📄 আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ)
'প্রত্যেক উম্মতের একজন 'আমীন' থাকে। আর আমার উম্মাতের আমীন হচ্ছে, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ।' -রাসূলে কারীম (স)-এর উক্তি
হালকা পাতলা গড়ন, লম্বাকৃতি দেহ, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা, ধীর-স্থির শান্ত-শিষ্ট মেজাজ, লাজ-নম্র, অমায়িক ব্যবহার, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, সদালাপী ও মিষ্টভাষী, দ্রুতগামী এবং কর্মতৎপর হিসেবে খ্যাত এমন এক ব্যক্তি, যার মনে গর্ব ও অহঙ্কারের লেশমাত্র ছিল না। কিন্তু রণক্ষেত্রে তিনিই যেন ঝলসে ওঠা তীক্ষ্ণধার তরবারি ও গর্জে ওঠা এক সিংহ শার্দুল এবং প্রতিকূল পরিবেশে দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন এক বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। ইতিহাস খ্যাত এ ব্যক্তিই মুসলিম উম্মাহর 'আমীন' আমর ইবনে আবদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ আল ফেহরী আল কুরাইশী। যিনি ছোট-বড় সবার নিকট আবু উবায়দা আল জাররাহ নামে পরিচিত।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর প্রশংসায় বলেছেন:
'গভীর পাণ্ডিত্য, চারিত্রিক মাধুর্য এবং শালীনতায় কুরাইশ বংশে তিন ব্যক্তি বিশেষভাবে খ্যাতি লাভ করেন। তারা যদি আপনার প্রশংসা করেন, তাতে মিথ্যা অতিরঞ্জন থাকবে না এবং আপনিও যদি তাদের প্রশংসা করতে চান, তাতেও কোনো অসত্যের আশ্রয় নিতে হবে না। তাঁরা হলেন:
'আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।'
আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইসলাম গ্রহণের দ্বিতীয় দিনে তাঁরই প্রচেষ্টায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, ওসমান ইবনে মাযউন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, আরকাম ইবনে আবিল আরকাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং তাঁকে সঙ্গে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হন। তাঁরা কালেমা তাওহীদের ঘোষণার মাধ্যমে একই সাথে তাঁর হাতে বাই'আত গ্রহণ করেন। এ পাঁচ ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত সাংগঠনিক কাঠামোই হলো পরবর্তী সময়ে ইসলামের সুমহান প্রাসাদের ভিত্তি।
আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মাক্কী জীবন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটাই অগ্নিপরীক্ষার এক দুর্বিষহ জীবন। প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারী অন্যসব সাহাবীদের মতো তিনিও আর্থিক সংকট, দুঃখ-কষ্ট, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন; কিন্তু আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঈমানী পরীক্ষা ইতিহাসে আদর্শের যে কোনো অনুসারীর বিচারে এক বিরল ঘটনা।
প্রতিটি ঈমানী পরীক্ষাতেই তিনি ধৈর্য ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শকে সমুন্নত করেছেন। কিন্তু বদরের যুদ্ধে তাঁর অকল্পনীয় ঈমানী পরীক্ষা অতীতের সব পরীক্ষাকে ম্লান করে দিয়েছে।
বদর প্রান্তরে তুমুল যুদ্ধের এক পর্যায়ে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মৃত্যুর পরওয়া না করে প্রচণ্ড আক্রমণে শত্রুবাহিনীর দুর্ভেদ্য ব্যূহকে ছত্রভঙ্গ করতে সমর্থ হন, এতে মুশরিকদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়ে যায়। এ সুযোগে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে শত্রুবাহিনীকে ধরাশায়ী করতে করতে সম্মুখপানে অগ্রসর হচ্ছিলেন ও তাঁর চতুর্দিকে ঘুরেফিরে আক্রমণ চালাচ্ছিলেন। কুরাইশ বাহিনীও বার বার তাঁকে প্রতিরোধ করার ব্যর্থ চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। এরই ফাঁকে শত্রুবাহিনীর ব্যূহ থেকে এক ব্যক্তি আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বার বার চ্যালেঞ্জ করছিল। তিনি ও আক্রমণের গতি পরিবর্তন করে প্রতিবারই তার সে চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ দুর্বলতার এক সুযোগে হঠাৎ সে তাঁর ওপর প্রচণ্ড আঘাত হেনে বসল। তিনি তড়িৎ গতিতে পাশ কাটিয়ে গেলে অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন। সে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে শত্রু নিধনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। ধৈর্যহীনতার চরম পর্যায়ে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তরবারির প্রচণ্ড এক আঘাতে তার শির দ্বিখণ্ডিত হয়ে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ল।
প্রিয় পাঠক! ভূলুণ্ঠিত এ ব্যক্তি কে? পূর্বেই আলোচনা করেছি, আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঈমান সর্বকালের কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় এমনভাবে উত্তীর্ণ যে, তা কোনো কল্পনাকারীর কল্পনারও ঊর্ধ্বে। স্তম্ভিত হবেন, ভূলুণ্ঠিত ব্যক্তির পরিচয়ে। সে আর কেউ নয়, সে হলো আবূ উবায়দার পিতা আবদুল্লাহ ইবনে জাররাহ।
এ ক্ষেত্রে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর পিতাকে হত্যা করেননি। তিনি হত্যা করেছেন, পিতার অবয়বে শিরকের প্রতিমূর্তিকে। মহান আল্লাহ তাঁর ও পিতার মাঝে সংঘটিত এ ঘটনা সম্পর্কে আল কুরআনের আয়াত নাযিল করলেন:
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُولَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيْمَانَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوحٍ مِنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُولَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ إِلَّا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ .
'তুমি পাবে না আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কোনো সম্প্রদায়, যারা ভালোবাসে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধচারীদেরকে হোক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্র ভ্রাতা অথবা তাদের জ্ঞাতি-গোত্র। এদের অন্তরে আল্লাহ সুদৃঢ় করে দিয়েছেন ঈমান এবং তাদের শক্তিশালী করেছেন তাঁর পক্ষ হতে রূহ দ্বারা। এদের প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেথায় তারা স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন, এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখো, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।'
আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পক্ষ থেকে এমনটি ঘটা আশ্চর্যের কিছুই ছিল না। আল্লাহর প্রতি তাঁর দৃঢ় ঈমান, ইসলামী আদর্শের কল্যাণকামিতায় এবং উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আমানতদার ও বিশ্বাসভাজন হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর স্থান ছিল শীর্ষে। যে কারণে অনেক মহান ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে তাঁর সমকক্ষ মর্যাদা পেতে আগ্রহী ছিলেন।
মুহাম্মদ ইবনে জাফর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এক সময় খ্রিস্টানদের একটি প্রতিনিধি দল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল:
'হে আবুল কাশেম! আপনার সাহাবীদের মধ্য থেকে আমাদের জন্য এমন এক ব্যক্তিকে মনোনীত করে দিন, যিনি আমাদের অর্থ-সম্পত্তির কিছু বিষয়ে সৃষ্ট বিবাদের সুষ্ঠু ফায়সালা করে দিতে পারবেন। আপনারা আমাদের কাছে খুবই আস্থাভাজন সম্প্রদায়।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন:
'তোমরা বিকেলে এখানে এসো, আমি তোমাদের সাথে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ এক ব্যক্তিকে পাঠাব।'
ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করেন:
'সারা জীবনে শুধু এবারই ঐ গুণের অধিকারী হওয়ার জন্য আমি আগ্রহী হয়ে উঠি। যদিও নেতৃত্ব লাভ কখনো আমি পছন্দ করিনি। তাই সে উদ্দেশ্যে একটু আগেভাগেই আমি যোহরের নামাযের জন্য মসজিদে গিয়ে হাজির হই। নামাযশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডানে ও বাঁয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগলেন। আমি সে মুহূর্তে একটু উঁচু হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নজরে পড়ার জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম। তিনি এদিক-সেদিক দেখতে লাগলেন। অবশেষে তিনি আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দেখতে পেলেন এবং তাকে ডেকে বললেন:
'তুমি তাদের সাথে যাও এবং বিবাদটির সুষ্ঠু নিষ্পত্তি করে দাও।'
'আমি মনে মনে বললাম, আবূ উবায়দা এ গুণটির অধিকারী হয়ে গেল।'
আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিই শুধু ছিলেন না; বিশ্বস্ততার সাথে ছিল শক্তি এবং একাধিক ক্ষেত্রে তিনি সেই শক্তির প্রমাণও দিয়েছেন। কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহ আরম্ভের পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বাণিজ্য কাফেলাকে ধাওয়া করার উদ্দেশ্যে মুহাজির সাহাবীদের সমন্বয়ে সুসজ্জিত যোদ্ধাদের একটি বাহিনীকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলে, তাদের সিপাহসালার হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকেই মনোনীত করেন। ঐ অভিযানে তিনি ত্যাগ ও কষ্টসহিষ্ণুতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায়কালে তাদের রসদবাবদ মাত্র এক ঝুড়ি খেজুর ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেননি। আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যেককে প্রতিদিন মাত্র একটি করে খেজুর রেশন হিসেবে বরাদ্দ করতেন। স্তন্য পানকারী শিশুদের মতো সারাদিনে তারা একটিমাত্র খেজুর চুষে খেতেন এবং তারপর পানি পান করতেন, এভাবে সবাই গোটা একটা দিন অতিবাহিত করতেন।
ওহুদ যুদ্ধে মুসলমানগণ এক পর্যায়ে পরাজয়ের সম্মুখীন হলেও মুশরিক বাহিনীর একজন চিৎকার করে বলছিল:
'আমাকে দেখিয়ে দাও মুহাম্মদকে।'
সেই চরম মুহূর্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে দশজন সাহাবী তাঁকে রক্ষা করার জন্য ঘিরে রেখেছিলেন, আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন তাদের অন্যতম।
এ যুদ্ধে শত্রুদের আঘাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি দন্ত মোবারক শহীদ হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিরস্ত্রাণ ভেঙে এর দুটি পেরেক তাঁর মাথায় ঢুকে পড়ে। আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মোবারক থেকে তা বের করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন; কিন্তু আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনি কাজটি আমাকে করতে দিন।'
আবূ বকর ছিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর অনুরোধে সাড়া দিয়ে তাঁকেই কাজটি করার সুযোগ দিলেন। আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আশঙ্কাবোধ করছিলেন যে, যদি হাতের সাহায্যে পেরেক দু'টি টেনে বের করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীষণ কষ্ট পাবেন। তাই তিনি দাঁত দিয়ে তা টেনে বের করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
প্রথমবারে একটি বের হয়ে এলেও আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সামনের একটি দাঁত ভেঙে যায়, দ্বিতীয় বারে অপরটিও বেরিয়ে আসে; কিন্তু এবারও তাঁর সামনের অপর একটি দাঁত ভেঙে যায়। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'আবূ উবায়দা ছিলেন সামনের দুটি দাঁত ভাঙা সর্বাপেক্ষা সুদর্শন ব্যক্তি।'
আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইসলাম গ্রহণের পর থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত পর্যন্ত তাঁর সাথে সমস্ত যুদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ দাওয়াতী ও রাষ্ট্রীয় কাজে অংশ নেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে খিলাফাতের বাইআতের দিন উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সম্বোধন করে বললেন:
'আপনার হাতটা বাড়িয়ে দিন, যাতে আমি বাইআত করতে পারি। কারণ, আমি রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই একজন আমীন বা বিশ্বস্ত ব্যক্তি থাকেন, এ উম্মতের মধ্যে আপনিই 'আমীন'। অতএব আপনিই এর একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি।'
এ কথা শুনে আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'এমন এক ব্যক্তিকে রেখে কখনোই নিজে খিলাফতের বাইআত নিতে পারি না, যাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশাতেই আমাদের জন্য নামাযের ইমাম নিযুক্ত করেছিলেন। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনিই আমাদের ইমামতি করেন।'
অতঃপর আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতেই খিলাফতের বাইআত করা হয়। তাই হকের ব্যাপারে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর জন্য উত্তম উপদেশদাতা ও সর্বাপেক্ষা অধিক সহযোগিতা দানকারী ছিলেন।
আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইনতিকালের পর আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে খিলাফতের বাইআত গ্রহণ করেন। আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর একান্ত অনুগত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সারা জীবনে মাত্র একবার ছাড়া আর কখনো তিনি খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নির্দেশ পালনে অনীহা দেখাননি।
প্রিয় পাঠক! কী সেই নির্দেশ, যেটি পালন করতে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন?
আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সিরিয়া বিজয়ের প্রাক্কালে যখন মুসলিম বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়ে একের পর এক বিজয় ছিনিয়ে আনছিলেন, তখন তিনি পূর্বে ফোরাত নদী এবং উত্তরে এশিয়া মাইনর পর্যন্ত তাঁর বিজয়ের সীমানা বিস্তৃত করেন। অব্যাহত গতিতে এ বিজয় চলাকালে সিরিয়ায় হঠাৎ নজীরবিহীন মহামারি দেখা দেয় এবং তাতে ব্যাপকভাবে মানুষ মারা যেতে থাকে। এ সময় আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে একখানা পত্র দিয়ে একজন দূত প্রেরণ করেন। পত্রে তিনি লিখেন:
إِنِّي بَدَتْ لِي إِلَيْكَ حَاجَةٌ لَاغِنى لِى عَنْكَ فِيهَا ، فَإِنْ أَتَاكَ كِتَابِي لَيْلًا فَإِنِّي أَعْزَمُ عَلَيْكَ أَلَّا تُصْبِحَ حَتَّى تَرَكَبَ إِلَى، وَإِنْ أَتَاكَ نَهَارًا فَإِنِّي أَعْزَمُ عَلَيْكَ أَلَّا يُمْسِيَ حَتَّى تَرْكَبَ إِلَى.
'অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে আমি বিশেষভাবে মদীনায় আপনার উপস্থিতি কামনা করছি। আপনার নিকট এ নির্দেশনামা রাতে পৌঁছলে ভোর হওয়ার পূর্বে এবং দিনে পৌছলে সূর্যাস্তের পূর্বে অশ্ব পৃষ্ঠে আরোহণ করে আমার কাছে চলে আসবেন বলে আশা করছি।'
আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু খালীফাতুল মুসলিমীনের এ নির্দেশনামা পাঠ করে বললেন:
'আমার কাছে আমীরুল মুমিনীনের কী প্রয়োজন, তা আমি বুঝতে পেরেছি। তিনি এমন এক ব্যক্তিকে জীবিত রাখতে চাচ্ছেন, যার বেঁচে থাকার কথা নয়।'
অতঃপর তিনি আমীরুল মুমিনীনকে লিখলেন:
'আমীরুল মুমিনীন, আপনার সমীপে আমার প্রয়োজনীয় বিষয়টা বুঝতে পেরেছি। আমি মুসলিম সৈন্যবাহিনীর দায়িত্বে নিয়োজিত। তারা মহামারীতে আক্রান্ত। তাদেরকে বিপদে রেখে আমি নিজে নিরাপদ স্থানে যাওয়া মোটেই পছন্দ করছি না। যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে মৃত্যু আমাকে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন না করেছে; ততক্ষণ আমি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাচ্ছি না। আমার এ পত্র আপনার কাছে পৌছার পর আমাকে ঐ নির্দেশ থেকে অব্যাহতি দান করবেন এবং আমাকে এখানে অবস্থান করার অনুমতি দান করবেন।'
আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পত্র পাঠের পর উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কেঁদে ফেললেন। তাঁর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকল, তাঁর এ অস্বাভাবিক কান্না দেখে তাঁর পাশে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা বললেন:
'হে আমীরুল মুমিনীন! আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কি মৃত্যুবরণ করেছেন?'
উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'না, বরং মৃত্যু তাঁর অতি নিকটে এসে পৌছেছে।'
উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ধারণা মিথ্যা ছিল না, অল্পদিনের মধ্যে আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মহামারীতে আক্রান্ত হলেন! মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি তাঁর বাহিনীকে অন্তিম উপদেশ দিয়ে বললেন:
إِنِّي مُوصِيكُمْ بِوَصِيَّةٍ إِنْ قَبِلْتُمُوهَا لَنْ تَزَالُوا بِخَيْرٍ : أَقِيمُوا الصَّلةَ، وَصُومُوا شَهْرَ رَمَضَانَ وَتَصَدَّقُوا ، وَحُجُوا وَاعْتَمِرُوا ، وَتَوَاصَوْا، وَانْصَحُوا لِامْرَائِكُمْ وَلَا تَغُشُوْهُمْ وَلَا تُلْهِكُمُ الدُّنْيَا، فَإِنَّ الْمَرْءَ لَوعُمِّرَ أَلْفَ حَوْلٍ مَا كَانَ لَهُ بُدَّ مِنْ أَنْ بَصِيرَ إِلَى مَصْرَعَى هَذَا الَّذِي تَرَوْنَ ... وَالسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةِ اللَّهِ .
'আমি তোমাদেরকে অন্তিম কিছু উপদেশ দিতে চাই। যদি তা গ্রহণ কর তাহলে সর্বদা তোমাদের কল্যাণ হতে থাকবে। নামায কায়েম করবে, রমযান মাসে রোযা রাখবে, যাকাত দিবে, হজ্জ ও উমরাহ পালন করবে, পরস্পরের মঙ্গল কামনা করে অসিয়ত করবে। আমীরদের পরামর্শ দান করবে, তাদেরকে ধোঁকা দেবে না এবং দুনিয়াদারী যেন তোমাদেরকে অন্য সবকিছু থেকে গাফেল করে না দেয়। কেননা, যদি কাউকে হাজার বছরও আয়ুষ্কাল দান করা হয় তবুও একথা নিশ্চিত যে, তাকেও একদিন এমনিভাবে মৃত্যুর সম্মুখীন হতে হবে। যেভাবে এ মুহূর্তে তোমরা আমাকে হতে দেখছ।'
এরপর তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
'আস্সালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ'
অতঃপর তিনি মু'আয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দিকে ফিরে বললেন:
'হে মুয়ায, মুসলিম বাহিনীর নামাযের ইমামতি করাও।'
এর অল্পক্ষণ পরেই তাঁর পবিত্র রূহ ইহজগতের মায়া ত্যাগ করে চলে গেল।
তখন মুয়ায রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দাঁড়িয়ে বললেন:
'প্রিয় ভাইয়েরা! আপনারা এমন এক ব্যক্তিকে হারিয়েছেন, খোদার শপথ! যাঁর মতো প্রশস্ত অন্তরের মানুষ আমার জানা মতে আর নেই, তাঁর মন সর্বপ্রকার হিংসা-বিদ্বেষ থেকে ছিল পবিত্র। সঙ্গী-সাথীদের ভুল-ত্রুটিতে দয়াশীল ও ক্ষমাসুলভ আচরণে তাঁর কোনো জুড়ি ছিল না। তাঁর মতো জনগণের এতো বড় কল্যাণকামীও আর কেউ ছিল না, তাঁর প্রতি সদয় হোন। আল্লাহ আপনাদের প্রতি সদয় হবেন।'
টিকাঃ
১. তাবাকাত ইবনে সা'দ। ৪র্থ খণ্ডে সূচী দ্রষ্টব্য। ২. আল ইসাবা: জীবনী নং ৪৪০০। ৩. আল ইসতিয়াব: ৩য় খণ্ড ২য় পৃ.। ৪. হুলিয়াতুল আউলিয়া: ১ম খণ্ড ১০০ পৃ.। ৫. আল বদয়ু ওয়াত্ তারিখ: ৫ম খণ্ড ৮৭ পৃ.। ৬. ইবনে আসাকের: ৭ম খণ্ড ১৫৭ পৃ.। ৭. সিফাতুচ্ছাওয়া: ১ম খণ্ড ১৪২ পৃ.। ৮. আশহারু মাশাহিরুল ইসলাম: ৫০৪ পৃ.। ৯. তারিখুল খামিস: ২য় খণ্ড ২৪৪ পৃ.। ১০. আর রিয়াদ আন নাদরা: ৩০৭ পৃ.। ১১. তাবাকাতুস সাআদাহ্।
📄 আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)
‘যে মধুর সুরে কুরআন অবতীর্ণ, কেউ যদি সেই সুরে কুরআন তিলায়াত করতে চায়, তাহলে সে যেন ইবনে ‘উম্মে আবদ’ অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সুরে কুরআন তিলাওয়াত করে।’ - রাসূলে কারীম (স)-এর উক্তি
সবার প্রিয়, কিশোর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে মক্কার লোকেরা ইবনে উম্মে আবদ বলে ডাকত। জনপদ থেকে বেশ দূরে মক্কার পাহাড়ি রাস্তায় জনৈক কুরাইশ সর্দার ‘উকবা ইবনে মু’আইতে’র বকরি চড়ানোই ছিল তাঁর একমাত্র কাজ।
মক্কায় নবীর আগমনের সংবাদ সে শুনত বটে; কিন্তু একদিকে অপরিণত বয়স এবং অপরদিকে মক্কার জনপদ থেকে দূরে থাকার কারণে তাঁর নিকট এর তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না। সকালে উকবার বকরির পাল নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া এবং রাতে প্রত্যাবর্তন ছিল তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস।
মক্কার অধিবাসী এ কিশোর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ একদিন দেখতে পেল, ব্যক্তিত্বের অধিকারী শ্রদ্ধাভাজন দুই জন ব্যক্তি দূর থেকে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছেন, তাদের চোখে-মুখে প্রচণ্ড ক্লান্তির ছাপ সুস্পষ্ট। প্রচণ্ড পিপাসায় তাদের ঠোঁট ও কণ্ঠনালী শুস্ক। তারা কিশোর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের কাছে এসে পৌঁছলে তাঁকে সালাম দিয়ে বললেন :
‘ওহে বালক! বকরির মধ্য থেকে একটিকে দোহন করে আমাদেরকে দাও, যাতে আমরা আমাদের পিপাসা দূর করে পরিতৃপ্ত হতে পারি।'
বালক উত্তর দিল : ‘আমি বকরির মালিক নই, আমি এর রক্ষক ও আমানতদার মাত্র।'
বালকের উত্তরে তারা বিরক্তি প্রকাশ করলেন না বরং তাদের মুখমণ্ডলে আনন্দের আভাস ফুটে উঠল এবং তাদের একজন বালককে বললেন : ‘তবে এমন একটি বকরি দেখিয়ে দাও, যা এখনো পর্যন্ত এক বারের জন্যও গাভিন হয়নি।'
বালক আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ পাশেরই একটি বকরির বাচ্চার দিকে ইশারা করল। তাদের একজন এগিয়ে গিয়ে বকরির বাচ্চাটিকে ধরে বিসমিল্লাহ বলে তার পালানে হাত বুলাতে আরম্ভ করল। বালক আবদুল্লাহ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে মনে মনে বলতে লাগল : ‘পাঁঠা দেখেনি, এমন বকরির বাচ্চা কখনো দুধ দেয় নাকি?’
কিন্তু বকরির বাচ্চার পালান দেখতে দেখতে স্ফীত হয়ে উঠল এবং তা থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ দুধ বেরিয়ে আসতে লাগল। অন্য ব্যক্তিটি বাটির ন্যায় একটি পাথর এনে ধরলেন এবং তা দুধে পূর্ণ হয়ে গেল। এবার তাঁরা উভয়েই দুধ পান করলেন এবং আমাকেও পান করালেন। কিন্তু আমি যা দেখলাম, তা যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। পরিতৃপ্তির সাথে আমাদের দুধ পান করার পর বরকতময় ব্যক্তিটি বকরির পালানকে লক্ষ্য করে বললেন : ‘পূর্বাবস্থায় ফিরে যাও।'
দেখতে দেখতেই তা চুপসে যেতে থাকল এবং পূর্বাবস্থায় ফিরে গেল। এবার আমি সেই বরকতময় ব্যক্তিকে বললাম : ‘আপনি যে কথাটি বললেন, আমাকে তা শিখিয়ে দিন।'
তিনি আমাকে বললেন : ‘হে বালক, তুমি সব কিছুই জানতে পারবে।'
এ ঘটনার মাধ্যমেই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইসলামের সাথে পরিচয়ের সূচনা হয়। বরকতপূর্ণ সেই লোকটি ছিলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর তাঁর সাথীটি ছিলেন আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।
কুরাইশদের সীমাহীন অত্যাচার ও নিপীড়নে অতিষ্ট হয়ে তাঁরা মক্কার পাহাড়ি রাস্তার দিকে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে গিয়েছিলেন। এই বালক যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন, ঠিক তেমনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাথী আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও তাঁর আমানতদারী ও বুদ্ধিমত্তার কারণে তাঁকে পছন্দ করে ফেলেছিলেন এবং তাঁর মধ্যে কল্যাণ দেখতে পেয়েছিলেন।
এরপর অল্প কয়েকদিন অতিবাহিত হতে না হতেই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিজেকে তাঁর খিদমতের জন্য পেশ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাঁকে নিজ সেবায় নিয়োজিত করলেন। সেদিন থেকেই সৌভাগ্যবান এই বালক আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বকরি চরানো থেকে সমস্ত সৃষ্টিকূলের মহান নেতার খিদমতের সৌভাগ্য লাভ করলেন।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে ছাঁয়ার মতো লেগে থাকতে শুরু করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়িতে অবস্থানকালে এবং সফরকালে এমনকি বাড়ির ভেতরে ও বাইরে যেখানেই থাকতেন, তিনি সর্বদা তাঁর খিদমতে নিমগ্ন থাকতেন।
নির্দিষ্ট সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেওয়া, গোসলের সময় পর্দার ব্যবস্থা করা, গৃহ থেকে বের হওয়ার সময় জুতা পরিয়ে দেওয়া, ঘরে প্রবেশকালে পা থেকে তা খুলে দেওয়া, তাঁর লাঠি ও মিসওয়াক এগিয়ে দেওয়া এবং তিনি তাঁর ঘরে প্রবেশ করলে তাঁর আগে আগে প্রবেশ করা, এসব কাজই তিনি করতেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইচ্ছা তাঁর নিজ কক্ষে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিলেন। নির্বিঘ্নে ও নিশ্চিন্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপনীয় বিষয় অবগতি লাভের অনুমতিও তাঁর ছিল। যে কারণে তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপন বিষয় জানার অধিকারী বলে ডাকা হতো।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গৃহে বেড়ে ওঠেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তত্ত্বাবধানে তিনি ইসলামের মহান শিক্ষায় শিক্ষিত হন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারিত্রিক গুণাবলি দ্বারা গুণান্বিত হন এবং তাঁর প্রতিটি স্বভাব ও অভ্যাস অনুসরণ করেন। যে কারণে তাঁর সম্পর্কে বলা হতো যে, ইসলামী শিক্ষা ও আমল-আখলাকে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচাইতে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ সাহাবা।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি শিক্ষা লাভ করার কারণে অন্যান্য সাহাবী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমগণের মধ্যে তিনি সবচাইতে উত্তম ও বিশুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। কুরআনের অর্থ ও মর্ম সম্পর্কে সর্বাধিক জানতেন এবং তিনি শরীআত সম্পকেও সর্বাধিক অবগত ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনাই সর্বাপেক্ষা বড় প্রমাণ। ঘটনাটি হলো:
'উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আরাফাতে অবস্থানকালে এক ব্যক্তি কুফা থেকে এসে তাঁর খিদমতে আরয করল : 'হে আমীরুল মুমিনীন! আমি কুফা থেকে এসেছি। সেখানে এমন এক ব্যক্তি আছেন, যিনি কুরআন শরীফ দেখা ছাড়াই শুধু স্মৃতি থেকেই কুরআন শরীফের কপি করে থাকেন।'
'একথা শুনে ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এতটা রাগান্বিত হলেন যে, খুব কম সময়ই তাঁকে এতটা রাগান্বিত হতে দেখা যেত। তিনি যারপরনাই ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন।
তিনি লোকটিকে বললেন: 'তুমি ধ্বংস হও! কে সেই ব্যক্তি?'
সে বলল: 'আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ।'
তাঁর নাম শোনামাত্রই উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ক্রোধ প্রশমিত হতে থাকল এবং তিনি স্বাভাবিক হলেন। স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে তিনি বললেন:
'তোমার জন্য আফসোস! আমার জানা নেই, তিনি ছাড়া এ পৃথিবীতে দ্বিতীয় আর কেউ জীবিত আছেন, যার দ্বারা এ কাজ সম্ভব। তোমাকে তাঁর পাণ্ডিত্যের কয়েকটি ঘটনা শোনাচ্ছি।'
এ বলে তিনি তাঁর কথা আরম্ভ করলেন:
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো এক রাতে মুসলমানদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলোচনা করার জন্য আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে কথাবার্তা বলছিলেন। আমিও তাঁদের সাথে ছিলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে পড়লে আমরাও তাঁর সাথে বেরিয়ে পড়লাম। এ সময় মসজিদে একজন অপরিচিত লোক নামায আদায় করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কিরাআত শোনার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন।'
অতঃপর আমাদের প্রতি লক্ষ্য করে বললেন:
'যে মধুর সুরে কুরআন অবতীর্ণ, কেউ যদি সেই সুরে কুরআন তিলায়াত করতে চায়, সে যেন ইবনে 'উম্মে আবদ' অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সুরে কুরআন তিলাওয়াত করে।'
নামাযশেষে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বসে দু'আ করতে শুরু করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে লাগলেন:
'আল্লাহর কাছে চাও, যা চাইবে তাই দেওয়া হবে। প্রার্থনা করো, যা প্রার্থনা করবে তাই পাবে।'
অতঃপর উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আরো বললেন : 'আমি মনে মনে বললাম, আল্লাহর কসম! আমি সকালেই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের কাছে গিয়ে তার দু'আয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের 'আমীন' বলার সুসংবাদ দেব। তাই আমি সকালে তার কাছে গিয়ে তাকে সুসংবাদটা জানালাম; কিন্তু জানতে পারলাম যে, আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আমার আগেই তাঁকে এ সংবাদ জানিয়ে গেছেন।
খোদার শপথ! যে কোনো কল্যাণ কাজে আমি আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনস্থ করেছি, সে কাজেই তিনি আমাকে পরাস্ত করেছেন।'
আল্লাহর কিতাব কুরআন মাজীদের জ্ঞানে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এতটা পাণ্ডিত্যের অধিকারী হয়েছিলেন যে, তিনি বলতেন:
'সেই আল্লাহর কসম! যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, কুরআন মাজীদের এমন কোনো আয়াতই নাযিল হয়নি, যে আয়াত সম্পর্কে আমি জানি না, তা কোথায় নাযিল হয়েছে এবং কার বিষয়ে নাযিল হয়েছে। আমি যদি জানতে পারি যে, এ ব্যাপারে অন্য কেউ আমার চেয়ে বেশি জানে, আর যদি তার কাছে যাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে আমি অবশ্যই তার কাছে যাব।'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর নিজের সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন, তাতে কোনো অতিরঞ্জন নেই। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে তাঁর নিম্নোক্ত ঘটনা তা-ই প্রমাণ করে:
'উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কোনো সফরে তিমিরাচ্ছন্ন এক গভীর রাতে এক কাফেলার সম্মুখীন হন। সেই কাফেলায় আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও ছিলেন।
কাফেলা কোথা থেকে আগমন করছে, একথা জিজ্ঞাসা করার জন্য উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দিলেন।
উত্তরে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কুরআনের ভাষায় উত্তর দিতে বললেন : مِنَ الْفَجِّ الْعَمِيقِ
'বহু দূর-দূরান্ত থেকে।'
উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জিজ্ঞাসা করতে বললেন : 'গন্তব্যস্থল কোথায়?' আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কুরআনের ভাষায় উত্তর দিতে বললেন : الْبَيْتِ الْعَتِيقِ .
'প্রাচীন গৃহের (খানায়ে কাবার) দিকে।'
ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ উত্তর শুনে বললেন : 'এ কাফেলায় নিশ্চয়ই কোনো জ্ঞানবান লোক আছেন।' তাই তিনি এক ব্যক্তিকে বললেন : 'তাঁকে জিজ্ঞাসা কর, আল কুরআনের কোন্ আয়াত সবচাইতে শ্রেষ্ঠ?' আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তরে বলে দিতে বললেন : اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ .
'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না।' উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন : 'জিজ্ঞাসা করো, আল কুরআনের কোন্ আয়াত ন্যায়বিচারের চরম উৎকর্ষতায় ভরা?'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তরে বলে দিতে বললেন : إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِبْتَاءِ ذِي الْقُرْبي.
'আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয় স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন।'
উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এরপর জিজ্ঞাসা করতে বললেন, 'আল কুরআনের কোন্ আয়াত সবচাইতে ব্যাপক অর্থব্যঞ্জক?'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তরে বলে দিতে বললেন: فَمَنْ يَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَّرَهُ، وَمَنْ يَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَّرَهُ .
'কেউ অণু পরিমাণ সৎ কর্ম করলে তা দেখবে ও কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কর্ম করলে তাও দেখবে।'
উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবার জিজ্ঞাসা করতে বললেন: 'আল কুরআনের কোন্ আয়াত সবচাইতে বেশি ভীতি প্রদর্শনকারী?'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তরে বলতে নির্দেশ দিলেন: لَيْسَ بِأَمَانِيِّكُمْ وَلَا أَمَانِيِّ أَهْلِ الْكِتَابِ مَنْ يَّعْمَلْ سُوءًا يُجْزَ بِهِ وَلَا يَجِدْ لَهُ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا .
'তোমাদের ও খ্রিস্টান, ইহুদী আহলে কিতাবীদের খেয়ালখুশি অনুসারে কাজ হবে না, কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল লাভ করবে, এবং আল্লাহ ছাড়া তার জন্য সে কোনো অভিভাবক ও সহায়ক পাবে না।'
উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবার জিজ্ঞাসা করতে বললেন: 'আল কুরআনের কোন্ আয়াত সর্বাধিক আশার সঞ্চারক?'
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তরে বলতে বললেন: قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ، إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ.
'বল, হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজের প্রতি অবিচার করেছ। আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না, আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'
অতঃপর উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জিজ্ঞাসা করলেন: 'এ কাফেলার মধ্যে কি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আছেন?'
তখন কাফেলার লোকজন সমস্বরে উত্তর দিল: 'হ্যাঁ, আল্লাহর শুকরিয়া, তিনি আমাদের সাথে আছেন।'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শুধুমাত্র সুন্দর কুরআন তিলাওয়াতকারী, ইবাদতকারী, আলেম ও জাহিদই ছিলেন না; সাথে সাথে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী, দৃঢ় মনোবলসম্পন্ন বীর মুজাহিদ এবং রণক্ষেত্রে প্রথম সারির যোদ্ধা।
তিনিই একমাত্র মুসলিম, যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরই পৃথিবীতে প্রকাশ্যে কুরআন পাঠ করে শুনিয়েছিলেন। মক্কায় মুসলমানগণ ছিলেন দুর্বল ও অসহায়। একদিন তারা মক্কায় একত্রিত হয়ে বলতে লাগলেন:
'মক্কার কুরাইশদের কি প্রকাশ্যে কুরআন শোনানো সম্ভব হলো না। কে এমন আছে যে, তাদেরকে সুউচ্চৈঃস্বরে কুরআন শোনাতে পারে?'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আমি তাদেরকে কুরআন শোনাব।'
সাহাবী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম বললেন:
'তুমি তা করলে আমরা আশঙ্কা বোধ করি। আমরা চাই, এমন কোনো ব্যক্তি এ কাজ করুক, যার অনেক জনবল আছে। যারা তাকে রক্ষা করবে এবং কুরাইশরা কোনো দূরভিসন্ধি নিয়ে অগ্রসর হলে তাদেরকে বাধা দিতে সক্ষম হবে।'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আমাকেই এ কাজ করতে দাও। আল্লাহই আমাকে তাদের নির্যাতন থেকে রক্ষা করবেন এবং তিনিই আমাকে সাহায্য করবেন।'
পরদিনই সকালে তিনি মসজিদে হারামের মাকামে ইবরাহিমের নিকট উপস্থিত হলেন। কুরাইশরা তখন কাবা শরীফের চারপাশে ব্যস্ত ছিল। তিনি মাকামে ইবরাহীমের পাশে দাঁড়িয়ে উচ্চৈঃস্বরে তিলাওয়াত আরম্ভ করলেন: الرَّحْمَنُ، عَلَّمَ الْقُرْآنَ، خَلَقَ الْإِنْسَانَ، عَلَّمَهُ الْبَيَانَ .
'করুণাময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে, দয়াময় আল্লাহ। তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন। তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ। তিনিই তাকে শিখিয়েছেন, ভাব প্রকাশ করতে।'
তিনি তিলাওয়াত করেই চলছেন, তাঁর এ কাজ কুরাইশদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল, তারা বলা শুরু করল : 'ইবনে উম্মে আবদ কী তিলাওয়াত করছে? ধ্বংস হোক সে। সে তো মুহাম্মদ যে কুরআনের কথা বলে, তা-ই তিলাওয়াত করছে!'
এই বলে তারা সম্মিলিতভাবে তাঁর দিকে ছুটে এল এবং তাঁর মুখমণ্ডলের ওপর বেদম প্রহার করতে লাগল। আর তিনি সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে তিলাওয়াত করেই চলেছিলেন। এ প্রহারের মধ্যে তিনি যতটুকু সম্ভব তিলাওয়াত করলেন। অতঃপর রক্তে রঞ্জিতাবস্থায় সাহাবীদের কাছে ফিরে এলেন।
তারা তখন বলতে লাগলেন: 'আমরা এই আশঙ্কাই করছিলাম।'
তিনি বললেন: 'খোদার কসম! আল্লাহর দুশমনদের আজ যতটুকু তুচ্ছ পেয়েছি, তা বলার নয়। তোমরা অনুমতি দিলে তাদেরকে আগামীকালও অনুরূপ শোনাতে পারি।'
তারা বলেন: 'না, যথেষ্ট হয়েছে। তুমি তাদেরকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই শুনিয়েছ।'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফত পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। তিনি অসুস্থ হয়ে মৃত্যু শয্যায় শায়িত হলে উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে দেখতে গেলেন।
তিনি তাঁকে বললেন: 'আপনি কিসের আশঙ্কা করছেন?'
তিনি বললেন:
'আমার আশঙ্কার কারণ আমার গোনাহসমূহ।'
উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'কোনো কিছুর আকাঙ্ক্ষা করছেন?'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আমি আল্লাহর রহমতের আকাঙ্ক্ষা করছি।'
উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আপনি বেশ কয়েক বছর যাবৎ যে সরকারি নাগরিক ভাতা নেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন, সে ভাতা দেওয়ার জন্য আদেশ দেব?'
তিনি উত্তরে বললেন:
'না তার কোনো প্রয়োজন নেই।'
উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আপনার পরে আপনার মেয়েদের তা কাজে লাগবে।'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আপনি কি আমার মেয়েদের অভাবগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করেন? আমি প্রতি রাতে তাদেরকে সূরা আল ওয়াকিয়াহ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছি। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: وَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولُ اللهِ ﷺ يقول " مَنْ قَرَأَ الْوَاقِعَةَ كُلَّ لَيْلَةٍ لَمْ تُصِبْهُ فَاقَةٌ أَبَدًا .
'যে প্রত্যেক রাতে সূরা আল ওয়াক্বিয়াহ পাঠ করবে, দারিদ্র্য ও অভাব তাকে স্পর্শ করবে না।'
রাত হলে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন। তখনো তাঁর মুখে জারি ছিল আল্লাহর নাম এবং পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহের তিলাওয়াত।
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ৪র্থ খণ্ড, ১২৯-১৩০ পৃ.। ২. আল ইস্তিয়াব (হায়দরাবাদ সংস্করণ) ১ম খণ্ড, ৩৫৯-৩৬২ পৃ.। ৩. উসদুল্ গাবা ৩য় খণ্ড: ২৫৬-২৬০ পৃ.। ৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ ১ম খণ্ড ১২-১৫ পৃ.। ৫. আল বিদায়াওয়ান নিহায়া ৭ম খণ্ড, ১৬২-১৬৩ পৃ.। ৬. তাবাকাত আশ-শা'রানী, ২৯-৩০ পৃ.। ৭. শাযরাতুয যাহাব ১ম খণ্ড: ৩৮-৩৯ পৃ.। ৮. তারিখুল ইসলাম লিয্যাহাবী, ২য় খণ্ড: ১০০-১০৪ পৃ.। ৯. সিয়ারু আলামুন নুবালা : ১ম খণ্ড, ৩৩১-৩৫৭ পৃ.। ১০. সিফাতুস সাফওয়া : ১ম খণ্ড, ১৫৪-১৬৬ পৃ.।
📄 সালমান আল ফারেসী (রাঃ)
'সালমান আল ফারেসী আহলে বাইত অর্থাৎ নবী পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত।' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)
এটি আল্লাহর সন্ধানে হকের তালাশে অবিস্মরণীয় ঘটনা। ঘটনাটি ঘটেছে সালমান আল ফারেসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর জীবনে। মহান আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট এবং তিনিও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।
যেহেতু এ ঘটনার ব্যাপারে তাঁর অনুভূতি অত্যন্ত গভীর এবং বর্ণনাও বস্তুনিষ্ঠ ও চিত্তাকর্ষক। সেহেতু নিজের জীবন সম্পর্কে সালমান আল ফারেসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিজের বক্তব্য হুবহু এখানে তুলে ধরা হলো।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সালমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'আমি ইরানের ইস্পাহান প্রদেশের 'জাইয়ান' গ্রামের এক যুবক। আমার পিতা ছিলেন সেই গ্রামের সর্দার। ধন-দৌলতে এই গ্রামের মধ্যে তাঁর যেমন কোনো জুড়ি ছিল না, তেমনি সামাজিক মর্যাদায়ও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
জন্মের পর থেকেই আমি ছিলাম এ পৃথিবীতে আমার পিতার সর্বাধিক স্নেহধন্য সন্তান। দিন দিন এ আদর এতই প্রগাঢ় হতে থাকে যে, মেয়েদের মতো তিনি আমাকেও ঘরের চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখতে পছন্দ করতেন।'
আমি অগ্নি পূজারী হিসেবেই নিজ ধর্মের উপর লেখাপড়া ও নিষ্ঠার সাথে আরাধনা-সাধনা করতাম। গির্জায় আলো জ্বালানোর দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার কারণে প্রতিদিন সকালে অগ্নিশিখা জ্বালাতাম। দিন বা রাতের কোনো সময়েই যাতে এ শিখার অগ্নি নিভে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হতো আমাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে।
গ্রামে আমার পিতার বিরাট শস্য খামার ছিল। সেখান থেকে আমাদের প্রচুর শস্য আসত। আমার পিতা শস্য কেটে নিয়ে আসতেন এবং নিজেই তার রক্ষণাবেক্ষণ করতেন।
একবার তিনি অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে আমাকে বললেন: 'তোমার আজ খামারের দেখাশোনার কাজে যেতে পারলে ভালো হয়।'
তার কথামতো আমি খামারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। বেশ কিছু রাস্তা অতিক্রম করার পর হঠাৎ গির্জায় আরাধনারত খ্রিস্টানদের প্রার্থনার আওয়াজ আমার কানে আসে। খ্রিস্টানদের ধর্ম-কর্ম সম্পর্কে আমার কিছুই জানা ছিল না। আমি অন্য ধর্মাবলম্বীদের সম্পর্কেও কিছু জানতাম না। কারণ, আমাকে লোকজনের সাথে মেলামেশা করতে দেওয়া হতো না, বরং বলা যায় স্নেহের বাঁধনে আটকে রাখা হয়েছিল। তাই গির্জায় প্রার্থনারত খ্রিস্টানদের প্রার্থনার আওয়াজ শুনে কৌতূহল জাগল, ওরা কী করছে, কী বলছে তা দেখা ও শোনার। এই কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে গির্জায় প্রবেশ করি। তাদের অনুষ্ঠানের সবকিছু খুবই মনোযোগের সঙ্গে দেখি। তাদের আরাধনা অনুষ্ঠান আমার খুব ভালো লাগে।
এ ঘটনাই আমাকে খ্রিস্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করে। মনে মনে বললাম: 'আমাদের অগ্নি পূজা থেকে খ্রিস্টান ধর্মই তো অনেক ভালো।'
তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান দেখে আমি সারাদিন পার করে দিলাম। খামারে আর যাওয়া হলো না। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম: 'এ ধর্মের কেন্দ্রীয় দফতর কোথায়?'
তারা জানাল : 'সিরিয়া।'
রাত ঘনিয়ে এলে আমি এখান থেকেই বাড়ি ফিরি। সারাদিনের কাজকর্মের হিসাব চাইলেন আমার পিতা। আমি বললাম:
'বাবা, আমি খামারে যাবার পথে কিছু লোককে দেখতে পাই, তারা গির্জায় আরাধনা করছিল। তাদের ধর্মের এ সকল কার্যাবলী আমাকে মুগ্ধ করে ফেলে। সবকিছু ভুলে আমি সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানেই সময় কাটিয়েছি।'
আমার এমন উত্তর শুনে আমার পিতা অত্যন্ত ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি বললেন:
'বৎস! সে ধর্মে কোনো কল্যাণ নেই, শুধু তোমার ও তোমার পিতার ধর্মই সর্বোৎকৃষ্ট ও কল্যাণকর।'
আমি বললাম : 'খোদার শপথ! তা হতেই পারে না, তাদের ধর্ম অবশ্যই আমাদের ধর্ম থেকে উত্তম।'
একথা শুনে আমার পিতা আরো ভয় পেয়ে গেলেন। নিজ ধর্ম ত্যাগ করে আমি ধর্মান্তরিত হই কি না এই আশঙ্কায় তিনি আমার দু'পায়ে বেড়ি পরিয়ে গৃহবন্দী করে রাখলেন। কিন্তু আমি প্রথম সুযোগেই সেই খ্রিস্টানদের কাছে সংবাদ পাঠালাম : 'সিরিয়ার উদ্দেশ্যে যদি কোনো কাফেলা তোমাদের এখানে আসে, তাহলে আমাকে সংবাদ দিও।'
কয়েক দিনের মধ্যেই সিরিয়ার উদ্দেশ্যে এক কাফেলা তাদের গির্জার কাছে তাঁবু খাটায়। এ সংবাদ আমার কাছে পৌঁছানো হয়। আমিও পায়ের বেড়ি ছিন্ন করে নিজেকে মুক্ত করে বাড়ি ত্যাগ করলাম এবং গোপনে তাদের সাথে রওয়ানা হলাম। এমনকি, শেষ পর্যন্ত সিরিয়ায় পৌঁছলাম। সিরিয়ায় উপস্থিত হয়ে আমি খ্রিস্টান ধর্মের সবচাইতে বড় পাদ্রীর খোঁজ করলাম।
তাদের অনেকেই জানাল 'বিশাপ হলেন বড় পাদ্রি।'
তাঁর খিদমতে হাজির হয়ে বললাম: 'আমি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছি। এখন আমি আপনার সাথে থেকে আপনার খিদমত করতে চাই। ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে চাই এবং আপনার সাথে আরাধনা করার সুযোগ লাভ করতে চাই।'
তিনি বললেন: 'গির্জায় প্রবেশ করো।'
আমি গির্জায় প্রবেশ করলাম এবং তার খিদমতে নিজেকে নিয়োজিত রাখলাম।
এভাবে কিছুদিন অতিবাহিত করার পর আমি বুঝতে পারলাম, এই পাদ্রি ভালো লোক নয়, বরং লোভী ও প্রতারক। তিনি তাঁর অনুসারীদের দান-খয়রাত করার নির্দেশ দিতেন এবং এ কাজে অনেক পুণ্য হবে বলে তাদের উদ্বুদ্ধ করতেন। তার কথায় আস্থা স্থাপন করে ভক্তরা প্রচুর অর্থ তাকে দিত; কিন্তু সেসব অর্থ দীন-দুঃখীদের না দিয়ে তিনি নিজের জন্য রেখে দিতেন। এভাবে তিনি ভক্তদের দানের সোনা-রূপা দিয়ে নিজের জন্য বিরাট সঞ্চয় গড়ে তোলেন। বড় বড় সাত পিপা ভরে উঠল সোনা-রূপা। এসব কাণ্ড দেখার পর পাদ্রির ওপর আমার কোনো আস্থা আর অবশিষ্ট রইল না; বরং তার ওপর আমি ভীষণ ক্ষুব্ধ হলাম। তিনি যেদিন মারা গেলেন, সেদিন তার দাফন-কাফনের জন্য দূর-দূরান্ত থেকেও খ্রিস্টানরা এসে জড়ো হলো। আমি তাদের বলে দেই:
'আপনাদের এই পাদ্রি কিন্তু খুব খারাপ ও পুরোদস্তুর প্রতারক। তিনি লোকদের দান-খয়রাত করতে বলতেন এবং এ কাজে সবাইকে উদ্বুদ্ধও করতেন। যারা তার কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দান করত, তাদের দানের একটি কানাকড়িও গরীব-দুঃখীদের দান করতেন না; বরং তা নিজের জন্য সঞ্চয় করে রাখতেন।'
উপস্থিত ভক্তদের অনেকে আমার কাছে জানতে চাইলেন, এসব আমি কিভাবে জানলাম। আমি বললাম:
'চলুন আমার সাথে, আমি তার সঞ্চিত ধন-ভাণ্ডার আপনাদের দেখিয়ে দিচ্ছি।'
তারা বলল:
'ঠিক আছে। তবে তাই হোক।' পাদ্রির গোপন ধনভাণ্ডার আমি তাদের দেখিয়ে দিলাম। তারা সেখান থেকে পিপাভর্তি সোনা ও রূপা উদ্ধার করল।
এসব দেখে তারা বলল:
'খোদার কসম, আমরা এই খারাপ ব্যক্তিকে দাফন করতে পারি না। দাফনের পরিবর্তে তাকে শূলে চড়িয়ে পাথর নিক্ষেপ করব।' তারা তা-ই করল।
কিছুদিন যেতে না যেতেই এই পাদ্রির স্থানে নতুন এক পাদ্রিকে নিয়োগ দেওয়া হলো। আমি নিজেকে তাঁর খিদমতে নিয়োজিত করলাম। দিন-রাতের অধিকাংশ সময় তিনি ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। তিনি ছিলেন দুনিয়াত্যাগী সাধক। আখিরাতের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল অনুরাগ। আমি এমন নিষ্ঠাবান পাদ্রি আর দেখিনি। আমি তাঁকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভালো বাসতাম। তাঁর সাথে আমি বহুদিন কাটিয়েছি।
তাঁর মৃত্যুর সময়ে আমি তাঁর কাছে আবেদন করলাম :
'মুহতারাম! আপনার পর আমি কার সান্নিধ্যে থেকে জীবন অতিবাহিত করব? আপনি আমাকে কার অনুগত হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন?'
তিনি বললেন : 'হে বৎস! আমার জানামতে মাওসেল শহরে এক ব্যক্তি আছেন, যিনি দীনকে কাটছাঁট করেননি। আমি তাঁকে ছাড়া আর কাউকে দেখছি না, তুমি তার কাছেই চলে যাও।'
অতঃপর এই সাধকের মৃত্যু হলে আমি 'মাওসেলের' সেই পাদ্রির কাছে চলে যাই এবং তাঁর কাছে বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করে আবেদন করি:
'সেই সাধক মৃত্যুকালে আপনার সাথে মিলিত হওয়ার জন্য আমাকে অসিয়ত করেছেন। একমাত্র আপনিই খ্রিস্টান ধর্মকে সঠিকভাবে ধরে রেখেছেন। এ কারণে আপনার খিদমতে আমার উপস্থিতি।'
তিনি বললেন:
'তুমি আমার কাছেই থাক।'
আমি তাঁর কাছে থাকি এবং তাঁকেও সঠিক পথের দিশারী হিসেবে দেখতে পাই; কিন্তু কিছুদিন পর তিনিও ইনতিকাল করলেন।
আমি তাঁর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে আবেদন করলাম : 'মুহতারাম! বুঝতে পারছেন যে, আপনার জীবন শেষ হয়ে এসেছে। আপনি আমার ব্যাপারে সবকিছুই জানেন। আপনার মৃত্যুর পর আমাকে কার খিদমতে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন?'
তিনি বললেন : 'বৎস 'নাছিবাইন' নামক স্থানের এক পাদ্রি ছাড়া আর কেউ নিজ দীনের অনুসরণে নেই। তার মতো আর কেউ এভাবে দীনের অনুসরণ করছে বলেও আমার মনে হয় না। সম্ভব হলে তুমি তার সান্নিধ্যে চলে যেতে পার।'
অতঃপর এ সাধকের মৃত্যু হলে আমি 'নাছিবাইন' নামক স্থানের সেই পাদ্রির সাথে সাক্ষাৎ করে আমার পূর্ববর্তী সাধকের অসিয়ত ও নিজ বিষয়ে বিস্তারিত জানাই। তিনিও আমাকে তাঁর সাথে অবস্থান করার অনুমতি দিলেন। তাঁকেও আমি অপর দুই পাদ্রির মতো খোদাভীরু পেলাম। কিছুদিন পর তিনিও ইনতিকাল করেন।
মৃত্যুর পূর্বকালে তাঁর নিকটও আগের মতো আবেদন করলাম :
'আমার ব্যাপারে আপনি ভালো করেই জানেন। আপনার পর এখন কার সাহচর্যে থাকব?'
তিনি বললেন : 'হে বৎস! খোদার শপথ করে বলছি, 'আম্মুরিয়ার' এক ব্যক্তি ছাড়া দ্বিতীয় আর কেউ সঠিকভাবে খ্রিস্টধর্মে কায়েম আছে বলে আমার জানা নেই। তুমি তার সাহচর্যে নিজেকে নিয়োজিত কর।'
এবার আমি 'আম্মুরিয়ার' সেই পাদ্রির খিদমতে উপস্থিত হয়ে তাঁকে আমার বিষয়ে বিস্তারিত জানালাম। তিনি আমাকে তাঁর সাথে থাকার অনুমতি দিলেন। আমি তখন থেকে তার খিদমতেই লেগে গেলাম। খোদার শপথ করে বলছি যে, তিনি তাঁর ঐসব সঙ্গী-সাথীদের মতোই হেদায়াতের উত্তম পথের পথিক ছিলেন। তাঁর থেকে আমি অনেক গাভী ও বকরি তোহফা হিসেবে লাভ করি। কিছুদিন পর তিনিও ইনতিকাল করলেন।
তার মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও তার কাছে নিবেদন করি : 'আপনি আমার ব্যাপারে বিস্তারিত জানেন, অতএব আপনি আমাকে কার সাহচর্য লাভের পরামর্শ দেন বা আমার করণীয় বিষয়ে কিইবা নির্দেশ দিচ্ছেন?'
তিনি বললেন : 'বৎস! আমার বিশ্বাস, আমরা যারা খ্রিস্টধর্মে আছি, তাঁদের কেউই ধর্মের ওপর সঠিকভাবে নেই। কিন্তু সে সময় অতি নিকটবর্তী, যে সময়ে ইবরাহীম আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীনের অনুসারী একজন নবীর আবির্ভাব ঘটবে। তিনি তাঁর জন্মভূমি থেকে দুই প্রান্তরে কালো পাথরে ঘেরা খেজুর বাগানের জন্য প্রসিদ্ধ ইয়াসরিব এলাকায় হিজরত করবেন। তাঁর কিছু প্রকাশ্য নিদর্শন থাকবে। তাঁর খিদমতে হাদীয়া পেশ করলে তিনি তা নিজের জন্য গ্রহণ করবেন। কিন্তু সদকা ও যাকাত কখনোই নিজের জন্য গ্রহণ করবেন না। তাঁর পিঠে থাকবে নবুওয়াতের মোহর বা ছাপ। যদি পার সে দেশে গিয়ে তাঁর সাথে মিলিত হবে।'
অতঃপর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন; কিন্তু আমি আম্মুরিয়াতেই অনেক দিন অবস্থান করলাম। অবশেষে 'কালব' গোত্রের একটি আরব বাণিজ্য কাফেলা এখান দিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় আমি তাদের কাছে আবেদন করি : 'যদি আরবের উদ্দেশ্যে আমাকে আপনাদের সাথে নিয়ে যান, তাহলে আমার গাভী ও বকরিগুলো আপনাদের দিয়ে দেব।'
তারা এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে বললেন : 'হ্যাঁ, আমরা আপনাকে সাথে নেব।'
ওয়াদা মোতাবেক আমি আমার গাভী ও বকরি তাদের দিয়ে দিলাম এবং তারা আমাকে তাদের সঙ্গে নিল। কিন্তু সিরিয়া ও মদীনার মাঝে 'ওয়াদীয়ে কুবা' নামক স্থানে এসে তারা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাকে একজন ইহুদীর কাছে বিক্রি করে দিল। বাধ্য হয়ে এই ইহুদীর খিদমতে নিয়োজিত হলাম। কিছুদিন পর উক্ত ইহুদীর এক ভাইপো (যিনি 'বনু কুরাইযা' গোত্রের লোক) এ বাড়িতে বেড়াতে এসে আমাকে তার কাছ থেকে কিনে নেয়। এভাবেই সে আমাকে 'ইয়াসরিব' নামক স্থানটিতে নিয়ে এল। এখানে এসেই খেজুর বাগান সমৃদ্ধ সেই স্থান দেখতে পেলাম, যার কথা আম্মুরিয়ার সেই পাদ্রি আমাকে বলে দিয়েছিলেন এবং বর্ণিত সেই মদীনা মুনাওয়ারারও সন্ধান পেলাম, যার প্রশংসা শুনেছি। এভাবে আমি এখানে পৌঁছে সেই ইহুদীর ভাইপোর খিদমতে নিয়োজিত থাকলাম।
এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাতেই অবস্থান করে কুরাইশদের আল্লাহর দীনের দাওয়াত দিচ্ছিলেন। আমার গোলামি বা দাস জিন্দেগী থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য মুক্তিপণের যে অংক নির্ধারিত করা হয়েছিল তা সংগ্রহ করার জন্য আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খবরাদি সংগ্রহ করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না।
কিছুদিন পরেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াসরিবে হিজরত করে আসেন। আমি এ সময় আমার মালিকের খেজুর গাছের মাথায় উঠে কিছু কাজ করছিলাম। আর আমার মালিক গাছের নিচে বসেছিলেন। এমন সময় সেখানে মালিকের ভাইপো এলেন এবং তাকে বলতে লাগলেন:
'আউস এবং খাযরাজ গোত্রের নবীকে আল্লাহ ধ্বংস করুক। তারা সবাই এখন কোবাতে একত্রিত হয়েছে এমন এক ব্যক্তিকে দেখার জন্য, যে নিজেকে নবী দাবি করে মক্কা থেকে হিজরত করে এসেছে।'
এ সংবাদ শোনামাত্রই আমার শরীরে যেন জ্বর এসে গেল। আমি তখন ভীষণভাবে কাঁপছিলাম। আমার ভয় হচ্ছিল যে, আমি মালিকের মাথার উপরই পড়ে না যাই। দ্রুত আমি খেজুর গাছ থেকে নেমে পড়ি এবং তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসা করি, আপনি কী বলছিলেন? সেই সংবাদটির পুনরাবৃত্তি করুন না। আমার মালিক এতে ভীষণভাবে রেগে গেলেন এবং আমাকে সজোরে চপেটাঘাত করে বললেন:
'তোমার এতে কী আসে যায়? যাও যে কাজ করছিলে সে কাজে ফিরে যাও।'
আমার মালিকের এ দুর্ব্যবহার নীরবে সহ্য করে পরে একসময় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্ধানে আমি কিছু খেজুর নিয়ে সাক্ষাৎ করার জন্য রওয়ানা হলাম। তাঁর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললাম :
'যতদূর জেনেছি, আপনি একজন ভালো লোক, আপনার সাথী-সঙ্গীরা গরীব এবং অভাবী। এই সামান্য কিছু সদকার জন্য ছিল। মনে করলাম যে, অন্যের চেয়ে আপনিই এর উত্তম হকদার। এই বলে খেজুরগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে পেশ করলাম।'
তিনি তাঁর সাহাবীদের বললেন: 'তোমরা খাও।'
তিনি তাঁর হাত সেদিকে সম্প্রসারণ করলেন না এবং এ খেজুর খেলেন না। আমি তা দেখে মনে মনে ভাবলাম, এটি একটি নিদর্শন। সেদিন তাঁর খিদমত থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম এবং আরো কিছু খেজুর সংগ্রহ করার কাজে লেগে গেলাম। ইতোমধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোবা থেকে মদীনা মুনাওয়ারাতে চলে গেলেন। আমি আবার মদীনায় তাঁর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করি:
'আমি সেদিন দেখলাম, আপনি সদকা খান না। তাই আজ আপনার সম্মানে কিছু হাদিয়া এনেছি।'
এবার তিনি তা খেলেন এবং সঙ্গীদেরও খেতে বললেন। তারাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে খেলেন। মনে মনে বললাম, এটি দ্বিতীয় নিদর্শন।
আমি যখন তৃতীয় বার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হই, তখন তিনি জান্নাতুল বাকীতে 'গারকাদ' নামক স্থানে তাঁর কোনো এক সাহাবীর দাফনকার্য সম্পন্ন করছিলেন। তিনি সেখানে দু-দুটি বিশেষ ধরনের আরবী চাদর বা গাউন মুড়ি দিয়ে বসে ছিলেন। এবার তাঁকে সালাম করে তাঁর পিঠে খাতমে নবুওয়াতের সেই চিহ্ন দেখার জন্য এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিলাম, যে চিহ্নটি সম্পর্কে আম্মুরিয়ার সেই পাদ্রি আমাকে বলে দিয়েছিলেন। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিঠের দিকে বারবার তাকাচ্ছি দেখে তিনি আমার মতলব বুঝে ফেললেন। নিজ পিঠ থেকে চাদর দু'টি ফেলে দিলেন। এবার আমি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে না করতেই মোহরের ছাপ দেখে তাঁকে নবী হিসেবে চিনতে পারলাম। কালবিলম্ব না করে সে মোহরে চুম্বন দিতে লাগলাম ও আনন্দে চক্ষু দিয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আমার এ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'কী ব্যাপার? তোমার কী হয়েছে?'
তখন আমি তাঁকে আমার সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। সবকিছু শুনে তিনি আশ্চর্য হলেন এবং খুশি মনে তার সাথী-সঙ্গীদেরকেও তা পুনরায় শোনানোর নির্দেশ দিলেন। আমি তাদেরও সে কাহিনী আবারও শোনাই। তারা এসব ঘটনা শুনে যেমন আশ্চর্য হলেন, তেমনি আনন্দিতও হলেন।'
সালমান আল ফারেসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দীনে হকের সন্ধানে নানা স্থানে অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে সফর করার জন্য সালাম। সালমান ফারেসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সালাম তাঁর ঈমানের দৃঢ়তার জন্য। তাকে সালাম তার মৃত্যুর দিনে এবং আখিরাতের জীবনেও।
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ (আস্সাআদাহ সংস্করণ): ৩য় খণ্ড, ১১৩-১১৪ পৃ.। ২. আল ইসতিয়াব (হায়দারাবাদ সংস্করণ): ২য় খণ্ড, ৫৫৬-৫৫৮ পৃ.। ৩. আল জরহু ওয়াত তা'দীলু ভূমিকা ১ম খণ্ড, ১ ২য় খণ্ড, ২৯৬-২৯৭ পৃ.। ৪. উসদুল গাবাহ্: ২য় খণ্ড, ৩২৮-৩৩২ পৃ.। ৫. তাহযীব আত্ তাহযীব: ৪র্থ খণ্ড ১৩৭-১৩৯ পৃ.। ৬. তাকরীবুত তাহযীব : ১ম খণ্ড, ৩১৫ পৃ.। ৭. আল জঊ বাইনা রিজালিস্ সহিহাইন: ১ম খণ্ড, ১৯৩ পৃ.। ৮. তাবাকাত আশ শ'রানী: ৩০-৩১ পৃ.। ৯. সিফাতুচ্ছাফওয়া : ১ম খণ্ড, ২১০-২২৫ পৃ.। ১০. শাজরাতুযযাহাব: ১ম খণ্ড, ৪৪ পৃ.। ১১. তারিখুল ইসলাম লিষ যাহাবী : ২য় খণ্ড, ৫৮-১৬৩ পৃ.। ১২. শিয়ারু আলাম আন নুবালা ১ম খণ্ড, ৩৬২-৪০৫ পৃ.।
📄 ইকরামা ইবনে আবী জাহল (রাঃ)
'কিছুক্ষণের মধ্যে ইকরামা মুমিন ও মুহাজির হিসেবে আগমন করবে, তোমরা তার পিতাকে গালি দেবে না। কারণ, মৃতকে গালি দিলে তা মৃতদের কাছে পৌছে না; কিন্তু জীবিতরা তাতে কষ্ট পায়।' 'স্বাগতম হে অশ্বারোহী মুহাজির, স্বাগতম'। - নবী করীম (সা)-এর স্বাগত বাণী
ইকরামার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে শেষ দিকের ঘটনাসমূহের অন্যতম। রহমতের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীনে হক ও হেদায়াতের দাওয়াত প্রকাশ্যে শুরু করেন, তখন ইকরামা ইবনে আবী জাহলের বয়স ত্রিশের কোঠায়। তখন ইকরামা ছিল কুরাইশদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদার অধিকারী, সবচেয়ে সম্পদশালী এবং বংশগতভাবে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত।
যদি তাঁর পিতার প্রতিবন্ধকতা না থাকত, তাহলে এটাই স্বাভাবিক ছিল যে, তার সমকক্ষ অন্যান্য সম্ভ্রান্ত পরিবারের সমকক্ষ ব্যক্তিবর্গ যেমন সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, মুস'আব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু প্রমুখের মতো সেও ইসলাম গ্রহণ করত।
প্রিয় পাঠক! কে তার এই পিতা? শিরক সম্রাট, মক্কার সবচেয়ে ক্ষমতাধর, ভয়াবহ নিপীড়নকারী যে তার কঠোর কঠিন ও ভয়ঙ্কর নির্যাতনের দ্বারা মুমিনদের ঈমানের পরীক্ষায় ফেলেছিল এবং মুমিনরাও এ পরীক্ষায় ছিলেন অবিচল। সে নানা চক্রান্তের মাধ্যমে মুমিনদের ঈমানকে চ্যালেঞ্জ করে চললে মুমিনরাও তাদের ঈমানের দৃঢ়তা ও শক্তি বার বার প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন। যার এতটুকু পরিচয়ই যথেষ্ট যে সে ছিল 'আবী জাহল।'
আর তার ছেলেই ইকরামা ইবনে আবী জাহল আল মাখযুমী। কুরাইশ বংশের হাতেগোনা কয়েকজন বীরপুরুষের অন্যতম। সুদক্ষ ঘোড়সওয়ার এবং বীর যোদ্ধা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধাচরণ ও শত্রুতামূলক আচরণের শিক্ষা সে তাঁর শিক্ষাদাতা পিতা আবী জাহলের কাছ থেকেই লাভ করেছিল। সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরম বিরোধিতায় লিপ্ত হয় এবং তাঁর সাহাবীদের ভীষণ কষ্ট দেয়। তার পিতা আবী জাহলকে সন্তুষ্ট করার জন্য মুসলমানদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানোই ছিল তার একমাত্র চিন্তা ও কাজ।
বদর যুদ্ধে তার পিতা আবী জাহল কুরাইশদের নেতৃত্ব দেয় এবং 'লাত' ও 'উয্যা' নামক মূর্তির নামে এই মর্মে শপথ করে: 'মুহাম্মদকে পরাস্ত না করে সে মক্কায় ফিরে আসবে না।'
তারপর সৈন্য-সামন্ত নিয়ে সে বদর প্রান্তরে উপস্থিত হয় এবং তিন দিন পর্যন্ত মুসলিম বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। সে অবস্থায় উট জবাই, মদ্যপান এবং নর্তকীদের নৃত্য উপভোগে নিমগ্ন থাকে।
বদর যুদ্ধে আবী জাহল মুশরিক কুরাইশদের নেতৃত্ব দান করে। তার পুত্র বীর যোদ্ধা ইকরামা ছিল তার শক্তিশালী বাহু, যার ওপর সে নির্ভর করত। 'লাত' ও 'উয্যা' আবী জাহলের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। কারণ, শোনার ক্ষমতাই তো তাদের নেই, ফলে তারা তাদেরকে সাহায্যও করতে পারেনি। তারা ছিল নিতান্তই অসহায় ও অক্ষম।
বদর যুদ্ধে আবী জাহল নিহত হলো এবং তার পুত্র ইকরামা তা নিজ চোখেই দেখল। মুসলিমদের বর্শা তার রক্ত বইয়ে দিল। পিতা আবী জাহলের শেষ আর্তনাদও পুত্র ইকরামা নিজ কানে ভালো করেই শুনেছিল।
যুদ্ধ শেষে ইকরামা কুরাইশ নেতা আবী জাহলের লাশ ফেলে রেখেই মক্কায় ফিরে আসতে বাধ্য হলো। যুদ্ধের পরাজয় আবী জাহলের লাশ মক্কায় এনে দাফন করতে তাকে অক্ষম করে দিয়েছিল। মুসলিম বাহিনীর কাছে পরাস্ত হওয়ায় পিতার লাশের সৎকাজের আশা পূরণ তো হলোই না; বরং লাশ রেখেই তাকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। বিজয়ী মুসলিম বাহিনী অগণিত লাশের সাথে আবী জাহলের লাশও 'কুলাইব' নামক একটি পরিত্যক্ত কূপে নিক্ষেপ করে মাটি চাপা দেয়।
বদর যুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে ইকরামার শত্রুতা ভিন্নরূপ পরিগ্রহ করল। প্রথম প্রথম সে পিতার মর্যাদা রক্ষা ও তাকে খুশি রাখার জন্য ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করছিল; কিন্তু তখন থেকে সে তার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ শুরু করে দিল।
ইকরামা এবং তার মতো আরো কয়েকজন যারা বদরের প্রান্তরে তাদের আত্মীয়-স্বজনের লাশ ফেলে আসতে বাধ্য হয়েছিল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে মক্কার মুশরিকদের হৃদয়-মনে নতুনভাবে শত্রুতার বহ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত করে, স্বজনহারা কুরাইশদের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। ফলস্বরূপ সংঘটিত হয় ওহুদ যুদ্ধ।
ইকরামা ওহুদ রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়লে তার সাথে তার স্ত্রী উম্মু হাকিমও যুদ্ধে অংশ নিল। যাদের নিকটাত্মীয় বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছিল তাদের স্ত্রীরাও যুদ্ধসারির পিছনে থেকে দফ বাজিয়ে ও শোকগাথা মরসিয়া গেয়ে গেয়ে অশ্বারোহী সৈন্যদের যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে, যেন তারা পশ্চাৎপসরণ না করে।
কুরাইশ বাহিনীর ব্যূহের ডানে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ এবং বামে ইকরামা ইবনে আবী জাহল অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়। এই দুই বীর যোদ্ধৃদ্বয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এবং তাঁর সাহাবীদের জন্য এক মহা পরীক্ষার অবতারণা করেন এবং যুদ্ধে মুশরিকদের জন্য অতীব মূল্যবান ভূমিকা পালন করে। আবূ সুফিয়ানের ভাষায় তা ছিল 'বদরের প্রতিশোধ'।
খন্দকের যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনী দীর্ঘদিন পর্যন্ত মদীনা অবরোধ করে রাখতে বাধ্য হওয়ায় ইকরামা ইবনে আবী জাহলের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়ে। সে কোনোভাবেই নিজেকে ধরে রাখতে পারছিল না। সে খন্দকের একটি সংকীর্ণ স্থানের সন্ধান পেয়ে সে স্থান দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল, দেখতে না দেখতেই তার জানবাজদের কয়েকজন তার পিছনে পিছনে ছুটে আসে।
পরিণতিতে আমর ইবনে আবদ উদ্দ আল আমেরী নামক চৌকশ মুসলিম প্রহরীর হাতে মুহূর্তের মধ্যে ধরাশায়ী হয় এবং ইকরামা কোনো রকমে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
মক্কা বিজয়ের দিন কুরাইশরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীদের মোকাবেলা করার সাহস না পেয়ে মক্কার প্রবেশ পথ উন্মুক্ত করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের এটাও একটা কারণ ছিল যে, তারা দেখেছে কেউ আক্রমণ না করলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সেনাধ্যক্ষদের যুদ্ধ না করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু ইকরামা ইবনে আবী জাহল এবং কুরাইশদের আরো কিছু লোক এহেন শুভ সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে বিরাট মুসলিম বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছোট একটি সংঘর্ষেই তাদের পরাস্ত করেন। তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক নিহত হয় এবং বাকিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
এবার ইকরামা বিস্মিত ও অনুতপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মুসলমান কর্তৃক মক্কা বিজিত হওয়ার পর সেখানে তার জন্য আশ্রয়ের স্থান থাকে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন; কিন্তু কয়েকজন গুরুতর অপরাধী সম্বন্ধে বলেন:
'তাদেরকে খানায়ে কাবার গিলাফের ভেতরে পাওয়া গেলেও যেন হত্যা করা হয়।'
ইকরামা ইবনে আবী জাহল ছিল সেই গুটিকয়েক অপরাধী লোকের অন্যতম। তাই সে মক্কা ত্যাগ করে ইয়ামেনের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আর পালানোর জন্য ইয়ামেন ছাড়া তার দ্বিতীয় কোনো আশ্রয়স্থলও ছিল না।
এদিকে ইকরামা ইবনে আবী জাহলের স্ত্রী উম্মু হাকিম, আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা অন্য আরো দশজন মহিলার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে তাঁর হাতে বাইআত গ্রহণের জন্য উপস্থিত হয়।
এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তাঁর দুই স্ত্রী, ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এবং বনু আবদুল মুত্তালিব গোত্রের কয়েকজন মহিলা উপস্থিত ছিলেন। আবূ সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা মুখমণ্ডল আবৃত অবস্থায় আলাপের সূত্রপাত করে বলে:
'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তাআলা তাঁর পছন্দনীয় দীনকে বিজয় দিয়েছেন। এজন্য আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া। আপনার সাথে আমাদের যে রক্তের সম্পর্ক, সে সম্পর্কের কারণেই আশা করি আপনি আমাদের প্রতি দয়া করবেন, যেহেতু আমরা সবাই ঈমানদার নারী।'
এ বলে সে বোরকার নিকাব সরিয়ে বলল:
'হে আল্লাহর রাসূল! আমি হিন্দ বিনতে উতবা।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সুস্বাগতম জানিয়ে বললেন:
'মারহাবা! তোমাকে স্বাগতম!'
অতঃপর হিন্দ বিনতে উতবা বলেন:
'হে আল্লাহর রাসূল! আজ আপনার ঘরের চেয়ে আর প্রিয় কোনো ঘর আমার নেই, অথচ এই ঘরই একদিন আমার নিকট সবচেয়ে ঘৃণার ছিল।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন:
'আরো কি কেউ কিছু বলতে চাও?'
এ সুযোগে ইকরামার স্ত্রী উম্মু হাকিম ওঠে দাঁড়ায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে বলে:
'হে আল্লাহর রাসূল! ইকরামা প্রাণভয়ে ইয়ামেনের দিকে পালিয়ে গেছে। অনুগ্রহ করে তাকে ক্ষমা করে নিরাপত্তা দিন। আল্লাহ আপনাকেও নিরাপত্তা দেবেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তাকে নিরাপত্তা দান করা হলো।'
নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে ইকরামার স্ত্রী উম্মু হাকিম সে মুহূর্তেই তাঁর স্বামীর সন্ধানে বের হয়ে পড়েন। তাঁর সাথে ছিল তাঁর রোমান ক্রীতদাস। ইয়ামেনের পথে অনেক দূর অগ্রসর হওয়ার পর ক্রীতদাসটি তাঁকে অসৎ কর্মের জন্য ফুসলাতে থাকে এবং তিনি টালবাহানার মাধ্যমেই কালক্ষেপণ করতে থাকেন।
অবশেষে, তারা এক আরব গোত্রে গিয়ে পৌঁছলে তিনি তাদের কাছে সাহায্য চান। তারা ক্রীতদাসকে বেঁধে রাখে এবং তিনি তাকে তাদের কাছে রেখে একাই ইয়ামেনের পথে অগ্রসর হতে থাকেন। অবশেষে তিনি ইকরামাকে 'তিহামা' এলাকার সমুদ্র তীরে খুঁজে পান। সে মুহূর্তে ইকরামা নৌকার মাঝির সাথে তর্কে লিপ্ত ছিল। মাঝি তাকে বলছিল:
'পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত আমি তোমাকে পার করব না।'
ইকরামা বলছিল: 'কিভাবে পবিত্র হব?'
মাঝি বলল: 'কালেমা শাহাদাত পড়ে পবিত্র হও।'
বল: 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।'
ইকরামা উত্তর দিল: 'এ কালেমার সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্যই তো আমি পালিয়েছি।'
বাদানুবাদের এক পর্যায়ে উম্মু হাকিম ইকরামার সামনে গিয়ে বললেন: 'ইকরামা! সবচেয়ে মহান, নিষ্পাপ এবং উত্তম ব্যক্তির নিকট থেকে আমি তোমার কাছে এসেছি। অর্থাৎ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর নিকট থেকে। তাঁর কাছে তোমার জন্য নিরাপত্তা চেয়েছিলাম। তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। অতএব নিজেকে আর ধ্বংসের পথে ঠেলে দিও না।'
ইকরামা বলল: 'তুমি কি তার সাথে কথা বলেছ?'
তার স্ত্রী বললেন: 'হ্যাঁ, আমি নিজেই তাঁর সাথে কথা বলেছি এবং তিনি তোমাকে নিরাপত্তা দান করেছেন।'
উম্মু হাকিম তাকে নানাভাবে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছিলেন। পরিশেষে, ইকরামা ফিরে যেতে রাজি হলো। অতঃপর উম্মু হাকিম তাকে তাদের রোমান ক্রীতদাসের আচরণ সম্পর্কে অবহিত করলে সে ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সেখানে এসে তাকে হত্যা করল।
পথে তাঁরা এক স্থানে রাত যাপনকালে ইকরামা তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করলে তিনি কঠোরভাবে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে বললেন:
'তা হতে পারে না। কারণ আমি মুসলমান আর তুমি মুশরিক।'
স্ত্রীর উত্তরে ইকরামা খুবই আশ্চর্যান্বিত হয়ে যায় এবং বলে:
'যে জিনিসটি তোমার ও আমার মিলনে বাধা হতে পারে তা নিঃসন্দেহে খুবই বড় ব্যাপার।'
ইকরামা মক্কার নিকটে এসে পৌঁছতেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের বললেন:
'কিছুক্ষণের মধ্যেই ইকরামা ইবনে আবী জাহল মুমিন ও মুহাজির হিসেবে তোমাদের মধ্যে উপস্থিত হচ্ছে। তোমরা তার পিতাকে মন্দ বলো না বা গালি দিও না। কেননা মৃত ব্যক্তিকে গালি দিলে জীবিতরা কষ্ট পায়, অথচ মৃতব্যক্তি তা শুনতে পায় না।'
দেখতে না দেখতেই ইকরামা এবং তার স্ত্রী উম্মু হাকিম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে বসেছিলেন, সেখানে এসে হাজির হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে দেখেই আনন্দে গায়ে চাদরহীন অবস্থায় ওঠে তাদেরকে স্বাগতম জানান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসলে ইকরামাও তাঁর সামনে বসে পড়ে, এবং বলে যে:
'হে আল্লাহর রাসূল! উম্মু হাকিম আমাকে জানিয়েছে যে, আপনি আমাকে নিরাপত্তা দান করেছেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দেন: 'হ্যাঁ সে ঠিকই বলেছে। তুমি এখন নিরাপদ।'
ইকরামা বলল: 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে কিসের দিকে আহ্বান করছেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'আমি তোমাকে আহ্বান করছি এই সাক্ষ্য দিতে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁরই রাসূল, নামায কায়েম করতে এবং যাকাত দিতে।'
এভাবে তিনি ইসলামের সমস্ত রুকনগুলো এক এক করে উল্লেখ করলেন।
ইকরামা বলল: 'আল্লাহর শপথ! আপনি ন্যায় ও সত্য ছাড়া আর কিছুর আহবান জানাননি এবং ভালো কাজ ছাড়া অন্য কিছুর নির্দেশও দেননি।'
সে আরো বলল: 'ইসলামের দিকে আহবান করার আগেও আপনি একজন সত্যবাদী ও অত্যন্ত নেক লোক ছিলেন।'
অতঃপর ইকরামা বলল: 'আমি বলতে পারি, এরূপ সর্বোত্তম কথা আপনি আমাকে শিখিয়ে দিন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'তুমি বল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দাহ ও রাসূল।'
ইকরামা বলল: 'অতঃপর কী?'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : 'তুমি বল, আমি আল্লাহকে এবং তারপর উপস্থিত সবাইকে সাক্ষী রেখে ঘোষণা করছি যে, আমি মুসলিম মুজাহিদ ও মুহাজির।'
ইকরামা অনুরূপ ঘোষণাই দিলেন। এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন: 'আজ তুমি চাইলে, আমি অন্যদেরকে যা দিয়েছি, তোমাকেও তার চেয়ে কম দেব না।'
তখন ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'জীবনে আপনার সাথে যে দুশমনি করেছি কিংবা আপনার বিরুদ্ধে যত যুদ্ধ-বিগ্রহে অংশ গ্রহণ করেছি এবং আপনার সাক্ষাতে বা অনুপস্থিতিতে যত কটুবাক্য বলেছি বা কুৎসা রটিয়েছি তার জন্য আল্লাহর কাছে আমার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করুন।'
তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য আল্লাহর দরবারে ইসতিগফার করে বলতে লাগলেন:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ كُلَّ عَدَاوَةٍ عادانِيهَا ، وَكُلَّ مَسِيرٍ سَارَ فِيهِ إِلَى مَوْضِع يريد به إطفاء نورِكَ، وَاغْفِرْ لَهُ ما نالَ مِنْ عِرْضِي فِي وَجْهِي أَوْ أَنَا غَائِبٌ عَنْهُ .
'হে আল্লাহ! ইকরামা আমার সাথে যত দুশমনী করেছে তা ক্ষমা করে দাও! তোমার দ্বীনের আলো নিভিয়ে দেয়ার জন্য যত চেষ্টা সাধনা করেছে, তা মাফ করে দাও। আমাকে যত গালমন্দ ও গীবত করেছে, তাও তাকে ক্ষমা করে দাও।'
তাঁর জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু'আ ও ইসতিগফার শুনে ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর চেহারা হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠল, তার অন্তর খুশিতে ভরে গেল। তিনি দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন:
'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর শপথ, এতদিন আল্লাহর দীনের প্রতিবন্ধকতায় যত ধন-সম্পদ ব্যয় করেছি, এখন থেকে তাঁর দীনের প্রচার ও প্রসারে তার দ্বিগুণ খরচ করবো। দীনের বিজয়কে ঠেকানোর জন্য যত যুদ্ধ করেছি, এখন থেকে দীনের বিজয়ের জন্য তার চেয়ে দ্বিগুণ জিহাদ করবো।'
এক সময়ের শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী বীর, ঐদিন থেকে আল্লাহর পথে আহ্বানকারী হিসেবে দাওয়াতে দীনের কাফেলায় শরীক হলেন। সার্বক্ষণিক ইবাদত-বন্দেগী এবং মসজিদে কুরআন তিলাওয়াতে নিরন্তর মশগুল থাকতে শুরু করলেন। মুখমণ্ডলে কুরআন শরীফ চেপে ধরে চুম্বন দিতেন এবং আল্লাহর ভয়ে কেঁদে কেঁদে বলতেন:
'আমার প্রভুর কিতাব, আমার প্রভুর বাণী...।'
ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কৃত ওয়াদা হুবহু পালন করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ইসলামের সমস্ত জিহাদে অংশগ্রহণ করেন। এমন কোনো দাওয়াতী কাফেলা প্রেরণ করা হতো না, যে কাফেলার অগ্রভাগে তিনি থাকতেন না।
ইয়ারমুকের যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনীর ওপর যখন শত্রুপক্ষের প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছিল, কালবিলম্ব না করে তিনি দ্রুতগামী ঘোড়া থেকে নেমে নিজ তলোয়ারের কোষ ভেঙে ফেলেন, জীবনে যেন কোনোদিন আর তলোয়ার কোষে আবদ্ধ করতে না হয়। তারপর রোমান সৈন্যদের ব্যূহ ভেদ করে বহুদূর পর্যন্ত অগ্রসর হন। তা দেখে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দ্রুতগতিতে তাঁর নিকটে গিয়ে তাঁকে বলেন:
'এভাবে ভেতরে ঢুকবেন না। কেননা আপনার নিহত হওয়া মুসলমানদের জন্য ভীষণ ক্ষতির কারণ হবে।'
ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জবাব দিলেন:
'হে খালিদ! আমাকে ছেড়ে দিন, আপনি আমার পূর্বেই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ঈমান এনেছেন। কিন্তু আমি ও আমার পিতা আবী জাহল তখন ইসলামের ঘোর দুশমন ছিলাম। অতএব আমাকে ছেড়ে দিন। আমাকে আমার অতীত কৃতকর্মের কাফফারা আদায় করতে দিন।'
অতঃপর তিনি আবার বলে উঠেন:
'আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে বহু যুদ্ধ করেছি। আর আজ রোমান সৈন্যদের ভয়ে পালাব! তা কক্ষনো হতে পারে না।'
অতঃপর তিনি মুসলিম সৈন্যদের আহ্বান করে বললেন:
'তোমাদের মধ্যে কে মৃত্যুর জন্য আমার হাতে হাত দিয়ে শপথ করতে রাজি আছ? এতে চার শত সৈনিক তার হাতে হাত দিয়ে শপথ করে। তাদের মধ্যে ছিলেন তার চাচা হারিস ইবনে হিশাম এবং দিরার ইবনুল আযওয়ার রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা। তাঁর আহ্বানে তারা মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর চারপাশে থেকে তার প্রতিরক্ষার জন্য যুদ্ধ করতে থাকেন এবং তাঁকে ভালোভাবেই রক্ষা করে চলেন।'
ইয়ারমুকের এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধশেষে মুসলমান বাহিনীর বিজয় লাভের পর দেখা গেল, তিনজন মুসলমান বীর যোদ্ধা শুক্র বাহিনীর হাতে ভীষণভাবে আহত হয়ে পড়ে ছটফট করছেন।
তাঁরা হলেন:
১. হারিস ইবনে হিশাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, ২. আইয়াশ ইবনে আবী রাবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং ৩. ইকরামা ইবনে আবী জাহল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।
হারিস ইবনে হিশাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অন্তিম সময়ে পানি পানি বলে চিৎকার করছিলেন। যখন দৌড়ে তাঁর কাছে পানি পৌঁছানো হলো, তখন তিনি দেখতে পেলেন যে, তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ইকরামা ইবনে আবী জাহল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সেদিকে তাকাচ্ছেন, তা দেখে হারিস ইবনে হিশাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আমার আগে ইকরামাকে পানি পান করাও।'
দৌড়ে যখন ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে পানি আনা হলো তখন ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও দেখতে পেলেন যে আইয়াশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তার দিকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় তাকাচ্ছেন। ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আগে আইয়াশকে পানি পান করাও।'
আইয়াশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে পানি আনা হলে দেখতে পেলেন, আইয়াশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন।
অতঃপর ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট পানি আনা হলে দেখা গেল, তিনিও আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন।
তাঁর কাছ থেকে হারিস ইবনে হিশাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে পানি আনা হলে দেখা গেল, আল্লাহ তাঁকেও নিজের কাছে নিয়ে গিয়েছেন।
জীবনের অন্তিম মুহূর্তে নিজের চেয়ে অপর দীনি ভাইকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে আল্লাহ তাঁদের ওপর সন্তুষ্ট হোন এবং তাদের সবাইকে হাউজে কাওসার থেকে পানি পান করান। তাঁরা যেন আর তৃষ্ণার্ত না থাকেন। হে আল্লাহ, বিশেষ করে তাঁদেরকে জান্নাতুল ফিরদাউস-এর বাগ-বাগিচা দান করো, যেন তারা অনন্তকাল সেখানে বিচরণ করতে পারেন। আমীন।
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ৫৬৪০ নং জীবনী। ২. তাহযীবুল আসমা; ১ম খণ্ড, ৩৩৮ পৃ.। ৩. খুলাসাতুত্ তাহযীব; ২২৮ পৃ.। ৪. যাইলুল মুজীল; ৪৫ পৃ.। ৫. তারীখুল ইসলাম লিয্যাহাবী: ১ম খণ্ড, ৩৮০ পৃ.। ৬. রাগবাতুল আমাল: ৭ম খণ্ড, ২২৪ পৃ.।