📄 ইকরামা ইবনে আবী জাহল (রাঃ)
'কিছুক্ষণের মধ্যে ইকরামা মুমিন ও মুহাজির হিসেবে আগমন করবে, তোমরা তার পিতাকে গালি দেবে না। কারণ, মৃতকে গালি দিলে তা মৃতদের কাছে পৌছে না; কিন্তু জীবিতরা তাতে কষ্ট পায়।' 'স্বাগতম হে অশ্বারোহী মুহাজির, স্বাগতম'। - নবী করীম (সা)-এর স্বাগত বাণী
ইকরামার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে শেষ দিকের ঘটনাসমূহের অন্যতম। রহমতের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীনে হক ও হেদায়াতের দাওয়াত প্রকাশ্যে শুরু করেন, তখন ইকরামা ইবনে আবী জাহলের বয়স ত্রিশের কোঠায়। তখন ইকরামা ছিল কুরাইশদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদার অধিকারী, সবচেয়ে সম্পদশালী এবং বংশগতভাবে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত।
যদি তাঁর পিতার প্রতিবন্ধকতা না থাকত, তাহলে এটাই স্বাভাবিক ছিল যে, তার সমকক্ষ অন্যান্য সম্ভ্রান্ত পরিবারের সমকক্ষ ব্যক্তিবর্গ যেমন সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, মুস'আব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু প্রমুখের মতো সেও ইসলাম গ্রহণ করত।
প্রিয় পাঠক! কে তার এই পিতা? শিরক সম্রাট, মক্কার সবচেয়ে ক্ষমতাধর, ভয়াবহ নিপীড়নকারী যে তার কঠোর কঠিন ও ভয়ঙ্কর নির্যাতনের দ্বারা মুমিনদের ঈমানের পরীক্ষায় ফেলেছিল এবং মুমিনরাও এ পরীক্ষায় ছিলেন অবিচল। সে নানা চক্রান্তের মাধ্যমে মুমিনদের ঈমানকে চ্যালেঞ্জ করে চললে মুমিনরাও তাদের ঈমানের দৃঢ়তা ও শক্তি বার বার প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন। যার এতটুকু পরিচয়ই যথেষ্ট যে সে ছিল 'আবী জাহল।'
আর তার ছেলেই ইকরামা ইবনে আবী জাহল আল মাখযুমী। কুরাইশ বংশের হাতেগোনা কয়েকজন বীরপুরুষের অন্যতম। সুদক্ষ ঘোড়সওয়ার এবং বীর যোদ্ধা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধাচরণ ও শত্রুতামূলক আচরণের শিক্ষা সে তাঁর শিক্ষাদাতা পিতা আবী জাহলের কাছ থেকেই লাভ করেছিল। সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরম বিরোধিতায় লিপ্ত হয় এবং তাঁর সাহাবীদের ভীষণ কষ্ট দেয়। তার পিতা আবী জাহলকে সন্তুষ্ট করার জন্য মুসলমানদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানোই ছিল তার একমাত্র চিন্তা ও কাজ।
বদর যুদ্ধে তার পিতা আবী জাহল কুরাইশদের নেতৃত্ব দেয় এবং 'লাত' ও 'উয্যা' নামক মূর্তির নামে এই মর্মে শপথ করে: 'মুহাম্মদকে পরাস্ত না করে সে মক্কায় ফিরে আসবে না।'
তারপর সৈন্য-সামন্ত নিয়ে সে বদর প্রান্তরে উপস্থিত হয় এবং তিন দিন পর্যন্ত মুসলিম বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। সে অবস্থায় উট জবাই, মদ্যপান এবং নর্তকীদের নৃত্য উপভোগে নিমগ্ন থাকে।
বদর যুদ্ধে আবী জাহল মুশরিক কুরাইশদের নেতৃত্ব দান করে। তার পুত্র বীর যোদ্ধা ইকরামা ছিল তার শক্তিশালী বাহু, যার ওপর সে নির্ভর করত। 'লাত' ও 'উয্যা' আবী জাহলের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। কারণ, শোনার ক্ষমতাই তো তাদের নেই, ফলে তারা তাদেরকে সাহায্যও করতে পারেনি। তারা ছিল নিতান্তই অসহায় ও অক্ষম।
বদর যুদ্ধে আবী জাহল নিহত হলো এবং তার পুত্র ইকরামা তা নিজ চোখেই দেখল। মুসলিমদের বর্শা তার রক্ত বইয়ে দিল। পিতা আবী জাহলের শেষ আর্তনাদও পুত্র ইকরামা নিজ কানে ভালো করেই শুনেছিল।
যুদ্ধ শেষে ইকরামা কুরাইশ নেতা আবী জাহলের লাশ ফেলে রেখেই মক্কায় ফিরে আসতে বাধ্য হলো। যুদ্ধের পরাজয় আবী জাহলের লাশ মক্কায় এনে দাফন করতে তাকে অক্ষম করে দিয়েছিল। মুসলিম বাহিনীর কাছে পরাস্ত হওয়ায় পিতার লাশের সৎকাজের আশা পূরণ তো হলোই না; বরং লাশ রেখেই তাকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। বিজয়ী মুসলিম বাহিনী অগণিত লাশের সাথে আবী জাহলের লাশও 'কুলাইব' নামক একটি পরিত্যক্ত কূপে নিক্ষেপ করে মাটি চাপা দেয়।
বদর যুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে ইকরামার শত্রুতা ভিন্নরূপ পরিগ্রহ করল। প্রথম প্রথম সে পিতার মর্যাদা রক্ষা ও তাকে খুশি রাখার জন্য ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করছিল; কিন্তু তখন থেকে সে তার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ শুরু করে দিল।
ইকরামা এবং তার মতো আরো কয়েকজন যারা বদরের প্রান্তরে তাদের আত্মীয়-স্বজনের লাশ ফেলে আসতে বাধ্য হয়েছিল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে মক্কার মুশরিকদের হৃদয়-মনে নতুনভাবে শত্রুতার বহ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত করে, স্বজনহারা কুরাইশদের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। ফলস্বরূপ সংঘটিত হয় ওহুদ যুদ্ধ।
ইকরামা ওহুদ রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়লে তার সাথে তার স্ত্রী উম্মু হাকিমও যুদ্ধে অংশ নিল। যাদের নিকটাত্মীয় বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছিল তাদের স্ত্রীরাও যুদ্ধসারির পিছনে থেকে দফ বাজিয়ে ও শোকগাথা মরসিয়া গেয়ে গেয়ে অশ্বারোহী সৈন্যদের যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে, যেন তারা পশ্চাৎপসরণ না করে।
কুরাইশ বাহিনীর ব্যূহের ডানে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ এবং বামে ইকরামা ইবনে আবী জাহল অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়। এই দুই বীর যোদ্ধৃদ্বয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এবং তাঁর সাহাবীদের জন্য এক মহা পরীক্ষার অবতারণা করেন এবং যুদ্ধে মুশরিকদের জন্য অতীব মূল্যবান ভূমিকা পালন করে। আবূ সুফিয়ানের ভাষায় তা ছিল 'বদরের প্রতিশোধ'।
খন্দকের যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনী দীর্ঘদিন পর্যন্ত মদীনা অবরোধ করে রাখতে বাধ্য হওয়ায় ইকরামা ইবনে আবী জাহলের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়ে। সে কোনোভাবেই নিজেকে ধরে রাখতে পারছিল না। সে খন্দকের একটি সংকীর্ণ স্থানের সন্ধান পেয়ে সে স্থান দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল, দেখতে না দেখতেই তার জানবাজদের কয়েকজন তার পিছনে পিছনে ছুটে আসে।
পরিণতিতে আমর ইবনে আবদ উদ্দ আল আমেরী নামক চৌকশ মুসলিম প্রহরীর হাতে মুহূর্তের মধ্যে ধরাশায়ী হয় এবং ইকরামা কোনো রকমে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
মক্কা বিজয়ের দিন কুরাইশরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীদের মোকাবেলা করার সাহস না পেয়ে মক্কার প্রবেশ পথ উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের এটাও একটা কারণ ছিল যে, তারা দেখেছে কেউ আক্রমণ না করলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সেনাধ্যক্ষদের যুদ্ধ না করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু ইকরামা ইবনে আবী জাহল এবং কুরাইশদের আরো কিছু লোক এহেন শুভ সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে বিরাট মুসলিম বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছোট একটি সংঘর্ষেই তাদের পরাস্ত করেন। তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক নিহত হয় এবং বাকিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
এবার ইকরামা বিস্মিত ও অনুতপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মুসলমান কর্তৃক মক্কা বিজিত হওয়ার পর সেখানে তার জন্য আশ্রয়ের স্থান থাকে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন; কিন্তু কয়েকজন গুরুতর অপরাধী সম্বন্ধে বলেন:
'তাদেরকে খানায়ে কাবার গিলাফের ভেতরে পাওয়া গেলেও যেন হত্যা করা হয়।'
ইকরামা ইবনে আবী জাহল ছিল সেই গুটিকয়েক অপরাধী লোকের অন্যতম। তাই সে মক্কা ত্যাগ করে ইয়ামেনের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আর পালানোর জন্য ইয়ামেন ছাড়া তার দ্বিতীয় কোনো আশ্রয়স্থলও ছিল না।
এদিকে ইকরামা ইবনে আবী জাহলের স্ত্রী উম্মু হাকিম, আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা অন্য আরো দশজন মহিলার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে তাঁর হাতে বাইআত গ্রহণের জন্য উপস্থিত হয়।
এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তাঁর দুই স্ত্রী, ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এবং বনু আবদুল মুত্তালিব গোত্রের কয়েকজন মহিলা উপস্থিত ছিলেন। আবূ সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা মুখমণ্ডল আবৃত অবস্থায় আলাপের সূত্রপাত করে বলে:
'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তাআলা তাঁর পছন্দনীয় দীনকে বিজয় দিয়েছেন। এজন্য আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া। আপনার সাথে আমাদের যে রক্তের সম্পর্ক, সে সম্পর্কের কারণেই আশা করি আপনি আমাদের প্রতি দয়া করবেন, যেহেতু আমরা সবাই ঈমানদার নারী।'
এ বলে সে বোরকার নিকাব সরিয়ে বলল:
'হে আল্লাহর রাসূল! আমি হিন্দ বিনতে উতবা।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সুস্বাগতম জানিয়ে বললেন:
'মারহাবা! তোমাকে স্বাগতম!'
অতঃপর হিন্দ বিনতে উতবা বলেন:
'হে আল্লাহর রাসূল! আজ আপনার ঘরের চেয়ে আর প্রিয় কোনো ঘর আমার নেই, অথচ এই ঘরই একদিন আমার নিকট সবচেয়ে ঘৃণার ছিল।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন:
'আরো কি কেউ কিছু বলতে চাও?'
এ সুযোগে ইকরামার স্ত্রী উম্মু হাকিম ওঠে দাঁড়ায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে বলে:
'হে আল্লাহর রাসূল! ইকরামা প্রাণভয়ে ইয়ামেনের দিকে পালিয়ে গেছে। অনুগ্রহ করে তাকে ক্ষমা করে নিরাপত্তা দিন। আল্লাহ আপনাকেও নিরাপত্তা দেবেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তাকে নিরাপত্তা দান করা হলো।'
নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে ইকরামার স্ত্রী উম্মু হাকিম সে মুহূর্তেই তাঁর স্বামীর সন্ধানে বের হয়ে পড়েন। তাঁর সাথে ছিল তাঁর রোমান ক্রীতদাস। ইয়ামেনের পথে অনেক দূর অগ্রসর হওয়ার পর ক্রীতদাসটি তাঁকে অসৎ কর্মের জন্য ফুসলাতে থাকে এবং তিনি টালবাহানার মাধ্যমেই কালক্ষেপণ করতে থাকেন।
অবশেষে, তারা এক আরব গোত্রে গিয়ে পৌঁছলে তিনি তাদের কাছে সাহায্য চান। তারা ক্রীতদাসকে বেঁধে রাখে এবং তিনি তাকে তাদের কাছে রেখে একাই ইয়ামেনের পথে অগ্রসর হতে থাকেন। অবশেষে তিনি ইকরামাকে 'তিহামা' এলাকার সমুদ্র তীরে খুঁজে পান। সে মুহূর্তে ইকরামা নৌকার মাঝির সাথে তর্কে লিপ্ত ছিল। মাঝি তাকে বলছিল:
'পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত আমি তোমাকে পার করব না।'
ইকরামা বলছিল: 'কিভাবে পবিত্র হব?'
মাঝি বলল: 'কালেমা শাহাদাত পড়ে পবিত্র হও।'
বল: 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।'
ইকরামা উত্তর দিল: 'এ কালেমার সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্যই তো আমি পালিয়েছি।'
বাদানুবাদের এক পর্যায়ে উম্মু হাকিম ইকরামার সামনে গিয়ে বললেন: 'ইকরামা! সবচেয়ে মহান, নিষ্পাপ এবং উত্তম ব্যক্তির নিকট থেকে আমি তোমার কাছে এসেছি। অর্থাৎ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর নিকট থেকে। তাঁর কাছে তোমার জন্য নিরাপত্তা চেয়েছিলাম। তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। অতএব নিজেকে আর ধ্বংসের পথে ঠেলে দিও না।'
ইকরামা বলল: 'তুমি কি তার সাথে কথা বলেছ?'
তার স্ত্রী বললেন: 'হ্যাঁ, আমি নিজেই তাঁর সাথে কথা বলেছি এবং তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দান করেছেন।'
উম্মু হাকিম তাকে নানাভাবে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছিলেন। পরিশেষে, ইকরামা ফিরে যেতে রাজি হলো। অতঃপর উম্মু হাকিম তাকে তাদের রোমান ক্রীতদাসের আচরণ সম্পর্কে অবহিত করলে সে ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সেখানে এসে তাকে হত্যা করল।
পথে তাঁরা এক স্থানে রাত যাপনকালে ইকরামা তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করলে তিনি কঠোরভাবে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে বললেন:
'তা হতে পারে না। কারণ আমি মুসলমান আর তুমি মুশরিক।'
স্ত্রীর উত্তরে ইকরামা খুবই আশ্চর্যান্বিত হয়ে যায় এবং বলে:
'যে জিনিসটি তোমার ও আমার মিলনে বাধা হতে পারে তা নিঃসন্দেহে খুবই বড় ব্যাপার।'
ইকরামা মক্কার নিকটে এসে পৌঁছতেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের বললেন:
'কিছুক্ষণের মধ্যেই ইকরামা ইবনে আবী জাহল মুমিন ও মুহাজির হিসেবে তোমাদের মধ্যে উপস্থিত হচ্ছে। তোমরা তার পিতাকে মন্দ বলো না বা গালি দিও না। কেননা মৃত ব্যক্তিকে গালি দিলে জীবিতরা কষ্ট পায়, অথচ মৃতব্যক্তি তা শুনতে পায় না।'
দেখতে না দেখতেই ইকরামা এবং তার স্ত্রী উম্মু হাকিম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে বসেছিলেন, সেখানে এসে হাজির হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে দেখেই আনন্দে গায়ে চাদরহীন অবস্থায় ওঠে তাদেরকে স্বাগতম জানান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসলে ইকরামাও তাঁর সামনে বসে পড়ে, এবং বলে যে:
'হে আল্লাহর রাসূল! উম্মু হাকিম আমাকে জানিয়েছে যে, আপনি আমাকে নিরাপত্তা দান করেছেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দেন: 'হ্যাঁ সে ঠিকই বলেছে। তুমি এখন নিরাপদ।'
ইকরামা বলল: 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে কিসের দিকে আহ্বান করছেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'আমি তোমাকে আহ্বান করছি এই সাক্ষ্য দিতে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁরই রাসূল, নামায কায়েম করতে এবং যাকাত দিতে।'
এভাবে তিনি ইসলামের সমস্ত রুকনগুলো এক এক করে উল্লেখ করলেন।
ইকরামা বলল: 'আল্লাহর শপথ! আপনি ন্যায় ও সত্য ছাড়া আর কিছুর আহবান জানাননি এবং ভালো কাজ ছাড়া অন্য কিছুর নির্দেশও দেননি।'
সে আরো বলল: 'ইসলামের দিকে আহবান করার আগেও আপনি একজন সত্যবাদী ও অত্যন্ত নেক লোক ছিলেন।'
অতঃপর ইকরামা বলল: 'আমি বলতে পারি, এরূপ সর্বোত্তম কথা আপনি আমাকে শিখিয়ে দিন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'তুমি বল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দাহ ও রাসূল।'
ইকরামা বলল: 'অতঃপর কী?'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : 'তুমি বল, আমি আল্লাহকে এবং তারপর উপস্থিত সবাইকে সাক্ষী রেখে ঘোষণা করছি যে, আমি মুসলিম মুজাহিদ ও মুহাজির।'
ইকরামা অনুরূপ ঘোষণাই দিলেন। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন: 'আজ তুমি চাইলে, আমি অন্যদেরকে যা দিয়েছি, তোমাকেও তার চেয়ে কম দেব না।'
তখন ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'জীবনে আপনার সাথে যে দুশমনি করেছি কিংবা আপনার বিরুদ্ধে যত যুদ্ধ-বিগ্রহে অংশ গ্রহণ করেছি এবং আপনার সাক্ষাতে বা অনুপস্থিতিতে যত কটুবাক্য বলেছি বা কুৎসা রটিয়েছি তার জন্য আল্লাহর কাছে আমার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করুন।'
তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য আল্লাহর দরবারে ইসতিগফার করে বলতে লাগলেন:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ كُلَّ عَدَاوَةٍ عادانِيهَا ، وَكُلَّ مَسِيرٍ سَارَ فِيهِ إِلَى مَوْضِع يريد به إطفاء نورِكَ، وَاغْفِرْ لَهُ ما نالَ مِنْ عِرْضِي فِي وَجْهِي أَوْ أَنَا غَائِبٌ عَنْهُ .
'হে আল্লাহ! ইকরামা আমার সাথে যত দুশমনী করেছে তা ক্ষমা করে দাও! তোমার দ্বীনের আলো নিভিয়ে দেয়ার জন্য যত চেষ্টা সাধনা করেছে, তা মাফ করে দাও। আমাকে যত গালমন্দ ও গীবত করেছে, তাও তাকে ক্ষমা করে দাও।'
তাঁর জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু'আ ও ইসতিগফার শুনে ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর চেহারা হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠল, তার অন্তর খুশিতে ভরে গেল। তিনি দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন:
'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর শপথ, এতদিন আল্লাহর দীনের প্রতিবন্ধকতায় যত ধন-সম্পদ ব্যয় করেছি, এখন থেকে তাঁর দীনের প্রচার ও প্রসারে তার দ্বিগুণ খরচ করবো। দীনের বিজয়কে ঠেকানোর জন্য যত যুদ্ধ করেছি, এখন থেকে দীনের বিজয়ের জন্য তার চেয়ে দ্বিগুণ জিহাদ করবো।'
এক সময়ের শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী বীর, ঐদিন থেকে আল্লাহর পথে আহ্বানকারী হিসেবে দাওয়াতে দীনের কাফেলায় শরীক হলেন। সার্বক্ষণিক ইবাদত-বন্দেগী এবং মসজিদে কুরআন তিলাওয়াতে নিরন্তর মশগুল থাকতে শুরু করলেন। মুখমণ্ডলে কুরআন শরীফ চেপে ধরে চুম্বন দিতেন এবং আল্লাহর ভয়ে কেঁদে কেঁদে বলতেন:
'আমার প্রভুর কিতাব, আমার প্রভুর বাণী...।'
ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কৃত ওয়াদা হুবহু পালন করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ইসলামের সমস্ত জিহাদে অংশগ্রহণ করেন। এমন কোনো দাওয়াতী কাফেলা প্রেরণ করা হতো না, যে কাফেলার অগ্রভাগে তিনি থাকতেন না।
ইয়ারমুকের যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনীর ওপর যখন শত্রুপক্ষের প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছিল, কালবিলম্ব না করে তিনি দ্রুতগামী ঘোড়া থেকে নেমে নিজ তলোয়ারের কোষ ভেঙে ফেলেন, জীবনে যেন কোনোদিন আর তলোয়ার কোষে আবদ্ধ করতে না হয়। তারপর রোমান সৈন্যদের ব্যূহ ভেদ করে বহুদূর পর্যন্ত অগ্রসর হন। তা দেখে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দ্রুতগতিতে তাঁর নিকটে গিয়ে তাঁকে বলেন:
'এভাবে ভেতরে ঢুকবেন না। কেননা আপনার নিহত হওয়া মুসলমানদের জন্য ভীষণ ক্ষতির কারণ হবে।'
ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জবাব দিলেন:
'হে খালিদ! আমাকে ছেড়ে দিন, আপনি আমার পূর্বেই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান এনেছেন। কিন্তু আমি ও আমার পিতা আবী জাহল তখন ইসলামের ঘোর দুশমন ছিলাম। অতএব আমাকে ছেড়ে দিন। আমাকে আমার অতীত কৃতকর্মের কাফফারা আদায় করতে দিন।'
অতঃপর তিনি আবার বলে উঠেন:
'আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে বহু যুদ্ধ করেছি। আর আজ রোমান সৈন্যদের ভয়ে পালাব! তা কক্ষনো হতে পারে না।'
অতঃপর তিনি মুসলিম সৈন্যদের আহ্বান করে বললেন:
'তোমাদের মধ্যে কে মৃত্যুর জন্য আমার হাতে হাত দিয়ে শপথ করতে রাজি আছ? এতে চার শত সৈনিক তার হাতে হাত দিয়ে শপথ করে। তাদের মধ্যে ছিলেন তার চাচা হারিস ইবনে হিশাম এবং দিরার ইবনুল আযওয়ার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা। তাঁর আহ্বানে তারা মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর চারপাশে থেকে তার প্রতিরক্ষার জন্য যুদ্ধ করতে থাকেন এবং তাঁকে ভালোভাবেই রক্ষা করে চলেন।'
ইয়ারমুকের এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধশেষে মুসলমান বাহিনীর বিজয় লাভের পর দেখা গেল, তিনজন মুসলমান বীর যোদ্ধা শুক্র বাহিনীর হাতে ভীষণভাবে আহত হয়ে পড়ে ছটফট করছেন।
তাঁরা হলেন:
১. হারিস ইবনে হিশাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, ২. আইয়াশ ইবনে আবী রাবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং ৩. ইকরামা ইবনে আবী জাহল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।
হারিস ইবনে হিশাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অন্তিম সময়ে পানি পানি বলে চিৎকার করছিলেন। যখন দৌড়ে তাঁর কাছে পানি পৌঁছানো হলো, তখন তিনি দেখতে পেলেন যে, তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ইকরামা ইবনে আবী জাহল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেদিকে তাকাচ্ছেন, তা দেখে হারিস ইবনে হিশাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আমার আগে ইকরামাকে পানি পান করাও।'
দৌড়ে যখন ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে পানি আনা হলো তখন ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও দেখতে পেলেন যে আইয়াশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তার দিকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় তাকাচ্ছেন। ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আগে আইয়াশকে পানি পান করাও।'
আইয়াশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে পানি আনা হলে দেখতে পেলেন, আইয়াশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন।
অতঃপর ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট পানি আনা হলে দেখা গেল, তিনিও আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন।
তাঁর কাছ থেকে হারিস ইবনে হিশাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে পানি আনা হলে দেখা গেল, আল্লাহ তাঁকেও নিজের কাছে নিয়ে গিয়েছেন।
জীবনের অন্তিম মুহূর্তে নিজের চেয়ে অপর দীনি ভাইকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে আল্লাহ তাঁদের ওপর সন্তুষ্ট হোন এবং তাদের সবাইকে হাউজে কাওসার থেকে পানি পান করান। তাঁরা যেন আর তৃষ্ণার্ত না থাকেন। হে আল্লাহ, বিশেষ করে তাঁদেরকে জান্নাতুল ফিরদাউস-এর বাগ-বাগিচা দান করো, যেন তারা অনন্তকাল সেখানে বিচরণ করতে পারেন। আমীন।
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ৫৬৪০ নং জীবনী। ২. তাহযীবুল আসমা; ১ম খণ্ড, ৩৩৮ পৃ.। ৩. খুলাসাতুত্ তাহযীব; ২২৮ পৃ.। ৪. যাইলুল মুজীল; ৪৫ পৃ.। ৫. তারীখুল ইসলাম লিয্যাহাবী: ১ম খণ্ড, ৩৮০ পৃ.। ৬. রাগবাতুল আমাল: ৭ম খণ্ড, ২২৪ পৃ.।
📄 যায়েদ আল খাইর (রাঃ)
'তুমি নিশ্চয়ই ধৈর্য ও উদারতার মতো এমন দুটি গুণে গুণান্বিত, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট খুবই প্রিয়।' - মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)
এখন এমন একজন প্রসিদ্ধ সাহাবীর জীবনের দুটি দিকের ওপর আলোচনা করতে চাই, যিনি ইসলাম পূর্বকালে যেমন আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণের পরের জীবনেও তেমনি এক মহান ও মহৎ ইতিহাস রচনা করে গেছেন।
তিনি ছিলেন যায়েদ আল খাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু। ইসলাম পূর্বকালে তাকে যায়েদ আল খাইল বলে ডাকা হতো। ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে যায়েদ আল খাইর নামে আখ্যায়িত করেন।
জাহেলী জীবনের যে অধ্যায় সম্পর্কে উপরে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে তা আরবী সাহিত্যে এভাবে বর্ণিত হয়েছে। যা বনূ আমের গোত্রের সর্দারের বরাত দিয়ে শায়বানী বর্ণনা করেছেন:
'আমরা এক বছর অনাবৃষ্টি ও অজন্মার সম্মুখীন হই। ক্ষেত-খামার যেমন জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়, তেমনি পশু-খাদ্যের অভাবে গবাদিপশুর স্তনের দুধও শুকিয়ে যায়। অভাবের তাড়নায় আমাদের গোত্রের এক ব্যক্তি সপরিবারে হিরায় চলে যায়। সেখানে সে পরিবার-পরিজনকে রেখে তাদেরকে বলে যায়, আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত তোমরা এখানেই অবস্থান করতে থাক।'
সে শপথ নেয় যে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে ফিরে আসবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ধন-দৌলত অর্জন করতে পারে, এমনকি এ পথে যদি তার মৃত্যুও হয়।
অতঃপর সফরের জন্য খাবার ও পানি নিয়ে সে অজ্ঞাত মনযিলের দিকে রওনা হয়। সারাদিন পথ চলার পর সে রাতের আঁধারে একটি তাঁবু দেখতে পায়, যার কাছেই ছিল একটি ঘোড়ার বাচ্চা বাঁধা। সে মনে মনে ভাবল, 'যাক এই প্রথমবারের মতো গণিমতের একটি মাল পেলাম।' সে ঘোড়ার রশির বাঁধন খোলার জন্য অগ্রসর হলো। রশি খুলে যখন পিঠে চড়তে উদ্যত হলো তখন হঠাৎ আওয়াজ এল:
'খবরদার! যদি বাচঁতে চাও তাহলে ঘোড়া থেকে নেমে নিজের জীবনকে গনীমতের মাল বলে মনে কর।'
তখন সে ঘোড়া থেকে নেমে জীবন বাঁচাতে নিজ পথেই রওনা হয়ে গেল। অতঃপর ক্রমাগত সাত দিন পথ চলার পর হঠাৎ সে একস্থানে উটের খোঁয়াড় দেখতে পেল, যার পাশেই বিরাট একটি তাঁবু এবং তার ভিতর চামড়ার তৈরি ঘর, যা প্রাচুর্য ও বিলাসিতার ইঙ্গিত বহন করছিল।
সে ভাবল : 'এ খোয়াড়টি নিশ্চয়ই উট রাখার জন্যই তৈরি, আর এ তাঁবুতে নিশ্চয়ই মানুষও থাকে।'
তখন সূর্য প্রায় ডুবু ডুবু। তাঁবুর ভেতর উঁকি মেরে সে দেখতে পেল, অতিশয় বৃদ্ধ এক ব্যক্তি সেখানে বসে আছে। সে ভিতরে ঢুকে বৃদ্ধের পিছনে ঘাপটি মেরে বসে পড়ল। বৃদ্ধটি তা বুঝতে পারল না। একটু পরই সূর্য অস্ত গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে একজন ঘোড়সওয়ার এসে উপস্থিত হলো। সে এক বিশাল দেহী স্বাস্থ্যবান ঘোড়সওয়ার, যার দু'পাশে দু'জন খাদেম হেঁটে চলে আসছে। সে তাকে দেখতেই পায়নি। যেমন আরোহী তেমনি তার বিরাট ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠ থেকে নামার জন্য এগিয়ে দেওয়া হল উচ্চাসন। এর দু'পাশে দু'জন খাদেম ঘোরাফেরা করছে। তাদের তত্ত্বাবধানে প্রায় ১০০টি উট এবং উটবহর, যাদের সামনে অবস্থান করছে বিরাট এক উট, যাকে অনুসরণ করে বাকি উটগুলো চলে থাকে। উটগুলোর সর্দার বসে পড়তেই বাকি সব উটও বসে পড়ল। এই অশ্বারোহী তার এক খাদেমকে বড় একটি উটনীর দিকে ইশারা করে বলল:
'একে দোহন কর এবং তাঁবুতে অবস্থানরত শেখকে পান করাও।'
নির্দেশ পাওয়ামাত্রই খাদেম একটি পাত্রে উট দোহন করল এবং বৃদ্ধের সামনে রেখে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বৃদ্ধটি সেখান থেকে সামান্য কিছু পান করে বাকিটুকু রেখে দিলে বৃদ্ধের পেছনে লুকিয়ে থাকা এ লোকটি কি করল, তার বর্ণনা থেকেই শোনা যাক:
সে বর্ণনায় বলে:
'লুকিয়ে থেকে আমি সব দেখতে থাকি। আস্তে আস্তে অত্যন্ত সাবধানে অগ্রসর হয়ে দুধের পাত্রখানা হস্তগত করে সবটুকু দুধ পান করে খালি পাত্রটি বৃদ্ধের সামনে রেখে দেই। কিছুক্ষণ পর খাদেম ফিরে এসে দেখল যে, পাত্রের সমস্ত দুধই শেষ। সে বলে উঠল:
'হে মালিক! উনি তো সবটুকুই পান করে ফেলেছেন।'
একথা শুনে অশ্বারোহী ব্যক্তির আর আনন্দের সীমা রইল না। সে খাদেমকে অন্য আরেকটি উট দোহন করে পাত্রখানা আবার বৃদ্ধের সামনে রাখার নির্দেশ দিল, খাদেম হুকুম তামিল করল।
এবারে বৃদ্ধ এক চুমুক পান করে বাকিটুকু সেবারের মতোই রেখে দিল। আমি ভাবলাম, এবার এখান থেকে অর্ধেক দুধ পান করি। কারণ, অশ্বোরোহীর মনে কোনো সন্দেহের সৃষ্টি হতে পারে।
এবার অশ্বারোহী খাদেমকে একটি বকরি যবেহ করার নির্দেশ দিল। বকরি যবেহ হয়ে গেলে অশ্বারোহী নিজেই গোশত ভুনা করল এবং নিজ হাতে বৃদ্ধকে খাওয়াল। বৃদ্ধকে খাওয়ানোর পরে সে এবং তার খাদেম খেতে বসল। কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল এবং নাক ডাকতে থাকল।
সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আমি সর্দার উটটির রশি খুলে তার পিঠে চড়ে বসি, সর্দার উটকে চালিয়ে নিতেই অন্য উটগুলোও পেছনে পেছনে চলতে আরম্ভ করল। সারা রাত ধরে চললাম।
সকাল হলে চতুর্দিকে ভালো করে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখলাম : 'কেউ আমার সন্ধানে আসছে কি না? কেউ খুঁজতে আসছে বলে আমার মনে হলো না। আমি চলতেই থাকলাম। এমনকি দুপুর হয়ে গেল। এবার চারদিকে আরো ভালো করে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগলাম। উদ্দেশ্য, কেউ খুজঁতে আসছে কি না, তা লক্ষ্য করা।'
এবার দেখতে পেলাম : 'অনেক দূরে যেন একটি শকুন বা বড় পাখি আমার দিকে ছুটে আসছে। তা ক্রমেই আমার নিকটবর্তী হতে থাকল এবং তারপর স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সে একজন অশ্বারোহী। আমার বুঝতে বিলম্ব হলো না যে, অশ্বারোহী তার উটগুলো উদ্ধার করার জন্যই এসেছে। আমি তড়িঘড়ি করে উটটিকে বেঁধে ফেললাম এবং তীরের থলি থেকে তীর বের করে পজিশন অনুযায়ী আমার চতুষ্পার্শ্বে রেখে দিয়ে অন্য একটি তীর ধনুকে স্থাপন করে উটগুলোকে পেছনে রেখে আগন্তুক অশ্বারোহীর দিকে তাক করে ধরলাম।'
অশ্বারোহী বেশ দূরে অবস্থান নিয়ে আমাকে বলল : 'সর্দার উটটির রশি খুলে দাও।'
আমি বললাম : 'কক্ষনো নয়। আমি হীরাতে অনেক ক্ষুধার্ত স্ত্রী ও সন্তানদের রেখে এসেছি এবং শপথ করেছি যে, আমি অর্থ-সম্পদ নিয়ে ফিরব, কিংবা আমার মৃত্যু হবে।'
সে বলল : 'তোমার নির্ঘাত মৃত্যুই হবে। তুমি সর্দার উটটির রশি খুলে দাও।'
আমি বললাম : 'আমি কখনোই রশি খুলে দেবো না।'
তখন সে বলল : 'তুমি ধ্বংস হও। তুমি বড়ই বিভ্রান্ত।'
সে আবার বলল : 'সর্দার উটটির রশির গিরা কোথায়? উটটির রশিতে তিনটি গিরা দিয়ে বাঁধা ছিল।'
সে বলল: 'উটের রশিটি দেখিয়ে দাও এবং বল কোন্ গিরাটিতে তীর নিক্ষেপ করব?'
আমি তাকে গিরাটি দেখিয়ে দিলাম। অশ্বারোহী সেই গিরাটিতে তীর নিক্ষেপ করল, যেন সে নিজ হাত দিয়ে সেটি সেখানে রাখল। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় গিরাটিতেও লক্ষ্য ভেদ করল।
এ কাণ্ড দেখে আমি তীরগুলো থলেতে রাখলাম এবং আত্মসমর্পণ করলাম। অশ্বারোহী এবার এগিয়ে এসে আমার তরবারিখানা নিয়ে নিল এবং বলল: 'আমার পেছনে আরোহণ কর।'
আমি তার পেছনে আরোহণ করলে সে বলল: 'তোমার সাথে কেমন ব্যবহার করব বলে তুমি ধারণা করছ?'
আমি উত্তর দিলাম: 'খারাপ ধারণাই করছি।'
অশ্বারোহী বলল: 'কেন?'
আমি বললাম : 'আপনার সাথে যে ব্যবহার করেছি, তার জন্য কোনো ভালো ব্যবহার আশা করতে পারি না। তাছাড়া আপনাকে যে কষ্ট দিয়েছি, তার জন্য। এখনতো আল্লাহ আপনাকে বিজয় দান করেছেন।'
অশ্বারোহী বলল: 'তুমি কি মনে কর যে, আমি তোমার সাথে খারাপ আচরণ করব? অথচ তুমি আমার পিতা 'মুহালহালের সাথে পানাহারে অংশ নিয়েছ এবং সে রাতে তার সাথে এক পাত্রে দুধ পান করেছো' এবং সে রাতে তার সঙ্গী হয়েছ।'
আমি মুহালহালের নাম শোনামাত্রই তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম: 'আপনি কি যায়েদ আল খাইল?
উত্তর এল: 'হ্যাঁ।'
উত্তর শুনে আমি বললাম : 'আপনি উত্তম কয়েদকারী হোন।'
অশ্বারোহী বলল: 'চিন্তার কোনো কারণ নেই- এ অভয় দিয়ে আমাকে নিজ আস্তানায় নিয়ে চলল।'
তিনি বললেন:
'আল্লাহর কসম! এ উটগুলো যদি আমার নিজের হতো, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাকে দিয়ে দিতাম। কিন্তু এগুলো আমার এক বোনের। আমাদের এখানে কিছু দিন থাক। আমি লুটতরাজের উদ্দেশ্যে সহসাই একগোত্রে হামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আশা করি, বহু সম্পদ ছিনিয়ে আনতে পারব। সেখানে তোমাকে যা দেওয়ার দিয়ে দেব।'
তিন দিন যেতে না যেতেই যায়েদের দলবল বনূ নুমাইর গোত্রের ওপর হামলা করে প্রায় ১০০টির মতো উট লুট করে আনল এবং সবগুলোই আমাকে দিয়ে দিল। এমনকি আমার নিরাপত্তার জন্য যতক্ষণ 'হীরাতে' আমি না পৌঁছি, ততক্ষণের জন্য কিছুসংখ্যক লোককেও সাথে দিয়ে দিল।'
যায়েদ আল খাইলের এটা হলো জাহেলী যুগের চিত্র। আর তার ইসলাম গ্রহণের পরের ঘটনাবলি তো সীরাতের কিতাবসমূহে এভাবে বর্ণিত হয়েছে:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের সংবাদ যায়েদ আল খাইলের কানে পৌঁছলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের যে যৎকিঞ্চিৎ সংবাদ তাঁর কাছে পৌছে, তার উপরই গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে সে সফরের জন্য সাজ-সরঞ্জাম ও ঘোড়া তৈরি করে এবং স্বগোত্রের নেতাদের তার সাথে সফর করার এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করার আহ্বান জানাল। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে 'বনূ তাঈ' গোত্রের এক বিরাট প্রতিনিধি দল তাদের অনুগামী হয়। তাদের মধ্যে যুর ইবনুস সাদুস, মালেক ইবনে জুবাইর এবং আমর ইবনে জুয়াইন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ বিরাট কাফেলা মদীনা মুনাওয়ারায় পৌঁছে এবং মসজিদের দরজার সাথে উটগুলো বসানো হয়।
মসজিদে প্রবেশ করেই তারা দেখতে পায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে বসে সমবেত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিচ্ছেন। তাঁর কথাগুলো ছিল যেমন হৃদয়গ্রাহী, তেমনি তাঁর প্রতি মুসলমানদের শ্রদ্ধা-ভক্তি ও আনুগত্যের উদাহরণও ছিল অনন্য। যেন তাঁর কথাগুলো শ্রোতাদের অন্তরে পৌঁছে গেঁথে যাচ্ছে।
খুতবা দানরত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টি যায়েদ ও তার সঙ্গী-সাথীদের ওপর পড়লে, তিনি খুতবার ভেতরেই বলে ওঠেন:
إِنِّي خَيْرٌ لَكُمْ مِنَ الْعُزَّى وَمِنْ كُلِّ مَا تَعْبُدُون ... إِنِّي خَيْرٌ لَكُمْ مِنَ الْجَمَلِ الْأَسْوَدِ الذي تعبدُونَهُ مِنْ دُونِ اللَّهِ .
'উয্যা ও অন্যান্য যেসব মূর্তির তোমরা পূজা করছ, তাদের সবার চেয়ে তোমাদের জন্য আমি উত্তম। আল্লাহ ছাড়া যেমন তোমরা কালো উটের ইবাদত করে থাকো এর চেয়েও আমি তোমাদের জন্য উত্তম।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুতবা যায়েদ আল খাইল এবং তার দলবলের ওপর দু'ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল। তাদের মধ্যে অনেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার দাওয়াত গ্রহণ করল। আর কিছুসংখ্যক তাঁর দাওয়াতে কর্ণপাত না করে অহংকারের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করল। দ্বিধাবিভক্ত কাফেলার অর্ধেক রওয়ানা হলো জান্নাতের পথে, আর বাকিরা জাহান্নামের দিকেই তাদের যাত্রা অব্যাহত রাখল। 'যুর ইবনুস সাদুস' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হীনদৃষ্টিতে দেখছিল, যা কখনোই অন্তর দিয়ে কামনা করার মতো ছিল না। আর তাই তখন তার আচরণেও এর প্রতিফলন ঘটল। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। সে ভাবছিল এমন যেন না হয় যে, তাকে খারাপ পরিণতির সম্মুখীন হতে হয়।
সে তার সঙ্গী-সাথীদের উদ্দেশ্য করে বলল:
'আমি দেখতে পাচ্ছি যে, সারা আরব এ ব্যক্তির করতলে আসবে। খোদার শপথ! আমি চাই না, তিনি আমার উপর কর্তৃত্ব করুন।'
অতঃপর সে সিরিয়ায় চলে যায় এবং মাথা ন্যাড়া করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে।
এদিকে যায়েদ আল খাইল ও তার অন্যান্য সাথীদের দৃশ্য ছিল ভিন্ন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুতবা শেষ হতে না হতেই যায়েদ আল খাইল মুসলিম জনতার সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন, সবারই দৃষ্টি পড়ল লম্বা-চওড়া স্বাস্থ্যবান এক আকর্ষণীয় চেহারার এ ব্যক্তির ওপর। এতো লম্বা যে, তিনি ঘোড়ায় চড়লে দু'পা মাটি স্পর্শ করত। যেমন কেউ গাঁধার পিঠে চড়লে হয়। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চৈঃস্বরে বলে ওঠেন:
'হে মুহাম্মদ! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং আপনি আল্লাহর বান্দাহ ও রাসূল।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে একটু অগ্রসর হলেন এবং প্রশ্ন করলেন:
'তুমি কে?'
যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জবাব দিলেন: 'আমি যায়েদ আল খাইল ইবনে মুহালহাল।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সাথে বললেন:
'না, তুমি এখন থেকে আর যায়েদ আল খাইল নও; বরং তুমি এখন থেকে যায়েদ আল খাইর। সেই আল্লাহর প্রশংসা, যিনি পাহাড়-পর্বত এবং সমতল ভূমির লুটতরাজের বিভীষিকা থেকে ফিরিয়ে এনে ইসলামের ছায়াতলে তোমাকে পৌঁছে দিয়েছেন।'
অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদ আল খাইরকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান। ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং অন্য একজন সাহাবা তাঁর সাথে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুজরা মুবারকে পৌঁছলে তিনি যায়েদ আল খাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আরাম করে বসার জন্য খেজুরের ছোবড়াভরা চামড়ার তৈরি একটি বালিশ সাদৃশ্য গদি এগিয়ে দেন। এটা যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে একটি খুবই অসম্ভব ব্যাপার ছিল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে তিনি আরাম গদিতে বসবেন। তাই তিনি এটা পুনরায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকেই এগিয়ে দিলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গদিটি আবার তার দিকেই এগিয়ে দেন এবং তিনিও পুনরায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে ঠেলে দেন। এমনি করে তিনবার গদিটির দিক পরিবর্তন হলো, যথাযথভাবে বৈঠকের কর্মসূচি আরম্ভ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
‘হে যায়েদ আল খাইর! কেউ আমার কাছে যে ব্যক্তিরই বর্ণনা দেয় পরে সাক্ষাৎ হলে দেখি সে বর্ণনার চেয়ে অনেক নিচে। একমাত্র তুমিই তার ব্যতিক্রম।'
তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ‘হে যায়েদ! তোমার মধ্যে দুটি গুণ বিদ্যমান, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের খুবই প্রিয়।'
যায়েদ জিজ্ঞাসা করলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল, কী সে গুণ?'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ‘উদারতা ও ধৈর্য।'
যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে এমন গুণ দিয়েছেন, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে প্রিয়।'
অতঃপর যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে ফিরে বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে মাত্র তিনশত অশ্বারোহী দিন, যাতে আমি রোমান সাম্রাজ্যে আক্রমণ চালিয়ে তাদের যেন পরাজিত করতে পারি। পতনের জন্য ওরাই যথেষ্ট হবে।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এই সাহসকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখলেন এবং বললেন: ‘হে যায়েদ! নিঃসন্দেহে তোমার এ সাহস অতীব পছন্দনীয়, সত্যিই তুমি একজন সাহসী পুরুষ।'
অতঃপর যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে তাঁর সব সহযোগীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেন।
অতঃপর যায়েদ আল খাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নজদ-এ তার বাড়িতে ফেরার জন্য মনস্থ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে দেশে ফেরার অনুমতি দিলেন, যায়েদ বিদায় হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'সে কতই না ভালো ব্যক্তি! কতই না ভালো হতো! যদি মদীনার সংক্রামক ব্যাধি থেকে সে নিরাপদ থাকত।'
সে সময় মদীনায় এক প্রকার মারাত্মক সংক্রামক জ্বরের আবির্ভাব ঘটে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই উক্তি করার পরদিনই যায়েদ আল খাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জ্বরে আক্রান্ত হলেন। অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি তার সঙ্গী-সাথীদের বললেন:
'কাইসের গোত্র থেকে দূরের পথ ধরে চল। জাহেলী যুগে তাদের সাথে আমাদের ভীষণ যুদ্ধ হয়েছে। এমন না হয়, তাদের সাথে কোনো সংঘাতও বেধে যায়। কারণ আল্লাহর নামে শপথ করছি, মৃত্যুর পূর্বে আমার দ্বারা কোনো মুসলিমের রক্তপাত সম্ভব নয়।'
তাঁকে নিয়ে তাঁর সাথীরা নজদ-এর উদ্দেশ্যে দ্রুতগতিতে পথ অতিক্রম করছিল। তাঁর জ্বরও প্রহরে প্রহরে বেড়েই চলছিল। বড় আশা ছিল যে, তিনি ফিরে যাবেন এবং নিজ গোত্রের অন্যান্য লোকদের নিজ হাতে ইসলামে দীক্ষিত করবেন। এরপরই তাঁর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল। তিনি ভীষণভাবে জ্বরে আক্রান্ত হলেন। অবশেষে তিনি পথিমধ্যেই প্রাণ ত্যাগ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর গুনাহ করার তিনি সময়ও পাননি। বেগুনাহ এ সাহাবী পরম শান্তিতে জান্নাতের পথ ধরলেন।
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ্: ২৯৪১ নং জীবনী। ২. আল ইসতিয়াব: ১ম খণ্ড, ৫৬৩ পৃ. (আস সায়াদ সংস্করণ)। ৩. আল্ আগানী: (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)। ৪. তাহজীব ইবনে আসাকির (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)। ৫. সামতুল লালিই: (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)। ৬. খাযানাতুল আদাব আল বাগদাদী: ২য় খণ্ড, ৪৪৮ পৃ.। ৭. যাইলুল মাযিল: ৩৩ পৃ.। ৮. সিমারুল কুলুব: ৮৭ পৃ.। ৯. আসশের ওয়াশ শুআরা: ৯৫ পৃ.। ১০. হুসনুস সাহাবা: ২৪৮ পৃ.।
📄 আদী ইবনে হাতেম আত্ তায়ী (রাঃ)
'যখন তারা কুফরীর পথ অবলম্বন করেছে, তখন তুমি ঈমান এনেছ। যখন তারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে অস্বীকার করেছে, তখন তুমি তাকে অনুসরণ করেছ, যখন তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তখন তুমি পূর্ণ আনুগত্যের পরিচয় দিয়েছ, এবং যখন তারা পশ্চাৎপদ হয়েছে তখন তুমি বীর বিক্রমে এগিয়ে চলেছ।' -ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু
নবম হিজরীতে আরবের এক প্রভাবশালী বাদশাহ ইসলামের বিজয়ে ভীত হয়ে দেশ ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবনযাপন করেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর এই ধর্মান্তরের ঘটনা খুবই চমৎকার ও বিরল এক দৃষ্টান্ত। ইসলামী দাওয়াতের বিরুদ্ধে তাঁর প্রবল বিরোধিতা একে একে ব্যর্থ হলে তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলামে তাঁর এই আত্মসমর্পণ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুর্লভ এক ঘটনার অন্তর্ভুক্ত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধাচরণকারী সেই বাদশাহ হলেন, ইতিহাস বিখ্যাত হাতেম আত তাঈ'র ছেলে 'আদী'। আদী শুধু বাদশাহ হিসেবেই নন; বরং দানবীর হিসেবেও ছিলেন, পিতার যোগ্য উত্তরসূরি। উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি 'তাঈ' রাজ্যের বাদশাহ হয়েছিলেন। লুটতরাজকৃত সম্পদের এক-চতুর্থাংশ সম্পদ তাঁর জন্য নির্ধারিত ছিল। তিনি শুধু দেশের বাদশাহই ছিলেন না; বরং সেনাপতির দায়িত্বও তিনি পালন করতেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আরবের সর্বত্র হক ও হেদায়াতের দাওয়াত দিতে শুরু করেন, তখন চতুর্দিকে ইসলামের দাওয়াত এর সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে। একের পর এক অঞ্চল ইসলামের দাওয়াতী পতাকার ছায়ায় আসতে থাকে। আদী ইবনে হাতেম আত তাঈ উপলব্ধি করতে পারেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বের কাছে তাঁর বংশানুক্রমে প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রীয় সীমানায় তাঁর রাজ্য নিশ্চিত অন্তর্ভুক্ত হবে। ঠাণ্ডা মাথায় তিনি এ আশঙ্কার কথা চিন্তা করে নতুন ইসলামী রাষ্ট্র এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তীব্র বিরুদ্ধাচরণ আরম্ভ করেন। অথচ তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। না দেখে না জেনে জঘন্যভাবে বিরোধিতা করতে লাগলেন। দীর্ঘ ২০ বছর অব্যাহতভাবে ইসলামের বিরোধিতা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে আল্লাহ তাআলা তাঁকে হেদায়েতের পথ দেখালেন ও সত্যের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তাঁর অন্তরকে প্রশস্ত করে দিলেন।
আদী ইবনে হাতেমের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা অবিস্মরণীয়। তাঁর নিজের বর্ণনা থেকেই আমরা এখন বিস্তারিত জানতে পারব। কারণ, তিনি নিজেই তাঁর ঘটনা বস্তুনিষ্ঠভাবে বর্ণনা করার জন্য যথেষ্ট।
আদী ইবনে হাতেম আত তাঈ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করছেন:
আরব বিশ্বে আমার চেয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে অন্তরে বিদ্বেষ পোষণকারী আর কেউ ছিল কি না সন্দেহ। আমি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এক সম্ভ্রান্ত রাজপরিবারের যুবরাজ ছিলাম। অন্যান্য রাজা-বাদশাহর মতো আমিও লুটতরাজকৃত ধন-সম্পদের এক চতুর্থাংশ পেতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের সংবাদ শুনে তাঁকে বড়ই ঘৃণা করতে লাগলাম। অথচ তাঁর শক্তি বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এমনকি তাঁর সৈন্যবাহিনী আরবের পূর্বপ্রান্ত থেকে পশ্চিমপ্রান্ত পর্যন্ত ছোট-বড় সব যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে দাপটের সাথে চলাফেরা করত। তখন একদিন আমার উটের রাখালকে বললাম:
'সাবাস গোলাম! দ্রুতগামী মোটাতাজা একটি উট আমার সফরের জন্য প্রস্তুত কর। এই উটকে আমার কাছেই সর্বক্ষণ বেঁধে রাখ। মুহাম্মদের সৈন্যবাহিনী বা ক্ষুদ্র কোনো সৈন্যদলের কথাও যদি জানতে পার তাহলে আমাকে তৎক্ষণাৎ সংবাদ দিও।'
কোনো একদিন সকালে গোলাম এসে আমাকে সংবাদ দিল : 'হে আমার মনিব! মুহাম্মদের সৈন্য আপনার ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। আপনি যে উটের কথা বলেছিলেন, সে ইচ্ছা এখন পূরণ করতে পারেন।'
তাকে বললাম : 'কেন? কী দুঃসংবাদ এনেছ?'
সে বলল : 'পতাকাবাহী কিছু সৈন্যকে আমাদের ভূখণ্ডে ঘোরাফেরা করতে দেখে তাঁদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যে, এরা মুহাম্মদের সৈন্যবাহিনী।'
তাঁকে বললাম : 'আমার জন্য যে উটটি তৈরি করে রেখেছ সেটি কাছে আনো। অতঃপর উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করতে লাগলাম। সবাইকে আমাদের প্রিয় ভূমি ছেড়ে পালানোর আহবান জানালাম এবং খুব দ্রুত সিরিয়ার দিকে রওনা দিলাম। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, সেখানকার সমধর্মী খ্রিস্টানদের সাথে মিলিত হয়ে সেখানেই যেন বসবাস করতে পারি।'
অত্যন্ত ব্যস্ততার সঙ্গে পরিবার-পরিজনকে একত্রিত করলাম। বিপদ নিশ্চিত জেনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু আমাদের জন্মস্থান নজদে আমার সহোদর বোন এবং তার সাথে বনূ তাঈ-এর বাদ বাকি লোক রয়ে গেল। আমার পক্ষে বোনকে আনার জন্য সেখানে যাওয়া সম্ভব ছিল না। সুতরাং আমার কাছে যারা উপস্থিত ছিল, তাদের নিয়েই সিরিয়ায় পৌঁছি এবং অন্যান্য খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ভাইদের সাথে বসবাস করতে থাকি। আমার বোনের ব্যাপারে যা আশঙ্কা করেছিলাম ঠিক তা-ই হয়েছিল। সিরিয়ায় অবস্থানকালে জানতে পারলাম, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অশ্বারোহী বাহিনী আমাদের বাড়ি-ঘরে হামলা করে মাল-সামান লুটতরাজ করে নিয়েছে। আমার বোন ও অন্যান্য মহিলাকে বন্দী করে ইয়াসরিবে নিয়ে যাওয়া হয়। মসজিদে নববীর দরজা সংলগ্ন নির্ধারিত স্থানে তাদের রাখা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এখান দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন আমার বোন সামনে দাঁড়িয়ে যায় এবং আরয করে :
'ইয়া রাসূলুল্লাহ! পিতা ইনতিকাল করেছেন। যিনি আমাকে সাহায্য করার জন্য আসার কথা তিনি গায়েব হয়েছেন। অতএব আপনি আমার ওপর করুণা করুন, আল্লাহ আপনার ওপর করুণা করবেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন: 'তোমাকে সাহায্য করার জন্য কার আসার কথা ছিল?'
আমার বোন উত্তর দেয়: 'আদী ইবনে হাতেমের।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছ থেকে যে পলায়ন করেছে, সেই ব্যক্তি কী?'
এ কথোপকথনের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্বাভাবিক গতিতে চলে যান। পরদিন যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার এখান দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সে আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে গতকাল যে আরয করেছিল, তারই পুনরাবৃত্তি করে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও গতকালের মতোই উত্তর দেন।
পরদিন আবার যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখান দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সে নিরাশ হওয়ায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আর কিছু আরয করল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছন থেকে এক ব্যক্তি আমার বোনকে আবার আবেদন করার জন্য ইশারা করলেন। ঐ ব্যক্তিটির ইশারা পেয়ে আমার বোন দাঁড়িয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে পূর্ব দু'দিনের মতোই আবেদন করে:
'ইয়া রাসূলুল্লাহ! পিতা ইনতিকাল করেছেন, সাহায্যের জন্য যার আসার কথা ছিল সে গায়েব হয়ে গেছে। অতএব আপনি আমার ওপর করুণা করুন, আল্লাহ আপনার ওপর করুণা করবেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন: 'হ্যাঁ, করলাম।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে মুক্ত হওয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে আমার বোন তাঁর খিদমতে আরয করল:
'আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে আমি সিরিয়ায় চলে যেতে চাই।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন:
'ব্যস্ত হয়ো না। ততদিন এখানে অপেক্ষা করতে থাক, যতদিন না তোমাদের সমগোত্রীয় নির্ভরযোগ্য কোনো কাফেলা না পাও। যে কাফেলা তোমাকে পরিজনের নিকট পৌঁছে দিতে পারে। যদি এমন কোনো কাফেলার সন্ধান পাও, তাহলে আমাকে অবহিত করো।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখান থেকে চলে যাওয়ার পর ইশারাকারী ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে উপস্থিত লোকেরা বললেন:
'তিনি আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।'
বিশ্বস্ত এক কাফেলার আগমন হলে, আমার বোন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে আরয করল:
'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার স্বগোত্রীয় একটি কাফেলা এখানে এসেছে, তাদের মধ্যে বেশ কিছু বিশ্বস্ত ব্যক্তি রয়েছে। যারা আমাকে আমার পরিজনের নিকট পৌছে দিতে পারে।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বোনকে কাপড়-চোপড় সেলাই করে দেন। আরোহণের জন্য একটি উট এবং প্রচুর পরিমাণ খাদ্য ও পানীয় সঙ্গে দেন। অতঃপর সে কাফেলার সাথে আমার বোন সিরিয়ার পথে রওনা হয়।
আদী ইবনে হাতেম আত তাঈ বলেন:
'এরপর থেকে নানাভাবে আমাদের কাছে তার সংবাদ আসতে থাকে, এবং তার আসার ব্যাপারে আশার সঞ্চার হয়; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বোনের প্রতি যে সম্মান ও ভদ্রসুলভ আচরণ করেছেন, এমন খবর আমি মোটেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তাছাড়া তাঁর প্রতি আমার কোনো ভালো ধারণাও ছিল না।'
একদিন আমি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসেছিলাম। এ অবস্থায় দেখতে পেলাম হাউদায় উপবিষ্ট এক মহিলাকে নিয়ে একটি উট আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
আমি বলে উঠলাম : 'হাতেমের মেয়ে?'
সত্যি সত্যি সে উট থেকে নেমেই আমাকে বলছিল : 'ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ছিন্নকারী যালিম! স্ত্রী, পরিবার, সন্তান-সন্ততি নিয়ে চলে এসেছ, আর অন্যদের মান-সম্মান ও সম্ভ্রমের কী হলো সে চিন্তাও করলে না?'
তাকে বললাম : 'সত্যি বলছি বোন, আমার যে পরিস্থিতি ছিল, সে পরিস্থিতিতে তা করা সম্ভব ছিল না। আমাকে গালমন্দ করো না, জীবনে বেঁচে যে এসেছি, এটাই কি যথেষ্ট নয়?'
নানাভাবে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করি। অবশেষে, তার ক্রোধ উপশম হলো, শান্ত হয়ে সে সব ঘটনা শোনাল। নিঃসন্দেহে সে একজন বুদ্ধিমতী, সাহসী ও চতুর মহিলা। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম : 'মুহাম্মদ সম্পর্কে তোমার কী ধারণা?'
সে উত্তর দিল : 'খোদার শপথ! আমি মনে করি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তুমি তাঁর সাথে দেখা করো। তিনি যদি নবী হন, তাহলে তাঁর কাছে শীঘ্রই যাওয়া শ্রেয়, আর যদি তিনি শাহানশাহ হন তাহলে তুমি যেভাবে ছিলে সেভাবেই মর্যাদা পাবে।'
আদী ইবনে হাতেম বলেন: 'আমি দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে কোনোরূপ নিরাপত্তা বা চিঠিপত্র ছাড়াই মদীনা মুনাওয়ারায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হই, শুধু আমার এতটুকু আশা ছিল যে, আমি জানতে পেরেছি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার উপস্থিতির প্রত্যাশা করেন।'
তিনি বলেছেন: 'আমি আশা করছি যে, আল্লাহ আদী ইবনে হাতেমের হাতকে আমার হাতের সাথে মিলিয়ে দেবেন। বুকভরা আশা নিয়ে মসজিদে নববীতে অবস্থানরত অবস্থায় তাঁকে গিয়ে সালাম করি।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন: 'কে?'
উত্তর দিলাম: 'আদী ইবনে হাতেম আত তাঈ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে ওঠে দাঁড়ালেন এবং আমার হাত ধরে সোজা তাঁর বাড়ির দিকে রওয়া হলেন।'
শপথ করে বলছি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সঙ্গে নিয়ে তার বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন, এমন সময় অশীতিপর এক বৃদ্ধা একটি শিশু ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দাঁড় করালেন। তার সমস্যা সংক্রান্ত বিষয়ে কথাবার্তা বললেন, বৃদ্ধার সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তিনি তাঁর সাথেই রইলেন। আমিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দাঁড়িয়েই রইলাম। আর মনে মনে বলতে লাগলাম: 'খোদার শপথ! এ ব্যক্তি তো কোনো বাদশাহ হতে পারেন না।'
অতঃপর আবার হাত ধরে রওয়া দিলেন। আমরা তাঁর বাড়ি পৌছে গেলাম। ভিতরে খেজুরের ছোবড়া ভরা চামড়ার তৈরি (তার বাসভবনের একমাত্র ফার্নিচারস্বরূপ) বালিশ সাদৃশ্য গদিখানা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বসতে বললেন। আমি লজ্জিত হয়ে বললাম: 'না, না আপনি বসুন।'
তিনি বললেন: 'না তুমিই বসো, পরিশেষে বেয়াদবি না হয় মনে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ মেনে নিয়ে তাতেই বসে পড়লাম।'
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেঝেতে বসলেন। তাঁর ঘরে এছাড়া বসার আর দ্বিতীয় কিছুই ছিল না। মনে মনে বলছিলাম: 'এ কোন বাদশাহর বাড়ি হতে পারে না।'
অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সম্বোধন করে বলেন: 'আদী, তুমি কি খ্রিস্টান ও পৌত্তলিকতার মাঝামাঝি রুকুসিয়া ধর্মাবলম্বী নও?'
আমি বললাম: 'জি হ্যাঁ।'
অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন:
'তুমি কি তোমার রাজ্যে এক-চতুর্থাংশ গ্রহণকারী নামে পরিচিত ছিলে না? তাদের নিকট থেকে যে এক-চতুর্থাংশ সম্পদ নিতে তা কি তোমার ধর্মে নিষিদ্ধ ছিল না?
আমি উত্তর দিলাম: 'জি হ্যাঁ, এবং আমার বুঝতে আর বাকি রইল না, তিনি অবশ্যই প্রেরিত রাসূল।'
তিনি আবার আমাকে সম্বোধন করে বলতে লাগলেন:
'হে আদী! সম্ভবত মুসলমানদের আর্থিক হীনতা ও অভাব-অনটন আজ তোমার ইসলামে প্রবেশের পথে প্রধান বাধা।'
'খোদার শপথ! সেদিন অতি নিকটে, যখন তাদের ধন-সম্পদের এতো প্রাচুর্য হবে যে, যাকাত-খয়রাত নেওয়ার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।'
'হে আদী! সম্ভবত, আজ মুসলমানদের সংখ্যাস্বল্পতা ও তাদের বিরুদ্ধে সীমাহীন শত্রুতা তোমার ইসলামে প্রবেশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।'
'খোদার শপথ! অচিরেই দেখতে পাবে, একজন মহিলা কাদেসিয়ার শেষ প্রান্ত থেকে একাকী উটে আরোহণ করে বায়তুল্লাহর যিয়ারতে আসবে, অথচ আল্লাহ ছাড়া তার আর কোনো ভয় থাকবে না।'
'হে আদী! ইসলাম গ্রহণে বাধা দানকারী, 'রাজা বাদশাহগণ সবাই অমুসলিম।'
'খোদার শপথ! অনতিবিলম্বেই দেখবে, ইরাকের বাবেলের শুভ্র রাজপ্রাসাদ মুসলমানদের করতলগত। কিসরা ইবনে হুরমুযের ধন-ভাণ্ডারও তাদের হস্তগত।'
আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেসা করলাম: 'কিসরা ইবনে হুরমুয়ের ধন-ভাণ্ডার?'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন:
'হ্যাঁ, কিসরা ইবনে হুরমুযের ধন-ভাণ্ডার।'
এ শুনে আমি কালেমা শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করলাম।
আদী ইবনে হাতেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন। তিনি বলতেন:
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুটি ভবিষ্যদ্বাণী তো স্বচক্ষে সংঘটিত হতে দেখলাম। আমি দেখেছি, কাদেসিয়া থেকে মহিলারা তাদের উটের পিঠে আরোহণ করে এসে নির্দ্বিধায় খোদার এই ঘর যিয়ারত করে যাচ্ছে। কিসরা সম্রাটের ধনভাণ্ডারে আক্রমণকারীদের মধ্যে আমিই অগ্রভাগে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার ছিলাম। খোদার শপথ! তৃতীয়টিও সংঘটিত হবে।'
আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীর ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়ন করেই দেখালেন। তৃতীয় ভবিষ্যদ্বাণী ইসলামের পঞ্চম খলীফা ওমর ইবনে আব্দুল আযীয রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সময় বাস্তবে সংঘটিত হয়। আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের এত ধনদৌলতের প্রাচুর্য দান করেন যে, সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত যাকাত বণ্টনকারীগণ যাকাত গ্রহণকারীদের তালাশের জন্য রাস্তায় রাস্তায় আহ্বান করে বেড়াতেন; কিন্তু তা গ্রহণ করার মতো কোনো অভাবীকে পেতেন না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণীকে আল্লাহ সত্যি সত্যি প্রমাণ করে দেখালেন এবং আদী ইবনে হাতেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শপথকেও আল্লাহ সম্মান দিলেন।
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ (আস সায়াদা সংস্করণ)-৪র্থ খণ্ড, ২২৮-২২৯ পৃ.। ২. আল ইসতিয়াব। (হায়দরাবাদ সংস্করণ)-২য় খণ্ড, ৫০২-৫০৩ পৃ.। ৩. উসদুল গাবাহ-৩য় খণ্ড, ৩৯২-৩৯৪ পৃ.। ৪. তাহযীবুত তাহযীব-৭ম খণ্ড, ১৬৬-১৬৭ পৃ.। ৫. তাকুরিবুত তাহযীব-২য় খণ্ড, ১৬ পৃ.। ৬. খুলাসাতু তাযহীব তাহযীবুল কামাল-২৬৩-২৬৪ পৃ..। ৭. তাজরীদু আসমাউস সাহাবা-১ম খণ্ড, ৪০৫ পৃ.। ৮. আল জামউ বাইনা রিজালিস সহীহাইন-১ খণ্ড, ৩৯৮ পৃ.। ৯. আল ইবরু-১ম খন্ড, ৭৪ পৃ.। ১০. আত তারীখুল কাবীর-৪র্থ খণ্ড, (ভমিকা), ১ম খণ্ড, ৪৩ পৃ.। ১১. তারীখুল ইসলাম লিযযাহাবী-৩য় খণ্ড, ৪৬-৪৮ পৃ.। ১২. শাজরাতুযযাহাব-১ম খণ্ড, ৭৪ পৃ.। ১৩. আল মায়ারেফ-১৩৬ পৃ.। ১৪. আল মুয়াম্মারুন-৪৬ পৃ.।
📄 আবু যর গিফারী (রাঃ)
'আবূ যর গিফারীর চেয়ে অধিক সত্যবাদী কোনো ব্যক্তি এ পর্যন্ত পৃথিবীতে না জন্মগ্রহণ করেছে, আর না আকাশ তাকে ছায়াদান করেছে।' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)
মক্কার সাথে বহির্বিশ্বের যাতায়াতের একমাত্র মরুপথ 'ওয়াদীয়ে ওয়াদ্দান' নামক স্থানে গিফার নামক একটি গোত্রের বসবাস ছিল। কুরাইশদের তেজারতী কাফেলা সিরিয়া যাতায়াতকালে তারা যা কিছু সাহায্য-সহযোগিতা করত এবং তাদের খিদমতের বিনিময়ে যা তারা পেত, তা দিয়েই এ গোত্রের কোনোভাবে জীবিকা নির্বাহ হতো। যদি কোনো কাফেলা কোনো কারণে সাহায্য করতে অনীহা দেখাত, তাহলে সে কাফেলা তাদের লুটতরাজের শিকার হতো।
'জুনদুব ইবনে জুনাদাহ' যাকে আবু যর বলে সম্বোধন করা হতো, তিনি এই গিফার গোত্রেরই সন্তান। কিন্তু গোত্রের অন্যান্য লোকের তুলনায় তাঁর সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সাহসিকতা, বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শিতা ছিল খুব বেশি। মূর্তিপূজার প্রতি তাঁর ছিল প্রচণ্ড ঘৃণা। তাঁর গোত্রের লোকজন আল্লাহ ছাড়া এসব দেব-দেবীর পূজা অর্চনা করুক, তা তিনি আদৌ পছন্দ করতেন না। কুসংস্কারাচ্ছন্ন আরবরা যেদিকে ছিল আগ্রহ সহকারে ধাবমান, তিনি তাঁর ঈমান নিয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন এর সম্পূর্ণ বিপরীতে।
এ পথে বিভিন্ন কাফেলার যাতায়াত এবং তাদের সঙ্গে মেলামেশার কারণে তিনি জানতে পারেন যে, আরবে এক নবীর আবির্ভাব ঘটেছে, যার কথাবার্তা যুক্তিসঙ্গত এবং বিবেকের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য। এ নবী তাঁর অনুসারীদের আলোর পথ, সত্যের পথ দেখান। তিনি আরও সংবাদ পেলেন যে, এ নবী আরবের মক্কাতেই জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তিনি মক্কাতেই দীন প্রচার করছেন।
তিনি তার ভাই আনিসকে বললেন:
'তুমি মক্কায় যাও, যে ব্যক্তি সেখানে নবুওয়াতের দাবি করছেন, তাঁর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে এস, তার ওপর নাকি ওহীও নাযিল হয়ে থাকে। কী অবতীর্ণ হয় তার কিছু নমুনা নিয়ে আসবে।'
একদিন আনিস মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। মক্কায় পৌছে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পবিত্র কালাম থেকে কিছু শোনে নিয়ে আবার 'ওয়াদীয়ে ওয়াদ্দান'-এর গিফার গোত্রে ফিরে এলেন। আবেগভরা মন নিয়ে আনিসকে অভ্যর্থনা জানিয়ে আবু যর গিফারী নতুন নবীর সংবাদ জানতে চাইলেন। আনিস মক্কায় গিয়ে যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, সবই বর্ণনা করলেন এবং আরও বললেন:
'আল্লাহর কসম! তিনি সকলকে উন্নত চরিত্রে চরিত্রবান হওয়ার উপদেশ দেন। তাঁর কথাবার্তা কবিতা নয়, অতি বাস্তব।'
তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'লোকেরা তার সম্পর্কে কি বলে?'
আনিস বললেন:
'তারা বলে, তিনি একজন জাদুকর বা গণক বা কবি হবেন।'
আবূ যর আনিসকে বললেন:
'তুমি আমার মনের ক্ষুধা মেটাতে পারলে না, আমার পিপাসাও তুমি নিবৃত্ত করতে পারলে না। যাক, তুমি যদি পরিবার-পরিজনের দেখাশোনা করতে পার, তাহলে আমি নিজে গিয়েই বিস্তারিত অবগত হই।'
আনিস বললেন:
'হ্যাঁ, পারব। তবে মক্কাবাসী থেকে খুবই সতর্ক থাকবেন।'
আনিস থেকে এ আশ্বাস পেয়ে আবু যর পরদিন সকালে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সাথে নিলেন, বকরির চামড়ার তৈরি পানি রাখার মশক এবং পথচলার কিছু পাথেয়। মক্কায় পৌঁছেই তিনি সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসু দৃষ্টিকে পাশ কাটিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন।
তিনি বুঝতে পারেন, মক্কার কুরাইশরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর খুবই ক্ষুব্ধ। তিনি কুরাইশদের মূর্তিগুলোকে পছন্দ করেন না। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারীদের তারা আদৌ বরদাশত করতে পারছে না। অধিকন্তু তাদের ওপর নিপীড়ন নির্যাতন করত এসব খবর তিনি আগেই পেয়েছিলেন। এ জন্য তিনি মক্কায় পৌঁছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করা মোটেই পছন্দ করলেন না। কারণ, জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি হতে পারে শত্রুদলভুক্ত। শেষে কোন্ মুসিবতেই না পড়তে হয়। নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই দিন অতিবাহিত হলো, রাত এল। মসজিদে হারামেই শুয়ে পড়লেন। তখন তার পাশ দিয়ে আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যাচ্ছিলেন। একজন ভিনদেশী মুসাফিরকে দেখে তাকে বললেন:
'এখানে শুয়ে আছেন। আমার মেহমান হোন না কেন?'
আবূ যর সম্মতি দিলেন, মেহমান হিসেবে আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাড়িতে রাত্রি যাপন করতে গেলেন। পারস্পরিক কুশল বিনিময় ছাড়াই রাত কাটালেন। সকালে আবু যর পানির মশক ও তার অন্যান্য পাথেয় নিয়ে মসজিদে হারামে চলে এলেন। দ্বিতীয় দিনও আবূ যর মসজিদে হারামেই কাটালেন; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখা পেলেন না। এ রাতেও তিনি মসজিদে হারামেই ঘুমিয়ে পড়লেন। সে রাতেও আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নজরে পড়লে তিনি আবূ যরকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'আপনি কি এখনো গন্তব্য স্থানের সন্ধান পাননি?'
একথা বলে তাকে গতরাতের মতো এ রাতেও মেহমান হিসেবে নিজ বাড়িতে আনলেন। সে রাতেও তারা পরস্পরকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না। তৃতীয় রাতেও আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মেহমান হলেন আবু যর গিফারী। এবার আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ যরকে জিজ্ঞাসা করলেন: 'সম্মানিত অতিথি, কী উদ্দেশ্যে আপনি মক্কা এসেছেন, অনুগ্রহ করে বলবেন কি?'
আবূ যর বললেন: 'যদি আমাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, আমি যেখানে যেতে চাই সেখানে পৌছে দেবেন, তাহলে বলতে পারি।'
আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে সে প্রতিশ্রুতি দিলে আবূ যর গিফারী বলতে লাগলেন: 'বহুদূর থেকে মক্কায় এসেছি, নতুন নবীর সাথে দেখা করে তাঁর ওপর অবতীর্ণ কিছু আয়াত শোনার উদ্দেশ্যে।'
একথা শোনামাত্রই আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মন খুশিতে ভরে উঠল। তিনি বললেন : 'আল্লাহর শপথ! তিনি অবশ্যই আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, অবশ্যই আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, অবশ্যই আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। সকালে আপনি আমাকে অনুসরণ করে চলবেন। যদি আপনার জন্য কোনো বিপদের আশঙ্কা করি, তাহলে আমি পানি ফেলানুর ভান করব। আর যখন ফের চলা আরম্ভ করব, আপনিও আমাকে অনুসরণ করে চলতে থাকবেন এবং আমি যেখানে প্রবেশ করব, আপনিও সেখানে প্রবেশ করবেন।'
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াত এবং তাঁর ওপর অবতীর্ণ আয়াত শ্রবণের আকাঙ্ক্ষায় সারা রাত আবূ যরের ঘুম হলো না। সকালে আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর মেহমানকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাড়ির দিকে রওনা হলেন এবং আবু যর তাঁকে অনুসরণ করে চললেন এবং কোনো দিকে না তাকিয়ে আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে গিয়ে হাজির হলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেকে উদ্দেশ্য করে বললেন: 'আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ!'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও উত্তরে বললেন: 'ওয়া আলাইকাসসালামু ওয়া রাহমাতুহু ওয়াবারাকাতুহু।'
আবু যর ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি, যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বপ্রথম সালাম দেন এবং তখন থেকেই ইসলামের এই সালামপ্রথা মুসলমানদের মধ্যে প্রচার ও প্রসার লাভ করে।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ যরকে পবিত্র কুরআনের অংশবিশেষ তিলাওয়াত করে শোনান এবং ইসলামের দাওয়াত পেশ করলে তিনি সাথে সাথে কালেমা শাহাদাত পাঠের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁকে নিয়ে মুসলমানের সংখ্যা দাঁড়াল তখন ৩-৪ বা ৪-৫ জন মাত্র।
আবু যর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইসলাম গ্রহণের পরের ঘটনা তাঁর ভাষায়ই এখন আমরা জানতে পারব। আবু যর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'ইসলাম গ্রহণের পর মক্কাতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অবস্থান করতে থাকি। তিনি প্রতিদিন আমাকে ইসলামের শিক্ষা দান করতেন ও আল কুরআনের অবতীর্ণ কিছু অংশ হিয্য করাতেন।'
তিনি আমাকে বললেন:
'মক্কায় তোমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ কাউকে জানতে দিও না। কেননা, আমি আশঙ্কা করছি, তারা তোমাকে হত্যা করে ফেলবে।'
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে আরয করলাম : 'যে সত্তার হাতে আমার জীবন, সেই সত্তার শপথ করে বলছি, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত মক্কা ত্যাগ করব না; যতক্ষণ না মসজিদে হারামে উপস্থিত হয়ে কুরাইশদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত না দেব।'
আমার একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব রইলেন। মসজিদে হারাম বা খানায়ে কা'বায় এসে দেখতে পেলাম, কুরাইশনেতারা আসর জমিয়ে পরস্পরে গল্পে ব্যস্ত। আমি তাদের ভিতরে ঢুকে পড়লাম এবং উচ্চৈঃস্বরে বললাম:
'হে কুরাইশগণ জেনে রাখো। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, 'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রেরিত রাসূল।'
আমার আওয়াজ তাদের কানে পৌছামাত্রই তারা তাদের গল্পের আসর ত্যাগ করে আমার দিকে ছুটে এসে বলতে থাকে, ধর্মচ্যুত এই ব্যক্তিকে আজ জনমের শিক্ষা দেওয়া উচিত। এ বলে তারা সম্মিলিতভাবে আমার ওপর এমনভাবে চড়াও হয় যে, তাতে আমি মৃত্যুর সম্মুখীন হই। এ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব আমাকে রক্ষা করার লক্ষ্যে দৌঁড়ে আসেন এবং তাদের হাত থেকে আমাকে ছাড়িয়ে নেন ও কুরাইশদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন:
'তোমরা নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংস ও বিপদ টেনে আনছ। গিফার গোত্রের এ লোককে মেরে ফেলতে চাচ্ছ? অথচ তাদের নাকের ডগার ওপর দিয়ে তোমাদের তেজারতী কাফেলা যাতায়াত করে! তোমরা তাকে আমার হাতে ছেড়ে দাও।'
উত্তেজনা প্রশমিত হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফিরে আসি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার রক্তাক্ত অবস্থা দেখে বললেন:
'তোমাকে কি ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জানাতে নিষেধ করিনি?'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উত্তর দিলাম:
'হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য এ ঘোষণা দেওয়া প্রয়োজন ছিল।'
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন:
'তোমার গোত্রের লোকদের মাঝে চলে যাও, যা কিছু দেখলে ও শুনলে, তা তাদের জানাও এবং তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে থাক। আশা করছি, দাওয়াত সম্প্রসারিত হবে এবং এর জন্য আল্লাহ তোমাকেও উত্তমভাবে পুরস্কৃত করবেন। তুমি যখন জানতে পারবে যে, আমি প্রকাশ্যভাবে দীনের আহ্বান জানাচ্ছি ও দীনের বিজয় হয়েছে, তখন তুমি আমার নিকট চলে এস।'
অতঃপর আমি আমার গোত্রের লোকজনের নিকট চলে আসি। প্রথমে আমার ভাই আনিস আমার সাথে সাক্ষাৎ করে বলে: 'কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?'
উত্তর দিলাম: 'সিদ্ধান্ত এই যে, তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি ও ইসলাম গ্রহণ করেছি।'
মুহূর্তের মধ্যে আল্লাহ তার অন্তরও ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দিলেন। সেও বলে উঠল: 'আমাদের পৌত্তলিক ধর্মের অসারতায় আমার মোটেই মন বসছে না। তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে আমিও ইসলাম গ্রহণ করছি।'
অতঃপর আমরা আমাদের মায়ের নিকট গেলাম। তাঁকেও ইসলামের দাওয়াত দিলাম। তিনিও আমাদের দু'জনের দীনের প্রতি আন্তরিকতার পরিচয় দিয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলেন। সেদিন থেকেই আমাদের পরিবার একটি মুসলিম পরিবার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। গিফার গোত্রের অন্যান্য লোকদেরকেও আল্লাহর পথে আহবান জানাতে থাকলাম। গিফার গোত্রের বিরাট জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয় এমনকি তারা জামাআতের সাথে নামায কায়েম করতে থাকে। সে গোত্রের আবার অনেকেই শর্ত আরোপ করে যে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের ধর্ম ত্যাগ করব না, যতদিন না রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করলে, তারা ইসলাম গ্রহণ করে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উদ্দেশ্যে বলেন: 'আল্লাহ গিফার গোত্রকে ক্ষমা করুন। আর আসলাম গোত্রকে আল্লাহ শান্তি ও নিরাপত্তা দান করুন।'
আবূ যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর নিজ পল্লির গিফার গোত্রেই বসবাস করতে থাকেন। সেখানে বসবাসকালেই বদর, ওহুদ ও খন্দক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। খন্দক যুদ্ধের পর তিনি মদীনায় আগমন করেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য লাভের জন্য অন্য সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সার্বক্ষণিক খিদমতে নিয়োজিত থাকার অনুমতি প্রার্থনা করলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে তার পবিত্র সংশ্রবের নিয়ামত থেকে তৃপ্ত হওয়ার অনুমতি প্রদান করেন। তিনিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সার্বক্ষণিক খিদমতের মাধ্যমে নিজেকে ধন্য করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ যর গিফারীকে অন্য সবার ওপর যেমন প্রাধান্য দিতেন, তেমনি তাঁকে সবচেয়ে বেশি সম্মানও করতেন। তাদের পরস্পরে এমন কোনো সাক্ষাৎ সংগঠিত হতো না, যে সাক্ষাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথে মোছাফাহা না করতেন, কিংবা মুচকি হাসির সাথে তাঁকে খোশ আমদেদ না জানাতেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকাল তাঁকে অস্বাভাবিকভাবে পীড়া দেয়। তাঁর মহান নেতার হেদায়াতের মজলিশ ও পবিত্র সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তাঁর মন ভেঙে যায়। পরিশেষে আবূ যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মদীনা মুনাওয়ারা ত্যাগ করে সিরিয়ায় এক গ্রামে গিয়ে বসবাস আরম্ভ করেন। আবূ বকর সিদ্দীক ও ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার খিলাফতের সময়ে তিনি সেখানেই অবস্থান করেন।
উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতের সময় আবু যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেখান থেকে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে চলে আসেন। দামেস্কের মুসলমানদের অসাধারণ বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণা ও ধন-দৌলতের প্রতি তীব্র মোহের অবস্থা দেখে তিনি অস্থির হয়ে পড়েন এবং কঠোর ভাষায় তাদের এই নৈতিক অধঃপতনের প্রতিবাদ জানাতে থাকেন; কিন্তু জনসাধারণ তাঁর আহবানে সাড়া না দিয়ে বিরুদ্ধাচরণে অবতীর্ণ হয়। এ অবস্থা দেখে উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে মদীনা মুনাওয়ারায় ডেকে পাঠালেন। খালীফাতুল মুসলিমীনের আহবানে সাড়া দিয়ে তিনি মদীনায় চলে আসেন। কিন্তু দেখতে না দেখতে এখানকার জনসাধারণের প্রতি তাদের বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণা ধন-দৌলতের প্রতি মোহের কারণে বিতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেন এবং জনসাধারণও নিজেদের সংশোধন না করে তাকে চরমপন্থী হিসেবে অপবাদ দিতে থাকে।
পরিশেষে, উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে মদীনা শহরের পরিবেশ থেকে সামান্য দূরে ‘আর রাবযা’ নামক একটি ছোট গ্রামে গিয়ে বসবাস করার নির্দেশ দিলেন। তিনিও শহরাঞ্চলের জনপদ থেকে দূরে ‘আর রাবযা’ গ্রামে গিয়ে দুনিয়ার ধন-সম্পদের চাকচিক্য থেকে দূরে থেকে ইবাদত-বন্দেগীতে ডুবে গেলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম ও দ্বিতীয় খলীফাদের মতো দুনিয়া ত্যাগী ও পরকালমুখী জীবন যাপন করতে লাগলেন।
একবার এক ব্যক্তি তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর ঘরের ভেতরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে থাকে। কিন্তু তাঁর ঘরে কোনো আসবাবপত্র ও সাজ-সরঞ্জাম না দেখে আবু যর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে জিজ্ঞাসা করে :
‘হে আবূ যর! আপনার ঘরের আসবাবপত্র কোথায়?।'
তিনি উত্তর দিলেন : ‘সেখানে (আখিরাতে) আমাদের আর একটা বাড়ি আছে, ভালো ভালো ফার্নিচার ও জিনিসগুলো আমরা সেখানেই পাঠিয়ে দেই।'
সে ব্যক্তি আবু যর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে আবার জিজ্ঞাসা করণ : ‘দুনিয়ায় যতদিন আছেন, জীবনযাপনের জন্য তো অত্যাবশ্যকীয় কিছু বস্তু তো নিশ্চয়ই প্রয়োজন?'
আবু যর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তর দিলেন : ‘কিন্তু বাড়ির মালিক তো আমাদের এ বাড়িতে থাকতে দেবেন না এবং সহসাই সেখানে পাঠিয়ে দেবেন।'
একবার সিরিয়ার গভর্নর তাঁর খিদমতে ৩০০ স্বর্ণমুদ্রা পাঠিয়ে আরয করেন : ‘আপনার প্রয়োজনীয় খরচাদিতে স্বর্ণমুদ্রাগুলো ব্যয় করতে অনুরোধ করছি।'
আবু যর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সিরিয়ার গভর্নরকে ঐ মুদ্রাগুলো ফেরত দিয়ে বললেন : ‘সিরিয়ার গভর্নর কি আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আমার চেয়েও দুর্বল ও নিকৃষ্টতম কাউকে পাননি?'
হিজরী ৩২ সনে এই বুযর্গ ও আবেদ সাহাবী ইহলোক ত্যাগ করে জান্নাতবাসী হন। তাঁর সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন: مَا أَقَلَّتِ الغبراء وَلا أَظَلَّت الخَضْرَاء مِنْ رَجُلٍ أَصْدَقَ مِنْ أَبِي ذَرٍ.
'আসমানের নিচে এ পৃথিবীতে আবূ যরের চেয়ে অধিক সত্যবাদী কোনো ব্যক্তির জন্ম হয় নাই।'
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ-আস্সায়াদাহ সংস্করণ-৩য় খন্ড, ৬০-৬৩ পৃ.। ২. আল ইসতিআব-হায়দরাবাদ সংস্করণ-২য় খন্ড, ৬৪৫-৬৪৬ পৃ.। ৩. তাহযীবুত তাহজিব-২য় খণ্ড, ৪২০ পৃ.। ৪. তাজরীদ আসমাউস সাহাবা-২য় খণ্ড, ১৭৫ পৃ.। ৫. তাজকিরাতুল হুফ্যাজ-১ম খণ্ড, ১৫-১৬ পৃ.। ৬. হুলিয়াতুল আওলিয়া-১ম খণ্ড, ১৫৬-১৭০ পৃ.। ৭. সিফাতুস সাফওয়া-১ম খণ্ড, ২৩৮-২৪৫ পৃ.। ৮. তাবাকাতুস শা'রানী-৩২ পৃ.। ৯. আল মা'আরিফ-১১০-১১১ পৃ.। ১০. শাজারাতুজ্জাহাব -১ম খণ্ড, ৩৯ পৃ.। ১১. আল ইবরু-১ম খণ্ড, ৩৩ পৃ.। ১২. যু আমাউল ইসলাম-১৬৭-১৭৩ পৃ.।