📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 উমায়ের ইবনে ওয়াহাব (রাঃ)

📄 উমায়ের ইবনে ওয়াহাব (রাঃ)


'রাসূলে কারীম (স)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে উমায়ের যখন মসজিদে নববীতে প্রবেশ করছিল, তখন সে আমার নিকট একটি শূকরের চেয়েও ঘৃণিত ছিল। আর ইসলাম গ্রহণের পর সে আজ আমার নিকট আমার কোনো কোনো সন্তানের চেয়েও প্রিয় হয়ে গেল।' -উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু

উমায়ের ইবনে ওয়াহাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর একই জীবনের মধ্যে ছিল দু'টি ধারা। একটি ছিল ইসলাম গ্রহণের পূর্ব-জীবন আর অন্যটি ছিল ইসলাম গ্রহণের পরের জীবন।

তার ইসলাম গ্রহণের পূর্ব-জীবন ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। বদর যুদ্ধে সে ইসলামের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিল; কিন্তু তার তরবারি তাকে মোটেই সাহায্য করতে পারেনি; বরং সে এক পর্যায়ে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা তাকে ইসলামের জন্যে কবুল করে নিয়েছিলেন বলে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে সে রক্ষা পায়। এ জন্যে সে মক্কায় ফিরে আসতে সমর্থ হয়; কিন্তু তার ছেলে ওয়াহাব মুসলমানদের হাতে বন্দী অবস্থায় মদীনায়ই রয়ে যায়।

উমায়ের ইবনে ওয়াহাব আশঙ্কা করেছিল যে, মক্কায় মুহাম্মদের উপর যেমন নির্যাতনের স্টীম রোলার চালানো হয়েছিল, তার ছেলেকে আটকাবস্থায় নির্মম নির্যাতন চালিয়ে তার কৃত অপরাধের প্রতিশোধ নেবে মুসলমানরা। এ দুশ্চিন্তায় উমায়ের ইবনে ওয়াহাব অত্যন্ত অস্থির হয়ে পড়ে।

কোনো এক দুপুরে ছেলের মুক্তির জন্যে প্রার্থনা করার উদ্দেশ্যে সে দেবতাদের জন্যে কিছু ভোগসামগ্রী নিয়ে কাবাগৃহে হাজির হয়। এ সময়ে কুরাইশ সরদার সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া বাইতুল্লাহর সন্নিকটস্থ হাজের নামক স্থানে উপবিষ্ট ছিল, তার সঙ্গে উমায়েরের সাক্ষাৎ ঘটে। তারা পরস্পরে কুশলবিনিময় করে। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া তখন উমায়ের ইবনে ওয়াহাবকে বলল:

'বসো ভাই! কিছু সুখ-দুঃখের কথা বলি, সময় আর কাটছে না। আমাদের কলিজার টুকরাদের মদীনায় বন্দী রেখে মোটেও শান্তিতে ঘুমাতে পারছি না।'

অতঃপর তারা একে অপরের মুখোমুখি বসে বদr যুদ্ধের বিভিন্ন বিভীষিকাময় ঘটনার আলোচনা শুরু করে। আলাপচারিতায় তারা কখনো মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সঙ্গীদের হাতে যুদ্ধবন্দী কুরাইশদের সংখ্যা নির্ণয় করছিল, আবার কখনো মুসলমানদের তরবারির আঘাতে তাদের নিহত নেতৃবৃন্দের কথা স্মরণ করে ভয়ে শিউরে উঠছিল। যাদের লাশ দিয়ে বদরের পুরানো ডোবাগুলো ভরাট করা হয়েছিল। আলোচনার এক পর্যায়ে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বলল:

'আজ আমাদের নেতারা মুসলমানদের হাতে নিহত, যুবকরা তাদের হাতে বন্দী। আল্লাহর কসম! আমাদের বেঁচে থাকার আর কি কোনো সার্থকতা আছে?'

এ কথা শুনে উমায়ের তার কথায় সায় দিয়ে বলল:
'তুমি যথার্থই বলেছ। সত্যিই, আমাদের বেঁচে থাকার আর কোনো যৌক্তিকতা নেই।'

এরপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে পুনরায় সে বলল:
'এই কাবার মালিকের কসম! আমি যদি ঋণগ্রস্ত না হতাম অথবা আজ আমার ঋণ পরিশোধ করার মতো কোনো ব্যবস্থা থাকত অথবা আমার অনুপস্থিতিতে সন্তান-সন্ততির অনাহারে মৃত্যুবরণ করার আশঙ্কা না করতাম তাহলে নিশ্চয়ই আমি মদীনায় গিয়ে মুহাম্মদকে এ দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় করে দিতাম এবং তাঁর মিশনকে স্তব্ধ করে দিয়ে আরববাসীকে এ অত্যাচার হতে মুক্ত করতাম।'

এরপর সে মৃদুস্বরে বলল:
'আমি যদি মদীনায় মুহাম্মদকে হত্যা করতে যাই, তাহলে কেউ আমাকে সন্দেহ করবে না যে, আমি তাঁকে হত্যা করতে এসেছি; বরং সবাই ভাববে যে, আমি আমার বন্দী ছেলের মুক্তির জন্যে তদবির করতে এসেছি।'

সাফওয়ান কালবিলম্ব না করে উমায়েরের ভাবাবেগকে লুফে নিয়ে বলল:
'হে উমায়ের! তোমার সমস্ত ঋণের বোঝা আমার উপর ছেড়ে দাও। পাহাড়সম ঋণকেও আমি পরিশোধ করতে প্রস্তুত। আর তোমার সমস্ত পরিবার-পরিজনকে আজই আমি আমার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করে নিচ্ছি। যতদিন আমি বেঁচে থাকবো ততদিন আমার অর্থ ও ধন- সম্পদের প্রাচুর্য তোমার পরিবারের জন্যে ব্যয়িত হবে।'

সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া'র এই তেজোদ্দীপ্ত প্রতিশ্রুতি শুনে উমায়েরের মধ্যকার হিংস্র পশুশক্তি গর্জন করে উঠল। সে সাফওয়ানকে বলল:

'তাহলে আমাদের দু'জনের মধ্যকার এ চুক্তির কথা আর কারো কাছে প্রকাশ করো না। আমি আমার কর্তব্য সম্পাদনের জন্যে বদ্ধপরিকর।'

রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি উমায়েরের হৃদয়ে হিংসার যে আগুন জ্বলছিল, সাফওয়ানের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রতিশ্রুতি তা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। সে অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাবাঘর থেকে বাড়ি ফিরল এবং পরিকল্পনাকে সামনে নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করল।

যেহেতু কুরাইশদের প্রায় প্রতিটি ঘরের কোনো না কোনো লোক মুসলমানদের হাতে যুদ্ধবন্দী হিসেবে মদীনায় ছিল, সেহেতু কয়েদিদের আত্মীয়-স্বজন সব সময়ই তাদের মুক্ত করার ব্যাপারে মদীনায় আসা-যাওয়া করত। তাই উমায়েরের মদীনা যাওয়াকে মুসলমানেরা কেউই সন্দেহের চোখে দেখবে না বলেই তার বিশ্বাস ছিল।

উমায়ের ইবনে ওয়াহাব পূর্ণ মানসিক প্রস্তুতি সহকারে মদীনা রওয়ানা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল এবং স্বীয় তরবারি আরও শাণিত করে তাতে বিষ মেখে নিলো। অবশেষে সফর সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেল। তাকে বহনকারী উট যতই মদীনার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, উমায়েরের হিংসার আগুন ততই দাউ দাউ করে জ্বলছিল। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এক পর্যায়ে উটটি মদীনায় মসজিদে নববীর কাছে এসে পৌঁছল। উমায়ের সেখানে অবতরণ করে তার বিষাক্ত তরবারি নিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খোঁজার জন্যে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করল।

এদিকে উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মসজিদে নববীর দরজার নিকট বসে কিছুসংখ্যক সাহাবীর সাথে বদর যুদ্ধের যুদ্ধবন্দী ও মৃত কুরাইশদের নেতৃত্বের পরাজয়ের ঘটনাবলি, মুসলমানদের সাহসিকতা ও বীরত্বের বর্ণনা এবং আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির আলোচনা করছিলেন। হঠাৎ মুখ ফেরাতেই তিনি দেখতে পেলেন যে, অস্ত্রসজ্জিত উমায়ের ইবনে ওয়াহাব মসজিদে নববীতে প্রবেশ করছে। তিনি চমকে উঠলেন এবং তার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে চিৎকার করে বলে উঠলেন:

'আল্লাহর দুশমন, উমায়ের ইবনে ওয়াহাব। নিশ্চয়ই কোনো খারাপ মতলব নিয়ে এ মসজিদে প্রবেশ করছে। এই সেই ব্যক্তি, যে মক্কায় আমাদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের লেলিয়ে দিয়েছিল এবং বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির কাজে ভীষণ ব্যস্ত ছিল। সে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে এখানে আসতে পারে না।'

এই বলে তিনি উপস্থিত সাহাবীদের তৎক্ষণাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারদিকে অবস্থান গ্রহণ করার নির্দেশ দিলেন এবং ঐ ব্যক্তির নাশকতামূলক কাজ সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকার জন্যে বললেন।

অতঃপর উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে বললেন:

'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর দুশমন উমায়ের ইবনে ওয়াহাব অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করেছে। নিশ্চয়ই তার কোনো কুমতলব রয়েছে।'

এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।'

উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ আদেশ শোনার পর উমায়েরের কাছে ফিরে গিয়ে এক হাতে উমায়েরের তরবারি এবং অন্য হাতে তার জামার কলার ধরে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে এলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দৃশ্য দেখে উমায়েরকে ছেড়ে দিয়ে উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াতে বললেন।

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমায়ের ইবনে ওয়াহাবকে নিকটে ডাকলেন। উমায়ের এসে জাহিলী নিয়মে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম জানাল। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন:

'শোনো উমায়ের, আল্লাহ আমাকে তোমাদের সালামের চেয়ে আরও উত্তম সালাম দিয়ে সম্মানিত করেছেন। এ সালাম হলো বেহেশতের সালাম, আস্সালামু আলাইকুম।'

উমায়ের বলল:
'কই, খুব বেশি পার্থক্য তো মনে হচ্ছে না; কিছুদিন আগেও তো এটাই ছিল আপনার সালাম।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'উমায়ের! কী উদ্দেশ্যে তুমি এখানে এসেছ?'

উমায়ের বলল:
'যুদ্ধবন্দীদের মুক্ত করার জন্যে এসেছি। আশা করি, এ ব্যাপারে আপনি আমাকে সার্বিক সহযোগিতা দান করবেন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'বন্দীমুক্তির উদ্দেশ্যেই যদি এসে থাকো, তাহলে অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় কেন?'

উমায়ের বলল:
'আল্লাহ এ তলোয়ারকে ধ্বংস করুন! বদরে এ তলোয়ার কি আমাদের কোনো কাজে এসেছে?'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'উমায়ের! সত্যি করে বলো, কী উদ্দেশ্যে তুমি এসেছ?'

উমায়ের বলল:
'বিশ্বাস করুন, দ্বিতীয় কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এখানে আসিনি।'

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'উমায়ের! তুমি এবং সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া খানায়ে কাবার হাজের নামক স্থানে বসে বদর যুদ্ধের পরাজয় সম্পর্কে কি কখনো আলোচনা করছিলে? তখন কি তুমি বলনি যে,

'আমি যদি ঋণগ্রস্ত না হতাম, অথবা সন্তান-সন্ততি আমার উপর নির্ভরশীল না হতো, তাহলে আমি মুহাম্মদকে হত্যার উদ্দেশ্যে অবশ্যই মদীনায় রওয়ানা হতাম।'

তোমার এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে সাফওয়ান ইবনে উমায়ের আমার হত্যার বিনিময়ে তোমার ঋণ এবং সন্তান-সন্ততির সব দায়-দায়িত্ব কি গ্রহণ করেনি? তোমরা দু'জন হয়তো মনে করেছিলে যে, তোমরা ব্যতীত এ কথাগুলো আর কেউ শোনেনি। অথচ তোমাদের উভয়ের মাঝে আল্লাহ বিদ্যমান ছিলেন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে এ কথা শুনে উমায়ের হতভম্ব হয়ে গেল এবং নির্বিকারে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল:

'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আল্লাহর পক্ষ হতে যে পয়গাম নিয়ে এসেছেন, আমরা তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতাম; কিন্তু আমার এবং সাফওয়ানের মাঝে যে কথোপকথন হয়েছিল, তা আমরা দু'জন ব্যতীত আর কেউই জানত না। আমার বিশ্বাস, নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে এ সম্পর্কে অবহিত করেছেন। আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি কোনো না কোনোভাবে আমাকে আপনার কাছে এনে ইসলামের আলো দিয়ে আলোকিত করেছেন। আমি এখন আর আপনার দুশমন উমায়ের ইবনে ওয়াহাব নই; বরং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর প্রেরিত রাসূল।'

এ ঘোষণার মাধ্যমেই উমায়ের ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন। তৎক্ষণাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের এই বলে নির্দেশ দিলেন: فَقَّهُوا أَخَاكُمْ فِي دِينِهِ ، وَعَلِمُوهُ الْقُرْآنَ ، وَأَطْلِقُوا أَسِيرَهُ.
'তোমাদের এই ভাইকে দীন সম্পর্কে জ্ঞান দাও, তাকে কুরআন শিক্ষা দাও এবং তার বন্দীদের মুক্ত করে দাও।'

উমায়েরের ইসলাম গ্রহণের সংবাদে মদীনার মুসলমানদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। এমনকি উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেই ফেললেন: لَخِنْزِيرٌ كَانَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ عُمَيْرِ بْنِ وَهْبٍ حِينَ قَدِمَ عَلَى رَسُول اللهِ ﷺ وَهُوَ الْيَوْمَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ بَعْضٍ أَبْنَانِي .

'ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উমায়ের ইবনে ওহাব আমার নিকট একটি শূকরের চেয়েও ঘৃণিত ছিল; কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর সে আমার নিকট আজ আমার কোনো কোনো সন্তানের চেয়েও অধিকতর প্রিয়।'

উমায়ের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মধ্যে এ বিপ্লবী পরিবর্তনের পর থেকে তিনি ইসলামী শিক্ষায় নিজেকে পরিশুদ্ধ করার সর্বাত্মক চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেন। আল কুরআনের আলোকে তাঁর জীবনকে আলোকিত করতে থাকেন। আল্লাহ ও রাসূলের (স) ভালোবাসায় তিনি এতই নিমগ্ন হয়ে যান যে, মক্কায় রেখে আসা তাঁর প্রিয় সন্তান-সন্ততির মায়াও ভুলে গেলেন।

এদিকে সাফওয়ান বিন উমাইয়া কুরাইশদের বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতে লাগল এবং বলতে শুরু করল : 'হে কুরাইশরা অপেক্ষা করো, সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন আমি তোমাদের এমন একটি শুভসংবাদ শোনাবো, যা তোমাদের বদরের পরাজয়ের গ্লানি ভুলিয়ে দেবে।'

সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া উমায়েরের হাতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হত্যার খবর শোনার জন্যে অধীর আগ্রহে মদীনার পানে চাতকপাখির মতো তাকিয়ে রইল। যতই দিন যাচ্ছিল, এ সংবাদ শোনার জন্য সাফওয়ান ততই অস্থির হয়ে উঠছিল। তার উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা ছিল সীমাহীন। কবে শুনবে সে সংবাদ, যা শোনার জন্যে সে পাঠিয়েছে উমায়েরকে মদীনায়। মদীনা হতে আগন্তুকদের কাছে উমায়ের ইবনে ওয়াহাব সম্পর্কে জানার জন্যে সাফওয়ান উদগ্রীব হয়ে উঠল। কিন্তু কেউই তাকে উমায়ের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সম্পর্কে কোনো খবর দিতে পারছিল না। পরিশেষে, কোনো এক আগন্তুক সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াকে সংবাদ পৌঁছে দিল:

'তুমি যার জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছো, সেই উমায়ের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে।'

এ সংবাদ সাফওয়ানের মাথায় বজ্রপাতের মতো মনে হলো। তার ধারণা ছিল: 'পৃথিবীর সকল মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলেও উমায়ের ইবনে ওয়াহাব তা গ্রহণ করতে পারে না।'

উমায়ের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এদিকে দীনের জ্ঞান ও পবিত্র কালামে পাকের হিফয করার কাজে আত্মনিয়োগ করলেন।

একদা তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন:
'হে আল্লাহর রাসূল! আমি জীবনের দীর্ঘ সময় আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে এবং ইসলাম গ্রহণকারীদের উপর কঠিন নির্যাতন ও অত্যাচারের কাজে ব্যয় করেছি। আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি মক্কায় গিয়ে কুরাইশদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথে আহ্বান জানাব। তারা যদি আমার দাওয়াত কবুল করে তাহলে তাদেরই কল্যাণ হবে। আর যদি তারা তা প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে আমি তাদের দীন সম্পর্কে এমন উচিত শিক্ষা দেব, যেভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের তারা দিয়েছিল।'

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে মক্কায় গিয়ে ইসলামের দাওয়াত প্রচারের অনুমতি দিলেন। উমায়ের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মক্কায় গিয়ে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার ঘরে প্রবেশ করে বললেন:

'হে সাফওয়ান, তুমি মক্কার নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে অন্যতম নেতা এবং কুরাইশদের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অন্যতম বুদ্ধিজীবী। তোমরা পাথরপূজা ও পাথরের মূর্তির জন্যে যা করে থাকো, সবই ধোঁকা। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি এটাকে দীন বলে বিশ্বাস করতে পারে? আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও তাঁর প্রেরিত রাসূল।'

উমায়ের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মক্কায় এসে আল্লাহর পথে মক্কাবাসীকে দাওয়াত দিতে আরম্ভ করলেন। তাঁর হাতে অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উমায়ের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে উত্তম পুরস্কার দান করুন এবং তাঁর কবর নূর দ্বারা আলোকিত করুন। আমীন।

টিকাঃ
১. হায়াতুস সাহাবা -৪র্থ খণ্ড সূচিপত্র দ্রঃ। ২. সীরাতে ইবনে হিশাম-সূচিপত্র দ্রষ্টব্য। ৩. আল ইছাবা-৬০৬০ নং জীবনী। ৪. তাবাকাত ইবনে সা'দ-৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৪৬।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 বারা’আ ইবনে মালেক আল আনসারী (রাঃ)

📄 বারা’আ ইবনে মালেক আল আনসারী (রাঃ)


'বারা"আ বিন মালেককে যেন কখনো মুসলিম বাহিনীর কোনো সালারের দায়িত্বে নিয়োগ না করা হয়। কেননা সে তার দ্রুতগামী পদক্ষেপ দ্বারা তাঁর বাহিনীকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিতে পারে।' -খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারুক (রা)

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একনিষ্ঠ খাদেম, জালীলুল কদর সাহাবী আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ছোট ভাই ছিলেন বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী। তিনি অত্যন্ত হালকা-পাতলা গড়নের ছিমছাম চেহারাবিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। মাথায় ছিল কোঁকড়ানো চুল। অদম্য সাহসী ও অগ্রাভিমুখী দ্রুতগামী আক্রমণে অভ্যস্ত বীর যোদ্ধা। এই যুবক সাহাবী ছিলেন। এতোই হালকা-পাতলা, দেখলে মনে হতো খুবই দুর্বল অথচ তাঁর বুদ্ধিমত্তা, অদম্য সাহসিকতা, প্রবল ঈমানী চেতনা ও অসাধারণ সমরকৌশল, যা মানুষকে তাক লাগিয়ে দিয়ে রীতিমতো ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে আছে।

এই ক্ষীণ দেহের অধিকারী বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী কেবল মল্লযুদ্ধেই শতাধিক মুশরিক যোদ্ধাকে জাহান্নামে প্রেরণ করেন। তিনি মল্লযুদ্ধ ছাড়াও সম্মুখ সমরে যে কত কাফির ও মুশরিককে জাহান্নামে পাঠিয়ে ইসলামের বিজয়কে ছিনিয়ে এনেছেন তার ইয়ত্তা নেই। যুদ্ধের দামামা তাঁর রক্তে এমন ক্ষিপ্রতা ও তেজস্বিতার সৃষ্টি করত যে, তিনি নিজ দল-বল পিছনে রেখে একাই শত্রুপক্ষের প্রাচীর ভেদ করে সম্মুখপানে দু'মুখো তলোয়ার দিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে যেতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর এই ব্যাকুল অগ্রগামিতা লক্ষ্য করে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর প্রতি এক বিশেষ বিধি-নিষেধ আরোপ করেন। তিনি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের গভর্নরদের কাছে এই বলে ফরমান জারি করেন:

أَلَّا يُوَلُّوهُ عَلَى جَيْشِ مِنْ جُيُوشِ الْمُسْلِمِينَ، خَوْفًا مِنْ أَنْ يُهْلِكَهُمْ بِإِقْدَامِهِ".
'বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারীকে যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো বাহিনীর দায়িত্ব যেন দেওয়া না হয়। কারণ আমি আশংকা করি যে, শত্রুবাহিনীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারীর যুদ্ধ করার যে মানসিকতা রয়েছে, যার ফলে তার অধীনস্থ সমগ্র বাহিনীই শত্রু বাহিনীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সমূহ বিপদের সম্মুখীন হতে পারে।'

বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইতিহাস সৃষ্টিকারী অসংখ্য ঘটনাবলির মধ্যে একটিমাত্র ঘটনা প্রিয় পাঠকদের খিদমতে পেশ করা হচ্ছে:

বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাহসিকতার পরিচয় ফুটে উঠে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর। যখন নবদীক্ষিত মুসলমানরা যেভাবে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেভাবেই না বুঝে দলে দলে ভণ্ডনবীদের দলে শামিল হচ্ছিল। ইসলামের এই চরম দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে আল্লাহ যাদের দৃঢ় মনোবল এবং ঈমানী মযবুতি দান করেছিলেন, শুধু তারা ব্যতীত অন্য সকলেই মুরতাদদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তায়েফ, মক্কা ও মদীনাসহ এর পার্শ্ববর্তী বিক্ষিপ্ত কিছু গোত্র ছাড়া বাকি সর্বত্রই এই ফিতনা ব্যাপকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল।

এই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইসলামের হেফাযতের জন্যে আমীরুল মুমিনীন আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে চতুর্মুখী ফিতনা মোকাবেলার যোগ্যতা ও দৃঢ়তা দান করেন। তিনি পাহাড়সম অটল হয়ে একাধারে যাকাত প্রদানে অস্বীকারকারীদের এবং ভণ্ড নবী ও তাদের অনুসারী মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করলেন। আনসার এবং মুহাজিরদের সমন্বয়ে তিনি সশস্ত্র এগারোটি বিশেষ বাহিনী তৈরী করে প্রত্যেক বাহিনীর জন্যে আলাদা আলাদা ঝাণ্ডা নির্ধারণ করলেন। ভণ্ড নবীদের সমুচিত শিক্ষা দিয়ে বিপথগামী ও ধর্মত্যাগী মুরতাদদের ইসলামে প্রত্যাবর্তনের জন্যে এসব বাহিনীকে আরব বিশ্বের চতুর্দিকে প্রেরণ করেন।

ভণ্ড নবী ও তাদের অনুসারী মুরতাদদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ছিল বনূ হানীফা সম্প্রদায়ের মুসায়লামাতুল কায্যাবের। মুসায়লামাতুল কায্যাব তার নিজস্ব গোত্র এবং সন্ধিতে আবদ্ধ সম্প্রদায়সমূহের সুদক্ষ চল্লিশ হাজার যোদ্ধার এক বিশাল বাহিনী গড়ে তুলেছিল। এই বাহিনী ইসলামের জন্য বিরাট এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যাদের অধিকাংশই ছিল সংকীর্ণ ভৌগোলিক ও বংশীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। যারা ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধের পরিবর্তে গোত্রীয় গোঁড়ামি, সংকীর্ণতা ও আঞ্চলিকতার শিকারে পরিণত হয়েছিল। তাদের মতে, অনেকের ভাষ্য ছিল:

أَشْهَدُ أَنَّ مُسَيْلَمَةَ كَذَّابٌ، وَمُحَمَّدًا صَادِقٌ ... لَكِنَّ كَذَّابَ ربيعَةَ أَحَبُّ إِلَيْنَا مِنْ صَادِقٍ مُضَر".
'আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিঃসন্দেহে মুসায়লামাতুল কায্যাব একজন ভণ্ড নবী এবং মুহাম্মদ সত্য নবী; কিন্তু আমাদের কাছে কুরাইশ বংশের সত্য নবীর চেয়ে স্বগোত্রীয় ভণ্ডনবী ও মিথ্যাবাদী মুসায়লামাতুল কায্যাবই ভালো।'

আমীরুল মু'মিনীন আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসায়লামাতুল কায্যাবের মোকাবেলা করার জন্যে আবূ জাহলের ছেলে ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নেতৃত্বে যে বাহিনী পাঠিয়েছিলেন, প্রচণ্ড হামলার মুখে তারা পরাজিত হয়ে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়। অতঃপর আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে আনসার এবং মুহাজির সাহাবাদের মধ্যে বিশিষ্ট যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত যে বাহিনী প্রেরণ করেন, তাদের মধ্যে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও ছিলেন।

খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ভণ্ডনবী মুসায়লামাতুল কায্যাব এবং তার অনুসারীদের সমুচিত শিক্ষা দিয়ে পুনরায় ইসলামে দীক্ষিত করার জন্যে সাহাবী যোদ্ধাদের নেতৃত্বে এই বিশেষ বাহিনী নিয়ে দ্রুতগতিতে নাজদের 'ইয়ামামা' নামক প্রান্তরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। মুহূর্তের মধ্যেই উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধ শুরুর প্রায় সাথে সাথেই মুসায়লামাতুল কায্যাবের বিশাল বাহিনী মুসলিম বাহিনীকে কাবু করে ফেলে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, সুশৃঙ্খল মুসলিম বাহিনীর পায়ের নিচের মাটি যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল। নিজেদের অবস্থান থেকে ক্রমেই তারা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছিল। এই নাজুক মুহূর্তে মুসায়লামাতুল কায্যাবের বাহিনী অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তাঁবুতে হামলা করে তাঁবুর খুঁটি উপড়ে ফেলে। এমনকি সেখানে অবস্থানরত খালিদ বিন্ ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর স্ত্রীকে হত্যার জন্যে উদ্যত হলে মুসায়লামাতুল কায্যাব বাহিনীরই একজন যোদ্ধা জাহিলিয়াতের প্রথানুযায়ী 'যুদ্ধক্ষেত্রে শিশু ও নারীদের হত্যা করা কাপুরুষোচিত ও গর্হিত কাজ'- এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁকে নিরাপত্তা দিয়ে রক্ষা করে।

এ চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় মুসলিম যোদ্ধারা নিশ্চিত পরাজয়ের আশঙ্কায় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন। তাঁরা এ কথা মনে করছিলেন যে, মুসায়লামাতুল কায্যাবের কাছে আজ পরাজয়ের পর এই আরব বিশ্বে ইসলামের নাম উচ্চারণ করার মতো আর কোনো ব্যক্তি অবশিষ্ট থাকবে না। শিরকমুক্ত এই জাযীরাতুল আরবে তাওহীদের বাণী উচ্চারণ ও আল্লাহর ইবাদত করার জন্য আর কেউ সাহস করবে না।

সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদের নিজের তাঁবু আক্রান্ত হওয়ার পর এই চরম নাজুক মুহূর্তে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বিক্ষিপ্ত মুসলিম বাহিনীকে তৎক্ষণাৎ পুনর্গঠিত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সাথে সাথে তিনি মুহাজির, আনসার, শহরবাসী ও মরুবাসী বেদুইন যোদ্ধাদের ভিন্ন ভিন্ন রেজিমেন্টে বিভক্ত করে প্রত্যেক রেজিমেন্টের জন্যে স্বগোত্রীয় উপ-সেনাপতি ও ভিন্ন ভিন্ন ঝাণ্ডা নির্ধারণ করেন। যেন প্রত্যেক বাহিনী স্বীয় অস্তিত্বের স্বার্থেই শত্রু বাহিনীর মোকাবেলায় মরণপণ চেষ্টা চালায় এবং কোন্ সেক্টর থেকে দুর্বলতা প্রকাশ পায় তাও চিহ্নিত করা সহজ হয়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই উভয় বাহিনীর মাঝে পুনরায় প্রচন্ড যুদ্ধ বেধে গেল। ভয়াবহ সে যুদ্ধ! মুসলিম যোদ্ধারা এর পূর্বে এমন মারাত্মক কোনো সংঘর্ষ কখনও প্রত্যক্ষ করেননি। এবার বীর বিক্রমে মুসলিম বাহিনী শত্রুবাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা মুসায়লামাতুল কায্যাব বাহিনীর যোদ্ধাদের ধরাশায়ী করে ইয়ামামার ময়দান লাশের স্তূপে পরিণত করে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। অপরপক্ষে, মুসায়লামাতুল কায্যাবের বাহিনী তাদের এই মারাত্মক ক্ষয়-ক্ষতি প্রত্যক্ষ করেও যুদ্ধ ময়দানে তখনও পাহাড়ের মতো অটল হয়ে মুসলমানদের মোকাবেলা অব্যাহত রাখল। মুসলিম যোদ্ধারা ঈমানী চেতনায় বলীয়ান হয়ে যুদ্ধের ক্ষিপ্রতাকে আরও তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলছিল।

ছাবিত বিন্ কায়েস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসলিম যোদ্ধাদের মধ্যে আনসার বাহিনীর ঝাণ্ডাবরদার (পতাকাবাহক) ছিলেন। তিনি যুদ্ধের এই তীব্রতা লক্ষ্য করে তার পরিচালিত বাহিনীর এই ঝাণ্ডাকে পিছনে সরিয়ে নিতে হতে পারে, তা আঁচ করে তৎক্ষণাৎ যুদ্ধ ময়দানে তাঁর দু'পায়ের হাঁটু পর্যন্ত মাটির নিচে গেড়ে ফেললেন। মুহূর্তেই শত্রু সৈন্যরা তার বহনকৃত ঝাণ্ডাকে ভুলুণ্ঠিত করার জন্যে তার ওপর আঘাত হানতে শুরু করল। তিনি একহাতে ঝাণ্ডাকে সমুন্নত রেখে অন্যহাতে তরবারি চালনা করে এ আক্রমণ প্রতিহত করতে করতে এক পর্যায়ে দুশমনের তরবারির আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

যুদ্ধের এই তীব্রতা ও প্রচণ্ডতার মাঝে মুহাজির বাহিনীর মধ্য হতে আমিরুল মু'মিনীন উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভাই যায়েদ ইবনুল খাত্তাব দুশমনের উপর আরও তীব্র গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে মোহাজিরদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলছিলেন:

أَيُّهَا النَّاسُ عَضُّوا عَلَى أَضْرَاسِكُمْ ، وَاضْرِبُوا فِي عَدُوِّكُمْ وَامْضُوا قُدُمًا ... أَيُّهَا النَّاسُ وَاللَّهِ، لَا أَتَكَلَّمُ بَعْدَ هَذِهِ الْكَلِمَةِ أَبَدًا حَتَّى يُهْزَمَ مُسَلَمَةُ أَوْ أَلْقَى اللَّهَ فَأُدْلِي إِلَيْهِ بحجتِي....
'হে মুসলিম যোদ্ধারা! আরও ক্ষীপ্র গতিতে আঘাত হানো, সম্মুখপানে অগ্রসর হও, শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ো, হে যোদ্ধারা জেনে রাখো, এটাই তোমাদের প্রতি আমার শেষ আহ্বান। হয় আজ মুসায়লামাতুল কায্যাবকে নিশ্চিহ্ন করবো অথবা শহীদ হয়ে আল্লাহর দরবারে পৌঁছে নিজের অপারগতা পেশ করবো।'

এ আহ্বানের সাথে সাথেই সমস্ত মুসলিম মুজাহিদ নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শত্রুবাহিনীর উপর প্রচণ্ড আঘাত হানতে শুরু করল। যায়েদ বিন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দু'হাতে তরবারি চালাতে চালাতে ক্ষীপ্রগতিতে দুশমনদের মাঝে ঢুকে পড়লেন। অসংখ্য মুরতাদদের ধরাশায়ী করার এক পর্যায়ে শত্রুর আঘাতে তিনি শাহাদাতের কোলে ঢলে পড়ে তার কৃত ওয়াদাকে বাস্তবে প্রমাণিত করেন।

আবূ হুযায়ফার কৃতদাস সালেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর উপর মুহাজির বাহিনীর ঝাণ্ডা বহন করার দায়িত্ব অর্পিত হয়। মুহাজিরদের অনেকেই তার প্রতি আশঙ্কা পোষণ করছিলেন যে, যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে তিনি সন্ত্রস্তবোধ করবেন। তারা তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন:

'আমরা আশঙ্কা করছি যে, তুমি যুদ্ধের প্রচণ্ডতায় ভীত হয়ে পশ্চাদপসরণ না করে বসো।' এবং এই সুযোগে শত্রুবাহিনী আমাদের ভিতরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা না করুক।

প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন:
'আমি যদি এ যুদ্ধে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করি তাহলে আমার চেয়ে নিকৃষ্টতম হাফেযে কুরআন আর কে হতে পারে?'

অতঃপর তিনি বীর বিক্রমে দুশমনদের প্রতি আঘাত হানতে হানতে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। মুরতাদদের তরবারির আঘাতের পর আঘাতে তার গোটা শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়; কিন্তু এতদসত্ত্বেও তিনি ইসলামের ঝাণ্ডাকে এক মুহূর্তের জন্যে ভূলুণ্ঠিত হতে দেননি।

কিন্তু এ যুদ্ধে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বীরত্বের কাছে এসব ঘটনা একেবারে নগণ্য বলে মনে হবে। খালিদ বিন্ ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উভয় পক্ষের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের এই প্রচণ্ডতার মধ্যে চূড়ান্ত আঘাতের মাধ্যমে ইসলামের বিজয় ছিনিয়ে আনার জন্যে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে উদ্দেশ্য করে বলেন:

'দুশমনদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ো হে আনসার যুবক ....'।

খালিদ ইবনে ওয়ালিদের এই নির্দেশ পেয়ে বারা'আ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনীর যোদ্ধাদের প্রতি লক্ষ্য করে বলেন:

يَا مَعْشَرَ الْأَنْصَارِ لَا يُفَكِّرَنَّ أَحَدُ مِنْكُمْ بِالرُّجُوعِ إِلَى الْمَدِينَةِ فَلَا مَدِينَةَ لَكُمْ بَعْدَ الْيَوْمِ ... وَإِنَّمَا هُوَ اللَّهُ وَحْدَهُ ... ثُمَّ الْجَنَّةُ .
'হে আনসার ভাইয়েরা! কখনো আপনারা মদীনায় ফিরে যাওয়ার চিন্তা করবেন না। এ মুহূর্ত হতেই আপনাদের জন্যে আর মদীনা নয়; আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তাওহীদের বাণীকে চিরসমুন্নত করে জান্নাতের দিকে অগ্রসর হোন।'

এই বলে তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে শত্রু বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বারা'আ ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দক্ষতার সাথে দু'ধারী তরবারি চালিয়ে তাঁর দু'পার্শ্বের দুশমনদের ধরাশায়ী করে সম্মুখে অগ্রসর হতে লাগলেন। মুসায়লামাতুল কায্যাবের যোদ্ধাদের শিরশ্ছেদ করতে করতে তিনি এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। এ আঘাতে মুসায়লামাতুল কায্যাব ও তাঁর বাহিনীর মধ্যে হঠাৎ ভীতি ও ত্রাসের সৃষ্টি হলো। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা যুদ্ধ ময়দান সংলগ্ন বাগানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো। যে বাগানটি পরবর্তী সময়ে অগণিত মৃতদেহের স্তূপের কারণে 'হাদীকাতুল মাউত' বা 'লাশের বাগান' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নানাবিধ ক্ষয়-ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে বাগানটি উচু ও প্রশস্ত দুর্ভেদ্য প্রাচীর দিয়ে বেষ্টিত ছিল। যুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে প্রাণ রক্ষার জন্যে মুসায়লামাতুল কায্যাব ও তাঁর অনুসারী যোদ্ধারা এ বাগানে আশ্রয় নিয়ে দ্রুত এর একমাত্র গেটটি বন্ধ করে দেয়। এভাবে নিজেরা নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে তার ভিতর থেকে মুসলমান বাহিনীর উপর বৃষ্টির মতো তীর বর্ষণ শুরু করে। এতে মুসলমানদের নিশ্চিত বিজয় আবার অনিশ্চয়তার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। মুসলিম যোদ্ধাদের পক্ষে তাদের মোকাবেলা করার সমস্ত পথ যেন রুদ্ধ হয়ে আসে। এ অবস্থায় মুসলিম বাহিনীর অন্যতম বীর সিপাহসালার বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তনের মাধ্যমে শত্রুদের প্রতি এক চরম ও শেষ আঘাত হানার জন্যে পরিকল্পনা নেন। তিনি তৎক্ষণাৎ একটি ঢাল সংগ্রহ করে তাঁর বাহিনীর লোকদের উদ্দেশ্য করে বললেন:

'আমি এ ঢালের উপরে বসে পড়ি, তোমরা আমাকে উঁচুতে উঠিয়ে ১০/১২টি বর্শা ফলকের সাহায্যে উপরে তুলে এ গেটের ভিতরে নিক্ষেপ কর। হয় আমি দুশমনদের হাতে শহীদ হয়ে যাবো অথবা ভিতরে গিয়ে তোমাদের জন্যে এ বাগানের গেট খুলে দেব।'

দেখতে না দেখতেই বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উন্মুক্ত তরবারি হাতে তার ঢালটির উপর বসে পড়লেন। অত্যন্ত হালকা-পাতলা ও ছিপ ছিপে আনসার যুবক বারা'আকে কয়েকজনে খুব সহজেই ঢালে বসিয়ে মাথার উপর তুলে নিলেন এবং সাথে সাথে অন্য কয়েকজন বর্শাধারী তাদের বর্শা ফলকে তাকে উপরে তুলে গেটের ভিতরে মুসায়লামাতুল কায্যাবের হাজার হাজার অনুগত যোদ্ধার মাঝে সজোরে নিক্ষেপ করলেন। বারা'আ অপ্রত্যাশিতভাবে তাদের মাঝে বজ্রপাতের ন্যায় লাফিয়ে পড়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতিতে গেট রক্ষী বাহিনীর উপর আক্রমণ শুরু করলেন। অন্যদিকে মুসায়লামাতুল কায্যাবের দুর্ধর্ষ সৈন্যরা চতুর্দিক থেকে ভিমরুলের মতো তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তলোয়ার, বর্শা আর খঞ্জরের আঘাতে তারা তাঁর গোটা দেহকেও ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলল; কিন্তু বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের গেটরক্ষী বেষ্টনির দশজনকে হত্যা করে পরিশেষে গেট খুলে দিতে সমর্থ হলেন।

এদিকে সাথে সাথে অপেক্ষমাণ বীর মুসলিম যোদ্ধারা 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে বাঁধভাঙা স্রোতের মতো ভিতরে ঢুকতে শুরু করলেন। যা ছিল এক নজীরবিহীন ভয়াল চিত্র! মুহূর্তেই উভয়পক্ষের মধ্যে পুনরায় ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। মুসলমানদের প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে মুসায়লামাতুল কায্যাবের বাহিনী প্রাণ ভয়ে দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে লাগল আর মুসলিম যোদ্ধারা এ সুযোগে তাদেরকে দলে দলে নিঃশেষ করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত সেখানে মুসায়লামাতুল কায্যাবের অবশিষ্ট বিশ হাজার সৈন্যের কবর রচনা করে তার দেহরক্ষী বাহিনীসহ তাকে ঘিরে ফেলে সবাইকে জাহান্নামের অতল গহবরে নিক্ষেপ করা হলো। সমস্ত বাগান বিশ হাজার মুরতাদের লাশের স্তূপে পরিণত হয়ে গেল।

অন্যদিকে এই দুঃসাহসী বীর যোদ্ধা বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, যিনি এ গেট খুলতে গিয়ে আশিটির অধিক তীর, বর্ষা ও তরবারির আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিলেন, তাঁকে বিশেষ চিকিৎসার জন্যে চিকিৎসা তাঁবুতে প্রেরণ করা হলো। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দীর্ঘ এক মাস ধরে নিজে বারা'আ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিদমতে নিয়োজিত থাকলেন। ধীরে ধীরে বারা'আ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সুস্থ হয়ে উঠলেন। তাঁর এই মহান ত্যাগ, এবং কুরবানীর বদৌলতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁরই হাতে মুসলমানদের এ যুদ্ধে বিজয় দান করে জাযীরাতুল আরবকে চিরদিনের জন্যে ভণ্ডনবী ও মুরতাদদের হাত থেকে পবিত্র করলেন।

মুসায়লামাতুল কায্যাব বাহিনীর সাথে ইয়ামামার প্রান্তরে 'হাদীকাতুল মাউতের' রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শাহাদাতের মৃত্যুর গৌরব থেকে মাহরুম হয়ে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শাহাদাতের তামান্নায় পরবর্তীতে একের পর এক সকল যুদ্ধে বীরত্বের সাথে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর জীবনের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা যে, তিনি যেন শাহাদাতের মৃত্যুর মাধ্যমে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে জান্নাতে মিলিত হতে পারেন।

সর্বশেষে তিনি পারস্য সাম্রাজ্যের সাথে মুসলমানদের 'তুস-তর' কেল্লা বিজয়ের জিহাদে অংশ গ্রহণ করেন। সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের এক পর্যায়ে পারস্য সৈন্যরা দুর্ভেদ্য 'তুস-তর' কেল্লায় আশ্রয় নিয়ে ভিতর থেকে এর বিশাল গেটটি বন্ধ করে দেয়। মুসলিম যোদ্ধারা এই কেল্লার চারপার্শে অবস্থান নিয়ে কেল্লাটিকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ধীরে ধীরে সব রসদ ও সরঞ্জামাদি নিঃশেষ হয়ে আসলে পারস্য বাহিনী জীবন রক্ষার লড়াইয়ে এক ধ্বংসাত্মক কৌশল অবলম্বন করে। তারা লম্বা শিকলের মাথায় মাছ ধরা বড়সির মতো লৌহ নির্মিত বড় বড় আংটাগুচ্ছ আগুনে পুড়িয়ে লাল করে নেয়। কেল্লার উপর থেকে মুসলমানদের উপরে তা নিক্ষেপ করে। প্রাচীর টপকে ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করা মাত্রই তাতে আটকিয়ে যাওয়া মুসলিম যোদ্ধাদের ক্রেনের মতো উপরে টেনে তুলে নিতে শুরু করে। এভাবে বেশ ক'জন মুসলিম যোদ্ধা আগুনে পোড়ানো আংটার নির্মম শিকারে পরিণত হন। অকস্মাৎ একটি আংটাগুচ্ছ বারা'আ বিন্ মালেকের বড় ভাই আনাস বিন্ মালেক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দেহে বিঁধে তাকে তুলে নিতে শুরু করে। বারা'আ বিন মালেক আল আনসারী কালবিলম্ব না করে এক লাফে এক হাতে শিকলটিকে ধরে ফেলে, ঝুলন্ত অবস্থায় অন্য হাতে আনাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শরীরে বিদ্ধ গরম আংটা খুলতে শুরু করেন। লাল টকটকে পোড়া আংটার দাহে তাঁর হাতের গোশ্ত পুড়ে ধোয়া বের হতে লাগলো। কিন্তু তিনি তাঁর আক্রান্ত হাতের অসহ্য কষ্টের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে আনাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আংটার হাত থেকে ছাড়ানোমাত্রই এক লাফে নীচে নেমে আসেন। তখন তাঁর পোড়া হাতে শুধু হাড়গুলো ছাড়া আর কোনো গোস্ত অবশিষ্ট ছিল না।

এই 'তুস-তর' কেল্লা বিজয়ের যুদ্ধে তিনি আল্লাহর দরবারে শাহাদাতের জন্যে দু'আ করেছিলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর এই দু'আ কবুল করে নেন। এ যুদ্ধেরই এক পর্যায়ে তিনি শত্রুর তরবারির আঘাতে শাহাদাতের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বহু আকাঙ্ক্ষিত শাহাদাতের মাধ্যমে তিনি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সান্নিধ্যের পথ রচনা করে পরবর্তী উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্যে প্রেরণা সৃষ্টি করে যান।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাতে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারীর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করুন ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দর্শনে তার চক্ষুদ্বয় শীতল করুন, ইসলামের খিদমতের জন্যে আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন। আমীন।

টিকাঃ
১. আল ইসাবা, ৬২০ নং জীবনী। ২. আল ইসতিয়াব বি হামেশে আল ইছাবা, ১ম খণ্ড, ১৩৭ পৃ.। ৩. আত্ তাবাকাতুল কুবরা, ৩য় খণ্ড, ৪৪১ পৃষ্ঠা, ৭ম খণ্ড, ১৭ পৃষ্ঠা এবং ১৩১ পৃ.। ৪. তারিখ আত্ তাবারী, ১০ম খণ্ডের সূচী দ্রষ্টব্য। ৫. আল কামিল ফিত্ তারিখ, সূচি দ্রষ্টব্য। ৬. আস সিরাতু আন্ নববীয়‍্যাহ, ইবনি হিশাম, সূচি দ্রষ্টব্য। ৭. হায়াতুস সাহাবা, ৪র্থ খণ্ড, সূচী দ্রষ্টব্য। ৮. কা'দাতু ফাতহু ফারেছ-লশিত খাত্তাব।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 উম্মু সালামা (রাঃ)

📄 উম্মু সালামা (রাঃ)


'তুমি তোমার অভিজাত মন সম্পর্কে যা বলেছ, আমি আল্লাহর কাছে দু'আ করছি, আল্লাহ যেন তোমার অন্তর থেকে তা দূর করে দেন এবং তুমি তোমার বৃদ্ধাবস্থায় পদার্পণের যে কথা বলেছ, আমিও তো বয়সের দিক দিয়ে তোমার মতো বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। আর তুমি তোমার সন্তান সম্পর্কে চিন্তা করছ? এখানে তোমার সন্তানতো আমারই সন্তান।' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

প্রিয় পাঠক! উম্মু সালামা সম্পর্কে কি কিছু জানেন? কে এই মহিয়সী মহিলা? তিনি ছিলেন মুসলিম নারীকূলের গর্ব উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন প্রসিদ্ধ মহিলা সাহাবী। তাঁর আসল নাম ছিল হিন্দ। উম্মু সালামা তাঁর ডাক নাম। পরবর্তী সময়ে তিনি উম্মুল মুমিনীনের মর্যাদা লাভ করেন এবং ডাক নামেই বেশী পরিচিত হন।

উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার পিতা ছিলেন বনু মাখযূম গোত্রের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা। তিনি তৎকালীন আরবের হাতেগোনা কয়েকজন দানবীর ব্যক্তির অন্যতম ছিলেন। এই দানশীলতার জন্যে তাঁকে 'সফর সামগ্রীর যোগানদাতা'ও বলা হতো। কারণ কোনো মুসাফির তাঁর সাথে ভ্রমণ করলে অথবা তাঁর বাড়িতে অবস্থান নিলে সেই মুসাফিরের কোনো সফর সামগ্রীর প্রয়োজন হতো না।

উম্মু সালামার স্বামী ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আবদিল আসাদ। তিনি ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম সম্মানিত দশজন সাহাবীর অন্যতম। আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং আরও দু'একজন সাহাবী ছাড়া তাঁর আগে আর কেউ ইসলাম গ্রহণ করেননি।

উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা তাঁর স্বামীর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনিও ছিলেন দ্বিতীয় ইসলাম গ্রহণকারী মহিলাদের অন্যতম। উম্মু সালামা ও তাঁর স্বামীর ইসলাম গ্রহণের খবর চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে কুরাইশদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। উম্মু সালামাদের উপরও নেমে আসে কঠিন ও অবর্ণনীয় নির্যাতন। সে নির্যাতনের বর্ণনা কোনো পাষাণ হৃদয়ের মানুষও যদি শোনে তাহলে তাঁর হৃদয়ও বিগলিত না হয়ে পারে না; কিন্তু উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা ও তাঁর স্বামী এত নির্যাতনের পরও বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি এবং কোনো প্রকার দুর্বলতা ও সংশয় তাঁদের স্পর্শ করেনি। তাঁরা কঠিন নির্যাতনের সময় ধৈর্য ও ত্যাগের অনুপম নজীর স্থাপন করেছেন।

মক্কায় ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম কাতারের সাহাবীদের উপর এভাবে চলছিল জুলুম-নিপীড়ন ও নির্যাতনের স্টীম রোলার। জান-মালের এক চরম নিরাপত্তাহীনতা- জাহিলী যুগের বর্বরতার এ এক ভয়াল ও করুণ চিত্র।

প্রতিনিয়তই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কানে ভেসে আসছিল সাহাবীদের ওপর নির্যাতনের রোমহর্ষক আর্তনাদ। সাহাবীদের জান-মালের হেফাযতের জন্যে তিনি দারুণভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। উপায়ান্তর না দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের হাবশায় (বর্তমান ইথিওপিয়া বা আবিসিনিয়া) হিজরতের অনুমতি দিলেন। ঈমানের হেফাযতের জন্য অনিশ্চিত নিরাপত্তার প্রত্যাশায় অন্যান্যের মতো উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এবং তাঁর স্বামীও হাবশায় হিজরত করেন।

উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা ও তাঁর স্বামী তাঁদের সুউচ্চ অট্টালিকা, বংশীয় প্রতিপত্তি এবং অঢেল ধন-সম্পদ সবকিছু ফেলে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, স্বাধীনভাবে তাঁর ইবাদত ও পারলৌকিক পুরস্কারের প্রত্যাশায় হাবশায় বাদশাহ নাজ্জাশীর নিরাপত্তা ও আশ্রয়ে খুবই শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।

বিশ্ব মানুষের কল্যাণ, মুক্তি এবং হেদায়াতের জন্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ওহী নাযিলের স্থান হিসেবে পছন্দ করেছিলেন মক্কা মুআয্যমা। এই মক্কা নগরী ত্যাগের যে কী মর্মজ্বালা! সেই মর্মজ্বালা একমাত্র তাঁরাই উপলব্ধি করেছেন, যারা নির্যাতনে জর্জরিত হয়েও মক্কায় ছিলেন এবং প্রাণাধিক প্রিয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র চেহারা মোবারক দেখে আর তাঁর সঙ্গে মুসাফাহায় ও আলিঙ্গনে হৃদয় শীতল করে সকল দুঃখ-যাতনা ভুলে যেতেন। তাঁরা সেই প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য হতে বঞ্চিত হয়ে হাবশায় নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে থাকেন। বিচ্ছিন্নতার দুশ্চিন্তাই ছিল তাঁদের সাথী। এই নিঃসঙ্গতা ও দুর্ভাবনাকে যদিও হাবশার বাদশাহ নাজ্জাসীর সার্বিক সহযোগিতা অনেকাংশে লাঘব করতো তবুও তাঁদের মনে ছিল নিদারুণ উৎকণ্ঠা ও ব্যাকুলতা।

কিছুদিন যেতে না যেতেই লোক মারফত মক্কায় ইসলামের দ্রুত প্রসারের সুখবর হাবশায় গিয়ে পৌঁছতে থাকে। তাঁরা জানতে পারেন, কুরাইশদের লৌহমানব হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব, তেজস্বী মহাবীর উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমসহ বহু প্রভাবশালী নেতৃস্থানীয় মক্কাবাসী ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার কারণে মুসলমানদের উপর থেকে কুরাইশদের নির্যাতন ও নিপীড়নের মাত্রা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। এ খবর শুনে মুহাজিরদের অনেকেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে পুণ্য স্মৃতিবিজড়িত মাতৃভূমি মক্কায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন এবং মক্কার উদ্দেশ্যে হাবশা ত্যাগ করেন। এই প্রত্যাবর্তনকারী কাফেলার সাথে উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এবং তাঁর স্বামীও ছিলেন।

হাবশা থেকে প্রত্যাগত সাহাবীগণ মক্কায় এসে বাস্তবে প্রত্যক্ষ করেন যে, মক্কায় ইসলাম সম্প্রসারণ এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে যেসব খবর তাঁরা হাবশায় বসে পেয়েছিলেন তা ছিল অতিরঞ্জিত। হামযা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইসলাম গ্রহণ কুরাইশদের প্রতিষ্ঠিত পৌত্তলিক সমাজ কাঠামোর ওপর ছিল একটি প্রচণ্ড আঘাত। কুরাইশদের আশঙ্কা- এভাবে অনবরত যদি সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা ইসলামের অনুসারী হয়ে যান, তাহলে তাদের প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থার পতন অনিবার্য। বিষয়টি তাদের কাছে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো ছিল। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, যে কোনোভাবে মুসলমানদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে হবে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তারা মুসলমানদের প্রতি অধিকতর হিংস্র হয়ে উঠে এবং সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও দৈহিক নির্যাতনের মাত্রা পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ও ভয়াবহতা লক্ষ্য করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার মুসলমানদের মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ দেন। কুরাইশদের সীমাহীন নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মদীনা হিজরতকারী দলের সাথে উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এবং তাঁর স্বামীও অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন; কিন্তু তাদের জন্যে হাবশার মতো মদীনায় হিজরত করা এতো সহজ ছিল না। এবারের হিজরত ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপদসংকুল। পদে পদে বিপদ-মুসীবত, জীবনের ঝুঁকি এবং সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট তাঁদেরকে অক্টোপাসের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে।

মদীনা হিজরতের দুঃখ-কষ্টের করুণ কাহিনী উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার ভাষায় ছিল:

'আমার স্বামী আবূ সালামা অতি সঙ্গোপনে মদীনা হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন। প্রয়োজনীয় কাজ সমাপ্ত করে তিনি আমার জন্যে একটি উটও প্রস্তুত রাখেন। অতি সতর্কতার সাথে সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে আমাদের একমাত্র ছেলে সালামাকে কোলে নিয়ে আমি উটের পিঠে সওয়ার হই। সাথে সাথে আমার স্বামী এদিক-সেদিক চিন্তা না করে দ্রুতগতিতে মদীনার উদ্দেশ্যে উট চালনা করতে থাকেন। চালকের সংকেত পাওয়ামাত্রই উটটিও তার স্বাভাবিক গতির চেয়ে আরও অধিক গতিতে এগিয়ে চলে। আমরা মক্কার সীমান্ত অতিক্রম করতে যাচ্ছি, ঠিক এ সময়ে আমার নিজ গোত্র বনু মাখযূমের কিছু লোক আমাদের দেখে ফেলে এবং গতিরোধ করে। তারা আমার স্বামী আবূ সালামাকে উদ্দেশ্যে করে বলে:

'তুমি যদি আমাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে চলে যেতেও সক্ষম হও তাতেই বা কী আসে যায়? কিন্তু তোমার স্ত্রী? সে তো আমাদের বংশের মেয়ে। তুমি চাইলেই কি আমরা তাকে তোমার সাথে যেখানে খুশি যেতে দেব? আর সে চাইলেই কি তোমার সাথে ইয়াসরিবে চলে যেতে পারবে?

'এই বলেই তারা আমার স্বামীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তারা আমার স্বামীর নিকট থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়। অতঃপর তারা আমাকে নিয়ে মক্কায় রওয়ানা হয়। ঠিক এ সময়ে আমার স্বামীর গোত্র আবুল আসাদের কিছু লোকজন ঘটনাক্রমে সেখানে এসে পৌছে। তারা দেখতে পায় যে, আমার স্বগোত্রীয় লোকজন আমার স্বামী থেকে আমাকে ও আমাদের সন্তানকে জোরপূর্বক মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এতে তারা ভীষণ ক্ষুব্ধ হয় এবং তারা আমার গোত্রের লোকদের বলে:

'তোমরা যেহেতু আমাদের গোত্রের আবূ সালামা থেকে তোমাদের মেয়েকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছ, সেহেতু আমাদের গোত্রের শিশু সন্তানকে তোমাদের সাথে যেতে দিতে পারি না। সে আমাদের বংশের ছেলে। তাই আমরাই তার বৈধ উত্তরাধিকারী।'

'এই উত্তরাধিকারীর দাবিতে উভয় গোত্রের লোকজনের মধ্যে আমার ছেলে সালামাকে নিয়ে ভীষণ বাক-বিতণ্ডার সৃষ্টি হয় এবং এক পর্যায়ে আমার স্বামীর গোত্রের লোকজন সালামাকে ছিনিয়ে নেয়। এই হাঙ্গামা এবং আক্রমণ পাল্টা-আক্রমণের এক পর্যায়ে আমি আমার স্বামী ও সন্তান থেকে মুহূর্তের মধ্যেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি।

'এদিকে আবূ সালামা আমার গোত্রীয় লোকজনের আক্রমণ থেকে কোনোমতে রক্ষা পেয়ে জীবন ও দীনের হেফাযতের উদ্দেশ্যে মদীনার দিকে চলে যান। এভাবেই আমি আমার গোত্রের লোকজনের হাতে বন্দী হয়ে পড়ি। অপরদিকে দুগ্ধপোষ্য সন্তান সালামা তার স্বগোত্রীয় লোকদের রক্ষণাবেক্ষণে চলে যায়।

'ক্ষণিকের মধ্যেই আমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় ও মধুর দাম্পত্য জীবনে নেমে আসে নানা বিপদ, শঙ্কা ও উদ্বেগ। আমাদের কলিজার টুকরা সন্তানটিও হৃদয়হীন হিংস্র দস্যুদের অন্যায়ের শিকারে পরিণত হয়। আমার এই বিরহ-বেদনার মর্মজ্বালা এবং বুকফাটা আর্তনাদে আকাশ-বাতাসও যেন ভারী হয়ে উঠে।

'আমার গোত্রের লোকেরা আমাকে এভাবে পাহারা দিয়ে রাখত, যেন তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে আমি মক্কার সীমানা অতিক্রম করে যেতে না পারি। কিন্তু প্রতিদিন আমি স্বামী ও সন্তানের বিরহ-বেদনার সীমাহীন যন্ত্রণা বুকে নিয়ে খুব প্রত্যুষেই ছুটে যেতাম 'আবতাহ' নামক উপত্যকার সেই স্মৃতি বিজড়িত স্থানে যেখান থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। সন্তান ও স্বামীকে ফিরে পাবার বুকভরা আশা নিয়ে সেখানে বসে হা-হুতাশ ও কান্নাকাটি করতাম। আল্লাহর দরবারে সারাটা দিন আহাজারিতে রত থাকতাম।

এমনিভাবে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেই উত্তপ্ত উপত্যকায় আমার কান্নাকাটির প্রায় একটি বছর অতিক্রান্ত হলো। হঠাৎ একদিন আমার চাচার বংশের একজন লোকের নেক নজরে পড়ে গেলাম। আমার আর্তনাদ তার হৃদয়ে দয়ার উদ্রেক করল। তার করুণা ও স্নেহ বাৎসল্য এই যন্ত্রণাদগ্ধ উপত্যকায় আমার জন্যে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ স্বরূপ অনুভূত হলো।

তিনি অত্যন্ত আবেগের সাথে আমার গোত্রের লোকদের উপর চাপ সৃষ্টি করলেন এবং তাদের বললেন:

'এই নিরীহ মেয়েটিকে কি তোমরা মুক্তি দেবে না? কী যে নির্মম আচরণ তোমরা তার সাথে অব্যাহতভাবে করছ! পশুত্বেরও একটি সীমা আছে। অত্যন্ত নির্দয়ভাবে তোমরা তাকে তার স্বামী ও সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছ। আর কতদিন তোমরা তাকে এভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে চাও?'

'মহান রাব্বুল আলামীনের অশেষ মেহেরবানীতে তার এ কথায় আমার গোত্রের লোকজনের পাষাণ হৃদয়ে একটু দয়া ও অনুকম্পার সৃষ্টি হলো। তার এই হৃদয়গ্রাহী নিবেদন ও চাপ সৃষ্টির এক পর্যায়ে তারা আমাকে আমার স্বামীর নিকট চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিল। তারা আমাকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিল:

'যদি ইচ্ছে করো তাহলে তুমি তোমার স্বামীর নিকট চলে যেতে পার।'

'স্বামীর নিকট চলে যাওয়ার' এ অনুমতি একদিকে যেমন আমার পেরেশানী কিছুটা লাঘব করল অন্যদিকে যেন আমার দুঃশ্চিন্তার মাত্রা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। আমার একমাত্র ছেলে সালামাকে মক্কায় বনূ আসাদ গোত্রের লোকদের হাতে বন্দী রেখে আমি কী করে মদীনায় আমার স্বামীর কাছে যেতে পারি? কী করে নিজের মনকে প্রবোধ দিতে পারি? তখন চোখের পানিও শুকিয়ে যাচ্ছিল, কলিজা ফেটে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল এই বেদনায় যে, আমার ছেলেকে মক্কায় রেখে আমি কি মদীনায় হিজরত করে মনে শান্তি পাব? এসব চিন্তায় আমি পাগলপারা হয়ে যাচ্ছিলাম।

'আল্লাহর মেহেরবানীতে কিছু হৃদয়বান লোক আমার এই করুণ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে তাদের সহানুভূতির হাত আমার দিকে প্রসারিত করল। তারা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে বনূ আসাদ গোত্রের নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করে আমার ছেলে সালামাকে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তাদেরকে রাজি করাতে সক্ষম হলো। এভাবে আমার নয়নের মণি সালামাকে আমি ফিরে পেলাম।

'ছেলে সালামাকে ফিরে পেয়েই মদীনায় যাওয়ার জন্যে একজন সফর সঙ্গীর অপেক্ষা করছিলাম। আমার ভয় হচ্ছিল যে, বিলম্বের কারণে আবার না জানি কোন্ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে স্বামীর সান্নিধ্য লাভে ব্যর্থ হই। অতএব কালবিলম্ব না করে আমি নিজেই বাহন উটটিকে সফরের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করলাম এবং কাউকে না পেয়ে একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করে আমার শিশু পুত্রসহ একাই রওয়ানা হয়ে গেলাম।

'মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে 'তানয়ীম' নামক স্থানে খানায়ে কাবার চাবি সংরক্ষণকারী ওসমান ইবনে তালহার সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়।

তিনি আমাকে দেখে বললেন: 'হে সফর সামগ্রীর যোগানদাতার মেয়ে, তুমি কোথায় যাচ্ছ?' আমি উত্তর দিলাম, 'স্বামীর সাথে মিলিত হওয়ার প্রত্যাশায় মদীনায় যাচ্ছি।' তিনি বললেন, 'তোমার সাথে কি কোনো সফরসঙ্গী নেই?'

উত্তরে আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম, আল্লাহ এবং আমার এই শিশু সন্তান সালামা ব্যতীত আমার সাথে আর কেউ নেই।'

আমার এই জওয়াব শুনে তিনি বললেন : 'আল্লাহর শপথ! এ অবস্থায় আমি তোমাকে একাকী যেতে দিতে পারি না। তুমি নিশ্চিন্ত হও যে, অবশ্যই আমি তোমাকে মদীনা পর্যন্ত পৌঁছে দেব।'

'এই বলে তিনি তাঁর নিজের গতি পরিবর্তন করে আমার উটের রশি ধরে মদীনার পথ ধরে চলতে থাকলেন। আল্লাহর শপথ! তাঁর মতো ভদ্র, চরিত্রবান ও আমানতদার সফরসঙ্গী এই জীবনে আর কখনো দেখিনি। যখন আমরা কোনো মঞ্জিলে পৌঁছতাম, তখন তিনি উটকে বসার নির্দেশ দিয়ে আমার দিকে না তাকিয়ে দূরে চলে যেতেন। আমি যেন সহজে উট থেকে অবতরণ করতে পারি। আমি উটের পিঠ থেকে নেমে গেলে তিনি এসে উটটিকে কোনো গাছের সাথে বেঁধে দিয়ে পুনরায় দূরে অন্য কোনো গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতেন। আবার যখন আমাদের রওয়ানা হওয়ার সময় হত, তখন তিনি উটকে প্রস্তুত করে আমার নিকটে এসে বসিয়ে দিয়ে নিজে সরে যেতেন এবং আমি ঠিকভাবে বসে আওয়াজ দিলে তিনি এসে রশি ধরে পথচলা শুরু করতেন।

'ক্রমাগত কয়েকদিন এভাবে আমরা মঞ্জিলের পর মঞ্জিল অতিক্রম করে মদীনার কাছে এসে পৌঁছলাম। মদীনা হতে মাত্র দু'মাইল দূরে 'কোবা' নামক স্থানে বনূ ওমর বিন আউফ গোত্রের লোকজনের সাথে আমার স্বামীর বসবাস করার খবর নিশ্চিতভাবে জানলাম। ওসমান বিন তালহা আমাকে বললেন:

'আল্লাহর উপর ভরসা করে তুমি এই গ্রামে প্রবেশ করো, এখানে তোমার স্বামী বসবাস করছেন।'

'অতঃপর ওসমান ইবনে তালহা আমাকে সহীহ-সালামতে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়ে খুশিমনে মক্কার পথে রওয়ানা হয়ে গেলেন।'

ত্যাগ-তিতিক্ষা, কুরবানী ও বিচ্ছিন্নতার বিরহ-বেদনার এক দীর্ঘ ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটল। সীমাহীন ঘাত-প্রতিঘাতের পর উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা তাঁর হারানো স্বামীকে পেয়ে চক্ষু শীতল করলেন। সালামার পিতাও তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় ছেলে ও স্ত্রীকে পেয়ে ধন্য হলেন।

কিছুদিন যেতে না যেতেই বদর যুদ্ধের রণ-দামামা বেজে উঠল। অন্যান্য সাহাবীদের মতো বীর বিক্রমে আবূ সালামাও এ জিহাদে অংশ নিলেন। অসাধারণ বীরত্ব ও যুদ্ধ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে অন্যান্য সাহাবীদের ন্যায় তিনিও বিজয়ীর বেশে ফিরে এলেন।

এদিকে বছর পার হতে না হতেই ওহুদের যুদ্ধের ডাক এসে গেল। সশর যুদ্ধের চেয়ে আরও অধিক বীর বিক্রমে আবূ সালামা ওহুদের রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ওহুদ যুদ্ধের নিশ্চিত বিপর্যয়কে রোধ করতে তিনি জীবনের মায়া ত্যাগ করে তাঁর সাথী-সঙ্গীদের নিয়ে মুশরিকদের পশ্চাৎপসরণে বাধ্য করেন। কিন্তু এ যুদ্ধে তিনি নিজে মারাত্মকভাবে আহত হলেন। তাঁর সমস্ত শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেল। দ্রুত তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু তার শরীরের মারাত্মক ক্ষতস্থানগুলোর উপরদিক শুকিয়ে উঠলেও ভিতরে পচন ধরে গিয়েছিল। ফলে এই মর্দে মুজাহিদ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। চিকিৎসার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার পরও তিনি ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়ছিলেন। এ অবস্থায় তিনি তাঁর স্ত্রী উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে এই বলে সান্ত্বনা দিতেন :

'আমি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট শুনেছি, কেউ যদি কোনো বিপদের সম্মুখীন হয় তাহলে দুঃশ্চিন্তা না করে সে যেন বলে, 'ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।'

কারণ, আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার অনুভূতিই মুমিনের জীবনে বিপদের মুহূর্তে প্রশান্তি দিতে পারে। তিনি এই বলেও প্রার্থনা করতে বলেছেন: اللَّهُمَّ عِنْدَكَ احْتَسَبْتُ مُصِيبَتِي هُذِهِ اللَّهُمَّ اخْلِقْنِي خَيْرًا مِّنْهَا إِلَّا عَطَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ .....

'হে আল্লাহ! আমি আমার এই বিপদে তোমার কাছেই প্রতিদান চাচ্ছি। তুমি আমাকে এর চাইতেও উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করো, আল্লাহ অবশ্যই তাকে তা দান করবেন।'

আবূ সালামার অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছিল। একদিন সকালে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে দেখার জন্যে তাশরীফ আনলেন। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নিয়ে যখন তিনি প্রত্যাবর্তন করছিলেন, ঠিক সে মুহূর্তেই আবূ সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে তাঁর চোখ দুটি বুঁজিয়ে দিলেন এবং আল্লাহর কাছে এই বলে প্রার্থনা করলেন:

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِأَبِي سَلَمَةَ، وَارْفَعْ دَرَجَتَهُ فِي الْمُقَرَّبِينَ وَاخْلُقَهُ فِي عَقِيهِ فِي الْغَابِرِينَ وَاغْفِرْ لَنَا وَلَهُ يَا رَبِّ الْعَلَمِينَ، وَافْسِحْ لَهُ فِي قَبْرِهِ ، وَنُورَ لَهُ فِيهِ.
'হে আল্লাহ! তুমি আবূ সালামার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দাও, তাঁর মর্যাদাকে বৃদ্ধি করে তোমার প্রিয় ও নিকটতম বান্দাহদের অন্তর্ভুক্ত করো, তাঁর পরিবার-পরিজনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করো এবং তাঁকে ও আমাদের সকলকে ক্ষমা করো। তাঁর কবরকে আলোকিত ও প্রশস্ত করে দাও।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তার স্বামী কর্তৃক বর্ণিত সেই দু'আ উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার স্মরণ হলো। তিনি- 'হে আল্লাহ বিপদে তোমার কাছেই এর প্রতিদান চাচ্ছি'- পর্যন্ত বলে থমকে গেলেন এবং মনে মনে বললেন:

'আবূ সালামার চেয়ে উত্তম জীবন সঙ্গী আর কে হতে পারে?'

এ চিন্তা করতে করতে দু'আর শেষ পর্যন্ত বললেন। এ দু'আর ফলাফল তড়িৎগতিতে তার সামনে এল। অর্থাৎ দেখতে না দেখতেই উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার দু'আ বাস্তবে প্রতিফলিত হলো।

উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার স্বামীর মৃত্যুতে সমস্ত মুসলমান শোকাভিভূত হলেন, যা অতীতে কারো মৃত্যুতে এমনটি হয়নি। উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার সীমাহীন দুঃখ-কষ্টে সমবেদনা জানাতে গিয়ে তাঁকে মুসলমানগণ 'আইয়্যিমুল আরাব' বা 'আরব জাতির বিধবা'- এই সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত করলেন।

আরবের ঐতিহ্যবাহী, সম্পদশালী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার মদীনায় একমাত্র শিশুসন্তানকে দেখা-শোনার আর কেউ অবশিষ্ট রইল না। মদীনার এই ইসলামী রাষ্ট্রের আনসার এবং মুহাজিরগণ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলকভাবে উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার খোঁজ-খবর নিতে লাগলেন। স্বামীর মৃত্যুর 'ইদ্দত' শেষ হতে না হতেই আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পক্ষ হতে উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা এ প্রস্তাব গ্রহণে অসম্মতি জানান।

অতঃপর ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার নিকট অনুরূপ প্রস্তাব প্রেরণ করেন; কিন্তু তাতেও উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের মতোই অসম্মতি জ্ঞাপন করেন।

আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মতো মর্যাদাবান জালীলুল কদর সাহাবীদ্বয়ের প্রস্তাবে অসম্মতি জানালে এই ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত বংশের বিধবাকন্যার ভবিষ্যৎ জীবনকে সুখময় করার নিমিত্তে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রস্তাব পেয়ে তিনি বললেন: 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার মধ্যে তিনটি এমন দুর্বলতা রয়েছে, যার কারণে আপনার এই মহান প্রস্তাব গ্রহণে আমি বড়ই সংকোচ বোধ করছি। প্রথমত, আমি আভিজাত্যের অহংকারে অহংকারী মেয়ে। আপনি যদি আমার এই আভিজাত্য মনোভাব দেখে বিরক্ত বোধ করেন তাহলে আমি আল্লাহ পাকের আযাবে নিপতিত হব। দ্বিতীয়ত, আমি এমন একজন মহিলা, যে বৃদ্ধা বয়সে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, একটি সন্তান রয়েছে।'

এই তিন শর্ত শ্রবণে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'তুমি তোমার অভিজাত মন সম্পর্কে যা বলেছ, আমি আল্লাহর কাছে দু'আ করছি, আল্লাহ যেন তোমার অন্তর থেকে তা দূর করে দেন এবং তুমি তোমার বৃদ্ধাবস্থায় পদার্পণের যে কথা বলেছ, আমিও তো বয়সের দিক দিয়ে তোমার মতো বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। আর তুমি তোমার সন্তান সম্পর্কে চিন্তা করছ? এখানে তোমার সন্তানতো আমারই সন্তান।'

অতঃপর উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। এভাবেই মহান আল্লাহ আবূ সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার বর্ণিত দু'আ বাস্তবায়িত করলেন এবং তাঁর পূর্বের স্বামীর চেয়ে শ্রেষ্ঠতম স্বামী দান করে উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহাকে মহিমান্বিত করলেন। তখন থেকে তিনি সম্ভ্রান্ত বনু মাখযূম গোত্রের মেয়ে হিসেবে অথবা উম্মু সালামা হিসেবে প্রসিদ্ধ না হয়ে কিয়ামত পর্যন্ত সকল মু'মিনদের মাতা বা 'উম্মুল মুমিনীন' খেতাবে ভূষিত হলেন।

আল্লাহ বেহেশতে উম্মুল মুমিনীন উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহার মর্যাদা বাড়িয়ে দিন এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন। আমীন!

টিকাঃ
১. আল ইসাবা, ২৪০-২৪২ পৃ.। ২. আল ইসতিয়াব, ২য় খণ্ড, ৭৮০ পৃ.। ৩. উসুদুল গাবা, ৫ম খণ্ড, ৫৫৮-৫৯৮ পৃ.। ৪. তাহযীব আত্ তাহযীব, ১২ খণ্ড, ৪৫৫-৪৬৫ পৃ.। ৫. সিফাতুস্-সাফওয়া, ২য় খণ্ড, ২০-২১ পৃ.। ৬. তাকরিবুত্ তাহযীব, ২য় খণ্ড, ৬২৭ পৃ.। ৭. শিজরাতুজ যাহাব, ১ম খণ্ড, ৬৯-৭০ পৃ.। ৮. তারিখুল ইসলাম লিয-যাহাবী, ৩য় খণ্ড, ৯৭-৯৮ পৃ.। ৯. আল বিদায়া ওয়া আন্ নিহায়া, ৮ম খণ্ড, ২১৪-২১৫ পৃ.। ১০. আল্ এ'লাম এবং ওহার মুরাজিয়াহু, ৯ম খণ্ড, ১০৪ পৃ.।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 হুযামা ইবনে উছাল (রাঃ)

📄 হুযামা ইবনে উছাল (রাঃ)


'হে ছুমামা! তোমার অতীতকর্মের জন্যে তুমি এখন আর নিন্দিত নও। কারণ, ইসলাম গ্রহণের ফলে ব্যক্তির অতীতের সমস্ত পাপ মুছে যায়।' -মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

ষষ্ঠ হিজরীতে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহির্বিশ্বে ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারণের কাজে মনোনিবেশ করেন। এ লক্ষ্যে তিনি সমকালীন আরব ও অনারব বিশ্বের মোট আটটি দেশের রাজা-বাদশাহ'র কাছে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে দূত মারফত চিঠি প্রেরণ করেন। এই আটজন রাজা-বাদশাহর মধ্যে ছুমামা ইবনে উছাল আল হানাফী অন্যতম। সে একাধারে বনূ হুনাইফা গোত্রের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা এবং ইয়ামামা নামক রাষ্ট্রের অত্যন্ত পরাক্রমশালী ও স্বৈরাচারী বাদশাহ। এ রাজ্যে তার হুকুম অমান্য করার সাধ্য কারো ছিল না।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ দূত-মারফত প্রেরিত চিঠিকে ইয়ামামার বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল অত্যন্ত তাচ্ছিল্য ও ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করে। সে আল্লাহর দাসত্ব এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যের মাধ্যমে ইহকালীন শান্তি ও পারলৌকিক মুক্তি ও কল্যাণের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে গর্ব ও অহঙ্কারে মেতে উঠে বলে:

'আমার মতো প্রভাবশালী ইয়ামামার বাদশাহকে আনুগত্যের আহ্বান জানিয়ে মুহাম্মদ নিরাপদে বসবাস করবে? এ কী করে সম্ভব?'

রাগে, ক্ষোভে ও অহমিকায় প্রায় উন্মাদ হয়ে সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র আঁটতে শুরু করে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর দাওয়াতকে দুনিয়া থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারলেই তার আত্মমর্যাদা রক্ষা পাবে- এটাই ছিল তখন তার একমাত্র অভিপ্রায়।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিদ্রিতাবস্থায় অথবা অন্য কোনো অসতর্ক মুহূর্তে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ইয়ামামার বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল মদীনায় গিয়ে পৌঁছল। চোরাগুপ্তা হামলার মাধ্যমে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার জন্যে সে ওৎ পেতে থাকে। এমনিভাবে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক অসতর্ক মুহূর্তে ছুমামা প্রায় তাঁকে হত্যাই করে ফেলত, যদি তাঁর চাচা তাকে এর ঠিক পূর্বমুহূর্তে এ কাজ থেকে বিরত না করত। রাসূলুল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করা থেকে বিরত হলেও তার হামলা থেকে কয়েকজন সাহাবী রক্ষা পেলেন না। ব্যর্থতার গ্লানিকে মুছে ফেলার জন্য রাতের আঁধারে সাহাবীদের উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে নির্মমভাবে হত্যা করে ছুমামা ইবনে উছাল ইয়ামামায় পালিয়ে গেল।

সাহাবায়ে কেরামের উপর এই নির্মম ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। এভাবে চোরাগুপ্তা হামলার মাধ্যমে হত্যা করার দুঃসাহস যেন আর কেউ করতে না পারে সে জন্যে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুমামা ইবনে উছালকে হত্যার মাধ্যমে এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন।

এ ঘটনার কিছুদিন পর ইয়ামামার সেই বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সদলবলে মক্কার পথে রওয়ানা হলো। তার উদ্দেশ্য ছিল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের হত্যার সাফল্যে আনন্দিত হয়ে সে খানায়ে কাবা তাওয়াফ করবে এবং কৃতজ্ঞতাস্বরূপ দেবতাদের সম্মানার্থে পশু বলি দেবে।

চোরাগুপ্তা হামলা ও নবপ্রতিষ্ঠিত ক্ষুদে ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর শত্রু পক্ষের সম্ভাব্য আকস্মিক হামলা প্রতিরোধ করার জন্যে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকায় যথাযথ পাহারার ব্যবস্থা করলেন। সশস্ত্র ছোট ছোট গ্রুপের মাধ্যমে শত্রুদের গতিবিধির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখার জন্য ঐসব স্থানে নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা করা হলো।

এদিকে ইয়ামামার সেই বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল তার দলবল নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে বিকল্প পথ না থাকায় অত্যন্ত সঙ্গোপনে মদীনার নিকটবর্তী ঐ একমাত্র পথ ধরে রাতের আঁধারে মক্কার দিকে যাচ্ছিল; কিন্তু মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের টহলরত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দৃষ্টি এড়িয়ে পথ অতিক্রম করা তাদের পক্ষে সম্ভব হলো না। টহলরত বাহিনীর চোখে ধুলা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রয়াসকালে ছুমামা ইবনে উছাল নিজেই মুসলমানদের হাতে ধরা পড়ে গেল।

মুসলিম সৈনিকরা ছুমামা ইবনে উছালকে শত্রুপক্ষের একজন সাধারণ সৈন্য মনে করে মদীনায় নিয়ে এসে মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে। সন্দেহভাজন এই দুষ্কৃতকারীর বিচারের ব্যাপারে সাহাবীগণ রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিদ্ধান্তের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকলেন।

এদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাষ্ট্রীয় কাজে মসজিদে নববীতে প্রবেশের সময় ইয়ামামার সেই বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছালকে খুঁটির সাথে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পেলেন। তিনি সাহাবীদের উদ্দেশ্য করে বললেন: 'তোমরা কি জানো, কাকে এই খুঁটির সাথে বেঁধে রেখেছ?'

উত্তরে সাহাবীগণ বললেন: 'না, আমরা তো তাকে চিনি না।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'এই সেই ইয়ামামার অহংকারী বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল আল হানাফী। তোমরা এই বন্দীর সাথে অত্যন্ত উত্তম ব্যবহার করবে।'

অতঃপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজনীয় কার্য সম্পাদন শেষে বাসায় ফিরে পরিবারের সদস্যদের বললেন: اجْمَعُوا مَا كَانَ عِنْدَكُمْ مِّنْ طَعَامٍ وَابْعَثُوا بِهِ إِلَى تُمَامَةَ بْنِ أَنَالٍ ..... 'তোমাদের কাছে খাবার কী আছে? সত্বর নিয়ে এসো এবং ছুমামা ইবনে উছালের জন্যে পাঠিয়ে দাও।'

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন: 'আমার উটনীকে সকাল-বিকাল দোহন করে যেন সে দুধ ছুমামার জন্যে নিয়মিত পাঠানো হয়।'

রাসূলুল্লাহ (স) ছুমামাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য হাজির করার পূর্ব পর্যন্ত তার সাথে সর্বপ্রকার উত্তম ব্যবহার অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করলেন।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুমামার অতীত কার্যকলাপ ও হত্যাকাণ্ডের জন্যে তাকে কোনোরূপ তিরস্কার না করে ইসলামের সুমহান দাওয়াত তার কাছে পেশ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ছুমামার কাছে গিয়ে বললেন:

'ছুমামা! তোমার কি কিছু বলার আছে?'

ছুমামা ইবনে উছাল আরয করল : 'আপনি যদি আমার উপর থেকে আপনার সাহাবীদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে চান, তাহলে আমাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করতে পারেন এবং তা আপনার জন্য অতিরঞ্জিত হবে না...। আর যদি আমার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে ক্ষমা করে দেন, তাহলে আপনি আপনার একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকেই ক্ষমা করবেন। যদি অর্থের বিনিময়ে আমাকে ক্ষমা করতে চান, তাহলে আপনি যে পরিমাণ অর্থের দাবি করবেন, আমি তা দিতে ব্যধ্য থাকবো।'

প্রথম দিন এই সামান্য কথা বিনিময়ের পর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'দিন পর্যন্ত আর ছুমামার সাথে কোনো কথা বললেন না। অপরদিকে, তিনি তার পানাহার ও আরাম-আয়েশের জন্যে পূর্বের চেয়ে আরও উত্তম ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। প্রতিদিনই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উটনী দোহন করে তার কাছে যথারীতি দুধ সরবরাহ করা হচ্ছিল।

তৃতীয় দিন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুমামা ইবনে উছালকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন:

'ছুমামা! তোমার কি কিছু বলার আছে?'

ছুমামা বললো : 'না, বলার আর কিছু নেই। যা আরয করার তা আপনাকে পূর্বেই করেছি। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা করেন, তাহলে এক কৃতজ্ঞকেই ক্ষমা করবেন। আর যদি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করেন, তাহলে তা আমার উপযুক্ত পাওনাই পরিশোধ করা হবে। আর যদি অর্থের বিনিময়ে আমাকে ক্ষমা করতে চান, তাহলে বলুন, যত অর্থের প্রয়োজন তা আমি দিতে প্রস্তুত।'

তার এ উত্তর শুনে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপারে পরবর্তী দিনের জন্যে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। পরের দিন তিনি তাকে পূর্বের মতো একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন। ছুমামা পূর্বের ন্যায় আরয করল :

'যদি আমাকে ক্ষমা করেন, তাহলে এক কৃতজ্ঞকেই ক্ষমা করবেন। আর যদি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করেন, তাহলে তা হবে আমার কৃত অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি। আর যদি অর্থের বিনিময়ে আমাকে ক্ষমা করতে চান, তাহলে বলুন, কত অর্থের প্রয়োজন, আমি তা পরিশোধ করতে প্রস্তুত।'

ছুমামার এই একই ধরনের উত্তর শুনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের উদ্দেশ্য করে বললেন : 'তোমরা ছুমামাকে মুক্ত করে দাও।'

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ পাওয়ামাত্র ছুমামাকে ছেড়ে দিয়ে তাকে মুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হলো।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ হতে ক্ষমা পেয়ে ছুমামা ইবনে উছাল সোজা মসজিদে নববীর সন্নিকটে 'বাকী' নামক স্থানে গোসল করতে চলে গেল। সেখানে সে অতি উত্তমভাবে গোসল সেরে পাক-পবিত্র হয়ে পুনরায় মসজিদে নববীতে ফিরে এসে উপস্থিত সাহাবীদের বৈঠকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘোষণা করল :

أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ .
'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং আমি এও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দাহ ও প্রেরিত রাসূল।'

কিছুক্ষণ পূর্বেও যে ছুমামা ইবনে উছাল ছিলেন ইসলামের চরম দুশমন, উদ্ধত ও অহংকারী পৌত্তলিক- পরশ পাথররূপী রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তিন দিনের সাহচর্য, সান্নিধ্য, ক্ষমা ও ভালোবাসায় অবিভূত হয়ে পবিত্র কালেমায়ে শাহাদাতের ঘোষণার মাধ্যমে সেই ছুমামা ইবনে উছালই পরিণত হলেন পূর্ণ মুসলিম এবং ইসলামের আপসহীন সৈনিকে। ইসলামে দীক্ষিত হবার পর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে ছুমামা ইবনে উছাল আল হানাফী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন :

'ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইসলাম গ্রহণের পূর্বে এই পৃথিবীতে আপনার চেয়ে অধিক ঘৃণিত আর কোনো ব্যক্তি আমার কাছে ছিল না। আর এখন পৃথিবীর সমস্ত লোকের চেয়ে আপনিই আমার নিকট অধিক প্রিয়। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, 'তখন ইসলামের চেয়ে ঘৃণিত কোনো ধর্ম আমার কাছে ছিল না; কিন্তু ইসলামই এখন আমার কাছে সর্বোৎকৃষ্ট জীবনব্যবস্থা। আপনার এই মদীনার চেয়ে তুচ্ছ কোনো শহর আমার কাছে ছিল না; কিন্তু এখন এই পুণ্যভূমি মদীনাই আমার সর্বোত্তম প্রিয় ভূমি।'

অতঃপর তিনি অত্যন্ত কাতরকণ্ঠে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আরয করলেন:

'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার বহু সাহাবীকে হত্যা করেছি। আপনি এর কী সাজা আমাকে দেবেন?'

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: لَا تَشْرِيْبَ عَلَيْكَ يَا ثُمَامَةٌ... فَإِنَّ الْإِسْلَامَ يَجُبُّ مَا قَبْلَهُ.
'হে ছুমামা! তোমার অতীতকর্মের জন্য তুমি এখন আর নিন্দিত ও অপরাধী নও। কারণ, ইসলাম গ্রহণের ফলে ব্যক্তির অতীতের সমস্ত পাপ মুছে যায়।'

ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অনুগ্রহ করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণের যে সৌভাগ্য দান করেছেন, সে জন্যে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে মোবারকবাদ এবং পরকালে নাজাতের সুসংবাদ জানালেন।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র যবান থেকে এই শুভসংবাদ শুনে ইয়ামামার বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে গেল। তিনি উপস্থিত সকলের সামনে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করলেন:

'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর শপথ! আপনার যত সাহাবীকে আমি হত্যা করেছি, অবশ্যই তার দ্বিগুণ মুশরিককে হত্যা করে এর বদলা নেব। আপনার এবং ইসলামের সাহায্যের জন্যে আমি আমার সমস্ত ধন-সম্পদ, সমরাস্ত্র, জনবল এমনকি প্রয়োজনে নিজের জীবন পর্যন্ত বিলিয়ে দিতেও প্রস্তুত থাকব।'

এই তেজোদীপ্ত ঘোষণার পর ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আরয করলেন:

'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা যাওয়ার পথে ধৃত হয়ে আপনার দরবারে হাজির হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছি। এখন কি আপনি আমাকে উমরাহ পালনের অনুমতি দেবেন?'

উত্তরে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : 'হ্যাঁ, তুমি উমরাহ পালনের জন্যে যেতে পারো। কিন্তু তা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের বিধান মোতাবেক হতে হবে।'

অতঃপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে উমরাহ পালনের সঠিক নিয়ম-পদ্ধতির শিক্ষা দিলেন।

উমরাহ পালনের নিয়ম-নীতি জ্ঞাত হওয়ার পর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিদায় নিয়ে ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। মক্কার প্রাণকেন্দ্র খানায়ে কাবায় পৌঁছে উপস্থিত জনতার সামনে তিনি উচ্চকণ্ঠে তালবিয়া পাঠ শুরু করলেন:

لبيكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ ... لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ ... إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ ... لَا شَرِيكَ لَكَ.
'আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির হয়েছি। আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি ঘোষণা করছি, তোমার কোনো অংশীদার নেই। আমি হাজির, হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা ও সমস্ত নিয়ামত এবং বাদশাহী একমাত্র তোমারই। তোমার এই সার্বভৌমত্বে কারো কোনো অংশীদারিত্ব নেই।'

এই ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুই রাসূলুল্লাহ (স)-এর উম্মতের মধ্যে প্রথম মুসলমান, যিনি সর্ব প্রথম এই 'তালবিয়ার' ধ্বনিতে মক্কার আকাশ-বাতাস মুখরিত করে খানায়ে কাবা তাওয়াফ করেন।

ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তেজোদীপ্ত কণ্ঠে তাওহীদের উদাত্ত ধ্বনি যখন বায়তুল্লাহ'র চারপাশের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলছিল, শিরক ও কুফরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণার মাধ্যমে একমাত্র ওয়াহাদানিয়াতের ঘোষণা যখন বুলন্দ হচ্ছিল, তখন কুফফারে কুরাইশরা এসে তাদের প্রতিষ্ঠিত ধ্যান-ধারণা, ধর্ম-বিশ্বাস ও দেবতাদের বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ও বিদ্রোহ হিসেবে তা গ্রহণ করল। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তারা নাঙা তরবারি ধারণ করে চতুর্দিক থেকে দলবদ্ধভাবে ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দিকে ছুটে আসতে লাগল। তাদের সবার চোখে-মুখে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছিল। কে কার পূর্বে ছুমামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শিরশ্ছেদ করে তাওহীদের আওয়াজকে এক মুহূর্তে স্তব্ধ করে দেওয়ার গৌরব অর্জন করতে পারবে- এই নিয়ে কিশোর-যুবক-বৃদ্ধ সকলের মাঝে মারমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়ে গেল।

ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ দৃশ্য দেখে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে; বরং বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে আরো উচ্চকণ্ঠে 'তাওহীদ' ও 'তালবিয়ার' ধ্বনি দিতে থাকলেন। এই উত্তপ্ত ও মারমুখী পরিস্থিতিতে কুরাইশদের এক যুবক ছুমামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বিষাক্ত তীর নিক্ষেপে ধরাশয়ী করার জন্যে উদ্যত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুরাইশ সরদারদের কয়েকজন তাকে জাপটে ধরে ফেলল। তারা চিৎকার করে বলে উঠল:

'তোমরা কি জানো, এ ব্যক্তি কে? কার প্রতি তীর নিক্ষেপ করছ? এ হলো ইয়ামামার বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল। তোমরা যদি তার প্রতি সামান্যতম দুর্ব্যবহার কর, তাহলে তার জনগণ সর্বপ্রকার খাদ্যসামগ্রী ও সাহায্য বন্ধ করে দেবে এবং যার পরিণতিতে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।'

নেতৃবৃন্দের মুখে ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পরিচয় এবং তার প্রতি দুর্ব্যবহারের সম্ভাব্য পরিণতি আঁচ করতে পেরে ক্ষিপ্ত ও উচ্ছৃঙ্খল জনগণ আঁৎকে উঠল। যুদ্ধবাজ বেদুইন যুবকদের উষ্ণ খুন যেন নিমিষেই হিম হয়ে গেল। উন্মুক্ত তরবারিগুলো কোষবদ্ধ হতে লাগল। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ অনুগত ভৃত্যের ন্যায় অত্যন্ত নম্র ও শান্ত মেজাজে ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে আরয করল:

'আপনি কি আপনার বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করে অন্য কোনো নতুন ধর্ম গ্রহণ করেছেন?'

ছুমামা ইবনে উছাল আল হানাফী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উত্তরে বললেন:

'আমি ধর্ম ত্যাগী নই, নতুন ধর্মও গ্রহণ করিনি; বরং দুনিয়া ও আখিরাতের সঠিক কল্যাণের জন্যে সর্বোত্তম দীন (জীবন বিধান) গ্রহণ করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী হয়েছি।'

উত্তর শেষ করেই তিনি বায়তুল্লাহর দিকে ইশারা করে কুরাইশদের উদ্দেশ্যে বললেন:

أقسِمُ بِرَبِّ هَذَا الْبَيْتِ، إِنَّهُ لَا يَصِلُ إِلَيْكُمْ بَعْدَ عَوْدَتِي إِلَى الْيَمَامَةِ حَبَّةٌ مِنْ قَبْحِهَا أَوْ شَيْءٌ مِنْ خَيْرَاتِهَا حَتَّى تَتَّبِعُوا مُحَمَّدًا عَنْ آخِرِكُمْ .
'আমি এই ঘরের প্রভুর শপথ করে বলছি, ইয়ামামায় প্রত্যাবর্তনের পর তোমাদের কাছে ততক্ষণ পর্যন্ত সাহায্যস্বরূপ খাদ্যদ্রব্যের চালান আসা তো দূরের কথা, গমের একটি দানাও মক্কায় আসবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমাদের সর্বোচ্চ এবং সর্বশেষ ব্যক্তি পর্যন্ত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী হবে।'

ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এই দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা শুনে উপস্থিত কুরাইশরা হতভম্ব হয়ে গেল। নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে আহাম্মকের মতো তারা ছামামা বিন উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আহহুর দিকে তাকিয়ে রইল।

বেদেরা বিশধর সাপের মুখে এক রকম গাছের শিকড় ছোঁয়ালে যেমন ফনা ধরা সাপ নিমষে চুপসে যায়, ঠিক তেমনি তৎকালীন পৌত্তলিকের দল মুষড়ে পড়ল। মুহূর্তেই পরিস্থিতি উল্টো দিকে মোড় নিল। তারা ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে চ্যালেঞ্জ করা তো দূরের কথা নিজেদের ভবিষ্যৎপরিণতির কথা চিন্তা করেই হতাশায় ভেঙে পড়ল। এ সুযোগে ছামামা বিন উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এই বিশাল জনসমুদ্রের মাঝে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিখিয়ে দেওয়া পদ্ধতিতে ওমরাহ সম্পাদন করতে লাগলেন। এক ঢিলে দুই পাখি। ইসলামের বীর-সৈনিকের কী অপূর্ব কৌশল!

কী অলৌকিক পরিবর্তন! কী সৌভাগ্য! যে ছুমামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মূর্তি ও দেবতাদের সান্নিধ্য লাভের প্রত্যাশায় তাদের সামনে বলিদান করার মানসে ইয়ামামা থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন, তিনিই আজ ইসলামী পদ্ধতিতে ওমরাহ সম্পাদনশেষে দেবতাদের সান্নিধ্যের পরিবর্তে মহান করুণাময় আল্লাহর রেজামন্দির জন্যে পশু কুরবানী দিয়ে ধন্য হলেন।

ওমরাহ সম্পাদনশেষে ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নিজ দেশ ইয়ামামায় প্রত্যাবর্তনের পর তাঁর জনগণকে কুরাইশদের সাহায্য-সহানুভূতি ও যাবতীয় রসদ পাঠানো বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন। সর্বত্র তাঁর এই নির্দেশ পৌছে দেওয়া হলো। সর্বস্তরের জনগণ তাঁর এই নির্দেশে সাড়া দিয়ে মক্কাবাসীদের জন্যে সমস্ত সাহায্য ও খাদ্যসামগ্রীর বরাদ্দ বন্ধ করে দিল।

দেখতে না দেখতেই এই অর্থনৈতিক অবরোধ মক্কাবাসীদের জন্যে এক করুণ অর্থনৈতিক মন্দভাবের সৃষ্টি করল। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম হু হু করে বেড়ে গেল। দেখা দিল চরম খাদ্যাভাব। সমস্ত জনগোষ্ঠী নিপতিত হলো এক মহাদুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে। তারা এ অবস্থায় সন্তান-সন্ততিসহ অনাহারে নিশ্চিত মৃত্যুর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। নিরুপায় হয়ে মক্কাবাসীরা সম্মিলিতভাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একটি চিঠি প্রেরণ করল। তাদের চিঠির ভাষা ছিল এই :

'যেহেতু ইতঃপূর্বে আপনার ব্যাপারে আমাদের দৃঢ় প্রত্যয় ছিল যে, আপনি নিজেও দয়াশীল এবং আপনি দয়া ও অনুগ্রহ এবং সুসম্পর্কের শিক্ষাই দিয়ে থাকেন। ভালোবাসা ও দয়ার এ শিক্ষার বিপরীত অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আপনাকে লিখছি যে, আমাদের বাপ-দাদাদের অধিকাংশকে আপনারা যুদ্ধের ময়দানে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন এবং এখন আমাদের ও আমাদের সন্তান-সন্ততিদের অনাহারে মারার ব্যবস্থা করেছেন। আপনার অনুসারী ইয়ামামার বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছাল আমাদের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে খাদ্য ও সাহায্যসামগ্রী পাঠানো সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছেন। এমতাবস্থায় আপনাকে আমরা সবিনয় অনুরোধ করছি, অনুগ্রহপূর্বক ইয়ামামার বাদশাহ ছুমামা ইবনে উছালকে অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করে খাদ্যসামগ্রী পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিন।'

মক্কাবাসীদের এই পত্র পেয়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুমামা ইবনে উছাল আল হানাফী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করে তাদের জন্যে শীঘ্রই খাদ্যসামগ্রী প্রেরণের নির্দেশ দিলেন। ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই নির্দেশ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে অবরোধ প্রত্যাহার করে তাদের জন্যে খাদ্য ও সাহায্যসামগ্রী পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন।

ছুমামা ইবনে উছাল (রা) ইসলাম গ্রহণের পর সারাটি জীবন আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা ও রাসূলে কারীম (স)-এর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি পালনে প্রাণপণ সচেষ্ট ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর যখন আরবে ভণ্ড নবীদের আবির্ভাব ঘটে, যখন দলে দলে ইসলামে নবদীক্ষিত লোকেরা ইসলাম ত্যাগ করে ভণ্ড নবীদের প্রতি ঈমান আনতে শুরু করে, সে সুযোগে ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নিজ গোত্র বন্ হুনায়ফার অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মুসায়লামাতুল কাযযাব নবুওয়াতের দাবি করে বসে এবং তার প্রতি ঈমান আনার জন্যে স্বগোত্রীয় লোকদের আহ্বান জানায়।

ইসলামের এই চরম দুর্দিন ও নাজুক অবস্থায়ও ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ভণ্ড নবী মুসায়লামাতুল কাযযাবকে কঠোরহস্তে দমন করার জন্যে দৃঢ়সংকল্প গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর স্বগোত্রীয় লোকদের ডেকে বলেন:

'খবরদার! তোমরা এই মুসায়লামাতুল কাযযাবের নবুওয়াতের মিথ্যা দাবির প্রতি ঈমান আনবে না। তার এই দাবিতে কোনো জ্যোতি নেই। আল্লাহর শপথ! এটা নিশ্চিত যে, তোমাদের মধ্যে যদি কেউ তার মিথ্যা ডাকে সাড়া দেয়, তাহলে আল্লাহ তার ভাগ্যে নির্ঘাত জাহান্নাম ছাড়া আর কিছু রাখেননি। শুধু তাই নয়, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ এই ভণ্ডকে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করার সংগ্রামে শরীক না হয় তাহলে তাকেও ভীষণ আযাবের সম্মুখীন হতে হবে।'

অতঃপর তিনি যুক্তি প্রদর্শন করে বলেন:
'দু'জন নবীর একত্রে আবির্ভাব হতে পারে না। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহর রাসূল। তারপরে কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবী আসবেন না। আর না কোনো নবুওয়াতের দাবিদার তাঁর রিসালাতের অংশীদার হতে পারে।'

এরপর ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসায়লামাতুল কাযযাবের কথিত ওহীর উদ্ধৃতির সাথে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ ওহী আল কুরআনের পার্থক্য তুলে ধরে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত পেশ করেন:

حٰم، تَنْزِيلُ الْكِتَبِ مِنَ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ، غَافِرِ الذَّنْبِ وَقَابِلِ التَّوْبِ شَدِيدِ الْعِقَابِ فِي الطُّولِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ إِلَيْهِ الْمَصِيرُ .

'হা-মীম। এই কিতাব সেই আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত, যিনি মহাশক্তিশালী, সর্ব বিষয়ে জ্ঞানী। (যিনি) গুনাহ মার্জনাকারী, তাওবা কবুলকারী, কঠিন শাস্তিদানকারী এবং অতি বড় অনুগ্রহ দানকারী। তিনি ছাড়া আর কোনো মা'বুদ নেই। প্রত্যেককে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।'

ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন:
'এই হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বাণী, আর ভণ্ডনবী মুসায়লামাতুল কাযযাবের কথা শোনো:

يَا ضِفْدَعُ نِقِى مَا تَنقِينَ، لَا الشَّرَابَ تَمْنَعِينَ وَلَا الْمَاءَ تُكَدِّرِينَ .
'হে ব্যাঙ! তুই যতই ঘেঁৎ ঘেঁৎ করিস না কেন, তোর এই ঘেঁৎ-ঘেঁৎ চিৎকারের কারণে না লোকদেরকে পুকুরের পানি পান করা থেকে বিরত রাখতে পারবি, আর না এর পানি ঘোলা করতে সক্ষম হবি।'

অতঃপর নিজ গোত্রের যেসব লোক ইসলামের প্রতি অবিচল ছিলেন তাদের সাথে নিয়ে ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসায়লামাতুল কাযযাব ও তার অনুসারী মুরতাদদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কালেমার ঝাণ্ডাকে সমুন্নত করার জন্যে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

হে আল্লাহ! সত্যের ঝাণ্ডাবাহী ছুমামা ইবনে উছাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষ থেকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করুন। খোদাভীরু মুত্তাকীনদের জন্যে আপনি জান্নাতের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার সর্বোচ্চ স্থানে তাঁকে অধিষ্ঠিত করুন, আমীন।

টিকাঃ
১. আল ইসাবা ফী তামিজ আস্ সাহাবা, ইবনে হাজার আল আসকালানী: ১ম খণ্ড, ২০৪ পৃ. মোস্তাফা মুহাম্মদ। ২. আল ইসতিয়াব ফি আসমাইল আসহাব, ইবনে আব্দুল বার ১ম খণ্ড, ৩০৫-৩০৯ পৃ.। ৩. আছ-সীরাত-আন-নববীয়াহ, ইবনে হিশাম, তাহাক্কিক আসসাক্কা সূচীপত্র দ্রষ্টব্য। ৪. আল এ'লাম লি জিরিকলী ওয়া মোরাজেয়াহু ২য় খণ্ড; ৮৬ পৃ.।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00