📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 মাজযায়াত ইবনে সাওব আস সাদৃসী (রাঃ)

📄 মাজযায়াত ইবনে সাওব আস সাদৃসী (রাঃ)


'মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইতিহাস বিখ্যাত সেই যোদ্ধা, যিনি দেড় বছর স্থায়ী শুধুমাত্র মল্লযুদ্ধেই শতাধিক মুশরিক যোদ্ধাকে হত্যা করেছিলেন। কাজেই যুদ্ধের ময়দানে তাঁর দ্বারা অগণিত শত্রু সৈন্যের নিহত হওয়াতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।' -ঐতিহাসিকদের উক্তি

আল্লাহর রাহে নিবেদিত মুসলিম বীর যোদ্ধাদের অপূর্ব ত্যাগ ও কুরবানীর বিনিময়ে আল্লাহ কাদেসিয়ার যুদ্ধে মুসলমানদের অকল্পনীয় বিজয় দান করেন। এ বিজয়ের আনন্দে মুসলিম বাহিনী যেমন হয় আনন্দিত, যুদ্ধেও হয়েছিল তেমনি রণক্লান্ত। অনেক যোদ্ধার দেহে তখনো যখম দগদগ করছিল। চিকিৎসার অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা। শাহাদাতপ্রাপ্ত সাথীদের কথা স্মরণ করে তাঁদেরও বড়ই লোভ শাহাদাতের গৌরব লাভ করার। কাদেসিয়ার যুদ্ধের মতোই ভয়াবহ আরেকটি যুদ্ধের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন তাঁরা।

পারস্য সম্রাটের সিংহাসনের চির পতন ঘটানোর জন্য আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পক্ষ থেকে কখন নির্দেশ আসে, সে অপেক্ষায়ও আছেন তাঁরা। ধৈর্যের বাঁধ যেন আর আটকিয়ে রাখা যাচ্ছে না, শুধু আমীরুল মুমিনীনের একটা নির্দেশের প্রয়োজন। শাহাদাতের জন্য অপেক্ষমাণ জিহাদের জন্য শাণিত তরবারি সজ্জিত বীর যোদ্ধাদের আর বেশী দিন অপেক্ষা করতে হলো না। অপেক্ষার প্রহর কাটল। মদীনা মুনাওয়ারা থেকে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বিশেষ দূত কুফায় এসে উপস্থিত হলেন। হাতে তাঁর কুফার শাসক আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর উদ্দেশ্যে প্রেরিত খালীফাতুল মুসলিমীনের ফরমান।

নির্দেশ হলো, 'সত্বর যেন তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে বসরা থেকে আগত মুসলিম সৈন্যবাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে পারস্য সেনাপতি হুরমুযানকে সমুচিত শিক্ষা দিতে 'আহওয়াজ' প্রদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন এবং পারস্য সম্রাটের মুকুট ও সাম্রাজ্যের হৃৎপিণ্ড নামে খ্যাত 'তুস্তার' শহর দখল করেন।'

এ নির্দেশনামায় বিশেষভাবে এটাও উল্লেখ করা হয় যে, বনূ বকর গোত্রের অবিসংবাদিত নেতা, খ্যাতনামা অশ্বারোহী, বীর যোদ্ধা 'মাজযাআত ইবনে সাওর আস্ সাদৃসীকে'ও যেন এ অভিযানে সাথে নেওয়া হয়। আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ফরমান অনুযায়ী পারস্য সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিলেন। সাথে সাথে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। মুসলিম বাহিনী দ্রুত সমরসজ্জায় সজ্জিত হলেন। সেনাবাহিনীকে পুনর্বিন্যস্ত করা হলো। আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মাজযাআত ইবনে সাওর আস সাদৃসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সহকারী কমান্ড হিসেবে তৎকালীন যুদ্ধ-কৌশল অনুযায়ী তাঁর বাম পার্শ্বের বাহিনী প্রধান নিযুক্ত করলেন। অতঃপর তিনি ও মাজযাআত ইবনে সাওর আস সাদৃসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বীর মুজাহিদদেরকে সাথে নিয়ে বসরা থেকে আগত বাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে তুস্তার শহরের দিকে রওয়ানা হলেন।

মুসলিম বাহিনী একের পর এক পারস্যের শহর, বন্দর ও নগর বিজয় করতে করতে সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকেন। পারস্য সম্রাটের সেনাপতি ও তার বাহিনী মুসলিম বাহিনীর আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে এক দুর্গ থেকে অন্য দুর্গে পলায়নের পথ ধরে পিছু হটতে থাকে। পরিশেষে তারা প্রতিরক্ষার জন্য দুর্ভেদ্য নগরী তুস্তারে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে।

তুস্তার ছিল শিক্ষা-সংস্কৃতি, কৃষ্টি-সভ্যতা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আবহাওয়া এবং আধুনিকতায় পারস্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নগরী। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দানে সে এক সীসাঢালা প্রাচীরবেষ্টিত শহর এবং পারস্য সম্রাটের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

ভূমি থেকে উঁচুতে অবস্থিত সুদৃশ্য অশ্বাকার সাদৃশ্যের প্রাচীনতম শহর তুস্তারকে খরস্রোত দুজাইল নদী তার সুপেয় পানি দিয়ে সর্বদা সতেজ রেখেছিল। শহরটির সর্বোচ্চ স্থানে প্রাচীন যুগে 'সম্রাট শাহপুর' সিংহসদৃশ এমন একটি ফোয়ারা তৈরি করেন, যেন শহরের তলদেশে সুড়ঙ্গপথে প্রবাহিত দুজাইল নদীর স্রোতধারা সেই ফোয়ারা দিয়ে প্রবাহিত হয়।

তুস্তার নগরীর তলদেশে তৈরি এ সুড়ঙ্গ ঝর্নাপথ, অশ্বাকার সদৃশ শহরটি এবং সিংহসদৃশ ফোয়ারা যেমন ছিল নয়নাভিরাম, তেমনি অনন্য কারুকার্যমণ্ডিত। বৃহদাকার শিলাখণ্ডকে কেটে কেটে তা প্রস্তুত করা হয়েছিল। লৌহ এবং অন্যান্য ধাতব মিশ্রিত মযবুত পিলার দ্বারা স্থিতিশীল করে সুড়ঙ্গ পথকে সীসা দ্বারা প্লাস্টার মুজাইক করে দেওয়া হয়েছিল। সে শহরের চতুষ্পার্শ্বে উঁচু প্রাচীরের বেষ্টনি দ্বারা দুর্ভেদ্যভাবে ঘেরাও করে রাখা হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে:

'পৃথিবীর সর্বপ্রথম ও সর্ববৃহৎ প্রাচীর এটি। এ প্রাচীরের চারপাশে পারস্য সেনাপতি হরমুযান এমন বিরাট খন্দক খনন করে রেখেছিল, যা অতিক্রম করা ছিল যে কোনো আক্রমণকারী বাহিনীর জন্য দুঃসাধ্য ব্যাপার।'

বিভিন্ন এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়ে পারস্য সেনাপতি হরমুযান এর ভিতরে আশ্রয় নেয় এবং খন্দককে রক্ষার জন্য পারস্যের সেরা চৌকস সৈন্যদের পাহারায় নিয়োজিত করে।

সুদক্ষ মুসলিম বাহিনী এর চারপাশে অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ ১৮ মাস এ খন্দককে অবরোধ করে রাখেন। এ অবরোধে পারস্য সৈন্যদের বিরুদ্ধে পরপর ৮০টি যুদ্ধ হয়; কিন্তু সফলতা আসেনি তাতে। যার প্রতিটিই মল্লযুদ্ধ থেকে শুরু করে রক্তাক্ত যুদ্ধে রূপান্তরিত হতে থাকে। মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এসব সংঘর্ষে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হন, যা একই সাথে শত্রু-মিত্র উভয় বাহিনীকেই স্তম্ভিত করে দেয়।

এসব মল্লযুদ্ধে পারস্য সৈন্যদের বাছাইকৃত যুদ্ধবাজ বীর পাহলোয়ানদের শতাধিককে তিনি একাই হত্যা করে ইতিহাস রচনা করেন। যে কারণে পারস্য সৈন্য বাহিনীর প্রতিটি সৈনিকের মনে তাঁর সম্পর্কে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে মুসলিম বাহিনীর মনোবলও বৃদ্ধি পায়। ফলে মুসলিম বাহিনী আরও অধিক ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে।

ইতঃপূর্বে যারা মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে চিনতেন না তারাও বীরত্বের কারণে তাঁকে চিনে ফেলেন এবং সবাই এটা ভালো করে বুঝতে সক্ষম হন যে, কেন আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ যুদ্ধে উপস্থিতির জন্য বিশেষভাবে মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ওপর এতো গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।

৮০টি খণ্ডযুদ্ধের সর্বশেষ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী শত্রুবাহিনীর ওপর মারাত্মক এক ঝটিকা আক্রমণ করে বসে। যে আক্রমণের মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে তারা খন্দকের ওপর তৈরি সেতু ছেড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। তারা শহরের ভিতর প্রবেশ করে দুর্গের ফটক বন্ধ করে দেয়। এবার মুসলিম বাহিনী অধিকতর কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন। এতদিনের বিজয় নৈপুণ্য ও ত্যাগ যেন ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম। পূর্বের চেয়ে এবার তারা আরো অধিক দুর্ভোগের সম্মুখীন হলেন।

শত্রুবাহিনী কেল্লার ওপর থেকে মুসলিম বাহিনীর ওপর অব্যাহতভাবে তীর নিক্ষেপ ও এমনসব লোহার শিকল নিক্ষেপ করতে থাকে যেসব শিকলের মাথায় সংযুক্ত ছিল বঁড়শির মতো কুঁকড়ানো আংটা, যা আগুনে জ্বালিয়ে লাল করে নেওয়া হতো। মুসলিম বাহিনীর প্রাচীর অতিক্রমকারী কোনো সৈনিকের শরীরে তা বিঁধে গেলেই তাঁকে সজোরে ওপরে টেনে তোলা হতো। যাদের টেনে তুলতে পারত না তারা আংটায় বিদ্ধ হয়ে পুড়ে যেতেন এবং শরীরের গোশত গলে নিচে পড়ে শহীদ হয়ে যেতেন।

মুসলিম বাহিনী সীমাহীন এই দুর্ভোগের এক পর্যায়ে আল্লাহর কাছে এ কঠিন অগ্নিপরীক্ষা থেকে নাজাত এবং শত্রুদের ওপর বিজয় লাভের জন্য একাগ্রচিত্তে দু'আ করতে লাগলেন। এদিকে বারবার প্রাচীর ভেদে ব্যর্থ হয়ে মুসলিম সেনাপতি আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তুস্তার নগরীর ঐতিহাসিক প্রাচীর কী করে ভেদ করা যায় সে বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলেন। কিন্তু কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে তিনি বারবার ব্যর্থতার শিকার হতে থাকলেন। এমতাবস্থায় প্রাচীরের ওপর থেকে হঠাৎ একটি তীর তাঁর সামনে এসে পড়ল। তীরটির দিকে তাকিয়ে তিনি দেখতে পেলেন যে, তার সাথে একটি পত্র সংযুক্ত। তাতে লেখা রয়েছে:

'মুসলিমগণ! আপনাদের প্রতি আমি দৃঢ় আস্থা পোষণ করছি। আমি ও আমার পরিবারসহ বাকি সঙ্গী-সাথীদের জান ও মালের নিরাপত্তা আরয করছি। যার বিনিময়ে আপনাদেরকে 'তুস্তার নগরীর' গোপন প্রবেশ পথ দেখিয়ে দিতে চাই।'

আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সাথে সাথে পত্র-প্রেরক তীরন্দাযকে লক্ষ্য করে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে উত্তর সম্বলিত জবাবী তীর নিক্ষেপ করলেন।

পারস্যবাসীরা মুসলমানদের সত্যবাদিতা, প্রতিশ্রুতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং ওয়াদা ভঙ্গ না করা সম্পর্কে পূর্ব থেকেই ওয়াকিবহাল ছিল। এ জন্য সে আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর জবাবে মোটেই সন্দেহ পোষণ করল না।

রাতের অন্ধকারে হামাগুড়ি দিয়ে সে মুসলিম বাহিনীর প্রহরীদের কাছে উপস্থিত হলো এবং সেনাপতি আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে দেখা করে নিম্নোক্ত বক্তব্য তুলে ধরল :

'আমরা আমাদের সম্প্রদায়ের সম্মানিত ও শ্রদ্ধাভাজন নেতৃবর্গ। হরমুযান আমার বড় ভাইকে হত্যা করেছে। তার পরিবার-পরিজনের ওপর চরম নির্যাতন চালিয়েছে এবং আমার ব্যাপারেও তার অন্তরে বিদ্বেষের আগুন জ্বলছে। এমনকি তার হাতে আমার ও আমার সন্তানদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। সে জন্য তার নির্যাতন ও যুলুমের ওপর আপনার ন্যায়নীতি ও ইনসাফকে প্রাধান্য দিচ্ছি। যেমন প্রাধান্য দিচ্ছি তার বিশ্বাসঘাতকতার ওপর আপনার প্রতিশ্রুতিকে। সে কারণেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমি তুস্তার নগরীতে প্রবেশের গোপন পথ আপনাদের দেখিয়ে দেব, যে পথ দিয়ে আপনারা ভিতরে প্রবেশ করতে পারবেন। অতএব আপনি খুবই বিচক্ষণ, সাহসী এবং সাঁতারে পটু এমন এক ব্যক্তিকে সঙ্গে দিন, যাকে আমি সেই গোপন পথটি দেখিয়ে দিতে পারি।'

একথা শুনে আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মাজযাআত ইবনে সাওর আস সাদৃসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ডেকে নিয়ে চুপি চুপি বিস্তারিত বর্ণনা করলেন:

'এখন তোমার গোত্র থেকে চতুর, সাহসী এবং সাঁতারে পটু এমন একজনকে বেছে দাও।'

মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'হে আমীরুল মুজাহিদীন! অন্য কাউকে না খুঁজে আপনি আমাকেই এ কাজে নিযুক্ত করতে পারেন।'

আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জবাব দিলেন:
'তুমি যদি স্বেচ্ছায় যেতে চাও, তাহলে আল্লাহর ফযলে খুবই ভালো হয়।'

অতঃপর তিনি মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে পরামর্শ দিলেন:
'রাস্তা ভালো করে চিনে নিতে হবে। প্রবেশদ্বার ও হরমুযানের অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত হতে হবে। তার জনশক্তি সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং এ সংবাদ কাউকে বলা যাবে না।'

অতঃপর রাতের অন্ধকারে মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইরানী পথ-প্রদর্শকের সাথে রওয়ানা হলেন। তুস্তার নগরী ও দুজাইল নদীর মাঝখানে বিদ্যমান খন্দক দিয়ে তারা প্রবেশ করলেন একটি সুড়ঙ্গে। খরস্রোত এ সুড়ঙ্গপথের অবস্থা ছিল বড়ই বন্ধুর ও বিপজ্জনক। হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ পথ এমন গভীর হতো যে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর দিয়ে সাঁতরিয়ে চলতে হতো। আবার হঠাৎ এমন সরু হয়ে আসতো যে, হামাগুড়ি দিয়ে এগুতে হতো। কখনো পথটি প্রশস্ত নদীতে পরিণত হতো। কখনো তা আঁকাবাঁকা হয়ে যেত, আবার দেখতে না দেখতেই পুনরায় সোজাসুজি রূপ নিত। এভাবে চলতে চলতে পরিশেষে তারা তুস্তার নগরীর প্রবেশদ্বারের কাছে উপনীত হলেন।

এ গোপন অভিযানে মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পথ প্রদর্শনকারীর বড় ভাইয়ের হত্যাকারী পারস্য সেনাপতি হরমুযান এবং তার অবস্থানস্থল ভালো করে দেখে নিলেন। প্রথম বার হরমুযানকে দেখা মাত্রই মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে বিষাক্ত তীরবিদ্ধ করে হত্যার মনস্থ করলেন; কিন্তু সে মুহূর্তে তাঁর সেনাপতি আবু মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পরামর্শের কথা স্মরণ হলো। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন:

'একথা যেন প্রকাশ না পায় এবং অভিযান যাতে গোড়াতেই বিফল না হয়।'

তাই তিনি অতিকষ্টে নিজেকে সংবরণ করে নিলেন এবং সমস্ত খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহের পর সুবহে সাদিকের পূর্ব মুহূর্তে সেই বিপজ্জনক সুড়ঙ্গপথে যথাস্থানে ফিরে এলেন।

আবূ মূসা আল্ আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসলিম বাহিনী থেকে বেছে বেছে সাহসী, বীর, বিপদ-মুসীবতে ধৈর্যশীল ও সাঁতারে পারদর্শী ৩০০ যোদ্ধাকে এ সুড়ঙ্গপথে অভিযান চালানোর জন্য মনোনীত করলেন এবং মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে এই কমান্ডো বাহিনীর 'আমীরুল জিহাদ' নিযুক্ত করলেন। তিনি নিজে তাঁদের সাথে কিছুদূর অগ্রসর হলেন ও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশাবলি দেওয়ার পর বিদায় দিলেন এবং 'আল্লাহু আকবার'কে শত্রুবাহিনীর ওপর আক্রমণের 'পাসওয়ার্ড' বা গোপন সংকেতশব্দ নির্ধারণ করে দিলেন।

মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনীর সদস্যদের নিজ কাপড়-চোপড় আঁটসাঁট করে নেওয়ার নির্দেশ দিলেন যেন সুড়ঙ্গপথের পানিতে সাঁতরাতে তাঁদের কোনো অসুবিধা না হয়। সৈন্যদের তরবারি ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র সঙ্গে নিতেও নিষেধ করে দিলেন এবং তরবারিকে দেহের সাথে এমনভাবে বেঁধে নিতে বললেন যেন সহজে খুলে না যায়। অতঃপর তিনি তাঁর বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে রাত গভীর হওয়ার পূর্বেই সুড়ঙ্গপথের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।

এই ভয়াবহ সুড়ঙ্গপথে মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর দুঃসাহসী বীর কমান্ডো বাহিনীকে নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা পথ চললেন। কখনো বা তারা এ দুর্গম পথের খরস্রোতকে উপেক্ষা করে বিজয়ী বেশে সামনে অগ্রসর হতেন। আবার কখনো বা নাকে-মুখে পানি ঢোকার কারণে তীব্র খরস্রোতের কাছে পরাভূত হতেন।

এভাবে পথ চলতে চলতে মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তুস্তার নগরীর প্রবেশদ্বারে এসে উপস্থিত হলেন। এখানে পৌছে দেখতে পেলেন যে, তাঁর ৩০০ জন সাথী যোদ্ধাদের ২২০ জনই এ সুড়ঙ্গপথে খরস্রোতের শিকার হয়ে শাহাদাত বরণ করেছেন এবং তাঁর সাথে জীবিত রয়েছেন মাত্র ৮০ জন।

তিমিরাচ্ছন্ন ভয়াবহ এ সুড়ঙ্গপথে যে ৮০ জন ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত সাথী জীবিত ছিলেন, তাঁদের নিয়েই তিনি তুস্তার নগরীর ভিতরে প্রবেশ করার সাথে সাথে তরবারি উন্মুক্ত করে মুহূর্তের মধ্যেই অসতর্ক প্রহরীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাদের তীক্ষ্ণধার তরবারির আঘাত বিদ্যুৎবেগে প্রহরীদের দ্বিখণ্ডিত করে চলল। মুহূর্তের মধ্যেই প্রহরীদের নিরাপত্তা ব্যূহ ভেদ করে তারা তুস্তার নরগীতে প্রবেশের সবক'টি ফটক খুলে দিতে সক্ষম হলেন। মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাহিনী ভিতর থেকে এবং মুসলিম বাহিনী দুর্গের বাইর থেকে এক সঙ্গে 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দিয়ে তুস্তার নরগীকে কাঁপিয়ে তুললেন।

ফজরের পূর্ব মুহূর্তে মুসলিম বাহিনী বাঁধভাঙা স্রোতের ন্যায় তুস্তার নগরীতে প্রবেশ করল। প্রচণ্ড সংঘর্ষ বেধে গেল। সে কি ভয়াবহ সংঘর্ষ। যেমন ভীতিকর, তেমনি রক্তক্ষয়ী। ইতিহাস এমন সংঘর্ষ খুব কমই প্রত্যক্ষ করেছে।

এ ভয়াবহ যুদ্ধের এক চরম পর্যায়ে মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দৃষ্টি পড়ল পারস্য সেনাপতি হরমুযানের ওপর। তিনি দেখতে পেলেন যে, সে এক উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে সৈন্য পরিচালনা করছে। কালবিলম্ব না করে তিনি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তরবারির আঘাত হানা মাত্রই উভয় বাহিনীর ভিড়ের এক ফাঁকে অল্পের জন্য হুরমুযান বেঁচে গিয়ে সহযোদ্ধাদের মধ্যে আত্মগোপন করে ফেলল। যুদ্ধের এক ফাঁকে সে আবার মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দৃষ্টিতে পড়ে গেল। তাকে দেখামাত্রই মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবারও হরmuযানের ওপর আক্রমণ চালালেন। এবার মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও হুরমুযানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ বেধে গেল। একে অপরকে বীরবিক্রমে আঘাতের পর আঘাত হেনে চললেন। তাদের পরস্পরের যেমন আক্রমণ-ভঙ্গি, তেমনি প্রতিহত-কৌশল। আঘাতের পর আঘাতের এক পর্যায়ে মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তরবারি পিছলে গেলে হরমুযানের তরবারি আঘাত করল বীর সেনাপতি মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে। যে আঘাতে তিনি ভূতলে লুটিয়ে পড়লেন। শাহাদাতের এ মুহূর্তে তাঁরই নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর এ বিজয় স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে করতে যুদ্ধের ময়দানেই তিনি চির বিদায় গ্রহণ করলেন।

বিজয়ের এই শুভ মুহূর্তে সেনাপতির শাহাদাত মুহূর্তের জন্যও মুসলিম বাহিনীকে দ্বিধাগ্রস্ত করল না। বীরবিক্রম এ আক্রমণকে তারা আরো বেগবান করে তুললেন। দেখতে না দেখতেই পারস্য সেনাপতি হরমুযান মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হলো ও মুসলিম বাহিনীকে আল্লাহ চূড়ান্ত বিজয় দান করলেন।

অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বিজয়ের সুসংবাদ জানানোর জন্য দ্রুতগামী সংবাদ বাহককে মদীনা মুনাওয়ারা প্রেরণ করা হলো। চৌকস মুজাহিদ বাহিনীর মাধ্যমে বন্দী পারস্য সেনাপতিকে মদীনা মুনাওয়ারায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলো। সামনে সামনে চলতে থাকল বন্দী পারস্য সেনাপতি হরমুযান। তার মাথায় ছিল হীরা-মণি-মুক্তাখচিত মুকুট ও তার কাঁধে শোভা পাচ্ছিল স্বর্ণের তৈরি ব্যাজ ও পদকসমূহ, যেন খালীফাতুল মুসলিমীন তা প্রত্যক্ষ করতে পারেন।

খালীফাতুল মুসলিমীনের দরবারে পারস্য বিজয় এবং হরমুযানকে বন্দী করার এ আনন্দ সংবাদের সাথে সাথে তারা মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মতো বীর অশ্বারোহী যোদ্ধার শাহাদাতের শোক-সংবাদও বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

টিকাঃ
১. তারীখুল উমাম ওয়াল মুলুক: আতাবারী ৪র্থ খণ্ড, ২১৬ পৃ.। ২. তারীখ খলীফা বিন খায়‍্যাত: ১ম খণ্ড, ১১৭ পৃ.। ৩. তারীখুল ইসলাম লিয্যাহাবী: ২য় খণ্ড, ৩০ পৃ.। ৪. মু'জামুল বুলদান লিল ইয়াকুত: মাদ্দা তাসতুর। ৫. আল ইসাবাহ : ৭৭৩ নং জীবনী। ৬ উসুদুল গাবা : ৪র্থ খণ্ড, ৩০ পৃ.।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 উসাইদ ইবনে হুদাইর (রাঃ)

📄 উসাইদ ইবনে হুদাইর (রাঃ)


'হে উসাইদ! ফেরেশতারা তোমার মধুর সুরে পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত শুনতে এসেছিল।' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)

ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম দাঈ ইলাল্লাহর অন্যতম হলেন মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু। প্রিয়নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের সংবাদ নিয়ে মক্কার এ যুবক ইয়াসরিবে (বর্তমান মদীনা মুনাওয়ারায়) উপস্থিত হন। তিনি খাযরাজ গোত্রের এক প্রভাবশালী নেতা আস'আদ ইবনে যুরারাহ'র অতিথি হিসেবে তাঁর বাড়িতে উঠেন। এ বাড়িকেই তাঁর অবস্থানস্থল এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত ও ইসলামী দাওয়াত প্রচারের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেন।

ইয়াসরিবের যুবকরা ইসলামের এই মহান মুবাল্লিগ মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দাওয়াতী সমাবেশগুলোতে খুবই উৎসাহের সাথে যোগ দিতে থাকে। এদিকে এই নূরানী চেহারার মানুষটি তাঁর সুমধুর কণ্ঠে হৃদয়গ্রাহী ভাষায় ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। সমাবেশের কলেবর দিনে দিনে বড় হতে থাকে। তাঁর চারিত্রিক গুণাবলির আকর্ষণ ছাড়াও যে শক্তিটি শ্রোতাদের সবচেয়ে বেশী আকৃষ্ট করত, তা হলো সুমিষ্ট সুরে আল কুরআনের তিলাওয়াত। তিনি আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে সংশ্লিষ্ট কুরআনের আয়াতগুলো মধুর সুরে তিলাওয়াত করতেন। যা শুনে কঠিন হৃদয়ও বিগলিত হয়ে যেত, শ্রোতাদের অনুশোচনার অশ্রু ঝরত। তাঁর এমন কোনো সমাবেশ ছিল না, যে সমাবেশে দলবদ্ধভাবে লোকজন ইসলাম গ্রহণ করে ঈমানী কাফেলার এ সংগঠনে শরীক না হতো।

একদা আসআদ ইবনে যুরারাহ তাঁর মেহমান মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সাথে নিয়ে বনূ আবদুল আশহাল গোত্রের জনশক্তিকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্যে রওয়ানা হলেন। বনূ আবদুল আশহাল গোত্রের একটি বাগানে সুপেয় পানির কূপের সন্নিকটে খেজুর গাছের ছায়ায় এসে তাঁরা বসে পড়লেন। যারা ইতঃপূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তারা এবং আগ্রহী অন্যান্যরাও ইসলামের মর্মবাণী শোনার জন্য একত্রিত হলেন। মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ আলোচনায় আল্লাহর ডাকে সাড়া দানকারীদের পুরস্কারস্বরূপ জান্নাতের সুসংবাদ ছিল। তাঁর আলোচনা শোনার জন্য চারপাশ থেকে লোকজন এসে ভিড় জমাল এবং তাঁর জ্ঞানগর্ভ ও মূল্যবান আলোচনা মনোযোগ সহকারে শুনতে লাগল।

এমন সময় এক ব্যক্তি গিয়ে আওস গোত্রের প্রখ্যাত দুই সরদার উসাইদ ইবনে হুদাইর এবং সা'দ ইবনে মুআযকে সংবাদ দিল যে: 'আসআদ ইবনে যুরারাহ-এর পৃষ্ঠপোষকতায় মক্কা থেকে আগত ইসলামের এক প্রচারক আপনাদের বাড়ির কাছেই এসে সমাবেশ করছে।'

এ সংবাদ শুনেই উসাইদ ইবনে হুদাইর ক্রোধান্বিত হয়ে উঠল সা'দ ইবনে মুআয তাঁকে আরো উৎসাহিত করে বলল: 'চলো, মক্কা থেকে আগত সেই যুবকের কাছে, যে আমাদের বাড়ির সীমানায় বসে গরীব-নিঃস্বদের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে ও তাদের ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করছে। আমাদের দেব-দেবীকে মন্দ বলছে ও ভর্ৎসনা করছে। তাকে এ কাজ থেকে বিরত কর, তাকে সতর্ক করে দাও। এরপর থেকে যেন সে আর কখনো আমাদের বাড়ির ধারে-কাছেও না আসে।'

সে তার প্রতিবাদী কণ্ঠকে কোনো বিরতি না দিয়ে আরো বলল: 'যদি সে আমার খালাত ভাই উসাইদ ইবনে যুরারাহর অতিথি না হতো ও তার ছত্রছায়ায় না চলত, তাহলে তাকে প্রতিহত করার জন্য আমিই যথেষ্ট ছিলাম।'

আর সময় ক্ষেপণ না করে উসাইদ তার বর্শাখানা হাতে নিয়ে বাগানের সেই সমাবেশের দিকে রওয়ানা হলো।

আসআদ ইবনে যুরারাহ তাকে সভার দিকে অগ্রসর হতে দেখেই মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে লক্ষ্য করে বললেন:

'হে মুসআব! আপনার কল্যাণ হোক এবং আপনি সফল হোন। আগন্তুক তার গোত্রের সরদার। গোত্রের সবচাইতে বিচক্ষণ, জ্ঞানী, সম্মানিত ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। এই ব্যক্তিই উসাইদ ইবনে হুদাইর! যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে তার অনুসরণে অগণিত লোক ইসলাম গ্রহণ করবে। তাকে আল্লাহর প্রভুত্বের ব্যাপারে সঠিক ধারণা দিন এবং সুন্দরভাবে তার নিকট ইসলামের দাওয়াত উপস্থাপন করুন।'

উসাইদ ইবনে হুদাইর সভাস্থলে এসে দাঁড়াল এবং মুসআব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথীর দিকে ক্রোধান্বিত হয়ে বলল:

'আমাদের বাড়ির সীমানায় তোমরা কী উদ্দেশ্যে এসেছো? কেনই বা গরীব ও নিঃস্ব সহজ-সরল লোকদের প্রতারিত করছ? যদি বাঁচতে চাও তোমরা দু'জন এখনই এ জনপদ ছেড়ে চলে যাও।'

জ্যোতির্মান চেহারা ও ঈমানী চেতনায় বলীয়ান, দৃঢ় মনোবলসম্পন্ন মিষ্টভাষী দাঈ মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আওস সরদার উসাইদের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাঁর স্বভাবসুলভ ভাবগম্ভীর ও স্পষ্ট ভাষায় বললেন:

'হে আওস গোত্রের নেতা! আমি কি আপনাকে এর চেয়েও উত্তম একটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারি?'

আওস সর্দার উসাইদ বলল:
'সেটা আবার কী?'

মুসআব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন:
'আমাদের এ সভায় একটু বসুন এবং আমরা যা বলছি তা একটু শুনুন। যা কিছু আলোচনা করছি, যদি মনে করেন যে, এসব কথা যুক্তিযুক্ত, তাহলে তা আপনিও গ্রহণ করুন। আর যদি মনে করেন, এসব কথা যুক্তিসঙ্গত ও বিবেকসম্মত নয়, তাহলে আমরা অবশ্যই এখান থেকে চলে যাবো এবং আর কখনো এখানে আসব না।'

উসাইদ ইবনে হুদাইর বলল: 'হ্যাঁ, তুমি যথার্থই বলেছ।'

তারপর সে তার বর্শাখানা মাটিতে রেখে বসে পড়ল।

মুসআব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে উদ্দেশ্য করে তাওহীদের মর্মবাণী সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে লাগলেন এবং আলোচনার মাঝে মাঝে পবিত্র কুরআন মাজীদ থেকে কিছু কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে শোনাতে থাকলেন।

আওস সরদার উসাইদ ইবনে হুদাইর মনোযোগ সহকারে তাঁর আলোচনা শুনতে লাগল। আলোচনার আকর্ষণে ভিতরে ভিতরে মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে তার হাত রেখে বায়'আতের জন্য যেন প্রস্তুত হলো।

এক পর্যায়ে সে সজোরে বলে উঠল: 'আহ! তুমি যা বলছ, তা কী সুন্দর! আর যা তুমি তিলাওয়াত করছ! তা কতই না মধুর!'

এ বলেই পুনরায় প্রশ্ন করল: 'যদি কেউ ইসলামে প্রবেশ করতে চায়, তাহলে সে কিভাবে ইসলামে প্রবেশ করবে?'

মুসআব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'গোসল করে নিতে হবে এবং পাক-পবিত্র কাপড়-চোপড় পরিধান করে ঘোষণা দিতে হবে:

'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। অতঃপর দু'রাকআত নামায আদায় করতে হবে।'

অতঃপর আওস গোত্রের একচ্ছত্র এই নেতা নিকটস্থ কূপে গোসল করে পাকসাফ হয়ে কালেমা শাহাদাতের ঘোষণার মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ এবং শুকরিয়াস্বরূপ দু'রাকআত নামায আদায় করলেন। যেভাবে তিনি ইসলামের গণ্ডিতে প্রবেশ করেন আরবের বিস্ময় যে, তাঁর মতো একজন বীর সৈনিক কী করে ইসলামে দীক্ষিত হলো? তিনি ছিলেন আওস গোত্রের হাতেগোনা বিনয়ী, ভদ্র, বিচক্ষণ, চতুর, বিজ্ঞ ও খ্যাতনামা একমাত্র নেতা। তিনি অশ্বারোহী এবং তীরন্দাযীতেও ছিলেন অতুলনীয়। তাঁর গোত্রের লোকেরা তাঁকে 'কামেল' বা সর্বগুণে গুণান্বিত উপাধিতে ভূষিত করেছিল। তৎকালীন সমাজে তিনি ছিলেন শিক্ষা-দীক্ষায় এক বিরল ব্যক্তিত্ব।

তাঁর ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে সা'দ ইবনে মুআযও কালেমা শাহাদাতের ঘোষণা দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। এ দুই নেতার একত্রে ইসলাম গ্রহণের ঘটনায় প্রভাবিত হয়ে আওস গোত্রের নারী-পুরুষ অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করলেন। তাঁদের এই প্রশংসনীয় ভূমিকার প্রভাবে ইয়াসরিবে ক্রমশ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হতে থাকল এবং খুব শীঘ্রই তা ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানীতে পরিণত হলো।

মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মধুর সুরে কুরআন তিলাওয়াতে মুগ্ধ হয়ে তাঁর তিলাওয়াতের অনুকরণে নিষ্ঠার সাথে সর্বদা কুরআন তিলাওয়াতে তিনি নিমগ্ন থাকতেন। তাঁর প্রাণপ্রিয় বন্ধু মুসআব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মধুর সুরে কুরআন তিলাওয়াতকে তিনি এমনভাবেই গ্রহণ করেন, যেমনটি মরুপ্রান্তরের প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি প্রাণরক্ষায় ব্যাকুল হয়ে শীতল সুপেয় পানির পাত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়। মনোযোগ সহকারে কুরআন তিলাওয়াতকেই তিনি জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ'র একজন অগ্রগামী মুজাহিদের বেশে অথবা মধুর সুরে কুরআন তিলাওয়াত ছাড়া অন্য কোনো অবস্থায় তাঁকে খুব কমই দেখা যেত।

উসাইদ ইবনে হুদাইরের ছিল সুমধুর কণ্ঠ ও স্পষ্ট বাচনভঙ্গি এবং ভাব প্রকাশের বিরল যোগ্যতা। তাঁর কালামে পাকের তিলাওয়াত খুবই শ্রুতিমধুর ছিল। তাঁর তিলাওয়াত আরো মনোমুগ্ধকর রূপ নিত, যখন তিনি গভীর রাতের নিস্তব্ধ পরিবেশে তিলাওয়াত করতেন। গভীর রাতে তাঁর তিলাওয়াত শোনার জন্য সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম ঔৎসুক্য নিয়ে প্রতীক্ষায় থাকতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যে মধুর সুরে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল, সেই অপূর্ব কন্ঠস্বর দান করা হয়েছিল তাঁকে। সেদিক দিয়ে তিনি কতই না সৌভাগ্যবান! উসাইদ ইবনে হুদাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তিলাওয়াত শুধু সাহাবীরাই উপভোগ করতেন না; বরং আকাশের ফেরেশতারাও তাঁর তিলাওয়াত উপভোগ করতেন।

কোনো এক গভীর রাতে উসাইদ ইবনে হুদাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাড়ির আঙিনায় বসেছিলেন। তাঁর পাশেই তাঁর ছেলে ইয়াহ্ইয়া ঘুমাচ্ছিল। নিকটেই জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ'র জন্য সর্বদা প্রস্তুত রাখা ঘোড়াটি বাঁধা ছিল।

রাত ছিল নীরব-নিস্তব্ধ। পরিচ্ছন্ন আকাশের তারকারাজি ছিল পৃথিবীকে মৃদু আলোদানে রত। নিঝুম ও স্নিগ্ধ পরিবেশের এ চমৎকার দৃশ্যে তিলাওয়াতের জন্য উসাইদ ইবনে হুদাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মন উৎফুল্ল হয়ে উঠল। তিনি মধুর ও নরম সুরে তিলাওয়াত আরম্ভ করলেন:

الٓمّٓ - ذَلِكَ الْكِتٰبُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ - الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلٰوةَ وَمِمَّا رَزَقْنٰهُمْ يُنْفِقُونَ - وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَبِالْاٰخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ. (سورة البقرة : ١ - ٤ )

এ পর্যন্ত তিলাওয়াত করতে না করতেই তিনি দেখতে পেলেন যে, তাঁর ঘোড়াটি যেন কিসের আতঙ্কে আতঙ্কিত হয়ে লাফালাফি করছে। বাঁধনের রশি ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা হচ্ছিল। এ দেখে তিনি তিলাওয়াত বন্ধ করলেন। সাথে সাথে ঘোড়াটিও স্থির ও শান্ত হয়ে গেল। তিনি পুনরায় তিলাওয়াত শুরু করলেন:

أُولٰئِكَ عَلٰى هُدًى مِّنْ رَّبِّهِمْ وَأُولٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ - (سورة البقرة : ٥)

তিলাওয়াত আরম্ভ করতে না করতেই এবার আরও দ্বিগুণ জোরে ঘোড়াটি লাফালাফি আরম্ভ করে দিল। তিনি পুনরায় তিলাওয়াত বন্ধ করলে ঘোড়াটিও শান্ত হয়ে গেল। এভাবে তিনি বারবার তিলাওয়াত করছিলেন এবং ঘোড়াটিও বারবারই লাফাচ্ছিল। আর তিনি থেমে গেলে ঘোড়াটিও থেমে যাচ্ছিল।

এ অবস্থায় ঘোড়াটি তাঁর ঘুমন্ত ছেলেকে পদপিষ্ট করতে পারে এ আশঙ্কায় কাছে গিয়ে তাকে জাগাতে চাইলেন। এ সময় হঠাৎ আকাশের দিকে তাঁর দৃষ্টি পড়লে দেখলেন এক অপূর্ব দৃশ্য!

'যা আকাশে ছায়াপথের মতো অনুপম আলোকচ্ছটা জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত অভাবনীয় সৌন্দর্য শোভা ছড়াচ্ছিল।'

তিনি তো পূর্বে কখনো এ অপরূপ শোভা প্রত্যক্ষ করেননি। তাঁর মনে হয়েছিল যে:
'জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত অসংখ্য প্রদীপ প্রজ্বলিত হয়ে সুশোভিত করে তুলেছে। সমস্ত নভোমণ্ডল আলোকিত হয়ে পড়েছে। সে জ্যোতি ও শুভ্রতা নভোমণ্ডলের সীমা ছাড়িয়ে ঊর্ধ্বেই উঠে চলেছে।'

ভোর হলে উসাইদ ইবনে হুদাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে রাতের ঘটনা বর্ণনা করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন:

'হে উসাইদ! তারা ছিল ফেরেশতা। তারা তোমার তিলাওয়াত শোনার জন্য অবতীর্ণ হয়েছিল। তুমি যদি তোমার তিলাওয়াত অব্যাহত রাখতে, তাহলে অন্য লোকজনও তা প্রত্যক্ষ করত এবং ফেরেশতারাও তাদের দৃষ্টির আড়ালে যেত না।' (স্মর্তব্য: এ ঘটনাটি বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে)

উসাইদ ইবনে হুদাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পবিত্র কুরআন শরীফের তিলাওয়াতে যেমন প্রগাঢ় ভালোবাসা গড়ে তুলেছিলেন, তেমনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথেও তাঁর ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত গভীর। আল কুরআন তিলাওয়াত ও শোনার সময় তিনি বিশেষভাবে পূত পবিত্র হয়ে ঈমানী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতেন। যখন তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে দৃষ্টি দিতেন, তখন দেখতে পেতেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো বা বক্তৃতা করছেন অথবা দীন ইসলামের ব্যাখ্যা দান করছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে একত্রে উপবেশনকালে তিনি মনে মনে ভাবতেন, যেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর গা ঘেঁষে বসেন।

সে উদ্দেশ্যে তিনিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে অগ্রসর হয়েই বসতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কয়েক বার তিনি গা ঘেঁষে বসার সৌভাগ্য লাভ করেছেন।

কোনো একদিন উসাইদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর গোত্রের লোকজনের উদ্দেশ্যে আলোচনা পেশ করছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পবিত্র আঙুল দ্বারা তাঁকে মৃদু গুঁতো দিয়ে আলোচনার প্রশংসা ও সমর্থন জানালেন। আলোচনা শেষে উসাইদ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন:

'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার এ গুঁতোর মাধ্যমে আমাকে ব্যথা দিয়েছেন।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে উত্তর দিলেন:
'উসাইদ! তাহলে তুমিও আমাকে অনুরূপ গুঁতোর মাধ্যমে প্রতিশোধ নাও।'

উসাইদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আপনার পরিধানে তো জামা রয়েছে। যখন আমাকে গুঁতো দিয়েছিলেন তখন আমার গায়ে জামা ছিল না।'

এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জামা খুলে উসাইদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ দিলেন। এতে উসাইদ ইবনে হুদাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে বললেন:

'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোন এবং সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বগল ও পাঁজরের মধ্যবর্তী স্থানে চুম্বন দিতে দিতে বললেন:

'এটি ছিল আমার আকাঙ্ক্ষা। ইসলাম গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই আমি এর অপেক্ষায় ছিলাম, এ মুহূর্তে আমি আমার সে আকাঙ্ক্ষা পূরণে ধন্য হলাম।'

প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারী হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাঁকে খুব ভালোবাসতেন এবং সর্বদাই তাঁকে অন্যদের চেয়ে বেশী প্রাধান্য দিতেন। উহুদ যুদ্ধে তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশেষ দেহরক্ষী দলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেহরক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর ওপর শত্রুবাহিনী পরপর বর্শার সাত সাতটি আঘাত হানে! তিনি প্রতিটি আঘাত অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে মুকাবিলা করেন। নিজ গোত্রেও তিনি সকলের অত্যন্ত আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি গোত্রের কারো ব্যাপারে সুপারিশ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথে সাথে তাঁর সুপারিশ গ্রহণ করতেন। সুপারিশ সংক্রান্ত একটি ঘটনার বর্ণনা উসাইদ ইবনে হুদাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এভাবে দেন:

'একদা আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে এক আনসার পরিবারের অভাব-অনটন ও দুঃখ-কষ্টের বর্ণনায় বলি, 'পরিবারের অধিকাংশই অসহায় মহিলা এবং অন্যরা গরীব-মিসকীন, তাদের উপার্জনক্ষম বলতে কেউ নেই।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সম্পর্কে আমার বর্ণনা শুনে বললেন:

'উসাইদ! অনেক বিলম্বে এসেছ। গনীমতের অর্থ-কড়ি যা কিছু হাতে ছিল তা বিতরণ করে ফেলেছি। আবার কোনো গনীমতের অর্থ-কড়ি আসার সংবাদ পেলে সে পরিবারের কথা স্মরণ করে দিও।'

'কিছুদিন পর খায়বার থেকে গনীমতের মাল মদীনায় এসে পৌঁছলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা আনসারদের মধ্যে বেশি বেশি করে বিতরণ করেন এবং আমার বর্ণনা দেওয়া আনসার পরিবারকেও প্রচুর ধন-সম্পদ দান করেন। এতে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলি :

'হে আল্লাহর রাসূল! সেই পরিবারের পক্ষ থেকে আল্লাহ আপনাকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করুন।'

প্রত্যুত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: وَأَنتُمْ مَعْشَرَ الْأَنصَارِ جَزَاكُمُ اللهُ أَطْيَبَ الْجَزَاءِ فَإِنَّكُمْ - مَا عَلِمْتُ . اعِفَةٌ صُبُرٌ، وَإِنَّكُمْ سَتَلْقَوْنَ أَثَرَةً بَعْدِي فَاصْبِرُوا حَتَّى تَلْقَوْنِي وَمَوْعِدُكُمُ الْحَوْضُ .

'তোমরা আনসার। আল্লাহ তোমাদেরও উত্তম পুরস্কার দান করুন। কেননা, আমার জানামতে দীর্ঘদিন যাবৎই তোমরা সবর ও ধৈর্যের এক জ্বলন্ত উদাহরণ সৃষ্টি করেছো। কিন্তু আমার পর তোমরা অচিরেই ভুল তথ্যের ভিত্তিতে অন্যদেরকে তোমাদের ওপর অগ্রাধিকার দিতে দেখবে।' সে ক্ষেত্রে তোমরা হাওযে কাওসারে আমার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করো। (দ্রষ্টব্য: বুখারী ও মুসলিম শরীফে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে)

উসাইদ ইবনে হুদাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:

'উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতকালে তিনি কোনো এক সময়ে মুসলমানদের মধ্যে প্রচুর ধনসম্পদ বিতরণ করেন। আমার জন্যও উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু একখণ্ড কাপড় পাঠিয়ে দেন। সে কাপড়খানা একটি জামা তৈরির জন্য যথেষ্ট ছিল না। ইত্যেমধ্যে আমি মসজিদে নববীতে অবস্থানকালে দেখতে পাই যে, উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আমার জন্য কাপড়ের যে খণ্ডটি পাঠিয়েছিলেন, ঠিক সে কাপড়েরই এমন একটি লম্বা পোশাক পরিধান করেন, যা মাটি স্পর্শ করছে, এক কুরাইশ যুবক আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছে। তা দেখে আমার পাশের ব্যক্তির কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেই ভবিষ্যদ্বাণীটি উল্লেখ করলাম যে:

'তোমরা আমার পরে অচিরেই ভুল তথ্যের ভিত্তিতে অন্যদেরকে তোমাদের ওপর অগ্রাধিকার দিতে দেখবে।'

লোকটি আমার এ মন্তব্য শুনে উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে গিয়ে তা বর্ণনা করে। একথা শুনে উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তৎক্ষণাৎ আমার কাছে চলে আসেন। তখন আমি মসজিদেই নামায আদায় করছিলাম।

তিনি বলেন:
'উসাইদ নামায পড়ে নাও।'

নামায শেষ করতেই তিনি আমার কাছে এসে বললেন:
'উসাইদ! তুমি ঐ কুরাইশ যুবককে দেখে কী বলেছ?'

আমি যা বলেছিলাম, আমীরুল মুমিনীনকে তা জানালে তিনি বললেন:
'হে উসাইদ! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। যে কাপড়টি তুমি দেখেছ তা অমুক লোকের জন্য পাঠিয়েছিলাম। তিনি এমন এক আনসার সাহাবী, যিনি আকাবার শপথ অনুষ্ঠানে এবং বদর ও উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৌভাগ্যবান গাযী সাহাবীদের অন্যতম। তাঁর থেকে এই কুরাইশ যুবক এ কাপড়খণ্ড ক্রয় করে পরিধান করেছে। হে উসাইদ! তুমি কি মনে করছ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, তা আমার খিলাফতের যুগেই বাস্তবায়ন হবে?'

উসাইদ বললেন:
'হে আমীরুল মুমিনীন! আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, তা আপনার শাসনামলে সংঘটিত হবে না।'

এ ঘটনার পর উসাইদ ইবনে হুদাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বেশি দিন জীবিত ছিলেন না। উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতের সময়ই তিনি ইনতিকাল করেন।

তাঁর ইনতিকালের পর দেখা গেল যে, তাঁর চার হাজার দিরহাম ঋণ রয়েছে। তাঁর পরিবারের লোকজন তাঁর একখণ্ড জমি বিক্রি করে সে ঋণ পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত নেন।

উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ খবর শুনে বললেন,
'আমার ভাই উসাইদের সন্তানদেরকে অপরের দয়া ও করুণার ওপর নির্ভরশীল রাখতে আমি পারি না। অতঃপর তিনি উসাইদ ইবনে হুদাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঋণদাতাদের সাথে আলোচনা করে তাদেরকে এ সিদ্ধান্তে সম্মত করেন যে, ঋণদাতারা উসাইদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর রেখে যাওয়া জমি থেকে প্রত্যেক বছর এক হাজার দিরহাম মূল্যের ফলমূল খরিদ মূল্যে নেবে। এভাবে চার বছরে চার হাজার দিরহাম পরিশোধ হবে।'

টিকাঃ
১. সহীহ আল বুখারী ও মুসলিম শরীফ (সাহাবীদের ফযীলত অধ্যায়)। ২. জামেউল উসূলঃ ৯ম খণ্ড, ৩/৮ পৃ.। ৩. তাবাকাত ইবনে সা'দঃ ৩য় খণ্ড, ৬০৩ পৃ.। ৪. তাহযীব আত তাহযীবঃ ১ম খণ্ড, ৩৪৭ পৃ.। ৫. উসদুল গাবাহঃ ১ম খণ্ড, ৯২ পৃ.। ৬. হায়াতুস সাহাবাঃ ৪র্থ খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য। ৭. আল আ'লাম এবং তাতে উল্লিখিত সহায়ক গ্রন্থাবলি।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)

📄 আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)


নিঃসন্দেহে তিনি তরুণ। কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞা, জ্ঞান, দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা অভিজ্ঞ জ্ঞানবান বৃদ্ধের ন্যায়। যেমন জ্ঞানপিপাসু, তেমনি মহান। -উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)

শীর্ষস্থানীয় শ্রদ্ধাভাজন ও মর্যাদাবান যেসব সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহুম সকলের কাছে ছিলেন অতি সম্মানিত, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁদের অন্যতম। এতদসত্ত্বেও তাঁর ছিল পৃথক কিছু বৈশিষ্ট্য। বয়সে তরুণ হওয়া সত্ত্বেও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সার্বক্ষণিক সাহচর্য লাভে ধন্য হয়েছিলেন। সম্পর্কের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আপন চাচাত ভাই। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। এজন্য তাঁকে বলা হতো উম্মতের শ্রেষ্ঠ আলেম বা 'হাবরুল উম্মাহ'। তিনি নিয়মিত নফল রোযা রাখতেন, তাওবা-ইসতিগফার করতেন এবং রাতভর নফল ও তাহাজ্জুদ নামায আদায় করতেন। আল্লাহর ভয়ে তিনি এমনভাবে ক্রন্দন করতেন যে দু'চোখের পানিতে বুক ভেসে যেত।

নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন উম্মতে মুহাম্মাদীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ খোদাপ্রেমিক। আল কুরআনের অর্থ অনুধাবনের ক্ষেত্রে তিনি যেমন ছিলেন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, তেমনি এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণেও ছিলেন উলামায়ে সাহাবীদের শীর্ষস্থানীয় ও অদ্বিতীয়। জটিল বিষয়ের নিগূঢ় তত্ত্ব উপলব্ধির ক্ষেত্রে তাঁর প্রজ্ঞা ছিল খুবই প্রখর। নৈতিক প্রভাব বিস্তারেও তার জুড়ি ছিল না।

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের তিন বছর পূর্বে মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইনতিকালের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র তেরো বছর। এতদসত্ত্বেও উম্মতে মুসলিমার জন্য তিনি এক হাজার ছয়শত ষাটটি হাদীস হিফয করে রাখেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে যা সংযোজিত হয়েছে।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাঁর মা তাঁকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হন। উদ্দেশ্য 'তাহনীকা' করণ বা তাঁর মুখের পবিত্র লালামিশ্রিত চর্বিত খেজুরের অংশবিশেষ নবজাতকের মুখে দিয়ে বরকত লাভ করা। মুখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র মুখের চর্বিত খেজুরের মাধ্যমে সর্বপ্রথম তাকওয়া ও হিকমত তাঁর দেহে প্রবেশ করে। وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا.
'যাকে হিকমত দান করা হয়েছে নিঃসন্দেহে তাকে অশেষ কল্যাণ দান করা হয়েছে।'

হাশেমী গোত্রের এই শিশু ধীরে ধীরে বড় হতে থাকেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেবায় নিমগ্ন থাকাকেই অধিক পছন্দ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিনি ওযূর পানি এনে দিতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে দাঁড়িয়ে গেলে তাঁর পেছনেই নামাযে দাঁড়াতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে বের হলে একই উটে তাঁর পিছনে বসে পড়তেন। এক কথায় উঠাবসা, চলাফেরা, যাতায়াত সব সময়ই আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ঠিক ছায়ার মতো লেগে থাকতেন।

তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যে হাদীস শুনতেন, সাথে সাথেই তা মুখস্থ করে নিতেন।

একবার একটি ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন:
'একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযূর ইচ্ছা করলে আমি বিষয়টি আঁচ করে তৎক্ষণাৎ ওযূর পানি এনে দেই। আমার তৎপরতা ও অনুধাবনশক্তির এ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই আনন্দিত হন। তিনি নামাযের প্রস্তুতি নিলে আমাকে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্য ইঙ্গিত করেন। আমি তাঁর পাশে না দাঁড়িয়ে পিছনে গিয়ে দাঁড়াই।
নামাযশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে লক্ষ্য করে বললেন:

'আবদুল্লাহ! তুমি কেন আমার পাশে না দাঁড়িয়ে পিছনের সারিতে দাঁড়ালে?'

আমি উত্তরে আরয করলাম:
ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার দৃষ্টিতে আপনি সম্মানিত ও শ্রদ্ধাভাজন হওয়ায় আমি আপনার পাশে দাঁড়ানো বেয়াদবী মনে করেছি।

আমার উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দভরে তাঁর দু'হাত আকাশের দিকে তুলে দু'আ করলেন:
اللَّهُمَّ أَنِهِ الْحِكْمَةَ .
'হে আল্লাহ, তুমি তাকে হিকমত, বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞা দান করো।'

সাথে সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ দু'আ কবুল করলেন। সে যুগের বহু খ্যাতিমান, বিচক্ষণ ও প্রজ্ঞাবানের চেয়ে হাশেমী গোত্রের এ শিশুটিকে আল্লাহ তাআলা শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত করেন।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার বিচক্ষণতার অনেক উদাহরণ আছে। নিম্নোক্ত উদাহরণটি সবিশেষ উল্লেখ্য:

মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বিরোধকে কেন্দ্র করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যোদ্ধা যখন তাঁর থেকে আলাদা হয়ে গেল, তখন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে প্রস্তাব দিলেন:

'আমীরুল মুমিনীন! আপনি অনুমতি দিলে আপনার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া যোদ্ধাদের সাথে আলোচনা করে আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করতে চাই।'

আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আমি আশঙ্কা করছি যে, তারা তোমার ওপর কোনো অন্যায় না করে বসে।'

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন:
'তা হতেই পারে না।'

আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে অনুমতি নিয়ে যখন তিনি খারেজী সম্প্রদায় অর্থাৎ আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া যোদ্ধাদের কাছে পৌঁছেন, তখন দেখতে পেলেন, তারা নামায ও ইবাদত-বন্দেগীতে খুবই একাগ্র ও একান্ত মনোযোগী।

তারা আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মোবারকবাদ জানিয়ে বললেন:
'কি উদ্দেশ্যে আপনার আগমন?'

তিনি বললেন : 'আপনাদের সাথে আলোচনা করার জন্য এসেছি।'

ইবনে আব্বাসের আলোচনার কথা জানতে পেরে তারা দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল।

কেউ কেউ বলল:
'ইবনে আব্বাসের সাথে কোনো আলোচনা করা যাবে না।'

অপর পক্ষ থেকে বলা হলো:
'আহ্! কেন বাধা দেওয়া হচ্ছে? তিনি কী বলতে এসেছেন বলতে দিন।'

পরিশেষে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আলোচনার অনুমতি দেওয়া হলো।

তখন তিনি তাদের উদ্দেশ্য করে বললেন:
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাত ভাই ও তাঁর জামাতা আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, যিনি সর্বপ্রথম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমান এনেছেন। আমি জানতে চাই, তাঁর বিরুদ্ধে আপনাদের কী কী অভিযোগ ও কেনই বা আপনারা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে চলে এসেছেন?'

তারা সমস্বরে উত্তর দিল: 'যেসব অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছি, তা প্রধানত তিনটি।'

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা জিজ্ঞেস করলেন: 'অভিযোগগুলো কী কী?'

তারা উত্তর দিল: 'তাঁর ও মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মধ্যকার বিরোধের নিষ্পত্তির জন্য প্রথমত দুই ব্যক্তিকে বিচারক মেনে নিয়ে তিনি শরীআতের সীমারেখা লঙ্ঘন করেছেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা ও মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন অথচ এ যুদ্ধে 'গনীমতের মাল' গ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি ও পরাজিত মহিলাদের বন্দিনী করতেও দেননি।
তৃতীয়ত, তিনি নিজের নামের শেষাংশ থেকে 'আমীরুল মুমিনীন' উপাধি বাদ দিয়েছেন অথচ মুসলমানেরা তাঁর হাতে বাইআত গ্রহণ ও তাঁকে তাদের আমীর নিযুক্ত করেছেন।'

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'আমি যদি কুরআন ও হাদীসের দলীল-প্রমাণের মাধ্যমে আপনাদের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে সমর্থ হই, তাহলে কি আপনারা আপনাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন? আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে আবার যোগ দেবেন?

তারা উত্তর দিল : 'অবশ্যই।'

তখন ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বললেন: 'আপনাদের অভিযোগ যে, আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দুই ব্যক্তিকে বিচারক মেনে নিয়ে শরীআতের সীমা লঙ্ঘন করেছেন। অথচ আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে: يٰأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَأَنْتُمْ حُرُمٌ وَمَنْ قَتَلَهُ مِنْكُمْ مُتَعَمِّدًا فَجَزَاءٌ مِّثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِّنْكُمْ.
'হে ঈমানদারগণ! ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শিকার করো না। তোমাদের কেউ যদি জেনে-বুঝে এরূপ অপরাধ করে, তবে শিকারের সমপরিমাণ একটি জন্তু তাকে কুরবানী করতে হবে। সে সম্পর্কে ফায়সালা করবে তোমাদের মধ্য হতে দু'জন সুবিচারক ব্যক্তি।' (সূরা মায়িদা: ৯৫)

হে ভায়েরা! আল্লাহর কসম দিয়ে আপনাদের বলছি, সিকি দিরহামের খরগোশের তুলনায় মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও সংশোধন, কলহ-বিবাদের পরিসমাপ্তি, তাদের পারস্পরিক রক্তপাত বন্ধের এবং বিবদমান দু'পক্ষের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য দু'ব্যক্তির ওপর ফায়সালার ভার দেওয়াটাই কি অধিক যুক্তিসঙ্গত নয়? এ জন্য দু'জন বিচারক নির্ধারণ করা কি শরীআত লঙ্ঘিত অপরাধ?

তারা উত্তর দিল : 'হ্যাঁ! তাহলে মুসলমানদের রক্তপাত বন্ধের ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের খাতিরে বিচারক নিযুক্ত করাটাই নিঃসন্দেহে অধিক যুক্তিসঙ্গত।'

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জিজ্ঞাসা করলেন: 'যথার্থ উত্তর দানের মাধ্যমে কি আপনাদের প্রথম প্রশ্নের পরিসমাপ্তি ঘটাতে পেরেছি?'

তারা উত্তর দিলো: 'আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আমরা প্রথম প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পেয়েছি।'

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'আপনাদের দ্বিতীয় প্রশ্ন, আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যুদ্ধ করেছেন অথচ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারিণীদেরকে বন্দী করেননি, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করেছেন। আপনারা কি চেয়েছেন যে, আপনাদের মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে বন্দী করা উচিত ছিল? যেমনটি করা হতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে? যে যুগে এ ধরনের বন্দিনীদের বাঁদী ও স্ত্রী হিসেবে যোদ্ধাদের জন্য বৈধ করে দেওয়া হতো?'

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'যদি আপনারা হ্যাঁ-সূচক উত্তর দেন, সে ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে কাফির হয়ে যাবেন। আর যদি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে 'মা' বলে পরিচয় দিতে অস্বীকার করেন, তবু কাফির হয়ে যাবেন। কেননা, পবিত্র কুরআন মাজীদের আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন: النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهُتُهُمْ .
'নিশ্চয়ই নবী ঈমানদার লোকদের পক্ষে তাদের নিজেদের অপেক্ষাও অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য এবং নবীর স্ত্রীগণ তাদের 'মা'। (সূরা আহযাব : ৬)

এখন আপনারা এ দুটি উত্তরের যে কোনো একটি বেছে নিন।

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ প্রশ্নে সবাই নীরব ও নিশ্চুপ হয়ে গেল। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জিজ্ঞাসা করলেন: 'আপনারা কি আপনাদের দ্বিতীয় প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পেয়েছেন?'

তারা সমস্বরে উত্তর দিল: 'খোদার শপথ! আমরা দ্বিতীয় প্রশ্নের অত্যন্ত সন্তোষজনক উত্তর পেয়েছি।'

তখন ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরে বললেন: 'আপনাদের অভিযোগ যে, আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর নাম থেকে 'আমীরুল মুমিনীন' উপাধি মুছে ফেলেছেন। এ ক্ষেত্রে হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রাক্কালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টান্ত আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। মুশরিকীনে মক্কার সাথে হুদাইবিয়া সন্ধির শর্তাবলিতে এ কথা উল্লেখ করা হয় যে, এই চুক্তি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে সম্পাদিত হচ্ছে। তখন মক্কার মুশরিকরা আপত্তি করে বলেছিল, আমরা যদি আপনাকে রাসূলই মেনে নেই, তাহলে মক্কায় প্রবেশে বাধা কেন? এবং আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধেই বা লিপ্ত কেন? তাই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর স্থলে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ লিখুন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এ শর্ত এই বলে মেনে নেন যে: وَاللَّهِ إِنِّي لَرَسُولُ اللَّهِ وَإِنْ كَذَّبْتُمُونِي .
'আল্লাহর শপথ! আমি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল, তোমরা যতই অস্বীকৃতি জানাও না কেন?'

এ উদাহরণ পেশ করার পর ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন: 'তৃতীয় অভিযোগের যথার্থ উত্তর পেয়েছেন কি?'

তারা সমস্বরে বলে উঠল: 'আল্লাহর শপথ! আমরা সন্তোষজনক জবাব পেয়েছি।'

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বিচক্ষণতা, প্রজ্ঞা এবং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এ আলোচনা চলার ফলে দলছুট ২০,০০০ (বিশ হাজার) যোদ্ধা সঙ্গীসাথী পুনরায় আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে যোগদান করে বৈধ ও ইসলামী সরকারের আনুগত্য স্বীকার করলেন। অবশিষ্ট ৪,০০০ (চার হাজার) যোদ্ধা প্রতিহিংসা, হঠকারিতা ও জিদের বশবর্তী হয়ে খারেজী সম্প্রদায় পরিচয়ে বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত হয়ে পড়ে।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শিশুকাল থেকেই অসাধারণ বিদ্যানুরাগী ছিলেন। বিদ্যার্জনের পথে ধারণাতীতভাবে প্রচেষ্টা ও নানাবিধ সাধনা অব্যাহত রেখেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবিতাবস্থায় যতদিন সম্ভব হয়েছে, সরাসরি নবুওয়াতের ঝর্নাধারা থেকে জ্ঞানের পিপাসা নিবৃত্ত করেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর তিনি সে পিপাসা নিবৃত্ত করার জন্য 'উলামাউস্ সাহাবা' বা সাহাবীদের মধ্যে যারা আলেম ছিলেন, তাঁদের সাহচর্যে এসে তাঁদের জ্ঞানভাণ্ডার থেকে পরিতৃপ্তি লাভ করেছেন।

তিনি নিজের শিক্ষা জীবনের ঘটনা উল্লেখপূর্বক বলেন:
'একবার আমার কাছে সংবাদ পৌঁছল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক সাহাবীর কাছে এমন একটি হাদীস আছে, যা আমার জানা নেই। আমি তৎক্ষণাৎ তার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আমি এমন এক সময় তাঁর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম, যখন তিনি দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তখন তাকে না ডেকে তাঁর বাড়ির দরজায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। মরুভূমির দমকা বাতাসে আমার চাদরের উপর বালির স্তর পড়ে গেল। অথচ আমি যদি দ্বিপ্রহরের এই প্রচণ্ড গরমে তার বাসায় প্রবেশের অনুমতি চাইতাম, তাহলে নিঃসন্দেহে তিনি আমাকে খোশ আমদেদ জানাতেন। আমি তার বিশ্রামকে আমার কষ্টের ওপর এ জন্যই প্রাধান্য দিয়েছিলাম, যেন তিনি দ্বিপ্রহরে খাওয়ার পর একটু অবসাদ দূর করে প্রশান্তি লাভ করতে পারেন।

তিনি ভিতর থেকে বেরিয়ে তাঁর বাড়ির দরজায় আমাকে এ অবস্থায় দেখতে পেয়ে বলেন:
'হে রাসূলুল্লাহর চাচাত ভাই! কী ব্যাপার? এ অবস্থায় আওয়াজ দেননি কেন? কী মনে করে এসেছেন? আমাকে ডেকে পাঠালে আমি নিজেই আপনার খিদমতে উপস্থিত হয়ে যেতাম।'

আমি তাঁকে উত্তরে বললাম:
'আপনার খিদমতে আমার উপস্থিতিটাই বেশি যুক্তিসঙ্গত। কারণ, ইলম শিক্ষা দেওয়া হয়, তা এমনিই আসে না। অতঃপর আশ্বস্ত হওয়ার পর তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি।'

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বিদ্যা অর্জনের পথে যেমন নিজেকে অত্যন্ত নগণ্য মনে করতেন, কোনোরূপ গর্ব-অহংকার হৃদয়ে স্থান দিতেন না, তেমনি আলেমদেরকে অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতেন। খিলাফাতে রাশিদার যুগে মদীনা মুনাওয়ারার শ্রেষ্ঠতম ফিক্‌হবিদ, বিচারশাস্ত্রের অন্যতম পারদর্শী ব্যক্তিত্ব, ইলমুল কিরাআত ও ফারায়েযশাস্ত্রের ইমাম এবং 'কাতিবে ওহী' বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ কুরআন মাজীদের বাণীসমূহের সর্বপ্রথম লিপিবদ্ধকারী যায়েদ ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে সংঘটিত একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

একদিন যায়েদ ইবনে সাবেত তাঁর অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করার জন্য প্রস্তুত। হাশেম গোত্রের এই বালক আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস যায়েদ ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সামনে এক হাতে তাঁর ঘোড়ার লাগাম এবং অন্য হাতে পা দানী ধরে এমনভাবে দাঁড়িয়ে যান, যেমন একজন ক্রীতদাস তার প্রভুর সম্মানে শ্রদ্ধাভরে দাঁড়িয়ে থাকে।

যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাকে বললেন:
'হে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাত ভাই। অনুগ্রহপূর্বক ঘোড়ার লাগাম ও রেকাব ছেড়ে দিন।'

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জবাব দিলেন:
'উলামায়ে ইসলামকে এভাবেই সম্মান প্রদর্শন করার জন্য আমরা নির্দেশিত হয়েছি।'

যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তা শোনামাত্র ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললেন:
'আপনার হাতখানা একটু দেখি।'

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর উদ্দেশ্যে হাত বাড়ানো মাত্রই যায়েদ ইবনে সাবিত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর হাতের দিকে ঝুঁকে পড়েন ও তাঁকে চুম্বন দিয়ে বলেন:

'আমরাও আমাদের নবীর আহলে বাইতের সদস্যদের সাথে এমনিভাবে সম্মান প্রদর্শন করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি।'

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বিদ্যা অর্জনের জন্য এমনভাবে মনোনিবেশ করেন যে, তিনি সর্বশাস্ত্রে আশ্চর্যজনকভাবে গভীর ব্যুৎপত্তি ও পাণ্ডিত্য লাভ করেন। অন্যতম প্রসিদ্ধ 'তাবেঈ' মাসরূক ইবনে আল আজদা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু' ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সম্পর্কে বলেন:

'যখন তাঁর দৈহিক কাঠামো ও অবয়বের প্রতি দৃষ্টিপাত করতাম তখন বলতাম যে, একজন সুপুরুষ। যখন কথাবার্তা বলতেন, তখন বলতাম যে, একজন বিশুদ্ধভাষী। আর যখন কোনো আলোচনায় অংশ নিতেন তখন বলতাম, সবচেয়ে জ্ঞানী ও বিজ্ঞ।'

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বিদ্যানুরাগীদের এ অসাধারণ ভিড় লাঘবের উদ্দেশ্যে এক এক দিন এক এক বিষয়ে প্রশ্নোত্তর ও আলোচনা করার সময়সূচি নির্ধারণ করে দেন। যেমন সপ্তাহে একদিন শুধু তাফসীর বিষয়েই আলোচনা করতেন। অপর দিন শুধু ফিক্‌হ, তার পরের দিন মাগাযী বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে সংঘটিত যুদ্ধসমূহের ওপর আলোচনা করতেন। অন্যদিন শুধু কবিতা, অপর দিন আরবদের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতেন। তাঁর ক্লাসে এমন কোনো আলেম বসতেন না, যিনি তাঁর আলোচনায় মুগ্ধ না হতেন এবং এমন কোনো প্রশ্নকারী ছিলেন না যে, তাঁর সন্তোষজনক উত্তরে সন্তুষ্ট না হতেন।

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যুবক হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ইলম ও পাণ্ডিত্য এবং ব্যুৎপত্তির গুণে খিলাফতে রাশিদার একজন অন্যতম উপদেষ্টা পদে অধিষ্ঠিত হন। খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যদি কোনো জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতেন, তখন তিনি পরামর্শের জন্য নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও গুণীজনসহ ইসলামের প্রথম যুগে ঈমান গ্রহণকারী শ্রদ্ধাভাজন সাহাবীদেরকে আহ্বান করতেন। তিনি তাদের সাথে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকেও আমন্ত্রণ জানাতেন। এসব মহতী পরামর্শ পরিষদের বৈঠকে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উপস্থিত হলে উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে খুবই সম্মান করতেন, নিজের পাশে বসাতেন এবং বলতেন:

'আমরা কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। এ ব্যাপারে আপনার সুনির্দিষ্ট মতামত ও সুচিন্তিত পরামর্শ একান্তই কাম্য।'

যুবক সাহাবী ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে মুরব্বী ও বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবীদের সমপর্যায়ের পদমর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে একদা প্রতিবাদ জানানো হলে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জবাব দেন:

إِنَّهُ فَتَى الْكُهُولُ، لَهُ لِسَانٌ سَؤُولٌ وَقَلْبٌ عَقُولٌ .
'নিঃসন্দেহে তিনি একজন তরুণ; কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞা, জ্ঞান, দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা, অভিজ্ঞ জ্ঞানবান বৃদ্ধের ন্যায়। তিনি যেমনি জ্ঞানপিপাসু তেমনি মহান।'

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জ্ঞানপিপাসু আলেম-ওলামা ও ছাত্রদের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে গিয়ে সাধারণ মুসলমানদেরকে মোটেই ভুলে যাননি। তাদের জন্যও রীতিমতো ওয়ায-মাহফিল ও আলোচনাসভা ইত্যাদির আয়োজন করতেন। পথহারা, বিপথগামী গুনাহগারদের উদ্দেশ্যে দেওয়া তাঁর ভাষণের কিয়দংশ উদ্ধৃত করা হলো:

'হে পথহারা বিপথগামী ভাইয়েরা! কখনোই আপনারা আপনাদের কৃত গুনাহের পরিণতি থেকে নিজেদেরকে ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে মনে করবেন না। জেনে রাখুন, নাফস বা কুপ্রবৃত্তির দাসত্বই মানুষকে কবীরা গুনাহ বা মহাপাপে লিপ্ত করে। আপনার ডানে ও বামে সার্বক্ষণিক দু'জন ফেরেশতার উপস্থিতিতে অপকর্মে লিপ্ত হওয়াতে লজ্জাবোধ না করা কিন্তু সাধারণ ও ছোট গুনাহ নয়।

গুনাহকে হাস্য ও তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উড়িয়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে কবীরা গুনাহ বা মহাপাপ। যার পরিণতিতে আল্লাহ ভীষণ সাজা দিতে পারেন। কোনো অপকর্ম বা পাপ করে খুশি হওয়া বা আনন্দ করা যেমন মহাপাপ, তেমনি পাপাচারে বা গুনাহের কাজে কৃতকার্য না হয়ে দুঃখ প্রকাশ করাও মহাপাপ।

আল্লাহ দেখছেন- এ অনুভূতিকে উপেক্ষা করে, গুনাহের কাজে লিপ্তাবস্থায় অন্তরে প্রকম্পন ও ভীতি অনুধাবন না করে, গোপনে কৃত পাপকার্যের সংবাদ বের হয়ে পড়ার আশঙ্কা করাও নিঃসন্দেহে কবীরা গুনাহ বা মহাপাপ।

আপনারা কি জানেন? আইয়ুব আলাইহিস সালামের গোনাহ কী ছিল? যার কারণে আল্লাহ তাঁকে ধনসম্পত্তি ও দৈহিক শাস্তির পরীক্ষায় ফেলেছিলেন? তাঁর ত্রুটি এতটুকুই ছিল যে, 'এক মিসকীন তাঁর ওপর কৃত অত্যাচার লাঘবের জন্য তাঁর নিকট সাহায্যের আবেদন করেছিল; কিন্তু তিনি তাঁকে সাহায্য করেননি বলেই তাঁর সে পরীক্ষা।'

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার কথাবার্তা কখনোই সাম স্যহীন লোকদের মতো ছিল না। যারা নিজেরা খারাপ কাজে লিপ্ত হয়ে অন্যদের তা থেকে বিরত থাকার উপদেশ প্রদান করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তিনি দিনের বেলায় রোযা রাখতেন এবং রাত্রিতে তাহাজ্জুদ নামাযে নিমগ্ন থাকতেন।

আবদুল্লাহ ইবনে মুলাইকা বর্ণনা করেন যে: 'আমি একবার ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার সাথে মক্কা থেকে মদীনায় যেতে সঙ্গী হয়েছিলাম। কাফেলা সারাদিন পথ অতিক্রম করার পর রাত্রি যাপনের জন্য যখন কোনো মনযিলে যাত্রাবিরতি করত, তখন দেখতাম অত্যন্ত ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত সঙ্গী-সাথীরা অবসাদ দূরীকরণের জন্য গভীর নিদ্রায় নিমজ্জিত হতো। অন্যদিকে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মধ্যরাত থেকেই তাহাজ্জুদ ও নফল নামাযে নিমগ্ন হতেন।'

এ সফরের এক রাতের অবস্থা ছিল এই: وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ، ذَلِكَ مَا كُنْتَ مِنْهُ تَحِيدُ .
'অতঃপর এই মৃত্যু-যন্ত্রণা পরম সত্য হয়ে উপস্থিত হলো। এ সেই মৃত্যু যা থেকে তুমি পালিয়ে বেড়াতে।' (সূরা কাফ: ১৯)

এ আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে তিনি ব্যাকুল হয়ে উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করছিলেন। এমনকি এ অবস্থায়ই ফজর হয়ে যায়।

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা ছিলেন সুশ্রী, সুপুরুষ ও আকর্ষণীয় চেহারার অধিকারী। রাতভর কান্নারত অবস্থায় অতিবাহিত করার কারণে তাঁর দু'চোখ দিয়ে ঝরে পড়া পানির দাগ এমন মনে হতো, যেন তাঁর দু'গালে চিকন দুটি কালো ফিতার মতো দাগ পড়েছে।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা সাহাবীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ আলেম হিসেবেই শুধু সুখ্যাতি অর্জন করেননি বরং অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন।

মুসলিম বিশ্বের খলীফা মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু একবার হজ্জ পালনে আসেন। অপরদিকে রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়া ও সরকারি পদবিহীন সাধারণ জীবন যাপনকারী ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাও সে বছর হজ্জে আসেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় সরকারি লোকজনের দ্বারা মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তাঁবুর শোভা বর্ধন করা হয়েছিল। অপরদিকে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার তাঁবুতে সারা মুসলিম বিশ্ব থেকে আসা তাঁর অনুসারী এবং জ্ঞানপিপাসুদের বিরাটসংখ্যক উপস্থিতি মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থানকে ম্লান করে দেয়।

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা ৭১ বছর বেঁচে ছিলেন। সাধনা, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান, হিকমত ও তাকওয়ার শিক্ষায় তিনি তাঁর যুগকে উজ্জ্বল করে গিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিজ্ঞ ও বুযুর্গ সাহাবীদের মধ্যে যারা জীবিত ছিলেন, তাঁদের এবং প্রসিদ্ধ তাবেঈদের উপস্থিতিতে আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ছেলে মুহাম্মাদ আল হানাফিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু' তার জানাযা নামাযের ইমামতি করেন। যখন তাঁকে কবরস্থ করা হচ্ছিল, তখন উপস্থিত বিশাল জনতা অদৃশ্য তিলাওয়াতকারীর উঁচু আওয়াজে আল কুরআনের এ আয়াতগুলোর তিলাওয়াত শুনতে পান।

يَأَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَّرْضِيَّةٌ . فَادْخُلِي فِي عِبْدِي وَادْخُلِي جَنَّتِي .
'হে প্রশান্ত আত্মা! তোমার রবের দিকে উত্তম পরিণতির জন্য সন্তুষ্টচিত্তে প্রত্যাবর্তন করো। আমার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং জান্নাতে প্রবেশ করো।' (সূরা ফাজর: ২৭-৩০)

টিকাঃ
১. মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে আবী তালিবকে তাঁর মা হানাফিয়ার পরিচয়ে এ জন্য পরিচিত করানো হয়েছে, যেন ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তান হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা থেকে পার্থক্য বোঝা যায়। আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ছেলে মুহাম্মদ হলেন বনু হানাফিয়া গোত্রের তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভের সন্তান। ২. মারবিয়াতে আল ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ফী আত্ তাফীর গ্রন্থের ৪র্থ খণ্ডে ৩৪৮-৩৪৯ পৃষ্ঠায় এ ব্যাপারে এ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন, যা নিম্নরূপ: عن سعيد بن جبير قال : مات ابن عباس بالطائف فشهدت جنازته، فجاء طائر لم ير على خلقته حتى دخل في نعشه ثم لم يرخارجا منه فلما دفن تليت هذه الآية على شفير القبر لا يرى من تلاها ..... 'সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রা) বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) তায়েফে ইনতিকাল করেন। আমি তাঁর জানাযার নামাযে অংশগ্রহণ করি। হঠাৎ এমন একটি পাখি, যা কখনো প্রত্যক্ষ করা হয়নি, এসে তার কফিনে ঢুকে পড়ে। অতঃপর এ পাখীকে কেউ কফিন থেকে বের হতে দেখেনি। এমনিভাবে তাঁকে দাফন করা হলে কবর থেকে অদৃশ্য তিলাওয়াতকারীর উঁচু আওয়াজে এই আয়াত তিনটির তিলাওয়াত করতে শোনা যায়। অনুবাদক। ১. জামেউল উসূল: ১০ম খণ্ড (ফাযায়েলুস সাহাবা অধ্যায়)। ২. আল ইসাবাহ: ৪৭৮১নং জীবনী। ৩. আল ইসতিয়াব: আল-হামেশে সাহাবা, ২য় খণ্ড, ৩৫০পৃ.। ৪. উসদুল গাবা: ৩য় খণ্ড, ১৯২ পৃঃ। ৫. সিফাতুস সাফওয়া: ১ম খণ্ড, ৭৪৬ পৃ: (হালাব সংস্করণ)। ৬. হায়াতুস সাহাবাহ: ৪র্থ খণ্ডের সূচি দ্রষ্টব্য। ৭. আল আ'লাম ও তার রেফারেন্সসমূহ।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 নু’মান ইবনে মুকাররিন আল মুযানী (রাঃ)

📄 নু’মান ইবনে মুকাররিন আল মুযানী (রাঃ)


নিফাকের আশ্রয়ের জন্য যেমন ঘর বা পরিবারের প্রয়োজন, ঈমানের প্রতিপালনের জন্যও তেমনি ঘর বা পরিবারের প্রয়োজন। বনূ মুকাররিনের পরিবার ছিল নিঃসন্দেহে ঈমানের ঘর বা পরিবার। -আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু

মক্কা থেকে ইয়াসরিবগামী পথের পাশেই ছিল মুযাইনা গোত্রের আবাস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করে এসেছেন, সে সংবাদ এবং এ পথে আসা-যাওয়া পথিকদের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নানাবিধ প্রশংসার সংবাদাদি সর্বক্ষণই মুযাইনা গোত্রের লোকদের কাছে পৌঁছত। তাঁর সম্পর্কে কখনোই কোনো খারাপ সংবাদ তাদের নিকট পৌঁছেনি।

কোনো এক সন্ধ্যায় মুযাইনা গোত্রের সরদার নু'মান ইবনে মুকাররিন আল মুযান্নী নিজ গোত্রীয় অন্যান্য ছোট-বড় সরদারদের সাথে তার ক্লাবঘরে খোশগল্প করছিলেন। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে তিনি বললেন:
আমার গোত্রীয় ভাইয়েরা! আল্লাহর শপথ করে বলছি:

'মুহাম্মদ সম্পর্কে যা জেনেছি এবং তাঁর দাওয়াত সম্পর্কে যা শুনেছি, তাতে ন্যায়পরায়ণতা এবং অপরের মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা ছাড়া তাঁর দাওয়াতে অন্য কিছু দেখছি না। আর তা-ই যদি হয়, তাহলে এ কল্যাণ ও শান্তির ডাকে সাড়া দিতে আমরা কেন বিলম্ব করব? অথচ লোকজন এ আহ্বানে দ্রুত সাড়া দিচ্ছে। অতঃপর তিনি তার আলোচনা অব্যাহত রেখে বললেন :

'আমি নিজের ব্যাপারে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, কাল প্রভাতেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে হাজির হব। তোমাদের কেউ যদি আমার সাথে যাওয়ার ইচ্ছা কর, তাহলে রাতেই প্রস্তুত হও।'

নু'মান ইবনে মুকাররিনের ভাষণ ও ঘোষণা উপস্থিত লোকদের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করল। ফজর হতে না হতেই দেখা গেল, নু'মান ইবনে মুকাররিনের ১০ ভাই এবং মুযাইনা গোত্রের ৪০০ অশ্বারোহী যোদ্ধা তাঁর নেতৃত্বে ইয়াসরিবের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার জন্য তৈরি।

বলা বাহুল্য, তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নু'মান ইবনে মুকাররিন এই বিরাট কাফেলা নিয়ে কোনো হাদিয়া-উপঢৌকন ছাড়া হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হতে লজ্জাবোধ করছিলেন। এদিকে ক্রমাগত অনাবৃষ্টি ও ফসলহানি মুযাইনা গোত্রকে অত্যন্ত অভাবী করে তুলেছিল। অভাবের কারণে গোত্রের ঘরে ঘরে কোনো শস্যদানা ছিল না এবং গাভীর বাঁটেও ছিল না দুধ। তারপরও নু'মান ইবনে মুকাররিন নিজের ও অন্যান্য ভাইদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্য সামগ্রী ও বকরি পশুসমূহের যা কিছু অবশিষ্ট ছিল সেসব সংগ্রহ করে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খidমতে পেশ করার জন্য এই বিরাট কাফেলার আগে আগে চলতে থাকলেন। নু'মান ইবনে মুকাররিন আল মুযান্নী ও তাঁর বিপুলসংখ্যক সাথী-সঙ্গীদের আগমনের সংবাদ ইয়াসরিব শহরের আনাচে-কানাচে খুশির ঢেউ ছড়িয়ে দেয়। কারণ, এ পর্যন্ত আরবের কোনো গোত্র এ গৌরবের অধিকারী হতে পারেনি যে, একই পরিবারের ১১ জন সহোদর তাদের গোত্রের ৪০০ জন অশ্বারোহী যোদ্ধার সাথে একত্রে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন।

নু'মান ইবনে মুকাররিন আল মুযান্নীর ইসলাম গ্রহণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনন্দের সীমা ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে নু'মানের হাদিয়া ও তাদের উপঢৌকন প্রেরণ আল্লাহর পক্ষ থেকে গৃহীত হওয়ার ও ইসলাম গ্রহণের শুভ সংবাদে নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয়:

وَمِنَ الْأَعْرَابِ مَنْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَيَتَّخِذُ مَا يُنْفِقُ قُرُبَاتٍ عِنْدَ اللَّهِ وَصَلَوَاتِ الرَّسُولِ إِلَّا إِنَّهَا قُرْبَةٌ لَّهُمْ سَيُدْخِلُهُمُ اللهُ فِي رَحْمَتِهِ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ .
'মরুবাসীদের কেউ কেউ আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান রাখে এবং যা ব্যয় করে তা আল্লাহর সান্নিধ্য ও রাসূলের দু'আ লাভের উপায় মনে করে। বাস্তবিকই তা তাদের জন্য আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায়, আল্লাহ তাদেরকে নিজ রহমতে দাখিল করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' (সূরা তাওবা : ৯৯)

নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাওহীদী ঝাণ্ডার নিচে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন জিহাদে অংশ নিতে থাকেন। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতের শুরুতে ফিতনায়ে মুনকিরীনে নবুওয়াত তথা ভণ্ড নবী দাবিদারদের ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর মুযাইনা গোত্রের বীর মুজাহিদদের সাথে নিয়ে আমীরুল মুমিনীন আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মূলশক্তি হিসেবে সুসংগঠিত হন। তাদের বিরুদ্ধে জিহাদে অংশ নিয়ে ফিতনা সৃষ্টিকারীদের পরাভূত করেন।

উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতকালে তিনি এমন খিদমত পেশ করেন, যার কারণে তিনি ইসলামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। কাদেসিয়ার যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে মুসলিম সেনাপতি সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কাদেসিয়া থেকে নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নেতৃত্বে কিসরা বা পারস্য সম্রাট ইয়াযদজুদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য এক প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেন। পারস্যের রাজধানী মাদায়েনে উপস্থিত হয়ে এই প্রতিনিধিদল কিসরা বা সম্রাট ইয়াযদজুদের সাক্ষাৎ কামনা করলে তার সাথে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হলো।

অতঃপর দোভাষীকে ডেকে সম্রাট বলল:
'এই প্রতিনিধিদলকে জিজ্ঞাসা কর, তারা কী উদ্দেশ্যে আমাদের দেশে এসেছে এবং কী উদ্দেশ্যেই বা তারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে? তাদেরকে জানিয়ে দাও, হয়তো তোমরা আমাদের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করছ এবং আমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে চাইনি।'

সম্রাটের এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সম্বোধন করে বললেন:

'তোমরা কেউ ইচ্ছা করলে জবাব দিতে পার। আর যদি তোমরা ভালো মনে কর, তাহলে তোমাদের পক্ষ থেকে আমি এর উত্তর দিতে প্রস্তুত।'

তারা বললেন:
'বরং আপনিই এর উত্তর দিন।'

তারা সম্রাটকে সম্বোধন করে বললেন:
'আমাদের মুখপাত্র হিসেবে তিনি বক্তব্য রাখবেন। অতএব তাঁর বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনুন।'

অতঃপর নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠ করে তাঁর বক্তব্যে বলেন:

'আল্লাহ আমাদের ওপর করুণা করেছেন এবং আমাদের জন্য তাঁর রাসূল প্রেরণ করেছেন। যিনি আমাদের কল্যাণের পথের সন্ধান দেন এবং সে পথে চলার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। অকল্যাণ ও পাপাচারের স্বরূপ উদ্‌ঘাটন করেন এবং তা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। তিনি আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি যে পথে আহ্বান জানান, যদি আমরা সে পথের অনুসারী হই, তাহলে আল্লাহ আমাদের দীন ও দুনিয়ার সার্বিক কল্যাণ ও মঙ্গল দান করবেন। তাঁর এ আহ্বানে সাড়া দেওয়ায় অতি দ্রুত আল্লাহ আমাদের দারিদ্র্যকে প্রাচুর্যে পরিণত করেছেন। নীচতা, হীনতা, অসম্মানের বদলে ইজ্জত ও সম্মান দিয়েছেন। পরস্পরের শত্রুতা ও হানাহানিকে ভ্রাতৃত্ব ও আন্তরিকতায় রূপান্তরিত করেছেন। তিনি আমাদের আরও নির্দেশ দেন:

*আমরা যেন মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান জানাই এবং আমাদের প্রতিবেশীদের থেকে তা আরম্ভ করি।'

অতএব আমরা আপনাদেরকেও আমাদের আদর্শ গ্রহণ করতে আহ্বান জানাচ্ছি। ইসলাম এমন এক জীবন বিধান, যা মানবকল্যাণের সমস্ত কর্মকাণ্ডকে কল্যাণ ও সম্মানের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার প্রেরণা দেয়। ইসলাম মানবতার অকল্যাণ ও ক্ষতিকর সমস্ত মত ও পথকে ঘৃণা করে এবং তা থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোর নির্দেশ দান করে। ইসলাম তার অনুসারীদের মিথ্যা ও কুফরীর শৃঙ্খল হতে মুক্তি দিয়ে ন্যায়, মানবতা ও ঈমানের আলোর পথে পরিচালিত করে। আপনারা যদি আমাদের এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে তা গ্রহণ করেন, তাহলে জীবনবিধান হিসেবে আপনাদের জন্য আল কুরআনকে রেখে যাব এবং আল কুরআন বোঝার ও তা অনুসরণ করার জন্য এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেব যেন এর নির্দেশমতো রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন।

অতঃপর পরকালের জবাবদিহিতা ও খোদাভীতির ওপর আপনাদের ন্যস্ত করে আমরা প্রত্যাবর্তন করব। আর যদি আপনারা ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন, তাহলে আমরা আপনাদের থেকে 'জিযিয়া' গ্রহণ করব এবং আপনাদের নিরাপত্তা বিধান করব। আর যদি 'জিযিয়া' প্রদানে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই যুদ্ধ করব।'

এ কথা শুনে সম্রাট ইয়াজ্জুদ ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে বলল:
'তোমাদের চেয়ে নিকৃষ্টতম, দুর্দশাগ্রস্ত, আত্মকলহে লিপ্ত ও ঘৃণিত ক্ষুদ্র কোনো জাতি এ পৃথিবীতে আছে বলে আমার জানা নেই। আঞ্চলিক করদ রাজ্যপ্রধানদের দ্বারাই তোমাদের ওপর আমাদের প্রভাববলয় বিদ্যমান ছিল। তোমাদের করায়ত্ত ও অধীনস্থ রাখার জন্য তারাই যথেষ্ট।'

অতঃপর একটু শান্ত হয়ে আবার বলল:
'অভাবের তাড়নাই যদি তোমাদেরকে আমার দরবারে উপস্থিত হতে বাধ্য করে থাকে, তাহলে আমি আমার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিচ্ছি, তারা তোমাদের প্রতিটি পরিবারের অভাব মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী এবং তোমাদের নেতৃবর্গ, সরদার ও গোত্রীয় প্রধানদের জন্য কাপড়-চোপড় ইত্যাদি পৌঁছে দেবে। এ ছাড়াও আমার পক্ষ থেকে তোমাদের তত্ত্বাবধানের জন্য একজন শাসক নিযুক্ত করে দিচ্ছি, যিনি তোমাদের প্রতি অতিশয় নম্র ও যত্নবান হবেন।'

প্রতিনিধিদলের জনৈক সদস্য ঘৃণাভরে সম্রাট ইয়াজ্জুদের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে তার ক্রোধ আবার বেড়ে যায় এবং বলতে থাকে:
'যদি দূত হত্যা করার মতো কোনো প্রথা থাকত, তাহলে আমি তোমাদেরকে অবশ্যই হত্যা করতাম। তোমাদের সেনাপতিকে জানিয়ে দাও:

'আমি তাকে সমুচিত শিক্ষাদানের জন্য আমার সেনাপতি রুস্তমকে পাঠাচ্ছি। সে সেনাপতিসহ তোমাদেরকে কাদেসিয়ার গর্তসমূহে পুঁতে ফেলবে।'

অতঃপর তাদেরকে মাটি বহন করে নেওয়ার মতো অপমানকর সাজা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করে বলল:
'এই প্রতিনিধিদলের মধ্যে যে সবচেয়ে সম্মানী, তার মাথায় মাটির একটি ডালা উঠিয়ে দাও এবং এ অবস্থায় বিভিন্ন অলিগলিতে উপস্থিত জনগণের সম্মুখ দিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে রাজধানীর প্রধান ফটক দিয়ে এদের এমনভাবে বিদায় কর, যেন উচিত শিক্ষা নিয়ে যায়।'

তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করা হলো:
আপনাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানী ব্যক্তি কে?

আসেম বিন উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কালবিলম্ব না করে সামনে অগ্রসর হয়ে বললেন:
'আমি!'

অতঃপর তারা তাঁর মাথায় মাটির ডালা উঠিয়ে দিল। তিনি এ মাটির ডালা বহন করে এনে তাদের উটের কাছে পৌঁছলেন এবং বহন করে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকটে এলেন ও তাঁকে এ সুসংবাদ দিলেন যে:

'আল্লাহ অবশ্যই মুসলমানদেরকে পারস্য সাম্রাজ্য বিজয় করাবেন এবং তাদেরকে এ দেশের ভূমির মালিক বানিয়ে দেবেন।'

তারপর কাদেসিয়ায় পারস্য সম্রাটের বিশাল বাহিনীর সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হয়। কাদেসিয়া প্রান্তরের গভীর গর্ত ও খালবিলগুলো পারস্য সম্রাটের সৈন্য বাহিনীর হাজার হাজার লাশের স্তূপে ভরাট হয়ে যায়। এ যুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানিতে মুহ্যমান পারস্য সম্রাট প্রতিশোধের জন্য সৈন্য সংগ্রহ ও রণ-প্রস্তুতিতে উন্মাদ হয়ে উঠল। তার এ যুদ্ধবিধ্বস্ত বাহিনীকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করার সিদ্ধান্ত নিল। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সে দেড় লাখ সশস্ত্র সৈন্যের বিরাট বাহিনী যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ তৈরি করে ফেলল। উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে পারস্য সম্রাটের এ বিরাট বাহিনীর রণ-প্রস্তুতির সংবাদ পৌছল। তিনি নিজেই সেনাপতির দায়িত্ব নিয়ে তার মোকাবেলা করার জন্য সিদ্ধান্ত নিলেন; কিন্তু 'মজলিসে শূরা' তাঁর এ মুহূর্তে মদীনায় উপস্থিত থাকার গুরুত্ব অনুভব করে তাঁকে সে ইচ্ছা পরিত্যাগ করতে অনুরোধ জানালেন যে:

'এ গুরু দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়ার জন্য এমন একজন যোগ্য সেনাপতি খুঁজে বের করুন, যার ওপর দায়িত্ব অর্পণ করে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন।'

উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মজলিসে শূরার অনুরোধ মেনে নিয়ে বললেন:
'তাহলে আপনারাই পরামর্শ দিন যে, এমন কে হতে পারে, যাকে এ বিরাট দায়িত্বে নিয়োজিত করা যেতে পারে?'

তাঁরা বললেন:
'আমীরুল মু'মিনীন! আপনিই তো আপনার সেনাবাহিনীর ব্যাপারে ভালো জানেন যে, তাদের মধ্যে কাকে এ গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের জন্য নিযুক্ত করা যেতে পারে!'

উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু চিন্তা-ভাবনার পর বললেন:
'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি এমন একজনকে এ অভিযানের জন্য সেনাপতি নিযুক্ত করতে চাই, যিনি শত্রুবাহিনীকে পরাস্ত করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হবেন। অতীতের যে কোনো সেনাপতির চেয়ে তার সাফল্যই হবে সর্বোত্তম। তিনি হলেন:

'আন নু'মান ইবনে মুকাররিন আল মুযানী।'

সবাই বলে উঠলেন:
'হ্যাঁ, এ কাজের জন্য তিনিই উপযুক্ত।'

জিহাদরত নু'মান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর প্রতি আমীরুল মুমিনীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নির্দেশ পাঠালেন এই ভাষায় :

'সালামান্তে
আমি অবগত হয়েছি যে, সুসজ্জিত বিপুলসংখ্যক পারস্য সৈন্য আপনাদের তথা ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে 'নাহাওয়ান্দে' সমবেত হয়েছে। আমার এ নির্দেশনামা পাওয়া মাত্রই আপনি আপনার বাহিনীসহ আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে ও তাঁরই ওপর ভরসা করে তাঁরই সাহায্যের আশায় শত্রুবাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য রওয়ানা হোন। মনে রাখবেন, আপনার বাহিনীকে নিয়ে অসাধ্য ঝুঁকিপূর্ণ এমন কোনো পথে রওয়ানা হবেন না, যা অতিক্রম করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ, এক লক্ষাধিক স্বর্ণমুদ্রার চেয়েও একজন মুসলমানের জীবন আমার নিকট শ্রেয়। ওয়াস্স্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।'

নির্দেশ পাওয়া মাত্র নু'মান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনীকে নিয়ে বিশাল শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য রওয়ানা হলেন। যুদ্ধ-কৌশল হিসেবে অশ্বারোহীর একটি ক্ষুদ্র দলকে 'নাহাওয়ান্দ' শহরে প্রবেশের পথঘাটসমূহ এবং তৎসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করলেন। 'নাহাওয়ান্দ' শহরের অদূরে তাদের ঘোড়া হঠাৎ থমকে গেল। তারা জোরে চাবুক মারার পরও ঘোড়াগুলো সামনে অগ্রসর হতে পারছিল না। রণক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই খ্যাতনামা তেজী ঘোড়াগুলো কেন সম্মুখে অগ্রসর হতে পারছে না, তা জানার জন্য ঘোড়ার পিঠ থেকে অশ্বারোহীরা নেমে পড়লেন। তারা দেখতে পেলেন বিশেষ ধরনের তৈরী লোহার পাত-পেরেক যা বিটুমিন-এর সাথে কার্পেটিংয়ের মতো রাস্তায় বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেসব ঘোড়াগুলোর পায়ে বিঁধে যাচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও ঘোড়াগুলো তা অতিক্রম করতে সক্ষম হচ্ছে না। পারস্য বাহিনী তাদের নিরাপত্তার জন্য 'নাহাওয়ান্দ' শহরে পৌঁছার সমস্ত পথে লোহার এসব পাতজাতীয় পেরেক বিছিয়ে রেখেছে, যেন পদাতিক বা অশ্বারোহী বাহিনীর যে কোনো অভিযান ব্যর্থ হয়ে যায়। অশ্বারোহী বাহিনী 'নাহাওয়ান্দ' শহরকে এ ধরনের দুর্ভেদ্য ও বহির্জগতের সাথে বিচ্ছিন্ন করে রাখার সংবাদ জানিয়ে নু'মান ইবনে মুকাররিনের নিকট পরামর্শ চেয়ে পাঠালেন।

নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁদের সেখানেই অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং প্রতি রাতে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অগ্নি প্রজ্বলিত করে আলোকিত করার উপদেশ দিলেন। 'নাহাওয়ান্দ' শহরে অবস্থানরত শত্রুবাহিনী তা যেন ভালো করে দেখতে পায়। মুসলিম বাহিনীকে এমন এক কৌশল গ্রহণ করতেও নির্দেশ দিলেন যাতে শত্রু বাহিনী মনে করে:

'বেশ কিছুদিন অবস্থানের পর আমাদের বিছানো পেরেকের দুর্ভেদ্য সীমা অতিক্রম করতে না পেরে এবং 'নাহাওয়ান্দ' শহরে প্রবেশে ব্যর্থ হয়ে মুসলিম সৈন্যরা পালিয়ে যাচ্ছে।' মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনীর পরাজয় ও পলায়ন সংবাদে নিশ্চিত হয়ে যেন তারা মুসলিম বাহিনীকে পিছন থেকে আক্রমণের লক্ষ্যে নিজেরাই নিজেদের রাস্তা পরিষ্কার করতে বাধ্য হয়।'

নু'মান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ কৌশল সফল হলো। যখন পারস্য বাহিনী দেখল যে, বেশ কিছুদিন অবস্থান নেওয়ার পর অশ্বারোহী মুসলিম বাহিনী পরাজিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পলায়নের পথ বেছে নিয়েছে, তখন তারা নিজেরাই নাহাওয়ান্দে পৌঁছার রাস্তায় বিছানো পেরক পরিষ্কার করে ফেলে। তাদের পথগুলো তারা নিজেরাই পেরেকমুক্ত করামাত্রই নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শত্রুবাহিনীর ওপর হঠাৎ আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন ও সংকেতস্বরূপ তিনবার আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারণ নির্ধারণ করে বলেন:

'আমি যখন প্রথম তাকবীরধ্বনি উচ্চারণ করব, তখন তোমাদের যারা এখনো পর্যন্ত অপ্রস্তুত তারা দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। দ্বিতীয় তাকবীরধ্বনির সাথে সাথে প্রত্যেকেই তার হাতিয়ার আক্রমণের জন্য পূর্ণ প্রস্তুত করে নেবে এবং তৃতীয় তাকবীরধ্বনির সাথে সাথেই আমি আল্লাহর দুশমনদের ওপর আক্রমণের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ব, আমার সাথে তোমরা সবাই আক্রমণ চালাবে।'

সিদ্ধান্ত মোতাবেক পর্যায়ক্রমে তিন বার তাকবীরধ্বনি উচ্চারণের মাধ্যমে শত্রুবাহিনীর ওপর বজ্রপাতের ন্যায় বীরবিক্রমে আক্রমণ চালালেন। দেখতে না দেখতেই তাঁর পেছনে মুসলিম বাহিনী ঝড়ের বেগে শত্রুবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। উভয় বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ বেধে গেল। যুদ্ধের ইতিহাসে এমন ভয়াবহ যুদ্ধ খুব কমই হয়েছে। মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণ পারস্য বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলল। অগণিত পারস্য সৈন্য মুসলিম বাহিনীর হাতে প্রাণ হারাল। পারস্য বাহিনীর লাশে শহরের পাহাড়ি টিলা থেকে সমতল ভূমি, পুকুর, ডোবা ও নালা-নর্দমা সব একাকার হয়ে গেল। পথঘাট, অলিগলি ও রাজপথ শত্রুদের রক্তের স্রোতে পিচ্ছিল হয়ে গেল।

আক্রমণের চরম এক পর্যায়ে মুসলিম সেনাপতি নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঘোড়ার পা প্রবাহিত রক্তের পিচ্ছিল পথে সটকে গেলে শত্রুবাহিনীর আক্রমণের মুখে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হয়ে শাহাদাত বরণ করলেন। তৎক্ষণাৎ মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভাই তাঁর হাত থেকে সেনাপতির ঝাণ্ডা নিজ হাতে নিয়ে তাঁরই চাদর দিয়ে তাঁর মৃতদেহকে ঢেকে দিলেন। যুদ্ধরত মুসলিম সৈন্য বাহিনীকে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর শাহাদাতের সংবাদ প্রচার থেকে বিরত থাকলেন। মুসলিম সৈন্য বাহিনীর এই বিরাট সাফল্য ও বিরাট বিজয় ইসলামের ইতিহাসে 'মহাবিজয়' নামে খ্যাতি লাভ করে।

বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী তাদের প্রাণপ্রিয় সেনাপতি নু'মান ইবনে মুকাররিন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ধন্যবাদ জানাতে এলে তাঁকে না দেখে এদিক-সেদিক খোঁজাখুঁজি করতে থাকে। তাঁর ভাই তখন নু'মান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর লাশের ওপর থেকে তাঁর চাদরখানা তুলে নিয়ে বললেন: 'ইনিই তোমাদের আমীর ও সেনাপতি।'

আল্লাহ বিজয় দানের মাধ্যমে তাঁর চক্ষুদ্বয়কে শীতল করে দিয়েছেন এবং শাহাদাতের মাধ্যমে তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তাঁকে ধন্য করেছেন।'

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ৮৭৪৫ নং জীবনী দ্রষ্টব্য। ২. ইবনুল আছীর: ২য় খণ্ড, ২১১ পৃ: ৩য় খণ্ড, ৭ পৃ:। ৩. তাহযীবুত তাহযীব : ১০ম খণ্ড, ৪৫৬ পৃ:। ৪. ফুতুহুল বুলদান: ৩১১ পৃ:। ৫. শারহে আলফিয়াতুল ইরাকী: ৩য় খণ্ড, ৭৬ পৃ:। ৬. আল ইলাম: ৯ম খণ্ড, ৯ পৃ:। ৭. আল কাদেসিয়া: ৬৬-৭৩ পৃ: দারুন নাফায়েস, বৈরূত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00