📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 সালমান আল ফারেসী (রাঃ)

📄 সালমান আল ফারেসী (রাঃ)


'সালমান আল ফারেসী আহলে বাইত অর্থাৎ নবী পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত।' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)

এটি আল্লাহর সন্ধানে হকের তালাশে অবিস্মরণীয় ঘটনা। ঘটনাটি ঘটেছে সালমান আল ফারেসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর জীবনে। মহান আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট এবং তিনিও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।

যেহেতু এ ঘটনার ব্যাপারে তাঁর অনুভূতি অত্যন্ত গভীর এবং বর্ণনাও বস্তুনিষ্ঠ ও চিত্তাকর্ষক। সেহেতু নিজের জীবন সম্পর্কে সালমান আল ফারেসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিজের বক্তব্য হুবহু এখানে তুলে ধরা হলো।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সালমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'আমি ইরানের ইস্পাহান প্রদেশের 'জাইয়ান' গ্রামের এক যুবক। আমার পিতা ছিলেন সেই গ্রামের সর্দার। ধন-দৌলতে এই গ্রামের মধ্যে তাঁর যেমন কোনো জুড়ি ছিল না, তেমনি সামাজিক মর্যাদায়ও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
জন্মের পর থেকেই আমি ছিলাম এ পৃথিবীতে আমার পিতার সর্বাধিক স্নেহধন্য সন্তান। দিন দিন এ আদর এতই প্রগাঢ় হতে থাকে যে, মেয়েদের মতো তিনি আমাকেও ঘরের চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখতে পছন্দ করতেন।'

আমি অগ্নি পূজারী হিসেবেই নিজ ধর্মের উপর লেখাপড়া ও নিষ্ঠার সাথে আরাধনা-সাধনা করতাম। গির্জায় আলো জ্বালানোর দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার কারণে প্রতিদিন সকালে অগ্নিশিখা জ্বালাতাম। দিন বা রাতের কোনো সময়েই যাতে এ শিখার অগ্নি নিভে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হতো আমাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে।

গ্রামে আমার পিতার বিরাট শস্য খামার ছিল। সেখান থেকে আমাদের প্রচুর শস্য আসত। আমার পিতা শস্য কেটে নিয়ে আসতেন এবং নিজেই তার রক্ষণাবেক্ষণ করতেন।

একবার তিনি অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে আমাকে বললেন: 'তোমার আজ খামারের দেখাশোনার কাজে যেতে পারলে ভালো হয়।'

তার কথামতো আমি খামারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। বেশ কিছু রাস্তা অতিক্রম করার পর হঠাৎ গির্জায় আরাধনারত খ্রিস্টানদের প্রার্থনার আওয়াজ আমার কানে আসে। খ্রিস্টানদের ধর্ম-কর্ম সম্পর্কে আমার কিছুই জানা ছিল না। আমি অন্য ধর্মাবলম্বীদের সম্পর্কেও কিছু জানতাম না। কারণ, আমাকে লোকজনের সাথে মেলামেশা করতে দেওয়া হতো না, বরং বলা যায় স্নেহের বাঁধনে আটকে রাখা হয়েছিল। তাই গির্জায় প্রার্থনারত খ্রিস্টানদের প্রার্থনার আওয়াজ শুনে কৌতূহল জাগল, ওরা কী করছে, কী বলছে তা দেখা ও শোনার। এই কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে গির্জায় প্রবেশ করি। তাদের অনুষ্ঠানের সবকিছু খুবই মনোযোগের সঙ্গে দেখি। তাদের আরাধনা অনুষ্ঠান আমার খুব ভালো লাগে।

এ ঘটনাই আমাকে খ্রিস্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করে। মনে মনে বললাম: 'আমাদের অগ্নি পূজা থেকে খ্রিস্টান ধর্মই তো অনেক ভালো।'

তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান দেখে আমি সারাদিন পার করে দিলাম। খামারে আর যাওয়া হলো না। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম: 'এ ধর্মের কেন্দ্রীয় দফতর কোথায়?'

তারা জানাল : 'সিরিয়া।'

রাত ঘনিয়ে এলে আমি এখান থেকেই বাড়ি ফিরি। সারাদিনের কাজকর্মের হিসাব চাইলেন আমার পিতা। আমি বললাম:

'বাবা, আমি খামারে যাবার পথে কিছু লোককে দেখতে পাই, তারা গির্জায় আরাধনা করছিল। তাদের ধর্মের এ সকল কার্যাবলী আমাকে মুগ্ধ করে ফেলে। সবকিছু ভুলে আমি সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানেই সময় কাটিয়েছি।'

আমার এমন উত্তর শুনে আমার পিতা অত্যন্ত ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি বললেন:
'বৎস! সে ধর্মে কোনো কল্যাণ নেই, শুধু তোমার ও তোমার পিতার ধর্মই সর্বোৎকৃষ্ট ও কল্যাণকর।'

আমি বললাম : 'খোদার শপথ! তা হতেই পারে না, তাদের ধর্ম অবশ্যই আমাদের ধর্ম থেকে উত্তম।'

একথা শুনে আমার পিতা আরো ভয় পেয়ে গেলেন। নিজ ধর্ম ত্যাগ করে আমি ধর্মান্তরিত হই কি না এই আশঙ্কায় তিনি আমার দু'পায়ে বেড়ি পরিয়ে গৃহবন্দী করে রাখলেন। কিন্তু আমি প্রথম সুযোগেই সেই খ্রিস্টানদের কাছে সংবাদ পাঠালাম : 'সিরিয়ার উদ্দেশ্যে যদি কোনো কাফেলা তোমাদের এখানে আসে, তাহলে আমাকে সংবাদ দিও।'

কয়েক দিনের মধ্যেই সিরিয়ার উদ্দেশ্যে এক কাফেলা তাদের গির্জার কাছে তাঁবু খাটায়। এ সংবাদ আমার কাছে পৌঁছানো হয়। আমিও পায়ের বেড়ি ছিন্ন করে নিজেকে মুক্ত করে বাড়ি ত্যাগ করলাম এবং গোপনে তাদের সাথে রওয়ানা হলাম। এমনকি, শেষ পর্যন্ত সিরিয়ায় পৌঁছলাম। সিরিয়ায় উপস্থিত হয়ে আমি খ্রিস্টান ধর্মের সবচাইতে বড় পাদ্রীর খোঁজ করলাম।

তাদের অনেকেই জানাল 'বিশাপ হলেন বড় পাদ্রি।'

তাঁর খিদমতে হাজির হয়ে বললাম: 'আমি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছি। এখন আমি আপনার সাথে থেকে আপনার খিদমত করতে চাই। ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে চাই এবং আপনার সাথে আরাধনা করার সুযোগ লাভ করতে চাই।'

তিনি বললেন: 'গির্জায় প্রবেশ করো।'

আমি গির্জায় প্রবেশ করলাম এবং তার খিদমতে নিজেকে নিয়োজিত রাখলাম।

এভাবে কিছুদিন অতিবাহিত করার পর আমি বুঝতে পারলাম, এই পাদ্রি ভালো লোক নয়, বরং লোভী ও প্রতারক। তিনি তাঁর অনুসারীদের দান-খয়রাত করার নির্দেশ দিতেন এবং এ কাজে অনেক পুণ্য হবে বলে তাদের উদ্বুদ্ধ করতেন। তার কথায় আস্থা স্থাপন করে ভক্তরা প্রচুর অর্থ তাকে দিত; কিন্তু সেসব অর্থ দীন-দুঃখীদের না দিয়ে তিনি নিজের জন্য রেখে দিতেন। এভাবে তিনি ভক্তদের দানের সোনা-রূপা দিয়ে নিজের জন্য বিরাট সঞ্চয় গড়ে তোলেন। বড় বড় সাত পিপা ভরে উঠল সোনা-রূপা। এসব কাণ্ড দেখার পর পাদ্রির ওপর আমার কোনো আস্থা আর অবশিষ্ট রইল না; বরং তার ওপর আমি ভীষণ ক্ষুব্ধ হলাম। তিনি যেদিন মারা গেলেন, সেদিন তার দাফন-কাফনের জন্য দূর-দূরান্ত থেকেও খ্রিস্টানরা এসে জড়ো হলো। আমি তাদের বলে দেই:

'আপনাদের এই পাদ্রি কিন্তু খুব খারাপ ও পুরোদস্তুর প্রতারক। তিনি লোকদের দান-খয়রাত করতে বলতেন এবং এ কাজে সবাইকে উদ্বুদ্ধও করতেন। যারা তার কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দান করত, তাদের দানের একটি কানাকড়িও গরীব-দুঃখীদের দান করতেন না; বরং তা নিজের জন্য সঞ্চয় করে রাখতেন।'

উপস্থিত ভক্তদের অনেকে আমার কাছে জানতে চাইলেন, এসব আমি কিভাবে জানলাম। আমি বললাম:
'চলুন আমার সাথে, আমি তার সঞ্চিত ধন-ভাণ্ডার আপনাদের দেখিয়ে দিচ্ছি।'

তারা বলল:
'ঠিক আছে। তবে তাই হোক।' পাদ্রির গোপন ধনভাণ্ডার আমি তাদের দেখিয়ে দিলাম। তারা সেখান থেকে পিপাভর্তি সোনা ও রূপা উদ্ধার করল।

এসব দেখে তারা বলল:
'খোদার কসম, আমরা এই খারাপ ব্যক্তিকে দাফন করতে পারি না। দাফনের পরিবর্তে তাকে শূলে চড়িয়ে পাথর নিক্ষেপ করব।' তারা তা-ই করল।

কিছুদিন যেতে না যেতেই এই পাদ্রির স্থানে নতুন এক পাদ্রিকে নিয়োগ দেওয়া হলো। আমি নিজেকে তাঁর খিদমতে নিয়োজিত করলাম। দিন-রাতের অধিকাংশ সময় তিনি ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। তিনি ছিলেন দুনিয়াত্যাগী সাধক। আখিরাতের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল অনুরাগ। আমি এমন নিষ্ঠাবান পাদ্রি আর দেখিনি। আমি তাঁকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভালো বাসতাম। তাঁর সাথে আমি বহুদিন কাটিয়েছি।

তাঁর মৃত্যুর সময়ে আমি তাঁর কাছে আবেদন করলাম :
'মুহতারাম! আপনার পর আমি কার সান্নিধ্যে থেকে জীবন অতিবাহিত করব? আপনি আমাকে কার অনুগত হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন?'

তিনি বললেন : 'হে বৎস! আমার জানামতে মাওসেল শহরে এক ব্যক্তি আছেন, যিনি দীনকে কাটছাঁট করেননি। আমি তাঁকে ছাড়া আর কাউকে দেখছি না, তুমি তার কাছেই চলে যাও।'

অতঃপর এই সাধকের মৃত্যু হলে আমি 'মাওসেলের' সেই পাদ্রির কাছে চলে যাই এবং তাঁর কাছে বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করে আবেদন করি:

'সেই সাধক মৃত্যুকালে আপনার সাথে মিলিত হওয়ার জন্য আমাকে অসিয়ত করেছেন। একমাত্র আপনিই খ্রিস্টান ধর্মকে সঠিকভাবে ধরে রেখেছেন। এ কারণে আপনার খিদমতে আমার উপস্থিতি।'

তিনি বললেন:
'তুমি আমার কাছেই থাক।'

আমি তাঁর কাছে থাকি এবং তাঁকেও সঠিক পথের দিশারী হিসেবে দেখতে পাই; কিন্তু কিছুদিন পর তিনিও ইনতিকাল করলেন।

আমি তাঁর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে আবেদন করলাম : 'মুহতারাম! বুঝতে পারছেন যে, আপনার জীবন শেষ হয়ে এসেছে। আপনি আমার ব্যাপারে সবকিছুই জানেন। আপনার মৃত্যুর পর আমাকে কার খিদমতে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন?'

তিনি বললেন : 'বৎস 'নাছিবাইন' নামক স্থানের এক পাদ্রি ছাড়া আর কেউ নিজ দীনের অনুসরণে নেই। তার মতো আর কেউ এভাবে দীনের অনুসরণ করছে বলেও আমার মনে হয় না। সম্ভব হলে তুমি তার সান্নিধ্যে চলে যেতে পার।'

অতঃপর এ সাধকের মৃত্যু হলে আমি 'নাছিবাইন' নামক স্থানের সেই পাদ্রির সাথে সাক্ষাৎ করে আমার পূর্ববর্তী সাধকের অসিয়ত ও নিজ বিষয়ে বিস্তারিত জানাই। তিনিও আমাকে তাঁর সাথে অবস্থান করার অনুমতি দিলেন। তাঁকেও আমি অপর দুই পাদ্রির মতো খোদাভীরু পেলাম। কিছুদিন পর তিনিও ইনতিকাল করেন।

মৃত্যুর পূর্বকালে তাঁর নিকটও আগের মতো আবেদন করলাম :
'আমার ব্যাপারে আপনি ভালো করেই জানেন। আপনার পর এখন কার সাহচর্যে থাকব?'

তিনি বললেন : 'হে বৎস! খোদার শপথ করে বলছি, 'আম্মুরিয়ার' এক ব্যক্তি ছাড়া দ্বিতীয় আর কেউ সঠিকভাবে খ্রিস্টধর্মে কায়েম আছে বলে আমার জানা নেই। তুমি তার সাহচর্যে নিজেকে নিয়োজিত কর।'

এবার আমি 'আম্মুরিয়ার' সেই পাদ্রির খিদমতে উপস্থিত হয়ে তাঁকে আমার বিষয়ে বিস্তারিত জানালাম। তিনি আমাকে তাঁর সাথে থাকার অনুমতি দিলেন। আমি তখন থেকে তার খিদমতেই লেগে গেলাম। খোদার শপথ করে বলছি যে, তিনি তাঁর ঐসব সঙ্গী-সাথীদের মতোই হেদায়াতের উত্তম পথের পথিক ছিলেন। তাঁর থেকে আমি অনেক গাভী ও বকরি তোহফা হিসেবে লাভ করি। কিছুদিন পর তিনিও ইনতিকাল করলেন।

তার মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও তার কাছে নিবেদন করি : 'আপনি আমার ব্যাপারে বিস্তারিত জানেন, অতএব আপনি আমাকে কার সাহচর্য লাভের পরামর্শ দেন বা আমার করণীয় বিষয়ে কিইবা নির্দেশ দিচ্ছেন?'

তিনি বললেন : 'বৎস! আমার বিশ্বাস, আমরা যারা খ্রিস্টধর্মে আছি, তাঁদের কেউই ধর্মের ওপর সঠিকভাবে নেই। কিন্তু সে সময় অতি নিকটবর্তী, যে সময়ে ইবরাহীম আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীনের অনুসারী একজন নবীর আবির্ভাব ঘটবে। তিনি তাঁর জন্মভূমি থেকে দুই প্রান্তরে কালো পাথরে ঘেরা খেজুর বাগানের জন্য প্রসিদ্ধ ইয়াসরিব এলাকায় হিজরত করবেন। তাঁর কিছু প্রকাশ্য নিদর্শন থাকবে। তাঁর খিদমতে হাদীয়া পেশ করলে তিনি তা নিজের জন্য গ্রহণ করবেন। কিন্তু সদকা ও যাকাত কখনোই নিজের জন্য গ্রহণ করবেন না। তাঁর পিঠে থাকবে নবুওয়াতের মোহর বা ছাপ। যদি পার সে দেশে গিয়ে তাঁর সাথে মিলিত হবে।'

অতঃপর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন; কিন্তু আমি আম্মুরিয়াতেই অনেক দিন অবস্থান করলাম। অবশেষে 'কালব' গোত্রের একটি আরব বাণিজ্য কাফেলা এখান দিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় আমি তাদের কাছে আবেদন করি : 'যদি আরবের উদ্দেশ্যে আমাকে আপনাদের সাথে নিয়ে যান, তাহলে আমার গাভী ও বকরিগুলো আপনাদের দিয়ে দেব।'

তারা এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে বললেন : 'হ্যাঁ, আমরা আপনাকে সাথে নেব।'

ওয়াদা মোতাবেক আমি আমার গাভী ও বকরি তাদের দিয়ে দিলাম এবং তারা আমাকে তাদের সঙ্গে নিল। কিন্তু সিরিয়া ও মদীনার মাঝে 'ওয়াদীয়ে কুবা' নামক স্থানে এসে তারা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাকে একজন ইহুদীর কাছে বিক্রি করে দিল। বাধ্য হয়ে এই ইহুদীর খিদমতে নিয়োজিত হলাম। কিছুদিন পর উক্ত ইহুদীর এক ভাইপো (যিনি 'বনু কুরাইযা' গোত্রের লোক) এ বাড়িতে বেড়াতে এসে আমাকে তার কাছ থেকে কিনে নেয়। এভাবেই সে আমাকে 'ইয়াসরিব' নামক স্থানটিতে নিয়ে এল। এখানে এসেই খেজুর বাগান সমৃদ্ধ সেই স্থান দেখতে পেলাম, যার কথা আম্মুরিয়ার সেই পাদ্রি আমাকে বলে দিয়েছিলেন এবং বর্ণিত সেই মদীনা মুনাওয়ারারও সন্ধান পেলাম, যার প্রশংসা শুনেছি। এভাবে আমি এখানে পৌঁছে সেই ইহুদীর ভাইপোর খিদমতে নিয়োজিত থাকলাম।

এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাতেই অবস্থান করে কুরাইশদের আল্লাহর দীনের দাওয়াত দিচ্ছিলেন। আমার গোলামি বা দাস জিন্দেগী থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য মুক্তিপণের যে অংক নির্ধারিত করা হয়েছিল তা সংগ্রহ করার জন্য আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খবরাদি সংগ্রহ করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না।

কিছুদিন পরেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াসরিবে হিজরত করে আসেন। আমি এ সময় আমার মালিকের খেজুর গাছের মাথায় উঠে কিছু কাজ করছিলাম। আর আমার মালিক গাছের নিচে বসেছিলেন। এমন সময় সেখানে মালিকের ভাইপো এলেন এবং তাকে বলতে লাগলেন:

'আউস এবং খাযরাজ গোত্রের নবীকে আল্লাহ ধ্বংস করুক। তারা সবাই এখন কোবাতে একত্রিত হয়েছে এমন এক ব্যক্তিকে দেখার জন্য, যে নিজেকে নবী দাবি করে মক্কা থেকে হিজরত করে এসেছে।'

এ সংবাদ শোনামাত্রই আমার শরীরে যেন জ্বর এসে গেল। আমি তখন ভীষণভাবে কাঁপছিলাম। আমার ভয় হচ্ছিল যে, আমি মালিকের মাথার উপরই পড়ে না যাই। দ্রুত আমি খেজুর গাছ থেকে নেমে পড়ি এবং তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসা করি, আপনি কী বলছিলেন? সেই সংবাদটির পুনরাবৃত্তি করুন না। আমার মালিক এতে ভীষণভাবে রেগে গেলেন এবং আমাকে সজোরে চপেটাঘাত করে বললেন:

'তোমার এতে কী আসে যায়? যাও যে কাজ করছিলে সে কাজে ফিরে যাও।'

আমার মালিকের এ দুর্ব্যবহার নীরবে সহ্য করে পরে একসময় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্ধানে আমি কিছু খেজুর নিয়ে সাক্ষাৎ করার জন্য রওয়ানা হলাম। তাঁর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললাম :

'যতদূর জেনেছি, আপনি একজন ভালো লোক, আপনার সাথী-সঙ্গীরা গরীব এবং অভাবী। এই সামান্য কিছু সদকার জন্য ছিল। মনে করলাম যে, অন্যের চেয়ে আপনিই এর উত্তম হকদার। এই বলে খেজুরগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে পেশ করলাম।'

তিনি তাঁর সাহাবীদের বললেন: 'তোমরা খাও।'

তিনি তাঁর হাত সেদিকে সম্প্রসারণ করলেন না এবং এ খেজুর খেলেন না। আমি তা দেখে মনে মনে ভাবলাম, এটি একটি নিদর্শন। সেদিন তাঁর খিদমত থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম এবং আরো কিছু খেজুর সংগ্রহ করার কাজে লেগে গেলাম। ইতোমধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোবা থেকে মদীনা মুনাওয়ারাতে চলে গেলেন। আমি আবার মদীনায় তাঁর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করি:

'আমি সেদিন দেখলাম, আপনি সদকা খান না। তাই আজ আপনার সম্মানে কিছু হাদিয়া এনেছি।'

এবার তিনি তা খেলেন এবং সঙ্গীদেরও খেতে বললেন। তারাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে খেলেন। মনে মনে বললাম, এটি দ্বিতীয় নিদর্শন।

আমি যখন তৃতীয় বার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হই, তখন তিনি জান্নাতুল বাকীতে 'গারকাদ' নামক স্থানে তাঁর কোনো এক সাহাবীর দাফনকার্য সম্পন্ন করছিলেন। তিনি সেখানে দু-দুটি বিশেষ ধরনের আরবী চাদর বা গাউন মুড়ি দিয়ে বসে ছিলেন। এবার তাঁকে সালাম করে তাঁর পিঠে খাতমে নবুওয়াতের সেই চিহ্ন দেখার জন্য এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিলাম, যে চিহ্নটি সম্পর্কে আম্মুরিয়ার সেই পাদ্রি আমাকে বলে দিয়েছিলেন। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিঠের দিকে বারবার তাকাচ্ছি দেখে তিনি আমার মতলব বুঝে ফেললেন। নিজ পিঠ থেকে চাদর দু'টি ফেলে দিলেন। এবার আমি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে না করতেই মোহরের ছাপ দেখে তাঁকে নবী হিসেবে চিনতে পারলাম। কালবিলম্ব না করে সে মোহরে চুম্বন দিতে লাগলাম ও আনন্দে চক্ষু দিয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আমার এ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন:

'কী ব্যাপার? তোমার কী হয়েছে?'

তখন আমি তাঁকে আমার সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। সবকিছু শুনে তিনি আশ্চর্য হলেন এবং খুশি মনে তার সাথী-সঙ্গীদেরকেও তা পুনরায় শোনানোর নির্দেশ দিলেন। আমি তাদেরও সে কাহিনী আবারও শোনাই। তারা এসব ঘটনা শুনে যেমন আশ্চর্য হলেন, তেমনি আনন্দিতও হলেন।'

সালমান আল ফারেসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দীনে হকের সন্ধানে নানা স্থানে অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে সফর করার জন্য সালাম। সালমান ফারেসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সালাম তাঁর ঈমানের দৃঢ়তার জন্য। তাকে সালাম তার মৃত্যুর দিনে এবং আখিরাতের জীবনেও।

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ (আস্সাআদাহ সংস্করণ): ৩য় খণ্ড, ১১৩-১১৪ পৃ.। ২. আল ইসতিয়াব (হায়দারাবাদ সংস্করণ): ২য় খণ্ড, ৫৫৬-৫৫৮ পৃ.। ৩. আল জরহু ওয়াত তা'দীলু ভূমিকা ১ম খণ্ড, ১ ২য় খণ্ড, ২৯৬-২৯৭ পৃ.। ৪. উসদুল গাবাহ্: ২য় খণ্ড, ৩২৮-৩৩২ পৃ.। ৫. তাহযীব আত্ তাহযীব: ৪র্থ খণ্ড ১৩৭-১৩৯ পৃ.। ৬. তাকরীবুত তাহযীব : ১ম খণ্ড, ৩১৫ পৃ.। ৭. আল জঊ বাইনা রিজালিস্ সহিহাইন: ১ম খণ্ড, ১৯৩ পৃ.। ৮. তাবাকাত আশ শ'রানী: ৩০-৩১ পৃ.। ৯. সিফাতুচ্ছাফওয়া : ১ম খণ্ড, ২১০-২২৫ পৃ.। ১০. শাজরাতুযযাহাব: ১ম খণ্ড, ৪৪ পৃ.। ১১. তারিখুল ইসলাম লিষ যাহাবী : ২য় খণ্ড, ৫৮-১৬৩ পৃ.। ১২. শিয়ারু আলাম আন নুবালা ১ম খণ্ড, ৩৬২-৪০৫ পৃ.।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 ইকরামা ইবনে আবী জাহল (রাঃ)

📄 ইকরামা ইবনে আবী জাহল (রাঃ)


'কিছুক্ষণের মধ্যে ইকরামা মুমিন ও মুহাজির হিসেবে আগমন করবে, তোমরা তার পিতাকে গালি দেবে না। কারণ, মৃতকে গালি দিলে তা মৃতদের কাছে পৌছে না; কিন্তু জীবিতরা তাতে কষ্ট পায়।' 'স্বাগতম হে অশ্বারোহী মুহাজির, স্বাগতম'। - নবী করীম (সা)-এর স্বাগত বাণী

ইকরামার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে শেষ দিকের ঘটনাসমূহের অন্যতম। রহমতের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীনে হক ও হেদায়াতের দাওয়াত প্রকাশ্যে শুরু করেন, তখন ইকরামা ইবনে আবী জাহলের বয়স ত্রিশের কোঠায়। তখন ইকরামা ছিল কুরাইশদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদার অধিকারী, সবচেয়ে সম্পদশালী এবং বংশগতভাবে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত।

যদি তাঁর পিতার প্রতিবন্ধকতা না থাকত, তাহলে এটাই স্বাভাবিক ছিল যে, তার সমকক্ষ অন্যান্য সম্ভ্রান্ত পরিবারের সমকক্ষ ব্যক্তিবর্গ যেমন সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, মুস'আব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু প্রমুখের মতো সেও ইসলাম গ্রহণ করত।

প্রিয় পাঠক! কে তার এই পিতা? শিরক সম্রাট, মক্কার সবচেয়ে ক্ষমতাধর, ভয়াবহ নিপীড়নকারী যে তার কঠোর কঠিন ও ভয়ঙ্কর নির্যাতনের দ্বারা মুমিনদের ঈমানের পরীক্ষায় ফেলেছিল এবং মুমিনরাও এ পরীক্ষায় ছিলেন অবিচল। সে নানা চক্রান্তের মাধ্যমে মুমিনদের ঈমানকে চ্যালেঞ্জ করে চললে মুমিনরাও তাদের ঈমানের দৃঢ়তা ও শক্তি বার বার প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন। যার এতটুকু পরিচয়ই যথেষ্ট যে সে ছিল 'আবী জাহল।'

আর তার ছেলেই ইকরামা ইবনে আবী জাহল আল মাখযুমী। কুরাইশ বংশের হাতেগোনা কয়েকজন বীরপুরুষের অন্যতম। সুদক্ষ ঘোড়সওয়ার এবং বীর যোদ্ধা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধাচরণ ও শত্রুতামূলক আচরণের শিক্ষা সে তাঁর শিক্ষাদাতা পিতা আবী জাহলের কাছ থেকেই লাভ করেছিল। সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরম বিরোধিতায় লিপ্ত হয় এবং তাঁর সাহাবীদের ভীষণ কষ্ট দেয়। তার পিতা আবী জাহলকে সন্তুষ্ট করার জন্য মুসলমানদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানোই ছিল তার একমাত্র চিন্তা ও কাজ।

বদর যুদ্ধে তার পিতা আবী জাহল কুরাইশদের নেতৃত্ব দেয় এবং 'লাত' ও 'উয্যা' নামক মূর্তির নামে এই মর্মে শপথ করে: 'মুহাম্মদকে পরাস্ত না করে সে মক্কায় ফিরে আসবে না।'

তারপর সৈন্য-সামন্ত নিয়ে সে বদর প্রান্তরে উপস্থিত হয় এবং তিন দিন পর্যন্ত মুসলিম বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। সে অবস্থায় উট জবাই, মদ্যপান এবং নর্তকীদের নৃত্য উপভোগে নিমগ্ন থাকে।

বদর যুদ্ধে আবী জাহল মুশরিক কুরাইশদের নেতৃত্ব দান করে। তার পুত্র বীর যোদ্ধা ইকরামা ছিল তার শক্তিশালী বাহু, যার ওপর সে নির্ভর করত। 'লাত' ও 'উয্যা' আবী জাহলের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। কারণ, শোনার ক্ষমতাই তো তাদের নেই, ফলে তারা তাদেরকে সাহায্যও করতে পারেনি। তারা ছিল নিতান্তই অসহায় ও অক্ষম।

বদর যুদ্ধে আবী জাহল নিহত হলো এবং তার পুত্র ইকরামা তা নিজ চোখেই দেখল। মুসলিমদের বর্শা তার রক্ত বইয়ে দিল। পিতা আবী জাহলের শেষ আর্তনাদও পুত্র ইকরামা নিজ কানে ভালো করেই শুনেছিল।

যুদ্ধ শেষে ইকরামা কুরাইশ নেতা আবী জাহলের লাশ ফেলে রেখেই মক্কায় ফিরে আসতে বাধ্য হলো। যুদ্ধের পরাজয় আবী জাহলের লাশ মক্কায় এনে দাফন করতে তাকে অক্ষম করে দিয়েছিল। মুসলিম বাহিনীর কাছে পরাস্ত হওয়ায় পিতার লাশের সৎকাজের আশা পূরণ তো হলোই না; বরং লাশ রেখেই তাকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। বিজয়ী মুসলিম বাহিনী অগণিত লাশের সাথে আবী জাহলের লাশও 'কুলাইব' নামক একটি পরিত্যক্ত কূপে নিক্ষেপ করে মাটি চাপা দেয়।

বদর যুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে ইকরামার শত্রুতা ভিন্নরূপ পরিগ্রহ করল। প্রথম প্রথম সে পিতার মর্যাদা রক্ষা ও তাকে খুশি রাখার জন্য ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করছিল; কিন্তু তখন থেকে সে তার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ শুরু করে দিল।

ইকরামা এবং তার মতো আরো কয়েকজন যারা বদরের প্রান্তরে তাদের আত্মীয়-স্বজনের লাশ ফেলে আসতে বাধ্য হয়েছিল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে মক্কার মুশরিকদের হৃদয়-মনে নতুনভাবে শত্রুতার বহ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত করে, স্বজনহারা কুরাইশদের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। ফলস্বরূপ সংঘটিত হয় ওহুদ যুদ্ধ।

ইকরামা ওহুদ রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়লে তার সাথে তার স্ত্রী উম্মু হাকিমও যুদ্ধে অংশ নিল। যাদের নিকটাত্মীয় বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছিল তাদের স্ত্রীরাও যুদ্ধসারির পিছনে থেকে দফ বাজিয়ে ও শোকগাথা মরসিয়া গেয়ে গেয়ে অশ্বারোহী সৈন্যদের যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে, যেন তারা পশ্চাৎপসরণ না করে।

কুরাইশ বাহিনীর ব্যূহের ডানে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ এবং বামে ইকরামা ইবনে আবী জাহল অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়। এই দুই বীর যোদ্ধৃদ্বয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এবং তাঁর সাহাবীদের জন্য এক মহা পরীক্ষার অবতারণা করেন এবং যুদ্ধে মুশরিকদের জন্য অতীব মূল্যবান ভূমিকা পালন করে। আবূ সুফিয়ানের ভাষায় তা ছিল 'বদরের প্রতিশোধ'।

খন্দকের যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনী দীর্ঘদিন পর্যন্ত মদীনা অবরোধ করে রাখতে বাধ্য হওয়ায় ইকরামা ইবনে আবী জাহলের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়ে। সে কোনোভাবেই নিজেকে ধরে রাখতে পারছিল না। সে খন্দকের একটি সংকীর্ণ স্থানের সন্ধান পেয়ে সে স্থান দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল, দেখতে না দেখতেই তার জানবাজদের কয়েকজন তার পিছনে পিছনে ছুটে আসে।

পরিণতিতে আমর ইবনে আবদ উদ্দ আল আমেরী নামক চৌকশ মুসলিম প্রহরীর হাতে মুহূর্তের মধ্যে ধরাশায়ী হয় এবং ইকরামা কোনো রকমে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

মক্কা বিজয়ের দিন কুরাইশরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীদের মোকাবেলা করার সাহস না পেয়ে মক্কার প্রবেশ পথ উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের এটাও একটা কারণ ছিল যে, তারা দেখেছে কেউ আক্রমণ না করলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সেনাধ্যক্ষদের যুদ্ধ না করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু ইকরামা ইবনে আবী জাহল এবং কুরাইশদের আরো কিছু লোক এহেন শুভ সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে বিরাট মুসলিম বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছোট একটি সংঘর্ষেই তাদের পরাস্ত করেন। তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক নিহত হয় এবং বাকিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

এবার ইকরামা বিস্মিত ও অনুতপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মুসলমান কর্তৃক মক্কা বিজিত হওয়ার পর সেখানে তার জন্য আশ্রয়ের স্থান থাকে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন; কিন্তু কয়েকজন গুরুতর অপরাধী সম্বন্ধে বলেন:

'তাদেরকে খানায়ে কাবার গিলাফের ভেতরে পাওয়া গেলেও যেন হত্যা করা হয়।'

ইকরামা ইবনে আবী জাহল ছিল সেই গুটিকয়েক অপরাধী লোকের অন্যতম। তাই সে মক্কা ত্যাগ করে ইয়ামেনের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আর পালানোর জন্য ইয়ামেন ছাড়া তার দ্বিতীয় কোনো আশ্রয়স্থলও ছিল না।

এদিকে ইকরামা ইবনে আবী জাহলের স্ত্রী উম্মু হাকিম, আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা অন্য আরো দশজন মহিলার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে তাঁর হাতে বাইআত গ্রহণের জন্য উপস্থিত হয়।

এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তাঁর দুই স্ত্রী, ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এবং বনু আবদুল মুত্তালিব গোত্রের কয়েকজন মহিলা উপস্থিত ছিলেন। আবূ সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা মুখমণ্ডল আবৃত অবস্থায় আলাপের সূত্রপাত করে বলে:

'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তাআলা তাঁর পছন্দনীয় দীনকে বিজয় দিয়েছেন। এজন্য আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া। আপনার সাথে আমাদের যে রক্তের সম্পর্ক, সে সম্পর্কের কারণেই আশা করি আপনি আমাদের প্রতি দয়া করবেন, যেহেতু আমরা সবাই ঈমানদার নারী।'

এ বলে সে বোরকার নিকাব সরিয়ে বলল:
'হে আল্লাহর রাসূল! আমি হিন্দ বিনতে উতবা।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সুস্বাগতম জানিয়ে বললেন:
'মারহাবা! তোমাকে স্বাগতম!'

অতঃপর হিন্দ বিনতে উতবা বলেন:
'হে আল্লাহর রাসূল! আজ আপনার ঘরের চেয়ে আর প্রিয় কোনো ঘর আমার নেই, অথচ এই ঘরই একদিন আমার নিকট সবচেয়ে ঘৃণার ছিল।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন:
'আরো কি কেউ কিছু বলতে চাও?'

এ সুযোগে ইকরামার স্ত্রী উম্মু হাকিম ওঠে দাঁড়ায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে বলে:
'হে আল্লাহর রাসূল! ইকরামা প্রাণভয়ে ইয়ামেনের দিকে পালিয়ে গেছে। অনুগ্রহ করে তাকে ক্ষমা করে নিরাপত্তা দিন। আল্লাহ আপনাকেও নিরাপত্তা দেবেন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তাকে নিরাপত্তা দান করা হলো।'

নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে ইকরামার স্ত্রী উম্মু হাকিম সে মুহূর্তেই তাঁর স্বামীর সন্ধানে বের হয়ে পড়েন। তাঁর সাথে ছিল তাঁর রোমান ক্রীতদাস। ইয়ামেনের পথে অনেক দূর অগ্রসর হওয়ার পর ক্রীতদাসটি তাঁকে অসৎ কর্মের জন্য ফুসলাতে থাকে এবং তিনি টালবাহানার মাধ্যমেই কালক্ষেপণ করতে থাকেন।

অবশেষে, তারা এক আরব গোত্রে গিয়ে পৌঁছলে তিনি তাদের কাছে সাহায্য চান। তারা ক্রীতদাসকে বেঁধে রাখে এবং তিনি তাকে তাদের কাছে রেখে একাই ইয়ামেনের পথে অগ্রসর হতে থাকেন। অবশেষে তিনি ইকরামাকে 'তিহামা' এলাকার সমুদ্র তীরে খুঁজে পান। সে মুহূর্তে ইকরামা নৌকার মাঝির সাথে তর্কে লিপ্ত ছিল। মাঝি তাকে বলছিল:

'পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত আমি তোমাকে পার করব না।'

ইকরামা বলছিল: 'কিভাবে পবিত্র হব?'

মাঝি বলল: 'কালেমা শাহাদাত পড়ে পবিত্র হও।'

বল: 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।'

ইকরামা উত্তর দিল: 'এ কালেমার সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্যই তো আমি পালিয়েছি।'

বাদানুবাদের এক পর্যায়ে উম্মু হাকিম ইকরামার সামনে গিয়ে বললেন: 'ইকরামা! সবচেয়ে মহান, নিষ্পাপ এবং উত্তম ব্যক্তির নিকট থেকে আমি তোমার কাছে এসেছি। অর্থাৎ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর নিকট থেকে। তাঁর কাছে তোমার জন্য নিরাপত্তা চেয়েছিলাম। তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। অতএব নিজেকে আর ধ্বংসের পথে ঠেলে দিও না।'

ইকরামা বলল: 'তুমি কি তার সাথে কথা বলেছ?'

তার স্ত্রী বললেন: 'হ্যাঁ, আমি নিজেই তাঁর সাথে কথা বলেছি এবং তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দান করেছেন।'

উম্মু হাকিম তাকে নানাভাবে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছিলেন। পরিশেষে, ইকরামা ফিরে যেতে রাজি হলো। অতঃপর উম্মু হাকিম তাকে তাদের রোমান ক্রীতদাসের আচরণ সম্পর্কে অবহিত করলে সে ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সেখানে এসে তাকে হত্যা করল।

পথে তাঁরা এক স্থানে রাত যাপনকালে ইকরামা তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করলে তিনি কঠোরভাবে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে বললেন:

'তা হতে পারে না। কারণ আমি মুসলমান আর তুমি মুশরিক।'

স্ত্রীর উত্তরে ইকরামা খুবই আশ্চর্যান্বিত হয়ে যায় এবং বলে:
'যে জিনিসটি তোমার ও আমার মিলনে বাধা হতে পারে তা নিঃসন্দেহে খুবই বড় ব্যাপার।'

ইকরামা মক্কার নিকটে এসে পৌঁছতেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের বললেন:

'কিছুক্ষণের মধ্যেই ইকরামা ইবনে আবী জাহল মুমিন ও মুহাজির হিসেবে তোমাদের মধ্যে উপস্থিত হচ্ছে। তোমরা তার পিতাকে মন্দ বলো না বা গালি দিও না। কেননা মৃত ব্যক্তিকে গালি দিলে জীবিতরা কষ্ট পায়, অথচ মৃতব্যক্তি তা শুনতে পায় না।'

দেখতে না দেখতেই ইকরামা এবং তার স্ত্রী উম্মু হাকিম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে বসেছিলেন, সেখানে এসে হাজির হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে দেখেই আনন্দে গায়ে চাদরহীন অবস্থায় ওঠে তাদেরকে স্বাগতম জানান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসলে ইকরামাও তাঁর সামনে বসে পড়ে, এবং বলে যে:

'হে আল্লাহর রাসূল! উম্মু হাকিম আমাকে জানিয়েছে যে, আপনি আমাকে নিরাপত্তা দান করেছেন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দেন: 'হ্যাঁ সে ঠিকই বলেছে। তুমি এখন নিরাপদ।'

ইকরামা বলল: 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে কিসের দিকে আহ্বান করছেন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'আমি তোমাকে আহ্বান করছি এই সাক্ষ্য দিতে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁরই রাসূল, নামায কায়েম করতে এবং যাকাত দিতে।'

এভাবে তিনি ইসলামের সমস্ত রুকনগুলো এক এক করে উল্লেখ করলেন।

ইকরামা বলল: 'আল্লাহর শপথ! আপনি ন্যায় ও সত্য ছাড়া আর কিছুর আহবান জানাননি এবং ভালো কাজ ছাড়া অন্য কিছুর নির্দেশও দেননি।'

সে আরো বলল: 'ইসলামের দিকে আহবান করার আগেও আপনি একজন সত্যবাদী ও অত্যন্ত নেক লোক ছিলেন।'

অতঃপর ইকরামা বলল: 'আমি বলতে পারি, এরূপ সর্বোত্তম কথা আপনি আমাকে শিখিয়ে দিন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'তুমি বল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দাহ ও রাসূল।'

ইকরামা বলল: 'অতঃপর কী?'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : 'তুমি বল, আমি আল্লাহকে এবং তারপর উপস্থিত সবাইকে সাক্ষী রেখে ঘোষণা করছি যে, আমি মুসলিম মুজাহিদ ও মুহাজির।'

ইকরামা অনুরূপ ঘোষণাই দিলেন। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন: 'আজ তুমি চাইলে, আমি অন্যদেরকে যা দিয়েছি, তোমাকেও তার চেয়ে কম দেব না।'

তখন ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'জীবনে আপনার সাথে যে দুশমনি করেছি কিংবা আপনার বিরুদ্ধে যত যুদ্ধ-বিগ্রহে অংশ গ্রহণ করেছি এবং আপনার সাক্ষাতে বা অনুপস্থিতিতে যত কটুবাক্য বলেছি বা কুৎসা রটিয়েছি তার জন্য আল্লাহর কাছে আমার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করুন।'

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য আল্লাহর দরবারে ইসতিগফার করে বলতে লাগলেন:

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ كُلَّ عَدَاوَةٍ عادانِيهَا ، وَكُلَّ مَسِيرٍ سَارَ فِيهِ إِلَى مَوْضِع يريد به إطفاء نورِكَ، وَاغْفِرْ لَهُ ما نالَ مِنْ عِرْضِي فِي وَجْهِي أَوْ أَنَا غَائِبٌ عَنْهُ .
'হে আল্লাহ! ইকরামা আমার সাথে যত দুশমনী করেছে তা ক্ষমা করে দাও! তোমার দ্বীনের আলো নিভিয়ে দেয়ার জন্য যত চেষ্টা সাধনা করেছে, তা মাফ করে দাও। আমাকে যত গালমন্দ ও গীবত করেছে, তাও তাকে ক্ষমা করে দাও।'

তাঁর জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু'আ ও ইসতিগফার শুনে ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর চেহারা হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠল, তার অন্তর খুশিতে ভরে গেল। তিনি দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন:

'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর শপথ, এতদিন আল্লাহর দীনের প্রতিবন্ধকতায় যত ধন-সম্পদ ব্যয় করেছি, এখন থেকে তাঁর দীনের প্রচার ও প্রসারে তার দ্বিগুণ খরচ করবো। দীনের বিজয়কে ঠেকানোর জন্য যত যুদ্ধ করেছি, এখন থেকে দীনের বিজয়ের জন্য তার চেয়ে দ্বিগুণ জিহাদ করবো।'

এক সময়ের শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী বীর, ঐদিন থেকে আল্লাহর পথে আহ্বানকারী হিসেবে দাওয়াতে দীনের কাফেলায় শরীক হলেন। সার্বক্ষণিক ইবাদত-বন্দেগী এবং মসজিদে কুরআন তিলাওয়াতে নিরন্তর মশগুল থাকতে শুরু করলেন। মুখমণ্ডলে কুরআন শরীফ চেপে ধরে চুম্বন দিতেন এবং আল্লাহর ভয়ে কেঁদে কেঁদে বলতেন:

'আমার প্রভুর কিতাব, আমার প্রভুর বাণী...।'

ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কৃত ওয়াদা হুবহু পালন করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ইসলামের সমস্ত জিহাদে অংশগ্রহণ করেন। এমন কোনো দাওয়াতী কাফেলা প্রেরণ করা হতো না, যে কাফেলার অগ্রভাগে তিনি থাকতেন না।

ইয়ারমুকের যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনীর ওপর যখন শত্রুপক্ষের প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছিল, কালবিলম্ব না করে তিনি দ্রুতগামী ঘোড়া থেকে নেমে নিজ তলোয়ারের কোষ ভেঙে ফেলেন, জীবনে যেন কোনোদিন আর তলোয়ার কোষে আবদ্ধ করতে না হয়। তারপর রোমান সৈন্যদের ব্যূহ ভেদ করে বহুদূর পর্যন্ত অগ্রসর হন। তা দেখে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দ্রুতগতিতে তাঁর নিকটে গিয়ে তাঁকে বলেন:

'এভাবে ভেতরে ঢুকবেন না। কেননা আপনার নিহত হওয়া মুসলমানদের জন্য ভীষণ ক্ষতির কারণ হবে।'

ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জবাব দিলেন:
'হে খালিদ! আমাকে ছেড়ে দিন, আপনি আমার পূর্বেই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান এনেছেন। কিন্তু আমি ও আমার পিতা আবী জাহল তখন ইসলামের ঘোর দুশমন ছিলাম। অতএব আমাকে ছেড়ে দিন। আমাকে আমার অতীত কৃতকর্মের কাফফারা আদায় করতে দিন।'

অতঃপর তিনি আবার বলে উঠেন:
'আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে বহু যুদ্ধ করেছি। আর আজ রোমান সৈন্যদের ভয়ে পালাব! তা কক্ষনো হতে পারে না।'

অতঃপর তিনি মুসলিম সৈন্যদের আহ্বান করে বললেন:
'তোমাদের মধ্যে কে মৃত্যুর জন্য আমার হাতে হাত দিয়ে শপথ করতে রাজি আছ? এতে চার শত সৈনিক তার হাতে হাত দিয়ে শপথ করে। তাদের মধ্যে ছিলেন তার চাচা হারিস ইবনে হিশাম এবং দিরার ইবনুল আযওয়ার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা। তাঁর আহ্বানে তারা মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর চারপাশে থেকে তার প্রতিরক্ষার জন্য যুদ্ধ করতে থাকেন এবং তাঁকে ভালোভাবেই রক্ষা করে চলেন।'

ইয়ারমুকের এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধশেষে মুসলমান বাহিনীর বিজয় লাভের পর দেখা গেল, তিনজন মুসলমান বীর যোদ্ধা শুক্র বাহিনীর হাতে ভীষণভাবে আহত হয়ে পড়ে ছটফট করছেন।

তাঁরা হলেন:
১. হারিস ইবনে হিশাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, ২. আইয়াশ ইবনে আবী রাবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং ৩. ইকরামা ইবনে আবী জাহল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।

হারিস ইবনে হিশাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অন্তিম সময়ে পানি পানি বলে চিৎকার করছিলেন। যখন দৌড়ে তাঁর কাছে পানি পৌঁছানো হলো, তখন তিনি দেখতে পেলেন যে, তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ইকরামা ইবনে আবী জাহল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেদিকে তাকাচ্ছেন, তা দেখে হারিস ইবনে হিশাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:

'আমার আগে ইকরামাকে পানি পান করাও।'

দৌড়ে যখন ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে পানি আনা হলো তখন ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও দেখতে পেলেন যে আইয়াশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তার দিকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় তাকাচ্ছেন। ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:

'আগে আইয়াশকে পানি পান করাও।'

আইয়াশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে পানি আনা হলে দেখতে পেলেন, আইয়াশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন।

অতঃপর ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট পানি আনা হলে দেখা গেল, তিনিও আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন।

তাঁর কাছ থেকে হারিস ইবনে হিশাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে পানি আনা হলে দেখা গেল, আল্লাহ তাঁকেও নিজের কাছে নিয়ে গিয়েছেন।

জীবনের অন্তিম মুহূর্তে নিজের চেয়ে অপর দীনি ভাইকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে আল্লাহ তাঁদের ওপর সন্তুষ্ট হোন এবং তাদের সবাইকে হাউজে কাওসার থেকে পানি পান করান। তাঁরা যেন আর তৃষ্ণার্ত না থাকেন। হে আল্লাহ, বিশেষ করে তাঁদেরকে জান্নাতুল ফিরদাউস-এর বাগ-বাগিচা দান করো, যেন তারা অনন্তকাল সেখানে বিচরণ করতে পারেন। আমীন।

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ৫৬৪০ নং জীবনী। ২. তাহযীবুল আসমা; ১ম খণ্ড, ৩৩৮ পৃ.। ৩. খুলাসাতুত্ তাহযীব; ২২৮ পৃ.। ৪. যাইলুল মুজীল; ৪৫ পৃ.। ৫. তারীখুল ইসলাম লিয্যাহাবী: ১ম খণ্ড, ৩৮০ পৃ.। ৬. রাগবাতুল আমাল: ৭ম খণ্ড, ২২৪ পৃ.।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 যায়েদ আল খাইর (রাঃ)

📄 যায়েদ আল খাইর (রাঃ)


'তুমি নিশ্চয়ই ধৈর্য ও উদারতার মতো এমন দুটি গুণে গুণান্বিত, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট খুবই প্রিয়।' - মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)

এখন এমন একজন প্রসিদ্ধ সাহাবীর জীবনের দুটি দিকের ওপর আলোচনা করতে চাই, যিনি ইসলাম পূর্বকালে যেমন আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণের পরের জীবনেও তেমনি এক মহান ও মহৎ ইতিহাস রচনা করে গেছেন।

তিনি ছিলেন যায়েদ আল খাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু। ইসলাম পূর্বকালে তাকে যায়েদ আল খাইল বলে ডাকা হতো। ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে যায়েদ আল খাইর নামে আখ্যায়িত করেন।

জাহেলী জীবনের যে অধ্যায় সম্পর্কে উপরে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে তা আরবী সাহিত্যে এভাবে বর্ণিত হয়েছে। যা বনূ আমের গোত্রের সর্দারের বরাত দিয়ে শায়বানী বর্ণনা করেছেন:

'আমরা এক বছর অনাবৃষ্টি ও অজন্মার সম্মুখীন হই। ক্ষেত-খামার যেমন জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়, তেমনি পশু-খাদ্যের অভাবে গবাদিপশুর স্তনের দুধও শুকিয়ে যায়। অভাবের তাড়নায় আমাদের গোত্রের এক ব্যক্তি সপরিবারে হিরায় চলে যায়। সেখানে সে পরিবার-পরিজনকে রেখে তাদেরকে বলে যায়, আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত তোমরা এখানেই অবস্থান করতে থাক।'

সে শপথ নেয় যে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে ফিরে আসবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ধন-দৌলত অর্জন করতে পারে, এমনকি এ পথে যদি তার মৃত্যুও হয়।

অতঃপর সফরের জন্য খাবার ও পানি নিয়ে সে অজ্ঞাত মনযিলের দিকে রওনা হয়। সারাদিন পথ চলার পর সে রাতের আঁধারে একটি তাঁবু দেখতে পায়, যার কাছেই ছিল একটি ঘোড়ার বাচ্চা বাঁধা। সে মনে মনে ভাবল, 'যাক এই প্রথমবারের মতো গণিমতের একটি মাল পেলাম।' সে ঘোড়ার রশির বাঁধন খোলার জন্য অগ্রসর হলো। রশি খুলে যখন পিঠে চড়তে উদ্যত হলো তখন হঠাৎ আওয়াজ এল:

'খবরদার! যদি বাচঁতে চাও তাহলে ঘোড়া থেকে নেমে নিজের জীবনকে গনীমতের মাল বলে মনে কর।'

তখন সে ঘোড়া থেকে নেমে জীবন বাঁচাতে নিজ পথেই রওনা হয়ে গেল। অতঃপর ক্রমাগত সাত দিন পথ চলার পর হঠাৎ সে একস্থানে উটের খোঁয়াড় দেখতে পেল, যার পাশেই বিরাট একটি তাঁবু এবং তার ভিতর চামড়ার তৈরি ঘর, যা প্রাচুর্য ও বিলাসিতার ইঙ্গিত বহন করছিল।

সে ভাবল : 'এ খোয়াড়টি নিশ্চয়ই উট রাখার জন্যই তৈরি, আর এ তাঁবুতে নিশ্চয়ই মানুষও থাকে।'

তখন সূর্য প্রায় ডুবু ডুবু। তাঁবুর ভেতর উঁকি মেরে সে দেখতে পেল, অতিশয় বৃদ্ধ এক ব্যক্তি সেখানে বসে আছে। সে ভিতরে ঢুকে বৃদ্ধের পিছনে ঘাপটি মেরে বসে পড়ল। বৃদ্ধটি তা বুঝতে পারল না। একটু পরই সূর্য অস্ত গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে একজন ঘোড়সওয়ার এসে উপস্থিত হলো। সে এক বিশাল দেহী স্বাস্থ্যবান ঘোড়সওয়ার, যার দু'পাশে দু'জন খাদেম হেঁটে চলে আসছে। সে তাকে দেখতেই পায়নি। যেমন আরোহী তেমনি তার বিরাট ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠ থেকে নামার জন্য এগিয়ে দেওয়া হল উচ্চাসন। এর দু'পাশে দু'জন খাদেম ঘোরাফেরা করছে। তাদের তত্ত্বাবধানে প্রায় ১০০টি উট এবং উটবহর, যাদের সামনে অবস্থান করছে বিরাট এক উট, যাকে অনুসরণ করে বাকি উটগুলো চলে থাকে। উটগুলোর সর্দার বসে পড়তেই বাকি সব উটও বসে পড়ল। এই অশ্বারোহী তার এক খাদেমকে বড় একটি উটনীর দিকে ইশারা করে বলল:

'একে দোহন কর এবং তাঁবুতে অবস্থানরত শেখকে পান করাও।'

নির্দেশ পাওয়ামাত্রই খাদেম একটি পাত্রে উট দোহন করল এবং বৃদ্ধের সামনে রেখে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বৃদ্ধটি সেখান থেকে সামান্য কিছু পান করে বাকিটুকু রেখে দিলে বৃদ্ধের পেছনে লুকিয়ে থাকা এ লোকটি কি করল, তার বর্ণনা থেকেই শোনা যাক:

সে বর্ণনায় বলে:
'লুকিয়ে থেকে আমি সব দেখতে থাকি। আস্তে আস্তে অত্যন্ত সাবধানে অগ্রসর হয়ে দুধের পাত্রখানা হস্তগত করে সবটুকু দুধ পান করে খালি পাত্রটি বৃদ্ধের সামনে রেখে দেই। কিছুক্ষণ পর খাদেম ফিরে এসে দেখল যে, পাত্রের সমস্ত দুধই শেষ। সে বলে উঠল:

'হে মালিক! উনি তো সবটুকুই পান করে ফেলেছেন।'

একথা শুনে অশ্বারোহী ব্যক্তির আর আনন্দের সীমা রইল না। সে খাদেমকে অন্য আরেকটি উট দোহন করে পাত্রখানা আবার বৃদ্ধের সামনে রাখার নির্দেশ দিল, খাদেম হুকুম তামিল করল।

এবারে বৃদ্ধ এক চুমুক পান করে বাকিটুকু সেবারের মতোই রেখে দিল। আমি ভাবলাম, এবার এখান থেকে অর্ধেক দুধ পান করি। কারণ, অশ্বোরোহীর মনে কোনো সন্দেহের সৃষ্টি হতে পারে।

এবার অশ্বারোহী খাদেমকে একটি বকরি যবেহ করার নির্দেশ দিল। বকরি যবেহ হয়ে গেলে অশ্বারোহী নিজেই গোশত ভুনা করল এবং নিজ হাতে বৃদ্ধকে খাওয়াল। বৃদ্ধকে খাওয়ানোর পরে সে এবং তার খাদেম খেতে বসল। কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল এবং নাক ডাকতে থাকল।

সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আমি সর্দার উটটির রশি খুলে তার পিঠে চড়ে বসি, সর্দার উটকে চালিয়ে নিতেই অন্য উটগুলোও পেছনে পেছনে চলতে আরম্ভ করল। সারা রাত ধরে চললাম।

সকাল হলে চতুর্দিকে ভালো করে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখলাম : 'কেউ আমার সন্ধানে আসছে কি না? কেউ খুঁজতে আসছে বলে আমার মনে হলো না। আমি চলতেই থাকলাম। এমনকি দুপুর হয়ে গেল। এবার চারদিকে আরো ভালো করে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগলাম। উদ্দেশ্য, কেউ খুজঁতে আসছে কি না, তা লক্ষ্য করা।'

এবার দেখতে পেলাম : 'অনেক দূরে যেন একটি শকুন বা বড় পাখি আমার দিকে ছুটে আসছে। তা ক্রমেই আমার নিকটবর্তী হতে থাকল এবং তারপর স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সে একজন অশ্বারোহী। আমার বুঝতে বিলম্ব হলো না যে, অশ্বারোহী তার উটগুলো উদ্ধার করার জন্যই এসেছে। আমি তড়িঘড়ি করে উটটিকে বেঁধে ফেললাম এবং তীরের থলি থেকে তীর বের করে পজিশন অনুযায়ী আমার চতুষ্পার্শ্বে রেখে দিয়ে অন্য একটি তীর ধনুকে স্থাপন করে উটগুলোকে পেছনে রেখে আগন্তুক অশ্বারোহীর দিকে তাক করে ধরলাম।'

অশ্বারোহী বেশ দূরে অবস্থান নিয়ে আমাকে বলল : 'সর্দার উটটির রশি খুলে দাও।'

আমি বললাম : 'কক্ষনো নয়। আমি হীরাতে অনেক ক্ষুধার্ত স্ত্রী ও সন্তানদের রেখে এসেছি এবং শপথ করেছি যে, আমি অর্থ-সম্পদ নিয়ে ফিরব, কিংবা আমার মৃত্যু হবে।'

সে বলল : 'তোমার নির্ঘাত মৃত্যুই হবে। তুমি সর্দার উটটির রশি খুলে দাও।'

আমি বললাম : 'আমি কখনোই রশি খুলে দেবো না।'

তখন সে বলল : 'তুমি ধ্বংস হও। তুমি বড়ই বিভ্রান্ত।'

সে আবার বলল : 'সর্দার উটটির রশির গিরা কোথায়? উটটির রশিতে তিনটি গিরা দিয়ে বাঁধা ছিল।'

সে বলল: 'উটের রশিটি দেখিয়ে দাও এবং বল কোন্ গিরাটিতে তীর নিক্ষেপ করব?'

আমি তাকে গিরাটি দেখিয়ে দিলাম। অশ্বারোহী সেই গিরাটিতে তীর নিক্ষেপ করল, যেন সে নিজ হাত দিয়ে সেটি সেখানে রাখল। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় গিরাটিতেও লক্ষ্য ভেদ করল।

এ কাণ্ড দেখে আমি তীরগুলো থলেতে রাখলাম এবং আত্মসমর্পণ করলাম। অশ্বারোহী এবার এগিয়ে এসে আমার তরবারিখানা নিয়ে নিল এবং বলল: 'আমার পেছনে আরোহণ কর।'

আমি তার পেছনে আরোহণ করলে সে বলল: 'তোমার সাথে কেমন ব্যবহার করব বলে তুমি ধারণা করছ?'

আমি উত্তর দিলাম: 'খারাপ ধারণাই করছি।'

অশ্বারোহী বলল: 'কেন?'

আমি বললাম : 'আপনার সাথে যে ব্যবহার করেছি, তার জন্য কোনো ভালো ব্যবহার আশা করতে পারি না। তাছাড়া আপনাকে যে কষ্ট দিয়েছি, তার জন্য। এখনতো আল্লাহ আপনাকে বিজয় দান করেছেন।'

অশ্বারোহী বলল: 'তুমি কি মনে কর যে, আমি তোমার সাথে খারাপ আচরণ করব? অথচ তুমি আমার পিতা 'মুহালহালের সাথে পানাহারে অংশ নিয়েছ এবং সে রাতে তার সাথে এক পাত্রে দুধ পান করেছো' এবং সে রাতে তার সঙ্গী হয়েছ।'

আমি মুহালহালের নাম শোনামাত্রই তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম: 'আপনি কি যায়েদ আল খাইল?

উত্তর এল: 'হ্যাঁ।'

উত্তর শুনে আমি বললাম : 'আপনি উত্তম কয়েদকারী হোন।'

অশ্বারোহী বলল: 'চিন্তার কোনো কারণ নেই- এ অভয় দিয়ে আমাকে নিজ আস্তানায় নিয়ে চলল।'

তিনি বললেন:
'আল্লাহর কসম! এ উটগুলো যদি আমার নিজের হতো, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাকে দিয়ে দিতাম। কিন্তু এগুলো আমার এক বোনের। আমাদের এখানে কিছু দিন থাক। আমি লুটতরাজের উদ্দেশ্যে সহসাই একগোত্রে হামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আশা করি, বহু সম্পদ ছিনিয়ে আনতে পারব। সেখানে তোমাকে যা দেওয়ার দিয়ে দেব।'

তিন দিন যেতে না যেতেই যায়েদের দলবল বনূ নুমাইর গোত্রের ওপর হামলা করে প্রায় ১০০টির মতো উট লুট করে আনল এবং সবগুলোই আমাকে দিয়ে দিল। এমনকি আমার নিরাপত্তার জন্য যতক্ষণ 'হীরাতে' আমি না পৌঁছি, ততক্ষণের জন্য কিছুসংখ্যক লোককেও সাথে দিয়ে দিল।'

যায়েদ আল খাইলের এটা হলো জাহেলী যুগের চিত্র। আর তার ইসলাম গ্রহণের পরের ঘটনাবলি তো সীরাতের কিতাবসমূহে এভাবে বর্ণিত হয়েছে:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের সংবাদ যায়েদ আল খাইলের কানে পৌঁছলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের যে যৎকিঞ্চিৎ সংবাদ তাঁর কাছে পৌছে, তার উপরই গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে সে সফরের জন্য সাজ-সরঞ্জাম ও ঘোড়া তৈরি করে এবং স্বগোত্রের নেতাদের তার সাথে সফর করার এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করার আহ্বান জানাল। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে 'বনূ তাঈ' গোত্রের এক বিরাট প্রতিনিধি দল তাদের অনুগামী হয়। তাদের মধ্যে যুর ইবনুস সাদুস, মালেক ইবনে জুবাইর এবং আমর ইবনে জুয়াইন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ বিরাট কাফেলা মদীনা মুনাওয়ারায় পৌঁছে এবং মসজিদের দরজার সাথে উটগুলো বসানো হয়।

মসজিদে প্রবেশ করেই তারা দেখতে পায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বরে বসে সমবেত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিচ্ছেন। তাঁর কথাগুলো ছিল যেমন হৃদয়গ্রাহী, তেমনি তাঁর প্রতি মুসলমানদের শ্রদ্ধা-ভক্তি ও আনুগত্যের উদাহরণও ছিল অনন্য। যেন তাঁর কথাগুলো শ্রোতাদের অন্তরে পৌঁছে গেঁথে যাচ্ছে।

খুতবা দানরত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টি যায়েদ ও তার সঙ্গী-সাথীদের ওপর পড়লে, তিনি খুতবার ভেতরেই বলে ওঠেন:

إِنِّي خَيْرٌ لَكُمْ مِنَ الْعُزَّى وَمِنْ كُلِّ مَا تَعْبُدُون ... إِنِّي خَيْرٌ لَكُمْ مِنَ الْجَمَلِ الْأَسْوَدِ الذي تعبدُونَهُ مِنْ دُونِ اللَّهِ .
'উয্যা ও অন্যান্য যেসব মূর্তির তোমরা পূজা করছ, তাদের সবার চেয়ে তোমাদের জন্য আমি উত্তম। আল্লাহ ছাড়া যেমন তোমরা কালো উটের ইবাদত করে থাকো এর চেয়েও আমি তোমাদের জন্য উত্তম।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুতবা যায়েদ আল খাইল এবং তার দলবলের ওপর দু'ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল। তাদের মধ্যে অনেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার দাওয়াত গ্রহণ করল। আর কিছুসংখ্যক তাঁর দাওয়াতে কর্ণপাত না করে অহংকারের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করল। দ্বিধাবিভক্ত কাফেলার অর্ধেক রওয়ানা হলো জান্নাতের পথে, আর বাকিরা জাহান্নামের দিকেই তাদের যাত্রা অব্যাহত রাখল। 'যুর ইবনুস সাদুস' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হীনদৃষ্টিতে দেখছিল, যা কখনোই অন্তর দিয়ে কামনা করার মতো ছিল না। আর তাই তখন তার আচরণেও এর প্রতিফলন ঘটল। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। সে ভাবছিল এমন যেন না হয় যে, তাকে খারাপ পরিণতির সম্মুখীন হতে হয়।

সে তার সঙ্গী-সাথীদের উদ্দেশ্য করে বলল:
'আমি দেখতে পাচ্ছি যে, সারা আরব এ ব্যক্তির করতলে আসবে। খোদার শপথ! আমি চাই না, তিনি আমার উপর কর্তৃত্ব করুন।'

অতঃপর সে সিরিয়ায় চলে যায় এবং মাথা ন্যাড়া করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে।

এদিকে যায়েদ আল খাইল ও তার অন্যান্য সাথীদের দৃশ্য ছিল ভিন্ন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুতবা শেষ হতে না হতেই যায়েদ আল খাইল মুসলিম জনতার সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন, সবারই দৃষ্টি পড়ল লম্বা-চওড়া স্বাস্থ্যবান এক আকর্ষণীয় চেহারার এ ব্যক্তির ওপর। এতো লম্বা যে, তিনি ঘোড়ায় চড়লে দু'পা মাটি স্পর্শ করত। যেমন কেউ গাঁধার পিঠে চড়লে হয়। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চৈঃস্বরে বলে ওঠেন:

'হে মুহাম্মদ! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং আপনি আল্লাহর বান্দাহ ও রাসূল।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে একটু অগ্রসর হলেন এবং প্রশ্ন করলেন:
'তুমি কে?'

যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জবাব দিলেন: 'আমি যায়েদ আল খাইল ইবনে মুহালহাল।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে সাথে বললেন:
'না, তুমি এখন থেকে আর যায়েদ আল খাইল নও; বরং তুমি এখন থেকে যায়েদ আল খাইর। সেই আল্লাহর প্রশংসা, যিনি পাহাড়-পর্বত এবং সমতল ভূমির লুটতরাজের বিভীষিকা থেকে ফিরিয়ে এনে ইসলামের ছায়াতলে তোমাকে পৌঁছে দিয়েছেন।'

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যায়েদ আল খাইরকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান। ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং অন্য একজন সাহাবা তাঁর সাথে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুজরা মুবারকে পৌঁছলে তিনি যায়েদ আল খাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আরাম করে বসার জন্য খেজুরের ছোবড়াভরা চামড়ার তৈরি একটি বালিশ সাদৃশ্য গদি এগিয়ে দেন। এটা যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে একটি খুবই অসম্ভব ব্যাপার ছিল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে তিনি আরাম গদিতে বসবেন। তাই তিনি এটা পুনরায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকেই এগিয়ে দিলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গদিটি আবার তার দিকেই এগিয়ে দেন এবং তিনিও পুনরায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে ঠেলে দেন। এমনি করে তিনবার গদিটির দিক পরিবর্তন হলো, যথাযথভাবে বৈঠকের কর্মসূচি আরম্ভ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

‘হে যায়েদ আল খাইর! কেউ আমার কাছে যে ব্যক্তিরই বর্ণনা দেয় পরে সাক্ষাৎ হলে দেখি সে বর্ণনার চেয়ে অনেক নিচে। একমাত্র তুমিই তার ব্যতিক্রম।'

তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ‘হে যায়েদ! তোমার মধ্যে দুটি গুণ বিদ্যমান, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের খুবই প্রিয়।'

যায়েদ জিজ্ঞাসা করলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল, কী সে গুণ?'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ‘উদারতা ও ধৈর্য।'

যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে এমন গুণ দিয়েছেন, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে প্রিয়।'

অতঃপর যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে ফিরে বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে মাত্র তিনশত অশ্বারোহী দিন, যাতে আমি রোমান সাম্রাজ্যে আক্রমণ চালিয়ে তাদের যেন পরাজিত করতে পারি। পতনের জন্য ওরাই যথেষ্ট হবে।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এই সাহসকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখলেন এবং বললেন: ‘হে যায়েদ! নিঃসন্দেহে তোমার এ সাহস অতীব পছন্দনীয়, সত্যিই তুমি একজন সাহসী পুরুষ।'

অতঃপর যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে তাঁর সব সহযোগীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেন।

অতঃপর যায়েদ আল খাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নজদ-এ তার বাড়িতে ফেরার জন্য মনস্থ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে দেশে ফেরার অনুমতি দিলেন, যায়েদ বিদায় হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

'সে কতই না ভালো ব্যক্তি! কতই না ভালো হতো! যদি মদীনার সংক্রামক ব্যাধি থেকে সে নিরাপদ থাকত।'

সে সময় মদীনায় এক প্রকার মারাত্মক সংক্রামক জ্বরের আবির্ভাব ঘটে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই উক্তি করার পরদিনই যায়েদ আল খাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জ্বরে আক্রান্ত হলেন। অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি তার সঙ্গী-সাথীদের বললেন:

'কাইসের গোত্র থেকে দূরের পথ ধরে চল। জাহেলী যুগে তাদের সাথে আমাদের ভীষণ যুদ্ধ হয়েছে। এমন না হয়, তাদের সাথে কোনো সংঘাতও বেধে যায়। কারণ আল্লাহর নামে শপথ করছি, মৃত্যুর পূর্বে আমার দ্বারা কোনো মুসলিমের রক্তপাত সম্ভব নয়।'

তাঁকে নিয়ে তাঁর সাথীরা নজদ-এর উদ্দেশ্যে দ্রুতগতিতে পথ অতিক্রম করছিল। তাঁর জ্বরও প্রহরে প্রহরে বেড়েই চলছিল। বড় আশা ছিল যে, তিনি ফিরে যাবেন এবং নিজ গোত্রের অন্যান্য লোকদের নিজ হাতে ইসলামে দীক্ষিত করবেন। এরপরই তাঁর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল। তিনি ভীষণভাবে জ্বরে আক্রান্ত হলেন। অবশেষে তিনি পথিমধ্যেই প্রাণ ত্যাগ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর গুনাহ করার তিনি সময়ও পাননি। বেগুনাহ এ সাহাবী পরম শান্তিতে জান্নাতের পথ ধরলেন।

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ্: ২৯৪১ নং জীবনী। ২. আল ইসতিয়াব: ১ম খণ্ড, ৫৬৩ পৃ. (আস সায়াদ সংস্করণ)। ৩. আল্ আগানী: (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)। ৪. তাহজীব ইবনে আসাকির (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)। ৫. সামতুল লালিই: (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)। ৬. খাযানাতুল আদাব আল বাগদাদী: ২য় খণ্ড, ৪৪৮ পৃ.। ৭. যাইলুল মাযিল: ৩৩ পৃ.। ৮. সিমারুল কুলুব: ৮৭ পৃ.। ৯. আসশের ওয়াশ শুআরা: ৯৫ পৃ.। ১০. হুসনুস সাহাবা: ২৪৮ পৃ.।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 আদী ইবনে হাতেম আত্ তায়ী (রাঃ)

📄 আদী ইবনে হাতেম আত্ তায়ী (রাঃ)


'যখন তারা কুফরীর পথ অবলম্বন করেছে, তখন তুমি ঈমান এনেছ। যখন তারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে অস্বীকার করেছে, তখন তুমি তাকে অনুসরণ করেছ, যখন তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তখন তুমি পূর্ণ আনুগত্যের পরিচয় দিয়েছ, এবং যখন তারা পশ্চাৎপদ হয়েছে তখন তুমি বীর বিক্রমে এগিয়ে চলেছ।' -ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু

নবম হিজরীতে আরবের এক প্রভাবশালী বাদশাহ ইসলামের বিজয়ে ভীত হয়ে দেশ ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবনযাপন করেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর এই ধর্মান্তরের ঘটনা খুবই চমৎকার ও বিরল এক দৃষ্টান্ত। ইসলামী দাওয়াতের বিরুদ্ধে তাঁর প্রবল বিরোধিতা একে একে ব্যর্থ হলে তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলামে তাঁর এই আত্মসমর্পণ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুর্লভ এক ঘটনার অন্তর্ভুক্ত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধাচরণকারী সেই বাদশাহ হলেন, ইতিহাস বিখ্যাত হাতেম আত তাঈ'র ছেলে 'আদী'। আদী শুধু বাদশাহ হিসেবেই নন; বরং দানবীর হিসেবেও ছিলেন, পিতার যোগ্য উত্তরসূরি। উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি 'তাঈ' রাজ্যের বাদশাহ হয়েছিলেন। লুটতরাজকৃত সম্পদের এক-চতুর্থাংশ সম্পদ তাঁর জন্য নির্ধারিত ছিল। তিনি শুধু দেশের বাদশাহই ছিলেন না; বরং সেনাপতির দায়িত্বও তিনি পালন করতেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আরবের সর্বত্র হক ও হেদায়াতের দাওয়াত দিতে শুরু করেন, তখন চতুর্দিকে ইসলামের দাওয়াত এর সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে। একের পর এক অঞ্চল ইসলামের দাওয়াতী পতাকার ছায়ায় আসতে থাকে। আদী ইবনে হাতেম আত তাঈ উপলব্ধি করতে পারেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বের কাছে তাঁর বংশানুক্রমে প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রীয় সীমানায় তাঁর রাজ্য নিশ্চিত অন্তর্ভুক্ত হবে। ঠাণ্ডা মাথায় তিনি এ আশঙ্কার কথা চিন্তা করে নতুন ইসলামী রাষ্ট্র এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তীব্র বিরুদ্ধাচরণ আরম্ভ করেন। অথচ তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। না দেখে না জেনে জঘন্যভাবে বিরোধিতা করতে লাগলেন। দীর্ঘ ২০ বছর অব্যাহতভাবে ইসলামের বিরোধিতা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে আল্লাহ তাআলা তাঁকে হেদায়েতের পথ দেখালেন ও সত্যের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তাঁর অন্তরকে প্রশস্ত করে দিলেন।

আদী ইবনে হাতেমের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা অবিস্মরণীয়। তাঁর নিজের বর্ণনা থেকেই আমরা এখন বিস্তারিত জানতে পারব। কারণ, তিনি নিজেই তাঁর ঘটনা বস্তুনিষ্ঠভাবে বর্ণনা করার জন্য যথেষ্ট।

আদী ইবনে হাতেম আত তাঈ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করছেন:

আরব বিশ্বে আমার চেয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে অন্তরে বিদ্বেষ পোষণকারী আর কেউ ছিল কি না সন্দেহ। আমি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এক সম্ভ্রান্ত রাজপরিবারের যুবরাজ ছিলাম। অন্যান্য রাজা-বাদশাহর মতো আমিও লুটতরাজকৃত ধন-সম্পদের এক চতুর্থাংশ পেতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবের সংবাদ শুনে তাঁকে বড়ই ঘৃণা করতে লাগলাম। অথচ তাঁর শক্তি বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এমনকি তাঁর সৈন্যবাহিনী আরবের পূর্বপ্রান্ত থেকে পশ্চিমপ্রান্ত পর্যন্ত ছোট-বড় সব যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে দাপটের সাথে চলাফেরা করত। তখন একদিন আমার উটের রাখালকে বললাম:

'সাবাস গোলাম! দ্রুতগামী মোটাতাজা একটি উট আমার সফরের জন্য প্রস্তুত কর। এই উটকে আমার কাছেই সর্বক্ষণ বেঁধে রাখ। মুহাম্মদের সৈন্যবাহিনী বা ক্ষুদ্র কোনো সৈন্যদলের কথাও যদি জানতে পার তাহলে আমাকে তৎক্ষণাৎ সংবাদ দিও।'

কোনো একদিন সকালে গোলাম এসে আমাকে সংবাদ দিল : 'হে আমার মনিব! মুহাম্মদের সৈন্য আপনার ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। আপনি যে উটের কথা বলেছিলেন, সে ইচ্ছা এখন পূরণ করতে পারেন।'

তাকে বললাম : 'কেন? কী দুঃসংবাদ এনেছ?'

সে বলল : 'পতাকাবাহী কিছু সৈন্যকে আমাদের ভূখণ্ডে ঘোরাফেরা করতে দেখে তাঁদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যে, এরা মুহাম্মদের সৈন্যবাহিনী।'

তাঁকে বললাম : 'আমার জন্য যে উটটি তৈরি করে রেখেছ সেটি কাছে আনো। অতঃপর উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করতে লাগলাম। সবাইকে আমাদের প্রিয় ভূমি ছেড়ে পালানোর আহবান জানালাম এবং খুব দ্রুত সিরিয়ার দিকে রওনা দিলাম। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, সেখানকার সমধর্মী খ্রিস্টানদের সাথে মিলিত হয়ে সেখানেই যেন বসবাস করতে পারি।'

অত্যন্ত ব্যস্ততার সঙ্গে পরিবার-পরিজনকে একত্রিত করলাম। বিপদ নিশ্চিত জেনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু আমাদের জন্মস্থান নজদে আমার সহোদর বোন এবং তার সাথে বনূ তাঈ-এর বাদ বাকি লোক রয়ে গেল। আমার পক্ষে বোনকে আনার জন্য সেখানে যাওয়া সম্ভব ছিল না। সুতরাং আমার কাছে যারা উপস্থিত ছিল, তাদের নিয়েই সিরিয়ায় পৌঁছি এবং অন্যান্য খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ভাইদের সাথে বসবাস করতে থাকি। আমার বোনের ব্যাপারে যা আশঙ্কা করেছিলাম ঠিক তা-ই হয়েছিল। সিরিয়ায় অবস্থানকালে জানতে পারলাম, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অশ্বারোহী বাহিনী আমাদের বাড়ি-ঘরে হামলা করে মাল-সামান লুটতরাজ করে নিয়েছে। আমার বোন ও অন্যান্য মহিলাকে বন্দী করে ইয়াসরিবে নিয়ে যাওয়া হয়। মসজিদে নববীর দরজা সংলগ্ন নির্ধারিত স্থানে তাদের রাখা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এখান দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন আমার বোন সামনে দাঁড়িয়ে যায় এবং আরয করে :

'ইয়া রাসূলুল্লাহ! পিতা ইনতিকাল করেছেন। যিনি আমাকে সাহায্য করার জন্য আসার কথা তিনি গায়েব হয়েছেন। অতএব আপনি আমার ওপর করুণা করুন, আল্লাহ আপনার ওপর করুণা করবেন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন: 'তোমাকে সাহায্য করার জন্য কার আসার কথা ছিল?'

আমার বোন উত্তর দেয়: 'আদী ইবনে হাতেমের।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছ থেকে যে পলায়ন করেছে, সেই ব্যক্তি কী?'

এ কথোপকথনের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্বাভাবিক গতিতে চলে যান। পরদিন যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার এখান দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সে আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে গতকাল যে আরয করেছিল, তারই পুনরাবৃত্তি করে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও গতকালের মতোই উত্তর দেন।

পরদিন আবার যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখান দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সে নিরাশ হওয়ায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আর কিছু আরয করল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছন থেকে এক ব্যক্তি আমার বোনকে আবার আবেদন করার জন্য ইশারা করলেন। ঐ ব্যক্তিটির ইশারা পেয়ে আমার বোন দাঁড়িয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে পূর্ব দু'দিনের মতোই আবেদন করে:

'ইয়া রাসূলুল্লাহ! পিতা ইনতিকাল করেছেন, সাহায্যের জন্য যার আসার কথা ছিল সে গায়েব হয়ে গেছে। অতএব আপনি আমার ওপর করুণা করুন, আল্লাহ আপনার ওপর করুণা করবেন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন: 'হ্যাঁ, করলাম।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে মুক্ত হওয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে আমার বোন তাঁর খিদমতে আরয করল:

'আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে আমি সিরিয়ায় চলে যেতে চাই।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন:
'ব্যস্ত হয়ো না। ততদিন এখানে অপেক্ষা করতে থাক, যতদিন না তোমাদের সমগোত্রীয় নির্ভরযোগ্য কোনো কাফেলা না পাও। যে কাফেলা তোমাকে পরিজনের নিকট পৌঁছে দিতে পারে। যদি এমন কোনো কাফেলার সন্ধান পাও, তাহলে আমাকে অবহিত করো।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখান থেকে চলে যাওয়ার পর ইশারাকারী ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে উপস্থিত লোকেরা বললেন:
'তিনি আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।'

বিশ্বস্ত এক কাফেলার আগমন হলে, আমার বোন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে আরয করল:

'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার স্বগোত্রীয় একটি কাফেলা এখানে এসেছে, তাদের মধ্যে বেশ কিছু বিশ্বস্ত ব্যক্তি রয়েছে। যারা আমাকে আমার পরিজনের নিকট পৌছে দিতে পারে।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বোনকে কাপড়-চোপড় সেলাই করে দেন। আরোহণের জন্য একটি উট এবং প্রচুর পরিমাণ খাদ্য ও পানীয় সঙ্গে দেন। অতঃপর সে কাফেলার সাথে আমার বোন সিরিয়ার পথে রওনা হয়।

আদী ইবনে হাতেম আত তাঈ বলেন:
'এরপর থেকে নানাভাবে আমাদের কাছে তার সংবাদ আসতে থাকে, এবং তার আসার ব্যাপারে আশার সঞ্চার হয়; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বোনের প্রতি যে সম্মান ও ভদ্রসুলভ আচরণ করেছেন, এমন খবর আমি মোটেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তাছাড়া তাঁর প্রতি আমার কোনো ভালো ধারণাও ছিল না।'

একদিন আমি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসেছিলাম। এ অবস্থায় দেখতে পেলাম হাউদায় উপবিষ্ট এক মহিলাকে নিয়ে একটি উট আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

আমি বলে উঠলাম : 'হাতেমের মেয়ে?'

সত্যি সত্যি সে উট থেকে নেমেই আমাকে বলছিল : 'ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ছিন্নকারী যালিম! স্ত্রী, পরিবার, সন্তান-সন্ততি নিয়ে চলে এসেছ, আর অন্যদের মান-সম্মান ও সম্ভ্রমের কী হলো সে চিন্তাও করলে না?'

তাকে বললাম : 'সত্যি বলছি বোন, আমার যে পরিস্থিতি ছিল, সে পরিস্থিতিতে তা করা সম্ভব ছিল না। আমাকে গালমন্দ করো না, জীবনে বেঁচে যে এসেছি, এটাই কি যথেষ্ট নয়?'

নানাভাবে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করি। অবশেষে, তার ক্রোধ উপশম হলো, শান্ত হয়ে সে সব ঘটনা শোনাল। নিঃসন্দেহে সে একজন বুদ্ধিমতী, সাহসী ও চতুর মহিলা। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম : 'মুহাম্মদ সম্পর্কে তোমার কী ধারণা?'

সে উত্তর দিল : 'খোদার শপথ! আমি মনে করি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তুমি তাঁর সাথে দেখা করো। তিনি যদি নবী হন, তাহলে তাঁর কাছে শীঘ্রই যাওয়া শ্রেয়, আর যদি তিনি শাহানশাহ হন তাহলে তুমি যেভাবে ছিলে সেভাবেই মর্যাদা পাবে।'

আদী ইবনে হাতেম বলেন: 'আমি দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে কোনোরূপ নিরাপত্তা বা চিঠিপত্র ছাড়াই মদীনা মুনাওয়ারায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হই, শুধু আমার এতটুকু আশা ছিল যে, আমি জানতে পেরেছি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার উপস্থিতির প্রত্যাশা করেন।'

তিনি বলেছেন: 'আমি আশা করছি যে, আল্লাহ আদী ইবনে হাতেমের হাতকে আমার হাতের সাথে মিলিয়ে দেবেন। বুকভরা আশা নিয়ে মসজিদে নববীতে অবস্থানরত অবস্থায় তাঁকে গিয়ে সালাম করি।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন: 'কে?'

উত্তর দিলাম: 'আদী ইবনে হাতেম আত তাঈ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে ওঠে দাঁড়ালেন এবং আমার হাত ধরে সোজা তাঁর বাড়ির দিকে রওয়া হলেন।'

শপথ করে বলছি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সঙ্গে নিয়ে তার বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন, এমন সময় অশীতিপর এক বৃদ্ধা একটি শিশু ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দাঁড় করালেন। তার সমস্যা সংক্রান্ত বিষয়ে কথাবার্তা বললেন, বৃদ্ধার সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তিনি তাঁর সাথেই রইলেন। আমিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দাঁড়িয়েই রইলাম। আর মনে মনে বলতে লাগলাম: 'খোদার শপথ! এ ব্যক্তি তো কোনো বাদশাহ হতে পারেন না।'

অতঃপর আবার হাত ধরে রওয়া দিলেন। আমরা তাঁর বাড়ি পৌছে গেলাম। ভিতরে খেজুরের ছোবড়া ভরা চামড়ার তৈরি (তার বাসভবনের একমাত্র ফার্নিচারস্বরূপ) বালিশ সাদৃশ্য গদিখানা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বসতে বললেন। আমি লজ্জিত হয়ে বললাম: 'না, না আপনি বসুন।'

তিনি বললেন: 'না তুমিই বসো, পরিশেষে বেয়াদবি না হয় মনে করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ মেনে নিয়ে তাতেই বসে পড়লাম।'

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেঝেতে বসলেন। তাঁর ঘরে এছাড়া বসার আর দ্বিতীয় কিছুই ছিল না। মনে মনে বলছিলাম: 'এ কোন বাদশাহর বাড়ি হতে পারে না।'

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সম্বোধন করে বলেন: 'আদী, তুমি কি খ্রিস্টান ও পৌত্তলিকতার মাঝামাঝি রুকুসিয়া ধর্মাবলম্বী নও?'

আমি বললাম: 'জি হ্যাঁ।'

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন:
'তুমি কি তোমার রাজ্যে এক-চতুর্থাংশ গ্রহণকারী নামে পরিচিত ছিলে না? তাদের নিকট থেকে যে এক-চতুর্থাংশ সম্পদ নিতে তা কি তোমার ধর্মে নিষিদ্ধ ছিল না?

আমি উত্তর দিলাম: 'জি হ্যাঁ, এবং আমার বুঝতে আর বাকি রইল না, তিনি অবশ্যই প্রেরিত রাসূল।'

তিনি আবার আমাকে সম্বোধন করে বলতে লাগলেন:
'হে আদী! সম্ভবত মুসলমানদের আর্থিক হীনতা ও অভাব-অনটন আজ তোমার ইসলামে প্রবেশের পথে প্রধান বাধা।'

'খোদার শপথ! সেদিন অতি নিকটে, যখন তাদের ধন-সম্পদের এতো প্রাচুর্য হবে যে, যাকাত-খয়রাত নেওয়ার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না।'

'হে আদী! সম্ভবত, আজ মুসলমানদের সংখ্যাস্বল্পতা ও তাদের বিরুদ্ধে সীমাহীন শত্রুতা তোমার ইসলামে প্রবেশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।'

'খোদার শপথ! অচিরেই দেখতে পাবে, একজন মহিলা কাদেসিয়ার শেষ প্রান্ত থেকে একাকী উটে আরোহণ করে বায়তুল্লাহর যিয়ারতে আসবে, অথচ আল্লাহ ছাড়া তার আর কোনো ভয় থাকবে না।'

'হে আদী! ইসলাম গ্রহণে বাধা দানকারী, 'রাজা বাদশাহগণ সবাই অমুসলিম।'

'খোদার শপথ! অনতিবিলম্বেই দেখবে, ইরাকের বাবেলের শুভ্র রাজপ্রাসাদ মুসলমানদের করতলগত। কিসরা ইবনে হুরমুযের ধন-ভাণ্ডারও তাদের হস্তগত।'

আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেসা করলাম: 'কিসরা ইবনে হুরমুয়ের ধন-ভাণ্ডার?'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন:
'হ্যাঁ, কিসরা ইবনে হুরমুযের ধন-ভাণ্ডার।'

এ শুনে আমি কালেমা শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করলাম।

আদী ইবনে হাতেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন। তিনি বলতেন:
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুটি ভবিষ্যদ্বাণী তো স্বচক্ষে সংঘটিত হতে দেখলাম। আমি দেখেছি, কাদেসিয়া থেকে মহিলারা তাদের উটের পিঠে আরোহণ করে এসে নির্দ্বিধায় খোদার এই ঘর যিয়ারত করে যাচ্ছে। কিসরা সম্রাটের ধনভাণ্ডারে আক্রমণকারীদের মধ্যে আমিই অগ্রভাগে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার ছিলাম। খোদার শপথ! তৃতীয়টিও সংঘটিত হবে।'

আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীর ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়ন করেই দেখালেন। তৃতীয় ভবিষ্যদ্বাণী ইসলামের পঞ্চম খলীফা ওমর ইবনে আব্দুল আযীয রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সময় বাস্তবে সংঘটিত হয়। আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের এত ধনদৌলতের প্রাচুর্য দান করেন যে, সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত যাকাত বণ্টনকারীগণ যাকাত গ্রহণকারীদের তালাশের জন্য রাস্তায় রাস্তায় আহ্বান করে বেড়াতেন; কিন্তু তা গ্রহণ করার মতো কোনো অভাবীকে পেতেন না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণীকে আল্লাহ সত্যি সত্যি প্রমাণ করে দেখালেন এবং আদী ইবনে হাতেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শপথকেও আল্লাহ সম্মান দিলেন।

টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ (আস সায়াদা সংস্করণ)-৪র্থ খণ্ড, ২২৮-২২৯ পৃ.। ২. আল ইসতিয়াব। (হায়দরাবাদ সংস্করণ)-২য় খণ্ড, ৫০২-৫০৩ পৃ.। ৩. উসদুল গাবাহ-৩য় খণ্ড, ৩৯২-৩৯৪ পৃ.। ৪. তাহযীবুত তাহযীব-৭ম খণ্ড, ১৬৬-১৬৭ পৃ.। ৫. তাকুরিবুত তাহযীব-২য় খণ্ড, ১৬ পৃ.। ৬. খুলাসাতু তাযহীব তাহযীবুল কামাল-২৬৩-২৬৪ পৃ..। ৭. তাজরীদু আসমাউস সাহাবা-১ম খণ্ড, ৪০৫ পৃ.। ৮. আল জামউ বাইনা রিজালিস সহীহাইন-১ খণ্ড, ৩৯৮ পৃ.। ৯. আল ইবরু-১ম খন্ড, ৭৪ পৃ.। ১০. আত তারীখুল কাবীর-৪র্থ খণ্ড, (ভমিকা), ১ম খণ্ড, ৪৩ পৃ.। ১১. তারীখুল ইসলাম লিযযাহাবী-৩য় খণ্ড, ৪৬-৪৮ পৃ.। ১২. শাজরাতুযযাহাব-১ম খণ্ড, ৭৪ পৃ.। ১৩. আল মায়ারেফ-১৩৬ পৃ.। ১৪. আল মুয়াম্মারুন-৪৬ পৃ.।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00