📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 আদী ইবনে হাতেম আত্ তায়ী (রাঃ)

📄 আদী ইবনে হাতেম আত্ তায়ী (রাঃ)


'যখন তারা কুফরীর পথ অবলম্বন করেছে, তখন তুমি ঈমান এনেছ। যখন তারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে অস্বীকার করেছে, তখন তুমি তাকে অনুসরণ করেছ, যখন তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তখন তুমি পূর্ণ আনুগত্যের পরিচয় দিয়েছ, এবং যখন তারা পশ্চাৎপদ হয়েছে তখন তুমি বীর বিক্রমে এগিয়ে চলেছ।' -ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু

নবম হিজরীতে আরবের এক প্রভাবশালী বাদশাহ ইসলামের বিজয়ে ভীত হয়ে দেশ ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবনযাপন করেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর এই ধর্মান্তরের ঘটনা খুবই চমৎকার ও বিরল এক দৃষ্টান্ত। ইসলামী দাওয়াতের বিরুদ্ধে তাঁর প্রবল বিরোধিতা একে একে ব্যর্থ হলে তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলামে তাঁর এই আত্মসমর্পণ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুর্লভ এক ঘটনার অন্তর্ভুক্ত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধাচরণকারী সেই বাদশাহ হলেন, ইতিহাস বিখ্যাত হাতেম আত তাঈ'র ছেলে 'আদী'। আদী শুধু বাদশাহ হিসেবেই নন; বরং দানবীর হিসেবেও ছিলেন, পিতার যোগ্য উত্তরসূরি। উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি 'তাঈ' রাজ্যের বাদশাহ হয়েছিলেন। লুটতরাজকৃত সম্পদের এক-চতুর্থাংশ সম্পদ তাঁর জন্য নির্ধারিত ছিল। তিনি শুধু দেশের বাদশাহই ছিলেন না; বরং সেনাপতির দায়িত্বও তিনি পালন করতেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আরবের সর্বত্র হক ও হেদায়াতের দাওয়াত দিতে শুরু করেন, তখন চতুর্দিকে ইসলামের দাওয়াত এর সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে। একের পর এক অঞ্চল ইসলামের দাওয়াতী পতাকার ছায়ায় আসতে থাকে। আদী ইবনে হাতেম আত তাঈ উপলব্ধি করতে পারেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বের কাছে তাঁর বংশানুক্রমে প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রীয় সীমানায় তাঁর রাজ্য নিশ্চিত অন্তর্ভুক্ত হবে। ঠাণ্ডা মাথায় তিনি এ আশঙ্কার কথা চিন্তা করে নতুন ইসলামী রাষ্ট্র এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তীব্র বিরুদ্ধাচরণ আরম্ভ করেন। অথচ তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। না দেখে না জেনে জঘন্যভাবে বিরোধিতা করতে লাগলেন। দীর্ঘ ২০ বছর অব্যাহতভাবে ইসলামের বিরোধিতা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে আল্লাহ তাআলা তাঁকে হেদায়েতের পথ দেখালেন ও সত্যের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তাঁর অন্তরকে প্রশস্ত করে দিলেন।

আদী ইবনে হাতেমের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা অবিস্মরণীয়। তাঁর নিজের বর্ণনা থেকেই আমরা এখন বিস্তারিত জানতে পারব। কারণ, তিনি নিজেই তাঁর ঘটনা বস্তুনিষ্ঠভাবে বর্ণনা করার জন্য যথেষ্ট।

আদী ইবনে হাতেম আত তাঈ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করছেন:

আরব বিশ্বে আমার চেয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে অন্তরে বিদ্বেষ পোষণকারী আর কেউ ছিল কি না সন্দেহ। আমি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এক সম্ভ্রান্ত রাজপরিবারের যুবরাজ ছিলাম। অন্যান্য রাজা-বাদশাহর মতো আমিও লুটতরাজকৃত ধন-সম্পদের এক চতুর্থাংশ পেতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের সংবাদ শুনে তাঁকে বড়ই ঘৃণা করতে লাগলাম। অথচ তাঁর শক্তি বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এমনকি তাঁর সৈন্যবাহিনী আরবের পূর্বপ্রান্ত থেকে পশ্চিমপ্রান্ত পর্যন্ত ছোট-বড় সব যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে দাপটের সাথে চলাফেরা করত। তখন একদিন আমার উটের রাখালকে বললাম:

'সাবাস গোলাম! দ্রুতগামী মোটাতাজা একটি উট আমার সফরের জন্য প্রস্তুত কর। এই উটকে আমার কাছেই সর্বক্ষণ বেঁধে রাখ। মুহাম্মদের সৈন্যবাহিনী বা ক্ষুদ্র কোনো সৈন্যদলের কথাও যদি জানতে পার তাহলে আমাকে তৎক্ষণাৎ সংবাদ দিও।'

কোনো একদিন সকালে গোলাম এসে আমাকে সংবাদ দিল : 'হে আমার মনিব! মুহাম্মদের সৈন্য আপনার ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। আপনি যে উটের কথা বলেছিলেন, সে ইচ্ছা এখন পূরণ করতে পারেন।'

তাকে বললাম : 'কেন? কী দুঃসংবাদ এনেছ?'

সে বলল : 'পতাকাবাহী কিছু সৈন্যকে আমাদের ভূখণ্ডে ঘোরাফেরা করতে দেখে তাঁদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যে, এরা মুহাম্মদের সৈন্যবাহিনী।'

তাঁকে বললাম : 'আমার জন্য যে উটটি তৈরি করে রেখেছ সেটি কাছে আনো। অতঃপর উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করতে লাগলাম। সবাইকে আমাদের প্রিয় ভূমি ছেড়ে পালানোর আহবান জানালাম এবং খুব দ্রুত সিরিয়ার দিকে রওনা দিলাম। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, সেখানকার সমধর্মী খ্রিস্টানদের সাথে মিলিত হয়ে সেখানেই যেন বসবাস করতে পারি।'

অত্যন্ত ব্যস্ততার সঙ্গে পরিবার-পরিজনকে একত্রিত করলাম। বিপদ নিশ্চিত জেনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু আমাদের জন্মস্থান নজদে আমার সহোদর বোন এবং তার সাথে বনূ তাঈ-এর বাদ বাকি লোক রয়ে গেল। আমার পক্ষে বোনকে আনার জন্য সেখানে যাওয়া সম্ভব ছিল না। সুতরাং আমার কাছে যারা উপস্থিত ছিল, তাদের নিয়েই সিরিয়ায় পৌঁছি এবং অন্যান্য খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ভাইদের সাথে বসবাস করতে থাকি। আমার বোনের ব্যাপারে যা আশঙ্কা করেছিলাম ঠিক তা-ই হয়েছিল। সিরিয়ায় অবস্থানকালে জানতে পারলাম, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অশ্বারোহী বাহিনী আমাদের বাড়ি-ঘরে হামলা করে মাল-সামান লুটতরাজ করে নিয়েছে। আমার বোন ও অন্যান্য মহিলাকে বন্দী করে ইয়াসরিবে নিয়ে যাওয়া হয়। মসজিদে নববীর দরজা সংলগ্ন নির্ধারিত স্থানে তাদের রাখা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এখান দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন আমার বোন সামনে দাঁড়িয়ে যায় এবং আরয করে :

'ইয়া রাসূলুল্লাহ! পিতা ইনতিকাল করেছেন। যিনি আমাকে সাহায্য করার জন্য আসার কথা তিনি গায়েব হয়েছেন। অতএব আপনি আমার ওপর করুণা করুন, আল্লাহ আপনার ওপর করুণা করবেন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন: 'তোমাকে সাহায্য করার জন্য কার আসার কথা ছিল?'

আমার বোন উত্তর দেয়: 'আদী ইবনে হাতেমের।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছ থেকে যে পলায়ন করেছে, সেই ব্যক্তি কী?'

এ কথোপকথনের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্বাভাবিক গতিতে চলে যান। পরদিন যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার এখান দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সে আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে গতকাল যে আরয করেছিল, তারই পুনরাবৃত্তি করে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও গতকালের মতোই উত্তর দেন।

পরদিন আবার যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখান দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সে নিরাশ হওয়ায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আর কিছু আরয করল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছন থেকে এক ব্যক্তি আমার বোনকে আবার আবেদন করার জন্য ইশারা করলেন। ঐ ব্যক্তিটির ইশারা পেয়ে আমার বোন দাঁড়িয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে পূর্ব দু'দিনের মতোই আবেদন করে:

'ইয়া রাসূলুল্লাহ! পিতা ইনতিকাল করেছেন, সাহায্যের জন্য যার আসার কথা ছিল সে গায়েব হয়ে গেছে। অতএব আপনি আমার ওপর করুণা করুন, আল্লাহ আপনার ওপর করুণা করবেন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন: 'হ্যাঁ, করলাম।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে মুক্ত হওয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে আমার বোন তাঁর খিদমতে আরয করল:

'আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে আমি সিরিয়ায় চলে যেতে চাই।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন:
'ব্যস্ত হয়ো না। ততদিন এখানে অপেক্ষা করতে থাক, যতদিন না তোমাদের সমগোত্রীয় নির্ভরযোগ্য কোনো কাফেলা না পাও। যে কাফেলা তোমাকে পরিজনের নিকট পৌঁছে দিতে পারে। যদি এমন কোনো কাফেলার সন্ধান পাও, তাহলে আমাকে অবহিত করো।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখান থেকে চলে যাওয়ার পর ইশারাকারী ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে উপস্থিত লোকেরা বললেন:
'তিনি আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।'

বিশ্বস্ত এক কাফেলার আগমন হলে, আমার বোন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে আরয করল:

'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার স্বগোত্রীয় একটি কাফেলা এখানে এসেছে, তাদের মধ্যে বেশ কিছু বিশ্বস্ত ব্যক্তি রয়েছে। যারা আমাকে আমার পরিজনের নিকট পৌছে দিতে পারে।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বোনকে কাপড়-চোপড় সেলাই করে দেন। আরোহণের জন্য একটি উট এবং প্রচুর পরিমাণ খাদ্য ও পানীয় সঙ্গে দেন। অতঃপর সে কাফেলার সাথে আমার বোন সিরিয়ার পথে রওনা হয়।

আদী ইবনে হাতেম আত তাঈ বলেন:
'এরপর থেকে নানাভাবে আমাদের কাছে তার সংবাদ আসতে থাকে, এবং তার আসার ব্যাপারে আশার সঞ্চার হয়; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বোনের প্রতি যে সম্মান ও ভদ্রসুলভ আচরণ করেছেন, এমন খবর আমি মোটেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তাছাড়া তাঁর প্রতি আমার কোনো ভালো ধারণাও ছিল না।'

একদিন আমি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসেছিলাম। এ অবস্থায় দেখতে পেলাম হাউদায় উপবিষ্ট এক মহিলাকে নিয়ে একটি উট আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

আমি বলে উঠলাম : 'হাতেমের মেয়ে?'

সত্যি সত্যি সে উট থেকে নেমেই আমাকে বলছিল : 'ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ছিন্নকারী যালিম! স্ত্রী, পরিবার, সন্তান-সন্ততি নিয়ে চলে এসেছ, আর অন্যদের মান-সম্মান ও সম্ভ্রমের কী হলো সে চিন্তাও করলে না?'

তাকে বললাম : 'সত্যি বলছি বোন, আমার যে পরিস্থিতি ছিল, সে পরিস্থিতিতে তা করা সম্ভব ছিল না। আমাকে গালমন্দ করো না, জীবনে বেঁচে যে এসেছি, এটাই কি যথেষ্ট নয়?'

নানাভাবে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করি। অবশেষে, তার ক্রোধ উপশম হলো, শান্ত হয়ে সে সব ঘটনা শোনাল। নিঃসন্দেহে সে একজন বুদ্ধিমতী, সাহসী ও চতুর মহিলা। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম : 'মুহাম্মদ সম্পর্কে তোমার কী ধারণা?'

সে উত্তর দিল : 'খোদার শপথ! আমি মনে করি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তুমি তাঁর সাথে দেখা করো। তিনি যদি নবী হন, তাহলে তাঁর কাছে শীঘ্রই যাওয়া শ্রেয়, আর যদি তিনি শাহানশাহ হন তাহলে তুমি যেভাবে ছিলে সেভাবেই মর্যাদা পাবে।'

আদী ইবনে হাতেম বলেন: 'আমি দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে কোনোরূপ নিরাপত্তা বা চিঠিপত্র ছাড়াই মদীনা মুনাওয়ারায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হই, শুধু আমার এতটুকু আশা ছিল যে, আমি জানতে পেরেছি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার উপস্থিতির প্রত্যাশা করেন।'

তিনি বলেছেন: 'আমি আশা করছি যে, আল্লাহ আদী ইবনে হাতেমের হাতকে আমার হাতের সাথে মিলিয়ে দেবেন। বুকভরা আশা নিয়ে মসজিদে নববীতে অবস্থানরত অবস্থায় তাঁকে গিয়ে সালাম করি।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন: 'কে?'

উত্তর দিলাম: 'আদী ইবনে হাতেম আত তাঈ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে ওঠে দাঁড়ালেন এবং আমার হাত ধরে সোজা তাঁর বাড়ির দিকে রওয়া হলেন।'

শপথ করে বলছি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সঙ্গে নিয়ে তার বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন, এমন সময় অশীতিপর এক বৃদ্ধা একটি শিশু ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দাঁড় করালেন। তার সমস্যা সংক্রান্ত বিষয়ে কথাবার্তা বললেন, বৃদ্ধার সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তিনি তাঁর সাথেই রইলেন। আমিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দাঁড়িয়েই রইলাম। আর মনে মনে বলতে লাগলাম: 'খোদার শপথ! এ ব্যক্তি তো কোনো বাদশাহ হতে পারেন না।'

অতঃপর আবার হাত ধরে রওয়া দিলেন। আমরা তাঁর বাড়ি পৌছে গেলাম। ভিতরে খেজুরের ছোবড়া ভরা চামড়ার তৈরি (তার বাসভবনের একমাত্র ফার্নিচারস্বরূপ) বালিশ সাদৃশ্য গদিখানা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বসতে বললেন। আমি লজ্জিত হয়ে বললাম: 'না, না আপনি বসুন।'

তিনি বললেন: 'না তুমিই বসো, পরিশেষে বেয়াদবি না হয় মনে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ মেনে নিয়ে তাতেই বসে পড়লাম।'

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেঝেতে বসলেন। তাঁর ঘরে এছাড়া বসার আর দ্বিতীয় কিছুই ছিল না। মনে মনে বলছিলাম: 'এ কোন বাদশাহর বাড়ি হতে পারে না।'

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সম্বোধন করে বলেন: 'আদী, তুমি কি খ্রিস্টান ও পৌত্তলিকতার মাঝামাঝি রুকুসিয়া ধর্মাবলম্বী নও?'

আমি বললাম: 'জি হ্যাঁ।'

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন:
'তুমি কি তোমার রাজ্যে এক-চতুর্থাংশ গ্রহণকারী নামে পরিচিত ছিলে না? তাদের নিকট থেকে যে এক-চতুর্থাংশ সম্পদ নিতে তা কি তোমার ধর্মে নিষিদ্ধ ছিল না?

আমি উত্তর দিলাম: 'জি হ্যাঁ, এবং আমার বুঝতে আর বাকি রইল না, তিনি অবশ্যই প্রেরিত রাসূল।'

তিনি আবার আমাকে সম্বোধন করে বলতে লাগলেন:
'হে আদী! সম্ভবত মুসলমানদের আর্থিক হীনতা ও অভাব-অনটন আজ তোমার ইসলামে প্রবেশের পথে প্রধান বাধা।'

'খোদার শপথ! সেদিন অতি নিকটে, যখন তাদের ধন-সম্পদের এতো প্রাচুর্য হবে যে, যাকাত-খয়রাত নেওয়ার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।'

'হে আদী! সম্ভবত, আজ মুসলমানদের সংখ্যাস্বল্পতা ও তাদের বিরুদ্ধে সীমাহীন শত্রুতা তোমার ইসলামে প্রবেশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।'

'খোদার শপথ! অচিরেই দেখতে পাবে, একজন মহিলা কাদেসিয়ার শেষ প্রান্ত থেকে একাকী উটে আরোহণ করে বায়তুল্লাহর যিয়ারতে আসবে, অথচ আল্লাহ ছাড়া তার আর কোনো ভয় থাকবে না।'

'হে আদী! ইসলাম গ্রহণে বাধা দানকারী, 'রাজা বাদশাহগণ সবাই অমুসলিম।'

'খোদার শপথ! অনতিবিলম্বেই দেখবে, ইরাকের বাবেলের শুভ্র রাজপ্রাসাদ মুসলমানদের করতলগত। কিসরা ইবনে হুরমুযের ধন-ভাণ্ডারও তাদের হস্তগত।'

আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেসা করলাম: 'কিসরা ইবনে হুরমুয়ের ধন-ভাণ্ডার?'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন:
'হ্যাঁ, কিসরা ইবনে হুরমুযের ধন-ভাণ্ডার।'

এ শুনে আমি কালেমা শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করলাম।

আদী ইবনে হাতেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন। তিনি বলতেন:
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুটি ভবিষ্যদ্বাণী তো স্বচক্ষে সংঘটিত হতে দেখলাম। আমি দেখেছি, কাদেসিয়া থেকে মহিলারা তাদের উটের পিঠে আরোহণ করে এসে নির্দ্বিধায় খোদার এই ঘর যিয়ারত করে যাচ্ছে। কিসরা সম্রাটের ধনভাণ্ডারে আক্রমণকারীদের মধ্যে আমিই অগ্রভাগে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার ছিলাম। খোদার শপথ! তৃতীয়টিও সংঘটিত হবে।'

আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীর ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়ন করেই দেখালেন। তৃতীয় ভবিষ্যদ্বাণী ইসলামের পঞ্চম খলীফা ওমর ইবনে আব্দুল আযীয রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সময় বাস্তবে সংঘটিত হয়। আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের এত ধনদৌলতের প্রাচুর্য দান করেন যে, সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত যাকাত বণ্টনকারীগণ যাকাত গ্রহণকারীদের তালাশের জন্য রাস্তায় রাস্তায় আহ্বান করে বেড়াতেন; কিন্তু তা গ্রহণ করার মতো কোনো অভাবীকে পেতেন না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণীকে আল্লাহ সত্যি সত্যি প্রমাণ করে দেখালেন এবং আদী ইবনে হাতেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শপথকেও আল্লাহ সম্মান দিলেন।

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ (আস সায়াদা সংস্করণ)-৪র্থ খণ্ড, ২২৮-২২৯ পৃ.। ২. আল ইসতিয়াব। (হায়দরাবাদ সংস্করণ)-২য় খণ্ড, ৫০২-৫০৩ পৃ.। ৩. উসদুল গাবাহ-৩য় খণ্ড, ৩৯২-৩৯৪ পৃ.। ৪. তাহযীবুত তাহযীব-৭ম খণ্ড, ১৬৬-১৬৭ পৃ.। ৫. তাকুরিবুত তাহযীব-২য় খণ্ড, ১৬ পৃ.। ৬. খুলাসাতু তাযহীব তাহযীবুল কামাল-২৬৩-২৬৪ পৃ..। ৭. তাজরীদু আসমাউস সাহাবা-১ম খণ্ড, ৪০৫ পৃ.। ৮. আল জামউ বাইনা রিজালিস সহীহাইন-১ খণ্ড, ৩৯৮ পৃ.। ৯. আল ইবরু-১ম খন্ড, ৭৪ পৃ.। ১০. আত তারীখুল কাবীর-৪র্থ খণ্ড, (ভমিকা), ১ম খণ্ড, ৪৩ পৃ.। ১১. তারীখুল ইসলাম লিযযাহাবী-৩য় খণ্ড, ৪৬-৪৮ পৃ.। ১২. শাজরাতুযযাহাব-১ম খণ্ড, ৭৪ পৃ.। ১৩. আল মায়ারেফ-১৩৬ পৃ.। ১৪. আল মুয়াম্মারুন-৪৬ পৃ.।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 আবু যর গিফারী (রাঃ)

📄 আবু যর গিফারী (রাঃ)


'আবূ যর গিফারীর চেয়ে অধিক সত্যবাদী কোনো ব্যক্তি এ পর্যন্ত পৃথিবীতে না জন্মগ্রহণ করেছে, আর না আকাশ তাকে ছায়াদান করেছে।' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)

মক্কার সাথে বহির্বিশ্বের যাতায়াতের একমাত্র মরুপথ 'ওয়াদীয়ে ওয়াদ্দান' নামক স্থানে গিফার নামক একটি গোত্রের বসবাস ছিল। কুরাইশদের তেজারতী কাফেলা সিরিয়া যাতায়াতকালে তারা যা কিছু সাহায্য-সহযোগিতা করত এবং তাদের খিদমতের বিনিময়ে যা তারা পেত, তা দিয়েই এ গোত্রের কোনোভাবে জীবিকা নির্বাহ হতো। যদি কোনো কাফেলা কোনো কারণে সাহায্য করতে অনীহা দেখাত, তাহলে সে কাফেলা তাদের লুটতরাজের শিকার হতো।

'জুনদুব ইবনে জুনাদাহ' যাকে আবু যর বলে সম্বোধন করা হতো, তিনি এই গিফার গোত্রেরই সন্তান। কিন্তু গোত্রের অন্যান্য লোকের তুলনায় তাঁর সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সাহসিকতা, বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শিতা ছিল খুব বেশি। মূর্তিপূজার প্রতি তাঁর ছিল প্রচণ্ড ঘৃণা। তাঁর গোত্রের লোকজন আল্লাহ ছাড়া এসব দেব-দেবীর পূজা অর্চনা করুক, তা তিনি আদৌ পছন্দ করতেন না। কুসংস্কারাচ্ছন্ন আরবরা যেদিকে ছিল আগ্রহ সহকারে ধাবমান, তিনি তাঁর ঈমান নিয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন এর সম্পূর্ণ বিপরীতে।

এ পথে বিভিন্ন কাফেলার যাতায়াত এবং তাদের সঙ্গে মেলামেশার কারণে তিনি জানতে পারেন যে, আরবে এক নবীর আবির্ভাব ঘটেছে, যার কথাবার্তা যুক্তিসঙ্গত এবং বিবেকের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য। এ নবী তাঁর অনুসারীদের আলোর পথ, সত্যের পথ দেখান। তিনি আরও সংবাদ পেলেন যে, এ নবী আরবের মক্কাতেই জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তিনি মক্কাতেই দীন প্রচার করছেন।

তিনি তার ভাই আনিসকে বললেন:
'তুমি মক্কায় যাও, যে ব্যক্তি সেখানে নবুওয়াতের দাবি করছেন, তাঁর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে এস, তার ওপর নাকি ওহীও নাযিল হয়ে থাকে। কী অবতীর্ণ হয় তার কিছু নমুনা নিয়ে আসবে।'

একদিন আনিস মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। মক্কায় পৌছে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পবিত্র কালাম থেকে কিছু শোনে নিয়ে আবার 'ওয়াদীয়ে ওয়াদ্দান'-এর গিফার গোত্রে ফিরে এলেন। আবেগভরা মন নিয়ে আনিসকে অভ্যর্থনা জানিয়ে আবু যর গিফারী নতুন নবীর সংবাদ জানতে চাইলেন। আনিস মক্কায় গিয়ে যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, সবই বর্ণনা করলেন এবং আরও বললেন:

'আল্লাহর কসম! তিনি সকলকে উন্নত চরিত্রে চরিত্রবান হওয়ার উপদেশ দেন। তাঁর কথাবার্তা কবিতা নয়, অতি বাস্তব।'

তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'লোকেরা তার সম্পর্কে কি বলে?'

আনিস বললেন:
'তারা বলে, তিনি একজন জাদুকর বা গণক বা কবি হবেন।'

আবূ যর আনিসকে বললেন:
'তুমি আমার মনের ক্ষুধা মেটাতে পারলে না, আমার পিপাসাও তুমি নিবৃত্ত করতে পারলে না। যাক, তুমি যদি পরিবার-পরিজনের দেখাশোনা করতে পার, তাহলে আমি নিজে গিয়েই বিস্তারিত অবগত হই।'

আনিস বললেন:
'হ্যাঁ, পারব। তবে মক্কাবাসী থেকে খুবই সতর্ক থাকবেন।'

আনিস থেকে এ আশ্বাস পেয়ে আবু যর পরদিন সকালে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সাথে নিলেন, বকরির চামড়ার তৈরি পানি রাখার মশক এবং পথচলার কিছু পাথেয়। মক্কায় পৌঁছেই তিনি সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসু দৃষ্টিকে পাশ কাটিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন।

তিনি বুঝতে পারেন, মক্কার কুরাইশরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর খুবই ক্ষুব্ধ। তিনি কুরাইশদের মূর্তিগুলোকে পছন্দ করেন না। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারীদের তারা আদৌ বরদাশত করতে পারছে না। অধিকন্তু তাদের ওপর নিপীড়ন নির্যাতন করত এসব খবর তিনি আগেই পেয়েছিলেন। এ জন্য তিনি মক্কায় পৌঁছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করা মোটেই পছন্দ করলেন না। কারণ, জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি হতে পারে শত্রুদলভুক্ত। শেষে কোন্ মুসিবতেই না পড়তে হয়। নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই দিন অতিবাহিত হলো, রাত এল। মসজিদে হারামেই শুয়ে পড়লেন। তখন তার পাশ দিয়ে আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যাচ্ছিলেন। একজন ভিনদেশী মুসাফিরকে দেখে তাকে বললেন:

'এখানে শুয়ে আছেন। আমার মেহমান হোন না কেন?'

আবূ যর সম্মতি দিলেন, মেহমান হিসেবে আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাড়িতে রাত্রি যাপন করতে গেলেন। পারস্পরিক কুশল বিনিময় ছাড়াই রাত কাটালেন। সকালে আবু যর পানির মশক ও তার অন্যান্য পাথেয় নিয়ে মসজিদে হারামে চলে এলেন। দ্বিতীয় দিনও আবূ যর মসজিদে হারামেই কাটালেন; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখা পেলেন না। এ রাতেও তিনি মসজিদে হারামেই ঘুমিয়ে পড়লেন। সে রাতেও আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নজরে পড়লে তিনি আবূ যরকে জিজ্ঞাসা করলেন:

'আপনি কি এখনো গন্তব্য স্থানের সন্ধান পাননি?'

একথা বলে তাকে গতরাতের মতো এ রাতেও মেহমান হিসেবে নিজ বাড়িতে আনলেন। সে রাতেও তারা পরস্পরকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না। তৃতীয় রাতেও আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মেহমান হলেন আবু যর গিফারী। এবার আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ যরকে জিজ্ঞাসা করলেন: 'সম্মানিত অতিথি, কী উদ্দেশ্যে আপনি মক্কা এসেছেন, অনুগ্রহ করে বলবেন কি?'

আবূ যর বললেন: 'যদি আমাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, আমি যেখানে যেতে চাই সেখানে পৌছে দেবেন, তাহলে বলতে পারি।'

আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে সে প্রতিশ্রুতি দিলে আবূ যর গিফারী বলতে লাগলেন: 'বহুদূর থেকে মক্কায় এসেছি, নতুন নবীর সাথে দেখা করে তাঁর ওপর অবতীর্ণ কিছু আয়াত শোনার উদ্দেশ্যে।'

একথা শোনামাত্রই আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মন খুশিতে ভরে উঠল। তিনি বললেন : 'আল্লাহর শপথ! তিনি অবশ্যই আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, অবশ্যই আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, অবশ্যই আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। সকালে আপনি আমাকে অনুসরণ করে চলবেন। যদি আপনার জন্য কোনো বিপদের আশঙ্কা করি, তাহলে আমি পানি ফেলানুর ভান করব। আর যখন ফের চলা আরম্ভ করব, আপনিও আমাকে অনুসরণ করে চলতে থাকবেন এবং আমি যেখানে প্রবেশ করব, আপনিও সেখানে প্রবেশ করবেন।'

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াত এবং তাঁর ওপর অবতীর্ণ আয়াত শ্রবণের আকাঙ্ক্ষায় সারা রাত আবূ যরের ঘুম হলো না। সকালে আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর মেহমানকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাড়ির দিকে রওনা হলেন এবং আবু যর তাঁকে অনুসরণ করে চললেন এবং কোনো দিকে না তাকিয়ে আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে গিয়ে হাজির হলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেকে উদ্দেশ্য করে বললেন: 'আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ!'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও উত্তরে বললেন: 'ওয়া আলাইকাসসালামু ওয়া রাহমাতুহু ওয়াবারাকাতুহু।'

আবু যর ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি, যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বপ্রথম সালাম দেন এবং তখন থেকেই ইসলামের এই সালামপ্রথা মুসলমানদের মধ্যে প্রচার ও প্রসার লাভ করে।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ যরকে পবিত্র কুরআনের অংশবিশেষ তিলাওয়াত করে শোনান এবং ইসলামের দাওয়াত পেশ করলে তিনি সাথে সাথে কালেমা শাহাদাত পাঠের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁকে নিয়ে মুসলমানের সংখ্যা দাঁড়াল তখন ৩-৪ বা ৪-৫ জন মাত্র।

আবু যর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইসলাম গ্রহণের পরের ঘটনা তাঁর ভাষায়ই এখন আমরা জানতে পারব। আবু যর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:

'ইসলাম গ্রহণের পর মক্কাতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অবস্থান করতে থাকি। তিনি প্রতিদিন আমাকে ইসলামের শিক্ষা দান করতেন ও আল কুরআনের অবতীর্ণ কিছু অংশ হিয্য করাতেন।'

তিনি আমাকে বললেন:
'মক্কায় তোমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ কাউকে জানতে দিও না। কেননা, আমি আশঙ্কা করছি, তারা তোমাকে হত্যা করে ফেলবে।'

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে আরয করলাম : 'যে সত্তার হাতে আমার জীবন, সেই সত্তার শপথ করে বলছি, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত মক্কা ত্যাগ করব না; যতক্ষণ না মসজিদে হারামে উপস্থিত হয়ে কুরাইশদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত না দেব।'

আমার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব রইলেন। মসজিদে হারাম বা খানায়ে কা'বায় এসে দেখতে পেলাম, কুরাইশনেতারা আসর জমিয়ে পরস্পরে গল্পে ব্যস্ত। আমি তাদের ভিতরে ঢুকে পড়লাম এবং উচ্চৈঃস্বরে বললাম:

'হে কুরাইশগণ জেনে রাখো। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, 'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রেরিত রাসূল।'

আমার আওয়াজ তাদের কানে পৌছামাত্রই তারা তাদের গল্পের আসর ত্যাগ করে আমার দিকে ছুটে এসে বলতে থাকে, ধর্মচ্যুত এই ব্যক্তিকে আজ জনমের শিক্ষা দেওয়া উচিত। এ বলে তারা সম্মিলিতভাবে আমার ওপর এমনভাবে চড়াও হয় যে, তাতে আমি মৃত্যুর সম্মুখীন হই। এ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব আমাকে রক্ষা করার লক্ষ্যে দৌঁড়ে আসেন এবং তাদের হাত থেকে আমাকে ছাড়িয়ে নেন ও কুরাইশদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন:

'তোমরা নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংস ও বিপদ টেনে আনছ। গিফার গোত্রের এ লোককে মেরে ফেলতে চাচ্ছ? অথচ তাদের নাকের ডগার ওপর দিয়ে তোমাদের তেজারতী কাফেলা যাতায়াত করে! তোমরা তাকে আমার হাতে ছেড়ে দাও।'

উত্তেজনা প্রশমিত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফিরে আসি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার রক্তাক্ত অবস্থা দেখে বললেন:
'তোমাকে কি ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জানাতে নিষেধ করিনি?'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উত্তর দিলাম:
'হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য এ ঘোষণা দেওয়া প্রয়োজন ছিল।'

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন:
'তোমার গোত্রের লোকদের মাঝে চলে যাও, যা কিছু দেখলে ও শুনলে, তা তাদের জানাও এবং তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে থাক। আশা করছি, দাওয়াত সম্প্রসারিত হবে এবং এর জন্য আল্লাহ তোমাকেও উত্তমভাবে পুরস্কৃত করবেন। তুমি যখন জানতে পারবে যে, আমি প্রকাশ্যভাবে দীনের আহ্বান জানাচ্ছি ও দীনের বিজয় হয়েছে, তখন তুমি আমার নিকট চলে এস।'

অতঃপর আমি আমার গোত্রের লোকজনের নিকট চলে আসি। প্রথমে আমার ভাই আনিস আমার সাথে সাক্ষাৎ করে বলে: 'কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?'

উত্তর দিলাম: 'সিদ্ধান্ত এই যে, তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি ও ইসলাম গ্রহণ করেছি।'

মুহূর্তের মধ্যে আল্লাহ তার অন্তরও ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দিলেন। সেও বলে উঠল: 'আমাদের পৌত্তলিক ধর্মের অসারতায় আমার মোটেই মন বসছে না। তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে আমিও ইসলাম গ্রহণ করছি।'

অতঃপর আমরা আমাদের মায়ের নিকট গেলাম। তাঁকেও ইসলামের দাওয়াত দিলাম। তিনিও আমাদের দু'জনের দীনের প্রতি আন্তরিকতার পরিচয় দিয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলেন। সেদিন থেকেই আমাদের পরিবার একটি মুসলিম পরিবার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। গিফার গোত্রের অন্যান্য লোকদেরকেও আল্লাহর পথে আহবান জানাতে থাকলাম। গিফার গোত্রের বিরাট জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয় এমনকি তারা জামাআতের সাথে নামায কায়েম করতে থাকে। সে গোত্রের আবার অনেকেই শর্ত আরোপ করে যে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের ধর্ম ত্যাগ করব না, যতদিন না রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করলে, তারা ইসলাম গ্রহণ করে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উদ্দেশ্যে বলেন: 'আল্লাহ গিফার গোত্রকে ক্ষমা করুন। আর আসলাম গোত্রকে আল্লাহ শান্তি ও নিরাপত্তা দান করুন।'

আবূ যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর নিজ পল্লির গিফার গোত্রেই বসবাস করতে থাকেন। সেখানে বসবাসকালেই বদর, ওহুদ ও খন্দক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। খন্দক যুদ্ধের পর তিনি মদীনায় আগমন করেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য লাভের জন্য অন্য সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সার্বক্ষণিক খিদমতে নিয়োজিত থাকার অনুমতি প্রার্থনা করলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে তার পবিত্র সংশ্রবের নিয়ামত থেকে তৃপ্ত হওয়ার অনুমতি প্রদান করেন। তিনিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সার্বক্ষণিক খিদমতের মাধ্যমে নিজেকে ধন্য করেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ যর গিফারীকে অন্য সবার ওপর যেমন প্রাধান্য দিতেন, তেমনি তাঁকে সবচেয়ে বেশি সম্মানও করতেন। তাদের পরস্পরে এমন কোনো সাক্ষাৎ সংগঠিত হতো না, যে সাক্ষাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথে মোছাফাহা না করতেন, কিংবা মুচকি হাসির সাথে তাঁকে খোশ আমদেদ না জানাতেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকাল তাঁকে অস্বাভাবিকভাবে পীড়া দেয়। তাঁর মহান নেতার হেদায়াতের মজলিশ ও পবিত্র সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তাঁর মন ভেঙে যায়। পরিশেষে আবূ যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মদীনা মুনাওয়ারা ত্যাগ করে সিরিয়ায় এক গ্রামে গিয়ে বসবাস আরম্ভ করেন। আবূ বকর সিদ্দীক ও ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার খিলাফতের সময়ে তিনি সেখানেই অবস্থান করেন।

উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতের সময় আবু যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেখান থেকে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে চলে আসেন। দামেস্কের মুসলমানদের অসাধারণ বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণা ও ধন-দৌলতের প্রতি তীব্র মোহের অবস্থা দেখে তিনি অস্থির হয়ে পড়েন এবং কঠোর ভাষায় তাদের এই নৈতিক অধঃপতনের প্রতিবাদ জানাতে থাকেন; কিন্তু জনসাধারণ তাঁর আহবানে সাড়া না দিয়ে বিরুদ্ধাচরণে অবতীর্ণ হয়। এ অবস্থা দেখে উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে মদীনা মুনাওয়ারায় ডেকে পাঠালেন। খালীফাতুল মুসলিমীনের আহবানে সাড়া দিয়ে তিনি মদীনায় চলে আসেন। কিন্তু দেখতে না দেখতে এখানকার জনসাধারণের প্রতি তাদের বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণা ধন-দৌলতের প্রতি মোহের কারণে বিতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেন এবং জনসাধারণও নিজেদের সংশোধন না করে তাকে চরমপন্থী হিসেবে অপবাদ দিতে থাকে।

পরিশেষে, উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে মদীনা শহরের পরিবেশ থেকে সামান্য দূরে ‘আর রাবযা’ নামক একটি ছোট গ্রামে গিয়ে বসবাস করার নির্দেশ দিলেন। তিনিও শহরাঞ্চলের জনপদ থেকে দূরে ‘আর রাবযা’ গ্রামে গিয়ে দুনিয়ার ধন-সম্পদের চাকচিক্য থেকে দূরে থেকে ইবাদত-বন্দেগীতে ডুবে গেলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফাদের মতো দুনিয়া ত্যাগী ও পরকালমুখী জীবন যাপন করতে লাগলেন।

একবার এক ব্যক্তি তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর ঘরের ভেতরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে থাকে। কিন্তু তাঁর ঘরে কোনো আসবাবপত্র ও সাজ-সরঞ্জাম না দেখে আবু যর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে জিজ্ঞাসা করে :

‘হে আবূ যর! আপনার ঘরের আসবাবপত্র কোথায়?।'

তিনি উত্তর দিলেন : ‘সেখানে (আখিরাতে) আমাদের আর একটা বাড়ি আছে, ভালো ভালো ফার্নিচার ও জিনিসগুলো আমরা সেখানেই পাঠিয়ে দেই।'

সে ব্যক্তি আবু যর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে আবার জিজ্ঞাসা করণ : ‘দুনিয়ায় যতদিন আছেন, জীবনযাপনের জন্য তো অত্যাবশ্যকীয় কিছু বস্তু তো নিশ্চয়ই প্রয়োজন?'

আবু যর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন : ‘কিন্তু বাড়ির মালিক তো আমাদের এ বাড়িতে থাকতে দেবেন না এবং সহসাই সেখানে পাঠিয়ে দেবেন।'

একবার সিরিয়ার গভর্নর তাঁর খিদমতে ৩০০ স্বর্ণমুদ্রা পাঠিয়ে আরয করেন : ‘আপনার প্রয়োজনীয় খরচাদিতে স্বর্ণমুদ্রাগুলো ব্যয় করতে অনুরোধ করছি।'

আবু যর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সিরিয়ার গভর্নরকে ঐ মুদ্রাগুলো ফেরত দিয়ে বললেন : ‘সিরিয়ার গভর্নর কি আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আমার চেয়েও দুর্বল ও নিকৃষ্টতম কাউকে পাননি?'

হিজরী ৩২ সনে এই বুযর্গ ও আবেদ সাহাবী ইহলোক ত্যাগ করে জান্নাতবাসী হন। তাঁর সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন: مَا أَقَلَّتِ الغبراء وَلا أَظَلَّت الخَضْرَاء مِنْ رَجُلٍ أَصْدَقَ مِنْ أَبِي ذَرٍ.
'আসমানের নিচে এ পৃথিবীতে আবূ যরের চেয়ে অধিক সত্যবাদী কোনো ব্যক্তির জন্ম হয় নাই।'

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ-আস্সায়াদাহ সংস্করণ-৩য় খন্ড, ৬০-৬৩ পৃ.। ২. আল ইসতিআব-হায়দরাবাদ সংস্করণ-২য় খন্ড, ৬৪৫-৬৪৬ পৃ.। ৩. তাহযীবুত তাহজিব-২য় খণ্ড, ৪২০ পৃ.। ৪. তাজরীদ আসমাউস সাহাবা-২য় খণ্ড, ১৭৫ পৃ.। ৫. তাজকিরাতুল হুফ্যাজ-১ম খণ্ড, ১৫-১৬ পৃ.। ৬. হুলিয়াতুল আওলিয়া-১ম খণ্ড, ১৫৬-১৭০ পৃ.। ৭. সিফাতুস সাফওয়া-১ম খণ্ড, ২৩৮-২৪৫ পৃ.। ৮. তাবাকাতুস শা'রানী-৩২ পৃ.। ৯. আল মা'আরিফ-১১০-১১১ পৃ.। ১০. শাজারাতুজ্জাহাব -১ম খণ্ড, ৩৯ পৃ.। ১১. আল ইবরু-১ম খণ্ড, ৩৩ পৃ.। ১২. যু আমাউল ইসলাম-১৬৭-১৭৩ পৃ.।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)

📄 আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)


'আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা) এমন এক জন্মান্ধ ব্যক্তি, যার সম্মানে আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে ১৬টি আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। অবতীর্ণ হওয়ার সময় থেকে যার তিলাওয়াত আরম্ভ হয়েছে, অদ্যাবধি চলছে, এবং যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিনই রাত দিন 'এর তিলাওয়াত অব্যাহত থাকবে।' -মুফাসসিরীনের উক্তি।

কে সেই ব্যক্তি? যার জন্য সপ্তম আকাশের ওপর থেকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করা হয়েছিল? জানেন কি, সে ব্যক্তি কে? যার সম্পর্কে জিবরাঈল আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ওহী নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন?

হ্যাঁ, সেই ব্যক্তিই হলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুয়াযযিন আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম রাদিয়াল্লালাহু তাআলা আনহু।

আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মাক্কী, কুরাইশী এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আত্মীয়। উম্মুল মুমিনীন খাদীজা বিনতে খুয়াইলিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার খালাত ভাই। তাঁর পিতা কায়েস ইবনে যায়েদ ও মা 'আতিকাহ বিনতে আবদুল্লাহ। 'আতিকাহ বিনতে আবদুল্লাহকে জন্মান্ধ সন্তানের মা হওয়ার কারণে উম্মে মাকতুম বলে সম্বোধন করা হতো।

আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মক্কাতেই ইসলামের আলোতে উদ্ভাসিত হন। আল্লাহ তাঁর অন্তরকে ইসলামের জন্য প্রশস্ত করেছেন। ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম যুগের ব্যক্তিবর্গের অন্যতম ছিলেন তিনি। মক্কার অন্যান্য মুসলমানদের মতো যুলুম, অত্যাচার ও নির্যাতনের স্টীম রোলারের নিষ্পেষণে অত্যন্ত দৃঢ় মনোবল, ধৈর্য ও নিষ্ঠার পরিচয় দেন তিনি।

সীমাহীন বিপদ-মুসিবতে তার পদঙ্খলনের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা ছিল না কিংবা দীপ্ত ঈমানী চেতনা ও মনোবলে ছিল না কোনো ভাঁটা। এসব নির্যাতন-নিপীড়ন তাকে আল্লাহর দীনকে মযবুত করে আঁকড়ে ধরার, আল কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করার, পরিপূর্ণভাবে শরীআতের জ্ঞান অর্জন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সার্বক্ষণিক সম্পর্ক গড়ার পথেই সহায়তা করে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্যের প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল, যার কারণে আল কুরআন হিফয করার ও যে কোনো প্রয়োজন বা ঘটনায় তাঁর দ্রুত উপস্থিতি সুনিশ্চিত করত। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর মনের উদ্বেগের ভিত্তিতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হওয়াটা অন্যান্য সাহাবী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমের চেয়ে সৌভাগ্যের কারণ হতো।

এক সময়ের ঘটনা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশ নেতাদের সদা সর্বদা ইসলামের দিকে আহ্বান জানাতেন, তারা ইসলাম গ্রহণ করুক এ ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। এ উদ্দেশ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন কুরাইশ নেতৃবর্গ অর্থাৎ উতবা ইবনে রাবী'য়া, তাঁর ভাই শাইবা ইবনে রাবী'আ, আমর ইবনে হিশাম বা আবু জাহল, উমাইয়া ইবনে খালফ এবং খালেদ সাইফুল্লার পিতা ওয়ালীদ বিন মুগীরার সাথে বসলেন এবং তাঁদের সামনে ইসলাম পেশ করে তাদেরকে বোঝাতে থাকলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশা করছিলেন যে, তারা ইসলাম গ্রহণ করবে, কিংবা অন্তত সাহাবী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুদের ওপর অব্যাহত নির্যাতন বন্ধ করবে।

এমতাবস্থায় আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে এসে তাঁকে আল কুরআন থেকে পাঠ করে শোনাতে আরয করেন। তিনি বলেন:

'হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ আপনার ওপর যেসব আয়াত অবতীর্ণ করেছেন, তা আমাকে শিক্ষা দিন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে কর্ণপাত না করে কুরাইশ নেতাদের সাথে আলোচনা অব্যাহত রাখেন ও তাঁর কথায় বিরক্তির ভাব প্রকাশ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচ্ছিলেন, যদি এসব নেতা ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তাদের ইসলাম গ্রহণ ইসলামের জন্য গৌরবজনক হবে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতী কাজের সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশ নেতাদের সাথে তাঁর আলোচনা শেষ করে বাড়ি ফিরতে মনস্থ করলে হঠাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুভব করলেন যে, কোনো কিছু তাঁকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে ফেলছে। অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রতি নাযিল করলেন:

عَبَسَ وَتَوَلَّى - أَنْ جَاءَهُ الْأَعْمَى . وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِّكْرَى - أَمَّا مَنِ اسْتَغْنَى ، فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى . وَمَا عَلَيْكَ أَلَّا يَزَّكَّى - وَأَمَّا مَنْ جَاءَكَ يَسْعَى - وَهُوَ يَخْشَى - فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَهُى - كَلَّا إِنَّهَا تَذْكِرَةٌ ، فَمَنْ شَاءَ ذَكَرَهُ - فِي صُحُفِ مُكَرَّمَةٍ - مَرْفُوعَةٍ مُطَهَّرَةٍ م - بِأَيْدِي سفرة - كِرَامِ مِ بَرَرَة .
'ভ্রূকুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। এ কারণে যে, অন্ধ লোকটি তাঁর কাছে এল। তুমি কেমন করে জানবে সে হয়তো পরিশুদ্ধ হয়ে যেত। অথবা উপদেশ গ্রহণ করত। ফলে উপদেশ তার জন্য উপকারী হতো। অথচ যে বেপরোয়া ভাব দেখায়, তুমি তার দিকে মনোযোগ দিচ্ছ! অথচ সে না শোধরালে তোমার তার ব্যপারে কোনো দায়িত্ব নেই। পক্ষান্তরে তোমার কাছে ছুটে এল ভীত-সন্ত্রস্ত চিত্তে। তার প্রতি তুমি অমনোযোগী হলে। কক্ষনো নয়, তা একটি উপদেশ বাণী। যার ইচ্ছা সে গ্রহণ করবে। এটা এমনসব সহীফায় লিপিবদ্ধ আছে, যা সম্মানিত। যা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, পবিত্র। এ সম্মানিত পূত পবিত্র চরিত্র লেখকদের হাতে লিখিত।'

আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সম্পর্কে ১৬টি আয়াত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরে অবতীর্ণ করলেন, যা অবতীর্ণ হওয়ার সময় থেকে অদ্যাবধি তিলাওয়াত করা হচ্ছে এবং দুনিয়া যতদিন থাকবে ততদিনই তিলাওয়াত হতে থাকবে। এরপর থেকে আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যখনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসতেন, তখনই তিনি তাকে সম্মান করতেন। কোনো বৈঠকে উপস্থিত হলে তাঁকে কাছে বসাতেন, খবরাখবর নিতেন এবং প্রয়োজন পুরো করতেন। যার কারণে সপ্ত আসমানের ওপর থেকে চরমভাবে তিরস্কার করা হয়েছিল তা কি বিস্ময়কর নয়?

যখন কুরাইশরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ঈমানদার সঙ্গী-সাথীদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালাল, তখন আল্লাহ মুসলমানদেরকে হিজরতের অনুমতি দান করলেন, আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দীনের হেফাযতে জন্মভূমি ত্যাগে ছিলেন প্রথম কাফেলার অন্তর্ভুক্তদের অন্যতম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের মধ্যে তিনি ও মুস'আব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হলেন সর্বপ্রথম মদীনায় হিজরতকারী সাহাবী।

আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইয়াসরিবে পৌছার পর পালাক্রমে তিনি ও তাঁর হিজরতের সাথী মুস'আব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জনগণের কাছে গিয়ে কুরআন পাঠ করে শোনাতেন এবং আল্লাহর দীন সম্পর্কে শিক্ষাদান করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করার পর বেলাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মুসলমানদের মুয়াযযিন নিযুক্ত করেন। তাঁরা প্রতিদিন পাঁচবার করে সুউচ্চ কণ্ঠে তাওহীদের ঘোষণা শোনাতেন এবং সবাইকে কল্যাণ ও সাফল্যের দিকে আহ্বান করতেন।

বেলাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আযান দিলে আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইকামত দিতেন এবং আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আযান দিলে বেলাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইকামত দিতেন।

রমযান মাসে বেলাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ব্যাপার সম্পূর্ণই ভিন্ন হয়ে যেত। মদীনাতে মুসলমানরা বেলাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর আযান শুনে সাহরী খেতেন ও আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর আযান শুনে রোযার নিয়ত করতেন। বেলাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বেশ রাত থাকতে আযান দিয়ে লোকদের জাগাতেন, কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আযানের জন্য ফজর পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন, এতে তিনি ভুল করতেন না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে অসম্ভব সম্মান করতেন। নিজের অনুপস্থিতিতে দশ বারের অধিক আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মদীনায় তাঁর খলীফা বা প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছেন। এবং এর মধ্যে অন্যতম ছিল মক্কা বিজয়ের জন্য যাত্রার সময়।

বদর যুদ্ধের পর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর মুজাহিদদের সুউচ্চ মর্যাদার কথা উল্লেখ করে কতিপয় আয়াত নাযিল করেন। ঐ সব আয়াতে জিহাদে অংশ গ্রহণে অক্ষমদের তুলনায় জিহাদে অংশ গ্রহণকারীদের মর্যাদা বর্ণনা করে জিহাদের জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। বিশেষ করে যারা ইচ্ছা বা আলস্য করে জিহাদে অংশ নেয়নি তাদের ওপর জিহাদে অংশ গ্রহণকারীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। এ আয়াত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মনে দাগ কাটে এবং তিনি যে বিরাট একটি মর্যাদার কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, এ কথা ভেবে তাঁর ভীষণ কষ্ট হয়। তাই তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করেন।

'হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমার পক্ষে জিহাদে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হতো, তাহলে অবশ্যই অংশগ্রহণ করতাম।'

তারপর অত্যন্ত বিনীত হৃদয়ে তাঁর ও তাঁর মতো লোকদের সম্পর্কে কুরআনে বিধান নাযিলের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতে থাকেন এই বলে:

'হে আল্লাহ! আমার অক্ষমতা গ্রহণ করে সে সম্পর্কে বিধান নাযিল করো, হে আল্লাহ! আমার অক্ষমতা গ্রহণ করে সে সম্পর্কে বিধান নাযিল করো।'

মহান আল্লাহ কত ত্বরিৎগতিতে তার এই দু'আ কবুল করেছেন, সে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওহী লেখক যায়েদ ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করেছেন:

'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে বসেছিলাম। হঠাৎ তিনি নীরব-নিথর হয়ে পড়লেন। এ সময় আমার উরুর ওপর তার উরুর চাপ পড়ে, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উরুর চেয়ে অধিক ভারী কিছু দেখিনি।'

অতঃপর এ অবস্থা কেটে গেলে তিনি আমাকে বললেন: 'হে যায়েদ লিখ!' আমি লিখলাম : لَا يَسْتَوِى الْقَاعِدُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُجَاهِدُوْنَ فِيْ سَبِيْلِ اللّٰهِ .
যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে এবং যারা জিহাদ না করে বসে থাকে তারা পরস্পর সমান হতে পারে না, তখন আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দাঁড়িয়ে বললেন:

'হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাকাস সালাম! যারা জিহাদে অংশগ্রহণ করতে অক্ষম তাদের ব্যাপারটা কেমন হবে?'

তার কথা শেষ হতে না হতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর আবার নীরবতা ছেয়ে গেল। এবারও তাঁর উরু আমার উরুর ওপর এসে পড়ল। এবারও আমি তেমনি ওজন অনুভব করলাম যেমন প্রথমবার করেছিলাম।

এ অবস্থা দূর হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'যায়েদ কী লিখেছো পড়ে শোনাও।' আমি পাঠ করে শোনালাম : لَا يَسْتَوِى الْقَاعِدُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ .
'মু'মিনদের মধ্যে যারা জিহাদে অংশগ্রহণ করেনি, তারা পরস্পরে সমান হতে পারে না।'

অতঃপর তিনি বললেন, এখানে লেখ: غَيْرُ أُولى الضَّرَرِ.
'যাদের কোনো অসুবিধা রয়েছে, সে সব মুমিনগণ ছাড়া।'

আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী তাদেরকে ব্যতিক্রমী হিসেবে বাদ দিয়ে আয়াত নাযিল হলো। এভাবে মহান আল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর মতো আর যারা জিহাদে অংশগ্রহণ করতে অক্ষম তাদেরকে জিহাদ থেকে অব্যাহতি দিলেন। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর জিহাদে অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা তাঁকে জিহাদে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

তিনি আল্লাহর পথে জিহাদে অংশগ্রহণের দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। কেননা, মহৎ কর্ম ছাড়া মহৎ ব্যক্তিদের হৃদয়মন তৃপ্ত হতে পারে না। সেদিন থেকে তিনি এ মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, কোনো যুদ্ধেই অংশগ্রহণ থেকে তাকে বিরত থাকতে না হয়, যুদ্ধের ময়দানে তিনি কী কাজ করতে চান তাও পূর্বে থেকেই নির্ধারিত করে নিলেন। তিনি বললেন :

'আমাকে মুসলিম বাহিনী ও শত্রুবাহিনীর মাঝে দাঁড় করিয়ে ঝাণ্ডা বহনের দায়িত্ব দাও। আমি তা বহন করব এবং হেফাযত করব। আমি তো অন্ধ, আমি যুদ্ধের ময়দান থেকে পালাতে পারব না।'

১৪ হিজরীতে উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একটি সিদ্ধান্তকর যুদ্ধ করে তাদের পরাজিত এবং মুসলিম বাহিনীর অগ্রাভিযানের পথ উন্মুক্ত করে দিতে চাইলেন। তাই তিনি গভর্নরদের নির্দেশ দিয়ে লিখলেন :

'যেসব লোকের অস্ত্র, ঘোড়া এবং বীরত্ব বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা আছে, তাদের কাউকেই আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিতে বাদ রেখ না। অতি দ্রুত এ কাজ করবে।'

এ আহ্বানের প্রেক্ষিতে মুসলিম জাহানের সর্বত্র থেকে দলে দলে মুসলমানরা মদীনায় এসে সমবেত হতে লাগলেন। এই মুজাহিদ বাহিনীতে আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও যোগ দিলেন। ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ বিরাট বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে নিযুক্ত করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও হেদায়াত দান করে বিদায় জানান। এ বাহিনী কাদেসিয়ায় পৌঁছলে দেখা গেল, আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে লৌহবর্ম পরিধান করে মুসলিম বাহিনীর পতাকা বহন ও তা হেফাযতের জন্য কিংবা শাহাদাত বরণের জন্য নিজেকে সজ্জিত করে ময়দানে হাজির হয়েছেন।

উভয়পক্ষ তিন দিন ধরে প্রচণ্ড যুদ্ধের মাধ্যমে কাদেসিয়া প্রান্তরকে উত্তপ্ত করে রাখে। উভয়পক্ষ এমনভাবে যুদ্ধ করে, যার কোনো নজির যুদ্ধের ইতিহাসে নেই। তৃতীয় দিনে এই যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়। বৃহৎ একটি সাম্রাজ্য ধ্বসে পড়ে এবং অতি মূল্যবান একটি সিংহাসনের পতন ঘটে। এভাবে মূর্তির দেশে ইসলামের পতাকা উড্ডীয়মান হয়। এ বিজয় অর্জিত হয়েছিল শত শত শহীদের জীবনের মূল্যে। আর এসব শহীদদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বিনিময় ছিল অন্যতম।

তিনি রক্তমাখা দেহে মৃত অবস্থায় পড়ে ছিলেন; কিন্তু তখনো তার হাতে জাপটে ধরা ছিল মুসলিম বাহিনীর পতাকা।

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ জীবনী নং- ৫৭৬৪। ২. আত্ তাবাকাতুল কুবরা ৪র্থ খণ্ড, ২০৫ পৃ.। ৩. সিফাতুস সাফওয়া: ১ম খন্ড, ২৩৭ পৃ.। ৪. যাইলুল মযীল-৩৬-৪৭ পৃ.। ৫. হাযাতুস সাহাবা: সূচিপত্র দ্রষ্টব্য। বিঃদ্র: ইবনে উম্মে মাকতুম বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিলেন। মদীনাবাসীরা তাঁকে শুধু আবদুল্লাহ নামেই ডাকতো। ইরাকবাসীরা তাঁকে ওমর নামে ডাকতেন। এবং তাঁর পিতার নাম সর্বসম্মতভাবে কায়েস বিন যায়েদ ছিল।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 মাজযায়াত ইবনে সাওব আস সাদৃসী (রাঃ)

📄 মাজযায়াত ইবনে সাওব আস সাদৃসী (রাঃ)


'মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইতিহাস বিখ্যাত সেই যোদ্ধা, যিনি দেড় বছর স্থায়ী শুধুমাত্র মল্লযুদ্ধেই শতাধিক মুশরিক যোদ্ধাকে হত্যা করেছিলেন। কাজেই যুদ্ধের ময়দানে তাঁর দ্বারা অগণিত শত্রু সৈন্যের নিহত হওয়াতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।' -ঐতিহাসিকদের উক্তি

আল্লাহর রাহে নিবেদিত মুসলিম বীর যোদ্ধাদের অপূর্ব ত্যাগ ও কুরবানীর বিনিময়ে আল্লাহ কাদেসিয়ার যুদ্ধে মুসলমানদের অকল্পনীয় বিজয় দান করেন। এ বিজয়ের আনন্দে মুসলিম বাহিনী যেমন হয় আনন্দিত, যুদ্ধেও হয়েছিল তেমনি রণক্লান্ত। অনেক যোদ্ধার দেহে তখনো যখম দগদগ করছিল। চিকিৎসার অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা। শাহাদাতপ্রাপ্ত সাথীদের কথা স্মরণ করে তাঁদেরও বড়ই লোভ শাহাদাতের গৌরব লাভ করার। কাদেসিয়ার যুদ্ধের মতোই ভয়াবহ আরেকটি যুদ্ধের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন তাঁরা।

পারস্য সম্রাটের সিংহাসনের চির পতন ঘটানোর জন্য আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পক্ষ থেকে কখন নির্দেশ আসে, সে অপেক্ষায়ও আছেন তাঁরা। ধৈর্যের বাঁধ যেন আর আটকিয়ে রাখা যাচ্ছে না, শুধু আমীরুল মুমিনীনের একটা নির্দেশের প্রয়োজন। শাহাদাতের জন্য অপেক্ষমাণ জিহাদের জন্য শাণিত তরবারি সজ্জিত বীর যোদ্ধাদের আর বেশী দিন অপেক্ষা করতে হলো না। অপেক্ষার প্রহর কাটল। মদীনা মুনাওয়ারা থেকে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বিশেষ দূত কুফায় এসে উপস্থিত হলেন। হাতে তাঁর কুফার শাসক আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর উদ্দেশ্যে প্রেরিত খালীফাতুল মুসলিমীনের ফরমান।

নির্দেশ হলো, 'সত্বর যেন তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে বসরা থেকে আগত মুসলিম সৈন্যবাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে পারস্য সেনাপতি হুরমুযানকে সমুচিত শিক্ষা দিতে 'আহওয়াজ' প্রদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন এবং পারস্য সম্রাটের মুকুট ও সাম্রাজ্যের হৃৎপিণ্ড নামে খ্যাত 'তুস্তার' শহর দখল করেন।'

এ নির্দেশনামায় বিশেষভাবে এটাও উল্লেখ করা হয় যে, বনূ বকর গোত্রের অবিসংবাদিত নেতা, খ্যাতনামা অশ্বারোহী, বীর যোদ্ধা 'মাজযাআত ইবনে সাওর আস্ সাদৃসীকে'ও যেন এ অভিযানে সাথে নেওয়া হয়। আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ফরমান অনুযায়ী পারস্য সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিলেন। সাথে সাথে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। মুসলিম বাহিনী দ্রুত সমরসজ্জায় সজ্জিত হলেন। সেনাবাহিনীকে পুনর্বিন্যস্ত করা হলো। আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মাজযাআত ইবনে সাওর আস সাদৃসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সহকারী কমান্ড হিসেবে তৎকালীন যুদ্ধ-কৌশল অনুযায়ী তাঁর বাম পার্শ্বের বাহিনী প্রধান নিযুক্ত করলেন। অতঃপর তিনি ও মাজযাআত ইবনে সাওর আস সাদৃসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বীর মুজাহিদদেরকে সাথে নিয়ে বসরা থেকে আগত বাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে তুস্তার শহরের দিকে রওয়ানা হলেন।

মুসলিম বাহিনী একের পর এক পারস্যের শহর, বন্দর ও নগর বিজয় করতে করতে সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকেন। পারস্য সম্রাটের সেনাপতি ও তার বাহিনী মুসলিম বাহিনীর আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে এক দুর্গ থেকে অন্য দুর্গে পলায়নের পথ ধরে পিছু হটতে থাকে। পরিশেষে তারা প্রতিরক্ষার জন্য দুর্ভেদ্য নগরী তুস্তারে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে।

তুস্তার ছিল শিক্ষা-সংস্কৃতি, কৃষ্টি-সভ্যতা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আবহাওয়া এবং আধুনিকতায় পারস্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নগরী। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দানে সে এক সীসাঢালা প্রাচীরবেষ্টিত শহর এবং পারস্য সম্রাটের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

ভূমি থেকে উঁচুতে অবস্থিত সুদৃশ্য অশ্বাকার সাদৃশ্যের প্রাচীনতম শহর তুস্তারকে খরস্রোত দুজাইল নদী তার সুপেয় পানি দিয়ে সর্বদা সতেজ রেখেছিল। শহরটির সর্বোচ্চ স্থানে প্রাচীন যুগে 'সম্রাট শাহপুর' সিংহসদৃশ এমন একটি ফোয়ারা তৈরি করেন, যেন শহরের তলদেশে সুড়ঙ্গপথে প্রবাহিত দুজাইল নদীর স্রোতধারা সেই ফোয়ারা দিয়ে প্রবাহিত হয়।

তুস্তার নগরীর তলদেশে তৈরি এ সুড়ঙ্গ ঝর্নাপথ, অশ্বাকার সদৃশ শহরটি এবং সিংহসদৃশ ফোয়ারা যেমন ছিল নয়নাভিরাম, তেমনি অনন্য কারুকার্যমণ্ডিত। বৃহদাকার শিলাখণ্ডকে কেটে কেটে তা প্রস্তুত করা হয়েছিল। লৌহ এবং অন্যান্য ধাতব মিশ্রিত মযবুত পিলার দ্বারা স্থিতিশীল করে সুড়ঙ্গ পথকে সীসা দ্বারা প্লাস্টার মুজাইক করে দেওয়া হয়েছিল। সে শহরের চতুষ্পার্শ্বে উঁচু প্রাচীরের বেষ্টনি দ্বারা দুর্ভেদ্যভাবে ঘেরাও করে রাখা হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে:

'পৃথিবীর সর্বপ্রথম ও সর্ববৃহৎ প্রাচীর এটি। এ প্রাচীরের চারপাশে পারস্য সেনাপতি হরমুযান এমন বিরাট খন্দক খনন করে রেখেছিল, যা অতিক্রম করা ছিল যে কোনো আক্রমণকারী বাহিনীর জন্য দুঃসাধ্য ব্যাপার।'

বিভিন্ন এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়ে পারস্য সেনাপতি হরমুযান এর ভিতরে আশ্রয় নেয় এবং খন্দককে রক্ষার জন্য পারস্যের সেরা চৌকস সৈন্যদের পাহারায় নিয়োজিত করে।

সুদক্ষ মুসলিম বাহিনী এর চারপাশে অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ ১৮ মাস এ খন্দককে অবরোধ করে রাখেন। এ অবরোধে পারস্য সৈন্যদের বিরুদ্ধে পরপর ৮০টি যুদ্ধ হয়; কিন্তু সফলতা আসেনি তাতে। যার প্রতিটিই মল্লযুদ্ধ থেকে শুরু করে রক্তাক্ত যুদ্ধে রূপান্তরিত হতে থাকে। মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এসব সংঘর্ষে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হন, যা একই সাথে শত্রু-মিত্র উভয় বাহিনীকেই স্তম্ভিত করে দেয়।

এসব মল্লযুদ্ধে পারস্য সৈন্যদের বাছাইকৃত যুদ্ধবাজ বীর পাহলোয়ানদের শতাধিককে তিনি একাই হত্যা করে ইতিহাস রচনা করেন। যে কারণে পারস্য সৈন্য বাহিনীর প্রতিটি সৈনিকের মনে তাঁর সম্পর্কে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে মুসলিম বাহিনীর মনোবলও বৃদ্ধি পায়। ফলে মুসলিম বাহিনী আরও অধিক ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে।

ইতঃপূর্বে যারা মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে চিনতেন না তারাও বীরত্বের কারণে তাঁকে চিনে ফেলেন এবং সবাই এটা ভালো করে বুঝতে সক্ষম হন যে, কেন আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ যুদ্ধে উপস্থিতির জন্য বিশেষভাবে মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ওপর এতো গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।

৮০টি খণ্ডযুদ্ধের সর্বশেষ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী শত্রুবাহিনীর ওপর মারাত্মক এক ঝটিকা আক্রমণ করে বসে। যে আক্রমণের মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে তারা খন্দকের ওপর তৈরি সেতু ছেড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। তারা শহরের ভিতর প্রবেশ করে দুর্গের ফটক বন্ধ করে দেয়। এবার মুসলিম বাহিনী অধিকতর কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন। এতদিনের বিজয় নৈপুণ্য ও ত্যাগ যেন ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম। পূর্বের চেয়ে এবার তারা আরো অধিক দুর্ভোগের সম্মুখীন হলেন।

শত্রুবাহিনী কেল্লার ওপর থেকে মুসলিম বাহিনীর ওপর অব্যাহতভাবে তীর নিক্ষেপ ও এমনসব লোহার শিকল নিক্ষেপ করতে থাকে যেসব শিকলের মাথায় সংযুক্ত ছিল বঁড়শির মতো কুঁকড়ানো আংটা, যা আগুনে জ্বালিয়ে লাল করে নেওয়া হতো। মুসলিম বাহিনীর প্রাচীর অতিক্রমকারী কোনো সৈনিকের শরীরে তা বিঁধে গেলেই তাঁকে সজোরে ওপরে টেনে তোলা হতো। যাদের টেনে তুলতে পারত না তারা আংটায় বিদ্ধ হয়ে পুড়ে যেতেন এবং শরীরের গোশত গলে নিচে পড়ে শহীদ হয়ে যেতেন।

মুসলিম বাহিনী সীমাহীন এই দুর্ভোগের এক পর্যায়ে আল্লাহর কাছে এ কঠিন অগ্নিপরীক্ষা থেকে নাজাত এবং শত্রুদের ওপর বিজয় লাভের জন্য একাগ্রচিত্তে দু'আ করতে লাগলেন। এদিকে বারবার প্রাচীর ভেদে ব্যর্থ হয়ে মুসলিম সেনাপতি আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তুস্তার নগরীর ঐতিহাসিক প্রাচীর কী করে ভেদ করা যায় সে বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলেন। কিন্তু কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে তিনি বারবার ব্যর্থতার শিকার হতে থাকলেন। এমতাবস্থায় প্রাচীরের ওপর থেকে হঠাৎ একটি তীর তাঁর সামনে এসে পড়ল। তীরটির দিকে তাকিয়ে তিনি দেখতে পেলেন যে, তার সাথে একটি পত্র সংযুক্ত। তাতে লেখা রয়েছে:

'মুসলিমগণ! আপনাদের প্রতি আমি দৃঢ় আস্থা পোষণ করছি। আমি ও আমার পরিবারসহ বাকি সঙ্গী-সাথীদের জান ও মালের নিরাপত্তা আরয করছি। যার বিনিময়ে আপনাদেরকে 'তুস্তার নগরীর' গোপন প্রবেশ পথ দেখিয়ে দিতে চাই।'

আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সাথে সাথে পত্র-প্রেরক তীরন্দাযকে লক্ষ্য করে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে উত্তর সম্বলিত জবাবী তীর নিক্ষেপ করলেন।

পারস্যবাসীরা মুসলমানদের সত্যবাদিতা, প্রতিশ্রুতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং ওয়াদা ভঙ্গ না করা সম্পর্কে পূর্ব থেকেই ওয়াকিবহাল ছিল। এ জন্য সে আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর জবাবে মোটেই সন্দেহ পোষণ করল না।

রাতের অন্ধকারে হামাগুড়ি দিয়ে সে মুসলিম বাহিনীর প্রহরীদের কাছে উপস্থিত হলো এবং সেনাপতি আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে দেখা করে নিম্নোক্ত বক্তব্য তুলে ধরল :

'আমরা আমাদের সম্প্রদায়ের সম্মানিত ও শ্রদ্ধাভাজন নেতৃবর্গ। হরমুযান আমার বড় ভাইকে হত্যা করেছে। তার পরিবার-পরিজনের ওপর চরম নির্যাতন চালিয়েছে এবং আমার ব্যাপারেও তার অন্তরে বিদ্বেষের আগুন জ্বলছে। এমনকি তার হাতে আমার ও আমার সন্তানদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। সে জন্য তার নির্যাতন ও যুলুমের ওপর আপনার ন্যায়নীতি ও ইনসাফকে প্রাধান্য দিচ্ছি। যেমন প্রাধান্য দিচ্ছি তার বিশ্বাসঘাতকতার ওপর আপনার প্রতিশ্রুতিকে। সে কারণেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমি তুস্তার নগরীতে প্রবেশের গোপন পথ আপনাদের দেখিয়ে দেব, যে পথ দিয়ে আপনারা ভিতরে প্রবেশ করতে পারবেন। অতএব আপনি খুবই বিচক্ষণ, সাহসী এবং সাঁতারে পটু এমন এক ব্যক্তিকে সঙ্গে দিন, যাকে আমি সেই গোপন পথটি দেখিয়ে দিতে পারি।'

একথা শুনে আবূ মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মাজযাআত ইবনে সাওর আস সাদৃসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ডেকে নিয়ে চুপি চুপি বিস্তারিত বর্ণনা করলেন:

'এখন তোমার গোত্র থেকে চতুর, সাহসী এবং সাঁতারে পটু এমন একজনকে বেছে দাও।'

মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'হে আমীরুল মুজাহিদীন! অন্য কাউকে না খুঁজে আপনি আমাকেই এ কাজে নিযুক্ত করতে পারেন।'

আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জবাব দিলেন:
'তুমি যদি স্বেচ্ছায় যেতে চাও, তাহলে আল্লাহর ফযলে খুবই ভালো হয়।'

অতঃপর তিনি মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে পরামর্শ দিলেন:
'রাস্তা ভালো করে চিনে নিতে হবে। প্রবেশদ্বার ও হরমুযানের অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত হতে হবে। তার জনশক্তি সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং এ সংবাদ কাউকে বলা যাবে না।'

অতঃপর রাতের অন্ধকারে মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইরানী পথ-প্রদর্শকের সাথে রওয়ানা হলেন। তুস্তার নগরী ও দুজাইল নদীর মাঝখানে বিদ্যমান খন্দক দিয়ে তারা প্রবেশ করলেন একটি সুড়ঙ্গে। খরস্রোত এ সুড়ঙ্গপথের অবস্থা ছিল বড়ই বন্ধুর ও বিপজ্জনক। হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ পথ এমন গভীর হতো যে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর দিয়ে সাঁতরিয়ে চলতে হতো। আবার হঠাৎ এমন সরু হয়ে আসতো যে, হামাগুড়ি দিয়ে এগুতে হতো। কখনো পথটি প্রশস্ত নদীতে পরিণত হতো। কখনো তা আঁকাবাঁকা হয়ে যেত, আবার দেখতে না দেখতেই পুনরায় সোজাসুজি রূপ নিত। এভাবে চলতে চলতে পরিশেষে তারা তুস্তার নগরীর প্রবেশদ্বারের কাছে উপনীত হলেন।

এ গোপন অভিযানে মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পথ প্রদর্শনকারীর বড় ভাইয়ের হত্যাকারী পারস্য সেনাপতি হরমুযান এবং তার অবস্থানস্থল ভালো করে দেখে নিলেন। প্রথম বার হরমুযানকে দেখা মাত্রই মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে বিষাক্ত তীরবিদ্ধ করে হত্যার মনস্থ করলেন; কিন্তু সে মুহূর্তে তাঁর সেনাপতি আবু মূসা আল আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পরামর্শের কথা স্মরণ হলো। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন:

'একথা যেন প্রকাশ না পায় এবং অভিযান যাতে গোড়াতেই বিফল না হয়।'

তাই তিনি অতিকষ্টে নিজেকে সংবরণ করে নিলেন এবং সমস্ত খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহের পর সুবহে সাদিকের পূর্ব মুহূর্তে সেই বিপজ্জনক সুড়ঙ্গপথে যথাস্থানে ফিরে এলেন।

আবূ মূসা আল্ আশ'আরী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসলিম বাহিনী থেকে বেছে বেছে সাহসী, বীর, বিপদ-মুসীবতে ধৈর্যশীল ও সাঁতারে পারদর্শী ৩০০ যোদ্ধাকে এ সুড়ঙ্গপথে অভিযান চালানোর জন্য মনোনীত করলেন এবং মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে এই কমান্ডো বাহিনীর 'আমীরুল জিহাদ' নিযুক্ত করলেন। তিনি নিজে তাঁদের সাথে কিছুদূর অগ্রসর হলেন ও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশাবলি দেওয়ার পর বিদায় দিলেন এবং 'আল্লাহু আকবার'কে শত্রুবাহিনীর ওপর আক্রমণের 'পাসওয়ার্ড' বা গোপন সংকেতশব্দ নির্ধারণ করে দিলেন।

মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনীর সদস্যদের নিজ কাপড়-চোপড় আঁটসাঁট করে নেওয়ার নির্দেশ দিলেন যেন সুড়ঙ্গপথের পানিতে সাঁতরাতে তাঁদের কোনো অসুবিধা না হয়। সৈন্যদের তরবারি ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র সঙ্গে নিতেও নিষেধ করে দিলেন এবং তরবারিকে দেহের সাথে এমনভাবে বেঁধে নিতে বললেন যেন সহজে খুলে না যায়। অতঃপর তিনি তাঁর বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে রাত গভীর হওয়ার পূর্বেই সুড়ঙ্গপথের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।

এই ভয়াবহ সুড়ঙ্গপথে মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর দুঃসাহসী বীর কমান্ডো বাহিনীকে নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা পথ চললেন। কখনো বা তারা এ দুর্গম পথের খরস্রোতকে উপেক্ষা করে বিজয়ী বেশে সামনে অগ্রসর হতেন। আবার কখনো বা নাকে-মুখে পানি ঢোকার কারণে তীব্র খরস্রোতের কাছে পরাভূত হতেন।

এভাবে পথ চলতে চলতে মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তুস্তার নগরীর প্রবেশদ্বারে এসে উপস্থিত হলেন। এখানে পৌছে দেখতে পেলেন যে, তাঁর ৩০০ জন সাথী যোদ্ধাদের ২২০ জনই এ সুড়ঙ্গপথে খরস্রোতের শিকার হয়ে শাহাদাত বরণ করেছেন এবং তাঁর সাথে জীবিত রয়েছেন মাত্র ৮০ জন।

তিমিরাচ্ছন্ন ভয়াবহ এ সুড়ঙ্গপথে যে ৮০ জন ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত সাথী জীবিত ছিলেন, তাঁদের নিয়েই তিনি তুস্তার নগরীর ভিতরে প্রবেশ করার সাথে সাথে তরবারি উন্মুক্ত করে মুহূর্তের মধ্যেই অসতর্ক প্রহরীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাদের তীক্ষ্ণধার তরবারির আঘাত বিদ্যুৎবেগে প্রহরীদের দ্বিখণ্ডিত করে চলল। মুহূর্তের মধ্যেই প্রহরীদের নিরাপত্তা ব্যূহ ভেদ করে তারা তুস্তার নরগীতে প্রবেশের সবক'টি ফটক খুলে দিতে সক্ষম হলেন। মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাহিনী ভিতর থেকে এবং মুসলিম বাহিনী দুর্গের বাইর থেকে এক সঙ্গে 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি দিয়ে তুস্তার নরগীকে কাঁপিয়ে তুললেন।

ফজরের পূর্ব মুহূর্তে মুসলিম বাহিনী বাঁধভাঙা স্রোতের ন্যায় তুস্তার নগরীতে প্রবেশ করল। প্রচণ্ড সংঘর্ষ বেধে গেল। সে কি ভয়াবহ সংঘর্ষ। যেমন ভীতিকর, তেমনি রক্তক্ষয়ী। ইতিহাস এমন সংঘর্ষ খুব কমই প্রত্যক্ষ করেছে।

এ ভয়াবহ যুদ্ধের এক চরম পর্যায়ে মাজযাআত ইবনে সাওর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দৃষ্টি পড়ল পারস্য সেনাপতি হরমুযানের ওপর। তিনি দেখতে পেলেন যে, সে এক উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে সৈন্য পরিচালনা করছে। কালবিলম্ব না করে তিনি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তরবারির আঘাত হানা মাত্রই উভয় বাহিনীর ভিড়ের এক ফাঁকে অল্পের জন্য হুরমুযান বেঁচে গিয়ে সহযোদ্ধাদের মধ্যে আত্মগোপন করে ফেলল। যুদ্ধের এক ফাঁকে সে আবার মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দৃষ্টিতে পড়ে গেল। তাকে দেখামাত্রই মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবারও হরmuযানের ওপর আক্রমণ চালালেন। এবার মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও হুরমুযানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ বেধে গেল। একে অপরকে বীরবিক্রমে আঘাতের পর আঘাত হেনে চললেন। তাদের পরস্পরের যেমন আক্রমণ-ভঙ্গি, তেমনি প্রতিহত-কৌশল। আঘাতের পর আঘাতের এক পর্যায়ে মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তরবারি পিছলে গেলে হরমুযানের তরবারি আঘাত করল বীর সেনাপতি মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে। যে আঘাতে তিনি ভূতলে লুটিয়ে পড়লেন। শাহাদাতের এ মুহূর্তে তাঁরই নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর এ বিজয় স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে করতে যুদ্ধের ময়দানেই তিনি চির বিদায় গ্রহণ করলেন।

বিজয়ের এই শুভ মুহূর্তে সেনাপতির শাহাদাত মুহূর্তের জন্যও মুসলিম বাহিনীকে দ্বিধাগ্রস্ত করল না। বীরবিক্রম এ আক্রমণকে তারা আরো বেগবান করে তুললেন। দেখতে না দেখতেই পারস্য সেনাপতি হরমুযান মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হলো ও মুসলিম বাহিনীকে আল্লাহ চূড়ান্ত বিজয় দান করলেন।

অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বিজয়ের সুসংবাদ জানানোর জন্য দ্রুতগামী সংবাদ বাহককে মদীনা মুনাওয়ারা প্রেরণ করা হলো। চৌকস মুজাহিদ বাহিনীর মাধ্যমে বন্দী পারস্য সেনাপতিকে মদীনা মুনাওয়ারায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলো। সামনে সামনে চলতে থাকল বন্দী পারস্য সেনাপতি হরমুযান। তার মাথায় ছিল হীরা-মণি-মুক্তাখচিত মুকুট ও তার কাঁধে শোভা পাচ্ছিল স্বর্ণের তৈরি ব্যাজ ও পদকসমূহ, যেন খালীফাতুল মুসলিমীন তা প্রত্যক্ষ করতে পারেন।

খালীফাতুল মুসলিমীনের দরবারে পারস্য বিজয় এবং হরমুযানকে বন্দী করার এ আনন্দ সংবাদের সাথে সাথে তারা মাজযাআত রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মতো বীর অশ্বারোহী যোদ্ধার শাহাদাতের শোক-সংবাদও বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

টিকাঃ
১. তারীখুল উমাম ওয়াল মুলুক: আতাবারী ৪র্থ খণ্ড, ২১৬ পৃ.। ২. তারীখ খলীফা বিন খায়‍্যাত: ১ম খণ্ড, ১১৭ পৃ.। ৩. তারীখুল ইসলাম লিয্যাহাবী: ২য় খণ্ড, ৩০ পৃ.। ৪. মু'জামুল বুলদান লিল ইয়াকুত: মাদ্দা তাসতুর। ৫. আল ইসাবাহ : ৭৭৩ নং জীবনী। ৬ উসুদুল গাবা : ৪র্থ খণ্ড, ৩০ পৃ.।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00