📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 তোফাইল ইবনে আমর আদ দাওসী (রাঃ)

📄 তোফাইল ইবনে আমর আদ দাওসী (রাঃ)


হে আল্লাহ, তোফাইল বিন আমর আদ'দাউসীকে তার উদ্দিষ্ট কল্যাণকর কাজে নিদর্শন দ্বারা সাহায্য করো। -রাসূলুল্লাহ (স)-এর দু'আ

তোফাইল ইবনে আমর আদ দাউসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আরবের ঐতিহ্যবাহী দাউস বংশের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। সমগ্র আরবে যে ক'জন উচ্চ নৈতিক গুণাবলি সম্পন্ন সভ্রান্ত নেতার পরিচয় পাওয়া যায় তোফাইল ইবনে আমর আদ দাউসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন তাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন আরব বিশ্বের প্রখ্যাত দানবীর। তাঁর বাড়িতে মেহমানদের জন্যে সর্বক্ষণ রান্নাবান্না হতো। কোনো আগন্তুক তাঁর দরবার থেকে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে গিয়েছেন এমন কোনো নজির পাওয়া যায় না। ক্ষুধার্তকে অনুদান, ভীতসন্ত্রস্তের নিরাপত্তা বিধান এবং অসহায় ও নিরাশ্রয়কে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে তাঁর সুখ্যাতি ছিল সবার শীর্ষে। তিনি শুধু একজন দানবীরই ছিলেন না; অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব, অনলবর্ষী বক্তা, সুসাহিত্যিক ও খ্যাতনামা কবিও ছিলেন। তাঁর বক্তৃতা ও কবিতার ছন্দে ছিল এক বিস্ময়কর জাদুকরী আকর্ষণ। শ্রোতাদের দেহ-মন এসবের আকর্ষণে হয়ে উঠত উদ্বেলিত। তিনি ছিলেন কাব্য ও ভাষাশিল্পের একচ্ছত্র সম্রাট। এর ভালো-মন্দ বিচারে পারদর্শী, সূক্ষ্মতম ত্রুটিও তাঁর নজর এড়িয়ে যেতে পারত না।

ধন-সম্পদ ও ঐশ্বর্য তাঁকে জাহেলী যুগেও পবিত্র খানায়ে কাবার তাওয়াফ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। সে সময়ের প্রচলিত প্রথানুযায়ী ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর জন্মভূমি লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চল 'তিহামা' থেকে মক্কায় আগমন করেন। এ সময় মক্কায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও কাফির কুরাইশদের মধ্যে পারস্পরিক শক্তি ও জনসমর্থন বৃদ্ধির চরম এক প্রতিযোগিতা চলছিল। উভয় পক্ষই নিজ নিজ অনুসারী বৃদ্ধির জন্যে ব্যাপক প্রচারাভিযান পরিচালনা করছিলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিকে যেমন তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতের প্রতি ঈমান আনার জন্য লোকেদের আহ্বান জানাচ্ছিলেন, অন্যদিকে কুরাইশরাও পৌত্তলিকতাকে আঁকড়ে ধরে জনগণকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহ্বান থেকে দূরে রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছিল।

এ অবস্থায় তোফাইল ইবনে আমর আদ দাউসী তাঁর মনের অগোচরেই উভয় পক্ষের লক্ষ্যে পরিণত হন। তাঁকে নিয়ে উভয় পক্ষের লোকজনের মধ্যে এক চরম স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। তোফাইল আদ দাউসী তা বুঝতে পেরে একদিকে যেমন কুরাইশদের দল ভারী করার প্রতি আন্তরিকতা পোষণ করতেন না, অন্যদিকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াতে সাড়া দেওয়ার মানসিকতাও তাঁর গড়ে উঠেনি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে ওমরাহ পালন করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করা।

তোফাইল ইবনে আমর আদ দাউসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে নিয়ে এই আদর্শিক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে মক্কায় যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল, সে ঘটনা ছিল অত্যন্ত চমৎকার ও আকর্ষণীয়। তোফাইল আদ দাউসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভাষায়:

'আমি যখন ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় পৌঁছলাম, তখন কুрайশ নেতৃবর্গ আমাকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা জানায় এবং তারা আমাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ভূষিত করে। অতঃপর আমাকে কেন্দ্র করে কুরাইশ বুদ্ধিজীবী ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ একটি বিশেষ সভার আয়োজন করে। উক্ত সভায় তারা অত্যন্ত সম্মানের সাথে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে:

'তোফাইল আদ দাউসী! মক্কা শহরে আপনার আগমনে আমরা আনন্দিত ও গর্বিত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আপনাকে অবগত না করে পারছি না যে, আমাদেরই এক ব্যক্তি নিজেকে নবী বলে দাবি করেছে। সে তার তৎপরতার মাধ্যমে আমাদের সমাজকাঠামোর ওপর এক প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে, আমাদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে এবং পরস্পরের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি ও পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছে। আমরা আশঙ্কা করছি, সে আপনার মতো জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যক্তির উপরও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। এমনকি সে আপনার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের মধ্যেও ভাঙন সৃষ্টি করতে পারে। হতে পারে এমন যে, আপনার অধীনস্থ ও অনুগত ব্যক্তিদেরও সে ধোঁকায় ফেলবে। তাই আপনার প্রতি আমাদের একান্ত পরামর্শ হলো, মক্কায় অবস্থানকালে আপনি তার সাথে কোনো কথা বলবেন না এবং তার কোনো কথা বা আলোচনা শুনবেন না। কারণ, তার কথার মধ্যে এক ধরনের জাদুকরী শক্তি রয়েছে, যা দিয়ে সে পিতা-পুত্র, ভাই-বোন এমনকি স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যেও ফাটল ধরাতে সক্ষম।'

কুরাইশ বুদ্ধিজীবী ও জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে এ ছাড়া আরও অনেক আজগুবি কথাবার্তা ও নানা প্রকার আশ্চর্যজনক ঘটনাবলি আমাকে শোনাল। ফলে, তাঁর জাদুকরী কার্যকলাপ সম্পর্কে আমি ও আমার জাতির লোকজনের ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনা রক্ষায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। অতঃপর দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলাম:

'আমি তাঁর সাথে কোনো কথা বলব না এবং তাঁর কোনো কথা শুনব না।'

পৌত্তলিক প্রথানুযায়ী হজ্জের সময় আমরা যেভাবে দেবতাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও খানায়ে কাবা তওয়াফ করে থাকি, পরদিন ঠিক তদ্রূপ তাওয়াফের উদ্দেশ্যে যখন রওয়ানা হই, তখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা যেন আমার কানে না পৌঁছে সেজন্য দু'কানের মধ্যে খুব ভালো করে তুলা গুঁজে দেই।

বায়তুল্লাহ শরীফে প্রবেশ করে দেখতে পাই, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায আদায় করছেন। কিন্তু তাঁর এ নামায আমাদের পৌত্তলিক প্রথার নামায থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। তিনি ইবাদত করছেন; কিন্তু তাঁর ইবাদত আমাদের ইবাদতের নিয়ম-পদ্ধতি থেকে ভিন্ন ধরনের। তাঁর ইবাদতের একাগ্রতার দৃশ্য আমাকে মুগ্ধ করে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইবাদতের আন্তরিকতা ও বিনয়ভাব এবং আমাদের প্রদর্শনীমূলক ও অন্তঃসারশূন্য ইবাদতের সাথে তুলনা করতে গিয়ে আমি বরং তাঁর দিকেই আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। এমনকি পূর্ব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমি অজ্ঞাতসারেই ধীরে ধীরে তাঁর নিকটে চলে আসি। আল্লাহর মহিমা! মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তিলাওয়াতের কিছু অংশ আমার কানে এসে পৌঁছে। কী অপূর্ব! হৃদয়গ্রাহী, মনোমুগ্ধকর ও অর্থবহ সে তিলাওয়াত! যা শুনে আমি নিজের প্রতি ধিক্কার দিয়ে বলছিলাম :

'তোফাইল, তোমার মা তোমাকে কতইনা হতভাগা সন্তান হিসেবে জন্ম দিয়েছিল! তুমি একজন তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন ব্যক্তি, খ্যাতনামা কবি, বিচক্ষণ বুদ্ধিজীবী ও জ্ঞান সম্রাট, ভাষার ভালো ও মন্দের পার্থক্য নির্ণয়ে তুমি অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। কে তোমাকে মুহাম্মদের কথা শ্রবণে বাধা সৃষ্টি করে রেখেছে? তিনি যদি কোনো উত্তম কথা বলেন, তাহলে তা গ্রহণ করতে তোমার আপত্তি কিসের? আর যদি তিনি অকারণে কিছু বলেন, তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করতেই বা বাধা কী?'

এসব কথা ভেবে ভেবে পরিশেষে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইবাদত ও তাওয়াফ সেরে নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তনের পূর্ব পর্যন্ত সেখানে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিলাম। অতঃপর তিনি যখন তাঁর বাড়ির দিকে ফিরলেন, আমি তাঁকে অনুসরণ করে চললাম এবং তাঁর সাথেই গৃহের মধ্যে প্রবেশ করলাম। এরপর আমি তাঁর খিদমতে আরয করলাম:

'হে মুহাম্মদ! আপনার জাতির লোকেরা আমাকে আপনার সম্পর্কে নানা ধরনের ভুল ধারণা দিয়েছে। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, তারা আপনার সম্পর্কে আমার মধ্যে প্রচণ্ড ভীতির সৃষ্টি করে দিয়েছে। আমি যেন আপনার কথা না শুনতে পাই, সেজন্যে কানে ভালো করে তুলা গুঁজে দিয়েছিলাম; কিন্তু আল্লাহর কী কুদরত! এ সত্ত্বেও আপনার তিলাওয়াতের একটি অংশ আমি শুনতে পাই, যা আমার কাছে অত্যন্ত ভালো লেগেছে। তাই আমি আপনার খিদমতে আরয করছি যে, আপনার দাওয়াত সম্পর্কে আমাকে অবগত করুন।'

অতঃপর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর দাওয়াত সম্পর্কে অবহিত করলেন এবং সূরা ফালাক ও সূরা ইখলাস তিলাওয়াত করে শোনালেন।

আহ! কি মনোমুগ্ধকর মধুর সে বাণী! এর চেয়ে সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী কথা আমি আর কখনো শুনিনি। এর চেয়ে উত্তম বাস্তবধর্মী নির্দেশাবলি সম্পর্কে কখনো অবগত হইনি। অতঃপর কালবিলম্ব না করে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ঘোষণা করি: وَشَهِدْتُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَدَخَلْتُ فِي الْإِسْلَامِ .
'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রাসূল।'

কালেমায়ে শাহাদাতের এ ঘোষণার মাধ্যমেই আমি ইসলামের সুমহান ছায়াতলে আশ্রয় নিই। ইসলাম গ্রহণের পর দীর্ঘদিন আমি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য লাভের প্রত্যাশায় মক্কায় অবস্থান করি। সে সুবাদে আমি ইসলামের মহান শিক্ষালাভ ও পবিত্র কুরআনে কারীম হিফয করতে থাকি। অতঃপর যখন আমি দেশে ফেরার ইচ্ছা করি তখন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করি, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার গোত্রের আমি একমাত্র নেতা। আমি এখন তাদের কাছে ফিরে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিতে চাই। আল্লাহর কাছে দু'আ করুন, তিনি যেন আমাকে এমন কোনো নিদর্শন দান করেন, যাতে মুগ্ধ হয়ে তারা আমার দাওয়াতে সাড়া দেয়। এ কথা শুনে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু'আ করেন:

اللَّهُمَّ اجْعَلْ لَهُ آيَةٌ .
'হে আল্লাহ! তুমি তোফাইল ইবনে আমর আদ দাউসীকে একটি নিদর্শন দান কর।'

এরপর আমি আমার জাতির লোকেদের কাছে ফিরে আসি। বাড়ি থেকে অনতিদূরে একটি উঁচু টিলায় এসে পৌঁছতে না পৌঁছতেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু'আর নিদর্শনস্বরূপ আমার কপালে ও দু'চোখের মধ্যবর্তী স্থানে একটি নূর প্রজ্বলিত হতে শুরু করল। সে যেন একটি সার্চ লাইট! আমি তা দেখে আল্লাহর কাছে দু'আ করলাম:

'হে আল্লাহ! নিদর্শনস্বরূপ আপনি আমার কপালে যে নূর দান করেছেন, একে দয়া করে অন্যত্র সরিয়ে দিন। কারণ, আমি আশঙ্কা করছি যে, আমার জাতির লোকেরা এটা ধারণা না করে যে, পৈত্রিক ধর্ম ত্যাগ করে ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পরিণামে আমার কপালে আগুন লেগেছে।'

অতঃপর আল্লাহ এ নূরকে আমার কপাল থেকে সরিয়ে আমার চিবুকের বাটে প্রজ্বলিত করেন। লোকজন আমার এই নিদর্শনকে প্রজ্বলিত ঝুলন্ত প্রদীপের মতো দেখতে পেত। এবার আমি আশ্বস্ত হলাম ও টিলা থেকে বাড়ির দিকে আসতে লাগলাম। বাড়িতে আসতে প্রথমে আমার বৃদ্ধ পিতা আমাকে স্বাগত জানালেন। আমি তাঁকে বললাম:

'হে আব্বা! আমি আপনার খিদমতে কিছু কথা আরয করতে চাই। হে আমার পিতা! আমি আপনার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে গেছি এবং আপনিও আমার হতে ভিন্ন হয়ে গেছেন।'

পিতা বললেন: 'কী হয়েছে বৎস? কীভাবে তুমি আমার থেকে আলাদা হলে?'

আমি বললাম: 'আমি ইসলাম গ্রহণ করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী হয়েছি।'

এ কথা শুনে পিতা বললেন: 'প্রিয় পুত্র আমার! এখন থেকে আমিও ইসলামকে নিজের দীন হিসেবে গ্রহণ করলাম।'

আমি তখন পিতাকে বললাম:

'হে আব্বা! আপনি গোসল করে, পাক-পবিত্র কাপড় পরিধান করে আসুন এবং আমি যেভাবে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছি, সে নিয়মে আপনাকেও ইসলামে দীক্ষিত করি।'

অতঃপর তিনি গোসল করে, পাক কাপড় পরিধান করে এলে, আমি ইসলামের মহান দাওয়াত তার সামনে তুলে ধরি। তিনি বিনা দ্বিধায় কালেমায়ে শাহাদাতের বাণী উচ্চারণ করে ইসলামে দীক্ষিত হন।

অতঃপর আমার স্ত্রী আমাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে আসে। আমি তাকেও বলি, তোমার সাথে একটু কথা আছে, তা হলো:

'তুমি এখন আর আমার নেই এবং আমিও আর তোমার নেই।'

স্ত্রী বলল : 'তা কীভাবে? আমার পিতামাতা আপনার জন্যে কুরবান হোক, আপনি কি আমার প্রতি রাগ করেছেন?'

উত্তরে আমি বললাম : 'ইসলাম তোমার এবং আমার মাঝে ব্যবধান সৃষ্টি করে দিয়েছে। কারণ, আমি ইসলাম গ্রহণ করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী হয়েছি।'

এ কথা শুনে স্ত্রী বলল: 'আমিও আপনার সাথে ইসলামে দীক্ষিত হলাম।'

অতঃপর আমি তাকে বললাম:

'দাউস গোত্রের দেবতার মূর্তির পাশ ঘেঁষে পাহাড় হতে যে ঝর্না প্রবাহিত হচ্ছে, সেখানকার স্বচ্ছ পানিতে গোসল করে এসো।'

স্ত্রী উত্তরে বলল: 'আমার পিতামাতা আপনার জন্যে কুরবান হোক, যেখানে আমাকে গোসল করতে পাঠাচ্ছেন, না জানি, ধর্মচ্যুত হওয়ার কারণে আমি যু-শারাহ বা ঝর্নাদেবীর অভিশাপে নিপতিত হই।'

আমি বললাম : 'তোমার দেবতা ধ্বংস হোক এবং তোমার কুচিন্তা দূর হোক! আমি এ জন্যে বলেছি যে, লোকজনের ভিড়ের আড়ালে একটু দূরে গিয়ে ভালো করে গোসল করে আসতে। আমি তোমাকে এই নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, এই পাথরের মূর্তি তোমার কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না।'

অতঃপর সে সেখান থেকে গোসল করে এলে, আমি তার কাছে ইসলামের সুমহান দাওয়াত পেশ করি এবং সে কালেমা শাহাদাতের বাণী উচ্চারণের মাধ্যমে ইসলামে দীক্ষিত হয়। অতঃপর আমি আমার দাউস সম্প্রদায়ের সমস্ত লোককে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাই। কিন্তু একমাত্র আবু হোরায়রা ব্যতীত তাৎক্ষণিকভাবে আর কেউ আমার এই আহ্বানে সাড়া দেয়নি। তারা ইসলাম গ্রহণে বড়ই মন্থর গতি অবলম্বন করে। দীর্ঘদিন দাওয়াতী কাজ অব্যাহত রাখার পর আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সাথে নিয়ে আমি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্যে মক্কায় আসি। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করেন :

'হে তোফাইল! তোমার দাওয়াতী কাজের অবস্থা কী? আল্লাহর ডাকে কেউ কি সাড়া দিয়েছে?'

উত্তরে আমি আরয করি : 'ইসলামের প্রতি তাদের অন্তর হিংসা ও বিদ্বেষে পরিপূর্ণ, তারা কুফরী ও শিরকের মধ্যে ভীষণভাবে নিমজ্জিত। খোদাদ্রোহিতা, নাফরমানী ও শঠতা তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তাদের ব্যাপারে অত্যন্ত নিরাশ।'

তোফাইল ইবনে আমর আদ দাউসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনায় বলেন : 'আমার থেকে দাওয়াতী কাজের এই হতাশাব্যঞ্জক সংবাদ শুনে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো মন্তব্য না করে উঠে এসে ওযু করে দু'রাকাআত নামায আদায় করলেন। নামাযশেষে আকাশ পানে দু'হাত তুলে মুনাজাত করতে থাকলেন।'

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ দৃশ্য দেখে ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন এই ভেবে যে, তিনি হয়তবা দাউস সম্প্রদায়কে ইসলাম গ্রহণ না করার কারণে বদদু'আ করবেন এবং যার ফলে সমগ্র দাউস সম্প্রদায় আল্লাহর গজবে পতিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।

আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মনে মনে আফসোস করে বলতে লাগলেন: 'হায়! কতইনা দুর্ভাগা এই দাউস সম্প্রদায়, যারা নিজেদের হঠকারিতার জন্যে আল্লাহর আযাবের সম্মুখীন হচ্ছে!'

কিন্তু কী আশ্চর্য! রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দরবারে দু'হাত তুলে বদদু'আর পরিবর্তে বলতে লাগলেন:

اللَّهُمَّ اهْدِ دَوْسًا ... اللَّهُمَّ اهْدِ دَوْسًا ... اللَّهُمَّ اهْدِ دَوْسًا.
'হে আল্লাহ! তুমি দাউস সম্প্রদায়কে হেদায়াত দান করো। হে আল্লাহ! তুমি তোফায়েলের গোত্র দাউস সম্প্রদায়কে হোদায়াতের পথ গ্রহণ করার তৌফিক দান করো...। হে আল্লাহ! তোমার দীনের জন্যে তাদের কবুল করো।'

অতঃপর তিনি আমাকে সম্বোধন করে বলেন:

'আমি প্রাণ খুলে তোমার এবং তোমার সম্প্রদায়ের জন্যে দু'আ করেছি-

ارْجِعْ إِلَى قَوْمِكَ وَارْفُقْ بِهِمْ وَادْعُهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ .
'তুমি তোমার সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে যাও এবং পুনরায় তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাও। নিরাশ না হয়ে দৃঢ়তার সাথে সেখানে তাদের মাঝেই অবস্থান করো এবং হিকমত ও ধৈর্যের সাথে ইসলামের দিকে তাদের আহ্বান জানাতে থাকো।'

তোফাইল ইবনে আমর আদ দাউসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্য লাভে নিজেকে ধন্য করে প্রবল আধ্যাত্মিক চেতনা ও উদ্দীপনা নিয়ে স্বগোত্রে প্রত্যাবর্তন করে পূর্ণোদ্যমে পুনরায় দাওয়াতী কাজ আরম্ভ করেন। তাঁর ভাষায় :

'এবার আমি অবিশ্রান্তভাবে আমার জাতিকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার কাজ আরম্ভ করে দিলাম। ইতোমধ্যেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করে চলে যান। বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধও এ সময়ের মধ্যে সংঘটিত হয়ে যায়। খায়বর যুদ্ধের প্রাক্কালে আমি আবার রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে মদীনায় গিয়ে উপস্থিত হই।'

'এবার আমার সাথে শুধু আবু হোরায়রা একাই নন, আল্লাহর মেহেরবানীতে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু'আয় দাউস সম্প্রদায়ের নবদীক্ষিত ৮০টি পরিবারের সদস্যরাও রয়েছে। যারা ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আল্লাহর দীনের ঝাণ্ডাকে সমুন্নত করার জন্য নিবেদিত। আমাদের দেখে রাসূলে কার্লাীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত খুশি হলেন এবং আমাদের খায়বর বিজয়ীদের মধ্যে গণ্য করে গণীমতের অংশ প্রদান করলেন। আমরা সকলেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আরয করলাম: 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা বিগত জিহাদে অংশগ্রহণ করতে পারিনি, তা সত্ত্বেও আপনি আমাদের গনীমতের সম্পদ দানে ধন্য করেছেন। এখন থেকে আমরা নিজেদের জিহাদের জন্যে আপনার কাছে পেশ করছি। প্রত্যেকটি জিহাদেই আপনার ডান পাশের বিশেষ বাহিনী হিসেবে আমাদের গ্রহণ করুন এবং আমাদের জন্যে একটি নির্দিষ্ট প্রতীক নির্ধারণ করুন।'

তুফাইল বিন আমর আদ দাউসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আরো বলেন:

'মক্কা বিজয় পর্যন্ত আমি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে মদীনায় অবস্থান করি। মক্কা বিজয়ের পর আমি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে নিবেদন করি, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমর বিন হামামার 'যুলকাফিন' নামে যে মূর্তিটি অদ্যাবধি দাউস সম্প্রদায়ের দেবতা হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে, আমাকে যদি অনুমতি দিতেন তাহলে আমি ঐ মূর্তিটিকে জ্বালিয়ে দিয়ে জাহিলিয়াতের সমস্ত কুসংস্কারের মূল্যোৎপাটন করে ফেলতাম। কারণ, নবদীক্ষিত মুসলমানরা এখনও এর প্রতি একটা বিশেষ ধারণা পোষণ করে যাচ্ছে।'

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সে অনুমতি দিলেন। অনুমতি পেয়ে তিনি স্বগোত্রীয় একটি গ্রুপ নিয়ে মূর্তি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। যুগ যুগ ধরে চলে আসা বিভিন্ন কুসংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু, মিথ্যা প্রত্যাশার প্রতীক, শিরকের এই বীজকে সমূলে উৎপাটন করার জন্যে তিনি যখন প্রস্তুতি নেন তখন লোকালয়ের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর এ দৃশ্য অবলোকনের জন্যে চতুর্দিকে প্রচণ্ড ভীড় জমায়। তারা সবাই আশঙ্কা করছিল যে, এই দেবতাকে জ্বালাতে গিয়ে 'যুল কাফিনের' অভিশাপে তোফাইল ও তাঁর সাথীরা এই বুঝি আসমানী কোনো বজ্রপাতে নিপতিত হয়; কিন্তু তোফাইল ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে অগ্রসর হয়ে চারপার্শ্বের হাজার হাজার অনুসারী ও উৎসুক জনতার চোখের সামনে 'যুলকাফিনের' মূর্তির গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। আগুন প্রজ্বলনকালে তোফাইল ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কাব্যিক ছন্দে বলেন:

بَاذَا الكَفِيْنِ لَسْتُ مِنْ عُبَادِكَا مِيْلَادُنَا أَقدَمُ مِنْ مِبْلَادِكَا إِنِّي حَشَوْتُ النَّارَ فِي فُؤَادِكَا
'রে যুলকাফিন, আমরা তোর অনুসারী নই, আমাদের জন্ম তোর জন্মের অনেক পূর্বে, অতঃএব আমি তোর মিথ্যা অস্তিত্বে আগুন ধরাচ্ছি, যদি তোর কোনো শক্তি থাকে তাহলে প্রতিহত কর।'

দাউস সম্প্রদায়ের নবদীক্ষিত মুসলমানদের হৃদয়ে 'যুলকাফিন' সম্পর্কে যে যৎসামান্য সংশয় ও ইতস্ততা ছিল, শিরকের সর্বশেষ যে ছোঁয়া অন্তরে ছিল, মূর্তি ভস্মীভূত হওয়ার সাথে সাথে তা শেষ হয়ে যায়। অতএব, যখন লোকেরা বাস্তবিকই বুঝতে পারল, এই যে মূর্তি, যাকে তারা গোটা জীবন শ্রদ্ধাভরে দেবতার মর্যাদা দিয়ে আসছিল, প্রকৃতপক্ষে তা একটি কাষ্ঠখণ্ড ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ফলে অবশিষ্ট লোকেরাও ইসলামে দীক্ষিত হয়ে এর ঝাণ্ডাকে সমুন্নত করার জন্যে নিজেদের জীবন ও সম্পদ কুরবান করার জন্যে এগিয়ে এল।

অতঃপর তোফাইল ইবনে আমর আদ দাউসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ শিরকমুক্ত করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে নিয়ে আসার পর বাকী জীবন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে থেকে সার্বক্ষণিকভাবে জিহাদে অংশগ্রহণের নিমিত্তে মদীনায় চলে আসেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত পর্যন্ত তিনি তাঁকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতেন।

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতকালে তিনি ও তাঁর ছেলে আমর সার্বক্ষণিক জিহাদে রত থাকেন। তাঁর শাসনামলে ভণ্ডনবী ও ইসলামত্যাগী মুরতাদদের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ যখন চরমে তখন ভণ্ড নবী 'মুসায়লামাতুল কাযযাবে'র সাথে রোমহর্ষক সংঘর্ষে তোফাইল ইবনে আমর আদ দাউসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও তাঁর ছেলে আমর প্রবল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যুদ্ধযাত্রার পথে তোফাইল ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এক আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখেন। তিনি উপস্থিত সাহাবাদের কাছে এর তাবীর জানতে চেয়ে বলেন: 'আমি এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখেছি।'

সাহাবাগণ জানতে চাইলেন: 'কী আশ্চর্যজনক স্বপ্ন?'

উত্তরে তিনি বললেন: 'আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমার মাথা মুণ্ডন করা হয়েছে এবং আমার মুখের ভিতর থেকে একটি পাখি বেরিয়ে উড়ে গেছে এবং একজন মহিলা আমাকে তার পেটের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলেছে এবং আমার ছেলে আমর আমাকে উদ্ধারের জন্যে সর্বাত্মক চেষ্টা করছে; কিন্তু আমার এবং তার মাঝে এক প্রতিবন্ধকতা আমাকে তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।'

উপস্থিত সাহাবীগণ এই স্বপ্নের বর্ণনা শুনে কিছুক্ষণ নির্বাক থাকলেন, অতঃপর বললেন : 'আল্লাহ আপনার ভালো করুন।'

অতঃপর তিনি নিজেই তাঁর স্বপ্নের তাবীর সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বললেন : 'আমি নিজেই আমার স্বপ্নের একটি তাবীর সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি যে, আমার মাথা মুড়ানো থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, আমি এ জিহাদে শহীদ হয়ে যাব। আর সেই পাখিটি যা আমার মুখের ভিতর দিয়ে বের হয়ে উড়ে গেছে, তা হবে আমার আত্মা, যা তার প্রতিপালকের সান্নিধ্যে আরশে মু'আল্লার দিকে উড্ডীয়মান হবে এবং যে মহিলা আমাকে তার পেটের ভিতরে ঢুকিয়ে ফেলেছে, সেটা হবে সেই যুদ্ধ ক্ষেত্রের কবরস্থান যেখানে আমার লাশ দাফন করা হবে। আর আমি অবশ্যই আশা করছি যে, এ যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা আমাকে শাহাদাত দান করবেন। আমার ছেলে যে আমাকে পাবার জন্যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল তা হলো, সেও আমার মতো শাহাদাতের সৌভাগ্য অর্জনের জন্যে যুদ্ধে প্রাণ বাজি রেখে লড়াই করবে; কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে এ যুদ্ধে শাহাদাতের সৌভাগ্য দানের পরিবর্তে অন্য আর একটি জিহাদ পর্যন্ত গাজী হিসেবে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবেন।'

ইয়ামামার প্রান্তরে 'মুসায়লামাতুল কাযযাবে'র সাথে ইসলামের ইতিহাসের প্রচণ্ডতম রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধে তোফাইল ইবনে আমর আদ দাউসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ঈমানী চেতনা ও শাহাদাতের বাসনায় উদ্বেলিত হয়ে সিংহের ন্যায় খোদাদ্রোহী নাস্তিক ও মুরতাদদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর তরবারির আঘাতে একের পর এক দুশমনদের দুর্ভেদ্য প্রাচীর যেন ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছিল। তোফাইল ইবনে আমর আদ দাউসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে প্রতিরোধ করার জন্যে চতুর্দিক থেকে তাঁকে ঘিরে ফেলা হলো। তলোয়ারের সাথে তলোয়ারের ঝংকারে অগ্নিস্ফুলিংগ তাঁর চতুর্পাশ আলোকিত করে তুলছিল। হঠাৎ কোনো এক শত্রুর আঘাত তোফাইল ইবনে আমর আদ দাউসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ধরায় লুটিয়ে দিল। তিনি কালেমা শাহাদাতের বাণী উচ্চারণ করতে করতে শাহাদাতের পেয়ালা পান করলেন।

এদিকে তাঁর পুত্র আমর পিতার চেয়েও অধিক বিক্রমে তাঁর চারপাশের মুশরিকদের ধরাশায়ী করে সম্মুখের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। প্রবল বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে তিনি বিজয়ের পতাকা ছিনিয়ে আনলেন। কিন্তু এই গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ে আমর তাঁর পিতা তোফাইল ইবনে আমর আদ দাউসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে তার ডান হাতের একটি কবজিও আল্লাহর পথে কুরবান করলেন। ইয়ামামার ময়দানে তাঁর পিতা এবং নিজ হাতের কবজীকে দাফন করে বিজয়ীর বেশে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

আমীরুল মু'মিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিলাফতকালে আমর বিন তোফাইল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা কোনো এক প্রয়োজনে এমন এক সময়ে তাঁর দরবারে উপস্থিত হন, যখন রাষ্ট্রীয় মেহমানদের সম্মানে এক ভোজসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। উক্ত অনুষ্ঠানে আমর বিন তোফাইল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকেও অংশগ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়; কিন্তু তিনি এ মহতী ব্যক্তিবর্গের সাথে বাম হাতে কিভাবে খানা গ্রহণ করবেন তা ভেবে খুবই সংকোচ বোধ করছিলেন। তাঁর এই সংকোচ বোধ লক্ষ্য করে আমীরুল মু'মিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকে বলেন:

'কী হয়েছে? তুমি কেন আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করতে চাচ্ছ না? তোমাকে বাম হাতে খাদ্য গ্রহণ করতে হবে এ জন্যে?'

উত্তরে তিনি বললেন: 'আমীরুল মু'মিনীন আপনি ঠিকই বলেছেন।'

তাঁর এই উত্তর শুনে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অত্যন্ত আবেগজড়িত কণ্ঠে বলে উঠলেন: وَاللَّهِ لَا أَذُوقُ هَذَا الطَّعَامَ حَتَّى تَخْلِطَهُ بِيَدِكَ الْمَقْطُوعَةِ ... وَاللَّهِ مَا فِي القَوْمِ أَحَدٌ بَعْضُهُ فِي الْجَنَّةِ إِلَّا أَنْتَ .
'আমর! আল্লাহর শপথ করে বলছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এ খাদ্য গ্রহণ করব না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি তোমার কর্তিত হাতের এই অবশিষ্ট অংশ দ্বারা এই খাদ্য ঘেঁটে দেবে। আমি শপথ করে বলছি, আমাদের এ উপস্থিতির মধ্যে তোমার মতো দ্বিতীয় এমন কোনো ব্যক্তি কি আছে? যিনি তার জীবদ্দশায় দেহের একটি অংশকে জান্নাতে পাঠিয়ে দিতে পেরেছে?'

আমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পিতা তোফাইল ইবনে আমর আদ দাউসী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শাহাদাতের পর থেকে তিনি পিতার শপথ অনুসরণে শাহাদাতের মৃত্যুর বাসনায় ব্যাকুল হয়ে উঠেন। আখিরাতমুখী জীবন তাঁর এই নশ্বর জগতের সব ধরনের মোহ ও চাকচিক্যকে পরাভূত করে। জান্নাতের অনন্ত শান্তির প্রত্যাশায় তাঁকে ব্যাকুল করে তুলে। শুধু এই শাহাদাতের মৃত্যুটাই যেন এই চাওয়া-পাওয়ার মাঝে ছিল একমাত্র অন্তরায়।

পনেরো হিজরীতে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রোমান সাম্রাজ্যের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের যে ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, সে যুদ্ধে তিনি রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে জিহাদে অংশ গ্রহণ করেন। এই রক্তক্ষয়ী প্রচণ্ড সম্মুখ যুদ্ধে যেসব মুসলিম মুজাহিদ শত্রুপক্ষের দুর্ভেদ্য প্রাচীরকে তাদের শাণিত তরবারির আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন, আমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন তাদের অন্যতম। এ যুদ্ধে তিনি শত্রুপক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করার এক পর্যায়ে কাফিরদের চতুর্মুখী হামলায় শাহাদাত বরণ করে পিতার স্বপ্নের বাস্তব সাক্ষ্য দিয়ে জান্নাতুল ফিরদাউসের অনন্ত জীবনে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমর ইবনে তোফাইল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার প্রতি অশেষ রহমত বর্ষণ করুন এবং পিতা ও পুত্র উভয়কে শাহাদাতের সুমহান পুরস্কারে ভূষিত করুন। আমীন!

টিকাঃ
১. আল ইসাবা ফি তামিজ আস্ সাহাবা-৩য় খণ্ড, ২৮৬-২৮৮ পৃ.। ২. আল ইসতিয়াব, হায়দরাবাদ সংস্করণ-১ম খণ্ড, ২১১-২১৩। ৩. উদ্বুদুল গাবা-৩য় খণ্ড, ৫৪-৫৫ পৃ.। ৪. ছেফাতুছ ছাফওয়া-১ম খণ্ড, ২৪৫-২৪৬ পৃ.। ৫. ছিয়ার আ'লামুন নুবালা-১ম খণ্ড, ২৪৮-২৫০ পৃ.। ৬. মুখতাছার তারিখি দামেস্ক-৭ম খণ্ড, ৫৯-৬৪ পৃ.। ৭. আল বিদায়া ওয়া আন্ নিহায়া-৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩৩৭ পৃ.। ৮. শুহাদা 'উল ইসলাম-১৩৮-১৪৩ পৃ.। ৯. সিরাতু বাতাল-লি মুহাম্মদ যায়দান, (দারুস সাউদীয়া) ১৩৮৬ হি.।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস সাহমী (রাঃ)

📄 আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস সাহমী (রাঃ)


'প্রত্যেক মুসলমানেরই উচিত, আবদুল্লাহ বিন হুযাফা (রা)-এর মাথায় চুম্বন করা আমি সর্ব প্রথম এ কাজ শুরু করছি।' - উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রসিদ্ধ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস্ সাহামী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কিছু অবিস্মরণীয় ঘটনা নিয়েই এই আলোচনা :

তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দুই পরাশক্তি, রোমান সম্রাট কায়সার এবং পারস্য সম্রাট কিসরার কাছে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ দূত হিসেবে ইসলামের দাওয়াত পৌছানোর দায়িত্ব পালন করে, তিনি তৎকালীন যুগে ইতিহাস সৃষ্টিকারী অনেক ব্যক্তিত্বের তুলনায় অধিক মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। অন্যথায়, হাজারো আরব সন্তানের মতো তিনিও অতীতের পাতায় অপরিচিত হয়ে থাকতেন। কে স্মরণ করতো তার নাম? জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে বিপদ সংকুল পথ পাড়ি দিয়ে দুই পরাশক্তির কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর ঘটনা তাঁকে রোজ কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় করে রাখবে।

তখন ৬ষ্ঠ হিজরী। আরবের ভৌগোলিক সীমার বাইরে অর্থাৎ বহির্বিশ্বে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্যে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। বহির্বিশ্বে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল সাহাবীকে মনোনীত করলেন। তাঁদের দায়িত্ব ছিল, বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে ইসলামের দাওয়াতপত্র পৌছিয়ে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করা। এই প্রতিনিধি প্রেরণের কাজটি ছিল যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এমনসব দেশে প্রতিনিধি প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, যেসব দেশের সাথে নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের কোনো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল না। ফলে এই প্রতিনিধি দলের সদস্যদের জানমালের ন্যূনতম নিরাপত্তা সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব ছিল না।

উপরন্তু, প্রতিনিধি দলের যেমন ছিল না সংশ্লিষ্ট কাজের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা, তেমনি সেসব দেশের রাজা-বাদশাহদের মন-মানসিকতা সম্পর্কেও তারা ছিলেন না ওয়াকিফহাল। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, এমন উদ্যোগ নেওয়ার অর্থ, জেনে-শুনে কাউকে যেন অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা। তাছাড়া সেসব দেশ থেকে এই দূতদের সহী-সালামতে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনেরও কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।

একদিকে বহির্বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার ব্যাকুলতা, অপরদিকে দূতের নিরাপত্তা চিন্তা এবং অকল্পনীয় কোনো নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা- এসব চিন্তায় রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাকুল হয়ে পড়লেন।

তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সাহাবীদের মন-মানসিকতা গঠনের লক্ষ্যে একটি সাধারণ সভা আহ্বান করলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহ্বানে সর্বস্তরের সাহাবীগণ এ সভায় ছুটে আসলেন। যথাসময়ে সভার কাজ আরম্ভ হলো। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের হাম্দ ও ছানা পেশ করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমগ্র বিশ্বে ইসলামের দাওয়াত পৌছে দেওয়ার আবশ্যকতার ওপর এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখলেন।

তিনি বললেন:
'বিশ্বের সকল দেশের শাসকবর্গের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্যে আমি একদল প্রতিনিধি প্রেরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মদীনার সীমানা পেরিয়ে ইসলামের দাওয়াত সমগ্র বিশ্বে সম্প্রসারণ করা যে অতীব জরুরি, আশা করি তোমরাও আমার সাথে এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করবে। আমি এও আশা করি যে, ঈসা আলাইহিস সালামের সাথে বনী ইসরাইলরা যেরূপ টালবাহানা ও মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছিল, তোমরা তেমন কোনো আচরণ করবে না বরং বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে এ কাজে অংশগ্রহণ করবে।'

উপস্থিত সাহাবীগণ সমস্বরে বলে উঠলেন: 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার দ্বারা অর্পিত যে কোনো দায়িত্ব পালনে আমরা সদা প্রস্তুত এবং বদ্ধপরিকর। পৃথিবীর যে প্রান্তে আপনি আমাদের পাঠাতে ইচ্ছা করেন, নির্দ্বিধায় আমরা সেখানে যেতে প্রস্তুত।'

সাহাবীদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। এ উদ্দেশ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি তাঁর রিসালাতের দাওয়াত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে পৌঁছানোর জন্যে ছয়জন বিশিষ্ট সাহাবীকে মনোনীত করলেন। আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস সাহামী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ছিলেন তাঁদেরই অন্যতম। পারস্য সম্রাট কিসরার নিকট রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিঠি পৌঁছানোর দায়িত্ব অর্পিত হলো তাঁরই ওপর।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের সৈনিক ঈমানী চেতনায় বলীয়ান, প্রজ্ঞাবান আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস্ সাহামী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে সফরের জন্য তৈরি হলেন। পরিবারের সকল সদস্য এবং বন্ধু বান্ধবদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলেন। সেখান থেকে পারস্য সম্রাট কিসরার উদ্দেশে লেখা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র নিয়ে বালুকাময় মরুভূমি ও দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে সুদূর পারস্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন তিনি। আল্লাহর সাহায্যের ওপর ভরসা করে এই মর্দে মুজাহিদ আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস্ সাহামী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু একাকী দীর্ঘ এই বিপদসংকুল পথ অতিক্রম করে অবশেষে পারস্য সম্রাটের দরবারে গিয়ে উপস্থিত হলেন। অতঃপর রাজ-দরবারের পারিষদবর্গকে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব বুঝিয়ে সম্রাটের সাথে তিনি সাক্ষাতের অনুমতি লাভ করলেন।

এদিকে পারস্য সম্রাট কিসরার নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ দূত আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস্ সাহামী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর আগমনের খবর পৌঁছলে সে ভাবল, অন্যান্য ক্ষুদ্র দেশীয় রাজ্যের মতো নবপ্রতিষ্ঠিত এই ইসলামী রাষ্ট্রও হয়তো আনুগত্যের অঙ্গীকার নিয়ে তাঁর দ্বারস্থ হচ্ছে। এই মনে করে সে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে তার দরবারকে সুসজ্জিত করার নির্দেশ দিল। উচ্চপদস্থ ও গণ্যমান্য সরকারি ও বেসরকারি ব্যক্তিবর্গকে দরবারে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিল। দোভাষীদেরও উপস্থিত থাকার ব্যবস্থা করা হলো। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস্ সাহামী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সাক্ষাতের জন্যে সম্রাট ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিল।

পাতলা আরবী জুববা এবং ঐতিহ্যবাহী সাধারণ আরবী পোশাক 'আবা' বা গাউন পরিহিত দৃঢ় মনোবলের অধিকারী এবং ঈমানী চেতনায় উদ্দীপ্ত আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস্ সাহামী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অত্যন্ত বীরোচিত ও ভাবগম্ভীর মেজাজে নির্ধারিত সময়ে দরবারে উপস্থিত হলেন। তাঁর নূরানী চেহারায় ইসলামের গৌরব ও মর্যাদা প্রতিফলিত হচ্ছিল।

রাষ্ট্রীয় প্রথানুযায়ী সম্রাট তার নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দূত থেকে চিঠি গ্রহণের নির্দেশ দিল। আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:

'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ চিঠিখানা আমাকে স্বহস্তে সম্রাটের হাতে প্রদানের জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব তাঁর নির্দেশের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্যে আমি সরাসরি সম্রাটের হাতেই চিঠিখানা হস্তান্তর করতে চাই।'

একথা শুনে সম্রাট কিসরা তার কাছে দূতকে আসার অনুমতি দিল এবং স্বহস্তে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিঠিখানা গ্রহণ করল।

অতঃপর সম্রাট ইরাক নিবাসী আল-হিরার একজন প্রখ্যাত দোভাষীকে চিঠিখানা খুলে পাঠ করে তা পারস্যের ভাষায় তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিল। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই ঐতিহাসিক পত্রখানার সম্বোধন ছিল নিম্নরূপ:

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مِنْ مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللَّهِ إِلَى كِسْرَى عَظِيمٍ فَارِس - سَلَامٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى وَأَمَنَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ، وَأَدْعُوكَ بِدَعَايَةِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، فَإِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَى النَّاسِ كَافَّةً، لأَنْذِرَ مَنْ كَانَ حَيَّا، وَيُحِقُّ الْقَوْلُ عَلَى الْكَافِرِينَ، وَأَسْلِمُ تُسْلِمُ، فَإِنْ تَوَلَّيْتَ فَإِنَّ إِثْمَ الْمَجُوسِ عَلَيْكَ .

বিস্‌মিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ-এর পক্ষ থেকে পারস্য সম্রাট কিসরা'র প্রতি-
'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনে হেদায়াতের অনুসরণ করেছে, তাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি তোমাকে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাচ্ছি।
জেনে রাখো, আমি সমস্ত মানবকূলের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি, যেন জীবিতদেরকে ঈমান গ্রহণ না করার পরিণতি সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করি এবং অস্বীকারকারীদের উপর তাঁর সাজার নির্দেশ যথার্থভাবে পরিগণিত হয়।
অতএব, তুমি ইসলাম গ্রহণ করে আনুগত্য স্বীকার করো, ইহকালে পূর্ণ নিরাপত্তা ও পরকালে শান্তির নিশ্চয়তা পাবে।
জেনে রাখো! যদি এ আহ্বানের প্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন ও এটিকে প্রত্যাখ্যান করো তাহলে অগ্নিপূজক 'মাজুস' জাতির সমস্ত গুনাহর দায়-দায়িত্ব তোমাকেই বহন করতে হবে।'

চিঠির এই ক’টি বাক্য শোনার সাথে সাথেই সম্রাট কিসরা হিংসা, অহংকার ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে। হিংস্রতায় তাঁর মুখমণ্ডল রক্তবর্ণ ধারণ করল। চিৎকার করে বলতে লাগল :

‘কী স্পর্ধা! মহামান্য সম্রাট কিসরার নামে পত্র লেখা শুরু না করে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলে শুরু করেছে? তা ছাড়াও আমার নামের পূর্বে মুহাম্মদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে?’

এই বলে সম্রাট ক্রোধে দোআবী থেকে চিঠিখানা কেড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল। আর বলল : ‘এ ভাষায় চিঠি লেখা কি তার পক্ষে শোভন? সে আমার অধীনস্থ একজন ব্যক্তি মাত্র।'

অতঃপর সম্রাট কিসরা আবদুল্লাহ ইবনে হুয়াফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে তাঁর দরবার থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিল। নির্দেশমতো তাঁকে সেখান থেকে বেরও করে দেওয়া হলো।

হিংস্র হায়েনার মতো বদ মেজাজী ও আত্ম-অহমিকায় বিভোর, ক্রোধে কম্পমান পারস্য সম্রাট কিসরার দরবার থেকে আবদুল্লাহ ইবনে হুয়াফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বেরিয়ে গিয়ে এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে তৎক্ষণাৎই মদীনা প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র সম্রাট কিসরার নিকট পৌঁছানোর পর আবদুল্লাহ ইবনে হুয়াফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অর্পিত দায়িত্ব পালনে পূর্ণ সফলকাম হলেও এ আশংকা ছিল যে, সম্রাটের হিংস্র মেজাজ যে কোনো ভয়ংকর দিকে মোড় নিতে পারে। সুতরাং এ দেশে আর থাকা যায় না। এই চিন্তা করেই তিনি দ্রুত মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।

পারস্য সম্রাট কিসরার মেজাজ যখন একটু শান্ত হলো, তখন সে আবদুল্লাহ ইবনে হুয়াফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে আরো কিছু তথ্য জানার জন্য তাঁকে আবার দরবারে নিয়ে আসতে কর্তব্যরত ব্যক্তিদের নির্দেশ দিল। নির্দেশমতো লোকজন চতুর্দিকে তাঁকে খুঁজতে শুরু করে। দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করেও তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। অবশেষে অশ্বারোহী সেনাবাহিনী তলব করা হলো এবং তাদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হলো, জাজিরাতুল আরবের যে কোনো স্থানে তাঁকে পাওয়া গেলে জীবিত অবস্থায় সম্রাটের কাছে হাজির করতে হবে। কিন্তু অশ্বারোহী বাহিনী তীব্র গতিতে ছুটে গিয়ে শেষ সীমানা পর্যন্ত পৌছেও তারা হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কোনো সন্ধান পেল না। বেদুইনদের থেকে তারা জানতে পারল, তিনি ইতোমধ্যে পারস্যের সীমানা অতিক্রম করে মদীনায় পৌঁছে গেছেন।

এদিকে আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নিরাপদেই মদীনা পৌছতে সমর্থ হলেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পারস্য সম্রাট কিসরার সাথে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা তুলে ধরার সাথে তাঁর পবিত্র চিঠিখানা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করার বর্ণনাও তিনি দিলেন। একথা শুনে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জবান থেকে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে এল: مَزَّقَ اللَّهُ مُلْكَةٌ ‘আল্লাহ, কিসরার সাম্রাজ্যকেও টুকরো টুকরো করে দিন।’

বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসা সৈন্যদের ব্যর্থতার গ্লানিতে কিসরা প্রতিহিংসার অগ্নিতে দগ্ধ হচ্ছিল। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরাশক্তি শাহানশাহ কিসরা সামান্য একজন ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে না পারায় নিজেকে অত্যন্ত হেয় ও অপমানিত বোধ করল।

সম্রাট কিসরা হতাশাগ্রস্ত ও দিশেহারা হয়ে পরিশেষে পারস্যের করদ রাজ্য ইয়ামেনের বাদশাহ 'বাজানের' কাছে ফরমান জারি করল:

'নির্দেশ পাওয়ামাত্র আপনার পক্ষ থেকে দু'জন শক্তিশালী চতুর এবং সাহসী ব্যক্তিকে হেজাজের নবী দাবিদার মুহাম্মদের কাছে পাঠাবেন, তারা যেন মুহাম্মদকে আমার কাছে ধরে নিয়ে আসে।'

শাহানশাহ কিসরার নির্দেশ 'বাজান'কে পালন করতেই হবে। তাই তৎক্ষণাৎ সে দু'জন চতুর ও সাহসী ব্যক্তিকে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি লিখিত ফরমানসহ হেজাজে পাঠাল। ফরমানে উল্লেখ করা হলো:

'কালবিলম্ব না করে সে যেন এই দু'ব্যক্তির সাথে পারস্য-সম্রাট কিসরার দরবারে গিয়ে হাজির হয়।'

'বাজান' এই দু'ব্যক্তিকে আরও নির্দেশ দিল, তারা যেন মুহাম্মদের নবুওয়াত সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্যাবলি সংগ্রহ করে ও তার কার্যাবলী পর্যবেক্ষণ করে এর একটি রিপোর্ট তার কাছে পেশ করে।

শাহী ফরমান পালনের সৌভাগ্য লাভে ধন্য হয়ে পূর্ণ মানসিক প্রস্তুতি সহকারে উৎফুল্লচিত্তে এই দু'ব্যক্তি হেজাজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেল। তায়েফে পৌঁছার পর কুরাইশ সম্প্রদায়ের দু'জন পৌত্তলিক ব্যবসায়ীর সাথে তাদের সাক্ষাৎ ঘটল। ব্যবসায়ীদ্বয়ের মাধ্যমে তারা জানতে পারল, মুহাম্মদ হিজরত করে মক্কা থেকে মদীনায় চলে গেছেন এবং দু'ব্যক্তি থেকে ব্যবসায়ীদ্বয় জানতে পারল, ইয়ামেনের বাদশাহ 'বাজানের' মাধ্যমে পারস্য সম্রাট কিসরা মুহাম্মদের প্রতি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। খবর শুনে খুশিতে আত্মহারা হয়ে তারা মক্কাবাসীর কাছে এ আনন্দ-সংবাদ দ্রুত পৌঁছানোর জন্যে ছুটে এল। তারা কুরাইশদের কাছে পৌঁছে বলল:

'আপনারা ধন্য হোন, আপনাদের জন্যে আমরা এক চিত্তাকর্ষক শুভসংবাদ নিয়ে এসেছি। মহামান্য পারস্য সম্রাট কিসরা মুহাম্মদকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। সুতরাং মুহাম্মদকে আপনাদের ভয় করার আর কোনো কারণ নেই। তার মোকাবেলার জন্যে পারস্য সম্রাটই যথেষ্ট।'

পরিকল্পনা অনুযায়ী 'বাজান' প্রেরিত ব্যক্তিদ্বয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসন্ধানের জন্যে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেল। তারা মদীনায় পৌঁছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর নিকট 'বাজান' প্রেরিত পরোয়ানা হস্তান্তর করল। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল:

'শাহানশাহ কিসরা ইয়ামেনের বাদশাহ 'বাজানের' কাছে এই মর্মে পত্র লিখেছেন যে, তিনি যেন তাঁর দরবারে আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে দু'জন লোক পাঠান। আমরা সে উদ্দেশ্যে এসেছি, যেন আপনাকে কিসরার দরবারে উপস্থিত করতে পারি। আপনি যদি কালবিলম্ব না করে আমাদের সাথে তাঁর দরবারে যেতে সম্মত হন তাহলে আমরা আপনার জন্য সম্রাটের কাছে এমনভাবে সুপারিশ করব, যাতে আপনার ওপর নির্যাতনের মাত্রা কম হয়। এ কথাগুলো একান্তভাবেই আপনার মঙ্গলের জন্যে বলছি। অন্যথায়, যদি আপনি সেখানে যেতে সম্মত না হন তাহলে আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, পরাক্রমশালী পারস্য সম্রাট কিসরা ও তাঁর সৈন্যবাহিনীর ক্রোধের হাত থেকে কোনো শক্তিই আপনাকে ও আপনার জনবলকে রক্ষা করতে পারবে না।'

এ কথা শুনে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটুখানি মুচকি হেসে বললেন: 'আজ তোমরা স্বস্থানে গিয়ে বিশ্রাম কর। আগামীকাল কথা হবে।'

পরের দিন উক্ত দু'ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করল:

'আপনি কি আমাদের সাথে কিসরার দরবারে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুতি নিয়েছেন?'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন: 'তোমরা যে শক্তিধর কিসরার কথা বলছ, তার সঙ্গে সাক্ষাৎ আর তোমাদের ভাগ্যে নেই। ইতোমধ্যে আল্লাহর গজবে সে ধ্বংস হয়ে গেছে।'

তিনি মাস, তারিখ ও সময়ের উল্লেখ করে বললেন: 'সম্রাট কিসরা তার পুত্র সিরওয়াই কর্তৃক এক রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে এবং নিজের পুত্রের হাতেই নিহত হয়েছে।'

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে এ কথা শুনে তারা উভয়েই হতভম্ব হয়ে অপলক নেত্রে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল। নিমিষেই তাদের চেহারার মধ্যে ভীতির ভাব পরিলক্ষিত হলো। আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় তারা বলল:

'আমরা কি এ খবর ইয়ামেনের বাদশাহ 'বাজানের' কাছে পৌছে দেব?'

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: 'হ্যাঁ, অবশ্যই। তাকে আরো জানিয়ে দাও যে, অচিরেই সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্যে ইসলামের বিস্তার লাভ ঘটবে এবং সে যদি ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তাকে ক্ষমতাচ্যুত না করে আমার পক্ষ থেকে ইয়ামেনের বাদশাহ নিযুক্ত করা হবে।'

শক্তিধর পারস্য সম্রাট কিসরার নির্দেশে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জীবিত অবস্থায় ধরে নিতে এসে আশ্চর্যজনকভাবে মানসিক পরিবর্তন নিয়ে উল্টো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দূতে রূপান্তরিত হয়ে আগন্তুকদ্বয় ইয়ামেনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেল।

ইয়ামেনের বাদশাহ 'বাজানের' কাছে উপস্থিত হয়ে তারা তাদের মিশন ব্যর্থ হওয়ার বিস্তারিত কারণসমূহ উপস্থাপন করল। ঘটনাবলি শুনে বাদশাহ বাজান বলল:

'মুহাম্মদের কথা যদি বাস্তবিকই ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে নিঃসন্দেহে তিনি আল্লাহর নবী। আর যদি তা মিথ্যা প্রমাণিত হয় তাহলে তাঁকে সমুচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব।'

কয়েক দিনের এই আলাপচারিতার রেশ কাটতে না কাটতেই পারস্য সম্রাট কিসরার পুত্র সিরওয়াইয়ের বিশেষ দূত এসে ইয়ামেনের বাদশাহর দরবারে উপস্থিত হলো। দূতের মাধ্যমে সিরওয়াই বাদশা 'বাজানের' কাছে তার পিতা কিসরার ক্ষমতাচ্যুতির কথা উল্লেখ করে লিখেছে:

'পারস্যে আমার নেতৃত্বে সাফল্যজনক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার কারণে আমি সম্রাট কিসরাকে হত্যা করেছি। সে ক্ষমতার অপব্যবহার করে জাতির সম্মানিত গুণীজন, নিষ্পাপ শিশু ও নারীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করে চলেছিল। নিরীহ জনগণের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করছিল। এসব কারণে তাকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আমার এ ফরমান পাওয়ামাত্রই আপনি ও আপনার রাজ-দরবারের সব ব্যক্তি আমার সরকারের আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকারের হলফ নিন।'

ইয়ামেনের বাদশাহ 'বাজান' যখন নবুওয়াতের সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের জন্যে অধীর আগ্রহে পারস্য সম্রাট কিসরার সংবাদ জানার জন্যে অপেক্ষায় ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কিসরার হত্যার সংবাদ শুনে সিরওয়াইয়ের প্রতি আনুগত্যের শপথের পরিবর্তে তার মধ্যে এক প্রবল ঈমানী চেতনার সৃষ্টি হলো। সিরওয়াইয়ের প্রতি আনুগত্যের ফরমান তার সুপ্ত ঈমানী চেতনাকে যেন আগ্নেয়গিরির উদ্‌দ্গীরণে রূপান্তরিত করল। কালবিলম্ব না করে সে স্বতস্ফূর্তভাবে কালেমা শাহাদাতের ঘোষণা দিল:

'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।'

সাথে সাথে রাজ-দরবারে উপস্থিত ইয়ামেন ও পারস্যের কর্মকর্তারা সমস্বরে কালেমা শাহাদাতের ঘোষণা উচ্চারণ করে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন।

অসংখ্য সাহাবীর মধ্য থেকে আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস্ সাহামী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পারস্য সম্রাট কিসরাকে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। ঠিক এমনিভাবে তিনি তদানীন্তন অপর এক শ্রেষ্ঠ পরাশক্তি রোম সম্রাট কায়সারের কাছে ইসলামের ঝাণ্ডাকে বুলন্দ করতে গিয়ে ঈমানের সর্বোচ্চ কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার গৌরবে গৌরবান্বিত হয়েছিলেন।

সে ঘটনাটি ঘটে হিজরী উনিশ সালে। আমিরুল মু'মিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং কায়সারের মোকাবেলার জন্যে সর্বস্তরের মুসলমানকে আহ্বান জানান। এ আহবানে আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস্ সাহামী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও সাড়া দিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

মুসলিম সৈন্যদের ঈমানী চেতনা, দৃঢ় মনোবল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথে জীবন বিলিয়ে দেওয়ার প্রচণ্ড জযবার সংবাদ রোমান সম্রাট পূর্ব থেকেই অবহিত হয়েছিলেন। সে তার সৈন্যবাহিনীকে নির্দেশ দিল:

'এই যুদ্ধে একজন মুসলিম সৈন্যকেও যদি বন্দী করা যায় তাহলে তাকে যেন জীবিত অবস্থায় আমার দরবারে উপস্থিত করা হয়।'

ঘটনাক্রমে এ যুদ্ধে অন্যান্য মুসলিম যোদ্ধার সাথে আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস্ সাহামী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রোমান সৈন্যদের হাতে বন্দী হন। যুদ্ধের ময়দান থেকে রোমান সেনাপতি তার সম্রাটের কাছে বিশেষ দূতের মাধ্যমে এ সংবাদ প্রেরণ করে:

'মুহাম্মদের প্রথম যুগের অত্যন্ত প্রসিদ্ধ সাহাবীদের অন্যতম বীর যোদ্ধা আবদুল্লাহ বিন হুযাফাকে মহামান্য সম্রাটের দরবারে যুদ্ধবন্দী হিসেবে পাঠাচ্ছি এবং এ জন্যে নিজেকে ধন্য মনে করছি।'

বিশেষ একটি স্কোয়াডের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস্ সাহামী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে রোমান সম্রাট কায়সারের দরবারে হাজির করা হয়। সম্রাট তার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের জন্যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস্ সাহামী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঈমানী দৃঢ়তা পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল। সম্রাট কায়সার প্রথমেই আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নূরানী চেহারার দিকে বিস্ময়ের সাথে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকল। এরপর সম্রাট তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন:

'আমি আপনার সমীপে একটি প্রস্তাব রাখতে চাই।'

আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'কী সেই প্রস্তাব?'

সম্রাট কায়সার বলল:
'আমি আশা করি, আপনি ইসলাম পরিত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হবেন। যদি আপনি এ প্রস্তাবে সম্মত হন, তাহলে আপনাকে এখনই মুক্ত করে দেব এবং সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করব।'

আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তৎক্ষণাৎ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উত্তর দিলেন:

'আপনি যে প্রস্তাব করেছেন, এর চেয়ে বরং মৃত্যুকে আমি হাজার বার মোবারকবাদ জানাই।'

এ কথা শুনে সম্রাট কায়সার বললেন:
'আমি আপনাকে একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি মনে করি। আপনি আবার গভীরভাবে ভেবে দেখুন। যদি আপনি আমার আহ্বানে সাড়া দিয়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন, তাহলে আপনাকে আমার ক্ষমতার অংশীদার বানাব এবং আমার সাম্রাজ্যের অর্ধেক আপনাকে দান করব।'

যুদ্ধবন্দী আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস সাহামী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু একটু মৃদু হেসে বললেন:

'আল্লাহর শপথ! খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের বিনিময়ে যদি সমগ্র রোমান সাম্রাজ্য এবং এই সাথে সমগ্র আরব বিশ্ব আর তাদের সমস্ত ধনভাণ্ডারও আমার হাতে তুলে দেওয়া হয় তবুও এক পলকের জন্যেও আমি ইসলাম পরিত্যাগ করতে পারি না।'

আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পক্ষ হতে এরূপ বলিষ্ঠ জওয়াব শুনে সম্রাট কায়সার আশ্চর্য হলো।

প্রলোভন দেখিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ধর্মচ্যুত করতে ব্যর্থ হয়ে চিরাচরিত নির্মম প্রথায় সম্রাট কায়সার তাঁকে প্রাণদণ্ডের হুমকি দিয়ে রাগান্নিত হয়ে বলল:

'এরপরও যদি তুমি ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ না কর তাহলে তোমাকে হত্যা করা হবে।'

আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:
'আপনার যা ইচ্ছা হয় তা-ই করতে পারেন; কিন্তু আমি এক মুহূর্তের জন্যেও ইসলাম ত্যাগ করতে পারবো না।'

অতঃপর সম্রাট তাঁকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানোর নির্দেশ দিল। নির্দেশ মতো আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড় করানো হলো। এবার সম্রাট তাঁকে ভীতি প্রদর্শনের জন্যে জল্লাদকে রোমান ভাষায় মৃদুস্বরে বলে দিল:

'আসামির হাতের কাছাকাছি একটি তীর যেন নিক্ষেপ করা হয়।'

জল্লাদ তার স্বভাবসুলভ মেজাজে হুংকার ছেড়ে তীব্র গতিতে একটি তীর নিক্ষেপ করল। তীরটি ক্ষীপ্র গতিতে আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর হাতের কজির পাশ দিয়ে পিছনের কাষ্ঠফলকে গিয়ে বিদ্ধ হলো।

এরপর সম্রাট পুনরায় তাঁকে স্বধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার আহ্বান জানাল; কিন্তু ফাঁসিকাষ্ঠে দণ্ডায়মান আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আগের মতোই নির্ভয়ে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন।

সম্রাট এবারও আঞ্চলিক ভাষায় জল্লাদকে পায়ের কাছে তীর নিক্ষেপ করার জন্য নির্দেশ দিল। উদ্দেশ্য ছিল, তিনি যেন ভীত হয়ে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন।

জল্লাদ এবার পূর্বের তুলনায় অধিক তর্জন-গর্জন করে হুংকার ছেড়ে একটি তীর আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দিকে নিক্ষেপ করল। পূর্বের মতো এবারও তীরটি তাঁর পায়ের পাশ ঘেঁষে দূরে গিয়ে বিদ্ধ হলো।

সম্রাট শেষবারের মতো তাঁকে ইসলাম ত্যাগ করার জন্যে আহ্বান জানাল। আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পূর্বের মতো এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করলেন।

আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ঈমানী দৃঢ়তা দেখে সম্রাট বিস্মিত ও হতাশ হলো এবং তাঁকে কঠিনতর পরীক্ষার সম্মুখীন করার পরিকল্পনা নিলো। সম্রাট তাঁকে ফাঁসির মঞ্চ হতে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিল। অতঃপর বিশালাকার একটি ডেকচি এনে তাতে তেল ফোটাতে বলল। ডেকচিতে ফুটন্ত তেল যখন সাঁ সাঁ আওয়াজ করছিল, তখন সম্রাট দু'জন মুসলিম যুদ্ধবন্দীকে এনে আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর চোখের সামনে তাদের একজনকে সেই ফুটন্ত ডেকচিতে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিল। জল্লাদেরা নির্দেশানুযায়ী তাদের একজনকে এর মধ্যে নিক্ষেপ করল। সাথে সাথে তাঁর সমস্ত শরীর সিদ্ধ হয়ে হাড় থেকে গোশত ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে লাগল। আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ পৈশাচিক নিষ্ঠুরতম দৃশ্য স্বচক্ষে অবলোকন করলেন।

এবার সম্রাট পুনরায় তাঁকে স্বধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার আহ্বান জানাল এবং বলল:

'তা যদি করা না হয় তাহলে তোমাকেও এই চরম পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।'

আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পূর্বের চেয়ে আরও দৃঢ়তার সাথে অত্যন্ত ঘৃণাভরে সম্রাটের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন।

সম্রাট যখন সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েও আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে ইসলাম ত্যাগে রাজি করাতে ব্যর্থ হলো, তখন সে হতাশা ও ক্রোধে আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকেও তার দুই সাথী যুদ্ধবন্দীর মতো সেই উত্তপ্ত ডেকচিতে নিক্ষেপের নির্দেশ দিল। জল্লাদেরা যখন তাঁকে ডেকচির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর চোখ থেকে দু'ফোটা অশ্রু নির্গত হলো। এ দেখে তারা দৌড়ে গিয়ে সম্রাট কায়সারকে বলল:

'এবার সে মৃত্যুর ভয়ে কেঁদে ফেলেছে।'

সম্রাট মনে করল, এই দুর্বল মুহূর্তে যদি তাঁকে ধর্মত্যাগের আহ্বান জানানো হয়, তাহলে সে রাজি হতে পারে। তাই সম্রাট তাঁকে পুনরায় তার নিকট নিয়ে আসার জন্যে নির্দেশ দিলেন। পরক্ষণেই আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে সম্রাটের সামনে হাজির করা হলো।

সম্রাট পুনরায় তাকে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার আহ্বান জানাল। শিকল পরিহিত ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত মৃত্যু পথযাত্রী আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবারও অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সম্রাটের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করলেন। এরপর সম্রাট বলল:

'ধিক্কার তোমার প্রতি, তুমি যদি মৃত্যুকেই ভয় না পেতে তাহলে কাঁদলে কেন?'

আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন:

'দেখুন, আমি মুত্যুর ভয়ে চোখের পানি ফেলিনি; বরং এই একটি মাত্র ডেকচির ফুটন্ত তেলের মাঝে আমাকে নিক্ষেপ করতে চাচ্ছেন, অথচ আমি আশা করেছিলাম যে, আমার শরীরে যতগুলো লোমকূপ রয়েছে ততগুলোই যদি আমার জীবন হতো এবং এক এক করে সবক'টিকে জলন্ত ডেকচিতে নিক্ষেপের মাধ্যমে আল্লাহর পথে শহীদ হতে পারতাম, তবে আমি হতাম শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। আফসোস! এই মর্যাদা লাভে ব্যর্থ হতে যাচ্ছি মনে করেই আমি চোখের পানি ফেলেছি।'

আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর এই ঈমানী দৃঢ়তা, আল্লাহ ও রাসূলের পথে অবিচল মনোবল প্রত্যক্ষ করে সম্রাট আশ্চর্য হলো। কিন্তু সে তার স্বভাবসুলভ অহঙ্কারের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে অত্যন্ত ক্রোধের সাথে বলল:

'কী স্পর্ধা! আমার গৌরব ও মর্যাদার প্রতি তোমার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই।'

এদিকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথীদের ত্যাগ ও কুরবানীর যে বর্ণনা সম্রাট পূর্বে শুনেছিল, আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর আচরণে সম্রাটের কাছে তা বাস্তব প্রমাণিত হলো। অপরদিকে সামান্য একজন যুদ্ধবন্দীর কাছে সম্রাটের শত আবেদন-নিবেদন ও কৌশল সব ব্যর্থ। সম্রাটের জন্যে এটা ছিল আত্মমর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন। তাই সম্রাট আত্মমর্যাদা শেষ রক্ষার জন্যে আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কাছে সর্বশেষ প্রস্তাব দিল :

'তুমি আমার কোনো প্রস্তাবই গ্রহণ করলে না। যদি তুমি আরবী প্রথা অনুযায়ী সম্মানার্থে আমার মাথায় শুধু একটি চুম্বন দিতে পার তাহলেও আমি তোমাকে মুক্তি দিতে পারি।'

কুটনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন ও বিচক্ষণতার অধিকারী আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ প্রস্তাব শোনামাত্রই একটি শর্ত আরোপ করে বললেন:

'এর বিনিময়ে সম্রাট যদি সকল যুদ্ধবন্দীকে মুক্তি দেন তাহলে এ প্রস্তাব আমি বিবেচনা করে দেখতে পারি।'

সম্রাট তাঁর মর্যাদা রক্ষার শেষ সুযোগটি আর হাতছাড়া করল না। সে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিত সাহাবীর বিচক্ষণতা ও কূটনেতিক প্রজ্ঞায় মুগ্ধ হয়ে বলল:

'হ্যাঁ, তার বিনিময়ে আপনিসহ সকল মুসলমান যুদ্ধবন্দীকে যথাযথ মর্যাদার সাথে মুক্ত করে দেওয়া হবে।'

আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন: 'আমি মনে মনে ভাবলাম, আল্লাহর এই দুশমনের মাথায় একটি চুম্বনের বিনিময়ে যদি আমি সমস্ত মুসলমান যুদ্ধবন্দীকে মুক্ত করিয়ে নিতে পারি তাহলে এতে লজ্জারই বা কী আছে?'

অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আরবী প্রথানুযায়ী রোমান সম্রাট কায়সারের মাথায় একটি চুম্বন করলেন।

সম্রাট হাফ ছেড়ে বাঁচল। কোনোমতে যেন তার ইজ্জত রক্ষা পেল। হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে কূটনৈতিক মর্যাদায় ভূষিত করা হলো। আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস্ সাহামী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সমস্ত মুসলমান যুদ্ধবন্দীকে মর্যাদার সাথে মুক্ত করে আমিরুল মু'মিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দরবারে এসে পৌঁছলেন।

রোমান-সম্রাট কায়সারের দরবারে সংঘটিত নজীরবিহীন ঘটনাবলির বর্ণনা আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সবাইকে শোনালেন। উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মুখে এই আশ্চর্যজনক বর্ণনা শুনে এবং তাঁর বিচক্ষণতায় মুগ্ধ হয়ে সদ্যমুক্ত সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বললেন:

حَقٌّ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ أَنْ يُقَبِّلَ رَأْسَ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ حُذَافَةَ وَأَنَا أَبْدَأُ بِذَلِكَ ... ثُمَّ قَامَ وَقَبَّلَ رَأْسَهُ ...
'প্রত্যেক মুসলমানেরই উচিত, আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস্ সাহামীর মাথায় চুম্বন করা এবং আমি সর্বপ্রথম তাঁর মাথায় চুম্বন করে এ কাজ শুরু করছি............।'

অতঃপর আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মাথায় সম্মানসূচক চুম্বন করলেন।

টিকাঃ
১. আল ইসাবা ফী তামিয আস সাহাবা, ইবনে হাজর, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৮৭-২৮৮ (তুবয়াতু মুহাম্মদ মোস্তফা)। ২. সিরাত ইবনে হিশাম (সূচিপত্র দ্রষ্টব্য)। ৩. হায়াতুস সাহাবা, মুহাম্মদ ইউসুফ আল কান্দাহলোভী, ৪র্থ খণ্ডের সূচিপত্র দ্রষ্টব্য। ৪. তাহজীব আত্ তাহজীব, ৫ম খণ্ড, ১৮৫ পৃ.। ৫. এম তাউল আসমা, ১ম খণ্ড, ৩০৮-৪৪৪ পৃ.। ৬. হুসনুস সাহাবা, ৩০৫ পৃ.। ৭. আল্ মুহাববার, ৭৭ পৃ.। ৮. তারিখুল ইসলাম লিয্ যাহাবী, ২য় খণ্ড, ৮৮ পৃ.।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 উমায়ের ইবনে ওয়াহাব (রাঃ)

📄 উমায়ের ইবনে ওয়াহাব (রাঃ)


'রাসূলে কারীম (স)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে উমায়ের যখন মসজিদে নববীতে প্রবেশ করছিল, তখন সে আমার নিকট একটি শূকরের চেয়েও ঘৃণিত ছিল। আর ইসলাম গ্রহণের পর সে আজ আমার নিকট আমার কোনো কোনো সন্তানের চেয়েও প্রিয় হয়ে গেল।' -উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু

উমায়ের ইবনে ওয়াহাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর একই জীবনের মধ্যে ছিল দু'টি ধারা। একটি ছিল ইসলাম গ্রহণের পূর্ব-জীবন আর অন্যটি ছিল ইসলাম গ্রহণের পরের জীবন।

তার ইসলাম গ্রহণের পূর্ব-জীবন ছিল অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। বদর যুদ্ধে সে ইসলামের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিল; কিন্তু তার তরবারি তাকে মোটেই সাহায্য করতে পারেনি; বরং সে এক পর্যায়ে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা তাকে ইসলামের জন্যে কবুল করে নিয়েছিলেন বলে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে সে রক্ষা পায়। এ জন্যে সে মক্কায় ফিরে আসতে সমর্থ হয়; কিন্তু তার ছেলে ওয়াহাব মুসলমানদের হাতে বন্দী অবস্থায় মদীনায়ই রয়ে যায়।

উমায়ের ইবনে ওয়াহাব আশঙ্কা করেছিল যে, মক্কায় মুহাম্মদের উপর যেমন নির্যাতনের স্টীম রোলার চালানো হয়েছিল, তার ছেলেকে আটকাবস্থায় নির্মম নির্যাতন চালিয়ে তার কৃত অপরাধের প্রতিশোধ নেবে মুসলমানরা। এ দুশ্চিন্তায় উমায়ের ইবনে ওয়াহাব অত্যন্ত অস্থির হয়ে পড়ে।

কোনো এক দুপুরে ছেলের মুক্তির জন্যে প্রার্থনা করার উদ্দেশ্যে সে দেবতাদের জন্যে কিছু ভোগসামগ্রী নিয়ে কাবাগৃহে হাজির হয়। এ সময়ে কুরাইশ সরদার সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া বাইতুল্লাহর সন্নিকটস্থ হাজের নামক স্থানে উপবিষ্ট ছিল, তার সঙ্গে উমায়েরের সাক্ষাৎ ঘটে। তারা পরস্পরে কুশলবিনিময় করে। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া তখন উমায়ের ইবনে ওয়াহাবকে বলল:

'বসো ভাই! কিছু সুখ-দুঃখের কথা বলি, সময় আর কাটছে না। আমাদের কলিজার টুকরাদের মদীনায় বন্দী রেখে মোটেও শান্তিতে ঘুমাতে পারছি না।'

অতঃপর তারা একে অপরের মুখোমুখি বসে বদr যুদ্ধের বিভিন্ন বিভীষিকাময় ঘটনার আলোচনা শুরু করে। আলাপচারিতায় তারা কখনো মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সঙ্গীদের হাতে যুদ্ধবন্দী কুরাইশদের সংখ্যা নির্ণয় করছিল, আবার কখনো মুসলমানদের তরবারির আঘাতে তাদের নিহত নেতৃবৃন্দের কথা স্মরণ করে ভয়ে শিউরে উঠছিল। যাদের লাশ দিয়ে বদরের পুরানো ডোবাগুলো ভরাট করা হয়েছিল। আলোচনার এক পর্যায়ে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বলল:

'আজ আমাদের নেতারা মুসলমানদের হাতে নিহত, যুবকরা তাদের হাতে বন্দী। আল্লাহর কসম! আমাদের বেঁচে থাকার আর কি কোনো সার্থকতা আছে?'

এ কথা শুনে উমায়ের তার কথায় সায় দিয়ে বলল:
'তুমি যথার্থই বলেছ। সত্যিই, আমাদের বেঁচে থাকার আর কোনো যৌক্তিকতা নেই।'

এরপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে পুনরায় সে বলল:
'এই কাবার মালিকের কসম! আমি যদি ঋণগ্রস্ত না হতাম অথবা আজ আমার ঋণ পরিশোধ করার মতো কোনো ব্যবস্থা থাকত অথবা আমার অনুপস্থিতিতে সন্তান-সন্ততির অনাহারে মৃত্যুবরণ করার আশঙ্কা না করতাম তাহলে নিশ্চয়ই আমি মদীনায় গিয়ে মুহাম্মদকে এ দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় করে দিতাম এবং তাঁর মিশনকে স্তব্ধ করে দিয়ে আরববাসীকে এ অত্যাচার হতে মুক্ত করতাম।'

এরপর সে মৃদুস্বরে বলল:
'আমি যদি মদীনায় মুহাম্মদকে হত্যা করতে যাই, তাহলে কেউ আমাকে সন্দেহ করবে না যে, আমি তাঁকে হত্যা করতে এসেছি; বরং সবাই ভাববে যে, আমি আমার বন্দী ছেলের মুক্তির জন্যে তদবির করতে এসেছি।'

সাফওয়ান কালবিলম্ব না করে উমায়েরের ভাবাবেগকে লুফে নিয়ে বলল:
'হে উমায়ের! তোমার সমস্ত ঋণের বোঝা আমার উপর ছেড়ে দাও। পাহাড়সম ঋণকেও আমি পরিশোধ করতে প্রস্তুত। আর তোমার সমস্ত পরিবার-পরিজনকে আজই আমি আমার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করে নিচ্ছি। যতদিন আমি বেঁচে থাকবো ততদিন আমার অর্থ ও ধন- সম্পদের প্রাচুর্য তোমার পরিবারের জন্যে ব্যয়িত হবে।'

সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া'র এই তেজোদ্দীপ্ত প্রতিশ্রুতি শুনে উমায়েরের মধ্যকার হিংস্র পশুশক্তি গর্জন করে উঠল। সে সাফওয়ানকে বলল:

'তাহলে আমাদের দু'জনের মধ্যকার এ চুক্তির কথা আর কারো কাছে প্রকাশ করো না। আমি আমার কর্তব্য সম্পাদনের জন্যে বদ্ধপরিকর।'

রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি উমায়েরের হৃদয়ে হিংসার যে আগুন জ্বলছিল, সাফওয়ানের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রতিশ্রুতি তা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। সে অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাবাঘর থেকে বাড়ি ফিরল এবং পরিকল্পনাকে সামনে নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করল।

যেহেতু কুরাইশদের প্রায় প্রতিটি ঘরের কোনো না কোনো লোক মুসলমানদের হাতে যুদ্ধবন্দী হিসেবে মদীনায় ছিল, সেহেতু কয়েদিদের আত্মীয়-স্বজন সব সময়ই তাদের মুক্ত করার ব্যাপারে মদীনায় আসা-যাওয়া করত। তাই উমায়েরের মদীনা যাওয়াকে মুসলমানেরা কেউই সন্দেহের চোখে দেখবে না বলেই তার বিশ্বাস ছিল।

উমায়ের ইবনে ওয়াহাব পূর্ণ মানসিক প্রস্তুতি সহকারে মদীনা রওয়ানা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল এবং স্বীয় তরবারি আরও শাণিত করে তাতে বিষ মেখে নিলো। অবশেষে সফর সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেল। তাকে বহনকারী উট যতই মদীনার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, উমায়েরের হিংসার আগুন ততই দাউ দাউ করে জ্বলছিল। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এক পর্যায়ে উটটি মদীনায় মসজিদে নববীর কাছে এসে পৌঁছল। উমায়ের সেখানে অবতরণ করে তার বিষাক্ত তরবারি নিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খোঁজার জন্যে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করল।

এদিকে উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মসজিদে নববীর দরজার নিকট বসে কিছুসংখ্যক সাহাবীর সাথে বদর যুদ্ধের যুদ্ধবন্দী ও মৃত কুরাইশদের নেতৃত্বের পরাজয়ের ঘটনাবলি, মুসলমানদের সাহসিকতা ও বীরত্বের বর্ণনা এবং আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির আলোচনা করছিলেন। হঠাৎ মুখ ফেরাতেই তিনি দেখতে পেলেন যে, অস্ত্রসজ্জিত উমায়ের ইবনে ওয়াহাব মসজিদে নববীতে প্রবেশ করছে। তিনি চমকে উঠলেন এবং তার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে চিৎকার করে বলে উঠলেন:

'আল্লাহর দুশমন, উমায়ের ইবনে ওয়াহাব। নিশ্চয়ই কোনো খারাপ মতলব নিয়ে এ মসজিদে প্রবেশ করছে। এই সেই ব্যক্তি, যে মক্কায় আমাদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের লেলিয়ে দিয়েছিল এবং বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির কাজে ভীষণ ব্যস্ত ছিল। সে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে এখানে আসতে পারে না।'

এই বলে তিনি উপস্থিত সাহাবীদের তৎক্ষণাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারদিকে অবস্থান গ্রহণ করার নির্দেশ দিলেন এবং ঐ ব্যক্তির নাশকতামূলক কাজ সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকার জন্যে বললেন।

অতঃপর উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে বললেন:

'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর দুশমন উমায়ের ইবনে ওয়াহাব অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করেছে। নিশ্চয়ই তার কোনো কুমতলব রয়েছে।'

এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।'

উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এ আদেশ শোনার পর উমায়েরের কাছে ফিরে গিয়ে এক হাতে উমায়েরের তরবারি এবং অন্য হাতে তার জামার কলার ধরে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে এলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দৃশ্য দেখে উমায়েরকে ছেড়ে দিয়ে উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াতে বললেন।

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমায়ের ইবনে ওয়াহাবকে নিকটে ডাকলেন। উমায়ের এসে জাহিলী নিয়মে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম জানাল। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন:

'শোনো উমায়ের, আল্লাহ আমাকে তোমাদের সালামের চেয়ে আরও উত্তম সালাম দিয়ে সম্মানিত করেছেন। এ সালাম হলো বেহেশতের সালাম, আস্সালামু আলাইকুম।'

উমায়ের বলল:
'কই, খুব বেশি পার্থক্য তো মনে হচ্ছে না; কিছুদিন আগেও তো এটাই ছিল আপনার সালাম।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'উমায়ের! কী উদ্দেশ্যে তুমি এখানে এসেছ?'

উমায়ের বলল:
'যুদ্ধবন্দীদের মুক্ত করার জন্যে এসেছি। আশা করি, এ ব্যাপারে আপনি আমাকে সার্বিক সহযোগিতা দান করবেন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'বন্দীমুক্তির উদ্দেশ্যেই যদি এসে থাকো, তাহলে অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় কেন?'

উমায়ের বলল:
'আল্লাহ এ তলোয়ারকে ধ্বংস করুন! বদরে এ তলোয়ার কি আমাদের কোনো কাজে এসেছে?'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন:
'উমায়ের! সত্যি করে বলো, কী উদ্দেশ্যে তুমি এসেছ?'

উমায়ের বলল:
'বিশ্বাস করুন, দ্বিতীয় কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এখানে আসিনি।'

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
'উমায়ের! তুমি এবং সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া খানায়ে কাবার হাজের নামক স্থানে বসে বদর যুদ্ধের পরাজয় সম্পর্কে কি কখনো আলোচনা করছিলে? তখন কি তুমি বলনি যে,

'আমি যদি ঋণগ্রস্ত না হতাম, অথবা সন্তান-সন্ততি আমার উপর নির্ভরশীল না হতো, তাহলে আমি মুহাম্মদকে হত্যার উদ্দেশ্যে অবশ্যই মদীনায় রওয়ানা হতাম।'

তোমার এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে সাফওয়ান ইবনে উমায়ের আমার হত্যার বিনিময়ে তোমার ঋণ এবং সন্তান-সন্ততির সব দায়-দায়িত্ব কি গ্রহণ করেনি? তোমরা দু'জন হয়তো মনে করেছিলে যে, তোমরা ব্যতীত এ কথাগুলো আর কেউ শোনেনি। অথচ তোমাদের উভয়ের মাঝে আল্লাহ বিদ্যমান ছিলেন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে এ কথা শুনে উমায়ের হতভম্ব হয়ে গেল এবং নির্বিকারে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল:

'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আল্লাহর পক্ষ হতে যে পয়গাম নিয়ে এসেছেন, আমরা তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতাম; কিন্তু আমার এবং সাফওয়ানের মাঝে যে কথোপকথন হয়েছিল, তা আমরা দু'জন ব্যতীত আর কেউই জানত না। আমার বিশ্বাস, নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে এ সম্পর্কে অবহিত করেছেন। আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি কোনো না কোনোভাবে আমাকে আপনার কাছে এনে ইসলামের আলো দিয়ে আলোকিত করেছেন। আমি এখন আর আপনার দুশমন উমায়ের ইবনে ওয়াহাব নই; বরং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর বান্দাহ ও তাঁর প্রেরিত রাসূল।'

এ ঘোষণার মাধ্যমেই উমায়ের ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন। তৎক্ষণাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের এই বলে নির্দেশ দিলেন: فَقَّهُوا أَخَاكُمْ فِي دِينِهِ ، وَعَلِمُوهُ الْقُرْآنَ ، وَأَطْلِقُوا أَسِيرَهُ.
'তোমাদের এই ভাইকে দীন সম্পর্কে জ্ঞান দাও, তাকে কুরআন শিক্ষা দাও এবং তার বন্দীদের মুক্ত করে দাও।'

উমায়েরের ইসলাম গ্রহণের সংবাদে মদীনার মুসলমানদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। এমনকি উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেই ফেললেন: لَخِنْزِيرٌ كَانَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ عُمَيْرِ بْنِ وَهْبٍ حِينَ قَدِمَ عَلَى رَسُول اللهِ ﷺ وَهُوَ الْيَوْمَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ بَعْضٍ أَبْنَانِي .

'ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উমায়ের ইবনে ওহাব আমার নিকট একটি শূকরের চেয়েও ঘৃণিত ছিল; কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর সে আমার নিকট আজ আমার কোনো কোনো সন্তানের চেয়েও অধিকতর প্রিয়।'

উমায়ের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর মধ্যে এ বিপ্লবী পরিবর্তনের পর থেকে তিনি ইসলামী শিক্ষায় নিজেকে পরিশুদ্ধ করার সর্বাত্মক চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেন। আল কুরআনের আলোকে তাঁর জীবনকে আলোকিত করতে থাকেন। আল্লাহ ও রাসূলের (স) ভালোবাসায় তিনি এতই নিমগ্ন হয়ে যান যে, মক্কায় রেখে আসা তাঁর প্রিয় সন্তান-সন্ততির মায়াও ভুলে গেলেন।

এদিকে সাফওয়ান বিন উমাইয়া কুরাইশদের বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতে লাগল এবং বলতে শুরু করল : 'হে কুরাইশরা অপেক্ষা করো, সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন আমি তোমাদের এমন একটি শুভসংবাদ শোনাবো, যা তোমাদের বদরের পরাজয়ের গ্লানি ভুলিয়ে দেবে।'

সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া উমায়েরের হাতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হত্যার খবর শোনার জন্যে অধীর আগ্রহে মদীনার পানে চাতকপাখির মতো তাকিয়ে রইল। যতই দিন যাচ্ছিল, এ সংবাদ শোনার জন্য সাফওয়ান ততই অস্থির হয়ে উঠছিল। তার উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা ছিল সীমাহীন। কবে শুনবে সে সংবাদ, যা শোনার জন্যে সে পাঠিয়েছে উমায়েরকে মদীনায়। মদীনা হতে আগন্তুকদের কাছে উমায়ের ইবনে ওয়াহাব সম্পর্কে জানার জন্যে সাফওয়ান উদগ্রীব হয়ে উঠল। কিন্তু কেউই তাকে উমায়ের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সম্পর্কে কোনো খবর দিতে পারছিল না। পরিশেষে, কোনো এক আগন্তুক সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াকে সংবাদ পৌঁছে দিল:

'তুমি যার জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছো, সেই উমায়ের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে।'

এ সংবাদ সাফওয়ানের মাথায় বজ্রপাতের মতো মনে হলো। তার ধারণা ছিল: 'পৃথিবীর সকল মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলেও উমায়ের ইবনে ওয়াহাব তা গ্রহণ করতে পারে না।'

উমায়ের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এদিকে দীনের জ্ঞান ও পবিত্র কালামে পাকের হিফয করার কাজে আত্মনিয়োগ করলেন।

একদা তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন:
'হে আল্লাহর রাসূল! আমি জীবনের দীর্ঘ সময় আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে এবং ইসলাম গ্রহণকারীদের উপর কঠিন নির্যাতন ও অত্যাচারের কাজে ব্যয় করেছি। আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি মক্কায় গিয়ে কুরাইশদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথে আহ্বান জানাব। তারা যদি আমার দাওয়াত কবুল করে তাহলে তাদেরই কল্যাণ হবে। আর যদি তারা তা প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে আমি তাদের দীন সম্পর্কে এমন উচিত শিক্ষা দেব, যেভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের তারা দিয়েছিল।'

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে মক্কায় গিয়ে ইসলামের দাওয়াত প্রচারের অনুমতি দিলেন। উমায়ের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মক্কায় গিয়ে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার ঘরে প্রবেশ করে বললেন:

'হে সাফওয়ান, তুমি মক্কার নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে অন্যতম নেতা এবং কুরাইশদের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অন্যতম বুদ্ধিজীবী। তোমরা পাথরপূজা ও পাথরের মূর্তির জন্যে যা করে থাকো, সবই ধোঁকা। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি কি এটাকে দীন বলে বিশ্বাস করতে পারে? আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও তাঁর প্রেরিত রাসূল।'

উমায়ের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মক্কায় এসে আল্লাহর পথে মক্কাবাসীকে দাওয়াত দিতে আরম্ভ করলেন। তাঁর হাতে অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উমায়ের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে উত্তম পুরস্কার দান করুন এবং তাঁর কবর নূর দ্বারা আলোকিত করুন। আমীন।

টিকাঃ
১. হায়াতুস সাহাবা -৪র্থ খণ্ড সূচিপত্র দ্রঃ। ২. সীরাতে ইবনে হিশাম-সূচিপত্র দ্রষ্টব্য। ৩. আল ইছাবা-৬০৬০ নং জীবনী। ৪. তাবাকাত ইবনে সা'দ-৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৪৬।

📘 সাহাবীদের আলোকিত জীবন > 📄 বারা’আ ইবনে মালেক আল আনসারী (রাঃ)

📄 বারা’আ ইবনে মালেক আল আনসারী (রাঃ)


'বারা"আ বিন মালেককে যেন কখনো মুসলিম বাহিনীর কোনো সালারের দায়িত্বে নিয়োগ না করা হয়। কেননা সে তার দ্রুতগামী পদক্ষেপ দ্বারা তাঁর বাহিনীকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিতে পারে।' -খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারুক (রা)

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একনিষ্ঠ খাদেম, জালীলুল কদর সাহাবী আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ছোট ভাই ছিলেন বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী। তিনি অত্যন্ত হালকা-পাতলা গড়নের ছিমছাম চেহারাবিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। মাথায় ছিল কোঁকড়ানো চুল। অদম্য সাহসী ও অগ্রাভিমুখী দ্রুতগামী আক্রমণে অভ্যস্ত বীর যোদ্ধা। এই যুবক সাহাবী ছিলেন। এতোই হালকা-পাতলা, দেখলে মনে হতো খুবই দুর্বল অথচ তাঁর বুদ্ধিমত্তা, অদম্য সাহসিকতা, প্রবল ঈমানী চেতনা ও অসাধারণ সমরকৌশল, যা মানুষকে তাক লাগিয়ে দিয়ে রীতিমতো ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে আছে।

এই ক্ষীণ দেহের অধিকারী বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী কেবল মল্লযুদ্ধেই শতাধিক মুশরিক যোদ্ধাকে জাহান্নামে প্রেরণ করেন। তিনি মল্লযুদ্ধ ছাড়াও সম্মুখ সমরে যে কত কাফির ও মুশরিককে জাহান্নামে পাঠিয়ে ইসলামের বিজয়কে ছিনিয়ে এনেছেন তার ইয়ত্তা নেই। যুদ্ধের দামামা তাঁর রক্তে এমন ক্ষিপ্রতা ও তেজস্বিতার সৃষ্টি করত যে, তিনি নিজ দল-বল পিছনে রেখে একাই শত্রুপক্ষের প্রাচীর ভেদ করে সম্মুখপানে দু'মুখো তলোয়ার দিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে যেতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর এই ব্যাকুল অগ্রগামিতা লক্ষ্য করে খালীফাতুল মুসলিমীন উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর প্রতি এক বিশেষ বিধি-নিষেধ আরোপ করেন। তিনি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের গভর্নরদের কাছে এই বলে ফরমান জারি করেন:

أَلَّا يُوَلُّوهُ عَلَى جَيْشِ مِنْ جُيُوشِ الْمُسْلِمِينَ، خَوْفًا مِنْ أَنْ يُهْلِكَهُمْ بِإِقْدَامِهِ".
'বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারীকে যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো বাহিনীর দায়িত্ব যেন দেওয়া না হয়। কারণ আমি আশংকা করি যে, শত্রুবাহিনীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারীর যুদ্ধ করার যে মানসিকতা রয়েছে, যার ফলে তার অধীনস্থ সমগ্র বাহিনীই শত্রু বাহিনীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সমূহ বিপদের সম্মুখীন হতে পারে।'

বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ইতিহাস সৃষ্টিকারী অসংখ্য ঘটনাবলির মধ্যে একটিমাত্র ঘটনা প্রিয় পাঠকদের খিদমতে পেশ করা হচ্ছে:

বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাহসিকতার পরিচয় ফুটে উঠে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর। যখন নবদীক্ষিত মুসলমানরা যেভাবে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেভাবেই না বুঝে দলে দলে ভণ্ডনবীদের দলে শামিল হচ্ছিল। ইসলামের এই চরম দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে আল্লাহ যাদের দৃঢ় মনোবল এবং ঈমানী মযবুতি দান করেছিলেন, শুধু তারা ব্যতীত অন্য সকলেই মুরতাদদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তায়েফ, মক্কা ও মদীনাসহ এর পার্শ্ববর্তী বিক্ষিপ্ত কিছু গোত্র ছাড়া বাকি সর্বত্রই এই ফিতনা ব্যাপকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল।

এই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইসলামের হেফাযতের জন্যে আমীরুল মুমিনীন আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে চতুর্মুখী ফিতনা মোকাবেলার যোগ্যতা ও দৃঢ়তা দান করেন। তিনি পাহাড়সম অটল হয়ে একাধারে যাকাত প্রদানে অস্বীকারকারীদের এবং ভণ্ড নবী ও তাদের অনুসারী মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করলেন। আনসার এবং মুহাজিরদের সমন্বয়ে তিনি সশস্ত্র এগারোটি বিশেষ বাহিনী তৈরী করে প্রত্যেক বাহিনীর জন্যে আলাদা আলাদা ঝাণ্ডা নির্ধারণ করলেন। ভণ্ড নবীদের সমুচিত শিক্ষা দিয়ে বিপথগামী ও ধর্মত্যাগী মুরতাদদের ইসলামে প্রত্যাবর্তনের জন্যে এসব বাহিনীকে আরব বিশ্বের চতুর্দিকে প্রেরণ করেন।

ভণ্ড নবী ও তাদের অনুসারী মুরতাদদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ছিল বনূ হানীফা সম্প্রদায়ের মুসায়লামাতুল কায্যাবের। মুসায়লামাতুল কায্যাব তার নিজস্ব গোত্র এবং সন্ধিতে আবদ্ধ সম্প্রদায়সমূহের সুদক্ষ চল্লিশ হাজার যোদ্ধার এক বিশাল বাহিনী গড়ে তুলেছিল। এই বাহিনী ইসলামের জন্য বিরাট এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যাদের অধিকাংশই ছিল সংকীর্ণ ভৌগোলিক ও বংশীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। যারা ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধের পরিবর্তে গোত্রীয় গোঁড়ামি, সংকীর্ণতা ও আঞ্চলিকতার শিকারে পরিণত হয়েছিল। তাদের মতে, অনেকের ভাষ্য ছিল:

أَشْهَدُ أَنَّ مُسَيْلَمَةَ كَذَّابٌ، وَمُحَمَّدًا صَادِقٌ ... لَكِنَّ كَذَّابَ ربيعَةَ أَحَبُّ إِلَيْنَا مِنْ صَادِقٍ مُضَر".
'আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিঃসন্দেহে মুসায়লামাতুল কায্যাব একজন ভণ্ড নবী এবং মুহাম্মদ সত্য নবী; কিন্তু আমাদের কাছে কুরাইশ বংশের সত্য নবীর চেয়ে স্বগোত্রীয় ভণ্ডনবী ও মিথ্যাবাদী মুসায়লামাতুল কায্যাবই ভালো।'

আমীরুল মু'মিনীন আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসায়লামাতুল কায্যাবের মোকাবেলা করার জন্যে আবূ জাহলের ছেলে ইকরামা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নেতৃত্বে যে বাহিনী পাঠিয়েছিলেন, প্রচণ্ড হামলার মুখে তারা পরাজিত হয়ে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়। অতঃপর আবূ বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে আনসার এবং মুহাজির সাহাবাদের মধ্যে বিশিষ্ট যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত যে বাহিনী প্রেরণ করেন, তাদের মধ্যে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুও ছিলেন।

খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ভণ্ডনবী মুসায়লামাতুল কায্যাব এবং তার অনুসারীদের সমুচিত শিক্ষা দিয়ে পুনরায় ইসলামে দীক্ষিত করার জন্যে সাহাবী যোদ্ধাদের নেতৃত্বে এই বিশেষ বাহিনী নিয়ে দ্রুতগতিতে নাজদের 'ইয়ামামা' নামক প্রান্তরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। মুহূর্তের মধ্যেই উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধ শুরুর প্রায় সাথে সাথেই মুসায়লামাতুল কায্যাবের বিশাল বাহিনী মুসলিম বাহিনীকে কাবু করে ফেলে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, সুশৃঙ্খল মুসলিম বাহিনীর পায়ের নিচের মাটি যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল। নিজেদের অবস্থান থেকে ক্রমেই তারা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছিল। এই নাজুক মুহূর্তে মুসায়লামাতুল কায্যাবের বাহিনী অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর তাঁবুতে হামলা করে তাঁবুর খুঁটি উপড়ে ফেলে। এমনকি সেখানে অবস্থানরত খালিদ বিন্ ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর স্ত্রীকে হত্যার জন্যে উদ্যত হলে মুসায়লামাতুল কায্যাব বাহিনীরই একজন যোদ্ধা জাহিলিয়াতের প্রথানুযায়ী 'যুদ্ধক্ষেত্রে শিশু ও নারীদের হত্যা করা কাপুরুষোচিত ও গর্হিত কাজ'- এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁকে নিরাপত্তা দিয়ে রক্ষা করে।

এ চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় মুসলিম যোদ্ধারা নিশ্চিত পরাজয়ের আশঙ্কায় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন। তাঁরা এ কথা মনে করছিলেন যে, মুসায়লামাতুল কায্যাবের কাছে আজ পরাজয়ের পর এই আরব বিশ্বে ইসলামের নাম উচ্চারণ করার মতো আর কোনো ব্যক্তি অবশিষ্ট থাকবে না। শিরকমুক্ত এই জাযীরাতুল আরবে তাওহীদের বাণী উচ্চারণ ও আল্লাহর ইবাদত করার জন্য আর কেউ সাহস করবে না।

সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদের নিজের তাঁবু আক্রান্ত হওয়ার পর এই চরম নাজুক মুহূর্তে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বিক্ষিপ্ত মুসলিম বাহিনীকে তৎক্ষণাৎ পুনর্গঠিত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সাথে সাথে তিনি মুহাজির, আনসার, শহরবাসী ও মরুবাসী বেদুইন যোদ্ধাদের ভিন্ন ভিন্ন রেজিমেন্টে বিভক্ত করে প্রত্যেক রেজিমেন্টের জন্যে স্বগোত্রীয় উপ-সেনাপতি ও ভিন্ন ভিন্ন ঝাণ্ডা নির্ধারণ করেন। যেন প্রত্যেক বাহিনী স্বীয় অস্তিত্বের স্বার্থেই শত্রু বাহিনীর মোকাবেলায় মরণপণ চেষ্টা চালায় এবং কোন্ সেক্টর থেকে দুর্বলতা প্রকাশ পায় তাও চিহ্নিত করা সহজ হয়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই উভয় বাহিনীর মাঝে পুনরায় প্রচন্ড যুদ্ধ বেধে গেল। ভয়াবহ সে যুদ্ধ! মুসলিম যোদ্ধারা এর পূর্বে এমন মারাত্মক কোনো সংঘর্ষ কখনও প্রত্যক্ষ করেননি। এবার বীর বিক্রমে মুসলিম বাহিনী শত্রুবাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা মুসায়লামাতুল কায্যাব বাহিনীর যোদ্ধাদের ধরাশায়ী করে ইয়ামামার ময়দান লাশের স্তূপে পরিণত করে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। অপরপক্ষে, মুসায়লামাতুল কায্যাবের বাহিনী তাদের এই মারাত্মক ক্ষয়-ক্ষতি প্রত্যক্ষ করেও যুদ্ধ ময়দানে তখনও পাহাড়ের মতো অটল হয়ে মুসলমানদের মোকাবেলা অব্যাহত রাখল। মুসলিম যোদ্ধারা ঈমানী চেতনায় বলীয়ান হয়ে যুদ্ধের ক্ষিপ্রতাকে আরও তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলছিল।

ছাবিত বিন্ কায়েস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসলিম যোদ্ধাদের মধ্যে আনসার বাহিনীর ঝাণ্ডাবরদার (পতাকাবাহক) ছিলেন। তিনি যুদ্ধের এই তীব্রতা লক্ষ্য করে তার পরিচালিত বাহিনীর এই ঝাণ্ডাকে পিছনে সরিয়ে নিতে হতে পারে, তা আঁচ করে তৎক্ষণাৎ যুদ্ধ ময়দানে তাঁর দু'পায়ের হাঁটু পর্যন্ত মাটির নিচে গেড়ে ফেললেন। মুহূর্তেই শত্রু সৈন্যরা তার বহনকৃত ঝাণ্ডাকে ভুলুণ্ঠিত করার জন্যে তার ওপর আঘাত হানতে শুরু করল। তিনি একহাতে ঝাণ্ডাকে সমুন্নত রেখে অন্যহাতে তরবারি চালনা করে এ আক্রমণ প্রতিহত করতে করতে এক পর্যায়ে দুশমনের তরবারির আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

যুদ্ধের এই তীব্রতা ও প্রচণ্ডতার মাঝে মুহাজির বাহিনীর মধ্য হতে আমিরুল মু'মিনীন উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ভাই যায়েদ ইবনুল খাত্তাব দুশমনের উপর আরও তীব্র গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে মোহাজিরদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলছিলেন:

أَيُّهَا النَّاسُ عَضُّوا عَلَى أَضْرَاسِكُمْ ، وَاضْرِبُوا فِي عَدُوِّكُمْ وَامْضُوا قُدُمًا ... أَيُّهَا النَّاسُ وَاللَّهِ، لَا أَتَكَلَّمُ بَعْدَ هَذِهِ الْكَلِمَةِ أَبَدًا حَتَّى يُهْزَمَ مُسَلَمَةُ أَوْ أَلْقَى اللَّهَ فَأُدْلِي إِلَيْهِ بحجتِي....
'হে মুসলিম যোদ্ধারা! আরও ক্ষীপ্র গতিতে আঘাত হানো, সম্মুখপানে অগ্রসর হও, শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ো, হে যোদ্ধারা জেনে রাখো, এটাই তোমাদের প্রতি আমার শেষ আহ্বান। হয় আজ মুসায়লামাতুল কায্যাবকে নিশ্চিহ্ন করবো অথবা শহীদ হয়ে আল্লাহর দরবারে পৌঁছে নিজের অপারগতা পেশ করবো।'

এ আহ্বানের সাথে সাথেই সমস্ত মুসলিম মুজাহিদ নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শত্রুবাহিনীর উপর প্রচণ্ড আঘাত হানতে শুরু করল। যায়েদ বিন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দু'হাতে তরবারি চালাতে চালাতে ক্ষীপ্রগতিতে দুশমনদের মাঝে ঢুকে পড়লেন। অসংখ্য মুরতাদদের ধরাশায়ী করার এক পর্যায়ে শত্রুর আঘাতে তিনি শাহাদাতের কোলে ঢলে পড়ে তার কৃত ওয়াদাকে বাস্তবে প্রমাণিত করেন।

আবূ হুযায়ফার কৃতদাস সালেম রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর উপর মুহাজির বাহিনীর ঝাণ্ডা বহন করার দায়িত্ব অর্পিত হয়। মুহাজিরদের অনেকেই তার প্রতি আশঙ্কা পোষণ করছিলেন যে, যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে তিনি সন্ত্রস্তবোধ করবেন। তারা তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন:

'আমরা আশঙ্কা করছি যে, তুমি যুদ্ধের প্রচণ্ডতায় ভীত হয়ে পশ্চাদপসরণ না করে বসো।' এবং এই সুযোগে শত্রুবাহিনী আমাদের ভিতরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা না করুক।

প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন:
'আমি যদি এ যুদ্ধে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করি তাহলে আমার চেয়ে নিকৃষ্টতম হাফেযে কুরআন আর কে হতে পারে?'

অতঃপর তিনি বীর বিক্রমে দুশমনদের প্রতি আঘাত হানতে হানতে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। মুরতাদদের তরবারির আঘাতের পর আঘাতে তার গোটা শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়; কিন্তু এতদসত্ত্বেও তিনি ইসলামের ঝাণ্ডাকে এক মুহূর্তের জন্যে ভূলুণ্ঠিত হতে দেননি।

কিন্তু এ যুদ্ধে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর বীরত্বের কাছে এসব ঘটনা একেবারে নগণ্য বলে মনে হবে। খালিদ বিন্ ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উভয় পক্ষের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের এই প্রচণ্ডতার মধ্যে চূড়ান্ত আঘাতের মাধ্যমে ইসলামের বিজয় ছিনিয়ে আনার জন্যে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে উদ্দেশ্য করে বলেন:

'দুশমনদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ো হে আনসার যুবক ....'।

খালিদ ইবনে ওয়ালিদের এই নির্দেশ পেয়ে বারা'আ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁর বাহিনীর যোদ্ধাদের প্রতি লক্ষ্য করে বলেন:

يَا مَعْشَرَ الْأَنْصَارِ لَا يُفَكِّرَنَّ أَحَدُ مِنْكُمْ بِالرُّجُوعِ إِلَى الْمَدِينَةِ فَلَا مَدِينَةَ لَكُمْ بَعْدَ الْيَوْمِ ... وَإِنَّمَا هُوَ اللَّهُ وَحْدَهُ ... ثُمَّ الْجَنَّةُ .
'হে আনসার ভাইয়েরা! কখনো আপনারা মদীনায় ফিরে যাওয়ার চিন্তা করবেন না। এ মুহূর্ত হতেই আপনাদের জন্যে আর মদীনা নয়; আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে তাওহীদের বাণীকে চিরসমুন্নত করে জান্নাতের দিকে অগ্রসর হোন।'

এই বলে তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে শত্রু বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বারা'আ ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দক্ষতার সাথে দু'ধারী তরবারি চালিয়ে তাঁর দু'পার্শ্বের দুশমনদের ধরাশায়ী করে সম্মুখে অগ্রসর হতে লাগলেন। মুসায়লামাতুল কায্যাবের যোদ্ধাদের শিরশ্ছেদ করতে করতে তিনি এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। এ আঘাতে মুসায়লামাতুল কায্যাব ও তাঁর বাহিনীর মধ্যে হঠাৎ ভীতি ও ত্রাসের সৃষ্টি হলো। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা যুদ্ধ ময়দান সংলগ্ন বাগানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলো। যে বাগানটি পরবর্তী সময়ে অগণিত মৃতদেহের স্তূপের কারণে 'হাদীকাতুল মাউত' বা 'লাশের বাগান' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নানাবিধ ক্ষয়-ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে বাগানটি উচু ও প্রশস্ত দুর্ভেদ্য প্রাচীর দিয়ে বেষ্টিত ছিল। যুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে প্রাণ রক্ষার জন্যে মুসায়লামাতুল কায্যাব ও তাঁর অনুসারী যোদ্ধারা এ বাগানে আশ্রয় নিয়ে দ্রুত এর একমাত্র গেটটি বন্ধ করে দেয়। এভাবে নিজেরা নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে তার ভিতর থেকে মুসলমান বাহিনীর উপর বৃষ্টির মতো তীর বর্ষণ শুরু করে। এতে মুসলমানদের নিশ্চিত বিজয় আবার অনিশ্চয়তার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। মুসলিম যোদ্ধাদের পক্ষে তাদের মোকাবেলা করার সমস্ত পথ যেন রুদ্ধ হয়ে আসে। এ অবস্থায় মুসলিম বাহিনীর অন্যতম বীর সিপাহসালার বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তনের মাধ্যমে শত্রুদের প্রতি এক চরম ও শেষ আঘাত হানার জন্যে পরিকল্পনা নেন। তিনি তৎক্ষণাৎ একটি ঢাল সংগ্রহ করে তাঁর বাহিনীর লোকদের উদ্দেশ্য করে বললেন:

'আমি এ ঢালের উপরে বসে পড়ি, তোমরা আমাকে উঁচুতে উঠিয়ে ১০/১২টি বর্শা ফলকের সাহায্যে উপরে তুলে এ গেটের ভিতরে নিক্ষেপ কর। হয় আমি দুশমনদের হাতে শহীদ হয়ে যাবো অথবা ভিতরে গিয়ে তোমাদের জন্যে এ বাগানের গেট খুলে দেব।'

দেখতে না দেখতেই বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উন্মুক্ত তরবারি হাতে তার ঢালটির উপর বসে পড়লেন। অত্যন্ত হালকা-পাতলা ও ছিপ ছিপে আনসার যুবক বারা'আকে কয়েকজনে খুব সহজেই ঢালে বসিয়ে মাথার উপর তুলে নিলেন এবং সাথে সাথে অন্য কয়েকজন বর্শাধারী তাদের বর্শা ফলকে তাকে উপরে তুলে গেটের ভিতরে মুসায়লামাতুল কায্যাবের হাজার হাজার অনুগত যোদ্ধার মাঝে সজোরে নিক্ষেপ করলেন। বারা'আ অপ্রত্যাশিতভাবে তাদের মাঝে বজ্রপাতের ন্যায় লাফিয়ে পড়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতিতে গেট রক্ষী বাহিনীর উপর আক্রমণ শুরু করলেন। অন্যদিকে মুসায়লামাতুল কায্যাবের দুর্ধর্ষ সৈন্যরা চতুর্দিক থেকে ভিমরুলের মতো তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তলোয়ার, বর্শা আর খঞ্জরের আঘাতে তারা তাঁর গোটা দেহকেও ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলল; কিন্তু বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাদের গেটরক্ষী বেষ্টনির দশজনকে হত্যা করে পরিশেষে গেট খুলে দিতে সমর্থ হলেন।

এদিকে সাথে সাথে অপেক্ষমাণ বীর মুসলিম যোদ্ধারা 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে বাঁধভাঙা স্রোতের মতো ভিতরে ঢুকতে শুরু করলেন। যা ছিল এক নজীরবিহীন ভয়াল চিত্র! মুহূর্তেই উভয়পক্ষের মধ্যে পুনরায় ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। মুসলমানদের প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে মুসায়লামাতুল কায্যাবের বাহিনী প্রাণ ভয়ে দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে লাগল আর মুসলিম যোদ্ধারা এ সুযোগে তাদেরকে দলে দলে নিঃশেষ করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত সেখানে মুসায়লামাতুল কায্যাবের অবশিষ্ট বিশ হাজার সৈন্যের কবর রচনা করে তার দেহরক্ষী বাহিনীসহ তাকে ঘিরে ফেলে সবাইকে জাহান্নামের অতল গহবরে নিক্ষেপ করা হলো। সমস্ত বাগান বিশ হাজার মুরতাদের লাশের স্তূপে পরিণত হয়ে গেল।

অন্যদিকে এই দুঃসাহসী বীর যোদ্ধা বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, যিনি এ গেট খুলতে গিয়ে আশিটির অধিক তীর, বর্ষা ও তরবারির আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিলেন, তাঁকে বিশেষ চিকিৎসার জন্যে চিকিৎসা তাঁবুতে প্রেরণ করা হলো। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দীর্ঘ এক মাস ধরে নিজে বারা'আ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর খিদমতে নিয়োজিত থাকলেন। ধীরে ধীরে বারা'আ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু সুস্থ হয়ে উঠলেন। তাঁর এই মহান ত্যাগ, এবং কুরবানীর বদৌলতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁরই হাতে মুসলমানদের এ যুদ্ধে বিজয় দান করে জাযীরাতুল আরবকে চিরদিনের জন্যে ভণ্ডনবী ও মুরতাদদের হাত থেকে পবিত্র করলেন।

মুসায়লামাতুল কায্যাব বাহিনীর সাথে ইয়ামামার প্রান্তরে 'হাদীকাতুল মাউতের' রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শাহাদাতের মৃত্যুর গৌরব থেকে মাহরুম হয়ে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু শাহাদাতের তামান্নায় পরবর্তীতে একের পর এক সকল যুদ্ধে বীরত্বের সাথে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর জীবনের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা যে, তিনি যেন শাহাদাতের মৃত্যুর মাধ্যমে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে জান্নাতে মিলিত হতে পারেন।

সর্বশেষে তিনি পারস্য সাম্রাজ্যের সাথে মুসলমানদের 'তুস-তর' কেল্লা বিজয়ের জিহাদে অংশ গ্রহণ করেন। সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের এক পর্যায়ে পারস্য সৈন্যরা দুর্ভেদ্য 'তুস-তর' কেল্লায় আশ্রয় নিয়ে ভিতর থেকে এর বিশাল গেটটি বন্ধ করে দেয়। মুসলিম যোদ্ধারা এই কেল্লার চারপার্শে অবস্থান নিয়ে কেল্লাটিকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ধীরে ধীরে সব রসদ ও সরঞ্জামাদি নিঃশেষ হয়ে আসলে পারস্য বাহিনী জীবন রক্ষার লড়াইয়ে এক ধ্বংসাত্মক কৌশল অবলম্বন করে। তারা লম্বা শিকলের মাথায় মাছ ধরা বড়সির মতো লৌহ নির্মিত বড় বড় আংটাগুচ্ছ আগুনে পুড়িয়ে লাল করে নেয়। কেল্লার উপর থেকে মুসলমানদের উপরে তা নিক্ষেপ করে। প্রাচীর টপকে ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করা মাত্রই তাতে আটকিয়ে যাওয়া মুসলিম যোদ্ধাদের ক্রেনের মতো উপরে টেনে তুলে নিতে শুরু করে। এভাবে বেশ ক'জন মুসলিম যোদ্ধা আগুনে পোড়ানো আংটার নির্মম শিকারে পরিণত হন। অকস্মাৎ একটি আংটাগুচ্ছ বারা'আ বিন্ মালেকের বড় ভাই আনাস বিন্ মালেক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দেহে বিঁধে তাকে তুলে নিতে শুরু করে। বারা'আ বিন মালেক আল আনসারী কালবিলম্ব না করে এক লাফে এক হাতে শিকলটিকে ধরে ফেলে, ঝুলন্ত অবস্থায় অন্য হাতে আনাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শরীরে বিদ্ধ গরম আংটা খুলতে শুরু করেন। লাল টকটকে পোড়া আংটার দাহে তাঁর হাতের গোশ্ত পুড়ে ধোয়া বের হতে লাগলো। কিন্তু তিনি তাঁর আক্রান্ত হাতের অসহ্য কষ্টের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে আনাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে আংটার হাত থেকে ছাড়ানোমাত্রই এক লাফে নীচে নেমে আসেন। তখন তাঁর পোড়া হাতে শুধু হাড়গুলো ছাড়া আর কোনো গোস্ত অবশিষ্ট ছিল না।

এই 'তুস-তর' কেল্লা বিজয়ের যুদ্ধে তিনি আল্লাহর দরবারে শাহাদাতের জন্যে দু'আ করেছিলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর এই দু'আ কবুল করে নেন। এ যুদ্ধেরই এক পর্যায়ে তিনি শত্রুর তরবারির আঘাতে শাহাদাতের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বহু আকাঙ্ক্ষিত শাহাদাতের মাধ্যমে তিনি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সান্নিধ্যের পথ রচনা করে পরবর্তী উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্যে প্রেরণা সৃষ্টি করে যান।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জান্নাতে বারা'আ ইবনে মালেক আল আনসারীর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করুন ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দর্শনে তার চক্ষুদ্বয় শীতল করুন, ইসলামের খিদমতের জন্যে আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন। আমীন।

টিকাঃ
১. আল ইসাবা, ৬২০ নং জীবনী। ২. আল ইসতিয়াব বি হামেশে আল ইছাবা, ১ম খণ্ড, ১৩৭ পৃ.। ৩. আত্ তাবাকাতুল কুবরা, ৩য় খণ্ড, ৪৪১ পৃষ্ঠা, ৭ম খণ্ড, ১৭ পৃষ্ঠা এবং ১৩১ পৃ.। ৪. তারিখ আত্ তাবারী, ১০ম খণ্ডের সূচী দ্রষ্টব্য। ৫. আল কামিল ফিত্ তারিখ, সূচি দ্রষ্টব্য। ৬. আস সিরাতু আন্ নববীয়‍্যাহ, ইবনি হিশাম, সূচি দ্রষ্টব্য। ৭. হায়াতুস সাহাবা, ৪র্থ খণ্ড, সূচী দ্রষ্টব্য। ৮. কা'দাতু ফাতহু ফারেছ-লশিত খাত্তাব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00