📄 আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ আল আসাদী (রাঃ)
'আমি তোমাদের মধ্য থেকে এমন এক ব্যক্তিকে দলের পরিচালক (সর্ব প্রথম আমীরুল মুমিনীন) মনোনীত করব, যে তোমাদের মধ্যে ক্ষুৎপিপাসায় সবচেয়ে বেশি ধৈর্য অবলম্বনে সক্ষম।' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)
আমরা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন ঘনিষ্ঠ সাহাবী ও প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবীদের অন্যতম আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ আল আসাদী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সম্পর্কে আলোচনা করছি। আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মাতা উমাইমা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফুফু। পরবর্তীতে তাঁর বোন উম্মুল মুমিনীন যায়নাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ে করায় পুনরায় তাদের মধ্যে নতুনভাবে আত্মীয়তার বন্ধন সৃষ্টি হয়। আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ আল আসাদী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই সম্মানিত সর্বপ্রথম সাহাবী, যাকে 'আমীরুল মুমিনীন' উপাধি দিয়ে ইসলামের সামরিক ঝাণ্ডা সোপর্দ করা হয়েছিল।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতের সূচনাকালে এবং 'দারুল আরকামে' প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচি শুরু করার পূর্বে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কায় কুরাইশদের অত্যাচারে যখন মুসলমানদের জানমাল একান্তই হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে তখন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের মদিনায় হিজরত করার অনুমতি দেন। তিনিই হলেন দ্বিতীয় মুহাজির সাহাবী, যার পূর্বে আবূ সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা ছাড়া অন্য কেউ মদীনায় হিজরত করার সৌভাগ্য লাভ করতে পারেননি।
ঘর-বাড়ি, পরিবার-পরিজন ও জন্মভূমি ত্যাগ করে আল্লাহর দীনের হেফাযতের জন্য হিজরত করার অভিজ্ঞতা এটাই তার প্রথম নয়। এর পূর্বেও তিনি পরিবারের কয়েকজনকে নিয়ে হাবশায় হিজরত করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। তবে তাঁর এবারকার হিজরত পূর্বের তুলনায় পরিপূর্ণ ও সামগ্রিক। মদীনা হিজরতে তাঁর ছেলে-মেয়ে, ভাইবোন, স্ত্রী পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজন সহ সকলেই অংশগ্রহণ করেছেন। কেননা তাঁর সমগ্র পরিবারটিই ছিল ইসলামী পরিবার এবং সমগ্র গোত্রটিই ছিল ঈমানদারদের গোত্র। এবারের হিজরতের পর তাঁর বাড়িটি বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। মরুভূমির দমকা হাওয়া তাঁর ঘরের একদিকের জানালা দিয়ে প্রবেশ করে অন্যদিকের জানালা দিয়ে শোঁ শোঁ করে বেরিয়ে যেত। মনে হতো, এই বিরাণ বাড়িটিতে কোনোদিন কেউ বাস করেনি। আর এখানে চা ও কফির আসরে সন্ধ্যায় কেউ একত্রিত হয়ে খোশ-গল্পেও রত থাকেনি।
আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হিজরতের মাত্র কয়েকদিন পর আবূ জাহল ও উতবা বিন রাবিয়ার নেতৃত্বে কুরাইশদের একটি দল মহল্লায় ঘুরে ঘুরে অনুসন্ধান চালাচ্ছিল যে, মুসলমানদের মধ্য থেকে কে কে মদীনায় হিজরত করে চলে গেছে, আর কে কে এখনো এখানে অবস্থান করছে। তারা আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাড়িতে পৌঁছে দেখতে পায় যে, জন-মানবহীন এই বিরাণ ঘরবাড়িগুলোর দরজা-জানালা দিয়ে দমকা বাতাসের সাথে ধুলাবালি প্রবেশ করে আসবাব পত্রের উপর একটি মোটা আবরণের সৃষ্টি করেছে। আর দমকা বাতাসের ঝাপটায় দরজা জানালাগুলো সজোরে আওয়াজ করছে। মনে হচ্ছিল বনূ জাহাশের পরিত্যক্ত ঘরবাড়িগুলো তাদের মালিকদের জন্যে ক্রন্দন করছে। বিরাণ বাড়িঘরগুলোর এই করুণ দশা প্রত্যক্ষ করে আবূ জাহল বলে উঠল:
'তারা কোথায়? যাদের জন্যে আজ বাড়িঘরগুলো ক্রন্দন করছে?'
আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর অত্যন্ত সুন্দর ও মূল্যবান আসবাবপত্র ও মনোরম বাড়িঘরের লোভ আবূ জাহলের পক্ষে সংবরণ করা সম্ভব হলো না। রাজা-বাদশাহগণ যেভাবে তাদের রাজ্যের ধন-সম্পত্তি যেমন খুশি তেমন ব্যবহার করে, অনুরূপ আবূ জাহলও আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের বাড়িঘরগুলো দখল করে যথেচ্ছা ব্যবহার শুরু করল।
মদীনায় আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট তাঁর ঘরবাড়ি আবূ জাহেল কর্তৃক দখলের খবর পৌঁছলে তিনি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এ খবর জানালেন। এ কথা শুনে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: أَلَا تَرْضَى يَا عَبْدَ اللَّهِ، أَنْ يُعْطِيَكَ اللَّهُ بِهَا دَارًا فِي الْجَنَّةِ .
'হে আবদুল্লাহ! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, আল্লাহ এর বিনিময়ে জান্নাতে তোমাকে সুন্দর সুন্দর অট্টালিকা দান করুন?'
প্রতি উত্তরে তিনি বললেন:
'নিশ্চয়ই হে আল্লাহর রাসূল!'
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় বললেন:
'তোমার জন্যে তাহলে জান্নাতের ঘরবাড়িই উত্তম।'
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে জান্নাতের সুসংবাদ শুনে তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন। আনন্দে তাঁর দু'চোখ জুড়িয়ে গেল।
প্রথম ও দ্বিতীয় দফা হিজরতের কারণে তাঁর ধন-সম্পত্তি ও সুখ-শান্তির অবসান হলো। মদীনায় তিনি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য জীবন যাপন করছিলেন। জীবনের এক বিরাট অংশে কুরাইশদের নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হওয়ার পর মদীনায় একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে না নিতেই তাঁকে অত্যন্ত কঠিন এক পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হলো। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত তাঁকে আর এতো কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়নি। তাঁর এ ঈমানী পরীক্ষা ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে আছে।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী মদীনা মোনাওয়ারায় সামরিক তৎপরতা জোরদার করার সিন্ধান্ত নিলেন। এ লক্ষ্যে তিনি আট সদস্যবিশিষ্ট একটি সশস্ত্র প্লাটুন গঠন করলেন, যাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ও সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু'র মতো সাহসী ও বুদ্ধিমান সাহাবীগণ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্য করে বললেন:
'আমি তোমাদের মধ্য থেকে এমন এক ব্যক্তিকে বাহিনীর পরিচালক মনোনীত করব, যে তোমাদের মধ্যে ক্ষুৎপিপাসায় সবচেয়ে বেশি ধৈর্য অবলম্বনে সক্ষম।'
এই বলে তিনি এই সেনা দলের ঝাণ্ডা আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে সোপর্দ করলেন। তখন থেকেই আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু প্রথম আমীর হলেন, যাঁকে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত করা হয়েছিল।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে তাঁর প্রয়োজনীয় করণীয় সম্পর্কে নির্দেশ দানের পর একটি চিঠি হাতে দিয়ে বললেন:
'এই চিঠিটি দু'দিনের পথ অতিক্রম না করে খুলবে না।'
অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নেতৃত্বে ইসলামের এই প্রথম গোয়েন্দা প্লাটুন মদীনা থেকে বিদায় নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশমতো দু'দিনের পথ অতিক্রম করার পর আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু চিঠিটি খুললেন। এতে হেদায়াত ছিল:
إِذَا نَظَرْتَ فِي كِتَابِى هُذَا فَامْضِ حَتَّى تَنْزِلَ نَخْلَةَ بَيْنَ الطَّائِفِ وَمَكَّةَ، فَتَرَصَدْ بِهَا قُرَيْشًا وَقِفْ لَنَا عَلَى أَخْبَارِهِمْ ....
'আমার এই চিঠি পাঠ করার পর পুনরায় পথ চলতে থাক, যতক্ষণ পর্যন্ত না তায়েফ এবং মক্কার মাঝখানে একটি খেজুর বাগান না পাবে। এ বাগানের নিকট দিয়ে কুরাইশরা যাতায়াত করে। তোমরা সেখানে অতি সঙ্গোপনে অবস্থান নিয়ে তাদের গতিবিধি ও খবরাখবর আমাকে অবহিত করবে।'
আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ চিঠিটি পাঠ করার সাথে সাথে বলে উঠলেন : 'আল্লাহর নবীর নির্দেশের প্রতি আনুগত্যের মস্তক অবনত করলাম।'
অতঃপর তিনি তাঁর বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
'রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন সম্মুখপথের নির্দিষ্ট একটি খেজুর বাগান পর্যন্ত গিয়ে সেখানে অবস্থান নিয়ে কুরাইশদের গতিবিধির খবরাখবর ও তথ্যাদি সংগ্রহ করে তাঁকে পাঠাই। কিন্তু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সে পর্যন্ত নিয়ে যেতে নিষেধ করেছেন। এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে শাহাদাতের মৃত্যুকে অবধারিত জেনে তোমাদের মধ্যে যারা আমার সাথে যেতে ইচ্ছুক, শুধু তাদেরকেই সাথে নেব। আর যারা অসম্মতি জানাবে তারা নিঃসংকোচে ফিরে যেতে পারবে।'
এ কথা শুনে সাহাবীদের সকলেই সমস্বরে বলে উঠলেন:
'আমরা সকলেই রাসূলের নির্দেশ পালনের জন্যে আনুগত্যের মস্তক অবনত করলাম। আল্লাহর রাসূল আপনাকে যে পর্যন্ত যেতে বলেছেন, আমরা সে পর্যন্ত আপনার সাথে যেতে অবশ্যই প্রস্তুত আছি।'
খেজুর বাগানের সন্নিকটে পাহাড়ের গা ঘেঁষে আঁকা-বাঁকা ও উঁচু-নিচু দুর্গম যে পথটি চলে গেছে, কুরাইশদের বহির্বিশ্বে যোগাযোগের একমাত্র পথ সেটিই। এই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গিয়ে তারা অত্যন্ত সংগোপনে কুরাইশদের গতিবিধি ও খবরাখবর জানার জন্যে ওৎ পেতে রইলেন। দায়িত্ব পালনরত অবস্থার কোনো এক পর্যায়ে তারা দেখতে পেলেন:
আমর বিন হাদরামী, হাকাম বিন ফায়সাল, ওসমান বিন আবদুল্লাহ ও তার ভাই মুগাইরার সমন্বয়ে কুরাইশদের এক ব্যবসায়ী কাফেলা প্রচুর পরিমাণ কিসমিস, চামড়ার সামগ্রী ও অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্যাদি নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ অবস্থায় কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়, সে ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথীরা সলা-পরামর্শ শুরু করলেন। নির্দিষ্ট দিবসটি ছিল 'আশহুরিল হুরুম' বা হত্যা ও যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ মাসসমূহের শেষ দিন। তারা পরামর্শ করছিলেন:
'আজ যদি আমরা তাদের ওপর হামলা করি তাহলে তো নিষিদ্ধ মাসেই তাদের ওপর আক্রমণ করা হবে। আর তা হবে হারাম মাসেরই অবমাননা। যার ফলে সমগ্র আরবে এর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। আর যদি আমরা আজকের দিনের সুযোগ ছেড়ে দেই তাহলে তো আগানীকালই তারা হারাম শরীফের সীমানার ভিতরে প্রবেশ করবে। আর সেখানে আমাদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযান পরিচালনার প্রশ্নই উঠে না। সেখানে তো সকলেরই জীবন ও সম্পদ নিরাপদ। মুশরিকরা তা মেনে না চললেও মুসলমানদের পক্ষে তো হারামের অবমাননা করা সম্ভব নয়।'
এসব বিষয়ের ভালোমন্দ উভয় দিক চিন্তা-ভাবনা করার পর শেষ পর্যন্ত তারা ঐদিনই তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে এ চারজনকে হত্যা করে কাফেলার সব কিছুকেই গনীমত হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্তে একমত হলেন। এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া মাত্রই কালবিলম্ব না করে তারা কুরাইশদের এই বাণিজ্য কাফেলার বিরুদ্ধে অভিযান চালালেন। এ অভিযানে কুরাইশদের একজন নিহত, দু'জন বন্দী ও চতুর্থ ব্যক্তি কোনো মতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলো।
আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং তাঁর বাহিনীর অন্যান্য সাহাবীরা এই দুই কয়েদি এবং তাদের উট বহরের সমস্ত মাল সামান নিয়ে দ্রুত গতিতে মদীনার দিকে ধাবিত হলেন। মদীনায় পৌঁছে তাঁরা দু'বন্দীসহ এসব মালামাল রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে হাজির করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ অমান্য করে নিষিদ্ধ মাসসমূহে রক্তপাত করে কয়েদি ও তেজারতি দ্রব্যাদি নিয়ে আসায় তিনি এসব গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন:
وَاللَّهِ مَا أَمَرْتُكُمْ بِقِتَالٍ، وَإِنَّمَا أَمَرْتُكُمْ أَنْ تَقِفُوا عَلَى أَخْبَارٍ قرَيْشٍ، وَأَنْ تَرَصُدُوا حَرَكَتَهَا .
'আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদের রক্তপাত করতে নির্দেশ দেইনি; শুধু নির্দেশ দিয়েছিলাম, কুরাইশদের গতিবিধি ও খবরাখবর সংগ্রহের লক্ষ্যে ওৎ পেতে থেকে সংগৃহীত তথ্যাদি আমাকে জানানোর জন্যে।'
কয়েদি দু'জনের ব্যাপারেও তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো ফায়সালা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আর বাণিজ্যসম্ভার ও উটবহর থেকে একটি কপর্দক গ্রহণ করতেও তিনি অস্বীকৃতি জানালেন।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ঘটনার নিন্দা, মালপত্র গ্রহণে অস্বীকৃতি ও তাদের কৃতকর্মের প্রতি ভর্ৎসনা করায় আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথীরা যেন আসমান থেকে পড়লেন। রাসূলে কারীমের ইচ্ছা ও নির্দেশবিরোধী কাজ করে তারা নিশ্চিতভাবেই নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছেন ভেবে অত্যন্ত অনুতপ্ত হচ্ছিলেন। এ ঘটনার ফলে মদীনার গোটা পরিবেশ যেন তাদের জন্যে সংকীর্ণ হয়ে আসছিল। তাদেরই একান্ত প্রিয় আনসার ও মুহাজির সঙ্গী সাথীরা তাদেরকে অত্যন্ত ভর্ৎসনা করতে শুরু করলেন। এমনকি তাদের সাথে কথাবার্তা পর্যন্ত বন্ধ করে দিলেন। যখন তাদের পাশ দিয়ে সাহাবীগণ যাতায়াত করতেন, তখন তাদের দিকে কটাক্ষ করে বলতেন:
'দেখো, এই চরমপন্থিরা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের বিপরীত কাজ করেছে.........।'
এখানেই শেষ নয়, জীবনটা তাদের জন্যে অত্যন্ত দুর্বিসহ হয়ে উঠল, এখন তারা এ কথাও জানতে পারলেন যে, মক্কার কুরাইশরা এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র আরব গোত্রসমূহে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড়ের সৃষ্টি করেছে। তারা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে বলে বেড়াচ্ছে:
'মুহাম্মদ হারাম মাসকে তার জন্যে হালাল করে ফেলেছে, এ মাসে সে রক্তপাতকে বৈধ করে নিয়েছে। ধন-সম্পত্তি লুট ও লোকদের বন্দী করা শুরু করে দিয়েছে।'
আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথীদের উপরে সমস্ত মুসলামানদের পক্ষ থেকে যে ধিক্কার ও ঘৃণা বর্ষণ হচ্ছিলো তা ছিল অবর্ণনীয়। একদিকে তাঁদের অনিচ্ছাকৃত ভুলের অন্তর্জালায় তাঁরা দগ্ধ হচ্ছিলেন। অপরদিকে তাঁদেরই ভুলের খেসারত হিসেবে তাঁদের প্রাণপ্রিয় নেতা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজ সারা বিশ্বে বিতর্কিত। এসব ভেবে দুশ্চিন্তা ও অনুশোচনায় আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং তার সঙ্গী-সাথীর একবারে ম্রিয়মান হয়ে গেলেন। এ অবস্থায় তারা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে যেতে খুবই লজ্জাবোধ করছিলেন।
ক্রমান্বয়ে অবর্ণনীয়ভাবে তাঁদের সামাজিক অবস্থার শোচনীয় অবনতি ঘটতে লাগল। তাদের ওপর যেন বিপদ-মুসীবতের একটি পাহাড় ভেঙে পড়ছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিলো, তখনকার গোটা প্রকৃতিই যেন তাদেরকে উপহাস করে বলছে:
'রাসূলের নির্দেশ অমান্য করেছো, এবার বোঝো মজা!'
এই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় হঠাৎ করে একজন সাহাবী দৌড়ে এসে তাদের এ সুসংবাদ দিয়ে বললেন:
بِأَنَّ اللهَ سُبْحَانَهُ قَدْ رَضِيَ عَنْ صَنِبْعِهِمْ، وَأَنَّهُ أَنْزَلَ عَلَى نَبِيِّهِ فِي ذَلِكَ قُرْآنًا".
'প্রিয় ভাইয়েরা! আপনাদের ঐ ঘটনা সংঘটিত হওয়ায় আল্লাহ আপনাদের প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছেন। শুধু তাই নয়, এ ব্যাপারে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর ওহী নাযিল করেছেন।'
এ সংবাদ প্রাপ্তির সাথে সাথে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সঙ্গীরা কী যে খুশি হয়েছিলেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। এদিকে দলে দলে সাহাবীরা তাদের মোবারকবাদ জানানো ও একটু কোলাকুলি করার মানসে খুশির সাথে তাদের উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হওয়া কুরআনের সেই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতে করতে ছুটে আসছিলেন। তাদের উদ্দেশ্যে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ হলো:
يَسْتَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيْهِ قُلْ قِتَالٌ فِيْهِ كَبِيرٌ وَصَدَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَكُفْرٌ بِهِ وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَإِخْرَاجُ أَهْلِهِ مِنْهُ أَكْبَرُ عِنْدَ اللَّهِ وَالْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ.
'হে নবী! লোকেরা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে হারাম মাসে যুদ্ধ করা কী? আপনি বলে দিন, এ মাসে যুদ্ধ করা অন্যায়; কিন্তু আল্লাহর নিকট তা হতেও অধিক বড় অন্যায় হচ্ছে, আল্লাহর পথ হতে লোকদেরকে বিরত রাখা। আল্লাহকে অস্বীকার ও অমান্য করা, আল্লাহবিশ্বাসীদের জন্য মসজিদে হারামের পথ রুদ্ধ করা এবং হারাম শরীফের অধিবাসীদের সেখান থেকে বহিষ্কার করা আর বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা রক্তপাত হতেও মারাত্মক ব্যাপার। (আল কুরআন ২, সূরা বাকারা ২১৬)
আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথীদের কার্যক্রমের সমর্থনে আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরআনের আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও অত্যন্ত খুশি হলেন এবং হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। আল্লাহ এ আয়াত নাযিলের মাধ্যমে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে সমগ্র আরব বিশ্বে কুরাইশদের প্রোপাগান্ডার ওপর যেন জ্বলন্ত আগুনে পানি ঢেলে দিলেন। শুধু তাই নয়, সমস্ত আরববাসীদের জানিয়ে দেওয়া হলো যে, আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথীদের কৃতকর্মের চেয়ে কুরাইশদের কৃতকর্ম ছিল আরও জঘন্য এবং ঘৃণিত।
অতঃপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দের সাথে উট বহরের সমস্ত মালপত্র গ্রহণ করলেন। মুক্তিপণ আদায় করে বন্দীদের মুক্তি দিলেন এবং আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথীদের প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন। কেননা, তাদের এই অভিযান মুসলমানদের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ের রচনা করেছে। তাদের এই উটবহর ইসলামের সর্বপ্রথম গণীমত, মুসলমানদের ওপর যুলুম-নির্যাতন ও জানমালের ক্ষয়-ক্ষতির প্রথম প্রতিশোধ। এরাই মুসলমানদের হাতে প্রথম বন্দী। আর এই ঝাণ্ডাই ইসলামের প্রথম জিহাদী ঝাণ্ডা, যা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে সোপর্দ করেছিলেন। আর আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুই এই প্রথম ব্যক্তি, যাঁকে 'আমীরুল মু'মিনীন' বলে সম্বোধন করা হয়েছিল।
কিছুদিন যেতে না যেতেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদেরকে ওহুদের রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানালেন। আল্লাহর রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়ে যার যা আছে তা নিয়েই মুসলমানরা ওহুদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এ যুদ্ধে মুসলমানদের অত্যন্ত কঠিন ঈমানী পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এতে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঈমানী পরীক্ষা ছিল সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ওহুদ যুদ্ধে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথী সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাসের মাঝে যে ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল, তা সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাসের বর্ণনায় নিম্নরূপ:
'ওহুদ যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের সাথে আমার দেখা হলো। তিনি আমাকে বললেন:
'চলো না আমরা একটু আল্লাহর কাছে দু'আ করি।'
আমি তাকে বললাম: 'ঠিক আছে।'
অতঃপর আমরা একটু নিরিবিলি স্থানে গিয়ে আল্লাহর কাছে মোনাজাত শুরু করলাম। আমি বললাম :
يَا رَبِّ إِذَا لَقِيتُ الْعَدُوِّ فَلَقِنِي رَجُلًا شَدِيدًا بَأْسُهُ، شَدِيدًا حَرَدُهُ أَقَاتِلُهُ وَيُقَاتِلُنِي، ثُمَّ ارْزُقْنِي الظَّفَرَ عَلَيْهِ حَتَّى أَقَاتِلَهُ وَأَخُذَ سَلَبَهُ، فَأَمَّنَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ جَحْشِ عَلَى دُعَائِي.
'হে আল্লাহ! যুদ্ধ শুরু হলে আমাকে সবচেয়ে শক্তিশালী, তেজস্বী ও এমন এক বীর যোদ্ধার সম্মুখীন করো, মুসলমানদের প্রতি যার হামলা হবে অত্যন্ত ক্ষীপ্র ও দুর্ধর্ষ। আমি তাকে চ্যালেঞ্জ করব এবং সেও আমাকে চ্যালেঞ্জ করবে। প্রচণ্ড লড়াইয়ের এক পর্যায়ে তুমি তার উপর আমাকে বিজয় লাভ করার তাওফীক দান করবে। এমনকি আমি যেন উন্মুক্ত তরবারির আঘাতে তাকে দ্বি-খণ্ডিত করে তার সমস্ত অস্ত্র গনীমত হিসেবে ছিনিয়ে নিতে পারি। আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশও আমার সাথে সাথে হাত তুলে আমার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে দু'আর সমর্থনে বলছিলেন আমীন! আমীন!'
অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দু'আ করা শুরু করলেন:
اللهُمَّ ارْزُقْنِي رَجُلًا شَدِيدًا ، حَرَدَهُ شَدِيدًا بَأْسُهُ أُقَاتِلُهُ فِيكَ وَيُقَاتِلُنِي، ثُمَّ يَأْخُذُنِي فَيُجْدَعُ أَنْفِي وَأُذُنِي فَإِذَا لَقِيتُكَ غَدًا ، قُلْت : فِيمَ جُدِعَ أَنْفُكَ وَاذْنُكَ؟ فَأَقُولُ : فِيكَ وَفِي رَسُولِكَ، فَتَقُولُ : صَدَقْتَ .....
'হে আল্লাহ! তুমি আমাকেও একজন শক্তিশালী বীর যোদ্ধার সম্মুখীন করো, যে অত্যন্ত বিক্রমের সাথে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমি শুধু তোমার সান্নিধ্য লাভের জন্যে উন্মুক্ত তরবারি হাতে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব। যুদ্ধের এক চরম মুহূর্তে তার তলোয়ারের আঘাতে যেন আমি শাহাদাতের মৃত্যুর সুধা পান করতে পারি। আর সে তোমার দীনের বিরোধী সৈনিক হওয়ার কারণে আমার উপর বিজয়ী হওয়ার খুশিতে সে যেন আমার নাক ও কান কেটে আমার মৃতদেহকে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয় এবং কাল কিয়ামতের দিন তোমার সামনে দণ্ডায়মান হলে যখন তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করবে, 'কী উদ্দেশ্যে তুমি তোমার নাক এবং কানকে বিচ্ছিন্ন করেছ?' তখন আমি যেন বলতে পারি, 'হে আল্লাহ! শুধু তোমার ও তোমার রাসূলের সৈনিক হওয়ার কারণে। তখন তুমি বলবে, 'সাদ্দাকতা, তুমি সত্য বলেছ।'
সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'ওহুদের ময়দানে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের দু'আ আমার দু'আ অপেক্ষা লাখো কোটি গুণ উত্তম ছিল। ওহুদ যুদ্ধের শেষ বেলায় আমি আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশকে শহীদ অবস্থায় তাঁর দেহকে নাক কান কাটা অবস্থায় দেখতে পেলাম। তাঁর লাশের পাশেই একটি গাছের ডালে তাঁর কর্তিত নাক ও কান ঝুলছিল।'
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দু'আ কবুল করেছিলেন। ওহুদের যুদ্ধে তাঁকে শাহাদাতের সর্বোত্তম মর্যাদায় ভূষিত করেছিলেন, যেমন ভূষিত করেছিলেন সাইয়েদুশ শুহাদা হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে।
যুদ্ধশেষে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের এই সু-মহান আদর্শ সৈনিক আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ও হামযা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে একই কবরে রক্তাক্ত অবস্থায় দাফন করেন। আল্লাহর রাহে কুরবানী দেওয়া তাদের এই পূত-পবিত্র রক্ত চিরদিন মুসলমানদের শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা পোষণের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে থাকবে এবং সেদিকেই হাতছানি দিয়ে ডাকবে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুসলমানকে তাঁদেরই পদাঙ্ক অনুসরণের তাওফীক এনায়েত করুন। আমীন!
টিকাঃ
১. আল ইছাবা জীবনী নং ৪৫৭৪। ২. ইমতাউল আসমা, ১ম খণ্ড, ৫৫ পৃ.। ৩. হুলিয়াতুল আউলিয়া, ১ম খণ্ড, ১০৮ পৃ.। ৪. হুসনুস্ সাহাবা, ৩০০ পৃ.। ৫. মাজমুয়াতুল অসায়েক আছ ছিয়াছিয়্যাহ, ৮ পৃ.।
📄 আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ)
'প্রত্যেক উম্মতের একজন 'আমীন' থাকে। আর আমার উম্মাতের আমীন হচ্ছে, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ।' -রাসূলে কারীম (স)-এর উক্তি
হালকা পাতলা গড়ন, লম্বাকৃতি দেহ, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা, ধীর-স্থির শান্ত-শিষ্ট মেজাজ, লাজ-নম্র, অমায়িক ব্যবহার, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, সদালাপী ও মিষ্টভাষী, দ্রুতগামী এবং কর্মতৎপর হিসেবে খ্যাত এমন এক ব্যক্তি, যার মনে গর্ব ও অহঙ্কারের লেশমাত্র ছিল না। কিন্তু রণক্ষেত্রে তিনিই যেন ঝলসে ওঠা তীক্ষ্ণধার তরবারি ও গর্জে ওঠা এক সিংহ শার্দুল এবং প্রতিকূল পরিবেশে দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন এক বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। ইতিহাস খ্যাত এ ব্যক্তিই মুসলিম উম্মাহর 'আমীন' আমর ইবনে আবদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ আল ফেহরী আল কুরাইশী। যিনি ছোট-বড় সবার নিকট আবু উবায়দা আল জাররাহ নামে পরিচিত।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর প্রশংসায় বলেছেন:
'গভীর পাণ্ডিত্য, চারিত্রিক মাধুর্য এবং শালীনতায় কুরাইশ বংশে তিন ব্যক্তি বিশেষভাবে খ্যাতি লাভ করেন। তারা যদি আপনার প্রশংসা করেন, তাতে মিথ্যা অতিরঞ্জন থাকবে না এবং আপনিও যদি তাদের প্রশংসা করতে চান, তাতেও কোনো অসত্যের আশ্রয় নিতে হবে না। তাঁরা হলেন:
'আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।'
আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইসলাম গ্রহণের দ্বিতীয় দিনে তাঁরই প্রচেষ্টায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, ওসমান ইবনে মাযউন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, আরকাম ইবনে আবিল আরকাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং তাঁকে সঙ্গে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হন। তাঁরা কালেমা তাওহীদের ঘোষণার মাধ্যমে একই সাথে তাঁর হাতে বাই'আত গ্রহণ করেন। এ পাঁচ ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত সাংগঠনিক কাঠামোই হলো পরবর্তী সময়ে ইসলামের সুমহান প্রাসাদের ভিত্তি।
আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মাক্কী জীবন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটাই অগ্নিপরীক্ষার এক দুর্বিষহ জীবন। প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারী অন্যসব সাহাবীদের মতো তিনিও আর্থিক সংকট, দুঃখ-কষ্ট, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন; কিন্তু আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঈমানী পরীক্ষা ইতিহাসে আদর্শের যে কোনো অনুসারীর বিচারে এক বিরল ঘটনা।
প্রতিটি ঈমানী পরীক্ষাতেই তিনি ধৈর্য ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শকে সমুন্নত করেছেন। কিন্তু বদরের যুদ্ধে তাঁর অকল্পনীয় ঈমানী পরীক্ষা অতীতের সব পরীক্ষাকে ম্লান করে দিয়েছে।
বদর প্রান্তরে তুমুল যুদ্ধের এক পর্যায়ে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মৃত্যুর পরওয়া না করে প্রচণ্ড আক্রমণে শত্রুবাহিনীর দুর্ভেদ্য ব্যূহকে ছত্রভঙ্গ করতে সমর্থ হন, এতে মুশরিকদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়ে যায়। এ সুযোগে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে শত্রুবাহিনীকে ধরাশায়ী করতে করতে সম্মুখপানে অগ্রসর হচ্ছিলেন ও তাঁর চতুর্দিকে ঘুরেফিরে আক্রমণ চালাচ্ছিলেন। কুরাইশ বাহিনীও বার বার তাঁকে প্রতিরোধ করার ব্যর্থ চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। এরই ফাঁকে শত্রুবাহিনীর ব্যূহ থেকে এক ব্যক্তি আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বার বার চ্যালেঞ্জ করছিল। তিনি ও আক্রমণের গতি পরিবর্তন করে প্রতিবারই তার সে চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ দুর্বলতার এক সুযোগে হঠাৎ সে তাঁর ওপর প্রচণ্ড আঘাত হেনে বসল। তিনি তড়িৎ গতিতে পাশ কাটিয়ে গেলে অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন। সে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে শত্রু নিধনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। ধৈর্যহীনতার চরম পর্যায়ে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তরবারির প্রচণ্ড এক আঘাতে তার শির দ্বিখণ্ডিত হয়ে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ল।
প্রিয় পাঠক! ভূলুণ্ঠিত এ ব্যক্তি কে? পূর্বেই আলোচনা করেছি, আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঈমান সর্বকালের কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় এমনভাবে উত্তীর্ণ যে, তা কোনো কল্পনাকারীর কল্পনারও ঊর্ধ্বে। স্তম্ভিত হবেন, ভূলুণ্ঠিত ব্যক্তির পরিচয়ে। সে আর কেউ নয়, সে হলো আবূ উবায়দার পিতা আবদুল্লাহ ইবনে জাররাহ।
এ ক্ষেত্রে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর পিতাকে হত্যা করেননি। তিনি হত্যা করেছেন, পিতার অবয়বে শিরকের প্রতিমূর্তিকে। মহান আল্লাহ তাঁর ও পিতার মাঝে সংঘটিত এ ঘটনা সম্পর্কে আল কুরআনের আয়াত নাযিল করলেন:
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُولَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيْمَانَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوحٍ مِنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُولَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ إِلَّا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ .
'তুমি পাবে না আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কোনো সম্প্রদায়, যারা ভালোবাসে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধচারীদেরকে হোক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্র ভ্রাতা অথবা তাদের জ্ঞাতি-গোত্র। এদের অন্তরে আল্লাহ সুদৃঢ় করে দিয়েছেন ঈমান এবং তাদের শক্তিশালী করেছেন তাঁর পক্ষ হতে রূহ দ্বারা। এদের প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেথায় তারা স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন, এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখো, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।'
আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পক্ষ থেকে এমনটি ঘটা আশ্চর্যের কিছুই ছিল না। আল্লাহর প্রতি তাঁর দৃঢ় ঈমান, ইসলামী আদর্শের কল্যাণকামিতায় এবং উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আমানতদার ও বিশ্বাসভাজন হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর স্থান ছিল শীর্ষে। যে কারণে অনেক মহান ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে তাঁর সমকক্ষ মর্যাদা পেতে আগ্রহী ছিলেন।
মুহাম্মদ ইবনে জাফর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এক সময় খ্রিস্টানদের একটি প্রতিনিধি দল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল:
'হে আবুল কাশেম! আপনার সাহাবীদের মধ্য থেকে আমাদের জন্য এমন এক ব্যক্তিকে মনোনীত করে দিন, যিনি আমাদের অর্থ-সম্পত্তির কিছু বিষয়ে সৃষ্ট বিবাদের সুষ্ঠু ফায়সালা করে দিতে পারবেন। আপনারা আমাদের কাছে খুবই আস্থাভাজন সম্প্রদায়।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন:
'তোমরা বিকেলে এখানে এসো, আমি তোমাদের সাথে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ এক ব্যক্তিকে পাঠাব।'
ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করেন:
'সারা জীবনে শুধু এবারই ঐ গুণের অধিকারী হওয়ার জন্য আমি আগ্রহী হয়ে উঠি। যদিও নেতৃত্ব লাভ কখনো আমি পছন্দ করিনি। তাই সে উদ্দেশ্যে একটু আগেভাগেই আমি যোহরের নামাযের জন্য মসজিদে গিয়ে হাজির হই। নামাযশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডানে ও বাঁয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগলেন। আমি সে মুহূর্তে একটু উঁচু হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নজরে পড়ার জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম। তিনি এদিক-সেদিক দেখতে লাগলেন। অবশেষে তিনি আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দেখতে পেলেন এবং তাকে ডেকে বললেন:
'তুমি তাদের সাথে যাও এবং বিবাদটির সুষ্ঠু নিষ্পত্তি করে দাও।'
'আমি মনে মনে বললাম, আবূ উবায়দা এ গুণটির অধিকারী হয়ে গেল।'
আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিই শুধু ছিলেন না; বিশ্বস্ততার সাথে ছিল শক্তি এবং একাধিক ক্ষেত্রে তিনি সেই শক্তির প্রমাণও দিয়েছেন। কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহ আরম্ভের পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বাণিজ্য কাফেলাকে ধাওয়া করার উদ্দেশ্যে মুহাজির সাহাবীদের সমন্বয়ে সুসজ্জিত যোদ্ধাদের একটি বাহিনীকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলে, তাদের সিপাহসালার হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকেই মনোনীত করেন। ঐ অভিযানে তিনি ত্যাগ ও কষ্টসহিষ্ণুতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায়কালে তাদের রসদবাবদ মাত্র এক ঝুড়ি খেজুর ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেননি। আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যেককে প্রতিদিন মাত্র একটি করে খেজুর রেশন হিসেবে বরাদ্দ করতেন। স্তন্য পানকারী শিশুদের মতো সারাদিনে তারা একটিমাত্র খেজুর চুষে খেতেন এবং তারপর পানি পান করতেন, এভাবে সবাই গোটা একটা দিন অতিবাহিত করতেন।
ওহুদ যুদ্ধে মুসলমানগণ এক পর্যায়ে পরাজয়ের সম্মুখীন হলেও মুশরিক বাহিনীর একজন চিৎকার করে বলছিল:
'আমাকে দেখিয়ে দাও মুহাম্মদকে।'
সেই চরম মুহূর্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে দশজন সাহাবী তাঁকে রক্ষা করার জন্য ঘিরে রেখেছিলেন, আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন তাদের অন্যতম।
এ যুদ্ধে শত্রুদের আঘাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি দন্ত মোবারক শহীদ হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিরস্ত্রাণ ভেঙে এর দুটি পেরেক তাঁর মাথায় ঢুকে পড়ে। আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মোবারক থেকে তা বের করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন; কিন্তু আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনি কাজটি আমাকে করতে দিন।'
আবূ বকর ছিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর অনুরোধে সাড়া দিয়ে তাঁকেই কাজটি করার সুযোগ দিলেন। আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আশঙ্কাবোধ করছিলেন যে, যদি হাতের সাহায্যে পেরেক দু'টি টেনে বের করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীষণ কষ্ট পাবেন। তাই তিনি দাঁত দিয়ে তা টেনে বের করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
প্রথমবারে একটি বের হয়ে এলেও আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সামনের একটি দাঁত ভেঙে যায়, দ্বিতীয় বারে অপরটিও বেরিয়ে আসে; কিন্তু এবারও তাঁর সামনের অপর একটি দাঁত ভেঙে যায়। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'আবূ উবায়দা ছিলেন সামনের দুটি দাঁত ভাঙা সর্বাপেক্ষা সুদর্শন ব্যক্তি।'
আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইসলাম গ্রহণের পর থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত পর্যন্ত তাঁর সাথে সমস্ত যুদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ দাওয়াতী ও রাষ্ট্রীয় কাজে অংশ নেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে খিলাফাতের বাইআতের দিন উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সম্বোধন করে বললেন:
'আপনার হাতটা বাড়িয়ে দিন, যাতে আমি বাইআত করতে পারি। কারণ, আমি রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই একজন আমীন বা বিশ্বস্ত ব্যক্তি থাকেন, এ উম্মতের মধ্যে আপনিই 'আমীন'। অতএব আপনিই এর একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি।'
এ কথা শুনে আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'এমন এক ব্যক্তিকে রেখে কখনোই নিজে খিলাফতের বাইআত নিতে পারি না, যাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশাতেই আমাদের জন্য নামাযের ইমাম নিযুক্ত করেছিলেন। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনিই আমাদের ইমামতি করেন।'
অতঃপর আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতেই খিলাফতের বাইআত করা হয়। তাই হকের ব্যাপারে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর জন্য উত্তম উপদেশদাতা ও সর্বাপেক্ষা অধিক সহযোগিতা দানকারী ছিলেন।
আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইনতিকালের পর আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে খিলাফতের বাইআত গ্রহণ করেন। আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর একান্ত অনুগত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সারা জীবনে মাত্র একবার ছাড়া আর কখনো তিনি খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নির্দেশ পালনে অনীহা দেখাননি।
প্রিয় পাঠক! কী সেই নির্দেশ, যেটি পালন করতে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন?
আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সিরিয়া বিজয়ের প্রাক্কালে যখন মুসলিম বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়ে একের পর এক বিজয় ছিনিয়ে আনছিলেন, তখন তিনি পূর্বে ফোরাত নদী এবং উত্তরে এশিয়া মাইনর পর্যন্ত তাঁর বিজয়ের সীমানা বিস্তৃত করেন। অব্যাহত গতিতে এ বিজয় চলাকালে সিরিয়ায় হঠাৎ নজীরবিহীন মহামারি দেখা দেয় এবং তাতে ব্যাপকভাবে মানুষ মারা যেতে থাকে। এ সময় আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে একখানা পত্র দিয়ে একজন দূত প্রেরণ করেন। পত্রে তিনি লিখেন:
إِنِّي بَدَتْ لِي إِلَيْكَ حَاجَةٌ لَاغِنى لِى عَنْكَ فِيهَا ، فَإِنْ أَتَاكَ كِتَابِي لَيْلًا فَإِنِّي أَعْزَمُ عَلَيْكَ أَلَّا تُصْبِحَ حَتَّى تَرَكَبَ إِلَى، وَإِنْ أَتَاكَ نَهَارًا فَإِنِّي أَعْزَمُ عَلَيْكَ أَلَّا يُمْسِيَ حَتَّى تَرْكَبَ إِلَى.
'অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে আমি বিশেষভাবে মদীনায় আপনার উপস্থিতি কামনা করছি। আপনার নিকট এ নির্দেশনামা রাতে পৌঁছলে ভোর হওয়ার পূর্বে এবং দিনে পৌছলে সূর্যাস্তের পূর্বে অশ্ব পৃষ্ঠে আরোহণ করে আমার কাছে চলে আসবেন বলে আশা করছি।'
আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু খালীফাতুল মুসলিমীনের এ নির্দেশনামা পাঠ করে বললেন:
'আমার কাছে আমীরুল মুমিনীনের কী প্রয়োজন, তা আমি বুঝতে পেরেছি। তিনি এমন এক ব্যক্তিকে জীবিত রাখতে চাচ্ছেন, যার বেঁচে থাকার কথা নয়।'
অতঃপর তিনি আমীরুল মুমিনীনকে লিখলেন:
'আমীরুল মুমিনীন, আপনার সমীপে আমার প্রয়োজনীয় বিষয়টা বুঝতে পেরেছি। আমি মুসলিম সৈন্যবাহিনীর দায়িত্বে নিয়োজিত। তারা মহামারীতে আক্রান্ত। তাদেরকে বিপদে রেখে আমি নিজে নিরাপদ স্থানে যাওয়া মোটেই পছন্দ করছি না। যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে মৃত্যু আমাকে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন না করেছে; ততক্ষণ আমি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাচ্ছি না। আমার এ পত্র আপনার কাছে পৌছার পর আমাকে ঐ নির্দেশ থেকে অব্যাহতি দান করবেন এবং আমাকে এখানে অবস্থান করার অনুমতি দান করবেন।'
আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পত্র পাঠের পর উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কেঁদে ফেললেন। তাঁর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকল, তাঁর এ অস্বাভাবিক কান্না দেখে তাঁর পাশে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা বললেন:
'হে আমীরুল মুমিনীন! আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কি মৃত্যুবরণ করেছেন?'
উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'না, বরং মৃত্যু তাঁর অতি নিকটে এসে পৌছেছে।'
উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ধারণা মিথ্যা ছিল না, অল্পদিনের মধ্যে আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মহামারীতে আক্রান্ত হলেন! মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি তাঁর বাহিনীকে অন্তিম উপদেশ দিয়ে বললেন:
إِنِّي مُوصِيكُمْ بِوَصِيَّةٍ إِنْ قَبِلْتُمُوهَا لَنْ تَزَالُوا بِخَيْرٍ : أَقِيمُوا الصَّلةَ، وَصُومُوا شَهْرَ رَمَضَانَ وَتَصَدَّقُوا ، وَحُجُوا وَاعْتَمِرُوا ، وَتَوَاصَوْا، وَانْصَحُوا لِامْرَائِكُمْ وَلَا تَغُشُوْهُمْ وَلَا تُلْهِكُمُ الدُّنْيَا، فَإِنَّ الْمَرْءَ لَوعُمِّرَ أَلْفَ حَوْلٍ مَا كَانَ لَهُ بُدَّ مِنْ أَنْ بَصِيرَ إِلَى مَصْرَعَى هَذَا الَّذِي تَرَوْنَ ... وَالسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةِ اللَّهِ .
'আমি তোমাদেরকে অন্তিম কিছু উপদেশ দিতে চাই। যদি তা গ্রহণ কর তাহলে সর্বদা তোমাদের কল্যাণ হতে থাকবে। নামায কায়েম করবে, রমযান মাসে রোযা রাখবে, যাকাত দিবে, হজ্জ ও উমরাহ পালন করবে, পরস্পরের মঙ্গল কামনা করে অসিয়ত করবে। আমীরদের পরামর্শ দান করবে, তাদেরকে ধোঁকা দেবে না এবং দুনিয়াদারী যেন তোমাদেরকে অন্য সবকিছু থেকে গাফেল করে না দেয়। কেননা, যদি কাউকে হাজার বছরও আয়ুষ্কাল দান করা হয় তবুও একথা নিশ্চিত যে, তাকেও একদিন এমনিভাবে মৃত্যুর সম্মুখীন হতে হবে। যেভাবে এ মুহূর্তে তোমরা আমাকে হতে দেখছ।'
এরপর তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
'আস্সালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ'
অতঃপর তিনি মু'আয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দিকে ফিরে বললেন:
'হে মুয়ায, মুসলিম বাহিনীর নামাযের ইমামতি করাও।'
এর অল্পক্ষণ পরেই তাঁর পবিত্র রূহ ইহজগতের মায়া ত্যাগ করে চলে গেল।
তখন মুয়ায রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দাঁড়িয়ে বললেন:
'প্রিয় ভাইয়েরা! আপনারা এমন এক ব্যক্তিকে হারিয়েছেন, খোদার শপথ! যাঁর মতো প্রশস্ত অন্তরের মানুষ আমার জানা মতে আর নেই, তাঁর মন সর্বপ্রকার হিংসা-বিদ্বেষ থেকে ছিল পবিত্র। সঙ্গী-সাথীদের ভুল-ত্রুটিতে দয়াশীল ও ক্ষমাসুলভ আচরণে তাঁর কোনো জুড়ি ছিল না। তাঁর মতো জনগণের এতো বড় কল্যাণকামীও আর কেউ ছিল না, তাঁর প্রতি সদয় হোন। আল্লাহ আপনাদের প্রতি সদয় হবেন।'
টিকাঃ
১. তাবাকাত ইবনে সা'দ। ৪র্থ খণ্ডে সূচী দ্রষ্টব্য। ২. আল ইসাবা: জীবনী নং ৪৪০০। ৩. আল ইসতিয়াব: ৩য় খণ্ড ২য় পৃ.। ৪. হুলিয়াতুল আউলিয়া: ১ম খণ্ড ১০০ পৃ.। ৫. আল বদয়ু ওয়াত্ তারিখ: ৫ম খণ্ড ৮৭ পৃ.। ৬. ইবনে আসাকের: ৭ম খণ্ড ১৫৭ পৃ.। ৭. সিফাতুচ্ছাওয়া: ১ম খণ্ড ১৪২ পৃ.। ৮. আশহারু মাশাহিরুল ইসলাম: ৫০৪ পৃ.। ৯. তারিখুল খামিস: ২য় খণ্ড ২৪৪ পৃ.। ১০. আর রিয়াদ আন নাদরা: ৩০৭ পৃ.। ১১. তাবাকাতুস সাআদাহ্।
📄 আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ)
‘যে মধুর সুরে কুরআন অবতীর্ণ, কেউ যদি সেই সুরে কুরআন তিলায়াত করতে চায়, তাহলে সে যেন ইবনে ‘উম্মে আবদ’ অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সুরে কুরআন তিলাওয়াত করে।’ - রাসূলে কারীম (স)-এর উক্তি
সবার প্রিয়, কিশোর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে মক্কার লোকেরা ইবনে উম্মে আবদ বলে ডাকত। জনপদ থেকে বেশ দূরে মক্কার পাহাড়ি রাস্তায় জনৈক কুরাইশ সর্দার ‘উকবা ইবনে মু’আইতে’র বকরি চড়ানোই ছিল তাঁর একমাত্র কাজ।
মক্কায় নবীর আগমনের সংবাদ সে শুনত বটে; কিন্তু একদিকে অপরিণত বয়স এবং অপরদিকে মক্কার জনপদ থেকে দূরে থাকার কারণে তাঁর নিকট এর তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না। সকালে উকবার বকরির পাল নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া এবং রাতে প্রত্যাবর্তন ছিল তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস।
মক্কার অধিবাসী এ কিশোর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ একদিন দেখতে পেল, ব্যক্তিত্বের অধিকারী শ্রদ্ধাভাজন দুই জন ব্যক্তি দূর থেকে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছেন, তাদের চোখে-মুখে প্রচণ্ড ক্লান্তির ছাপ সুস্পষ্ট। প্রচণ্ড পিপাসায় তাদের ঠোঁট ও কণ্ঠনালী শুস্ক। তারা কিশোর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের কাছে এসে পৌঁছলে তাঁকে সালাম দিয়ে বললেন :
‘ওহে বালক! বকরির মধ্য থেকে একটিকে দোহন করে আমাদেরকে দাও, যাতে আমরা আমাদের পিপাসা দূর করে পরিতৃপ্ত হতে পারি।'
বালক উত্তর দিল : ‘আমি বকরির মালিক নই, আমি এর রক্ষক ও আমানতদার মাত্র।'
বালকের উত্তরে তারা বিরক্তি প্রকাশ করলেন না বরং তাদের মুখমণ্ডলে আনন্দের আভাস ফুটে উঠল এবং তাদের একজন বালককে বললেন : ‘তবে এমন একটি বকরি দেখিয়ে দাও, যা এখনো পর্যন্ত এক বারের জন্যও গাভিন হয়নি।'
বালক আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ পাশেরই একটি বকরির বাচ্চার দিকে ইশারা করল। তাদের একজন এগিয়ে গিয়ে বকরির বাচ্চাটিকে ধরে বিসমিল্লাহ বলে তার পালানে হাত বুলাতে আরম্ভ করল। বালক আবদুল্লাহ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে মনে মনে বলতে লাগল : ‘পাঁঠা দেখেনি, এমন বকরির বাচ্চা কখনো দুধ দেয় নাকি?’
কিন্তু বকরির বাচ্চার পালান দেখতে দেখতে স্ফীত হয়ে উঠল এবং তা থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ দুধ বেরিয়ে আসতে লাগল। অন্য ব্যক্তিটি বাটির ন্যায় একটি পাথর এনে ধরলেন এবং তা দুধে পূর্ণ হয়ে গেল। এবার তাঁরা উভয়েই দুধ পান করলেন এবং আমাকেও পান করালেন। কিন্তু আমি যা দেখলাম, তা যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। পরিতৃপ্তির সাথে আমাদের দুধ পান করার পর বরকতময় ব্যক্তিটি বকরির পালানকে লক্ষ্য করে বললেন : ‘পূর্বাবস্থায় ফিরে যাও।'
দেখতে দেখতেই তা চুপসে যেতে থাকল এবং পূর্বাবস্থায় ফিরে গেল। এবার আমি সেই বরকতময় ব্যক্তিকে বললাম : ‘আপনি যে কথাটি বললেন, আমাকে তা শিখিয়ে দিন।'
তিনি আমাকে বললেন : ‘হে বালক, তুমি সব কিছুই জানতে পারবে।'
এ ঘটনার মাধ্যমেই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইসলামের সাথে পরিচয়ের সূচনা হয়। বরকতপূর্ণ সেই লোকটি ছিলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর তাঁর সাথীটি ছিলেন আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।
কুরাইশদের সীমাহীন অত্যাচার ও নিপীড়নে অতিষ্ট হয়ে তাঁরা মক্কার পাহাড়ি রাস্তার দিকে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে গিয়েছিলেন। এই বালক যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন, ঠিক তেমনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাথী আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও তাঁর আমানতদারী ও বুদ্ধিমত্তার কারণে তাঁকে পছন্দ করে ফেলেছিলেন এবং তাঁর মধ্যে কল্যাণ দেখতে পেয়েছিলেন।
এরপর অল্প কয়েকদিন অতিবাহিত হতে না হতেই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিজেকে তাঁর খিদমতের জন্য পেশ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাঁকে নিজ সেবায় নিয়োজিত করলেন। সেদিন থেকেই সৌভাগ্যবান এই বালক আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বকরি চরানো থেকে সমস্ত সৃষ্টিকূলের মহান নেতার খিদমতের সৌভাগ্য লাভ করলেন।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে ছাঁয়ার মতো লেগে থাকতে শুরু করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়িতে অবস্থানকালে এবং সফরকালে এমনকি বাড়ির ভেতরে ও বাইরে যেখানেই থাকতেন, তিনি সর্বদা তাঁর খিদমতে নিমগ্ন থাকতেন।
নির্দিষ্ট সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেওয়া, গোসলের সময় পর্দার ব্যবস্থা করা, গৃহ থেকে বের হওয়ার সময় জুতা পরিয়ে দেওয়া, ঘরে প্রবেশকালে পা থেকে তা খুলে দেওয়া, তাঁর লাঠি ও মিসওয়াক এগিয়ে দেওয়া এবং তিনি তাঁর ঘরে প্রবেশ করলে তাঁর আগে আগে প্রবেশ করা, এসব কাজই তিনি করতেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইচ্ছা তাঁর নিজ কক্ষে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিলেন। নির্বিঘ্নে ও নিশ্চিন্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপনীয় বিষয় অবগতি লাভের অনুমতিও তাঁর ছিল। যে কারণে তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোপন বিষয় জানার অধিকারী বলে ডাকা হতো।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গৃহে বেড়ে ওঠেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তত্ত্বাবধানে তিনি ইসলামের মহান শিক্ষায় শিক্ষিত হন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারিত্রিক গুণাবলি দ্বারা গুণান্বিত হন এবং তাঁর প্রতিটি স্বভাব ও অভ্যাস অনুসরণ করেন। যে কারণে তাঁর সম্পর্কে বলা হতো যে, ইসলামী শিক্ষা ও আমল-আখলাকে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচাইতে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ সাহাবা।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সরাসরি শিক্ষা লাভ করার কারণে অন্যান্য সাহাবী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমগণের মধ্যে তিনি সবচাইতে উত্তম ও বিশুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। কুরআনের অর্থ ও মর্ম সম্পর্কে সর্বাধিক জানতেন এবং তিনি শরীআত সম্পকেও সর্বাধিক অবগত ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনাই সর্বাপেক্ষা বড় প্রমাণ। ঘটনাটি হলো:
'উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আরাফাতে অবস্থানকালে এক ব্যক্তি কুফা থেকে এসে তাঁর খিদমতে আরয করল : 'হে আমীরুল মুমিনীন! আমি কুফা থেকে এসেছি। সেখানে এমন এক ব্যক্তি আছেন, যিনি কুরআন শরীফ দেখা ছাড়াই শুধু স্মৃতি থেকেই কুরআন শরীফের কপি করে থাকেন।'
'একথা শুনে ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এতটা রাগান্বিত হলেন যে, খুব কম সময়ই তাঁকে এতটা রাগান্বিত হতে দেখা যেত। তিনি যারপরনাই ক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন।
তিনি লোকটিকে বললেন: 'তুমি ধ্বংস হও! কে সেই ব্যক্তি?'
সে বলল: 'আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ।'
তাঁর নাম শোনামাত্রই উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ক্রোধ প্রশমিত হতে থাকল এবং তিনি স্বাভাবিক হলেন। স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে তিনি বললেন:
'তোমার জন্য আফসোস! আমার জানা নেই, তিনি ছাড়া এ পৃথিবীতে দ্বিতীয় আর কেউ জীবিত আছেন, যার দ্বারা এ কাজ সম্ভব। তোমাকে তাঁর পাণ্ডিত্যের কয়েকটি ঘটনা শোনাচ্ছি।'
এ বলে তিনি তাঁর কথা আরম্ভ করলেন:
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো এক রাতে মুসলমানদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলোচনা করার জন্য আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে কথাবার্তা বলছিলেন। আমিও তাঁদের সাথে ছিলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে পড়লে আমরাও তাঁর সাথে বেরিয়ে পড়লাম। এ সময় মসজিদে একজন অপরিচিত লোক নামায আদায় করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কিরাআত শোনার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন।'
অতঃপর আমাদের প্রতি লক্ষ্য করে বললেন:
'যে মধুর সুরে কুরআন অবতীর্ণ, কেউ যদি সেই সুরে কুরআন তিলায়াত করতে চায়, সে যেন ইবনে 'উম্মে আবদ' অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের সুরে কুরআন তিলাওয়াত করে।'
নামাযশেষে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বসে দু'আ করতে শুরু করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে লাগলেন:
'আল্লাহর কাছে চাও, যা চাইবে তাই দেওয়া হবে। প্রার্থনা করো, যা প্রার্থনা করবে তাই পাবে।'
অতঃপর উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আরো বললেন : 'আমি মনে মনে বললাম, আল্লাহর কসম! আমি সকালেই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের কাছে গিয়ে তার দু'আয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের 'আমীন' বলার সুসংবাদ দেব। তাই আমি সকালে তার কাছে গিয়ে তাকে সুসংবাদটা জানালাম; কিন্তু জানতে পারলাম যে, আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আমার আগেই তাঁকে এ সংবাদ জানিয়ে গেছেন।
খোদার শপথ! যে কোনো কল্যাণ কাজে আমি আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনস্থ করেছি, সে কাজেই তিনি আমাকে পরাস্ত করেছেন।'
আল্লাহর কিতাব কুরআন মাজীদের জ্ঞানে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এতটা পাণ্ডিত্যের অধিকারী হয়েছিলেন যে, তিনি বলতেন:
'সেই আল্লাহর কসম! যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, কুরআন মাজীদের এমন কোনো আয়াতই নাযিল হয়নি, যে আয়াত সম্পর্কে আমি জানি না, তা কোথায় নাযিল হয়েছে এবং কার বিষয়ে নাযিল হয়েছে। আমি যদি জানতে পারি যে, এ ব্যাপারে অন্য কেউ আমার চেয়ে বেশি জানে, আর যদি তার কাছে যাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে আমি অবশ্যই তার কাছে যাব।'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর নিজের সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন, তাতে কোনো অতিরঞ্জন নেই। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে তাঁর নিম্নোক্ত ঘটনা তা-ই প্রমাণ করে:
'উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কোনো সফরে তিমিরাচ্ছন্ন এক গভীর রাতে এক কাফেলার সম্মুখীন হন। সেই কাফেলায় আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও ছিলেন।
কাফেলা কোথা থেকে আগমন করছে, একথা জিজ্ঞাসা করার জন্য উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দিলেন।
উত্তরে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কুরআনের ভাষায় উত্তর দিতে বললেন : مِنَ الْفَجِّ الْعَمِيقِ
'বহু দূর-দূরান্ত থেকে।'
উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জিজ্ঞাসা করতে বললেন : 'গন্তব্যস্থল কোথায়?' আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কুরআনের ভাষায় উত্তর দিতে বললেন : الْبَيْتِ الْعَتِيقِ .
'প্রাচীন গৃহের (খানায়ে কাবার) দিকে।'
ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ উত্তর শুনে বললেন : 'এ কাফেলায় নিশ্চয়ই কোনো জ্ঞানবান লোক আছেন।' তাই তিনি এক ব্যক্তিকে বললেন : 'তাঁকে জিজ্ঞাসা কর, আল কুরআনের কোন্ আয়াত সবচাইতে শ্রেষ্ঠ?' আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তরে বলে দিতে বললেন : اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ .
'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না।' উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন : 'জিজ্ঞাসা করো, আল কুরআনের কোন্ আয়াত ন্যায়বিচারের চরম উৎকর্ষতায় ভরা?'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তরে বলে দিতে বললেন : إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِبْتَاءِ ذِي الْقُرْبي.
'আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয় স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন।'
উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এরপর জিজ্ঞাসা করতে বললেন, 'আল কুরআনের কোন্ আয়াত সবচাইতে ব্যাপক অর্থব্যঞ্জক?'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তরে বলে দিতে বললেন: فَمَنْ يَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَّرَهُ، وَمَنْ يَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَّرَهُ .
'কেউ অণু পরিমাণ সৎ কর্ম করলে তা দেখবে ও কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কর্ম করলে তাও দেখবে।'
উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবার জিজ্ঞাসা করতে বললেন: 'আল কুরআনের কোন্ আয়াত সবচাইতে বেশি ভীতি প্রদর্শনকারী?'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তরে বলতে নির্দেশ দিলেন: لَيْسَ بِأَمَانِيِّكُمْ وَلَا أَمَانِيِّ أَهْلِ الْكِتَابِ مَنْ يَّعْمَلْ سُوءًا يُجْزَ بِهِ وَلَا يَجِدْ لَهُ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا .
'তোমাদের ও খ্রিস্টান, ইহুদী আহলে কিতাবীদের খেয়ালখুশি অনুসারে কাজ হবে না, কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল লাভ করবে, এবং আল্লাহ ছাড়া তার জন্য সে কোনো অভিভাবক ও সহায়ক পাবে না।'
উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবার জিজ্ঞাসা করতে বললেন: 'আল কুরআনের কোন্ আয়াত সর্বাধিক আশার সঞ্চারক?'
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তরে বলতে বললেন: قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ، إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ.
'বল, হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজের প্রতি অবিচার করেছ। আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না, আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'
অতঃপর উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জিজ্ঞাসা করলেন: 'এ কাফেলার মধ্যে কি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আছেন?'
তখন কাফেলার লোকজন সমস্বরে উত্তর দিল: 'হ্যাঁ, আল্লাহর শুকরিয়া, তিনি আমাদের সাথে আছেন।'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শুধুমাত্র সুন্দর কুরআন তিলাওয়াতকারী, ইবাদতকারী, আলেম ও জাহিদই ছিলেন না; সাথে সাথে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী, দৃঢ় মনোবলসম্পন্ন বীর মুজাহিদ এবং রণক্ষেত্রে প্রথম সারির যোদ্ধা।
তিনিই একমাত্র মুসলিম, যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরই পৃথিবীতে প্রকাশ্যে কুরআন পাঠ করে শুনিয়েছিলেন। মক্কায় মুসলমানগণ ছিলেন দুর্বল ও অসহায়। একদিন তারা মক্কায় একত্রিত হয়ে বলতে লাগলেন:
'মক্কার কুরাইশদের কি প্রকাশ্যে কুরআন শোনানো সম্ভব হলো না। কে এমন আছে যে, তাদেরকে সুউচ্চৈঃস্বরে কুরআন শোনাতে পারে?'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আমি তাদেরকে কুরআন শোনাব।'
সাহাবী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুম বললেন:
'তুমি তা করলে আমরা আশঙ্কা বোধ করি। আমরা চাই, এমন কোনো ব্যক্তি এ কাজ করুক, যার অনেক জনবল আছে। যারা তাকে রক্ষা করবে এবং কুরাইশরা কোনো দূরভিসন্ধি নিয়ে অগ্রসর হলে তাদেরকে বাধা দিতে সক্ষম হবে।'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আমাকেই এ কাজ করতে দাও। আল্লাহই আমাকে তাদের নির্যাতন থেকে রক্ষা করবেন এবং তিনিই আমাকে সাহায্য করবেন।'
পরদিনই সকালে তিনি মসজিদে হারামের মাকামে ইবরাহিমের নিকট উপস্থিত হলেন। কুরাইশরা তখন কাবা শরীফের চারপাশে ব্যস্ত ছিল। তিনি মাকামে ইবরাহীমের পাশে দাঁড়িয়ে উচ্চৈঃস্বরে তিলাওয়াত আরম্ভ করলেন: الرَّحْمَنُ، عَلَّمَ الْقُرْآنَ، خَلَقَ الْإِنْسَانَ، عَلَّمَهُ الْبَيَانَ .
'করুণাময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে, দয়াময় আল্লাহ। তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন। তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ। তিনিই তাকে শিখিয়েছেন, ভাব প্রকাশ করতে।'
তিনি তিলাওয়াত করেই চলছেন, তাঁর এ কাজ কুরাইশদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল, তারা বলা শুরু করল : 'ইবনে উম্মে আবদ কী তিলাওয়াত করছে? ধ্বংস হোক সে। সে তো মুহাম্মদ যে কুরআনের কথা বলে, তা-ই তিলাওয়াত করছে!'
এই বলে তারা সম্মিলিতভাবে তাঁর দিকে ছুটে এল এবং তাঁর মুখমণ্ডলের ওপর বেদম প্রহার করতে লাগল। আর তিনি সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে তিলাওয়াত করেই চলেছিলেন। এ প্রহারের মধ্যে তিনি যতটুকু সম্ভব তিলাওয়াত করলেন। অতঃপর রক্তে রঞ্জিতাবস্থায় সাহাবীদের কাছে ফিরে এলেন।
তারা তখন বলতে লাগলেন: 'আমরা এই আশঙ্কাই করছিলাম।'
তিনি বললেন: 'খোদার কসম! আল্লাহর দুশমনদের আজ যতটুকু তুচ্ছ পেয়েছি, তা বলার নয়। তোমরা অনুমতি দিলে তাদেরকে আগামীকালও অনুরূপ শোনাতে পারি।'
তারা বলেন: 'না, যথেষ্ট হয়েছে। তুমি তাদেরকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই শুনিয়েছ।'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফত পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। তিনি অসুস্থ হয়ে মৃত্যু শয্যায় শায়িত হলে উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে দেখতে গেলেন।
তিনি তাঁকে বললেন: 'আপনি কিসের আশঙ্কা করছেন?'
তিনি বললেন:
'আমার আশঙ্কার কারণ আমার গোনাহসমূহ।'
উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'কোনো কিছুর আকাঙ্ক্ষা করছেন?'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আমি আল্লাহর রহমতের আকাঙ্ক্ষা করছি।'
উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আপনি বেশ কয়েক বছর যাবৎ যে সরকারি নাগরিক ভাতা নেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন, সে ভাতা দেওয়ার জন্য আদেশ দেব?'
তিনি উত্তরে বললেন:
'না তার কোনো প্রয়োজন নেই।'
উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আপনার পরে আপনার মেয়েদের তা কাজে লাগবে।'
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আপনি কি আমার মেয়েদের অভাবগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করেন? আমি প্রতি রাতে তাদেরকে সূরা আল ওয়াকিয়াহ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছি। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: وَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولُ اللهِ ﷺ يقول " مَنْ قَرَأَ الْوَاقِعَةَ كُلَّ لَيْلَةٍ لَمْ تُصِبْهُ فَاقَةٌ أَبَدًا .
'যে প্রত্যেক রাতে সূরা আল ওয়াক্বিয়াহ পাঠ করবে, দারিদ্র্য ও অভাব তাকে স্পর্শ করবে না।'
রাত হলে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন। তখনো তাঁর মুখে জারি ছিল আল্লাহর নাম এবং পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহের তিলাওয়াত।
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ: ৪র্থ খণ্ড, ১২৯-১৩০ পৃ.। ২. আল ইস্তিয়াব (হায়দরাবাদ সংস্করণ) ১ম খণ্ড, ৩৫৯-৩৬২ পৃ.। ৩. উসদুল্ গাবা ৩য় খণ্ড: ২৫৬-২৬০ পৃ.। ৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ ১ম খণ্ড ১২-১৫ পৃ.। ৫. আল বিদায়াওয়ান নিহায়া ৭ম খণ্ড, ১৬২-১৬৩ পৃ.। ৬. তাবাকাত আশ-শা'রানী, ২৯-৩০ পৃ.। ৭. শাযরাতুয যাহাব ১ম খণ্ড: ৩৮-৩৯ পৃ.। ৮. তারিখুল ইসলাম লিয্যাহাবী, ২য় খণ্ড: ১০০-১০৪ পৃ.। ৯. সিয়ারু আলামুন নুবালা : ১ম খণ্ড, ৩৩১-৩৫৭ পৃ.। ১০. সিফাতুস সাফওয়া : ১ম খণ্ড, ১৫৪-১৬৬ পৃ.।
📄 সালমান আল ফারেসী (রাঃ)
'সালমান আল ফারেসী আহলে বাইত অর্থাৎ নবী পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত।' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)
এটি আল্লাহর সন্ধানে হকের তালাশে অবিস্মরণীয় ঘটনা। ঘটনাটি ঘটেছে সালমান আল ফারেসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর জীবনে। মহান আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট এবং তিনিও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।
যেহেতু এ ঘটনার ব্যাপারে তাঁর অনুভূতি অত্যন্ত গভীর এবং বর্ণনাও বস্তুনিষ্ঠ ও চিত্তাকর্ষক। সেহেতু নিজের জীবন সম্পর্কে সালমান আল ফারেসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিজের বক্তব্য হুবহু এখানে তুলে ধরা হলো।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সালমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'আমি ইরানের ইস্পাহান প্রদেশের 'জাইয়ান' গ্রামের এক যুবক। আমার পিতা ছিলেন সেই গ্রামের সর্দার। ধন-দৌলতে এই গ্রামের মধ্যে তাঁর যেমন কোনো জুড়ি ছিল না, তেমনি সামাজিক মর্যাদায়ও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
জন্মের পর থেকেই আমি ছিলাম এ পৃথিবীতে আমার পিতার সর্বাধিক স্নেহধন্য সন্তান। দিন দিন এ আদর এতই প্রগাঢ় হতে থাকে যে, মেয়েদের মতো তিনি আমাকেও ঘরের চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখতে পছন্দ করতেন।'
আমি অগ্নি পূজারী হিসেবেই নিজ ধর্মের উপর লেখাপড়া ও নিষ্ঠার সাথে আরাধনা-সাধনা করতাম। গির্জায় আলো জ্বালানোর দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার কারণে প্রতিদিন সকালে অগ্নিশিখা জ্বালাতাম। দিন বা রাতের কোনো সময়েই যাতে এ শিখার অগ্নি নিভে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হতো আমাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে।
গ্রামে আমার পিতার বিরাট শস্য খামার ছিল। সেখান থেকে আমাদের প্রচুর শস্য আসত। আমার পিতা শস্য কেটে নিয়ে আসতেন এবং নিজেই তার রক্ষণাবেক্ষণ করতেন।
একবার তিনি অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে আমাকে বললেন: 'তোমার আজ খামারের দেখাশোনার কাজে যেতে পারলে ভালো হয়।'
তার কথামতো আমি খামারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। বেশ কিছু রাস্তা অতিক্রম করার পর হঠাৎ গির্জায় আরাধনারত খ্রিস্টানদের প্রার্থনার আওয়াজ আমার কানে আসে। খ্রিস্টানদের ধর্ম-কর্ম সম্পর্কে আমার কিছুই জানা ছিল না। আমি অন্য ধর্মাবলম্বীদের সম্পর্কেও কিছু জানতাম না। কারণ, আমাকে লোকজনের সাথে মেলামেশা করতে দেওয়া হতো না, বরং বলা যায় স্নেহের বাঁধনে আটকে রাখা হয়েছিল। তাই গির্জায় প্রার্থনারত খ্রিস্টানদের প্রার্থনার আওয়াজ শুনে কৌতূহল জাগল, ওরা কী করছে, কী বলছে তা দেখা ও শোনার। এই কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে গির্জায় প্রবেশ করি। তাদের অনুষ্ঠানের সবকিছু খুবই মনোযোগের সঙ্গে দেখি। তাদের আরাধনা অনুষ্ঠান আমার খুব ভালো লাগে।
এ ঘটনাই আমাকে খ্রিস্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করে। মনে মনে বললাম: 'আমাদের অগ্নি পূজা থেকে খ্রিস্টান ধর্মই তো অনেক ভালো।'
তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান দেখে আমি সারাদিন পার করে দিলাম। খামারে আর যাওয়া হলো না। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম: 'এ ধর্মের কেন্দ্রীয় দফতর কোথায়?'
তারা জানাল : 'সিরিয়া।'
রাত ঘনিয়ে এলে আমি এখান থেকেই বাড়ি ফিরি। সারাদিনের কাজকর্মের হিসাব চাইলেন আমার পিতা। আমি বললাম:
'বাবা, আমি খামারে যাবার পথে কিছু লোককে দেখতে পাই, তারা গির্জায় আরাধনা করছিল। তাদের ধর্মের এ সকল কার্যাবলী আমাকে মুগ্ধ করে ফেলে। সবকিছু ভুলে আমি সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানেই সময় কাটিয়েছি।'
আমার এমন উত্তর শুনে আমার পিতা অত্যন্ত ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি বললেন:
'বৎস! সে ধর্মে কোনো কল্যাণ নেই, শুধু তোমার ও তোমার পিতার ধর্মই সর্বোৎকৃষ্ট ও কল্যাণকর।'
আমি বললাম : 'খোদার শপথ! তা হতেই পারে না, তাদের ধর্ম অবশ্যই আমাদের ধর্ম থেকে উত্তম।'
একথা শুনে আমার পিতা আরো ভয় পেয়ে গেলেন। নিজ ধর্ম ত্যাগ করে আমি ধর্মান্তরিত হই কি না এই আশঙ্কায় তিনি আমার দু'পায়ে বেড়ি পরিয়ে গৃহবন্দী করে রাখলেন। কিন্তু আমি প্রথম সুযোগেই সেই খ্রিস্টানদের কাছে সংবাদ পাঠালাম : 'সিরিয়ার উদ্দেশ্যে যদি কোনো কাফেলা তোমাদের এখানে আসে, তাহলে আমাকে সংবাদ দিও।'
কয়েক দিনের মধ্যেই সিরিয়ার উদ্দেশ্যে এক কাফেলা তাদের গির্জার কাছে তাঁবু খাটায়। এ সংবাদ আমার কাছে পৌঁছানো হয়। আমিও পায়ের বেড়ি ছিন্ন করে নিজেকে মুক্ত করে বাড়ি ত্যাগ করলাম এবং গোপনে তাদের সাথে রওয়ানা হলাম। এমনকি, শেষ পর্যন্ত সিরিয়ায় পৌঁছলাম। সিরিয়ায় উপস্থিত হয়ে আমি খ্রিস্টান ধর্মের সবচাইতে বড় পাদ্রীর খোঁজ করলাম।
তাদের অনেকেই জানাল 'বিশাপ হলেন বড় পাদ্রি।'
তাঁর খিদমতে হাজির হয়ে বললাম: 'আমি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছি। এখন আমি আপনার সাথে থেকে আপনার খিদমত করতে চাই। ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে চাই এবং আপনার সাথে আরাধনা করার সুযোগ লাভ করতে চাই।'
তিনি বললেন: 'গির্জায় প্রবেশ করো।'
আমি গির্জায় প্রবেশ করলাম এবং তার খিদমতে নিজেকে নিয়োজিত রাখলাম।
এভাবে কিছুদিন অতিবাহিত করার পর আমি বুঝতে পারলাম, এই পাদ্রি ভালো লোক নয়, বরং লোভী ও প্রতারক। তিনি তাঁর অনুসারীদের দান-খয়রাত করার নির্দেশ দিতেন এবং এ কাজে অনেক পুণ্য হবে বলে তাদের উদ্বুদ্ধ করতেন। তার কথায় আস্থা স্থাপন করে ভক্তরা প্রচুর অর্থ তাকে দিত; কিন্তু সেসব অর্থ দীন-দুঃখীদের না দিয়ে তিনি নিজের জন্য রেখে দিতেন। এভাবে তিনি ভক্তদের দানের সোনা-রূপা দিয়ে নিজের জন্য বিরাট সঞ্চয় গড়ে তোলেন। বড় বড় সাত পিপা ভরে উঠল সোনা-রূপা। এসব কাণ্ড দেখার পর পাদ্রির ওপর আমার কোনো আস্থা আর অবশিষ্ট রইল না; বরং তার ওপর আমি ভীষণ ক্ষুব্ধ হলাম। তিনি যেদিন মারা গেলেন, সেদিন তার দাফন-কাফনের জন্য দূর-দূরান্ত থেকেও খ্রিস্টানরা এসে জড়ো হলো। আমি তাদের বলে দেই:
'আপনাদের এই পাদ্রি কিন্তু খুব খারাপ ও পুরোদস্তুর প্রতারক। তিনি লোকদের দান-খয়রাত করতে বলতেন এবং এ কাজে সবাইকে উদ্বুদ্ধও করতেন। যারা তার কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দান করত, তাদের দানের একটি কানাকড়িও গরীব-দুঃখীদের দান করতেন না; বরং তা নিজের জন্য সঞ্চয় করে রাখতেন।'
উপস্থিত ভক্তদের অনেকে আমার কাছে জানতে চাইলেন, এসব আমি কিভাবে জানলাম। আমি বললাম:
'চলুন আমার সাথে, আমি তার সঞ্চিত ধন-ভাণ্ডার আপনাদের দেখিয়ে দিচ্ছি।'
তারা বলল:
'ঠিক আছে। তবে তাই হোক।' পাদ্রির গোপন ধনভাণ্ডার আমি তাদের দেখিয়ে দিলাম। তারা সেখান থেকে পিপাভর্তি সোনা ও রূপা উদ্ধার করল।
এসব দেখে তারা বলল:
'খোদার কসম, আমরা এই খারাপ ব্যক্তিকে দাফন করতে পারি না। দাফনের পরিবর্তে তাকে শূলে চড়িয়ে পাথর নিক্ষেপ করব।' তারা তা-ই করল।
কিছুদিন যেতে না যেতেই এই পাদ্রির স্থানে নতুন এক পাদ্রিকে নিয়োগ দেওয়া হলো। আমি নিজেকে তাঁর খিদমতে নিয়োজিত করলাম। দিন-রাতের অধিকাংশ সময় তিনি ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। তিনি ছিলেন দুনিয়াত্যাগী সাধক। আখিরাতের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল অনুরাগ। আমি এমন নিষ্ঠাবান পাদ্রি আর দেখিনি। আমি তাঁকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ভালো বাসতাম। তাঁর সাথে আমি বহুদিন কাটিয়েছি।
তাঁর মৃত্যুর সময়ে আমি তাঁর কাছে আবেদন করলাম :
'মুহতারাম! আপনার পর আমি কার সান্নিধ্যে থেকে জীবন অতিবাহিত করব? আপনি আমাকে কার অনুগত হওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন?'
তিনি বললেন : 'হে বৎস! আমার জানামতে মাওসেল শহরে এক ব্যক্তি আছেন, যিনি দীনকে কাটছাঁট করেননি। আমি তাঁকে ছাড়া আর কাউকে দেখছি না, তুমি তার কাছেই চলে যাও।'
অতঃপর এই সাধকের মৃত্যু হলে আমি 'মাওসেলের' সেই পাদ্রির কাছে চলে যাই এবং তাঁর কাছে বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করে আবেদন করি:
'সেই সাধক মৃত্যুকালে আপনার সাথে মিলিত হওয়ার জন্য আমাকে অসিয়ত করেছেন। একমাত্র আপনিই খ্রিস্টান ধর্মকে সঠিকভাবে ধরে রেখেছেন। এ কারণে আপনার খিদমতে আমার উপস্থিতি।'
তিনি বললেন:
'তুমি আমার কাছেই থাক।'
আমি তাঁর কাছে থাকি এবং তাঁকেও সঠিক পথের দিশারী হিসেবে দেখতে পাই; কিন্তু কিছুদিন পর তিনিও ইনতিকাল করলেন।
আমি তাঁর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে আবেদন করলাম : 'মুহতারাম! বুঝতে পারছেন যে, আপনার জীবন শেষ হয়ে এসেছে। আপনি আমার ব্যাপারে সবকিছুই জানেন। আপনার মৃত্যুর পর আমাকে কার খিদমতে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন?'
তিনি বললেন : 'বৎস 'নাছিবাইন' নামক স্থানের এক পাদ্রি ছাড়া আর কেউ নিজ দীনের অনুসরণে নেই। তার মতো আর কেউ এভাবে দীনের অনুসরণ করছে বলেও আমার মনে হয় না। সম্ভব হলে তুমি তার সান্নিধ্যে চলে যেতে পার।'
অতঃপর এ সাধকের মৃত্যু হলে আমি 'নাছিবাইন' নামক স্থানের সেই পাদ্রির সাথে সাক্ষাৎ করে আমার পূর্ববর্তী সাধকের অসিয়ত ও নিজ বিষয়ে বিস্তারিত জানাই। তিনিও আমাকে তাঁর সাথে অবস্থান করার অনুমতি দিলেন। তাঁকেও আমি অপর দুই পাদ্রির মতো খোদাভীরু পেলাম। কিছুদিন পর তিনিও ইনতিকাল করেন।
মৃত্যুর পূর্বকালে তাঁর নিকটও আগের মতো আবেদন করলাম :
'আমার ব্যাপারে আপনি ভালো করেই জানেন। আপনার পর এখন কার সাহচর্যে থাকব?'
তিনি বললেন : 'হে বৎস! খোদার শপথ করে বলছি, 'আম্মুরিয়ার' এক ব্যক্তি ছাড়া দ্বিতীয় আর কেউ সঠিকভাবে খ্রিস্টধর্মে কায়েম আছে বলে আমার জানা নেই। তুমি তার সাহচর্যে নিজেকে নিয়োজিত কর।'
এবার আমি 'আম্মুরিয়ার' সেই পাদ্রির খিদমতে উপস্থিত হয়ে তাঁকে আমার বিষয়ে বিস্তারিত জানালাম। তিনি আমাকে তাঁর সাথে থাকার অনুমতি দিলেন। আমি তখন থেকে তার খিদমতেই লেগে গেলাম। খোদার শপথ করে বলছি যে, তিনি তাঁর ঐসব সঙ্গী-সাথীদের মতোই হেদায়াতের উত্তম পথের পথিক ছিলেন। তাঁর থেকে আমি অনেক গাভী ও বকরি তোহফা হিসেবে লাভ করি। কিছুদিন পর তিনিও ইনতিকাল করলেন।
তার মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও তার কাছে নিবেদন করি : 'আপনি আমার ব্যাপারে বিস্তারিত জানেন, অতএব আপনি আমাকে কার সাহচর্য লাভের পরামর্শ দেন বা আমার করণীয় বিষয়ে কিইবা নির্দেশ দিচ্ছেন?'
তিনি বললেন : 'বৎস! আমার বিশ্বাস, আমরা যারা খ্রিস্টধর্মে আছি, তাঁদের কেউই ধর্মের ওপর সঠিকভাবে নেই। কিন্তু সে সময় অতি নিকটবর্তী, যে সময়ে ইবরাহীম আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীনের অনুসারী একজন নবীর আবির্ভাব ঘটবে। তিনি তাঁর জন্মভূমি থেকে দুই প্রান্তরে কালো পাথরে ঘেরা খেজুর বাগানের জন্য প্রসিদ্ধ ইয়াসরিব এলাকায় হিজরত করবেন। তাঁর কিছু প্রকাশ্য নিদর্শন থাকবে। তাঁর খিদমতে হাদীয়া পেশ করলে তিনি তা নিজের জন্য গ্রহণ করবেন। কিন্তু সদকা ও যাকাত কখনোই নিজের জন্য গ্রহণ করবেন না। তাঁর পিঠে থাকবে নবুওয়াতের মোহর বা ছাপ। যদি পার সে দেশে গিয়ে তাঁর সাথে মিলিত হবে।'
অতঃপর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন; কিন্তু আমি আম্মুরিয়াতেই অনেক দিন অবস্থান করলাম। অবশেষে 'কালব' গোত্রের একটি আরব বাণিজ্য কাফেলা এখান দিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় আমি তাদের কাছে আবেদন করি : 'যদি আরবের উদ্দেশ্যে আমাকে আপনাদের সাথে নিয়ে যান, তাহলে আমার গাভী ও বকরিগুলো আপনাদের দিয়ে দেব।'
তারা এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে বললেন : 'হ্যাঁ, আমরা আপনাকে সাথে নেব।'
ওয়াদা মোতাবেক আমি আমার গাভী ও বকরি তাদের দিয়ে দিলাম এবং তারা আমাকে তাদের সঙ্গে নিল। কিন্তু সিরিয়া ও মদীনার মাঝে 'ওয়াদীয়ে কুবা' নামক স্থানে এসে তারা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাকে একজন ইহুদীর কাছে বিক্রি করে দিল। বাধ্য হয়ে এই ইহুদীর খিদমতে নিয়োজিত হলাম। কিছুদিন পর উক্ত ইহুদীর এক ভাইপো (যিনি 'বনু কুরাইযা' গোত্রের লোক) এ বাড়িতে বেড়াতে এসে আমাকে তার কাছ থেকে কিনে নেয়। এভাবেই সে আমাকে 'ইয়াসরিব' নামক স্থানটিতে নিয়ে এল। এখানে এসেই খেজুর বাগান সমৃদ্ধ সেই স্থান দেখতে পেলাম, যার কথা আম্মুরিয়ার সেই পাদ্রি আমাকে বলে দিয়েছিলেন এবং বর্ণিত সেই মদীনা মুনাওয়ারারও সন্ধান পেলাম, যার প্রশংসা শুনেছি। এভাবে আমি এখানে পৌঁছে সেই ইহুদীর ভাইপোর খিদমতে নিয়োজিত থাকলাম।
এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কাতেই অবস্থান করে কুরাইশদের আল্লাহর দীনের দাওয়াত দিচ্ছিলেন। আমার গোলামি বা দাস জিন্দেগী থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য মুক্তিপণের যে অংক নির্ধারিত করা হয়েছিল তা সংগ্রহ করার জন্য আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খবরাদি সংগ্রহ করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না।
কিছুদিন পরেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়াসরিবে হিজরত করে আসেন। আমি এ সময় আমার মালিকের খেজুর গাছের মাথায় উঠে কিছু কাজ করছিলাম। আর আমার মালিক গাছের নিচে বসেছিলেন। এমন সময় সেখানে মালিকের ভাইপো এলেন এবং তাকে বলতে লাগলেন:
'আউস এবং খাযরাজ গোত্রের নবীকে আল্লাহ ধ্বংস করুক। তারা সবাই এখন কোবাতে একত্রিত হয়েছে এমন এক ব্যক্তিকে দেখার জন্য, যে নিজেকে নবী দাবি করে মক্কা থেকে হিজরত করে এসেছে।'
এ সংবাদ শোনামাত্রই আমার শরীরে যেন জ্বর এসে গেল। আমি তখন ভীষণভাবে কাঁপছিলাম। আমার ভয় হচ্ছিল যে, আমি মালিকের মাথার উপরই পড়ে না যাই। দ্রুত আমি খেজুর গাছ থেকে নেমে পড়ি এবং তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসা করি, আপনি কী বলছিলেন? সেই সংবাদটির পুনরাবৃত্তি করুন না। আমার মালিক এতে ভীষণভাবে রেগে গেলেন এবং আমাকে সজোরে চপেটাঘাত করে বললেন:
'তোমার এতে কী আসে যায়? যাও যে কাজ করছিলে সে কাজে ফিরে যাও।'
আমার মালিকের এ দুর্ব্যবহার নীরবে সহ্য করে পরে একসময় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্ধানে আমি কিছু খেজুর নিয়ে সাক্ষাৎ করার জন্য রওয়ানা হলাম। তাঁর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললাম :
'যতদূর জেনেছি, আপনি একজন ভালো লোক, আপনার সাথী-সঙ্গীরা গরীব এবং অভাবী। এই সামান্য কিছু সদকার জন্য ছিল। মনে করলাম যে, অন্যের চেয়ে আপনিই এর উত্তম হকদার। এই বলে খেজুরগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে পেশ করলাম।'
তিনি তাঁর সাহাবীদের বললেন: 'তোমরা খাও।'
তিনি তাঁর হাত সেদিকে সম্প্রসারণ করলেন না এবং এ খেজুর খেলেন না। আমি তা দেখে মনে মনে ভাবলাম, এটি একটি নিদর্শন। সেদিন তাঁর খিদমত থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম এবং আরো কিছু খেজুর সংগ্রহ করার কাজে লেগে গেলাম। ইতোমধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোবা থেকে মদীনা মুনাওয়ারাতে চলে গেলেন। আমি আবার মদীনায় তাঁর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করি:
'আমি সেদিন দেখলাম, আপনি সদকা খান না। তাই আজ আপনার সম্মানে কিছু হাদিয়া এনেছি।'
এবার তিনি তা খেলেন এবং সঙ্গীদেরও খেতে বললেন। তারাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে খেলেন। মনে মনে বললাম, এটি দ্বিতীয় নিদর্শন।
আমি যখন তৃতীয় বার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হই, তখন তিনি জান্নাতুল বাকীতে 'গারকাদ' নামক স্থানে তাঁর কোনো এক সাহাবীর দাফনকার্য সম্পন্ন করছিলেন। তিনি সেখানে দু-দুটি বিশেষ ধরনের আরবী চাদর বা গাউন মুড়ি দিয়ে বসে ছিলেন। এবার তাঁকে সালাম করে তাঁর পিঠে খাতমে নবুওয়াতের সেই চিহ্ন দেখার জন্য এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিলাম, যে চিহ্নটি সম্পর্কে আম্মুরিয়ার সেই পাদ্রি আমাকে বলে দিয়েছিলেন। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিঠের দিকে বারবার তাকাচ্ছি দেখে তিনি আমার মতলব বুঝে ফেললেন। নিজ পিঠ থেকে চাদর দু'টি ফেলে দিলেন। এবার আমি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে না করতেই মোহরের ছাপ দেখে তাঁকে নবী হিসেবে চিনতে পারলাম। কালবিলম্ব না করে সে মোহরে চুম্বন দিতে লাগলাম ও আনন্দে চক্ষু দিয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আমার এ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'কী ব্যাপার? তোমার কী হয়েছে?'
তখন আমি তাঁকে আমার সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। সবকিছু শুনে তিনি আশ্চর্য হলেন এবং খুশি মনে তার সাথী-সঙ্গীদেরকেও তা পুনরায় শোনানোর নির্দেশ দিলেন। আমি তাদেরও সে কাহিনী আবারও শোনাই। তারা এসব ঘটনা শুনে যেমন আশ্চর্য হলেন, তেমনি আনন্দিতও হলেন।'
সালমান আল ফারেসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দীনে হকের সন্ধানে নানা স্থানে অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে সফর করার জন্য সালাম। সালমান ফারেসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সালাম তাঁর ঈমানের দৃঢ়তার জন্য। তাকে সালাম তার মৃত্যুর দিনে এবং আখিরাতের জীবনেও।
টিকাঃ
১. আল ইসাবাহ (আস্সাআদাহ সংস্করণ): ৩য় খণ্ড, ১১৩-১১৪ পৃ.। ২. আল ইসতিয়াব (হায়দারাবাদ সংস্করণ): ২য় খণ্ড, ৫৫৬-৫৫৮ পৃ.। ৩. আল জরহু ওয়াত তা'দীলু ভূমিকা ১ম খণ্ড, ১ ২য় খণ্ড, ২৯৬-২৯৭ পৃ.। ৪. উসদুল গাবাহ্: ২য় খণ্ড, ৩২৮-৩৩২ পৃ.। ৫. তাহযীব আত্ তাহযীব: ৪র্থ খণ্ড ১৩৭-১৩৯ পৃ.। ৬. তাকরীবুত তাহযীব : ১ম খণ্ড, ৩১৫ পৃ.। ৭. আল জঊ বাইনা রিজালিস্ সহিহাইন: ১ম খণ্ড, ১৯৩ পৃ.। ৮. তাবাকাত আশ শ'রানী: ৩০-৩১ পৃ.। ৯. সিফাতুচ্ছাফওয়া : ১ম খণ্ড, ২১০-২২৫ পৃ.। ১০. শাজরাতুযযাহাব: ১ম খণ্ড, ৪৪ পৃ.। ১১. তারিখুল ইসলাম লিষ যাহাবী : ২য় খণ্ড, ৫৮-১৬৩ পৃ.। ১২. শিয়ারু আলাম আন নুবালা ১ম খণ্ড, ৩৬২-৪০৫ পৃ.।