📄 আবু আইউব আল আনসারী (রাঃ)
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) প্রাচীরের পাদদেশে দাফন করা হয়েছে।
আরবের ঐতিহ্যবাহী বনু নাজ্জার গোত্রের আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন বিশিষ্ট সাহাবী। এ সাহাবীর আসল নাম খালিদ ইবনে যায়েদ ইবনে কুলাইব। তাঁর ডাক নাম ছিল আবু আইউব। কিন্তু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুহাজিরদের সাহায্য-সহযোগিতা দানের সর্বোচ্চ গৌরবে গৌরবান্বিত হওয়ার কারণে ইতিহাসে তিনি আনসারী নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। মুসলিম বিশ্বে আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু একটি বহুল পরিচিত নাম। এ প্রসিদ্ধ সাহাবীর নাম জানেন না এমন লোক অতি অল্পই আছে।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় পৌঁছানোর পর আল্লাহ তাআলার ইশারায় আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাসগৃহকে নিজের অবস্থানের জন্যে বেছে নেন। আল্লাহ আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে এভাবে সমগ্র বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি দান করেন এবং ইসলামী জগতে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রাখেন।
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাসগৃহে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবতরণ ও অবস্থানের ঘটনা অত্যন্ত চমকপ্রদ ও আনন্দদায়ক। কুরাইশদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় পৌঁছলে মদীনার অধিবাসীরা তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও মহানন্দে উষ্ণ সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনবার্তা পেয়ে মদিনাবাসী যেন তাদের একান্ত প্রিয়জনের সান্নিধ্য লাভের প্রত্যাশায় অধীর আগ্রহে তাঁর শুভাগমনের প্রতীক্ষা করতে থাকে। এ উপলক্ষে নেতৃবর্গ স্ব-স্ব বাসগৃহ সুসজ্জিত করে প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন, রাহমাতুল্লিল আ'লামীন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন তাঁর গৃহকে নিজ অবস্থানের জন্যে বেছে নেন। কে তার বাসগৃহে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পেয়ে ধন্য হবে- এ নিয়ে তাদের মধ্যে চলছিল এক নীরব ও স্নায়ুবিক প্রতিযোগিতা।
এদিকে রাসূলুল্লাহ (স) সরাসরি মদীনায় না পৌঁছে অনতিদূরের 'কুবা' নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন। কুবার মুসলমানদের অনুরোধে তিনি সেখানে চারদিন অবস্থান করেন। এ সময় তিনি সেখানে তাকওয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম মসজিদ 'মসজিদে কুবা' নির্মাণ করেন।
এরপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উটনীর পিঠে সওয়ার হয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। মদীনার নেতৃবর্গ ও সর্বস্তরের জনসাধারণ রাস্তায় সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খোশ আমদেদ জানান। সকলেরই প্রত্যাশা যে, এ মহান নেতাকে অবস্থানের জন্যে স্বগৃহে পেয়ে নিজেদের ধন্য করবেন। কিন্তু তাঁকে বহনকারী উটনীকে একের পর এক নেতৃবৃন্দের গৃহ অতিক্রম করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে দেখে প্রত্যেকেই এমনভাবে বিনয়ের সাথে অনুরোধ জানাচ্ছিলেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের এখানেই অবস্থান নিন। আমাদের রয়েছে বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র জনগোষ্ঠী ও ধন-সম্পত্তির প্রাচুর্য। এসব আপনার প্রতি যে কোনো হুমকি মোকাবেলা করতে সক্ষম।'
কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) সবাইকে এই বলে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন:
دَعُوهَا فَإِنَّهَا مَأْمُورَةٌ .
'উটনীকে চলতে দাও। কোথায় থামবে এ ব্যাপারে সে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে আদেশপ্রাপ্ত।'
এদিকে উটনীটি তার স্বাভাবিক গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সকলেই অতি ঔৎসুক্যের সাথে তাকিয়ে রইলেন উটনীর চলার পথের দিকে। উটনী যখন এক একটি বাড়ি অতিক্রম করছিল, তখন সে বাড়ির লোকজন অত্যন্ত হতাশ হয়ে নিজেদের দুর্ভাগা মনে করছিল। অপরদিকে পরবর্তী বাড়ির লোকজন বুকভরা আশা নিয়ে ভাবছিল, উটনী তাদের বাড়ির সামনেই থামবে; কিন্তু একের পর এক বাড়ির লোকজনের আশা আনন্দ নিরানন্দে পরিণত হচ্ছিল। এভাবেই উটনী অন্য কোথাও অবস্থান না নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চললো। উৎসুক জনতা বিশাল মিছিলের ন্যায় উটনীর পেছনে পেছনে চলতে লাগলেন। তাঁরা দেখতে চান, সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিটি কে, যার বাড়িতে রাসূলে কার্লাীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবস্থান নেবেন।
অবশেষে এ কৌতূহল ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। উটনী আৰু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাসগৃহের সামনের উন্মুক্ত মাঠে এসে বসে পড়ল। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবতরণ না করে উটনীকে পুনরায় পথ চলার ইশারা দিয়ে লাগাম সহজ করে দিলেন। কিন্তু সে সামনে অগ্রসর না হয়ে ঘুরে ফিরে একই স্থানে এসে বসে গড়তে লাগল। এ দৃশ্য অবলোকনে আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হৃদয় আনন্দে ভরে উঠল। তিনি দৌড়ে গিয়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উষ্ণ প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানালেন এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মালপত্র উটনীর পিঠ থেকে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বহন করে আনতে থাকলেন। আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অনুভব করছিলেন, তিনি যেন আজ সমস্ত পৃথিবীর ধন-সম্পদ দিয়ে নিজের বাড়িঘর পরিপূর্ণ করলেন।
কালবিলম্ব না করে আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর দোতলা বাসগৃহের উপর তলার সমস্ত আসবাবপত্র সরিয়ে সেখানে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থানের জন্যে সুসজ্জিত করলেন; কিন্তু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরের চেয়ে নিচ তলায় অবস্থান করাটা বেশি পছন্দ করলেন। আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে সে অনুযায়ী নিচ তলায় তাঁর থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে পানাহার সেরে নিচ তলায় শুয়ে পড়লেন। আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর স্ত্রীসহ উপর তলায় চলে গেলেন, কিন্তু তাঁরা নিজ কক্ষের দরজা বন্ধ করতে ইতস্তত করছিলেন। আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বলল:
'আমাদের প্রতি ধিক্কার! আমরা কতইনা বেয়াদবী করছি! আল্লাহর রাসূলকে নিচে রেখে আমরা উপরে ঘুমাতে যাচ্ছি? আল্লাহর রাসূলকে নিচে রেখে আমরা উপরে হেঁটে বেড়াবো, তা কী করে সম্ভব? আমরা কি আল্লাহর রাসূল ও তাঁর ওহীর মাঝখানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করব? এ অবস্থা যদি অব্যাহত রাখি, তাহলে নিশ্চয়ই আমরা ধ্বংসের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে যাবো।'
এসব চিন্তা করতে করতে তাঁদের শরীর যেন নিস্তেজ হয়ে আসছিল। চিন্তা করে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছিলেন না যে, তাঁরা এখন কী করবেন। পরিশেষে তাঁরা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরের সরাসরি উপরে অবস্থান না করে দূরে এক কোণে থাকার মনস্থ করলেন; কিন্তু হেঁটে যাবেন কী করে? যদি পায়ের শব্দে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে? অথবা উপর থেকে কোনো ধুলোবালি নিচে পড়ে? অনেক চিন্তা-ভাবনার পরে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির ওপর ভর করে তাঁরা অত্যন্ত আদব ও সংকোচের সঙ্গে মেঝের মাঝখান অতিক্রম না করে এক কিনারায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন।
পরদিন সকালে আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে এসে অত্যন্ত আদবের সঙ্গে বললেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এবং আমার স্ত্রী গত রাতে একটুও ঘুমাতে পারিনি।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'কেন, কী হয়েছে?'
উত্তরে আবু আইউব আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আমরা এ নিয়ে অত্যন্ত সংকোচবোধ করছিলাম যে, আপনি নিচে আর আমরা উপরে কিভাবে থাকব। আমাদের চলাফেরার কারণে ধুলা-বালি নিচে পড়তে পারে এবং আমরা আপনার ও আল্লাহর ওহীর মাঝখানে যদি কোনো প্রতিবন্ধক হয়ে যাই।'
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে বললেন:
'আবু আইউব এতে সংকোচের কী আছে? আমি তো স্বেচ্ছায় নিচে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ বহু লোকজন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে এবং সে কারণে নিচে থাকাই শ্রেয়।'
আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্ত সম্মানের সাথে মেনে নিলেন। পরদিন রাতে খুব সতর্কতার সাথে চলাফেরা করলেও কীভাবে যেন পানিভর্তি কলসটি হঠাৎ পড়ে ভেঙে যায় এবং সমগ্র মেঝেতে গড়িয়ে যায়। আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভাষায়:
'একেতো প্রচণ্ড শীতের রাত। এমতাবস্থায় আমি এবং আমার স্ত্রী আশঙ্কা করছিলাম, যদি পানি গড়িয়ে নিচে পড়ে তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে তাঁর কষ্ট হতে পারে, অথচ তখন আমাদের ঘরে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্যে একমাত্র সম্বল আমাদের ব্যবহার্য কম্বলটি ছাড়া বিকল্প আর কোনো বস্ত্র নেই। অগত্যা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চলাফেরার পথে যাতে পানি পড়তে না পারে, সেজন্যে ঐ কম্বলটি দিয়েই মেঝের পানি সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেললাম।'
পরের দিন সকালে আমি পুনরায় রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে এই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বললাম:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনার নির্দেশ পালনে সর্বাত্মক কুরবানী দিতে প্রস্তুত; কিন্তু আপনাকে নিচে রেখে আমাদের উপরে থাকাটা মানসিকভাবে কোনোমতেই মেনে নিতে পারছি না। এই বলে কলসি ভেঙে যাওয়ার ঘটনা বললাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এবারের আবেদন গ্রহণ করলেন এবং তিনি উপরে অবস্থান নিলেন, আর আমরা নিচে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।'
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাড়ির সামনের সেই খোলা স্থানটি, যেখানে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বহনকারী উটনী এসে বসে পড়েছিল, সেখানেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৈরি করলেন ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম প্রাণকেন্দ্র 'মাসজিদুন নববী'। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থানের জন্যে মাসজিদুন নববী সংলগ্ন হুজরা খানাসমূহের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত না হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ সাত মাস তিনি আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাসগৃহে অবস্থান করেন।
অতঃপর নির্মাণ কাজ শেষ হলে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হুজরায় চলে আসেন। এভাবে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সর্বোত্তম প্রতিবেশীতে পরিণত হন এবং তাদের মাঝে মধুর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন এবং তাঁর যে কোনো প্রয়োজনে তিনি দ্রুত এগিয়ে আসতেন। আর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং পারস্পরিক ব্যবহারের মাঝে কোনো লৌকিকতার ঝামেলা পছন্দ করতেন না। তিনি সব সময়ই আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাড়িতে গিয়ে তাঁর পরিবারের খোঁজ-খবর নিতেন। মনে হতো তাঁরা সকলে একই পরিবারভুক্ত।
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করেন: একদা আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দুপুরের সময় অত্যন্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায় মসজিদে নববীতে এসে ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দেখতে পান। ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কুশল জানার এক পর্যায়ে দুপুর বেলায় তাঁর মসজিদে আগমনের কারণ জানতে চাইলে আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন: 'একমাত্র ক্ষুধার তাড়না আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।'
ওমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ কথা শুনে বললেন: 'আল্লাহর শপথ! আমিও একই কারণে এখানে এসেছি।'
উভয়ের কথোপকথনের মাঝে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে এসে উপস্থিত হন। তিনি উভয়ের উদ্দেশ্যে বলেন: 'এ অসময়ে তোমরা কেন এখানে?'
তারা উত্তরে বললেন: 'আল্লাহর শপথ! আমরা উভয়েই ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির হয়ে এখানে এসেছি।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে বললেন: 'আমিও জীবনমৃত্যুর ফায়সালাকারী সেই সত্তার কসম খেয়ে বলছি, সেই একই কারণে আমিও এখানে উপস্থিত হয়েছি।'
অতঃপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে বললেন: 'তোমরা আমার সাথে চলো।'
তিনি তাঁদের সাথে নিয়ে আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাড়িতে উপস্থিত হলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নিয়মিত খাবার প্রস্তুত রাখতেন। তিনি না এলে তা পরিবারের লোকেদের খেতে বলতেন।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আসতে দেখে আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর স্ত্রী দৌড়ে দরজায় গিয়ে বললেন: 'মারহাবা বি নাবিয়্যিল্লাহি ওয়া বিমান মা'আহ্।' অর্থাৎ 'আল্লাহর নবী ও তাঁর সাহাবীদের আগমন শুভ হোক।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন: 'আবূ আইউব কোথায়?'
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পাশেরই খেজুর বাগানে কাজ করছিলেন। রাসূলে কারীমের কণ্ঠস্বর শুনে তিনিও দৌড়ে এসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন: 'আল্লাহর নবী ও তাঁর প্রিয় সাহাবীদের আগমন শুভ হোক।'
অতঃপর আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্যে করে বলেন: 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি তো সাধারণত এ সময়ে কখনো আসেন না।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ।'
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মোবারকে ক্ষুধার ছাপ লক্ষ্য করে তাড়াতাড়ি বাগানে গিয়ে আধাপাকা খেজুরের একটি থোকা নিয়ে এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দেখে বললেন: 'কী দরকার ছিল এই আধাপাকা থোকাটি কাটার? একে পরিপক্ক হতে দেওয়াই তো ভালো ছিল।'
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'আমি চাচ্ছিলাম, এ থোকার কাঁচা-পাকা সব ধরনের খেজুরের স্বাদ আপনি গ্রহণ করবেন। আর আপনার মেহমানদারীর জন্যে আমি এখনই একটি বকরি যবেহ করছি।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'দেখ, দুধ দেয় এমন কোনো বকরি জবেহ করো না।'
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ঠিক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশমতো দুধ দেয় না এমন একটি বকরি যবেহ করলেন এবং তাঁর স্ত্রীকে বললেন: 'তুমি তো খুব সুন্দর রুটি তৈরি করতে পারো, এবার মেহমানদের জন্য সর্বোচ্চ মানের রুটি তৈরি করে আনো তো দেখি?'
অল্পক্ষণের মধ্যেই বকরির গোস্ত ভুনা ও রেজালা এ দু'ভাবে রান্না করে সম্মানিত মেহমানদের সামনে উপস্থিত করা হলো। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে কিছু গোশত এবং রুটি নিয়ে আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে তুলে দিয়ে বললেন:
'এগুলো ফাতেমাকে দিয়ে এসো, অনেকদিন ধরে এত মজাদার খাবার আমাদের ঘরে তৈরি হয়নি।'
অতঃপর তৃপ্তির সাথে পানাহারের পর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবিতার মতো করে বললেন:
'রুটি-গোশত খেজুর আধাপাকা খেজুর পাকা কচমচে খেজুর!'
এ শব্দগুলো উচ্চারণের সাথে সাথে তাঁর চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল এবং তিনি বললেন:
'যে মহান সত্তার হাতে আমার জীবন ও মৃত্যুর ফায়সালা, তাঁর শপথ করে বলছি, এ সকল নিয়ামত সম্পর্কেই তো কিয়ামতের দিন তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।'
সুস্বাদু খাদ্যবস্তু পানাহারের পূর্বে অবশ্যই বলবে:
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ .
এবং পানাহারশেষে বলবে:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هُوَ أَشْبَعَنَا وَأَنْعَمَ عَلَيْنَا فَأَفْضَلَ .
'সমস্ত প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে অত্যন্ত অনুগ্রহ করে উত্তম খাদ্যে পরিতৃপ্ত করেছেন।'
অতঃপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায়ের মুহূর্তে আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে পরের দিন তাঁর বাসায় আসার দাওয়াত দিলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁকে কেউ দাওয়াত করলে তিনিও তাকে অনুরূপ দাওয়াত করতেন। কিন্তু আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হুজুরের দাওয়াত ভালো করে শুনতে পাননি। পরে ওমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে উচ্চৈঃস্বরে বললেন:
'হে আবূ আইউব! আপনাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগামীকাল তাঁর বাসায় আসার জন্যে বলেছেন।'
আবূ আইউব আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ কথা শুনে বললেন: سَمْعًا وَطَاعَةً لِرَسُولِ اللَّهِ .
'রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহ্বানে অবশ্যই আসবো।'
পরের দিন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাড়িতে আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এলে তিনি তাঁকে ছোট্ট একটি কাজের মেয়ে উপহার দিয়ে বললেন:
'হে আবূ আইউب! এই মেয়েটির সাথে খুব ভালো আচরণ করবে ও উত্তম আদব-কায়দা শিক্ষা দেবে। আমাদের এখানে থাকাকালীন আমরা তাকে খুব ভালো হিসেবেই পেয়েছি।'
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে দেওয়া ছোট্ট কাজের মেয়েটিকে নিয়ে আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অত্যন্ত আনন্দের সাথে বাসায় ফিরলেন। স্বামীর সাথে ছোট্ট মেয়েটিকে দেখে তাঁর স্ত্রী জিজ্ঞাসা করলেন:
'হে আইউবের আব্বা! এ মেয়ে কার জন্যে নিয়ে এলেন?'
আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্যে উপহারস্বরূপ একে দিয়েছেন।'
তাঁর স্ত্রী বললেন:
'তিনি কতই না শ্রদ্ধাভাজন! তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন ও কৃতজ্ঞ হোন এবং যাকে দান করা হয়েছে, তার প্রতি স্নেহপরবশ থাকুন, সে কতই না উত্তম!'
আব আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহ বললেন:
'এর প্রতি উত্তম ব্যবহার করার জন্যে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন।'
তাঁর স্ত্রী বললেন:
'আমরা তার সাথে এমন কী সদাচরণ করতে পারি, যার দ্বারা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ যথার্থভাবে পালন করা হবে?'
আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহ বললেন:
'আমি তো একে আযাদ করে দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথ খুঁজে পাচ্ছি না। এভাবে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ যথার্থভাবে পালন করা হবে।'
তাঁর স্ত্রী বললেন:
'হ্যাঁ, আপনার এই প্রস্তাবই যুক্তিযুক্ত ও সঠিক বলে মনে হয়। যেহেতু আপনি এতেই সন্তুষ্ট, তাই তাকে মুক্ত করে দিন।'
অতঃপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসীয়তের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ছোট্ট কাজের মেয়েটিকে আযাদ করে দেওয়া হলো।
এতো গেল আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর স্বাভাবিক জীবনের একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। তাঁর যুদ্ধকালীন জীবনের ঘটনাবলি আরও অধিক আকর্ষণীয় ও বৈচিত্র্যময়.....।
আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর সমগ্র জীবনটাই আল্লাহর পথের একজন নিষ্ঠাবান সৈনিক হিসেবে অতিবাহিত করেছেন। তাঁর ব্যাপারে বলা হয় যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুরু করে মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়ব্যাপী সমস্ত যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। শুধু ঐসব যুদ্ধের একটিতে মাত্র অংশ গ্রহণ করতে পারেননি, যেসব যুদ্ধ একই সময়ে দু'স্থানে সংঘটিত হয়েছে। তাঁর জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ ছিল মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ছেলে ইয়াযীদের নেতৃত্বে পরিচালিত কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) বিজয়ের যুদ্ধ। এ সময় আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আশি বছরের বৃদ্ধ। কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের জন্যে সাধারণ সৈনিক হিসেবে ইয়াযীদের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্যে আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার কারণে বয়সের আধিক্য সত্ত্বেও তাঁকে বিরত রাখা সম্ভব হয়নি। বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গমালা বিদীর্ণ করে তিনি কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) বিজয়ে যাবেন- এটাই ছিল তাঁর এই প্রবল আকাঙ্ক্ষার মূল কারণ।
সমুদ্রপথে কিছু দূর অতিক্রম করতে না করতেই তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। দুশমনদের উপর উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে দুর্বার গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার আকাঙ্ক্ষা যেন তাঁর স্থিমিত হয়ে এল। এ অসুস্থতা ক্রমশই বৃদ্ধি পেয়ে যুদ্ধ এবং তাঁর মাঝে প্রবল অন্তরায় সৃষ্টি করল। সেনাপতি ইয়াযীদ তাঁকে সেবা-শুশ্রূষার জন্যে এসে জিজ্ঞাসা করলেন:
'হে আবু আইউব আল আনসারী, আল্লাহ আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হোন! আমাদের উদ্দেশ্যে আপনার শেষ অসীয়ত বলুন।'
উত্তরে তিনি বললেন:
'সমস্ত মুসলমান যোদ্ধাদের প্রতি আমার সালাম পৌছে দিন এবং তাঁদের বলে দিন, আবু আইউব আল আনসারী তোমাদের প্রতি অসীয়ত করেছেন, তোমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করে দুর্বার গতিতে দুশমনদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কনস্টান্টিনোপলের শেষ সীমানা পর্যন্ত বিজয় না করে থামবে না। তাদের এও বলে দিন, আমি যদি ইন্তিকাল করি, তাহলে তারা যেন আমার লাশকে সমুদ্র বক্ষে নিক্ষেপ না করে তাদের সাথে বহন করে নিয়ে যায় এবং কনস্টান্টিনোপলের প্রাচীরের পাদদেশে দাফন করে।'
এই অসীয়ত বর্ণনা শেষ হতে না হতেই এই মহান বিপ্লবী মহাপুরুষের পবিত্র আত্মা দেহত্যাগ করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যায়।
রণতরী বহরের সমস্ত মুসলিম যোদ্ধা আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শেষ অসীয়তকে অত্যন্ত জযবা ও শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করলেন। তাঁর নির্দেশমতো মুসলিম সৈন্যরা সর্বশক্তি নিয়োগ করে দুশমনের ওপর ক্ষিপ্রতার সাথে আঘাতের পর আঘাত হানতে শুরু করলেন। এ প্রচণ্ড আঘাতে দুশমনরা পিছু হটতে লাগল। আর মুসলমান সৈন্যরা আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর লাশকে বহন করে বিজয়ীর বেশে কনস্টান্টিনোপলে গিয়ে পৌঁছলেন। আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শেষ অসীয়ত অনুযায়ী তাঁকে কনস্টান্টিনোপলের (ইস্তাম্বুল) প্রাচীরের পাদদেশে দাফন করা হলো।
ইসলামের বীর মুজাহিদ আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত রহমত বর্ষিত হোক। আশি বছরের বার্ধক্য যাকে আল্লাহর পথে জিহাদে অংশগ্রহণে বিরত রাখতে পারেনি, তিনি বিছানায় শুয়ে মৃত্যুবরণ করার চেয়ে অশ্বপৃষ্ঠে মৃত্যুবরণকে শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। তিনিই এই জিহাদের কাফেলার রণতরীতে মৃত্যুবরণ করে চিরদিনের জন্যে জিহাদী জযবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
টিকাঃ
১. আল্ ইসাবা ফি তামিযিস্ সাহাবা, ৯৮-২৯০ তুবয়া ছায়াদাহ ২য় খণ্ড। ২. আল্ ইসতিয়ার, হায়দারাবাদ সংস্করণ: ১ম খণ্ড, ১৫২ পৃ.। ৩. উসদুল গাবা, ৫ম খণ্ড, ১৪৩-১৪৪ পৃ.। ৪. তাহযীব আত্ তাহযীব, ৩য় খণ্ড, ৯০-৯১ পৃ.। ৫. তাকরীব আত্ তাহযীব, ১ম খণ্ড, ২১৩ পৃ.। ৬. ইবনে খাইয়াত ৮৯, ১৪০, ১৯০ ও ৩০৩ পৃ.। ৭. তাজরীদু আসমাউস্ সাহাবা, ১ম খণ্ড, ১৬১ পৃ.। ৮. খোলাসাতু তাহযীবুত তাহযিব কামাল, ১০০-১০১ পৃ.। ৯. আল্ জারহু ওয়া তা'তাদীল, ১ম খণ্ড, ভূমিকা ও ২য় খণ্ড, ১৩১ পৃ.। ১০. সিফাতুস ছাফওয়া, ১ম খণ্ড, ১৮৬-১৮৭ পৃ.। ১১. আত্ তাবাকাত আল কুবরা, ৩য় খণ্ড, ৪৮৪-৪৮৫ পৃ.। ১২. আল্ ইব্র, ১ম খণ্ড, ৫৬ পৃ.। ১৩. তারীখুল ইসলাম লিয যাহাবী, ২য় খণ্ড, ৩২৭-৩২৮ পৃ.। ১৪. শিজরাতুয যাহাব, ১ম খণ্ড, ৫৭ পৃ.। ১৫. দায়েরাতুল মা'য়ারেফ আল্ ইসলামিয়া, ১ম খণ্ড, ৩০৯-৩১০ পৃ.। ১৬. আল্ জাম'উ বাইনা রিজালিস্ ছাহিহাইন, ১ম খণ্ড, ১১৮-১১৯ পৃ.। ১৭. মিন আবতালিনা আল্লাযিনা ছানায়ু আত তারিখ (লি আবিফতুহ আত তাওরিসী): ১০৫-১১০ পৃঃ। ১৮. ছিলছিলাতু আ'লামুল মুসলিমিন, ৪র্থ নং। ১৯. আল আ'লাম, ২য় খণ্ড, ৩৩৬ পৃ.।
📄 আমর ইবনুল জামুহ (রাঃ)
বৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দৃঢ় সংকল্প করেছিলেন যে শাহাদাতের বিনিময়ে খোঁড়া পা নিয়েই তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন। -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)
বনূ সালামা আল মুসাওয়াদ গোত্রের নেতা আমর ইবনুল জামূহ জাহেলী যুগে মদীনার অন্যতম প্রসিদ্ধ দানবীর এবং অভিজাত ব্যক্তিদের অন্যতম ছিল। সেকালের প্রথানুযায়ী অভিজাত সম্প্রদায়ের নেতারা সকলেই নিজেদের জন্য এক একটি মূর্তি নির্দিষ্ট করে রাখত। তারা কোথাও রওয়ানা হওয়ার প্রাক্কালে এবং প্রত্যাবর্তনের পরে এসব দেবতার সামনে উপস্থিত হয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করত। বিভিন্ন মৌসুমে দেবতাদের উদ্দেশ্যে পশু বলিদান করত ও নিজেদের ভাগ্য নির্ণয়ের জন্যে তাদের শরণাপন্ন হতো। আমর ইবনুল জামূহ তার নিজের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান কাঠ দিয়ে নির্মিত যে মূর্তিটি নির্দিষ্ট করেছিল, তা 'মানাত' নামে প্রসিদ্ধ ছিল। সে অত্যন্ত মূল্যবান সুগন্ধি ও তৈলাক্ত দ্রব্যাদি মেখে মূর্তিটিকে সম্মানের সাথে সংরক্ষণ করত।
ইসলামপূর্ব মদীনার প্রখ্যাত এই নেতা আমর ইবনুল জামূহ ষাটের কোঠায় পদার্পণ করেছে। সে রুচিবোধ ও আভিজাত্যের জন্য ছোট-বড় সবার কাছেই সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র ছিল। সকলেই তাকে সমীহ করে চলত। এক সময়ে ইসলামের প্রথম দাঈ মুস'আব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইসলামের দাওয়াত নিয়ে মদীনায় আগমন করেন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে মদীনার ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন। তাঁর আহ্বানে আকৃষ্ট হয়ে আমর ইবনুল জামূহ'র তিন ছেলে মুয়াওয়ায, মু'য়ায ও খাল্লাদ সঙ্গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন। মুআয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁদের তা'লীম ও তারবিয়্যাতের দায়িত্ব নিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছিলেন। আমর ইবনুল জামূহ'র অগোচরেই ছেলেদের প্রচেষ্টায় তাদের মা 'হিন্দ'ও ইসলামে দীক্ষিত হন।
মদীনার ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারণের ফলে হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি ছাড়া বাকি সবাই ইসলামে দীক্ষিত হওয়ায় আমর ইবনুল জামূহ-এর স্ত্রী 'হিন্দ' তার স্বামীর জন্যে অত্যন্ত চিন্তান্বিত হয়ে পড়লেন। কাফির হিসেবে তাঁর স্বামী যদি ইন্তিকাল করে তাহলে নির্ঘাত জাহান্নাম ছাড়া তার ভাগ্যে আর কিছু জুটবে না। এ চিন্তায় তিনি অত্যন্ত পেরেশান হয়ে পড়েন।
অপরপক্ষে, মুস'আব ইবনে উমাইর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু খুব স্বল্পসময়ের মধ্যে মদীনার আনাচে-কানাচে ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক কিশোর ও যুবককে ইসলামে দীক্ষিত করায় আমর ইবনুল জামূহ তার ছেলেদের ব্যাপারে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। পাড়ার অন্যান্য ছেলেদের মতো তার ছেলেরাও ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলামে দীক্ষিত না হয়, এ আশঙ্কায় সে তার স্ত্রীকে সতর্ক করে দিয়ে বলল:
'হে 'হিন্দ'! তুমি তোমার ছেলেদের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকবে, যেন তারা মক্কা থেকে আগত সেই ব্যক্তির (মুস'আব ইবনে উমাইর) সাথে কোনো প্রকারের উঠা-বসা ও দেখা সাক্ষাৎ না করে। দেখি ঐ লোকটির ব্যাপারে কী ব্যবস্থা অবলম্বন করা যায়।'
স্ত্রী বললেন: 'আপনার উপদেশ শিরোধার্য। আপনি ঠিকই বলেছেন; কিন্তু আপনার ছেলে মুআয সেই লোকটির কাছ থেকে কিছু কথা শুনে এসেছে, তার কাছ থেকে তা একবার শুনে দেখবেন কী?'
স্ত্রীর মুখে একথা শুনে আমর ইবনুল জামূহ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বলল:
'ধিক্কার তোমার প্রতি! আমার অজান্তেই মু'আয কি তার স্বধর্ম ত্যাগ করে ঐ লোকটির অনুসারী হয়েছে?'
দীনদার মহিলা তাঁর স্বামীর প্রতি অনুরাগী হয়ে উত্তর দিলেন:
'না না কক্ষনোই না, ব্যাপারটি এমন হয়েছিল যে, মু'আয কৌতূহলবশে সেই ব্যক্তির কোনো এক বৈঠকে যোগ দিয়েছিল এবং তার কাছে কিছু শুনে তা-ই মুখস্থ করে রেখেছে।'
আমর ইবনুল জামূহ স্ত্রীর কথায় একটু আশ্বস্ত হয়ে বলল: 'তাকে আমার নিকট ডাক।'
অতঃপর মু'আযকে তার সামনে ডাকা হলে সে ছেলেকে বলল: 'ঐ লোকের কিছু কথা নাকি তুমি মুখস্থ করেছ? তা আমাকে শোনাও তো দেখি।'
মু'আয অত্যন্ত আদবের সাথে তাঁর পিতার সামনে পাঠ করে শোনালেন : بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ - الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ - الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ - مُلِكِ يَوْمِ الدِّينِ - إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ - اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ - صِرَاطَ الَّذِينَ انْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ .
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
'সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলারই জন্য, যিনি নিখিল জাহানের রব। যিনি দয়াময় মেহেরবান, বিচার দিনের মালিক। (হে আল্লাহ!) আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি। আমাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করো। সেসব লোকের পথ, যাদেরকে তুমি পুরস্কৃত করেছো, যারা অভিশপ্ত নয়, যারা পথ ভ্রষ্টও নয়।'
মু'য়ায-এর সুললিত কণ্ঠে কুরআনুল কারীমের সূরা ফাতিহার তিলাওয়াত শুনে আমর ইবনুল জামূহ বলে উঠল: مَا أَحْسَنَ هُذَا الْكَلَامَ وَمَا أَجْمَلَهُ أَوَ كُلُّ كَلَامَهُ مِثْلُ هُذَا؟
'বাহ! কত সুন্দরই না এ কথাগুলো, কী চমৎকার এর বাচনভঙ্গি ও উপস্থাপন, তার সমস্ত কথাগুলোই কি এমন চমৎকার?'
পিতার এ মন্তব্য শুনে মু'য়ায তার দুর্বলতার সুযোগে বলে ফেলল:
'আব্বা! আপনি কি তাঁর হাতে 'বায়'আত' গ্রহণ করবেন? কেননা, আপনার সম্প্রদায়ের সকলেই তো তার হাতে 'বায়'আত' গ্রহণ করেছেন।'
ছেলের একথা শুনে পিতা একটু নীরব থেকে বলে উঠল:
'না এতো শীঘ্রই নয়; যতক্ষণ পর্যন্ত মানাতের সাথে পরামর্শ না করেছি। একটু অপেক্ষা করো, দেখি 'মানাত' কী সিদ্ধান্ত দেয়।'
পিতার এ কথা শুনে মু'য়ায বলে উঠল:
'হে পিতা! এ ব্যাপারে 'মানাত' আপনাকে কী সিদ্ধান্ত দেবে? সে তো একটি কাঠের মূর্তি মাত্র। তার তো কোনো বিবেক নেই। সে তো বোবা ও বধির।'
ছেলের যুক্তির সামনে কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে আমর ইবনুল জামূহ তাকে ধমক দিয়ে বলল:
'আমি তো বলেছি, তার পরামর্শ ছাড়া আমার পক্ষে স্বধর্ম ত্যাগ করা সম্ভব নয়।'
জাহিলিয়াতের প্রথানুযায়ী যখন কোনো মূর্তি বা দেবতার কাছ থেকে পরামর্শ চাওয়া হতো, কোনো আবেদন-নিবেদন পেশ করা হতো, তখন সেই মূর্তির পেছনে একজন বৃদ্ধা মহিলাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হতো এই ধারণায় যে:
'দেবতা তার অনুরাগীর আবেদন-নিবেদনের উত্তর বা কোনো পরামর্শ সেই বৃদ্ধা মহিলার অন্তরে সৃষ্টি করে দেবে। আর সেই মহিলা তার ভাষায় দেবতার ভাবকে ফুটিয়ে তুলবে।'
আমর ইবনুল জামূহ একইভাবে মূর্তি 'মানাতের' সাথে পরামর্শ করার লক্ষ্যে তার পেছনে এক বৃদ্ধা মহিলাকে দাঁড় করিয়ে নিজের একটি খোঁড়া পা'কে লম্বা করে দিয়ে অত্যন্ত কষ্ট করে এক পায়ে বিনয়ের সাথে 'মানাতের' ভূয়সী প্রশংসা শুরু করল। অতঃপর মানাতকে উদ্দেশ্য করে বলল:
'হে মানাত! নিঃসন্দেহে তুমি জানো, ইসলামের এই আহ্বানকারী যিনি মক্কা হতে এখানে এসেছে, তুমি ছাড়া তার মোকাবেলা করার আর কেউ নেই.....। সে এজন্যেই এখানে এসেছে, যেন তোমার ইবাদত হতে আমায় বিরত রাখা যায়.....। আমি তার প্রচারিত খুব সুন্দর ও উত্তম কথা শোনার পরও তোমার সাথে পরামর্শ ব্যতীত তার কাছে 'বাইআত' করাকে কোনোক্রমেই পছন্দ করছি না। তাই তুমি আমাকে এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত দাও'।
এতো কিছু বলে অনেক কাকুতি-মিনতি করার পরও 'মানাতের' পেছনে দণ্ডায়মান বৃদ্ধা কোনো জওয়াব দিচ্ছিল না। কেননা, সে মদীনার আবহাওয়াকে খুব ভালোভাবেই আঁচ করতে পেরেছিল। অতীতে বহু ভণ্ডামি করলেও এ ক্ষেত্রে সে তার পুনরাবৃত্তি করতে সাহস পাচ্ছিল না।
আমর ইবনুল জামূহ মনে করল যে, 'মানাত' বোধ হয় তার ওপরে রাগ করেছে। তাই সে 'মানাত'কে সম্বোধন করে বলল:
'মানাত, তুমি আমার প্রতি রাগ করেছ? তুমি মনে কষ্ট পাবে এমন কোনো পদক্ষেপ আমি নেবো না; কিন্তু আমার আপত্তির কিছু নেই। তোমাকে কয়েকদিনের সময় দিচ্ছি, তুমি একটু শান্ত হলে পুনরায় তোমার খিদমতে উপস্থিত হব। আশা করি, তখন তুমি আমাকে সঠিক পরামর্শ দানে ধন্য করবে।'
আমর ইবনুল জামূহ'র ছেলেরা একথা ভালো করেই জানত যে, পিতার অন্তরে মূর্তি 'মানাতের' প্রতি কত শ্রদ্ধা ও ভক্তি রয়েছে। দীর্ঘ জীবনে সে 'মানাতকে' অন্তরের গভীর থেকে ভক্তি করে আসছিল। কিন্তু ছেলেরা এ কথাও বুঝতে পারছিল যে, তাদের পিতার অন্তর দোদুল্যমান হয়ে উঠেছে। 'মানাতের' প্রতি অন্ধভক্তি ও শ্রদ্ধার স্থলে সন্দেহ ও সংশয় মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে- এটাই ঈমানের পথে অগ্রসর হওয়ার প্রথম লক্ষণ।
আমর ইবনুল জামূহ-এর ছেলেরা তাদের বন্ধু মু'য়ায বিন জাবালের সাথে শলাপরামর্শ শুরু করল, কিভাবে পিতার অন্তর থেকে মূর্তি 'মানাতের' প্রতি অন্ধবিশ্বাস সমূলে উৎপাটন করে তাকে ইসলামের ছায়াতলে টেনে আনা যায়। তারা সবাই মিলে রাতের আঁধারে মূর্তি 'মানাত'কে তার মন্দির থেকে উঠিয়ে নিয়ে সালামা গোত্রের আবর্জনার গর্তে নিক্ষেপ করে চুপিসারে ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। সকালবেলা আমর ইবনুল জামূহ নিত্যদিনের মতো শ্রদ্ধা নিবেদন করতে 'মানাতের' মন্দিরে প্রবেশ করল। তখন সে 'মানাতকে' না পেয়ে রাগে, ক্ষোভে অস্থির হয়ে সবাইকে ধিক্কার দিতে শুরু করল। তার ভাষায়:
'তোমাদের প্রতি ধ্বংস নেমে আসুক, কে আমাদের দেবতাকে রাতে অপহরণ করেছ?'
কিন্তু কেউই এর দায়দায়িত্ব স্বীকার করল না। নিজের ছেলেরাই এ কাজ করেছে কি না ভেবে ঘরের আনাচে-কানাচে সে খোঁজাখুঁজি শুরু করল। কোথাও না পেয়ে সে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হলো এবং এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে লাগল। সবাইকে ধমক দিয়ে শাসিয়ে এদিক-সেদিক খোঁজাখুঁজি শুরু করল। পরিশেষে, সে সালামা গোত্রের ময়লা ও আবর্জনার গর্তে উল্টো মাথায় পড়ে থাকা অবস্থায় 'মানাত'কে দেখতে পেল। সে তাকে সেখান থেকে তুলে এনে যত্নের সাথে গোসল করিয়ে ধুয়ে-মুছে নানা ধরনের আতর ও সুগন্ধি মাখিয়ে যথাস্থানে রেখে দিয়ে বলল:
'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি যদি জানতে পারি যে, কে তোমার সাথে এ দুর্ব্যবহার করেছে, তাহলে নিশ্চয়ই আমি তাকে সমুচিত শিক্ষা দেব।'
পরদিন রাতে ছেলেরা তাদের বন্ধু মু'য়ায বিন জাবালসহ পূর্বের রাতের মতো 'মানাতকে' তুলে নিয়ে তার সারা গায়ে মলমূত্র মাখিয়ে সেখানেই ফেলে আসল। পরের দিন সকালে মু'য়াযের পিতা 'মানাতের' প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে পূর্বের ন্যায় তাকে দেখতে না পেয়ে অত্যন্ত চিন্তান্বিত হয়ে রাগে ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিল। এবার তাকে আরও বিশ্রী অবস্থায় পেয়ে অত্যন্ত দুঃখের সাথে তুলে এনে উত্তমরূপে গোসল করিয়ে আতর-সুগন্ধি মাখিয়ে ভক্তিভরে যথাস্থানে রেখে দিল।
পর দিন রাতেও ছেলেরা পূর্বের ন্যায় 'মানাত'কে সরিয়ে এনে একই অবস্থায় ময়লা আবর্জনার কূপে নিক্ষেপ করে আসে। সকালে আমর ইবনুল জামূহ অতিষ্ঠ হয়ে মানাতের গলায় একটি উন্মুক্ত তরবারি লটকিয়ে দিয়ে বলে দিল:
'হে মানাত। খোদার কসম! কে যে তোমার সাথে বার বার এরূপ দুর্ব্যবহার করছে তা তুমি নিশ্চয়ই জানো, তোমার মধ্যে প্রকৃত অর্থেই যদি কোনো সামর্থ্য ও শক্তি থাকে তাহলে এ তরবারি দিয়ে সেই দুষ্টকে প্রতিহত করবে। এই তলোয়ার তোমার সাথেই রইল।'
এই বলে সে ঘরে চলে আসে।
এদিকে ছেলেরা পিতার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখছিল, কখন তিনি গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হন। পিতা ঘুমিয়ে পড়লে তারা অত্যন্ত সংগোপনে ঝুলন্ত তলোয়ারটি নিজেরা নিয়ে মূর্তি 'মানাতকে' প্রতিবারের ন্যায় তুলে নিয়ে দূরে চলে যায়। বাড়ির পাশেই পাওয়া এক মৃত কুকুরকে রশি দিয়ে বেঁধে নিয়ে মানাতের গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে মলমূত্র ও আবর্জনার গভীর গর্তের মাঝে নিক্ষেপ করে চলে আসে।
প্রতিদিনের ন্যায় ঘুম থেকে ওঠে তাদের পিতা আমর ইবনুল জামূহ বুকভরা আশা নিয়ে 'মানাতের' খিদমতে হাজিরা দিতে যাচ্ছিল এ আশায় যে, আজ একটু প্রাণভরে তাকে ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদন করবে; কিন্তু প্রতিদিনের ন্যায় আজও 'মানাতকে' স্বস্থানে না পেয়ে দ্রুত আবর্জনার সেই কূপের দিকে ছুটে গিয়ে দেখতে পেল, গলায় মৃত কুকুর বাঁধা অবস্থায় 'মানাত' উল্টোমুখো হয়ে পড়ে আছে এবং সাথে তলোয়ারটিও কে বা কারা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। 'মানাতের' এই দুরবস্থা দেখে এবার সে আর তাকে উঠাতে অগ্রসর হলো না। তার মনে বিরাট পরিবর্তন এসে গেল। সারা জীবনের সমস্ত ভুল-ভ্রান্তি সে বুঝতে পারল। বৃথা ভক্তি-শ্রদ্ধার অসারতা উপলব্ধি করতে পেরে বলে উঠল:
وَاللَّهِ لَوْ كُنْتِ إِلَهَا لَمْ تَكُنْ أَنْتَ وَكَلْبُ وَسْطَ بِشْرٍ فِي قَرَنٍ -
'আল্লাহর শপথ! তুমি যদি সত্যিই ইলাহ বা (দেবতা) হতে তাহলে তুমি এই মৃত কুকুরের সাথে একত্রে উল্টোমুখো হয়ে আবর্জনার গর্তে পড়ে থাকতে না।'
এই বলেই তিনি কালেমা শাহাদাতের উচ্চারণের মাধ্যমে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন।
ইসলাম গ্রহণের পর আমর ইবনুল জামূহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অতীত মুশরিকী জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের কথা চিন্তা করে লজ্জিত হতেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণ শুধুমাত্র মৌখিক স্বীকৃতিই ছিল না; বরং অন্তরের অন্তঃস্তল থেকেই তিনি তা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাঁর জান-মাল, সন্তান-সন্ততি সবকিছুই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দাসত্ব ও আনুগত্যের জন্যে কুরবান করেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের মাত্র কিছুদিন পরই ওহুদের রণ-দামামা বেজে ওঠে। তাঁরই ছেলেরা যুদ্ধে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে শহীদী মৃত্যু বরণ করে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবে- ছেলেদের এই জোশ ও জযবা দেখে তাঁর ভেতরে এক নবচেতনার সৃষ্টি হয়। তিনিও বার্ধক্যকে উপেক্ষা করে আল্লাহর রাসূলের নেতৃত্বে তাঁর জিহাদী ঝাণ্ডার নিচে শামিল হওয়ার জন্যে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন। কিন্তু তার ছেলেরা এই বৃদ্ধ বয়সে পিতাকে জিহাদে অংশ নিতে বারণ করলেন। কেননা, তাঁর যুদ্ধে অংশ গ্রহণের বয়স শেষ হয়ে গেছে, অধিকন্তু তাঁর একটি পা একেবারেই অচল। যেহেতু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে জিহাদে অংশগ্রহণ করা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন, সেহেতু ছেলেরা তাঁকে পরামর্শ দিল:
'হে আব্বা! যেহেতু আল্লাহ আপনাকে জিহাদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন, তাই আপনা থেকেই তা নিজের ওপর টেনে নেবেন না।'
ছেলেদের এই পরামর্শে বৃদ্ধ পিতা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়ে রাগে-ক্ষোভে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে ছেলেদের বিরুদ্ধে এই বলে অভিযোগ দায়ের করলেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ছেলেরা এই সর্বোত্তম ইবাদত 'জিহাদ' থেকে আমাকে বিরত রাখার জন্যে পরামর্শ দিচ্ছে এবং তারা যুক্তি প্রদর্শন করছে, যেহেতু আমি বৃদ্ধ, খোঁড়া, তাই আমার জন্যে জিহাদ জরুরি নয়।'
আমি খোদার কসম করে বলছি:
'আমি এই খোঁড়া পা দিয়েই জান্নাতে প্রবেশ করব।'
আমর ইবনুল জামূহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এই ঈমানী জযবা ও শাহাদাতের তামান্না দেখে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ছেলেদের ডেকে বললেন:
دَعُوهُ، لَعَلَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَرْزُقُهُ الشَّهَادَةَ.
'তোমাদের পিতাকে জিহাদে যেতে দাও। এমনও হতে পারে এ জিহাদের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁকে শাহাদাতের সম্মানে সম্মানিত করবেন।'
আল্লাহর রাসূলের আদেশের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে ছেলেরা তাঁকে জিহাদে অংশগ্রহণের জন্যে আর বাধা না দিয়ে মোবারকবাদ জানালেন।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হতে জিহাদে অংশ নেওয়ার অনুমতি পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত ও খুশি হয়ে আমর ইবনুল জামূহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বাড়িতে ফিরে এলেন। জিহাদের প্রস্তুতি নিয়ে বাড়ি থেকে রওয়ানা হওয়ার প্রাক্কালে তিনি স্ত্রীকে ডেকে তাঁর নিকট থেকে চিরদিনের জন্যে বিদায় নিলেন.......। অতঃপর কিবলামুখী হয়ে আকাশপানে দু'হাত তুলে দু'আ করলেন :
"اَللّٰهُمَّ ارْزُقْنِي الشَّهَادَةَ وَلَا تَرُدَّنِي إِلَى أَهْلِي خَائِبًا". 'হে আল্লাহ! আমাকে শহীদী মৃত্যু দান করো। বিফল মনোরথ হয়ে আমাকে আমার পরিবার-পরিজনের মাঝে আর ফিরিয়ে এনো না।'
এরপর তিনি তাঁর তিন পুত্রসহ জিহাদে রওয়ানা হলেন। এ যুদ্ধে তিনিই ছিলেন বনূ সালামা গোত্রের সবচেয়ে বৃদ্ধ যোদ্ধা।
ওহুদের যুদ্ধে মুশরিক কুরাইশ বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের এক পর্যায়ে যখন মুসলমান যোদ্ধাদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিল এবং লোকেরা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যুদ্ধের ময়দানে ফেলে রেখে প্রাণভয়ে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করছিল, ঠিক সেই চরম মুহূর্তে আমর ইবনুল জামূহ ও তাঁর ছেলেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিরাপদ রাখার জন্যে কুরাইশ বাহিনীর উপর প্রাণপণে আক্রমণ চালাচ্ছিলেন এবং তিনি চিৎকার করে করে বলছিলেন:
إِنِّي لَمُشْتَاقٌ إِلَى الْجَنَّةِ ، إِنِّي لَمُشْتَاقٌ إِلَى الْجَنَّةِ ... 'আমি অবশ্যই জান্নাত প্রত্যাশী, আমি অবশ্যই জান্নাত প্রত্যাশী, আমি অবশ্যই জান্নাতের প্রত্যাশী।'
ছেলে খাল্লাদ পিতার সাথে ছায়ার মতো লেগে থেকে তরবারি চালিয়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর আসা আঘাতকে প্রতিহত করছিলেন। আল্লাহর্ অশেষ মহিমা পিতা-পুত্র উভয়েই কুরাইশদের প্রচণ্ড হামলায় মুহূর্তের ব্যবধানে শাহাদাতের তামান্না পূরণ করেন।
ওহুদ যুদ্ধ শেষে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ যুদ্ধে শাহাদাত বরণকারীদের দাফন কার্য সম্পাদন করতে গিয়ে সাহাবীদের উদ্দেশ্য করে বললেন:
خَلَّوْاهُمْ بِدِمَانِهِمْ وَجِرَاحِهِمْ ، فَأَنَا الشَّهِيدُ عَلَيْهِمْ ، ثُمَّ قَالَ : ما مِنْ مُسْلِمٍ يُكْلَمُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ إِلَّا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَسِيلُ دَمًا ، اللَّوْنُ كَلَوْنِ الزَّعْفَرَانِ ، وَالرِّيحُ كَرِيحِ الْمِسْكِ، ثُمَّ قَالَ : ادْفَنُوا عَمْرَو بْنَ الْجَمُوحِ مَعَ عَبْدُ اللَّهِ بن عَمْرٍو ، فَقَدْ كَانَ مُتَحَابِينَ مُتَصَافِينَ فِي الدُّنْيَا .
'হে সাহাবীগণ! এই শহীদদের ক্ষতবিক্ষত দেহ রক্তমাখা অবস্থায় দাফন করো। কেননা আমি তাদের এই শাহাদাতের সাক্ষ্য দেব।
অতঃপর তিনি বলেন:
'এমন কোনো মুসলমান নেই, যে আল্লাহর পথে আহত হয়েছে অথচ সে কিয়ামতের দিন তার ক্ষত স্থান থেকে রক্ত প্রবাহিত অবস্থায় উঠবে না। যে রক্তের বর্ণ হবে জাফরানের মতো এবং যার সুগন্ধি হবে মিশ্ক আম্বরের ন্যায়।'
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমর ইবনুল জামূহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আবদুল্লাহ বিন আমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে একত্রে দাফন করার নির্দেশ দিলেন। কেননা, জীবিত অবস্থায় তারা পরস্পর অত্যন্ত পবিত্র ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন।
আমর ইবনুল জামূহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং ওহুদের শহীদদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন, আল্লাহ তাঁদের কবরসমূহকে নূরের আলোয় উদ্ভাসিত করুন। আমীন!
টিকাঃ
১. আল ইসাবা জীবনী নং ৫৭৯৯। ২. ছাফওয়াতুছ ছাফওয়া, ১ম খণ্ড, ২৬৫ পৃষ্ঠা।
📄 আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ আল আসাদী (রাঃ)
'আমি তোমাদের মধ্য থেকে এমন এক ব্যক্তিকে দলের পরিচালক (সর্ব প্রথম আমীরুল মুমিনীন) মনোনীত করব, যে তোমাদের মধ্যে ক্ষুৎপিপাসায় সবচেয়ে বেশি ধৈর্য অবলম্বনে সক্ষম।' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)
আমরা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন ঘনিষ্ঠ সাহাবী ও প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবীদের অন্যতম আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ আল আসাদী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সম্পর্কে আলোচনা করছি। আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মাতা উমাইমা বিনতে আবদুল মুত্তালিব রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ফুফু। পরবর্তীতে তাঁর বোন উম্মুল মুমিনীন যায়নাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ে করায় পুনরায় তাদের মধ্যে নতুনভাবে আত্মীয়তার বন্ধন সৃষ্টি হয়। আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ আল আসাদী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই সম্মানিত সর্বপ্রথম সাহাবী, যাকে 'আমীরুল মুমিনীন' উপাধি দিয়ে ইসলামের সামরিক ঝাণ্ডা সোপর্দ করা হয়েছিল।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতের সূচনাকালে এবং 'দারুল আরকামে' প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচি শুরু করার পূর্বে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কায় কুরাইশদের অত্যাচারে যখন মুসলমানদের জানমাল একান্তই হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে তখন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের মদিনায় হিজরত করার অনুমতি দেন। তিনিই হলেন দ্বিতীয় মুহাজির সাহাবী, যার পূর্বে আবূ সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা ছাড়া অন্য কেউ মদীনায় হিজরত করার সৌভাগ্য লাভ করতে পারেননি।
ঘর-বাড়ি, পরিবার-পরিজন ও জন্মভূমি ত্যাগ করে আল্লাহর দীনের হেফাযতের জন্য হিজরত করার অভিজ্ঞতা এটাই তার প্রথম নয়। এর পূর্বেও তিনি পরিবারের কয়েকজনকে নিয়ে হাবশায় হিজরত করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। তবে তাঁর এবারকার হিজরত পূর্বের তুলনায় পরিপূর্ণ ও সামগ্রিক। মদীনা হিজরতে তাঁর ছেলে-মেয়ে, ভাইবোন, স্ত্রী পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজন সহ সকলেই অংশগ্রহণ করেছেন। কেননা তাঁর সমগ্র পরিবারটিই ছিল ইসলামী পরিবার এবং সমগ্র গোত্রটিই ছিল ঈমানদারদের গোত্র। এবারের হিজরতের পর তাঁর বাড়িটি বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। মরুভূমির দমকা হাওয়া তাঁর ঘরের একদিকের জানালা দিয়ে প্রবেশ করে অন্যদিকের জানালা দিয়ে শোঁ শোঁ করে বেরিয়ে যেত। মনে হতো, এই বিরাণ বাড়িটিতে কোনোদিন কেউ বাস করেনি। আর এখানে চা ও কফির আসরে সন্ধ্যায় কেউ একত্রিত হয়ে খোশ-গল্পেও রত থাকেনি।
আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হিজরতের মাত্র কয়েকদিন পর আবূ জাহল ও উতবা বিন রাবিয়ার নেতৃত্বে কুরাইশদের একটি দল মহল্লায় ঘুরে ঘুরে অনুসন্ধান চালাচ্ছিল যে, মুসলমানদের মধ্য থেকে কে কে মদীনায় হিজরত করে চলে গেছে, আর কে কে এখনো এখানে অবস্থান করছে। তারা আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাড়িতে পৌঁছে দেখতে পায় যে, জন-মানবহীন এই বিরাণ ঘরবাড়িগুলোর দরজা-জানালা দিয়ে দমকা বাতাসের সাথে ধুলাবালি প্রবেশ করে আসবাব পত্রের উপর একটি মোটা আবরণের সৃষ্টি করেছে। আর দমকা বাতাসের ঝাপটায় দরজা জানালাগুলো সজোরে আওয়াজ করছে। মনে হচ্ছিল বনূ জাহাশের পরিত্যক্ত ঘরবাড়িগুলো তাদের মালিকদের জন্যে ক্রন্দন করছে। বিরাণ বাড়িঘরগুলোর এই করুণ দশা প্রত্যক্ষ করে আবূ জাহল বলে উঠল:
'তারা কোথায়? যাদের জন্যে আজ বাড়িঘরগুলো ক্রন্দন করছে?'
আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর অত্যন্ত সুন্দর ও মূল্যবান আসবাবপত্র ও মনোরম বাড়িঘরের লোভ আবূ জাহলের পক্ষে সংবরণ করা সম্ভব হলো না। রাজা-বাদশাহগণ যেভাবে তাদের রাজ্যের ধন-সম্পত্তি যেমন খুশি তেমন ব্যবহার করে, অনুরূপ আবূ জাহলও আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের বাড়িঘরগুলো দখল করে যথেচ্ছা ব্যবহার শুরু করল।
মদীনায় আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিকট তাঁর ঘরবাড়ি আবূ জাহেল কর্তৃক দখলের খবর পৌঁছলে তিনি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এ খবর জানালেন। এ কথা শুনে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: أَلَا تَرْضَى يَا عَبْدَ اللَّهِ، أَنْ يُعْطِيَكَ اللَّهُ بِهَا دَارًا فِي الْجَنَّةِ .
'হে আবদুল্লাহ! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, আল্লাহ এর বিনিময়ে জান্নাতে তোমাকে সুন্দর সুন্দর অট্টালিকা দান করুন?'
প্রতি উত্তরে তিনি বললেন:
'নিশ্চয়ই হে আল্লাহর রাসূল!'
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় বললেন:
'তোমার জন্যে তাহলে জান্নাতের ঘরবাড়িই উত্তম।'
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে জান্নাতের সুসংবাদ শুনে তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন। আনন্দে তাঁর দু'চোখ জুড়িয়ে গেল।
প্রথম ও দ্বিতীয় দফা হিজরতের কারণে তাঁর ধন-সম্পত্তি ও সুখ-শান্তির অবসান হলো। মদীনায় তিনি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য জীবন যাপন করছিলেন। জীবনের এক বিরাট অংশে কুরাইশদের নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হওয়ার পর মদীনায় একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে না নিতেই তাঁকে অত্যন্ত কঠিন এক পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হলো। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত তাঁকে আর এতো কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়নি। তাঁর এ ঈমানী পরীক্ষা ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে আছে।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী মদীনা মোনাওয়ারায় সামরিক তৎপরতা জোরদার করার সিন্ধান্ত নিলেন। এ লক্ষ্যে তিনি আট সদস্যবিশিষ্ট একটি সশস্ত্র প্লাটুন গঠন করলেন, যাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ও সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু'র মতো সাহসী ও বুদ্ধিমান সাহাবীগণ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্য করে বললেন:
'আমি তোমাদের মধ্য থেকে এমন এক ব্যক্তিকে বাহিনীর পরিচালক মনোনীত করব, যে তোমাদের মধ্যে ক্ষুৎপিপাসায় সবচেয়ে বেশি ধৈর্য অবলম্বনে সক্ষম।'
এই বলে তিনি এই সেনা দলের ঝাণ্ডা আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে সোপর্দ করলেন। তখন থেকেই আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু প্রথম আমীর হলেন, যাঁকে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত করা হয়েছিল।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে তাঁর প্রয়োজনীয় করণীয় সম্পর্কে নির্দেশ দানের পর একটি চিঠি হাতে দিয়ে বললেন:
'এই চিঠিটি দু'দিনের পথ অতিক্রম না করে খুলবে না।'
অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নেতৃত্বে ইসলামের এই প্রথম গোয়েন্দা প্লাটুন মদীনা থেকে বিদায় নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশমতো দু'দিনের পথ অতিক্রম করার পর আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু চিঠিটি খুললেন। এতে হেদায়াত ছিল:
إِذَا نَظَرْتَ فِي كِتَابِى هُذَا فَامْضِ حَتَّى تَنْزِلَ نَخْلَةَ بَيْنَ الطَّائِفِ وَمَكَّةَ، فَتَرَصَدْ بِهَا قُرَيْشًا وَقِفْ لَنَا عَلَى أَخْبَارِهِمْ ....
'আমার এই চিঠি পাঠ করার পর পুনরায় পথ চলতে থাক, যতক্ষণ পর্যন্ত না তায়েফ এবং মক্কার মাঝখানে একটি খেজুর বাগান না পাবে। এ বাগানের নিকট দিয়ে কুরাইশরা যাতায়াত করে। তোমরা সেখানে অতি সঙ্গোপনে অবস্থান নিয়ে তাদের গতিবিধি ও খবরাখবর আমাকে অবহিত করবে।'
আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ চিঠিটি পাঠ করার সাথে সাথে বলে উঠলেন : 'আল্লাহর নবীর নির্দেশের প্রতি আনুগত্যের মস্তক অবনত করলাম।'
অতঃপর তিনি তাঁর বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
'রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন সম্মুখপথের নির্দিষ্ট একটি খেজুর বাগান পর্যন্ত গিয়ে সেখানে অবস্থান নিয়ে কুরাইশদের গতিবিধির খবরাখবর ও তথ্যাদি সংগ্রহ করে তাঁকে পাঠাই। কিন্তু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সে পর্যন্ত নিয়ে যেতে নিষেধ করেছেন। এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে শাহাদাতের মৃত্যুকে অবধারিত জেনে তোমাদের মধ্যে যারা আমার সাথে যেতে ইচ্ছুক, শুধু তাদেরকেই সাথে নেব। আর যারা অসম্মতি জানাবে তারা নিঃসংকোচে ফিরে যেতে পারবে।'
এ কথা শুনে সাহাবীদের সকলেই সমস্বরে বলে উঠলেন:
'আমরা সকলেই রাসূলের নির্দেশ পালনের জন্যে আনুগত্যের মস্তক অবনত করলাম। আল্লাহর রাসূল আপনাকে যে পর্যন্ত যেতে বলেছেন, আমরা সে পর্যন্ত আপনার সাথে যেতে অবশ্যই প্রস্তুত আছি।'
খেজুর বাগানের সন্নিকটে পাহাড়ের গা ঘেঁষে আঁকা-বাঁকা ও উঁচু-নিচু দুর্গম যে পথটি চলে গেছে, কুরাইশদের বহির্বিশ্বে যোগাযোগের একমাত্র পথ সেটিই। এই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গিয়ে তারা অত্যন্ত সংগোপনে কুরাইশদের গতিবিধি ও খবরাখবর জানার জন্যে ওৎ পেতে রইলেন। দায়িত্ব পালনরত অবস্থার কোনো এক পর্যায়ে তারা দেখতে পেলেন:
আমর বিন হাদরামী, হাকাম বিন ফায়সাল, ওসমান বিন আবদুল্লাহ ও তার ভাই মুগাইরার সমন্বয়ে কুরাইশদের এক ব্যবসায়ী কাফেলা প্রচুর পরিমাণ কিসমিস, চামড়ার সামগ্রী ও অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্যাদি নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ অবস্থায় কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়, সে ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথীরা সলা-পরামর্শ শুরু করলেন। নির্দিষ্ট দিবসটি ছিল 'আশহুরিল হুরুম' বা হত্যা ও যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ মাসসমূহের শেষ দিন। তারা পরামর্শ করছিলেন:
'আজ যদি আমরা তাদের ওপর হামলা করি তাহলে তো নিষিদ্ধ মাসেই তাদের ওপর আক্রমণ করা হবে। আর তা হবে হারাম মাসেরই অবমাননা। যার ফলে সমগ্র আরবে এর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। আর যদি আমরা আজকের দিনের সুযোগ ছেড়ে দেই তাহলে তো আগানীকালই তারা হারাম শরীফের সীমানার ভিতরে প্রবেশ করবে। আর সেখানে আমাদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযান পরিচালনার প্রশ্নই উঠে না। সেখানে তো সকলেরই জীবন ও সম্পদ নিরাপদ। মুশরিকরা তা মেনে না চললেও মুসলমানদের পক্ষে তো হারামের অবমাননা করা সম্ভব নয়।'
এসব বিষয়ের ভালোমন্দ উভয় দিক চিন্তা-ভাবনা করার পর শেষ পর্যন্ত তারা ঐদিনই তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে এ চারজনকে হত্যা করে কাফেলার সব কিছুকেই গনীমত হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্তে একমত হলেন। এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া মাত্রই কালবিলম্ব না করে তারা কুরাইশদের এই বাণিজ্য কাফেলার বিরুদ্ধে অভিযান চালালেন। এ অভিযানে কুরাইশদের একজন নিহত, দু'জন বন্দী ও চতুর্থ ব্যক্তি কোনো মতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলো।
আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং তাঁর বাহিনীর অন্যান্য সাহাবীরা এই দুই কয়েদি এবং তাদের উট বহরের সমস্ত মাল সামান নিয়ে দ্রুত গতিতে মদীনার দিকে ধাবিত হলেন। মদীনায় পৌঁছে তাঁরা দু'বন্দীসহ এসব মালামাল রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে হাজির করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ অমান্য করে নিষিদ্ধ মাসসমূহে রক্তপাত করে কয়েদি ও তেজারতি দ্রব্যাদি নিয়ে আসায় তিনি এসব গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন:
وَاللَّهِ مَا أَمَرْتُكُمْ بِقِتَالٍ، وَإِنَّمَا أَمَرْتُكُمْ أَنْ تَقِفُوا عَلَى أَخْبَارٍ قرَيْشٍ، وَأَنْ تَرَصُدُوا حَرَكَتَهَا .
'আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদের রক্তপাত করতে নির্দেশ দেইনি; শুধু নির্দেশ দিয়েছিলাম, কুরাইশদের গতিবিধি ও খবরাখবর সংগ্রহের লক্ষ্যে ওৎ পেতে থেকে সংগৃহীত তথ্যাদি আমাকে জানানোর জন্যে।'
কয়েদি দু'জনের ব্যাপারেও তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো ফায়সালা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আর বাণিজ্যসম্ভার ও উটবহর থেকে একটি কপর্দক গ্রহণ করতেও তিনি অস্বীকৃতি জানালেন।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ঘটনার নিন্দা, মালপত্র গ্রহণে অস্বীকৃতি ও তাদের কৃতকর্মের প্রতি ভর্ৎসনা করায় আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথীরা যেন আসমান থেকে পড়লেন। রাসূলে কারীমের ইচ্ছা ও নির্দেশবিরোধী কাজ করে তারা নিশ্চিতভাবেই নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছেন ভেবে অত্যন্ত অনুতপ্ত হচ্ছিলেন। এ ঘটনার ফলে মদীনার গোটা পরিবেশ যেন তাদের জন্যে সংকীর্ণ হয়ে আসছিল। তাদেরই একান্ত প্রিয় আনসার ও মুহাজির সঙ্গী সাথীরা তাদেরকে অত্যন্ত ভর্ৎসনা করতে শুরু করলেন। এমনকি তাদের সাথে কথাবার্তা পর্যন্ত বন্ধ করে দিলেন। যখন তাদের পাশ দিয়ে সাহাবীগণ যাতায়াত করতেন, তখন তাদের দিকে কটাক্ষ করে বলতেন:
'দেখো, এই চরমপন্থিরা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের বিপরীত কাজ করেছে.........।'
এখানেই শেষ নয়, জীবনটা তাদের জন্যে অত্যন্ত দুর্বিসহ হয়ে উঠল, এখন তারা এ কথাও জানতে পারলেন যে, মক্কার কুরাইশরা এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র আরব গোত্রসমূহে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড়ের সৃষ্টি করেছে। তারা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে বলে বেড়াচ্ছে:
'মুহাম্মদ হারাম মাসকে তার জন্যে হালাল করে ফেলেছে, এ মাসে সে রক্তপাতকে বৈধ করে নিয়েছে। ধন-সম্পত্তি লুট ও লোকদের বন্দী করা শুরু করে দিয়েছে।'
আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথীদের উপরে সমস্ত মুসলামানদের পক্ষ থেকে যে ধিক্কার ও ঘৃণা বর্ষণ হচ্ছিলো তা ছিল অবর্ণনীয়। একদিকে তাঁদের অনিচ্ছাকৃত ভুলের অন্তর্জালায় তাঁরা দগ্ধ হচ্ছিলেন। অপরদিকে তাঁদেরই ভুলের খেসারত হিসেবে তাঁদের প্রাণপ্রিয় নেতা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজ সারা বিশ্বে বিতর্কিত। এসব ভেবে দুশ্চিন্তা ও অনুশোচনায় আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং তার সঙ্গী-সাথীর একবারে ম্রিয়মান হয়ে গেলেন। এ অবস্থায় তারা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে যেতে খুবই লজ্জাবোধ করছিলেন।
ক্রমান্বয়ে অবর্ণনীয়ভাবে তাঁদের সামাজিক অবস্থার শোচনীয় অবনতি ঘটতে লাগল। তাদের ওপর যেন বিপদ-মুসীবতের একটি পাহাড় ভেঙে পড়ছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিলো, তখনকার গোটা প্রকৃতিই যেন তাদেরকে উপহাস করে বলছে:
'রাসূলের নির্দেশ অমান্য করেছো, এবার বোঝো মজা!'
এই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় হঠাৎ করে একজন সাহাবী দৌড়ে এসে তাদের এ সুসংবাদ দিয়ে বললেন:
بِأَنَّ اللهَ سُبْحَانَهُ قَدْ رَضِيَ عَنْ صَنِبْعِهِمْ، وَأَنَّهُ أَنْزَلَ عَلَى نَبِيِّهِ فِي ذَلِكَ قُرْآنًا".
'প্রিয় ভাইয়েরা! আপনাদের ঐ ঘটনা সংঘটিত হওয়ায় আল্লাহ আপনাদের প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছেন। শুধু তাই নয়, এ ব্যাপারে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর ওহী নাযিল করেছেন।'
এ সংবাদ প্রাপ্তির সাথে সাথে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সঙ্গীরা কী যে খুশি হয়েছিলেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। এদিকে দলে দলে সাহাবীরা তাদের মোবারকবাদ জানানো ও একটু কোলাকুলি করার মানসে খুশির সাথে তাদের উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হওয়া কুরআনের সেই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতে করতে ছুটে আসছিলেন। তাদের উদ্দেশ্যে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ হলো:
يَسْتَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيْهِ قُلْ قِتَالٌ فِيْهِ كَبِيرٌ وَصَدَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ وَكُفْرٌ بِهِ وَالْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَإِخْرَاجُ أَهْلِهِ مِنْهُ أَكْبَرُ عِنْدَ اللَّهِ وَالْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ.
'হে নবী! লোকেরা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে হারাম মাসে যুদ্ধ করা কী? আপনি বলে দিন, এ মাসে যুদ্ধ করা অন্যায়; কিন্তু আল্লাহর নিকট তা হতেও অধিক বড় অন্যায় হচ্ছে, আল্লাহর পথ হতে লোকদেরকে বিরত রাখা। আল্লাহকে অস্বীকার ও অমান্য করা, আল্লাহবিশ্বাসীদের জন্য মসজিদে হারামের পথ রুদ্ধ করা এবং হারাম শরীফের অধিবাসীদের সেখান থেকে বহিষ্কার করা আর বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা রক্তপাত হতেও মারাত্মক ব্যাপার। (আল কুরআন ২, সূরা বাকারা ২১৬)
আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথীদের কার্যক্রমের সমর্থনে আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরআনের আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও অত্যন্ত খুশি হলেন এবং হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। আল্লাহ এ আয়াত নাযিলের মাধ্যমে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে সমগ্র আরব বিশ্বে কুরাইশদের প্রোপাগান্ডার ওপর যেন জ্বলন্ত আগুনে পানি ঢেলে দিলেন। শুধু তাই নয়, সমস্ত আরববাসীদের জানিয়ে দেওয়া হলো যে, আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথীদের কৃতকর্মের চেয়ে কুরাইশদের কৃতকর্ম ছিল আরও জঘন্য এবং ঘৃণিত।
অতঃপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দের সাথে উট বহরের সমস্ত মালপত্র গ্রহণ করলেন। মুক্তিপণ আদায় করে বন্দীদের মুক্তি দিলেন এবং আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথীদের প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন। কেননা, তাদের এই অভিযান মুসলমানদের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ের রচনা করেছে। তাদের এই উটবহর ইসলামের সর্বপ্রথম গণীমত, মুসলমানদের ওপর যুলুম-নির্যাতন ও জানমালের ক্ষয়-ক্ষতির প্রথম প্রতিশোধ। এরাই মুসলমানদের হাতে প্রথম বন্দী। আর এই ঝাণ্ডাই ইসলামের প্রথম জিহাদী ঝাণ্ডা, যা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে সোপর্দ করেছিলেন। আর আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুই এই প্রথম ব্যক্তি, যাঁকে 'আমীরুল মু'মিনীন' বলে সম্বোধন করা হয়েছিল।
কিছুদিন যেতে না যেতেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদেরকে ওহুদের রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানালেন। আল্লাহর রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়ে যার যা আছে তা নিয়েই মুসলমানরা ওহুদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এ যুদ্ধে মুসলমানদের অত্যন্ত কঠিন ঈমানী পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এতে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঈমানী পরীক্ষা ছিল সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ওহুদ যুদ্ধে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর সাথী সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাসের মাঝে যে ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল, তা সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাসের বর্ণনায় নিম্নরূপ:
'ওহুদ যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের সাথে আমার দেখা হলো। তিনি আমাকে বললেন:
'চলো না আমরা একটু আল্লাহর কাছে দু'আ করি।'
আমি তাকে বললাম: 'ঠিক আছে।'
অতঃপর আমরা একটু নিরিবিলি স্থানে গিয়ে আল্লাহর কাছে মোনাজাত শুরু করলাম। আমি বললাম :
يَا رَبِّ إِذَا لَقِيتُ الْعَدُوِّ فَلَقِنِي رَجُلًا شَدِيدًا بَأْسُهُ، شَدِيدًا حَرَدُهُ أَقَاتِلُهُ وَيُقَاتِلُنِي، ثُمَّ ارْزُقْنِي الظَّفَرَ عَلَيْهِ حَتَّى أَقَاتِلَهُ وَأَخُذَ سَلَبَهُ، فَأَمَّنَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ جَحْشِ عَلَى دُعَائِي.
'হে আল্লাহ! যুদ্ধ শুরু হলে আমাকে সবচেয়ে শক্তিশালী, তেজস্বী ও এমন এক বীর যোদ্ধার সম্মুখীন করো, মুসলমানদের প্রতি যার হামলা হবে অত্যন্ত ক্ষীপ্র ও দুর্ধর্ষ। আমি তাকে চ্যালেঞ্জ করব এবং সেও আমাকে চ্যালেঞ্জ করবে। প্রচণ্ড লড়াইয়ের এক পর্যায়ে তুমি তার উপর আমাকে বিজয় লাভ করার তাওফীক দান করবে। এমনকি আমি যেন উন্মুক্ত তরবারির আঘাতে তাকে দ্বি-খণ্ডিত করে তার সমস্ত অস্ত্র গনীমত হিসেবে ছিনিয়ে নিতে পারি। আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশও আমার সাথে সাথে হাত তুলে আমার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে দু'আর সমর্থনে বলছিলেন আমীন! আমীন!'
অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দু'আ করা শুরু করলেন:
اللهُمَّ ارْزُقْنِي رَجُلًا شَدِيدًا ، حَرَدَهُ شَدِيدًا بَأْسُهُ أُقَاتِلُهُ فِيكَ وَيُقَاتِلُنِي، ثُمَّ يَأْخُذُنِي فَيُجْدَعُ أَنْفِي وَأُذُنِي فَإِذَا لَقِيتُكَ غَدًا ، قُلْت : فِيمَ جُدِعَ أَنْفُكَ وَاذْنُكَ؟ فَأَقُولُ : فِيكَ وَفِي رَسُولِكَ، فَتَقُولُ : صَدَقْتَ .....
'হে আল্লাহ! তুমি আমাকেও একজন শক্তিশালী বীর যোদ্ধার সম্মুখীন করো, যে অত্যন্ত বিক্রমের সাথে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমি শুধু তোমার সান্নিধ্য লাভের জন্যে উন্মুক্ত তরবারি হাতে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব। যুদ্ধের এক চরম মুহূর্তে তার তলোয়ারের আঘাতে যেন আমি শাহাদাতের মৃত্যুর সুধা পান করতে পারি। আর সে তোমার দীনের বিরোধী সৈনিক হওয়ার কারণে আমার উপর বিজয়ী হওয়ার খুশিতে সে যেন আমার নাক ও কান কেটে আমার মৃতদেহকে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয় এবং কাল কিয়ামতের দিন তোমার সামনে দণ্ডায়মান হলে যখন তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করবে, 'কী উদ্দেশ্যে তুমি তোমার নাক এবং কানকে বিচ্ছিন্ন করেছ?' তখন আমি যেন বলতে পারি, 'হে আল্লাহ! শুধু তোমার ও তোমার রাসূলের সৈনিক হওয়ার কারণে। তখন তুমি বলবে, 'সাদ্দাকতা, তুমি সত্য বলেছ।'
সা'দ বিন আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'ওহুদের ময়দানে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের দু'আ আমার দু'আ অপেক্ষা লাখো কোটি গুণ উত্তম ছিল। ওহুদ যুদ্ধের শেষ বেলায় আমি আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশকে শহীদ অবস্থায় তাঁর দেহকে নাক কান কাটা অবস্থায় দেখতে পেলাম। তাঁর লাশের পাশেই একটি গাছের ডালে তাঁর কর্তিত নাক ও কান ঝুলছিল।'
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দু'আ কবুল করেছিলেন। ওহুদের যুদ্ধে তাঁকে শাহাদাতের সর্বোত্তম মর্যাদায় ভূষিত করেছিলেন, যেমন ভূষিত করেছিলেন সাইয়েদুশ শুহাদা হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে।
যুদ্ধশেষে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের এই সু-মহান আদর্শ সৈনিক আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ও হামযা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে একই কবরে রক্তাক্ত অবস্থায় দাফন করেন। আল্লাহর রাহে কুরবানী দেওয়া তাদের এই পূত-পবিত্র রক্ত চিরদিন মুসলমানদের শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা পোষণের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে থাকবে এবং সেদিকেই হাতছানি দিয়ে ডাকবে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুসলমানকে তাঁদেরই পদাঙ্ক অনুসরণের তাওফীক এনায়েত করুন। আমীন!
টিকাঃ
১. আল ইছাবা জীবনী নং ৪৫৭৪। ২. ইমতাউল আসমা, ১ম খণ্ড, ৫৫ পৃ.। ৩. হুলিয়াতুল আউলিয়া, ১ম খণ্ড, ১০৮ পৃ.। ৪. হুসনুস্ সাহাবা, ৩০০ পৃ.। ৫. মাজমুয়াতুল অসায়েক আছ ছিয়াছিয়্যাহ, ৮ পৃ.।
📄 আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাঃ)
'প্রত্যেক উম্মতের একজন 'আমীন' থাকে। আর আমার উম্মাতের আমীন হচ্ছে, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ।' -রাসূলে কারীম (স)-এর উক্তি
হালকা পাতলা গড়ন, লম্বাকৃতি দেহ, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা, ধীর-স্থির শান্ত-শিষ্ট মেজাজ, লাজ-নম্র, অমায়িক ব্যবহার, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, সদালাপী ও মিষ্টভাষী, দ্রুতগামী এবং কর্মতৎপর হিসেবে খ্যাত এমন এক ব্যক্তি, যার মনে গর্ব ও অহঙ্কারের লেশমাত্র ছিল না। কিন্তু রণক্ষেত্রে তিনিই যেন ঝলসে ওঠা তীক্ষ্ণধার তরবারি ও গর্জে ওঠা এক সিংহ শার্দুল এবং প্রতিকূল পরিবেশে দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন এক বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। ইতিহাস খ্যাত এ ব্যক্তিই মুসলিম উম্মাহর 'আমীন' আমর ইবনে আবদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ আল ফেহরী আল কুরাইশী। যিনি ছোট-বড় সবার নিকট আবু উবায়দা আল জাররাহ নামে পরিচিত।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর প্রশংসায় বলেছেন:
'গভীর পাণ্ডিত্য, চারিত্রিক মাধুর্য এবং শালীনতায় কুরাইশ বংশে তিন ব্যক্তি বিশেষভাবে খ্যাতি লাভ করেন। তারা যদি আপনার প্রশংসা করেন, তাতে মিথ্যা অতিরঞ্জন থাকবে না এবং আপনিও যদি তাদের প্রশংসা করতে চান, তাতেও কোনো অসত্যের আশ্রয় নিতে হবে না। তাঁরা হলেন:
'আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।'
আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইসলাম গ্রহণের দ্বিতীয় দিনে তাঁরই প্রচেষ্টায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, ওসমান ইবনে মাযউন রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, আরকাম ইবনে আবিল আরকাম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং তাঁকে সঙ্গে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হন। তাঁরা কালেমা তাওহীদের ঘোষণার মাধ্যমে একই সাথে তাঁর হাতে বাই'আত গ্রহণ করেন। এ পাঁচ ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত সাংগঠনিক কাঠামোই হলো পরবর্তী সময়ে ইসলামের সুমহান প্রাসাদের ভিত্তি।
আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মাক্কী জীবন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটাই অগ্নিপরীক্ষার এক দুর্বিষহ জীবন। প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারী অন্যসব সাহাবীদের মতো তিনিও আর্থিক সংকট, দুঃখ-কষ্ট, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন; কিন্তু আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঈমানী পরীক্ষা ইতিহাসে আদর্শের যে কোনো অনুসারীর বিচারে এক বিরল ঘটনা।
প্রতিটি ঈমানী পরীক্ষাতেই তিনি ধৈর্য ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শকে সমুন্নত করেছেন। কিন্তু বদরের যুদ্ধে তাঁর অকল্পনীয় ঈমানী পরীক্ষা অতীতের সব পরীক্ষাকে ম্লান করে দিয়েছে।
বদর প্রান্তরে তুমুল যুদ্ধের এক পর্যায়ে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মৃত্যুর পরওয়া না করে প্রচণ্ড আক্রমণে শত্রুবাহিনীর দুর্ভেদ্য ব্যূহকে ছত্রভঙ্গ করতে সমর্থ হন, এতে মুশরিকদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়ে যায়। এ সুযোগে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে শত্রুবাহিনীকে ধরাশায়ী করতে করতে সম্মুখপানে অগ্রসর হচ্ছিলেন ও তাঁর চতুর্দিকে ঘুরেফিরে আক্রমণ চালাচ্ছিলেন। কুরাইশ বাহিনীও বার বার তাঁকে প্রতিরোধ করার ব্যর্থ চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। এরই ফাঁকে শত্রুবাহিনীর ব্যূহ থেকে এক ব্যক্তি আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বার বার চ্যালেঞ্জ করছিল। তিনি ও আক্রমণের গতি পরিবর্তন করে প্রতিবারই তার সে চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এ দুর্বলতার এক সুযোগে হঠাৎ সে তাঁর ওপর প্রচণ্ড আঘাত হেনে বসল। তিনি তড়িৎ গতিতে পাশ কাটিয়ে গেলে অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন। সে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে শত্রু নিধনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। ধৈর্যহীনতার চরম পর্যায়ে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তরবারির প্রচণ্ড এক আঘাতে তার শির দ্বিখণ্ডিত হয়ে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ল।
প্রিয় পাঠক! ভূলুণ্ঠিত এ ব্যক্তি কে? পূর্বেই আলোচনা করেছি, আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঈমান সর্বকালের কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় এমনভাবে উত্তীর্ণ যে, তা কোনো কল্পনাকারীর কল্পনারও ঊর্ধ্বে। স্তম্ভিত হবেন, ভূলুণ্ঠিত ব্যক্তির পরিচয়ে। সে আর কেউ নয়, সে হলো আবূ উবায়দার পিতা আবদুল্লাহ ইবনে জাররাহ।
এ ক্ষেত্রে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর পিতাকে হত্যা করেননি। তিনি হত্যা করেছেন, পিতার অবয়বে শিরকের প্রতিমূর্তিকে। মহান আল্লাহ তাঁর ও পিতার মাঝে সংঘটিত এ ঘটনা সম্পর্কে আল কুরআনের আয়াত নাযিল করলেন:
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُولَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيْمَانَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوحٍ مِنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُولَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ إِلَّا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ .
'তুমি পাবে না আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী এমন কোনো সম্প্রদায়, যারা ভালোবাসে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধচারীদেরকে হোক না এই বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্র ভ্রাতা অথবা তাদের জ্ঞাতি-গোত্র। এদের অন্তরে আল্লাহ সুদৃঢ় করে দিয়েছেন ঈমান এবং তাদের শক্তিশালী করেছেন তাঁর পক্ষ হতে রূহ দ্বারা। এদের প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেথায় তারা স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন, এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখো, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।'
আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পক্ষ থেকে এমনটি ঘটা আশ্চর্যের কিছুই ছিল না। আল্লাহর প্রতি তাঁর দৃঢ় ঈমান, ইসলামী আদর্শের কল্যাণকামিতায় এবং উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আমানতদার ও বিশ্বাসভাজন হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর স্থান ছিল শীর্ষে। যে কারণে অনেক মহান ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে তাঁর সমকক্ষ মর্যাদা পেতে আগ্রহী ছিলেন।
মুহাম্মদ ইবনে জাফর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এক সময় খ্রিস্টানদের একটি প্রতিনিধি দল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল:
'হে আবুল কাশেম! আপনার সাহাবীদের মধ্য থেকে আমাদের জন্য এমন এক ব্যক্তিকে মনোনীত করে দিন, যিনি আমাদের অর্থ-সম্পত্তির কিছু বিষয়ে সৃষ্ট বিবাদের সুষ্ঠু ফায়সালা করে দিতে পারবেন। আপনারা আমাদের কাছে খুবই আস্থাভাজন সম্প্রদায়।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন:
'তোমরা বিকেলে এখানে এসো, আমি তোমাদের সাথে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ এক ব্যক্তিকে পাঠাব।'
ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করেন:
'সারা জীবনে শুধু এবারই ঐ গুণের অধিকারী হওয়ার জন্য আমি আগ্রহী হয়ে উঠি। যদিও নেতৃত্ব লাভ কখনো আমি পছন্দ করিনি। তাই সে উদ্দেশ্যে একটু আগেভাগেই আমি যোহরের নামাযের জন্য মসজিদে গিয়ে হাজির হই। নামাযশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডানে ও বাঁয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগলেন। আমি সে মুহূর্তে একটু উঁচু হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নজরে পড়ার জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম। তিনি এদিক-সেদিক দেখতে লাগলেন। অবশেষে তিনি আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দেখতে পেলেন এবং তাকে ডেকে বললেন:
'তুমি তাদের সাথে যাও এবং বিবাদটির সুষ্ঠু নিষ্পত্তি করে দাও।'
'আমি মনে মনে বললাম, আবূ উবায়দা এ গুণটির অধিকারী হয়ে গেল।'
আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিই শুধু ছিলেন না; বিশ্বস্ততার সাথে ছিল শক্তি এবং একাধিক ক্ষেত্রে তিনি সেই শক্তির প্রমাণও দিয়েছেন। কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহ আরম্ভের পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বাণিজ্য কাফেলাকে ধাওয়া করার উদ্দেশ্যে মুহাজির সাহাবীদের সমন্বয়ে সুসজ্জিত যোদ্ধাদের একটি বাহিনীকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলে, তাদের সিপাহসালার হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকেই মনোনীত করেন। ঐ অভিযানে তিনি ত্যাগ ও কষ্টসহিষ্ণুতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায়কালে তাদের রসদবাবদ মাত্র এক ঝুড়ি খেজুর ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেননি। আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যেককে প্রতিদিন মাত্র একটি করে খেজুর রেশন হিসেবে বরাদ্দ করতেন। স্তন্য পানকারী শিশুদের মতো সারাদিনে তারা একটিমাত্র খেজুর চুষে খেতেন এবং তারপর পানি পান করতেন, এভাবে সবাই গোটা একটা দিন অতিবাহিত করতেন।
ওহুদ যুদ্ধে মুসলমানগণ এক পর্যায়ে পরাজয়ের সম্মুখীন হলেও মুশরিক বাহিনীর একজন চিৎকার করে বলছিল:
'আমাকে দেখিয়ে দাও মুহাম্মদকে।'
সেই চরম মুহূর্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে দশজন সাহাবী তাঁকে রক্ষা করার জন্য ঘিরে রেখেছিলেন, আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন তাদের অন্যতম।
এ যুদ্ধে শত্রুদের আঘাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি দন্ত মোবারক শহীদ হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিরস্ত্রাণ ভেঙে এর দুটি পেরেক তাঁর মাথায় ঢুকে পড়ে। আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মোবারক থেকে তা বের করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন; কিন্তু আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আপনি কাজটি আমাকে করতে দিন।'
আবূ বকর ছিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর অনুরোধে সাড়া দিয়ে তাঁকেই কাজটি করার সুযোগ দিলেন। আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আশঙ্কাবোধ করছিলেন যে, যদি হাতের সাহায্যে পেরেক দু'টি টেনে বের করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীষণ কষ্ট পাবেন। তাই তিনি দাঁত দিয়ে তা টেনে বের করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
প্রথমবারে একটি বের হয়ে এলেও আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সামনের একটি দাঁত ভেঙে যায়, দ্বিতীয় বারে অপরটিও বেরিয়ে আসে; কিন্তু এবারও তাঁর সামনের অপর একটি দাঁত ভেঙে যায়। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'আবূ উবায়দা ছিলেন সামনের দুটি দাঁত ভাঙা সর্বাপেক্ষা সুদর্শন ব্যক্তি।'
আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইসলাম গ্রহণের পর থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত পর্যন্ত তাঁর সাথে সমস্ত যুদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ দাওয়াতী ও রাষ্ট্রীয় কাজে অংশ নেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে খিলাফাতের বাইআতের দিন উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সম্বোধন করে বললেন:
'আপনার হাতটা বাড়িয়ে দিন, যাতে আমি বাইআত করতে পারি। কারণ, আমি রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই একজন আমীন বা বিশ্বস্ত ব্যক্তি থাকেন, এ উম্মতের মধ্যে আপনিই 'আমীন'। অতএব আপনিই এর একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি।'
এ কথা শুনে আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'এমন এক ব্যক্তিকে রেখে কখনোই নিজে খিলাফতের বাইআত নিতে পারি না, যাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশাতেই আমাদের জন্য নামাযের ইমাম নিযুক্ত করেছিলেন। এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনিই আমাদের ইমামতি করেন।'
অতঃপর আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতেই খিলাফতের বাইআত করা হয়। তাই হকের ব্যাপারে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর জন্য উত্তম উপদেশদাতা ও সর্বাপেক্ষা অধিক সহযোগিতা দানকারী ছিলেন।
আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইনতিকালের পর আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে খিলাফতের বাইআত গ্রহণ করেন। আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর একান্ত অনুগত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সারা জীবনে মাত্র একবার ছাড়া আর কখনো তিনি খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নির্দেশ পালনে অনীহা দেখাননি।
প্রিয় পাঠক! কী সেই নির্দেশ, যেটি পালন করতে আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন?
আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সিরিয়া বিজয়ের প্রাক্কালে যখন মুসলিম বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়ে একের পর এক বিজয় ছিনিয়ে আনছিলেন, তখন তিনি পূর্বে ফোরাত নদী এবং উত্তরে এশিয়া মাইনর পর্যন্ত তাঁর বিজয়ের সীমানা বিস্তৃত করেন। অব্যাহত গতিতে এ বিজয় চলাকালে সিরিয়ায় হঠাৎ নজীরবিহীন মহামারি দেখা দেয় এবং তাতে ব্যাপকভাবে মানুষ মারা যেতে থাকে। এ সময় আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে একখানা পত্র দিয়ে একজন দূত প্রেরণ করেন। পত্রে তিনি লিখেন:
إِنِّي بَدَتْ لِي إِلَيْكَ حَاجَةٌ لَاغِنى لِى عَنْكَ فِيهَا ، فَإِنْ أَتَاكَ كِتَابِي لَيْلًا فَإِنِّي أَعْزَمُ عَلَيْكَ أَلَّا تُصْبِحَ حَتَّى تَرَكَبَ إِلَى، وَإِنْ أَتَاكَ نَهَارًا فَإِنِّي أَعْزَمُ عَلَيْكَ أَلَّا يُمْسِيَ حَتَّى تَرْكَبَ إِلَى.
'অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে আমি বিশেষভাবে মদীনায় আপনার উপস্থিতি কামনা করছি। আপনার নিকট এ নির্দেশনামা রাতে পৌঁছলে ভোর হওয়ার পূর্বে এবং দিনে পৌছলে সূর্যাস্তের পূর্বে অশ্ব পৃষ্ঠে আরোহণ করে আমার কাছে চলে আসবেন বলে আশা করছি।'
আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু খালীফাতুল মুসলিমীনের এ নির্দেশনামা পাঠ করে বললেন:
'আমার কাছে আমীরুল মুমিনীনের কী প্রয়োজন, তা আমি বুঝতে পেরেছি। তিনি এমন এক ব্যক্তিকে জীবিত রাখতে চাচ্ছেন, যার বেঁচে থাকার কথা নয়।'
অতঃপর তিনি আমীরুল মুমিনীনকে লিখলেন:
'আমীরুল মুমিনীন, আপনার সমীপে আমার প্রয়োজনীয় বিষয়টা বুঝতে পেরেছি। আমি মুসলিম সৈন্যবাহিনীর দায়িত্বে নিয়োজিত। তারা মহামারীতে আক্রান্ত। তাদেরকে বিপদে রেখে আমি নিজে নিরাপদ স্থানে যাওয়া মোটেই পছন্দ করছি না। যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে মৃত্যু আমাকে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন না করেছে; ততক্ষণ আমি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাচ্ছি না। আমার এ পত্র আপনার কাছে পৌছার পর আমাকে ঐ নির্দেশ থেকে অব্যাহতি দান করবেন এবং আমাকে এখানে অবস্থান করার অনুমতি দান করবেন।'
আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পত্র পাঠের পর উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কেঁদে ফেললেন। তাঁর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকল, তাঁর এ অস্বাভাবিক কান্না দেখে তাঁর পাশে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা বললেন:
'হে আমীরুল মুমিনীন! আবু উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কি মৃত্যুবরণ করেছেন?'
উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'না, বরং মৃত্যু তাঁর অতি নিকটে এসে পৌছেছে।'
উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ধারণা মিথ্যা ছিল না, অল্পদিনের মধ্যে আবূ উবায়দা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মহামারীতে আক্রান্ত হলেন! মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি তাঁর বাহিনীকে অন্তিম উপদেশ দিয়ে বললেন:
إِنِّي مُوصِيكُمْ بِوَصِيَّةٍ إِنْ قَبِلْتُمُوهَا لَنْ تَزَالُوا بِخَيْرٍ : أَقِيمُوا الصَّلةَ، وَصُومُوا شَهْرَ رَمَضَانَ وَتَصَدَّقُوا ، وَحُجُوا وَاعْتَمِرُوا ، وَتَوَاصَوْا، وَانْصَحُوا لِامْرَائِكُمْ وَلَا تَغُشُوْهُمْ وَلَا تُلْهِكُمُ الدُّنْيَا، فَإِنَّ الْمَرْءَ لَوعُمِّرَ أَلْفَ حَوْلٍ مَا كَانَ لَهُ بُدَّ مِنْ أَنْ بَصِيرَ إِلَى مَصْرَعَى هَذَا الَّذِي تَرَوْنَ ... وَالسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةِ اللَّهِ .
'আমি তোমাদেরকে অন্তিম কিছু উপদেশ দিতে চাই। যদি তা গ্রহণ কর তাহলে সর্বদা তোমাদের কল্যাণ হতে থাকবে। নামায কায়েম করবে, রমযান মাসে রোযা রাখবে, যাকাত দিবে, হজ্জ ও উমরাহ পালন করবে, পরস্পরের মঙ্গল কামনা করে অসিয়ত করবে। আমীরদের পরামর্শ দান করবে, তাদেরকে ধোঁকা দেবে না এবং দুনিয়াদারী যেন তোমাদেরকে অন্য সবকিছু থেকে গাফেল করে না দেয়। কেননা, যদি কাউকে হাজার বছরও আয়ুষ্কাল দান করা হয় তবুও একথা নিশ্চিত যে, তাকেও একদিন এমনিভাবে মৃত্যুর সম্মুখীন হতে হবে। যেভাবে এ মুহূর্তে তোমরা আমাকে হতে দেখছ।'
এরপর তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
'আস্সালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ'
অতঃপর তিনি মু'আয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দিকে ফিরে বললেন:
'হে মুয়ায, মুসলিম বাহিনীর নামাযের ইমামতি করাও।'
এর অল্পক্ষণ পরেই তাঁর পবিত্র রূহ ইহজগতের মায়া ত্যাগ করে চলে গেল।
তখন মুয়ায রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দাঁড়িয়ে বললেন:
'প্রিয় ভাইয়েরা! আপনারা এমন এক ব্যক্তিকে হারিয়েছেন, খোদার শপথ! যাঁর মতো প্রশস্ত অন্তরের মানুষ আমার জানা মতে আর নেই, তাঁর মন সর্বপ্রকার হিংসা-বিদ্বেষ থেকে ছিল পবিত্র। সঙ্গী-সাথীদের ভুল-ত্রুটিতে দয়াশীল ও ক্ষমাসুলভ আচরণে তাঁর কোনো জুড়ি ছিল না। তাঁর মতো জনগণের এতো বড় কল্যাণকামীও আর কেউ ছিল না, তাঁর প্রতি সদয় হোন। আল্লাহ আপনাদের প্রতি সদয় হবেন।'
টিকাঃ
১. তাবাকাত ইবনে সা'দ। ৪র্থ খণ্ডে সূচী দ্রষ্টব্য। ২. আল ইসাবা: জীবনী নং ৪৪০০। ৩. আল ইসতিয়াব: ৩য় খণ্ড ২য় পৃ.। ৪. হুলিয়াতুল আউলিয়া: ১ম খণ্ড ১০০ পৃ.। ৫. আল বদয়ু ওয়াত্ তারিখ: ৫ম খণ্ড ৮৭ পৃ.। ৬. ইবনে আসাকের: ৭ম খণ্ড ১৫৭ পৃ.। ৭. সিফাতুচ্ছাওয়া: ১ম খণ্ড ১৪২ পৃ.। ৮. আশহারু মাশাহিরুল ইসলাম: ৫০৪ পৃ.। ৯. তারিখুল খামিস: ২য় খণ্ড ২৪৪ পৃ.। ১০. আর রিয়াদ আন নাদরা: ৩০৭ পৃ.। ১১. তাবাকাতুস সাআদাহ্।