদের মধ্যে যারা নির্ভরযোগ্য আলেম ছিলেন, তাদের অনেকেই ইনতিকাল করেছেন। যারা আছেন তারাও একে একে চিরতরে চলে যাবেন। আমি দেখছি, তাদের শূন্যস্থান পূরণ হবে না। কারণ, আপনারা বিদ্যাচর্চা ও ইসলামের জ্ঞান আহরণে আগ্রহী হচ্ছেন না। আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি যে, আপনাদেরকে দেওয়ার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজে যে দায়িত্ব নিয়েছেন, আপনারা তা-ই পাওয়ার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করছেন। যে বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে আল্লাহ আপনাদের নির্দেশ দিয়েছেন, আপনারা সে গুরুদায়িত্বই ভুলে গিয়েছেন।'
আপনাদের হলো কী? অল্পে তৃপ্তির পরিবর্তে আপনারা খাবার টেবিলে এত অধিক আয়োজন করে থাকেন, যার সামান্য খেয়ে থাকতে পারেন। আপনারা এমনসব অট্টালিকা তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, যেসব অট্টালিকায় আপনারা চিরদিন বসবাস করবেন না। এবং এমনসব উচ্চাশার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন, যার বাস্তবায়ন কখনো সম্ভব নয়। আপনাদের পূর্বে যেসব লোকেরা অঢেল সম্পদ অর্জন করেছিল এবং প্রাচুর্যের অন্বেষণে ও প্রতিযোগিতায় নেমেছিল, তাদের সম্পদের ধ্বংসাবশেষ এবং তাদের অট্টালিকাসমূহ আজ বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে।
হে দামেশকবাসী ভাইয়েরা!
আপনাদের অতি নিকটেই হুদ আলাইহিস সালামের উম্মত ‘আদ’ জাতির ধ্বংসাবশেষ, যে জাতি জনবল, ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্যে পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্য ও উন্নত জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। আজ কে এমন আছে যে, আমার নিকট থেকে মাত্র দু’দিরহামের বিনিময়ে তাদের ধ্বংসাবশেষ ক্রয় করতে প্রস্তুত?’
উপস্থিত জনগণ তার এ হৃদয়গ্রাহী আলোচনা শুনে শুধু বিমুগ্ধই হয়নি, বরং ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকে। এ কান্নার আওয়াজ মসজিদের বাইরের লোকজন পর্যন্ত শুনতে পায়।
এরপর থেকে আবূ দারদা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দামেশকের সাধারণ সভা-সমাবেশে যোগ দিতে থাকেন। হাট-বাজারে চলাফেরা ও যাতায়াত অব্যাহত রাখেন। কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর দিতেন, অজ্ঞ ও নিরক্ষরদের জ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে এবং গাফিলদের দায়িত্বসচেতন করে তুলতে বিভিন্ন মজলিস-মাহফিলে যোগ দিতেন।
একবার চলার পথে তিনি দেখতে পান, একদল লোক জড়ো হয়ে এক ব্যক্তিকে গালমন্দ ও বেদম বেত্রাঘাত করছে। তিনি তাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন:
‘ব্যাপার কী?’
তারা বলল: ‘সে ব্যক্তি মহা অপরাধে অপরাধী।'
আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'যদি কেউ কোনো কূপে পড়ে যায়, তাহলে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করবে না?'
তারা বলল:
'অবশ্যই।'
তিনি বললেন:
'তাহলে তাকে আর গালমন্দ ও মারধর করো না, বরং সৎ পরামর্শ দাও এবং সুন্দর জীবন যাপনের পথ দেখাও। আর আল্লাহ যে তোমাদেরকে গুনাহ থেকে রক্ষা করেছেন, তার জন্য শুকরিয়া আদায় কর।'
উত্তেজিত ব্যক্তিরা আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বলল:
'তাহলে কি আপনি তাকে ঘৃণা করেন না?'
তিনি উত্তর দিলেন:
'প্রকৃতপক্ষে সে কাজকে আমি অবশ্যই ঘৃণা করি; কিন্তু যখন সে ঐ কাজ থেকে বিরত হবে, তখন থেকেই সে আমার ভাই।'
সেই অপরাধী ব্যক্তিটি আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কথাবার্তা শুনে এতই বিমুগ্ধ হল যে, তৎক্ষণাৎ তাওবা করে নতুন এক মানুষে পরিণত হলো।
এক যুবক আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল : 'হে রাসূলুল্লাহর সাথী, আমাকে কিছু উপদেশ দিন।'
তিনি সে যুবককে বললেন:
'হে প্রিয় বৎস! গোপনে গোপনে আল্লাহকে স্মরণ কর, আল্লাহ তোমাকে তোমার বিপদ ও কঠিন মুহূর্তে স্মরণ করবেন। হে প্রিয় বৎস, তুমি পারলে আলেম হও, নচেৎ শিক্ষার্থী। তা না পারলে কমপক্ষে শ্রবণকারী হও; কিন্তু মূর্খ অজ্ঞ হয়ে থেকো না। তাহলে ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রিয় বৎস, মসজিদই যেন তোমার বাড়ি হয়। কারণ, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:
'মসজিদ হলো প্রত্যেক খোদাভীরু লোকের বাড়ি, যারা মসজিদকে তাদের বাড়ি বানাবে, মহান আল্লাহ তাদের প্রশান্তি ও রহমতের নিশ্চয়তা দান করবেন এবং তাদের ওপর তাঁর রহমত, অনুগ্রহ ও করুণা বর্ষণ করবেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলার নিশ্চয়তাও প্রদান করবেন।'
তিনি একদিন দেখলেন, একদল যুবক রাস্তার পাশে বসে খোশগল্প করছে এবং পথচারীদের দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি তাদের কাছে গিয়ে বললেন :
'হে বৎসগণ! মুসলিম যুবকদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও পূত পবিত্র স্থান হলো তাদের নিজেদের বাসগৃহ। তাদের দৃষ্টিকে সংরক্ষণ ও নাফসকে নিয়ন্ত্রণ রাখার স্থান হলো নিজ নিজ গৃহ। তোমাদের নৈতিকতার জন্য সাংঘাতিক ধরনের অপরাধ হলো হাট-বাজার ও গমনাগমনের রাস্তায় বসে আড্ডা দেওয়া। কারণ, এ ধরনের বদ-অভ্যাস যুবকদের অকর্মণ্য করে তোলে ও তাদের নৈতিকতাকে ধ্বংস করে দেয়।'
তিনি দামেশকের গভর্নর থাকাকালীন মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর কাছে এক বিশেষ দূত প্রেরণ করেন। সে দূতের মাধ্যমে মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ প্রস্তাব পেশ করেন যে, তাদের মেয়ে দারদা'কে তার ছেলে ইয়াযীদের সঙ্গে বিবাহ দিতে যেন রাজি হন। তারা মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ছেলে ইয়াযীদের সঙ্গে তাদের মেয়ে দারদা'কে বিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং তার পরিবর্তে সাধারণ মুসলিম পরিবারের একজন উন্নত চরিত্রের অধিকারী দ্বীনদার আল্লাহভীরু যুবকের সঙ্গে বিয়ে দেন। আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ পদক্ষেপের কথা দামেশকবাসীর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। সমাজের সর্বস্তরের লোকজন আলোচনা করতে থাকে যে, আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মেয়েকে মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ছেলে ইয়াযীদের সাথে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সাধারণ মুসলিম পরিবারের এক ছেলের সাথে তাকে বিবাহ দিয়েছেন। কোনো এক ব্যক্তি তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর দেন :
'আমি আমার মেয়েকে যে ধরনের ইসলামী ধ্যান-ধারণার আলোকে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছি, এ বিবাহ প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে আমি ঠিক তার বিপরীত অবস্থা থেকে তাকে রক্ষা করেছি মাত্র।'
সে ব্যক্তি বলল: 'সেটা আবার কিভাবে?'
আবূ দারদা' তাকে পাল্টা প্রশ্ন করে বললেন:
'রাজপ্রাসাদে যখন তার সামনে সেবার জন্য ক্রীতদাসেরা সদা প্রস্তুত থাকবে এবং সে নিজেকে এমন প্রাসাদের মধ্যে দেখতে পাবে, যার ঝাড়বাতির চাকচিক্য দৃষ্টি কেড়ে নেবে, তখন তার দীন কোথায় থাকবে?'
তিনি সিরিয়ার গভর্নর থাকাকালীন আমীরুল মুমিনীন উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু গোপনে তাঁর অবস্থা জানার জন্য কোনো রাতের আঁধারে গভর্নর আবূ দারদা'র বাড়িতে পৌঁছে তাঁর ঘরের কড়া নাড়লেন। ঘরের দারজা খোলা পেয়ে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অন্ধকার ঘরে ঢুকে পড়লেন। আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কারো প্রবেশের পদধ্বনি আঁচ করে উঠে দাঁড়ালে দেখেন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু। তাঁকে খোশ আমদেদ জানালেন এবং বসতে বললেন। মুসলিম বিশ্বের দুই মহান নেতা রাতের অন্ধকারেই একান্ত পরিবেশে পারস্পরিক আলোচনায় নিমগ্ন হয়ে পড়লেন। আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঘরে কুপি জ্বালানোর মতো তেল না থাকায় রাতের আঁধারে তারা একে অপরকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। এ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ফাঁকে উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু আনহুর 'বালিশ' কেমন, আরামদায়ক, না সাধারণ তা হাত বাড়িয়ে দেখেন। তিনি দেখতে পান যে, আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তার ঘোড়ার পিঠে ব্যবহৃত কাপড়টিকেই রাত্রিবেলা বালিশ হিসেবে ব্যবহার করছেন। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবার আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বিছানার অবস্থা কেমন, তা হাত বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করেন। দেখেন, গুঁড়ো পাথর মিশ্রিত বালি সমতল করে নিয়ে একেই তিনি বিছানা বানিয়েছেন। এবার উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর লেপ-তোশকের অনুরূপভাবে খবর নিতে লাগলেন। দেখতে পেলেন যে, লেপ-তোশক বা কম্বল ইত্যাদি বলতে পাথর কণার বিছানায় তার একটি মাত্র পাতলা কম্বল যা দামেশকের প্রচণ্ড শীত প্রতিরোধের মোটেই উপযোগী নয়। এসব দেখে তিনি আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললেন:
'আমি কি আপনার প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর জন্য বাইতুলমাল থেকে উপযুক্ত ভাতার ব্যবস্থা করিনি? আমি কি আপনার মাসিক ভাতা যথাসময়ে আপনার কাছে প্রেরণ করিনি? আপনার এ দুরবস্থায় আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক।'
আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু খালীফাতুল মুসলিমীনকে উত্তর দিলেন: 'হে খালীফাতুল মুসলিমীন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সে হাদীসটি কি আপনার মনে পড়ে? যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শুনিয়েছিলেন?'
উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'কোন্টি?'
আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আমাদের একথা বলেননি? لَيَكُن بَلاغُ أَحَدِكُمْ مِّنَ الدُّنْيَا كَزَادِ رَاكِبٍ .
'দুনিয়ায় তোমাদের ধন-সম্পদ ও অর্থকড়ি যেন একজন মুসাফিরের সরঞ্জামাদির চেয়ে বেশি না হয়।'
উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন: 'হ্যাঁ।'
আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'হে খালীফাতুল মুসলিমীন, এ সত্ত্বেও আমরা কী করছি?'
উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কথা শুনে কাঁদতে লাগলেন। তাঁর সাথে সাথে আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নিজেও কাঁদতে থাকলেন। অতঃপর তাদের উভয়ের কাঁদতে কাঁদতেই রাত ভোর হয়ে গেল।
আবু দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত দামেশকবাসীদের হেদায়াতের জন্য ওয়ায-নসীহত জারি রাখেন। সর্বদাই তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সতর্ক করেন। আল কুরআনের ইল্ম, ইসলামের চিন্তা ও দর্শন এবং হিকমত-এর দীক্ষা দিতে থাকেন। জীবনের অন্তিম সময়ে তাঁর বন্ধু-বান্ধব তাঁর শয্যাপাশে উপস্থিত হয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন: 'আপনার অভিযোগ কী?'
তিনি বললেন: 'আমার গুনাহের ব্যাপারে আমি চিন্তিত।'
অতঃপর তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো: 'আপনার অন্তিম ইচ্ছা কী?'
তিনি বললেন: 'আল্লাহর ক্ষমাই আমার অন্তিম ইচ্ছা।'
অতঃপর তাঁর আশপাশের উপস্থিত সবাইকে বললেন: 'আমাকে কালেমা তাইয়েবার তালকীন করতে থাক।'
উপস্থিত লোকজন সমস্বরে কালেমা তাইয়েবার আবৃত্তি বা তালকীন করতে থাকেন। দেখতে পেলেন যে, তাঁর পবিত্র আত্মা এ দুনিয়া ত্যাগ করে ইল্লিয়্যীনের পথে রওয়ানা হয়ে গেছে।'
আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইনতিকালের পর প্রখ্যাত তাবেঈ আওফ ইবনে মালিক আল আশজাঈ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু স্বপ্নে দেখেন যে : 'সুবিস্তীর্ণ সুন্দর সবুজ মাঠ, যেদিকে নজর যায় সেদিকেই শুধু সবুজ, আর সবুজ, যার মধ্যখানে চামড়া দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি বিশালাকার একটি গম্বুজ। তার চারপাশে সাদা ও সম্মুখমুখী সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো হাজার হাজার বকরির পাল, যা কোনো চোখ কখনো দেখেনি।'
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: 'এসব কার?'
তাঁকে জানানো হলো: 'এসব আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর।'
অতঃপর আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেই গম্বুজ থেকে বেরিয়ে এসে তাঁকে বললেন:
'হে ইবনে মালেক, মহান আল্লাহ আমাদের আল কুরআনের বদৌলতে এসব দান করেছেন। তুমি যদি এ পথ ধরে আরো একটু এগিয়ে যাও, তাহলে এমন কিছু দেখতে পাবে, যা তোমার চোখ কোনো দিনই দেখেনি। এমন কিছু শুনতে পাবে, যা তোমার কান কোনো দিনই শোনেনি এবং এমন কিছু পাবে, যা কোনো দিন কল্পনাও করতে পারনি।'
ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জিজ্ঞাসা করলেন: 'হে আবূ মুহাম্মদ, এসব কার জন্য?'
তিনি বললেন: 'আল্লাহ এসব আবু দারদা'র জন্য সজ্জিত করে রেখেছেন। কেননা, আবূ দারদা' রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সত্যিকার অর্থেই এবং মনে-প্রাণেই দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও লোভ-লালসাকে পরিত্যাগ করেছিলেন এবং দুনিয়াকে তাঁর দু'হাত ও সীনা দ্বারা ধাক্কা দিয়ে দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন।'
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ৬১১৭ নং জীবনী। ২. আল ইসতিআব (হামেশে ইসাবাহ): ৩য় খণ্ড, ১৫ পৃ:, ৪র্থ খণ্ড, ১২৫৯ পৃঃ। ৩. উসদুল গাবাহ: ৪র্থ খণ্ড, ১৫৯ পৃঃ। ৪. হুলিয়াতুল আওলিয়া: ১ম খণ্ড, ৩০৮ পৃঃ। ৫. হুসনুস সাহাবা: ২১৮ পৃঃ। ৬. সাফওয়াতুস সাফওয়া: ১ম খণ্ড, ২৫৭ পৃঃ। ৭. তারীখুল ইসলাম লিযযাহাবী: ২য় খণ্ড, ১০৭ পৃঃ। ৮. হায়াতুস সাহাবা: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য। ৯. আল কাওয়াকিবুদ দুররিয়াহ: ১ম খণ্ড, ৪৫ পৃ:। ১০. আল আ'লাম লিযিরিকলী: ৫ম খণ্ড, ২৮১পৃ:।