📄 বারা’আ ইবনে মালেক আল আনসারী (রাঃ)
'বারা"আ বিন মালেককে যেন কখনো মুসলিম বাহিনীর কোনো সালারের দায়িত্বে নিয়োগ না করা হয়। কেননা সে তার দ্রুতগামী পদক্ষেপ দ্বারা তাঁর বাহিনীকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিতে পারে।' -খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারুক (রা)
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একনিষ্ঠ খাদেম, জালীলুল কদর সাহাবী আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ছোট ভাই ছিলেন বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী। তিনি অত্যন্ত হালকা-পাতলা গড়নের ছিমছাম চেহারাবিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। মাথায় ছিল কোঁকড়ানো চুল। অদম্য সাহসী ও অগ্রাভিমুখী দ্রুতগামী আক্রমণে অভ্যস্ত বীর যোদ্ধা। এই যুবক সাহাবী ছিলেন। এতোই হালকা-পাতলা, দেখলে মনে হতো খুবই দুর্বল অথচ তাঁর বুদ্ধিমত্তা, অদম্য সাহসিকতা, প্রবল ঈমানী চেতনা ও অসাধারণ সমরকৌশল, যা মানুষকে তাক লাগিয়ে দিয়ে রীতিমতো ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে আছে।
এই ক্ষীণ দেহের অধিকারী বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী কেবল মল্লযুদ্ধেই শতাধিক মুশরিক যোদ্ধাকে জাহান্নামে প্রেরণ করেন। তিনি মল্লযুদ্ধ ছাড়াও সম্মুখ সমরে যে কত কাফির ও মুশরিককে জাহান্নামে পাঠিয়ে ইসলামের বিজয়কে ছিনিয়ে এনেছেন তার ইয়ত্তা নেই। যুদ্ধের দামামা তাঁর রক্তে এমন ক্ষিপ্রতা ও তেজস্বিতার সৃষ্টি করত যে, তিনি নিজ দল-বল পিছনে রেখে একাই শত্রুপক্ষের প্রাচীর ভেদ করে সম্মুখপানে দু'মুখো তলোয়ার দিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে যেতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর এই ব্যাকুল অগ্রগামিতা লক্ষ্য করে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর প্রতি এক বিশেষ বিধি-নিষেধ আরোপ করেন। তিনি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের গভর্নরদের কাছে এই বলে ফরমান জারি করেন:
أَلَّا يُوَلُّوهُ عَلَى جَيْشِ مِنْ جُيُوشِ الْمُسْلِمِينَ، خَوْفًا مِنْ أَنْ يُهْلِكَهُمْ بِإِقْدَامِهِ".
'বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারীকে যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো বাহিনীর দায়িত্ব যেন দেওয়া না হয়। কারণ আমি আশংকা করি যে, শত্রুবাহিনীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারীর যুদ্ধ করার যে মানসিকতা রয়েছে, যার ফলে তার অধীনস্থ সমগ্র বাহিনীই শত্রু বাহিনীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সমূহ বিপদের সম্মুখীন হতে পারে।'
বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইতিহাস সৃষ্টিকারী অসংখ্য ঘটনাবলির মধ্যে একটিমাত্র ঘটনা প্রিয় পাঠকদের খিদমতে পেশ করা হচ্ছে:
বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাহসিকতার পরিচয় ফুটে উঠে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর। যখন নবদীক্ষিত মুসলমানরা যেভাবে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেভাবেই না বুঝে দলে দলে ভণ্ডনবীদের দলে শামিল হচ্ছিল। ইসলামের এই চরম দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে আল্লাহ যাদের দৃঢ় মনোবল এবং ঈমানী মযবুতি দান করেছিলেন, শুধু তারা ব্যতীত অন্য সকলেই মুরতাদদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তায়েফ, মক্কা ও মদীনাসহ এর পার্শ্ববর্তী বিক্ষিপ্ত কিছু গোত্র ছাড়া বাকি সর্বত্রই এই ফিতনা ব্যাপকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল।
এই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইসলামের হেফাযতের জন্যে আমীরুল মুমিনীন আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে চতুর্মুখী ফিতনা মোকাবেলার যোগ্যতা ও দৃঢ়তা দান করেন। তিনি পাহাড়সম অটল হয়ে একাধারে যাকাত প্রদানে অস্বীকারকারীদের এবং ভণ্ড নবী ও তাদের অনুসারী মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করলেন। আনসার এবং মুহাজিরদের সমন্বয়ে তিনি সশস্ত্র এগারোটি বিশেষ বাহিনী তৈরী করে প্রত্যেক বাহিনীর জন্যে আলাদা আলাদা ঝাণ্ডা নির্ধারণ করলেন। ভণ্ড নবীদের সমুচিত শিক্ষা দিয়ে বিপথগামী ও ধর্মত্যাগী মুরতাদদের ইসলামে প্রত্যাবর্তনের জন্যে এসব বাহিনীকে আরব বিশ্বের চতুর্দিকে প্রেরণ করেন।
ভণ্ড নবী ও তাদের অনুসারী মুরতাদদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ছিল বনূ হানীফা সম্প্রদায়ের মুসায়লামাতুল কায্যাবের। মুসায়লামাতুল কায্যাব তার নিজস্ব গোত্র এবং সন্ধিতে আবদ্ধ সম্প্রদায়সমূহের সুদক্ষ চল্লিশ হাজার যোদ্ধার এক বিশাল বাহিনী গড়ে তুলেছিল। এই বাহিনী ইসলামের জন্য বিরাট এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যাদের অধিকাংশই ছিল সংকীর্ণ ভৌগোলিক ও বংশীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। যারা ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধের পরিবর্তে গোত্রীয় গোঁড়ামি, সংকীর্ণতা ও আঞ্চলিকতার শিকারে পরিণত হয়েছিল। তাদের মতে, অনেকের ভাষ্য ছিল:
أَشْهَدُ أَنَّ مُسَيْلَمَةَ كَذَّابٌ، وَمُحَمَّدًا صَادِقٌ ... لَكِنَّ كَذَّابَ ربيعَةَ أَحَبُّ إِلَيْنَا مِنْ صَادِقٍ مُضَر".
'আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিঃসন্দেহে মুসায়লামাতুল কায্যাব একজন ভণ্ড নবী এবং মুহাম্মদ সত্য নবী; কিন্তু আমাদের কাছে কুরাইশ বংশের সত্য নবীর চেয়ে স্বগোত্রীয় ভণ্ডনবী ও মিথ্যাবাদী মুসায়লামাতুল কায্যাবই ভালো।'
আমীরুল মু'মিনীন আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসায়লামাতুল কায্যাবের মোকাবেলা করার জন্যে আবূ জাহলের ছেলে ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নেতৃত্বে যে বাহিনী পাঠিয়েছিলেন, প্রচণ্ড হামলার মুখে তারা পরাজিত হয়ে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়। অতঃপর আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে আনসার এবং মুহাজির সাহাবাদের মধ্যে বিশিষ্ট যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত যে বাহিনী প্রেরণ করেন, তাদের মধ্যে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও ছিলেন।
খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ভণ্ডনবী মুসায়লামাতুল কায্যাব এবং তার অনুসারীদের সমুচিত শিক্ষা দিয়ে পুনরায় ইসলামে দীক্ষিত করার জন্যে সাহাবী যোদ্ধাদের নেতৃত্বে এই বিশেষ বাহিনী নিয়ে দ্রুতগতিতে নাজদের 'ইয়ামামা' নামক প্রান্তরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। মুহূর্তের মধ্যেই উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধ শুরুর প্রায় সাথে সাথেই মুসায়লামাতুল কায্যাবের বিশাল বাহিনী মুসলিম বাহিনীকে কাবু করে ফেলে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, সুশৃঙ্খল মুসলিম বাহিনীর পায়ের নিচের মাটি যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল। নিজেদের অবস্থান থেকে ক্রমেই তারা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছিল। এই নাজুক মুহূর্তে মুসায়লামাতুল কায্যাবের বাহিনী অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তাঁবুতে হামলা করে তাঁবুর খুঁটি উপড়ে ফেলে। এমনকি সেখানে অবস্থানরত খালিদ বিন্ ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর স্ত্রীকে হত্যার জন্যে উদ্যত হলে মুসায়লামাতুল কায্যাব বাহিনীরই একজন যোদ্ধা জাহিলিয়াতের প্রথানুযায়ী 'যুদ্ধক্ষেত্রে শিশু ও নারীদের হত্যা করা কাপুরুষোচিত ও গর্হিত কাজ'- এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁকে নিরাপত্তা দিয়ে রক্ষা করে।
এ চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় মুসলিম যোদ্ধারা নিশ্চিত পরাজয়ের আশঙ্কায় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন। তাঁরা এ কথা মনে করছিলেন যে, মুসায়লামাতুল কায্যাবের কাছে আজ পরাজয়ের পর এই আরব বিশ্বে ইসলামের নাম উচ্চারণ করার মতো আর কোনো ব্যক্তি অবশিষ্ট থাকবে না। শিরকমুক্ত এই জাযীরাতুল আরবে তাওহীদের বাণী উচ্চারণ ও আল্লাহর ইবাদত করার জন্য আর কেউ সাহস করবে না।
সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদের নিজের তাঁবু আক্রান্ত হওয়ার পর এই চরম নাজুক মুহূর্তে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বিক্ষিপ্ত মুসলিম বাহিনীকে তৎক্ষণাৎ পুনর্গঠিত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সাথে সাথে তিনি মুহাজির, আনসার, শহরবাসী ও মরুবাসী বেদুইন যোদ্ধাদের ভিন্ন ভিন্ন রেজিমেন্টে বিভক্ত করে প্রত্যেক রেজিমেন্টের জন্যে স্বগোত্রীয় উপ-সেনাপতি ও ভিন্ন ভিন্ন ঝাণ্ডা নির্ধারণ করেন। যেন প্রত্যেক বাহিনী স্বীয় অস্তিত্বের স্বার্থেই শত্রু বাহিনীর মোকাবেলায় মরণপণ চেষ্টা চালায় এবং কোন্ সেক্টর থেকে দুর্বলতা প্রকাশ পায় তাও চিহ্নিত করা সহজ হয়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই উভয় বাহিনীর মাঝে পুনরায় প্রচন্ড যুদ্ধ বেধে গেল। ভয়াবহ সে যুদ্ধ! মুসলিম যোদ্ধারা এর পূর্বে এমন মারাত্মক কোনো সংঘর্ষ কখনও প্রত্যক্ষ করেননি। এবার বীর বিক্রমে মুসলিম বাহিনী শত্রুবাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা মুসায়লামাতুল কায্যাব বাহিনীর যোদ্ধাদের ধরাশায়ী করে ইয়ামামার ময়দান লাশের স্তূপে পরিণত করে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। অপরপক্ষে, মুসায়লামাতুল কায্যাবের বাহিনী তাদের এই মারাত্মক ক্ষয়-ক্ষতি প্রত্যক্ষ করেও যুদ্ধ ময়দানে তখনও পাহাড়ের মতো অটল হয়ে মুসলমানদের মোকাবেলা অব্যাহত রাখল। মুসলিম যোদ্ধারা ঈমানী চেতনায় বলীয়ান হয়ে যুদ্ধের ক্ষিপ্রতাকে আরও তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলছিল।
ছাবিত বিন্ কায়েস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসলিম যোদ্ধাদের মধ্যে আনসার বাহিনীর ঝাণ্ডাবরদার (পতাকাবাহক) ছিলেন। তিনি যুদ্ধের এই তীব্রতা লক্ষ্য করে তার পরিচালিত বাহিনীর এই ঝাণ্ডাকে পিছনে সরিয়ে নিতে হতে পারে, তা আঁচ করে তৎক্ষণাৎ যুদ্ধ ময়দানে তাঁর দু'পায়ের হাঁটু পর্যন্ত মাটির নিচে গেড়ে ফেললেন। মুহূর্তেই শত্রু সৈন্যরা তার বহনকৃত ঝাণ্ডাকে ভুলুণ্ঠিত করার জন্যে তার ওপর আঘাত হানতে শুরু করল। তিনি একহাতে ঝাণ্ডাকে সমুন্নত রেখে অন্যহাতে তরবারি চালনা করে এ আক্রমণ প্রতিহত করতে করতে এক পর্যায়ে দুশমনের তরবারির আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
যুদ্ধের এই তীব্রতা ও প্রচণ্ডতার মাঝে মুহাজির বাহিনীর মধ্য হতে আমিরুল মু'মিনীন উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভাই যায়েদ ইবনুল খাত্তাব দুশমনের উপর আরও তীব্র গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে মোহাজিরদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলছিলেন:
أَيُّهَا النَّاسُ عَضُّوا عَلَى أَضْرَاسِكُمْ ، وَاضْرِبُوا فِي عَدُوِّكُمْ وَامْضُوا قُدُمًا ... أَيُّهَا النَّاسُ وَاللَّهِ، لَا أَتَكَلَّمُ بَعْدَ هَذِهِ الْكَلِمَةِ أَبَدًا حَتَّى يُهْزَمَ مُسَلَمَةُ أَوْ أَلْقَى اللَّهَ فَأُدْلِي إِلَيْهِ بحجتِي....
'হে মুসলিম যোদ্ধারা! আরও ক্ষীপ্র গতিতে আঘাত হানো, সম্মুখপানে অগ্রসর হও, শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ো, হে যোদ্ধারা জেনে রাখো, এটাই তোমাদের প্রতি আমার শেষ আহ্বান। হয় আজ মুসায়লামাতুল কায্যাবকে নিশ্চিহ্ন করবো অথবা শহীদ হয়ে আল্লাহর দরবারে পৌঁছে নিজের অপারগতা পেশ করবো।'
এ আহ্বানের সাথে সাথেই সমস্ত মুসলিম মুজাহিদ নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শত্রুবাহিনীর উপর প্রচণ্ড আঘাত হানতে শুরু করল। যায়েদ বিন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দু'হাতে তরবারি চালাতে চালাতে ক্ষীপ্রগতিতে দুশমনদের মাঝে ঢুকে পড়লেন। অসংখ্য মুরতাদদের ধরাশায়ী করার এক পর্যায়ে শত্রুর আঘাতে তিনি শাহাদাতের কোলে ঢলে পড়ে তার কৃত ওয়াদাকে বাস্তবে প্রমাণিত করেন।
আবূ হুযায়ফার কৃতদাস সালেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর উপর মুহাজির বাহিনীর ঝাণ্ডা বহন করার দায়িত্ব অর্পিত হয়। মুহাজিরদের অনেকেই তার প্রতি আশঙ্কা পোষণ করছিলেন যে, যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে তিনি সন্ত্রস্তবোধ করবেন। তারা তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন:
'আমরা আশঙ্কা করছি যে, তুমি যুদ্ধের প্রচণ্ডতায় ভীত হয়ে পশ্চাদপসরণ না করে বসো।' এবং এই সুযোগে শত্রুবাহিনী আমাদের ভিতরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা না করুক।
প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন:
'আমি যদি এ যুদ্ধে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করি তাহলে আমার চেয়ে নিকৃষ্টতম হাফেযে কুরআন আর কে হতে পারে?'
অতঃপর তিনি বীর বিক্রমে দুশমনদের প্রতি আঘাত হানতে হানতে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। মুরতাদদের তরবারির আঘাতের পর আঘাতে তার গোটা শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়; কিন্তু এতদসত্ত্বেও তিনি ইসলামের ঝাণ্ডাকে এক মুহূর্তের জন্যে ভূলুণ্ঠিত হতে দেননি।
কিন্তু এ যুদ্ধে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বীরত্বের কাছে এসব ঘটনা একেবারে নগণ্য বলে মনে হবে। খালিদ বিন্ ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উভয় পক্ষের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের এই প্রচণ্ডতার মধ্যে চূড়ান্ত আঘাতের মাধ্যমে ইসলামের বিজয় ছিনিয়ে আনার জন্যে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
'দুশমনদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ো হে আনসার যুবক ....'।
খালিদ ইবনে ওয়ালিদের এই নির্দেশ পেয়ে বারা'আ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনীর যোদ্ধাদের প্রতি লক্ষ্য করে বলেন:
يَا مَعْشَرَ الْأَنْصَارِ لَا يُفَكِّرَنَّ أَحَدُ مِنْكُمْ بِالرُّجُوعِ إِلَى الْمَدِينَةِ فَلَا مَدِينَةَ لَكُمْ بَعْدَ الْيَوْمِ ... وَإِنَّمَا هُوَ اللَّهُ وَحْدَهُ ... ثُمَّ الْجَنَّةُ .
'হে আনসার ভাইয়েরা! কখনো আপনারা মদীনায় ফিরে যাওয়ার চিন্তা করবেন না। এ মুহূর্ত হতেই আপনাদের জন্যে আর মদীনা নয়; আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তাওহীদের বাণীকে চিরসমুন্নত করে জান্নাতের দিকে অগ্রসর হোন।'
এই বলে তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে শত্রু বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বারা'আ ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দক্ষতার সাথে দু'ধারী তরবারি চালিয়ে তাঁর দু'পার্শ্বের দুশমনদের ধরাশায়ী করে সম্মুখে অগ্রসর হতে লাগলেন। মুসায়লামাতুল কায্যাবের যোদ্ধাদের শিরশ্ছেদ করতে করতে তিনি এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। এ আঘাতে মুসায়লামাতুল কায্যাব ও তাঁর বাহিনীর মধ্যে হঠাৎ ভীতি ও ত্রাসের সৃষ্টি হলো। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা যুদ্ধ ময়দান সংলগ্ন বাগানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো। যে বাগানটি পরবর্তী সময়ে অগণিত মৃতদেহের স্তূপের কারণে 'হাদীকাতুল মাউত' বা 'লাশের বাগান' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নানাবিধ ক্ষয়-ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে বাগানটি উচু ও প্রশস্ত দুর্ভেদ্য প্রাচীর দিয়ে বেষ্টিত ছিল। যুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে প্রাণ রক্ষার জন্যে মুসায়লামাতুল কায্যাব ও তাঁর অনুসারী যোদ্ধারা এ বাগানে আশ্রয় নিয়ে দ্রুত এর একমাত্র গেটটি বন্ধ করে দেয়। এভাবে নিজেরা নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে তার ভিতর থেকে মুসলমান বাহিনীর উপর বৃষ্টির মতো তীর বর্ষণ শুরু করে। এতে মুসলমানদের নিশ্চিত বিজয় আবার অনিশ্চয়তার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। মুসলিম যোদ্ধাদের পক্ষে তাদের মোকাবেলা করার সমস্ত পথ যেন রুদ্ধ হয়ে আসে। এ অবস্থায় মুসলিম বাহিনীর অন্যতম বীর সিপাহসালার বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তনের মাধ্যমে শত্রুদের প্রতি এক চরম ও শেষ আঘাত হানার জন্যে পরিকল্পনা নেন। তিনি তৎক্ষণাৎ একটি ঢাল সংগ্রহ করে তাঁর বাহিনীর লোকদের উদ্দেশ্য করে বললেন:
'আমি এ ঢালের উপরে বসে পড়ি, তোমরা আমাকে উঁচুতে উঠিয়ে ১০/১২টি বর্শা ফলকের সাহায্যে উপরে তুলে এ গেটের ভিতরে নিক্ষেপ কর। হয় আমি দুশমনদের হাতে শহীদ হয়ে যাবো অথবা ভিতরে গিয়ে তোমাদের জন্যে এ বাগানের গেট খুলে দেব।'
দেখতে না দেখতেই বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উন্মুক্ত তরবারি হাতে তার ঢালটির উপর বসে পড়লেন। অত্যন্ত হালকা-পাতলা ও ছিপ ছিপে আনসার যুবক বারা'আকে কয়েকজনে খুব সহজেই ঢালে বসিয়ে মাথার উপর তুলে নিলেন এবং সাথে সাথে অন্য কয়েকজন বর্শাধারী তাদের বর্শা ফলকে তাকে উপরে তুলে গেটের ভিতরে মুসায়লামাতুল কায্যাবের হাজার হাজার অনুগত যোদ্ধার মাঝে সজোরে নিক্ষেপ করলেন। বারা'আ অপ্রত্যাশিতভাবে তাদের মাঝে বজ্রপাতের ন্যায় লাফিয়ে পড়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতিতে গেট রক্ষী বাহিনীর উপর আক্রমণ শুরু করলেন। অন্যদিকে মুসায়লামাতুল কায্যাবের দুর্ধর্ষ সৈন্যরা চতুর্দিক থেকে ভিমরুলের মতো তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তলোয়ার, বর্শা আর খঞ্জরের আঘাতে তারা তাঁর গোটা দেহকেও ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলল; কিন্তু বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের গেটরক্ষী বেষ্টনির দশজনকে হত্যা করে পরিশেষে গেট খুলে দিতে সমর্থ হলেন।
এদিকে সাথে সাথে অপেক্ষমাণ বীর মুসলিম যোদ্ধারা 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে বাঁধভাঙা স্রোতের মতো ভিতরে ঢুকতে শুরু করলেন। যা ছিল এক নজীরবিহীন ভয়াল চিত্র! মুহূর্তেই উভয়পক্ষের মধ্যে পুনরায় ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। মুসলমানদের প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে মুসায়লামাতুল কায্যাবের বাহিনী প্রাণ ভয়ে দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে লাগল আর মুসলিম যোদ্ধারা এ সুযোগে তাদেরকে দলে দলে নিঃশেষ করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত সেখানে মুসায়লামাতুল কায্যাবের অবশিষ্ট বিশ হাজার সৈন্যের কবর রচনা করে তার দেহরক্ষী বাহিনীসহ তাকে ঘিরে ফেলে সবাইকে জাহান্নামের অতল গহবরে নিক্ষেপ করা হলো। সমস্ত বাগান বিশ হাজার মুরতাদের লাশের স্তূপে পরিণত হয়ে গেল।
অন্যদিকে এই দুঃসাহসী বীর যোদ্ধা বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, যিনি এ গেট খুলতে গিয়ে আশিটির অধিক তীর, বর্ষা ও তরবারির আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিলেন, তাঁকে বিশেষ চিকিৎসার জন্যে চিকিৎসা তাঁবুতে প্রেরণ করা হলো। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দীর্ঘ এক মাস ধরে নিজে বারা'আ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিদমতে নিয়োজিত থাকলেন। ধীরে ধীরে বারা'আ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সুস্থ হয়ে উঠলেন। তাঁর এই মহান ত্যাগ, এবং কুরবানীর বদৌলতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁরই হাতে মুসলমানদের এ যুদ্ধে বিজয় দান করে জাযীরাতুল আরবকে চিরদিনের জন্যে ভণ্ডনবী ও মুরতাদদের হাত থেকে পবিত্র করলেন।
মুসায়লামাতুল কায্যাব বাহিনীর সাথে ইয়ামামার প্রান্তরে 'হাদীকাতুল মাউতের' রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শাহাদাতের মৃত্যুর গৌরব থেকে মাহরুম হয়ে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শাহাদাতের তামান্নায় পরবর্তীতে একের পর এক সকল যুদ্ধে বীরত্বের সাথে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর জীবনের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা যে, তিনি যেন শাহাদাতের মৃত্যুর মাধ্যমে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে জান্নাতে মিলিত হতে পারেন।
সর্বশেষে তিনি পারস্য সাম্রাজ্যের সাথে মুসলমানদের 'তুস-তর' কেল্লা বিজয়ের জিহাদে অংশ গ্রহণ করেন। সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের এক পর্যায়ে পারস্য সৈন্যরা দুর্ভেদ্য 'তুস-তর' কেল্লায় আশ্রয় নিয়ে ভিতর থেকে এর বিশাল গেটটি বন্ধ করে দেয়। মুসলিম যোদ্ধারা এই কেল্লার চারপার্শে অবস্থান নিয়ে কেল্লাটিকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ধীরে ধীরে সব রসদ ও সরঞ্জামাদি নিঃশেষ হয়ে আসলে পারস্য বাহিনী জীবন রক্ষার লড়াইয়ে এক ধ্বংসাত্মক কৌশল অবলম্বন করে। তারা লম্বা শিকলের মাথায় মাছ ধরা বড়সির মতো লৌহ নির্মিত বড় বড় আংটাগুচ্ছ আগুনে পুড়িয়ে লাল করে নেয়। কেল্লার উপর থেকে মুসলমানদের উপরে তা নিক্ষেপ করে। প্রাচীর টপকে ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করা মাত্রই তাতে আটকিয়ে যাওয়া মুসলিম যোদ্ধাদের ক্রেনের মতো উপরে টেনে তুলে নিতে শুরু করে। এভাবে বেশ ক'জন মুসলিম যোদ্ধা আগুনে পোড়ানো আংটার নির্মম শিকারে পরিণত হন। অকস্মাৎ একটি আংটাগুচ্ছ বারা'আ বিন্ মালেকের বড় ভাই আনাস বিন্ মালেক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দেহে বিঁধে তাকে তুলে নিতে শুরু করে। বারা'আ বিন মালেক আল আনসারী কালবিলম্ব না করে এক লাফে এক হাতে শিকলটিকে ধরে ফেলে, ঝুলন্ত অবস্থায় অন্য হাতে আনাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শরীরে বিদ্ধ গরম আংটা খুলতে শুরু করেন। লাল টকটকে পোড়া আংটার দাহে তাঁর হাতের গোশ্ত পুড়ে ধোয়া বের হতে লাগলো। কিন্তু তিনি তাঁর আক্রান্ত হাতের অসহ্য কষ্টের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে আনাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আংটার হাত থেকে ছাড়ানোমাত্রই এক লাফে নীচে নেমে আসেন। তখন তাঁর পোড়া হাতে শুধু হাড়গুলো ছাড়া আর কোনো গোস্ত অবশিষ্ট ছিল না।
এই 'তুস-তর' কেল্লা বিজয়ের যুদ্ধে তিনি আল্লাহর দরবারে শাহাদাতের জন্যে দু'আ করেছিলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর এই দু'আ কবুল করে নেন। এ যুদ্ধেরই এক পর্যায়ে তিনি শত্রুর তরবারির আঘাতে শাহাদাতের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বহু আকাঙ্ক্ষিত শাহাদাতের মাধ্যমে তিনি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সান্নিধ্যের পথ রচনা করে পরবর্তী উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্যে প্রেরণা সৃষ্টি করে যান।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাতে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারীর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করুন ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দর্শনে তার চক্ষুদ্বয় শীতল করুন, ইসলামের খিদমতের জন্যে আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন। আমীন।
টিকাঃ
১. আল ইসাবা, ৬২০ নং জীবনী। ২. আল ইসতিয়াব বি হামেশে আল ইছাবা, ১ম খণ্ড, ১৩৭ পৃ.। ৩. আত্ তাবাকাতুল কুবরা, ৩য় খণ্ড, ৪৪১ পৃষ্ঠা, ৭ম খণ্ড, ১৭ পৃষ্ঠা এবং ১৩১ পৃ.। ৪. তারিখ আত্ তাবারী, ১০ম খণ্ডের সূচী দ্রষ্টব্য। ৫. আল কামিল ফিত্ তারিখ, সূচি দ্রষ্টব্য। ৬. আস সিরাতু আন্ নববীয়্যাহ, ইবনি হিশাম, সূচি দ্রষ্টব্য। ৭. হায়াতুস সাহাবা, ৪র্থ খণ্ড, সূচী দ্রষ্টব্য। ৮. কা'দাতু ফাতহু ফারেছ-লশিত খাত্তাব।
📄 উম্মু সালামা (রাঃ)
'তুমি তোমার অভিজাত মন সম্পর্কে যা বলেছ, আমি আল্লাহর কাছে দু'আ করছি, আল্লাহ যেন তোমার অন্তর থেকে তা দূর করে দেন এবং তুমি তোমার বৃদ্ধাবস্থায় পদার্পণের যে কথা বলেছ, আমিও তো বয়সের দিক দিয়ে তোমার মতো বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। আর তুমি তোমার সন্তান সম্পর্কে চিন্তা করছ? এখানে তোমার সন্তানতো আমারই সন্তান।' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
প্রিয় পাঠক! উম্মু সালামা সম্পর্কে কি কিছু জানেন? কে এই মহিয়সী মহিলা? তিনি ছিলেন মুসলিম নারীকূলের গর্ব উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন প্রসিদ্ধ মহিলা সাহাবী। তাঁর আসল নাম ছিল হিন্দ। উম্মু সালামা তাঁর ডাক নাম। পরবর্তী সময়ে তিনি উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদা লাভ করেন এবং ডাক নামেই বেশী পরিচিত হন।
উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার পিতা ছিলেন বনু মাখযূম গোত্রের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা। তিনি তৎকালীন আরবের হাতেগোনা কয়েকজন দানবীর ব্যক্তির অন্যতম ছিলেন। এই দানশীলতার জন্যে তাঁকে 'সফর সামগ্রীর যোগানদাতা'ও বলা হতো। কারণ কোনো মুসাফির তাঁর সাথে ভ্রমণ করলে অথবা তাঁর বাড়িতে অবস্থান নিলে সেই মুসাফিরের কোনো সফর সামগ্রীর প্রয়োজন হতো না।
উম্মু সালামার স্বামী ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আবদিল আসাদ। তিনি ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম সম্মানিত দশজন সাহাবীর অন্যতম। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং আরও দু'একজন সাহাবী ছাড়া তাঁর আগে আর কেউ ইসলাম গ্রহণ করেননি।
উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা তাঁর স্বামীর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনিও ছিলেন দ্বিতীয় ইসলাম গ্রহণকারী মহিলাদের অন্যতম। উম্মু সালামা ও তাঁর স্বামীর ইসলাম গ্রহণের খবর চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে কুরাইশদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। উম্মু সালামাদের উপরও নেমে আসে কঠিন ও অবর্ণনীয় নির্যাতন। সে নির্যাতনের বর্ণনা কোনো পাষাণ হৃদয়ের মানুষও যদি শোনে তাহলে তাঁর হৃদয়ও বিগলিত না হয়ে পারে না; কিন্তু উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা ও তাঁর স্বামী এত নির্যাতনের পরও বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি এবং কোনো প্রকার দুর্বলতা ও সংশয় তাঁদের স্পর্শ করেনি। তাঁরা কঠিন নির্যাতনের সময় ধৈর্য ও ত্যাগের অনুপম নজীর স্থাপন করেছেন।
মক্কায় ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম কাতারের সাহাবীদের উপর এভাবে চলছিল জুলুম-নিপীড়ন ও নির্যাতনের স্টীম রোলার। জান-মালের এক চরম নিরাপত্তাহীনতা- জাহিলী যুগের বর্বরতার এ এক ভয়াল ও করুণ চিত্র।
প্রতিনিয়তই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কানে ভেসে আসছিল সাহাবীদের ওপর নির্যাতনের রোমহর্ষক আর্তনাদ। সাহাবীদের জান-মালের হেফাযতের জন্যে তিনি দারুণভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। উপায়ান্তর না দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়া বা আবিসিনিয়া) হিজরতের অনুমতি দিলেন। ঈমানের হেফাযতের জন্য অনিশ্চিত নিরাপত্তার প্রত্যাশায় অন্যান্যের মতো উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এবং তাঁর স্বামীও হাবশায় হিজরত করেন।
উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা ও তাঁর স্বামী তাঁদের সুউচ্চ অট্টালিকা, বংশীয় প্রতিপত্তি এবং অঢেল ধন-সম্পদ সবকিছু ফেলে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, স্বাধীনভাবে তাঁর ইবাদত ও পারলৌকিক পুরস্কারের প্রত্যাশায় হাবশায় বাদশাহ নাজ্জাশীর নিরাপত্তা ও আশ্রয়ে খুবই শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।
বিশ্ব মানুষের কল্যাণ, মুক্তি এবং হেদায়াতের জন্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ওহী নাযিলের স্থান হিসেবে পছন্দ করেছিলেন মক্কা মুআয্যমা। এই মক্কা নগরী ত্যাগের যে কী মর্মজ্বালা! সেই মর্মজ্বালা একমাত্র তাঁরাই উপলব্ধি করেছেন, যারা নির্যাতনে জর্জরিত হয়েও মক্কায় ছিলেন এবং প্রাণাধিক প্রিয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র চেহারা মোবারক দেখে আর তাঁর সঙ্গে মুসাফাহায় ও আলিঙ্গনে হৃদয় শীতল করে সকল দুঃখ-যাতনা ভুলে যেতেন। তাঁরা সেই প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য হতে বঞ্চিত হয়ে হাবশায় নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে থাকেন। বিচ্ছিন্নতার দুশ্চিন্তাই ছিল তাঁদের সাথী। এই নিঃসঙ্গতা ও দুর্ভাবনাকে যদিও হাবশার বাদশাহ নাজ্জাসীর সার্বিক সহযোগিতা অনেকাংশে লাঘব করতো তবুও তাঁদের মনে ছিল নিদারুণ উৎকণ্ঠা ও ব্যাকুলতা।
কিছুদিন যেতে না যেতেই লোক মারফত মক্কায় ইসলামের দ্রুত প্রসারের সুখবর হাবশায় গিয়ে পৌঁছতে থাকে। তাঁরা জানতে পারেন, কুরাইশদের লৌহমানব হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব, তেজস্বী মহাবীর উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমসহ বহু প্রভাবশালী নেতৃস্থানীয় মক্কাবাসী ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার কারণে মুসলমানদের উপর থেকে কুরাইশদের নির্যাতন ও নিপীড়নের মাত্রা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। এ খবর শুনে মুহাজিরদের অনেকেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে পুণ্য স্মৃতিবিজড়িত মাতৃভূমি মক্কায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন এবং মক্কার উদ্দেশ্যে হাবশা ত্যাগ করেন। এই প্রত্যাবর্তনকারী কাফেলার সাথে উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এবং তাঁর স্বামীও ছিলেন।
হাবশা থেকে প্রত্যাগত সাহাবীগণ মক্কায় এসে বাস্তবে প্রত্যক্ষ করেন যে, মক্কায় ইসলাম সম্প্রসারণ এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে যেসব খবর তাঁরা হাবশায় বসে পেয়েছিলেন তা ছিল অতিরঞ্জিত। হামযা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইসলাম গ্রহণ কুরাইশদের প্রতিষ্ঠিত পৌত্তলিক সমাজ কাঠামোর ওপর ছিল একটি প্রচণ্ড আঘাত। কুরাইশদের আশঙ্কা- এভাবে অনবরত যদি সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা ইসলামের অনুসারী হয়ে যান, তাহলে তাদের প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থার পতন অনিবার্য। বিষয়টি তাদের কাছে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো ছিল। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, যে কোনোভাবে মুসলমানদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে হবে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তারা মুসলমানদের প্রতি অধিকতর হিংস্র হয়ে উঠে এবং সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও দৈহিক নির্যাতনের মাত্রা পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ও ভয়াবহতা লক্ষ্য করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার মুসলমানদের মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ দেন। কুরাইশদের সীমাহীন নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মদীনা হিজরতকারী দলের সাথে উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এবং তাঁর স্বামীও অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন; কিন্তু তাদের জন্যে হাবশার মতো মদীনায় হিজরত করা এতো সহজ ছিল না। এবারের হিজরত ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপদসংকুল। পদে পদে বিপদ-মুসীবত, জীবনের ঝুঁকি এবং সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট তাঁদেরকে অক্টোপাসের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে।
মদীনা হিজরতের দুঃখ-কষ্টের করুণ কাহিনী উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার ভাষায় ছিল:
'আমার স্বামী আবূ সালামা অতি সঙ্গোপনে মদীনা হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন। প্রয়োজনীয় কাজ সমাপ্ত করে তিনি আমার জন্যে একটি উটও প্রস্তুত রাখেন। অতি সতর্কতার সাথে সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে আমাদের একমাত্র ছেলে সালামাকে কোলে নিয়ে আমি উটের পিঠে সওয়ার হই। সাথে সাথে আমার স্বামী এদিক-সেদিক চিন্তা না করে দ্রুতগতিতে মদীনার উদ্দেশ্যে উট চালনা করতে থাকেন। চালকের সংকেত পাওয়ামাত্রই উটটিও তার স্বাভাবিক গতির চেয়ে আরও অধিক গতিতে এগিয়ে চলে। আমরা মক্কার সীমান্ত অতিক্রম করতে যাচ্ছি, ঠিক এ সময়ে আমার নিজ গোত্র বনু মাখযূমের কিছু লোক আমাদের দেখে ফেলে এবং গতিরোধ করে। তারা আমার স্বামী আবূ সালামাকে উদ্দেশ্যে করে বলে:
'তুমি যদি আমাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে চলে যেতেও সক্ষম হও তাতেই বা কী আসে যায়? কিন্তু তোমার স্ত্রী? সে তো আমাদের বংশের মেয়ে। তুমি চাইলেই কি আমরা তাকে তোমার সাথে যেখানে খুশি যেতে দেব? আর সে চাইলেই কি তোমার সাথে ইয়াসরিবে চলে যেতে পারবে?
'এই বলেই তারা আমার স্বামীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তারা আমার স্বামীর নিকট থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়। অতঃপর তারা আমাকে নিয়ে মক্কায় রওয়ানা হয়। ঠিক এ সময়ে আমার স্বামীর গোত্র আবুল আসাদের কিছু লোকজন ঘটনাক্রমে সেখানে এসে পৌছে। তারা দেখতে পায় যে, আমার স্বগোত্রীয় লোকজন আমার স্বামী থেকে আমাকে ও আমাদের সন্তানকে জোরপূর্বক মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এতে তারা ভীষণ ক্ষুব্ধ হয় এবং তারা আমার গোত্রের লোকদের বলে:
'তোমরা যেহেতু আমাদের গোত্রের আবূ সালামা থেকে তোমাদের মেয়েকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছ, সেহেতু আমাদের গোত্রের শিশু সন্তানকে তোমাদের সাথে যেতে দিতে পারি না। সে আমাদের বংশের ছেলে। তাই আমরাই তার বৈধ উত্তরাধিকারী।'
'এই উত্তরাধিকারীর দাবিতে উভয় গোত্রের লোকজনের মধ্যে আমার ছেলে সালামাকে নিয়ে ভীষণ বাক-বিতণ্ডার সৃষ্টি হয় এবং এক পর্যায়ে আমার স্বামীর গোত্রের লোকজন সালামাকে ছিনিয়ে নেয়। এই হাঙ্গামা এবং আক্রমণ পাল্টা-আক্রমণের এক পর্যায়ে আমি আমার স্বামী ও সন্তান থেকে মুহূর্তের মধ্যেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি।
'এদিকে আবূ সালামা আমার গোত্রীয় লোকজনের আক্রমণ থেকে কোনোমতে রক্ষা পেয়ে জীবন ও দীনের হেফাযতের উদ্দেশ্যে মদীনার দিকে চলে যান। এভাবেই আমি আমার গোত্রের লোকজনের হাতে বন্দী হয়ে পড়ি। অপরদিকে দুগ্ধপোষ্য সন্তান সালামা তার স্বগোত্রীয় লোকদের রক্ষণাবেক্ষণে চলে যায়।
'ক্ষণিকের মধ্যেই আমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় ও মধুর দাম্পত্য জীবনে নেমে আসে নানা বিপদ, শঙ্কা ও উদ্বেগ। আমাদের কলিজার টুকরা সন্তানটিও হৃদয়হীন হিংস্র দস্যুদের অন্যায়ের শিকারে পরিণত হয়। আমার এই বিরহ-বেদনার মর্মজ্বালা এবং বুকফাটা আর্তনাদে আকাশ-বাতাসও যেন ভারী হয়ে উঠে।
'আমার গোত্রের লোকেরা আমাকে এভাবে পাহারা দিয়ে রাখত, যেন তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে আমি মক্কার সীমানা অতিক্রম করে যেতে না পারি। কিন্তু প্রতিদিন আমি স্বামী ও সন্তানের বিরহ-বেদনার সীমাহীন যন্ত্রণা বুকে নিয়ে খুব প্রত্যুষেই ছুটে যেতাম 'আবতাহ' নামক উপত্যকার সেই স্মৃতি বিজড়িত স্থানে যেখান থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। সন্তান ও স্বামীকে ফিরে পাবার বুকভরা আশা নিয়ে সেখানে বসে হা-হুতাশ ও কান্নাকাটি করতাম। আল্লাহর দরবারে সারাটা দিন আহাজারিতে রত থাকতাম।
এমনিভাবে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেই উত্তপ্ত উপত্যকায় আমার কান্নাকাটির প্রায় একটি বছর অতিক্রান্ত হলো। হঠাৎ একদিন আমার চাচার বংশের একজন লোকের নেক নজরে পড়ে গেলাম। আমার আর্তনাদ তার হৃদয়ে দয়ার উদ্রেক করল। তার করুণা ও স্নেহ বাৎসল্য এই যন্ত্রণাদগ্ধ উপত্যকায় আমার জন্যে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ স্বরূপ অনুভূত হলো।
তিনি অত্যন্ত আবেগের সাথে আমার গোত্রের লোকদের উপর চাপ সৃষ্টি করলেন এবং তাদের বললেন:
'এই নিরীহ মেয়েটিকে কি তোমরা মুক্তি দেবে না? কী যে নির্মম আচরণ তোমরা তার সাথে অব্যাহতভাবে করছ! পশুত্বেরও একটি সীমা আছে। অত্যন্ত নির্দয়ভাবে তোমরা তাকে তার স্বামী ও সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছ। আর কতদিন তোমরা তাকে এভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে চাও?'
'মহান রাব্বুল আলামীনের অশেষ মেহেরবানীতে তার এ কথায় আমার গোত্রের লোকজনের পাষাণ হৃদয়ে একটু দয়া ও অনুকম্পার সৃষ্টি হলো। তার এই হৃদয়গ্রাহী নিবেদন ও চাপ সৃষ্টির এক পর্যায়ে তারা আমাকে আমার স্বামীর নিকট চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিল। তারা আমাকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিল:
'যদি ইচ্ছে করো তাহলে তুমি তোমার স্বামীর নিকট চলে যেতে পার।'
'স্বামীর নিকট চলে যাওয়ার' এ অনুমতি একদিকে যেমন আমার পেরেশানী কিছুটা লাঘব করল অন্যদিকে যেন আমার দুঃশ্চিন্তার মাত্রা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। আমার একমাত্র ছেলে সালামাকে মক্কায় বনূ আসাদ গোত্রের লোকদের হাতে বন্দী রেখে আমি কী করে মদীনায় আমার স্বামীর কাছে যেতে পারি? কী করে নিজের মনকে প্রবোধ দিতে পারি? তখন চোখের পানিও শুকিয়ে যাচ্ছিল, কলিজা ফেটে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল এই বেদনায় যে, আমার ছেলেকে মক্কায় রেখে আমি কি মদীনায় হিজরত করে মনে শান্তি পাব? এসব চিন্তায় আমি পাগলপারা হয়ে যাচ্ছিলাম।
'আল্লাহর মেহেরবানীতে কিছু হৃদয়বান লোক আমার এই করুণ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে তাদের সহানুভূতির হাত আমার দিকে প্রসারিত করল। তারা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে বনূ আসাদ গোত্রের নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করে আমার ছেলে সালামাকে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তাদেরকে রাজি করাতে সক্ষম হলো। এভাবে আমার নয়নের মণি সালামাকে আমি ফিরে পেলাম।
'ছেলে সালামাকে ফিরে পেয়েই মদীনায় যাওয়ার জন্যে একজন সফর সঙ্গীর অপেক্ষা করছিলাম। আমার ভয় হচ্ছিল যে, বিলম্বের কারণে আবার না জানি কোন্ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে স্বামীর সান্নিধ্য লাভে ব্যর্থ হই। অতএব কালবিলম্ব না করে আমি নিজেই বাহন উটটিকে সফরের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করলাম এবং কাউকে না পেয়ে একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করে আমার শিশু পুত্রসহ একাই রওয়ানা হয়ে গেলাম।
'মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে 'তানয়ীম' নামক স্থানে খানায়ে কাবার চাবি সংরক্ষণকারী ওসমান ইবনে তালহার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়।
তিনি আমাকে দেখে বললেন: 'হে সফর সামগ্রীর যোগানদাতার মেয়ে, তুমি কোথায় যাচ্ছ?' আমি উত্তর দিলাম, 'স্বামীর সাথে মিলিত হওয়ার প্রত্যাশায় মদীনায় যাচ্ছি।' তিনি বললেন, 'তোমার সাথে কি কোনো সফরসঙ্গী নেই?'
উত্তরে আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম, আল্লাহ এবং আমার এই শিশু সন্তান সালামা ব্যতীত আমার সাথে আর কেউ নেই।'
আমার এই জওয়াব শুনে তিনি বললেন : 'আল্লাহর শপথ! এ অবস্থায় আমি তোমাকে একাকী যেতে দিতে পারি না। তুমি নিশ্চিন্ত হও যে, অবশ্যই আমি তোমাকে মদীনা পর্যন্ত পৌঁছে দেব।'
'এই বলে তিনি তাঁর নিজের গতি পরিবর্তন করে আমার উটের রশি ধরে মদীনার পথ ধরে চলতে থাকলেন। আল্লাহর শপথ! তাঁর মতো ভদ্র, চরিত্রবান ও আমানতদার সফরসঙ্গী এই জীবনে আর কখনো দেখিনি। যখন আমরা কোনো মঞ্জিলে পৌঁছতাম, তখন তিনি উটকে বসার নির্দেশ দিয়ে আমার দিকে না তাকিয়ে দূরে চলে যেতেন। আমি যেন সহজে উট থেকে অবতরণ করতে পারি। আমি উটের পিঠ থেকে নেমে গেলে তিনি এসে উটটিকে কোনো গাছের সাথে বেঁধে দিয়ে পুনরায় দূরে অন্য কোনো গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতেন। আবার যখন আমাদের রওয়ানা হওয়ার সময় হত, তখন তিনি উটকে প্রস্তুত করে আমার নিকটে এসে বসিয়ে দিয়ে নিজে সরে যেতেন এবং আমি ঠিকভাবে বসে আওয়াজ দিলে তিনি এসে রশি ধরে পথচলা শুরু করতেন।
'ক্রমাগত কয়েকদিন এভাবে আমরা মঞ্জিলের পর মঞ্জিল অতিক্রম করে মদীনার কাছে এসে পৌঁছলাম। মদীনা হতে মাত্র দু'মাইল দূরে 'কোবা' নামক স্থানে বনূ ওমর বিন আউফ গোত্রের লোকজনের সাথে আমার স্বামীর বসবাস করার খবর নিশ্চিতভাবে জানলাম। ওসমান বিন তালহা আমাকে বললেন:
'আল্লাহর উপর ভরসা করে তুমি এই গ্রামে প্রবেশ করো, এখানে তোমার স্বামী বসবাস করছেন।'
'অতঃপর ওসমান ইবনে তালহা আমাকে সহীহ-সালামতে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়ে খুশিমনে মক্কার পথে রওয়ানা হয়ে গেলেন।'
ত্যাগ-তিতিক্ষা, কুরবানী ও বিচ্ছিন্নতার বিরহ-বেদনার এক দীর্ঘ ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটল। সীমাহীন ঘাত-প্রতিঘাতের পর উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা তাঁর হারানো স্বামীকে পেয়ে চক্ষু শীতল করলেন। সালামার পিতাও তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় ছেলে ও স্ত্রীকে পেয়ে ধন্য হলেন।
কিছুদিন যেতে না যেতেই বদর যুদ্ধের রণ-দামামা বেজে উঠল। অন্যান্য সাহাবীদের মতো বীর বিক্রমে আবূ সালামাও এ জিহাদে অংশ নিলেন। অসাধারণ বীরত্ব ও যুদ্ধ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে অন্যান্য সাহাবীদের ন্যায় তিনিও বিজয়ীর বেশে ফিরে এলেন।
এদিকে বছর পার হতে না হতেই ওহুদের যুদ্ধের ডাক এসে গেল। সশর যুদ্ধের চেয়ে আরও অধিক বীর বিক্রমে আবূ সালামা ওহুদের রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ওহুদ যুদ্ধের নিশ্চিত বিপর্যয়কে রোধ করতে তিনি জীবনের মায়া ত্যাগ করে তাঁর সাথী-সঙ্গীদের নিয়ে মুশরিকদের পশ্চাৎপসরণে বাধ্য করেন। কিন্তু এ যুদ্ধে তিনি নিজে মারাত্মকভাবে আহত হলেন। তাঁর সমস্ত শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেল। দ্রুত তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু তার শরীরের মারাত্মক ক্ষতস্থানগুলোর উপরদিক শুকিয়ে উঠলেও ভিতরে পচন ধরে গিয়েছিল। ফলে এই মর্দে মুজাহিদ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। চিকিৎসার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার পরও তিনি ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়ছিলেন। এ অবস্থায় তিনি তাঁর স্ত্রী উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে এই বলে সান্ত্বনা দিতেন :
'আমি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট শুনেছি, কেউ যদি কোনো বিপদের সম্মুখীন হয় তাহলে দুঃশ্চিন্তা না করে সে যেন বলে, 'ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।'
কারণ, আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার অনুভূতিই মুমিনের জীবনে বিপদের মুহূর্তে প্রশান্তি দিতে পারে। তিনি এই বলেও প্রার্থনা করতে বলেছেন: اللَّهُمَّ عِنْدَكَ احْتَسَبْتُ مُصِيبَتِي هُذِهِ اللَّهُمَّ اخْلِقْنِي خَيْرًا مِّنْهَا إِلَّا عَطَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ .....
'হে আল্লাহ! আমি আমার এই বিপদে তোমার কাছেই প্রতিদান চাচ্ছি। তুমি আমাকে এর চাইতেও উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করো, আল্লাহ অবশ্যই তাকে তা দান করবেন।'
আবূ সালামার অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছিল। একদিন সকালে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে দেখার জন্যে তাশরীফ আনলেন। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নিয়ে যখন তিনি প্রত্যাবর্তন করছিলেন, ঠিক সে মুহূর্তেই আবূ সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে তাঁর চোখ দুটি বুঁজিয়ে দিলেন এবং আল্লাহর কাছে এই বলে প্রার্থনা করলেন:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِأَبِي سَلَمَةَ، وَارْفَعْ دَرَجَتَهُ فِي الْمُقَرَّبِينَ وَاخْلُقَهُ فِي عَقِيهِ فِي الْغَابِرِينَ وَاغْفِرْ لَنَا وَلَهُ يَا رَبِّ الْعَلَمِينَ، وَافْسِحْ لَهُ فِي قَبْرِهِ ، وَنُورَ لَهُ فِيهِ.
'হে আল্লাহ! তুমি আবূ সালামার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দাও, তাঁর মর্যাদাকে বৃদ্ধি করে তোমার প্রিয় ও নিকটতম বান্দাহদের অন্তর্ভুক্ত করো, তাঁর পরিবার-পরিজনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করো এবং তাঁকে ও আমাদের সকলকে ক্ষমা করো। তাঁর কবরকে আলোকিত ও প্রশস্ত করে দাও।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তার স্বামী কর্তৃক বর্ণিত সেই দু'আ উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার স্মরণ হলো। তিনি- 'হে আল্লাহ বিপদে তোমার কাছেই এর প্রতিদান চাচ্ছি'- পর্যন্ত বলে থমকে গেলেন এবং মনে মনে বললেন:
'আবূ সালামার চেয়ে উত্তম জীবন সঙ্গী আর কে হতে পারে?'
এ চিন্তা করতে করতে দু'আর শেষ পর্যন্ত বললেন। এ দু'আর ফলাফল তড়িৎগতিতে তার সামনে এল। অর্থাৎ দেখতে না দেখতেই উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার দু'আ বাস্তবে প্রতিফলিত হলো।
উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার স্বামীর মৃত্যুতে সমস্ত মুসলমান শোকাভিভূত হলেন, যা অতীতে কারো মৃত্যুতে এমনটি হয়নি। উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার সীমাহীন দুঃখ-কষ্টে সমবেদনা জানাতে গিয়ে তাঁকে মুসলমানগণ 'আইয়্যিমুল আরাব' বা 'আরব জাতির বিধবা'- এই সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত করলেন।
আরবের ঐতিহ্যবাহী, সম্পদশালী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার মদীনায় একমাত্র শিশুসন্তানকে দেখা-শোনার আর কেউ অবশিষ্ট রইল না। মদীনার এই ইসলামী রাষ্ট্রের আনসার এবং মুহাজিরগণ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলকভাবে উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার খোঁজ-খবর নিতে লাগলেন। স্বামীর মৃত্যুর 'ইদ্দত' শেষ হতে না হতেই আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পক্ষ হতে উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এ প্রস্তাব গ্রহণে অসম্মতি জানান।
অতঃপর ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার নিকট অনুরূপ প্রস্তাব প্রেরণ করেন; কিন্তু তাতেও উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের মতোই অসম্মতি জ্ঞাপন করেন।
আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মতো মর্যাদাবান জালীলুল কদর সাহাবীদ্বয়ের প্রস্তাবে অসম্মতি জানালে এই ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত বংশের বিধবাকন্যার ভবিষ্যৎ জীবনকে সুখময় করার নিমিত্তে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রস্তাব পেয়ে তিনি বললেন: 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার মধ্যে তিনটি এমন দুর্বলতা রয়েছে, যার কারণে আপনার এই মহান প্রস্তাব গ্রহণে আমি বড়ই সংকোচ বোধ করছি। প্রথমত, আমি আভিজাত্যের অহংকারে অহংকারী মেয়ে। আপনি যদি আমার এই আভিজাত্য মনোভাব দেখে বিরক্ত বোধ করেন তাহলে আমি আল্লাহ পাকের আযাবে নিপতিত হব। দ্বিতীয়ত, আমি এমন একজন মহিলা, যে বৃদ্ধা বয়সে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, একটি সন্তান রয়েছে।'
এই তিন শর্ত শ্রবণে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'তুমি তোমার অভিজাত মন সম্পর্কে যা বলেছ, আমি আল্লাহর কাছে দু'আ করছি, আল্লাহ যেন তোমার অন্তর থেকে তা দূর করে দেন এবং তুমি তোমার বৃদ্ধাবস্থায় পদার্পণের যে কথা বলেছ, আমিও তো বয়সের দিক দিয়ে তোমার মতো বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। আর তুমি তোমার সন্তান সম্পর্কে চিন্তা করছ? এখানে তোমার সন্তানতো আমারই সন্তান।'
অতঃপর উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। এভাবেই মহান আল্লাহ আবূ সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার বর্ণিত দু'আ বাস্তবায়িত করলেন এবং তাঁর পূর্বের স্বামীর চেয়ে শ্রেষ্ঠতম স্বামী দান করে উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে মহিমান্বিত করলেন। তখন থেকে তিনি সম্ভ্রান্ত বনু মাখযূম গোত্রের মেয়ে হিসেবে অথবা উম্মু সালামা হিসেবে প্রসিদ্ধ না হয়ে কিয়ামত পর্যন্ত সকল মু'মিনদের মাতা বা 'উম্মুল মুমিনীন' খেতাবে ভূষিত হলেন।
আল্লাহ বেহেশতে উম্মুল মুমিনীন উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার মর্যাদা বাড়িয়ে দিন এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন। আমীন!
টিকাঃ
১. আল ইসাবা, ২৪০-২৪২ পৃ.। ২. আল ইসতিয়াব, ২য় খণ্ড, ৭৮০ পৃ.। ৩. উসুদুল গাবা, ৫ম খণ্ড, ৫৫৮-৫৯৮ পৃ.। ৪. তাহযীব আত্ তাহযীব, ১২ খণ্ড, ৪৫৫-৪৬৫ পৃ.। ৫. সিফাতুস্-সাফওয়া, ২য় খণ্ড, ২০-২১ পৃ.। ৬. তাকরিবুত্ তাহযীব, ২য় খণ্ড, ৬২৭ পৃ.। ৭. শিজরাতুজ যাহাব, ১ম খণ্ড, ৬৯-৭০ পৃ.। ৮. তারিখুল ইসলাম লিয-যাহাবী, ৩য় খণ্ড, ৯৭-৯৮ পৃ.। ৯. আল বিদায়া ওয়া আন্ নিহায়া, ৮ম খণ্ড, ২১৪-২১৫ পৃ.। ১০. আল্ এ'লাম এবং ওহার মুরাজিয়াহু, ৯ম খণ্ড, ১০৪ পৃ.।
📄 হুযামা ইবনে উছাল (রাঃ)
'হে ছুমামা! তোমার অতীতকর্মের জন্যে তুমি এখন আর নিন্দিত নও। কারণ, ইসলাম গ্রহণের ফলে ব্যক্তির অতীতের সমস্ত পাপ মুছে যায়।' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
ষষ্ঠ হিজরীতে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহির্বিশ্বে ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারণের কাজে মনোনিবেশ করেন। এ লক্ষ্যে তিনি সমকালীন আরব ও অনারব বিশ্বের মোট আটটি দেশের রাজা-বাদশাহ'র কাছে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে দূত মারফত চিঠি প্রেরণ করেন। এই আটজন রাজা-বাদশাহর মধ্যে ছুমামা ইবনে উছাল আল হানাফী অন্যতম। সে একাধারে বনূ হুনাইফা গোত্রের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা এবং ইয়ামামা নামক রাষ্ট্রের অত্যন্ত পরাক্রমশালী ও স্বৈরাচারী বাদশাহ। এ রাজ্যে তার হুকুম অমান্য করার সাধ্য কারো ছিল না।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ দূত-মারফত প্রেরিত চিঠিকে ইয়ামামার বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল অত্যন্ত তাচ্ছিল্য ও ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করে। সে আল্লাহর দাসত্ব এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যের মাধ্যমে ইহকালীন শান্তি ও পারলৌকিক মুক্তি ও কল্যাণের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে গর্ব ও অহঙ্কারে মেতে উঠে বলে:
'আমার মতো প্রভাবশালী ইয়ামামার বাদশাহকে আনুগত্যের আহ্বান জানিয়ে মুহাম্মদ নিরাপদে বসবাস করবে? এ কী করে সম্ভব?'
রাগে, ক্ষোভে ও অহমিকায় প্রায় উন্মাদ হয়ে সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র আঁটতে শুরু করে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর দাওয়াতকে দুনিয়া থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারলেই তার আত্মমর্যাদা রক্ষা পাবে- এটাই ছিল তখন তার একমাত্র অভিপ্রায়।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিদ্রিতাবস্থায় অথবা অন্য কোনো অসতর্ক মুহূর্তে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ইয়ামামার বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল মদীনায় গিয়ে পৌঁছল। চোরাগুপ্তা হামলার মাধ্যমে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার জন্যে সে ওৎ পেতে থাকে। এমনিভাবে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক অসতর্ক মুহূর্তে ছুমামা প্রায় তাঁকে হত্যাই করে ফেলত, যদি তাঁর চাচা তাকে এর ঠিক পূর্বমুহূর্তে এ কাজ থেকে বিরত না করত। রাসূলুল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করা থেকে বিরত হলেও তার হামলা থেকে কয়েকজন সাহাবী রক্ষা পেলেন না। ব্যর্থতার গ্লানিকে মুছে ফেলার জন্য রাতের আঁধারে সাহাবীদের উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে ছুমামা ইবনে উছাল ইয়ামামায় পালিয়ে গেল।
সাহাবায়ে কেরামের উপর এই নির্মম ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। এভাবে চোরাগুপ্তা হামলার মাধ্যমে হত্যা করার দুঃসাহস যেন আর কেউ করতে না পারে সে জন্যে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুমামা ইবনে উছালকে হত্যার মাধ্যমে এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন।
এ ঘটনার কিছুদিন পর ইয়ামামার সেই বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সদলবলে মক্কার পথে রওয়ানা হলো। তার উদ্দেশ্য ছিল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের হত্যার সাফল্যে আনন্দিত হয়ে সে খানায়ে কাবা তাওয়াফ করবে এবং কৃতজ্ঞতাস্বরূপ দেবতাদের সম্মানার্থে পশু বলি দেবে।
চোরাগুপ্তা হামলা ও নবপ্রতিষ্ঠিত ক্ষুদে ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর শত্রু পক্ষের সম্ভাব্য আকস্মিক হামলা প্রতিরোধ করার জন্যে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকায় যথাযথ পাহারার ব্যবস্থা করলেন। সশস্ত্র ছোট ছোট গ্রুপের মাধ্যমে শত্রুদের গতিবিধির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখার জন্য ঐসব স্থানে নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা করা হলো।
এদিকে ইয়ামামার সেই বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল তার দলবল নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে বিকল্প পথ না থাকায় অত্যন্ত সঙ্গোপনে মদীনার নিকটবর্তী ঐ একমাত্র পথ ধরে রাতের আঁধারে মক্কার দিকে যাচ্ছিল; কিন্তু মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের টহলরত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দৃষ্টি এড়িয়ে পথ অতিক্রম করা তাদের পক্ষে সম্ভব হলো না। টহলরত বাহিনীর চোখে ধুলা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রয়াসকালে ছুমামা ইবনে উছাল নিজেই মুসলমানদের হাতে ধরা পড়ে গেল।
মুসলিম সৈনিকরা ছুমামা ইবনে উছালকে শত্রুপক্ষের একজন সাধারণ সৈন্য মনে করে মদীনায় নিয়ে এসে মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে। সন্দেহভাজন এই দুষ্কৃতকারীর বিচারের ব্যাপারে সাহাবীগণ রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্তের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকলেন।
এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাষ্ট্রীয় কাজে মসজিদে নববীতে প্রবেশের সময় ইয়ামামার সেই বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছালকে খুঁটির সাথে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পেলেন। তিনি সাহাবীদের উদ্দেশ্য করে বললেন: 'তোমরা কি জানো, কাকে এই খুঁটির সাথে বেঁধে রেখেছ?'
উত্তরে সাহাবীগণ বললেন: 'না, আমরা তো তাকে চিনি না।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'এই সেই ইয়ামামার অহংকারী বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল আল হানাফী। তোমরা এই বন্দীর সাথে অত্যন্ত উত্তম ব্যবহার করবে।'
অতঃপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজনীয় কার্য সম্পাদন শেষে বাসায় ফিরে পরিবারের সদস্যদের বললেন: اجْمَعُوا مَا كَانَ عِنْدَكُمْ مِّنْ طَعَامٍ وَابْعَثُوا بِهِ إِلَى تُمَامَةَ بْنِ أَنَالٍ ..... 'তোমাদের কাছে খাবার কী আছে? সত্বর নিয়ে এসো এবং ছুমামা ইবনে উছালের জন্যে পাঠিয়ে দাও।'
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন: 'আমার উটনীকে সকাল-বিকাল দোহন করে যেন সে দুধ ছুমামার জন্যে নিয়মিত পাঠানো হয়।'
রাসূলুল্লাহ (স) ছুমামাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য হাজির করার পূর্ব পর্যন্ত তার সাথে সর্বপ্রকার উত্তম ব্যবহার অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করলেন।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুমামার অতীত কার্যকলাপ ও হত্যাকাণ্ডের জন্যে তাকে কোনোরূপ তিরস্কার না করে ইসলামের সুমহান দাওয়াত তার কাছে পেশ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ছুমামার কাছে গিয়ে বললেন:
'ছুমামা! তোমার কি কিছু বলার আছে?'
ছুমামা ইবনে উছাল আরয করল : 'আপনি যদি আমার উপর থেকে আপনার সাহাবীদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে চান, তাহলে আমাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করতে পারেন এবং তা আপনার জন্য অতিরঞ্জিত হবে না...। আর যদি আমার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে ক্ষমা করে দেন, তাহলে আপনি আপনার একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকেই ক্ষমা করবেন। যদি অর্থের বিনিময়ে আমাকে ক্ষমা করতে চান, তাহলে আপনি যে পরিমাণ অর্থের দাবি করবেন, আমি তা দিতে ব্যধ্য থাকবো।'
প্রথম দিন এই সামান্য কথা বিনিময়ের পর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'দিন পর্যন্ত আর ছুমামার সাথে কোনো কথা বললেন না। অপরদিকে, তিনি তার পানাহার ও আরাম-আয়েশের জন্যে পূর্বের চেয়ে আরও উত্তম ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। প্রতিদিনই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উটনী দোহন করে তার কাছে যথারীতি দুধ সরবরাহ করা হচ্ছিল।
তৃতীয় দিন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুমামা ইবনে উছালকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন:
'ছুমামা! তোমার কি কিছু বলার আছে?'
ছুমামা বললো : 'না, বলার আর কিছু নেই। যা আরয করার তা আপনাকে পূর্বেই করেছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা করেন, তাহলে এক কৃতজ্ঞকেই ক্ষমা করবেন। আর যদি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করেন, তাহলে তা আমার উপযুক্ত পাওনাই পরিশোধ করা হবে। আর যদি অর্থের বিনিময়ে আমাকে ক্ষমা করতে চান, তাহলে বলুন, যত অর্থের প্রয়োজন তা আমি দিতে প্রস্তুত।'
তার এ উত্তর শুনে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপারে পরবর্তী দিনের জন্যে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। পরের দিন তিনি তাকে পূর্বের মতো একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন। ছুমামা পূর্বের ন্যায় আরয করল :
'যদি আমাকে ক্ষমা করেন, তাহলে এক কৃতজ্ঞকেই ক্ষমা করবেন। আর যদি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করেন, তাহলে তা হবে আমার কৃত অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি। আর যদি অর্থের বিনিময়ে আমাকে ক্ষমা করতে চান, তাহলে বলুন, কত অর্থের প্রয়োজন, আমি তা পরিশোধ করতে প্রস্তুত।'
ছুমামার এই একই ধরনের উত্তর শুনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের উদ্দেশ্য করে বললেন : 'তোমরা ছুমামাকে মুক্ত করে দাও।'
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ পাওয়ামাত্র ছুমামাকে ছেড়ে দিয়ে তাকে মুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হলো।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হতে ক্ষমা পেয়ে ছুমামা ইবনে উছাল সোজা মসজিদে নববীর সন্নিকটে 'বাকী' নামক স্থানে গোসল করতে চলে গেল। সেখানে সে অতি উত্তমভাবে গোসল সেরে পাক-পবিত্র হয়ে পুনরায় মসজিদে নববীতে ফিরে এসে উপস্থিত সাহাবীদের বৈঠকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘোষণা করল :
أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ .
'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং আমি এও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দাহ ও প্রেরিত রাসূল।'
কিছুক্ষণ পূর্বেও যে ছুমামা ইবনে উছাল ছিলেন ইসলামের চরম দুশমন, উদ্ধত ও অহংকারী পৌত্তলিক- পরশ পাথররূপী রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তিন দিনের সাহচর্য, সান্নিধ্য, ক্ষমা ও ভালোবাসায় অবিভূত হয়ে পবিত্র কালেমায়ে শাহাদাতের ঘোষণার মাধ্যমে সেই ছুমামা ইবনে উছালই পরিণত হলেন পূর্ণ মুসলিম এবং ইসলামের আপসহীন সৈনিকে। ইসলামে দীক্ষিত হবার পর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে ছুমামা ইবনে উছাল আল হানাফী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন :
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইসলাম গ্রহণের পূর্বে এই পৃথিবীতে আপনার চেয়ে অধিক ঘৃণিত আর কোনো ব্যক্তি আমার কাছে ছিল না। আর এখন পৃথিবীর সমস্ত লোকের চেয়ে আপনিই আমার নিকট অধিক প্রিয়। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, 'তখন ইসলামের চেয়ে ঘৃণিত কোনো ধর্ম আমার কাছে ছিল না; কিন্তু ইসলামই এখন আমার কাছে সর্বোৎকৃষ্ট জীবনব্যবস্থা। আপনার এই মদীনার চেয়ে তুচ্ছ কোনো শহর আমার কাছে ছিল না; কিন্তু এখন এই পুণ্যভূমি মদীনাই আমার সর্বোত্তম প্রিয় ভূমি।'
অতঃপর তিনি অত্যন্ত কাতরকণ্ঠে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আরয করলেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার বহু সাহাবীকে হত্যা করেছি। আপনি এর কী সাজা আমাকে দেবেন?'
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: لَا تَشْرِيْبَ عَلَيْكَ يَا ثُمَامَةٌ... فَإِنَّ الْإِسْلَامَ يَجُبُّ مَا قَبْلَهُ.
'হে ছুমামা! তোমার অতীতকর্মের জন্য তুমি এখন আর নিন্দিত ও অপরাধী নও। কারণ, ইসলাম গ্রহণের ফলে ব্যক্তির অতীতের সমস্ত পাপ মুছে যায়।'
ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অনুগ্রহ করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণের যে সৌভাগ্য দান করেছেন, সে জন্যে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মোবারকবাদ এবং পরকালে নাজাতের সুসংবাদ জানালেন।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র যবান থেকে এই শুভসংবাদ শুনে ইয়ামামার বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে গেল। তিনি উপস্থিত সকলের সামনে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করলেন:
'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর শপথ! আপনার যত সাহাবীকে আমি হত্যা করেছি, অবশ্যই তার দ্বিগুণ মুশরিককে হত্যা করে এর বদলা নেব। আপনার এবং ইসলামের সাহায্যের জন্যে আমি আমার সমস্ত ধন-সম্পদ, সমরাস্ত্র, জনবল এমনকি প্রয়োজনে নিজের জীবন পর্যন্ত বিলিয়ে দিতেও প্রস্তুত থাকব।'
এই তেজোদীপ্ত ঘোষণার পর ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আরয করলেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা যাওয়ার পথে ধৃত হয়ে আপনার দরবারে হাজির হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছি। এখন কি আপনি আমাকে উমরাহ পালনের অনুমতি দেবেন?'
উত্তরে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : 'হ্যাঁ, তুমি উমরাহ পালনের জন্যে যেতে পারো। কিন্তু তা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের বিধান মোতাবেক হতে হবে।'
অতঃপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে উমরাহ পালনের সঠিক নিয়ম-পদ্ধতির শিক্ষা দিলেন।
উমরাহ পালনের নিয়ম-নীতি জ্ঞাত হওয়ার পর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিদায় নিয়ে ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। মক্কার প্রাণকেন্দ্র খানায়ে কাবায় পৌঁছে উপস্থিত জনতার সামনে তিনি উচ্চকণ্ঠে তালবিয়া পাঠ শুরু করলেন:
لبيكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ ... لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ ... إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ ... لَا شَرِيكَ لَكَ.
'আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির হয়েছি। আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি ঘোষণা করছি, তোমার কোনো অংশীদার নেই। আমি হাজির, হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা ও সমস্ত নিয়ামত এবং বাদশাহী একমাত্র তোমারই। তোমার এই সার্বভৌমত্বে কারো কোনো অংশীদারিত্ব নেই।'
এই ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুই রাসূলুল্লাহ (স)-এর উম্মতের মধ্যে প্রথম মুসলমান, যিনি সর্ব প্রথম এই 'তালবিয়ার' ধ্বনিতে মক্কার আকাশ-বাতাস মুখরিত করে খানায়ে কাবা তাওয়াফ করেন।
ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তেজোদীপ্ত কণ্ঠে তাওহীদের উদাত্ত ধ্বনি যখন বায়তুল্লাহ'র চারপাশের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলছিল, শিরক ও কুফরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণার মাধ্যমে একমাত্র ওয়াহাদানিয়াতের ঘোষণা যখন বুলন্দ হচ্ছিল, তখন কুফফারে কুরাইশরা এসে তাদের প্রতিষ্ঠিত ধ্যান-ধারণা, ধর্ম-বিশ্বাস ও দেবতাদের বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ও বিদ্রোহ হিসেবে তা গ্রহণ করল। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তারা নাঙা তরবারি ধারণ করে চতুর্দিক থেকে দলবদ্ধভাবে ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দিকে ছুটে আসতে লাগল। তাদের সবার চোখে-মুখে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছিল। কে কার পূর্বে ছুমামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শিরশ্ছেদ করে তাওহীদের আওয়াজকে এক মুহূর্তে স্তব্ধ করে দেওয়ার গৌরব অর্জন করতে পারবে- এই নিয়ে কিশোর-যুবক-বৃদ্ধ সকলের মাঝে মারমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়ে গেল।
ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ দৃশ্য দেখে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে; বরং বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে আরো উচ্চকণ্ঠে 'তাওহীদ' ও 'তালবিয়ার' ধ্বনি দিতে থাকলেন। এই উত্তপ্ত ও মারমুখী পরিস্থিতিতে কুরাইশদের এক যুবক ছুমামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বিষাক্ত তীর নিক্ষেপে ধরাশয়ী করার জন্যে উদ্যত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুরাইশ সরদারদের কয়েকজন তাকে জাপটে ধরে ফেলল। তারা চিৎকার করে বলে উঠল:
'তোমরা কি জানো, এ ব্যক্তি কে? কার প্রতি তীর নিক্ষেপ করছ? এ হলো ইয়ামামার বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল। তোমরা যদি তার প্রতি সামান্যতম দুর্ব্যবহার কর, তাহলে তার জনগণ সর্বপ্রকার খাদ্যসামগ্রী ও সাহায্য বন্ধ করে দেবে এবং যার পরিণতিতে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।'
নেতৃবৃন্দের মুখে ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পরিচয় এবং তার প্রতি দুর্ব্যবহারের সম্ভাব্য পরিণতি আঁচ করতে পেরে ক্ষিপ্ত ও উচ্ছৃঙ্খল জনগণ আঁৎকে উঠল। যুদ্ধবাজ বেদুইন যুবকদের উষ্ণ খুন যেন নিমিষেই হিম হয়ে গেল। উন্মুক্ত তরবারিগুলো কোষবদ্ধ হতে লাগল। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ অনুগত ভৃত্যের ন্যায় অত্যন্ত নম্র ও শান্ত মেজাজে ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে আরয করল:
'আপনি কি আপনার বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করে অন্য কোনো নতুন ধর্ম গ্রহণ করেছেন?'
ছুমামা ইবনে উছাল আল হানাফী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তরে বললেন:
'আমি ধর্ম ত্যাগী নই, নতুন ধর্মও গ্রহণ করিনি; বরং দুনিয়া ও আখিরাতের সঠিক কল্যাণের জন্যে সর্বোত্তম দীন (জীবন বিধান) গ্রহণ করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী হয়েছি।'
উত্তর শেষ করেই তিনি বায়তুল্লাহর দিকে ইশারা করে কুরাইশদের উদ্দেশ্যে বললেন:
أقسِمُ بِرَبِّ هَذَا الْبَيْتِ، إِنَّهُ لَا يَصِلُ إِلَيْكُمْ بَعْدَ عَوْدَتِي إِلَى الْيَمَامَةِ حَبَّةٌ مِنْ قَبْحِهَا أَوْ شَيْءٌ مِنْ خَيْرَاتِهَا حَتَّى تَتَّبِعُوا مُحَمَّدًا عَنْ آخِرِكُمْ .
'আমি এই ঘরের প্রভুর শপথ করে বলছি, ইয়ামামায় প্রত্যাবর্তনের পর তোমাদের কাছে ততক্ষণ পর্যন্ত সাহায্যস্বরূপ খাদ্যদ্রব্যের চালান আসা তো দূরের কথা, গমের একটি দানাও মক্কায় আসবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমাদের সর্বোচ্চ এবং সর্বশেষ ব্যক্তি পর্যন্ত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী হবে।'
ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এই দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা শুনে উপস্থিত কুরাইশরা হতভম্ব হয়ে গেল। নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে আহাম্মকের মতো তারা ছামামা বিন উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আহহুর দিকে তাকিয়ে রইল।
বেদেরা বিশধর সাপের মুখে এক রকম গাছের শিকড় ছোঁয়ালে যেমন ফনা ধরা সাপ নিমষে চুপসে যায়, ঠিক তেমনি তৎকালীন পৌত্তলিকের দল মুষড়ে পড়ল। মুহূর্তেই পরিস্থিতি উল্টো দিকে মোড় নিল। তারা ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে চ্যালেঞ্জ করা তো দূরের কথা নিজেদের ভবিষ্যৎপরিণতির কথা চিন্তা করেই হতাশায় ভেঙে পড়ল। এ সুযোগে ছামামা বিন উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এই বিশাল জনসমুদ্রের মাঝে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিখিয়ে দেওয়া পদ্ধতিতে ওমরাহ সম্পাদন করতে লাগলেন। এক ঢিলে দুই পাখি। ইসলামের বীর-সৈনিকের কী অপূর্ব কৌশল!
কী অলৌকিক পরিবর্তন! কী সৌভাগ্য! যে ছুমামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মূর্তি ও দেবতাদের সান্নিধ্য লাভের প্রত্যাশায় তাদের সামনে বলিদান করার মানসে ইয়ামামা থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন, তিনিই আজ ইসলামী পদ্ধতিতে ওমরাহ সম্পাদনশেষে দেবতাদের সান্নিধ্যের পরিবর্তে মহান করুণাময় আল্লাহর রেজামন্দির জন্যে পশু কুরবানী দিয়ে ধন্য হলেন।
ওমরাহ সম্পাদনশেষে ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নিজ দেশ ইয়ামামায় প্রত্যাবর্তনের পর তাঁর জনগণকে কুরাইশদের সাহায্য-সহানুভূতি ও যাবতীয় রসদ পাঠানো বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন। সর্বত্র তাঁর এই নির্দেশ পৌছে দেওয়া হলো। সর্বস্তরের জনগণ তাঁর এই নির্দেশে সাড়া দিয়ে মক্কাবাসীদের জন্যে সমস্ত সাহায্য ও খাদ্যসামগ্রীর বরাদ্দ বন্ধ করে দিল।
দেখতে না দেখতেই এই অর্থনৈতিক অবরোধ মক্কাবাসীদের জন্যে এক করুণ অর্থনৈতিক মন্দভাবের সৃষ্টি করল। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম হু হু করে বেড়ে গেল। দেখা দিল চরম খাদ্যাভাব। সমস্ত জনগোষ্ঠী নিপতিত হলো এক মহাদুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে। তারা এ অবস্থায় সন্তান-সন্ততিসহ অনাহারে নিশ্চিত মৃত্যুর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। নিরুপায় হয়ে মক্কাবাসীরা সম্মিলিতভাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একটি চিঠি প্রেরণ করল। তাদের চিঠির ভাষা ছিল এই :
'যেহেতু ইতঃপূর্বে আপনার ব্যাপারে আমাদের দৃঢ় প্রত্যয় ছিল যে, আপনি নিজেও দয়াশীল এবং আপনি দয়া ও অনুগ্রহ এবং সুসম্পর্কের শিক্ষাই দিয়ে থাকেন। ভালোবাসা ও দয়ার এ শিক্ষার বিপরীত অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আপনাকে লিখছি যে, আমাদের বাপ-দাদাদের অধিকাংশকে আপনারা যুদ্ধের ময়দানে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন এবং এখন আমাদের ও আমাদের সন্তান-সন্ততিদের অনাহারে মারার ব্যবস্থা করেছেন। আপনার অনুসারী ইয়ামামার বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল আমাদের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে খাদ্য ও সাহায্যসামগ্রী পাঠানো সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছেন। এমতাবস্থায় আপনাকে আমরা সবিনয় অনুরোধ করছি, অনুগ্রহপূর্বক ইয়ামামার বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছালকে অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করে খাদ্যসামগ্রী পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিন।'
মক্কাবাসীদের এই পত্র পেয়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুমামা ইবনে উছাল আল হানাফী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করে তাদের জন্যে শীঘ্রই খাদ্যসামগ্রী প্রেরণের নির্দেশ দিলেন। ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই নির্দেশ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে অবরোধ প্রত্যাহার করে তাদের জন্যে খাদ্য ও সাহায্যসামগ্রী পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন।
ছুমামা ইবনে উছাল (রা) ইসলাম গ্রহণের পর সারাটি জীবন আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা ও রাসূলে কারীম (স)-এর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি পালনে প্রাণপণ সচেষ্ট ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর যখন আরবে ভণ্ড নবীদের আবির্ভাব ঘটে, যখন দলে দলে ইসলামে নবদীক্ষিত লোকেরা ইসলাম ত্যাগ করে ভণ্ড নবীদের প্রতি ঈমান আনতে শুরু করে, সে সুযোগে ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিজ গোত্র বন্ হুনায়ফার অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মুসায়লামাতুল কাযযাব নবুওয়াতের দাবি করে বসে এবং তার প্রতি ঈমান আনার জন্যে স্বগোত্রীয় লোকদের আহ্বান জানায়।
ইসলামের এই চরম দুর্দিন ও নাজুক অবস্থায়ও ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ভণ্ড নবী মুসায়লামাতুল কাযযাবকে কঠোরহস্তে দমন করার জন্যে দৃঢ়সংকল্প গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর স্বগোত্রীয় লোকদের ডেকে বলেন:
'খবরদার! তোমরা এই মুসায়লামাতুল কাযযাবের নবুওয়াতের মিথ্যা দাবির প্রতি ঈমান আনবে না। তার এই দাবিতে কোনো জ্যোতি নেই। আল্লাহর শপথ! এটা নিশ্চিত যে, তোমাদের মধ্যে যদি কেউ তার মিথ্যা ডাকে সাড়া দেয়, তাহলে আল্লাহ তার ভাগ্যে নির্ঘাত জাহান্নাম ছাড়া আর কিছু রাখেননি। শুধু তাই নয়, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ এই ভণ্ডকে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করার সংগ্রামে শরীক না হয় তাহলে তাকেও ভীষণ আযাবের সম্মুখীন হতে হবে।'
অতঃপর তিনি যুক্তি প্রদর্শন করে বলেন:
'দু'জন নবীর একত্রে আবির্ভাব হতে পারে না। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহর রাসূল। তারপরে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবী আসবেন না। আর না কোনো নবুওয়াতের দাবিদার তাঁর রিসালাতের অংশীদার হতে পারে।'
এরপর ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসায়লামাতুল কাযযাবের কথিত ওহীর উদ্ধৃতির সাথে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ ওহী আল কুরআনের পার্থক্য তুলে ধরে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত পেশ করেন:
حٰم، تَنْزِيلُ الْكِتَبِ مِنَ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ، غَافِرِ الذَّنْبِ وَقَابِلِ التَّوْبِ شَدِيدِ الْعِقَابِ فِي الطُّولِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ إِلَيْهِ الْمَصِيرُ .
'হা-মীম। এই কিতাব সেই আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত, যিনি মহাশক্তিশালী, সর্ব বিষয়ে জ্ঞানী। (যিনি) গুনাহ মার্জনাকারী, তাওবা কবুলকারী, কঠিন শাস্তিদানকারী এবং অতি বড় অনুগ্রহ দানকারী। তিনি ছাড়া আর কোনো মা'বুদ নেই। প্রত্যেককে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।'
ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'এই হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বাণী, আর ভণ্ডনবী মুসায়লামাতুল কাযযাবের কথা শোনো:
يَا ضِفْدَعُ نِقِى مَا تَنقِينَ، لَا الشَّرَابَ تَمْنَعِينَ وَلَا الْمَاءَ تُكَدِّرِينَ .
'হে ব্যাঙ! তুই যতই ঘেঁৎ ঘেঁৎ করিস না কেন, তোর এই ঘেঁৎ-ঘেঁৎ চিৎকারের কারণে না লোকদেরকে পুকুরের পানি পান করা থেকে বিরত রাখতে পারবি, আর না এর পানি ঘোলা করতে সক্ষম হবি।'
অতঃপর নিজ গোত্রের যেসব লোক ইসলামের প্রতি অবিচল ছিলেন তাদের সাথে নিয়ে ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসায়লামাতুল কাযযাব ও তার অনুসারী মুরতাদদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কালেমার ঝাণ্ডাকে সমুন্নত করার জন্যে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
হে আল্লাহ! সত্যের ঝাণ্ডাবাহী ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষ থেকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করুন। খোদাভীরু মুত্তাকীনদের জন্যে আপনি জান্নাতের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার সর্বোচ্চ স্থানে তাঁকে অধিষ্ঠিত করুন, আমীন।
টিকাঃ
১. আল ইসাবা ফী তামিজ আস্ সাহাবা, ইবনে হাজার আল আসকালানী: ১ম খণ্ড, ২০৪ পৃ. মোস্তাফা মুহাম্মদ। ২. আল ইসতিয়াব ফি আসমাইল আসহাব, ইবনে আব্দুল বার ১ম খণ্ড, ৩০৫-৩০৯ পৃ.। ৩. আছ-সীরাত-আন-নববীয়াহ, ইবনে হিশাম, তাহাক্কিক আসসাক্কা সূচীপত্র দ্রষ্টব্য। ৪. আল এ'লাম লি জিরিকলী ওয়া মোরাজেয়াহু ২য় খণ্ড; ৮৬ পৃ.।
📄 আবু আইউব আল আনসারী (রাঃ)
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) প্রাচীরের পাদদেশে দাফন করা হয়েছে।
আরবের ঐতিহ্যবাহী বনু নাজ্জার গোত্রের আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন বিশিষ্ট সাহাবী। এ সাহাবীর আসল নাম খালিদ ইবনে যায়েদ ইবনে কুলাইব। তাঁর ডাক নাম ছিল আবু আইউব। কিন্তু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুহাজিরদের সাহায্য-সহযোগিতা দানের সর্বোচ্চ গৌরবে গৌরবান্বিত হওয়ার কারণে ইতিহাসে তিনি আনসারী নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। মুসলিম বিশ্বে আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু একটি বহুল পরিচিত নাম। এ প্রসিদ্ধ সাহাবীর নাম জানেন না এমন লোক অতি অল্পই আছে।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় পৌঁছানোর পর আল্লাহ তাআলার ইশারায় আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাসগৃহকে নিজের অবস্থানের জন্যে বেছে নেন। আল্লাহ আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে এভাবে সমগ্র বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি দান করেন এবং ইসলামী জগতে বিশেষভাবে স্মরণীয় করে রাখেন।
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাসগৃহে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবতরণ ও অবস্থানের ঘটনা অত্যন্ত চমকপ্রদ ও আনন্দদায়ক। কুরাইশদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় পৌঁছলে মদীনার অধিবাসীরা তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও মহানন্দে উষ্ণ সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনবার্তা পেয়ে মদিনাবাসী যেন তাদের একান্ত প্রিয়জনের সান্নিধ্য লাভের প্রত্যাশায় অধীর আগ্রহে তাঁর শুভাগমনের প্রতীক্ষা করতে থাকে। এ উপলক্ষে নেতৃবর্গ স্ব-স্ব বাসগৃহ সুসজ্জিত করে প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন, রাহমাতুল্লিল আ'লামীন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন তাঁর গৃহকে নিজ অবস্থানের জন্যে বেছে নেন। কে তার বাসগৃহে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পেয়ে ধন্য হবে- এ নিয়ে তাদের মধ্যে চলছিল এক নীরব ও স্নায়ুবিক প্রতিযোগিতা।
এদিকে রাসূলুল্লাহ (স) সরাসরি মদীনায় না পৌঁছে অনতিদূরের 'কুবা' নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন। কুবার মুসলমানদের অনুরোধে তিনি সেখানে চারদিন অবস্থান করেন। এ সময় তিনি সেখানে তাকওয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম মসজিদ 'মসজিদে কুবা' নির্মাণ করেন।
এরপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উটনীর পিঠে সওয়ার হয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। মদীনার নেতৃবর্গ ও সর্বস্তরের জনসাধারণ রাস্তায় সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খোশ আমদেদ জানান। সকলেরই প্রত্যাশা যে, এ মহান নেতাকে অবস্থানের জন্যে স্বগৃহে পেয়ে নিজেদের ধন্য করবেন। কিন্তু তাঁকে বহনকারী উটনীকে একের পর এক নেতৃবৃন্দের গৃহ অতিক্রম করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে দেখে প্রত্যেকেই এমনভাবে বিনয়ের সাথে অনুরোধ জানাচ্ছিলেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের এখানেই অবস্থান নিন। আমাদের রয়েছে বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র জনগোষ্ঠী ও ধন-সম্পত্তির প্রাচুর্য। এসব আপনার প্রতি যে কোনো হুমকি মোকাবেলা করতে সক্ষম।'
কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) সবাইকে এই বলে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন:
دَعُوهَا فَإِنَّهَا مَأْمُورَةٌ .
'উটনীকে চলতে দাও। কোথায় থামবে এ ব্যাপারে সে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে আদেশপ্রাপ্ত।'
এদিকে উটনীটি তার স্বাভাবিক গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সকলেই অতি ঔৎসুক্যের সাথে তাকিয়ে রইলেন উটনীর চলার পথের দিকে। উটনী যখন এক একটি বাড়ি অতিক্রম করছিল, তখন সে বাড়ির লোকজন অত্যন্ত হতাশ হয়ে নিজেদের দুর্ভাগা মনে করছিল। অপরদিকে পরবর্তী বাড়ির লোকজন বুকভরা আশা নিয়ে ভাবছিল, উটনী তাদের বাড়ির সামনেই থামবে; কিন্তু একের পর এক বাড়ির লোকজনের আশা আনন্দ নিরানন্দে পরিণত হচ্ছিল। এভাবেই উটনী অন্য কোথাও অবস্থান না নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চললো। উৎসুক জনতা বিশাল মিছিলের ন্যায় উটনীর পেছনে পেছনে চলতে লাগলেন। তাঁরা দেখতে চান, সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিটি কে, যার বাড়িতে রাসূলে কার্লাীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবস্থান নেবেন।
অবশেষে এ কৌতূহল ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। উটনী আৰু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাসগৃহের সামনের উন্মুক্ত মাঠে এসে বসে পড়ল। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবতরণ না করে উটনীকে পুনরায় পথ চলার ইশারা দিয়ে লাগাম সহজ করে দিলেন। কিন্তু সে সামনে অগ্রসর না হয়ে ঘুরে ফিরে একই স্থানে এসে বসে গড়তে লাগল। এ দৃশ্য অবলোকনে আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হৃদয় আনন্দে ভরে উঠল। তিনি দৌড়ে গিয়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উষ্ণ প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানালেন এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মালপত্র উটনীর পিঠ থেকে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বহন করে আনতে থাকলেন। আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অনুভব করছিলেন, তিনি যেন আজ সমস্ত পৃথিবীর ধন-সম্পদ দিয়ে নিজের বাড়িঘর পরিপূর্ণ করলেন।
কালবিলম্ব না করে আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর দোতলা বাসগৃহের উপর তলার সমস্ত আসবাবপত্র সরিয়ে সেখানে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থানের জন্যে সুসজ্জিত করলেন; কিন্তু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরের চেয়ে নিচ তলায় অবস্থান করাটা বেশি পছন্দ করলেন। আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে সে অনুযায়ী নিচ তলায় তাঁর থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে পানাহার সেরে নিচ তলায় শুয়ে পড়লেন। আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর স্ত্রীসহ উপর তলায় চলে গেলেন, কিন্তু তাঁরা নিজ কক্ষের দরজা বন্ধ করতে ইতস্তত করছিলেন। আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বলল:
'আমাদের প্রতি ধিক্কার! আমরা কতইনা বেয়াদবী করছি! আল্লাহর রাসূলকে নিচে রেখে আমরা উপরে ঘুমাতে যাচ্ছি? আল্লাহর রাসূলকে নিচে রেখে আমরা উপরে হেঁটে বেড়াবো, তা কী করে সম্ভব? আমরা কি আল্লাহর রাসূল ও তাঁর ওহীর মাঝখানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করব? এ অবস্থা যদি অব্যাহত রাখি, তাহলে নিশ্চয়ই আমরা ধ্বংসের মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে যাবো।'
এসব চিন্তা করতে করতে তাঁদের শরীর যেন নিস্তেজ হয়ে আসছিল। চিন্তা করে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছিলেন না যে, তাঁরা এখন কী করবেন। পরিশেষে তাঁরা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরের সরাসরি উপরে অবস্থান না করে দূরে এক কোণে থাকার মনস্থ করলেন; কিন্তু হেঁটে যাবেন কী করে? যদি পায়ের শব্দে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে? অথবা উপর থেকে কোনো ধুলোবালি নিচে পড়ে? অনেক চিন্তা-ভাবনার পরে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির ওপর ভর করে তাঁরা অত্যন্ত আদব ও সংকোচের সঙ্গে মেঝের মাঝখান অতিক্রম না করে এক কিনারায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন।
পরদিন সকালে আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে এসে অত্যন্ত আদবের সঙ্গে বললেন:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এবং আমার স্ত্রী গত রাতে একটুও ঘুমাতে পারিনি।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'কেন, কী হয়েছে?'
উত্তরে আবু আইউব আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আমরা এ নিয়ে অত্যন্ত সংকোচবোধ করছিলাম যে, আপনি নিচে আর আমরা উপরে কিভাবে থাকব। আমাদের চলাফেরার কারণে ধুলা-বালি নিচে পড়তে পারে এবং আমরা আপনার ও আল্লাহর ওহীর মাঝখানে যদি কোনো প্রতিবন্ধক হয়ে যাই।'
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে বললেন:
'আবু আইউব এতে সংকোচের কী আছে? আমি তো স্বেচ্ছায় নিচে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ বহু লোকজন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে এবং সে কারণে নিচে থাকাই শ্রেয়।'
আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্ত সম্মানের সাথে মেনে নিলেন। পরদিন রাতে খুব সতর্কতার সাথে চলাফেরা করলেও কীভাবে যেন পানিভর্তি কলসটি হঠাৎ পড়ে ভেঙে যায় এবং সমগ্র মেঝেতে গড়িয়ে যায়। আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভাষায়:
'একেতো প্রচণ্ড শীতের রাত। এমতাবস্থায় আমি এবং আমার স্ত্রী আশঙ্কা করছিলাম, যদি পানি গড়িয়ে নিচে পড়ে তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে তাঁর কষ্ট হতে পারে, অথচ তখন আমাদের ঘরে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্যে একমাত্র সম্বল আমাদের ব্যবহার্য কম্বলটি ছাড়া বিকল্প আর কোনো বস্ত্র নেই। অগত্যা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চলাফেরার পথে যাতে পানি পড়তে না পারে, সেজন্যে ঐ কম্বলটি দিয়েই মেঝের পানি সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেললাম।'
পরের দিন সকালে আমি পুনরায় রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে এই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বললাম:
'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনার নির্দেশ পালনে সর্বাত্মক কুরবানী দিতে প্রস্তুত; কিন্তু আপনাকে নিচে রেখে আমাদের উপরে থাকাটা মানসিকভাবে কোনোমতেই মেনে নিতে পারছি না। এই বলে কলসি ভেঙে যাওয়ার ঘটনা বললাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এবারের আবেদন গ্রহণ করলেন এবং তিনি উপরে অবস্থান নিলেন, আর আমরা নিচে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।'
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাড়ির সামনের সেই খোলা স্থানটি, যেখানে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বহনকারী উটনী এসে বসে পড়েছিল, সেখানেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৈরি করলেন ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম প্রাণকেন্দ্র 'মাসজিদুন নববী'। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থানের জন্যে মাসজিদুন নববী সংলগ্ন হুজরা খানাসমূহের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত না হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ সাত মাস তিনি আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাসগৃহে অবস্থান করেন।
অতঃপর নির্মাণ কাজ শেষ হলে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হুজরায় চলে আসেন। এভাবে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সর্বোত্তম প্রতিবেশীতে পরিণত হন এবং তাদের মাঝে মধুর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন এবং তাঁর যে কোনো প্রয়োজনে তিনি দ্রুত এগিয়ে আসতেন। আর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং পারস্পরিক ব্যবহারের মাঝে কোনো লৌকিকতার ঝামেলা পছন্দ করতেন না। তিনি সব সময়ই আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাড়িতে গিয়ে তাঁর পরিবারের খোঁজ-খবর নিতেন। মনে হতো তাঁরা সকলে একই পরিবারভুক্ত।
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করেন: একদা আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দুপুরের সময় অত্যন্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায় মসজিদে নববীতে এসে ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে দেখতে পান। ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কুশল জানার এক পর্যায়ে দুপুর বেলায় তাঁর মসজিদে আগমনের কারণ জানতে চাইলে আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন: 'একমাত্র ক্ষুধার তাড়না আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে।'
ওমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ কথা শুনে বললেন: 'আল্লাহর শপথ! আমিও একই কারণে এখানে এসেছি।'
উভয়ের কথোপকথনের মাঝে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে এসে উপস্থিত হন। তিনি উভয়ের উদ্দেশ্যে বলেন: 'এ অসময়ে তোমরা কেন এখানে?'
তারা উত্তরে বললেন: 'আল্লাহর শপথ! আমরা উভয়েই ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির হয়ে এখানে এসেছি।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে বললেন: 'আমিও জীবনমৃত্যুর ফায়সালাকারী সেই সত্তার কসম খেয়ে বলছি, সেই একই কারণে আমিও এখানে উপস্থিত হয়েছি।'
অতঃপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে বললেন: 'তোমরা আমার সাথে চলো।'
তিনি তাঁদের সাথে নিয়ে আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বাড়িতে উপস্থিত হলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নিয়মিত খাবার প্রস্তুত রাখতেন। তিনি না এলে তা পরিবারের লোকেদের খেতে বলতেন।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আসতে দেখে আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর স্ত্রী দৌড়ে দরজায় গিয়ে বললেন: 'মারহাবা বি নাবিয়্যিল্লাহি ওয়া বিমান মা'আহ্।' অর্থাৎ 'আল্লাহর নবী ও তাঁর সাহাবীদের আগমন শুভ হোক।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন: 'আবূ আইউব কোথায়?'
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পাশেরই খেজুর বাগানে কাজ করছিলেন। রাসূলে কারীমের কণ্ঠস্বর শুনে তিনিও দৌড়ে এসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন: 'আল্লাহর নবী ও তাঁর প্রিয় সাহাবীদের আগমন শুভ হোক।'
অতঃপর আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্যে করে বলেন: 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি তো সাধারণত এ সময়ে কখনো আসেন না।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ।'
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা মোবারকে ক্ষুধার ছাপ লক্ষ্য করে তাড়াতাড়ি বাগানে গিয়ে আধাপাকা খেজুরের একটি থোকা নিয়ে এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দেখে বললেন: 'কী দরকার ছিল এই আধাপাকা থোকাটি কাটার? একে পরিপক্ক হতে দেওয়াই তো ভালো ছিল।'
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন: 'আমি চাচ্ছিলাম, এ থোকার কাঁচা-পাকা সব ধরনের খেজুরের স্বাদ আপনি গ্রহণ করবেন। আর আপনার মেহমানদারীর জন্যে আমি এখনই একটি বকরি যবেহ করছি।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'দেখ, দুধ দেয় এমন কোনো বকরি জবেহ করো না।'
আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ঠিক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশমতো দুধ দেয় না এমন একটি বকরি যবেহ করলেন এবং তাঁর স্ত্রীকে বললেন: 'তুমি তো খুব সুন্দর রুটি তৈরি করতে পারো, এবার মেহমানদের জন্য সর্বোচ্চ মানের রুটি তৈরি করে আনো তো দেখি?'
অল্পক্ষণের মধ্যেই বকরির গোস্ত ভুনা ও রেজালা এ দু'ভাবে রান্না করে সম্মানিত মেহমানদের সামনে উপস্থিত করা হলো। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে কিছু গোশত এবং রুটি নিয়ে আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতে তুলে দিয়ে বললেন:
'এগুলো ফাতেমাকে দিয়ে এসো, অনেকদিন ধরে এত মজাদার খাবার আমাদের ঘরে তৈরি হয়নি।'
অতঃপর তৃপ্তির সাথে পানাহারের পর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবিতার মতো করে বললেন:
'রুটি-গোশত খেজুর আধাপাকা খেজুর পাকা কচমচে খেজুর!'
এ শব্দগুলো উচ্চারণের সাথে সাথে তাঁর চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল এবং তিনি বললেন:
'যে মহান সত্তার হাতে আমার জীবন ও মৃত্যুর ফায়সালা, তাঁর শপথ করে বলছি, এ সকল নিয়ামত সম্পর্কেই তো কিয়ামতের দিন তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।'
সুস্বাদু খাদ্যবস্তু পানাহারের পূর্বে অবশ্যই বলবে:
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ .
এবং পানাহারশেষে বলবে:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي هُوَ أَشْبَعَنَا وَأَنْعَمَ عَلَيْنَا فَأَفْضَلَ .
'সমস্ত প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে অত্যন্ত অনুগ্রহ করে উত্তম খাদ্যে পরিতৃপ্ত করেছেন।'
অতঃপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায়ের মুহূর্তে আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে পরের দিন তাঁর বাসায় আসার দাওয়াত দিলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁকে কেউ দাওয়াত করলে তিনিও তাকে অনুরূপ দাওয়াত করতেন। কিন্তু আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হুজুরের দাওয়াত ভালো করে শুনতে পাননি। পরে ওমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে উচ্চৈঃস্বরে বললেন:
'হে আবূ আইউব! আপনাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগামীকাল তাঁর বাসায় আসার জন্যে বলেছেন।'
আবূ আইউব আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ কথা শুনে বললেন: سَمْعًا وَطَاعَةً لِرَسُولِ اللَّهِ .
'রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহ্বানে অবশ্যই আসবো।'
পরের দিন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাড়িতে আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এলে তিনি তাঁকে ছোট্ট একটি কাজের মেয়ে উপহার দিয়ে বললেন:
'হে আবূ আইউب! এই মেয়েটির সাথে খুব ভালো আচরণ করবে ও উত্তম আদব-কায়দা শিক্ষা দেবে। আমাদের এখানে থাকাকালীন আমরা তাকে খুব ভালো হিসেবেই পেয়েছি।'
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে দেওয়া ছোট্ট কাজের মেয়েটিকে নিয়ে আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অত্যন্ত আনন্দের সাথে বাসায় ফিরলেন। স্বামীর সাথে ছোট্ট মেয়েটিকে দেখে তাঁর স্ত্রী জিজ্ঞাসা করলেন:
'হে আইউবের আব্বা! এ মেয়ে কার জন্যে নিয়ে এলেন?'
আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্যে উপহারস্বরূপ একে দিয়েছেন।'
তাঁর স্ত্রী বললেন:
'তিনি কতই না শ্রদ্ধাভাজন! তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন ও কৃতজ্ঞ হোন এবং যাকে দান করা হয়েছে, তার প্রতি স্নেহপরবশ থাকুন, সে কতই না উত্তম!'
আব আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহ বললেন:
'এর প্রতি উত্তম ব্যবহার করার জন্যে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন।'
তাঁর স্ত্রী বললেন:
'আমরা তার সাথে এমন কী সদাচরণ করতে পারি, যার দ্বারা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ যথার্থভাবে পালন করা হবে?'
আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহ বললেন:
'আমি তো একে আযাদ করে দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথ খুঁজে পাচ্ছি না। এভাবে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ যথার্থভাবে পালন করা হবে।'
তাঁর স্ত্রী বললেন:
'হ্যাঁ, আপনার এই প্রস্তাবই যুক্তিযুক্ত ও সঠিক বলে মনে হয়। যেহেতু আপনি এতেই সন্তুষ্ট, তাই তাকে মুক্ত করে দিন।'
অতঃপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসীয়তের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ছোট্ট কাজের মেয়েটিকে আযাদ করে দেওয়া হলো।
এতো গেল আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর স্বাভাবিক জীবনের একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। তাঁর যুদ্ধকালীন জীবনের ঘটনাবলি আরও অধিক আকর্ষণীয় ও বৈচিত্র্যময়.....।
আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর সমগ্র জীবনটাই আল্লাহর পথের একজন নিষ্ঠাবান সৈনিক হিসেবে অতিবাহিত করেছেন। তাঁর ব্যাপারে বলা হয় যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুরু করে মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়ব্যাপী সমস্ত যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। শুধু ঐসব যুদ্ধের একটিতে মাত্র অংশ গ্রহণ করতে পারেননি, যেসব যুদ্ধ একই সময়ে দু'স্থানে সংঘটিত হয়েছে। তাঁর জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ ছিল মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ছেলে ইয়াযীদের নেতৃত্বে পরিচালিত কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) বিজয়ের যুদ্ধ। এ সময় আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আশি বছরের বৃদ্ধ। কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের জন্যে সাধারণ সৈনিক হিসেবে ইয়াযীদের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্যে আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার কারণে বয়সের আধিক্য সত্ত্বেও তাঁকে বিরত রাখা সম্ভব হয়নি। বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গমালা বিদীর্ণ করে তিনি কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) বিজয়ে যাবেন- এটাই ছিল তাঁর এই প্রবল আকাঙ্ক্ষার মূল কারণ।
সমুদ্রপথে কিছু দূর অতিক্রম করতে না করতেই তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। দুশমনদের উপর উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে দুর্বার গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার আকাঙ্ক্ষা যেন তাঁর স্থিমিত হয়ে এল। এ অসুস্থতা ক্রমশই বৃদ্ধি পেয়ে যুদ্ধ এবং তাঁর মাঝে প্রবল অন্তরায় সৃষ্টি করল। সেনাপতি ইয়াযীদ তাঁকে সেবা-শুশ্রূষার জন্যে এসে জিজ্ঞাসা করলেন:
'হে আবু আইউব আল আনসারী, আল্লাহ আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হোন! আমাদের উদ্দেশ্যে আপনার শেষ অসীয়ত বলুন।'
উত্তরে তিনি বললেন:
'সমস্ত মুসলমান যোদ্ধাদের প্রতি আমার সালাম পৌছে দিন এবং তাঁদের বলে দিন, আবু আইউব আল আনসারী তোমাদের প্রতি অসীয়ত করেছেন, তোমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করে দুর্বার গতিতে দুশমনদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কনস্টান্টিনোপলের শেষ সীমানা পর্যন্ত বিজয় না করে থামবে না। তাদের এও বলে দিন, আমি যদি ইন্তিকাল করি, তাহলে তারা যেন আমার লাশকে সমুদ্র বক্ষে নিক্ষেপ না করে তাদের সাথে বহন করে নিয়ে যায় এবং কনস্টান্টিনোপলের প্রাচীরের পাদদেশে দাফন করে।'
এই অসীয়ত বর্ণনা শেষ হতে না হতেই এই মহান বিপ্লবী মহাপুরুষের পবিত্র আত্মা দেহত্যাগ করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যায়।
রণতরী বহরের সমস্ত মুসলিম যোদ্ধা আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শেষ অসীয়তকে অত্যন্ত জযবা ও শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করলেন। তাঁর নির্দেশমতো মুসলিম সৈন্যরা সর্বশক্তি নিয়োগ করে দুশমনের ওপর ক্ষিপ্রতার সাথে আঘাতের পর আঘাত হানতে শুরু করলেন। এ প্রচণ্ড আঘাতে দুশমনরা পিছু হটতে লাগল। আর মুসলমান সৈন্যরা আবূ আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর লাশকে বহন করে বিজয়ীর বেশে কনস্টান্টিনোপলে গিয়ে পৌঁছলেন। আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শেষ অসীয়ত অনুযায়ী তাঁকে কনস্টান্টিনোপলের (ইস্তাম্বুল) প্রাচীরের পাদদেশে দাফন করা হলো।
ইসলামের বীর মুজাহিদ আবু আইউব আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত রহমত বর্ষিত হোক। আশি বছরের বার্ধক্য যাকে আল্লাহর পথে জিহাদে অংশগ্রহণে বিরত রাখতে পারেনি, তিনি বিছানায় শুয়ে মৃত্যুবরণ করার চেয়ে অশ্বপৃষ্ঠে মৃত্যুবরণকে শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। তিনিই এই জিহাদের কাফেলার রণতরীতে মৃত্যুবরণ করে চিরদিনের জন্যে জিহাদী জযবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
টিকাঃ
১. আল্ ইসাবা ফি তামিযিস্ সাহাবা, ৯৮-২৯০ তুবয়া ছায়াদাহ ২য় খণ্ড। ২. আল্ ইসতিয়ার, হায়দারাবাদ সংস্করণ: ১ম খণ্ড, ১৫২ পৃ.। ৩. উসদুল গাবা, ৫ম খণ্ড, ১৪৩-১৪৪ পৃ.। ৪. তাহযীব আত্ তাহযীব, ৩য় খণ্ড, ৯০-৯১ পৃ.। ৫. তাকরীব আত্ তাহযীব, ১ম খণ্ড, ২১৩ পৃ.। ৬. ইবনে খাইয়াত ৮৯, ১৪০, ১৯০ ও ৩০৩ পৃ.। ৭. তাজরীদু আসমাউস্ সাহাবা, ১ম খণ্ড, ১৬১ পৃ.। ৮. খোলাসাতু তাহযীবুত তাহযিব কামাল, ১০০-১০১ পৃ.। ৯. আল্ জারহু ওয়া তা'তাদীল, ১ম খণ্ড, ভূমিকা ও ২য় খণ্ড, ১৩১ পৃ.। ১০. সিফাতুস ছাফওয়া, ১ম খণ্ড, ১৮৬-১৮৭ পৃ.। ১১. আত্ তাবাকাত আল কুবরা, ৩য় খণ্ড, ৪৮৪-৪৮৫ পৃ.। ১২. আল্ ইব্র, ১ম খণ্ড, ৫৬ পৃ.। ১৩. তারীখুল ইসলাম লিয যাহাবী, ২য় খণ্ড, ৩২৭-৩২৮ পৃ.। ১৪. শিজরাতুয যাহাব, ১ম খণ্ড, ৫৭ পৃ.। ১৫. দায়েরাতুল মা'য়ারেফ আল্ ইসলামিয়া, ১ম খণ্ড, ৩০৯-৩১০ পৃ.। ১৬. আল্ জাম'উ বাইনা রিজালিস্ ছাহিহাইন, ১ম খণ্ড, ১১৮-১১৯ পৃ.। ১৭. মিন আবতালিনা আল্লাযিনা ছানায়ু আত তারিখ (লি আবিফতুহ আত তাওরিসী): ১০৫-১১০ পৃঃ। ১৮. ছিলছিলাতু আ'লামুল মুসলিমিন, ৪র্থ নং। ১৯. আল আ'লাম, ২য় খণ্ড, ৩৩৬ পৃ.।